Showing posts with label তুরস্ক. Show all posts
Showing posts with label তুরস্ক. Show all posts

Monday, August 24, 2026

সামরিক দিক থেকে তুরস্ক এত শক্তিশালী হলো কীভাবে

তুরস্ক এখন শুধু ন্যাটোর বড় সামরিক শক্তি নয়, মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলেও নিজেদের সামরিক প্রভাব বাড়াচ্ছে। দেশটির হাতে বিপুলসংখ্যক সেনা, ট্যাংক, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ ও ড্রোন রয়েছে। একই সঙ্গে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পও দ্রুত শক্তিশালী করছে আঙ্কারা।

২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, তুরস্কের সক্রিয় সেনাসদস্য প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার। এর সঙ্গে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার রিজার্ভ সেনা এবং দেড় লাখের মতো আধাসামরিক সদস্য রয়েছে। সব মিলিয়ে এই সংখ্যা ১০ লাখের বেশি।

স্থলবাহিনী তুরস্কের সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দেশটির কাছে প্রায় ২ হাজার ২৮৪টি ট্যাংক এবং প্রায় ৯৮ হাজার বিভিন্ন ধরনের সামরিক যান রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে এক হাজারের বেশি স্বচালিত কামান, ৬৩৫টি টানা কামান এবং ২৩৭টি রকেট লঞ্চার।

আকাশপথেও তুরস্কের শক্তি বড়। দেশটির সামরিক বহরে প্রায় ১ হাজার ১০১টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে ২০১টি যুদ্ধবিমান, ৮৪টি পরিবহন বিমান, ৩০১টি প্রশিক্ষণ বিমান এবং ৫০৯টি হেলিকপ্টার রয়েছে। তুরস্কের যুদ্ধবিমান বহরের মূল শক্তি এখনো এফ-১৬। পাশাপাশি নিজেদের তৈরি কেএএএন যুদ্ধবিমানও উন্নয়ন করছে দেশটি।

তবে তুরস্কের সামরিক শক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো ড্রোন। দেশটির বায়কার কোম্পানির তৈরি বায়রাকতার টিবি-২ বিশ্বের পরিচিত সামরিক ড্রোনগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। তুরস্ক এখন বিভিন্ন দেশে এসব ড্রোন রপ্তানিও করছে। ২০২৫ সালে দেশটির প্রতিরক্ষা রপ্তানি প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা ২০২১ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।

নৌবাহিনীতেও তুরস্কের বড় উপস্থিতি রয়েছে। দেশটির নৌবহরে প্রায় ১৯২টি জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি ফ্রিগেট, ৯টি করভেট এবং ১৪টি সাবমেরিন। কৃষ্ণসাগর, এজিয়ান সাগর ও ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের নৌবাহিনী সক্রিয়। বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালির নিয়ন্ত্রণও দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

তুরস্ক এখন নিজের অস্ত্র নিজেই তৈরির দিকে এগোচ্ছে। দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে বর্তমানে ৪ হাজার ৫০০টির বেশি কোম্পানি কাজ করছে এবং প্রতিরক্ষা প্রকল্পের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে। দুই দশক আগে যেখানে স্থানীয়ভাবে তৈরি সামরিক সরঞ্জামের অংশ ছিল প্রায় ২০ শতাংশ, এখন তা ৮৫ শতাংশের বেশি বলে তুরস্কের সরকারি তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

তুরস্কের সামরিক শক্তির পেছনে ভৌগোলিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে অবস্থান করার পাশাপাশি দেশটির সীমান্ত রয়েছে সিরিয়া, ইরাক, ইরান, জর্জিয়া ও বুলগেরিয়ার সঙ্গে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য, ককেশাস, বলকান ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে তুরস্কের সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব রয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা। তুরস্ক বহু বছর ধরে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে এবং সিরিয়া ও ইরাকের উত্তরাঞ্চলেও সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। ন্যাটোর সদস্য হিসেবে যৌথ প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও সামরিক প্রযুক্তির সুবিধাও পাচ্ছে দেশটি।

তবে শুধু ট্যাংক, বিমান বা যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা দিয়ে কোনো দেশের সামরিক শক্তি পুরোপুরি বোঝা যায় না। এসব অস্ত্রের কতগুলো কার্যকর, আধুনিক যুদ্ধে কতটা সক্ষম এবং বিভিন্ন বাহিনী কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: ওয়াইনেট নিউজ

ছবি: এপি
ছবি: এপি

Sunday, August 23, 2026

তুরস্কের পরিকল্পনা নস্যাৎ করতেই সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে হামলা ইসরায়েলের

তুরস্ক সিরিয়ার একটি বিমানঘাঁটিতে এমন এক কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা করছে, যা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। গোয়েন্দাদের এমন তথ্যের ভিত্তিতেই সিরিয়ার আবু আল দুহুর বিমানঘাঁটিতে গত সপ্তাহে হামলার সুপারিশ করেছিল ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এ দাবি করেছেন। খবর আল জাজিরার।

কাটজ বলেন, হামলার অনুমোদন দেওয়ার আগে সিরিয়া সরকারকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সতর্ক করেছিল ইসরায়েল। একই সঙ্গে এ-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য মার্কিন কর্মকর্তাদেরও দেওয়া হয়। তবে সিরিয়ার পক্ষ থেকে ইসরায়েলের দাবির বিষয়ে কোনো সাড়া না পাওয়ার পর হামলা চালানো হয়।

যদিও ইসরায়েলের এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে তুরস্ক। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলার আগে বা হামলার সময় আবু আল দুহুর ঘাঁটিতে কোনো তুর্কি সামরিক প্রতিনিধি দল ছিল না।

সিরিয়াও জানিয়েছে, আবু আল দুহুরে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। তবে সামরিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য তুরস্কের কর্মকর্তারা ওই স্থাপনা পরিদর্শন করেছিলেন।

গত ১৮ আগস্ট উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার ওই বিমানঘাঁটিতে আট দফা বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল। হামলায় বিমানঘাঁটির রানওয়ে ও অস্ত্র-সরঞ্জাম সংরক্ষণের স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

মার্কিন বিশেষ দূত টম ব্যারাক ইসরায়েলের এই হামলাকে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তুরস্ক, ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে সংঘাত এড়াতে একটি সমন্বয়ব্যবস্থা তৈরির বিষয়ে কাজ করছে তারা।

তবে ব্যারাকের মন্তব্যেরও সমালোচনা করেছেন কাটজ। তার দাবি, ব্যারাকের প্রতিক্রিয়ায় অনেক ভুল তথ্য রয়েছে এবং গোলান মালভূমি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের সঙ্গেও তার কিছু বক্তব্য সাংঘর্ষিক।

সূত্র : আল জাজিরা

সিরিয়ার আবু আল দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে প্রহরারত একজন সিরীয় সৈন্য। ছবি: এএফপি
সিরিয়ার আবু আল দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে প্রহরারত একজন সিরীয় সৈন্য। ছবি: এএফপি

Thursday, August 20, 2026

তুরস্কের ঘাঁটি নিয়ে ইসরায়েলের ভয়: সিরিয়ায় হামলার আগে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপ করেন মোসাদপ্রধান

রয়টার্সঃ সিরিয়ায় সম্প্রতি ইসরায়েলের বিমান হামলার কয়েক দিন আগে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধানের সঙ্গে সিরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি ফোনালাপ হয়েছে। এ ফোনালাপে তাঁরা সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

মোসাদপ্রধান রোমান গফম্যান ও সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানির মধ্যে ১৪ আগস্ট এ ফোনালাপ হয়। এটি সিরিয়ার ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা প্রশাসনের সঙ্গে ইসরায়েলের এযাবৎকালের সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ। ফোনালাপের ঠিক চার দিন পর সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায় ইসরায়েল।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সাধারণত মোসাদ-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দিয়ে থাকে। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে যোগাযোগ করা হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাইবানির মুখপাত্রও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।

সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলার পর গত মঙ্গলবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একটি বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, দামেস্ক প্রশাসন সিরিয়ায় তুর্কি সেনা মোতায়েনের অনুমতি দেওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। নেতানিয়াহুর দাবি, সেখানে তুর্কি সেনা মোতায়েন করা হলে তা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করবে। এ বিষয়ে তারা সিরিয়াকে বারবার সতর্ক করলেও আল-শারা প্রশাসন তা আমলে নেয়নি।

দুটি সূত্র বলছে, হামলার চার দিন আগে মোসাদপ্রধান গফম্যান ও সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাইবানির মধ্যে এ ফোনালাপ হয়। এতে সিরিয়াকে দেওয়া তুরস্কের সামরিক সহায়তার বিষয় বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। সূত্র আরও জানায়, ফোনালাপে সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো, অস্ত্র বিক্রি, ড্রোন সরবরাহসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইসরায়েল নানা তথ্য জানতে চায়। সিরিয়ার সেনাবাহিনীকে তুরস্ক অস্ত্র সরবরাহ করছে কি না, গফম্যান সেটিও জানতে চান।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তৃতীয় আরেকটি সূত্র ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, দুই নেতার মধ্যে সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি নিয়েই মূলত কথা হয়েছে।

এদিকে এ ফোনালাপের বিষয়ে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

তুরস্ক-সিরিয়া সম্পর্ক নিয়ে নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারি

সিরিয়ায় ২০২৪ সালে ‘স্বৈরশাসক’ বাশার আল-আসাদ সরকারকে হটিয়ে দেন আল-শারার নেতৃত্বে দেশটির বিদ্রোহীরা। এর পর থেকে তুরস্ক শারা প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়েছে। এর আগেও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় তুরস্ক বাশার সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিদ্রোহীদের সমর্থন দেয়। সিরিয়ায় তুরস্কের এ ক্রমবর্ধমান প্রভাব ইসরায়েলের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সিরিয়ার শাসক আল-শারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। গত জুলাই মাসে তিনি জানিয়েছিলেন, সিরিয়া ইসরায়েলের সঙ্গে একটি নিরাপত্তাচুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। পাশাপাশি ইসরায়েল যেন সিরিয়ার প্রতি আরও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করে, সে জন্য অন্যান্য প্রভাবশালী দেশকে যুক্ত করে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টাও চালাচ্ছে দামেস্ক।

নেতানিয়াহু গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা একটি ভিডিও বার্তায় সিরিয়াকে হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘ইসরায়েলের জন্য হুমকি হতে পারে, সিরিয়ায় তুরস্কের এমন কোনো সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি ইসরায়েল সহ্য করবে না।’

সাম্প্রতিক ইসরায়েলি বিমান হামলার দিকে ইঙ্গিত করে নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘আমরা তুরস্ককে স্পষ্টভাবে বলেছিলাম, এমনটা করবেন না। তারা স্পষ্টত আমাদের বার্তা শোনেনি। তাই আমরা (সিরিয়ায় বিমান হামলা চালানোর মাধ্যমে) নিশ্চিত করেছি, যেন তারা (তুরস্ক) বার্তাটি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে।’

তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় গত বুধবার ইসরায়েলের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা এগুলো ‘ভিত্তিহীন অভিযোগ’ বলে আখ্যায়িত করেছে। তুর্কি প্রশাসনের মতে, সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর চালানো ‘অবৈধ বিমান হামলা’ বৈধতা দিতেই ইসরায়েল এ ধরনের অভিযোগ তুলছে।

তুরস্কের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার জন্য তারা বৈধ উপায়ে সিরিয়া সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা চালিয়ে যাবে। তবে নিজেদের সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনার বিষয়ে তারা নির্দিষ্ট করে কিছু বলেনি।

তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং সিরিয়া ও ইরাকবিষয়ক বিশেষ দূত টম বারাক মঙ্গলবার বলেন, ইসরায়েলের এ বিমান হামলা ‘একটি অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে এ হামলা কোনো ভূমিকা রাখবে না’।

মঙ্গলবার রয়টার্সকে দেওয়া আরেক বক্তব্যে টম বারাক বলেন, ইসরায়েল, তুরস্ক ও সিরিয়ার মধ্যে যাতে কোনো সংঘাত না বাধে, সে জন্য ওয়াশিংটন একটি সমঝোতার উপায় খোঁজার চেষ্টা করছে। তিনি আরও জানান, এ তিন দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে।

হোয়াইট হাউসের স্টেট ডাইনিং রুমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আগে অপেক্ষা করছেন রোমান গফম্যান। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
হোয়াইট হাউসের স্টেট ডাইনিং রুমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আগে অপেক্ষা করছেন রোমান গফম্যান। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

মক্কা চুক্তি কেন ইসরায়েল-আমিরাত জোটকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে by ডেভিড হার্স্ট

ডেভিড হার্স্টের বিশ্লেষণঃ যদিও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চমক একদম পছন্দ করে না, তবু ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ ছিল আরব আমিরাত (ইউএই) ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য এক বিরাট চমক।

গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার জবাবে একটি মুসলিম জোট গড়ে তোলার ইচ্ছার কথা বেশ স্পষ্ট করেই জানিয়েছিলেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তবে আড়ালে থেকে চতুর চাল চেলেছেন সৌদি আরবের ডি ফ্যাক্টো শাসক—ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস)। ইরান যুদ্ধের দুপক্ষই যাতে তাঁর পদক্ষেপে সমন্বয় বা সহমর্মিতা খুঁজে পায়, তিনি সেভাবেই এগোচ্ছিলেন।

গত মাসে ওয়াশিংটনে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান একটি শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। কিন্তু এর পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতে বাদ সাধেন। তিনি পেছনের শর্ত হিসেবে সৌদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার তাগিদ দেন।

দক্ষিণ ইরাকে ইরান–সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স বা মিলিশিয়াগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় সৌদি ও মার্কিন যুদ্ধবিমান। এই মিলিশিয়াগুলোর নেতৃত্বে ছিলেন ইরানের আইআরজিসির ‘উপদেষ্টারা’।

সৌদি গোয়েন্দারা খবর পেয়েছিল, মিলিশিয়াগুলো কুয়েতে সীমান্ত পার হয়ে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। একই সময়ে ইয়েমেনের সানাতেও হামলা চালায় সৌদি যুদ্ধবিমান। কারণ, হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছিল।

মৌলিক পরিবর্তন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ ইরানবিরোধী হামলায় যারা যোগ দিয়েছিল, সেই জোটের কাছে মনে হচ্ছিল, সৌদির শাসক অবশেষে তাদের পক্ষ নিচ্ছেন। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়া তাঁর ভাবনায় ছিল না।

এই পুরো অঞ্চলে এখন ঘটে চলেছে মৌলিক কিছু পরিবর্তন। ইরান, গাজা ও লেবাননে ইরানের সাম্প্রতিক তিন যুদ্ধ সৌদি মানসিকতায় বড় পরিবর্তন এনেছে।

পশ্চিমে শিক্ষিত সৌদি বিশ্লেষকেরা দেখছেন, কীভাবে দুজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলের গণহত্যাকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছেন। ফলে তাঁরা আর নিজেদের পশ্চিমা শিবিরের লোক ভাবতে পারছেন না। একই সঙ্গে তাঁরা দেখছেন, যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে নিজের বিমানঘাঁটিগুলোই রক্ষা করতে পারছে না। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তৈরি হয়েছে চরম অবজ্ঞা।

সৌদি শুরা কাউন্সিলের সাবেক সদস্য ড. আহমেদ আলতুওয়াইজরি সেসব সৌদি বুদ্ধিজীবীর অন্যতম, যাঁদের কথা এখানে বলা হচ্ছে। তিনি বললেন, ‘মক্কা চুক্তি এক চরম সংকটকালে আলোর মুখ দেখেছে। ট্রাম্পের ওপর থেকে সবাই আস্থা হারিয়েছে। এই চুক্তি শুধু এই তিন দেশের নয়, পুরো অঞ্চলের স্বার্থ রক্ষা করবে। এটি পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক হিসাব পাল্টে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে আরব ও মুসলিম বিশ্বের আরও দেশ এই চুক্তিতে যোগ দেবে।’

এ সংঘাতে ট্রাম্পের দুর্বলতা উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। তিনি যুদ্ধে জিততে পারছেন না, আবার কোনো সমাধানও বের করতে পারছেন না। ইরানি মধ্যস্থতাকারীরা বিষয়টি ধরে ফেলেছেন। তাঁরা হরমুজ প্রণালির বর্তমান অচলাবস্থা ট্রাম্পের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত টেনে নিতে চান। কারণ, তাঁরা হিসাব করছেন, ট্রাম্প কংগ্রেসে তাঁর নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন। আর তাতে দুর্বল অবস্থায় তাঁকে আলোচনার টেবিলে আনা সহজ হবে।
এই নতুন চুক্তিতে প্রতিষ্ঠাতা তিন সদস্যেরই নিজস্ব সুবিধা রয়েছে।

ড. আলতুওয়াইজরির মতে, ‘এটি ভারতকে সামলাতে পাকিস্তানকে সাহায্য করবে। তুরস্কও মনে করত, তাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সরাসরি হুমকির সামনে ন্যাটো যথেষ্ট নয়। প্রকাশ্যেই বলা হচ্ছিল, ইরানের পর তুরস্কের পালা। আর সৌদি আরব কেবল তুরস্ক ও পাকিস্তানের সামরিক শক্তি দিয়েই সুবিধা পাবে না, তাদের গোয়েন্দা ও যুদ্ধকৌশলগত পরিকল্পনা থেকেও লাভবান হবে।’

আড়াল থেকে প্রকাশ্যে

ইসরায়েলি কূটনৈতিক ও সামরিক পরিকল্পনাকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বলছিলেন, তাঁরা ‘সুন্নি’ মুসলিম জোটের বিরুদ্ধে একটি জোট তৈরি করতে চায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে তাদের সামরিক সহযোগিতা ছিল এ পরিকল্পনার মূল কেন্দ্র। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ আক্রমণ সেই জোটকে আড়াল থেকে সামনে নিয়ে আসে।
যেটা আগে গোপনে চলত, সেটা এখন একেবারে প্রকাশ্যে চলে এসেছে। আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ (এমবিজে) আব্রাহাম আকোর্ডে বেশ উৎসাহের সঙ্গেই সই করেছিলেন। যুদ্ধের আগুনে সেই চুক্তির পরীক্ষাও হয়ে গেছে।

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মুখে যখন আবুধাবি কোণঠাসা, তখন ইসরায়েল সেখানে তাদের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং উচ্চ প্রযুক্তির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করে। একটি আরব দেশে সরাসরি ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে তাদের সবচেয়ে আধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করাকে তখন নজিরবিহীন হিসেবে দেখা হয়েছিল।

ইসরায়েলের স্বপ্ন ছিল, শত্রুদের একবার পিষে ফেলতে পারলে ভারত থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বিশাল জোট তৈরি হবে। আর ইসরায়েল বসবে তেল, গ্যাস, অর্থ ও প্রযুক্তির সেই সংযোগস্থলের কেন্দ্রে। এই অঞ্চলের সামরিক চাবিকাঠি থাকবে তেল আবিবের হাতে।

এ পরিকল্পনায় মিসর ও সিরিয়ার মতো প্রথাগত আরব শক্তির পতন ছিল নিশ্চিত। তারা হয় নিঃস্ব হয়ে দেউলিয়া হবে, না হয় ধর্মীয় ও জাতিগত উপদলে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে। আহমদ আল-শারার সিরিয়া নিয়ে ইসরায়েলের এখনো একই পরিকল্পনা।

আমিরাত ও ইসরায়েল—উভয়ের স্বার্থই ছিল অভিন্ন। তারা ইয়েমেন, সুদান ও লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ উসকে দিতে চেয়েছিল। এমনকি সোমালিল্যান্ডের মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলকে ব্যবহার করে সামরিক ঘাঁটির জাল বিছিয়ে নিজেদের জলপথের সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে চেয়েছিল। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ঠিক এ প্রকল্পেরই এক মারাত্মক প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিদ্বন্দ্বী দুই জোট

এর প্রথম প্রভাব পড়বে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যকার কৌশলগত বিরোধকে আরও গভীর ও তীব্র করার মাধ্যমে। গত ডিসেম্বরে ইয়েমেন থেকে আমিরাতিরা বহিষ্কৃত হওয়ার পর রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুল খালেক আবদুল্লাহ লিখেছিলেন, ‘ইয়েমেন নিয়ে আমাদের মতপার্থক্য আছে। সংঘাতের কারণে তা এখন শীর্ষ পর্যায়ে। সহযোগীদের মধ্যে ঝামেলা হতেই পারে, কিন্তু তারা আবার এক হয়।’

কিন্তু জানুয়ারি আসতে না আসতেই আবদুল খালেক আবদুল্লাহর সুর বদলে গেল। তিনি লিখলেন, ‘সৌদি আরব আর আমিরাতের মধ্যকার দূরত্ব কেবল ইয়েমেন সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি আরও গভীর।’ সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ তখন বলেছিলেন, সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ‘সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর’।

এরপর আরব আমিরাত তাদের দেশে আল অ্যারাবিয়ার এক্স অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয় এবং ওপেক ত্যাগ করে।

গত মাসে অবশ্য কিছুটা সম্পর্কের উন্নতি দেখা গিয়েছিল। সৌদি রাজকীয় উপদেষ্টা তুর্কি আল শেখ একটি ছবি শেয়ার করেন। সেখানে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান এবং আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদকে কোলাকুলি করতে দেখা যায়। ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘সৌদি আরব ও আরব আমিরাত: দুই ভাইয়ের গল্প এবং এক গভীর অংশীদারত্ব’। কিন্তু এই ঐক্য বেশি দিন টিকল না।

মক্কা চুক্তি নিয়ে ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন আবদুল খালেক আবদুল্লাহ। তিনি প্রশ্ন তুললেন, ‘এটি যদি কোনো জোট না হয়, তবে এর নাম কী?’ এরপর তিনি বড় অক্ষরে ট্রাম্পের স্টাইলে লিখলেন, ‘উপসাগরীয় সহযোগিতা এখন ভালো অবস্থায় নেই। প্রধান দেশগুলো নিজ ঘরের বাইরে গিয়ে নিরাপত্তা খুঁজছে। নতুন আঞ্চলিক অক্ষ আর সামরিক জোট তৈরির এই দৌড় জিসিসি-কে দুর্বল করে দিচ্ছে।’

জবাবে সৌদি প্রিন্স আবদুলরহমান বিন মুসাইদ লিখলেন, ‘সমস্যা কোথায়, জনাব? যেকোনো দেশের কি নিজের পছন্দমতো চুক্তি করার অধিকার নেই? এটি কি প্রতিটি দেশের সার্বভৌম বিষয় নয়? নাকি সৌদি আরবের বেলাতেই এই যুক্তি খাটবে না!’

সৌদির ড. আহমেদ আল-সানি পোস্ট করলেন, ‘পাঁচ বছর আগে কোনো আমিরাতি অ্যাকাউন্ট থেকে “সৌদির কৌশলগত গভীরতা” নিয়ে আক্রমণ করার কথা কল্পনাই করা যেত না। মক্কা চুক্তি তেতো সত্যটা সামনে এনে দিল: বিরোধ সেখানে, যেখানে রিয়াদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তারা কেবল অর্থায়নই করবে না, সিদ্ধান্তও তারাই নেবে।’

সৌদিরা এখন পুরোপুরি নিশ্চিত যে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট ইয়েমেন ও সুদানে তাঁদের জীবন কঠিন করে তুলবেন। আমিরাত ইচ্ছা করেই ইয়েমেন ও সুদানে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। তারা মিসরকে সৌদির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে উসকানি দেবে।
পরিস্থিতি যদি চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, তবে রিয়াদ আবুধাবিতে ক্ষমতার পরিবর্তনের পথও ভাবতে পারে। স্থানীয় দ্বন্দ্ব থামানোর এটিই হবে সহজতম উপায়।

সৌদিরা তাঁদের কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সে কারণেই তাঁরা মক্কা চুক্তিতে মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করেছিলেন। গত সপ্তাহে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মিসর সফরকালে আশা প্রকাশ করেন, কায়রোও এই চুক্তিতে যোগ দেবে এবং চার দেশ মিলে কাজ করবে।

সুরক্ষা ও সমাধান

ওয়াশিংটনে এই দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক জোটকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে দুভাবে—একটি হলো গভীর কৌশলগত জোট, আর অন্যটি ক্ষিপ্র কিন্তু লেনদেনসর্বস্ব জোট।
সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা থিওডর সিঙ্গার বলেন, ‘প্রথম দর্শনে আমিরাত-ইসরায়েল জোট দুপক্ষকেই তাৎক্ষণিক সুবিধা দেয়। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে মক্কা চুক্তি আরও ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের কল্যাণে হয়তো ইসরায়েলের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে, কিন্তু সেই অস্ত্র ব্যবহারের কোনো আঞ্চলিক বৈধতা তাদের নেই। তারপরও এ যুদ্ধগুলো তাদের সামরিক উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। নেতানিয়াহু আর ট্রাম্প পুরো উপসাগরকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছেন। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধের উপক্রম।

গাজা ও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল দীর্ঘ মেয়াদে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে বড় ধরনের অবকাঠামো তৈরি করছে। কোনো ফ্রন্ট থেকেই পিছু হটার লক্ষণ নেই। হামাস আর হিজবুল্লাহকে নিশ্চিহ্ন করার সামরিক লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় ও ট্রাম্পের চাপ সামলাতে গিয়ে ইসরায়েল কেবল নিজের অবস্থান কাঁটাতারে ঘিরেই শক্ত করছে।
এমন পরিস্থিতিতে আরব বিশ্ব সুরক্ষার জন্য এবং সমাধানের জন্য মক্কা জোটের দিকেই তাকিয়ে থাকবে।

* ডেভিড হার্স্ট, মিডল ইস্ট আইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক। মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।

মক্কায় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরের পর সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (মাঝে), তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান (বাঁয়ে) এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ৭ আগস্ট ২০২৬।
মক্কায় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরের পর সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (মাঝে), তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান (বাঁয়ে) এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ৭ আগস্ট ২০২৬। ছবি: এএফপি

Wednesday, August 19, 2026

সিরিয়ায় হামলাকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের উত্তেজনার শঙ্কা

সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলাকে কেন্দ্র করে তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন সিরিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত থমাস বারাক। মঙ্গলবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সিরিয়ার কোনো সামরিক ঘাঁটিতে এ ধরনের হামলা হলে সেখানে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়তে পারে।

এর আগে মঙ্গলবার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি বাহিনী হামলা চালায়। রানওয়ে সংস্কারের কাজ দেখতে তুরস্কের একটি সামরিক প্রতিনিধিদল ঘাঁটিটি পরিদর্শনের পরই হামলা চালানো হয়। ইসরায়েলের দাবি, সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের সুযোগ ভালোভাবে নিচ্ছে না তারা। এর প্রতিক্রিয়ায় হামলা হয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে ইসরায়েল।

এ বিষয়ে মার্কিন বিশেষ দূত থমাস বারাক বলেন, হামলার আগে তুরস্ককে সতর্ক করা হয়নি। ফলে প্রতিক্রিয়া হিসেবে তুরস্ক ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সময়ে সিরিয়ার দারা অঞ্চলের একটি গ্রামের কাছে গোলাবর্ষণের খবরও পাওয়া গেছে।

মার্কিন এই দূত বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইসরায়েল, সিরিয়া ও তুরস্কের মধ্যে একটি সমন্বয় বা ‘ডিকনফ্লিকশন’ ব্যবস্থা জরুরি। ভবিষ্যতে ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। তার মতে, এই মুহূর্তে উত্তেজনা কমানো এবং আরও সংযত পদক্ষেপের সুযোগ তৈরি করাই অগ্রাধিকার।

এর আগে আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরায়েলি হামলার খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বারাক এটিকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি’ বলে মন্তব্য করেন।

এরপর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে হামলার বিষয়টি কার্যত নিশ্চিত করে। বিবৃতিতে বলা হয়, নিরাপত্তা বিষয়ে ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে একটি বিদ্যমান অবস্থান বজায় রাখার সমঝোতা ছিল। কিন্তু সিরিয়া আলেপ্পোর কাছে একটি বিমানঘাঁটিতে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের সুযোগ দিয়ে সেই অবস্থান প্রায় লঙ্ঘন করেছে।

ইসরায়েলের দাবি, এ ধরনের তুর্কি মোতায়েন তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে এবং সিরিয়াকে এ বিষয়ে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল। তবে সিরিয়া সতর্কতা উপেক্ষা করায় ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মেনে নেবে না বলে জানিয়েছে।

রাতে সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত আবু আল-দুহুর সামরিক বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চারটি বিমান দিয়ে ঘাঁটির রানওয়ে ও সংরক্ষণাগার লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। সিরিয়া এ হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করেছে।

সিরিয়ার একটি সামরিক সূত্র ও স্থানীয় এক বাসিন্দা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-আরাবি আল-জাদিদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রানওয়ে সংস্কারের কাজ দেখতে তুরস্কের একটি সামরিক প্রতিনিধিদল ঘাঁটিটি পরিদর্শনের পরই হামলা চালানো হয়।

আবু আল-দুহুর ঘাঁটি সারাকিবের প্রায় ১৭ মাইল পূর্বে অবস্থিত। ইদলিব, হামা ও আলেপ্পো এই তিন অঞ্চলের মধ্যবর্তী কৌশলগত অবস্থানে থাকা ঘাঁটিটি উত্তর সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোর একটি।

তুরস্ককে ঘিরে ইসরায়েলের উদ্বেগ

তুরস্কের সহায়তায় বিমানঘাঁটিটির বড় ধরনের সংস্কার এবং সেখানে সম্ভাব্য তুর্কি সামরিক উপস্থিতি ইসরায়েলের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ওই এলাকায় ইসরায়েলের আকাশ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই হামলাটি চালানো হয়ে থাকতে পারে।

তবে ইসরায়েল তুরস্ক বা সিরিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না। একই সঙ্গে ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে নিজেদের আকাশসীমায় সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখাকে ইসরায়েল গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে।

এ অবস্থায় সিরিয়ায় ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা এবং তুরস্কের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনার ঝুঁকি তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন তিন দেশের মধ্যে সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তুলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। 

শারা, নেতানিয়াহু ও এরদোয়ান। ছবি: সংগৃহীত
শারা, নেতানিয়াহু ও এরদোয়ান। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে ট্রাম্পকে এরদোয়ানের আহ্বান

ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে দেশটির সঙ্গে আলোচনার পথে এগোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে শান্তি প্রচেষ্টায় আঙ্কারার সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। খবর রয়টার্সের।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় এরদোয়ান এ আহ্বান জানান বলে জানিয়েছে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়।

এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা নিরসনে কূটনীতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন এরদোয়ান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং তুরস্ক শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করে যাবে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে সাময়িক সমঝোতা হলেও স্থায়ীভাবে সংঘাত বন্ধের আলোচনা সাম্প্রতিক সময়ে থমকে গেছে। সোমবার এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, আলোচনা থেকে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না আসায় ইরান সামরিকভাবে পুরোপুরি আক্রমণাত্মক অবস্থানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

একই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টাতেও অগ্রগতি থেমে গেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের শুরু থেকেই তুরস্ক যুদ্ধের বিরোধিতা করে আসছে। একই সঙ্গে ইরানের হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ারও নিন্দা জানিয়েছে আঙ্কারা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং পাকিস্তান ও কাতারের মতো মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে তুরস্ক নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী রয়েছে তুরস্কের এবং দেশটির সঙ্গে ইরানের সরাসরি সীমান্ত রয়েছে। ফলে চলমান সংঘাতের প্রভাব নিয়ে আঙ্কারার বিশেষ কৌশলগত উদ্বেগ রয়েছে।

এরদোয়ানের ফোনালাপের এক দিন আগে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং যুদ্ধবিরতি অব্যাহত রাখার বিষয়েও আলোচনা করেন।

ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ছাড়াও গাজা যুদ্ধ এবং সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি সই হওয়া প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়েও আলোচনা করেন এরদোয়ান।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ওই চুক্তিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য শক্ত অবস্থানের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন। গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়।

গাজা পরিস্থিতি নিয়েও ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেন এরদোয়ান। তিনি বলেন, ট্রাম্পের ঘোষিত গাজা শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের হামলা বেড়েছে।

তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরেই গাজায় যুদ্ধ বন্ধ এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। 

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : রয়টার্স
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : রয়টার্স

Sunday, August 16, 2026

ট্রাকে চড়ে, সামরিক বিমানে চড়ে তুরস্ক ত্যাগের আগে কী কী করেছিলেন ট্রাম্প, মানসিক অবস্থাই-বা কেমন ছিল

তুরস্কে গত মাসে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন মঞ্চে উঠছিলেন, ততক্ষণে তাঁকে গোপনে দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছিল।

ওই দিন (ন্যাটো সম্মেলনের শেষ দিনে, ৮ জুলাই) সকালেই মার্কিন কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে একটি উদ্বেগজনক তথ্য নিয়ে আসেন। ইরানিরা জানত, আঙ্কারার কোন বিলাসবহুল চেইন হোটেলে ট্রাম্প অবস্থান করছিলেন। তুরস্কের রাজধানীতে তাঁর মোটর শোভাযাত্রা কীভাবে চলাচল করছে, সে সম্পর্কেও তারা অবগত ছিল।

মার্কিন কর্মকর্তারা সিএনএনের কাছে দাবি করেছেন, ইরান ট্রাম্পকে হত্যা করার পরিকল্পনায় অনড় ছিল। এমনকি তারা এয়ারফোর্স ওয়ান বিমানটিকে ভূপাতিত করার জন্য কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করার ছক কষছিল।

তুরস্কের রাজধানীতে ট্রাম্পের নিরাপত্তা ও যাতায়াতের খুঁটিনাটি তথ্য ইরান যেভাবে জোগাড় করেছিল, তা তাঁর পুরো দলকে আতঙ্কিত করে তোলে। যদিও কিছু মার্কিন কর্মকর্তা মনে করেছিলেন, অত্যন্ত সুরক্ষিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্পকে হত্যার ইরানিদের চেষ্টা সফল হওয়াটা অসম্ভব।

একজন কর্মকর্তা জানান, ইসরায়েলি সরকার ইরানের এ সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টার গোয়েন্দা তথ্য মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সঙ্গে ভাগাভাগি করেছিল। তবে সিআইএ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ইসরায়েলের এই গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে সন্দিহান ছিলেন।

সিআইএর কয়েকজন কর্মকর্তা এ তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ইরান আদৌ এ ধরনের হামলা চালানোর ক্ষমতা রাখে কি না, তা নিয়েও তাঁরা সন্দিহান ছিলেন বলে ওই কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান।

তা সত্ত্বেও এ তথ্য পাওয়ার পর মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে সতর্কতা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়া মার্কিন কর্মকর্তারা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ট্রাম্পের ওপর তিনটি পৃথক হত্যাচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তার ওপর ইরানের এই ক্রমাগত হুমকির কারণে তাঁর নিরাপত্তা দল সব সময়ই একধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে ছিল।

তাই বিষণ্ন মুখে এবং বাঁ হাতে একটি ফোল্ডার ধরে ট্রাম্প নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দুই ঘণ্টা দেরিতে সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন। সেখানে তিনি সম্মেলনটিকে একটি বড় সাফল্য বলে ঘোষণা করেন। তবে আগের দিনের মতোই ট্রাম্পের কথাবার্তায় ইরান তাঁকে হত্যা করার যে চেষ্টা করছে, তা নিয়ে একধরনের দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠছিল।

ট্রাম্পের পাশে এ সময় মন্ত্রিসভার তিনজন সদস্য এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে ছিলেন। ট্রাম্প বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের জীবন অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ একটি পেশা।’

কয়েক মিনিট পরই ট্রাম্প মঞ্চ ত্যাগ করেন। তাঁর মোটর শোভাযাত্রাটি আঙ্কারা বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হয়। এটি প্রেসিডেন্ট কমপ্লেক্স ত্যাগ করার ঠিক চার মিনিট পর একটি সাদা রঙের ক্যাটারিং ট্রাক এসে এয়ারফোর্স ওয়ান বিমানের পাশে থামে।

হুমকি মূল্যায়ন ও নতুন কৌশল

প্রেসিডেন্টকে কীভাবে নিরাপদে দেশ থেকে বের করে নেওয়া যায়, তা নিয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের একটি ছোট দল দিনভর ব্যস্ত ছিল। কর্মকর্তারা জানান, তাঁরা সকাল ও বিকেলজুড়ে তুরস্কের বিভিন্ন বিকল্প নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখেন। এ সময় ট্রাম্প বিশ্বনেতাদের সঙ্গে একের পর এক বৈঠক করছিলেন এবং কর্মকর্তারা তাঁকে প্রতিমুহূর্তের খবরাখবর জানাচ্ছিলেন।

দীর্ঘ আলোচনার জন্য কর্মকর্তাদের হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল না। ৮ জুলাই সন্ধ্যায় ট্রাম্পের তুরস্ক ত্যাগ করার কথা ছিল। এই সুনির্দিষ্ট হুমকির বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই তাঁর রওনা হওয়ার সূচি নির্ধারিত ছিল।

আঙ্কারার কারুকার্যখচিত ও অত্যন্ত সুরক্ষিত বেশতেপে প্রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সের ছোট ছোট কক্ষে বসে এ পরিকল্পনা করা হয়। ট্রাম্পের পৌঁছানোর আগেই তুরস্কে চলে এসেছিলেন মার্কিন জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। তিনি সিক্রেট সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের এক করেন এবং একটি জরুরি পরিকল্পনা সাজান।

কর্মকর্তারা হুমকির ধরনসহ বেশ কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখছিলেন। ইসরায়েল প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছিল, ইরান তার সহযোগীদের ব্যবহার করে ট্রাম্পকে হত্যার জন্য একটি নতুন পরিকল্পনা করছে। তবে এ তথ্য ছিল বেশ অস্পষ্ট। ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা সে সময় এক সংবেদনশীল পর্যায়ে ছিল। তাই কিছু কর্মকর্তা মনে করেছিলেন, এটি হয়তো ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার একটি চেষ্টা হতে পারে।

এ বিষয়ে অবগত তিনটি মার্কিন সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্পের এ সফরের আগে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যে ইরানের নতুন কোনো নির্দিষ্ট হত্যা পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। এর পরিবর্তে কর্মকর্তারা বিষয়টিকে ইরানের বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে ট্রাম্পের মৃত্যুর জন্য ক্রমাগত আহ্বান জানানোর সাধারণ ঘটনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

ট্রাম্পকে নিশানা করার এ ইচ্ছা কেবল ইরানের নেতৃত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের আগের সপ্তাহে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। কয়েক দিন ধরে চলা সেই জানাজায় অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের হাতেও ট্রাম্পকে হত্যা করার আহ্বান–সংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা গিয়েছিল।

একজন মার্কিন কর্মকর্তার মতে, শীর্ষ সম্মেলন শুরুর পর মার্কিন গোয়েন্দাদের কাছে আরও তথ্য আসতে শুরু করে। এতে বিমানবন্দর এলাকার কাছাকাছি কোনো স্থান থেকে উড্ডয়নের সময় এয়ারফোর্স ওয়ান লক্ষ্য করে ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কার কথা বলা হয়।

কিছু কর্মকর্তার কাছে এই আশঙ্কা একটু অতিরঞ্জিত মনে হয়েছিল। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এবং তুরস্কের সঙ্গে ইরানের ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের নিরাপত্তা ছিল নজিরবিহীনভাবে কঠোর। বিশ্বনেতাদের অন্যান্য সম্মেলনের চেয়েও এখানে অনেক বেশি নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

আঙ্কারাজুড়ে হাজার হাজার তুর্কি নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিল। প্রায় প্রতিটি রাস্তার মোড়ে বসানো হয়েছিল অস্থায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা। শীর্ষ সম্মেলনস্থল এবং বিমানবন্দরকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছিল বহুমাত্রিক নিরাপত্তাবলয়। এই বিমানবন্দর দিয়েই ন্যাটোর ৩২টি সদস্যদেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরা যাতায়াত করছিলেন।

কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার এ তথ্য ঠিক কোথা থেকে এসেছে, তা স্পষ্ট নয়। মার্কিন এবং আঞ্চলিক কর্মকর্তারা পরে জানান, প্রেসিডেন্টের প্রস্থানের পর কোনো সন্দেহভাজন উগ্রবাদীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণও পাওয়া যায়নি।

তবু সিক্রেট সার্ভিস মনে করেছিল, সময় কম থাকলেও এই সম্ভাব্য ঝুঁকিকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। একজন মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘হুমকিটি এতটাই গুরুতর ছিল যে সেদিন আমাদের চরম কিছু পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল। পরিস্থিতি তেমন না হলে আমরা কখনোই এ পদক্ষেপগুলো নিতাম না।’

এ বিষয়ে অবগত দুটি সূত্র জানায়, কিছু নিরাপত্তা কর্মকর্তা মনে করেছিলেন, ট্রাম্পকে তুরস্ক থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় ছিল সকালেই গোপনে দেশ ত্যাগ করা, যখন ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি প্রথম শনাক্ত হয়।

তবে সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়া হয়। ট্রাম্প তাঁর পূর্বনির্ধারিত সূচি বজায় রাখেন। তিনি সংবাদ সম্মেলন ডাকার আগে ইউক্রেন ও সিরিয়ার নেতার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও করেন।

তবে এটি স্পষ্ট ছিল, এই জীবননাশের হুমকি তাঁর ওপর একধরনের মানসিক চাপ তৈরি করছিল। ন্যাটোর মহাসচিবের সঙ্গে এক সকালের বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ‘আজ সকালে আমি একটি বিষয় লক্ষ করলাম। আমি তাদের সব তালিকার শীর্ষে রয়েছি। এ পর্যন্ত মনে হচ্ছে, আমি কিছুটা ভাগ্যবান। কিন্তু ভাগ্য হয়তো সব সময় সহায় থাকে না।’

খাবার সরবরাহের ট্রাকের আড়ালে ছদ্মবেশ

যখন সিক্রেট সার্ভিস, হোয়াইট হাউস এবং সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে গোপনে দেশ থেকে বের করার পরিকল্পনা করছিলেন, তখন ট্রাম্প নিজেও একটি ভিন্ন চেষ্টায় ব্যস্ত ছিলেন। তিনি তুরস্কে আসতে যে ৪০ কোটি ডলার মূল্যের জাম্বো জেট বিমানটি ব্যবহার করেছিলেন, সেটি কেন ফেরতযাত্রায় ব্যবহার করছেন না, তার একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা তাঁকে দাঁড় করাতে হতো।

কাতার থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া বোয়িং ৭৪৭ উড়োজাহাজটি প্রেসিডেন্টের কাছে অত্যন্ত গর্বের বিষয় ছিল। তবে কিছু কর্মকর্তা গোপনে ইরানের প্রতিবেশী দেশে এই বিমানে করে ভ্রমণ করার বিষয়ে আগে থেকেই বেশ শঙ্কিত ছিলেন।

ওয়াশিংটন থেকে ফ্লাইটটি সফলভাবেই তুরস্কে অবতরণ করে। ট্রাম্প নিজের পছন্দের রঙে সাজানো নতুন উড়োজাহাজটি নিয়ে বেশ গর্বিত ছিলেন। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি আনন্দের সঙ্গে উড়োজাহাজটি দেখান। ট্রাম্প টারমাকে দাঁড়িয়ে তাঁর সমকক্ষ এরদোয়ানকে বলেছিলেন, তাঁর পুরোনো বিমানটি এখন কেবল একটি ‘ব্যাকআপ’ হিসেবে রয়েছে।

তবে এর এক দিন পরই নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেন, ট্রাম্পকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য নতুন বিমান বা অতি পরিচিত হালকা নীল ও সাদা রঙের পুরোনো মডেল—কোনোটিই নিরাপদ হবে না। ট্রাম্প দ্রুত বুঝতে পারেন, বিশ্বসেরা বলে দাবি করা তাঁর সাধের বিমানটি কেন ফেরতযাত্রায় ব্যবহার করা হচ্ছে না, তা নিয়ে মানুষ অপ্রীতিকর প্রশ্ন তুলতে পারে।

বেলা ৩টা ৪২ মিনিটে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে বসার ঠিক আগে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। তিনি লেখেন, কাতার থেকে পাওয়া নতুন উড়োজাহাজটি যুক্তরাজ্যের একটি বিমানঘাঁটিতে পাঠানো হচ্ছে, যাতে সেখানকার সেনারা এটি ঘুরে দেখার সুযোগ পান।

ট্রাম্প আরও লিখেছেন, ‘সবাই দারুণ উত্তেজিত। আমরা ভাবলাম, প্রথম সুযোগটি সেনারাই পাক।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, তিনি নিজে পুরোনো বিমানটিতে করে ফিরে যাচ্ছেন।

বাস্তবে ট্রাম্প কোনো উড়োজাহাজেই ফিরছিলেন না। তাঁর উপদেষ্টারা এবং সিক্রেট সার্ভিস মিলে এক চতুর ছদ্মবেশের পরিকল্পনা করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সুরক্ষার জন্য কৌশলটি আগে থেকেই তাদের গোপন নীতিমালায় ছিল।

সিক্রেট সার্ভিসের যোগাযোগপ্রধান অ্যান্টনি গুগলিয়েলমি বলেন, ‘মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস যেকোনো জায়গায় আমাদের সুরক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য রিয়েল-টাইমে সব ধরনের তথ্য বিশ্লেষণ করে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রেসিডেন্টের ওপর হওয়া হত্যাচেষ্টা এবং উল্লেখযোগ্য হুমকি বৃদ্ধির কারণে আমরা আমাদের মিশন সফল করতে সব সময় অনড় রয়েছি।’

এই চতুর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ট্রাম্পকে প্রথমে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান বিমানে চড়তে হয়েছিল। এরপর তাঁকে বিমানের মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকে দ্রুত হেঁটে অন্য পাশের একটি বিকল্প বহির্গমন পথ দিয়ে বের করে নেওয়া হয়, যেখানে একটি সাদা রঙের খাবার সরবরাহের (ক্যাটারিং) ট্রাক অপেক্ষা করছিল।

তুর্কি এয়ারলাইনসের সুস্বাদু খাবারের বেশ সুনাম রয়েছে। বিমানের কেবিন ক্রুরা শেফের টুপি ও সাদা জ্যাকেট পরে ঐতিহ্যবাহী নানা খাবার পরিবেশন করেন। বিমানের এই খাবারগুলো সাধারণত হাইড্রোলিক ট্রাকের মাধ্যমে উড়োজাহাজে ওঠানো হয়।

তবে এ বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তি জানান, এবার নির্দিষ্ট সময়ে ক্যাটারিং ট্রাকটি পুরোপুরি খালি ছিল। মার্কিন কর্মকর্তারা ওই দিন সকালেই ঠিক কী কাজে লাগবে, তা বিস্তারিত না জানিয়েই গোপনে ট্রাকটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন।

আগে থেকেই পরিষ্কার করে রাখা ট্রাকের ভেতরের খালি বাক্সে ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন তাঁর সার্বক্ষণিক ব্যক্তিগত সহকারী নাটালি হার্প। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ওভাল অফিসের বর্তমান অপারেশন ডিরেক্টর ও একসময়ের বিশ্বস্ত বডিগার্ড ওয়াল্ট নাউটা এবং হোয়াইট হাউসের পার্সোনেল প্রধান ড্যান স্কাভিনো, যিনি কয়েক দশক ধরে ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করছেন। এ ছাড়া ট্রাম্পের সুরক্ষায় কয়েকজন সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্টও সেই ট্রাকের কনটেইনারের ভেতরে ছিলেন।

সবাই ট্রাকে ওঠার পর স্যুট পরা একজন সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট সামনের কেবিনে চালকের পাশের আসনে বসেন। এরপর টারমাক পেরিয়ে মাত্র ১৬২ সেকেন্ড ড্রাইভ করে ট্রাকটি ট্রাম্পকে নিয়ে অপেক্ষাকৃত ছোট একটি সি-৩২এ বিমানের পাশে গিয়ে থামে।

খাবার সরবরাহের এই ট্রাকে কারা কারা চড়বেন, তা ঠিক কীভাবে ঠিক করা হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। পরে যুক্তরাজ্যের মিল্ডেনহল বিমানঘাঁটির উদ্দেশে রওনা হওয়া এই সি-৩২এ সামরিক বিমানে ট্রাম্পের সঙ্গে যোগ দেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।

বড় উড়োজাহাজেই রয়ে যান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তাঁদের সঙ্গে ট্রাম্পের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সহযোগীও ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শীর্ষ নীতি উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার, যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেং, স্টাফ সেক্রেটারি উইল শার্ফ, উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল নিধাম এবং ডেপুটি চিফ অব স্টাফ রিচার্ড ওয়াল্টার্স।

জনসংখ্যা ও অগ্রবর্তী দলের অন্য স্টাফরাও বড় উড়োজাহাজেই অবস্থান করছিলেন। তাঁদের অনেকেই জানতেন না, ট্রাম্প সামনের কেবিনে নেই এবং আসলে তিনি এই উড়োজাহাজের যাত্রীই নন। তাঁদের সবাইকে উড়োজাহাজের পর্দা টেনে রাখতে বলা হয়েছিল।

সাবেক সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট ও সিএনএনের বিশ্লেষক জনাথন ওয়াক্রো বলেন, প্রেসিডেন্টের যাতায়াতের সময় সিক্রেট সার্ভিসের পক্ষে এমন বিভ্রান্তিকর কৌশল নেওয়া নতুন কিছু নয়। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার জন্য প্রায় সময়ই এমন মেকি বা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রেসিডেন্ট যখন কোনো হেলিকপ্টারে ওঠেন, তখন একই রকম তিনটি হেলিকপ্টার আকাশে ওড়ে, যাতে সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে চিহ্নিত করা না যায়।’

ট্রাম্প অবশ্য চলতি সপ্তাহে সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন, তুরস্ক ছাড়ার সময় আসলে তাঁর প্রধান উড়োজাহাজটিই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিল। যদিও সেখানে তাঁর না থাকার কথা কেউ জানতেন না। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা যে দুটি বিমানকেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছিলেন, তার প্রমাণ মেলে আরেকটি পদক্ষেপে। তুরস্কের আকাশসীমা পার না হওয়া পর্যন্ত দুটি বিমানের সুরক্ষার্থে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে কাতার থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া বোয়িং ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজ। ছবির বাঁয়ে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তাবহর দেখা যাচ্ছে
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে কাতার থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া বোয়িং ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজ। ছবির বাঁয়ে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তাবহর দেখা যাচ্ছে

Monday, August 10, 2026

তুরস্কের পিকেকে নিরস্ত্রীকরণ বিলে কারাবন্দি কুর্দি নেতার সমর্থন

তুরস্কে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি বা পিকেকের সাবেক যোদ্ধাদের বেসামরিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাবিত একটি বিলের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন কারাবন্দি কুর্দি নেতা সালাহউদ্দিন দেমিরতাশ। তুরস্কের পার্লামেন্টে বিলটি নিয়ে ভোট হওয়ার একদিন আগে রোববার (৯ আগস্ট) তিনি এ সমর্থন জানান।

২০১৬ সাল থেকে কারাগারে থাকা দেমিরতাশ কুর্দিপন্থি পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (এইচডিপি) সাবেক সহসভাপতি। রাজনীতি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে গেলেও তিনি এখনো তুরস্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কুর্দি নেতা হিসেবে বিবেচিত।

দেমিরতাশ বলেন, প্রস্তাবিত আইনটি তুরস্ক ও পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য বিভেদ তৈরি করা, রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া বা কোনো ফলহীন আলোচনা চালিয়ে যাওয়া নয়।

পিকেকে ও তুরস্কের মধ্যে ১৯৮৪ সাল থেকে চলা সংঘাতে ৪০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। কুর্দিদের স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করা পিকেকেকে তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

পার্লামেন্টের বিচারবিষয়ক কমিটি শুক্রবার বিলটি অনুমোদন করেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, পিকেকের সাবেক যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত ও সাজা কার্যকর পাঁচ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত স্থগিত রাখা হতে পারে। ওই সময়ের মধ্যে তারা নতুন কোনো অপরাধে জড়ালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর কোনো নতুন অপরাধ না হলে মামলাগুলো বন্ধ এবং সাজা শেষ হয়েছে বলে বিবেচনা করা হবে। কার্যত এটি সাধারণ ক্ষমার মতো সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডসহ কিছু গুরুতর অপরাধ এই সুবিধার আওতায় থাকবে না। ২০০৫ সালের ১ জুনের আগে সংঘটিত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধও এর বাইরে রাখা হয়েছে।

পিকেকের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ ওজালানের বিষয়টিও এই বিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ১৯৯৯ সাল থেকে মারমারা সাগরের ইমরালি দ্বীপের কারাগারে বন্দি ওজালান প্রস্তাবিত আইনকে দীর্ঘদিনের সংঘাত সমাধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ক্ষমতাসীন একে পার্টি, তাদের জাতীয়তাবাদী মিত্র এমএইচপি ও কুর্দিপন্থী ডিইএম পার্টি এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছে।

এর আগে গত বছর ওজালান পিকেকেকে কংগ্রেস ডেকে অস্ত্র ত্যাগ ও সংগঠনটি বিলুপ্ত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কয়েক দশকের সংঘাতের অবসানের প্রচেষ্টায় তার ওই আহ্বানকে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হয়।

সূত্র: শাফাক নিউজ 

কারাবন্দি কুর্দি নেতা সালাহউদ্দিন দেমিরতাশ। ছবি: সংগৃহীত
কারাবন্দি কুর্দি নেতা সালাহউদ্দিন দেমিরতাশ। ছবি: সংগৃহীত

Sunday, August 9, 2026

‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ ইরানকে লক্ষ্য করে নয়—তুরস্কের আশ্বাস, সৌদিকে সতর্ক করল তেহরান

আল–জাজিরাঃ সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি ইরানকে লক্ষ্য করে করা হয়নি বলে জোর দিয়ে বলেছেন তুরস্কের নেতারা।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গতকাল শনিবার বলেছেন, চুক্তিতে ইরান কিংবা অন্য কোনো দেশকে অভিন্ন হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।

গত শুক্রবার ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে সই করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।

চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে হাকান ফিদান বলেন, ‘আমরা লিখিতভাবে কোনো অভিন্ন হুমকির কথা উল্লেখ করিনি।’ তাঁর বক্তব্য, চুক্তিতে সই করা দেশগুলোর কোনো একটির ওপর হামলা না করা কোনো দেশকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।

আর্টিকেল ৫-এর আদলে অঙ্গীকার

ফিদানের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি ‘কারিগরিভাবে’ ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর সঙ্গে তুলনীয়। ন্যাটোর এ যৌথ প্রতিরক্ষা ধারায় কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সই হওয়া চুক্তি অনুযায়ী, এ ধরনের হামলার জবাব কেমন হবে, তা নির্ভর করবে পরিস্থিতির ওপর।

চুক্তি অনুযায়ী, কোনো দেশ আক্রান্ত হলে প্রথমে তাকে সহায়তার অনুরোধ জানাতে হবে। একই সঙ্গে কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, সেটিও নির্দিষ্ট করতে হবে। সেই সহায়তার পরিধি গোয়েন্দা তথ্য ও রসদ সরবরাহ থেকে শুরু করে গোলাবারুদ কিংবা সামরিক ইউনিট মোতায়েন পর্যন্ত হতে পারে।

নতুন জোটের আওতায় রাজনৈতিক ও সামরিক কমিটিও গঠিত হবে। এসব কমিটিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক বাহিনীর প্রধানেরা থাকবেন। সৌদি আরবে থাকবে একটি সচিবালয়।

তিন দেশ যৌথ প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, রসদ সরবরাহ, হুমকি মূল্যায়ন ও সামরিক সক্ষমতার পারস্পরিক সমন্বয় নিয়ে কাজ করবে বলে জানান ফিদান।

প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতাও চুক্তিটির গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। মক্কায় তিন নেতার আলোচনায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। এর মধ্যে ছিল, একে অপরের সামরিক প্রযুক্তি থেকে কীভাবে দেশগুলো সুবিধা নিতে পারে, সেই প্রশ্নও।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, চুক্তিটির প্রস্তুতি চলছিল প্রায় দুই বছর আট মাস ধরে। অর্থাৎ ইরানকে ঘিরে বর্তমান উত্তেজনার জেরে হঠাৎ করে চুক্তিটি তৈরি করা হয়নি, ফিদানের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিতই পাওয়া যায়।

ইরানের আপত্তি

তুরস্কের আশ্বাসের পরও ইরানের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা এই চুক্তির সমালোচনা করেছেন। সেই সঙ্গে নিরাপত্তার জন্য নতুন মিত্রদের ওপর নির্ভর না করতে সৌদি আরবকে সতর্ক করেছেন তাঁরা।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক কমিটির সদস্য মাহমুদ নাবাবিয়ান বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা সৌদি আরবের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে না। সৌদি নেতাদের বিষয়টি বুঝতে হবে।

একই কমিটির আরেক সদস্য ইব্রাহিম রেজায়িও এ চুক্তিকে অবাস্তব বা শুধুই ‘কাগুজে চুক্তি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সরাসরি এ চুক্তির কথা উল্লেখ করেননি। তবে তিনি আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিজেদের ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানিয়েছেন। একে তিনি ‘প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব’ বলে বর্ণনা করেন।

একই সঙ্গে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি ও প্রস্তুতির কথা জোরালোভাবে তুলে ধরেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

জোটের পরের সদস্য হতে পারে মিসর

ফিদানের বক্তব্যে চুক্তিটিকে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের হাতে নেওয়ার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

আনাদোলুকে ফিদান বলেন, ‘বাইরের কোনো শক্তি এ অঞ্চলে এসে আধিপত্য বিস্তার করলে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং তা আরও জটিল হয়ে ওঠে।’

ফিদান তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে এ উদ্যোগের ‘মূল দেশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছেন, আঙ্কারা এ ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করতে চায়।

ফিদান বলেন, ‘আমাদের প্রেসিডেন্টের ভাবনা অনুযায়ী, আমাদের তিনটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। আমাদের পরিধি বাড়াতে হবে এবং প্রয়োজনে সব দেশকে এ ছাতার নিচে আনতে হবে।’

ফিদানের ভাষ্য, ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ এ উদ্যোগে আগ্রহ দেখিয়েছে। তাঁর আশা, ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে বর্ণনা করা মিসরও যোগ দেবে। তবে তার আগে কিছু কারিগরি বিষয়ের নিষ্পত্তি করতে হবে।

এ মুহূর্তে চুক্তির বাস্তব প্রয়োগের অনেক বিষয়ই চূড়ান্ত নয়। সংকটকালে তিন দেশের সামরিক বাহিনী কীভাবে সমন্বয় করবে, সেটিও এর মধ্যে রয়েছে।

তবে চুক্তিতে পরিকল্পিত কমিটি, স্থায়ী সচিবালয় এবং সামরিক সক্ষমতার পারস্পরিক সমন্বয় ও প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব—সব মিলিয়ে এ ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে, এটি শুধু পারস্পরিক প্রতিরক্ষার ঘোষণায় সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা নেই।

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের নেতারা সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে ত্রিপক্ষীয় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সইয়ের পর কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছবি তোলেন। ৭ আগস্ট, ২০২৬
তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের নেতারা সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে ত্রিপক্ষীয় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সইয়ের পর কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছবি তোলেন। ৭ আগস্ট, ২০২৬ ছবি: তুরস্কের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের প্রেস অফিস/এএফপি

Saturday, August 8, 2026

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আঞ্চলিক শক্তির জন্ম দেবে ‘মক্কা চুক্তি’?

এটি ছিল ঐতিহাসিক ঘোষণা। শুক্রবার তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। গত বছর রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে হওয়া একই ধরনের একটি চুক্তির ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই নতুন এই প্রতিরক্ষা জোট গড়ে উঠেছে।

‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স প্যাক্ট’ নামে পরিচিত এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, এই চুক্তি এমন একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক জোটের সূচনা করতে পারে, যা ইসরাইল ও ইরানের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকবে এবং উভয় দেশের ব্যাপারেই সতর্ক থাকবে।

আঞ্চলিক হুমকির মুখে শক্তি ও ঐক্যের বার্তা দিতে চাইলেও তিন দেশই চুক্তিটিকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সতর্ক রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তিন দেশই আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের অযথা উসকে না দেয়ার ব্যাপারে সতর্ক। পাশাপাশি, জোটের কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য দুই দেশ ঠিক কতটা বাধ্যতামূলকভাবে সামরিকভাবে পাশে দাঁড়াবে, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।

কিলোয়েন গ্রুপের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হারলান উলম্যান আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমরা এখনো মক্কা চুক্তির ঘোষণাটি দেখিনি। আমরা মনে করছি, এতে বলা হয়েছে, একজনের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এখানে “উচিত” শব্দটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর অর্থ এই নয় যে, অবশ্যই (সামরিকভাবে) জড়াতে হবে।’

এই তিন দেশের জন্য হুমকিগুলোও দূরের কোনো বিষয় নয়। গত ফেব্রুয়ারি থেকে পাকিস্তান আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতে জড়িয়ে আছে। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গেও কয়েক দিন ধরে গোলাগুলি বিনিময় করেছে ইসলামাবাদ।

অন্যদিকে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সৌদি আরব তেহরান ও দেশটির মিত্রদের হামলার শিকার হয়েছে একাধিকবার।

তুরস্কও বহু বছর ধরে দেশের ভেতরে ও বাইরে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে লড়াই করে আসছে। ইসরাইলের সঙ্গেও দেশটির উত্তেজনা বেড়েছে। তবে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কীভাবে তিন দেশকে এসব সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে, তা এখনো পরিষ্কার নয় বলে মনে করেন উলম্যান।

তিনি বলেন, ‘ধরা যাক, ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবে হামলা চালাল। তাহলে কি তুরস্ক এতে জড়িয়ে পড়বে? পাকিস্তান কি জড়িয়ে পড়বে? সেটাই এখন দেখার বিষয়।’

বদলে যাচ্ছে আঞ্চলিক সমীকরণ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা গেছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরাইলে হামলা এবং এরপর গাজায় ইসরাইলের চালানো যুদ্ধ ও ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে কয়েক দশকের উত্তেজনাও শেষ পর্যন্ত একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে, যার এখনো অবসান হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য ও এর বাইরের দেশগুলো নতুন বাস্তবতার সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেবে এবং পরবর্তী পর্যায়ের জন্য কীভাবে প্রস্তুত হবে, তা নিয়ে হিসাব-নিকাশ করছে।

পারস্পরিক হুমকির মুখে অনেক দেশই অতীতের মতপার্থক্য পাশে সরিয়ে বাস্তববাদী নীতিকে এগিয়ে নেয়ার পথ বেছে নিচ্ছে। তুরস্ক ও সৌদি আরব এর অন্যতম উদাহরণ। ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পর দুই দেশের মধ্যে গভীর বিরোধ তৈরি হয়েছিল, যা কয়েক বছর স্থায়ী হয়।

তবে ২০২২ সালের মধ্যে রিয়াদ ও আঙ্কারা তাদের পুরোনো মতপার্থক্য অনেকটাই পাশে সরিয়ে রাখে। সৌদি আরব তখন পুরো অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা কমানোর কৌশল অনুসরণ করছিল, আর তুরস্ক অর্থনীতি শক্তিশালী করার দিকে নজর দিচ্ছিল।

এরপর থেকে ইসরাইল ও ইরান মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নে চাপ প্রয়োগ করে আসছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চাপই পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো দেশগুলোকে আরও কাছাকাছি আসতে ভূমিকা রেখেছে।

প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলাই লক্ষ্য

মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হলো তিন দেশের ওপর সম্ভাব্য যেকোনো হুমকি প্রতিহত করার সক্ষমতা তৈরি করা। আল জাজিরার প্রতিবেদক ওসামাহ বিন জাভিদ বলেন, তিন দেশই জোটে ভিন্ন ধরনের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে এসেছে।

তিনি বলেন, ‘প্রতিটি দেশই অনন্য সক্ষমতা নিয়ে এসেছে। পাকিস্তানের রয়েছে যুদ্ধে অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী, বিপুল অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা এবং পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার- মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো দেশের মধ্যে এটিই একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার।’

অন্যদিকে তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো সদস্য হিসেবে বিশ্বমানের ড্রোন প্রযুক্তি ও অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে এসেছে। আর সৌদি আরব দিচ্ছে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক শক্তি।’

যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান প্রশ্নের মধ্যেই নতুন সামরিক জোট ও নতুন ধরনের প্রতিরোধব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়েছে।

সৌদি আরব এবং তুলনামূলকভাবে তুরস্কও দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে বলে মনে করছে বিভিন্ন দেশ। ফলে অনেক দেশই বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুঁজছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান অগ্রাধিকার বলে মনে হচ্ছে। এতে অন্য মার্কিন মিত্রদের প্রয়োজনে ওয়াশিংটন কতটা তাদের রক্ষা করতে প্রস্তুত, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

উলম্যান বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, মিত্রদের নিজেদেরই নিজেদের রক্ষা করতে হবে। আমার কাছে এটা পরিষ্কার যে, আমাদের মিত্ররা অন্যদিকে তাকাচ্ছে।

ইসরাইল ও ইরান- কারা সবচেয়ে বড় হুমকি?

ইসরাইল ও ইরানকে আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে দেখা হলেও মক্কা চুক্তির তিন স্বাক্ষরকারী দেশই সতর্কতার সঙ্গে বলেছে, এই জোট কোনো নির্দিষ্ট বাইরের শক্তিকে লক্ষ্য করে গঠিত হয়নি।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরাইল ও ইরানের কাছ থেকে আসা ঝুঁকি স্পষ্ট। বিন জাভিদ বলেন, তিন দেশের জন্যই ইসরাইল আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় হুমকি। এই হুমকির তালিকায় ইরানের অবস্থানও খুব কাছাকাছি। বিশেষ করে সৌদি আরবের জন্য, তেহরান ওয়াশিংটনের স্বার্থে হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

অঞ্চলের অনেকের মতে, ২০২৩ সালের পর ইসরাইল দেখিয়েছে যে তারা আলোচনার বদলে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে বিরোধ মেটাতেই বেশি আগ্রহী। অথচ একসময় ইসরাইল সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য জোর চেষ্টা চালিয়েছিল।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও সম্প্রতি একটি উদীয়মান ‘সুন্নি অক্ষ’ নিয়ে সতর্ক করতে শুরু করেছেন। তবে তিনি এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেননি।

বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দিতে পারে এবং সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ শক্তিগুলোকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক- তিন দেশেই সুন্নি মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।

অন্যদিকে, ইরান ইতোমধ্যে সৌদি আরবে হামলা চালিয়েছে। ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীও দেশটিতে হামলা করেছে। জবাবে সৌদি আরব ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ওপর ইরাকে হামলা চালিয়েছে।

নতুন সদস্য আসবে?

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে কি না, সেটিও এখনো অনিশ্চিত। মিসর, কাতার, সিরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো দেশগুলো এতে যোগ দিতে পারে কিনা, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

এ ধরনের জোটের সুবিধা অবশ্যই রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিভক্ত। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিভক্তিই ইসরাইল ও ইরানের মতো আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় তাদের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ।

তবে অতীতের বিভক্তি ও ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থের কারণে জোটের সম্প্রসারণ নিশ্চিত নয়।

উদাহরণ হিসেবে সিরিয়ার কথা বলা যায়। দীর্ঘ ১৩ বছরের ভয়াবহ সংঘাতের পর এখন দেশটি যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে মনোযোগ দিচ্ছে। ইসরাইলের উত্তর সীমান্তে সিরিয়ার অবস্থানের কারণে এমন কোনো চুক্তিতে যোগ দিতে দেশটি দ্বিধায় পড়তে পারে, যা ইসরাইলের কাছে নেতিবাচকভাবে বিবেচিত হতে পারে।

মিসরও অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অতীতে আঞ্চলিক নৌপথ ও বাণিজ্যিক জাহাজ সুরক্ষায় সৌদি নেতৃত্বাধীন একটি জোটে যোগ দিতেও মিসর দ্বিধা করেছিল। কারণ, এতে দেশটি আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা ছিল।

সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক জোটের সম্ভাব্য আরেক সদস্য হতে পারে ইউএই। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়েমেনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের অবস্থান এই তিন দেশের থেকে বারবার আলাদা হয়েছে। ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করাও এর একটি বড় উদাহরণ।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য করা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসও এমন একটি আঞ্চলিক বলয় তৈরি করেছে, যা মক্কা জোটের দেশগুলোর তুলনায় ইসরাইলের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত হতে পারে।

সত্যিই কি নতুন ‘অক্ষ’ তৈরি হচ্ছে?

মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সম্পর্ক ও পরিবর্তনশীল সমীকরণ শুক্রবারের চুক্তির পরপরই একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে- এমন ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। গত কয়েক দশকে এই অঞ্চলে জোট ও মিত্রতার সমীকরণ বহুবার বদলেছে। ভবিষ্যতেও তা বদলাতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জোটের প্রকৃত সক্ষমতা বোঝা যাবে তখনই, যখন এটি বাস্তব কোনো সংকটে পরীক্ষার মুখে পড়বে। ইসরাইল ও ইরান ইতোমধ্যে দেখিয়েছে, তারা যুদ্ধে যেতে এবং এর পরিণতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।

কিন্তু সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান কি একে অপরের জন্য একই ধরনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত?

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা তিন দেশকে সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে। আর তখনই তাদের সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে দেবে—সত্যিই কি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল ও ইরানকে ঘিরে বিদ্যমান দুই মেরুর বাইরে তৃতীয় কোনো আঞ্চলিক শক্তির অক্ষ গড়ে উঠছে?

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আঞ্চলিক শক্তির জন্ম দেবে ‘মক্কা চুক্তি’?

Thursday, July 16, 2026

ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টা যেভাবে পাল্টে দিল তুরস্ককে

রাস্তায় ট্যাংকের মহড়া, ভবনের ওপর যুদ্ধবিমানের উড্ডয়ন আর সংসদ ভবনে বোমা হামলা—২০১৬ সালের ১৫ জুলাই এমন এক নজিরবিহীন রাতের সাক্ষী হয়েছিল তুরস্ক। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের আহ্বানে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই সামরিক অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। ওই রাতে ১৮৪ জন বেসামরিক নাগরিকসহ মোট ২৫৩ জন নিহত হন। মাত্র কয়েক ঘণ্টার সেই ঘটনা গত এক দশকে তুরস্কের রাজনীতি, ক্ষমতা এবং পররাষ্ট্রনীতিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।

ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান

তুর্কি সরকারের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইসলামপন্থি ধর্মগুরু ফেতুল্লাহ গুলেনের নেটওয়ার্ক এই অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিল। তবে ২০২৪ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত গুলেন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ওই ঘটনার পর দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়, যা ২০১৮ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল।

এই সময়ে তুরস্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শুদ্ধি অভিযান চালানো হয়। গুলেন নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে হাজার হাজার সেনাসদস্য, বিচারক, পুলিশ, শিক্ষাবিদ ও সরকারি কর্মচারীকে গ্রেফতার বা বরখাস্ত করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় শত শত স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়।

তবে সমালোচকদের দাবি, গুলেনপন্থিদের দমনের নামে এই অভিযান মূলত ভিন্নমত স্তব্ধ করতে ব্যবহার করা হয়েছে।

এরদোয়ানের হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ

ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রভাব ছিল প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। ২০১৭ সালের গণভোটে সামান্য ব্যবধানে সংবিধানে বড় পরিবর্তন আনা হয়। এর মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে শক্তিশালী নির্বাহী রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়ানো হয়।

সমর্থকদের মতে, এই ব্যবস্থা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করেছে।

তবে ফ্রিডম হাউজের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, এতে আইনপ্রণেতাদের ক্ষমতা দুর্বল হয়েছে এবং রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন।

ইস্তানবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক দোগান চেতিনকায়া বলেন, নতুন এই প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থা মূলত খামখেয়ালিপনা ও অস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দ্বারা চিহ্নিত।

শুদ্ধি অভিযানের পর তুরস্কের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বেড়েছে। হাজার হাজার বিচারক-প্রসিকিউটরকে অপসারণ করায় বিচার বিভাগ স্বায়ত্তশাসন হারিয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ২০২৬ সালের রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে তুরস্কের অবস্থান ১৬৩তম। সম্প্রতি প্রেসিডেন্টকে অপমানের অভিযোগে একজন জনপ্রিয় কমেডিয়ানও গ্রেফতার হয়েছেন।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও এর প্রভাব স্পষ্ট। ২০২৫ সালের মার্চে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও ইস্তানবুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুকে দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। ২০২৬ সালের মে মাসে আদালতের আদেশে প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি-এর নেতৃত্বেও হস্তক্ষেপ করা হয়, যাকে বিরোধীরা ‘বিচারিক অভ্যুত্থান’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

তবে সরকারের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতেই এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে।

রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের অবসান

তুর্কি রাজনীতিতে এই ঘটনার অন্যতম বড় ইতিবাচক পরিবর্তন হলো সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। ধারাবাহিক কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীকে দৃঢ়ভাবে সরকারের অধীনে আনা হয়েছে। মিলিটারি একাডেমি ও হাসপাতালগুলো পুনর্গঠন করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক তুর্কি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জনগণ সক্রিয়ভাবে সামরিক হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করেছে, যা রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর অভিভাবকত্বের যুগের অবসান ঘটিয়েছে।

নিরাপত্তাকেন্দ্রিক বৈচিত্র্যময় পররাষ্ট্রনীতি

ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থে উত্তর সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট ও কুর্দি গোষ্ঠী ওয়াইপিজি-র বিরুদ্ধে তিনটি বড় সামরিক অভিযান চালায় আঙ্কারা।

একই সঙ্গে নেটের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তুরস্ক রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে। রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আঙ্কারার বিরোধ তৈরি হয়। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং তুরস্ককে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি থেকে বাদ দেয়। তবে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। অন্যদিকে, ২০১৮ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার বিষয়ে তুরস্কের আলোচনা কার্যত স্থগিত রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টা যেভাবে পাল্টে দিল তুরস্ককে
অভ্যুত্থানচেষ্টাটি মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল, কিন্তু এর পরিণতি গত এক দশকে তুর্কি রাজনীতিকে পুনর্গঠন করেছে। ছবি: বিবিসি

Tuesday, July 7, 2026

ট্রাম্পের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের আগে ন্যাটোর বড় অস্ত্র চুক্তি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে শীর্ষ সম্মেলনের আগে তুরস্কে কয়েক হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর নেতারা। মূলত ইউরোপের প্রতিরক্ষায় নিজেদের ব্যয় বাড়ানোর যে মার্কিন আহ্বান ছিল, তাতে সাড়া দেওয়ার বার্তা দিতেই এ ঘোষণা দেওয়া হয়। গতকাল মঙ্গলবার তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় প্রতিরক্ষাশিল্প ফোরামের এক অনুষ্ঠানে উৎসবমুখর পরিবেশে এসব উদ্যোগের কথা জানান ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুতে। তিনি ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিদের একে একে মঞ্চে ডেকে নেন। এ সময় বড় পর্দায় বিভিন্ন চুক্তির আর্থিক মূল্য প্রদর্শন করা হয়। মার্ক রুতে বলেন, ‘একসঙ্গে কাজ করলে আমরা আরও বেশি কিছু করতে পারি। ন্যাটোর মিত্ররা নতুন বহুজাতিক ক্রয় জোটে যোগ দিচ্ছে। এতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সহজে পাওয়া যাবে।’

সম্মেলনের চমক হিসেবে চুক্তির বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল। এই চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় দেশগুলো মার্কিন কোম্পানি নর্থরপ গ্রুম্যানের কাছ থেকে নজরদারি ড্রোন এবং ন্যাটো জোট সুইডেনের কোম্পানি ‘সাব’–এর কাছ থেকে উড়োজাহাজ কিনবে। এ ছাড়া ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপে যৌথভাবে উৎপাদনের বিষয়ে জার্মানি ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ড্রোন–বিধ্বংসী সক্ষমতা বাড়াতে মিত্ররা ৪ হাজার কোটি (৪০ বিলিয়ন) ডলারের বেশি বিনিয়োগ করবে বলেও ন্যাটো মহাসচিব নিশ্চিত করেছেন।

স্নায়ুযুদ্ধের শুরু থেকে ন্যাটো জোট ইউরোপকে রক্ষা করে এলেও ট্রাম্প প্রায়ই প্রতিরক্ষায় ইউরোপের অপর্যাপ্ত অবদানের সমালোচনা করেন। মার্ক রুতে জানান, রুশ হুমকির ভয় ও ট্রাম্পের জোরালো চাপের কারণে ইউরোপীয়রা তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় ‘বিস্ময়করভাবে’ বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ন্যাটোর ইউরোপীয় দেশগুলো ও কানাডা প্রতিরক্ষায় আরও ৯ হাজার কোটি ডলার বেশি ব্যয় করেছে। সব মিলিয়ে এ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার কোটি ডলারে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি।

এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ও অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা

শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠক করবেন ট্রাম্প। সূত্র বলছে, ট্রাম্প হয়তো তুরস্ককে আবার এফ-৩৫ স্টিলথ ফাইটার কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার অনুমতি দিতে পারেন। ২০১৯ সালে রাশিয়ার এস-৪০০ ব্যবস্থা কেনার পর তুরস্ককে এ কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

এদিকে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালানোর পর ন্যাটোর অভ্যন্তরে উত্তেজনা বেড়েছে। ওই সংঘাতে সমর্থন না দেওয়ায় ট্রাম্প ন্যাটো সদস্যদের কড়া সমালোচনা করেন। তবে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের দাবি, যুদ্ধ নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা না হলেও তাঁরা আকাশসীমা ও ঘাঁটি ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন। ওই যুদ্ধ ইউরোপের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র এখন ইউরোপ থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণাও দিয়েছে। এর মধ্যে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে ট্রাম্পের দ্বন্দ্ব ইউরোপের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

শীর্ষ সম্মেলনে ন্যাটো সদস্যরা এ বছর ইউক্রেনের জন্য সাত হাজার কোটি ইউরো (আট হাজার কোটি ডলার) সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন। এর মধ্যেই সোমবার কিয়েভে রাশিয়ার হামলায় অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন, যা ইউক্রেনে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রকট সংকটের বিষয়টিই নতুন করে সামনে এনেছে।

ন্যাটো নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে আয়োজিত ‘ন্যাটো সামিট ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি ফোরাম’-এ বক্তব্য দিচ্ছেন ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুতে। আঙ্কারা, তুরস্ক। ৭ জুলাই ২০২৬
ন্যাটো নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে আয়োজিত ‘ন্যাটো সামিট ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি ফোরাম’-এ বক্তব্য দিচ্ছেন ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুতে। আঙ্কারা, তুরস্ক। ৭ জুলাই ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

Friday, July 3, 2026

ইস্তাম্বুল যখন ‘ক্যাটস্তাম্বুল’

তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরের বিড়ালপ্রেমের গল্পটা বেশ পুরোনো—সেই অটোমন আমলের। বিড়ালপ্রেম এখনো টিকে আছে। শহরের আনাচকানাচে অগুনতি বিড়ালের উপস্থিতিই তার প্রমাণ। তাই তো বিশ্বজুড়ে বিড়ালপ্রেমীদের কাছে শহরটি আরেক নামে পরিচিত—‘ক্যাটস্তাম্বুল’। আর অনেক ভ্রমণপিপাসুই ইস্তাম্বুলে ছুটে যান শুধু এই বিড়ালের জন্য।

ইস্তাম্বুল তুরস্কের সবচেয়ে বড় শহর, খুব ব্যস্ত। শহরটিতে দেড় কোটি মানুষের পাশাপাশি বসবাস করে আনুমানিক আড়াই লাখ বিড়াল। রাস্তাঘাট, মসজিদ, ক্যাফে ও মেট্রোস্টেশনগুলো—কোথায় দেখা যায় না এই বিড়ালগুলোকে। পর্যটকদের ভালোবাসা পেতেও ছুটে যায় বিড়ালগুলো। তাঁরাও তাই বিড়ালের সঙ্গে নিজেদের ক্যামেরাবন্দী করতে ভোলেন না।

ইস্তাম্বুলে বিড়ালের একটি মিউজিয়াম রয়েছে। মিউজিয়ামটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ফাতিহ দাগলি বলছিলেন বিড়ালের প্রতি তাঁদের ভালোবাসার কথা। তিনি বলেন, শহরের প্রতিটি পৌর এলাকায় রাস্তাঘাটে বেড়ে ওঠা বিড়ালদের জন্য বিনা মূল্যে পশুচিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। আর বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো ছাড়ে বিড়ালের চিকিৎসা দেয়। অনেক সময় চিকিৎসার খরচ জোগান স্থানীয় লোকজনও।

ইস্তাম্বুলের মানুষ বিড়াল পালেন, বেশির ভাগ বিড়াল বেড়ে ওঠে রাস্তাঘাটে। তবে ঘরের কিংবা বাইরের—কোনোটির প্রতি বাসিন্দাদের ভালোবাসার কমতি নেই বলে মনে করেন আলোকচিত্রী মার্সেল হাইজনেন। তাঁর ভাষায়, ইস্তাম্বুলের সব বিড়ালের মালিক শহরের মানুষেরাই। নিজ নিজ এলাকার বিড়ালগুলোর প্রতি তাঁদের যত্নআত্তির কোনো কমতি নেই।

বিড়ালের সঙ্গে ইস্তাম্বুলের এক বাসিন্দা
বিড়ালের সঙ্গে ইস্তাম্বুলের এক বাসিন্দা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Sunday, June 21, 2026

‘সিরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে ইসরায়েল’, পরবর্তী নিশানা কে—তুরস্ক না পাকিস্তান

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির এক মন্ত্রী চলতি সপ্তাহে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, আজ হোক বা কাল, ইসরায়েলকে সিরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াতে হবে।

গত বুধ ও বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকে দেওয়া একাধিক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের প্রবাসীবিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি এ মন্তব্য করেন। সাক্ষাৎকারগুলোয় মধ্যপ্রাচ্যে একটি ‘উগ্র সুন্নি অক্ষ’ গড়ে উঠছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সিরিয়ার বর্তমান ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সরকারের দিকে ইঙ্গিত করে এ কট্টরপন্থী মন্ত্রী বলেন, ‘আইএস ও আল-কায়েদার আদর্শে বিশ্বাসী একটি “জিহাদি” শাসনব্যবস্থা, যাদের মূল লক্ষ্য জেরুজালেম দখল করা, তারা কখনো ইসরায়েল রাষ্ট্রের পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করতে পারে না।’

বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের আর্মি রেডিওর সঙ্গে আলাপকালে আমিচাই চিকলি তাঁর দৃষ্টিতে গড়ে ওঠা এক নতুন ইসরায়েলবিরোধী জোটের রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান, তুরস্ক ও কাতার মিলে এ নতুন জোট গঠন করেছে।’

এ জোট নিয়ে চিকলি এতটাই চিন্তিত যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া সাম্প্রতিক শান্তিচুক্তির চেয়েও এটি তাঁকে বেশি উদ্বিগ্ন করছে।

লিকুদ পার্টির এই মন্ত্রী অবশ্য স্বীকার করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে ইরান বড় ধরনের কিছু সাফল্য অর্জন করেছে। তবে তিনি বলেন, ‘এর চেয়েও অনেক বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো মধ্যপ্রাচ্যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা নতুন এ অক্ষ বা জোট।’

ইসরায়েলি এই মন্ত্রীর মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা ও সমঝোতায় পাকিস্তান ও তুরস্ক বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। আর এর মধ্য দিয়েই তারা এই নতুন জোটের অংশ হয়ে উঠেছে।

বৃহস্পতিবার ‘কোল বারামা’রেডিওকে দেওয়া অন্য এক সাক্ষাৎকারে চিকলি এই নতুন জোটে কাতারের ভূমিকা কেমন, তা ব্যাখ্যা করেন। পারস্য উপসাগরীয় এই দেশটিকে তিনি ‘জিহাদিদের জনসংযোগ শাখা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

‘উগ্র সুন্নি অক্ষ’

আমিচাই চিকলি বিশ্বজুড়ে কট্টরপন্থী রাজনীতিবিদ ও সরকারগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার কাজ করছেন। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের কট্টরপন্থী উসকানিদাতা টমি রবিনসনের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। রবিনসনের আসল নাম স্টিফেন ইয়াক্সলে-লেনন।

রাশিয়া থেকে যুক্তরাজ্যে ফেরার পর ব্রিটিশ পুলিশ রবিনসনকে আটকে দেয় এবং তাঁর মুঠোফোনগুলো জব্দ করে।

এ ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করে মন্ত্রী চিকলি বলেন, ‘প্রকৃত “ইসলামি সন্ত্রাসের” বিরুদ্ধে ব্রিটেনের অন্যতম স্পষ্ট এক কণ্ঠস্বরকে এখন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় হেনস্তা করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্রিটেন খুব দ্রুতই ইউরোপের দ্বিতীয় ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবে।’

‘কোল বারামা’রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি এই মন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান ও তুরস্ক হলো ভারত, গ্রিস ও সাইপ্রাসের শত্রু, যারা (এই তিন দেশ) আবার ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র।

বুধবার ‘১০৩এফএম’রেডিওকে চিকলি বলেন, ‘আমরা আমাদের চোখের সামনে একটি নতুন অক্ষ বা জোটের উত্থান প্রত্যক্ষ করছি।’ তুরস্ক, কাতার ও পাকিস্তানকে ইঙ্গিত করে তিনি কথিত এ জোটকে ‘একটি উগ্র সুন্নি অক্ষ, যা তাঁর আগে দেখা যেকোনো কিছুর চেয়েও বেশি বিপজ্জনক’ বলে বর্ণনা করেন।

সাক্ষাৎকারে চিকলি কাতার ও পাকিস্তান—উভয় দেশের কথা উল্লেখ করলেও মূল মনোযোগ ছিল তুরস্কের ওপর। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের দূরদর্শিতা বা লক্ষ্যকে তিনি ‘আমাদের জন্য একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সংমিশ্রণ’ বলে আখ্যা দেন।

চিকলি বলেন, তুরস্ক মূলত সিরিয়ায় ‘একটি তুর্কি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠা করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘তুরস্ক ও সিরিয়া আমাদের জন্য ইরানের চেয়ে ১০ হাজার গুণ বেশি উদ্বেগের কারণ।’

লিকুদ দলীয় এই মন্ত্রীর মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমাগত বাড়ছে। সম্প্রতি এরদোয়ান বলেছেন, সিরিয়া ও লেবাননে ইসরায়েলের হামলা তাঁর দেশের জন্য হুমকিস্বরূপ।

চলতি মাসের শুরুর দিকে তুর্কি নেতা বলেছিলেন, ‘ইসরায়েলকে অবশ্যই থামাতে হবে, এটি মানবতার দায়িত্ব।’

অন্যদিকে তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুস্তফা চিফৎচি সম্প্রতি জেরুজালেম মুক্ত করার বিষয়ে কথা বলেছেন।

তুরস্কের কাছ থেকে হুমকি আসার কথা বলা প্রথম ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ নন চিকলি। গত সপ্তাহে লিকুদ পার্টিরই আরেক আইনপ্রণেতা আরিয়েল কেলনার তুরস্ককে একটি ‘শত্রু রাষ্ট্র’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ ছাড়া গত মাসে ইসরায়েলি সংস্কৃতি ও ক্রীড়ামন্ত্রী মিকি জোহর বলেছিলেন, ইসরায়েলের ‘অবশ্যই তুরস্ককে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।’ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতে তুরস্ককে ভারী আঘাত সইতে হবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি।

গত ফেব্রুয়ারিতে সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তিনি তুরস্ককে শত্রু হিসেবে দেখেন। তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘তুরস্ক হলো নতুন ইরান।’

বৃহস্পতিবার চিকলিকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, আড়াই বছরের যুদ্ধের পর ইসরায়েলিরা কি এখন একটু শান্তিময় সময়ের আশা করতে পারে? জবাবে বলেন, তিনি তেমনটাই আশা করেন, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

চিকলির মতে, তুরস্কের ‘খুব স্পষ্ট উচ্চাকাঙ্ক্ষা রয়েছে’ এবং তারা ইসরায়েলের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইসরায়েলের আঙ্কারা জয়ের কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই এবং সিরিয়া ও তুরস্কের সঙ্গে যুদ্ধ না হলে তিনি খুবই খুশি হবেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার ঘটনা থেকে তিনি কী শিক্ষা পেয়েছেন, তা মনে করিয়ে দিয়ে চিকলি বলেন, ‘শত্রু যখন কিছু বলে, আমি তা মনোযোগ দিয়ে শুনি।’

জেরুজালেমে ইহুদিবিদ্বেষ–বিষয়ক এক সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন ইসরায়েলের প্রবাসীবিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি (ডানে)। তাঁর পাশে বসে আছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার। ২৭ মার্চ, ২০২৫
জেরুজালেমে ইহুদিবিদ্বেষ–বিষয়ক এক সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন ইসরায়েলের প্রবাসীবিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি (ডানে)। তাঁর পাশে বসে আছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার। ২৭ মার্চ, ২০২৫ ছবি: এএফপি

Tuesday, June 9, 2026

পাশ্চাত্যের সামরিক বাজারে তুরস্কের আধিপত্য

দুই দশকের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ফলে তুরস্ক বিদেশী অস্ত্রনির্ভর দেশ থেকে বিশ্বের অন্যতম বড় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও ড্রোন রফতানিকারকে পরিণত হয়েছে। ইউরোপ ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর বাড়তি নিরাপত্তা চাহিদার সুযোগ নিয়ে তুরস্ক এখন প্রতিরক্ষা বাজারে নিজেদের অবস্থান আরো শক্ত করছে।

একসময় বিদেশী অস্ত্র নির্মাতাদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল তুরস্ক দু’দশকের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের ড্রোনসহ অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের একটি প্রধান রফতানিকারক দেশে রূপান্তর করেছে।

বর্তমানে দেশটি উপসাগরীয় অঞ্চল, আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের কিছু অংশসহ প্রায় ৪০টি দেশে অস্ত্র সরবরাহ করছে। বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত সশস্ত্র ড্রোনের প্রায় ৬৫ শতাংশই এখন জোগান দিচ্ছে দেশটি।

পাশ্চাত্যের দেশগুলো এখন নতুন করে নিজেদের সামরিক শক্তি সাজাচ্ছে। নিরাপত্তা জোটগুলো পুনর্গঠিত হচ্ছে। ন্যাটো সদস্য তুরস্ক এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছে, পাশ্চাত্যের প্রতিরক্ষা বাজারে তুরস্ক নিজের অবস্থান আরো দৃঢ় করতে চাইছে।

ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযানের পর তাদের নিরাপত্তা নির্ভরতা পুনর্বিবেচনা করছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। পরিবর্তিত এমন পরিস্থিতিতে অনেক ন্যাটো মিত্র তুরস্ককে কেবল তাদের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের একটি সামরিক দুর্গ হিসেবেই দেখছে না, বরং একটি সম্ভাব্য শিল্প অংশীদার হিসেবেও বিবেচনা করছে।

ইউক্রেনীয় বাহিনীর ব্যবহৃত উচ্চ-প্রোফাইল সশস্ত্র ড্রোনসহ তুর্কি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রফতানি ২০২১ সাল থেকে তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। গত বছর এই রফতানির পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আর তুরস্কের মোট রফতানির প্রায় ৩ দশমিক৭ শতাংশই হলো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রফতানি।

পাশাপাশি, এই একই সময়ে ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি প্রায় চার গুণ বেড়ে ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি বাইকার, টার্কিশ অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ এবং আরকা ডিফেন্স ও কালের মতো ছোট সংস্থাগুলোর পরিপক্বতা প্রকাশ করে। টেকসই রাষ্ট্রীয় সমর্থন, নমনীয় সরবরাহ চেইন এবং ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী ব্যবস্থা পরিবর্তনের ইচ্ছার কারণে তুর্কি প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত বাজারে প্রবেশ করতে পেরেছে। এর তুলনায় পাশ্চাত্যের সরবরাহকারীরা সক্ষমতার ঘাটতির সাথে দীর্ঘ ক্রয় প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয় ক্রেতাদের।

তুরস্কের প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, আগামী দু’বছরে তারা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রফতানি দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা তাদের ঋণ পরিশোধ এবং আরো উন্নয়নের জন্য অর্থ জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব তৈরি করবে।

উত্তরে ইউক্রেন এবং দক্ষিণ-পূর্বে ইরানের মতো দুটি বড় সঙ্ঘাতের মাঝখানে থাকা তুরস্কের নিজস্ব নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িয়ে আছে। তাদের বিমান প্রতিরক্ষা, জেট এবং ট্যাংকের ইঞ্জিনের ঘাটতিগুলো বাণিজ্য ও প্রযুক্তি চুক্তির মাধ্যমে পূরণ করা যেতে পারে।

সূত্র : জেরুসালেম পোস্ট

তুরস্কে তৈরি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইলদিরিমহানের পাশে দেশটির পরিবহন ও অবকাঠামো মন্ত্রী আবদুলকাদির উরালোগলু
তুরস্কে তৈরি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইলদিরিমহানের পাশে দেশটির পরিবহন ও অবকাঠামো মন্ত্রী আবদুলকাদির উরালোগলু। সংগৃহীত

Monday, June 8, 2026

পশ্চিমে বদলাচ্ছে সমীকরণ, সেই সুযোগে বাড়ছে তুরস্কের অস্ত্রের বাজার

টানা দুই দশকের সরকারি বিনিয়োগের ফলে তুরস্ক এখন ড্রোন ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো যখন নতুন করে অস্ত্রের মজুত বাড়াচ্ছে এবং নিরাপত্তা জোটগুলো পুনর্গঠিত হচ্ছে, তখন এই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে ন্যাটো সদস্য তুরস্ক।

এই তুরস্ক একসময় অস্ত্রের জন্য নির্ভরশীল ছিল বিদেশি কোম্পানিগুলোর ওপর। এখন তারা উপসাগরীয় অঞ্চল, আফ্রিকা ও এশিয়ার প্রায় ৪০টি এবং ইউরোপেরও কিছু দেশে অস্ত্র সরবরাহ করছে। ক্রেতাদের দৃষ্টিতে, তুরস্কের অস্ত্র তুলনামূলক সস্তা, দ্রুত হাতে পাওয়া যায় এবং সহজেই ব্যবহার করা যায়।

ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর ইউরোপীয় সরকারগুলো তাদের নিরাপত্তা–সংক্রান্ত নির্ভরতা নতুন করে মূল্যায়ন করছে। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি কতটা টেকসই, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। এই পরিস্থিতিতে ন্যাটোর অনেক মিত্রদেশ তুরস্ককে এখন কেবল এই সামরিক জোটের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের একটি শক্তিশালী সামরিক দুর্গ হিসেবেই দেখছে না; বরং দেশটিকে সামরিকশিল্পের সম্ভাবনাময় অংশীদার হিসেবেও বিবেচনা করছে।

আগামী মাসে তুরস্কে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ অন্য নেতারা অংশ নেবেন। আঙ্কারা আশা করছে, এর ফলে পশ্চিমা বাজারে, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নে তাদের অস্ত্র বিক্রি ও যৌথ উৎপাদন প্রসারিত হবে।

এ ক্ষেত্রে তুর্কি প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু কাঠামোগত বাধার সম্মুখীন হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে কেবল নির্দিষ্ট সদস্যদের জন্য উন্মুক্ত প্রতিরক্ষা উদ্যোগ এবং বৃহত্তর কূটনৈতিক বিরোধের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক বাধা।

বাণিজ্য পরিসংখ্যান নিয়ে রয়টার্সের এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২১ সালের পর থেকে তুরস্কের সমরাস্ত্র রপ্তানি তিন গুণের বেশি বেড়ে গত বছর এক হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ব্যবহৃত আধুনিক সশস্ত্র ড্রোনও রয়েছে। এই সময়ে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি প্রায় চার গুণ বেড়ে ৫৬০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।

এই প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে যে তুরস্কের নিজস্ব প্রতিরক্ষাশিল্প কতটা পরিপক্ব হয়েছে। ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বাইকার ও টার্কিশ অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজের পাশাপাশি আরকা ডিফেন্স ও কাইলের মতো ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোও এই সাফল্যের অংশীদার।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, সরকারের ধারাবাহিক পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ সরবরাহব্যবস্থা এবং ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী অস্ত্র তৈরির কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত বাজারে জায়গা করে নিয়েছে। যেখানে পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর উৎপাদন সীমাবদ্ধতা ও বিপণন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার মতো জটিলতা রয়েছে।

যুদ্ধের হুমকি ও সুযোগ

তুরস্কের প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, আগামী দুই বছরের মধ্যে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি দ্বিগুণ করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের। এই খাত থেকে আসা আয়ের মাধ্যমে তারা দেশের ঋণ শোধ করতে ও আরও উন্নয়নমূলক কাজের তহবিল জোগাড় করতে চায়।

উত্তরে ইউক্রেন এবং দক্ষিণ-পূর্বে ইরান—এই দুই বড় সংঘাতের মাঝে দেশটির অবস্থান। আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান ও ট্যাংকের ইঞ্জিনের অভাবের কারণে তুরস্কের নিজস্ব নিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ব্যবসা ও প্রযুক্তি চুক্তির মাধ্যমে তারা এই ঘাটতি মেটাতে পারে।

হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো চান কাসাপোলু বলেন, আধুনিক সরঞ্জাম, বিশেষ করে ড্রোন রপ্তানি করে তুরস্কের প্রতিরক্ষাশিল্প ‘বড় ধরনের অগ্রগতি’ অর্জন করেছে।

কাসাপোলু আরও বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে আধুনিক যুদ্ধ শুধু অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং শিল্পের সক্ষমতা ও স্থায়িত্বেরও প্রয়োজন আছে। আর এই জায়গায় তুরস্ক বেশ আস্থা অর্জন করেছে।

নজরে ন্যাটো সম্মেলন

বিশ্বে ব্যবহৃত সশস্ত্র ড্রোনের ৬৫ শতাংশই সরবরাহ করে তুরস্ক। পাশাপাশি তারা গোলাবারুদ রপ্তানিতেও অন্যতম শীর্ষ দেশ।

এ ছাড়া তারা যুদ্ধজাহাজ, বিমানবাহী রণতরি, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং সাঁজোয়া যান তৈরি করছে বা তৈরির পরিকল্পনা করছে। ইন্দোনেশিয়া গত বছর জানিয়েছে, তারা তুরস্ক থেকে ৪৮টি যুদ্ধবিমান কিনবে, যেগুলো তৈরির কাজ এখনো চলছে।

তবে তুরস্কের এই বড় লক্ষ্যের সঙ্গে কিছু রাজনৈতিক ও সুনামের ঝুঁকিও রয়েছে।

গত মাসে ইস্তাম্বুলের এক প্রদর্শনীতে তুরস্ক নিজেদের তৈরি একটি আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মডেল দেখিয়েছে। এর প্রচারণামূলক ভিডিওতে দেখানো হয়, ক্ষেপণাস্ত্রটি উত্তর আমেরিকার দিকে ছোড়া হচ্ছে। এটি নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ সমালোচনা করেছেন।

তুরস্কের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ৭ ও ৮ জুলাই আঙ্কারায় অনুষ্ঠেয় ন্যাটো সম্মেলনে প্রতিরক্ষা খাতই হবে আলোচনার প্রধান বিষয়।

ন্যাটোপ্রধান মার্ক রাটে বলেছেন, এই সম্মেলনে প্রতিরক্ষাশিল্প নিয়ে যে সংলাপের পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা হবে ন্যাটোর ইতিহাসে এ যাবৎকালের সবচেয়ে সমন্বিত আয়োজন।

ইউরোপীয় বাধা

ন্যাটোর মিত্রদেশগুলোকে নিজেদের সুরক্ষার দায়িত্ব আরও বেশি করে নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এমনকি জার্মানি থেকে হাজার হাজার সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনাও করছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের এসব পদক্ষেপে তুরস্কের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, ন্যাটো জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী রয়েছে তুরস্কের।

গত এপ্রিলে ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি একটি আহ্বান জানান তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসার গুলার। তিনি বলেন, ইউরোপের যেসব নিরাপত্তা চুক্তিতে তুরস্কের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরের ন্যাটো সদস্যদের রাখা হয়নি, সেসব চুক্তি বাতিল করা উচিত। তাঁর মতে, এ ধরনের নীতি ইউরোপের নিরাপত্তা ও সক্ষমতার জন্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ থেকে সেনা কমালে যতটা ক্ষতি, এই নীতি তার চেয়েও বেশি ক্ষতি করবে বলে মনে করেন তিনি।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘সিকিউরিটি অ্যাকশন ফর ইউরোপ (সেফ)’ কর্মসূচি থেকে তুরস্ককে একপ্রকার বাদই দেওয়া হয়েছে। যদিও আঞ্চলিক নীতি নিয়ে বিরোধের জেরে কিছু দেশের সরকার তুরস্ককে এড়িয়ে চলছে। তুরস্কের প্রধান বিরোধী দলের ওপর আইনি দমন–পীড়নসহ গণতন্ত্রের অবনতি নিয়ে দেশগুলোর উদ্বেগ রয়েছে।

এত কিছুর পরও পোল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল ও রোমানিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের চুক্তি করেছে তুরস্কের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এরই মধ্যে ইতালির ‘পিয়াজ্জো অ্যারোস্পেস’ অধিগ্রহণ করেছে তুরস্কের ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বায়কার। এ ছাড়া ড্রোন উৎপাদনের জন্য ইতালীয় কোম্পানি লিওনার্দোর সঙ্গেও তারা অংশীদারত্ব গড়েছে।

বিশ্বজুড়ে সামরিক ব্যয়ের হিড়িক

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে বিশ্বজুড়ে সামরিক ব্যয় ২৪ শতাংশ বেড়েছে। এর পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন (লাখ কোটি) ডলার। এই সময়ে শুধু ইউরোপেই সামরিক ব্যয় বেড়েছে ৭৫ শতাংশ।

একই সময়ে গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) খাতে নিজেদের অর্থায়নে চলা প্রকল্পের সংখ্যা দ্বিগুণ করেছে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সংস্থা। দেশটিতে এ ধরনের প্রকল্পের সংখ্যা এখন ১ হাজার ৪০০টির বেশি।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আরদা মেভলুতোলু মনে করেন, রাজনৈতিক বাধাগুলো সামলানো গেলে ইউরোপের সঙ্গে তুরস্কের সহযোগিতা আরও জোরদার হবে। সে ধরনের গভীর সহযোগিতার পরিবেশ এখন তৈরি হয়েছে।

মেভলুতোলু বলেন, ইউরোপের এখন এমন সমাধান দরকার, যা খুব দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়। তবে এই সহযোগিতাকে একটি স্বাভাবিক ধারায় এগিয়ে নিতে হলে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। তাঁর মতে, তুরস্ক এখন ইউরোপ এবং ন্যাটো—উভয়ের সঙ্গেই নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন ও জোরদারের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ‘সাহা ২০২৬’ আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ প্রদর্শনীতে দেশটির সামরিক সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বায়কারের তৈরি চালকবিহীন যুদ্ধবিমান ‘কিজিলএলমা’। ৮ মে ২০২৬
তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ‘সাহা ২০২৬’ আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ প্রদর্শনীতে দেশটির সামরিক সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বায়কারের তৈরি চালকবিহীন যুদ্ধবিমান ‘কিজিলএলমা’। ৮ মে ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

Sunday, June 7, 2026

যে কারণে হাকান ফিদান এরদোয়ানের পর দেশটির দ্বিতীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি

দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্যে দুই দিনের সরকারি সফরে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক নানা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর প্রেক্ষাপটে তার এই সফর কূটনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সফরকালে তিনি বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরও পরিদর্শন করেন।

যদিও সরকারি পরিচয়ে তিনি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই তাকে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী সহযোগীদের একজন হিসেবে বিবেচনা করেন। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে তাকে তুরস্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক হিসেবেও দেখা হয়।

সেনাবাহিনী থেকে রাষ্ট্রীয় কৌশলবিদ

১৯৬৮ সালে আঙ্কারায় জন্ম নেওয়া হাকান ফিদানের কর্মজীবনের শুরু সামরিক বাহিনীতে। দীর্ঘ সময় তিনি নন-কমিশন্ড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে সামরিক জীবনের পাশাপাশি তিনি উচ্চশিক্ষার প্রতি সমান গুরুত্ব দেন।

ন্যাটোর একটি মিশনে দায়িত্ব পালনকালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড থেকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে বিলকেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তার গবেষণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা।

এরদোয়ানের আস্থাভাজন হয়ে ওঠা

রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই ফিদানের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উত্থান শুরু হয়। ২০০৩ সালে তাকে তুরস্কের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (টিকা)-এর দায়িত্ব দেওয়া হয়।

চার বছর ধরে ওই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থেকে তিনি মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা ও বলকান অঞ্চলে তুরস্কের প্রভাব বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার দক্ষতা ও কৌশলগত চিন্তাভাবনা দ্রুতই এরদোয়ানের আস্থা অর্জন করে। পরবর্তীতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত হন।

গোয়েন্দা সংস্থার নেতৃত্বে দীর্ঘ অধ্যায়

২০১০ সালে মাত্র ৪২ বছর বয়সে তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এমআইটির প্রধান নিযুক্ত হন হাকান ফিদান। সে সময় এটি ছিল একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা, কারণ এত অল্প বয়সে আগে কেউ এই পদে আসীন হননি।

প্রায় ১৩ বছর গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি সংস্থাটিকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে ভূমিকা রাখেন। ২০১৬ সালের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সময় সরকারের অবস্থান সুসংহত রাখতে এবং সংকট মোকাবিলায় তার ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত হয়।

তুরস্কের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ইস্যু বিশেষ করে সিরিয়া, লিবিয়া ও ইউক্রেন সংশ্লিষ্ট নানা কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা কার্যক্রমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এ কারণেই তাকে আঙ্কারার ‘ব্ল্যাক বক্স’ বা গোপন তথ্যের নির্ভরযোগ্য রক্ষক হিসেবে অভিহিত করা হয়।

পররাষ্ট্রনীতির নেতৃত্বে নতুন ভূমিকা

২০২৩ সালের নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। গোয়েন্দা অঙ্গনের নেপথ্য ভূমিকা থেকে বেরিয়ে এসে তিনি সরাসরি তুরস্কের বৈদেশিক নীতির মুখপাত্র ও প্রধান বাস্তবায়নকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।

বিশ্লেষকদের মতে, আনুষ্ঠানিক পদমর্যাদার বাইরে জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্রনীতি এই তিন ক্ষেত্রেই তার গভীর প্রভাব রয়েছে। ফলে অনেকেই তাকে তুরস্কের বর্তমান ক্ষমতার কাঠামোয় সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন হিসেবে দেখেন।

ঢাকা সফরের তাৎপর্য

বাংলাদেশ সফরের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা আরো সম্প্রসারণ করা। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা খাতে যৌথ সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। তুরস্কের আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

এ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের প্রশ্নে তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। ফিদানও এই সংকটের টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক সমাধানের পক্ষে তুরস্কের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

ভবিষ্যতের নেতৃত্বে কি হাকান ফিদান?

তুরস্কের রাজনীতিতে এরদোয়ানের পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা যতই বাড়ছে, ততই সামনে আসছে হাকান ফিদানের নাম। শান্ত স্বভাব, কৌশলী নেতৃত্ব এবং নিরাপত্তা ও কূটনীতি দুই ক্ষেত্রেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণে তাকে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ জাতীয় নেতা হিসেবে বিবেচনা করেন অনেক পর্যবেক্ষক।

বিশ্ব রাজনীতিতে তুরস্কের প্রভাব বাড়ানোর যে কৌশল আঙ্কারা অনুসরণ করছে, হাকান ফিদানকে সেই নীতির অন্যতম প্রধান স্থপতি মনে করা হয়। তার ঢাকা সফরও বৃহত্তর আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সূত্র: আল-জাজিরা, মিডল ইস্ট আই

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান।

Wednesday, March 25, 2026

৬ বছরের সাধনা, হাতে লেখা বিশাল কোরআন

প্রকাশ ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ ভোর থেকে সন্ধ্যা—টানা ছয়টি বছর এভাবেই কেটেছে তাঁর। তুরস্কের ইস্তাম্বুলের মিহরিমাহ সুলতান মসজিদের একটি ছোট কামরায় নিবিষ্ট মনে তুলি চালিয়েছেন তিনি।

লক্ষ্য ছিল পবিত্র কোরআনের এক অনন্য পাণ্ডুলিপি তৈরি করা। দীর্ঘ শ্রম ও শৈল্পিক নৈপুণ্যের পর অবশেষে সেই মহৎ কাজ শেষ করেছেন ইরাকি ক্যালিগ্রাফার আলী জামান।

৫৪ বছর বয়সী এই শিল্পীর তৈরি করা কোরআনের পাণ্ডুলিপিটি এখন ইস্তাম্বুলের ওই মসজিদেই সংরক্ষিত আছে। পাণ্ডুলিপিটির বিশালত্ব যে কাউকেই চমকে দেবে। এতে রয়েছে ৩০২টি দ্বিমুখী স্ক্রল বা পাতা, যার প্রতিটির দৈর্ঘ্য ৪ মিটার (১৩ ফুট) এবং প্রস্থ ১ দশমিক ৫ মিটার (৫ ফুট)।

আলী জামান বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, ‘যখনই আমি এই কোরআনটির কথা ভাবি, আমার এক অদ্ভুত প্রশান্তি লাগে। মহান আল্লাহ আমাকে এটি শেষ করার তৌফিক দিয়েছেন, এ জন্য আমি গর্বিত।’

অদম্য স্পৃহা

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য সাধারণ কাগজ ব্যবহার করেননি জামান। ডিমের সাদা অংশ, কর্ন স্টার্চ (ভুট্টার আটা) এবং ফিটকিরির বিশেষ মিশ্রণে তৈরি করা হয়েছিল টেকসই বিশেষ কাগজ।

১২ বছর বয়স থেকে ক্যালিগ্রাফির প্রেমে পড়া জামান মূলত ইরাকের সোলাইমানিয়া প্রদেশের বাসিন্দা। তবে ক্যালিগ্রাফি বা হস্তশিল্পের কদর তুরস্কে বেশি হওয়ায় ২০১৭ সালে সপরিবারে ইস্তাম্বুলে চলে আসেন তিনি।

আলী জামানের এই দীর্ঘ সাধনায় বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে তাঁর পরিবারকেও।

তাঁর ছেলে রেকার জামান স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘বাবার এই প্রকল্পের কাজ চলাকালীন আমরা তাঁকে খুব কমই কাছে পেয়েছি। শুধু তাঁর খাবার পৌঁছে দেওয়ার সময় অথবা রাতে যখন তিনি ঘুমাতে আসতেন, তখনই তাঁর দেখা মিলত। আলহামদুলিল্লাহ, কাজ শেষ হওয়ার পর এখন আমরা তাঁকে বেশি সময় পাচ্ছি।’

বিশ্ব রেকর্ডের হাতছানি

আলী জামানের দাবি, এটি বিশ্বের বৃহত্তম হাতে লেখা কোরআন। যদিও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ এখনো এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি।

রেকর্ড অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের মক্কার ‘হলি কোরআন মিউজিয়ামে’ সংরক্ষিত একটি কোরআনকে বিশ্বের বৃহত্তম ছাপানো কোরআন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে জামানের শিল্পকর্মটি হাতে লেখা হওয়ার কারণে এর গুরুত্ব আলাদা।

শিল্প বিশেষজ্ঞ উমিত কোসকুনসু বলেন, ‘ইসলামি ক্যালিগ্রাফি কেবল সাধারণ কোনো লেখা নয়, এটি একধরনের ইবাদত। আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি মাধ্যম।’

বর্তমানে এই বিশাল পাণ্ডুলিপিটি ধুলাবালি ও আর্দ্রতা থেকে বাঁচাতে বিশেষ আবরণে ঢেকে রাখা হয়েছে।

আলী জামানের শেষ ইচ্ছা, কোনো বিশেষ জাদুঘর বা শিল্পসংগ্রাহক যেন এটি সংগ্রহ করেন, যেখানে সাধারণ মানুষ এই অনন্য শিল্পকর্মটি দেখার ও মূল্যায়ন করার সুযোগ পাবে।

সূত্র: এপি

নিবিষ্ট মনে কোরআনের ক্যালিগ্রাফি আঁকছেন আলী জামান
নিবিষ্ট মনে কোরআনের ক্যালিগ্রাফি আঁকছেন আলী জামান। ছবি: এপি

Saturday, March 7, 2026

সৌদি আরব কেন তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে by বেতুল দোগান-আক্কাস

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সম্প্রতি সৌদি আরব সফর করেছেন। সফরটি এমন সময়ে হলো, যখন ইয়েমেন ও হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে বিরোধী স্বার্থের কারণে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। একই সঙ্গে পাকিস্তান-সৌদি আরব সামরিক জোটে তুরস্ক যুক্ত হতে পারে, এমন গুঞ্জনও জোরালো হয়েছে। এসব নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ইস্যু। তবে সৌদি আরব, যখন ইয়েমেনে আরও সক্রিয় হয়ে আঞ্চলিক রাজনীতিতে ফিরে আসছে, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের তথাকথিত ‘নতুন সৌদিয়ানা’ ধারণায় তুরস্কের অবস্থান কোথায়?

২০১৮ সালে সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকাণ্ডের পর মোহাম্মদ বিন সালমান আঞ্চলিক রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে নীরব ছিলেন। তিনি অভ্যন্তরীণ রূপান্তরে মনোযোগী ছিলেন। এটি ছিল একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কারণ, ‘নতুন সৌদিয়ানা’ ধারণা শুধু সৌদি পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা। এটি আরব বিশ্বের দায়ভার নিতে আগ্রহী নয়। ইয়েমেন ও সিরিয়ায় ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা এবং ফিলিস্তিনে কয়েক দশকব্যাপী সংঘাত এই শিক্ষাই দেয়।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের পর সৌদি পররাষ্ট্রনীতি আবার সক্রিয় হয়েছে। রিয়াদ এখন নতুন করে আঞ্চলিক অবস্থান ও কৌশল সংজ্ঞায়িত করতে চাইছে।

নতুন সৌদিয়ানা ধারণা মূলত সৌদি আরবকেন্দ্রিক। প্রকল্পটির পেছনে রয়েছে একাধিক বাস্তব কারণ। এক. সৌদি আরবের জনমিতিক পরিবর্তন—জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই ৩০ বছরের নিচে। দুই. তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে মুক্তি। তিন. মোহাম্মদ বিন সালমানের চেয়ারের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। সর্বোপরি ‘সৌদিয়ানা’ ধারণার পুনর্নির্মাণ, যেখানে রাজতন্ত্র ও জাতীয় গৌরব গুরুত্ব পাচ্ছে আর ওয়াহাবি প্রভাব প্রান্তিক হচ্ছে।

এ প্রেক্ষাপটে অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে সৌদি যুবরাজের মনোযোগ দেওয়ার ঘটনা কোনো আকস্মিক বিষয় নয়, বরং তা তাঁর কৌশলগত নীতির মূল ভিত্তি। কিন্তু আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজের অবস্থান জোরদার করতে হলে নির্ভরযোগ্য অংশীদার প্রয়োজন।

ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরাত তার জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় রিয়াদের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগে সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছালেও বর্তমানে গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠা অগ্রাধিকার পেয়েছে।

এই ‘নতুন সৌদিয়ানা’কে আগের সৌদি পররাষ্ট্রনীতি থেকে আলাদা করে যে বিষয়টি, তা হলো রিয়াদ আর মধ্যপ্রাচ্যের সবার দায়িত্ব এককভাবে নিতে প্রস্তুত নয়। তবে ইয়েমেনের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে সৌদি আরবের মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বীরাও বদলে গেছে।

এ বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্বকে বিবেচনায় নিয়ে মোহাম্মদ বিন সালমানকে তাঁর কৌশল নতুনভাবে সাজাতে হচ্ছে। তাঁর শাসনকে নতুন আঞ্চলিক সক্রিয়তার পর্ব বলা যেতে পারে, কিন্তু নির্ভরযোগ্য অংশীদার প্রয়োজন। তাহলেই সৌদি আরব আরও বহির্মুখী হতে পারে।

এ প্রেক্ষাপটে তুরস্কের আঞ্চলিক ভূমিকা (গাজায় সমঝোতা আলোচনায় সহায়তা, আফ্রিকা ও ইয়েমেনে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা) রিয়াদ ও আঙ্কারাকে কাছাকাছি এনেছে। এটি মোহাম্মদ বিন সালমানকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আগ্রাসী নীতির বিপরীতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি করেছে।

তুরস্কের সম্ভাব্য সৌদি-পাকিস্তান সামরিক চুক্তিতে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নতুন ক্ষমতার অক্ষের ইঙ্গিত দেয়। আঙ্কারার জন্য এটি একটি ভারসাম্যের খেলা। কেননা সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে দেশটিকে।

গত সপ্তাহে এরদোয়ানের রিয়াদ সফর শেষে সৌদি ও তুর্কি নেতারা যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েল কর্তৃক ‘সোমালিল্যান্ডের স্বীকৃতি’ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁরা সোমালিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন দেন। সৌদি আরব ও তুরস্ক সুদানের অখণ্ডতা রক্ষা, গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সিরিয়া থেকে ইসরায়েলের প্রত্যাহার প্রশ্নেও যৌথ অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছে। সিরিয়া বিষয়ে এরদোয়ান বলেন, তুরস্কের মানদণ্ড হলো, ‘এমন একটি সিরিয়া, যা প্রতিবেশীদের জন্য হুমকি হবে না, সন্ত্রাসী সংগঠনকে আশ্রয় দেবে না এবং সমান নাগরিকত্বের ভিত্তিতে সমাজের সব অংশকে অন্তর্ভুক্ত করবে।’

স্পষ্টতই সৌদি আরব আর অভ্যন্তরীণ কিংবা আঞ্চলিক রাজনীতিতে স্থবির নেই। তবে নতুন পরিচয় ও অংশীদারত্ব গড়ে তোলার এই প্রয়াস কতটা টেকসই ও সফল হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

বেতুল দোগান-আক্কাস, তুরস্কের এই গবেষকের গবেষণার ক্ষেত্র হলো আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-14%2Fzkwpvw8c%2FMotamot-1.jpg?rect=0%2C0%2C600%2C400&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স

Friday, February 6, 2026

সৌদি আরবে এরদোগান, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার

সৌদি আরব ও তুরস্ক প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের সৌদি সফর শেষে প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, দুই দেশের এই সহযোগিতা পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করবে এবং বহুপক্ষীয় কাঠামোর মাধ্যমে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারে ভূমিকা রাখবে। প্রতিরক্ষা খাতে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো দ্রুত কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়। এ খবর দিয়েছে সৌদি গেজেট।

মঙ্গলবার রিয়াদের আল-ইয়ামামাহ প্রাসাদে সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বিস্তৃত বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট এরদোগান। বৈঠকে দুই নেতা ঐতিহাসিক সম্পর্ক পর্যালোচনা করেন এবং সব ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।

যৌথ বিবৃতিতে অপরাধ দমন, চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদ এবং এর অর্থায়ন প্রতিরোধ, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সাইবার নিরাপত্তায় সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।
দুই দেশ অর্থনৈতিক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কের অগ্রগতির প্রশংসা করে এবং সৌদি ভিশন ২০৩০ ও ‘সেঞ্চুরি অব তুর্কিয়ে’ ভিশনের আওতায় বিনিয়োগ সুযোগ কাজে লাগানোর বিষয়ে একমত হয়। জিসিসি ও তুরস্কের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত করার ওপরও জোর দেয়া হয়।

সৌদি পক্ষ তুরস্কে তাদের বিনিয়োগের প্রশংসা করে, বিশেষ করে আর্থিক খাত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, রিয়েল এস্টেট ও উৎপাদন শিল্পে। একই সঙ্গে সৌদি আরবে কার্যরত তুর্কি কোম্পানিগুলোর অবদানও স্বীকৃতি দেয়া হয়।
জ্বালানি খাতে দুই দেশ বৈশ্বিক তেলবাজারে সৌদি আরবের ভূমিকার প্রশংসা করে এবং তেল, পেট্রো কেমিক্যাল ও কৃষি পুষ্টি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ, ক্লিন হাইড্রোজেন উৎপাদন ও পরিবহন প্রযুক্তিতে যৌথ কাজের আগ্রহও প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের অনুসন্ধান ও প্রক্রিয়াজাতে সহযোগিতা জোরদারের কথা বলা হয়।

দুই দেশ গাজায় চলমান মানবিক সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং অবরোধ তুলে নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তা প্রবেশের আহ্বান জানায়। ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব ও ঐক্যের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয় এবং সিরিয়ায় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় নেয়া পদক্ষেপের প্রশংসা করা হয়।
সৌদি আরব ও তুরস্ক আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে পারস্পরিক সমন্বয় জোরদারের অঙ্গীকার করে এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় যৌথ উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয়।

https://mzamin.com/uploads/news/main/201988_Kaium-9.webp