Sunday, December 29, 2013

গণতন্ত্র ও জবাবদিহি- আইন নয়, শক্তির শাসন চলছে by মিজানুর রহমান খান

আইন নয়, শক্তির শাসন চলছে। ‘সরকারি অবরোধ’ও এবারই নতুন নয়, এবারই শেষ নয়। নতুন চটকদার স্লোগান ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ মানে মসনদের দিকে অভিযাত্রা।
দুই দলের নেতা-কর্মীদের আজ যাদের মাঠে সক্রিয় দেখা যাবে, তারা নিশ্চয়ই সম্পদশালী অথবা তাদের খেদমতগার। কারণ, সম্পদশালীরাই অবরোধ করার সময় পায়। ঠেকানোরও সময় পায়। তাই এ ধরনের বালা-মুসিবত থেকে রেহাই চাইলে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের হদিস পেতে হবে। এটা আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়। এটা রাজনৈতিক সমস্যা নয়। এটা তথাকথিত ভোটের অধিকার হরণের সংকটও নয়। এটা মূলত অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করা ও তা রক্ষা করার সমস্যা।

সম্পদ বিবরণীর খবর আমাদের নির্বাচন কমিশন শুধু নয়, সুপ্রিম কোর্ট ও দুদকের দিকেও নতুন করে তাকানোর সুযোগ করে দিল। আসুন, প্রতিহত করা ও প্রতিরোধ করার ডামাডোলের মধ্যে আমরা বরং অবৈধ সম্পদ রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাগুলোর দিকে নজর দিই। কয়েক দিন ধরে পত্রিকায় মন্ত্রী, মন্ত্রীপত্নী ও শাসকদলীয় রুই-কাতলাদের সম্পদের পাহাড় গড়ার খবর এক-এগারো কালে সুপ্রিম কোর্ট ও দুদকের বিশেষ ভূমিকাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
আজকের পরিস্থিতির দায়, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট এড়াতে পারেন না।
বেগম খালেদা জিয়া তাঁর সংবাদ সম্মেলনে চলতি সম্পদ কেলেঙ্কারি নিয়ে মুখ খুলতে ভোলেননি। কিন্তু তা ততটুকুই, যতটুকু তাঁর জুতার মাপে লাগে। পুনর্বার সিংহাসনে বসতে তাঁর যেখানে যতটুকু প্রতিশ্রুতি না দিলেই নয়, সেটুকু তিনি দেবেনই।
তাই তিনি এবং তাঁর মিত্ররা এইট পাস আবু সাফাকে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় সম্পর্কে মুখ খোলেন না। দলের আয়-ব্যয়ের হিসাব যখন ইসি গোপন করে চলে, তখনো দুই দল দুই নেত্রী এককাট্টা থাকেন। ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’র আয়োজন ও প্রতিহত করতে কার কত খরচ হলো, সেটাই আমরা জানতে চাই।
আজকে মন্ত্রী, মন্ত্রীপত্নী ও প্রভাবশালীরা বিএনপি সরকারের মতোই সম্পদের পাহাড় গড়তে পারলেন। তাঁদের প্রত্যেকের ওপরে ওপরের ‘দোয়া’ আছে। দায়মুক্তির রক্ষাকবচও আছে। আইনি রক্ষাকবচটা রাজনীতিকেরা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সুপ্রিম কোর্টের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি পেয়েছেন। দুদক মায়াকান্না জুড়ল। কারণ, দুদক আইন পাল্টে সংসদ সরকারি কর্মচারীদের সুরক্ষা দিল। এই সুরক্ষা হলো দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরে দুদকের ক্ষমতা খর্ব করা। দুদক ও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো যথারীতি ক্ষমতাসীন দলের তল্পিবাহক হয়ে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছে। আবার এই দুদক যদি তৎপর হতোও তাহলে কী ঘটত, সেটা আঁচ করতে আমরা এক-এগারোর উপাখ্যান ভুলতে পারি না।
এটা পর্যালোচনা করব। হাতেনাতে পরীক্ষা করে দেখব, দুর্নীতিতে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন দেশটির সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তদের শাস্তি দিতে কী ধরনের প্রবণতা দেখিয়ে থাকে। এমনকি গণমাধ্যমও কমবেশি একই সুরে কোরাস গাইতে অভ্যস্ত।
অবৈধ সম্পদের ফিরিস্তি কেবলই দুর্নীতির সূচক নয়, এটা নির্বাচনী দুর্নীতি ও ভোট অবমাননার সূচকও বটে। দুই নেত্রী ঠেকানোর রাজনীতি করছেন। শেখ হাসিনা শেখাচ্ছেন, ভোট নয়, যুদ্ধাপরাধীর বিচারই আসল। আর খালেদা জিয়ার মন্তব্য, ‘দুই প্রধান রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে একটি ঐকমত্য ও সমঝোতা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সবার অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়।’ এটা আক্ষরিক অর্থে রক্তারক্তি এড়ানো অর্থে সত্যি। এর চেয়ে বেশি নয়। ডাকাবুকোদের সঙ্গে মনোনয়ন-বাণিজ্য বা অবরোধ-বাণিজ্য করে দুই দল যদি ক্ষমতার ‘শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর’ ঘটাত, তাহলে আজকের অবস্থা সৃষ্টি হতো না। এক-এগারো সৃষ্টি হতো না। ১৯৯৬-তে নিয়মরক্ষার নির্বাচন করতে হতো না।
আমি সন্দেহ করি না যে বিএনপি যেদিন সরকার করবে, সেদিনই আরেক সংকটের সূচনা ঘটবে। আবারও ‘সরকারি অবরোধ’ পত্রিকার শিরোনাম হবে। এর কারণ, তারা কেউ আবু সাফা বনাম নির্বাচন কমিশন মামলার রায় মানে না। মানার মতো সংগঠন তারা গড়তে চায় না। কারণ, তেমন সংগঠন গড়লে নেতৃত্বের খাসতালুকটা টলে উঠবে। তাই ওরা ওদের শর্তে ভোটাধিকার এবং অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটদান জপ করে। দুই দলের আঁতাত এখানে নিরঙ্কুশ। চলতি ডামাডোলের মধ্যেও ওদের ঐক্যটা লক্ষণীয়।
আইনজীবী আবদুল মোমেন চৌধুরী রিট করেছিলেন। প্রার্থীদের আটটি তথ্য জানার অধিকারকে সুষ্ঠু নির্বাচনের অনুষঙ্গ হিসেবে ঘোষণা করেন বিচারপতি এম এ মতিন। ২০০৫ সালের ২৪ মে তিনি যখন এই যুগান্তকারী রায়টি লেখেন, তখন দুই দলের কারও কানে পানি ঢোকেনি। সরকার ও ইসির প্রতি দুটি রুল জারি হয়েছিল। কিন্তু কেউ তাতে পাত্তা দেয়নি। কোনো এফিডেভিট ইন অপোজিশন ছিল না। ড. কামাল হোসেন একাই শুনানিতে অংশ নেন। আদালতের কাগজপত্র সাক্ষ্য দিচ্ছে, মূল দুই দলের সঙ্গে যুক্ত থাকা আইনজীবীরা এই রায় থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। এই নাটকের দুটি বিবেক চরিত্র ড. কামাল হোসেন ও বিচারপতি এম এ মতিন। তাঁরা বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। তাঁদের ডাক শুনতে সরকারি অবরোধ ও অভিযাত্রাওয়ালাদের কেউ প্রস্তুত ছিল না, এখনো নেই। আট তথ্য প্রকাশে বিচারপতি এম এ মতিন কিন্তু নির্দিষ্টভাবে আরপিও শোধরাতে বলেননি। এক-এগারোতে অধ্যাদেশ করে এটা চালু করা হয়েছিল। ভাগ্যিস, নবম সংসদ এটা বাতিল করেনি।

সুপ্রিম কোর্টের রায় দুই নেত্রী ও তদীয় স্তাবকদের প্রয়োজনের সঙ্গে যখন যতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, ততটাই গ্রহণযোগ্য এবং এই প্রজাতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। বাকিটা বাতিল। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কথা বলে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করা হয়েছে। এখন মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলছেন, এনবিআর ছাড়া সম্পদের বিবরণী নিয়ে আর কারও উচ্চবাচ্য বারণ। তাঁর এই বক্তব্য আদালত অবমাননা। আওয়ামী লীগ যদি সংগঠনগতভাবে এটা মানে তাহলে আওয়ামী লীগও আদালত অবমাননাকারী।
বিচারপতি এম এ মতিনের ওই ১১ পৃষ্ঠার রায়টির তাৎপর্য এই মুহূর্তে বহুমাত্রিক। আর সেটা কেবলই সম্পদের বিবরণীসংক্রান্ত নয়। ক্ষমতাসীনদের ধড়ফড়ানি সত্ত্বেও ওয়েবসাইট থেকে সম্পদের বিবরণী সরায়নি ইসি। সরালে তারা মামলায় পড়ত।
আওয়ামী লীগ ও ইসি কার্যত সুপ্রিম কোর্ট ও সংবিধান অবমাননা করে চলেছে।
সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নে দুই রায় দাতার মধ্যে বিচারপতি খায়রুল হক যতটা আলোচিত বিচারপতি মতিন ততটাই অনালোচিত। বিচারপতি খায়রুলের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ঝেড়ে ফেলা হয়। বিচারপতি মতিনের রায় ‘একতরফা’ নির্বাচন আটকাতে পারে না। এটা অবৈধ বলে গণ্য হয় না।

ওই রায়টি এখন প্রচলিত আইন। যে আইন নির্দিষ্টভাবে সংবিধানের নির্বাচনসংক্রান্ত বিধানাবলি ব্যাখ্যা করেছে। বলেছে ‘প্রার্থী সম্পর্কে জানার অধিকার নাগরিকের ভোটাধিকারের অন্তর্ভুক্ত’। সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদে নির্বাচন করার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ইসিকেই ঘোষণা করা আছে। এটি বলেছে, নির্বাচন অনুষ্ঠান তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ার ইসির ওপর ন্যস্ত। বিচারপতি মতিন লিখেছেন, ‘ইসির এই ক্ষমতা পূর্ণাঙ্গ। ধরে নিতে হবে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে যখন যেমন ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব তার প্রয়োগ করা দরকার, সেটা ইসিকে সংবিধান দিয়েই রেখেছে। নির্দিষ্টভাবে কোনো বিষয়ে তাকে নিষেধ করা হলে সেটাই কেবল বাদ যাবে।’ অথচ ইসি এতটাই অন্ধ যে তারা এখন ‘৯০ দিনের মধ্যে’ কথাটা ছাড়া আর কিছু দেখছে না। নাগরিক সমাজও তাই। তারা ওই রায় থেকে শুধু সম্পদ বিবরণীর অংশটুকু নিয়ে মাততে চায়। বাকিটুকু তার মগজে ঢোকে না।
আমি পরিষ্কার দেখি, বিচারপতি মতিনের এই অংশ মানলেই ইসি সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদের আওতায় সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দিতে পারে। কিন্তু এভাবে ইসি সবল হোক সেটা বিএনপিও চায় না। ‘সরকারি অবরোধ’ ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রা দুটোই শঠতাপূর্ণ।
আগামীকাল: সুপ্রিম কোর্ট যখন সংবিধানবিচ্যুত
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

দেখবো কতোদিন আটকে রাখতে পারেন - বেগম খালেদা জিয়া

বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের খুন এবং তাকে বাধা দেয়ার পরিণত শুভ হবে না বলে হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্যে করে তিনি বলেছেন, আপনার পিতাও ৩০ হাজার মানুষ হত্যা করেছিল। তার পরিণতি ভালো হয়নি। এবারও পরিণতি ভালো হবেনা। এসবের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ ও কঠিন। শেখ হাসিনা রক্তগঙ্গা বইয়ে দিচ্ছেন। রক্তের সাগর পাড়ি দিয়ে নৌকা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না। নিজ বাসার সামনে খালেদা জিয়া সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, দেখি কতদিন আটকিয়ে রাখতে পারেন। যতদিন এরকম করবেন ততদিন কর্মসূচি চলবে। শেখ হাসিনা রক্তের গঙ্গা বইয়ে দিচ্ছেন। এই রক্তের গঙ্গার ওপর দিয়ে তিনি তার নৌকা দিয়ে ক্ষমতায় যাবেন। এই ক্ষমতা দুরাশা। সেটা ভুলে যেতে বলেন। ক্ষমতা। দেখবো কতোদিন আটকে রাখতে পারেন। কর্মসূচি চলবে যতোদিন এরকম করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ভুলে যাননি সেই দিনগুলোর কথা। আজকে সারা দেশকে কি অবস্থা করে রেখেছেন। সাহস থাকলে ছেড়ে দিতেন। দেখতেন যে কিভাবে জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। মা-বোন, ভাই, কৃষক শ্রমিক মেহনতি জনতা রাস্তায় নামতো। আপনারা জাতীয় পতাকার অবমাননা করেছেন। দেশের প্রতিটি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছেন। আজকে আমি রাজ পথে যেতে চাই। কিন্তু কেন বাধা দেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, তাদেরতো রাজপথে নামার সাহস নেই। দুনিয়ার সিকিউরিটি নিয়ে চলেন, আর মানুষ মারেন। মানুষ গুম করেন। মানুষ খুন করেন। সারা দুনিয়া জেনে গেছে যে হাসিনা কতো মানুষ খুন করেছে। কতো মানুষ গুম করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এই পুলিশ বাহিনী, র‌্যাব বাহিনী। আর কতো মানুষ মারবেন? তাও দেখবো। এর আগেওতো মেরেছেন। তার পিতা ক্ষমতায় থেকে ৩৫ হাজার লোক মেরেছেন। আর এখন আরও মারছেন। মারেন। এর পরিণতিযে শুভ হবে না তা তারা জেনে গেছেন। এর পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ ও কঠিন। জবাবদিহী করার জন্য প্রস্তুুত থাকেন। সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারা আইনজীবীদের ওপর আক্রমন করেন, গ্রেপ্তার করেন, সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছেন, মা-বোনদের ওপর নির্যাতন করছেন। আপনারা (প্রধানমন্ত্রী) মহিলা। আপনাদের মহিলাদের প্রতি এতোটুকু সম্মান নেই।

দেখবো কতোদিন আটকে রাখতে পারেন - বেগম খালেদা জিয়া

বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের খুন এবং তাকে বাধা দেয়ার পরিণত শুভ হবে না বলে হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া।

অবরুদ্ধ নয়াপল্টন by কাফি কামাল

নয়াপল্টনের প্রবেশমুখ নাইটিঙ্গেল মোড়ে কাটাতারের বেড়া। কয়েক স্তরে সতর্ক প্রহরায় পুলিশ। সাধারণ মানুষের প্রবেশে মানা। ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে উল্টোপথে।
তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়া নয়াপল্টন ভিআইপি সড়কটি ঢুকতে পারছেন না গণমাধ্যমকর্মীরা। একই দৃশ্য ফকিরাপুল মোড়েও। কাটাতারের বেড়া দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে নয়াপল্টনের প্রতিটির গলিমুখ। সেখানে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা। আশপাশের প্রতিটি বিল্ডিংয়ের ছাদে দূরবীন হাতে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। নয়াপল্টনে ঢোকার সব পথে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। কাউকে কোথাও দাঁড়াতে দেয়া হচ্ছে না। ভিআইপি সড়কটির সকল প্রতিষ্ঠান তালাবদ্ধ। জনশূন্য নয়াপল্টনে টহল দিচ্ছে পুলিশের ছোট ছোট টিম। ছুটোছুটি করছে এপিসি, জলকামান। সবখানে সাদা পোশাকধারী গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের আনাগোনা। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কলাপসিবল গেটে আগের মতোই ঝুলছে তালা। সেখানে বসে আছে পুলিশ। মাঝে মধ্যে কার্যালয়ের দায়িত্বরত কর্মচারীরা কলাপসিবল গেটের ভেতরে দাঁড়িয়ে উঁকি মারছেন। কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় অলস সময় পার করছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। সবমিলিয়ে ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’কে কেন্দ্র করে নয়াপল্টন পরিণত হয়েছে রীতিমতো নিষিদ্ধ এলাকায়। সুনসান নয়াপল্টনে কেবল পুলিশের টহল। নয়া পল্টনে শুধুই পুলিশ। ১৮দলের ঘোষণা অনুযায়ী সকাল থেকে হাজার-হাজার নেতাকর্মীর স্লোগান ও পদভারে মুখরিত হওয়ার কথা নয়াপল্টন। কিন্তু ঠিক উল্টো পরিস্থিতি সেখানে। নয়াপল্টনের শতভাগ নিয়ন্ত্রন র‌্যাব-পুলিশ-গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের হাতে। ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি ঠেকাতে গতরাত থেকে রাজধানী জুড়ে চলছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কড়া তৎপরতা। কাটাতারের বেড়া ও বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টির মাধ্যমে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে গুলশানে বিরোধী নেতা খালেদা জিয়ার বাসভবন। রাজধানীতে ঘুরছে না গণপরিবহনের চাকা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে রিক্সা থেকে শুরু করে প্রতিটি হালকাযান তল্লাশি করছে পুলিশ। পাহারা বসিয়েছে সরকার দলীয় নেতাকর্মীরা। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতি পেরিয়ে নয়াপল্টন অভিমুখে নেই কোন বিরোধীদলের মিছিল। এমনকি কয়েকজন একত্রিত হয়েও চলাচলও করতে পারছেন না। তবুও নয়াপল্টনে সদাসতর্ক আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। এদিকে নয়াপল্টনসহ পুরো পল্টন এলাকা ঘিরে রেখেছে র‌্যাব-পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার নিরাপত্তার জাল। চলছে কঠোর নজরদারি। এমনকি নয়াপল্টনের গলিগুলোতেও দেয়া হয়েছে একাধিক কাটাতারের ব্যারিকেড। ওদিকে সোয়া ১টার সময় গলিপথে নয়াপল্টন যাবার পথে পুরনো পল্টন রাস্তা থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক কূটনীতিক ইনাম আহমেদ চৌধুরীকে আটক করে পুলিশ। তারপরই তাকে ডিবি কার্যালয়ে নেয়া হয়। এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশের সতর্ক দৃষ্টি গলিয়ে নয়াপল্টনে ঢুকে পড়েছিলেন বিরোধী দলের কয়েকজন কর্মী ও সাধারণ মানুষ। ৫ মিনিটের মধ্যেই ১১টা ৩৫ মিনিটে নয়াপল্টনের ভিআইপি সড়ক থেকে তাদের আটক করে পুলিশ। তাদের মধ্যে সাবেক এমপি রওশন আরা ফরিদ, মহিলা দলের নেত্রী সাদিয়া হক, জান্নাতুল ফেরদৌস, এলিজা জামান, শিরিন আখতার রীনা, নয়াপল্টনের দোকান কর্মচারী জামসেদ আলী, ফকরুল ইসলাম মুন্সি, সাইদুল ইসলাম, আবু তাহের, ইসমাইল, বিআরটিসি বাসের স্টাফ বাদল, দুই ছাত্র আশিক ও রুবেল। সবমিলিয়ে নয়াপল্টন ও ফকিরাপুল থেকে আটক করা হয় ১২ জনকে। তাদের সবাইকে পল্টন মডেল থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। ওদিকে পাঁচদফা টানা অবরোধের পর রাজধানী অভিমুখে গণতন্ত্রের অভিযাত্রা কর্মসুচি ঘোষণা করেছিলেন বিরোধী নেতা খালেদা জিয়া। সারা দেশ থেকে সে কর্মসুচিতে অংশ নিয়ে আজ অভিযাত্রার শেষ গন্তব্য ছিল নয়াপল্টন। যে কোন মূল্যে কর্মসুচি সফল করার ঘোষণা দিয়ে বিএনপির তরফে গতকাল জানানো হয়েছিল প্রতিকূলতা পেরিয়ে কর্মসুচিতে অংশ নেবেন খালেদা জিয়া। তবে সকাল থেকে নয়াপল্টনমুখী হননি বিএনপিসহ ১৮দলের কোন শীর্ষস্থানীয় নেতা। কোন দৃশ্যমান তৎপরতা চালাতে পারেনি তারা। বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, নয়া পল্টনের কাছাকাছি এলাকায় নেতা-কর্মীরা বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থান করছেন। পুলিশি বাধার কারণে তারা সমাবেশস্থলে উপস্থিত হতে পারছেন না। পুলিশের কর্মকর্তারা বলেছেন, অনুমতি না থাকায় সমাবেশ হতে দেয়া হবে না।

অবরুদ্ধ নয়াপল্টন by কাফি কামাল

নয়াপল্টনের প্রবেশমুখ নাইটিঙ্গেল মোড়ে কাটাতারের বেড়া। কয়েক স্তরে সতর্ক প্রহরায় পুলিশ। সাধারণ মানুষের প্রবেশে মানা। ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে উল্টোপথে।

ঐক্যবদ্ধভাবে রাস্তায় নেমে আসুন- অলি আহমদ

সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-র সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।
গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এ আহ্বান জানান। বিবৃতিতে অলি আহমদ বলেন, বিগত কয়েক মাস ধরে প্রত্যকটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সমর্থক এবং সাধারণ মানুষ আতঙ্ক  ও মৃত্যুপুরীতে বসবাস করছে। সোনার বাংলা আজ শ্মশানে পরিণত হচ্ছে। তিনি বলেন, ভয় প্রদর্শন করে মানুষের মন জয় করা সম্ভব নয়। প্রতিবন্ধকতা যত বড় তা অতিক্রম করার গৌরবও তত বড়। দেশকে রক্ষা করুন। বর্তমান প্রতিবন্ধকতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকারকে বা অন্য কাউকে সক্রিয় পদক্ষেপ নিতে হবে। এই অসহনীয় অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পন্থা হচ্ছে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত করা। এই মুহূর্তে প্রয়োজন দেশের মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনে নিজের পদ-পদবির কথা চিন্তা না করে এগিয়ে আসা। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে অলি আহমদ বলেন, এই মুহূর্তে দল এবং নিজের কথা চিন্তা না করে, দেশের অবস্থা অনুধাবন করুন। বহু রাজনৈতিক নেতা চূড়ান্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাদের শেষ রক্ষা হয়নি। তিনি বলেন, সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে অপশাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় দাঁড়াতে হবে। ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ সফল করতে হবে। কর্নেল অলি বলেন, দেশকে বাঁচাতে একদলীয় নির্বাচন বন্ধ করুন। দেশ এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অনেকে চায় না বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবে গড়ে উঠুক। এদেশে সমস্যা সৃষ্টি করে তারা ফায়দা লুটতে চায়। রাজনীতিবিদদের অনেকেই ওই দেশগুলোর এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ এখন নিজের ছায়ার সঙ্গে নির্বাচনী যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। তারা দেশের মানুষকে তোয়াক্কা করছে না। জনগণের মনে প্রশ্ন- বর্তমান আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাদের নিয়ে গঠিত হয়েছে? এদের প্রায় অনেকে ১৯৭৪ সালের রক্ষী বাহিনী ও লাল বাহিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

ঐক্যবদ্ধভাবে রাস্তায় নেমে আসুন- অলি আহমদ

সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানিয়েছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-র সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।

ক্ষমতা- আমাদের আম-আদমিরা কোথায়? by ওয়াসি আহমেদ

বিস্ময়কর হলেও মানতে হবে, পৃথিবী থেকে আম আদমি লুপ্ত হয়নি। এই সেদিন ভারতের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে আম আদমি পার্টির (এপিপি) অভাবিত সাফল্যের সুবাদে তাদের খোঁজ পাওয়া গেল।
রাজনীতির গৎবাঁধা ছক উল্টে দিয়ে তারা তাদের শক্তিমত্তাকেই জানান দিল না, বড় কাজটি যা করল তা এক কথায় প্রকাশ করলে বলতে হয় প্রত্যাখ্যান। মতলববাজ, দুর্নীতিকবলিত, প্রচলিত রাজনীতিকে সরোষ প্রত্যাখ্যান।

যে যেভাবেই দেখার চেষ্টা করুন, ঘটনাটা তথাকথিত নেতিবাচক ভোটের কারসাজি নয়। সাম্প্রতিক তৃতীয় বিশ্বে গণতন্ত্রচর্চা বলতে যা বোঝায় তা চার বা পাঁচ বছরের বিরতিতে নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার ভোট প্রয়োগের মধ্য দিয়ে শাসকবদল। সামগ্রিক বিচারে প্রত্যাশার চেয়ে এখানে ক্ষোভ-হতাশাই বেশি ক্রিয়াশীল। কিন্তু দিল্লিতে বিপুলসংখ্যক আম-আদমি এপিপির পক্ষে রায় দিয়ে যা করল তাতে অনেকেই প্রত্যাশা দেখতে পাচ্ছেন। হ্যাঁ, ক্ষোভ-হতাশা রয়েছে শাসককুলকে প্রত্যাখ্যানে, তবে ভুঁইফোড় এপিপির পক্ষাবলম্বনের মধ্য দিয়ে প্রত্যাখ্যানের শক্তিতে তারা আশার আলোর খোঁজই করেছে। সে আশা কতটা ফলবান হবে বা আদৌ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কি না, সে অন্য বিতর্ক।
অরবিন্দ কেজরিওয়ালের এপিপিকে রাজনৈতিক দল বলার সময় এখনো আসেনি। আন্না হাজারের সঙ্গে মতভিন্নতার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দল গড়া, নির্বাচনে অংশ নেওয়া, শীলা দীক্ষিতের মতো ডাকসাইটে মুখ্যমন্ত্রীকে হটানো, এমনকি সরকার গঠনের পরও এপিপিকে ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড়জোর একট সরব সিভিল সোসাইটি আন্দোলনের মুখপাত্র আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। তবে বড় যে কাজটি তারা করেছে তা বিলুপ্ত হতে বসা আমজনতাকে দিয়ে রাজনৈতিক নষ্টামিকে ঝাঁটাপেটা করা। অনেকটা আক্ষরিক অর্থেই, এপিপির নির্বাচনী প্রতীক ঝাঁটা।
ভোট যদি রাজনীতিচর্চার মুখ্য নিয়ামক হয়, তাহলে সেই ভোটের মাধ্যমেই রাজনৈতিক বজ্জাতিকে ঝাঁটার ঘায়ে ঘায়েল করা সমসাময়িক কালের বড় ঘটনা। ব্যতিক্রমীও বটে। রাজনীতিবিদেরা জনগণ জনগণ করে যতই গলার শিরা ছিঁড়ে ফেলার কায়দা করুক, তারা নিশ্চিত ধরে নেয় যাদের দোহাই উঠতে-বসতে তারা পাড়ে তারা অদৃশ্য, পঞ্চভূতে বিলীন। কিন্তু প্রবল ধাক্কায় খোঁয়ারি ভেঙে ভারতীয় রাজনীতিবিদদের কথাবার্তায় বেফাঁস কিছু সত্য ঠিকই বেরিয়ে পড়েছে। কংগ্রেসের ভরাডুবির আগে মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত সদম্ভে বলেছিলেন আম আদমি বলে কিছু তাঁর রাডারে ধরা পড়ছে না। আর ভরাডুবির পর কংগ্রেসের মন্ত্রী সচিন পাইলটের মতে, ঘটনাটা বড়ই আশ্চর্যজনক (অ্যাশটোনিশিং)। আশ্চর্য হওয়ার পেছনে তাঁর বক্তব্য, সাধারণ মানুষের পক্ষে একটা কঠিন পরিস্থিতিতে এক জায়গায় জড়ো হয়ে নিজেদের এভাবে প্রাসঙ্গিক ও অর্থময় করে তুলতে পারা ঘটনা হিসেবে সম্পূর্ণ নতুন, বিগত কয়েক যুগে যার নজির নেই। এটা পরিষ্কার, রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিহীন সাধারণ মানুষ তথা আম আদমির অস্তিত্ব সচিন পাইলটদের হিসাবনিকাশে ছিল না।
ব্যাপার যা দাঁড়াল, আম আদমি আছে, তার অপার শক্তি নিয়েই। আম আদমি কারা? তারা কি জোট-গোত্রহীন, সামাজিকভাবে পরিচিতিহীন, পশ্চাৎপদ, ছন্নছাড়া বেয়াকুব জনগোষ্ঠী? রাজনীতিতে আসক্তি নেই বলে কি তারা রাজনীতি-অসচেতন, নাকি রাজনীতিবিমুখও? বিমুখ হতে গেলে কিন্তু বেয়াকুবি চলে না, সচেতনতার দরকার হয়। শিল্পবিপ্লবের সময় সমাজের মানুষজনকে মোটামুটি তিন শ্রেণীতে ভাগ করার রেওয়াজ ছিল—কুলীন (নোবিলিটি), যাজক (ক্লার্জি) এবং সাধারণ মানুষ (কমোনার)। আজকের দিনে এই শ্রেণীভাগের প্রাসঙ্গিকতা সেভাবে না থাকলেও কৌতূহলের ব্যাপার হলো, সাধারণ মানুষ যারা অভব্য-অভদ্র না হলেও কুলীন বা এলিট মোটেও নয়, ধর্ম-কর্ম করলেও মোল্লা-পুরুত-পাদরি নয়, তাদের নিয়ে টানাহেঁচড়ার শেষ নেই। অন্য দুই সম্প্রদায়কে নিয়ে কালেভদ্রে কথা ওঠে, বিতর্ক হলে সেটা একাডেমিক পর্যায়েই থেকে যায়। মূলত তারা এলিট গোত্রবদ্ধ। উন্নত ও তৃতীয় বিশ্বের এলিটদের মধ্যে ফারাক ম্যালা, যদিও মনস্তত্ত্বের রসায়নে বিভেদ নেই। অন্যদিকে মাত্রার তারতম্য সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মতিগতি সব বিশ্বেই এক। এখানে বলা উচিত, তৃতীয় বিশ্বে খুদে এলিটদের দাপটে সাধারণেরা অচ্ছুত আম আদমিতে পর্যবসিত। সর্বসাধারণ তারা নয়, রাজনীতিবিদেরা জনগণ বলে তাদের বোঝাতে চাইলেও তারা সেই জনগণও নয়। সুতরাং মূল প্রশ্ন তারা কারা?
দিল্লি নির্বাচনে তাদের যে পরিচয় উঠে এসেছে তাতে তারা ঘোরতর রাজনীতিসচেতন, তবে বিদ্যমান রাজনীতিতে আস্থাহীন। তারা তথাকথিত আদর্শিক দর্শনের তোয়াক্কা করে না। দরিদ্র-অবস্থাপন্ন, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, বেকার-পেশাজীবী মিলে তারা যে জায়গায় এককাট্টা, তা তাদের আত্মোপলব্ধিতে। লেজুড়বৃত্তিহীন বলে নিজ নিজ আত্মোপলব্ধিকে ইচ্ছামতো শাণাতে তারা সক্ষম, যা রাজনৈতিক দলের ধ্বজাধারীদের পক্ষে অসম্ভবই নয়, কল্পনাতীতও। এপিপি তাদের একত্র করেছে, যূথবদ্ধতার শক্তি জুগিয়েছে। যেহেতু তারা আম আদমি, কঠিন তত্ত্বকথায় আগ্রহ নেই, এপিপি তাদের সোজাসাপটা বলেছে—দুর্নীতি হটাও, রাজনীতি চোরে ভরে গেছে, চোরদের বিদায় করো।
যে কারণে এত কথা এবার সে প্রসঙ্গে আসতে হচ্ছে। বাংলাদেশে আমরা আম-আদমির দেখা কবে পেয়েছি? আমরা সংগঠিত গণ-আন্দোলন দেখেছি, স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থান দেখেছি আর গোটা জাতির পরাধীনতার গ্লানি ঘোচাতে মরণপণ মুক্তিযুদ্ধ ৪২ বছর আগে শুরু হয়ে আজও শেষ হয়নি। বেশ কটা জাতীয় নির্বাচনও দেখা সারা, অচিরে আবারও দেখতে যাচ্ছি। যত রূঢ়ই শোনাক, আমজনতাকে আলাদা করে খুঁজে বের করা মুশকিল। তারা ছিল, তবে জনারণ্যে আচ্ছন্ন। প্রগতিচিন্তার ইচ্ছাপূরণের খোরাক জোগাতে এ নিয়ে কেউ দ্বিমত পোষণ করলেও কিছু যায়-আসে না। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াপনার অন্যতম ক্ষত হলো ইচ্ছাপূরণের কারসাজিতে প্রগতিশীল হতে চাওয়া।
এখন যা প্রশ্ন, আমাদের মতো হতদরিদ্র, চিরবঞ্চিত মানুষের দেশে স্বতন্ত্র, স্বাধীন, অমুখাপেক্ষী আমজনতার অস্তিত্ব নেই কথাটা বলতে কি আমরা কুণ্ঠিত? গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থা আর কত দুর্নীতিবাজ হলে, রাজনীতি কতটা বেলাজ-বেহায়াপনা উগরে দিলে ১৬ কোটি মানুষের অন্তত একটা উল্লেখযোগ্য অংশ রাজনৈতিক দলবাজিমুক্ত নিখাদ আমজনতায় পরিণত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে? তথ্য বলছে, এ দেশে আমাদের অবাধ দুর্নীতি ও অপশাসনের পালাবদলময় রাষ্ট্রব্যবস্থা পৃথিবীর উন্নত-অনুন্নত, ধনী-নির্ধন সব দেশকে টেক্কা দেওয়ার নজির রেখেছে। আমাদের তথাকথিত জনপ্রতিনিধিরা ক্ষমতায় আসীন হওয়ামাত্র আলাদিনের দৈত্যের ভেলকিবাজিতে অতি অনায়াসে নিজেদের বিত্ত-বৈভবের শনৈঃ শনৈঃ স্ফীতি ঘটান। নিজেদের ঘটান, তাঁদের পতিব্রতা স্ত্রীদের ঘটান, আত্মীয়-পরিজনও এ থেকে বাদ পড়েন না। আমাদের জ্যেষ্ঠতম মন্ত্রী জনসমক্ষে এর সরল-সোজা ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জানান, ক্ষমতায় বসলে সম্পদ বাড়াই স্বাভাবিক ঘটনা। খবরের কাগজের পাতায় এ নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা চলছে। এ পর্যন্তই।
এমন অকপট ব্যাখ্যা, যা আগে কারও মগজে গজায়নি, সম্পদশালী হওয়ার অত্যন্ত সুচারু ও নির্ঝঞ্ঝাট পথই বাতলে দেয় না, সম্পদ আহরণের একটা তত্ত্বও দেশবাসীর কাছে পেশ করে। ক্ষমতায় আরোহণ মানে তো কেবল মন্ত্রী-সাংসদ মিলে শ কয়েক মানুষের সম্পদ-আকাঙ্ক্ষাকেই চরিতার্থ করা না, রাষ্ট্রব্যবস্থার স্তরে স্তরে, নানা অন্ধি-সন্ধিতে পাহারারত বেশুমার সহগামী ও তাদের তাঁবেদারদেরও সম্পদশালী করা। হ্যাঁ, কাজটা সম্পদ আহরণ, চুরি নয়।
চুরি যে করে সে সোজাসাপটা চোর। সিঁধ কেটে বা গা-গতরে চপচপে তেল মেখে ঘুমন্ত গৃহস্থের ঘরে রাতের আঁধারে হানা দেয় যারা, তাদের চোর বলা হয়। তাদের খুব সাবধানি হতে হয়, কারণ ধরা পড়ার ভয়। চোর বা তার মামাতো-খালাতো ভাই পকেটমাররা নিম্ন শ্রেণীর জীব। এদের সঙ্গে শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মধ্যবিত্তের কোনোরূপ জ্ঞাতিগত সম্পর্ক বা কিনশিপ নেই।
অন্যদিকে ক্ষমতায় চড়ে চুরির অক্লান্ত সাধনায় যাদের অশেষ প্রতিষ্ঠা-প্রতিপত্তি, তাদের প্রতি আপামর মধ্যবিত্তের জ্ঞাতিগত ও সামাজিক পক্ষপাত এতই প্রবল, সুভাষণের আড়াল খুঁজে চুরিকে চুরি না বলে বলা হয় সম্পদ আহরণ। জ্যেষ্ঠতম মন্ত্রী নিজে সম্পদশালী না হয়েও তত্ত্বটি কেন ফলাও করে জাহির করলেন? দেশবাসী জানে তাঁর অবস্থান তাঁর রাজনৈতিক সহগামীদের থেকে যথেষ্ট তফাতে। সামাজিক মনস্তাত্ত্বিকেরা এর পেছনে যে কারণটি অবশ্যই খুঁজে পাবেন তা এই জ্ঞাতিত্ব। আমাদের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাতাবরণে যার লালন প্রশ্নাতীত এবং আপাতদৃষ্টিতে যার বাড় অপ্রতিরোধ্য।
এ সত্ত্বেও এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন, একচেটিয়া রাজনৈতিক জ্ঞাতিত্বের মায়ায় দেশের কমবেশি ১৬ কোটি মানুষই মোহান্ধ, অবরুদ্ধ। মায়ার এ বলয় অনেক বড়, সন্দেহ নেই; তবে এর বাইরে যারা, যাদের বলতে পারি আম আদমি, তারা কোথায়? তারা নেই এ কথা হঠকারিতামূলক। এ দেশে মৃত্যু অবধি থাকব বলে যারা টিকে আছি, তাদের বিশ্বাস করতেই হবে তারা আছে, হয়তো জনারণ্যে আচ্ছন্ন হয়ে।
তাদের তালাশ করতে হয়, এক জায়গায় জড়ো করতে হয়।
কারা করবে তালাশ? ঘুরিয়ে বললে, কে বা কারা কিসের যোগ্যতায় তাদের কাছে পৌঁছাবে বা পৌঁছার সাহস করবে? প্রশ্নটা যত অবধারিতই হোক, রাজনৈতিক মৎস্যজীবীদের জাল থেকে বেরোতে গেলে এ প্রশ্ন করে করে জবাবের অপেক্ষায় থাকা ছাড়া উপায় নেই।
ওয়াসি আহমেদ: কথাসাহিত্যিক।

সমঝোতার পথ খুঁজুন- কেন সরকারি অবরোধ?

বিরোধী দলের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি ২৯ ডিসেম্বর হলেও সরকার আরও আগেভাগেই প্রস্তুত। দুই দিন আগে থেকেই সম্ভব-অসম্ভব সব উপায়ে ঢাকামুখী চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে রেখেছে সরকার।

সহজিয়া কড়চা- সংবিধান ও গণতন্ত্র—কোনো নামেই অশান্তি নয় by সৈয়দ আবুল মকসুদ

১৮-দলীয় জোটের নেতা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আজ ঢাকা অভিমুখে গণতন্ত্রের অভিযাত্রার কর্মসূচি দিয়েছেন।

শুভবুদ্ধির উদয় হোক by সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক

বিরাজমান উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সামনে কী হবে বা হতে পারে, তা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠায় রয়েছে পুরো দেশ। পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত সংবাদ ও কলাম পড়ছি। টেলিভিশনের টকশোগুলোতে বিভিন্ন আলোচনা শুনছি। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয়েই আলোচনা হচ্ছে বেশি। সাধারণ মানুষের ভাষ্য হচ্ছে, তারা এই অস্থিরতা থেকে পরিত্রাণ চায়। কিন্তু পরিত্রাণের কোনো পথ মানুষ দেখছে না। সরকার ও বিরোধী পক্ষের অনেকেই বলছেন, বর্তমান রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের দমন করতে হবে। সাধারণ নাগরিকরা সর্বদাই বলছেন, সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। বর্তমানে যে রাজনৈতিক সহিংসতা চলছে তার দুটি দিক রয়েছে। ১. সরকার পক্ষ বলছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বানচাল করার জন্য বিরোধী দল এবং তাদের সহযোগীরা এই সহিংসতা চালাচ্ছে। সরকারি দলের বাইরে যারা আছেন কিন্তু বিরোধী শিবিরেও প্রকাশ্যে নেই, তারা বলছেন, সরকারি ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই নিয়ে সহিংসতা বাড়ছে। ২. সরকার নিজেদের বাহিনী ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের দিয়ে দমনপীড়ন চালানোর মাধ্যমে সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে। বহু ক্ষেত্রেই সরকারি বাহিনী বা সরকারি দলের লোকেরা সহিংসতা ঘটিয়ে বিরোধী শিবিরের ওপর বদনাম চাপিয়ে দিচ্ছে।
এরূপ পরিস্থিতি প্রসঙ্গে পর্যবেক্ষকদের মত হল, সরকার এটা পরিকল্পিতভাবেই চেয়েছিল। কারণ সরকার ভেবেছিল, যুদ্ধাপরাধের বিচার ও অরাজক পরিস্থিতির বিষয়টি সামনে এনে জনগণের খুব কাছে যেতে পারবে এবং এমন পরিস্থিতি নির্বাচনের জন্য তাদের সহায়ক হবে। ক্ষমতাসীন দল তিন বছর আগে থেকেই তাদের এ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। তিন বছর আগে তারা যখন রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত ছিল, তখন তারা ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের বা ২০১৪ সালের জানুয়ারির কথা মাথায় রেখেই কৌশল নির্ধারণ ও পরিকল্পনা করেছিল। তাদের মূল্যায়নে প্রধান বিষয় ছিল, আবার ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কী কী বাধা আসতে পারে এবং সেগুলো থেকে কিভাবে উত্তরণ ঘটানো যায়। ক্ষমতাসীন দল আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিল, ভারতপ্রীতি ও মন্ত্রীদের প্রশ্নাতীত দুর্নীতির কারণে তাদের জনসমর্থন কমবে। সুতরাং সে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের বিষয়টি মাথায় রেখেই তারা সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে দেন। সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি বাতিল করলে রাজনৈতিক অঙ্গন অস্থির হয়ে উঠবে, এটাও তারা ভালো করেই জানতেন। সুতরাং পরিকল্পনা করেই ও প্রস্তুতি নিয়েই তারা মাঠে নেমেছেন। অথচ সংবিধান সংশোধনের আগে ক্ষমতাসীন দল বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও আলাপচারিতায় তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতির পক্ষে বক্তব্য দিয়ে গেছে। এটা যে জনসমর্থন পাওয়ার জন্য তা বেশ স্পষ্ট এবং পরবর্তী সময়ে সেটি বাতিল করলে পানি ঘোলা হবে, সেই ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করা সহজ হবে, এটাও তারা জানতেন। আর জেনেশুনেই তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের মাধ্যমে প্রদত্ত একটি মৌখিক রায়ের উসিলায় তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিকে সংবিধান থেকে মুছে দেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গটি আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ ছিল, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি বাতিলের বিষয়টির উল্লেখ ছিল না। ২০১১ সালের মাঝামাঝিতে পাস করা পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা শুধু তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিই বাতিল করা হয়নি, সংবিধানের আরও অনেক মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ পরিবর্তনগুলোও অস্থিরতা সৃষ্টির অন্যতম কারণ।
সরকার জনগণকে; মিডিয়াকর্মী, পত্রিকার কলাম লেখক ও টকশোয় অংশগ্রহণকারীদের ব্যস্ত রাখার জন্য এমন কিছু বিষয়ের অবতারণা করতে থাকে, যাতে সবাই মূল বিষয় থেকে দূরে থাকে। কারণ নির্বাচনের আগে মানুষ সরকারের কর্মকাণ্ডগুলোর মূল্যায়ন করবে। সরকারের দুর্নীতি ও ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করবে। এতে করে স্বাভাবিকভাবেই সরকারের জনসমর্থন কমবে। তাই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল পরিকল্পনা করে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ সৃষ্টি করাল যাতে করে ওগুলো নিয়ে মানুষ ব্যস্ত থাকে। এর কিছুদিন পর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামকে মহাসমাবেশ করার অনুমতি দেয় এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এনে র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সমন্বয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। এ ঘটনাটিও সরকার ঘটিয়েছে যাতে করে হেফাজতে ইসলাম নিয়ে বেশ কিছুদিন মানুষ ব্যস্ত থাকে। সুতরাং অফিস-আদালতে, পথেঘাটে, চায়ের দোকানে আলোচনার বিষয়বস্তু পাল্টে গেছে। গত পাঁচ-ছয় মাস যাবত কোথাও পদ্মা সেতুর দুর্নীতি, হলমার্ক-ডেসটিনি কেলেংকারি, বিসমিল্লাহ গ্র“পের ঋণ জালিয়াতি, শেয়ার মার্কেটের মহাদুর্নীতি এবং রেলমন্ত্রীর কালো বিড়াল নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। মিডিয়া থেকেও এসব বিষয় প্রায় উধাও হয়ে গেছে। সরকারপন্থী মিডিয়াগুলো সরকারের এরূপ পরিকল্পনায় প্রভূত সহযোগিতা করে। ২০১৩ সালের শেষাংশে যেরূপ পরিস্থিতি আমরা দেখছি, সেরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে এমনটি সরকার আগেই কল্পনা করে নিয়েছিল। রাজনৈতিক যুদ্ধে মিডিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও অপরিহার্য, এটা স্বীকার করেই সরকার তাদের অনুগত কিছু ব্যক্তিকে টেলিভিশন লাইসেন্স প্রদান করেছিল। সেই টেলিভিশনগুলো নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন ও মূল্যায়ন করতে চেষ্টা করলেও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার কারণে যথার্থ নিরপেক্ষ থাকতে পারে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত পাঁচ-ছয় মাস যাবত অব্যাহতভাবে বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং বিরোধী দলের উদ্দেশে বেশিরভাগ সময় আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলছেন, যার কারণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একটি শোভনীয় বা সহনশীল আবহ সৃষ্টি হয়নি। সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে বিরোধের মূল জায়গাটি জনগণের কাছে অস্পষ্ট রাখার বিষয়ে সরকার দক্ষতা দেখিয়েছে। সরকার চাচ্ছে, তাদের দলীয় সরকারের অধীনে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীরই অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিরোধী দল চাচ্ছে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরূপ পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষকে কাছাকাছি আনার জন্য প্রায় সমগ্র বিশ্ব চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাতে কোনো ফল মেলেনি।
এবার একটু ব্যতিক্রমী প্রসঙ্গে আসি। গত প্রায় দশ দিন ধরে বিভিন্ন দৈনিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা তাদের হলফনামায় নিজেদের সম্পর্কে যে বিবরণ দিয়েছেন, সে বিবরণ দেখে মানুষের চক্ষু প্রায় চড়কগাছ! আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের সম্পদের বিবরণ দেখে এটা বেশ সহজেই অনুমেয় তারা কী পরিমাণ দুর্নীতি করছেন। অনেকে মন্তব্য করেছেন, আমরা প্রার্থীদের সম্পদ গড়ার দুর্নীতির যে বিবরণ পাচ্ছি, সেটি একটি সামান্য অংশ মাত্র। কারণ হলফনামায় কেউই তার দুর্নীতির পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করবে না। অতএব সেই প্রকাশিত ক্ষুদ্র অংশটিই যদি এত মারাত্মক ও ভয়ংকর হয়, তাহলে পূর্ণ অংশটি কত ভয়ংকর ও মারাত্মক হতে পারে? বিষয়টি খুব সহজেই অনুমেয়। মহাজোট সরকারকে অনেকেই এখন মহাদুর্নীতিবাজ সরকার বলে সম্বোধন করছেন। আরও আশ্চর্যের বিষয়, প্রার্থীদের হলফনামাগুলো যেন জনসমক্ষে প্রকাশ করা না হয় সেজন্য ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করেছে। কেননা ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের দুর্নীতির চিত্র জনসমক্ষে প্রকাশ পেয়ে গেলে সাজানো নির্বাচনের সাজানো হাওয়ার দিক বদলে যেতে পারে। অনেকে রসিকতা করে বলছেন, এতদিন একটি কালো বিড়ালের গল্প জানতাম, আওয়ামী লীগে যে এত কালো বিড়ালের জন্ম হয়েছে, আমরা সেটা জানতাম না! স্বাধীন চেতনাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে, দায়িত্ববোধকে বিসর্জন দিয়ে বর্তমান নির্বাচন কমিশন আওয়ামী লীগের অনুরোধ রক্ষা করেছে এবং দুর্নীতির চিত্রগুলো তাদের ওয়েবসাইট থেকে গায়েব করে ফেলেছে। অর্থাৎ এভাবে তারা দুর্নীতিবাজদের সহায়তা করছেন। জনগণের জানার অধিকারকে খর্ব করছেন।
যাই হোক, ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলকে দমন-নিপীড়নের মাধ্যমে এতটাই কোণঠাসা করে রেখেছে যে, তারা রাজপথে আন্দোলন করার কোনো সুযোগই পাচ্ছেন না, যা গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের নামান্তর বললে কম বলা হবে। আজ ২৯ ডিসেম্বর মার্চ ফর ডেমোক্রেসির সমাবেশের ওপর সরকার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। সরকার কোনো আইন-কানুন, রেওয়াজের তোয়াক্কা না করে আইন-শৃংখলা বাহিনী দিয়ে যেসব কাজ করিয়েছে, তা দেখে মানুষ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কথা ভুলে গেছে। সহিংসতার কারণে মানুষ মারা যাচ্ছে, সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে, অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ। এরূপ পরিস্থিতিতে সামনে আরও কঠোর আন্দোলনের কথা বলা হয়েছে বিরোধী শিবিরের পক্ষ থেকে। এরপর থেকে সরকারদলীয় বুদ্ধিজীবীরা বলতে শুরু করলেন, বিরোধী দল দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করে অগ্রগতি বন্ধ করে দিচ্ছে, বিরোধী দল মানুষ মারছে ইত্যাদি। সরকার কর্তৃক আনীত অভিযোগগুলো প্রতিহিংসামূলক। কারণ বিরোধী দল দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে যে দাবি-দাওয়া সরকারের কাছে পেশ করে আসছে, তার প্রতি সরকার কোনোভাবেই কর্ণপাত করেনি। যদি করত তাহলে দেশবাসীকে আজকের অস্থির রাজনীতি দেখতে হতো না। বিরোধী দলের দাবি অযৌক্তিক নয়। নিরপেক্ষ-নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চাওয়া অবশ্যই গণতান্ত্রিক অধিকার। বরং সরকারই এ দাবিকে অস্বীকার করে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে। আর সরকারের এরূপ নিরপেক্ষহীনতা এবং পরিকল্পিত কিছু কর্মকাণ্ডের কারণেই দেশে এ অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। সুতরাং দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ আনতে হলে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে।
পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত ছাড়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পাশে কেউ নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ কেউই নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীর পাশে নেই। কোন সাহসে তিনি এগোচ্ছেন? অদৃশ্য এমন কী কারণ রয়েছে যার ওপর নির্ভর করে তিনি কাউকেই তোয়াক্কা করছেন না? একজনমাত্র সতীর্থকে নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছা দুষ্কর। বিষয়টি তিনি নিজেও বেশ ভালো করেই জানেন। তারপরও কেন ঢাল-তলোয়ারহীন অবস্থায় দুস্তর পারাপারে যাত্রা করেছেন, আমার জানা নেই। আমার আবেদন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেন ইতিহাসে কলঙ্কিতদের তালিকায় নিজের নাম যুক্ত না করেন, এটা বিবেচনায় রাখবেন। তার শুভবুদ্ধির উদয় হবে সেই প্রার্থনাই করি।
মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক : কলাম লেখক; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

সিকিমের মীর জাফরের আত্মোপলব্ধি by ইকতেদার আহমেদ

আমাদের দেশে ও বাংলা সাহিত্যে মীর জাফর নামটি বিশ্বাসঘাতকের প্রতিশব্দ বা সমার্থক শব্দ হিসেব ঠাঁই করে নিয়েছে। মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রে বাংলার স্বাধীনতা ইংরেজদের হাতে সমর্পণের পর থেকে অদ্যাবধি মীর জাফর বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে চিহ্নিত। বিশ্বাসঘাতকতা-পরবর্তী মীর জাফর স্বল্প সময়ের জন্য বাংলার মসনদে আরোহণ করে আত্মতৃপ্তি লাভ করলেও অচিরেই তার ও তার পুত্রের করুণভাবে জীবনের যবনিকাপাত ঘটলে সে আত্মতৃপ্তি চিরদিনের জন্য তার পরিবারের সদস্য ও অনুরাগীদের কাছে আত্মজ্বালা হিসেবে দেখা দেয়। হিমালয়ের দক্ষিণ কোলঘেঁষে পূর্ব পশ্চিমে বিস্তৃত পাশাপাশি অবস্থিত তিনটি দেশ বংশানুক্রমিকভাবে কয়েক শতক ধরে রাজা দ্বারা শাসিত ছিল। এ তিনটি দেশের দুটি নেপাল ও ভুটান বর্তমানে স্বাধীন রাষ্ট্র। অপরদিকে এ দুটির মাঝখানে অবস্থিত সিকিমের পায়ে আবদ্ধ হয়েছে পরাধীনতার শিকল। পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী বৌদ্ধ গুরু পদ্মসম্ভবা অষ্টম শতাব্দীতে সিকিম সফর করেন এবং সেখানকার অধিবাসীদের বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষাদানপূর্বক রাজতন্ত্রের ভবিষ্যদ্বাণী করেন। ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি সিকিমে নামগিয়েল রাজবংশ রাজ্য শাসনের কর্তৃত্ব লাভ করে এবং সে কর্তৃত্ব তিন শতকেরও বেশি সময় ধরে ভারত দ্বারা স্বাধীনতা হরণ পর্যন্ত অক্ষুণ্ন থাকে। নামগিয়েল বংশের শাসন অব্যাহত থাকাকালীন প্রথম সার্ধশতকে সিকিম বারবার নেপালি আক্রমণকারীদের আগ্রাসী অভিযানে রাজ্যের ভূমি হারানোসহ লুণ্ঠনের কবলে পতিত হয়। পরবর্তীকালে উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনকালে সিকিম ব্রিটিশদের সঙ্গে মিত্রতা বন্ধনে আবদ্ধ হলে নেপাল সর্বাÍক শক্তি দিয়ে সিকিমের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এ যুদ্ধে সিকিমের অধিকাংশ অঞ্চল নেপালের কাছে হাতছাড়া হয়ে যায়। এরপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অষ্টাদশ শতকের প্রারম্ভে নেপাল আক্রমণ করলে গুর্খা যুদ্ধের প্রাদুর্ভাব হয় এবং এ যুদ্ধ-পরবর্তী সিকিম নেপালের সঙ্গে সুগাউলি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে দখলকৃত ভূমি ফেরত পায়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলা একসময় সিকিমের অংশ ছিল। অষ্টাদশ শতকের তৃতীয় দশকের মাঝামাঝি সিকিম সামান্য অর্থের বিনিময়ে দার্জিলিং শহরের মালিকানা ব্রিটিশদের কাছে হস্তান্তরে বাধ্য হয় এবং এর কিছুকাল পর সম্পূর্ণ দার্জিলিং জেলা ও মোরাং অঞ্চল ব্রিটিশদের হস্তগত হয়। উপমহাদেশ শাসনকালে ব্রিটিশরা সিকিমের রাজাকে স্বাধীন সত্তা বজায় রেখে দেশ পরিচালনার নিশ্চয়তা দেয়। সিকিম স্থলবেষ্টিত হিমালয় পাদদেশের একটি রাজ্য। এর পশ্চিমে নেপাল, উত্তরে চীনের তিব্বত, পূর্বে ভুটান এবং দক্ষিণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। সর্বশেষ ২০১১-এ অনুষ্ঠিত আদমশুমারি অনুযায়ী সিকিমের লোকসংখ্যা ৬ লাখ ১১ হাজারের কাছাকাছি। সিকিম গোয়ার পর ভারতের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য। পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা সিকিম-নেপাল সীমানায় অবস্থিত। সিকিমের আয়তন ৭ হাজার ৯৬ কিলোমিটার। এটি ভারতের সবচেয়ে কম জনবসতিপূর্ণ রাজ্য।
ব্রিটিশদের কাছ থেকে উপমহাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর জহরলাল নেহেরু ভারতের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন গণভোটের মাধ্যমে সিকিমকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়। কিন্তু নেহেরুর শাসনামল থেকেই সিকিম ভারতের বিশেষ আশ্রিত রাজ্য হিসেবে পরিগণিত হতে থাকে এবং এর প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ ভারত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। ভারতের সঙ্গে চীনের একমাত্র স্থল যোগাযোগ ছিল সিকিমের নাথুলা-পাস দিয়ে। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের পর এ পাসটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, যা ২০০৬ সালে খুলে দেয়া হয়। নামগিয়েল রাজবংশের শেষ রাজা চগিয়াল পান্ডেল থন্ডুপ নামগিয়েল ১৯৬৫ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেন। রাজার আমেরিকান স্ত্রী হুপ কুক সিকিমের সাবেক সম্পদের প্রত্যাবর্তনবিষয়ক নিবন্ধ লিখলে ভারত চরমভাবে অসন্তুষ্ট হয়। ১৯৭৪ সালে সিকিমে যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে ৩২ আসনের পার্লামেন্টে লেন্দুপ দর্জির নেতৃত্বাধীন সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস (এসএনসি) ৩১টি আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার গঠন করে। সরকার গঠন-পরবর্তী সিকিমকে ভারতভুক্ত করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৯৭৫ সালের ২৭ মার্চ লেন্দুপ দর্জির মন্ত্রিসভা সিকিমের রাজতন্ত্র বিলোপের সিদ্ধান্ত নেয়। অতঃপর সিদ্ধান্তটি পার্লামেন্টে অনুমোদন পরবর্তী চারদিনের মাথায় সাজানো ও পাতানো গণভোটের আয়োজন করে বলপ্রয়োগে সিকিমকে ভারতভুক্ত করা হয়।
সিকিমের সচেতন জনগোষ্ঠীর অভিমত, গণভোটটি ছিল নেহায়েত একটি আনুষ্ঠানিকতা। মূলত গণভোট অনুষ্ঠানের আগেই সিকিমের সর্বত্র ছদ্মবেশে ভারতীয় পুলিশ ও সৈন্যদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে, যারা বন্দুকের ভয় দেখিয়ে সিকিমের নাগরিকদের গণভোটের সপক্ষে ভোটদানে বাধ্য করেছিল। সিকিমের নামগিয়েল রাজবংশ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও রাজ্যের অর্ধেকেরও বেশি নেপালি বংশোদ্ভূত হিন্দু জনগোষ্ঠী বৌদ্ধ রাজার শাসনকে কখনও তাদের স্বার্থের অনুকূলে ভাবেনি।
১৯৭৩-৭৫ সালে বৌদ্ধ রাজার বিরুদ্ধে আন্দোলন চলাকালীন দেখা গেছে, সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রতি ভারতের সমর্থন এতটাই প্রকাশ্য ছিল যে, রাজার বিরুদ্ধে আন্দোলনে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী স্থানীয় সিকিমিদের অংশগ্রহণ নগণ্য হওয়ায় বিক্ষোভকে ব্যাপকতর করার প্রয়াসে দার্জিলিংসহ ভারতের আশপাশের এলাকা থেকে লোক এনে বিক্ষোভ সংগঠিত করা হতো এবং সবাইকে অবাক করে দিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যরা সাদা পোশাকে সিকিমে ঢুকে এসব বিক্ষোভে অংশ নিত। ক্ষমতাচ্যুত রাজা চগিয়ালের এডিসি হিসেবে কর্মরত ক্যাপ্টেন সোনাম ইয়াংদার ভাষ্য থেকে উপরোক্ত বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়।
সিকিমে রাজতন্ত্রবিরোধী বিক্ষোভ ভারতের মদদে যখন বৃদ্ধি পায় তখন ভারতের পক্ষ থেকে ভয় ছিল, সিকিমের অস্থিতিশীলতার সুযোগে চীন এটিকে তিব্বতের অংশ দাবি করে চীনের অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টা চালাবে। কিন্তু রাজা চগিয়াল রাজতন্ত্র রক্ষার ক্ষেত্রে ভারত সবসময় সচেষ্ট থাকবে এ বিশ্বাসে কখনও চীনকে তার নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ গোলযোগে বিজড়িত করতে চাননি।
সিকিমের ক্ষেত্রে ভারতকে বরাবরই দ্বৈত ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। ভারত সবসময় রাজা চগিয়াল লামডেনকে বলে এসেছে, যে কোনো মূল্যে সিকিমের রাজতন্ত্র রক্ষা করতে হবে। অন্যদিকে লেন্দুপ দর্জিকে বলে আসছিল, যে কোনো কিছুর বিনিময়ে হলেও রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করতে হবে। ভারতের মিথ্যা আশ্বাসে সরল রাজা পরবর্তীকালে বোকা বনলেও সে আশ্বাস ক্ষণকালের জন্য হলেও লেন্দুপ দর্জির মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আশা পূরণ করেছিল। সিকিমের পার্শ্ববর্তী ভুটান ১৯৭১ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। ভুটানের পথ ধরে সিকিম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করলে তা যে সিকিমের ভারতভুক্তির ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে দেখা দেবে, সে বিষয়টি ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সঠিকভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাছাড়া কৌশলগত কারণে হিমালয়ের কোলে নেপাল-ভুটানের মতো ভারত-চীন সীমান্তে তৃতীয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটুক তা ভারত কখনও চায়নি। ১৯৭৫ সালে সিকিম ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলে লেন্দুপ দর্জি ভারতের ২২তম রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। কিন্তু তার সে গৌরব চার বছরের মাথায় ভূলুণ্ঠিত হয়। ১৯৭৯-এর নির্বাচনে দেখা গেল পূর্ববর্তী নির্বাচনে একটি আসন

একটি গল্প, ক্ষমতাসীনদের সম্পদ ও দায়হীন কমিশন by আলমগীর স্বপন

একটি অপরাধবিষয়ক গল্প দিয়েই শুরু করা যাক। একদল ডাকাত ব্যাংকে ঢুকেছে ডাকাতির জন্য। উপস্থিত গ্রাহক আর কর্মচারীরা প্রথমে বাধা দেয়ার চেষ্টা করে তাদের। এ সময় ডাকাতেরা বন্দুক তাক করে বলে, ‘ভাইসব, টাকা গেলে সরকারের যাবে, আর প্রাণ গেলে যাবে আপনাদের। আপনারাই বুঝুন কোনটা বাঁচাবেন।’ এই হুমকিতে সবাই প্রাণ বাঁচানোর পথই বেছে নিলেন। তাই ডাকাতদের নির্বিঘ্নে টাকা নিয়ে আস্তানায় ফিরে যেতে আর কোনো বাধার মুখে পড়তে হল না। আস্তানায় ফিরে ডাকাতদের একজন বলল, ‘এবার গুনে দেখি কত টাকা লুট করলাম।’ এতে একজন বাধা দিয়ে বলে, ‘ধুর, এত টাকা গোনা কষ্টের ব্যাপার। টিভির খবর দেখেই জানা যাবে কত টাকা লুট করেছি।’ এদিকে ঘটনা শুনে মন্ত্রী মহোদয় ব্যাংক পরিদর্শনে গেলেন। সব কিছু দেখে তিনি বললেন, ‘ডাকাতেরা শুধু কয়েক বস্তা টাকাই নিয়েছে। বেশিরভাগ টাকাই তো রয়ে গেছে, আর সেফ ডিপোজিট বক্সগুলোও তো আছে। আসুন আমরা ওগুলো নিজেদের মাঝে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিই। ডাকাতদের দোষ হবে। কেউ বুঝতে পারবে না।’ যেমন কথা তেমন কাজ, সব ভাগাভাগি হয়ে গেল। আর ডাকাতির দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হল ডাকাত দলের সদস্যদের।
এই গল্পের মোরাল হল, যে যত উপরে, তার চুরি তত বড় এবং তা ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর চুরি-ডাকাতি করার ইচ্ছা থাকলে ভোটে দাঁড়িয়ে ক্ষমতায় গিয়ে মন্ত্রী-এমপি হয়ে করাটাই ভালো। এটাই বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নির্ভুল পদ্ধতি! গত পাঁচ বছরে ক্ষমতাসীন মন্ত্রী-এমপিদের অর্জিত সম্পদ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও এই সত্য একটু ঘুরিয়ে স্বীকার করেছেন। তিনি রাখঢাক না করে সরাসরিই বলেছেন, ‘ক্ষমতাবানরা তো সম্পদশালী হবেনই।’ এ জন্যই আমরা দেখতে পাচ্ছি ক্ষমতার পাঁচ বছরে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি ও নেতাকর্মীদের একটি অংশের সম্পদ ফুলে ফেঁপে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রীর সাবেক বিশেষ সহকারী মাহবুব-উল আলম হানিফের সম্পদের পাহাড় গড়ার খবর যেমন এসেছে, তেমনি সবচেয়ে আলোচিত হয়েছেন ২০ একর থেকে ২ হাজার ৮৬৫ একর কৃষি জমির মালিক বনে যাওয়া সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান। অন্যদিকে আলাদীনের জাদুর চেরাগের ছোঁয়া এসব প্রভাবশালীর স্ত্রীরাও কিন্তু কম পাননি। ঘরে বসে কোনো কিছু না করেও তারা আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। তবে এ তো গেল হলফনামায় তারা যে সম্পদের তথ্য দিয়েছেন তার চিত্র। এর বাইরে তাদের আরও বেশি সম্পদ আছে বলেই স্বাভাবিক ধারণা। এ জন্যই প্যারোডি করে বলা হচ্ছে, ‘আগে ছিল হাওয়া ভবন/এখন দেখি বহু ভবন’।
এ অবস্থায় ক্ষমতার জাদুর চেরাগে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে ওঠা এই রাজরাজড়াদের জবাবদিহিতার কি কোনো সুযোগ আছে? অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় নেই। কেননা নব্য এই জমিদারি শাসনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কিংবা নির্বাচন কমিশন (ইসি) মনে হয় প্রজা হয়েই থাকতে চায়। তা না হলে স্বাধীন হয়েও কেন দুদক এক্ষেত্রে গা-ঝাড়া দিয়ে মাঠে নামতে চায় না? নির্বাচন কমিশনই বা কেন ক্ষমতাসীন সম্পদশালীদের সম্পদের তথ্য আড়াল করতে চায়?
হলফনামায় প্রার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে সর্বোচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। এই নির্দেশনার বাধ্যবাধকতার কথা জানিয়ে, সম্পদের তথ্য লুকাতে নির্বাচন কমিশনে যাওয়া আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদের আবদার নাকচ করে দিতে পারতেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। কিন্তু তা না করে আদালতের নির্দেশ ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) মাঝখানে ফাঁকফোকর খুঁজেছেন তিনি। এর পরপরই ইসির ওয়েবসাইট থেকে রহস্যজনকভাবে প্রার্থীদের তথ্য-প্রমাণ গায়েবও হয়ে গিয়েছিল। যেখানে জনমত, আদালতের নির্দেশনা ইসির পক্ষে, সেখানে কেন সিইসি আলাদীনের চেরাগওয়ালাদের পক্ষ নিতে চেয়েছেন? অবশ্য আশার বিষয়, সমালোচনার মুখে ইসি তার অবস্থান পরিবর্তন করেছেন।
অন্যদিকে কারও অস্বাভাবিক সম্পদ আছে এমন সন্দেহ হলেই ব্যবস্থা নেয়ার কথা দুদকের। কিন্তু প্রার্থীদের ফুলে ফেঁপে ওঠা সম্পদের খবর গণমাধ্যমে এলেও এক্ষেত্রে কার্যত নির্বিকার প্রতিষ্ঠানটি। দুদকের কর্তাব্যক্তিরা বরং বলছেন, নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের সম্পদ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে বিশৃংখলা সৃষ্টি হতে পারে। দুদকের এত জনবল নেই যে সব বিষয়ে তারা হাত দেবে। কিন্তু দুদক আইন কী বলে। দুদক আইনের ২৬ (১) ধারা অনুযায়ী, ‘কমিশন কোনো তথ্যের ভিত্তিতে এবং উহার বিবেচনায় প্রয়োজনীয় তদন্ত পরিচালনার পর যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, কোনো ব্যক্তি বা তাহার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি, বৈধ উৎসের সহিত অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পত্তির দখলে রহিয়াছেন বা মালিকানা অর্জন করিয়াছেন, তাহা হইলে কমিশন লিখিত আদেশ দ্বারা উক্ত ব্যক্তিকে কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত পদ্ধতিতে দায়-দায়িত্বের বিবরণ দাখিলসহ উক্ত আদেশে নির্ধারিত অন্য যে কোনো তথ্য দাখিলের নির্দেশ দিতে পারবে।’
দুদক আইনে আমরা স্পষ্টই দেখছি, মন্ত্রী, এমপি, ক্ষমতাসীন বা সন্দেহভাজনদের অস্বাভাবিক সম্পদের তথ্য খতিয়ে দেখতে কী করতে হবে প্রতিষ্ঠানটিকে। অবশ্য সমালোচনার পর এখন দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ বদিউজ্জামান বলছেন, নির্বাচনের পর সন্দেহভাজনদের সম্পদের তথ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। সংশ্লিষ্টরা কীভাবে অল্প সময়ে এত বেশি সম্পদ অর্জন করেছেন সে বিষয়ে যৌক্তিক তথ্য চাওয়া হবে। তার কথা সত্যি হলে ভালো। আর পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য কৌশলী বক্তব্য হলে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানটির গ্রহণযোগ্যতা আরও তলানিতে ঠেকবে।
এক্ষেত্রে অবশ্য অতীতের অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত। গত পাঁচ বছর দুদক স্বপ্রণোদিত হয়ে কোনো ক্ষমতাসীনের সম্পত্তির তথ্য খতিয়ে দেখেনি। ইতিহাসে একবারই ভিভিআইপি, ভিআইপি রাজনীতিকদের বা তাদের প্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাব নিয়ে দুদকের চৌকাঠে দৌড়াতে দেখা গেছে। আর সেটি ছিল সেনাসমর্থিত বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। তবে তত্ত্বাবধায়কের আমলের সেই আশার বেলুন নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের আমলে পুরোটাই চুপসে গেছে। কেননা অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় বিশেষ আদালতে যাদের সে সময় সাজা হয়েছিল, গত পাঁচ বছরে তাদের অনেকেরই মামলা বাতিল হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে অবশ্য সৌভাগ্যবান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা। আর যাদের বিরুদ্ধে এখনও মামলা আছে, বিশেষ করে বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে, সেসব মামলা গত পাঁচ বছর উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত হয়ে আছে। এসব ক্ষেত্রে দুদকের বিরুদ্ধে অভিযোগ হল ক্ষমতাসীন ভিভিআইপি-ভিআইপি রাজনীতিকদের অবৈধ সম্পদের মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি শৈথিল্য দেখিয়েছে। প্রশ্ন আছে তাদের তদন্তের দুর্বলতা নিয়েও। আবার এক্ষেত্রে আদালতের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে খোদ দুদকই। বছরের পর বছর মামলা ঝুলিয়ে না রেখে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করে এর সুরাহা করতে পারতেন আদালত। এ কারণে বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে ঝুলে থাকা এসব মামলাই আবার বাতিল হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে, যদি তারা আবার ক্ষমতায় আসে।
ক্ষমতার এই চক্রে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হয়েও দুদক কিংবা নির্বাচন কমিশন সব সময় গিনিপিগ হিসেবে থেকে যাচ্ছে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানে যারা আসছেন, প্রধান কিংবা সদস্য হচ্ছেন, তারা চাকরি জীবনে সর্বোচ্চ অর্জনের পরই দায়িত্ব নিচ্ছেন। অবসর থেকে ফিরে এক্ষেত্রে কি তাদের চাওয়া-পাওয়ার কিছু থাকতে পারে? কিন্তু দলীয় ও নতজানু মনোবৃত্তির কারণে তারা সাহসী ভূমিকা রেখে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারছেন না। ইতিহাসের বরপুত্র হওয়ার সেই সুযোগ অবশ্য এখনও আছে দুদকের কর্তাদের সামনে। নির্বাচন কমিশনও অনমনীয় হয়ে এসব ক্ষেত্রে রাখতে পারে দৃষ্টান্ত। সুযোগ আছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনেও। কেননা তিনিই প্রতিবছর মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদের হিসাব জমা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। যদিও গত পাঁচ বছরে তা কথার কথাই থেকে গেছে। তারপরও আমরা হতাশ হতে চাই না। কেননা অর্থমন্ত্রী, দুদক চেয়ারম্যান বলছেন ব্যবস্থা নেয়ার কথা, আশ্বাস দিয়েছেন নতুন কিছু করার, সন্দেহভাজন সম্পদশালীদের ধরার। তাই এ দেশের আমজনতা ভারতের দিল্লির আম আদমি পার্টি হয়ে ওঠার আগে আরও সুযোগ দিতে চায় তাদের। অপেক্ষা করে দেখতে চায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীল অবস্থান।
আলমগীর স্বপন : সাংবাদিক

উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ by বদরুদ্দীন উমর

‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ শিরোনামে শামসুর রাহমান এক কবিতা লিখেছিলেন। এ কবিতা লেখার সময় তার মাথায় ছিল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মতো ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীল দল। তিনি বেঁচে থাকলে তার মাথায় যে এখন আওয়ামী লীগও থাকত এটা মনে হয়। কারণ এখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটও এখন একই ধরনের উদ্ভট এক উটের পিঠে চড়ে জনগণের ওপর লাঠি ঘোরাচ্ছে ও দেশের সর্বনাশ করছে। এরা যে শুধু এভাবে লাঠি ঘোরাচ্ছে তাই নয়, এদের মুখেও কোনো লাগাম নেই এবং কথা বলার সময় এদের মুখভঙ্গির মধ্যেও নেই কোনো সভ্যতার ছাপ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন যে, তিনি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে গ্রাম্য বর্বরতার হাত থেকে উদ্ধার করেছিলেন। এখন বাংলাদেশের এমনই অবস্থা যে, জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মতো রাজনৈতিক দলকে উদ্ভট উটের পিঠ থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে দেশকে রক্ষা করার মতো কোনো যথাযথ রাজনৈতিক শক্তি নেই।
বাংলাদেশের সর্বত্র এখন এক অস্বাভাবিক অবস্থা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাদের কয়েকটি হাস্যকর জোট সঙ্গী দলকে সঙ্গে নিয়ে আগামী ৫ জানুয়ারি এক প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এমনভাবে মরিয়া হয়েছে, যার প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি-জামায়াত ঐক্য জোটও এখন একইভাবে মরিয়া হয়ে দেশজুড়ে জ্বালাও-পোড়াও অভিযান শুরু করে এমন বিশৃংখল ও ধ্বংসাÍক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, যার কোনো পূর্ব দৃষ্টান্ত এ দেশে নেই। আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র নেতা হিসেবে শেখ হাসিনা এখন যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করে চলেছেন, তারও কোনো পূর্ব দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে, বলা চলে বিশ্বের অন্য কোনো দেশের রাজনীতিতেও নেই। এটাই এই সমগ্র পরিস্থিতির মূল কারণ। পর পর তার অনেক কাজের দ্বারাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, তার চিন্তা ও কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক বলে আখ্যায়িত হওয়ার অযোগ্য। তার মধ্যে কোনো সঙ্গতি ও সামঞ্জস্য নেই। তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে বেশ কিছুদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য তাদের নাছোড় দাবির অর্থ হল তারা নির্বাচিত সরকারের পরিবর্তে একটি অনির্বাচিত সরকারের অধীনে ও নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন করতে চান। শেখ হাসিনার দাবি হল, নির্বাচন যাতে কোনো অনির্বাচিত সরকারের অধীনে না হতে পারে, এ জন্যই তিনি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস করে দেশে গণতন্ত্র সমুন্নত রাখার ব্যবস্থা করেছেন! বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, ১৯৯৬ সালে বিএনপির বিরোধিতার মুখে তিনি দেশে এক অস্থির পরিস্থিতি তৈরি করে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্য সংবিধান সংশোধন করেছিলেন!! সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোনো নির্বাচিত সরকার ছিল না এবং সেই ধরনের সরকারের অধীনে শেখ হাসিনা ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮-এর নির্বাচন করেছিলেন। কাজেই হঠাৎ করে এ ব্যাপারে তার সম্পূর্ণ উল্টো অবস্থান বাস্তবিকই বিস্ময়কর। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, অনির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে ‘নীতিগত’ ও ‘গণতান্ত্রিক’ অবস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে পঞ্চদশ সংশোধনীকে অবলম্বন করে তিনি ৫ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে অনড় থাকা সত্ত্বেও ইতিমধ্যে অধিকাংশ ভোটারকে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করে তিনি একটি অনির্বাচিত সরকারের প্রধান হওয়া নিশ্চিত করেছেন!!! তার এই স্ববিরোধী এবং অগণতান্ত্রিক কাজের জন্য তার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নেই। তিনি মনে করছেন সরকারি ক্ষমতার জোরে এভাবে সরকার গঠন করে ক্ষমতায় টিকে যাবেন!!! কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে এ চিন্তা যে সম্ভব নয়, এটা বলাই বাহুল্য।
আগামী নির্বাচন যেভাবেই হোক তার সরকারের অধীনে ও নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তিনি যেসব কাজ করছেন তার মধ্যে একটি হল, তাদের জোটের শরিক জাতীয় পার্টিকে ভেঙে ফেলে নিজেদের নির্বাচন সঙ্গী করা। জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ঘোষণা করেছেন যে, তিনি নির্বাচন করবেন না। এই মর্মে তিনি তার দলের প্রার্থীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য চিঠি দিতে বলেছেন। তারা সে চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু হাসিনার অনুগত এবং আজ্ঞাবাহী নির্বাচন কমিশন সব নিয়ম-কানুন শিকেয় তুলে তাদের দরখাস্ত নামঞ্জুর করে তাদের নির্বাচন প্রার্থিতা বহাল রেখেছেন!! শুধু তাই নয়, এরশাদ যাতে সক্রিয়ভাবে নির্বাচনে যাওয়ার বিরুদ্ধে আরও কোনো পদক্ষেপ ব্যক্তিগতভাবে নিতে না পারেন তার জন্য তাকে শেখ হাসিনা অসুস্থ ঘোষণা করে চিকিৎসার জন্য সামরিক হাসপাতালে আটক রেখেছেন। এরশাদ বলছেন, তিনি অসুস্থ নন। তাকে জোরপূর্বক হাসপাতালে আটক রাখা হয়েছে! কিন্তু সরকার বলছে, তিনি অসুস্থ!! এখানেই শেষ নয়, এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদের সঙ্গে চক্রান্ত করে শেখ হাসিনা তাকে দিয়ে নির্বাচন করাচ্ছেন। তারা ইতিমধ্যে এরশাদের মতের বিরুদ্ধে তার নামে নির্বাচনী ইশতেহারও প্রচার করেছেন জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনের লাইনে রাখার জন্য!! অর্থাৎ শেখ হাসিনা এখন শুধু আওয়ামী লীগেরই নয়, অন্য একটি পার্টির নির্বাচনও গায়ের জোরে পরিচালনা করছেন!! এরও কোনো পূর্ব দৃষ্টান্ত নেই। এটা কোনো সুস্থ মস্তিষ্ক ও সুস্থ রাজনৈতিক চিন্তাপ্রসূত ব্যাপার নয়। এর সঙ্গে গণতন্ত্রচর্চার যে কোনো সম্পর্ক নেই, এটাও বলাই বাহুল্য।
বিএনপি-জামায়াত জোট কয়েক মাস ধরে আন্দোলনের নামে দেশে হরতাল-অবরোধ ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচি পালন করছে। শেখ হাসিনা এই জ্বালাও-পোড়াও এর মতো বিধ্বংসী কাণ্ডের মুখর সমালোচক। তার অনুগৃহীত মন্ত্রী-এমপি ও দলীয় নেতারা তোতাপাখির মতো তার এই কথার প্রতিধ্বনি করছেন। আগে দেখা গেছে, বিএনপির হরতালের সমালোচনা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ নিজেও একদিন সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে। এখন বিএনপির ২৯ ডিসেম্বরের ‘ঢাকা চলো’ কর্মসূচি বানচাল করার জন্য তারা শুধু পুলিশকে দিয়ে ঢাকার সমাবেশের জন্য তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেই নয়, দেশব্যাপী এক অবরোধ কর্মসূচি কার্যকর করতে পুলিশসহ সব রকম আইন-শৃংখলা বাহিনী এবং তাদের সহযোগী হিসেবে দলীয় গুণ্ডাপাণ্ডাদেরও পথে নামিয়েছে!! সরকারি দল আওয়ামী লীগের এই অবরোধ বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর অবরোধের মতোই অচল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে বিএনপি এই অবরোধের মুখে তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে দেশজুড়ে যে ধ্বংসাÍক পরিস্থিতি দেখা দেবে তার দায়ভার যে আওয়ামী লীগকে নিতে হবে, এটা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং বুদ্ধিজীবী ছাড়া আর কে অস্বীকার করতে পারে?
এসব থেকে বোঝার অসুবিধা নেই যে, বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর রাজনীতি দেশ ও জনগণকে এমন এক ভয়াবহ সংকটের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে, যার দায়িত্ব মূলত সরকারের। নির্বাচনকালে শেখ হাসিনা নিজে সরকারি ক্ষমতায় থেকে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি করার সিদ্ধান্তে অনড় থেকেই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন। তিনি যেভাবে সরকার ও নিজের দলের নেতৃত্ব প্রদান করছেন সাধারণভাবে রাজনৈতিক সংকট ও সামাজিক বিশৃংখলার পূর্বশর্ত তৈরি করেছেন। অন্য কারণ বাদ দিয়েও শেখ হাসিনার এই অবস্থা রাজনৈতিক অসুস্থতার লক্ষণ। এর চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, তাতে দেশ ও বিদেশে আওয়ামী লীগের বিচ্ছিন্নতা এখন প্রায় সম্পূর্ণ। ভারত সরকার ছাড়া এদের সমর্থন ও শক্তির জোগান দেয়ার অন্য কেউ নেই। কাজেই ভারত সরকার ছাড়া আর কোনো শক্তির পক্ষে এই চিকিৎসা প্রদানের ক্ষমতা নেই। তবে পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যাতে ভারতীয় হাসপাতালেও এ চিকিৎসা সম্ভব, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

চীনের আকাশে মার্কিন বিমান

চীন ঘোষিত নতুন ‘আকাশ প্রতিরক্ষা অঞ্চল’কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দেশটির নতুন আকাশসীমা আইন লংঘন করে সেখানে দুটি বি-৫২ বোমারু বিমান পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিমান দুটি পূর্ব চীন সাগরে চীনের ঘোষিত অঞ্চলের মধ্যে থাকা জাপানি মালিকানাধীন দুটি বিতর্কিত দ্বীপের আকাশসীমায় টহল দেয়। বিতর্কিত অঞ্চলটিতে জঙ্গি বিমান পাঠানোর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র চীনকে অবহিত করেনি। কর্মকর্তারা এএফপিকে জানান, এ ঘটনার মাধ্যমে বেইজিং অঞ্চলটিতে কোনো ধরনের আগ্রাসন চালালে ওয়াশিংটন তা প্রতিহত করার ইঙ্গিত দিল। এর মাধ্যমে জাপানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনেরও আভাস পাওয়া গেল। অস্ত্রবিহীন বোমারু বিমান দুটি সোমবার গুয়াম থেকে উড্ডয়ন করে। প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা একে ‘কোরাল লাইটনিং গ্লোবাল পাওয়ার ট্রেইনিং স্টোরি’ নামে একটি নিয়মিত মহড়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পেন্টাগনের মুখপাত্র কর্নেল স্টিভেন ওয়ারেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘গত রাতে আমরা একটি প্রশিক্ষণ মহড়া চালিয়েছি। অনেক আগেই মহড়াটির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। গুয়াম থেকে দুটি বিমান উড্ডয়ন করে গুয়ানেই ফিরে আসার পরিকল্পনা করা হয়।’ পূর্ব চীন সাগরে মানববসতিহীন কিন্তু খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ কয়েকটি দ্বীপের (জাপানে সেনকাকু ও চীনে দিয়াওয়ু) মালিকানা নিয়ে জাপান ও চীনের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। বর্তমানে জাপানি মালিকানাধীন দ্বীপগুলো ঐতিহাসিকভাবে চীনের সীমানাভুক্ত ছিল বলে চীন দাবি করে আসছে। ভূতাত্ত্বিকভাবে দ্বীপগুলো চীনের সীমানায় পড়েছে বলে জাতিসংঘে যুক্তি পেশ করেছে দেশটি। শনিবার ওই দ্বীপের আকাশসীমাসহ পূর্ব চীন সাগরের একটি ব্যাপক এলাকাকে নিজের ‘আকাশ প্রতিরক্ষা অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা দেয় চীন। এই এলাকায় প্রবেশকারী বিদেশী বিমানকে চীনের আইন মেনে চলতে হবে আর না হলে ‘জরুরি প্রতিরক্ষা পদক্ষেপ’ মোকাবেলা করতে হবে বলে জানিয়ে দেয় দেশটি।
এ ঘোষণা দেয়ার পর পরই জাপান প্রতিবাদ জানিয়ে ‘কোনোভাবেই বৈধ নয়’ বলে ঘোষণাটি প্রত্যাখ্যান করে। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা কর্নেল স্টিভ ওয়ারেন পেন্টাগন থেকে বলেছেন, ‘আমরা আমাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম অনুযায়ী কাজ করে যাব, এর আওতায় আমরা। ওই এলাকায় উড্ডয়ন পরিকল্পনা চীনের কাছে পেশ করব না, তাদের সঙ্গে রেডিও মারফত যোগাযোগও করব না।’ পর্যবেক্ষণে ছিল মার্কিন বোমারু বিমান-চীন : চীন বলেছে, বিমান প্রতিরক্ষা শনাক্তকরণ এলাকা বা এডিআইজেড অঞ্চলে দুটি নিরস্ত্র ও দূরপাল্লার মার্কিন বোমারু বিমান প্রবেশের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিমান দুটি বিতর্কিত সেনকাকু বা দিয়াওয়ু দ্বীপপুঞ্জের ওপর দিয়ে ওড়াউড়ি করে এবং এজন্য চীনের কোনো অনুমতি নেয়া হয়নি বলে পেন্টাগন জানিয়েছে। এ বিষয়ে চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, বিমান প্রতিরক্ষা শনাক্তকরণ এলাকায় কার্যকরী বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রয়েছে। মার্কিন বি-৫২ বোমারু বিমান দুটিকে শনাক্ত করা হয় এবং তারা ২ ঘণ্টা ২২ মিনিট ধরে ওই এলাকার ওপর দিয়ে উড়ে বেড়ায় সে রেকর্ডও তাদের হাতে রয়েছে। আকাশ নীতি মানবে না জাপান এয়ারলাইন্স : চীন পূর্ব চীন সাগর এলাকায় ‘আকাশ প্রতিরক্ষা শনাক্তকরণ অঞ্চল’ গঠন করে যেসব নিয়মনীতির ঘোষণা দিয়েছে বুধবার তা না মানার কথা জানিয়েছে জাপানের দুটি এয়ারলাইন্স। জাপান এয়ারলাইন্সের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোকে চীনের নিয়মনীতি মানতে হবে না, মঙ্গলবার জাপান সরকার এ কথা বলার পর আমরা বৈঠকে বসি। বৈঠকে চীনের আকাশ প্রতিরক্ষা অঞ্চলের নিয়ম না মানার সিদ্ধান্ত হয়।’ এ পরিপ্রেক্ষিতে অল নিপ্পন এয়ারওয়েজও চীনের নিয়ম না মানার ঘোষণা দেয়। এর আগে জাপানের দুটি বৃহৎ এয়ারলাইন্স বলেছিল, চীনের ঘোষিত আকাশ প্রতিরক্ষা অঞ্চল দিয়ে বিমান আসা-যাওয়ার জন্য তারা বেইজিংয়ের কাছে তাদের ফ্লাইট পরিকল্পনা জমা দিয়েছে।

মধ্যমেয়াদি সংকটের পথে বাংলাদেশ?

টানা অবরোধে অর্থনীতির চাকা অচল। পরিবহনের অপেক্ষায়
বাঘাবাড়ী নৌবন্দরে লাখ লাখ টন সার পড়ে আছে
বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল ও সহিংস রাজনীতি দেশের অর্থনীতিকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল করে দিচ্ছে। সারা বিশ্বে বাংলাদেশ যেখানে একটি সম্ভাবনার দেশ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছিল, এখন তা ক্রমেই একটি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। দেশের নির্বাচনী অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা এখন যেভাবে চলছে, ২০১৪ সালেও যদি তা অব্যাহত থাকে, তাহলে দেশ একটি মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটে নিপতিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সিপিডির পক্ষ থেকে আমরা গত অক্টোবরে বলেছিলাম, চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে। এরপর বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বাংলাদেশ ব্যাংকও একই ধরনের প্রাক্কলন করেছে। এমনকি সম্প্রতি কেউ কেউ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কাও করেছেন। তা যদি হয়, তবে তিন দশক ধরে গড়ে ১ শতাংশ হারে দেশে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ছিল, এই দশকে (২০১০-২০) তাতে বিচ্যুতি ঘটতে পারে। অথচ, এই দশকে গড়ে ৭ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হওয়ার কথা ছিল। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলে, রাজনৈতিক অস্থিরতার ধাক্কা খাওয়া দেশগুলোয় প্রবৃদ্ধির হারে একবার বড় পতন হলে তা আবার ফিরিয়ে আনতে কমপক্ষে চার থেকে ছয় বছর সময় লেগে যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কি সে পথে এগোচ্ছে? প
রবৃদ্ধি মার খাওয়ার মূল কারণ হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগের ধারা দুর্বল হয়ে যাওয়া। গত দুই বছরে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ কমলেও সরকারি বিনিয়োগ তা অনেকটা পুষিয়ে নিয়ে মোট বিনিয়োগের হারকে খুব একটা পড়তে দেয়নি। এবার সরকারি ও ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ উভয় ক্ষেত্রেই পতন ঘটবে বলে মনে হচ্ছে। বিনিয়োগের পতনের ধারা শুধু দেশীয় ব্যক্তি খাত নয়, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সত্য। এতে দেশজ আয়ের অংশ হিসেবে মোট বিনিয়োগের হার নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যেটি একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। বিনিয়োগ কমে যাওয়ার প্রত্যক্ষ ফল বর্ধিত কর্মসংস্থান না হওয়া। কিন্তু অর্থনীতির ব্যষ্টিক পর্যায়ের অর্থাৎ উৎপাদন ও ব্যবসায় পর্যায়ের যে পরিস্থিতি, তাতে নতুন কর্মসংস্থান দূরের কথা, এই মুহূর্তে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছাঁটাই হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। হরতাল-অবরোধে নিয়ত আয় হারাচ্ছেন দিনমজুরেরাও। ভবিষ্যতে এর প্রভাব পড়বে দারিদ্র্য পরিস্থিতির ওপর। রাষ্ট্রীয় খাতের বিনিয়োগের দুর্বল অবস্থার প্রমাণ হলো গত অর্থবছরের প্রথম চার মাসে, যেখানে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হয়েছিল ২০ শতাংশের মতো, সেখানে এবার বাস্তবায়ন হয়েছে ১৫ শতাংশ। এর বড় কারণ, বৈদেশিক সাহায্যের অবমুক্তি হচ্ছে ধীরগতিতে। গত অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে যেখানে ৩৬ কোটি মার্কিন ডলার নিট বৈদেশিক সাহায্য এসেছিল, এবার একই সময়ে তা এসেছে মাত্র ছয় কোটি ডলার। তাই এডিপি বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে বৈদেশিক প্রকল্প সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়নের ক্ষেত্রেও একধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে হয়। এখানেও টাকা অবমুক্তির হার গত বছরের তুলনায় কম। এর বড় কারণ,
সরকার জুলাই-অক্টোবরে রাজস্ব আদায় করেছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ছয় হাজার কোটি টাকা কম। বছর শেষে যা প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে। তবে এসব কিছু ছাপিয়ে হয়তো রয়েছে দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে উন্নয়ন প্রশাসনের ত্রিশঙ্কু অবস্থা। দৈনন্দিন কাজের বাইরে রাজনৈতিক সহিংসতা মোকাবিলা ও নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের পর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য তাদের হয়তো সামান্যই সময় কিংবা উৎসাহ থাকবে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে এই উন্নয়ন প্রশাসনের গতি ফিরে পাওয়া আরও কষ্টকর হবে। মোট আমদানির হার প্রভূত পরিমাণে কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে বিনিয়োগ চাহিদা পড়ে যাওয়ায় আমদানিকাঠামোতে পুঁজি পণ্যের উপস্থিতি কমে যাওয়া। একই সঙ্গে আমরা দেখি, ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহের হার এখন বাজেট ঘোষণার সময়ের চেয়েও কম, যা কিনা মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে শিল্পঋণের প্রবাহের বৃদ্ধিও নেতিবাচক, যা সাম্প্রতিককালে আর দেখা যায়নি। এই মুহূর্তে দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রায় ৮৪ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে। তবে ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থার চিত্র বেশি প্রকাশ পায় তফসিলকৃত মন্দঋণের হারের বৃদ্ধিতে।
২০১২ সালের জুনে যা ছিল ৭ শতাংশের কিছুটা ওপরে, এ বছরের জুনে তা হয়ে যায় প্রায় ১২ শতাংশ। আর এ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে তা আরও ১ শতাংশ বেড়ে গেছে। হল-মার্কের মতো বহু মন্দ গ্রাহককে ঋণ দেওয়া যেমন এর জন্য দায়ী, তেমনি রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যবসায় মার খেয়ে অনেক প্রকৃত উদ্যোক্তাই ব্যাংককে টাকা ফেরত দিতে পারছেন না। প্রবাসী-আয় (রেমিট্যান্স) বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাঙা করার ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রেমিট্যান্স এসেছে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ কম। এর অন্যতম কারণ, জুলাই-অক্টোবর মাসে জনশক্তি রপ্তানি কমে গেছে প্রায় ২১ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রায় টাকার বিনিময় হার শক্তিশালী হওয়ায় অনেক অনাবাসী হয়তো ব্যাংকের মাধ্যমে উপার্জিত টাকা পাঠাতে অনুৎসাহী হচ্ছেন। আবার কেউ হয়তো দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিদেশে টাকা রাখাটাই শ্রেয় মনে করে থাকতে পারেন। আর নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অবৈধ উপায়ে বিপুল পরিমাণে টাকা পাঠানোর প্রবণতা ইতিমধ্যে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখনো উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হচ্ছে আমাদের রপ্তানি খাত। গত পাঁচ মাসে রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। একদিকে তাজরীন ও রানা প্লাজা-উত্তর সময়ে বাংলাদেশে শিল্পকারখানায় কর্মপরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ, অন্যদিকে রাজনৈতিক সহিংসতায় উৎপাদন, পরিবহন ও জাহাজীকরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এর মধ্যেও রপ্তানির এই প্রবৃদ্ধি প্রশংসনীয়। তবে মনে রাখতে হবে, এগুলো সবই আগের কার্যাদেশের কারণে, যা ভবিষ্যতে অব্যাহত থাকবে, তার নিশ্চয়তা নেই। ইতিমধ্যে প্রচুর কার্যাদেশ বাতিল হচ্ছে। ক্রেতারা আমদানির বিকল্প উৎস খুঁজছেন ভারত, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমারে। সম্প্রতি পাকিস্তান ইউরোপীয় বাজারে বিশেষ বাণিজ্য-সুবিধা পেয়েছে, ভারতও পেতে চলেছে জাপানের বাজারে। এ ছাড়া পোশাকশিল্পের শ্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে যেসব শর্ত প্রতিপালন করতে হবে, তা-ও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বছর দেশে আমনের ভালো ফলন হয়েছে। চাষাধীন জমির পরিমাণ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে বিঘাপ্রতি ফসলের উৎপাদনও। কিন্তু রাজনৈতিক সহিংসতায় পরিবহনব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ায় ধান-চাল আটকে গেছে মিলের চাতাল কিংবা পাইকারি গুদামে। এতে কৃষক ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং গ্রামীণ শিল্পকারখানা বঞ্চিত হচ্ছে প্রাপ্য আয় থেকে। শীতকালীন সবজি ও দুধের মতো পচনশীল পণ্য খুচরা বাজারে আসতে না পারায় গ্রামীণ অর্থনীতি আরেক দফা ধাক্কা খাচ্ছে। এখন তো বোরো মৌসুমই হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছে। কারণ, সারা দেশে কৃষকের কাছে সার-বীজ পৌঁছানো যাচ্ছে না।
তবে গ্রামে বা শহরে—সব ক্ষেত্রেই মার খাচ্ছেন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ব্যবসায়ীরা। এঁরা সবাই স্বল্পপুঁজিতে চলেন, বেশির ভাগেরই ব্যাংক-সুবিধা নেই। রাজনৈতিক নৈরাজ্যের কারণে তাঁদের নিত্যদিনের উৎপাদন ও বেচাকেনা যদি চালু না থাকে, তাহলেও তাঁদের কাঁচামালের দাম, দোকান ভাড়া ও শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন দিতে হয়। আর সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ইতিমধ্যে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।  এদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতায় শীতকালের ভরা মৌসুমেও কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সুন্দরবনসহ দেশের পর্যটন স্থানগুলো এখন পর্যটকশূন্য। সংকটের পদধ্বনি বাংলাদেশ অর্থনীতি এখন একটি নিষ্ঠুর সময় অতিক্রম করছে। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতির টিকে থাকার ক্ষমতাকে পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, অর্থনীতি আর কত দিন এভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে পারবে? সহিংসতার রাজনীতির দাবানলে অর্থনীতির সম্ভাবনার আশা-স্বপ্নগুলো কখন সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যাবে? বর্তমানের অনিশ্চিত যাত্রা অব্যাহত থাকলে শুধু ২০১৩-১৪ অর্থবছর নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি মধ্যমেয়াদি সংকটে প্রবেশ করতে পারে। মনে রাখতে হবে, অনিশ্চয়তার মধ্যে কোনো দিনই বড় ধরনের ব্যক্তি বিনিয়োগ হয় না, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের গুণমানও বাড়ে না। বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ কি না, বিশ্বে এই প্রশ্নও এখন উঠছে। আমদানির উৎস হিসেবে বাংলাদেশ নির্ভরযোগ্য দেশ কি না, সেটাও আলোচিত হচ্ছে। যাঁরা একদিন বাংলাদেশের সম্ভাবনার অর্থনীতি নিয়ে প্রশংসাগাথা লিখতেন, তাঁরা আজ এ দেশের রাজনৈতিক ঝুঁকি ও সামাজিক অস্থিরতা নিয়ে উচ্চকিত।
বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত অবস্থানকে কেন্দ্র করে চীন, ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারকে নিয়ে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সহযোগিতার যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, ক্রমেই যেন তা ম্রিয়মাণ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের ‘উন্নয়ন-রহস্য’ উন্মোচন করতে না পেরে যারা একদিন ঈর্ষান্বিত ছিল, সেসব প্রতিযোগী দেশ আজ সম্ভবত স্বস্তি বোধ করছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির স্বল্পকালীন সংকট মধ্যমেয়াদি সংকটে রূপান্তর হবে কি না, তা নির্ভর করছে আমাদের সাংঘর্ষিক রাজনীতি আরও কত ব্যাপক হবে এবং তা কতটা দীর্ঘায়িত হবে। এতে আমাদের মধ্যম আয়ের দেশের রূপান্তরিত হওয়ায় স্বপ্নপথটি আরও দীর্ঘায়িত হয়ে যাচ্ছে নিঃসন্দেহে। মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছাতে আমাদের প্রয়োজন ছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। অথচ প্রতিনিয়ত আমরা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকেই ধ্বংস করে চলেছি। এ অবস্থায় আমাদের আন্তর্জাতিক সহযোগীরা (ঋণদানকারী সংস্থা, পণ্য ও জনশক্তি আমদানিকারী দেশ, বৈদেশিক বিনিয়োগকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি) একবার মুখ ঘুরিয়ে নিলে তাদের আবারও ফিরিয়ে আনতে অনেক সময় লেগে যাবে। দেশের প্রতিটি নাগরিককে বিদেশে ভাবমূর্তির এই নতুন সংকটের দায় বহন করে বেড়াতে হবে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন এই আশঙ্কাজনক প্রবণতাগুলোকে আটকাতে পারবে বলে মনে করি না। যত দিন পর্যন্ত আমরা একটি আস্থাভাজন নির্বাচনব্যবস্থার অধীনে একটি অংশগ্রহণমূলক, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান না করতে পারছি, তত দিন দেশে শান্তি ও স্বস্তি ফিরবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে রক্ষার স্বার্থে ২০১৪ সালে দ্রুতই আমাদের সেই জায়গায় পৌঁছাতে হবে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য : অর্থনীতিবিদ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
debapriya.bh@gmail.com

দুই নৌকায় এরশাদের পা

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ কিছুদিন ধরেই হাসির উদ্রেক করছেন। সকালে হ্যাঁ বললে বিকেলে না বলেন। এমনকি আত্মহত্যার হুমকি পর্যন্ত তিনি দিতে বাদ রাখেননি। প্রতিনিয়ত মত পরিবর্তনের নেপথ্যে তাঁর যতখানি ক্ষমতার মোহ, তার চেয়ে বেশি তাঁর নিরাপদ জীবনের চেষ্টা। নব্বইয়ে স্বৈরাচারী অভিধায় পরিচিত এরশাদের শাসনামলের অবসান হলে তিনি কারাবাস ভোগ করেন। জীবনের শেষ সময়ে এসে আর তিনি কারবাসী হতে চান না। ফলে তাঁকে ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গেই থাকতে হবে।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে জোট-মহাজোটের টানাপোড়েন তত্ত্বাবধায়ক প্রশ্নে। এই দ্বন্দ্বের আড়ালে এরশাদ বারবার বোঝার চেষ্টা করেছেন, কে ক্ষমতায় আসতে পারে। তিনি যে মুহূর্তে জোটের পাল্লা ভারী দেখেছেন, তখন মহাজোটের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন; আবার যখন মহাজোটের পাল্লা ভারী মনে করেছেন, তখন জোটের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু যে সময়ে এসে লক্ষ করলেন, জোট ও মহাজোট উভয় সম্ভাবনা সমান, তখন তিনি সাহস করে দুই নৌকায় পা রাখলেন। ১৮-দলীয় জোট নির্বাচনে আসেনি হেতু যে নির্বাচন হচ্ছে সেই সরকার কত দিন টিকে থাকবে, তা নিশ্চিত করে কারও পক্ষেই বলা সম্ভব নয়। যত দিন এ সরকার থাকবে, তত দিন তার সঙ্গে যেমন এরশাদের থাকা প্রয়োজন; তেমনি সরকার যদি দীর্ঘ মেয়াদে না চলে, তার প্রস্তুতিও থাকা দারকার। বিধায়, তিনি কৌশলে রাজনীতি থেকে কিছুদিনের জন্য দূরে থাকলেন এবং রওশন এরশাদকে দিয়ে জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে রাখলেন। এতে মহাজোটকে তিনি বলতে পারছেন, তাঁর দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।
জোটকে বলতে পারবেন, তিনি নির্বাচনে অংশ নেননি। ক্ষমতাসীনেরা একটি পাতানো নির্বাচনী বৈতরণি পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছে। নির্বাচন কমিশন যে স্বাধীন নয়, তারও প্রমাণ মিলছে। জোট সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রার্থিতা বাতিল হচ্ছে। আবার অনেকেই আবেদন করলেও প্রার্থিতা বাতিল হচ্ছে না। জাতীয় পার্টি ১৮টি আসনে এরই মধ্যে জয়ী হয়েছে। জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদের পদত্যাগ নিয়ে আরেকটি নাটক সাজানো হয়েছে। কয়েক স্তরে জাতীয় পার্টির ভাঙন সম্পন্ন হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, রওশন এরশাদ ও এরশাদকে ঘিরে জাতীয় পার্টির আরেকবার ভাঙন তৈরি হলো। এটা ঠিক নয়। বরং এরশাদ না থাকলে জাতীয় পার্টি কেমন চলতে পারে, তার একটা মহড়া চলছে। জাতীয় পার্টির আপাত দ্বিধাবিভক্তি পার্টিকে যদি আরও মজবুত করে তোলে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ক্ষমতাসীন এরশাদের রংপুরের মাটিতে একটি জনসভা করারও সামর্থ্য ছিল না। অথচ সেই এরশাদ যখন জেলে ছিলেন, তখন রংপুরের মানুষ তাঁকে জেল থেকে বের করে আনার জন্য ব্যাপক সমর্থন দিয়েছিল। বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই হয়তো চিকিৎসার নামে তাঁকে রাজনীতির মাঠ থেকে আড়াল করা হয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি যে মুক্ত নন, সেটা পরিষ্কার। তবে এই বন্দীজীবন তাঁর স্বেচ্ছা গ্রহণ কি না, তা সাধারণের মনে প্রশ্ন তৈরি করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে কারাগারে থেকে তিনি করুণাধর্মী সমর্থন পেয়েছিলেন। ১৮ ডিসেম্বর ছিল এরশাদের মুক্তির দাবিতে রংপুরে হরতাল। স্বতঃস্ফূর্ত এ হরতালে রংপুরে একটি রিকশাও চলেনি। অনেক ওষুধ ও খাবারের দোকান পর্যন্ত বন্ধ ছিল। এই হরতালে অনেক পিকেটার ছিল লুঙ্গি পরা, শাড়ি পরা সাধারণ মানুষ। বাইসাইকেলে একজনকে যেতে দেখে এক পিকেটার বলছে, ‘মামু (এরশাদ) জেলোত আর তোমরা সাইকেলোত চড়ি যান? নামি যাও।’ রাস্তার পাশে বাড়ির ভেতর থেকে নারীরা বলছেন, ‘সাইকেল থাকি নামি যাও।’ তারা কোনো গাড়ি ভাঙচুর কিংবা কোথাও অগ্নিসংযোগ করেনি।
কিন্তু হরতালের ধরন বলে দেয়, সাধারণ মানুষের আবেগের জায়গাটা কোথায়। এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালীন স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছিলেন, সন্দেহ নেই। তাই বলে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপিও ক্ষমতায় গিয়ে এমন ভালো কিছু করেনি, যা এরশাদকে শতভাগ মলিন করে দেয়। বরং গণতন্ত্রের নামে বর্তমান সরকার যা করছে, তাও অনেকাংশে স্বৈরতান্ত্রিক। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন সারের নামে অনেক কৃষককে মেরেছে, জঙ্গিদের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিল দেশ। দ্বিতীয়বার যখন চারদলীয় জোট নামে ক্ষমতায় আসীন হয়, তখন সংখ্যালঘুদের ওপর যে নির্মমতা-নৃশংসতা দেখিয়েছে, তা অতীতকে ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের দেশে উন্নয়নের প্রধান তিনটি সূচক—পোশাকশিল্প, কৃষি ও অভিবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। এই খাতগুলোর উন্নয়ন চলমান, এগুলো ততটা রাজনীতিনির্ভর নয়। তিন আমলেই মানুষ এর সুফল পেয়েছে। তবে এরশাদের সমস্যা হলো মহাজোটের শরিক হয়েও নিজের নামের মামলাগুলোর সুরাহা করতে পারেননি। আওয়ামী লীগও তা হয়তো চায়নি। এরশাদকে হাতে রাখার অস্ত্র হিসেবে মামলাগুলো জিইয়ে রেখেছে। সেই মামলা নামের জুজুর ভয়ে তিনি প্রলাপ বকেন, দুই নৌকায় পা রাখেন। তবে, যদি দশম জাতীয় সংসদ খুব দ্রুত ভেঙে দিতে হয় এবং ১৮-দলীয় জোটকে এরশাদ ১৯-দলীয় জোটে পরিণত করেন এবং জোর করে তাঁকে চিকিৎসার নামে বন্দী করে রাখা হয়েছিল বলে প্রচার করেন, তাহলে রংপুর অঞ্চলে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একক নির্বাচন করলে জাতীয় পার্টি যেখানে দু-চারটি আসনের বেশি পেত কি না সন্দেহ, সেখানে তারা রংপুর বিভাগের আসনগুলোয় লাঙ্গলের জয়-পতাকা ওড়াতে পারবে।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

বাস্তবায়নভিত্তিক পরিকল্পনা চাই

নতুন বছরের সূচনাতেই বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ এবং তা পঠন-পাঠনের উপযুক্ত শিক্ষা-পরিবেশ তৈরি হোক—এমন দাবি উঠেছে। দাবি বা প্রত্যাশাটি নিশ্চয়ই শুভ এবং যৌক্তিক। কারণ, মানুষ সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্নটি দেখে তার মাতৃভাষায়। কিন্তু পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত বাস্তব অবস্থা বিবেচনা না করে নিলে তা বাস্তবায়নের মুখ দেখে না। সোনার পাথরবাটি বা কাঁঠালের আমসত্ত্ব বলে বাংলায় যে বাগ্ধারা আছে, এসব অবাস্তবতা বোঝাতেই সেগুলো ব্যবহূত হয়ে থাকে। বাংলাদেশ জনবহুল, কিন্তু সে তুলনায় এর সম্পদ সীমিত। বাঙালি জাতির প্রাধান্য হলেও কমপক্ষে ৪০টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বাস এই দেশে। ক্ষুদ্র জাতিগুলোর ভাষাও ভিন্ন, জনসংখ্যা নানা রকম। যেমন, চাকমাদের জনসংখ্যা বেশি, প্রায় তিন লাখের মতো। কিন্তু খিয়াংদের সংখ্যা অনেক কম, প্রায় আড়াই হাজার। সংখ্যার এই তারতম্য তো আছেই, তার ওপর তাদের অনেকের বাসও স্বাভাবিক লোকালয় থেকে দূরে, দুর্গম এলাকায়। এই জনগোষ্ঠীর দু-একটির মাত্র ভাষা প্রকাশের সম্পূর্ণ লিপি বা হরফ আছে; বেশির ভাগেরই লিপি নেই। পাঠ্যপুস্তক রচনা করতে হলে তো আগে লিপি বা হরফ চাই—কোন লিপি গ্রহণ করবে তারা? এ বিষয়গুলো সামনে রেখে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক রচনা ও পঠন-পাঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি।
২০১৪ সালের জানুয়ারিতে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সাদ্রি—এই পাঁচটি ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করার সরকারি সিদ্ধান্ত থাকলেও এখনো বই রচনা সম্পূর্ণ হয়নি বলে জানা যায়। কেন রচিত হয়নি—এর সংগত কারণগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। সাঁওতালরা কোন লিপি ব্যবহার করবে, এই সিদ্ধান্তই হয়নি; অথচ জনসংখ্যায় তারা উল্লেখ করার মতো। বিদেশি অর্থে পরিচালিত কতিপয় এনজিও প্রায়ই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পঠন-পাঠন বিষয়ে বক্তব্য উল্লেখ করে, কিন্তু লিপির প্রশ্নটি তারা সামনে আনতে চায় না। অথচ, লেখাপড়ার ক্ষেত্রে লিপির প্রসঙ্গ আসবে সর্বাগ্রে। লিপির প্রসঙ্গটি অমীমাংসিত রেখে লিখিত পাঠ্যবই প্রণয়নের আলোচনা আকাশকুসুম বাকবিস্তার মাত্র। অধিকাংশ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষার লিপি নেই, কোনো কোনো জনগোষ্ঠীর সব মিলিয়ে মাত্র ১০ বা তার কম লিপি আছে। তারা কীভাবে মাতৃভাষা লিখবে বা পড়বে? তাই আগে দেখা প্রয়োজন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের ব্যাপারে বিদেশি অর্থে পরিচালিত এনজিও, সরকার এবং যারা এই জাতিগোষ্ঠীভুক্ত এই তিন পক্ষ সর্বোচ্চ পরিমাণে আন্তরিক কি না। প্রায়ই দেখা যায়, প্রথম পক্ষটির আন্তরিকতার অভাব।
এটিই অনেক সময় সরকারি সিদ্ধান্তকে বিলম্বায়িত করার ক্ষেত্রে কাজ করে। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সাদ্রি ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করার সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে কাজ করেছে প্রধানত এনজিওগুলো। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই মূলত এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। লক্ষ করার ব্যাপার, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে এই পাঁচটি মোটামুটিভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্থাৎ সংখ্যালঘুর সংখ্যাগুরু। এরা আবার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য শহরাঞ্চলেও। এদের অনেকের সন্তান বাংলা ও ইংরেজি মিডিয়ামে লেখাপড়া করে; অনেকে মেধা বা কোটায় দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া এবং চাকরি নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে এই জনগোষ্ঠীতে মিশ্রণ ঘটেছে বা একাধিক ধারা সৃষ্টি হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। তাই আজ চাকমাদের জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষাদান বা গারোদের (মান্দি) জন্য মাতৃভাষায় লেখাপড়ার উদ্যোগ গ্রহণ পদক্ষেপ হিসেবে সুন্দর শোনাবে ও মহান কর্ম বলে মনে হবে হয়তো, কিন্তু এর সার্বিক বাস্তবায়ন সম্ভবপর হবে না। বরং মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের আয়োজন করে শত শত ক্ষুদ্র জাতিশিশুকে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নের জন্য এনে দু-চার বছর পর সেসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে তা অসন্তোষ তো ছড়াবেই, তার চেয়ে বড় কথা, তা হবে ওই শিশুদের জীবন অন্ধকার করে দেওয়ার শামিল।
এ প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা প্রদত্ত একটি তথ্য স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন: ‘ইউএনডিপির অর্থায়নে পরিচালিত ৩৩২টি স্কুল অর্থসংকটের কারণে বন্ধ হতে চলেছে। কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।’ (প্রথম আলো, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৩)। এই তথ্যটি পুরো বাস্তবতার সহস্রাংশ মাত্র। তাই এ দেশের ক্ষুদ্র জাতির জন্য প্রয়োজন, বাস্তবায়নভিত্তিক একটি ভাষা ও শিক্ষা পরিকল্পনা, যা প্রণীত হবে সব পক্ষের মত নিয়েই। ভাষা ও শিক্ষা পরিকল্পনার আগে ‘বাস্তবায়নভিত্তিক’ কথাটির ওপর জোর দিতে চাই। কথার ফুলঝুরি সাজিয়ে আপাতত সম্মোহন করা হয়তো সম্ভব হয়, কিন্তু তা প্রকৃত কাজে আসে না। এ ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী মেঘালয় রাজ্য আমাদের দৃষ্টান্ত হতে পারে। সেখানে লিপিহীন বা স্বল্পলিপির ভাষাগুলোকে এক লিপিতে আনা হয়েছে। আমাদের দেশেও এ ক্ষেত্রে ইংরেজি লিপিকে গ্রহণ করা যেতে পারে। আর মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক রচনা করার ক্ষেত্রে প্রাথমিক নির্বাচন হিসেবে ‘সংখ্যালঘুর সংখ্যাগুরুত্ব’কে প্রাধান্য না দিয়ে ধরা যেতে পারে জনসংখ্যায় অপেক্ষাকৃত কম ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে।
একটি উদাহরণ দেওয়া যাক: বাংলাদেশে খিয়াংদের জনসংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার, চাকমাদের সংখ্যা তিন হাজারের সামান্য বেশি। এরা এখনো মিশ্র সংস্কৃতির কবলে পড়েনি। এ দুটি জাতিগোষ্ঠীর সব শিশুর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার জন্য তাদের মাতৃভাষায় যদি পুস্তক প্রণয়ন করা যায় এবং তা বাস্তবায়নভিত্তিক একটি ভাষা ও শিক্ষা পরিকল্পনা মোতাবেক প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভবপর হয়, তাহলে সেটা যেমন সফল হবে, তেমনি বোঝা যাবে, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের ব্যাপারে ভবিষ্যতে আর কীভাবে অগ্রসর হওয়া উচিত। যেহেতু এসব ভাষার লিপি নেই সেহেতু মেঘালয়ের দৃষ্টান্ত অনুসারে ইংরেজি ভাষার লিপিতেই তাদের গ্রন্থ প্রণীত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাঙালিদের আঁতকে ওঠার ব্যাপার নেই। কারণ, লক্ষ্য হলো ক্ষুদ্র জাতির শিশুদের তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদান—বাংলা ভাষা বা লিপির প্রসার নয়। বাংলার চেয়ে ইংরেজি ভাষার লিপিসংখ্যা ও লেখনজটিলতা কম বলে এটা সহজতর হবে।
ড. সৌমিত্র শেখর: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
scpcdu@gmail.com

India, Bangla to face off in court -December date to hear 40-year-old dispute over patch of sea by CHARU SUDAN KASTURI

India and Bangladesh will confront each other this December in the UN’s top arbitration court at The Hague in search of a final victory in a four-decade-long maritime dispute over a Bengal-sized, gas-rich patch of sea at the mouth of the Hariabhanga river.

The Permanent Court of Arbitration, the highest arbiter of territorial disputes between nation states for over 100 years, has decided to hear arguments on the dispute from December 9, senior government officials have told The Telegraph.

The court will declare its final verdict in March, the officials said. The court’s judgment cannot be challenged under international law.

“After 40 years of dispute, this is it,” an official said. “What the court decides will determine where we can fish, where we can hunt for minerals and where we can dig for oil and gas.”

The neighbours have bickered over the about 80,000sqkm patch of sea in the Bay of Bengal from 1971, when Bangladesh was born. The patch includes a disputed maritime border — 12 nautical miles off the coast of each nation — and a large economic zone over which both assert exclusive rights.

In 2009, after a dozen rounds of inconclusive talks that started in 1974, Bangladesh had approached the Permanent Court of Arbitration, followed by India later that year.

At stake is the future livelihood of millions of Bengal and Odisha fishermen, for whom the settlement could open up miles of unchallenged open sea that both India and Bangladesh currently prevent each other from using for anything other than transit. As fish near the coast are depleted, fishermen are increasingly finding themselves forced to go further out to sea.

India in 2006 also discovered 100 trillion cubic feet of natural gas in a creek about 50km to the south of the mouth of the Hariabhanga, and within the contested region. This is almost twice what the entire Krishna-Godavari basin at the centre of the corporate battle between the Ambani siblings has been shown to hold to date.

The disputed stretch starts at the mouth of the Hariabhanga, where both India and Bangladesh have claimed an uninhabited island that emerged in the 1970s after a series of cyclones and sank in 2010 amid rising water levels.

The island itself isn’t important for either nation, though India had planted a flag on it.

But whoever gets the island — called New Moore by India and South Talipatti by Bangladesh — will also gain a triangular slice of sea bordered by the river’s mouth in the north, and the island in the south.

The disputed area expands further out at sea, because of differing arguments that India and Bangladesh will make before the arbitration court. India is arguing that the maritime territory and the exclusive economic zones be demarcated on the basis of “equidistance” — equal distance from the nearest point on the coast for both nations.

The principle of equidistance, recognised under the UN Convention of the Law of Sea, is ironically the principle that helped Bangladesh win a similar dispute with Myanmar last year.

But Bangladesh is arguing that the principle of equidistance does not hold in its dispute with India, because its coast has large and frequent concave dimples.

Instead, Bangladesh is arguing, the maritime territory should be demarcated on the principle of equity — equal areas of the sea for both nations.

Bangla clashes kill 9

Nine persons were killed in violence that rocked cities across Bangladesh as the main Opposition BNP today enforced a 48-hour transport blockade to push its demand for postponing the general election scheduled for January 5 amid a standoff over the interim government that will conduct the polls, PTI reported.

A paramilitary soldier was among nine persons killed in the violence that erupted soon after the Election Commission announced the poll schedule yesterday. Over 100 people, including policemen, were injured across the country.

telegraphindia.com