Saturday, December 7, 2013

দক্ষিণ আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া নেলসন ম্যান্ডেলার ভাষণ ‘স্বাধীনতাই হবে আমাদের শাসক’

ইউনিয়ন বিল্ডিংস, প্রিটোরিয়া, ১০ মে ১৯৯৪
আজ এখানে আমাদের উপস্থিতির মাধ্যমে এবং দেশজুড়ে ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে উদ্যাপনের দ্বারা আমাদের নবীন স্বাধীনতার প্রতি গৌরব ও প্রত্যাশা ন্যস্ত করছি।
সুদীর্ঘকাল স্থায়ী নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা থেকে অবশ্যই এমন একটি সমাজ জন্মলাভ করবে, যা সমগ্র মানবতাকেই গৌরবান্বিত করবে।
দক্ষিণ আফ্রিকার সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের প্রতিদিনের কর্ম থেকেই উদ্ভূত হবে দক্ষিণ আফ্রিকার সেই বাস্তবতা, যা সুবিচারের প্রতি মানবিক বিশ্বাসকে দৃঢ়তর করবে, মানবাত্মার মহত্ত্ব-সম্পর্কিত আস্থাকে শক্তিশালী করবে এবং সবার গৌরবময় জীবনের জন্য আমাদের সব প্রত্যাশাকে স্থায়িত্ব দেবে। এ সবকিছুই আমরা চাই আমাদের নিজেদের জন্য এবং সমগ্র বিশ্বের জনগণের জন্যও, এখানেও তাঁদের ব্যাপক প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।
আমার সহযোদ্ধাদের প্রতি এ কথা বলতে আমার কোনো দ্বিধা নেই যে, আমাদের প্রত্যেকেই এই শোভাময় দেশটির মাটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত হয়ে আছি, যেমনটি রয়েছে প্রিটোরিয়ার বিখ্যাত ‘জাকারান্ডা’ এবং বুশভেল্ডের (ট্রান্সভালের নিচু অঞ্চল) ‘মাইমোসা’ বৃক্ষগুলো। যখনই আমরা কেউ দেশের মাটি স্পর্শ করি, তখনই ব্যক্তিগতভাবে নবীকরণের উপলব্ধি সঞ্চারিত হয়। মৌসুম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আবেগ-অনুভূতিরও পরিবর্তন ঘটে। ঘাসগুলো যখন সবুজ হয়ে ওঠে, যখন ফুল ফোটে, তখন আমরাও আনন্দ অনুভব করি এবং উজ্জীবিত হই।
আমরা সবাই দেশমাতৃকার সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক যে অবিচ্ছিন্নতা উপলব্ধি করি, তার মধ্যেই ব্যাখ্যা মেলে, কী দারুণ বেদনা আমাদের সহ্য করতে হয়েছে, যখন আমাদের দেশটি সংঘাতে সংঘাতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল, যখন বিশ্বের সবাই আমাদের দেশটিকে বর্জন করছিল, অপরাধী গণ্য করে নিঃসঙ্গতায় ঠেলে দিচ্ছিল। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এর কারণ ছিল, আমাদের এই দেশটিকে ধ্বংসাত্মক নীতি-কৌশল এবং সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ আর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ভিত্তি বানিয়ে ফেলা হয়েছিল।
আমরা দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণ আবার হূদয়ভরে ভাবতে পারছি, বিশ্বমানবতা আমাদের আবার বুকে টেনে নিয়েছে। বেশি দিন হয়নি, আমাদের অপরাধী বলে বিবেচনা করা হতো, আমরাই আজ দেশের মাটিতে বিশ্বের জাতিসমূহের আতিথেয়তা করার বিরল সুযোগ পেয়েছি। আমাদের মান্যবর আন্তর্জাতিক অতিথিদের ধন্যবাদ জানাই। কারণ, তাঁরা এখানে আমাদের জনগণের সঙ্গে সমবেত হয়ে সুবিচার, শান্তি আর মানবিক মর্যাদার অনন্যসাধারণ বিজয়ের অংশভাগী হয়েছেন। আমরা অবশ্যই প্রত্যাশা করব যে, যখন আমরা শান্তি, সমৃদ্ধি, লিঙ্গবৈষম্যহীনতা, জাতিগত বৈষম্যহীনতা এবং গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করব, তখনো আপনারা আমাদের পক্ষেই থাকবেন।
গভীর প্রশংসার সঙ্গে আমি উল্লেখ করতে চাই যে, বর্তমান অবস্থানে পৌঁছার জন্য আমাদের জনগণ, তাদের রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক, ধর্মীয় সংগঠন, নারী এবং যুবসমাজ, ব্যবসায়ীসহ প্রথাগত এবং অন্য সংগঠনসমূহ যথার্থই বিপুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এ ক্ষেত্রে আমার অনুবর্তী ব্যক্তি, সম্মানিত ডেপুটি প্রেসিডেন্ট এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্কের ভূমিকাও সমগুরুত্বের সঙ্গেই উল্লেখযোগ্য।
শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে চাই আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বস্তরের সদস্যদের প্রতি। তাঁরা সবাই প্রভূত সহায়তা প্রদান করেছেন আমাদের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিরাপদে অনুষ্ঠানের কাজে। অন্ধকারের রক্তপিপাসু, যারা এখনো আলোতে আসতে রাজি নয়, তাদের কাছ থেকে গণতান্ত্রিক শক্তির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কাজেও সেনাসদস্যরা বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।
এখন সব ক্ষত নিরাময়ের সময় সমাগত। এত দিন গোষ্ঠী-সংঘাতের যে গভীর খাদ আমাদের বিচ্ছিন্ন-বিভক্ত করে রেখেছিল, তাতে সেতু-সংযোগের সময় এসেছে। গঠনমূলক কাজের সময়টা এখন আমাদেরই হাতে। শেষ পর্যন্ত আমরা রাজনৈতিক বন্ধনমুক্ত হতে পেরেছি। আমরা এখন আমাদের জনগণের প্রতি দারিদ্র্য, বঞ্চনা, দুর্দশা এবং লৈঙ্গিক ও অন্যবিধ বৈষম্য মুক্তির অঙ্গীকার করছি।
স্বাধীনতার লক্ষ্যে শেষ পদক্ষেপটি আমরা তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই নিতে পেরেছি। এখন আমরা পরিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজেদের উৎসর্গ করছি। আমাদের লাখো কোটি মানুষের অন্তরে আশা জাগাতে আমরা বিজয় লাভ করেছি। এখন আমরা নতুন অঙ্গীকার করছি, আমরা এমন এক সমাজ গড়ে তুলব, যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার সব মানুষ, কালো-সাদানির্বিশেষে সবাই ভয়হীন হূদয়ে মাথা উঁচু করে চলতে পারবে। সবাইকে অসমর্পণীয় মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। আমাদের বহু বর্ণ-জাতি নিজেদের মধ্যে এবং বিশ্বের সবার সঙ্গে শান্তিতে থাকবে।
নতুন করে জাতি গঠনের লক্ষ্যে আমাদের উদ্যোগের নিদর্শন হিসেবে বর্তমান জাতীয় ঐক্যের অন্তর্বর্তী সরকার, জরুরি পদক্ষেপ বিবেচনা করেই বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগরত আমাদের জাতির সবাইকে মুক্তি প্রদান করা হবে। অতঃপর তাঁদের সবার জন্যই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ব্যবস্থা করা হবে।
আমাদের দেশে এবং বিশ্বের যেখানে যত বীর এবং বীরাঙ্গনারা আমাদের মুক্তির অনুকূলে জীবন দিয়েছেন, কিংবা অন্যবিধ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁদের সবার উদ্দেশে আজকের এই আনন্দময় দিনটিকে আমরা উৎসর্গ করছি। তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ লাভ করেছে, স্বাধীনতাই তাঁদের পুরস্কার।
আপনারা দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণ, একটি ঐক্যবদ্ধ, গণতান্ত্রিক, বর্ণবৈষম্যহীন, লৈঙ্গিক বৈষম্যমুক্ত জাতি গঠনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমাদের ওপর যে মহান দায়িত্ব ন্যস্ত করেছেন, তার জন্য সম্যকরূপেই বিনম্র এবং সম্মানিত বোধ করছি। আমরা এখনো উপলব্ধি করি যে স্বাধীনতার কোনো সহজ পথ নেই। বিশেষভাবেই আমরা জানি যে, আমাদের কারও পক্ষেই একাকী কোনো সাফল্য লাভ করা সম্ভব নয়। ঐক্যবদ্ধ জনগণ হিসেবে কাজ করেই আমরা জাতীয় পুনর্মিলন ও পুনর্গঠন এবং একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা করতে পারব।
সবার জন্য সুবিচার নিশ্চিত হোক। সবার জন্য শান্তি নিশ্চিত হোক। সবাইকেই কাজ, খাদ্য, পানি ও লবণের নিশ্চয়তা দিতে হবে। সবাই জানবেন, প্রত্যেকের পূর্ণ বিকাশের জন্য আপনাদের সবারই দেহ-মন-আত্মার মুক্তির নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে। কখনো নয়, আর কখনো নয়, এই সুন্দর দেশের কোনো মানুষ আর কখনো অন্য কারও দ্বারা নির্যাতিত হবে না, বিশ্বের নোংরা মানুষ বলে কারও দ্বারাই অপমানিত হবে না। স্বাধীনতাই হবে আমাদের শাসক। এমন গৌরবময় মানবিক অর্জন কখনো সূর্যাস্তের আঁধারে হারাতে পারে না।

ঈশ্বর আফ্রিকার মঙ্গল করুন।
ভাষান্তর: রামেন্দ্র চৌধুরী।
সূত্র: নেলসন ম্যান্ডেলা ইন হিজ ওন ওয়ার্ডস।

তাঁর মৃত্যু নেই বাংলাদেশেও by মতিউর রহমান

মানুষের জীবনের মতো মৃত্যুও স্বাভাবিক, অবশ্যম্ভাবী। বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে আলোচিত ও সম্মানিত তারকা নেলসন ম্যান্ডেলার জীবনাবসান হয়েছে।

কারামুক্তির পর নেলসন ম্যান্ডেলার ভাষণ- ‘ভয়কে জয় করেই আমাদের এগোতে হবে’

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যেসব বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন, তা ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ এবং যুগ যুগ ধরে মানুষকে প্রেরণা দেবে।

কালের পুরাণ- সুজাতার সফরে বাংলাদেশ কী পেল? by সোহরাব হাসান

ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিংয়ের সফরটি নিছক শুভেচ্ছা সফর ছিল না। ছিল তার চেয়েও কিছু বেশি। তবে কতটা বেশি এবং কতটা ফলপ্রসূ, সেই প্রশ্নের উত্তর জানতে আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

মেয়র আইভীর শপথ

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছেন, নারায়ণগঞ্জের বর্বর খুনি গডফাদাররা কিভাবে মনোনয়ন পেল সেটা বুঝতে পারছি না।

এসো নীপবনে- সত্য-মিথ্যা by আবুল হায়াত

আমি মিথ্যার বেসাতি করি। কথাটা একবচনে শুনতে খুব খারাপ লাগছে কি? তাহলে বহুবচনেই বলা যাক। আমরা মিথ্যার বেসাতি করি। ‘আমরা’ বলতে আমি অভিনয়শিল্পীদের বোঝাচ্ছি।
কথাটা আসলেই সত্যি। ‘অভিনয়’ ব্যাপারটিই মিথ্যাশ্রয়ী। অনেকে বলেন কল্পনাশ্রয়ী। বিষয় তো একই। যা হয়নি, ঘটেনি, হবে না বা ঘটবে না তাকে আমরা সত্যরূপে প্রকাশ করছি নাটকের মাধ্যমে। বিশেষ করে অভিনয় করে। বিশ্বাসযোগ্যভাবে মিথ্যাকে উপস্থাপন করে অভিনয় করছি বা করার চেষ্টা করছি। যিনি যত বিশ্বাসযোগ্যভাবে মিথ্যাকে উপস্থাপন করছেন তিনিই তত ভালো অভিনেতা।

আসলে মিথ্যাটা কী?
সোজা কথায় যাহা সত্য নয়, তাহাই মিথ্যা। অভিধান অনুযায়ী—একটি অসত্যকে ইচ্ছাকৃতভাবে সত্যরূপে উপস্থাপন করাই হচ্ছে মিথ্যা। আরও বিস্তারিত বলা হয়েছে কোথাও কোথাও—ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে বঞ্চিত করার জন্য কিংবা বিভ্রান্ত করার জন্য কোনো অসত্যকে সত্যরূপে উপস্থাপন করাই হচ্ছে মিথ্যা। তাহলে অন্তত এই একটি কারণে অভিনয়শিল্পীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে না—‘মিথ্যা’র পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে হবে, তখনই সেটা অপরাধ। সাদা বা সৎ মিথ্যার একটা উদাহরণ দেওয়া যায়। ক্যানসারে আক্রান্ত সন্তানকে বা কোনো আত্মীয়কে যখন তার মৃত্যু সন্নিকট জেনেও কেউ বলছেন, ‘কিছু হয়নি তোমার। ডাক্তার বলে গেলেন, এই তো আর দিন সাতেক পরেই তুমি উঠে চলাফেরা করতে পারবে।’
আসলে আমরা সবাই জন্মগতভাবে অভিনেতা। অর্থাৎ অসত্য বলতে পারাটা মানুষেরই প্রকৃতি। উদ্দেশ্যটাই নির্ধারণ করবে আপনি মিথ্যা বলছেন, না অসত্য বলছেন। এবার তাহলে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমরা অভিনয়শিল্পীগণ অসত্যের বেসাতি করি। মিথ্যার নয়।
মিথ্যা নিয়ে এত টানাহেঁচড়া করছি কেন? নিশ্চয়ই আপনার মনে এ প্রশ্ন জাগছে। জাগাটাই স্বাভাবিক। উত্তরটা দেওয়ার আগে একটা গল্প বলি।
একটি মাইক্রোবাসে দেশের বিখ্যাত সব রাজনীতিবিদ যাচ্ছিলেন এক সম্মেলনে যোগ দিতে। মাইক্রোটি গ্রামের পথে দুর্ঘটনায় পড়ে। প্রত্যেক রাজনীতিবিদ মারা যান। একজন কৃষক খেতে কাজ করছিলেন। তিনি দেখেন এই দুর্ঘটনা। তিনি একাই সবাইকে দাফন করেন।
কদিন পরই ওপর মহল থেকে রাজনীতিবিদদের খোঁজে আসেন মেলা লোকজন, সেপাই-সান্ত্রি। গাড়ির ভগ্নাবশেষ দেখে খুঁজে পান অকুস্থল। কৃষকেরও দেখা পান তাঁরা।
‘সবাই মারা গেছেন?’ কেউ প্রশ্ন করেন।
‘জি সবাই।’ কৃষক বলেন।
‘দেহগুলো কোথায়?’ অন্য কেউ জানতে চান।
‘কবর দিয়ে দিয়েছি।’
‘আপনি নিশ্চিত সবাই মারা গেছেন?’ আরেকজনের প্রশ্ন। ‘মাইক্রোবাসটির যাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ অবশ্য বলছিলেন, “আমি মারা যাইনি”। কিন্তু আমরা জানি, রাজনীতিবিদরা সব সময় মিথ্যা কথা বলেন, তাই ভাবলাম তখনো মিথ্যাই বলছেন...।’
এই গল্পটা কিন্তু আমেরিকার, এখানকার নয়। সেখানকার রাজনীতিবিদদের স্বভাবচিত্র নিয়ে নানা চুটকি-গল্প চালু আছে। আরেকটি গল্প বলি তাহলে, আমেরিকারই।
এক মাইক্রোভর্তি রাজনীতিবিদ ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। গাড়িটি দুর্ঘটনায় পড়ে সব যাত্রী নিহত হন। পরদিন পত্রিকায় সংবাদ বেরোয়: ‘দেশবাসীর জন্য একটি দুঃসংবাদ এবং একটি সুসংবাদ আছে। সুসংবাদ হচ্ছে এক মাইক্রোবাসভর্তি রাজনীতিবিদ দুর্ঘটনায় পড়ে নিহত হয়েছেন। আর দুঃসংবাদ হচ্ছে—মাইক্রোটিতে দুর্ঘটনার সময় একটি সিট খালি ছিল!’
মিথ্যার কথা বলতে গিয়ে রাজনীতিবিদদের কথা চলে এল, সে জন্য দুঃখিত। কিন্তু আসলেই মিথ্যার সঙ্গে অভিনয়শিল্পীরা যেমন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত, তেমনি রাজনীতিবিদেরাও জড়িত। অন্তত বর্তমান যুগে।
অভিনয়ের শেষ কথা বলে কিছু নেই। মিথ্যাকে নিয়ে আপনি ইচ্ছামতো খেলতে পারেন। নিজের ইচ্ছামতো। আমরা অভিনেতারাও পারি। তবে আমাদের বেলায় এটা ‘অসত্য’। কিন্তু রাজনীতিবিদদের বেলায় কী? ‘অসত্য’ না মিথ্যা?
বিচারটা আপনাদের ওপরই ছেড়ে দিলাম।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের উক্তিটা স্মরণ করা যেতে পারে: ‘পৃথিবীর প্রাচীনতম ব্যবসার সবচেয়ে কাছেরটি হচ্ছে রাজনীতি।’
আরেকটা বইতে কিছুদিন আগে দেখলাম একজন হলিউড অভিনেতার উক্তি: মিথ্যা তিন প্রকার—এক, ছোট মিথ্যা। দুই, বড় মিথ্যা। তিন, রাজনীতি।
রাজনীতি শব্দটা এসেছে গ্রিক শব্দ ‘পলিতিকোস’ থেকে, যার অর্থ হচ্ছে নাগরিকসম্পর্কীয়, নাগরিকের জন্য বা নাগরিক-এর। এর সংজ্ঞা এ রকম: পলিতিকোস ইজ দ্য প্র্যাকটিস অ্যান্ড থিওরি অব ইনফ্লুয়েন্সিং আদার পিপল অন আ সিভিক অর ইন্ডিভিজুয়াল লেভেল (নাগরিক বা ব্যক্তিগত পর্যায়ে অন্য লোকদের প্রভাবিত করার শাস্ত্র ও অনুশীলন)।
আর যা-ই থাক, এর ভেতর ‘অসত্য’ বা মিথ্যার কোনো স্থান নেই। কিন্তু বাস্তবে কী দেখছি আমরা? আমার মতো একজন চরম আশাবাদী মানুষও আজ অতলান্তিক হতাশায় পতিত হয়েছি। বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, মিথ্যা আসলে চার প্রকার: এক, ছোট মিথ্যা। দুই, বড় মিথ্যা। তিন, রাজনীতি। চার, বাংলাদেশের রাজনীতি।
তাহলে ‘সত্যের অবস্থান কী? সত্যের অবস্থান বড় কঠিন, সাংঘাতিক নিষ্ঠুর। আজ বাংলাদেশের মানুষ অসহায়, নিরাপত্তাহীন, রাজনীতিবিদদের জেদের শিকার, এটাই সত্য। নিরপরাধ মানুষ বেঘোরে প্রাণ দিচ্ছে, এটাই সত্য। রাজনীতিবিদেরা লাশের ওপর উৎসব করছেন আর ক্ষমতার লড়াই লড়ছেন, এটাই মহাসত্য। তার চেয়েও বড় সত্য: ‘আপনারা আমাদের বানান নাই। আমরাই আপনাদের বানাইছি।’
জয়তু গীতা সেন, আপনাকে সালাম!
আবুল হায়াত: নাট্যব্যক্তিত্ব।

যত দিন জীবিত, তত দিন আমিই চেয়ারম্যান: এরশাদ

অবসরে যাওয়ার খবর ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি বলেন, ‘আমি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। আমি এখনো জীবিত আছি। যত দিন জীবিত আছি, তত দিন আমিই চেয়ারম্যান।’

আজ শনিবার বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কের নিজ বাসভবনে বেলা সোয়া দুইটার দিকে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন এরশাদ।
এরশাদ বলেন, ‘আমি কাউকে ক্ষমতা হস্তান্তর করিনি। রওশন এরশাদ ক্ষমতা নেননি। আমি থাকতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হয় কী করে?’ তিনি বলেন, ‘যতই প্রোপাগান্ডা করুন, বিভ্রান্তি ছড়ান, আমি বলেছি সব দল না এলে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে যাবে না। আমরা কখনোই যাব না।’
নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় তাঁর দলের সদস্যদের থাকা প্রসঙ্গে এরশাদ বলেন, ‘তাঁরা থাকুক বা না থাকুক তাতে কিছু যায়-আসে না। আমাদের মহাসচিব প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে যাচ্ছেন।’
এর আগে আজ সকালে জাতীয় পার্টির বহিষ্কৃত জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্বস্ত সূত্রে তিনি জানতে পেরেছেন রওশন এরশাদকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়ে এইচ এম এরশাদ অবসরে যাবেন বা চিকিত্সা নিতে যাবেন। তিনি বলেন, এর অর্থ হচ্ছে, এরশাদ নির্বাচন বর্জনের যে ঘোষণা দিয়েছেন তা থেকে তিনি বেরিয়ে আসবেন। তাঁর গুলশানের বাসভবনে সাংবাদিকদের কাছে এ তিনি দাবি করেন।

এরশাদের বাসায় সাকিব

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বারিধারার বাসায় আজ শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে যান ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান।

এরশাদের সঙ্গে দেখা করে সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে সাকিব ওই বাসা থেকে বেরিয়ে যান। তবে এ সাক্ষাতের বিষয়ে তিনি বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের কোনো কিছু বলেননি।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৫ ডিসেম্বর সাকিবের বিবাহোত্তর সংবর্ধনা। এরশাদকে ওই অনুষ্ঠানের দাওয়াত দিতেই সাকিব এসেছিলেন।

সংবিধানের বাইরে যাওয়া সম্ভব না, তারানকোকে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে বলেছেন, তাঁর সরকার নির্বাচনে সব দলকে আনার চেষ্টা করছে। এই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তবে সংবিধানের বাইরে গিয়ে সরকারের পক্ষে কিছু করা সম্ভব হবে না।

আজ শনিবার বিকেলে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারানকোর বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন।

গওহর রিজভী বলেন, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকার যা যা করেছে তা তারানকোর কাছে তুলে ধরেন। রিজভী জানান, প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিবকে বলেন, ‘সব দলকে নির্বাচনে আনার অনেক চেষ্টা করেছি। আরও চেষ্টা করব। কিন্তু সংবিধানের বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়।’

রিজভী জানান, তারানকো নির্বাচন পেছানো যায় কি না, তা জানতে চান। এ ছাড়া নির্বাচনে সব দলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা যায় কি না, তা-ও জানতে চান তিনি। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের তারিখ পেছানোর বিষয় নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা দরকার। সরকার এখানে হস্তক্ষেপ করবে না। তবে যা কিছুই করা হোক না কেন তা সংবিধানের মধ্যেই করতে হবে।

আজ বিকেল চারটায় তারানকো গণভবনে প্রবেশ করেন। শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর অন্য কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত থাকলেও কিছুক্ষণ পরেই তাঁরা বেরিয়ে যান। এরপর এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে একান্ত বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী ও তারানকো।

তারানকোর সঙ্গে খালেদার বৈঠক

বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপির চেয়ারপারসনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। বৈঠকে রাজনৈতিক সংকট, সরকারের ভূমিকা, সহিংসতাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁদের দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বৈঠকে উপস্থিত বিএনপির এক নেতা।

আজ শনিবার সন্ধ্যা সাতটার কিছু পরে গুলশানে খালেদা জিয়ার বাসায় বৈঠক শুরু হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে এই বৈঠক।

বৈঠক শেষে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী জানান, এর আগে জাতিসংঘের মহাসচিব যে চিঠি দিয়েছিলেন তার সূত্র ধরে বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। নির্বাচন পেছানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য প্রসঙ্গে সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে শমসের মবিন বলেন, এ প্রসঙ্গে তাঁর দল এই মুহূর্তে কিছু বলতে চায় না। তিনি আরও জানান, সহকারী মহাসচিবের সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা আবার বৈঠক করবেন। এরপর তাঁরা সংবাদমাধ্যমকে বিস্তারিত জানাতে পারবেন।

খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকের সময় শমসের মবিন চৌধুরী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মঈন খান এবং বিএনপির চেয়ারপারসনের দুই উপদেষ্টা সাবিহউদ্দিন আহেমদ ও রিয়াজ রহমান। দলীয় নেতাদের নিয়ে বৈঠকের পর তারানকোর সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন খালেদা জিয়া।

মৃত্যুহীন প্রাণ by আসিফ রশীদ

একটি পৃথিবী মৃত, অন্যটি ক্ষমতাহীন
এ দুইয়ের মাঝে হাঁটতে গিয়ে
আমি থেকেছি বিশ্রামহীন।
- ম্যাথু আর্নল্ড
ম্যান্ডেলা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করেননি, মৃত্যুই ম্যান্ডেলার জন্য অপেক্ষা করেছিল। চারদিক থেকে প্রতিকূলতায় ঘেরা একটি সমস্যা সংকুল বিশ্বে যখন তার আবির্ভাব ঘটেছিল এবং সেই বিশ্ব থেকে পালিয়ে গিয়েছিল সত্য, তখন পরাজয় ঘটেছিল ম্যান্ডেলার। কিন্তু তিনি ফিরে এসেছিলেন বিজয়ী হয়ে, বীরের বেশে। তার সামনে তখন সব বিকল্পই ছিল। যাদের দ্বারা তিনি নিগৃহীত হয়েছিলেন, হারিয়ে ফেলেছিলেন যৌবনের ২৭টি বছর, তাদের ওপর তিনি প্রতিশোধ নিতে পারতেন অবলীলায়। কিন্তু শত্র“কে ক্ষমা করে দেয়ার বিকল্পটিই বেছে নিয়েছিলেন তিনি।
ম্যান্ডেলা একবার বলেছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকাবাসীকে স্মরণ করতে হবে তাদের ভয়াবহ অতীতের কথা, যাতে আমরা সঠিক পদক্ষেপটি নিতে পারি। যেখানে ক্ষমা করা দরকার, সেখানে ক্ষমা করতে হবে। তবে অতীতকে কখনও ভুলে গেলে চলবে না।
ম্যান্ডেলার সংগ্রাম ছিল যে বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে কেমন ছিল তার রূপ, সেটা কারোই ভুলে যাওয়া উচিত নয়। ম্যান্ডেলার আÍজীবনী গ্রন্থ ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ থেকে আমরা জানতে পারি, শ্বেতাঙ্গরা জনসংখ্যার মাত্র ১৩ শতাংশ হয়েও তিন শতাব্দীরও বেশি শাসন করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা। এই তো সেদিনের কথা। বর্ণবাদের ভিত গড়তে কতই না আইন করেছিল তারা। ১৯১৩ সালের ভূমি আইনের মাধ্যমে দেশের ৮৭ ভাগ ভূখণ্ড থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল কৃষ্ণাঙ্গদের। ১৯২৩ সালের নগর এলাকা আইনের মাধ্যমে কালোদের জন্য শহরতলীতে গড়ে তোলা হয় অসংখ্য বস্তি। উদ্দেশ্য সাদাদের শিল্পকারখানার জন্য সস্তায় শ্রমিক সরবরাহ। শহরের কেন্দ্রে বসবাসের অধিকার ছিল না তাদের। নিজ দেশে চলাফেরায় ছিল না স্বাধীনতা। ছিল না স্বাধীনভাবে ব্যবসা করার অধিকার।
ম্যান্ডেলা লিখেছেন : ‘একজন আফ্রিকান শিশুর জন্ম হয় শুধু আফ্রিকানদের জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়া হাসপাতালে। তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয় শুধু আফ্রিকানদের বাসে করে। সে বসবাস করে শুধু আফ্রিকানদের এলাকায় এবং পড়াশোনা করে কেবল আফ্রিকানদের স্কুলে- যদি আদৌ সে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায়। যখন বড় হয়, তখন আফ্রিকানদের জন্য নির্দিষ্ট চাকরিটিই কেবল সে করতে পারে। বাড়িভাড়া নেয় শুধু আফ্রিকানদের জন্য নির্ধারিত শহরতলীতে। চড়ে কেবল আফ্রিকানদের নির্দিষ্ট ট্রেনে। দিনে বা রাতের যে কোনো সময় তাকে পথিমধ্যে পাস দেখানোর নির্দেশ দেয়া হতে পারে। কেউ দেখাতে ব্যর্থ হলে তাকে গ্রেফতার করে জেলে নিক্ষেপ করা হয়। বর্ণবাদী আইন ও নিয়ম-কানুন দ্বারা তার জীবন হয়ে পড়ে নিয়ন্ত্রিত, যা তাকে বেড়ে ওঠার পথে পঙ্গু করে দেয়। তার সম্ভাবনাগুলো ঝাপসা করে ফেলে এবং তার জীবনের বিকাশকে করে দেয় রুদ্ধ।’
দক্ষিণ আফ্রিকার এই চরম বর্ণবাদী নীতিই ছিল কৃষ্ণাঙ্গদের দারিদ্র্যের প্রধান কারণ। ম্যান্ডেলা যখন জোহানেসবার্গে ল’ ফার্মে কেরানির কাজ করার পাশাপাশি পড়

৯৬ ও ১৩ সালের তফাৎটা বুঝতে হবে by মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

বাংলাদেশ একটা চরম সংকটকাল অতিক্রম করছে। অনেকে বলছেন, এটা নতুন কিছু নয়, এ রকম সংকট এ দেশে আগেও হয়েছে। এদের যুক্তি, ১৯৯৬ সালে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একই প্রকৃতির রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছিল। ওই সময় সরকারি দল নিজেদের নির্বাচিত সরকার দাবি করে সাংবিধানিকভাবে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে চেয়েছিল; আর বিরোধী দল চেয়েছিল নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৭৩ দিন হরতাল করেছিল। ওই সময়ও অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর জেনারেল স্যার নিনিয়ানসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিদেশী ব্যক্তিত্ব সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণ করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। পরে আন্দোলনের তীব্রতায় সরকার অবস্থান পরিবর্তন করে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার স্বার্থে একটি যেনতেন প্রকারের নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ওই সংকট উত্তরণ করতে পেরেছিল। তবে ১৯৯৬ সালের সংকটের সঙ্গে বর্তমান সংকটের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য আছে। ১৯৯৬ সালে সরকার প্রথম দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিলে কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু তা না করায় বিরোধী দল আন্দোলনের একপর্যায়ে সংসদ থেকে সম্মিলিত পদত্যাগ করায় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সরকারের পক্ষে আরেকটি সংসদ নির্বাচন করা ছাড়া সাংবিধানিকভাবে আওয়ামী লীগের দাবি মানা সম্ভব ছিল না। কাজেই সরকার ওই সময় আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা এবং ওই নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও একটি যেনতেন প্রকারের নির্বাচন করে সংসদে এককভাবে ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিয়ে ওই সংকটের সমাধান করেছিল। আওয়ামী লীগ ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনের বিরোধিতা করে একে প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও ষষ্ঠ সংসদে এককভাবে পাস করা সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিধান অনুযায়ী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পরোক্ষভাবে ওই ত্র“টিপূর্ণ নির্বাচনটিকে স্বীকৃতি প্রদান করেছিল।
বর্তমানের অবস্থাকে ১৯৯৬ সালের সংকটের সঙ্গে হুবহু তুলনা করা যথার্থ নয়। কারণ, এখন সরকার চাইলে একদিনেই সমস্যার সমাধান করতে পারে। এ জন্য সরকারকে সমঝোতার ভিত্তিতে সংসদে নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকার গঠনকল্পে একটি বিল এনে সে বিল পাস করে সে অনুযায়ী পরিবর্তিত সিডিউলে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে সমস্যার দ্রুত সমাধান করা সম্ভব। এ রকম একটি বিল সংসদে পাস করার উদ্দেশ্যে সরকার যদি বিরোধী দলকে সংসদে যোগদান করতে অনুরোধ করে, তাহলে এটি মনে করার কোনো কারণ নেই যে, বিএনপি সংসদে যোগ দেবে না। আর যদি বিএনপি সংসদে যোগ নাও দেয়, তাহলেও সরকারের কিছু আসে যায় না। কারণ, সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিএনপির সমর্থন ছাড়াই সরকার এমন বিল জাতীয় সংসদে একক প্রচেষ্টায় পাস করতে পারে। কিন্তু সরকার সে পথে অগ্রসর হয়নি। কেন সে পথে সরকার অগ্রসর হয়নি সে সম্পর্কে নাগরিক সম্প্রদায়ের মধ্যে যে ধারণা গড়ে উঠেছে তা হল, বিগত পাঁচ বছরে সরকার দেশ পরিচালনায় দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেনি। দলীয়করণ, দুর্নীতি ও বিরোধী দলকে যুগপৎ সংসদের ভেতরে ও বাইরে কোণঠাসা করে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলা ও নিপীড়নের কারণে সরকারের জনপ্রিয়তা যথেষ্ট হ্রাস পায়। উপনির্বাচন, স্থানীয় ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সরকার বুঝতে পারে যে, নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন করলে সরকার পরাজয় এড়াতে পারবে না। এ কারণে সরকার জনমত উপেক্ষা করে দলীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে স্বনিয়োজিত নির্বাচন কমিশনের অধীনে সংসদ, মন্ত্রিসভা ও সংসদ সদস্যদের স্বপদে বহাল রেখে দলীয়করণকৃত প্রশাসন ও স্বনিয়োজিত নির্বাচন কমিশনের আনুকূল্য লাভের মধ্য দিয়ে নিজেদের নির্বাচনী বিজয় নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করে।
বিরোধী দল সরকারের এ উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে দুই বছর ধরে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। সরকার দমন-পীড়ন এবং হামলা-মামলা করেও বিরোধী দলকে এ আন্দোলন থেকে সরাতে পারেনি। কারণ, বিরোধী দল জানে, যতই জনপ্রিয়তা থাকুক সরকারি দলের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অর্থই হল নির্বাচনী পরাজয় মেনে নেয়া। বিরোধীদলীয় এ আন্দোলন প্রথম দিকে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে সরকারই বিরোধী দলকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। প্রথম দিকে বিরোধী দলের সমাবেশ, জনসভা এবং বিভাগীয় পর্যায়ের রোডমার্চ কর্মসূচিগুলোতে কোনো সহিংসতা হয়নি। পরবর্তীকালে বিরোধীদলীয় কর্মসূচিতে জনসমর্থন বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার তাদের কর্মসূচিতে বাধা দেয়া শুরু করে। বিভাগীয় রোডমার্চ শেষ করে বিরোধী দল ঢাকা মহাসমাবেশ কর্মসূচি দিলে ওই কর্মসূচিতে সরকার ব্যাপকভাবে বাধা দেয়। পরবর্তীকালে হরতালের কর্মসূচিগুলোতে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের রাস্তায় পিকেটিং, মিছিল-মিটিং করতে দেয়া হয়নি। তাদের মানববন্ধনেও এক সময় বাধা দেয়া হয়। বিরোধীদলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা করে অনেক কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেফতার করে কারাগারে নেয়া হয়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের মতো একজন ক্লিন ইমেজের নেতার বিরুদ্ধে সিটি কর্পোরেশনের ময়লার গাড়ি ভাংচুরের মামলা দিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। সম্প্রতি দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার, মওদুদ আহমদ, রফিকুল ইসলাম মিয়া, শিমুল বিশ্বাস, আসম হান্নান শাহের মতো বর্ষীয়ান নেতাদের যে ধরনের মামলায় গ্রেফতার করা হয়, তাতে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, সরকার বিরোধীদলীয় কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেফতার করে আন্দোলন দমন করতে চায়। বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদের গ্রেফতারের সময়কাল ও ভঙ্গিমা দেখেও অনুধাবন করা যায় যে, সরকার গ্রেফতারের মাধ্যমে বিরোধী নেতাদের আতংকিত করে তাদের আন্দোলন দমন করতে চায়।
বিরোধীদলীয় আন্দোলন যখন শান্ত ছিল তখন সরকার তাদের শান্তিপূর্ণ আন্দেলন করতে বাধা সৃষ্টি করেছে। বিরোধী দল আন্দোলন স্তিমিত করে সংলাপ-সমঝোতার ওপর গুরুত্বারোপ করলে সরকারি দলের মন্ত্রী-নেতারা সে বিষয়টিতে আন্তরিকভাবে সাড়া না দিয়ে পরিবর্তে ‘বিরোধী দলের আন্দোলনের মুরোদ নেই’ বলে সমালোচনা করে বিরোধী দলকে আন্দোলনে উসকানি দিয়েছে। আর এখন সমঝোতার প্রায় সব পথ বন্ধ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে বিরোধী দল যখন জোরালো আন্দোলন শুরু করেছে, তখন সরকারি দল সে আন্দোলনে সৃষ্ট সহিংসতার সমালোচনা করছে। সরকারি দল যদি বিরোধী দলকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে না দেয়, যদি তাদের দাবি মানার ব্যাপারে তাদের সঙ্গে সংলাপ-সমঝোতা না করে এককভাবে নির্বাচন করতে চায়, তাহলে বিরোধী দল দাবি আদায়ের লক্ষ্যে জোরালো আন্দোলন করা ছাড়া আর কী করতে পারে! জনপ্রিয়তা, নৈতিকতা ও যৌক্তিকতার বিবেচনায় বিরোধী দল সরকারি দলের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে, সে কারণে আÍঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধী দল সরকারের পাতা দলীয় সরকারের অধীনে একক নির্বাচনের ফাঁদে পা দিয়ে নিশ্চিত নির্বাচনী পরাজয় মেনে নেবে কেন?
নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার ত্র“টি-বিচ্যুতি সংশোধন করে সেই সংশোধিত নির্দলীয় ব্যবস্থার অধীনে সংসদ নির্বাচন করার সুযোগ ছিল সরকারের। কিন্তু সরকার সে পথে না গিয়ে প্রথম দিকে ইভিএমে সংসদ নির্বাচন করতে উদ্যোগ গ্রহণ করলে ওই উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর স্বনিয়োজিত নির্বাচন কমিশনের অধীনে নিজেরা ক্ষমতায় থেকে দলীয় তত্ত্বাবধানে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চেয়েছে। বিরোধী দলকে আন্ডারএস্টিমেট করে চালাকি করে যে নির্বাচনে জেতা যাবে না, সে সত্যটি সরকার অনেক দেরি করে বুঝতে পেরেছে। নিজেদের জনপ্রিয়তা যাচাই করার পর নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবি না মানার যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, এ বছরের মাঝামাঝি পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভরাডুবির পর সরকার সে সিদ্ধান্তে অনড় থাকার মানসিকতা জোরদার করে। এ জন্য প্রধান বিরোধী দলসহ ১৮ দলীয় জোট নির্বাচনে না এলেও জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনকালীন সরকারে পাঁচজন মন্ত্রী ও একজন উপদেষ্টা দিয়ে পৃথকভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণে রাজি করিয়ে ওই দলটিকে বিরোধী দল বানানোর পরিকল্পনা করে। জাপা প্রধান সব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না বলে এলেও পরবর্তীকালে সবাইকে চমকে দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বিরোধীদলীয় লাগাতার কর্মসূচির মধ্যে কমিশন ঘোষিত নির্বাচনী সিডিউল অনুযায়ী সরকারি দল ও জাপা প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দেন। এভাবে জাপাকে পৃথকভাবে নির্বাচন করিয়ে সরকার যখন বিরোধীদলীয় দাবি এবং সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পরামর্শ উপেক্ষা করে একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল সরকার, তখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহু নাটকীয়তা সৃষ্টিকারী বহুরূপী এরশাদ মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার মাত্র দু’দিন পর নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে জাপার সব প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার এবং মন্ত্রিসভা থেকে জাপা সদস্যদের পদত্যাগ করতে নির্দেশ দেন।
জাতীয় পার্টির নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত সরকারকে মহাগ্যাঁড়াকলে ফেলে দিয়েছে। সরকারের পক্ষে এখন আর এ নির্বাচনকে সবার অংশগ্রহণমূলক বলার কোনো উপায় থাকল না। এহেন একতরফা নির্বাচন হলে সে নির্বাচনে যে সবাই আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কমনওয়েলথ এ রকম নির্বাচন পর্যবেক্ষণে তাদের অনাগ্রহের কথা বলে দিয়েছে। শিক্ষকরা নিরাপত্তাজনিত কারণে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে অনীহা প্রকাশ করছেন। জাপা নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে যেসব আসনে কেবল সরকারি দল ও জাপা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিল সে আসনগুলোতে আর নির্বাচনের প্রয়োজন হবে না। ফলে প্রায় ২০% আসনে সরকারি দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে পারবেন, যা সংসদীয় নির্বাচনের ইতিহাসে একটি অনন্য রেকর্ড হবে। জাপার নির্বাচন বর্জনের পরও ৪ ডিসেম্বর সরকারি দল কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় নির্বাচন করার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। দলীয় মুখপাত্র সৈয়দ আশরাফ বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন ঘোষিত সময়েই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তারিখের হেরফের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মেনে নেবে না। যত বাধাই আসুক, আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে।’
গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নামে আওয়ামী লীগ যেভাবে একতরফা নির্বাচন করতে চাইছে, তাতে উদ্বিগ্ন হয়ে অনেকে ভাবছেন, এ দেশের রুগ্ন গণতন্ত্রকে হয়তো আবারও হাসপাতালে যেতে হবে। কারণ, এ রকম নির্বাচন করতে গেলে যে সহিংসতা হবে তাতে আবারও রাজনীতিতে অরাজনৈতিক শক্তির হস্তক্ষেপ হতে পারে। একটা বিষয় ভুলে গেলে চলবে না, আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন প্রতিহত করার যে ঘোষণা দিয়েছিল, সে ঘোষণার সঙ্গে ১৮ দলের দশম সংসদ নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণার পার্থক্য অনেক। কারণ, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জানতো যে, ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনটি সরকার সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য বাধ্য হয়ে করছে। নির্বাচনটি সরকার ক্ষমতায় থাকার উদ্দেশ্যে নয়, বরং বিরোধীদলীয় দাবি মেনে নেয়ার লক্ষ্যে সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরির জন্য করছে। এ কারণে ওই নির্বাচনে সহিংসতার মাত্রা হয়তো অতটা জোরদার ছিল না। কিন্তু দশম সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। এ নির্বাচন সরকার বিরোধীদলীয় দাবি মেনে নেয়ার জন্য নয়, বরং ক্ষমতায় থাকার জন্যই করছে। কাজেই এ ক্ষেত্রে এ নির্বাচন প্রতিহত করার ক্ষেত্রে ১৮ দল সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করবে। ফলে ওই রকম অবস্থায় নির্বাচন হতে পারবে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, গায়ের জোরে নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকার লক্ষ্যে যেনতেন প্রকারে নির্বাচন ও সরকার গঠন করলে সে সরকার প্রথম দিন থেকেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে। ফলে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়বে।
গণতন্ত্রে একদলীয় নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পায় না। জাপার নির্বাচন বর্জনের ফলে সরকারের পক্ষে দশম সংসদ নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক প্রমাণের আর সুযোগ রইল না। বাংলাদেশের রুগ্ন গণতন্ত্রকে গ্যাঁড়াকলে পড়া মহাজোট সরকার কোনোভাবে শুশ্রুষা করতে পারবে, নাকি হাসপাতালে পাঠাবে, তাই এখন দেখার বিষয়।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি আর গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার এক নয় by সুলতান মাহমুদ রানা

দেশে প্রতিটি সরকারের শেষ সময়ে এসে নির্বাচনকালীন সরকার ও নির্বাচন প্রশ্নে সংকট সৃষ্টি যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। ’৯০ পরবর্তী প্রায় প্রতিটি সরকারের মেয়াদ শেষেই নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে সংঘাত ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। কখনও সংকট থেকে সুষ্ঠু উত্তরণ ঘটেছে আবার কখনও রাজনৈতিক ঘোলাটে পরিবেশ জাতির জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে এবং মেয়াদ শেষ করে ক্ষমতা থেকে চলে যায়। কিন্তু রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আজ পর্যন্ত কোনো সরকারই আনতে পারেনি। রাজনীতিকরা তাদের প্রদত্ত গণতন্ত্র কায়েমের প্রতিশ্র“তি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। গণতন্ত্র রক্ষার অঙ্গীকার করা হয় কিন্তু গণতন্ত্র কিংবা গণতান্ত্রিক পরিবেশ কোনোটাই রক্ষিত হয় না। নির্বাচনের উদ্দেশ্য হল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা, কারণ গণতন্ত্র আমাদের সাংবিধানিক অধিকার। সংবিধানের ১১ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে।’ সত্যিকারের গণতন্ত্র তথা গণতান্ত্রিক শাসনের কার্যকারিতা বহুলাংশে নির্ভর করে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সরকারের আচরণ ও কার্যক্রমের ওপর। রাজনীতিকরা সাধারণ মানুষকে সব সময়ই বোঝানোর চেষ্টা করেন, একমাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় এবং এরপর রূপকথার কেচ্ছার মতো যেন, ‘everyone will live happily thereafter’ অর্থাৎ সবাই পরবর্তীকালে মহাসুখে বসবাস করবে। গণতন্ত্র কায়েমের জন্য আর কিছুই দরকার হবে না। তবে এ কথা অবশ্যই ঠিক যে, গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে সংসদ নির্বাচন অপরিহার্য।
কিন্তু সংসদ নির্বাচনের আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর গণতন্ত্রসম্মত অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার এমন হবে যাতে রাজনৈতিক দলগুলো দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ধরে রাখতে সংসদীয় কৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে। রাজনৈতিক বিরোধিতার জের ধরে বিরোধী দলের নেতার নামে প্লেট চুরির মামলা ঠুকে দেয়া কিংবা ককটেল ফাটানোর মামলায় দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কারাগারে বন্দি করে রাখা- এসব গণতন্ত্রের নমুনা নয়। গণতন্ত্রে বিরোধী দলও সাংবিধানিক মর্যাদা পায়। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো সরকারি ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিরোধী দলের যথাযথ মান রাখে না। পরমতের প্রতি শ্রদ্ধা গণতন্ত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলেও তা মেনে চলার মানসিকতা এখানে নেই। পরমত মেনে চলার প্রসঙ্গে বিশিষ্ট মনীষী ভলতেয়ারের বিখ্যাত উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য : ‌I do not agree with a word you say, but ও রিষষ defend to the death your right to say it.’ অর্থাৎ ‘আমি তোমার একটি কথাও সমর্থন করি না, কিন্তু তোমার মত প্রকাশের অধিকারকে প্রাণ দিয়ে রক্ষা করব।’ রাজনৈতিক দলগুলোকে আজ একই কণ্ঠে অঙ্গীকার করতে হবে, তারা আজ যে সমঝোতা ও প্রতিশ্র“তি দেবে তা আগামী দিনেও যথাযথভাবে মেনে চলবে। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে পুনরায় দেশে কোনো অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে না। এ কারণে রাজনৈতিক দলগুলোকে হতে হবে স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ ও গণতন্ত্রমনা। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষার্থে প্রতিশ্র“তি দেয় ঠিকই, কিন্তু তা রক্ষায় তাদের সফলতার পরিমাণ খুবই কম। সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কথা থাকলেও দলতন্ত্র ও ফায়দাতন্ত্রের লাগামহীন চর্চার ফলে তারা যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। সংগঠিত নাগরিক সমাজের অধিকাংশ আজ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অনুগত। ’৯০-এর গণআন্দোলনের সময় একতাবদ্ধ শিক্ষক, ডাক্তার, আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও অন্য পেশাজীবীদের অনেকেই তাদের নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে এসে এখন দলীয় অঙ্গ কিংবা সহযোগী সংগঠনের খাতায় নিজেদের নাম লিখিয়েছেন। ফলে তারা গণতান্ত্রিক শাসনকে সুসংহত করার ক্ষেত্রে অতন্দ প্রহরীর ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।
দেশের গণতান্ত্রিক শাসনের ব্যর্থতার মূলে আরও একটি বড় সমস্যা হল- সংসদীয় গণতন্ত্র বিদ্যমান থাকলেও দেশে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থা বিদ্যমান অর্থাৎ এখানে প্রধানমন্ত্রীই সব ক্ষমতার মূলে। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো কিছুই কার্যকর অর্থে করা সম্ভব নয়। সংসদীয় বিধান মোতাবেক সংসদে সরকারের প্রতি অনাস্থা আনার বিধান থাকলেও সংবিধানে বর্ণিত ৭০ নং অনুচ্ছেদের ফলে তা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সাংবিধানিক কিছু পরিবর্তন কিংবা সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। কারণ ক্ষমতার কেন্দ বিন্দু যদি এক ব্যক্তিভিত্তিক হয় তাহলে দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার মাত্রার চেয়ে দুর্নীতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগই বেশি তৈরি হয়। দেশের সাংবিধানিক ধারা মতে, সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর মতের বিরুদ্ধে সংসদে ভোটাধিকার প্রয়োগ করলে এমনকি ভোটের সময় সংসদে অনুপস্থিত থাকলে পদ হারানোর ভয়ে সংসদ সদস্যরা নিজস্ব বিবেক-বুদ্ধির বাইরে চলে যান। এটিই হচ্ছে এ দেশে দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার নমুনা। যেখানে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান, সেখানে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাবের বিধান থাকলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।
রাজনৈতিক দলগুলো দেশ ও সমাজ গঠনের কোনো আদর্শভিত্তিক পরিকল্পনা কিংবা বক্তব্য দেয় না। ক্ষমতায় যাওয়াই হল দলগুলোর প্রধান লক্ষ্য। রাজনৈতিক দলগুলোর ছত্রছায়ায় সন্ত্রাস ও দুর্নীতি এখন রাজনীতির বড় নিয়ামক। এখানে নির্বাচন হয়, কিন্তু কীভাবে হয় সেটা একটু বিশ্লেষণ করলেই এর প্রকৃতি অনুধাবন করা যাবে। যেভাবে একজন বিত্তশালী ব্যক্তি হাট কিংবা বাজার ইজারা নিয়ে থাকে, অনেকটা সেভাবেই দেশের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। একজন বিত্তশালী ব্যক্তি হাট বা বাজার ইজারা নেন এজন্য যে, কয়েক বছর পর সেখান থেকে তিনি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা আয় করবেন এবং লাভবান হবেন। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিটি নির্বাচনে জনপ্রতিনিধিরা মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে লাখ লাখ টাকা খরচ করে নির্বাচিত হয়ে সেই টাকা তুলতে অনেকটাই সচেষ্ট থাকেন। অর্থ ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে নির্বাচনে জয়ী হওয়া বর্তমানে সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। একজন সংসদ সদস্য নির্বাচনে ৪০ লাখ টাকা খরচ করলে নির্বাচিত হওয়ার পর তা কীভাবে দ্বিগুণ করা যায় সেদিকেও খেয়াল রাখেন। কাজেই নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হাট বা বাজার ইজারা নিয়ে ব্যবসা করার শামিলই বটে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত করার জন্য দেশের রাজনীতিকরা অতীতে নানা প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন, কিন্তু সেগুলো তারা রক্ষা করতে পারেননি। যেমন ১৯৯০ সালের তিন জোটের রূপরেখা। ওই রূপরেখার মাধ্যমে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নানাবিধ সংস্কারের অঙ্গীকার করেছিল। যেমন- জাতীয় সংসদকে সব সমস্যা সমাধানের কেন্দ বিন্দুতে পরিণত করা, নির্বাচিত সরকারকে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করার চেষ্টা থেকে বিরত থাকা। কিন্তু দেশে বিদ্যমান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোই তিন জোটের রূপরেখার প্রতিশ্র“তি রাখতে পারেনি। বিরোধী দলগুলো সংসদের অধিবেশন বর্জন করেছে প্রতিনিয়ত। সংসদকে সমস্যা সমাধানের কেন্দ বিন্দুতে পরিণত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
তাই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানাই, আপনারা নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে সমঝোতা এবং পরবর্তীকালে ক্ষমতায় এসে পুনরায় ক্ষমতা ধরে রাখার নতুন ফন্দি করতে সচেষ্ট না হয়ে গণতন্ত্র রক্ষার প্রতিশ্র“তি দিন। আমরা চাই সত্যিকার গণতন্ত্র। এজন্য শুধু নির্বাচন নয় বরং নির্বচন পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে সমঝোতা এবং তা মেনে চলার অঙ্গীকার আবশ্যক। যে গণতন্ত্রে স্থিতিশীলতা, একে অপরের প্রতি আস্থা এবং জনগণের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানোর ব্যবস্থা আছে, সেই গণতন্ত্রের প্রতীক্ষায় আছি আমরা সর্বসাধারণ।
সুলতান মাহমুদ রানা :
সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আর যাওয়ার জায়গা নাই by ফরহাদ মজহার

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং ঝড়ের মতোই এসেছিলেন, ঝড়ের মতোই গেলেন। পাঁচ তারিখ খুব সকালে যখন তিনি দিল্লি ফিরে যাচ্ছেন, তখন থেকেই ভাবছি তার এই আসার আদৌ নতুন কোনো তাৎপর্য আছে কিনা। দিল্লি ঢাকাকে যেটা জানাতে চেয়েছে সেটা ভারতীয় পত্রপত্রিকার ও তাদের থিংকট্যাংকগুলোর সুবাদে আমরা আগেই জানি। সেটা হল শেখ হাসিনার একতরফা নির্বাচনের নীতি সমর্থন। তিনি নেপালের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, সেখানেও একটি দল নির্বাচন বর্জনের হুমকি দিয়েছিল, কিন্তু শেষাবধি সেখানে নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন বর্জনের পরোয়া না করে শেখ হাসিনাকে ‘গণতন্ত্রের স্বার্থেই’ নির্বাচন করতে হবে, এটাই উচিত কাজ (দেখুন প্রথম আলো, ‘গণতন্ত্রের স্বার্থেই নির্বাচন হওয়া উচিত’, ৬ ডিসেম্বর ২০১৩)। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় দিল্লি সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন হোক সেটাই চায় কিনা, বাংলাদেশের সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন। সুজাতা সিং বলেছেন, ‘অধিকাংশের অংশগ্রহণ’ কাম্য। বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করা গেলে দিল্লির তাতে বিশেষ আপত্তি থাকার কথা নয়। সুজাতা সিং ঢাকায় নেমেই বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন তিনি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদের কাছ থেকে বাংলাদেশ সম্পর্কে যা জানার জেনে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে বিশেষ বিমানে পাঠিয়েছেন এ কথাই বলতে যে, নির্বাচন করতে হবে। একতরফা নির্বাচনের কী পরিণতি হতে পারে তার নমুনা আমরা এখন দেখছি। অভিজ্ঞতাও হচ্ছে। ঢাকার বাইরে রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ কতটুকু আছে দিল্লির নীতিনির্ধারকরা সেটা হিসাব ও মূল্যায়ন করেছেন কিনা জানি না। নেপালের নির্বাচনের অবস্থা আর বাংলাদেশের পরিস্থিতি এক নয়। তুলনা অর্থহীন। এরপরও শেখ হাসিনাকে দিল্লি যখন একতরফা নির্বাচনের পরামর্শ দিচ্ছে, তাতে আমাদের আশংকাই ঠিক হতে চলেছে। দিল্লি বাংলাদেশে রক্তপাতই চায়। দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা দিল্লি নিজের কর্তব্য গণ্য করে না।
খবরের কাগজে যা পড়েছি আর বিভিন্ন সূত্রে যতটুকু জানাজানি তাতে নিশ্চিত যে, ভারতের পররাষ্ট্র সেক্রেটারির ভ্রমণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই সত্য ছাড়া নতুন কিছুই যোগ করেনি। তবে বিয়োগের খাতায় যুক্ত হয়েছে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি। এটা ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের জন্য নতুন বাস্তবতা। তিনি সম্ভবত এই আকস্মিকতার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। এ ঘটনা সুজাতা সিং ও দিল্লির সাউথ ব্লকের মাথাব্যথার বড় কারণ হতে পারে। তিনি দিল্লি ছাড়ার আগে জেনে এসেছিলেন মহাজোটের নতুন সরকারে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আছেন। এটাই স্বাভাবিক। দিল্লি শেখ হাসিনাকেই ক্ষমতায় ফের ফিরিয়ে আনতে চায়। এদিক থেকে বিচার করলে বাংলাদেশের এখনকার রক্তপাতের জন্য নির্বিচারে শেখ হাসিনার সরকারকে সমর্থনের দায় দিল্লির এড়ানো মুশকিল। শেখ হাসিনার একগুঁয়েমি ও বিরোধী দলকে নিপীড়ন ও নির্যাতনের মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার পেছনে দিল্লির উৎসাহ ও প্রশ্রয় কাজ করেছে।
এরশাদের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক বিবেচনায় রাখলে দিল্লির প্রধান মিত্র শেখ হাসিনার সঙ্গেই জাতীয় পার্টির থাকার কথা। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কে চিড় ধরেছে এমন কোনো খবর আমার জানা নেই। ফলে এরশাদ ‘সর্বদলীয়’ সরকারে থাকবেন না, সেটা সুজাতা সিংয়ের জন্য খুবই বিস্ময়কর খবর। এর জন্য তার প্রস্তুতি থাকার কথা নয়। এরশাদ গত তিন ডিসেম্বর মঙ্গলবার দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। পরদিন চার তারিখ বুধবার তিনি নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকা তার দলের মন্ত্রীদের পদত্যাগ ও দলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করার নির্দেশ দেন। এরশাদ নির্বাচন করবেন না এই হঠাৎ ঘোষণা শুধু শেখ হাসিনার নয়, দিল্লির পরিকল্পনাকেও বেশ নড়বড়ে করে দিয়েছে। সুজাতা সিংয়ের সফরের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আছে কিনা জানা যায়নি।
তারপরও সবাই বলছেন, ডিগবাজি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নতুন দিচ্ছেন না, এটা তার পরিচিত ক্রীড়া। ফলে এরশাদ আসলে কী চাইছেন এবং কী করবেন সেটা চূড়ান্তভাবে জানার জন্য আমাদের ১৩ তারিখ অবধি অপেক্ষা করতে হবে। সেই দিন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। মাঝখানে রয়েছে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর সফর। আজ ছয় তারিখ শুক্রবার তিনি বাংলাদেশে আসবেন। তার সফর শেষ হবে ১০ তারিখে। নতুন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয় কিনা সেটা তখন দেখা যাবে।
নতুনভাবে গঠিত মহাজোট সরকারকেই আওয়ামী লীগ ‘সর্বদলীয়’ দাবি করছে। নৈতিক বৈধতা হারিয়ে ফেলা সরকারকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি। এই বেকায়দা অবস্থায় তথাকথিত ‘সর্বদলীয়’ সরকার থেকে জাতীয় পার্টির বেরিয়ে আসা ক্ষমতাসীনদের জন্য আছাড় খাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং এই বিপদ কতটা টের পেয়েছেন আমরা জানি না। তবে তার কাণ্ডজ্ঞান সক্রিয় থাকলে এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের সময় টের পেয়েছেন যে দিল্লির ছক অনুযায়ী বাংলাদেশের রাজনীতি চলছে না। এরশাদের অবস্থান সাময়িকও যদি হয় এদিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। দিল্লির ঘুঁটি তিনি সাময়িক হলেও কিছুটা এলোমেলো করে দিতে পেরেছেন। এর পরিণতি খারাপ দিকে গড়াতে পারে সে ব্যাপারেও এরশাদের হুঁশ আছে। তিনি বুঝেছেন এতবড় অঘটন ঘটিয়ে তার অক্ষত থাকা কঠিন। গ্রেফতার হয়ে যেতে পারেন। তাই আÍহত্যার হুমকি দিয়ে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
কাণ্ডজ্ঞানের কথা তুলছি বাধ্য হয়ে। এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় একজন ভারতীয় আমলা হিসেবে সুজাতা সিং যে যুক্তি দিয়েছিলেন বলে পত্রপত্রিকায় দেখেছি, সেখানে কূটনৈতিক কাণ্ডজ্ঞানেরই প্রকট অভাব দেখা গেছে। সুজাতা সিংয়ের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতের পর এরশাদ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ভারতের পররাষ্ট্র সচিব তাকে বলেছেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দল ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থান হবে। সেটা তিনি চান কিনা? তিনি উত্তর দিয়েছেন, যদি সেটা ঘটে তবে তার দায় সরকারের। বলেছেন, ‘সরকার সবাইকে শত্র“ বানিয়েছে। দেশের জনমত ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে।’ যদি এই সুবচন শেষ মুহূর্তে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অভিজ্ঞতাসিদ্ধ বিবেচনা বোধ (!) হয়ে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে জনরোষ থেকে তিনি কিছুটা নিস্তার পাবেন, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। যদি তিনি তার সুবিধাবাদ পরিত্যাগ করে এই অবস্থানে অনড় থাকেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে দরকষাকষির চালাকি পরিহার করেন, তাহলে তাকে নিয়ে কার্টুনের প্রতিযোগিতাও অনেক কমে আসবে।
ভারতীয় সচিবের কাণ্ডজ্ঞানের অভাব বলছি এ কারণে যে, বাংলাদেশের জনগণ ক্ষমতায় কাকে চায় বা না চায় সেটা বাংলাদেশের ব্যাপার। মনে যাই থাকুক, এ ব্যাপারে কিছু না বলাই কূটনৈতিক কাণ্ডজ্ঞান। কূটনীতিক হিসেবে সে ব্যাপারে মন্তব্য অনভিপ্রেত। আমি ‘শিষ্টাচার’ বলছি না, কারণ দিল্লির কাছ থেকে সেটা আশা করা বৃথা। তবে দিল্লি যদি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে আদৌ প্রভাব বিস্তার করতে চায়, তাহলে শেখ হাসিনার পক্ষে নির্বিচারে দাঁড়ানো কূটনৈতিক বুদ্ধির পরিচয় নয়। বিশেষত দেশের সবাইকে যে সরকার শত্র“তে পরিণত করে ফেলেছে। দিল্লির উচিত এরশাদের মতো ভুল শুধরে বাংলাদেশের জনগণের মন জয় করার চেষ্টা করা। আর সেই শিক্ষাটা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কাছ থেকে বিনীত চিত্তে গ্রহণ করে সুজাতা সিং দিল্লি ফিরে গেলে তা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক হতো। দিল্লির পররাষ্ট্রনীতিতে গুণগত পরিবর্তন ঘটানোই বরং কাজ। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদই, ঠাট্টা মনে হলেও, দিল্লির উপযুক্ত শিক্ষক। আমি মশকারা করে বলছি না, বরং আন্তরিকভাবেই বলছি। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ক্ষমতাসীনরা দায়ী- দিল্লির এই উপলব্ধি দরকার।
আর আমাদেরও উচিত ভারতের গণতান্ত্রিক জনগণের সঙ্গে মৈত্রী রচনার প্রশ্নকে সব সময়ই নজরের সামনে রাখা; তাদের ন্যায়সঙ্গত উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগকে আন্তরিকভাবে বোঝা ও প্রশমনের চেষ্টা করা। যেন দক্ষিণ এশিয়াকে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিকভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকা শুধু নয়, প্রয়োজনীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়ে ওঠে। ষোল কোটি মানুষের এই দেশটির নিজের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার জন্যই সেটা জরুরি। জরুরি আমাদের বৈষয়িক সমৃদ্ধির জন্যও। ভারতের আমলাতন্ত্র, শাসকশ্রেণী ও গণমাধ্যমের ভূমিকার কারণে যা কঠিন হয়ে আছে। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য দিল্লির উচিত প্রতিবেশীদের সঙ্গে দাসমূলক সম্পর্ক নয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মর্যাদার ভিত্তিতে মৈত্রীর সম্পর্ক চর্চা। সেই জায়গা থেকেই দরকার অজ্ঞতা, উগ্রতা, সাম্প্রদায়িকতা, বিদ্বেষ, মিথ্যাচার, কুপ্রচার বা ঘৃণা চর্চার মানসিকতা ও সংস্কৃতি থেকে নিজেদের মুক্তির প্রাণপণ প্রয়াস চালানো। উভয় পক্ষের।
অন্য আরেক দিক থেকেও পররাষ্ট্র সচিবের কাণ্ডজ্ঞানের অভাব অবিশ্বাস্যই বলতে হবে। ভারত যেখানে তার নিজের দেশের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি প্রশমন করতে পারছে না, সেখানে বাংলাদেশের মৌলবাদ নিয়ে উৎকণ্ঠা একান্তই হিন্দুত্ববাদী উৎকণ্ঠা ও ইসলাম-বিদ্বেষ ছাড়া আর কী হতে পারে? গুজরাটের দাঙ্গায় মুসলমানদের হত্যার জন্য যাকে দায়ী করা হয় ভারতে আজ সেই নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী পদে অভিষিক্ত করার রাজনীতি প্রবল। নরেন্দ্র মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েও যেতে পারেন। যারা তাদের নিজের দেশের মৌলবাদ রুখতে অক্ষম, তারা যখন অন্য দেশে এসে মৌলবাদ ঠেকানোর জন্য শেখ হাসিনাকে সমর্থনের কথা বলেন, তাকে ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিই বা বলা যেতে পারে।
এসব ধৃষ্টতা আমাদের সহ্য করতে হবে। একজন ভারতীয় আমলা, যিনি রাজনীতিবিদ নন কিংবা ভারতের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিও নন, তিনি অনায়াসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেত্রীর সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয়ে কথা বলে যাচ্ছেন। অথচ তার রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কথা বলার থাকলে কথা বলার কথা শুধু সচিব পর্যায়ে। পরাশক্তির নির্লজ্জ দালালি করতে গিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা নিজেদের আত্মসম্মান ও আÍমর্যাদাই শুধু হারান না, দেশের মাথাও লুটিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু জনগণ নিজেরা যতদিন তাদের মর্যাদা রক্ষাকে রাজনীতির কর্তব্য বলে গণ্য করবে না ততদিন এ ধরনের ধৃষ্টতা কৌটিল্যপনা ও মোগলাই অহংকার নির্বিশেষে শেয়াল কিংবা সিংহ সবাই আমাদের দেখিয়ে যাবে।
দুই
ব্যক্তি হিসেবে সুজাতা সিং সম্পর্কে আমি আপত্তি করছি না। তিনি সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব হয়েছেন। পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে যোগদানের পরপরই পররাষ্ট্র বিভাগকে নতুনভাবে সাজাতে চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশে যারা রাজনীতি করছেন কিংবা সরকারি পর্যায়ে যারা নীতিনির্ধারক তাদের এই পরিবর্তনটা বোঝা দরকার। সমুদ্র ভারতের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ- এই উপলব্ধি ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে অনেক দিন আগে থেকেই আছে। চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক্ষেত্রে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতা আছে। এগুলো নতুন খবর নয়। সমুদ্রকেন্দ্রিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ভারতের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতি ও কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ সমুদ্র ও সমুদ্রের সন্নিহিত দেশ ও অঞ্চল শুধু প্রতিরক্ষা বিভাগের নয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরও ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের বিষয় ও তৎপরতার এলাকা। সুজাতা সিং পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর সমুদ্রকেন্দ্রিক অঞ্চলের দেশগুলো যে বিভাগের অধীনে ছিল সে বিভাগকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। আগে বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, মিয়ানমার ও মালদ্বীপ ছিল এই বিভাগের অধীন (ইঝগ ফরারংরড়হ)। সুজাতা সিং দায়িত্ব নেয়ার পর মালদ্বীপ ও শ্রীলংকার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে তিনি শুধু দ্বিপাক্ষিক গণ্য করছেন না, তাদের নিয়ে ভিন্নভাবে ভাবতে শুরু করেছেন। ভারত মহাসাগর ঘিরে দিল্লির বৃহৎ ও বিস্তৃত স্বার্থের দিক থেকে শ্রীলংকা ও মালদ্বীপকে তিনি চিহ্নিত করেছেন। এই দুটো দেশ ভারত মহাসাগরে দিল্লির নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত রাখার খুঁটি। সেই জায়গা থেকেই তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবেন; সেটা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ছাড়িয়েও বহুপাক্ষিক আরও বিভিন্ন সম্পর্কের অন্তর্গত হবে। তাদের দেখভাল করবে ভিন্ন একটি বিভাগ। তার অধীনে যাবে সেশেলস, মরিশাস ও মাদাগাস্কার।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের মধ্যে সমন্বয়ের দরকার আছে। সেটা দেখবে বাকি বিভাগ। বাংলাদেশ দিল্লির দক্ষিণ এশিয়া নীতির অন্তর্গত। সুজাতা হয়তো ভাবছেন বাংলাদেশ দিল্লির অধীনই থাকবে এবং বাংলাদেশের প্রতি দিল্লির নীতিও হবে এই বশ্যতা নিশ্চিত করা। গত ৪২ বছর এটা সম্ভব হয়েছে, সেটা এখনও হবে। এরশাদ শেখ হাসিনার হাত থেকে ছুটে গেছেন কিনা আমরা এখনও জানি না। সুজাতা একান্তে এরশাদকে আর কিছু বলেছেন কিনা সেটাও আমাদের জানার উপায় নেই। তবে যারা বলছেন, এরশাদ যদি শেষ অবধি শেখ হাসিনার হাত থেকে ছুটে যায় তাহলে ক্ষমতাসীনদের হাতে জরুরি অবস্থা জারি করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না, তারা কিছুটা আগাম কথা বলছেন। অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর সফরের ফল কী দাঁড়ায়, তার ওপর আমাদের নির্ভর করতে হবে। ফার্নান্দেজ আসছেন নাভি পিল্লাইয়ের কড়া বক্তব্যের পরে। হানাহানি ও সংঘাত বন্ধ না হলে রাজনীতিবিদ, আমলা ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিরা হেগে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বিচারের জন্য গঠিত ফৌজদারি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে পারেন- এই সম্ভাবনাও নতুন বাস্তবতা।
এর ফলে পরিস্থিতির কিছু গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে। জরুরি অবস্থা জারি করে সরকার চরম হিংসাত্মক নীতি অনুসরণ করলে সেটা বাস্তবসম্মত সমাধান হবে না। ক্ষমতাসীনদের প্রস্থানের জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে।
আর যাওয়ার জায়গা নেই- এ দিকটাই শুধু এখন পরিষ্কার।

‘ভয়কে জয় করেই আমাদের এগোতে হবে’

১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কারামুক্তির পর
কেপটাউনে স্ত্রী উইনির সঙ্গে নেলসন ম্যান্ডেলা
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যেসব বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন, তা ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ এবং যুগ যুগ ধরে মানুষকে প্রেরণা দেবে। ১৯৯০ সালে কারামুক্তির পর কেপটাউনে এবং ১৯৯৪ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেওয়া তাঁর বক্তৃতার ভাষান্তর প্রকাশ করা হলো
কেপটাউন, ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯০

বন্ধুরা, কমরেডরা এবং আমার সহযাত্রী দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণ। সবার জন্য শান্তি, গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতার নামে আমি আপনাদের সম্ভাষণ জানাচ্ছি। আমি এখানে আপনাদের সামনে কোনো ভবিষ্যদ্বক্তা হিসেবে দাঁড়াইনি, দাঁড়িয়েছি আপনাদের, দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণের সেবক হিসেবে। আপনাদের অবিরাম বীরত্বপূর্ণ ত্যাগ স্বীকারের ফলেই আমার পক্ষে আজ এখানে দাঁড়ানো সম্ভব হয়েছে। আমি তাই, আমার জীবনের বাকি সবটুকু সময় আপনাদের হাতেই সমর্পণ করছি। আমার এ মুক্তির দিনটিতে আমার আন্তরিক উষ্ণ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি আমার লাখ লাখ সহযোদ্ধা এবং তাঁদেরও, যারা বিশ্বের সর্বত্র আমার মুক্তির জন্য অবিশ্রান্ত প্রচারণা চালিয়েছেন। আমার বিশেষ সম্ভাষণ প্রেরণ করছি কেপটাউনের জনগণের উদ্দেশে, এ নগরে আমার তিন দশকের বাসস্থান। আপনাদের গণমিছিল এবং অন্যবিধ উপায়ে পরিচালিত সংগ্রাম সব রাজনৈতিক বন্দীর জন্যই নিরন্তর শক্তি-সাহসের উৎস ছিল। আফ্রিকার জাতীয় কংগ্রেসকে (এএনসি) আমি অভিবাদন জানাচ্ছি।
আমাদের মহান মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে সংগঠনটি আমাদের সব প্রত্যাশাই পূরণ করছে। আমি আমাদের প্রেসিডেন্ট কমরেড অলিভার টাম্বোকে অভিবাদন জ্ঞাপন করছি, তিনি চরম বিরূপ পরিস্থিতিতেও এএনসির নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন। এএনসির সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের আমি অভিবাদন জানাই। আপনারা আমাদের সংগ্রামের মহান কাজে প্রাণ দিয়েছেন, অঙ্গহানি মেনে নিয়েছেন। উমখন্তো উই সিজ উইর প্রতিরোধ যোদ্ধাদের আমি সালাম জানাই। সলোমন মাহলাঙ্গু এবং অ্যাশলি ক্রিলের মতো প্রতিরোধ যোদ্ধারা সমগ্র দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণের মুক্তির সংগ্রামে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার কমিউনিস্ট পার্টিকে আমার সালাম, গণতন্ত্রের সংগ্রামে দলটি মহার্ঘ অবদান রেখেছেন। আপনারা সুদীর্ঘ ৪০ বছর ধরে অবিশ্রান্ত নির্যাতন সহ্য করেছেন। মোজেস কোটানে, ইউসুফ দাদু, ব্র্যাম ফিশার এবং মোজেস মাভিদার মতো মহান কমিউনিস্টদের স্মৃতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অম্লান থাকবে। আমি সাধারণ সম্পাদক জো স্লোভোর প্রতি অভিবাদন জানাচ্ছি, তিনি আমাদের মহত্তম দেশপ্রেমিকদেরই একজন। এ তথ্য আমাদের উল্লসিত করছে যে, আমাদের এবং পার্টির মধ্যকার সম্পর্কটি বরাবরের মতোই সুদৃঢ় থাকবে। ‘ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’, ‘ন্যাশনাল এডুকেশন ক্রাইসিস কমিটি’, ‘দক্ষিণ আফ্রিকার যুব কংগ্রেস, ট্রান্সভাল এবং নাটালের ভাতীয় কংগ্রেস এবং কসাটো এবং জন-গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অপরাপর সহযোগী সংগঠনকে আমার অভিবাদন জানাই। আমি ‘ব্লাক স্যাশ’ এবং ‘ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব সাউথ আফ্রিকান স্টুডেন্টস’কেও সালাম জানাচ্ছি।
আমরা গৌরবের সঙ্গে লক্ষ করেছি যে, আপনারা দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ জনগণের বিবেক হিসেবে কাজ করেছেন। আমাদের সংগ্রামের ইতিহাসের অন্ধকারতম দিনগুলোতেও আপনারা স্বাধীনতার পতাকা সমুন্নত রেখেছেন। বিগত কয়েক বছরের ব্যাপক গণ-যুদ্ধের উদ্যোগ আমাদের সংগ্রামের শেষ পর্যায় শুরুর ক্ষেত্রে মূল চাবিকাঠির ভূমিকা পালন করছে। আমাদের দেশের শ্রমজীবী জনগণকে আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। আপনাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি আমাদের আন্দোলনের গর্বের বস্তু। শোষণ ও নির্যাতন অবসানের সংগ্রামে আপনারাই ছিলেন সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য শক্তি। বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতি আমি শ্রদ্ধা প্রকাশ করছি, যখন আমাদের জনগণের সংগঠনসমূহকে নীরব করে ফেলা হয়েছিল, তখন তাঁরাই বিচারের দাবিতে প্রচারণা এগিয়ে নিয়েছেন। আমি এ দেশের ঐতিহ্যবাহী নেতৃত্বের স্মৃতির প্রতি অভিবাদন জানাচ্ছি—এখনো আপনারা অনেকেই হিন্টসার মতো এবং সেখুখুমির মতো মহান বীরদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছেন। সীমাহীন বীরত্বের জন্য অভিবাদন জানাই যুবকদের, তোমরা সিংহ বিক্রম যুবকেরা, সমগ্র সংগ্রামেরই শক্তি জুগিয়েছ। আমাদের জাতির ঘরে ঘরে মা, স্ত্রী ও বোনদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। আপনারাই হচ্ছেন আমাদের সংগ্রামে প্রস্তর-দৃঢ় ভিত্তি। বর্ণবাদ অন্য যে কারও চেয়ে আপনাদের ওপরই অধিকতর বেদনাময় আঘাত দিয়েছে।
আজকের এই অনুষ্ঠানে আমি বিশ্বসমাজকেও বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামে তাদের মহান অবদানের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনাদের সমর্থন ছাড়া আমাদের সংগ্রাম এতটা অগ্রসর অবস্থানে পৌঁছতে পারত না। যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া প্রদেশগুলো যে চরম ত্যাগ স্বীকার করেছে, দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষ সে কথা চিরকাল স্মরণ রাখবে। আমার প্রিয় পত্নী এবং পরিবারের কথা গভীর প্রশংসায় উল্লেখ না করে আমার এ প্রশস্তি-কথন শেষ হতে পারে না, কারণ, সুদীর্ঘ এবং নিঃসঙ্গ কারাজীবনে তাঁরাই আমাকে নিরন্তর শক্তি জুগিয়েছেন। আমি নিশ্চিত যে তাঁরা আমার চেয়েও অধিকতর দুঃখ-বেদনা বহন করেছেন। আরও অগ্রসর হওয়ার আগেই আমি বলতে চাই যে, আজকের পরিস্থিতিতে আমি বিশেষ কয়েকটি দিক সম্পর্কে কেবল প্রাথমিক মন্তব্যই করতে পারি। আমার কমরেডদের সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনার সুযোগ পাওয়ার পরই আমি বিস্তারিত এবং পরিপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করব। এখন দক্ষিণ আফ্রিকা, কালো এবং সাদা, অধিকাংশ মানুষ উপলব্ধি করতে পারছে যে বর্ণবাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। শান্তি এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে আমাদের সিদ্ধান্তমূলক সমবেত কর্মপ্রয়াসের দ্বারাই এর অবসান ঘটাতে হবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরই কেবল আমাদের সংগঠনের এবং জনগণের সূচিত প্রতিরোধমূলক এবং অন্যান্য কার্যক্রম সম্পর্কে গণ-প্রচারণার ইতি ঘটানো হতে পারে।
বর্ণবাদ আমাদের উপমহাদেশে বেহিসেবি ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। আমাদের লাখ লাখ মানুষের জীবনে পারিবারিক সম্পর্কের সূত্রটি বিনষ্ট হয়ে গেছে। লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন ও কর্মহীন। আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে এবং আমাদের জনগণ রাজনৈতিক কোন্দলে জড়িয়ে পড়েছে। ১৯৬০-এ ‘উমখন্তো সিজ উই’ নামে এএনসির সামরিক শাখা গঠনের বিষয়টি ছিল বর্ণবাদী হিংস্রতার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক প্রচেষ্টা মাত্র। যেসব কারণে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করতে হয়েছিল, সেগুলো এখনো অব্যাহতই রয়েছে, আমাদেরও কোনো বিকল্প নেই, সংগ্রাম চালিয়ে যেতেই হবে। আমরা আজ এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করছি যে যথাসত্বর আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হবে, যার ফলে আর সশস্ত্র সংগ্রামের প্রয়োজন থাকবে না। আমি আফ্রিকান জাতীয় কংগ্রেসের একজন অনুগত এবং সুশৃঙ্খল সদস্য। সুতরাং সংগঠনটির সব লক্ষ্য, দক্ষতা এবং কৌশল সম্পর্কে আমি সম্পূর্ণ আস্থাশীল। আগের যেকোনো সময়ের মতোই এখনো আমাদের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজটি একই রকম গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নেতার পক্ষেই এককভাবে এ বিপুল দায়িত্ব বহন করা সম্ভব নয়। নেতা হিসেবে আমাদের সবারই দায়িত্ব হচ্ছে, সংগঠনের সমীপে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করা, যাতে সক্রিয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হতে পারে।
গণতান্ত্রিক পদ্ধতি সম্পর্কে কর্তব্যবোধ থেকেই এ কথা বলার প্রয়োজন উপলব্ধি করছি যে আন্দোলনের নেতা হচ্ছেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি দায়িত্ব পালনের জন্য জাতীয় সম্মেলন কর্তৃক গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। এটা হচ্ছে এমন একটি নীতি, ব্যতিক্রমহীনভাবেই যা মেনে চলতে হবে। আজ আমি আপনাদের অবহিত করতে চাই যে, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক করাই ছিল সরকারের সঙ্গে আমার আলোচনার লক্ষ্য। আমরা এখনো সংগ্রাম-সংশ্লিষ্ট দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা শুরুই করতে পারিনি। সরকারের সঙ্গে পরবর্তী আলোচনার প্রথমেই আমার দিক থেকে, এএনসি এবং সরকারের মধ্যে বৈঠকের প্রস্তাব করা ছাড়াও দেশের ভবিষ্যৎ-সংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনায় উত্থাপন করা হবে। মি ডি ক্লার্ক দেশে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে, অন্য যেকোনো জাতীয়তাবাদী প্রেসিডেন্টের তুলনায় অধিকতর বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। তবে, আরও কতিপয় বিষয় ‘হারারে ঘোষণা’য় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, আমাদের জনগণের মূল দাবিগুলো সম্পর্কে সমঝোতামূলক আলোচনা শুরুর আগেই, যেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের অন্যান্য দাবির সঙ্গেই আমি জোর দিয়েই বলতে চাই যে অবিলম্বে জরুরি অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে এবং কোনো কোনো রাজবন্দীকে নয়, সব রাজবন্দীর মুক্তি দিতে হবে। এমন একটি স্বাভাবিক অবস্থা নিশ্চিত করতে হবে,
যাতে স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যায় এবং আমরা জনগণের সঙ্গে মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে তাঁদের অভিমত গ্রহণ করতে পারি। সমঝোতামূলক আলোচনা কে করবেন, কী কী বিষয় আলোচনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে, এসব বিষয়ে জনগণের সঙ্গে আগেই আলোচনা করতে হবে। আমাদের জনগণের মাথার ওপর দিয়ে কিংবা পশ্চাতে সমঝোতামূলক আলোচনা চলতে পারে না। আমরা বিশ্বাস করি যে সম্প্রদায়গত ভেদাভেদহীন গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত একটি সংগঠনই কেবল দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। গণতান্ত্রিক, জাতি-বিদ্বেষহীন এবং একত্বশীল দক্ষিণ আফ্রিকা গঠনের জন্য অবশ্যই আমাদের জনগণের বহুল উচ্চারিত দাবি অনুসারেই বর্ণবাদের অবসান ঘটাতে হবে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পর শ্বেতাঙ্গ একাধিপত্যের অবসান ঘটানো এবং আমাদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর মৌলিক পুনর্বিন্যাস করাও অপরিহার্য, যাতে বর্ণবাদের ফলে সৃষ্ট বৈষম্য দূরীকরণ এবং আমাদের সমাজের পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক বিকাশ সম্ভব হতে পারবে। এ কথাও উল্লেখ করা দরকার যে মি ডি ক্লার্ক একজন সততাসম্পন্ন ব্যক্তি, যিনি একজন জন-ব্যক্তিত্বের অঙ্গীকার অসম্মান করার বিপদ সম্পর্কে যথার্থই অবহিত রয়েছেন। কিন্তু একটি সংগঠন হিসেবে রূঢ় বাস্তবতার ভিত্তিতেই আমাদের নীতি ও কৌশল প্রণয়ন করতে হবে।
আর সেই বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা এখনো জাতীয়তাবাদী সরকারের অধীনে দুর্ভোগ পোহাচ্ছি। আমাদের সংগ্রাম এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়ে উপনীত হয়েছে। আমরা আমাদের জনগণকে আহ্বান জানাচ্ছি, এই সময়টাকে ধরে রাখুন, যাতে গণতন্ত্রের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয় এবং অব্যাহত থাকে। স্বাধীনতার জন্য আমরা সুদীর্ঘকাল অপেক্ষায় রয়েছি। আমাদের পক্ষে আর অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। এখন সবদিকেই আমাদের সংগ্রাম তীব্রতর করে তুলতে হবে। আমাদের উদ্যোগের শিথিলতা খুবই ভুল হবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষমা করতে পারবে না। দিগন্তে দৃশ্যমান স্বাধীনতার আভাসই আমাদের উদ্যম দ্বিগুণ বাড়াতে অনুপ্রাণিত করবে। সুশৃঙ্খল গণপ্রচেষ্টার মাধ্যমেই কেবল আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত করা যেতে পারে। শ্বেতাঙ্গ সহযোদ্ধাদের প্রতি আমরা আহ্বান জানাচ্ছি, নতুন এক দক্ষিণ আফ্রিকা গঠনে আমাদের সঙ্গে যোগ দিন। স্বাধীনতার সংগ্রাম আপনাদেরও রাজনৈতিক ঠিকানার নিশ্চয়তা দেবে। বিশ্ব-সমাজের প্রতি আমাদের আহ্বান, বর্ণবাদী শাসকদের নিঃসঙ্গ করে ফেলতে আপনাদের প্রচারণা অব্যাহত রাখুন। এখন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার (Lift sanctions) করা হলে, বর্ণবাদ সম্পূর্ণ অবসানের প্রক্রিয়াটিকে বিনষ্ট করার ঝুঁকি নিতেই হবে। স্বাধীনতার লক্ষ্যে আমাদের অগ্রযাত্রা অপরিবর্তনীয়। আমাদের যাত্রাপথে ভয়কে প্রতিবন্ধক হতে দেওয়া চলবে না।
ভাষান্তর: রামেন্দ্র চৌধুরী।
সূত্র: নেলসন ম্যান্ডেলা ইন হিজ ওন ওয়ার্ডস।

‘স্বাধীনতাই হবে আমাদের শাসক’

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ
গ্রহণ অনুষ্ঠানে নেলসন ম্যান্ডেলা
ইউনিয়ন বিল্ডিংস, প্রিটোরিয়া, ১০ মে ১৯৯৪
আজ এখানে আমাদের উপস্থিতির মাধ্যমে এবং দেশজুড়ে ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে উদ্যাপনের দ্বারা আমাদের নবীন স্বাধীনতার প্রতি গৌরব ও প্রত্যাশা ন্যস্ত করছি। সুদীর্ঘকাল স্থায়ী নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতা থেকে অবশ্যই এমন একটি সমাজ জন্মলাভ করবে, যা সমগ্র মানবতাকেই গৌরবান্বিত করবে। দক্ষিণ আফ্রিকার সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের প্রতিদিনের কর্ম থেকেই উদ্ভূত হবে দক্ষিণ আফ্রিকার সেই বাস্তবতা, যা সুবিচারের প্রতি মানবিক বিশ্বাসকে দৃঢ়তর করবে, মানবাত্মার মহত্ত্ব-সম্পর্কিত আস্থাকে শক্তিশালী করবে এবং সবার গৌরবময় জীবনের জন্য আমাদের সব প্রত্যাশাকে স্থায়িত্ব দেবে। এ সবকিছুই আমরা চাই আমাদের নিজেদের জন্য এবং সমগ্র বিশ্বের জনগণের জন্যও, এখানেও তাঁদের ব্যাপক প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। আমার সহযোদ্ধাদের প্রতি এ কথা বলতে আমার কোনো দ্বিধা নেই যে, আমাদের প্রত্যেকেই এই শোভাময় দেশটির মাটির সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত হয়ে আছি, যেমনটি রয়েছে প্রিটোরিয়ার বিখ্যাত ‘জাকারান্ডা’ এবং বুশভেল্ডের (ট্রান্সভালের নিচু অঞ্চল) ‘মাইমোসা’ বৃক্ষগুলো। যখনই আমরা কেউ দেশের মাটি স্পর্শ করি, তখনই ব্যক্তিগতভাবে নবীকরণের উপলব্ধি সঞ্চারিত হয়। মৌসুম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আবেগ-অনুভূতিরও পরিবর্তন ঘটে। ঘাসগুলো যখন সবুজ হয়ে ওঠে, যখন ফুল ফোটে, তখন আমরাও আনন্দ অনুভব করি এবং উজ্জীবিত হই। আমরা সবাই দেশমাতৃকার সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক যে অবিচ্ছিন্নতা উপলব্ধি করি, তার মধ্যেই ব্যাখ্যা মেলে,
কী দারুণ বেদনা আমাদের সহ্য করতে হয়েছে, যখন আমাদের দেশটি সংঘাতে সংঘাতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল, যখন বিশ্বের সবাই আমাদের দেশটিকে বর্জন করছিল, অপরাধী গণ্য করে নিঃসঙ্গতায় ঠেলে দিচ্ছিল। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এর কারণ ছিল, আমাদের এই দেশটিকে ধ্বংসাত্মক নীতি-কৌশল এবং সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ আর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ভিত্তি বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। আমরা দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণ আবার হূদয়ভরে ভাবতে পারছি, বিশ্বমানবতা আমাদের আবার বুকে টেনে নিয়েছে। বেশি দিন হয়নি, আমাদের অপরাধী বলে বিবেচনা করা হতো, আমরাই আজ দেশের মাটিতে বিশ্বের জাতিসমূহের আতিথেয়তা করার বিরল সুযোগ পেয়েছি। আমাদের মান্যবর আন্তর্জাতিক অতিথিদের ধন্যবাদ জানাই। কারণ, তাঁরা এখানে আমাদের জনগণের সঙ্গে সমবেত হয়ে সুবিচার, শান্তি আর মানবিক মর্যাদার অনন্যসাধারণ বিজয়ের অংশভাগী হয়েছেন। আমরা অবশ্যই প্রত্যাশা করব যে, যখন আমরা শান্তি, সমৃদ্ধি, লিঙ্গবৈষম্যহীনতা, জাতিগত বৈষম্যহীনতা এবং গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করব, তখনো আপনারা আমাদের পক্ষেই থাকবেন। গভীর প্রশংসার সঙ্গে আমি উল্লেখ করতে চাই যে, বর্তমান অবস্থানে পৌঁছার জন্য আমাদের জনগণ,
তাদের রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক, ধর্মীয় সংগঠন, নারী এবং যুবসমাজ, ব্যবসায়ীসহ প্রথাগত এবং অন্য সংগঠনসমূহ যথার্থই বিপুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এ ক্ষেত্রে আমার অনুবর্তী ব্যক্তি, সম্মানিত ডেপুটি প্রেসিডেন্ট এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্কের ভূমিকাও সমগুরুত্বের সঙ্গেই উল্লেখযোগ্য। শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে চাই আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বস্তরের সদস্যদের প্রতি। তাঁরা সবাই প্রভূত সহায়তা প্রদান করেছেন আমাদের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিরাপদে অনুষ্ঠানের কাজে। অন্ধকারের রক্তপিপাসু, যারা এখনো আলোতে আসতে রাজি নয়, তাদের কাছ থেকে গণতান্ত্রিক শক্তির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কাজেও সেনাসদস্যরা বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন। এখন সব ক্ষত নিরাময়ের সময় সমাগত। এত দিন গোষ্ঠী-সংঘাতের যে গভীর খাদ আমাদের বিচ্ছিন্ন-বিভক্ত করে রেখেছিল, তাতে সেতু-সংযোগের সময় এসেছে। গঠনমূলক কাজের সময়টা এখন আমাদেরই হাতে। শেষ পর্যন্ত আমরা রাজনৈতিক বন্ধনমুক্ত হতে পেরেছি। আমরা এখন আমাদের জনগণের প্রতি দারিদ্র্য, বঞ্চনা, দুর্দশা এবং লৈঙ্গিক ও অন্যবিধ বৈষম্য মুক্তির অঙ্গীকার করছি। স্বাধীনতার লক্ষ্যে শেষ পদক্ষেপটি আমরা তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই নিতে পেরেছি। এখন আমরা পরিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজেদের উৎসর্গ করছি। আমাদের লাখো কোটি মানুষের অন্তরে আশা জাগাতে আমরা বিজয় লাভ করেছি। এখন আমরা নতুন অঙ্গীকার করছি, আমরা এমন এক সমাজ গড়ে তুলব, যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার সব মানুষ, কালো-সাদানির্বিশেষে সবাই ভয়হীন হূদয়ে মাথা উঁচু করে চলতে পারবে। সবাইকে অসমর্পণীয় মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। আমাদের বহু বর্ণ-জাতি নিজেদের মধ্যে এবং বিশ্বের সবার সঙ্গে শান্তিতে থাকবে।
নতুন করে জাতি গঠনের লক্ষ্যে আমাদের উদ্যোগের নিদর্শন হিসেবে বর্তমান জাতীয় ঐক্যের অন্তর্বর্তী সরকার, জরুরি পদক্ষেপ বিবেচনা করেই বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগরত আমাদের জাতির সবাইকে মুক্তি প্রদান করা হবে। অতঃপর তাঁদের সবার জন্যই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ব্যবস্থা করা হবে। আমাদের দেশে এবং বিশ্বের যেখানে যত বীর এবং বীরাঙ্গনারা আমাদের মুক্তির অনুকূলে জীবন দিয়েছেন, কিংবা অন্যবিধ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁদের সবার উদ্দেশে আজকের এই আনন্দময় দিনটিকে আমরা উৎসর্গ করছি। তাঁদের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ লাভ করেছে, স্বাধীনতাই তাঁদের পুরস্কার। আপনারা দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণ, একটি ঐক্যবদ্ধ, গণতান্ত্রিক, বর্ণবৈষম্যহীন, লৈঙ্গিক বৈষম্যমুক্ত জাতি গঠনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমাদের ওপর যে মহান দায়িত্ব ন্যস্ত করেছেন, তার জন্য সম্যকরূপেই বিনম্র এবং সম্মানিত বোধ করছি। আমরা এখনো উপলব্ধি করি যে স্বাধীনতার কোনো সহজ পথ নেই। বিশেষভাবেই আমরা জানি যে, আমাদের কারও পক্ষেই একাকী কোনো সাফল্য লাভ করা সম্ভব নয়। ঐক্যবদ্ধ জনগণ হিসেবে কাজ করেই আমরা জাতীয় পুনর্মিলন ও পুনর্গঠন এবং একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা করতে পারব। সবার জন্য সুবিচার নিশ্চিত হোক। সবার জন্য শান্তি নিশ্চিত হোক। সবাইকেই কাজ, খাদ্য, পানি ও লবণের নিশ্চয়তা দিতে হবে। সবাই জানবেন, প্রত্যেকের পূর্ণ বিকাশের জন্য আপনাদের সবারই দেহ-মন-আত্মার মুক্তির নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে। কখনো নয়, আর কখনো নয়, এই সুন্দর দেশের কোনো মানুষ আর কখনো অন্য কারও দ্বারা নির্যাতিত হবে না, বিশ্বের নোংরা মানুষ বলে কারও দ্বারাই অপমানিত হবে না। স্বাধীনতাই হবে আমাদের শাসক। এমন গৌরবময় মানবিক অর্জন কখনো সূর্যাস্তের আঁধারে হারাতে পারে না। ঈশ্বর আফ্রিকার মঙ্গল করুন। ভাষান্তর: রামেন্দ্র চৌধুরী।
সূত্র: নেলসন ম্যান্ডেলা ইন হিজ ওন ওয়ার্ডস।

বিশ্বনায়কের মহাপ্রয়াণ

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা ও প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা অপরিসীম ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে নিজের আসন করে নিয়েছিলেন। একদা স্বদেশের শ্বেতাঙ্গ শাসক এবং আত্মগর্বে গর্বিত পশ্চিমের নেতারা যাঁকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে তাঁরাই এই আফ্রিকান নেতাকে বন্ধু, সুহূদ ও পথপ্রদর্শক হিসেবে বরণ করে নিয়েছেন। গণতন্ত্র, সাম্য ও ন্যায়ের সংগ্রামে তাঁর অবদান যেমন অবিস্মরণীয়, তেমনি তাঁর শূন্য আসনও পূরণ হওয়ার নয়। ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই জন্ম নেওয়া নেলসন ম্যান্ডেলা দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার স্বৈরশাসককে কেবল উচ্ছেদ করেননি, গণতন্ত্রকেও সুসংহত করেছেন। ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অগ্রগতির যে ধারা তিনি সূচনা করে গেছেন, তা অব্যাহত রয়েছে। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা একাধিকবার কারারুদ্ধ হন; ১৯৬২ সালে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে একটানা ২৭ বছর জেল খাটতে হয়েছে। পাশাপাশি আন্দোলন-সংগ্রামও চলেছে। জেলে থাকতেই নেলসন ম্যান্ডেলা বর্ণবাদী প্রেসিডেন্ট ডি ক্লার্ক সরকারের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। ১৯৯০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সরকার এএনসির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় এবং ১১ ফেব্রুয়ারি তাঁকে মুক্তি দেয়। ১৯৯৪ সালের নির্বাচনে ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং শান্তি ও গণতন্ত্রের স্বার্থে সাবেক শ্বেতাঙ্গ শাসকের সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলেন,
যার অংশ হিসেবে ডি ক্লার্ক ভাইস প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন। পৃথিবীর ইতিহাসে এই দৃষ্টান্ত অনন্য। দায়িত্ব নেওয়ার পর এক বক্তৃতায় দক্ষিণ আফ্রিকার মহানায়ক বলেছিলেন, ‘আমরা শ্বেতাঙ্গ শাসনের পরিবর্তে কৃষ্ণাঙ্গদের শাসন কায়েম করতে চাই না। আমরা এমন শাসন কায়েম করতে চাই, যেখানে সাদা-কালোর মধ্যে ভেদ থাকবে না, সব নাগরিক সমান সুযোগ ভোগ করবে।’ ১৯৯৩ সালে ডি ক্লার্কের সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। নেলসন ম্যান্ডেলার চরিত্রের সবচেয়ে অনুকরণীয় দিক হলো, ক্ষমতার প্রতি নির্মোহ। পাঁচ বছর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের পর তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ত্যাগ করেন। ইচ্ছা করলে আজীবন প্রেসিডেন্ট পদে থাকতে পারতেন ম্যান্ডেলা। অবসর জীবনে তিনি নেলসন ম্যান্ডেলা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মানবতা ও শান্তির সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। এই মহান নেতার সঙ্গে আমাদেরও এক দুর্লভ আনন্দময় স্মৃতি রয়েছে। ১৯৯৭ সালে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ডেমিরেলের সঙ্গে তিনিও বাংলাদেশে এসেছিলেন। সেদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নেলসন ম্যান্ডেলা শান্তি, ন্যায়, সমঝোতা ও সমন্বয়ের যে বাণী উচ্চারণ করেছিলেন, তা বর্তমান বাংলাদেশের জন্যও সমানভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এই মহানায়কের মহাপ্রয়াণে আমরা শোকাভিভূত। তাঁর স্মৃতির প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

থাই রাজার সমঝোতার আহ্বান

থাইল্যান্ডে চলমান সংকট নিরসনে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি রাজা ভুমিবল আদুলিয়াদজ। বিক্ষোভে সৃষ্ট অস্থিরতার মধ্যেই রাজা ভুমিবল আদুলিয়াদজের ৮৬তম জন্মদিন উদযাপিত হচ্ছে বৃহস্পতিবার। জন্মদিন উপলক্ষে উপকূলীয় হুয়া হিনের রাজপ্রাসাদে বসে তিনি জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি থাইল্যান্ডের সব মানুষকে একে অপরকে সমর্থন করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, থাইল্যান্ডে সব সময় শান্তি বজায় ছিল কারণ এর জনগণ সবসময় একতাবদ্ধ। ২৪ নভেম্বর থেকে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার পদত্যাগের দাবিতে সরকারি ভবনগুলো দখল করে নিয়েছিল থাইল্যান্ডের বিক্ষোভকারীরা। ভাংচুর চালিয়েছে পুলিশ সদর দফতরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়। পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের নির্দেশে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে নিরাপত্তা বাহিনী। দু’পক্ষের সংঘাতে ঝরেছে ৪টি তাজাপ্রাণ। আর পঙ্গু হয়ে আহত হয়েছে অনেকে। কিন্তু দেশের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তির জন্মদিনে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে দু’দিন আগেও এমন ঘোরবিরোধী অবস্থানে থাকা থাইল্যান্ডের সরকার ও বিরোধী পক্ষ। ব্যাংকক পোস্ট জানিয়েছে, হুয়া হিন শহরে অবস্থিত রাজভবন ক্লাই কাঙ্গবোন প্রাসাদের সামনে রাজাকে স্বচক্ষে দেখার জন্য মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল। এছাড়া, রাজার জন্মদিন উৎসবে যোগ দিতে ইচ্ছুক জনগণকে আনা-নেয়ার জন্য বিশেষ বাস ও ট্রেন সার্ভিস চালু করেছে সরকার।
জন্মদিনে সবাই এক : এদিকে জন্মদিনের উৎসব উপলক্ষে থাই রাজধানী ব্যাংককের রাস্তাগুলো পরিষ্কার করা হয়। পাশাপাশি রাজার প্রাসাদের সামনেও শুভেচ্ছা জানাতে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল শত শত শুভাকাক্সক্ষী। এতকিছুর পরও বুধবারের দৃশ্য দেখে যে কারো চোখ ছানাবড়া হতে বাধ্য। কারণ সকাল থেকেই সরকারি বাহিনীর সঙ্গে হাত লাগিয়ে রাস্তা পরিষ্কারে ব্যস্ত আন্দোলনকারীরাও। যেন রাজা ভুমিবলের জন্মদিনে শত্র“তা ভুলে গেছে দু’পক্ষ। শহরের ডেমোক্রেসি মনুমেন্ট এলাকার চারপাশ পরিষ্কার করছে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের দল। কারণ সেখানেই রাজার জন্মদিনের অনুষ্ঠান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় পত্রিকাগুলো বলছে, বিশেষ যাতায়াত ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে করে সবাই রাজা ভুমিবলের হুয়া হিন শহরে যেতে পারে। অনেকেই সেই শহরে রাজাকে একনজর দেখতে রাজপ্রাসাদে গেছেন।

পাকিস্তান যুদ্ধে পরাজিত হবে : মনমোহন সিং

যদি কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে কোনো যুদ্ধ হয়, তাহলে সে যুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত হবে বলে দেশটিকে সতর্ক করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। এর আগে ‘কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চতুর্থ যুদ্ধ লেগে যেতে পারে’ বলে মন্তব্য করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। শরিফের এ মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিক বিবৃতিতে পাকিস্তানকে সতর্ক করলেন মনমোহন। ভারত ও পাকিস্তানের গণমাধ্যম সূত্রে এ খবর জানা গেছে। মনমোহন বুধবার বলেন, আমার জীবদ্দশায় এমন কোনো যুদ্ধ হলে পাকিস্তানের জয়লাভের কোনো সুযোগ নেই। বুধবার পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন একটি প্রতিবেদনে জানায়, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে এক সফরে আজাদ জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীরের বাজেট অধিবেশনে দেয়া ভাষণে শরিফ বলেন, কাশ্মীর নিয়ে দুই পারমাণবিক পরাশক্তির মধ্যে যে কোনো সময় চার নম্বর যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। অবশ্য কয়েক ঘণ্টা পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করা হয়।
ডনের প্রকাশিত নিবন্ধকে ভুল ও কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দেয়া হয়।তবে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে একটি বিবৃতিতে বলা হয়, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর মুক্ত হয়ে গেছে এমন স্বপ্ন দেখেন তিনি (নওয়াজ শরিফ)। আর এ স্বপ্ন তার জীবদ্দশাতেই বাস্তবে পরিণত হতে পারে। আর তার এই বক্তব্যই ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। দু’দেশই যখন তাদের পারস্পারিক সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারে চেষ্টা করছে ঠিক সে সময়েই এমন মন্তব্য করা হল। গত এক দশকের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে কাশ্মীরসহ ভারত-পাকিস্তানের অন্যান্য সীমান্তে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা সবচেয়ে বেড়ে গেছে। গত সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ সভায় মনমোহন-শরিফ সাক্ষাৎ হয়। ওই সময় তারা দু’জনই সীমান্তে গোলাগুলি বন্ধের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান। এর আগে তিনটি ভারত-পাক যুদ্ধের সাক্ষী দুই দেশ। একটি ১৯৬৫ সালে, পরেরটি ১৯৭১ সালে এবং সর্বশেষ যুদ্ধটি ১৯৯৯ সালে কার্গিলে।

আরবি না জেনেও আরব গায়ক

মার্কিন তরুণী জেনিফার গ্রট একটি আরবি শব্দও বলতে পারেন না তবে তিনিই আরবি সঙ্গীতের ক্ষুদে আরব গায়কদের টপকে ‘আরব ট্যালেন্ট’ খেতাবটি জিতে নিয়েছেন।
আশ্চর্যজনক হলেও সত্য বিচারকদের আরবি গানে মুগ্ধ করে এ বিজয় মুকুট ছিনিয়ে নিয়েছেন। আরবি গানে অভিষেক অনুষ্ঠানে বাজিমাত করে দিয়েছেন জেনিফার গ্রট। ম্যাসাচুসেসটসের বোস্টনে বেড়ে ওঠা জেনিফার গ্রটের তিন বছর বয়সে ভায়োলিন এবং পিয়ানোতে হাতেখড়ি। এদিকে এএফপির এক সাংবাদিকের কাছে অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে জেনিফার বলেন, মাত্র তিন বছর আগে ফাইরুজের লেখা একটি অনলাইন নিবন্ধ পড়ার পর আরবি গানের প্রতি অনুরুক্ত হয়ে পড়েন। এমনকি আরব বিশ্বের রেডিওতে প্রতিদিন সকলে আরবি গান শোনার মধ্য দিয়ে জেনিফারের আরবি গানের প্রতি ভালোবাসা বেড়ে যায় বহুগুণ।

ইউক্রেন বিক্ষোভে সাবেক তিন প্রেসিডেন্টের সমর্থন

পূর্ব ইউরোপের দেশ ইউক্রেনের সাবেক তিন প্রেসিডেন্ট সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। লিওনিদ ক্রাভচুক, লিওনিদ কুচমা ও ভিক্টর ইউশেঙ্কো বুধবার রাতে এক বিবৃতিতে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানান। এই তিন প্রেসিডেন্ট আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করলেন যখন রাজধানী কিয়েভে হাড়কাঁপানো শীত উপেক্ষা করে শত শত বিক্ষোভকারী ইনডিপেন্ডেন্স স্কয়ারে অবস্থান ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছেন। ওই স্কয়ারের পাশে সরকারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভবন অবস্থিত বলে বিক্ষোভকারীদের অবস্থান ধর্মঘট করার কারণে কার্যত ওইসব ভবন অচল হয়ে পরেছে।
ইউক্রেন সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে গিয়েও শেষ মুহূর্তে সরে আসার কারণে দেশটিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। সরকারবিরোধীরা দাবি করছেন, হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্ত স্বাক্ষর করতে অথবা প্রেসিডেন্টকে সরে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু পার্লামেন্টে এ সংক্রান্ত এক আস্থাভোটে প্রেসিডেন্ট জয়লাভ করার পর তিনি পদত্যাগ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এদিকে, জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী গুইদো ওয়েস্তারওয়েলে বুধবার কিয়েভের ইনডিপেন্ডেন্স স্কয়ারে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের দরজা আপনাদের জন্য এখনও খোলা রয়েছে।’ অন্যদিকে, ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে রাশিয়া। সূত্র: ন্যাশন, এসবিএস নিউজ।