Wednesday, February 18, 2015

আক্রান্ত হলে আত্মরক্ষার অধিকার আছে পুলিশের: আইজিপি

পুুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হক বলেছেন, যখন কোন ঘটনা ঘটে সেখানে সকল নাগরিকের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপর হামলা হলে তাদেরও আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। কেউ গুলি করলে, তখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায়। তখন সন্ত্রাসীরা মারা যায়। পাল্টা প্রশ্ন করে আইজিপি বলেন, তারা যে নিরীহ লোক সেটা আপনারা কী করে বুঝবেন? লোকটা নিরীহ কি না, সেটা তো তদন্তের বিষয়। আক্রান্ত হলে আত্মরক্ষার অধিকার পুলিশের আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পদে পদে জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়।
বুধবার দুপুরে র‌্যাব সদর দপ্তর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। এসময় বেগম খালেদা জিয়াকে কবে গ্রেপ্তার করা হবে জানতে চাইলে আইজিপি বলেন, ‘এটা এ মুহূর্তে বলা যাবে না। পুরো বিষয়টি তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীল। তাঁরা যদি সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে সহায়তা চায়, আমরা সহায়তা দেব। গণগ্রেপ্তার ও মামলার বিষয়ে আইজিপি বলেন, যারা নাশকতা করছে বা সন্দেহ আছে যে করতে পারে তাদের ডিটেক্ট করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। হিযবুত তাহরীর আইএস-এর আদলে বড় ধরনের কোন ঘটনা ঘটাতে পারে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এরকম কোন তথ্য তার কাছে নেই। পুলিশ এই সংগঠনকে হুমকি মনে করে না। তবে পুলিশ, র‌্যাবসহ অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্তক অবস্থানে রয়েছে। র‌্যাব সদর দপ্তরে যাওয়ার পর আইজিপি একেএম শহীদুল হককে র‌্যাবের পক্ষ থেকে গার্ড অফ অনার দেয়া হয়। পরে তিনি র‌্যাবের বিভিন্ন ইউনিট ঘুরে দেখেন এবং খোঁজ খবর করেন। এ সময় র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান ও র‌্যাব সদর দফতরের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা তার সঙ্গে ছিলেন।

‘আদালতের রায় মানলে বিএনপি’র অস্তিত্ব থাকে না’ -প্রধানমন্ত্রী

আদালতের রায় পুরোপুরি মানলে বিএনপি নামের রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব থাকে না বলে জানিয়েছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, জিয়াউর রহমান সংবিধান লঙ্ঘন করে  ক্ষমতা দখল করেছিল। হাইকোর্টে রায়ে ওই ক্ষমতা দখল অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। আর অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীদের তৈরী সংগঠন হচ্ছে বিএনপি। তাই রায় অনুযায়ী বিএনপি রাজনৈতিক দল নয়। তবে নির্বাচন কমিশনে বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধিত। বুধবার বিকালে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় তিনি হিযবুত তাহরীরের পোস্টার ছাপিয়ে জঙ্গি কর্মকান্ডকে উৎসাহিত করার অভিযোগ করে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে শুরু হওয়া অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হরতাল-অবরোধের নামে খালেদা জিয়া ও বিএনপি-জামায়াতের নাশকতা, সন্ত্রাস ও মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত হিজবুত তাহরীর, আইএস (ইসলামিক স্টেট)সহ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর যোগসূত্র রয়েছে। এদের কর্মকান্ড একইসূত্রে গাঁথা। তবে ইস্যুবিহীন অন্দোলনের নামে বীভৎস্য কায়দায় এতো মানুষকে খুনের দায় কোনভাবেই এড়াতে পারবেন না বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। আইনানুযায়ী যা যা করার তাই করা হবে। তার (খালেদা জিয়া) বিচার বাংলার মাটিতেই করা হবে।

ব্রিটেনে বিক্ষোভের মুখে বন্ধ হলো ইসরাইলি অস্ত্র কারখানা

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইসরাইলি মালিকানাধীন একটি অস্ত্র কারখানা দখল করে নিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভের মুখে কারখানাটির কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেছে।
ইসরাইলি অস্ত্র কোম্পানি এলিবিট সিস্টেমের সহযোগী সংস্থা কেন্ট-ভিত্তিক ইন্সট্রো প্রিসিসিওনে প্রবেশপথ দখল করে নেয় বিক্ষোভকারীরা। এ সময় কোনো কোনো বিক্ষোভকারী কারখানাটির ছাদেও অবস্থান নেয়। ইসরাইলি পণ্য বর্জন, পুঁজি প্রত্যাহার এবং নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা বিডিএস আন্দোলনের আহ্বান জানিয়ে এই অস্ত্র কারখানায় বিক্ষোভ করা হয়। অধিকৃত ফিলিস্তিনে অবৈধ বসতি স্থাপন বন্ধে ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টির আন্তর্জাতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে শুরু হয়েছে বিডিএস আন্দোলন। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী নীতি গ্রহণের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কঠোর পরিস্থিতির মুখে পড়েছে ইসরাইল।
সূত্র : রেডিও তেহরান।

রাজধানীতে ৭ গাড়িতে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ

বুধবার রাজধানীর পৃথকস্থানে সাত গাড়িতে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। আগুনের বিষয়ে ফায়ার সাভির্সের কাছে কোন তথ্য নেই বলে জানানো হয়েছে। সূত্র জানায়, সকাল ১০ টায় পল্লবীর সাংবাদিক কলোনীর সামনে প্রজাপতি নামে একটি যাত্রীবাহী বাসে দুর্বৃত্তরা আগুন দেয়। সকাল সাড়ে ৬ টায় ডেমরার রানীমহল বাসস্টান্ডে একটি যাত্রীবাহী লেগুনাকে গতিরোধ করে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। সকাল ৮ টায় ডেমরার স্টাফ কোয়ার্টারের সামনে একটি পিকঅ্যাপ ভ্যানে আগুন দেয়ার খবর পাওয়া গেছে। সকাল ৬ টায় মোহাম্মদপুরে বেঁড়িবাঁধে একটি পিকঅ্যাপভ্যানে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। সকাল ১১ টায় মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্তরে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। সকাল পৌঁনে ১০ টায় আদাবরের মূল রাস্তায় একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে।  সকাল ৮ টায় মগবাজারের রেলক্রসিয়ের পাশে একটি প্রাইভেট কারে আগুন দেয়া হয়। আগুনের বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের ডিউটি অফিসার নিলুফা ইয়াসমিন জানান, রাজধানীর কোনস্থানে তারা আগুনের খবর পাননি। এদিকে, রাজধানীর ফকিরাপুল বাজারে, মতিঝিল সোনালী ব্যাংকের সামনে, উত্তরা হাজি ক্যাম্পের সামনে ও তেজগাঁয়ের হলিক্রসের সামনে, ধানম-িতে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে ও মুগদার বৌদ্ধ মন্দিরের সামনে একাধিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে উপস্থিত হয়। পরে পথচারীসহ ওই এলাকার লোকজনের দেহ ও ব্যাগ তল্লাশী করেন। তবে সংশ্লিষ্ট থানা গুলোতে যোগাযোগ করা হলে তারা ককটেল বিস্ফোরণের বিষয়টি অস্বীকার করেন।

ঢাকা থেকে সারাদেশ বিচ্ছিন্ন : কুটনীতিকদের এফবিসিসিআই

রাজধানী ঢাকা থেকে সারাদেশ গত ৪৪ দিন ধরে বিচ্ছিন্ন রয়েছে বলে বিদেশী কুটনীতিকদের জানিয়েছেন ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদ। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি কুটনীতিতিক ও সহযোগি বিদেশী সংস্থার প্রধানদের জানাতে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় একথা জানান তিনি। ৪৪ দিনের হরতাল-অবরোধে ব্যবসায়ীদের এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলেও জানান আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর এই উপদেষ্টা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, পাকিস্তান, কানাডা, রাশিয়া, তুরস্ক, ভারত ও সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিরা সভায় যোগ দেন।
এফবিসিসিআইর পক্ষ থেকে সাবেক সভাপতি ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুণ, আনিসুল ও হক ও একে আজাদ, প্রথম সহসভাপতি মনোয়ারা হাকিম আলী, সহসভাপতি হেলাল উদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন পরিচালক উপস্থিত ছিলেন।
তবে এফবিসিসিআই সরকারের হয়ে কাজ করছে অভিযোগ করে গত কিছুদিন ধরে অনুষ্ঠান বর্জনকারি পরিচালকরা আজও অনুপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
গত ৪৪ দিনের টানা অবরোধে রাষ্ট্রের এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে দাবি করে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তৈরিপোশাক, পরিবহন, পোল্ট্রি, আবাসন ও পর্যটন খাতের ব্যবসায়ীরা। চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নিরসনে আইন করে হরতাল-অবরোধ বন্ধের দাবি জানান তিনি। এতে ৮৮ জন মানুষ নিহত হয়েছে বলেও কূটনীতিকদের জানানো হয়।
কাজী আকরাম বলেন, ৪৪ দিনের অবরোধ-হরতালে পণ্য উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়েছে। বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। প্রভাব পড়ছে পণ্যমূল্যের ওপর। এভাবে চললে দেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। এমতাবস্থায় আইন করে হরতাল-অবরোধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে এবং চলমান হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার করতে আন্দোলনরত দলগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করতে কুটনীতিকদের আহবান জানান তিনি।
দেশরক্ষার স্বার্থে চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনের দাবিতে নিজেদের পালন করা বিভিন্ন কর্মসূচীর কথা জানিয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, আমাদের কাছে দলের চেয়ে দেশ বড় বিবেচনায় সারা দেশের ব্যবসায়ীদের নিয়ে আমরা অবস্থান ধর্মঘট পালন করেছি। দেশের অর্থনীতি সচল না থাকলে দেশ সঙ্কটে পড়ে যাবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ অবস্থার অবসান দরকার। এক্ষেত্রে বিদেশী বন্ধুদেরও ভুমিকা রাখা দরকার।

জাতিসংঘ মহাসচিবের চিঠিকে গতানুগতিক বলছে আ.লীগ by আবদুর রশিদ

জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের পাঠানো চিঠির গুরুত্ব না দিলেও জবাব দেবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার। দলটির মতে, এই চিঠি গতানুগতিক, গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নেই। জাতিসংঘ মহাসচিবের চিঠি দেওয়ায় দলটি কোনো চাপ অনুভব করছে না। আওয়ামী লীগের দুজন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিবের পাঠানো চিঠির উপাদান নিয়ে দলীয় ফোরামে কোনো আলোচনা করেননি প্রধানমন্ত্রী। কবে করবেন, তা–ও তাঁরা জানেন না। তবে তাঁরা জেনেছেন, জাতিসংঘ মহাসচিবের চিঠিতে বিরোধী জোটের সঙ্গে আলোচনা করা এবং একই সঙ্গে সহিংসতা বন্ধের কথা বলা হয়েছে। ওই দুই নেতার মতে, আওয়ামী লীগ সরকার এখন সহিংসতা বন্ধেরই প্রয়াস চালাচ্ছে। সরকার এখন সেদিকেই নজর দিচ্ছে। সহিংসতা বন্ধ করলেই কেবল বিরোধী জোটের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। তবে সহিংসতা বন্ধ হলে কী নিয়ে, কখন, কীভাবে আলোচনা হবে, সেটা তাঁরা বলতে পারেননি।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রথম আলোকে বলেন, ‘আলোচনা হবে না, এটা কেউ বলছে না। তবে এর আগে সন্ত্রাস-নাশকতা শুড বি স্টপড। এটা বন্ধ না হলে কিছুই হবে না।’ জাতিসংঘ মহাসচিবের আহ্বান সাড়া দেবেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সব আহ্বানই নিচ্ছি। তবে এই হুমকি দিয়ে কিছু করা যায় না। বিএনপিও পারবে না।’
এটাকে কি আপনারা আন্তর্জাতিক বিশ্বের চাপ হিসেবে দেখছেন কি না, জানতে চাইলে আজ বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি কোনো চাপ নয়। আপনারা দেখেছেন বাংলাদেশে একে একে যাঁরা নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত এসেছেন, তাঁদের সবার সঙ্গে আপনাদের কথা হয়েছে। সেখানে কোথাও কোনো চাপের কথা নেই। আমরা শুধু খেয়াল রাখব, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সরকারের কোনো কর্মকাণ্ড সমালোচনার মুখে না পড়ে। আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি, চিঠির একটা জবাব যাবে।’
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাতিসংঘের স্পিরিট হচ্ছে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান। বর্তমান সরকার সেই কাজটিই করছে। আর যদি নির্বাচনের জন্য সংলাপের কথা বলা হয়, তাহলে সেটা তো এখনো আসেনি।’
আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাছান মাহমুদ বলেন, ‘জাতিসংঘ মহাসচিবকে অনুরোধ জানাব, উনি আগে সহিংসতা বন্ধ করার আহ্বান জানাবেন। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার, জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে না।’
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা প্রথম আলোকে বলেন, রাজনীতিতে আলাপ-আলোচনা বন্ধ থাকুক, এটা কেউ বিশ্বাস করে না। সহিংসতা, পেট্রলবোমা কি রাজনীতি? তারা যে মানুষ হত্যা করছে, এ জন্য কি তাদের অনুশোচনা আছে? জাতিসংঘ মহাসচিব যদি প্রধানমন্ত্রীকে আলোচনা করা ও সহিংসতা বন্ধ করার আহ্বান জানান, তাহলে ওই চিঠি ইতিবাচকভাবে নেওয়া যেতে পারে।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আমলে নেওয়া যেতে পারে। তবে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই।’
সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, ‘যারা সন্ত্রাসের সঙ্গে সরাসরি জড়িত, তাদের সঙ্গে আলোচনার দ্বিপাক্ষিক ভিত্তি হতে পারে না।’ জাতিসংঘ মহাসচিবের চিঠির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দেশ ও জাতির স্বার্থে যেটা ভালো, সেটাই প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করবেন বলে আমার দল মনে করে।’
জানা গেছে, দুই চিঠিতেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্বের প্রসঙ্গটি টানেন বান কি মুন। বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন সূচকের পাশাপাশি আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জনের প্রশংসা করেন জাতিসংঘের মহাসচিব। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যোগদানকারী অন্যতম শীর্ষ দেশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নের স্বার্থে শান্তি ও স্থিতিশীলতা জাতিসংঘের আগ্রহের বিষয় বলে বান কি মুন উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের চলমান সহিংসতায় জাতিসংঘের গভীর উদ্বেগের কথা তুলে ধরে নিরপরাধ লোকজন সহিংসতার শিকার হওয়ায় গভীর উদ্বেগ জানান বান কি মুন।

নিঃসঙ্গ ‘ফিরোজা’ by মানসুরা হোসাইন

রাজধানীর গুলশান ২ নম্বরের ৭৯ নম্বর সড়কের
‘ফিরোজা’ বাড়িটি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা
জিয়ার ভাড়া বাস। ছবি: মানসুরা হোসাইন
খালেদা জিয়ার বাড়ির ছাদে লাগানো হয়েছে লাউগাছ।
বাঁশের মাচায় বড় হওয়া লাউয়ের ডগার দেখা মিলল ফটকের
বাইরের রাস্তা থেকে। ছবি: মানসুরা হোসাইন।
রাজধানীর গুলশান ২ নম্বরের ৭৯ নম্বর সড়কে বিএনপির চেয়ারপারসন
খালেদা জিয়ার ভাড়া বাসার মূল ফটক। ছবি: মনিরুল আলম
বাড়ির সামনে ফিরোজা রং দিয়ে ইংরেজিতে ‘ফিরোজা’ লেখা। মূল ফটক গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ। বাড়িটির ভেতরে আম, কাঁঠাল, নারকেলসহ অনেক গাছ। ভেতরের দোতলা সাদা ঝকঝকে বাড়িটির ছাদে বাঁশের মাচায় লকলকিয়ে ওঠা লাউয়ের ডগা। সবই আছে, শুধু বাড়ির ভাড়াটে বেশ কিছু দিন এখানে থাকছেন না।  মঈনুল রোড থেকে কয়েক বছর হলো এখানে উঠেছেন। সমাজে প্রভাবশালী। স্বাভাবিকভাবে ফটকের বাইরে পুলিশের অবস্থান নিশ্চিত। একজন হাবিলদারের নেতৃত্বে সাতজন পুলিশ সদস্য পালা করে বাড়িটির নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। বাড়ির সঙ্গেই পুলিশ সদস্যদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা। ফটকের বাইরে এই পুলিশ সদস্যদের বসার জায়গা। বাড়ির সীমানাপ্রাচীরে কিছু রাজনৈতিক পোস্টার দৃশ্যমান। ফটকের কাছে থাকা ইন্টারকম দীর্ঘদিন নষ্ট। অবশ্য একটি মোবাইল ফোনসেট আছে যোগাযোগের জন্য। বাড়ির বাসিন্দা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গত ৩ জানুয়ারি থেকে তাঁর দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান করায় হয়তোবা চিত্রটা এ রকম।
গত সোমবার সকালে গুলশানের ২ নম্বরের ৭৯ নম্বর সড়কে ওই বাড়ির ফটকে দেখা হয় দুই পুলিশ সদস্যের সঙ্গে। তাঁরা জানালেন, গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এ বাড়িতে খালেদা জিয়ার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী এবং দলের দু-একজন ছাড়া আর কাউকে ঢুকতে দেখেননি। ছোট ভাইয়ের স্ত্রী এই বাড়ি থেকে খালেদা জিয়ার খাবার নিয়ে যান। তবে সেটিও নিয়মিত না। খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মারা যাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী ও মেয়েরা এ বাড়িতে এসেছিলেন বলে তাঁরা শুনেছেন। তাঁরা বলেন, এক ব্যক্তি মাঝে মাঝে ওই বাড়িতে বাজার পৌঁছে দেন। তবে প্রতিদিন নিয়ম করে বাড়ির ভেতরে দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষীরা। জানা গেল, আগে থেকেই নিয়ম ছিল, আগাম অনুমতি নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢোকার। কিন্তু অনুমতিটা কে দেবে, তাই আর ভেতরটা দেখা হয় না। খালেদা জিয়ার বাড়ির এক বাসিন্দা সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি নিজের পরিচয় বা ভেতরে কে আছেন তা নিয়ে কথা বলতে চাননি। শুধু জানালেন, অনুমতি নেই। বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান টেলিফোনে প্রথম আলোকে বললেন, ‘ম্যাডামের বাড়িতে কর্মচারীরা ছাড়া এখন আর কেউ নেই।’
খালেদা জিয়ার বাড়ি ফেরা নিয়ে কিছু জানেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে দায়িত্বরত একজন পুলিশ সদস্য বললেন, ‘ম্যাডাম অবরোধ দিয়েছেন, যেদিন অবরোধ শেষ হবে, সেই দিনই আসবেন। আমরা গেটে দায়িত্ব পালন করি। খালেদা জিয়া ম্যাডাম যখন বের হতেন এবং ঢুকতেন, তখন স্যালুট দিতাম। গেটের ভেতরে ঢোকার আমাদের অনুমতি নাই।’
খালেদা জিয়া যখন বাড়িটিতে ওঠেন, তখন থেকেই কনস্টেবল আলমগীর ভূইয়া দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বললেন, ‘বাড়ির গাছ থেকে কেউ কোনো ফল পেড়ে খেতে পারবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন ম্যাডাম। গাছ থেকে যখন যে ফল নিচে পড়বে এবং যার সামনে পড়বে সেই তা খেতে পারবে। তাই আমরাও পাকা আম কখন পড়বে তার অপেক্ষায় থাকি।’ তাই আম বা অন্যান্য ফল ফটকের বাইরে পড়লে কুড়ানোর জন্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় পুলিশ সদস্যদের মধ্যে।
প্রকৃতির নিয়ম মেনে এবারও আমগাছে মুকুল ধরেছে। কিন্তু পাকতে পাকতে বাড়ির বাসিন্দা কী ফিরবেন?

‘পদত্যাগ করুন, তবেই নিরাপদ অবতরণের বিষয়টি বিবেচনা করবে জনগণ’ -বিএনপি

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দ্রুত পদত্যাগের আহ্বান জানিয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে দ্রুত পদত্যাগ করুন। তবেই জনগণ আপনার নিরাপদ অবতরণের বিষয়টি সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করবে। এসময় সালাহউদ্দিন আহমেদ অভিযোগ করেন, সরকার জনগণের বৈধ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সন্ত্রাসী ও জঙ্গী কার্যক্রম বলে চালিয়ে দেয়ার প্রচারযুদ্ধ শুরু করেছে। আজ বুধবার বিকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, বর্তমান অবৈধ সরকার জনগণের বৈধ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সন্ত্রাসী ও জঙ্গী কার্যক্রম বলে চালিয়ে দেয়ার প্রচারযুদ্ধ শুরু করেছে। ইতোমধ্যে  পেট্রলবোমায় আক্রান্ত মানুষের আর্তনাদকে পুঁজি করে আন্তর্জাতিক মহলের সহানুভূতি অর্জনে আওয়ামী ভণ্ডামী জনগণের সামনে উন্মোচিত হয়েছে। কতিপয় দলকানা গণমাধ্যমে দিবা-নিশি অপপ্রচারের মাধ্যমে গোয়েবলসীয় কায়দায় বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের  নেতৃত্বে চলমান শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনকে কলুষিত করার হীন চক্রান্ত কখনও সফল হবে না। সালাহউদ্দিন বলেন, আমরা অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে তথ্য-উপাত্ত সহকারে জাতির সামনে বারবারই উপস্থাপন করেছি, এসব জঘন্য পেট্রলবাজির সঙ্গে সরকারি দলের নেতাকর্মীরাই জড়িত। গণতন্ত্র মুক্তির ন্যায্য আন্দোলনকে দমন-পীড়নের সকল অপচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে এখন  কেবল নিয়ন্ত্রিত ও দলকানা কতিপয় মিডিয়ার বদৌলতে অনির্বাচিত ও অবৈধ সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়। জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে চায়। বিবৃতিতে তিনি বলেন, প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে লুট করা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা চিরস্থায়ীকরণের প্রাণান্তকর আওয়ামী কসরত জাতীয় জীবনে চরম রাজনৈতিক সংকট উৎপত্তির মূল কারণ। গায়ের জোরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তি ঘটানোর ফলেই সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। বাকশালের অনুকরণে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েমের উগ্র বাসনাই জাতিকে চরম সংকটে নিপতিত করেছে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব বলেন, বিরোধী দলের কার্যালয় তালাবদ্ধ করে, দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে, বিদ্যুৎ, টেলিফোন, ফ্যাক্স, ইন্টারনেট, ক্যাবল লাইন কেটে দিয়ে এবং সর্বশেষ খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী  দেশের মানুষকে গণতন্ত্রের সবক শেখাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ও তার নেতা-মন্ত্রীদের মিথ্যার  বেসাতি এ দেশের জনগণ ও সারাবিশ্ব জানে। দেশের পরিস্থিতি ১৯৭১ সালের মতো- প্রধানমন্ত্রীর মঙ্গলবারের এ বক্তব্যের সমর্থন করে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তিনি ঠিকই বলেছেন, কারণ ১৯৭১ এ শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে জনগণের মুক্তি সংগ্রাম জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। আর বর্তমানে গণতন্ত্র হত্যাকারী আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী গণতান্ত্রিক সমাজ পুন:প্রতিষ্ঠার দুর্বার আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনায় সমৃদ্ধ প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণে জাতীয় ঐকমত্যের বিকল্প নেই। সেই জাতীয় স্পৃহা পূরণে সমগ্র জাতি আজ ঐক্যবদ্ধ।
বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, জনগণের ভোটের অধিকার আদায়ের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠা, সাংবিধানিক, মৌলিক ও মানবাধিকার আদায়ের সংগ্রামে আন্দোলনরত জনগণ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত প্রায়। তিনি বলেন, মঙ্গলবারও গাইবান্ধার জামায়াতকর্মী মোস্তফা মঞ্জিলকে ঠা-া মাথায় গুলি করে হত্যা করেছে সরকারি পেটোয়া র‌্যাব-পুলিশ বাহিনী। পুলিশি নির্যাতনে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেছে জামায়াত কর্মী শফিকুল ইসলাম। আর রূপক মিয়াকে গুলি করে হত্যার পর লাশ গুম করে পুলিশ। আমরা এহেন ঘৃণ্য নরহত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। ক্ষমতার পট পরিবর্তন হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী আদালতে এসব নরহত্যার বিচার করা হবে। বিবৃতিতে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আপনার পিতা রক্ষীবাহিনী সৃষ্টি করে ৩০ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেন। অসংখ্য বিরোধী মতের রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে বিনা বিচারে হত্যা করে হত্যার রাজনীতি প্রচলন করেছিলেন। আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করে স্বঘোষিত স¤্রাট বনে গিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি। আপনিও চলমান গণআন্দোলনকে দমন করার জন্য আপনার পেটোয়া পুলিশ-র‌্যাব ও বিজিবিকে দলীয় বাহিনীতে পরিণত করে নরহত্যার নির্দেশ প্রদান করে গণতন্ত্রের শবযাত্রার আয়োজন সম্পন্ন করেছেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দুই অস্ত্রধারী গ্রেপ্তার by তাসনীম হাসান

গত রোববার ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের সময় ধারালো অস্ত্র হাতে
নাসিম সিয়াম (বাঁয়ে), গত বছর ২৪ আগস্ট ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের মিছিলে
কোমরে পিস্তলসহ আলাউদ্দিন l ফাইল ছবি
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে গুলি ও সংঘর্ষের ঘটনায় দুই নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে নাসিম সিয়ামকে গত রোববার সংঘর্ষের সময় ধারালো অস্ত্র হাতে মহড়া দিতে দেখা যায়। অপরজন এস এম আলাউদ্দিন গত বছরের ২৪ আগস্ট কোমরে পিস্তল নিয়ে ক্যাম্পাসে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন।
পুলিশ জানায়, গতকাল মঙ্গলবার সকাল নয়টায় নাসিম সিয়ামকে শাহ আমানত হলের সামনে থেকে এবং আলাউদ্দিনকে উত্তর ক্যাম্পাসে তাঁর বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার বিলুপ্ত কমিটির মানবসম্পদবিষয়ক সম্পাদক আলাউদ্দিন দেড় বছর আগে যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। নাসিম লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী। দুজনই ছাত্রলীগের সিএফসি (চুজ ফ্রেন্ডস উইথ কেয়ার) ও ক্যাম্পাস ছাত্রলীগ পক্ষের হয়ে রাজনীতি করছেন।
হাটহাজারী থানার তদন্ত কর্মকর্তা সালাহ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, রোববারের সংঘর্ষের ঘটনায় এই দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা দুজন ওই দিন শিক্ষকদের ধাওয়া করার সময় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ধারালো অস্ত্র হাতে নাসিম সিয়ামের ছবিও প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছে।
কোমরে পিস্তলসহ আলাউদ্দিনের ছবি গত বছরের ২৫ আগস্ট প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছে।
গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে ছাত্রলীগের ‘ভিএক্স’ (ভার্সিটি এক্সপ্রেস) এবং ‘সিএফসি’ ও ‘ক্যাম্পাস ছাত্রলীগ’ পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ভিএক্স পক্ষের নেতা ফরহাদ হোসেন বাদী হয়ে সিএফসি ও ক্যাম্পাস ছাত্রলীগ পক্ষের ২৩ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২ জনকে আসামি করে হাটহাজারী থানায় বিস্ফোরক আইনে মামলা করেন। মামলায় ২ নম্বর আসামি করা হয় আলাউদ্দিনকে।
এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মঞ্জুর আহমেদ প্রথম আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, গতকাল গ্রেপ্তার হওয়া দুজনকেই বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
গত সোমবার প্রথম আলোতে প্রকাশিত ছবিতে সিয়ামের সঙ্গে আরও একজনকে ধারালো অস্ত্রসহ দেখা গেছে। তাঁর পরিচয়ও পাওয়া গেছে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরটি বিভাগের (শিক্ষা, গবেষণা ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট) শিক্ষার্থী নিয়াজ উদ্দিন। গত বছরের ২০ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার এলাকায় পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা করেন ছাত্রলীগের ভিএক্স পক্ষের নেতা-কর্মীরা। এ ঘটনায় পুলিশের হাটহাজারী থানার উপপরিদর্শক মঞ্জুর আহমদ বাদী হয়ে সাতজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও আটজনকে আসামি করে মামলা করেন। এই মামলার অন্যতম আসামি নিয়াজ উদ্দিন। পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর তাঁকে তিন মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সিরাজ উদ দৌল্লাহ বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া দুজনের মধ্যে আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা রয়েছে, আর অন্যজন নাসিম সিয়ামকে রোববারের সংঘর্ষের সময় ধারালো অস্ত্র হাতে দেখা গেছে।
সোমবার গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে সিয়ামের সঙ্গে দেখা যাওয়া নিয়াজের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বলেন, তাঁকে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় তিন মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছিল। পাশাপাশি আজীবন কেন বহিষ্কার করা হবে না—এই মর্মে নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি এখনো তার জবাব দেননি।

দ্বিমুখী ক্ষতিতে প্রান্তিক মানুষ by দেলোয়ার হুসেন ও মামুন আব্দুল্লাহ

টানা অবরোধ ও হরতালের কারণে দ্বিমুখী ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের প্রান্তিক মানুষ। বিশেষ করে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ভাসমান হকার, দৈনন্দিন আয়ের ওপর নির্ভরশীল স্বল্প আয়ের মানুষের অবস্থা এখন নিঃস্ব হওয়ার মতো। রাজনৈতিক অস্থিরতায় তাদের কাজের সুযোগ যেমন সংকুচিত হয়ে পড়েছে, তেমনি কমে গেছে তাদের আয়। ফলে বাধ্য হয়ে জীবনযাত্রার মান কমাতে হয়েছে। একদিকে কৃষকরা ক্রেতার অভাবে তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারছে না, অন্যদিকে সরবরাহ কম থাকায় তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। ফলে দুই দিক থেকেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই অবস্থা বেশিদিন চলতে থাকলে টানা লোকসানে পড়ে পণ্য উৎপাদনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন কৃষক ও ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোক্তারা। তখন দেশে পণ্যের চাহিদা ও উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেবে, যা মূল্যস্ফীতির হারকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। এমনকি খোদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সোমবার এক অনুষ্ঠানে স্বীকার করেছেন, অবরোধ-হরতালের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দেশের কৃষকরা। তারা পথে বসে গেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এমকে মুজেরী যুগান্তরকে বলেন, যে করেই হোক উৎপাদন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে হবে। কৃষক বা ছোট উদ্যোক্তারা পণ্যের বিপণন করতে না পারায় এখন উৎপাদন করছেন না। এই অবস্থা বেশিদিন চললে সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি দেখা দেবে। উৎপাদন কমে গেলে দেশে খাদ্য ঘাটতি হতে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনই সতর্ক ব্যবস্থা নিতে হবে।
কৃষকের নাভিশ্বাস : পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় বিশেষ করে কৃষকের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। একদিকে তারা উৎপাদিত পণ্য ক্ষেত থেকে তুলে বিক্রি করতে পারছেন না, অন্যদিকে কীটনাশক, সার, বীজ এবং ডাল, তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে হচ্ছে চড়া দামে। শীত মৌসুমে উৎপাদিত পণ্যই একমাত্র কৃষকরা পুরোমাত্রায় ঘরে তুলতে পারেন। অন্য সময়ে অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি বা বন্যার কারণে কৃষক পুরো ফসল ঘরে তুলতে পারেন না। এবার শীতের সবজি ও অন্যান্য পণ্যের বিক্রি আশানুরূপ হয়নি। গত ৫ জানুয়ারি থেকে টানা অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ফলে কৃষক উৎপাদিত পণ্য ক্ষেত থেকে গ্রামের পাইকারি বাজারে নিয়ে এসেও ক্রেতার অভাবে বিক্রি করতে পারছে না। এতে বাজারেই পণ্য পচে নষ্ট হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় ক্ষেত থেকে পণ্য তোলার খরচও পাওয়া যাচ্ছে না বলে অনেক পণ্য ক্ষেতেই পচে যাচ্ছে।
যুগান্তরের নরসিংদী প্রতিনিধি বিশ্বজিত সাহা জানান, অবরোধ শুরুর পর নরসিংদীর চৈতাবো এলাকায় নাশকতা আতংকে সবজির ট্রাক উল্টে মারা গেছেন শিবপুরের ৫ জন কৃষক ও পাইকার। এই ঘটনার পর সবজি নিয়ে কৃষক ও পাইকাররা ঢাকামুখী হচ্ছেন কম। স্থানীয় পাইকারি সবজির বাজারগুলোও প্রায় পাইকারশূন্য। পরিবহন সংকটে নরসিংদী থেকে সবজি এনে সেগুলো রফতানিও হচ্ছে কম। ফলে কৃষকদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। তারা ঋণ নিয়ে চাষ করেছেন। শস্য বিক্রি করে ঋণ শোধের কথা। কিন্তু এখন পণ্য বিক্রিই করতে পারছেন না। ঋণ শোধ করবেন কীভাবে।
মঙ্গলবার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নারায়ণপুর সবজির হাটে গিয়ে দেখা যায়, আশপাশের গ্রাম থেকে সবজি চাষীরা ভ্যানে ঝুড়িভর্তি বিভিন্ন সবজি নিয়ে হাটে জড়ো হয়েছেন। কিন্তু টানা হরতালে পাইকারি ক্রেতা কম আসায় সবজি বিক্রি করতে পারছেন না। পাইকারের তুলনায় সবজির সরবরাহ বেশি। ফলে কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে সবজি বিক্রি করছেন।
আধা বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করেছেন বেলাব উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের পুটিমারা গ্রামের সবজি চাষী ফিরোজ মিয়া। তিনি জানান, হরতালের এক সপ্তাহ আগে যে বেগুন এক হাজার টাকা মণ বিক্রি হয়েছে, সেগুলো এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মণ দরে। প্রতি মণে তাদের লোকসান হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। বেগুন সপ্তাহে দুই দিন তুলতে হয়। সময়মতো না তুললে বেগুনে পোকা ধরে পচে যায়। তাই বাধ্য হয়েই হরতাল-অবরোধের মধ্যেই জমি থেকে বেগুন তুলতে হচ্ছে। কিন্তু ক্রেতা না পাওয়ায় বিক্রি করা যাচ্ছে না। তিনি জানান, নিজেদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পারলেও কীটনাশক, সার, বীজ কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। ডাল, তেলও কিনতে হয় বেশি দামে। এগুলোর সরবরাহ কম হওয়ায় দাম বেড়েছে। ফলে দুই দিক থেকেই আমরা লোকসানে পড়ছি।
একই কথা বললেন নারায়ণপুর বাজারে টমেটো বিক্রি করতে আসা সবজি চাষী নুরুল ইসলাম। তিনি জানান, আগে টমেটো ১৬ টাকা কেজি বিক্রি হতো। এখন তা ৮-৯ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দাম কমে যাওয়ায় এখন উৎপাদন খরচও উঠবে না। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা এহন বেকুপার (অসহায়) মধ্যে পড়ছি। গিরস্ (কৃষক) মইর‌্যা যাওয়ার অবস্থা হইছে।’
সবজি চাষী বায়েজিদ বলেন, ‘সকাল ৮টার সময় টমেটো নিইয়্যা বাজারে আইছি, হরতালের কারণে ঢাকা থাইক্যা পাইকার আসতে পারে নাই। কি কইর‌্যা আমরা চলাফেলা করি বুঝতে পারছি না।’
সারা দেশেই কৃষকের একই অবস্থা। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের অবস্থা আরও খারাপ। তারা উৎপাদিত পণ্য ক্ষেতেই নষ্ট করে দিচ্ছেন। কৃষি বিপণন অধিদফতর সূত্র জানায়, কৃষকের ক্ষতি নিরূপণের বিষয়ে তাদের জেলা অফিসগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এগুলোর তথ্য পাওয়া গেলে মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে। তখন মন্ত্রণালয় থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সংকটে ক্ষুদ্র শিল্প : দেশের আনাচে কানাচে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্ষুদ্র শিল্প। এগুলোর পণ্য উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা চলে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে। অবরোধের কারণে পণ্য বিপণন করতে না পারায় তারা এখন উৎপাদনও কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় সরবরাহ সংকটও প্রকট হয়েছে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের সূত্র জানায়, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুঁজির ঘূর্ণন হয় সাপ্তাহিক ভিত্তিতে। ফলে এক সপ্তাহে কোনো কারণে পণ্য বিক্রি করতে না পারলে তারা পুঁজির সংকটে পড়েন। চলমান টানা অবরোধের কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে পথে বসে গেছেন। তাদের টেনে তুলতে হলে এখন নতুন পুঁজির জোগান দিতে হবে। তা না হলে ঘুড়ে দাঁড়াতে পারবেন না তারা।
বগুড়া ব্যুরো প্রধান নাজমুল হুদা নাসিম জানান, উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পারায় মালিকরা শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে অনেকে তাদের শ্রমিকদের বিদায় করে দিচ্ছেন। বেকার শ্রমিকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।
বগুড়া বিসিক সূত্র জানায়, জেলায় ছোট-বড় সব মিলিয়ে তিন হাজার ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প রয়েছে। এখানে হস্তশিল্প, কারুশিল্প, নকশিকাঁথা, তালের আঁশের ঝুড়ি, তাল পাখা, মোমবাতি, তাঁতের শাড়ি, স্পেয়ার পার্টস, কোদাল, কাস্তেসহ বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী উৎপন্ন হয়। এসব পেশার সঙ্গে ২০ হাজার মানুষ জড়িত। মালিকরা ব্যাংক ঋণে বা নিজস্ব টাকায় পণ্য সামগ্রী তৈরি করলেও সেগুলো বাজারে বিক্রি করতে পারছেন না। বাইরে থেকে ক্রেতা আসতে না পারায় উৎপাদিত পণ্যে ঘর ভরে যাচ্ছে। শিগগিরই এসব পণ্য বিক্রি করতে না পারলে ব্যবসায়ীরা কর্মচারীদের বেতন দিতে ব্যর্থ হবেন। ব্যাংকের সুদ বৃদ্ধি পাবে। লোকসান গুনতে হওয়ায় ইতিমধ্যে অর্ধেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।
বগুড়া শহরের চকলোকমান এলাকার পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের প্রধান সমন্বয়ক শেখ মোহাম্মদ আবু হাসানাত জানান, তার প্রতিষ্ঠানে নকশিকাঁথা, চাদর, তালের আঁশের ঝুড়িসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা হয়। এসব পণ্য বিদেশে রফতানি হয়ে থাকে। এ প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬০০ নারী শ্রমিক কাজ করেন। শীত মৌসুমে এসব পণ্যের চাহিদা বেশি। বিপুলসংখ্যক পণ্য তৈরি করা হলেও বিদেশ থেকে ক্রেতা না আসায় বিক্রি হচ্ছে না। এ অচলাবস্থার নিরসন না হলে তিনি তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের বেতন দিতে ব্যর্থ হবেন। ফলে তাদের কাজ থেকে বিদায় করে দিতে হবে।
বগুড়া বিসিকের ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম সানাউল হক জানান, দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে এ শিল্পের অবস্থা আরও খারাপ হবে।
পাইকারি বাজারে ক্রেতা নেই : গ্রামের পাইকারি বাজারগুলোতে ক্রেতা নেই। পরিবহন সংকট ও বোমা আতংকের কারণে পাইকাররা গ্রামের হাটগুলোতে যাচ্ছেন না। ফলে ক্রেতা না থাকায় পাইকারি বাজারগুলো হয়ে গেছে মৃতপ্রায়। নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি কাপড়ের বাজার নরসিংদীর শেখেরচর বাবুরহাট এখন প্রায় ক্রেতাশূন্য। ক্রেতা না থাকায় তাঁতিরাও এখন আর পণ্য নিয়ে হাটে আসেন না। তাঁতিদের ঘরে জমছে কাপড়ের স্তূপ। ফলে বাধ্য হয়ে তাঁতিরা উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন। অবরোধের কারণে বাবুরহাটের সাপ্তাহিক লেনদেন ৭০০ কোটি টাকা থেকে নেমে ৫০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বস্ত্রশিল্পে। এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। বাবুরহাটে বিভিন্ন প্রকারের কাপড়ের প্রায় ৫ হাজার দোকান রয়েছে। এ কাপড়ের বাজারকে কেন্দ্র করে নরসিংদীজুড়ে গড়ে উঠেছে সহস্রাধিক টেক্সটাইল, ডাইং, অ্যামব্রয়ডারিসহ সহায়ক শিল্প-কারখানা। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ৫ লক্ষাধিক মানুষ।
পাইকারি বিক্রেতা আলমগীর হোসেন বলেন, যে হাটে প্রতি সপ্তাহে প্রচুর বেচাকেনা হতো অবরোধের সহিংসতার আতংকে তা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
মুন টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপক আলামিন বলেন, অবরোধে ব্যবসায়ীদের মেরুদণ্ড ভেঙে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। বাবুরহাট বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন বলেন, অবরোধের কারণে সর্ববৃহৎ পাইকারি কাপড়ের বাজার শেখেরচর বাবুরহাটের লেনদেনে ধস নেমেছে। পূর্বে যেখানে প্রতি সপ্তাহে ৭শ’ থেকে ৮শ’ কোটি টাকা লেনদেন হতো এখন তা ৫০ কোটি টাকাও হয় কিনা সন্দেহ রয়েছে। অন্য পাইকারি হাটগুলোরও একই অবস্থা।
ভাসমান হকারদের অবস্থা শোচনীয় : টানা অবরোধে পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ভাসমান হকারদের অবস্থা খুবই করুণ। ভাসমান হকাররা বিশেষ করে বাস টার্মিনাল, লঞ্চ টার্মিনাল, রেল স্টেশনে পণ্য বিক্রি করে। এসব স্থানে যাত্রী কম থাকায় তাদের পণ্য বিক্রি হচ্ছে না। এছাড়া বাস-ট্রেন ঠিকমতো চলাচল না করায় তাদের আয়ের পথও বন্ধ হয়ে গেছে। রাজধানীর আশপাশের এলাকা থেকে প্রতিদিন যারা বিভিন্ন পণ্য এনে ভাসমান অবস্থায় বিক্রি করতেন পরিবহন সংকটে তারাও নিয়মিত আসতে পারছেন না। ফলে তাদের আয়ের সুযোগ কমে গেছে। নগরীর ভাসমান শ্রমিকদের অবস্থা আরও খারাপ। কাজ না পেয়ে অনেকে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন।
দুগ্ধ খামারিদের দুর্দিন : মিল্কভিটা, আড়ং, প্রাণ কোম্পানিগুলোর দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠেছে দুগ্ধ খামার। খামারিরা দুধ উৎপাদন করে ওইসব কোম্পানির কাছে বিক্রি করে। কোম্পানি তা প্রক্রিয়াজাত করে প্যাকেটজাত করে বাজারে বিক্রি করে। অবরোধ শুরুর পর থেকে বাজারে দুধের বিক্রি কমে গেছে। ফলে কোম্পানিগুলো দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কমিয়ে দিয়েছে। এ কারণে তারা খামারিদের কাছ থেকে দুধ কিনছে কম। কিন্তু খামারিদের বক্তব্য- কোম্পানি বা ক্রেতারা দুধ না কিনে থাকতে পারে। কিন্তু আমরা তো আর গরুর দুধ সংগ্রহ না করে থাকতে পারি না। কারণ গরুকে প্রতিদিন খাওয়াতে হয়। আর গাভী প্রতিদিনই দুধ দেয়। এই দুধ সংগ্রহ না করে কোনো উপায় নেই। সংগৃহীত দুধ বিক্রি করতে না পেরে তা রাস্তায় ফেলে প্রতিবাদও করেছেন খামারিরা।
শাহজাদপুর প্রতিনিধি মুমীদুজ্জামান জাহান জানান, এ অঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ ৮৫ হাজার লিটার দুগ্ধ উৎপাদন হয়। লাগাতার হরতাল-অবরোধে দুধের বিক্রি কমে গেছে। ফলে দেড় মাসে লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা। খামারিরা দুধ বিক্রি করতে না পারলেও অবরোধে সরবরাহ কম থাকায় গো-খাদ্য খৈল, ভুসি ও দানাদার গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে প্রতিদিন কৃষকদের গো-খাদ্য ক্রয় বাবদ লোকসান হচ্ছে ৩৪ লাখ টাকা। এ হিসাবে দেড় মাসে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এ ছাড়া গবাদি পশুর চিকিৎসা ও অন্য খরচ বাদে বাকি টাকা লোকসান হচ্ছে।

সংলাপ না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি চলবে: কাদের সিদ্দিকী

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, সরকার জনবিচ্ছিন্ন। অরাজকতা গুণ্ডামি করে শান্তি স্থাপন করা যায় না। তিনি বলেন, সংলাপ ছাড়া শান্তি আসবে না।যতদিন সংলাপ না হবে ততদিন অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাবার ঘোষনা দেন তিনি। বুধবার দুপুরে মতিঝিলে দলীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
কাদের সিদ্দিকী বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সহিংসতা বাড়ছে। দেশ শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আমি এখানে ২২ দিন ধরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছি, প্রধানমন্ত্রীকে আলোচনায় বসতে এবং খালেদা জিয়াকে অবরোধ প্রত্যাহার করতে আহ্বান জানাচ্ছি। এ অবস্থান কর্মসূচি থেকে আমাদের কামনা চাই দেশে শান্তি আসুক। দেশ যেখানে আছে সেখান থেকে দায়িত্বশীল হোক।
তিনি বলেন, বিকলাঙ্গ জাসদের মন্ত্রী ইনু ছাড়া আর সবাই সংলাপ চায়। আলোচনা না করে আপনি কীভাবে ক্ষমতায় থাকতে চান।প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনি আলোচনায় বসুন, দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে আলোচনার কোনো বিকল্প নেই।
কাদের সিদ্দিকী জাতিসংঘের মহাসচিবের উদ্দেশে বলেন, যারা বিদেশীদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে পারে আর দেশের মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারে না, তাদের বিদেশে শান্তিরক্ষা মিশনে থাকার কোনো অধিকার নেই। জাতিসংঘের মহাসচিবকে বলব, তাদের ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হোক।
তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে গণতন্ত্র নেই।নির্বাচনের নামে প্রহসন করে কেউ ক্ষমতায় থাকতে পারেনি।আমরা বিপথমুক্ত পরিচ্ছন্ন গণতন্ত্র চাই। নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র চাই না। আয়ুব খান নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। কিন্তু টিকতে পারেনি।
তিনি জানান, দুই নেত্রী যতদিন গো ধরে বসে থাকবে ততদিন তার অবস্থান কর্মসূচি চলবে।
২৮ জানুয়ারি থেকে মতিঝিলে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নিরবচ্ছিন্ন অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন কাদের সিদ্দিকী।
সংবাদ সম্মেলনে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান তালুকদার বীরপ্রতীক, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ইকবাল সিদ্দিকী, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম দেলোয়ার, নাসরিন সিদ্দিকীও যুব আন্দোলনের আহ্বায়ক হাবিব উন নবী সোহেল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ট্রেনের টয়লেটে সন্তান প্রসব

প্রসব বেদনায় ট্রেনের টয়লেটে গিয়ে সন্তান জন্ম দিয়েছেন ভারতের এক নারী। টয়লেটের প্যান দিয়ে নবজাতকটি নিচে পড়ে গেলেও জীবিত পাওয়া গেছে। সোমবার ভারতের রাজস্থান রাজ্যের হনুমানগড় স্টেশন এলাকায় এ অলৌকিক ঘটনা ঘটে। মঙ্গলবার এএফপির খবরে বলা হয়, স্টেশনের অল্প দূরেই কয়েক মিনিটের জন্য দাঁড়িয়েছিল ট্রেনটি। এ সময় মানু নামের ওই যাত্রীর প্রসব বেদনা ওঠে। তড়িঘড়ি টয়লেটে সন্তান জন্ম দিয়েই অজ্ঞান হয়ে যান তিনি। রেলওয়ে পুলিশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সুভাষ বিষ্ণু জানান, ভারতের অধিকাংশ ট্রেনের শৌচাগার থেকে ময়লা সরাসরি রেললাইনে পড়ে। শিশুটিও শৌচাগারের ভেতর দিয়ে রেললাইনের ওপর পড়ে যায়। ট্রেনটি স্টেশনে চলে আসার পর অচেতন প্রসূতিকে টয়লেট থেকে উদ্ধার করা হয়। ওদিকে স্থানীয় এক নিরাপত্তারক্ষী নবজাতককে রেললাইনের ওপর কাঁদতে দেখে পুলিশকে খবর দেন। পরে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে খুঁজে পান মা-বাবা। আরেক পুলিশ কর্মকর্তা রাম সিং বলেন, শিশুটি বেঁচে থাকবে, এমনটা বাবা-মা ভাবেননি। তারা খুবই খুশি।

সব যদি স্বাভাবিক হবে? by সাজেদুল হক

চলমান অস্থিরতায় দেশের পোশাক ও বস্ত্রশিল্প তথা জাতীয় অর্থনীতি ও
জনজীবন অচলাবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন
বিজিএমইএ আয়োজিত এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে
ও একাÍতা জানিয়ে দেশের বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরা
সময়ের ব্যবধান দু’ঘণ্টার মতো। দূরত্ব অবশ্য অনেক। ঢাকায় সচিবালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে সিনিয়র মন্ত্রী আমির হোসেন আমু জানালেন, সবকিছুই স্বাভাবিক। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকার অত্যন্ত সন্তুষ্ট। ঘণ্টা দুয়েক পর সিলেটে আরেক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানালেন, বুধবারের এসএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। বিরোধী জোটের হরতালের কারণেই এ পরীক্ষা পেছানো হয়। আমির হোসেন আমু ছাড়াও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমও বলেছেন, দেশের সবকিছু স্বাভাবিক। কোথাও হরতাল হচ্ছে না। কয়দিন ধরেই এ প্রচারণা চলছে, সব ঠিক আছে। কোথাও কোন সঙ্কট নেই। কিন্তু এ নিয়ে অন্তত ১০টি প্রশ্ন উঠেছে-
১. সব যদি স্বাভাবিক হবে তবে দফায় দফায় কেন এসএসসি পরীক্ষা পেছানো হচ্ছে? সর্বশেষ আজকের এসএসসি পরীক্ষা কেন পেছানো হলো। ‘কোন কারণ’ ছাড়াই কেন শিক্ষার্থীদের জীবন বিপন্ন করা হচ্ছে? রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। রাজধানীর বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুক্রবার-শনিবার ক্লাস পরীক্ষা নিয়ে ক্ষতি কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। তা কেন?
২. বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয় অভিমুখে প্রতিদিনই সরকারপন্থি বিভিন্ন সংগঠন যাত্রা করছে। খালেদা জিয়ার কাছে হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছেন তারা। দেয়া হচ্ছে আলটিমেটাম। হরতাল-অবরোধ যদি নাই হয় তবে তা প্রত্যাহারের দাবি উঠছে কেন?
৩. পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবিতে সব ব্যবসায়ী সংগঠনই রাস্তায় নেমে এসেছে। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের শীর্ষ নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে হিসাব দিচ্ছেন তাদের কত টাকা ক্ষতি হচ্ছে। ‘স্বাভাবিক পরিস্থিতি’ সত্ত্বেও কেন তারা তা করছেন?
৪. অর্থমন্ত্রী আবুল মাল মুহিত সোমবারও বলেছেন, টানা অবরোধের কারণে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। এজন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক। তারা পথে বসে গেছেন। মফস্বল এলাকায় বিপর্যয় নেমে এসেছে। এর আগেও তিনি বলেছিলেন, জেলা শহরগুলোর পরিস্থিতি মারাত্মক? কেন তিনি এসব কথা বলছেন?
৫. নিরপেক্ষ সূত্রগুলো দাবি করছে, মহাসড়কগুলোতে ২৫ ভাগের বেশি যানবাহন চলাচল করছে না। সরকারই রাত ৯টার পর গাড়ি না চালাতে পরিবহন মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সবকিছু যদি স্বাভাবিক হবে তবে মহাসড়কে কেন স্বাভাবিক যানবাহন চলছে না?
৬. বার্ন ইউনিটে মানুষের আর্তনাদ দেখে কোন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষই স্থির থাকতে পারছেন না। কেন এখনও বার্ন ইউনিটে মানুষ আসছে। কেন পঙ্গু হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ মানুষের ভিড় বাড়ছে? কেন পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হচ্ছে মানুষ? কেন মারা যাচ্ছে তারা। কেন আগুন জ্বলছে বাসে। কেন ককটেল বিস্ফোরণ হচ্ছে যত্রতত্র। কেন ক্রসফায়ারে মারা যাচ্ছে আদম সন্তান। কেন পায়ে গুলি করা হচ্ছে নিরীহ মানুষের।
৭. সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি কেন হরতাল-অবরোধে বিচার কার্যক্রমে অংশ নেয়া থেকে বিরত রয়েছে। কেন বিঘ্ন ঘটছে বিচার কার্যক্রমে। কেন প্রতিদিন মিছিল হচ্ছে উচ্চ আদালতে।
৮. সরকারপ্রধানের তাগাদা দেয়ার পরও বেশিরভাগ সংসদ সদস্য নিজ এলাকায় যাননি। কেন কয়েকটি জায়গায় তাদের সমাবেশ হামলার শিকার হয়েছে।
৯. কারাগারগুলো কেন বন্দিদের ভিড়ে ঠাসা? কেন ৪০ দিনে ১৪ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কেন অভিযানের নামে মানুষের ঘরবাড়ি তছনছ করা হচ্ছে। কেন প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন মানুষ?
১০. কেন বহু মানুষ হতাশ হয়ে পড়ছেন? কেন তারা দেশত্যাগের চেষ্টা করছেন?
লিখেছেন: সাজেদুল হক

‘আমি হিন্দু শিবির নই’ by মাহমুদ মানজুর

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ছাত্র নয়ন বাছার। ছিলেন হাসি-খুশি তরতাজা এক তরুণ। হঠাৎ ৪ঠা ফেব্রুয়ারি বদলে যায় তার জীবনের কাহিনী। পুলিশের গুলিতে আহত নয়ন বাছারের এখনকার ঠিকানা পঙ্গু হাসপাতালের এবি ওয়ার্ডের ৬৯ নম্বর বিছানা। গতকাল একটি ইনজেকশন দেয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু অর্থাভাবে ১১৫০ টাকা দামের সে ইনজেকশন কেনা সম্ভব হয়নি। মা শিখা রানী মজুমদার ও ছেলের আহজারিতে ভারি এখন ওই ওয়ার্ডের পরিবেশ। একটু পরপর কান্নার শব্দ। মাকে নয়ন বলছিলেন, আমার পা যদি কেটে ফেলতে হয়। তোমার কি হবে মা? একজীবনে আর কত কষ্ট করবা?
কিভাবে বদলে গেল নয়ন বাছারের জীবন। নিজেই তিনি বর্ণনা করছিলেন সেদিনের কথা। রাত প্রায় সাড়ে আটটা। টিউশনি শেষ করে এলেন ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে। মীরহাজীরবাগ যাওয়ার উদ্দেশে ওঠেন একটি বাসে। এ সময় বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বাস থেকে নামার পর পুলিশ তার কাছে জানতে চায়, তিনি জামায়াত-শিবির করেন কিনা? জবাবে তিনি বলেন, আমার নাম নয়ন বাছার, আমি হিন্দু সম্প্রদায়ের। এর পরই হাঁটুর ওপরে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে সাদা পোশাকের পুলিশ। তারপর আর মনে নেই।
কেন এমন হলো। মা-ছেলের কাছে সে প্রশ্নের জবাব নেই। শিখা রানী মজুমদার বলছিলেন, আমি তো পাথর হয়ে গেছি। নয়ন গর্ভে থাকতেই ওর বাবা ভারতে চলে গেছে। আর ফিরেনি। এর পর এই বুকের মানিককে নিয়ে একা একা জীবন সংগ্রাম করে টিকে আছি ২২টি বছর ধরে। এ ছেলেটিকে বুকে আগলে রেখে তিল তিল করে স্বপ্ন বুনেছি। নিজে না খেয়ে, না পরে ওকে মানুষের মতো মানুষ করার প্রতিজ্ঞা করেছি। ও জগন্নাথে ভর্তি হওয়ার পর ভেবেছি এই বুঝি আমার যুদ্ধের দিন শেষ হলো। এই তো আর কয়টা দিন। ও পড়াশোনা শেষ করে ভাল একটি চাকরি করবে। সুন্দরী মেয়ে দেখে ধুমধাম করে বিয়ে করাবো। আমি-ছেলে আর ছেলের বৌ মিলে বাকি জীবনটা শান্তিতে কাটিয়ে দেবো। এই বলে শিখা রানী মজুমদার ফুঁফিয়ে কেঁদে ওঠেন। হাসপাতালে দেখতে আসা নয়ন বাছারের এক বন্ধু জানালেন, শিখা রানী মজুমদার তার বাবারবাড়িতে ছোট্ট একটি ঘর তুলে নয়নকে নিয়ে থাকতেন। বাগেরহাটের স্থানীয় একটি রেজিস্ট্রার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নামমাত্র বেতনে চাকরি করেই সংসার চলতো মা-ছেলের। এই ছেলের ভবিষ্যৎ আর পড়াশোনার কথা চিন্তা করে নতুন সংসারের কথা না ভেবে একাই থেকে গেছেন ছেলেকে আঁকড়ে ধরে। নয়ন বাছারের বন্ধু আরও জানান, ১৩ দিন ধরে প্রতিদিন নয়ন বাছারের চিকিৎসা খরচ লাগে প্রায় ৫০০০ টাকা। প্রতিদিন ১১৫০ টাকা দামের একটি ইনজেকশন কিনতে হয়। এ টাকা জোগাড় করতে শিখা রানীর হিমশিম খেতে হচ্ছে। হাত বাড়িয়ে দেয়ার মতো তেমন কোন সামর্থ্যবান স্বজনও নেই। নিজের স্বজন এবং সঞ্চয়ের সব টাকা শেষ এরই মধ্যে। গতকাল ইনজেকশনের অভাবে নয়নের পা ড্রেসিং করানো হয়নি। এ প্রতিবেদককে হাতজোড় করে শিখা রানী বলেন, দয়া করে আপনারা (সাংবাদিক) আমার গ্রামের এমপি-চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কাছে খবর নিন। আমার ছেলের ভার্সিটিতে-মেসে খবর নিন। তারপর লেখেন। তবুও পুলিশের বানানো কথাগুলো লেখবেন না। আমার ছেলে জীবনে কোন দিন মিটিং-মিছিলে যায়নি। আমাকে আর আমার ছেলেটাকে বাঁচতে দিন। নয়ন বাছারের চিকিৎসা খরচের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার আবেদনও করেছেন এই অসহায় স্কুলশিক্ষিকা। এদিকে গতকাল পঙ্গু হাসপাতালে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পুলিশের গুলিতে আহত পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ১৭। এক মাসে এমন রোগীর তিনজনের পা কাটা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্তব্যরত নার্স বলেন, ইদানীং পুলিশ কেইসে যে কয়জন গুলিবিদ্ধ রোগী আসেন, তার বেশির ভাগই হাঁটুতে গুলিবিদ্ধ। আর হাঁটুতে গুলি করা মানে হচ্ছে আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করা।

সংলাপে বসুন -হাসিনা–খালেদাকে বান কি মুনের চিঠি by রাহীদ এজাজ

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা থেকে উত্তরণে সংলাপে বসতে দুই নেত্রীকে আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে লেখা পৃথক দুই চিঠিতে বান কি মুন এ আহ্বান জানান।
নিউইয়র্ক ও ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো জাতিসংঘ মহাসচিবের পক্ষ থেকে দুই নেত্রীকে চিঠি দেওয়ার বিষয়টি গত রোববার প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছে।
সূত্রটি জানায়, প্রধানমন্ত্রীকে বান কি মুন গত ৩০ জানুয়ারি চিঠি লিখেন। এর কয়েক দিন পর প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠিটি পৌঁছানো হয়। একই সময়ে বিএনপির চেয়ারপারসনকেও চিঠি পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি ওই দুই চিঠিতে বান কি মুন উল্লেখ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে বান কি মুনের চিঠি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি এ কে আবদুল মোমেন গতকাল মঙ্গলবার সকালে (ঢাকার সময়) প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।’ এ ধরনের চিঠি ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর মাধ্যমে পৌঁছানো হয়েছে কি না প্রশ্ন করা হলে আবদুল মোমেন বলেন, সেটি হতে পারে।
তবে সরকারের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে জানান, গত সপ্তাহে চিঠিটি ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আবার বিএনপির চেয়ারপারসন কার্যালয়ের একটি সূত্র গতকাল রাতে প্রথম আলোকে জানায়, খালেদা জিয়াকে লেখা বান কি মুনের চিঠিটিও গত সপ্তাহে পৌঁছেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিবের সহযোগী মুখপাত্র এরি কানেকো ১২ ফেব্রুয়ারি ই-মেইলে প্রথম আলোকে জানান, বান কি মুন বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
জানা গেছে, দুই চিঠিতেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্বের প্রসঙ্গটি টানেন বান কি মুন। বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন সূচকের পাশাপাশি আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জনের প্রশংসা করেন জাতিসংঘের মহাসচিব। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যোগদানকারী অন্যতম শীর্ষ দেশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি ও উন্নয়নের স্বার্থে শান্তি ও স্থিতিশীলতা জাতিসংঘের আগ্রহের বিষয় বলে বান কি মুন উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের চলমান সহিংসতায় জাতিসংঘের গভীর উদ্বেগের কথা তুলে ধরে নিরপরাধ লোকজন সহিংসতার শিকার হওয়ায় তিনি গভীর উদ্বেগ জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লেখা চিঠিতে বান কি মুন বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য সংসদের বাইরের বিরোধী দলকে নিয়ে আলোচনায় বসার অনুরোধ জানান। চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও ইতিবাচক উন্নয়নের ব্যাপারে জাতিসংঘ মহাসচিব ব্যক্তিগতভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। তাই সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক (সাবেক) সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে তারানকোকে বাংলাদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করছেন কি না সেটি তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেননি।
খালেদা জিয়ার কাছে লেখা চিঠিতে সহিংসতা বন্ধের ওপর গুরুত্ব দিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন বান কি মুন। বাংলাদেশে চলমান সমস্যার সমাধানে তিনি তারানকোকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি চিঠিতে উল্লেখ করেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে লেখা এটাই প্রথম চিঠি। অবশ্য নির্বাচনের আগের বছর ২০১৩ সালে তিনি দুই নেত্রীকে সংলাপে বসতে মে ও নভেম্বর মাসে চিঠি লিখেন। আর একই অনুরোধ জানিয়ে দুজনকে ফোন করেন আগস্টে।
নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতপার্থক্য দূর করতে জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানের দূত হিসেবে তারানকো ২০১২ ও ২০১৩ সালে তিন দফায় ঢাকায় আসেন। ২০১৩ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি ছয় দিনের জন্য বাংলাদেশ সফর করেন। ওই সফরের সময় তিনি দুই দলকে আলোচনার টেবিলে বসালেও তাদের মতপার্থক্য দূর করতে পারেননি। তাই দুই দলকে দুই দফায় টেবিলে বসানোর ‘সাফল্য’ নিয়েই ঢাকা ছেড়েছিলেন তারানকো।
এদিকে, গতকাল নিউইয়র্কে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র ফারহান হক বলেন, বাংলাদেশে জানমালের ক্ষয়ক্ষতিতে মহাসচিব উদ্বিগ্ন। তিনি আন্তরিকভাবে এর শান্তিপূর্ণ সমাধান চান। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি এ তথ্য জানান।
বাংলাদেশ সরকার চাইছে না তারানকো ঢাকা সফর করুন— বাংলাদেশের কিছু পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত এমন খবরের বিষয়ে জানতে চাইলে ফারহান হক বলেন, তারানকোকে আবার ঢাকায় পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা এই মুহূর্তে নেই। মহাসচিবের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি শুধু বাংলাদেশের সরকার ও বিরোধী দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং তিনি সে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন।

রাজনৈতিক নেতাদের সৌজন্যবোধ ও ভাষারীতি by সৈয়দ আবুল মকসুদ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর আমন্ত্রণে পাকিস্তানের রিপাবলিকান-আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী মালিক ফিরোজ খান নূন ভারত সফরে গিয়েছিলেন। সেই সরকারি সফরে প্রধানমন্ত্রী নূনের সঙ্গী হয়েছিলেন তাঁর পত্নী ভিকারুননিসা নূন। পিআইএর বিশেষ বিমানে তাঁরা নয়াদিল্লি যান। প্রধানমন্ত্রী নেহরু পাকিস্তানি অতিথিদের পালাম বিমানবন্দরের গ্যাংওয়েতে গিয়ে অভ্যর্থনা জানান। মালিক ও ভিকারুননিসা বিমানের সিঁড়ি দিয়ে পাশাপাশি নামছিলেন। সিঁড়ির কয়েক ধাপ থাকতেই কীভাবে বেগম ভিকারুননিসার এক পাটি জুতা নিচে পড়ে যায়। নিশ্ছিদ্র সিকিউরিটির বহু কর্মকর্তা বিমান ঘিরে ছিলেন। তাঁদের কেউ নন, সিঁড়ির নিচ থেকে বেগম নূনের জুতাটি স্বয়ং জওহরলাল নেহরু তুলে আনেন। সিকিউরিটির লোকেরা ও অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা হতবাক। হতবাক পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও। কিন্তু তাঁদের হতবাক হওয়ার মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায় যখন তাঁরা দেখেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জুতাটি বেগম নূনের পায়ে পরিয়ে দিতে এগিয়ে গিয়ে নিচু হচ্ছেন। সে এক অকল্পনীয় দৃশ্য। বেগম নূনের পায়ে জুতা পরিয়ে দিতে গিয়ে নেহরু ছোট হয়েছেন, সে-কথা নিতান্ত ছোটলোক কেউ ছাড়া দুনিয়ার মানুষ বলবে না। বরং প্রকাশ পেয়েছে নেহরুর ঔদার্য, পরম সৌজন্যবোধ ও শিষ্টাচার।
নেহরু, নূন বা ভিকারুননিসা—কেউই ছোট পরিবার থেকে উঠে আসা মানুষ নন। একজন এলাহাবাদের অভিজাত পরিবারের মানুষ, আরেকজন পাঞ্জাবের অভিজাত সামন্ত-ভূস্বামী পরিবারের। নেহরুর বাবা মতিলাল নেহরু ছিলেন ভারতের ব্রিটিশবিরোধী শীর্ষ স্বাধীনতাসংগ্রামীদের একজন এবং পরে মহাত্মা গান্ধীর বন্ধু ও সহকর্মী। নেহরু যদি প্রধানমন্ত্রী নাও হতেন, ছিলেন একজন বিশ্বমানের বুদ্ধিজীবী। ফিরোজ খান নূন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরও ছিলেন পঞ্চাশের দশকে। ভিকারুননিসা ছিলেন একজন সমাজকর্মী। বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় তিনি গভর্নর হাউসে বসে থাকতেন না। বাঙালি নারীনেত্রীদের সঙ্গে মিশে তিনি বহু কাজ করেছেন নারীর উন্নতির জন্য। বাংলার চিত্রশিল্পীদের ভিকারুননিসা পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। ঢাকায় সেকালে একটি চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজকও ছিলেন। বেইলি রোডের ভিকারুননিসা নূন স্কুলটি তাঁরই প্রতিষ্ঠিত ও তাঁর নামে।
স্যার ফিরোজ খান তাঁর এক স্মৃতিকথায় লিখেছেন, জওহরলাল ভিকারের জুতা কুড়িয়ে ওর পায়ে পরিয়ে দিতে গিয়ে কোনো বিপদে পড়েননি। প্রশংসিত হয়েছেন। কিন্তু ব্যাপারটা যদি বিপরীত হতো? নেহরু পিন্ডি আসতেন। বেগম নেহরুর বা তাঁর কন্যা ইন্দিরার জুতা আমি তাঁদের পায়ে পরিয়ে দিতাম? পাকিস্তানের নেতারা আমাকে ছিঁড়ে ফেলত।
বছর খানেকের মতো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ফিরোজ খান নূন। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর তাঁকে সরিয়ে দিয়ে জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেন। পরে আইয়ুব তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেছেন, আমার দুঃখ যে একজন ভালো মানুষের কাছ থেকে আমাকে ক্ষমতা নিতে হয়।
প্রতিপক্ষ বা বিপরীত চিন্তার মানুষকে অসুন্দর ভাষায় নিন্দা বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মধ্যে কিছুমাত্র বাহাদুরি নেই। তা করে কোনো লাভ হয় না। বরং একজন সম্মান্য ব্যক্তির সম্মান রক্ষা করাই একজন সম্মানিত ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের বৈশিষ্ট্য।
পশ্চিমবঙ্গের দলমত-নির্বিশেষে সব মিডিয়াই খালেদা জিয়ার প্রতি বিরূপ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসিমা রাওয়ের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভারত সফরে গিয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের কোনো কোনো কাগজ লিখল, তিনি ভালো ইংরেজি জানেন না, ভারতের নেতাদের সঙ্গে কী আলোচনা করবেন? দিল্লি থেকে ফেরার পথে খালেদা জিয়া কলকাতায় ঘণ্টা খানেক যাত্রাবিরতি করেন। মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বিমানবন্দরে গিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা ২০ মিনিট একান্তে কথা বলেন। বৈঠকের পর সাংবাদিকেরা জ্যোতি বসুকে ঘিরে ধরেন। তাঁরা জানতে চান, ‘কী কথা কইলেন? বাংলায়ই তো কইলেন? উনি তো ইংরেজি জানেন না।’ জ্যোতি বসু ছিলেন মুরব্বিস্থানীয় নেতা। তিনি ধমক দেন, ‘কী সব বাজে কথা বলো। তাঁর সঙ্গে তো আমার ইংরেজিতেই কথাবার্তা হলো। ভালোই ইংরেজি বলেন।’ এক বিখ্যাত দৈনিকের সাংবাদিক চুপ হয়ে যান। ওই দিন আমি কলকাতার কাছেই বারাকপুর গান্ধী ভবনে ছিলাম।
আদব-কায়দা, ভদ্রতা, সৌজন্য-শালীনতা প্রভৃতি মানবিক গুণ পেশা ও স্থান-কাল-পাত্রনির্বিশেষে সবার জন্যই এক। একজন অধ্যাপক, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, স্থপতি, ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, লেখক-কলামিস্ট-অভিনেতার জন্য একরকম আর একজন রাজনৈতিক নেতার জন্য অন্য রকম নয়। একজন ডাক্তার বা স্থপতি আরেকজন ডাক্তার বা স্থপতিকে, যিনি তাঁর পেশাগত প্রতিপক্ষ, তাঁকে অসুন্দর বা কুরুচিপূর্ণ ভাষায় নিন্দা করেন না। রাজনীতির বিতর্ক কিছুটা কড়াই হয়। কিন্তু তার মাত্রা কতটা? একজন রাজনীতিককে তাঁর প্রতিপক্ষকে অথবা ভিন্নমতাবলম্বীকে অশালীন ভাষায় গালমন্দ করার অধিকার কে দিয়েছে?
সন্তোষের এক বৃদ্ধ নেতাকে তালের টুপি মাথায় দিয়ে পল্টন ময়দানের জনসভায় বলতে শুনেছি, ‘ফেরেশতারা যদি আমার কাছে আসিয়া বলে তোমারে জান্নাতুল ফেরদৌসে (সর্বোচ্চ বেহেশত) নিয়া যাইতেছি, তবে ওই বেহেশতে আমেরিকার সরকারের দুই-একজন আছে, আমি তাদের বলব, ওই বেহেশতে আমি যাব না, যাব না, যাব না।’ মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির আমরাও অবিচল বিরোধী। কিন্তু সে দেশের কোনো রাষ্ট্রদূতকে আমার বাড়ির কাজের মেয়ের সঙ্গে তুলনা করা খুবই অনুচিত। তা ছাড়া, ওই কথায় রাষ্ট্রদূত মজীনা নন, মারাত্মক অপমান করা হয়েছে মর্জিনা নামের গৃহকর্মীকে শুধু নয়, মর্জিনা নামের দেশের সব নারীকে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত সে দেশের কোনো জুনিয়র মন্ত্রী দেখতে যদি রূপসী নাও হন, তা বলতে নেই এবং তাঁকে দু-আনার মন্ত্রী বলে তাচ্ছিল্য করা খুবই অশোভন।
এবং নিশা দেশাইয়ের পর্যায়ের কর্মকর্তার সঙ্গে বর্তমান সরকারের নেতারা অতীতে বহুবার বৈঠক করেছেন। নিশা দেশাই সম্পর্কে যে মন্তব্য করা হয়েছে, তা সাম্প্রদায়িকতাদুষ্ট ও বর্ণবাদী। বর্ণবাদ সারা বিশ্বে ধিক্কৃত।
খালেদা জিয়ার ছেলের মৃত্যুর পরে শেখ হাসিনা অবরুদ্ধ খালেদা জিয়ার গুলশানের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ক্ষমতাসীন দলের প্রধান শুধু নন, দেশের প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী একটি প্রতিষ্ঠান। সংবাদমাধ্যম থেকে জানলাম, প্রধানমন্ত্রী যখন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের সামনে যান, তখন ওই ভবনের ভেতরে দলের সিনিয়র নেতারা কেউ কেউ ছিলেন। তাঁরা বেরিয়ে এসে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ভেতরে নিয়ে বসাতে পারতেন। এবং সেটাই করা ছিল তাঁদের ১০০ ভাগ সামাজিক ও দলীয় দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অসৌজন্য দেখিয়ে বিএনপির নেতারা এবং খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা অত্যন্ত নীচুতার পরিচয় দিয়েছেন। কাজটির জন্য ধিক্কার জানাই।
বিএনপির চেয়ারপারসন সভা-সমাবেশ করার অনুমতি না পেয়ে লাগাতার অবরোধ-হরতালের ডাক দিয়েছেন। ওই কর্মসূচিতে মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। মরছে মানুষ হানাহানিতে। অনেকে পেট্রলবোমায় পুড়ে। কেউ ক্রসফায়ার বা এনকাউন্টারে। আর দেরি না করে দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার আকুতি দেশবাসীর। খালেদা জিয়াকে কঠোর সমালোচনা করার অধিকার শুধু সরকারি দলের নয়, যেকোনো নাগরিকের আছে। কিন্তু সমালোচনার যে বাহন, সেই ভাষা ব্যবহারেরও একটা সীমা আছে। সমালোচনা ও পাল্টা সমালোচনা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির রীতি। অসুন্দর ভাষায় কাউকে গালাগাল দেওয়া আর গায়ে হাত তোলার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
অর্থমন্ত্রী গাজীপুরে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, খালেদা স্টুপিড মহিলা, দেশ ধ্বংস করতে চায়। অন্যান্য নেতার ভাষাও খুবই কটু। ছেলেমেয়েরা যদি তাদের চাচা-মামা-ফুফু-খালাকে স্টুপিড বলে, তাদের দোষ দেওয়া যাবে না।
বর্তমানে দেশে যে একটি অস্বাভাবিক অবস্থা চলছে, তা কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁর অবসান চাইছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাব্যবস্থা—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটা মীমাংসায় পৌঁছানো দরকার। আগেও এ–জাতীয় রাজনৈতিক সংঘাত-সংকটে বুদ্ধিজীবী নাগরিক সমাজ যা-ই বলা হোক—অনেকে উদ্যোগ নিয়েছেন। এবারও কয়েকজন নাগরিক রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির নেত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন আলোচনার মাধ্যমে দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। যাঁরা ওই আবেদন করেছেন, তাঁদের ঢাল-তলোয়ার কিছুই নেই। তাঁরা যদি গভীর রাতে বন-জঙ্গলে গিয়ে বা গোপন আস্তানায় বসে কোনো ষড়যন্ত্র পাকিয়ে থাকেন, সংঘবদ্ধভাবে অথবা ব্যক্তিগতভাবে কেউ, গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে সরকার। কিন্তু যে ভাষায় গালাগাল দেওয়া হচ্ছে, তা খুবই দুঃখজনক। আমাদের সমাজটা ছোট। অনেকের সঙ্গেই অনেকের ব্যক্তিগত সম্পর্ক। অনবরতই দেখা হয়ে থাকে। সৌজন্য দূরে থাক, ন্যূনতম চক্ষুলজ্জা থাকবে না—তা কি হয়!
আমি যদি সরকারের পরামর্শদাতা হতাম, হতভাগ্য নাগরিকদের ওই উদ্যোগের কথা শুনে বলতাম: বেশ তো, আপনারা বলছেন, দেখি কী হয়। দরখাস্ত দিয়ে যান। অথবা বলতাম: আপনাদের প্রস্তাব এই-এই কারণে গ্রহণযোগ্য নয়। ল্যাঠা চুকে যেত। কিন্তু এভাবে বিষাক্ত বাণ নিক্ষেপ, তাতে নাগরিক উদ্যোক্তাদের যা-ই হোক, দেশের মানুষ কী ভাবছে? এ করে কী লাভ?
বাঙালির অন্যকে অপমান করার প্রতিভা সীমাহীন। কঠোর সমালোচনাও ভদ্র ভাষায় করা যায়। রাজনৈতিক নেতাদের পরামর্শ দেওয়া তো দূরের কথা, অনুরোধ করাও অপরাধ ও ধৃষ্টতার মধ্যে পড়ে। তবু করজোড়ে মিনতি করব, মানুষকে কম অপমান করুন। মানুষ আপনাদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দেবে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

বিশ্বের শীর্ষ ধনী পুতিন?

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিন বিশ্বের শীর্ষ ধনী বলে দাবি করেছেন হেজ ফান্ড ম্যানেজার বিল ব্রাউডার। এক সময় রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বিদেশী বিনিয়োগকারী ব্রাউডার বলেন, পুতিন প্রায় ২০,০০০ কোটি ডলারের (১৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা) সম্পদের মালিক। এটা সত্য হলে পুতিন হবেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ধনী। সিএনএনের অনুষ্ঠানে ফরিদ জাকারিয়া ব্রাউডারকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘পুতিনের আনুমানিক সম্পদ কত? জবাবে ব্রাউডার বলেন, ‘আমার মনে হয় তা ২০০ বিলিয়ন ডলার হবে।’ বিশ্বের সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি ধরা হয় বিল গেটসকে, যার সম্পদের পরিমাণ ৭৯ বিলিয়ন ডলারের মতো। সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা পুতিন ১৪ বছর ধরে রাশিয়ার ক্ষমতায় রয়েছেন।
১৯৯৯ সালের আগস্টে তিনি রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী এবং ২০০০ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ব্রাউডার জানান, স্কুল, সড়ক এবং হাসপাতাল নির্মাণ না করে পুতিন এসব সম্পদ সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত রেখেছেন এবং শেয়ার ও অন্যান্য ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন। ব্রাউডার বলেন, ক্ষমতার প্রথম ১০ বছরেই পুতিন যতটা পারা যায় রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি করেছেন। ২০০০ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল গড়ে প্রায় ৭ শতাংশ। এ সময় জিডিপির আকার ছয়গুণ বেড়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে রাশিয়ার অর্থনীতিতে তখন রমরমা অবস্থা বিরাজ করছিল। অর্থনৈতিক উন্নতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পুতিন তার ক্ষমতাকে সংহত করেছেন এবং নতুন কোটারি গোষ্ঠী তৈরি করেছেন, যারা পুতিনের প্রতি অনুগত। বিজনেস ইসনাইডার।

ভেড়াবর্ষ

বেইজিংয়ে একটি শপিং মলের সামনে নির্মিত দৈত্যাকৃতির ভেড়ার ভাস্কর্যের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন কয়েকজন চীনা নাগরিক। এবার চীনের আসন্ন সৌরবর্ষের প্রতীক ভেড়া নাকি ছাগল হবে তা এখনো নির্দিষ্ট হয়নি। তবে ভেড়ার পক্ষে প্রচারণা বেশি। আগামী ১৯ ফেব্র“য়ারি এই নতুন বর্ষ শুরু হবে। সোমবার তোলা ছবি এএফপি

‘বর্তমান সঙ্কটের মূলে অনির্বাচিত সরকার’ -ইইউ প্রতিনিধি দলকে বিএনপি

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেছেন বাংলাদেশ সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দল। বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠক হয়। বর্তমান সরকারের নানা অনিয়ম, রাজনৈতিক জটিলতা সৃষ্টিকারী একতরফা পদক্ষেপ, ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দমন-পীড়ন, বিভিন্ন সহিংস কর্মকা- ও বিরোধী গণতান্ত্রিক রাজনীতি চর্চায় প্রতিবন্ধকতার কথা বৈঠকে তুলে ধরেন খালেদা জিয়া। এ সময় সরকারের নানা কর্মকা- ও বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর নির্মমতার সচিত্র প্রতিবেদনসহ ভিডিও ফুটেজ ও দালিলিক তথ্য-উপাত্ত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধি দলের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেই সঙ্গে চলমান আন্দোলনে সহিংসতার ব্যাপারে সরকারের তরফে বিএনপিকে দায়ী করা হলেও এসব ঘটনায় সরকারি দলের লোকজনের সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে নানা তথ্যও তাদের কাছে দেয়া হয়। পরে বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেল জানান, বৈঠকে মানবাধিকার, শ্রম অধিকার ও চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে।
বৈঠক সূত্র জানায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দল আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছাতে বিএনপির ইতিবাচক মনোভাবের জন্য স্বস্তি প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে নাশকতামূলক কার্যকলাপে না জড়ানোর জন্যও বিএনপির প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রতিনিধি দলটি বিভিন্ন বিষয়ে বিএনপির অবস্থান জানতে চেয়েছে।
ওদিকে সূত্রে জানা গেছেÑ বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান সঙ্কটের মূলে হচ্ছে অনির্বাচিত সরকার। এর সমাধানের পথ হচ্ছেÑ একটি জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই এ সঙ্কট সমাধান হতে হবে। আমরা যে কোন সময় আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। কিন্তু এ সরকার আলোচনায় বসতে রাজি নয়। চলমান সহিংসতা সম্পর্কে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, বিরোধী দলের সঙ্গে এ সহিংসতার কোন সম্পর্ক নেই। যে নাশকতা চলছে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচার করা হোক। কিন্তু সরকার সেটা করছে না। কারণ সরকারের ভয় সুষ্ঠু তদন্ত হলে তাদের লোকজনেরই নাম বেরিয়ে আসবে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনায় সরকারি দলের অঙ্গ সংগঠন যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ধরা পড়ছে। আমাদের আন্দোলনকে কলুষিত করতেই সরকার নিজেদের লোক দিয়ে এসব সহিংসতা ঘটাচ্ছে। আমরা প্রতিদিনই এ সহিংস ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছি। আমরা কোনদিনই এ রকম সহিংসতা করার নির্দেশনা আমাদের নেতাকর্মীদের দিইনি। সরকার সুষ্ঠু তদন্ত না করে উল্টো সহিংসতার অভিযোগে পাইকারিভাবে বিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করছে, নির্যাতন করছে। ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করছে। যা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। নিজেদের লোকজনের নাম বেরিয়ে আসার ভয়ে সরকার ২০১৩ সালের সহিংস ঘটনারও তদন্ত করেনি। ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকার বিষয়ক উপকমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্রিশ্চিয়ান দান প্রেদা (রুমানিয়ান)’র নেতৃত্বে বৈঠকে অংশ নেয়া প্রতিনিধি দলের সদস্যরা হলেনÑ ক্যারল ক্রাসকি (পোল্যান্ড), ইয়োসেফ ভেইডেনহোলজার (অস্ট্রিয়া), ব্রিজিটি বাটেইলি, মার্সিন গাসিক ও লেভেন্তে সাসি। এছাড়া পার্লামেন্টের তিন কর্মকর্তাও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির পক্ষে খালেদা জিয়া ছাড়াও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক আইজিপি এমএ কাইয়ুম বৈঠকে অংশ নেন। সূত্র জানায়, বৈঠকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সুনির্দিষ্ট দাবি এবং আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, বিচার বহির্ভূত হত্যাকা-ের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে একটি প্রস্তাব উত্থাপন হয়েছে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এই প্রতিনিধি দলটি সরজমিনে পরিস্থিতি দেখতে বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। এদিকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের পতাকাবাহী গাড়িতে করে প্রতিনিধি দলটি কার্যালয়ে যান। ফটকের সামনে গাড়ি থেকে নেমে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা হেঁটে ওই কার্যালয়ে ঢোকেন। ফটক দিয়ে ঢোকার পর তাদের অভ্যর্থনা জানান বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। তিনি প্রতিনিধি দলের সদস্যদের কার্যালয়ের দোতলায় খালেদা জিয়ার বৈঠক কক্ষে নিয়ে যান। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধি দল পৌঁছার ঘণ্টা খানেক আগে চেয়ারপারসন কার্যালয়ে যান বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। বিএনপি চেয়ারপারসনের ওই কার্যালয়ে ঢোকা-বের হওয়া নিয়ন্ত্রণ করছে পুলিশের বিশেষ শাখার সদস্যরা। নজরুল ইসলাম খান এসবি সদস্যদের কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে কার্যালয়ে ঢোকেন। প্রসঙ্গত, নিজ কার্যালয়ে দেড় মাস ধরে প্রথমে অবরুদ্ধ ও পরে কৌশলগত অবস্থান করছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এমন পরিস্থিতিতে দেড় মাসের মাথায় কয়েকদিন আগে প্রথম কূটনীতিক হিসেবে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে গিয়ে তার সঙ্গে বৈঠক করেন যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন।
কলা-রুটিও ফিরিয়ে দিলো পুলিশ
অবরুদ্ধ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে কলা-রুটিও নিতে দেয়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গতকাল দুপুরে দু’দফা খাবার ফিরিয়ে দেয় তারা। কার্যালয়ে খাবার প্রবেশে বাধা দেয়ায় গত ৭ দিন ধরে খাবার সঙ্কটে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন কয়েকজন নেতাসহ কার্যালয়ে অবস্থানরত অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। গতকাল বেলা ২টার দিকে একটি রিকশাযোগে ৩০ প্যাকেট খাবার কার্যালয়ের উত্তরদিক দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করানো হয়। এসময় ৮৬ নম্বর সড়কের প্রবেশমুখেই রিকশাটি আটকে দেয় পুলিশ। খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের জন্য ওই খাবার আনা হয়েছেÑবলা হলে রিকশাচালককে ফিরিয়ে দেয় তারা। এরপর বেলা পৌনে তিনটার দিকে খালেদা জিয়ার জন্য কিছু শুকনা খাবার নিয়ে আসেন সিএনজিচালক নূরুজ্জামান। শুকনা খাবারের মধ্যে ছিলÑ চিড়া, গুড়, ২ বোতল পানি, ৪ প্যাকেট রুটি ও ৪ হালি কলা। তবে তাকে কার্যালয়ের প্রবেশ করতে দেয়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। মিনিট পাঁচেক পর চলে যান তিনি। এসময় সাংবাদিকদের কাছে নূরুজ্জামান বলেন, তার বাড়ি শরীয়তপুরের গজারিয়া থানায়। ঢাকার কেরানীগঞ্জে থেকে সিএনজি চালান তিনি। খালেদা জিয়ার জন্য ওই খাবার নিয়ে এসেছিলেন বলে দাবি করেন ওই সিএনজিচালক। এদিকে সকাল ১১টার দিকে খালেদা জিয়ার কার্যালয় ঘেরাও করতে এসেছিলেন আওয়ামী লীগপন্থি মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদের শতাধিক নেতাকর্মী। তবে পুলিশ তাদের গুলশান-২ নম্বর গোলচত্বরেই আটকে দেয়। পুলিশি বাধা পেয়ে সেখানেই তারা অবস্থান নিয়ে সমাবেশ করেন। ঘণ্টাখানেক অবস্থান করে চলে যান তারা। এরপর বেলা পৌনে ১২টার দিকে খালেদা জিয়ার কার্যালয় ঘেরাও করতে ঝাড়– মিছিল নিয়ে আসেন মহিলা লীগের একদল কর্মী। তাদের গুলশান-২ নম্বর গোলচত্বরে আটকে দেয়। কিছুক্ষণ অবস্থানের পর তারা চলে যান।
১১ই ফেব্রুয়ারি রাত থেকে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে খাবার প্রবেশ দেয়নি পুলিশ। তবে খালেদা জিয়ার জন্য তার স্বজনদের আনা খাবার প্রবেশ করতে বাধা দেয়া হয়নি। ওদিকে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে খাবার নিতে বাধা দেয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন ‘ইউনিভার্সিটি টিচার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা। কার্যালয়ে খাবার প্রবেশে বাধা দেয়াকে মানবতাবিরোধী কাজ বলে উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, বিভিন্ন গণমাধ্যমের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে খাবার সরবরাহে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক বাধা দেয়া হচ্ছে। বিগত কয়েকদিন ধরে কার্যালয়ে অবস্থানরত স্টাফ, নিরাপত্তা কর্মীসহ নেতাকর্মীরা না খেয়ে মানবতের জীবনযাপন করছেন।

মধ্যবর্তী নির্বাচন ও সংবিধান by ইকতেদার আহমেদ

সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় সংসদের মেয়াদ অবসান-পরবর্তী অথবা মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে নির্বাচন আয়োজন একটি স্বীকৃত ব্যবস্থা। সংসদের মেয়াদ অবসানের কারণে যে নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়, সেটি নির্ধারিত নিয়মমাফিক নির্বাচন। আর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে অনুষ্ঠিত হয় অনির্ধারিত নির্বাচন। এরূপ অনির্ধারিত নির্বাচনকে মধ্যবর্তী নির্বাচন বলা হয়।
১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে আমাদের সংবিধান প্রণয়নের মধ্য দিয়ে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা চালু হয়। এ সরকারব্যবস্থাটি ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ পর্যন্ত চালু থাকে। ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থার বিলোপ করে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা চালু করা হয়। রাষ্ট্রপতিশাসিত এ সরকারব্যবস্থা ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৯১ পর্যন্ত চালু থাকে। ওই তারিখে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আবার সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা চালু করা হয়। জাতীয় সংসদের নির্বাচন বিষয়ে ৭২-এর সংবিধানে উল্লেখ ছিল মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এবং মেয়াদ অবসানের আগে অন্য কারণে সংসদ ভেঙে গেলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা চালু করা হলেও সে সংশোধনী দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিধানে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। এরপর ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ সংসদে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করা হয়, তাতে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে পরিবর্তন আনা হয়। পরিবর্তিত বিধানে বলা হয়, মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসানের আগে অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন বিষয়ে এ বিধানটি নবম সংসদ নির্বাচনে কার্যকর থাকে। নবম সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান রহিত করলে ২০১১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে পুনঃজাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে ৭২-এর সংবিধানে উল্লিখিত বিধান প্রবর্তিত হয়। অর্থাৎ মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এবং মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
প্রথম সংসদ নির্বাচন থেকে ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত এ ছয়টি সংসদের কোনোটি মেয়াদ পূর্ণ করতে না পারায় দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ এ পাঁচটি নির্বাচন সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। সুতরাং এ পাঁচটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের বেলায় মেয়াদ অবসানের আগে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজন হয়নি। এরপর সপ্তম, অষ্টম ও নবম এ তিনটি নির্বাচনের মধ্যে প্রথম দুইটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এবং শেষটি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ায় এ তিনটি সংসদ মেয়াদ পূর্ণ করায় এবং এ তিনটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে মেয়াদ অবসান বা মেয়াদ অবসানের আগে অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান কার্যকর থাকায় ওই তিনটি নির্বাচনের সময় সংসদের মেয়াদ অবসান হয়েছে কি হয়নি, সে প্রশ্নটি অপ্রাসঙ্গিক ছিল।
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর গত বছর ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনটি এ দেশের ইতিহাসে সংসদ বহাল থাকাবস্থায় ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনটি সংসদ বহাল রেখে এবং দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ায় প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ এর জোটভুক্ত ২০ দল এবং অপরাপর কিছু দল যেমন গণফোরাম, সিপিবি, বিকল্প ধারা বাংলাদেশ, কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগ প্রভৃতি এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। তা ছাড়া এ নির্বাচন জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের জন্য উন্মুক্ত ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। অবশিষ্ট যে ১৪৭টি আসনে ভোট হয়, তাতে ভোটার উপস্থিতি ছিল খুবই নগণ্য। এ নির্বাচন ভারত ও ভুটানের চারজন পর্যবেক্ষক ছাড়া অন্যান্য দেশের কোনো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক পর্যবেক্ষণ করেনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও দেশের মানুষের কাছে এ নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ। আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষপর্যায়ের নেতার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল নেহাত সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার জন্য এ নির্বাচন আয়োজন করা হয়েছে এবং নির্বাচন অনুষ্ঠান-পরবর্তী অচিরেই সব দলের অংশ নেয়ার ভিত্তিতে একাদশ সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।
দশম সংসদ নির্বাচনটি প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও এর নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটভুক্ত দল এবং আরো কিছু দল শুধু বর্জনই করেনি, প্রতিহতেরও হুমকি দিয়েছিল। দেশের বেশির ভাগ দলের বর্জন ও প্রতিহতের মুখে যেভাবে বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্র ভোটারশূন্য ছিল, তাতে গণতন্ত্রের মাপকাঠিতে এটিকে কোনোভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন বলার অবকাশ নেই। দশম সংসদ নির্বাচনের সময় বিরোধী দলগুলোর হরতাল ও অবরোধের ডাকে দেশব্যাপী যে সহিংস অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টির হরতাল ও অবরোধের আহ্বানে দেশব্যাপী অনুরূপ সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। ষষ্ঠ ও দশম সংসদ নির্বাচন এ দু’টি নির্বাচনই একতরফা ও ভোটারবিহীনভাবে অনুষ্ঠিত হয়। এ দু’টি নির্বাচনের মধ্যে পার্থক্য প্রথমটি অনুষ্ঠিত হওয়ার এক মাসের মধ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ষষ্ঠ সংসদে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস করে সে সংসদের অবলুপ্তি ঘটিয়ে সব দলের অংশগ্রহণে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন সপ্তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ সুগম করেন। সে সময় বেগম খালেদা জিয়া তার দল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিষয়ে অনীহ হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন বিরোধী দলের দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়ে দেশকে অস্থিতিশীলতা ও নৈরাজ্য থেকে রক্ষার জন্য সংসদে একতরফাভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করেছিলেন। দশম সংসদ নির্বাচনের পর দেশবাসী প্রত্যাশা করেছিল যে আওয়ামী লীগ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহানুভবতার বশবর্তী হয়ে দ্রুত সব দলের অংশগ্রহণে একাদশ সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী দেখা গেল আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ দশম সংসদের মেয়াদ অবসান পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে অনড়।
দশম সংসদের মেয়াদ এক বছর পূর্ণ হওয়ার দিন ছিল গত ৫ জানুয়ারি। ওই দিন আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র রক্ষা দিবস এবং বিএনপিসহ এর জোটভুক্ত দলগুলো গণতন্ত্র হত্যা দিবস পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। উভয় দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির ফলে দেশব্যাপী পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে পড়ে এবং সারা দেশ বিরোধী দলের অবরোধ ও হরতালের কবলে পড়ে। বিরোধী দলের অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচি এখনো অব্যাহত আছে। ফলে এরই মধ্যে সহিংসতায় জান ও মালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তথাকথিত ক্রসফায়ারে বেশ কিছু মৃত্যুর ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এসব মৃত্যুতে যাদের প্রাণ গেছে তারা সাধারণ জনমানুষ ও বিরোধী দলের নেতাকর্মী।
আমাদের দেশে এ পর্যন্ত দলীয় সরকারের অধীনে যত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এর প্রতিটিতেই ক্ষমতাসীন দল বিজয়ী হয়েছে। অপর দিকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে চারটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে সে চারটিতে বিরোধী দল বিজয়ী হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে আমাদের ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দল একের প্রতি অপরে আস্থাশীল নয়। এ আস্থাহীনতার কারণে কোন ধরনের সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আমরা এখনো স্থায়ীভাবে এ বিষয়টি সুরাহা করতে পারিনি। এ কারণেই যে বারবার আমাদের অসহনীয় সহিংস পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
দশম সংসদ নির্বাচনটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক না হওয়া সত্ত্বেও সরকারি দল মনে করছে নির্ধারিত মেয়াদের পর ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরা আরো যুক্তি দেখিয়ে বলেন, আমাদের সংবিধানে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোনো বিধান নেই। তাদের এ যুক্তি যে অমূলক তা সংবিধানের বিধানাবলি পর্যালোচনা থেকে স্পষ্টত প্রতিভাত।
সংসদের মেয়াদ বিষয়ে সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে, রাষ্ট্রপতি আগে ভেঙে না দিয়ে থাকলে প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে পাঁচ বছর অতিবাহিত হলে সংসদ ভেঙে যাবে। সংবিধানের এ বিধানটি দিয়ে একটি সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে সংবিধানের বর্তমান বিধান অর্থাৎ মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিন আগে এবং মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং আগেকার বিধান মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধানের আগেকার বিধান ও বর্তমান বিধান বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, উভয় বিধানে মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। নির্ধারিত মেয়াদের আগে অর্থাৎ পাঁচ বছর পূর্ণ করার আগে যেকোনো জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সেটিই মধ্যবর্তী নির্বাচন। সংসদের দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠÑ এ পাঁচটি নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে সংবিধানে বর্তমানে যে বিধান আছে সে বিধান কার্যকর ছিল। সুতরাং একই বিধানের অধীন সংসদের পাঁচটি মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টি সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত। সঙ্গত কারণেই অনেকের মনে প্রশ্ন উদয় হতে পারে আমাদের সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারালে পদত্যাগ করবেন অথবা সংসদ ভেঙে দেয়ার জন্য লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দেবেন। এ বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন থাকাকালীন তিনি কী করে রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভেঙে দেয়ার জন্য পরামর্শ দেবেন? এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ষষ্ঠ সংসদ ভেঙে দেয়াটি প্রণিধানযোগ্য। তা ছাড়া আমাদের অবশ্যই বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিতে আমাদের এ সংবিধান রচিত হয়েছে। দেশের বর্তমান বিরাজমান পরিস্থিতিতে জনগণের অভিপ্রায় বিষয়ে গণভোটের আয়োজন করা হলে দেশের বর্তমান সহিংস পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মধ্যবর্তী নির্বাচনের সপক্ষে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পড়বে এ বিষয়ে বোধকরি দ্বিমত পোষণের কোনো অবকাশ নেই। প্রশ্ন উঠতে পারে সংবিধানে তো বর্তমানে গণভোটের বিধান নেই।
সংবিধানে এর উত্তর খুঁজতে গেলে বলতে হয় সংবিধানে যখন গণভোটের বিধান ছিল সেটি সংবিধানের প্রস্তাবনাসহ কিছু অনুচ্ছেদ সংশোধনসংক্রান্ত। আর তাই মধ্যবর্তী নির্বাচন বিষয়ে জনগণের অবস্থান পক্ষে নাকি বিপক্ষে গণভোটের মাধ্যমে তা জানার জন্য সংবিধান কোনোভাইে অন্তরায় নয়। আমাদের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম সংসদ নির্বাচন মেয়াদ অবসানের আগে অনুষ্ঠিত হওয়ায় এ চারটি নির্বাচনও মধ্যবর্তী নির্বাচন ছিল। যদিও সে সময় রাষ্ট্রতিশাসিত সরকারব্যবস্থা ছিল তা সত্ত্বেও সরকারব্যবস্থার ভিন্নতা এতদবিষয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে অভিন্ন হওয়ায় তা কোনোভাইে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানকে ক্ষুণœ করে না। আর তাই দেশবাসীর প্রত্যাশা যেকোনো ধরনের খোঁড়া যুক্তি দিয়ে সংবিধান দিয়ে প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত নিয়মের ব্যত্যয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে কোনো ধরনের অন্তরায় সৃষ্টি না করাই কাম্য।
লেখক : সাবেক জজ; সংবিধান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com

রাঙ্গামাটি থেকে পাচার হচ্ছে ভারতীয় কাঠ by সুশীল প্রসাদ চাকমা

রাঙ্গামাটি থেকে পাচার হচ্ছে ভারতীয় সেগুনসহ বিভিন্ন প্রজাতের মূল্যবান কাঠ। পাচারের কৌশল হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে স্থানীয় জোতবাগানের অনুকূলে ইস্যুকৃত ফ্রি পারমিটগুলো। এসব ফ্রি পারমিটের আড়ালে মূলত পাচার করা হচ্ছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের মিজোরাম থেকে চোরাই পথে আনা বিপুল পরিমাণ কাঠ। তবে বিষয়টির ব্যাপারে জানা নেই বলে দাবি করেছেন বন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। অথচ পাচারকালে অনেক সময় বিপুল পরিমাণ কাঠ আটকও করছে বন বিভাগ। পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগ সূত্র জানায়, গত বছর প্রায় দেড় কোটি টাকার কাঠ আটক করেছে তারা। কিন্তু আটক কাঠগুলো স্থানীয় জোতবাগানের বলে দাবি করা হয়েছে। রাঙ্গামাটি রুট দিয়ে ভারতীয় কাঠ পাচার হয়ে আসার বিষয়ে জানতে ফোনে যোগাযোগ করলে বন বিভাগের রাঙ্গামাটি সার্কেলের বনসংরক্ষক মো. আবু হানিফ পাটোয়ারী বিষয়টি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা রেঞ্জের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা বলেন। এ ব্যাপারে পার্বত্য চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. সামসুল আজমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলে ব্যস্ত আছেন উল্লেখ করে পরে ফোন করবেন বলে জানান তিনি। এছাড়া পাচারে কিছুসংখ্যক কাঠচোর, অসাধু কাঠ ব্যবসায়ী ও বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট রেঞ্জের বন কর্মীরা জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেলেও তা অস্বীকার করে বিষয়টি সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন বন বিভাগের বরকল রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুর রকিব সরকার। তিনি তার রেঞ্জের অধীন রাঙ্গামাটির রুট দিয়ে ভারতীয় কাঠ পাচার হয়ে আসার ব্যাপারে জানা নেই বলে জানান। স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানায়, স্থানীয় বিভিন্ন জোতবাগানের মালিকের নামে নির্ধারিত অংকের পার্সেন্টেজ নিয়ে ফ্রি পারমিট ইস্যু করে বন বিভাগের বরকল রেঞ্জ। অনেক জোতবাগানে অল্প পরিমাণ কাঠ থাকলেও প্রতি পারমিটে দেখানো হয় হাজার হাজার ঘনফুট। কিন্তু বাস্তবে সেসব পরিমাণের অংক কেবল কাগজে। যত বেশি পরিমাণ দেখানো যায় রেঞ্জ কর্মকর্তা-বন কর্মীদের তত লাভ। কারণ পার্সেন্টেজ আদায় করা হয়ে থাকে প্রতি ঘনফুট হিসাবে। আর ডি-ফর্ম থেকে শুরু করে টিপি (ট্রান্সফার পাস) পর্যন্ত প্রতি ঘনফুট (সেগুন) ৮০ টাকা এবং অন্যান্য ৫০ টাকা হারে পার্সেন্টেজ আদায় করে সংশ্লিষ্ট রেঞ্জের কর্মকর্তা-কর্মীরা। এতে প্রতি পারমিটে লাখ লাখ টাকা আয় হয় তাদের। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে রাঙ্গামাটি থেকে প্রতিদিন পাচার হচ্ছে ভারত থেকে আনা প্রচুর কাঠ। এসব বিদেশী কাঠ চোরাই পথে পাচার হয়ে আসছে রাঙ্গামাটি জেলার বরকলের সীমান্তবর্তী এলাকা ঠেগামুখ, বড়হরিণা ও ছোটহরিণা নৌরুট দিয়ে। ভারতের মিজোরাম থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করান হচ্ছে চোরাই কাঠগুলো। সূত্রমতে, বাংলাদেশে পর্যাপ্ত সীমান্ত চৌকি না থাকায় রাতের আঁধারে বাঁশের চালি করে প্রতিনিয়ত বিদেশী চোরাই কাঠ বাংলাদেশে প্রবেশ করাচ্ছে উভয় দেশের সংঘবদ্ধ একাধিক চোরাকারবারি চক্র। এরপর চোরাই পথে আনা বিদেশী কাঠগুলো স্থানীয় বিভিন্ন জোতবাগানের মালিকের নামে ইস্যুকৃত ফ্রি পারমিটের আড়ালে অভিনব কায়দায় পাচার হয়ে আসে। সেগুলো দেশীয় ইঞ্জিনবোটযোগে বরকল ও হরিণা নৌরুট দিয়ে আনা হয় সরাসরি রাঙ্গামাটি ও কাপ্তাই সদরে। সেখান থেকেই পাচার হয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। এদিকে পাচার রোধে বন বিভাগের টহল দল ও নিরাপত্তাবাহিনীর তৎপরতা থাকলেও জোত পারমিটের আড়ালে পরিবহন করায় বিদেশী কাঠগুলো চেনার কোনো উপায়ই থাকে না বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট বন কর্মকর্তারা। ফলে বৈধ কাগজপত্রমূলে প্রচুর বিদেশী কাঠ পাচার হয়ে গেলেও সেগুলো আটক করা সম্ভব হয় না। যেগুলোর সঠিক কাগজপত্র থাকে না কেবল সেসব কাঠ আটকের সুযোগ থাকে বন বিভাগের।এদিকে সংশ্লিষ্টদের মতে, ভারতের মিজোরাম থেকে পাচার হয়ে আসা সেগুন কাঠগুলো অতি উত্তম মানের। সেজন্য এদেশীয় কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছে কাঠগুলোর কদর বেশি। অন্যদিকে ভারতের দুর্গম মিজোরামে সেগুন কাঠের মূল্য একেবারে কম। কিন্তু বাংলাদেশে পাচার করে বিক্রি করতে পারলে পাওয়া যায় সেদেশের চেয়ে অনেকগুণ বেশি দাম। তাই পাচারকারী চক্র প্রতিনিয়ত অবৈধভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করাচ্ছে প্রচুর ভারতীয় সেগুন কাঠ।

আনোয়ারা–বাঁশখালী–চকরিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক- দুই পাশে হাজারো অবৈধ স্থাপনা by আব্দুল কুদ্দুস ও এস এম হানিফ

(কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার হািজ বাজারে এবিসি মহাসড়কের জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয়েছে দোকানপাট l প্রথম আলো) চট্টগ্রামের এবিসি (আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া) আঞ্চলিক মহাসড়কের পেকুয়া অংশের দুই পাশ দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে হাজারো দোকানপাট। জমি বেদখল হয়ে গেলেও উদ্ধারে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ। সওজ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী সূত্র জানায়, ১৫৮ কিলোমিটারের কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর যানবাহনের চাপ কমানো এবং দূরত্ব কমিয়ে আনতে এবিসি মহাসড়ক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ২০০২ সালে ১১৩ কিলোমিটারের এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। চকরিয়া থেকে কক্সবাজারের খুরুশকুল পর্যন্ত ৩৭ কিলোমিটারের এবিসি সড়ক সম্প্রসারণ সম্ভব হলে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব কমবে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার। চট্টগ্রামের আনোয়ারা থেকে বাঁশখালী হয়ে কক্সবাজারের চকরিয়া পর্যন্ত ৭৬ কিলোমিটারের রাস্তা ইতিমধ্যে নির্মাণ হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজারের পেকুয়া ও চকরিয়া অংশে পড়েছে ১৮ কিলোমিটার।
১৪ ফেব্রুয়ারি দুপুরে মহাসড়ক পরিদর্শন করে দেখা গেছে, পেকুয়ার ১০ কিলোমিটারের দুই পাশে ছয়টি হাটবাজারসহ গড়ে উঠেছে কাঁচা-পাকা অন্তত এক হাজার দোকানপাট, ঘরবাড়ি ও বহুতল ভবন। ফলে মহাসড়ক দিয়ে যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
হাজি বাজারের ব্যবসায়ী মফিজুর রহমান বলেন, ‘এই সড়কে যানবাহন তেমন চলে না। তাই দোকান খুলে ব্যবসা করছি। সরকার যখন বলবে, দোকান সরিয়ে নেব।’
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, সওজ বিভাগ এবিসি মহাসড়কের জন্য জমি অধিগ্রহণ করলেও কোনো সীমানা খুঁটি দেয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, সওজের কয়েকজন কর্মচারী এ জমিতে স্থাপনা তৈরির সুযোগ দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, সড়ক বিভাগের সার্ভেয়ার (জরিপকারী) কর্মচারী এসে মাসে মাসে টাকা নিয়ে যান।
সওজের সার্ভেয়ার অনুপম শর্মা বলেন, জেলা শহর থেকে পেকুয়া ১২০ কিলোমিটার দূরে। তাই সরকারি এই জমি বেদখল হয়ে গেলেও ঠিকমতো তদারকি সম্ভব হচ্ছে না। গত পাঁচ বছরে তিনি চারবার সড়কটি পরিদর্শনে গিয়েছেন। তবে তিনি অর্থ আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
সওজ বিভাগ সূত্র আরও জানায়, ২০০২-০৩ অর্থবছরে সরকার মহাসড়কের জন্য টৈটং বাজার থেকে ইদমনি স্টেশন পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ জায়গা অধিগ্রহণ করে। এর মধ্যে সড়কের জন্য ১৮ ফুট প্রস্থ ও সড়কের দুই পাশে ৬২ ফুট করে জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়। আবার সেতুর সংযোগ সড়কের জন্য নেওয়া হয় ১২০ ফুট জমি। ওই সময় ২৭৫ জন জমির মালিককে প্রায় ছয় কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়।
সরেজমিন ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মহাসড়কের পাশের জায়গা দখল করে টৈটং বাজারে ১৩০টি, হাজি বাজারে ৯০টি, ধনিয়াকাটা স্টেশনে ১১৭টি, পেকুয়া চৌমুহনী স্টেশনে ১৬৭টি, নন্দীর পাড়া স্টেশন ৫০টি দোকান ঘর ও পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে আরও ৫০টি দোকান ও স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে।
টৈটং বাজারে মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে ১৩টি দোকান নির্মাণ করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হাসান। হাসান বলেন, ১১ বছর আগে নিজের জায়গায় তিনি ১৩টি দোকান তৈরি করেন। সড়ক বিভাগের লোকজন ২০০৩ সালে অধিগ্রহণের নামে এই জমি কেড়ে নেয়। তিনি ক্ষতিপূরণও পাননি বলে দাবি করেন।
সওজ বিভাগ, চকরিয়ার উপসহকারী প্রকৌশলী মুহাম্মদ শহিদুল আলম জানান, ২০০২-০৩ সালে সওজ ছয় কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে এই জমি হুকুম দখল করেছিল। কিন্তু তদারকির অভাবে বেশ কিছু জমি বেদখলে চলে গেছে। ২০১১ সালে ৫০-৬০ জন দখলদারকে উচ্ছেদ নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০১২ সালের জুন মাসে বন্যার পানিতে কাগজপত্র নষ্ট হলে ওই উচ্ছেদ কার্যক্রম থেমে যায়।
অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সওজ কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী রানা প্রিয় বড়ুয়া জানান, সম্প্রতি তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন। শিগগিরই তিনি এবিসি সড়ক পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেবেন।