Sunday, February 22, 2026

ট্রাম্পের চাপের মধ্যে ভেনেজুয়েলা, নতুন প্রেসিডেন্টের কৌশল কি

প্রকাশ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ জানুয়ারিতে কারাকাসের আকাশে নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের আলোকিত প্রোফাইল দেখানো হয়। সরকারের আয়োজন করা ড্রোন শোতে শত শত ড্রোনের স্থির আলো তাদের চিত্রকে মেঘের সামনে স্থির রাখে। তারপর পুনর্বিন্যস্ত হয়ে পুনরায় তাদের প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানায়: ‘জনতা তাদের ফেরার প্রত্যাশায়’।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঝটিকা অভিযানের পর ৩রা জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে দেশ থেকে তুলে নিয়ে যায় প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। ভেনেজুয়েলা তখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং এখনকার কার্যনির্বাহী লিডার ডেলসি রদ্রিগেজ নতুন করে মাদুরো ও ফ্লোরেসের প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানালেও, এমন কোনো চিহ্ন নেই যে তাদেরকে ফেরত দেয়া হবে। মাদুরো ও তার স্ত্রী এখন নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে বিচার অপেক্ষায় রয়েছেন। ড্রাগ ট্রাফিকিংসহ নানা অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তারপরও মাদুরোর অনুগত রদ্রিগেজ একটি জটিল ভারসাম্য বজায় রাখতে বাধ্য: তার সমাজতান্ত্রিক ভিত্তিকে ধরে রাখতে মাদুরোকে সমর্থন করে থাকে এবং একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মধ্যে নীতি পরিবর্তন করে, যেহেতু না মানলে তার ভাগ্যও মাদুরোর মতো হতে পারে।

চাতাম হাউস থিঙ্ক ট্যাঙ্কের ল্যাটিন আমেরিকা সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ক্রিস্টোফার সাবাতিনি বলেন, ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ভেনেজুয়েলা এখন মার্কিন প্রোটেক্টরেট। তাই তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের ইচ্ছায় কাজ করছেন। তার বিরুদ্ধেও তদন্ত হচ্ছে। এ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত হননি, ইন্ডিক্টমেন্ট বা বাউন্টি নেই। তবে হুমকি সবসময় আছেই। হুমকি হলো, ‘আমাদের কাছে আপনার বিরুদ্ধে প্রমাণ আছে।’

রদ্রিগেজ এখন কূটনৈতিক একটি তীব্র ভারসাম্য ধরে রেখেছেন। তার প্রথম বক্তব্যে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট মাদুরো ইতিমধ্যেই এরকম আক্রমণের সতর্কতা দিয়েছিলেন। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও আগ্রহ আছে। তবে পরে ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, কারাকাস ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে এবং তিনি সেই অর্থ পরিচালনা করবেন।

১৬ জানুয়ারি জাতীয় পরিষদে তার প্রথম ভাষণে রদ্রিগেজ ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সম্প্রসারণের’ সমালোচনা করেন। একই দিনে তিনি সিআইএ ডিরেক্টর জন রাটক্লিফের সঙ্গে কারাকাসে সাক্ষাৎ করেন। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক বিশ্লেষক কারমেন বিয়াট্রিজ ফার্নান্দেজ বলেন, রদ্রিগেজের বৈধতা মার্কিন সামরিক শক্তির উপর নির্ভর করছে। এটি টিকে থাকবে যদি ট্রাম্প চায়। তিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবেন না। একটি বড় প্রশ্ন হলো, রদ্রিগেজ কতক্ষণ ভেনেজুয়েলার বামপন্থী এবং মার্কিন প্রশাসন উভয়ের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে পারবে? আর যদি তাকে বেছে নিতে হয়, কতটা কঠিন হবে তা, নাকি একপক্ষ সুস্পষ্টভাবে ক্ষমতাশালী?

ট্রাম্পের চাপের মধ্যে ভেনেজুয়েলা, নতুন প্রেসিডেন্টের কৌশল কি

গ্রিনল্যান্ডে ভাসমান হাসপাতাল পাঠানোর ঘোষণা ট্রাম্পের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল শনিবার বলেছেন, তিনি গ্রিনল্যান্ডে একটি হাসপাতাল জাহাজ পাঠানোর বিষয়ে লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রির সঙ্গে মিলে কাজ করছেন।

গ্রিনল্যান্ড হলো ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে এ অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার আগ্রহ দেখিয়ে আসছেন।

গতকাল রিপাবলিকান গভর্নরদের সম্মানে হোয়াইট হাউসে আয়োজিত নৈশভোজের ঠিক আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি গ্রিনল্যান্ডে হাসপাতাল জাহাজ পাঠানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।

ট্রাম্প লিখেছেন, ‘লুইজিয়ানার অসাধারণ গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রির সঙ্গে কাজ করে আমরা গ্রিনল্যান্ডে একটি বড় হাসপাতাল জাহাজ পাঠাতে যাচ্ছি, যেন সেখানে অসুস্থ এবং যথাযথ সেবা না পাওয়া অনেক মানুষের চিকিৎসা করা যায়। জাহাজটি রওনা দিয়েছে!’

নৈশভোজে ল্যান্ড্রির পাশেই ট্রাম্পকে বসতে দেখা গেছে। তাঁরা দুজন গল্প করছিলেন।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের পোস্টের বিষয়ে হোয়াইট হাউস বা ল্যান্ড্রির দপ্তর কোনো প্রশ্নের জবাব দেয়নি। জাহাজটি ডেনমার্ক বা গ্রিনল্যান্ডের অনুরোধে পাঠানো হচ্ছে কি না এবং কারা অসুস্থ, সে বিষয়েও কিছু জানানো হয়নি। যুদ্ধবিষয়ক দপ্তরও তাৎক্ষণিকভাবে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি।

গত সপ্তাহে ডেনমার্কের রাজা ফ্রেডরিক এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো গ্রিনল্যান্ড সফর করেন। দ্বীপটি কিনে নেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের আগ্রহের প্রেক্ষাপটে এ সফরকে গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে ডেনমার্ক সরকারের ঐক্য প্রদর্শনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কয়েক মাসের উত্তেজনার পর সমস্যার সমাধানে গত মাসের শেষ দিকে গ্রিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়।

ডেনমার্কের জয়েন্ট আর্কটিক কমান্ড বলেছে, গতকাল ট্রাম্পের ওই পোস্টের কয়েক ঘণ্টা আগে গ্রিনল্যান্ডের জলসীমায় একটি মার্কিন সাবমেরিনের এক নাবিকের জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছিল। পরে তারা ওই নাবিককে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়েছে।

তবে এ ঘটনায় জেফ ল্যান্ড্রির কী ভূমিকা ছিল বা ট্রাম্পের পোস্টটির সঙ্গে ওই উদ্ধার অভিযানের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।

মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে দুটি হাসপাতাল জাহাজ আছে। এগুলো হলো ইউএসএনএস মার্সি ও ইউএসএনএস কমফোর্ট। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই লুইজিয়ানায় অবস্থান করে না।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-22%2Fwhcqizzl%2FHospital-Ship.jpg?rect=0%2C0%2C1121%2C747&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
রিপাবলিকান গভর্নরদের সম্মানে হোয়াইট হাউসে আয়োজিত নৈশভোজে বক্তৃতা দিচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

ইরানে হামলা চালানো নিয়ে কেন দোলাচলে ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে চূড়ান্ত সীমা (রেড লাইন) নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন এক মাসের বেশি সময় আগে। তখন ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছিল। সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো হলে ইরানে ‘কঠিন আঘাত’ হানা হবে। বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে তিনি এ-ও বলেছিলেন যে ‘সাহায্য আসছে’।

তবে প্রতিশ্রুতিমতো আর এগোননি ট্রাম্প। গত জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তিনি বলেন, ইরানে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে। যদিও তখনো বিক্ষোভকারীর ওপর দমনপীড়ন চলছিল বলে সংবাদমাধ্যমে খবর আসছিল। এর পর থেকে ইরানের বিক্ষোভ নিয়ে চুপ ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি বরং এখন সরব হয়েছেন—ইরান কেন পরমাণু অস্ত্র বানাতে পারবে না, তা নিয়ে। বারবার হুমকি দিচ্ছেন—বলছেন, তেহরান চুক্তি না করলে ‘খারাপ পরিণতি’ ঘটবে।

পরিস্থিতি অবশেষে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই একটি সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। সেই সিদ্ধান্তটি কী হতে পারে? ট্রাম্প হয়তো যে চূড়ান্ত সীমার কথা বলে আসছেন, তা কার্যকর করবেন। অথবা এমন কিছু করবেন, যা রাজনৈতিকভাবে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে ইরান হামলা চালালে রাজনৈতিকভাবে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিই তৈরি হবে।

হামলার বিষয়টি কেন সামনে এল? সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদের বৈঠকের মাত্র দুই দিন পর গত বৃহস্পতিবার তেহরানকে একটি সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন ট্রাম্প। সেদিন গাজা ‘শান্তি পর্যদের’ (বোর্ড অব পিস) বৈঠকে তিনি বলেছেন, ইরান যদি ১০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি না করে, তাহলে দেশটিতে হামলা চালাবে মার্কিন বাহিনী। সিএনএনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহেই ইরানে হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র।

পরে ওই সময়সীমা নিয়ে এয়ার ফোর্স ওয়ানে (মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী বিমান) সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় ১০ থেকে ১৫ দিনই যথেষ্ট সময়, এটাই মোটামুটি সর্বোচ্চ সময়।’

হামলার বিপক্ষে মার্কিনরা

গত বছরের জুনে ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ক্যারিবীয় সাগরে মাদক পাচারকারী তকমা দিয়ে একের পর এক নৌযানে হামলা চালিয়েছে দেশটি। এতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া গত মাসে ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায় মার্কিন বাহিনী। এই পদক্ষেপগুলো মার্কিনরা এখন পছন্দ করছে না।

গত মাসে করা বিভিন্ন জরিপেই তা দেখা গেছে। যেমন একটি জরিপ চালিয়েছিল ইপসস। তাতে দেখা গেছে, ইরানের বিক্ষোভকারীদের ওপর দমনপীড়নের জবাবে দেশটিতে হামলা চালানোর বিপক্ষে ছিলেন ৪২ শতাংশ মানুষ। পক্ষে ছিলেন মাত্র ১৬ শতাংশ। একই বিষয় নিয়ে সিবিএস নিউজ-ইউগভের জরিপে হামলার বিপক্ষে ছিলেন ৬৭ শতাংশ মানুষ। পক্ষে ছিলেন ৩৩ শতাংশ।

গত মাসেই কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির জরিপে নিবন্ধিত মার্কিন ভোটারদের ৭০ শতাংশ মত দিয়েছিলেন যে ইরানে বিক্ষোভকারীরা নিহত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের এতে জড়ানো উচিত হবে না। ওই জরিপে বেশির ভাগ রিপাবলিকানও ইরানে হামলার বিরোধিতা করেছিলেন। অথচ গত বছরের জুনে ইরানে হামলার পরপরই কুইনিপিয়াকের করা একটি জরিপে হামলার সমর্থন দিয়েছিলেন ৪২ শতাংশ ভোটার।

পাল্টা হামলার শঙ্কা

সিবিএস ও কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির গত জুনের জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জনের ৮ জন অংশগ্রহণকারীই অন্তত কিছুটা হলেও বড় পরিসরে যুদ্ধ বেধে যাওয়ার শঙ্কায় ছিলেন। এমনকি প্রতি ১০ জনের ৬ জন রিপাবলিকানও সেটিই মনে করতেন। আর সিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, ৭১ শতাংশ মার্কিন মনে করতেন যে ইরানে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিশোধমূলক হামলা চালাবে তেহরান।

এসব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, গত বছরে ইরান বা চলতি বছরে ভেনেজুয়েলায় হামলা নিয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না মার্কিনরা। হামলাগুলোর উদ্দেশ্য কী—সে ব্যাপারেও নিশ্চিত ছিলেন না। এসব হামলার ভবিষ্যৎ ফল কী হতে পারে, তা নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। তবে হামলাগুলো যেহেতু স্বল্প সময়ের জন্য হয়েছিল, তাই তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

আগামী কয়েক দিনের মধ্যে জানা যেতে পারে ইরান নিয়ে নিজের চূড়ান্ত সীমা কার্যকর করার বিষয়টিতে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন ট্রাম্প। তবে এখন যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো নিজেকে একটি কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড় করিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। আর এটি এমন সময়ে ঘটছে, যখন তাঁর জনপ্রিয়তা কমেই চলেছে।

আরব সাগরে মার্কিন রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন
আরব সাগরে মার্কিন রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। ছবি: রয়টার্স

জার্মানি কেন ‘আরেকটি ইসরায়েল’ হয়ে উঠছে by জুর্গেন ম্যাকার্ট

জার্মানির রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক অবস্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে গাজায় চলমান গণহত্যার ক্ষেত্রে সীমাহীন নিষ্ঠুরতার সঙ্গে জার্মানির সম্পৃক্ততা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে চলমান অবরোধের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থনের কারণে।

একইসাথে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের আগ্রাসী যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান দেশটির রাজনৈতিক সততাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ও নিজ দেশের নাগরিকদের প্রতিও জার্মানির সরকারের দায়বদ্ধতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

ইসরায়েলি শাসনের সহযোগী হয়ে ওঠার পর থেকে জার্মানির শীর্ষ নেতৃত্ব ধীরে ধীরে একই ধরনের রাজনৈতিক ভাষা ও কৌশল গ্রহণ করেছে। তাঁদের নীতিতে শিষ্টাচারের অভাব স্পষ্ট। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থেকেও তারা ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে।

২০২৪ সালের গ্রীষ্মে জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক ও সাবেক চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস যোদ্ধাদের হাতে ইসরায়েলি নারীদের ধর্ষণের একটি ভিডিও তাঁরা দেখেছেন; কিন্তু এমন কোনো ভিডিও কখনো প্রকাশিত হয়নি। এই বক্তব্য জার্মানির জনগণকে বিভ্রান্ত করার শামিল। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, এর চেয়ে গুরুতর ঘটনা আর কী হতে পারে! কিন্তু সময় দেখাল, রাজনৈতিক শিষ্টাচারের অবক্ষয় কতটা গভীর হয়েছে।

গত সপ্তাহে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল এমন একটি পদক্ষেপ পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক করে তোলে। দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার ও নাগরিক সমাজের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যে কুৎসা রটনার কৌশল চালু আছে, তিনি সেটিকেই অনুসরণ করেন।

তাঁর ফরাসি সহকর্মীর সঙ্গে মিলে তিনি জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রানচেস্কা আলবানেজের পদত্যাগ দাবি করেন। অভিযোগ আছে, আল–জাজিরা ফোরামে আলবানেজ নাকি ইসরায়েলকে মানবতার শত্রু বলেছেন। ফরাসি রাজনীতিক ক্যারোলিন ইয়াদান এ বক্তব্যকে ইহুদিবিদ্বেষী বলে আখ্যা দেন।

কিন্তু আলবানেজ আসলে যা বলেছিলেন, তা ভিন্ন। তিনি বলেছিলেন, যাঁদের হাতে বিপুল অর্থ, অ্যালগরিদম বা অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণে নেই, মানবজাতি হিসেবে তাঁদের জন্য একটি অভিন্ন শত্রু রয়েছে। বক্তব্যটি সাধারণ মানবিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া হয়েছিল। এটিকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়।

ওয়াডেফুল ও তাঁর মন্ত্রণালয় সূত্র যাচাইয়ের প্রয়োজনও মনে করেননি। আরেকজন ইউরোপীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ তুলেছেন শুনেই তিনি সেই সুরে সুর মিলিয়েছেন। এ ঘটনাকে সাম্প্রতিক জার্মান পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম উদ্বেগজনক অধ্যায় বলা যায়।

এরপর আরও একটি ঘটনা ঘটে। জার্মানির পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট জুলিয়া ক্লোকনার ফেব্রুয়ারি মাসে ইসরায়েল সফর করেন। সফর শেষে তিনি জার্মানির সরকারি টেলিভিশন এআরডিতে বক্তব্য দেন। তিনি গাজার সীমান্তবর্তী ইয়েলো লাইনে দাঁড়িয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রচারণার পুনরাবৃত্তি করেন। তাঁর বক্তব্যে গাজায় চলমান ধ্বংসযজ্ঞের কোনো সমালোচনা ছিল না।

জুলিয়া ক্লোকনার বলেন, কিছু বসতি ও তাঁবু ধ্বংস হয়েছে, এ ছাড়া কিছু না। যে অংশটি তিনি দেখেছেন, তা অন্য অংশের মতো এতটা বিধ্বস্ত নয়। কারণ, অনেক জিম্মিকে সেখানে রাখা হয়েছিল। এই বক্তব্য প্রশ্নের জন্ম দেয়।

যদি ইসরায়েল জানত জিম্মিরা কোথায় আছে, তবে তাদের উদ্ধারের বদলে চারপাশে ব্যাপক বোমাবর্ষণ কেন হলো?

ক্লোকনার আরও বলেন, সেখানে এক বিশাল ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক রয়েছে, যেন আরেকটি গাজা; কিন্তু তিনি সীমান্তে দাঁড়িয়ে কীভাবে এই সুড়ঙ্গ দেখলেন? তিনি কি কোনো সুড়ঙ্গে গিয়েছিলেন? কোনো ছবি বা ভিডিও কি তিনি দেখাতে পেরেছেন? এমন কোনো প্রমাণ সামনে আসেনি। এরপর তিনি আন্তর্জাতিক রেডক্রসের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন।

তাঁর দাবি, ইয়েলো লাইন বা হলুদ রেখা স্থাপনের পর গুলি ও লড়াই বন্ধ হয়েছে। খাদ্য ও ওষুধসহ সহায়তা বেড়েছে। তবে দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্যের নিয়মের কারণে চিকিৎসা সরঞ্জাম ধীরে পৌঁছাচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, হামাস তাদের লোকজনকে সামনে পাঠিয়ে কষ্ট দিচ্ছে।

এই বক্তব্যও বিতর্কের জন্ম দেয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা জানিয়েছে, গাজায় সহায়তা প্রবেশে নানা বাধা রয়েছে। খাদ্য, পানি, তাঁবু ও ওষুধ সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।

ক্লোকনারের বক্তব্যে এসব উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা যায়নি। সমালোচকেরা বলছেন, জার্মান নেতৃত্ব ইসরায়েলের বক্তব্যকে যাচাই ছাড়াই গ্রহণ করছে। গাজার হাসপাতাল ধ্বংসের পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী যে ব্যাখ্যা দিয়েছিল, তাতেও অনেকে অসংগতি খুঁজে পেয়েছিলেন। তবু জার্মানির শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে খুব কমই প্রশ্ন তুলেছেন।

এই ধারাবাহিক অবস্থান জার্মান নীতিকে বিতর্কিত করেছে। আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অঙ্গীকার ও মানবাধিকারের প্রশ্নে তাদের ভূমিকা এখন সমালোচনার মুখে। দেশে ও দেশের বাইরে অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক সততা ও স্বাধীন অবস্থান ধরে রাখার বদলে জার্মান নেতৃত্ব একতরফা অবস্থান নিচ্ছে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, জার্মানি কি তার ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা পালনের নামে অন্যায়ের প্রতি নীরব সমর্থন দিচ্ছে? সমালোচকদের মতে, দেশটি যেন নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির বদলে অন্যের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠছে। এতে জার্মান গণতন্ত্র ও নৈতিক অবস্থানের ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতি জার্মান রাজনীতির জন্য একটি বড় পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড, তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব এবং নাগরিকদের প্রতি জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে এই সংকট আরও গভীর হবে। জার্মান নেতৃত্বের সামনে এখন মূল প্রশ্ন, তারা কি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেবে, নাকি বিতর্কিত নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে।

* জুর্গেন ম্যাকার্ট, জার্মানির পটসডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক
- মিডিল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-17%2F0pxqxy27%2FU2GM54IBGJL6JKEAAUPOJCUHQQ.jpg?rect=0%2C0%2C640%2C427&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
জার্মানি ও ইসরায়েলের পতাকা। ছবি : রয়টার্স

বিজেপির স্পিকারকে ‘অপমানের’ প্রতিশোধ নিতে বাড়িতে ঢুকে রাহুলকে হত্যার হুমকি তরুণের

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ ভারতের লোকসভার বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধীকে ‘বাড়িতে ঢুকে’ গুলি করে খুন করার হুমকি দিয়েছেন রাজস্থান রাজ্যের এক তরুণ। এ ঘটনায় মরুরাজ্য রাজস্থানের কোটা জেলা থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার ওই তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ভারতের সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভার স্পিকার বিজেপি নেতা ওম বিড়লা এই কোটা আসন থেকেই নির্বাচিত হয়েছেন। রাহুলকে হত্যার হুমকি দিয়ে গ্রেপ্তার হওয়া তরুণের নাম রাজ সিং।

সম্প্রতি এক ভিডিওতে রাজ সিং কংগ্রেস ও লোকসভার বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধীকে খুন করার হুমকি দেন। ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর কংগ্রেসের অভিযোগের ভিত্তিতে কোটা পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে।

সংসদের বাজেট অধিবেশনে কংগ্রেসসহ বিরোধীরা ওম বিড়লার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পেশ করেছেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ জ্ঞাপনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় রাহুল নানাভাবে সরকারকে আক্রমণ করেন।

ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নরবনের লেখা এক বইয়ের কিছু উদ্ধৃতি দিতে গেলে সরকারপক্ষ তার তীব্র বিরোধিতা করে। স্পিকার ওম বিড়লাও রাহুলসহ বিরোধীদের বাধা দেন। প্রধানমন্ত্রীর জবাবি ভাষণ ছাড়াই স্পিকার ধন্যবাদ জ্ঞাপনের প্রস্তাব পাস করিয়ে দেন।

২০২০ সালে লাদাখে চীন–ভারত সংঘাত নিয়ে জেনারেল নরবনে তাঁর বইয়ে যে স্মৃতিচারণা করেছেন, বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল সেটাই। নরবনের দাবি, চীনের হামলা মোকাবিলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে না নিয়ে তাঁর ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাতে তিনি অসহায় বোধ করেছিলেন।

সাবেক সেনাপ্রধানের এই স্মৃতিচারণা এক ইংরেজি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল। রাহুল সেখান থেকেই উদ্ধৃতি দিতে গেলে বাধা পান।

সে ঘটনার পর সংসদ অচল হয়ে যায়। স্পিকারের অফিসে ডাকা মিটিংয়ে ২৫ জন বিরোধী সদস্য স্পিকারকে অসম্মান করেন বলেও সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। রাহুলের সংসদ সদস্য পদ বাতিল করার দাবি জানিয়ে বিজেপির পক্ষ থেকে এক প্রস্তাবও পেশ করা হয়।

সেই বিতর্কের মধ্যেই ওম বিড়লার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের নোটিশ জমা পড়ে। স্পিকারও জানিয়ে দেন, অনাস্থা প্রস্তাবের মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত তিনি লোকসভার পরিচালকের আসনে বসবেন না।

কোটায় গ্রেপ্তার তরুণ এরই প্রতিবাদ জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেন। তাতে উত্তেজিতভাবে তাঁকে বলতে শোনা যায়, বাজেট অধিবেশনে স্পিকারকে যে ২৫ বিরোধী সদস্য অসম্মান ও অপমান করেছিলেন, তাঁর বিশ্বাস, রাহুলের নির্দেশেই তা হয়েছে।

গ্রেপ্তার রাজ সিংকে বলতে শোনা যায়, রাহুল ও ওই সংসদ সদস্যরা ওম বিড়লার কাছে ক্ষমা না চাইলে তিনি রাহুলের বাড়িতে ঢুকে তাঁকে গুলি করে মারবেন।

ভিডিওতে ওই তরুণ নিজেকে ‘করণি সেনা’র কোটা জেলার মুখপাত্র বলে দাবি করেছেন। তিনি যেখানে বসে ওই ভিডিও তৈরি করেন, সেখানে তাঁর পেছনের দেয়ালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্পিকার ওম বিড়লার ছবি টাঙানো ছিল। রাজ সিংয়ের গলায় ছিল গেরুয়া উত্তরীয়।

ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে গেলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিজেপি অথবা করণি সেনার পক্ষ থেকে অবশ্য তা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে দেখা যায়নি। বৃহস্পতিবার কোটা পুলিশ রাজ সিংকে গ্রেপ্তার করে।

কোটা পুলিশের কর্মকর্তা তেজস্বিনী গৌতম পিটিআইকে বলেন, কোটার কংগ্রেস নেতাদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর রাজ সিংকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, কোটার করণি সেনা জানিয়েছে, গ্রেপ্তার রাজ সিং তাদের মুখপাত্র নন। তাদের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্কই নেই। ‘করণি সেনা’ রাজস্থানের উগ্র রাজপুতদের একটি সংগঠন। রাজপুত সম্প্রদায়ের অধিকার, সংস্কৃতি ও মর্যাদা রক্ষায় তারা লড়াই করে।

স্থানীয় বিজেপি নেতারাও জানিয়েছেন, রাজ সিংয়ের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই।

বিজেপি ও করণি সেনা দায়িত্ব অস্বীকার করলেও শীর্ষ কংগ্রেস নেতা কে বেণুগোপাল এক বিবৃতিতে বলেছেন, স্বঘোষিত ‘মোদিভক্তরা’ ঘৃণা ছড়ানোর পাশাপাশি প্রকাশ্যে রাহুল গান্ধীকে খুনের হুমকি দিতে শুরু করেছেন। অথচ শাসক দল নির্বিকার। কারও মুখে রা শব্দটি নেই। জাতীয় স্তরে বিজেপি ঘৃণা ও প্রতিহিংসার যে রাজনীতি করে চলেছে, এসব ঘটনা তারই ফল। সংসদের অভ্যন্তরে ও বাইরে এই জিনিসই চলছে।

এ প্রসঙ্গে কংগ্রেস মুখপাত্র পবন খেরা বলেছেন, ‘আরএসএস–বিজেপির ইকোসিস্টেম গডসে (নাথুরাম) তৈরির কারখানা।’

ভারতের কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী
ভারতের কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। ফাইল ছবি: এএফপি

এপস্টিনের দ্বীপে যাওয়ার কথা স্বীকার করলেন ট্রাম্পের বাণিজ্যমন্ত্রী

প্রকাশ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেছেন, তিনি ২০১২ সালে কুখ্যাত মার্কিন ধনকুবের ও যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের দ্বীপে গিয়েছিলেন। এই স্বীকারোক্তি তাঁর আগের বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। আগে তিনি দাবি করেছিলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার অনেক আগেই এপস্টিনের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন তিনি।

গতকাল মঙ্গলবার ক্যাপিটল হিলে এক শুনানিতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় লুটনিক এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘ছুটিতে পরিবার নিয়ে একটি নৌকায় ভ্রমণকালে আমি তাঁর (এপস্টিন) সঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম। ওই সময় আমার সঙ্গে আমার স্ত্রী ও চার সন্তান ছিল। আমরা ওই দ্বীপে দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম— এটি সত্য। তবে সেটি ছিল মাত্র এক ঘণ্টার জন্য।’

লুটনিকের এই সফর নিয়ে হওয়া বিভিন্ন চিঠিপত্র বা ই–মেইল মার্কিন বিচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত এপস্টিন-সংক্রান্ত নথিপত্রে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতা লুটনিকের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তবে গতকাল হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, বাণিজ্যমন্ত্রী লুটনিকের ওপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী এর আগে কংগ্রেসকে বলেছিলেন যে ২০০৫ সালেই তিনি এপস্টিনের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। নিউইয়র্কে লুটনিকের প্রতিবেশী ছিলেন প্রয়াত এই ধনকুবেন। লুটনিকের দাবি ছিল, এপস্টিন তাঁর বাড়ির একটি কক্ষে শরীর মালিশের টেবিল রাখার কারণ হিসেবে ‘যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ’ ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। আর এরপরই তিনি এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।

তবে গতকাল দেওয়া সাক্ষ্যে লুটনিক বলেন, ‘আমার জানামতে, পরবর্তী ১৪ বছরে আমি আরও দুবার তাঁর সঙ্গে দেখা করেছি।’

মার্কিন বিচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত নথিপত্র অনুযায়ী, লুটনিক ২০১২ সালের ২৩ ডিসেম্বর এপস্টিনের দ্বীপে যান। এর চার বছর আগেই ২০০৮ সালে শিশুদের যৌনকর্মে বাধ্য করার দায়ে এপস্টিন দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন।

ক্যাপিটল হিলের ওই শুনানিতেই লুটনিক প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে এপস্টিনের দ্বীপে যাওয়ার কথা স্বীকার করলেন। ওই মধ্যাহ্নভোজের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমি ঠিক মনে করতে পারছি না, কেন আমরা সেখানে গিয়েছিলাম, তবে আমরা গিয়েছিলাম।’

অবশ্য জেফরি এপস্টিন–সংক্রান্ত কোনো অপকর্মে লুটনিকের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়নি।

এপস্টিনের দ্বীপে যাওয়ার বাইরেও আরও একবার তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা জানিয়েছেন লুটনিক। তিনি বলেন, ওই সফরের প্রায় দেড় বছর পর এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর এক ঘণ্টার একটি বৈঠক হয়েছিল।

লুটনিক দাবি করেন, মার্কিন বিচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত এপস্টিনের লাখ লাখ পৃষ্ঠার নথির মধ্যে মাত্র ১০টির মতো ই–মেইলে তাঁর নাম এসেছে। নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ১৪ বছরে তাঁর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না। ওই ব্যক্তির সঙ্গে আমার প্রায় কোনো লেনদেনই ছিল না।’

তবে লুটনিকের এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে ক্ষুব্ধ মেরিল্যান্ডের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান হলেন। শুনানিতে লুটনিককে রীতিমতো তুলোধুনো করেন তিনি।

বাণিজ্যমন্ত্রী লুটনিকের এপস্টিনের দ্বীপে সফরের তথ্য ফাঁস হওয়ার পর থেকেই তাঁর পদত্যাগের দাবিতে সরব হয়ে ওঠেন ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান— উভয় পক্ষের অনেক নেতা।

গত বছর বিচার বিভাগকে এপস্টিন-সংক্রান্ত জনসমক্ষে প্রকাশে বাধ্য করতে যে আইন করা হয়েছিল, তার দুই প্রধান রূপকার ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস সদস্য রো খান্না ও রিপাবলিকান থমাস ম্যাসি। লুটনিকের এমন লুকোচুরিতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁরা দুজনেই অবিলম্বে বাণিজ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। রো খান্না জানান, নথিপত্রে আরও কিছু নাম রয়েছে, যা আগে আড়াল করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক। ফাইল ছবি: রয়টার্স

শিশুদের নিয়ে একজন কৃষকের অন্য রকম একুশে ফেব্রুয়ারি by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

প্রকাশ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ শিশুদের হাতে ফুলের ঝুড়ি। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো তাদের ভাষা আন্দোলনের গল্প শোনাতে শোনাতে হেঁটে যাচ্ছেন কৃষক মনিরুজ্জামান। চৈতন্যপুর থেকে গ্রামের শিশুদের নিয়ে তিনি যাচ্ছেন কান্তপাশা গ্রামে। তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে যেতে তিনি গল্পে গল্পে বলে যান ইতিহাস। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে তিনি এভাবে শিশুদের মুখে মুখে ইতিহাস শেখান।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার নিভৃত একটি গ্রাম চৈতন্যপুর। শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামে কোনো বিদ্যালয় নেই, শহীদ মিনারও নেই। পাশের কান্তপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আছে শহীদ মিনার। কৃষক মনিরুজ্জামানের বাসা রাজশাহী নগরের মহিষবাথান মহল্লায়। তিনি চৈতন্যপুরে জমি ইজারা নিয়ে চাষাবাদ করেন। তিনি গোদাগাড়ীর এক ফসলি জমিতে নতুন নতুন ফসলের চাষাবাদ করেন। এ জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন। তিনি জমিতে ফুলের চাষও করেন।

কৃষক মনিরুজ্জামান বরাবরই গ্রামের শিশুদের নিয়ে ব্যতিক্রমী সব আয়োজন করেন। শনিবার সকাল সাতটা থেকেই শিশুরা তাঁর জমির গাঁদাফুল তুলতে শুরু করে। এবার জমি থেকে তিন ঝুড়ি ফুল তুলেছে শিশুরা। এসব ফুল নিয়ে তাদের তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হবে। যেতেই যেতেই মনিরুজ্জামান তাদের গল্পে গল্পে একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস বলেন। তারপর শহীদ মিনারে গিয়ে উপস্থিত অন্যান্য গ্রাম থেকে আসা সব শিশুর হাতে একটি করে গাঁদাফুল দেওয়া হয়। সেই ফুল দিয়ে তারা শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। মাঠ থেকে ফুল তোলা, হেঁটে কান্তপাশা বিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে নেতৃত্ব দেয় চৈতন্যপুর গ্রামের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তৃষ্ণা রানী সরকার, লক্ষ্মী রানী, নবম শ্রেণির লিপি সরকার, রিত্তিকা রানী, আদুরি রানী, দীপালি রানী ও ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী উর্মি রানী।

মনিরুজ্জামানের নির্দেশনায় শিশুরা ফুল দিয়ে শহীদ মিনারে বাংলায় ‘২১’ তৈরি করে। বেদির চারদিকে ও সিঁড়িতে প্রদীপ জ্বালানোর মতো করে ফুল দিয়ে সাজায়। ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে দেয় শহীদ মিনারে। মিনারের স্তম্ভের ওপরেও প্রদীপের মতো করে ফুল সাজিয়ে দেওয়া হয়।

কান্তপাশা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম শিশুদের উদ্দেশে বলেন, আজ মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। দিনটি কেবল স্মরণীয় দিন নয়, একটি আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম। ভাষার অধিকারের সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের উজ্জ্বল ইতিহাস। সালটি ছিল ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি। এক জনসভায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন উর্দু ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। তার প্রতিবাদেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বাংলাভাষী মানুষ, যা চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি...।

কী উদ্দেশ্যে নিজের জমিতে চাষ করা ফুল দিয়ে শিশুদের নিয়ে এই আয়োজন করেন, জানতে চাইলে মনিরুজ্জামান বলেন, ভাষার কারণেই পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতি সামনে এগিয়ে গেছে। যাদের ভাষা যত জনপ্রিয়, যে ভাষায় যত বেশি মানুষ কথা বলে, সেই ভাষার মানুষ তত বেশি এগিয়ে গেছে। যেমন জাপানে গবেষণা করতে গেলে প্রথম দেড় বছর সেই দেশের ভাষা শিখতে হয়। গবেষণাটি তাদের ভাষাতেই করতে হয়। এর মাধ্যমে আসলে তারা তাদের ভাষাটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চায়। আর মায়ের ভাষার জন্য রক্ত দেওয়ার ঘটনা পৃথিবীতে বিরল। সেই জায়গা থেকে ভাষাসৈনিকদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হলে শিশুদের ভাষাজ্ঞান ও ভাষাশিক্ষায় দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তিনি শিশুদের গল্পের ছলে ভাষার জন্য আত্মত্যাগের মহান ইতিহাসটা বলেন, যাতে তারা সহজেই এই বয়সে ইতিহাস জানতে পারে। পরে যখন বইপুস্তকে পড়বে, তখন ইতিহাসটা পরিচিত মনে হবে, ভালো লাগবে। ভেতরে শ্রদ্ধাবোধ জাগবে।

অনুভূতি জানতে চাইলে শিক্ষার্থী তৃষ্ণা রানী সরকার বলে, ‘আমরা নিজের হাতে ফুল তুলেছি। মনির (মনিরুজ্জামান) কাকুর মুখে একুশে ফেব্রুয়ারির গল্প শুনতে শুনতে কখন কান্তপাশায় আইসি পড়ছি, বুঝতেই পারিনি। জীবনে কোনো দিন এই স্মৃতি ভুলব না।’

একুশে ফেব্রুয়ারির গল্প শুনতে শুনতে শিশুরা যাচ্ছে পাশের গ্রাম কান্তপাশায়। আজ শনিবার সকালে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চৈতন্যপুর গ্রামে
একুশে ফেব্রুয়ারির গল্প শুনতে শুনতে শিশুরা যাচ্ছে পাশের গ্রাম কান্তপাশায়। আজ শনিবার সকালে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চৈতন্যপুর গ্রামে। ছবি: প্রথম আলো