Showing posts with label বিবিসি বাংলা. Show all posts
Showing posts with label বিবিসি বাংলা. Show all posts

Friday, October 23, 2026

৫৭ বছর বয়সেই ৫৮ সন্তানের বাবা, মনে থাকে না অনেকের নাম!

চার স্ত্রী, ৫৮ সন্তান আর প্রতিদিনের খাবার জোগাড়ের কঠিন লড়াই- আফগানিস্তানের মোহাম্মদ সাদিকের জীবনে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে দারিদ্র্য, অপূর্ণতা ও অসংখ্য চ্যালেঞ্জ। ৫৭ বছর বয়সী এই ব্যক্তি গাড়ির শোরুমে কাজ করে বিশাল পরিবারের ভরণপোষণের চেষ্টা করছেন।

সন্তানদের কেউ যেন ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে না যায়, আর সবাই যেন শিক্ষার সুযোগ পায়; এখন এই দুটি স্বপ্নই তার জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া।

আফগানিস্তানের উরুজগান প্রদেশের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাদিকের পরিবার দেশটির অন্যতম বড় পরিবার হিসেবে পরিচিত। কয়েক সপ্তাহ আগেই জন্ম হয়েছে তার সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের। এত বড় পরিবারের প্রতিদিনের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে তাকে প্রতিনিয়ত আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

সাদিকের ভাষায়, তার সারাদিনের চেষ্টা মূলত সন্তানদের খাবার ও পানীয়ের ব্যবস্থা করাকে ঘিরেই। কিন্তু সীমিত আয়ে এত মানুষের ভরণপোষণ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিবারের ছোট সন্তানদেরও এর প্রভাব মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে, তার চার স্ত্রী বছরের পর বছর ধরে গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনের দায়িত্ব সামলে আসছেন। সাদিক জানান, বিয়ের সময় তার স্ত্রীদের বয়স ছিল মাত্র ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে।

সন্তানদের নাম ভুলে যান, রাতে গুনে দেখেন সবাইকে

এত বেশি সন্তান থাকার কারণে মাঝেমধ্যে তাদের সবার নাম মনে রাখতে পারেন না মোহাম্মদ সাদিক। বিষয়টি বলতে গিয়ে তিনি হাসেন। সন্তানদের অনেককেই তাই নাম ধরে না ডেকে ‘বাবা’ কিংবা ‘আমার সন্তান’ বলে সম্বোধন করেন।

প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সন্তানদের গুনে দেখেন তিনি। উদ্দেশ্য, সবাই বাড়িতে ফিরেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া।

একবার রাতের খাবারের সময় সন্তানদের গুনতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, একজন অনুপস্থিত। কিন্তু সেই সন্তান ছেলে, নাকি মেয়ে- সেটিও মনে করতে পারেননি তিনি। পরে সন্তানদের মায়েদের কাছে জানতে চাইলে একজন জানান, তার সন্তানকে নানির বাড়িতে পাঠানো হয়েছে এবং সে সেখানেই রাত কাটাবে।

মেয়ের বিয়ের সময়ও এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। বিয়ে পড়ানোর জন্য আসা মৌলভি সাদিকের কাছে তার মেয়ের নাম জানতে চান। কিন্তু কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর তিনি ভুল করে অন্য এক মেয়ের নাম বলে বসেন।

ঘটনাটি স্মরণ করে সাদিক বলেন, ‘যে মৌলভি সাহেব বিয়ে পড়িয়েছিলেন, তিনি আমাকে আমার মেয়ের নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি কিছুক্ষণ চিন্তা করে ভুলবশত আমার অন্য এক মেয়ের নাম বলে ফেলি। তখন মৌলভি সাহেব হেসে বললেন, আপনি বাড়ি গিয়ে আবার দেখে আসুন, ভুল নাম বলেছেন কি না।’

বাড়িতে উৎসবের মতো কোলাহল, কিন্তু খাবারের সংকটও নিত্যসঙ্গী

সাদিকের বর্ণনায়, ছোট সন্তানরা যখন তাকে ঘিরে জড়ো হয়, তখন বাড়ি হাসি, আনন্দ ও কোলাহলে ভরে ওঠে। তার মনে হয়, যেন বাড়িতে কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে।

যদিও এই প্রাণচাঞ্চল্যের আড়ালেই রয়েছে কঠিন বাস্তবতা। দারিদ্র্যের কারণে কখনও কখনও পরিবারের কিছু সন্তানকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যেতে হয়।

পরিবারে দিনে মাত্র দুবার রান্না হয়- সকালে ও সন্ধ্যায়। রান্নার দায়িত্ব পালন করেন দুই নারী। পরিবারের সদস্যদের খাবারের ব্যবস্থা করাই যেখানে প্রতিদিনের বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

৫৭ বছর বয়সী সাদিক একটি গাড়ির শোরুমে কাজ করেন। তিনি জানান, প্রতিটি গাড়ি বিক্রির জন্য মাত্র এক হাজার আফগানি কমিশন পান। এত বড় পরিবারের ব্যয়ের তুলনায় এই আয় খুবই সামান্য।

আরও সন্তান নেওয়ার পেছনে নিজের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল ‘নবীর অনুসারীর সংখ্যা বাড়ানো।’

অল্প বয়সে বিয়ে, এক জীবনে বহু দায়িত্ব

মোহাম্মদ সাদিকের প্রথম বিয়ে হয়েছিল ২০ বছর বয়সে। তরুণীদের বিয়ে করার কারণ সম্পর্কে বিবিসির প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, প্রতিটি বিয়ের জন্য কনের পরিবারকে দেওয়ার অর্থ জোগাড় করতে তাকে কয়েক বছর ধরে সঞ্চয় করতে হয়েছে।

তার চার স্ত্রী বিয়ের সময়ই ছিলেন খুব অল্পবয়সী। এরপর তাদের জীবনের বড় অংশ কেটেছে গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান ও সন্তানদের লালন-পালনের মধ্য দিয়ে। শৈশব ও কৈশোরেই তাদের কাঁধে এসে পড়ে সংসারের বিশাল দায়িত্ব, যা পরবর্তী জীবনেও অব্যাহত থাকে।

যদিও এই পরিবারের জীবনে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে গভীর শোকও। বছরের পর বছর ধরে সাদিক ও তার স্ত্রীরা ১৪ সন্তান হারিয়েছেন। এতগুলো সন্তান হারানোর বেদনা তাদের জীবনের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি।

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প বয়সে বিয়ে ও গর্ভধারণ মা এবং অনাগত শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ঘন ঘন গর্ভধারণ নারীদের মধ্যে আরও নানা স্বাস্থ্যগত জটিলতা তৈরি করতে পারে।

আফগানিস্তানে গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদানের সময় নারীদের মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় মানসম্মত চিকিৎসাসেবার সীমিত সুযোগ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে।

সাদিকের পরিবারের ক্ষেত্রেও দারিদ্র্য প্রতিদিনের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। শীতকালে পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতরে একসঙ্গে বসে খাবার খান। গ্রীষ্মে খাবার খাওয়া হয় উঠানে। কিন্তু মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাব তাদের জীবনকে আরও কষ্টকর করে তুলেছে।

যে জায়গায় পরিবারের সদস্যরা গোসল করেন, সেই স্থানেই কাপড় ও বাসন ধোয়া হয়। একই জায়গা শৌচাগার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

পরিবারের ব্যয় সামলাতে শুধু সাদিক একা নন, তার অনেক সন্তানও কাজ করে। তারা কাগজ, প্লাস্টিক ও অন্যান্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ সংগ্রহ করে। এসব উপকরণ কখনও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, আবার কখনও বিক্রি করে পরিবারের খরচে অবদান রাখা হয়।

এক কম্বলের নিচে ছয়-সাতজনের রাত

পরিবারটির বসবাসের পরিবেশও বেশ কষ্টকর। শীতের রাতে কখনও কখনও ছয়-সাতজন মানুষকে একটি পাতলা কম্বলের নিচে ঘুমাতে হয়। সাধারণ গদি ছাড়া তাদের শোয়ার জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেই।

বাড়ির কক্ষগুলোতে জানালা নেই, নেই মজবুত দরজাও। প্রবেশপথে শুধু একটি পাতলা পর্দা ঝোলানো রয়েছে। শীতের সময় ঘর গরম রাখার জন্য পরিবারটি মূলত কাগজ ও সহজলভ্য অন্যান্য উপকরণ পুড়িয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে।

এত প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন সাদিক। নিজে পড়াশোনা করতে পারেননি বলে সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর ব্যাপারে তিনি আগ্রহী। কিন্তু সীমিত আয়ের কারণে তাদের শিক্ষার খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

পরিবারের ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেয়ে তিনি সরকার, সহায়তা সংস্থা এবং আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন। তার আশা, সহায়তা পেলে সন্তানদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা এবং তাদের ভবিষ্যতের জন্য কিছুটা ভালো ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।

সাদিকের জীবনের সবচেয়ে বড় দুটি স্বপ্ন

অভাব, দুশ্চিন্তা ও প্রতিদিনের সংগ্রামের মধ্যেও মোহাম্মদ সাদিকের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। সন্তানদের জন্য তার চাওয়া মাত্র দুটি- শিক্ষা এবং পর্যাপ্ত খাবার।

নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ইচ্ছার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার প্রথম ইচ্ছা, আমার সন্তানরা শিক্ষা লাভ করুক, ধর্ম এবং পৃথিবী সম্পর্কে জানুক। দ্বিতীয়ত, তাদের যেন কখনও ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে না হয় এবং তাদের পেট যেন ভরা থাকে।’

৫৮ সন্তানকে নিয়ে সাদিকের পরিবারে প্রতিদিনই চলছে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। কখনও সন্তানদের নাম মনে রাখতে না পারা, কখনও রাতে সবাইকে গুনে দেখা, আবার কখনও খাবারের অভাবে সন্তানদের কষ্ট- সব মিলিয়ে তার জীবন এক কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এত বড় পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে তার নিজের স্বপ্নগুলোও যেন সীমাবদ্ধ হয়ে এসেছে সন্তানদের শিক্ষা ও দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তার মধ্যে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

আফগানিস্তানের উরুজগান প্রদেশের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাদিক ও তার বাড়ি ছবি: গ্রাফিক্স
আফগানিস্তানের উরুজগান প্রদেশের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাদিক ও তার বাড়ি ছবি: গ্রাফিক্স

Wednesday, October 21, 2026

মিয়ানমারের ব্যাপারে নীতি বদলাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, কীসের ইঙ্গিত

বিবিসি বাংলাঃ মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের দূরত্ব কমিয়ে দেশটির সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক নেতা মিন অং হ্লাইংয়ের বৈঠক এবং দেশটির কয়েকজন ব্যবসায়ীর ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘটনায় ওয়াশিংটনের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে সরে এসে মিয়ানমারের সঙ্গে ব্যবসায়িক ও কৌশলগত স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন কি না ট্রাম্প।

২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেত্রী অং সান সু চিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ছিল খুবই সীমিত। জান্তা সরকারকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সেই নীতিতে পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে।

সামরিক নেতার সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তার বৈঠক

গত ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে দেশটির সামরিক নেতা মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর গোয়েন্দা ও গবেষণাবিষয়ক সহকারী সচিব মাইকেল ভ্যান্স। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তিনি।

বৈঠকের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল, ইয়াঙ্গুনে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের সঙ্গে বিরোধের জেরে জুন মাসে আটক মার্কিন নাগরিক অ্যাডাম কাস্তিয়োকে মুক্ত করা। তবে দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভ্যান্স এর আগে জুন মাসে টোকিওতে মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। চলতি মাসেও টোকিওতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি সামরিক শাসনের বিরোধী পক্ষগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তার আলোচনা হয়েছে।

এতে বোঝা যাচ্ছে, মিয়ানমারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগের পরিধি বাড়ছে। তবে এই যোগাযোগকে দেশটির সামরিক সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার সমতুল্য মনে করার সুযোগ নেই।

ট্রাম্পের শুল্কের হুমকি থেকে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

মিয়ানমারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তনের আভাস অবশ্য গত বছর থেকেই পাওয়া যাচ্ছিল। সে সময় ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছিল।

ট্রাম্প মিয়ানমারসহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের নেতাদের ব্যক্তিগত চিঠি পাঠিয়ে সতর্ক করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির কারণে তাঁদের দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। মিয়ানমারের জন্য প্রস্তাবিত শুল্কের হার ছিল ৪০ শতাংশ।

তবে মিন অং হ্লাইং ট্রাম্পের চিঠির জবাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ অব্যাহত রাখার উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি ট্রাম্পের নেতৃত্বের প্রশংসাও করেন তিনি।

২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে এ ধরনের যোগাযোগ ছিল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

অভ্যুত্থানের পর দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া এবং অং সান সু চিকে কারাবন্দি করার ঘটনায় আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে জান্তা সরকার। বিশ্বের অধিকাংশ দেশই মিন অং হ্লাইংয়ের সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া থেকে বিরত থাকে। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে ঘনিষ্ঠ ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ও বিরল মৃত্তিকা খনিজের হিসাব

মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পেছনে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ কাজ করছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। বিশেষ করে বিরল মৃত্তিকা খনিজের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ কমানোর আগ্রহ ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চীন বিরল মৃত্তিকা খনিজের রপ্তানি সীমিত করার পদক্ষেপ নেওয়ার পর এসব গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করে ট্রাম্প প্রশাসন। আধুনিক প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস ও বিভিন্ন শিল্পে এসব খনিজের ব্যবহার রয়েছে।

মিয়ানমারে বিরল মৃত্তিকা খনিজের বড় মজুত রয়েছে। তবে এসব খনিজের বেশির ভাগই এমন এলাকায় পাওয়া যায়, যেখানে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংঘাত চলছে। বর্তমানে চীনা কোম্পানিগুলো সেখানে খনিজ উত্তোলন করে প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য চীনে নিয়ে যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা সহজ হবে না। কারণ, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং চীনা কোম্পানিগুলোর দীর্ঘদিনের কার্যক্রম বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

লবিস্ট নিয়োগ ও সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা

মিয়ানমারের সামরিক সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে লবিং কার্যক্রমও জোরদার করেছে। দেশটির শাসকগোষ্ঠী ওয়াশিংটনভিত্তিক লবিং প্রতিষ্ঠান ডিসিআইয়ের সঙ্গে ৩০ লাখ ডলারের একটি চুক্তি করে। এর আগে ২০০২ সালে মিয়ানমারের সামরিক সরকার নিজেদের ভাবমূর্তি উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠানটির সহায়তা নিয়েছিল।

এ ছাড়া ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বিতর্কিত লবিস্ট রজার স্টোনকেও নিয়োগ দেয় জান্তা সরকার। তাকে মাসে ৫০ হাজার ডলার পারিশ্রমিক দেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাবেক মার্কিন মেরিন সেনা ও ট্রাম্প-সমর্থক অ্যাডাম কাস্তিয়োও মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, সামরিক জান্তাকে বিচ্ছিন্ন রাখতে নিষেধাজ্ঞার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি।

কাস্তিয়ো যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ, মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং চীনের প্রভাব কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দলের সঙ্গে আলোচনা করেন।

নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ, তবু নীরব ওয়াশিংটন

মিয়ানমারের সামরিক সরকার ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজন করে। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে অভ্যুত্থানের নেতা মিন অং হ্লাইং সামরিক শাসক থেকে নামমাত্র বেসামরিক প্রেসিডেন্টে পরিণত হন।

নির্বাচনটি অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি বলে পশ্চিমা দেশগুলোর অনেকে সমালোচনা করলেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আগের মতো জোরালো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশের নির্বাচন নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে আসা ওয়াশিংটনের এ নীরবতা নীতিগত পরিবর্তনের আলোচনাকে আরো জোরালো করেছে।

এ ছাড়া সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সময় নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা মিয়ানমারের কয়েকজন ব্যক্তির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের মিয়ানমারবিষয়ক উপদেষ্টা রিচার্ড হর্সির মতে, শিরোনামে যতটা পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে পরিবর্তন তার চেয়ে কম। মিন অং হ্লাইংয়ের ওপর এখনো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

হর্সির মতে, নতুন বিষয়টি হলো দুই পক্ষের যোগাযোগের মাত্রা এবং বৈঠকের স্থান। নেপিদোতে মার্কিন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি মিন অং হ্লাইংয়ের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করেছে। তবে তার পরবর্তী লক্ষ্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, যা অর্জন করা অনেক কঠিন হবে।

মানবাধিকার ও মানবিক সহায়তা নিয়ে উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তনের আলোচনার পাশাপাশি মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ইউএসএআইডি বিলুপ্তির সিদ্ধান্তে মিয়ানমারের বিরোধী গোষ্ঠী, স্বাধীন গণমাধ্যম ও শরণার্থীদের জন্য বরাদ্দ সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের প্রায় চার হাজার নাগরিকের অস্থায়ী সুরক্ষার মর্যাদা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তও সমালোচনার মুখে পড়েছে। তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হলে কেউ কেউ কারাবন্দি হওয়া বা আরো গুরুতর পরিণতির মুখে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় প্রতারণা চক্র দমনে জান্তা সরকারের সহযোগিতা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। বড় ধরনের কয়েকটি অভিযানের পর এসব চক্র প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর মিত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

লোয়ি ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক পরিচালক হান্টার মার্সটনের মতে, নেপিদোর সঙ্গে আলোচনা করাটাই ভুল নয়। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই যোগাযোগের বিনিময়ে ওয়াশিংটন কী অর্জন করতে চাইছে এবং কী ছাড় দিচ্ছে।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এ যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ নিশ্চিত করা, বেসামরিক মানুষের ওপর বিমান হামলা বন্ধে চাপ দেওয়া এবং মিয়ানমারের বিরোধী পক্ষ ও জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা। প্রতারণা চক্রগুলোর অর্থের প্রবাহ বন্ধ করতে চীনসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ও জরুরি।

সম্পর্কের বরফ গলছে, কিন্তু কতটা?

মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ বৃদ্ধি ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্ন রাখার নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিরল মৃত্তিকা খনিজ, প্রতারণা চক্র দমন এবং মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তার মতো বিষয় এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে যোগাযোগ বাড়লেও দুই দেশের সম্পর্কের মৌলিক পরিবর্তন এখনো সীমিত। মিন অং হ্লাইংয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও কাটেনি।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসন মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আদর্শিক অবস্থানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই যোগাযোগের ফলে মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাস্তব কোনো অগ্রগতি হয় কি না, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

মিয়ানমারের ব্যাপারে নীতি বদলাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, কীসের ইঙ্গিত

0007

Tuesday, October 6, 2026

ভারতে নারী বিক্ষোভকারীদের হেনস্থা, আবারো নতুন কর্মসূচির ডাক ককরোচ পার্টির

ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লি ও মুম্বাইয়ে টানা কয়েকদিন ধরে বিক্ষোভ চলছে। পুলিশের বাধা, আটক ও নারী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে আন্দোলন আরো জোরালো হয়েছে। এরই মধ্যে আগামী ১০ অক্টোবর আবারো দিল্লিতে বড় ধরনের বিক্ষোভ ও মিছিলের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং কয়েকটি বামপন্থী ছাত্র সংগঠন।

২ অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তীর দিন শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ পরবর্তী দুই দিনও অব্যাহত থাকে। বিক্ষোভকারীদের অনেকে চলমান কর্মসূচিকে ‘যন্তর-মন্তর ২.০’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তবে এবার দিল্লি পুলিশ আগের তুলনায় আরো কঠোর অবস্থান নেয়। বিক্ষোভকারীদের কাউকেই যন্তর-মন্তরে পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি।

রোববার দিল্লিতে সাধারণ মানুষ, সমাজকর্মী ও ছাত্র সংগঠনগুলোর উদ্যোগে ইন্ডিয়া গেট থেকে যন্তর-মন্তর পর্যন্ত ‘সিটিজেন্স মার্চ’ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। এর আগের দিন দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে কয়েকজন নারী সাংবাদিককে হেনস্থার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার পর রোববার আন্দোলন আরো তীব্র হয়ে ওঠে।

এর মধ্যে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কয়েকটি কলেজ ক্যাম্পাসে নারী নিরাপত্তার দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে যন্তর-মন্তরে পুলিশের আচরণ নিয়ে ক্ষোভের বিষয়টি একাকার হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ দুই প্রতিবাদের বিভিন্ন ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

ছাত্র সংগঠন আইসার নেত্রী নেহা বোরা অভিযোগ করেন, পুলিশ যে গাড়িতে তাকে নিয়ে যায়, সেখানে কোনো নারী পুলিশ সদস্য ছিলেন না। পরে তাকে যন্তর-মন্তর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের নারেলা এলাকায় নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। আইসার অভিযোগ, ওই সময় নেহা বোরার কাছে তার মোবাইল ফোনও ছিল না।

আন্দোলন চলাকালে আরো কয়েকজন নেতা দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করেন। আম আদমি পার্টির কর্মীরাও বিপুলসংখ্যায় ইন্ডিয়া গেট এলাকায় বিক্ষোভে যোগ দেন। দলের দিল্লি প্রদেশ সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজকেও আটক করে পুলিশ।

পরে এক্সে পোস্ট করা এক ভিডিওতে সৌরভ ভরদ্বাজ অভিযোগ করেন, ইন্ডিয়া গেটে তাকে পুলিশ উল্টো করে ঝুলিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, যাতে ক্যামেরায় তার মুখ ধরা না পড়ে। ভিডিওতে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়।

সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদবও পুলিশের বিরুদ্ধে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর-মন্তরের দিকে যাওয়ার সময় তাদের জোর করে আটক করা হয়েছে। তার ভাষ্য, এটি এক দিনের প্রতীকী প্রতিবাদ নয়; জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

রোববার সন্ধ্যায় ইন্ডিয়ান ইয়ুথ কংগ্রেসও জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে মিছিল করে। ভোটার তালিকায় কথিত অনিয়মের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগ দাবি করে সংগঠনটি। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তারা যন্তর-মন্তর আবার মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা এবং জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেপ্তারের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচির কথা জানায়।

অন্যদিকে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে মুম্বাইয়ে ‘গর্জনা মোর্চা’ আয়োজন করে উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা ও রাজ ঠাকরের মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা (এমএনএস)। কর্মসূচিতে দুই ঠাকরে নেতাই অংশ নেন।

এর আগে ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কেও ককরোচ জনতা পার্টির ডাকে বড় বিক্ষোভ হয়। পুলিশ অনুমতি না দিলেও বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন। ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রকাশের পর ওই কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল।

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, সরকার এতটাই অযোগ্য যে দুই মাসের মধ্যে তাদের দ্বিতীয়বার বিক্ষোভে নামতে হচ্ছে। তিনি বলেন, গান্ধী যদি ভারতের আত্মা হন, তবে আম্বেদকর দেশটির মেরুদণ্ড। তার দাবি, ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর ও জওহরলাল নেহরুই ভারতের জনগণকে ভোটাধিকার দিয়েছেন।

মুম্বাইয়ের ওই কর্মসূচিতে অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি এবং সুরকার-গায়ক বিশাল দাদলানিও উপস্থিত ছিলেন। উদ্ধব ঠাকুরের শিবসেনাও এতে সমর্থন জানায়।

এদিকে মুম্বাইয়ের কর্মসূচির পর সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকে আগামী ১০ অক্টোবর দিল্লিতে ফের বড় আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘আমার ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছি, আপনিও গুছিয়ে নিন, দিল্লি রওনা হতে হবে।’

দিল্লিতে যন্তর-মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়ার পাশাপাশি দিল্লি মেট্রোও ১০টির বেশি স্টেশন বন্ধ করে দেয়। এরপরও বিপুলসংখ্যক মানুষ যন্তর-মন্তরে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের আটক করে। নেহা বোরা, প্রশান্ত ভূষণ, যোগেন্দ্র যাদব, সৌরভ ভরদ্বাজ ও সঞ্জয় সিংসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করা হলেও কাউকেই বিক্ষোভস্থলে পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি।

এদিকে নির্বাচন কমিশন শুক্রবার সকালে এক্সে পোস্ট করে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরে বাদ পড়া নামগুলো পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে বিশেষ অভিযানের ঘোষণা দেয়। এর আওতায় ভোটার তালিকা যাচাই, বাদ পড়া ভোটারদের শনাক্ত করা এবং তাদের ফর্ম-৬ পূরণ করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, বুথ লেভেল কর্মকর্তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাই করবেন। তরুণ ভোটারদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং বুথ পর্যায়ে বিশেষ শিবিরও আয়োজন করা হবে।

কেন জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি?

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ছাড়া অপর দুই নির্বাচন কমিশনার গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিয়ে ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাদের জানানো হয়নি। নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং কথিত ‘অননুমোদিত ও বেআইনি’ পদক্ষেপ নিয়ে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী আপত্তি তুলেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ককরোচ জনতা পার্টিও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জোরালো করেছে। তাদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক কার্যক্রম নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে এবং কমিশনের প্রতি আস্থা পুনঃস্থাপন করতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ প্রয়োজন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

ভারতে নারী বিক্ষোভকারীদের হেনস্থা, আবারো নতুন কর্মসূচির ডাক ককরোচ পার্টির
রোববার নারী বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয় দিল্লি পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত

Friday, October 2, 2026

বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় কারাওইন, ৮৫৯ সালে মরক্কোয় প্রতিষ্ঠা করেন ফাতিমা

উত্তর আফ্রিকার মুসলিমপ্রধান দেশ মরক্কোর একটি প্রাচীন শহরের নাম 'ফেজ'। পাহাড়ঘেরা শহরটির রাস্তাগুলো এতটাই সরু ও আঁকাবাঁকা যে, সেখান দিয়ে ইঞ্জিনচালিত গাড়ি চলাচল করতে পারে না। ফলে যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের জন্য গাধা এবং গরুর গাড়িই বাসিন্দাদের প্রধান ভরসা।

পাহাড়িপথ ধরে মূল শহরে প্রবেশ করতেই পরস্পর সংযুক্ত এমন অসংখ্য গলি চোখে পড়ে, যেগুলো দেখে দর্শনার্থীদের মনে হতে পারে যে, তারা একটি গোলকধাঁধার মধ্যে এসে পড়েছেন।

কিন্তু শহরের যেকোনো প্রান্তের উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে কেউ যদি কেন্দ্রের দিকে তাকান, তাহলে প্রথমেই যে দৃশ্যটিতে তার চোখ আটকে যাবে, সেটি হচ্ছে- সবুজ রঙের সিরামিক টালি দেওয়া চমৎকার কিছু ছাদ। এসব ছাদের নিচেই গত সাড়ে এগারোশ' বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন বয়সী মানুষের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে আসছে একটি প্রতিষ্ঠান, যার বর্তমান নাম 'ইউনিভার্সিটি অব আল কারাওইন' বা আল কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়। কেউ কেউ এই একে 'আল কারাওইন' এবং 'আল কারাওইন' নামেও ডেকে থাকেন।

৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে বর্তমান বিশ্বের 'প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো ও গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস। 'আল কারাওইন' চালু হওয়ার দু'শ বছরেরও বেশি সময় পর ১০৮৮ সালে ইতালিতে 'বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়' কার্যক্রম শুরু করে, যা ইউরোপের সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত। এর বছর আটেকের মাথায় ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছিল তারও শত বছর পরে, ত্রয়োদশ শতকের শুরুর দিকে।

কিন্তু এগুলোর চেয়েও চমকপ্রদ তথ্য হচ্ছে, আল কারাওইন নামের প্রচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন মুসলিম নারী, যার নাম: ফাতিমা আল-ফিহরি। কে ছিলেন এই ফাতিমা? কেন এবং কীভাবে তিনি সেই নবম শতকে একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা জানবো, কিন্তু তার আগে আরেকটি একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

ইউনেস্কো ও গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস 'আল কারাওইন'কে বর্তমানে কার্যক্রম চালু রয়েছে- এমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে 'সবচেয়ে প্রাচীন' বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর অর্থ আল কারাওইনের আগেও বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে থাকতে পারে, যেমন: প্রাচীন ভারতের তক্ষশীলা ও নালন্দার কথা জানা যায়, কিন্তু সেগুলো এখন আর চালু নেই। কিন্তু হাজার বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও আল কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয় এখনও সারাবিশ্বের শিক্ষার্থীদেরকে আকর্ষণ করে চলেছে।

কে ছিলেন ফাতিমা?

ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থে ফাতিমা আল-ফিহরি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। তবে সেসব তথ্যের বেশিরই নেওয়া হয়েছে চতুর্দশ শতাব্দীতে লেখা একটি প্রাচীন ইতিহাস গ্রন্থ থেকে। 'রাওয আল-কিরতাস' নামের ওই বইটি লিখেছেন ইতিহাসবিদ ইবনে আবি জার। এটি মূলত ফেজ শহরের প্রচীন ইতিহাস বিষয়ক একটি গ্রন্থ।

ইতিহাসবিদ ইবনে আবি জারের দেওয়া তথ্যমতে, ফাতিমা আল-ফিহরি'র ছিলেন আরবের সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের উত্তরসূরি। তার পূর্বপুরুষরা পেশায় বণিক ছিলেন। এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন শহরে তাদের যাতায়াত ছিল। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে এক সময় তারা তিউনিসিয়ার কাইরুয়ান শহরে যান এবং সেখানে বসতি গড়ে তোলেন।

ওই শহরেই আনুমানিক আটশ' খ্রিস্টাব্দের দিকে জন্ম হয় ফাতিমা আল-ফিহরি'র। তার পুরোনাম ছিল- ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ আল ফিহরি আল কুরাইশিয়া। বাবা মুহাম্মদ আল ফিহরিও ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। দীর্ঘদিন ব্যবসায় মন্দা চলার একপর্যায়ে তিনি আর্থিক সংকটে পড়েন এবং ভাগ্য ফেরানোর আশায় নবম শতাব্দীর প্রথমভাগে মরক্কোয় পাড়ি জমান।

সম্পদ লাভ

মরক্কো যাওয়ার পর ক্রমেই আর্থিক অবস্থা ফিরতে থাকে মুহাম্মাদ আল ফিহরি'র। পরিবার-পরিজন নিয়ে একপর্যায়ে তিনি ফেজ শহরে থিতু হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফেজ তখন ক্রমেই ওই এলাকার ব্যবসা বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে শুরু করেছে। পরবর্তীতে মুহাম্মদ আল ফিহরি রীতিমত ধনী ব্যবসায়ীতে পরিণত হন।

এই ব্যবসায়ী তার ছেলে-মেয়েদের সবাইকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছিলেন। ছোটবেলায় পরিবারের কাছ থেকেই ইসলামি রীতি-নীতির শিক্ষা পান ফাতিমা আল-ফিহরি। পরবর্তীতে তিনি কোরান-হাদিসের পাশাপাশি ফিকাহ বা ইসলামি আইনশাস্ত্রসহ আরো অনেক বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

বড় হওয়ার পর ফেজ শহরেই একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়ে হয় ফাতিমার। কিন্তু কয়েক বছর না যেতেই তার জীবনে যেন দুর্যোগ নেমে আসে। স্বামীকে হারিয়ে অল্প বয়সেই বিধবা হন ফাতিমা। কাছাকাছি সময়ে বাবা এবং ভাইকেও হারান। ফলে উত্তরাধিকারসূত্রে পরিবারের বিপুল সম্পত্তির মালিকানা চলে যায় ফাতিমা আল-ফিহরি এবং তার বোন মারিয়াম আল-ফিহরির নামে।

'আল কারাউইয়্যিন' প্রতিষ্ঠা

উত্তরাধিকারসূত্রে বিপুল সম্পত্তির মালিকানা পাওয়ার পর ফাতিমা এবং তার বোন মারিয়াম সিদ্ধান্ত নেন যে, সেগুলো তারা কোনো বিলাসিতার উদ্দেশ্যে ব্যয় করবেন না। তারা স্থির করেন, সম্পদ দিয়ে এমন কিছু করবেন যা ইসলাম ও মানবতার কল্যাণে কাজে আসবে।

ফেজে তখন মুসলিমদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছিল। তাদের কথা মাথায় রেখে শহরে বড় মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন দুই বোন। মারিয়াম আল-ফিহরি তার সম্পত্তির বেশিরভাগ অংশ ব্যয় করে বড় একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যেটি 'আল আন্দালুস মসজিদ' নামে পরিচিত।

চমৎকার কারুকার্যখচিত ওই মসজিদটির আয়তন এতটাই বিশাল যে, সেখানে একসঙ্গে প্রায় ২০ হাজার মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন। অন্যদিকে, ফাতিমা আল-ফিহরিও তার ভাগের অর্থ-সম্পদ খরচ করে আরেকটি বড় মসজিদ তৈরি করেন। তবে অন্য মসজিদগুলোর তুলনায় সেটি ছিল ব্যতিক্রম।

মসজিদ কমপ্লেক্সের নকশায় নামাজ পড়ার জায়গার পাশাপাশি বিশাল একটি ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র বা মাদ্রাসাও রাখেন ফাতিমা। ইতিহাসবিদদের মতে, হিজরি ২৪৫ সালের (৮৫৯ খ্রিস্টাব্দ) পহেলা রমজানে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরের দুই বছরের মধ্যে মসজিদের মূল ভবন তৈরি হয়ে যায়। তবে মাদ্রাসাসহ পুরো কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে ১২ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত সময় লেগে গিয়েছিল বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

ইতিহাসবিদ ইবনে আবি জার তার 'রাওয আল-কিরতাস' বইতে উল্লেখ করেছেন যে, ফাতিমা নিজে সার্বক্ষণিকভাবে মসজিদ কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ তদারকি করতেন। এক্ষেত্রে তিনি এতটাই নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন যে, মসজিদ কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত টানা রোজা রেখেছিলেন বলেও জানা যায়।

নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর ফাতিমা তার জন্মস্থান তিউনিসিয়ার কাইরুয়ান শহরের নামের সঙ্গে মিল রেখে মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্সটির নামকরণ করেন 'আল কারাওইন'। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, ফেজ শহরের যে এলাকায় ফাতিমা ও তার পরিবারের সদস্যরা বসবাস করতেন, সেখানকার বাসিন্দাদের বড় অংশই কাইরুয়ান থেকে এসে সেখানে বসতি গড়ে তুলেছিলেন।

সেজন্য ফেজের বাকি অংশের বাসিন্দাদের কাছে এলাকাটি পরিচিত পায় 'কারাওইন' নামে, যার অর্থ 'কাইরুয়ান থেকে আসা ব্যক্তিগণ'। সেই ধারাবাহিকতায় মসজিদ কমপ্লেক্সটির নামকরণ করা হয়েছিল 'আল কারাওইন'।

হাজার বছরের পথচলা

কমপ্লেক্সটি প্রাচীন ফেজ শহরের একেবারে কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সেখানকার মূল স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে একটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসা এবং একটি গ্রন্থাগার। কমপ্লেক্সের একেবারে কেন্দ্রে আল কারাউইয়্যিন মসজিদের অবস্থান। সেখানে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের জন্যও আলাদা নামাজ পড়ার জায়গা রাখা হয়। মসজিদের দিকে তাকালেই ছাদে একটি বড় মিনার চোখে পড়ে। ওই মিনার থেকে প্রতিদিন নামাজের আগে আজানের শব্দ ভেসে আসে।

মসজিদের বাইরের অংশে বেশ বড় একটি খালি আঙিনা দেখা যায়। সেখানে মার্বেল পাথরের তিনটি ফোয়ারা রয়েছে, যা মুসল্লিদের ওযু করার কাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। শুরুর দিকে মসজিদটির দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ১০০ ফুট, যা পরবর্তীতে আরো বড় করা হয়েছে। এটি প্রথমবার সংস্কার করা হয়েছিল ৯৫৬ সালে। কর্ডোবার তৎকালীন শাসক তৃতীয় আব্দুর রহমানের উদ্যোগে তখন মসজিদটি আরো বড় করা হয়। এতে মসজিদের সামনের খোলা জায়গাটিও আগের জায়গা থেকে পেছনে সরে যায়। আর ওপরের সাদ রঙের মিনারটি স্থানান্তর করে মসজিদের উত্তরপাশের দেয়ালে স্থাপন করা হয়।

এরপর দ্বাদশ এবং ষোড়শ শতাব্দীতে আরো দু'বার মসজিদের আকার সম্প্রসারণ করা হয়। এভাবে বাড়তে বাড়তে বর্তমানে মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭২ ফুটে দাঁড়িয়েছে, যা এটিকে আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম বৃহত্তম মসজিদে পরিণত করেছে। সেখানে প্রায় ২২ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের ছাদে পাঁচটি গম্বুজ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান প্রবেশদ্বারটির ওপরে থাকা গম্বুজটি ভেতরের অংশ অত্যন্ত কারুকার্যমণ্ডিত। ভবনের মাঠের দরজা এবং উঁচু দেয়ালেও চমৎকার সব নকশা চোখে পড়ে।

সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার

মসজিদের বাইরে আল কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক একাডেমিক ভবন এবং ছাত্রাবাস যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার।মারিনিড রাজবংশের শাসনামলে ১৩৫৯ সালে গ্রন্থাগারটি সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। এই গ্রন্থাগারে মধ্যযুগের ২০ হাজারেরও বেশি বই রয়েছে, যেগুলো মূলত হাতে লেখা। এর মধ্যে চার হাজারের মতো 'দুর্লভ গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপি' অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা ইসলামী ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে গ্রন্থাগারের সংগ্রহে থাকা উল্লেখযোগ্য পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে রয়েছে: ইমাম মালিক ইবনে আনাস রচিত বিখ্যাত হাদিস সংকলন 'আল-মুওয়াত্তা'-র খণ্ডসমূহ, ইবনে ইসহাক রচিত 'আল-সিরাহ আন-নাবাওয়িয়্যাহ' বা ইসলামের নবী মোহাম্মদের জীবনী, ইবনে খালদুনের ঐতিহাসিক গ্রন্থ 'মুকাদ্দিমাহ ' ও 'আল- ইবারে'র মূল পাণ্ডুলিপি।

এছাড়াও লাইব্রেরিটিতে মুসলিমদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কুরআনের একটি প্রচীন পাল্ডুলিপি পাওয়া যায়, যা ১৬০২ সালে সুলতান আহমদ আল মনসুর গ্রন্থাগারটিতে দান করেছিলেন। ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে এই লাইব্রেরির সর্বশেষ সংস্কারের সময় ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপিগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য একটি অত্যাধুনিক গবেষণাগার নির্মাণ করা হয়। গ্রন্থাগারটিতে ষোড়শ শতাব্দীর একটি ভল্ট রয়েছে, যেখানে একটি দুর্ভেদ্য তামার দরজা আছে। সেই দরজায় চারটি তালা রয়েছে এবং এটি খুলতে চারজন চাবিধারীর প্রয়োজন হয়। 'দুর্লভ গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপিগুলো' ওই নিরাপদ ভল্টে সংরক্ষিত আছে।

সনদ প্রথা চালু

ফাতিমার হাতে প্রতিষ্ঠিত আল কারাওইনকে কেন্দ্র করে ফেজ হয়ে উঠতে থাকে আফ্রিকার ইসলামী শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও এখানে জ্ঞানার্জন করতে পারতো। তবে তাদের পড়ার জায়গা ছিল পুরুষদের থেকে আলাদা। এমনকি ফাতিমা নিজেও এখানে অধ্যয়ন করতেন বলে জানা যায়।

প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে মাদ্রাসাটি মূলত ইসলামী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিত। কিন্তু পরবর্তীতে ভাষাবিজ্ঞান, ব্যাকরণ, আইন, গণিত, সঙ্গীত, দর্শন, সুফিবাদ, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান পর্যন্ত এর পরিধি বিস্তৃত হয়। শুধু মুসলমান না, মধ্যযুগের অনেক খ্যাতিমান ইহুদি এবং খ্রিস্টান মনীষীও এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বেরিয়েছেন। এর ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন পোপ দ্বিতীয় সিলভাস্টার, যিনি এখান থেকে আরবি সংখ্যাপদ্ধতি বিষয়ে ধারণা লাভ করে সেই জ্ঞান ইউরোপে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকতার সাথে যুক্ত ছিলেন বিখ্যাত মালিকি বিচারপতি ইবনে আল-আরাবি, ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন এবং জ্যোতির্বিদ নূরুদ্দীন আল-বিতরুজি।

মরক্কোর ইতিহাসবিদ মোহাম্মদ আল-মানুনি'র মতে, আনুমানিক ১০৪০ থেকে ১১৪৭ সালের মধ্যে মাদ্রাসাটি উচ্চশিক্ষার একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যেখানে শিক্ষার্থীদেরকে যোগ্যতার ভিত্তিতে সনদ প্রদান করা হতো। বেশিরভাগ বেশিরভাগ ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা একমত হয়েছে যে, আল কারাউইয়্যিনই ছিল বিশ্বের প্রথম ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। ১৯৬৩ সালে একটি রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে একে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার উদ্যোগ গ্রহণ করে মরক্কো। ১৯৬৫ সালে আল কারাউইয়্যিন নামের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটি যুক্ত করা হয়।

বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় কারাওইন, ৮৫৯ সালে মরক্কোয় প্রতিষ্ঠা করেন ফাতিমা

Saturday, September 12, 2026

ইরান-সমর্থিত হুথিরা এগোচ্ছে ‘বিদ্যুৎ গতিতে’, বিস্মিত বিশ্লেষকরা

বিবিসি বাংলাঃ ইয়েমেনের উপকূলীয় সমতলভূমি তিহামাহর দক্ষিণাংশজুড়ে হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা অধিকাংশ বিশ্লেষককেই বিস্মিত করেছে। সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স নামে পরিচিত হুথিবিরোধী জোট ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলজুড়ে উল্লেখযোগ্য এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত।

কয়েক দিনের মধ্যেই এর বড় অংশ হুথিদের দখলে চলে গেছে।

কিছু হিসাব অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত বিদ্রোহীরা দেশের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলরেখার প্রায় ১৩০ কিলোমিটার (৮১ মাইল) দখল করেছে। এটি কয়েক বছরের মধ্যে গোষ্ঠীটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সামরিক সাফল্য। ১২ বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধ, সৌদি আরবের বিধ্বংসী বিমান হামলা এবং মার্কিন, ইসরাইলি ও ব্রিটিশ বাহিনীর আক্রমণ সত্ত্বেও হুথিরা যে এখনও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে টিকে আছে, সেটিই এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।

প্রতিপক্ষ যখন হতভম্ব ও মনোবলহীন, তখন অদূর ভবিষ্যতে হুথিদের সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। এখন তারা সেখানে অবস্থান নিয়েছে এবং তারা নিজেদের অবস্থান সুসংহত করবে, ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি বিবিসিকে বলেন। আর তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে দিতে খরচও অনেক বেশি হবে।

অবশ্য হুথিরা একা নয়।

ইয়েমেনের হুথিরা ইরানের সমর্থন পেয়ে থাকে এবং তথাকথিত অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স-এর অন্য অংশগুলো, অর্থাৎ লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজায় হামাস এবং সিরিয়ায় আসাদ সরকারের অভিজ্ঞ বিপর্যয় ও পরাজয়ের পর তেহরানের জন্য এই সমর্থন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তাই তারা হুথিদের জন্য তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে, আল-ওমেইসি বলেন।

এবং অবশ্যই তাদের সেই সমর্থন প্রয়োজন।

বেশিরভাগ বিশ্লেষকই একমত যে হুথিদেরকে কেবল ইরানের পুতুল হিসেবে বর্ণনা করা ভুল হবে। তবে গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ একটি অস্বস্তিকর নতুন বাস্তবতা সামনে এনেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যৌথ হামলা চালানোর সাত মাস পর, তেহরানের শাসকগোষ্ঠী এখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক পথের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব বিস্তার করছে। একটি হলো পারস্য উপসাগরের মুখে হরমুজ প্রণালি, অন্যটি হলো লোহিত সাগর (এবং সুয়েজ খাল)-এর প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দাব।

লন্ডনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষণা ফেলো ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেন, এখন ইরান সরাসরি এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের সবচেয়ে কৌশলগত দুটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ নিয়ন্ত্রণ করছে।

তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও তেল বাণিজ্যের ৩৫ শতাংশেরও বেশি এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এটি একটি পারমাণবিক বোমার বিপর্যয়ের সমপর্যায়ের প্রভাব হতে পারে।

যদি হুথিরা লোহিত সাগরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপেরও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে থাকে, যার মধ্যে রয়েছে পেরিম, যা বাব আল-মান্দাবের সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের মাঝখানে অবস্থিত, তাহলে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনে হস্তক্ষেপ করার তাদের সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।

গাজা যুদ্ধের পর ইসরাইলকে ঘিরে হুথিদের কর্মকাণ্ডই দেখিয়েছে যে, লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজ হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং ছোট আক্রমণকারী নৌযানের কাছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

এই ভৌগোলিক অগ্রগতি ছাড়াই তারা বাব আল-মান্দাব হয়ে সুয়েজের দিকে যাওয়া ও আসা জাহাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল, ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ আইওনা ক্রেগ শুক্রবার বিবিসি রেডিও ৪-এর টুডে অনুষ্ঠানে বলেন।

কিন্তু এখন তারা বাব আল-মান্দাবের ওপর সরাসরি নজরদারির সুযোগ থাকা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে, যা তাদের আরও বেশি প্রভাব দিচ্ছে। শুক্রবার বিকেলে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে হুথি সামরিক বাহিনী বলেছে, যেসব কোম্পানির জাহাজ সৌদি নয়, তাদের জন্য নৌ চলাচল নিরাপদ। তবে সৌদি জাহাজগুলো আগে থেকেই অবরোধের আওতায় রয়েছে। এই বক্তব্যের আন্তরিকতা নিয়ে শিপিং কোম্পানিগুলোর সন্দেহ থাকা স্বাভাবিক।

তাদের আগের হামলাগুলোতে হুথিরা বলেছিল তারা শুধু ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করছে। কিন্তু বাস্তবে তারা এমন জাহাজেও হামলা চালায় যার সঙ্গে ইসরাইলের কোনো সম্পর্ক ছিল না, যার মধ্যে একটি নরওয়েজীয় পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজও ছিল।

তবে ক্রেগ বলেন, হুথিরা হয়তো নির্বিচারে হামলা থেকে বিরত থাকতে পারে। কারণ তারা ২০২৫ সালের বসন্তে ছয় সপ্তাহব্যাপী বড় মার্কিন বিমান ও নৌ হামলা, 'অপারেশন রাফ রাইডার'-এর পুনরাবৃত্তি চাইবে না।

তিনি বলেন, তারা ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত প্রতিক্রিয়া অনুভব করেছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও জড়াতে চাইবে?

ইরানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ ইতোমধ্যেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করায় নতুন একটি সংঘাতমুখী পরিস্থিতি তার জনসমর্থন বা নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাবনাকে খুব একটা শক্তিশালী করবে বলে মনে হয় না।

অ্যাক্সিওস ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ চেয়ে করা আবেদনগুলো এখন পর্যন্ত সাড়া পায়নি।

অ্যাক্সিওস লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে ক্রমবর্ধমান সংঘাত নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং একদিকে সৌদি আরবকে সমর্থন জোরদার করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়া এড়াতে চাইছে।

তবে সৌদি আরবে উদ্বেগের কারণ শুধু বাব আল-মান্দাবের সম্ভাব্য হুমকি নয়।

সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে হুথিদের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার স্যাটেলাইট চিত্র ইঙ্গিত করে যে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প এই রুটকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

এর মধ্য দিয়ে ইরানের ইয়েমেনি মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও তাদের মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরান সরাসরি হামলার নির্দেশ না দিয়ে থাকলেও, এর সুফল যে তারা পাবে তা স্পষ্ট।

লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ও বিশ্লেষক বারাআ শাইবান বলেন, ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে বড় এই সংঘাত বৃদ্ধির সূত্রপাত জুলাই মাসে। তখন হুথিদের একটি প্রতিনিধিদল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া থেকে ফিরে আসে।

তিনি বলেন, এর পরপরই উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। এবং খুব স্পষ্টভাবেই মনে হয়েছে যে [ইরান] এখন লোহিত সাগরে আরও বড় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

ইয়েমেন যখন আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, সৌদি আরব যখন লোহিত সাগরে তার অর্থনৈতিক জীবনরেখা রক্ষায় উদ্বিগ্ন, এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দৃশ্যত এই সংঘাতে জড়াতে অনাগ্রহী, তখন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত নতুন এবং সম্ভাব্য বিপজ্জনক এক মাত্রা পেয়েছে।

আর ইয়েমেনের জনগণের জন্য, যারা ১২ বছরের গৃহযুদ্ধে বাস্তুচ্যুত, বিপর্যস্ত, ক্ষুধার্ত এবং দারিদ্র্যপীড়িত হয়ে পড়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলবে।

ছবি: সংগৃহীত।
ছবি: সংগৃহীত।

Wednesday, August 12, 2026

হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি: স্বাস্থ্য পরীক্ষার ক্ষেত্রে রুটিন চেকআপ কেন জরুরি? by নাগিব বাহার

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক মানুষ মারা যায় হৃদরোগ ও স্ট্রোকের কারণে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ মারা যায় হৃদরোগ ও স্ট্রোকের কারণে। প্রশ্ন আসে - একজন মানুষের কোন সময় হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তা কীভাবে অনুমান করা সম্ভব।
আপাতদৃষ্টিতে এই প্রশ্নের উত্তরটা সহজ - নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা করলেই মানুষের স্বাস্থ্যের সামগ্রিক চিত্রের একটি ধারণা পাওয়া সম্ভব।
কিন্তু কোন সময় ঠিক কোন পরীক্ষাটি করা উচিত? - সেটি কীভাবে নির্ণয় করা সম্ভব?
বিবিসি বাংলা'র সাথে এ বিষয়ে কথা বলার সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ শোয়েব মোমিন মজুমদার 'রুটিন চেকআপ' বা নিয়মমাফিক স্বাস্থ্যপরীক্ষার বিষয়ে কিছু খুঁটিনাটি তথ্য জানান।
মি. মজুমদারের মতে, স্বাস্থ্য পরীক্ষা মূলত দুই ভাবে হয়ে থাকে। যথা - রোগের লক্ষণভেদে স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা (বয়সভেদে শারীরিক পরিবর্তন বিচারে)।
বয়স ৪০ হওয়ার পর সাধারণত, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায় বলে মন্তব্য করেন মি. মজুমদার।
মি. মজুমদার বলেন, বাংলাদেশের মত দেশে শহুরে জীবনে সাধারণত যথেষ্ট পরিমাণ শারীরিক পরিশ্রম করা হয়ে ওঠে না যার ফলে ডায়বেটিস, হার্টের রোগ, স্ট্রোক, প্যারালাইসিসের ঝুঁকি বাড়ে এবং শরীরে কোলস্টোরেলের মাত্রা বেড়ে যায়।
"এ কারণে চল্লিশোর্ধ প্রত্যেক ব্যক্তির নিয়মিত কিছু রুটিন স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা উচিত।"
এরকম ক্ষেত্রে নিয়মিতভাবে কয়েকটি বিশেষ ধরণের পরীক্ষা করা উচিত বলে জানান মি. মজুমদার।

প্রাথমিকভাবে সবার যেসব স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা উচিত

"চল্লিশোর্ধ সব ব্যক্তির নিয়মিত বিরতিতে কয়েকটি বিশেষ পরীক্ষা করা প্রয়োজন", বলেন মি. মজুমদার।
"যেগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো রক্তের সিবিসি পরীক্ষা।"
হিমোগ্লোবিনসহ রক্তের অন্যান্য কণিকাগুলো সঠিক অনুপাতে আছে কিনা - তা দেখা হয় এই পরীক্ষার মাধ্যমে।
বয়স চল্লিশ পার হওয়ার পর ক্যান্সার বা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে যার প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে রক্তের হিমোগ্লোবিনের মাত্রায় তারতম্য দেখা দিতে পারে বলে জানান মি. মজুমদার।
এছাড়া রুটিন স্বাস্থ্যপরীক্ষার মধ্যে কিডনির 'ক্রিয়েটিনিন' পরীক্ষা এবং লিভারের 'এএলটি বা এসজিপিটি' পরীক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ।
আর বয়স চল্লিশ পার হওয়ার পর সাবরই ডায়বেটিস এবং কোলস্টোরেলের মাত্রা পরীক্ষা করানো উচিত বলে মন্তব্য করেন মি. মজুমদার।

দূষণজনিত রোগের সতর্কতা

মি. মজুমদার বলেন, ক্রমবর্ধমান মাত্রায় দূষণের কারণে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বিভিন্ন রকম রোগের আশঙ্কা বেড়ে যাচ্ছে।
"অতিমাত্রায় শব্দ দূষণের কারণে বয়সের সাথে সাথে অপেক্ষাকৃত তাড়াতাড়ি মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়ার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে।"
এছাড়া বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসকষ্টজনিত এবং ফুসফুসের রোগ বেড়ে যাওয়া, এমনকি ফুসফুসের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন মি. মজুমদার।
মি. মজুমদার বলেন, এরকম ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে রোগের লক্ষণ অনুমান করে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নেয়া উচিত।
ভেজালযুক্ত খাবার গ্রহণ করার কারণেও বিভিন্ন রকমের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বলে মন্তব্য করেন মি. মজুমদার। তাই সেবিষয়টিও বিবেচনায় রেখে নিয়মমাফিক স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা উচিত বলে মন্তব্য করেন মি. মজুমদার।
"তবে প্রাথমিক কয়েকটি পরীক্ষা বাদে অন্যান্য পরীক্ষার ক্ষেত্রে সবাইকেই রোগের লক্ষণ যাচাই করে স্বাস্হ্যপরীক্ষা করা উচিত।"

ধূমপানের ঝুঁকি

মি. মজুমদার বলেন, "ধূমপানের কারণে বিবিধ প্রকার রোগ হয়ে থাকে। তাই ধূমপায়ীদের অবশ্যই নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা উচিত।"
ধূমপানের কারণে খাদ্যনালী, জিহ্বা, ফুসফুস, বৃহদান্ত্রে ক্যান্সারের ঝুঁকিসহ মস্তিষ্কের রক্তনালী ব্লক হয়ে স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায় বলে জানান মি. মজুমদার।
"এছাড়াও ধূমপানের কারণে রক্তনালী ব্লক হতে পারে। হাত বা পায়ের রক্তনালী ব্লক হয়ে ঐ অঙ্গ অকেজো হওয়া থেকে শুরু করে অঙ্গহানিও হতে পারে।"
এসব কারণে স্বাস্থ্যপরীক্ষার বিষয়ে অধূমপায়ীদের চেয়ে ধূমপায়ীদের আরো বেশি নিয়মিত ও সচেতন হওয়া উচিত বলে মনে করেন মি. মজুমদার।
চিকিতসকদের মতে, চল্লিশোর্ধ ব্যক্তিদের নিয়মমাফিকভাবে কয়েকটি পরীক্ষা করা উচিত

Sunday, June 21, 2026

'বাবা' নিয়ে জনপ্রিয় পাঁচটি গানের গল্প by অর্চি অতন্দ্রিলা

'মা'কে নিয়ে যে পরিমাণে গান তৈরি হয়েছে বা যত পরিচিতি পেয়েছে, সে তুলনায় 'বাবা' নিয়ে গান সেভাবে কমই দেখা যায়। তবে আধুনিক সময়ে 'বাবাকে' নিয়ে তৈরি হওয়া বেশ কিছু গানই মানুষের মনে ছাপ ফেলেছে।

জনপ্রিয়তা, সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং দীর্ঘ দিন ধরে শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নেওয়ার মতো বিষয় বিবেচনায় কয়েকটি গান বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো।

এসব গান তৈরির পেছনের গল্প বা ইতিহাস সম্পর্কে কী জানা যায়?

'বাবা' - জেমস

বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে নগর বাউলখ্যাত জেমসের কণ্ঠে গাওয়া 'বাবা' গানটির অবস্থান অনেক এগিয়ে। "বাবা কতদিন, কতদিন দেখিনা তোমায়, কেউ বলেনা তোমার মত কোথায় খোকা ওরে বুকে আয়" এই গানটিকে বাংলাদেশের শ্রোতাদের কাছে বাবাকে নিয়ে সবচেয়ে আবেগঘন আধুনিক গানের একটি হিসেবেও দেখেন অনেকে।

গানটির গীতিকার এবং সুরকার প্রিন্স মাহমুদ একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ফারুক মাহফুজ আনাম বা জেমস নাকি এই গানটি গাইতেই আগ্রহী ছিলেন না। শিল্পী ও সুরকার তানভীর তারেকের সাথে একটি সাক্ষাৎকারে সেটি উল্লেখ করেন তিনি।

"রেকর্ডিং-এ জেমস ভাই গানটি শুনে… এই কয়েকদিন আগে মা বললাম, এখন কী বাবা... কেমন কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে প্রিন্স। তখন আমি বললাম জেমস ভাই, এটা গাইতে হবে। জেমস ভাই বলে কী, আরেকটা গান দে আমারে," সে সাক্ষাৎকারে বলছিলেন মি. মাহমুদ।

তখন স্টুডিওতে প্রয়াত শিল্পী হাসান আবেদুর রেজা জুয়েলও ছিলেন এবং প্রিন্স মাহমুদ তাকে বলার পর তখন তিনি গানটি গাইতে রাজি হন। "জুয়েল ভাই তখন 'বিদায় শব্দটা কেন এত যন্ত্রণাময়' এটা গেয়ে ফেলছে, তখন আমি জুয়েল ভাইকে বললাম আপনি বাবা গানটি গান, জেমস ভাইকে এটা দিয়ে দেই" বলছিলেন তিনি।

পরের দিন আবারও স্টুডিওতে আসেন তারা তিনজন। জেমস তখন 'বিদায় শব্দটা কেন এত যন্ত্রণাময়' গানটা শুনে রেকর্ডিং শুরুর ঠিক আগে আবার বাবা গানটা শুনতে চান। "এদিকে জুয়েল ভাই তো বাবা গানটা মোটামুটি বোধহয় তুলে ফেলছে, কিন্তু জুয়েল ভাই এত ভালো মানুষ ছিল… পরে জেমস ভাই এসে বলে ঠিক আছে এটাই গাই।"

নব্বই দশকের শেষদিকে এসে প্রকাশিত সেই গান এখনও বাবা দিবসের বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাবাকে স্মরণ করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। বাবাকে হারানোর বেদনা আর স্মৃতিমেশানো সেই গান অনেকের জন্য গভীর আবেগের কারণ হয়।

'আয় খুকু আয়' - হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তী মজুমদার

বাবাকে নিয়ে বাংলা গানের ইতিহাসে বড় সাড়া জাগানো গান 'আয় খুকু আয়'। গানটি প্রকাশের ৫০ বছর হয়েছে।

এর গীতিকার ছিলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুরকার ছিলেন পণ্ডিত ভি. বালসারা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও শ্রাবন্তী মজুমদারের কণ্ঠে গানটি জনপ্রিয়তা পায়।

গানটি পরবর্তীতে আরও অনেকেই নতুন করে গেয়েছেন। কিন্তু সত্তরের দশকের সেই গানটিই আবেদন ধরে রেখেছে মানুষের মনে।

গানটি মূলত শ্রাবন্তী মজুমদারের অ্যালবামের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এর সুরকার ভি. বালসারার প্রাথমিকভাবে গানটি পছন্দ হয়নি, কারণ এতে কিছু ইংরেজি শব্দ বা আধুনিক ধাঁচের রূপ ছিল সেটার তেমন প্রচলন সেসময় ছিল না; কলকাতার ডিডি বাংলার এক সাক্ষাৎকারে এভাবে বর্ণনা করেছিলেন মিজ মজুমদার।

তার আগ্রহেই সুরকার বালসারা রাজি হন এবং তিনি চেয়েছিলেন গানটি তার সাথে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গাইবেন। তারা একসাথে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কাছে যান।

"আমার বুক দুরু দুরু করছে যদি হেমন্তদা বলেন আমি করবো না… হেমন্তদা পড়েই বললেন- আমি গাইবো" বলেন মিজ মজুমদার।

তিনি ভি. বালসারাকে অনুরোধ করেন যেন সুরটা খুব 'সিম্পল ও মনোটনাস' হয় যেন সবাই সহজে গাইতে পারে।

এরপর বাধা হয়ে দাঁড়ালো গানটা লম্বা হয়ে যাওয়া।

"গানটা এত বড়, আমাদের তো তখন সাড়ে ছয় মিনিটের বেশি করা যাবে না। তো মি. বালসারা, আমি আর পুলকদা গেলাম হেমন্তদার কাছে। মি. বালসারা গিয়ে বললেন যে হেমন্তদা, যদি শেষের দুটা ভার্স (লাইন) বাদ দিয়ে দেওয়া যায় তাহলে গানটা ঠিকমতো মিউজিকে আসে"।

এভাবে বেশ অনেকগুলো সাক্ষাৎকারেই বর্ণনা করেন মিজ মজুমদার।

তার ভাষায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন "গানের ওই ভার্স যদি বাদ দাও তাহলে আর গানটা দাঁড়ায় না, তুমি তোমার মিউজিক বাদ দিয়ে দাও, ফেলে দাও। এই দুটো ভার্স থাকতেই হবে"।

পরে সেসব রেখেই মিউজিক কম্পোজ করেন মি. বালসারা।

সেসময় গানের রেকর্ডিং এখনকার মতো বারবার করার সুযোগ ছিল না। সবাই মিলে একসাথে এক-দুইবারে যেমন হয়। এইটা তিনবার রেকর্ড করা হয়েছিল।

পরবর্তীতে গানটি পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে ব্যাপক পরিচিতি পায়।

'বাবার মুখে শুনেছিলাম গান' - এন্ড্রু কিশোর

"আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান, সেদিন থেকে গানই জীবন, গানই আমার প্রাণ" গানটি ১৯৮৪ সালের নয়নের আলো চলচ্চিত্রের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

গানটির সুরকার ও গীতিকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল এবং গেয়েছিলেন এন্ড্রু কিশোর।

নয়নের আলো চলচ্চিত্রের শুধু এই গানটিই না, প্রায় সবগুলো গানই ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। যেমন আমার বুকের মধ্যেখানে, আমার সারা দেহ খেও গো মাটি, আমি তোমার দুটি চোখে দুটি তারা হয়ে থাকবো, এমন বেশ কিছু গান।

প্রয়াত আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ২০১৪ সালে বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এই চলচ্চিত্রের গানের কাজ পাওয়া 'হিমালয় পর্বতের চূড়ায় ওঠা'র মতো ছিল।

সেসময় অনেকের মাঝে বসিয়ে কড়া মন্তব্যের মুখে তাকে পড়তে হতো বলছিলেন তিনি।

"ঐ সময় তো সাউন্ডপ্রুফ রুম ছিল না, আমার বাসায় বসে বসে টিউন করতাম, ক্যাসেট রেকর্ডারে গানগুলো ধারণ করতাম। তো কখন মুরগি ডাকলো কখন কুকুর ডাকলো সেটা আমি শুনতে পেতাম না। ওরা ঠিকই গান শুনতে গিয়ে বলতো, এই মুরগী ডাকলো কেন, কুকুর ডাকলো কেন? গান আবার ঠিক করে নিয়ে আসো। এটা করতে করতে আমার জীবন বার হয়ে গেছে, এটা আমার মনে পড়ে" বলেছিলেন তিনি। আগে দেশাত্মবোধক গান করলেও নয়নের আলো'র জন্য গান তৈরিকে নিজ ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট বলে জানান তিনি।

সুরকার ও সংগীত পরিচালক ইমন সাহা বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ক্যারিয়ারের প্রথম দিককার সময়ে মি. বুলবুল তার বাবা সত্য সাহার কাছ থেকে নানা ধরনের পরামর্শ নিতেন।

"বাবা বলছে দেখ, যেটাই, করিস না কেন, আমাদের গ্রামীণ অডিএন্সটাকে, মাথায় রাখিস। ফিল্মের অডিএন্স কিন্তু গ্রামের অডিএন্স, ফোক বেজ যদি কিছু করিস তাহলে দেখবি যে জিনিসটা খুব সহজে মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে। নয়নের আলো ছবির গানগুলি শুনলেই বুঝবেন যে কোথায় জানি, একটা মাটির গন্ধ আছে" বলছিলেন ইমন সাহা।

ব্যক্তিগতভাবে বাবা নিয়ে নয়নের আলো চলচ্চিত্রের গানটি ছোটবেলা থেকেই গুনগুন করে গাইতেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সরাসরি বাবা নিয়ে না, কিন্তু

এমন বেশ কিছু গান রয়েছে যেগুলো ঠিক বাবাকে নিয়ে গান না, কিন্তু মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিত। এর মাঝে প্রথমেই থাকবে মান্না দের 'তুই কি আমার পুতুল পুতুল সেই ছোট্ট মেয়ে' যেটি মেয়েকে নিয়ে বাবার গান।

গানটি নিয়ে মান্না দে তার আত্মজীবনী 'জীবনের জলসা ঘরে' বইতে উল্লেখ করেছেন, গীতিকার মিল্টু ঘোষের লেখা গানটি সুপর্ণকান্তি ঘোষকে গানটি সুর করতে বলেছিলেন তিনি সঙ্গীত পরিচালক নচিকেতা ঘোষের ছেলে সুপর্ণকান্তিকে তিনি খোকা বলতেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেই খোকার গানটির কথা সেভাবে পছন্দ হয়নি। কিন্তু সেটা অবিবাহিত তরুণ খোকার জন্য স্বাভাবিক বলেই বর্ণনা করেন তিনি।

"মেয়েকে বিদায় দেওয়ার নাড়ী-ছেঁড়া অসহ্য যন্ত্রণার সে অভিজ্ঞতা আমার আছে। দু'-দু'বার সেই নাড়ী-ছেঁড়া যন্ত্রণায় কেঁদেছি আমি। তাই আমি জানি ভাষাটা সত্যিই মনের কথা থেকেই হয়েছে" মান্না দে লেখেন।

দুই জন কন্যাসন্তানের পিতা হিসেবে মান্না দে'র মন ছুঁয়েছিল সেই গান।

আরেকটি 'গান বাবা বলে গেল আর কোনোদিন গান করো না' যেটি লিখেছেন আমজাদ হোসেন, সুর করেছেন আলাউদ্দিন আলীর ও গেয়েছেন শামীমা ইয়াসমিন দিবা। বাবার শাসন থেকে শুরু হওয়া এই গানটির মূল থিম অবশ্য 'গান গাওয়া', বাবা নয়। তবে 'জন্ম থেকে জ্বলছি' চলচ্চিত্রের এই গানটি অনেক বেশি পরিচিত।

বাবা তুমি আমার বেঁচে থাকার কারণ - তানভীর ইভান

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব পরিচিত হয়ে ওঠা গান 'বাবা তুমি আমার বেঁচে থাকার কারণ, বলো তোমার মতো করবে কে শাসন'। পিরান খানের সুরে গাওয়া এই গানটি মূলত 'আপন' নামের একটি নাটকের জন্য গাওয়া হয়েছিল।

এনিয়ে শিল্পী তানভীর ইভান দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে বলেন নাটকটির "পরিচালক অমি ভাই পিরানকে ফোন করে বলেন, বাবাকে নিয়ে একটা গান লাগবে। পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর আমরা বসে গানটা তৈরি করি। তানজিব সৌরভের লেখা কথায় সুর করেন পিরান। মেহেদীবাগের (চট্টগ্রাম) স্টুডিওতে গানটা তৈরি করি"।

এই গানটির ব্যাপক পরিচিতি পাওয়া ছাড়াও গানটি শুনে মি. ইভানের বাবা-মা আবেগে কেঁদেছেন, সেটা তার জন্য একটা বড় পাওয়া।

আরও অনেক গানই আছে বাবা নিয়ে যেগুলো মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছে। যেমন গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা সৈয়দ আব্দুল হাদীর গাওয়া 'বাবার কথা মনে পড়ে,' আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠে 'বাবা তোমার কথা মনে পড়ে' আসিফ আকবরের 'বাবা নেই', গীতিকবি মিল্টন খন্দকারের 'আমি যাচ্ছি বাবা' (গেয়েছেন ঝিনুক) বা 'বাবা তোমার ছেলে আজ বড় হয়েছে' (গেয়েছেন মনির খান), এমন অনেক গানই রয়েছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে 'জংলি' চলচ্চিত্রে প্রিন্স মাহমুদের পরিচালনায় 'বাবা তোমায় ছাড়া' গানটিও বেশ পরিচিতি পেয়েছে।

বাবা সন্তানের প্রতীকী ছবি

Wednesday, June 17, 2026

ইরান কেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিকে বিজয় হিসেবে দেখছে

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হতে যাওয়া সমঝোতা স্মারককে কোনো ধরনের পিছু হটা নয়, বরং প্রতিরোধ ও বিজয়ের ফলাফল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে ইরানের নেতৃত্ব। তবে, এই যুক্তি দাঁড় করানো সহজ নয়।

দেশটি সদ্য একটি যুদ্ধ পার করেছে, যার ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, অর্থনীতি তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠীর একটি অংশ কয়েক মাস ধরেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতার বিরুদ্ধে কথা বলে আসছে।

দেশের ভেতরে ও বাইরে এমন ইরানিরাও রয়েছেন, যারা এই সংকটকে কূটনীতির মুহূর্ত নয়, বরং শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখেন।

এই বিভক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই তেহরান এখন এই চুক্তিটি গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করছে।

ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা চুক্তিটিকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। পার্লামেন্টের স্পিকার এবং আলোচনায় প্রধান ইরানি ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এটিকে চূড়ান্ত বিজয়ের পথে একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই সমঝোতাকে 'সম্ভাব্য রূপান্তরকারী' হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ইরানের বহু সমস্যা সমাধান হতে পারে এবং ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে ‘এক ভিন্ন পৃথিবী তৈরি করতে পারে’।

গালিবাফের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাকে পেজেশকিয়ানের মধ্যপন্থি শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে দেখা হয় না; তার প্রকাশ্য সমর্থন ইঙ্গিত দেয় যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আরও শক্তিশালী অংশ, এমনকি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসের ভেতরেও এই চুক্তির পক্ষে সমর্থন আছে।

তেহরানের নেতৃত্ব এই চুক্তিকে বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করছে আরেকটি কারণেও। তাদের যুক্তি হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের প্রধান লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারেনি।

তারা ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি, ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারেনি, সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে পারেনি এবং হিজবুল্লার সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারেনি।

বরং, ইরান এখনো আলোচনার টেবিলে রয়েছে, লেবাননকে কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।

তবে সরকারের এই বর্ণনা ইরানের ভেতরেই বিতর্কের মুখে পড়েছে।

কট্টরপন্থি একজন সংসদ সদস্য, যিনি ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির ডেপুটি চেয়ারম্যান, তিনি খসড়া চুক্তিটিকে এমন একটি নথি হিসেবে অভিহিত করেছেন বলে জানা যাচ্ছে, যা ইরানকে মার্কিন 'উপনিবেশে' পরিণত করবে।

এই সমালোচনা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বাইরের কোনো উৎস থেকে আসেনি, বরং এটি এসেছে জাতীয় নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেই।

গত কয়েক মাস ধরে পার্লামেন্টের কট্টরপন্থি সদস্যরা, রাষ্ট্র-সমর্থিত গণমাধ্যম এবং সরকারপন্থি নিয়মিত সমাবেশগুলোতে বারবার বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করা যায় না।

তাদের যুক্তি, যুদ্ধ শুরুর অল্প আগে পর্যন্তও কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল, আর ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি আড়াল করতে আলোচনাকে ব্যবহার করেছে। তাদের দৃষ্টিতে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো চুক্তি আপসকামিতার পরিচয় হিসেবে দেখা হতে পারে।

তবে এখন এসব কট্টরপন্থি কণ্ঠগুলোকে কিছুটা নীরব দেখা যাচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে যে চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনুমোদিত হয়েছে। তার মানে এই নয় যে পূর্ণ ঐক্য রয়েছে।

ইরানের নেতৃত্ব চুক্তিটিকে সামরিক চাপের ফলাফল হিসেবে তুলে ধরতে পারে—যেমন হরমুজ প্রণালি ঘিরে চাপ বা যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক জ্বালানি স্বার্থে হামলা।

কিন্তু অর্থনৈতিক বিষয়গুলোও তেহরানকে বাধ্য করেছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ, তেলবাজার ও বৈদেশিক মুদ্রায় সীমিত প্রবেশাধিকার, এবং অত্যন্ত উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি—সব মিলিয়ে দেশ ও সাধারণ মানুষকে চাপে ফেলেছে।

ইরানের অনেক পরিবারের প্রশ্ন হলো- চুক্তিটি বিজয়ের মতো শোনাচ্ছে কি না, তা নয়; বরং এটি দাম কমাবে কি না এবং আরেক দফা যুদ্ধের আশঙ্কা কমাবে কি না সেটি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ইরান সরাসরি করদাতাদের অর্থ পাবে না, তবে যদি তারা তাদের অঙ্গীকার পূরণ করে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়, তাহলে তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রবেশাধিকার পেতে পারে।

এতে তেহরান চুক্তিটিকে আমেরিকার ওপর নির্ভরতা নয়, বরং বিনিয়োগ ও পুনর্গঠনের পথ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।

তবুও ঝুঁকি স্পষ্ট। সমঝোতা স্মারকের বিস্তারিত এখনও পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলো- ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ, অনুমোদিত সমৃদ্ধির মাত্রা, যাচাই-বাছাই, নিষেধাজ্ঞা শিথিল, হরমুজ প্রণালি ও লেবানন- এগুলো এখনো আলোচনার বাকি। সেই সাথে ইসরায়েল নিয়ে অনিশ্চয়তাও রয়েছে।

দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েল প্রত্যাহার করবে—এমন প্রতিবেদনের বিরোধিতা করে বলেছেন, যতদিন প্রয়োজন, ততদিন ইসরায়েলি বাহিনী সেখানে থাকবে।

এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে লেবাননে ইসরায়েলের কার্যকলাপের সমালোচনা করে বলেছেন সেখানে অনেক মানুষ নিহত হয়েছে।

তিনি আরও বলেছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ঠিক আগে বৈরুতে ইসরায়েলি হামলায় তিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন, তবে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার সম্পর্ক "চমৎকার" বলেই দাবি করেছেন।

তেহরানের জন্য ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের এই দৃশ্যমান টানাপড়েন কাজে লাগে।

এটিকে এমন প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায় যা ইরানের চাপ ইসরায়েলের কার্যক্রমের স্বাধীনতাকে জটিল করেছে। তবে এটিই চুক্তিটিকে ভঙ্গুরও করে তুলেছে।

যদি ইসরায়েল লেবাননে অভিযান চালিয়ে যেতে থাকে, তাহলে ইরানকে প্রতিক্রিয়া জানানোর চাপের মুখে পড়তে হবে।

যদি ইসরায়েল লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখে, তাহলে ইরানের ওপর পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখানোর চাপ বাড়বে। আর যদি ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে সংযত রাখতে না পারে, তাহলে লেবানন এই সমঝোতার আওতায় রয়েছে, তেহরানের এই দাবি খুব দ্রুতই পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।

বিবিসি পার্সিয়ানের পাঠক-দর্শকদের প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, সরকার যে 'বিজয়ের' বর্ণনা তুলে ধরছে, তা সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি।

সেখানে একজন বলেছেন, আরেকটি ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কায় তিনি খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন, কিন্তু চুক্তির কথা শোনার পরও তার "কোনো আস্থা নেই" এবং চুক্তি টিকে থাকলে দেশ সঠিকভাবে পরিচালিত হবে কি না তা নিয়ে তিনি চিন্তিত।

আরেকজন সরকারবিরোধী ইরানি, যিনি শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করেছিলেন, তিনি জানতে চান- যদি এতে ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তন না আসে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় কী লাভ হলো।

"আমাদের আশা ছিল শাসনব্যবস্থা বদলাবে। কিন্তু কষ্ট, মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনীতির আরও ক্ষতি ছাড়া মানুষের কী উপকার হয়েছে?"

তবে অনেকে আবার সরকারের অবস্থানের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল ছিলেন।

একজন দর্শক ইরানকে বিজয়ী আখ্যা দিয়ে বলেছেন, "ভিক্ষা" নয়, বরং শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সম্ভব- এটি এই যুদ্ধ দেখিয়েছে।

আরেকজন আরও সতর্কভাবে চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এতে মানুষ কিছুটা স্বস্তি নিয়ে কাজে ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।

"আমার মনে হয় এটি অস্থায়ী। তবে কিন্তু আমাদের কয়েক মাসের জন্য দম নেওয়ার সুযোগ এবং শান্তি প্রয়োজন ছিল। সম্ভবত এটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন"।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র চুক্তিটিকে বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে, কারণ এটিকে সহজে প্রয়োজনীয়তা হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব নয়। কিন্তু অনেক ইরানির কাছে এর সাফল্য স্লোগানে নির্ধারিত হবে না।

বরং পরিমাপ হবে- যুদ্ধ থামে কি না, পণ্যমূল্য কমে কি না, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয় কি না, এবং নেতৃত্ব আরেক দফা আকস্মিক উত্তেজনা ছাড়া পরবর্তী পর্যায় সামাল দিতে পারে কি না। -আমার দেশ থেকে নেওয়া বিবিসি বাংলার খবর

ইরান কেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিকে বিজয় হিসেবে দেখছে

Tuesday, March 24, 2026

ইরান যুদ্ধ : পানি কি হয়ে উঠেছে যুদ্ধের অস্ত্র? by নিক এরিকসন

প্রাকৃতিক সম্পদ ফুরিয়ে যাওয়া নিয়ে সংঘাতের মতো দুঃস্বপ্নের কাহিনি সিনেমায় বা গল্পে পড়ি আমরা। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের যুদ্ধ যতই নিবিড় হচ্ছে, ততই যেন ওই গল্প বা সিনেমার দৃশ্যগুলোর কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে রূঢ় বাস্তবটা।

এই যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল তেলকে কেন্দ্র করে। এই অঞ্চলে বহু দিন ধরে পশ্চিমা হস্তক্ষেপের কারণ হয়ে থেকেছে ওই তেল।

তবে এখন যুদ্ধের পরিধি যত বিস্তৃত হচ্ছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোও জড়িত হয়ে পড়ছে, এরকম পরিস্থিতিতে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলছেন, আরেকটি নাজুক প্রাকৃতিক সম্পদও সংঘাতের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তা হলো জল বা পানি।

বিশ্বের মাত্র ২% মিষ্টি পানির সরবরাহ রয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলে। তাই সমুদ্রের পানিকে লবণ-মুক্ত করার ওপরেই এই অঞ্চলকে খুব বেশি নির্ভর করতে হয়। জ্বালানি তেল শিল্প ১৯৫০ সালের পর থেকে যত এগিয়ে গেছে, তার সঙ্গেই চাপ পড়েছে মিষ্টি পানির সীমিত সরবরাহের ওপরে।

ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস্ জানাচ্ছে, কুয়েতের ৯০% পানি আসে লবণ-মুক্ত করার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ওমানে ৮৬%, সৌদি আরবে ৭০% আর সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪২% মিষ্টি পানিই ওই প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে আসে।

ওমানের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট, ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার সায়েন্সের ড. উইল লা কেন বিবিসির নিউজডে অনুষ্ঠানে বলেছেন, "উপসাগরীয় অঞ্চলের লবণ-মুক্তকরণ কারখানাগুলি ২০২১ সালে প্রতিদিন মোট দুই কোটি কিউবিক মিটার (এক কিউবিক মিটার, এক হাজার লিটারের সমান) পানি টেনে নিত। এই পরিমাণ পানি দিয়ে অলিম্পিক্স মানের আট হাজার সুইমিং পুল ভর্তি করা যাবে।"

পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে কেন লক্ষ্যবস্তু করছে ইরান?

এই অঞ্চলের কৃষি আর খাদ্য উৎপাদনও লবণ-মুক্তকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরবরাহ করা পানির ওপরে নির্ভর করে, কারণ, যে ভূগর্ভস্থ পানি আগে সেচের কাজে ব্যবহার করা হত, সেই জল-স্তর অনেক নীচে নেমে গেছে।

এজন্যই পানি সরবরাহের পরিকাঠামো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র আর ইরান – উভয়ই চাইছে এটা ব্যবহার করতে।

বিশ্লেষকরা বলছেন যে, সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলকে মোকাবিলা করার থেকে বরং সংঘাতের পরিধি নানা ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে তেহরান। পানি সরবরাহের অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভবত ইরানের সেই কৌশলেরই অংশ, যদিও বলা হচ্ছে যে এগুলো প্রতিশোধ নেওয়া।

কাতারের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মার্ক ওয়েন জোনস্ বলছেন, "যদি উপসাগরীয় অঞ্চলের সরকারগুলো দেখে যে তাদের পানি সরবরাহের অবকাঠামোর ওপরে হামলা হচ্ছে, তাহলে এটা খুবই সম্ভব যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপরে যুদ্ধ শেষ করার জন্য চাপ তৈরি করবে। ইরানের হামলাগুলোর লক্ষ্য হচ্ছে একটা আতঙ্ক তৈরি করা, যাতে বেসামরিক নাগরিকরা "থাকবেন না পালাবেন", সেই সিদ্ধান্তের ওপরে প্রভাব বিস্তার করা যায়।

সমুদ্রের পানি লবণ-মুক্তকরণ কারখানায় হামলা

বাহারাইন ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে যে তাদের একটি লবণ-মুক্তকরণ কারখানার ওপরে সরাসরি হামলা করা হয়েছে। তবে ইরান পাল্টা জবাবে বলেছে যে যুক্তরাষ্ট্র আগে হরমুজ প্রণালীর কেশম্ দ্বীপের একটি পানি কারখানায় হামলা চালিয়ে ক্ষতি করে দিয়েছিল।

দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরে ইরান যে হামলা চালায়, তার কাছেই অবস্থিত রয়েছে বিশ্বের অন্যতম সব থেকে বড়ো পানি লবণ-মুক্ত করার কারখানাটি।

আবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাতেও একটি পানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে আগুন ধরে গিয়েছিল। যদিও কর্মকর্তারা বলছেন যে ওই কারখানাটি আংশিকভাবে সচল আছে।

কুয়েতের দোহা ওয়েস্ট কারখানাটিরও ক্ষতি হয়েছে, যদিও সেখানে সরাসরি হামলা হয়নি। কাছাকাছি বন্দরে ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হলে সেখানকার ধ্বংসাবশেষ উড়ে এসে কারখানাটিতে আছড়ে পড়ে।

ইউনাইটেড নেশনস্ ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর ওয়াটার, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হেল্থের প্রধান, অধ্যাপক কাভেহ্ মাদানি বিবিসিকে বলেছেন, "ইরানের জন্য এটা একটা সংকেত দেওয়ার কৌশল।"

ইরান অবশ্য যে কোনো হামলাকেই তাদের ওপরে হামলার জবাব আখ্যা দিয়ে সেগুলিকে 'ন্যায়সংগত' বলে দাবি করছে। বিশেষত কেশম্ দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বদলা যে বাহারাইনে তাদের জবাবি হামলা, সেটাও বলেছে ইরান।

গুরুত্বপূর্ণ পানি সরবরাহের অবকাঠামোর ওপরে চালানো হামলা থেকে বোঝা যায় যে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের জবাব দিতে ইরান কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে।

তবে অধ্যাপক মাদানি মনে করেন, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু হিসাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের বহুমূল্য পানি সরবরাহ অবকাঠামোর ওপরে দীর্ঘস্থায়ী আক্রমণ করতে পারে, এই আতঙ্ক জিইয়ে রাখাতেই ইরানের শক্তি। এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে নিশ্চিতভাবে তারা এ ধরনের হামলা চালাবে।

তার কথায়, "ঐতিহাসিকভাবে, পানি সবসময়েই হুমকি দেওয়ার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে।"

মার্কিন ঘনিষ্ঠ দেশগুলিতে পানি-নিরাপত্তা কি নড়বড়ে?

মি. মাদানি বলছিলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে পানি লবণ-মুক্তকরণ কারখানাগুলোতে সরাসরি আর সুস্পষ্ট হামলার ব্যাপারে তেহরান যে দৃশ্যত কিছুটা সাবধানতা আর সংযম দেখাচ্ছে, তা সম্ভবত জেনেভা কনভেনশনের ৪৫ নম্বর ধারার কারণে। আবার তাদের নিজেদের হামলাগুলিকে যাতে জবাবি হামলা বলে চালানো যায়, সেই প্রচেষ্টাও আছে।

"আইন বলছে যে বেসামরিক স্থাপনায় আক্রমণ করা যায় না, তবে শুরু তো ইরান করেনি। আব্বাস আরাঘচির সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে সেটাই তো লেখা হয়েছে," ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গিটা নিজের কথায় বলছিলেন মি. মাদানি।

কেশম্ দ্বীপে হামলার ঘটনাটিকে মি. আরাঘচি "এক বিপজ্জনক প্রচেষ্টা, যার পরিণতি হবে গুরুতর…নির্লজ্জ এবং মরিয়া হয়ে যাওয়া অপরাধ"। তিনি এও লিখেছিলেন যে ওই হামলায় অনেকগুলি গ্রামে পানি সরবরাহ সীমিত হয়ে গেছে।

দীর্ঘস্থায়ী হোক বা না হোক, এই ঘটনাগুলিই প্রমাণ করে যে জল-নিরাপত্তার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলির অবস্থা কতটা নড়বড়ে। দুর্বলতা ইরানেরও আছে, তবে মি. মাদানি বলছিলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রতিবেশী দেশগুলির তুলনায় ইরানের পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র আছে, তারা লবণ-মুক্তকরণ প্রক্রিয়ার ওপরে অনেকটা কম নির্ভরশীল।

তবুও অন্যান্য পর্যবেক্ষকরা বলছেন গুরুত্বপূর্ণ পানি সরবরাহের পরিকাঠামোর ওপরে উপসাগরীয় অঞ্চলে যে হামলা চালিয়েছে ইরান, এবার তাদের দেশের পরিকাঠামোর ওপরেও পাল্টা আক্রমণের সম্ভাবনা নিজেরাই তৈরি করেছে।

বেশ কিছুদিন যাবৎ ইরান এক 'চূড়ান্ত জলের আকালের' মুখোমুখি হচ্ছে। কম বৃষ্টিপাত, "রাজধানীর শতাব্দী প্রাচীন জল সরবরাহ ব্যবস্থায় ফুটো হয়ে যাওয়া" এবং ইসরায়েলের সঙ্গে গত বছরের '১২ দিনের যুদ্ধ' – সব মিলিয়েই এই ঘাটতি, জানিয়েছেন শক্তি মন্ত্রী আব্বাস আলিয়াবাদি।

দেশের বিভিন্ন জায়গায় বাঁধগুলির অবস্থা ইতোমধ্যেই 'উদ্বেগজনক অবস্থায়' আছে, বলছিলেন ইরানের ন্যাশানাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট অ্যান্ড ড্রট ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের আহমাদ ভাজিফেহ্। যে-সব বড়ো ভূগর্ভস্থ শিলাস্তরে জল পাওয়া যায়, সেখান থেকে অতিরিক্ত পানি তুলে নেওয়া হয়েছে, জায়ানদেহ্ রু দর মতো নদীগুলি হ্রাস পেয়েছে আর লেক উর্মিয়া ব্যাপকভাবে ছোট হয়ে এসেছে।

ফ্রেড পিয়ার্সের মতো পরিবেশবিদরা বলছেন যে অনেক দশক ধরে বাঁধ নির্মাণ, পানি নির্ভর কৃষিকাজ আর অব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে আরও ঘোরালো করে তুলেছে। কোনো এলাকায় তো ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এত বেশি পরিমাণে হয়েছে, যে মাটি বসে যাওয়ার মতো গুরুতর ঘটনাও ঘটেছে।

সরকারি কর্মকর্তারা তো এমন হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন যে একদিন হয়ত তেহরানেও নিয়ন্ত্রণ চালু করতে হবে বা আংশিকভাবে শহর খালি করে দিতে হবে।

ইরানের সঙ্গে প্রতিবেশীদের পানি নিয়ে যেসব বিবাদ

গবেষকদের একাংশ মনে করেন যে এই সমস্যাটা একদিকে যেমন পরিবেশগত ভাবে, তেমনই জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকেও হুমকি। এর ফলে ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতাবস্থার ওপরে যেমন প্রভাব পড়বে, তেমনই দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও প্রভাবিত হবে। এর ওপরে তো যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহের তুমুল সংঘাত পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তুলেছে।

যুদ্ধের আগেই পানির অভাব ইরানে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছিল। খুজেস্তান, ইশফাহান সহ অন্যান্য জায়গায় বিক্ষোভের সময়ে আরও বিভিন্ন বৃহত্তর ইস্যু, যেমন জীবনযাত্রার খরচ এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইত্যাদির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল পানির সংকটও।

পানি নিয়ে ইরানকে যে-সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তার মাঝেই এসেছে আঞ্চলিক উত্তেজনা। হেলমন্দ নদী নিয়ে আফগানিস্তানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের বিরোধ চলছে, আবার টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীগুলির ওপরে বাঁধ নির্মাণ নিয়ে তুরস্কের সঙ্গে সমস্যা আছে। অন্যদিকে ইরাকের সঙ্গে অভিন্ন জলপথ নিয়েও ইরানের বিরোধ আছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের পানি সরবরাহ যে কতটা ভঙ্গুর অবস্থায় আছে, তা এই যুদ্ধের ফলে সামনে এলো। এছাড়াও পানি সরবরাহ যে সংঘাতের সময়ে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, সেই দিকটাও উন্মোচিত হলো। তেল আর গ্যাসের মজুতের মতো কারণগুলির সঙ্গেই পরিবেশগত চাপও এখন সংঘাতের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে।

ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের সংঘাতগুলি শুধুই আর তেল বা গ্যাসের পাইপলাইন বা জ্বালানিবাহী জাহাজের ওপরে নির্ধারিত হবে না। তার সঙ্গেই নদী, ভূগর্ভস্থ পানির আধার আর পানি লবণ-মুক্তকরণ কারখানা নিয়েও সংঘাত বাঁধবে। তা চলতি সংঘাতের ক্ষেত্রে যেমন বাস্তব, তেমনটাই ভবিষ্যতেও।

হতে পারে পানি হয়ত তখন তেলের থেকে ভারী হয়ে উঠবে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কি এবার পানীয় জলের সংঘাতের দিকে এগোবে?
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কি এবার পানীয় জলের সংঘাতের দিকে এগোবে?


Saturday, January 24, 2026

আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন কীভাবে অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে? by আবুল কালাম আজাদ

বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়াই চলছে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি।

২০১৪ সাল থেকে একাধারে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর আবারো সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া আসন্ন নির্বাচনটি শেষ পর্যন্ত কতটা অংশগ্রহণমূলক হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বাংলাদেশে পর পর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্যে ২০১৪ আর ২০২৪ সালে বিএনপি ও জামায়াত অংশ না নেয়ায় একতরফা নির্বাচন হয়েছে।

আর আঠারো সালের নির্বাচনকে সমালোচকেরা বলে থাকেন রাতের ভোট। আসন্ন নির্বাচনও সব দলের অংশগ্রহণে হচ্ছে না।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে সেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেনা ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগ এবং তাদের জোটের শরিক মিত্র দলগুলোর কয়েকটি।

এই নির্বাচনে মূলত অংশ নিচ্ছে গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তি বিশেষ করে ২০১৪ এবং ২৪ সালের ভোটে অংশ না নেয়া আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াত।

ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ রয়েছে। নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধনও বাতিল করে দিয়েছে।

এ অবস্থায় দলটি ভোটে অংশ নিতে না পারলেও বিতর্কের কিছু নেই বলে মনে করে আওয়ামী বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের দৃষ্টিতে এই নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক হবে।

দুই জোটের অবস্থান

ছাব্বিশের নির্বাচনটিও ভবিষ্যতে কারো কারো কাছে একতরফা হিসেবে মূল্যায়ন হবে। তবে জাতীয় নির্বাচনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা দুই জোটের নেতারা মনে করেন, সর্বস্তরের ভোটার, বৈধ দল ও প্রার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলেই হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছেন, ভোটার উপস্থিতির মাধ্যমেই আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে।

বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, "অংশগ্রহণমূলক বলতে আমরা বুঝি ভোটারদের অংশগ্রহণ। পার্টিকুলার কোনো দলের নয়।

"নির্বাচনটা অনুষ্ঠিত হয় একটা আইনের ভিত্তিতে। দেশে ইলেকশন কমিশন আছে, একটা নির্বাচনী আইন আছে সাংবিধানিক একটা বিধি আছে। আপনারা দেখবেন সেই আইনের ভিত্তিতে যারা যারা যোগ্য হবেন, আইনের মধ্যে যারা থাকবেন- তারা ইলেকশন করবেন, দ্যাট ইজ কল পার্টিসিপেটরি, দ্যাট ইজ কল ইনক্লুসিভ।

"নির্বাচনে যোগ্য লোকদেরকে নির্বাচন করতে না দিলেই সেটা হবে অংশগ্রহনহীন ইলেকশন" বলেন জামায়াত নেতা মি. পরওয়ার।

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ মনে করেন, এবার অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন প্রশ্নে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই।

তার যুক্তি, বর্তমানে দেশের নিবন্ধিত সব দলই ভোটে অংশ নিচ্ছে, তাই এটি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন।

"ইনক্লুসিভ ইলেকশন মানেই হচ্ছে আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচন। বিকজ আওয়ামী লীগ কোনো পলিটিক্যাল পার্টি না। তারা একটা মাফিয়া গোষ্ঠী, তারা রাজনৈতিক চরিত্র হারিয়েছে, তারা এদেশে গণহত্যা চালিয়েছে, জনরায় হয়েছে।

"গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে তারা এদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি চায় না। ইনক্লুসিভ মানে যারা এখন রাজনীতিতে রেজিস্ট্রার্ড আছে, ইলেকশন কমিশনের সাথে নিবন্ধন আছে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে"।

বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলছেন, "যদি দুএকটা ছোট খাট দল ইলেকশনে অংশগ্রহণ না করে থাকে, সেটা সবসময় হয়ে থাকে তাতে কিছু যায় আসে না। নির্বাচনের ইনক্লুসিভ চরিত্র থাকবে গ্রহণযোগ্য হবে বিশ্বাসযোগ্য হবে।"

জাতীয় পার্টির ভিন্ন অবস্থান

বিএনপি ও জামায়াতের দুই প্রধান জোট আসন্ন নির্বাচনে মুখোমুখি হয়েছে। আওয়ামী লীগ না থাকায় এই দুই জোটের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।

দুই জোট মনে করছে, ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বাসযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে। তবে তাদের এই প্রত্যাশা পূরণ হবে কিনা- সেটি নিয়ে সন্দেহ এবং আশঙ্কার কথা শোনা যায় জাতীয় পার্টির অবস্থান থেকে ।

দলটির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বিবিসি বাংলাকে বলেন, "আনকন্ট্রোলড আনচেকড একটা ইলেকশনের দিকে বাংলাদেশ যাচ্ছে এবং ভোটের দিনে এখানে স্থানীয় মব, স্থানীয় শক্তি, স্থানীয়ভাবে যারা হোল্ড রাখে, তারা যা চাইবে তাই হবে।

"বাধা দেয়ার মতো কোনো শক্তি এখন পর্যন্ত আমরা দেখতে পারছি না। এই যে বল্গাহীন, বাধা না দেয়ার ক্ষমতা ছাড়া একটা ভোট হচ্ছে সেটারতো বিকল্প আরো অনেক কিছু হওয়া উচিত ছিল। জাতীয় পাটি জামাতের নিষিদ্ধের সময় প্রতিবাদ করেছিল, জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের সময়ও প্রতিবাদ করেছে" বলেন মি.পাটোয়ারী।

অতীতে আওয়ামী লীগের জোটের সঙ্গে থাকা জাতীয় পার্টি এবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। জাতীয় পার্টির মহাসচিব বলছেন, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার ঘটনা আওয়ামী লীগকে কোনো পলিটিক্যাল সলিউশন দেয়নি। আবার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার ঘটনাও কিন্তু বিএনপি- জামায়াতকে কোনো পলিটিক্যাল সলিউশন দিল না।

"ইনক্লুসিভ ভোট ছাড়া ফুল ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন হবে না। পরের ভোটে গিয়ে হয়তো আমরা একটা ফুল ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশনের দিকে যেতে পারি। সেদিকে যেতে গেলে আগেতো একটা সেমি ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন লাগবে। আমি মনে করি সেদিক থেকে এবারের ভোটে অনেক সমস্যার সমাধান হবে" বলেন মি. পাটোয়ারী।

মি. পাটোয়ারীর কথায়, ভোট না হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।

"এই ইলেকশনটা কিন্তু একটা ট্রানজিশন, একটা সেমি ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন। আওয়ামী লীগেরও কিন্তু একটা ট্রানজিশন প্রয়োজন। সকলেরই কিন্তু একটা শিফট প্রয়োজন। ভোট না হলে বর্তমান সরাকার দেশ চালাতে পারবে না।"

অভ্যুত্থান পরবর্তী নির্বাচনী রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নাগরিক অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, "প্রকৃত অংশগ্রহনমূলক যেটাকে আমরা বুঝি যে সকল রাজনৈতিক দল মত সবার অংশগ্রহন সেটা এবার আসলেও বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

"সামনে এটা হয়তো পরের নির্বাচনে হলেও হতে পারে যদি আওয়ামী লীগ তার বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করে পর্যালোচনা করে এবং বিচারগুলো যদি হয়ে যায়, তারপরে আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই একভাবে আসতে পারে।

"এখন ওই আংশিকভাবেই নির্বাচন করতে হবে। তারপরেও নির্বাচন কতটা ঠিকঠাক হয় সেটাও এখন উদ্বেগের বিষয়" বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।

ভোটার উপস্থিতিতে প্রভাব

অতীতে নির্বাচনগুলোর বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ এই দুই দলেরই ভোটার সবচেয়ে বেশি। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকলেও দলটির সমর্থক ভোটাররা রয়েছেন; তাদের ভোট জয় পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

তবে এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাদের কর্মী সমর্থকদের ভোটদানে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে। সেটি ভোটার উপস্থিতিতে কেমন প্রভাব ফেলবে, সেটি নিয়ে দলগুলোর ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন রয়েছে।

বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমদ বলছেন, আওয়ামী লীগ না থাকায় ভোটার উপস্থিতিতে কোনো প্রভাব পড়বে না।

"এদেশের মানুষ এবং নতুন প্রজন্ম যারা নতুন ভোটার হয়েছে, যাদের বয়স আঠারো থেকে ত্রিশ পঁয়ত্রিশের মধ্যে তারা স্বাধীনভাবে মুক্ত পরিবেশে ভোট দেয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে, উদগ্রীব হয়ে আছে, এই ভোটারকে কেউ থামাতে পারবে না।

"আর এখানে একটা ক্ষুদ্র অংশ যদি নিজেরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না চায় বা ভোট দিতে না চায়, সেই স্বাধীনতাতো তাদের আছে। তবে আমি মনে করি না যে, তাদের সংখ্যা খুব একটা বেশি হবে" বলেন বিএনপি নেতা মি.আহমদ।

জামায়াত জোটের পক্ষ থেকেও মনে করা হয় যে, ভোটার উপস্থিতি নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।

তবে জাতীয় পার্টির মহাসচিব বলছেন, আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত কী অবস্থান নেয়, সেটি ভোটার উপস্থিতিতে প্রভাব ফেলবে।

"যদি আওয়ামী লীগ অলটুগেদার ভোট বর্জন করে, তাহলে কিন্তু কাস্টিংটা অবৈধভাবে করতে হবে। এবং সেটাকে কেউ লুকাতে পারবে না। বাংলাদেশে ৪২ হাজার সেন্টারে ভোট হবে, সেখানে অবৈধ কাস্টিংগুলো একসময় ন্যাকেড হয়ে যাবে এবং ভোটটা তখন প্রশ্নবিদ্ধ হবে"।

শামীম পাটোয়ারি এ-ও বলেন, আওয়ামী লীগের ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসুক, এটা আমরা সবাই চাচ্ছি এবং কী করলে আসবে- সেটা সবাইকে একটা সমঝোতাও করতে হবে।

বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এবার ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পড়লে প্রশ্ন উঠতে পারে।

আনু মুহাম্মদের ভাষায়, "ফিফটি পার্সেন্টের বেশি ভোট না হলেতো সেটা গ্রহণযোগ্য হয় না। আর এতদিন পরে নির্বাচন হচ্ছে এটাতো আরো বেশি হবার কথা। সেটা যদি না হয় সেটা একটা ব্যর্থতা হবে।

"এখন এটা নির্ভর করে নির্বাচন কমিশন কতটা আস্থার অবস্থা তৈরি করতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার কতটা আন্তরিকতার সাথে নির্বাচনে যায়। এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে এটা স্পষ্ট করতে হবে যে, তারা কোনো পক্ষপাতিত্ব করছে না। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনেরও এটা একটা পরীক্ষা" বলেন আনু মুহাম্মদ।

আসন্ন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হবে- এমন বিশ্লেষণ আছে। প্রথমত ভোটার উপস্থিতি, দ্বিতীয়ত নিরাপত্তা ও ভোটের পরিবেশ, যা শান্তিপূর্ণ অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করবে। এখানেও দুশ্চিন্তা দিক রয়েছে বলে মনে করেন আনু মুহাম্মদ।

"জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু যারা তাদের মধ্যে আগের বিভিন্ন নির্বাচনে আমরা দেখছি যে, তাদের মধ্যে একটা আতঙ্কের অবস্থা তৈরি করা হয়, যাতে নির্বাচনে তারা ভোট দিতে না যায়।

"তাদের নির্বাচনে যাওয়া এবং না যাওয়া- দুই দিক থেকে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। সেই জায়গাটাতো নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা আসে কারণ তারা একটা বড় অংশ।"

সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের মধ্যেও আতঙ্ক আছে বলে বলছেন আনু মুহাম্মদ

"এখন মাজার আক্রান্ত হচ্ছে, বাউলরা আক্রান্ত হচ্ছে- এদের সাথেতো বিশাল জনগোষ্ঠী। এখন তারা যদি দেখে যে, আমরা একটা সহিংসতার মধ্যে পড়বো বা যারা এখানে নির্বাচন করছে বা দাপটের সাথে চলাফেরা করছে তারা আমাদের উপর আক্রমণ করতে পারে, তাহলেও ভোটসংখ্যা অনেক কমে যাবে।"

গণঅভ্যুত্থানে পতন হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের
গণ-অভ্যুত্থানে পতন হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের

Sunday, January 11, 2026

'মুসলমান তোষণের' তকমা মুছতেই কি একের পর এক মন্দির উদ্বোধন মমতা ব্যানার্জীর? by অমিতাভ ভট্টশালী

এপ্রিল মাসে পশ্চিমবঙ্গের সৈকত শহর দীঘায় জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধন, গত সপ্তাহে কলকাতা সংলগ্ন নিউটাউনে দুর্গা অঙ্গন পরিসরের শিলান্যাসের পরে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে মমতা ব্যানার্জী উত্তরাঞ্চলীয় শিলিগুড়ি শহরে একটি মহাকাল মন্দির পরিসরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।

এছাড়াও সম্প্রতি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র বেশ কয়েকটি তীর্থস্থানের পরিকাঠামো উন্নয়নও করেছে তার সরকার।

এর মধ্যে সর্বশেষ প্রকল্পটির উদ্বোধন করেছেন তিনি সোমবার, পাঁচই জানুয়ারি। বঙ্গোপসাগরের তীরে গঙ্গাসাগরের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সড়ক যোগাযোগের জন্য ১৭০০ কোটি ভারতীয় টাকার মূল্যের একটি সেতু প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন তিনি।

বিজেপি যে তার দিকে মুসলমান তোষণের রাজনীতি করেন বলে আঙ্গুল তুলত, সেই তকমা কাটানোই কি এই হিন্দু ধর্মীয় পরিসরগুলি গড়ছে তার সরকার? সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এই সব উদ্যোগ কি কয়েকমাসের মধ্যে হতে চলা রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে আরও কিছু হিন্দু ভোট তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা?

তার দল বলছে অযোধ্যায় যখন রাম মন্দির গড়া এবং তার উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীই মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন, তখন তো এসব প্রশ্ন ওঠে না!

বিশ্লেষকরা অবশ্য মনে করছেন যে আরও কিছু হিন্দু ভোট টানার উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী যে 'নরম হিন্দুত্বের পথ' নিয়েছেন, সেই প্রচেষ্টা দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল বা ছত্তিশগড়ের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেল, এমনকি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীরাও করেছিলেন, তবে সকলেই ব্যর্থ হয়েছেন। 'হিন্দু ধর্মীয় ভাবাবেগ' কীভাবে ভোটে রূপান্তরিত করা যায়, সে ব্যাপারে বিজেপি বহুগুণ বেশি পারদর্শী।

উদাহরণস্বরূপ, বিশ্লেষকরা দেখাচ্ছেন যে, নাগরিকত্ব, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপরে অত্যাচার বা সর্বশেষ মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে ছেড়ে দেওয়ার মতো ইস্যুগুলিকে লাগাতার বিজেপি তুলে ধরছে – যাতে 'হিন্দু ভাবাবেগ' ব্যবহার করা যায় ভোটযন্ত্রে।

মন্দির গড়তে কী কী প্রকল্প মমতা ব্যানার্জীর?

গত বছর এপ্রিল মাসে সৈকত শহর দীঘায় এক নতুন জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। এরপরে গত সোমবার কলকাতা লাগোয়া নিউটাউনে দুর্গা অঙ্গনের শিলান্যাস করেন তিনি।

প্রায় ১৭ একর জমির ওপরে দুর্গা অঙ্গনটি গড়ে উঠবে। সেখানে মন্দিরের পাশাপাশি গড়া হবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনও।

ইউনেস্কো আগেই কলকাতার দুর্গাপুজোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন সরকার চাইছে দুর্গা অঙ্গনকে কেন্দ্র করে যাতে আরও পর্যটক আকৃষ্ট করা যায়। ইতোমধ্যেই কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গ আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে দ্বিতীয় সব থেকে পছন্দের গন্তব্য হয়ে উঠেছে।

ওই শিলান্যাস অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মিজ. ব্যানার্জী বলেছিলেন, "অনেকে আমাকে তোষণের রাজনীতির জন্য দোষারোপ করেন। কিন্তু আমি সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষ। প্রতিটা ধর্মের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করি আমি। এমন একটাও ধর্মীয় উৎসব দেখাতে পারবেন না যেখানে আমি যাই না। গুরদোয়ারায় গেলে কাপড় দিয়ে মাথা ঢেকে নিই। রোজায় যখন যাই তখন কেন আপত্তি ওঠে? প্রতিটা ধর্মের নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। সেগুলোর কোনও একটিকে আমি অশ্রদ্ধা কেন করব?"

দুর্গা অঙ্গনের শিলান্যাসের আগেই মিজ. ব্যানার্জী ঘোষণা করেছিলেন যে উত্তরাঞ্চলীয় শহর শিলিগুড়িতে একটা মহাকাল মন্দির গড়া হবে। হিন্দুদের উপাস্য মহাকাল শিবেরই আরেকটি নাম। শিলিগুড়ি থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরের শৈল শহর দার্জিলিংয়ে একটি প্রাচীন ও বিখ্যাত মহাকাল মন্দির আছে।

গত বছর নভেম্বর মাসে রাজ্য মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে শিলিগুড়ির মাটিগাড়া এলাকায় মহাকাল মন্দির এবং সঙ্গে একটি সাংস্কৃতিক পরিসর গড়া হবে। মন্দিরের জন্য ২৫ একর জমি এবং সাংস্কৃতিক পরিসরের জন্য আরও তিন একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে।

মমতা ব্যানার্জীর ১৬ই জানুয়ারি ওই প্রকল্পটির শিলান্যাস করার কথা আছে।

দীঘা, নিউটাউন এবং শিলিগুড়ি – তিনটি মন্দিরের ক্ষেত্রেই লাগোয়া সাংস্কৃতিক পরিসর গড়া হচ্ছে এবং পুরো পরিসর পরিচালনার জন্য ট্রাস্ট গড়া হচ্ছে।

কী যুক্তি দিচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস?

একের পর এক মন্দির গড়ার পিছনে কোনও রাজনীতি আছে, এটা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে না তৃণমূল কংগ্রেস। তবে একান্ত আলোচনায় তারা বলে থাকেন যে বিজেপি যেভাবে হিন্দু ভোট একজোট করতে মেরূকরণের রাজনীতি করে থাকে, তারই পাল্টা মমতা ব্যানার্জীর এই মন্দির গড়ার পরিকল্পনা।

আনুষ্ঠানিকভাবে দলটির অন্যতম মুখপাত্র অধ্যাপক মনোজিৎ মন্ডল বলছিলেন, "কোনও মন্দিরই কিন্তু সরাসরি সরকার গড়ছে না। স্বশাসিত সংস্থাগুলি বানাচ্ছে এবং ট্রেজারি থেকেও কোনও অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে না বলেই আমি জানি।

"এইসব মন্দিরগুলি তো বিপুল সংখ্যক পর্যটক আকৃষ্ট করছে। দীঘার মন্দিরটি উদ্বোধনের পরে কয় মাসের মধ্যেই এক কোটিরও বেশি মানুষ সেখানে গেছেন। পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন যদি হয়, সেটা কি খারাপ?" প্রশ্ন মি. মণ্ডলের।

তিনি আরও বলছিলেন যে অযোধ্যায় রামমন্দির যখন একটি অ-সরকারি ট্রাস্ট বানায় কিন্তু তার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় আকর্ষণ হয়ে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী – তখন তো কোনও প্রশ্ন ওঠে না!

তার কথায়, "অযোধ্যায় যখন প্রধানমন্ত্রীর পৃষ্ঠপোষকতায় রামমন্দির গড়া হয়, তার উদ্বোধনের দিন হিন্দু সাধু সন্ন্যাসীদের বদলে তিনিই হয়ে ওঠেন কেন্দ্রীয় আকর্ষণ বিন্দু – তখন তো কেউ প্রশ্ন তোলে না! তাহলে পশ্চিমবঙ্গে কেন মন্দির আর তার সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গন গড়া হলে সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে?"

'বড়ো দেরি করে ফেলেছেন'

বছরের শেষে কলকাতায় তিন দিনের সফরে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি মূলত নির্বাচন নিয়েই বিজেপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা সারেন। তারই মধ্যে একটি সংবাদ সম্মেলনে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল মমতা ব্যানার্জীর একের পর এক মন্দির গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে।

"অমিত শাহ ওই সংবাদ সম্মেলনে যেটা বলেছেন, আমিও সেই একই কথা বলব। একজন গর্বিত হিন্দু হিসাবে আমি মন্দির গড়াকে খারাপ কেন বলব? কিন্তু মমতা ব্যানার্জী বড়ো দেরি করে ফেলেছেন," বলছিলেন বিজেপি নেতা অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দ।

তার কথায়, "এতদিন মমতা ব্যানার্জী সংখ্যালঘু তোষণ করে এসেছেন। এখন তার মনে ভয় ঢুকেছে যে হিন্দুদের ভোট তিনি পাবেন না এবারের নির্বাচনে। তাই তাদের মন জিততে মন্দির বানাচ্ছেন। চেষ্টা করছেন যদি হিন্দুদের মন ঘোরানো যায়। কিন্তু অমিত শাহের মতোই আমিও বলব তিনি বড়ো দেরি করে ফেলেছেন।"

'নরম হিন্দুত্ব'-র পথ কি আরও হিন্দু ভোট টানতে পারবে?

বিশ্লেষকরা বলছেন, সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে বিজেপির প্রাপ্ত ভোটের ফারাক মাত্রই চার থেকে পাঁচ শতাংশ। তবে এলাকা বিশেষে ভোটের এই ফারাকটা যদিও কম বেশি আছে। বিজেপি এই ফারাকটা মেটাতে পারলেই তারা তৃণমূল কংগ্রেসকে টপকিয়ে যেতে পারবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তবে এক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের একটা 'প্লাস পয়েন্ট' হলো তাদের অতি শক্তপোক্ত সংগঠন এবং পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের গড়ে তোলা কর্মী-দলের কাঠামো।

এখানে একটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার যে বিজেপি কিন্তু প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান ভোটারদের সমর্থন কখনই পায় না। তাই আদতে তাদের প্রাপ্ত ভোটের হিসাব কষতে হয় বাকি ৭০ শতাংশের মধ্যে থেকে।

আবার তৃণমূল কংগ্রেসেরও আশঙ্কা আছে যে তাদের দিকে যে হিন্দু ভোটাররা আছেন, সেখান থেকে কিছুটা বিজেপি টেনে নিতে যাতে না পারে।

"বিজেপি এখন তাই হিন্দু ভোটের আরও মেরূকরণ করতে চাইছে। তারা বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপরে অত্যাচার, নাগরিকত্ব এবং একেবারে সম্প্রতি মুস্তাফিজুর রহমানের মতো বিষয়গুলিকে তুলে আনছে নির্বাচনের আগে। এতে তারা মনে করছে যে হিন্দু ভোটারদের একটা অংশ তাদের দিকে ঘুরে যেতে পারে," বলছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক ও দ্য ওয়াল সংবাদ পোর্টালের এক্সিকিউটিভ এডিটর অমল সরকার।

তার কথায়, "ধর্মীয় মেরূকরণের হিসাব গত কয়েকটি নির্বাচন থেকেই হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে, কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেটাই কেন্দ্রস্থলে চলে আসবে বলে মনে হচ্ছে। আবার আসাম আর কেরালাতেও মোটামুটি একই সময়ে নির্বাচন আছে। মুসলমান-বিরোধী হাওয়া তুলতে পারলে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেই আসাম এবং কেরালাতেও তারা নিজেদের পালে হাওয়া লাগাতে পারবে বলে বিজেপি সম্ভবত হিসাব কষছে। এটারই পাল্টা চাল হিসাবে মমতা ব্যানার্জীর এই একের পর এক মন্দির নির্মাণের ঘোষণাকে দেখতে হবে।"

যদিও বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্প এবং সরাসরি নগদ দেওয়া হয়, এরকম নানা প্রকল্প মমতা ব্যানার্জীর সরকার অনেকদিন আগে থেকেই নিয়েছেন। কাকে তারা ভোট দেবেন, সেই ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের কাছে এ ধরনের প্রকল্পগুলি চিরকালই একটা নির্ণায়ক হয়ে থেকেছে – সেই বামফ্রন্ট আমল থেকেই।

আর নারীদের মধ্যে মমতা ব্যানার্জীর জনপ্রিয়তা আছেই।

এসব সত্ত্বেও কেন আরও হিন্দু ভোট টানতে মমতা ব্যানার্জীকে মন্দির গড়তে হচ্ছে – এই প্রশ্নের জবাবে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির গবেষক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য বলছিলেন, "সংখ্যালঘু তোষণের রাজনীতি করেন বলে মমতা ব্যানার্জীর বিরোধীরা যে অভিযোগ করেন, সেটা তো এই মন্দির গড়ার ঘোষণাগুলির মাধ্যমে ব্যালান্স করার একটা চেষ্টা তার আছেই। তবে সেই প্রচেষ্টা কিন্তু এখন নয়, ২০২১ এর ভোটের আগে থেকেই তিনি শুরু করেছিলেন। তবে যে ভোটাররা হিন্দু সংখ্যাগুরুবাদে বিশ্বাস করেন, তাদের কিন্তু এইসব দেখিয়ে মমতা ব্যানার্জী নিজের দিকে টানতে পারবেন না।

"এই অংশটা হচ্ছে বিজেপির ডেডিকেটেড ভোট ব্যাংক। কিন্তু তার বাইরে যে ফ্লোটিং হিন্দু ভোট আছে, তাদের একটা অংশকে যদি মন্দির প্রকল্পগুলি দেখিয়ে টানতে পারে, তৃণমূল কংগ্রেস সেই চেষ্টা করছে," বলছিলেন মি. ভট্টাচার্য।

তিনি এই আশঙ্কাও প্রকাশ করছিলেন যে এর আগে যে অ-বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলগুলি বিজেপির মোকাবিলা করে হিন্দু ভোট টানার জন্য এই 'নরম হিন্দুত্বের লাইন' নিয়েছেন, কেউই কিন্তু সফল হননি।

তার কথায়, "যেমন দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়াল চেষ্টা করেছেন বড়ো বড়ো হনুমান মন্দির বানিয়ে – তিনি পরাজিত। ছত্তিশগড়ের কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেল রামচন্দ্রের বনবাসে যাওয়ার পথ গড়েছিলেন, তিনিও হেরেছেন। মধ্যপ্রদেশের কংগ্রেস চেষ্টা করেছে – তারাও আজ পরাজিত। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী হঠাৎ শিব-ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। আসলে হিন্দুত্বের রাজনীতিতে বিজেপি অন্যদের থেকে শত যোজন এগিয়ে আছে। এটা তাদের পরিচিত মাঠ।"

অমল সরকারের কথায়, "হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে একটা সময় মোকাবিলা করার জন্য ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হত। কিন্তু এখন একটা ট্রেন্ড চলছে যে হিন্দুত্ব দিয়েই তাদের মোকাবিলা করার চেষ্টা হচ্ছে। এটা ভারতের রাজনীতিতে গত কয়েক বছর ধরে শুরু হয়েছে।"

কলকাতা লাগোয়া নিউ টাউনে দুর্গা অঙ্গনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী
কলকাতা লাগোয়া নিউ টাউনে দুর্গা অঙ্গনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী

Friday, January 9, 2026

'এটা আমার নতুন অধ্যায়ের সূচনা'- বহিষ্কারের আদেশের পর বললেন রুমিন ফারহানা

বহিষ্কারের ঘটনা স্বাভাবিক হলেও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিনই দল থেকে বহিষ্কারের আদেশ আসা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন রুমিন ফারহানা, তবে এটাও বলেছেন, "এটা আমার জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও নতুন যাত্রা"।

তবে যেহেতু স্বতন্ত্র নির্বাচন করছেন, তাই বহিষ্কারের ঘটনা ঘটবে জানতেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মঙ্গলবার ভোরে খালেদা জিয়া মারা যান। পরে সকাল এগারোটায় বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির এক বৈঠকে মিজ ফারহানাসহ নয়জনকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পরে গতকালই বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করায় মিজ ফারহানাসহ নয় জনকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

মিজ ফারহানা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বহিষ্কার আদেশ এসছে এটা স্বাভাবিক। এটাতো হবেই। তবে উনি যেদিন চলে গেলেন সেদিনই বহিষ্কার আদেশ আসাটা, এটাকে আমি বলবো যে, এটা আল্লাহর একটা ইশারাও বটে।"

"যিনি আমাকে এনেছিলেন, যার ছায়ায় আমি ছিলাম, তিনি যেদিন চলে গেলেন, বিএনপির সাথে আমার যাত্রাও সেদিনই শেষ হলো," বলেন তিনি।

শোকের দিনে স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠক নিয়ে প্রশ্ন

বাবা অলি আহাদ মারা যাওয়ার পর ২০১২ সালে রাজনীতিতে হাতেখড়ি পেশায় আইনজীবী মিজ ফারহানার। বাবা রাজনীতিবিদ হলেও বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না।

ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহালের দাবিতে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন করছিলো। সে সময় বিএনপির আন্তর্জাতিক কমিটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে পথচলা শুরু করেছেন মিজ ফারহানা।

পরবর্তী সময় মিজ ফারহানাকে বিএনপির পক্ষে গণমাধ্যমে বেশ সরব হয়ে উঠতে দেখা গেছে।

২০১৮ সালের নির্বাচনের পর বিএনপির মনোনীত সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য রুমিন ফারহানার সংসদে একটি বক্তব্য নিয়ে মূলত ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। মিজ ফারহানা তার বক্তব্যের শুরুতেই যখন বলেন যে, এই সংসদ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়, তখন সরকার দলীয় সংসদ সদস্যরা ব্যাপক শোরগোল শুরু করেন।

ওই সময় নানা ইস্যুতে সংসদ অধিবেশনে মন্তব্যের কারণে রুমিন ফারহানা আলোচনায় ছিলেন। একপর্যায়ে সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউটও করেন তিনিসহ বিএনপির এমপিরা।

মিজ ফারহানা জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার 'আহ্বানে, অভিভাবকত্বে এবং ছায়ায়' গত ১৭ বছর বিএনপির সাথে ছিলেন।

অনেক সময়ই বয়স এবং অভিজ্ঞতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলেও খালেদা জিয়া তাকে দলে অনেক বড় বড় কাজ দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিনেই বিএনপির বৈঠক করে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে রুমিন ফারহানা বলেন, "সাধারণত বাঙালি সংস্কৃতি বলেন বা পশ্চিমা সংস্কৃতিই বলেন, মৃত্যুর একটা ভাবগাম্ভীর্য আছে। এরকম দিন আমরা সাধারণত কোনো রকম সিদ্ধান্তে যাই না"।

"খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিন, যেখানে রাষ্ট্রীয় শোক... সেদিন দলের স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং হওয়া, বহিষ্কার আদেশ আসা... আমি জানি না, বাংলাদেশের মানুষ এটাকে কীভাবে নেবে," বলেন সদ্য বহিষ্কৃত এই বিএনপি নেত্রী।

এই বহিষ্কার আদেশই বিএনপির সাথে মিজ ফারহানার 'যাত্রা শেষের ক্লিয়ার ইনডিকেশন' বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির যে রাজনীতি তাতে তার অবস্থান কোথায়? এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি তিনি।

জীবনে ' নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও নতুন যাত্রা '

দলীয় সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই গত ১০ বছর ধরে ব্রাক্ষণবাড়িয়া - ২ আসনে নির্বাচনের জন্য রাজনীতি, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিলেন বলে দাবি করেন মিজ ফারহানা।

এর আগে, ওই আসনে ২০১৮ সালে বিএনপি নেতা উকিল আব্দুস সাত্তার নির্বাচন করেছিলেন।

পরে ২০২৩ সালে মি. সাত্তার দল পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

সে সময় ওই আসনে নির্বাচন করতে দলের হাই কমান্ড নির্দেশ দিয়েছিল বলে দাবি করেন রুমিন ফারহানা।

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার ওই আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের এক নেতাকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে।

পরে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন মিজ ফারহানা।

"আমি গত ১০ বছর ধরেই কাজ করছিলাম। এখন হঠাৎ করে জুনায়েদ আল হাবিব জোটের প্রার্থী আসাটা আমার জন্য একটু বিস্ময়কর ছিলো," বলেন তিনি।

বিএনপি মঙ্গলবার যে নয় জনকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানায় তাদের প্রত্যেকেই আগামী সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন।

তবে, বিএনপিতে দলীয় রাজনীতির সমাপ্তি হলেও মিজ ফারহানা এটিকে তার জীবনে 'নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও নতুন যাত্রা' বলে মনে করেন।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জোটের প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কতটুকু সাড়া পাবেন এমন প্রশ্নে জানান, এলাকার মানুষের চাওয়ার প্রেক্ষিতেই একা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

"রাজনীতিতে এমপি বা মন্ত্রী হওয়া এগুলো একেকটা ঘটনা। কিন্তু রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা অনেক বড় একটা ব্যাপার। আমি একজন রাজনীতিবিদ হতে চাইছি," বলেন মিজ ফারহানা।

রুমিন ফারহানা

Thursday, January 8, 2026

একপাক্ষিক নির্বাচনের শঙ্কা জামায়াত- এনসিপির, কী বলছে ইসি? by সজল দাস

সিলেটে 'দ্বৈত নাগরিকত্ব' ইস্যুতে এনসিপি প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হলেও একই ইস্যুতে বিএনপি ও গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কুড়িগ্রামে মনোনয়ন বাতিল করায় প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতের প্রার্থী।

মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তে আরও বেশ কয়েকটি জেলার রিটার্নিং অফিসারের প্রতি ক্ষোভ জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি, এবি পার্টিসহ বেশ কিছু দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।

যাদের অনেকে অভিযোগ করেছেন, সামান্য ভুলের জন্য তাদের মনোনয়ন বাতিল করা হলেও প্রশাসনের 'পছন্দের' প্রার্থীদের একই ভুল এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষকে সুবিধা দিতে প্রশাসন একপক্ষীয় আচরণ করছে বলেও দাবি করেছেন তারা।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ দিয়ে এসেছে এনসিপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল।

যদিও মনোনয়ন যাচাই-বাছাই, স্থগিত কিংবা বাতিল করার ক্ষেত্রে আইনের কোনো ব্যত্যয় হচ্ছে না বলে দাবি রিটার্নিং কর্মকর্তাদের। বরং, নির্বাচনের আগে প্রশাসনকে চাপে রাখতেই এমন অভিযোগ তোলা হচ্ছে বলেই মনে করেন তাদের কেউ কেউ।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ইসি সচিব আখতার হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলছেন, প্রশাসনের কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, মনোনয়ন বাতিল হওয়া সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা নির্বাচন কমিশনের কাছে আপিল করতে পারবেন। এরপরও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন থাকলে আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

যদিও প্রার্থী ও ভোটারদের আস্থা ধরে রাখতে কমিশনকে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট যেকোনো অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া উচিত–– বলছেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলি।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ৩০০ আসনে মোট দুই হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে এক হাজার ৮৪২টি মনোনয়ন।

বাতিল হওয়া ৭২৩ জনের মধ্যে জাতীয় পার্টির অন্তত ৫০ জন, বিএনপির ২৫ জন, জামায়াতে ইসলামীর ১০ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির তিন জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ৩৯ জন রয়েছেন। বাতিলদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীই বেশি।

প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ কেন?

মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে সিলেটের তিনটি আসনে বিএনপি, এনসিপি ও গণঅধিকার পরিষদের তিন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র স্থগিত করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. সারওয়ার আলম।

জানা গেছে, দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পরবর্তীতে পুনরায় যাচাই-বাছাই করে সিলেট- ৩ সংসদীয় আসনের বিএনপি প্রার্থী এম এ মালেক এবং সিলেট- ৬ সংসদীয় আসনের গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জাহিদুর রহমানের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হলেও বাতিল হয় যুক্তরাজ্যের নাগরিক ও সিলেট-১ আসনে এনসিপি প্রার্থী এহতেশামুল হকের মনোনয়নপত্র।

সিলেটের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. সারওয়ার আলম বলছেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের প্রয়োজনীয় কাগজ জমা না দেওয়ায় এনসিপি প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, ডুয়েল সিটিজেনশিপ বা দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি এমপি হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না। এক্ষেত্রে তাকে দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিল করতে হয় এবং তিনি যে এটি বাতিল করেছেন তার কাগজপত্র কমিশনে জমা দিতে হয়।

"যেহেতু নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ, এই কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যে ওই দেশের নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য আবেদন করেছেন তার রিসিট বা ডকুমেন্ট মনোনয়নের সঙ্গে জমা দিলেই ধরে নেওয়া হয় যে বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন," বলেন তিনি।

মি. আলম জানান, সিলেটে প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে যে তিনজন প্রার্থীর মনোনয়ন দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে স্থগিত করা হয়েছিল তাদের মধ্যে দুই জন প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট জমা দিয়েছেন।

কিন্তু "একজন প্রার্থী এনসিপির তিনি কোনো ডকুমেন্ট জমা দিতে পারেননি। তিনি যে সাবমিট করেছেন এমন কোনো কিছুও তিনি দিতে পারেননি। এ কারণেই তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে," মি. আলম বলেন।

নাগরিকত্ব বাতিলের এই বিষয়টি ওই দেশে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমেও যাচাই করা হয়, এক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

রিটার্নিং কর্মকর্তার এই সিদ্ধান্তকেই পক্ষপাতিত্বমূলক বলে অভিযোগ তুলেছেন এনসিপি প্রার্থী এহতেশামুল হক। তার দাবি, একই পরিস্থিতিতে প্রার্থী ভেদে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের প্রয়োজনীয় কাগজ জমা না দেওয়ায় তার সঙ্গে বিএনপি এবং গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীর মনোনয়নও স্থগিত হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে বাকি দুজনেরটা বৈধ হলেও তার মনোনয়ন বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।

তিনি দাবি করেন, ক্রিসমাস উপলক্ষে যুক্তরাজ্যের হোম অফিস বন্ধ থাকায় কেউই সেখানকার কাগজ আনতে পারেনি।

মি. হক বলেন, "প্রোপার কাগজ দিতে পারিনি, উনি (রিটার্নিং কর্মকর্তা) আমার মনোনয়ন বাতিল করলেন এটা ঠিক আছে। কিন্তু ঠিক একই ইস্যুতে (দ্বৈত নাগরিকত্ব) বিএনপি প্রার্থীর ক্ষেত্রে রিটার্নিং কর্মকর্তা বললেন যেহেতু যুক্তরাজ্যের হোম অফিস বন্ধ, যেহেতু আজকে লাস্ট ডেইট সেহেতু আমি কন্ডিশনালি ওনাকে দিচ্ছি।"

"আমি নাগরিক হিসেবে কেন এই কনসিডারেশন পেলাম না, আমার জন্যও তো যুক্তরাজ্যের হোম অফিস বন্ধ। এটা দ্বিচারিতা," বলেন তিনি।

প্রশাসনের বিরুদ্ধে, মনগড়াভাবে মনোনয়ন বাতিলের অভিযোগ তুলেছেন কুড়িগ্রাম- ৩ সংসদীয় আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহীও।

তার দাবি, বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই রিটার্নিং কর্মকর্তা তার মনোনয়ন বাতিল করেছেন।

যদিও এই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা অন্নপূর্ণা দেবনাথ।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, "আমি বিধিবদ্ধ নিয়ম মেনেই সব কাজ করেছি, তার নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র কোনোকিছুই ছিল না। সংক্ষুব্ধ হলে উনারা নির্বাচন কমিশনে আপিলের সুযোগ নিতে পারেন।"

নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর এমন অভিযোগ প্রশাসনকে চাপে রাখার কৌশল হতে পারে বলেও মনে করেন মিজ দেবনাথ।

নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে একাধিক রাজনৈতিক দল। আচরণবিধি লঙ্ঘনসহ নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণের প্রসঙ্গও সামনে আনছেন তারা।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানাতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতারা।

প্রশাসনের একতরফা আচরণের অন্তত একশটি উদাহরণ রয়েছে বলে দাবি করেন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি'র মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি বলছেন, একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি প্রশাসন পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ করছে দাবি করে তিনি বলেন, "সম্প্রতি একটি দলের চেয়ারপার্সন দেশে আসার পর বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানগণ একটি পার্টি অফিসের দিকে তাদের কেবলা ঠিক করে ফেলেছেন। এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ"।

প্রশাসনের এমন আচরণের কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অতীতের মতো পক্ষপাতিত্ব এবং একতরফা হওয়ার শঙ্কা মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনিয়ম চলতে থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে মাঠের কর্মসূচি দেওয়া হবে।

একই দিনে, কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচনে লেভেল প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিতের দাবি জানায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। নির্বাচনের সামগ্রিক আলোচনা থেকে গণভোটের বিষয়টি হারিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছে দলটি।

ইসলামী আন্দোলনের যুগ্মমহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, তুচ্ছ কারণে মনোনয়ন বাতিল ও প্রশাসনের একপক্ষীয় আচরণের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে জানিয়েছেন তারা।

বুধবার ইসির সঙ্গে বৈঠক করে জামায়াত অভিযোগ করেছে, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সাংবাদিকদের বলেন, "গত কয়েক দিনের সরকারের আচরণে এবং প্রটেকশনের নামে যে বাড়াবাড়িটা চলছে সেসব আচরণে এই আশঙ্কা তো শুধু আমাদের মনেই তো নয়, আপনাদের মনেও এটা স্বাভাবিকভাবে জাগার কথা যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডটা নাই।"

দেশের অনেক জায়গায় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বৈষম্যমূলক আচরণ করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অনেকের প্রার্থিতা বাতিল নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, "বৈষম্য হয়েছে ওই সমস্ত জায়গার ডিসিদের মানসিকতার কারণে। যারা একটা পলিটিক্যাল পার্টিকে বিলং করে এবং অন্য কাউকে পছন্দ করতে চায় না, তারা চেষ্টা করছে এটা করার জন্য," বলেন মি. তাহের।

ডিসি-এসপিদের ভেতরে বৈষম্যমূলক আচরণ হচ্ছে এবং তাদের বিষয়ে তালিকা তৈরি করবেন বলেও জানান জামায়াতের এই নেতা।

অভিযোগ নিয়ে কমিশন যা বলছে

নির্বাচনের আগে প্রশাসনের 'বিতর্কিত' ভূমিকা ইসির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলবে বলে মন্তব্য করেছে অভিযোগকারী রাজনৈতিক দলগুলো।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলির মতে, নিজেদের নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখার স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নির্বাচন কমিশনের।

অবশ্য পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ থাকলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের দরজা খোলা রয়েছে বলেও জানান তিনি। বলেন, আপিলের পর নির্বাচন কমিশন কী করে সেটাও দেখা জরুরি।

"সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা নির্বাচন কমিশনে আপিল করবে, সেখানেও না হলে আদালত আছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

নির্বাচন কমিশনে একাধিক রাজনৈতিক দলের এমন অভিযোগ, প্রশাসনকে চাপে রাখার কৌশল কি না–– এমন প্রশ্নের জবাবে মিজ টুলি বলছেন, "রাজনৈতিক দলগুলোর অনেক কৌশল থাকে, এটিও তার একটি হতে পারে। কিন্তু যদি কোনো অভিযোগ থাকে নির্বাচন কমিশনের সেটি খতিয়ে দেখা উচিত।"

নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ অবশ্য বলছেন, ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল কিছু অভিযোগ দিয়ে গেছেন, "বিষয়গুলো আমরা দেখবো।"

"যদি প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের বিষয়টা ঘটে থেকে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেওয়া হবে, প্রশাসনিকভাবে যেটা আছে। কিন্তু যাচাই বাছাই না করে তো কোনো কমেন্ট করা ঠিক না," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. আহমেদ।

সংবাদিকদের সামনে কথা বলেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করে অভিযোগ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টিও