Friday, August 1, 2014

সংলাপ? এজেন্ডা কী হবে? by আবদুল মান্নান

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০১১ সাল থেকে একটিমাত্র বিষয় ঘুরেফিরে এখনো আলোচনায় আসছে, আর তা হচ্ছে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি এখনো তাদের সেই দাবি নিয়ে বেশ সোচ্চার। এমনকি ঈদের দিন দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তি আর দলীয় নেতা-কর্মীদের জন্য দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও তাঁর এই দাবির কথা পুনরুল্লেখ করতে ভোলেননি। তিনি সব সময় একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন এবং তা হচ্ছে, এ মুহূর্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচন দিয়ে বর্তমান সরকারকে বিদায় নিতে হবে।
মানলাম, বর্তমান সরকার খুবই খারাপ সরকার কিন্তু এমন একটি অসাংবিধানিক ব্যবস্থায় যদি নির্বাচন হয়ও, বেগম জিয়া কীভাবে বুঝলেন, এই ‘খারাপ সরকার’ বিদায় হবে? নাকি তাঁর কাছে এমন কোনো গোপন তথ্য আছে, যা অন্য কারও জানা নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাংলাদেশ আবিষ্কার করেনি। কারণ, এমন ব্যবস্থার অধীনে সদ্য স্বাধীন অনেক দেশে ইতিপূর্বে নির্বাচন হয়েছে। তবে অন্য সব দেশে প্রচলিত সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী একটি বিদায়ী সরকারের অধীনেই পরবর্তী সংসদ বা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের আগে আন্দোলনরত তিন জোট এই মর্মে ঘোষণা করেছিল, একবার এরশাদের পতন হলে কমপক্ষে তিনটি নির্বাচন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে এবং সেই সরকারের রূপরেখা কী হবে, তা–ও তিন জোট তাদের রূপরেখায় বর্ণনা করেছিল।
১৯৯১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এমন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিএনপি এবং তাদের তখন অঘোষিত মিত্র জামায়াত বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনেই হওয়ার কথা ছিল কিন্তু ১৯৯৪ সালে মাগুরা উপনির্বাচনে বিএনপি ভয়াবহ কারচুপির আশ্রয় নিলে অন্যান্য রাজনৈতিক দল বুঝে ফেলে, বেগম জিয়ার সরকারের আমলে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাদের এই বিশ্বাস আরও পাকাপোক্ত হলো, যখন ১৯৯৫ সালে ঢাকা-১০ আসনে উপনির্বাচনের নামে খোদ রাজধানীতেই একটি নির্বাচনী তামাশার মাধ্যমে বেগম জিয়ার রাজনৈতিক উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালুকে জেতানো হলো। অথচ এই দুটি নির্বাচন এসব তামাশার মাধ্যমে জেতার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কারণ, এই দুই উপনির্বাচনে হারলেও বিএনপির কোনো ক্ষতিই ছিল না। এই দুই নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি গণদাবিতে পরিণত হয় এবং শেষমেশ অনেক টালবাহানা করে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি ভোটারবিহীন একদলীয় নির্বাচন করে বেগম জিয়া সংসদে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন।যেই সংসদে এই সংশোধনী পাস করা হয়, সেই সংসদে বঙ্গবন্ধুর খুনি আবদুর রশীদও সদস্য ছিলেন।
১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনটি এই সংশোধনীর আওতায় করা হয় কিন্তু এই প্রথম নির্বাচনটিও নির্ঝঞ্ঝাটে হয়েছিল বলা যাবে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব পালনকালে অনেক বিতর্কিতভাবে সেনাপ্রধানের অগোচরে সেনাবাহিনীতে বিএনপির দলীয় রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস কিছু রদবদল করলে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরের পরিস্থিতি বেশ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। অনেকে সামরিক অভ্যুত্থানেরও আশঙ্কা করেন। ত্রয়োদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সরকারের সব ক্ষমতা প্রধান উপদেষ্টার হাতে ন্যস্ত করলেও সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্রপতির অধীনে রাখা হয়। হঠাৎ সেনাবাহিনীতে রদবদল, পুরো সেনাবাহিনীতে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার পর অনেকের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে, সংবিধান সংশোধনের সময় একটি বদমতলবে সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্রপতির অধীনে রাখার ব্যবস্থা হয়েছিল। কারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্দলীয় থাকলেও রাষ্ট্রপতি তো দলীয়ই থাকবেন।
তবে সে–যাত্রায় জাতি একটি মহাসংকট থেকে নিস্তার পেয়েছিল সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের বিচক্ষণতা আর দূরদর্শিতার কারণে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারে ছিল এবং সময়মতো সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিতে বিচারপতি লতিফুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। ২০০১ সালে বিচারপতি লতিফুর রহমান সরকার গঠনের আগে থেকেই পুরো প্রশাসনকে তছনছ করা শুরু করেন এবং তাঁর সাথি হন প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু সাঈদ। সেই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট বিজয়ী হয়। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বেগম জিয়ার মেয়াদকাল ছিল নানাভাবে দেশে এবং দেশের বাইরে আলোচিত-সমালোচিত। নির্বাচনে পরপরই দক্ষিণবঙ্গে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নেমে আসে এক ভয়াবহ দুর্যোগ। ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, উচ্ছেদ, খুন, জখম হয়ে ওঠে নিত্যদিনের ঘটনা। যার ফলে কয়েক হাজার মানুষ ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে অনেকে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমান হাওয়া ভবন থেকে চালু করেন একটি বিকল্প প্রশাসন। এই ভবনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে দেশের অর্থনীতিবিধ্বংসী দুর্নীতির এক ভয়াবহ বলয়। বাংলাদেশ হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের একটি অভয়ারণ্য আর অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের একটি নিরাপদ রুট। এসব অপকর্মের মচ্ছবে সরকার থাকে নির্বিকার।
২০০৬ সালের মেয়াদ শেষে পূর্বনির্ধারিত সংসদ নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুরু হয়ে যায় বিএনপি-জামায়াত জোটের ক্ষমতাকে আরও দীর্ঘায়িত করার নীলনকশা প্রণয়নের কাজ। যখন ২০০৪ সালে বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা দুই বছর বাড়ানো হয়, যার প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল বিএনপির পছন্দসই একজনকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করা। অবশ্য পরবর্তীকালে সেই নির্ধারিত প্রধান বিচারপতি এই পদ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাঁর সম্মান রক্ষা করেছিলেন। এ জন্য তাঁকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। ২০০৬ সালে কে হবেন প্রধান উপদেষ্টা, যখন এ নিয়ে সারা দেশে এক চরম অশান্তি আর রক্তক্ষরণ, তখন সবাইকে অবাক করে দিয়ে দলীয় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টা বনে যান। শুরু হয় আরেক সংকট, যার ফলে আসে এক-এগারো। ২০০৮ সালের নির্বাচনটিও একধরনের অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। কারণ, সংবিধানের বাধ্যবাধকতা ছিল এই রকম একটি সরকারের মেয়াদ ছয় মাস থাকবে, যা ছিল দুই বছর।
২০০৯ থেকে ২০১৩, এই মেয়াদে সংসদে বিরোধী দল ছিল বিএনপি-জামায়াত কিন্তু তারা তাদের আসন রক্ষার বাধ্যবাধকতার কারণ ছাড়া কখনো সংসদে উপস্থিত থাকেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দেওয়ার জন্য বিএনপি-জামায়াত ২০১৩ সালে এত জানমালের ক্ষতি করল, তা তো সরকার নয়, দেশের সর্বোচ্চ আদালত সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বাতিল করে দিয়েছেন। ১৯৯৯ সালে এম সলিম উল্লাহ নামের একজন আইনজীবী হাইকোর্টে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীকে চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট মামলা করেন।মহামান্য আদালত দীর্ঘ শুনানির পর ২১-০৭-২০০৩ তারিখে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্য সুপারিশ করেন। তখন বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায়। প্রকৃতপক্ষে ÿসংবিধানের (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন, ১৯৯৬-এর আইনগত অবস্থান নিরূপণই এই মামলার একমাত্র বিচার্য বিষয় ছিল।২০১১ সালে দীর্ঘ শুনানি, অ্যামিকাস কিউরিদের মতামত ইত্যাদি বিবেচনাপূর্বক মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এই মর্মে ২০১২ সালে রায় প্রদান করেন এবং রায়ে বলেন, ‘তর্কিত সংবিধানের (ত্রয়োদশ সংশোধন) আইন, ১৯৯৬-কে অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করা হইল এবং ইহা অবশ্যই অবৈধ।’ এই ছিল মূল মামলার চূড়ান্ত আদেশ বা রায়। বাকি যা আছে তা হলো আদালতের পর্যবেক্ষণ বা মন্তব্য। পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘...তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সাময়িকভাবে শুধু পরবর্তী দুইটি সাধারণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে থাকিবে কি না সে সম্বন্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের প্রতিনিধি জাতীয় সংসদ লইতে পারে।’ জাতীয় সংসদ এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়নি এবং যেহেতু জাতীয় সংসদ সার্বভৌম, সেহেতু জাতীয় সংসদের ওপর বাইরের কারও খবরদারি চলে না। রায়ে আরও বলা হয়, জাতীয় সংসদ এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেখান থেকে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের বাদ দেওয়া বাঞ্ছনীয়। মহামান্য আদালত পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, বরং ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুধু জনগণের নির্বাচিত জাতীয় সংসদের সদস্যদের দ্বারা গঠিত হইতে পারে, কারণ, জনগণের সার্বভৌমত্ব ও ক্ষমতায়ন, গণতন্ত্র, প্রজাতান্ত্রিকতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের basic structure এবং এই রায়ে উক্ত বিষয়গুলির ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হইয়াছে।’
ওপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে বলে, বিএনপি যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দাবিতে রাজনৈতিক অঙ্গন অস্থিতিশীল করতে হুমকি দেয়, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তা যদি করার চেষ্টা করা হয় এবং তাকে কেন্দ্র করে অন্য আর একজন যদি আদালতের শরণাপন্ন হন, তাহলে কী হবে? আগের অবস্থায় ফিরতে হলে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। এর চেয়ে উন্নত কোনো উপায় দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞদের জানা থাকলে তা জনগণের সঙ্গে শেয়ার করলে দেশের মানুষ উপকৃত হবেন। আর যদি বিএনপি এবং তার মিত্ররা আন্দোলনের নামে আবার দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, তাহলে সেই ভোগান্তি থেকে তারাও নিস্তার পাবে না। তারা সব সময় সংলাপের কথা বলে। কিন্তু সেই সংলাপের তো একটি অর্থবহ ও বাস্তবমুখী এজেন্ডা থাকতে হবে। শেখ হাসিনা বিগত সময়ে সংলাপের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। আর বিএনপি যদি সামনের নির্বাচনে অংশ নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশনে তাদের নিবন্ধন বাতিল হতে পারে। দেশে গণতন্ত্রের স্বার্থে একাধিক বিরোধী দল থাকাটা বাঞ্ছনীয়। দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কারও লাভ নেই। কারও আগ্রহ থাকলে ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায়ের ৩৮৮ পৃষ্ঠার বইটি বাজারে পাওয়া যায়। সংরক্ষণের জন্য একটি অসামান্য দলিল।
আবদুল মান্নান: বিশ্লেষক ও গবেষক।

তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ? by আনিসুল হক

ঈদের আগে একদিন টেলিভিশনে আল-জাজিরা দেখছিলাম। ইসরায়েলের একজন আর ফিলিস্তিনের একজন টক শোয় অংশ নিচ্ছিলেন, যার যার জায়গা থেকে, আর কেন্দ্রে বসে একজন সঞ্চালক মধ্যস্থতা করছিলেন।
ফিলিস্তিনি প্রশ্ন করলেন, আজ আমরা ১০ হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করছিলাম, সেখানে কেন ইসরায়েলি সৈন্যরা গুলি করল?
ইসরায়েলি ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন, আপনি সন্ত্রাস সমর্থন করেন, নাকি শান্তি?
ফিলিস্তিনি আলোচক বললেন, আমি হিংসার বিরুদ্ধে। আমি অহিংস আন্দোলনের পক্ষে। কিন্তু শান্তিপূর্ণ সমাবেশে ইসরায়েলি সৈন্যরা কেন গুলি করবে? তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন ইসরায়েলি ভদ্রলোককে—যিনি কিনা আবার একজন সাবেক কূটনীতিক—আপনি ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতাকে সমর্থন করেন কি না?
ইসরায়েলি বললেন, হ্যাঁ। আমি ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার সমর্থন করি। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের মিছিল থেকেও গুলি করা হয়েছিল।
>>ইসরায়েলি আগ্রাসন থেকে রেহাই পায়নি এই শিশুরাও
আল-জাজিরা টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা গেল, বিচ্ছিন্নভাবে হাতে তৈরি অস্ত্র থেকে গুলি ছোড়া হচ্ছে সৈন্যদের দিকে। আল-জাজিরা এই ফুটেজ কোথায় পেয়েছে, আমি জানি না। কাজেই এর সত্যতা নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না। তবে আল-জাজিরা ফিলিস্তিনিদের সমর্থন করে, অন্তত ইসরায়েলি বর্বরতার বিরোধিতা করে, এটা কোনো গোপন বিষয় নয়। আর ইসরায়েলি সৈন্যরা আল-জাজিরার অফিসের ভেতরেও এবার গোলা ছুড়েছে। ইসরায়েলে আল-জাজিরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এই রকম খবর আল-জাজিরা টেলিভিশনেই দেখলাম বলে মনে হচ্ছে।
যাই হোক, এরপর একবার বিবিসি, একবার সিএনএন দেখি। খুব বেশিক্ষণ দেখেছি তা নয়। কিন্তু মনটা খুব বিষণ্ন হয়ে আছে। যে নিউইয়র্ক টাইমস-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে ইসরায়েল পক্ষপাতিত্বের, তাদের হিসাবেই ১৩২৮ জন ফিলিস্তিনি এবং ৫৯ জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন ৮ জুলাইয়ের পরে গাজায় ইসরায়েলি হামলায়। ৮ থেকে ৩০ জুলাই ২৩ দিনে প্রায় ১৪০০ মানুষের মৃত্যু! তার মধ্যে আছে নারী আর শিশুরা। ইসরায়েলি সৈন্যরা হামলা করেছে হাসপাতালে, স্কুলে, জাতিসংঘের আশ্রয়কেন্দ্রে। বাড়িঘর ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আশ্চর্য যে কোথাও কোনো বিকার নেই। এই শিশুহত্যা, নারীহত্যা বিশ্ববিবেককে বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারছে বলে তো মনে হচ্ছে না।
আমেরিকার একটা গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে, ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টার। আমি একবার তাদের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র গিয়েছিলাম দিন পনেরোর জন্য। সেখানে আলোচনা হচ্ছিল, সন্ত্রাস কী? তাতে আমরা কয়েকজন মোটামুটিভাবে এই রকম একটা সংজ্ঞা দাঁড় করাতে পেরেছিলাম, কোনো একটা উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য, কোনো দাবি-দাওয়া আদায় বা জানান দেওয়ার জন্য, সংশ্লিষ্ট নয়, এমন মানুষ মারা, কে মারা যাবে তার পরোয়া না করেই হামলা করা—এটাই হলো সন্ত্রাস। ১১ সেপ্টেম্বরের টুইন টাওয়ারে হামলায় যারা মারা গিয়েছে, তারা নিরস্ত্র বেসামরিক সাধারণ মানুষ। এটা সন্ত্রাসী হামলা। কোনো একটা রেলস্টেশনে বোমা ফাটানো, এটা সন্ত্রাসী কাজ।
আজকে আমার মনে সেই সংজ্ঞাটা ঘুরেফিরে বাজছে। যে ফিলিস্তিনি শিশুটা মায়ের কোলে ঘুমুচ্ছে, যে শিশুরা রাস্তায় বা সৈকতে দৌড়ঝাঁপ করছে, তার সঙ্গে সন্ত্রাস, সন্ত্রাসী, রাজনীতি, সীমান্ত, দল, মূল্যবোধের সম্পর্ক কোথায়? একজনকে নিরস্ত করতে গিয়ে ১৩২৮ জন মানুষ মেরে ফেলা হলো, স্কুল-হাসপাতাল-জাতিসংঘ আশ্রয়কেন্দ্র-টেলিভিশন কেন্দ্রে বোমা-গোলা ছোড়া, এটা কি তাহলে সন্ত্রাস নয়?
তাহলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যাঁরা লড়াই করছেন, যাঁরা সন্ত্রাসমুক্ত পৃথিবী গড়বেন বলে ছারখার করলেন ইরাক, আফগানিস্তান, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে তছনছ করলেন মধ্যপ্রাচ্যের একটার পর একটা দেশ, আর পাহারা দিয়ে রাখছেন মধ্যপ্রাচ্যেরই আমির-ওমরাহতন্ত্র, তারা এখন কোথায়?
আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি টেলিভিশনের প্রকাশ্য সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলিদের নিজেদের রক্ষা করার জন্য যেকোনো কিছু করার অধিকারকে সমর্থন করেছেন। কিন্তু তিনি একটা ফোন ধরেছিলেন অফ দ্য রেকর্ড। তিনি জানতেন না ক্যামেরা খোলা আছে। তিনি গাজায় পরিচালিত ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞকে বলে ফেলেন, ‘ইটস আ হেল অব এ পিনপয়েন্ট অপারেশন।’ তিনি এও বলেন, তাঁর এখনই ওই এলাকায় চলে যাওয়া উচিত।
জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, ঘুমন্ত শিশুদের ওপর হামলার চেয়ে লজ্জাজনক আর কিছুই হতে পারে না। প্রেসিডেন্ট ওবামাও নাকি গাজায় ক্রমবর্ধমান নারী-শিশু-সাধারণ মানুষের মৃত্যুতে খুবই উদ্বিগ্ন। তা সত্ত্বেও এঁরা কেউই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একটা কড়া বিবৃতিও দিতে পারেন না। রূপকথার গল্পের বাঁদরের কলজে যেমন গাছের মগডালে বাঁধা থাকে, তেমনি মনে হয়, এদের কোনো একটা স্বার্থ ইসরায়েলিদের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। আল-জাজিরা টেলিভিশনেই দেখলাম, ইসরায়েলি সংহতির সভা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। কর্তারা সেখানে গিয়ে সংহতি জানাচ্ছেন। ওবামা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে, এটা প্রমাণিত হলে ওবামা নিজেই ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না।
আমাদের কিছুই করার নেই, তাই আমরা প্রতিবাদ করি। ফেসবুকে হ্যাশট্যাগ দিয়ে গাজা সমর্থন করি। কিন্তু তার দ্বারা ফিলিস্তিনি দুধের শিশুর রক্তাক্ত হওয়া আমরা ঠেকাতে পারি না। শুধু আমরা এটা বুঝি, বিশ্বশান্তির জন্যই দরকার ফিলিস্তিনিদের জন্য একটা স্বাধীন আবাসভূমি। যেকোনো স্বাধীনতার আন্দোলনই এক পক্ষের জন্য মুক্তির আন্দোলন, আরেক পক্ষের চোখে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনিরা তাদের মুক্তির জন্য লড়ছে। আর ইসরায়েল তাদের নাগরিকদের শান্তি ও নিরাপত্তার
জন্য জিরো টলারেন্স প্রদর্শন করে চলেছে। একটার পর একটা যুদ্ধ হয়েছে। ইসরায়েল নিজেদের এলাকা বাড়িয়ে নিয়েছে।
ইসরায়েল ইরানে বিমান পাঠিয়ে সম্ভাব্য পারমাণবিক বোমার কারখানা বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে।
ছোট ছোট কবরে ছোট ছোট শরীরগুলোকে শোয়ানো হচ্ছে। সেই শিশুদের যাদের নিজেদের কোনো দোষ নেই, যারা নিজেদের কৃতকর্মের জন্য ভুগছে না। এই পৃথিবীতে এত অবিচার কেন? রবীন্দ্রনাথের মতো বলতে হচ্ছে, তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

বেবী মওদুদ আছে, থাকবে by মালেকা বেগম

বেবী মওদুদ (১৯৪৮-২০১৪) (আফরোজা নাহার মাহফুজা খাতুন) দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র রোগযন্ত্রণা পেয়ে আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছে ২৫ জুলাই ২০১৪। তবু বলতে চাই, বেবী আছে, বেবী থাকবে; তার নানাবিধ কর্মকাণ্ডের ইতিবাচক উদ্যোগ-উদ্যমের সফলতার ইতিহাসে তার নাম বাদ পড়বে না।
বেবীর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার প্রথম সূত্রপাত একটি চিঠির মাধ্যমে। ১৯৬৬-৬৭ সালে আমি যখন ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভানেত্রী, তখন সুদূর রাওয়ালপিন্ডি থেকে (স্মৃতিতে যদি ভুল না হয়ে থাকে) মাহফুজা খাতুন স্বাক্ষরিত একটি চিঠি এসেছিল ছাত্র ইউনিয়নের ঠিকানায়, আমার নামে। প্রবল আকাঙ্ক্ষায় চিঠির কালো হরফগুলোকে বেবী রক্তিম করে তুলেছিল ভাষার আগুনছটায়! ঢাকায় আসবে শিগগিরই, যোগ দেবে ছাত্র ইউনিয়নে, ভর্তি হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইত্যাদি তথ্যে ঠাসা ছিল সেই চিঠি। রক্তিম ভালোবাসা জানিয়েছিল। অটুট ছিল এত বছর ধরে সেই ভালোবাসা, অটুট থাকবে সেই ভালোবাসা।
সাক্ষাতে যখন পরিচয় হলো নিবিড়, জানলাম বাংলা সাহিত্যচর্চায়, সংগ্রামমুখর বিপ্লবী ধ্যানধারণায় সে অগ্রগামী দলের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়। তার বাবা আবদুল মওদুদ বিচারপতি ছিলেন। বাবার মওদুদ নামটি নিজের নামের সঙ্গে ব্যবহার করতে চায়নি, যদি কেউ সুবিধাভোগী মনে করে। স্বামী হাসান আলীর নামও যুক্ত করেনি। কিন্তু হঠাৎ করেই বাবার নাম যুক্ত করে ‘বেবী মওদুদ’ নামে সে আত্মপ্রকাশ করেছে। এসব তার একান্ত ব্যক্তিগত হলেও আত্মমগ্ন হয়ে এ বিষয়েও কিছু একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিল। সেসব একান্ত ব্যক্তিগত। থাক সে কথা।
বেবী ছাত্র ইউনিয়নের সবার প্রিয় হয়ে ছিল। বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল, ১৯৬৭-৬৮ সালে রোকেয়া হল ছাত্রী সংসদের সদস্য ছিল। আমি সেই ছাত্রী সংসদের সহসভানেত্রী ছিলাম। মনে পড়ে বিভিন্ন টুকরো টুকরো ঘটনা। উৎফুল্ল তারুণ্যে বেবী সব রকমের কাজে অগ্রগামী ছিল। লেখালেখি, লিফলেটের বক্তব্য তৈরি, ম্যাগাজিন প্রকাশের কাজ, রচনা প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা—এ ধরনের সব কাজে ওর ছিল প্রচণ্ড উৎসাহ।
সে সময়টা ছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখার যুগ। আন্দোলন-সংগ্রামের চড়াই-উতরাই পথে চলছিলাম ছাত্রছাত্রীরা নিজ নিজ সংগঠনের পতাকাতলে। কিন্তু ঐক্যবদ্ধ ছিলাম সবাই স্বাধীনতার এক দফা দাবির আন্দোলনে। বেবী সেই আন্দোলনে কাজ করত নিজ আনন্দে, নিজ ইচ্ছায়। সংগঠনের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করত না আবার ওর ইচ্ছাবিরুদ্ধ কাজ চাপিয়ে দেওয়াও সম্ভব ছিল না।
মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টাই সে ঢাকায় ছিল। নানা রকম কাজে যুক্ত ছিল। প্রথম মহিলা আইনজীবী ও ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচিত সাংসদ মেহেরুন্নেসা খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যুদ্ধ-নির্যাতিত মেয়েদের আশ্রয়ের জন্য সম্ভবমতো অল্পস্বল্প কাজ করেছে বেবী। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গরম কাপড়, অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করত। অবরুদ্ধ ঢাকায় যতটুকু সম্ভব ছিল, বেবী ততটুকুই করেছিল। যদিও কখনোই সেই কাজ বাগাড়ম্বর করে প্রচার করেনি।
স্বাধীনতার পর ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’-এর কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সদস্য হয়েছে বেবী। তখন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলাম। মহিলা সমাচার প্রকাশের দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করেছিল সে প্রচার সম্পাদিকা হিসেবে।
বেবীর জীবনসঙ্গী আইনজীবী হাসান আলী ভাই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির রাজনীতি করতেন। তাদের সহজ-সরল সাংসারিক জীবনে দুটি ছেলে যখন হাসিখুশির ফোয়ারা খুলে দিয়েছিল, সেই সময় হঠাৎ হাসান আলী ভাই হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে যখন মারা গেলেন, তখন আমাদের হৃদয়ভারাক্রান্ত হয়েছিল। বেবীর আর্ত–চেহারার সেই সব দিনের কথা ভুলতে পারিনি বহুদিন। সাংবাদিকতার পেশায় নিযুক্ত থেকে, মহিলা পরিষদের সাংগঠনিক দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করে, দুই শিশুকে সঠিকভাবে পালন করে বেবী তার জীবনের চলা থামায়নি। সে সময় অনেক কাছে থেকে জেনেছি বেবীর জীবনযন্ত্রণা।
বেবী তার শিশু ছেলে দুটিকে মানুষ করেছে একাধারে বাবা ও মায়ের স্নেহ-মমতা-দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে। কঠিন-কঠোর স্নেহে ছেলেদের সে বলেছে, আজ বাবা নেই, কাল মা থাকবে না, নিজেরা একা চলতে শেখো। স্বনির্ভর হয়েছে অভি আর দীপ্ত। মায়ের বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, পরিচালনায় ওরা দেশ ও আদর্শকে ভালোবাসতে শিখেছে।
বেবীর সঙ্গে আমার নারী আন্দোলনের, মহিলা পরিষদ সংগঠনের সম্পর্ক দীর্ঘ ২২ বছরের। কিন্তু ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা-ভালোবাসার সম্পর্ক অটুট ছিল। তার সুস্থ জীবনের ছুটোছুটি, সাংবাদিকতার কর্মকাণ্ডে ভরপুর সময় পর্যন্ত। অসুস্থতা যখন চরম পর্যায়ে, চেনা-অচেনার জগতে হারিয়ে যাচ্ছিল বেবী, কষ্টে জর্জরিত হয়েছি, সাংসদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার ছিল না। রাজনৈতিক কোনো পদেরও আকাঙ্ক্ষা ছিল না। তবু সে সাংসদ হয়েছিল। আমার সঙ্গে তার মতের অমিল ছিল না। কিন্তু মতান্তর হতো নীরবে। হঠাৎ দেখা, হঠাৎ কথা, হঠাৎ না দেখার দীর্ঘ সময় পার করেছি আমরা। পরস্পর শ্রদ্ধা-ভালোবাসা অটুট রেখেছিলাম আমরা।
সাংগঠনিক নানা পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বেবী তার সাংবাদিকতার সূত্রে জানা নানা তথ্য দিয়ে আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। কোথায় নির্যাতনের শিকার হয়েছে নারী, কোথায় ফতোয়ার শিকার হয়েছে নারী, যেতে হবে সংগঠন থেকে, মামলা করতে হবে, আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে মেয়েটির—এমনই সব তাড়নায় বেবী আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছে। সুফিয়া খালাম্মা থেকে শুরু করে সংগঠনের নেতাদের কাছে গিয়ে গিয়ে প্রচারমাধ্যমের গুরুত্ব জানিয়েছে।
সিলেট জেলার কমলগঞ্জের নূরজাহান যখন ফতোয়ার ও ফতোয়াবাজদের পাথর নিক্ষেপে নির্যাতনের শিকার হয়েছে, আত্মহনন করতে বাধ্য করা হয়েছে নূরজাহানকে—বেবী তখন ছুটে এসে জানিয়েছে আমাকে, খালেদা মাহবুবকে নিয়ে ঘটনার কেন্দ্রে গিয়ে থানায় মামলা দেওয়া, স্থানীয় মৌলভীবাজার শাখাকে আন্দোলনে নামানোর সব সাংগঠনিক কাজে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল।
একইভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি গ্রামের একটি শিশু-কিশোরী মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে বাবার বাড়িতে সন্তানবতী হয়ে মর্মান্তিকভাবে পীড়িত হচ্ছিল। স্থানীয় সাংবাদিক খবরটি জাতীয় দৈনিকে দেওয়ার পর বেবী ছুটে এসেছে—ঘটনাস্থলে যেতে হবে, এর প্রতিবাদে রুখে দাঁড়াতে হবে। বেবীর নেতৃত্বে অকুস্থলে গিয়েছিলাম। মেয়েটিকে মহিলা পরিষদের রোকেয়া সদনে সাদরে আশ্রয় দেওয়া হলো। ফুটফুটে কন্যাসন্তান নিয়ে ধর্ষণকারীর বিরুদ্ধে মামলা মোকাবিলা করে সেই মেয়েটি এখন সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মহিলা পরিষদে। তার মেয়েটি উচ্চশিক্ষা নিয়ে স্বনির্ভর হয়েছে। সেসবই ১৯৯০-৯২-এর ঘটনা।
বেবীর সঙ্গে সাংগঠনিকভাবে মহিলা পরিষদের অঙ্গনে সেই আমার শেষ কর্মকাণ্ড। কিন্তু শেষেরও শুরু আছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের বর্তমান স্থায়ী বাসভবনটির জমিটুকু বেবীর উদ্যোগ-উদ্দীপনায় সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল খুব সম্ভবত ১৯৮৮–এর দিকে। বেবী তখন ওই বাসভবনের একটি ভাড়াবাড়িতে থাকত। বাড়ির মালিক খালাম্মারা তিন বোন। পৈতৃক বাড়ির অংশীদার এক বোন তার অংশের বাড়িটি বিক্রি করবেন খবর জেনে বেবী আমাকে জানাল, সুফিয়া খালাম্মাকে জানাল যে মহিলা পরিষদের স্থায়ী ঠিকানা প্রয়োজন, নিজস্ব ভবন দরকার। আমরা যেন বাড়িটি কিনে রাখি। সুফিয়া খালাম্মার নির্দেশ পেয়ে বেবী ও আমি সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত নিয়ে কপর্দকহীনভাবে বাড়ির মালিকের কাছে ছোটাছুটি শুরু করেছিলাম। সমাজকল্যাণমূলক কাজে উদ্বুদ্ধ বাড়ির মালিক খালাম্মা বেশ কম মূল্যেই একতলা একটি পুরোনো দালান-জমি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করলেন। আবদুল মোহাইমেন (সাবেক এমপি ও পাইওনিয়ার প্রেসের স্বত্বাধিকারী) ধার দিলেন, ব্যাংক লোন নিয়ে সেই ধার শোধ হলো, মানবাধিকার আন্দোলনের নেত্রী হামিদা হোসেনের প্রাণান্ত চেষ্টায় সংগৃহীত অর্থানুকূল্যে ব্যাংকের ধার শোধ হলো। বাড়িটি বহুতল করার জন্য মহিলা পরিষদের কর্মী, শুভানুধ্যায়ী সবার সাহায্যে অর্থ সংগ্রহ করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলো। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এখন নিজ স্থায়ী সুফিয়া কামাল ভবনে বহু প্রজেক্টের কাজ চালাচ্ছে।
বেবীর স্বপ্ন, বেবীর প্রচেষ্টা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ইতিহাসে যেন লিপিবদ্ধ থাকে। সুফিয়া কামাল ভবনের কোনো একটি পরিকল্পনায় বেবী মওদুদের অবদান যেন স্বীকৃতি পায়, সেটাই আমার একান্ত নিবেদন। বেবী আছে, বেবী থাকবে এসব কর্মকাণ্ডের ইতিহাসে উৎকীর্ণ হয়ে।
মালেকা বেগম: অধ্যাপক, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি। প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।

শব্দের রাজনীতি ও শব্দ বিভ্রাট by রাজীব সরকার

প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক যতীন সরকারের অনবদ্য স্মৃতিকথা ‘পাকিস্তানের জন্ম মৃত্যু-দর্শন’ বইয়ে অসংখ্য তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। একটি ঘটনা পাকিস্তানের জাতির পিতা জিন্নাহর শোকসভাকে কেন্দ্র করে। ময়মনসিংহের সেই শোকসভায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন একজন আইনজীবী। তিনি ইংরেজিতে বক্তৃতা দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। বাংলায় বক্তৃতা দিতে গেলেও তিনি অনেক ইংরেজি ইডিয়মের এমন অনুবাদ করতেন যা শ্রোতাদের মধ্যে বেশ হাস্যরসের সঞ্চার ঘটাত। জিন্নাহর শোকসভায় বক্তৃতা তার জন্য হাস্যরসের বদলে করুণ রস সঞ্চার করল। জিন্নাহ সম্পর্কে দুয়েকটি প্রশংসামূলক বাক্য উচ্চারণের পরই তিনি বলতে লাগলেন, ‘জিন্নাহ ছিলেন একজন ... জিন্নাহ ছিলেন একজন ...। উপযুক্ত বাংলা শব্দটি তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। শব্দ খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘জিন্নাহ ছিলেন একজন দৈত্য।’ আর যায় কোথায়? শ্রোতাদের কে একজন চিৎকার করে উঠল, ‘কী, জিন্নাহকে দৈত্য বলল? এত বড় অপমান? ধর ব্যাটাকে।’
মরহুম ‘জাতির পিতা’র অপমানে বহু শ্রোতাই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে বক্তাকে ধাওয়া করল। তখন জেলা জজ না আর কে একজন কোনো রকমে নিজের গাড়িতে তুলে নিয়ে তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেন এবং এভাবেই তিনি ‘জনতার ক্রোধ’ থেকে সেদিন রক্ষা পান।
ইংরেজি ‘Giant’ শব্দটির বাংলা করে ওই উকিল বক্তা জিন্নাহকে ‘দৈত্য’ আখ্যা দিয়ে সম্মান জানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ফল হল বিপরীত। এতে সম্মানের বদলে অপমান করা হয়েছে ভেবেই সে-সভার জিন্নাহ ভক্ত শ্রোতারা উত্তেজিত হয়ে উঠে বক্তাকে আক্রমণ করতে গিয়েছিল।
বেচারা আইনজীবী ভদ্রলোক যে ভুলটি করেছিলেন তা বিরল নয়। এ জন্য তাকে খুব একটা দায়ী করা যায় না। শব্দ যদি স্থান কাল ভেদে ভিন্ন অর্থ বহন করে অর্থাৎ বহুগামী আচরণ করে তবে ব্যবহারকারীর আর কী দোষ! তিনি তো নিমিত্ত মাত্র।
শব্দের এ বহুগামিতা বুঝতে না পেরে অনেকেই শব্দের রাজনীতির শিকার হয়। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রোকেয়ার মতো সমাজহিতৈষী মনীষারা সমাজ সংস্কারকরূপে বিখ্যাত। কিন্তু ২০০৭ সালে এ দেশে ১/১১ আগমনের পর সংস্কার শব্দটির অর্থই পাল্টে যায়। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলে যেসব নেতা সংস্কারপন্থী ছিলেন তারা প্রত্যেকেই ‘সংস্কার’-এর খেসারত দিয়েছিলেন। তখন সংস্কারবাদী ও রাজাকার যেন সমার্থক দুটি শব্দে পরিণত হয়েছিল।
রাজাকারের প্রসঙ্গ যেহেতু উঠলই, এর বিবর্তনটুকুও দেখা যাক। ‘রাজাকার’ শব্দের অর্থ স্বেচ্ছাসেবক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ক্লাবে, রাজনৈতিক দলে প্রচুর স্বেচ্ছাসেবক পাওয়া যায়। তাদের ‘রাজাকার’ সম্বোধন করলে তারা খুশি হবেন না নিশ্চয়ই। ১৯৭১ সালে এ শব্দটির অর্থ পাল্টে যায়। একই কথা প্রযোজ্য ‘আলবদর’ ‘আলশামস’ শব্দ দ্বয়ের ক্ষেত্রেও। এ শব্দগুলোও তাদের সতীত্ব হারিয়েছে একই সময়ে বকধার্মিকদের হাতে।
‘সতীত্ব’ কথাটি আমাদের খুব পছন্দের, বিশেষ করে বাঙালি পুরুষের। নিজের স্ত্রীর কাছে এ বস্তুটি তার চাই-ই। সমাজের চোখেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এর পরুষবাচক শব্দ ‘সৎ’-এর অর্থ কিন্তু ভিন্ন। যে অর্থে নারী ‘সতী’ সেই অর্থে পুরুষ ‘সৎ’ না হলেও তাকে সৎলোক বলা যায়। আবার যে অর্থে পুরুষ ‘সৎ’ সেই অর্থে নারী ‘সতী’ হলেও তাকে অসতী বলা যায়। শব্দের এ লৈঙ্গিক রাজনীতির কারণে সংবাদপত্রে মুখরোচক সংবাদ পরিবেশিত হয়- জনৈক পুরুষ নারীঘটিত কেলেংকারিতে জড়িয়ে পড়েছেন। কখনও শুনি না কোনো নারী পুরুষঘটিত কেলেংকারিতে জড়িয়ে পড়েছেন।
শব্দও তাই নারী-পুরুষ চেনে। লিঙ্গ ভেদে শব্দের অর্থ পাল্টে যায়। ধরা যাক সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের কথা। বিনোদন প্রতিবেদক লিখলেন অক্ষয় কুমারের ‘সাহসী’ শট দেখে দর্শক দারুণ বাহ্বা দিয়েছে। এরপর লিখলেন কারিনা কাপুরের ‘সাহসী’ শট দেখে দর্শক আরও বেশি হাততালি দিয়েছে। পার্থক্য বোঝা গেল? স্ট্যান্টম্যান ছাড়াই কোনো ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্যে নায়ক অভিনয় করেছেন। তাই তিনি সাহসী। নায়িকাও সাহসী। তবে স্ট্যান্টম্যান ছাড়ার কারণে নয়, পোশাক ছাড়ার কারণে। নায়িকা যত বেশি বিবসনা হতে পারেন তিনি তত বেশি সাহসী।
তাই শব্দের চালচিত্র আপাতদৃষ্টিতে সরল মনে হলেও এর কোপানলে পড়লে মানুষ বিব্রত হতে বাধ্য। এক ঘূর্ণিঝড় উপদ্রুত অঞ্চলে ত্রাণ বিতরণ করতে গেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি। মানুষের দুর্গতির কথা শুনে তিনি বললেন, ‘আমি আপনাদের বাঁশ দেব।’ এ কথা শুনে জনগণ তাকে ধাওয়া করল। বিক্ষুব্ধ জনতাকে কে বোঝাবে যে ভেঙে যাওয়া ঘরবাড়ি নির্মাণের উপকরণ হিসেবে সেই নেতা বাঁশ দেয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।
শব্দের রাজনীতি বিভ্রান্ত করে দেয় কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরও। ইংরেজি পরীক্ষায় জানতে চাওয়া হয়েছে ‘বৃষ্টি পড়ছে’ বাক্যটির অনুবাদ। এক শিক্ষার্থী লিখল-Brishty is reading. সে ভুল লিখল না শুদ্ধ সেই মীমাংসা কীভাবে হবে?
ইংরেজির প্রসঙ্গ যেহেতু উঠলই তাই এ ভাষার রাজনীতিও বোঝা প্রয়োজন। স্ত্রীর বিরতিহীন গালাগাল থেকে বাঁচার জন্য এক স্বামী কিছুদিন ধরে অজ্ঞাতবাস করছেন। একদিন স্বামী ফোন করে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘Darling, what are you doing?’ স্ত্রীর জবাব, ‘I am dying.’ স্বামী শুনে উৎফুল্ল হলেও বেদনার্ত চিত্তে বললেন, ‘Oh! how I will leave without you?’ স্ত্রী বললেন, ‘Idiot. I am dying my hair.’ বেচারা স্বামী খুব হতাশ হলেন ইংরেজি ভাষার এ দ্বিচারিতা দেখে।
তবে শুধু শব্দকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। অতি ব্যবহারে আমরা অনেক সময় শব্দের তাৎপর্য ও গ্রহণযোগ্যতা দুটিই নষ্ট করে ফেলি। ‘ফুলের মতো পবিত্র’ কথাটি উপমা হিসেবে অসাধারণ। কিন্তু যে কোনো নির্বাচনের আগে ‘অমুক ভাইয়ের চরিত্র, ফুলের মতো পবিত্র’ কথাটির ব্যবহার এত বেশি হয় যে ফুল বা পবিত্র কোনোটির পবিত্রতা আর বজায় থাকে না।
এবার চরিত্রের গভীরে একটু প্রবেশ করা যাক। ‘চরিত্র অমূল্য সম্পদ’- এ কথাটি না শুনে আমরা কেউ স্কুলের গণ্ডি পার হইনি। বিভিন্ন সদগুণের সমাহারকে আমরা চরিত্র বলি। যার মাঝে এ গুণাবলি অনুপস্থিত তিনি চরিত্রহীন। কিন্তু এভাবে চরিত্রের বিচার আমরা করি না। কোনো ব্যক্তি খুন, ডাকাতি, দুর্নীতি, প্রতারণা, নারী নির্যাতন করেও ‘চরিত্রবান’ থাকতে পারেন। শুধু একটি কারণে তিনি ‘চরিত্রহীন’ হয়ে যান। যদি একাধিক নারীর সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকে বা তিনি যদি পরকীয়া প্রেমে আসক্ত হয়ে পড়েন তবে অন্যসব গুণ থাকলেও তিনি ‘চরিত্রহীন’। আর যদি এক নারীর প্রতি বিশ্বস্ত থেকে অন্যসব দোষকে তিনি ধারণ করেন এরপরও তিনি ‘চরিত্রবান’ থেকে যান আমাদের সমাজে। চরিত্র সম্পর্কে আমাদের এ অদ্ভুত মানসিকতা দেখে প্রয়াত লেখক হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, ‘বাঙালির চরিত্র শরীরের কয়েক ইঞ্চি জায়গার মধ্যে সীমাবদ্ধ।’
চরিত্র শব্দটির আরেক অর্থ ধর্ম বা বৈশিষ্ট্য। যেমন বস্তুর প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য বোঝাতে চরিত্র কথাটি ব্যবহৃত হয়। এ ক্ষেত্রেও বিপদের অন্ত নেই। ইংরেজি ‘জবষরমরড়হ’ শব্দটির বঙ্গানুবাদ করা হয়েছে ধর্ম যেমন- ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান। অথচ বাংলা ‘ধর্ম’ শব্দটির অর্থ আরও বিস্মৃত। সেই বিস্মৃতি বুঝতে না পেরে এক ছাত্র পুরো শ্রেণীকক্ষে হাসির রোল বইয়ে দিয়েছিল। শিক্ষক জানতে চেয়েছিলেন ‘আগুনের ধর্ম পোড়ানো’ বাক্যটির ইংরেজী কি। ওই ছাত্রটি তৎক্ষণাৎ জবাব দিয়েছিল-Burning is the religion of fire.
শব্দের অর্থ বুঝতে আমরা ভুল করলেও আগুন সেই ভুল করে না। তার কাজ সে করবেই। কবিগুরু বলেছিলেন, ‘ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো।’ তার কথা আমরা রেখেছি। আগুন জ্বালিয়েছে, জ্বালছি, ভবিষ্যতেও জ্বালব- তবে ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে নয়। আগুন জ্বালিয়েছি পোশাক শিল্পের কারখানায়, গরিব বস্তিতে, সংখ্যালঘুর উপাসনালয়ে ও বাসস্থানে।
রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা সর্বত্রগামী হলেও ক্রীড়াক্ষেত্রে তার কোনো আগ্রহের কথা আমরা কখনও শুনিনি। শব্দের রাজনীতি তার সেই অপূর্ণতা ঘুচিয়ে দিয়েছে। এক চাকরির ইন্টারভিউয়ে এক প্রার্থী বলেছিল, রবীন্দ্রনাথ ফুটবল খেলতে ভালোবাসেন। তাই বলেছেন, ‘মোরে বল দাও, দাও প্রাণে শক্তি।’ কারণ গায়ে শক্তি না থাকলে শুধু ফুটবল থাকলে কাজ হবে না। তাই ফুটবলের পাশাপাশি তিনি শক্তিও প্রার্থনা করেছেন। শব্দের রাজনীতি বোঝার জন্য ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ও ব্যবহারিক অর্থের পার্থক্য জানা জরুরি। এক পণ্ডিত তা না জেনে কী বিপদে পড়েছিলেন তা উল্লেখ করে এ প্রসঙ্গে ইতি টানছি।
সেই পণ্ডিত বিশেষ প্রয়োজনে রাতের বেলা একটি ঝোপের দিকে যাচ্ছিলেন। গ্রামের লোকজন তাকে ওখানে যেতে নিষেধ করল, কারণ সেখানে প্রায়ই বাঘে আক্রমণ করে। পণ্ডিত বললেন, “বাঘ আবার কী? মানে ব্যাঘ্র তো? ব্র্যাঘ্র শব্দ তৈরি হয়েছে ‘বি’ উপসর্গ আর ‘আ’ উপসর্গের পর ‘ঘ্রা’ ধাতুর সঙ্গে ‘অ’ প্রত্যয় যোগ করে। (বি-আ-ঘ্রা+অ)। ‘ঘ্রা’ ধাতুর অর্থ ‘ঘ্রাণ নেয়া’। তাই ‘ব্যাঘ্র’ মানে ‘যে বিশেষ করে ঘ্রাণ নেয়’। ওই ব্যাঘ্র আমাকে কী করবে?”
এ সাহসে ভর করে পণ্ডিত ঝোপের ভেতর ঢুকলেন। হঠাৎ এক ব্যাঘ্র এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। চিৎকার করে পণ্ডিত বললেন, ‘ওহে ব্যাঘ্র, এ তুমি কি করছ? তোমার তো কেবল ঘ্রাণ নেয়ার কথা, ভক্ষণ করছ কেন আমাকে? তুমি তো পাণিনির ব্যাকরণের নিয়ম লঙ্ঘন করছ?’
ব্যাঘ্র পাণিনির নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পণ্ডিতের শুধু ঘ্রাণ নয়, প্রাণ নিয়ে ছাড়ল।

রজনীগন্ধার চাষাবাদ by আলমগীর সাত্তার

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করব বলে একাত্তর সালের মে মাসে আমি গিয়ে উপস্থিত হলাম আগরতলায়। ওখানে গিয়ে তিন-চার দিন ছিলাম ওখানকার শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সুজিৎদের বাসায়। ওই সময় একদিন গেলাম সিটিটিআই অর্থাৎ ক্রাফটস টিচারস ট্রেনিং ইন্সটিটিউটের প্রিন্সিপাল নন্দীবাবুর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি ছিলেন আমাদের সেক্টর কমান্ডার সিআর দত্তের সম্পর্কে মামা।
প্রিন্সিপাল নন্দীবাবু আমাকে সিটিটিআই-এর মূল ভবনের দোতলায় থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। ওখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য বড় একটি হলঘর ছিল। নন্দীবাবু বললেন, আপনাকে এই হলঘরেই থাকতে হবে। পাশেই ছিল ইন্সটিটিউটের বিশাল লাইব্রেরি ঘর। সংলঘ্ন ছিল খুব পরিচ্ছন্ন বাথরুম। কাছেই ক্রাফটস ইন্সটিটিউটের হোস্টেলে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেমেয়েরা অবস্থান করছিল এবং তারা নিজেদের জন্য একটি মেস পরিচালনা করছিল। আমার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা হল ওখানেই।
আমার থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা মোটামুটি ভালো হওয়ার পরও একটা সমস্যা রয়ে গেল। তা হল, আমার তো কোনো বিছানাপত্র ছিল না। তা তো থাকার কথাও ছিল না। যুদ্ধ করতে ভারতে গিয়েছি, সঙ্গে তো কাঁথা-বালিশ নিয়ে যাওয়ার কথা নয়। বিশাল হলঘরের পাখার নিচে দুটি বেঞ্চ একত্র করে ঘুমানোর ব্যবস্থা করেছিলাম। শুধু কাঠের বেঞ্চের ওপর বিছানা ছাড়া ঘুুমাতে অভ্যস্ত না হওয়ায় ব্যাপারটা আমার জন্য কষ্টকরই ছিল।
ক্রাফটস ইন্সটিটিউটে যাওয়ার দুই দিন পর সকাল ১০টার দিকে নন্দীবাবু আমাকে তার অফিসে ডেকে পাঠালেন। ওই অফিসে গিয়ে দেখলাম, নন্দীবাবুর সামনের চেয়ারে বসা ৩০-৩২ বছর বয়সের সুন্দরী এবং সম্ভ্রান্ত একজন মহিলাকে। প্রিন্সিপাল নন্দীবাবু আলাপ করিয়ে দিলেন। তিনি ছিলেন ত্রিপুরা রাজ্যের লেফটেন্যান্ট গভর্নর মি. ডায়াসের স্ত্রী, মিসেস ডায়াস। কিছুক্ষণের আলাপচারিতার পর মিসেস ডায়াস নন্দীবাবুকে সঙ্গে নিয়ে আমার থাকার ব্যবস্থা দেখতে এলেন।
বিছানা ছাড়া শুধু খালি বেঞ্চের ওপর আমার শয়নের ব্যবস্থা দেখে মিসেস ডায়াস দয়াপরবশ হয়ে বললেন, গভর্নর হাউসে ফিরে গিয়ে তিনি আমার জন্য কিছু কম্বল এবং বিছানার চাদর পাঠিয়ে দেবেন। দেখলাম, দয়াশীল মহিলা তার কথা রেখেছেন। দুই ঘণ্টার মধ্যেই তিনি একখানা জিপ গাড়িতে ১০-১২টা কম্বল এবং বেশ কিছু নতুন এবং পুরনো বিছানার চাদর পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আসলে এগুলো ছিল গভর্নর হাউসের গার্ডদের জন্য নির্দিষ্ট।
কম্বল এবং চাদরগুলো পেয়ে আমার ঘুমানোর কষ্ট দূর হল। বেঞ্চ দুটি সরিয়ে কম্বল এবং তার ওপর চাদর বিছিয়ে সুন্দরভাবে বিছানা প্রস্তুত করলাম। বিছানাটা সুন্দর হলেও একটি জিনিসের অভাব রয়ে গেল। বিছানায় শুয়ে মাথায় দেয়ার জন্য কোনো বালিশ ছিল না। মনে মনে ভাবলাম, যা পেয়েছি তাতেই খুশি হওয়া উচিত।
এর একদিন পর হল ঘর সংলগ্ন লাইব্রেরি ঘরে বসে দুপুরের পর বই পড়ছিলাম। ওই লাইব্রেরিতে তিন-চারটা দৈনিক পত্রিকা রাখা হতো। ওখানে বেশ বড়মাপের একটা রেডিওও ছিল।
আমি লাইব্রেরি ঘরে বসে সমরেশ বসুর লেখা ‘বিবর’ নামের উপন্যাসখানা পড়ছিলাম। আমি ওই লেখকের তেমন ভক্ত না। যেহেতু একাত্তর সালের দিকে বইখানা খুব বিতর্কিত এবং আলোচিত ছিল, তাই অনেকটা কৌতূহলের বশে পড়ে দেখছিলাম, বইখানায় এমন কি লেখা হয়েছে, যা নিয়ে এমন বিতর্ক? বইখানার বিষয়বস্তু নাকি অশ্লীলতার দোষে দুষ্ট! বইখানা পড়ে আমার কিন্তু তেমন একটা অশ্লীল বলে কিছু মনে হয়নি। আমরা প্রকৃতির নিয়মে দৈনন্দিন যা করি, অথবা সৃষ্টির বহমানতা রক্ষার্থে যা কিছু ঘটে সেসবের ইঙ্গিত করে কিছু লেখা হয়েছে। আর এতেই বইখানার বক্তব্য অশ্লীল হয়ে গেল!
যাক এসব কথা। বইখানা যখন পড়ছিলাম, তখন লাইব্রেরি ঘরে একজন মহিলা প্রবেশ করল। এর আগেও একাধিকবার তাকে ইন্সটিটিউট ভবনে দেখেছি। দেখতে অতি সাধারণ মানের চেয়ে বেশি সুন্দরী না। তবে খুব খারাপও না। চেহারা অবশ্য ছিল বুদ্ধিদীপ্ত। বয়সটা ৩০-৩২ হওয়ায় তার দেহখানায় পরিপূর্ণতা ছিল। একাত্তর সালের দিকে এবং পরবর্তী সময়ের পর বেশ কিছু দিন ভারতীয় এমনকি বাংলাদেশী মেয়েদের মাঝে হাতাকাটা ব্লাউজ এবং অজন্তা স্টাইলে শাড়ি পরার খুব প্রচলন ছিল। অজন্তা স্টাইলে শাড়ি পরার ধরনটা হল- ব্লাউজ বেশ খাটো, গলার দিকটা বড় অর্থাৎ লোকাট এবং শাড়ি পরতে হবে কোমরের ঢাল বেয়ে নিচু করে। অর্থাৎ শরীরের মধ্যভাগ হবে অনেকখানি দৃশ্যমান। আসলে সে যুগে অজন্তাগুহার নারীদের ছবিগুলো আঁকা হয়েছিল, তখনকার সময় ভারতীয় নারীদের মাঝে ব্লাউজ পরার প্রথা ছিল না। প্রথা ছিল সুদৃশ্য বক্ষবন্ধনীর ব্যবহার। আগত ভদ্রমহিলা হাতাকাটা ব্লাউজ এবং অজন্তা স্টাইলে শাড়ি পরেছিলেন।
আগন্তুক ভদ্রমহিলা লাইব্রেরিয়ানকে প্রশ্ন করলেন, ‘বিবর’ বইখানা পাওয়া যাবে কিনা? ‘বিবর’ বইখানার তখন জনপ্রিয়তা এমন ছিল যে, কেউ ওটা পড়ে লাইব্রেরিতে ফেরত দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য কেউ নিয়ে যেত। ভদ্রমহিলার প্রশ্ন শুনে লাইব্রেরিয়ান আমাকে দেখিয়ে তাকে বললেন, বইখানা আমারই হাতে এবং আমি পড়ছি। আমি বললাম, আজ বইখানা পড়ে কালই লাইব্রেরিতে ফেরত দেব। এটাই তার সঙ্গে আমার প্রথম বলা কথা।
বারবার ভদ্রমহিলা, ভদ্রমহিলা না বলে আমি তার একটা নাম দিচ্ছি। বাস্তব চরিত্র বলেই সত্যিকারের নামের পরিবর্তে অন্য একটি নাম দিচ্ছি। কিন্তু পদবিটা ঠিক রাখছি। মনে করা যাক, তার নাম আতসী বিশ্বাস।
বিকেল তখন চারটে বা সাড়ে চারটে বাজে। লাইব্রেরিয়ান ভদ্রলোক সব বইয়ের আলমারি তালা দিয়ে বন্ধ করে চলে গেলেন। আমি আতসী বিশ্বাসকে বললাম, ‘বিবর’ বইখানা চাইলে আপনি এখনই নিয়ে যেতে পারেন।
তিনি বললেন, না, আগে আপনি পড়ুন, তারপর বইখানা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন শুনব।
কথা বলতে বলতে আতসী বিশ্বাস আমার সঙ্গে থিয়েটার হলঘরে চলে এলেন। আমার বিছানার ওপর বসে বাংলা সাহিত্য নিয়ে অনেক কথা বললেন। দেখলাম, সাহিত্য সম্পর্কে তার জ্ঞান আমার চেয়ে অনেক বেশি। আমি কেবল রবীন্দ্রনাথ এবং শরৎচন্দ্রের লেখা বইগুলো পড়েছি। ইংরেজিতে অনুবাদ করা কিছু রুশ সাহিত্যও পড়েছি। কিন্তু বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে তার পড়াশোনার ব্যাপকতা অনেক বেশি। চলে যাওয়ার আগে আতসী বিশ্বাস আমার কম্বল ও চাদরের বিছানা দেখিয়ে প্রশ্ন করলেন, আপনার মাথায় দেয়ার বালিশ নেই? বললাম, বিছানার কম্বল ও চাদরগুলো তো মিসেস ডায়াস পাঠিয়েছেন। বালিশের কথা হয়তো তার মনে ছিল না!
দুই দিন পর আবার আতসী বিশ্বাসের দেখা পেলাম। তিনি হাতে দুটো বালিশ নিয়ে এসে বললেন, সিটিটিআই-এর পক্ষ থেকে আপনাকে উপহার দেয়া হল। প্রশ্ন করলাম, সিটিটিআই-এর পক্ষ থেকে, না আপনার পক্ষ থেকে এ উপহার! বললেন, প্রিন্সিপাল নন্দীবাবুর অনুমতি নিয়েই আমি তৈরি করেছি।
একটু রসিকতা করে প্রশ্ন করলাম, আমি মানুষ একটা। একটা বালিশ হলেই চলত। তবে দুটি কেন? আতসী বিশ্বাসও একটু দুষ্টমির হাসি হেসে বললেন, এখন আরেকজন জোগাড় করার চেষ্টা করুন।
আতসী বিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ভবনের নিচের তলায় সিটিটিআই-এর অ্যাকাউন্ট্যান্ট রঞ্জিৎ বিশ্বাসের অফিসে গেলাম। যুদ্ধকালীন সময় বলে সিটিটিআই-এর শিক্ষা-কার্যক্রম বন্ধ ছিল। কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষয়িত্রী এবং অফিসের লোকজন নিয়মিত হাজিরা দিতেন।
২.
রঞ্জিৎ বিশ্বাস আমাদের জন্য চা-বিস্কুটের ব্যবস্থা করলেন। চা-পান শেষ হলে আতসী বিশ্বাস উঠে তার বিভাগে চলে গেলেন।
আতসী বিশ্বাস যখন চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে যাচ্ছিলেন, তখন তার দিকে আমি তাকিয়ে ছিলাম। আতসীর বয়স ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যেই হবে। আমারই সমবয়সী হবেন। আমার তখন বয়স ছিল ৩২ বছর। কোনো এক বিখ্যাত লেখক লিখেছেন, ‘ফেমিনিন বিউটি ইজ মেনি সাইডেড’। কোনো কোনো মহিলাকে সামনের দিক থেকে দেখলে ভালো লাগে, আবার কাউকে কাউকে পেছন থেকে দেখলে ভালো লাগে। আতসী বিশ্বাসকে পেছন থেকে দেখেই ভালো লাগল বেশি।
আতসী বিশ্বাস চলে যাওয়ার পর রঞ্জিৎ বিশ্বাস তার সম্পর্কে অনেক কথাই বললেন। বললেন, ভদ্রমহিলা মানুষ হিসেবে বেশ ভালো। কিন্তু তার ভাগ্যটা তেমন ভালো না। বললেন, আতসীর বিবাহিত জীবনের কথা। বললেন, ১০-১২ বছর আগে আতসীর বিয়ে হয়। তার স্বামী আগরতলায় একটি কো-অপারেটিভ ব্যাংকে চাকরি করেন। বিয়ের পাঁচ-ছয় বছর পরেও তার কোনো সন্তান-সন্ততি হয়নি। ওই ছুঁতো ধরে স্বামী আরও একটি বিয়ে করেন সেই পাঁচ-ছয় বছর আগে। দ্বিতীয় বিয়ে করায় আতসী স্বামীকে পরিত্যাগ করে চলে আসেন। এখন থাকেন ভাইয়ের বাসায়। ডিভোর্স হয়নি, কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই। আরও মজার বিষয় হল, দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভেও স্বামী ভদ্রলোকের কোনো সন্তান হয়নি।
আমি বললাম, তাহলে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, স্বামী ভদ্রলোকই সন্তান জন্ম দিতে অক্ষম।
রঞ্জিৎ দা এরপর বললেন, ভদ্রলোকের দ্বিতীয় স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। স্বামী এখন আবার আতসীকে ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছেন। কিন্তু স্বামীর কাছে আতসী আর ফিরে যেতে রাজি নয়। যে স্বামী তাকে কোনো সন্তান দিতে পারবেন না, তার কাছে ফিরে যাবে কেন? আমাদের দেশের সামাজিক নিয়মের কারণে সে স্বামীকে ডিভোর্স করছে না। স্বামী আছে, থাক, তার কাছে কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এমন অবস্থাটা তো বেশ ভালোই।
বিকাল বেলা লাইব্রেরি ঘরে বসে পত্রিকা পড়ছিলাম। ৫টা বোধ হয় তখন বাজে। আতসী বিশ্বাস এলেন। তাকে ‘বিবর’ বইখানা দিলাম। তিনি প্রশ্ন করলেন, কেমন লাগল বইখানা? বললাম, ভালো লাগেনি।
কেন? বলে আতসী আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বললাম, অশ্লীলতার কারণে নয়। অমন বিখ্যাত লেখক! কিন্তু ‘বিবর’ বইয়ের ভাষার মাঝে কেমন যেন একটা চালিয়াতি ভাব আছে। তবে একটা কথা খুব ভালো লেগেছে, ‘ভালোবাসা’ কাকে বলে? যে বাসায় ভালো টয়লেট আছে। বেশ এই পর্যন্ত! আমার কথা শুনে তিনি বেশ হাসলেন।
আতসী বিশ্বাস জিজ্ঞেস করলেন, চা খাবেন? বললাম, প্রস্তাবটা খারাপ নয়। বিকাল বেলায় এক কাপ চা পেলে আমি খুশি হব সন্দেহ নেই। আলসেমির জন্য দোকানে গিয়ে চা-পান করা হয়নি।
রঞ্জিৎ বাবুর ওখানে চায়ের সব সরঞ্জাম আছে। তাই তার অফিসে গেলাম। কিন্তু দেখলাম, তিনি বাসায় চলে গেছেন। তখন আমি আতসীকে প্রস্তাব করলাম, চলুন তাহা বাবুর বাসায় যাই।
তাহা বাবুর বাড়ি পশ্চিম বাংলায়। তিনিও ছিলেন ক্রাফটস ইন্সটিটিউশনের শিক্ষক। ছেলেমেয়ের পড়াশোনার ব্যাঘাত হবে বলে তার পরিবার-পরিজন থাকত পশ্চিম বাংলার বাড়িতে। তাহা বাবু ছিলেন মুসলমান। তার বাসাটা ছিল ইন্সটিটিউটের বাইরে কিন্তু প্রাচীর সংলগ্ন। তার বাসাটা ছিল খুবই সুন্দর বাংলো প্যাটার্নের। সামনে ছিল বিশাল পুকুর। আর পুকুরের চারপাশে ছিল নারিকেল, সুপারি, আম-কাঁঠালের বাগান। তাহা বাবু ছিলেন অত্যন্ত ভালো মানুষ।
তাহা বাবুর বাসায় চা খেতে যাওয়ার প্রস্তাবে আতসী খুশি মনেই রাজি হয়ে গেলেন। তিনি চললেন আগে আগে আর আমি পেছনে পেছনে। আমি আগেই বলেছি, আতসী বিশ্বাসকে পেছন থেকে দেখতেই বেশি ভালো লাগে। তাই আমি তার পেছনেই হাঁটছিলাম।
মেয়েদের সৌন্দর্য বিচার করা একটু কঠিন ব্যাপারই বটে। এ প্রসঙ্গে আমি জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রকর রেমব্রান্টের কথা একটু উল্লেখ করতে চাই।
সপ্তদশ শতকের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী রেমব্রান্ট ৩০ বছর বয়সেই খ্যাতির মধ্যগগনে পৌঁছান। ১৬৩৪ সালে তিনি প্রেম করে সাসকিয়া আলেনবুর্গ নামের খুব সুন্দরী এবং ধনবতী ২০ বছর বয়সের এক মহিলাকে বিয়ে করেন। বিয়ের সাত বছর পরই যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে সাসকিয়া মারা যান। ইতিমধ্যে সাসকিয়ার গর্ভে চারটি সন্তান হয়। এদের মধ্যে টিটুস নামের পুত্র সন্তানটি কেবল বেঁচে ছিল।
শিশুপুত্র টিটুসকে দেখাশোনা করার জন্য প্রথমে ডিরিক্স নামের এক মহিলাকে নিযুক্ত করা হয়। তারপর গৃহকর্মের জন্য এবং টিটুসকে দেখাশোনা করার জন্য হেন্ড্রিকিয়া নামের এক মহিলাকে নিয়োগ দেন রেমব্রান্ট।
অতি সাধারণ ঘরের মেয়ে হেন্ড্রিকিয়াই রেমব্রান্টের মনজয় করে নেন। হেন্ড্রিকিয়ার বয়স ছিল প্রায় ৪০ বছর এবং ছিলেন বেশ মোটাসোটা। সুন্দরী তাকে অবশ্যই বলা যায় না। অভিজাত ঘরের ধনবতী কন্যা সাসকিয়াকে মডেল করে রেমব্রান্ট কয়েকখানা ডেকোরেটিভ ধরনের ছবি এঁকে ছিলেন। কিন্তু অতি বিখ্যাত এবং নগ্ন চিত্রগুলো, যেমন ‘বাথশেবা উইল কিং ডেভিডস লেটার, ওমম্যান বেইজিং’ এসব ছবি এঁকেছিলেন হেন্ড্রিকিয়াকে মডেল করে।
রেমব্রান্ট হেন্ডিকিয়াকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছিলেন, কিন্তু বিয়ে করতে পারেননি। সাসকিয়া মৃত্যুর আগে উইল করে গিয়েছিলেন যে, তার মৃত্যুর পর বিয়ে করলে রেমব্রান্ট সাসকিয়ার সহায় সম্পত্তির উত্তরাধিকারিত্ব থেকে বঞ্চিত হবেন। হেন্ড্রিকিয়ার গর্ভে রেমব্রান্টের একটি মেয়ে সন্তান জন্ম নেয়। তিনি তার নাম রেখেছিলেন কর্নেলিয়া। রেমব্রান্টের মায়ের নামও ছিল কর্নেলিয়া।
রেমব্রান্টের মতো খ্যাতিমান মানুষ অভিজাত ঘরের যে কোনো সুন্দরীকে বিয়ে করতে পারতেন। অথচ তিনি তার মনপ্রাণ সঁপে দিয়েছিলেন ঘরের কাজের মেয়েকে, যে কিনা আবার তেমন সুন্দরীও ছিলেন না। আসলেই মেয়েদের সৌন্দর্য ‘মেনি সাইডেড’। কে কার মনকে উদ্দীপ্ত করতে পারে সেটাই হল আসল কথা।
তাহা বাবুর বাসায় গেলাম যখন তিনি তখন বেশ খুশিমনে আমাদের আপ্যায়ন করলেন। টোস্ট বিস্কুট সহকারে চা পান করলাম। এরপর আমরা গল্প করছিলাম। খুব তাড়াতাড়ি সময় পেরিয়ে গেল। তখন রাত ৮টা বাজে। আমি বললাম, এবার তো আমার যেতে হবে। ছাত্র ইউনিয়নের হোস্টেলে পঙ্কজ ভট্টাচার্য খুব সুরালো কণ্ঠে এখনই ডাক দেবেন, আপনারা খেতে আসুন। সময়মতো না পৌঁছলে রাতটা আমাকে উপোষ করে কাটাতে হবে। এই বলে আমি ইন্সটিটিউট ভবনের দিকে চললাম। আতসী বিশ্বাস চলে গেলেন তার বাসায়।
রাতে খেয়েদেয়ে এসে ক্র্যাফটস ভবনের সিঁড়ির ওপর বসলাম। রাত তখন ১০টা হবে। ক্র্যাফটস ভবন তখন খুব নির্জন। অন্ধকার রাতে আকাশের তারাগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হল, আজ যেন তারা-নক্ষত্র সব বেশি উজ্জ্বল। ভাবছিলাম, গ্রহ-নক্ষত্র না-কি মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে। মনে মনে বললাম- হে, গ্রহ-তারা, তোমরা আমার ভাগ্যে কী নির্ধারণ করেছ, তা তো আমার জানা নেই। আমি বর্বর পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছি। আতসী বিশ্বাস, বিজন বাবুর শালি বা অমন কারও সঙ্গে প্রেম করতে আসিনি। আজ সকাল বেলায় দুই নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের সঙ্গে দেখা হয়েছিল ডা. সুজিৎদের বাসায়।
আমি খালেদ মোশাররফকে অনুরোধ করলাম, আমাকে কলকাতায় যাওয়ার একটা ব্যবস্থা করে দেন। আমাকে কিন্তু একখানা পরিচয়পত্রও লিখে দিতে হবে। কলকাতায় গিয়ে আমি চলে যাব পলাশী নামের স্থানে। ওখানে নৌ-কমান্ডোদের প্রথম ব্যাচের ট্রেনিং শুরু হয়েছে। আমি সাঁতারে খুবই দক্ষ। বরিশালের মানুষ। খুব খরসে াতা নদীতেও দুই-তিন মাইল সাঁতারে আমার কষ্ট হয় না।
ছিলাম পিআইএ-এর পাইলট। সারাটা দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা হোটেলের সুইমিংপুলে সাঁতার কাটতাম। পলাশীর নৌকমান্ডো ট্রেনিং সেন্টারে গিয়ে পরিচয় দিলে ক্যাম্প কমান্ডার সহজেই আমাকে দলভুক্ত করে নেবেন বলেই আমার বিশ্বাস। প্রথম ব্যাচে সুযোগ না পেলে দ্বিতীয় ব্যাচে ট্রেনিং করব।
খালেদ মোশাররফ বললেন, শুনেছি, মুক্তিবাহিনী এয়ারফোর্স গঠিত হতে যাচ্ছে। তা গঠিত হলে ওই এয়ারফোর্সের পাইলট হিসেবে তুমি বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। এসব কথা চিন্তা করতে করতে গিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।
পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্ট করলাম, রাস্তার পাড়ের একটি রেস্তরাঁয়। দুপুরের কিছু আগে গেলাম ছাত্র ইউনিয়নের হোস্টেলে। ওইদিন বেলা ১০টার দিকে কোনো একটি বিদেশী সাহায্য সংস্থা হোস্টেলের ছেলেমেয়েদের মাঝে বেশ কিছু কাপড়-চোপড় বিতরণ করেছে। হোস্টেলের কেউ একজন সাহায্য সংস্থার লোকদের কাছ থেকে আমার জন্য একটি ট্রাউজার এবং একখানা ধুতি চেয়ে রেখেছিল। আমার জন্য যে শুভাকাক্সক্ষী ওগুলো চেয়ে রেখেছিল, তার নামটা আজ আর মনে করতে পারছি না।
আমার আস্তানায় ফিরে এসে ট্রাউজারটা পরে দেখলাম, আমার এমনভাবে ফিটিং হয়েছে যে, ভালো দর্জিও অমন করে আমার জন্য ট্রাউজার তৈরি করে দিতে পারত না। এবার ধুতি পরার পালা। ধুতি পরতে আমি অভ্যস্ত ছিলাম না। তাই গেলাম রঞ্জিৎ বাবুর কাছে। তিনি আমাকে ধুতি পরার কৌশল শিখিয়ে দিলেন। দুই-তিনবার ট্রায়াল দিয়ে কৌশলটা রপ্ত করে নিলাম।
যুদ্ধ করার জন্য ভারতে গেলেও সঙ্গে আমার অন্যান্য জামাকাপড়ের সঙ্গে গরদের একটি পাঞ্জাবিও ছিল। ধুতি এবং গরদের পাঞ্জাবি পরে নিজের কাছেই নিজেকে মনে হল ভালো মানিয়েছে। তবে ধুতি এবং পাঞ্জাবির সঙ্গে এমন জুতা খুব মানানসই নয়। এ কথা চিন্তা করে রিকশা নিয়ে গেলাম আগরতলার কামান চৌমোহনীতে। ওখানকার জুতার দোকান থেকে একজোড়া স্যান্ডেল কিনলাম।
দুপুরবেলা ছাত্র ইউনিয়নের হোস্টেল থেকে খেয়েদেয়ে এসে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে এসে রঞ্জিৎ বাবুর অফিসে গেলাম। অল্প সময় পরেই সেখানে আতসী বিশ্বাস এলেন। তিনি আমার বেশভূষা দেখে খুব তারিফ করে বললেন, বাহ, বেশ মানিয়েছে। তিনি বললেন, এবার আর আপনাকে শরণার্থী মনে হয় না, মনে হয় এপার বাংলার কোনো অভিজাত ঘরের মানুষ। আমি প্রতিবাদ করে বললাম, আমি শরণার্থী নয়। আমি এসেছি যুদ্ধ করতে। কয়েক দিনের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে হবে আমার স্থান। মুক্তিযোদ্ধাদের শরণার্থী কেউ বলে না। আমার কথা শুনে বেশ রসিকতা করে আতসী গান গাইলেন :
‘যাবার আগে যাওগে আমায় জাগিয়ে দিয়ে,
রক্তে মোর চরণ-দোলা লাগিয়ে দিয়ে।’
বিকাল চারটে বাজে। রঞ্জিৎ বাবু চা পরিবেশন করলেন। তারপর আরও কিছুক্ষণ গল্প করলাম। বিকাল ৫টায় রঞ্জিৎ বাবু চেয়ার ছেড়ে উঠে বললেন এবার তিনি বাসায় যাবেন। আতসীও বললেন, তিনিও এবার বাসায় যাবেন। আমি প্রশ্ন করলাম, আপনার বাসা কোথায়?
তিনি বললেন, বেশ কাছেই। ক্রাফটস ভবনের গেট দিয়ে বেরিয়ে ডান দিকে যাবেন। ১০০ গজ পরেই ইন্সটিটিউটের হোস্টেল, আরও খানিকটা এগিয়ে গেলে রাস্তার শেষ মাথায় জেলখানার গেট। এবার বাম দিকের রাস্তা ধরে হাঁটলে পাঁচ মিনিট পরেই আমাদের বাসা।
আমি বললাম, প্রতিদিন সকাল-বিকাল আমি তো ওই দিকেই হাঁটতে যাই।
আমি এবং আতসী বিশ্বাস হাঁটতে হাঁটতে ওইদিকেই গেলাম। আমরা তাদের বাসা ছাড়িয়ে আরও কিছুটা দূরে গেলাম। ওখানে একটা টিলার মতো খানিকটা উঁচু জায়গা। তারপর বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃষিভূমি। উঁচু জায়গাটায় আছে অনেক লিচু গাছ।
আমরা একটা লিচু গাছের নিচে বসে গল্প করছিলাম। লিচু গাছগুলো দেখিয়ে আতসীকে বললাম, আপনাকে একটা গল্প বলব, একটু মনোযোগ দিয়ে শুনবেন।
বললাম, গী দ্য মপাসাঁর লেখা একটা গল্পে পড়েছি, একবার তিনি প্যারিস থেকে বেশ দূরের একটি পাহাড়ি শহরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। ওখানে অবস্থান করার সময় তিনি পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটি গ্রামে গিয়ে পৌঁছলেন। তখন দেখলেন, ওখানকার কয়েকটি গ্রামে প্রচুর কাজুবাদামের গাছ। ওখানকার গ্রামের একজন মানুষকে তিনি প্রশ্ন করলেন, এ অঞ্চলে এত কাজুবাদামের গাছ কেন? লোকটি বলল, আমাদের গির্জার ধর্মযাজক খুব ভালো মানুষ। তিনি নিয়ম করে দিয়েছেন, গ্রামের কোনো মেয়ে বা ছেলে অবৈধ প্রেম করলে তার শাস্তি হল প্রেমিক-প্রেমিকা উভয়কে একটি করে কাজুবাদাম গাছের চারা রোপণ করতে হবে। আমাদের এখানকার মানুষ এত প্রেমিক বলে এত কাজুবাদামের গাছ দেখছেন।
গল্পটা বলে আতসী বিশ্বাসকে প্রশ্ন করলাম, আপনাদের এখানে কেউ অবৈধ প্রেম করলে কি তাকে লিচু গাছ রোপণ করতে হয়? নতুবা আগরতলায় এত লিচু গাছ দেখছি কেন?
বেশ সম্প্রতিভভাবেই আতসী উত্তর দিলেন- হ্যাঁ, আমাদের এখানে লিচু অথবা কাঁঠাল গাছের চারা রোপণ করতে হয়। দেখছেন না, এখানে কাঁঠাল গাছের সংখ্যাও কম না।
আমি বললাম, আসলে কাঁঠাল অথবা লিচু গাছ না লাগিয়ে রজনীগন্ধা ফুলের চারা রোপণ করা উচিত। রবিঠাকুর কিন্তু রজনীগন্ধা ফুলকে প্রেমের প্রতীক হিসেবে দেখতেন। তাই তার লেখায় তিনি বারবার রজনীগন্ধা ফুলের কথা লিখেছেন। আতসী বিশ্বাস আমার সঙ্গে একমত পোষণ করে বললেন, তাহলে রজনীগন্ধা ফুলের চাষাবাদ ভালোই হতো। মাত্র একদিন পরের কথা। দিনটা ছিল শনিবার। বিকাল বেলা, ভারতীয় সামরিক বাহিনীর একজন মেজর পদমর্যাদার অফিসার ক্রাফটস ভবন অফিসে এসে আমাকে বললেন, আগামী দিন দুপুর বেলায় ক্যাপ্টেন খালেক, ক্যাপ্টেন শাহাব উদ্দিন এবং আমাকে কোথাও যেতে হবে। পরের দিন ঠিক বেলা ২টায় তিনি আমাদের নিতে আসবেন। পরের দিন ঠিক সময়মতো মেজর সাহেব একখানা জিপ গাড়ি নিয়ে এলেন। আমরা তার সঙ্গে আগরতলা বিমানবন্দরে গেলাম। তারপর ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সে করে গেলাম কলকাতা। সেখান থেকে দিল্লি। শেষ পর্যন্ত গন্তব্য হল নাগাল্যান্ডের রাজধানী ডিমাপুর। শুরু হল আকাশ যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রশিক্ষণ। হতে চেয়েছিলাম, জলযুদ্ধের নৌকমান্ডো। কিন্তু গ্রহ-নক্ষত্র নির্দিষ্ট করে রেখেছিল, আমাকে হতে হবে আকাশ যুদ্ধের সৈনিক। যুদ্ধের ডামাডোলে ভুলে গেলাম রজনীগন্ধা ফুলের চাষাবাদের কথা।

শিল্প-সাহিত্যের সদর দরোজা ও গলিতত্ত্ব by ফজলুল হক সৈকত

সাহিত্য-শিল্পের সাধনা, চর্চা কিংবা লালনের সাথে নেশাদ্রব্যের প্রয়োগ (গ্রহণ বা সেবন অর্থে) অথবা সামান্যতমও সমাচার সম্পৃক্ত আছে কি-না-এ সম্বন্ধে সাধারণের মনে কিছু সরল জিজ্ঞাসা আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে সেরকম প্রশ্নের সামনাসামনি হয়েছি ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক পরিসরে ও বিচিত্র অবসরে। আবার আমার সাধারণ ধারণা এরকম জিজ্ঞাসার কাছে বিব্রত কিংবা উল্লসিত হতে হয়েছে অনেককেই; অন্তত যারা শিল্প-সাহিত্যের কারবারের সাথে কোনো-না-কোনোভাবে জড়িত আছেন। সাহিত্যিক কিংবা শিল্পীকে কি মদ্যপ কিংবা গাঁজাখোর হতে হয়? গঞ্জিকাসেবন বা মদপানের ফলে কি সাহিত্য-শিল্পসাধনার পথ প্রশস্ত হয়; শিল্পের ওই কারিগর কিংবা সাহিত্যের সাধক কি বেশি মাত্রায় অথবা উৎকৃষ্ট জাতের শিল্পকর্মের উদ্ভাবন করছেন? সাহিত্য কি সাধকের মেধা-চিন্তা ও চর্চার সরল পথ ধরে সদর দরোজা দিয়ে অন্দরে প্রবেশ করছে? না-কি গলির ভেতরে অথবা চিপায় অন্ধকারে সেবনমগ্ন কোনো গেঁজেল, বা দামি কার্পেটমোড়া বহুতল ভবনের করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো মদ্যপের মনে ভর করে গোপন কোনো পথ খুঁজে নিচ্ছে সাহিত্য ও শিল্প মাধ্যম?
‘গাঁজা না খেলে ভাব আসে না’, ‘শিল্পের সাধনা করতে গেলে এট্টু-আট্টু গিলতে হয় আর কি’, ‘মাঝে মাঝে মাথা ধরে এলে গঞ্জিকা খানিকটা কাজ দেয়’, ‘মদ না খেলে মাথা খোলে না’- এমন জাতের কিছু কথা এদিক-ওদিক শুনতে পাওয়া যায় বটে। অথচ দেখুন, আমরা বোধ করি সকলেই বিশ্বাস করি যে, মেধা, গডগিফটেড প্রতিভা, অর্জিত জ্ঞান ও চর্চার প্রতিফলন প্রভৃতি সৃজনভার প্রকাশের একটি সাধারণ ধারা। শিল্পীকে প্রতিভাবান হতে হয়। সাধনা করতে হয়। চিন্তা করতে হয়। তবে এই পরিচিত ধারাটির সাথে আরেকটি ধারা আমাদের চোখে পড়ছে। আর তা হলো সাধনার পথ ঠিক রাখতে কিছু লোক গঞ্জিকা বা মদের আশ্রয় নিচ্ছেন (অন্তত তাদের এবং তাদের সমর্থকদের তো সেরকমই দাবি!)। এই যে গেঁজেল বা মাতানো আবেশে ও আবেগে তৈরি অন্য একটি পথ ও রীতি (নাকি মেকি তত্ত্ব!), এটি বোধকরি সবকালে, সারাজাহানে প্রচলিত আছে। এবং কোনটি যথার্থ আর কোনটি বানানো- সাধারণের কাছে তার ঠিক ঠিক হিসাব মেলা ভার। সৃষ্টিশীলতা আর নেশাগ্রস্ততা কি পরস্পরের পরিপূরক? এখানে ফ্রেঞ্চ ভাষায় লেখা ও গাওয়া একটা জনপ্রিয় গানের প্রসঙ্গ তুলতে ইচ্ছে করছে। গানটি এরকম : ‘জ ন পু পা থাভাইয়ে, জ ন পু পা দেজুনে, জ মে উবলিয়ে... জ ফুমে’ (লিরিকটির বাংলা মানে দাঁড়ায় : আমার কোনো কাজে মন বসছে না, দুপুরে খেতেও ভালো লাগছে না, মাথা কেমন যেন আউলিয়ে গেছে... আমি তাই সিগারেট টানছি)। তার মানে কি কাজে মন না থাকলে, মনে অস্থিরতা কাজ করলে বিড়ি-সিগারেট প্রভৃতি কোনো কাজ দেয়? মাথার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সৃজনবেদনাকে ঠিকঠাক রাখতে হলে তবে কি ধূমপানের প্রয়োজন পড়ে? চিন্তা ও স্বপ্নময়তায় দোলা লাগায় এসব নেশাদ্রব্য? গঞ্জিকার বাহাদুরিও কি এইরকম ব্যাপারের সাথে সম্পৃক্ত? কারো মতে ‘হ্যাঁ’ আবার কারো মতে ‘না’।
উনিশ শতকে ইউরোপ-আমেরিকার ইতিবাচক পরিবর্তনের যে হাওয়া ভারতে প্রবেশ করেছিল, তার বাতাসে ভর করে বাঙালি চিন্তাবিদ ও স্বপ্নবাজদের আবির্ভাবের কথা বোধকরি আমাদের মনে আছে। সেদিনের সেই বিপ্লব ও উন্নয়নের ধারায় বাঙালিকে যুক্ত করেছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মতো অগ্রসর মানুষেরা। সমাজে তখন দুটি ধারা প্রবাহিত ছিল। একটি ধারা পাশ্চাত্য-অনুসরণে চিন্তার লালন এবং কর্ম ও আচারের আভিজাত্যে নিজেদের অগ্রসর নাগরিকরূপে তৈরি করছিল। আর অন্যরা ওই পাশ্চাত্যেরই পন্থায় মদ প্রভৃতি নেশায় ও বিচিত্র অনাচারে জড়িয়ে পড়ছিল। ঠিক সাহিত্য-শিল্পের সাধনায় ও পরিচর্যায় লেগে থাকা দুটি বিপরীতভাবের ধারার মতো। মধুসূদন বাঙালির চিন্তার ও স্বপ্নের মুক্তিদাতা হয়েও বোতলের টান পরিহার করতে পারেননি। তিনি মদ খেতেন বলে কি সৃষ্টিশীল কাজ করতে পারতেন? না-কি সৃষ্টিজনিত ক্লান্তি দূর করতে গিলতেন মদ? মাথার কিংবা মনের কর্মক্ষমতা কি এভাবে বাড়িয়ে তোলা যায়? কি ভাবতেন আসলে মাইকেল? বোতলে হাতই বা রাখতেন কেন? অথবা চুমুকে চুমুকে কি প্রেরণা পেতেন তিনি? আরো পরে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় অতিমাত্রায় নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ায় শেষদিকে তার সৃষ্টির শিল্পমান ধরে রাখতে পারেননি- এ কথা তো অনেকেরই জানা। আমাদের কানে এ সংবাদও পৌঁছেছে যে, অস্ট্রেলিয়ার প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী নামাৎজিরাকে মদ্যপ হওয়ার অপরাধে নাগরিকত্ব হারাতে হয়েছে। তার মানে কি দাঁড়ায়? দাঁড়ায় এটা- চিন্তা ও স্বপ্নময়তায় অবগাহনের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিক ও সামাজিক অগ্রগতি অর্জনের পথ নির্মিত হয়। মেধা কিংবা প্রতিভা আর সাধনার দৃঢ়তা ওই সড়ককে প্রসারিত করে। সদর দরোজা পর্যন্ত পৌঁছতে সহায়তা করে। আর আলগা ভাব কিংবা গোপন গলি-ফর্মুলা (আড়ালে-আবডালে নেশায় বুঁদ হয়ে শিল্পের পথে হাঁটবার বাহানা!) কোনো-কোনো ক্ষেত্রে খানিকটা চমক সৃষ্টি করতে পারলেও আদতে ওটা কেবল ‘ভাব’ বৈ তো অন্য কিছু নয়।
আরেকটি কথা- মানুষ আত্মহত্যা করে কেন? মানসিক যন্ত্রণার কারণে? অনেকে না-কি (শুনেছি) কষ্ট থেকে রেহাই পেতে মদ বা গঞ্জিকার দ্বারস্থ হয়? আবার অন্যের দ্বারা কেউ কেউ প্রভাবিত হয়, অথবা স্রেফ অপরের ক্ষতি করে এমন কথাও আমাদের কানে ও গোচরে আসে। আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে, সূর্যমুখীকে আ্ত্মহননের পথে পাঠালেন না বঙ্কিম। আবার ঠিকই কুন্দকে বিষের বাটি হাতে তুলে দিলেন। এই দ্বৈতচিন্তার সমাবেশ ঘটল কি করে? এখানে শিল্পীর কি লাভ-ক্ষতি? রোহিনীকে গুলি করে মেরে কার লাভ- গোবিন্দলালের না-কি বঙ্কিমের? সাহিত্যচর্চা কি পেশা? তাহলে অন্য পেশার লোকেরা যদি নেশায় বুঁদ হয়, তখন আমরা ব্যাপারটিকে কোন নিক্তিতে পরিমাপ করতে পারি? আজকাল মধ্যে মধ্যে শুনতে পাই- নেশা ছাড়া না-কি মানুষ হয় না। কথাটার মানে দাঁড়ায়- মানুষ মাত্রেই নেশার দাস। যেমন ‘মানুষ অভ্যাসের দাস’। আবার ‘অভ্যাসও কিন্তু মানুষের দাস’। কাজেই নেশায় মগ্ন হয়ে পড়া যেমনটা স্বাভাবিক, তেমনি নেশাকে নিয়ন্ত্রণ করা বা নেশাদ্রব্য থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার কৌশলও মানুষের জানা। অতএব, মানুষ নেশা দ্বারা পরিচালিত নয়। মানুষের সৃষ্টিকর্ম- সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়াদিও নেশার ওপর নির্ভরশীল নয় কিছুতেই। কাজেই ‘আপনার কি কোনো নেশা আছে?’ বা ‘গাঁজা-টাজার অভ্যাস আছে না-কি?’- এই জাতীয় জিজ্ঞাসার উত্তর হয়তো সব সময় ঠিকঠাক মতো পাওয়া যায় না। তাতে অবশ্য শিল্প কিংবা সাহিত্যের কোনো ক্ষতি নেই। শিল্পীকে আঁকতে গেলে বা মঞ্চে দাঁড়াতে গেলে গলায় কিছুটা ঢেলে নিতে হবে। অথবা লিখতে বসলে খানিকটা টেনে নিলে ভালো হয়- এসবের কোনো মানে থাকতে পারে না।
সাহিত্য কি সদর দরোজা দিয়ে বাজারে কিংবা অন্দরে প্রবেশ করে? সাহিত্যের বাজার বলতে আসলে কী বোঝায়? সাহিত্য বাজারে ভালো কাটলে (কেটে কুচি কুচি নয়- বিক্রি-বাট্টা অর্থে) তা বাজার দখল করে। তখন কি সেটা বাজারি হয়ে যায়? আর ‘বাজারি সাহিত্য’ কিংবা ‘বাহারি শিল্প’ কি সকলে গ্রহণ করে? ব্যাপারগুলো মোটেও সরল নয়। এবং সে কারণেই শিল্প-সাহিত্যের সদর দরোজার প্রবেশের ঘটনাটাও একেবারে সোজাসাপটা কাজ নয়। আর গলি-ঘুঁজিতে যে সাহিত্যের চর্চা ও সমাদর- তার কি দশা? প্রকাশ্যে যে শিল্পভুবন আলো ছড়ায় না- তার বিকাশের জন্য যখন দরকার হয়ে পড়ে গলির নীরবতা অথবা গোপনতা, তাকে কি আমরা জাতীয় সাহিত্য-শিল্প বলতে পারি? গাঁজার টানে টানে কিংবা মাদকের মাদকতায় আওড়ানো কথামালা, গেঁজেলের মাতানো কল্পনা ও সৃজনভাবনায় যে শিল্পময়তার বুনন, তাকে আমরা কি নামে ডাকবো? সাহিত্যের বিকাশের জন্য কিংবা শিল্পের পরিচর্যার জন্য গলিতত্ত্বের প্রসঙ্গ ও প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারটা তাহলে আমাদের গোচরে বা অগোচরে, কীভাবে জায়গা করে নিল? এসব সৃষ্টিরই কি বাজার ভালো? হতে পারে। এসবে এক ধরনের মানুষ মাতানোর বিশেষ প্রবণতা থাকে বটে!
সাহিত্যের সদর দরোজার সামনের পথে কি স্রষ্টা ও ভোক্তার মানসিক প্রশান্তি প্রলেপ-মলম বিছানো থাকে? যদি এমনটিই হয়, তাহলে বুঝতে হবে যিনি সৃষ্টি করবেন এবং যার জন্য সৃষ্টি হবে উভয়কেই থাকতে হবে সতেজ ও সামর্থ্যবান। কেউ মাতাল বা গেঁজেল হলে সে সৃজনশিল্পী বা গ্রহণদার যে-ই হোন না কেন, সৃষ্টির সৌন্দর্যটা শেষ পর্যন্ত আর থাকে না। থাকতে পারে না। মানসিক প্রশান্তি সৃষ্টিকারীর মানসিক অবস্থাও থাকে প্রত্যাশিত প্রশান্ত-পরিস্থিতির খুব কাছাকাছি। মিথ্যা দিয়ে তো সত্য রচনা চলে না! সদর দরোজা দিয়ে ঢুকতে হলে সাহস লাগে। গলি-ঘুঁজির ভেতরে ঢুকতে ও পথ-চলতে যে সাহস লাগে না- তা নয়। তবে ব্যাপারটা হলো স্পষ্টতা আর গোপনীয়তার। স্পষ্টতায় ফাঁক থাকে না। গোপনীয়তায় অনেক জোড়াতালি থাকে। গোঁজামিলের দরকার পড়ে। ভান ধরলে আসলটা হারিয়ে যায়। সত্য আর মিথ্যা যেমন আলাদা, তেমনই সদর দরোজার শিল্প ও সাহিত্য আর গলির ভেতরে জন্ম নেওয়া শিল্প ও সাহিত্য ভিন্ন ভিন্ন ভুবনের উপাদান। গাঁজার আড্ডায় তৈরি হওয়া কিংবা গলির অন্ধকার পথের ধারা থেকে উঠে আসা সাহিত্য কিংবা শিল্প কতটা গ্রহণযোগ্যতা পায়? শেষ পর্যন্ত কি এগুলো বাজারি হয়ে কিছুকাল ইতি-উতি করে কেটে পড়ে? না-কি থাকে সাহিত্যধারার অনুষঙ্গী হয়ে? এসব বিবেচনায় নানা বিবেচকের চোখ পড়েছে। আজও পড়ছে। আর যতই এসব বিবেচনা আমাদের সতর্ক চোখের সামনে টেবিলে সাজানো থাক-না-কেন, সমাজে ও কালে এবং বোধকরি উত্তরকালেও এসব গেঁজেল সাহিত্যের ভারে আমরা ক্লান্ত হতে থাকবো।
মাঝে মধ্যে উপন্যাস প্রভৃতিকে ‘গল্পের বই’ বলতে শুনি। আগেকার দিনের মানুষ সিনেমাকে না-কি বলতো ‘বই’। সম্ভবত বই-এর কাহিনী অবলম্বনে সেলুলয়েডের ফিতায় কাহিনীর পদার্পণ ছিল বলে এমন নামে ডাক পড়ত। আর আকজাল চিত্রকর্মেরও বই বেরিয়েছে। সঙ্গীত প্রভৃতি জনপ্রিয় ধারা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে সারা দুনিয়ার প্রান্তে ও প্রান্তরে; গলি থেকে সদর দরোজা হয়ে সোজা আকাশ পথ ধরে মানুষের চেতন-ভুবনে। কাজেই মেকি গলিতত্ত্ব বা গঞ্জিকানির্ভর শিল্পচর্চার কাল এবং সাহিত্যসাধনার সময় ফুরিয়েছে। আঙুলের চাপে চাপে চলছে চিন্তা-কল্পনা ও স্বপ্নের কারবার। শিল্প এবং সাহিত্যও পেয়েছে বিচিত্র সদর পথের সন্ধান। ভান বা বাহানা কিংবা অজুহাত এখন বহুহাত দূরে সরে গেছে।

মূক–বধিরের মতোই নিশ্চুপ আরব নেতারা

গাজা শহরের আল-শিফা হাসপাতালের বাইরে ইসরায়েলি হামলায়
প্রিয়জন হারানো স্বজনদের আহাজারি। গতকাল তোলা ছবি। এএফপি
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিভিন্ন দেশের অগণিত সাধারণ মানুষ এ হামলার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ-প্রতিবাদ জানাচ্ছে। কিন্তু আরব নেতারা একেবারেই নিশ্চুপ। ইসরায়েলের রক্তাক্ত হামলা শুরুর তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কার্যকর একটি যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নিতে পারেননি তাঁরা। নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক বিশ্লেষণে এ কথা বলা হয়েছে। বিশ্লেষণের পর্যবেক্ষণ, আরব নেতাদের চুপ থাকার বিষয়টি আসলে মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডের পতনের পরই ঠিক হয়ে গেছে। ওই সময় থেকেই মূলত মিসর, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও জর্ডান মিলে একটি বলয় তৈরি হয়েছে। এটি হলো রাজনৈতিক ইসলামি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বলয়। এটি অবশ্যই ফিলিস্তিনের কট্টরপন্থী দল হামাসের বিরুদ্ধে গেছে। আর পক্ষে গেছে ইসরায়েলের। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উইলসন সেন্টারের গবেষক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ইসলামি রাজনৈতিক শক্তির প্রতি আরব দেশগুলোর ভয় ও অনীহা এতই প্রবল যে এ শক্তির উত্থানকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর চেয়েও গুরুতর মনে করেন তাঁরা। মিলার বলেন, ‘আমি এ ধরনের পরিস্থিতি কখনো দেখিনি, যেখানে অনেক আরব দেশই গাজায় হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের জন্য বরং হামাসের দিকেই অভিযোগের আঙুল তুলছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরব নেতারা আসলে মূক-বধিরের মতো নীরবতা পালন করছেন।’ গাজায় এবারের ইসরায়েলি অভিযান শুরু হওয়ার পর মিসর যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেয়।
ওই উদ্যোগের পর সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ ফোন করেন মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির কাছে। সিসির কার্যালয় জানায়, বাদশাহ আবদুল্লাহ বলেছেন, গাজার বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তিনি ইসরায়েলের কোনো দোষ দেখেননি। আবদুল্লাহ এ-ও বলেছেন, ‘সামরিক সংঘর্ষের ফলে সাধারণ ফিলিস্তিনিরা যে রক্তপাতের শিকার হচ্ছে, তার জন্য ওই ফিলিস্তিনিরা কোনোভাবেই দায়ী নয়।’ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফেলো খালেদ এলিন্দি বলেন, বাদশাহ আবদুল্লাহর এ কৌশলগত বক্তব্যে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সমমনা আরব দেশগুলোর অভিন্ন অবস্থানের কথাই প্রতিফলিত হয়েছে। যেখানে ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের স্বার্থ একই বিন্দুতে। খালেদ বলেন, আরব দেশগুলোর বর্তমান বলয়ের নেতৃত্বে থাকা মিসর যেমন রাজনৈতিক ইসলামি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তেমনি ইসরায়েলও ফিলিস্তিনের ইসলামপন্থী কট্টর গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। আর এখানেই ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর আপাত অভিন্ন অবস্থানের মূল বিষয়টি ফুটে উঠেছে। আরব বসন্তের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিস্তিনের অনেক বিশ্লেষকই ধারণা করেছিলেন, এ বসন্ত আরব সরকারগুলোকে নিজ নিজ জনগণের প্রতি আরও দায়বদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক করবে, যা ফিলিস্তিনিদের প্রতি আরও সহানুভূতিমূলক ও ইসরায়েলের প্রতি কঠোর অবস্থান নিতে সরকারগুলোকে বাধ্য করবে। কিন্তু মিসরে আরব বসন্তের পরে ক্ষমতায় আসা মুসলিম ব্রাদারহুডের পতনের পর সেই সমীকরণও যেন পাল্টে যায়। মিসরের নেতৃত্বে নতুন বলয় সৃষ্টি হওয়ায় ইসরায়েল নিঃসঙ্গ না হয়ে বরং ফিলিস্তিনের কট্টরপন্থীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আরব দেশগুলোর মৌন সমর্থন পাচ্ছে।
গাজায় ইসরায়েলি হামলায় হতাহত ও ধ্বংসযজ্ঞের জন্য মিসরের কর্মকর্তারাও হামাসকেই দায়ী করছেন। গাজায় খাদ্য ও চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রকট অভাব সত্ত্বেও সিসি সরকার মিসর ও গাজার সঙ্গে যোগাযোগের অবৈধ সুড়ঙ্গগুলো বন্ধ করে রেখেছে। বন্ধ করে দিয়েছে সীমান্ত ক্রসিংও। গাজার উত্তরাঞ্চলীয় শহর বেইত লাহিয়ার বাসিন্দা সালহান আল-হিরিস বলেন, ‘সিসি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর চেয়ে খারাপ। মিসর আমাদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের চেয়েও জঘন্য ষড়যন্ত্র করছে। সিসি সরকার মিসরে ব্রাদারহুডকে ধ্বংস করছে, এখন হামাসের বিরুদ্ধে লেগেছে।’ ইসরায়েলের সঙ্গে মিসর, সৌদি আরব ও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সমমনা অবস্থান সৃষ্টি হওয়ার আরেকটি কারণ হলো ইরানবিরোধী মনোভাব। এই ইরানের বিরুদ্ধে হামাসকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে। মিসর শুরুতেই যুদ্ধবিরতির যে প্রস্তাব দিয়েছিল, তা নিয়ে হামাসের সঙ্গে আলোচনা এখনো চলছে বলে খবর রয়েছে। মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক ও মোহাম্মদ মুরসির সময়ে যে আলোচকেরা বিভিন্ন সময়ে হামাসের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন, তাঁরাই এ আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। জেরুজালেমভিত্তিক সালেম কলেজের প্রধান মার্টিন ক্রামার বলেন, মিসরের বর্তমান সরকার এবং সৌদির সমমনা আরব দেশগুলো মনে করে, হামাসকে পরাজিত করতে হলে ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ পোহাতেই হবে। কারণ তারা চায় না, হামাস ফিলিস্তিনে শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাক।

কাঁদলেন জাতিসংঘের কর্মকর্তা

ক্রিস গানেস
গাজায় জাতিসংঘের শরণার্থী শিবির হিসেবে ব্যবহৃত বিদ্যালয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন জাতিসংঘের কর্মকর্তা ক্রিস গানেস। এ ঘটনাকে ইসরায়েলবিরোধী একচোখা আবেগের প্রদর্শনী আখ্যা দিয়ে গানেসকে বরখাস্ত করার দাবি জানিয়েছে ইসরায়েল। খবর এনডিটিভির। গাজার ওই শরণার্থী শিবিরে গত বুধবার ইসরায়েলি হামলায় ১৫ ফিলিস্তিনি নিহত ও শতাধিক আহত হয়। একটি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় ওই হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন জাতিসংঘের রিলিফ অ্যান্ড ওয়ার্কস এজেন্সির (ইউএনআরডব্লিউএ) মুখপাত্র গানেস। জাতিসংঘ এই হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করে এর নিন্দা জানিয়েছে। টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারের পর এক বিবৃতিতে গানেস বলেন, যেকোনো পরিসংখ্যান মানবিকভাবে খতিয়ে দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তরিকভাবেই তা খতিয়ে দেখতে হবে। প্রতিটি তথ্যের আড়ালে যেসব মানবিক বিষয় থাকে, সেগুলো ভুলে গেলে চলবে না। গাজায় ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর জাবালিয়া গার্লস ইলিমেন্টারি স্কুল জাতিসংঘের শরণার্থী শিবির হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সেখানে আশ্রয় নিয়েছে অন্তত তিন হাজার ৩০০ ফিলিস্তিনি, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। ইউএনআরডব্লিউএর প্রধান পিয়েরে ক্রাহেনবুল জানান, তিন হাজারের বেশি গৃহহীন ফিলিস্তিনি প্রাণ বাঁচাতে এই বিদ্যালয় ও বিদ্যালয় চত্বরে আশ্রয় নেয়।হামলা শুরুর পর থেকে ইউএনআরডব্লিউএর পক্ষ থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে ১৭ বার যোগাযোগ করা হয়েছে। প্রতিবারই শরণার্থী শিবিরের বিষয়ে তাদের তথ্য দেওয়া হয়েছে। হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেও ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে ইউএনআরডব্লিউএর যোগাযোগ হয়। তার পরও হামলা চালানো হলো। হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে কাঁদায় গানেসকে বরখাস্ত করার দাবি জানিয়ে জাতিসংঘে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে ইসরায়েল। জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত রন প্রসর বলেন, গানেসকে অবশ্যই বরখাস্ত করতে হবে। ইসরায়েলবিরোধী একচোখা আবেগের যে প্রদর্শনী চলছে, জাতিসংঘের কর্মকর্তা হয়েও গানেস সেই প্রদর্শনীতে যোগ দিয়েছেন।

নিজেই বই লিখে সবাইকে ‘সত্য’ জানাবেন সোনিয়া

ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের প্রধান সোনিয়া গান্ধী বলেছেন, তিনি নিজেই এবার বই লিখবেন এবং সবাই সেটি পড়ে সত্য জানতে পারবেন। বিষয়টি তিনি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন এবং অবশ্যই লিখবেন। খবর এনডিটিভির। কংগ্রেসের সাবেক নেতা নটবর সিংয়ের আত্মজীবনীতে তাঁর কয়েকটি মন্তব্যের জবাবে সোনিয়া ওই বক্তব্য দেন। নটবর এক সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেন, ছেলে রাহুল গান্ধীর বিরোধিতার কারণে সোনিয়া প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ‘অন্তরের বাণী শুনে’ নয়।
রাহুল ভয় পেয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলে তাঁর বাবা রাজীব গান্ধী ও দাদি ইন্দিরা গান্ধীর মতো মাকেও হয়তো আততায়ীর হামলায় প্রাণ হারাতে হবে। ইন্দিরা ও রাজীব দুজনেই প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে নিহত হন। নটবরের আত্মজীবনীতে সোনিয়াকে ‘কর্তৃত্ববাদী’ও ‘ম্যাকিয়াভেলীয়’ চরিত্রের অধিকারী আখ্যা দেওয়া হয়। সোনিয়া বলেন, তিনি এ ধরনের আক্রমণে অভ্যস্ত। তবে এসব মন্তব্যে তিনি আহত হন না। কারণ, তিনি নিজের শাশুড়িকে বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হতে দেখেছেন, স্বামীর মৃত্যুও দেখেছেন। কাজেই তিনি (সোনিয়া) এসব আঘাতের (নটবরের মন্তব্য) ঊর্ধ্বে। তাদের যদি ভালো লাগে, এসব করতে থাকুক এবং এতে তাঁর ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। দুর্নীতির অভিযোগে ৮৩ বছর বয়সী নটবর সিং ২০০৫ সালে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট সরকার থেকে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। আত্মজীবনীতে তাঁর বিভিন্ন মন্তব্য ‘হাস্যকর’ বলে দাবি করেছে কংগ্রেস।

১৭ লাখ লোকের গাজায় ইসরায়েলি লাখ সেনার অভিযান

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নির্মম অভিযান চলছেই। এতে গতকাল বৃহস্পতিবারও অন্তত ১০ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। টানা ২৪ দিনের এই অভিযানে এ নিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪৩৫ জনে।

>>নিরাপদ ভেবে জাতিসংঘের শরণার্থী শিবিরে পরিবারের সঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিল এই শিশুটি। শেষরক্ষা হয়নি। সেখানেও হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। আহত এই শিশুকে গতকাল গাজার কামাল এদওয়ান হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয় l ছবি: এএফপি
আন্তর্জাতিক মহলের তীব্র সমালোচনা এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির আহ্বান সত্ত্বেও ইসরায়েল অনমনীয় মনোভাব দেখিয়ে বলছে, গাজায় হামাসের সব সুড়ঙ্গ ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত সামরিক অভিযান চলবে। গাজা অভিযানের জন্য আরও ১৬ হাজার সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে।
এদিকে, গাজায় জাতিসংঘের আরেকটি আশ্রয়শিবিরে ইসরায়েলি হামলার নিন্দা করেছে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র। গত বুধবারের ওই হামলায় ১৬ জন নিহত হন। পাশাপাশি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান নাভি পিল্লাই। খবর এএফপি, রয়টার্স ও বিবিসির।
ইসরায়েলের গতকালের হামলায় এক নারীসহ ছয়জন নিহত হন গাজার দক্ষিণের খান ইউনিস শহরে। দুজন নিহত হন গাজার মধ্যভাগের দার আল-বালাহ এলাকায়। আর রাফাহ শহরে হামলায় নিহত হন এক নারীসহ দুজন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গতকাল বলেছেন, গাজায় হামাসের সব সুড়ঙ্গপথ ধ্বংস না করা পর্যন্ত অভিযান চলবে। মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা অনেকগুলো সুড়ঙ্গ ধ্বংস করতে পেরেছি। এই কাজ শেষ করার জন্য আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।...কাজেই আমি এমন কোনো প্রস্তাব মেনে নেব না, যা ইসরায়েলি জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর কাজকে ব্যাহত করে।’
এই প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র গতকাল আরও ১৬ হাজার সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে বলে ঘোষণা করেছেন। এ নিয়ে এই অভিযানে নিয়োজিত সেনাসদস্যের সংখ্যা দাঁড়াবে ৮৬ হাজারে। মাত্র ৭৭ লাখ জনসংখ্যার ক্ষুদ্র কিন্তু শক্তিধর দেশ ইসরায়েলের সক্রিয় সেনাসংখ্যাই এক লাখ ৭৬ হাজার ৫০০। অন্যদিকে ঘনবসতিপূর্ণ গাজার মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ। দুই দিকে ইসরায়েল, এক দিকে মিসর ও এক দিকে সাগরঘেরা গাজা উপত্যকার আয়তন মাত্র ৩৬০ বর্গকিলোমিটার। সমুদ্রপথেও ফিলিস্তিনিদের চলার স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রিত।
জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন গত বুধবার বলেন, ফিলিস্তিনে জাতিসংঘ পরিচালিত একটি বিদ্যালয়ে আজ সকালে নিন্দনীয় একটি হামলা হয়েছে। ওই বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছে তিন হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি। ...এ হামলা অগ্রহণযোগ্য এবং দায়ীদের বিচার হতে হবে।
জাতিসংঘ মহাসচিব জানান, ওই বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। বিদ্যালয়টির অবস্থানও তাদের জানানো হয়েছিল। কাজেই বিদ্যালয়টির অবস্থান এবং সেখানে যে সাধারণ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে, তা ইসরায়েলি বাহিনী জানত।
নাভি পিল্লাই গতকাল বলেছেন, ‘ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে গাজায় আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। তারা বাড়িঘর, বিদ্যালয়, হাসপাতাল এমনকি জাতিসংঘ পরিচালিত আশ্রয়শিবিরেও গোলাবর্ষণ করছে। এসব হামলা দুর্ঘটনাক্রমে ঘটছে বলে আমি মনে করি না।’
কট্টরপন্থী ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসনিয়ন্ত্রিত গাজা উপত্যকায় এ পর্যন্ত চার লাখ ২৫ হাজার মানুষ আশ্রয়হীন হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। এর মধ্যে দুই লাখ ২৫ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে জাতিসংঘের ৮৬টি আশ্রয়শিবিরে।
ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত জাতিসংঘের আশ্রয়শিবিরে হামলার নিন্দা জানিয়েছে। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মুখপাত্র বার্নাদাতি মিহান বলেন, গাজায় জাতিসংঘ পরিচালিত বিদ্যালয়ে হামলায় শিশু, জাতিসংঘের কর্মীসহ নিরীহ ফিলিস্তিনিরা নিহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার নিন্দা জানায়।
গাজা থেকে হামাস রকেট ছুড়ছে—এই অজুহাত তুলে গত ৮ জুলাই ‘অপারেশন প্রটেক্টিভ এজ’ নামের এই অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। প্রথম দিকে বিমান হামলায় তা সীমাবদ্ধ থাকলেও হামাসের সুড়ঙ্গ ধ্বংস করার কথা বলে ১৭ জুলাই থেকে শুরু হয় স্থল অভিযান। হামাস অস্ত্র পাচার ও ইসরায়েলে চোরাগোপ্তা হামলা চালাতে ওই সব সুড়ঙ্গ ব্যবহার করে বলে অভিযোগ আছে। তবে ইসরায়েল জবাবে প্রত্যাঘাত করছে বহুগুণ শক্তি দিয়ে এবং তাদের হামলায় নিহতদের বেশির ভাগই শিশুসহ বেসামরিক লোক।