Showing posts with label অর্থ ও বাণিজ্য. Show all posts
Showing posts with label অর্থ ও বাণিজ্য. Show all posts

Wednesday, January 21, 2026

ইসরায়েলের সঙ্গে ২০২৫ সালে কোন দেশ কত বড় চুক্তি করেছে

ইসরায়েল গত বছর তার বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে হাজার হাজার কোটি ডলারের জ্বালানি, প্রযুক্তি ও সামরিক খাতে চুক্তি করেছে। এসব দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও মিসর, চীন, জার্মানি, সুইজারল্যান্ডসহ এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নাম রয়েছে। আছে প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান গুগল ও এআই প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানের নামও।

এসব চুক্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মিসরের সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি। গত ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ওই জ্বালানি চুক্তির অনুমোদন দেন। চুক্তির আওতায় ২০৪০ পর্যন্ত লেভিয়াথান গ্যাসক্ষেত্র থেকে মিসরকে সাড়ে তিন হাজার কোটি ডলারের গ্যাস দেবে ইসরায়েল। এর ফলে ইসরায়েলের ওপর মিসরের জ্বালানিনির্ভরতা আরও বাড়বে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল বিশেষ করে ফিলিস্তিন এবং অঞ্চলজুড়ে ‘যুদ্ধে পরীক্ষিত’ সামরিক এবং নজরদারি সরঞ্জাম বিক্রি করে লাভবান হয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় গত বছর ইসরায়েল প্রযুক্তি ও সামরিক খাতে বেশ কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। মার্কিন টেক জায়ান্ট গুগল (অ্যালফাবেট) সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক কোম্পানি ‘উইজ’ কেনার জন্য ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলারের চুক্তি চূড়ান্ত করছে। এ ছাড়া হাইফা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার (১৯ মাইল) দূরে ইসরায়েলের বৃহত্তম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ডেটা সেন্টার স্থাপনের জন্য এনভিডিয়াকে ১৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগে রাজি করিয়েছে।

ইউরোপের দেশ জার্মানি ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তি ৩১০ কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৬ শ কোটি ডলার করেছে, যার আওতায় দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অত্যাধুনিক ‘অ্যারো–৩’ পাবে জার্মানি। জার্মানির সঙ্গে এই চুক্তি ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামরিক রপ্তানি।

জনসমক্ষে প্রকাশিত ইসরায়েলের স্বাক্ষরিত কিছু বড় চুক্তি তুলে ধরা হলো:

সাড়ে তিন হাজার কোটি ডলার

মিসরের জ্বালানি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের স্বাক্ষরিত সাড়ে তিন হাজার কোটি ডলারের চুক্তির আওতায় দীর্ঘ মেয়াদে প্রাকৃতিক গ্যাস পাবে মিসর। ইসরায়েল ১৩০ বিলিয়ন ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি করবে ২০২৬ থেকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত। এটি ২০২৫ সালে ইসরায়েল স্বাক্ষরিত সবচেয়ে বড় প্রকাশ্য চুক্তি।

৩ হাজার ২০০ কোটি ডলারের চুক্তি

গুগলের মূল কোম্পানি অ্যালফাবেট ইসরায়েলি সাইবার নিরাপত্তাপ্রতিষ্ঠান ‘উইজ’ কিনতে চুক্তি করেছে, যা ইসরায়েলের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম প্রযুক্তি চুক্তি। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি এটা চূড়ান্ত হওয়ার কথা।

আড়াই হাজার কোটি ডলারের চুক্তি

পালো অল্টো নেটওয়ার্কস ইসরায়েলি সাইবার নিরাপত্তাপ্রতিষ্ঠান সাইবারআর্ক কেনার ঘোষণা দিয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ ও শেয়ারহোল্ডার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে এটি চূড়ান্ত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বাণিজ্যের বড় অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র ও চীন

ইসরায়েল ২০১৯ সাল থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৪ হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য করেছে, যা ইসরায়েলের মোট বাণিজ্যের ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ।

এ ছাড়া চীনের সঙ্গে ৮ হাজার ৬৫০ কোটি ডলারের (১১.৬%), জার্মানির সঙ্গে ৪ হাজার কোটি ডলারের (৫.৫%) এবং তুরস্কের সঙ্গে ৩ হাজার ৫৭০ কোটি ডলারের (৪.৮%) বাণিজ্য করেছে ইসরায়েল।

সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ইসরায়েলের বাণিজ্য ছিল ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের। এই তালিকায় বেলজিয়াম, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ান, হংকং, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশের নাম রয়েছে।

২০২৪ সালে ইসরায়েলের আমদানি ও রপ্তানির তালিকায় দেখা যায়, দেশটি ফোন, কম্পিউটার, বিদ্যুতের যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস, ট্রাক, বাস এবং উড়োজাহাজসহ খনিজ পণ্য পেট্রোলিয়াম, কয়লা ও সিমেন্ট আমদানি করে। দেশটির রপ্তানির তালিকায় রয়েছে হীরা, সোনা, অপটিক্যাল, প্রযুক্তিগত ও চিকিৎসা যন্ত্রসরঞ্জাম ইত্যাদি।

Wednesday, September 24, 2025

না, লেনদেনে ট্রাম্প ভরসা করার মতো লোক নন by রিচার্ড কে শারউইন

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য কমিশনার মারোশ শেফচোভিচ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর মধ্যে হওয়া একটি বাণিজ্যচুক্তির কথা বলেছেন। এই চুক্তি অনুযায়ী, ইউরোপীয় রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্র ১৫ শতাংশ হারে শুল্ক বসাবে। এর বদলে ইউরোপ আগামী তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৭৫০ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি কিনবে এবং আরও ৬০০ বিলিয়ন ডলার সেখানে বিনিয়োগ করবে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য আলাদা অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যদিও তার পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি। শেফচোভিচ এ চুক্তিকে বলছেন, ‘এটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো চুক্তি ছিল।’ কিন্তু আসলেই কি এটা সবচেয়ে ভালো চুক্তি ছিল? ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর শুধু বিদেশি বাণিজ্য অংশীদারেরাই নন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, আইন প্রতিষ্ঠান, এমনকি সংবাদমাধ্যমও ভাবছে, ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করা মানে কি কেবল শক্তির খেলায় নামা, নাকি এর ফলে আমরা আইনকে অবহেলা করা এক নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতায় ঢুকে পড়ছি?’

এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আইনের শাসন না থাকলে কোনো চুক্তিকেই আমরা ‘সর্বোত্তম’ বলতে পারি না। বাজার যেটা চায়, সেটা হলো স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা, যা আসে আইনের শাসন থেকে। আইন না থাকলে সবকিছু হয়ে দাঁড়ায় জোরজবরদস্তি আর লোকদেখানো নাটক। একটা ভালো চুক্তির জন্য দরকার দুটি বিষয়—একটি হলো সত্যিকারের সদিচ্ছা; আরেকটি হলো এমন নিয়মকানুন, যা নির্ভরযোগ্যভাবে কার্যকর করা যায় এবং একতরফাভাবে পরিবর্তন করা যায় না।

এবার ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প আগের চেয়ে বেশি বেপরোয়া ও ‘স্বাধীন’ হয়েছেন। তাঁর ওপর আইনের নিয়ন্ত্রণ কার্যত উঠে গেছে। এর একটি উদাহরণ হলো দেশের সবচেয়ে বড় আইনজীবী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাঁর ‘চুক্তি’। এখন পর্যন্ত নয়টি বড় আইনপ্রতিষ্ঠান এমন চাপে পড়েছে যে তারা ট্রাম্পপন্থী কাজে ৯৪০ মিলিয়ন ডলারের বিনা পারিশ্রমিক আইনি সহায়তা দিতে রাজি হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল—তাদের সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স বাতিল করা হবে, সরকারিভাবে চুক্তি থেকে বাদ দেওয়া হবে, এমনকি ফেডারেল কোর্টেও ঢুকতে দেওয়া হবে না। যদিও চারটি প্রতিষ্ঠান ট্রাম্পের এসব নির্বাহী আদেশের বিরুদ্ধে মামলা করে এবং আদালতে জয় পায়।

তাহলে প্রশ্ন আসে, দেশের সেরা আইনজীবীরা কেন এমন চাপের কাছে নতিস্বীকার করলেন? এর কারণ হলো আইনজীবীরা বুঝেছেন, এখন আর কেবল আইনের পক্ষে থাকলেই নিরাপদ থাকা যায় না। ট্রাম্প প্রশাসন পুরো আইন প্রয়োগব্যবস্থাকে নিজের ইচ্ছার অধীন নিয়ে এসেছে। প্রেসিডেন্ট চাইলে যেকোনো সময় যেকোনোভাবে তাঁদের শাস্তি দিতে পারেন। আইনের কোনো সুরক্ষা আর নেই। এখানেই মূল সমস্যা। যারা একচ্ছত্র ক্ষমতা চায়, তারা কোনো নিয়ম মানে না।

দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসেই ট্রাম্প ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার মাধ্যমে অতিরিক্ত ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি ব্যবহার করেন ১৭৯৮ সালের এলিয়েন এনিমিস অ্যাক্ট। এই আইন কেবল তখনই কার্যকর হয়, যখন যুদ্ধ বা বিদেশি আগ্রাসনের মতো পরিস্থিতি ঘটে। কিন্তু ট্রাম্প এই আইন ব্যবহার করে ভেনেজুয়েলার একটি মাদক চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করেন। এই যুক্তি ব্যবহার করে যেকোনো দেশের নাগরিককে (যে দেশ যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসন বা মাদক পাচারের উৎস) টার্গেট করা সম্ভব।

ট্রাম্পের আরেকটি নির্বাহী আদেশ যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার বাতিল করে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী বলছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এবং এখানকার আইনের আওতায় থাকা প্রত্যেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।’ এ পরিস্থিতিতে কেউ যদি ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ‘আপনি আসলে কোন ভিত্তিতে এই চুক্তিকে টেকসই বলে মনে করছেন?’

এই সংকটে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় বিশ্ববিদ্যালয়ও। ট্রাম্প প্রশাসন তাদের হুমকি দিয়েছে, বিলিয়ন ডলারের সরকারি অনুদান বন্ধ করে দেবে, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর-ছাড়ের সুবিধাও বাতিল করবে। এখন তারা ভাবছে, ট্রাম্পকে খুশি রাখতে কি চুক্তি করে ফেলবে, নাকি একজোট হয়ে বলবে, ‘আমরা এই অন্যায় শর্ত মেনে নেব না?’ যে চুক্তি যেকোনো সময় একতরফাভাবে বাতিল বা পরিবর্তন করা যায়, সেই চুক্তি আসলে ফাঁকা বুলি। এটি আত্মপ্রবঞ্চনা, স্বার্থের মুখোশ।

* রিচার্ড কে শারউইন, নিউইয়র্ক ল স্কুলের আইন বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেন। রয়টার্স

Tuesday, September 9, 2025

ট্রাম্পের শুল্কে ভারতের অর্থনীতি কতটা ঝুঁকিতে by অজয় শাহ

ট্রাম্পের শুল্কনীতি ভারতের অর্থনীতি ও কৌশলগত ভবিষ্যতের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের বিভিন্ন পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, রাশিয়া থেকে ভারত তেল কিনছে বলেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্পের এ ঘোষণা বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ভালো সম্পর্ক থেকেও সরে আসার ইঙ্গিত। ভারতের অর্থনীতি এত দিন বিশ্ববাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থেকে যে সুবিধা ভোগ করে এসেছে, নতুন শুল্কের কারণে তা কিছুটা চাপের মুখে পড়তে পারে। এর চেয়েও বড় ঝুঁকি হলো, ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনায় এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে।

তবে ভারতের জন্য আশার কথা, এমন কিছু কারণ আছে, যা এই নতুন শুল্কের তাৎক্ষণিক প্রভাব কমিয়ে আনবে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও ভৌগোলিকভাবে দেশটি অনেক দূরে অবস্থিত। উচ্চ পরিবহন খরচের কারণে ভারত অনেক আগে থেকেই বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করার কৌশল নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারও কখনো একই রকম থাকে না। ট্রাম্পের এই বৈশ্বিক শুল্কযুদ্ধ নতুন করে বাণিজ্যের ধারা পরিবর্তন করবে এবং সরবরাহব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস ঘটাবে। ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা অন্যান্য দেশের ব্যবসায়ীদের মতোই বিকল্প বাজার খুঁজে নেবেন; যদিও এই পরিবর্তনের খরচ বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্রাম্প যে শুল্ক বসিয়েছেন, তা ভারতের মোট রপ্তানির একটি ছোট অংশকে প্রভাবিত করবে। গত অর্থবছরে ভারত প্রায় ৪৪১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য বিদেশে বিক্রি করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য নতুন শুল্কের আওতায় পড়ছে। অর্থাৎ মোট রপ্তানির ১৫ শতাংশের কম প্রভাবিত হবে। তাই এই শুল্ক ভারতের জন্য অবশ্যই একধরনের সমস্যা তৈরি করবে, কিন্তু সেটা এত বড় আঘাত নয় যে ভারতের পুরো রপ্তানি ব্যবসা বা অর্থনীতি ভেঙে পড়বে।

শুধু পণ্যের দিকে তাকালে ভারতের বাণিজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী খাতটি আড়ালে থেকে যায়। সেটি হলো সেবা খাত। বর্তমানে ভারতের সেবা রপ্তানি বছরে ৩৮০ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং তা দ্রুত বাড়ছে। এ খাতই ভারতের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির আসল চালিকা শক্তি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেবা রপ্তানির মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, আর্থিক সেবা, ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার আউটসোর্সিং, গবেষণা ও উন্নয়ন ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত, যেগুলোর ওপর কোনো শুল্ক আরোপ করা হয় না।

ট্রাম্পের শুল্কনীতি থেকে সৃষ্ট নীতিগত অনিশ্চয়তা ভারতকে একটি অপ্রত্যাশিত সুবিধাও দিতে পারে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে অন্য দেশে বৈচিত্র্য আনতে চাইবে। এই পরিবর্তন থেকে ভারত বড় লাভবান হতে পারে। বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, ভারতের পণ্য ও সেবা রপ্তানিকারকেরা ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র বাদে অন্যান্য ওইসিডি দেশের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে।

তবে এ ঘটনার প্রভাব কেবল বাণিজ্য অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভারতের আন্তর্জাতিক অবস্থান সম্পর্কেও একটি বড় প্রশ্ন তোলে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি হলো ভারতকে একটি আত্মবিশ্বাসী এবং উন্মুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তোলা, যা পশ্চিমাদের প্রযুক্তি, অর্থ ও বাজারের সহায়তা নিয়ে বিশ্বায়নের মাধ্যমে উন্নতি অর্জন করতে চায়। ভারতের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করতে হলে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও গভীর সংযোগ স্থাপন জরুরি।

এ ভাবনা বা দৃষ্টিভঙ্গি বলছে, ভারতের উন্নতি অনেকটাই পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ফল। ১৯৯১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ভারতের অর্থনৈতিক সাফল্যের বড় কারণ ছিল পশ্চিমা দেশগুলোর প্রযুক্তি, ব্যবসায়িক সংযোগ ও বিনিয়োগ। এ সময় পশ্চিমা দেশগুলোয় ভারতীয় প্রবাসীদের সংখ্যা বেড়েছে, আর তাদের প্রভাবও অনেক বেশি হয়েছে। ভারতও পশ্চিমাদের প্রযুক্তি আর ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। যদিও মাঝেমধ্যে রাশিয়া বা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর কথা বলা হয়, বাস্তবে ভারতের ধনী বা প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানদের ওই দেশগুলোয় পড়াশোনা করতে পাঠানোর ঘটনা প্রায় নেই।

দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক সংযোগকে সুযোগ নয়, বরং দুর্বলতা হিসেবে দেখে। এই মনোভাব এসেছে ঔপনিবেশিক আমল থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পশ্চিমাদের প্রতি অবিশ্বাস থেকে। এতে আত্মনির্ভরশীলতার ওপর এত বেশি জোর দেওয়া হয় যে তা প্রায়ই অর্থনৈতিক দক্ষতা ও প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে।

ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি ভারতের মধ্যে যে রক্ষণশীল বা সুরক্ষাবাদী ভাবনা আগে থেকেই ছিল, সেটাকে আরও শক্তিশালী করেছে। এখন অনেকেই মনে করতে শুরু করেছে যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিশ্বাসযোগ্য নয়, আর পশ্চিমাদের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ হলে সেটা ভারতের নিরাপত্তা ও স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

যদি ভারতের নেতারা এই ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন, তাহলে দেশটি হয়তো সুরক্ষাবাদী নীতি নেবে (মানে নিজেদের বাজার অন্যদের জন্য বন্ধ করে দেবে) এবং সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের দিকে যাবে। এতে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এশিয়ার নিরাপত্তা কমে যাবে, আর বিশ্বে যে সামান্য উদারনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আছে, সেটাও দুর্বল হয়ে পড়বে।

তবে ভালো খবর হলো, উন্মুক্ত অর্থনীতির পক্ষে থাকা দৃষ্টিভঙ্গি এখনো প্রাধান্য পাচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ভারতের যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, তা শুল্ক কমানো এবং সুরক্ষাবাদী নীতি হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই চুক্তি দেখায়, ভারত এখনো পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে ওইসিডি দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করতে আগ্রহী। আশা করা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য চুক্তির আলোচনাও একই ধারা অনুসরণ করবে এবং ভারতের বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্তি আরও দৃঢ় হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিকে ভারত নিজের জন্য সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এ ঘটনা ভারতকে স্পষ্টভাবে ভাবতে সাহায্য করবে যে তার ভবিষ্যৎ কৌশল কী হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষাবাদী নীতির জবাবে ভারতের উচিত নয় প্রতিশোধ নেওয়া বা অন্যদের থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলা। বরং ভারতের উচিত সেই সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা, যারা এখনো সৎ নিয়ম মেনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশ্বাস করে। যদি ভারত যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করে, তাহলে দেশটি তার অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলো নতুনভাবে সাজাতে পারবে। এতে ভারত প্রমাণ করতে পারবে যে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা শুধু তার উন্নতির জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের জন্যও জরুরি।

* অজয় শাহ, মুম্বাইভিত্তিক অলাভজনক গবেষণা সংস্থা এক্সকেডিআর ফোরামের সহপ্রতিষ্ঠাতা
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ট্রাম্পের ঘোষিত ৫০ শতাংশ শুল্কের প্রতিবাদে ভারতে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভ
ট্রাম্পের ঘোষিত ৫০ শতাংশ শুল্কের প্রতিবাদে ভারতে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স

Tuesday, August 26, 2025

গাজায় হামলার নিন্দা জানালেও ইসরায়েলের সঙ্গে কেন বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে এসব দেশ

কখনো বিমান হামলা করে, কখনো অভুক্ত রেখে, কখনো তিলে তিলে, আবার কখনো দ্রুত—সব রকমভাবে অব্যাহতভাবে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করে চলেছে ইসরায়েল। এর মধ্যেই ২৮টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গাজায় ইসরায়েলি যুদ্ধের অবসানের দাবিতে একটি বিবৃতি স্বাক্ষর করেছেন।

জাতিসংঘ এবং অন্যান্য সংস্থা গাজায় দুর্ভিক্ষের আশঙ্কার কথা জানানোর কয়েক মাস পর এখন এসব দেশ কেবল বিবৃতি দিচ্ছে। কিন্তু সংকট সমাধানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

যেসব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিবৃতি দিয়েছেন, সেসব দেশের কয়েকটি ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। গত সপ্তাহে ফ্রান্সও ঘোষণা দিয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বরে দেশটি ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। এ ঘোষণায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা।

তবে সমালোচকেরা বলছেন, এসব দেশ মুখে যতই ইসরায়েলের সমালোচনা করুক না কেন, তারা এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে ব্যবসা–বাণিজ্য করে লাভবান হচ্ছে। তারা ইসরায়েলের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি বা এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, যা ইসরায়েলকে গাজায় গণহত্যামূলক যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করতে পারে।

এখন পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার ও নৃশংস হামলায় অন্তত ৫৯ হাজার ৮২১ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৭৭ জন।

জেনে নেওয়া যাক, কোন দেশগুলো ইসরায়েলকে একদিকে তাদের সামরিক আগ্রাসনের জন্য দোষারোপ করছে, অন্যদিকে তাদের সঙ্গে কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

তথ্যভিত্তিক উন্মুক্ত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম অবজারভেটরি অব ইকোনমিক কমপ্লেক্সিটির (ওইসি) ২০২৩ সালের তথ্যানুসারে, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, জাপান, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, স্পেন, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য—প্রতিটি দেশ ওই বছর ইসরায়েলের সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের বেশি আমদানি-রপ্তানি বা উভয় ধরনের বাণিজ্য করেছে।

এসব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে কী ধরনের বাণিজ্য করে

এসব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে প্রধানত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহন, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (চিপ), টিকা ও সুগন্ধির মতো বিভিন্ন পণ্য বাণিজ্য করে।

ইসরায়েল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেসব পণ্য রপ্তানি করে, সেগুলোর একটির নাম ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট। এগুলো আসলে ছোট আকারের চিপ, যা কম্পিউটার, মুঠোফোন, টেলিকম যন্ত্রপাতি, মেডিকেল ডিভাইসসহ নানা ইলেকট্রনিক পণ্যে ব্যবহৃত হয়।

এই চিপগুলোর একটি বিশাল অংশ আয়ারল্যান্ডে রপ্তানি হয়। শুধু ২০২৩ সালে দেশটিতে প্রায় ৩৫৮ কোটি ডলার মূল্যের ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট রপ্তানি করেছিল ইসরায়েল। আয়ারল্যান্ড ইসরায়েল থেকে মোট যত পণ্য আমদানি করে, তার মধ্যে এই চিপই সবচেয়ে বেশি দামে এবং বেশি পরিমাণে আমদানি করা হয়।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে ইসরায়েলে সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি করে ইতালি।

২০২৩ সালে ইসরায়েলে মোট ৩৪৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে ইতালি। এর মধ্যে গাড়ি রপ্তানি করা হয় ১১ কোটি ৬০ লাখ ডলারের।

এসব দেশ কি ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে আয়ারল্যান্ড ও স্পেন ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের তীব্র সমালোচনা করেছে। কিন্তু এরপরও তারা ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করেনি।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী আরও সাতটি দেশ ১৯৮৮ সালেই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এসব দেশ হলো সাইপ্রাস, মাল্টা ও পোল্যান্ড। তারা ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার ঘোষণার পরপরই স্বীকৃতি দিয়েছিল।

এ ছাড়া আইসল্যান্ড ২০১১ সালে, সুইডেন ২০১৪ সালে এবং নরওয়ে ও স্লোভেনিয়া ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফ্রান্স বলেছে, তারা আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে স্বীকৃতি দেবে।

কোন কোন দেশ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছে

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছে অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, কানাডা, সাইপ্রাস, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, গ্রিস, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, জাপান, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্লোভেনিয়া, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য।

সবগুলো দেশই এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।

ইসরায়েল বিবৃতির প্রতিক্রিয়ায় কী বলেছে

স্বাভাবিকভাবেই ইসরায়েল বিবৃতিটি প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওরেন মারমোরস্টেইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘ইসরায়েল এই বিবৃতিকে বাস্তবতা বিবর্জিত বলে মনে করে। এটি হামাসকে ভুল বার্তা দিচ্ছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলো আর কী করছে

ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য এক জরুরি বৈঠকে গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং সব বন্দীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছে। তারা গাজায় ইসরায়েলের অবরোধের ফলে সৃষ্ট খাদ্যসংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এসব চাপের ফলে ইসরায়েল কি বদলেছে

গাজায় ফিলিস্তিনিদের অনাহারের বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিকভাবে খুব আলোচিত। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের মতো ইসরায়েলপন্থীরাও এখন এ বিষয়ে কথা বলছেন।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইসরায়েল আল-মাওয়াসি, দেইর আল-বালা ও গাজা শহরে ‘মানবিক উদ্দেশ্যে’ প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত গাজায় ‘কৌশলগত বিরতি’ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এটি গত রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে।

তবে এই বিরতির মধ্যেও রোববার সকালে ইসরায়েলি বাহিনী অন্তত ৪৩ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রোববার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অনাহার ও অপুষ্টিতে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে দুজন শিশু।

এ নিয়ে গাজায় অনাহারে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ১৩৩ জনে, যার মধ্যে ৮৭টি শিশু।

গাজা উপত্যকার কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থিত বুরেইজ শরণার্থীশিবিরে ইসরায়েলি হামলার পর পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে একটি শিশু
গাজা উপত্যকার কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থিত বুরেইজ শরণার্থীশিবিরে ইসরায়েলি হামলার পর পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে একটি শিশু। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Thursday, July 17, 2025

ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধে চীন জিতে যাচ্ছে by জংইউয়ান জো লিউ

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে জেনেভা ও লন্ডনে যে বাণিজ্য আলোচনা হয়েছে, তা সাময়িক স্বস্তি দিলেও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান দেয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব অস্থায়ী ব্যবস্থাকে ‘চুক্তি’ হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং দাবি করেছেন, এসব চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো।

কিন্তু চীন বিষয়টিকে একেবারেই ভিন্নভাবে দেখছে। চীনের মতে, তারা এ বাণিজ্য সংঘাত আরও আত্মবিশ্বাস নিয়ে এবং আরও আত্মনির্ভর হয়ে পার হয়ে এসেছে। চীন মনে করছে, তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ভালো ফল দিচ্ছে।

২০১৮ সালে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এ কঠিন বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়। এর পর থেকে চীন এমন একটি কৌশল গ্রহণ করেছে, যেখানে প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক—দুই ধরনের পদক্ষেপ একত্রে রয়েছে।

আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে চীন তাদের বাণিজ্যপ্রবাহের পথ ঘুরিয়ে দিয়েছে; ডলারের ওপর নির্ভরশীল বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার বিকল্প খুঁজেছে এবং নিজেদের প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ অনেক গুণ বাড়িয়েছে।

চীন অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোগ বাড়াতে চেয়েছে। এটি তারা শুধু ভোক্তাপ্রবণতা বাড়ানোর জন্য করেনি, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা গ্রিন টেকের মতো কৌশলগত খাতে চাহিদা বাড়ানোর জন্যও করেছে।

আক্রমণাত্মক কৌশল হিসেবে চীন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছে এবং প্রতিপক্ষের ওপর দ্রুত ও সুচিন্তিতভাবে জবাব দেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার প্রশাসন যখন নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকি দেয় বা তা কার্যকর করে, চীন তখন সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, কঠিন অবস্থান নিয়েছে এবং কখনোই ভয় পায়নি।

চীন শুধু প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না, বরং এই পুরো বাণিজ্য সংঘাতকে নিজেদের শর্তে পুনঃসংজ্ঞায়িত করছে।

একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগুলো আসলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের শিল্প খাতের চীনের ওপর নির্ভরতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে। বিশেষ করে বিরল খনিজ ও বিভিন্ন কাঁচামাল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে চীনের ওপর নির্ভরশীল, তা ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে।

ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদকেরা বিপাকে পড়েছেন এবং অতিরিক্ত দামে তাঁরা এসব উপকরণ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। এ বছরের এপ্রিলের শুরুতে চীন যখন বিরল খনিজের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ শুরু করল, তখন তারা সহজেই বুঝতে পারল, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে চাপ সৃষ্টি করার এক কার্যকর হাতিয়ার।

ট্রাম্পের এ অনিয়মিত ও নাটকীয় শুল্ক নীতি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জন্য একধরনের প্রচারণামূলক জয় এনে দিয়েছে। যদিও চীনের জনগণের কাছে ট্রাম্পকে প্রতিহত করা ততটা জনপ্রিয় কিছু নয়, তবুও এ যুদ্ধ তাদের একটি কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে।

বৈশ্বিক দক্ষিণের (গ্লোবাল সাউথ) যেসব দেশ পশ্চিমা উন্নয়ন মডেলের প্রতি সন্দেহপ্রবণ, তারা এ সংকটে চীনের স্থিতিশীল অবস্থান দেখে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ‘বিশ্ব এক শতকে একবার দেখা যাওয়া বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে’ কথাটির ওপর আস্থা খুঁজে পাচ্ছে।

চীন মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের চেষ্টার ফল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যে অর্থনৈতিক সংযোগ তৈরি হয়েছিল, তা ট্রাম্প প্রশাসন যেকোনো মূল্যে বিচ্ছিন্ন করতে চায় এবং এর মাধ্যমে ট্রাম্প চীনের উত্থান ঠেকিয়ে দিতে চান। চীন চায় না তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ হোক। চীন চায় না তাদের অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা হোক। কিন্তু চীন মনে করে, চীন যদি বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য হয়, তাহলে তারা সে বিচ্ছিন্নতাও মেনে নিতে পারবে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সামনে মাথা নত করবে না। চীন মনে করে, ট্রাম্প যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছেন, সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র হেরে যাবে।

এ কারণেই চীনা নেতৃত্ব, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা আত্মনির্ভরতা তৈরির দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানো।

যদিও মার্কিন বাজারের চাহিদা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সঙ্গে তুলনা চলে না, তবুও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ধরে নিচ্ছে, তারা আর যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিযোগিতা করতে পারবে না বা মার্কিন উচ্চ প্রযুক্তি পাবে না। সেটি মাথায় রেখেই তারা নিজেদের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। চীনের প্রযুক্তি কোম্পানি হুয়াওয়ের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর দুর্দান্তভাবে কোম্পানিটির ঘুরে দাঁড়ানো এর একটি বড় উদাহরণ। এখন টিকটকের মালিক প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্সও একই ধরনের চাপের মুখে রয়েছে। ট্রাম্প চান এটি মার্কিনদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হোক।

নিশ্চিতভাবেই ট্রাম্পের শুল্ক নীতির কারণে চীনের গায়েও আঘাত লেগেছে। বিশেষ করে কম দামের হালকা শিল্পপণ্য (যেমন পোশাক, জুতা) এসব খাতে এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে এতে কিছু ইতিবাচক দিকও তৈরি হতে পারে। যেমন ছোট ছোট অদক্ষ প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ে গিয়ে শিল্পে একধরনের সংহতি ও দক্ষতা বাড়বে। এতে বেকারত্ব বাড়তে পারে। কিন্তু চীনে যেহেতু অনেক কারখানাই অটোমেশনের মাধ্যমে চলে, সেহেতু এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ততটা গুরুতর হবে না।

এর চেয়ে বড় কথা, চীন অতীতে এর চেয়ে বড় ধাক্কা সামলেছে। ১৯৯২ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত বাজারভিত্তিক সংস্কারের কারণে ৭ কোটি ৬০ লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছিলেন। সেটিও তারা সামাল দিয়েছে। সুতরাং আজকের কিছু ছাঁটাই চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতা নড়বড়ে দেওয়ার মতো কিছু হবে না।

এদিকে ট্রাম্পের শুল্ক নীতি যেসব দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে, সেগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন হুয়াওয়ে ও জেডটিইয়ের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা চীনের প্রযুক্তি খাতে অগ্রগতির ইচ্ছাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন নতুন করে ভূরাজনৈতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাগুলো চীনের শাসকদের জন্য জনগণকে ‘বিদেশিদের অপমান’-এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। শুল্কে সাময়িক বিরতি চীনা রপ্তানিকারকদের পণ্য পাঠানোর একটু সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু সেটি কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি নয়।

এ শুল্ক ধাক্কা যখন এল, তখন চীন তাদের ১৪তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষ বছরে ছিল। সে কারণে চীনা নীতিনির্ধারকেরা অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে এবং ছোট ব্যবসাগুলোকে বাঁচাতে সরকারি ব্যয় ও মুদ্রানীতির সাহায্য নিয়েছে। কিন্তু এগুলো চীনের অর্থনীতির গঠনগত সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারবে না। এ ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে আরও বহু বছর লাগবে।

এখন বাইরের দুনিয়া চীনের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এ সময়ে চীনের শীর্ষ নেতা ও বড় ব্যবসায়ীরা (যাঁদের অনেকেই প্রকৌশলে পড়েছেন) দেশের উন্নত প্রযুক্তি খাতে বেশি করে পয়সাকড়ি ঢালছেন। তাঁরা বিশেষভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নতুন ধরনের আধুনিক কারখানা গড়তে মনোযোগী হয়েছেন।

২০১৮ সালে ট্রাম্প যখন চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেন, তখন থেকেই চীন সিদ্ধান্ত নেয়, তারা নিজেদের প্রযুক্তি নিজে তৈরি করবে। এখনো সেই চেষ্টা পুরোপুরি সফল হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্র যখন চীনকে চেপে ধরছে, তখন চীনের সামনে এ প্রযুক্তি উন্নয়নের চেষ্টা ছাড়া আর কোনো সহজ পথ খোলা নেই।

* জংইউয়ান জো লিউ, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের চীনবিষয়ক গবেষক
- সত্ত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

সি চিন পিং এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প
সি চিন পিং এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: এএফপি

Thursday, July 3, 2025

চীনকে বাগে আনতে ট্রাম্পকে যে পথে হাঁটতে হবে by ই ফুসিয়ান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক আরোপের যে নীতি গ্রহণ করেছেন, তা অনেক সমালোচনার মুখে পড়েছে এবং সেই সমালোচনার পেছনে যুক্তিও আছে। কিন্তু ট্রাম্প যেটি বলছেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কলকারখানাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এটি একেবারে ভুল কিছু নয়।

সমস্যা হলো ট্রাম্পের ‘চিকিৎসা পদ্ধতি’। তিনি যেন অস্ত্রোপচার করতে চাচ্ছেন করাত দিয়ে, যা কিনা রোগীকেই মেরে ফেলতে পারে। অথচ দরকার ছিল আরও সূক্ষ্ম স্ক্যালপেল (অপারেশনের জন্য ব্যবহার্য ধারালো ছুরি)। সরলভাবে বললে, ট্রাম্প সমস্যার ধরন বুঝলেও তাঁর সমাধানের পথটা খুব রুক্ষ আর বিপজ্জনকভাবে বেছে নিয়েছেন।

বর্তমানে যেটা আমরা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের নিয়মকানুন দেখি (যেমন বিভিন্ন দেশের মধ্যে পণ্যের লেনদেন ও ডলারের গুরুত্ব), তার সবকিছু তৈরি হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ব্রেটন উডস নামের একটি জায়গায় অনুষ্ঠিত এক বড় সম্মেলনে। তখন ইউরোপ ছিল যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ আর যুক্তরাষ্ট্র ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি। ১৯৪৮ সালে ওই সম্মেলনের চার বছর পর দুনিয়ার অর্ধেকের বেশি পণ্য একা যুক্তরাষ্ট্রই তৈরি করত।

তবে সেই সময় যে ‘নির্ধারিত বিনিময় হার’ (ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট) চালু করা হয়েছিল, মানে একেক দেশের মুদ্রার মান একভাবে বেঁধে দেওয়া হতো, তবে সেটি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো হয়নি। এর ফলে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্প দুর্বল হতে শুরু করে। ১৯৫৩ সালে বিশ্বে উৎপাদিত সব পণ্যের ৫৫ শতাংশ যেটি একা যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করত, সেটি ১৯৭০ সালে ২৪ শতাংশে নেমে আসে।

এই অবস্থায় প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ১৯৭১ সালে বড় একটি সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মার্কিন ডলারকে সোনার মানের সঙ্গে যুক্ত থাকার নিয়ম থেকে আলাদা করে দেন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতের অবস্থা কিছুটা স্থির হয়। পরবর্তী ৩০ বছর ধরে অবস্থা মোটামুটি একই রকম থাকে।

সরল করে বললে, যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় কারখানা ছিল দুনিয়ার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু ভুল নিয়মে তাদের উৎপাদন দুর্বল হয়। পরে কিছু বড় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তারা আবার নিজেদের অবস্থান কিছুটা ঠিক করে নেয়।

ডলারকে সোনার মান থেকে বিচ্ছিন্ন করার এক বড় প্রভাব হলো যুক্তরাষ্ট্র আগে যে আয় করত (অর্থাৎ রপ্তানি করে যা পেত), তার চেয়ে বেশি খরচ করা শুরু করে (অর্থাৎ আমদানি বেশি করে)। ফলে ধীরে ধীরে তারা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ঘাটতির দেশ হয়ে ওঠে। আর এই সুযোগে জাপান তাদের উৎপাদন খাত অনেক বড় করে তোলে।

এরপর ১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর (জাপান, পশ্চিম জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য) সঙ্গে এক চুক্তি করে, যার মাধ্যমে ডলারের মূল্য কমিয়ে দেয়। এতে কিছুদিনের জন্য আমদানি কমে যায় এবং বাণিজ্যঘাটতি কিছুটা কমে। কিন্তু ১৯৯৪ সালে নাফটা নামে একটা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি চালু হয়, আর ২০০১ সালে চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যোগ দেয়। তখন ব্যাপক হারে সস্তা চীনা পণ্য মার্কিন বাজারে ঢুকতে থাকে।

২০০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দুটি বিষয় ঘটে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ও আমদানির অনুপাত ৬৫ শতাংশ থেকে কমে ৪৫ শতাংশে চলে আসে। মানে আমদানি বাড়ে, রপ্তানি কমে। দ্বিতীয় ঘটনাটি হলো, তাদের উৎপাদনের পরিমাণ, যা একসময় দুনিয়ার ২৫ শতাংশ ছিল, তা নেমে ১৬ শতাংশে নেমে যায়।

এই তথ্যগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প খাত ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে আর এর পেছনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি অনেকটা দায়ী। ট্রাম্প এই দুর্বলতার দিকটা ঠিকই ধরেছেন। তবে তিনি যে কৌশল নিচ্ছেন, যেমন সবার ওপর একসঙ্গে শুল্ক বসিয়ে দেওয়া, সেটি সমস্যা কমানোর বদলে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো চীন নিজেও তাদের অতিরিক্ত পণ্য উৎপাদন বা ওভারক্যাপাসিটি সমস্যার কারণে বেশ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। মানে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, চীনও সমস্যায় আছে।

শিশুরা অনেক কিছু ব্যবহার করে, যেমন খেলনা, জামা–কাপড়, খাবার, শিক্ষা, ইত্যাদি। তাই কোনো পরিবারে যত বেশি শিশু থাকে, তত বেশি খরচ হয়। কিন্তু চীনে অনেক দিন ধরে এক সন্তান নীতি চলায় এখন তাদের শিশুদের সংখ্যা অনেক কম। এর ফলে একদিকে যেমন পরিবার ছোট হয়েছে, অন্যদিকে তাদের খরচও কমে গেছে। এই কারণেই চীনে মানুষের আয় কম এবং তারা বাজারে খুব বেশি জিনিসপত্র কেনে না।

চীনের পরিবারগুলো যত কম খরচ করে, ততই চীনের ভেতরে (দেশের মধ্যে) জিনিসপত্র বিক্রি কম হয়। তাই তারা বাধ্য হয়ে অনেক পরিমাণে পণ্য তৈরি করে অন্য দেশে রপ্তানি করে। ২০২৩ সালে চীন প্রায় ১ দশমিক ৮৬ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা তাদের পুরো জিডিপির ১০ দশমিক ৫ শতাংশ।

এই জায়গাতেই যুক্তরাষ্ট্র একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ, মার্কিনরা অনেক জিনিস কেনেন ও ব্যবহার করেন। আবার ডলার হলো বিশ্বের প্রধান মুদ্রা, তাই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাজারে অনেক পণ্য কিনতে পারে এবং সব দেশই যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য বিক্রি করতে চায়। চীনের অতিরিক্ত পণ্যের জন্য তাই যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে বড় ক্রেতা। এই দুই দেশের এমন সম্পর্ককে ইতিহাসবিদেরা বলছেন ‘চিমেরিকা’ (চীন আর আমেরিকা মিলিয়ে এই নাম)।

এই সম্পর্ক শুরুতে দুই দেশের জন্যই উপকারী মনে হলেও পরে সমস্যা তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের শিল্প ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়, কারণ, সস্তা চীনা পণ্য মার্কিন বাজারে ঢুকতে থাকে। আর চীনের ভেতরে নিজের মানুষের চাহিদা এত কম যে তারা সব সময় বাইরে পণ্য বিক্রি না করলে চলতে পারে না।

চীন এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছে। সেখানে এখন এক সন্তান নীতির পরিবর্তে এখন দুই সন্তান বা তিন সন্তান নিতে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ পরিবার এত কম আয় করে যে তারা আর বেশি সন্তান নিতে চায় না।

চীন সরকার এখন ভাবছে, তাদের কাছে তো অনেক ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করা তরুণ আছেন, তাই তাঁদের দিয়ে অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই তরুণেরা চাকরি খোঁজেন যেসব জায়গায়, সেখানে খুব কম চাকরি আছে। তাই দেশে বেকারত্ব বাড়ছে, নতুন বিয়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, যার মানে হচ্ছে জন্মহারও কমছে।

এসব সমস্যা সমাধানে যদি যুক্তরাষ্ট্র (বিশেষ করে ট্রাম্প) সব দেশের ওপর বড় বড় শুল্ক বসিয়ে দেয়, তাহলে শুধু চীন নয়, পুরো বিশ্ববাণিজ্যই বড় বিপদে পড়বে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের যে বিশাল বাণিজ্যঘাটতি, তার সঙ্গে চীনের অতিরিক্ত রপ্তানি ভারসাম্য তৈরি করে।

ট্রাম্প যদি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে চান, তাহলে সেটা চীন থেকেই করতে হবে। অর্থাৎ চীনের জন্মহার বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানোর ভেতরেই মূল সমস্যা নিহিত। কিন্তু এই কাজ শুল্ক বসিয়ে (ট্যারিফ দিয়ে) করা সম্ভব নয়। এটা করতে হলে চীনকে তার ভেতরের সমাজ ও অর্থনীতি নিয়ে বড় পরিকল্পনা করতে হবে।

* ই ফুসিয়ান, উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী। তিনি চীনের এক সন্তান নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

এক সন্তান নীতি থেকে সরে এসেছে চীন
এক সন্তান নীতি থেকে সরে এসেছে চীন। রয়টার্স

Saturday, April 19, 2025

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য: টানাপড়েনে ক্ষতিগ্রস্ত কারা?

বাংলাদেশে বিদেশিদের নিয়ে বিনিয়োগ সম্মেলন চলাকালে গত ৮ই এপ্রিল হুট করে দুই দেশের মধ্যকার ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয় ভারত। ফলে ভারতীয় বন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে পণ্য রপ্তানির সুবিধা হারায় বাংলাদেশ। অন্যদিকে গত মঙ্গলবার ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ করেছে বাংলাদেশ। এতদিন বেনাপোল, ভোমরা, সোনামসজিদ, বাংলাবান্ধা, বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানির সুযোগ ছিল। প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশ-ভারতের বাণিজ্যে টানাপোড়নে, ক্ষতিগ্রস্ত কারা? আর লাভবান হচ্ছে কারা? প্রতিবেশী দেশের এমন একতরফা পদক্ষেপকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

যদিও বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেছেন, ভারত হঠাৎ করে ট্রান্সশিপমেন্ট বাতিল করলেও বাংলাদেশের সমস্যা হবে না। তবে ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট বাতিলে বাংলাদেশি পণ্য পরিবহন খরচ দুই হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। আমরা যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছি তাতে এ খরচ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে একসময় মাইনাস টাকায়ও নিতে পারবো। বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা হয়েছে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আমরা সংকট কাটানোর চেষ্টা করবো।

অবশ্য ট্রান্সশিপমেন্ট বাতিল ইস্যুতে বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, ভারতের বন্দরগুলোতে যানজট তৈরি হচ্ছে। ওই জট কাটাতেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
ট্রান্সশিপমেন্ট হলো- এমন একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া, যেখানে একটি দেশ তার পণ্য সরাসরি গন্তব্য দেশে না পাঠিয়ে মাঝপথে অন্য একটি দেশের বন্দর ব্যবহার করার মাধ্যমে রপ্তানি করে। একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পণ্য আমদানিও করা হয়। ২০২০ সালের ২৯শে জুন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তি হয়। কিন্তু গত ৮ই এপ্রিল একতরফাভাবে সেই চুক্তি বাতিল করে ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অব ইনডাইরেক্ট ট্যাক্সেস অ্যান্ড কাস্টমস (সিবিআইসি)।

কতটা ক্ষতি হবে বাংলাদেশের?
বিশ্লেষকরাও বলছেন, ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বন্ধ হওয়ায় বাংলাদেশের তেমন কোনো সমস্যা হবে না। কারণ, বাংলাদেশ এই সুবিধা খুব বেশি ব্যবহার করতো না। তাছাড়া, বাংলাদেশ ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানেই বেশি পণ্য রপ্তানি করে। ভারত বলেছে, এই দুই দেশে পণ্য রপ্তানিতে ট্রান্সশিপমেন্ট বাতিলের প্রভাব পড়বে না। মূলত, ভারতের বিমানবন্দর ব্যবহার করে ইউরোপ-আমেরিকায় তৈরি পোশাকসহ ‘সামান্য কিছু পণ্য’ রপ্তানি করতো বাংলাদেশ। এখন সেই সুবিধাটুকুই বন্ধ।

কার্গো বন্ধের প্রভাব
ঢাকা থেকে ইউরোপগামী এয়ার কার্গোর স্পট রেট কেজিপ্রতি ৬.৩০ ডলার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬.৫০ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠাতে এখন কেজিপ্রতি ৭.৫০ থেকে ৮ ডলার গুনতে হচ্ছে, যেখানে ২০২৪ সালের আগস্টে এই রেট ছিল ৬.৯১ ডলার। অন্যদিকে কলকাতা থেকে কেজিতে এই খরচ মাত্র ৪ ডলার এবং মালদ্বীপ থেকে ৩.৫০ ডলার। রপ্তানিকারকদের এখন বাড়তি চার্জও গুনতে হচ্ছে। এসব চার্জের মধ্যে রয়েছে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য কেজিতে ২.৫০ টাকা, স্ক্যানিংয়ের জন্য কেজিতে ২ টাকা, আর ওয়্যারহাউজ স্টোরেজের ভাড়ার জন্য কেজিতে দৈনিক ২৫ পয়সা।
টিএডি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশিকুর রহমান তুহিন বলেন, ব্যবসা পরিচালনার খরচ বেড়ে যাবে, লিড টাইম বাড়বে, এবং আমাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে আসবে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস এক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিজিএপিএমইএ) সভাপতি মো. শাহরিয়ার বলেন, ইইউতে কেজিতে প্রায় ৬ ডলার খরচে পণ্য পাঠাতে পারছেন। কিন্তু ফরোয়ার্ডাররা জানিয়েছেন, খরচ আরও বাড়বে। সরকার যদি অবিলম্বে বাড়তি কার্গো সার্ভিস চালু না করে এবং বিমানবন্দরের জট না কাটায়, প্রধান বাজারগুলো থেকে আমরা ছিটকে পড়বো।

কারা লাভবান আর কারা ক্ষতিগ্রস্ত?
মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে সুতা আনা বন্ধ হবে। এতে স্থানীয় শিল্প সুরক্ষা পাবে। আবার ভারত থেকে সমুদ্রপথে সুতা আমদানি করলে আর্থিকভাবে লাভ হবে। আবার স্থলপথের চেয়ে সমুদ্রপথে সময় খুব বেশি লাগবে না।
ভারত থেকে সুতা আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা ও কম মূল্যে সুতা রপ্তানির অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশের বস্ত্র খাতের ব্যবসায়ীরা। অর্থাৎ স্থলসীমান্তে বাংলাদেশ কাস্টমসে যে পরিমাণ সুতা আমদানির কথা বলা হয়, এর চেয়ে বেশি সুতা দেশে আসে। লোকবলের অভাবে সশরীরে পরিদর্শন করার সক্ষমতা কম কাস্টমস কর্তৃপক্ষের। এই সুযোগে ৩০ কাউন্টের সুতার চালানের ভেতরে ৮০ কাউন্টের সুতা আনার অভিযোগও আছে।
সুতার সূক্ষ্মতা ও স্থূলতা পরিমাপ হয় কাউন্ট দিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশের স্থলবন্দরে সুতার সূক্ষ্মতা ও স্থূলতা মাপার পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি নেই। কয়েক বছর আগে বেনাপোল স্থলবন্দরে সুতার সূক্ষ্মতা ও স্থূলতা পরিমাপের জন্য যন্ত্রপাতি বসালেও দুই মাসের মাথায় তা অকেজো হয়ে যায়।

জানা গেছে, ভারতের কর্ণাটক, তামিলনাড়ু ও গুজরাট থেকে বাংলাদেশে সুতা আসে। সড়কপথে সুতা আসতে ১০-১২ দিন সময় লাগে। অন্যদিকে, চেন্নাই সমুদ্রবন্দর থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত আসতে সময় লাগে দুই সপ্তাহের মতো। আর সমুদ্রপথে পণ্য এলে তিন-চারদিন বেশি সময় লাগে। কিন্তু জাহাজে সুতা আনলে ভাড়া ১০ শতাংশ কম পড়ে।

ভারত হয়ে কতো কার্গো যেতো?
ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার ও পোশাক রপ্তানিকারকদের তথ্যমতে, বাংলাদেশের সাপ্তাহিক এয়ার কার্গোর প্রায় ১৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬০০ টন, ভারতের বিমানবন্দর দিয়ে পরিবাহিত হতো। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ৪৬২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ৩৪ হাজার ৯০০ টনের বেশি পোশাকপণ্য ভারত হয়ে যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ ৩৬টিরও বেশি দেশে পাঠানো হয়।

বাংলাদেশের কার্গো হ্যান্ডলিং ক্ষমতা
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা সীমিত। ২০২৪ সালে এই বিমানবন্দরে প্রায় ২ লাখ টন রপ্তানি পণ্য এবং প্রায় ৫০ হাজার টন আমদানি পণ্য প্রক্রিয়াজাত হয়। এসব পণ্য বহনকারী প্রধান এয়ারলাইনের মধ্যে রয়েছে- এমিরেটস এয়ারলাইন্স, কাতার এয়ারওয়েজ, টার্কিশ, সৌদিয়া, ইতিহাদ ও বিমান বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট কম এবং কার্গো চাহিদা কম থাকায় দেশের বাকি দু’টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর- সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-নগণ্য পরিমাণ কার্গো হ্যান্ডলিং করেছে।

সমাধান কিভাবে?
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাবেক পরিচালক কাজী ওয়াহিদুল আলম মনে করেন, দ্রুততম সমাধান নির্ভর করছে ঢাকা বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালু করা এবং স্বল্পমেয়াদে কোনো তৃতীয় পক্ষের অপারেটরকে নিয়োগ দিয়ে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের উপযুক্ত করে তোলা। তিনি বলেন, থার্ড টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা তিন গুণ হয়ে বছরে ৫.৪৭ লাখ টনে উন্নীত হতে পারে। ঢাকা বিমানবন্দরের তিনটি স্ক্যানিং মেশিনের মধ্যে একটা প্রায় সবসময়ই অকেজো থাকে। মেশিনটি জরুরি ভিত্তিতে ঠিক করা দরকার।  

উল্লেখ্য, স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ করার দাবি অনেক দিনের। গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে অন্যতম বস্ত্র খাতের অন্যতম কাঁচামাল সুতা আমদানি বন্ধের দাবি জানায় বস্ত্রশিল্পমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এসোসিয়েশন (বিটিএমএ)।  

mzamin

Thursday, March 13, 2025

তিন মাসে প্রায় ৫ হাজার কোটিপতি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বেড়েছে

অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে অর্থাৎ গত তিন মাসে ব্যাংকগুলোতে কোটিপতি অ্যাকাউন্ট বা হিসাবধারীর সংখ্যা বেড়েছে ৪ হাজার ৯৫৪টি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অস্থিরতায় অনেকেই ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিতে থাকেন। ফলে কমে যায় কোটিপতিদের সংখ্যা। তবে দেশের মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা কমে আসতে শুরু করায় মানুষের হাতে থাকা অর্থ ব্যাংকে ফিরতে শুরু করেছে। ফলে কোটিপ্রতি হিসাবধারী সংখ্যা বাড়ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট অ্যাকাউন্টের (হিসাব) সংখ্যা ১৬ কোটি ৩২ লাখ ৪৭ হাজার ৫৩২টি। এসব হিসাবে মোট আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭১১ কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে মোট অ্যাকাউন্টের (হিসাব) সংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ২০ লাখ ২৮ হাজার ২৫৫টি। এসব হিসাবে জমা ছিল ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। সেই অনুযায়ী তিন মাসে ব্যাংক খাতের হিসাব সংখ্যা বেড়েছে ১২ লাখ ১৯ হাজার ২৭৭টি আর আমানতের পরিমাণ বেড়েছে ৪৫ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোটি টাকার হিসাব মানেই কোটিপতি ব্যক্তির হিসাব নয়। কারণ ব্যাংকে এক কোটি টাকার বেশি অর্থ রাখার তালিকায় ব্যক্তি ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। আবার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কতটি ব্যাংক হিসাব খুলতে পারবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। ফলে এক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির একাধিক অ্যাকাউন্টও রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কোটি টাকার হিসাবও রয়েছে।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ডিসেম্বর শেষে এক কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৮১টি। তিন মাসে আগে (সেপ্টেম্বর শেষে) ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার ১২৭টি। সে হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে কোটিপতি হিসাব সংখ্যা বেড়েছে ৪ হাজার ৯৫৪ টি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে দেশে কোটি টাকার আমানতকারী ছিলেন মাত্র ৫ জন। ১৯৭৫ সালে তা বেড়ে ৪৭ জনে উন্নীত হয়। ১৯৮০ সালে কোটি টাকার হিসাবধারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৮টি। ১৯৯০ সালে কোটি টাকার হিসাবধারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৪৩টি, ১৯৯৬ সালে ২ হাজার ৫৯৪টি, ২০০১ সালে ৫ হাজার ১৬২টি, ২০০৬ সালে ৮ হাজার ৮৮৭টি এবং ২০০৮ সালে ছিল ১৯ হাজার ১৬৩টি।

২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৩ হাজার ৮৯০টি, ২০২১ সালের ডিসেম্বর বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৯৭৬টিতে। এরপর ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কোটি টাকার হিসাবধারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ ৯ হাজার ৯৪৬টি, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দাঁড়ায় এক লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টিতে এবং গত জুনে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ ১৮ হাজার ৭৮৪টিতে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সেই হিসাবের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৭ হাজার ১২৭টিতে। আর সবশেষ ডিসেম্বর শেষে কোটি টাকার হিসাবধারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৮১টি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি আমানতকারী ছিল ৫ জন, ১৯৭৫ সালে তা ৪৭ জনে উন্নীত হয়। ১৯৮০ সালে কোটিপতি হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল ৯৮টি। এরপর ১৯৯০ সালে ৯৪৩টি, ১৯৯৬ সালে ২ হাজার ৫৯৪ জন, ২০০১ সালে ৫ হাজার ১৬২টি, ২০০৬ সালে ৮ হাজার ৮৮৭টি এবং ২০০৮ সালে ছিল ১৯ হাজার ১৬৩টি।

২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে কোটি টাকা আমানতকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৩ হাজার ৮৯০টি। ২০২১ সালের ডিসেম্বর বেড়ে তা দাঁড়ায় ১ লাখ ১৯৭৬টিতে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই হিসাবের সংখ্যা ছিল এক লাখ ৯ হাজার ৯৪৬টি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দাঁড়ায় এক লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টিতে। গত বছরের জুনে এমন হিসাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ ১৮ হাজার ৭৮৪টিতে, সেপ্টেম্বরে এক লাখ ১৭ হাজার ১২৭টিতে এবং ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ২২ হাজার ৮১টিতে।

mzamin

Saturday, February 22, 2025

রড ও সিমেন্টের দাম কমায় শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা by আরিফুল ইসলাম

৫ই আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। থমকে আছে বিভিন্ন খাতের ব্যবসা। এই হাওয়া লেগেছে রড-সিমেন্ট শিল্পেও। বিগত সরকারের সময়ে নেয়া একাধিক মেগা প্রকল্পকে কেন্দ্র করে রমরমা ব্যবসা করতেন রড-সিমেন্ট শিল্পের ব্যবসায়ীরা। পট পরিবর্তনের পর বন্ধ হয়ে গেছে বিগত সরকারের নেয়া অনেক প্রকল্প। এছাড়া ১৬ বছরের একচেটিয়া শাসনব্যবস্থার ফলে দেশের মধ্যে সরকার সমর্থিত বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিরা তাদের বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করতেন। বর্তমানে সে সবের কাজও বন্ধ হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় বিপাকে পড়েছেন রড-সিমেন্ট শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা। নির্মাণশিল্পের ভরা মৌসুমেও ক্রেতাদের কাছ থেকে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সাড়া। এতে চাহিদা ও উৎপাদন দু’টোই নিম্নমুখী। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি বড় এবং মাঝারি নির্মাণ প্রকল্প বন্ধ থাকা, নতুন করে প্রকল্প শুরু না করার প্রভাব পড়েছে এ খাতে। অবস্থা এমন চলতে থাকলে চরম সংকটে পড়বে এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। সরজমিন রাজধানীর গ্রীন রোড, কাওরান বাজার, কাঁঠালবাগান এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

গ্রীন রোডে আমিন এন্টারপ্রাইজের মালিক স্বপন বলেন, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর রড-সিমেন্টের বাজারে প্রভাব পড়েছে। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা বেশির ভাগ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করতেন। রড-সিমেন্টেরও বড় একটা অংশ সরকারি প্রকল্পের কাজেই ব্যবহার হয়। এজন্য আগের থেকে বিক্রি এখন অনেক কম। জননী এন্টারপ্রাইজের নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, স্থায়ী কোনো সরকার না আসা পর্যন্ত স্থিতিশীলতা বা পরিবর্তন হবে না। আগের থেকে বিক্রি কমেছে। নতুন কোনো নির্বাচিত সরকার এলে অবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা করছি।

জানা গেছে, সিমেন্ট খাতের উৎপাদন সরকারি নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। দেশের বিভিন্ন মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ। যেসব প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে সেগুলো গত ৫ই আগস্টের পর বন্ধ রয়েছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সিমেন্ট খাতে। এ ছাড়া রডের দাম টনপ্রতি ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা কমেছে। রডের পাশাপাশি সিমেন্টের দামও বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) ১০ থেকে ১৫ টাকা কমেছে। চাহিদা না বাড়লে রড-সিমেন্টের দাম আরও কমবে বলে আশঙ্কা মিলমালিকদের। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অবকাঠামো খাত সবচেয়ে নাজুক সময় পার করছে। চলমান প্রকল্পের কাজে ধীরগতির পাশাপাশি বিগত ছয় মাসে নতুন কোনো মেগা প্রকল্পের অনুমোদন হয়নি। আগের প্রকল্পগুলোয় বিক্রি করা পণ্যের দামও মেটাতে পারছে না অনেক প্রতিষ্ঠান। ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে অনেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের খোঁজ মিলছে না। আবার সরকারি প্রকল্পের বিল আটকে থাকায় পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বকেয়া পরিশোধ করতে পারছেন না অনেকে। এদিকে গত এক বছর ডলারের মূল্য ক্রমাগত বৃদ্ধির কারণে বাড়তি দামে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অথচ দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন উৎপাদকরা। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত ইস্পাত শিল্পকে নিয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া না হলে এর সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, গত দুই মাসে কোম্পানি ভেদে ইস্পাতের বিক্রি কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ। পাশাপাশি সিমেন্টের বিক্রি কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। এর প্রধান কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা উল্লেখ করছেন সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ থাকাকে। কারণ, দেশের মোট ১ লাখ ২০ হাজার টন উৎপাদিত ইস্পাতের প্রায় ৬৫ শতাংশ ব্যবহৃত হয় সরকারি প্রকল্পে। সামপ্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতায় সিমেন্টের চাহিদা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে। সিমেন্ট খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদা কম থাকায় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দাম আরও নিম্নমুখী হতে পারে। সিমেন্ট ও ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে সরকারের বেশির ভাগ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বেসরকারি আবাসন শিল্পেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এরই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাজারে।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের তথ্য অনুসারে, দেশের কোম্পানিগুলোর রড উৎপাদনে সক্ষমতা ১ কোটি ২০ লাখ টন। বছরে সর্বোচ্চ চাহিদা ৬৫ লাখ টন। এর মধ্যে ৬০ শতাংশই ব্যবহার হয় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে। বাকি ৪০ শতাংশ বেসরকারি ও ব্যক্তিগত অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার হয়। বর্তমানে চাহিদা কমে ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। সবচেয়ে বেশি চাহিদা কমেছে সরকারি প্রকল্পে। এখানে রডের চাহিদা ২০ শতাংশের নিচে নেমে আসায় দামও ধারাবাহিকভাবে কমছে।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স এসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মো. শামসুল আলম খান বলেন, আমাদের স্টিল শিল্পের ভৌত অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে হয়ে থাকে। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের উপর বড় ধরনের চাহিদা থাকে রড শিল্পে। প্রকল্পগুলোর কাজের মন্থরগতি ও স্থবিরতা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে আগের তুলনায় ব্যবসা- বাণিজ্য অনেকটা কমেছে।

mzamin

Tuesday, January 28, 2025

কম দামে হাতে বানানো চামড়ার জুতা পাওয়া যাবে যেখানে by এম এ হান্নান

অনেকক্ষণ ধরে খুঁজছি, পাচ্ছি না। ভাবলাম, নেমে যাই। এরপর দেখি আশপাশে জিজ্ঞেস করে। জিগাতলায় জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের গলির মুখে এসে ভাড়া চুকিয়ে রিকশা থেকে যেই নামতে যাব, আমাদের কথা বুঝতে পেরে রিকশাওয়ালা মামা বললেন, ‘চলেন, আপনাগো এক্কেবারে জুতার কারখানার সামনেই দিয়া আহি।’ সামনের আরও দুটি গলি পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম হাতে বানানো জুতার রাজ্যে। ঠিকানা মূলত ধানমন্ডি ৮/এ, কিন্তু লোকে এখনো ধানমন্ডি পুরোনো ১৫ নম্বর রোড বলেই অভ্যস্ত। পরপর বেশ কটি দোকান—দ্য নিউ সঞ্জীব শুজ, জোনাকি শুজ, নিউ বাবুল শু অ্যান্ড লেদার ক্র্যাফট, গোলাপ শুজ, অপর্ণা শুজ, নিউ রোড স্টার শুজ, আবদুল্লাহ ফুট ওয়্যারসহ আরও কত কি নামের জুতার দোকান। রাস্তার পাশেই দোকান। দোকানে স্তরে স্তরে সাজানো জুতা। কোনো দোকানে ক্রেতার অর্ডার নেওয়া হচ্ছে, কোনো দোকানে অর্ডারের জুতা বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কোনোটায় আবার নকশা অনুযায়ী জুতা বানানো নিয়ে ক্রেতা–বিক্রেতায় চলছে আলাপ।

নিউ বাবুল শু অ্যান্ড লেদার ক্র্যাফটে আসল চামড়ায় পছন্দসই জুতা বানাতে উত্তরা থেকে ছুটে এসেছেন তাহসিন আহমেদ খান। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী ঘোড়া চালাতে পারদর্শী। ঘোড়ায় চড়ার সময় গায়ে থাকে বিশেষ পোশাক আর পায়ে বিশেষ জুতা, নাম ‘কাউবয় বুট’। উঁচু হিলের এই কাউবয় বুট উঠে যায় একেবারে হাঁটু পর্যন্ত। এক হাতে সঙ্গে আনা কাউবয় বুট, অন্য হাতে মুঠোফোনে থাকা পছন্দের নকশা দেখিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেন কেমন ধরনের কাউবয় বুট চান।

বাবুল শুজের বর্তমান ব্যবস্থাপক গণেশ রবিদাস জানালেন, এমন এক জোড়া কাউবয় বুট তৈরি করতে তাহসিনকে গুনতে হবে ১৫ হাজার টাকা। তবে আজকে দোকানের প্রথম ক্রেতা বলে দুই হাজার টাকা ছাড় পেলেন তাহসিন। ফলে ১৩ হাজার টাকায় পেয়ে যাচ্ছেন পছন্দসই টেকসই নতুন এক জোড়া কাউবয় বুট।

তাহসিনের মতো শুধু উত্তরা থেকেই নয়, টঙ্গী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা, সিলেটসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে পশ্চিম ধানমন্ডির এই পুরোনো ১৫ নম্বর রোডে ফরমাশ নিয়ে আসে লোকজন।

জুতার কারিগরদের আস্তানা

রাস্তার সারি সারি জুতার দোকানের ঠিক পেছনেই কারখানা, বন্ধ ঘরে নিপুণ হাতে সকাল-সন্ধ্যা কাজ করে চলেছেন কারিগরেরা। নিউ সঞ্জীব শুজের কারখানার ছোট্ট ঘরের তিন প্রান্তে তিনজন কাজ করছেন। পাকা ঘরটার মেঝে থেকে ছয় ফুট কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠলে মেলে আরেকটি মেঝে, সেখানেও কাজ চলছে।

বাবু রবিদাসের সঙ্গে কথা হলো। ১৯৫৪ সাল থেকে জুতা বানানোর কাজ করছেন ৯০ বছর বয়সী এই কারিগর। রবি দাস জানান, কয়েকটি ধাপে জুতা বানানোর কাজ চলে।

প্রথম ধাপে, ওপরের মেঝেতে নির্দিষ্ট মাপের চামড়া কেটে তৈরি করা হয় একেক জোড়া জুতার মাপ। চামড়ার এই অংশকে বলে ‘আপার অংশ’। শংকর, প্রদীপ আর হীরা নামের তিন কারিগর এই কাজ করেন।

দ্বিতীয় ধাপে বাবু রবিদাস ও স্বপন রবিদাস বাবলা কাঠের ছাঁচে (ডাইস) আপার অংশ বসিয়ে হাতুড়ি, পেরেক সহযোগে জুতার মূল কাঠামো গড়ে দেন। একেক নকশার জুতার জন্য একেক রকমের ছাঁচ। স্বপন রবিদাস জানান, কিছুদিন আগেই বংশাল থেকে ২৬ জোড়া নতুন ছাঁচ বানিয়ে এনেছেন। প্রতি জোড়া ১ হাজার ৫০০ টাকা করে। এখনো অনেক ছাঁচ ঘরের দেয়ালজোড়া তাকে তুলে রাখা আছে। নির্দিষ্ট নকশা ও গড়নের জুতার চাহিদা ফুরিয়ে গেলে সেসব ছাঁচও অচল হয়ে পড়ে। এ মাসের শুরুতেই অকেজো হয়ে পড়া দুই ট্রাক ছাঁচ ফেলে দিতে হয়েছে।

তৃতীয় ধাপে জুতার গায়ে রং ও ফিনিশিংয়ের কাজ করেন দিলীপ রবিদাস।

ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়ার আগে কমপক্ষে তিন দিন ধরে শুকানো হয় জুতার রং।

যে ধরনের জুতা বানানো যাবে

বানানো যাবে ফরমাল শু, হাফ শু, ক্যাজুয়াল শু, লোফার, চেলসি বুট, কাউবয় বুট, নাগরা, স্নিকার, কেডসসহ রং ও নকশা অনুযায়ী যেকোনো রকমের চামড়ার জুতা। স্যান্ডেল সাধারণত বানানো হয় না। ১২ জোড়া বা তার বেশি ফরমাশ এলে স্যান্ডেল জুতা বানানোর অর্ডার নেয় এখানকার সব কটি দোকান। এসব দোকানে নারী ও ১০ বছরের নিচের বয়সী শিশুদের জুতা বানানোর চল নেই।

বাজারে নামকরা সব ব্র্যান্ড থাকতেও কেন কারিগরের হাতে বানানো দোকানে ফরমাশ আসে? এমন প্রশ্নের উত্তরে গণেশ রবিদাস জানান, প্রথমত, আসল চামড়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। বাজারে নির্দিষ্ট কিছু আকারের বাইরের জুতা পাওয়া মুশকিল। এখানে আছে পায়ের মাপ অনুযায়ী জুতা বানানোর সুযোগ। আবার দেখা গেল আকার মিললেও জুতার রং নকশা পছন্দ হচ্ছে না। এখানে পাচ্ছেন পছন্দের রং ও নকশায় জুতা বানিয়ে নেওয়ার সুযোগ।

জন্মগতভাবে কারও কারও পায়ের সমস্যা থাকতে পারে, এক পা ছোট তো অন্য পা বড়, কোনো পায়ে পাঁচ তো কোনো পায়ে ছয় আঙুল। আবার কারও পায়ের পাতা থাকতে পারে বাঁকা। কেউ বা আবার অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পায়ের সমস্যায় ভোগেন। এসব ক্ষেত্রে বাজারে ঘুরে জুতা না মিললেও এখানে মিলবে সেসব জুতা বানিয়ে নেওয়ার সুযোগ। আসল চামড়ায় বানানো জুতার সঙ্গে আছে ওয়ারেন্টি সুবিধা। সব রকম জুতাতেই ছয় মাস থেকে এক বছরের ওয়ারেন্টি–সুবিধা পাবেন। এই সময়ের মধ্যে জুতার সোল ক্ষয়ে যাওয়া ছাড়া সব রকমের সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে।

যেমন খরচ

সাধারণত ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে পছন্দসই জুতা বানানো যায়। কিছু কিছু জুতার ক্ষেত্রে জুতার গঠন, নকশা ও হাতের কাজের বাড়তি সংযোজনের জন্য দাম ১৫ হাজার থেকে ১৮ হাজারেও গিয়ে ঠেকে।

যেখানে যেখানে মিলবে এমন দোকান

হাজারীবাগের পরে হাতে বানানো জুতার দোকান সবচেয়ে বেশি আছে পুরান ঢাকার দিকে। পুরান ঢাকার সিদ্দিক বাজার, আলু বাজার, বংশাল, মালিটোলা, মোগলটুলীসহ ধানমন্ডির পুরোনো ১৫ নম্বর রোড, মিরপুর ১০, ১১, ১২, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, পান্থপথ, মৌচাক মার্কেটের নিকটবর্তী সিদ্ধেশ্বরী রোড, টিকাটুলি কালীমন্দিরের পাশেসহ ঢাকার অনেক জায়গাতেই পেয়ে যাবেন কারিগরের হাতে বানানো চামড়ার জুতা।

সাধারণত ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে পছন্দসই জুতা বানানো যায়
সাধারণত ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে পছন্দসই জুতা বানানো যায় ছবি: কবির হোসেন

Wednesday, December 4, 2024

অর্থ পাচার করে একটি দেশের অর্থনীতি যেভাবে শুকিয়ে ফেলা হয়েছে: নিউইয়র্ক টাইমস

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের হিসাবে, শেখ হাসিনার গত ১৫ বছরের শাসনামলে কেবল বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থা থেকেই ১৭ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। তবে অন্যান্য অর্থনীতিবিদের হিসাবে, শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, তা ৩০ বিলিয়ন বা ৩ হাজার কোটি ডলারের বেশি হতে পারে।

নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাচার হওয়া টাকার প্রকৃত পরিমাণ কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। বিভিন্ন ধরনের আর্থিক হিসাব-নিকাশ করে আহসান মনসুর বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে তাঁর সহযোগীরা বাংলাদেশের ব্যাংক খাত থেকে যে পরিমাণ অর্থ লুট করেছে, তা কার্যত পৃথিবীর আর্থিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এতে বাংলাদেশের অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।

মার্কিন এই সংবাদমাধ্যমের অনলাইন সংস্করণে আজ বুধবার এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সাক্ষাৎকার কবে নেওয়া হয়েছে তা নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়নি। তবে চলতি সপ্তাহে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি–বিষয়ক শ্বেতপত্র কমিটি বলেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে সার্বিকভাবে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়েছে।

আহসান মনসুর নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ বুঝতে পেরেছিল, লুটপাট করার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা হচ্ছে ব্যাংক। এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো শত শত কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বিভিন্ন কোম্পানিকে ঋণ দিয়েছে, যে কোম্পানিগুলোর অনেকগুলোর অস্তিত্বই নেই। এই টাকাও কখনো সম্ভবত ব্যাংকে ফিরে আসবে না; এই অর্থের একটি বড় অংশ দেশ থেকে অবৈধভাবে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হওয়ার আগে ২৭ বছর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) কাজ করছেন আহসান মনসুর। তিনি বলেন, ব্যাংকের পুরো পরিচালনা পর্ষদ হাইজ্যাক করা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, বিশ্বের অন্য কোনো দেশে সরকারের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ এভাবে গুন্ডা–মাস্তানদের সহযোগিতায় পুরো ব্যাংক খাতে এমন পদ্ধতিগতভাবে ডাকাতি করেছে, এমন ঘটনা তিনি আর কোথাও দেখেননি।

সংবাদে বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে এখনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পালা চলছে, গণসহিংসতাও দেখা যাচ্ছে। অর্থনীতি প্রসঙ্গে আহসান মনসুর বলেন, আগামী বছর অর্থনীতির আকাশে আরও ঝড় উঠবে; এরপর অর্থনীতির আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করবে।

শেখ হাসিনা ভারতের পালিয়ে গেছেন। তাঁর ভাগ্যে কী আছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার বলেছে, তাঁকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। এর মধ্যে শেখ হাসিনার অন্যতম সহযোগী সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের তদন্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের নির্বাহী পরিচালক এ কে এম এহসান। সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে এখনো অভিযোগ গঠন করা হয়নি। তবে আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেছেন, হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ‘উইচ হান্ট’ করা হচ্ছে, তিনি তার বাইরে নন।

নিউইয়র্ক টাইমস শেখ হাসিনা ও সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। ঢাকায় আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় শূন্য পড়ে আছে। এরপর তারা শেখ হাসিনার মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সফল হয়নি।

ইসলামী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল মান্নানের পদত্যাগের ঘটনা সবিস্তারে তুলে ধরেছে নিউইয়র্ক টাইমস। সংবাদে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি আর দশটা সাধারণ দিনের মতো আব্দুল মান্নান কার্যালয়ে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন। পথিমধ্যে তিনি একটি ফোন কল পান। কলটি করেছিলেন সামরিক গোয়েন্দা দপ্তরের প্রধান। তাঁকে বলা হয়, গাড়ির গতিমুখ পরিবর্তন করে তিনি যেন সংস্থাটির সদর দপ্তরে চলে আসেন।

গত অক্টোবর মাসে আব্দুল মান্নান নিউইয়র্ক টাইমসকে সেই ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। কার্যালয়ে যাওয়ার পর সামরিক গোয়েন্দারা আব্দুল মান্নানের ফোন, ঘড়ি ও ওয়ালেট রেখে দেন। এরপর গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান আব্দুল মান্নানের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের বিবরণ দেন; বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে তিনি যে গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের কাছে নিয়ে গেছেন, সে জন্য তাঁর প্রশংসা করেন।

আব্দুল মান্নান ভাবছিলেন, তাঁর সময়টা বোধ হয় বৃথা যাচ্ছে। কিন্তু এরপরই তাঁকে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগের চিঠিতে সই করতে বলা হয়। গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান তাঁকে বলেন, এই আদেশ দেশের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে থেকে এসেছে, অর্থাৎ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু তিনি প্রথমে পদত্যাগ পত্রে সই করতে রাজি হননি। তখন ইসলামের খলিফা ওসমানের কথা মনে হচ্ছিল তাঁর। সপ্তম শতাব্দীতে ঘাতকের আক্রমণের মুখে তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছেন।

কিন্তু এই পর্যায়ে এসে আব্দুল মান্নান আর বলতে পারলেন না। প্রথমত তিনি বলেন, গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাঁকে মৌখিকভাবে রাজি করানোর চেষ্টা করেছেন। এরপর তাঁকে গোয়েন্দা প্রধানের কার্যালয় থেকে আরেকটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।

আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমি যে ধরনের মানুষ, তাতে ওই সময়ে আমাকে যে অপমানজনক পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, তার বিবরণ দেওয়া সম্ভব নয়।’ এরপর তিনি সময়ের হিসাব ভুলে যান এবং একপর্যায়ে জানতে পারেন, দুপুরের আগে আগে তিনি পদত্যাগ পত্রে সই করেছেন। এরপর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং পরবর্তী আট বছর তিনি কার্যত নির্বাসনে ছিলেন; এখন তিনি আবার একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হয়েছেন।

আব্দুল মান্নান ও আহসান মনসুর একই সুরে বলেন, ওই ঘটনার পর এস আলম গোষ্ঠী ইসলামী ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়। এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সাইফুল আলম ট্রেডার হিসেবে ব্যবসা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বিশেষ করে শেখ হাসিনার আমলে জ্বালানি, আবাসন খাতসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি, এস আলম গোষ্ঠী অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত শূন্য করে দেওয়ার চক্রান্ত করেছিল।
হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএফআইইউর নির্বাহী পরিচালক এ কে এম এহসান। ইসলামী ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংক এস আলম গোষ্ঠীর হাতে যাওয়ার পর নামে–বেনামে বিভিন্ন কোম্পানিকে ঋণ দেওয়া হয়েছে, যে ঋণের বড় অংশ আর ফেরত আসেনি। ফলে সেগুলো খেলাপি হয়ে গেছে।

এদিকে এস আলম গ্রুপও বসে নেই। তারা আইনি প্রতিষ্ঠান কুইন ইমানুয়েলের মাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছে। বলেছে, দেশের একটি মাত্র ব্যাংক তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সেটা ইসলামী ব্যাংক নয়। তাদের অভিযোগ, আহসান এইচ মনসুর এস আলম গোষ্ঠীর সঙ্গে নিপীড়নমূলক আচরণ করছেন; এমনকি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে না।

লাইফ সাপোর্টে ব্যাংক খাত

বাংলাদেশে অনেক ব্যাংক এখন লাইফ সাপোর্টে আছে বলে নিউইয়র্ক টাইমসের সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি যেসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ভালো, তারাও সেভাবে ঋণ দিতে পারছে না, এমনকি আমানতকারীদের টাকা সব সময় ফেরত দিতে পারছে না। আমানতকারীদের তারা মাঝেমধ্যে টাকা তোলার সুযোগ দিচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে যে টাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেই টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শেখ হাসিনার দলের অনেক সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের মামলা করা হয়েছে, যে অর্থ মূলত আমদানি–রপ্তানির মাধ্যমে পাচার করা হয়েছে।

এর মাধ্যমে যে কেবল কিছু মানুষের পকেট ভারী হয়েছে তা নয়, এতে বাংলাদেশের মুদ্রার দরপতনও হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে বাংলাদেশ থেকে এই অর্থ পাচারের গতি বাড়তে থাকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে বাংলাদেশের মুদ্রার বড় ধরনের দরপতন হয়। আমদানি মূল্য অনেকটা বেড়ে যায়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের লোডশেডিংয়ের মুখে পড়ে বাংলাদেশ।

অনেক ব্যাংকে নগদ অর্থের সংকট আছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা পুরো বেতন তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন। এমনকি যেদিন বেতন দেওয়া হয়, সেদিন তারা পুরো টাকা তুলতে পারেননি, এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে।

ওষুধ কোম্পানি টেকনো ড্রাগ কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হয়েছে। এই কোম্পানির সহমহাব্যবস্থাপক মাজেদুল করিম নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, নিম্ন আয়ের কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কর্মীরা তাঁর কাছে অভিযোগ করেছেন, ব্যাংক টাকা দিতে পারছে না, সে কারণে কোম্পানি বাধ্য হয়ে নগদ অর্থে মজুরি পরিশোধ করছে। তিনি আরও বলেন, নিজের ডেবিট কার্ড দিয়েও টাকা তোলা যাচ্ছে না।

আহসান মনসুর বলেন, এ বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির বছর নয়, যদিও মূল্যস্ফীতির হার কমে আসছে ও প্রবাসী আয়প্রবাহ বাড়ছে। তিনি আশাবাদী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বাংলাদেশের মুদ্রা স্থিতিশীল করতে আরও তিন বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি ডলার সহায়তা দেবে। ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর।

অর্থ পাচার করে একটি দেশের অর্থনীতি যেভাবে শুকিয়ে ফেলা হয়েছে: নিউইয়র্ক টাইমস

Tuesday, November 26, 2024

মৃত্যুর পর ১৫ হাজার কোটি ডলারের সম্পদের কী হবে, জানিয়েছেন ওয়ারেন বাফেট

মৃত্যুর পর তাঁর বিপুল সম্পদের কী হবে, তা নিয়ে এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা জানিয়েছেন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ওয়ারেন বাফেট। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেছেন যে তিনি অর্থ দান অব্যাহত রাখবেন। ১৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি মূল্যের সম্পদের মালিক বাফেট ফোর্বসের ধনীর তালিকায় এখন ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছেন।

বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান বার্কশায়ার হ্যাথওয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়ারেন বাফেট গতকাল সোমবার শেয়ারহোল্ডারদের কাছে একটি চিঠি লিখেছেন। মৃত্যু নিয়ে তাঁর ভাবনা, তাঁর একসময়ের প্রত্যাশা যে প্রয়াত প্রথম স্ত্রী তাঁর চেয়েও বেশি দিন বাঁচবেন এবং কীভাবে তাঁর বিপুল সম্পদের ভাগ–বাঁটোয়ারা করা হবে, চিঠিতে তিনি এসব সম্পর্কে লিখেছেন।

সিএনএন জানিয়েছে, বাফেটের বয়স এখন ৯৪। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘দিন শেষ সময় জয়ী হয়। কিন্তু সময় চঞ্চলও হতে পারে। কখনো কখনো তা অন্যায্য ও নিষ্ঠুর। জীবনকে কখনো কখনো জন্মেই শেষ করে দেয় কিংবা কিছুদিন পরই। আবার কখনো কখনো শত বছর বা তার চেয়েও বেশি দিন অপেক্ষা করে। আজ পর্যন্ত আমি ভাগ্যবান। কিন্তু বেশি দিন নেই, সে চলে আসবে।’

প্রায় ১৩০০ শব্দের চিঠিতে ওয়ারেন বাফেট লিখেছেন যে তিনি আশা করছেন, তাঁর তিন সন্তান লম্বা সময় ধরে বেঁচে থাকবেন এবং সিদ্ধান্ত নেবেন তাঁদের পিতার সম্পদ আর কোন কোন মানবহিতৈষী কাজে ব্যবহার করা যায়। তাঁর তিন সন্তান হলেন সুজি, হাওয়ার্ড ও পিটার—এরই মধ্যে ষাটের কোটা ছাড়িয়েছেন। কারও কারও বয়স ৭০ ছাড়িয়ে গেছে।

ওয়ারেন বাফেটের যখন মৃত্যু ঘটবে, তখন তাঁর তিন সন্তান সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন, কীভাবে তাঁদের পিতার সম্পদ দান করা হবে। কিন্তু তাঁর সন্তানেরা যদি সম্পদের ভবিষ্যতের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারেন, তাহলে কী হবে, সে সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়েছেন ওয়ারেন বাফেট। সেক্ষেত্রে তিনটি ট্রাস্টি তাঁর সম্পদের সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হবে। তবে এগুলোর নাম তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেননি।

ওয়ারেন বাফেট লিখেছেন, ‘২০০৬ সালে সম্পদ দান করার অঙ্গীকার করার পর আমার সন্তানদের প্রত্যাশিত জীবনকাল আরও হ্রাস পেয়েছে। আমি কখনোই একটি বংশধারা তৈরি করতে চাইনি কিংবা এমন কোনো পরিকল্পনা করিনি, যা আমার সন্তানদের জীবনকালকে অতিক্রম করে যাবে।’

চিঠিতে মার্কিন এই ধনী ঘোষণা করেছেন যে তিনি তাঁর কোম্পানির ১ হাজার ৬০০ ‘ক্লাস এ’ শেয়ার ২৪ লাখ ‘ক্লাস বি’ শেয়ারে রূপান্তরিত করছেন। পরিবর্তিত এই শেয়ারের বিপরীতে ভোট কম দেওয়ার অধিকার থাকবে।

রূপান্তরিত এসব শেয়ারের মধ্যে ১৫ লাখ শেয়ার সুজান টমসন বাফেট ফাউন্ডেশনে যাবে। প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করা হয়েছে বাফেটের প্রয়াত প্রথম স্ত্রীর নামে। এ ছাড়া তিন লাখ শেয়ার দেওয়া হবে তিনটি অন্য ফাউন্ডেশনে। এই ফাউন্ডেশনগুলোর নেতৃত্বে আছেন বাফেটের সন্তানেরা। এসব শেয়ারের মোট মূল্য ১২০ কোটি ডলার।

ওয়ারেন বাফেট প্রতিবছর তাঁর চারটি পারিবারিক ফাউন্ডেশনে দান করে থাকেন। এর পাশাপাশি তাঁর অর্থ যায় বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনে। ২০০৬ সালে তিনি অঙ্গীকার করেন যে ধীরে ধীরে তিনি তাঁর সম্পদ দান করে দেবেন। ব্লুমবার্গের হিসাবে, তাঁর সম্পদের পরিমাণ অন্তত ১৫ হাজার কোটি ডলার।

এই আইকনিক বিনিয়োগকারী একসময় বলেছিলেন যে তিনি জীবিত অবস্থায় যতটা সম্ভব দান করছেন, বাকি অর্থ বিতরণ করা হবে তাঁর মৃত্যুর পর।

যেসব পিতা-মাতার বিপুল সম্পত্তি রয়েছে, কিন্তু তাঁরা পরে মারা যাবেন, তাঁদের জন্যও কিছু উপদেশ দিয়েছেন ওয়ারেন বাফেট। তিনি লিখেছেন, ‘আপনার সন্তানেরা যখন বড় হবেন, তাঁদেরকে আপনার উইল পড়তে দিন এবং তারপর তাতে সই করুন। নিশ্চিত হন যে তাঁরা যেন আপনার যুক্তি এবং আপনার মৃত্যুর পর তাঁদের ঘাড়ে যে দায়িত্ব পড়বে, এই দুটি বিষয়ই বুঝতে পারেন।’

ওয়ারেন বাফেট
ওয়ারেন বাফেট। ছবি: রয়টার্স

Sunday, November 17, 2024

রাষ্ট্রের মেরামত না হলে সংস্কার করে লাভ হবে না: ড. দেবপ্রিয়

বেরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ও অর্থনীতির শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, রাষ্ট্রের মেরামত যদি না হয়, দুই পয়সার সংস্কার করে কোনও লাভ হবে না। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা না গেলে, সংস্কারের পথে এগোনো সম্ভব নয়। শনিবার রাজধানীর মহাখালীতে ‘পলিসি ডায়ালগ অন ফিন্যান্সিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক রিফর্মস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি সৈয়দ ফরহাত আনোয়ারের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

দেবপ্রিয় বলেন, মাসোহারা দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে লোক রাখা হয়েছিল। তারা টাকা ছাপিয়েছে, ভুয়া রিজার্ভ দেখিয়েছে। ব্যাংক চালানোর মতো যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও এমন ব্যক্তিকে ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের দুটো কিডনি। একটি ফিন্যানসিয়াল সেক্টর, আরেকটি এনার্জি সেক্টর। দুটোই খেয়ে ফেলেছে বিগত সরকার। যারা এনার্জি সেক্টর খেয়েছে, তারাই আবার ফিন্যানসিয়াল সেক্টর খেয়েছে। আমরা মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ে আছি। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার পর, যদি দ্রুত সংস্কার না করা যায় তাহলেও এগোনো সম্ভাবনা হবে না বলেও মন্তব্য করেন সিপিডির এই বিশেষ ফেলো।

উন্নয়নের বয়ানের ব্যবস্থা করা না গেলে এগোনো সম্ভব নয় জানিয়ে দেবপ্রিয় বলেন, বিগত সরকারের আমলে প্রবৃদ্ধির তথ্য ও উপাত্তে মারাত্মক সমস্যা ছিল। তথ্যে রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ছাড়া প্রবৃদ্ধি দেখানো হয়েছে, যেখানে ট্যাক্স জিডিপি বাড়েনি। ট্যাক্স নাই, বিনিয়োগ নাই আর দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখাতে গিয়ে সামাজিক উন্নয়ন, স্বাস্থ্য শিক্ষায় গুরুতর অবমূল্যায়ন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংককে ডিজিটালাইজ করতে হবে, অর্থনৈতিক লেনদেনে স্বচ্ছতা আনতে হবে উল্লেখ করে সেমিনারে এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ লিমিটেডের (এবিবি) চেয়ারম্যান সেলিম আর এফ হোসাইন বলেন, সরাসরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অর্থনৈতিক সেক্টরে লুটপাট হয়েছে। যেখানে ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিবিদরা জড়িত ছিলেন।

অর্থনৈতিক সংস্কার ছাড়া কোনো উপায় নেই উল্লেখ করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কমিশনার ফারজানা লালারুখ বলেন, বিএসইসি মার্কেট রিফর্ম করতে চায়। বর্তমান মার্কেটকে উল্লেখযোগ্য জায়গায় নিয়ে যেতে কাজ করছি।

mzamin

Tuesday, November 12, 2024

সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছেন বিনিয়োগকারীরা

নিরাপদ বিনিয়োগের উৎস হিসেবে বিবেচিত সঞ্চয়পত্রে আবার ঝুঁকছে সাধারণ মানুষ। ফলে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে এ খাতে নিট বিক্রি (বিনিয়োগ) ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকারও বেশি। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এ খাতে নিট বিক্রি দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকা, যা পুরো অর্থবছরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৫৪ শতাংশ। উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে গত বছরও সঞ্চয়পত্র ভেঙে ফেলার প্রবণতা দেখা গেলেও সমপ্রতি এর বিক্রি বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর পরিচালন ব্যয় অনেক কমেছে। এর অন্যতম কারণ মন্ত্রী, এমপিসহ অনেকের পেছনে আগের মতো আর নিয়মিত ব্যয় হচ্ছে না। আবার এখন যেকোনো খরচ করার ক্ষেত্রে জবাবদিহি বাড়ানো হয়েছে। এসব কারণে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে আগের সরকারের যে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল তা কমছে। এ ছাড়া আস্থার সংকটে দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আমানত তুলে নেয়ার প্রবণতা অব্যাহত আছে। সেই আমানতের একটা অংশ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হিসেবে আসছে। আবার সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর প্রবণতাও কমেছে। শেয়ারবাজারেও দুর্দিন চলছে। সব মিলিয়ে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। উল্লেখ্য, সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগ সরকারের ঋণ হিসেবে গণ্য হয়। এটা বাজেট ঘাটতির অর্থায়নে ব্যবহার করে সরকার।

নিম্ন মধ্যবিত্ত, সীমিত আয়ের মানুষ, মহিলা, প্রতিবন্ধী ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সঞ্চয়পত্রের বিভিন্ন প্রকল্প চালু রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষার কথা বিবেচনায় নিয়ে সঞ্চয়পত্রে তুলনামূলক বেশি মুনাফা (সুদ) দেয় সরকার। বর্তমানে পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সুদের হার ১১.৭৬ শতাংশ। এ ছাড়া পরিবার সঞ্চয়পত্রে সুদের হার ১১.৫২ শতাংশ, ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে সুদ ১১.২৮ শতাংশ ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে সুদের হার ১১.০৪ শতাংশ।

সরকারি হিসাবেই দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি এখন ৯.৯২ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বেশি ১০.৪০ শতাংশ। জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ১১ শতাংশ ছাড়িয়ে ১১.৬৬ শতাংশে উঠেছিল; খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ১৪.১০ শতাংশ। কিন্তু হঠাৎ করেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে।

গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের পুরো সময়ে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি ছিল ২ হাজার ১১২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ঋণাত্মক। অর্থাৎ গত অর্থবছরে যত টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল, তার চেয়ে ২ হাজার ১১২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বেশি সুদ-আসল বাবদ সরকারের কোষাগার থেকে পরিশোধ করতে হয়েছিল। অথচ চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিস্থিতি ঠিক উল্টো। এই অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৩৩২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এই তিন মাসে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল বাবদ পরিশোধের পরও সরকারের কোষাগারে ৮ হাজার ৩৩২ কোটি ৮০ লাখ টাকা জমা ছিল; এই টাকা সরকার ঋণ হিসেবে নিয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহার করছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বেশ কমে গিয়েছিল; বিক্রির চেয়ে সুদ-আসল পরিশোধে ৩ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা বেশি চলে গিয়েছিল।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত দুই অর্থবছরে (২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪) সঞ্চয়পত্র থেকে কোনো ঋণ পায়নি সরকার; উল্টো আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল কোষাগারে থেকে পরিশোধ করেছে।

সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা গেছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৩৩২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর মানে হচ্ছে- এই তিন মাসে মোট যত টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, তা থেকে আগে বিক্রি হওয়া সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর ৮ হাজার ৩৩২ কোটি ৮০ লাখ টাকা সরকারের কোষাগারে জমা ছিল; এই টাকা সরকার তার প্রয়োজনমাফিক খরচ করেছে। অথচ গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এই তিন মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা ঋণাত্মক (-)। তার মানে হচ্ছে ওই তিন মাসে যত টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে তার সঙ্গে ১ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা যোগ করে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধ করতে হয়েছে সরকারকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই (জুলাই- সেপ্টেম্বর) সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ছিল ধণাত্মক (+)। অর্থাৎ যত টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে, গ্রাহকদের সুদ-আসল পরিশোধের পরও সরকারের কাছে অবশিষ্ট থেকে।
অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ১৮৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ধণাত্মক। দ্বিতীয় মাস আগস্টে এই বিক্রির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৩৬ কোটি ১৫ লাখ টাকা। তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে নিট বিক্রি ছিল জুলাই-আগস্ট দুই মাসের বিক্রির প্রায় দ্বিগুণ ৪ হাজার ১০৯ কোটি ৯ লাখ টাকা।

বিক্রির চাপ কমাতে ২০১৯ সালের ১লা জুলাই থেকে মুনাফার ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। একই সঙ্গে এক লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন (কর শনাক্তকরণ নম্বর) বাধ্যতামূলক করা হয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকলে সঞ্চয়পত্র বিক্রি না করার শর্ত আরোপসহ আরও কিছু কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তারপরও বাড়তে থাকে বিক্রি।

সর্বশেষ সঞ্চয়পত্র খাতে সরকারকে যাতে বেশি সুদ পরিশোধ করতে না হয়, সে জন্য বিক্রি কমাতে ২০২১ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ২ শতাংশের মতো কমিয়ে দেয় সরকার। এরপর থেকে বিক্রি কমতে থাকে।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ধরেছিল সরকার। নানা ধরনের কড়াকড়ি, সুদের হার হ্রাস এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ায় মানুষের সঞ্চয়ে টান পড়ায় বিক্রি কমে যাওয়ায় এই খাত থেকে কাঙ্ক্ষিত ঋণ পাচ্ছিল না সরকার। সে কারণে সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্য কমিয়ে ২০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু অর্থবছর শেষে সঞ্চয়পত্র থেকে এক টাকাও ঋণ পায়নি সরকার; উল্টো আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের সুদ-আসল পরিশোধ বাবদ ৩ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা কোষাগার থেকে অথবা ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে হয়।

২০২২-২৩ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে কোনো ঋণ না পাওয়ায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ১৮ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়। কিন্তু গত অর্থবছরের এই খাত থেকে কোনো ঋণ নিতে পারেনি সরকার। উল্টো ২১ হাজার ১২৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা কোষাগার থেকে গ্রাহকদের সুদ-আসল বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে। এর আগে ২০২১-২২ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ১৯ হাজার ৯১৬ কোটি টাকার ঋণ পেয়েছিল সরকার। ২০২০-২১ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ৪১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা।  চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ধরেছিল ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ৮ হাজার ৩৩২ কোটি ৮০ লাখ টাকা তিন মাসেই (জুলাই- সেপ্টেম্বর) নেয়া হয়ে গেছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সামপ্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স অনেক বেড়েছে। রেমিট্যান্সের একটি অংশ দিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনেন অনেকেই। অন্যদিকে অনেক ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। সে কারণে আমানতের সুদের হার আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেলেও মানুষ এখন আর কোনো ব্যাংকেই টাকা রাখছে না। যতটুকু সঞ্চয় আছে, তা দিয়ে ঝুঁকিমুক্ত সঞ্চয়পত্র কিনছে। আর দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারে মন্দা চলছে। ফলে সবাই এখন সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছে।

Tuesday, October 22, 2024

এভিয়েশন খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী ১০ দেশ

বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও সিঙ্গাপুরসহ অন্তত ১০টি দেশ। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর অংশগ্রহণে ‘ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অরগানাইজেশনের (আইকাও)’ ডিরেক্টর জেনারেল অব সিভিল এভিয়েশন (ডিজিসিএ) সম্মেলনে দেশগুলো এই আগ্রহের কথা জানায়। ওই সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মঞ্জুর কবীর ভূঁইয়া। ওই সময়ে বেবিচক সদস্য (ফ্লাইট স্ট্যান্ডার্ড এন্ড রেগুলেশন্স) গ্রুপ ক্যাপ্টেন মো. মুকিত-উল-আলম মিঞা উপস্থিত ছিলেন।

সোমবার (২১ অক্টোবর) বেবিচক জানায়, সম্মেলনে বেবিচক চেয়ারম্যান যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, চীন, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ফ্রান্স এবং জাপানসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এসব দেশগুলো বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

এ ছাড়া তারা বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সহায়তা, সেবা সহজীকরণে এভিয়েশন সেক্টরে নতুন প্রযুক্তির সন্নিবেশ করতে সহায়তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এসব সহায়তা দেশের এভিয়েশন সেক্টরকে আরও আধুনিক, নিরাপদ এবং আন্তর্জাতিক মানে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

১৪ অক্টোবর ফিলিপাইনের সেবুতে শুরু হওয়া ওই সম্মেলন গত ১৮ অক্টোবর শেষ হয়। সম্মেলনে এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘শেপিং দ্য ফিউচার অব এভিয়েশন : সাস্টেইনেবল, রেজিলেন্ট অ্যান্ড ইনক্লুসিভ।’ এতে বাংলাদেশ ছাড়াও, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ ৩৯টি দেশের সিভিল এভিয়েশন চেয়ারম্যান, মহাপরিচালক ও তাদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

এ ছাড়াও ১১টি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিও ছিলেন ওই সম্মেলনে। সম্মেলনে বেবিচক চেয়ারম্যান আইকাও কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট সালভাতোর সাকিতানো এবং মহাসচিব জুয়ান কার্লোস সালাজারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় তারা তারা বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টরের উন্নয়নের প্রশংসা করেন বলে বেবিচকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। 

প্রতীকী ছবি

Thursday, September 19, 2024

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে বিদেশে ‘সরানো’ দুই লাখ কোটি টাকার খোঁজে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে পাচার হওয়া অর্থ-সম্পদের হদিস পেতে সে দেশের সরকারের দ্বারস্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সহযোগীদের সম্পদ যুক্তরাজ্যে পাচার করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করতে অন্তর্বর্তী সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে। শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকারের সদস্যদের ওপর নতুন সরকার যে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে, তার অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্য সরকারের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ব্রিটিশ গণমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, নতুন প্রশাসন তদন্ত করছে যে শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১৩ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৩০০ কোটি পাউন্ডের সমপরিমাণ ২ লাখ কোটি টাকা বিদেশে সরানো হয়েছে কি না। যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশের সাবেক সরকারের সহযোগীরা সম্পদ গড়েছেন বলে কর্তৃপক্ষ ধারণা করছে। যুক্তরাজ্য ছাড়াও সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আহসান এইচ মনসুর আরও বলেন, এ ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য সরকার ‘বেশ সহায়তা’ করছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার বাংলাদেশ ব্যাংকে এসেছিলেন; তাঁরা অনেক কারিগরি সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন।

বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রীর কেনা ১৫০ মিলিয়ন বা ১৫ কোটি পাউন্ডের সম্পত্তির অর্থের উৎস সম্পর্কে বাংলাদেশ জানতে চেয়েছে বলে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, এসব সম্পদ বাংলাদেশ পুনরুদ্ধার করতে চায়; সে লক্ষ্যে যুক্তরাজ্য সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তারা; কিন্তু বৈঠকে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে তাঁরা কিছু বলতে রাজি হননি।

শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ করে আসছেন বাংলাদেশের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক বিধিনিষেধ আছে। প্রতি বছর বাংলাদেশের নাগরিকেরা বৈধভাবে মাত্র কয়েক হাজার ডলার বিদেশে নিতে পারেন।

আহসান মনসুর বলেন, ‘এই বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রধানমন্ত্রীর অজ্ঞাতসারে দেশ থেকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।’ তবে তিনি এ–ও বলেন, তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। তিনি ভারতের কোথায় আছেন তা জানা যায়নি। ফলে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের পক্ষে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

তবে এসব অভিযোগ যুক্তরাজ্যের স্যার কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টির সরকারের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর হতে পারে। শেখ হাসিনার ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিক লেবার সরকারের সিটি মিনিস্টার, যদিও এখন পর্যন্ত এমন কোনো ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি যে টিউলিপ সিদ্দিক এসব অপকর্মের সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত ছিলেন। এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য টিউলিপ সিদ্দিকের সঙ্গে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস যোগাযোগ করলেও তিনি সাড়া দেননি।

শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসও ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সঙ্গে এক সাক্ষাতে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সহায়তা চেয়েছেন।

মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ দেশটি থেকে ‘চুরি হওয়া ও বিদেশে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনবে। সরকারের যেসব অগ্রাধিকার রয়েছে, এটি তার মধ্যে অন্যতম।’

শেখ হাসিনা দুই দশক বাংলাদেশ শাসন করেছেন; কিন্তু তাঁর শাসনামলে ভোট চুরি, অধিকার লঙ্ঘন ও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগ থেকে ছাত্রবিক্ষোভ সৃষ্টি হয়; পরিণতিতে হাসিনা সরকারের পতন হয়।

চলতি বছরের শুরুতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ইউকে জানায়, যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর মালিকানাধীন কোম্পানির সম্পত্তি আছে। সে দেশে যে বাংলাদেশিদের এ রকম ‘অব্যাখ্যাত সম্পদ’ আছে, এটি তার নজির। তারা বলেছিল, যুক্তরাজ্য সরকারের উচিত হবে, এসব খতিয়ে দেখা।

এই পরিপ্রেক্ষিতে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস যুক্তরাজ্যের ভূমি নিবন্ধন দপ্তর ও কোম্পানি–সংক্রান্ত দপ্তরের নথি খতিয়ে দেখেছে। তাদের অনুসন্ধানে পাওয়া যায়, সাইফুজ্জামান চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো ১৫ কোটি পাউন্ডের বেশি মূল্যের অন্তত ২৮০টি সম্পত্তি কিনেছে।

এসব সম্পদ ২০১৬ সালের পর থেকে কেনা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ভূমি কার্যালয়ের তথ্যানুসারে, বেশির ভাগ সম্পদ কেনা হয়েছে ২০১৯ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যে। সাইফুজ্জামান চৌধুরী ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের ভূমিমন্ত্রী ছিলেন।

যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় সম্পদ কিনেছেন সাইফুজ্জামান চৌধুরী। এর মধ্যে ফ্রিহোল্ড বা চিরকালীন মালিকানার অধিকারের সম্পদ আছে, যার মধ্যে রয়েছে লন্ডনের মূলকেন্দ্রের ফিটজ্রোভিয়া এলাকার এমারসন বেইনব্রিজ হাউস, পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটে ৬১টি বাড়ি ও ব্রিস্টলে একটি সমবায় সুপারমার্কেট।

যুক্তরাজ্যে এসব সম্পদ কেনার অর্থ কোত্থেকে এসেছে তা পরিষ্কার নয়। যদিও নথিপত্র দেখে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, কিছু সম্পদ কেনার ক্ষেত্রে বন্ধকি ঋণ নেওয়া হয়েছে।

সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আইনজীবী আজমালুল হোসেন ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, তাঁর মক্কেলের ‘লুকানোর কিছু নেই’ এবং তিনি কোনো কিছু চুরি করেননি। তিনি আরও বলেন, সাইফুজ্জামান চৌধুরী চতুর্থ প্রজন্মের ব্যবসায়ী। রাজনীতিতে আসার আগে সেই ১৯৯০-এর দশক থেকে তিনি যুক্তরাজ্যে সম্পদ কিনছেন।

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী চলতি বছরের শুরুতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আন্তর্জাতিক ব্যবসার অর্থ থেকে তিনি বিদেশে সম্পদ কিনেছেন। আজমালুল হোসেন বলেন, ড. ইউনূসের ‘অসাংবিধানিক সরকার’ আওয়ামী লীগ সদস্য ও নেতাদের নিপীড়ন করছে। তিনি আরও বলেন, যথেষ্ট আশঙ্কা আছে, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আরাফাত ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, তদন্ত হলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহযোগীরা নির্দোষ প্রমাণিত হবেন। তিনি আরও বলেন, ‘(নতুন সরকার) সব কিছুকে বড় দুর্নীতি হিসেবে দেখাতে চাইছে। তাঁরা সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দোষী করতে চাইছেন। তবে এটা ভালো যে যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তা হচ্ছে ...এসব অভিযোগ তাঁদের প্রমাণ করতে হবে।’

যুক্তরাজ্য সরকার জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকার পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ করেছে কি না, সে বিষয়ে তারা কিছু বলবে না। এ বিষয়ে তাদের অনেক পুরোনো নীতি রয়েছে।

ছবি : সংগৃহীত

উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে হাজার কোটি ডলার সহায়তার আশ্বাস

শেখ হাসিনার সরকারের পদত্যাগের পর অন্তর্বর্তী সরকার উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করছেন অর্থ ও বাণিজ্য উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর পৃথক পৃথক বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে বড় অঙ্কের বৈদেশিক সহায়তা পাওয়ার আশ্বাস পেয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি) ও যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএআইডি) সঙ্গে অর্থ উপদেষ্টার বৈঠক হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে জুম প্ল্যাটফরমে একটি বৈঠক হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, ভারত, চীন প্রভৃতি দেশের রাষ্ট্রদূত এবং হাইকমিশনারদেরও অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। সবার কাছ থেকে মোট ১ হাজার ২০ কোটি ডলার পাওয়া যেতে পারে বলে জানা গেছে।

বিভিন্ন দেশ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠকের ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাথিউ এ ভারগিসের নেতৃত্বে একটি দল সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেন।
প্রায় ১০০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা চেয়ে বিশ্বব্যাংকের কাছে চিঠি দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ২ কিস্তিতে ৫০ কোটি ডলার করে এ অর্থ চেয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। এ ছাড়া আর্থিক খাত সংস্কারে বাংলাদেশকে ১০০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা দিতে পারে বিশ্বব্যাংক। এই ঋণ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের পর্ষদে অনুমোদিত হওয়ার কথা।
সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সংস্কার কার্যক্রমের জন্য সহায়তা দরকার। তাৎক্ষণিক বাজেট সহায়তাও প্রয়োজন। সেই সঙ্গে দরকার কারিগরি সহায়তা। তারল্য সহায়তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আলোচনা ‘মোটামুটি’ ইতিবাচক হয়েছে। তারা উন্মুক্ত মন নিয়েই আলোচনা করতে এসেছিলেন, আরও আলোচনা হবে। তবে আলোচনার মূল নজর ছিল সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন নিয়ে। তিনি বলেন, এ বছর আমরা বাজেট সহায়তা প্রত্যাশা করছি। সালেহউদ্দিন আহমেদ সচিবালয়ে আইএসডিবি’র রিজিওনাল হাব ম্যানেজার নাসিস সোলাইমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে তিনি বলেন, আগামী তিন বছরে একটা প্যাকেজের আওতায় বাংলাদেশকে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার ঋণ দেবে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি)। বিভিন্ন খাতের জন্য এ অর্থ দেবে তারা। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাটসহ ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে এ ঋণ দেয়া হবে। প্রান্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণেও ঋণের অর্থ ব্যয় করা যাবে। এ ছাড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ঋণ দেবে তারা। এদিকে গত রোববার সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা এডিবি’র কান্ট্রি ডিরেক্টর এডিমন গিনটিংয়ের নেতৃত্বাধীন একটি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ডিসেম্বরের মধ্যে বাজেট সহায়তা হিসেবে বাংলাদেশকে ৪০ কোটি ডলার ঋণ দেবে এডিবি। সংস্থাটি ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি খাতে সংস্কারের জন্য দেবে ৫০ কোটি ডলার। এটা পাওয়া যাবে ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে। এর বাইরে জ্বালানি খাতের উন্নয়নেও এডিবি’র কাছে ১০০ কোটি ডলার চেয়েছে বাংলাদেশ।
সংস্থাটি চলমান প্রকল্পগুলোও অব্যাহত রাখবে।
যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশকে ২০ কোটি ডলারের বেশি উন্নয়ন সহায়তা দিচ্ছে। রোববার সে দেশের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএআইডি) সঙ্গে একটি চুক্তি সই হয়েছে। স্বাস্থ্য, সুশাসন, মানবিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি এবং মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এ অর্থ কাজে লাগানো হবে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত এক চুক্তির আলোকে এ সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
এদিকে আইএমএফের কাছ থেকে বাড়তি ৩০০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী সরকার। আইএমএফের আবাসিক প্রতিনিধি জয়েন্দু দে’র সঙ্গে অনলাইনে বৈঠকের পর অর্থ উপদেষ্টা ১লা সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের জানান, বাড়তি সহায়তা অনুমোদনের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমানে ৪৭০ কোটি ডলারের একটি ঋণ কর্মসূচি চলমান। আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠেয় আইএমএফের বার্ষিক সাধারণ সভায় এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা হবে।
যুক্তরাজ্য, ভারত, চীন ও জাপানের কাছ থেকে বাড়তি বৈদেশিক সাহায্যের আশ্বাস না মিললেও অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করে দেশগুলোর রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা বলে গেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধিতে তারা আগ্রহী এবং তাদের দেশের অর্থায়নে চলমান প্রকল্পগুলো অব্যাহত থাকবে।
এদিকে বুধবার ঢাকার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে একনেক সভা শেষে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ জানিয়েছেন, দাতাগোষ্ঠী হাত খুলে টাকা দিতে চাচ্ছে। ইউএসএডি বলছে, তোমরা প্রকল্প তৈরি করো; আমরা টাকা দেবো। যেসব প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল কিন্তু টাকা নেয়া হয়নি এসব টাকা বাজেট সহায়তায় দিতে চায় বিশ্বব্যাংক।

mzamin

Tuesday, September 17, 2024

বুধবার পুরো বিশ্বের আর্থিক খাত কেন মার্কিন ফেডের দিকে তাকিয়ে থাকবে

পুরো বিশ্বের আর্থিক খাত এখন তাকিয়ে আছে ফেডারেল রিজার্ভের দিকে। সুদের হার কমানোর বিষয়ে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী বুধবার কী সিদ্ধান্ত নেয়, নজর সেদিকেই। এই বহুল প্রত্যাশিত পদক্ষেপ শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, তার প্রভাব থাকবে পৃথিবীজুড়েই। এমনকি ডলার তেজি থাকবে, নাকি তা তেজ হারাবে, তা–ও নির্ভর করবে ফেডের সিদ্ধান্তের ওপর।

মূল্যস্ফীতির রাশ টানতে ফেড দীর্ঘ সময় ধরে নীতি সুদহার বাড়িয়েই চলছিল। অনেক বছরের মধ্যে এখন তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, বেশ কয়েক বছরের মধ্যে নেওয়া প্রথম পদক্ষেপে সুদের হার কতটা কমানো হবে, তা নিয়ে পরিষ্কার কোনো ধারণা এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। একই সঙ্গে চলতি বছরের শেষে রয়েছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি বাড়তি উদ্বেগের বিষয়।

সোসাইটি জেনারেলের এফএক্স অ্যান্ড রেটস বিভাগের করপোরেট গবেষণা বিষয়ক প্রধান কেনেথ ব্রো বলেন, ‘আমরা জানি না এই ধারা কেমন হবে। এটি কি ১৯৯৫ সালের মতো হবে, যখন ৭৫ ভিত্তি পয়েন্ট করে হার কমানো হচ্ছিল। নাকি এটা ২০০৭–০৮ সালের মতো হবে, যখন ৫০০ ভিত্তি পয়েন্ট কমানো হয়েছিল।’
দেখা যাক বিশ্বের আর্থিক বাজারে প্রত্যাশা কী:

১. নেতৃত্বকে অনুসরণ করা

গত বসন্তে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ছিল। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তখন এই প্রশ্ন ছিল যে ফেড যদি নীতি সুদ না কমায়, তাহলে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা ব্যাংক অব কানাডা সুদের হার কতটা কমাতে পারবে। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যে সুদের হার কমাচ্ছে, তা দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোকে এখন স্বস্তি দেবে।

ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমাতে যাচ্ছে বলে বাজারে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে, তা ইতিমধ্যে অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নীতি সুদ কমাতে উৎসাহিত করেছে। তবে ইউরোপে ফেডের তুলনায় সুদের হার হ্রাস কম হবে। কারণ, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংক অব ইল্যান্ড মূল্যস্ফীতির বিষয়ে সতর্ক অবস্থানের কথা জানিয়েছে।

বন্ড বাজারের জন্যও নীতিসুদ কমানো আশীর্বাদ হতে পারে। ২০২৩ সাল শেষের পর এই প্রথম বারের মতো মার্কিন, জার্মান ও ব্রিটিশ সরকারি বন্ডের বিপরীতে সুদ আয় কমে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২. স্বস্তির জায়গা

উদীয়মান দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য মার্কিন সুদের হার কমানোর বিষয়টি বেশ স্বস্তির ব্যাপার হবে। এর ফলে তারা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির জন্য আরও বেশি সমর্থন জোগাতে পারবে। রয়টার্স যে ১৮টি উদীয়মান দেশের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করেছে, তাদের অর্ধেকই এরই মধ্যে সুদের হার কমাতে শুরু করেছে। তারা এই কাজ করছে ফেডের পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অনিশ্চয়তার বিষয়টিও তাদের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে রয়েছে। বিএনপি পারিবাসের কর্মকর্তা ট্রাং নগুয়েন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হবে। রাজস্ব নীতির যে ভিন্নতা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, তা সুদের হার কমানোর এই কালচক্রকে জটিল করে তুলেছে।

৩. ডলারের শক্তিক্ষয়

যেসব দেশ আশা করছে যে মার্কিন নীতিসুদ কমানোর ফলে ডলারের শক্তি কমবে এবং তাদের মুদ্রা শক্তিশালী হবে, তাদের সেই আশা পূরণ না–ও হতে পারে। বিনিয়োগ ব্যাংক জে পি মর্গান স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে ফেডের সুদের হার কমানোর সর্বশেষ চার কালচক্রের তিনটির ক্ষেত্রেই প্রথম দফায় ডলার শক্তিশালী হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের নীতি সুদহার কমানো অন্যদের জন্য কতটা আপেক্ষিক, তার ওপর ডলারের দামের বিষয়টি নির্ভর করবে। ডলার যদি সত্যিই কম আয়ের মুদ্রা না হয়ে ওঠে, তাহলে অ–মার্কিন বিনিয়োগকারীদের কাছে এর আবেদন থেকেই যাবে।

তবে এশিয়ার অনেক দেশ মার্কিনদের আগেই সুদের হার কমিয়েছে। এর ফলে জুলাই ও আগস্টে দক্ষিণ কোরিয়ার ওন, থাইল্যান্ডের বাথ ও মালয়েশিয়ার রিঙ্গিতের দাম বেড়েছে। আর ডলারের বিপরীতে চীনের ইউয়ানের দাম বছরজুড়ে যতটা কমেছিল, সেই ঘাটতি ওই সময়ে পূরণ হয়ে যায়।

৪. ইকুইটির অগ্রযাত্রা


বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকার কারণে অর্থ বিনিয়োগ হোঁচট খেয়েছিল। মার্কিন সুদহার কমলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরদার হবে, ফলে ইকুইটি বিনিয়োগ আবার বাড়তে পারে। আগস্টে দুর্বল মার্কিন কর্মসংস্থান পরিসংখ্যান প্রকাশের পরের তিন দিনে বিশ্বে শেয়ারবাজারের ৬ শতাংশ পতন হয়েছিল।

৫. উজ্জ্বল দিন

ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমালে মূল্যবান ও মৌলিক ধাতু সুবিধা পেতে পারে। কম সুদের হার ও দুর্বল ডলার বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন ধাতু কিনতে উৎসাহিত করতে পারে। স্বর্ণের মতো মূল্যবান ধাতুর দাম বাড়তে পারে। দেখা গেছে বন্ড থেকে আয় কমে গেলে এর দাম বাড়ে, কারণ বিনিয়োগকারীরা সোনা কেনেন।

সোনার দাম এখন রেকর্ড উচ্চতায় রয়েছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জন রিড বলেন, বিনিয়োগকারীদের সোনা কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া উচিত।

ফেডারেল রিজার্ভ বা ফেড
ফেডারেল রিজার্ভ বা ফেডছবি : রয়টার্স

Friday, September 13, 2024

তরতাজা দেশ গড়তে ব্যবসায়ীদের সহায়তা চাইলেন ড. ইউনূস

নতুন তরতাজা দেশ গড়তে ব্যবসায়ীদের কাছে সহায়তা চেয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘ন্যাশনাল বিজনেস ডায়ালগ’ অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংলাপের সময় তিনি এ সহায়তা চান। ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসিবি) বাংলাদেশ এবং ১৫টি জাতীয় বাণিজ্য সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সংলাপে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, ডিসিসিআই, এমসিসিআই, এফআইসিসিআই, বিএবি, বিকেএমইএ, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের মতো সংগঠনের নেতা ও সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এতে সম্প্রতি বিভিন্ন শিল্পকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের কারণে দেশের অর্থনীতিতে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার চিত্র তুলে ধরেন ব্যবসায়ীরা।

শ্রমিক, শিল্প-মালিক এবং সরকারকে এক টিম হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমার একটা আশা, যতদিন থাকি, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ককে একটা সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাবো। শ্রমিক-মালিক, সরকার একসঙ্গে টিম হয়ে এটা করবে। ব্যবসা করা একটা সংগ্রাম, এ সংগ্রামটা আমরা সহজ করবো। তিনি বলেন, যতটুকু সময় আমরা সরকারে আছি, ততটুকু সময়েই টিম হিসেবে কাজ করবো। সবাই মিলে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবো। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান প্রথাগত আন্দোলন ছিল না। তারা এটা জেনেই রাস্তায় নেমেছিল যে, না-ও ফিরতে পারে বাড়িতে। প্রাণের বিনিময়ে তারা লক্ষ্য অর্জন করেছে। নতুন বাংলাদেশের জন্য তরুণদের লড়াইয়ের প্রশংসা করে তিনি বলেন, তারা এ সুযোগ না করে দিলে জাতিকে পচনের হাত থেকে রক্ষা করা যেত না। তাই আমাদের সুস্থ-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে এগিয়ে যেতে হবে।

ব্যবসায়ীদের প্রধান উপদেষ্টা বলেন, চিন্তা করে দেখুন, কী এ সুযোগ। সবকিছু থেকে আপনি মুক্ত। আপনি নতুনভাবে জন্মগ্রহণ করেছেন, নতুনভাবে অগ্রসর হবেন। নতুন করে যে স্বপ্ন তারা আমাদের মনে জাগিয়ে দিয়েছে সেটা যদি আপনার মনে রেখাপাত করে তাহলে সে স্বপ্নপূরণে আপনিও শরিক হবেন। এ সুযোগ আর কখনো আসে কিনা জানি না। এ সুযোগ আমরা যেন হারিয়ে না ফেলি।

জেনেভা কনভেনশনে যোগদান প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এটা বহুদিন পড়ে আছে, আমরা জেনেভা কনভেনশনে যোগ দিতে পারিনি। সবাই যখন একটা টিম হলাম; শ্রমিক-মালিক, সরকার সবাই যখন টিম হলাম ওটাও আমরা করে ফেলবো। তিনি বলেন, ওটা না করলে সামনে এগিয়ে যাওয়া কষ্টকর হবে। যেখানেই যাবেন এটা বাধা দেবে। পশ্চিমারা বলছে, তোমরা শ্রমিকদের যা শর্ত, প্রাপ্য এগুলোতে তোমরা সই করছো না। কাজেই যদি আমাদের এগিয়ে যেতে হয় পরিষ্কারভাবে হতে হবে। ড. ইউনূস বলেন, আমাদের সাহস দিন, এগিয়ে আসেন, আমরা সবাই মিলে আইএলও কনভেনশনে স্বাক্ষর করে ফেলি।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন,  আমরা আর পচন নয়, সুস্থ-বল জাতি হিসেবে দাঁড়াতে চাই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনারা যদি মন ঠিক করেন, খুব দ্রুত নতুন বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলবো। চলেন একসঙ্গে কাজ করি আমরা। নতুন বাংলাদেশ গড়তে গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ দেয়া শত শত ছাত্র-জনতার কথা স্মরণ করিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আজ যারা সামনে বসে আছেন তারা বিশ্বমানের উদ্যোক্তা। আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের জন্য আপনারা কী শপথ নেবেন?

ড. ইউনূস বলেন, যে স্বপ্নের পেছনে গিয়ে তুমি প্রাণ দিয়েছো, যে নতুন বাংলাদেশ গড়ার, সে নতুন বাংলাদেশ গড়বোই। এ হবে আমাদের শপথ। এ সুযোগ জাতির জীবনে বারে বারে আসে না।

তৈরি পোশাক শিল্পকে বিশ্বের এক নম্বরে নিয়ে যাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আজ যে দুই নম্বরে আছি কী করে আমরা এক নম্বর হবো, আমাদের মেয়াদকালে যদি আপনারা এক নম্বরে নিয়ে যেতে পারেন আমরাও স্মরণ করবো, একটা কিছু করেছি তো। সবকিছু আমরা জানি না, আমাদের অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু একযোগে কাজ করলে অভিজ্ঞতা এসে যাবে। সবাই মিলে কাজ করবো।

ইউরোপ-আমেরিকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে সরকারের উদ্যোগের কথা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমরা আজ ধরনা দিই ব্যবসায়ীদের কাছে, যারা ইউরোপে আছেন, আমেরিকায় আছেন তাদের কাছে আমাদের ফরিয়াদ কী করতে হবে, তারাও কৌতূহল নিয়ে দেখছেন আমাদের এখানে কী হচ্ছে। তাদের আমরা ডেকে আনতে পারি এখানে আসুন তোমরাও শরিক হও এর মধ্যে। আমাদের সুযোগ দাও একবার।
তিনি বলেন, আমরা নিম্নআয়ের দেশ থেকে মধ্য আয়ের দেশে গেলে সুযোগ-সুবিধা হারিয়ে ফেলবো। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতায় শক্ত প্রতিযোগী হওয়ার জন্য আমরা সামর্থ্য অর্জন করতে চাই। আমরা পেছনে থাকতে চাই না। সেজন্য তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য একজন বিশেষ দূত নিয়োগ দিয়েছি, তিনি লুৎফে সিদ্দিকী।

আইসিসিবি সভাপতি মাহবুবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠানের তার পক্ষে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনটির নির্বাহী কমিটির সদস্য মীর নাসির হোসেন। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে রপ্তানি খাত দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখে। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীদের অসৎ চর্চা এবং আর্থিক অনিয়মের কারণে দেশের অর্থনীতি আজ হুমকির মুখে পড়েছে। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সেসব অসাধু ব্যবসায়ী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জোরালো আবেদন জানানো যাচ্ছে।

দেশের সিংহভাগ বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তারা যারা সৎভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন, তাদেরকে নিরাপদে ও আস্থার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য একটি ব্যবসা অনুকূল পরিবেশ তৈরির জন্য আপনার কাছে বিনীত অনুরোধ জানিয়ে আইসিসিবি এই মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে এক নম্বর অগ্রাধিকার দেয়ার আহ্বান জানান।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময় থেকেই দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যার ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এই সুযোগে কিছু দুষ্কৃতকারী দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। যার একটি বড় প্রভাব পড়ছে রপ্তানিসহ সব শিল্পকারখানাগুলোর ওপর। শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন বহিরাগতদের উস্কানিতে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে। এমনকি শ্রমিক সংগঠনগুলোও এই কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় বলে বিবৃতি দিচ্ছে। এসব দুষ্কৃতকারীরা ব্যবসায়িক স্থাপনা, শিল্পকারখানায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ চালাচ্ছে।

দুষ্কৃতকারীদের হামলার কারণে এপর্যন্ত প্রায় আনুমানিক ১০০টির অধিক কারখানায় ভাঙচুর চালানো হয়েছে এবং অবস্থা বেগতিক দেখে ২০০-এর অধিক কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে আনুমানিক ৫ হাজার কোটি টাকার অধিক ক্ষতি হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্প পুলিশের সীমিত উপস্থিতি, থানা পুলিশের কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গরূপে চালু না হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা প্রত্যক্ষভাবে কর্মসংস্থান হ্রাস করবে। তাই অবিলম্বে সকল শিল্পাঞ্চলে যৌথবাহিনীর অধিকতর উপস্থিতি সর্বক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করার জন্য জোরালোভাবে আবেদন জানানো হয়।

আইসিসিবি বলেছে, তৈরি পোশাক, ওষুধ, খাদ্য ও কৃষি,  আদা, চামড়া ও পাদুকা শিল্প, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, পাটজাতদ্রব্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ অন্যান্য অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে প্রায় ৭ কোটি জনবলের কর্মসংস্থান রয়েছে। অস্থিরতার কারণে শিল্পকারখানার চাকা চলমান রাখা না গেলে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য কর্মহীন হয়ে যেতে পারে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করবে। যেসব এলাকায় যৌথবাহিনীর উপস্থিতি দেখতে পাওয়া গেছে সেখানে সার্বিক পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছে। এ পদক্ষেপ পুরো শিল্পাঞ্চলে প্রসারিত হলে অচিরেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে বলে ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস।

mzamin