Showing posts with label বাংলা ট্রিবিউন. Show all posts
Showing posts with label বাংলা ট্রিবিউন. Show all posts

Wednesday, June 24, 2026

ঘরের রান্না, সম্পর্কের উনুন ও বদলে যাওয়া নগরজীবন by প্রশান্ত কুমার শীল

বাংলা সিনেমার এক অমর চরিত্র ধনঞ্জয়। তপন সিনহা নির্মিত ‘গল্প হলেও সত্যি’ ছবির সেই ধনঞ্জয় কেবল একজন গৃহকর্মী নয়, সে যেন এক হারিয়ে যেতে বসা পারিবারিক সংস্কৃতির প্রতিনিধি।

তার হাতে রান্না ছিল শিল্প, সংসার ছিল দায়িত্ব, আর মানুষকে খাওয়ানো ছিল এক ধরনের মানবিক সাধনা। আজকের শহুরে জীবনে দাঁড়িয়ে ধনঞ্জয়কে মনে পড়া অকারণ নয়। কারণ, আমাদের চারপাশে এখন রমরমা ফুড ডেলিভারি অ্যাপ, ক্লাউড কিচেন, ইনস্ট্যান্ট ফুড সার্ভিস। অথচ ঘরের রান্না, পারিবারিক খাবার ও একসঙ্গে বসে খাওয়ার সংস্কৃতি যেন ক্রমেই সরে যাচ্ছে জীবনের প্রান্তে।

শহুরে জীবনের ব্যস্ততা এখন নতুন এক খাদ্যসংস্কৃতি তৈরি করেছে। অফিসের সময় বদলেছে, কাজের ধরন বদলেছে, পরিবারের কাঠামো বদলেছে। একসময় মধ্যবিত্ত পরিবারের রান্নাঘর ছিল সংসারের কেন্দ্রবিন্দু। সকালে বাজার, দুপুরে রান্না, বিকালে নাস্তা, রাতে সবাই মিলে খাওয়ার মধ্যে একটি পারিবারিক ছন্দ ছিল। এখন সেই জায়গা দখল করেছে মোবাইল স্ক্রিন। ক্ষুধা লাগলে কেউ আর রান্নাঘরের দিকে তাকায় না, বরং ফোনের অ্যাপে আঙুল চালিয়ে অর্ডার দেয়। কয়েক মিনিটের মধ্যে খাবার হাজির।

এই পরিবর্তনকে একেবারে নেতিবাচক বলা যাবে না। কারণ প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। নগরের যানজট, কর্মব্যস্ততা, একক পরিবার, নারী-পুরুষ উভয়ের চাকরি—সব মিলিয়ে অনেক পরিবারেই প্রতিদিন রান্না করা কঠিন হয়ে উঠেছে। ফুড ডেলিভারি অ্যাপ তাই প্রয়োজনের জায়গা থেকে জনপ্রিয় হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি সুবিধাজনক, দ্রুত ও বৈচিত্র্যময় এক ব্যবস্থা। এখন কেউ চাইলেই একই দিনে বিরিয়ানি, সুশি, পাস্তা, কাচ্চি, থাই স্যুপ কিংবা ডেজার্ট

অর্ডার করতে পারে। খাবার এখন কেবল পুষ্টি নয়, বিনোদনও বটে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সুবিধার ভিড়ে আমরা কি যেন হারাচ্ছি?

ভারতের অত্যন্ত জনপ্রিয় সেলিব্রিটি শেফ, রন্ধনশিল্পী এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব সঞ্জীব কাপুর। তিনি তাঁর সুস্বাদু রান্নার কৌশল এবং জনপ্রিয় টিভি শো 'খানা খাজানা'র মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছেন। তিনি বলেছেন “ফুড ডেলিভারি অ্যাপ জীবনযাত্রার পরিবর্তনের প্রতিফলন, কিন্তু শিশুদের ঘরের রান্নার মূল্য বোঝা উচিত।” কথাটি নিছক আবেগের নয়; বরং এর মধ্যে লুকিয়ে আছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা। কারণ, ঘরের রান্না শুধু খাবার নয়, এটি স্মৃতি, সম্পর্ক ও পরিচয়ের অংশ। মায়ের হাতের ডাল, দাদির পাটিসাপটা, ঈদের সেমাই, পূজার সন্দেশ কিংবা বৃষ্টির দিনের খিচুড়ি-ইলিশ—এসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আবেগ, পারিবারিক ইতিহাস ও সামাজিক বন্ধন।

ধনঞ্জয় চরিত্রটির সাফল্য এখানেই। সে রান্নাকে কেবল দায়িত্ব মনে করেনি; বরং সৃজনশীলতা ও যত্নের জায়গা থেকে দেখেছে। তার রান্নায় ছিল কল্পনা, আন্তরিকতা ও শিল্পবোধ। কাঁচকলার কোপ্তাকে মাংসের স্বাদে নিয়ে যাওয়া কিংবা চালতা দিয়ে ডাল রান্না। এসব কেবল রন্ধন দক্ষতা নয়, এটি জীবনকে উপভোগ করার এক নান্দনিকতা। আজকের দ্রুতগতির শহুরে সমাজে সেই নান্দনিকতা ক্রমেই বিরল হয়ে যাচ্ছে।

এখনকার শিশুরা হয়তো জানেই না, রান্নাঘরের গন্ধ কীভাবে পরিবারের আবহ তৈরি করে। অনেক শিশুর কাছে খাবার মানেই ব্র্যান্ডেড প্যাকেট, রেস্টুরেন্ট বা অ্যাপভিত্তিক ডেলিভারি। ফলে খাবারের সঙ্গে তাদের আবেগগত সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে না। তারা জানছে না একটি রান্না তৈরি হতে কত সময়, শ্রম ও মমতা লাগে। খাবার তাই তাদের কাছে ভোগের বস্তু, জীবনের অংশ নয়।

ফুড ডেলিভারি অ্যাপের আরেকটি সামাজিক দিকও রয়েছে। এই অ্যাপভিত্তিক অর্থনীতি নগরে নতুন ধরনের শ্রমবাজার তৈরি করেছে। হাজার হাজার তরুণ এখন ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু এই শ্রমের পেছনে রয়েছে অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, নিরাপত্তাহীনতা ও মানসিক চাপ।

একদিকে মানুষ দ্রুত খাবার পাচ্ছে, অপরদিকে সেই দ্রুততার জন্য কেউ রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ছুটে চলেছে। প্রযুক্তির এই সুবিধাবাদী কাঠামোর মধ্যে মানবিক শ্রমের মূল্য কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেটিও ভাবার বিষয়।

অন্যদিকে, ঘরের রান্না কমে যাওয়ার ফলে পারিবারিক যোগাযোগও কমছে। আগে খাওয়ার টেবিল ছিল আলাপের জায়গা। সেখানে পরিবারের সদস্যরা দিনের গল্প বলতো, মতবিনিময় করতো, সম্পর্ক দৃঢ় হতো।

এখন অনেকেই একা একা মোবাইল হাতে খাবার খায়। কেউ সিরিজ দেখে, কেউ স্ক্রল করে, কেউ অফিসের মেইল দেখে। ফলে খাওয়ার সামাজিকতা হারিয়ে যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও আছে। শহরের জীবন ব্যয়বহুল, সময় সংকুচিত, মানুষের ধৈর্য কমে গেছে। তাই অনেকের কাছে রান্না একটি ঝামেলার কাজ। কিন্তু রান্নাকে যদি শুধুই শ্রম হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তার মানবিক ও সাংস্কৃতিক দিকটি হারিয়ে যায়। ধনঞ্জয় আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া দিকটির কথাই মনে করিয়ে দেয়।

বাঙালি সংস্কৃতিতে খাবার সবসময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করেছে। সাহিত্য, সিনেমা, লোকজ সংস্কৃতি—সর্বত্র খাবারের উপস্থিতি লক্ষণীয়। বিভূতিভূষণের উপন্যাসে, সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে কিংবা রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রে খাবারের প্রসঙ্গ বারবার এসেছে। কারণ, খাবার মানুষের জীবনযাত্রা, শ্রেণি, সংস্কৃতি ও আবেগের প্রতিফলন। আজকের নগরসভ্যতায় সেই সাংস্কৃতিক গভীরতা ক্রমশ পণ্যে রূপ নিচ্ছে।

তবে বাস্তবতাকে অস্বীকার করাও সমাধান নয়। আধুনিক জীবনে ফুড ডেলিভারি অ্যাপ থাকবে, প্রযুক্তিও থাকবে। কিন্তু তার মধ্যেও ঘরের রান্না ও পারিবারিক খাবারের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখা জরুরি। সপ্তাহে অন্তত কয়েক দিন পরিবার একসঙ্গে বসে খেতে পারে। শিশুকে রান্নাঘরের সঙ্গে

পরিচিত করা যেতে পারে। রান্নাকে নারীর একক দায়িত্ব না ভেবে পারিবারিক অংশগ্রহণে রূপ দেওয়া প্রয়োজন। বাবা-মা একসঙ্গে রান্না করলে শিশুরাও খাবারের মূল্য বুঝবে।

একটি সমাজের পরিবর্তন বোঝার জন্য তার খাবারের সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। আজ আমরা দ্রুততার সমাজে বাস করছি। সব কিছু এখন ‘ইনস্ট্যান্ট’। কিন্তু জীবনের সব অনুভূতি কি ইনস্ট্যান্ট হয়? মায়ের হাতের রান্না, পরিবারের সঙ্গে বসে খাওয়া, কারও জন্য যত্ন করে রান্না করা—এসবের কোনও অ্যাপভিত্তিক বিকল্প নেই।

ধনঞ্জয় তাই কেবল সিনেমার চরিত্র নয়; সে এক সাংস্কৃতিক স্মৃতি। সে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রান্নাঘর শুধু চুলা-পাতিলের জায়গা নয়, এটি সম্পর্কের উনুন। সেখানে যত্ন, সৃজনশীলতা ও ভালোবাসা একসঙ্গে সেদ্ধ হয়। আধুনিক শহর হয়তো আমাদের দ্রুত করেছে, কিন্তু মানবিক করেছে কী?

সম্ভবত এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আজও ধনঞ্জয় ফিরে আসে। কখনও সিনেমার পর্দায়, কখনও স্মৃতির ভেতর, কখনও সঞ্জীব কাপুরের মন্তব্যে। আর তখন মনে হয়, প্রযুক্তির যুগেও ঘরের রান্নার ধোঁয়া আসলে এক ধরনের সভ্যতার গন্ধ।

* প্রশান্ত কুমার শীল, শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ঘনঘন গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ: নিরাপত্তাহীন নগরজীবনের নীরব আতঙ্ক

Tuesday, June 23, 2026

দেবব্রত বিশ্বাস : রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্রাত্য পুরুষ by অনুরুদ্ধ গোস্বামী

"যে রবীন্দ্রনাথের সংগীতচিন্তা আমার চিন্তাধারার ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল, সেই রবীন্দ্রনাথের নির্দেশ অমান্য করে, নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে মাঝারি কর্তাদের বিধিনিষেধ মেনে আর রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই, প্রবৃত্তিই নেই। এই ব্যাপারে যুক্তিহীন কতগুলি নিয়ম যতদিন বলবৎ থাকবে, ততদিন নিজেকে দূরে সরিয়েই রাখব"— দেবব্রত বিশ্বাস, (ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত, পৃ. ১৩০)

এই কথাগুলোই ছিল দেবব্রত বিশ্বাসের সমগ্র সংগীতজীবনের সারসত্য। প্রতিষ্ঠানের চোখে তিনি ছিলেন ব্রাত্য, কিন্তু মানুষের কাছে ছিলেন অনিবার্য। তাঁর ভরাট কণ্ঠ, স্বতন্ত্র গায়কি আর আবেগময় পরিবেশনায় রবীন্দ্রসংগীতকে তিনি বাঙালি মধ্যবিত্তের সংকীর্ণ সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে নিয়ে এসেছিলেন সাধারণ মানুষের জীবনে, পৌঁছে দিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়।

রবীন্দ্রসংগীতের 'শুদ্ধতা' রক্ষার নামে তৎকালীন প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন একা, ঋজু মেরুদণ্ড নিয়ে এবং আপসহীনভাবে। সমালোচনা, বিতর্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার মুখে বারবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন, তবু থেকেছেন নিজ দর্শন ও বিশ্বাসে অবিচল। অর্থ, খ্যাতি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির মোহ—এসবের কোনো কিছুই দেবব্রত বিশ্বাসকে কোনোদিন স্পর্শ করেনি। যা তিনি অন্তরে ধারণ করতেন, সেই বিশ্বাসেই গেয়ে গেছেন আমৃত্যু।

১৯১১ সালের ২২ আগস্ট অবিভক্ত বাংলার বরিশালে এক ব্রাহ্ম পরিবারে জন্ম নেন দেবব্রত বিশ্বাস। বাবা দেবেন্দ্রকিশোর বিশ্বাস, মা অবলাদেবী। পিতৃপুরুষের ভিটা ছিল কিশোরগঞ্জের ইটনা গ্রামে। তাঁর ঠাকুরদা ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করায় গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন, সেই বিতাড়নের উত্তাপ পরবর্তী প্রজন্মেও পোহাতে হয়েছে দেবব্রতকে। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের চোখে তিনি ছিলেন 'ম্লেচ্ছ'। শৈশবের এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও অপমান পরবর্তী জীবনে অন্যায় ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছিল তাঁকে। 'জর্জ' নামেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত—জন্মের সময় ইংল্যান্ডের সিংহাসনে ছিলেন পঞ্চম জর্জ, সেই অনুষঙ্গেই বাবা এই নামটি রেখেছিলেন।

কিশোরগঞ্জ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক, আনন্দমোহন কলেজ হয়ে কলকাতা সিটি কলেজে আই.এ., তারপর বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষে ১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেন। ১৯৩৪ সালে যোগ দেন হিন্দুস্থান ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে, যা পরে জীবনবিমা নিগম নামে পরিচিতি পায়। সেখান থেকেই ১৯৭১ সালে অবসর নেন। সংগীতে কোনো প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না তাঁর—মায়ের কণ্ঠে ব্রহ্মসংগীত ও রবীন্দ্রসংগীত শুনতে শুনতে বেড়ে ওঠা। ১৯২৮ সালে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের শতবার্ষিকী উৎসবে প্রথমবার দেখেন রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে নিবিড় পরিচয় ঘটে রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীচৌধুরানীর হাত ধরে। পাম অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে পিয়ানোর সাহচর্যে তিনি রবীন্দ্রসংগীতের ভেতরের আলোটুকু অনুভব করতে শিখলেন। বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ শৈলজারঞ্জন মজুমদারের পরিচালনায় কনক দাসের সঙ্গে এইচএমভি থেকে প্রকাশিত "সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান" এবং "হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব"—গান দুটির মাধ্যমে প্রথম দ্বৈত রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ডের মাধ্যমে এই জগতে তাঁর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু।

১৯৩৮ সালে পিতৃবিয়োগ ও তীব্র আর্থিক অনটনের মধ্যেই দেবব্রতর জীবনচেতনা বামপন্থার দিকে দৃঢ়ভাবে ঝুঁকতে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলায় গড়ে ওঠা প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মঞ্চে তিনি নিয়মিত গাইতে শুরু করলেন স্বদেশি গান ও রবীন্দ্রনাথের দেশাত্মবোধক গানগুলো। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের লেখা গানে সুরারোপ করলেন দেবব্রত—ঐতিহাসিকভাবে যার নাম হলো 'নবজীবনের গান'।

দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিয়েছিলেন সেই গান। বিজন ভট্টাচার্যের নাটক 'নবান্ন' এবং গণনাট্য সংঘের ছায়ানাটক 'শহীদের ডাক'-এর সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও তিনি ছিলেন প্রথম সারির সৈনিক। পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের মতো প্রতিভাধর মানুষদের সঙ্গে এই সময়েই গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় গণনাট্যের তরুণ গায়ক কলিম শরাফীকে নিজের ঘরে লুকিয়ে রেখে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। ১৯৪৭-এর দেশভাগ তাঁর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে—যে পূর্ববঙ্গের মাটিতে জন্ম ও শৈশব, তা রাতারাতি 'বিদেশ' হয়ে যাওয়া তিনি মানসিকভাবে মেনে নিতে পারেননি।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীতে নতুন রেকর্ডের মাধ্যমে রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের পর জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছালেন দেবব্রত। কিন্তু ১৯৬৪ সাল থেকে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তীব্র আকার নিতে থাকে। বোর্ড একের পর এক রেকর্ড অননুমোদিত করতে লাগল—কখনো অতিরিক্ত বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে, কখনো গানের গতি নিয়ে, কখনো স্বরলিপির প্রশ্নে। কিন্তু ঠিক কোথায় কী ভুল, তা কখনো স্পষ্ট করা হয়নি। বিচারটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অনুভূতিনির্ভর, কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়।

১৯৭৪ সালে বোর্ডের সেক্রেটারিকে লেখা দীর্ঘ চিঠিতে দেবব্রত রবীন্দ্রনাথের নিজের কথাই তুলে ধরলেন। গায়কের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ দিলীপকুমার রায়কে বলেছিলেন, "গানের গতি অনেকখানি তরল, কাজেই তাতে গায়ককে খানিকটা স্বাধীনতা তো দিতেই হবে।" আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি তিনি তুলে ধরলেন— "সরস্বতীকে শিকল পরাইলে চলিবে না... সংসারে কেবল মাঝারির রাজত্বেই এমন নিদারুণতা সম্ভব।"

যে রবীন্দ্রনাথের নামে নিয়মের বেড়াজাল তৈরি হচ্ছিল, সেই রবীন্দ্রনাথই যে শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস করতেন—এই সত্যটাই বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন দেবব্রত। ১৯৭৭ সালে বোর্ড কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও পরিস্থিতি আর আগের জায়গায় ফেরেনি। দেবব্রত তখন জানালেন, বোর্ডের পরীক্ষকরা বয়সে ও অভিজ্ঞতায় তাঁর চেয়ে কম—তাদের হাতে নিজের ব্যাখ্যা ও প্রকাশের স্বাধীনতা তুলে দিতে রাজি নন তিনি। তিনি চেয়েছিলেন বিশ্বস্ত বন্ধু জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রকে রেকর্ড অনুমোদনের দায়িত্ব দেওয়া হোক। কিন্তু ২৫ অক্টোবর ১৯৭৭-এ জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র প্রয়াত হলেন—বন্ধ হয়ে গেল শেষ সম্ভাবনাটুকুও। বোর্ডের অনুমোদন না পেয়ে রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে রচিত নিজের 'গুরু বন্দনা' গানটিও প্রকাশ করতে পারেননি তিনি। পাহাড়সম বেদনার ভার বুকে নিয়ে ১৯৮০ সালে লিখলেন— "কে রে হেরা আমারে গাইতে দিল না।"

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বদেশে স্বজনদের লড়াইয়ের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ও সুরে দুটি গান রেকর্ড করেন দেবব্রত বিশ্বাস। ওপার বাংলার জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন তিনি। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশেও একাধিকবার এসে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেছেন।

জীবনের শুরুতে যিনি ছিলেন 'ম্লেচ্ছ', শেষ জীবনে নিজেই বললেন রবীন্দ্রসংগীত জগতে তিনি হয়ে গেছেন 'হরিজন'। এই বিচিত্র পরিহাসই তাঁর গোটা জীবনের প্রতীক হয়ে উঠল। ১৯৮০ সালের ১৮ আগস্ট, ৬৯ বছর বয়সে কলকাতায় দেবব্রত বিশ্বাসের দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটে। দেবব্রত বিশ্বাস আজও প্রথাবিরোধী মানুষের কাছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর শিল্পীস্বাধীনতার এক অবিনশ্বর নাম— সফদার হাশমির মতো তাই দেবব্রত বিশ্বাসকে নিয়েও একই কথাই বলা যায়, দেবব্রত বিশ্বাস মানে জাগা, জেগে থাকা, জাগানো।

দেবব্রত বিশ্বাস : রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্রাত্য পুরুষ
দেবব্রত বিশ্বাস

Friday, August 15, 2025

কেন ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস?

জওহরলাল নেহেরু কংগ্রেস সভাপতি থাকার সময় ২৬ জানুয়ারিকে ভারতের স্বাধীনতা দিবস ঘোষণার কথা ছিল। ১৯৩০ সাল থেকে এ দিনটিকেই কংগ্রেস স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করতো এবং পরে ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে ঘোষিত হয়। তবুও লর্ডমাউন্টব্যাটেনকে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ক্ষমতা হস্তান্তরের যে আদেশপত্র দিয়েছিল তাতে বলা ছিল ৩০ জুন, ১৯৪৮-এর মধ্যেএই কাজ শেষ করতে হবে। দাঙ্গা ও সংঘাত এড়াতে আগেভাগেই ভারতের স্বাধীনতা বিল ১৯৪৭ সালের ৪ জুলাই ব্রিটিশ হাউস অফ কমন্সে পেশ করা হয়। দু সপ্তাহের মধ্যেই তা পাস হয়ে যায়। এর ভিত্তিতে ভারত ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়। এর পর থেকে ১৫ আগস্টই পালিত হচ্ছে ভারতের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে।
১৯২৯ সালে জওহরলাল নেহরু কংগ্রেস সভাপতি থাকাকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে পূর্ণ স্বরাজের ডাক দিয়েছিলেন। তার আহ্বানে ২৬ জানুয়ারিকে স্বাধীনতা দিবস ঘোষণার কথা ছিল। ১৯৩০ সাল থেকে এ দিনটিকেই কংগ্রেস স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করত, যতদিন না ভারত স্বাধীনতা পায় এবং ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে ঘোষিত হয়। ২৬ জানুয়ারির ওই দিনটিতেই ভারত সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়।
তাহলে ১৫ আগস্ট কীভাবে ভারতের স্বাধীনতা দিবস হল? লর্ডমাউন্টব্যাটেনকে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ক্ষমতা হস্তান্তরের যে আদেশপত্র দিয়েছিল তাতে বলা ছিল এই কাজ শেষ করতে হবে ৩০ জুন, ১৯৪৮-এর মধ্যে। এ ব্যাপারে সি রাজাগোপালাচারীর বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, ইংরেজরা যদি ১৯৪৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করত, তাহলে হস্তান্তর করার মত কোনও ক্ষমতাই তাদের হাতে থাকত না। ফলে মাউন্টব্যাটেন সে কাজ এগিয়ে এনেছিলেন ১৯৪৭ সালের অগাস্টে।
সে সময়ে মাউন্টব্যাটেন দাবি করেছিলেন, ক্ষমতা হস্তান্তরের দিনটি এগিয়ে আনার মধ্যে দিয়ে তিনি দাঙ্গা ও রক্তপাত এড়িয়ে যেতে পেরেছেন। তাঁর দাবি ভুল প্রমাণিত হওয়ার পর আত্মপক্ষ সমর্থনে মাউন্টব্যাটেন লিখেছিলেন, ‘যেখানেই সাম্রাজ্যের শাসনের অন্ত হয়েছে, সেখানেই রক্তপাত হয়েছে। এ দাম দিতেই হবে।‘
মাউন্টব্যাটেনের দেওয়া তথ্যের উপর নির্ভর করে ভারতের স্বাধীনতা বিল ব্রিটিশ হাউস অফ কমন্সে পেশ করা হয় ১৯৪৭ সালের ৪ জুলাই। দু সপ্তাহের মধ্যেই তা পাস হয়ে যায়। এর ভিত্তিতে ভারতে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয় এবং তৈরি হয় ভারত ও পাকিস্তান। এ দুই রাষ্ট্রকেই ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট গ্রন্থে মাউন্টব্যাটেনকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। সেখানে তিনি দাবি করেছেন, ‘আমি দিনটা এমনিই বেছেছিলাম। একটা প্রশ্নের উত্তরে আমি এই জবাব দিই। আমি বদ্ধপরিকর ছিলাম যে আমি দেখাব আমিই গোটা বিষয়টার নিয়ন্ত্রক। ওরা যখন জিজ্ঞাসা করেছিল যে আমি কোনও দিন নির্দিষ্ট করেছি কিনা, আমি বুঝে গিয়েছিলাম দ্রুত ব্যাপারটা সেরে ফেলতে হবে। আমি ও নিয়ে ভাবিনি তখনও- আমি ভাবছিলাম আগস্ট বা সেপ্টেম্বর কিছু একটা, তার পর আমি বলে দিই ১৫ আগস্ট। কেন? কারণ এ দিনটা জাপানের আত্মসমর্পণের দ্বিতীয় বার্ষিকী।‘
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জাপানের সম্রাট হিরোহিতো একটি রেকর্ডের রেডিও ভাষণ দেন যা পরে জুয়েল ভয়েস ব্রডকাস্ট নামে পরিচিত হয়। সেই রেডিও ভাষণে তিনি মিত্রশক্তির কাছে জাপানের আত্মসমর্পণের কথা ঘোষণা করেন। মাউন্টব্যাটেন স্মরণ করতে পেরেছিলেন যে তিনি সে ভাষণ শুনেছিলেন চার্চিলের ঘরে বসে এবং মিত্রশক্তির সুপ্রিম কম্যান্ডার হিসেবে জাপানের আত্মসমর্পণের নথিতে ১৯৪৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরও করেছিলেন।
কিন্তু পাকিস্তান ১৪ আগস্ট স্বাধীন হল কীভাবে? সত্যি কথা বলতে কি, হয়নি। ভারতের স্বাধীনতা বিলে দুই দেশকেই ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দেওয়ার কথা বলা ছিল। পাকিস্তান প্রথমে ১৫ আগস্টকেই স্বাধীনতা দিবস হিসেবে মেনেছিল। পাকিস্তানের প্রথম ভাষণে জিন্নাহ বলেছিলেন, ‘১৫ আগস্ট স্বাধীন, সার্বভৌম পাকিস্তানের জন্মদিন।‘ তবুও ১৯৪৮ সাল থেকে পাকিস্তান ১৪ আগস্ট থেকে স্বাধীনতা দিবস পালন করতে শুরু করে, তার একটা কারণ হতে পারে করাচিতে ক্ষমতা হস্তান্তর ঘটেছিল ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট, এথবা ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ছিল ২৭ তম রমজান যা মুসলিমদার কাছে অত্যন্ত পবিত্র একটি দিন।
কারণ যাই হোক না কেন ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই ৭৩ বছর ধরে তাদের স্বাধীনতা দিবস পালন করে তীব্র দেশপ্রেমের সঙ্গে। দুই দেশেই অবশ্য স্বাধীনতার ফল ব্যাপক সংখ্যার নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নিরিখে এ তারিখের তেমন কোনও তাৎপর্য নেই।
>>>ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে

Tuesday, June 10, 2025

রহস্যময় স্টোনহেঞ্জ দর্শন by রবিউল ইসলাম

স্টোনহেঞ্জ
ইংল্যান্ডের প্রাগৈতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ স্টোনহেঞ্জ এককথায় অসাধারণ। তবে কিছু পাথরখণ্ড ছাড়া এখানে আর কিছুই নেই! সালিসবুরির কাছে নিওলিথিক যুগের এই পাথর বৃত্তের সৃষ্টি আজও এক রহস্য। এজন্যই পর্যটকদের কাছে এটি বেশ আকর্ষণীয়।
‘তোমার ঐতিহাসিক ব্যাপারে আগ্রহ থাকলে যেতে পারো’– সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রনি পরামর্শ দিলেন এভাবেই। ব্রিস্টল থেকে টন্টনে ঢুকেই একদিনের ব্যবধানে রনি ভাই-সাকেব ভাই স্টোনহেঞ্জ দেখে ফেলেছেন। ফেসবুকে সেসব ছবি চোখে পড়ায় রনি ভাইকে ফোন দিলাম। তার মুখে গল্প শোনার পাশাপাশি গুগলে স্টোনহেঞ্জ সম্পর্কে অল্পবিস্তর পড়াশোনার সুবাদে জায়গাটির ব্যাপারে আরও বেশি আগ্রহ তৈরি হলো। কিন্তু টন্টনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের দশজনের দলটা স্টোনহেঞ্জে যাওয়ার সময় বের করতে পারেনি। টন্টন থেকে নটিংহাম যাওয়ার পথে অবশেষে সেই ইচ্ছেপূরণ হলো।
বাসে চড়ে টন্টন থেকে নটিংহাম ছয়-সাত ঘণ্টার পথ। এত্তো লাগেজ নিয়ে এমন লম্বা পথ বাসে কীভাবে পাড়ি দিবো ভেবে সবার কপালে ভাঁজ। এর মধ্যে সুমন ভাইয়ের মাথায় আইডিয়া এলো– ‘রবি, আমরা নিজেরাই তো একটা ১২ আসনের গাড়ি ভাড়া করতে পারি।’ যেই ভাবা সেই কাজ।
পরিকল্পনা অনুযায়ী নটিংহামে যাওয়ার পথে স্টোনহেঞ্জ দেখবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যাওয়ার পথে ঠিক নয়, ওয়াল্টশায়ার কাউন্টিতে অবস্থিত স্টোনহেঞ্জ দেখে নটিংহামের পথ ধরতে অনেকটা পিছিয়ে আসতে হবে! তবুও যাবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এমন সুযোগ জীবনে আর নাও আসতে পারে!

আমাদের সবুজ রঙা গাড়ি ছুটে চলছে। যেতে যেতে ফিরে গেলাম ২০০০ সালে। সেই সময় কম্পিউটারে স্ক্রিনে প্রথম এই রহস্যময় পাথরখণ্ডগুলো দেখি। এবার সামনে থেকে স্টোনহেঞ্জ দেখবো– এমন রোমাঞ্চ নিয়ে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ওয়াল্টশায়ার পৌঁছে গেলাম।
গাড়ি থেকে নেমে কম্পার্টমেন্টে ঢুকতেই চোখে পড়ে খাবারের দোকান, স্টেশনারি হাউস, স্যুভেনির হাউস। একইসঙ্গে বিশাল আকৃতির বাগান। সেখানে খড় দিয়ে বানানো ছোট ছোট কিছু ঘর। একপাশে বিশাল পাথরখণ্ডের একটি নমুনা।
স্টোনহেঞ্জ দর্শনের জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের খরচ করতে হয় ২১ পাউন্ড। ভ্রমণসঙ্গী ইয়াসিন রাব্বি দ্রুত টিকিট কেটে নিয়ে এলো। আমরা স্টোনহেঞ্জ দেখার উদ্দেশে পা বাড়ালাম। তবে এর আগে ছোট্ট একটি জাদুঘরে এ প্রসঙ্গে ধারণা পাওয়া গেলো। এতে স্টোনহেঞ্জ সম্পর্কে বিস্তারিত অনেক তথ্য রয়েছে। কীভাবে ধীরে ধীরে এর পরিসর বেড়েছে, সেই সম্পর্কেও বলা আছে।
প্রায় চার হাজার বছর আগে তৈরি পাথরখণ্ডের এই স্তূপ নিয়ে হাওয়ায় উড়ে বেড়ায় অনেক প্রশ্ন। কারা বানিয়েছে স্টোনহেঞ্জ? কেন বানিয়েছে? এটা কি কোনও কবরস্থান? এসব প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানীরা এখনও খুঁজে বেড়াচ্ছেন। কিছু কিছু ব্যাখা ছোট্ট জাদুঘরটিতে আছে। সেখানে একটি ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে স্টোনহেঞ্জের অতীত ও বর্তমান কিছু তথ্য বর্ণনা করা হয়েছে।

ঐতিহাসিকেরা স্টোনহেঞ্জ নির্মাণের তিনটি সময়কাল নির্ধারণ করেছেন। অনেকে প্রথম ধাপটি প্রাগৈতিহাসিক যুগের চেয়ে এক হাজার বছর আগের হিসাব করলেও এ নিয়ে দ্বিমত আছে। প্রথম ধাপে এর বাইরের দিকের ৩৬০ ফুট ব্যাসের একটি বৃত্তাকার পরিখা খননের কাজ শুরু হয়, যার গভীরতা ছয় ফুট। পরিখার উত্তর-পূর্বে একটি বড় প্রবেশপথ ও দক্ষিণ দিকে একটি ছোট প্রবেশপথ আছে। এই পরিখা ও এর ঢালু কিনারাকে একত্রে ‘হেঞ্জ’ বলা হয়।

পুরো হেঞ্জজুড়ে রয়েছে ৫৬টি ছোট ছোট খাদ, এসবের প্রতিটির ব্যাস তিন ফুটের মতো। ১৭ শতকে জন অব্রে নামক এক ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক এই খাদ বা গর্ত আবিষ্কার করেন। তার নামেই এগুলোর নামকরণ হয় ‘অব্রে হোল’। ধারণা করা হয়, গর্তগুলোকে ‘ব্লুস্টোন’ অথবা কাঠের তক্তা দিয়ে ভরাট করা হয়েছিল। ব্লুস্টোন হচ্ছে স্টোনহেঞ্জের সবচেয়ে ছোট আকারের পাথর, যেগুলো ভেজা অবস্থায় কিছুটা নীলাভ দেখায়।
দ্বিতীয় ধাপে ঠিক কী কাজ হয়েছিল সেই প্রমাণ খুব একটা দৃশ্যমান নয়। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, আগেরটি শেষ হওয়ার ১০০ থেকে ২০০ বছর পর শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপের কাজ। এ সময় থেকে স্টোনহেঞ্জকে সমাধিক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে থাকে। তখন কেন্দ্রে ছাদসদৃশ গঠন বানানো হয়। বৃত্তাকার পরিখায় শবদাহের জন্য নতুনভাবে আরও ৩০টি গর্ত খনন করা হয়।

তৃতীয় ধাপের কাজ শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপের প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ বছর পর। প্রধান কাজ মূলত এ সময় হয় এবং এটাই সবচেয়ে দীর্ঘ ধাপ। তখন অব্রে হোলগুলোর ব্লুস্টোন তুলে ফেলে বসানো হয় ৩০টি বিশালাকার ‘সারসেন’। স্টোনহেঞ্জের সবচেয়ে বড় পাথরগুলোকে সারসেন বলা হয়। এগুলো ২৫ মাইল দূরবর্তী মার্লবোরো নামক স্থান থেকে আনা হয়েছিল। প্রতিটি সারসেন উচ্চতায় ১৩ ফুট ও প্রায় ৭ ফুট চওড়া। এগুলার ওজন প্রায় ২৫ টন! ওই সময় আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া এত বড় পাথরগুলো কীভাবে টেনে আনা হয়েছে তা আজও বিস্ময়!
জাদুঘরে স্টোনহেঞ্জের নকশা
স্টোনহেঞ্জ একটি সমাধিস্থলই ছিল, আশেপাশের এলাকা থেকে পাওয়া হাড় ও কঙ্কাল থেকে সেই প্রমাণ পাওয়া যায়। এ থেকে ধারণা করা হয়, বিভিন্ন দূরবর্তী এলাকা থেকে লোকজন এখানে উপাসনার জন্য আসতো। এতে ৬৩ জন মানুষের হাড়ের টুকরো খুঁজে পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে রহস্য আরও ঘণীভূত হয়েছে। হুট করেই মনে পড়লো কিছুদিন আগে তো এখানে অনেক মানুষের কঙ্কাল পাওয়া গেছে। নরবলি হতো কিনা কে জানে! ভাবনার জগতে চলে গেলাম– গভীর রাতে পুরোহিতের নেতৃত্বে একদল মানুষ মশাল জ্বালিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন স্টোনহেঞ্জের দিকে। ভাবতেই কেমন যেন লাগছে!
অনেকেরই ধারণা, অদ্ভুত গঠনের স্টোনহেঞ্জকে পবিত্র স্থান হিসেবে ব্যবহার করতেন ধর্মযাজকরা। তারাই এর নির্মাণের নেপথ্যে ছিলেন। তাদের বলা হয় ড্রুয়িদ। ১৭৪০ সালে এটি ড্রুয়িদদের প্রার্থনার ঘর হিসেবে ব্যবহার হতো। প্রাচীন জাদুর কেন্দ্র হিসেবে এটি ব্যবকহৃত হতো বলে জনশ্রুতি আছে। জাদুঘরে এসব তথ্যে চোখ বোলাতে বোলাতে আধঘণ্টা কীভাবে কাটলো টেরও পেলাম না।
এবার আমাদের সেই রহস্যময় পাথরখণ্ডের সমষ্টি দেখার পালা। জাদুঘর থেকে বেরিয়ে নির্ধারিত গাড়িতে উঠতে দেরি হলো না কারও। ১০ মিনিটের মাথায় পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে।

গাড়ি থেকে নেমে হা হয়ে দেখছি! সত্যিই কি আমরা স্টোনহেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে! ব্যাপারটা যে কল্পনার রাজ্যে আবদ্ধ নেই, তা বুঝতে হাতে চিমটি পর্যন্ত কাটা হলো। সত্যিকার অর্থেই স্টোনহেঞ্জ অপার এক সৌন্দর্যের নাম। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলপড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থীর পাশাপাশি ভ্রমণপিপাসুদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। সবাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে স্টোনহেঞ্জ দেখছেন, ছবি তুলছেন। মোদ্দাকথা, তারা বিস্ময় নিয়ে উপভোগ করছেন বিস্ময়কর এই জায়গা। তবে কাছে যেতে না পারায় অনেকের মধ্যে ছিল আক্ষেপ।
১৯৮৬ সালে স্টোনহেঞ্জকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ ঘোষণা দেয় ইউনেস্কো। এরপর থেকে এর কাছে যাওয়া বন্ধ রয়েছে। স্টোনহেঞ্জের খুব কাছাকাছি পর্যটকদের চলাফেরা নিষিদ্ধ। এ কারণে দর্শনার্থীদের একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে দেখতে হয় নব্যপ্রস্তরযুগীয় বিস্ময়টিকে।

প্রতিদিনই স্টোনহেঞ্জে বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের ভিড় জমে। কার্ডিফ থেকে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে এসেছেন পিটার নিক্সন নামের একজন শিক্ষক। পৃথিবীর ইতিহাসসহ জটিল সব রহস্য সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের জানা উচিত বলে মনে করেন তিনি। তার কথায়, ‘এই ছেলেমেয়েরা কার্ডিফে পড়াশোনা করে। শিক্ষা সফরে এখানে এসেছে ওরা। স্টোনহেঞ্জের ইতিহাস বেশ রহস্যময়। আশা করি, এই প্রজন্ম একদিন তা উন্মোচন করতে পারবে।’
১৯১৮ সালের ২৬ অক্টোবর ব্রিটিশ সরকারের হাতে স্টোনহেঞ্জ তুলে দেন শিল্পপতি সেসিল চাব। এরপর এটি রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেসিল ও ম্যারি চাবের উদারতা স্টোনহেঞ্জকে বাঁচিয়েছে নিঃসন্দেহে। এর মাধ্যমে অবহেলিত ধ্বংসাবশেষ থেকে এটি পরিণত হয়েছে ব্রিটেনের জাতীয় সম্পদে।

স্টোনহেঞ্জের গঠন খানিকটা জটিল। তবে এটি তৈরিতে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। ধূসর বর্ণের প্রায় ১৩ ফুট উচ্চতার পাথরগুলোতে ফুটে উঠেছে জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্যের ছাপ। প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার সঙ্গে এই স্থাপত্যের খানিকটা মিল পাওয়া যায়। স্টোনহেঞ্জের পাথরগুলোর গঠনে আছে দুটি বৃত্তাকার ও দুটি ঘোড়ার খুরের নলের আকারবিশিষ্ট পাথরের সারি। এছাড়া কতগুলো পৃথক পাথর রয়েছে অল্টার স্টোন।
সময় ফুরিয়ে এসেছে। আমাদের যেতে হবে নটিংহামে। সবুজ রঙের বাসটিতে চেপে বসার পরও যতক্ষণ পারা যায়, পেছন ফিরে বিস্ময়কর এসব পাথরখণ্ড থেকে দৃষ্টি সরলো না।
>>>ছবি: লেখক
স্টোনহেঞ্জের সামনে লেখক

Thursday, August 15, 2024

খন্দকার মোশতাকের উত্থান-পতন by এমরান হোসাইন শেখ

খন্দকার মোশতাক আহমেদ
বাংলাদেশের ইতিহাসে জঘন্যতম বিশ্বাসঘাতক হিসেবে যে নামটি সবার আগে আসে, তা হলো খন্দকার মোশতাক আহমদ। দেশের আপামর জনগণের কাছে একজন নিন্দিত ও ঘৃণিত ব্যক্তি। বন্ধু হিসেবে বুকে টেনে নেওয়া জাতির পিতার হত্যার মূল পরিকল্পনায় ছিলেন এই বিশ্বাসঘাতক। জাতির পিতাকে হত্যার পরপরই নিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও।

১৯১৯ সালে কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দির দশপাড়া গ্রামে জন্ম মোশতাক আহমদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনকারী এই ঘাতকের শুরুর জীবন এতটা কালিমালিপ্ত দেখা যায়নি। বঙ্গবন্ধুর কাছের মানুষ ছিলেন তিনি। ছাত্র রাজনীতিতে তার বিচরণ ছিল। মুসলিম লীগের ছাত্র শাখার নেতৃত্ব পালন করেন। পরে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর হাত ধরে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেন। এ সময় উদীয়মান তরুণ এবং ক্যারিশমেটিক নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নজরে আসেন মোশতাক। তখন থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ছিল তার পদচারণা।

মোশতাক ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অতি ভক্ত। আওয়ামী লীগের ভেতর তিনি ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দলে বামপন্থীরা কোণঠাসা হয়ে পড়লে মোশতাক আওয়ামী লীগে আরও ‘গুরুত্বপূর্ণ‘ হয়ে ওঠেন। অতি বিনয়ী ভদ্রতার মুখোশ পরা হাসিতে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতেন।

খন্দকার মোশতাক ১৯৪২ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন। তিনি যুক্তফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেওয়া হলে ১৯৫৪ সালে তাকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৫৫ সালে তিনি মুক্ত হয়ে আবারও সংসদে যুক্তফ্রন্টের চিফ হুইপ হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করার পর তিনি আবারও বন্দি হন। তিনবার জেল খেটে বঙ্গবন্ধুর আরও কাছে আসেন। ৬ দফা আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গ্রেফতারও হন। দেশের আটটি রাজনৈতিক দল ১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী ‘গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করলে তাতে খন্দকার মোশতাক আহমদ পশ্চিম পাকিস্তান অংশের সমন্বয়ক ছিলেন। ১৯৬৯ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে আইয়ুব খানের ডাকা গোলটেবিল বৈঠকে তিনি আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মোশতাক অন্যদের মতো ভারতে পাড়ি জমান এবং মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকার গঠন করলে সেখানেও বিদ্যুৎ, সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করা হয় মোশতাককে। ১৯৭৫ সালে মন্ত্রণালয় পরিবর্তন করে তাকে করা হয় বাণিজ্যমন্ত্রী। বঙ্গবন্ধুর সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ভারত নীতিতে মোশতাকের সমর্থন ছিল না। তবুও বঙ্গবন্ধু তার স্বভাবজাত মহানুভবতায় তাকে নবগঠিত বাকশালে ঠাঁই দেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্য ও আসামির জবানবন্দি থেকে জানা গেছে, পচাঁত্তরের মাঝামাঝি মোশতাকের ষড়যন্ত্র শুরু হয়। তিনি নিজে ও আত্মীয়দের মাধ্যমে সেনা সদস্যদের নিয়ে জাতির পিতাকে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকেন। এ সময় গাজীপুর, কুমিল্লাসহ ঢাকায় সহযোগীদের নিয়ে একাধিক বৈঠক করেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু হত্যার আসামি তাহের উদ্দিন ঠাকুর জবাববন্দিতে বলেন, ‘‘১৯৭৫ সালের মে বা জুনের প্রথম দিকে গাজীপুরের সালনা হাইস্কুলে ঢাকা বিভাগীয় স্বনির্ভর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। সালনাতে মোশতাক সাহেব সেনা অফিসারদের জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমাদের আন্দোলনের অবস্থা কী?’ জবাবে তারা জানান যে, ‘বস সবকিছুর ব্যবস্থা নিচ্ছেন। আমরা তার প্রতিনিধি।’ ১৯৭৫ সালের জুনে দাউদকান্দি মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সেনা অফিসারদের মধ্যে মেজর রশীদ, মেজর বজলুল হুদা, মেজর শাহরিয়ার, মেজর ফারুক যোগদান করেন।

১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট সচিবালয়ে গেলে খন্দকার মোশতাক বলেন, ‘এ সপ্তাহে ব্রিগেডিয়ার জিয়া দুইবার এসেছিলেন। তিনি এবং তার লোকেরা তাড়াতাড়ি কিছু একটা করার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন।’ আমি জিজ্ঞাসা করায় খন্দকার মোশতাক জানান, ‘বলপূর্বক মত বদলাইতে চায়, প্রয়োজনবোধে যেকোনও কাজ করতে প্রস্তুত।’ খন্দকার মোশতাককে জিজ্ঞাসা করায় তিনি জানান যে, তিনি তার মতামত দিয়েছেন। কারণ, এছাড়া অন্য আর কাজ কিছু নাই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকাল অনুমান ৬টার সময় খাদ্যমন্ত্রী টেলিফোনে আমার কাছে জানতে চান যে, ‘গুলির আওয়াজ শুনেছি কিনা।’ আমি না বলে জানাই। পরে আমাকে পুনরায় টেলিফোনে রেডিও শুনতে বলেন। রেডিওতে শুনি মেজর ডালিমের ঘোষণা, ‘শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে।’ বুঝলাম, তাদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কাজ সম্পন্ন হয়েছে।’’

প্রসঙ্গত, বঙ্গবন্ধুর হত্যার মূল পরিকল্পনায় যে মোশতাক ছিলেন, তা স্পষ্ট হয় ৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পরপরই। ওইদিনই মোশতাক নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন এবং বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সূর্যসন্তান বলে আখ্যায়িত করেন। ক্ষমতায় বসে ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মোশতাক ইমডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান চালু করেন। তার শাসনামলেই চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মো. মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামানকে ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। কারাবন্দি করা হয় আওয়ামী লীগের শত শত নেতাকর্মীকে। অবশ্য এত কিছুর পরও ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেননি মোশতাক। ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৮৩ দিনের মাথায় ১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বর খালেদ মোশারফের পাল্টা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি। ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে তাকে বন্দি করা হয়। জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণের পর মোশতাক প্রথমে বন্দি থাকলেও ১৯৭৬ সালে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্ত হয়ে ডেমোক্রেটিক লীগ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গড়তে গিয়ে ব্যর্থ হন। পরে সামরিক শাসককে অপসারণের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে তাকে আবারও গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দুটি দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়। আদালত তাকে পাঁচ বছরের শাস্তি প্রদান করেন। জেল থেকে মুক্তিলাভের পর তিনি সক্রিয় রাজনীতি শুরু করেন। তবে রাজনীতিতে আর সফলতা পাননি। হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত সহকারী আ.ফ.ম. মুহিতুল ইসলাম ধানমন্ডি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু এর আগেই ওই বছরের ৫ মার্চ মোশতাক মৃত্যুবরণ করেন। ফলে হত্যার দায় থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি।

মৃত্যুর পর পুলিশ পাহারায় দাউদকান্দির দশপাড়ায় তাকে দাফন করা হয়। বর্তমানে সীমানা প্রাচীর ঘেরা তার বাড়িতে দোতলা একটি ভবন রয়েছে। এছাড়া, সেখানে একটি মসজিদ ও পারিবারিক কবরস্থান আছে। মোশতাকের ছেলেমেয়েরা বিদেশে বসবাস করেন। প্রথমদিকে তারা মাঝে মধ্যে দেশে এলেও জনরোষের ভয়ে গত কয়েক বছর ধরে তারা দেশে ফেরেননি।

বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে মোশতাক আহমেদের সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন,‘‘খন্দকার মোশতাককে তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় সূক্ষ্ম কূটচাল চালতে দেখেছেন। দেশে যখন পুরোদমে যুদ্ধ চলছিল, মোশতাক বলাবলি করতেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে জীবিত পেতে চাইলে দেশ স্বাধীন হবে না।’ তবে আমরা কৌশল করে তার জবাবে বলতাম— দুটোই চাই। ষড়যন্ত্রের কারণে সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় মোশতাককে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়। তখন অলিখিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রীয় কাজ করতেন আব্দুস সামাদ আজাদ। ওই সময় থেকেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা জোরদার করেন মোশতাক। তার এই ষড়যন্ত্রের ব্যাপারটি প্রমাণিত হয় ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে।’’

‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়ে মোশতাককে নিয়ে বঙ্গবন্ধু
মোশতাকের গালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু
বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইয়ে বেশ কয়েকবার খন্দকার মোশতাক আহমদের নাম এসেছে। বইয়ের নির্ঘণ্টে দেখা গেছে, ৮টি পৃষ্ঠায় তার নাম বা প্রসঙ্গ এসেছে। দেখা গেছে, কোনও কোনও পৃষ্ঠায় একাধিকবার তার নাম এসেছে। বইয়ে উল্লিখিত সময়ে খন্দকার মোশতাক নিজেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জেলে ছিলেন। কখনও একই জেলখানায় কখনও ভিন্ন স্থানে। বঙ্গবন্ধু তাঁর বর্ণনায় কখনও কখনও মোশতাকের শারীরিক অসুস্থতা বা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার কথাও উল্লেখ করেছেন।

রোজনামচা বইয়ে বঙ্গবন্ধু ও খন্দকার মোশতাক জেলে থাকতে কোনও এক বাংলা নববর্ষে (১৫ এপ্রিল) পরস্পরকে ফুল পাঠিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়ের কথাও উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া, এক কোরবানির ঈদে একসঙ্গে নামাজ পড়ার কথাও রয়েছে। মাঝে মাঝে বঙ্গবন্ধু তাকে বন্ধু বলে সম্বোধন করেছেন। কখনও বা নাম উল্লেখ করেছেন। মোশতাক অন্য জেলে থাকলে বিভিন্ন মাধ্যমে তার খবর নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

জেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মোশতাক সম্পর্কে বইয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমার জায়গা থেকে আমি দেখলাম, মোশতাক হাসপাতালের বারান্দায় চেয়ারে বসে রয়েছে। চেনাই কষ্টকর। বেচারাকে কী কষ্টই না দিয়েছে! একবার পাবনা, একবার রাজশাহী একবার ঢাকা জেল।’

আরেক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘খন্দকার মোশতাক আহমদ ও আবদুল মোমিন সাহেব হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মোশতাক সাহেবের শরীর খুবই খারাপ। ওজন অনেক কম হয়ে গেছে। মোমিন সাহেব এখন ভালো। তাদের সাথে দেখা হয়েছিল হাসপাতালের দরজায়। তারা সব দলের ঐক্য চায়। তবে পূর্ব বাংলার দাবি ছেড়ে নয়, ত্যাগ করতে প্রস্তুত আছে।’

৬ দফা আন্দোলনের সময় একসঙ্গে জেলে যাওয়ার পর অন্যান্য নেতার পাশাপাশি মোশতাক সম্পর্কেও বর্ণনা করেছেন জাতির পিতা। তিনি লিখেছেন, ‘মোশতাক সাহেব তো পুরনো পাপী। অত্যন্ত সহ্য শক্তি, আদর্শে অটল। এবার জেল তাকে বেশি কষ্ট দিয়েছে— একবার পাবনা জেলে, একবার রাজশাহী জেলে, আবার ঢাকা জেলে নিয়ে। কিন্তু সেই অতি পরিচিত হাসিখুশি মুখ।’

২৩-২৭ এপ্রিল ১৯৬৭ সময়ের একটি বর্ণনায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমি, সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন, বিশিষ্ট নেতা খোন্দকার মোশতাক আহমেদ জেলে আছি। আমরা ছয় দফা দাবির জন্য জেলে এসেছি।’

কারাগারের রোজনামচা বইয়ে জাতির পিতা যেসব রাজনীতিক বা ব্যক্তির বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে লিখেছেন, বইটির শেষাংশে তাদের সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরা হয়েছে। এসব ব্যক্তিত্বের মধ্যে খোন্দকার মোশতাক আহমেদও রয়েছেন। বইটিতে তার জীবনী সম্পর্কে যা তুলে ধরা হয়েছে তা হলো— ‘খোন্দকার মোশতাক আহমদ (১৯১৯-১৯৯৬): বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দক্ষিণপন্থী অংশের নেতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নানা সন্দেহজনক ও বিতর্কিত কাজে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকারের (১৯৭১-৭৫) বিভিন্ন দফতরের মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মর্মান্তিক ও ষড়যন্ত্রমূলক হত্যায় তার (মোশতাক) গোপন সমর্থন ও সহায়তা ছিল বলে ধারণা করা হয়। ১৯৭৫-এ দেশদ্রোহী স্বাধীনতাবিরোধী কতিপয় সেনা সদস্য বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর তাকে রাষ্ট্রপতির আসনে বসায়। ক্ষমতায় বসেই তিনি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের কতক মৌলিক রাষ্ট্রীয় আদর্শের পাশ্চাৎমুখী পরিবর্তন ঘটান। তিনি বাংলাদেশের একজন নিন্দিত রাজনীতিবিদ।

>>>তথ্য সূত্র: বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার একাধিক আসামি ও সাক্ষীর সাক্ষ্য, কারাগারের রোজনামচাসহ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একাধিক বই এবং গণমাধ্যমে দেওয়া আমির হোসেন আমুর একটি সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ।

Wednesday, July 17, 2024

গোলাপজান by মঈনুল হাসান

নুরুর মার বয়স কত হবে? পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ কিংবা তার বেশি বা কমও হতে পারে। অন্তত চোখের অনুমান দিয়ে মাথা হতে পা পর্যন্ত পরিমাপ করে বছর-মাসের যোগফল ঘোষণা করে বয়স সাব্যস্ত করা আমার পক্ষে বেশ কঠিন ছিল। তাছাড়া তেমন কঠিন নিরীক্ষাশক্তি আমার কোনোকালেই ছিল না বলে জানি।
আমার বাবা খুব সামান্য চাকুরি করতেন বলে সরকারি কোয়ার্টারের হলুদ একটা ভবনের চারতলার কোনো এক পাশে অন্যের সাবলেট হিসেবে তিনি আমাদের নিয়ে থাকতেন। মা যেদিন থেকে বিছানায় শুয়ে অসহায় চোখে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন সেদিন থেকে আমার একাকি বিষণ্ন দিনগুলো শুরু হয়। অথচ ক্যালেন্ডারের পাতায় সে ক্লান্তিময় দিনগুলো গোনার চেয়ে আমি মুগ্ধ হয়ে তার ছবির দিকেই তাকিয়ে থাকতাম। যেমনই আমাদের ঘরে নুরুর মাকে প্রথমদিন দেখে তাকিয়ে ছিলাম । তার পূর্বের জীবনবৃত্তান্ত আমাদের জানা ছিল না। কিংবা কীভাবে সে আমাদের ঘরে প্রবেশের সুযোগ পেল তেমন কৌতূহল আমার মধ্যে মোটেই ছিল না। তারপরও সে এলো যখন একখণ্ড মেঘের ছায়া যেন আকাশ কাঁপিয়ে দারুণভাবে এলো।
আমাদের এক কক্ষের জীবনে ততদিনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে নুরুর মা। একদিন দাঁড়িয়ে দেখলাম থপথপ করে ঘরে ঢুকে মায়ের মাথায় জলপট্টি বেঁধে দিল সে—কিছু বুঝে বা না বুঝে অথবা বাবার কাছ হতে নির্দেশিত হয়ে। আমি তখন মায়ের কাছাকাছি জানালার লোহার শিক ধরে আপাত শূন্যতার ঘোরে। যতখানি উচ্চতায় উঠলে নিজেকে মানুষের চেয়ে অন্য কোনো উড়ন্ত জীবের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া যায় বা তেমনভাবে কল্পনা করা যায় সেরকম একটা চেষ্টাই ছিল আমার খেলার অংশবিশেষ। আমি বোধহয় নুরুর মাকে নিয়েই ভাবছিলাম; যে কিনা মেঘ, মেঘের কালো অথবা সেখানে আড়াল হওয়া প্রকাণ্ড কোনো বাজপাখির উড়ন্ত ছায়া হয়ে আমার মন দখল করে আছে। আগেই বলে নিচ্ছি এ গল্প কিন্তু আমি কিংবা আমাদের নয়।
আমার মা নাজমা নাহার দীর্ঘদিনের রোগশয্যায় ক্লান্ত। ঠিক কী অসুখে তিনি বিছানায় রয়েছেন আমার কোমল প্রাণে তার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। এদিকে একটা ঘোষিত কয়েদঘরের মধ্যে মায়ের সঙ্গী হয়ে সকাল থেকে রাত অবধি কাটাতে হতো বলে আমার চারপাশের পৃথিবী দারুণভাবে হাঁপিয়ে উঠেছিল। কারণ, সকাল হলেই জানতাম কখন সন্ধ্যা আসবে। আর এভাবে দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যাসহ সবকিছুই দেখতে হতো চারতলার জানালা হতে। আমাদের শৈশবের সে সময়টায় সম্ভবত এটাই ছিল সর্বোচ্চ কোনো আবাসের ঠিকানা যেখান থেকে তাকিয়ে পৃথিবীর ব্যস্ততা দেখা যেতো আর দেখা যেতো নিচের পিঁপড়ার মতো মানুষজনের বিরামহীন আনাগোনা। এভাবে ওপর থেকে তাকিয়ে নিচের অজানা দেশ ভ্রমণ করাই আমার খেলার অংশ হয়ে উঠল দিনের পর দিন।
ফিরে আসি নুরুর মার কাছে। মায়ের মাথায় জলপট্টি বেঁধে দিয়ে সারা বিকাল ক্লান্তিহীন শুশ্রূষার কারণে সেদিন সন্ধ্যার সময়ে মা অনেক দিন পর একটু চোখ মেলে চাইলেন। খানিকক্ষণ তাকিয়ে তিনি এই পৃথিবী দেখলেন আর এই দৃশ্য দেখে আমি যেন আমার পুরো জগৎটা দেখলাম। কারণ, বাবাসহ আমাদের তিনজনের পরিবার ছিল আমার সমস্ত পৃথিবী। বাবা যদি সূর্য হয়ে থাকে, ছিমছাম সে পৃথিবীর কক্ষপথ ছিল মাকে নিয়ে। এর মধ্যে নুরুর মা চলে এল এক অচেনা গ্রহ হয়ে। এসব ভাবনার মধ্যেই পা টিপে টিপে খাট থেকে নেমে আমি আমার নির্ধারিত নির্বাসিত এক কক্ষের জীবন থেকে বেরিয়ে পড়ি সামনের অপরিসর বারান্দায়।
রান্নাঘরের কলতলার কাছে আরেকদিন পিঁড়ি টেনে বসে ছিল নুরুর মা। বাবা তখনও ফেরেননি। বয়সজনিত ভীরুতায় কাঠের সবুজ ভারী দরজার আড়াল থেকে দেখলাম মানুষটিকে। কাছে যেতে সাহস হলো না। মুখটা বিশাল। তোষা পাটের মতো রুক্ষ চুলগুলো লালচে কোঁকড়ানো। একটা লালরঙা চুলের ফিতায় খোঁপাবদ্ধ চুলগুলো মাথার ওপরের দিকে কেমন অবিন্যস্ত। পরনের জংলি ছাপার শাড়িটাও লাল। তবে হাঁটুর কাছাকাছি কাপড় উঠিয়ে পা ছড়িয়ে বসায় ভেতরের নীল পেটিকোট বেরিয়ে আছে। অনেকক্ষণ পর খেয়াল করলাম হাতে-কানে কোথাও অলংকার না থাকলেও নাকে একটা নীল নাকফুল আর রূপার নোলক।
চুলায় আগুন নেই। আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে বিড়িটা সে ধরালো দেশলাই দিয়ে। তারপর ঠোঁটের এক কোণে বিড়িটা রেখে দাঁত দিয়ে চেপে ধরে চুলায় আগুন জ্বালিয়ে গনগনে সে আগুনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো সেদিনের নুরুর মা। একটা অখণ্ড অচল পাহাড় যেন—কোত্থেকে চলে এল আমাদের চারতলার এ ঘরে। নিঃশব্দে জ্বাল চলতে থাকে আর টগবগ করে ফুটতে থাকে হাঁড়ির ভাত। পা ছড়িয়ে রাখা ঝাঁঝালো চেহারার মানুষটা একদেহ রুক্ষতা নিয়ে সেখানে বসেই থাকে—বসে থেকে বিড়ির ধোঁয়া ছেড়ে ফ্যানসা ভাতের ধোঁয়াময় এক অন্য পৃথিবীতে হারিয়ে যেতে থাকে ক্রমশ। তার সে পৃথিবী আরও অচেনা হতে হতে কিংবা অচেনা সে গ্রহটি ভিন্ন কক্ষপথে হারিয়ে যেতে যেতে একসময় আমাদের কাছে অপার রহস্য রেখে চলে যায় নুরুর মা।
---দুই---
স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষে শীতের লম্বা ছুটি চলছিল একমাস ধরে। মায়ের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে জানালার গরাদ ধরে মানুষ দেখাই আমার একমাত্র খেলা তখন। এমন সময়ে সকলেই বাইরের নতুন জগতের সাথে পরিচিত হয়। অথচ আমার কৈশোরের সরল চোখে আশ্চর্য হয়ে বসে আছে সেদিনের আলুথালু নুরুর মা। চারতলার জানালা থেকে তার আসার অপেক্ষায় হয়তো দাঁড়িয়ে থাকতাম আমি।
অন্য আর সব দিনের মতো রান্নাঘরে কারও অসতর্ক পায়ের আওয়াজে আমি সেদিকে এগিয়ে যাই। হ্যাঁ, নুরুর মা-ই। আমি অবশ্য তাকে ডাকতাম নুরুম্মা বলে। ওপর থেকে প্রায়ই দেখতাম কেউ একজন একটা নতুন রিকশা নিয়ে অপেক্ষা করছে নিচে রাস্তার ধারে। আর আমি বুঝতাম নুরুম্মা এসেছে।
আজও একটা উৎকট গন্ধ আসছে রান্নাঘরের ওদিক থেকে। বিড়ির লালচে আগুনের মতো তার চোখ দুটো যেন জ্বলছে আর নিভছে। নুরুম্মার সাথে আমার সহজাত দূরত্ব কমে এলেও চোখে ক্রোধের আগুন দেখে ফিরে আসি ঘরের দিকে। বাইরের জগতের সাথে ততদিনে আমার যোগসূত্র ঘটে গেছে হারুনের কারণে। হারুন নুরুম্মার ছেলে। আমার কথা বলার আর বাইরের দুনিয়ার সাথে পরিচয় ঘটিয়ে দেবার জন্য প্রকৃত একজন মানুষ। আর পুরো এ ঘটনার মাধ্যম হলো নুরুম্মা, যার কারণে আমার ছোট্ট দুনিয়া থেকে অজানা এক বৃহৎ দুনিয়ায় প্রবেশের সুযোগ ঘটেছিল একটু একটু করে।
আজ নুরুম্মাকে কেমন অস্বাভাবিক লাগছে। অন্যদিনের চেয়েও অপরিচিত এক হিংস্র ছায়া আপাদমস্তক রুক্ষতা নিয়ে ভীষণভাবে জেঁকে বসে আছে তার শরীরে। তবে তার গোলগাল চেহারায় রুক্ষতা থাকলে কী হবে, কথার মধ্যে যে মায়া ছিল তা তার সাথে কেউ কথা না বললে বুঝতে পারবে না। অনেকদিন থেকে দেখছি বিকালের এ সময়টাতে এসে সে খুব তৃপ্তি নিয়ে নুনগোলা ভাতের ফেন খেত। খাওয়ার অন্য কিছু ছিল না বলে ঠিক নয়, এটা ছিল তার প্রিয় অভ্যাসের মতো।
আমাকে দেখলে বলত, এট্টু ফ্যান খাইবাম?
আমি মাথা নেড়ে ‘না’ বলতাম।
সেও তখন মায়া করে বলত, যাও গুরো গিয়া। হারুন নিচত আছে।
আমি ঠিক এ কথাগুলো শোনার জন্যই অধীর হয়ে অপেক্ষা করতাম। কারণ, আমি জানি ওদিকে হারুন যথারীতি তার রঙিন রিকশা নিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে। হারুন। আমার চেয়ে বয়সে কত বড় তা ঠিক জানি না, তবে বেশ বড়ই হবে। এদিকে মনে মনে আমি কখনও ভাবতাম, নিশ্চয়ই নুরু নামে তার আরেক ছেলে ছিল অন্য কোথাও। নইলে লোকে তাকে ওই নামে ডাকবে কেন? আমার বিকালের খেলার অংশটা শেষমেশ রিকশায় চড়া পর্যন্ত বর্ধিত হয়েছিল নুরুম্মার কারণেই। সেদিন থেকে সে অচেনা গ্রহটি আমার কাছে আরও প্রিয় হয়ে আমাদের নিজস্ব গ্রহের উপগ্রহ হয়ে উঠতে লাগল।
আমাদের দিনগুলো নুরুম্মা ও হারুনকে কেন্দ্র করে ভালোই কেটে যাচ্ছিল। এর মধ্যে কয়েক মাস কেটে গেছে। একদিন বিকালে বাইরের রোদটা দিনটাকে পুড়িয়ে দিয়ে একটু থিতু হয়েছে কেবল। ভাপওঠা রাস্তায় লোকজনের চলাচল ও কোলাহল দুটোই কম। দু একটি শালিক-চড়–ই-কাক শুধু এদিক ওদিক হাঁটছে। মা শুয়ে আছেন পর্দার আড়ালে। দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে আমিও খেলছি প্রতিদিনের মতো।
আমি মায়ের বুকের ওঠানামা দেখছি মানানসই দূরত্ব থেকে। ওদিকে রক্তলাল চোখ ও আলুথালু চুলে নুরুম্মা বসে আছে রান্নাঘরের মেঝেতে। আমাকে দেখে ফেন খাওয়ার কথা বলল না আজ। আমি নুন দেয়া ফেন খাওয়ার চিন্তায় মগ্ন হয়ে তাকিয়ে থাকি তার দিকে কিছু শুনব বলে। নুরুম্মার সামনে মাটির মালসাতে ফেন। নাকে ঝুলানো নোলক থেকে টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছে জল— ভালো করে খেয়াল করে দেখি সে মেঝের দিকে মাথা নিচু করে বসে কাঁদছে। গায়ে জড়ানো মোটা সুতি থানও কেমন এলোমেলো। তবে চারদিকের নানান অসঙ্গতির মাঝে তার অসংলগ্ন বসার ভঙ্গিতেও শরীরী দৃঢ়তা স্পষ্ট।
সিঁড়ির কাছ থেকে কয়েকজন আগন্তুকের দুপদাপ শব্দ আসছে পায়ের। তারপর হঠাৎ দরজায় ঠকঠক। আমি ভীত হয়ে সরে আসলাম। আবারও কড়া নাড়ার অস্থির শব্দ। নুরুম্মাই উঠে গেল টলতে টলতে। দরজার অপর প্রান্তে যারা দাঁড়িয়ে তাদের একজন এ ভবনের তিন তলায় থাকেন। বাবার চেনা লোকগুলো। লোকগুলোর সাথে নুরুম্মার ধ্বস্তাধ্বস্তিতে আমি আরও হতভম্ব হয়ে যাই। তারপর লোকগুলো চলে যেতেই দ্রুত কপাট বন্ধ করে দেয় নুরুম্মা। অনেকক্ষণ পরে আমার নজরে এলো একটা ধারালো দা। কাপড়ের কাছা দিয়ে পেঁচানো দাটি নুরুম্মা তখন আঁচলের আড়াল থেকে বের করে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ভেতর ও বাইরের সম্ভাব্য পরিস্থিতির অনুপুঙ্খ পাঠ বিশ্লেষণের চেষ্টা করি আমি। আমার বয়স কিংবা বিচারবোধ উদ্ভূত এ পরিস্থিতির সাথে কিছুতেই তাল মিলিয়ে উঠতে পারছিল না। তবে কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে এবং তা যে অত্যন্ত মারাত্মক, তা নুরুম্মার থরথর করে কাঁপুনি থেকে আঁচ করতে পারছিলাম। আমার প্রতিদিনের খেলার জগৎ নুরুম্মা তার খেয়াল খুশিমতো এভাবে ভণ্ডুল করে দিতে পারে না। আমি হতবাক হয়ে পড়ে আছি তখনও। নুরুম্মা দা হাতে করে দরজার কাছাকাছি তখনও দাঁড়িয়ে। বাইরের দরজায় কড়ার গায়ে আগের চেয়েও আরও কঠিন ঘায়ের শব্দ এবার। আরও কঠিন স্বরে কেউ তখন ডাকছে।
গোলাপি...ওই গোলাপি...শিগগির বাইর হইয়া আয়। নইলে কপালে কিন্তু খারাবি আছে কইলাম।
ভেতরে দাঁড়িয়ে নুরুম্মা থরথর করে কাঁপছে। বাইরে অনবরত ধাক্কা, জোরে জোরে কড়া নাড়া, দুমদাম আওয়াজ শুধু। আবারও সেই একই কর্কশ কণ্ঠের হাঁক।
গোলাপি... তাড়াতাড়ি দরজা খোল।
---তিন---
শঙ্কিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে এমন একটি দিনেই প্রথম জানতে পারলাম নুরুম্মার নাম গোলাপজান। বাইরের আর ভেতরের পৃথিবী এক হবার পরেই আমি বুঝতে পারি আমার এ ছোট্ট গণ্ডির বাইরের বিশাল জগৎটা ভীষণ অন্যরকম। সেখানে কোথাও কোনো বড় তাণ্ডব হয়ে গেছে, লণ্ডভণ্ড হয়েছে কিছু। নইলে এমন হচ্ছে কেন সব? আজ গোলাপজানের চোখগুলো সুতি থানের লাল পাড়ের মতো রক্তিম হয়েইবা আছে কেন? কেন খুনরাঙা জবার লালচে রঙের ছোপ ছোপ দাগ তার কাপড়ের ফ্যাকাশে জমিনে?
অপরিচিত দুজন আগন্তুকের মধ্যে সম্ভবত একজন ছিল গোলাপজানের স্বামী। তারা হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যেতে চেয়েছিল তাকে। কাপড়ের আড়াল থেকে দ্রুত দাটা বের করে আনে সে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েকটা কোপ বসিয়ে দেয় একজনের কাঁধে। রক্তবন্যায় ভেসে যাবার আগে লোকটা গোলাপজানের হাত ছেড়ে তিন লাফে সিঁড়ি দিয়ে পালিয়ে যেতে যেতে সেখানেই লুটিয়ে পড়ে। কিছু রক্ত গড়িয়ে পড়ে থাকে দরজার মুখটায়, কিছু হয়তো সিঁড়িঘরের মাঝে। কিন্তু, এ দৃশ্য দেখার সাথে সাথে পরবর্তী ঘটনাক্রমের সাক্ষী হবার জন্য আমাকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করে থাকতে হয়।
কয়েকটা দিন কেটে যায় নিরুপদ্রব। রুটিন মেনেই গোলাপজান আবার সাংসারিক টুকিটাকি কাজ সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রতিদিনের মতো বিকালের নরম আলো সাঁতরে ভারী দেহ নিয়ে থপথপ আওয়াজ তুলে এসে বসতো রান্নাঘরের উনুনের কাছে। তারপর চুলার গনগনে আঁচে সিদ্ধ হয়ে ভাতের চাল ফুটে উঠতো রোজ। এদিকে গোলাপজানের পরিবর্তিত মনোজগতে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে শুরু করেছে তাও বেশ বুঝতে পারছিলাম আমি। তার ঠোঁটে গুঁজে রাখা বিড়ির আগুন চোখে-মুখেও দপদপ করে জ্বলে উঠতো উন্মত্ততার প্রতীক হয়ে। চারপাশের সবকিছু দেখে কী প্রচণ্ড ঘৃণা ফুটে উঠতো তার সমস্ত মুখমণ্ডল জুড়ে। তাই আগের মতো তার কাছে যেতে আমার ঠিক সাহস হতো না আর।
আপনাদের জানিয়ে রাখি, চারতলার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালে চোখের নাগালের সাথে রেলিঙের উচ্চতাটা প্রায় সমান বলে আমাকে দু পায়ের পাতায় ভর দিয়ে দাঁড়াতে হতো। এভাবে ওপর থেকে নিচে তাকিয়ে দেখতাম আগের মতোই একটা রঙিন রিকশা রাস্তায় দাঁড়ানো। সেখানে হারুন নয়, যেন অন্য কেউ; একজন অচেনা মানুষের প্রতিকৃতি। আমার ভেতরে প্রশ্ন জাগে তবে কি হারুনসহ রিকশাটা ছিনতাই হয়ে গেছে? আমার রঙিন রিকশাওয়ালা—যে আমাকে বাইরের জগৎ দেখিয়েছে। নাকি শুধু একলা হারুন? যে কিনা পালিয়ে গেছে গোলাপজানের সাথে সেদিনের ঘটনার কারণে। রঙিন রিকশাওয়ালার এ পলায়নপর ঘটনা আমাকে আরও একা করে দেয়।
কয়েকদিন বাদে একদিনের এক বিষণ্ন মধ্যাহ্নে কয়েকজন পুলিশ এসে খোঁজ-খবর করে আমাদের কাছে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তারা নিয়ে যায় গোলাপজানকে। আর গোলাপজান নয়, নুরুম্মা তখন আমাকে মায়াভরা দৃষ্টি নিয়ে সোহাগ করে ডাকছে, ‘খোকন, এট্টু ফ্যান খাইবাম’?
গোলাপজানকে নিয়ে শেষে অনেক কথাই ছড়িয়ে পড়ে আমাদের চারতলা কোয়ার্টারের ঘরে ঘরে। আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা আসে না কিংবা সেসব রটনা বলতে ইচ্ছা করে না। সকলের মুখে মুখে নিঃশব্দ দুপুরের একাকী প্রহরগুলোতে নুরুম্মারা গোলাপজান হয়ে যায়। তারা ঘর ভেঙে অন্য পুরুষ নিয়ে দেশান্তরী হয়, কেউ বলে বেশ্যাও হয়ে যায়। আর গোলাপজানের গল্পটা এভাবে আমার মনের ভেতরে সযত্নে লুকিয়ে থাকে অনেকদিন পর্যন্ত। যার শেষ পরিণতি দেখে আপনারাও হয়তো তার নামের মাঝে হারিয়ে যাবেন একসময়।  কিন্তু, আমার কোমল মনে ছায়াছবির মতো খেলা করে দুজন নীল পোশাকের পুলিশ গোলাপজানকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় হাত ধরাধরি করে। আগের মতোই তার পরনে ছিল শাদা থানের লাল পেড়ে মোটা কাপড়।
আমার দিকে তাকানো চোখ দুটো ছিল আশ্চর্য রকমের স্থির; তবে চকচক করছিল জেদে, ক্ষোভে নাকি কোনো মায়ার আগুনে? আমি সেদিন সে আগুনের ভাষা বুঝতে পারিনি। চোখে শুধু ভাসতে থাকে দুজন পুলিশ ও একজন গোলাপজান আমার দৃষ্টিসীমা থেকে হারিয়ে যায় একটু একটু করে। আর পড়ে থাকে শুধু তার বিদায়ের সময়ে কাপড়ের খোঁট দিয়ে মুছে নেয়া কয়েক ফোঁটা চোখের জল আর সেই ভরাট কণ্ঠস্বর, ‘খোকন, এট্টু ফ্যান খাইবাম’?

Saturday, July 6, 2024

বৃষ্টিতে শিলিগুড়ি টু গ্যাংটক by ওয়ালিউল বিশ্বাস

শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটকের পথে
শিলিগুড়ির জিপ চালকরা নানান ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছেন মনে। সেসব যে আমাদের একেবারে কাবু করছে না তা নয়। কিন্তু বেশিক্ষণ সাহস ধরে রাখা যাচ্ছে না। যেমন, বেশিরভাগ ড্রাইভার জানালো– শিলিগুড়ি থেকে সিকিম যেতে জিপ নেওয়ার বিকল্প নেই। এখানে সরকারি বাস চলে, কিন্তু সবার জন্য না! তবে দু’একজন জানালেন– বাস ঠিকই আছে, তবে স্থানীয় বাসে ওঠা আর সমস্যার লড়িতে ওঠা একই বিষয়। বাস যাবে খুব ধীরগতিতে। র‌্যাম্পোতে বাস থামলে পুরো বাসের লোকজন সিকিমে যাওয়ার অনুমতি নেবে। এ কারণে রাজ্যের দেরি হবে।
র‌্যাম্পো হলো সিকিম রাজ্যের দূতাবাসের মতো। সেখান থেকেই সিকিমে যাওয়ার অনুমতি নিতে হয়। পাসপোর্টে আগমন ও বহির্গমনের সময়সহ সিল মারা হয়। বিদেশিদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক।
দেরির কারণে প্রধান যে সমস্যা হবে তা হলো, সিকিমের রাজধানী গ্যাংটকে নামার পর রাত নেমে আসবে। তখন কোনও হোটেল ভাড়া পাওয়া যাবে না। এসব কথা আমরা বিশ্বাস করার ভঙ্গি দেখিয়েছি। তাদের কথাতেই একপ্রকার সায় দিতে হয়েছে। কারণ সেখানকার জিপ চালকরা বেশ একতাবদ্ধ। আর জিপে সময়ও কম লাগে।
আরেকটি ভয়াবহ বিষয় হলো, দেড়শ কিলোমিটারের এই দীর্ঘ পথে বাংলাদেশি, নেপালি ও বিদেশিদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম। এসব দেশের পর্যটকরা কোনোভাবেই জিপে ভারতীয়দের সঙ্গে ভাগাভাগি করে যেতে পারবেন না। এমনকি বাংলাদেশি বা বিদেশিদের স্ব স্ব দেশের নাগরিকদের সঙ্গেই যেতে হবে। আর সর্বনিম্ন দুই জন হতে হবে। তাই আমরা দু’জন হওয়ায় বিপদ যেন বেড়ে গেলো। কারণ আটজনের জিপের ভাড়া দু’জনে দিতে হবে। আর সেটা ২০০০-২৫০০ রুপি!
শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটকের পথে
আমরা বাংলাদেশি বলেও তাদের মধ্যে একটা ভ্রু কুঁচকানো ভাব দেখা গেলো। কারণ র্যা ম্পোতে অনুমতি নেওয়ার বিলম্ব। শিলিগুড়ির এই চালকদের সঙ্গে বনিবনা করাটা বেশ কঠিন হয়ে উঠলো। একবার মনে হলো, দার্জিলিংয়ের দিকে হাঁটা দিই। পরে অন্য একটি ঘটনা মনে পড়ে গেলো।
চ্যাংড়াবান্ধা থেকে শিলিগুড়ি আসার সময়ের ঘটনা। সীমান্ত পেরিয়ে সরাসরি মহাসড়ক। সেখান থেকে বাস অহরহ শিলিগুড়ি যায়। এমন একটা বাসে উঠে বসেছি। হঠাৎ দেখি আকাশ কালো হয়ে গেলো। আমি ও সহযাত্রী আশিক মুস্তাফা একেবারে পেছনের আসনে বসা। পাশেই সৌম্য চেহারার শুভ্র চুলের একজন ভদ্রলোক। জানালায় চোখ মেলে রেখেছেন। নতুন এলাকা, তাই খুচরো আলাপ জমানোর চেষ্টা করলাম। হালকা স্বরে বললাম, দাদা এদিকে কি নিয়মিতই বৃষ্টি হয়? ভদ্রলোক একবার আমাকে দেখে মুখটা হাসি হাসি করে মেঘের দিকে তাকালেন। বললেন, ‘এখন তো দাদা বৃষ্টিরই সময়। পাশে নদী-পাহাড়। বৃষ্টি তো হবেই!’
আবহাওয়া তাহলে ঠাণ্ডাই থাকে?
-তা তো বটেই। মেঘ দেখছেন না? এ মেঘে শিলাবৃষ্টি নামে।
আপনি দাদা কোথায় যাবেন?
-সামনের স্টপেজেই।
এখানেই বাড়ি আপনার?
-না।
-তাহলে কোথায়?
লালমনিরহাট!
শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটকের পথে
মেঘ থেকে বৃষ্টি নয়, যেন আমি পড়লাম! এ ভদ্রলোকও বাংলাদেশি। তাকে বললাম, ভাই আপনি বাংলাদেশি অথচ এখানকার খবর বলছেন! ভদ্রলোক এবারও হাসলেন। তবে এবার মেঘের দিকে নয়, আমার দিকে তাকিয়ে মুখটা আরও প্রসারিত করে বললেন, ‘নতুন জায়গা। আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথা না বললে ঠকাবে। তাই আপনার সঙ্গে এভাবে একটু কথা বলে নিলাম আরকি!’
শিলিগুড়িতেও যখন ভাড়ামতো জিপ পাচ্ছিলাম না, তখন সেই সৌম্য চেহারার আত্মবিশ্বাসী ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ে গেলো। এতে কাজও হলো। বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে সহযাত্রী আশিক ও আমি এক ড্রাইভারকে প্রস্তাব দিলাম, ছয় আসনের জিপে আমি ও আশিক থাকবো। আর যাত্রাপথে দু’একজন যা পাবেন নিয়ে নেবেন। কোনও সমস্যা নাই। তবে শর্ত একটাই। গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী খোঁজা যাবে না! ভাড়া পাবেন ১৩০০ রুপি!
ব্যস, চালকবেচারা খানিক যোগ-বিয়োগ করে হিন্দিতে কিছু একটা বললেন। যার অর্থ হলো, গাড়িতে উঠে পড়ুন দাদা। চলুন যাই। শুরু হলো আমাদের শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটকের ৫ ঘণ্টার যাত্রা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে জিপে চড়ে বসলাম। (চলবে)

>>>ছবি: লেখক

Tuesday, June 18, 2024

পুনরায় হৃদয়ং by রাজর্ষি দাশ ভৌমিক

দ্বিতীয়বার বিবাহ করে সুদেব ভাবলো এইবার সংসারী হবে। প্রথম বউয়ের সবকিছু একদম ভুলে গেছে সে। আসলে যতদিন না ভুলতে পারছে ততদিন দ্বিতীয় বিয়ে করবে না বলেই ঠিক করেছিল। ততদিন যথেচ্ছ মদ খাবে, রোববার বেলা অবধি ঘুমোবে, এক জামাকাপড় পরে দিনের পর দিন অফিস করবে, বন্ধুদের সোম-শুক্র যেদিন খুশি নেমন্তন্ন করে খাওয়াবে আর মধ্যরাতে ইংরেজি টিভি চ্যানেল তারস্বরে চালিয়ে তারিয়ে তারিয়ে দেখবে। এই জীবন সুদেব কয়েকবছর যাপন করার পর পেটে আলসার ধরা পড়লো। মধ্যরাতে প্রবল পেট ব্যথা। জল গড়িয়ে দেওয়ার কেউ নেই। মায়ের ফটোর দিকে তাকাতে গিয়ে চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। বউকে ডিভোর্স দেওয়াটা কি বেজায় ভুল হয়েছে ভাবতে গিয়ে প্রথম বউয়ের নাম আর মনে পড়লো না। সুদেব এইভাবে ভুলে গেল প্রথম বউয়ের কথা। আলসারের অপারেশনের ধাক্কাটা সামলে দার্জিলিং ঘুরতে গিয়ে প্রথম বিয়ে নিয়ে ভাবলো। মনে হল, সে একা ছাদনাতলায় যাচ্ছে, একা হনিমুনে, একা খেলা করে উঠে একঢোক জল খেয়ে একা ঘুমিয়ে পড়ছে। বিয়ে, প্রেম, ঝগড়া, ইস্যু এবং ডিভোর্স আর সর্বোপরি জ্বলজ্যান্ত একটা মেয়ে ঝাপসা হয়ে গেছে।
বিয়েটা কেনো টিকলো না ভাবার চেষ্টা করলে সুদেব আর মেয়েটির কোনো দোষ দেখতে পায় না। মেয়েটিই যেখানে ঝাপসা হয়ে গেছে, সেখানে মেয়েটির আর কী দোষই বা স্পষ্ট থাকবে। সুদেব বরং নিজের দোষ দেখতে পায়। প্রচুর দোষ, অসংখ্য দোষ। গুছিয়ে সংসার করার বয়সে সে সংসারে প্রবেশ করেনি। অল্পবয়সে বিয়েটা করেছিল। কলেজের লাস্ট ইয়ারে। আর গুছিয়ে সংসার করার বয়সে পৌঁছে অগোছালোভাবটা তার সর্বাঙ্গ ঢেকে দিয়েছে। সুদেব তাই এবার সাতটায় উঠে বাজারে যাবে, দরকারি কোনো জিনিস কিনতে ভুল করবে না, সংসারের মানুষদের প্রয়োজন মেটাবে, বছরে একবার পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়াও যেতে পারে। আলসারের অপারেশনের পর এমনিতেই মদ খাওয়া কমে গেছে, সপ্তাহে দু’একদিন, এক-দু পেগ, তাও পুরনো বন্ধুদের চাপে। সুদেবের স্কুলবেলার কথা মনে পড়ে—এনুয়াল পরীক্ষায় মাঝারি ফল করার পর প্রতিবার প্রতিজ্ঞা করতো নতুন ক্লাসে ভালোভাবে পড়াশুনা করবে। মধ্যমেধার ছাত্র সে, মধ্যমেধাকে অজুহাত বানিয়ে ইস্কুলের অসাফল্যগুলোকে সান্ত্বনা দেয়। সংসারে তার অক্ষমতাগুলো স্পষ্ট, সেগুলো ঝেড়ে ফেলাও কঠিন নয়, সুদেব ভাবে দ্বিতীয়বার বিবাহ করে এবার সংসারী হবে।
প্রথমবার বিয়ের থেকে সুদেব ও সেই মেয়েটির কোনো ছেলেপুলে হয়নি। সুদেবের দ্বিতীয় বউয়ের প্রথম পক্ষ থেকে একটি মেয়ে ছিলই। বন্ধুদের আসরে সুদেবের সঙ্গে দ্বিতীয় বউয়ের প্রথম পরিচয় হয়। তখনও সুদেবের প্রথম ডিভোর্সটি হয়নি। দুজনের সম্পর্কটা কেবলমাত্র পরিচিতির স্তরেই ছিল। দ্বিতীয় বউয়ের ততদিনে প্রথম ডিভোর্সটি হয়ে গেছে। দ্বিতীয়বার বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর সুদেব তাই আর বেশি ছোঁকছোঁক করেনি, উদ্দেশ্য যখন সংসারী হওয়া তখন আর প্রেমে মজে বৃথা সময় নষ্ট করা কেনো!
দ্বিতীয় বউটি ভালোই, নিঃসন্দেহে। বিয়াল্লিশ বছরের মদ্যপ, চাকুরিজীবীকে বিবাহ করার মানসিকতা নিয়েই সে সুদেবের বাগুইহাটির ফ্ল্যাটে প্রবেশ করলো। বিয়ে হল অনাড়ম্বরভাবে। এ জীবনে, সুদেব হাঁপ ছেড়ে ভাবলো, দু’দুটি বিবাহের পিছনে লোক খাইয়ে তাকে আর পয়সা নষ্ট করতে হল না। গেজেটেড অফিসার বাপ প্রথম বিয়েটি টাকা পয়সা উড়িয়ে দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিয়েতে, সইসাবুদের পর বন্ধুদের আপবিট বেঙ্গলি ফিউশন রেস্তোরাঁতে বাফে খাইয়ে দেওয়া হল, বিল হল হাজার আঠারো—এবাদে বউ আর মেয়ের ট্যাক্সিভাড়া বাবদ আরো হাজার। দ্বিতীয় বউ যখন সুদেবের ফ্ল্যাটে ঢুকছে তার ডানহাত শক্ত করে চেপে ধরে আছে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী মেয়ে। সুদেব স্যুটকেশ নামিয়ে ফ্ল্যাটের তালাচাবি খুললো। পাশের ফ্ল্যাটের মজুমদাররা এসে বউ দেখে গেলেন। মজুমদার গিন্নি একটা হালকা নথ উপহার দিলেন। রাত্রি দশটার দিকে বন্ধুবান্ধব গানবাজনা করে বিদায় নিলে, মেয়েও ঘুমের অজুহাতে ড্রয়িংরুমের সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। দ্বিতীয় বউ যেন মেয়েকে কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়েও পারলো না। সুদেব দ্বিতীয়বারের জন্য ফুলশয্যায় প্রবেশ করলো। দ্বিতীয় বউয়ের মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। সে প্রথমবার লক্ষ্য করল তার দ্বিতীয় স্বামীর বুকময় সাদা চুল। পরদিন সকালে উঠে বাজার নামিয়েই সুদেব ছুটলো ফার্নিচারের দোকানে মেয়ের জন্য একখানি সস্তার সিঙ্গল খাট কিনতে, নিদেনপক্ষে একটি ক্যাম্পখাট। এইভাবে সুদেব তার দ্বিতীয় সংসার শুরু করলো।
দ্বিতীয় বউ এককালে চাকুরি করতো, মেয়ে জন্মানোর পর ছেড়ে দেয়। ডিভোর্সের পর মায়ের বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করে। চাকরিতে আর ফেরা হয়নি, মৃত বাবার পেনশন, অল্প সঞ্চয় আর খোরপোশে মেয়েকে পড়াচ্ছিলো, নিজেকে সামলাচ্ছিলো। ডিভোর্সের পর দু’একবার পুরুষের প্রেমাসিক্ত হতে হতেও নিজেকে সামলেছে। পরনির্ভরশীল একট ডিভোর্সি মেয়েকে ফুঁসলে নেওয়ার মতো দুর্জনের অভাব কলকাতা শহরে নেই। অতপর সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে, মেয়ের পড়াশোনায় নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছে। ময়লা ঝেড়ে ফের হারমোনিয়ামে রেওয়াজ শুরু করেছে, মাঝেমধ্যে মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁদেছে ও মেয়েকে কোলে নিয়ে অনির্বচনীয় আনন্দে মেতে উঠেছে। মা চাকরির কথা তুললে, ওসব ভুলে গেছি বলে দায় ঠেলেছে। মায়ের শরীর ভাঙতে শুরু করার পর, মা ‘ঈশ্বর যা করেন ভালোর জন্যেই করেন’ এই দিকটা বুঝতে পেরেছেন। সংসারে তাকে দেখার বলতে একমাত্র এই ডিভোর্সি মেয়ে। সুদেবের দ্বিতীয় বউটি কিন্তু বিবাহিত সুদেবের দিকে একবারটির জন্যও হাত বাড়ায়নি, বন্ধুদের গ্রুপের অনেককে নিয়ে রাতজাগা-চিন্তায় রমণ করলেও সুদেব ছাড় পেয়েছিল। নিতান্ত সাধারন, নিতান্ত মদ্যপ, নিতান্ত চাকুরিজীবি সুদেব। আর সেকারণেই ডিভোর্সি সুদেবকে ভারি নির্ঝঞ্ঝাট মনে হল। এতগুলো বছর একা থাকার পর একটি পুরুষের জীবনে ফের জায়গা নেওয়ার মতো যথেষ্ট মনের জোর অবশিষ্ট ছিল না। পুরুষের দাবিগুলো কতটা মেটাতে সে সক্ষম হবে তা নিয়ে সংশয় ছিল এবং তার মেয়ের জীবনেও জ্ঞান হওয়ার পর প্রথম পুরুষের উপস্থিতি, সেই শঙ্কা! সুদেবের দ্বিতীয় বউ মায়ের পরামর্শ নিয়ে, মায়ের জন্য একটি আয়ার ব্যাবস্থা করে, বিয়েতে সম্মতি দিল।
দু’জনের দ্বিতীয় সংসারটিই দু’জনের জন্য অনেকটা বিস্ময়ের ও স্বস্তির হল। সুদেব কয়েকদিন সংসার করেই বুঝলো এইবার তার সংসারী হওয়ার ইচ্ছে রয়েছে কিন্তু অপরপক্ষের সুদেবের কাছে সংসারী হওয়ার জন্য কোনো প্রত্যাশা নেই। আর দ্বিতীয় বউটি দেখল—পুরুষের দাবিদাওয়া নিয়ে তার মনে যতই শঙ্কা থাক, সুদেবের কোনো দাবিই নেই। সুদেব বরং রোজ সকালে একব্যাগ বাজার নামিয়ে রাখছে, ফ্রিজে ডিম-দুধ ফুরিয়ে গেলে নিজেই দেখেশুনে কিনে আনছে। মেয়ের যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সেদিকে সুদেব সদাতত্পর। মেয়ের জন্য একটি খাট, পড়ার টেবিল আর সেকেন্ড হ্যান্ড ল্যাপটপ বিয়ের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই কিনে এনেছে। এবং প্রথম দু’একদিনের পর সুদেব নিজে খাওয়াদাওয়া হলে এসি চালিয়ে হালকা চাদর টেনে ঘুমিয়ে পড়ছে। সুদেবের দ্বিতীয় বউ নিশ্চিন্ত হয়ে মেয়ের সঙ্গে মাধ্যমিকের পড়াশুনা চালাচ্ছে। সংসার করতে গিয়ে সুদেব দেখছে তবু যেন ছোটখাটো ভুল সে করেই ফেলছে, এই যেমন সেদিন কালোজিরের প্যাকেট শেষ, তবু বাজার থেকে আনতে ভুলে গেল, মাংসের জন্য দই আনতে দু’বার দোকানে যেতে হল। এজন্য সংসারে কোনো অশান্তি নেই, দ্বিতীয় বউটি অফিসের জামাকাপড় ইস্ত্রি করে রাখছে, টিফিনবাক্স গুছিয়ে রাখছে।
দ্বিতীয় বিয়ের তিনমাসের মাথায় সুদেবের চাকরিটা চলে গেল। সুদেব ছিল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। মাঝারি মাপের একটি ফার্মে সিনিয়ার ম্যানেজার। তাদের মাঝারি কোম্পানিটিকে একটি বড় আমেরিকান ফার্ম কিনে নিল এবং টপ ম্যানেজমেন্টের সবাইকে একদিনে রেজিগনেশন দিতে অনুরোধ করলো। সুদেব যদি জুনিয়ার ইঞ্জিনিয়ার বা নিদেনপক্ষে করণিক হত হয়ত চাকরিটা যেত না, হাজার পনের মাইনেতে সংসার চালিয়ে দিতে পারতো। নিচুতলার ছাঁটাই হলে কাজ করার লোক পাওয়া যাবে না, উপরতলার বদলি ইন্ডাস্ট্রিতে অঢেল, পিএফ আর ছাঁটাইয়ের ভয়ে সব বাবুরা রেজিগনেশন জমা করে দিল। সুদেব সেদিন অঢেল মদ খেলো, আলসারের পুরনো ব্যথায় কাতরালো, বমি আর খিস্তি করতে করতে বাড়ি ঢুকলো। সুদেবের অবস্থা দেখে মেয়ে ভয় পেয়ে গেল, দ্বিতীয় বউ তাড়াতাড়ি মেয়েকে বইখাতা সমেত—মেয়ের সামনে মাধ্যমিক—বেডরুমে ঢুকিয়ে দিয়ে সুদেবকে মেয়ের খাটে শুইয়ে দিল। পরদিন সকালে এ নিয়ে কোনো কথা হল না, সংসারী সুদেব এক কিলোর ইলিশ নিয়ে এলো। মেয়ের সঙ্গে অনেকটা গল্প করে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলো। বউ জিজ্ঞেস করলো—অফিস যাবে না, শরীর ঠিক আছে? সুদেব বললো, একটু অম্বল। সুদেবের দ্বিতীয় বউ আর কোনো কথা না বলে ইলিশ রাঁধতে গেল।  
মধ্যরাতে সুদেব তার দ্বিতীয় বউকে বললো—তার আর চাকরি নেই। বউ বললো—মেয়েকে বোলো না, সামনে মাধ্যমিক, চিন্তা করবে। মায়ের পেনশন তো আছে। আমারও কিছু গয়না আছে। এতগুলো বছরতো দুটো মানুষের চললোই। পরদিন এগারোটার মধ্যে সংসারের সব কাজ সেরে সুদেব বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। কফিহাউসে দশ কাপ কফি খেয়ে চারঘণ্টা কাটালো, বিকালে ময়দানে গিয়ে ঘাসে তন্দ্রা দিল। মেয়ের যতদিন না মাধ্যমিক হলো সুদেবের এইভাবেই চললো। পাছে মেয়ে জানতে পেরে যায়, সুদেব তাই সারাদুপুর বন্ধুবান্ধবের অফিসে ঢুঁ মারে, নাটকের দলের রিহার্সাল দেখে, ময়দানে ঘাস চিবোয়, কফিহাউসে আর কফি খাওয়া হয় না, বরং সন্ধে নামলে সে টাকায় খালাসিটোলায় গিয়ে সস্তায় বাংলা খায়। একদিন পিএফের টাকা পেতে পুরনো অফিসে গেল, প্রথম বিয়ের পর সে এই অফিসে চাকরিতে ঢুকেছিলো, এখানে শেষ ষোলটা বছর আটঘণ্টা করে সপ্তাহের দিনগুলো কাটিয়েছে। নতুন একাউটেন্ট মেয়েটি বললো লাখ চারেকের মতো পিএফ পাওনা আছে সুদেবের। একগুচ্ছ ফর্মফিলাপ করতে হবে, বছরের শেষ দিকে হয়ত টাকাটা পেতে পারে। সুদেব ফর্মটর্ম পূরণ করে খালাসিটোলায় গেল। এক বাল্যবন্ধুর কাছে হাজার খানেক টাকা ধার নিয়েছে। তাতেই মদ, তাতেই বাসভাড়া। সকালে বাজারের পয়সা দ্বিতীয় বউ তার মায়ের পেনশন থেকে দিচ্ছে। হিসেব চাইছে না, সুদেব তবু বাজার থেকে ফিরে খুচরো টাকা, দশটাকার নোট ড্রেসিংটেবিলের সামনে রেখে দিচ্ছে। দু’একটা চাকরির খোঁজ আছে, কিন্তু সেসব কাজ চব্বিশ ছাব্বিশ বছরের তরুণ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার করতে পারে। পেটে আলসার, ব্লাডপ্রেসার নিয়ে আর সুদেব সাইটে দাঁড়াতে পারবে না। টাকার প্রয়োজন থাকলেও সুদেব তাই অফার ফিরিয়ে দিচ্ছে। একটা অফিসজব পেলে অবশ্যই নেবে, মিষ্টির দোকানে খাতা দেখার কাজ থাকলেও নেবে। কিন্তু সুদেব সংসারী। সকালবেলাটা তার সংসারের কাজে বেরিয়ে যায়, মেয়ের সামনে মাধ্যমিক, মেয়েকে তাই অংক দেখায়, দুপুরটা কাটে বন্ধুদের পয়সায় চা-কফি খেয়ে আর সন্ধেটা নিজের পয়সায় বাংলা খেয়ে। ওয়েলিংটন থেকে দুবার বাস পালটে সুদেব বাড়ি ফেরে, কন্ডাকটাররা মুখচেনা হয়ে গেছে, দু’একদিনের বাসভাড়া বাকি রাখা যায়।
মেয়ের মাধ্যমিকের পর সুদেবের আর বাড়িতে মদ খাওয়ায় কোনো বাধা রইলো না। সে জন্তু না, সে মদ খেয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করে না আর তার দ্বিতীয় পক্ষের বউটাও ভালো। সুদেব তাই রাত্রে খাওয়ার টেবিলে বসে বরফঠাণ্ডা জলে বাংলা মেশায়। বউ আর মেয়ে শোওয়ার ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ে। সুদেব ভালো সংসারী হতে চেয়েছিল। দ্বিতীয়বারের সংসারে সে যে জিনিসটা প্রথম কিনেছিল তা হল মেয়ের জন্য খাট। অল্প টলতে টলতে এসে সেই খাটে এখন বেঘোরে ঘুমায় সুদেব। বউ-মেয়ে তার মদ্যপানে বাধা দেয় না, সুদেবও তাদের কাছে কিছুর দাবি করে না তবু তার বউ কালো জিরে দিয়ে কাটাপোনা রাঁধে। মাসে একবার করে গিয়ে সুদেবের দ্বিতীয় বউ মায়ের পেনশনের টাকা ব্যাঙ্ক থেকে তুলে আনে। সুদেব যে টাকা বন্ধুদের থেকে ধার নিয়েছিল সে টাকা ফুরিয়েছে, মদ খেয়ে আর সংসারের টুকটাক কাজে ফুরিয়েছে। মদ খেতে খেতে সুদেব নিজের ক্রমক্ষীয়মাণ শরীরের দিকে তাকায়। প্রথম বউয়ের কথা মনে করার চেষ্টা করে। মনে করার চেষ্টা করে বিয়েতে কী কী মেনু ছিল আর বউ চলে যাওয়ার পর প্রথম মাসটা সে কেমন বিছানায় ছটফট করত। ভাবতে ভাবতে সুদেব লুঙ্গির মধ্যে দিয়ে হাত ঢুকিয়ে নিজেকে খোঁজে। ভাবে একটা চাকরি পেলে পুজোয় ঘু্রতে যাবে। ভাবতে ভাবতে দ্বিতীয় সংসারের জন্য কেনা সিঙ্গল খাটে ঘুমিয়ে পড়ে।
সকালে উঠে সুদেব আজকাল আর বাজারে যাচ্ছে না। বিগত কয়েকদিন ড্রেসিংটেবিলের উপর বাজারফেরতা খুচরো রাখেনি। ইচ্ছে করেই; মদের সঙ্গে চাট কেনার টাকাটাও বন্ধুদের থেকে হাত পেতে নিতে হাত কাঁপে। সুদেব বাজার ফেরতা দশ-বারো টাকার চানাচুর কিনে সিঙ্গল খাটের ম্যাট্রেসের নিচে রেখে দেয়। সুদেবের দ্বিতীয় স্ত্রীটি কোনো অশান্তি করেনি, নির্দ্বিধায় সুদেবের এলোমেলো বেডকভার গুছিয়ে দেয়। তার চোখে চানাচুরের খালি-ভর্তি প্যাকেট পড়েছে। অথর্ব মায়ের পেনশনের টাকা, সংসারের জন্য ঐ কটি টাকাই। সুদেবকে কিছু বলেনি। সুদেবের দ্বিতীয় স্ত্রী নিজেই চটের থলি নিয়ে বাজার করে আনে, সংসারের এটা ওটা দরকারের জিনিস কিনে আনেন। ঘুমচোখে সুদেব দেখে তার দ্বিতীয় বউ ফ্ল্যাটের দরজা ভেজিয়ে বেরিয়ে গেল।

Wednesday, July 12, 2023

ডায়েট মেন্যুতে অ্যালোভেরা রাখবেন কেন?

কেবল রূপচর্চাতেই নয়, স্বাস্থ্যরক্ষাতেও অ্যালোভেরা অনন্য। এটি ওজন কমাতে সাহায্য করে। ডায়েট লিস্টে অ্যালোভেরা নিয়মিত রাখলে পারেন আরও নানাবিধ সুফল। জেনে নিন ডায়েট মেন্যুতে কেন এবং কীভাবে রাখবেন অ্যালোভেরা।
অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে ভরপুর
অ্যালোভেরাতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে। এটি ডায়েট চার্টে থাকলে যেমন সুস্থ থাকবে শরীর, তেমনি সুস্থ থাকবে ত্বক ও চুল।
হজমশক্তি বাড়ায়
হজমশক্তি বাড়াতে অ্যালোভেরার জুড়ি মেলা ভার। অ্যালোভেরাতে থাকা ল্যাক্সেটিভ উপাদান পেট পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। ফলে খাবার হজম হয় দ্রুত। একই সঙ্গে এটি অন্ত্রের খারাপ ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ কমায় এবং ভালো ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়ায়। এতে স্বাভাবিকভাবেই হজম ক্ষমতা বাড়ে।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে
সমীক্ষা বলছে, টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আত্রান্তরা নিশ্চিন্তে এই রস পান করতে পারেন। এতে ইনসুলিনের ক্ষরণ বাড়ে। নিয়ন্ত্রণে থাকে শর্করার পরিমাণ।
ওজন কমায় দ্রুত
অ্যালোভেরাতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, অ্যান্টি-ইনফ্লমেটারি এবং ডিটক্সিফাইং উপাদান ওজন কমাতে সাহায্য করে। শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ দূর করে এটি। 
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
অ্যালোভেরায় থাকা ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
ডায়েটে অ্যালোভেরা যেভাবে রাখতে পারেন
  • জুস হিসেবে পান করতে পারেন অ্যালোভেরা। এজন্য পাতার কিছুটা অংশ কেটে নিন। তারপর ওপরের সবুজ অংশ সরিয়ে চামচ দিয়ে বের করে নিন জেল। হলদেটে আঠা যেন না থাকে। এবার জেল ভালো করে ধুয়ে নিয়ে ডাবের পানি বা নরমাল পানির মধ্যে দিয়ে, অল্প মধু মিশিয়ে ব্লেন্ড করে নিন। চাইলে পছন্দের ফলের রসও মেশাতে পারেন।
  • সালাদে মিশিয়ে খেতে পারেন এটি। এজন্য পাতা ভালো করে ধুয়ে নিন। আঠা যেন না থাকে। এবার ছোট ছোট টুকরোয় কেটে মিশিয়ে নিন সালাদের সঙ্গে।
  • অ্যালোভেরার জুস বরফের ট্রেতে জমিয়ে রাখতে পারেন। শরবতের সঙ্গে মিশিয়ে পান করতে পারবেন।
>>>তথ্য: এনডিটিভি
জুস হিসেবে পান করতে পারেন অ্যালোভেরা

Monday, March 20, 2023

বাংলার স্থাপত্যে ঐতিহাসিক নিদর্শন শাহী মসজিদ by নাকিবুল আহসান নিশাদ

অতীতের স্থাপত্য বর্তমানের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। বাংলাদেশ এদিক দিয়ে বেশ সমৃদ্ধ। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এর প্রমাণ পাওয়া যায়। উত্তরবঙ্গে সম্ভবত এগুলো বেশি। বারো আউলিয়ার মাজার শরীফ, ভিতরগড় দুর্গনগরী, গোলকধাম মন্দির, কান্তজির মন্দির, নয়াবাদ মসজিদসহ অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে দেশের এই অংশে।
এমনই একটি স্থাপনা মির্জাপুর শাহী মসজিদ। পঞ্চগড়ের আটোয়ারির মির্জাপুরে এটি অবস্থিত। দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকে সমৃদ্ধ করেছে এই মসজিদ। দৃষ্টিনন্দন কারুকাজখচিত মার্বেল পাথরের শৈল্পিক স্থাপনাটির নির্মাণ প্রসঙ্গে রয়েছে ভিন্ন মত।
মির্জাপুর শাহী মসজিদ
ঐতিহাসিকদের অভিমত, মোগল আমলে প্রতিষ্ঠিত হয় মির্জাপুর শাহী মসজিদ। কারও কারও ধারণা, মির্জাপুর গ্রামের মালিক উদ্দিন এই মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। কেউ কেউ মনে করেন, দোস্ত মোহাম্মদ নামের এক ব্যক্তি মসজিদটির নির্মাণকাজ শেষ করেন। তবে মসজিদের শিলালিপি ঘেঁটে প্রত্নতত্ত্ববিদরা ধারণা করেন, ১৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে মোগল শাসক শাহ সুজার শাসনামলে এটি গড়ে তোলা হয়।
তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মির্জাপুর শাহী মসজিদের দৈর্ঘ্য ৪০ ফুট, প্রস্থ ২৫ ফুট। দেয়ালে টেরাকোট ফুল ও লতাপাতার বিভিন্ন খোদাই করা নকশা আছে, যা মূলত লাল ও সাদা রঙের কালি দিয়ে করা হয়েছে।
মসজিদটির মূল আকর্ষণ গম্বুজের চার কোণের চারটি মিনার। সামনের দেয়ালের দরজার দু’পাশে গম্বুজের সঙ্গে মিল রেখে দুটি মিনার দৃশ্যমান। মসজিদের দেয়ালে কারুকার্য ও বিভিন্ন আকৃতির নকশা। দেয়ালের চারপাশ ইসলামি টেরাকোটা ফুল ও লতাপাতার নকশায় অলঙ্কৃত। সামনের অংশের টেরাকোটাগুলো ভিন্ন ভিন্ন। ভেতরের দেয়ালে বিভিন্ন রঙের খোদাই করা কারুকার্য ও বিভিন্ন ফুল, লতাপাতাসহ পবিত্র কোরআনের ক্যালিওগ্রাফি তুলির ছোঁয়ায় সজ্জিত। এগুলো দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

সম্পূর্ণ মসজিদ তিন ফুট উঁচু দেয়ালে ঘেরা। এতে প্রবেশের তিনটি বড় দরজা আছে। প্রধান দরজার ঠিক সামনেই একটি তোরণ। সেটি অতিক্রম করে মসজিদে প্রবেশ করতে হয়। প্রধান দরজার ঠিক ওপরেই ফরাসি ভাষায় লিখিত কালো বর্ণের একটি ফলক ও ফলকের লিপি। ভাষা থেকে অনুমান করা যায়, মসজিদটি মোগল সম্রাট শাহ আলমের শাসনমালে নির্মিত। এছাড়া ১৬৭৯ সালে ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে নির্মিত মসজিদের সঙ্গে এর অনেকাংশে মিল পাওয়া যায়। সেটিও মোগল আমলে নির্মিত।
শাহী মসজিদের সামনের অংশে নামাজ পড়ার জন্য কিছু জায়গা রাখা হয়েছে। প্রায় ৩৬৩ বছরের পুরনো এই মসজিদে এখনও নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া হয়। মসজিদের ঠিক পাশেই একটি মাদ্রাসা ও মক্তব। যেখান থেকে ভেসে আসে পবিত্র কোরআনের মিষ্টি সুর।

যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে দিনরাত বাসে সরাসরি আটোয়ারি যাওয়া যায়। সেখান থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে মির্জাপুর। ব্যাটারিচালিত অটোতে চড়ে মির্জাপুর বাজারে পৌঁছে ভ্যানে উঠতে হবে। এক কিলোমিটার পরে পূর্ব দিকে মির্জাপুর শাহী মসজিদ।
ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে দিনাজপুর পর্যন্ত যাওয়া যায়। সেখান থেকে আটোয়ারি রেলস্টেশন হয়ে বাস বা ব্যাটারিচালিত অটোতে চড়ে মির্জাপুর যেতে হবে। তারপর ভ্যানে উঠে মির্জাপুর শাহী মসজিদ।
কোথায় থাকবেন
পঞ্চগড় শহরে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। এগুলোতে এসি/নন-এসি সিঙ্গেল বা ডাবল কক্ষ পাওয়া যায়। ভাড়া ১২০ টাকা থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে।

Wednesday, January 18, 2023

বাড়িতে থাকুক একটি তুলসি গাছ

তুলসি গাছের উপকারিতার কথা বলে আর শেষ করা যাবে না। আগেকার দিনে প্রতিটি বাড়িতে বাড়িতেই একটি করে তুলসি গাছ ছিল। ফ্ল্যাট বাড়ির চলে বাড়িতে গাছের সংখ্যা এখন শূন্যের কোটায়। তবুও নিজের প্রয়োজনে গাছ লাগানোর চর্চা শুরু হয়েছে। সেই চর্চায় থাকুক একটু তুলসি গাছ। জেনে নিন গাছের যত্ন আর গাছের উপকারিতার কথা।
তুলসি গাছের যত্ন
১) তুলসি গাছে প্রতিদিন পানি দিতে হয়।
২) গাছের গোড়ায় রান্না ঘরের সবজির খোসা, চাপাতা, ডিমের খোসা দিন সপ্তাহে একদিন।
৩) ঘরে রোদ না এলে একদিন অন্তত গাছটিকে রোদে রাখুন।
তুলসি গাছের উপকারিতা
১) বমি কিংবা মাথা ঘোরা বন্ধে তুলসি পাতার রসের মধ্যে গোলমরিচ মিশিয়ে খেলে বিশেষ উপকার পাওয়া যায়।
২) সকালবেলা খালি পেটে তুলসি পাতা চিবিয়ে রস পান করলে খাবার রুচি বাড়ে।
৩) ঘা যদি দ্রুত কমাতে চান তাহলে তুলসি পাতা এবং ফিটকিরি একসঙ্গে পিষে ঘায়ের স্থানে লাগান, দ্রুত কমে যাবে।
৪) শরীরের কোন অংশ যদি পুড়ে যায় তাহলে তুলসির রস এবং নারকেলের তেল ফেটিয়ে লাগান, এতে জ্বালাপোড়া কমে যাবে।
৫) পেট খারাপ হলে তুলসীর ১০ টা পাতা সামান্য জিরার সঙ্গে পিষে ৩-৪ বার খেলেই পেট ঠিক হয়ে যাবে।

Wednesday, August 10, 2022

টুথব্রাশে জীবাণু আক্রমণ করছে না তো?

আমরা অনেকেই ব্যবহারের পর টুথব্রাশ বাথরুমে রেখে দিই। এটি একেবারেই অনুচিত। বাথরুমে থাকা জীবাণু ভেজা টুথব্রাশে খুব সহজেই আক্রমণ করতে পারে। সুস্থ থাকতে চাইলে তাই টুথব্রাশ সংরক্ষণ করতে হবে স্বাস্থ্যকর উপায়ে।
  • টুথব্রাশ ব্যবহারের পর এমন স্থানে রাখবেন যেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করে। কারণ ভেজা টুথব্রাশ দ্রুত না শুকালে খুব সহজে জীবাণু বাসা বাধতে পারে। ব্যবহারের পর বেডরুমে কোনও স্ট্যান্ডে রেখে দিতে পারেন টুথব্রাশ।
  • টুথব্রাশ কভার ব্যবহার না করাই ভালো।
  • ব্যবহারের পর ভালো করে ধুয়ে তারপর রাখুন টুথব্রাশ।
  • তিন থেকে চার মাস পর পর বদলে ফেলুন টুথব্রাশ।
তথ্য: টাইমস অব ইন্ডিয়া

Friday, July 22, 2022

রক্তশূন্যতা দূর হয় পালং শাক খেলে

প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি ছাড়াও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে পালং শাকে। এক কাপ তাজা পালং শাক থেকে ৩০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ২৪ গ্রাম ম্যাগনেশিয়াম ও ১৬৭ মিলিগ্রাম পটাসিয়াম ছাড়াও প্রোটিন এবং আয়রন পাওয়া যায় প্রচুর পরিমাণে।
  • *পালং শাকে প্রচুর ভিটামিন সি এবং বিটা ক্যারোটিন থাকে যা কোলনের কোষগুলোকে রক্ষা করে।
  • *পালং শাকে থাকা আয়রন রক্তশূন্যতা দূর করে।
  • *বাতের ব্যথা, অস্টিওপোরোসিস,  মাথাব্যথা দূর করতে প্রদাহনাশক হিসেবে কাজ করে পালং শাক।
  • *স্মৃতিশক্তি এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে খুবই কার্যকর এই শাক।
  • *পেট পরিষ্কার রাখে এই শাক। তাছাড়া রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে, দৃষ্টিশক্তিও বাড়ায়।
  • *কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
  • *পালং শাকে ১৩ প্রকার ফাভোনয়েডস আছে যা ক্যানসার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি প্রোস্টেট ক্যানসার প্রতিরোধে খুবই কার্যকর।
  • *পালং শাক দাঁত ও হাড়ের ক্ষয়রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
>>>তথ্য: নিউজ এইটিন

Tuesday, July 12, 2022

অনেক গুণের থানকুনি পাতা by মেহনাজ বিনতে ওয়াহিদ

গরম ভাতের সঙ্গে থানকুনি পাতার ঝাল ঝাল ভর্তা থেকে খুবই মুখরোচক। শরবত বা সালাদেও ভিন্ন স্বাদ নিয়ে আসে এটি। কেবল খেতেই সুস্বাদু নয়, পুষ্টিগুণের দিক থেকেও অনন্য এই পাতা। দৈনন্দিন জীবনের একাধিক সমস্যার হাত থেকে মুক্তি পেতে নিয়মিত খেতে পারেন থানকুনি পাতা। জেনে নিন এর উপকারিতাগুলো।
  • ভিটামিনের অভাবে ঘা জাতীয় সমস্যা হয় আমাদের শরীরে। এ থেকে মুক্তি পেতে পান করুন থানকুনি পাতার রস।
  • কাশি ও ঠাণ্ডা লাগার সমস্যা দূর করতে থানকুনি পাতার রসের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খান।
  • হজমের সমস্যা বা পেটের সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে এই পাতা।
  • থানকুনি পাতার সঙ্গে কাঁচাকলা ও পেঁপে দিয়ে পাতলা ঝোল করে খেতে পারেন। এটি পেট পরিষ্কার করে ও লিভার বা যকৃতের সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়।
  • থানকুনি পাতায় উপস্থিত অ্যামাইনো অ্যাসিড, বিটা ক্যারোটিন, ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ফাইটোকেমিকাল ত্বকের পুষ্টির ঘাটতি দূর করে।
  • খাবার এবং আরও নানাভাবে একাধিক ক্ষতিকর টক্সিন আমাদের শরীরে ও রক্তে প্রবেশ করে। প্রতিদিন সকালে অল্প পরিমাণ থানকুনি পাতার রসের সঙ্গে ১ চামচ মধু মিশিয়ে খেলে রক্তে উপস্থিত ক্ষতিকর উপাদানগুলি বেরিয়ে যায়।
>>>তথ্য: নিউজ এইটিন 
থানকুনি পাতা

Friday, April 15, 2022

গল্প- বাড়ি বানানোর পরিকল্পনা by লিডিয়া ডেভিস

অনুবাদ : মেহেদী হাসান। পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে বয়ে চলা রাস্তাটা থেকে আমাকে জমিটা দেখানো হল। আর সাথে সাথেই আমি জমিটা কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। জমির দালাল তখন যদি আমাকে জমিটির খারাপ দিক সম্পর্কে অবগত করত, তাহলে সেই মুহূর্তে আমি তার কথায় কর্ণপাত করতাম না। আশেপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আমি মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম : লম্বা উপত্যকা জুড়ে গ্রীষ্মের বৃষ্টিতে খানিকটা তলিয়ে যাওয়া লাল টকটকে আঙ্গুরের ক্ষেত; বেশ দূরে বুনো হলুদ রঙের লতাপাতা এবং কাঁটাগাছের ঝোপঝাড়ে ভরা ক্ষেত এবং এগুলোর পেছনে জঙ্গলে আচ্ছাদিত পাহাড়ের ঢালু; উপত্যকার মাঝখানে সামান্য উঁচু জায়গায় একটা খামার বাড়ির ধ্বংসস্তূপ : এটার বাগানের প্রাচীরের ভাঙা পাথরের ভেতর থেকে একটি তুন্ত গাছ গজিয়েছে এবং পাশেই মাটির উপর বিছিয়ে থাকা বাদামী রঙের পঁচে যাওয়া নাশপাতিগুলোর উপর প্রাচীন নাশপাতি গাছটির ছায়া পড়েছে।

গাড়ির উপর ঝুঁকে পড়ে দালালটি বলল, ‘এখনও একটা কক্ষ অটুট আছে। কক্ষটি ময়লা আবর্জনায় ভরা। অনেক বছর ধরে এখানে নানা ধরনের জীব-জন্তুর বাস’। আমরা পায়ে হেঁটে বাড়িটাতে ঢুকলাম। মেঝের টাইলসের উপর জীব-জন্তুর নাদা জমে ঘন হয়ে আছে। পাথরগুলোর মাঝখান দিয়ে বাতাস এসে গায়ে লাগল এবং সুউচ্চ ছাদের ভেতর দিয়ে সূর্যালোক দেখতে পেলাম। তবে এগুলোর কোন কিছুই আমাকে দমাতে পারল না। আমি সেই দিনই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করিয়ে নিলাম।

এক টুকরো জমি খুঁজে পাওয়া এবং সেই জমির উপর বাড়ি বানানোর জন্য আমি এত বছর ধরে অপেক্ষা করে আছি যে, মাঝে মাঝে মনে হয় এই পৃথিবীতে আমার আগমনের আর কোন উদ্দেশ্য নেই। এই আকাঙ্ক্ষা আমার ভেতরে জন্ম নেয়ার পর থেকে আমার সকল শক্তি-সামর্থ্য এটা পূরণে নিয়োজিত : স্কুলের পাঠ চুকানোর সাথে সাথেই পাওয়া চাকরীটি খুবই ক্লান্তিকর এবং জঘন্য, তবে চাকরীটিতে আমার কাজের বোঝা বাড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বেতন বাড়তে থাকে। খুব কম টাকায় দিনাতিপাত করতে আমি খুবই সাদামাটা জীবন-যাপন করি এবং নিত্য নতুন বন্ধু-বান্ধব জোটানো এবং নিজেকে উপভোগ করার হাতছানি থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখি। চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে নিজেকে জমি খোঁজার কাজে নিয়োজিত করার মত টাকা-পয়সা সঞ্চয় করতে আমার অনেক বছর সময় লেগে যায়। রিয়েল এস্টেটের দালাল আমাকে এক জমি থেকে আরেক জমিতে নিয়ে যেতে থাকে। জমি দেখতে দেখতে আমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি এবং আসলে কী যে খুঁজছি তার দিশা হারিয়ে ফেলি। অবশেষে এই উপত্যকা আমার নজরে আসার সাথে সাথেই আমি বুঝতে পারলাম যে, আমার মাথা থেকে একটা বিশাল বোঝা নেমে গেল।

গ্রীষ্মের উষ্ণতা যখন বাড়িটির উপর ঝুলে থাকে, কালি-ঝুলি মাখা আমার এই রাজকীয় কক্ষের ভেতরে আমি বেশ মজেই থাকি। ঝাড়পোছ করে নানা ধরনের আসবাবপত্র দিয়ে কক্ষটি সাজাই এবং কোনার দিকে একটা ছবি আঁকার বোর্ড স্থাপন করি, যেখানে আমি বাড়িটাকে নতুন করে বানানোর পরিকল্পনার কাজ শুরু করি। কাজ থেকে চোখ তুলে জলপাই’র পাতায় সূর্যের আলো দেখে বাইরে যাওয়ার জন্য মন আনচান করে ওঠে। বাড়ির পাশে ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়ানোর সময় আমি সারা জীবন শহরে কাটানো ক্লান্ত ও উৎসুক চোখে লতাগুল্মের ভেতর দিয়ে উড়ে বেড়ানো ম্যাগপাই এবং দেয়ালের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া টিকটিকির দিকে তাকিয়ে থাকি। ঝড়ো বাতাসে আমার জানালার পাশের সাইপ্রেস গাছগুলো নুয়ে পড়ে।

এরপর আসে শরতের কনকনে শীত এবং শিকারীরা আমার বাড়ির আশপাশ দিয়ে ঘুরঘুর করতে শুরু করে। তাদের রাইফেলের গুলির শব্দে আমি আতঙ্কিত হয়ে উঠতে থাকি। পার্শ্ববর্তী ক্ষেতে সুয়ারেজ-ট্রিটমেন্ট চত্বরের একটা পাইপ ফেটে যায় এবং ভয়ানক দুর্গন্ধে চারপাশের বাতাস ভরে ওঠে। ফায়ারপ্লেসে আগুন ধরানোর পরও আমার রুম কখনই গরম হত না।

একদিন আমার জানালার কাছে এক তরুণ শিকারীর শরীরের ছায়া দেখতে পাই। লেদারের জ্যাকেট পরা লোকটির কাঁধে রাইফেল। আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে আমার দরজার নিকটে এসে কড়া না নেড়েই ধাক্কা দিয়ে দরজাটি খুলে ফেলে। দরজার ছায়ায় দাঁড়িয়ে সে আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার চোখজোড়া ছিল কোমল নীল এবং পাতলা লালচে দাড়িতে তার ত্বক কোনমতে ঢাকা পড়েছিল। তৎক্ষণাৎ তাকে আমার আধা-পাগল মনে হয় এবং আমি আতঙ্কিত হয়ে উঠি। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে : তারপর রুমের ভেতরে কী আছে সেসব বেশ কিছুক্ষণ ধরে দেখার পর দরজা বন্ধ করে চলে যায়।

আমার ভেতরটা রাগে গজ গজ করতে থাকে। এমনভাবে লোকটি আমার ছোট্ট পাথুরে কলমটি নাড়াচাড়া করে এবং এমন রূঢ়ভাবে আমাকে নিরীক্ষণ করে, মনে হয় যেন সে চিড়িয়াখানা দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। আমি ভয়ানক ক্রুদ্ধ হয়ে রুমের ভেতরে পায়চারী করতে থাকি। তবে এই অজপাড়া গায়ে আমার এই নিঃসঙ্গ জীবনে সে কৌতুহল জাগিয়ে তোলে। এবং বেশ কিছুদিন পর তাকে দেখার জন্য আমি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠি।

সে আবার আসে এবং এবার সে আর দরজার সামনে ইতস্তত করে না, সোজা হেঁটে ঘরের ভেতরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসে আমার সাথে কথা বলতে শুরু করে। তবে তার মুখের ভাষা আমি বুঝতে পারি না। সে একটা শব্দ দুই-তিন বার করে বলে এবং তা সত্ত্বেও সে কী বলতে চাচ্ছে, তা কেবল ধারণা করতে পারি। এবং যখন আমি তার কথার উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি, আমার শহুরে ভাষা বুঝতে তার একই ধরনের সমস্যা হয়। তার সাথে কথাবলা বন্ধ করে আমি তাকে এক গ্লাস মদ এনে দেই। তবে সে তা ফিরিয়ে দেয়। সে অদ্ভুতভাবে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় এবং খুব কাছ থেকে আমার জিনিসপত্র নিরীক্ষণ করার চেষ্টা করে। দেয়ালের পাশে আমার বইয়ের তাক থেকে সে দেখা শুরু করে। বইয়ের তাকটি ঢাকা ছিল এমন একটা কাপড় দিয়ে, যার উপর ছিল আমার বিশেষ পছন্দের বিভিন্ন স্থাপত্যের বাড়ির প্রিন্ট— বাড়িগুলোর কিছু ছিল প্যারিসের প্লাস দি ভোস (Place des Vosges)-এর রাজকীয় বাড়িগুলোর মতো এবং কিছু ছিল মোনপাহনাস (Montparnasse)-এর পেছনে দরিদ্র লোকদের কোয়ার্টারগুলোর মতো। অবশেষে সে আমার ছবি আঁকার বোর্ডের নিকট আসে, যেখানে সে কিছুক্ষণের জন্য থেমেবোর্ডের দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করে ব্যাপারটা কী তা জানার জন্য অপেক্ষা করে। আমি একটা বাড়ির বানানোর পরিকল্পনা করছি এই সত্যটি বুঝতে তার বেশ সময় লাগে এবং বুঝতে পারার পর সে প্রতিটি কক্ষের দেয়ালের কয়েক ইঞ্চি ওপর দিয়ে আঙুল ঘোরাতে থাকে। পরীক্ষা করে দেখা এবং আঙুল ঘোরানো শেষে সে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। এরপর সে একপাশে এমন ব্যঙ্গাত্মকভাবে তাকায়, যার অর্থ আমি ধরতে পারি না এবং এরপর সে চলে যায়।

আমি আবার ক্ষিপ্ত হয়ে উঠি এই ভেবে যে, সে আমার রুমে অনধিকার প্রবেশ করে আমার গোপনীয়তা জেনে গেল। তা সত্ত্বেও আমার রাগ পড়ে যাওয়ার পর চাই যে, সে ফিরে আসুক। এই ঝড়ো বাতাসের মধ্যেও সে পরের দিন এল। এবং কয়েকদিন পর আবারও এল। আমি তার প্রতীক্ষায় বসে থাকতে শুরু করি। সে প্রতিদিন অনেক ভোরে শিকারে বের হত এবং সপ্তাহে বেশ কয়েকবার শিকারের পর মাঠ থেকে হেঁটে আমার এখানে চলে আসত, মাঠের সাদা মাটির ওপর রোদ পড়ে চকচক করত। তার মুখ আনন্দে ঝলমল করত এবং সে প্রাণ শক্তিতে এতটাই ভরপুর থাকত যে, তা ভেতরে আটকে রাখতে পারত না : কয়েক মিনিট পরপর চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে দ্রুত হেঁটে দরজার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাত, বেসুরো ভাবে শিষ বাজাতে বাজাতে রুমের মাঝখানে ফিরে এসে চেয়ারে বসে পড়ত। ধীরে ধীরে তার শক্তি ফুরিয়ে আসত এবং এক পর্যায়ে সব শক্তি শেষ হয়ে গেলে সে চলে যেত। সে কখনই কোন কিছু খেত না এবং খেতে বললে সে অবাক হয়ে যেত—যেন খাবার বা পানীয় ভাগ করে খাওয়া অন্তরঙ্গতার প্রকাশ।

আমাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করা তেমন সহজ ছিল না, তবে একত্রে করার মতো অনেক কাজ আমরা জুটিয়ে নিয়েছিলাম। দেয়ালের ফাটল বন্ধ করা এবং ফায়ারপ্লেসের জন্য কাঠ জড়ো করে দিয়ে সে শীতকালের জন্য প্রস্তুতি নিতে আমাকে সাহায্য করে। কাজ করার পর আমরা ক্ষেতে ও জঙ্গলে বেড়াতে যেতাম। আমার বন্ধুটি আমাকে তার পছন্দের জায়গাগুলো দেখায়—কাঁটাগাছের কুঞ্জ, খরগোশের আস্তানা এবং পাহাড় গায়ে একটা গুহা। তাকে দেখানোর মত একটা জিনিসই আমার ছিল এবং আমার মতই তার কাছেও এটাকে রহস্যাবৃত এবং চিত্তাকর্ষক মনে হয়েছে।

সে আমার সাথে দেখা করতে এলেই আমরা প্রথমে নীলনকশাটির কাছে যেতাম, যেখানে আমি আরেকটি কক্ষ যুক্ত করেছি অথবা আমার পড়ার কক্ষের পরিধি বাড়িয়েছি। তাকে দেখানোর জন্য সেখানে সবসময় কোন না কোন পরিবর্তন থাকত, কারণ পরিকল্পনার উন্নতিকল্পে আমি কখনও থেমে থাকি নি এবং সার্বক্ষণিক কাজ করে গিয়েছি। মাঝে মাঝে সে আমার পেন্সিল তুলে নিত এবং এলোপাতাড়ি এমন কিছু আঁকত যা আমার মনে কখনও আসে নি—একটি ধূমপান কক্ষ অথবা আলু রাখার ভূগর্ভস্থ ভান্ডার।

তবে পরিকল্পনাটি নিয়ে ব্যস্ত থাকা এবং বন্ধুর সাথে সময় কাটানো একটা ভয়ঙ্কর সত্য থেকে আমার চোখ ফিরিয়ে রাখে : আমি যতই আমার এই বাড়িটাতে বাস করতে থাকি এবং সময় যতই গড়িয়ে যেতে থাকে আমার বাড়ি বানানোর সম্ভবনা ততই ফিকে হয়ে উঠে। টাকা-পয়সা হাত গলে বেরিয়ে যেতে থাকে এবং আমার স্বপ্নও এটার সাথে সাথে উবে যেতে শুরু করে। আশেপাশে কোন বাজার না থাকা এই গ্রামটিতে খাবারের দাম ছিল শহরের চেয়ে দ্বিগুন। ভাল রাজমিস্ত্রি এবং ছুতার, এমনকি গরীবরাও ছিল দুষ্প্রাপ্য এবং তাদের মজুরী এখানে অনেক বেশী : কয়েক মাসের জন্য তাদের কাজে লাগালে আমার কাছে চলার মত আর তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। এসব জানার পরও আমি হাল ছাড়ি নি, তবে আমাকে জর্জরিত করে রাখা এইসব প্রশ্নের কোন উত্তর আমার জানা ছিল না।

শুরুতে বাড়ির নীলনকশা আমার সকল সময় এবং মনোযোগ কেড়ে নিত কারণ এই নীলনকশা থেকেই আমি আমার বাড়ি তৈরী করতে চেয়েছি। ধীরে ধীরে এই নীলনকশাটি আমার কাছে সত্যিকারের বাড়ির চেয়েও বেশী জীবন্ত হয়ে ওঠে : পেনসিলে আঁকা রেখাগুলোর মাঝে আমি কল্পনায় আরো বেশী সময় কাটাতে থাকি, যে রেখাগুলো আমি আমার খুশী মত পরিবর্তন করতাম। তবে আমি যদি খোলাখুলি স্বীকার করতাম যে, বাড়িটি তৈরীর আর কোন সম্ভাবনা নেই তাহলে নীলনকশাটা তার আবেদন হারাত। সুতরাং বাড়ি তৈরীতে আমি বিশ্বাস হারাই নি যদিও আমার এই বিশ্বাসের তলা থেকে বাড়ি তৈরির সম্ভাবনা ক্রমান্বয়ে ধ্বসে যেতে থাকে।

গ্রামটির আশেপাশে কয়েক মাস অন্তর অন্তর নতুন বাড়ি গজিয়ে ওঠা আমার পরিস্থিতিকে আরো বেশী নাজুক করে তোলে। জমিটা কেনার সময় এই উপত্যকায় একমাত্র যে স্থাপনাগুলো ছিল, তা হল মাঠের মধ্যে চষা জমির উপর উবু হয়ে বসে থাকা পাথরের কুঁড়েঘর যেগুলোর ভেতরটা গুহার মতই অন্ধকার। দলিলে সাক্ষর করার পর আমি এখানে দাঁড়িয়ে একরের পর একর পরিত্যক্ত আঙুর এবং ফসলের ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। এরপর চোখ চলে গিয়েছিল দিগন্তে যেখানে গ্রামটি একটি ছোট্ট পাহাড়ের উপর জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। দুর্গের মত দেখতে গ্রামটির গীর্জার বুরুজগুলো উপরে গুচ্ছবদ্ধ। আর এখন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত এই এলাকাটির এখানে সেখানে লাল মাটির উপরে ক্ষত চোখে পড়ে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই ক্ষতের উপর থেকে খোস-পাঁচড়ার মত জেগে উঠে নতুন বাড়ি। এইসব পরিবর্তন মানিয়ে নেয়ার মত সময় এই অঞ্চলটির ছিল না : এক বাড়ির কাজ শেষ হতে না হতেই আরেকটা বাড়ির তৈরীর জন্য ওক গাছ কাটা শুরু হয়ে যেত।

আমি ভয় এবং সন্দেহের সাথে একটা বাড়ি কাজ এগিয়ে যেতে দেখি, কারণ আমার বাড়ি থেকে এটার দূরত্ব ছিল মাত্র কয়েক মিনিটের হাঁটাপথ। যে পরিকল্পিত গতিতে এটার কাজ এগোতে থাকে তা আমাকে নাড়িয়ে দেয় এবং মনে হয় যেন এটা আমার পরিস্থিতিকে বিদ্রুপ করছে। পান্ডুর বর্ণের দেয়াল এবং জানালায় সস্তা লোহার গ্রিলের বাড়িটা দেখতে কুৎসিত।

বাড়িটার কাজ শেষ হওয়ার এবং বাড়িটির পাশে শেষ চারা গাছটি রোপন হওয়ার সাথে সাথে বাড়ির মালিক পরিবার নিয়ে শহর থেকে গাড়ি চালিয়ে এসে পুরো সেইন্টডে এখানে কাটিয়ে যায়। এরা বারান্দা থেকে উপত্যকার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন তারা বক্সসিটে বসে অপেরা উপভোগ করছে। আবহাওয়া ভাল থাকলে প্রত্যেক সাপ্তাহিক ছুটিতে তারা বাড়িটাতে আসে এবং এই প্রত্যন্ত অঞ্চলটাকে তাদের রেডিও’র শব্দে ভরিয়ে ফেলে। আমি গোমড়া মুখে জানালা দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে তাদের কাজকর্ম দেখি।

সবচেয়ে খারাপ ঘটনাটা হল, সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে আমার বন্ধুটি আমার সাথে দেখা করতে আসা বন্ধ করে দিল। আমি জানতাম যে আমার প্রতিবেশীরা তাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। একদিন দূর থেকে উঠানের মধ্যে তাদের মাঝখানে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। আমার নিজেকে খুব অসহায় লাগে। অবশেষে আমাকে মনে মনে স্বীকার করতে হল যে, আমার পরিস্থিতি কতটা নাজুক। মনে হল জমিটা বিক্রি করে দিয়ে অন্য কোথাও চলে যাই।

আশা করলাম যে, শহুরে লোকদের কাছ থেকে জমিটির ভাল দাম পাব। তবে যখন আমি রিয়েল এস্টেটের দালালের শরণাপন্ন হলাম, সে আমাকে খোলাখুলি বলল, যেহেতু পাশের জমিতে একটা সুয়ারেজ ইয়ার্ড আছে এবং আমার বাড়ি বসবাসের অযোগ্য তাই, এই জমি বিক্রি করা প্রায় অসম্ভব। সে আরো বলল যে, আমার প্রতিবেশীরাই কেবল এই জমি কেনার ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারে। যারা সত্যিকার অর্থে এখানে আমার উপস্থিতিতে বিরক্ত এবং আমাকে এখান থেকে বিদায় করার জন্য নামমাত্র একটা মূল্য দিতে রাজী। তারা এই দালালকে জানিয়েছে যে তাদের বাহির উঠানের সামনে আমার বাড়িটি একটা চক্ষুশূল এবং তাদের বন্ধু-বান্ধব বেড়াতে এলে এটা তাদের জন্য বিব্রতকর হয়ে দাঁড়ায়। এটা শুনে আমি খুবই মর্মাহত হলাম। আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলাম যে, এই জমি কখনই আমার প্রতিবেশীদের নিকট বিক্রি করব না। কখনই আমার উপর দিয়ে তাদেরকে টেক্কা দিতে দিব না। আমি কোন কথা না বাড়িয়ে দালালটির কাছ থেকে চলে আসি। যখন আমি বিষন্ন মনে দরজার বাইরে পা রাখি তখন তার অন্য রুমে হেঁটে যাওয়ার এবং তার বউয়ের সাথে কথা বলার এবং উচ্চস্বরে হাসার শব্দ শুনতে পাই।

এটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়।

কয়েক সপ্তাহ পর আমার বন্ধুটি যখন কোন কিছু না জানিয়ে আমার এখানে আসা একবারে বন্ধ করে দেয় তখন আমার তিক্ততা কানায় কানায় ভরে উঠে। আমি হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হই এবং সিদ্ধান্তে আসি যে, বাড়ি বানানোর পরিকল্পনা বাদ দিয়ে শহরে গিয়ে আমার পুরাতন চাকরীতে ফিরে যাব। আমার প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তিরা আমার জায়গায় নেয়ার মত এমন কাউকে খুঁজে পায় নি যে, এই দীর্ঘ কর্ম ঘন্টা হাসি মুখে সহ্য করবে এবং নিজেকে এই অন্তহীন জটিলতার মধ্যে নিক্ষেপ করবে। তারা বেশ কয়েকবার চিঠি লেখে আমাকে ফিরে আসতে বলেছে এবং বেশী বেতনের প্রস্তাব দিয়েছে। আমার মনে হল আমি খুব সহজেই আমার পুরাতন জীবনে ফিরে যেতে পারি। তাহলে এই গ্রামাঞ্চলে আমার এই থাকাটাকে একটা দীর্ঘ ছুটি কাটানো বলে চালিয়ে দেয়া যায়। এমনকি কিছুক্ষণের জন্য আমার মধ্যে এই উপলব্ধি আসে যে আমি শহুরে জীবন এবং অফিসে আমার পরিচিতদের অভাব অনুভব করছি, যারা আমাকে বিশেষ করে কর্মক্লান্ত দিন শেষে পানীয় কিনে খাওয়াত। জমির দালালটিকে আমার প্রতিবেশীদের কাছে জমি বিক্রির প্রস্তাব দিতে বলি এবং নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করি যে আমি সঠিক কাজটিই করছি। তবে এই কাজে আমার হৃদয় টানে নি। জিনিসপত্র বাঁধার সময় এবং বাড়ির ক্ষুদ্র চৌহদ্দির মধ্যে শেষবারের মত হেঁটে বেড়ানোর সময় নিজেকে একজন বদলে যাওয়া মানুষ মনে হতে থাকে।

প্রথম সূর্যালোকে আমার সুটকেস দরজার বাইরে আসে এবং আমার ভাড়া করা ট্যাক্সিটি ধুলো-ধূসরিত রাস্তা দিয়ে হেলেদুলে আমার কাছে চলে আসে। এবং আমি সত্যি সত্যি চলে যাচ্ছিলাম। মনে হল আমি বোধ হয় একটু তাড়াহুড়া করে ফেলছি। তরুণ বন্ধুটির কাছ থেকে বিদায় না নিয়ে যাওয়াটা বোধ হয় ঠিক হবে না, যে বন্ধুটির নামও আমি জানি না। ট্যাক্সি চালককে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে পরের দিন ঠিক এই সময়ে আসতে বলি। সে আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে গাড়ি নিয়ে চলে যায়। ট্যাক্সির পেছনে ধুলো ঘূর্ণি হয়ে উঠে গাড়ির পেছন পেছন যেতে থাকে। আমি সুটকেসগুলো রুমের ভেতরে নিয়ে এসে বসে থাকি। আমার বন্ধুটিকে কিভাবে খুঁজে বের করা যায় তা ভেবে কিছুটা সময় ব্যয় করার পর আমার মনে হল যে, বোকার মত কাজ করে ফেলেছি। এরকম শোচনীয় পরিস্থিতিতে নিজেকে আরেকটা দিন ধরে রাখার কোন মানে হয় না এবং তাকে খুঁজে পাওয়াও সম্ভব নয়। অফিসের কর্তাব্যক্তিরা যখন দেখবে যে আমি অফিসে এসে উপস্থিত হই নি তখন বিরক্ত হয়ে উঠবে। তারা আমার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে আমার খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করবে। এবং খোঁজ নিতে না পেরে পুরোপুরি হতাশ হয়ে যাবে। সকাল গড়িয়ে যেতে থাকে এবং আমি আরো বেশী অস্থির ও নিজের প্রতি রেগে উঠি। আমার মনে হয় যে, বিশাল ভুল করে ফেলেছি। তবে এটা ভেবে একটু স্বস্তি পাই যে, পরের দিন সবকিছু পরিকল্পনা মাফিক হবে এবং শেষমেষ মনে হবে যে এই দিনটি আমাকে কখনও পার করতে হয় নি।

সেই দীর্ঘতপ্ত বিকেলে ছোট ছোট পাখিরা কাঁটাময় ঝোপঝাড়ে ডানা ঝাপটাতে থাকে এবং মাটি থেকে মিষ্টি গন্ধ ভেসে ওঠে। আকাশ ছিল মেঘশূন্য এবং সূর্য জমিনের বুকে কালো ছায়া ফেলছিল। আমি চারপাশের সৌন্দর্য থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে কাচারী ঘরের দেয়ালের পাশে বসে থাকি। আমার মন পড়ে থাকে শহরে এবং গ্রামের এই বন্দীদশা একঘেয়ে লাগতে শুরু করে। ঘরে রাতের বেলায় খাওয়ার মত কিছু ছিল না, তবে গ্রামের দিকে হেঁটে যেতেও ইচ্ছা করছিল না। ঠান্ডায় এবং ক্ষুধায় কাতর হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিছানায় নির্ঘুম শুয়ে থাকি।

সূর্যাদয়ের আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়ি। আমি এমন ভয়ঙ্কর ক্ষুধার্ত ছিলাম যে, মনে হল যেন পেটে পাথর গজিয়েছে। ভাবলাম ট্রেন স্টেশনে গিয়ে সকালের নাস্তা সারা যাবে। জানালার বাইরে সবকিছু অন্ধকারে ঢাকা। অন্ধকার জঙ্গলের ওপাশে পুবের আকাশ ফর্সা হয়ে এলে দমকা হাওয়া এসে গাছের পাতা নাড়িয়ে দিল। ধীরে ধীরে গাছের পাতারা সবুজ রঙ ফিরে পেল। জঙ্গলে এবং বাড়ির পাশে পাখ-পাখালির কলকাকলী জেগে উঠে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। আমি খুব মনযোগ দিয়ে পাখিদের কল-কাকলী শুনলাম। অবশেষে যখন ট্যাক্সিটি চলে এল তখন এখানে এতই ভাল লেগে গেল যে, এখান থেকে চলে যেতে মন সায় দিল না। ট্যাক্সি চালক রাগারাগি করে চলে গেল।

পুরো সকালবেলা এবং বিকেল অব্দি আগের দিন ঠিক যেমনভাবে বসে ছিলাম সেভাবে আমি কাচারী ঘরে বসে রইলাম, তবে আজকে আমি অধৈর্য হয়ে পড়ি নি বা অন্য কোথাও যেতে মন উৎসুক হয় নি। আমার সামনে যা ঘটে চলে তাতে আমি মগ্ন হয়ে পড়ি—জঙ্গলের ভেতরে পাখদের হারিয়ে যাওয়া, পোকা-মাকড়দের পাথরের গা বেয়ে হেঁটে বেড়ানো—যেন আমি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছি, যেন আমি নিজের অনুপুস্থিতে সবকিছু চেয়ে চেয়ে দেখছি। অথবা এমন জায়গায় আছি যেখানে আমার থাকা উচিত নয়, যেখানে আমাকে কেউ চায় না, কিছুক্ষণের জন্য আলোর পেছনে পড়ে গিয়ে আমি নিজের ছায়া হয়ে উঠেছি; স্যুটকেসের ফিতা শীঘ্রই আটোসাটো হবে এবং আমি চলে যাব নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেতে : আমি আবার স্বাধীন হয়ে উঠব।

সন্ধ্যা নামার সময় আমি বুঝতে পারি নি যে, আমি ক্ষুধার্ত। বেশ হালকা বোধ হতে থাকে। আমি বসে বসে কিসের জন্য যেন অপেক্ষা করতে থাকি। প্রচণ্ড শীত এবং অন্ধকার তাড়িত হয়ে ঘরের ভেতরে এসে শুয়ে পড়ি এবং নানা ধরনের দুঃস্বপ্ন দেখি।

পরের দিন সকালবেলায় সবচেয়ে কাছের ক্ষেতটির দূর প্রান্তে ধীরে ধীরে হেঁটে আসতে থাকা একটা অবয়ব চোখে পড়ে। আমার মনে হল যেন একটি বিশাল শূন্যতা ভরে উঠল। শূন্যতাটির কথা না জেনেই আমি সেই কবে থেকে আমার বন্ধুর প্রতীক্ষায় বসে আছি। তাকে দেখার সাথে সাথে তার দ্বিধা অস্বাভাবিক মনে হতে শুরু হল এবং এটা আমাকে ভয় পাইয়ে দিল। সে হলরেখার ওপর দিয়ে হেলেদুলে আসছে, সে তার নাকটি এমনভাবে উপরে তুলে রেখেছে যেন স্প্যানিয়েল কুকুরের মত বাতাসের গন্ধ শুকছে এবং মনে হল কোথায় যাচ্ছে তা সে জানে না। তাকে এগিয়ে আনার জন্য তার দিকে দৌড়ে যাই এবং কাছাকাছি এসে দেখতে পাই যে, কপালে ব্যান্ডেজ বাঁধা এবং মুখ ভয়ানক ফ্যাকাসে। কাছে আসতেই সে হতচকিত হয়ে যায় এবং আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন আমি তার অপরিচিত। আমি তাকে ধরে ধরে নিয়ে আসি। বাড়িতে ঢোকা মাত্রই সে আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। ক্লান্তিতে সে থরথর করে কাঁপছিল। সে এত বেশী শুকিয়ে গেছে যে তার গালে গর্ত পড়ে গেছে এবং তার হাত হয়ে উঠেছে নখরের মত, চোখ জ্বরে জবা ফুলের মত লাল। আমি ডাক্তার ডাকতে গ্রামে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠি। তবে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হওয়ার পর সে অনেকটা ধীর-স্থির ভাবে কথা বলতে শুরু করে। অনেকক্ষণ ধরে সে কিছু একটা বলে এবং আমি কিছু না বুঝেই বিছানার পাশে বসে শুনে যাই। সে তার হাত দিয়ে বেশ কয়েকটা অঙ্গভঙ্গি করল এবং অবশেষে আমি বুঝতে পারি যে, শিকার করার সময় সে কোন একটা দূর্ঘটনার শিকার হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে যখন আমি তাকে মনে মনে গালাগাল দিচ্ছি তখন সে কোন এক হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে।

সে অবিরত কথা বলতে থাকে এবং সে কী বলছে সেদিকে মনযোগ দেয়া আমার জন্য কঠিন হয়ে উঠে। আমি অধৈর্য হয়ে উঠি। কিছুক্ষণ পর আমি এটা আর নিতে না পেরে উঠে দাঁড়িয়ে রুমের ভেতরে পায়চারি করতে শুরু করি। অবশেষে সে চুপ করে এবং রুমের এক কোনে জানালার নীচে আঙুল নির্দেশ করে। আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না কারন সেখানে জানালা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। হঠাৎ আমি বুঝতে পারলাম যে, সে ছবি আকার বোর্ডের দিকে আমার মনযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে যা ওখান থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। মানে, সে আমার বাড়ির নীলনকশাটা দেখতে চায়। মোড়ক খুলে নীলনকশাটা তার হাতে দিলাম। তারপরও তাকে অসন্তুষ্ট মনে হল। পকেট হাতড়ে একটা পেনসিল বের করে তাকে দিলাম। সে নীলনকশার উপর আঁকতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যে সে পুরো কাগজটি কিনারা পর্যন্ত জটিল সব চিত্র দিয়ে ভরে ফেলল। তার দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে কাগজটির দিকে তাকিয়ে থেকে অবশেষে আমি একটি টাওয়ারের ছবি চিনতে পারলাম এবং এমন একটা কিছু যাকে এই সব আঁকিবুঁকির মধ্যে একটা দরজা বলে বোধ হল। পৃষ্ঠাটি ভরিয়ে ফেললে আমি তাকে আরো পৃষ্ঠা এনে দিলাম এবং সে আঁকতে থাকল। আঁকার সময় তার হাত থামে নি বললেই চলে এবং যা সে এঁকেছে তার মধ্যে এমন জটিলতা আছে যা, বহু নিঃসঙ্গ দিনের চিন্তা এবং অনুশীলনের ফলেই কেবল আয়ত্ত করা সম্ভব। যখন সে এতই ক্লান্ত হয়ে পড়ল যে, পেনসিল নড়ানোর মত শক্তিও আর অবশিষ্ট রইল না, তখন সে ঘুমিয়ে পড়ল। সেই সন্ধ্যায় আমি তাকে রেখে গ্রামে খাবারের খোঁজে গেলাম।

ক্ষেত-খামার পাড়ি দিয়ে বাড়িতে ফেরার সময় লাল রঙের ভূ-দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে মনে হল যে আমি এটার সাথে গভীরভাবে পরিচিত, যেন এখানে আসার অনেক আগে থেকেই এটা আমার। এটাকে ছেড়ে যাওয়ার চিন্তাকে তাৎপর্যহীন মনে হল। কয়েক দিনের মধ্যে আমার ক্ষোভ এবং হতাশায় ভাটা পড়ে, এখন সেই শুরুর দিককার মত যে জিনিসের দিকেই তাকাই না কেন, মনে হয় যেন একটা খোলস অথবা একটা খোসা যা ফেঁটে গিয়ে একটা নিখুঁত ফল বের হয়ে পড়বে। ক্লান্ত হওয়া সত্ত্বেও, আমার মন সম্মুখ পানে ধাবিত হল : আমি বাড়ির পাশের এক ফালি জমি পরিষ্কার করে নিয়ে একটা আস্তাবল তৈরী করে সাদা-কালো গাভীদের নিয়ে এসে সেখানে ঢোকালাম আর ভীত-সন্ত্রস্ত মুরগীরা এগুলোর চারপাশে হেঁটে বেড়াতে লাগল। প্রতিবেশীর বাড়িটাকে আড়াল করার জন্য বাড়ির সীমানা দিয়ে একসার সাইপ্রেস গাছ লাগালাম। ধ্বসে পড়া দেয়ালটি ভেঙ্গে ফেলে একই পাথর দিয়ে আমার নিজস্ব খামার বাড়ি তৈরী করে ফেললাম। শেষ হওয়ার পর মনে হল এটা যার চোখে পড়বে তারই ঈর্ষা জাগ্রত হবে। আমার স্বপ্ন সত্যি হবে, প্রথমে যেমনটা হওয়ার কথা ছিল।

আমি সম্ভবত প্রলাপ বকছিলাম। ব্যাপারটির এমন পরিণতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। তবে আমি যখন ক্ষেতের উপর হলরেখার গভীরে এক পা দিয়ে এবং আরেক পা দিয়ে হলরেখার চূড়া অতিক্রম করে হেঁটে আসছিলাম, এই আশঙ্কায় আমি খুবই খুশী হয়ে উঠি যে, যেকোন সময় আমার হতাশা এবং নৈরাশ্য পঙ্গপালের মত আকাশ অন্ধকার করে দিয়ে আমার উপর নিমজ্জিত হবে। সন্ধ্যাটা স্নিগ্ধ, আলো নরম ও কমনীয়, পৃথিবীটা পক্ষাঘাতগ্রস্থ এবং আমি, অনেক নীচে, একমাত্র সচল প্রাণী।