Tuesday, July 5, 2016

জাপানে সবার মুখে ঢাকা হত্যাকাণ্ড

জাপানে এখন সবচেয়ে আলোচিত সংবাদ হচ্ছে বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদীদের নৃশংসতা, যে নৃশংসতার কোপানলে প্রাণ দিতে হয়েছে সাতজন নিরপরাধ জাপানি নাগরিককে। টেলিভিশন, সংবাদপত্র আর বিভিন্ন সামাজিক নেটওয়ার্কেই সেই আলোচনা সীমিত নেই, এমনকি তা ছড়িয়ে পড়েছে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, সওদাগরি কোম্পানির কার্যালয় আর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। মানুষ ভেবে পাচ্ছেন না মানুষের পক্ষে কী করে এতটা নিষ্ঠুর আর নির্দয় হওয়া সম্ভব, যখন কিনা মায়ের বয়সী কোনো নারীকেও জবাই করে বধ করায় কোনো রকম পাপবোধ তাদের মনে দেখা দেয় না। আর বাংলাদেশ সম্পর্কে যাঁরা কিছুটা অবগত, তাঁদের অনেকে ভেবেই পাচ্ছেন না কী করে সেই দেশটির কিছু মানুষের পক্ষে এ রকম বর্বর পশুতে পরিণত হওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও তাঁরা এ কারণে উদ্বিগ্ন যে, পুরো ঘটনার ফলে এখন হয়তো বাংলাদেশের ভ্রান্ত এক ছবি জাপানিদের মনের পর্দায় জায়গা করে নেবে, যার ফল হয়তো হবে সুদূরপ্রসারী। কথা হয়েছে বাংলাদেশে জাপানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাৎসুশিরো হরিগুচির সঙ্গে। তিনি বললেন, জাপানে বাংলাদেশ সম্পর্কে যাঁরা জানেন না, সেই সব সাধারণ জাপানির মধ্যে এই হত্যাকাণ্ড বিরূপ ধারণার জন্ম দিতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, এ রকম দুঃখজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা গেলে বিরূপ সেই প্রতিক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি না-ও হতে পারে। রাষ্ট্রদূত হরিগুচির মতে,
পুরো ঘটনার সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকটি হচ্ছে এ রকম ধারণা তৈরি হওয়া যে, বাংলাদেশকে সাহায্য করার উদ্দেশ্য নিয়ে যাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন, তাঁদের হত্যা করাই ছিল লক্ষ্য। সে রকম ঘটনা কেবল বর্বরতাই নয়, বরং একই সঙ্গে হচ্ছে ন্যূনতম মূল্যবোধেরও বিপরীত। ফলে তা জাপানের পুরো উন্নয়ন সাহায্য ধারণার মূলেও আঘাত করতে পারে। এতে করে নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও একধরনের হতাশা দেখা দিতে পারে। তবে জাপানের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের ভাষণ লেখকদের একজন তোমোহিকো তানিগুচি মনে করেন না যে জাপানি স্বেচ্ছাসেবীদের হত্যা দেশের মানুষকে উন্নয়নশীল বিশ্বের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত হওয়ায় নিরুৎসাহিত করবে। তিনি বরং মনে করছেন, বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে এবং নিহত ব্যক্তিদের অনুসৃত আদর্শ সমুন্নত রাখতে জাপানের আরও বেশি মানুষ এখন সেই পথ অনুসরণ করবেন। দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি ৮০ বছর বয়সী জাইকা পরামর্শকের প্রসঙ্গটি তুলে ধরেন, নিজের জীবন বিপন্ন করে জীবনের শেষ বেলাতেও যিনি বাংলাদেশের পরিবহন সমস্যা সমাধানে কাজ করে গেছেন। তোমোহিকো তানিগুচি মনে করেন, এঁরাই জাপানকে পথ দেখান এবং ভবিষ্যতেও তাঁদের দেখানো পথে জাপান এগিয়ে যাবে। সেইশিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক,
উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ মাসাআকি ওহাশি অনেক দিন ধরে বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর ধারণা, বাংলাদেশে জাপানের সম্পৃক্ততা এখন হয়তো কিছুটা হলেও সংকুচিত হয়ে আসবে। অন্যদিকে জাপানের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা বিস্তৃত হলে তা কেবল সরকারি পর্যায়েই নয়, বেসরকারি খাত ও এনজিও কর্মকাণ্ডকেও প্রভাবিত করতে পারে। রেডিও জাপানের সাবেক একজন সাংবাদিক আই নিমি বলেন, সন্ত্রাসবাদীরা তাদের বর্বরতার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের যে পরিচিতি এখন বিশ্বের সামনে তুলে ধরছে, তা দেশটির আসল পরিচয় নয়। বাংলাদেশিদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বুঝতে সক্ষম হয়েছেন কট্টর মৌলবাদী হিসেবে যা বোঝায়, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ সে রকম নন। বরং ইসলামের সহনশীল ও পরমতসহিষ্ণু একটি ধারা এঁদের জীবনে বহমান। ফলে সন্ত্রাসবাদী হামলার সংবাদ একদিকে যেমন তাঁকে মর্মাহত করেছে, অন্যদিকে সেই খবর শুনে অবাকও তিনি হয়েছেন। তিনি মনে করেন, দেশের এই ভুল প্রতিনিধিত্ব শুধরে নিতে হলে বাংলাদেশের সরকার ও নাগরিকদেরই এগিয়ে আসতে হবে। জাপান ও বাংলাদেশের বন্ধুত্ব যেহেতু অনেক মানুষের অবদানের ফলাফল, আই নিমি তাই মনে করেন সেই অর্জন সহসা নষ্ট হবে না।
টোকিও, ৩ জুলাই ২০১৬
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

বিদেশি নাগরিকদের আশ্বস্ত করা জরুরি

গুলশানে সন্ত্রাসী হামলার মূল লক্ষ্য যে ছিল বিদেশি নাগরিকেরা, সেটা পরিষ্কার। সন্ত্রাসীদের হাতে প্রাণ হারানো ২০ জনের মধ্যে ১৭ জনই বিদেশি নাগরিক। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বিদেশি নাগরিকেরা বাংলাদেশে আসার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত হতে পারে, দেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়াই শোকার্ত বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। গুলশানে হামলার ঘটনায় নিহত নয় ইতালীয় নাগরিকের মধ্যে ছয়জনই ছিলেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ক্রেতা। আর জাপানের সাত নাগরিকই বাংলাদেশে এসেছিলেন মেট্রোরেলের পরামর্শক হিসেবে। গতকাল নিহত এই বিদেশিদের মরদেহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই মরদেহগুলো যখন দেশে ফিরবে তখন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে আরেক দফা প্রতিক্রিয়া হবে, এটাই স্বাভাবিক। সরকারকে এসব দিক বিবেচনায় রাখতে হবে এবং খুবই সংবেদনশীলতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। সন্ত্রাসবাদ এখন এমন এক বৈশ্বিক সমস্যা যা সামাল দিতে উন্নত দেশগুলোও হিমশিম খাচ্ছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশকে এখন বিশ্বের সামনে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় তার আন্তরিক উদ্যোগের বিষয়টি তুলে ধরতে হবে। যেসব দেশের নাগরিকেরা গুলশানের সন্ত্রাসে নিহত হয়েছেন, সেসব দেশের জনগণ ও সরকার এই ঘটনার তদন্ত, বিচার–প্রক্রিয়ার দিকে নজর রাখবে। ফলে এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সরকার কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা-ও এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজরদারির মধ্যে থাকবে। জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসী তৎপরতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও উন্নয়নের সম্ভাবনাকে নষ্ট করতে দেওয়া যাবে না। দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এরই মধ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। নিরাপত্তাব্যবস্থার দৃশ্যমান উন্নতির মাধ্যমেই কেবল বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর এবং সেখানকার নাগরিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আমরা আশা করব সরকার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেবে এবং দেশের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে, যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আস্থা ফিরে পায়।

মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ করছেন নরেন্দ্র মোদি

নরেন্দ্র মোদি
দুই বছর পর ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ হচ্ছে। নতুন মন্ত্রী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে উত্তর প্রদেশসহ সেসব রাজ্যের দিকে, যেগুলোতে আগামী বছর বিধানসভা নির্বাচন হবে। মন্ত্রিসভার সঙ্গে সঙ্গে বিজেপি সংগঠনেও রদবদল ঘটানোর সম্ভাবনা রয়েছে। মন্ত্রিসভায় রদবদলের বিষয়টি এত দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিই ঠিক করে এসেছেন। এবার এ দায়িত্বটি পেয়েছেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। গতকাল সোমবার দলীয় কার্যালয়ে সম্ভাব্য মন্ত্রীদের ডেকে নিয়ে তিনি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। বিজেপি সূত্র বলছে, উত্তর প্রদেশ থেকে চারজনকে মন্ত্রী করা হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিজেপির নির্বাচনী শরিক আপনা দলের অনুপ্রিয়া প্যাটেল। এই দলটি গতকালই বিজেপির সঙ্গে মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উত্তর প্রদেশ থেকে আর যাঁদের মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা, তাঁরা হলেন ব্রাহ্মণ নেতা মহেন্দ্র পান্ডে, অনগ্রসর নেত্রী সাবিত্রি ফুলে ও কট্টরপন্থী যোগী আদিত্যনাথ। গুজরাটে আগামী বছর ভোট। তাই এ রাজ্যের প্রতিনিধিত্বও বাড়ানো হবে। এখান থেকে পুরুষোত্তম রুপালা ও মনসুখভাই মান্ডাভিয়ার নামও শোনা যাচ্ছে। রাজস্থানের প্রতিনিধিত্ব করার সম্ভাবনা রাম মেঘাওয়াল ও পি পি চৌধুরীর।
পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং থেকে নির্বাচিত বিজেপির লোকসভা সদস্য সুরিন্দর সিং আলুওয়ালিয়ার মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার ১০ শতাংশ মন্ত্রী করা যায়। সে অর্থে লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে মোট ৮২ জন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হতে পারেন। বর্তমানে মোদির মন্ত্রিসভার সদস্য ৬৬। সর্বানন্দ সোনোয়াল আসামের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে গেছেন। তাঁর স্থানে আসাম বিজেপির প্রবীণ নেতা রাজেন্দ্র গোহাইন ও রমেন ডেকার মধ্যে একজনের মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা। স্বরাষ্ট্র, অর্থ, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কোনো বদল ঘটছে না। অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির হাতেই তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থাকছে। তাঁকে অতিরিক্ত দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হয় কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়। নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। সেই নীতিতে লালকৃষ্ণ আদভানি, মুরলি মনোহর যোশী, যশোবন্ত সিং ও যশবন্ত সিনহাদের মন্ত্রিসভা এবং সংগঠনে কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। বর্তমান মন্ত্রিসভার নাজমা হেপতুল্লা ও কলরাজ মিশ্রও ৭৫ পেরোলেন। কলরাজ উত্তর প্রদেশের প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মণ নেতা। ভোটের আগে তাঁকে মন্ত্রির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে কি না সে জল্পনাই এখন চলছে।

ইউকিপ নেতা ফারাজের পদত্যাগ

নাইজেল ফারাজ
যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়নবিরোধী ইউকে ইন্ডিপেনডেন্স পার্টির (ইউকিপ) প্রধানের পদ থেকে নাইজেল ফারাজ পদত্যাগ করছেন। ২৩ জুনের গণভোটে যুক্তরাজ্যের ইইউ ছাড়ার পক্ষে প্রচারাভিযান চালানো এই নেতা গতকাল সোমবার লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। নাইজেল ফারাজ বলেন, যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের পক্ষে ভোট দেওয়ায় তাঁর ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল হয়েছে’। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের এখন দরকার একজন ‘ব্রেক্সিট প্রধানমন্ত্রী’। এ সময় ফারাজ বলেন, ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ‘পিছু হটা’র বিরুদ্ধে তাঁর দল প্রচার চালাবে।
দলে তাঁর স্থলে বিশেষ কাউকে সমর্থন করবেন না বলেও এ সময় জানান ফারাজ। এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো ইউকিপ প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করলেন ফারাজ। তবে তিনি এবার আর ফেরার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করে দেন। সংবাদ সম্মেলনে নাইজেল ফারাজ বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করতাম, এই দেশের স্বশাসিত হওয়া উচিত। ব্রেক্সিট প্রচারাভিযানে আমি বলেছিলাম, আমি আমার দেশ ফেরত চাই। এখন আমি বলছি, আমি আমার জীবন ফেরত চাই।’ নাইজেল ফারাজ ইউরোপীয় পার্লামেন্টেরও একজন সদস্য। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ইউরোপীয় পার্লামেন্টে মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত থাকবেন তিনি।