Sunday, October 10, 2010

ভ্ল­াদিমির মায়াকভস্কি ও আন্দ্রেই ভজ্‌নেসেন্‌স্কির দুটি কবিতা

ভিন্নরুচির্হিঃ লোকাঃ

ভ্ল­াদিমির মায়াকভস্কি

ঘোড়াটি
দেখে উটটিকে
নিজস্ব কর্কশ অট্টহাস্যে লুটোপুটি
ফেটে প’ড়ে বলে, “মন,
চেয়ে দ্যাখ্,
ঘোড়াত্বের কী-সাঙ্ঘাতিক এ-
অতিরঞ্জন!”

বিরক্ত উটটি তখন:
“তুই — ঘোড়া!
নাহ্!
তুই তো অপরিণত এক
উটই।”

শুধু বিধাতাই,
সর্বজ্ঞ যে-জন,
জানত, ওরা
স্তন্যপায়ী
দু’টি
ভিন্ন ঘরানার।
------------------

নাক

আন্দ্রেই ভজ্‌নেসেন্‌স্কি


নাক নাকি বাড়ে মানুষের আজীবন
(বৈজ্ঞানিকের গবেষণা অনুযায়ী)।

এই গতকাল বললেন ডাক্তার:
‘মাথায় তোমার যত বুদ্ধিই থাক্,
নাসাটা তোমার পুরো জ’মে গেছে, ভাই।’
তবে ঠাণ্ডায় বাইরে যাস্ নে আর,
নাক!

আমার উপরে, তোমার উপরে, আর ঐ কাপুচিন
মঠবাসীদের ’পরে
চিকিৎসা-বিদ্যার কিছু জানা সূত্রের নির্ভরে,
ঘড়ির মতন নাগাড়ে, বিরতিহীন
সোল্লাসে বাড়ে নাসাতরু দিনদিন।

রাতারাতি তারা বেড়ে চলে অনুখন
প্রতি নাগরিকে, বিশেষ বা সাধারণ,
সান্ত্রির তথা মন্ত্রীর ’পরে, ধনী তথা গরিবের,
প্যাঁচার মতন নিশি-ডাক ছেড়ে ছেড়ে,
ঠাণ্ডা এবং প্রায়-নিষ্ক্রিয়, মেরে
ফাটিয়ে দিয়েছে মুষ্টিযোদ্ধা যাকে,
অথবা থেঁৎলে গিয়েছে যা দরোজায়,
আর আমাদের স্ত্রী-জাতি পড়োশিদের
সেগুলি যে, আহা, তুরপুন হয়ে ঢোকে
কত দুয়ারের চাবির ছিদ্রে, হায়!

গোগল-মরমি, ঝঞ্ঝেটে আত্মাটি
ধ্যানে জেনেছিল ইহাদের খুঁটিনাটি।

আমার ইয়ার বুগিন্্স্, মদের ঘোরে
স্বপ্ন দেখল, যেন গির্জার চূড়ার মতন চোখা
হয়ে, ঝাড়বাতি-বালতি-গামলা টুটে,
জাগিয়ে এবং বিঁধে ফেলে যত অবাক্ সিলিং, পরে
গেঁথে মেঝেগুলি-খোঁটে
রিসিট যেমন গেঁথে রাখা হয়-তারপর একরোখা
উঠে গেল নির্বাক্
উপরে, আরও উপরে
তার আপনার নাক।

‘এর মানেটা কী?’ পরদিন প্রাতে আমাকেই শুধাল সে।
‘হুশিয়ারি কেয়ামতের: হয়তো,’ আমি বলি, ‘তোর বই-
পত্রের হ’তে পারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শীঘ্রই।’
তিরিশ তারিখে বন্ধু-বেচারা ঢুকে গেল কারাগারে।

কেন, হে প্রধান নাক-বিধায়ক, কেন
বাড়ে আমাদের নাকগুলি, আর কমে আয়ু আমাদের?
কেন এই ছোট মাংসপিণ্ড রাতের অন্ধকারে
আমাদের শুষে ভ্যাম্পায়ার বা সাক্শন-পাম্প্-হেন
খালি করে একেবারে?

এস্কিমো জাতি, এরকম শোনা যায়,
মুখের বদলে নাক দিয়ে চুমু খায়।

আমাদের মাঝে এখন অবধি চলন হয় নি এর।

(ডব্ল্যু এইচ অডেনের ইংরেজি অনুবাদ থেকে)
================
ভ­াদিমির মায়াকভস্কি (জন্ম. বাঘদাতি, জর্জিয়া ১৯/৭/১৮৯৩ — ১৪/৫/১৯৩০)
---------------------
আন্দ্রেই ভজ্‌নেসেন্‌স্কি (জন্ম. মস্কো, ১২/৫/১৯৩৩)



bdnews24 এর সৌজন্যে
অনুবাদ: সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

এই কবিতা গুলো পড়া হয়েছে... 

free counters

ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকার কবিতা ও প্রিয় বন্ধুর জন্য বিলাপ

ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াসের জন্য বিলাপ
(Llanto Por Ignacio Sanchez Mejias)

১. জখম ও মৃত্যু
(La Cogida y la Muerte)


ঘড়িতে তখন বিকেল পাঁচটা।
কাঁটায় কাঁটায় বিকেল পাঁচটা।
এনেছে ছেলেটা শাদা এক থান
ঘড়িতে তখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
রয়েছে সাজানো লেবুর ঝুড়ি একখানা
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
বাকিটা মৃত্যু এবং কেবলই মৃত্যু সে।

বাতাস উড়িয়ে নিয়েছে উল কার্পাসের
যখন ঘড়িতে বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
আর অক্সাইড-গুঁড়ো-ছিটানো
উড়লো কাচ আর নিকেল
ঘড়িতে যখন বাজলো বিকেল পাঁচটা।
লড়াইয়ে এখন মেতেছে ঘুঘু ও চিতাবাঘে
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
গুঁতোগুঁতি করে ঊরুতে একটি একাকী শিঙ
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
আর উদারায় বাজলো তার
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
বিষের ঘণ্টা বাজলো আর উঠলো ধোঁয়া
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
কোনায় কোনায় জমাট নীরবতা
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
আর এলো ওই তুঙ্গ-হৃদয় একাকী ষাঁড়!
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
বরফ তখন অতিরিক্ত ঝরালো ঘাম
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা,
ষাঁড়-লড়াইয়ের বৃত্ত যখন আয়োডিনে ছয়লাপ
ঘড়িতে তখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
জখমের ’পর মৃত্যু তার পাড়লো ডিম
বিকেল পাঁচটায়।
বিকেল পাঁচটায়।
ঘড়িতে তখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা ।

চাকায় বসানো শবাধার এক শয্যা তার
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
কানে বাজে ওই বাঁশি ও হাড়ের অনুরণন
ঘড়িতে তখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
এখন তার কপাল ফুঁড়ে হাম্বা হাম্বা ডাকছে ষাঁড়
ঘড়িতে তখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
সারা ঘর করে যাতনায় ঝিলমিল
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
পচা-ক্ষত এক আসছে এখন দূর থেকে
ঘড়িতে যখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
সবুজাভ ওই কুঁচকি ফুঁড়ে জাগে পদ্মের একটি শুঁড়
ঘড়িতে তখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
ক্ষতেরা যখন সূর্যের মতো জ্বলছে, আর
ঘড়িতে তখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
ঘড়িতে তখন বেজেছে বিকেল পাঁচটা।
আহা, নিদারুণ সেই বিকেলের পাঁচটা!
[সকল ঘড়িতে তখন বিকেল পাঁচটা!]
গাঢ় বিকেলের ছায়ায় তখন পাঁচটা!

২. ঝরে-পড়া রক্ত
(La Sangre Derramada)

আমি তা দেখবো না!

চাঁদকে বোলো, আসুক সে,
ইগনাসিওর রক্ত আমি
দেখতে চাই না বালির ’পর।

আমি তা দেখবো না!

হাঁ-খোলা চাঁদ।
অনড় মেঘমালার ঘোড়া, আর
উইলোর বেড়া-ঘেরা
স্বপ্নের ধুধু ষাঁড়-লড়াইয়ের বৃত্তটা।

আমি তা দেখবো না!

স্মৃতি আমার উঠুক জ্বলে!
অমল ধবল হাস্নুহেনায়
ছড়াক তার উষ্ণতা!

আমি তা দেখবো না!

আদি পৃথিবীর সেই গাভীটা
বালিতে গড়ানো লোহু-ভেজা সেই নাকে
বোলালো তার বিষাদমাখা জিভ,
আর যতো ষাঁড় গিসান্দোর
মৃত্যু তারা অংশত, পাথর তারা অংশত,
যেন তারা তুলছে ঢেঁকুর দু’শো বছর ধরে
এই দুনিয়ার চ’রে বেড়ানোর সুখে
না,
আমি তা দেখবো না!

নিজের মৃত্যু নিজের কাঁধে নিয়ে
ইগনাসিও উঠলো ধাপে ধাপে।
সে করেছে ভোরের সন্ধান
কিন্তু সে-ভোর পেল না খুঁজে আর।
খুঁজলো সে তার দীপ্ত মুখচ্ছবি
স্বপ্ন তাকে করলো বিহ্বল
খুঁজতে নিজের সুন্দর দেহখানি
নিজ রক্তের দেখলো সে উদ্গার।
বোলো না আমায় দেখতে একে আর!
ক্রম-নিস্তেজ ফিনকি সে-রক্তের
চাইনে আমি শুনতে বারবার:
আসনের ধাপ রক্ত-আলোয় হাসে
আর সে-লোহু ছিটকে গিয়ে পড়ে
তর-না-সওয়া হাজার লোকের
পোশাকে ও পাদুকায়।
চেঁচিয়ে কারা আমায় কাছে ডাকে!

বোলো না আমায় দেখতে একে আর !

দেখলো যখন আসছে ধেয়ে শিঙ
তখনো চোখে পড়েনি পলক তার,
সর্বনাশী মায়েরা তবুও সবে
তুললো তাদের মাথা।
আর গোপন স্বরের এক হাওয়া
উঠলো আর পেরলো খামার ষাঁড়ের,
রাখাল যতো হাল্কা কুয়াশার
চেঁচাল দিব্য-ষাঁড়কে লক্ষ্য করে।
ছিলো না এমন রাজার দুলাল কোনো
তুলনীয় তার হতে পারে সেভিয়ায়
তারটির মতো এমন তরবারি
এমন খাঁটি হৃদয় ছিলো না কোনো।
সিংহযুথের মতোন প্রবল ছিল
অবাক করা শৌর্যবীর্য তার,
মার্বেলে গড়া যেনবা ধড় এক
পরিমিত আর ছিল সুনির্ণিত।
আন্দালুসীয় রোমের গরিমা তার
মোহন শিরে করলো ঝলমল;
যেখানে মেধা ও সরস কৌতুকে
হাসিখানি তার হয়েছে সুরভিলতা ।
লড়াই-রিঙে কতো বড়ো মাতাদোর!
পাহাড়ি দেশের সুজন কৃষাণ এক!
কতো না দক্ষ ফসলের গোছা হাতে!
ঘোড়ার পিঠে কেমন অকুতোভয়!
শিশির-ছোঁয়ায় কেমন পরিস্নাত!
কতো ঝলমল আনন্দ উৎসব!
অন্ধকারের বান্দেরিয়া হাতে
কেমন মোহন রূপের বাহার তার!

অথচ এখন দিয়েছে সে কালঘুম।
ধ্রুব আঙুলে শ্যাওলা আর ঘাস
ফোটায় আজ তার করোটির ফুল।
গান গেয়ে তার রক্ত বেরিয়ে আসে;
গায় তৃণভূমি এবং জলার সাথে,
হিমায়িত শিঙে সে-গান গড়িয়ে নামে,
আত্মারা টলে সেই ঘন কুয়াশায়
হাজার খূরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে,
যেন দীঘল, কালো, বিষণ্ন জিভ,
বেদনার এক গড়েছে পুষ্করিণী
পাশে তারাভরা গুয়াদাল্কিভির;
আহা, স্পেনের ধবল প্রাচীরখানি!
আহা, বেদনার কালোবরণ ষাঁড়!
আহা রে, জমাট ইগনাসিওর খুন!
আহা রে, তার ধমনীর বুলবুল !
না।
আমি তা দেখবো না!

একে বুকে ধরে এমন পেয়ালা নেই,
একে পান করে এমন চাতক নেই,
আলোর তুহিন পারে না জুড়াতে একে,
কোনো গান কোনো শাদা লিলির বান,
কোনো কাচ নেই রক্তকে ঢাকে রুপোর আচ্ছাদনে।
না।
আমি তা দেখবো না!

৩. শুইয়ে রাখা শব
(Cuerpo Presente)


বাঁকাজল আর তুষারজমাট সাইপ্রেস তরুহীন
পাথর এক কপাল যাতে স্বপ্ন কেঁদে মরে।
সময় ব’য়ে নে’য়ার মতো পাথর এক কাঁধ
অশ্রু, রিবন, গ্রহে সাজানো গাছগাছালি ভরা।

দেখেছি ধূসর বৃষ্টিধারা ঢেউয়ের পানে ছোটে
চালুনিময় কোমল হাত ঊর্ধ্বে তুলে ধরে,
রক্ত শোষণ না ক’রে যারা এলিয়ে দেয় তাদের
সেই পাথরে হঠাৎ সে যেন না ধরা পড়ে।

যেহেতু পাথর কুড়ায় বীজ এবং মেঘমালা,
ছায়ার নেকড়ে, কংকালেরা তামাশা ক’রে যায়:
দেয় না শব্দ একটুখানি ফটিক, কিবা আগুন
দেয় শুধু রিঙ এবং রিঙ, ঘেরহীন ওই ষাঁড়-লড়াইয়ের রিঙ।

পাথরে এখন নিথর শুয়ে সুজাত ইগনাসিও
সবই তো শেষ! হচ্ছে কী! ওর মুখটি মনে আঁকো:
মৃত্যু এসে ঢেকেছে ওকে অগুরু গন্ধকে
কৃষ্ণ মিনোতারের মুণ্ডু বসিয়ে দিলো কাঁধে।

সবই তো শেষ। বৃষ্টি ওর মুখের ভেতর ঢোকে
চুপসানো ওর বুক ছেড়ে যায় হাওয়া যেন উন্মাদ,
আর বরফের অশ্রুভেজা প্রেম
দিচ্ছে ওম নিজেকে নিজে পালের অগ্রভাগে।

ওরা কী বলে? এসেছে নেমে আবিল নীরবতা।
শুইয়ে রাখা ক্রম-পাণ্ডুর শবকে ঘিরে আছি,
সেই নিরূপম তনুর গড়ন যেনবা পাপিয়ার
আর দেখি তা কতো না অতল গর্তে ভরে যায়।

কে করে ভাঁজ লাশের কাপড়? ওর কথা সব ঝুট!
গায় না কেউ এখানে গান, কাঁদে না ঘরের কোণে,
জুতোয় কেউ পরায় না নাল, দেখায় না ভয় সাপে।
চাইনে কিছু এখানে, শুধু পটলচেরা চোখে
দেখতে চাই ওর দেহটা কেবল নির্নিমেষে।

এখানে চাই দেখতে তাদের, যাদের কড়া গলা।
ঘোড়াকে যারা মানায় বশ, শাসন করে নদী;
শীর্ণ-পাঁজর যাদের গলা গানের সুরে মাতে
তাদের মুখ আগুনে পাথর, সূর্য দিয়ে ভরা।

এই পাথরের সামনে, আমি দেখতে চাই তাদের
ছিন্ন-লাগাম এই দেহের, এরই সম্মুখে ।
মরণে বাঁধা এই সেনানী, তার মুক্তির পথ
বাৎলে দিক তারা আমায় এখন, এইবেলা।

চাই তারা দেখাক আমায় নদীর মতো শোক
থাকবে যার গভীর তট, মধুর কুজ্ঝটি,
না শুনে আজ এসব ষাঁড়ের দ্বিগুণ ঘড়্‌ঘড়্‌
ইগনাসিওর লাশ ব’য়ে নিতে
যেখানে সে ফানা হবে।

নিজেকে হারাবে চাঁদের গোল ষাঁড়-লড়াইয়ের রিঙে
যে চাঁদ তার তরুণ-দিনে শান্ত-দুঃখী ষাঁড়ের ভাব করে,
মাছের গান-রিক্ত-রাতে হারায় নিজেকেই
আর জমাট ধোঁয়ার শাদা ঝোঁপের ওই আড়ে।

চাইনে আমি মুখটি ওর রুমালে ঢেকে দিতে
যেন যে-মরণ ব’য়ে সে বেড়ায়, মানিয়ে নিতে পারে।
ইগনাসিও! রেখো না মনে এসব কিছু, এসব হাম্বারব
যাও গে ঘুমোও, ওড়ো, জিরোও; সাগরও তো যায় মরে!

৪. গরহাজির আত্মা
(Alma Absente)


তোমাকে ষাঁড় চেনে না, ওই ডুমুরগাছও না,
নয় ঘোড়ারা, তোমার ওই বাড়ির পিঁপড়েরাও।
শিশুটি আর ওই যে বিকেল তোমায় চেনে না
কেননা তুমি গিয়েছ মরে চিরকালের তরে।

ওই পাথরের শক্ত কাঁধ তোমায় চেনে না
কালো রেশম, যেখানে তুমি বন্দি হ’য়ে আছো।
তোমার স্মৃতি নীরব, সে-ও তোমাকে চেনে না
কেননা তুমি গিয়েছ মরে চিরদিনের তরে।

আসবে শরৎ ছোট্ট শাদা শামুক সাথে নিয়ে,
তুষারে ভেজা আঙুর আর পাহাড়শ্রেণী নিয়ে,
কেউ তবুও রাখবে না তো তোমার চোখে চোখ
কেননা তুমি গিয়েছ মরে চিরকালের তরে।

যেহেতু তুমি গিয়েছ মরে চিরকালের তরে,
তাদেরই মতো এই দুনিয়ার গিয়েছে যারা মরে,
সেসব মৃতের মতো যারা মরা কুকুরদের
ভাগাড়ে লীন হওয়ার মতো হয়েছে বিস্মৃত।

তোমায় কেউ চেনে না। না, তবুও আমি গাই
তোমার তনুর রূপ-সুষমা ভাবীকালের তরে।
পরিণত তোমার মনের স্তব করে যাই গানে।
তোমার ওই মরণ-তিয়াস, তোমার মুখের স্বাদ
ছিলো যে-বিষাদ লুকিয়ে তোমার মুখর উল্লাসে।

এমন খাঁটি আন্দালুসি দুঃসাহসে ভরা
ফের যদিবা জন্ম নেয় তা-ও বহু যুগ পর
গুমরে-মরা কথায় আমি তার যশোগান করি
আর এসব জলপাইগাছ, ওদের ভেতর দিয়ে
বয়ে চলা করুণ হাওয়া স্মরণ করি আমি
================
ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকা (Federico García Lorca, ৫/৬/১৮৯৮ — ১৯/৮/১৯৩৬)
গ্রানাদা জন্ম দিয়েছে বিশ্ববিশ্রুত অনেক কবি-লেখকের। কিন্তু জনপ্রিয়তা, খ্যাতি আর প্রভাবের বিচারে ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকার সঙ্গে কারোরই তুলনা চলে না। জীবৎকালেই হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তি। আর মৃত্যুর পর তার খ্যাতি স্বদেশ স্পেনের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে সপ্তসিন্ধু দশদিগন্তে। সবচে’ বেশি সংখ্যক বিদেশি ভাষায় অনূদিত হিস্পানি ভাষার এই কবি-নাট্যকারের ভক্তের সংখ্যা উত্তরকালে কেবলই বেড়েছে। অন্যভাবে বললে স্পেনে ও স্পেনের বাইরে, আবিশ্ব নিখিলে, গার্থিয়া লোরকা আজ এক জাদুনাম।

লোরকার জন্ম ১৮৯৮ খিস্টাব্দের ৫ জুন, গ্রানাদা থেকে মাইল কয়েক দূরে গেনিল নদীতীরবর্তী ফেন্তে ভাকেরোস (Fuente Vaqueros) নামের এক ছোট্ট গ্রামে। জায়গাটা গ্রানাদার বিস্তীর্ণ উর্বর ভেগা অঞ্চলের ঠিক কেন্দ্রস্থলে। গ্রাম ঘিরে আছে নিবিড় পপলারকুঞ্জ। লোরকার বাবা দন ফেদেরিকো গার্থিয়া রদ্রিগেস (Don Federico Garcia Rodriguez) ছিলেন সে গ্রামেরই এক সম্পন্ন কৃষক। আর মা দোনা ভিসেন্তা লোরকা রোমিয়েরো (Dona Vicenta Lorca Romero) ছিলেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা। লোরকার জীবনের প্রথম ১১টি বছর কাটে এই ভেগা অঞ্চলে — জলপাইবন আর সঘন পপলারকুঞ্জ, সদা কলস্বরা স্রোতোস্বিনী, পাহাড়, উপত্যকা আর তৃণভূমিঘেরা মায়াবী গ্রামীণ নিসর্গের কোলে। নিজের চাষাভুষোমার্কা চেহারাটাও তার সেখান থেকেই পাওয়া — রসিকতা করে প্রায়ই বলতেন লোরকা।

১৯০৯ সালে লোরকার পরিবার তার পড়াশুনার জন্য পাড়ি জমায় গ্রানাদা শহরে। নিউইয়র্কে আট মাস, কিউবাতে তিন মাস (১৯২৯-৩০) আর বুয়েনোস আইরিসে পাঁচ মাস (১৯৩৩-৩৪) — এই সময়টুকু বাদ দিলে লোরকার ঝোড়ো আর স্বপ্লায়ু জীবনের পুরোটাই কেটেছে মাদ্রিদ আর গ্রানাদায়। ১৯৩৬ সালের জুলাইতে, স্পেনে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ঠিক আগে, বন্ধুদের নিষেধ উপেক্ষা করে লোরকা ফিরে যান গ্রানাদায়। আর তার এক মাস পরেই ১৯ আগস্ট স্বৈরশাসক জেনারেল ফ্রাঙ্কোর খুনে ফালাঙ্গিস্ত (Falangist) বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে প্রাণ দেন। ঐতিহ্যবাহী যে-প্রিয় মুরিশ শহরে বেড়ে উঠেছিলেন লোরকা, যে শহর বারবার ঝিল্‌কে উঠেছে তার কবিতা ও নাটকে, সেই গ্রানাদারই অনতিদূরে ঘাতকের বুলেটে অকালে লুটিয়ে পড়েছে তার তরুণ মেধাবী প্রাণ।

বলা বাহুল্য, প্রাগ্রসর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীই কাল হলো লোরকার। এ নিয়ে কোনো রাখঢাক ছিলো না তার। আর সেটাই ক্ষেপিয়ে তোলে উগ্র ডানপন্থিদের। তারা তাকে দুষমণ হিসেবে চিহ্নিত করে। গ্রানাদার উত্তর-পুবের আল্‌ফাকার (Alfaqar) নামের পাহাড়ঘেরা স্থানে একটি জলপাইগাছের নিচে গুলি করে মারা হয় ৩৮ বছর বয়সী লোরকাকে। আজও সেই জলপাইতরু ঠায় দাঁড়িয়ে। অবশ্য সেটি এখন ‘লোরকা স্মৃতিউদ্যান’-এর ভেতর দেয়াল দিয়ে ঘেরা। সেখানটায় আরও তিন হতভাগার সঙ্গে সমাহিত করা হয় তাকে। ওদের একজন স্কুল শিক্ষক, বাকি দু’জন মাতাদোর (ষাঁড়-লড়িয়ে )।
 দালি ও লোরকা
তার কালের মহান ফ্লামেঙ্কো (Flamenco) গায়ক হুয়ান ব্রেভা’র (Juan Breva) প্রশস্তি করে একটা কবিতা লিখেছিলেন লোরকা। সে কবিতারই কয়েকটি চরণ হতে পারতো সদা-হাসিমাখা-মুখের-কবি লোরকার নিজেরই এফিটাফ :
`…Era la misma
pena cantando
detrás de una sonrisa.’

উপরের তিনটি চরণের ইংরেজি ভাষান্তর হাতের কাছে নেই। স্প্যানিশ ভাষায় আমার হাঁটুভাঙা যেটুকু জ্ঞান তাতে বাংলা করলে অনেকটা এরকম দাঁড়ায়:
‘নিজের অসহ যাতনা
ছিলো সে নিজে
হাসিতে তা ঢেকে গেয়ে গেছে নিজ গান’

বহু সংস্কৃতির ঐকতান-ধ্বনিত গ্রানাদা, বহু শতাব্দীর বিস্ময়-খচিত গ্রানাদা এমন এক উন্মুক্ত স্বর্গের নাম একদা যাতে এসে মিশেছিল নানা জাতির রক্ত আর মেধা, পশ্চিম ভূমধ্যসাগরের ঢেউয়ের কলতান আর নিকটপ্রাচ্যের বহুবর্ণিলতা, গ্রিক, আরব আর রোমানদের নানা গরিমা আর জিপসিদের অনিকেতবৃত্তি। এসব কিছুকেই সাঙ্গীকৃত করে এগিয়েছেন লোরকা। আন্দালুসিয়ার লোক-ঐতিহ্যের উদ্দীপক ইডিয়ম আর মেটাফরকে তিনি খুঁজে ফিরেছেন তার কবিতায় নাটকে। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এমন সংরাগদীপ্ত মেলবন্ধন স্পেনের আর কোনো কবির মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আজো, তার মৃত্যুর এতোকাল পরেও, স্পেনের মানুষ লোরকার কবিতার মধ্য দিয়ে নিজেদের চেনাতে ভালোবাসে। সম্ভবত আধুনিক কালে তিনিই একমাত্র কবি যার কবিতাকে শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত আর অশিক্ষিত সবাই ভালোবাসে;`…a poet whose worth is loved and acclaimed by the illiterate and the sophisticated alike.’ এ সত্ত্বেও লোরকা ছিলেন আধুনিক কালের সবচে’ জটিল কবিদের একজন। কেননা ব্যক্তিগত কাব্যভাষা ও ইডিয়ম তৈরির জন্য ক্রম অপসৃয়মান এক লোকজীবনের ভাবাবেগের সঙ্গে ক্রম আগ্রাসী, ক্রম জটিল আর শিল্পায়িত এক পৃথিবীর মূল্যবোধের মেলবন্ধন ঘটাবার প্রায়-অসম্ভব কাজে হাত দিতে হয়েছিল তাকে। কবিতার টেকনিক আর উপাদানের জন্য সমসাময়িকদের দিকে যেমন, তেমনি তিনি অকুণ্ঠিতভাবে হাত বাড়িয়েছেন মধ্যযুগের আরব কবিদের দিকে, গ্রিক-রোমান কাব্যের অতীত ঐতিহ্যের দিকে, পুরাণ-উপকথার দিকে ।

প্রেম, ভাবাবেগ আর সহিংস মৃত্যু — সর্বদাই এ তিনটি তার কবিতার প্রধান অনুষঙ্গ। সবকিছু ছাপিয়ে বারংবার নিজের মৃত্যুর প্রসঙ্গ উঠে এসেছে তার কবিতা ও নাটকে। এমনকি লঘু রচনায়ও তার দেখা মেলে। তার নিতান্তই হাল্কারসের একটি লেখা শেষ হয়েছে মৃত্যুর অনুষঙ্গ দিয়ে: “Take me by the hands, my love, / for I come quite badly wounded / Dying of love!’’

লোরকার চোখে মৃত্যু এক নীরব আগন্তুক, সর্বদা মুখোশ-পরে-থাকা মনোলিথিক এক শক্তি, যে বিনা বাধায় জীবনের টুঁটি টিপে ধরে মেতে ওঠে অনিবার উল্লাসে। তার তীব্র নখরে বন্দি জীবনের ত্রস্ত বুলবুল:“…Three thousand men came armed with shining knives to assasinate the nightingale.’’

এ রকম অসংখ্য ভয় জাগানিয়া, রোমহর্ষক চিত্রকল্প ছড়িয়ে আছে তার কবিতায় কবিতায়। ‘নিউ ইয়র্কে কবি’ (Poeta en Nueva York) নামের কবিতায় এভাবেই নিজের মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করেন লোরকা:
“ ..I sensed that they had murdered me.
They swept through cafes, graveyards, churches,
They opened the wine-casks and the closets,
They ravaged three skeletons to yank the gold teeth out.
But they never found me.
They never found me?
No, they never found me.’’

(Edwin Honig-এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে উদ্ধৃত)

লোরকা হয়তো ফালাঙ্গিস্তদের দিক থেকে নিজের ঘনায়মান বিপদ আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন ডানপন্থি এক বন্ধুর কাছে। তবু শেষরক্ষা হয়নি। বন্ধুটির অনুপস্থিতির সুযোগে খুনে ব্ল্যাক গার্ড বাহিনীর লোকেরা সিভিল গভর্নমেন্ট বিল্ডিংয়ে তার বন্ধুর বাসা থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায়। তার পরের ঘটনা সবার জানা। বিনা বিচারে পরদিন ভোরে গুলি করে মারা হয় স্পেনের সর্বকালের সেরা কবিরত্নটিকে। এক প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, খুন করার আগে লোরকাকে তার নিজের কবর খুঁড়তে বাধ্য করে ওরা।

‘‘ওর (লোরকার) পায়ুপথে দু’দুটো গুলি ছুড়েছিলাম আমি…’’ — খুনিদের একজন পরে গর্ব করে বলেছিলো।

এমনই নৃশংস, বীভৎস সে মৃত্যু! খুন করার আগে লোরকাকে দিয়ে একটি চিরকুট লিখিয়ে নিয়ে বাহকের মাধ্যমে তা পাঠানো হয় তার বাবার কাছে। সেই চিরকুটে লোরকা লিখেছিলেন: ‘প্লিজ বাবা, এই লোকের হাতে আর্মির জন্য চাঁদা হিসেবে ১০০০ পেসেতা দিয়ে দিও।’’

তার বাবা দন ফেদেরিকো অশুভ সেই চিরকুট নিজের ওয়ালেটে বাকি জীবন বয়ে বেড়িয়েছেন। জনকের কাছে পুত্রের লাশের চেয়ে কম ভারি ছিলো না তা।

লোরকার মা দোনা ভিসেন্তা ছিলেন সুশিক্ষিত, সাহিত্য-সঙ্গীতের সমঝদার, কল্পনাপ্রতিভাধর এক নারী। ছেলে লোরকাকে সেভাবেই গড়ে তুলেছিলেন তিনি। মায়ের যাবতীয় সদগুণ জন্মদাগের মতো সঙ্গী হয়েছিলো লোরকার। শৈশবে অসুস্থতা ছিলো নিত্যসঙ্গী। চার বছর বয়স পর্যন্ত হাঁটার ক্ষমতা ছিলো না। পরে হাঁটতে শিখলেন বটে, তা-ও আবার খুঁড়িয়ে। খেলাধুলা করার মতো শারীরিক সামর্থ্য ছিলো না বলে মেতে থাকতেন অন্যসব শিশুতোষ আনন্দে, নতুন নতুন উদ্ভাবনের নেশায়। দু’বছর বয়সেই আধো আধো গলায় গান গেয়ে তাক লাগিয়ে দিতেন আশপাশের সবাইকে। তিন বছরে পা দিতে না দিতেই কল্পিত চার্চ মাস (Imaginary Church Mass)-এর আদলে মিনিয়েচার থিয়েটার সাজানো ছিলো শিশু লোরকার প্রিয় খেলাগুলোর একটি। বাড়ির পাশের গির্জার পাদ্রীকে নকল করে চলতো ‘খুৎবা পাঠ’ (Sermon)। আর সেটা এমনই উপভোগ্য হতো যে পাড়াসুদ্ধু লোক শুনতো নরম-নীরব হয়ে। তবে ফেদেরিকো নামের ছোট্ট সে পাদ্রী আগেভাগেই শর্ত দিয়ে রাখতো, ‘খুৎবা’ শুনে সবাইকে কাঁদতে হবে। অন্যরা কান্নার অভিনয় করলেও, গৃহকর্মীদের একজন সত্যি সত্যিই কাঁদতো। সে কান্না সহজে থামতো না। এমনই অভিনয়প্রতিভা ছিলো লোরকার।

ছাত্র হিসেবে ভালো ছিলেন না। তবে তার সঙ্গীতপ্রতিভা বোদ্ধাদেরও প্রশংসা কুড়ায়। পিয়ানো আর গিটার বাদনে তার পারদর্শিতা ছিলো ঈর্ষণীয়। পিয়ানোতে বেটোফেনের (Bethoven) সোনাটা বাজিয়ে সেন্ত্রো র্আতিস্তিকো দ্য গ্রানাদার তৎকালীন প্রধান ফার্নান্দো দ্য লস রিয়োসকে পর্যন্ত তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। রিয়োসের ভাষায়, লোরকা এক অসাধারণ সঙ্গীতপ্রতিভা (Extraordinary Musical Talent)। বলা বাহুল্য লোরকার কবিতার সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্য ও গীতলতার পেছনে তার এই সঙ্গীতপ্রেমের ভূমিকা অনেক।

উচ্চশিক্ষার জন্য লোরকা প্রথমে গ্রানাদা, পরে ভর্তি হন মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

লোরকার বন্ধুবৃত্তটা ছিলো অনেক তারায় ভরা। কে না ছিলেন সেখানে! কবিতা, সঙ্গীত, চিত্রকলা, নাটক থেকে শুরু করে বুলফাইটের দুনিয়া-মশহুর নায়কেরা ছিলেন তার বন্ধু। চিত্রশিল্পী সালভাদর দালি, চলচ্চিত্রনির্মাতা লুই বুনুয়েল, কবি পাবলো নেরুদা, রাফায়েল আলবের্তি, হোর্হে গিয়্যেন, হুয়ান রামোন হিমেনেথ, পেদ্রো সালিনাস, দামাসো আলোনসো, লুইস সেরনুদা, বুলফাইটার-কবি-নাট্যকার ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াস — কতো কতো প্রোজ্জ্বল নাম!

সালভাদর দালির সঙ্গে তার ঘটনাবহুল বন্ধুত্ব নানা কারণে আলোচিত। দালি-লোরকার প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে ১৯২৩ সালে। দালির প্রখর ব্যক্তিত্ব আর সুন্দর চেহারা দুটোরই প্রেমে পড়েছিলেন লোরকা। আর লোরকাও গভীরভাবে আলোড়িত করেছিলেন দালিকে। কিন্তু সে বন্ধুতায়ও ফাটল ধরলো যখন কিনা দালি আর বুনুয়েল মিলে নির্মাণ করলেন স্পল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র Un Chien Andalou (১৯২৮)। লোরকার ধারণা, তাকে নিয়েই বানানো হয়েছে এ ছবি। সমকামিতার প্রসঙ্গ ছিলো তাতে। যদিও বাস্তবতা হচ্ছে, দালির সঙ্গে তার বন্ধুত্বের প্রেরণায় আধুনিক শিল্পকলা ও সমকামিতার সাফাই গেয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন লোরকা। এছাড়া সমকামিতাকে উপজীব্য করে নাটকও লিখেছিলেন যা ছিলো তার সময়ে এক বিরাট ট্যাবু।

ব্যক্তিগত সম্পর্কের দিক থেকে দালি-লোরকা যেমন ছিলেন মানিকজোড়, তেমনি শিল্পের সাধনায়ও ছিলেন যুগলবন্দি। সুবাদে কবিতা, নাটক আর চিত্রকলা হয়ে উঠেছিল একটি অন্যটির পরিপূরক।

দালি তার আত্মজীবনী Secret Life-এ লোরকার প্রশস্তি গেয়েছেন:
“The poetic phenomenon in its entirety and `in the raw’ presented itself before me suddenly in flesh and bone, confused, blood-red, viscious and sublime, quivering with a thousand fires of darkness and subterranean biology, like all matter endowed with originality of its own.’’

আর ‘Oda a Salvador Dali’ ( Ode to Salvador Dali) কবিতায় লোরকা লেখেন:
“O,Salvador Dali, voice steeped in olives!
I speak of what your person and your art tell me .
I praise not your imperfect adolescent brush,
but sing in the firm direction of your arrows.

I sing your handsome energy full of light.
Your love of what has a possible explanation.’’
(Edwin Honig-এর ইংরেজি অনুবাদ )

‘‘ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াসের মৃত্যু’’ প্রসঙ্গে
ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াস লোরকার প্রিয় বন্ধুদের একজন। ছিলেন একাধারে সুদক্ষ মাতাদোর (ষাঁড়-লড়িয়ে), কবি ও নাট্যকার। পরাবাস্তব....
(ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াস (৬/৬/১৮৯১ — ১৩/৮/১৯৩৪)
একটি নাটকও আছে ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াসের। মাতাদোর হিসেবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে তখন গোটা স্পেনে। অবশ্য মাঝপথে ষাঁড়-লড়াইয়ে বেশ কিছুদিন ক্ষান্ত দিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন অন্যসব সৃষ্টির নেশায়। পরে আবার রক্তের টানে ফিরতে চেয়েছিলেন রিংয়ে। আর সেটাই শেষ। ষাঁড়-মানুষের লড়াইয়ে এ যাত্রা জয়ী হয় ষাঁড়।

রিংয়ে প্রিয় বন্ধু ইগনাসিও মেহিয়াসের মৃত্যু তীব্রভাবে নাড়া দেয় লোরকাকে। বন্ধুর মৃত্যুকে উপজীব্য করে লোরকা ১৯৩৫ সালে যে দীর্ঘ কবিতাটি রচনা করেন অনেক সমালোচকের চোখে তা লোরকার সর্বোত্তম কবিতা। হিস্পানি ভাষার শ্রেষ্ঠ ৪টি শোকগাথার একটি হিসেবেও গণ্য করা হয় একে। কবিতাটি ৪টি ভাগে বিভক্ত। তবে এদের আলাদা আলাদা মোটিফগুলো আবার একসূত্রে গ্রথিত। এ কবিতায় নিজের প্রথম দিককার কবিতার গীতলতার সঙ্গে ব্যালাডের বর্ণনাত্মক রীতির মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন লোরকা। সেই সঙ্গে ট্রাজেডির গভীর আবহ সৃষ্টির জন্য তাতে যোগ করেছেন জিপসি বিলাপগাথার রিদম, ব্যবহার করেছেন নাট্য আঙ্গিক আর লোকগাথার উপাদান।

‘‘ত্রাদিত্তোরে ত্রাদুত্তুরে’’ — অনুবাদক বিশ্বাসঘাতক। এই বদনাম মাথায় নিয়েও ‘তোমাকে শিকার করে ফিরি যেন, যদ্যপি না পাই’ — ভিন্ন ভাষার মধুরতাকে আপন ভাষায় শিকার করার নাছোড়, দুর্মর চেষ্টাটি সতত চলমান। যেহেতু ‘অনুবাদ আসলে একটা চমৎকার ছল, নিজেকে আবিষ্কার করার বিনীত উপায়’ — যেমনটি বলেছেন শক্তিমান দুই কবি-অনুবাদক শঙ্খ ঘোষ আর অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। তবে একথা মানছি, নিতান্ত আবেগ-সম্বল আমার মতো অক্ষম, বেলায়েক অনুবাদকের ‘স্থানে স্থানে প্রকাশিত নিজ মন উক্তি’ প্রায়শই মূল রচনার বারোটা বাজায়। বিশ্বাসহন্তাই শুধু নয়, বোধ করি অনুবাদক কখনো কখনো হয়ে ওঠে আততায়ী।

আবার অনুবাদ যদি রসোত্তীর্ণও হয় তবুও কি সবার মনপসন্দ হয় তা? মূলের আত্মা কি ধরা দেয় অপর ভাষায়? বিশেষত কবিতায়? দুটি ভাষার তীব্র চুম্বনের মাঝখানেও কি থেকে যায় না অদৃশ্য কাচের দেয়াল?

উল্টো পিঠেও কথা থাকে, এ ব্যবধানও ঘুচিয়ে দিতে পারেন কেউ কেউ, কঠিন নির্মোক ভেঙে এনে দেন মণি ও মুকুতা। করাঙ্গুলিগণনীয় তারা। আমার সময়ে, আমার প্রজন্মের কারো কারো মধ্যেও পেয়ে যাই এমন প্রায়-অলৌকিক গুণপনা। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ নামের একজন আছেন; মিদাসের স্পর্শ নিয়ে হস্ত তার সতত ফলিয়ে যাচ্ছে সোনা। ওর অনুবাদে কোলরিজের ‘কুবলা খান’ বারবার পড়ি। অবাক হয়ে ভাবি, কী করে ‘সারাক্ষণ কলস্বর রণিত আবেশে!’ আমারও উড়িবার হয় সাধ। আমা হেন তাঁতীরও ফার্সি পড়বার খায়েশ জাগে।

লোরকার এ দীর্ঘ ব্যঞ্জনামধুর, বিয়োগবেদনাদীপ্ত অসামান্য কবিতাটি অনুবাদ করতে গেছি ক্ষমতা নয়, শুধু প্রেম সম্বল করে। তাতে বালখিল্যতা আছে, আছে ভাবাবেগ আর নিজেকে পরখ, আবিষ্কার করে নেয়ার চেষ্টা। কবিতাটির আভা ও গরিমা বাংলায় আমার করা অনুবাদে কতোটা ধরা পড়েছে সে বিচার সংবেদী পাঠকের। অনুবাদকর্মটির (কাণ্ডটির?) প্রথম পাঠক আমার দুই গুণী বন্ধু। প্রথম জন কবি শরিফ শাহরিয়ার, দ্বিতীয় জন কবি-অনুবাদক সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। সুব্রতর বিস্তারিত মন্তব্য ও পরামর্শ আমার অনুবাদকর্মটির প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জনে দারুণ কাজে লেগেছে। অবশ্য অনেক স্থানে ওর পরামর্শ মানা সম্ভব হয়নি। সেটা কিছুটা আমার ব্যক্তিরুচি আর বাকিটা আমার ক্ষমতার দৌড়ের সীমাবদ্ধতার কারণে। যেসব স্থানে ওর পরামর্শ মানা সম্ভব হয়েছে, বোধ করি, সেখানটায় এসে অনুবাদ যৎকিঞ্চিৎ উৎরে (?) গেছে। বন্ধু হয়ে ওকে স্রেফ ধন্যবাদ জানানোর মতো ছোটোলোকি আমায় মানায় না। আমেন!!!
------------------


bdnews24 এর সৌজন্যে
অনুবাদ: জুয়েল মাজহার

এই কবিতা গুলো পড়া হয়েছে...
free counters

স্টিফেন ডান-এর দুটি কবিতা

বাড়িতে নিয়মিত যা যা করি

মা যখন মারা গেল
ভেবেছিলাম: এবার একটা মৃত্যুর কবিতা লেখা হবে।
ওটা ক্ষমার অযোগ্য

তবুও নিজেকে ক্ষমা চোখে দেখি
মায়েদের ভালবাসা পেয়ে
ছেলেরা যেমন করতে পারে।

তাঁর কফিনে স্থির চেয়ে থাকি
যদিও জানি কতকাল এই শুয়ে থাকা,
কত জীবনের সুখ স্মৃতি

মগজের কোষে।
ঠিক বলা মুশকিল
কী ভাবে আমরা বিষণ্নতা কাটিয়ে উঠি,

কিন্তু মনে আছে আমার, মাত্র
বারো আমি, ১৯৫১, পৃথিবী তখনো
আমার কাছে অপরিচিত।

আমি মার কাছে (ভয়ে ভয়ে)
তার স্তন দেখার আবদার করি
কোনো দ্বিধা কিম্বা লজ্জা ছাড়াই
মা আমাকে তার কামরায় নিয়ে যায়
আমি স্থির তাকাই ওদের দিকে,
সাহস হয়নি আর কিছু জিগ্যেস করি।

আজ, এতদিন পর, একজন বলে
কর্কট রাশির জাতকেরা মায়ের আশির্বাদ না পেলে
অভিশপ্ত হয়, কিন্তু আমি, কর্কটরাশি হয়েও,

নিজেকে আবার ভাগ্যবান মনে করি। ভাগ্যবান আমি
মা আমাকে তার
স্তন দেখিয়েছিলো

যখন আমার বয়সী
বালিকারা নারী হয়ে উঠছিলো,
কপাল আমার

সে আমাকে কমবেশি শাস্তি
দিতে পারতো। যদি আমি তার
স্তন ছুঁতে কিম্বা
চুষতে চাইতাম,
তাহলে সে কী করতো?
মা স্বর্গ বাসিনী

যে আমাকে নারীদের মাঝে
স্বাভাবিক দেখতে চেয়েছিল,
এই কবিতাটি

সেখানে নিবেদিত
যেখানে আমরা থেমে গেছি, অসম্পূর্ণতার কাছে
যা ছিল চাওয়ার অধিক
এবং
আমরা আবার বাড়ির নিয়মিত কাজে
ফিরে যাই ।
=============

স্মিথভিল মেথডিস্ট চার্চে

পুরা সপ্তাহ আর্টস এ্যান্ড ক্রাফটস হওয়ার কথা,
কিন্তু “জিসাস সেভস” বোতাম নিয়ে
মেয়েটি যখন ঘরে ফিরে, বুঝলাম কী চাল
চলছে, সেই পুরানা কৌশল।

ছোট্ট বন্ধুদের ভালই লেগেছে তার।
কাগজ ভাঁজ করে কিম্বা মুচড়ে মুচড়ে পুতুল বানানো
বন্ধ করে যখন ওরা গান গাইছিলো, সেও বেশ আমোদে ছিল।
কী এমন খারাপ হতো।

জিসাস ভালো মানুষ, ভালো মানুষকে ভক্তি
আর অপকর্মে তাল মিলিয়ে চলা
এও করতে হয়,
ওটাও আবার দুঃখজনক।

আমরা বলি, ঠিক আছে। শুধু এক সপ্তাহ। কিন্তু যখন
সে “জিসাস আমায় ভালোবাসে, বাইবেল বলে তাই,”
গাইতে গাইতে বাড়ি ফেরে, ভাবলাম ব্যাপারটা নিয়ে
কথা বলা দরকার। আমরা কি বলতে পারি

জিসাস তোমাকে ভালোবাসে না? তোমাকে কষ্ট দিতে
বাইবেলের মতো পূন্য-গ্রন্থের কথা কেউ কেউ বলে,
এ কথা কি তাকে বলা যায়? কিছু না বলেই
আমাদের কথা শেষ হয়।

সেও তো বহুদিন আগে যখন জিসাসকে আমরা নিয়তি
অথবা বন্ধুর মতো করে চেয়েছিলাম,
ভক্তিও করেছিলাম আর ভাবতাম তিনি
যথার্থই মৃত:,

আমাদের ছেলেমেয়েরা তাঁকে লিংকন
অথবা থমাস জেফারসনের মতই একজন ভাবতো।
অল্পদিনেই আমরা বুঝে ফেলি: কোনো শিশুকেই
তার মনের বিরুদ্ধে বোঝানো কঠিন।

শুধু মন ভোলানো গল্পই তা পারে, কিন্তু
এর চেয়ে ভালো গল্পও আমাদের জানা নেই।
প্যারেন্টস নাইটে আর্টস এ্যান্ড ক্রাফটস
অ্যাপেটাইজারের মতই

ছড়ানো ছিটানো ছিল। আমরা চার্চের
ভেতরে গিয়ে বসি
ছেলেমেয়েরা পবিত্র নৌকা আর ঈশ্বরের জ্বয়ধ্বনি
করে গান গায়

এবং জিসাসের জন্য লম্প-ঝম্পও করে। কোনটা
তামাসা আর
কোনটা প্রার্থনা এই জীবনে প্রথম বুঝে
উঠতে পারিনি।

ইভ্যলুশন ঐন্দ্রজালিক কিন্তু এতে বীরদের কপাল পোড়ে।
“ইভ্যলুশন লাভস ইউ’”
সন্তানকে এ কথা বলা যায়!
ধ্বংস নিয়ে যত্তোসব ফালতু গল্প এবং

কয়েক শতাব্দী চমকে দেওয়ার মতো কিছুই ঘটেনি।
আমার মেয়ের জন্য একটা ভালো গল্পও আমার
জানা ছিল না অথচ সে আজ উদ্ভাসিত। গাড়ি করে বাড়ি
যেতে যেতে সেই গানগুলো সে গাইছিলো

মাঝে মাঝে জিসুর জন্য উঠেও দাঁড়ায়।
গাড়ি চালানো, দোল খাওয়া কিম্বা
মনে মনে সুর মেলানো ছাড়া আমাদের
কিছুই করার ছিল না।
=======================
(স্টিফেন ডান (Stephen Dunn, জন্ম. কুইনস, নিউ ইয়র্ক, ১৯৩৯)
[স্টিফেন ডান কবিতার বই ডিফারেন্ট আওয়ারস (২০০০)-এর জন্য পুলিৎজার পুরস্কার পান ২০০১ সালে। বিশ বৎসর বয়সে কর্পোরেট চাকুরিতে ক্রমাগত ভালো করতে থাকায় ভয় পেয়ে চাকুরি ছেড়ে লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন তিনি। এরপর কবি সস্ত্রীক এক বৎসরের জন্য স্পেনযাত্রা করেন। সেখানে উপন্যাস লিখবার চেষ্টা কবিতা রচনায় মোড় নেয়। এ সময়ে কবির সে সময়কার একমাত্র সাহিত্যিক বন্ধু স্যাম টোপারফ তাঁর কাছে বেড়াতে আসেন। তিনি পরামর্শ দেন কবিতা ঠিক পথে এগুচ্ছে। স্টিফেন ডান এরপর পুরোপুরি কবিতায় মন দেন। বিভিন্ন কলেজে কবিতা এবং ক্রিয়েটিভ রাইটিং-এর শিক্ষক, সম্পাদক তিনি। পেশাদার বাস্কেটবল খেলোয়াড় ছিলেন।

কীভাবে কবিতা লেখেন সে ব্যাপারে বলতে গিয়ে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, কবিতা যখন শুরু করেন তখন কোনো নির্দিষ্ট ডিজাইন থাকে না তাঁর। কখনো কোনো ছবি থেকে কখনো কোনো আইডিয়া দিয়ে অগ্রসর হন তিনি। এবং তাঁর স্বভাব হলো যা তিনি বলতে চান তা বলা থেকে বিরত থাকেন। ফলে তাঁর কবিতার আগানোটি এক অর্থে নানান বাদ দেওয়ার সমাহার যেখানে তিনি হয়তো কিছু বলতে চেয়েছিলেন।]
-------------
তাদেউজ রজেভিচ ও তার কয়েকটি কবিতা


bdnews24 এর সৌজন্যে
অনুবাদ: শামস আল মমীন


এই কবিতা গুলো পড়া হয়েছে...
free counters

'তাদেউজ রজেভিচ ও তার কয়েকটি কবিতা' অনুবাদঃ মাসুদুজ্জামান

কবি কে

তিনিই কবি যিনি কবিতা লেখেন
আবার তিনিও কবি যিনি পদ্যটদ্য লেখেন না।

তিনিই আসলে কবি যিনি পায়ের বেড়ি খুলে ছুঁড়ে ফেলে দেন
আবার তিনিও কবি যিনি এই শৃঙ্খলে আবদ্ধ হতে ভালোবাসেন

কবিকে আসলে বিশ্বাসী হতে হয়
তিনিও কবি যার কোনো কিছুতে বিশ্বাস নেই

কবি আসলে এমন মানুষ যাকে মিথ্যে কথা বলতে হয়
আবার তিনিও কবি যাকে বলা হয়েছে অনেক মিথ্যে কথা

তিনিই হলেন কবি যিনি টাল খেয়ে ভেঙে পড়েন
আবার তিনিও কবি যিনি উদ্ধত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ান

কবি তিনিই যাকে সবকিছু ছেড়েছুড়ে ফেলে দিতে হয়
আবার তিনিও কবি যিনি কোনো কিছুই ছেড়ে চলে যান না।
=============


একটি আধুনিক প্রেমের কবিতার খসড়া

এখনও শাদা
একে শুধু ভালো করে বর্ণনা করা যায় ধূসরতার পটে
পাখিকে পাথর দিয়ে
সূর্যমুখি
ডিসেম্বরে

পুরনো প্রেমের কবিতা
মাংসের চমকপ্রদ বর্ণনায় ভরা
এটা-সেটা কত যে কচকচানি থাকে
যেমন চোখের পাতার

এখনও লাল
এটা বর্ণনা করা দরকার
ধূসরতা দিয়ে সূর্যকে বৃষ্টি দিয়ে
নভেম্বরের পপি
ঠোঁটকে রাত্রি দিয়ে

রুটির সবচেয়ে
স্পর্শকাতর বর্ণনা হলো
খিদের একটা বিবরণ দাঁড় করানো
রোমকূপের ভেজা অংশ
উষ্ণ অভ্যন্তর
রাতের বেলায় সূর্যমুখি
প্রজননের দেবী সিবিলির স্তন-পেট-উরু
জলের
একটি বসন্তস্বচ্ছ
পরিষ্কার বর্ণনা হলো
তৃষ্ণার বিবরণ
ছাই
মরুভূমি
সৃষ্টি করে দৃষ্টিবিভ্রম
মেঘ আর গাছ সরে এসে
ঢুকে পড়ে আয়নায়

খিদের অভাব
মাংসের
অনুপস্থিতি হলো
ভালোবাসার আরেকটি বর্ণনা
এই হলো সেই আধুনিক প্রেমের পদ্য
===========


অনেক কাজের ভিড়ে

অনেক কাজের মাঝে
খুব জরুরি
আমি ভুলেই গিয়েছিলাম
এটাও খুব দরকারি

মরে যাওয়া

অকিঞ্চিৎকর
আমি এই বাধ্যবাধকতাকে অবহেলা করেছিলাম
অথবা একে পূরণ করছিলাম
হেলাফেলার সঙ্গে

আগামীকালের শুরুতে
সবকিছু বদলে যাবে
বিজ্ঞতার সঙ্গে আশা নিয়ে
সময়ক্ষেপণ না করে
আমি নিষ্ঠার সঙ্গে মরে যাওয়া শুরু করবো
==============


দেবদূত বিষয়ক হোমওয়ার্ক

পতনোন্মুখ
দেবদূত

কিশলয়ের সঙ্গে
সাদৃশ্যময়
অ্যাবাকাস
বাঁধাকপির পাতগুলি
কালো চালের জন্যে ধুকছে
শিলাবৃষ্টির সঙ্গে মিল আছে এদের
লালবর্ণে আঁকা
নীল আগুন
সুবর্ণময় জিভ

পতনোন্মুখ দেবদূত
পিঁপড়ের সঙ্গে সাদৃশ্যবাচক
চাঁদ ঢুকিয়ে দেয়
মৃতের শরীরে তার সবুজ নখ

দেবদূতেরা স্বর্গে
সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত কিশোরীর
উরুর ভেতর অংশের সঙ্গে সাদৃশ্যময় স্বাদু

তারা ঠিক নক্ষত্রের মতো
লজ্জাজনক স্থানে জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকে
তারা ত্রিভুজ আর গোলকের মতো বিশুদ্ধ
তাদের ভেতরটা যদিও
কঠিন

পতনোন্মুখ দেবদূত
শবগৃহের খোলা জানালার মতো
গরুর চোখের মতো
পাখির কঙ্কালের মতো
ভেঙেপড়া বিমানের মতো
মৃত সৈনিকের ফুসফুসে বসা মাছির মতো
শরতবৃষ্টির সুতার মতো
উড়ন্ত পাখির বদ্ধ ঠোঁটের মতো

রমণীর হাতের তালুতে
লক্ষ দেবদূত
পরিভ্রমণরত

তবে তাদের কোনো নাভিকুণ্ড নেই
সেলাই মেশিনে তারা শাদা পালে
টাইপ করে চলে আকারে দীর্ঘ এক-একটি কবিতা

তাদের শরীর হয়তো কোনো অলিভ গাছের কাণ্ডে
কলমের মতো করে ফের জন্ম দেয়া যাবে

তারা ছাদে ঘুমায়
তারা ফোটায় ফোটায় ঝরে পড়ে
============


জীবনের মধ্যপর্বে

পৃথিবীতে কেয়ামত আসা আর
আমার মৃত্যুর পর
দেখলাম জীবনের মধ্যপর্বে আমি দাঁড়িয়ে আছি
আমাকেই আমি সৃষ্টি করেছি
গড়ে নিয়েছি এই জীবন
মানুষ পশু প্রাকৃতিক দৃশ্য

আমি বলছি, এটা একটা টেবিল
একটা টেবিল
টেবিলের উপর সটান শুয়ে আছে রুটি ও একটা ছুরি
ছুরির কাজ হচ্ছে রুটি কাটা
মানুষ এই রুটি দিয়েই নিজেদের ঋষ্টপুষ্ট করে

সবারই মানুষকে ভালোবাসা উচিত
রাত্রি আর দিনের কাছ থেকে আমি এটাই শিখেছিলাম
একজন মানুষের কী কী ভালোবাসা উচিত

একজনের প্রশ্নের উত্তরে এই কথাগুলোই বলেছিলাম
===========


ফেরা
হঠাৎ করে খুলে যাবে জানালা
মা ডেকে বলবেন
ঘরে ফেরার সময় হয়েছে

দেয়াল যাবে খুলে আর আমি
কাদামাখা জুতা পায়ে প্রবেশ করবো বেহেশতে

এরপর টেবিলের কাছে সরে আসবো
কোনো কথা জিজ্ঞেস করলে রেগেমেগে উত্তর দেবো

আমি ভালো আছি একা থাকতে
দাও। মাথায় হাত দিয়ে আমি
বসে থাকবো অপেক্ষায়। কেমন করে তাদের বলি
সেই দীর্ঘ
আর জটিল পথের কথা

এখানে এই বেহেশতে মা
বুনে চলেছেন সবুজ স্কার্ফ

চারদিকে মাছির মধুর গুনগুন

ছ’দিন একটানা কাজ করার পর
বাবা চুলার কাছে ঘুমঘুম চোখে ঢুলু ঢুলু

না, একেবারেই আমি তাদের বলতে পারবো না
মানুষ একজন আরেক জনের গলার
কাঁটা হয়ে আছে



বেঁচে যাওয়া মানুষ

আমার বয়স চব্বিশ
আমাকে কসাইখানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল
কিন্তু বেঁচে গেছি।

নিচের কথাগুলো শূন্যতার সমার্থক:
মানুষ আর পশু
প্রেম আর ঘৃণা
বন্ধু আর শত্রু
অন্ধকার আর আলো।

মানুষ আর পশুকে একই পদ্ধতিতে হত্যা করা হচ্ছিল
আমি এটা দেখিনি:
টুকরো টুকরো করে কাটা মানুষে বোঝাই সব ট্রাক
ওরা রক্ষা পায়নি।

আদর্শের কথা শুধুই কচকচি:
সদ্গুণ আর ষণ্ডামি
সত্য আর মিথ্যা
সুন্দর আর কদর্য
সাহস আর ভীরুতা।

সদ্গুণ আর ষণ্ডামিকে একই পাল্লায় মাপা হয়
আমি এটা দেখিনি;
মানুষ একই সঙ্গে কী করে
ষণ্ডামি আর সদ্গুণের অধিকারী হয়।

আমি একজন শিক্ষক ও গুরুজিকে খুঁজছি
হয়তো তিনি আমার দৃষ্টি আর বাচনের ক্ষমতাকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারবেন
হয়তো তিনি আবার বস্তুর নাম ও আদর্শকে
অন্ধকার আর আলোকে আলাদা করে শিখিয়ে দিতে পারবেন

আমার বয়স চব্বিশ
আমাকে হত্যা করার জন্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল
কিন্তু আমি বেঁচে গেছি।
===========


প্রুফ

মৃত্যুকে সংশোধন করা যাবে না
কবিতার একটা পঙ্‌ক্তিকেও নয়
ওই নারী কোনো প্রুফরিডার নন
তিনি কোনো সহৃদয় সংবেদী
মহিলা সম্পাদকও নন

একটা বাজে উপমা চিরজীবী হয়ে টিকে যেতে পারে

ঘিনঘিনে পোশাক পরা কবি যিনি মারা গেছেন
তিনি তো জবুথবু মৃত এক কবি

যিনি বিরক্তিকর তিনি মৃত্যুর পরেও বিরক্ত করেন
যিনি হাঁদারাম তিনি তো কবরের ভেতর থেকেও
বকবক করতেই থাকবেন
=======================
পোলিশ কবি তাদেউজ রজেভিচ
বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালের সবচেয়ে প্রভাবশালী পোলিশ কবি তাদেউজ রজেভিচ (জন্ম ১৯২১)। প্রতীক, উপমা, শব্দব্যবহারের অভূতপূর্ব কলাপ্রকৌশলে পোলান্ডের কবিতার তথাকথিত লিরিকময়তাকে একেবারে বদলে দিয়েছেন তিনি। খুবই শক্তিশালী, অন্তর্ভেদী তার দৃষ্টি আর উপস্থাপনা। তিনি বলেছেন, “কবিতার তথাকথিত ছন্দোস্পন্দের বিষয়টি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের বন্দিশিবির সৃষ্টির মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে গেছে।” যুদ্ধের বীভৎসতা, নির্যাতন আর যুদ্ধপরবর্তী সময়ের সংকট ও অপ্রাপ্তিকে তিনি তার কবিতার বিষয় করে তুলেছেন। রজেভিচকে মনে করা হয় যুদ্ধোত্তর পোলিশ কবিতার অন্যতম প্রধান কবি। তবে শুধু কবি নন, তিনি পোলিশ ভাষার একজন গুরুত্বপূর্ণ নাট্যকার, সমালোচক ও ছোটগল্পের রচয়িতা।
পশ্চিমের অনেক সমালোচক প্রশ্ন তুলেছিলেন, ফ্যাসিবাদী রূঢ় বাস্তবতা আর নির্মমতার পর কী ভালো কবিতা রচনা করা সম্ভব? বিশেষ করে রাজনীতি যেখানে প্রধান ও প্রখর হয়ে ওঠে? রজেভিচ পোলিশ কবিতার ইতিহাসে ‘চতুর্থ সাহিত্য ঘরানা’র সৃষ্টি করে দেখিয়ে দিয়েছেন, রাজনীতি ও নির্মমতার ভেতর থেকেও নিয়ন্ত্রিত শৈলী, পরিমিত শব্দ ব্যবহার, অন্তর্গত অনুভবকে অবলম্বন করে ভালো কবিতা লেখা সম্ভব। কাব্যজীবনের প্রাথমিক পর্বে এই ধরনের কবিতা রচনার মধ্য দিয়েই পোলিশ সাহিত্যভুবনে তার আবির্ভাব ঘটে উদ্বেগ (১৯৪৭) ও লাল দস্তানা (১৯৪৮) কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে।

জীবনের প্রথম দিকে তীব্র সংকটের মুখোমুখি হয়েছিলেন রজেভিচ। গেস্টাপো বাহিনী তার বড়ো ভাইকে খুন করে, এই ভাইয়ের স্মৃতি তিনি কখনও ভুলতে পারেননি; নিজেও মৃত্যুর প্রান্ত থেকে ফিরে এসেছিলেন। কবিতায়, গল্পে, এমনকি নানা ধরনের গদ্যে সেই নির্মমতার কথা ঘুরে-ফিরে এসেছে। ফলে সমকালসম্পৃক্ত, আপাত অগভীর কবিতা রচনা করাই ছিল তার জন্যে স্বাভাবিক, কিন্তু তিনি প্রচলিত পথে না হেঁটে রচনা করতে থাকেন অন্তর্গত সংবেদনশীল কবিতা। তারই মাধ্যমে অস্তিত্বের জন্যেই বেঁচে থাকা—পোলিশ কবিতার ধারায় সংযুক্ত হলো এই নতুন সংবেদ। শূন্যতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম হয়ে উঠলো তার কবিতার মর্মবস্তু। পরবর্তী সময়পর্বে রচিত রাজপুত্রের সঙ্গে কথপোকথন (১৯৬০), অনামা কণ্ঠস্বর (১৯৬১), একটি মুখ (১৯৬৪) তৃতীয় মুখ (১৯৬৮) ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে এই বিষয়টিই প্রধান হয়ে উঠেছে।

রজেভিচের সময়ে আভাঁগার্দধর্মী কবিতার ধারাটি পোলান্ডে বেশ শক্তিশালী ছিল। এই ধরনের কবিতায় সরাসরি উপমা, বাক্প্রতিমা, শব্দের ব্যবহার ঘটতো। রজেভিচ সেই পথে না হেঁটে রচনা করেছেন মানব অস্তিত্বের স্মারক হয়ে উঠতে পারে এমন সব কবিতা, যা তার কথায় হয়ে উঠেছে জন্মের কার্যকারণ আর মৃত্যুর কার্যকারণে পরম্পরিত জীবনবেদ। কবিতায় এই জীবনের কথা সবটা বলা সম্ভব নয় ভেবে এই সময় তিনি গড়ে তোলেন ‘মুক্তমঞ্চ’, লিখে ফেলেন বেশ কিছু নাটক—কার্ডে লিপিবদ্ধ নির্ঘণ্ট (১৯৬৮), উপবিষ্ট অপেক্ষমান বৃদ্ধা (১৯৬৯), সেই চারজনকে নিয়ে (১৯৭২) ইত্যাদি।

সমালোচকদের মতে তার কানটি প্রখর, অর্থাৎ তার শ্রবণদক্ষতা ও তজ্জনিত প্রতিক্রিয়া চোখে পড়ার মতো। সমকালের নন্দনরীতি সম্পর্কে তিনি যেমন ছিলেন সচেতন, তেমনি সৃষ্টিশীলতার কোন নতুন রাস্তায় তাকে হাঁটতে হবে, সেটাও তিনি বেশ ভালোই জানতেন। নারীবাদ ও উত্তর-আধুনিকতার দ্বারা স্পৃষ্ট হয়ে এভাবেই তিনি রচনা করেন কাব্যগ্রন্থ শ্বেতবিবাহ (১৯৭৫)।

রজেভিচ এখন আর আগের মতো সৃষ্টিশলিতায় সক্রিয় নেই, তবে তিনি লিখে চলেছেন তার কবিজীবননির্ভর আত্মজীবনী। কবিতা ও জীবন যে একাকার হয়ে থাকে, সেটাই হচ্ছে এই আত্মজীবনীর মূল বিষয়। রজেভিচ এমন এক কবি যিনি কবিতার সংজ্ঞাকে অগ্রাহ্য আর প্রবলভাবে প্রতিরোধ করেছেন। কবিতার যত ধরনের তথাকথিত ফাঁদ আছে, তার সবগুলো তিনি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন। তাকে তাই বলা হয় নৈঃশব্দ্যের কবি, সংবেদনার কবি। অনেকে তাকে ‘প্রায়-মিস্টিক’ কবি বলেও আখ্যায়িত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ধ্রুপদী আভাঁগার্দ কবি হিসেবেও পরিচিত, উত্তর-আধুনিক কবির শিরোপাও জুটেছে তার।

যেভাবেই আখ্যায়িত করা হোক না কেন, রজেভিচের স্বর ও কাব্যশৈলী সরল কিন্তু স্নায়ুক্ষয়ী, সন্ত্রাস আর শূন্যতাকে তিনি ধরতে পারেন সহজেই। তিনি বলেছেন, আমার লক্ষ্য “পদ্য লেখা নয় ঘটনার বিবরণ দেয়া।” কিন্তু দেখা গেছে এই ঘটনার বিবরণই হয়ে উঠেছে এক-একটি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট অভূতপূর্ব কবিতা। তার শেষের দিকের লেখায় মানবজীবনের দ্বন্দ্ব, ক্ষোভ, হতাশা, আনন্দ, বেদনার ছবি বেশ স্পষ্ট। কবিতায় নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী আরেক পোলিশ কবি চেশোয়াভ মিউশ তাকে এসব কারণে চিহ্নিত করেছেন নৈরাজ্যের কবি বলে, “রজেভিচ হচ্ছেন নৈরাজ্যের কবি যিনি নস্টালজিয়া বা স্মৃতিকাতরতাকে বিন্যস্ত করে কবিতা লিখতে ভালোবাসেন।”

এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ১৪। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় তার কবিতা অনূদিত হয়েছে। এখানে অনূদিত কবিতাগুলোর উৎস বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং জে. ডি. ম্যাকক্লাচির সম্পাদিত দ্য ভিনটেজ বুক অফ কনটেমপোর‌্যারি ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি (১৯৯৬)।

bdnews24 এর সৌজন্যে
অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান


এই কবিতা গুলো পড়া হয়েছে...
free counters

বৃষ্টি এবং আফসোস

বাসা থেকে হোটেলে ফিরছিলেন। সাকিব আল হাসানকে দেখেই লবিতে বসে থাকা কয়েকজন ভারতীয় ব্যবসায়ী ছুটে এলেন—প্লিজ, একটু ছবি তুলতে চাই। ছবি তুললেন, কিন্তু মুখে ট্রেডমার্ক হাসিটা নেই।
সাকিবের হাসি হারাল কী কারণে? এবার একটু ম্লান হেসে বললেন, ‘বললে বিশ্বাস করবেন? আসলেই মনে হচ্ছে একটা সুযোগ মিস হয়ে গেল। ম্যাচটা হলো না।’
নিম্নচাপজনিত টানা বৃষ্টিতে দ্বিতীয় ওয়ানডে যে হবে না, এটা অনেকটা নিশ্চিতই ছিল। তার পরও একটু আফসোস বাংলাদেশ দলের; নিউজিল্যান্ড দলেরও নিশ্চয়ই তাই। এই আফসোসের ম্যাচটা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হলো কাল বেলা ১১টার দিকে। ম্যাচের ভাগ্য প্রকৃতি আগেই নির্ধারণ করে রেখেছে জেনেও মাঠে গিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ম্যাচ রেফারি জানালেন, ম্যাচ হবে না।
তৃতীয় ম্যাচও যে হবেই, এমন নিশ্চয়তাই বা কী? বিবিসির আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, সোমবার দিনটা ঢাকায় রৌদ্রোজ্জ্বলই থাকার কথা। কিন্তু ক্রিকেটের সবচেয়ে নামী ওয়েবসাইট ক্রিকইনফো আবার অন্য কী একটা সূত্র থেকে বলছে, এদিনও বজ্রপাতসহ বৃষ্টি হবে!
তা সোমবার যা-ই হোক, কালকের ম্যাচ বাতিল হওয়ায় দর্শকেরও বিশেষ আফসোসের কারণ আছে। অন্তত যারা ম্যাচটির টিকিট কিনে ফেলেছিল, তাদের তো আফসোসটা বেশিই হওয়ার কথা। সেটিতে প্রলেপ দিতে বিসিবি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, দ্বিতীয় ম্যাচের টিকিট দিয়েই ১১ তারিখের তৃতীয় ম্যাচটি দেখা যাবে।
বিসিবির টিকিট ও আসন ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান জি এস হাসান তামিম জানান, ‘দ্বিতীয় ম্যাচের আড়াই হাজারের মতো গ্যালারির টিকিট বিক্রির পরই বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আর তৃতীয় ম্যাচের জন্য আমরা আগে থেকেই একটু দর্শকসংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছি। সব মিলিয়ে ১৬ থেকে ১৮ হাজার দর্শকের হাতে তৃতীয় ম্যাচের টিকিট থাকছে।’
দর্শকসংখ্যা পরিবর্তিত হলেও, পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। ম্যাচ গতকাল হলেও দর্শকেরা মাঠে আসত ফলাফল ১-০ জেনে, পরশু ম্যাচ হলেও দর্শকেরা সেই ফলাফল জেনেই আসবে। এখানেই বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের আফসোস।
আফসোসের কথাটা বলছিলেন আবদুর রাজ্জাক, ‘আমি বলছি না যে, ম্যাচ হলেই আমরা জিতে যেতাম। কিন্তু প্রতিটি ম্যাচই তো জয়ের একটা সুযোগ, তাই না? সেদিক থেকে দেখতে গেলে, আমাদের সিরিজে আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগই নষ্ট হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, ম্যাচের দিন বৃষ্টির জন্য এমন বাইরে বসে থাকতে কার ভালো লাগে?’
এটাকেই আসল কথা বলছিলেন মাশরাফির ইনজুরিতে আবার অধিনায়কত্ব পাওয়া সাকিব। ম্যাচ না হওয়ায় আসল আক্ষেপের জায়গাটা সুনির্দিষ্টভাবে বললেন তিনি, ‘দেখুন, এখন আমাদের ক্রিকেটারদের মানসিকতাই বদলে গেছে। বৃষ্টিতে ম্যাচ ভেসে যাওয়া মানে, বেঁচে যাওয়া নয়। আমরা প্রত্যেকে আসলে খেলাটা খুব উপভোগ করি। হারি-জিতি, মাঠে লড়াই করেই সেটা মানতে চাই। হোটেলে শুয়ে-বসে দিন কাটানোটা বিন্দুমাত্র ভালো লাগে না।’
ভালো না লাগলেও শুয়ে-বসেই আসলে দিন কাটাতে হলো দুই দলকে। নিউজিল্যান্ড দলের কর্মকর্তাস্থানীয় কয়েকজন সকালে মাঠে গিয়েছিলেন। শাহরিয়ার নাফীস, মুশফিকুর রহিম, জুনায়েদ সিদ্দিকরা কয়েকজন মিরপুর ইনডোরে গিয়েছিলেন ব্যাটিং করতে। দুই দলের খেলোয়াড়ই দুপুরের দিকে হোটেল জিমনেসিয়ামে খানিকটা সময় কাটিয়ে রুমের দরজা আটকে দিলেন।
নিউজিল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা যেভাবে নিজেদের ‘গৃহবন্দী’ করে ফেললেন; তাতে মনে হতে পারে, আবহাওয়ার ওপর খুব চটেছেন তাঁরা। বাংলাদেশে ১০ দিন কাটিয়ে মাত্র একটি ম্যাচ খেলতে পারার পর না চটাটাই হতো অস্বাভাবিক।

এশিয়ান গেমস ফুটবলে বাংলাদেশ ‘ই’ গ্রুপে

এশিয়ান গেমস ফুটবলে বাংলাদেশ ‘ই’ গ্রুপে আরব আমিরাত, উজবেকিস্তান ও হংকংয়ের বিপক্ষে লড়বে। আগামী ৭ থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত চীনের গুয়াংজুতে অনুষ্ঠিত হবে এশিয়ার ‘অলিম্পিক’ নামে খ্যাত এই ক্রীড়া প্রতিযোগিতা।
এশিয়ান গেমসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ইভেন্ট ফুটবলে অংশ নিচ্ছে মোট ২৪টি দেশ। এই ২৪টি দলকে ছয়টি গ্রুপে ভাগ করে আয়োজন করা হচ্ছে এই ইভেন্ট। প্রতিটি গ্রুপের সেরা দুই দল এবং সবকটি গ্রুপের মধ্য থেকে তৃতীয় স্থান অর্জনকারী সেরা ৪টি দল যাবে পরবর্তী নকআউট রাউন্ডে।
ফুটবল ইভেন্টে ‘এ’ গ্রুপে স্বাগতিক চীন মুখোমুখি হবে মালয়েশিয়া, কিরঘিজস্তান ও জাপানের। ‘বি’ গ্রুপে আছে ইরান, ভিয়েতনাম, বাহরাইন ও তুর্কমেনিস্তান। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের অপেক্ষায় আছে ‘সি’ গ্রুপের দলগুলো। এই গ্রুপে আছে এবারের ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দুই দেশ উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া, প্যালেস্টাইন এবং জর্ডান। গতবারের শিরোপাজয়ী কাতারের সঙ্গে ‘ডি’ গ্রুপে আছে কুয়েত, ভারত ও সিঙ্গাপুর। আর ‘এফ’ গ্রুপে আছে থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ, ওমান ও পাকিস্তান।
১৯৭৮ সালে ব্যাংকক এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ফুটবলে অংশ নেয়। এ পর্যন্ত এশিয়ান গেমসের ছয়টি আসরে ফুটবলে অংশ নিয়ে মোট ১৮টি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে বাংলাদেশের ঝুলিতে রয়েছে কেবল দুটি জয়। ১৯৮২ সালে দিল্লি এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ মালয়েশিয়াকে ২-১ গোলে এবং ১৯৮৬ সালে সিউল এশিয়ান গেমসে নেপালকে ১-০ গোলে পরাজিত করে। বাকি ১৬টি ম্যাচের প্রতিটিতেই অবশ্য বাংলাদেশ পরাজিত হয়। ১৮টি ম্যাচে বাংলাদেশ গোল হজম করেছে মোট ৪৮টি, পক্ষান্তরে প্রতিপক্ষের জালে ঠেলতে পেরেছে ৬টি গোল। ১৯৯৪ সালের হিরোশিমা এশিয়ান গেমস ও ১৯৯৮ সালের ব্যাংকক এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ ফুটবলে অংশ নেয়নি।

তথ্য দেওয়ার দায়িত্ব কে নেবেন by মশিউল আলম

২৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবস উপলক্ষে দেশের নাগরিক-সমাজের হতাশার কথা জানা গেল। অনেকগুলো বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতা ও বিশিষ্ট নাগরিকের সমন্বয়ে গঠিত তথ্য অধিকার ফোরাম নামের একটি যৌথ মঞ্চ সেদিন ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে একটি মানববন্ধন করেছে। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালের মার্চ মাসে তথ্য অধিকার আইন নামের যে আইন পাস করেছে, সেটির বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে তাঁরা হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তাঁরা সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে দ্রুততম সময়ে তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা আরও দাবি করেছেন, তথ্য কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক, তা নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা হোক। এ ছাড়া জনস্বার্থে সম্পাদিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সব চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা হোক এবং সেগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক।
৩ অক্টোবর আগারগাঁও গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভবনে বাংলাদেশ তথ্য কমিশনের কার্যালয়ে প্রধান তথ্য কমিশনার এম জমির জানালেন, কমিশন গত মার্চ মাসে একটি বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেটি সংসদকে দেওয়া হয়েছে; সংসদ সদস্যরা তথ্য মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটিতে প্রতিবেদনটি নিয়ে আলোচনা করেছেন। ওই প্রতিবেদনে ২০০৯ সালের জুলাইতে তথ্য কমিশন গঠন থেকে শুরু করে পরবর্তী পাঁচ মাস কমিশন কী কী কাজ করেছে তার বিবরণ রয়েছে। কমিশনের প্রধান কাজের মধ্যে ছিল জেলায় জেলায় গিয়ে আইনটি সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে সভা-বৈঠক করা। কিন্তু আইন অনুযায়ী কাজটি তথ্য কমিশনের প্রধান দায়িত্ব নয়। প্রধান কাজ হলো, নাগরিকরা তথ্য চেয়ে না পেলে তার প্রতিকার করা। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তথ্য কমিশনে কোনো নাগরিক গিয়ে বলেননি যে তিনি তথ্য চেয়ে পাননি, তাই কমিশনের কাছে আরজি নিয়ে এসেছেন। অর্থাৎ তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োগ এখনো শুরু হয়নি বললেই চলে।
আইনটি বাস্তবায়নের জন্য একদম প্রথমেই যে কাজ করা প্রয়োজন তা হলো, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যেসব প্রতিষ্ঠান সরকারি অর্থ ব্যয় করে বা বিদেশি সাহায্য পায়, তথ্য অধিকার আইনে যাদের ‘কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, সেসব কর্তৃপক্ষের প্রত্যেক ইউনিটে একজন করে তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা। এই কর্মকর্তা নিয়োগ না করা পর্যন্ত তথ্য চেয়ে আবেদন করারই কোনো সুযোগ সৃষ্টি হয় না। অর্থাৎ আইনের প্রয়োগ শুরুই করা যায় না। তাই তথ্য অধিকার আইনে স্পষ্ট ভাষায় সময় উল্লেখ করে বলা হয়েছে, আইনটি কার্যকর হওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে সব ইউনিটে একজন করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকতা নিয়োগ করতে হবে। ৬০ দিন অর্থাৎ তিন মাসের মধ্যেই যে কাজটি সম্পন্ন করার নির্দেশনা খোদ আইনেই দেওয়া আছে, সেটি সম্পন্ন হয়নি ১৪ মাসেও।
সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে মোট কতজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে সে হিসাব কারও কাছে নেই। তথ্য কমিশনার সাদেকা হালিমের অনুমান, এ সংখ্যা হবে প্রায় ছয় লাখ। অবশ্য অনেকের ধারণা, এত বেশি নয়। তবে যা-ই হোক না কেন, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে এই সংখ্যা দুই লাখের বেশি হতে পারে। এর মধ্যে এ পর্যন্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে মাত্র সাড়ে পাঁচ হাজার। তথ্য কমিশন বলছে, প্রতিদিনই নিয়োগ চলছে, নতুন নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম তাঁদের কাছে প্রতিদিনই আসছে। এগুলো হচ্ছে সরকারি পর্যায়ে। বেসরকারি পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোতে তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগে বড়ই অনীহা লক্ষ করছে তথ্য কমিশন। অবাক ব্যাপার হচ্ছে, যেসব এনজিও এতকাল তথ্য অধিকার আইন পাসের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে, তাদের মধ্যেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগে গড়িমসি প্রবল। প্রধান তথ্য কমিশনার এম জমির জানালেন, ২০০৯ সালের জুলাই থেকে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসে মাত্র ১০টি এনজিও তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছিল। তারপর কমিশনের পক্ষ থেকে একাধিকবার কড়া ভাষায় তাগাদা দেওয়ার পর আরও কিছু এনজিও কাজটি করেছে, কিন্তু এখনো সে সংখ্যা উল্লেখ করার মতো নয়। অনেক বড় বড়, খ্যাতিমান এনজিও তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করেনি বলে অসন্তোষ প্রকাশ করলেন প্রধান তথ্য কমিশনার।
যতক্ষণ পর্যন্ত তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তথ্য অধিকার আইনের প্রয়োগ হতে পারছে না। এভাবে আইনের একটি নির্দেশনা দীর্ঘ সময় ধরে লঙ্ঘিত হচ্ছে। সরকারের সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা কার্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত বা অধীনস্থ অধিদপ্তর, পরিদপ্তর বা দপ্তরের প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয় কার্যালয়, আঞ্চলিক কার্যালয়, জেলা কার্যালয় ও উপজেলা কার্যালয়কে একজন করে তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে। কাজটি কোথাও আগে হচ্ছে, কোথাও পরে হচ্ছে, কেন সব ইউনিটে একই সঙ্গে হচ্ছে না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তিন মাসের মধ্যে যে কাজ শেষ করার কথা, ১৪ মাসে সম্পন্ন হয়েছে তার অতি সামান্য অংশ—এটি একটি গবেষণার বিষয় হতে পারে।
প্রধান তথ্য কমিশনার এই ক্ষেত্রে কতকগুলো বাস্তবিক সমস্যা লক্ষ করেছেন। যেমন, একজন সরকারি কর্মকর্তা, যিনি ইতিমধ্যে কোনো না কোনো দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন, তাঁর ওপর বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে যখন তথ্য প্রদানের দায়িত্ব আরোপ করা হবে তখন তিনি কেন তা গ্রহণে উৎসাহ বোধ করবেন? এটি প্রধান তথ্য কমিশনের জিজ্ঞাসা। কারণ এই দায়িত্ব পালনের জন্য কোনো কর্মকর্তাকে বাড়তি আর্থিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে না। তাঁর মোবাইল ফোন নম্বর তথ্য কমিশনকে জানাতে হবে, তিনি তথ্য প্রদানসংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সেটি ব্যবহার করবেন, কিন্তু সেই খরচ তাঁকে সরকার দেবে না। এটি একটি দিক। আরেকটি দিক হলো, একটি অফিসের সব বিষয়ে তথ্য জনগণকে জানানোর দায়িত্ব পালন করা এক বিরাট দায়িত্ব। আইন অনুযায়ী কোনো নাগরিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে কোনো তথ্য চেয়ে আবেদন করলে আবেদনপত্র গ্রহণের দিন থেকে পরবর্তী ২০ দিনের মধ্যে সেই তথ্য তাঁকে সরবরাহ করতে হবে। তথ্যটি কোথায় আছে, কীভাবে আছে তা যেমন একটি সমস্যা, তেমনই নিয়মিত অন্যান্য স্থায়ী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদনকারীকে তথ্য দিতে না পারেন, যদি অসুস্থ হন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে অন্যভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়তে হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে তাঁর তথ্য প্রদানের দায়িত্ব পালন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কীভাবে সম্ভব? প্রধান তথ্য কমিশনার বললেন, বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা উচিত: দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কিছু আর্থিক প্রণোদনা, নিদেনপক্ষে মোবাইল ফোনের খরচ দেওয়া হলে তাঁরা উৎসাহিত বোধ করতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, প্রত্যেকটি ইউনিটে তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একজন করে বিকল্প কর্মকর্তা থাকা উচিত, যাতে একজনের অনুপস্থিতি বা অসুস্থতার সময় বিকল্প কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
জনসাধারণের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে বাস্তবিক ক্ষেত্রে যিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন তিনি হচ্ছেন তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। একজন নাগরিক তথ্য চাইতে সর্বপ্রথমে হাজির হবেন তাঁরই দুয়ারে। তিনি তথ্যপ্রার্থী নাগরিকের প্রতিপক্ষ নন, বরং সহযোগী। এই সহযোগিতার দ্বারা তিনি জনসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন। প্রার্থিত তথ্য যেন তিনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তথ্যপ্রার্থী নাগরিকের হাতে তুলে দিতে পারেন, তার সব ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে। সেই ক্ষেত্রে অনেক কাজ বাকি রয়েছে। বস্তুত সে লক্ষ্যে কোনো কাজই এখন পর্যন্ত শুরু হয়নি। তথ্য প্রদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর সার্বিক সামর্থ্য বাড়াতে হবে; হাতের কাছেই যেন সব তথ্য সুশৃঙ্খলভাবে সজ্জিত থাকে, যেন নাগরিকেরা চাওয়ামাত্র তিনি তা সরবরাহ করতে পারেন, যেন তাঁকে অপারগতা প্রকাশ করতে না হয় এবং সে জন্য তথ্য কমিশনের সামনে আসামির মতো হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে না হয়, সে রকম একটি সমৃদ্ধ তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ সামনে রয়েছে। এই কাজটি বিরাট। তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগের দায়িত্ব সরকারের (তথ্য কমিশনের নয়)। এর একদম প্রাথমিক প্রস্তুতির ধাপটি হচ্ছে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা। যত দ্রুত সম্ভব দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগের কাজটি শেষ করা প্রয়োজন। কারণ এরপর তাঁদের ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজগুলো করতে হবে দ্রুতগতিতে।
মশিউল আলম: সাংবাদিক।

ইংলিশ চ্যানেলের কাছে দুর্ঘটনায় রাসায়নিক দ্রব্যবাহী জাহাজ

ইংলিশ চ্যানেলের প্রবেশমুখে দুর্ঘটনা-
কবলিত রাসায়নিক দ্রব্যবাহী জাহাজ ওয়াইএম ইউরেনাস
আটলান্টিক মহাসাগরের ফ্রান্স উপকূলের কাছে ইংলিশ চ্যানেলের প্রবেশমুখে গতকাল শুক্রবার রাসায়নিক দ্রব্যবাহী একটি জাহাজ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ফ্রান্সের কর্তৃপক্ষ জানায়, অপর একটি জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। জাহাজের ১৩ জন ক্রুকে উদ্ধার করা হয়েছে।
ফ্রান্সের কর্মকর্তারা জানান, শুক্রবার সকালে রাসায়নিক দ্রব্যবাহী জাহাজ ওয়াইএম ইউরেনাস থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়, জাহাজের কোনো অংশ ছিদ্র হয়ে গেছে। নিরাপত্তার কারণে ১৩ জন ক্রুর সবাই জাহাজ ছেড়ে যাচ্ছেন। ওই সময় তাঁরা ওয়েসেন্ট দ্বীপ থেকে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিলেন। তখনই জানানো হয়, জাহাজে ছয় হাজার টন রাসায়নিক দ্রব্য রয়েছে।
ব্রিটেনের কোস্টগার্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পিটার বুলার্ড জানান, ‘রাসায়নিক দ্রব্যবাহী জাহাজটি ডুবে গেলেও আপাতত পরিবেশদূষণের আশঙ্কা নেই। এখন আমাদের প্রধান কাজ হবে ফ্রেঞ্চ কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করা।’
৪০০ ফুট দীর্ঘ ওয়াইএম ইউরেনাস ইতালি ও নেদারল্যান্ড এবং হানজিন রিকজাড স্পেন ও নেদারল্যান্ডের মধ্যে চলাচল করে।

নেদারল্যান্ডে সরকার গঠন করছেন ভিভিডি নেতা রুট্টে

নেদারল্যান্ডের উদারপন্থী ভিভিডি পার্টির নেতা মার্ক রুট্টেকে সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির রানি বিয়েট্রিক্স। ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টিকে নিয়ে গঠিত মধ্য-ডানপন্থী জোটের নেতৃত্ব দেবেন রুট্টে। ইসলামবিরোধী নেতা খিয়ার্ট ভিল্ডার্সের দল ফ্রিডম পার্টি সংসদে তাদের সমর্থন দেবে, কিন্তু সরকারে অংশ নেবে না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে নেদারল্যান্ডে এই প্রথম সংখ্যালঘু সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে এবং ১৯১৮ সালের পর প্রথম উদারপন্থী প্রধানমন্ত্রী হবেন রুট্টে।
গত বৃহস্পতিবার রানি বিয়েট্রিক্সের সঙ্গে বৈঠকের পর রুট্টে সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভিভিডি এবং ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিককে (সিডিএ) নিয়ে সরকার গঠনের জন্য আমার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রানি। আমি এতে রাজি হয়েছি।’
আফগানযুদ্ধে সেনা মোতায়েন নিয়ে বিতর্কের মুখে সিডিএর সাবেক নেতা জ্য পিটার বালকেনেন্দার নেতৃত্বে গঠিত জোট সরকার ভেঙে যায় গত ফেব্রুয়ারিতে। এরপর থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দিয়েই চলছে নেদারল্যান্ড।
গত জুনের নির্বাচনে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। এই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিপুল ভোট পেয়ে তৃতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হয় ডানপন্থী ফ্রিডম পার্টি (পিভিভি)।
সরকার গঠনে গত সপ্তাহে দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। সে অনুযায়ী পার্লামেন্টে ভিভিডি-সিডিএ জোটকে সমর্থন দেবে মুসলিমবিরোধী সাংসদ ভিল্ডার্সের ফ্রিডম পার্টি (পিভিভি)। তবে তারা সরকারে অংশ নেবে না।
নির্বাচনে ১৫০ আসনের পার্লামেন্টে ৫২টি আসন পেয়েছে ভিভিডি এবং সিডিএ। পার্লামেন্টে আইন পাস করতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য পিভিভির সমর্থন প্রয়োজন হবে রুট্টের সরকারের।

ফ্রান্সে বোরকা নিষিদ্ধ করার শেষ আইনি বাধা পার

ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আইনি কর্তৃপক্ষ সাংবিধানিক পরিষদ বোরকা নিষিদ্ধ-সংক্রান্ত একটি আইন অনুমোদন করেছে। গত বৃহস্পতিবার পরিষদ আইনটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। এর মাধ্যমে ফ্রান্সে প্রকাশ্যস্থানে বোরকা পরা নিষিদ্ধ করার শেষ আইনি বাধা অপসারিত হলো। ফ্রান্স সরকার এ আইনের মাধ্যমে নারীর অধিকার সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে দাবি করেছে। তবে মুসলিম নেতাদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে ফ্রান্স মুসলমানদের ধর্মীয় অনুশাসনকে কলঙ্কিত করেছে।
এর আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজির সরকার আইনটি পার্লামেন্টে পেশ করলে ওই পরিষদ সতর্ক করে বলেছিল, বোরকা নিষিদ্ধ করলে সংবিধান লঙ্ঘিত হতে পারে। তবে খসড়া পর্যালোচনা করে সংশোধিত আকারে তৈরি আইনটি শেষ পর্যন্ত পরিষদ অনুমোদন করে।
অনুমোদিত আইনে বলা হয়েছে, আগামী বছরের প্রথম দিন থেকে ফ্রান্সে প্রকাশ্যে কোনো নারী সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল ঢেকে বের হতে পারবেন না। কেউ আইন লঙ্ঘন করলে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ধর্ম চর্চার স্বাধীনতা যাতে লঙ্ঘিত না হয়, এ জন্য মসজিদ বা অন্য কোনো উপাসনালয়ে কেউ সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল ঢাকলে তাঁকে বাধা দেওয়া হবে না।

নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা

চীনের ভিন্নমতাবলম্বী গণতন্ত্রপন্থী মানবাধিকারকর্মী ও লেখক লিউ সিয়াওবো এ বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। চীনের মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘদিন ধরে অহিংস আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে নোবেল কমিটি গতকাল শুক্রবার তাঁকে এই পুরস্কার দিয়েছে।
১৯০১ সালে প্রথমবারের মতো নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়। ওই বছর থেকেই শান্তিতে পুরস্কারও দেওয়া হচ্ছে। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী গুরুত্বপূর্ণব্যক্তিরা হলেন:
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা (২০০৯), গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ও বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস (২০০৬), আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা ও এর সাবেক প্রধান এল বারাদি (২০০৫), কেনিয়ার পরিবেশ ও রাজনৈতিক কর্মী ওয়াঙ্গারি মাথি (২০০৪), ইরানের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী শিরিন এবাদি (২০০৩), সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার (২০০২), জাতিসংঘ ও এর সাবেক মহাসচিব কফি আনান (২০০১), দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট কিম দে জং (২০০০), পূর্ব তিমুরের রোমান ক্যাথলিক যাজক ক্যারোল ফিলিপ জিমেনেস বেলো ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসে রামোস হোর্তা (১৯৯৬), সমন্বিতভাবে ইসরায়েলের রাজনীতিবিদ আইজ্যাক রবিন ও শিমন পেরেজ এবং ফিলিস্তিনের নেতা ইয়াসির আরাফাত (১৯৯৪), যৌথভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা ও ফ্রেডেরিক ডি ক্লার্ক (১৯৯৩), গুয়াতেমালার আদিবাসী নেতা রিগোবার্তা মেনচু (১৯৯২), মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চি (১৯৯১), সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা মিখাইল গর্বাচেভ (১৯৯০), তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা (১৯৮৯)।

জাতীয় ঐক্যের ডাক দিলেন মালিকি

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী নূরি আল-মালিকি দেশটিতে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। গতকাল শনিবার বাগদাদে উপজাতিপ্রধানদের সঙ্গে এক বৈঠকে মালিকি বলেন, বিদেশে নির্বাসিত রাজনীতিকদের জন্য ইরাকের দরজা এখন খোলা।
মালিকি বলেন, ‘যা হওয়ার হয়ে গেছে এবং যাঁরা ভুল করেছেন, তাঁরা ভুলই করেছেন। এ জন্য আমরা তাঁদের ক্ষমা করে দিয়েছি। কারণ, ঘৃণা আর বিদ্বেষ নতুন ইরাকের ভিত্তি হতে পারে না। তাই যাঁরা বিদেশে রয়েছেন, তাঁদের জন্য ইরাকের দরজা খোলা আছে। তাঁরা ইচ্ছা করলে দেশে ফিরতে পারবেন।’

কাশ্মীরের কিছু অংশে আবার কারফিউ

ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের কিছু অংশে গতকাল শুক্রবার আবারও কারফিউ জারি করা হয়েছে। ভারত শাসনের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদী এক নেতার নতুন করে বিক্ষোভ আহ্বানের পর এই কারফিউ জারি করল ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী।
কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরে কিছু অংশে ও উত্তরাঞ্চলীয় জেলা বারামুল্লা ও কুপওয়ারার কিছু এলাকায় এই কারফিউ জারি করা হয়। পুলিশের এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়।
এর আগে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন হুরিয়াত কনফারেন্সের কট্টরপন্থী অংশের নেতা সৈয়দ আলি গিলানি জুমার নামাজের পর বাসিন্দাদের ভারতবিরোধী বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে, এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জুমার নামাজের পর সহিংসতার আশঙ্কায় এই কারফিউ জারি করা হয়েছে।
গত ১১ জুন পুলিশের কাঁদানে গ্যাসের শেলের আঘাতে এক ছাত্র নিহত হওয়ার পর থেকেই মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরে বিক্ষোভ চলছে।
ওই ঘটনার পর থেকে এ পর্যন্ত সেখানে মোট ১১০ জন বিক্ষোভকারী ও পথচারী নিহত হয়েছে। এর আগে এ সপ্তাহের শুরুতে কারফিউ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

আফগানিস্তানে বোমা হামলায় গভর্নর নিহত

আফগানিস্তানের তাখার প্রদেশে গতকাল শুক্রবার একটি মসজিদে বোমা হামলায় কুনদুজ প্রদেশের গভর্নর মোহাম্মদ ওমরসহ ১৬ জন নিহত ও কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন। হামলার সময় তাঁরা তাখার প্রদেশের রাজধানী তালোকানে জুমার নামাজ পড়ছিলেন। তাখারের পুলিশ-প্রধান শাহজাহান নূরি এ কথা জানান। পূর্বাঞ্চলীয় খোস্ত প্রদেশে গতকাল ন্যাটো বাহিনীর হামলায় রক্ষীবাহিনীর ছয় সদস্য নিহত হয়েছেন। খোস্ত প্রদেশ পুলিশের উপপ্রধান ইয়াকুব খান এ কথা জানান।
শাহজাহান নূরি বলেন, ‘পরিস্থিতি গোলমেলে। এ হামলা আত্মঘাতী নাকি মসজিদে আগে থেকেই বোমা পেতে রাখা হয়েছিল, তা জানি না।’
গত মাসে পার্লামেন্টে নির্বাচনের পর আফগানিস্তানে এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা। এ ছাড়া শুক্রবারের নামাজের সময় এমন হামলার ঘটনা আফগানিস্তানে খুব কমই ঘটেছে। গত জুলাই মাসে খোস্ত প্রদেশের এক মসজিদে পেতে রাখা বোমা হামলায় পার্লামেন্ট নির্বাচনের এক প্রার্থী নিহত হন। তাৎক্ষণিকভাবে এই হামলার দায় কেউ স্বীকার করেননি।
এদিকে খোস্ত প্রদেশে ন্যাটো বাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে ছয় রক্ষীবাহিনীর সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
খোস্তের পুলিশের উপপ্রধান ইয়াকুব খান বলেন, এ ঘটনার পর শত শত গ্রামবাসী তাঁদের মৃতদেহ প্রাদেশিক গভর্নরের বাড়িতে নিয়ে এসে বিক্ষোভ করেন। এ সময় বিক্ষোভকারীরা মার্কিনবিরোধী স্লোগান দেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যতটুকু নিশ্চিত হয়েছি, তা হলো, ন্যাটো হেলিকপ্টার হামলায় ছয় স্থানীয় নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন। তবে ন্যাটো বলেছে, রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা প্রথমে তাঁদের ওপর গুলি চালিয়েছেন। আমরা জানি না, আসলে কে দোষী।’
ইয়াকুব খান বলেন, রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা স্থানীয় উপজাতি নেতাদের জন্য কাজ করেন। তাঁরা সরকারের সঙ্গে জড়িত নন।

ওবামার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদত্যাগ করছেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেমস জোনস পদত্যাগ করছেন। প্রেসিডেন্ট ওবামা গতকাল শুক্রবার হোয়াইট হাউসে জেমস জোনসসহ ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা পরিবর্তন করার ঘোষণা দেন।
প্রেসিডেন্ট ওবামা জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য জেমস জোনসকে ধন্যবাদ জানান। এ সময় তিনি টমাস ই. ডনিলন তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন বলে উল্লেখ করেন। ডনিলন জেমস জোনসের ডেপুটি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জোনস পদত্যাগ করছেন—এ ধরনের গুঞ্জন বেশ কিছুদিন থেকেই শোনা যাচ্ছিল।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এক বিবৃতিতে বলেন, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ এবং জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জেমস জোনস দারুণ অবদান রেখেছেন।
জেমস জোনসই বারাক ওবামার জাতীয় নিরাপত্তা টিমের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সদস্য, যিনি পদত্যাগ করছেন।
প্রেসিডেন্ট ওবামার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও শীর্ষ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ল্যারি সামারসসহ হোয়াইট হাউসের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার পদত্যাগের খবরের পরে নতুন করে এই খবর এল।

মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের জয়ে বাধা হতে পারে বিজেপি!

চলতি মাসের শেষে এবং আগামী মাসের প্রথম দিকে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় বিহার রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিছু সমস্যা সত্ত্বেও নির্বাচন সামনে রেখে বিহারের ক্ষমতাসীন জোট ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও জনতা দল (ইউনাইটেড) বা জেডি (ইউ) একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে—গুজরাটের মুখমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির সাংসদ বরুণ গান্ধীকে তারা নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহার করবে না। এ দুজনই কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী নেতা হিসেবে পরিচিত। কাজেই তাঁদের উপস্থিতি কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষ যাতে মুসলিম ভোট টানতে না পারে, সে জন্য এই কৌশল।
তবে বিজেপি-জেডির (ইউ) যৌথ নির্বাচনী প্রচারণা নিয়ে আরেকটি সমস্যা রয়ে গেছে। রামমন্দির নিয়ে আন্দোলনের প্রধান প্রচারক এল কে আদভানি এবং অযোধ্যা মামলার কৌঁসুলি রবিশঙ্কর প্রসাদকে নিয়ে প্রচারণা চালাতেও সমস্যার মুখে পড়তে হবে মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারকে। কেননা অযোধ্যা মামলার রায় হলো সবে। অযোধ্যায় সেই জমির তিন ভাগের এক ভাগ পেয়েছে মুসলিমরা অন্য দুই ভাগ হিন্দুরা। কাজেই মুসলিমরা এটাকে সহজভাবে নেবে না। আর সে বিষয়টি ভোলার আগেই এ নির্বাচনে বিজেপি যতই হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের কথা বলুক, তা কাজে আসবে বলে মনে হয় না। বিশেষ করে আদভানি ও রবিশঙ্করেরা যদি প্রাচারণায় যোগ দেন, তাহলে সেটা আরও কঠিন হবে।
বিজেপি আগেই ঘোষণা দিয়েছে, জেডির (ইউ) সঙ্গে তারা যৌথভাবে অনেক সমাবেশ করবে। কিন্তু জেডির (ইউ) নেতারা এখন বলছেন, এ ধরনের সমাবেশ না করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এর আগে ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচন ও ২০০৫ সালের রাজ্যসভা নির্বাচনে দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) ও লোক জন শক্তি (এলজেপি) ভালো করতে পারেনি মুসলিমদের কাছে টানতে না পেরে। তবে আরজেডি ও এলজেপি আশা করছে, আযোধ্যা মামলার রায়ের পর সংখ্যালঘু ভোটাররা এবার ক্ষমতাসীন জোটের বিপক্ষে রায় দেবে। রায়ের পর আরজেডির নেতা লালুপ্রসাদ যাদবের আচরণে পরিবর্তন এসেছে এবং ধারণা করা হচ্ছে, আদভানি ও রবিশঙ্করের উপস্থিতিকে তিনি পুরোপুরি কাজে লাগাতে চাইবেন।
তবে জেডি (ইউ) মনে করে, এবার নির্বাচনে বিহারে মুখ্যমন্ত্রী পদের দাবিদার দুজন, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার (জেডি-ইউ) ও লালুপ্রসাদ (আরজেডি)। অযোধ্যার বিষয়টি ইস্যু হোক বা না হোক, এ দুজনের মধ্য থেকেই একজনকে বেছে নেবে ভোটাররা। আর এ ক্ষেত্রে নীতিশ কুমারই এগিয়ে থাকবেন তাঁর উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে। যদিও অযোধ্যা মামলার রায়কে নির্বাচনী প্রচারণায় কাজে লাগানো বিজেপির জন্য কঠিন হবে।
ঠিক এ কারণেই বিজেপি ছাড় দিতে রাজি হয়েছে নরেন্দ্র মোদি ও বরুণ গান্ধীকে ব্যবহার না করার ক্ষেত্রে আপস করে। তবে আদভানি ও রবিশঙ্কর প্রসাদ তো রইলেন। নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁদের উপস্থিতি আসলে কী ফল দেবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

জলবায়ু আলোচনা নিয়ে অচলাবস্থার জন্য ধনী দেশগুলো দায়ী: চীন

জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনা নিয়ে সৃষ্ট অচলাবস্থার জন্য উন্নত বিশ্বকে দায়ী করেছে চীন। বেইজিং বলেছে, ধনী দেশগুলোকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের মাত্রা কমিয়ে আনতে হবে। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে নতুন চুক্তিতে পৌঁছাতে আলোচনার পথ উন্মুক্ত হবে বলে তাদের বিশ্বাস।
চীনা শহর তিয়ানজিনে চলমান জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলনে গতকাল শুক্রবার স্বাগতিক দেশের প্রতিনিধি এসব কথা বলেন। তবে সম্মেলনে অন্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা অগ্রগতির পথে চীনই বড় অন্তরায়।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরস্পরবিরোধী এ অবস্থানের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে জাতিসংঘের নতুন চুক্তির সম্ভাবনা হুমকির মুখে পড়তে পারে। কেননা আগামী বছরের সম্ভাব্য নতুন চুক্তির ভিত্তি তিয়ানজিন সম্মেলনেই প্রতিষ্ঠিত হবে বলে তাঁরা আশা পোষণ করেছিলেন। সপ্তাহব্যাপী এ সম্মেলন আজ শনিবার শেষ হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক চীনা আলোচক হুয়াং হুইকাং বলেছেন, ‘আমরা শঙ্কিত, কেউ কেউ কিয়োটো প্রটোকলকে গলাটিপে হত্যা করতে চাইছে।’ তিনি বলেন, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দিয়ে উন্নত বিশ্বের উচিত, ২০১৩ সাল থেকে কিয়োটো প্রটোকলের পরবর্তী ধাপ নিয়ে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করা। হুয়াং বলেন, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের মাত্রা কমিয়ে আনতে ধনী দেশগুলোর বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
তবে সম্মেলনে অন্য আলোচকেরা বলেছেন, ২০১২ সালের পর কিয়োটো প্রটোকলের বৈধতা নিয়ে আলোচনার বিষয়টি চীন এড়িয়ে যাচ্ছে। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে দরিদ্র দেশগুলোকে সহায়তা ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তি বিনিময় সংক্রান্ত চুক্তির পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।

নতুন ছায়া মন্ত্রিসভা ঘোষণা করলেন এড মিলিব্যান্ড

ব্রিটেনের পার্লামেন্টের বিরোধী দল লেবার পার্টি নতুন ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করেছে। দলের নবনির্বাচিত নেতা এড মিলিব্যান্ড গতকাল শুক্রবার এই মন্ত্রিসভা ঘোষণা করেন। নতুন এই ছায়া মন্ত্রিসভায় রেকর্ডসংখ্যক ১১ জন নারী স্থান পেয়েছেন।
ছায়া মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন ইভেট্টে কুপার। এই পদে নির্বাচিত হতে স্বামী এড বলসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়েছে তাঁকে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী ছায়া মন্ত্রিসভায় লেবার পার্টির সদস্যদের কমপক্ষে ছয়জন নারী সদস্য নির্বাচিত করার কথা। সে অনুযায়ী তাঁরা আটজনকে নির্বাচিত করেছেন। এ ছাড়া সংরক্ষিত পদে আরও তিনজন নারী স্থান পেয়েছেন।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের মন্ত্রিসভায় নারী সদস্যদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি নারী সদস্য রয়েছেন এডের ছায়া মন্ত্রিসভায়। এ মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী টেসা জুয়েল, সাবেক ইউরোপ মন্ত্রী ক্যারোলিন ফ্লিন্ট ও দুই যমজ বোন মারিয়া ও অ্যাঞ্জেলা ইগল।
এই ছায়া মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী অ্যালান জনসন, অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ও জিম মার্ফি। আরও রয়েছেন দলীয় নেতার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় এড মিলিব্যান্ডের প্রচারণা ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী সাদিক খান।
তবে সাবেক মন্ত্রী জ্যাক স্ট্র ও ডেভিড মিলিব্যান্ডের মতো নেতারা ছায়া মন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে অংশ নেননি। দলীয় এই নির্বাচনে প্যাট ম্যাকফ্যাডেন, বেন ব্র্যাড শ, শন উডওয়ার্ডের মতো প্রভাবশালী নেতারা হেরে গেছেন।

আফগানিস্তানের নিরাপত্তার অর্থে পকেট ভারী তালেবানের

আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষে যেসব চুক্তিভিত্তিক বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থা দায়িত্ব পালন করেছে, তাদের মাধ্যমে তালেবান জঙ্গিদের কাছে তহবিল পৌঁছেছে। গত বৃহস্পতিবার মার্কিন সিনেটের একটি প্রতিবেদনে এ কথা জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি ওই নিরাপত্তা সংস্থাগুলো প্রায়ই আফগানিস্তানের যুদ্ধবাজ গোষ্ঠীর নেতাদের ভাড়া করেছে; যাঁরা তালেবান, হত্যা ও অপহরণের সঙ্গে জড়িত।
সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী কমিটির প্রণীত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে বেসরকারি বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও তাঁদের প্রতি নজরদারি ব্যবস্থা দুর্বল ছিল। কোম্পানিগুলো বেশির ভাগ সময়ই স্থানীয় সাধারণ আফগানদের সেনাসদস্য হিসেবে ভর্তি করতে ব্যর্থ হয়ে যুদ্ধবাজ নেতাদের ভাড়া করেছে। এ ব্যাপারে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় কমিটির চেয়ারম্যান ডেমোক্র্যাট পার্টির সিনেটর কার্ল লেভিন বলেন, ‘আফগানিস্তানে প্রায়ই বেসরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা যুদ্ধবাজ নেতাদের শক্তিশালী করেছে। আফগানিস্তানে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে তারা ক্ষমতাধর হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। এই চুক্তিভিত্তিক কোম্পানিগুলো আমাদের সেনাদের নিরাপত্তা এবং এই অভিযানের সাফল্য হুমকির মুখে ফেলেছে।’
কার্ল লেভিন বলেন, ‘বেশ কয়েকটি চুক্তিভিত্তিক নিরাপত্তা কোম্পানি জোট বাহিনীর বিরুদ্ধে কাজ করেছে—এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে। যে লড়াইয়ের জন্য তাদের ভাড়া করা হয়েছে, সেটাই ভণ্ডুল করার হুমকি সৃষ্টি করেছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ যুদ্ধবাজ নেতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে যাওয়ার ছিদ্র আমাদের বন্ধ করা দরকার।’
প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে কোম্পানিগুলো স্বল্প প্রশিক্ষিত ও অনভিজ্ঞ আফগানদের ভাড়া করেছে। কীভাবে বেশ কয়েকটি কোম্পানি জেনেশুনে তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা যুদ্ধবাজ নেতাদের তহবিল সরবরাহ করেছে।
আফগানিস্তানে বর্তমানে ২৬ হাজার বেসরকারি নিরাপত্তা সদস্য কাজ করছেন। প্রতি ১০ জনের নয়জনই কাজ করছেন মার্কিন সরকারের পক্ষে। এসব বেসরকারি নিরাপত্তা সদস্য কূটনৈতিক মিশন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে রয়েছেন।
সিনেটের ওই প্রতিবেদনে শিনদান্দ বিমান ঘাঁটির একটি ঘটনার উদাহরণ টানা হয়। বলা হয়, আর্মার গ্রুপ নর্থ আমেরিকা নামের একটি কোম্পানি ওই বিমান ঘাঁটিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় দুই প্রতিপক্ষ যুদ্ধবাজ নেতাকে ভাড়া করে। চুক্তির মেয়াদ অনুযায়ী পুরো সময় দুই পক্ষের সদস্যরা পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলা ও হত্যার ঘটনায় জড়িত ছিল।
এই প্রতিবেদনের জবাবে বেসরকারি নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত পর্ষদের সভাপতি ডগ ব্রুকস বলেন, রণাঙ্গনে চুক্তিভিত্তিক কোম্পানিগুলোকে নিয়োগ দেওয়া নিয়ে কঠিন সমস্যায় পড়তে হয়। অন্যদিকে মার্কিন কংগ্রেস সবচেয়ে কম দামে লোক ভাড়া করতে চায়। এতে মানসম্পন্ন কোম্পানিগুলো বাদ পড়ে।

ফেডারেশন কাপ পিছিয়ে গেল

টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার কথা ছিল গতকাল থেকে। কিন্তু টানা বৃষ্টির কারণে কাল মাঠে গড়ায়নি গ্রামীণফোন ফেডারেশন কাপ ফুটবল। আবহাওয়ার উন্নতি হলে কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে চট্টগ্রাম আবাহনী-বাংলাদেশ পুলিশের উদ্বোধনী ম্যাচটি হবে আগামীকাল। পরের ম্যাচগুলোও একইভাবে ক্রমানুয়ায়ী বদলে যাবে। বেলা সাড়ে তিনটায় শুরু হবে খেলা।

বাকি তিন ম্যাচেও অধিনায়ক সাকিব

মাশরাফি বিন মুর্তজা উইকেটে পড়ে যাওয়া মাত্র সাকিব আল হাসান বুঝেছিলেন, ওই ম্যাচটায় তাঁকে অধিনায়কত্ব করতে হচ্ছে। আর মাশরাফি মাঠের বাইরে চলে যাওয়ায় সবাই বুঝেছিলেন, সিরিজের বাকি ম্যাচগুলোতে সাকিবকেই অধিনায়কত্ব সামলাতে হবে।
কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ব্যাপারটি বুঝতে একটু সময় লাগছিল। দল সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের খবর, দ্বিতীয় ওয়ানডের আগে পরশু সংবাদ সম্মেলনের আগ পর্যন্ত সাকিবকে বোর্ড জানায়নি যে পরের ম্যাচে তাঁকে অধিনায়কত্ব করতে হবে। যার প্রতিফলন ছিল সাকিবের কথায়—‘পরের ম্যাচ পর্যন্ত ক্যাপ্টেনসি করছি, এটুকু জানি!’
শেষ পর্যন্ত কাল টেকনিক্যাল কমিটির সভার পর এ ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পেরেছে বিসিবি। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয়েছে, সিরিজের বাকি ম্যাচগুলোতে সাকিব বাংলাদেশের অধিনায়কত্ব করবেন। সাকিবের সঙ্গে আলোচনার পর তিনি এ ব্যাপারে সম্মতিও জানিয়েছেন।
তবে বিচিত্র ব্যাপার হলো, কোনো সহ-অধিনায়ক নির্বাচন করতে পারেনি বিসিবি। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কোনো কারণে মাঠ ছেড়ে গেলে সাকিবই সহ-অধিনায়ক নির্বাচন করে যাবেন! ভেতরের খবর হলো, সাকিবের সঙ্গে এর আগে সহ-অধিনায়ক হিসেবে থাকা মুশফিকুর রহিমের ওপর ভরসা রাখতে পারছে না বিসিবি। কারণ, তাদের বিবেচনায় এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান নাকি ফর্মে নেই।
এটা ঠিক যে সর্বশেষ ইংল্যান্ড সফরে রানে ছিলেন না মুশফিক। কিন্তু এ বছরই টেস্ট ও ওয়ানডেতে দুর্দান্ত কিছু ইনিংস এসেছে মুশফিকের ব্যাট থেকে। কিপিংয়েও বলার মতো কোনো অবনতি হয়নি। ক্রিকেট প্রশাসকদের স্মৃতিশক্তি বোধহয় খুব দুর্বল হয়!

সামুরাইয়ে বধ আর্জেন্টিনা

অক্টোবর মাসটা শিনজি ওকাজাকির জন্য খুবই পয়মন্ত। বিশেষ করে ৮ অক্টোবর। এ মাসেই আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল তাঁর দুই বছর আগে। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দুটি হ্যাটট্রিকই এ মাসে। প্রথমটি গত বছরের ৮ অক্টোবরে। এক বছর পর ঠিক একই দিনে শিনজি তাঁর জীবনের স্মরণীয়তম গোলটি করলেন। যে গোলে বলা যায় ইতিহাস গড়ল জাপান। আর্জেন্টিনাকে বধ করল সূর্যোদয়ের দেশ!
১৯ মিনিটে করা এই গোলটি অবশ্যই অনেক দিন মনে রাখবেন শিনজি। কিন্তু প্রীতি ম্যাচ বলে এর জয়-পরাজয় নিয়ে আসলে কিছুই আসে-যায় না। তা-ই কি! এই পরাজয় কি সার্জিও বাতিস্তার ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ করল না। ডিয়েগো ম্যারাডোনার অনুসারীরা কি সোচ্চার হবে না! আর্জেন্টিনার মানুষ দ্রুতই ভুলে যাবে আগের ম্যাচেই স্পেনকে ৪-১ গোলে হারিয়ে দেওয়ার কথা। আর্জেন্টিনা সমর্থকদের জন্য এই পরাজয় হতাশার হলেও ম্যারাডোনার অনুসারীরা হয়তো তাতেও খুঁজে নেবে আশার আলো!
এই জয়ে সবচেয়ে উপকার হলো আসলে আলবার্তো জাকেরনির। এসি মিলানের সাবেক কোচ জয় দিয়ে শুরু করলেন জাতীয় দলে। ‘আর্জেন্টিনাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই’—এই মন্ত্র তিনি পড়ে আসছিলেন কদিন থেকেই। হয়তো সেটি ছিল গোল কম হজম করার জন্যই সাহস দেওয়ার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ল ব্লু সামুরাইরা।
অবশ্য ম্যাচের ফল হতে পারত অন্য রকম। স্বাভাবিকভাবেই আর্জেন্টিনার আক্রমণের ধার এ ম্যাচে ছিল বেশি। লিওনেল মেসি সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারেননি। ম্যাচের শুরুর দিকে তাঁর দুটো ভালো আক্রমণ প্রতিহত করে দেওয়ার ফাঁকেই দলকে এগিয়ে নেন শিনজি।
গোলদাতা হিসেবে অবশ্য শিনজির বদলে থাকতে পারত মাকোতো হাসেবের নাম। কেইসুকে হোন্ডার বাড়িয়ে দেওয়া বলে জোরাল শট নিয়েছিলেন মাকোতো। আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরো তা ঠেকিয়ে দিলে ফিরতি বল জালে পাঠিয়ে সাইতামা স্টেডিয়ামকে উল্লাসে মাতিয়ে দেন শিনজি। ২৫ মিনিটে সমতা ফেরানোর সহজ সুযোগ নষ্ট করেন কার্লোস তেভেজ।
আক্রমণের ধার বাড়াতে ৩৫ মিনিটেই গঞ্জালো হিগুয়েইনকে নামিয়ে দেন বাতিস্তা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জাপানি রক্ষণেরই জয় হয়েছে। হতাশা নিয়েই ফিরতে হয়েছে রাফায়েল নাদালকে! হ্যাঁ, নাদালই। পাশের শহরেই টেনিস খেলতে যাওয়া নাদাল গিয়েছিলেন বন্ধু মেসির খেলা দেখতে। জাপান ওপেনে নাদাল কালই জয় পেয়েছেন কোয়ার্টার ফাইনালে। মেসির সঙ্গে ডিনার করার কথাও ছিল তাঁর।
ডিনার নাদালের যেমনই লাগুক, মেসির বিস্বাদই লাগার কথা!

প্রিয় মাঠে অস্ট্রেলিয়ার সমতার লড়াই

ইতিহাসে ঠাঁই পাওয়া এক ম্যাচের অংশ হতে পেরে ভালো লাগছে’—মোহালি টেস্ট শেষে মহেন্দ্র সিং ধোনির মতো একই সুর ছিল রিকি পন্টিংয়ের কণ্ঠেও। তবে আসল কথাটা বলেছেন মাইক হাসি। ঐতিহাসিক ম্যাচের অংশ হওয়ার তৃপ্তি আছে, কিন্তু তাতে পরাজয়ের জ্বালাটা যে অনেক বেশি! অস্ট্রেলীয়রা তাই নাকি টগবগ করে ফুটছে। বোর্ডার-গাভাস্কার ট্রফিটা এবারও অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না, কিন্তু একটা সম্মান নিয়ে তো ফিরতে হবে। দ্বিতীয় টেস্ট হারলে যে হোয়াইটওয়াশ হয়ে মানটাও যাবে!
সমতা ফেরানোর লড়াইয়ে অনেক কিছুই অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে। ‘ভারতের মাটিতে টেস্ট খেললে কোন মাঠে খেলতে চাও?’ অস্ট্রেলিয়াকে এই সুযোগ দিলে তারা যে মাঠকে বিনা দ্বিধায় বেছে নেবে, সেখানেই দ্বিতীয় টেস্ট। বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম, যেখানে চার টেস্ট খেলে একটিতেও হারেনি অস্ট্রেলিয়া। ১৯৯৮ সালে প্রথম দুই টেস্টে হারার পর এখানেই পেয়েছিল সান্ত্বনার জয়। ২০০৪ সালে এখানে জিতেই শুরু হয়েছিল ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ের পথে যাত্রা।
এর ঠিক উল্টো অবস্থানে আবার ভারত। দেশের মাটিতে একমাত্র এই মাঠেই ভারতের রেকর্ড স্বাগতিকের মতো নয়, জয়ের চেয়ে হার বেশি! চিন্নাস্বামীতে টেস্ট জয়ের অনুভূতির সঙ্গে পরিচয় আছে এই দলের শুধু শচীন টেন্ডুলকারের। সর্বশেষ সেই জয়ের বয়সও ১৫ বছর হতে চলল! শুধু পরিসংখ্যান নয়, ভারতের বাধা নিয়তিও। মোহালি তাদের শুধু স্মরণীয় এই জয়ই উপহার দেয়নি, কিছু কেড়েও নিয়েছে। মোহালিতে পাওয়া চোট এই টেস্ট খেলতে দিচ্ছে না ওপেনার গৌতম গম্ভীর ও ব্যাটে-বলে মোহালি জয়ের অন্যতম নায়ক ইশান্ত শর্মাকে। জয়দেব উনাদকাট ও অভিনব মুকুন্দকে ডাকা হয়েছে স্কোয়াডে, তবে একাদশে নিশ্চিতভাবেই ঢুকবেন মুরালি বিজয় ও শ্রীশান্ত।
ভারতের মতো না হলেও চোট-দুশ্চিন্তা আছে অস্ট্রেলিয়া শিবিরেও। চোটের কারণে ডগ বলিঞ্জারের মাঠ ছাড়াকে মোহালিতে হারের অন্যতম কারণ বলেছিলেন পন্টিং। বাঁহাতি পেসারকে নিয়ে শঙ্কা আছে এই টেস্টেও। সর্বশেষ দুটো প্র্যাকটিস সেশনের একটিতেও বোলিং করতে দেখা যায়নি তাঁকে। পয়মন্ত ভেন্যুও তাই পন্টিংয়ের কপালের ভাঁজ কমাতে পারছে না। দুশ্চিন্তা আছে আরও। যে নিম্নচাপ বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড দ্বিতীয় ওয়ানডের অপমৃত্যু ঘটাল, সেই নিম্নচাপের প্রভাবেই তিন দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে বেঙ্গালুরুতে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, এই টেস্টের পাঁচ দিনেও যথেষ্ট বাগড়া দিতে পারে বৃষ্টি। সেটা সত্যি হলে, অস্ট্রেলিয়ারই বেশি শঙ্কিত হওয়ার কথা। ম্যাচ জেতার তাগিদ তো তাদেরই বেশি!
অস্ট্রেলিয়ার জন্য আরেকটি দুঃসংবাদ—সুস্থ হয়ে উঠছেন ভিভিএস লক্ষ্মণ। মোহালি টেস্টের পর যাঁকে নিয়ে পন্টিং একটু ঘুরিয়ে প্রশস্তি গেয়েছিলেন লক্ষ্মণের, ‘আশা করি, ওর পিঠের ব্যথা ভালো হবে না, পরের টেস্টে ও খেলতে পারবে না।’ বাবরি মসজিদ রায়ের সঙ্গে মিলিয়ে একটা রসিকতা নাকি চালু হয়ে গেছে ভারতজুড়ে, ‘ভারতজুড়ে প্রশ্ন রামের জন্ম কোথায়, আর অস্ট্রেলিয়া-জুড়ে প্রশ্ন, লক্ষ্মণটার জন্ম হলো কেন!’
কে জানে, ব্যাঙ্গালোর টেস্ট শেষে নতুন কোনো রসিকতা চালু হয়ে যায় কি না!

তবুও আশাবাদী বাতিস্তা

আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনা অধ্যায় শেষ হওয়ার পর সাময়িকভাবে কোচের দায়িত্ব নিয়ে শুরুটা ভালোই করেছিলেন সার্জিও বাতিস্তা। বিশ্বজয়ী স্পেনকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে নতুন আর্জেন্টিনারই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন তিনি। নিজের কোচের চাকরিটা স্থায়ী করার পথেও এগিয়ে গিয়েছিলেন অনেক দূর। কিন্তু একটি ম্যাচই বাতিস্তার সাজানো বাগান কিছুটা হলেও তছনছ করে দিয়েছে। শুক্রবার জাপানের কাছে আর্জেন্টিনার হেরে যাওয়ায় আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন হয়তো কোচের পদে বাতিস্তার নিয়োগ স্থায়ী করা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বসেছে।
বিশ্বকাপের পর আর্জেন্টিনার কোচের পদে নতুন করে নিয়োগ পাওয়ার কথা ছিল কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনার। কিন্তু ফেডারেশনের সঙ্গে টক্করে গিয়ে ম্যারাডোনা অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে তিন মাস আগেই। চিরদিনের আবেগী ম্যারাডোনা আবার গত মাসে নতুন করে আর্জেন্টিনার কোচের পদে ফিরে আসার ইচ্ছাটা জানিয়ে দিয়েছেন বেশ স্পষ্ট করেই। বলেছেন, আর্জেন্টিনার কোচের পদে ফিরতে নিজের জীবন পর্যন্ত দিতে রাজি তিনি।
ম্যারাডোনার ব্যাপারে আর্জেন্টাইনরা চিরদিনই একটু আবেগপ্রবণ। ম্যারাডোনা যখন ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তখন তিনি আবার আর্জেন্টিনার কোচের পদে ফিরলেও ফিরতে পারেন। এমনই একটা সময়ে স্থায়ী হিসেবে কোচপদ প্রত্যাশী বাতিস্তার জন্য জাপানের বিপক্ষে হারটা কি বড় ধরনের আঘাত হয়েই এল?
ব্যাপারটি খোলাসা করেছেন বাতিস্তা নিজেই। বলেছেন, জাপানের কাছে হেরে যাওয়াটা সবকিছু শেষ করে দেয়নি। ব্যাপারটি নিয়ে তিনি যে একদমই মাথা ঘামাচ্ছেন না, তাও আবার বলতে পারেননি তিনি। বাতিস্তা আশা প্রকাশ করেছেন, আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশন শুধু এ একটা হারকেই বড় করে না দেখে তাঁর সার্বিক পারফরমেন্স মূল্যায়ন করবে। একটি ম্যাচে হেরে যাওয়াতেই যে কোচের পদ ছেড়ে দিতে হবে, এমনটা মনে করেন না তিনি।
অন্য কোনো ক্ষেত্র হলে এসব নিয়ে হয়তো আলোচনাই উঠত না। একটা ম্যাচের ব্যর্থতায় আর যা-ই হোক কোচের চাকরি যায় না। কিন্তু ম্যারাডোনা রয়েছেন বলেই হয়তো বাতিস্তার চাকরিটা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

হারুকি মুরাকামির গল্প 'নিখুঁত মেয়েটির সঙ্গে দেখা হওয়ার পর'

এপ্রিলের এক অপরূপ সকালে, টোকিওর কেতাদুরস্ত হারাজুকু এলাকার সংকীর্ণ রাস্তায় আমি মুখোমুখি হেঁটে গেলাম আমার জন্য ১০০% নিখুঁত মেয়েটির সামনে দিয়ে।

সত্যি কথা বলতে কী, সে যে দেখতে খুব সুন্দর তা নয়। ভিড়ের মধ্যে তাকে আলাদা করা যাবে না। এমন বিশেষ চমকদার পোশাকও পরেনি সে। ঘুম ভেঙে এইমাত্র উঠে আসার কারণে অপরিপাটি পেছনের চুল। বয়সও খুব কম নয় — তিরিশের কাছাকাছি হবে। সেভাবে বললে, তাকে ‘মেয়ে’ই বলা চলে না। তবু পঞ্চাশ গজ দূর থেকেও আমি টের পেলাম: সে আমার জন্য ১০০% নিখুঁত মেয়ে। তাকে দেখামাত্র আমার বুকের ভেতরটা ধুকপুক করতে থাকলো, মরুভূমির মতো শুকিয়ে গেল জিহ্বা।

আপনাদের হয়তো নিজ নিজ প্রিয় ধাঁচের মেয়ে আছে — কারো বা হয়তো, ধরা যাক, চিকন হাঁটুর মেয়ে পছন্দ, কারো বড় বড় চোখের, কারো বা কোমনীয় আঙুলের, অথবা আপনি হয়তো তেমন কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই কোনো মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন। আমার নিজেরও কিছু বিশেষ পছন্দ-অপছন্দ আছে। মাঝে মাঝে রেস্টুরেন্টে পাশের টেবিলের কোনো মেয়ের দিকে আমার চোখ আটকে যায় শুধু তার নাকটা আমার ভালো লেগে গেছে বলে।
তবে কেউ জোর গলায় বলতে পারবে না, তার জীবনের ১০০% নিখুঁত মেয়েটি আগে থেকে ঠিক করে রাখা কোনো ধাঁচের। এই যে নাকের ব্যাপারে আমার এতো বাছবিচার, কিন্তু সেই ১০০% নিখুঁত মেয়েটির নাকের আকৃতি আমি মনেই করতে পারছি না — এমনকি তার নাক ছিল কিনা সেটাই আমার মনে নেই। শুধু এটুকু আমি নিশ্চিত মনে করতে পারি যে, সে তেমন একটা সুন্দর ছিল না। অদ্ভুত ব্যাপার।

‘গতকাল রাস্তায় যেতে যেতে ১০০% নিখুঁত মেয়ের দেখা পেয়েছি,’ কোনো এক লোককে বললাম আমি।

লোকটা বলল, ‘তাই নাকি? খুব সুন্দর দেখতে?’

‘না তেমন একটা নয়।’

‘তাহলে তোমার পছন্দের ধাঁচের, তাই না?’

‘জানি না। তার কোনো কিছুই মনে নাই — চোখ বা বুকের আকার।’

‘অদ্ভুত।’

‘হ্যাঁ। অদ্ভুত।’

বিরক্ত হয়ে লোকটা বলে, ‘তা, তুমি কী করলা? কথা বললা? পিছন পিছন গেলা?’

‘নাহ। শুধু রাস্তায় পাশ কাটিয়ে গেলাম।’

মেয়েটা পূর্ব থেকে পশ্চিমে হেঁটে যাচ্ছে, আমি যাচ্ছি পশ্চিম থেকে পূবে। এপ্রিলের অপূর্ব এক সকাল।

ইস্‌, যদি কথা বলতে পারি মেয়েটার সাথে। আধা ঘণ্টা কথা বলতে পারলেই হয়ে যায়: মেয়েটাকে শুধু তার নিজের সম্পর্কে বলতে বলবো, আমার সম্পর্কেও অনেক কিছু বলবো তাকে, আর তাকে বলবো — বলতে পারলে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগবে — ১৯৮১ সালের এপ্রিলের এক অপূর্ব সকালে হারাজুকু এলাকার এক সরু রাস্তায় আমাদের এভাবে মুখোমুখি হেঁটে যাওয়ার ঘটনাটি ঘটনোর পেছনে ভাগ্যের কী যে জটিল এক ষড়যন্ত্র কাজ করছে। এর মধ্যে নিশ্চয়ই বহু গোপন ব্যাপার ঠাসা আছে, শান্তির সময়ে বানানো একটা প্রাচীন ঘড়ির মতো।

রাস্তায় কথা বলার পর আমরা হয়তো কোথাও লাঞ্চ করতে বসবো, হয়তো উডি অ্যালানের কোনো সিনেমা দেখবো, ককটেল খেতে কোনো হোটেল বারে গিয়ে বসবো। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে, ব্যাপারটা হয়তো বিছানা পর্যন্ত গড়াবে।

একের পর এক সম্ভাবনা আমার মনের দরজায় কড়া নাড়ছে।

আমাদের দুজনের মধ্যেকার দূরত্ব এবার পঞ্চাশ গজে কমে এসেছে।

কীভাবে শুরু করবো? কী বলবো?

‘গুড মর্নিং, মিস। আপনার সাথে একটু কথা বলতাম, এই আধা ঘণ্টার মতো। সময় হবে কি?’

হাস্যকর। ইন্সুরেন্সের দালালের মতো শোনাবে।

‘মাপ করবেন, এখানে আশপাশে সারারাত খোলা থাকে এমন ধোপার দোকান আছে নাকি, বলতে পারেন?’

না, এটাও সমান হাস্যকর। প্রথম কথা হলো, আমার হাতে ময়লা কাপড়ের গাট্টি নেই। এরকম একটা বাক্য কার বিশ্বাস হবে?

হয়তো সহজ সত্য কথাটা বলে দিলেই কাজ হয়ে যাবে। ‘গুড মর্নিং, আপনি আমার জন্য ১০০% নিখুঁত মেয়ে।’

না, সে এই কথা বিশ্বাস করবে না। কিংবা বিশ্বাস যদি করেও, আমার সাথে হয়তো কথা বলতে চাইবে না। স্যরি, সে হয়তে বলবে, আপনার জন্য ১০০% নিখুঁত মেয়ে আমি হলে হতেও পারি, কিন্তু আপনি আমার জন্য ১০০% নিখুঁত ছেলে নন। এমনটা হতেই পারে। আর যদি এই পরিস্থিতি হয়, আমি সম্ভবত খানখান হয়ে যাবো। এ আঘাত আমার পক্ষে আর কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। আমার বয়স এখন বত্রিশ, আর বয়স বাড়লে এরকম আঘাত সামলানো দায় হয়ে যায়।

একটা ফুলের দোকানের সামনে আমরা একে অপরকে পেরিয়ে গেলাম। একটা মৃদু, উষ্ণ বাতাসের ঝাপটা আমাকে ছুঁয়ে গেল। রাস্তার এসফল্ট স্যাঁতস্যাতে, আর আমার নাকে এসে লাগলো গোলাপের গন্ধ। তার সাথে কথা বলা আমার পক্ষে সম্ভব না। মেয়েটা একটা সাদা সোয়েটার পরেছে, আর তার ডান হাতে একটা ধবধবে সাদা খাম ধরা, খামে একটা ডাকটিকেট লাগানো। সে তাহলে কাউকে চিঠি লিখেছে, হয়তো সারা রাত জেগে চিঠিটা লিখেছে সে, তার ঘুমঘুম চোখ দেখে এমনটা অনুমান করাই যায়। ওই খামের ভিতর হয়তো তার জীবনের সব গোপন কথা লেখা আছে।

আমি আরো কয়েক কদম এগিয়ে ঘুরে দাঁড়ালাম: মেয়েটা ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে।

* * *
এখন আমি নিশ্চিত করে জানি, ঠিক কোন কথাটা বলা যেতো মেয়েটাকে। সেটা একটা লম্বা বক্তৃতাই হয়ে যেত, এত লম্বা যে, আমি ঠিকঠাক মতো বলতে পারতাম কিনা, কে জানে। আমার মাথায় যেসব বুদ্ধি আসে, কোনোটাই খুব বাস্তববাদী হয় না।

সে যাই হোক। আমি শুরু করতে পারতাম, ‘এক যে ছিল,’ দিয়ে, আর শেষ করতাম,‘বড় করুণ কাহিনি, তাই না?’ দিয়ে।

* * *

এক যে ছিল ছেলে, আর এক যে ছিল মেয়ে। ছেলেটার বয়স ছিল আঠার আর মেয়েটার ষোল। ছেলেটা দেখতে এমন কোনো রাজপুত্তুর ছিল না, আর মেয়েটাও ছিল না তেমন বলার মতো সুন্দর। আর দশজনের মতো তারা ছিল কেবলই সাধারণ নিঃসঙ্গ এক ছেলে আর সাধারণ নিঃসঙ্গ এক মেয়ে। তবে তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতো যে, পৃথিবীতে কোথাও তার জন্য ১০০% নিখুঁত একটা ছেলে আর ১০০% নিখুঁত একটা মেয়ে আছে। হ্যাঁ, তারা বিশ্বাস করতো একদিন অলৌকিক একটা কিছু ঘটবে। আর সেই অলৌকিক ঘটনাটা সত্যি সত্যি ঘটেছিল।

একদিন একটা রাস্তার কোণায় তাদের একে অপরের দেখা হয়ে গেল।

‘অবিশ্বাস্য ঘটনা,’ ছেলেটা বলল। ‘আমি সারা জীবন ধরে তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। হয়তো বিশ্বাস করবে না, কিন্তু তুমি হচ্ছো আমার জন্য ১০০% নিখুঁত মেয়ে।‘

‘আর তুমি,’ মেয়েটি বলল ছেলেটিকে, ‘তুমি হচ্ছো আমার জন্য ১০০% নিখুঁত ছেলে। তোমাকে যে-যে ভাবে কল্পনা করেছিলাম, তুমি ঠিক ঠিক তাই। এ যে একেবারে স্বপ্ন।’

তারা একটা পার্কের বেঞ্চে বসলো, হাতে হাত ধরে। আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা একে অপরকে তাদের নিজ নিজ কাহিনি বললো। এখন তারা আর নিঃসঙ্গ নয়। তারা একে অপরের ১০০% নিখুঁত অপরকে খুঁজে পেয়েছে। ১০০% নিখুঁত অপরকে আবিষ্কার করা এবং নিজে তার দ্বারা আবিষ্কৃত হওয়া কী বিস্ময়করই না এক ব্যাপার। এ এক দৈব ঘটনা, মহাজাগতিক দৈব।

তারা যখন বসে কথা বলছিল, তখন ক্ষীণ এক চিলতে সন্দেহের রেখা তাদের মনে আসন গেড়ে বসলো। এতো সহজে কারো স্বপ্ন সত্যি হয়ে যাওয়া কি ঠিক হচ্ছে?

আর তাই, তাদের দুজনের কথা মধ্যে যখন মুহূর্তের নীরবতা নেমে এসেছে, ছেলেটা মেয়েটাকে বললো, ‘চলো নিজেদের পরীক্ষা করি — শুধু একবারের জন্য। আমরা যদি সত্যি সত্যি একে অন্যের ১০০% নিখুঁত মনের মানুষ হই, তাহলে অন্য কোথাও অন্য কোনোখানে আমাদের আবার দেখা হবে। হবেই। যখন সেটা ঘটবে, আমরা সেবারও জেনে যাবো যে, আমরা একে অপরেরর ১০০% নিখুঁত জুটি, আর তক্ষুণি আমরা বিয়ে করবো। তোমার কী মত?’

‘হ্যাঁ,’ মেয়েটি বললো, ‘ঠিক তাই করা উচিৎ আমাদের।’

আর তারা আলাদা হয়ে গেল। মেয়েটা গেল পুব দিকে, ছেলেটা পশ্চিমে।

নিজেদের ওরকম একটা পরীক্ষার মুখে ঠেলে দেওয়ার তাদের কোনোই প্রয়োজন ছিল না। এরকম একটা পরীক্ষায় নিজেদের দাঁড় করানো তাদের উচিৎই হয়নি, কেননা তারা আসলেই ছিল একে অপরের ১০০% নিখুঁত জুটি, আর তাদের যে দেখা হয়ে গেছে, এটাই ছিল একটা দৈব। কিন্তু এটা জানা তো আর তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না, তাদের যে বয়স কম। ভাগ্যের হিমশীতল, অকরুণ ঢেউ এসে তাদের শূন্যে ছুড়ে দিলো বড় নিষ্ঠুরভাবে।

এক শীতের মৌসুমে ছেলে আর মেয়ে দুজনেরই কঠিন ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগে ধরলো, কয়েক সপ্তাহ ধরে জীবন আর মৃত্যুর দোলাচলে দুলতে দুলতে তারা দুজন তাদের দেখা হওয়ার সব স্মৃতি হারিয়ে ফেলল। যখন তারা জাগলো, তখন তাদের মাথা শিশু ডি এএইচ লরেন্সের পয়সা জমানোর মাটির ব্যাংকটার মতো ফাঁকা হয়ে গেছে।

দুজনেই তারা প্রতিভাবান, শক্ত মনের মানুষ। তাই নিজেদের নিরলস চেষ্টায় তারা আবার সেই জ্ঞান আর অনুভূতি অর্জন করে নিতে পারলো, যার গুণে তারা সমাজের পরিপূর্ণ সদস্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আর ঈশ্বরের কী কৃপা, তারা এমন সুযোগ্য নাগরিক হয়ে উঠলো, যারা জানে এক সাবওয়ে লাইন বদলে কীভাবে আরেক সাবওয়ে লাইনে যেতে হয়, জানে কীভাবে পোস্টাপিসে গিয়ে বিশেষ-ডেলিভারি চিঠি পাঠাতে হয়। আর, কথা হলো, পরবর্তীকালে প্রেমের অভিজ্ঞতাও তাদের হয়েছে, কখনও কখনও ৭৫%, এমনকি কখনও ৮৫% পর্যন্ত প্রেম।

এরপর সময় গড়াতে থাকলো ঝড়ের গতিতে। দেখতে না দেখতে ছেলেটা বত্রিশে পা দিলো, আর মেয়েটা ত্রিশে।

এবং এপ্রিলের এক চমৎকার সকালে দিনের প্রথম কফিটার সন্ধানে ছেলেটা পশ্চিম থেকে পুবে হেঁটে যাচ্ছিল, আর একটা বিশেষ-ডেলিভারি চিঠি পোস্ট করার জন্য ঠিক সেই সময় মেয়েটা হেঁটে যাচ্ছিল পুব থেকে পশ্চিমে। দুজনেই হাঁটছিল টোকিওর হারাজুকু এলাকার একই সংকীর্ণ রাস্তা ধরে। রাস্তাটার ঠিক মাঝখানে তারা একে অপরকে পেরিয়ে গেল। আর তখন তাদের হৃদয়ের কোনো এক কোণায় মুহূর্তের তরে দোলা দিয়ে গেল নিজ নিজ হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির খুবই আবছা এক উদ্ভাস। দুজনেরই বুকের ভেতরটা একটু ধুকপুক করে উঠলো। আর তারা বুঝতে পারলো:

এই হলো আমার জন্য ১০০% নিখুঁত মেয়ে।

এই হলো আমার জন্য ১০০% নিখুঁত ছেলে।

কিন্তু তাদের স্মৃতির সেই আভা বড়ই আবছা। আর তাদের চিন্তায়ও চৌদ্দ বছর আগের সেই টলটলে ভাব ক্ষয়ে গেছে। তাই কোনো কথা না বলে তারা একে অপরকে পেরিয়ে গেল, মিশে গেল ভিড়ের মধ্যে। চিরকালের জন্যে।

খুব করুণ গল্প, তাই না?
=================
জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির
জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির জন্ম কিয়োতো শহরে ১৯৪৯ সালের ১২ জানুয়ারি। ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে টোকিওতে একটি জাজবার খোলেন। বেসবল খেলা দেখার সময় আকস্মিকভাবেই উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা তার মাথায় আসে। প্রথম সেই উপন্যাসটির নাম হিয়ার দ্য উইন্ড সিংস। নোমো সাহিত্য পুরষ্কার লাভ করে বইটি। এরপরে নরওয়েজিয়ান উড লিখে জাপানসহ সারা বিশ্বে হৈ চৈ ফেলে দেন। কাফকা অন দ্য শোওর-এর জন্য পান কাফকা পুরষ্কার।

মুরাকামির উল্লেখ্যযোগ্য অন্য বইগুলো হচ্ছে: দ্য উইন্ড আপ বার্ড ক্রনিকল, আন্ডারগ্রাউন্ড, স্পুটনিক সুইট হার্ট, আফটার দ্য কোয়েক, ব্লাইন্ড উইলো স্লিপিং উইমেন, আফটার ডার্ক, এলিফ্যান্ট ভ্যানিশেস।

bdnews24 এর সৌজন্যে
অনুবাদ: দিলওয়ার হাসান
--------------- 
এই ওয়েব্লগের আরো গল্প....
পিটার নাজারেথ-এর গল্প 'মালদার'    ইতালো কালভিনোর গল্প : ‘জেদ’   হারুকি মুরাকামির গল্প 'উড়োজাহাজ'  হার্টা ম্যুলার-এর গল্প 'আমার পরিবার'  হার্টা ম্যুলার-এর গল্প 'অন্ত্যেষ্টির বয়ান'  আর. কে. নারায়ণ-এর গল্প 'ঈশ্বরণ'  স্টিভেন মিলহসার-এর গল্প 'বহির্জাগতিক আক্রমণ'  আর. কে. নারায়ণ-এর গল্প 'মাসে পঁয়তাল্লিশ টাকা'  এনগুগি ওয়া থিওংগ্’ও-এর গল্প ‘ফেরা’  আর. কে. নারায়ণ-এর গল্প 'বাবার সাহায্য'  মানুয়েল মুহিকা লাইনেস-এর গল্প ‘গুরুত্ব’

এই গল্পটি পড়া হয়েছে...
free counters

পিটার নাজারেথ-এর গল্প 'মালদার' অনুবাদঃ মাসুদ খান

রকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিল বাবু মান্না লেইতাও। সেটা সেই আমলের কথা, যখন গোয়া-র বাসিন্দাদের কারুরই কোনো গাড়ি ছিল না। ছাতাটাকে ছড়ির মতো করে ধরে শহরটাতে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত তাকে, আর সেই কালে তার পক্ষে সেটাই ছিল মানানসই। কিন্তু দশকের পর দশক গুজরে যাওয়ার পর, এখন, যখন গোয়াবাসীরা সাইকেল-যুগ পার করে এসে পা দিয়েছে গাড়ির জমানায়, যখন তারা গাড়ির মালিক হওয়ার মতো যথেষ্ট স্বচ্ছল, তাজ্জব ব্যাপার, এই যুগে এসে কিনা তাকে দেখা যাচ্ছে ভেসে বেড়াতে নেড়িকুত্তার মতো, ফুটপাতে, অলিতে গলিতে। ‘কে এই বেখাপ্পামতন লোকটা?’ — হঠাৎ কারুর মধ্যে এমতো হুশ না হওয়া অব্দি যেন তার হুশের কিনার ধরে চুপিচুপি চলেছে মানুষটা।

ইতালো কালভিনোর গল্প : ‘জেদ’

ওপর দিকে তাকিয়ে থেকে ফুটপাথ ডিঙিয়ে আমি কয়েক পা পিছিয়ে এলাম। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাত দুটোকে মুখের কাছে চোঙার মতো ধরে ভবনের সবচেয়ে উঁচু তলার বাসাটাকে লক্ষ্য করে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘টেরেসা!’

চাঁদের আলোয় শিউরে উঠল আমার ছায়া, সরে এলো পায়ের কাছে।

পাশ দিয়ে হেঁটে গেল কেউ একজন। আমি আবার চেঁচালাম : ‘টেরেসা!’

লোকটা আমার কাছে এসে বলল,‘আপনি আরো জোরসে না ডাকলে ভদ্রমহিলা তো আপনাকে শুনতে পাবে না রে ভাই। আসুন আমরা দুজনে মিলে ট্রাই করি। তিন পর্যন্ত গুণছি, তিন বলামাত্র আমরা দুজন একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠবো।’ বলেই লোকটা গুণতে শুরু করে দিলো : ‘এক, দুই, তিন।’ আমরা দুজনেই গলা ছুড়লাম, ‘টেরে…সা…!’

থিয়েটার বা ক্যাফে থেকে ফিরছিল ছেলেছোকরাদের একটা দল। আমাদের এই চেঁচামেচি তাদের চোখে পড়ল। তারা বলল,‘আসেন ভাই, আপনাদের সাথে আমরাও গলা মেলাই।’ মাঝরাস্তায় তারাও আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে গেল। তাদের মধ্যে প্রথমজন এক থেকে তিন গুণলো আর তখন সবাই একযোগে চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘টে..রে…সা…!’

আরো কেউ একজন হেঁটে যাচ্ছিল। সেও আমাদের সাথে যোগ দিলো। মিনিট পনেরোর মধ্যে আমরা জনাবিশেক লোক জমে গেলাম। থেকে থেকেই নতুন কেউ না কেউ যোগ দিচ্ছে।

আগে-পিছে না হয়ে সবার একসাথে চেঁচিয়ে উঠতে পারা কঠিন হয়ে উঠছে। প্রত্যেকবার কেউ না কেউ তিন গোনার আগেই চেঁচিয়ে উঠছে বা সবার চেঁচানো শেষ হয়ে গেলেও গলা ধরে রাখছে। তবে এতোকিছুর পরও শেষ পর্যন্ত আওয়াজটা খুব একটা খারাপ হচ্ছিলো না। আমরা একমত হলাম যে, ‘টে’ ধ্বনিটা একটু নিচু তবে লম্বা লয়ে উচ্চারণ করতে হবে, ‘রে’ ধ্বনিটা হবে উঁচু এবং দীর্ঘ লয়ের, আবার ‘সা’ হবে নিচু এবং সংক্ষিপ্ত। এতে ফল মিললো। আওয়াজটা জোরালো হচ্ছে। কেউ একজন সামান্য হেরফের করে ফেললে একটু গোলমাল বেঁধে যাচ্ছে, এই যা।

আমরা ভুলচুক এভাবে যখন প্রায় কমিয়ে এনে ফেলেছি, তখন কেউ একজন একটা কথা বলে উঠলো। ব্রণ ওঠা লোকের গলা যেমন হয়, লোকটার গলার স্বর সেইরকম। লোকটা বলল, ‘আচ্ছা, আপনি নিশ্চিত তো, ভদ্রমহিলা বাসাতেই আছেন?’

‘না,’ আমি বললাম।

‘তাহলে তো সমস্যা গুরুতর,’ আরেকজন বলল। ‘আপনি ঘরের চাবি নিতে ভুলে গেছেন, তাই না?’

‘আমার চাবি আমার সঙ্গেই আছে,’ আমি জবাব দিলাম।

‘তাহলে সোজা উপরে উঠে যাচ্ছেন না কেন রে ভাই?’ লোকজন জানতে চাইলো।

‘এ বাসায় আমি থাকি না,’ আমার জবাব। ‘আমার বাসা শহরের আরেক প্রান্তে।’

‘আচ্ছা, সেক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন না করে পারছি না,’ খনখনে গলার লোকটা বলল। ‘এখানে তাহলে থাকেটা কে?’

‘আমি জানি না আসলে,’ আমি বললাম।

এ কথা শুনে লোকজনের মধ্যে বেশ খানিকটা হতাশা দেখা দিলো।

‘সেক্ষেত্রে আপনি কি একটু ব্যাখ্যা করবেন মশাই,’ দেঁতো গলার এক লোক বলে উঠলো, ‘এখানে নিচে দাঁড়িয়ে আপনি টেরেসা টেরেসা বলে ডাকাডাকি করছেন কেন?’

‘অন্য কোনো নামেও আমরা ডাকতে পারি, কিংবা এই নামেই ডাকতে পারি অন্য কোথাও গিয়ে : আমার কোনো আপত্তি নেই,’ আমি বললাম।

লোকজন এবার বড়ো বিরক্ত হলো।

‘ভাওতাবাজি করছেন না তো ভাই!’ কর্কশ কণ্ঠের লোকটা সন্দিহান গলায় জানতে চাইলো।

‘কী যে বলেন!’ আমি কাঁচুমাচু মুখে বললাম। অন্যদের দিকে তাকালাম সমর্থনের আশায়। কেউ কিছু বললো না।

ভদ্রলোক গোছের কেউ একজন বলে উঠলো, ‘আচ্ছা, শেষবারের মতো একবার টেরেসা বলে ডাক দিয়ে দেখি না কেন, তারপর যার যার রাস্তা মাপি।’

কাজেই আরেকবার হাঁক ছাড়লাম আমরা। ‘এক দুই তিন টেরেসা!’ এবার আওয়াজ তেমন জোরালো হলো না। তারপর সবাই যে যার বাড়ির উদ্দেশে পা বাড়ালো, কেউ এদিকে, তো কেউ ওদিকে।

আমিও হাঁটা দিলাম। রাস্তায় মোড়ে পৌঁছেছি, কি পৌঁছিনি, মনে হলো শুনতে পেলাম, একটা কণ্ঠস্বর তখনও ডাকছে : ‘টে..রে..সা!’

কেউ একজন নিশ্চয়ই থেকে গেছে। সে ডেকে চলেছে। খুব একগুয়ে কেউ একজন।
================
ইতালো কালভিনোর গল্পগ্রন্থ Numbers in the Dark থেকে
ইতালো কালভিনো (১৯২৩-১৯৮৫)

এই ওয়েব্লগের আরো গল্প ....
হারুকি মুরাকামির গল্প 'উড়োজাহাজ'  হার্টা ম্যুলার-এর গল্প 'আমার পরিবার'  হার্টা ম্যুলার-এর গল্প 'অন্ত্যেষ্টির বয়ান'  আর. কে. নারায়ণ-এর গল্প 'ঈশ্বরণ'  স্টিভেন মিলহসার-এর গল্প 'বহির্জাগতিক আক্রমণ'  আর. কে. নারায়ণ-এর গল্প 'মাসে পঁয়তাল্লিশ টাকা'  এনগুগি ওয়া থিওংগ্’ও-এর গল্প ‘ফেরা’  আর. কে. নারায়ণ-এর গল্প 'বাবার সাহায্য'  মানুয়েল মুহিকা লাইনেস-এর গল্প ‘গুরুত্ব’


bdnews24 এর সৌজন্যে
অনুবাদ: শিবব্রত বর্মন

এই গল্পটি পড়া হয়েছে....
free counters