Monday, September 8, 2025

ভারতীয়দের ট্রাম্পের ‘অপমান’ নিয়ে কী বললেন শশী থারুর

শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ভারতে আসছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাণিজ্য ও কৃষি–সংশ্লিষ্ট দুই কমিশনার। চলতি সপ্তাহে বাণিজ্য কমিশনার মার্কোস স্টেফকোভিচ ও কৃষি কমিশনার ক্রিস্টোফে হ্যানসেনের দিল্লি সফরে ভারত ও ইইউয়ের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) রূপরেখা চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা।

পদমর্যাদায় পূর্ণমন্ত্রীর সমান এই দুই কমিশনারের সঙ্গে ব্রাসেলস থেকে ভারতে আসছেন ৩০ সদস্যের এক প্রতিনিধি দল, যাঁরা এফটিএ–সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ের খুঁটিনাটি চূড়ান্ত করবেন। তাঁরা ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল ও কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র অনুযায়ী, এই সফরেই ভারত ও ইইউ জোটের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হবে বলে ভারতের ধারণা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে টালবাহানার দরুন ভারত চাইছে কালক্ষেপণ না করে ইইউয়ের সঙ্গে চুক্তি সেরে ফেলতে। ভারত ও ইইউয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১২ হাজার কোটি ইউরো, যা ভারতের মোট বাণিজ্যের সাড়ে ১১ শতাংশ।

চলতি সপ্তাহে ভারতে আসছেন ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচও। তাঁর সফরের উদ্দেশ্যও ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করা, যাতে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বহর বৃদ্ধি পায়। ২০২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৬৫৩ কোটি ডলার। ২০২৫ সালে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য হয়েছে ১ হাজার কোটি ডলার।

ভারত–ইসরায়েল দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের এক বড় অংশজুড়ে আছে হীরা ও রাসায়নিক পণ্য। এ ছাড়া রয়েছে উচ্চপ্রযুক্তি, চিকিৎসা সরঞ্জাম, নবায়নযোগ্য শক্তিপ্রযুক্তি ও কৃষি খাতে সহযোগিতা।

বেজালেল স্মোটরিচ তিন দিনের সফরে বৈঠক করবেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন, বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং নগরোন্নয়নমন্ত্রী মনোহরলাল খাট্টারের সঙ্গে। জেরুজালেম থেকে পিটিআই জানাচ্ছে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করাই স্মোটরিচের সফরের মূল উদ্দেশ্য। এই সফরে তিনি মুম্বাই ও গুজরাটেও যাবেন।

২০২০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েল ১৫টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি করেছে। সেই তালিকায় রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, জাপান, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের মধ্যে ভারত সরকারও সম্প্রতি স্পষ্ট করে দিয়েছে, কোনো একটি দেশের ওপর তারা বাণিজ্যনির্ভরতা বৃদ্ধি করতে চায় না। যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে ভারত তাই আগ্রহ দেখিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি হবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ের পেন্ডুলাম দুলেই চলেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায় নিয়মিত বিভিন্ন মন্তব্য করছেন, যার কিছু কিছু পরস্পরবিরোধীও। এ বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছেন কংগ্রেসের লোকসভা সদস্য শশী থারুর। গতকাল রোববার তিনি বলেছেন, সব ঠিক আছে। কিন্তু অপমান ভুলে গেলে চলবে না।

শুল্ক নিয়ে বারবার তোপ দাগা ও ৫০ শতাংশ শুল্কবৃদ্ধির আবহে সম্প্রতি ট্রাম্প ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক নিয়ে মন্তব্য করেন। ‘ভারত ও রাশিয়াকে চীনের অন্ধকারে হারিয়ে ফেলা’ নিয়ে খেদ প্রকাশ করার পরের দিনেই হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের উত্তরে মোদিকে ‘পরম বন্ধু ও মহান নেতা’ উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘দুদেশের সম্পর্ক বিশেষ ধরনের। এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ নেই।’

ওই মন্তব্য ‘ইতিবাচক’ বলে মোদিও সময় নষ্ট না করে বলেন, ‘ভারত ওই ইতিবাচক মনোভাবের পূর্ণ প্রতিদান দেবে।’ শশী থারুরের সতর্কবাণী এই বিষয়েই।

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পকে তাঁর বলা মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইয়ের সাংবাদিক। প্রধানমন্ত্রী মোদির মন্তব্যের পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও।

ওই দুজনের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে শশী থারুর বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী খুব তাড়াতাড়ি প্রত্যুত্তর দিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীও। ট্রাম্পের ওই মন্তব্য আমি সতর্কতার সঙ্গে স্বাগত জানাব। কিন্তু কেউ এত দ্রুত অপমান ভুলে যেতে পারেন না। ক্ষমাও করতে পারেন না। ৫০ শতাংশ শুল্ক নিয়ে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর সঙ্গীরা যেসব মন্তব্য করছেন এবং ভারতীয়দের যে অপমান সহ্য করতে হচ্ছে, মনে হয় না আমরা তা পুরোপুরি ভুলে যেতে পারব। ক্ষমাও করতে পারব।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শশী থারুর
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শশী থারুর


ট্রাম্প-সি কারও সঙ্গে সম্পর্ক টিকল না, একলা চলবেন মোদি? by মুজিব মেশাল ও হরিকুমার

নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণঃ নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংকে স্বাগত জানাতে লালগালিচা বিছিয়ে দিয়েছিলেন। নিজের দেশে চীনা নেতার সঙ্গে নদীর তীরে দোলনায় বসে গল্প করেছিলেন এই আশায় যে চীনের মতো ভারতও একদিন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করবে।

কিন্তু মোদি ও চিন পিংয়ের সেই দোলনাঝুলনের পরপরই সীমান্তে ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে ভয়ংকর উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। সংঘাত হয়েছিল। সেই সংঘাতের সময় চীন ভারতের অনেকখানি ভূমি দখল করে নিয়েছিল।

ওই ঘটনা মোদিকে বিব্রত করে এবং হিমালয় অঞ্চলের উচ্চভূমিতে কয়েক বছর ধরে হাজার হাজার ভারতীয় সেনা মোতায়েন রাখতে বাধ্য করে। এটি ভারতের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে।

ওই ঘটনার পর মোদি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকলেন। শীতল যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ধীরে ধীরে উষ্ণ হতে থাকা সম্পর্ককে দ্রুত এগিয়ে নিতে মোদি নিজের রাজনৈতিক পুঁজি খরচ করলেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই তাঁর সঙ্গে মোদির এমন সম্পর্ক গড়ে উঠল যে তিনি প্রটোকল ভেঙে হিউস্টনের স্টেডিয়ামে ভরা জনসমাবেশে দাঁড়িয়ে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য ভারতীয় মার্কিন ভোটারদের কাছে ভোট চেয়ে বসলেন।

সেবার ট্রাম্প হেরে যাওয়ার পর জো বাইডেন এলেন। বাইডেন প্রশাসন দলীয় রাজনীতি উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ককে চীনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অংশীদারি হিসেবে আরও সম্প্রসারণ করতে লাগল। মোদি এক যৌথ অধিবেশনে বলেছিলেন, ‘“এ. আই” মানে “আমেরিকা অ্যান্ড ইন্ডিয়া”।’

কিন্তু হঠাৎ ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এসে মোদির জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প ভারতকে নিশানা করে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন, কারণ, ভারত রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কিনছে। ট্রাম্প ভারতের অর্থনীতিকে ‘মৃত’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি চলতি বছরের শুরুতে পাকিস্তানের নেতৃত্বকে ভারতের সমান মর্যাদা দিয়েছেন; যদিও এর আগে তিনি পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক বলেছিলেন। কিছুদিন আগে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে লড়াই বেঁধে যায় এবং কয়েক দিন পর দুই দেশ অস্ত্রবিরতিতে যায়। ট্রাম্প দাবি করেছেন, তাঁর মধ্যস্থতায়ই ভারত-পাকিস্তান বিরোধ মিটেছে।

এসব ঘটনা ভারতের জন্য এক আত্মসমালোচনার মুহূর্ত তৈরি করেছে। কারণ দেখা যাচ্ছে, আকারে বিশাল ও অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান হলেও ভারতের বিশ্বমঞ্চে ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মোদি স্বীকার করেছেন, এই বাণিজ্যবিরোধের কারণে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।

এখন কিছুটা উষ্ণতা ফেরানোর জন্য চীনের সঙ্গে আবার ভারত যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। সাত বছর পর চলতি মাসের শেষে মোদির চীন সফরের কথা রয়েছে। তবে সীমান্ত সংঘাত ও পাকিস্তানের সামরিক তৎপরতায় চীনের প্রকাশ্য সমর্থন সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়িয়ে রেখেছে। পাশাপাশি চীন ভারতকে বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তোলার প্রচেষ্টাকে সন্দেহের চোখে দেখছে।

মোদি বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন। তিনি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা (যিনি নিজেও ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্যবিরোধে আছেন) এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলেছেন। উভয় পক্ষই ‘ভারত-রাশিয়া বিশেষ ও সুবিধাজনক কৌশলগত অংশীদারত্ব’ আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পুতিনের নয়াদিল্লি সফরের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করতে মস্কো গেছেন।

হঠাৎ তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা ভারতের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বপ্নে কিছুটা ধাক্কা দিয়েছে। দুই পরাশক্তি—যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের মধ্যে আটকে পড়েছে ভারত। এরা প্রয়োজনে ভারতকে চাপে রাখতে পিছপা হয় না। তাই ভারত আবার সেই পুরোনো নীতি ‘কৌশলগত স্বনির্ভরতা’য় ফিরতে চাইছে। মানে, কোনো বড় জোটে বেশি জড়িয়ে না পড়ে নিজের মতো করে চলতে চাইছে।

ভারতের সাবেক কূটনীতিক নিরুপমা রাও বলেছেন, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত দুই দশক ধরে গড়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্বের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে। তাই ভারত এখন বাস্তবতা মেনে কৌশল বদলাবে, যাতে নিজের স্বার্থ রক্ষা করা যায়।

ট্রাম্প যে অতিরিক্ত ২৫% শুল্ক ভারতের ওপর চাপিয়ে দিলেন, সেটি হয়তো ভারতের ওপর চাপ তৈরি করার কৌশল। ভারত যাতে নতুন বাণিজ্যচুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মানতে বাধ্য হয়, সে কারণেই সম্ভবত এই নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এটি রাশিয়াকেও চাপ দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে, যেন তারা ইউক্রেন ইস্যুতে ছাড় দেয়।

রাশিয়ার তেলের ব্যাপারটি আলোচনায় আসার আগেই যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের মধ্যে বাণিজ্যঘাটতি কমানো নিয়ে অগ্রগতি হচ্ছিল। ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনতে রাজি হয়েছিল। কয়েক দফা আলোচনার পর দুই দেশের মধ্যে প্রথম ধাপের চুক্তি প্রায় ঠিক হয়ে গিয়েছিল। এমনকি ভারত নিজের দীর্ঘদিনের সুরক্ষিত কৃষিবাজারও আংশিকভাবে খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

সাবেক জি-২০ দূত অমিতাভ কান্ত বলেছেন, ট্রাম্প অন্য মিত্রদেশগুলোর সঙ্গেও একই কৌশল ব্যবহার করেছেন। তাই এখনো একটি পারস্পরিক লাভজনক চুক্তির সম্ভাবনা আছে। তবে তিনি সতর্ক করেছেন, বাণিজ্য সমস্যা মিটলেও পারস্পরিক বিশ্বাস পুরোপুরি ফিরবে না।

চীনের আগ্রাসনের ঘটনায় দেখা গেছে, মোদি প্রকাশ্যে তেমন হইচই না করে শান্তভাবে সংকট সমাধানের চেষ্টা করেছেন। সীমান্তে চীনের হামলার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও নৌবাহিনীর সহযোগিতা বাড়ালেও সরাসরি চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হাতিয়ার হয়ে কাজ করা থেকে বিরত থেকেছেন। এ কারণে গত অক্টোবর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্প যখন ভারতের ওপর বেশি শুল্ক বসালেন, তখন মোদি স্পষ্টভাবে বললেন, ভারত তার কৃষক, জেলে ও দুগ্ধশিল্পীদের স্বার্থে কোনো আপস করবে না। তিনি জানেন, এর জন্য তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে বড় রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। তবু তিনি প্রস্তুত।

আসলে রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে বিরোধ শুরু হওয়ার আগেই সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল। বছরের শুরুতে ভারত-পাকিস্তানের সীমান্তে গোলাগুলির পর ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি দুই দেশকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করিয়েছেন।

পাকিস্তান এ দাবিকে স্বাগত জানায়, এমনকি নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য ট্রাম্পকে মনোনীত করে। কিন্তু ভারত এ দাবি সরাসরি অস্বীকার করে এবং দেখাতে চায়, মোদিই সামরিক শক্তি দিয়ে পাকিস্তানকে পিছু হটতে বাধ্য করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার মূল কারণ হলো এখন দুই দেশের সম্পর্ক রাষ্ট্রের বদলে দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভর করছে। ট্রাম্প আর মোদি দুজনই খুব ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও অহংকারী স্বভাবের। তাই সম্পর্কের ভাঙন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।

* মুজিব মেশাল, দ্য টাইমসের দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরোর প্রধান ও হরি কুমার, দিল্লিভিত্তিক সাংবাদিক
- নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া ইংরেজি থেকে অনূদিত

সি চিনপিং, নরেন্দ্র মোদি ও ডোনাল্ড ট্রাম্প
সি চিনপিং, নরেন্দ্র মোদি ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: রয়টার্স

আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির ভোটাররা কী করবেন by সোহরাব হাসান

প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশের পর নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। এমনকি নির্বাচনের সময় কীভাবে মব–সন্ত্রাস ঠেকানো যাবে, সেই পথও বাতলে দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন। তিনি বলেছেন, ৩০০ আসনে মব সন্ত্রাস ভাগ হয়ে গেলে তাদের মোকাবিলা করা কঠিন হবে না।

কিন্তু একজন সাবেক দক্ষ আমলা হিসেবে তাঁর জানার কথা কোনো নির্বাচনে ৩০০ আসনে সন্ত্রাস হয় না। যেসব আসনে মারদাঙ্গা প্রার্থী থাকেন, আর যেসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা কম থাকে, সেখানে সন্ত্রাস হয়। নির্বাচন কমিশনকে তাই ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র বাছাই করলেই হবে না, ঝুঁকিপূর্ণ আসনও বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ ১৯৯১ সালে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি একটি উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের সন্ত্রাসের কাছে হার মেনেছিলেন এবং সেই নির্বাচনের ফলাফল জাতীয় রাজনীতির গতি–প্রকৃতি বদলে দিয়েছিল।

একইভাবে যে আওয়ামী লীগ আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল, তারাই আবার পরবর্তী সময়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সেই ব্যবস্থা বাতিল করে নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছিল। তত্ত্বাবধায়ক–ব্যবস্থা বাতিলের পর যে তিনটি নির্বাচন হয়েছিল, তাতে জনগণ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।

সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে নাসির উদ্দীন কমিশন এর আগে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯৭২ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের প্রস্তাব। এতে সশস্ত্র বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, নির্বাচনে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে পুরো আসনের নির্বাচন বাতিল করার কথা বলা হয়েছে, প্রার্থীর বিদেশে থাকা সম্পদের হিসাব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব প্রস্তাব প্রার্থীর জবাবদিহির আওতায় আনা ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করি।  

তবে নির্বাচন কমিশন একক প্রার্থীর ক্ষেত্রে ‘না’ ভোটের বিধান রাখার যে প্রস্তাব দিয়েছে, সেটি সুষ্ঠু নির্বাচনের স্থলে কারসাজির সুযোগ বাড়িয়ে দিতে পারে। উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির ৪৯ জন এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছিলেন। এসব আসনে ‘না’ ভোটের ব্যবস্থা থাকলে নির্বাচনের গুণগত কোনো ফারাক হতো কি? বরং জয়ী দল এ কথা বলার সুযোগ পেত যে তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত নয়। অতএব কোনো বিধান চালুর আগে এর পরিণামের কথাও কমিশনকে ভাবতে হবে। নির্বাচন কমিশন যদি ‘না’ ভোট চালু করতে চায়, সব আসনের জন্যই সেটি করতে হবে। এখানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী ব্যক্তিদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই।

নির্বাচন কমিশন জোটবদ্ধ নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলীয় প্রতীক বহাল রাখার কথা বলেছে। এটা গণতান্ত্রিক রীতির সঙ্গে কতটা যায়, সেই প্রশ্নও উঠবে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে প্রতীকের বিষয়টি উন্মুক্ত ছিল। কেউ জোটের প্রতীকে, কেউ দলের প্রতীকে নির্বাচন করেছেন। ২০১৮ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরাও ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করেছেন (যেহেতু জামায়াতের নিবন্ধন স্থগিত ছিল)। দলীয় প্রতীক রাখা নিয়ে ছোট দলগুলো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এতে বড় দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়বে এবং ছোট দলের প্রার্থীদের বাড়তি ঝামেলায় পড়তে হবে।

নির্বাচন কমিশনের যে প্রস্তাব সবচেয়ে বেশি আলোচিত, সেটি হলো পলাতক আসামিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা। আদালত কোনো ব্যক্তিকে পলাতক ঘোষণা করলে তাঁর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ থাকার কথা নয়। পলাতক আসামিকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার প্রস্তাবটি ছিল মূলত নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের। সে সময়ে নির্বাচন কমিশন এই প্রস্তাবের সঙ্গে দ্বিমত করেছিল।

গত মার্চ মাসে তারা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে লিখিতভাবে জানিয়েছিল, এমন বিধান অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে। এরপর কেন নির্বাচন কমিশন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিল, সেই প্রশ্নের জবাবে কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে উভয় পক্ষের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে এটা করা হয়েছে। প্রশ্নটা সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টির নয়, আইনের। সংবিধানবিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক পলাতক আসামিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব সমর্থন করে ন্যায্য প্রয়োগ নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। রাজনৈতিক দলের নেতারা আইনের অপব্যবহার না হওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।  

নির্বাচন কমিশন আরও যেসব সংশোধনী প্রস্তাব এনেছে, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। যেমন লাভজনক প্রতিষ্ঠানে থাকা ব্যক্তিকে নির্বাচনে প্রার্থী হতে না দেওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি থেকে পদত্যাগ করা, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেশে ও বিদেশে থাকা সম্পদের হিসাব দাখিল করা। কমিশন প্রস্তাব করেছে, রাজনৈতিক দল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান নিতে পারবে; কিন্তু ৫০ হাজার টাকার বেশি হলে সেটি চেকের মাধ্যমে নিতে হবে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীর পাশাপাশি অনুদানদাতার আয়–ব্যয়েও স্বচ্ছতা আসবে ধারণা করি।

নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ নির্বাচনে ভোটারদের ‘প্রথম চোখ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সাড়ে ১২ কোটি ভোটারের কতজনকে তাঁরা হাজির করতে পারেন, তার ওপরই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করছে। সংশ্লিষ্টদের মনে রাখতে হবে, ভোটারদের বাছাই করার সুযোগ ছিল না বলে বিগত তিনটি নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হয়েছিল। এবার সেই বাছাইয়ের সুযোগ কতটা থাকবে?

অনেকে বলেছেন, নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সব দলের অংশগ্রহণের প্রয়োজন নেই। ভোটাররা অংশ নিলেই হবে মানলাম; কিন্তু ভোটাররা যদি দেখেন প্রার্থী বাছাইয়ে সুযোগ সীমিত, তাহলে তাঁরা ভোটকেন্দ্রে যেতে বা ভোট দিতে উৎসাহী হবেন না।

সরকার নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। অন্যদিকে একটি মহল স্বৈরাচারের সহযোগী হিসেবে জাতীয় পার্টিকেও নিষিদ্ধ করার দাবি জানাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা আমরা জানি না। যদি আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যায়, তাহলে তাদের সমর্থক ভোটাররা কী করবেন?

 নির্বাচন কমিশন আরপিওতে যত সংশোধনীই আনুক না কেন, গরিষ্ঠসংখ্যক ভোটারকে কেন্দ্রে আনাই তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

সোহরাব হাসান, কবি ও সাংবাদিক
- sohrabhassan55@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির ভোটাররা কী করবেন

ইতিহাসের আয়নায় বদরুদ্দীন উমর ও বামপন্থা by লাবণী মণ্ডল

লেখক-গবেষক, রাজনীতিক ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

আজ রোববার সকাল ১০টার একটু পর রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সম্পাদক ফয়জুল হাকিম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বদরুদ্দীন উমরের বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।

একাধারে শিক্ষক, লেখক, চিন্তক ও রাজনৈতিক কর্মী— বদরুদ্দীন উমর বামপন্থী ধারার এক ব্যতিক্রমী ও গভীরতম প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক চিন্তার অনুপম পাঠ হলো মহিউদ্দিন আহমদের লেখা বামপন্থার সুরতহাল: বদরুদ্দীন উমরের ইতিহাস পরিক্রমা।

প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ১৯২ পৃষ্ঠার এই বই এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে রচিত হলেও এটি নিছক কথোপকথন নয়। বরং এখানে মিলেছে আত্মজৈবনিক প্রসঙ্গ, রাজনৈতিক ইতিহাস, তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং বাংলাদেশের বাম রাজনীতির বহু অজানা অধ্যায়ের প্রাণবন্ত বিবরণ। বইটি যেমন ব্যক্তি বদরুদ্দীন উমরের ভাবনার ভেতর প্রবেশের দরজা খুলে দেয়, তেমনি পাঠককে নিয়ে যায় ইতিহাসের উত্থান-পতনের অভ্যন্তরেও।

এই বই নিয়ে লেখাটি পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

বাংলাদেশের বাম রাজনীতির ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গেলে যাঁর নাম অবধারিতভাবে চলে আসে, তিনি বদরুদ্দীন উমর। একাধারে শিক্ষক, লেখক, চিন্তক ও রাজনৈতিক কর্মী—তিনি বামপন্থী ধারার এক ব্যতিক্রমী ও গভীরতম প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক চিন্তার অনুপম পাঠ হলো মহিউদ্দিন আহমদের লেখা বামপন্থার সুরতহাল: বদরুদ্দীন উমরের ইতিহাস পরিক্রমা।

প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ১৯২ পৃষ্ঠার এই বই এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে রচিত হলেও এটি নিছক কথোপকথন নয়। বরং এখানে মিলেছে আত্মজৈবনিক প্রসঙ্গ, রাজনৈতিক ইতিহাস, তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং বাংলাদেশের বাম রাজনীতির বহু অজানা অধ্যায়ের প্রাণবন্ত বিবরণ। বইটি যেমন ব্যক্তি বদরুদ্দীন উমরের ভাবনার ভেতর প্রবেশের দরজা খুলে দেয়, তেমনি পাঠককে নিয়ে যায় ইতিহাসের উত্থান-পতনের অভ্যন্তরেও।

‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’ হয়ে ওঠার পথে

বদরুদ্দীন উমরের চিন্তাজগৎ বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’, যার উৎপত্তি ইউরোপীয় মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিকদের ভাবনায়। এই ধারণায় এমন এক বুদ্ধিজীবীর কথা বলা হয়, যিনি কেবল তত্ত্ব নির্মাণ করেন না, বরং বাস্তবেও সেই তত্ত্ব প্রয়োগে সক্রিয় থাকেন। বদরুদ্দীন উমর এ ধারণার বাস্তব প্রতিফলন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার পেশা ছেড়ে তিনি যুক্ত হন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টিতে (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী)। যদিও পরবর্তীকালে মতপার্থক্যের কারণে দলীয় রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তবু বাম রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সংলগ্নতা অটুট থাকে। গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে আন্দোলন, সভা-সেমিনার, লেখালিখি—সবখানেই তিনি থেকেছেন সক্রিয়।

রাজনীতি, দর্শন ও ব্যক্তি

বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে বদরুদ্দীন উমরের ব্যক্তিজীবনের সংযোগটি এতে যত্নের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে কাটানো শৈশব ও কৈশোর, পরিবারের পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসা, ছাত্রজীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, শিক্ষকতা, পরবর্তীকালে লেখালেখিতে সম্পূর্ণ মনোনিবেশ—সবই এসেছে তাঁর নিজস্ব কণ্ঠে। যদিও এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী নয়, তবু তাঁর চিন্তার পেছনের পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা এখানে গভীরভাবে প্রতিফলিত।

বদরুদ্দীন উমর অকপটে জানিয়েছেন, ছাত্ররাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত না থেকেও কীভাবে তিনি বাম রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের চেষ্টাও করেন। তবে পরবর্তীকালে সক্রিয় রাজনৈতিক সংগঠকের চেয়ে তাঁর ভূমিকা বেশি হয়ে ওঠে চিন্তক ও লেখকের। এটি এক অর্থে তাঁর রাজনৈতিকতা ও আত্মজিজ্ঞাসার অনুপম দলিল।

বামপন্থার সুরতহাল

বইয়ের মূল অংশজুড়ে এসেছে বাম রাজনীতির নানা বাঁকবদলের আলোচনা। সেখানে অবধারিতভাবে এসেছে আওয়ামী লীগের জন্ম, শেখ মুজিবের উত্থান, ভাসানীর রাজনৈতিক অবস্থান, ন্যাপ গঠন, পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য, ঊনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তর–পরবর্তী সময়, জাসদের উত্থান, সর্বহারা পার্টির রাজনীতি, ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড, এমনকি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাও।

এ বই কেবল ইতিহাস নয়, দৃষ্টিভঙ্গিরও দলিল। বদরুদ্দীন উমরের বিশ্লেষণ তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দায়বদ্ধতা থেকে উৎসারিত। তিনি কেবল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের তাত্ত্বিকতা নয়; বরং জীবনের বাস্তবতায় তার প্রয়োগযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে বইটি হয়ে উঠেছে তত্ত্ব ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব-সন্ধির এক মনস্তাত্ত্বিক দলিলও।

বইয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়জুড়ে রয়েছে তাঁর পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের গল্প। ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার গ্রহণ না করে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি নিজের তাগিদে, নিজের আনন্দে বই লিখি। এর জন্য কেউ আমাকে পুরস্কার দেবে, এটা আমি গ্রহণ করতে পারি না। এটা একধরনের ইগো বলতে পারেন।’ নোবেল পুরস্কার সম্পর্কেও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, নোবেল অনেক সময় সাম্রাজ্যবাদের কূটকৌশলের অংশ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন স্পষ্ট ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থান নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রম।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ এখানে কেবল প্রশ্নকারী নন; তিনি একধরনের শ্রুতিলেখক, যিনি বক্তার কণ্ঠস্বর ও বয়ানের স্বচ্ছতা বজায় রেখে তাঁর অন্তর্গত চিন্তার বিন্যাসে এক ধ্যানস্থ দক্ষতা দেখিয়েছেন। তাঁর ভাষা সহজ, নির্ভার। রাজনৈতিক ইতিহাসের মতো কঠিন বিষয়কেও তিনি উপস্থাপন করেছেন কথোপকথনের প্রাণবন্ত ধারায়।

ইতিহাসের আয়নায় একটি চিন্তার পরিক্রমা

এ গ্রন্থ বাংলাদেশের বাম রাজনীতির চূড়ান্ত বা সামগ্রিক সুরতহাল নয়, বরং একজন তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কর্মীর আত্মপ্রবণ যাত্রার দলিল। ষাট-সত্তরের দশকের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বাম রাজনীতির ইতিহাস ও অন্তর্দ্বন্দ্ব জানতে আগ্রহী পাঠকের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য। তবে এই পাঠ গ্রহণের জন্য প্রয়োজন পাঠকের বিশ্লেষণী মনোভাব। ‘বামপন্থার সুরতহাল’ শুধু ব্যক্তির আত্মকথা নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক মূল্যবান অনুরণন।

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

সংসদ, পরিষদ না গণভোট— কোন পথে যাবে দেশ by সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন

সমাজ তার প্রয়োজনেই রাষ্ট্র ও সংবিধান তৈরি করে এবং একই কারণে সমাজ নিয়ত সংবিধানের সংস্কার করতে থাকে। কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম এই প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে না, তাই এই সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় অনেক বৈচিত্র্য দেখা যায়। অতএব চলমান সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব যে অনেকভাবেই বাস্তবায়িত হতে পারে, সেটা ধরে নিয়ে আমাদের বাস্তবায়নের পথ খুঁজতে হবে।

যখন কোনো দেশ নতুন করে তার সংবিধান তৈরি করতে চায়, তখন সাধারণত কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি বা সাংবিধানিক পরিষদ তৈরি করেই সেটা করা হয়। কিন্তু বিদ্যমান সংবিধান সংস্কারের জন্যও সাংবিধানিক পরিষদ সৃষ্টি করার উদাহরণ ইতিহাসে অনেক পাওয়া যায়।

২০২২ সালে চিলি তাদের সংবিধান সংস্কারের জন্য যে সাংবিধানিক পরিষদ তৈরি করে, তার নামই রাখা হয় সংবিধান সংস্কার পরিষদ। যদিও সেই পরিষদ যে সংস্কার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য গণভোটে পেশ করে, সেটা চিলির জনগণ প্রত্যাখ্যান করেন।

ইন্দোনেশিয়া তার প্রথম সংবিধান পায় ১৯৪৫ সালে। ১৯৯৮ সালে একনায়ক সুহার্তোর পতনের পর প্রচলিত সংবিধানে ফেডারেল বা প্রাদেশিক কাঠামো প্রবর্তন, রাষ্ট্রপতির মেয়াদ সীমিতকরণ এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার মতো মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সাংবিধানিক পরিষদ নির্বাচিত হয়।

এই পরিষদ ঐকমত্যে পৌঁছানোর জন্য তিন বছর ধরে আলোচনা করে ২০০২ সালে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে সক্ষম হয়। ইন্দোনেশিয়া ছাড়াও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইতালি সাংবিধানিক পরিষদ তৈরি করে তাদের সংবিধানের মৌলিক সংস্কার করার জন্য।

সংবিধান পরিষদ তৈরি না করে নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমেও সংবিধানের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা যায়। সংসদ সাধারণত সংবিধান সংশোধনের মধ্যে তাদের এখতিয়ার সীমাবদ্ধ রাখলেও ইতিহাসে সংসদের মাধ্যমে মৌলিক সংস্কার সাধনের উদাহরণ আছে অনেক।

বাংলাদেশের সংসদ দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করে। জার্মানির সংসদের দুই কক্ষ বুন্ডেস্টাগ ও বুন্ডেসরাট মিলে দুই জার্মানি একীভূত করার মতো বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আর দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ-পরবর্তী নতুন সংবিধান তাদের নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমেই অধিষ্ঠিত করে। যুক্তরাজ্যের কোনো লিখিত সংবিধান না থাকলেও ১৯৪৯ সালে তাদের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্স, উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসের ক্ষমতা অনেক কমিয়ে ফেলে।

সংসদ তো নির্বাচিত; কিন্তু নির্বাচিত সাংবিধানিক পরিষদ ছাড়াই যে সংবিধানের বড় পরিবর্তন আনা যায়, সেই উদাহরণ খোদ বাংলাদেশেই আছে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের করা বাকশাল বাতিল করা হয় জিয়াউর রহমানের একক সিদ্ধান্তে। সেই পরিবর্তন নাগরিকদের পক্ষে ছিল বলে সেই সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।

এক ব্যক্তির নেতৃত্বে সংবিধান পরিবর্তন নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হচ্ছে ফ্রান্সের পঞ্চম রিপাবলিক। পঞ্চাশের দশকে ফ্রান্স যখন তাদের সাংবিধানিক পরিষদের তৈরি চতুর্থ রিপাবলিকের সংসদীয় গণতন্ত্র নিয়ে বারবার হোঁচট খাচ্ছে এবং তাদের উপনিবেশ আলজেরিয়ার স্বাধীনতাযুদ্ধ নিয়ে ফ্রান্সের সমাজ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, তখন চার্লস দ্য গলের নেতৃত্বে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়িয়ে গণভোটের মাধ্যমে পঞ্চম রিপাবলিকের সংবিধান গৃহীত হয়। সেই পঞ্চম রিপাবলিক এখনো অটুট।

অনেক সময় অনির্বাচিত সংস্থাও সংবিধানের মৌলিক এবং স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে। ১৯৭৩ সালে ভারতের উচ্চ আদালত সংবিধানের মূল কাঠামো নিয়ে তাঁদের রায়ের মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদের সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করেন। ১৯৪৭ সালে দখলদার মার্কিন প্রশাসন জাপানের নির্বাচিত সংসদের সংবিধান প্রস্তাব বাতিল করে দিয়ে সেই সংসদকে দিয়েই নিজেদের প্রস্তাবিত সংবিধান পাস করিয়ে নেয়। জাপান এখনো বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া সেই সংবিধান নিয়েই চলছে।

এই দিকে সাংবিধানিক পরিষদের তৈরি করা সংবিধানও অনেক সময় দেশের কোনো কাজে আসে না। চিলির উদাহরণ থেকে আমরা দেখলাম, যেখানে সাংবিধানিক পরিষদের প্রস্তাব চিলির জনগণ প্রত্যাখ্যান করেন। আইসল্যান্ডে আবার দেখা যায়, তাদের জনগণ ১৯১২ সালে তাদের সাংবিধানিক পরিষদ দিয়ে যেই সংবিধান প্রস্তাব গণভোটে পাস করে, সেই সংবিধান তাদের সংসদ নাকচ করে দেয়। বিচিত্র এই পৃথিবী।

অনেক সময় সাংবিধানিক পরিষদের পাস করা সংবিধান নিজেই দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে। সাদ্দাম-পরবর্তী ইরাক ২০০৫ সালে তাদের সরকার হিসেবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সংসদ নির্বাচিত করে, যাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব ছিল একটি সংবিধান প্রণয়ন করা। প্রস্তাবিত সংবিধান গণভোটে ৮০ ভাগ সমর্থন পেয়ে পাস হলেও সংখ্যালঘু সুন্নিরা সেই সংবিধান প্রত্যাখ্যান করে এবং ইরাক গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সেই গৃহযুদ্ধ থেকে ইরাক এখনো বের হতে পারেনি।

এত সব উদাহরণ থেকে এটা পরিষ্কার যে বাংলাদেশের জন্য তার সংবিধান সংস্কারের যে সুযোগ এসেছে, সেটা বাস্তবায়নের জন্য তার সামনে অনেকগুলো পথ খোলা আছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধ্যাদেশ, সাংবিধানিক পরিষদ, সংবিধান সংস্কার পরিষদ, এক নির্বাচনে সাংবিধানিক পরিষদ এবং সংসদ, কেবল সংসদ এবং গণভোট; সব পথেই সংবিধান সংস্কার সম্ভব।

অনেকেই মনে করেন যে সাংবিধানিক পরিষদ সৃষ্টি হলে সংবিধান নতুন করে লেখার চাপ সৃষ্টি হবে এবং দেশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। আমরা অন্য দেশের উদাহরণ থেকে দেখলাম যে সংবিধান সংস্কারের জন্যও সাংবিধানিক পরিষদের নির্বাচন করা যায়; সুতরাং সাংবিধানিক পরিষদ সৃষ্টি করলেই চলমান সংবিধান বাতিল হয়ে যায় না। অতএব নতুন সংবিধান তৈরির প্রশ্ন ওঠে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পরিষদ, সংবিধান সংস্কার পরিষদ বা সংসদ, সব ক্ষেত্রেই ঐকমত্য সনদের ভিত্তিতেই সংস্কার করবে, বিধায় নতুন সংবিধানের আবদার খুব একটা হালে পানি পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

বাস্তবায়নের পথে আসল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সংস্কার প্রস্তাবনার বিষয়ে কোনো দ্বিধা না রেখে একটা ঐকমত্যে পৌঁছানো। আপত্তি নিষ্পত্তি করে একটা পরিষ্কার প্রস্তাব দাঁড় করাতে পারলে বাকি পথ সহজ হয়ে যাবে। সেই পরিষ্কার করার পথে সংস্কারের পরিসর নিয়ে ঐকমত্যে আসাটা আরও একটা বড় পরীক্ষা। এখন পর্যন্ত যতটুকু বিষয়ে ঐকমত্য পৌঁছানো গেছে, সেটুকুতে অভ্যুত্থান-পরবর্তী জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন নেই। তার মানে, দলগুলোকে ঐকমত্যে আসা প্রস্তাবের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

যদি সংস্কার নিয়ে কোনো যদি কিন্তু ছাড়া একটা পরিষ্কার প্রস্তাব আনা যায় এবং যেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, উচ্চকক্ষ, নারীর অংশগ্রহণ, সাংবিধানিক পদে নিয়োগসহ ক্ষমতাকাঠামোর কিছু মৌলিক সংস্কার সংযুক্ত থাকে, সে ক্ষেত্রে সেই সমঝোতার সনদের পক্ষে অঙ্গীকারের ওপর ভিত্তি করে সংসদের হাতেই বাস্তবায়নের দায়িত্ব অর্পণ করার সুযোগ থাকবে।

আরেকটা প্রশ্ন হচ্ছে, সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলাকালে সরকার পরিচালনা করবে কারা। চলমান মব আর চাঁদাবাজির অস্থিরতায় দেশের অনেকেই নির্বাচিত সরকারের হাতে দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের অপেক্ষায় আছেন, সে জন্য অনেক সময় নিয়ে সংবিধান সংস্কার করে তারপর নতুন সরকারের ক্ষমতায় আসার সুযোগ আর এখন নেই। অতএব সামনের নির্বাচন হতে হবে সংসদ যোগ সাংবিধানিক সভার নির্বাচন, ঠিক সত্তরের নির্বাচন যেমন হয়েছিল, তেমন। সংস্কার প্রস্তাব সম্পর্কে পরিষ্কার ঐকমত্যে পৌঁছানো গেলে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা খুব কম সময়ের মধ্যেই সংস্কার বাস্তবায়ন করে তাঁদের আইনসভা এবং সরকারি দায়িত্ব পালন শুরু করতে পারবেন।

এই আলোচনা থেকে আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে যতই চেষ্টা করি না কেন, পরিপূর্ণভাবে সংস্কার টেকসই নিশ্চিত করার কোনো প্রক্রিয়া দুনিয়াতে নেই। গত ৭৫ বছরে পৃথিবীতে যে ২০০টি দেশ আছে, সেখানে ৬০০ সংবিধান তৈরি হয়েছে। তার মানে, সংবিধানের সংশোধন অবশ্যম্ভাবী। তার ওপর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে সংবিধান সংস্কারের পথ খোলা না রাখলে সেই রাষ্ট্রে সাংবিধানিক গোলযোগ অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। সব দিক বিচারে বাংলাদেশের এই ক্রান্তিলগ্নে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারলেই সংস্কার টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বাড়বে।

শেষমেশ নাগরিকেরাই সংবিধানের সবচেয়ে বড় রক্ষাকর্তা। সংস্কার প্রস্তাবগুলো জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে পারলে সেটা যেকোনো পদ্ধতিতেই অধিষ্ঠিত হোক না কেন, সেটা টেকসই হতে বাধ্য।

* সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের একজন রাজনৈতিক কর্মী। ই-মেইল hasibh@gmail.com।
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-20%2F2r638t2c%2Fsohh.JPG?rect=36%2C0%2C542%2C361&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

ইসরায়েলের হামলা ও হুমকির মুখে গাজা নগরী ছাড়ছেন ফিলিস্তিনিরা

ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা ও একের পর এক হুমকির মুখে ফিলিস্তিনের গাজা নগরী ছেড়ে পালাচ্ছেন বাসিন্দারা। প্রাণ বাঁচাতে যে যা পারছেন, তা–ই নিয়ে উপত্যকাটির দক্ষিণ দিকে চলে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে আজ রোববার হামাসকে আবার আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেয়ন সার। এ ছাড়া গাজায় হামলা চলবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

গাজায় ২৩ মাস ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে আগস্ট থেকে গাজা নগরী দখলের অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। তখন থেকেই শহর এলাকাটি এবং এর আশপাশে তীব্র হামলা চালানো হচ্ছে। এরই মধ্যে গত গতকাল শনিবার নতুন করে নগরীর বাসিন্দাদের দক্ষিণে আল–মাওয়াসি এলাকায় সরে যেতে বলা হয়। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানায়, আগামী দিনগুলোতে সেখানে হামলা বাড়বে।

ইসরায়েলের নৃশংস হামলার মুখে যদিও আগে থেকেই গাজা নগরী ছাড়ছেন বাসিন্দারা। শনিবারই প্রাইভেট কার ও গাধায় টানা গাড়িতে করে জিনিসপত্র নিয়ে অনেককে দক্ষিণের দিকে যেতে দেখা যায়। অনেকে যাচ্ছেন হেঁটে। নগরীর শেখ রাদওয়ান এলাকার বাসিন্দা আবু মোহাম্মদ আল–দাউদি বলেন, পালানো অথবা মারা যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। ইসরায়েলি বাহিনী কাউকেই ছাড়ছে না।

উম রামি নামের এক নারীও তাঁর চর শিশু সন্তানকে নিয়ে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পাশেই তাঁর স্বামী গাধায় টানা গাড়িতে মালামাল তুলছিলেন। গত শুক্রবার গাজা নগরীতে বহুতল ভবন মুশতাহা টাওয়ার ধ্বংসের কথা স্মরণ করেন তিনি। উম রামি বলেন, ‘ভয় পাচ্ছি, গাজার অন্য টাওয়ারগুলোরও একই পরিণতি হবে। দক্ষিণের দিকে পালিয়ে যাচ্ছি, তবে জানি না সেখানে কী হবে।’

গাজা নগরীর বহুতল ভবনগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে সেখানে বসবাস করা প্রায় ১০ লাখ ফিলিস্তিনির ‘ব্যাপক হারে বাস্তুচ্যুত হাওয়ার বিপর্যয়ের’ ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন বলে জানান উপত্যকার জনসংযোগ কার্যালয়ের পরিচালক ইসমাইল আল–থাওয়াবতা। তিনি বলেন, গাজা নগরীতে ৫১ হাজারের বেশি বহুতল ভবন বা টাওয়ার এবং অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে।

এমন বিপর্যয়ের মধ্যে আজ ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেয়ন সার জেরুজালেমে সাংবাদিকদের বলেছেন, হামাসকে আত্মসমর্পণ ও অস্ত্রসমর্পণ করতে হবে। একই সঙ্গে গাজা বন্দী বাকি জিম্মিদের মুক্তি দিতে হবে। এর মাধ্যমেই কেবল হামলা থামানো সম্ভব। জবাবে হামাসের কর্মকর্তা বাসেম নাইম রয়টার্সকে বলেছেন, তাঁরা অস্ত্রসমর্পণ করবেন না। তবে জিম্মিদের মুক্তি দিতে রাজি।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এতে এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ৬৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি। আহত হয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার মানুষ।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-07%2F7ar09rk1%2Fgaza-flee.jpg?rect=0%2C0%2C4663%2C3109&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসরায়েলের হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের শোকার্ত স্বজনেরা। আজ রোববার গাজা নগরীতে। ছবি: এএফপি

সবার জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিতে বাংলাদেশের লাগবে ৭৫ বছর, ভারত–পাকিস্তানের অবস্থা কী by পার্থ শঙ্কর সাহা

দেশের ৪০ শতাংশের বেশি মানুষ নিরাপদ পানি পায় না। এসডিজি অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যেই সবার জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করতে হবে।

পানির সরবরাহ বৃদ্ধি, খোলা স্থানে মলত্যাগের অভ্যাস প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা, স্যানিটেশনের আওতা বাড়ানো—এমন নানা ক্ষেত্রে অগ্রগতি আছে বাংলাদেশের। তবে এত কিছুর পরও দেশের ৪০ শতাংশের বেশি মানুষ নিরাপদ পানি পায় না। এ ক্ষেত্রে গত প্রায় এক দশকে মাত্র ৩ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। এভাবে চললে সবার জন্য নিরাপদ পানি  নিশ্চিত করতে আরও ৭৫ বছর লাগতে পারে। আগামী ২৫ বছরের মধ্যে ভারত ও ভুটান সব মানুষের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে পারবে। যদিও নিরাপদ পানি প্রাপ্তির এ হারের দিক থেকে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক পিছিয়ে পাকিস্তান।

জাতিসংঘের দুই সংস্থা ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) জয়েন্ট মনিটরিং প্রোগ্রাম (জেএমপি) ২০২৫–এর প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। চলতি মাসেই এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) খাতে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অবস্থা তুলে ধরে দুই বছর পরপর এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
২০০০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের তৈরি করা সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এমডিজি) সবার জন্য পানি নিশ্চিতের কথা ছিল। জেএমপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ খাবার পানি পায়। ২০১৫ সালে এ হার ছিল ৯৭ শতাংশ। এখন জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যেই সবার জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করতে হবে।

জেএমপির এই প্রতিবেদন মূল্যায়ন করে অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবার জন্য পানি এবং সবার জন্য নিরাপদ পানি এক নয়। আমরা এমডিজিতে যে অর্জন করেছিলাম, সেটা নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগেছি এবং এখনো ভুগছি। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনেক চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু নিরাপদ পানি পাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা সক্ষমতা দেখাতে পারছি না।’

নিরাপদ পানি বলতে কী বোঝায়

নিরাপদ পানি বলতে বোঝায় এমন পানি, যার উৎস থেকে মানুষ সহজে পানি পেতে পারে। কারও নিজস্ব জমি বা বাড়ির ভেতরেই সেই উৎস থাকবে। এ পানি যখনই প্রয়োজন, তখনই পাওয়া যাবে এবং তা অবশ্যই মলের জীবাণু ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ থেকে মুক্ত। এটি এসডিজি ৬.১-এর একটি মূল ধারণা।

বাংলাদেশে নিরাপদ পানির কী অবস্থা

জেএমপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পানি অনিরাপদ করে ই–কোলাইয়ের মতো মলের জীবাণু। দেশের প্রায় ৬০ জেলায় আর্সেনিক দূষণ রয়েছে। এসব বিবেচনায় এখন ৫৯ শতাংশ মানুষ নিরাপদ খাবার পানি পায়। ২০১৫ সালে এ হার ছিল ৫৬ শতাংশ।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ক্যাম্পাসের পানি পান করে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েন। পানির এ অবস্থার কারণে অনেক শিক্ষার্থী হল ছেড়ে বাসায়ও চলে যান। শিক্ষার্থীরা তখন জানিয়েছিলেন, পানির সমস্যার কারণে তাঁদের একাডেমিক কার্যক্রমও বন্ধ থাকে দিন কয়েক। বুয়েটের উপাচার্য আবু বোরহান মোহাম্মদ বদরুজ্জামান পানির সমস্যার কথা তখন স্বীকার করেছিলেন।

বুয়েটের মতো এমন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খাওয়ার পানিতে এই দূষণ আলোচনার সৃষ্টি করে। তবে শুধু বুয়েটেই নয়, দেশের অনেক স্থানের সরবরাহের পানিতেও মলের জীবাণু রয়ে গেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, নারায়ণগঞ্জ ও খুলনায় এখন ওয়াসার সরবরাহের পানি আছে। কিন্তু সেই পানিও সুপেয় নয়। আর এসব কারণে বাংলাদেশে নিরাপদ পানি পাওয়ার হার কম।

জেএমপির প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে নিরাপদ পানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা পানির গুণগত মান। বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৪ জেলায় অর্ধেকের কম মানুষ এমন উন্নত পানি ব্যবহার করছে, যা নিজস্ব বাড়ির ভেতরে পাওয়া যায়, প্রয়োজনমতো সব সময় পাওয়া যায় এবং দূষণমুক্ত।’

দক্ষিণ এশিয়ায় কার কী অবস্থা

এক দশকে নিরাপদ পানি প্রাপ্তির দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এগিয়ে ভারত। দেশটিতে এখন ৭৬ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানি পায়। ২০১৫ সালে এ হার ছিল ৬১ শতাংশ। ভুটানের ৬৬ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানির আওতায় আছে। ২০১৫ সালে এর হার ছিল ৪৭ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে নেপাল। দেশটির ১৬ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানি পায়। পাকিস্তানের ৪৫ শতাংশ মানুষ এখন নিরাপদ পানি পায়। এক দশক আগে এ হার ছিল ৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ এক দশকে দেশটি মাত্র ১ শতাংশ এগিয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটার এইডের বাংলাদেশীয় প্রধান হাসিন জাহান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভারত ও ভুটানের অগ্রগতির পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি হলো রাজনৈতিক অগ্রাধিকার। ‘স্বচ্ছ ভারত’ কর্মসূচি ছিল দেশটির সরকারের অগ্রাধিকার। এদিকে নেপালও ২০৪১ সালের মধ্যে প্রতিটি ঘরে ট্যাপের পানি দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে খোলা স্থানে মলত্যাগের হার কমিয়ে এনেছিল। এটা বড় অর্জন। একই ধরনের প্রতিশ্রুতি ছাড়া বাংলাদেশের নিরাপদ পানির ক্ষেত্রে কোনো অর্জন সম্ভব নয়।’

স্যানিটেশন খাতে কিছু আশা

পানির ক্ষেত্রে এক দশকে এগিয়ে যাওয়ার হার শ্লথ হলেও স্যানিটেশন খাতে অগ্রগতি কিছুটা দ্রুত। বছরে গড়ে ১ দশমিক ১ শতাংশ হারে। কিন্তু তাতেও বাংলাদেশে সর্বজনীন স্যানিটেশন নিশ্চিত হতে পারে ২০৮৩ সালের আগে নয়। সেই তুলনায় নেপাল ২০৪৯ সালে এবং ভারত ২০৪১ সালে এ লক্ষ্য পূরণে পৌঁছাতে পারবে।

জেএমপির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে স্যানিটেশন কাভারেজ কিছুটা উন্নত হলেও এখনো প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ন্যূনতম স্যানিটেশন–সুবিধা থেকেও বঞ্চিত। আর ২ কোটি মানুষ হাত ধোয়ার মৌলিক সুবিধা ছাড়াই বসবাস করছে।