Showing posts with label সীমান্ত সন্ত্রাস. Show all posts
Showing posts with label সীমান্ত সন্ত্রাস. Show all posts

Saturday, September 26, 2026

মুর্শিদাবাদে বাবা ও তিন ছেলেকে আটকের পর বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে, দাবি মানবাধিকার সংস্থার

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যের মুর্শিদাবাদের সুতি এলাকার একটি ঘটনা রাজ্য পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কর্মপদ্ধতি নিয়ে আবার প্রশ্ন উঠেছে। সীমান্ত এলাকা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর তরফে গত বৃহস্পতিবার বিষয়টিকে প্রকাশ্যে আনা হয়েছে।

‘মাসুম’–এর তরফ থেকে বলা হচ্ছে, গত ১৩ আগস্ট সুতি থানার উমরাপুর পঞ্চায়েতের বালিয়াঘাটি গ্রাম থেকে ষাটোর্ধ্ব ডাবলু শেখ এবং তাঁর তিন ছেলে কায়েম শেখ, রাজাউল শেখ ও ১৬ বছর বয়সী কিশোর আসমাউল শেখকে পুলিশ কোনো প্রকার আগাম তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই আটক করে। শেখ পরিবারের দাবি ও নথিপত্রকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দ্রুততার সঙ্গে তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া হয়। ওই পরিবারের প্রধান ডাবলু শেখ ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নাগরিক এবং চলতি বছরও তিনি ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এমনকি তাঁর বাবা শেখ সামজানির নাম ১৯৬৬ সালের ভারতের নির্বাচনী রেকর্ডে রয়েছে। পরিবারটির কাছে আধার ও রেশন কার্ডের মতো যাবতীয় বৈধ ভারতীয় পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এই পুরো ঘটনার পেছনে কোনো বৈধ আইনি অনুসন্ধান ছিল না বলেই মানবাধিকার সংগঠনের দাবি। সন্দেহজনক নাগরিকত্বের নামে কেবল বাংলাভাষী, দরিদ্র বা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের হওয়ার কারণে কাউকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দেওয়া আইনত ও সংবিধানগতভাবে সম্পূর্ণ বেআইনি।

রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই বিশেষ করে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের যেভাবে গণহারে হেনস্থার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা তীব্র উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছে পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সংস্থাগুলো। সীমান্তবর্তী অঞ্চল ও বিভিন্ন স্থানে বাঙালি মুসলিমদের লক্ষ্য করে প্রশাসনিক ও পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই তাঁদের গায়ে ‘বিদেশি’র তকমা সেঁটে দেওয়া হচ্ছে। কোনো নাগরিককে তাঁর আইনি অধিকার রক্ষা ও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ না দিয়েই সীমান্ত পার করে দেওয়ার প্রক্রিয়া মূলত সাংবিধানিক সুরক্ষাকবচকে অস্বীকার করার শামিল। যে পরিবারগুলোর স্বজনদের এভাবে জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হচ্ছে, তাঁরা এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন—প্রিয়জন আদৌ বেঁচে আছেন, নাকি ভিনদেশের কোনো কারাগারে বন্দী, সে খবরও পরিবারগুলো পাচ্ছে না।

এই অমানবিক পরিস্থিতি ও বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ ‘মাসুম’ ও ‘প্যাকটি’ রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জানিয়ে সরাসরি পদক্ষেপের দাবি তুলেছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, যদি কোনো রকম নিরপেক্ষ ও যাচাইযোগ্য সিদ্ধান্ত ছাড়াই ওই চারজনকে আন্তর্জাতিক সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে, তবে অবিলম্বে ডাবলু শেখ ও তাঁর তিন সন্তানকে নিরাপদে ভারতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। এই পুরো আটক ও সীমান্ত পার করে দেওয়ার বেআইনি ঘটনার পেছনে কাদের ভূমিকা ছিল, তা নিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও সময়সীমাভিত্তিক তদন্তের দাবি রাখা হয়েছে। পুলিশের অনুসন্ধান প্রতিবেদন, এফআরআরওর নির্দেশপত্র, বিএসএফকে হস্তান্তরের দলিল এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগসংক্রান্ত সব রেকর্ড সর্বসমক্ষে প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছে।

পাশাপাশি সুতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, জঙ্গিপুর জেলার পুলিশ সুপার এবং জড়িত অন্যান্য ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার ভূমিকা তদন্ত করে দেখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। ভুয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো ভারতীয় নাগরিককে বেআইনিভাবে আটক বা বিতাড়িত করার পেছনে যেসব সরকারি কর্মকর্তা জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। সবশেষে ডাবলু শেখ ও তাঁর পরিবারের দীর্ঘদিনের ভোটার তালিকা এবং অন্যান্য দেওয়ানি নথিপত্র নতুন করে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত
বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত। ফাইল ছবি

Wednesday, June 17, 2026

ভারত জোর করে মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে: এইচআরডব্লিউ

এইচআরডব্লিউ মনে করে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করাটা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এ ছাড়া মানুষকে খাদ্য, পানি, আশ্রয় বা চিকিৎসাসেবা ছাড়া ফেলে রাখাটা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণের শামিল হতে পারে।

ভারতের কর্তৃপক্ষ পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত অনেক মুসলিম বাঙালিকে ন্যূনতম আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়াই জোর করে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। তারা মনে করে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করাটা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। গতকাল মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংস্থাটি এমন উদ্বেগ জানিয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে নির্মমভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে বা সীমান্তে আটকে রেখে দিচ্ছে, তাদের মৌলিক মানবাধিকারকে উপেক্ষা করছে। সরকারকে (ভারত) অবৈধভাবে মানুষকে বহিষ্কার বন্ধ করতে হবে, যথাযথ আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে এবং মুসলিমদের প্রতি এই উদ্বেগজনক বৈরিতার অবসান করতে হবে।’

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে এখন পর্যন্ত ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের চালানো এ ধরনের ২১টি চেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে। এই ২১ ঘটনায় শিশুসহ ২০০ জনের বেশি মানুষকে বাংলাদেশের সীমান্ত জেলাগুলোতে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, মার্চের নির্বাচনে তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয় পাওয়ার পর তাঁর সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় শত শত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে আটক করা হয়েছে। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, তারা ৯ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁরা বলেছেন, বিএসএফের সদস্যরা রাতে দলে দলে মানুষকে সীমান্তে এনে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিজিবি প্রবেশে বাধা দিলে পরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা সেই মানুষদের আবার ফিরে যেতে দেয়।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা পঞ্চগড়ে ৫ জুন শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হলে ৭৫ ঘণ্টার দীর্ঘ অচলাবস্থা তৈরি হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল হোসেন এইচআরডব্লিউকে বলেন, ওই দলটি বাংলাদেশের ভেতরে প্রায় ৫০ ফুট জায়গা পর্যন্ত ঢুকে পড়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি বিজিবিকে জানান। পরে বিজিবির সদস্যরা সেখানে পৌঁছালে তাঁরা পিছু হটে নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নেন।

আটকে পড়া ব্যক্তিদের অবস্থা বর্ণনা করে প্রত্যক্ষদর্শী রুবেল হোসেন বলেন, প্রথম রাতে ওই মানুষগুলো প্রচণ্ড বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে ছিল। দ্বিতীয় দিনে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা কিছু শুকনা খাবার সরবরাহ করে।

রুবেল বলেন, ‘আমি যা দেখেছি, তা ছিল যুদ্ধের মতো এক অচলাবস্থা। সেখানে বিএসএফ ও বিজিবি দুই পক্ষেরই বড় সংখ্যার সদস্য মোতায়েন ছিল।’

রুবেল হোসেন আরও বলেন, সীমান্তে দুই বাহিনীর মধ্যে বারবার স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার চেষ্টা করা হলেও কোনো সমাধান হয়নি। শেষ পর্যন্ত বিএসএফ দলটিকে আবার ভারতের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

৬ জুন ভোরে বিএসএফের সদস্যরা দুটি বাঙালি মুসলিম পরিবারের ছয় সদস্যকে বাংলাদেশের তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্তের দিকে ঠেলে দেন। বিজিবি তাদের প্রবেশে বাধা দেয়। বিএসএফও তাদের ভারতে ফিরতে দেয়নি। এমন অবস্থায় পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হয়। পরদিন তাদের আবার ভারতে ফিরে যেতে দেওয়া হয়।

বিজিবির বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮ জুন ঠাকুরগাঁও জেলায় প্রায় ৪৮ ঘণ্টা শূন্যরেখায় (সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডের সরু অংশে) আটকে থাকার পর বিএসএফ ১১ জনকে ভারতের দিকে ফিরিয়ে দেয়। তাঁদের মধ্যে এক গর্ভবতী নারীও ছিলেন।

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মার্চে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ঠিক আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন তাড়াহুড়া করে ভোটার তালিকায় নিবীড় সংশোধন (এসআইআর) আনে। এর মাধ্যমে ৯০ লাখের বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এতে অনেকের মধ্যে আটক ও বহিষ্কারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

২০১৯ সালে ভারতের আসাম রাজ্যে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের একটি ত্রুটিপূর্ণ ও বৈষম্যমূলক প্রক্রিয়ার কারণে ১৯ লাখের বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন অবস্থার মধ্যে পড়ে যান। এরপর হাজার হাজার বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে আটককেন্দ্রে রাখা হয় এবং অনেককে অবৈধভাবে বহিষ্কার করা হয়।

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বারবার রাজ্যের বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের সীমান্তের কাছাকাছি একটি সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে যাই এবং সেখান থেকে সরাসরি সীমান্ত পার করে দিই। সেখানে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে যে কিছু কথিত অবৈধ বাংলাদেশি নিজেরাই ফিরে যেতে শুরু করেছে।’

পঞ্চগড়ের বাসিন্দা হাসিবুল ইসলাম বলেন, পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির একটি ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। তাদের কাছে ভারতের আধার কার্ড ছিল, তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় পুলিশ তাদের আটক করে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করেছিল। বিএসএফ তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে।

হাসিবুল বলেন, পরিবারটির সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি চারবার ভোট দিয়েছেন। কিন্তু চলতি বছর তাঁদের কেউ ভোট দিতে পারেননি। কারণ, তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

তিন দিন সীমান্তে আটকে থাকার পর শেষ পর্যন্ত পরিবারটিকে আবার ভারতে ফিরে যেতে দেওয়া হয়।

ভারতীয় কর্মকর্তাদের দাবি, বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছেন এবং তাঁদের স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার জন্য সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সে প্রসঙ্গ টেনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, কোনো ব্যক্তি যদি সত্যিকার অর্থে স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরতে চান, তাহলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী তাঁকে সহায়তা করা যেতে পারে, কিন্তু কাউকে জোর করে দেশে ফেরত পাঠানো বা বহিষ্কার করা উচিত নয়।

সংস্থাটি আরও বলেছে, সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া কয়েকজনের অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁদের পরিচয়পত্র, অর্থ ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছে, যা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের কর্তৃপক্ষ শত শত কথিত অনিয়মিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে বিভিন্ন অস্থায়ী আটককেন্দ্রে আটকে রেখেছে। আটক ব্যক্তিদের বেশির ভাগ মুসলিম হলেও তাঁদের মধ্যে কিছু হিন্দুও আছেন।

এক ভারতীয় অধিকারকর্মী এইচআরডব্লিউকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর আটককেন্দ্রে আনুমানিক ৪০০ ব্যক্তি আটক আছেন। তাঁদের অনেককেই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার পর আটক করা হয়েছে।

ওই অধিকারকর্মী মনে করেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়াটা এখন গ্রেপ্তার, আটক ও বহিষ্কারের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষও বলেছে, আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানো কাউকে গ্রহণ করা হবে না। তাদের মতে, কাউকে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে যথাযথ পরিচয় যাচাই এবং বিদ্যমান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ এবং সব ধরনের জাতিগত বৈষম্য বিলোপবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী ভারত সবার অধিকার সুরক্ষিত রাখতে বাধ্য। একই সঙ্গে জাতি, বর্ণ, বংশপরিচয়, জাতীয়তা বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে যেন নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত না করা হয়, তা–ও ভারতকে নিশ্চিত করতে হবে।

সংস্থাটির মতে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করাটা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এ ছাড়া মানুষকে খাদ্য, পানি, আশ্রয় বা চিকিৎসাসেবা ছাড়া ফেলে রাখাটা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণের শামিল হতে পারে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, যাঁদের বহিষ্কারের চেষ্টা করা হচ্ছে, তাঁদের জন্য ভারত সরকারের মৌলিক আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা উচিত। এর মধ্যে বহিষ্কারের কারণ সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য জানার সুযোগ, আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার অধিকার এবং বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ থাকতে হবে।

সংস্থাটি আরও বলেছে, শিশুদের বহিষ্কার করা বা সীমান্তে আটকে রাখাটা জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের লঙ্ঘন। এই সনদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রগুলো শিশুদের জাতীয়তার সুরক্ষা দিতে বাধ্য। সনদটি অন্যায়ভাবে শিশুদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া নিষিদ্ধ করেছে।।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নাগরিকত্ব যাচাই এবং নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে ফেরত পাঠানোর জন্য দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা আছে। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় অনেক মানুষ দুই দেশের সীমান্তরক্ষা বাহিনীর পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে আটকে পড়ছেন, যা তাঁদের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘জাতীয়তা যা-ই হোক না কেন, কোনো মানুষকে দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়।’

এ ধরনের বহিষ্কার অভিযান বন্ধ করার জন্য মীনাক্ষী ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কারণে আর কখনো মানুষের মৌলিক মর্যাদা যেন ক্ষুণ্ন না হয়, তা দুই দেশের সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
সম্প্রতি কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে ছয়জনকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ
সম্প্রতি কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে ছয়জনকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। ছবি: প্রথম আলো

Saturday, June 13, 2026

কুলাউড়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি তরুণ নিহত

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে মুজিব আলী (২০) নামের বাংলাদেশি এক তরুণ নিহত হয়েছেন। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের দত্তগ্রাম সীমান্তে ভারতের অভ্যন্তরে এ ঘটনা ঘটে।

দত্তগ্রাম সীমান্ত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৪৬ ব্যাটালিয়নের আওতায় পড়েছে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ওই ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ শুক্রবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, বিএসএফ নিহত মুজিবের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য স্থানীয় হাসপাতালের মর্গে নিয়ে গেছে। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর তারা লাশ হস্তান্তর করবে বলে জানিয়েছে।

নিহত মুজিব আলী একই এলাকার বাসিন্দা মৃত অজিব উল্লাহর ছেলে। শরীফপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) স্থানীয় ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জয়নুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, নিহত মুজিব চোরাকারবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ঘটনার সময় তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিলেন বলে জানা গেছে।

বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দত্তগ্রাম সীমান্তে মনু নদ দেশের সীমানা ভাগ করে দিয়েছে। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে দত্তগ্রামের বাসিন্দা মুজিবসহ ছয়-ছয়জন বাংলাদেশি মনু নদ পার হয়ে সীমান্তের ১৮৫২ ও ১৮৫৩ নম্বর মূল সীমান্তখুঁটির মাঝখান দিয়ে ভারতে ঢুকে পড়েন। সেখানে বিএসএফের টহলদল তাঁদের দেখে বাধা দেয়। একপর্যায়ে টহলদলের সদস্যরা গুলি চালালে মুজিব ঘটনাস্থলেই মারা যান। তাঁর সহযোগীরা দ্রুত সটকে পড়েন। এ দিকে গুলির শব্দ পেয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফের সংশ্লিষ্ট এলাকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরা বিস্তারিত জানান।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। ফাইল ছবি

Thursday, June 11, 2026

পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত ও আটককেন্দ্রে দুর্দশাগ্রস্ত কথিত ৪৭১ বাংলাদেশি

ভারতে এখন চরম বিপদের মুখে পড়েছেন কথিত বহু বাংলাদেশি নাগরিক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের ধরে নিয়ে বিভিন্ন ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা আটককেন্দ্রে রাখছে। আবার কাউকে আটকে থাকতে হচ্ছে ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তের মধ্যবর্তী অঞ্চল, অর্থাৎ ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, উত্তর চব্বিশ পরগনার বসিরহাট সীমান্তবর্তী এলাকায় কথিত অনুপ্রবেশকারীদের ভিড় বাড়ছে। প্রশাসনিক কর্তারা জানিয়েছেন, বসিরহাটের বিথারী-হাকিমপুর পঞ্চায়েত এলাকার হাকিমপুর চেকপোস্টে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৮২ জন কথিত বাংলাদেশি নাগরিক সে দেশে ঠেলে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। বাদুড়িয়া ও স্বরূপনগর এলাকার তিনটি ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ সব মিলিয়ে ৪৭১ জন কথিত বাংলাদেশি নাগরিককে আটকে রাখা হয়েছে।

আটক এই মানুষদের সিংহভাগই অত্যন্ত সাধারণ শ্রমজীবী শ্রেণির। ভারতের সংবাদমাধ্যমের দাবি, অভাবের তাড়নায় বা ভালো কাজের লোভে তাঁরা বিভিন্ন সময়ে পশ্চিমবঙ্গের নানা সীমান্ত এলাকা দিয়ে দালালদের মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। অনুপ্রবেশের পর তাঁরা কেবল পশ্চিমবঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, কাজের খোঁজে ছড়িয়ে পড়েছিলেন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও।

বর্তমানে বাদুড়িয়া ও স্বরূপনগরের ওই তিনটি আটককেন্দ্রে থাকা ৪৭১ জনের সঠিক নাম, পরিচয় ও নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার কাজ চলছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) আধিকারিকেরা আটক ব্যক্তিদের আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) থেকে শুরু করে যাবতীয় বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের কাজ করছেন।

বিএসএফ সূত্রকে উদ্ধৃত করে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ সঠিক ও নিশ্চিত তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত কাউকেই বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে না।

পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমের খবরে দাবি করা হয়, আটককেন্দ্রের বন্দিদশা স্বস্তির না হলেও সেখানে থাকা শিশু, নারী ও পুরুষদের মানবিক দিকটি বিবেচনা করছে প্রশাসন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে তাঁদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা, নিয়মিত খাওয়াদাওয়া ও নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করা হচ্ছে, যাতে নিজ দেশে ফেরার আগে তাঁদের বড় ধরনের কোনো শারীরিক বা মানসিক অসুবিধা না হয়। পাশাপাশি অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আটককেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় স্তরে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিজেপি সরকার দেশের সীমান্তগুলোতে কথিত অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বাড়তি নজর দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর কথিত অনুপ্রবেশ নিয়ে আরও বেশি শোরগোল শুরু করেছে এবং কথিত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা বলে অনেক মানুষকে ধরপাকড় করছে, যাঁদের বেশির ভাগই মুসলিম। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের ২ হাজার ২০০ কিলোমিটারের সীমান্ত রয়েছে।

সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ দ্রুত শেষ করতে বিএসএফের হাতে জমি তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু করেছে পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার। এই সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রাজ্যের প্রশাসনিক বৈঠকেও কথিত অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে নিজের কঠোর ও আপসহীন অবস্থানের কথা বারবার বলছেন উগ্রপন্থী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার কাছে যাচাই–বাছাইয়ের জন্য নথিপত্রহীন এক কথিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে আটকে রাখা হয়। ২৮ মে ২০২৬, হাকিমপুর
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার কাছে যাচাই–বাছাইয়ের জন্য নথিপত্রহীন এক কথিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে আটকে রাখা হয়। ২৮ মে ২০২৬, হাকিমপুর। ছবি: এএফপি

Wednesday, December 31, 2025

ভারতের ‘আন্তরাষ্ট্র দমন’ নিয়ে অভিযোগের শেষ কোথায় by হেলাল মহিউদ্দীন

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘ট্রান্সন্যাশনাল রিপ্রেশন’ (আন্তরাষ্ট্র দমন) বলে একটি ধারণা রয়েছে। ধারণাটি দিয়ে রাষ্ট্রগুলোর নিজ রাষ্ট্র ছাড়িয়ে অন্য রাষ্ট্রে অন্তর্ঘাত চালানো বোঝায়। নব্বইয়ের দশকে বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক বিপর্যয়ের আগে এই ধারণাটি দিয়ে বোঝানো হতো সিআইএ, কেজিবি, এমআইসিক্স, মোসাদ ইত্যাদি আন্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা কার্যক্রমের মাধ্যমে ভিনদেশে ভিন্নমতের সরকারকে চাপে রাখা। লক্ষ্য থাকত রাজনৈতিকভাবে কোনো দেশকে চাপে রাখা।

গোয়েন্দা সিনেমা, থ্রিলার, গেম, উপন্যাসে সেসব কার্যক্রমের কল্পগল্প উদাহরণ ভূরি ভূরি রয়েছে। সাধারণত আমনাগরিক পর্যায়ে ‘আন্তরাষ্ট্র দমন–এর ঘটনা মোটেই ঘটত না। অন্তর্ঘাতগুলো সাধারণ নাগরিক বা ছোটখাটো রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীর বিরুদ্ধে হতো না। ঘটত স্পাই-স্পাই, স্পাই-রুলিং এলিট, স্পাই-অস্ত্র উৎপাদক ও বিক্রেতা গোষ্ঠীর দালাল ও বাজার দখলদার পর্যায়ে। নিজ দেশের গোয়েন্দা তথ্য অন্য দেশের হাতে তুলে দেওয়া ডাবল এজেন্ট বা স্বপক্ষত্যাগীরাও লক্ষ্যবস্তু হতো।

গত তিন দশকে অপঘাতগুলো কমতে কমতে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামছিল। আলোচনায় ছিল মাত্র দুটি ঘটনা। এক. ২০০৬ সালে লন্ডনে রাশিয়ার নাগরিক আলেক্সান্দর লিটভেঙ্কো হত্যাকাণ্ড। দুজন রুশ নাগরিকের সঙ্গে মিটিং ও খাবার শেষের পর পোলোনিয়াম-২১০ এর মতো মারাত্মক রেডিওঅ্যাকটিভ বিষক্রিয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়। [২০১৮ সালে আরেক সাবেক রুশ গোয়েন্দা সের্গেই স্ক্রিপাল ও তাঁর কন্যা ইউলিয়া স্ক্রিপাল বিষাক্ত নোভিচক নার্ভ এজেন্ট-এর (এ-২৩৪) বিষক্রিয়ায় মরতে বসেছিলেন। তাঁরা অবশ্য শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেছেন।] দুই. তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে স্বপক্ষত্যাগী অনুমিত জামাল খাসোগির হত্যাকাণ্ড।

লক্ষণীয়, উল্লিখিত দুটি হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে। ভিনদেশের সাধারণ নাগরিককে বা রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীকে প্রবাসে কোনো দেশের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে কাউকে হত্যার ঘটনা কোনো গণতান্ত্রিক দেশ চালায় না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটানো দেশ হিসেবে ভারত এবং তার গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর নাম বহুল আলোচিত হচ্ছে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশে।

কানাডা পৃথিবীর শান্তিবাদী দেশগুলোর অন্যতম। দেশটির রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ভারতের, বিশেষত পাঞ্জাবি ও গুজরাটি অভিবাসীদের অসামান্য আধিপত্য রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি কানাডার শান্তিবাদী মানুষদের বড় অংশই অশান্ত হয়ে উঠছেন ভারতবিরোধিতায়।

ঘটনার শুরু কানাডায় শিখদের মধ্যে জনপ্রিয় নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর হত্যাকাণ্ড। কানাডা সরকারের দাবি ভারত সরকার এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত। হাতে আছে নিশ্চিত গোয়েন্দা তথ্যপ্রমাণ। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে কানাডার তখনকার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো নিজেই নিজ্জর হত্যায় ‘বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ’ রয়েছে বলে জানিয়েছেন। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ কুখ্যাত বিষ্ণোই গ্যাংকে (লরেন্স বিষ্ণোই নামের একজন গ্যাং লিডারের নামে এই গ্যাংয়ের নামকরণ হয়েছে) ব্যবহার করছে কানাডার জমিনে কানাডার নাগরিক শিখ নেতাদের নিধনের কাজে। নিজ্জর ছাড়া আরও অনেকেই নাকি আছে ‘র’–এর নিধন তালিকায়।

বিখ্যাত অ্যাঙ্গাস রিড ইনস্টিটিউট ও এশিয়া প্যাসিফিক ফাউন্ডেশনের যৌথ জরিপ প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালে। জরিপে দেখা যায়, কানাডার নাগরিকদের ভারতের প্রতি কূটনৈতিক সমর্থন তলানিতে ঠেকেছে। ২০২২ সালের জরিপে যেখানে ভারতের প্রতি সমর্থন ছিল ৫২ শতাংশ নাগরিকের, মাত্র এক বছর আট মাস পর ২০২৪-এ সেটি ২৪ শতাংশে এসে ঠেকেছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পতনের হার ২৬ শতাংশ।

ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি কানাডায় বিপন্ন। ঘটনাটির দায়দায়িত্ব বিষয়ে আদালত এখনো চূড়ান্ত সুরাহা দেয়নি। ভারত যথারীতি সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কিন্তু আধুনিক কূটনীতিতে ‘চূড়ান্ত রায়’ আসার আগেই ‘আখ্যান’ তৈরি হয়ে যায়। আর আখ্যান তৈরি হয় রাষ্ট্রের বক্তব্য, গোয়েন্দা তথ্য, আদালতের নথি, সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মিশেলে। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। কূটনীতিক বহিষ্কার, ভিসা ও সেবা সীমিত করা, আস্থার সংকট এখনো কমেনি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ পর্যায়েই থেমে থাকেনি। অভিযোগ ছাড়িয়ে অভিযোগপত্র তৈরির পর্যায়ে চলে গেছে। মামলা হয়েছে আদালতে। মার্কিন বিচার বিভাগ ২০২৪ সালের অক্টোবরে ঘোষণা দেয়, একজন ভারতীয় সরকারি কর্মচারী বিকাশ যাদব যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যার জন্য ভাড়াটে খুনি জোগাড়যন্ত্রসহ টাকাপয়সা লেনদেনের প্রায় সব প্রক্রিয়াই গুটিয়ে আনে। সব রকম যোগাযোগ হয়েছে গোপন ও কৌশলী এনক্রিপ্টেড বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে। কিন্তু দুর্ঘটনাটি ঘটার আগেই মধ্যস্থতাকারী সরকারি গোয়েন্দা দপ্তরে চর হিসাবে কাজ পেয়ে যান এবং ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেন। মার্কিন কর্তৃপক্ষের জানা হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ভারতের অন্তর্ঘাত তৎপরতা।

এই ধরনের মামলা কেবল কূটনৈতিক সম্পর্কে আটকে থাকে না, ‘রুল অব ল’ পরিসরে ঢুকে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক সমাজ প্রশ্ন তোলে—গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়েও ভারত কীভাবে বিদেশের মাটিতে ট্রান্সন্যাশনাল রিপ্রেশনে সাহসী হয়ে উঠছে? ভারত যথারীতি এই অভিযোগগুলোও অস্বীকার করেছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে উদীয়মান তরুণ নেতা ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশের সব রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নজরদারি ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে চিহ্নিত আততায়ী ভারতে পালিয়ে গেছে—এই তথ্যেই বিশ্বাস রাখছে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী। তাদের সন্দেহ ও বিশ্বাস হত্যাকাণ্ডটির দায় ভারতের। যথারীতি ভারত হত্যা-সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে চলেছে। কিন্তু জনমনে ভারতের প্রতি অনাস্থা ও অবিশ্বাস আরও কয়েক ধাপ বেড়েছে এবং বাংলাদেশের মানুষের অন্তরাত্মা থেকে ক্ষতটি দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।

ভারতই হবে বৈশ্বিক দক্ষিণের নেতা—একুশ শতকের শুরুতে এই প্রত্যাশা ছিল প্রতিবেশী দেশগুলোর। কিন্তু বর্তমান সময়ে নতুন বন্ধুত্বের আফগানিস্তান এবং ভুটান ছাড়া প্রায় সব প্রতিবেশীর চোখেই ভারত ‘বিতর্কিত বহিঃশত্রু’। দেশটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়বে ধারণা করা হয়েছিল তিনটি বাস্তবতায়। এক. দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি ও বাজার, দুই. প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ, তিন. বড় কূটনৈতিক ভূমিকা, বিশেষত বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রতিনিধি হয়ে ওঠার চেষ্টা।

অথচ কানাডায় নিজ্জর হত্যা ও যুক্তরাষ্ট্রের মামলা চতুর্থ বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের থিঙ্কট্যাংক কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্সের মতে ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছায়ায় প্রবাসী বিরোধীদের টার্গেটিং’ তবে ভারতের ‘সফট পাওয়ার’, বিশেষত বহির্বিশ্বে ‘গণতান্ত্রিক উদাহরণ’কে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি শুধুই সত্য-মিথ্যার প্রশ্ন নয়। বরং ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ ও ‘স্বচ্ছতা’র প্রশ্ন। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এ রকম অভিযোগ উঠলে আন্তর্জাতিক অংশীদারেরা দুটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। এক. অভিযুক্ত রাষ্ট্র স্বচ্ছ তদন্তে সহযোগিতা করছে কি না। দুই. ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে অভিযুক্ত রাষ্ট্র সত্যিকার প্রাতিষ্ঠানিক সততা দেখায় কি না!

কানাডার নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আলাপ-আলোচনার বড় অংশ জুড়েই থাকে বিদেশি হস্তক্ষেপ, অপতথ্য এবং প্রবাসী কমিউনিটির আচরণ। কানাডার সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি ম্যারি-জোসি হোগ-এর নেতৃত্বে ২০২৩ সালে গঠিত ‘পাবলিক ইনকোয়ারি ইনটু ফরেন ইন্টারফিয়ারেন্স ইন ফেডারেল ইলেকটোরাল প্রসেসেস অ্যান্ড ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউশনস’ এখন অবধি কাজ করে চলেছে।

আলোচনা ও প্রতিবেদনগুলোতে একাধিক দেশকে ‘অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভারত সেগুলোর অন্যতম। রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত প্রতিবেদন জানাচ্ছে, কানাডীয় গোয়েন্দা প্রতিবেদনের মূল্যায়নমূলক পরামর্শ, ‘ভারতকে বিদেশি হস্তক্ষেপের অন্যতম ক্রীড়নক’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হোক।

মূল্যায়নগুলো ভারতবিদ্বেষী যেমন নয়, ভারতকে সরাসরি দোষারোপও নয়। তবু ভারতের বিরুদ্ধে ‘কাঠামোগত সন্দেহ’ প্রবল হতে প্রবলতর হচ্ছে। কানাডার নীতিনির্ধারণেও তাই মূল্যায়নগুলোই বেশি ভূমিকা রাখছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের অন্যতম বড় খবর—ভারতীয় সংগঠিত অপরাধচক্রটিকে (লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং) ‘ক্রিমিনাল নেটওয়ার্ক’ ঘোষণা করা হয়েছে। কূটনৈতিক আস্থা প্রতিদিনই ভাঙছে। আস্থা ভাঙলে যা হয়—বাণিজ্য, ভিসা, শিক্ষা-অভিবাসন, এমনকি প্রতিরক্ষা-প্রযুক্তি সহযোগিতাতেও তার প্রভাব পড়ছে।

ভারত ‘বিশ্বাস হারানো’র মতো কৌশলগত সংকটে পড়েছে ভালোভাবেই। কারণ, দুটি দেশই ভারতের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগী রাষ্ট্র। উইলসন সেন্টারের বিশ্লেষণ—ভারত হয়তো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ ও ‘চরমপন্থী’দের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে দেশ দুটিকে অভিযুক্ত করতে পারে। কিন্তু উভয় দেশেই আইনি কাঠামো শক্ত ও স্বচ্ছ হওয়ায় এবং সংবাদমাধ্যম স্বাধীন ও অনুসন্ধানী থাকায় জনমত তৈরিতে সরকারের প্রয়োজন হয় না।

উইলসন সেন্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের ‘অবিশ্বস্ত’ পরিচিতি ঘোচানোর উপায় স্বচ্ছ তদন্ত ও তথ্য বিনিময় সহযোগিতা। প্রয়োজনে স্পষ্ট ভাষায় রাষ্ট্রীয় দায় স্বীকার করা বা নাকচ করা। ভারত অবশ্য কোনোটিই করছে না। ফলে আস্থার সংকট বাড়ছেই। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অপরাধী বিনিময় চুক্তি রয়েছে। কিন্তু যখন কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র বিষয়েই ভারত নির্বিকার, বাংলাদেশের দাবিকে দেশটি কতটা আমলে নেবে অনুমান করা কঠিন।

শাস্তিপ্রাপ্ত দাগি আসামিদের আশ্রয়দান ইতিমধ্যে ভারতের নৈতিক ও কূটনৈতিক সম্মানকে দারুণভাবে খর্ব করেছে। শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের যদি সত্যিই ভারত জেনেশুনে আশ্রয় দিয়ে থাকে, তবে দুই দেশের সম্পর্ক আরও খারাপের দিকে যেতে পারে। বল এখন ভারতের কোর্টে। কূটনৈতিক সমাধানে দেশটির আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসাই উভয় দেশের জন্য মঙ্গলকর।

* হেলাল মহিউদ্দীন, যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটার মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সমাজবিজ্ঞান অধ্যাপনায় নিয়োজিত
- মতামত লেখকের নিজস্ব

সম্প্রতি উদীয়মান তরুণ নেতা ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন
সম্প্রতি উদীয়মান তরুণ নেতা ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন

Monday, November 17, 2025

ভারত কেবল মুসলিমদের ‘বিদেশি’ বলে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে by আরশাদ আহমেদ ও মহিবুল হক

ভারত থেকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো নাগরিকদের বেশির ভাগই সে দেশের নাগরিক। যাঁদের পাঠানো হচ্ছে তাঁরা মুসলিম এবং বাংলাভাষী। আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে ভুক্তভোগীদের অবস্থা নিয়ে ২৪ জুন আল–জাজিরার অনলাইনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। আরশাদ আহমেদ ও মহিবুল হক প্রতিবেদনটি করেছেন।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের ৬৭ বছর বয়সী সাইকেল মেকানিক আলী গত ৩১ মে নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। এর আগে তিনি চারটি ভয়ংকর দিন কাটিয়েছিলেন বাংলাদেশে। জন্মের পর থেকে তিনি জীবনভর এই প্রতিবেশী দেশটির নাম কেবল ‘গালি হিসেবে’ শুনেছেন বলে দাবি করেন।

আলীর এই এক সপ্তাহের দুর্ভোগ শুরু হয় ২৩ মে। ওই দিন রাজ্যের মোরিগাঁও জেলার কুইয়াদল নামের ছোট একটি গ্রামে তাঁর ভাড়া বাসা থেকে আসাম পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। সেদিন রাজ্য সরকার ঘোষিত ‘বিদেশি নাগরিকদের’ ধরপাকড় শুরু করে। আসামে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষকে কেবল ‘বিদেশি নাগরিক’ বলা হয়ে থাকে।

আসাম হচ্ছে চা উৎপাদনকারী এলাকা। এ অঞ্চলে ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে বাংলাভাষী মানুষের আগমন ঘটেছে এবং তাঁরা সেখানে বসবাস করছেন। এর পর থেকে স্থানীয় আদিবাসীদের (যাঁরা মূলত অসমিয়া ভাষায় কথা বলেন) সঙ্গে জাতিগত উত্তেজনা তৈরি করেছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২০১৬ সালে প্রথমবার আসামের ক্ষমতায় এলে এই উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। রাজ্যের ৩ কোটি ১০ লাখ জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি মুসলিম, যা ভারতের যেকোনো রাজ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ হার।

আলী হচ্ছেন সেই ৩০০-এর বেশি মুসলিমের একজন, যাঁদের মে মাস থেকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো (পুশ ইন) হয়েছে। এমন তথ্য দিয়েছেন খোদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। তিনি বলেছেন, ‘এ ধরনের ঠেলে পাঠানো আরও জোরদার করা হবে। আমাদের রাজ্যকে বাঁচাতে আরও সক্রিয় ও উদ্যোগী হতে হবে।’

নীল আকাশের নিচে নরক

২৩ মে পুলিশ আলীকে আটক করে ২০০ কিলোমিটারের বেশি দূরের গোয়ালপাড়া জেলার মাতিয়ায় নিয়ে যায়। ওই এলাকায় আসামের কথিত ‘অবৈধ’ অভিবাসীদের জন্য রাজ্যের সবচেয়ে বড় বন্দিশিবির নির্মাণ করা হয়েছে।

তিন দিন পর ২৭ মে ভোরবেলায় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) আলী, পাঁচ নারীসহ ১৩ জনকে একটি ভ্যানে করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়ে যায়।

আলী বলেন, ‘বিএসএফ আমাদের জোর করে ওপারে ঠেলে দিতে চাইছিল। কিন্তু বিজিবি (বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড) এবং স্থানীয় বাংলাদেশিরা প্রতিবাদ জানায়, তারা আমাদের নেবে না। কারণ, আমরা ভারতীয়।’

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ নামে পরিচিত একটি খোলা মাঠে আলীসহ অন্যদের পরবর্তী ১২ ঘণ্টা হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। তাঁদের জন্য ছিল না কোনো খাবার, আশ্রয় কিংবা সুরক্ষা।

আলীকে জলাভূমিতে বসে থাকতে এবং তাঁর চোখেমুখে গভীর আতঙ্ক দেখা যাচ্ছে—এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা নীল আকাশের নিচে নরক দেখেছি আর অনুভব করেছি, কেমন করে জীবন আমাদের ছেড়ে যাচ্ছিল।’

আলী বলেন, তাঁরা যখন ভারতের দিকেই ফিরে যেতে চান, তখন বিএসএফ তাঁদের ভয় দেখিয়ে বলে, ফিরে গেলে গুলি করা হবে।

আলী বলেন, ‘আমরা কান্নাকাটি করে অনুরোধ করেছিলাম যেন আমাদের না ঠেলে দেওয়া হয়। তখন ভারতের নিরাপত্তা সদস্যরা রাবার বুলেট ছোড়েন। ওই স্থান আমাদের জন্য কোনো “নো ম্যানস ল্যান্ড” ছিল না। বরং সেটি ছিল এমন এক জায়গা, যেখানে আমাদের কোনো দেশই ছিল না।’

৫০ বছর বয়সী রহিমা বেগমকে একইভাবে আসামের গোলাঘাট জেলা থেকে ধরে নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলছেন, এ ঘটনার স্মৃতি তাঁকে এখনো তাড়া করে।

রহিমা বলেন, ‘আমি যখন দৌড়ে বাংলাদেশের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করি, তখন বিজিবি আমাকে মারধর করে। আমার কোনো পালানোর পথ ছিল না। বিএসএফ হুমকি দেয়, যদি আমরা না যাই ওপারে, তাহলে তারা আমাদের গুলি করে মারবে।’

বাংলাদেশের সীমান্ত শহর রৌমারীর সাংবাদিক জিতেন চন্দ্র দাস। তিনি এ ঘটনা নিয়ে একটি বাংলা দৈনিকে প্রতিবেদন করেছিলেন। এই সাংবাদিক আল–জাজিরাকে বলেন, বিএসএফ ওই আটকে পড়া ভারতীয় নাগরিকদের ওপর রাবার বুলেট ছুড়েছে। বিএসএফ তাঁদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাতে ‘আকাশে চার রাউন্ড গুলি’ ছুড়েছে।

তবে ২৭ মে বিএসএফ এক বিবৃতিতে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা কেবল বাংলাদেশি নাগরিকদের ‘অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে’ কাজ করেছে।

বাংলাদেশি গ্রামবাসী ও বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপের পর বিজিবি আলীকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তে নামিয়ে দেয়। সেখান থেকে তিনি জঙ্গল পেরিয়ে ১০ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা শেষে বাড়ি ফেরেন।

৩১ মে আসামভিত্তিক দ্য সেন্টিনেল পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজিবির কাছ থেকে বিএসএফ ৬৫ জন সন্দেহভাজন ভারতীয় নাগরিককে ফেরত নেয়।

বাংলাদেশে ঠেলে পাঠনো হয়েছিল, ভারতের এমন মুসলিম নাগরিকেরা আল–জাজিরাকে বলেন, বিজিবি তাঁদের আন্তর্জাতিক সীমান্তে রেখে যায়। সেখান থেকে অন্তত ১০০ জন নিজেরাই বাড়ি ফিরে যান। এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে অনেকেই জানান, সীমান্তে ‘সাদাপোশাকে থাকা লোকজন’ তাঁদের গ্রহণ করেন এবং পরে হাইওয়েতে ফেলে রেখে চলে যান।

মুসলিমদের বিতাড়নের ঢেউ

গত ২২ এপ্রিল ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে গুলি করে ২৬ জনকে হত্যা করে সশস্ত্র গোষ্ঠী। ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা পাকিস্তান-সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ তোলে ভারত। ওই ঘটনার পরই ভারতে মুসলিমবিরোধী মনোভাব আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এর পর থেকেই তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ বিতাড়নের প্রচার-প্রচারণা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি অধ্যাপক অপূর্বানন্দ আল–জাজিরাকে বলেন, পেহেলগাম হামলার পর ভারতের কেন্দ্রীয় ও আসাম রাজ্য সরকারে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি দুর্বল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে তাড়িয়ে দেওয়ার অজুহাত খুঁজে পায়। যেমন রোহিঙ্গা সম্প্রদায় কিংবা বাংলাভাষী ভারতের মুসলিম নাগরিক।

অপূর্বানন্দ বলেন, ‘বিজেপি সরকারের অধীন ভারতে মুসলিম পরিচয় মানেই সন্ত্রাসবাদের প্রতীক। এই সরকার বাংলাভাষী মুসলিমদের অবৈধ বাংলাদেশি হিসেবে বিবেচনা করে।’

আসামের বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করে আসছে, চলমান কথিত বিদেশি নাগরিক ধরার অভিযানে কেবল মুসলিমদের নিশানা করা হচ্ছে। কংগ্রেস পার্টির নেতা দেবব্রত শইকিয়া আল–জাজিরাকে বলেন, তারা কেবল মুসলিমদেরই মাতিয়া বন্দিশিবির থেকে ঠেলে পাঠিয়েছে।

অবশ্য বিজেপির মুখপাত্র মনোজ বৌরাহ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অভিযান ধর্মভিত্তিক নয়। তিনি দাবি করেন, অবৈধ হিন্দুদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়নি। কারণ, তাঁরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হতে পারেন।

আসামের পরিস্থিতি

আসামে বহু দশক ধরে জাতিগত ও ধর্মীয় উত্তেজনা চলে আসছে। এই উত্তেজনার মূল শিকড় রয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে।

১৯ শতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা আসামের পার্বত্য এলাকাগুলোয় চা–বাগান তৈরি করে। এতে কাজ করতে বাংলাভাষী মুসলিম ও হিন্দু—উভয় সম্প্রদায়ের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক আসামে আসেন। তাঁদের অনেকে বর্তমান বাংলাদেশের অঞ্চল থেকে এসেছেন।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় ভারত ও পাকিস্তান—দুটি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে গঠিত হয়। পাকিস্তানের একটি অংশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান, যেখানে বেশির ভাগ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলতেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা ছিল উর্দু।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভাষা নিয়ে গণ–আন্দোলনের পর ভারতের সহায়তায় ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধ হয় এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।

আজকের দিনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার (২ হাজার ৫৪৫ মাইল) দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ২৬০ কিলোমিটার (১৬০ মাইল) আসামের সঙ্গে।

অন্যদিকে আসামের কর্তৃপক্ষ ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চকে (বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার আগের দিন) একটি সীমারেখা হিসেবে নির্ধারণ করে। বাংলাভাষী বসবাসকারীদের নাগরিকত্ব দাবি করতে হলে প্রমাণ হিসেবে দাখিল করতে হয়, তাঁরা ওই তারিখের আগে আসামে এসেছিলেন।

এ ধরনের নাগরিকত্ব সম্পর্কিত মামলাগুলো নিষ্পত্তি করে আসাম রাজ্যে স্থাপিত বিশেষ ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল’ বা বিদেশি ট্রাইব্যুনাল। এসব ট্রাইব্যুনাল একটি বিশেষ আদালতের মতো কাজ করে এবং সরকারি নথিপত্রে ছোটখাটো বানান ভুল বা অমিল দেখিয়ে মানুষকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করার ক্ষমতা রাখে।

২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছিল, এসব ট্রাইব্যুনাল ছিল ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ এবং তারা ‘ইচ্ছামতো কাজ করে’।

ওই বছরেই আসামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়। অবৈধ বাসিন্দাদের শনাক্ত করতে সরকার বহু বছর ধরে এই এনআরসি প্রস্তুত করছিল।

এই তালিকায় প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দাকে বাদ দেওয়া হয়, যাঁদের মধ্যে প্রায় ৭ লাখ মুসলিম। এনআরসি প্রকাশের পর জোরপূর্বক ভারত থেকে বহিষ্কার করতে শত শত মুসলিমকে বন্দিশিবিরে ধরে নেওয়া হয়।

আলীর নাম এনআরসিতে ছিল। তবে ২০১৩ সালে মোরিগাঁওয়ের একটি ট্রাইব্যুনাল তাঁকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করেন। কারণ, কিছু কাগজপত্রে তাঁর বাবার নাম ছিল ‘সামত আলী’। আবার কিছু কাগজপত্রে ‘চামত আলী’ এবং ‘চাহমত আলী’ হিসেবে তাঁর বাবার নাম লেখা হয়েছে।

নাগরিকত্ব বাতিলের পর আলী দুই বছর বন্দিশিবিরে কাটান। ২০১৪ সালে আসাম হাইকোর্টও ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রাখেন।

আলী বলেন, তিনি এতটাই দরিদ্র যে সুপ্রিম কোর্টে এই রায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার সামর্থ্য তাঁর নেই।

‘তারা আমাকে বাংলাদেশি বানিয়ে দিল’

বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এমন অনেক মুসলিমের নাগরিকত্ব–সংক্রান্ত মামলা এখনো আদালতে বিচারাধীন।

হয়রানির শিকার এসব মুসলিমের দাবি, এ পরিস্থিতিতে তাঁদের বিরুদ্ধে সরকারের ধরপাকড় বেআইনি। তারা অবৈধ বিদেশি ধরার নামে ইচ্ছামতো হয়রানি করছে।

মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা স্বীকার করেছেন, ‘যাদের মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে, এমন কিছু মানুষকে কূটনৈতিক চ্যানেলে বাংলাদেশ থেকে ফেরত আনা হয়েছে।’

তাঁদের একজন হলেন সোনা বানু। তিনি রাজ্যের বরপেটা জেলার বুড়িখামার গ্রামের বাসিন্দা। তাঁকে ২৭ মে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে পাঠানো হয়।

৫৯ বছর বয়সী সোনা বানু আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমি কখনো ভাবিনি, যে দেশে আমি জন্মেছি, যেখানে আমার মা–বাবা ও দাদু-দাদির জন্ম, সেই দেশ আমাকে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে পাঠাবে। তারা আমাকে বাংলাদেশি বানিয়ে দিল। অথচ বাংলাদেশকে আমি জীবনে কেবল ১০ মিটার দূর থেকে দেখেছি, নো ম্যানস ল্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়ে।’

মোরিগাঁও জেলার মিকিরভেটা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া যেন আমার জন্য মৃত্যুদণ্ডের মতো ছিল।’

আসামের মুসলিম খায়রুল

খায়রুল ইসলাম বলেন, প্রাসঙ্গিক দলিল-দস্তাবেজ থাকার পরও ২০১৬ সালে তাঁকে ‘বিদেশি’ নাগরিক ঘোষণা করা হয়। তাঁর পরিবার ব্রিটিশ আমলের জমির দলিল আদালতে জমা দিয়েছিল, যেখানে তাঁর দাদার নামে ভূমি রেকর্ড ছিল। তিনি এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছেন।

খায়রুল বলেন, ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে কাটানো সময় আমাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। আমাদের শরণার্থীর চেয়েও খারাপ অবস্থায় রাখা হয়েছিল। আমাদের কষ্ট পুরো পৃথিবীর চোখে দৃশ্যমান ছিল। আমরা যেন ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশের জন্যই বিদেশি ছিলাম।’

কিন্তু ৫০ বছর বয়সী নিজাম আহমেদ সরকারি নথি অনুযায়ী, কোনোভাবেই বিদেশি ছিলেন না। গোলাঘাট জেলার জামুগুড়ি চা–বাগান এলাকায় ট্রাকচালক হিসেবে কর্মরত নিজামের নাম এনআরসিতে রয়েছে। তবু তাঁকে নো ম্যানস ল্যান্ডে ফেলে দেওয়া হয়।

নিজামের ছেলে জাহিদ বলেন, একটি ভাইরাল ভিডিও থেকে তিনি তাঁর বাবার আটক হওয়ার খবর জানতে পারেন। ওই ভিডিওতে তাঁর বাবাকে বিজিবির সদস্যদের সঙ্গে দেখা যায়।

জাহিদ বলেন, ‘[আমরা] ভারতীয়। আমার দাদা সেকেন্ড আসাম পুলিশ ব্যাটালিয়নে ছিলেন।’

আল–জাজিরা এ তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত করেছে, নিজামের বাবা সেলিম উদ্দিন আহমেদ ১৯৬০ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত রাজ্য পুলিশের সদস্য ছিলেন।

জাহিদ বলেন, ‘আমার দাদা যদি এখন বেঁচে থাকতেন, এটা তাঁকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিত। একজন পুলিশ কর্মকর্তার ছেলেকে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হলো।’

‘ফিরে এলে গুলি করব’

সম্প্রতি ভারতের বিজেপিশাসিত অন্যান্য রাজ্যেও কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের বিতাড়নের অভিযান ছড়িয়ে পড়েছে।

গুজরাট রাজ্যের প্রধান শহর আহমেদাবাদের পুলিশ জানিয়েছে, তারা ২৫০ জনের বেশি ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছে। এসব ব্যক্তি ‘অবৈধভাবে এখানে বসবাস’ করছেন। তাঁরা ‘বাংলাদেশি অভিবাসী’ বলে পুলিশ দাবি করছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে পুলিশ কর্মকর্তা অজিত রাজিয়ানের বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের বহিষ্কারের প্রক্রিয়া চলছে।

ভারতের সবচেয়ে ধনী রাজ্য মহারাষ্ট্রেও গত মাসে সাতজন মুসলিমকে বিদেশি দাবি করে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর জন্য বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপে ১৫ জুন তাঁদের সীমান্ত থেকে ফিরিয়ে আনা হয় বলে জানান পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য সমীরুল ইসলাম। এ দলটি বিজেপিবিরোধী ইন্ডিয়া জোটের শরিক।

সমীরুল আল–জাজিরাকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ও অন্যান্য রাজ্য কর্তৃপক্ষ মহারাষ্ট্র পুলিশকে জানিয়েছিল, এসব ব্যক্তি পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা, তাঁরা ভারতীয় নাগরিক। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ বা সরকারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না করেই তাঁদের বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।

১৬ জুন কলকাতায় এক সংবাদ সম্মেলনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মহারাষ্ট্র পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শুধু বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণেই তাঁদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আল–জাজিরার সঙ্গে কথা বলা ওই সাত মুসলিমের মধ্যে তিনজন বলেন, তাঁরা যখন মহারাষ্ট্র পুলিশের হেফাজতে ছিলেন, তখন পরিবার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁদের ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণস্বরূপ কাগজপত্র জমা দেয়।

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বাসিন্দা মিরানুল শেখ ও নিজামউদ্দিন শেখকে আরেকটি ভাইরাল ভিডিওতে নো ম্যানস ল্যান্ডে দেখা গেছে।

৩২ বছর বয়সী মিরানুল আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা বারবার বলছিলাম, আমরা মুর্শিদাবাদ থেকে এসেছি। কিন্তু বিএসএফ আমাদের মারধর করেছে। তারা গালাগাল করে বলেছিল, “ফিরে এলে গুলি করব।”’

আল–জাজিরা ১৯ জুন বিএসএফের কাছে এসব অভিযোগ সম্পর্কে মন্তব্য জানাতে ই–মেইল করলেও এই প্রতিবেদন করা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

আসামের ‘মিয়া’ মুসলিমরা

এই ব্যাপক অভিযান চলাকালে আসামের পুলিশ ২৫ মে গোলাঘাট জেলার নোয়াজান গ্রাম থেকে বাংলাভাষী মুসলিম আবদুল হানিফকে তাঁর বাড়ি থেকে আটক করে। কিন্তু তাঁকে আটকের কোনো কারণ জানানো হয়নি।

আল–জাজিরাকে হানিফের বড় ভাই দীন ইসলাম বলেন, পুলিশ বলেছিল, দুই দিনের মধ্যে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে।

পূর্ব আসামে বাংলাভাষী মুসলিমদের জন্য পুলিশি অভিযান নতুন কিছু নয়। রাজ্যের চা-বাগান অঞ্চলে অভিবাসীবিরোধী মনোভাব ব্যাপকভাবে দেখা যায়। তবে পুলিশ যে এটি একটি ‘রুটিন যাচাই-বাছাই অভিযান’ বলে উল্লেখ করেছে, সেটিই হানিফকে খুঁজে বের করতে পরিবারকে মরিয়া করে তোলে।

দীন ইসলাম বলেন, ‘আমরা তার খোঁজে এক থানা থেকে আরেক থানায় ঘুরছি; কিন্তু পুলিশ কিছু বলছে না।’

দীন ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, হানিফকে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল গোলাঘাটের পুলিশ সুপার রাজেন সিংয়ের কার্যালয়ে। সেখানে হানিফসহ আরও কয়েকজনকে আটক রাখা হয়েছিল। পরে তাঁদের সবাইকে বাংলাদেশ সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

হানিফের পরিবার দৃঢ়তার সঙ্গে বলছে, তিনি বিদেশি নন। দীন ইসলাম বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে কোনো ট্রাইব্যুনালে মামলা নেই। শুধু আমরা “মিয়া” বলে সন্দেহ থেকে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’

আসামে মিয়া একটি অপমানসূচক শব্দ, যা আদিবাসী অসমিয়ারা বাংলাভাষী মুসলিমদের ‘বাংলাদেশি’ বোঝাতে ব্যবহার করে।

আল–জাজিরা হানিফের অবস্থান জানতে চাইলে পুলিশ সুপার রাজেন সিং বলেন, এ ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যায় না।

হানিফের সঙ্গে রাজেন সিংয়ের কার্যালয়ে ছিলেন একজন স্থানীয় ব্যক্তি। তিনি বলেন, তাঁদের দলটিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। হানিফকে সম্ভবত বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে।

নিজের পরিচয় গোপন রেখে স্থানীয় ওই ব্যক্তি বলেন, তাঁকেও বাংলাদেশ সীমান্তে নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, মানুষ রাতারাতি গায়েব হয়ে যাচ্ছে। হানিফ হয়তো অনেকের মতো বাংলাদেশে হারিয়ে গেছেন।

আল–জাজিরা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করেছে, গত মাসে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী যাঁদের জোর করে নো ম্যানস ল্যান্ডে ঠেলে পাঠিয়েছে, তাঁদের মধ্যে অন্তত ১০ জনের অবস্থান এখনো অজানা।

নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানের জন্য আসামে অন্তত চারটি পরিবার হাইকোর্টে আবেদন করেছে। তাদের মধ্যে অন্তত দুটি পরিবার ‘দেশি’ মুসলিম সম্প্রদায়ের, যাদের রাজ্য সরকার নিজস্ব আদিবাসী মুসলিম হিসেবে গণ্য করে।

সামসুল আলীর ছেলে বক্কার আলী বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম, আমরা আদিবাসী মুসলিম; তাই নিরাপদ। কিন্তু এখন দেখছি, এখানে কোনো মুসলিমই নিরাপদ নন।’

বক্কার বলেন, তাঁর বাবাকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে। এখন তিনি সে দেশের পুলিশের হেফাজতে আছেন।

বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার জেল সুপার আমিরুল ইসলাম ১৬ জুন আল–জাজিরাকে জানান, আরেকজন ভারতীয় নাগরিক দইজান বিবি বাংলাদেশ পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।

নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মুখপাত্র ফয়সাল মাহমুদ আল–জাজিরাকে বলেন, বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারকে একটি কূটনৈতিক বার্তা পাঠিয়েছে, যাতে বলা হয়েছে, বিএসএফ যে পদ্ধতিতে মানুষকে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দিচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হচ্ছে না।

ভারতীয় বাহিনী মুসলিমদের বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে—এমন অভিযোগ নিয়ে আল–জাজিরা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে মন্তব্য জানতে চাইলেও এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা (২৪ জুন) পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

‘মুসলিমদের বেছে বেছে ঠেলে পাঠানো হয়েছে’

ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর এবং কিংস কলেজ লন্ডনের যৌথ ডক্টরাল ফেলো এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিশ্লেষক অংশুমান চৌধুরী বলেছেন, আসাম সরকার যে কথিত ‘অবৈধ অভিবাসী’দের ঠেলে পাঠানোর (পুশ ব্যাক) দাবি করছে, তা আসলে ‘জোরপূর্বক বহিষ্কার’।

আল–জাজিরাকে অংশুমান চৌধুরী বলেন, ‘পুশ ব্যাক’ অর্থ হচ্ছে—যে অভিবাসীরা আপনার সীমান্তে ঢোকার চেষ্টা করছেন, তাঁদের ঠেলে ফেরত পাঠানো। কিন্তু সরকার যা করছে, তা হলো মানুষকে ধরে তুলে নেওয়া এবং তাদের আরেকটি দেশে ছুড়ে ফেলা।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সরকার যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেটিকে তিনি ন্যায্য বলেই মনে করছেন। কারণ, তিনি ১৯৫০ সালের একটি আইনের কথা উল্লেখ করছেন, যা জেলা কমিশনারদের নির্দিষ্ট কিছু কাগজপত্রহীন অভিবাসীকে বহিষ্কার করার ক্ষমতা দেয়।

কিন্তু আসাম হাইকোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ওলিউল্লাহ লস্কর বলছেন, এই আইন কেবল তাঁদের জন্য, যাঁরা অবৈধভাবে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছেন বা যাঁরা ভিসার মেয়াদ শেষে থেকে যাচ্ছেন।

ওলিউল্লাহ লস্কর আল–জাজিরাকে বলেন, যাঁরা বহু প্রজন্ম ধরে আসামে বসবাস করছেন এবং যাঁদের হাতে রাজ্য সরকার-প্রদত্ত নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই আইন নয়।

সরকারি প্রতিশোধের আশঙ্কায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন আইনজীবী বলেন, এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টে ‘ঘোষিত বিদেশি’ বন্দিদের বিষয়ে শুনানির সময় আসাম সরকার নিজেই বলেছে, যাঁদের বাংলাদেশের ঠিকানা জানা নেই, তাঁদের বহিষ্কার করা সম্ভব নয়।

সরকার এক হলফনামায় বলেছে, বিনীতভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে যে সংশ্লিষ্ট বিদেশি দেশের নাগরিকত্ব যাচাই ও ভ্রমণ অনুমতির (ট্রাভেল পারমিট) ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এই বন্দিদের বহিষ্কার করা যাবে না।

অমুসলিম, বিশেষ করে হিন্দুদের যাঁরা ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে আসামে প্রবেশ করেছেন, তাঁদের মামলাগুলো ট্রাইব্যুনালে না পাঠাতে গত বছর আসাম সরকার পুলিশকে নির্দেশ দেয়। এ তারিখটি ছিল ভারতের বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমা।

২০১৯ সালের এ আইন অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ওই নির্ধারিত তারিখের আগে প্রতিবেশী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে ‘ধর্মীয় নির্যাতনের’ শিকার অমুসলিমদের কেউ ভারতে প্রবেশ করলে তাঁদের জন্য সে দেশের নাগরিকত্ব পাওয়া সহজতর করা হয়েছে। এই আইনের বিরুদ্ধে ভারতজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। কারণ, এটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের লঙ্ঘন বলে অভিযোগ ওঠে। জাতিসংঘ একে ‘মৌলিকভাবে বৈষম্যমূলক’ বলে অভিহিত করেছে।

ক্ষুব্ধ আলী বলেন, ‘আমাদের জাতীয়তা প্রমাণ করতে ২০-৩০টা কাগজ দেখাতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের হিন্দুরা শুধু বললেই হয়, তারা হিন্দু, তাহলেই তারা নাগরিকত্ব পেয়ে যায়।’

বিএসএফ সীমান্তে ধরে নিয়ে যাওয়া ৫০ বছর বয়সী রহিমা বেগম গোলাঘাটে নিজের বাড়ির বাইরে বসে আল–জাজিরাকে বলেন, যে দেশকে তিনি নিজের দেশ মনে করেন এবং যেখানে তাঁর জন্ম, এখন তিনি সেই দেশের কাছে নিজেকে প্রতারিত মনে করেন।

রহিমা বলেন, ‘এই দেশ আমার, কিন্তু আমি এ দেশের নই।’

৪ থেকে ৭ মে ভারত থেকে ১৬৭ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে
৪ থেকে ৭ মে ভারত থেকে ১৬৭ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ছবি: বন বিভাগের সৌজন্যে

Monday, August 25, 2025

'আমি ঢাকা থেকে এসেছি, আমাকে যদি সেখানে পাঠানো হয় আমার খুব একটা সমস্যা হবে না'

বাংলায় কথা বলা কি তার জন্য নিরাপদ? একটি আলোচনাসভায় মজার ছলেই একথা বলে ওঠেন নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন। আলোচনায় উপস্থিত শহরের তরুণ দর্শকদের মনে করিয়ে দেন তিনি মূলত ঢাকার বাসিন্দা। কলকাতায় সল্টলেকের অমর্ত্য সেন গবেষণা কেন্দ্রে যুব ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা বিষয়ক এক   আলোচনা সভায় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আমি ঢাকা থেকে এসেছি এবং আমাকে যদি সেখানে পাঠানো হয় তাহলে আমার খুব একটা সমস্যা হবে না।’

তিনি ভাষাগত কুসংস্কার থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোকপাত করেন। সেন বলেন, ‘আমি সংবাদপত্রে পড়েছিলাম যে বাংলা বলার জন্য একজনকে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল। আমি চিন্তিত ছিলাম।’

অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকরা যখন বাংলা বলার জন্য লোকদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয় নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তখন সেন কটাক্ষ করে বলেন, ‘আমি কি বাংলায় উত্তর দেব?’

তিনি বলেন, ‘বাংলা সভ্যতার নানা গুন আছে যেগুলো আমাদের মর্যাদা দিতে হবে। যেখানে তার উল্টোটা ঘটবে সেখানে বড় ভাবে প্রতিবাদ করতে হবে।’

সেনের কথায়, ‘আমি বলছি না যে, ভারতে বাঙালি সভ্যতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলা ভাষা একাদশ শতাব্দী থেকেই বিদ্যমান।’

বিহার এসআইআর
মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার বিষয়েও সতর্ক করে দেন অমর্ত্য সেন। তিনি বলেন, ‘ভারতের অনেক মানুষের কাছে এমন কোনও নথি নেই যার সাহায্যে তারা ভোটার হওয়ার দাবি করতে পারে। যদি কিছু মানুষের উপকার করার অজুহাতে এমন একটি অনুশীলন বাস্তবায়িত হয় যা আরও অনেকের ক্ষতি করবে এবং মানুষকে বঞ্চিত করবে তাহলে এটি একটি বড় ভুল হবে।’

অর্থনীতিবিদের কথায়, ‘আমি বলছি না যে, পুরাতন তালিকায় কোনও ত্রুটি নেই- ত্রুটি অবশ্যই থাকবে। কিন্তু আমি মনে করি না যে কোনও অনুশীলনকে ন্যায্যতা দেয়ার কোনও কারণ আছে যদি এটি সংশোধন করার নামে আরো সাতটি ত্রুটি সংযুক্ত করে।’

নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গে একই রকম Special Intensive Revision বা SIR প্রয়োগ করবে কিনা তা নিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে জল্পনা চলছে। ইতিমধ্যেই বিহারে বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জুন মাস থেকে এই ভোটার তালিকা সংশোধন চলছে। নথি-ভিত্তিক যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিরোধী ইন্ডিয়া ব্লক সতর্ক করে দিয়েছে যে, এটি কাগজপত্রবিহীন প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে।

হিন্দু-মুসলিম ঐক্য
মুসলিম শাসকরা কেবল হিন্দুদের উপর অত্যাচার করতো এই আখ্যানকে প্রত্যাখ্যান করে সেন বন্ধুত্ব এবং সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতার উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়ে বলেন, মুসলিম শাসকদের অধীনেই রামায়ণ ও মহাভারত সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছিল।'

তিনি আরেকটি উদাহরণ হিসেবে দারা শিকোহের উপনিষদের ফারসি অনুবাদের কথা উল্লেখ করেন এবং সিরাজ-উদ-দৌলাকে লেখা রবার্ট ক্লাইভের একটি চিঠির কথা উল্লেখ করেন। ওই চিঠিতে ক্লাইভ সিরাজের নয়জন বন্ধুর নাম উল্লেখ করেছিলেন তাদের মধ্যে সাতজন ছিলেন হিন্দু।

সূত্র : দ্য টেলিগ্রাফ

mzamin

Monday, July 21, 2025

বাংলাদেশে ‘পুশ ইনে’ বিপদে ভারতীয়রাই by সালেহ উদ্দিন আহমদ

ভারতে সবচেয়ে ‘বিখ্যাত’ বাংলাদেশি এখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়া ৫ আগস্টের পর অনেক আওয়ামী লীগপন্থী রাজনীতিবিদ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। বাংলাদেশে ভারতের যত ‘পুশ ব্যাক’ হচ্ছে, স্বভাবতই এসব বাংলাদেশিদের তার বাইরে রাখা হয়েছে। 

২.
নিয়তির কী পরিহাস! ভারতে আসল বাংলাদেশিদের ‘মেহমান’ বানিয়ে, ‘পুশ ব্যাকের’ জন্য ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে হাজার হাজার ভারতীয় নাগরিককে ‘বাংলাদেশি’ বলে হেনস্তা করা হচ্ছে। এঁদের মধ্যে রয়েছেন বাংলা ভাষাভাষী অনেক হিন্দু ও মুসলমান। এই সব দরিদ্র লোকগুলোকে ভারত সরকার ব্যবহার করছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘বাংলাদেশকে শায়েস্তা করার’ রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য।

বিজিপিশাসিত রাজ্যগুলোও এই পুশ ব্যাককে ব্যবহার করছে নিজ নিজ রাজ্যে অবাঙালি ভোটারদের মন জয় করে বিজেপির ভোট বাড়াতে।

১৭ জুলাই ‘বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে বাঙালিদের ওপর অত্যাচার’-এর প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস কলকাতায় এক মিছিল বের করে। কলকাতার বাংলা পত্রিকা আনন্দবাজার জানায়, মিছিল শেষে মমতার প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার বক্তৃতায় সিংহভাগজুড়েই ছিল বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে বাঙালিদের হেনস্তার অভিযোগ।

প্রতিবাদ সভায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বিজেপিশাসিত রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার এবং বাংলাদেশি তকমা দিয়ে আটক করা গণতন্ত্রের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ।

ভারতীয় সংবাদপত্রগুলোতে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই সব বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া অসহায় ভারতীয় নাগরিকদের হৃদয়বিদারক কাহিনিগুলো ক্রমান্বয়ে প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু ভারত সরকার নির্বিকার। মোদি সরকার এই বিষয়গুলো নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য না করলেও তাদের কর্মকাণ্ড সাক্ষ্য দেয় তাদের মূল উদ্দেশ্য কী।

৩.
আসাম থেকে বিবিসির একটা প্রতিবেদন, প্রকাশ পায় জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে।
ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্য আসামের বারপেটা জেলার বাসিন্দা ৫৮ বছর বয়সী সোনা বানু। তিনি বলেন যে ২৫ মে তাঁকে স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে ডেকে পাঠানো হয় এবং পরে তাঁকে বাংলাদেশ সীমান্তের এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁকে এবং আরও প্রায় ১৩ জনকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, কেন যে তাঁকে অন্য দেশে পাঠানো হলো, তা তাঁকে বলা হয়নি; এই পরিস্থিতিতে তিনি খুব ভয় পেয়েছিলেন। সোনা বানু বলেন, তিনি সারা জীবন আসামে বসবাস করেছেন, তিনি একজন ভারতীয় নাগরিক এবং বাংলাদেশ থেকে আসা ‘অবৈধ অভিবাসী’ নন।

‘তারা আমাকে বন্দুকের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমি মশা এবং জোঁকে ভরা হাঁটু পর্যন্ত জলের মধ্যে দুই দিন খাবার বা জল ছাড়াই কাটিয়েছি’, সোনা বানু চোখের জল মুছতে মুছতে বিবিসির প্রতিবেদককে বলেন। দুই দিন সীমান্তবর্তী এলাকায় রাখার পর, তাঁকে বাংলাদেশের পাশের একটি পুরোনো কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

সেখানে দুই দিন থাকার পর, বাংলাদেশি কর্মকর্তারা তাঁকে এবং আরও কয়েকজনকে সীমান্তের ওপারে ভারতীয় কর্মকর্তাদের কাছে নিয়ে যান। ভারতীয় কর্মকর্তারা শেষমেশ তাঁদের ভারতে তাঁদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। এই সব কথা মনে পড়লে এখনো সোনা বানুর বুক কেঁপে ওঠে।

সোনা বানুকে কেন হঠাৎ করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল এবং তারপর ফিরিয়ে আনা হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। তবে তাঁর ঘটনাটি সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি, যেখানে আসামের কর্মকর্তারা অতীতে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ সন্দেহে তথাকথিত ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ‘বিদেশি ঘোষিত’ ব্যক্তিদের আটক করে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দিয়েছেন। বিবিসি কমপক্ষে ছয়টি ঘটনা খুঁজে পেয়েছে, যেখানে লোকেরা বলেছে যে তাদের পরিবারের সদস্যদের তুলে নেওয়া হয়েছে, সীমান্তবর্তী শহরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশে ‘পুশ’ করা হয়েছে।

ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী, আসাম পুলিশ এবং রাজ্য সরকারের কর্মকর্তারা বিবিসির প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি।

৪.
ভারতীয় ‘পুশ ব্যাক’ নিয়ে আল–জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে আসে ভারত কীভাবে নিজ দেশের দরিদ্র নাগরিকদের ‘পুশ ব্যাকে’ ব্যবহার করছে।

৩১ মে, ৬৭ বছর বয়সী এই সাইকেল মেকানিক ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্য আসামে তাঁর বাড়িতে ফিরে আসেন, চার দিন ধরে বাংলাদেশে আটকে থাকার পর।

আলীর সপ্তাহব্যাপী হেনস্তা শুরু হয় ২৩ মে, যখন পুলিশ তাঁকে আসামের মরিগাঁও জেলার একটি ছোট গ্রাম কুয়াডালের তাঁর ভাড়া বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। সরকারি অভিযানটি ছিল ‘ঘোষিত বিদেশি নাগরিকদের’ বিরুদ্ধে। ২৩ মে পুলিশ আলীকে তুলে নেওয়ার পর তাঁকে আসামের গোয়ালপাড়া জেলার মাটিয়াতে ১২৪ মাইল দূরে অবস্থিত একটি আটক কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।

তিন দিন পর ২৭ মে ভোরের দিকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সৈন্যরা তাঁকে এবং পাঁচজন মহিলাসহ আরও ১৩ জনকে একটি ভ্যানে করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়ে যায়। তাদের বলা হয় তারা যদি ফিরে আসতে চেষ্টা করে, তাদের গুলি করা হবে। একজন ভারতীয় সাংবাদিক বলেছেন, বিএসএফ তাদের ভয় দেখতে চারটি রাবার বুলেটের গুলি ছুড়েছে।

বাংলাদেশি গ্রামবাসীর ক্রুদ্ধ প্রতিবাদের পর বাংলাদেশের বিজিবি সৈন্যরা আলীকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের একটি সীমান্ত পয়েন্টে ফেলে দেয়, যেখান থেকে তিনি ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ১০ ঘণ্টার যাত্রা করে বাড়ি ফিরে আসেন।

আসামভিত্তিক দ্য সেন্টিনেল সংবাদপত্রের ৩১ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে এই ঘটনায় বিএসএফ বিজিবি থেকে ৬৫ জন ভারতীয় নাগরিককে পেয়েছে।

‘বাংলাদেশি’ পরিচয় দিয়ে উচ্ছেদের ঘটনায় আসামে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে বরাক উপত্যকার বাঙালি–অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সাম্প্রতিক এক মন্তব্যে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। তিনি বলেছেন, আগামী আদমশুমারিতে কেউ মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা উল্লেখ করলে তাঁকে ‘বিদেশি’ বলে চিহ্নিত করা হবে।

‘বাংলাদেশি তাড়ানোর’ এই সব ঘটনা এখন বিজেপিশাসিত অন্য রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। দিল্লি, বিহার ও মহারাষ্ট্রের অনেকগুলো ঘটনা সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।

৫.
ভারতের এক রাজ্যের যাযাবর শ্রমিকেরা অন্য রাজ্যে দল বেঁধে গিয়ে কাজ করেন, এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু আজকাল বাংলা ভাষাভাষী শ্রমিকদের জন্য এটা কঠিন হয়ে উঠেছে। কারণ, ভারতের অনেক রাজ্যেই ‘বাংলা বললেই বাংলাদেশি’ নীতি প্রয়োগ করে তাঁদের হেনস্তা করা হচ্ছে এবং অনেককে বাংলাদেশে জোর করে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এমনি একটা ঘটনা উঠে এসেছে সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টে, পশ্চিমবঙ্গের যাযাবর শ্রমিকদের এক মামলায়। কাজের সূত্রে দিল্লিতে গিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকেরা। সেখানে শুধু বাংলায় কথা বলার ‘অপরাধে’ তাঁদের আটক করা হয়েছে। সন্দেহ করা হয়েছে, তাঁরা বাংলাদেশি। অভিযোগ, বেআইনিভাবে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় তাঁদের আটকে রাখা হয়েছিল। পরিচয়টুকুও যাচাই করা হয়নি।

বীরভূমের পাইকরের এই ছয়জন যাযাবর শ্রমিককে বাংলাদেশি সন্দেহে দিল্লিতে আটক করা হয়েছিল এবং তারপর তাঁদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে আদালতে জানান মামলাকারীর আইনজীবী।

থানা থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশি সন্দেহে যাঁদের আটক করা হয়েছিল, তাঁদের বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের ‘পুশ’ করিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।

কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার এক খবরে জানা যায়, কলকাতা হাইকোর্ট কেন্দ্রের এই ‘বাংলাদেশি শনাক্তকরণ’ কার্যক্রম নিয়ে একগাদা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন কেন্দ্রকে ‘হঠাৎ করে কেন দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাদেশি শনাক্ত করার কাজ শুরু হলো? এর পেছনে কারণ কী? সব রাজ্যের জন্য কেন জুন মাস বেছে নেওয়া হলো?

পূর্বপরিকল্পিতভাবেই কি এটা করা হচ্ছে? অভিযোগ উঠছে, বাংলায় কথা বলার জন্য আটক করা হচ্ছে, এটা কি সত্য।’

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিজেপি দলের সংসদ নেতা শুভেন্দু অধিকারী এখন রোহিঙ্গাদের নিয়ে এক নতুন জুজু তুলেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গেও অনুপ্রবেশ করছে রোহিঙ্গারা। তাঁর অদ্ভুত দাবি, অবিলম্বে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চাই।

৬.
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর, কিছু বছর ধরে ভারত, পাকিস্তান এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ‘মাইগ্রেশন’ বা স্থানান্তর একটা অতি সাধারণ ব্যাপার ছিল। কারও জন্য এটা ছিল পারিবারিক প্রয়োজন, কারও জন্য ছিল ঐচ্ছিক সিদ্ধান্ত। সব সরকার এটাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছিল। তখনকার দিনে কোনো সরকারই এসবের তেমন কোনো কাগজপত্র বা নথি সংরক্ষণ করেনি।

ভারতে বিজেপি সরকার পরবর্তীকালে বিভিন্ন আইন জারি করে বেছে বেছে বিভিন্ন গোষ্ঠীর লোকজনকে কাগজপত্র দেখানোর জন্য হয়রানি করছে। এই হয়রানি কখনো ভাষাভিত্তিক, কখনোবা ধর্মভিত্তিক আবার কখনো এলোপাতাড়িভাবে, বিশেষত, অন্য রাজ্যে আসা বাংলা কথা বলা শ্রমিকদের ওপর। এই সব হয়রানির একটা চরম পদক্ষেপ হলো বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’।

এর সঙ্গে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা রিফিউজিদের তুলনা করলে দেখা যাবে এক ভিন্ন চিত্র। এদের বলা হতো ‘বিহারি রিফিউজি’। ঢাকার মোহাম্মদপুর, খুলনার খালিশপুর, চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, রংপুরের সৈয়দপুর এই সব এলাকায় বিহারিরা আশ্রয় গড়ে তোলে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেক দিন বিহারিরা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিতে অস্বীকার করেছে। তখন বাংলাদেশ সরকার যৌক্তিকভাবে এদের ভারতে ‘পুশ ব্যাক’ করতে পারত, কারণ এরা এসেছিল ভারত থেকে। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো সরকারই সেই অমানবিক পথটা বেছে নেয়নি।

৭.
বাংলাদেশিরা জীবিকার জন্য ভারতে যায়, এটা একটা প্রচারণা বা অযৌক্তিক কথা। এটা সত্য, অনেক বাংলাদেশি ঝুঁকি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, কানাডা ও আমেরিকায় যায় ভালো জীবন ও জীবিকার সন্ধানে। কিন্তু ভারতকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা অযৌক্তিক।

আইএমএফের ২০২৫ সালের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ভারতীয়দের মাথাপিছু গড় আয় ২৯৩৭ ইউএস ডলার।  আর বাংলাদেশিদের মাথাপিছু গড় আয় ২৭৭৪ ইউএস ডলার, খুবই কাছাকাছি। ভারতে পেশাজীবীদের চাকরিবাজার বাংলাদেশ থেকেও অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক। আর শ্রমজীবীরা অবশ্যই ভারতের কোনো শহরে কাজ করে বাংলাদেশ থেকেও বেশি পারিশ্রমিক পাবেন না; ভারতের যেসব শহরে পারিশ্রমিক কিছুটা বেশি যেমন মুম্বাই, দিল্লি সেসব জায়গায় থাকা-খাবার খরচও আকাশচুম্বী।
সুতরাং এটা কোনো যুক্তিতেই টিকবে না যে বাংলাদেশিরা ভারতে অবৈধভাবে কাজ করতে যাবে।

ভারত সরকারকে এই ‘পুশ ব্যাক’ ব্যাপারটা বন্ধ করতে হবে। এতে কত কত দরিদ্র ভারতীয় নাগরিক যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং নিজেদের দেশের নেতৃবৃন্দের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠছে, তা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমগুলোর রিপোর্টেই তুলে ধরা হয়েছে।

একজন মানুষ শুধু ভোটের ঘুঁটি নন, তিনি দেশের একজন নাগরিক এবং একটা পরিবার। দুই দেশের বা দেশের নেতাদের মাঝে যদি কোনো সমস্যা থাকে, সেটা আলাপ–আলোচনা করে মেটানো যায়, কিন্তু নিজ দেশের কিছু নাগরিকের জীবন ধ্বংস করে সমস্যার সমাধান খোঁজা খুব অমানবিক।

* সালেহ উদ্দিন আহমদ, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- ই-মেইল: salehpublic711@gmail.com

Thursday, June 12, 2025

‘পুশ ইন’ কি দিল্লির বৈরী নীতির অংশ নয় by খাজা মাঈন উদ্দিন

ইতিহাস যা-ই বলুক, একটি জনগোষ্ঠীকে তাদের ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে তাদেরই ভূখণ্ড থেকে তুলে নিয়ে অন্য দেশে চালান করে দিচ্ছে আজকের ভারত।

অন্যদিকে যে বাংলাদেশ প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে উচ্ছেদ হওয়া দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠীকেও আশ্রয় দিয়েছে, তার ভূখণ্ডেই ঠেলে (পুশ ইন) দেওয়া হচ্ছে আরেক সীমান্ত-সংলগ্ন দেশের নাগরিক মুসলমান নর-নারীকে।

এভাবে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মুসলমানদের পণ বানানোর পাশাপাশি নিজ দেশের ইস্যুকে আন্তসীমান্ত দ্বন্দ্বে পরিণত করা হচ্ছে। মুসলমান ভোটার-সমৃদ্ধ পশ্চিম বাংলা ও আসামে নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতের কেন্দ্রীয় হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের এমন পদক্ষেপ সে দেশের ভেতরকার গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও বিবেকবান মানুষের কাছেও কি প্রশংসিত হচ্ছে?

এ পর্বে কিছু মুসলমান ভারতীয়র গলা ধাক্কা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর এ কাজটি দিল্লি করছে জুলাই ২০২৪ বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে। ঢাকার প্রতি বৈরী নীতির অংশ হিসেবেই যে এই উদ্যোগ, সেটা বাংলাদেশের মানুষের না বোঝার কিছু নেই।

প্রথমে বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর ভিসা-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপ এবং একপর্যায়ে বাংলাদেশের জন্য ভারত দিয়ে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করা হলো।

গণতন্ত্র হত্যাকারী শাসক হাসিনার বিরুদ্ধে একটি সফল ছাত্র-জনতার বিপ্লবকে সন্ত্রাসী বা জঙ্গি তৎপরতা আখ্যা দিয়ে ভারতীয় ‘গদি মিডিয়া’ ব্যাপক গুজব ও কুৎসা রটনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এর আগে বাংলাদেশের গণমানুষের বিক্ষোভের মুখে পিছু হটা হাসিনাকে দিল্লিতেই আশ্রয় দেওয়া হলো বাংলাদেশিদের আবেগের প্রতি স্পর্শকাতরতা না দেখিয়েই।

এ-জাতীয় পরিস্থিতিতে যৌথ নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা, চোরাচালানের মতো দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলো কি তাহলে বাংলাদেশের দৃষ্টির আড়ালেই রাখা যাবে?

দিল্লিওয়ালাদের এহেন মনোভাব এবং কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য ভারত ও বাংলাদেশের বাইরে পররাষ্ট্রনীতির পণ্ডিত, এমনকি কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন বৈশ্বিক নাগরিকেরা বোঝেন না, এমন তো নয়!

ভারত এখন বলতে চায় ‘পুশ ইন’ করানো ব্যক্তিরা তার দেশে অনুপ্রবেশকারী এবং অনেকে অনেক দিন ভারতে বসবাস করলেও তারা সেখানকার বৈধ নাগরিক নয়।
নিজের নাগরিকদের রাষ্ট্রহীন করার বিষয়ে বিদেশি গণমাধ্যম, যেমন বিবিসি ভিকটিমের নাম ধরে রিপোর্ট করেছে, নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশের দিকে ‘পুশ ইন’ করা মুসলমানেরা ভারতের নাগরিক।

তাদের কেউ যদি সত্যি বেড়াতে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিক হয়ে থাকে, তাহলে প্রমাণ সাপেক্ষে নিয়ম অনুযায়ী সসম্মানে তাদের ফেরত পাঠানো যেত। তাই বলে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশ তার নাগরিক মানবে, সে রকম কোনো বাধ্যবাধকতা নেই ঢাকার। নরেন্দ্র মোদির বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প কি ‘অবৈধ’ ভারতীয়দের আমেরিকায় স্বাগত জানাচ্ছেন?

নিজের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির দাবার চাল দিতে ব্যবহার করে রাষ্ট্র এবং সভ্যতা হিসেবে ভারত নিজের ভয়াবহ দৈন্য প্রকাশ করছে এবং এটা তার নেতৃবৃন্দ ও নীতি পরিচালনাকারীরা করছেন সচেতনভাবেই।

বাংলাদেশকে অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলায় ফেলে কতটা ঠিক আচরণ করছে, সেই আত্মসমালোচনা ‘দূর কি বাত’, দিল্লি সেই আত্মোপলব্ধির ধারকাছে আছে বলে মনে হচ্ছে না। বরং বাংলাদেশ নিয়ে তার পদক্ষেপ, যেমন প্রফেসর ইউনূস সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পারতপক্ষে যোগাযোগ না রাখার দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকাশ পাচ্ছে ক্রোধ, যে ক্রোধের উৎস ঢাকায় তার অনুগত শাসকের পতন।

ভারত বাংলাদেশের জনগণকে নিয়ে ক্রুদ্ধ হবে তার যথাযথ কোনো কারণ দেখা যাচ্ছে না, এর উল্টোটা ছাড়া। দিল্লির গোপন ও প্রকাশ্য মদদে হাসিনা এ দেশের মানুষকে দেড় যুগ গণতন্ত্র ও মানবিক অধিকারবঞ্চিত রেখেছে, এক ফ্যাসিবাদী শাসককে মহান প্রমাণ করতে সচেষ্ট থেকেছে।

ভুলে গেলে চলে না ২০২৪-এর ডামি নির্বাচনের পর পরই সংক্ষুব্ধ বাংলাদেশিরা দেশে-বিদেশে ভারতীয় পণ্য বর্জন শুরু করেছিল, হাসিনা খেদাও আন্দোলনের আগেই। সে অবস্থায় বাংলাদেশের জনগণের ওপর নতুন দিল্লির রাগ-ক্ষোভ পরাজিত পক্ষের ক্রোধের সঙ্গে তুলনীয়। যদিও দিল্লির ক্রোধ বেশি থাকার কথা সীমান্ত সংঘাতে জড়ানো পারমাণবিক শক্তি পাকিস্তান এবং অধিক শক্তিধর প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের ওপর।

শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রতি নমনীয়তা আর পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন প্রতিবেশীর সামনে এসে অগ্নিমূর্তি ধারণ করাটা চাণক্য কৌটিল্যের ‘মাৎস্যন্যায়’ নীতিরই আধুনিক রূপ, যে নীতিতে বড় মাছ ছোট মাছকে খেয়ে ফেলে।

দিল্লির শাসকেরা ওই পুরোনো নীতিতেই বুঁদ হয়ে আছেন, যখন বাংলাদেশের মানুষের প্রতি শান্তি ও সৌহার্দ্যের হাত বাড়ালে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে অচলাবস্থার বরফ গলা শুরু হতে পারত।

জাপান, জার্মানি এবং দক্ষিণ আফ্রিকা একসময় তাদের পূর্বের শাসকদের অন্যায় কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা চেয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষের কাছে; তাতে তাদের ক্ষতি হয়নি।

বাংলাদেশে বিগত দেড় দশকে হাসিনার কর্মকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গাওয়ার মতো কোনো নৈতিক যুক্তি নেই দিল্লির। অস্বীকার করা যাবে না, গুমের বাংলাদেশি ভিকটিম আবিষ্কৃত হয়েছে ভারতে। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর রিপোর্টে উঠে এসেছে হাসিনা শাসনকালের গুম, খুন, অত্যাচারের কাহিনি। সারা বিশ্ব দেখেছে কেমন হয়েছে তখনকার বাংলাদেশের তিন তিনটি জাতীয় নির্বাচন।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির বইয়ে এবং ২০১৪-এর নির্বাচনের আগে পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিংয়ের ঢাকা সফরকালে হাসিনার অনুকূলে বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচনে দিল্লির নগ্ন হস্তক্ষেপ এখানকার রাজনৈতিক শক্তি ও সচেতন মানুষকে ভীষণভাবে আহত আর অপমানিত করে।

সেই অত্যাচারী হাসিনা রাজত্বের যখন অবসান হলো, সভ্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিক্রিয়া ছিল এক রকম, ভারতের ভিন্ন। অতঃপর ইউনূস সরকারের প্রতি দিল্লি ও ভারতীয় মিডিয়ার আচরণ হয়ে পড়ে অনেকটাই খড়্গহস্ত অথচ বাকি পৃথিবী প্রফেসর ইউনূসের প্রতি প্রবলভাবে শ্রদ্ধাশীল।

আবার হাসিনা আমলে, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের মধুচন্দ্রিমার কালেও, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার সীমান্তে হোক বা জাতিসংঘে ভোটাভুটিতে হোক, বাংলাদেশকে সমর্থন করেনি ভারত।

তাহলে কেউ তো ধরে নিতেই পারে ভারত বাংলাদেশকে প্রতিবেশী হিসেবে বন্ধু রাষ্ট্র জ্ঞান করে না, যদি না সে ‘করদ রাজ্য’ হয়। এবং কৌটিল্যেরই ফর্মুলায়, যদি ‘আমার শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ হয়, ভারতের ‘জানি দোস্ত’ ইসরায়েলের শত্রু ইরানের স্ট্যাটাস কী দাঁড়ায় বা ভারত বন্ধু রাশিয়ার শত্রু আমেরিকার? অথবা চিরশত্রু পাকিস্তানের বন্ধু তুরস্ক বা চীনের বন্ধু যখন বাংলাদেশ?

ভারতের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় ‘মানব পাচারের’ মতো কূটচালের সাফল্য ও নেতিবাচক প্রভাব দুই-ই ভালো করে জানেন সে দেশের কূটনীতিক ও কৌশলগত বিশেষজ্ঞরা। যেমন কিঞ্চিৎ জানেন অন্য বন্ধুপ্রতিম দেশের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও, যাদের কাছে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেমন তা অজানা নয়।

বাংলাদেশের দিকে তার মুসলমান নাগরিকদের সংকীর্ণ কারণে ঠেলে পাঠিয়ে ভারত বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে শুধু সংখ্যালঘুর প্রতি জুলুমই প্রমাণ করছে না, যাকে এত দিন ধরে বলত ১৯৪৭-এর দেশভাগ, সেই মুসলমান জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি পাকিস্তান এবং এখনকার বাংলাদেশ গঠনের যথার্থতাকেই নিশ্চিত করে।

যে মুহূর্তে বাংলাদেশ সুষ্ঠু নির্বাচন, গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, হত্যাকাণ্ড, গুম, জেল, জুলুম, দুর্নীতি, অর্থ পাচারসহ বড় বড় অপরাধের বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে, এবং দেশকে বিশ্ব সমাজে একটি মর্যাদাশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট, তখন ভারত গঠনমূলক যোগাযোগ ও সংলাপ থেকে দূরে সরে আছে।

হাসিনা আমলে সই করা কিছু অসম এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধী গোপন যুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে জনমতের চাপ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও ঢাকা এখন পর্যন্ত চুক্তিগুলো ঢেকেই রেখেছে, সম্ভবত সম্পর্কের অবনতি ঠেকাতে।

কূটনীতি পারস্পরিক সৌজন্যের দাবি রাখে, যা বোধ হয় শুধুই গোপন ব্যাপার বা পেঁচিয়ে অর্ধেক কথা বলার বিষয় নয়; আগামী দিনে দিল্লি ঢাকার সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক গড়তে ও রাখতে চায়, তার ধারণা বাংলাদেশের জনগণকে সরাসরি দিয়ে দিলেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন যুগ শুরু হতে পারে।

* খাজা মাঈন উদ্দিন সাংবাদিক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

কু‌ড়িগ্রা‌মের রৌমারীতে সীমান্ত দিয়ে ১৪ ব্যক্তি‌কে পুশ-ইন করাতে চেয়েছিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। এ সময় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বি‌জি‌বি) বাধা দেয়। ১৭ মে, বড়াইবা‌ড়ি সীমান্ত
কু‌ড়িগ্রা‌মের রৌমারীতে সীমান্ত দিয়ে ১৪ ব্যক্তি‌কে পুশ-ইন করাতে চেয়েছিল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। এ সময় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বি‌জি‌বি) বাধা দেয়। ১৭ মে, বড়াইবা‌ড়ি সীমান্ত। ছবি: সংগৃহীত

Friday, June 6, 2025

‘আমাকে বন্দুকের মুখে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয়েছিল’ by অরুনোদয় মুখার্জি

সোনা বানু এখনও আতঙ্কে কেঁপে ওঠেন যখন গত কয়েক দিনের ঘটনা মনে পড়ে। ৫৮ বছর বয়সী এই নারী ভারতের উত্তর-পূর্ব আসামের বরপেটা জেলার বাসিন্দা। তিনি জানান, গত ২৫ মে তাকে স্থানীয় থানায় ডেকে পাঠানো হয় এবং পরে বাংলাদেশ সীমান্তের এক পয়েন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে ও আরও প্রায় ১৩ জনকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি জানান, কেন তাকে পাঠানো হলো, তা জানানো হয়নি। তবে এটি এমন এক পরিস্থিতি ছিল যা তিনি দীর্ঘদিন ধরে আশঙ্কা করছিলেন। সোনা বানুর দাবি, তিনি সারা জীবন আসামেই থেকেছেন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন যে, তিনি ভারতীয় নাগরিক, কোনো অবৈধ বাংলাদেশি নন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সোনা বানু বলেন, তারা বন্দুক ঠেকিয়ে আমাকে ঠেলে দেয়। আমি দুই দিন খাবার ও পানি ছাড়াই এক ফাঁকা মাঠে হাঁটু সমান পানিতে ছিলাম। সেখানে মশা ও জোঁকে ভরা ছিল।

সেই দুই দিন তিনি ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ‘নো-ম্যানস ল্যান্ড’-এ কাটান। তারপর তাকে বাংলাদেশের এক পুরনো কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানান তিনি। সেখানেও দুই দিন থাকার পর, বাংলাদেশি কর্মকর্তারা তাদের সীমান্ত পার করিয়ে ফের ভারতের হাতে তুলে দেন। কেন তাকে প্রথমে বাংলাদেশে পাঠানো হলো এবং পরে ফিরিয়ে আনা হলো, সেটি এখনও পরিষ্কার নয়। তবে তার ঘটনা আসামে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার মধ্যে একটি, যেখানে ‘বিদেশি ট্রাইবুনাল’ কর্তৃক ‘বিদেশি’ ঘোষিত ব্যক্তিদের সীমান্তে নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

বিবিসি অন্তত ছয়টি এমন ঘটনার কথা জানতে পেরেছে, যেখানে মানুষ অভিযোগ করেছেন তাদের স্বজনদের এইভাবে সীমান্ত পার করিয়ে দেয়া হয়েছে। ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ), আসাম পুলিশ ও রাজ্য সরকার বিবিসির প্রশ্নের উত্তর দেয়নি।

ভারতে ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী’ দমন নতুন নয়। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ৪,০৯৬ কিমি দীর্ঘ এবং অনেক জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে অরক্ষিত। তবে আইনজীবীরা বলছেন, কাউকে হঠাৎ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে তাদের অন্য দেশে পাঠিয়ে দেওয়া- এটা এখনো বিরল ঘটনা। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে এমন ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে। বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের মতে, মে মাসে ভারত থেকে অন্তত ১,২০০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১০০ জনকে বাংলাদেশ ভারতীয় নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করে ফেরত পাঠিয়েছে।

বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী জানিয়েছে, তারা এমন অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে। আসামে এই ইস্যু অনেক বেশি সংবেদনশীল, কারণ এখানকার রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্ব ও জাতিগত পরিচয়ের বিষয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে।

আসামের জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি)-র তালিকায় ২০১৯ সালে প্রায় ২০ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়ে। এদের অনেককে বন্দী শিবিরে রাখা হয়, বাকিরা উচ্চ আদালতে আবেদন করেন। সোনা বানু জানান, তার মামলা এখনো সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন, তবুও তাকে জোর করে দেশছাড়া করা হয়েছে। এমনই এক ভুক্তভোগী ৬৭ বছর বয়সী মালেকা খাতুন, যিনি এখনো বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, এখানে আমার কেউ নেই।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব শর্মা সম্প্রতি বলেছেন, যাদের ‘বিদেশি’ ঘোষণা করা হয়েছে এবং যারা কোনো আদালতে আপিল করেনি, তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তবে আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, এসব ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার ‘ইচ্ছাকৃত অপব্যাখ্যা’ করা হয়েছে। এমনই এক পরিবারের সদস্য সঞ্জিমা বেগম জানান, তার পিতাকে ভুল পরিচয়ের কারণে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করা হয়। তার পিতার নাম আব্দুল লতিফ, দাদার নাম আব্দুল সুবহান। কিন্তু নোটিশে লেখা ছিল, “আবদুল লতিফ, পিতা শুকুর আলী”, যাকে তারা চেনেন না।

আরেক ভুক্তভোগী খায়রুল ইসলাম, যিনি একটি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। তাকেও একই সময়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তার স্ত্রী রিতা খাতুন বলেন, প্রতিটি কাগজে প্রমাণ আছে যে আমার স্বামী ভারতীয়। তবু সেটি যথেষ্ট ছিল না। বর্তমানে যারা ফিরে এসেছেন, তারাও আতঙ্কে আছেন- আবার কখন তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ‘আমরা খেলনা নই’-  বলেন সঞ্জিমা বেগম। ‘এরা মানুষ, এভাবে ইচ্ছামতো ছুঁড়ে ফেলা যায় না।’
(বিবিসি থেকে অনুবাদ) 

mzamin

Tuesday, May 27, 2025

ভারতীয় মিডিয়ায় সীমান্তের গোলাগুলিতে নিহত ব্যক্তিকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে খবর প্রচার

ভারত-পাকিস্তান মধ্যকার সীমান্ত উত্তেজনার সময় গোলাগুলিতে প্রাণ হারানো ব্যক্তিকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে খবর প্রচার করেছে ভারতীয় মিডিয়া। যা নিয়ে বেশ চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। নিহত ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ ইকবাল। যিনি ৭ মে প্রতিবেশী দুই দেশের সীমান্তে গোলাগুলিতে নিহত হয়েছেন। তবে তার মৃত্যুকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেছে ভারতীয় মিডিয়া। পড়নে দাড়ি-টুপি থাকায় তাকে সন্ত্রাসী হিসেবে প্রচার করা হয়েছে বলে দাবি মোহাম্মদ ইকবালের ভাই ফারুক আহমেদের। তিনি বলেছেন, তার ভাই ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বাসিন্দা। ক্ষোভের সঙ্গে বিবিসিকে এ বিষয়টি জানিয়েছেন ফারুক। বলেছেন, দুই দশকের বেশি সময় ধরে জিয়া উল উলুম মাদরাসায় শিক্ষকতা করেছেন মোহাম্মদ ইকবাল। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরই কিছু সংবাদমাধ্যম ইকবালের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে তাকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে খবর প্রচার করেছে। ফারুক বলেন, আমার ভাই একজন শিক্ষক ছিলেন। তবে তার দাঁড়ি, টুপি দেখে তাকে সন্ত্রাসী আখ্যা দেয়া হয়েছে। প্রথমত ইকবালকে হারিয়ে আমাদের পরিবার শোকাহত। এরপর আবার গণমাধ্যমগুলোর মিথ্যা অভিযোগ। এ যেন কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় সীমান্তে গোলাগুলিতে ইকবালসহ ১৬ জন ভারতীয় নিহত হয়েছেন। এছাড়া ৪০ বেসামরিক নাগরিক নিহতের দাবি করেছে পাকিস্তান।

পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে কয়েক দশক ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ বিরাজ করছে। ১৯৪৭ সালে বৃটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর কাশ্মীর নিয়েই তিনটি যুদ্ধ করেছে এ দুই দেশ। ভারত-পাকিস্তান সামরিক দ্বন্দ্ব যখন তীব্র হয় তখন আরেক যুদ্ধ শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে এক পক্ষ অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ করতে থাকে। এছাড়া ভারতীয় গণমাধ্যমেও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হয়। ইকবালকে সন্ত্রাসী আখ্যা দেয়ার মতো আরও কয়েকটি বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যম গুলোতে। এর মধ্যে একটি হলো, ভারত পাকিস্তানের করাচি বিমান বন্দর ধ্বংস করে দিয়েছে। এছাড়া এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) দিয়ে একটি ভিডিও তৈরি করা হয়। যেখানে পাকিস্তান আমির্র এক জেনারেলকে বলতে শোনা যায়, ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে তার দেশ দুটি বিমান হারিয়েছে। ওই ভিডিও এতই নিখুঁতভাবে বানানো যে, এর সত্যতা নির্ণয় করা কঠিন।

এদিকে স্বাধীন সংবাদ প্ল্যাটফর্ম নিউজলন্ড্রির ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মনীষা পাণ্ডে বলেন, মিডিয়া যে পরিমাণ ভুল তথ্য প্রচার করেছে তা মর্মান্তিক। এ বিষয়ে ইকবালের ভাই ফারুক বলেন, আমি জানিনা সংবাদমাধ্যমগুলো আমার ভাইয়ের বিষয়ে এসব তথ্য কোথা থেকে পেয়েছে। তিনি প্রশ্ন করেন, তারা কার সঙ্গে কথা বলেছে? তাদের কাছে কী প্রমাণ আছে যে, আমার ভাই সন্ত্রাসী? ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও পরিবারটিকে এখনও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রতিদিনের মতো আমার ভাই ৭মে সকালে মাদ্রাসার উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হন। তবে ফিরে আসেন লাশ হয়ে। দুপুর নাগাদ আমরা তাকে দাফন করি। কয়েক ঘণ্টা পরই এক আত্মীয় হোয়াটসঅ্যাপে আমাদেরকে একটি ভিডিও ফরওয়ার্ড করেন। যেখানে একটি পরিচিত সংবাদমাধ্যমে ইকবালকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে খবর প্রচার করা হয়। এতে আমরা হতবাক হয়ে পড়ি। এরপর আমাদের কাছে একের পর এক ফোনকল আসতে থাকে। জি নিউজ, এবিপি আনন্দ ও নিউজ এইটটিনের মতো পরিচিত সংবাদমাধ্যম গুলোতে ইকবালের নামে এসব প্রচার করা হয়। 

mzamin

Wednesday, April 30, 2025

রাতে সীমান্তে গুলিবিনিময়, ভারতের গোয়েন্দা ড্রোন ভূপাতিত করেছে পাকিস্তান

ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে পঞ্চম রাতেও উভয়পক্ষে গুলিবিনিময় হয়েছে। এর জন্য ভারত যখন পাকিস্তানকে দোষারোপ করছে তখন নিয়ন্ত্রণরেখায় আকাশসীমা লঙ্ঘনের কারণে ভারতের একটি কোয়াডকপ্টার গুলি করে ভূপাতিত করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। পাকিস্তান বলছে, ভারতের আগ্রাসনের ফলে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ওয়াগা সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় নাগরিকরা দেশে ফিরে যাচ্ছেন এবং পাকিস্তানিরাও তাদের দেশে ফিরে যাচ্ছেন। ওয়াগা সীমান্ত দিয়ে পাকিস্তানি একজন কূটনীতিক ও সাতজন স্টাফ দেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে আছেন কূটনীতিক সোহেল কামার। অন্য চার স্টাফের সঙ্গে তিনি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ওয়াগা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে লাহোর পৌঁছেছেন। একই দিন বিকালে দিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনের অন্য তিনজন সদস্য তাদের পরিবারের ২৬ জন সদস্যকে নিয়ে একই রুটে দেশে ফিরেছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডয়েচে ভেলে, জিও নিউজ। পেহেলগাম সন্ত্রাসী হামলার বিষয়ে পাকিস্তান যতই আন্তর্জাতিক পক্ষপাতিত্বহীন, স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করছে, ভারত ততই ওই ঘটনার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করছে। এ নিয়ে দুই পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশের মধ্যে ভয়াবহ উত্তেজনা চলছে। পাল্টাপাল্টি যুদ্ধ প্রস্তুতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। এরই মধ্যে আরব সাগরে ভারতের নৌবাহিনী মহড়া চালিয়েছে। তা থেকে বলা হয়েছে, দূরবর্তী সুনির্দিষ্ট টার্গেটে হামলা চালাতে সক্ষম তারা। এর মধ্যদিয়ে যে পাকিস্তানের দিকে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়। বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে বলা হচ্ছে ভারত তার সেনাদের প্রস্তুত করেছে। পাকিস্তানের সেনাদেরও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দুই দেশের এমন যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস উভয় পক্ষকে সংযমের আহ্বান জানিয়েছেন। অনলাইন জিও নিউজ নিরাপত্তা সূত্রগুলোকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ভারতের একটি কোয়াডকপ্টার নিয়ন্ত্রণরেখায় আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। এ জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী তা গুলি করে ভূপাতিত করেছে। ওই সূত্র আরও জানিয়েছেন কোয়াডকপ্টারটি দিয়ে ভিমবারের মানাবার সেক্টরে গোপন নজরদারি করার চেষ্টা করছিল শত্রুপক্ষ। ফলে সময় উপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তান সেনারা। তারা শত্রুদের অশুভ উদ্দেশ্য ভণ্ডুল করে দিয়েছে। নিরাপত্তা সূত্রগুলো আরও নিশ্চিত করেছে যে, যেকোনো আগ্রাসনের তাৎক্ষণিক ও কার্যকর জবাব দেয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত পাকিস্তানি সেনারা। ওদিকে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চলমান এই উত্তেজনার মধ্যে ভারতের মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা ও হিমাচল প্রদেশে আটকা পড়েছেন প্রায় দুই হাজার কাশ্মীরি। কাশ্মীরি একজন ছাত্র জিও নিউজকে বলেছেন, তারা শ্রীনগরে পৌঁছার চেষ্টা করছেন। নিজেদের বাসায় ফিরতে না পেরে তারা বিভিন্ন অফিসে ঘুমাচ্ছেন। এ ছাড়া ভারতশাসিত কাশ্মীরের শিক্ষার্থী, কর্মজীবী এবং ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকারে পরিণত হচ্ছেন।

ডয়েচে ভেলে বলছে, দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি গুলি চললেও তার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করেছে ভারত। তাদের অভিযোগ, পাকিস্তানের সেনারা গুলি চালাতে শুরু করে। ভারত তার জবাব দিয়েছে। পাল্টা ভারতকে দায়ী করছে পাকিস্তান। তারাও একই রকম বক্তব্য দিচ্ছে। ফলে নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে বলা সম্ভব নয় যে, কে বা কোন পক্ষ আগে গুলি চালিয়েছে। ভারতীয় সেনার তরফে বিবৃতিতে বলা হয়েছে,  কোনোরকম উস্কানি ছাড়াই পাকিস্তানের সেনা ‘স্মল আর্মস ফায়ারিং’ শুরু করে। কুপওয়ারা ও বারামুলায় নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর এই গুলি চলে। আখনুরেরও গুলি চলে। ভারতীয় সেনা তার প্রত্যুত্তর দিয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে প্রতি রাতেই কাশ্মীর সীমান্তে গুলি চলছে। পেহেলগামে ২৬ জনের মৃত্যুর পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একাধিক ব্যবস্থা নেয়ার কথা ঘোষণা করেছে ভারত। পাকিস্তানও জানিয়েছে, তারা সিমলা চুক্তি-সহ ভারতের সঙ্গে সব চুক্তি স্থগিত করছে। তারপর থেকেই জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখে প্রতিরাতে গুলির লড়াই চলছে। কাশ্মীর  থেকে ডয়েচে ভেলের প্রতিনিধি স্যমন্তক ঘোষ জানিয়েছেন, প্রতিদিন রাত বারোটার পর গুলি চলছে। ভোরে থেমে যাচ্ছে। তবে শুধু গুলিই চলেছে। এ ছাড়া সীমান্তে প্রচুর সেনা মোতায়েন করছে ভারত। ব্যাপক মুভমেন্ট হচ্ছে।

পাকিস্তানে কী কী ওষুধ রপ্তানি করে ভারত এক্সপোর্ট কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার কাছ থেকে তার তালিকা চেয়েছে ভারত সরকার। জরুরিভিত্তিতে তাদের এই তালিকা পাঠাতে বলা হয়েছে। নিউজ-১৮’র রিপোর্ট বলছে, ২১৯টি দেশের মধ্যে ভারত থেকে ওষুধ নেয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তান ৩৮তম স্থানে আছে। ২০২৪ সালে ১৭ কোটি ৬৫ লাখ ৪০ হাজার ডলারের ওষুধ কিনেছে পাকিস্তান। তবে পাকিস্তান এই ওষুধ সরাসরি  কেনে না। ভারত থেকে আমিরাতে ওষুধ যায়।  সেখান থেকে তারা এই ওষুধ কেনে। ভারতীয় কর্মকর্তারা মনে করেন, পাকিস্তানে ওষুধ বিক্রি বন্ধ হলে ভারতীয় ব্যবসায়ী ও উৎপাদকদের খুব একটা ক্ষতি হবে না। কিন্তু পাকিস্তানে তার প্রভাব পড়বে। তাদের অনেক বেশি দাম দিয়ে ওষুধ কিনতে হবে।

জাতিসংঘে ভারতীয় দূতের প্রতিক্রিয়া: জাতিসংঘে ভারতের সহকারী স্থায়ী প্রতিনিধি  যোজনা প্যাটেল বলেছেন, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তার দেশ গত এক দশক ধরে সন্ত্রাসবাদীদের সমর্থন করে। এই স্বীকারোক্তিতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তবে তার এই কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে, পাকিস্তান একটি দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র এবং তারা বিশ্বে সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহ দিচ্ছে। গোটা বিশ্ব শুনেছে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কী বলেছেন। এই প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি থেকে বোঝা যাচ্ছে, পাকিস্তান আঞ্চলিক স্থিতি নষ্ট করতে চাইছে। বিশ্ব এখন চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে পারে না।

mzamin

Monday, January 13, 2025

বিজিবি শক্ত অবস্থানে থাকায় ভারত বেড়া নির্মাণ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে

বিজিবি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের শক্ত অবস্থানের কারণে ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। গতকাল সচিবালয়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা এ কথা বলেন। সম্প্রতি সীমান্তের পাঁচটি জায়গায় ভারত কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু করেছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, বিজিবি এবং স্থানীয় মানুষের শক্ত অবস্থানের কারণে ভারত ওই সব স্থানে কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে সীমানা নির্ধারণ এবং উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে এ পর্যন্ত চারটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ছিল- সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে ডিফেন্স পোটেনশিয়ালিটি আছে এমন কাজ কেউ করতে পারবে না। শূন্য লাইন থেকে ১৫০ গজের মধ্যে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করতে গেলে একে অপরের কাছ থেকে সম্মতি নিতে হবে। সম্মতি ছাড়া তারা এ কাজটা করতে পারবে না। জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে তিন হাজার ২৭১ কিলোমিটারে ইতিমধ্যে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ফেলেছে। বাকি রয়েছে ৮৮৫ কিলোমিটার। তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময়ে ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভারত সীমান্তে কিছু অসম কাজ করেছে, যেগুলো ভারতের করা উচিত হয়নি, কিন্তু আমাদের আগের সরকার সেই সুযোগ দিয়েছে। এ সুযোগের মধ্যে রয়েছে তারা ১৬০টি স্থানে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে। সেখানে ঝামেলা রয়েছে। ৭৮টি স্থানে আরেকটি ঝামেলা রয়েছে। এখন পাঁচটি স্থানে ঝামেলা দেখা দিয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাটের তিন বিঘা করিডোর, নওগাঁর পত্নীতলা, ফেনী, কুষ্টিয়া ও কুমিল্লায় সমপ্রতি (কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ নিয়ে) ঝামেলা দেখা দিয়েছে।

কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ নিয়ে বিজিবি ও বিএসএফের ভেতরে একটা আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের বিজিবি শক্ত অবস্থান নেয়ায় ভারত এই জায়গায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এখানে একটা বড় সমস্যা হচ্ছে- আগের সরকার যেহেতু কিছু কিছু জায়গায় লিখিত দিয়ে গেছে। এই জায়গায় এটা করতে পারবে, ওই জায়গায় ওইটা করতে পারবে। যেগুলো তাদের দেয়া উচিত হয়নি। উপদেষ্টা বলেন, বিভিন্ন জায়গায় বিজিবির সঙ্গে আমাদের জনগণ খুব শক্ত অবস্থান নেয়ায় অন্য জায়গাগুলোতে তারা কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। তাদের এ শক্ত অবস্থানের জন্য বিজিবি এবং বাংলাদেশের জনগণকে আমি অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাই। স্থানীয় সাংবাদিকরা আমাদের এক্ষেত্রে পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন। ভারতের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হচ্ছে। আমরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও জানিয়েছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দু’একদিনের মধ্যে ভারতীয় হাইকমিশনারকে ডেকে বসতে পারে, এটার ব্যাপারে কী করবেন সে বিষয়ে। সীমান্তে এখন কি অবস্থা- এ বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, কাজ বন্ধ আছে। যে কয়টা জায়গায় কাজ শুরু হয়েছিল সব জায়গায় বন্ধ আছে। আমরা এই কাজগুলো করতে দেবো না।

লালমনিরহাটের তিন বিঘা করিডোরে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে জানিয়ে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘১৯৭৪ সালে যখন বেরুবাড়ী চুক্তি হয়েছে। তখন আমরা বেরুবাড়ী দিয়ে দিয়েছি। আমাদের সংসদ সেটা অনুসমর্থন করেছে। কিন্তু তিন বিঘা করিডোরে যাওয়ার জন্য আমাদের প্যাসেজটা দেয়ার কথা ছিল ভারতের। এটা সারা জীবনের জন্য তারা আমাদের দিয়ে দেবে। আমরা দিয়ে দিয়েছি। কিন্তু তারা সংসদে অনুসমর্থন করেননি। জায়গাটা আমাদের দেয়নি।

একঘণ্টা খুলে আবর একঘণ্টা বন্ধ রাখতো। ৬ ঘণ্টা খুলতো, ৬ ঘণ্টা বন্ধ রাখতো। রাতে পুরোটাই বন্ধ থাকতো। ২০১০ সালে একটি চুক্তি হয়, সেখানে বলা হয় করিডোর ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। আমরা ব্যবহার করতে পারবো। তার পরিবর্তে একটা বিরাট ঝামেলা করেছে যে, আঙ্গরপোতা-দহগ্রামে আমাদের যে জায়গাটি সেখানে জিরো লাইনের ওপরে তারা কাঁটাতারের বেড়া দিতে পারবে। যেখানে বলা আছে ১৫০ গজের মধ্যে করতে পারবে না। এজন্য সেখানে বড় ধরনের একটি সমস্যা হচ্ছে। তারা সেখানে বেড়া নির্মাণ করতে গেলে আমরা বাধা দেই। কিন্তু আইনগতভাবে বাধা দেয়ার এখতিয়ার নেই। যেহেতু আমরা ইতিমধ্যে সাইন করেছি। আমরা যদি সেখানে বেশি কঠোর হই তারা আবার প্রবেশের ক্ষেত্রে ঝামেলা করবে। এ বিষয়ে আগামী ১৬ই ফেব্রুয়ারিতে বিজিবি-বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক আছে। এগুলো নিয়ে আলোচনা হবে যাতে কাজগুলো বন্ধ করা যায়। সীমান্তে আমরা শক্তি বাড়াচ্ছি কিনা- এ বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, বর্ডারে আমাদের প্রচুর শক্তি আছে। জনগণ হলো আমার বড় শক্তি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। আমাদের জায়গা দেবো না আমরা তো কঠোরই। তারা তো বিভিন্ন জায়গায় সমস্যা করার চেষ্টা করবে। আমরা যেভাবেই হোক কৌশলে সেই সমস্যার সমাধান করবো। গত সরকার কিছু সুবিধা দিয়ে ভারতের সঙ্গে অসম চুক্তি করেছে সেই সুবিধাগুলো বাতিল করা হবে কিনা- এ বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, এজন্যই তো আমাদের বিজিবি মহাপরিচালক ফেব্রুয়ারি মাসে যাচ্ছেন। আমরা তাদের একটি চিঠিও দেবো। যে অসম চুক্তিগুলো হয়েছে সেগুলো যাতে বাদ দেয়া যায়। এই সমস্যার সমাধান হবে বলেও আশাবাদী স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। এলিফ্যান্ট রোডে একজন ব্যবসায়ীকে কোপানো হয়েছে। এসব ঘটনা ছড়িয়ে পড়ছে- দৃষ্টি আকর্ষণ করলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, মাঝে মাঝে ঘটনা ঘটছে। আগে এত মিডিয়া ছিল না, এখন একটা আওয়াজ হলে আপনারা জেনে যান। আগে এত জানাজানি হতো না। আপনারা এসব জানাচ্ছেন বলে আমরা উপকৃত হচ্ছি। সঙ্গে সঙ্গে আমরা অ্যাকশন নিচ্ছি। যদি আপনারা না জানাতেন হয়তো আরও বেড়ে যেতো।

mzamin

Thursday, December 12, 2024

মন্দির সংস্কারে বাধা দিতে বিজিবি ভারতে প্রবেশ করেনি: বিএসএফ

আসামের সীমান্তে একটি মন্দির সংস্কারের কাজে বাধা দিতে বিজিবির সদস্যরা ভারতে প্রবেশ করেছিল বলে ভারতীয় মিডিয়াতে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে এবং স্থানীয় স্তরে যে রটনার জেরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল তাকে অস্বীকার করেছে বিএসএফ। গত সপ্তাহে সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্তে একটি মন্দির সংস্কারের কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগ উঠেছিল বিজিবির বিরুদ্ধে।

এই নিয়ে সমাজমাধ্যমেও রটনা হয়েছিল যে, বিজিবি ভারতের মধ্যে প্রবেশ করেছিল এবং মন্দির সংস্কারের কাজে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু বিএসএফ-র এক ঊর্ধ্বতন কর্তা এই রটনাকে খারিজ করে দিয়ে জানিয়েছেন, বিজিবির কোনও সদস্যের ভারতে কোনও অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেনি। তিনি আরও বলেন, বিজিবি আন্তর্জাতিক সীমান্ত প্রটোকল ভঙ্গ করার মত কাজ করে না বলেই তাদের বিশ্বাস।

বিএসএফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সীমান্তের কাছে থাকা একটি মন্দির সংস্কারের জন্য পর্দা টাঙানো হয়েছিল। সেটি নিয়ে বিজিবি তাদের উদ্বেগ জানিয়েছিল। বিএসএফের পক্ষ থেকে সীমান্তের দায়িত্বে থাকা বিজিবি কর্মকর্তাদের জানানো হয় যে, এটি সাময়িক ভবে টাঙানো হয়েছে। মন্দির সংস্কারের কাজ হয়ে গেলেই খুলে ফেলা হবে। পরে সেটি খুলে ফেলা হলে বিজিবি কোনও নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি হচ্ছে না- বুঝতে পেরে আর কোনও আপত্তি জানায়নি।

mzamin

Monday, October 7, 2024

সীমান্তে বিএসএফ’র টার্গেট বাংলাদেশের মানুষ- রিজভী

মৌলভীবাজারে বিএসএফ’র গুলিতে নিহত স্বর্ণা দাসের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ পরবর্তী পথসভায় বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সীমান্তে হত্যার সময় ভারত দেখেনি তারা হিন্দু না মুসলমান। তাদের টার্গেট হচ্ছে বাংলাদেশি, তাদের টার্গেট হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ। শুধুমাত্র শেখ হাসিনা ছাড়া যারাই যখন ক্ষমতায় এসেছে তারা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তকে নিরাপদ সীমান্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। ভারত তা শুনেনি, তারা সীমান্তকে পৃথিবীর সবচেয়ে রক্তাক্ত সীমান্ত, সহিংস সীমান্ত এবং মৃত্যু ও লাশের মিছিলে পরিণত সীমান্ত করেছে।

রোববার (৬ই অক্টোবর) জুড়ী উপজেলার পশ্চিমজুড়ী ইউনিয়নের খাকটেখা কালনীগড় বাজারে বিএসএফ’র গুলিতে নিহত স্বর্ণা দাসের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন রুহুল কবির রিজভী। এ সময় ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর পক্ষ থেকে স্বর্ণা দাসের পরিবারের হাতে আর্থিক অনুদান তুলে দেন তিনি।

সেখানে পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি আরও বলেন, স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সীমান্তে লাশের সংখ্যা বেড়েই চলছে। ভারতের হাতে বানানো তাদের গোলাম শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে তাই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী আরও আক্রমণাত্মক। ৫ই আগস্ট জনগণের যে বিপ্লব হয়েছে তার ধারাবাহিকতায় জনগণের আস্থা নিয়ে ড. ইউনূস সরকারে আসে। আমাদেরও এই সরকারের প্রতি আস্থা আছে। তবে গণতন্ত্রের চর্চাকে সামনে রেখে দ্রুত নির্বাচন দেয়া উচিত। নির্বাচন দিতে কেন বিলম্ব করছেন? অতি দ্রুত গণতন্ত্র রক্ষায় নির্বাচন দিন।

রিজভী বলেন, বর্তমানে যিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব তিনি কাতারের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তখন যারা বিএনপি করতো তিনি তাদের পাসপোর্ট রিনিউ করতেন না। এ বিতর্কিত রাষ্ট্রদূতের কারণেই অনেক বাংলাদেশিকে দেশে ফিরতে হয়েছে। সে তো স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার এজেন্ট। সে কীভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব হলো? এরা কখনোই চাইবে না আপনি সফল হোন। এদের মতো স্বৈরাচারী সরকারের এজেন্টরা আপনাকে প্রতিনিয়ত বিতর্কিত করবে। কাতার বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক ও মৌলভীবাজার জেলা বিএনপি’র উপদেষ্টা শরিফুল হক সাজুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন আমরা বিএনপি পরিবারের উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল, আলমগীর কবীর, আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমন, মৌলভীবাজার জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন আহমেদ মিঠু।

mzamin


Monday, September 23, 2024

সীমান্তে হত্যা দিয়ে কী ভারত আন্তর্জাতিক আইন ভাঙছে না? by সুবাইল বিন আলম

আসুন একটা ঘটনা চিন্তা করি। সার্বিয়া বসনিয়াকে আক্রমণ করলো। কিন্তু যুদ্ধের মধ্যে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকেও মেরে ফেললো। কিছু লাশ চাপা দেয়ার চেষ্টাও করলো। অন্যের সীমান্তে এসে মানুষ ধরে নিয়ে গেল। মারা গেল অনেক শিশু।  খুব খারাপ লাগছে না? জ্বি, এগুলা যুদ্ধাপরাধ। যার শাস্তি এই বিশ্বেই হচ্ছে। আমাদের দেশ কি যুদ্ধাবস্থায় আছে?  নাই। কিন্তু এরকম ঘটনা কী হর হামেশা ঘটছে না? আমাদের সীমান্তে আসলে কী হচ্ছে? এর থেকে প্রতিকারের উপায় কি?

দ্যা ডিপ্লোমেটের একটা অপ-এডে বাংলাদেশ ভারত সীমান্তকে ভয়ঙ্করতম সীমান্ত হিসেবে লেখা হয়েছিল। হবেই না কেন? যুদ্ধ ব্যতীত এত হত্যা আর অন্য কোনো দেশের সীমান্তেই হয় না।  মুহম্মদ আব্দুর রব উনার বাংলাদেশ, ভুগোল, বৈশ্বিক রাজনীতি এবং পরিবেশ বইয়ে ১৯৯০ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত ২০৬ জন সাধারণ মানুষকে সীমান্তে খুনের কথা বলেছেন। অধিকারের মতে ২০০০-২০২০ পর্যন্ত ১২৩৬ জন খুন হইয়েছে বিএসএফের হাতে। আহত হয়েছে ১১৪৫ জন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে ২০২১ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত মারা গেছে ৭০ জন। এই হিসাব শুধু পত্রিকাতে আসা হিসাব। বাস্তবে আরও বেশি।

মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে স্বর্ণা দাস (১৪) নামের এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। ডেইলি মানবজমিনের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে আকুতি করে এই কিশোরী বলেছিল আমাকে মেরো না, আইনের আশ্রয় নাও। এই কথার পরও ওদের মন গলে নাই। আমাদের সনাতন ধর্মের মানুষেরা ভারতের উপর অনেক আস্থা রাখে। কিন্তু ভারতের গুলি থেকে তাদেরও রক্ষা নাই। এই ব্যাপারে তার পরিবারের সাক্ষী সবাই নিচ্ছে। কিন্তু ভারতের টাইমস অফ ইন্ডিয়া ৪ সেপ্টেম্বর তাদের রিপোর্টে দাবি করেছে বিজিবির গুলিতে স্বর্ণা মারা গেছে। ফেলানীর ঘটনা আমরা সবাই জানি, তার জন্য ভারতের আদালতে বিচার নামের প্রহসনে আমরা জানতে পারলাম কেউ তাকে মারে নাই। এমনি এমনি লাশটা কাটাতারে নিজেই ঝুলে ছিল। এভাবেই ভারতীয় প্রোপাগাণ্ডাতে আমরা হারিয়ে যাই।  এপ্রিলে ফেসবুকে একটা ভিডিও ভাইরাল হয়। দেখা যায় লালমনিরহাটে বিএসএফ আমাদের সীমান্তের ভিতর ঢুকে ২ জন রাখালকে গুলি করছে, আর রাখালরা দৌড়ে পালাচ্ছে (যুগান্তর ৯ই এপ্রিল, ২০২৪)। ওরা নো ম্যানস ল্যান্ড পার হয়ে আমাদের এলাকায় কেন আসলো?  ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ইসহাক আলী খান পান্না ভারতে প্রবেশের সময় বিএসএফ’র গুলিতে নিহতের অভিযোগ আছে। (ইনকিলাব ২৫শে আগস্ট, ২০২৪) সারা জীবন ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্কও উনাকে এই গুলির হাত থেকে বাঁচাতে পারে নাই। যদিও বিএসএফ এখানেও অন্য গল্প বলছে।

ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় দু’টি প্রটোকল আছে-  জয়েন্ট ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ গাইডলাইনস ফর বর্ডার অথোরিটিজ অব দ্য টু কান্ট্রিজ, ১৯৭৫ ও দ্য ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কো-অর্ডিনেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান, ২০১১। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত এ রকম দ্বিপক্ষীয় দু’টি প্রটোকল হলো-  জয়েন্ট ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ গাইডলাইনস ফর বর্ডার অথোরিটিজ অব দ্য টু কান্ট্রিজ, ১৯৭৫ ও দ্য ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কো-অর্ডিনেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান, ২০১১। জয়েন্ট ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ গাইডলাইনস ফর বর্ডার অথোরিটিজ অব দ্য টু কান্ট্রিজ প্রটোকলের ধারা ৮ (আই) অনুসারে, এক দেশের নাগরিক যদি বেআইনিভাবে অন্য দেশে প্রবেশ করার চেষ্টা করে বা কোনো অপরাধে লিপ্ত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী আত্মরক্ষায় যেকোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারবে, তবে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না করাটাই বাঞ্ছনীয়। আর্টিকেল ৮ (এম) অনুসারে, সীমান্ত দিয়ে যদি গরু পাচার করা হয়, তাহলে গরু ও গরু পাচারকারীদের সম্পর্কে তথ্য অপর পক্ষের সীমান্তরক্ষীদের কাছে হস্তান্তর করতে হবে এবং নিকটস্থ থানার পুলিশের কাছে মামলা করে গরু উদ্ধারে পদক্ষেপ নিতে হবে। (প্রথম আলো, ৪ই সেপ্টেম্বর,২০২৪)।

এখন আমাদের কি আসলে কিছুই করার নাই? এই ক্ষেত্রে আসলে কয়েকটা উপায় আছে। প্রথমত হচ্ছে ডিপ্লোম্যাটিক উপায়। গতবছরের ২২শে জুন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী সীমান্তে হত্যা শূন্যতে নামিয়ে নিয়ে আসার ব্যাপারে একমত হয়েছিল। ৫৪তম ভারত বাংলাদেশ বর্ডার সম্মেলনেও এই কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু কাজের গরু কেতাবে আছে। মৃত্যুর মিছিল থামে নাই। আগের নতজানু পররাষ্ট্রনীতিও এর জন্য দায়ী। বাংলাদেশ কিন্তু ভারতের প্রায় সব দাবি মেনে নিয়েছিল যাতে এই মিছিল থামে। যেমন কাঁটাতারের বেড়া, যা পাকিস্তান বা চীনের সীমান্তে নাই, মোবাইল টাওয়ার সরিয়ে দেয়া। বাংলাদেশের সীমান্তে এই অধম ভারতের রোমিং দিয়ে মোবাইল ব্যবহার করে এসেছে, বাংলাদেশের নেটওয়ার্ক না পেয়ে। তারমানে তারা কিন্তু সরায় নাই। এবার আর না পেরেই বাংলাদেশ সরকার খুব কড়া করে চিঠি দিয়েছে।

এরপর আসে নিজ নিজ দেশের আইন। ভারত বাংলাদেশ দুই দেশের আইনেই নিরস্ত্র মানুষদের মেরে ফেলার কোনো আইন নাই। আইন নাই চোরাচালানীদের বা বিনা বিচারে শাস্তি দেয়ারও। কিন্তু ভারত এই কাজ করেই যাচ্ছে আত্মরক্ষার দায়ে গুলি বলে অথবা স্বর্ণার কেসের মতো অস্বীকার করে শেষ উপায় তো ফেলানীর মতো কেস করা আছেই। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ‘ট্রিগার হ্যাপি: এক্সক্লুসিভ নিউজ অব ফোর্স বাই ইন্ডিয়ান ট্রুপস অ্যাট দ্য বাংলাদেশ বর্ডার’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, অপরাধী হিসেবে সীমান্ত হত্যার শিকার ব্যক্তিরা হয় নিরস্ত্র থাকে অথবা তাদের কাছে বড়জোর কাস্তে, লাঠি বা ছুরি থাকে। (৪ই সেপ্টেম্বর,২০২৪) উনাদের এই আষাড়ে গল্প ভারতের মানবাধিকার সংস্থাগুলোও খারিজ করে দেয়।  

সব শেষ উপায় আন্তর্জাতিক আইনে ব্যবস্থা খোঁজা। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এর রোম সংবিধির অনুচ্ছেদ ৭ এর অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞা সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে যখন কোনো বেসামরিক ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত ব্যাপক বা পদ্ধতিগত আক্রমণের অংশ হিসেবে, হত্যাসহ বেশকিছু অপরাধ। আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের বল প্রয়োগ এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের উপর জাতিসংঘের মৌলিক নীতি, ১৯৯০ ? নীতি ৯-এ পরিস্কারভাবে বলা আছে আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাগণ কারও বিরুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করবেন না, আত্মরক্ষা বা অন্যদের প্রতিরক্ষা, মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের হুমকি, বিশেষ করে গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধ, জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকির সঙ্গে জড়িত, এমন একটি বিপদ উপস্থিত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার, অথবা তাদের পলায়ন প্রতিরোধ করতে এবং শুধুমাত্র যখন পর্যাপ্ত বিকল্প অনুপস্থিত। জেনেভা কনভেনশন এবং অতিরিক্ত প্রোটোকল ? জেনেভা কনভেনশন ৪, অনুচ্ছেদ ৩: অ-আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে, জীবন এবং ব্যক্তির প্রতি সহিংসতা নিষিদ্ধ করে, বিশেষ করে সবধরনের হত্যা, অঙ্গচ্ছেদ, নিষ্ঠুর আচরণ এবং নির্যাতন, তাদের যারা সক্রিয় শত্রুতাকারী নয়। ভারতের এই হত্যার মধ্যে অনেক শিশুও আছে।  ভারত এইভাবে আন্তর্জাতিক আইনের অনেক ধারাই আমাদের সীমান্তে ভেঙেছে, যা অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধ বা মানবাধিকার লঙ্ঘন।  হয়তো কোনো উপায় না থাকলে আমাদের এই পথেই হাঁটতে হবে।
ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান বা চায়না বর্ডারেও বছরে গড়ে ৫/ ৬ জনের বেশি সাধারণ মানুষ মারা যায় না, যদিও প্রায়ই এদের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা থাকে। যদিও ওইখানে প্রায় যুদ্ধাবস্থা থাকে। আমরা চাই প্রতিবেশীর সঙ্গে সমমর্যাদাতে বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক। আমাদের একজনও যেন আর সীমান্তে মারা না যায়, তাদেরও না। আর এটা  ভারত নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি সংশোধন করে এগিয়ে আসলেই শুধুমাত্র তা সম্ভব।

লেখক: টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক কলামিস্ট।

mzamin


Saturday, September 14, 2024

সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যার প্রতিবাদে কল্যাণ ফ্রন্টের মানববন্ধন

ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিএসএফের গুলিতে স্বর্ণা দাস এবং জয়ন্ত সিংহকে হত্যার প্রতিবাদে যশোরে মানববন্ধন করেছেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের জেলা শাখার নেতারা। শনিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) যশোর প্রেস ক্লাবের সামনে এই মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব নির্মল কুমার বিটের সভাপতিত্বে এবং সংগঠনের যশোর জেলা শাখার নেতা অ্যাডভোকেট সুদীপ্ত কুমার ঘোষের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্ট যশোর জেলা শাখার নেতা অসীম কুমার, মানিক সাহা, বিষ্ণুপদ সাহা প্রমুখ। কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন যশোর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, শিক্ষক নেতা অধ্যাপক অলোক ঘোষ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রবিউল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা আমির ফয়সাল প্রমুখ নেতারা।

কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী একের পর এক গুলি চালিয়ে নিরীহ বাংলাদেশিদের হত্যা করছে। বিএসএফের এই নৃশংস ও নির্বিচারে হত্যা গণহত্যার শামিল। পৃথিবীর সব দেশে সীমান্ত আছে, কিন্তু একমাত্র বাংলাদেশ সীমান্ত তার ব্যতিক্রম। যেখানে প্রতিনিয়ত প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী একের পর এক নিরীহ বাংলাদেশিদের হত্যা করে। অথচ আমেরিকা-মেক্সিকো, ভারত-চীন কিংবা ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে বিরোধ থাকা সত্ত্বেও এমন হত্যার কোনো ঘটনা ঘটে না। স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় বাহিনী একের পর এক নিরীহ বাংলাদেশিকে নৃশংসভাবে হত্যা করেই চলেছে। এ পর্যন্ত তাদের হাতে কয়েক হাজার নিরীহ বাংলাদেশি নির্মম হত্যার শিকার হয়েছেন। সীমান্ত হত্যার বিষয়টি তাদের কাছে সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বক্তারা ভারতকে সীমান্তে হত্যা বন্ধ কিংবা এই জাতীয় কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। সীমান্তে যদি এই নৃশংস হত্যার পুনরাবৃত্তি ঘটে, তার জন্য ভারতকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তারা। 

সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্ট। ছবি : কালবেলা
সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্ট। ছবি : কালবেলা

Wednesday, September 11, 2024

সীমান্ত হত্যা: প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেন ভারতীয় দূত, উপদেষ্টা বললেন আমরা যুদ্ধ চাই না

সীমান্ত হত্যা বাংলাদেশ-ভারত বিদ্যমান সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এমন মন্তব্য করে মঙ্গলবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, যতটা সম্ভব কড়া ভাষায় হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। সেগুনবাগিচায় উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। সম্প্রতি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে বাংলাদেশি কিশোরী স্বর্ণা দাস নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় নোট পাঠিয়ে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা। তারপরও সীমান্ত হত্যার ঘটনা ঘটছে। প্রতিবাদে কাজ না হলে বাংলাদেশ কী করবে? এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, আমরা প্রতিবাদের ভাষা অনেক শক্ত করেছি। আমাদের এই মুহূর্তে এটুকুই করার আছে। আমরা তো যুদ্ধ বাঁধাতে পারি না! আমরা কোনো অবস্থাতেই যুদ্ধ চাই না। এ সময় দুই দেশের স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে এখনই সীমান্তে রক্ত ঝরা বন্ধের তাগিদ দেন তিনি।

এদিকে উপদেষ্টা যখন গণমাধ্যমের মুখোমুখি ঠিক সেই সময়ে নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠকে ছিলেন ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং ভারতীয় হাইকমিশন উভয়ে এটাকে সৌজন্য সাক্ষাৎ বলে দাবি করেন। সেই সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলেন ভারতীয় দূত। সেখানে সীমান্ত হত্যার বিষয়ে তার দৃষ্টি  আকর্ষণের চেষ্টা করেন উপস্থিত সাংবাদিকরা। কিন্তু হাইকমিশনার মিস্টার ভার্মা তা এড়িয়ে যান।
উপদেষ্টার প্রত্যাশা বাংলাদেশের প্রতিবাদ আমলে নেবে ভারত: গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও বলেন, সীমান্ত হত্যার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যু। সেটা আমরা প্রতি মুহূর্তে বলছি। আমরা আশা করবো, ভারত আমাদের প্রতিবাদ নোট আমলে নেবে। নোটে বাংলাদেশ দাবি জানিয়েছে, যারা সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তাদের বিচারের সম্মুখীন করার। উপদেষ্টা বলেন, আমরা আর একটি হত্যাকাণ্ডও দেখতে চাই না। অতীতের ঘটনাগুলোর নিন্দা জানিয়ে আমরা স্পষ্টভাবেই এটা বলেছি। সম্প্রতি মৌলভীবাজার জেলায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে বাংলাদেশি কিশোরী স্বর্ণা দাস নিহত হ?ন। স্বর্ণা দাসের ঝরা রক্তের দাগ শুকানোর আগেই (৩ দিনের মাথায়) ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে  জয়ন্ত কুমার সিংহ নামের ১৫ বছর বয়সী আরেক বাংলাদেশি নিহত হন। ওই কিশোর বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ফকিরভিটা বেলপুকুর গ্রামের বাসিন্দা মহাদেব কুমার সিংহের ছেলে। এ ঘটনায় মহাদেব কুমার সিংহ ও নিটালডোবা গ্রামের দরবার আলী নামের আরেক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ঠাকুরগাঁও সীমান্তে কিশোর হত্যার প্রসঙ্গ টেনে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, গতকাল যেটা হলো সেটা নিয়েও আমরা একই রকম প্রতিবাদ জানাবো। যেখানে আমাদের সুযোগ হবে আমরা বলবো। এটা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। দুই দেশের স্বার্থে উচিত এটা থেকে বেরিয়ে আসা। এটা ভারতের পক্ষেও উপকারী হচ্ছে বলে আমি কাউকে বলতে শুনিনি।  
সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি হাইকমিশনারের: এদিকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও গভীর করার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা। মঙ্গলবার দুপুরে নতুন পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের তিনি আলাপে বলেন, ‘দুই দেশের জনগণের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা, শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য আমরা বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছি। বহুমুখী খাতের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আমরা আমাদের সম্পৃক্ততা বজায় রাখবো। আমাদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং আমরা আগামী দিনগুলোতে এই সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেয়ার অপেক্ষায় আছি। এ সময় নতুন পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে পরিচয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করেন প্রণয় ভার্মা। এদিকে সীমান্ত হত্যা বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে প্রণয় ভার্মা ডিপ্লোমেটিক জাবাব দেন। বলেন, আমি বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাই না, কারণ ইতিমধ্যে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা কথা বলেছেন। গত ৫ই অগাস্ট ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পলায়নের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন সমীকরণ দেখা দিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। যা উভয়ের জন্য তৈরি করেছে।