Tuesday, January 19, 2016

অবসরের পরও রায় লেখা সংবিধান পরিপন্থী: প্রধান বিচারপতি

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহা । ফাইল ছবি
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, কোনো কোনো বিচারপতি রায় লিখতে অস্বাভাবিক বিলম্ব করেন। আবার কেউ কেউ অবসর গ্রহণের দীর্ঘদিন পর পর্যন্ত রায় লেখা অব্যাহত রাখেন, যা আইন ও সংবিধান পরিপন্থী। বাংলাদেশের ২১ তম প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বাণীতে প্রধান বিচারপতি এ কথা বলেন।
গত বছরের ১৭ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। বাণীতে প্রধান বিচারপতি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ বাংলাদেশের সংবিধান, আইনের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ গ্রহণ করেন। কোনো বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর তিনি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে গণ্য হন বিধায় তাঁর গৃহীত শপথও বহাল থাকে না। আদালতের নথি সরকারি দলিল (পাবলিক ডকুমেন্ট)। একজন বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর আদালতের নথি নিজের নিকট সংরক্ষণ, পর্যালোচনা বা রায় প্রস্তুত করা এবং তাতে দস্তখত করার অধিকার হারান। আশা করি বিচারকগণ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এমন বেআইনি কাজ থেকে বিরত থাকবেন।
প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, ১৭ জানুয়ারি ২০১৫ থেকে ৩০ নভেম্বর ২০১৫ পর্যন্ত আপিল বিভাগে মামলা নিষ্পত্তির পরিমাণ নয় হাজার ৩৫৬ টি। এ সময় বিগত বছরের মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে পাঁচ হাজার ৭৮৯ টি। এ ক্ষেত্রে তুলনামূলক মামলা নিষ্পত্তির শতকরা হার ১৬২ শতাংশ। হাইকোর্ট বিভাগে ২০১৫ নালের নভেম্বর পর্যন্ত মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা ৩৩ হাজার ৩৮০ টি। অথচ ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ২২ হাজার ৪৭৭ টি। এ ক্ষেত্রে তুলনামূলক মামলা নিষ্পত্তির শতকরা হার ১৪৯ শতাংশ। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন আদালতে মোট মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩৩ টি। এ সময়ে ২০১৪ সালে নিষ্পত্তির পরিমাণ নয় লাখ ৯৭ হাজার ৬৫২ টি। এ ক্ষেত্রে তুলনামূলক মামলা নিষ্পত্তির হার ১০৭ শতাংশ।

অভিজ্ঞতায় আমিই সবার সেরা : হিলারি

ধীরে ধীরে বেজে উঠছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দামামা। চূড়ান্ত লড়াইয়ের আগে গা গরমের টেলিভিশন বিতর্কে মুখোমুখি হয়ে নিজেদের ঝালিয়ে নিচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে লড়তে আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কে হবেন ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী, সে লড়াইও শুরু হতে যাচ্ছে শিগগিরই। তবে তার আগেই চূড়ান্ত বিতর্কে মুখোমুখি হয়ে উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে দিলেন দুই ডেমোক্র্যাট মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ও ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। এ সময় নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলে স্যান্ডার্সের সমালোচনার জবাব দেন হিলারি।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, হিলারি ও স্যান্ডার্সের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিতর্ক হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে আসন্ন আইওয়া ও নিউ হ্যাম্পশায়ার ককাসে লড়াই জমে উঠবে এই দু’জনের মধ্যেই। সাউথ ক্যারেলিনার চার্লসটনে লেস্টার হল্টের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই ডেমোক্র্যাট ডিবেটের পুরোটা সময়ই ছিল তুমুল উত্তেজনায় ঠাসা। দু’জনই এ সময় একে অপরকে আক্রমণ করে বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করে এনবিসি টেলিভিশন। দু’জনের সঙ্গে বিতর্কে আরও অংশ নেন আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী ও মেরিল্যান্ডের সাবেক গভর্নর মার্টিন ও’ম্যালে। তবে হিলারি ও স্যান্ডার্সের সামনে তিনি ছিলেন অনেকটাই নিষ্প্রভ। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি বলেন, ‘সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব নেয়ার জন্য আমি প্রস্তুত। অভিজ্ঞতায় আমিই সেরা।’ যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তে থাকা অস্ত্র সহিংসতার ব্যাপারে সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সকে আক্রমণ করে বক্তব্য দেন হিলারি ক্লিনটন। পক্ষান্তরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় হিলারি ওয়াল স্ট্রিটের বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের স্বার্থে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ আনেন স্যান্ডার্স। এএফপি, বিবিসি

নিষেধাজ্ঞামুক্ত ইরান: কিছু বিচার-বিবেচনা by আলী রীয়াজ

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ইইউর পররাষ্ট্রনীতি–বিষয়ক
প্রধান কর্মকর্তার যৌথ সংবাদ সম্মেলন
পরমাণু শক্তি হ্রাস ও উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে ইরান তার প্রতিশ্রুতি পালন করেছে—জাতিসংঘের পারমাণবিক সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে এ কথা বলার পর ইরানের ওপর ২০০৩ সাল থেকে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার অবসান ঘটেছে। গত বছরের মাঝামাঝি ইরান জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্য ও জার্মানির সঙ্গে পরমাণু শক্তি হ্রাস বিষয়ে যে চুক্তি করেছিল, তার পর্যায়ক্রমিক পদক্ষেপের তৃতীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সাফল্যের সঙ্গে পূরণ করার ফলে এখন ইরানের ওপর আর কোনো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থাকল না। এর আশু প্রতিক্রিয়া হচ্ছে যে ইরান আবার বিশ্ববাজারে তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হবে এবং অনুমান করা হচ্ছে যে এতে করে দেশটি অচিরেই বিশ্ববাজারে দৈনিক কমপক্ষে পাঁচ লাখ, মাস ছয়েকের মধ্যে ১০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ করতে সক্ষম হবে। তা ছাড়া দেশের বাইরে ইরানের যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ আটক করা হয়েছিল, ইরান এখন সেগুলো ধীরে ধীরে ফেরত পাবে।
প্রায় ১২ বছর ধরে আলোচনা প্রচেষ্টার—যাতে কখনো অগ্রগতি হয়েছে, কখনো এসেছে স্থবিরতা—পরিণতি এসেছিল গত বছরের মাঝামাঝি ভিয়েনায় চুক্তি স্বাক্ষর এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব গ্রহণের মধ্য দিয়ে। ‘যৌথ সার্বিক কর্মপরিকল্পনা’ নামের এই চুক্তির সবচেয়ে বড় দিক ছিল যে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনবে এবং এই প্রক্রিয়ার নজরদারি করবে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থা। ভবিষ্যতেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর নজরদারির ব্যবস্থা থাকবে। এই চুক্তির আওতায় গত কয়েক মাসে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে এমনভাবে ঢেলে সাজানো হয়েছে, যাতে করে ইরানের পক্ষে পরমাণু অস্ত্র তৈরি আপাতত প্রায় অসম্ভব। স্মরণ করা যেতে পারে যে জাতিংঘের এই পারমাণবিক সংস্থাই ২০০৮ সালের মে মাসে এবং ২০১১ সালের নভেম্বরে প্রকাশ্যে ইরানের পারমাণবিক কার্যকলাপের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল।
এই চুক্তির আওতায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ হ্রাসের বিষয়ে পাঁচটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছিল। তার মধ্যে প্রথমটি ছিল ফাইনালাইজেশন ডে বা চূড়ান্তকরণ দিবস, যেদিন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ চুক্তি অনুমোদন করে, অর্থাৎ ২০ জুলাই। তার ৯০ দিন পরে ছিল অ্যাডাপশন ডে বা গ্রহণ দিবস, যেদিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইনসভাগুলোর এই প্রস্তাব গ্রহণের বাধ্যবাধকতা ছিল, দিনটি ছিল ১৮ অক্টোবর। তৃতীয় দিন ছিল ইমপ্লিমেন্টেশন ডে বা বাস্তবায়ন দিবস; বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থার প্রতিবেদন যেখানে এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে সব শর্ত পালন এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ সম্পন্ন করার ফল জানানো হবে, তারপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ নির্ধারিত ছিল না, কিন্তু বলা হয়েছিল, তা হতে হবে ডিসেম্বর বা জানুয়ারি মাসে। এখন সেই পদক্ষেপ নেওয়া হলো। চতুর্থ পদক্ষেপ আসবে গ্রহণ দিবস থেকে আট বছর পরে, অর্থাৎ ২০২৩ সালে। একে বলা হয়েছে ট্রানজিশন ডে বা পরিবর্তন দিবস। যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, যদি আট বছরের আগে সম্পন্ন হয়, তবে এই দিন আগেও আসতে পারে। আর সব শেষে টার্মিনেশন ডে বা সমাপ্তিকরণ দিবস আসবে ২০২৫ সালে। এই দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার তৃতীয়, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তরে সাফল্য অর্জন করা গেছে।
গত বছর চুক্তি করার সময় কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে ইরান তার প্রতিশ্রুতি পালনে আন্তরিক নয় এবং সে কারণে ইরান প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ হবে। যাঁরা ইরানের সঙ্গে বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর টানাপোড়েন বহাল রাখতে চান, তাঁরা চাইছিলেন যে ইরান ব্যর্থ হোক। অন্যপক্ষে যাঁরা পশ্চিমা দেশগুলোর আন্তরিকতা বিষয়ে সন্দিহান থাকেন এবং এ ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি, তাঁরা বলছিলেন যে পশ্চিমারা একটা অজুহাত খাড়া করে ইরানের ওপরে চড়াও হবে। এখন পর্যন্ত দুই পক্ষের এই লোকদের আশঙ্কা সত্য হয়নি। ইরান তার আন্তরিকতা প্রমাণ করেছে এবং পশ্চিমারা কথা ভঙ্গ করেনি। সেটা সম্ভব হয়েছে; কেননা, দুই পক্ষই জানে যে এই চুক্তি বাস্তবায়ন উভয়ের জন্যই লাভজনক। ইরানের সঙ্গে এই চুক্তির বিরোধীদের মধ্যে শক্তিশালী আঞ্চলিক দেশও ছিল এবং আছে। ইসরায়েল ও সৌদি আরব সুস্পষ্টভাবেই বলে এসেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের, বিশেষত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অত্যুৎসাহের কারণে চুক্তি হয়েছে এবং তা মোটেই ভালো হয়নি। এই অঞ্চলের আরও অনেক দেশ এই মতের সমর্থক। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রিপাবলিকান পার্টি এবং দল-নির্বিশেষে দক্ষিণপন্থীরা এর বিরুদ্ধে। এত কিছু সত্ত্বেও এতটা পথ যে অগ্রসর হওয়া গেছে, সেটা নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। এক অর্থে এটি কেবল ইরানের জন্যই একটা ঐতিহাসিক দিন তা নয়, এই চুক্তি ও অগ্রগতি প্রমাণ করে যে সংঘাত, সহিংসতা ও যুদ্ধের বাইরে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে মতপার্থক্য দূর করা সম্ভব, উভয় পক্ষের আন্তরিকতা থাকলে আলোচনার মাধ্যমে পথ বের করা যায়।
ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনকাঠামোর গণতন্ত্রহীনতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাববলয় বিস্তারের জন্য গৃহীত অনুসৃত নীতি ও কৌশল বিষয়ে জোর আপত্তি সত্ত্বেও এটা স্বীকার করতে হবে যে ইরানের রাজনীতিবিদেরা এই চুক্তিতে উপনীত হওয়ার ক্ষেত্রে এবং এ পর্যন্ত তা বাস্তবায়নের পথে প্রাজ্ঞতা দেখিয়েছেন। গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতিতে সংকট, প্রবৃদ্ধি হ্রাস, বেকারত্ব বৃদ্ধি, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া—এসব তাঁদের বিবেচনায় ছিল, সেটা আমরা বুঝতে পারি, কিন্তু সেগুলোর বাইরেও আঞ্চলিক রাজনীতিতে তাঁদের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির চেষ্টা যে কাজ করেছে, সেটা দুর্নিরীক্ষ্য নয়। ইরান ইতিমধ্যে তার আশপাশে একাধিক সংঘাতে জড়িয়ে আছে; সেই সময় নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকা, তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া বহন করা ইরানের জন্য ক্রমেই অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ইরানের নেতারা সেই দিকটি বিস্মৃত হননি।
অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো যে কেবল অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দেশের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র যাওয়ার পথ বন্ধ করার জন্যই এই চুক্তির বাস্তবায়নে আন্তরিক থেকেছে, তা নয়। আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানের শক্তি ও প্রভাব অস্বীকারের উপায় নেই। তার হাতে পারমাণবিক অস্ত্রের সম্ভাবনা যে পশ্চিমাদের মিত্র দেশ ইসরায়েল ও সৌদি আরবের স্বার্থের অনুকূলে নয়, সেটাও ইরানকে নিরস্ত্র করার একটা অন্যতম কারণ বলে আমরা ধরে নিতে পারি। অর্থনৈতিক বিবেচনা, বিশেষত বিশ্ব অর্থনীতিতে আরও বেশি গতিশীলতা আনার জন্য ইরানে বিনিয়োগ ও ইরানের ভোক্তাদের কাছে পণ্য পৌঁছানো—দুই-ই দরকার। ইউরোপের অর্থনীতিকে চাঙা করে তুলতে দরকার স্বল্পমূল্যে তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা। বিশ্ববাজারে স্বল্পমূল্যে তেল সরবরাহের তাগিদের একটা রাজনৈতিক দিকও আছে। এতে করে রাশিয়ার রপ্তানি করা তেলের দামও কমবে এবং তা রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। কিন্তু স্বল্পমূল্যে তেল সরবরাহ তেল কোম্পানিগুলোর জন্য কতটুকু গ্রহণযোগ্য, সেটা আমরা আগামী কয়েক মাসে দেখতে পাব। এসব বিবেচনার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক অবস্থা, বিশেষত আঞ্চলিক সংঘাতগুলোর ফলে যে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, সেটা নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় যে ছিল এবং আছে, তা–ও অনুমেয়।
গত বছর পরমাণু শক্তি বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের উন্নতি ঘটছে। এখন আন্তর্জাতিক পারমাণবিক সংস্থার পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পারস্পরিক আস্থা বাড়বে বলে অনুমান করা যায়। এতে করে এ দুই দেশের পক্ষে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজের সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে এই ঘনিষ্ঠতার সম্ভাবনা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক মিত্রদের দূরত্ব, এমনকি টানাপোড়েন তৈরি করবে বলে আশঙ্কা করা যায়।
গত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক শক্তি ভারসাম্যের ক্ষেত্রে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। সেই পরিবর্তন কোনো সুস্পষ্ট রূপ নিয়েছে—এমন বলা যাবে না; পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চলমান বলাই যথাযথ। আঞ্চলিক যুদ্ধগুলো সেই পরিবর্তনেরই প্রমাণ, আইএসের উত্থানও এই প্রক্রিয়ার সঙ্গেই যুক্ত। এর সঙ্গে এই নতুন বাস্তবতা যুক্ত হলো। তার প্রতিক্রিয়া আমাদের সবার মনোযোগ দাবি করে; কেননা, এর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া কোনোটাই কেবল ওই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

বহুত্ববাদী ভারত হিন্দুত্ববাদী না হোক by কুলদীপ নায়ার

আমি খুব উৎসাহী সিনেমা দর্শক নই। কিন্তু আমির খানের মতো অভিনেতাদের সিনেমা দেখি, কারণ তিনি স্বাভাবিক অভিনয় করেন। তাঁর মতো অভিনেতার সিনেমা দেখলে মনে হয় না যে সিনেমা দেখছি, মনে হয় নিজের জীবনই দেখছি। আমি অবশ্যই বলব যে তারকুন্দে বার্ষিক বক্তৃতায় তিনি যে বললেন, তাঁর স্ত্রী প্রায়ই তাঁকে বলেন, তাঁদের দেশ ছেড়ে যাওয়া উচিত কি না, এ কথা কিন্তু আমার পছন্দ হয়নি। তবে পরবর্তী সময়ে তিনি এর জন্য ক্ষমা চেয়েছেন, আর কুৎসিত বিতর্কের অবসান ঘটিয়েছেন।
কিন্তু নরেন্দ্র মোদির সরকার আবারও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পর্যটন প্রচারণার কর্মসূচি ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়ার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন আমির খান, কিন্তু নরেন্দ্র মোদির সরকার তাঁর সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করেনি। বিজেপি আসলে কী বার্তা দিতে চাইছে, সেটা আমার বোধগম্য নয়। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে ওই মন্তব্য করার জন্য ক্ষমতাসীন দল তাঁকে শাস্তি দিচ্ছে।
ওই অনুষ্ঠানে আমি উপস্থিত ছিলাম, কারণ সেখানে আমাকে সমগ্র কর্মজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। আমির খানের মন্তব্য একটু খাপছাড়া মনে হলেও তা আক্রমণাত্মক ছিল না। সম্প্রতি ভারত থেকে সহিষ্ণুতা উঠে গেছে বলে তিনি যে ফরিয়াদ করেছেন, তা তো মিথ্যা নয়। কিন্তু তাঁর কথায় এমন কিছু ছিল না, যাতে কেউ আহত হতে পারেন।
দৃশ্যত বোঝা যাচ্ছে, মোদি সরকার তাঁর মন্তব্য ভুলে যায়নি বা তাঁকে ক্ষমা করেনি, আর সে কারণেই তাঁর চুক্তি নবায়ন করা হয়নি। এতে অনেকেরই ভ্রু কুঁচকে গিয়েছিল, আর উদার মানুষেরা সরকারকে প্রশ্নও করেছিল, কারণ তারা এটাকে ইস্যু বানাতে চায়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও এতে সন্দেহ নেই যে মোদি সরকার আমির খানকে শাস্তি দিয়েছে।
এতে মোদি সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তারা সংখ্যালঘুদের শান্ত করতে বলেছিল, সব কা সাথ, সব কা ভিকাস অর্থাৎ সবার সঙ্গে সবার বিকাশ। কিন্তু দৃশ্যত চরমপন্থী আরএসএস মোদি সরকার পরিচালনা করে। এমনকি প্রসার ভারতীর মতো একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানকেও আরএসএস– প্রধান মোহন ভাগওয়াতের বক্তৃতা প্রচার করতে হয়েছে। স্বাধীনতার পর এমন ঘটনা এই প্রথম ঘটল।
মোদি সরকার এটা বুঝতে পারে না যে এটা আইনিভাবে ঠিক হলেও নৈতিকভাবে ভুল। ভারতের সংখ্যালঘুরা সন্দেহ করে, বিজেপি সরকার হিন্দুত্ববাদী, তারা ভীতসন্ত্রস্ত, তারা দেশে নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বলে মনে করে, সংবিধান অনুসারে যে দেশের আইনে সবাই সমান।
বিজেপি সরকার যে নিয়োগ দিচ্ছে তাতে সংকীর্ণতাবাদের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তো আরএসএসপন্থী কয়েকজন একাডেমিককে বিশ্ববিদ্যালয়টির শীর্ষ স্থানে বসা থেকে বিরত রাখতে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়া মোদি সরকার যে বার্তা দিচ্ছে তা হলো বিদ্যায়তনও এইচআরডি মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে না।
পুনের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া (এফটিআইআই) এক বছর ধরে ঠিকঠাক কাজ করছে না, কারণ আরএসএস প্রচারক গজেন্দ্র চৌহানকে এই সংস্থাটির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চৌহান স্রেফ একজন অভিনেতা, আরও অনেক যোগ্য অভিনেতাকে ডিঙিয়ে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ চলচ্চিত্র অভিনেতা চৌহানের নিয়োগের বিরুদ্ধে কথা বললেও মোদি সরকার তাতে কান দেয়নি।
আরেকটি চোখে পড়ার মতো দৃষ্টান্ত হচ্ছে পঙ্কজ নিহালিনি, যাকে সেন্সর বোর্ডের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি একজন ভালো চলচ্চিত্র নির্মাতা, তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু তাঁর সঙ্গে আরএসএসের সখ্যের কথাও সবার জানা। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পরই ওখানে গেরুয়াকরণের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু সরকার শেষমেশ চাপের কাছে নতি স্বীকার করে, তাঁর জায়গায় নিখুঁত মানুষ শ্যাম বেনেগালকে বসানো হয়। তবে পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ক্ষেত্রে সরকার নিজের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে।
আমি মনে করি, সরকারের ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া প্রচারণার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর থাকাকালে আমিরের ওই কথা বলা ঠিক হয়নি। অবস্থান নেওয়ার আগে তাঁর পদত্যাগ করা উচিত ছিল। বস্তুত, তিনি যখন প্রথম দফাতেই ওই প্রস্তাব মেনে নেন, তখন আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। তিনি জানেন, মোদি সরকারের অবস্থান কী, আর আরএসএসই বা কীভাবে সরকার পরিচালনা করছে।
কিন্তু সবচেয়ে গুরুতর ব্যাপার হচ্ছে অমিতাভ বচ্চনের ওই পদে আসীন হওয়া। এটা সবাই জানে যে তিনি সব সময় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকেন, তা যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন। তিনি কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এলাহাবাদ আসন থেকে লোকসভা নির্বাচন করেছিলেন। তারপর থেকে তিনি আর অবস্থান নেননি, সব সরকারের সঙ্গেই তিনি মানিয়ে চলেছেন, কংগ্রেস বা বিজেপি—যে সরকারই হোক না কেন। তিনি শুধু জানেন, রুটির কোন পাশটাতে মাখন লাগানো আছে।
ঘটনাচক্রে মোদি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন অমিতাভ গুজরাটের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন। আমির খানকে জোরপূর্বক বিদায় দেওয়ার কারণে তিনি যদি পদত্যাগ করতেন, তাহলে বোঝা যেত, তিনি নীতিগত অবস্থান নিয়েছেন, যার সঙ্গে আপস চলে না। কিন্তু তাঁর মধ্যে আমি যা খুঁজছি, সেটা নেই।
তাঁর স্ত্রী জয়া বচ্চনের কথাই ধরুন, সমাজবাদী পার্টির মুলায়ম সিং তাঁকে দুবার রাজ্যসভার জন্য মনোনীত করেছিলেন। বস্তুত, পার্টি চেয়েছিল তিনি ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুন, কিন্তু তিনি রাজি না হওয়া সত্ত্বেও মুলায়ম দ্বিতীয়বারের মতো তাঁকে রাজ্যসভার জন্য মনোনীত করেন। এসব থেকেই বোঝা যায়, অমিতাভ যেকোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতিরই সুযোগ নিতে পারেন। বিজেপির সংকীর্ণতার ওপর আমির খানের সাহসী মন্তব্য বা তাঁকে যতই দৃষ্টিকটুভাবে সরিয়ে দেওয়া হোক না কেন, অমিতাভের তাতে কিছু আসে যায় না।
এখানে জাতির জন্য শিক্ষণীয় কিছু বিষয় আছে। একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে সবার জন্যই জায়গা করে দিতে হবে, এমনকি সমালোচকের জন্যও। ভারত পাকিস্তানের মতো নয়। ভারত একটি বহুত্ববাদী রাষ্ট্র, যেখানে মতামতের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে, আর সংখ্যালঘুদের আত্মপ্রকাশের সব অধিকারই আছে। কিন্তু করুণার বিষয় হচ্ছে, আসাদউদ্দিন ওয়াইসির মতো মানুষেরা সেই অধিকারের অপব্যবহার করে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যকার পার্থক্য আরও তীব্র করে তুলছেন।
বল এখন বিজেপির কোর্টে। দলটিকে সহিষ্ণুতার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আমার মতো একজন মানুষও মনে করছে, ভারত বহুত্ববাদের পরিচয় হারিয়ে হিন্দুত্ববাদী হয়ে উঠছে। এটা ভারতীয় মূল্যবোধ নয়। দেশটির সংবিধানও এই সুযোগ দেয় না। ভারতের স্বাধীনতার সংগ্রাম স্রেফ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ছিল না, ১৫০ বছরের শাসনে গড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেও এই লড়াই পরিচালিত হয়েছে। আমাদের এমন এক দেশ গড়তে হবে, যেখানে আমির খানের মতো মানুষদের ওরকম মন্তব্য করতে হবে না, যে কথায় সংখ্যালঘুদের বেদনা খুব পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক

শার্লি এবদোর সমালোচনায় জর্ডানি রানির পাল্টা কার্টুন

রানি রানিয়া
সিরীয় শিশু আয়লান কুর্দির ছবি ব্যবহার করে ফ্রান্সের বিতর্কিত সাময়িকী শার্লি এবদোর ছাপা সমালোচিত কার্টুনের পাল্টা জবাব দিলেন জর্ডানের রানি রানিয়া। শার্লি এবদোয় প্রকাশিত ‘অভিবাসী’ শিরোনামের ওই কার্টুনে দেখা যায়, লম্পট দুই ব্যক্তি এক নারীর পেছনে দৌড়াচ্ছে। কার্টুনের এক পাশে বৃত্তের ভেতরে আঁকা রয়েছে সৈকতে পড়ে থাকা শিশু আয়লান কুর্দির লাশ। খবর বিবিসি ও গার্ডিয়ানের। শার্লি এবদো গত সপ্তাহে তাদের সর্বশেষ সংখ্যায় এ বছর ইংরেজি নববর্ষ উদ্যাপনের সময় জার্মানির কোলন শহরে যৌন হয়রানির ঘটনা নিয়ে ওই কার্টুন ছাপে। কার্টুনে ইঙ্গিত করা হয়েছে, বড় হয়ে আয়লানও কোলন শহরের ঘটনায় জড়িত সন্দেহভাজন অভিবাসীদের মতোই যৌন নিপীড়ক হতো। এমন প্রেক্ষাপটে জর্ডানের রানি রানিয়া গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আয়লানের একটি ইতিবাচক কার্টুন পোস্ট করেন। জর্ডানি কার্টুনিস্ট ওসামা হাজ্জাজের আঁকা এ কার্টুনে আয়লানকে একজন চিকিৎসক হিসেবে দেখানো হয়েছে। ছবিটির নিচে রানি লিখেছেন, আয়লান একজন চিকিৎসক হতে পারত; হতে পারত একজন শিক্ষক বা একজন স্নেহময়ী পিতা।
বিতর্কিত ওই কার্টুনের মাধ্যমে শার্লি এবদো বর্ণবাদী আচরণ করেছে বলে ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে বিশেষ করে অনলাইনে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এ জন্য ফরাসি পত্রিকাটিকে বিদ্রূপ করেও কার্টুন প্রকাশিত হয়েছে। কানাডায় থাকা আয়লানের স্বজনেরা বলেছেন, তাঁরা শার্লি এবদোর এই কাজে বিরক্ত। শার্লি এবদো এর আগেও কয়েকবার আয়লানকে নিয়ে কার্টুন ছেপেছে। এর মধ্যে একটিতে দেখা যায়, শিশু আয়লানের মৃতদেহ এমন একটি সৈকতে ভেসে উঠেছে, যার পাশেই রয়েছে জনপ্রিয় ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁ ম্যাকডোনাল্ড’স এর বিজ্ঞাপনচিত্র। ক্যাপশনে লেখা: ‘খুব কাছাকাছি’। গত বছর জঙ্গিরা প্যারিসে শার্লি এবদো কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে কার্টুনিস্টসহ ১১ জনকে হত্যা করে। সে ঘটনার পর পাশ্চাত্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পত্রিকাটির প্রতি জনমনে সহানুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল। শার্লি এবদো বিভিন্ন সময়ে মহানবী (সা.) ও ইসলামধর্মকে ব্যঙ্গ করার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই হামলা চালানো হয়েছিল বলে মনে করা হয়।

একটু ঘুমাতে চাই

১৯৯৫ সালে তানিয়োশি ইয়োশিমির (ডানে) সাক্ষাৎকার
নিয়েছিলেন আশীষ রায়। ছবি: বোসফাইলস ডট ইনফো
‘আমি একটু ঘুমাতে চাই’—তাইপেই শহরে তৎকালীন জাপানি সামরিক হাসপাতালে শুয়ে বিড়বিড় করে বলছিলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু। বলেই চিরনিদ্রায় চোখ বুজেছিলেন। ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট রাত ১১টার দিকের ঘটনা এটি। তৎকালীন জাপানি সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ড. তানিয়োশি ইয়োশিমির একটি সাক্ষাৎকারের বরাত দিয়ে লন্ডনভিত্তিক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আশীষ রায় এমনটাই দাবি করেছেন। তানিয়োশি ইয়োশিমির দাবি, বিমান দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের অন্যতম নায়ক সুভাষ বসুকে তাঁর অধীনেই চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। খবর হিন্দুস্তান টাইমসের। আশীষ রায় গত শনিবার একটি ওয়েবসাইটে নেতাজির বিষয়ে বেশ কিছু নতুন তথ্য-প্রমাণ প্রকাশ করেছেন। আশীষ এতে বলেছেন, তিনি ১৯৯৫ সালে তানিয়োশি ইয়োশিমির একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেখানে ইয়োশিমি বলেছিলেন, ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট বিমান দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ও দগ্ধ কয়েকজনকে হাসপাতালে আনা হয়। তিনি বলেন, ‘নোনোমিয়ো নামের একজন লেফটেন্যান্ট আমাকে বলেন, “ইনি মি. চন্দ্র বোস, খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।” নোনোমিয়ো আমাকে বলেন, আমি যেন যেকোনো মূল্যে তাঁর জীবন বাঁচাই।’ ইয়োশিমি বলেন, একসময় সুভাষ বসুর অবস্থা চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে যাচ্ছে বুঝে তিনি তাঁকে বললেন, ‘আমি আপনার জন্য কী করতে পারি?’ এ সময় নেতাজি বিড়বিড় করে বলেন, ‘মনে হচ্ছে মাথার মধ্যে সব রক্ত ছুটে যাচ্ছে। আমি একটু ঘুমাতে চাই।’
ইয়োশিমি বলেন, তখন তিনি নেতাজির দেহে একটি ইনজেকশন দেন। এর পরপরই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া সাক্ষ্যে ইয়োশিমি বলেছিলেন, নেতাজির প্রায় পুরো শরীরই দগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। চেহারা বিকৃত হওয়ায় তাঁর চেহারা বোঝা যাচ্ছিল না। নেতাজি ইংরেজিতে কথা বলছিলেন বলে নাকামুরা নামের একজন দোভাষীকে ডেকে আনা হয়। ইয়োশিমি জানান, তাঁকে নাকামুরা বলেছিলেন, সুভাষ বসুর দোভাষী হিসেবে আগেও বহুবার তাঁর কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। ফলে দুর্ঘটনায় বিকৃত চেহারার ব্যক্তিটি যে সুভাষ বসুই, তা বুঝতে তাঁর অসুবিধা হয়নি। সুভাষ বসু ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট জাপান যাওয়ার পথে বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান বলে বিভিন্ন পক্ষের জোরালো দাবি রয়েছে। তবে অনেকেই এই দাবির বিষয়ে সংশয় পোষণ করেন। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত অক্ষশক্তির অংশ জাপানের সঙ্গেই হাত মিলিয়েছিলেন সুভাষ বসু। ২৩ জানুয়ারি নেতাজির ১১৯তম জন্মদিন। সেদিন থেকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এ-সংক্রান্ত গোপন নথি প্রকাশ করা শুরু করবে। নেতাজির ‘অন্তর্ধান রহস্য’ কাটাতে তা সাহায্য করতে পারে। ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাদের কাছে থাকা কিছু ফাইল প্রকাশ করেছে।

শিক্ষক আন্দোলন ও পদ মানক্রম বিতর্ক by মিজানুর রহমান খান

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংগত প্রশ্ন তুলেছেন যে এত বেতন বাড়ানোর পরও কেন এই আন্দোলন? এককথায় এর উত্তর হলো রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রমে অধ্যাপকদের মর্যাদার বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে ফয়সালা করলে তা সংকট উতরাতে সহজ হতে পারে। আওয়ামী লীগের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে সুপরিচিত একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীকে এ কথাটি বলতেই তিনি তাৎক্ষণিক এর সঙ্গে একমত হলেন। বললেন, ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স শোধরানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে মর্যাদার প্রশ্নটিই বড়। সেখানেই ঘাটতি চলছে। যুগ্ম সচিবদের সঙ্গে অধ্যাপকদের এক কাতারে রাখা হয়েছে।’ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সের বাংলা তরজমা হলো ‘পদ মানক্রম’। এটি বিদেশি কূটনীতিক কোরের সদস্যরাসহ রাষ্ট্রের নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের পদের আপেক্ষিক মানক্রম। এটি প্রধানত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ ও তাঁদের আসনবিন্যাসের কাজে লাগলেও এটি আসলে মর্যাদা নির্ধারণী একটি সংবেদনশীল বিষয়। এর সঙ্গে জাতীয় বেতনকাঠামোর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।
আমাদের দেশে বর্তমানে সামরিক শাসন আমলের ১৯৮৬ সালে হালনাগাদ করা পদ মানক্রম বহাল আছে। যদিও ১৯৯০ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এটি একাধিকবার সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে এটি হালনাগাদ করার কোনো উদ্যোগ কখনো চোখে পড়েনি।
মোগল আমলে বাংলায় মানক্রম নির্ধারিত হতো বংশগত ও জাতিগত অবস্থান বিবেচনায়। বাংলাপিডিয়া বলেছে, ‘স্থানীয় অধিবাসীদের জন্য মর্যাদার অগ্রাধিকার ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত মহারাজা, রাজা, নওয়াব, স্যার, সুলতান, রায় বাহাদুর, খান বাহাদুর ইত্যাদি উপাধির গুরুত্বের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতো। স্থানীয়দের মধ্যে জমিদার নন এমন উপাধিপ্রাপ্তরা ছিলেন পদসোপানের সর্বনিম্ন স্তরে।’ এরপর আমরা যখন গণতন্ত্র পেলাম, তখন গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে এটি প্রতিস্থাপন না করে ঔপনিবেশিক ও পাকিস্তানি ধ্যানধারণা মনে–প্রাণে আঁকড়ে ধরে এটি নকল করেছি। ব্রিটিশ শাসনের গোড়ায় বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা নির্বাহী বিভাগের তুলনায় উচ্চতর মর্যাদা লাভ করতেন। ১৮৬১ সালে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের ঊর্ধ্বে অবস্থান লাভ করে এবং ফলে এই অনুক্রম বদলে যায়। সেই ধারা আজও চলছে। উদাহরণ দিই, প্রশাসন ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদ সচিব পদক্রমের ১৬তম স্তরে। আর বিচার ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদ জেলা ও দায়রা জজকে অনুক্রমের ২৪–এ উপসচিব মর্যাদাসম্পন্ন ডিসিদের সঙ্গে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ বিচারকেরাও মর্যাদায় উপসচিব হয়েই আছেন।
আমরা আমলাদের প্রতি যথারীতি শ্রদ্ধাশীল। নাগরিকের জীবনে দৈনন্দিন প্রত্যক্ষ শাসনের কলকাঠি তাঁদের হাতেই। শিক্ষা যেভাবে জাতির মেরুদণ্ড, সেভাবে একটি দক্ষ আমলাতন্ত্র জাতীয় প্রশাসনের মেরুদণ্ড। বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর প্রতিটিরই পদ মানক্রম রয়েছে। তার সঙ্গে মিল রেখে এটা নির্ধারণ করতে হবে। সে কাজ করতে আমাদের সরকারকে একটি নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারে পরিণত হতে হবে। তার এমন আচরণ করা উচিত নয়, যা বৈষম্যমূলক বা বিমাতাসুলভ। আর কোনো যুক্তিনিষ্ঠ আমলাতন্ত্র মানতে পারে না যে অন্যায্যভাবে হলেও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিচারক ও অধ্যাপকদের ওপরে তাদের ঠাঁই পেতেই হবে। এখন তেমনটাই প্রতীয়মান হচ্ছে।
এই রাষ্ট্র যদি নিজেকে গণতান্ত্রিক দাবি করে, তাহলে তাকে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু পদ মানক্রম নিশ্চিত করতে হবে। যেহেতু বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর পদ মানক্রম এখন অনলাইনে সহজলভ্য, সুতরাং সেগুলো পর্যালোচনা করে আমরা সহজেই একটি গ্রহণযোগ্য পদ মানক্রম প্রস্তুত করতে পারি। পাকিস্তান সরকার ১৯৫০ সালে এক অস্থায়ী আদেশবলে প্রথম একটি পদ মানক্রম প্রস্তুত করেছিল। এই বিশেষ আদেশটি পাকিস্তান সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ থেকে জারি করা হয়েছিল। এ আদেশে সামরিক ও বেসামরিক আমলারা সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করেন। এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের পদ মানক্রমকে মুক্ত করতে হবে।
বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে প্রধান বিচারপতি ছিলেন ৩ নম্বর স্তরে, স্পিকারের ওপরে। ১৯৮৬ সালে সামরিক শাসনে প্রধান বিচারপতিকে স্পিকারের নিচে ৪ নম্বরে নামানো হলো। ভারতে কিন্তু স্পিকারের ওপরেই প্রধান বিচারপতিকে রাখা হয়েছে। ভারতে উপাচার্য ও জাতীয় অধ্যাপক সচিব ও মেজর জেনারেলের ওপরে, বাংলাদেশে নিচে। সপ্তম গ্রেডে যখন সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত অধ্যাপকদের প্রথম গ্রেডে বেতন দেওয়া হলো, তখনো কিন্তু তাঁদের সচিবদের সমমর্যাদায় আনার দরকার মনে করেনি আমলাতন্ত্র। আর এখন সপ্তম গ্রেডের মতো সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত অধ্যাপকদের প্রথম গ্রেডে বেতন প্রদান অব্যাহত রাখতে আকস্মিক অস্বীকৃতি কেন, তা রহস্যজনক। বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার নেতৃত্বাধীন পে–কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অর্থমন্ত্রীসহ আট মন্ত্রীকে নিয়ে ১২ জানুয়ারি নতুন কমিটি হয়েছে। এতে আশা ও শঙ্কা দুটোই আছে। কারণ, পদ মানক্রম নির্ধারণের সঙ্গে বিচারকদের বেতন–ভাতার আরও বেশি স্পর্শকাতরতা রয়েছে। আর এখানে একটি অচলাবস্থা বিরাজ করছে।
ভারতে রাজ্য সরকারের সচিব ও কেন্দ্রীয় সরকারের যুগ্ম সচিবের সমান হলেন প্রিন্সিপাল জজ, যুগ্ম সচিবের সমান মর্যাদায় জেলা ও দায়রা জজ। একটি অঙ্গরাজ্যের যুগ্ম সচিবের সমান যদি জেলা জজ হন, তাহলে স্বাধীন রাষ্ট্রের জেলা জজ কেন উপসচিব হিসেবে থাকবেন? এবং যত দূর বুঝতে পারি, এ বিষয়ে সৃষ্ট অসন্তোষ অপনোদন না করেই বিচার বিভাগের জন্য নতুন পে–স্কেলের ঘোষণা আসবে। এবং সেখানে আবারও টাকার অঙ্কে হয়তো অনেক বেতন বাড়বে, কিন্তু অধস্তন আদালতের দেড় হাজার বিচারকের মনে অস্বস্তি থেকে যাবে। সরকার বৈষম্য দূর করতে টাস্কফোর্স গঠনের কথা ভাবছে। কিন্তু এই টাস্কফোর্সের সঙ্গে আরও একটি টাস্কফোর্স গঠন করা দরকার, যারা বিবেচনায় নেবে সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের যুগ্ম সচিব এবং জ্যেষ্ঠ জেলা জজদের উপসচিবের মর্যাদায় রাখা ঠিক নয়। সংখ্যা দিয়েই মানমর্যাদা নির্ধারণ হবে? কেউ বলছেন, এটাও বিবেচ্য যে সচিব ১২২ ও অধ্যাপক ৮২০, সচিব ও অধ্যাপক যথাক্রমে ৫৯ ও ৬৫ বছরে অবসরে যান। যুক্তি হিসেবে এটা সবল? সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা সংখ্যায় কত কম হয়েও তাঁরা মর্যাদায় মন্ত্রী। বহু দেশে বিচারকেরা আমৃত্যু কাজ করেন। সেসব দেশ সচিবদের সঙ্গে এর তুলনা করে না।
আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা যখন মর্যাদার কথা বলছেন, সচিবের সমান মর্যাদা চাইছেন, তখন তাঁদের অধ্যাপনা ছেড়ে সচিব হতে বলা হচ্ছে। তাঁদের অনেকেরই দলাদলিতে যুক্ত হওয়া, দলবাজি করে নিয়োগ ও পদোন্নতি পাওয়া, ভর্তি-বাণিজ্য, অনিয়ন্ত্রিত খণ্ডকালীন চাকরি, দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়া ইত্যাদি সামনে আনা হচ্ছে। কিন্তু মর্যাদার নীতিগত প্রশ্ন ও অভিযোগকে আলাদা করতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের পদ মানক্রম ন্যায্যতার সঙ্গে নির্দিষ্ট হতে হবে। ব্যক্তি ও একশ্রেণির পেশাজীবীর অযথাযথ আচরণকে বিবেচনায় নিয়ে পদ মানক্রমের অসংগতি জিইয়ে রাখা সমীচীন নয়।
প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যদের কখনো চাকরির ক্ষেত্রে অন্তত শ্রেণি হিসেবে পদ মান সোপান বা বেতন–ভাতা বিতর্কে শামিল হতে হয়নি। এটা কী নির্দেশ করে? সিভিল সার্ভিসের অনেক আমলার জন্য আমরা গর্ববোধ করি। কিন্তু শ্রেণি হিসেবে জ্যেষ্ঠ জেলা জজ ও জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের ওপরে তাঁদের শ্রেষ্ঠত্ব মানতে হবে? বিচার বিভাগ যখন জেলা জজকে সচিবের পদমর্যাদা দিল, তখন সংসদে মুহূর্তে জোরালো কণ্ঠে উচ্চারিত হলো—এই সিদ্ধান্ত ‘সম্পূর্ণ অনৈতিক।’ নির্বাহী বিভাগ ও সংসদকে কখনো তো অধ্যাপক ও জেলা জজদের অনৈতিকভাবে পিছিয়ে রাখায় বিব্রত হতে দেখিনি। তাহলে ওই বিশেষ শ্রেণির জন্য এতটা স্পর্শকাতরতা কেন? শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মধ্যে যাঁরা শিক্ষাজীবনের সব স্তরে প্রথম শ্রেণি কিংবা প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছেন, তাঁরাই প্রধানত অধ্যাপনার জীবন বেছে নিয়েছেন। অন্যদিকে প্রশাসন ক্যাডারে যাঁরা গেছেন, তাঁদের সবার ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রের পদ মানক্রম কী বলছে? শিক্ষকেরা সংগত প্রশ্ন তুলেছেন যে সচিবের নিচে জাতীয় অধ্যাপকদের রাখা হবে কেন?
পদ মানক্রমের ১৯ স্তরে সিলেকশন গ্রেডের অধ্যাপকদের রাখা হয়েছে সব থেকে নিচে। এমনকি তাদের দুদকের, কৃষি ও সোনালী ব্যাংকের এমডির ওপরে তোলা যায়নি। সব থেকে পরিহাস হলো, ২২ স্তরের ক্রমিকের সবশেষ ধাপে রাখা হয়েছে মেডিকেল ও প্রকৌশল কলেজের অধ্যক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের নিচে আমরা কেন অধ্যাপকদের রাখব?
এসব যুক্তির আলোকেই বলি, অসন্তুষ্টির কারণ যদিও অনেক, তবে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তার অবসান করুন, তাহলে বেতন-বৈষম্য হ্রাস করতে তা সহায়ক হবে। প্রসঙ্গক্রমে এ কথা না বললেই নয় যে বিচারকেরা বেতন-ভাতার প্রশ্নেই ঐক্যবদ্ধভাবে রিট করেছিলেন। জন্ম নিয়েছিল মাসদার হোসেন মামলার। আজ দলাদলিতে করুণভাবে বিভক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ, যেখানে ৩৭ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, যারা তাঁদের গলদপূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুদ্ধতা নিয়ে তর্ক তুলতে নারাজ, শিক্ষার মানোন্নয়নে কোনো অভিন্ন কর্মসূচি দিতে অপারগ, সেখানে তাঁরা বেতন-ভাতা ও মর্যাদার প্রশ্নে একতাবদ্ধ হয়েছেন। বাঘ-মহিষ এক ঘাটে! বলা বাহুল্য, শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার ও তার মান বাড়াতে তাঁরা আন্দোলনে নামলে জনগণ তাঁদের প্রকৃত মর্যাদার আসনে বসাবে। সর্বস্তরে দায়িত্বশীলদের কাজে ক্ষয় দেখে আমজনতা মনঃকষ্টে আছেন। তাই শিক্ষকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এই আন্দোলন অসম্পূর্ণ এবং স্বতঃস্ফূর্ত জনসাড়া বঞ্চিত হতে বাধ্য।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক ৷
mrkhanbd@gmail.com

গণতন্ত্র, জিয়া ও বিএনপি by সুশীল বড়ুয়া

জাতীয় অধ্যাপক মরহুম আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নানাবিধ সমস্যা নিয়ে কথা বলার জন্য। সে দিনের অভিজ্ঞতা ও মন্তব্য আহমদ ছফার সাথে আলাপচারিতায় তিনি বলেছিলেন, ‘সেভেন্টি টু-তে একবার ইউনিভার্সিটির কাজে তার লগে দেখা করতে গেছিলাম। শেখ সাহেব জীবনে অনেক মানুষের সাথে মিশছেন ত আদব লেহাজ আছিল খুব ভালা। অনেক খাতির করলেন। কথায় কথায় আমি জিগাইলাম, আপনার হাতে ত অখন দেশ চালাইবার ভার, আপনে অপজিশনের কী করবেন। অপজিশন ছাড়া দেশ চালাইবেন কেমনে? জওহরলাল নেহরু ক্ষমতায় বইস্যাই জয়প্রকাশ নারায়ণরে কইলেন, তোমরা অপজিশন পার্টি গইড়া তোল। শেখ সাহেব বললেন, আগামী ইলেকশনে অপজিশন পার্টিগুলা ম্যাক্সিমাম পাঁচটার বেশি সিট পাইব না। আমি একটু আহত হইলাম, কইলাম, আপনে অপজিশনরে একশ সিট ছাইড়া দেবেন না? শেখ সাহেব হাসলেন। আমি চইল্যা আইলাম। ইতিহাস শেখ সাহেবের স্টেটসম্যান অইবার একটা সুযোগ দিছিল। তিনি এইডা কামে লাগাইবার পারলেন না।’
১৯৪৭-১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণ পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য সামরিক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে আসছিলেন, তবুও এ দেশের জনগণ কোনো দিন পাকিস্তানে গণতন্ত্রের স্বাদ পায়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই গণতান্ত্রিক আন্দোলন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। এই সময় বঙ্গবন্ধু ছিলেন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নিবেদিতপ্রাণ এক অগ্রসৈনিক।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দেয়া হয়। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ প্রহসনের নির্বাচনে পরিণত করে।
৭ মার্চের নির্বাচন কী রকম হয়েছিল, তা সে সময়ের রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ন্যাপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ও পঙ্কজ ভট্টাচার্য ৯ মার্চ একটি যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, কমপক্ষে ৭০টি নির্বাচনী আসনে যেখানে ন্যাপ ও অন্যান্য বিরোধী দলের প্রার্থীদের সুনিশ্চিত বিজয়ের সম্ভাবনা ছিল, শাসক দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, অস্ত্রের ঝনঝনানি, ভয়ভীতি, সন্ত্রাস প্রয়োগ, গুণ্ডাবাহিনী ব্যবহার, ভুয়া ভোট, পোলিং বুথ দখল, পোলিং এজেন্ট অপহরণ, বিদেশী সাহায্য সংস্থা, জাতিসঙ্ঘ, সরকারি গাড়ি এবং রেডক্রসের গাড়ির অপব্যবহার প্রভৃতি চরম অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের মাধ্যমে ওই নির্বাচনী কেন্দ্রগুলোকে নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেছে এবং বিরোধী দলের প্রার্থীদের জোরপূর্বক পরাজিত করেছে। চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া চট্টগ্রাম-১৪ আসনে ন্যাপ প্রার্থী মোস্তাক আহমদ চৌধুরীকে সংবাদপত্র, বাংলাদেশ বেতার, বিটিভি, ভয়েস অব আমেরিকা তথা দেশী-বিদেশী পত্রপত্রিকায় বিজয়ী বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের নিকট উদ্বেগজনক খবর এসেছে যে, ন্যাপ প্রার্থী মোস্তাক আহমদ চৌধুরীকে পরাজিত বলে ঘোষণা দেয়ার প্রস্তুতি শাসক দল গ্রহণ করছে।’
শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের আহ্বায়ক খান সাইফুর রহমান জাতীয় প্রেস ক্লাবে ১১ মার্চ এক সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি করেন, ‘মেজর জলিল, ড. আলিম আল-রাজি, (ন্যাপ-ভাসানী), মোস্তাক আহমদ চৌং (ন্যাপ) কাজী হাতেম আলী (শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল) এবং আরো কয়েকটি আসনে নিশ্চিতভাবে বিরোধী দল জয়লাভ করিয়াছে।’
একজন মার্কিন কূটনীতিকের পর্যবেক্ষণ ছিল ‘তেহাত্তরের মার্চ মাসের নির্বাচন হলো শেষ যাত্রার শুরু। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জিতেছিল বিপুলভাবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতারা ভোট নিয়ে ছেলেখেলা করেছে এবং জালিয়াতি থেকে নিজেদের নিবৃত্ত রাখতে পারেনি।’
নিয়তির নির্মম পরিহাস হলো, খন্দকার মোশতাক আহমদ নির্বাচনে করুণভাবে পরাজিত হয়েছিলেন জাসদের প্রার্থী রশিদ ইঞ্জিনিয়ারের কাছে। হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দাউদকান্দি থেকে ব্যালটবাক্স এনে মোশতাককে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করলে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে ছিল দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, গণনির্যাতন। রক্ষীবাহিনী, লালবাহিনী, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ নানা বাহিনীর নির্যাতনে জনগণ অসহায় হয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরকারি দলের তল্পীবাহকে পরিণত হয়। সেই সময়ের জাসদের এক প্রচারপত্র থেকে জানা যায়, ‘গত ২৫ মাসে গুম ও খুন হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার। রক্ষীবাহিনী ও পুলিশের হামলা হয়েছে প্রায় ২৪ হাজার পরিবারে। জেলে রাজবন্দী আছে ১৮ হাজারের ওপর। হুলিয়া আছে প্রায় ২৫ হাজার নেতা ও কর্মীর নামে। বাড়ি পুড়েছে প্রায় আড়াই হাজার। নারী ধর্ষণ সীমাহীন।
প্রগতিশীল নেতা ও কর্মীদের গুম ও খুন করার জন্য এক ঢাকা শহরেই নামানো হয়েছে প্রায় দেড় শ’ স্কোয়াড। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আজ খুনের আড্ডা।
১৯৭৩-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যত ভোট পেয়েছে, তার শতকরা ৫২ ভাগ জাল, আর প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের দারিদ্র্যের সুযোগ লোভ লালসার মাধ্যমে ঠকিয়ে নেয়া। উপনির্বাচন এবং স্কুল-কলেজের নির্বাচনও বস্তুত ব্যালটবাক্স ছিনতাই ও বুলেট ব্যবহারের নির্বাচন। সভা-জমায়েত, মিছিল, ধর্মঘট ইত্যাদি জনগণের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ফরমান জারি করে সেগুলোও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন, যাতে কুকুরের মতো মরতে থাকলেও আর প্রতিবাদ করতে না পারে। যত্রতত্র জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা, হয়রানি চলছে নিরীহ মানুষদের ওপর। এটাই মুজিববাদী গণতন্ত্রের স্বরূপ।’
স্বাধীন দেশ ও জনগণের আকাক্সক্ষা ছিল গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র ও আইনের শাসন তো প্রতিষ্ঠা করেইনি; বরং একদলীয় বাকশালীয় শাসনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। জাতি-রাষ্ট্রের বিকাশের জন্য দরকার বহুদলীয় গণতন্ত্র ও আইনের শাসন। অন্যথায় দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাকামী জনগণের সামনে মুক্তির দূত হিসেবে আবির্ভূত হয়ে ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তেমনিভাবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর আবারো উদয় হন বহুদলীয় গণতন্ত্রের দেবদূত হয়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গণতন্ত্রের পরিবর্তে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেন। অন্য দিকে, জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে জাতি-রাষ্ট্রের (নেশন স্টেট) ভিত রচনা করেন। জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেন, বাংলাদেশকে বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের বিকল্প নেই। জিয়াউর রহমান দেখলেন, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে দরকার শক্তিশালী রাজনৈতিক দল। তাই তিনি উদ্যোগ নিলেন একটি শক্তিশালী উদার গণতান্ত্রিক দল প্রতিষ্ঠার। রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে তার ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কর্মসূচির মূল বিষয় ছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশ নেয়া। জিয়া মনে করেন বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়াও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক জাতিসত্তার অবস্থান রয়েছে। তাদের রাষ্ট্রের মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, তার দলের মূলনীতি হবে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। অনেক বুদ্ধিজীবী মনে করেন, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ সাম্প্রদায়িকতায় দুষ্ট। তাদের যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, ভারতীয় জাতীয়তাবাদও কি তাই? তারা কোনো উত্তর দিতে পারেন না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতীয় জাতীয়তাবাদের দার্শনিক ভিত্তি দেয়ার জন্য এক মহাকাব্যিক উপন্যাস গোরা সৃষ্টি করেন। ‘গোরা’ উপন্যাসকে মার্কসীয় দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করতে গিয়ে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, বোঝা যায় ইংরেজ শাসনের ইতিবাচক দিকগুলোর প্রতিই রবীন্দ্রনাথের বিশেষ আকর্ষণ। রবীন্দ্রনাথ ওজন করছেন না, পাল্লার কোন দিকটা কতটা ভারী তার মাপ নিচ্ছেন না, তবে ওই শাসনের প্রতিক্রিয়ায় ও প্রভাবে নতুন কতগুলো বোধের যে সৃষ্টি হয়েছিল, তাদের বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। সবচেয়ে বড় সৃষ্টি ভারতবর্ষীয় জাতীয়তাবাদ।
বাংলার পুরনো ইতিহাস পর্যালোচনা করে জিয়াউর রহমান দেখতে পান, একসময় বাংলা ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম। তৎকালে বাংলার গ্রামগুলো ছিল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বশাসিত অঞ্চল। খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ শতক পূর্বে বাংলার ইতিহাসে গ্রাম পঞ্চায়েতের উল্লেখ আছে। বাংলাদেশের ব্রান্ড অ্যাম্বাসেডর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের গ্রামসরকার তত্ত্ব জিয়াউর রহমানকে গ্রামসরকার গঠন করতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি তার নতুন দলের কর্মসূচিতে এর প্রাধান্য দেন। গ্রামসরকারের মূল দায়িত্ব খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রাম প্রশাসনের উন্নয়ন, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষণ ও স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তি ও গণশিক্ষা প্রসার। গ্রামসরকার গঠন ছিল দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান ছিল বাংলাদেশের জনগণের জন্য অন্ধকারের মধ্যে আলোর ছটা এবং আওয়ামী লীগের জন্যও আশীর্বাদ। জিয়াউর রহমান মনে করেছিলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে আওয়ামী লীগের মতো পুরনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন।
’৭৪-৭৫ সালে ছিল পুরো দেশ দুর্ভিক্ষপীড়িত। রাজধানী ঢাকায় ছিল কঙ্কালসার মানুষের ভিড়। দেশের অর্থনীতি ছিল শূন্য। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলেন এবং শূন্য অর্থনীতিকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যান। বঙ্গবন্ধুর দক্ষিণহস্ত খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয় এবং মোশতাক রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রিসভার বেশির ভাগ সদস্য মোশতাকের মন্ত্রিসভায়ও যোগ দেন। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) যদি ৭ নভেম্বর (১৯৭৫) সিপাহি জনতার অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসতে পারত, তাহলে সারা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের জন্য মহাবিপদ হিসেবে দেখা দিত। কারণ জাসদের সংগঠন প্রতিটি থানায় পর্যন্ত ছিল। আওয়ামী লীগের দুঃশাসনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দল হলো জাসদ।
জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর গণতন্ত্রের পথে দেশকে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রক্রিয়া শুরু করেন। ১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই রাজনৈতিক দল বিধি জারি করেন। উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠনের মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করেছিলেন। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগও বিলপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বিলুুপ্ত আওয়ামী লীগ জিয়াউর রহমানের সময়ে পুনরুজ্জীবন পেল। ১৯৭৮ সালে ৩ জুন আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট গঠন করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেয় এবং ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৩৯টি আসনে জয় লাভ করে। জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগের প্রতি কত সহনশীল ছিলেন দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে তিনি তা দেখিয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালের ৪ এপ্রিল জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধুর নামে একটি শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে বলা হয় বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে প্রস্তাব করছে যে, ‘বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুতে বাংলাদেশ রাজনীতির জগতে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বকে হারিয়েছে। এই সংসদ তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছে এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের নিকট গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছে।’ পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের দেশে আনার ব্যবস্থা করেন। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের অনুপস্থিতির কারণে ১৫ আগস্টের মতো বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটে।
জিয়াউর রহমান ছিলেন ভিশনারি রাষ্ট্রনায়ক। তিনি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করার আগে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, দলের এমন নাম ঠিক করতে হবে যে, ভাষা হবে এ দেশের মাটি আর মানুষের আত্মার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। গণতন্ত্রের ঐতিহাসিক প্রয়োজনে তিনি ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ সালে নতুন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। এর নাম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, সংক্ষেপে বিএনপি।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

একজন জাতীয়তাবাদী সৈনিক জিয়া by এমাজউদ্দীন আহমদ

সত্যিই জিয়াউর রহমান আমৃত্যু একজন সৈনিক। সৈনিক হিসেবেই তিনি এই জাতির জীবনে সবচেয়ে সঙ্কটাপন্ন সময়ে আবির্ভূত হন। সৈনিক হিসেবেই তিনি সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নেন। সৈনিক হিসেবেই তিনি শাহাদত বরণ করেন। সারা জীবন তিনি সৈনিক হয়ে রইলেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রেই কাটালেন। তার জীবনে রণাঙ্গন বদলেছে। রণকৌশল পাল্টেছে। পাল্টেছে যুদ্ধাস্ত্রও। পাল্টায়নি শুধু তার সৈনিকজীবন। কোনো পরিবর্তন আসেনি বাংলাদেশ রাজনীতির ক্ষেত্রে তার সৈনিকসুলভ বলিষ্ঠ ভূমিকায়।
এক অর্থে প্রত্যেকেই সৈনিক। জীবনটা যেন যুদ্ধক্ষেত্র। যুদ্ধ করেই সবাইকে টিকে থাকতে হয়। যা কিছু গৌরবের তা অর্জন করতে হয়। এ অর্থে জিয়াউর রহমান সৈনিক নন। তিনি সৈনিক দেশকে ভালো বেসে, দেশের জন্য অর্থপূর্ণ কিছু করতে উদগ্র আকাক্সক্ষার জন্য। তিনি সৈনিক একজন সাচ্চা জাতীয়তাবাদী হিসেবে জাতির আশা-আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে নিশ্চিত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করার জন্য রাজনীতিকে তাদের মধ্যে টেনে আনার পক্ষে দুর্লঙ্ঘ বাধা-বিপত্তি অপসারণের জন্য। এদিক থেকে বিচার করলে বলা যায়, উন্নয়নশীল বিশ্বে দেশপ্রেমিক সব রাষ্ট্রনায়কই সৈনিক। জাতীয় অগ্রগতি অর্জনের জন্য প্রতি পদে পদে তাকে লড়তে হয়। লড়তে হয় কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে, তা দেশেরও হয়, হয় বিদেশেরও। সর্বক্ষণ তাকে যুদ্ধকালীন সতর্কতার এক পরিবেশের মধ্যে থাকতে হয়। সব প্রতিবন্ধকতাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে শত্রুর ওপর বিজয় অর্জনের কৌশল সদা তৈরি রাখতে হয়। লক্ষ্য অর্জনে সর্বাধিক স্বল্প ব্যয়ে যেন তা সম্ভব হয় সে সম্পর্কেও তিনি সদাজাগ্রত। এ অর্থেও জিয়াউর রহমান একজন সৈনিক এবং বলতে কোনো দ্বিধা নেই, তিনি ছিলেন এক সফল সৈনিক। শ্রেষ্ঠতম মুক্তিযোদ্ধাদের একজন তিনি। জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের প্রধান সেনাপতি। জনস্বার্থের অতন্দ্র প্রহরী। তার যুদ্ধক্ষেত্র শুধু মুক্তিযুদ্ধের মহান ক্ষেত্রেই সীমিত নয়, তা সম্প্রসারিত ছিল মাঠে-ঘাটে, কৃষকদের দোরগোড়ায়, শ্রমিকের কারখানার প্রান্তে, দেশের তরুণদের আত্মবিশ্বাস জাগ্রত করার লক্ষ্যে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে পল্লী উন্নয়ন ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন চত্বরে।
খ্যাতনামা নাট্যকার হেনরিক ইবসেন তার অত্যন্ত জনপ্রিয় নাটকে (An Enemy of the people) লিখেছেন, ‘একটি রাজনৈতিক সম্প্রদায় একটি জাহাজের মতো। এই জাহাজ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার জন্য প্রত্যেককে তৈরি হওয়া উচিত’ (A community is like a ship; everyone ought to be prepared to take the helm.)। সত্যিই তো, পরিচালনার দায়িত্ব নিতে রাষ্ট্রীয় জাহাজের প্রত্যেক যাত্রীকেই প্রস্তুত থাকতে হয়। প্রত্যেককেই নাবিকের ভূমিকা পালনের জন্য তৈরি হতে হয়। এই তো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মহান শিক্ষা। অংশগ্রহণকারী নাগরিক (তথা পারটিসিপেন্ট সিটিজেন) হিসেবে প্রত্যেককে গড়ে উঠতে হবে। তা না হলে, এ ব্যবস্থা সার্থক হবে না। স্বাধীনতা, স্বাতন্ত্র্য অর্থপূর্ণ হবে না। গণ-অধিকার হারাবে তার মর্মবাণী। মুক্তিযুদ্ধের অনলকুণ্ড থেকে প্রাণ পাওয়া বাংলাদেশে জনগণের জীবনে আসবে না পরিবর্তনের কোনো ছাপ। লাগবে না অগ্রগতির বিন্দুমাত্র ছোপ। কিন্তু এই পরিবর্তন তো আপনা-আপনি আসবে না। অনগ্রসর তৃতীয় বিশ্বে গণ-অধিকারের প্রত্যয় তো এমনিতেই আসেনি। সব ক্ষেত্রে এ জন্য প্রয়োজন হয়েছে একজন যুগদর্শীর। একজন জননেতার। একজন সৈনিকের বাংলাদেশে এই যুগদর্শী হলেন জাতীয়তাবাদী দর্শনের প্রধান সেনাপতি জিয়াউর রহমান। তারই সার্থক নেতৃত্বের পরশমণির স্পর্শ গ্রাম-বাংলার কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে সৃষ্টি করে এই পরিবর্তনের মৃদু তরঙ্গ। নতুনভাবে জনগণকে ভাবিয়ে তোলে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তাদের ভূমিকা সম্পর্কে। তাদের অধিকার এবং দায়িত্ব সম্পর্কে।
এর মূল নিহিত জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির অভ্যন্তরে। গ্রাম-বাংলাকেই তিনি চিহ্নিত করেছিলেন তার মূল কর্মক্ষেত্ররূপে। লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন যুগ যুগ ধরে উপেক্ষিত গ্রামীণ জনসাধারণকে। সূচনা করেছিলেন শেকড়স্পর্শী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের। তিনি সঠিকভাবে অনুধাবন করেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সনাতন জীবনব্যবস্থায় অভ্যস্ত মানুষকে নতুন পৃথিবীতে টেনে আনতে হলে শাসনব্যবস্থায় তাদের সক্রিয় অংশ নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি পল্লী অঞ্চলকে প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্যে রূপান্তরিত করেন। এ দেশের ইতিহাসে তিনিই সর্বপ্রথম গ্রামবাসীর নিজস্ব সরকার- গ্রামসরকার সৃষ্টি করেন যেখানে নিজেদের মতো করে গ্রামপর্যায়ে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের চেষ্টা তারা করতে পারেন। গ্রামপর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সর্বপ্রথম এ দেশের গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী বা ভিডিপি গড়ে তোলার ব্যবস্থা করেন। গ্রামাঞ্চলে যুবশক্তিকে বিভিন্ন অর্থপূর্ণ কাজে লাগানোর জন্য যুব-কো-অপারেটিভ কমপ্লেক্সের ব্যবস্থা করেন। পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে পল্লী এলাকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের ব্যবস্থা করেন।
এভাবেই বাংলাদেশে সর্বপ্রথম গ্রামীণ সেচব্যবস্থা, মৎস্যসম্পদের উন্নয়ন, স্বাস্থ্য এবং বয়স্ক শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন ঘটে। ১৯৭৬-৭৭ সালে গৃহীত পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প-১-এর মাধ্যমে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলায় ৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ের উন্নয়ন কর্মসূচি, ১৯৭৭-৭৯ সালে গৃহীত উন্নয়ন প্রকল্প-২-এর মাধ্যমে বৃহত্তর পাবনার ৭২ কোটি টাকা কর্মসূচি এবং ১৯৭৮-৭৯ সালে নোয়াখালী সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচির সাফল্য এ ক্ষেত্রে নতুন দিগদর্শন। ১৯৭৮ সালে গৃহীত দ্বিবার্ষিক পরিকল্পনায় যেসব লক্ষ্য চিহ্নিত হয় সে দিকে দৃষ্টি দিলে বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল উন্নয়নের হার বাড়ানো, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে পরনির্ভরশীলতা কমানো, সম্পদের সুষম বণ্টন, জনসংখ্যা বাড়ার হার কমিয়ে আনা, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, নিরক্ষরতা দূর করা এবং রফতানি আয় বাড়ানোর মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন।
দেশকে স্বনির্ভর ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক অবকাঠামোর উন্নয়নে কৃষকদের মধ্যে সর্বপ্রথম তিনিই স্বল্পমেয়াদি ঋণদানের ব্যবস্থা চালু করেন। এ ক্ষেত্রে ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কৃষকদের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ১০০ কোটি টাকার বিশেষ ঋণ বিতরণ প্রকল্প উল্লেখযোগ্য।
শুধু প্রকল্প প্রণয়ন এবং আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তার উদ্যোগকে সীমিত না রেখে পল্লী অঞ্চলের মানুষের অবস্থা সরাসরি দেখার জন্য তিনি গ্রাম থেকে গ্রামাঞ্চলে ছুটে গেছেন। কথা বলেছেন কৃষকদের সাথে, জেলে-মুটে মজুরদের সাথে। প্রত্যেকের মনে জাগ্রত করেছেন একধরনের অদম্য স্পৃহা। নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য নতুন উন্মাদনা। এমনি এক ঘটনার বিবরণ দিয়ে এ কে এম শামসুল বারী মিয়া মোহন লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট জিয়া এক সভাশেষে ফেরার সময় হঠাৎ ওই কৃষকের বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়েন। বাড়ির মহিলাকে বলেন, ‘আমাকে বসতে দিন’। মোড়ায় বসে তিনি বলেন, ‘মা আমাকে কি খেতে দেবেন?’ মহিলা তো আর তাকে চেনে না। তাই বলল, ‘কী খাবেন আপনি?’ তিনি বললেন, ‘পেঁপে খাবো।’ মহিলা বলল, ‘পেঁপে তো নেই আমাদের।’ তিনি বলেন, ‘তবে কী আছে? কলা, লেবু ডাব?’ মহিলাটি বলল, ‘তা-ও নেই।’ ‘তবে দুধ আছে তো? তাই দিন’। জিয়া বলেন, ‘একটা ছাগল তো পালতে পারেন। আর লেবুগাছ, কলাগাছ, পেঁপেগাছ লাগানো তো সহজ। এ জন্য বেশি জায়গাও লাগে না। এসব লাগাবেন, আমি আবার আসব মেহমান হয়ে, কেমন?’ এরই মধ্যে বাড়ির মালিক এবং অন্য সব লোক এসে হাজির হলো। লোকটি বলেছিল, ‘বাবা আমি লেবুগাছ, পেঁপেগাছ, কলাগাছ লাগিয়ে, ছাগল কিনে আপনার জন্য অপেক্ষা করব।’ এভাবে জিয়াউর রহমান গ্রাম-বাংলায় সৃষ্টি করেছিলেন জাগরণের নতুন স্পন্দন। খাল কাটা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গ্রাম-বাংলার লাখো মানুষকে তিনি সম্পৃক্ত করেছিলেন সামগ্রিক কার্যকলাপে। নিরক্ষরতা দূরীকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ জনসাধারণের মধ্যে জাগিয়েছিলেন নতুনভাবে ভাগ্য গড়ার প্রত্যাশা। পরিকল্পিত পরিবারব্যবস্থার শুভসূচনা করে বলিষ্ঠ জীবনবোধে সংযোজন করেন নতুন অধ্যায়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অপচয়প্রবণ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজতন্ত্রকে পাল্টে, বেসরকারি উদ্যোগকে প্রাণবন্ত করে, বিশেষ করে শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়িয়ে এবং রফতানি বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে নতুনভাবে ঢেলে সাজিয়ে যে দিকনির্দেশনা দান করেন আজ তা বিকশিত হয়েছে ফুলে-ফলে। কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব হলো? কিভাবে একজন পেশাদার সৈনিক জাতি গঠনের সৈনিকে রূপান্তরিত হলেন?
এমন রূপান্তরের কারণের দিকে না তাকিয়ে শুধু ইতিহাসের পাতায় দৃষ্টি দিলেও এমন দৃষ্টান্ত মেলে অনেক। ‘ইউরোপের অসুস্থ মানুষ।’ (সিক-মেন অব ইউরোপ) রূপে নিন্দিত, নিগৃহীত এবং পদদলিত তুরস্কের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন হয়েছিল কামাল আতাতুর্কের ভগ্নস্তূপ থেকে মিসরের উত্থানের জন্য প্রয়োজন হয়েছিল গামাল নাসেরের। চতুর্থ রিপাবলিকের জন্য প্রয়োজন হয়েছিল ফ্রান্সকে আলোয় টেনে আনার জন্য জেনারেল দ্য গলের। তার প্রয়োজনীয়তার কথা ফরাসি জাতি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করে। লিবিয়াকে আধুনিকতার আলোয় আনার কৃতিত্ব কর্নেল গাদ্দাফির একার। ঘানা যে আজ বিশ্বরাজনীতির ক্ষেত্রে পরিচিত হয়েছে তার মূলে রয়েছে এন ক্রুমার অবদান।
জিয়ার সাথে এসব নেতার আত্মিক সম্পর্ক। সবাই ছিলেন প্রথম শ্রেণীর দেশপ্রেমিক। সবাই ছিলেন এক নম্বরের জাতীয়তাবাদী। সবারই চিন্তাভাবনায় প্রতিফলিত হয়েছে জাতীয় শ্রীবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ স্বপ্ন, জাতীয় সংস্কৃতির অনস্বীকার্য স্বাতন্ত্র্য, জাতীয় রাজনীতির স্বাধীনচেতা বৈশিষ্ট্য। সবাই চেয়েছেন জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে সমগ্র জাতির, বিশেষ করে পল্লীবাসীর, কৃষক-শ্রমিক ও জনসমষ্টির অবহেলিতদের অংশ নেয়া। সবারই চোখে একই আলো- ‘আমার দেশ, আমার জাতি কোনো দিন কারো কাছে মাথা নত করবে না। ভিক্ষার হাত কারো কাছে প্রসারিত করবে না।’ প্রত্যেকেই চেয়েছেন, রাজনীতি ক্ষমতার দ্বন্দ্ব অথবা সংগ্রামে পরিণত না হয়ে হোক জনকল্যাণ অর্জনের সুষ্ঠু মাধ্যম। প্রত্যেকে তাই এখনো বেঁচে রয়েছে জাতীয় চেতনায়, জাতির শ্রেষ্ঠতম সন্তানদের অন্যতম হয়ে। কে তাদের ভুলতে পারে? কার সাধ্য ভোলে জিয়াকে? প্রত্যেকে চেয়েছেন জাতিকে স্বয়ম্ভর করে গড়ে তুলতে যেন নিজেদের স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্যের মর্যাদা ভুলে গিয়ে অন্যের ওপর নির্ভর করতে না হয়। হেনরিক ইবসেনের কথা, এসব জাতীয় সৈনিক বিশ্বাস করতেন যে, ‘যে সংসার ঋণের ওপর নির্ভরশীল সেখানে থাকতে পারে না কোনো স্বাধীনতা, থাকে না কোনো সৌন্দর্য (There can be no freedom or beauty about a home life that depends on borrowing or debt!- A Doll's House, Act-I').
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের জীবন ও কর্ম by সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম

স্বাধীনতার ঘোষণা। শব্দগুলো হুবহু এ রকম নয়; কিন্তু আমি সহজ করে উপস্থাপন করার জন্য এ রকম করে সাজিয়েছি উদ্বৃতি চিহ্নের মধ্যে। ‘আমি মেজর জিয়া; আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। আমি মেজর জিয়া; আমি আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। আমি আপনাদেরকে আশ্বস্ত করতে চাই, দখলদার বাহিনীর হাত থেকে আমাদের দেশকে মুক্ত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ ইতোমধ্যই শুরু হয়ে গেছে। স্বাধীনতাকামী দেশবাসী এবং মানবতাবাদী বিশ্ববাসীর প্রতি আমার আহ্বান, আমাদের এই যুদ্ধে আপনারা আমাদের পাশে দাঁড়ান; এই যুদ্ধে আমাদের সহায়তা করুন; আমাদের সরকার এবং রাষ্ট্রকে আপনারা স্বীকৃতি দিন।’ ২৭ মার্চ ১৯৭১, চট্টগ্রাম মহানগরের উপকণ্ঠের তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের কালুরঘাট সম্প্রচার কেন্দ্র থেকে, তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান এরূপ কথাগুলোই নিজের কণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন। তার আগের দিন, ঘড়ির কাঁটা ২৬ মার্চ ১৯৭১-এর আগমন ঘোষণা করেছিল, তার কয়েক মিনিটের মধ্যেই অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান পিএসসি, ব্যাটালিয়নের সৈনিকদের সামনে একটি শূন্য ড্রামের ওপর দাঁড়িয়ে উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন অনেকটা এ রকম, ‘আমরা বিদ্রোহ করলাম; আমরা মুক্তিযুদ্ধ শুরু করলাম।’ ব্যাটালিয়নের সবাই উচ্চস্বরে সম্মতি দিয়েছিল।
বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম মহান ব্যক্তিত্ব শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মদিনে, সম্মানিত পাঠকের বরাবর আমার বিনীত নিবেদন এই কলাম। ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ায় তার জন্ম। তার বাবা মনসুর রহমান ছিলেন সরকারি দফতরে চাকরিরত একজন রসায়নবিদ। মায়ের নাম ছিল জাহানারা খাতুন (প্রকাশ রানী)। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে জিয়া ছিলেন দ্বিতীয়। তার শৈশবের কিছুকাল বগুড়ার গ্রামে ও কিছুকাল কলকাতা শহরে কাটে। ভারত বিভাজনের পর তিনি প্রথমে পরিবারের সাথে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন অতঃপর তার বাবার সাথে করাচি চলে যান। সেখান থেকে তিনি পরবর্তী ধাপের লেখাপড়া শেষ করেন এবং ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান মিলিটারি অ্যাকাডেমি কাকুল-এ যোগ দেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনে যেমন অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ তারিখের মধ্যে, ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ছয় দফা উপস্থাপনের দিনটি অথবা ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণের দিনটি, অধিকতর স্মরণীয় এবং অধিকতর উজ্জ্বল; তেমনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবনের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ তারিখের মধ্যে ২৬ ও ২৭ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার দিনটি অথবা ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের দিনটি অধিকতর স্মরণীয় এবং অধিকতর উজ্জ্বল। জিয়াউর রহমান যেহেতু সেনাবাহিনীতে ছিলেন, সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই তার সাথে আমার মতো ক্ষুদ্র ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা সেনাবাহিনীর মাধ্যমেই শুরু। ১৯৫৫ সালে পাকিস্তান মিলিটারি অ্যাকাডেমি কাকুল থেকে কমিশন পেয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। তার সাথে আরো বাঙালি তরুণ ছিলেন, যারা একই দিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন পেয়েছিলেন; এদের একজনকে অনেকেই সহজে চিনবেন যথা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম সেনাবাহিনী প্রধান বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ বীর উত্তম। কমিশনের পরদিন থেকে জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে একজন অফিসার হিসেবে চাকরি করেন। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় তিনি প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন এবং বীরত্বের সাথে বর্তমান পাকিস্তানের লাহোরের কাছে ভারতীয় সীমান্তে প্রতিরক্ষা যুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধের পরে ১৯৭১-এর আগে, জিয়াউর রহমান চারটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বর্তমান পাকিস্তানের কোয়েটার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্টাফ কলেজে স্টাফ কোর্স সম্পন্ন করে পিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। দ্বিতীয়ত, তিনি পাকিস্তান মিলিটারি অ্যাকাডেমি কাকুলে একজন প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তৃতীয়ত, সেনাবাহিনীর মনোনীত হয়ে তিনি ছয় মাসের জন্য উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে জার্মানি যান। চতুর্থত, তিনি ঢাকার অদূরে জয়দেবপুরে (গাজীপুর) দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং চট্টগ্রাম মহানগরীর ষোলোশহরে নবপ্রতিষ্ঠিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে উপ-অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৫-এর পরে ১৯৭১-এর আগে সময়টা ছিল উত্তাল। ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দাবিনামা উপস্থাপন করেন। ১৯৬৮-এর শেষাংশ থেকে পুরো ১৯৬৯ ছিল গণ-আন্দোলনের বছর। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর ছিল তৎকালীন পাকিস্তানব্যাপী সাধারণ নির্বাচন; যেই নির্বাচনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ ভূমিধস সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। নির্বাচনের ফলাফলের তাৎপর্য ছিল এই যে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ছয় দফার ভিত্তিতে স্বাধিকার চান তথা পাকিস্তানের সংবিধানকে সংশোধন করে নতুন শাসনতান্ত্রিক কাঠামো চান। তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক জান্তা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের রায়কে উপেক্ষা করেন এবং মানতে অস্বীকার করেন। এই ষড়যন্ত্রমূলক আচরণের প্রথম আনুষ্ঠানিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ১ মার্চ ১৯৭১ তারিখে, যেদিন পাকিস্তানের সামরিক জান্তা সরকার আসন্ন জাতীয় সংসদের অধিবেশনকে স্থগিত ঘোষণা করে। এরপর আসে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ।
ওপরের দু’টি অনুচ্ছেদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, তিনি ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে উঠছিলেন। তিনি ক্রমেই জনগণের আকাক্সক্ষাকে নিজের হৃদয়ে স্থান দিয়েছিলেন। নিজে সামরিক কর্মকর্তা হলেও শৃঙ্খলার কঠিন বেড়াজালে আবদ্ধ হলেও তিনি নিজেকে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণের জন্য কী খেদমত করা যায় সে প্রসঙ্গে চিন্তাভাবনা শুরু করার সুযোগ ও পরিবেশ পেয়েছিলেন। আমার চাকরি জীবনে, ১৯৯৩ সালের মে থেকে ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আমি চট্টগ্রাম মহানগরী থেকে ১০ মাইল উত্তরে ভাটিয়ারির বাংলাদেশ মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে কমান্ড্যান্টের দায়িত্ব পালন করেছি। আমার দায়িত্ব মেয়াদের শেষ ছয় মাস আমি ব্যস্ত ছিলাম একটি অতিরিক্ত কাজে। চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অবস্থিত ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদর দফতরের উল্টো দিকে একটি পুরনো একতলা দালানকে সংস্কার করে সেখানে স্থাপন করা হচ্ছিল এক মুক্তিযুদ্ধের জাদুঘর। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পুরো চট্টগ্রাম জেলা ছিল ১ নম্বর সেক্টরের অধীন। সেই ১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে উদ্ভাসিত রাখার জন্য আমরা ওই মুক্তিযুদ্ধ-জাদুঘর স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান মুক্তিযোদ্ধা লে. জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম বীর বিক্রম এবং তৎকালীন চট্টগ্রাম অঞ্চলের এরিয়া কমান্ডার ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আজিজুর রহমান বীর উত্তমের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায়, আমার সার্বিক নেতৃত্বে ও পরিচালনায় ওই জাদুঘরটি স্থাপিত হয়। ওই জাদুঘরের নাম স্মৃতি অম্লান। সেই জাদুঘর স্থাপনের কাজ করতে গিয়ে আমরা অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও মেজর জিয়াউর রহমানের অনেক কিছু জানতে পারি। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শুরু থেকেই মেজর জিয়া সন্ধ্যার পরে রাতের বেলা একটি টয়োটা কারে করে শহরের বিভিন্ন জায়গায় যেতেন। উদ্দেশ্য পাকিস্তানি গোয়েন্দা বাহিনীদের চোখ এড়িয়ে বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জনগণকে নিয়ে কী করা যায়, সে পরিকল্পনা করা। ওই টয়োটা কারের মালিক, ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বর মাসে, চট্টগ্রাম সেনানিবাসের কর্তৃপক্ষের কাছে, মিউজিয়ামে প্রদর্শনের নিমিত্তে, ওই কারটি অফেরতযোগ্য উপহারস্বরূপ দেন। সেনানিবাসের স্বাভাবিক বিধিনিষেধ মানা সাপেক্ষে, যে কেউ ইচ্ছা করলে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে প্রবেশের বায়েজিদ বোস্তামি গেট দিয়ে প্রবেশ করলেই, এক শ’ গজ মাত্র যাওয়ার পর ওই মিউজিয়ামের একতলা ভবনটি দেখতে পাবেন এবং তার সামনে কারটি দণ্ডায়মান দেখতে পাবেন।
১৯৭১-এর ৪ এপ্রিল তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজারের বাসভবনে অনুষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধের প্রথম অপারেশনাল সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সভাপতিত্ব ও নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন তৎকালীন কর্নেল এম এ জি ওসমানী। মেজর জিয়া সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ১৯৭১-এর জুন-জুলাই মাসে যখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজনে প্রথম ব্রিগেড প্রতিষ্ঠা করতে হলো, তখন লে. কর্নেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে জেড ফোর্স গঠন করা হয়। জেড ফোর্স বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত এবং উত্তর-পূর্ব এলাকায় যুদ্ধ করে। ঢাকা পতনের চার দিন আগেই জেড ফোর্স বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাংশ শত্রুমুক্ত করে। আরো অনেকের সাথে তিনি বীর উত্তম খেতাব পান। প্রথম তিন মাস তিনি জেড ফোর্স থেকে রূপান্তরিত হওয়া ৪৪ পদাতিক ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন, কুমিল্লা সেনানিবাসে। কুমিল্লা সেনানিবাসের তৎকালীন নাম ছিল ময়নামতি সেনানিবাস। এখনো সর্ব দক্ষিণের প্রবেশপথ দিয়ে সেনানিবাসে ঢুকতে গেলেই হাতের বাঁয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ দেখা যাবে, যেটি জিয়াউর রহমানের নির্দেশে তিন মাসের মধ্যেই স্থাপিত হয়েছিল। ১৯৭২ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপ-সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত হন। যদিও তিনি জিয়াউর রহমান থেকে কনিষ্ঠ ছিলেন, তথাপি সফিউল্লাহকেই তৎকালীন সরকার সেনাবাহিনী প্রধান নিয়োগ করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে বঙ্গবন্ধু হত্যা ঘটনার পর সমগ্র দেশে ও প্রশাসনে অনেক কিছু ওলট-পালট হয়। প্রায় তিন বছর চার মাস আট দিন চাকরির পর, তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল সফিউল্লাহকে (বীর উত্তম) সরিয়ে তার জায়গায় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে (বীর উত্তম) সেনাবাহিনী প্রধান নিয়োগ করা হয়। একই বছরের ৩ নভেম্বরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালী চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের নেতৃত্বে একটি কু অনুষ্ঠিত হয়। এই কু-এর নেতৃবৃন্দ ৩ নভেম্বর শুরু হওয়া মাত্রই জিয়াউর রহমানকে নিজ বাসভবনে বন্দী করেন। জিয়াউর রহমান কোনো প্রকার অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে চাননি; তিনি সেনাবাহিনী প্রধানের পদ থেকে ইস্তফা দেন; এই শূন্যস্থানে ৫ নভেম্বর তারিখে খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম সেনাবাহিনী প্রধান হয়ে যান। ইতোমধ্যে ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার বিপ্লব সাধিত হয়। স্বাধীনতাকামী, জাতীয়তাবাদী, মুক্তিযুদ্ধমুখী সাধারণ সৈনিকেরা তৎকালীন জাসদের ষড়যন্ত্রকে মোকাবেলা করেই জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেন এবং সেনাবাহিনী প্রধানের পদে তিনি আবার আসীন হন। ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা পুনরুজ্জীবনের দিন। বিশৃঙ্খলা থেকে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর কাঠামো অস্তিত্ব এবং আনুগত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তিন মাস আগে খন্দকার মোশতাকের জারি করা মার্শাল ল শাসন মোতাবেক, মোস্তাক ছিলেন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল সফিউল্লাহ ছিলেন অন্যতম উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। ৭ নভেম্বরের পর নতুন প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম হলেন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং নতুন সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম হলেন অন্যতম উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। কালক্রমে, দেশের প্রশাসন জিয়াউর রহমানের প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। প্রথমে গণভোটের মাধ্যমে, পরে প্রকাশ্য নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি দেশের প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে অতি প্রত্যুষে, চট্টগ্রাম মহানগরীতে সরকারি সার্কিট হাউজে অবস্থানকালে একটি সেনাবিদ্রোহের ফলে জিয়াউর রহমান শহীদ হন। বীর উত্তম জিয়াউর রহমান, রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশে অনেকগুলো দূরদর্শী ও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
এই সংক্ষিপ্ত কলামে অনেক কিছু লেখা যাবে না। তারপরও তারিখের ধারাবাহিতকা বজায় না রেখেই আমি এ রকম কিছু দূরদর্শী ও তাৎপর্যপূর্ণ কাজ বা কিছু সিদ্ধান্ত বা কিছু অর্জনের কথা বর্তমান প্রজন্মের উপকারার্থে তথা এই কলামের সম্মানিত পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করছি।
এক. ১৯৭২-এ প্রতিষ্ঠিত জাতীয় রক্ষীবাহিনী জনগণের মানসপটে একটি ভীতিকর বাহিনী ছিল এবং তৎকালীন সেনাবাহিনীর মানসপটে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী বাহিনী ছিল। সেনাবাহিনী প্রধান হওয়ার পরপরই জিয়াউর রহমানের তৎপরতায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, রক্ষীবাহিনীকে ভেঙে দেয়া হবে না বরং তাদেরকে দেশের সেবার জন্য নতুন সুযোগ দেয়া হবে। রক্ষীবাহিনীকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে একীভূত বা আত্তীকরণ তথা ইন্টিগ্রেট করা হয়। পরিহাসের বিষয় যদিও এই মুহূর্তে (২০০৯ থেকে ২০১৬) জিয়াউর রহমানের একনিষ্ঠ সমালোচনাকারীদের মধ্যে, সাবেক রক্ষীবাহিনীর ও পরে সেনাবাহিনীর কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ অফিসার আছেন।
দুই. ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সাংগঠনিক পর্যায় ছিল ব্যাটালিয়ন, তার ওপরে ব্রিগেড এবং তার ওপরে সেনাবাহিনীর সদর দফতর। জিয়াউর রহমান ১৯৭৬-এর শুরুতেই নবম পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাংগঠনিক স্তরকে এক ধাপ ওপরে নিয়ে যান।
তিন. জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশে স্বাধীনতা অর্জন যেমন সেনাসদস্য ও জনগণের সম্মিলিত প্রয়াস ছিল, তেমনই দুর্যোগকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্বও যৌথভাবে সামরিক বাহিনী ও জনগণকে পালন করতে হবে। অতএব জনগণকে মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তার জন্য তিনি ভিলেজ ডিফেন্স পার্টি বা ভিডিপি নামে একটি সংগঠন সৃষ্টি করেন এবং ১০ বছরের মধ্যে এক কোটি বাংলাদেশীকে ভিডিপিতে প্রশিক্ষণ দেবেন এই লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেন। ভিডিপি প্রশিক্ষণের মৌলিক অংশ ছিল একেবারেই প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণ, অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণ এবং দ্বিতীয় অংশ ছিল জীবিকা নির্বাহের উন্নতির জন্য একটি সেকেন্ডারি পেশা যথা হাঁস-মুরগি পালন যথা ক্ষেত-খামারকরণ ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ।
চার. জিয়াউর রহমান পর্যায়ক্রমে সামরিক আইন শাসনকে শিথিল করেন এবং আড়াই বছরের মাথায় এটি পূর্ণাঙ্গভাবে প্রত্যাহার করেন।
পাঁচ. ১৯৭৫ সালে আনীত বাংলাদেশ সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে যে বহুদলীয় গণতন্ত্র নিষিদ্ধ হয়েছিল, জিয়াউর রহমান পুনরায় সেই বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেন এবং বাকশাল হওয়ার আগে যেসব রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে বিদ্যমান ও সক্রিয় ছিল, সবগুলোকে নতুনভাবে রাজনীতি করার সুযোগ দেন। তিনি নতুন রাজনৈতিক দল চালু করার অনুমতি দেন এবং উদ্যোগও নেন। বহুদলীয়, সংসদ নির্বাচন এবং সর্বজনীন ভোটের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বন্দোবস্ত করেন। সংবাদপত্রের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন।
ছয়. বিদেশ সম্পর্কের অঙ্গনে, জিয়াউর রহমান সার্কের (বা দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতা সংস্থা) স্বপ্নদ্রষ্টা। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স, নন-অ্যালাইন মুভমেন্ট এবং ব্রিটিশ কমনওয়েলথ অব নেশনস- এই তিনটি সংগঠনেই বাংলাদেশের অবস্থানকে সুদৃঢ় করেন। তিনি আল কুদস কমিটির সদস্য ছিলেন।
সাত. শিল্পাঙ্গনে, পূর্বে অনুসৃত জাতীয়করণ নীতি স্থগিত করেন। ব্যক্তি উদ্যোগে শিল্প প্রসারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বর্তমান ঢাকা মহানগরের মতিঝিলে অবস্থিত শিল্পভবন নামক বহুতল দালানটি জিয়াউর রহমানের আমলেই করা।
আট. সরকারি কর্মকাণ্ডের সম্প্রসার ঘটান। তিনি ধর্ম মন্ত্রণালয়, যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করেন। শিশু অ্যাকাডেমি জিয়াউর রহমানেরই উদ্যোগ।
নয়. তিনি পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ড, হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, শিশু হাসপাতল, নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করেন।
দশ. মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার অন্যতম নির্দশনস্বরূপ তিনি রাষ্ট্রীয় সম্মান হিসেবে ‘একুশে পদক’ প্রদান প্রবর্তন করেন।
এগারো. বহুধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি সম্মানের নির্দশনস্বরূপ তিনি চীন থেকে, অতিশ দীপঙ্কর ও শ্রীজ্ঞানের দেহভস্ম বাংলাদেশে আনেন এবং একটি স্মৃতিসৌধ স্থাপন করে রক্ষণাবেক্ষণ করেন।
১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ ঢাকা মহানগরের রামপুরায় অবস্থিত টেলিভিশন ভবনে, তৎকালীন বেতার ও তথ্য বিভাগের পদস্থ অফিসারদের এক সমাবেশে জেনারেল জিয়াউর রহমান বলেছিলেন (দৈনিক বাংলা ১৪ মার্চ ১৯৭৬): ‘আমরা সকলে বাংলাদেশী। আমরা প্রথমে বাংলাদেশী এবং শেষেও বাংলাদেশী। এই মাটি আমাদের, এই মাটি থেকে আমাদের অনুপ্রেরণা আহরণ করতে হবে। জাতিকে শক্তিশালী করাই আমাদের লক্ষ্য। ঐক্য, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, নিষ্ঠা ও কঠোর মেহনতের মাধ্যমেই তা সম্ভব।’ ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনালের সাংবাদিক ‘সুজান গ্রিন’, ঢাকা থেকে পাঠানো এক ডেসপাচে লিখেছিলেন, ‘সাম্যের প্রতীক ও সৎ লোকরূপে ব্যাপকভাবে গণ্য জিয়াউর রহমান, স্বনির্ভর সংস্কার কর্মসূচি শুরু করে বাংলাদেশের ভিক্ষার ঝুলি ভাঙার প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছেন।’ মালয়েশিয়া দৈনিক ‘বিজনেস টাইমস’-এ প্রকাশিত ওই ডেসপাচে বলা হয় : ‘অতীতে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত করেছিল যে মহাপ্লাবী সমস্যাগুলো, রাষ্ট্রপতি জিয়া কার্যত সেগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন (দৈনিক ইত্তেফাক, ৪ নভেম্বর ১৯৭৯)।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরোক্ষ নেতৃত্বে, প্রবাসী সরকারের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে, রণাঙ্গনের লাখো মুক্তিযোদ্ধার জ্যেষ্ঠতম অধিনায়কদের অন্যতম ছিলেন সেক্টর কমান্ডার ও ফোর্স কমান্ডার মেজর, পরবর্তীকালে লে. কর্নেল জিয়াউর রহমান। একান্ত শৃঙ্খলা অনুরাগী দেশপ্রেমিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে তিনি বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলেই উপ-সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে আন্তরিক দায়িত্ব পালন করেন। পরিবেশ এবং জনআকাক্সক্ষা যখন তাকে জাতির চালকের আসনে বসায়, তখনো, বীর উত্তম জিয়াউর রহমান একান্তই আন্তরিক দেশপ্রেমিকতার সাথে দেশের সেবা করেন। তিনি ছিলেন সামরিক জেনারেল, রূপান্তরিত হয়েছিলেন একজন রাজনীতিবিদে এবং সঙ্গতভাবেই উন্নীত হয়েছিলেন একজন রাষ্ট্রনায়কের মর্যাদায়। এতদসত্ত্বেও চিরন্তন ঘোষণা হবে এরূপ : জিয়াউর রহমান একজন মানুষ ছিলেন; মানুষ হিসেবে তারও ভুলভ্রান্তি ছিল; ভুলভ্রান্তি থাকাই স্বাভাবিক; কিন্তু তার অর্জন ছিল অনেক বেশি, অনেক মহৎ ও অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯ জানুয়ারি বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের জন্মদিনে আমরা তার বিদেহী আত্মার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করছি; তার রূহের মাগফিরাত কামনা করছি।
লেখক : মেজর জেনারেল (অব:), চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com

এক মত ও বহু মত by সৈয়দ আবুল মকসুদ

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিটলারের পরাজয়ের পর জার্মানি ছিল আক্ষরিক অর্থেই একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশ। ভৌগোলিকভাবে দুটুকরো হয়ে যায় জার্মানি। সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক শিবিরে থাকে পূর্ব জার্মানি: জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক বা জিডিআর। পশ্চিম জার্মানি—ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি থাকে পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে। কিন্তু দেশটির আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। সেই বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে সেখানে আবির্ভাব ঘটতে পারত একজন শক্তিশালী ডিকটেটরের। কিন্তু জার্মানির নতুন নেতৃত্ব সে পথ গ্রহণ না করে উদার গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করেন। রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়, জার্মানিতে ‘এক মত’ চলবে না। ভালো হোক মন্দ হোক, রাষ্ট্রে ও সমাজে নানা মতের সহ-অবস্থান থাকতে হবে।
বাস্তবিক পক্ষে শুধু রাষ্ট্রে নয়, জার্মান সমাজে, এমনকি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ও পরিবারে পর্যন্ত ‘এক মত’ পরিত্যাজ্য। আমি জার্মান পরিবারে দেখেছি, শিশুকাল থেকেই স্বাধীন চিন্তায় উৎসাহ দেওয়া হয়। যেকোনো প্রশ্নে ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের সমান। জার্মান সংবিধান, যার নাম ‘বেসিক ল’ বা মৌলিক আইন, তাতে বাক্ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার শতভাগ গ্যারান্টি দেওয়া আছে। শিল্পী-সাহিত্যিকদের স্বাধীনতা সীমাহীন। আমি সেকালের পশ্চিম জার্মানির রাজধানী বন নগরীর প্রেসক্লাবে এক কার্টুন প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিলাম। তাতে প্রদর্শিত হয়েছিল একজন খ্যাতিমান কার্টুনশিল্পীর আঁকা ব্যঙ্গচিত্র। বিষয়বস্তু জার্মান রাজনীতিবিদ। জনা চল্লিশ বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতার কার্টুন। তাতে প্রেসিডেন্ট, চ্যান্সেলর থেকে শুরু করে মন্ত্রী ও পার্লামেন্ট মেম্বারদের ব্যঙ্গচিত্র ছিল। প্রত্যেক নেতার মুখটা মানুষের, তার শরীরটি পশুর। কোনো নেতা বিড়াল, কোনো নেতা কুকুর, কোনো নেতা বেজি, কোনো নেতা শুয়োর, কোনো নেতা সাপ, কোনো নেতা ষাঁড় প্রভৃতি। বাংলাদেশে ওই রকম কার্টুনের যদি কোনো শিল্পী প্রদর্শনী করতেন, তাহলে তা নিয়ে হতো নানা রকম মামলা—দেওয়ানি, ফৌজদারি ও রিট। সে মামলাও একটি নয়, বিভিন্ন জেলা শহরে। অনুভূতিতে আঘাতের কারণে মানহানির মামলা তো হতোই। ফৌজদারি মামলা হতো, কারণ ওই প্রদর্শনী ভাঙচুর করতে গিয়ে জনা বিশেক জখম হয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে থাকত চিকিৎসাধীন। হতো বহু প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন। সেখানেও মারামারিতে মাথা ফাটত কয়েকজনের। বিভিন্ন নিকৃষ্ট জানোয়ারের সঙ্গে রাজনীতিকদের তুলনা করায় কোনো আপত্তি উঠেছে কি না—জানতে চাইলে একজন জার্মান কর্মকর্তা বলেছিলেন, আর্ট ইজ ফ্রি। শিল্পী তাঁর শিল্পকর্মে স্বাধীন।
উনিশ শতক থেকে পৃথিবীর প্রায় সব প্রগতিশীল দার্শনিক ও রাজনৈতিক তত্ত্বের উদ্ভব জার্মানিতে। উনিশ শতকেই পৃথিবীর প্রথম শ্রমিক সংগঠন গড়ে ওঠে জার্মানিতে। সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সূচনাও জার্মানিতে। শিল্প-সাহিত্য, তত্ত্বজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার প্রভৃতি ক্ষেত্রেও জার্মানরাই ছিলেন অগ্রগামী। তারপরও কী কারণে জার্মানিতে হিটলারের নেতৃত্বে বর্বর ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে এবং তাঁর এক যুগের শাসনকালে অতীতের সব গৌরব ম্লান হয়ে যায়, তা বোঝার জন্য খুব বেশি বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। তার একমাত্র কারণ ‘এক মত’-এর প্রাধান্য এবং বহু মতের প্রকাশ ও সমন্বয় না থাকা। কোনো রাষ্ট্রেরই ভালোমন্দের সব দায়দায়িত্ব কোনো একটি গোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে দিতে পারে না জনগণ। সেই গোষ্ঠী যদি অপার দেশপ্রেমিক ও অত্যন্ত যোগ্যতাসম্পন্ন হয়, তা হলেও নয়। সেই জন্য হিটলারের পতনের পরপরই নতুন গণতান্ত্রিক জার্মানির যাত্রা শুরুর সময়ই ‘এক মত’-এর প্রাধান্য বর্জিত হয় এবং বহু মতের গুরুত্ব ঘোষিত হয়।
একটি রাষ্ট্র কোনো এক-দরজাবিশিষ্ট প্রায় অন্ধকার আলো-বাতাসহীন ঘর নয়। রাষ্ট্রকে হতে হয় বহু দরজা-জানালাবিশিষ্ট একটি আলোকিত ও উন্মুক্ত ভবন। এক-দরজাবিশিষ্ট রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত কিমের উত্তর কোরিয়া, সৌদি আরব, সিরিয়া প্রভৃতি। একটি মাত্র দরজা থাকাতে আলো-বাতাসহীন জায়গাতেই আইএস প্রভৃতির মতো জিনিসের জন্ম হতে পারে। তাতে শাসকদের যতটুকু ক্ষতি, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ক্ষতি দেশের জনগণের। মূল্যটা শেষ পর্যন্ত জনগণকেই দিতে হয়। কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ মিয়ানমারের শাসকেরা নন, খেসারত দিয়ে আসছে সে দেশের সাধারণ মানুষ। পাকিস্তানি শাসকদের দুর্বুদ্ধির মূল্য দিয়েছে এবং দিচ্ছে পাকিস্তানের জনগণ এবং আরও বহুকাল দেবে।
রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপক বা ম্যানেজার হলো সরকার, কিন্তু রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। রাষ্ট্রের নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে সরকার। সরকারের নিজস্ব নীতিনির্ধারক রয়েছেন। তাঁদের দুর্বলতা ও ভুলভ্রান্তি থাকা সম্ভব। সরকারের বাইরে নাগরিকদের যেসব সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদের মতামতের মূল্য সামান্য নয়। কিছু কিছু প্রশ্নে বরং বেশি। কারণ সরকারের মেয়াদকাল নির্দিষ্ট, জনগণ চিরস্থায়ী; প্রজন্মের পর প্রজন্ম বংশানুক্রমে মানুষ বেঁচে থাকে। কোনো সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনাহীনতার কারণে যদি দেশের একটি অমূল্য বনভূমি ধ্বংস হয়ে যায়, সেই সরকারের তাতে কিছুই আসে-যায় না; কিন্তু সর্বনাশ দেশের জনগণের। এক প্রজন্মের ক্ষতি নয়, অনাগত সব প্রজন্মের। কোনো সরকারের গৃহীত কোনো প্রকল্পে যদি চেরনোবিলের মতো বিস্ফোরণ ঘটায় লাখ লাখ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়, তাতে সেই সরকারের লোকদের কী যায়-আসে। জনগণের ভবিষ্যৎ জনগণই ভালো বোঝে।
পশ্চিমের গণতান্ত্রিক দেশে স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, থিংক ট্যাংক, বেসরকারি সংস্থা, পরিবেশবাদী ও মানবাধিকার সংস্থা, সিভিল সোসাইটির সংগঠনগুলোকে সরকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকে। আর যদি নাও দেয়, অন্তত তাদের কাজের মূল্যায়ন করে। নাগরিক সমাজের মতামতের মূল্য দেয়। আর কিছুই যদি না করে, অন্তত অসম্মান করে না। ভিন্নমতাবলম্বীকে অপমানটা করে না। আমাদের সরকার তাদের নিজেদের সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো মতামতকেই দাম দেয় না; বরং যেকোনো ভিন্নমত বিচার-বিবেচনা না করে তাকে তীব্রভাবে আক্রমণ করে।
সরকারি লোকেরা যেহেতু টাকাপয়সা বোঝেন ভালো, তাই কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে যখন সমালোচনামূলক মতামত আসে—তাঁরা প্রথমেই প্রশ্ন তোলেন, তারা গবেষণা যে করে, টাকা পায় কোথায়? শুধু টাকা কোথায় পায়, তা-ই নয়, বলেই দেন টাকাটা তারা পায় নির্ঘাত সরকারের শত্রুপক্ষ থেকে। এই ধরনের প্রশ্ন তোলা খুব নিম্নমানের গ্রাম্যতা। রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনার কাজটা যেহেতু সরকারের, সুতরাং তার কাজের প্রশংসা-সমালোচনা-নিন্দা হবেই। অন্যায্য ও বিদ্বেষমূলক সমালোচনায় মানুষ কানই দেয় না—নিন্দা নিন্দুকের মুখেই থাকে।
সব গণতান্ত্রিক সমাজেই গণমাধ্যম স্বাধীন এবং সমালোচনামূলক কর্তৃত্বের কাজ করে। মাঠপর্যায়ের মানুষের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। স্বাধীন নাগরিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন জাতীয় সমস্যা নিয়ে কাজ করে। তাদের গবেষণালব্ধ সমীক্ষার ফলাফল গণমাধ্যম সরকার ও দেশবাসীর কাছে পৌঁছে দেয়। সেই সব বেসরকারি সমীক্ষা সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করতে পারে। নাগরিকদের সমীক্ষা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সহায়ক—উন্নয়নের শত্রু নয়। বিতর্ক হতেই পারে এবং হওয়াই বাঞ্ছনীয়। অমর্ত্য সেনের ভাষায় যাকে বলে তক্কাতক্কি। যে সমাজে বিতর্ক বা তক্কাতক্কির সুযোগ নেই, তা এক-দরজাবিশিষ্ট ঘর।
গত ৪০ বছরে বাংলাদেশের সমাজে ব্যাপক রূপান্তর ঘটেছে। মানুষ পুরোনো বাংলাদেশে ফিরে যেতে চায় না; বরং চায় নতুন আরও ভালো এক বাংলাদেশ। যেখানে মানুষ তার পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করতে পারবে, যেখানে থাকবে সামাজিক ন্যায়বিচার। যেখানে মানুষ আছে, সেখানে সমস্যা থাকবে। সব সমস্যার সমাধান একা সরকারের পক্ষে করা সম্ভব নয়। বিশ্বায়নের যুগে কোনো দেশই এখন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। প্রাকৃতিক ও সামরিক সব সমস্যাই সম্মিলিত চেষ্টা ছাড়া সমাধান অসম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা লাগবেই। জঙ্গিবাদ মহামারির আকারে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা তুলনামূলকভাবে ভালো আছি। কিন্তু জঙ্গিবাদ কার প্ররোচনায়, কোথায়, কী আকার ধারণ করে, তা বলা সম্ভব নয়। কোন জঙ্গিবাদ দমনের ধরন কী রকম হবে, তা একা সরকারের পক্ষে নির্ধারণ করাও সম্ভব নয়। নাগরিক সমাজ, মানবাধিকারকর্মী, উন্নয়ন গবেষকদের বুদ্ধি-পরামর্শ দরকার। সবাইকে ঠেলা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলে বড় ক্ষতির আশঙ্কা।
জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন গত শুক্রবার সাধারণ পরিষদে বলেছেন, অপরিকল্পিত নীতি, ব্যর্থ নেতৃত্ব, কঠোর পন্থা, কেবল সামরিক বল প্রয়োগ করে জঙ্গিবাদ নির্মূলের চেষ্টা হয়েছে। উপেক্ষিত হয়েছে মানবাধিকার। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এসব পন্থা নেওয়ার ফলে জঙ্গিবাদ বেড়েই চলেছে। প্রতিটি রাষ্ট্রকে তিনি জঙ্গিবাদ নির্মূলে জাতীয় পরিকল্পনা তৈরির আহ্বান জানান।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি দাবি করে, প্রতিটি দেশের নেতৃত্বের সুবিবেচনাপ্রসূত সংযমী সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক পরিমিতিবোধ। সে জন্য এক মতের একরোখা নীতি নয়, চাই বহু মতের সমন্বয়ী সিদ্ধান্ত, পক্ষপাতহীনতা ও সহনশীলতা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হীন পন্থায় দুর্বল করতে চাইলে হিতে বিপরীত হয়। ভিন্নমতাবলম্বীকে তার অপ্রীতিকর কথার জন্য চপেটাঘাত না করে তা ধীরস্থিরভাবে বিচার করে প্রত্যাখ্যান করাই ভালো। নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে, যেন প্রত্যেক মানুষের মধ্যে এই বোধ জন্মে: এই রাষ্ট্র আমার।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।

নদীর দুই তীর মিলছে একই স্বপ্নে! by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে এ বছরই টানেল
নির্মাণের কাজ শুরু হচ্ছে l ছবি: প্রথম আলো
নতুন বছরের শুরুতেই সুসংবাদ পাওয়া গেল। চট্টগ্রামের (বৃহত্তর অর্থে বাংলাদেশেরও) লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের প্রস্তাব একনেক বৈঠকে অনুমোদন পাওয়ার পর সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে আলোর আভাস দেখা যাচ্ছে। চীন সরকারের ঋণ-সহায়তায় প্রায় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পটির কাজ এ বছরের নভেম্বর মাসে শুরু হবে। কর্ণফুলীর পানি প্রবাহের ১৫০ ফুট নিচ দিয়ে ৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার এই টানেল যাবে শহরের অপর প্রান্তের আনোয়ারায়।
২০০৮ সালে চট্টগ্রামের লালদীঘির মাঠে নির্বাচনী জনসভায় কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই প্রতিশ্রুতির কতটা কল্পনাবিলাসী এবং কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে নানা কথা ছিল তখন থেকেই। ২০১২ সালে সম্ভাব্যতা প্রতিবেদন চূড়ান্ত হওয়ার পর স্থান নির্বাচন নিয়ে কালক্ষেপণ হয়। ২০১৪ সালের শেষ দিকে এসে কর্ণফুলীর মোহনায় টানেল নির্মাণে নগর পরিকল্পনাবিদ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দুই বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা একমত হলে স্বপ্ন ও বাস্তবের দূরত্ব কমে আসে। সম্প্রতি একনেক এ বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার পর আমাদের দেশের জন্য নদীর নিচে গাড়ি চলাচলের নতুন ধারণাটি আর অবিশ্বাস্য বলে ভাবছে না সাধারণ মানুষ। বরং সুড়ঙ্গের দুই প্রান্ত কাছাকাছি এলে চীনের সাংহাইয়ের আদলে ‘টু টাউনস—ওয়ান সিটি’ গড়ে ওঠার সম্ভাবনাকেও অলীক বলে মনে হয় না আজ।
নদীর ওপারে আনোয়ারা গ্রামের মানুষের মনে কর্মসংস্থানসহ জীবনমান বৃদ্ধির আশার সঞ্চার হয়েছে। ইতিমধ্যে চীন সেখানে জায়গা বরাদ্দ চেয়েছে। সরকারও ৩৫০ একর জমির ওপর অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে।
এ টানেল তৈরি হলে আউটার রিংরোড হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানবাহন মূল শহর এড়িয়ে কক্সবাজারসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামে যাতায়াত করতে পারবে। দূরত্ব কমবে ৩৫ কিলোমিটার। আউটার রিংরোডের কাজ চলছে পুরোদমে। এটি নির্মিত হচ্ছে উপকূলীয় বাঁধের ওপর: এটা হবে একই সঙ্গে ‘এমব্যাংকমেন্ট কাম হাইওয়ে’—বাঁধ ও মহাসড়ক। এর কার্যকারিতা হবে বহুমুখী। প্রাকৃতিকভাবেই দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে চট্টগ্রামের একটি বিরাট অঞ্চল। ১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে লক্ষাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটেছিল এ অঞ্চলে। কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদহানি হয়েছিল। এর আগে-পরেও বড়-ছোট বেশ কিছু প্রাকৃতিক বৈরিতা মোকাবিলা করতে হয়েছে চট্টগ্রামবাসীকে। উপকূলীয় বাঁধের ওপর আউটার রিংরোডটি শক্তিশালী প্রতিরোধ হিসেবে গড়ে উঠলে ইপিজেড, কর্ণফুলী ইপিজেড, সমুদ্রবন্দর, নৌবন্দর, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘এমব্যাংকমেন্ট কাম হাইওয়ে’ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারী যানবাহনগুলোর গতি পরিবর্তন করে শহরের যানজট হ্রাস করাও সম্ভব হবে।
চট্টগ্রামের উন্নয়নের সঙ্গে এ দেশের অর্থনীতির ভাগ্য সম্পৃক্ত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলের অবকাঠামোগত ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের দিকে তাকিয়ে আছে প্রতিবেশী দেশগুলোও। এসব খাতে নিজেদের স্বার্থেই বিনিয়োগে আগ্রহী তারা। সমুদ্র-বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সম্পৃক্ততার কথা জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে এখন। এই আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা উদ্যোগের একদিকে রয়েছে বাংলাদেশ-ভারত-ভুটান-নেপাল (সিবিআই)। ভুটান ও নেপাল সমুদ্রে প্রবেশের সুবিধাবঞ্চিত দেশ। অন্যদিকে ‘সেভেন সিস্টারস’ নামে পরিচিত ভারতের সাতটি রাজ্যও স্থলবেষ্টিত। ফলে এই দেশগুলো চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে নিজেদের স্বার্থেই ব্যবহার করতে চায়।
অন্যদিকে রয়েছে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইসি)—এই চার দেশের অর্থনৈতিক করিডর স্থাপনের উদ্যোগ। ‘কুনমিং ইনিশিয়েটিভ’ নামে পরিচিত এই উদ্যোগ সম্পর্কে চীন বলছে, ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান করিডর’। নতুন সিল্ক রোড ও মেরিটাইম সিল্ক রুট পুনর্গঠনের জন্য চীনের প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। চীনের ইউনান ও সিচুয়ান প্রদেশ এবং মিয়ানমারের শান ও রাখাইন রাজ্যের প্রবেশদ্বার হতে পারে চট্টগ্রাম। কেননা, চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে নিকটতম সমুদ্রবন্দর গুয়াংজুর দূরত্ব প্রায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার। অথচ চট্টগ্রামের সঙ্গে মিয়ানমার হয়ে কুনমিংয়ের দূরত্ব এক হাজার কিলোমিটার। আমাদের অংশে উখিয়ার বালুখালী থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত মাত্র দুই কিলোমিটার সড়ক করা গেলে মিয়ানমারের এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে বাংলাদেশ। সেই সড়ক নির্মাণের কাজও ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই চীন তার ইউনান প্রদেশের পণ্য ৭০০ কিলোমিটারের পথ বাঁচিয়ে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে রপ্তানির উদ্যোগ নিতে আগ্রহী হবে।
ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের দূরত্ব মাত্র ২০০ কিলোমিটার। এ রকম সুযোগ ফেলে ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দূরের কলকাতা বন্দর ব্যবহার ভারতের এই রাজ্যটির জন্য অর্থনৈতিকভাবে যে যুক্তিযুক্ত নয়, সে কথা তাদের চেয়ে ভালো বুঝবে কে? আবার সড়কপথে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সাব্রুম-রামগড় সীমান্তের দূরত্ব ৭৫ কিলোমিটার, বিলোনিয়া-ফেনীর দূরত্ব ২৫০ কিলোমিটার। সুতরাং এই বন্দর ব্যবহার নিয়ে দর-কষাকষির এক চমৎকার অবস্থানে আছি আমরা।
সম্ভাবনার পাশাপাশি সীমাবদ্ধতার দিকগুলোও শনাক্ত করা দরকার। বন্দরের সক্ষমতা না বাড়ালে এই অবস্থানের শতভাগ সুযোগ আমরা নিতে পারব না। অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে নয় মিটারের বেশি ড্রাফটের জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করতে পারে না। অথচ নদীর নাব্যতা ও গভীরতা বাড়ানোর জন্য ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের উদ্যোগটা প্রায় ব্যর্থই হয়েছে বলা যায়।
এদিকে কক্সবাজার জেলার সোনাদিয়া দ্বীপে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে সরকার অনেক দূর অগ্রসর হয়েও তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বলে মনে হয়। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম নগর শাখার সভাপতি ও সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী সরাসরি প্রতারণার অভিযোগ তুলেছেন খোদ তাঁর দলের সরকারের বিরুদ্ধেই। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের বিষয়ে জাপানের একটি প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্যতা জরিপ সম্পন্ন হয়েছিল এবং চীন এখানে বিনিয়োগের আগ্রহও প্রকাশ করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ প্রকল্পটি যে নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্ব হারাল, তার কারণ হিসেবে ভারতের অনাগ্রহই দায়ী বলে মনে করেন কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ।
অর্থনীতিবিদ মইনুল ইসলাম প্রশ্ন তুলেছেন, ‘সোনাদিয়া বন্দর কি ভূ–রাজনীতির শিকার?’ তিনি বলেছেন, ‘ভারত যদি চীনকে সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ থেকে বিরত রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দেয়, তাহলে বাংলাদেশ সরকারের উচিত ওই বন্দর নির্মাণের বিকল্প অর্থায়নের জন্য ভারতকে চাপ দেওয়া।’ (প্রথম আলো, ৯ অক্টোবর)। আসলে দেনদরবারের সামর্থ্য ও যোগ্যতার ওপর নির্ভর করছে নিজেদের লাভালাভের অনেক কিছুই।
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের পায়রা নদীর মোহনায় একটি বন্দর গড়ে তোলার ব্যাপারে এখন সরকারকে অধিক আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে। প্রস্তাবিত এই বন্দরের সম্ভাব্যতা যাচাই-সংক্রান্ত কোনো সমীক্ষা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। চট্টগ্রাম বন্দরেরই অর্থায়নে চলছে এ বন্দর নির্মাণের কাজ। এখানেই সম্ভবত মহিউদ্দিন চৌধুরীর ক্ষোভ। কিন্তু এই ক্ষোভকে শুধু ‘আঞ্চলিকতা’র দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হবে না। বিষয়টি অগ্রাধিকার নির্ণয় করার। প্রস্তাবিত পায়রা বন্দরের জন্য অবকাঠামো, পশ্চাৎ সুযোগ-সুবিধা এবং যে স্টেকহোল্ডার দরকার, তা আছে কি না, যাচাই করতে হবে। তার আগে ফিজিবিলিটি রিপোর্টে উল্লিখিত সম্ভাবনাময় সোনাদিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার কি না, সেটাই ভাবতে হবে সরকারকে। আমাদের ধারণা, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘কমার্শিয়াল হাব’ বা বাণিজ্যিক কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠার যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তা অগ্রাহ্য করা ঠিক হবে না।
যা-ই হোক, শুরু করেছিলাম কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল নির্মাণ প্রসঙ্গে। এই টানেল নদীর দুই প্রান্তকে কাছাকাছি এনে বিরাট অর্থনৈতিক-সামাজিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। শহররক্ষা বাঁধের ওপর নির্মিত আউটার রিংরোড সেই সম্ভাবনাকে বহুমাত্রিক করে তুলবে। ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রামে আসছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার একগুচ্ছ প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন। বদলে যাচ্ছে চট্টগ্রাম। সব মিলিয়ে আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রবল উদ্দীপনার সঞ্চার হয়েছে এ অঞ্চলের মানুষের মনে। এখন শুধু কর্ণফুলীর দুই তীরের মতো স্বপ্ন ও বাস্তবতাকে মেলানোর জন্য অপেক্ষা।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

ভুলে ভরা এক উন্নয়নের মডেল by মাহা মির্জা

বিদেশি কোম্পানি আর বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা হয় এই নিয়তেই সাজিয়েছেন তাঁরা এই উন্নয়নের মডেল। তবে চুনারুঘাটের লড়াকু মেয়েরা খুব স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। চাপিয়ে দেওয়া ‘উন্নয়ন’ তাঁরা মানবেন না।
টানা এক মাস হবিগঞ্জের চান্দপুর চা-বাগানের নারী শ্রমিকেরা তিন ফসলি জমিতে ‘বেজা’র প্রস্তাবিত স্পেশাল ইকোনমিক জোন (এসইজেড) বা বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। চা-বাগানের এই শ্রমিকেরা দেড় শ বছর ধরে বংশপরম্পরায় চাষ করেছেন এই জমিতেই। বিনিময়ে তিন প্রজন্ম ধরে খাজনা দিয়েছে সরকারকে। এই জমির রেজিস্ট্রি করা দলিল নেই তাঁদের কাছে, কিন্তু হেমন্ত শেষে চান্দপুর চুনারুঘাটের ৫১১ একর জমির বিস্তীর্ণ কাটা ধানের মাঠ দেখলে বোঝা যায় এই জমির সঙ্গে এখানকার আট হাজার মানুষের নাড়ির সম্পর্ক।
মধ্যবিত্ত মানসে স্পেশাল ইকোনমিক জোন মানেই উন্নয়ন। দাবি করা হয়, এর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান তৈরি হয়, এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন হয়, বৈদেশিক মুদ্রা আসে এবং সরকার রাজস্ব পায়। অথচ গত দুই দশকে দেখা গেছে, এসইজেড করার উদ্দেশ্যে যেখানেই জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে, সেখানেই গড়ে উঠেছে গণপ্রতিরোধ। রাষ্ট্র বলছে উন্নয়ন। অথচ ভারতের সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, ওডিশা, গুরগাঁও, রাইগড়, নিয়মগিরি আর আমাদের ফুলবাড়ী থেকে চান্দপুর চুনারুঘাটের অগণিত মানুষ কেন এই উন্নয়ন মডেলকে প্রত্যাখ্যান করছে, কেন ‘জীবন দেব তবু জমি দেব না’ বলে বুলেটের সামনে দাঁড়াচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
প্রথমত বলা হয়, এসইজেড থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসে, যার মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন হয়। এই সেই ট্রিকেল ডাউন বা চুইয়ে পড়া অর্থনীতির তত্ত্ব, যার কঠোর সমালোচনা রয়েছে মূলধারার অর্থনীতিতেই। আদৌ কি ওপর থেকে সম্পদ ‘চুইয়ে’ পড়ে প্রান্তে? আদৌ কি বৈদেশিক মুদ্রার বিশাল রিজার্ভ থেকে মাঠঘাটের কৃষক– শ্রমিকের উন্নয়ন হয়? নাকি শ্রমিকের ঘামে অর্জিত ডলার পাচার হয়ে যায় বিদেশে? গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশ থেকে গড়ে প্রতিবছর পাচার হয় ৫৫৮ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে ১০ বছরে অর্থ পাচারের পরিমাণ সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি ডলারের বেশি (বাংলাদেশের দুই বছরের বাজেটের সমান)। বৈদেশিক মুদ্রার দরকার পড়লে ফসলি জমি নষ্ট না করে, হাজারো মানুষকে উচ্ছেদ না করে এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাচার রোধ করছে না কেন সরকার? দ্বিতীয়ত প্রচার করা হয়, এসইজেড থেকে বিশাল রাজস্ব পাবে সরকার। অথচ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (BEZA) ‘বেজা’র সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে এসইজেডগুলোতে প্রথম ১০ বছরের জন্য শতকরা ১০০ ভাগ আয়কর মুক্তি, ১১তম বছরে শতকরা ৭০ ভাগ এবং ১২তম বছরে শতকরা ৩০ ভাগ করমুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সব রকম রপ্তানি কর অব্যাহতিও ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া এসব অঞ্চলে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দেওয়া হয় অস্বাভাবিক কম মূল্যে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। অর্থাৎ এসইজেড থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পায়—এই বহুল প্রচারিত ধারণাটিও আদতে একটি মিথ। বরং স্পষ্টতই এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পদ হস্তান্তরিত হয় বেসরকারি কোম্পানির হাতে।
তৃতীয়ত বলা হয়, জমি অধিগ্রহণের ফলে উচ্ছেদ হওয়া কৃষক ওই শিল্পাঞ্চলে গড়ে ওঠা কারখানাতেই চাকরি পান। অথচ ভারতে দেখা গেছে মোট এসইজেডের মাত্র ৯ দশমিক ৬ শতাংশ ম্যানুফ্যাকচারিং খাতভিত্তিক আর ৫৬ দশমিক ৬৪ শতাংশই আইটি সেক্টরভিত্তিক। অর্থাৎ অধিকাংশ বিনিয়োগই সার্ভিস সেক্টর (আইটি, হোটেল, রিয়েল এস্টেট) ভিত্তিক হওয়ায় কৃষক পরিবারের সদস্যদের এসব শিল্পাঞ্চলে চাকরি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকে না। এক এলাকার কৃষক উচ্ছেদ হয়ে আরেক এলাকার শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েট চাকরি পায় ঠিকই কিন্তু মাঝখান থেকে হারিয়ে যায় বহুদিনের খেতখামার, ফসলি জমি, আর স্বনির্ভর একেকটি গ্রাম, জিডিপির অঙ্কে যার হিসাব হয় না। উল্লেখ্য যে ভারতে এসইজেডের মাধ্যমে ৩৯ লাখ কর্মসংস্থানের কথা বলা হলেও দীর্ঘ দুই দশকে কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৮৪ হাজার, যা ঘোষিত কর্মসংস্থানের মাত্র ৭ শতাংশ।
এদিকে এ দেশে ইতিমধ্যে ঘোষিত শিল্পাঞ্চলগুলোতে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে ন্যূনতম বিনিয়োগ কত হতে হবে, এ-সংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট সরকারি নীতিমালা নেই। বেগমখান চা-বাগানের অঞ্জলি বাগতিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এখানে জোন হলে নাকি ঘরে ঘরে চাকরি হবে? দিদি ফুঁসে উঠে বলেছিলেন, ‘মিথ্যা মিথ্যা মিথ্যা। রশিদপুর গ্যাসফিল্ডের জন্য হামাদের জমি লিয়েছিল কোম্পানি। বলেছিল গঁায়ের লোকের চাকরি দেবে। অথচ কারখানা ঝাট দেবার লিয়েও গঁাও থেকে হামাদের একটা লোক লেয়নি কোম্পানি।’ ভারতের শ খানেক এসইজেডের ওপর দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী মাইকেল লেভিন। নথিবদ্ধ করেছেন ওই সব এলাকার জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদের করুণ কাহিনি, চাকরির নামে প্রহসনের গল্প, শিল্পায়ন আর উন্নয়নের নামে কৃষক আর প্রান্তিক মানুষের সম্পদ বাণিজ্যিক কোম্পানির পকেটে চলে যাওয়ার কাহিনি। উল্লেখ্য, স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে প্রায় সাড়ে চার কোটি প্রান্তিক মানুষের উচ্ছেদের প্রমাণ পাওয়া যায়।
বলা হয়, এসইজেডের মাধ্যমে ওই এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, উর্বর ফসলি জমি নষ্ট করে, খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ফেলে, কৃষককে তাঁর জমি থেকে বিতাড়িত করে চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়ার নাম কি উন্নয়ন? বেগমখান চা-বাগানের সহচরী বলেছেন, তাঁর আট মাসের খোরাক আসে এই জমি থেকে। বছরে ৪০ মণ ধান করেন। ছাওয়াল-পাওয়াল অসুস্থ হলে ধান বেচার টাকায় চিকিৎসা হয়। ছেলের জন্য ম্যাট্রিকের ২০০০ টাকা ফিস ভরেছেন শীতকালের সবজি বেচে। বলেছেন, এই তিন কেয়ার জমিই তাঁর উন্নয়ন, তঁার পরিবারের ভবিষ্যৎ। নতুন করে আর কোনো উন্নয়ন তাঁর দরকার নেই।
১২ বছর ধরে পস্কো স্টিল প্রজেক্ট ঠেকিয়ে রেখেছে ওডিশার মানুষ। তারা বলছে, আমাদের চাকরির দরকার নেই। উন্নয়ন করতে চাইলে আমাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করুন। নিয়মগিরির ডঙরিয়া আদিবাসীদের প্রতিরোধেও শোনা গেছে একই কথা, ‘উন্নয়ন করতে চাইলে পাহাড়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করো, বাচ্চাদের স্কুল বানাও। বক্সাইট খনিতে আমাদের লাভ নেই, লাভ কেবল কোম্পানির।’ আর চান্দপুরের নারীদের মিছিল তো জানিয়েই দিয়েছে, এমন জবরদস্তিমূলক উন্নয়ন তারা চায় না। বেগমখান বাগানের কনকলতাদি বলছিলেন, ‘উন্নয়ন করতে চাইলে চা-শ্রমিকের বেঁচে থাকার মতো মজুরি নির্ধারণ করে দিক সরকার। ভূমির অধিকার দিক। জমি থেকে খেদিয়ে আবার কিসের উন্নয়ন?’ নমিতাদির সরল প্রশ্ন ছিল, ‘এই যে আমরা ফসল ফলাই, এতে কি উন্নয়ন হয় না?’
এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়কব্যবস্থা, ফসলের ন্যায্যমূল্য আর শ্রমের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত না করে কৃষককে ধরে বেঁধে কারখানার শ্রমিক বানানো, আর চা-শ্রমিককে জবরদস্তি করে আইটি পার্কের পিয়ন বানানোর এই উন্নয়ন মডেল যে কতখানি ফাঁপা এবং গণমানুষের সঙ্গে সংযোগবিহীন, ভারতের ৬০০ এসইজেডের তিক্ত অভিজ্ঞতাই তার প্রমাণ। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে ভারতের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের একটি রিপোর্ট গত দুই দশকে ভারতীয় এসইজেডগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে মন্তব্যে করেছে, ‘দিস ইজ আ ক্লিয়ার লুট অব পাবলিক মানি ফর দ্য সেইক অব ফরেন মানি।’ অথচ ভারতের অভিজ্ঞতা আমলে নিচ্ছেন না আমাদের নীতিনির্ধারকেরা। বরং বিদেশি কোম্পানি আর বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা হয় এই নিয়তেই সাজিয়েছেন তাঁরা এই উন্নয়নের মডেল। তবে চুনারুঘাটের লড়াকু মেয়েরা খুব স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। চাপিয়ে দেওয়া ‘উন্নয়ন’ তাঁরা মানবেন না।
মাহা মির্জা: অ্যাক্টিভিস্ট ও পিএইচডি গবেষক, বিলেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানি।

কৃষি-অন্তঃপ্রাণ এক অর্থনীতিবিদের বিদায় by শাইখ সিরাজ

ড. মাহবুব হোসেন
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে বাংলাদেশের হাতে গোনা যে কয়জন মানুষের সুগভীর পর্যবেক্ষণ, তার মধ্যে ড. মাহবুব হোসেন ছিলেন অন্যতম একজন। একজন উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ হলেও কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের মূলধারা যে কৃষি, তা তাঁর নিজস্ব চিন্তার জায়গাতে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। তাই যতটা না অর্থনীতিবিদ হিসেবে, তারচেয়ে বেশি কৃষি বিশেষজ্ঞ হিসেবে দেশে অল্প দিনেই তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নে তাঁর পর্যবেক্ষণ আমাদের দেশে যেমন, একইভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ছিল দারুণ গ্রহণযোগ্য ও সমাদৃত। তাঁর আকস্মিক চলে যাওয়া আমাদের দেশের মূল স্রোতের উন্নয়ন চিন্তাজগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করেছে।
ড. মাহবুব হোসেনের সঙ্গে আমার জানাশোনা নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। তখন আমি বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠান করি। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের মহাপরিচালক। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ওই প্রতিষ্ঠানেই। মহাপরিচালক হিসেবেও তিনি দারুণ দক্ষতার পরিচয় রেখে চলছিলেন। অনেকটা নিভৃতচারী গোছের সাদাসিধে মানুষ ছিলেন তিনি। তখন থেকেই ড. মাহবুবকে আমি মাহবুব ভাই হিসেবে সম্বোধন করে আসছিলাম। তখন খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা না থাকলেও সম্পর্কটি বেশ গভীর হয়ে ওঠে ২০০৪ সালে। ড. মাহবুব তখন ফিলিপাইনের লাজব্যানোসে অবস্থিত আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইআরআরআই বা ইরি) সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান। আমি গিয়েছিলাম বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও ধান গবেষণার অগ্রগতি নিয়ে কাজ করতে। তখন তাঁকে অনেকটা নিবিড়ভাবে পেয়েছিলাম। জানতে পেরেছিলাম ধান গবেষণার ওই সময়ের অবস্থা সম্পর্কে। বলা বাহুল্য, ইরির ভূমিকা, উন্নয়নশীল বিশ্বের ধান গবেষণা, আমাদের বাংলাদেশের অবস্থান এই বিষয়গুলো মাহবুব ভাই আমার সামনে স্পষ্ট করে তোলেন। আমি একজন অর্থনীতিবিদের বিজ্ঞানচেতনা এবং মানবিক ও সমাজ দর্শন খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাই। আমার মনে আছে, মাহবুব ভাই বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট গবেষণা পরিচালনার জন্য ইউরোপ-আমেরিকা থেকে যে পরিমাণ তহবিল পেত, তা তখন অনেকটাই কমে এসেছে। তখন তিনি আজকের দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, আমাদের বাংলাদেশের মতো দেশকে ধান গবেষণায় স্বনির্ভর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার বিকল্প নেই। তহবিলের প্রশ্নে বাইরের পানে তাকিয়ে থাকার দিন মনে হয় শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি সে সময়ই বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করছিলেন কৃষির গতি-প্রকৃতি পাল্টে যাওয়ার ইস্যুতে। জলবায়ুর পরিবর্তন, সমাজ ও রাজনৈতিক নানা বিষয়, আমাদের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বিষয়গুলো তিনি বারবার চিন্তায় আনতেন। তিনি ছিলেন দারুণ উদার, সচেতন ও নিরপেক্ষ চেতনার মানুষ। তিনি সব সময় উন্নয়ন চেতনার পক্ষ নিয়ে কথা বলতেন। সরকারযন্ত্রের ইতিবাচক কাজকে বেশ আগ্রহের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতেন। কোনো কিছুকে উড়িয়ে দেওয়ার মানসিকতা তাঁর ছিল না। তাঁর সুগভীর বিশ্লেষণ ও মন্তব্যগুলো আমি মিলিয়ে মিলিয়ে দেখেছি, তা কৃষির মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে শতভাগ সংগতিপূর্ণ। শুধু কাগজপত্রে হিসাবনিকাশ করে তাঁর কাজ কখনোই শেষ করেননি তিনি, চেষ্টা করেছেন মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে সব সময় তাঁর লেখনী, গবেষণা ও চিন্তার মধ্যে রাখতে। উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ হিসেবে যে কাজটি অনেক বড়।
আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে দীর্ঘ ১৬ বছর দায়িত্ব পালন শেষে বাংলাদেশে যখন চলে এলেন, তখন মাহবুব ভাই তাঁর অবস্থানে থেকেই আমার কাজকর্মের বেশ সহায়ক হয়ে উঠলেন। আমি কয়েক দিন পরপরই তাঁকে চ্যানেল আই স্টুডিওতে পেয়েছি। কৃষির যেকোনো ইস্যু নিয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছি। আমি যে অনুষ্ঠানগুলোতে নীতি পরিকল্পনা ও গবেষণাকে বিষয়বস্তু করেছি, সেখানেই ড. মাহবুবকে সর্বাগ্রে স্মরণ করেছি। অনেক অজানা বিষয় জেনেছি। কিছু বিষয় নিজের ভেতর খোলাসা করারও সুযোগ পেয়েছি। আমি দেখেছি, মাহবুব ভাই কখনো শুধুই সমালোচনার জন্য সমালোচনা করতেন না। মিতভাষীও ছিলেন বৈকি। সব সময় কথা বলতেন হিসাব করে, চিন্তা করে, যাতে কথাটি কোনো না–কোনোভাবে উপকারে লাগে। কখনো তাঁর আচরণে কাউকে আঘাত করার প্রবণতা ছিল না, বিরোধিতা করতেন তাও অত্যন্ত নমনীয়তার সঙ্গে। এর মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘ প্রজ্ঞা, চিন্তা ও বিনয়ী স্বভাবই বারবার উঠে এসেছে।
প্রান্তজনের অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, তখন দেশের বর্গাচাষিদের ঋণপ্রাপ্তির বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল আমার। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক ড. মাহবুবের মাধ্যমে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাককে কাজে লাগায় বর্গাচাষিদের মাঝে ঋণ বিতরণে। ঢাকায় আর্মি স্টেডিয়ামে বর্গাচাষিদের এক সম্মেলন হয়েছিল। বাংলাদেশে কৃষিঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সেটি ছিল একটি মাইলফলক উদ্যোগ। সে অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন। ওই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পেছনে মাহবুব হোসেনের ছিল অনেক বড় ভূমিকা।
২০১৪ সালে পূর্ব আফ্রিকার রুয়ান্ডায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল দ্বিতীয় বায়োফর্টিফিকেশন সম্মেলন। আমার সুযোগ হয়েছিল ওই সম্মেলনে উপস্থিত থাকার। ওই সম্মেলনের একটি সেশনে সভাপতিত্ব করেন মাহবুব হোসেন। তিনি সুদীর্ঘ গবেষণার আলোকেই তাঁর কাজের পরিধি বিস্তৃত করেছিলেন বিশ্বব্যাপী। যুক্ত ছিলেন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। ভূমি সংস্কার, দরিদ্র কৃষক, কৃষি ও কৃষকের ঝুঁকি, ধান গবেষণার প্রভাব ও বাস্তবতা, সবুজ বিপ্লব, এশিয়ার কৃষিনির্ভর দেশগুলো ছিল তাঁর গবেষণার বিষয়।
২০১৪ সালের বইমেলায়ও মাহবুব ভাইকে কাছে পেয়েছিলাম আমার একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে। অনেক গল্প-গুজব ও ভাব বিনিময় হয়েছিল বইমেলা প্রাঙ্গণের ক্যাফেটেরিয়ায় বসে। যা হোক, এমন টুকরো টুকরো বহু স্মৃতি আছে মাহবুব হোসেনের সঙ্গে। তিনি তাঁর অবস্থানে কৃষি অর্থনীতির বিষয়গুলো গণমাধ্যমে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে ছিলেন অকপট। নিজস্ব প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতাকে তিনি ব্যবহার করেছেন নিজস্ব তাগিদ বা গভীর দায়িত্ববোধ থেকেই। কৃষি তাঁর মূল বিষয় ছিল না। কিন্তু তিনি কৃষিকে তাঁর অধ্যয়নের বিষয়ের চেয়েও এনেছিলেন সামনে। আমিও কৃষি নিয়ে পড়াশোনা করিনি। পড়েছি ভূগোলে, কিন্তু তীব্র অনুরাগ নিয়ে লেগে আছি কৃষিতে। হয়তো সে কারণেই এ দেশের মূলধারার সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলোর সঙ্গে চেনা-জানার সুযোগ হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জায়গা থেকে যে কথা আজ গভীরভাবে মনে হচ্ছে তা হলো, কৃষির ন্যায্যতার প্রশ্নে দায়িত্ব নিয়ে কথা বলার মতো মানুষের বড্ড অভাব আমাদের দেশে। যে একজন ছিলেন, তিনিও চলে গেলেন।
শাইখ সিরাজ: পরিচালক ও বার্তাপ্রধান, চ্যানেল আই।
shykhs@gmail.com