Monday, June 15, 2015

আদালতের অনুমতি ছাড়াই দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়লেন বশির

ওমর আল বশির
আদালতের অনুমতি ছাড়াই দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়েছেন সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশির। দেশটির স্থানীয় গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে আজ সোমবার বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিবিসি অনলাইনের খবরে জানানো হয়, প্রেসিডেন্ট বশিরকে বহনকারী বিমানটি সুদানের রাজধানী খার্তুমে পৌঁছালে এ ব্যাপারে সংবাদ সম্মেলন করা হবে।
গতকাল দক্ষিণ আফ্রিকার একটি আদালত প্রেসিডেন্ট বশিরের সে দেশ ত্যাগ নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী আদেশ দেন। আফ্রিকান ইউনিয়নের (এইউ) সম্মেলনে যোগ দিতে যাওয়া বশিরকে গ্রেপ্তারের জন্য এর আগেই দক্ষিণ আফ্রিকাকে আহ্বান জানিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)।
প্রেসিডেন্ট বশিরের বিরুদ্ধে সুদানের দারফুরে সংঘটিত সহিংসতার সূত্রে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে। তাঁকে গ্রেপ্তার করার আবেদন করে আইসিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, তাঁকে গ্রেপ্তার করতে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘কোনো চেষ্টাই উপেক্ষা করা উচিত নয়’।
এই প্রেক্ষাপটে জোহানেসবার্গের একটি আদালত বলেন, বশিরকে দ্য হেগে আইসিসির কাছে তুলে দেওয়ার আবেদন গৃহীত হবে কি না, তার শুনানি না হওয়া পর্যন্ত তিনি সে দেশ ছাড়তে পারবেন না। গতকালই এ শুনানি হওয়ার কথা। সুদানের সুনা বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়, দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রেসিডেন্ট বশিরের সঙ্গে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং শীর্ষস্থানীয় সরকারি কর্মকর্তারা আছেন।
আফ্রিকান ইউনিয়নের অভিযোগ, পক্ষপাতমূলকভাবে, বিশেষ করে এই মহাদেশের কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং অন্যান্য ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ নিয়ে এইউ এবং আইসিসির মধ্যে উত্তেজনা চলছে। এর আগে এইউ ক্ষমতাসীন রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানদের বিরুদ্ধে বিচারকাজ শুরু না করতে আইসিসির প্রতি আবেদন করেছিল।
আইসিসির নিজস্ব কোনো পুলিশ বাহিনী নেই। আদেশ পালনের জন্য তাদের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ওপরই নির্ভর করতে হয়। রোম সংবিধি অনুসারে গঠিত আইসিসি। এতে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের দেশে বশির পা ফেলামাত্র তাঁকে গ্রেপ্তারে বাধ্য। তবে এমনটা না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও আইসিসির প্রেসিডেন্ট সিদিকি কাবা এই বলে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকা বশিরকে গ্রেপ্তার না করলে এর ফল খুব খারাপ হবে।
প্রেসিডেন্ট বশিরের বিরুদ্ধে আইসিসির সমন জারির পর তাঁর বিদেশ ভ্রমণ নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়। তিনি আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বন্ধুভাবাপন্ন দেশছাড়া অন্য কোথাও যান না। তবে বরাবর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন তিনি।
বশির কীভাবে গেলেন, জানাতে হবে সাত দিনে
সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশিরকে দেশ ত্যাগ করতে না দেওয়া-সংক্রান্ত আদেশ কেন পালন করা হলো না—গত সোমবার দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের কাছে তা জানতে চেয়েছেন দেশটির একটি আদালত। এর জবাব দিতে সরকারকে এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে। খবর এএফপির।
আফ্রিকান ইউনিয়নের (এইউ) দুই দিনের সম্মেলনে যোগ দিতে গত রোববার দক্ষিণ আফ্রিকা যান বশির। সম্মেলন শেষ হওয়ার আগেই সোমবার তিনি দেশটি ত্যাগ করে নিজ দেশে ফিরে যান। এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) দারফুরে সংঘটিত যুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত বশিরকে গ্রেপ্তার করতে দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। এর সূত্র ধরে দেশটির আদালত বশিরকে দেশ ত্যাগ না করতে নির্দেশ দেন। তবে সোমবার বশিরকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না, সে বিষয়ে আদেশ দিতে আদালত বসার আগেই দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়েন সুদানের প্রেসিডেন্ট। বশির চলে যাওয়ায় আদালত সরকারের সমালোচনা করেন এবং বশির কীভাবে চলে গেলেন, তা জানতে চান।

কূলদীপ নায়ারের চোখে মোদির ঢাকা সফর

ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সাবেক কূটনীতিক কূলদীপ নায়ার। ভারতের দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় তিনি বিশ্লেষণ করেছেন নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর। তার লেখার বাংলা অনুবাদ নিম্নরূপ-
ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরটি হয়েছে অসময়ে। দেখে মনে হয়েছিল তিনি যেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পড়তি ইমেজ ঠেকাতে গিয়েছিলেন বাংলাদেশে। তিনি সেখানে কেবল ভারতবিরোধী অনুভূতিকেই আরও তীব্রতর করে তুলেছেন। কেননা, নয়া দিল্লিকে নিরপেক্ষ হিসেবে মনে হয়নি।
আমি জানি না কেন, এবং কতদিন ধরে আমাদের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনকে সমর্থন দিয়ে যেতে হবে। এটা সত্য যে, তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। শেখ মুজিব পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করেছেন। কিন্তু এ পরিচয়ের কারণেই হাসিনা সংবিধান ও প্রচলিত নিয়মনীতিকে অবজ্ঞা করার অধিকার পেতে পারেন না।
একটি উদাহরণ দেখুন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। শাসক দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পক্ষে ব্যাপক হারে বাক্সে ব্যালট পেপার ঢোকানো হয়েছে। ভোটার ও অন্যদের কাছে চিত্রটি ভয়াবহ হয়ে ধরা দেয়। শেখ মুজিব নিশ্চিতভাবে তার কবরে ঘুমিয়ে পড়ছেন। তিনি রাওয়ালপিন্ডির সামরিক জান্তা শাসকদের বিরুদ্ধে মানুষের আত্মপ্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ক্রমবর্ধমান মৌলবাদী প্রভাবের বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ অক্ষকে শক্তি জুগিয়েছে ঢাকায় মোদির সফর। কিন্তু হাসিনা এরপরও নিজের জন্য কোন না কোন উপায় খুঁজে বের করতেনই। প্রকৃতপক্ষে, যে দাম্ভিক উপায়ে নিজের চারপাশের ভিন্নমত তিনি দমন করেছেন, তাতে তার ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে সন্দেহ জন্মে। মুক্ত রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক পথে শাসনের প্রতি কি তার কখনই দৃঢ় আস্থা ছিল?
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হচ্ছে, তিনি যে উপায়ে বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল হোসেনকে অপদস্থ করেছেন, সেটি। কামাল হোসেন তার বাবা শেখ মুজিবের একজন সহকর্মী। সারা জীবন ধরে নীতি আঁকড়ে থাকার কারণে তিনি একজন কিংবদন্তি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নির্বাচন বর্জন করাটা ছিল একটি হঠকারী কাজ। তবে এটিও সত্য যে, হাসিনা এটি পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, নির্বাচনে জেতার জন্য তিনি যে কোন কিছু করতে পারেন। তারপরও, বিএনপি যদি অংশগ্রহণ করতো, তাহলে এর সামান্য কয়েকজন প্রার্থী হলেও জিতে আসতো। এর ফলে মানুষের সামনে হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতা তারা করতে পারতো।
নিঃসন্দেহে, সাধারণ নির্বাচন শাসকদের ভাগ্য নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কেননা, এর মাধ্যমে যাচাই করা যেত, নির্বাচনী প্রচারাভিযানে যেসব প্রতিশ্রুতি শাসক দল দিয়েছে, তা তারা পূরণ করতে পেরেছে কিনা।
ভারত অনেক ভাগ্যবান। কারণ, যেভাবে প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু দেশকে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ করে গেছেন, তা এখনও কায়মনোবাক্যে অনুসরণ করা হয়। কিন্তু তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী গণতন্ত্রকে কক্ষচ্যুত করেছিলেন। তিনি কেবল গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধই করেননি, অনেক মৌলিক অধিকারকেও বাতিল করেছিলেন। কিন্তু মানুষ বিষয়গুলোকে ভালভাবে নেয়নি। নির্বাচনে মানুষ নিজেদের দমিত ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছিল। এটা অভাবনীয় ছিল যে, এমনকি মহান ইন্দিরা গান্ধীও পরাজিত হতে পারেন!
১৯৮০ সালের দিকে পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর তিনি স্রেফ দায়িত্ব পালনকারী আমলাদেরও শাস্তি দেয়ার পথ বের করে নিয়েছিলেন। এটা দুঃখজনক যে, পূর্বের জনতা সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিল বলে যাকেই সন্দেহ করেছিলেন তিনি, তার বিরুদ্ধেই প্রতিশোধ নেয়া হয়েছিল। জরুরি অবস্থার রচয়িতা ভারতের কংগ্রেস পার্টি শেষ পর্যন্ত শিক্ষা পেয়েছিল। দলটি নিজেদের কুকর্ম নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছে। কিন্তু দলটি জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছে তা দেখাই আমার স্বপ্ন। কারণ, দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে বড় ধরণের পার্থক্য রয়েছে।
শাসনের প্রতি গণমানুষের কিছু একটা বলার অধিকার থেকে জন্ম নেয় বাংলাদেশ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশটি মত প্রকাশের প্রাণশক্তি হারিয়েছে। অথচ এটি এক সময় এ জাতির ছিল। এটিই স্বয়ং একটি অবনমন। কিন্তু এটা আরও মর্মভেদী একটি বিষয় যে, এ পরিবর্তনটা করছে এমন এক পরিবার, যারা পশ্চিম পাকিস্তানের নিষ্ঠুরতা থেকে জাতিকে মুক্ত করেছিল।
এর জন্য হাসিনা ছাড়া কাউকে দায়ী করার নেই। তিনি নিজেই গণতন্ত্রের অগ্নিশিখাকে নিভিয়ে ফেলছেন। শেখ মুজিবের কন্যা এমনটি করছেন- এটা কেবল হতাশাজনকই নয়, অপ্রতিভ একটি বিষয়। তিনি জাতিকে শিকল পরাতে পারেন, এমন ভাবনাটাও যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু এটা হতে পারে। কেননা, তিনি সঠিক ও ভুল এবং নৈতিক ও অনৈতিকের মধ্যের রেখাটি মুছে ফেলেছেন।
হাসিনা স্বৈরশাসকের প্রতিচ্ছবির প্রতিনিধিত্ব করছেন। এ অবস্থার মধ্যে মোদির সফরটি ছিল সম্পূর্ণ দুর্ভাগ্যজনক। তার উচিত ছিল বাংলাদেশের কোথাও বলা যে, এ দেশটি বিপ্লব থেকে সৃষ্ট। তাই দেশটির উচিত সে ধরনের ভাবনার দীপ্তি ছড়ানো অব্যাহত রাখা। কিন্তু তিনি বরং হাসিনাকে আশ্বস্ত করার পথ বেছে নিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষ হতাশ। কেননা, মানুষ তার কাছে এমন কিছু লক্ষণ প্রত্যাশা করছিল, যাতে মনে হয়, হাসিনা যেভাবে দেশ চালাচ্ছেন, তাতে ভারত খুশি নয়। 
এটা সত্য যে, মোদি ছিটমহল বিনিময়ের ব্যাপারে দীর্ঘদিনের ঝুলন্ত একটি চুক্তি বাস্তবায়নে সক্ষম হয়েছেন। এ চুক্তিটি নিয়ে যখন সংসদে আলোচনা করা হয়, তখন এর পক্ষে সব দলের সমর্থন ছিল। তবে অবশ্যই, চুক্তিটি বাস্তবায়নের কৃতিত্ব তার। পাশাপাশি উপকারী ও চমৎকার প্রতিবেশীর সঙ্গে চুক্তিটিতে সমর্থন দেয়ায় সব রাজনৈতিক দলকে ধন্যবাদ দেয়া উচিত ছিল তার। তার জন্য ‘বার্লিন ওয়াল’ পতনের কৃতিত্ব নেয়াটা অভদ্রতাসুলভ।
মোদি পাকিস্তানের সমালোচনা থেকে দূরে থাকবেন, এটাই আমি প্রত্যাশা করি। এর মানে এই নয় যে, সমালোচনাটা অযৌক্তিক। কিন্তু তিনি যখন বিদেশের মাটিতে দক্ষিণ এশিয়ায় সৌহার্দ্যরে কথা বলছেন, তখন ইসলামাবাদকে সমালোচনা করা এড়িয়ে যাওয়া উচিত ছিল। তার উপলব্ধি করা উচিত, যেমনটি তার পূর্বসূরিরা করেছেন, একদিন অবশ্যই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ বাজার থাকবে। একদিন ব্যবসা-বাণিজ্য ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে তারা একে অপরের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে।
বাংলাদেশের মানুষ তিস্তার পানি নিয়ে একটি চুক্তির প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের মন্তব্যটি সহায়ক ছিল না। কারণ, মোদির ঢাকা যাত্রা শুরুর আগেই সুষমা জানিয়ে দেন, সফরের আলোচ্যসূচিতে তিস্তা নেই। প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সফরে অংশ নেয়াটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এ থেকে ঢাকার ইঙ্গিত পাওয়া উচিত যে, তিস্তা সমস্যার সমাধানের বিষয়টি নয়া দিল্লি গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে। মোদির সফরে যেহেতু চুক্তিটি হয়নি, এর মানে এটি ধরে নেয়া উচিত নয় যে, ভারত নিজের অবস্থান বদলাতে রাজি নয়। প্রকৃতপক্ষে, মোদির সফর থেকে ঢাকার এ বার্তা নেয়া উচিত, প্রক্রিয়া যেহেতু শুরু হয়েছে, সমাধান হতে হয়তো আরও কিছুটা সময় লাগবে।

মোদির ‘ঐতিহাসিক’ সফর by মিজানুর রহমান খান

নরেন্দ্র মোদির সফরকে শেখ হাসিনা বলেছেন ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’। ভারতীয় কর্মকর্তাদের কথায়, এই সফর ‘অত্যন্ত ঐতিহাসিক’। পানিসম্পদ প্রশ্নে মোদি আমাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করেছেন। বলেছেন যে ‘বিরোধ নয়, আমাদের নদী হওয়া উচিত আমাদের সম্পর্ক প্রতিপালনের উৎস।’ সামনের দিনগুলোতে ভারতীয় সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়টি আমরা প্রধানত বুঝব নদী প্রতিপালনের ভিত্তিতে। মোদির কথায়, ‘পানি ভাগাভাগি সবার ওপরে একটি মানবিক বিষয়। এটা সীমান্তের উভয় পাশের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করে।’ এটা করে বলেই আন্তর্জাতিক নদী আইনে ‘ন্যায্য’ কথাটি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এটা দুঃখের বিষয় যে তিস্তার ‘ন্যায্য সমাধানের’ নির্দিষ্ট সময়সীমা তিনি দেননি। বরং ‘তিস্তা ও ফেনী নদী’ প্রশ্নে ‘রাজ্য সরকারগুলোর’ সমর্থননির্ভরতার কথা খোলাখুলি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
শেখ হাসিনা ব্যারাজের প্রস্তাব দিলে মোদি তা পরীক্ষার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি নিশ্চয় ৪৬ বছর আগে ফিরবেন না। ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে দিল্লিতে দুই দেশের সচিব পর্যায়ের আলোচনায় গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণ করলে ভারতীয় ভূখণ্ডের কী ক্ষতি হবে, তা চিহ্নিত করতে ভারত একটি যৌথ সমীক্ষার প্রস্তাব দিয়েছিল। পাকিস্তান তা মেনে নিয়েছিল। ভারতও পাকিস্তানি বিশেষজ্ঞদের তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প পরিদর্শন করতে দিতে সম্মত হয়েছিল। সুতরাং পানি ভাগাভাগি খুবই পুরোনো অমীমাংসিত প্রশ্ন। বিজেপি শাসনামলে পানির প্রশ্নে সিদ্ধান্ত হয়নি।
জনসংঘের নেতা অটল বিহারি বাজপেয়িকে দেওয়া সম্মাননা মোদির হাতে তুলে দেওয়া সত্যি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। হিন্দু মৌলবাদী দল জনসংঘ, যা পরে বিজেপিতে রূপান্তরিত হয়, সেই দলটি কিন্তু বাংলাদেশ প্রশ্নে গোড়া থেকেই ইন্দিরা গান্ধীর পাশে দাঁড়ায়। একাত্তরে প্রকাশিত জনসংঘের মুখপত্র তার সাক্ষ্য দেবে। বাজপেয়ি তখন ইন্দিরাকে ‘দুর্গা দেবী’ বলে প্রশংসা করেছিলেন। এক পাকিস্তান ভেঙে ‘দুটি পাকিস্তান’ করা নিয়ে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের একাংশ তখন দ্বিধান্বিত ছিল। তাই বাংলাদেশের সঙ্গে নাড়ির সম্পর্ক মানেই যে কংগ্রেস নয়, তাতে যে মোদির দল বিজেপিরও ভূমিকা রয়েছে, তা প্রথম পাদপ্রদীপে এল। এখন তিস্তাসহ গঙ্গা চুক্তি পর্যালোচনার মতো বিষয় দুই দেশ নতুন উদ্যমে শুরু করতে পারে। অনতিবিলম্বে তিস্তা চুক্তি মোদির জন্য অগ্নিপরীক্ষা।
মোদির বহুল আলোচিত সফর, যাতে ভারত আরও বেশি সন্তুষ্ট, তার রেশ ধরে রাখাটাই মুখ্য চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সত্যিই ‘নতুন উচ্চতায়’ উঠছে কি না, তার মাপকাঠি হবে জনগণের আবেগ। এতে যাতে আঘাত না লাগে, তাদের মধ্যে বঞ্চনার বোধ যাতে না আসে। কানেক্টিভিটি কত ভালো, সেটা যেমন শেখ হাসিনা অকপটে বলেন; গঙ্গা ব্যারেজ কত ভালো, এখন সেটা তেমনি মোদির কণ্ঠে শুনতে চাই। ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব’—শুধু এমন কিছুর উচ্চারণই দুই দেশের সম্পর্কের গুণগত স্থায়ী পরিবর্তনের নির্দেশক হতে পারে।
১৯৬৫ সালের আগের অবস্থায়, অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যে রেল, নৌ ও সড়কপথের যোগাযোগকে পুনরুজ্জীবিত করতে ভারতের একটি বিশেষ আগ্রহ আমরা দেখতে পাচ্ছি। একে স্বাগত জানাই। ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট, সমুদ্রবন্দর ব্যবহারসহ আরও অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক সহযোগিতা বাড়তে থাকুক, একই সঙ্গে অভিন্ন পানিসম্পদ ব্যবহারের উন্নয়নও সমানতালে হতে হবে। আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহারে দিল্লির মনোভাব বদলাচ্ছে কি না, সেটা এখনো অস্পষ্ট। লক্ষণীয় যে বাংলাদেশের উদ্বেগের কারণে নয়, টিপাইমুখ প্রকল্প ‘বর্তমান রূপে’ না করার যুক্তি হিসেবে নির্দিষ্টভাবে ভারতের ‘সংবিধিবদ্ধ প্রয়োজনের’ কথা বলা হয়েছে। আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প, মানে এক নদীর পানি অন্য নদীতে টেনে নিয়ে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা, এর ফলে নিম্ন অববাহিকার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বিরাট ক্ষতির আশঙ্কা রয়ে গেছে। যৌথ ঘোষণায় যদিও কেতাদুরস্ত কূটনৈতিক রীতিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের জন্য প্রতিকূল হয় এমনভাবে তারা নদী সংযোগ করবে না’, কিন্তু নদী সংযোগের ধারণাই ক্ষতিকর। ভারতে কার্যকর নদী সংযোগ প্রকল্প পানি চুক্তি অকার্যকর করে দিতে পারে।
ইন্দিরাপুত্র সঞ্জয় গান্ধীর স্ত্রী মানেকা গান্ধী¦, মোদি যাঁকে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী করেছেন, তিনি¦ বলেছেন, ‘ভারতের নদী সংযোগ প্রকল্প অত্যন্ত ভয়ংকর। যেসব নদী যুক্ত করা হবে, সেসব নদীকে হত্যা করা হবে।’ (দ্য হিন্দু, ১৪ আগস্ট, ২০১৪) ভারতে এ নিয়ে বিতর্ক আগেও ছিল, এখনো আছে। কিন্তু মোদি এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির এটা ছিল স্বপ্নের প্রকল্প। মধ্যপ্রদেশের বিজেপি সরকার ভারতের প্রথম নদী সংযোগ প্রকল্প ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন করেছে। অল্প কদিন আগে আসামের দৈনিক অসমতে নদী সংযোগ প্রকল্পের বিষয়ে খবর দেখলাম। ভারতের পরিবেশমন্ত্রী প্রকাশ জাভেদকার বলেছেন, ‘যেসব নদী কাছাকাছি, সেগুলোকে আগে যুক্ত করা হবে।’ ৩০ ডিসেম্বর ২০১৪ ইকোনমিক টাইমস-এর শিরোনাম: ‘নদী সংযোগ শিগগিরই বাস্তবে রূপ নিচ্ছে? প্রধানমন্ত্রী মোদি অবিলম্বে প্রকল্প হাতে নিতে চান।’ মোদি ইতিমধ্যে পূর্ণাঙ্গ নদী মানচিত্র তৈরি করতে বলেছেন। স্যাটেলাইট ও থ্রিডি প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রামবাসীর জন্য উৎকৃষ্ট সেচব্যবস্থার বুদ্ধি বাতলাতে বলেছেন। মোদির এই সফর নিশ্চয় ‘ঐতিহাসিক’, কিন্তু তা অধিকতর অর্থপূর্ণ হবে, যদি মোদির উন্নয়ন-দর্শনে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নদীর ফারাকটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৬ জুন মোদি ঢাকায় ‘আমাদের নদীগুলোকে পরিচ্ছন্ন ও নব জীবনদানে’ একত্রে কাজ করতে বলেছেন। কানেক্টিভিটি প্রসঙ্গে নদীর ওপরও জোর দিয়েছেন। উদারনৈতিক নৌপরিবহন প্রটোকল চুক্তিও হয়েছে। সত্যিই আমাদের নদীগুলোর নবজীবন দরকার। ভারতীয় বিনিয়োগকে কার্যকর করতেও নদীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। যৌথ নদী কমিশনের উচিত হবে মোদির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘আমাদের নদীগুলোকে নবজীবন দানে’ একটি সমীক্ষা চালানো। মোদির কণ্ঠে জীবনানন্দের ‘আবার আসিব ফিরে’ বড় ভালো লেগেছে। তবে কথা হলো, ‘ধানসিড়িটি’ তো রক্ষা করতে হবে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের এটি এমন একটি সুবর্ণ প্রেক্ষাপট, যখন সীমান্ত সমস্যার চিরকালীন মীমাংসার উপলক্ষকে আমরা বড় করে দেখছি। মোদি নিজেই একে ‘বার্লিন দেয়াল’ ভেঙে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করে আমাদের চমকে দিয়েছেন। মোদি সরকারের নদী সংযোগ দর্শন হলো ‘সুজালম, সুফালম, মাতারাম’। আশা করব, আমাদের ‘সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা’ এই বাংলার মুখ মলিন হওয়া তিনি চাইবেন না। সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার আয়তনের এই ‘বার্লিন দেয়ালের’ বিশেষত্ব হলো গঙ্গা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র, যা এই দেয়ালকে চিরস্থায়ী প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দিয়েছে। এই নদীগুলোর প্রবাহ এমনিতে থাকবে না। একে বাঁচাতে হবে। বাণিজ্য ও ট্রান্সশিপমেন্টে লব্ধ অর্থ যদি জীবনের জন্য হয়, তাহলে বাংলাদেশি বাঙালির সেই জীবনের পিদিম না নেভাতে খরস্রোতা নদী চাই। মোদি বর্ণিত ‘নতুন অর্থনৈতিক মাত্রায়’ ট্রানজিট ও নানা সওদা বেচে আমাদের অনেক টাকাপয়সা হবে, কিন্তু তা কে খাবে?
যৌথ নদী কমিশনের উচিত হবে মোদির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘আমাদের নদীগুলোকে নবজীবন দানে’ একটি সমীক্ষা চালানো। মোদির কণ্ঠে জীবনানন্দের ‘আবার আসিব ফিরে’ বড় ভালো লেগেছে। তবে কথা হলো, ‘ধানসিড়িটি’ তো রক্ষা করতে হবে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তির্যক মন্তব্য করেছিলেন, হিন্দুদের পানিতে উর্বর হতে দেওয়ার চেয়ে পাকিস্তানকে তিনি মরুভূমি দেখতে চাইবেন। এর উত্তরে জওহর লাল নেহরু বলেছিলেন, ‘ভারতীয় পানি নিয়ে ভারত কী করবে, সেটা ভারতের ব্যাপার।’ (হিন্দুস্তান টাইমস, ২ জুন ২০১৫) কিন্তু নেহরু ঠিকই ‘ভারতীয় পানি’ দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানকে সুজালম, সুফালম করার বন্দোবস্ত করেছিলেন, আধা ডজন কাশ্মীরি নদী নিয়ে করা সেই চুক্তি ইন্দাজ ট্রিটি নামে পরিচিত। সেটাই ছিল সত্যিকারের ‘অত্যন্ত ঐতিহাসিক’ পানি চুক্তি। যৌথ বিবৃতিতে ছয় নদীর বিষয়ে চুক্তির অঙ্গিকার আছে। তাই সার্থক কানেক্টিভিটির জন্য দুই দেশেরই বৈধ পানিস্বার্থ রক্ষা করে নদী ও সড়ক দুটিকেই তরতাজা করা লাগবে।
তিস্তা শুকিয়ে যাচ্ছে। গত মার্চের শেষ ১০ দিনে তিস্তায় পানি ছিল মাত্র ৩১৫ কিউসেক, ইতিহাসের সর্বনিম্ন; এর আগের বছরে একই সময়ের তুলনায় যা ২৩৫ কিউসেক কম। এই তিস্তায় ২০১১ সালে চূড়ান্ত হওয়া ৫০: ৫০ ভাগাভাগির ‘অন্তবর্তীকালীন’ চুক্তিটাও এখন করা যাচ্ছে না। মমতা তিস্তার একটি পয়েন্টে নাকি রাজ্যের হিস্যার গ্যারান্টি চান। ইন্দাজ চুক্তিতে নিম্ন অববাহিকার দেশ হিসেবে পাকিস্তানকে প্রায় ৮০ শতাংশ পানির গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছিল। আর ৬ জুন ওয়াটার: এশিয়াজ নিউ ব্যাটল গ্রাউন্ড বইয়ের লেখক ব্রহ্মাচেলানি হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেছেন, ‘এই শতাব্দীতে বিশ্বে বড় কোনো পানি ভাগের চুক্তি হয়নি। নেহরু যা পেরেছিলেন, এখন আর তা সম্ভব নয়, কারণ রাজ্যগুলো তাদের অধিকার খাটাচ্ছে।’ তবু আশা, মোদি আমাদের জীবনে ইন্দাজের স্মৃতিধন্য নেহরু হয়ে উঠুন।
সামনে হয়তো অন্তর্বর্তীকালীন তিস্তা চুক্তি পাব, সুষম পানিধারা পাব কি? যৌথ বিবৃতির ‘অববাহিকা ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা’র বাস্তবায়ন ছাড়া তো তা সম্ভব মনে হয় না। ৫৪টি সীমান্ত নদীর জন্য আলাদা চুক্তি বাস্তবসম্মত মনে হয় না। ইন্দাজের মতো উল্লেখযোগ্য নদী নিয়ে একটি আমব্রেলা চুক্তি হতে পারে। সমাধানটা রাজনৈতিক। ওই সময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন স্মৃতিচারণ করেছেন: ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিটা দফায় দফায় বৈঠকের পরও তিন-চারটি বিষয়ে আটকে গিয়েছিল। উভয় দিকের কর্মকর্তারা ধাঁধায় পড়েন। স্মিতহাস্য বঙ্গবন্ধু শ্রীমতী ইন্দিরাকে বলেছিলেন, ‘আপনাদের দার্জিলিং, শিলং, শিমলা আছে। বলুন তো আমি কেন বলব না যে আমাদের একটি হিলি (পার্বত্য) স্টেশন লিখে দিন!’
সেদিন যে চেতনায় সীমান্ত চুক্তি সই হয়েছিল, সেই চেতনায় মোদির বাংলাদেশ নীতির গ্রন্থনা চাই। দিল্লির ওই সভায় উচ্চারিত বঙ্গবন্ধুর উক্তি বিশেষ প্রণিধানযোগ্য: ‘আয়তনে ভারত কত বৃহৎ, জনসংখ্যায় “বড়” হলেও বাংলাদেশ মাত্র ৫৫ হাজার বর্গমাইলের। কোনো “ধূসর” বিষয় থাকলে আপনারা নিশ্চয় অনিচ্ছাভরে তা বাংলাদেশকে দেবেন না। তবে ব্যাপকভিত্তিক নীতি হিসেবে অনেক ক্ষুদ্র ভূখণ্ডের দেশ হিসেবে বিষয়গুলো আমাদের অনুকূলেই নিষ্পত্তি করুন। এক উত্তম প্রতিবেশী হিসেবে আমরা আপনাদের কাছে তাই আশা করি।’
মোদির কণ্ঠে যখন শুনলাম, পাখি, বাতাস ও পানির ভিসা লাগে না, ‘পানি নিয়ে রাজনীতি নয়,’ চকিতে মুগ্ধ হলাম।
তাঁর সফর বাংলাদেশের জন্য ‘অত্যন্ত ঐতিহাসিক’ হবে সেই আশায় রইলাম।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

আমার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কীসের জন্য? -সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী by তানজির আহমেদ রাসেল

লন্ডনের পিকাডেলির পার্ক লেইন শেরাটন হোটেলে গতকাল
রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর হাতে মানপত্র তুলে দেন প্রবীণ
সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী। ছবি: প্রথম আলো
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের যে ভৌগলিক অবস্থার গুরুত্ব রয়েছে, সেটাকে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নতি করাই সরকারের লক্ষ্য। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখেই বাংলাদেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। শুধু নিজেদের কথা নয়। প্রতিবেশীদের কথাও ভাবতে হবে। রোববার লন্ডনের পার্কলেন হোটেলে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দেয়া সংবর্ধনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি। ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য শেখ হাসিনাকে এ নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হয়। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকসহ নির্বাচিত বাংলাদেশি বৃটিশ পার্লামেন্ট সদস্যদের অভিনন্দন জানানো হয়। সফরকালে স্থানীয় বিএনপির বিক্ষোভে বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার বিরুদ্ধে ডেমোনস্ট্রেশন কীসের জন্য? স্থলসীমানা চুক্তি বাস্তবায়ন করেছি তার প্রতিবাদে? সমুদ্রসীমা অর্জন করেছি তার প্রতিবাদে? লন্ডনে বসে অপমান করবে, সেটা হবে না। প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান চলাকালেও হিলটন হোটেলের সামনে যুক্তরাজ্য বিএনপির শতাধিক নেতা-কর্মী বিক্ষোভ করেন। মাথায় কালো কাপড় বেধে ব্যানার ও পোস্টার নিয়ে তারা বিভিন্ন সেøাগান দেন। এর আগে শুক্রবার এবং শনিবার প্রধানমন্ত্রীর হোটেলের সামনে বিক্ষোভ করে স্থানীয় বিএনপি।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও মিয়ানমার মিলে আমরা যৌথভাবে যোগাযোগের মাধ্যমে আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়েছি। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে হাতজোড় করে বসে থেকে কী অর্জন করলেন।
বিএনপি জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন করে দেশের দুই শতাধিক মানুষকে হত্যা করে কী অর্জন করল। কী লাভ হলো দেশের। তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে কয়টি চুক্তি হয়েছে, সেগুলো আওয়ামী লীগ ও তার সরকারের কূটনৈতিক সাফল্য। আজ সারাবিশ্বে বাংলাদেশ একটি মডেল।
তিনি বলেন, দেশ আজ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। অনেক বাঁধা আসবে। সেই প্রতিকূলতা ঠেলেই এগিয়ে যেতে হবে। দারিদ্র্যকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অভিন্ন শত্রু হিসাবে উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে সবাইকে এক সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি ।
অনুষ্ঠানে শুরুতেই যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের নেতারা শেখ হাসিনার হাতে ফুলের তোড়া তুলে দেন।  যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে ক্রেস্ট উপহার দেওয়া হয় । শেখ হাসিনা তার ভাগনি টিউলিপের হাতের ফুলের তোড়া ও বই তুলে দেবার পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে টিউলিপ বলেন, আসলে কখনও ভাবিনি, নিজের খালার হাত থেকে ফুল পাব।
সভায় সভাপতিত্ব করেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান শরীফ। বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী।এদিকে আমন্ত্রণপত্র থাকার পরও প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনা সভায় সাংবাদিকদের প্রবেশে বাঁধা দেবার ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা।

লন্ডনে বসে অপমান করবে, সেটা হবে না: প্রধানমন্ত্রী by তবারুকুল ইসলাম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে
নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা
যুক্তরাজ্য সফরকালে স্থানীয় বিএনপির বিক্ষোভে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা । তিনি বলেছেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ডেমোনস্ট্রেশন (বিক্ষোভ) কীসের জন্য? স্থলসীমানা চুক্তি বাস্তবায়ন করেছি তার প্রতিবাদে? সমুদ্রসীমা অর্জন করেছি তার প্রতিবাদে? লন্ডনে বসে অপমান করবে, সেটা হবে না।’
গতকাল রোববার লন্ডনের পিকাডেলির পার্ক লেইন শেরাটন হোটেলে এক সংবর্ধনায় বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। বাংলাদেশে স্বৈরাচারের পতন, গণতন্ত্রায়ণ, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে অবদান এবং সর্বশেষ ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তির সফল বাস্তবায়নের সম্মাননা হিসেবে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ ওই সংবর্ধনার আয়োজন করে।
প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা দেওয়ার সময় ওই হোটেলের সামনে যুক্তরাজ্য বিএনপির শতাধিক নেতা-কর্মী বিক্ষোভ করেন। মাথায় কালো কাপড় বেধে ব্যানার ও পোস্টার নিয়ে নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ করেন। পুলিশ এ সময় বিক্ষোভকারীদের ঘিরে রাখে। নিরাপত্তা বেষ্টনী মধ্যে বিএনপির বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন।
এর আগে গত শুক্রবার এবং শনিবার প্রধানমন্ত্রী যে হোটেলে অবস্থান করছেন (পশ্চিম লন্ডনের হিলটন পার্ক লেইন) তার সামনেও একইভাবে বিক্ষোভ করেছে বিএনপি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একদিকে আমাদের যেমন ন্যাচারাল ক্যালামিটিজ (প্রাকৃতিক দুর্যোগ) আছে, সেইসঙ্গে আমাদের ম্যান মেইড ক্যালামিটিজও (মানুষ সৃষ্ট দুর্যোগ) আছে। দুটোই আমাদের মোকাবিলা করতে হয়। জ্বালাও, পোড়াও, খুন, হত্যা-আর তার মূল হোতা তো এখানেই বসে আছে’।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ করার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কীসের এত তোষামোদি? ’
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী আরও বলেন, এতিমের অর্থ যারা চুরি করে খেয়েছে, বাসে আগুন দিয়ে যারা মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে এবং যারা হুকুম দিয়ে এগুলো করিয়েছে, তাদের বিচার বাংলাদেশের মাটিতে হবে।
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরীফের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুকের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত ওই সভায় প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে একটি মানপত্র পড়েন প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা প্রধানমন্ত্রীকে ফুল ও ক্রেস্ট উপহার দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, এত প্রশংসা পাওয়ার যোগ্যতা তাঁর নেই। তিনি বলেন, ‘বাবার কন্যা হিসেবে আমি গর্বিত। কারণ আমার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমার এর চাইতে বড় কিছু পাওয়ার নেই’।
১৯৭৫ ও ২০০৭ সালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় তাঁর প্রতি যুক্তরাজ্যপ্রবাসীদের ভালোবাসা ও অবদানের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য এখন তাঁর কাছে আরও আপন। কারণ তাঁর ভাগনি টিউলিপ ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তিন কন্যা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এমপি নির্বাচিত হওয়ায় একজন বাঙালি হিসেবে তিনি গর্বিত।
বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়নমুখী কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রায় চার কোটি ৫৭ লাখ ইন্টারনেট গ্রাহক রয়েছে বাংলাদেশে। আধুনিক প্রযুক্তির শিক্ষার পাশাপাশি নিশ্চিত হয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা। নেপালে ভূমিকম্প দুর্গত মানুষদের তাৎক্ষণিকভাবে ১০ হাজার মেট্রিকটন চাল সহায়তা দেওয়া হয়েছে। নেপাল চাইলে বাংলাদেশ এক লাখ মেট্রিকটন চাল সহায়তা দিতে প্রস্তুত বলে প্রধানমন্ত্রী জানান।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে বিরোধ মীমাংসা করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, অতীতের কোনো সরকার এমনটা কল্পনাও করতে পারেনি। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান এবং নেপাল যোগাযোগ ক্ষেত্রে যে সমঝোতা করেছে তা সবার জন্য উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
ভৌগোলিক অবস্থার কারণে বাংলাদেশের যে গুরুত্ব রয়েছে সেটিকে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নতি করাই লক্ষ্য বলে জানান শেখ হাসিনা। দারিদ্র্যকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অভিন্ন শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দারিদ্র্য মোকাবিলায় সবাইকে কাজ করতে হবে। শুধু নিজেদের কথা নয়। প্রতিবেশীদের কথাও ভাবতে হবে।
দেশের পাঁচ কোটি মানুষ নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২২ দশমিক ৬০ ভাগে নামিয়ে এনেছি। হতদরিদ্রের সংখ্যা ৭ ভাগে নেমে এসেছে। এসব বিষয়ে শিগগিরই আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রকাশ হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্দিষ্ট করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে গৃহহীন, ভূমিহীন কোনো মানুষ থাকবে না। এ ব্যাপারে প্রত্যেক জেলা প্রশাসককে (ডিসি) নির্দেশ দেওয়া আছে। গৃহহীন, ভূমিহারা মানুষ থাকলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁদের সরকারি অর্থে বাড়ি করে দেবেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী ভাগনি টিউলিপসহ উপস্থিত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপি লেবার দলের মাইক গ্যাপস, জো স্টিভেনস, ওয়েস স্ট্রিটিং ও কনজারভেটিভ দলের এমপি পল স্কালির হাতে ফুলের তোড়া ও বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ইংরেজি সংস্করণ তুলে দিয়ে অভিনন্দন জানান। এ সময় টিউলিপ বলেন, ‘কখনো ভাবিনি এ রকম একটি অনুষ্ঠানে নিজের খালার হাত থেকে ফুল নেব। আপনাদের দোয়া ও সমর্থন ছাড়া আমি ব্রিটিশ এমপি হতে পারতাম না।’
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন, প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী।

ভারত-বাংলাদেশ পাকিস্তানের প্রত্যেক নাগরিক হিন্দু : মোহন ভগবৎ

পুরো ভারতীয় উপমহাদেশই একটি হিন্দু জাতি- এমনটাই বিশ্বাস করেন ভারতের রাষ্ট্রীয় সমাজসেবক সংঘ-আরএসএস নেতা মোহন ভগবৎ। শনিবার ইন্ডিয়া টুডের এক খবরে বলা হয়, মথুরায় শুক্রবার সংঘের একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি উপলক্ষে দেয়া বক্তব্যে এ কথা বলেছেন ভগবৎ। তিনি বলেন, ভারত, বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের প্রত্যেক নাগরিকই যে হিন্দু- এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। হিন্দু শাস্ত্রবিদ ভগবৎ বলেন, ‘ভারত একটি হিন্দু রাষ্ট্র। এ বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। আর এ বিশ্বাসেই আমাদের আটকে থাকতে হবে। নিজেদের এলাকা ভিন্ন করে নিতেই পারি আমরা। কিন্তু তাতে ভারত যে একটি হিন্দু জাতির দেশ, সে বিষয়টি কোনোভাবেই বাতিলের খাতায় ফেলা যেতে পারে না।’
মানুষকে চিহ্নিত করার বিভিন্ন পথের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ নিজেদের হিন্দু বলেন। কেউ বলেন, তারা ভারতীয়। এমন মানুষও আছেন যারা নিজেদের আর্য হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং অনেকে বলেন যে তারা মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী নন। কিন্তু এসব বক্তব্যে ভারত যে একটি হিন্দু রাষ্ট্র, তা মনে করতে কোনো বাধা নেই।’ ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান- তিনটি দেশই হিন্দু রাষ্ট্র, এমন দাবি করে তিনি বলেন, ‘ভারতীয় উপমহাদেশে যারাই বাস করেন, তাদের প্রত্যেকেই হিন্দু জাতির অংশ। তাদের পৃথক নাগরিকত্ব থাকতে পারে। কিন্তু তাদের জাতীয়তা হিন্দুত্ব। নিজের যুক্তির স্বপক্ষে প্রমাণ দেখাতে ইতিহাসের দিকে তাকানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ ‘স’-কে ‘হ’ হিসেবে উচ্চারণ করত আরবীয়রা। সে কারণেই তারা আমাদের হিন্দু বলতো, কারণ আমাদের দেশে সিন্ধু নামের একটি নদী ছিল। এটা সেই এলাকায় ছিল, যেখান থেকে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান আলাদা হয়ে যায়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যায় বাংলাদেশ। এ কারণে ওই অঞ্চল দুটোতে বসবাসকারী মানুষের নাগরিকত্ব আলাদা হয়ে গেছে। কিন্তু তাই বলে তারা তাদের বাড়িঘর কিংবা জাতীয়তা ত্যাগ করেননি। সেজন্যই আমি বলি যে তাদের জাতীয়তাবাদ এখনও একই রয়েছে।’

মডেল থেকে রাজবধূ!

সাবেক রিয়েলিটি শো’র তারকা সোফিয়া হেলকুভিস্তকে বিয়ে করতে চলেছেন সুইডেনের যুবরাজ কার্ল ফিলিপ। স্টকহোমে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে শনিবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন এ জুটি। এ বিয়ের ফলে এই প্রথম সুইডেনে রাজপরিবারের বাইরের কোনো নারী রাজকুমারী হলেন। কনে সোফিয়ার বয়স ৩০। তিনি ছিলেন মডেল। পরে যোগব্যায়ামের প্রশিক্ষক হন। এখন মানবসেবা করছেন। যুবরাজ ফিলিপের বয়স ৩৬। সুইডেনের সিংহাসনের তৃতীয় উত্তরাধিকারী তিনি। ২০১০ সালে সুইডেনের একটি রেস্তোরাঁয় দু’জনের প্রথম দেখা।
এরপর ভালোলাগা এবং প্রণয়। পরে তাদের সম্পর্কের বিষয়টি গণমাধ্যমে আসে। রাজকুমারের সঙ্গে অভিসারের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সোফিয়ার অতীত নিয়ে নানা মুখরোচক কাহিনী প্রকাশ করেছে সুইডেনের পত্রপত্রিকাগুলো। এক রিয়ালিটি শো-এ তাকে প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় দেখা গেছে বলেও খবর বেরিয়েছিল। কিন্তু এসব সমালোচনা টলাতে পারেনি রাজকুমার ফিলিপকে। তাছাড়া নিজের অতীত নিয়ে মোটেও লজ্জিত নন সোফিয়া। তিনি বলেন, ‘আমার এসবে অনুশোচনা নেই। এসব অভিজ্ঞতা মিলিয়েই আজকের আমি।’ বিয়ের পর তার জনকল্যাণ কাজে সহায়তা করবে রাজপ্রাসাদ। দক্ষিণ আফ্রিকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়তে রাজকুমার তাকে সহায়তা করবে বলে বিবিসি জানিয়েছে। ডেইলি মেইল।

প্রণবের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে মুখ খুললেন বেগম খালেদা জিয়া

এ নিয়ে কথা হয়েছে বিস্তর। আলোচনা-সমালোচনা শেষ হয়নি আজও। কেন ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির সঙ্গে দেখা করেননি বেগম খালেদা জিয়া? নানা মুনির নানা মত। কিন্তু খালেদা জিয়া ছিলেন নিশ্চুপ। এতদিন পর এই প্রথম এ ব্যাপারে মুখ খুললেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। জানালেন, প্রাণনাশের হুমকি থাকার কারণেই প্রণব মুখার্জির সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারেন নি তিনি। নিজের এ বক্তব্যকে প্রকৃত সত্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন খালেদা জিয়া।
ভারতের দ্যা সানডে গার্ডিয়ানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার বৈঠক বানচাল করতে বাংলাদেশ সরকার সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ ব্যাপারে বিস্তারিত ব্যাখ্যাও দেন বিএনপি চেয়ারপারসন। গত ৭ই জুন নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের কয়েকঘণ্টা পর গুলশান কার্যালয়ে বসে দ্যা সানডে গার্ডিয়ানের সাংবাদিক সৌরভ স্যানালকে সাক্ষাৎকারটি দেন বেগম খালেদা জিয়া। সানডে গার্ডিয়ান পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক এম জে আকবর। যিনি ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির মুখপাত্র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রণব মুখার্জির সঙ্গে বাতিল হওয়া বৈঠক নিয়ে খালেদা জিয়ার মুখ খোলার পর অনেকেই স্মরণ করছেন ২০১৩ সালের ৪ঠা মার্চ দিনটির কথা। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায়কে কেন্দ্র করে তখন রাজপথ ছিল উত্তপ্ত। জামায়াতের ডাকা ৪৮ ঘণ্টা হরতালের সেদিন ছিল দ্বিতীয় দিন। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে আসা ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি অবস্থান নেন হোটেল সোনারগাঁওয়ে। এখানেই প্রণব মুখার্জির সঙ্গে বৈঠক করার কথা ছিল খালেদা জিয়ার। বিকাল সোয়া ৪টার দিকে বৈঠকটির সময় নির্ধারিত ছিল। সেসময় বিএনপির পক্ষ থেকে বৈঠক বাতিলের কারণ হিসেবে নিরাপত্তার কথাই বলা হয়েছিল। বৈঠকের নির্ধারিত সময়ের কাছাকাছি সময়ে হোটেল সোনারগাঁওয়ের পাশে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। যে বিস্ফোরণের খবর আবার খুব দ্রুতই প্রচারিত হয় ভারতীয় মিডিয়ায়।
দ্যা সানডে গার্ডিয়ানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে কথা বলেছেন বেগম খালেদা জিয়া। এখানে সাক্ষাৎকারটির হুবহু তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: বেগম জিয়া, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ কেমন হলো?
উত্তর: বৈঠক অত্যন্ত সন্তোষজনক হয়েছে। মোদিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ ছিল চমৎকার। আমি অবশ্যই বলবো, খুবই আন্তরিক পরিবেশে বৈঠক হয়েছে। এতে আমি খুবই সন্তুষ্ট।
প্রশ্ন: আপনাদের আলোচনায় মূল কি কি ইস্যু ছিল?
উত্তর: যেমনটি আমি বলেছি, বৈঠক হয়েছে অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে এবং ফলপ্রসূ। আপনারা দেখেছেন বৈঠকটি ছিল ওয়ান-টু-ওয়ান। আমরা যেসব বিষয়ে আলোচনা করেছি বাস্তবেই সবটা বলতে পারছি না। তবে এটা বলতে পারি যে, অবশ্যই বৈঠক হয়েছে সন্তোষজনক।
প্রশ্ন: নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ আদৌ হবে কিনা তা নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সবাই ছিলেন দ্বিধাদ্বন্দ্বে। শেষ পর্যন্ত আপনি যখন প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে পৌঁছালেন, তখন কি এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব শেষ হয়ে গেছে? কেন এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব?
উত্তর: কি নিয়ে এতসব সংশয়? একবারও কি আমি বলেছি যে, আমি মোদিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবো না? নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হওয়ার পর ব্যক্তিগতভাবে আমি তাকে অভিনন্দন জানিয়েছি। আমার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) একজনও নেতার মুখ থেকে কি শুনেছেন যে, আমি মোদিজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবো না? বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের নেতা মোদিজি। তিনি দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক শক্তিশালী করার বাসনা নিয়ে বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুল বার্তা দেয়ার জন্য বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। তা করতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। মোদিজির সঙ্গে আমার যাতে সাক্ষাৎ না হয় তা নিশ্চিত করতে এমন কিছু নেই যা তারা করেনি।
প্রশ্ন: ম্যাডাম, প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরের সময় আপনাকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য সম্মিলিতভাবে ষড়যন্ত্র হয়েছিল এই অভিযোগই করছেন? এর নেপথ্যে কে ছিল?
উত্তর: সোজাসুজি আসল কথা বলি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশে অবস্থানকালে তার সঙ্গে যাতে আমার কোন সাক্ষাতের সম্ভাবনা প্রকাশ্যে নাকচ করে দেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। এরপরই নয়াদিল্লি বাস্তবতা প্রকাশ করে দেয়। বাংলাদেশের দেয়া বিবৃতির কয়েক ঘণ্টা পরেই ও প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরের প্রাক্কালে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শঙ্কর নয়াদিল্লিতে বলেন যে, সাক্ষাৎ হবে। আপনি এ বিষয়টিকে কিভাবে বিচার করবেন? আমার সঙ্গে এই সাক্ষাৎ ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকার যত রকম পারে সেভাবেই প্রচেষ্টা নিয়েছে। তারপরও সাক্ষাৎ হয়েছে। এ জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে আমি ধন্যবাদ জানাই। তারা আসলে চায়নি যে, মোদিজির সঙ্গে আমার কোন আলোচনা হোক।
প্রশ্ন: এরপর আমি আপনাকে সরাসরি একটি প্রশ্ন করতে চাই। আপনি যেমনটা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, সম্ভবত ক্ষমতাসীন সরকার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ যাতে কখনও না হয় তা নিশ্চিত করতে কূটচাল চেলেছিল। কিন্তু আমরা যদি একটু পেছন ফিরে তাকাই, যখন ২০১৩ সালের মার্চে ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশ সফর করেছিলেন, আপনি কিন্তু তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন নি...।
উত্তর: আমাকে এ প্রশ্নটি করার জন্য আমি খুব খুশি। এটা সত্য কথা যে, আমি প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরের সময় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি নি। ওই সময় ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর তিন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিরুদ্ধে হরতাল আহ্বান করেছিল জামায়াতে ইসলামী। ওই সময়ে আমি জানতে পারি যে, যদি আমি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাই তাহলে আমার ওপর আক্রমণ হতে পারে। এক্ষেত্রে সেটা হতে পারতো প্রাণনাশের হুমকি। প্রেসিডেন্ট যে হোটেলে অবস্থান করছিলেন তার কাছেই একটি পেট্রলবোমা বিস্ফোরিত হয়েছে। আমার তো ওই পথ দিয়েই যাওয়ার কথা ছিল।
প্রশ্ন: কিন্তু জামায়াতে ইসলামী তো আপনার রাজনৈতিক মিত্র। তারা কেন আপনার ওপর হামলা চালাবে?
উত্তর: যথার্থ কথা। এটাই পয়েন্ট। যদি ওইদিন আমার কিছু হতো তাহলে পুরো দায় গিয়ে বর্তাতো জামায়াতের ওপর। আমার বিরোধী পক্ষ তো এই গেম খেলার পরিকল্পনা করেছিল। এটা আমরা বুঝতে পারি এবং তারপরই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ওই সাক্ষাৎ বাতিল করি। আজ আপনার সঙ্গে প্রকৃত সত্য ভাগাভাগি করলাম।
প্রশ্ন: বেগম জিয়া, ঢাকায় প্রণব মুখার্জির সঙ্গে আপনি কেন সাক্ষাৎ করেন নি সে বিষয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গির কথা তুলে ধরলেন। কিন্তু বাকি বিশ্ব মনে করে, এটা আপনার ভারতবিরোধী আরেকটি অবস্থান...।
উত্তর: কেন আমি ভারতবিরোধী হবো? দেখুন, আমি আপনাকে এ বিষয়টিই বলার চেষ্টা করছি। ক্ষমতাসীন সরকার আমাকে ভারত ও হিন্দুবিরোধী হিসেবে তুলে ধরতে সমন্বিতভাবে চেষ্টা করছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী বন্ধন। স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের অবদান আমরা সর্বাঙ্গীণ স্বীকার করি। প্রধানমন্ত্রীর সফর ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে। এ সুযোগ নিয়ে তারা আমাকে ভারতবিরোধী হিসেবে দেখাতে চায়। তাদের একটি  সুসংগঠিত প্রচারণাবিষয়ক মেশিনারি আছে যা, বেপরোয়াভাবে আমাকে ও বিএনপিকে ভারতবিরোধী হিসেবে দেখাতে কাজ করে যাচ্ছে।
প্রশ্ন: জামায়াতে ইসলামী আপনার জোটের শরিক। তাদেরকে ধর্মীয় কট্টরপন্থি হিসেবে দেখা হয় এবং মনোভাবে তারা ভারতপন্থি না...।
উত্তর: জামায়াত আমাদের জোটের শরিক। এর বেশি কিছু নয়। জোটে থেকে তাদেরকে বিএনপির কথা শুনতে হয়। আমরা যখন এসব কথা নিয়ে এখানে আলোচনা করছি, তখন আপনার কাছে বলি যে, বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের হাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দুরা যে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে তা জেনে আপনি বিস্মিত হবেন। তাদের বাড়িঘর লুট করা হয়েছে। জমিজমা কেড়ে নেয়া হয়েছে। আর উল্টো আমাদেরকে বলা হচ্ছে আমরা হিন্দুবিরোধী? আমরা হিন্দুদের সঙ্গে আছি। দেশের প্রতিটি নাগরিকের কল্যাণের জন্য আমরা আছি। বাংলাদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সন্ত্রাসের রাজত্ব। আমাদের ওপর হামলা হচ্ছে। আমার নেতাদের হত্যা করা হচ্ছে। প্রায় ২০ হাজার নেতাকর্মী নিখোঁজ রয়েছেন। সরকারের বিরুদ্ধে যে-ই কথা বলছে তাকেই চিহ্নিত করে তার ওপর হামলা করা হচ্ছে। এখানে জরুরি অবস্থার চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আমি কথা বললেই আমাকে পাকিস্তানি এজেন্টের তকমা লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমার স্বামী জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। তখন তিনি ছিলেন একজন মেজর। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। আমরা কি সে কথা ভুলতে পারি?
প্রশ্ন: কিন্তু বেগম জিয়া, আপনি তো নির্বাচন থেকে সরে এসে আওয়ামী লীগকে দৃশ্যত একটি বিজয় দিয়ে দিয়েছেন। এখন আপনি বলছেন, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে...।
উত্তর: এরও আগে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে আন্দোলন করেছে। আমরা তা মেনে নিয়েছি এবং অতীতে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেই তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সংবিধান সংশোধন করে। এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিধি বাতিল করা হয়। যেহেতু তারা নির্বাচনে জালিয়াতির জন্য পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র ও পুলিশকে ব্যবহার করবে তাই আমরা বুঝতে পারি যে, বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। সবেমাত্র অনুষ্ঠিত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কি হলো দেখুন। ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গেলে তাদেরকে বলা হলো বাড়ি চলে যেতে। কারণ, ইতিমধ্যেই তাদের ভোট দেয়া হয়ে গেছে। নির্বাচনের সময় একজন পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে পরিষ্কার শোনা যায় যে, তিনি কিভাবে অন্যদের বলছেন, কিভাবে পুলিশ নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করেছে। এখানে কি আমরা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করতে পারি? এখন যে ভবনটিতে বসে আছি এখানেই ৯২ দিন আমাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। তারা যোগাযোগের সব লাইন কেটে দিয়েছিল। পেপার স্প্রে ব্যবহার করা হয়েছে। খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করা হয়েছিল। এক পর্যায়ে পানিও বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এটাই হলো বাস্তব কাহিনী।
প্রশ্ন: তাহলে সামনের পথ কোনদিকে বেগম জিয়া?
উত্তর: আমরা চাই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণের এই একটিই পথ আছে। এ জন্য বাংলাদেশের বিষয়ে অবশ্যই দৃষ্টি দেয়া উচিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের।

বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ by আনিসুল হক

আজকে সিরিয়াস দার্শনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। যদিও কলামটির নাম গদ্যকার্টুন। এই কলামে রসিকতা করার ব্যাপক চেষ্টা করা হয়! সেই চেষ্টা প্রায়ই নিদারুণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় বটে।
তার আগে একটা পরামর্শ দিই। বাংলাদেশের রাস্তায় রাস্তায় হাটে-বাজারে-স্টেশনে-টার্মিনালে মোড়ে মোড়ে সত্যিকারের সিসি টিভি বা ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা বসান।
শক্তিশালী ক্যামেরা। যা সত্যিকারের ভিডিও ফুটেজ দেবে। যা থেকে মানুষদের নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা যাবে। ধরা যাক, পয়লা বৈশাখে টিএসসি এলাকার ক্যামেরাগুলো যদি শক্তিশালী হতো, তাহলে আমরা সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারতাম, কারা আসলে ওই ভিড়ের মধ্যে নখরযুক্ত থাবা নিয়ে হামলে পড়েছিল মেয়েদের ওপরে। যেমন চলন্ত মাইক্রোবাসে ধর্ষণের ঘটনার অপরাধীদের ধরা গেছে বলে দাবি করেছে র্যা ব। ভদ্রমহিলা যে দোকানে কাজ করতেন, সেখানকার ভিডিও ফুটেজ দেখার মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভবপর হয়েছে।
এবার আমার দার্শনিক আলোচনা।
মিশেল ফুকো কারাগারের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, কারাগারে একটা উঁচু টাওয়ার থাকে। সেখানে অবস্থান নিয়ে প্রহরীরা সারাক্ষণ নজর রাখে কে কোথায় কী করছে। তেমনিভাবে আমাদের সমাজ হলো, প্যান-অপটিক সমাজ। স্তরে স্তরে এখানে পাহারাদাররা বসে আছে। কে কোথায় কী করছে, তা ওয়াচ করছে। তা মনিটর করছে।
মানুষের চলাফেরার কথা বলার কোনো স্বাধীনতা নেই। এটা কেবল কারাগারে নয়, যেকোনো প্রতিষ্ঠানের বেলাতেই সত্য। সেটা হাসপাতাল হতে পারে, স্কুল হতে পারে, কোনো একটা অফিস হতে পারে। সর্বত্রই নজরদারি। সর্বত্রই মানুষকে শিকলে বন্দী করে রাখার চেষ্টা। মানুষ আসলে স্বাধীন নয়। কিন্তু প্রগতিশীলের কর্তব্য হবে, প্রতিনিয়ত স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে যাওয়া।
এই যে কে কোথায় কী করছে, এটা যদি সব সময় সবাই দেখে ফেলে, তা আসলে কতটা কাম্য। কতটা স্বাস্থ্যকর সামাজিকভাবে? আমরা কি কেউ কাচের ঘরে বসবাস করতে পারব? ধরা যাক, আমাদের ঘরগুলোর দেয়াল স্বচ্ছ কাচের তৈরি। বাইরে থেকে সব দেখা যায়। সেই ঘরে আমাদের বসবাস করতে হবে দিনরাত। এটা কি সম্ভব?
ঔপন্যাসিক মিলান কুন্ডেরা এই রকমের রাষ্ট্র-ব্যবস্থা নিয়ে খুব ভেবেছেন, উপন্যাস লিখেছেন। যেখানে রাষ্ট্র সবকিছু মনিটর করার চেষ্টা করছে, পুলিশ চারপাশের সবকিছু রেকর্ড করছে।
তবে আমাদের ভাবনার কিছু নেই। আমাদের দেশে আইন হয়ে গেছে, আইন অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ আমাদের সবার সব ফোনালাপ রেকর্ড করতে পারে। তা তারা করছেও। এবং দরকারমতো কোনো কোনো ফোনালাপ প্রকাশও করে দেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নাগরিকদের ফোনালাপ আড়ি পেতে শোনে, রেকর্ড করে, সেই অধিকার আইন করে তাদের দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই ফোনালাপ নেটে ছেড়ে দেওয়ার অধিকার কি দেওয়া হয়েছে? তাহলে ফোনালাপগুলো বাইরে আসে কী করে?
তবে আসল সমস্যা হলো, ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো। সেখানে আমরা কী করি, কী খাই, কী লিখি—সব বিক্রি করে দেওয়া হয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে, তা থেকে তারা বের করে ফেলে কার কী অভ্যাস, কে কী ধরনের পণ্য পছন্দ করে, কী দেখতে চায়, কী কিনতে চায়!
এখন বুঝুন তাহলে অবস্থাটা। আপনি ফোনে যা যা আলাপ করছেন, তা রেকর্ড হতে পারে। আপনি ফেসবুকে কী করছেন, তার মাধ্যমে আপনার সম্পর্কিত তথ্য বিশ্লেষণ করছে কেউ না কেউ। আর সিসি ক্যামেরা থাকলে আপনি কখন কোথায় যাচ্ছেন, কী করছেন, কার সঙ্গে আছেন, তার ভিডিও রেকর্ড করা হচ্ছে সর্বত্র!
আমরা কি একটা কাফকার জগতে বসবাস করছি? কাফকার দুঃস্বপ্নের জগতে?
মিলান কুন্ডেরা একটা সত্যিকারের কাহিনি শুনিয়েছিলেন প্রাগ শহর নিয়ে, সেই সময়ের কাহিনি, যখন তা সোভিয়েতদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
একজন ইঞ্জিনিয়ার একটা সেমিনারে অংশ নিতে প্রাগ শহর থেকে গেছেন লন্ডনে। ফিরেও এসেছেন ঠিক সময়ে। এসে দেখলেন, খবরের কাগজে ছাপা হয়েছে, এই ইঞ্জিনিয়ার চেক সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লন্ডনে বক্তব্য দিয়েছেন এবং তিনি আর দেশে ফিরবেন না।
যা ছাপা হয়েছে, তা ঘোরতর মিথ্যা। তিনি ছুটলেন খবরের কাগজের অফিসে। সম্পাদক দোষ স্বীকার করলেন। বললেন, এই খবর এসেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দোষ স্বীকার করে বলল, কিছু করার নেই, এটা এসেছে আমাদের লন্ডন দূতাবাস থেকে। গোয়েন্দারা পাঠিয়েছে এই খবর।
ইঞ্জিনিয়ার সাহেব এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ছোটাছুটি করে অবশেষে একদিন সত্যি সত্যি দেশ ছেড়ে চলে গেলেন। বাঁচার তাগিদে।
মিলান কুন্ডেরা বলেন, ফ্রানৎস কাফকার গল্পে এই রকম ঘটে। আগে শাস্তি হয়, পরে অপরাধ খোঁজা হয়। কাফকার ট্রায়াল উপন্যাসে একদিন জোসেফ কে নামের প্রধান চরিত্রটি দেখে, তার ঘরে দুজন লোক ঢুকে গেছে। তারা তাকে বলছে, তোমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জোসেফ কে-র নাশতা তারা খেয়ে ফেলে। জোসেফ কে তখনো রাত্রি-পোশাকে। তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলতে কিছুই থাকে না।
আর কাফকার গল্প মেটামরফসিসের প্রথম লাইন তো বিখ্যাত: দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে একদিন সকালে গ্রেগর সামসা দেখতে পায় সে একটা ভয়াবহ পোকায় পরিণত হয়ে গেছে।
আমাদের দেশটা কি কাফকার দুঃস্বপ্নের জগতে পরিণত হচ্ছে?
লিমন কিংবা কাদেরকে চিরটাকাল খুঁজতে হবে তাঁদের অপরাধ কী!
মিলান কুন্ডেরাই বলেছিলেন, প্রাগে একজন লোকের শাস্তি হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিরোধিতাকারী হিসেবে, তিনি জেলে ছিলেন, কিন্তু আজীবন তিনি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করে গেছেন, কারণ তিনি বলেন, না হলে তো আমার পুরো জীবন ব্যর্থ হয়ে যায়, সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস বজায় রাখলে তবু সান্ত্বনা আসে, মহান সমাজতন্ত্র রক্ষার জন্য আমাকে কারাবাস করতে হচ্ছে।
আমরাও বিশ্বাস হারাচ্ছি না। আমেরিকানরা আমাদের ফেসবুক নজরদারি করে, কিংবা আমাদের ফোনালাপ রেকর্ড করা হয়, এসবই করা হচ্ছে কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে।
কিন্তু একদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে যদি দেখি, একটা বড় পোকায় পরিণত হয়েছি, উল্টে আছি মেঝেতে, পা ছুড়ছি, কিন্তু সোজা হতে পারছি না... তখন...
না। আর বলব না। জর্জ ওরওয়েলের লেখা নাইনটি এইটিফোরে এই রকম একটা একনায়কবাদী রাষ্ট্রের বর্ণনা আছে, যেখানে আছে এই বিখ্যাত সংলাপটি, বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ...
আমরা আমাদের ব্যক্তিগত পরিসরটুকুনের ওপরে কেউ খবরদারি করুক, সেটা চাই না, কিন্তু যে অপরাধীরা ধর্ষণ করে, খুন করে, বোমাবাজি করে, পেট্রলবোমা ছোড়ে, তারা সবাই ধরা পড়ুক সিসি ক্যামেরার কল্যাণে, সেটাও চাই।
একটা ভালো রাষ্ট্র, একটা ভালো শাসন তা দেওয়ার চেষ্টাই তো করবে।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

ধর্ষণের সময় পুলিশ ও তার সহযোগীরা মদ্যপ ছিল

প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন ওই নারী পুলিশ কনস্টেবল। সুখী হতে চেয়েছিলেন  তিনি। প্রেম করার সময় এএসআই কালিমুর তাকে সুখী করার জন্য যা যা করা দরকার তাই করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। তার কথায় বিশ্বাসও করেছিলেন তিনি। কিন্তু, বিয়ের পর হঠাৎ বদলে যান কালিমুর। বিভিন্ন কারণে-অকারণে মারধর করতেন। দিনের পর দিন নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। চাকরি ছেড়ে দেয়া ও যৌতুকের টাকার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। একসময় তারা আলাদা থাকতে শুরু করেন। এরইমধ্যে ওই নারী কনস্টেবলের কোলজুড়ে মাইশা নামে এক কন্যা সন্তান আসে। তিনি ভেবেছিলেন সন্তানের মুখ দেখে হয়তো এবার তার স্বামীর পরিবর্তন হবে। কিন্তু তার মধ্যে কোন পরিবর্তন আসেনি। বরং আগের চেয়ে নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। শেষে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ করতে বাধ্য হন তিনি। এর প্রতিশোধ নিতে ফুসলিয়ে তাকে নিয়ে এক আত্মীয়ের বাসায় নিয়ে যায়। ওই নারী কনস্টেবলের পরিবারের লোকজন অভিযোগ করেছেন, ধর্ষণের সময় এএসআই কালিমুর ও তার দুই সহযোগী মদ্যপ ছিল।
গত ১০ই মার্চ খিলগাঁও থানাধীন সি ব্লকের তিলপাপাড়ার ১৭ নম্বর রোডের ৮৬/৩, নম্বর বাড়ির নিচতলার বেডরুমে আটকে রেখে ওই মহিলার কনস্টেবলকে গণধর্ষণ করে তার সাবেক স্বামী এসপিবিএনে (স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন) কর্মরত এএসআই কালিমুর রহমান ও তার দুই সহযোগী। ১১ই মার্চ ওই বাড়ি থেকে কৌশলে বের হয়ে আসেন ওই মহিলা কনস্টেবল। এরপর তিনি রাজারবাগ হাসপাতালে যান চিকিৎসা নিতে। কিন্তু, সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে (ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস) ভর্তি হওয়ার জন্য বলেন। গত ১৩ই মার্চ দুপুরে তিনি ওসিসিতে ভর্তি হন। এ ঘটনায় শনিবার রাতে নির্যাতিতার বোন অ্যাডভোকেট নাসরিন আক্তার মায়া বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে খিলগাঁও থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। গতকাল সকালে ওই  মহিলা কনস্টেবলের ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছে। আগামী তিনদিনের মধ্যে পরীক্ষার রিপোর্ট দেয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন।
গতকাল সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ওসিসির সামনে ওই নির্যাতিতা মহিলা কনস্টেবলের পরিবার দাঁড়িয়ে আছেন। তারা একজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এমন একটি ঘটনায় তারা হতবাক হয়েছেন। তাদের একটাই দাবি, দোষীদের যেন দ্রুত গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনা হয়। নির্যাতিতার বোন অ্যাডভোকেট নাসরিন আক্তার সোমা জানান, কারণে-অকারণে তার বোনকে নির্যাতন করায় এএসআই কালিমুরকে গত বছরই তালাক দিয়েছিল তার মহিলা কনস্টেবল বোন। এরপর পূর্ণ সংসার করার জন্য বিভিন্ন দেন-দরবার করে আসছিল কালিমুর। কিন্তু, তার বোন আর রাজি হচ্ছিল না। তিনি আরও বলেন, কিছুদিন আগে কালিমুর মতিঝিল জোনের পুলিশের এক কর্মকর্তাকে জানান যে, তিনি আবার সংসার করবেন। এছাড়া কালিমুর তার বোনকে প্রায়ই ফোন করতো। বিভিন্ন প্রলোভন দেখাতো। তার কথায় প্রলোভনে তার বোনের মানসিক অবস্থা একটু নরম হয়। তিনি আবার নতুন করে সংসার করার উদ্যোগ নেন। প্রতিদান হিসেবে পেয়েছেন পাশবিক নির্যাতন। তিনি অভিযোগ করে আরও জানান, তার বোন কয়েকদিন ধরে অসুস্থ। ১০ই মার্চ সকালে তিনি রাজারবাগ হাসপাতালে যান। এসময় ওই নারী কনস্টেবলকে ফোন দেয় কালিমুর। কালিমুরের কথায় তিনি রাজি হয়ে খিলগাঁওয়ে গেলে তাকে এএসআই কালিমুর ও দুই সহযোগী মিলে মদ্যপ অবস্থায় ধর্ষণ করে। তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় প্রাথমিকভাবে ১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আর ৩টি মামলা প্রক্রিয়াধীন আছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ওসিসির (ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার) সমন্বয়ক ডা. বিলকিস বেগম জানান, ওই মহিলা কনস্টেবলকে মানসিকভাবে শক্তি যোগানোর জন্য কাউন্সেলিং করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তার ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছে। তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। খিলগাঁও থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, নির্যাতিতার বোন  বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। ওই মামলায় বাদী এসআই কালিমুর রহমান ও অজ্ঞাত চারজনকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই এএসআই কালিমুর রহমান পলাতক রয়েছে। তাকে ধরতে বিভিন্নস্থানে অভিযান চলছে।

ভারতে যে কারণে ‘অভ্যুত্থান’ ঘটে না

ব্যাপকভিত্তিক ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ ব্যবস্থার মাধ্যমে
সত্তরের দশক নাগাদ ভারতের সেনাবাহিনী পুরোপুরি
‘ক্যু-রোধক’ হয়ে ওঠে। এর মধ্য দিয়ে ভারতীয়
গণতন্ত্রের টেকসই অবস্থান সুনিশ্চিত হয়েছে। ছবি: রয়টার্স
ঔপনিবেশিক এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে হুটহাট সামরিক শাসন আসে। ব্যতিক্রম ভারত। অনেকের আশঙ্কা সত্ত্বেও দেশটিতে কখনো অভ্যুত্থান বা ক্যু হয়নি, আসেনি সামরিক শাসন। বরং ভারত আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশ। কোন জাদুবলে গণতন্ত্রকে এতটা টেকসই করেছে ভারত?
প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিশেষ করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ভারতে সামরিক শাসন আসা অসম্ভব ছিল না। এমনকি দেশটিতে ১৯৬৭ সালের সাধারণ নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহের সময় দ্য টাইমস এর সংবাদদাতা নেভিল ম্যাক্সওয়েল ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, এটাই হতে যাচ্ছে সম্ভবত শেষ নির্বাচন।
নেভিল একা নন, আরও অনেকেরই ধারণা ছিল, ভারত সামরিক শাসনের অধীনে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—দেশটিতে তেমন ঘটনা কখনোই ঘটেনি।
কিন্তু কেন?
ভারতের সেনাবাহিনী কেন কখনো ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেনি—এই প্রশ্নের উত্তরে প্রায়ই জোর দিয়ে বলা হয়, তারা সুশৃঙ্খল, উঁচু মাত্রায় পেশাদার। এ ক্ষেত্রে ব্রিটিশদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঐতিহ্যের কথাও উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু এসব তত্ত্ব ধোপে টেকে না। প্রতিবেশী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন্মও একই ঐতিহ্য থেকে। তাই বলে তারা ক্ষমতা দখল থেকে বিরত নেই। তারাও পেশাদার। প্রয়োজনে তারা বসে থাকে না। সংকটে এগিয়ে আসা তারা দায়িত্ব মনে করে।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানী স্টিভেন উইলকিনসন তাঁর ‘আর্মি অ্যান্ড নেশন’ বইয়ে ওই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করেছেন। ভারতে সামরিক অভ্যুত্থান না হওয়ার কারণ জানতে ফিরে তাকাতে হবে পাকিস্তানের দিকে। দেশটিতে সামরিক শাসনের একটি প্রাক-ইতিহাস আছে, যার সূত্রপাত হয়েছিল অবিভক্ত ভারত আমলে।
শুরু থেকেই ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে একটা বড় পার্থক্য দেখা যায়। ভারতে কংগ্রেস ছিল টেকসই ও স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হওয়া দল। আর পাকিস্তানে মুসলিম লীগ ছিল অনেকটা ‘জিন্নাহ এবং তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা’ আদলের দল। বিশেষ করে ১৯৪৮ সালে জিন্নাহর মৃত্যুর পর পাকিস্তানে ভয়ংকর কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়।
‘মার্শাল ল’ আশীর্বাদ!
পাকিস্তানে অপ্রত্যাশিতভাবে সামরিক শাসন আসেনি। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, পঞ্চাশের দশকের শুরুর দিকে লাহোরে দাঙ্গা হয়। দাঙ্গা মোকাবিলায় ব্যর্থ হয় বেসামরিক প্রশাসন। শেষমেশ তলব করা হয় সেনাবাহিনী। তারা দ্রুত পরিস্থিতি শান্ত করে। এরপর সেনাবাহিনী আরও কিছুদিন মাঠে থাকে। এই সময়ে তারা দীর্ঘ দিন ধরে অবহেলিত বেশ কিছু জনসেবামূলক কাজ করে মানুষের মন জয় করে। বছরের পর বছর ধরে যে কাজ বেসামরিক প্রশাসন করতে ব্যর্থ হয়েছে, মাত্র কয়েক দিনে তা করে জনগণের কাছ থেকে বিপুল সম্মান ও শ্রদ্ধা কুড়ায় সেনাবাহিনী।
রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে ‘মার্শাল ল’ জারি এবং সেনা তলব করেন গর্ভনর জেনারেল। এতে সেখানকার জনগণের একটা অংশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। এমনকি তারা এটাকে আশীর্বাদ হিসেবেও বিবেচনা করে। এরপর সচরাচর অবশ্যম্ভাবীভাবে যা হয়, দেশটির সামরিক সরকার দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
সুরক্ষা বেড়ি
পাকিস্তানের মতো একই ঐতিহ্য থেকে জন্ম ভারতের সেনাবাহিনীর। ব্রিটিশ ভারতে ভারতীয় জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান উপভোগ করত সেনাবাহিনী। নীতিগত বিষয়েও তাদের ভূমিকা ছিল।
কিন্তু স্বাধীনতার পর অবস্থা বদলাতে থাকে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বিশ্বাস করতেন, নতুন ভারতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা পুনরায় বিবেচনা করা দরকার। সেনাবাহিনী পুরোপুরি বেসামরিক সরকারের অধীনস্ত করতে নতুন এক নীতির প্রবর্তন করেন তিনি। এরপর ধারাবাহিকভাবে বাজেটে কাটছাঁট করা হয়।
সামরিক বাহিনীকে সুরক্ষা বেড়ির আওতায় আনতে এবং ভারতীয় সমাজে তাদের প্রভাব কমাতে বছরের পর বছর ধরে একটি পদ্ধতিগত কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হয়। সামরিক বাহিনীকে দ্ব্যর্থহীনভাবে তাদের জন্য নির্ধারিত পরিধির মধ্যে আবদ্ধ রাখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
স্বীকৃতিবিহীন অর্জন
ব্যাপকভিত্তিক ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সত্তরের দশক নাগাদ ভারতের সেনাবাহিনী পুরোপুরি ‘ক্যু-রোধক’ হয়ে ওঠে। এর মধ্য দিয়ে ভারতীয় গণতন্ত্রের টেকসই অবস্থান সুনিশ্চিত হয়েছে। এটি নেহরু যুগের অন্যতম সেরা অর্জন হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো—এই অর্জন যথেষ্ট স্বীকৃতি পায়নি। এমনকি ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোও এই অর্জনকে অবজ্ঞা করেছে। আর ওই দেশগুলো সত্যিকারের সামরিক অভ্যুত্থান অথবা অভ্যুত্থানচেষ্টার মুখোমুখি হয়েছে।
‘ক্যু-রোধক’ ব্যবস্থা কীভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে, এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন রাজনৈতিক বিজ্ঞানী স্টিভেন উইলকিনসন। ‘ক্যু’ করা থেকে সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি বিরত রাখতে সতর্কতার সঙ্গে চিন্তাভাবনা প্রসূত বিস্তারিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্রের মাধ্যমে কঠোর নির্দেশাবলী ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো প্রতিষ্ঠা, সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যে অর্ডার অব প্রেসিডেনস পুনর্নির্ধারণ, পদোন্নতির প্রতি গভীর মনোযোগ সৃষ্টি, জনসমক্ষে সেনা কর্মকর্তাদের বিবৃতি দিতে অনুমতি না দেওয়া, প্রতি ভারসাম্যমূলক আধাসামরিক বাহিনী তৈরি প্রভৃতি। কোয়ার্টজ ইন্ডিয়া অবলম্বনে

পরিবর্তনের রাশ টানুন by ডেসমন্ড টুটু ও ট্রেভর ম্যানুয়েল

আজকাল মানুষ নৈতিকভাবে সঠিক ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক—এ দুটি বিষয়ের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বাধ্য হয়। বটেই, তাদের এ বেছে নেওয়ার ব্যাপারটা কখনো কখনো পারস্পরিক নির্ভরশীল ব্যাপার বলে মনে হয় না। ফলে মানুষ কোন পথটা বেছে নেবে, সে সিদ্ধান্ত নেওয়া তাদের জন্য খুবই কঠিন হয়। আবার কখনো কখনো নৈতিক সঠিকতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ এক বিন্দুতে মিলিত হয়।
বিষয়টির নৈতিক অপরিহার্যতা সন্দেহাতীত। কারণ, চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া, তাপমাত্রা পরিবর্তন ও সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি—এসবের ফল ভোগ করতে হয় দুনিয়ার গরিব মানুষকেই। আবার যে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের কারণে এ জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে, এই দরিদ্র মানুষই তার সুবিধা পায় সবচেয়ে কম। তারপরও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুনিয়ায় দারিদ্র্য ও অসমতা বাড়তে পারে। অর্থাৎ, আমরা যদি সময়মতো বিষয়টিতে গুরুত্ব না দিই, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পক্ষে উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে বা এমনকি সে সুযোগ তারা নাও পেতে পারে। ফলে খুব সাধারণভাবে বললে, আজ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকোপ হ্রাস করাই হচ্ছে সঠিক কাজ।
সৌভাগ্যবশত, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি আমলে নেওয়ার অর্থনৈতিক সুবিধাদি কী, তা পরিষ্কার। সর্বোপরি, জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক ক্ষতি অনেক। যেমন: ঘন ঘন হয় এমন চরম মাত্রার পরিবেশগত ঘটনার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য। তারপরও ভবিষ্যতের জন্য টেকসই উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ক্রমবিকাশমান প্রাযুক্তিক উন্নয়নের ভিত্তিতে ‘সবুজ’ অর্থনীতি গড়ে তোলাই হচ্ছে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ, যা একই সঙ্গে সবচেয়ে কার্যকরও বটে।
এ লক্ষ্যে ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক, শহর ও জাতীয় পর্যায়ে কর্মোদ্যোগ গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিষয়টা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক সমস্যা, আর এর সমাধানও হবে বৈশ্বিক। এ ক্ষেত্রে সঠিক কাজটা করতে দুনিয়ার হাতে সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত মতৈক্য। এর মধ্যে বিপুল অঙ্কের অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে। সে কারণে দুনিয়ার নেতাদের উচিত হবে, এ বছরের ডিসেম্বরে প্যারিসে অনুষ্ঠেয় ইউনাইটেড নেশনস ক্লাইমেট চেঞ্জ কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈশ্বিক পর্যায়ে অভিন্ন একটি কর্মোদ্যোগ গ্রহণ করা।
বস্তুত, বিশ্বনেতারা ইতিমধ্যে তা করার অঙ্গীকার করেছেন। ২০১১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্যোগে সে দেশে অনুষ্ঠিত ইউএন ক্লাইমেট চেঞ্জ কনফারেন্সে যত শিগগির সম্ভব জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি আইনি চুক্তিতে আসার ব্যাপারে ঐকমত্য হয়েছিল, ২০১৫ সালের মধ্যে সেটা হওয়ার কথা।
ডারবান সম্মেলনের পর গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। গত মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলো, গ্যাবন, মেক্সিকো, নরওয়ে, রাশিয়া, সুইজারল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ৩০টি দেশ ২০২০ সাল-উত্তর তাদের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর পরিকল্পনা পেশ করেছে। আগামী দিনগুলোয় এ প্রক্রিয়া আরও জোরদার হবে। আশা করা যাচ্ছে, ব্রাজিল, চীন ও ভারত অঙ্গীকারনামা পেশ করবে।
প্যারিস সম্মেলন সফল হতে হলে প্রতিটি অংশগ্রহণকারী দেশকে যত শিগগির সম্ভব ২০২০ সাল-পরবর্তী সময়ের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ সম্পর্কে জানাতে হবে। নৈতিক অপরিহার্যতা পূরণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার অর্থনৈতিক সুবিধা—এ দুই পরিপ্রেক্ষিতেই সেটা করতে হবে। আর চূড়ান্ত চুক্তির মধ্যে আগামী ৫০ বছরের জন্য কার্বন হ্রাসের কার্যকর ও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা থাকতে হবে।
সত্য কথা হচ্ছে, দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের সরকার বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ার হার প্রাক্-শিল্পযুগের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস নির্ধারণ করার যে প্রতিশ্রুতি ২০০৯ সালে দিয়েছিল ও ২০১০ সালে যেটা পুনর্ব্যক্ত করেছিল, তা এ স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে আনুক্রমিকভাবে কার্বন নিঃসরণ কমানোর নীতি গ্রহণ করা উচিত। যাতে এর মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে পরিষ্কার সংকেত দেওয়া যায় যে সরকার জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তরিক।
নিম্ন কার্বন নিঃসরণকারী শিল্পে বিনিয়োগে প্রণোদনা দেওয়া হবে—এমন কৌশলের মধ্যে তা থাকতে পারে। আগামী ১৫ বছরে সারা দুনিয়ায় অবকাঠামো নির্মাণে ৯০ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হবে, সে ক্ষেত্রে একদম নিশ্চায়ক না হলেও এমন মনোভঙ্গির প্রভাব বিবেচনাযোগ্য।
জলবায়ু পরিবর্তনের রাশ টেনে ধরার ক্ষেত্রে নৈতিক ও অর্থনৈতিক অপরিহার্যতার চেয়ে শক্তিশালী কিছু হতে পারে না। যদিও সামনে এগোনোর পথ বন্ধুর, প্রতি পদক্ষেপে আমাদের নতুন ও অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। নেলসন ম্যান্ডেলার বিখ্যাত বাণী থেকে আমরা উৎসাহ নিতে পারি: ‘না হওয়া পর্যন্ত সবকিছুই অসম্ভব মনে হয়।’ টেকসই, সমৃদ্ধ ও ন্যায়সংগত ভবিষ্যৎ নির্মাণে আমাদের হাতে এখন নজিরবিহীন সুযোগ এসেছে। সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের কাজ এখনই শুরু করতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
* ডেসমন্ড টুটু: শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী আর্চবিশপ।
* ট্রেভর ম্যানুয়েল: দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক অর্থমন্ত্রী।

তদন্তের ক্ষমতা নিজেদের হাতেই রাখতে চায় পুলিশ by রোজিনা ইসলাম

পুলিশের কাছেই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ নারী!
পুলিশের কাছেই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ নারী!
নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম-দুর্নীতিসহ স্পর্শকাতর অভিযোগের তদন্তের ক্ষমতা নিজেদের কাছেই রাখতে চায় পুলিশ। এগুলোর তদন্তের ক্ষমতা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটিকে দিতে চায় না।
পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসা অনিয়ম-দুর্নীতি ও নানা স্পর্শকাতর অভিযোগ তদন্তের জন্য মন্ত্রণালয় দুটি কমিটি গঠন করায় এর প্রতিক্রিয়ায় পুলিশ অধিদপ্তর মন্ত্রণালয়কে এ কথা জানিয়েছে। পুলিশ অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে ওই কমিটি পুলিশ বাহিনীর অধিকার খর্ব করবে উল্লেখ করে তা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেও পুলিশের কর্মকর্তারা একই দাবি জানিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী চায়ের নিমন্ত্রণে পুলিশ সদর দপ্তরে গেলেও এ দাবি জানানো হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তর, অধিদপ্তর, সংস্থা ও ব্যক্তির কাছ থেকে অনেক অভিযোগ স্বরাষ্ট্রে আসে। আগে পুলিশকে এসব তদন্ত করতে দেওয়া হতো। এতে দেখা যায়, বাহিনীর একক তদন্তে দুর্বলতা থাকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়ে আসা অভিযোগগুলো তদন্তের জন্য গত মার্চে মন্ত্রণালয় ও জেলা পর্যায়ে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিকে। আর কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পদমর্যাদার সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক বা তাঁর প্রতিনিধি। দুই কমিটিরই সদস্যসচিব করা হয়েছে পুলিশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধিকে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের অনুমোদনে এই কমিটি করা হয়। বিষয়টি মন্ত্রণালয় ১৯ মার্চ চিঠি দিয়ে পুলিশ অধিদপ্তরকে জানায়।
পুলিশ অধিদপ্তর এই কমিটি গঠনের তীব্র বিরোধিতা করে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ১৮৬১ সালের পুলিশ অ্যাক্ট অনুযায়ী, পুলিশ বাহিনী প্রতিষ্ঠার পর থেকে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় নিজস্ব বিধিবিধানের আলোকে বিভিন্ন অভিযোগ বিষয়ে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন আইন ও বিধিবিধানে সুস্পষ্টভাবে পুলিশের শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিষয়ে করণীয় পদ্ধতি বলা আছে। গত পাঁচ বছরে পুলিশের সব স্তরের ৬৭ হাজার ৮২০ জন সদস্যের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা প্রতি বছর গড়ে ১৩ হাজার ৫৬৪ জন। এএসপি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ব্যাপারেও পুলিশ কর্মকর্তা নিযুক্ত করে তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার রীতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। কিন্তু হঠাৎ পুলিশ বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভাগ-বহির্ভূত কমিটির মাধ্যমে তদন্ত করার বিষয়টি বোধগম্য নয়। পুলিশ বাহিনীর শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত এ আদেশ প্রতিষ্ঠিত বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এটি অপ্রয়োজনীয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ তদন্তের জন্য বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তার সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে তদন্ত করা প্রচলিত নিয়ম। এ ছাড়া পুলিশ আইন, ১৮৬১ অনুসারে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তদন্ত কমিটি গঠনের ক্ষমতা সরকার বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাখে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পুলিশ অধিদপ্তর পাঁচ বছরের যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, সেখানে বলা নেই কতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল বা কতজনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তাঁরা পর্যালোচনা করে দেখেছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া ২৬টি অভিযোগ পুলিশ অধিদপ্তরে তদন্তের জন্য পাঠিয়েছিল। এর মধ্যে ১৮টি প্রমাণিত হয়নি এবং দুটি আংশিক প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুলিশের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তদন্ত করেছে তা প্রমাণিত হয়েছে। ফলে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট বাহিনীর এককভাবে তদন্তে সত্য উদ্ঘাটন না হয়ে তদন্তে দুর্বলতা রয়ে যায়।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটি বিভাগীয় মামলা-সংশ্লিষ্ট তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবে না। তারা শুধু মন্ত্রণালয়ে আসা অভিযোগ তদন্ত করবে। তাই পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োগ করা বিধিবিধানের সঙ্গে এ কমিটির কার্যপরিধি সাংঘর্ষিক নয়। নালিশ, এজাহার বা আদালতের মন্তব্য ছাড়া পুলিশের বিরুদ্ধে যেকোনো অভিযোগের বিরুদ্ধে পিআরবি প্রবিধান অনুযায়ী যেখানে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত করার বা নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, সেখানে সরকার তথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটিকে পুলিশ অধিদপ্তরের চিঠিতে কেন ‘বিভাগ-বহির্ভূত কমিটি’ বলা হলো তা মন্ত্রণালয়ের বোধগম্য নয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। কারণ, মন্ত্রণালয় মনে করে, পুলিশ বাহিনীর শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী কোনো আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, সাংঘর্ষিক বা সরকারের এখতিয়ার নেই, এমন কোনো আদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়নি। পুলিশ অধিদপ্তর বিষয়টি অনুধাবন না করেই মন্ত্রণালয়ের চিঠি প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছে।
জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেকোনো কমিটি করতেই পারে। রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেকোনো বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার রাখে। মন্ত্রণালয়ের সেই নির্বাহী ও রাজনৈতিক ক্ষমতা আছে। কিন্তু মাত্রাটা যেন বেশি না হয়ে যায়, সে বিষয়ে লক্ষ রাখতে হবে।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা পুলিশের প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। পুলিশের কর্মকর্তারা আমার কাছে এসেছিলেন, তাঁরা এ কমিটির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। দেখি এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কী করা যায়।’
আরেকটি চিঠির বিরোধিতা: সম্প্রতি মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশ অধিদপ্তরে ‘জেলা প্রশাসক-পুলিশ সুপার দ্বন্দ্বে মাঠ প্রশাসনের চেইন অব কমান্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা’ শিরোনামে এক চিঠিতে জানানো হয়, হাতে অস্ত্র থাকায় এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হওয়ায় পুলিশের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের সখ্য বেশি। রাজনৈতিক ও অবৈধ অর্থের জোরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থেকে পদোন্নতি পেয়ে জেলার এসপি হন অনেকেই। এঁদের অনেকের মূল লক্ষ্য থাকে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকে অর্থ উপার্জন।
মন্ত্রণালয়ের এমন বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুলিশ ও রাজনীতিবিদদের সন্ধির ন্যূনতম কোনো অবকাশ নেই। প্রতিবেদনের এ বক্তব্য রাজনীতিবিদসহ পুলিশের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী ও সুশৃঙ্খল বাহিনীকে হেয় করা এবং গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে ভূমিকা পালনকারী একটি সংস্থার মনোবল ক্ষুণ্ন করার অপপ্রয়াস মাত্র ও সুশৃঙ্খল গণতান্ত্রিক কাঠামোতে আঘাত হানার শামিল। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যন্ত্রের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রতিবেদন অপ্রত্যাশিত ও অনভিপ্রেত।

মোদির সঙ্গে বৈঠক ঠেকাতে সব চেষ্টাই হয়েছে -দ্য সানডে গার্ডিয়ানকে খালেদা

হোটেল সোনারগাঁওয়ে পৌনে এক ঘণ্টার বৈঠকে প্রায় ১০-১২ মিনিট
একান্তে কথা বলেন খালেদা জিয়া ও নরেন্দ্র মোদি। ছবি: ফোকাস বাংলা
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশ সফরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তিনি যাতে বৈঠক করতে না পারেন সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছিল।
গত ৭ জুন খালেদা-মোদি বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা পরই নয়াদিল্লিভিত্তিক রোববারের পত্রিকা দ্য সানডে গার্ডিয়ানের এক সাংবাদিককে গুলশানে নিজের কার্যালয়ে সাক্ষাৎকার দেন খালেদা জিয়া। তখনই তিনি এ অভিযোগ করেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দ্য সানডে গার্ডিয়ানের সাংবাদিক সৌরভ স্যান্যাল। পত্রিকাটি গতকাল ওই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে।
মোদির সফরকালে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক হবে কি হবে না, এ নিয়ে চলছিল জল্পনাকল্পনা। মোদির প্রথম সফরের মাত্র একদিন আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সাক্ষাতের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এস জয়শঙ্কর নয়াদিল্লিতে সংবাদমাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রী মোদির সফরসূচিতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক হবে।
সফরসূচি অনুযায়ী প্যান প্যাসেফিক সোনারগাঁও হোটেলে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন। এর মধ্যে প্রায় ১২ মিনিট একান্তে কথা বলেন খালেদা ও মোদি। বৈঠক শেষ হওয়ার পর খালেদা জিয়া সেখান থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আলোচনা খুবই আন্তরিক ছিল।
সৌরভ সান্নালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর বৈঠক, ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখ্যার্জির সঙ্গে দেখা না করা, জামায়াতে ইসলামী, নির্বাচন নিয়ে খালেদা জিয়া খোলামেলা কথা বলেছেন।
সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক সৌরভ খালেদার কাছে বৈঠক কেমন হয়েছে তা জানতে চান। জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, খুবই আন্তরিক পরিবেশে বৈঠক হয়েছে। এতে তিনি সন্তুষ্ট। তিনি বলেন, ‘মোদিজির সঙ্গে দেখা হওয়াটা ছিল চমৎকার।’
আলোচনার মূল বিষয়বস্তু কী ছিল এমন প্রশ্নের জবাবে খালেদা বলেন, ‘আমরা ঠিক কী কী নিয়ে কথা বলেছি তার সব বলতে পারব না, তবে অবশ্যই বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত সন্তোষজনক।’
নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর বৈঠক হওয়া না হওয়া নিয়ে যে সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল সেই প্রসঙ্গে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, ‘কী নিয়ে সংশয়? আমি কি একবারও বলেছি যে, আমি মোদিজির সঙ্গে দেখা করব না? নির্বাচনে তিনি জয়ী হওয়ায় আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম। আপনি কি বিএনপির একজন নেতাকেও বলতে শুনেছেন, আমি মোদিজির সঙ্গে দেখা করব না? মোদিজি বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের নেতা। তিনি দুই দেশের সম্পর্ককে জোরদার করার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। ভুল বার্তা পৌঁছে দিতেই ইচ্ছেকৃতভাবে এই সংশয় তৈরি করা হয়েছিল এবং তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। সত্যি বলতে কি, মোদিজির সঙ্গে যাতে আমার বৈঠক না হয়, সে জন্য এমন কোনো চেষ্টা নেই যা তারা করেনি।’
এই ষড়যন্ত্রের পেছনে কে ছিল-জানতে চাইলে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমি সরাসরিই বলতে চাই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী প্রকাশ্যেই বলে বসেন, বাংলাদেশ সফরকালে মোদিজির সঙ্গে আমার বৈঠকের “কোনো সম্ভাবনা” নেই। মোদিজির সফরের একদিন আগে এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বিবৃতির কয়েক ঘণ্টা পরই ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এস জয়শঙ্কর নয়াদিল্লিতে বলেন, বৈঠক হতে যাচ্ছে। আপনি এটাকে কীভাবে বিচার করবেন? আমি এ জন্য ভারত সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। বাংলাদেশের সরকার চায়নি আমার সঙ্গে মোদিজির কোনো আলোচনা হোক।’
২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখর্জির সঙ্গে কেন দেখা করেননি জানতে চাইলে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, প্রণব মুখার্জির সফরের সময় জামায়াতে ইসলামীর ডাকে দেশে অবরোধ চলছিল। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাদের শীর্ষ তিনজন নেতাকে সাজা দেওয়ার প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামী হরতাল ডেকেছিল। তিনি বলেন, ‘আমাকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকটি বাতিল করতে হয়েছিল, কারণ আমরা জানতে পেরেছিলাম, তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে আমার ওপর হামলা করা হবে। প্রকৃতপক্ষে তা জীবনের জন্য হুমকি ছিল।’
এই উত্তরের পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিক সৌরভ জানতে চান জামায়াতে ইসলামী বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক। তাহলে তারা কেন তাঁর (খালেদা) ওপর হামলা করবে?
খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমার সঙ্গে যেকোনো কিছুই ঘটতে পারত, আর এর পুরো দায় গিয়ে পড়ত জামায়াতের ওপর এবং আমাদের বিরোধী পক্ষগুলোর এটাই ছিল পরিকল্পনা, যা আমরা বুঝতে পেরেছিলাম। তাই বৈঠকটি বাতিল করা হয়েছিল। আজ আমি আপনাকে প্রকৃত বিষয়টি জানালাম।’
প্রণব মুখার্জির সঙ্গে দেখা না করার মধ্য দিয়ে বহির্বিশ্বের কাছে, ভারতবিরোধী অবস্থানই প্রকাশ পেয়েছিল—এমনটা মনে করেন কি না জানতে চাইলে খালেদা বলেন, ‘আমি কেন ভারতবিরোধী হতে যাব? ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে ভারতবিরোধী ও হিন্দুবিরোধী হিসেবে দাঁড় করাতে সমন্বিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে।’
সাংবাদিক সৌরভ স্যান্যাল এ সময় জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামীর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন করে বলেন, কট্টর ধর্মীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করা হয় জামায়াতকে। এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভারতপন্থী নয়।
এর জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, ‘জামায়াত আমাদের জোটের শরিক; এটুকুই। জোটে তাদের বিএনপির কথা শুনতে হবে।’ এ সময় বিএনপির এই নেতা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হাতে কীভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন নির্যাতিত হচ্ছে সেই বিবরণ দেন। তিনি বলেন, ‘হিন্দুদের ঘরবাড়ি লুটপাট করা হয়েছে, ভূমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে...আর আমাদের বলা হচ্ছে হিন্দুবিরোধী।’
সব শেষে খালেদা জিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে মত দেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ওপর বহির্বিশ্বের নজর রাখা উচিত বলে উল্লেখ করেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: টাকার খেলা! by হাসান ফেরদৌস

কিছুদিন আগে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার প্রথম পাতায় একটি খবরের শিরোনাম ছিল: ‘২০১৬ সালের নির্বাচনের প্রধান বিবেচ্য: টাকা, টাকা, টাকা’। সে শিরোনাম পড়ে এ দেশে কেউ ভ্রু কুঁচকেছেন, এ কথা শুনিনি। কারণ, কথাটা এত পুরোনো যে এ নিয়ে অধিকাংশই কথা বলার কোনো প্রয়োজন দেখেননি।
আমেরিকায় কেন, অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশেই নির্বাচন মানেই টাকার খেলা! আপনি যত অভিজ্ঞ ও যোগ্য প্রার্থী হন না কেন, বস্তাবোঝাই টাকা না থাকলে নির্বাচনে জেতা আপনার পক্ষে অসম্ভব। তবে এ কাজে অন্য সবাইকে টেক্কা দিয়েছে মার্কিনরা। তারা নিজেদের বিশ্বের সেরা গণতান্ত্রিক মডেল হিসেবে পরিচয় করাতে ভালোবাসে। কিন্তু এই দেশে, আর যা-ই হোক, টাকা না থাকলে নির্বাচনে জেতা অসম্ভব। সে কারণে এখানে গণতন্ত্রের নতুন নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডলারোক্রেসি’।
টাকা দিয়ে কীভাবে নির্বাচন জেতা বা হারা যায়, তার সেরা উদাহরণ বারাক ওবামা। ২০০৮ সালে অভাবনীয় জনপ্রিয়তার জোয়ারে ওবামা প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর জনপ্রিয়তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু সেই জনপ্রিয়তাকে নির্বাচনী বিজয়ে পরিণত করা সম্ভব হয় টাকার জোরে। এ দেশে সরকারি তহবিল থেকে নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের আইন রয়েছে। ২০০৮ সালে ওবামা চাইলে সরকারি তহবিল থেকে ৮৪ মিলিয়ন ডলার পেতে পারতেন। কিন্তু শর্ত ছিল, এর বাইরে এক পয়সাও তোলা যাবে না। ওবামা আগাগোড়া বলে এসেছেন তিনি সরকারি তহবিল নিয়েই নির্বাচন করবেন। কিন্তু যেই টের পেলেন, দশ-বিশ ডলার করে হলেও বিস্তর চাঁদা তোলার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে, অমনি জানিয়ে দিলেন, সরকারি তহবিল নিয়ে তিনি নির্বাচন করবেন না। যুক্তি দেখালেন, তাঁর প্রতিপক্ষ জন ম্যাককেইনের হয়ে রিপাবলিকান দল দেদার চাঁদা তুলছে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার এ ছাড়া অন্য পথ নেই। সে বছরের নির্বাচনে ওবামা একাই ৭৫০ মিলিয়ন ডলার চাঁদা তুলেছেন।
বলা যায়, সেদিন থেকেই আমেরিকায় সরকারি খরচে জাতীয় নির্বাচনের ধারণার মৃত্যু হয়।
কথাটা হয়তো পুরোপুরি সত্য হলো না। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বরাবরই ধনীদের পক্ষে গেছে। একদম প্রথম দিকের প্রেসিডেন্টদের বেলাতেও কথাটা সত্যি। এ দেশে পাঁচ-দশজন অতি ধনী এককাট্টা হয়ে বরাবরই ঠিক করে দিয়েছেন কে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হবেন। ব্যাপারটা এতটা দৃষ্টিকটু হয়ে পড়ে যে ১৯০৭ সালে প্রেসিডেন্ট থিওডর রুজভেল্ট প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে ‘পাবলিক ফিন্যান্সিং’-এর আইন প্রস্তাব করেন। এই আইন অনুসারে প্রত্যেক নাগরিকের ওপর ধার্য করা হয় নির্বাচনে ব্যয় নির্বাহের জন্য নামমাত্র কর। রাজনৈতিক প্রার্থী বা দলের জন্য চাঁদা দেওয়া নিষিদ্ধ নয়, তবে কে কী পরিমাণ চাঁদা দেবেন, তার সর্বোচ্চ হার বেঁধে দিয়ে একাধিক আইন পাস হয়েছে এই দেশে।
অবস্থাটা নাটকীয়ভাবে বদলে যায় ২০১০ সালে। সে বছর এ দেশের সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত দেন, যার যা খুশি চাঁদা দেওয়াটা তার শাসনতান্ত্রিক অধিকার। এর নাম নাকি ‘ফ্র স্পিচ!’ বড় বড় করপোরেশনেরও মুখ খুলে কথা বলার বা পকেট ঝেড়ে চাঁদা দেওয়ার—অধিকার আছে। ব্যস, হয়ে গেল। তখন থেকেই যথেচ্ছ চাঁদা তোলার জন্য তথাকথিত ‘সুপার পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি’ হাড্ডাহাড্ডি লড়াইেয় নেমে পড়ল। ২০১২ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে এই ‘সুপার প্যাক’-এর নেতৃত্বে এ দেশের নির্বাচনে কেনাবেচার তেজারতি হয় কোনো রাখঢাক ছাড়াই।
২০১৬ সালের নির্বাচনেও সেই একই মাদারির খেল হবে, তবে টাকার অঙ্কটা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
আমেরিকার রাজনীতিতে টাকার ভূমিকা কী রকম ভয়াবহ, সে কথা সবচেয়ে স্পষ্ট বলেছেন খোদ ওবামা। কেনেথ ভোগেলের নতুন বই বিগ মানিতে ২০১২ সালের একটি ঘটনা বলা হয়েছে। ওবামা তাঁর নিজের সমর্থকদের এক তহবিল সংগ্রহ ডিনারে আমন্ত্রণ করেছিলেন। সেখানে প্লেটপ্রতি দাম ধরা হয়েছিল ১৭ হাজার ৯০০ ডলার। ডেমোক্রেটিক পার্টির বাঘা বাঘা দেনেওয়ালা সেখানে উপস্থিত। মাইক্রোসফটের বিল গেটসের দিকে তাকিয়ে ওবামা বললেন, ‘দেখুন, এখন আমরা এমন একটা অবস্থায় পৌঁছেছি, যখন মাত্র শ দুয়েক লোক একটা জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করতে পারেন। অবস্থা যদি না বদলায়, তাহলে সম্ভবত আমিই হব শেষ প্রেসিডেন্ট, যে মোটা চাঁদা ছাড়াই নির্বাচনে জিতেছে। আমি মোটা টাকার চাঁদা পেয়েছি বটে, কিন্তু অধিকাংশ চাঁদাই এসেছে তৃণমূল থেকে, অল্প টাকার চাঁদা।’
২০১২ সালে তাঁর পুনর্নির্বাচনে ওবামা ছোট-বড় অঙ্ক মিলিয়ে এক বিলিয়ন ডলারের অধিক চাঁদা তুলতে সক্ষম হন। অন্যদিকে তাঁর প্রতিপক্ষ মিট রমনি তোলেন সোয়া বিলিয়ন ডলার। এর বাইরে যদি ‘সুপার প্যাক’-এর চাঁদা ধরা হয়, সেখানেও রমনি ওবামার তুলনায় কম করে হলেও এক শ মিলিয়নের অধিক চাঁদা তোলেন। তারপরও যে শেষ পর্যন্ত ওবামা জিতলেন, রমনি নন, তার কারণ অবশ্য স্বতন্ত্র। তবে টাকার হিসাবে তিনি যে রমনি থেকে খুব পিছিয়ে ছিলেন না, সেটি তঁার বিজয়ের অন্যতম কারণ, সে কথাতেও কোনো সন্দেহ নেই।
২০১৬ সালের নির্বাচনে এই টাকার খেল যে অন্য যেকোনো সময়কে ছাড়িয়ে যাবে, তার সব লক্ষণ বর্তমান। এখনো দুই দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী চূড়ান্ত হয়নি, তবে ডেমোক্রেটিক দলের হয়ে হিলারি ও রিপাবলিকানদের জেব বুশ যাঁর যাঁর দলের প্রধান দাবিদার হয়ে উঠেছেন। তাঁরা দুজনের কেউই জোরেশোরে নির্বাচনী প্রচারণায় নামেননি, আপাতত সব শক্তি ও মেধা নিয়োগ করেছেন টাকা তোলায়। যত পারো টাকা তোলো। নিজেরা সরাসরি তুলতে না পারলে যার যার সুপার প্যাকের মাধ্যমে তাঁরা টাকা তুলছেন।
ব্যাপারটা কী রকম নির্লজ্জ আকার নিয়েছে, তা জেব বুশের সাম্প্রতিক আবেদনপত্র থেকেই ঠাওর করা যায়। নিজ সমর্থকদের এক চিঠিতে তিনি সরাসরি বলেছেন, আপনারা প্রত্যেকে এক মিলিয়ন ডলার করে চাঁদা দিন। টাকাটা যাবে তাঁর সুপার প্যাকের তহবিলে। মজার ব্যাপার হলো বুশ এখনো নিজের প্রার্থিতাই ঘোষণা করেননি। শর্ত আছে, কোনো ঘোষিত প্রার্থী তাঁর সুপার প্যাকের সঙ্গে সলাপরামর্শ করে চাঁদা তুলতে পারবেন না। এই নামমাত্র নিয়ন্ত্রণ মাথায় রেখে আনুষ্ঠানিক প্রার্থী পদ ঘোষণার আগে বুশ দুই হাতে টাকা কুড়াচ্ছেন।
একই কথা হিলারি সম্বন্ধেও। তাঁর টার্গেট আড়াই বিলিয়ন ডলার চাঁদা তোলা। গত নির্বাচনে ওবামা ও রমনি মিলে ঠিক এই পরিমাণ চাঁদা তুলেছিলেন। হিলারিকে এই কাজে মদদ দিচ্ছেন স্বামী বিল ক্লিনটন। হিলারির সুপার প্যাকের মাধ্যমে নতুন-পুরোনো বন্ধুদের কাছে মাথার টুপিটি বাড়িয়ে বসে আছেন তাঁরা দুজনেই। কিছুদিন আগে নিউইয়র্কে এসেছিলেন হিলারি ‘ফান্ড রেইজিং ডিনারে’, সেখানে প্লেটপ্রতি চাঁদা ছিল ৫০ হাজার ডলার। জেব বুশ অবশ্য তাঁর চেয়ে এক কাঠি সরেস। তিনিও নিউইয়র্কে এসে ওয়াল স্ট্রিটের টাকার কুমিরদের ডিনারে নিমন্ত্রণ দিয়েছিলেন। সেখানে প্লেট প্রতি চাঁদা ছিল এক লাখ ডলার!
সবচেয়ে ভয়ের কথা তা হলো এ দেশের দু-চারজন ধনকুবের এবার প্রতিজ্ঞা করে বসেছেন, তাঁদের নিজেদের পছন্দের প্রার্থী পাস করিয়ে আনতে যত টাকা লাগে, তাঁরা ঢালবেন। তাঁদের মধ্যে ১ নম্বরে রয়েছেন টেক্সাসের দুই তেল ব্যবসায়ী—চার্লস ও ডেভিড কোক। তাঁরা নিজেরাই ৯০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করার কথা ঘোষণা করেছেন। আরেক বিলিয়নিয়ার, ক্যাসিনো মালিক সেল্ডন এডেলসনও জানিয়েছেন, হিলারিকে হারাতে তিনি মানিব্যাগ খুলে ধরতে পিছপা হবেন না। গত নির্বাচনে তিনি ব্যয় করেছিলেন প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার, এবার খরচ তার চেয়ে কয়েক গুণ হবে, তা নিশ্চিত।
ফলে বিস্ময়ের কিছু নেই, বিলিয়নিয়ার-মিলিয়নিয়ারদের পেছনে করজোড়ে লাইন দিচ্ছেন দুই দলের প্রত্যেক প্রার্থী। একমাত্র ব্যতিক্রম ভারমন্ট থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। এই স্বঘোষিত সমাজতন্ত্রী কোনো সুপার প্যাকের পয়সা নেবেন না। বলেছেন, যে চাঁদা তুলবেন, তার সবটাই আসবে সাধারণ মানুষের দেওয়া দশ-বিশ ডলার থেকে। নির্বাচনে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণার প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সিনেটর স্যান্ডার্স তুলেছেন ১২ লাখ ডলার, চার দিনে ৪০ লাখ। এর মধ্যে সর্বোচ্চ চাঁদার পরিমাণ ছিল ৪৩ ডলার।
তবে স্যান্ডার্স ২০১৬ মালের নির্বাচনে জিতে আসবেন, এ কথা যদি কেউ ভেবে থাকেন, তাহলে তিনি সম্ভবত মূর্খের স্বর্গে বাস করেন। কেন, তা জানার জন্য আমাদের শুনতে হবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার এই দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে কী ভাবেন। ২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্টের ‘সিটিজেন ইউনাইটেড’-এর পক্ষে রায় ঘোষণার পর কার্টার ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন, আমেরিকার নির্বাচনী ব্যবস্থা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ নির্বাচনী ব্যবস্থার একটা। আর তার একমাত্র কারণ হলো অর্থের অর্গলহীন আমদানি।
‘ডেমোক্রেসি’ নয়, এ দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার নাম যথার্থই ‘ডলারোক্রেসি।’
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন- ব্যাচেলর নেতা...

ভারতের ব্যাচেলর নেতা নরেন্দ্র মোদি। বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে কিছুটা মুশকিল হয় তার। গত বছর নির্বাচনে বিরাট জয়ের পর মায়ের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন। মাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন- সেটা দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এরপর জাঁকজমকপূর্ণ অভিষেক অনুষ্ঠানে তিনি মাকে আমন্ত্রণ জানাতে ব্যর্থ হন। নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। এটা প্রশংসনীয়। কিন্তু তিনি পুরুষের সম্পর্কের ভিত্তিকে এবং সুরক্ষা করার মূল্যবান সম্পদ বা ব্যক্তি হিসেবে ‘আমাদের মা, মেয়ে আর বোনদের’ সংজ্ঞায়িত করেন। প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগ পর্যন্ত তিনি স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান যে, তার একজন স্ত্রী আছেন এবং তারা আলাদা থাকেন। এটা তার সুনামের জন্য সহায়ক নয়। তরুণ বয়সে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়েছিল তাকে। আর এরপর থেকে তারা একসঙ্গে ছিলেন না। মোদি দারুণ বাকপটু। তবে মাঝে মধ্যেই বিতর্কিত মন্তব্য করে বসেন। ৭ই জুন সফল বাংলাদেশ সফরকালীন স্থুল এক মন্তব্য করেন মোদি। তার আতিথ্যকর্তা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি বলেন, নারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এদিকে ভারতের সমালোচকরা পশ্চাদমুখী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য মোদির সমালোচনা করেছেন যে দৃষ্টিভঙ্গি ওইসব মানুষদের জন্য স্বাভাবিক যারা দেশকে ‘ভারত মাতা’ বলে শ্রদ্ধা করে কিন্তু নারীদের সঙ্গে জঘন্য আচরণ করে। তারপরও এমন দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তৃতি ব্যাপক। শুধু ভারতেই নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে। পুরো এ অঞ্চলটি নারীদের সমমর্যাদা ও সুযোগ দিতে ব্যর্থ। কিন্তু সেটা একটু অদ্ভুত ঠেকতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নারীরা যে শীর্ষস্থানীয় ভূমিকা পালন করে থাকেন সে বিবেচনায়। চীন, জাপান, রাশিয়া ও অন্যান্য অনেক দেশ এখনও কোন নারী প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতে পারে নি। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় এ যাবৎ অনেক নারী প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট ছিলেন ও আছেন। হিলারি ক্লিনটন যদি আগামী বছর বিশ্বের সব থেকে শক্তিশালী গণতন্ত্রের নেতৃত্ব দিতে নির্বাচিত হন তাহলে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের নেতৃত্ব দানকারী ইন্দিরা গান্ধীর পর অর্ধশতক পূর্ণ হবে। ১৯৬০ সালে শ্রীলঙ্কার শ্রীমাভো বন্দরনায়েক বিশ্বের প্রথম নারী রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হন। দেশটিতে মা ও তার মেয়ে দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কার্যালয়ে অধিষ্ঠিত হয়েছেন যা অনন্যসাধারণ এক নজির। ৯০ দশকের শেষের দিকে চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা যখন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তখন একইসময়ে তার বয়োবৃদ্ধ মা মিসেস বন্দরনায়েক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার তৃতীয় মেয়াদ পূর্ণ করেন। দক্ষিণ এশিয়ার গতন্ত্রগুলোর শীর্ষে নারীরা উন্নতি করেন এর পেছনে আংশিক কারণ হলো এমন বংশ থেকে তারা এসেছেন যারা অতীতে রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশের প্রধান দু’নেত্রী রাজনীতিতে আসেন উত্তরাধিকার সূত্রে। পাকিস্তানের একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেনজির ভুট্টো তার পিতা জুলফিকার আলী ভুট্টো নিহত হওয়ার পর রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। জুলফিকার আলী একজন জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ভারতে কংগ্রেস দলের ভবিষ্যৎ নেত্রী হিসেবে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে অনেকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে থাকেন। এর অন্যতম কারণ হলো তার মা সোনিয়া গান্ধী ও তার দাদি ইন্দিরা গান্ধী এ দায়িত্ব পালন করেছেন। দাদির সঙ্গে প্রিয়াঙ্কার চেহারার দারুণ সাদৃশ্যও রয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়া যদি সম্ভ্রান্ত নারীদের জন্য অন্যতম সেরা স্থান হয় যেখানে তারা রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা করতে পারেন; একইসঙ্গে এটা একজন সাধারণ নারীর জন্য সব থেকে খারাপ স্থানগুলোর একটি। শীর্ষস্থানীয় নারীরা মাঝে মধ্যে যে অন্ধ দেশপ্রেমের মুখোমুখি হন তা নিম্নস্থানীয়দের ওপর থাকা বোঝার স্তূপের পাশে মলিন হয়ে যায়। ‘মা সূচকে’ দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের অবস্থান অত্যন্ত বাজে। বৃটিশ দাতব্য প্রতিষ্ঠান সেভ দ্য চিলড্রেন মে মাসে সূচকটি প্রকাশ করে। এতে নারীদের ভালো থাকার ওপর ভিত্তি করে ১৭৯টি দেশের অবস্থান নির্ণয় করা হয়েছে। যে বিষয়গুলো নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে তার মধ্যে মায়েদের আয়ু, নারীদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো ছিল। এশিয়ার মধ্যে সূচকে উপমহাদেশের রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান ছিল সব থেকে খারাপ। ভারত ও পাকিস্তানে (সূচকে অবস্থান যথাক্রমে ১৪০তম ও ১৪৯তম) নারীদের জীবনযাত্রার মান আফগানিস্তানের (১৫২তম) তুলনায় সামান্য উন্নত। আর চীনের থেকে তো অনেক পিছিয়ে (৬১তম)।
তবে সবকিছু হতাশাব্যঞ্জক নয়। গত ২৫ বছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর আনুষ্ঠানিক স্বাস্থ্যবিষয়ক স্কিমের বদৌলতে দক্ষিণ এশিয়ানদের জন্য কিছু কিছু বিষয় নাটকীয়ভাবে উন্নতি হয়েছে। বাল্য বিবাহের বিষয়টি বিবেচনা করুন। ২০ শতকের মাঝামাঝি সময়ের দিকে গড়ে ভারতীয় নারীদের বিয়ে হতো ১৫ বছর বয়সে। তারা সন্তানও গ্রহণ করতেন অনেক আগে এবং ঘন ঘন। এখন ভারতীয় নারীদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা শিক্ষা সমাপ্ত হওয়ার পর। গড়ে ২১ বছর বয়সে। আরেকটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৩ সালে সন্তান প্রসব করতে গিয়ে বিশ্বে মৃত্যু হয়েছে ২ লাখ ৮৯ হাজার নারীর। এর এক চতুর্থাংশ দক্ষিণ এশিয়ায়। কিন্তু এখানেও অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। এ অঞ্চলে এমন মৃত্যুর হার ১৯৯০ সালে প্রতি ১ লাখে ৫৫০ জন থেকে কমে এখন ১৯০ হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলো- নেপাল, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ বিনামূল্যে মা ও শিশু সেবা দিয়ে এবং আরও নারী স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। তারপরও আরও অগ্রগতি দেখতে হলে নারীদের জন্য দক্ষিণ এশিয়াকে অনেক বেশি ব্যয় করা প্রয়োজন। এ অঞ্চল জনস্বাস্থ্য খাতে জাতীয় প্রবৃদ্ধির ১ শতাংশও ব্যয় করে না। চীন ব্যয় করে ৩.১ শতাংশ। এতে করে যারা সন্তান প্রসব করান এবং শিশু সেবার জন্য যাদের সব থেকে বেশি দায়িত্ব থাকে তাদের ওপর বড় বোঝা এসে পড়ে। এর আংশিক কারণ হলো বিদ্যমান দরিদ্রতা। ২০১২ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যানে দেখা যায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিবছর জনপ্রতি স্বাস্থ্য সেবার জন্য সরকারি ও বেসরকারি বরাদ্দ মিলিয়ে ৫০ ডলারের কিছু বেশি হবে। আফ্রিকা প্রায় এর দ্বিগুণ ব্যয় করে। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এটা দশগুণ বেশি। উত্তর আমেরিকায় প্রতিবছর স্বাস্থ্যখাতে জনপ্রতি ব্যয় ছিল ৮৫০০ ডলার। দক্ষিণ এশিয়ায় নারীদের জন্য সম্পদের ব্যয় অন্য যে কোন স্থানের তুলনায় অনেক বেশি অসম। দিল্লির ধনী এলাকাগুলোতে (ঢাকা ও অন্যত্রও চিত্র একই) নারীরা উন্নত বিশ্বের মানদণ্ডের কাছাকাছি মাতৃত্বসেবাসহ অন্যান্য সেবা উপভোগ করতে পারে। কিন্তু একই শহরের দরিদ্র অংশের নারীরা বিশেষ করে যারা বস্তি এলাকায় থাকে তারা অপেক্ষাকৃত দরিদ্র গ্রামগুলোর থেকেও খারাপ পরিস্থিতির শিকার। দিল্লিতে এমন নারীদের মাত্র ১৯ ভাগ সন্তান প্রসবের সময় দক্ষ কাউকে কাছে পায়। দক্ষিণ এশিয়ায় বিদ্যমান সম্পদকে আরও সম্প্রসারণ করার একটি উপায় হলো এমন বৈষম্য কমিয়ে আনা। কিন্তু সেটা নারীদের প্রতি পুরোনো ধাঁচের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হতে যে সময় লাগে তার থেকে দ্রুত হওয়ার সম্ভাবনা কম।