Friday, September 6, 2013

যুক্তরাষ্ট্রকে পুতিনের হুশিয়ারি

সিরিয়ার বিরুদ্ধে একপেশে সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের হুশিয়ার করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিন। বিবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়, জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া সামরিক অভিযান চালালে তা ‘আগ্রাসন’ হতে পারে বলে পুতিন মন্তব্য করেছেন। কথিত রাসায়নিক হামলার অভিযোগে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। এ বিষয়ে পুতিন বলেছেন,
সিরিয়া সরকার রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করছে এমনটি ‘নিশ্চিতভাবে’ প্রমাণিত হলে নিরাপত্তা পরিষদ যদি শক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেয় রাশিয়া তা আগ্রাহ্য করবে না। তবে জাতিসংঘের পরামর্শ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা চালায় তবে রাশিয়া কি প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা বলার সময় এখনও হয়নি বলে জানান তিনি। পুতিনের এই মন্তব্যের আগে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের বৈদেশিক সম্পর্ক-বিষয়ক সিনেট কমিটি সিরিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর একটি খসড়া প্রস্তাব অনুমোদন করে। ৬০ দিনে অভিযান শেষ করার নির্দেশনা দেয়া এই প্রস্তাবটির উপর আগামী সপ্তাহে কংগ্রেস অধিবেশনের সময় ভোটাভুটি হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, একমাত্র নিরাপত্তা পরিষদ সিরিয়ায় হামলার অনুমোদন দিতে পারে। কথিত রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ এনে আমেরিকা যখন দামেস্কের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা করছে এমন সময়ে এ কথা বললেন বান কি মুন। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের সময় মুন বলেন, আমি বার বার বলেছি, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রাথমিক দায়িত্ব রয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের। তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শুধু আত্মরক্ষার জন্য কিংবা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নিয়েই কেবল শক্তি প্রয়োগ আইনসংগত হতে পারে। অন্যদিকে রাশিয়া পূর্ব-ভূমধ্যসাগরে একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রবাহী জাহাজসহ দুটি রণতরী পাঠিয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই দুই রণতরী সেখানে পৌঁছাবে বলে রুশ নৌবাহিনী সূত্র থেকে জানানো হয়েছে। এই দুই যুদ্ধজাহাজের একটি কৃষ্ণ সাগরের রুশ নৌবহরের এসকর্ট শিপ-স্মেতিভি এবং অন্যটি হল বাল্টিক সাগরের ডেস্ট্রয়ার নাতসতোইচিভি। স্মেতিভি রণতরী ৪৪৬০ টন পানি অপসারণ করতে পারে এবং এ যুদ্ধজাহাজে কেএইচ-৩৫ জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং একে-৭২৬ গোলন্দাজ ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া এ জাহাজে রয়েছে ১৬টি বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৫টি ৫৩৩-এমএম টপের্ডো।
ওবামাকে হিলারির সমর্থন : সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন বলেছেন, তিনি প্রেসিডেন্ট ওবামার সিরিয়া হামলাকে সমর্থন করেন। তবে এর আগে সিরিয়ায় সামরিক হামলার বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন তিনি। মঙ্গলবারই প্রথম এ বিষয়ে মুখ খুলে সিরিয়ায় সামরিক হামলার ওবামার পরিকল্পনাকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সমর্থন জানান। বুধবার এ খবর জানিয়েছে অনলাইন টেলিগ্রাফ।
পোকার খেলছিলেন ম্যাককেইন!
মার্কিন সিনেটে সিরিয়া-বিষয়ক শুনানির সময় স্মার্ট ফোনে পোকার খেলছিলেন রিপাবলিকান দলের সিনেটর জন ম্যাককেইন! খবর এএফপির। প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, মঙ্গলবার মার্কিন প্রশাসন সিনেট সদস্যদের নিয়ে যখন রাসায়িক হামলা চালানোর অভিযোগে সিরিয়ায় বোমা নিক্ষেপের পরিকল্পনা করছেন, ম্যাককেইন তখন তার আইফোনে একমনে পোকার খেলছেন। ওয়াশিংটন পোস্টের ফটোগ্রাফার ম্যাককেইনের পোকার খেলার ওই ছবি ইন্টারনেটে পোস্ট করার পর ম্যাককেইনের টনক নড়েছে। তিনি অবশ্য এ ঘটনাকে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। এ ঘটনাকে ‘স্ক্যান্ডাল!’ লিখে টুইটও করেছেন তিনি। কিন্তু তা হলে কি হবে, এরইমধ্যে ওই ছবিটি হাজারবার রি-টুইট করা হয়েছে টুইটারে।

সিরিয়া ঘিরে ফেলেছে মার্কিন সামরিক শক্তি

সিরিয়ার চারপাশ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কোথায়, কেমন ও কত সক্ষমতার- দেখে নেয়া যাক এক নজরে।
অ্যাকরোতিরি বিমান ঘাঁটি
এই ঘাঁটি থেকে পশ্চিমাদের যৌথবাহিনী সিরিয়ার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে খুব সহজেই। সোমবার থেকে এখানে হামলার জন্য তোড়জোড় শুরু হয়েছে। সামরিক পরিবহনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ থেকে আসা জেট বিমান এখানে অহরহ অবতরণ করতে পারে। ঘাঁটিটি ব্রিটিশ নৌসেনাদের অধীনে। সিরিয়া থেকে এটি ১০০ কিলোমিটারের চেয়ে কম দূরত্বে অবস্থিত।
ইনসারলিক বিমান ঘাঁটি
এটি যুক্তরাষ্ট্রের ৩৯তম বিমান ঘাঁটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গঘাঁটি। এখানে রয়েছে ৫ হাজার মার্কিন নৌসেনা। সিরিয়ায় আগ্রাসনে এর ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
মার্কিন নৌবাহিনীর রণতরী
ইউএসএস মাহান : আরলেইহ ব্র“ক শ্রেণীর ডেস্ট্রয়ার ডিডিজি-৭২ যা টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সজ্জিত। টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র সহজেই সিরিয়ায় আঘাত আনতে সক্ষম। ২০১১ সালে লিবিয়ার স্বৈরশাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে হটাতে ন্যাটো পরিচালিত ‘অপারেশন ইউনিফায়েড প্রটেক্টর’ অভিযানে নৌ-রণতরী ইউএসএস মাহান ব্যবহার করা হয়। জিব্রাল্টার প্রণালি হয়ে সরাসরি ভূমধ্যসাগরে এ ডেস্ট্রয়ার রণতরীটি প্রবেশ করলেও সিরিয়া হামলায় সম্ভবত এটি ব্যবহৃত হবে না।
ইউএসএস গ্রেভলি : ইউএসএস মাহানের মতো ইউএসএস গ্রেভলিও আরলেইহ ব্র“ক শ্রেণীর ডেস্ট্রয়ার। ডিডিজে-১০৭ ডেস্ট্রয়ার এটি। রণতরীটি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহন ও নিক্ষেপে সক্ষম। ২০১০ সালে এ যুদ্ধ জাহাজটি কমিশন লাভ করে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্র“প টু’র অন্তর্ভুক্ত। সিরিয়ায় আঘাতে ব্যবহৃত হতে পারে গ্রেভলি।
ইউএসএস ব্যারি : এটিও আরলেইহ ব্র“ক শ্রেণীর ডিডিজে-৫২ ডেস্ট্রয়ার। এ রণতরীটি থেকেও টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে সিরিয়ায় হামলা চালানো সম্ভব। ২০১১ সালে ‘অপারেশন অডেসি ডন’র আওতায় গাদ্দাফির আকাশ প্রতিরক্ষা গুঁড়িয়ে দিতে ইউএসএস ব্যারি থেকে ৫৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়।
মার্কিন সাবমেরিন : পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত হানতে ওস্তাদ মার্কিন সাবমেরিনগুলো। এরই মধ্যে ভূমধ্যসাগরে সাবমেরিন মোতায়েন করা হয়েছে। ১৬শ’ কিলোমিটার দূরের কোনো লক্ষ্যবস্তুতে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করতে সক্ষম এ সাবমেরিনগুলো।
ইউএসএস স্যান অ্যান্টানিও : দ্বৈত্যাকার এ উভচর জাহাজটি ৩০০ মেরিন ও দূরবর্তী যোগাযোগের সরঞ্জাম বহন করতে সক্ষম। এটি ভাসমান ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ অভিযানে এটি সাময়িক ঘাঁটির কাজও করতে পারে।
কেএএসওটিসি : এ বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও জর্ডান যৌথ সামরিক মহড়া চালায় জর্ডানের ‘কিং আবদুল্লাহ-২ স্পেশাল অপারেশন ট্রেনিং সেন্টারে’। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র সেখানে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে। সম্ভাব্য সিরিয়া হামলায় তা ব্যবহার করা হবে।
ইউএসএস কিরসারজ : প্রশস্ত ডেকবিশিষ্ট এ নৌতরীটিও স্যান অ্যান্টানিও’র মতো উভচর। সংযুক্ত আরব আমিরাতের অনুমতি সাপেক্ষে এটি এখন লৌহিত সাগরে অবস্থান করছে। ২০১১ সালে লিবিয়ায় গাদ্দাফিবিরোধী অভিযানে এটি ব্যবহৃত হয়।
ইউএসএস হ্যারি ট্র–ম্যান : নরফোক ও ভার্জিনিয়া থেকে উড়ে আসা বিমানের জন্য এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সমুদ্র নিরাপত্তার অংশ হিসেবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের অধীনে পরিচালিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কোরিয়া, কিউবা, লিবিয়াসহ আরও কয়েকটি অঞ্চলে অভিযান চালায় এটি।
ইউএসএস মিনিতজ : এটিও পঞ্চম নৌবহরের অংশ হিসেবে পরিচালিত। প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিরাপত্তার জন্য এভারেট ও ওয়াশিংটনের বিমান ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘ক্যারিয়ার এয়ার উইং ইলেভেন’ যা আফগান যুদ্ধের ‘অপারেশন এনডিওরিং ফ্রিডমে’ ব্যবহার করা হয়।
ইউডেইভ বিমান ঘাঁটি : এটি হল কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ পরিসরের বিমান ঘাঁটি। এখান থেকে বোমারু বিমান ‘বি-১’ সিরিয়ায় আক্রমণ করতে সক্ষম। সমুদ্র থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে এর ধ্বংসাÍক ক্ষমতা ঢের বেশি।তথ্যসূত্র : আল জাজিরা।

আফগান পুলিশের রকেট ছুড়ে মাছ শিকার : ৬ শিশু নিহত

আফগানিস্তানের নদীতে রকেট ছুড়ে মাছ শিকার করতে গিয়ে ৬ শিশুকে হত্যা করেছে দেশটির পুলিশ। এ অভিযোগে নিরাপত্তা বাহিনী এরই মধ্যে ৮ পুলিশকে গ্রেফতার করেছে। শুক্রবার আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলীয় বাগলান প্রদেশের দোশি জেলায় এ ঘটনা ঘটে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ‘পুলিশ নদীতে রকেট চালিত গ্রেনেড ছুড়লে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তা এমন একস্থানে আঘাত হানে যেখানে কয়েকটি শিশু খেলা করছিল। গ্রেনেডের আঘাতে ৬ শিশু নিহত ও ২ জন আহত হয়।’ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে,
‘সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের অভিযোগে ওই ৮ পুলিশকে গ্রেফতার করা হয় এবং ঘটনা তদন্তের জন্যে পুলিশ সদস্যদের সামরিক আদালতের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’ প্রাদেশিক গভর্নরের মুখপাত্র আহমাদ জাভিদ বাশারাত ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, নিহত শিশুদের বয়স ১০ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই নিহত শিশুদের পরিবারকে টেলিফোন করে সমবেদনা জানিয়েছেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। আফগানিস্তান মাছ শিকারের জন্যে হ্যান্ড গ্রেনেড কিংবা আরপিজির মতো অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা নতুন কিছু নয়। এমনকি দেশটির কোনো কোনো এলাকায় মাছ শিকারের জন্যে পানিতে ইলেক্ট্রিক জেনারেটর এবং বিদ্যুৎ পরিবাহী বিপজ্জনক তারও ব্যবহার করা হয়। সূত্র : এএফপি।

আমি ও সাব্রিনা এবং রফিক by মশিউল আলম

সাব্রিনা আমার সঙ্গে প্রেমের ছল করে, রফিকের সঙ্গে শোয়। কিন্তু কী করবেন? আমি নভেম্বরে ৪০ ছুঁচ্ছি আর রফিক ৩২ বছরের টগবগে যুবক। দেবদারুগাছের মতো সুঠাম, প্রায় ছয় ফুট লম্বা, আবলুশ কাঠের মতো কালো। সাব্রিনা কালোই পছন্দ করে কারণ আমি কালো নই; পাঁচ ফুট সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি শরীরটা আমার যে ত্বকে মোড়া তার রং রোদে পোড়া এঁটেল মাটির মতো। স্বাস্থ্য অবশ্য ভালো; ভোরে চন্দ্রিমা উদ্যানে এক ঘণ্টা হাঁটি, দশ মিনিট দৌড়াই। বাসায় শবাসন করি। শীর্ষাসনও করতে পারি, যদি জানতে চান। সাব্রিনা বলে, ‘ইউ আর পারফেক্টলি ফিট, শার!’ (ও নিজের নাম বলে শাবরিনা শুলতানা, রাজশাহীকে বলে রাজসাই।) আমি খুব বুঝি, সাব্রিনা ‘পারফেক্টলি ফিট’ বলে আমার প্রশংসা করে কেন। আমার বউ তো বলে ঠিক উল্টা: ‘তুমি কিন্তু বুড়া হয়ে যাচ্ছ!’ আই ডোন্ট মাইন্ড; আমার বউ সতী। তার বিচারে মিথ্যা প্রশংসা করা একধরনের দুর্নীতি, যেমন ঘুষ দেওয়া। সাব্রিনা আমার বউয়ের অজান্তে আমার সঙ্গে সেই দুর্নীতি করে। মুখের ওপর আমাকে বলে, ‘আপনি শার এত ভালো...ইউ আর রিয়েলি এ লাভেবল ম্যান!’ এ সংসারে লাভের তো নানা প্রকারভেদ, ওকে জিজ্ঞাসা করি, আমার জন্য ওর লাভটা কোন প্রকারের। সাব্রিনা আমার মুখের দিকে চেয়ে খিল খিল হেসে বলে, ‘ওহ শার! ইউ আর শো কিউট!’ ‘নেক্সট উইকে হিল ট্র্যাকটসে আমার টুর। তুমি যাবে আমার সঙ্গে?’ ‘দরকার হলে কেন যাব না, শার?’ কিন্তু ওর মায়ের জ্বর আসে।
মহিলা বিধবা, চারটি কন্যার জননী। সাব্রিনাই সবার বড়, এবং একমাত্র উপার্জনকারী। ওর তিনটি বোন বিদ্যালয় মহাবিদ্যালয়-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করে। ওদের খরচ জোগায় সাব্রিনা একাই। ওদের বাড়ি নাই, অন্যের বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকে; দুটি মাত্র ঘরে পাঁচজন মানুষ, বাড়িভাড়াও সাব্রিনাকেই জোগাতে হয়; বাজার খরচ, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ...আপনারা তো সবই জানেন, স্ট্রাগলিং ফ্যামিলি। সাব্রিনাই একমাত্র ভরসা। আমি হিল ট্র্যাকটসের টুর বাতিল করলাম। সাব্রিনা এক দিন অফিস কামাই দিয়ে সোমবারেই হাজির (নইলে মূল্যবান অর্জিত ছুটি কাটা যাবে)। ‘একি শার! আপনি টুরে যাননি?’ ‘তোমার মার শরীর এখন কেমন?’ ‘শিরিয়াশ কিছু না, শার, ভাইরাশ।’ ‘টুরটা তাহলে নেক্সট উইকেই সেরে আসি, কী বল?’ ধরা-খাওয়া ভাবটা দিব্যি সামলে নিয়ে সাব্রিনা বলে, ‘ঠিকাছে, শার।’ ঘরে ফিরে বউকে বলি, ‘তোমাকে ভালোবাসি’। ওর দুই চক্ষু একটা চক্কর খেয়ে উঠে যায় কপালে, নাচানাচি শুরু করে দুই ভুরু: ‘কী ব্যাপার? মদ খেয়ে আসছ নাকি?’ আমি ঠোঁট সরু করে ওর মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ি, ও শিকারি কুকুরের মতো গন্ধ শোঁকে। কিন্তু অ্যালকোহলের গন্ধ না পেয়ে অবাক ও খুশি হয়ে দুই হাতে বেড় দিয়ে জাপটে ধরে আমাকে, ঠোঁটে ঠোঁট রাখে, মনে হয় বলবে ‘আমিও তোমাকে ভালোবাসি’। কিন্তু এহেন মিথ্যা কথা ওর মুখ থেকে বের হয় না; ও আমার দুই ঠোঁট কামড়াতে আরম্ভ করে। আমি ব্যথা পেয়ে ‘আউ’ আর্তনাদ করে উঠলে ও খিলখিল হেসে বলে, ‘তোমার আজ কী হইছে?’
দুই কলম্বোর এক নারী অধিকার সংস্থার চিঠি আসে; সেখানে সেমিনার হবে। আমাদের সংস্থা থেকে একজন কর্মীকে ওরা চায়। সাব্রিনার সামনে আমি একটা মুলা দোলাতে আরম্ভ করি: ‘শ্রীলঙ্কা যাবে?’ কখনো বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পায়নি যে মেয়ে, তার বড় বড় সুন্দর চোখ দুটি আরও বড় হয়ে ওঠে: ‘আমি? শ্রীলঙ্কা!...আমি শার..., আমাকে শার, পাঠাবেন? আমার ইংলিস প্রনানশিয়েশান যা খারাপ!’ ওর ঠোঁট কাঁপে। আমি বলি, ‘আজ বাসায় ফেরার সময় এক হালি আনারস কিনে নিয়ে যাবে। ব্লেন্ডার আছে বাসায়? জুস বানিয়ে মাকে খাওয়াবে। আবার যেন জ্বর না আসে।’ সাব্রিনা লজ্জা পেয়ে বাসায় ফিরে যায়। কিন্তু সাব্রিনা সুলতানার পাসপোর্ট নাই। সেমিনার শুরু হতে বাকি মাত্র তিন দিন। সাব্রিনা এক দৌড়ে পাসপোর্ট অফিসে যায়। গিয়ে জানতে পারে, এক দিনের মধ্যে পাসপোর্ট পেতে হলে নগদ সাড়ে ছয় হাজার টাকা দরকার। ফিরে এসে রণে ভঙ্গ দেওয়ার ভান করে আমাকে বলে, ‘থাক শার, আমার ভাগ্যে নাই।’ তখন আমি তার ভাগ্যবিধাতা সাজি। আমার টেলিফোনে দৌড়ে চলে আসে পাসপোর্ট অফিসের এক দালাল। আমি তাকে সাত হাজার টাকা দিই। পরদিন বেলা তিনটার মধ্যে সাব্রিনা সুলতানার পাসপোর্ট নিয়ে সে হাজির। আমি তাকে আরও ৫০০ টাকা বকশিশ দিলে সে আপাদমস্তক সালাম ঠুকে নিঃশব্দে পালায় (আমার ধারণা, বেটা সাব্রিনার সঙ্গে আমার ব্যাপার টের পেয়েছিল)। সাব্রিনা জীবনে প্রথম নিজের পাসপোর্ট হাতে পেয়ে আমার মুখের দিকে এমন চোখে তাকায়, যেন আমার গলা জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দেবে।
তিন
আমার জন্য গ্রিন টি নিয়ে কলম্বো থেকে ফিরে আসে সাব্রিনা: ‘আপনি শার, এমনিতেই সবুজ। গ্রিন টি আপনাকে চিরসবুজ করে দিবে!’ আমি বলি, ‘এইবার কক্সবাজার যাওয়া যাক।’ সাব্রিনা এমন চোখে আমার চোখের দিকে তাকায়, যেন আমি একটা বাঘ আর ও হরিণের বাচ্চা। তবু সে আমার সঙ্গে কক্সবাজার রওনা করে। তার পাশে বসে শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত বাসেও গরম লাগে আমার। কক্সবাজারে বাস থেকে নেমে দুজনে রিকশায় উঠলে সমুদ্র থেকে দমকা বাতাস এসে ঝাপটা মারে চোখে-মুখে। আমি বলি, ‘বাতাসে জ্বালা।’ সাব্রিনা হেসে ভুরু নাচিয়ে বলে: ‘কিসের জ্বালা, শার?’ হোটেলে আমাদের দুজনার জন্য বরাদ্দ কক্ষ একটি, কিন্তু খাটের সংখ্যা দুই। একটি খাটের কিনারে বসে সাব্রিনা বলে, ‘এটা কি ঠিক হলো, শার? এক রুমে দুই বেড?’ আমি বিভ্রান্ত: তবে কি এক বেডের রুম নিলেই ও খুশি হতো? সাব্রিনা বলে চলে, ‘রিশিপসানের লোকেরা কী ভাবল, বলেন তো? হাজবেন্ড-ওয়াইফ কি আলাদা বেডে সোয়?’ আমি ওর গা ঘেঁষে বসে ওর ঠোঁটের একদম কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলি, ‘কে কী ভাবল তাতে কী এসে যায়?’ সাব্রিনা সরে বসে সাপের মতো ফণা তুলে বলে, ‘আলাদা রুম নিলে কী ক্ষতি ছিল বলেন তো?’ আমি কৌশলী নেউলের মতো ওর পাশ থেকে উঠে এসে বসি অন্য খাটটির কিনারে। তাকাই ওর দিকে, আমার চোখে চোখ পড়তেই ও মুখ নামিয়ে নেয়। নিচের দিকে চেয়ে মোজাইকের মেঝেতে পায়ের বুড়ো আঙুলে মাটি খোঁড়ার চেষ্টা করে।
চার সন্ধ্যায় আমরা সৈকতে যাই। উত্তাল ফেনিল ঢেউ সবেগে ছুটে আসতে দেখে কোনো দিন সমুদ্র-না-দেখা সাব্রিনা সভয়ে আমার একটা হাত চেপে ধরে বলে, ‘উফ্্ শার! এ কী শিন!’ ঢেউ ফিরে গেলে সে আমার হাতের মুঠি থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিতে চায়, কিন্তু আমি ছাড়ি না। জোড়া হাত দোলাতে দোলাতে বলি, ‘চলো হাঁটি।’ সাব্রিনা তার মরাল গ্রীবা দুলিয়ে সায় দিয়ে শুভ্র দাঁতের সারি বিকশিত করে হাসে; ফিরে যাওয়া শেষ ঢেউয়ের স্মৃতিধর ভেজা বালুরেখা ধরে আমরা পাশাপাশি হেঁটে চলি। সাব্রিনা আবছায়া সমুদ্রের দিকে চেয়ে বলে, ‘এত সব্দ কী করে হয়, শার?’ সমুদ্রের নিনাদ কথাটা আমার মনে পড়ে, কিন্তু আমি কিছু বলি না। জানি, এমন অনেক মুহূর্ত আসে যখন কিছু একটা বলা দরকার বলে মনে হয়, তখন আমরা সবাই এ রকম কথা বলি, এমন প্রশ্ন তুলি যার উত্তর জানতেই হবে এমন কোনো কথা নাই। সমুদ্রের বাতাস আমাদের ক্ষুধার্ত করে। আমরা দ্বিতীয়বারের মতো খেতে যাই। রেস্টুরেন্টে পূর্ণ চাঁদের মতো বড় বড় রুপচাঁদা ভাজা হয়, আমরা হাউমাউ করে খাই। রাত্রি ১১টা বাজে, আমি হোটেলে ফিরতে চাই কিন্তু সাব্রিনা আবার সৈকতে। সেখানে গিয়ে ওর হাত ধরে কাব্য করে বলি, ‘চলো জলে নামি।’ শিউরে ওঠে সাব্রিনা, ‘উউউ, আমার ভয় করে!’ ‘ভয় কিসের? আমি আছি না?’ আমি ওর দুই কাঁধে দুহাত রেখে মুখের দিকে তাকাই: ওর ধবধবে পরিপাটি দাঁতের সারি দেখে আমার আপন বউয়ের কথা মনে পড়ে যায়। ‘তোমার দাঁতগুলি ভীষণ সুন্দর,’ বলি আমি, ‘আমার মন চাচ্ছে ওই দাঁতগুলি আমার দুই ঠোঁট কামড়ে কামড়ে খেয়ে ফেলুক!’ ‘ওহ্্ শার, আপনি এত দুষ্টু!’
পাঁচ সাব্রিনা যখন সারাটা রাত সৈকতেই কাটিয়ে দেওয়ার ফন্দি আঁটে, তখন আমি ওকে পাকড়াও করে ফিরে আসি হোটেলে। কক্ষে ঢুকি ওর কোমর জড়িয়ে ধরে। সাব্রিনা বলে, ‘শার, যা হওয়ার যথেষ্ট হয়েছে, এখন কিন্তু সংযম দরকার।’ আমি দুই হাতে ওকে জাপটে ধরে একটি খাটে দড়াম করে শুয়ে পড়ে আমার হাতঘড়ি ওর চোখের সামনে ধরে বলি, ‘দ্যাখো, সংযমের বারোটা বেজে গেছে!’ আমার প্রবল বেষ্টনী থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সচেষ্ট সাব্রিনা কঠিন স্বরে বলে, ‘আপনি কি সত্যিই আমার সর্বনাস করতে চান?’ আমি ওর ওষ্ঠাধরের দিকে আমার চঞ্চু বাড়িয়ে বলি, ‘না, আমি চাই তুমিই আমার সর্বনাশ কর!’ সাব্রিনা মুখ সরিয়ে নিয়ে বলে, ‘আমার সম্পর্কে আপনার ধারণা একদমই ঠিক না কিন্তু!’ আমি ওর লম্বাটে থুতনিতে মৃদু কামড় বসিয়ে বলি, ‘কিন্তু আমার সম্পর্কে তোমার ধারণা হান্ড্রেড পার্সেন্ট নির্ভুল।’ সাব্রিনা ঠান্ডা স্বরে বলে, ‘তাহলে কি আপনি জোর খাটাবেন?’ আমার বলতে ইচ্ছা করে, ‘হ্যাঁ, দরকার হলে অবশ্যই জোর খাটাব। কেন তুমি আমার সঙ্গে প্রেমের ভাব কর, আর রফিকের সঙ্গে শোও?’ কিন্তু আমার বুকের ভেতর থেকে এই কথাগুলো বের হতে পারে না। আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে। সাব্রিনাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে গিয়ে এসির সুইচটা অফ করি। তারপর শুয়ে পড়ি অন্য খাটটিতে। ওর দিকে আর ফিরেও তাকাতে ইচ্ছা করে না। কিছুক্ষণ পর ঘরের বাতি নিভে যায়। অনেকক্ষণ পর শুনতে পাই সাব্রিনার তরল স্বর, ‘শার কি রাগ করলেন?’ আমি সাড়া দিতে পারি না, নিঃসাড় পড়ে থাকি, চোখ বন্ধ। ‘শার? ও শার! শাআর!’ সাব্রিনার স্বর এবার ফিসফিসানির মতো শোনায়।
এর মধ্যে হঠাৎ অন্ধকারে ঝংকার দিয়ে সচল হয়ে ওঠে শীতাতপ-নিয়ন্ত্রণযন্ত্র। সেই মিহি যান্ত্রিক শব্দের গভীরে থেমে থেমে বেজে চলে সাব্রিনার কণ্ঠনিঃসৃত শা শা শা ধ্বনি; ক্রমে তা কাছে আসে, যেন হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আসে আরও কাছে, তারপর আমার চোখ-মুখ পুড়ে যায় গরম নিঃশ্বাসে। ঝট করে খুলে যায় আমার দুই চোখ, দেখতে পাই আমার মুখের ওপর ঝুঁকে আছে সাব্রিনার মুখ, আঁধারে জ্বলছে ওর বড় বড় দুটি চোখ, নাক-মুখ দিয়ে একযোগে বেরিয়ে আসছে লু হাওয়া। আমার শীতল গালে তপ্ত গাল পেতে সে বলে, ‘শার, ইউ আর শো কিউট!’ আমি নীরব। ‘বাব্বাহ! এত রাগ!’ আমার ঠান্ডা কপালে গরম কপাল রেখে বলে সে, ‘রাগটা একটু সামলানো যায় না?’ আমি কিছু বলি না। সাব্রিনার টিকোল নাকের ডগা মৃদু ঠোকর মারে আমার ভোঁতাটে নাকের ডগায়, ‘এত্ত অভিমান বাবুর!’ আমি কাত হয়ে দেয়ালের দিকে পাশ ফিরি, সে এক হাতে জড়িয়ে ধরতে চায় আমার গলা। আমার একটা হাত সরিয়ে দেয় তার ছলাকলাকুশলী হাতটাকে। ‘আমার চাকরিটা কি চলে যাবে, শার?’ আমি চমকে উঠলাম। পাশ ফিরে তাকালাম ওর দিকে: ওর চোখে-মুখে বিষ। আমি বললাম, ‘রাত অনেক হলো। এখন ঘুমানো যাক।’ ‘ও মা, কেন?’‘কেন মানে?’ ‘কিছু হবে না?’ ‘কী হবে?’ ‘কেন, শেক্শ্্?’ ‘ফাজলামো শুরু করেছ আমার সঙ্গে?’ ছোটখাটো একটা হুংকার বেরিয়ে এল আমার গলা থেকে, ‘যাও, শুয়ে পড়ো।’
ছয় দরজায় ধাক্কার শব্দে ঘুম ছুটে গেল। বাইরে ভোর। দরজায় ধপ্ ধপ্ বেড়ে উঠলে অন্য খাটে হুড়মুড় শব্দ করে উঠে বসল সাব্রিনা: চোখে-মুখে আতঙ্ক ও বিস্ময়। আমি উঠে গিয়ে দরজার কাছে দাঁড়াই। ‘কে?’ দরজায় আবার ধপ্্ ধপ্্, যেন কেউ ঘুষি মারছে। আমি রেগে দরজা খুলি: সামনে দাঁড়িয়ে রফিক। কোনো কথা না বলে সে আমার কপাল বরাবর এমন প্রবল এক ঘুষি বসিয়ে দিল যে আমি ছিটকে পড়লাম তিন হাত দূরে গিয়ে। চৌঁওও শব্দ করে একটা আলু গজিয়ে উঠল আমার ডান ভুরুর ঠিক ওপরে।
সাত
‘ডেকেছেন কেন?’ ঢাকায়, অফিসে আমার টেবিলের সামনে এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে, কোমরে একটা হাত রেখে অন্য হাতের তর্জনীতে কপালের একগাছি চুল পেঁচাতে পেঁচাতে জিজ্ঞাসা ছুড়ে দিল সাব্রিনা। তার কণ্ঠে এখন আর ‘শার’ সম্বোধন নেই। আমি ধমকের সুরে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমরা কোন হোটেলে কত নাম্বার রুমে উঠেছিলাম, রফিক সেটা জানতে পেরেছিল কীভাবে?’ ‘আমিই জানিয়েছিলাম।’ ‘তুমি? কীভাবে, কখন? কেন?’ ‘মোবাইলে। আপনি তখন বাথরুমে ছিলেন...’ ‘আশ্চর্য! অন্য এক পুরুষের সঙ্গে হোটেলে উঠেছ, এক রুমে তার সঙ্গে রাত কাটাচ্ছ—এটা তুমি জানিয়ে দিলে তোমার প্রেমিককে? তোমার মাথায় কি কিছু আছে?’ ‘ভাবতাম যে আছে। কিন্তু এখন দেখছি নাই।’ হঠাৎ আমার মেজাজ আরও তিরিক্ষি হয়ে উঠল। ইচ্ছা হলো গেট আউট বলে চেঁচিয়ে উঠি। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, ‘ঠিক আছে। এখন যাও।’ ‘ডেকেছিলেন কি এই জন্যেই?’ ‘তো? আবার কী জন্যে?’ ‘আচ্ছা।’ সাব্রিনা বেরিয়ে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে পা বাড়াল। তারপর হঠাৎ থেমে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল আমার দিকে। ‘আবার কী?’ আমি ধমক দিয়ে উঠলাম। ওকে আর আমার সহ্যই হচ্ছিল না। ‘রফিক আর আপনার মধ্যে কোনো পার্থক্য নাই!’ বিষাক্ত কণ্ঠে বলল সে। ‘মানে?’ ‘দুজনই শেইম টাইপের ইতর!’  মেঝেতে গুড়ি মেরে গট গট করে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন মিস সাব্রিনা সুলতানা।

নিসর্গে নির্জন গণেশ হালুই by আমিমুল এহসান

শিল্পী: গণেশ হালুই, ‘শিরোনামহীন-৪৭’
বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসের আয়োজনে গত ২৮ আগস্ট শুরু হয়েছে ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী গণেশ হালুইয়ের চিত্র প্রদর্শনী। ‘বাস্তবের ছন্দ’ শিরোনামে এ প্রদর্শনীতে সহায়তা দিচ্ছে প্রথম আলো। প্রদর্শনী চলবে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আজন্মকাল ধরে শিল্পী গণেশ হালুইয়ের ছবিতে এক প্রবহমান নিঃসঙ্গতা থেকে গেছে। বিচ্ছিন্নতা তাঁর চিত্রধারায় অনিবার্য উপকরণ, যার শুরুতে কোথাও নিরন্তর সংঘাত ছিল—ব্যক্তি আর সমাজের বলয়ে। শিল্পী বলেছিলেন, সবকিছুর উৎসে কোনো এক যন্ত্রণা থাকে। সে কারণেই বিমূর্ত-নিসর্গের প্রাজ্ঞ শিল্পী হয়েও নিছক প্রকৃতিবাদিতাকে আশ্রয় করেননি তিনি—নিসর্গচিত্রে নিজস্ব আঙ্গিক আর প্রকাশভঙ্গি নির্মাণ করেছেন, যা তাঁকে ভারতের সমকালীন চিত্রধারার অগ্রজ শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বেঙ্গল গ্যালারির ‘বাস্তবের ছন্দ’ পর্বে, ওয়াটার কালার আর গোয়াশে গণেশ হালুইয়ের স্বতন্ত্র চিত্রধারা আরও প্রাজ্ঞ হয়ে উঠেছে। গণেশ হালুইয়ের জন্ম পূর্ববঙ্গের জামালপুরে, ১৯৩৬ সালে। ব্রহ্মপুত্রের বদ্বীপ অধ্যুষিত ভূখণ্ডে বেড়ে ওঠা; তারপর দেশভাগের আশ্চর্য করুণ দিনলিপি লিখতে লিখতে ওপারে চলে যাওয়া, সেটা ১৯৫০ সাল। কলকাতার চারু ও কারু মহাবিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেন ১৯৫৬ সালে। দীর্ঘদিন নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন বিমূর্তধারার নিসর্গচিত্রে, যদিও তাঁর শুরুটা অজন্তার ম্যুরাল স্টাডি দিয়ে, যা তাঁর ছবিতে বর্ণনাধর্মিতা আর বৌদ্ধধর্মের শান্ত-সমাহিত মিনিমালিস্ট অভিব্যক্তি নিয়ে এসেছে। রেখা, বিন্দু কিংবা জলের অধঃক্ষেপে সংকেতচিহ্নের মতো তাঁর ছবিতে জল, মাটি এবং শ্যামলিমা নির্ভার-নিরবচ্ছিন্ন। সেখানে সন্তর্পণে জ্যামিতির বিসর্জন আছে, ভাসমান প্রান্তরে ক্ষীণতর যথাসামান্য সরলরৈখিক ছায়া আছে। এই প্রকৃতি দূরবর্তীভাবে বাংলার, এখানে নিরুত্তাপ বর্ণের একমুখিন বিস্তৃতির মধ্যে কৃষিক্ষেত্রের বিভাজন আর নদীমাতৃক ভূখণ্ড চোখে পড়ে। কুমড়ো ফুলে নুয়ে পড়া লতায় ঘনঘোর বর্ষা আর পরিপার্শ্বের ভ্রাম্যমাণ মেঘ তাঁর ছবিতে কিউবিস্ট হয়ে উঠতে পারত, কেবলই ত্রিকোণ হতে পারত পাহাড়। যেমন বৃত্তের গায়ে রেখাই যথেষ্ট বৃক্ষের স্থাপনায়, সেভাবে বিমূর্তের সহজতর জ্যামিতিতে শিল্পী বিচরণ করেননি। তাঁর পাহাড়ের গায়ে মাটির ঘন আভরণ লেগে থাকে আর সহজ নীল বেঁকে যায় নদী হয়ে। চিরপরিচিত বাস্তব প্রকৃতির সঙ্গে বিমূর্তের ছন্দ এখানে প্রলেপের মতো অস্ফুট লেগে থাকে।
দ্বিমাত্রিক কম্পোজিশনকে তিনি অনায়াস ঋদ্ধতা দিয়েছেন; এখানে আনুভূমিক স্থিতিই প্রধান। ফর্মের বিন্যাসে কৌণিকতা যদিবা আসে, তবে তা পারসপেক্টিভের আপাত গণিতে; আগন্তুক কোনো গতির আরোপণে নয়। কিংবা কখনো অমোঘ বাতাস যদি আসে, তাঁর ছবিতে বস্তুকণারা ভেসে যায়, এমনকি পাহাড়ও। এভাবে শিরোনামহীন হতে হতে তুলট কাগজে ভেসে গেছে নদী, মেঘ, লতাপাতা-গুল্ম আর অঝোর বৃষ্টিপাত। বর্ণমুখরতায় গণেশ হালুইয়ের আগ্রহ সীমিত, তিনি ফর্মের আউটলাইনকে প্রাধান্য দেন। আর এতে ছায়া-প্রচ্ছায়ার গভীরতা অতিপ্রাকৃতিক হয়ে ওঠে। সাদা-কালোর সারল্যে বস্তুকণারা নির্লিপ্ত থেকে যায়। ছবির ফ্রেমে বিষয়বস্তুর সমাবেশে শিল্পী প্রবলভাবে স্থাপত্যিক। টু-পয়েন্ট, থ্রি-পয়েন্ট পারসপেক্টিভকে ভেঙে দিয়ে নতুন ত্রিমাত্রিক পরিসর নির্মাণ করেন তিনি। নিসর্গকে তিনি দেখছেন উড়ে যাওয়া পাখির দৃষ্টিতে। কেননা অনেকটা পরিসরজুড়ে তিনি অধিকার করতে চেয়েছেন প্রান্তরকে। তাঁর ছবিতে, নিজস্ব নির্জনে কোথাও মানুষের চলাচল নেই, শব্দ নেই, সামাজিক যোগাযোগ নেই। যেন তিনি মানুষের বিসর্জন চান নিসর্গে, এমনকি নিজেরও। তাঁর ব্যক্তিগত নির্বাণযাত্রা মহাজাগতিক এক প্রকৃতির কাছে সমর্পিত।
‘শিরোনামহীন-৬৭’
এই প্রকৃতি পরিচিত পটভূমি থেকে উঠে আসেনি। শিল্পীর কোনো এক ব্যক্তিগত নিসর্গ আছে । সেখানে সবই ক্ষীণধারা জল আর বাদামি রোদে ভেসে থাকা বৃক্ষের মতো পরিমিত রেখা এবং রং। কখনো তা দূরের, যেন জানালার ওপাশে বন পার হয়ে পথ, পথের শেষে সবুজ মাঠ-রেললাইন পার হয়ে হলুদ আকাশে শুচিস্নিগ্ধ বৃষ্টি নেমেছে। তার পতনের শব্দেরা আসবে না জেনে শিল্পী কোনো একটি স্মৃতিচিহ্ন এঁকেছেন জলের রঙে। কখনো তিনি নিঝুম শেওলার গাঢ় সবুজ অন্ধকারে ডুবে গেছেন। ছবিতে উঁকি দিয়ে গেছে মিরো, ক্যান্ডিনিস্কি কিংবা ক্যালডারের মুক্ত ফর্ম। তবু সব ছাপিয়ে গণেশ হালুইয়ের নিঃসঙ্গ ব্যক্তিগত অভিযাত্রাই মৌলিক হয়ে উঠেছে। ব্রহ্মপুত্রের অবিরল জলধারা, পূর্বপুরুষের অপস্রিয়মাণ ছায়া আর ধর্মযুদ্ধের হন্তারক চাহনি মনে পড়ে গেলে তিনি পরিত্যক্ত দুঃখকে আনন্দের রঙেই চিত্রিত করেন। এত যে বিমূর্ত প্রকৃতি, রেখায়-রঙে-বিন্দুতে, জাগতিক ঋতুচক্রে, তাতে শেষাবধি মানুষ থাকল না? মানুষ কি প্রকৃতির বিরুদ্ধজন, যাকে শিল্পী সন্তর্পণে সরিয়ে রাখেন? মানুষ কি কেবলই বারুদ? নিশ্চিতভাবে এই ভূখণ্ডে গণেশ হালুইয়ের পদচারণ স্মৃতিতাড়িত। অপরিসীম নৈঃশব্দ্যের ভেতর সেই স্মৃতির উদ্যাপনকে তিনি ‘শিরোনামহীন’ রেখেছেন। একই সঙ্গে পরিমিত সংকেত, নিয়ন্ত্রিত চাহনি, অস্বচ্ছ কিংবা প্রবল জলরঙে ব্যক্তিগত নিসর্গের নির্মাণ বিধৃত করেছেন। সেখানে কেবল নিরেট বস্তু নেই, তার উদ্ভাস আছে, স্মৃতির তাড়না নেই, তার সংকলিত অধঃক্ষেপ আছে। তুলট কাগজে অবিরল শূন্যস্থান আছে, তুলির টানে অপ্রচলিত ধ্রুপদ পরিমিতি আছে। যতটা প্রয়োজন তার চেয়েও সংক্ষিপ্ত সেই রূপকল্পে বৌদ্ধধর্মের প্রশান্তির মতো হোমগন্ধ লেগে থাকে।