Showing posts with label শফিক রহমান. Show all posts
Showing posts with label শফিক রহমান. Show all posts

Sunday, September 19, 2021

ধ্বংসের পথে ঢাকার দুটি ক্যারাভান সরাই by শফিক রহমান

বড় কাটারা
অযত্ন-অবহেলা আর দখল-বেদখলে ধ্বংসের পথে ঢাকার দুটি ক্যারাভান সরাই। স্থানীয়ভাবে ‘কাটরা’ (বড় কাটরা ও ছোট কাটরা) হিসেবে পরিচিত এ স্থাপনা দুটি ঢাকায় মোঘল যুগের সূচনার চার থেকে পাঁচ দশকের মাথায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেষে দক্ষিণমুখী করে নির্মাণ করা হয়। আজকে নানা ধরনের অবৈধ স্থাপনা চারদিক থেকে যেমন স্থাপনা দুটির গলা টিপে ধরেছে তেমনি ভবনের মধ্যেও চেপে বসেছে দখলদাররা। যদিও বৃটিশ সরকারের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকারও নানা সময়ে স্থাপনা দুটিকে ‘হেরিটেজ ভবন’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এছাড়া সংরক্ষণের অভাবে একদিকে যেমন ভবন দুটির জৌলুস ফিঁকে হয়ে যাচ্ছে। তেমনি গবেষণার অভাবে ধোয়াশা কাটছে না এর নির্মাণের প্রকৃত কারণ ও নানা সময়ে ব্যবহারের ধরন প্রকৃতি নিয়েও।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যাচ্ছে, বড় কাটরাটি ১৬৪৪ সালে নির্মিত হয় মোঘল সম্রাট শাহজাহানের পুত্র সুবেদার শাহ সুজার নির্দেশে। নির্মাণ করেন তারই প্রধান স্থপতি (মীর-ই-ইমারত) মীর মুহম্মদ আবুল কাসেম। বলা হয়, প্রথমে এটি প্যালেস হিসেবে নির্মিত হয় এবং এখানে শাহ সুজার বসবাস করার কথা ছিল। কিন্তু তিনি এখানে থাকেননি। পরে এটি ক্যারাভান সরাইতে রূপান্তর করা হয়। কিন্তু এ তথ্যের সঙ্গে একমত নন আরবান স্টাডি গ্রুপের (ইউএসজি) প্রধান নির্বাহী স্থপতি তাইমুর ইসলাম। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে পুরান ঢাকার ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা এ স্থপতি সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন, এটির লেআউট, চেহারা কোনটাই বুঝায় না যে এটি প্যালেস হিসেবে নির্মিত হয়েছে।
এদিকে তথ্যানুসন্ধানে বড় কাটরায় ফারসি ভাষায় লিখিত দুটি শিলালিপির খোঁজ পাওয়া গেছে। এর একটিতে ভবনটির নির্মাণের সময় হিসেবে ১৬৪৪ সালকে উল্লেখ করা হয়েছে। আরেকটিতে স্থাপনাটির নির্মাতা এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় নির্বাহের উপায় সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন লেখায় যার বাংলায় অনুবাদ হিসেবে পাওয়া যায়, ‘সুলতান শাহ্ সুজা সব সময় দান-খয়রাতে মশগুল থাকিতেন। তাই খোদার করুণালাভের আশায় আবুল কাসেম তুব্বা হোসায়নি সৌভাগ্যসূচক এই দালানটি নির্মাণ করিলেন। ইহার সঙ্গে ২২টি দোকানঘর যুক্ত হইল যাহাতে এইগুলোর আয়ে ইহার মেরামতকার্য চলিতে পারে এবং ইহাতে মুসাফিরদের বিনামূল্যে থাকার ব্যবস্থা হইতে পারে। এই বিধি কখনো বাতিল করা যাইবে না। বাতিল করিলে অপ্রাধী শেষ বিচার দিনে শাস্তি লাভ করিবে। শাদুদ্দিন মুহম্মদ সিরাজি কর্তৃক এই ফলকটি লিখিত হইল।’
ফলকে উল্লেখ করা দোকান কাঠামোগুলো বড় কাটরায় এখনও আছে কিন্তু সেখানে অবস্থান নিয়েছে সেলুন, খাবারের দোকান, মুদি দোকান, এম্ব্রয়ডারি কারখানাসহ নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং তাতে হারিয়ে গেছে মোঘল স্থাপত্য কলার নির্মাণ শৈলী।
বর্তমানে বড় কাটরার উত্তরাংশ সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত। পূর্ব ও পশ্চিমাংশের সামান্য কিছু এখনও আছে। কিন্তু দক্ষিণাংশের কাঠামো এখনও আছে। দক্ষিণাংশের দৈর্ঘ ৬৭.৯৭ মিটার। এ অংশের মাঝখানে রয়েছে তিন তলা গেট হাউজ।
তাইমুর ইসলাম বলেন, বড় কাটরার নির্মাণ কাঠামোর অনন্য বৈশিষ্ট হচ্ছে গেট হাউজটা। এটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যার বাইরে থেকে দেখলে পুরা তিন তলা উচ্চতাটা দেখা যায়। কিন্তু কাটরার প্রাঙ্গনের ভিতরের অংশে ঢুকলে তখন আর বাইরের মাপের ওই উচ্চতাটা পাওয়া যায় না। অর্থাৎ ভিতরের অংশে ‘স্পেস মেনুপুলেশন’ করা হয়েছে। এটাকে ‘মোঘল স্থাপত্য রীতি’ উল্লেখ করে উদাহরণ হিসেবে বুলন্দ দরওয়াজ, আগ্রাফোর্ট ইত্যাদির সঙ্গে তুলনা করেন তাইমুর ইসলাম।
বড় কাটারা, মুঘল আমলের স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ
গেট হাউজের নিচ তলায় দুই পাশে চারটি করে মোট ৮টি বিশাল আকারের চেম্বার রয়েছে। যেগুলোতেও রয়েছে মোঘল স্থাপত্য রীতির ফোর পয়েন্ট আর্চের অনুকরণে পয়েন্টেড ভল্ট। যেই চেম্বারগুলোর উচ্চতা প্রায় ১৫ ফুট এবং লম্বায় ও চওড়ায় প্রায় ৬০ ও ৫০ ফুট আকারের প্রতিটি। যেগুলোতে বর্তমানে সাদা পলেস্তরা করা হয়েছে। উভয় দিকেরই শেষ দুটি কক্ষ থেকে উত্তর দিকের কিছু অংশ কেটে নিয়ে পূর্ব-পশ্চিমে ১টি করে আলাদা কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে।
এছাড়া বড় কাটরার মূল কাঠামো জুড়ে রয়েছে একটি মাদ্রাসা। জামিয়া হোসাইনিয়া আশরাফুল উলূম বড় কাটারা মাদরাসা নামের ওই প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষের দাবি, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দখলে থাকায় বড় কাটরার অবয়বটা এখনও আছে। না হলে এটির অবস্থা ছোট কাটরার চেয়েও খারাপ হতো।’
মাদরাসাটির অধ্যক্ষ মুফতি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সাউথ এশিয়ান মনিটরকে জানান, ১৯০৮ সালে খান বাহাদুর হাফেজ মোহাম্মদ হোসাইন রেকর্ড সূত্রে বড় কাটরার মালিক হন। ১৯৩১ সালে ওয়াকফ করেন এবং ওই বছরই মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠার নেতৃত্বে ছিলেন শাইখুল ইসলাম আল্লামা যফর আহমদ উসমানী, আবদুল ওয়াহ্হাব পীরজী হুজুর, শামছুল হক ফরিদপুরী এবং মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর।
বর্তমানে মাদরাসাটিতে প্রাথমিক থেকে দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স সমমান) শিক্ষা ব্যবস্থা চালু আছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাড়ে সাত শতাধিক এবং শিক্ষকের সংখ্যা ৪৫ জন।
ছোট কাটরা
বড় কাটরা হতে প্রায় ১৮৩ মি. পূর্ব দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরেই শায়েস্তা খানের সময় নির্মিত হয়েছিল ছোট কাটরা। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ১৬৬৩ সালে এটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৬৬৬ সালের দিকে শেষ হয়। তাইমুর ইসলাম জানান, ক্যারাভান সরাইর আদলে এটি নির্মিত হলেও আসলে কি কাজে ব্যবহার হতো তার কোন প্রামাণ পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে বড় কাটরার সঙ্গে ছোট কাটরার নির্মাণ শৈলীর পার্থক্য টেনে তিনি বলেন, বড় কাটরার প্রত্যেকটি চেম্বারে যেমন পয়েন্টেড ভল্ট পাওয়া যাচ্ছে ছোট কাটরাতে কিন্তু সেগুলো পাওয়া যাচ্ছে না। সেখান স্লিংটা ফ্লাট আর কর্ণারগুলো কার্ভ করা। যাকে ‘শায়েস্তা খান স্টাইল’ হিসেবেই উল্লেখ করলেন স্থপতি তাইমুর ইসলাম।
কিন্তু দখল আর বেদখলে ছোট কাটরার অস্তিত্বও আজ খুঁজে পাওয়া কষ্টের। চারদিকেই রয়েছে নানা ধরনের স্থাপনা। এসব ঠেলে এগুলে দেখা যাবে উত্তর ও দক্ষিণ অংশে রয়েছে দুটি প্রবেশপথ। এর মধ্যে দক্ষিণেরটি প্রধান গেট হাউজ। সম্প্রতি ওই তিন তলা গেট হাউজের ভাঙ্গা-নড়বড়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে দেখা গেল দ্বিতীয় তলার তিনটি কক্ষ ব্যবহার হচ্ছে গোডাউন হিসেবে। তিন তলায় রয়েছে ‘সাপ লুডু’ তৈরির কারখানা। এছাড়া নিচ তলাও রয়েছে ভাঙ্গারির দোকানসহ নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
ছোট কাটারায় বই বাঁধাইয়ের দোকান
বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায়, ১৮১৬ সালে মিশনারি লিওনারদ ছোট কাটরায় খুলেছিলেন ঢাকার প্রথম ইংরাজি স্কুল। ১৮৫৭ সালে এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ঢাকার প্রথম নরমাল স্কুল। পরে এটি ছিল ঢাকার নবাব পরিবারের দখলে এবং তাতে তখন কয়লা ও চুণার কারখানার কাজ চলত।
হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, সর্বপ্রথম ১৯০৮ সালে বড় কাটরাটিকে হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় বৃটিশ সরকার। যদিও ১৯১২ সালের দিকে তা আবার তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। ১৯৫৭ সালে আবার হেরিটেজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এবং ২০০৯ সালে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বড় কাটরা ও ছোট কাটরাকে হেরিটেজ হিসেবে তালিকা ভুক্ত করে। কিন্তু সরকারের ওই দুটি সংস্থার কোন সংস্থাই স্থাপনা দুটির সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও অবৈধ দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিচ্ছে না। অথচ, এখনও উদ্যোগ নিলে পর্যায়ক্রমে স্থাপনা দুটির সংরক্ষণ সম্ভব বলে বিশ্বাস তাইমুরের। তিনি বলেন, বড় কাটরা ও ছোট কাটরার সংরক্ষণের উদ্যোগ আরবান ডিজাইনেরই অংশ হিসেবে হওয়া উচিত এবং আর্কিটেক্ট, প্লানারসহ নানা পেশাজীবীর সমন্বয়ে একটি টিম করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, ওখানে যারা দখলে আছেন তাদের মধ্যে তিন চার ধরনের মালিকানা দাবি করছেন। কেউ দখলে আছেন ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে, কেউ অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে। আবার কেউ ব্যক্তিগত মালিকানাও দাবি করছেন। এই সব কিছু নিয়েই প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি জরিপ করা উচিত।
তবে সেই উদ্যোগটিই নেয়া হচ্ছে না বলে জানালেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক (ঢাকা ডিভিশন) রাখী রায়। তিনি বলেন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ হেরিটেজ হিসেবে স্থাপনা দুটিকে তালিভুক্ত করেছে। কিন্তু ছোট কাটরা নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দখলে, বড় কাটরাও একটি মাদ্রাসাসহ নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দখলে। তাদেরকে উচ্ছেদ করে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সংরক্ষণ বলতে যেটা বুঝায় সেটা এখনও হয়ে ওঠেনি। বলেন, ‘আমরা নিয়মিত পরিদর্শনে যাচ্ছি। কেউ কোন ভাবে ক্ষয়-ক্ষতি করছে কিনা সেটা দেখছি।’
তারপরওতো দেখা যাচ্ছে যে যার মতো ব্যবহার করছে, তাতে ধ্বংসও হচ্ছে। সেটা আকটাবেন কিভাবে? জানতে চাইলে রাখী রায় বলেন, ধ্বংস যা হওয়ার আগে হয়েছে। এখন আর হচ্ছে না।
ছোটকাটার মধ্য দিয়ে চলে গেছে একটি পায়ে চলা পথ

Tuesday, July 13, 2021

ঢাকায় আর্মেনিয়ান গির্জা দেখভালের দায়িত্বে হিন্দু ও মুসলমানরা by শফিক রহমান

পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকার দোকানগুলো থেকে ভেসে আসা কেমিকেল ও পারফিউমের সৌরভ গায়ে মেখে আর্মেনিয়ান স্ট্রীট ধরে একটু এগিয়ে গেলেই রাস্তার পাশ ঘেষে বড় একটি গেট হাউজ। গেট হাউজটি পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়বে অষ্টাদশ শতকে নির্মিত ‘চার্চ অব হলি রিজারেকেশন’। ঢাকায় ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে যে কয়টি স্থাপনা সগৌরবে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে তার মধ্যে ১৭৮১ সালে আর্মেনিয়ানদের নির্মিত এই চার্চটিও অন্যতম। স্থানীয়দের কাছে যেটি ‘আর্মেনিয়ান চার্চ’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বর্তমানে ঢাকায় আর কোন আর্মেনিয়ান না থাকায় গির্জাটির দেখাশুনা এবং পরিচালনার দায়িত্ব বাংলাদেশি হিন্দু ও মুসলমানদের হাতে।
তাদের একজন প্রায় ষাট বছর বয়সী শংকর ঘোষ। যিনি ৩২ বছরে ধরে যুক্ত আছেন চার্চটির পরিচর্যার সঙ্গে। গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে গির্জা-পালকের (ওয়ার্ডেন) অনুপস্থিতিতে তিনিই এখন চার্চটির দেখাশুনার দায়িত্বপালন করছেন। সঙ্গে রয়েছেন আরও কয়েকজন। তবে গত বছর দুয়েক হলো শংকর ঘোষদের কাজ ও চার্চটির তদারক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত জনৈক আর্মেনীয় আর্মেন আর্স্লেনিয়ান। ব্যবসার কাজে প্রায়ই তিনি ঢাকা আসেন। খোঁজ-খবর নেন। কার্যত তিনিই এখন চার্চটির ওয়ার্ডেন।
এর আগে সর্ব শেষ গির্জা-পালক (ওয়ার্ডেন) হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন মাইকেল জোসেফ মার্টিন। ১৯৪২ সালে তার বাবার পথ অনুসরণ করে তিনি বাংলাদেশের এই অংশে এসেছিলেন। ২০১৪ সাল থেকে কানাডাতে মেয়েদের সঙ্গে বসবাস করছেন মার্টিন এবং এর মধ্য দিয়ে ঢাকার সঙ্গে আর্মেনীয়দের সম্পর্কের শেষ সূত্রটি হারিয়ে যায়। এর আগে তার অবর্তমানে কে এই গির্জার দেখাশোনার ভার নেবে? এমন প্রশ্নের জবাবে সংবাদ সংস্থা এএফপি’কে মাইকেল জোসেফ মার্টিন বলেছিলেন, ঈশ্বর কখনোই এরকম একটি স্থানকে অরক্ষিত আর অযত্নে পড়ে থাকতে দিতে পারেন না।
এর আগে ১৯৯১ সালে নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা নেফিয়েট স্টেফানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আর্মেনীয়দের সম্পর্কের শেষ সূত্রটি হারিয়ে যায়।
ঢাকায় অষ্টাদশ শতকে নির্মিত আর্মেনিয়ান গির্জা ‘চার্চ অব হলি রিজারেকেশন’
ঢাকায় আর্মেনিয়ানদের আগমনের সঠিক সময়টি না জানা গেলেও বাংলায় বিশেষ করে কলকাতায় তাদের আগমন ঘটে ১৬৪৫ সালে। পরে তারা হুগলি, চুঁচুড়া, সায়দাবাদ (রাজধানী মুর্শিদাবাদের উপকণ্ঠে একটি শহরতলি), মুর্শিদাবাদ, কাসিমবাজার এবং বাংলার আরও কিছু বাণিজ্যকেন্দ্রে তাদের বসতি প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু তাদের শক্ত ঘাঁটি ছিল ঢাকায়। মোঘল আমল ছাপিয়ে কোম্পানি আমল এবং ব্রিটিশ আমলেও অর্থে-বিত্তে এবং প্রভাব-প্রতিপত্তিতে তারা ছিলেন শীর্ষে। বিশেষ করে অষ্টাদশ শতকে লবণ ব্যবসা ছিলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া দখলে। লবণ উৎপাদন ও বিতরণের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করতো কোম্পানি। আর পূর্ববঙ্গে লবণের ঠিকাদারদের অধিকাংশই ছিলেন আর্মেনীয়রা। ঠিকাদারি ছাড়াও পান, পাট ও কাপড়ের ব্যবসায় ছিলো তাদের কর্তৃত্ব। জমিদারীও ছিলো অনেকের।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ১৮৭৪-৭৫ সালে ঢাকা পৌরসভার নয়জন কমিশনারের মধ্যে দুইজনই ছিলেন আর্মেনীয়। তারা হলেন জে জি এন পোগজ এবং এন পি পোগজ। এদের মধ্যে এন পি পোগজ যাঁর পুরো নাম নিকোলাস পিটার পোগজ ১৮৪৮ সালে ঢাকায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তখন স্কুলটির নাম ছিল পোগোজ অ্যাংলো-ভারনাকুলার স্কুল। শুরু থেকে তিন দফায় স্থানান্তর শেষে চিত্তরঞ্জন এভিনিউর বর্তমান ঠিকানায় থিতু হয়েছে। এটির এখনকার নাম পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজ।
এছাড়া আরও প্রভাবশালী পরিবার হিসেবে যে কয়েকটি আর্মেনীয় পরিবারের নাম পাওয়া যায় সেগুলো হলো- আরাতুন, পানিয়াটি, স্টিফান, লুকাস, কোজা মাইকেল, মানুক, হার্নি, সিরকোর এবং সার্কিস। এসব ধনী আর্মেনীয়নরা ঢাকায় নিজেদের থাকার জন্য তৈরি করেছিলেন প্রাসাদতুল্য সব বাড়ি। যেমন ফরাসগঞ্জের বর্তমান রূপলাল হাউস ছিলো আরাতুনের। মানুক থাকতেন সদরঘাটে। বর্তমানে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি (বাফা) যে বাড়িতে সেটি ছিলো নিকি পোগজের। পরে আর্মেনিটোলায় নির্মিত হয়েছিলো ‘নিকি সাহেবের কুঠি’। আনন্দরায় স্ট্রিটে ছিলো স্টিফানের বাড়ি।
আর শহরের যে এলাকাটিতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আর্মেনিয়ানদের বসবাস ছিল সেটি পরিচিতি পায় ‘আর্মেনিটোলা’ হিসেবে। যার পূর্ব নাম ছিল ‘মহল্লা আলে আবু সাঈদ’। ওই এলাকাতেই গীর্জা নির্মাণ এবং তাদের কবরস্থানের জন্য জমি দান করেন আগা মিনাস ক্যাটচিক নামের এক আর্মেনীয়। ১৭৮১ সালে আর্মেনিয়ান এপোস্টলিক চার্চের অধীনে নির্মিত এই গির্জাটি লম্বায় সাড়ে সাতশো ফুট। আমের্নীয়দের নিজস্ব স্থাপত্য রীতি অনুসরণ করে নির্মিত চারদিকে উচু প্রাচীরবেষ্টিত এ গির্জার প্রবেশ পথটি (গেট হাউজ) বিশাল ও কারুকার্যময়। গির্জার পেছনটা পুর্বদিকে এবং সম্মুখের অংশটি পশ্চিম দিকে। ২০০ ফিট উচু অত্যন্ত আকর্ষণীয় মিনারটি চারস্তরে বিভক্ত। গির্জার ভেতরে মঞ্চের ওপর যিশু খ্রিস্টের বিশাল ছবি এবং যারা প্রার্থনা করতে যেতেন তাদের বসার জন্য রয়েছে সুন্দর কারুকার্যময় স্থান। এছাড়া রয়েছে ওপরে ওঠার জন্য সুদৃশ্য প্যাচানো কাঠের একটি সিঁড়ি। গির্জাটির প্রবেশ পথ ৪টি এবং জানালা ১৭টি।
১৮৩৭ সালে গির্জার পশ্চিম পার্শ্বে একটি ক্লক টাওয়ার নির্মাণ করা হয়। যেটি নির্মাণ করে দিয়েছিলেন জোহানস কারু পিয়েত সার্কিস। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে টাওয়ারটি ভেঙে যায়। পরে সেটা আর মেরামত করা হয়নি। যদিও এর আগেই ১৮৮০ সালের দিকে গীর্জার ওই বিখ্যাত ঘরিটি বন্ধ হয়ে যায়।
ঢাকার আর্মেনিটোলায় আর্মেনিয়ান গির্জার অভ্যন্তরভাগ
ইতিহাস বিবেচনায় গির্জাটির গুরুত্ব বাড়ছে দেশি-বিদেশি নানা পেশার লোকদের কাছে। প্রতিনিয়ত তারা ভীর করছেন গির্জার প্রাঙ্গণ, বারান্দা ও হল ঘরে। কেউ কাঠের প্যাচানো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছেন। কিন্তু কালের পরিক্রমায় গির্জাটির প্রার্থনা কার্যক্রম বন্ধের উপক্রম হয়েছে। চলতি ২০১৯ সালে সর্বশেষ প্রার্থনা হয়েছে জানুয়ারি মাসে এবং দীর্ঘ ৫৫ বছর পর গত ১৫ ফেব্রুয়ারি এক ক্যাথলিক দম্পতির বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। এর আগে সর্বশেষ ১৯৬৪ সালে আর্মেনিয়ান চার্চে বিবাহ অনুষ্ঠান হয়েছিলো।
বর্তমানে চার্চটির কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম হলো ‘মাইকেল জোসেফ মার্টিন ফুড প্রোগ্রাম’। এ কর্মসূচির আওতায় মাসের প্রতি শুক্রবার স্থানীয় ক্ষুধার্ত গরিবদের বিনামূল্যে খাবার পরিবেশন করা হয় এবং শিশুদের দেয়া হয় দুধ। ২০১৬ সাল থেকে এ কর্মসূচি চালু রয়েছে।
চার্চটিতে অনিয়মিত যে প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয় তা করান ঢাকার তেজগাঁওয়ের রোমান ক্যাথলিক পুরোহিতরা। জানা গেছে, আর্মেনীয়রা ঢাকায় থিতু হওয়ার শুরুর দিকে তারা তেজগাঁওয়ের ওই রোমান ক্যাথলিকদের হলি রোজারি চার্চ (Holy Rosary Church) ব্যাবহার করতেন এবং তার পাশেই মৃত আর্মেনীয়দের কবর দেয়া হতো। হলি রোজারি চার্চটি নির্মিত হয় ১৬৭৭ সালে।
পরে আর্মেনিটোলায় গির্জাটি নির্মিত হওয়ায় আর্মেনিয়ানদের ধর্মানুষ্ঠান পালন সহজ হয় এবং কবরস্থান সমস্যারও সমাধান হয়। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে গির্জাটির উত্তর, পূর্ব দিকে এবং দক্ষিণ অংশের প্রাঙ্গণ এমনকি বারান্দার মেঝেতেও প্রচুর সমাধিফলক। অধিকাংশ এপিটাফ বা স্মৃতিফলকে উদ্ধৃত রয়েছে ধর্মগ্রন্থের বাণী, মৃতের নাম-পরিচয়, জন্ম-মৃত্যুর সাল ও তারিখ। এক্ষেত্রে বারান্দার গা ঘেষে থাকা যে স্মৃতিফলকটি সবার নজর কাড়ে সেটি হলো এভিয়েটর গ্রেগরির সমাধি (Avietter Gregory)। তিনি ছিলেন ওই সময়ে ঢাকার সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ। স্মৃতিফলক অনুযায়ী ১০৮ বছর ৪ মাস ৪ দিন বয়সে মারা যান তিনি। স্মৃতিফলকে লেখা রয়েছে, “To the Memory of Avietter Gregory ESQre 9th May 1862 at Dacca of which was an old resident at the advanced age of 108 years 4 months and 4 days.”
ওখানেই রয়েছে পোগজ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সেই নিকোলাস পিটার পোগজের সমাধি। এছাড়া জনৈক ক্যাটচিক আভেটিক থমাসের (Chtchick Avietick Thomas) সমাধির ওপর তাঁর স্ত্রী কলকাতা থেকে কিনে এনে বসিয়েছিলেন সুন্দর এক মূর্তি, যা এখনো টিকে আছে। এপিটাফে তিনি তার স্বামীকে উল্লেখ করেছেন, “A fond wife’s tribute to her deeply mourned and best of husbands Chtchick Avietick Thomas.” #

Sunday, March 21, 2021

মন্দির সংখ্যায় ভারতকে ছাড়িয়ে, বাংলাদেশে ইসকনের প্রভাব বাড়ছে by শফিক রহমান

কেন্দ্র ভারতে হলেও বাংলাদেশে প্রভাব বাড়ছে ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেস- ইসকনের। তা ভক্ত অনুসারির সংখ্যার বিচারে, আচার অনুষ্ঠান আয়োজনে এবং প্রচার প্রাচরনায়ও। এমনকি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের লোক নিয়োগের আবদারও বাড়ছে।
১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে। অভিযোগ রয়েছে ইসকনের ভক্ত-অনুসারি বা দিক্ষিত এমন কমপক্ষে তিন জনকে নিয়োগ দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ওপর চাপ রয়েছে সংগঠনটির। প্রসঙ্গটি তোলা হলে ইসকনের কেন্দ্রীয় স্বামীবাগ আশ্রমের ব্রহ্মচারী ঈশ্বর গৌরহরিদাস কোন রাখ ঢাক ছাড়াই বললেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকদের ৩/৪ জন করে ইসকনের ভক্ত-অনুসারি রয়েছেন। আর নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ার সব ক্ষেত্রেই ২/৩ জন করে থাকছেন।
হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘ওখানেও আমাদের একজন নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন। সব প্রক্রিয়া শেষ। এখন শুধু ফলাফলের অপেক্ষা।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৮-২০১৩ মেয়াদে গণিতে মাস্টার্স সম্পন্ন করা তরুণ এই ব্রহ্মচারী আরও জানান, তার বিভাগে ইসকনের অনুসারি কোন শিক্ষক না থাকলেও উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগে একজন শিক্ষক ছিলেন যিনি পরে বিভাগীয় প্রধানেরও দায়িত্ব পালন করেন।
কৃষ্ণ ভত্তির নতুন ধারা নিয়ে সৃষ্ট এই সংগঠনটির যাত্রা শুরু ১৯৬৬ সালে নিউ ইয়র্কে। যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এসি ভক্তিভেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ। তবে বাংলাদেশে ইসকনের কার্যক্রম নিয়ে প্রথম ১৯৭৫ সালে আয়ারল্যান্ডের একজন ও কানাডার দুই নাগরিক আসেন। প্রথমে তারা ঢাকার ৬১ তেজকুনিপড়ায় অফিস খুলে কার্যক্রম শুরু করেন। কিন্তু সে সময় বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তারা আর বেশি দিন স্থায়ী হতে পারেননি।
পরে আবার ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে শুরু হয় ইসকনের প্রচার কার্য। এ যাত্রায়ও প্রথমে তারা তেজকুনিপাড়ায় এবং পরে ঢাকার ওয়ারি ও চিটাগং-এর হাটাজারিতে মন্দির স্থাপন করে। অল্প সময়ের মধ্যে হাটাজারিতে তাদের প্রভাব এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, ওই এলাকায় একটি গ্রামের নাম ‘ইসকন নগর’ রাখা হয়েছে।
১৮৯৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভারতের উত্তর কলকাতার ১৫১ নং হ্যারিসন রোডে জন্মগ্রহণ করা এসি ভক্তিভেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে ১৯৬৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে যান। বলা হয়, সেখানে তিনি যে জায়গাটিতে সর্ব প্রথম ওঠেন সেটির নিয়ন্ত্রণ ছিল হিপ্পিদের। বিশৃঙ্খলা ও অনিয়মই ছিল যাদের জীবনের অংশ। কিন্তু প্রভুপাদের কির্তন ও বিভিন্ন বাদ্য যন্ত্রের বাজনায় আকৃষ্ট হয়ে হিপ্পিরা তার কাছে জড়ো হতে থাকে এবং শিষ্যত্ব গ্রহণ করে স্বাভাবিক জীবন যাপন শুরু করে। একই সঙ্গে স্বামী প্রভুপাদের কৃষ্ণ ভক্তের নতুন ধারার সূচনা ঘটে।
পরে ১৯৭২ সালে তিনি যান রাশিয়াতে এবং সেখানেও তিনি কৃষ্ণ ভক্তির বিভিন্ন নমুনা প্রচার করতে থাকেন। ইসকনের দাবি, বর্তমানে রাশিয়াতে তাদের মন্দিরের সংখ্যা দুই শতাধিক। আর বাংলাদেশে গত এক দশকে মন্দিরের সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১টিতে। এর মধ্যে ঢাকাতেই ছয়টি। প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের দিকে এর সংখ্যা ছিল ৩৫টি।
অথচ, ইসকনের কেন্দ্রীয় দপ্তর ভারতের মায়াপুরে এবং এসি ভক্তিভেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ শেষ নিঃশ্বাসও ত্যাগ করেছেন ওখানে। সেই গোটা ভারতেই এখন পর্যন্ত ইসকনের মন্দিরের সংখ্যা ৬৪টি। ফলে তুলনামূলক বিচারে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে ইসকনের প্রচার ও প্রসার অনেকটাই বেড়েছে জানিয়ে সংগঠনটির সাবেক সম্পাদক কৃষ্ণ কির্তন আচার্য বলেন, ভারতে হিন্দু বেশি কিন্তু ধার্মিক হিন্দু কম। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে বলে ইসকনের প্রসারটাও বেশি হচ্ছে।
ভারত-বাংলাদেশের তুলনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, ভারতে অধিকাংশই রাম ভক্ত। সেখানে বাংলাদেশে ইসকনের মাধ্যমে বাড়ছে কৃষ্ণ ভক্তের সংখ্যা।
ইসকনের দর্শন
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস শ্রী কৃষ্ণ ভগবান যুগে যুগে মর্ত্যে আসেন। আদিকাল থেকে সময়কে অগ্নি, দাপর, ত্রাতা ও কলি- এই চার যুগে ভাগ করে বর্তমান যুগকে তারা কলি যুগ বলছেন। আজ থেকে ৫ হাজার বছর আগে কৃষ্ণের অবতারের মাধ্যমে কলি যুগ শুরু হয়েছে।
তবে ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা এসি ভক্তিভেদান্ত প্রভুপাদের বিশ্বাস, প্রায় ৫০০ বছর আগে শ্রী কৃষ্ণ বৃন্দা বনে অবতার হয়েছেন ‘নিমাই সন্যাস’ নাম নিয়ে। ওই সময়ের দর্শনকে তারা ‘শ্রী চৈতন্য মহা প্রভু দর্শন’ বলে মেনে আসছে। ইসকনের মুল ভিত্তি হচ্ছে সেই ‘শ্রী চৈতন্য মহা প্রভু দর্শন’।
ঢাকার স্বামীবাগ আশ্রমে গিয়ে দেখা গেছে গেরুয়া ও সাদা বসনে ন্যাড়া মাথায় এক গোছা চুলের ঝুটি নিয়ে কেউ জপমালা জপছেন, কেউ মন্দিরের কাজ করছেন, কেউ ব্যস্ত সন্ধ্যারতি নিয়ে। যাদের সবাই তরুণ যুবক। কথা বলে জানা গেলো তারা সবাই কম বেশি শিক্ষিত। ইসকনের শর্ত হচ্ছে, দিক্ষা নিতে কেউ আগ্রহী হলে তাকে কমপক্ষে এসএসসি পাস ও বয়সে তরুণ হতে হবে। এই তরুণদের দিয়েই চলছে ইসকনের কৃষ্ণভক্তির প্রচার কাজ। বর্তমানে বাংলাদেশে ইসকনের মোট স্থায়ী বা আজীবন সদস্যের সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার। ২০০৩/২০০৪ সালের দিকেও তা ছিল মাত্র ১৯০০ জনের মধ্যে।
এদিকে ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে উপস্থিতি রয়েছে হিন্দুদের। কিন্তু কৃষ্ণ ভক্তিই হোক আর পূজা অর্চনাই হোক সব কিছুই বছরের বিশেষ কয়েকটি পূজা যেমন, দূর্গা পুজা, সরস্বতী পূজা, লক্ষ্মী পূজা এবং শ্রী কৃষ্ণের জন্মতারিখে পালিত জন্মাষ্টমির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও ইসকন এর ব্যাপ্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শহর ও গ্রাম সর্বত্রই চোখে পরে ইসকনের ভক্ত ও অনুসারিদের বিশেষ করে যুবক ছেলেরাই কাপড়ের থলের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে সার্বক্ষণিক ‘হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ’ বলে জপমালা গুনছে। অথচ, বাংলাদেশর এই অংশে এই প্রক্রিয়ায় উপসনার প্রচলন ছিলোনা।
১৯৯০ সালে ঢাকায় প্রথম ইসকনের আয়োজন করা জগন্নাথ দেবের রথ যাত্রা এখন একটি আলোচিত অনুষ্ঠান। ব্রহ্মচারী ঈশ্বর গৌরহরিদাস জানান, প্রতি বছর জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে দেশের ৫৪টি জেলায় এক সঙ্গে রথ যাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বলেন, আয়োজন, লোক সমাগম ও মন্ত্রীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান এখন রথ যাত্রা।
প্রচারের কৌশল
প্রচারনার মাধ্যম হিসেবে তারা বেছে নিয়েছে কির্তন পরিবেশনাকে। স্বামীবাগ আশ্রম ও মন্দিরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে তাদের কির্তন পরিবেশনার দল। সাথে গীতা থেকে পাঠ ও আলোচনার আয়োজন করছে তারা।
এছাড়া ইসকনের ভক্তরা কৃষ্ণ ভক্ত তৈরির জন্যে সারা দেশে ঘুরে ঘুরে বিষয় ভিত্তিক ছোট ছোট নাটিকা প্রচার করছে। এর আগেও সনাতন ধর্ম প্রচার কাজে যেসব নাটক মঞ্চায়ন করা হতো সেগুলোর সবটাই ছিল মহাভারতের গল্প বা কোন কোন অধ্যায় ভিত্তিক। কিন্তু ইসকন যে সব নাটিকা মঞ্চায়ন করে সেগুলো সমসাময়িক ঘটনা, সমাজ, সংস্কৃতি কেন্দ্রীক। ইসকনের একজন ব্রহ্মচারী বলেন, ‘নাটিকাগুলোর রচনায়, নির্দেশনায় এবং অভিনয়ে আমরাই থাকি। তবে সব সময় মনে রাখতে হয়- আমরা বিনোদনের জন্য করছি না। কৃষ্ণের দর্শন প্রচারের জন্যই কাজ করছি। সেই দিকটিই যাতে ফুটে ওঠে।”
এছাড়া স্বামীবাগ আশ্রম থেক ২৯ বছর ধরে প্রকাশ হচ্ছে মাসিক পত্রিকা ‘হরেকৃষ্ণের সমাচার’ ও ২৩ বছর ধরে প্রকাশ হচ্ছে ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘অমৃতের সন্ধানে’।

Wednesday, February 10, 2021

প্রযুক্তির প্রভাবে মন্দা বাংলাদেশের ‘চটি উপন্যাসের’ বাজার by শফিক রহমান

‘যদি এই বাস্তবধর্মী উপন্যাসটি পড়ে বর্তমান যুব সমাজ সামান্যতমও জ্ঞান লাভ করে সেই মতো চলার প্রেরণা পায়, তবে নিজেকে ধন্য মনে করব।’ এমন দাবি ও প্রত্যাশা বাংলাদেশের বহুল বিক্রিত বইয়ের (উপন্যাস) লেখক কাসেম বিন আবুবাকারের। তার প্রথম উপন্যাস ‘ফুটন্ত গোলাপ’ এর ভূমিকায় তিন এ কথাগুলো লিখেছেন। যে উপন্যাসটিতে তিনি নির্মাণ করেছেন ইসলামী আদর্শ ও হুকুম-আহকাম মেনে চালা এক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রী ও একই ভাবাদর্শে বিশ্বাসী এক ছাত্রের প্রেম-বিবাহ ও সংসার জীবনকাহিনী। গল্পের ভাঁজে ভাঁজে আবার রেখেছেন বন্ধুদের সঙ্গে বন্ধুদের কূট-কৌশলে বিরহ, বিচ্ছেদ অতপর মিলন…।
কাসেম বিন আবুবাকার ‘ভিন্ন ধারার’ লেখক। ওই পথে তিনি পৌঁছেছেন লাখ লাখ পাঠকের কাছে। ১৩৬ পৃষ্ঠার ফুটন্ত গোলাপেরই ৩২তম সংস্করণ শেষ। কাজ চলছে পরবর্তী সংস্করণের। বইটির প্রকাশক এবং নূর-কাসেম পাবলিশার্সের স্বত্বাধিকারী মো. সায়ফুল্লাহ খাঁন বলেন, পাঠকের কাছে বইটি ‘অঘোষিত পাঠ্যবই’ (স্কুল-কলেজের পাঠ্যবই বুঝাচ্ছেন)।
দেশের পুস্তক প্রকাশনা ও বিক্রির বড় মোকাম হিসেবে পরিচিত পুরান ঢাকার বাংলাবাজার কেন্দ্রীক প্রকাশনী সংস্থা ‘সাহিত্যমালা’ ১৯৮৬ সালে বইটি প্রথম প্রকাশ করে। ১০ বছর কপিরাইট মেয়াদ শেষে ১৯৯৬ সালে প্রাকশনার দায়িত্ব পায় নূর-কাসেম পাবলিশার্স। সায়ফুল্লাহ খাঁন জানান, ১৯৯৭ সাল থেকে তিনি ৩২টি সংস্করণ শেষ করেছেন। বিক্রি করেছেন কয়েক লাখ কপি। আগের হিসাব তার জানা নেই।
তবে শুধু ‘ফুটন্ত গোলাপ’ই নয় বাসর রাত, বালিকার অভিমান, বিদেশী মেম, বিদায় বেলায়, বিলম্বিত বাসর, অবশেষে মিলন, প্রেম যেন এক সোনার হরিণ, একটি ভ্রমর পাঁচটি ফুল, সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে, আমিও মানুষ, তুমিও মানুষ, শ্রেয়সী এবং ক্রন্দসী প্রিয়াসহ শতাধিক উপন্যাস লিখেছেন কাসেম বিন আবুবাকার। এর মধ্যে বিদেশী মেম উপন্যাসটির চলছে ১৭তম সংস্করণ, ক্রন্দসী প্রিয়া’র ১৬তম, বাসর রাত’র ১৪তম এবং বিদায় বেলায়’র ১১তম সংস্করণ। একটু পুরনোর মধ্যে সবচেয়ে কম সংস্করণ ‘শবনম’ শিরোনামের উপন্যাসটির। সেটিরও পঞ্চম সংস্করণ বাজারে।
বর্তমানে ৮১ বছর বয়সী এই লেখকের ধারায় আরও লিখছেন অনেকে। যুক্ত হয়েছেন তার ছেলে সায়ফুল্লাহ খাঁনও। পুস্তক প্রকাশনার পাশাপাশি তিনি লিখছেন গল্প-উপন্যাস। বাজারে তার বই ১৫টি। ২০০১ সালে প্রকাশ হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘প্রথম প্রেম’। বর্তমানে ১০৩ পৃষ্ঠার ওই বইটির দ্বাদশ সংস্করণ বাজারে। বইটিরও হাজার পঞ্চাশেক কপি বিক্রি হয়েছে বলে জানান সায়ফুল্লাহ খাঁন। তিনি বলেন, লেখার মধ্যে আমরা সহজ ভাষায় গল্প বলি। পাঠক তৈরি করি। পরবর্তীতে তারা যাতে সিরিয়াস গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ পাঠে আগ্রহী হয়।
তাদের এ ধারায় আরও সহজ করে বর্তমানে যারা ‘উপন্যাস’ লিখছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন মো. আকাশ চৌধুরী (বকুল), মো. আরিফুল ইসলাম (আরিয়ান), মো. আবু ইউসুফ (সৌরভ), মো. কহিনূর ইসলাম (শিশির), ফরহাদ হাসান সবুজ, মো. কামরুল হাসান, খোরশেদ আলম, মোস্তাক আহমেদ, শুভশ্রী নুপুর, সুমনা আক্তার সুমী, এমডি মুরাদ, এম এ কালাম। বাহারি নামে এবং বলিউড, ঢালিউড (ঢাকাইয়া চলচ্চিত্র) এবং টালিউডের (কলকাতার চলচ্চিত্র) বিখ্যাতসব নায়িকাদের ছবি দিয়ে প্রচ্ছদ সাজানো তাদের ওই লেখাগুলো ‘চটি উপন্যাস’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু অশ্লীল নয়। তবে বিষয় মূলে ‘কিশোর প্রেম’।
এদের মধ্যে এম এ কালামের ২০০৪ সাল থেকে লেখা ২১টি উপন্যাসের মধ্যে তৃতীয় উপন্যাসটিরই নাম ‘প্রিয়া এখন অন্য কারো’। বলিউড অভিনেত্রী ভূমিকা চাওলার ছবি নিয়ে প্রচ্ছদ সাজানো ৪৮ পৃষ্ঠার বইটিতে গল্প এঁটেছেন স্কুল পড়ুয়া কিশোর-কিশোরীর প্রেম কাহিনী। কাহিনীতে প্রেম নিবেদন পর্যায়ে গল্পের মূল চরিত্র প্রিয়ার ভাইয়ের হাতে বেদম পিটুনি খায় আশিক। আশিকের বয়ানে তখন লেখক এম এ কালাম ছন্দ মিলিয়ে লিখছেন, “জাল যখন পুকুরে ফেলেছি, মাছ আমি ধরবো। মাইর যখন খেয়েছি প্রিয়াকে আমি ভালোবাসবো”।
গল্পের ধারাবাহিকতায় আশিকের প্রস্তাবে সাড়া মিললেও প্রিয়ার বিয়ের আয়োজন হয় আরেক জনের সঙ্গে। আবার আশিকের জবানে লেখক লিখছেন, “হায়রে ভালোবাসা, একজন কাঁদে আরেক জন সুখের ঘর বাঁধে। এর নাম কি ভালোবাসা”। লেখক আরও লিখছেন, “এভাবে শেষ হয়ে যায় একটি প্রেমের নিষ্ঠুর…কাহিনী, প্রিয়া এখন অন্য কারো।”
বর্তমানে এ ধারার লেখকদের প্রতিনিধিত্ব করছেন এই এম এ কালামই। যিনি স্কুল-কলেজের শিক্ষা সহায়ক বইয়ের (বাংলাদেশে যা গাইড বই হিসেবে পরিচিত) প্রকাশনী সংস্থা অবস্মরনীয় পাবলিকেশন্সের বিক্রয় প্রতিনিধি। পেশার পাশাপাশি এসব বই লিখছেন, আবার নিজের প্রকাশনী সংস্থা ‘কালাম বুক হাউজ’র ব্যানারে অন্য লেখকদের বই প্রকাশও করছেন। বাংলাবাজারের আলী রেজা মার্কেটের সাগর বুক ডিপোর সামনে একটি ব্যানারে ঝুলছে এম এ কালামের ছবি সস্বলিত বিজ্ঞাপন। লেখা রয়েছে, ‘এম এ কালাম- এই প্রজন্মের প্রতিভাবান তরুণ লেখক’। তিনি জানান, তার প্রথম উপন্যাস ‘প্রথম দেখায় তোমাকে আমি ভালোবেসেছি’ আর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘এই জীবনে তোমাকে ভালোবেসে পেলাম না’।
বাজারে খুঁজে পাওয়া এই ধারার আরও কিছু ‘উপন্যাসের’ মধ্যে রয়েছে সুমনা আক্তার সুমীর ‘দু’ ফোটা চোখের জল’, শুভশ্রী নুপুরের ‘বড় বেশি ভালোবাসি তোমাকে’, ফরহাদ হোসেন সবুজের ‘ভালোবাসা হলো সংসার হলো না’, মো. কামরুল হাসানের ‘স্বার্থপর ভালোবাসা’, নুরুজ্জামান শেখ সোহাগের ‘কণ্ঠের মাধুর্যে প্রেম করা ভুল’, মো. আকাশ চৌধুরী বকুলের ‘না বলা ভালোবাসা’, মো. আরিফুল ইসলাম আরিয়ানের ‘শুধু তোমার জন্য’ এ এম সোহাগের ‘এই মন তোমাকে দিলাম’ এবং মো. আবু ইউসুফ সৌরভের ‘ভালোবাসার শেষ নেই’।
তবে সম্প্রতি বাজার অনুসন্ধানে জানা গেছে, নামে এমন আকর্ষণীয় ও বাহারি হলেও বর্তমানে বিক্রিতে মন্দা এসব ‘চটি উপন্যাসের’। আগে যেখানে বাংলাবাজারের সোহেল বুক ডিপো, তানিয়া বুক ডিপো, হিমু প্রকাশনী, মনিহার বুক ডিপো, একতা প্রকাশনী, শরীফ বুক ডিপো এবং সাগর বুক ডিপোসহ বেশ কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা এসব ‘চটি উপন্যাস’ প্রকাশ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিল। সম্প্রতি বাংলাবাজার খুঁজে শুধু সাগর বুক ডিপোতে উপরে উল্লেখিত লেখকদের বইকয়টি পাওয়া গেছে। সাগর বুক ডিপোর কর্ণধার সাগর হোসেন বলেন, এসব বই এখন আর চলে না। কেউ প্রকাশও করে না। সপ্তাহ খানেক হলো ১০ কপি করে কয়েকজন লেখকের বই উঠিয়েছি। প্রতি কপি বইয়ের দাম ১৫ টাকা। কিন্তু এক কপিও বিক্রি হয়নি।
২০১০ সালের দিক থেকে মন্দার এ ধারা শুরু হয়েছে বলেও জানান সাগর হোসেন। কারণ হিসেবে তিনি দায়ি করেন ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইউটিউবকে। এসব বইয়ের আগের বাজার চাঙ্গার কথা জানিয়ে এই প্রকাশক ও বিক্রেতা বলেন, “গফ্ফার হোসেন নামের একজন লেখক ছিলেন। ২০০১ সালে তার লেখা ‘কেউ বুঝেনা দুঃখ আমার’ এবং ‘আমি ভুল করেছি ছাত্রজীবনে তোমাকে ভালোবেসে’ শিরোনামের দুইটা বই আমি প্রকাশ করেছিলাম। বই দুইটির কয়েক লাখ কপি বিক্রি হয়েছে। ২০০২ সালে প্রকাশ করেছিলাম জালিশ মাহমুদ সাগরের ‘চোখ যে মনের কথা বলে’। এই বইটিরও অনেক সাড়া পেয়েছিলাম। এর আগে ১৯৯৫ সালের দিকে হাফিজ লাইব্রেরী প্রকাশ করেছিল এম ডি মুরাদের ‘হৃদয় দেবে কি দেবে না’। ওই সময়ে এই বইটিও অনেক সাড়া জাগানো বই ছিল।”
মজার বিষয় হলো সেই এম ডি মুরাদ এখনও লিখছেন। সাগর বুক ডিপোতেই পাওয়া গেল তার উপন্যাস ‘প্রেম দেবে কি দেবেনা’। কিন্তু এবার আর সাড়া জাগছে না। জানা গেছে, ওই সময়ে পাঠক প্রিয় লেখকদের তালিকায় আরও ছিলেন- সোহেল রানা, আবু হানিফ, হুমায়ুন কবির মৃধা, চঞ্চল চৌধুরী ও এইচ এম আলম হৃদয়। সোহেল রানার আলোচিত বই ‘অনেক স্বপ্ন ছিল তোমাকে নিয়ে’।
কালাম বলেন, লেখকের অভাব নেই। পুরনোদের জায়গায় নতুনরা এসেছেন। কিন্তু পাঠকেরই অভাব। মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক ও ইউটিউব সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। মাত্র একটা ক্লিকেই সবাই পেয়ে যাচ্ছেন দুনিয়ার সব বিনোদন। আমাদের বই পড়ে বিনোদনের যুগ বুঝি শেষ হয়েই গেল।
শহরের ফুটপাতে হকারদের বসায় কড়াকড়ির কথাও তুলে ধরেন এম এ কালাম। তিনি জানান, গ্রাম-গঞ্জে স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের মধ্যে আমাদের পাঠক ছিল। এছাড়া শহরাঞ্চলের বিশেষ করে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামসহ যেখানে যেখানে গার্মেন্টস শিল্প কারখানা রয়েছে ওইসব এলাকার শ্রমিকদের আসা যাওয়ার রাস্তার ফুটপাতে বিক্রি হতো এসব বই। এখন ফুটপাতে বিক্রিও কমে গেছে।
ফলে ‘প্রযুক্তি’ যার প্রভাবে পাঠক পেয়েছে ভিন্ন স্বাদের পথ, তাতে সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে এদেশের আদি একটি অধ্যায়ের। প্রশ্ন হচ্ছে, কালাম, মুরাদ, নুপুর ও সূমীরা কি খুঁজে নিতে পারবে নতুন কোন পথ?

Thursday, September 10, 2020

স্মৃতির অতলে ঢাকার ‘টাকার হাট’ by শফিক রহমান

সংরক্ষণ, গবেষণা আর প্রচারণার অভাবে স্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে ঢাকার ‘টাকার হাট’। এলাকাটির নাম বিকৃত হয়ে এখন ‘টেকের হাট’ ধারণ করেছে। সিটি করপোরেশনসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের নথিপত্রে বিকৃত নামটিই ব্যবহার করা হচ্ছে। পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণ আন্দোলন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইতিহাস অনুসন্ধানে বিশদ গবেষণা দরকার। ঢাকার ক্ষেত্রে বরাবরই যার ঘাটতি রয়েছে।

ঢাকার প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তানের কাপ্তানবাজার মোড় থেকে সদরঘাটমুখী নাবাবপুর সড়ক ধরে দুই পাশের ইলেক্ট্রিক ও ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যসহ বিভিন্ন যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ বিক্রির দোকানগুলো পেছনে ফেলে সামনে এগুলেই ২০৫নং এবং ২০৬নং হোল্ডিংয়ের মাঝ দিয়ে পশ্চিম দিকে চলে গেছে সরু একটি লেন। বসত-বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা এবং ছোট ছোট দোকানে ঠাসা লেনটি ভেতরে একটু ঘুরে আবার নবাবপুর সড়েকে এসে শেষ হয়েছে। ছোট এই লেনটিই সবার কাছে আজ ‘টেকের হাট লেন’ হিসেবে পরিচিত। দোকানগুলোর সাইনবোর্ডেও লেখা তাই।

লেন ধরে একটু এগুলেই ২৪নং টেকের হাট লেন। দোতলা এই স্থাপনাটির কার্নিশে এখনও ঝুলছে নকশা ও কারুকার্য খচিত কাঠের কাজ। যার অধিকাংশ ভেঙ্গে পড়েছে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে। ভবনটির দেয়াল ঘেষে ডান দিকের পথ ধরে এগুলে মোঘল স্থাপনা রীতিতে নির্মিত আরও কয়েকটি ছোট ছোট ঘর। যেগুলোর দেয়ালের চুন-সুরকির পলেস্তারা খসে পরে বেড়িয়ে গেছে পাতলা ইটের গাঁথুনি। ভেঙ্গে পড়েছে কার্নিশগুলোও।

বলা হচ্ছে এই স্থাপনাগুলো ঘিরেই ছিল ঢাকার ঐতিহাসিক ‘টাকার হাট’। স্থানীয়দের মুখে মুখেও রটে বেড়াচ্ছে মুদ্রা বেচা-কেনার ইতিহাস ও গল্প। তবে এর স্বপক্ষে জোর যুক্তি তুলেন আরবান স্টাডি গ্রুপের (ইউএসজি) প্রধান নির্বাহী স্থপতি তাইমুর ইসলাম। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে পুরান ঢাকার ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা এ স্থপতি সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন, ‘ফিজিক্যাল এভিডেন্স যা পাওয়া যায় তার ভিত্তিতে বলা যায় এখানে মুদ্রা বিনিময়ের একটি কেন্দ্র ছিল।’

তিনি বলেন, ঢাকার মোঘলরা যখন চলে গেলেন, বিশেষ করে এখান থেকে ক্যাপিটাল শিফট করে মুর্শিদাবাদের নেয়া হলো। তার পরও প্রায় ৫০ বছর ধরে ঢাকায় একটি ভাইব্রেন্ট ইকোনমিক একটিভিটিস ছিল। ওই সময়ে ঢাকায় ৭ ধরনের মুদ্রা ব্যবহারের কথা জানা যায়। সেগুলো বিনিময় হতো কোথায়? খুব সম্ভবত এই টাকার হাটে।

এদিকে তাইমুর ইসলামের বক্তব্যের পক্ষে প্রামাণ পাওয়া যায় এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ আয়োজিত একটি সেমিনারের কার্যবিবরণীতে। ১৯৯৩ সালের ১৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ‘আর্কিটেকচারাল কনজারভেশন’ শীর্ষক এক সেমিনারের ওই কার্যবিবরণীতে মীর মোবাশ্বের আলীসহ ফারুক এ ইউ খান, শাহেদা রহমান ইমাম, মহিবুল আরেফিন খান এবং এম শহীদুল আমীনের ‘Early 20th century mansions of Dhaka city: Contextual concepts’ শিরোনামের একটি লেখায় উল্লেখ করা হয়, ওই সময় প্রত্যেক অঞ্চলের নিজস্ব মুদ্রা ছিল। ১৭৮৭ সালের দিকে বিশেষ করে ঢাকাতে ৭ ধরনের মুদ্রার প্রচলন ছিল।

যাকে মূলত ‘কারেন্সি ক্যাওয়াস’ হিসেবেই উল্লেখ করেন মীর মোবাশ্বের আলীসহ তাঁর সহলেখকরা।

তাঁরা আরও জানান, প্রত্যেকটি মুদ্রার নিজস্ব মূল্য ছিল এবং সেগুলোর একটির সঙ্গে আরেকটির বিনিময় প্রক্রিয়ায় কতগুলো নিয়ম মানা হতো।

এদিকে টাকার হাটের উপস্থিতি প্রমাণের জন্য ১৯১০ সাল থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যে প্রকাশিত ঢাকার সিএস (ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে-১৮৮৫ সালের বঙ্গীয় প্রজাতন্ত্র আইনানুসারে সিলেট ও পার্বত্য জেলা বাদে সারা দেশে পরিচালিত জরিপ) ম্যাপের প্রসঙ্গ হাজির করেন স্থপতি তাইমুর ইসলাম। তিনি বলেন, এখন পুরো এলাকাটি নানা ধরনের স্থাপনায় ভরে গেলেও সিএস ম্যাপে ওই স্থাপনাটিকে কেন্দ্র করে প্রায় এক একর সম পরিমান আয়তাকার একটি ফাঁকা জায়গা দেখা যাচ্ছে। তাতেও অনুমান করা যায় এলাকাটি জুড়ে ওই ধরনের একটি কর্মকাণ্ড ছিল।

এদিকে বৃটিশ আমলে ‘নবাবপুর’ নাম নেয়া এলাকাটির পূর্বনাম ছিল ওমরাও পাড়া। তারও আগে এর নাম ছিল পুরানা মোঘলটুলি। ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যাচ্ছে, এই এলাকারই আরেকটি অংশে ছিল ‘মহাজনপুর’। বলা হয়, মোঘল আমলের শেষদিকে এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলে ঋণ প্রদান আর বন্ধকী ব্যবসা এবং সোনা-রুপা টাকায় পরিবর্তনের কাজ কারবার হতো টাকার হাট এলাকায়। আর মহাজনপুরে ছিল ওইসব ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগকারী তথা মহাজনদের বাসস্থান।

তাইমুর ইসলাম বলেন, অবহেলা এবং সংরক্ষণের উদ্যোগের অভাবে ইতোমধ্যে অনেক কিছু ধ্বংস গেছে। অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন আমরা হারিয়ে ফেলেছি। এখন সবার আগে দরকার সংরক্ষণ এবং পাশাপাশি গবেষণা। কারণ, বইয়ের পাতায় কিংবা গবেষণা পত্রে মানুষ যেই জিনিসটি জানতে পারবে সেটা যখন বাস্তবে এসে দেখতে পারবে তখনই ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল হবে বাস্তবের।

তিনি আরও বলেন, আরবান স্টাডি গ্রুপের করা এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাই কোর্ট ২০১৮ সালে পুরান ঢাকার ২২০০ ঐতিহ্যবাহী ভবন ও স্থাপনার ধ্বংস, পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। রায়ে অবিলম্বে এই ভবনগুলোকে এসেসমেন্ট করে তালিভুক্ত করতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং প্রতি তিন মাস পর পর অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে। টাকার হাটের স্থাপনাগুলোও ওই তালিকাভুক্ত। কিন্তু আদালতের ওই আদেশ বাস্তবায়নের কোন উদ্যেগ আমরা দেখছি না। সেটা যেমন আদালতের রায়ের বরখেলাপ তেমনি রায়কে অমান্য করেই ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে অনেক ভবন। ধ্বংস করা হচ্ছে ঐতিহাসিক নিদর্শন সমূহ।
এমনি গলি ও ভবনের আড়ালে হারিয়ে গেছে পুরনো ঢাকার ‘টাকার হাট’। টেকের হাট লেনে’র ২৪ নং স্থাপনার একটি অংশ, ছবি: দিপংকর হালদার

Tuesday, April 14, 2020

পুরান ঢাকায় ‘লাঞ্চ এট হেরিটেজ হোম’ by শফিক রহমান

খাবারের ঐতিহ্য আর ঐতিহ্যের সঙ্গে খাবার। এই দুইয়ের সম্মিলনে রাজধানী ঢাকার পুরনো শহরের নূর বকস রোডের দুই শতাধিক বছরের পুরনো ‘জমিদার সাহেব বাড়িতে’ চালু হয়েছে ‘লাঞ্চ এট হেরিটেজ হোম’।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি ঢাকা ও সোনারগাঁয়ের সাবেক জমিদার মৌলভী আবুল খায়রাত মোহাম্মদের (১৮৫০-১৯৩০) তৈরি করা লাল রঙের দোতলা ঐতিহাসিক ওই বাসভবনে বাঙ্গালীর পারিবারিক আপ্যায়নের আবহ ও পুরনো ঢাকার খাবারের ঘরোয়া স্বাদ নিয়ে এ আয়োজন আবু মোহাম্মদ ইমরানের। যিনি প্রতিনিধিত্ব করছেন আবুল খায়রাতের ষষ্ট প্রজন্মের।
পুরনো ঢাকার বেসরকারি, আধাসরকারি এমনকি সরকারি ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো যখন একে একে ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে তখন আবু ইমরানের অভিমত ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের পক্ষে। বরাবরই যুক্ত রয়েছেন ‘সেইভ পুরান ঢাকা’ আন্দোলনের সঙ্গে। ‘লাঞ্চ এট হেরিটেজ হোম’ উদ্যোগকেও ওই আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখছেন ইমরান।
ইতোমধ্যে আবু ইমরানের এ আয়োজনে আবুল খায়রাতের সময়ের আর্ট, এন্টিক আর ডাইনিং টেবিলে আতিথেয়তা গ্রহণ করেছেন অনেকে। যাদের মধ্যে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এ বছরের জানুয়ারির মধ্যে অংশ নিয়েছেন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানী, অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপাইনের অতিথিরা।
ইমরান বলেন, “আমার এ আয়োজনের বয়স মাত্র মাস পাঁচেক। কিন্তু আতিথেয়তা এবং আপ্যায়নে আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য দুইশ বছরেরও বেশি। এই বাড়িতে চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান ছিলেন তিন মাসের বেশি সময়। কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই বাড়িতে বসেই লিখেছেন তার বিষের বাঁশি কাব্যের কয়েকটি কবিতা। তারও আগে এই বাড়িতে অসংখ্যবার এসেছেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক (অবিভক্ত বাংলা ও পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী), মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী (আওয়ামী মুসলিম লীগ ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির-ন্যাপ প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি), হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (আওয়ামী লীগ নেতা ও পাকিস্তানের ৫ম প্রধানমন্ত্রী), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ (আওয়ামী লীগ নেতা ও বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি) তৎকালীন নেতারা। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথায় এই বাড়িটির কথা উল্লেখ করেছেন। পঞ্চাশের দশকের যুক্তফ্রন্টের কয়েকটি বৈঠক এই বাড়িতেই হয়েছে।”

ইমরানদের পারিবারিক অ্যালবামে ১৯৩৭ সালে তোলা ‘Some Stalwarts of Eastern Bengal’ শিরোনামের একটি ছবিতেও দেখা যায় শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, বিচারপতি স্যার জাহেদ সোহরাওয়ার্দী, স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, অধ্যাপক শাহেদ সোহরাওয়ার্দী, ড. সয়ুদ হোসাইন, সৈয়দ আলী আহমদসহ দশ জনকে।
অ্যালবামের ৬৪ নাম্বার ছবিটি এখানে আরও প্রাসঙ্গিক। যার ক্যাপশনে লেখা রয়েছে- Moulana Shawkat Ali entertained at Dacca by Aligarh Old Boys। ছবিটি তোলা হয়েছিল ১৯২১ সালে।
তবে এ যুগে আবুল খায়রাতের পরিবারের ভিন্নধর্মী এ আপ্যায়নের আয়োজনে অংশ নিতে হলে অন্তত একদিন আগে ফোন করতে হবে আপনাকে। দিনে সর্বোচ্চ জায়গা পাবেন ২০ থেকে ২৫ জন। জন প্রতি খরচ কোনভাবেই এক হাজার টাকার ওপরে যাবে না।
ইতোমধ্যে ঢাকাইয়া খাবারের রসালো বর্ননা ও বাড়ির ঠিকানা খুঁজে পাওয়ার বিস্তারিত সব জানিয়ে খোলা হয়েছে ‘Lunch at Emran’s Heritage Home’ ফেসবুক পেজ।
ইমরান বলেন, ‘এ আয়োজনের পুরো কৃতিত্বের অংশিদার আরবান স্টাডি গ্রুপের (ইউএসজি) প্রধান নির্বাহী স্থ্যপতি তাইমুর ইসলাম। যিনি আমাদের পুরনো ঢাকার ইতিহাস ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মসহ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে গত ১০/১২ বছর ধরে নিরলসভাবে কাজ করছেন। ঐতিহ্য সংরক্ষণ সংশ্লিষ্ঠ দেশি-বিদেশী পেশাজীবীসহ নানা পেশার পর্যটকদের নিয়ে সপ্তাহে দুই দিন নিয়মিত আয়োজোন করছেন ‘হেরিটেজ ওয়াক’। যার সুবাধেই আবার নতুন করে অনেকের কাছে পরিচিত হয়ে উঠছে আবুল খায়রাত ও তার পরিবারের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। ‘লাঞ্চ এট হেরিটেজ হোম’ এসব অনুপ্রেরণারই ফসল।
প্রসঙ্গত, জমিদার আবুল খায়রাত মোহাম্মদের প্রথম পুরুষ মুন্সী আলম। ইয়েমেনে যার জন্মস্থান। মুন্সী আলমের দুই ছেলের একজন মুন্সী গুল বকস ও আরেকজন মুন্সী নূর বকস। এই নূর বকসেরই ছেলে আবুল খায়রাত মোহাম্মদ। যার দুই ছেলের একজন আবুল হাসনাত ও আরেকজন আবু জাফর জিয়াউল হক ওরফে নাবালক মিয়া। নাবালক মিয়ার ছয় ছেলে ও ছয় মেয়ের মধ্যে এম এ জাহাঙ্গীরেরই ছেলে এ এম ইমরান।
পুরান ঢাকার বেচারাম দেউড়ির ওই বাড়িটির পাশের চারটি সড়কের নাম এই পরিবারের চার সদস্যের নামে- নূর বকস রোড, আবুল খায়রাত রোড, আবুল হাসনাত রোড ও নাবালক মিয়া লেন।

Wednesday, March 11, 2020

ধ্বংসের পথে ঢাকার যত মোঘল স্থাপনা by শফিক রহমান

হাই কোর্টের নির্দেশ অমান্য করে ঈদের দিন রাতে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে পুরান ঢাকার চকবাজারের নানা কারুকার্য সমৃদ্ধ ‘জাহাজ বাড়ি’ খ্যাত দোতলা একটি ভবন। স্থাপনাটি ব্রিটিশ আমলের (১৮৭০)। কিন্তু একইভাবে ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে বা অযত্ন ও অবহেলায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ঢাকায় মোঘল স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত স্থাপনাগুলোও। সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে অধীনে যে স্থাপনাগুলো আছে সেগুলোও সঠিক প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ না করায় মৌলিকত্ব হারিয়েছে মোঘল স্থাপত্য রীতি।
রাজধানী হিসেবে ঢাকা ৪০০ বছর পার করেছে ২০১০ সালে। মোঘল সুবেদার ইসলাম খাঁর হাতে প্রতিষ্ঠিত রাজধানীই এই ঐতিহ্যের ইতিহাস ধারন করছে। বলা হয়, গোটা ইউরোপে স্থাপত্য কলা ও নির্মাণ শৈলীর জন্য যেমন প্রসিদ্ধ রোমান যুগ তেমনি এই উপমহাদেশের নির্মাণ শৈলীতে সমৃদ্ধ মোঘল আমল। বাংলায় বিশেষ করে ঢাকায়ও যার ছোঁয়া লেগেছিল। ঢাকায় লাহোরের হুমায়ুন শাহী মসজিদ কিংবা তাজমহলের মতো মিনার সম্বলিত কোন স্থাপনা নির্মাণ করা না হলেও এখানকার মাটি, পানি, পরিবেশ-প্রকৃতি, ঝড়-ঘুর্ণিঝড় ও ভূমিকম্পের কথা বিবেচনায় রেখে স্থানীয় উপাদান পোড়া মাটির ইট আর চুন-সুরকির গাঁথুনিতে স্বল্প উচ্চতার মিনার ও গম্বুজ নিয়ে একে একে নির্মাণ হয়েছিল মসজিদ-মন্দির, ভবন, সরাইখানা। সঙ্গে ছিল ঘাট, পুল ইত্যাদি। যার বেশিরভাগের অস্তিত্ব অনেক আগেই বিলিন হয়ে গেছে। ধারাবাহিক ধ্বংসের মধ্যেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা যে কয়টি স্থাপনা আজও মোঘল নীর্মাণ রীতির সাক্ষ্য বহন করছে সেগুলোও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দখল-বেদখলে সচেতনভাবেই ধ্বংস করা হচ্ছে। যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে লালবাগের শাহী মসজিদ।
১৬৭৮ সালে ঢাকার দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে সম্রাট আওরঙ্গজেবের ছেলে এবং তৎকালীন বাংলার সুবেদার মুহাম্মদ আজম শাহের তত্ত্বাবধানে নির্মিত কিলা আওরঙ্গবাদ বা লালবাগ কেল্লার দক্ষিণের সীমানা প্রাচীরের কয়েক গজের মধ্যে লালবাগ শাহী মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আওরঙ্গজেবের প্রপৌত্র এবং তৎকালীন ঢাকার উপ-শাসক ফররুখ শিয়ার। কিন্তু বেদখল, বেপরোয়া সংস্কার আর সম্প্রসারণের ফলে বর্তমানে শুধু বাইরে থেকেই নয় ভেতর থেকেও বোঝার উপায় নেই মসজটি আদৌ মোঘল স্থাপনা কিনা। চওড়া দেয়ালে লাগানো হয়েছে গ্লাস টাইলস, ছাদ-গম্বুজ ভেঙ্গে ফেলে দিয়ে নতুন করে ছাদ দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি সাউথ এশিয়ান মনিটরের পক্ষ থেকে সরেজমিনে দেখতে গেলে অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলনা আদি মসজিদের। খোঁজ নেয়া হয় মসজিদ কম্পাউন্ডের মধ্যেই অবস্থিত মসজিদ পরিচালনা কমিটির কক্ষে। সেখানে তখন গল্প করছিলেন কয়েজন বয়স্ক সদস্য। আদি মসজিদের অস্তিত্ব জানতে চাইলে একজন মাথার ওপর দেয়ালে ঝুলতে থাকা একটি ফটোগ্রাফ দেখিয়ে ঢাকাইয়া উচ্চারণে বললেন, ‘আদি মসজিদের ডিজাইন ওই। আমরা ছাদ ভেঙে ফেলে দিয়েছি। বাইরের সাড়ে চারফুট চওড়া দেয়াল টাইলস দিয়ে ঢেকে দিয়েছি। মসজিদের মাঝখানে আর্চওয়েসহ দুটি দেয়াল ছিল তা ভেঙ্গে ৮টি পিলার বসানো হয়েছে।’
খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ
সংস্কারের নামে ধ্বংসযজ্ঞের বিশাল এই কর্মযজ্ঞ দেখাতে কক্ষের বাইরে নিয়ে এলেন কমিটির হিসাব রক্ষক সেলিম বাবু। আসর নামাজ শেষে মাগরিবের জন্য অপেক্ষারত মুসল্লিদের মাঝখানে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন কোথায় কোথায় ভাঙ্গা হয়েছে। তাদের এ কাজে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ভূমিকা কি ছিল জানতে চাওয়া হলে হাসি দিয়ে ডান হাত তুলে জানালার বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, প্রত্মতত্ত্ব বিভাগের ভূমিকা ওই দেয়াল পর্যন্ত। ওটা লালবাগ কেল্লার দেয়াল। তিনি আরও বলেন, ‘তারপরও আমরা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে ডেকেছিলাম। তারা আমাদের কাজে খুশি।’
সেলিম বাবুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মসজিদের মূল ফটকে এসে দাঁড়ালে দেখা গেল টাইলসে মোড়ানো একটি গেট। যেখান ইলেক্ট্রনিক সাইনবোর্ডে বাংলা, ইংরেজি ও আরবী হরফে লেখা মসজিদটির নাম ও পরিচয়। তথ্যের ধারাবাহিকতায় একটু পরেই স্ক্রিনে ভেসে উঠলো প্রতিষ্ঠার সাল ১৭০৩ খ্রীষ্টাব্দ।
১৫০ ফুট দৈর্ঘ এবং ৫৬ ফুট চওড়া এই মসজিদটিকে বলা হয় বাংলায় বিদ্যমান মোঘল মসজিদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়।
লালবাগ কেল্লার সামনের পথ ধরে পশ্চিম দিকে একটু এগুলে আতশখানা এলাকার রাস্তার পাশেই খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ। ফররুখ শিয়ারের শাসনামলে ১৭০৬ সালে ঢাকার প্রধান কাজী ইবাদুল্লাহর তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই মসজিদটির গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পরে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মহাপরিচালক সাক্ষরিত ‘সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ’ উল্লেখ করা একটি সাইনবোর্ড। যেখানে এই প্রত্নসম্পদের বিকৃতি বা ভেঙ্গে ফেললে, এমনকি এর কোন অংশে দাগ কাটলেও সর্বাধিক এক বছর পর্যন্ত জেল, জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কার্যত স্থাপনাটির সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগই তার শর্ত ভঙ্গ করেছে। মসজিদটির আদি স্থাপনার চুন-সুরকির আস্তরের ওপর সিমেন্ট-বালুর পাতলা একটি আস্তর দেয়া হয়েছে। লাল এবং গোলাপির মাঝামাঝি অদ্ভুত একটি রঙ করা হয়েছে। জানালায় লাগানো হয়েছে গ্রীল। যা মোঘল স্থাপনার সঙ্গে শুধু বেমানানই নয় বেখাপ্পাও। যাকে ‘পাকা হাতে কাঁচা কাজ’ বলে অবহিত করেছেন আরবান স্টাডি গ্রুপের (ইউএসজি) প্রধান নির্বাহী স্থপতি তাইমুর ইসলাম। দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে পুরান ঢাকার ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা এ স্থপতি সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন, লালবাগ কেল্লা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি সিগনেচার প্রজেক্ট। তার কয়েক গজের মধ্যেই অবস্থিত লালবাগ শাহী মসজিদটিকে খুব বাজেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। কিন্তু মসজিদটির আদি অস্থিত্ব রক্ষায় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কার্যকর কোন ভূমিকা আমরা দেখিনি। একটু দূরের খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদটিকে তারা তালিকাভূক্ত করে সংরক্ষণ করেছে। কিন্তু দায়সারাভাবে।
ফ্রেমে বাঁধানো লালবাগ শাহী মসজিদের আসল রূপ
তিনি বলেন, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও এলাকা সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় হিস্টোরিক্যাল সেটিংস ও বাফার জোন নিয়ে আমরা কথা বলছি। লালবাগ কেল্লা এলাকায় এই সেটিংসটা নিয়ে কাজ করা দরকার ছিল। তাহলে এলাকাটির ঐতিহাসিক চরিত্রটা ধরে রাখা যেত। কিন্তু সরকার, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), সিটি করপোরেশন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কাউকেই সেই উদ্যোগটা নিতে দেখিনি।
খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদের স্থাপত্য রীতির মৌলিকত্ব তুলে ধরে তাইমুর ইসলাম বলেন, ১৭ ফুট উচু একটি বেইজের ওপর তিন গম্বুজের এই মসজিদটি নির্মিত। বলা যায় এটা একটি ইউনিক স্টাইল। যে স্টাইলটা আমরা দেখতে পাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের মধ্যে অবস্থিত মুসা খাঁর মসজিদে, আজিমপুর এতিমখানার মধ্যে গোর শহীদ এতিমখানা মসজিদে এবং আজিমপুর গোরস্থানের পাশের মসজিদটিতে।
তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে আজিমপুর গোরস্থানের পাশের মসজিদটি ভাঙ্গা শুরু করলে অনেক হৈ চৈ করে আটকানো হলো।
১৭৪৬ সালে নির্মিত আজিমপুর শাহী মসজিদ খ্যাত ওই মসজিদটি ২০১৭ সালে ভাঙ্গা শুরু হয়েছিল। এর আগে ২০০৮ সালে ভাঙ্গা হয় পুরান ঢাকার উমেশ চন্দ্র দত্ত লেন ও হায়দার বকশ লেনের মুখে অবস্থিত প্রাচীন চুড়িহাট্টা মসজিদটি। ২০১৪ সালে ভাঙ্গা হয় আরমানিটোলার কে পি ঘোষ রোডের হিঙ্গা বিবি মসজিদটি।
এদিকে মোঘল আমলের স্থাপনা দখল-বেদখল আর ধ্বংসের তালিকায় আরও রয়েছে নলগোলা শাহী মসজিদ। নতুন নতুন স্থাপনায় চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়েছে। ফলে বাইরে থেকে মসজিদটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। বুড়িগঙ্গার তীরে নির্মিত এই মসজিদটিকে মোহাম্মদপুরের সাত গম্বুজ মসজিদের ‘আইডেনটিক্যাল’ উল্লেখ করে তাইমুর ইসলাম বলেন, নদীর তীরে চমৎকার একটি পরিবেশে এটি নির্মিত হয়েছিল। যেখানে সকালে-বিকেলে বসে থাকলে অসাধারণ একটি ফিলিংস হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দখল-বেদখলে সব হারিয়ে গেছে।
মোহাম্মদপুরের কাটাসুর এলাকায় ১৬৮০ সালে মোঘল সুবেদার শায়েস্তা খাঁর ছেলে উমিদ খাঁর তত্ত্বাবধানে নির্মিত সাত গম্বুজ মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সংরক্ষণে থাকলেও নতুন স্থাপনায় চারদিক থেকে ঢেকে ফেলা হয়েছে। যা প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ আইনেরও পরিপন্থী।
সংস্কারের পর বর্তমান লালবাগ শাহী মসজিদের অভ্যন্তরভাগ
এদিকে বাবুবাজার এলাকায় মিটফোর্ড হাসপাতালের পেছনে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত শায়েস্তা খাঁর মসজিদও একইভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। মসজিদটির কেন্দ্রীয় প্রবেশ পথের উপরে একটি ফারসি শিলালিপি দেখা যায়। গবেষকরা বলছেন, শিলালিপি অনুযায়ী সুবেদার শায়েস্তা খাঁ মসজিদটি নির্মাণ করেন। তবে নির্মাণ তারিখ এবং শিলালিপির অন্য শব্দগুলোর পাঠোদ্ধার সম্ভব হয় নি। তা সত্ত্বেও শায়েস্তা খাঁর প্রথম সুবেদারিকালে (১৬৬৩-১৬৭৮) মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। মসজিদটি শায়েস্তা খাঁর প্রাসাদ এলাকার ভেতরে অবস্থিত ছিল। তাইমুর ইসলাম বলেন, মোঘল স্থাপনায় শায়েস্তা খাঁ রীতি বলে একটি স্থাপত্য রীতি আমরা দেখতে পাই। মসজিদটিতে সেই শায়েস্তা খাঁ রীতিতো পাওয়াই যায় না এমনকি মোঘল স্থাপনা বলে চেনাটাও মুসকিল।
ধ্বংসের পথে ঢাকার দুটি পান্থশালাও
এদিকে অযত্ন-অবহেলা আর দখল-বেদখলে ধ্বংসের পথে ঢাকার দুটি পান্থশালাও। স্থানীয়ভাবে ‘কাটরা’ (বড় কাটরা ও ছোট কাটরা) হিসেবে পরিচিত এ স্থাপনা দুটি ঢাকায় মোঘল যুগের সূচনার চার থেকে পাঁচ দশকের মাথায় বুড়িগঙ্গা নদির তীর ঘেষে দক্ষিণমুখী করে নির্মাণ করা হয়। নানা ধরনের অবৈধ স্থাপনা চারদিক থেকে যেমন স্থাপনা দুটির গলা টিপে ধরেছে তেমনি ভবনের মধ্যেও চেপে বসেছে দখলদাররা।
বড় কাটরা ১৬৪৪ সালে নির্মিত হয় মোঘল সম্রাট শাহজাহানের পুত্র সুবেদার শাহ সুজার নির্দেশে। নির্মাণ করেন তারই প্রধান স্থপতি (মীর-ই-ইমারত) মীর মুহম্মদ আবুল কাসেম। বলা হয়, প্রথমে এটি প্রাসাদ হিসেবে নির্মিত হয় এবং এখানে শাহ সুজার বসবাস করার কথা ছিল। কিন্তু তিনি এখানে থাকেননি। পরে এটি পান্থশালায় রূপান্তর করা হয়।
বড় কাটরায় ফারসি ভাষায় লিখিত দুটি শিলালিপির খোঁজ পাওয়া গেছে। এর একটিতে ভবনটির নির্মাণ সাল হিসেবে ১৬৪৪ সাল উল্লেখ করা হয়েছে। আরেকটিতে স্থাপনাটির নির্মাতা এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় নির্বাহের উপায় হিসেবে ২২টি দোকান ঘর থেকে আয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলকে উল্লেখ করা দোকান কাঠামোগুলো বড় কাটরায় এখনও আছে কিন্তু সেখানে অবস্থান নিয়েছে সেলুন, খাবারের দোকান, মুদি দোকান, এম্ব্রয়ডারি কারখানাসহ নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং তাতে হারিয়ে যাচ্ছে মোঘল স্থাপত্য কলার নির্মাণ শৈলী।
সাত গম্বুজ মসজিদ
বড় কাটরার উত্তরাংশ সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত। পূর্ব ও পশ্চিমাংশের সামান্য কিছু এখনও আছে। দক্ষিণাংশের কাঠামো এখনও আছে। দক্ষিণাংশের দৈর্ঘ ৬৭.৯৭ মিটার। এ অংশের মাঝখানে রয়েছে তিন তলা গেট হাউজ।
গেট হাউজের নিচ তলায় দুই পাশে চারটি করে মোট ৮টি বিশাল আকারের চেম্বার রয়েছে। যেগুলোতেও রয়েছে মোঘল স্থাপত্য রীতির ফোর পয়েন্ট আর্চের অনুকরণে পয়েন্টেড ভল্ট। যে চেম্বারগুলোর উচ্চতা প্রায় ১৫ ফুট এবং প্রতিটি দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে প্রায় ৬০ ও ৫০ ফুট। যেগুলোতে বর্তমানে সাদা পলেস্তরা করা হয়েছে। উভয় দিকেরই শেষ দুটি কক্ষ থেকে উত্তর দিকের কিছু অংশ কেটে নিয়ে পূর্ব-পশ্চিমে ১টি করে আলাদা কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে।
এছাড়া বড় কাটরার মূল কাঠামো জুড়ে রয়েছে একটি মাদ্রাসা। ১৯৩১ সালে প্রতিষ্ঠিত জামিয়া হোসাইনিয়া আশরাফুল উলূম বড় কাটারা নামের মাদরাসাটির অধ্যক্ষ মুফতি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের দাবি, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দখলে থাকায় বড় কাটরার অবয়বটা এখনও আছে। না হলে এটির অবস্থা ছোট কাটরার চেয়েও খারাপ হতো।’
বড় কাটরা হতে প্রায় ১৮৩ মি. পূর্ব দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে শায়েস্তা খাঁর সময় নির্মিত হয়েছিল ছোট কাটরা। ১৬৬৩ সালে এটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৬৬৬ সালের দিকে শেষ হয়।
বড় কাটরার সঙ্গে ছোট কাটরার নির্মাণ শৈলীর পার্থক্য টেনে তাইমুর ইসলাম বলেন, বড় কাটরার প্রত্যেকটি চেম্বারে যেমন পয়েন্টেড ভল্ট পাওয়া যায় ছোট কাটরায় সেগুলো পাওয়া যায় না। সেখান স্লিংটা ফ্লাট আর কর্ণারগুলো কার্ভ করা। যাকে ‘শায়েস্তা খাঁ স্টাইল’ হিসেবেই উল্লেখ করলেন স্থপতি তাইমুর ইসলাম।
কিন্তু দখল আর বেদখলে ছোট কাটরার অস্তিত্ব আজ খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। চারদিকেই রয়েছে নানা ধরনের স্থাপনা। এসব ঠেলে এগিয়ে গেলে দেখা যাবে উত্তর ও দক্ষিণ অংশে রয়েছে দুটি প্রবেশপথ। এর মধ্যে দক্ষিণেরটি প্রধান গেট হাউজ। সম্প্রতি ওই তিন তলা গেট হাউজের ভাঙ্গা-নড়বড়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে দেখা গেল দ্বিতীয় তলার তিনটি কক্ষ ব্যবহার হচ্ছে গোডাউন হিসেবে। তিন তলায় রয়েছে ‘সাপ লুডু’ তৈরির কারখানা। এছাড়া নিচ তলাও রয়েছে ভাঙ্গারির দোকানসহ নানা ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
তবে শুধু বিশেষ স্থাপনা নয় পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকার পাড়া-মহল্লার আবাসিক ভবনেও শায়েস্তা খাঁর নির্মাণ রীতির নিদর্শনের কথা জানালেন তাইমুর ইসলাম। তিনি বলেন, ‘এখনও হাজারিবাগ, নবাবপুর, পান্নিটোলা, তাঁতিবাজার, শাখারিবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ওই নমুনাটা আমরা দেখতে পাই। জোর গলায় বলা যায় শাখারিবাজারের ৩০/৪০টি বাড়িতে ওর নমুনা এখনও আছে।’ বিশেষ ভাবে তিনি উল্লেখ করেন শাখারিবাজারের ৯, ১৫, ২৩, ৩০, ৬২-৬৩, ১২৫, ১২৬, ১২৭ ও ১৩৫ নং ভবনের কথা। কিন্তু অযত্ন, অবহেলা আর সংরক্ষণের অভাবে সব নিদর্শনই হারিয়ে যাচ্ছে। তাইমুর ইসলাম বলেন, আরবান স্টাডি গ্রুপের করা এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাই কোর্ট ২০১৭ সালে পুরান ঢাকার ২২০০ ঐতিহ্যবাহী ভবন ও স্থাপনার ধ্বংস, পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। রায়ে অবিলম্বে এই বভনগুলোকে এসেসমেন্ট করে তালিভূক্ত করতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং প্রতি তিন মাস অন্তর অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে । কিন্তু আদালতের ওই আদেশও বাস্তবায়নের কোন উদ্যেগ আমরা দেখছি না। সেটা যেমন আদালতের রায়ের বরখেলাপ তেমনি রায়কে অমান্য করেই ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে ভবনগুলোক। ধ্বংস করা হচ্ছে ঐতিহাসিক নিদর্শন সমূহ।
ঘাট ও পুল
ঢাকায় মোঘল আমলে নির্মিত ২২টি ব্রিজ বা পুলের তথ্য জানান তাইমুর ইসলাম। তিনি বলেন, সর্বশেষ আমাদের দেখা পুলটি ছিল বর্তমানের এলিফ্যান্ট রোডের হাতিরপুলটি। বাকিগুলো এর আনেক আগেই ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিল। আর ঘাট প্রসঙ্গে চাঁদনিঘাটের কথা উল্লেখ করেন তাইমুর ইসলাম। তিনি বলেন, চাঁদনিঘাটে থাকতো ইসলাম খাঁর বজরা। আর অশ্বারোহীদের জন্য ছিল আলাদা ঘাট। যার নাম ছিল সোয়ারী ঘাট। ইতিহাসের সেই খ্যাতি ছাপিয়ে সোয়ারী ঘাটকেন্দ্রীক মাছের বড় পাইকারি বাজারের খ্যাতিই এখন সবার মুখে মুখে।

Tuesday, January 14, 2020

পৌষ সংক্রান্তি ও পুরান ঢাকার সাকরাইন উৎসব by শফিক রহমান

পৌষসংক্রান্তি বাঙালি সংস্কৃতিসহ উপমহাদেশে একটি বিশেষ উৎসবের দিন। বাংলা বর্ষপঞ্জির নবম মাস ‘পৌষ’-এর শেষ দিন এই উৎসব পালন করা হয়। তবে উৎসবটি পুরান ঢাকায় সাকরাইন নামে পরিচিত। দিনটি উদযাপনে নানা আয়োজনের মধ্যে আকর্ষনীয় পর্ব দিনভর ঘুড়ি উড়ানো। পশ্চিম ভারতের গুজরাট রাজ্যে দিনটিতে সূর্য দেবতার কাছে নিজেদের ইচ্ছা বা আকূতিকে পৌঁছাতে পালন করা হয় ঘুড়ি উৎসব।
১৭৪০ সালে ঢাকার নবাব নাজিম নওয়াজেস মোহাম্মদ খাঁনের উদ্যেগে ঢাকায় ঘুড়ি উড়ানোর প্রচলন শুরু হয়। আজও উৎসবের দিনে আকাশ ছেয়ে যায় বাহারি রঙ্গে ঘুড়িতে। চলে সুতায় সুতায় কাটাকাটি।
সন্ধ্যায় শুরু হয় মুখে কেরোসিন নিয়ে আগুনে ফু দিয়ে আকাশে অগ্নিকুণ্ড তৈরির খেলা (ফায়ার ব্রিদ), আতশবাজির মেলা আর ফানুস উড়ানো। হালে যোগ হয়েছে লেজার লাইটের আঁকি-বুকি। এভাবে বিদায় জানানো হয় পৌষ মাসকে।
পঞ্জিকার হিসাব মতে গত ১৪ জানুয়ারি ছিল পৌষ সংক্রান্তি। নাটাই, ঘুড়ি আর আতশবাজির কেনাবেচা, সুতোয় কাচের গুড়া ও রং দিয়ে ‘মাঞ্জা’ দেয়া এবং খাবারের আয়োজনের প্রায় ১ মাসের প্রস্তুতি শেষে ওই দিন সকালে পুরান ঢাকার সব কিশোর-যুবক যোগ দেয় ঘুড়ি উড়ানোর উৎসবে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গেণ্ডারিয়া, মুরগীটোলা, ধুপখোলা, দয়াগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, সূত্রাপুর, কাগজিটোলা, বাংলাবাজার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, কলকতাবাজার, ধোলাই খাল, নারিন্দা ও সদরঘাট এলাকার পুরো আকাশ ছেয়ে যায় ঘুড়িতে।
আগে এ উৎসবটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে পুরান ঢাকায় সাড়ম্বরে পালিত হয়। উৎসবে অংশ নেন সব ধর্মের সব বয়সী মানুষ। সাকরাইন পরিণত হয়েছে পুরান ঢাকায় বসবাসকারী সকল মানুষের উৎসবে। এখন সাকরাইনে অংশ নিতে নতুন ঢাকাসহ নানা এলাকা থেকে মানুষ পুরান ঢাকায় হাজির হয়। আসেন অনেক বিদেশি পর্যটকও।
আমরা যখন পৌঁছালাম তখন বিকাল ৩টা। কিন্তু ঘুড়ি, সুতা ও নাটাইয়ের দোকানে তখনও ভিড়। পাড়া মহল্লার গলিতে গলিতে কিশোর-যুবকরা ছুটছে ঘুড়ি নিয়ে। ছাদে ছাদে তখন বাগট্টা বয়েজ ক্লাব (ঘুড়ির সুতা কেটে দিলে পুরান ঢাকায় বাগট্টা বলা হয়), কাইট বয়েজ ক্লাব, সুতা ক্লাব, রঙ সুতা ক্লাবসহ নানা নামের কিশোর ক্লাবের প্রস্তুতি শেষ। এর মধ্যেই ২/৩টি ছাদ পেড়িয়ে আমাদের ঠাঁই হয় সূত্রাপুরের কাগজিটোলার ‘রুটলেস ক্লাবের’ আয়োজনে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কিশোরদের এ আয়োজনে যুক্ত হন শিশু থেকে বয়স্ক পুরুষ-মহিলা সবাই। সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের সামান্য বিরতির পরেই এছাদ-ওছাদের আলোর ঝলকানি, আতশবাজির আলোর বিচ্ছুরণ, রঙিন ফানুস আর লেজার লাইটের আঁকি-বুকিতে ঝলমল করে ওঠে পুরান ঢাকার আকাশ। সঙ্গে চলে কান ফাটা আওয়াজের গান-সঙ্গীত।
তবে সাকরাইন উদযাপনের চলমান এ রীতিতে আপত্তি পুরনোদের। তারা বলেন, এ পদ্ধতিতে ছাদে ছাদে বন্ধুবান্ধবদের দলের টাকা তুলে লাখ লাখ টাকার বাহারি আয়োজনে উদযাপন জমজমাট হচ্ছে কিন্তু হারিয়ে গেছে শৈল্পিক নৈপূন্য।। আগে ঘুড়ি-নাটাই প্রত্যেকে হাতে বানাতো। থাকতো ঢাউস ‘ল্যাঞ্জার’ ঘুড়ি (ঘুড়ির লেজকে পুরান ঢাকায় বলে ল্যাঞ্জা)। একই পদ্ধতিতে সুতায় হাতে মাঞ্জা মারা হতো। আর ঘরে ঘরে বানানো হতো পিঠা বিশেষ করে পাটিসাপটা, দুধ চিতই, মালপোয়া, ক্ষীর পুলি। সঙ্গে থাকতো নলেন গুড়ের পায়েশ। কিন্তু এখন এসবকিছু নেই। জায়গাটি দখল করেছে কারখানায় তৈরি বাণিজ্যিক পণ্য।
তারপরও মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব ঈদ, হিন্দুদের পুজা, খ্রিস্টানদের বড় দিন আর শিয়া মুসলিমদের আশুরাসহ সব উৎসবেরই উদযাপন মাটির সংস্পর্শে। কিন্তু পৌষসংক্রান্তি বা সাকরাইন উদযাপনে ঢাকাইয়ারা উঠে যায় ওপরে, উদযাপন করে খোলা আকাশের নিচে। বিউটি আর ভাইবরেন্সিতে এই একটি দিনে তারা যেন জানান দেন, ‘ঢাকাইয়ারা আলাদা’।
এশিয়ার অন্যান্য দেশেও বর্ণিল আয়োজনে উৎসবটি পালিত হয়। নেপালে দিবসটি ‘মাঘি’, থাইল্যান্ডে ‘সংক্রান’, লাওসে ‘পি মা লাও’ নামে পরিচিত। এছাড়া মিয়ানমারে ‘থিং ইয়ান’, কম্বোডিয়ায় ‘মহাসংক্রান’ এবং পশ্চিমবঙ্গে মকরসংক্রান্তি নামে উদযাপিত হয়।
এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে মকরসংক্রান্তিতে নতুন ফসলের উৎসব ‘পৌষ পার্বণ’ উদযাপিত হয়। নতুন ধানের চাল, খেজুরের গুড় এবং পাটালি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরি করা হয়।
ফসলের উৎসব বা ‘পৌষ পার্বণ’ ছাড়াও ভারতীয় সংস্কৃতিতে এটি ‘উত্তরায়ণের সূচনা’ হিসেবে পরিচিত। একে অশুভ সময়ের শেষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই দিনে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার সাগরদ্বীপে কপিল মুনির আশ্রমকে কেন্দ্র করে পুণ্যস্নান ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়। আর বীরভূমের কেন্দুলী গ্রামে দিনটিকে ঘিরে হয় জয়দেব মেলা।
গুজরাটে গুড় দিয়ে তৈরি তিলের লাড্ডু এই উৎসবের অন্যতম উপাদেয় খাবার। মহারাষ্ট্রে একে বলা হয় ‘তিলগুল’। কর্ণাটকে একে বলা হয় ‘ইল্লু বিল্লা’।
ভারতীয় জ্যোতিষ শাস্ত্রে ‘মকরসংক্রান্তি’র অর্থ-নিজ কক্ষপথ থেকে সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশকে বোঝানো হয়।

Wednesday, November 20, 2019

অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প by শফিক রহমান

অতীত গৌরব হারিয়ে এখন শুধু অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টা করছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প। দেশটির বছর শুরু করতে হয়েছে আমদানি করা চলচ্চিত্র দিয়ে। ৪ জানুয়ারি ছিল বছরের প্রথম শুক্রবার। বাংলাদেশে সাধারণত এই দিনটিতে নতুন চলচ্চিত্র মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু ওই দিন মুক্তি দেয়ার মতো কোন দেশীয় চলচ্চিত্র না থাকায় কলকাতার কৌশিক গাঙ্গুলী পরিচালিত ‘বিসর্জন’ সিনেমাটি ঢাকার মধুমিতা, বলাকা, শ্যামলী, স্টার সিনেপ্লেক্স এবং চট্টগ্রামের সিলভার স্ক্রিনে মুক্তি দেয়া হয়। চলচ্চিত্রটির আমদানিকারক মধুমিতা মুভিজ-এর কর্ণধার ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বলেন, “দেশি সিনেমা দিয়ে বছরটা শুরু করতে পারলে আমাদের ভালো লাগতো।” তিনি ঢাকার প্রায় ৫১ বছরের পুরোনো সিনেমা হল মধুমিতার কর্ণধারও।
গেল বছরও কোন ভালো খবর দিতে পারেনি চলচ্চিত্র শিল্প। ওই বছর আমদানি করা ১১টি কলকাতার বাংলা ছবি এবং ৪টি যৌথ প্রযোজনার ছবিসহ মোট ৫৬টি ছবি মুক্তি পায় বাংলাদেশে। কিন্তু এর ৫০টি ছবিই ছিল দর্শক বিমুখ।
এর আগের বছর ২০১৭ সালও এর ব্যতিক্রম কিছু ছিলনা। ওই বছর ৬ অক্টোবর মুক্তি পাওয়া গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামালাকে ভিত্তি করে দীপংকর দীপন পরিচালিত ‘ঢাকা অ্যাটাক’ ছবিটি ছাড়া কোনটিই সাড়া ফেলতে পারেনি। ওই বছর মুক্তি পেয়েছিল ৫৭টি ছবি। যদিও গত শতাব্দির আশির দশকে বছরে ১২০টিরও বেশি চলচ্চিত্র মুক্তি পেত। যার অধিকাংশই থাকতো দর্শক প্রিয়তার শীর্ষে।
চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ঠ ও গবেষকরা বলছেন, ঢাকার চলচ্চিত্রে ধস ও দর্শক বিমুখতার এ ধারা শুরু হয় নব্বইয়ের দশক থেকে, অশ্লিল চলচ্চিত্র নির্মাণের কারণে। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় টিভি নেটওয়ার্কের বিস্তার, সিডি, ভিসিডি, ডিবিডি। পরে যুক্ত হয়েছে ইন্টারনেট, ইউটিউব। সম্প্রতি এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নেটফ্লিক্স। এছাড়া চলচ্চিত্রের গল্পে বৈচিত্র্য ও নির্মাণশৈলীতে দক্ষতার অভাব থাকছেই। ফলে দর্শক আর হলমুখো হচ্ছে না।
এতে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে সিনেমা হলগুলো। একে একে সেগুলো বন্ধ করে, ভেঙ্গে ফেলে সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে বহুতল শপিংমল। এ প্রক্রিয়ায় সর্বশেষ ভাঙ্গা হচ্ছে ঢাকার কাওরান বাজার এলাকার বহুল পরিচিত পূর্ণিমা সিনেমা হলটি।
এর আগে ঢাকাতেই ভাঙ্গা হয়েছে আরমানিটোলা এলাকার শাবিস্তান সিনেমা হল, ওয়াইজ ঘাট এলাকার মুন সিনেমা হল, সদরঘাটের রূপমহল, ইসলামপুরের লায়ন, গুলিস্তানের গুলিস্তান ও নাজ, এলিফ্যান্ট রোডের মল্লিকা, মিরপুরের বিউটি এবং শ্যামলী এলাকার শ্যামলী সিনেমা হলটি।
এর মধ্যে ‘শাবিস্তান’ ছিল ঢাকার প্রথম সিনেমা হল। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় ঢাকার আরমানিটোলায় এটি স্থাপিত হয়। ১৯৫৬ সালের পর এর নামকরণ হয় পিকচার হাউজ। ওই বছর জনৈক মোহাম্মদ মোস্তফা সিনেমা হলটি কিনে নেন এবং নাম পরিবর্তন করে রাখেন শাবিস্তান।
রূপমহল ছিল ঢাকার দ্বিতীয় সিনেমা হল। ১৯২৪ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৫৬ সালে ঢাকায় তৈরি করা প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তি পায় এখানে।
ঢাকার আরেকটি বিখ্যাত সিনেমা হল লায়ন। বলা হচ্ছে এটি ঢাকার তৃতীয় সিনেমা হল। এখানেই মুক্তি পায় উপমহাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র আলম আরা।
চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির তথ্যমতে, দেশ স্বাধীনের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল ৩০০টির মতো। আশির দশকে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৪০০টিতে। সেখানে এখন সচল আছে মাত্র ৩০০টি। সঙ্গে রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্ক ও শ্যামলী শপিংমল কেন্দ্রিক কয়েকটি সিনেপ্লেক্স।
চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান এ বাস্তবতাকে এক কথায় ‘স্থবির’ বলে উল্লেখ করছেন চলচ্চিত্র গবেষক অনুপম হায়াত। তিনি বলেন, সিনেমা মানেই সিনেমা হল ও বড় পর্দা। এর ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে বেসিক সিনেমা। কিন্তু বাংলাদেশে বড় পর্দা আর অগ্রসর হচ্ছেনা। বরং সংকুচিত হচ্ছে। আরেক দিকে কিছু চলচ্চিত্র হচ্ছে দেশে বিদেশে পুরস্কারও পাচ্ছে কিন্তু পুঁজি আসছে না। তার মানে এটাকে স্থবিরতাই বলা চলে।
দীর্ঘ ৪৫ বছরে ধরে চলচ্চিত্র বিষয়ক লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা টেনে অনুপম হায়াত বলেন, ১৯৬৪ সালে মুক্তি পায় কবরী ও বেবী জামান অভিনিত ও সুভাষ দত্ত পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘সুতরাং’। ওই সময় চলচ্চিত্রটি বানাতে খরচ হয়েছিল সোয়া এক লাখ টাকা আর আয় করেছিল সাড়ে ৮ লাখ টাকা। আজকে কেউ এর ধারে-কাছেও নেই।
১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া রাজ্জাক, সুচন্দা, খান আতাউর রহমান, রওশন জামিল অভিনিত ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গ টেনে অনুপম হায়াত বলেন, ছবিটির যখন নির্মাণের কাজ চলে তখন দেশের শাসন ক্ষমতায় আইয়ুব খান। সবকিছু স্থবির। ওর মধ্যেও চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে সেই সেনা শাসক আইয়ুব খানের একনায়কোচিত চরিত্রকে এক গৃহবধু নারীর মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছিলেন পরিচালক জহির রায়হান। আজকে এ ধরনের গল্প কি কল্পনা করা যায়?
ঝিমাচ্ছে এফডিসি
চলচ্চিত্রের উন্নয়নে বাংলাদেশ ফিল্ম ডেভলপমেন্ট করপোরেশনও (এফডিসি) এখন আর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ১৯৫৭ সালে যখন স্বয়ংসম্পূর্ণ ফিল্ম স্টুডিও ছিল শুধু বোম্বে, লাহোর, করাচি ও কলকাতায় তখন বাংলাদেশ অঞ্চলে চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশে সাড়ে ছয় একর জমির ওপর স্থাপন করা হয় এফিডিসি। এখানেই নির্মিত হয়েছে বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসের কালজয়ী সব চলচ্চিত্র ও গান। আজ প্রতিষ্ঠানটি হারিয়ে ফেলেছে সেই গৌরব। গত বছর এফিডিসি’র তত্ত্বাবধানে মাত্র ২৬টি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে। এর মধ্যে ৩টি ভারতের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনায়।
প্রতিষ্ঠানটির ৯টি ইনডোর শুটিং ফ্লোরের প্রায় সবগুলোই বেশিরভাগ সময় খালি থাকছে। দুটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল ৭ ও ৮নং ফ্লোর দুটি ব্যবহার করছে। ফলে চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী, কলা-কৌশলী ও গণমাধ্যমকর্মীদের পদচারনায় যে এফডিসি ২৪ ঘন্টাই সরগরম থাকতো আজ তা ঝিমিয়ে পড়েছে। অধিকাংশ সময় অলস সময় পার করছেন কর্মকর্তারা। তবে সবেচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ঠ সহশিল্পী, ফাইট ম্যান, স্ট্যান্ট ম্যান ও সেট ডিজাইনাররা। কাজ না থাকায় বেকার হয়ে পড়েছেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক এবং চলচ্চিত্র গবেষক ফাহমিদুল হক বলেন, পুরোনো সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সিনেপ্লেক্স হচ্ছে। আরেক দিকে এফডিসি’র কার্যকলাপ ক্ষয়িষ্ণু কিন্তু চলচ্চিত্র হচ্ছে ইন্ডিপেনডেন্টলি। এতে গত দেড় দুই দশক ধরে এফডিসিতে যে অশ্লিল চলচ্চিত্র নির্মাণ হতো সেটা বন্ধ হচ্ছে। তবে কোন চলচ্চিত্র সাড়া ফেলছে না, দর্শক টিকেট কেটে হলে গিয়ে সিনেমা দেখছে না। কিন্তু প্রযোজক, পরিচালকের পুঁজিরও সংকট হচ্ছে না। সেটা কোন প্রকল্প বা অনুদানের মাধ্যমে আগে থেকেই সিকিউরড থাকছে। বলা যায় এক ধরনের জোড়া-তালি দিয়েই চলছে এবং আগামী কয়েক বছর এভাবেই চলবে। সেটাই ধারনা করা যায়।
হারিয়ে গেছেন সিনেমার ব্যানার-পোস্টার শিল্পীরা
ঢাকাইয়া চলচ্চিত্রের এই দুর্দিনের অনেক আগেই হারিয়ে গেছেন হাতে করা সিনেমার ব্যানার-পোস্টার শিল্প ও শিল্পীরা। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে বাজারে ডিজিটাল প্রিন্ট আসাতে শুরু করে। ফলে ২০০০ সালের মধ্যে হারিয়ে যায় সিনেমা সংশ্লিষ্ঠ এ শিল্প মাধ্যমটি।
ঢাকায় ৩০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান ছিল যাদের মূল কাজ ছিল সিনেমার ব্যানার ও পোস্টার করা। শহরের পল্টন ও কাকরাইল এলাকা যেমন ছিল চলচ্চিত্র বিতরণ ও বিপণনের কেন্দ্রস্থল তেমন ব্যানার ও পোস্টার তৈরির কেন্দ্রবিন্দু ছিল পুরোনো ঢাকা। এর মধ্যে বিখ্যাত ছিল নবাবপুর এলাকার রূপায়ন পাবলিসিটি, কোর্ট স্ট্রীটের শিল্পী আর্ট পাবলিসিটি ও মায়া পাবলিসিটি। তাঁতিবাজার এলাকার চিত্রকর, জুগিনগরের এসএম পাবলিসিটি, পল্টনের বিকেটি পাবলিসিটি এবং নারিন্দার ফারজানা আর্ট।
এঁদের মধ্যে পাইওনিয়ার ছিল রূপায়ন পাবিলিসিটি। সত্তুরের দশকের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটি শুরু করেন সুভাষ চক্রবর্তী ও ধীরেন দাস। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে তারা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দিয়ে ভারতে স্থায়ী হন।
জানা গেছে, ওই ধীরেন দাসই ঢাকাইয়া চলচ্চিত্রে সর্বপ্রথম চার রঙের পোস্টার আঁকেন। আজিম, আনোয়ার হোসেন ও আনোয়ারা অভিনিত এবং নজরুল ইসলাম পরিচালিত ওই চলচ্চিত্রটির নাম ছিল ‘স্বর্ণ কমল’।
এঁদের মধ্যে ঝুলনবাড়ি এলাকার এভারগ্রীন পাবলিসিটির মালিক ছিলেন এ জেড পাশা। তিনিই ডিজাইন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কার্জন হল সংলগ্ন দোয়েল চত্ত্বরের, মতিঝিল শাপলা চত্বরের। এনসিসি ব্যাংকের লোগোটিও তার করা।
আরও জানা গেছে, পল্টন এলাকার জিন পাবলিসিটির বাবুল চৌধুরী ঢাকাইয়া চলচ্চিত্রের সর্ব প্রথম চার রঙের কম্পিউটারাইজড পোস্টার তৈরি করেন। তার প্রথম চলচ্চিত্র ছিল যমুনা ফিল্ম করপোরেশনের ‘অবুঝ মনের ভালোবাসা’।

মৌলিকত্ব হারাচ্ছে বাংলাদেশের ওয়াজ মাহফিল by শফিক রহমান

ক্রমশ মৌলিকত্ব এবং ধর্মীয় আবেদন হারাচ্ছে বাংলাদেশের ‘ইসলামিক জলসাগুলো’। স্থানীয়ভাবে ‘ওয়াজ মাহফিল’ নামে পরিচিত এসব সমাবেশে ইসলামিক ধর্মোপদেশ দেয়া হলেও ফিঁকে হয়ে আসছে আগের ‘ধর্মীয় চেতনা ও ভাবগাম্ভীর্য’। জাতীয়-আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রসঙ্গও আসছে না আগের মতো। সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে হাস্য-রস। কোন কোন ক্ষেত্রে খিস্তি-খেউড়ও। ফলে ইসলামি দাওয়াত ও আমল-আখলাকের শিক্ষা পৌঁছানোর ঐতিহাসিক স্বীকৃত এ মাধ্যমটি ক্রমশ যেন রূপ নিচ্ছে ‘তামাশার আসরে’। নানা অঞ্চলের নানা বয়সের বিভিন্ন ধারা ও মতাদর্শের আলেম-ওলামার সস্তা-সরল উদাহরণ-উপমা, অঙ্গ-ভঙ্গী ও বয়ানেই ঘটছে এ অবনতি।
এর জন্য জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের বিজ্ঞ আলেমদের অনুপস্থিতিকে দায়ী করছেন দেশের প্রবীণদের কেউ কেউ। কেউ আবার এক্ষেত্রেও প্রযুক্তির প্রভাব বিশেষ করে সামাজিক গণমাধ্যমকে দায়ী করছেন। তাদের বক্তব্য, আগেও হয়তো আঞ্চলিক পর্যায়ে ছোট ছোট আয়োজনে বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে এ ধারা চলে আসছিল কিন্তু তার প্রভাব ছিল সীমাবদ্ধ। কিন্তু ফেসবুক-ইউটিউবের প্রভাবে এখন সবকিছুই আঞ্চলিক সীমানা পেড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ছে জাতীয় পর্যায়ে, ভাইরাল হচ্ছে এবং স্থায়ী একটি প্রভাব সৃষ্টি করছে।
ইউটিউবে শুধু ‘ওয়াজ’ লিখে সার্চ দিয়েই দেখা যাবে নামের আগে-পরে বাহারী বিশেষণযুক্ত অসংখ্য আলেম-ওলামার অসংখ্য ওয়াজ। পরিচিত-অপরিচিত, বিখ্যাত-অখ্যাত নানা ইউটিউব চ্যানেলের ব্যানারে ঝুলছে তাদের ওইসব ওয়াজ ও ওয়াজের খণ্ড অংশ। সঙ্গে চটকদার ভাষার বিজ্ঞাপন দেখে ওয়াজের বয়ান না ভেবে কৌতুকের বিনোদন ভাবলেও ভুল হবে না। যেমন, ইসলামিক ওয়াজ বগুড়া নামক একটি ইউটিউব চ্যানেলের বিজ্ঞাপন, ‘গোলাম রাব্বানীর হাসির ওয়াজ- একটা লাইক দিবেন ভাইয়া’। ওয়াজ বাংলা টিভি লিখেছে, ‘বউয়ের হাতে মার খেলেন-অস্থির হাসির ওয়াজ’। নিচে হুজুরের নাম হিসেবে লেখা-আমির হামজা্।
তাকওয়া মিডিয়া সেন্টার নামের ইউটিউব চ্যানেলটি বলছে, ‘হাসি কান্নায় মজার ওয়াজ’। পাশে একটু ছোট করে লেখা- ভাইরাল ওয়াজ। তাতে ক্লিক করতেই দেখা গেল- উত্তেজনায় হুজুর এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন, অমনি দুই হাতের উপর ভর দিয়ে লাফ দিয়ে পা তুলে বসে পরলেন সিটে। মোড় দিয়ে ঘুরে বসে চোখে-মুখে হাসির ঝিলিক নিয়ে বললেন-আইজগা বেডা খেলা দেহামু। এবার মাইক্রোফোন মুখ বরাবর তুলে দেয়ার জন্য মাইক অপারেটরকে উদ্দেশ্য করে হাক দিয়ে বললেন- এই মাইকওয়ালা উডা বেডা। আবার মোড় দিয়ে ঘুরে বসে বললেন- পাগলারে চিনা রাখবি। এইডা আলাদা জিনিস…। গত বছরের ৮ ডিসেম্বর আপ হওয়া ওয়াজের ওই ভিডিওটি গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত ভিউয়ারের সংখ্যা ছিল ১২,৪৩,০৭৬ জন।
এমন ওয়াজের তালিকায় আরও আছে, ‘ফানা ফানা ওয়াজ’; ‘এমন ওয়াজ আর শুনিনি- হাসতে হাসতে প্যান্ট খুলে যায়’; ‘১০০% মজার ওয়াজ- কলিজা ঠাণ্ডা’; ‘ডিজিটাল বক্তার ডিজিটাল ওয়াজ’; ‘ডিজিটাল ওয়াজ-মাল যায়তেছে’; ‘পান ও জর্দা-চরম হাসির ওয়াজ’; ‘এই ওয়াজ শুধু অবিবাহিতদের জন্য’; ‘ইন্ডিয়ান সিরিয়াল কিরন মালা নাটকের জন্য দোয়া- একটু হাসলে দোষ কিসের?’ ইত্যাদি।
অথচ, আশি এবং নব্বইয়ের দশক জুড়ে দেশের স্বনামখ্যাত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বের করা ওয়াজের ক্যাসেটগুলোর কাভারে বাংলা ক্যালিগ্রাফিতে লেখা থাকত বিষয় বিবেচনায় ক্যাসেটের শিরোনাম এবং সঙ্গে যার বয়ান তার নাম ও ছবি। আর শিরোনামের শীর্ষে থাকত ‘রাসুল্লাহ (সা:) এর জীবনী’; ‘বেহেস্ত দোযখ’; ‘নবীজির ইন্তেকাল’; ‘নবীজির মেরাজ’; ‘কারবালার করুণ কাহিনী’ ইত্যাদি।
মোহাম্মদিয়া ইসলামিক মিডিয়া নামের ইউটিউব চ্যানেলের হাসির ওয়াজের বিজ্ঞাপন দেয়া হযরত মাওলানা মুফতি ইলিয়াছুর রহমান জিহাদীর একটি ওয়াজের খণ্ডিত অংশে ক্লিক করতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল হুজুরের ছবি। তিনি ‘মা’ ডাকের সৌন্দর্য এবং আল্লাহর নামের মহিমা বুঝাতে বর্তমান সময়ের ছেলে-মেয়েদের আধুনিক নাম নিয়ে ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ করছেন। নিজের মুখকে বিকৃত করে ছন্দ মিলিয়ে বলছেন, পিংকি, রিংকি, হেলেনা, দোলেনা, এদিক-সেদিক যায়না, কখনও ঘরে থাকেনা।…জুতা দিয়া বাইড়াই। বদমাইশের স্টাইলের গুষ্ঠি কিলাই।’
অন্য হুজুরদের বয়ানের মধ্যেই আবার এসব ওয়াজের কড়া সমালোচনা পাওয়া যায়। যেমনটি পাওয়া গেল ইসলামিক ওয়াজ ইউটিউব চ্যানেলের ব্যানারে মুফতি উবায়দুল্লাহ বিন সাঈদের একটি ওয়াজের খণ্ডিত অংশে। সেখানে তিনি বলছেন, ওয়াজের মঞ্চ গুরুগম্ভীর একটা বিষয়। ওয়াজ শুনে মানুষের দিলে কম্পন আসবে, মানুষের দিল নরম হবে। কোরআনের আয়াত থেকে তিনি আরও বলছেন, মুমিনের সামনে যখন আয়াত তিলাওয়াত করা হয় তখন মুমিনের ঈমান বাড়তে থাকে। আর বর্তমানে আমাদের ওয়াজ শুনলে পরে মানুষের হাসতে হাসতে পেট ব্যাথা শুরু হয়। একেওকি আপনারা ওয়াজ বলবেন?
তিনি বলেন, ‘যত ফান ভিডিও আছে তা ওয়াজে শুরু হয়েছে। এর নাম ওয়াজ নয়। খোদার কসম, আল্লাহর নবীর সারা জীবনে ওয়াজে বসে একটি বারও অযথা কোথাও হাসাননি। কেউ পারলে প্রমাণ করুক বিশ্বনবী ওয়াজ করছেন আর এভাবে মানুষকে হাসাইয়া হাসাইয়া পেট ব্যাথা করাইছেন। একটা প্রমাণ কেউ দেখাইতে পারবেন? তাহলে তুমি কার আদর্শ মেনে ওয়াজ করছো। বোঝা গেল এগুলা ওয়াজ নয় ধান্ধা, তামাশা। আর তামাশা বাড়ার কারণেই মানুষ ওয়াজের মধ্যে যায় মজা পেয়ে চলে আসে কিন্তু কেউ আমল করেনা।’
ওয়াজ মাহফিলের বয়ানে রাজনৈতিক প্রসঙ্গ
ওয়াজ মাহফিলের বয়ানে রাজনৈতিক প্রসঙ্গের উপস্থিতি ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত এবং সত্য একটি ঘটনা। তা জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক যে কোন প্রসঙ্গের। বলা হতো- ওয়াজ মাহফিলকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত ছিলেন জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। যিনি বর্তমানে যুদ্ধাপরাধ মামলায় আমৃত্যু সাজাপ্রাপ্ত এবং কারাবন্দি। তবে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ছাড়াও তার সমকালীন অন্যান্য আলেম ওলামার বয়ানেও রাজনৈতিক প্রসঙ্গের উপস্থিতি ছিল সরবে। বিশেষ করে আশির দশক জুড়ে প্রায় সবার বয়ানে থাকত আফগানিস্তানে রাশিয়ার আগ্রাসন ও নির্যাতনের নানা বর্ণনা। পরের দশকগুলোতেও এর ধারবাহিকতায় যুক্ত হয় ইরাকে মার্কিন হামলা, আফগানিস্তানে মার্কিন হামলার ইস্যুসহ ফিলিস্তিনিদের প্রতি বাংলাদেশীদের সমর্থন ও সহমর্মিতার প্রকাশ।
তবে এমন আন্তর্জাতিক একটি ইস্যুকে ওয়াজ মাহফিলের ময়দানে মজা করে তুলে ধরতেন মাওলানা সিরাজুল ইসলাম সীমান্ত বুলবুল। সাতক্ষীরা বা যশোরের সীমান্ত এলাকায় বাড়ি বলেই নামের শেষে যুক্ত হয়েছিল ‘সীমান্ত বুলবুল’। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে সিরাজুল ইসলাম সীমান্ত বুলবুলের বয়স আশির কোঠায়। তখনও মাঝ রাতে দুই থেকে তিন ঘন্টা ধরে বয়ান করতেন পুরো সময়টি হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে। কোরআনের তাফসির এবং হাদীসের ব্যাখ্যার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্ব ও বীরত্বের কাহিনী তুলে ধরতেন। এক্ষেত্রে প্রায়ই তিনি টেনে আনতেন ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ, যুদ্ধবিরতি, ১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারির তাসখন্দ চুক্তি এবং চুক্তি পরবর্তী ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর প্রসঙ্গটি। তিনি বলতেন, চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর মূলে ছিল ‘পরাজয়ের গ্লানি’।
প্রসঙ্গত, চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাসখন্দে রহস্যজনকভাবে মারা যান ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো আজও লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর রহস্য জানা যায়নি। ২০১৫ সালে শাস্ত্রীর পরিবার নতুন করে দাবি তোলে, তার মৃত্যু সংক্রান্ত সমস্ত ফাইল প্রকাশ্যে আনার।
কিন্তু বর্তমানের ওয়াজ মাহফিলে রাজনৈতিক প্রসঙ্গের উপস্থিতি তেমন একটা দেখা যায়না। তবে গত ৩ মার্চ জাতীয় সংসদে কওমি মাদ্রাসা ও হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফীকে কটাক্ষ করে দেয়া বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বক্তব্য এ পালে কিছুটা হাওয়া এনে দেয়। এই সময়ের মধ্যে মাহফিলের বয়ানে অধিকাংশ আলেম ওলামার শুধু আলোচনা সমালোচনাই নয় বিষোদগারের মুখে পরেন রাশেদ খান মেনন।
এছাড়াও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ইসলামি রাজনৈতিক দলসহ নানা পক্ষের সমালোচনার জের ধরে গত ৯ মার্চ বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্যরা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেন- দলের সভাপতি রাশেদ খান মেননের বক্তব্য বিকৃত করে একটি মহল দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করছে।
সম্প্রতি কথা হচ্ছিল প্রযোজনা সংস্থা বাঁশরির কর্ণধার মো. রিপনের সঙ্গে। তিনি বাঁশরির ব্যানারে দীর্ঘ দিন বাংলা লোকজ গান বিশেষ করে বাউল, জারি-সারি ও পালাগানের ক্যাসেট, সিডি ও ভিডি প্রকাশ করতেন। সঙ্গে প্রকাশ করতেন ওয়াজের ক্যাসেট ও সিডি। তিনি জানান, ওয়াজের ক্যাসেট, সিডি-ভিসিডির চাহিদার শীর্ষে ছিল জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ওয়াজ। তার পরেই ছিল যুক্তিবাদী মীর হাবিবুর রহমান ও চরমোনাইর মরহুম পীর সৈয়দ মাওলানা মো. ফজলুল করিমের ওয়াজ। পরে এদের সঙ্গে আরও যুক্ত হন মাওলানা তোফাজ্জেল হোসেন, মাওলানা সাইফুল ইসলাম যুক্তিবাদী এবং তারিক মনোয়ারসহ বেশ কয়েকজন। মো. রিপন বলেন, ‘বর্তমানে এ লাইনে নতুন নতুন অনেক মাওলানা এসেছেন। আমরা এখন আর কারো ওয়াজের সিডি-ভিসিডি করছিনা। পুরনো প্রযোজনাগুলো বাঁশরী ইউটিউব চ্যানেলে ছেড়ে দিয়েছি।’
এর আগে ২০১০ সালে প্রযোজনা সংস্থা সাউন্ডটেক’র ব্যবস্থাপক আতিউর রহমান এই প্রতিবেদককে জানিয়েছিলেন, ওই সময়ে হঠাৎ করে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ওয়াজের সিডি-ভিসিডির চাহিদা কমে যায়। কারণ হিসেবে যুদ্ধাপরাধ মামলায় তার গ্রেফতারের ঘটনাকেই উল্লেখ করেছিলেন আতিউর রহমান। যদিও বর্তমানে ইউটিউবে তার অসংখ্য ওয়াজ দেখা যাচ্ছে। যার ভিউয়ারের সংখ্যাও অনেক।
বর্তমানে যাদের ওয়াজ ইউটিউবে বেশি দেখা যাচ্ছে তাদের মধ্যে রয়েছেন মাওলানা হাফীজুর রহমান, মুফতি আমির হামজা, আল্লামা মামুন হক, মুফতি রিজওয়ান রফিকী, মাওলানা আবদুল্লাহ আল আমীন (যাকে দ্বিতীয় সাঈদী বলে উল্লেখ করা হচ্ছে), মো. রেজাউল করিম সীমান্ত বুলবুল, মাওলানা মোশতাক ফয়েজী, মাওলানা আবদুল খালেক শরীয়তপুরী, মাওলানা নাসির উদ্দিন গোপালগঞ্জ, রফিক উল্লাহ আফসারি প্রমূখ। এদের মধ্যে দুই একজন ছাড়া বাকি সবাই ইউটিউব জগতে ‘হাসির হুজুর’ হিসেবে পরিচিত।
নতুন অনুসঙ্গ শিশু বক্তা
ওয়াজ মাহফিলের বিরাজমান এ বিশৃঙ্খলার মধ্যে নতুন অনুসঙ্গ হিসেবে যুক্ত হয়েছে ‘শিশু বক্তা’ ও ‘কিশোর বক্তা’। এদের তালিকায় রয়েছেন আবু মুসা বিপ্লবী। তার পরিচয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে আবদুর রহিম বিপ্লবী হুজুরের ছাত্র। আরেকজন হলেন হাফেজ ক্বারী রফিকুল ইসলাম নেত্রকোনা (বাংলাদেশে হুজুরদের নামের শেষে নিজ জেলার নাম যুক্ত করার প্রবণতা দীর্ঘ দীনের। এক্ষেত্রেও শিশু বক্তা রফিকুল ইসলামের নামের শেষে ‘নেত্রকোনা’ জেলার নামটিকে ব্যবহার করা হয়েছে)। একই ধারায় রয়েছেন ক্বারী মাওলানা মো. নূরুল ইসলাম বিক্রমপুরী (বিক্রমপুর জেলা থেকে বিক্রমপুরী)। আরও রয়েছেন মুহাম্মদ নাঈম উদ্দিন আজিজি। যাকে জুনিয়র তাহেরী নামেও পরিচিত করা হয়। এছাড়া রয়েছেন কিশোর বক্তা ক্বারী মুহাম্মদ শামীম রেজা কাদেরী।
ইউটিউব চ্যানেলে এসব শিশু ও কিশোর বক্তাদের ওয়াজে লাইক-শেয়ার অনেক হলেও সমালোচনা আছে আলেম ওলামাসহ দর্শক শ্রোতাদের মাঝে। যেমন, ক্বারী মাওলানা মো. নূরুল ইসলাম বিক্রমপুরীর একটি ওয়াজের মন্তব্যের ঘরে শুরুতেই একজন লিখেছেন, ‘এই শিশুর কন্ঠটা পুঁজি করে যারা ব্যবসা করছে তাদেরকে আল্লাহ হেদায়েত দান করুক আমিন…।’
রেজাউল করিম নামে একজন লিখেছেন, ‘ইসলাম ধর্ম প্রচার কি এত সহজ? আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাহলে নবীদেরকে কেন ৪০ বছর বা পূর্ণাঙ্গ বয়সে নবুয়ত দান করলেন? আবেগি বাঙালী…শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।’
মাসুদ আজাদ নামের একজন লিখেছেন, ‘এই বাচ্চাকে আল্লাহ মাফ করুক। ৯ বছর বয়সে একজন কিভাবে মাওলানা হয়। ১৪ বছর লাগে শুধু পড়া লেখাতেই..।’
আর মিজান হাওলাদার নামে একজন লিখেছেন, ‘হায়রে বাঙালী মুসলিম বুঝলিনা, এই চেয়ারটার দাম দিতে পারলি না।’
একই বক্তব্য মুফতি উবায়দুল্লাহ বিন সাঈদের। তিনি বলেন, বিশ্ব নবী বলেছেন অযোগ্য লোকের হাতে যখন দায়িত্ব অর্পণ হয় তখন কেয়ামতের অপেক্ষা কর। আমি বলব, বাংলাদেশের শিশু বক্তা, ২৬ ইঞ্চি বক্তা, অন্ধ বক্তা, আম্মা হুজুর, মহিলা বক্তা এই সবগুলো হলো অযোগ্য ওয়াজ করার জন্য। আর আমরা অযোগ্য লোককে দাওয়াত করে ওয়াইজি বানিয়ে দিচ্ছি। এর মানে কেয়ামতের আলামত নিজেরাই সংঘটিত করছি।
একই ভাবে এটাকে ‘কেয়ামতের আলামত’ উল্লেখ করে এগুলো থামানোর আর্জি মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারীর। তিনি বলেন, তাফসির মাহফিলের মধ্যেও শো-অফ। খালি লোক দেখানোর মানসিকতা। এগুলো বন্ধ করেন। এগুলোর সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক নাই।
তিনি আরও বলেন, ওয়াজ মাহফিল দীনের দাওয়াতের একটা প্লাটফর্ম। এখানে লৌকিকতা যেন না হয়। আমাদের দরকার এখলাস। এখলাসের বড়ই অভাব। মাহফিলে গেলে আমাদের বলা হয়- হুজুর আপনাকে কিন্তু কাপাইতে হবে। আবার বলে- হুজুর আপনাকে কিন্তু জমাইয়া দিয়া যাইতে হবে। এগুলোর সঙ্গে হেদায়েতের কোন সম্পর্ক আছে? এই জন্যইতো সমাজে হেদায়েত নাই। মাহফিলের পর মাহফিল হয় কিন্তু ফজরের নামাজটা ঠিকমতো হয়না। আসুন আমরা এখন একটু থামি। অনেক হয়েছে।
ওয়াজ মাহফিল যত ধারা ও উপধারা
উপমহাদেশে প্রথম ওয়াজ মাহফিলের সূচনা ঘটে শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভীর (রঃ) হাত ধরে। চরমোনাইর পীর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাবেক মহাসচিব এবং বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা বোর্ডের মহাসচিব আল্লামা নূরুল হুদা ফয়েজী জানান, মুঘল শাসনামলের অবসান এবং ব্রিটিশ রাজত্বের সূচনা পর্বে সমাজে সৃষ্ট নৈরাজ্য, অপসংস্কৃতি ও ইসলামের বিকৃতি দূর করতে কুরআন ও হাদিসের আলোকে বয়ানের এ ধারা শুরু করেন শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী। পরবর্তীতে যা ভারত-পাকিস্তানসহ বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে।
আশির দশক থেকে বাংলাদেশে ব্যাপক হারে ওয়াজ মাহফিলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে এখানে ওয়াজ মাহফিল বিভিন্ন ধারা ও উপধারায় বিশেষভাবে পাঁচ ধারায় বিভক্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেমন, কওমি বা দেওবন্দি ধারা, আলিয়া মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ধারা, ওরস ও মাজারকেন্দ্রিক ধারা, জামায়াত বা মওদুদীবাদের ধারা এবং আহলে হাদিস বা সালাফী মতবাদের অনুসারীদের ধারা। শেষের এই ধারাটি কোনো মাজহাব মানে না বলে তাদেরকে ‘লা মাজহাবী’ও বলা হয়ে থাকে।
চট্টগ্রামের আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়া মাদ্রাসা থেকে প্রকাশিত সাময়িকী আত-তাওহীদের সম্পাদক মাওলানা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, ওয়াজের ময়দানে বাতিলের ফিতনাসহ নানা মতবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। নামেও পরিবর্তন এসেছে। কেউ বলছেন, ইসলামি সম্মেলন, কেউ বলছেন ‘শানে রেসালত সম্মেলন’; ‘শানে মোস্তফা’ ইত্যাদি। ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে ‘এশায়াত সম্মেলনের’।
আল্লামা নূরুল হুদা ফয়েজী বলেন, মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য ব্রিটিশরা নানা বাতিল মতবাদ সৃষ্টি করেছিল। সমাজে আজও তারা আছে। মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
ওয়াজ মাহফিলে হাসি-তামাশার প্রসঙ্গে নূরুল হুদা ফয়েজী বলেন, ‘এরা কন্ট্রোলের বাইরে।’

Tuesday, November 12, 2019

বাংলাদেশে অডিও সিডি-ভিসিডি বিক্রি বন্ধ, লাইক-সাবসক্রাইবার বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় প্রযোজকরা by শফিক রহমান

এক ধরনের ধসের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের অডিও সিডি-ভিসিডির মার্কেট। বন্ধ হয়ে গেছে দেশটির এক সময়ের ক্যাসেট এবং কিছু দিন আগের অডিও সিডি-ভিসিডির প্রযোজনা ও বিক্রয়ের একমাত্র হাব হিসেবে পরিচিত পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীর বিক্রয় কেন্দ্রগুলো। আগে পাটুয়াটুলীর নূরুল হক মার্কেট, সালাম ম্যানশন, হাজী নূর মার্কেট এবং আরেফিন প্লাজাসহ আশপাশের মার্কেট থেকে অখ্যাত-বিখ্যাত নানা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে প্রকাশ হতো বাউল, বিচ্ছেদ, জারি-সারি, পালাগান, ইসলামী গজল, হামদ-নাত, ওয়াজ, কোরআন তেলাওয়াতসহ আধুনিক ও ব্যান্ড সঙ্গীতের জনপ্রিয়সব ক্যাসেট। প্রায় দেড় দশক আগে ওই প্রতিষ্ঠানগুলো জড়ো হয়েছিল ওই এলাকারই ঐতিহাসিক ও আলোচিত মুন সিনেমা হল ভেঙ্গে গড়ে ওঠা মুন কমপ্লেক্সের তৃতীয় তলায়।
সম্প্রতি ফেব্রুয়ারির এক সন্ধ্যায় নগরীর ব্যস্ততম ওই অংশের ঘড়ি, চশমা, কাপড় ও বোরকার দোকানের হাজার ওয়াটের লাইটের নিচে বসে বিক্রেতারা যখন পাইকারি ক্রেতাদের নিয়ে ব্যস্ত, যখন  সামনের ছোট-চাপা রাস্তায় রিকশা, ভ্যান আর ঠেলা গাড়ির ঠাসা-ঠাসি, তখন মুন কমপ্লেক্সের তৃতীয় তলায় অডিও সিডি-ভিসিডির মার্কেট জুড়ে অন্ধকার। সাটার নামানো দোকানগুলো ঘিরে তৈরি হয়েছে ভৌতিক এক নিরবতা। দুই একটি দোকানে আলো জ্বলছে। সেগুলোর সামনের অংশে সিডি-ভিসিডি বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড থাকলেও ভেতরে কাজ করছে পাঞ্জাবি, বোরকা ও টি শার্ট প্যাকেজিং এর শ্রমিকরা। এর মধ্যেই খুঁজে পাওয়া গেল ‘মা সিডি ভিশন’।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক শিবু কৌতুহলী হয়ে নড়েচড়ে বসে জানালেন, ‘বিক্রি নাই, ব্যবসা বন্ধ।’ সঙ্গে সঙ্গেই তিনি পাল্টা প্রশ্ন রাখেন, ফেসবুক, ইউটিউবের যুগে এসবের কি আর চাহিদা থাকে?
শিবু জানান, তিনি মুলত বাউল, বিচ্ছেদ, জারি-সারি ও পালা গানের ক্যাসেট প্রযোজনা ও বিক্রি করতেন। ১৯৮৪ সালে জনি এন্টারপ্রাইজের ব্যানারে প্রথম প্রকাশ করেন মালেক সরকারের গাওয়া সুলায়মান পয়গম্বরের জারির ক্যাসেট। এর ধারাবাহিকতায় একে একে প্রকাশ করেন ঐতিহাসিক চরিত্র হানিফ পালোয়ান, সোহরাব-রুস্তুম, মা ফাতেমার শক্তি পরীক্ষাসহ নানা শিরোনামের জারি গানের ক্যাসেট।
শিবু আরও জানান, ১৯৯৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘মা সিডি ভিশন’ এবং ওই বছরই তিনি প্রথম প্রকাশ করেন লোক সঙ্গীত শিল্পী মমতাজের ‘মরার কোকিলে’ সিডিটি। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সিডিটির শিরোনামের গানটি পৌঁছে যায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে। শিবুর দাবি, এই গানটির মাধ্যমেই মমতাজ যুক্ত হন সঙ্গীত জগতের ‘মূল ধারায়’। তিনি বলেন, মমতাজের খ্যাতি আগেও ছিল। কিন্তু তা পালা গানের শিল্পী হিসেবে। এই গানটিই তাকে এনে দেয় ভিন্ন পরিচয়।
পরবর্তীতে মমতাজ সমান তালে গেয়েছেন রেডিও, টেলিভিশন, দেশি-বিদেশি কনসার্টসহ নানা অনুষ্ঠানে। পরিচিতি পেয়েছেন বাংলাদেশের ফোক সম্রাজ্ঞী হিসেবে।
জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন প্রথমে সংরক্ষিত মহিলা আসনে। বর্তমানে নির্বাচিত।
জানা গেছে, পাকিস্তান আমলেই পাটুয়াটুলিতে দেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির গোড়াপত্তন ঘটে। বিশেষ করে তখন দুই তিনটি ব্যবসায়ি প্রতিষ্ঠান গ্রামোফোন থেকে গান-মিউজিক কপি করে বিক্রি শুরু করে। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিস ওউনারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এমআইবি) জানায়, এর ধারাবাহিকতায় ওই এলাকায় ১১২টি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। যদিও সারা দেশে তখন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৭১টি।
ক্ষিণ আলোতে মোবাইলের ক্যামেরায় সারি সারি বন্ধ দোকানের ছবি তুলতে গেলে উদ্দেশ্য জানতে চান স্বপন দাস। নিজেকে ‘সুর সঙ্গীত’ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের মালিক পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘ব্যবসায়ী হিসেবে আমরা বুদ্ধিমান না। এক সময় যখন ক্যাসেট বের করা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম ততোদিনে বাজার দখল করে নিয়েছে অডিও সিডি-ভিসিডি। ওই সময় আর্থিকভাবে বড় একটা ধরা খেয়েছি। পরে আবার যখন সিডি-ভিসিডি নিয়ে ব্যস্ত রয়েছি ততোদিনে ফেসবুক, ইউটিউবের যুগ চলে এসেছে। আবার আর্থিক ক্ষতি।’
তবে এবার ক্ষতির ধকল কাটিয়ে ওঠার চেষ্টার কথা জানালেন স্বপন দাস। তিনি বলেন, ‘ইউটিউবে সুরসঙ্গীত’ নামে একটি চ্যানেল খুলেছি। পুরোনো প্রযোজনাগুলো ওখানে ছাড়া হয়েছে। নতুনগুলোও ছাড়া হচ্ছে। তাতে খরচ কিছুটা উঠে আসা শুরু হয়েছে।’
স্বপন দাস জানান, তার বাবা সুবল চন্দ্র দাস ছিলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত ঢোল বাদক। ১৯৯৪ সালে তিনিই শুরু করেন ‘সুর সঙ্গীত’ এবং প্রতিষ্ঠানটির লোগো হিসেবে রাখেন ঢোলকে। তাদের প্রথম এবং বিখ্যাত প্রযোজনা মমতাজের ‘ভাব বৈঠকী’।
ইউটিউবে সার্চ দিয়ে দেখা গেল বাংলার ঢোলের ছবি দিয়ে তৈরি করা লোগো এবং ‘সুরসঙ্গীতে’র ব্যানারে ইতোমধ্যে ১৯৪টি ভিডিও আপ হয়েছে। শুরুতেই দেখা যায় মমতাজের ছবি সম্বলিত সেই অ্যালবামটি। যার শিরোনামে লেখা রয়েছে ‘মমতাজের শ্রেষ্ঠ অ্যালবাম-ভাববৈঠকী’। এক বছর আগে আপ হওয়া অ্যালবামটি ইতোমধ্যে ভিউয়ারের সংখ্যা পার করেছে ১২ লাখ ৩৪ হাজার।
এদিকে একই তথ্য জানালেন এমআইবি’র সেক্রেটারি জেনারেল এবং সেন্ট্রাল মিউজিক এন্ড ভিডিওস (সিএমভি)-এর কর্ণধার শাহেদ আলী পাপ্পু। তিনি বলেন, অডিও সিডি-ভিসিডি’র দোকান কেন্দ্রীক ব্যবসা বন্ধ। ব্যবসাটা এখন করপোরেট পর্যায়ে চলে গেছে। মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো আমাদের কাছ থেকে কনটেন্ট নেয়। এছাড়া ফেসবুক গ্রুপ আছে, ইউটিউবে চ্যানেল আছে।
আয়ের হিসাব বিশেষ করে দোকান ভিত্তিক বিক্রির তুলনায় বর্তমান প্রক্রিয়ায় আয় বেশি না কম জানতে চাইলে শাহেদ আলী পাপ্পু বলেন, পুরনো একটি ধারা থেকে একেবারেই নতুন একটি পথে আমরা চলতে শুরু করেছি। এ পথে আয় আসছে কিন্তু পুরো মাত্রায় আসতে হয়তো একটু সময় লাগবে।
ইউটিউবে সার্চ দিয়ে দেখা গেল সিএমভি’র সাবসক্রাইবার ১.৫ মিলিয়ন ছাড়িয়েছে।
এছাড়া সিডি চয়েসের ০.৫ মিলিয়ন, সিডি ভিশনের ০.২ মিলিয়ন, সুরঞ্জলীর ০.৬ মিলিয়ন, মিউজিক হেভেনের ০.৭ মিলিয়ন, বাউল মেলার ০.২ মিলিয়ন, চেনাসুরের ০.২ মিলিয়ন, লেজার ভিশনের ০.৭ মিলিয়ন, অনুপমের ০.১ মিলিয়ন, সাউন্ডটেকের ১.৪ মিলিয়ন, সঙ্গীতার ০.২ মিলিয়ন। তবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সাবসক্রাইবার জি সিরিজের থলিতে। তাদের মোট সংখ্যা ২.৪ মিলিয়ন ছাড়িয়েছে। আর সবচেয়ে কম সুরের মেলার। তাদের মাত্র ২৭টি।
এদের মধ্যে ‘সঙ্গীতা’ শুরু হয় আশির দশকের শুরুর দিকে। প্রতিষ্ঠানটির আদি নাম ছিল সামাদ ইলেক্ট্রনিকস। পরে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘সঙ্গীতা’। বাংলাদেশের বিখ্যাত শিল্পীদের অধিকাংশ গানই সঙ্গীতার ব্যানারে বাজারে এসেছে।
মুলত ওই আশির দশককেই বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির বিকাশের দশক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর ধারাবাহিকতা চলে পরের দশক জুড়েও। ওই সময়ের মধ্যে বের হওয়া অধিকাংশ অ্যালবামই আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয়তা পায়।
তবে শুধু প্রযোজনা ও বিক্রিই নয় ক্যাসেট প্রস্তুতেরও কেন্দ্র ছিল পাটুয়াটুলি। সাউন্ডটেক ও কেটি ছিল মূল প্রস্তুতকারক। যদিও প্রতিষ্ঠান দুটি স্থানীয়ভাবে শুধু ক্যাসেটের কেসিং তৈরি করতো এবং তার মধ্যে আমদানি করা টেপ বসিয়ে দিত। পরবর্তীতে সাউন্ডটেক প্রযোজনা প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয় এবং বের করে জনপ্রিয়সব গানের অ্যালবাম।
ইউটিউবে সাউন্ডটেকের দুটি সেকশন দেখা যাচ্ছে। একটি সাউন্ডটেক মিউজিক, আরেকটি সাউন্ডটেক নাটক। অন্যান্য প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোরও এমন একাধিক সেকশন দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে লেজার ভিশনের সেকশনগুলোর মধ্যে বাড়তি দেখা যাচ্ছে ‘লেজার ভিশন বাউলিয়ানা’; ‘লেজার ভিশন মুভি’ ও ‘লেজার ভিশন ডকুমেন্টারি’।
তবে প্রতিষ্ঠিত সবকয়টি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানেরই কমন একটি সেকশন ‘ইসলামিক’। যেখানে রয়েছে ইসলামিক গান, কোরআন তেলাওয়াত ও ওয়াজ।
‘পরিবর্তন’ তা যে ধরনেরই হোক তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন মিউজিক শিল্প উদ্যোক্তারা। গ্রামোফোন থেকে ক্যাসেট, ক্যাসেট থেকে সিডি-ভিসিডি-ডিভিডি। এবার ডিজিটাল প্রযুক্তিতে লাইক-সাবসক্রাইবার বাড়ানোর প্রতিযোগিতা। সঙ্গীত চলছেই।

Wednesday, October 30, 2019

ঢাকায় ইহুদিদের ফ্রিম্যাসন্স হল এখন ভূমি বিভাগের কার্যালয় by শফিক রহমান

ঢাকায় এক সময়ের ইহুদিদের ক্লাব ফ্রিম্যাসন্স হলটি এখন ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ৩০২ বছর আগে লন্ডনে যে ‘ফ্রিম্যাসন্স’ আন্দোলন শুরু হয়েছিল তার ঢেউ এসে লেগেছিল উপমহাদেশের কলকাতা, করাচি, লাহোর, মাদ্রাজ, মুম্বাইসহ কয়েকটি শহরে। বাদ যায়নি ঢাকাও। তবে ১৯৭৮ সালে ঢাকায় ৬৭ বছরের কার্যক্রম সমাপ্তি ঘটে। ওই বছর ঢাকা লজকে (ঢাকা কার্য‌কার্যালয়ের অফিশিয়াল নাম) চিঠি দিয়ে কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা জানায় লন্ডস্থ ইউনাইটেড গ্রান্ড লজ (প্রধান কার্যালয়ের অফিশিয়াল নাম)। পুরনো নথিপত্র ঘেটে এমনটাই জানা গেছে।
ঢাকার প্রাণকেন্দ্র পল্টন মোড় থেকে গুলিস্তানের দিকে যেতে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রায় পেছনের দিকে উঁচু প্রাচীর এবং উঁচু গেট ঘেরা উপনিবেশিক স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত একটি দোতলা ভবন। পকেট গেট ঠেলে ভিতরে ঢুকলে আম-কাঁঠাল আর নিম গাছের ছায়া ঘেরা এক চিলতে ফাঁকা জায়গা। তা পার হয়ে ভবনটির মূল দরজার দিকে এগুলে চোখে পড়বে দেয়াল ঘেষে জ্যামিতিক কাটা-কম্পাসের প্রতীকী রূপ নিয়ে মনোগ্রাম সমৃদ্ধ পাথরে খোদাই করা একটি নামফলক। যেখানে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে ‘ফ্রিম্যাসন্স হল, ১৯১০’।
স্থানীয় প্রবীণদের বক্তব্য, বছর পঞ্চাশেক আগেও ভবনটিতে কিছু মানুষদের আসা যাওয়া ছিল। কিন্তু সেখানে সাধারণের প্রবেশ সম্ভব ছিল না। তাই কারো কারো কাছে ভবনটি ছিল ‘ইহুদিদের রহস্য ঘেরা ক্লাব’।
সাউথ এশিয়ান মনিটর’র পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দেয়ালের নাম ফলকটি ছাড়া ভবনটির ইতিহাস আমাদের কিছু জানা নেই।’
যোগাযোগ করা হয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রধানের সহায়তায় অনুমতি মেলে ‘৭০ পুরানা পল্টন’ শিরোনামের বাদামি মোটা কাগজে মোড়ানো এবং লাল ফিতায় বাধা ভারি একটি ফাইল দেখার। ফাইলের কাভার ওল্টাতেই পাতলা কাগজের কিছু নোটশিট। যেখানে শুধু মামলার নথি-পত্র তলব ও দাখিলের তথ্য। প্রায় শেষে দিকে আরও অনেক কাগজের মধ্যে পাওয়া গেল আকাশি রঙের ছোট একটি বুকলেট। যেটা মূলত একটি গঠনতন্ত্র। যার আলোকেই পরিচালিত হতো ঢাকা ফ্রিম্যাসন্স আন্দোলন। এর পরেই পাওয়া গেল একটি লিজ দলিল। ১৯২৮ সালের ২ মার্চ সাক্ষরিত ওই লিজ দলিলে বার্ষিক ১৩৫ রুপি (তৎকালীন প্রচলিত মূদ্রা) খাজনা প্রদানের শর্তে এক বিঘা সমপরিমাণ প্লটটি ঢাকা লজকে বরাদ্ধ দেয়া হয়। এসবের ফাঁকেই রয়েছে ইউনাইটেড গ্রান্ড লজের লেটার হেডে জনৈক ক্যাপ্টেন এ এম এম রহমানকে লেখা একটি চিঠি। সেখানেই ঘোষণা দেয়া আছে ঢাকা লজের কার্যক্রম বন্ধের।
১৯৭৮ সালের ২৩ জানুয়ারি ক্যাপ্টেন এ এম এম রহমানকে ‘ডিয়ার ব্রাদার রহমান’ উল্লেখ করে গ্রান্ড সেক্রেটারি জে. এ র‌্যাডফোর্ড লিখেছেন, ‘I have to inform you that as a result of the Dacca Lodge No. 3323 being erased by Grand Lodge on the 14th December 1977. The Dacca Lodge Welfare Society is effectively invalidates from this date.’
ওই নথিতেই রয়েছে প্লট ও ভবনসহ সবকিছু ঢাকা জেলা প্রশাসককে হস্তান্তরের তথ্য। পরে জেলা প্রশাসক ভূমি মন্ত্রণালয়কে প্লট ও ভবনটিকে ব্যবহারের অনুমতি দেয়।
এদিকে নথিতে ঢাকার তৃতীয় সাবজজ আদালতে ১৯৭৯ সালে ঢাকা জেলা প্রশাসককে বিবাদি করে ঢাকা লজ ওয়েলফেয়ার সোসাইটির (!) নাম নিয়ে দায়ের করা একটি দেওয়ানী মামলার তথ্য রয়েছে। ঢাকা জজকোর্টের রেকর্ড রুম থেকে জানানো হয় ১৯৮২ সালের ২৩ এপ্রিল ওই মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন তৃতীয় সাবজজ আদালত। পরে ১৯৮৪ সালে ওই পক্ষটি মামলাটি নিয়ে হাইকোর্টের দেওয়ানী আপিল বিভাগে গেলে ১৯৮৭ সালের ২২ জুন বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীর নেতৃত্বে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ, বিচারপতি এম এইচ রহমান এবং বিচারপতি এ টি এম আফজালের আপীল বেঞ্চ মামলাটিকে নিস্পত্তির জন্য ফের তৃতীয় সাবজজ আদালতে পাঠান। কিন্তু ওই আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্তদের অসহযোগিতায় মামলাটির সর্বশেষ অগ্রগতি এবং বাদি হিসেবে ঢাকা লজ ওয়েলফেয়ার সোসাইটির নাম নিয়ে কারা রয়েছেন তা এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে ক্যাপ্টেন এ এম এম রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্ঠা করা হয়। খোঁজ নেয়া হয়েছে তার বাসার ঠিকানায়। জে. এ র‌্যাডফোর্ডের চিঠিতেই ৭/১ হাটখোলা রোডের ঠিকানার কথা উল্লেখ রয়েছে। যদিও ওই ঠিকানায় এখন সেন্ট্রাল উইমেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুতল ক্যাম্পাস। যার এক পাশে আরেকটি বহুতল ভবন। যেটিতে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ছিল কিন্তু বর্তমানে ফাঁকা।
আরেক পাশে দোতলা বাংলো টাইপের একটি বাড়ি। যার দোতলা কার্নিশে বড় করে লেখা রয়েছে ‘গ্লাস ভিউ’।
প্রথম দিন বাড়িটির মালিক পক্ষের কাউকে পাওয়া না গেলেও দ্বিতীয় দিনে পাওয়া গেল। খবর পেয়ে মধ্য বয়সী একজন দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। ক্যাপ্টেন এ এম এম রহমানের নাম শুনেই বলে উঠলেন-‘আপেল ভাইদের কথা বলছেন? দাঁড়ান আমি নিচে আসছি।’ এসে বললেন, পাশের বাসায় দীর্ঘ দিন ভাড়া ছিলেন আপেল ভাইয়ারা। তিনি বাংলাদেশ সরকারের সচিব হয়ে অবসরে গেছেন। কিন্তু তার অফিশিয়াল নামটা আমাদের জানা নেই। এ এম এম রহমান তাঁরই ছোট ভাই। কিন্তু এখন তারা কোথায় গেছেন সেটাতো জানা নেই। তবে শুনেছি আপেল ভাইয়া গুলশানে কোথাও উঠেছেন।
ঢাকার পল্টন মোড়ে এক সময়ের ফ্রিম্যাসন্স হল
তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশের ভবনটিও একই মালিকানার। তিনি পুরান ঢাকার কাজী নান্না মিয়া। তাঁর বড় ছেলে এ্যাডভোকেট মইনুল ইসলাম আপেল ভাইদের সম্পর্কে জানতে পারেন।
উঠে আসার সময় তার নামটি জানতে চাওয়া হলে জানালেন, তিনি হরদেও গ্লাস ফ্যাক্টরির মালিক ফজলুর রহমানে ছেলে তালিবুর রহমান।
পরামর্শ মতে পাশের ভবনটিতে যোগাযোগ করা হলে দেখা হয় এ্যাডভোকেট মইনুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, সেতো অনেক দিন আগের কথা। তারা আমাদের এখানে ভাড়া ছিলেন। ওর পরেতো আর কোন যোগাযোগ ছিল না। এখন কোথায় আছেন তাও জানা নেই।
এদিকে তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, লন্ডনে ফ্রিম্যাসন্স আন্দোলন শুরু হয় ১৭১৭ সালে। আর এই উপমহাদেশে সর্বপ্রথম ১৭২৯ সালে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে প্রতিষ্ঠিত হয় ফ্রিম্যাসন্স ক্লাব। এর ধারাবাহিকতায় ১৭৫৩ সালে মাদ্রাজে, ১৭৫৮ সালে মুম্বাইতে এ আন্দোলনের বিস্তৃতি ঘটে।
পাকিস্তান অংশে এর প্রথম শাখা স্থাপিত হয় ১৮৫৯ সালে লাহোরে। ১৯০৪ সালের ৪ এপ্রিল ক্লাবটি ভূমিকম্পে ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে ১৯১৬ সালে পুনরায় নির্মাণ করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় পেশোয়ার, মুলতান, শিয়ালকোট, রাওয়ালপিণ্ডি, হায়দারাবাদ, কোয়েটা ও করাচিতে এর শাখা গড়ে উঠেছিল। বলা হয়, ওই সময় ফ্রিম্যাসন্স ক্লাব এতটাই প্রসারমাণ ছিল যে শুধু করাচিতে ২০টি এবং লাহোরে তিনটি শাখা গড়ে উঠেছিল।
তবে ১৯৭২ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ফ্রীম্যাসোনরী আন্দোলনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন এবং লজ ভবনগুলো বাজেয়াপ্ত করেন।
এদিকে ১৯১০ সালে ঢাকায় ফ্রিম্যাসন্স আন্দোলন শুরু হলেও ভূখণ্ডের এই অংশে ইহুদীদের আধিক্যের তেমন তথ্য পাওয়া যায় না। ১৯৪৭ সালে কলকাতায় চার হাজার ইহুদীর বসবাসের তথ্য জানাচ্ছে এশিয়ান জিউশ লাইফ। ওই একই সময়ে বাংলাদেশের এই অংশে ইহুদীদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩৫ জন।
উপমহাদেশে বসবাসকারি ইহুদিরা প্রধানত বনি ইসরাইল ও বাগদাদি ইহুদি – এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিলেন। তবে একটি পক্ষকে বাগদাদি বলা হলেও তারা মূলত ইউরোপিয় ইহুদি, যারা ক্রুসেডের সময় বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। অনুমান করা হয় মোঘল আমলে ইউরোপিয়দের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি পেলে তখনই উপমহাদেশে তাদের আগমন ঘটে। কাপড়, সিল্ক, মসলিন ও মুক্তার ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের।
হোটেল রেষ্টুরেন্ট ব্যবসায়ও তাদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখ করার মতো। যেমন, কলকাতায় তাদের উদ্যোগেই গড়ে উঠেছিল ট্রিংকা রেষ্টুরেন্ট ও গ্রান্ড হোটেল। আর ঢাকার গুলিস্তানে তাদের মালিকানায় ছিল রিজ রেস্তোরাঁ। তখনকার সময় ঢাকায় তেমন কোনো হোটেল না থাকায় সেই রিজ রেস্তোরাঁয়ই সরকারি-বেসরকারি অনেক অনুষ্ঠান হতো।
ফ্রেন্ডস সার্ভিস ইউনিটের ঢাকা প্রধান টোরেন্স মিউসের আমন্ত্রণে ১৯৫০ সালের ১৩ আগস্ট শেষবারের মতো ঢাকায় আসেন কবি-সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু। তাঁর সৌজন্যে রিজ রেস্তোরাঁয়ই নৈশভোজের আয়োজন করা হয়।
ওই পঞ্চাশের দশকেই রেস্তোরাঁটির হাত বদল হলে একই সঙ্গে তার নামও বদল হয়ে হয় ‘রেক্স’। রেক্স রেস্তোরাঁও ছিল ঢাকার বনেদি বাসিন্দা ও কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডাস্থল।
তবে বাংলাদেশে সর্বশেষ দুটি ইহুদি পরিবারের অস্তিত্বের খবর পাওয়া যায় বিভিন্ন লেখায়। তার একটি রাজশাহীর কোহেন পরিবার। তাদের পূর্বপুরুষ এসেছিলেন ইরাক থেকে। ওই পরিবারেরই বিখ্যাত একজন মর্ডি কোহেন। তিনি প্রথমে রাজশাহীতে রেডিওতে ঘোষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৪ সালে ২৫ ডিসেম্বর ঢাকার ডিআইটি ভবনের বাইরে পাকিস্তান টেলিভিশনের উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান। উদ্বোধনী দিনের অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন মর্ডি কোহেন। তার উপস্থাপনায় স্টুডিও থেকে প্রচার হয় একটি গানের অনুষ্ঠান।
দেখতে সুদর্শন মর্ডি কোহেন সহজেই টেলিভিশনের একজন জনপ্রিয় ঘোষক হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন। একসময় সংবাদ পাঠক হিসেবেও তিনি আবির্ভূত হন। এছাড়া খান আতাউর রহমান পরিচালিত নবাব সিরাজউদ্দৌলাসহ কয়েকটি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন তিনি। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর তিনি তাঁর পরিবারসহ কলকাতা চলে যান। সেখানে তিনি তপন সিংহ পরিচালিত ‘সাগিনা মাহাত’ ছবিতে অভিনয় করেন।
মর্ডির এক ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় মাস্টার্স করেছেন। তিনি পরে ইসরায়েলের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। তারা অনেকের কাছে কোহেন ব্রাদার্স নামে পরিচিত ছিলেন।
২০১৪ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মর্ডি কোহেন ঢাকায় এসেছিলেন। ঢাকা থেকে কলকাতায় ফিরে গিয়ে তিনি মারা যান। কলকাতার নারকেলডাঙ্গায় তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের বারোক পরিবারেও ছিলেন দুই ভাই। রহমিম এজরা বারোক এবং রহমিম ডেভিড বারোক। এজরা বারোক চাকমা রাজপরিবারের এক রাজকন্যাকে বিয়ে করেন এবং চন্দ্রঘোনায় বসবাস করতেন। তিনি বাংলাদেশ আমলে মৃত্যবরণ করেন। চন্দ্রঘোনা ক্যাথলিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। ইহুদি হলেও স্থানীয়দের কাছে তিনি খৃষ্টান বলেই পরিচিত ছিলেন। এডি এডওয়ার্ড নামে পরিচিত ছিলেন তিনি। ব্যবসায়ি এবং মহাজন হিসেবেও তার সুনাম ছিল। তার কোন সন্তান ছিলনা।
তার ছোট ভাই ডেভিড বারোক বসবাস করতেন চট্টগ্রাম শহরে। তিনিও একজন ধনি ব্যবসায়ি ছিলেন। ১৯৭৮ সালে তিনি মারা যান এবং তাকে চট্টগ্রাম ক্যাথলিক চার্চ এর কবরস্থানে কবর দেওয়া হয়। ডেভিড বারোক এর ছেলে জোসেফ বর্তমানে কানাডাতে বসবাস করছেন। এছাড়া ইউনুস দানিয়েল নামে আরেকজন ইহুদি ব্যবসায়ি চট্টগ্রামে বসবাস করতেন। যার নামের কারনে অনেকেই তাকে ইরানি মুসলিম বা ইসমাইলি শিয়া বলে মনে করতেন। বলা হয়, বাংলাদেশে এখনও দু’একটি ইহুদি পরিবার আছেন কিন্তু পরিচয় গোপন করে চলছেন।
এদিকে বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপেও সন্ধান চলছে ঢাকার ফ্রিম্যাসন্স ও ফ্রীম্যাসনরীর। কিন্তু কারো যোগাযোগ মিলছে না। তাহলে মর্ডিই কি শেষ ইহুদি যিনি কলকাতার জীবন থেকে ঝরে পড়েছেন? দিনটা ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর। যা আবার মর্ডির প্রিয় বাংলাদেশের বিজয় দিবসও!
ফ্রিম্যাসন্স হলের নামফলক, প্রতিষ্ঠাকাল ১৯১০ সাল