Thursday, December 24, 2015

সবার অসুবিধা হচ্ছে মানে ইসি নিউট্রাল : রকিব উদ্দিন

নির্বাচন কমিশনের অবস্থান নিয়ে প্রধান তিন দলের সমালোচনায় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির নিরপেক্ষতা আরো স্পষ্ট হচ্ছে বলে দাবি করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ।
তিনি বলেছেন, নিরপেক্ষতার প্রশ্নের মধ্যে আমাদের নিরপেক্ষতা (প্রমাণ) হবে। সব দলের যদি কিছু না কিছু অসুবিধা হচ্ছে তাহলে বুঝতে হবে আমরা অ্যাকশন নিচ্ছি। আমাদের অবস্থান নিউট্রাল। নিউট্রাল দিকটা আরো স্পষ্ট করে দিচ্ছি।
আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নিজ কার্যালয় থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় তিনি সাংবাদিকদের একথা বলেন।
পৌর ভোটের প্রচারণার মাঠে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও দশম সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির সমালোচনার মুখে এ কথা বললেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
দুপুরে আওয়ামী লীগ প্রতিনিধি দল সিইসির সাথে সাক্ষাৎ করে বিএনপির প্রতি সদয় হয়ে সরকারি দলের প্রতি নির্বাচন কমিশন নির্দয় আচরণ করছে বলে অভিযোগ করে। সেই সাথে বিএনপিকে বাড়তি সুবিধা দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করে দলটি।
বিকেলে জাতীয় পার্টির প্রতিনিধি এসে অভিযোগ করে, সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট হওয়া দুরূহ হয়ে পড়েছে। ক্ষমতাসীনদের দ্বারা তারা আক্রান্ত হচ্ছেন।
এভাবে সব দল ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে- এই প্রসঙ্গে সিইসির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, আমরা অ্যাকশন নিচ্ছি। সবার কিছু যখন অসুবিধা হচ্ছে, বুঝতেই হবে সবার প্রতি আমরা অ্যাকশন নিচ্ছি। আমাদের নিউট্রাল অবস্থা আরো স্পষ্ট হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের অভিযোগ প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, আমরা নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। কারো চেহেরা দেখে বা কারো প্রতি সদয় বা কারো প্রতি নির্দয়ের প্রশ্ন আসছে না। সবাইকে সাংবিধানিক অধিকার দেয়ার চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে অনিয়মের বিষয়ে জরিমানা, শোকজ, কর্মকর্তাদের বদলিসহ ইসির নেয়া ব্যবস্থাও তুলে ধরেন তিনি।
বিধিলঙ্ঘনকারী এমপি-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘন হলে আমার সবারই বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেব। ইতোমধ্যে এমপিদের শোকজ করেছি। তারা দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া থানার ওসি ও নিজেদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিয়েছি। আমরা সবদিক থেকে আইনটা প্রয়োগ করছি।
বিধি লঙ্ঘনকারী এমপি-মন্ত্রীদের তালিকা প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় থেকে চাওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমন কোনো চিঠি আমরা পাইনি।
ভোটে হানাহানি ও সংঘাতের বিষয়ে সিইসি বলেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। যদিও দুর্ভাগ্যবশত এটা কালচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে যতদিন যাবে পলিটিক্যাল কালচার ইমপ্রুভ করবে। এদিন এমন দিন আসবে সেন্টারে পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবের টহলের প্রয়োজন হবে না।
ডেমোক্রেসি ওয়াচ ও অধিকারসহ ১০টি পর্যবেক্ষক সংস্থার বিষয়ে আওয়ামী লীগের আপত্তি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিইসি রকিব উদ্দিন বলেন, এটা কমিশনের সিদ্ধান্তের বিষয়। কমিশন বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

মিরপুরে 'জঙ্গি আস্তানায়' অভিযান : সাতজন আটক : বিস্ফোরক উদ্ধার

রাজধানীর মিরপুর-১ এ জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে একটি ছয়তলা বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বৃহস্পতিবার ভোররাত থেকে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে অবস্থান নেয়। অভিযান চালিয়ে সাতজনকে আটক ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে তিনজন জেএমবির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, মিরপুর ব্লক-১ এর নয় নম্বর রোডের সেকশন-১’র শাহ আলী থানা এলাকার ঐ ভবনটিতে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।
ডিসি মিরপুর বিভাগের কমিশনার কায়েমুজ্জামান জানান, মধ্যরাতে পুলিশ সন্দেহভাজন জঙ্গি সন্দেহে মিরপুরের শাহ আলী থানা এলাকার একটি ছয়তলা ভবনে অভিযান চালায়। ঐ বাড়ির ছয়তলায় একটি মেসে জঙ্গিদের অবস্থান শনাক্ত করে। পুলিশ মেসের ভেতর ঢুকতে চাইলে মেসের জানালা দিয়ে তাদের লক্ষ্য করে তিন-চারটি ককটেল ছুড়ে মারে। এই অবস্থায় পুলিশ বাইরে ও ভিতরে অবস্থান নেয়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছেন, গত কয়েকদিনের জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। আটককৃত এক জঙ্গির স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে ভোররাতে পুলিশ ঐ ভবনের বাইরে অবস্থান নেয়। এ সময় সেখান থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছোড়া হয়। এতে পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। এতে কেউ হতাহত হয়নি।
তিনি আরো জানান, ভবনটির ছয়তলা ইউনিটের একটি মেস থেকে সাতজনকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে তিনজন জেএমবির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছেন। বাকিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে নিশ্চিত হওয়া যাবে। আটককৃতদের ডিবির কার্যালয়ে নেয়া হয়েছে।
গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার বলেন, জঙ্গি আস্তানা থেকে বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। আরো বিস্ফোরক আছে কিনা সেটি খুঁজে দেখা হচ্ছে। কিছু অবিস্ফোরিত গ্রেনেড পড়ে আছে সেটি নিষ্ক্রিয় করতে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট কাজ করছে।
বিস্ফোরক উদ্ধার সম্পর্কে মনিরুল ইসলাম বলেন, বিস্ফোরকগুলো হ্যান্ড গ্রেনেড। হোসনি দালান ও কামরাঙ্গির চরসহ সম্প্রতি হামলাগুলোতে যে বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো আর উদ্ধারকৃত বিস্ফোরকগুলো একই।

পৌর নির্বাচন থেকে বিএনপি সরে দাঁড়াবে না : মির্জা ফখরুল

চলমান পৌরসভা নির্বাচনকে গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে একটি চ্যালেঞ্চ হিসাবে অভিহিত করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আন্দোলনের জন্যই বিএনপির এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ। এ কারণেই এ নির্বাচনে যতই চাপ আসুক নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবে না বিএনপি বলে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার অগণতান্ত্রিকভাবে দেশ পরিচালনা করছেন। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের অযথা হয়রানি করছে। দলীয় প্রার্থী, কর্মী ও সমর্থকরা সুষ্ঠুভাবে ভোটের প্রচারণাও চালাতে পারছেন না। এ নির্বাচনে এখনও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলার সৈয়দপুরে ধানের শীষের পক্ষে প্রচারণা চালানোর আগে সৈয়দপুর বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে এ কথা বলেন। সেই সাথে তিনি গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে জনগণকে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেয়ার আহবান জানান। সৈয়দপুর পৌরসভার বর্তমান মেয়র ও দলীয় প্রার্থী অধ্যক্ষ আমজাদ হোসেন সরকার ভজে’কে সাথে নিয়ে শহরের শহীদ ডাঃ জিকরুল হক সড়কে ধানের শীষের পক্ষে প্রচারণা চালান, লিফলেট বিতরণ করেন।
এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি’র সাবেক এমপি আখতারুজ্জামান মিয়া সহ স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা কর্মীরা।
এর আগে তিনি ইউএস বাংলার একটি বিমানে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছালে দলীয় নেতাকর্মীরা তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। আজ বিকালেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব জেলার জলঢাকা পৌরসভা নির্বাচনে প্রচারণায় অংশ নেবেন।

ধানের শীষের বিজয় ঠেকাতে নীলনক্সা তৈরি করছে সরকার : ভিপি সাইফুল

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বগুড়া জেলা সভাপতি ভিপি সাইফুল ইসলাম বলেছেন, পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র করছে সরকার। তারা জনগণের রায় ছিনিয়ে নিতে নীলনক্সা তৈরি করছে। তাই নিজে ভোট দিয়ে কেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। যতক্ষণ কেন্দ্রে ফলাফল ঘোষণা না হবে ততক্ষণ কেন্দ্রে থাকতে হবে। তিনি বলেন, সকল ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে ধানের শীষ বিপুল ভোটে বিজয়ী করতে হবে। এই বিজয়ের মাধ্যমে সরকারের পতন আন্দোলন বেগবান করতে হবে।
তিনি বৃহস্পতিবার বগুড়ার সারিয়াকান্দি পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী টিপু সুলতানের ধানের শীষের পক্ষে এক নির্বাচনীসভায় একথা বলেন। এসময় তিনি টিপু সুলতানের হাতে ধানের শীষ তুলে দেন। সভায় টিপু সুলতান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি মন্জুরুল হক মন্জু , সারিয়াকান্দি উপজেলা বিএনপির সভাপতি সুজাউদ্দৌলা সন্জু, সাধারন সম্পাদক লুৎফুল হায়দার রুমি, বিএনপি নেতা সিরাজুল ইসলাম মানিক, শাজাহান আলী মুকুল , লুৎফর রহমান , ইকবাল কবির পলাশ, শহিদুল ইসলাম, তাহেরুল ইসলাম, শাহাদৎ হোসেন সনি প্রমুখ।
এর আগে বগুড়া পৌরসভার ২০ নং ওয়ার্ডে বিএনপির কাউন্সিলর প্রার্থী রোস্তম আলীর ইটপাখি মার্কা ও নারী কাউন্সিলর প্রার্থী রেহেনা আক্তার রানুর গ্যাসের চুলা মার্কায় ভোট চেয়ে সাবগ্রামে গণসংযোগ করেন ভিপি সাইফুল ইসলাম।
তিনি বিকেলে শেরপুর পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ও বর্তমান মেয়র স্বাধীন কুমার কুন্ডুর ধানের শীষে ভোট চেয়ে শেরপুর বাসষ্ট্যান্ড এলাকায় গণসংযোগ করেন। এসময় মেয়র স্ব্যাধীন , জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ও শেরপুর উপজেলা আহবায়ক জানে আলম খোকা, বিএনপি নেতা মনজুরুল হক মন্জু, পিয়ার হোসেন, বিএইচএম কামরুজ্জামান রাফু, আকতার আলম সেলিম, সালমা ইসলাম শেফা, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা শাহাবুল ইসলাম সবুজ ও আব্দুল মোমিন জনি উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বগুড়া পৌরসভার ১১নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী ও বর্তমান কাউন্সিলর কারাবন্দি সিপার আল বখতিয়ারের পান্জাবী মার্কায় মালতিনগরে ভোট চেয়ে প্রচারনায় অংশ নেন ভিপি সাইফুল ইসলাম। দিনব্যাপী গণসংযোগে তার সফর সঙ্গী ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মাহবুব হাসান লেমন, যুবদল নেতা আব্দুল মান্নান প্রমুখ।

বাম ও ইসলামপন্থীরা এক কাতারে দাঁড়াবে! by মাসুদ মজুমদার

মুসলিম কমরেড যেমন আছে, তেমনি হিন্দু কমরেডও রয়েছে। সাম্যবাদী হয়েও ধর্মীয় পরিচয় ঘুচানো যায়নি। এ উপমহাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয় সব সময় প্রাধান্য পেয়েছে। প্রগতিশীল হলেও ধর্মাচার ভুলে যাওয়ার কোনো প্রেরণা এ উপমহাদেশের রাজনীতিতে নেই। তবে অসাম্প্রদায়িক থাকার একটা উপমা কেউ কেউ সৃষ্টি করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে- সাম্যবাদী কমরেডরা রাতারাতি পুঁজিবাদের খপ্পরে পড়ে যাচ্ছেন। সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের পদচুম্বন করে কৃতার্থ হচ্ছেন। তত্ত্বীয় বাম রাজনীতি যতটুকু বুঝেছি, তার সাথে ইসলামের সাম্যবাদী চিন্তার মেলবন্ধন সম্ভব। অর্থনৈতিক সাম্য, সামাজিক সুবিচার, নৈতিক অবস্থান ও ইনসাফের বিবেচনায় সাম্যবাদ ও ইসলাম কাছাকাছি। অনেকেই বলেন, আধ্যাত্মিক চিন্তার বাইরে জাগতিক ধারণায় যতটা মানবিক হওয়া সম্ভব তা শুধু ইসলাম ও সাম্যবাদেই রয়েছে। তাহলে এ দুই পন্থীরা কমন ইস্যুতে এক জায়গায় দাঁড়ায় না কেন?
ইরানি বিপ্লবের তত্ত্বীয় ধারণায় ডক্টর আলী শরিয়তির একটা অবস্থান ছিল বলে মনে করা হয়। তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। একসময় ছিলেন বাম রাজনীতির তুখোড় প্রবক্তা। ধীরে ধীরে তার চিন্তার রূপান্তর ঘটে। যখন বাম রাজনীতির সাথে নিজেকে তত্ত্বীয়ভাবে জড়িয়ে ফেলেন, তখন তার ভাবনার প্রথম বিষয় ছিল মানুষের মুক্তি, কল্যাণ ও সামাজিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠার আকুতি। মার্কসবাদের একটি ব্যবস্থাপত্র তাকে আকর্ষণ করেছিল। পরবর্তীকালে তার ধারণা পাল্টাতে থাকে। সাম্যবাদের তত্ত্বীয় ধারণাও প্রায়োগিক ব্যবস্থাপত্রের মধ্যে তিনি কিছু বৈসাদৃশ্য ও জটিলতা অনুভব করতে থাকেন। সে সময় তিনি ইসলামের প্রায়োগিক অঙ্গীকার, সামাজিক সুবিচার, ইরানি সমাজ ও মানুষ নিয়েও ভাবতেন। সমাজে প্রভাবক শ্রেণী কারা- কারাই বা জনগণের অঘোষিত নেতার আসনে বসে আছেন, সেটা খুঁজে পেতে চাইলেন; একসময় পেলেনও। ইসলামের রাজনৈতিক রূপ ও অর্থব্যবস্থা তাকে সাম্যবাদের চেয়ে বেশি আকৃষ্ট করল।
আলী শরিয়তির ‘মজলুম’ নামের একটি চটি বই পড়ে তার চিন্তার সাথে পরিচিতি ঘটে। বুঝলাম, তিনি মানুষ ও মানবতার মুক্তি চান। পিরামিডের প্রতিটি পাথরের মধ্যে মানুষ নামের দাসদের রক্ত ও ঘামের গন্ধ তিনি পেয়েছেন। ফেরাউনদের অত্যাচারের ক্ষতচিহ্নহ্ন তিনি হৃদয় দিয়ে স্পর্শ করতে চেয়েছেন। তাই শ্রমশোষণ ও পুঁজির দাসত্ব থেকে মানুষকে রক্ষা করতে চান। রেজা শাহের বাদশাহী বা রাজতন্ত্র নিয়ে তার কোনো নগদ আগ্রহ ছিল না। তবে বুঝতেন শাহ একনায়ক ও শোষক। একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বরকন্দাজ। তিনিও জানতেন তাসের রাজা ছাড়া একসময় আর কোনো রাজা হয়তো থাকবে না। কিন্তু অন্য যেকোনো তন্ত্রের ছিদ্র দিয়ে শাসকেরা রাজা হয়ে উঠবেন। যেমন নির্বাচিত স্বৈরাচার শব্দটি এখন আর অপরিচিত নয়। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে একনায়ক সেজে যাওয়ার উপমাও অনেক। ধারণা ছিল, আদি দাসপ্রথাও থাকবে না। কিন্তু মানুষের মানসিক দাসত্বের ঘোর কাটবে না। রূপান্তরিত দাসপ্রথাও ঘুরেফিরে থেকে যাবে। তিনি বুঝতেন মানুষ স্বভাবত কর্তৃত্ববাদী, আনুগত্যপরায়ণ ও দ্রোহচিন্তার মতো পরস্পরবিরোধী বৈশিষ্ট্য লালন করে।
আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাসী ডক্টর শরিয়তি জাতিরাষ্ট্রের ধারণা অস্বীকার করতেন না। তবে মানবতার মুক্তির জন্য এটাকে কোনো সমাধান মনে করতেও দ্বিধান্বিত ছিলেন। এ ধরনের একটি বিশ্বাসের জায়গায় দাঁড়িয়ে ইরানি সমাজ ও আর্যাবর্তের মানুষ সম্পর্কে তিনি অনুসন্ধিৎসু হলেন। তিনি দেখলেন, পারস্য জাতীয়তাবাদের মন্ত্রমুগ্ধরা এক ধরনের জাতীয়তাবাদী অহংবোধ লালন করেন। প্রগতিশীল ও আধুনিকমনস্ক হয়েও তারা ‘মারজাহ’ নামে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় চর্চাকেন্দ্রের সাথে জড়িত। এর মাধ্যমে ইরানি জাতি ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা করে দেখার ভড়ং করে না, বরং ধর্মাচার ও লোকজ সংস্কৃতি চর্চাকে তারা জাতীয় সংস্কৃতির স্তরে উন্নীত করে নিয়েছে। তাই একজন বরেণ্য আলেমের সান্নিধ্য ও নির্দেশনা মেনেই তারা রাষ্ট্রাচারের সাথে মিলেমিশে থাকে। বিপ্লব ধর্মকে আরো কার্যকরভাবে সামনে এনে দেয়- রাজনীতি ধরন পাল্টায়। কিছু গুণগত পরিবর্তন এনে দেয়।
ইরানের জনগণের বিপ্লবী চৈতন্যের ভ্রুণটি জন্ম নেয় ইসলামের সূচনাপর্বে। সামাজিক শক্তি হিসেবে ধর্মীয় নেতাদের উপস্থিতিও ঐতিহ্য লালিত। আমাদের সমাজে সামাজিক শক্তি হিসেবে ধর্মীয় নেতারা সে তুলনায় অনগ্রসর। ঔপনিবেশিক শাসন এর একটি মৌলিক কারণ। তা ছাড়া পারস্যবাসীর আত্মস্থ করার ক্ষমতাও বেশি।
জার্মান প্রবাদ হচ্ছে- যৌবনে সাম্যবাদে দীক্ষা নেয়া তারুণ্যের ধর্ম। চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে ধর্মে অনুরাগ বয়সের ধর্ম। আমরাও তরুণ থাকতে মার্কসবাদ-মাওবাদের স্বাপ্নিক জীবনঘনিষ্ঠতার ভেতর সর্বহারা শ্রেণীর মুক্তির প্রহর গুনতাম। ধর্মের লাগাম ছিঁড়ে সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করার মধ্যে বস্তুবাদের মোহনীয় গন্ধ শুঁকে দেখতাম। বয়স বাড়ার পর তুলনামূলক অধ্যয়নের কিছুটা সুযোগ ঘটে। তখন আলী শরিয়তির মতো চিন্তার ভ্রুণটিকে বিকশিত হতে দেখে টের পেলাম মানুষ ও মানবতার মুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভেবেছেন নবী-রাসূলরাই। তাঁরাই বেশি ভেবেছেন ন্যায়নীতি ও ইনসাফ নিয়ে। ওল্ড ও নিউ টেস্টামেন্ট এবং কুরআন এর সাক্ষ্য বহন করে। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের ওপর খানিকটা চোখ বুলিয়ে মনে হলো, ধর্মগুলোর মিল অনেক বেশি। সৃষ্টিরহস্য ও মানুষ নিয়ে সামগ্রিক ভাবনা ধর্মের ভেতর বেশি জায়গা পেয়েছে। ওল্ড ও নিউ টেস্টামেন্টের মধ্যে বিকৃতি-বিচ্যুতির পরও সাযুজ্য এক উল্লেখযোগ্য বিষয়। বেদ যখন বলে সৃষ্টিকর্তা ওঁঙ্কার দিয়ে আসমান-জমিনের সব কিছুর অস্তিত্ব দিয়েদিলেন। তখন সব ক’টি আসমানি কিতাবের মূল সুর ‘কুন’ বলেই বিধাতা ‘হও’ বলেন, অমনি সব হয়ে যায়- এ ধারণার আশ্চর্য মিল খুঁজে পেলাম। আদম-হাওয়া থেকে আদালতে আখেরাতসহ মৃত্যুভাবনা ধর্মীয় চিন্তার বাইরে কিছুই নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞান এখনো জন্ম-মৃত্যুর চূড়ান্ত সংজ্ঞা নিরূপণ করতে পারেনি। অথচ ধর্মচিন্তায় এর সহজ-সরল ব্যাখ্যা সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেয়।
এ বক্তব্যে বিশ্বাসীদের নিজ নিজ বিশ্বাস পাল্টানোর কোনো তাগিদ নেই। একটি উপমা হিসেবে শুধু বলা যায়, সব ধর্মের ধার্মিক মানুষ সত্য-মিথ্যার একটি মানদণ্ড লালন করেন। ভালো-মন্দের ফারাক বুঝতে চান। স্বর্গ-নরকে বিশ্বাস রাখেন। শয়তান বা প্রবঞ্চকের ধারণা বোঝেন। একজন সৃষ্টিকর্তার একক সার্বভৌমত্ব মানেন। তবে কেউ কেউ স্রষ্টার কাছে পৌঁছার লক্ষ্যে মাধ্যম ধরে অগ্রসর হওয়ার মতো একটি ধারণা পোষণ করেন। এ ধারণাও আবার সর্বজনীন নয়। একেশ্বরবাদী ব্রাহ্মচিন্তার সাথে মূর্তিবাদীর সাদৃশ্য কমই দেখতে পাই। ত্রিত্ববাদের সাথে একমত নয়, এমন খ্রিষ্টানকেও জানি।
প্রসঙ্গটি টেনেছি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামিস্ট ও লেফটিস্টদের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্বের বিষয়টির ওপর খানিকটা আলোকপাতের জন্য। আলী শরিয়তির প্রসঙ্গ টানার কারণও অভিন্ন। প্রসঙ্গে প্রশ্নটা তুলতে চাই- জালেমের বিরুদ্ধে যারা মজলুমের বিজয় কামনা করেন, তারা এককাতারে দাঁড়াতে পারেন না কেন? বামরা মন্দের ভালো বাছাই করার সময় পুঁজিবাদ ও নিপীড়ক শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা দেন। আবার ইসলামিস্টরাও বামদের নাস্তিক ও খোদাদ্রোহী-ধর্মদ্রোহী আখ্যায়িত করে মন্দের ভালো বাছাই করার সময় সুবিধাবাদ আশ্রয়ী শক্তির পৃষ্ঠপোষকতা করেন। কায়েমি স্বার্থবাদকে প্রশ্রয় দেন। ধর্ম মানলে কতগুলো নৈতিক বিধিবিধান মানতে হয়। কতক মূল্যবোধ মেনে চলতে হয়। কমিউনিস্টদেরও নীতিবোধ ও মানবিক গুণাবলি অর্জনের তাগিদ আছে। ধর্মপন্থী ও বামপন্থীরা এসব ব্যাপারে যত্নশীলও। তাহলে ধর্মীয় ভাবধারাপুষ্ট নৈতিকতা ও বস্তুতান্ত্রিক চিন্তাপ্রসূত মানবিক গুণাবলির মেলবন্ধন হয় না কেন!
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কতগুলো নতুন উপসর্গ দেখা যায়। জনগণের ওপর শাসন চলছে জনগণের সম্মতি ছাড়া। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে। আগ্রাসী সম্প্রসারণবাদকে এতটাই প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে- যেখানে সার্বভৌমত্ব উপেক্ষিত হচ্ছে। জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত ও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বিদেশের বাজারে রূপান্তরিত হচ্ছে। একই সাথে জাতি ও জনগণের শত্রু ও বন্ধু পাল্টে দেয়ার অপচেষ্টা চলছে। বস্তুবাদকে ভোগবাদে উন্নীত করা হয়েছে। এই জাতির চিরায়ত মূল্যবোধ, ঐতিহ্য চেতনায় আঘাত হানা হচ্ছে। অর্থনৈতিক শোষণের সাথে রাজনৈতিক নিপীড়ন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিচ্ছে। পরগাছা সংস্কৃতির সয়লাব বইয়ে দেয়া হয়েছে। নিরাপদে ও নিরুপদ্রবে থাকার মতো স্বস্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। জাতির মেরুদণ্ডই শুধু ভেঙে দেয়া হচ্ছে না- একটি জাতিরাষ্ট্রকে কৌশলগত দিক থেকেও বিপজ্জনক হুমকির মধ্যে ফেলে দেয়া হচ্ছে। বন্ধু না বাড়িয়ে শত্রুর সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। ঐক্যবদ্ধ একটি জাতি, অসাম্প্রদায়িক চৈতন্য লালনকারী একটি জনগোষ্ঠীকে ভাগ-বিভাজন করে অন্যদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সবার বিবেচনায় থাকা ভালো, রাজনৈতিক পরাজয় অর্থনৈতিক পরাজয়কে আবশ্যম্ভাবী করে। তখন সাংস্কৃতিক বিপর্যয় রোধ করা যায় না। আমরা কোন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছি সেটা মগজে রাখা ভালো।
মনে মনে স্বপ্ন দেখি, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাম ও ইসলামিস্টরা যদি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে আপসহীন থেকে ইনসাফের পক্ষে ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে একটি সমতল জায়গায় অবস্থান নিত, তাহলে সুবিধাবাদ, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদ নিপাত যেত। মানুষের মর্যাদা বাড়ত। ন্যায়নীতি ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পক্ষে একটি নতুন স্রোতের জন্ম নিত। জাতীয় ঐক্যের ফাটল মেরামতের একটি গ্রহণযোগ্য উপায়ও আমরা খুঁজে পেতাম। কবি গবেষক ফরহাদ মজহারের চিন্তাভাবনা ও গবেষণাপ্রসূত প্রবন্ধ-নিবন্ধে একটি সমন্বিত চিন্তার জায়গা দেখতে পাই। মওলানা ভাসানী এ পথে একটি পদচিহ্ন এঁকে গেছেন। কমরেড তোয়াহা, কমরেড নূরুল হক মেহেদী ও মেজর জলিলও বেশ অগ্রসর ভূমিকা পালন করতে সচেষ্ট ছিলেন। কমরেড হক ও সিরাজ শিকদার অনুসারীদের অনেকেই সাম্যবাদের ইসলামি মডেল নিয়ে ভাবছেন। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদও বিলম্বিত চিন্তায় বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে চেয়েছেন। আরো কিছু উদ্যে যে কেউ নিতে পারেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সামাজিক শক্তি হিসেবে ইসলামিস্টদের উপড়ে ফেলা কিংবা অস্বীকার করার সাধ্য কারো নেই। লেফটিস্টদের সাংস্কৃতিক বিচরণ রোধ করাও কঠিন। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বলয়ে দ্বন্দ্ব ও সঙ্ঘাত রেখে রাজনৈতিক ঐক্য হয় না। পরস্পরের ধ্বংস কামনা ও নিপাত যাওয়ার দাবি অর্থহীন। তাই মোটা দাগে কয়েকটি ইস্যুতে এক জায়গায় দাঁড়ানোর দায়বোধ সবারই থাকা উচিত। যে অর্থে ইসলামিস্টরা প্রতিক্রিয়াশীল, সংশোধনবাদী ও প্রগতিশীল নয়, একই অর্থে বামপন্থীরাও অভিযুক্ত। যারা ধর্মের তুলনামূলক পাঠে আগ্রহী তারা জানেন, মোশরেকের তুলনায় আহলে কিতাবধারীরা মন্দের ভালো। অভিশপ্ত ইহুদিবাদীদের তুলনায় খ্রিষ্টানরা অধিকতর গ্রহণযোগ্য। রাজনৈতিক ধর্মে পুঁজিবাদের বা ধনতন্ত্রের তুলনায় সাম্যবাদ ভালো হতে দোষ কি!
masud2151@gmail.com

কথার পিঠে কথা, রাজনৈতিক by সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক

বিজয়ের মাস চলছে। বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে বলতেই হবে, স্বাধীন বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার তথা স্বাধীন অস্তিত্বের স্বাদ গ্রহণ করতে শুরু করেছে ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে। অনেক চড়াই-উৎরাই পার হয়ে আমরা আজ এ অবস্থানে এসেছি। সারা বছরই কেউ-না-কেউ কোনো-না-কোনো পত্রিকায় বা টকশো বা সেমিনারে দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে চিন্তাভাবনা প্রকাশ করে থাকেন। মুক্তিযোদ্ধারা, মার্চ ও ডিসেম্বর মাসে একটু বেশি করেন। কলামলেখক ও সাংবাদিক পীর হাবিবুর রহমান গত ২৫ নভেম্বর সুন্দর একটি কলাম লিখেছিলেন ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পত্রিকায়। এক বছর পরও ওই কলামের বক্তব্য থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে এবং নিজের মতামত যুক্ত করে আজকের কলামটি উপস্থাপন করছি একটু ভিন্ন স্টাইলে।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব সৃষ্টি করা প্রয়োজন
পীর হাবিব : ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মতো কঠিন এবং রাজনীতির মতো দুর্বোধ্য বিষয় মোকাবেলা করেও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনেক ছোটখাটো বিষয়ের সমস্যা সমাধানেও যখন ভূমিকা রাখতে দেখা যায়, তখন নেতৃত্বের সঙ্কট উন্মোচিত হয়।’ আমার মন্তব্য : আগামী দিনের জন্য নেতৃত্ব প্রস্তুত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বাংলাদেশের সংবিধানের মাধ্যমে এবং রেওয়াজের মাধ্যমেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী। এর সুফলের তুলনায় কুফল বহু গুণ বেশি। সংবিধানের সংস্কার প্রয়োজন, ইতোমধ্যে সংবিধান কয়েকবার সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো করা হয়েছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্বার্থের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। বাংলাদেশের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ মাথায় রেখে সংবিধান সংশোধন করা প্রয়োজন।
দলীয়করণ বন্ধ করা প্রয়োজন
পীর হাবিব : ‘দেশে দলীয়করণের প্রতিযোগিতা প্রশাসনের ওপর মানুষের আস্থা ও সম্মানের জায়গা সরিয়ে দিয়েছে। ... নিয়োগবাণিজ্য বা রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ স্বীকৃত হয়েছে।’ আমার মন্তব্য : জনাব এইচটি ইমাম হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা। কিছু দিন পূর্বে তিনি ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানে যে কথাগুলো বলেছেন, সে কথাগুলো যেকোনো সচেতন নাগরিককেই উৎকণ্ঠিত করতে বাধ্য। বাংলাদেশের এমন কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বা সংস্থা নেই যেখানে একান্তভাবেই আওয়ামী লীগের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে চাকরি দেয়া হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ স্পর্শকাতর বাহিনী বা বিভাগগুলোতেও এই কাজ করা হয়েছে বলেই মানুষ বিশ্বাস করে। ওই বিশ্বাসের সমর্থন পাওয়া গেল এইচটি ইমামের কথা থেকে। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষকে সরকারি চাকরি দেয়ার কারণেই গত বছর ৫ জানুয়ারি অতি ন্যক্কারজনকভাবে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয়েছে। এতবড় একটা বেনিফিট বা লাভ পাওয়ার পর, কী কারণে বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল দলীয়করণ বন্ধ করবে বা কমিয়ে দেবে সেটা বোধগম্য নয়। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ মেয়াদে দলীয়করণ করেছেন এটা সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হয়। তবে বিগত সাত বছর ধরে সেটা সীমাহীনভাবে চলছে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র এতবড় ভার বহন করতে পারবে কি না, এটা কঠিন প্রশ্ন।
দুর্নীতির ডালাপালা
পীর হাবিব : ‘দুর্নীতি দিনে দিনে বহু বেড়েছে।’ আমার মন্তব্য : দুর্নীতি এখন যে স্তরে আছে, সেই স্তরে একদিনে পৌঁছেনি। ১৯৭২ থেকে শুরু করে, প্রতিটি বছর, প্রতিটি রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সরকারের মেয়াদেই, প্রতি সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি বিভিন্ন মাত্রা অর্জন করেছে। তবে বিগত ছয়-সাত বছর ধরে দুর্নীতি বাংলাদেশকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো, বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের একাধিক মন্ত্রীর কথাবার্তা ও কর্ম প্রত্যক্ষভাবেই দুর্নীতিকে উৎসাহিত করছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক সরকারের জ্যেষ্ঠ ব্যক্তি, যারা নিজেরা দুর্নীতি করেননি, তাদের অপরাধ হচ্ছে, দায়িত্বে অবহেলা। আজ থেকে ছয়-সাত বছর আগের শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি, চার বছর আগের হলমার্ক ও ডেসটিনি কেলেঙ্কারি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারি, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি ইত্যাদির দায়িত্ব কে নেবে এটা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী প্রশ্ন। বাংলাদেশের একটি দৈনিক পত্রিকা ‘মানবজমিন’ ১০ জানুয়ারি ২০১৫ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেই প্রতিবেদনের শিরোনামেই উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এক বছরেই পাচার ৭৬ হাজার কোটি টাকা’।ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) এই তথ্য প্রকাশ করেছে। জিএফআই সাত বছর ধরে উন্নয়নশীল দেশ থেকে কী পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে পাচার হয়ে গেছে, তা নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এক বছরেই বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। টাকার অঙ্কে তা ৭৬ হাজার ৩৬১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ২০১৩ সালে এ অর্থ পাচার হয়েছে। সমগ্র বাংলাদেশের সব নাগরিক অন্ধ বা বধির এবং চেতনাবিহীন হয়ে গেছে অথবা তাদের স্মৃতিশক্তি ও পর্যবেক্ষণ শক্তি লোপ পেয়েছে এরূপ কল্পনা করলে, ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা ভুল করবেন।
রাজনীতিতে সহনশীলতা বনাম প্রতিহিংসা
পীর হাবিব : ‘রাজনীতিতে সহনশীলতার উল্টো পথে আগ্রাসী রূপ নিয়েছে প্রতিহিংসা। গুম, খুন মানুষের জীবনকে নিরাপত্তাহীন করেছে।’ আমার মন্তব্য : রাজনীতিতে সহনশীলতা অপরিহার্য। সহনশীলতার অন্তত দু’টি আঙ্গিক আছে। যথা : কর্মে সহনশীলতা এবং মুখের বাক্য-বিনিময়ে সহনশীলতা। সাধারণভাবে যারা দেশ ও রাষ্ট্র চালান তারাই অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় হন। অতএব, জ্যেষ্ঠতম নেতা প্রধানমন্ত্রীই সবার আগে অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় হওয়ার কথা। কিন্তু অঙ্কের মতো জরিপ করে যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে অবশ্যই বলা যাবে যে, প্রধানমন্ত্রী ঘন ঘন বিরোধী দলের প্রতি ও বিরোধীদলীয় রাজনীতির নেতৃত্বের প্রতি অত্যন্ত অসহনশীল ও আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করে থাকেন। কর্মের সহনশীলতা প্রসঙ্গে আমার মন্তব্য, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের অনৈতিক ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রতি সহনশীল হওয়া রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকারক। অপর পক্ষে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন (একটি বা একাধিক) এর ভেতরে যে আক্রমণাত্মক পরিবেশ, সেটা অন্য কাউকে সহনশীল হতে উৎসাহিত করে না। বরং অন্যদেরও উৎসাহিত করে আক্রমণাত্মক হতে। বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিহিংসাপরায়ণ- এ কথা বহু লোক বলছেন। কাউকে-না-কাউকে প্রতিহিংসা বাদ দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। বহু লোক বলছেন, আগামীতে যদি ২০ দলীয় জোট ক্ষমতায় আসে, তাহলে তারা বর্তমান ক্ষমতাসীনদের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হবে। এই চিন্তার ধারাবাহিকতায় অনেকেই বলছেন, ২০ দলীয় জোট যদি অগ্রিম ঘোষণা দেয় যে, তারা প্রতিহিংসাপরায়ণ হবে না, তাহলে বর্তমানের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ঠাণ্ডা মাথায় নিজেদের ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়ের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে কিছুটা হলেও নিশ্চিত হয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক চিন্তা করতে পারে। আমার নিবেদন, শুভ কাজ যথাশীঘ্র শুরু করাই ভালো। পারলে ২০১৫ সালের বিজয় দিবসের পর থেকেই শুরু হোক; প্রতিহিংসার বদলে জাতীয় ভিত্তিতে মায়া-মমতা ও সহমর্মিতার পরিবেশ সৃষ্টি করা হোক।
বাংলাদেশে মাদকের আগ্রাসন
পীর হাবিব : ‘ইয়াবাসহ মাদকের আগ্রাসন একেকটি পরিবারকেই নয়, দেশের একটি প্রজন্মকে অন্ধকার পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।’ আমার মন্তব্য : মাদকের আগ্রাসন নতুন নয়। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর আছে। এই মুহূর্তে মাদকের আগ্রাসন থেকে দেশের তরুণ সম্প্রদায়কে বাঁচানোর জন্য এই অধিদফতর কোনো অবস্থাতেই যথেষ্ট উপযুক্ত, যথেষ্ট দক্ষ, যথেষ্ট আগ্রহী ও যথেষ্ট ক্ষমতাবান নয়। মাদক এখন একটি জাতীয় সমস্যা। মাদকের সমস্যা থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে রাজনৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ে এমপিউটেশন প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, ডায়াবেটিস রোগীর হাতে সংক্রমণ এবং ঘা হয়েছে, চার-পাঁচটি আঙুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, হাতের কব্জি দুর্বল হয়ে গেছেÑ এ অবস্থায় হাতের কনুইয়ের নিচে কেটে ফেলতে হবে। মাদক সমস্যার মতোই অন্য একটি সমস্যা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছি। কিছু দিন ধরে সোনা চোরাচালান প্রচণ্ড বেড়ে গেছে। খবর পড়ি আর চিন্তা করি। দেশের মানুষ খবর পড়েন এবং চিন্তা করেন। কোনো সমাধানের কথাবার্তা পত্রিকায় দেখা যাচ্ছিল না। হঠাৎ বছর খানেক আগে একটি চোরাচালান ধরা পড়ার পর সেটার পিঠে পিঠে সূত্র ধরে আগাতে আগাতে দেখা গেল, মিডিয়ার মতে, এই অপকর্মটিতে বাংলাদেশ বিমানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা আছে। যেখানে ঘরের ভেতরেই শত্রু, সেখানে বাইরের শত্রুর প্রয়োজন নেই। মাদক প্রসঙ্গে ফিরে আসি। মাদক বাংলাদেশকে শেষ করে দেবে। যারা মাদকের ব্যবসা করে, তারা টাকা অর্জনের জন্য মাদক ও ইয়াবার চোরাকারবার করে। আমার অনুভূতি বা মূল্যায়ন অনেকটা এ রকম। মোট ১২ থেকে ২০ জনের জাতীয় পর্যায়ের একটি সিন্ডিকেট পুরো বাংলাদেশে ইয়াবার চোরাচালান ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তাদের অধীনে ১০০ থেকে ১৫০ জন উপ-নিয়ন্ত্রক আছে। এসব উপ-নিয়ন্ত্রকের অধীনে হাজার থেকে দেড় হাজার সহকারী নিয়ন্ত্রক রয়েছে। সহকারী নিয়ন্ত্রকদের নিচে ১০ থেকে ১২ হাজার খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ী সক্রিয়। দেশব্যাপী আনা-নেয়ার জন্য লাখ থেকে দেড় লাখ বহনকারী বা কুরিয়ার আছে, যারা অন্যান্য পেশায় জড়িত থাকতেও পারে বা নাও থাকতে পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে সাধারণত খুচরা ব্যবসায়ী ধরা পড়ে। বড় জোর, সহকারী নিয়ন্ত্রক ধরা পড়ে দু’একজন। এর উপরের স্তরের লোকেরা এ পর্যন্ত ধরা পড়েছে বলে কোনো দিন শুনিনি। মিডিয়ার রিপোর্ট মোতাবেক, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের বহুলালোচিত একজন রাজনীতিবিদ মাদকের ব্যবসার ক্ষেত্রে ওই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করেন। আমার এ মন্তব্য শুধু এই ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য নয় বরং সর্বজনীনভাবেই প্রযোজ্য। ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা ব্যতীত মাদকের ব্যবসা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদ এবং ক্ষমতাসীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ব্যক্তিদের প্রভাব বা সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিতভাবেই এই মুহূর্তেও আছে। তবে যেহেতু কোনো সরকারি বাহিনী বা কোনো সাংবাদিক এরূপ গভীরে অনুসন্ধান করেন না, সেহেতু ওই ব্যক্তিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। কেউ যদি বেশি অনুসন্ধানের আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে তার পরিণতি হয়তো খারাপ হবে। যদি কেউ এমন অবস্থার সম্মুখীন হয়, তাহলে তার পরিবার অসহায় হয়ে পড়ে। রাষ্ট্র ওই অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ায় না। এই অনুচ্ছেদ শেষ করতে চাই একটি কথা বলে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের ভূখণ্ড যেমন বঙ্গোপসাগরের পানির নিচে ডুবে যেতে পারে বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে, তেমনি সারা জাতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নৈতিকতা, মেধা ও কর্মক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মাদক তথা ইয়াবার কারণে। একজন মানুষ যদি যক্ষ্মা বা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এবং তার চিকিৎসা না করা হয়, তাহলে সে ধীরে ধীরে মারা যাবে। অনুরূপ মাদকের কারণে পুরো জাতি আক্রান্ত এবং অসুস্থ। দু’চারটি মিষ্টি কথা, দু’চারটি ক্লিনিকের বিজ্ঞাপন, দু’চারটি টকশোতে কিছু নসিহত কোনো মতেই মাদকের বা ইয়াবার আক্রমণ থেকে বাংলাদেশকে বাঁচাতে পারবে না। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মাদক আগ্রাসন তথা ইয়াবা আক্রমণ যারা পরিচালনা করছেন, তাদের বেশির ভাগই শিক্ষিত এবং বিদেশে থাকেন।
কল্যাণের লক্ষ্যে পরিশীলিত রাজনীতি
কলাম শেষ করতে চাই সম্মানিত পাঠকের কাছ থেকে শুভেচ্ছা কামনা করে। কেন, তার বিনীত ব্যাখ্যা পরবর্তী লাইনগুলো। বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন হলো ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষা করতে হলে পরিশীলিত রাজনীতিবিদ, পরিশীলিত চিন্তাবিদ, পরিশীলিত আমলা, পরিশীলিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিশীলিত বিনিয়োগকারী এবং পরিশীলিত শ্রমজীবী প্রয়োজন। তবে, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থাৎ সবার আগে প্রয়োজন পরিশীলিত রাজনীতিবিদ। কারণ, সর্বশেষ বিচারে রাজনীতিবিদেরাই দেশ পরিচালনার জন্য দায়ী। ২০০৭ সালের ৪ ডিসেম্বর নিজে নাম লিখিয়েছিলাম একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে। সেই থেকে চেষ্টা করছি প্রচার করতে, পরিবেশন করতে একটি আহ্বান ও একটি প্রয়োজনীয়তা। সেটি হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন প্রয়োজন। বাংলাদেশের মেধাবী ও সাহসী ব্যক্তিগণকে এবং তরুণ সম্প্রদায়কে রাজনীতিবিমুখ হতে দেয়া যাবে না। অপর দিকে, রাজনীতির পঙ্কিলতা ও দুর্গন্ধ তরুণ সম্প্রদায়কে দূরে ঠেলে দেয়। অতএব, প্রবীণদেরই দায়িত্ব উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা। ওই সংগ্রামে লিপ্ত আছি নিজের অতি সীমিত শক্তিতে, সীমিত সংখ্যক বন্ধু ও শুভাকাক্সক্ষীর সহযোগিতায়। নতুন দলটির বয়স আট বছর হলো। কিছু না হোক, শুভেচ্ছা অবশ্যই কাম্য।
লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com

আবের ‘আবেনোমিকস’র কি হাল?

বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক সমৃৃদ্ধশীল রাষ্ট্র জাপানে বর্তমান ক্ষমতাসীন শিনজো আবের আমলে কতটা উন্নত হয়েছে দেশটি- তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে শুরু হয়েছে জল্পনা-কল্পনা। দেশটির জাতীয় নির্বাচনের আগে আবের প্রতিশ্রুতি অনেকের কাছে অযৌক্তিক মনে হলেও কারও কাছে প্রাসঙ্গিক। তার নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল- ‘আমাকে নির্বাচিত করুন। জাপানের আর্থিক ঊর্ধ্বগতি আনায়ন করব। দেশের জাতীয় ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করব।’ আবের এই প্রতিশ্রুতির কতটা তিনি বাস্তবায়ন করেছেন তারই আলোকে বুধবার আবে শাসনের ভাঙা-গড়ার তিন বছর নিয়ে এক প্রতিবেদন তৈরি করেছে এএফপি। ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির জয়ে ক্ষমতায় বসেন শিনজো আবে। চলতি সপ্তাহের শনিবার তার ৩ বছর পূর্ণ হয়। ক্ষমতায় এসে অর্থনীতির লাগাম পুনরুদ্ধারে রাজস্ব বৃদ্ধি, আর্থিক স্বচ্ছলতা ও কাঠামোগত সংস্কার-এ ৩ নীতির সমন্বয়ে ‘আবেনোমিকস’ নামক নতুন এক অর্থ পলিসি ঘোষণা করেন আবে। এক সময়কার এশিয়া অর্থনীতির অন্যতম পরিচালিকা খ্যাত জাপানে আশানুরূপ নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি পূরণে ব্যর্থ আবে। দেশটির অর্থনৈতিক মন্দা, ২০১১ সালের ভূমিকম্প, সুনামি ও চীনের সঙ্গে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা জাপানের শক্তিকে খর্ব করেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, রফতানিকারদের জন্য এটা সুখবর যে,
গত ৩ বছরে দেশটির শেয়ার সূচক দ্বিগুণ হয়ে ২০ হাজার লেভেলে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে আবের শাসনামলে দেশটির উন্নয়ন নিয়ে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিএনপি পরিবাসের অর্থনীতিবিদ রাউথারো কুনো বলেন, আবেনোমিকসকে বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায়, দেশটির আর্থিক কর্মক্ষমতা খুবই দুর্বল। দাইওয়া ইন্সটিটিউট অব রিসার্চের অর্থনীতিবিদ সাতোশি ওসানাই বলেন, আবে সরকারে প্রথমার্ধে ভালোই চলছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তা ফিকে হয়ে যায়। জাপান আগামী ২০২০ সালের অলিম্পিকের আয়োজক দেশ। এর দ্বারা দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চপেটাঘাত আসতে পারে বলে মনে করেন দাই-ইচি লাইফ রিসার্চ ইন্সটিটিউটের প্রধান হাইদিও কুমানো। এদিকে চলতি বছরের জুন মাসে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সরকারি ১০ সংস্থা কর্তৃক ৪১৭ ক্যাটাগরিতে দেশটির প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার প্রশাসনিক নথির পরিকল্পনা করা হয়। এর মধ্যে ৩টি গোপন নথি ফাঁস হয়েছে। এজন্য নথি ফাঁসে জড়িতদের সাজা হিসেবে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড নির্ধারণে আইন পাস করে জাপান সরকার। তবে এর সপক্ষে এখনও কোনো মামলা করা হয়নি।

বাংলাদেশ চায় রাষ্ট্রনায়ক by এমাজউদ্দীন আহমদ

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাষ্ট্রনায়কের (Statesman), রাজনীতিকের (Politician) নয়। রাজনীতিকেরা দল ভাঙেন, রাষ্ট্রনায়কেরা দল গড়ে তোলেন, শুধু বর্তমানের জন্য নয়, ভবিষ্যৎকে সামনে রেখেও। রাজনীতিকেরা বিতর্ক সৃষ্টি করেন, রাষ্ট্রনায়কেরা কিন্তু বিতর্কিত হয়েও ভবিষ্যৎ বিতর্কের শত ছিদ্র বন্ধ করেন। রাজনীতিকেরা জাতিকে বিভক্ত করেন এবং জাতীয় বিভক্তির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সদা ব্যগ্র। রাষ্ট্রনায়ক কিন্তু জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সঙ্কল্পবদ্ধ এবং নিজের জীবন বিপন্ন করেও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। রাজনীতিকেরা বর্তমানকেই মুখ্যজ্ঞান করে বর্তমানেই বসবাস করতে চান। রাষ্ট্রনায়ক কিন্তু বর্তমানে বসবাস করেও অতীতকে ভোলেন না এবং ভবিষ্যৎকে দৃষ্টিতে রাখেন। রাজনীতিকেরা রাজনৈতিক দলকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন, রাষ্ট্রনায়ক কিন্তু রাজনৈতিক দলকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে দলের ঊর্ধ্বে যে জনগণ এবং জাতি তার প্রতিই হন অধিক আকৃষ্ট। রাজনীতিকদের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রক্ষমতাই প্রধান। এ ক্ষমতাকে তারা উপভোগ করেন তাদের প্রভাব, বৈভব ও প্রতিপত্তির মাধ্যম হিসেবে। রাষ্ট্রনায়কের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রক্ষমতা উপায় বটে, কিন্তু তা জনকল্যাণ এবং রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির লক্ষ্যে কোনো সময়ে উপেয় নয়।
রাজনীতিকেরা বাংলাদেশে রাজনীতিকে অসুস্থ করে তুলেছেন। জাতি আজ বিভক্ত। ধনী-দরিদ্র, গ্রামবাসী-নগরবাসী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত পর্যায়ে যে বিভক্তি ছিল আজ তার ওপর এসেছে রাজনৈতিক বিভাজন। চুয়াল্লিশ বছর আগের স্বাধীনতাযুদ্ধকে কেন্দ্র করে আজো কেউ স্বাধীনতার পক্ষের, কেউ বা নতুনভাবে চিহ্নিত হচ্ছেন স্বাধীনতাবিরোধী রূপে। তা ছাড়াও শুরু হয়েছে নতুনভাবে জাতীয়তার প্রশ্নের বিভাজন। কেউ কেউ বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। কেউ প্রচার করছেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কথা। সব মিলিয়ে জাতির একাংশ হয়েছে আওয়ামীপন্থী এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। অন্য অংশটি জাতীয়তাবাদী, বাংলাদেশী জাতীয়তায় বিশ্বাসী। এই বিভাজন এমন প্রকট হয়ে উঠেছে যে, দুই-এর মধ্যে নেই কোনো যোগসূত্র, নেই কোনো ‘হাইফেন’। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার এই যে, এই বিভাজন প্রতিদিন যেমন দৃঢ়তর হচ্ছে, তেমনি সমাজ জীবনের প্রায় প্রতি ক্ষেত্রে তা পরিব্যাপ্ত হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে, শ্রমিক সংগঠনে, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে, এমনকি প্রশাসনেও এর দীর্ঘ ছায়া সব কিছুকে মলিন করে তুলেছে। এর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শুধু জাতীয় ঐক্য নয়, জাতীয় অগ্রগতির গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং করবেও।
আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে বাংলাদেশ অগ্রগতির কোন স্তরে উপনীত হবে, রোগব্যাধি-কুসংস্কার-দারিদ্র্যের ওপর কতটুকু বিজয় অর্জন করবে, শিল্প-বাণিজ্য ক্ষেত্রে উন্নতির স্পর্শ কতটুকু লাভ করবে এ সম্পর্কে রাজনীতিকেরা এতটুকু ভাবেননি। বাংলাদেশের জনশক্তিকে দক্ষ শ্রমশক্তিতে রূপান্তরের কোনো চিন্তাভাবনা তাদের নেই। দক্ষিণ এশিয়ার প্রান্তসীমায় অবস্থিত প্রান্তিক বাংলাদেশে দক্ষিণ এশিয়ার একটি অগ্রগামী রাষ্ট্র হিসেবে কিভাবে তারা দেখতে চান, এ বিষয়েও তাদের কোনো প্রস্তুতি নেই। প্রস্তুতি নেই আগামী শতাব্দীতে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর উন্নয়ন সমারোহে কিভাবে সংশ্লিষ্ট হবে সে সম্পর্কেও। তাই বলি, বাংলাদেশ অনেক রাজনীতিক দেখেছে। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অচ্ছেদ্য গ্রন্থিতে আবদ্ধ হয়ে শ্বাসকষ্ট ভোগ করছে দীর্ঘ দিন। জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড থেকে স্বাধীনতার পতাকা ছিনিয়ে এনেছে। আপন গৌরবে সার্বভৌমত্বের আশীর্বাদ লাভ করে বিজয়তিলক কপালে পরেছে। ওইসব সঙ্কটময় মুহূর্তে রাজনীতিকেরা যে ভূমিকা পালন করেছেন, এ দেশের সাদামাটা নিরক্ষর দরিদ্র জনসাধারণ তথা ছাত্র-শ্রমিকেরা তারচেয়ে কোনো অংশে কম গৌরবময় ভূমিকা পালন করেননি। রাজনীতিকদের স্বপ্ন জনগণকে যতটুকু প্রভাবিত করেছে, জনগণের অগ্রগামী পদক্ষেপ রাজনীতিকদের তার চেয়ে অনেক বেশি প্রেরণা জুগিয়েছে।
রাজনীতিকেরা ব্যক্তিস্বার্থে, কোনো কোনো সময় দলীয় স্বার্থে, এমনকি কখনো পারিবারিক স্বার্থে, রাজনীতি পরিচালনা করছেন। জনগণের কথা বলেছেন বটে, কিন্তু তাদের কর্মপ্রচেষ্টায় জনগণ কোনো দিন মুখ্য হয়ে ওঠেনি। রাজনীতি হয়নি জনকল্যাণমূলক সুসংহত উদ্যোগ। নিজেরা দলাদলি করেছেন। নিজেরা দল ভেঙেছেন। ভেঙেছেন পরের ঘরও। কখনো কিন্তু এ কারণে লজ্জায় তাদের মুখ লাল হয়ে ওঠেনি। সংসদে তারা যা বলেন এবং যেভাবে ও ভাষায় বলেন, কোনো দিন কেউ ভেবে দেখেননি যাদের জন্য এসব কথা, তারা কিভাবে তা গ্রহণ করবেন অথবা বক্তাদের সম্বন্ধে তারা কী ধারণা পোষণ করবেন। গাঁয়ের ঝগড়া গাঁয়ে মানায়। গ্রাম্য মুড়লিও গ্রামবাসীর জন্য। জাতি কিন্তু চায় উন্নতমানের বিতর্ক, সৃজনশীল ধারণার প্রকাশ। জাতি উত্তম কথা শুনতে চায়। অন্য দেশে যা ঘটে এবং যেভাবে, তার প্রতিফলন দেখতে চায় নিজেদের সমাজে। দেখতে চায় তুলনামূলক সৌকর্য, কৃতিত্বের অভিব্যক্তি, সুরুচিসম্পন্ন আলোচনা-পর্যালোচনা। মেঠো বাচালতায় তারা ক্লান্ত। নিম্নমানের ঝগড়াটে কথাবার্তায় তাদের তীব্র অনীহা। কোন নেতা কখন কী স্বপ্ন দেখলেন, সে সম্পর্কে জনগণের তেমন আগ্রহ নেই। তারা আগ্রহী মানবেতর জীবন থেকে কিভাবে রেহাই পাবেন। অশিক্ষা ও নিরক্ষরতার কবল থেকে কখন তারা মুক্ত হবেন। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে কিভাবে তারা বেরিয়ে আসবেন। এসব বিষয়ে জনগণ আগ্রহী। সম্প্রতি অনেক নেতানেত্রী একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার কথা বলে থাকেন। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য সবার আগে রাজনীতিকদের চিন্তা-ভাবনা, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ, রুচিশীলতা-আন্তরিকতায় আমূল পরিবর্তন সাধিত হতে হবে। যে দৈন্যদশায় এখন রাজনীতিকেরা প্রপীড়িত, তার হাত থেকে তাদের অব্যাহতি পেতে হবে। নিজেদের মান উন্নত করতে হবে তাদের। ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে, দলীয় স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থে রূপান্তরিত করতে হবে। জাতীয় স্বার্থ কিভাবে সমুন্নত রাখতে হবে, সে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। অন্তত পঞ্চাশ বছর সামনে দৃষ্টি দিতে হবে। প্রতিটি পদক্ষেপে সে লক্ষ্য যেন বাস্তবায়ন হয় তা চিন্তায় রাখা প্রয়োজন। বিরোধী দলের অবস্থানে যা বলেছি, ক্ষমতাসীন দলে তার আর প্রয়োজন নেই- এ মানসিকতা বলদর্পীর। ক্ষমতাসীন থেকে যা করেছি, বিরোধী দলে এসে তা ভুলে যাওয়া এক ধরনের হীনম্মন্যতা। দুই-এর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করাই রাষ্ট্রনায়কোচিত কাজ। বাংলাদেশে এখন তাই প্রয়োজন রাষ্ট্রনায়কের। রাজনীতিকেরা রাষ্ট্রনায়কোচিত গুণে বিভূষিত না হলে শুকনো পাতার মতো তারা ঝরে পড়বেন বাংলাদেশ রাজনীতির আধমরা গাছ থেকে। তারা তখন এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলার জন্য কাউকে পাবেন না। বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস তা-ই বলে।
রাষ্ট্রনায়ক মাটিতে অবস্থান গ্রহণ করেও আকাশচারণ করেন। বর্তমানকে অবহেলা না করেও ভবিষ্যৎ দর্শন করেন। অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেন। অনেকটা ওয়ার্ডসওয়ার্থের (Wordsworth) ভরত পাখির (Skylark) মতো, পা রয়েছে মাটিতে, কিন্তু অপূর্ব সুরের ঝঙ্কারে আকাশ-বাতাস মুখরিত করছে। দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত থেকেও সমগ্র জাতিকে আহ্বান করছেন ভবিষ্যতের স্বপ্নসাধ মেটানোর জন্য। জাতীয় ধী এবং মনীষার সৌধ নির্মাণে। সব সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্যের চিরন্তন বাণী নিয়ে সবার মনে সৃষ্টিশীল প্রয়াসের ঐকতান সৃষ্টি করতে। প্রতিহিংসার স্পৃহা ত্যাগ করে আকাশের উদারতায় সবাইকে জাতীয় প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের আহ্বান। এটি রাজনীতিকদের নয়, রাষ্ট্রনায়কের ভাষা। আজ বাংলাদেশে তাই প্রয়োজন রাষ্ট্রনায়কের। সঙ্কীর্ণমনা, হিংসুটে, প্রতিহিংসাপরায়ণ, ঝগড়াটে, স্থূলবুদ্ধির রাজনীতিকের নয়। বাংলাদেশ চায় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, উদার হৃদয় বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়ক, কোন্দলপ্রিয় রাজনীতিক নয়।
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্যারিস চুক্তির ধোঁয়াশা ও বাংলাদেশের আশা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্ববাসীর আসলেই একটি চুক্তি দরকার ছিল। প্যারিসেই সেই চুক্তির দেখা মিলবে—এই পূর্বাভাস আগেই ছিল। অনেকের মতে, ১২ ডিসেম্বর প্যারিসের লা বুর্জেতে যা ঘটে গেল, সেটাই ওই বহু আকাঙ্ক্ষিত চুক্তি। যে চুক্তি হওয়ার কথা ছিল ২০০৯ সালে, ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে। ছয় বছর ধরে চলা একের পর এক সম্মেলন ও আলোচনার ফলাফল হিসেবে ৩২ পৃষ্ঠার একটি নথি অনুমোদন দিয়েছে বিশ্বের ১৯৫টি রাষ্ট্র। ওই নথিটিকেই বলা হচ্ছে প্যারিস চুক্তি। জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন সংস্থা থেকে শুরু করে বিশ্বের বেশির ভাগ রাষ্ট্রই ওই নথি অনুমোদন দিয়ে যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে। যাহোক, যাঁর যাঁর দেশে গিয়ে অন্তত বলা যাবে কোনো ব্যর্থ সম্মেলন থেকে তাঁরা ফেরেননি। এখন ওই চুক্তিতে মুক্তি খোঁজার আহ্বান জানিয়ে ইতিমধ্যে বিশ্বের বহু সংস্থা বিবৃতি, বিশ্লেষণ ও তাদের বিবেচনা হাজির করছে। আগামী দিনের চ্যালেঞ্জও উদ্ঘাটন শুরু হয়েছে। কিন্তু কী আছে ওই ৩২ পৃষ্ঠার নথিতে। প্যারিসের ২১তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের উদ্যোক্তা জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত কাঠামোর (ইউএনএফসিসিসি) ওয়েবসাইটে গিয়ে কেউ যদি প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্ট নামে নথিটি ডাউনলোড করে একটু চোখ বোলান, তাহলে অনেকেরই বিভ্রান্তি কাটতে পারে। কেননা, ওটি আসলে কোনো চুক্তি নয়। ৩২ পৃষ্ঠার ওই নথির ১৯ পৃষ্ঠা হচ্ছে প্যারিসে যা আলোচনা হয়েছে তার সারমর্ম। অর্থাৎ ১৪ দিনের আলোচনায় রাষ্ট্রগুলো যেসব বিষয়ে একমত হয়েছে, তা সেখানে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে কোন দেশের কী দায়িত্ব, কীভাবে তা পালন হবে, কবে সেটা বাস্তবায়ন হবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। প্যারিস সম্মেলনের আলোচনার ফলাফলের শেষে ২০ থেকে ৩২ পৃষ্ঠা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে একটি পরিশিষ্ট বা অ্যানেক্স। ওই পরিশিষ্টের মধ্যে রয়েছে প্যারিস চুক্তির একটি চূড়ান্ত খসড়া।
ওই সিদ্ধান্তের শুরুতেই বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ২২ এপ্রিল থেকে ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিলের মধ্যে জাতিসংঘের মহাসচিব উচ্চপর্যায়ের একটি সভার আয়োজন করে প্যারিস চুক্তিতে রাষ্ট্রপ্রধানদের স্বাক্ষর নেবেন। এখানেই শেষ নয়, এর পরে আবার রাষ্ট্রগুলোকে তার নিজ নিজ দেশের সংসদে বা রাষ্ট্রপ্রধানের নির্বাহী আদেশে ওই চুক্তিটি অনুমোদন দিতে হবে। ওই অনুমোদনের পর ২০২০ সাল থেকে চুক্তিটি বাস্তবায়ন শুরু হবে। এখন অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, এত প্রক্রিয়া শেষ করে যে চুক্তিটি বিশ্ববাসী পাবে, তা কি বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে কেউ যদি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে অতীত আলোচনা ও চুক্তিকেন্দ্রিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নেন, তাহলে অনেক উত্তর চলে আসবে। ২০১০ সালে কানকুন সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্যারিস চুক্তিতে জাতিসংঘের সবুজ জলবায়ু তহবিলে (জিসিএফ) কোন দেশ কত অর্থ দেবে, সে ব্যাপারে দিকনির্দেশনা থাকার কথা ছিল। মেক্সিকোর কানকুন শহরের ১৬তম জলবায়ু সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২০ সাল পর্যন্ত শিল্পোন্নত বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ১০ হাজার কোটি ডলার দেবে। প্যারিস সিদ্ধান্তের সংযুক্তি হিসেবে থাকা চুক্তির খসড়ায় কোন দেশ, কবে থেকে, কী পরিমাণে অর্থ দেবে তার কোনো রূপরেখা নেই। ১৯৯৭ সালে জাপানের কিয়োটো শহরে হওয়া জলবায়ু সম্মেলনে একটি প্রটোকল বা আইনি বাধ্যবাধকতাসহ চুক্তি হয়েছিল। তাতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের সব দেশ স্বাক্ষর করেছিল। অ্যানেক্স-১ খ্যাত বিশ্বের ৩৭টি শিল্পোন্নত রাষ্ট্র জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হিসেবে শিল্পবিপ্লবের পর থেকে তাদের কার্বন নিঃসরণ যে দায়ী, সেই দায় শিকার করে নিয়েছিল। বলেছিল, তারা ২০১২ সাল পর্যন্ত তাদের মোট কার্বন নিঃসরণের ৫ শতাংশ কমাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তাদের জাতীয় আয়ের ৭ শতাংশ সহায়তা হিসেবে দেবে। কিয়োটো প্রটোকল আইনি বাধ্যবাধকতাসহ চুক্তি ছিল। বলা ছিল বিশ্বের কোনো দেশ ওই চুক্তির বরখেলাপ করলে তার জবাবদিহি থাকবে। ইউরোপের দু-তিনটি দেশ বাদে ওই অঙ্গীকার কেউই বাস্তবায়ন করেনি। আর যুক্তরাষ্ট্র তো শেষ পর্যন্ত কিয়োটো প্রটোকল তাদের কংগ্রেসে অনুমোদন করাতে পারেনি। ফলে তারা ওই চুক্তির বাইরে ছিল। কিয়োটো প্রটোকেল বলা হয়েছিল, ২০১২ সাল থেকে শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো কী পরিমাণে কার্বন কমাবে, কত অর্থ জলবায়ু তহবিল হিসেবে দেবে, তা নির্ধারণ করে একটি চুক্তি হবে। প্যারিস চুক্তির সারবস্তু খেয়াল করলে বিশ্ব কিন্তু ১৯৯৭ সালের কিয়োটো চুক্তির চেয়েও পিছিয়ে গেল। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে এমন আশা দিয়ে গেছে।
কিন্তু ওই চুক্তিতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়টি আর আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে থাকল না। কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের হিসাবমতে, কার্বন নিঃসরণ কমানোর জাতীয় পরিকল্পনা বা (আইএনডিসি) বাস্তবায়ন করতে হলে রাষ্ট্রগুলোকে বছরে ব্যয় করতে হবে ১০ থেকে ২০ লাখ কোটি ডলার। বাংলাদেশ সরকারের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গত এক যুগে এক হাজার কোটি ডলার ব্যয় করেছে। ২০১৫ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশকে ব্যয় করতে হবে আরও চার হাজার কোটি ডলার। এই অর্থ কে দেবে, কবে দেবে তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। শেষ পর্যন্ত এর বড় অংশ হয়তো বাংলাদেশ রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে। তবে ওই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হলেই বিশ্ব কি জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ থেকে নিরাপদ হয়ে গেল? খোদ জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত প্যানেলের (আইপিসিসি) বিজ্ঞানীরা প্যারিস সম্মেলনের আগে ১৯৫টি দেশের কার্বন নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকারনামা নিয়ে একটি পর্যালোচনা হাজির করেছে। তাতে তারা দেখিয়েছে, ওই অঙ্গীকার শতভাগ বাস্তবায়ন হলেও এই শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা আরও তিন ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়বে। যদি তাই হয় তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? সেই প্রশ্নের উত্তর প্যারিস চুক্তির আলোকেই খুঁজতে হবে। অন্যদিকে কিয়োটো প্রটোকল চুক্তিতে শিল্পোন্নত বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতির যে দায় স্বীকার করে নিয়েছিল, প্যারিসে এসে তারা তা থেকে মুক্তি পেয়ে গেল। সব মিলিয়ে আমরা হবু প্যারিস চুক্তির যদি সারসংক্ষেপ করি তাহলে যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে, এই চুক্তিতে শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো কার্বন নিঃসরণ কমানো ও বাড়ানোর কাজটি স্বাধীনভাবে করবে। তারা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অর্থ দেওয়ার বিষয়টিও সুনির্দিষ্ট করল না। তবে যারা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিন্তু এর জন্য দায়ী নয়, তাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকারের আওতায় নিয়ে এল। এতসব জেনে হয়তো অনেকে বলতে পারেন, তাহলে এই চুক্তি লইয়া আমরা কী করিব? ওই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের জন্যই তোলা থাকল।
ইফতেখার মাহমুদ: সাংবাদিক।

আইন সংস্কারের সুপারিশ বিবেচনায় নিন

একটি গবেষণার ভিত্তিতে ভূমিসংক্রান্ত আইনি সমস্যার সমাধানে যেসব সুপারিশ পাওয়া গেছে, তা অবিলম্বে সরকারি মনোযোগের দাবি রাখে। জমি নিয়ে একটি মামলার বিরোধ নিষ্পত্তিতে বর্তমানে গড়ে প্রায় সাড়ে নয় বছর সময় লাগে। অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতের নেতৃত্বে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনসহ ১১টি বেসরকারি সংস্থা চার বছরের বেশি সময় ধরে গবেষণার পর ভূমিসংক্রান্ত ১৪৬টি আইন বিশ্লেষণ করে যথার্থই বলেছে যে এসব আইন না পাল্টাতে পারলে দরিদ্র, প্রান্তিক ও নারীর ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা কখনোই সম্ভব হবে না। ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে বলা হয়, বর্তমানে দেশের অধস্তন আদালতে যে ৩০ লাখ মামলা বিচারাধীন, তার অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে ভূমিবিরোধের সঙ্গে জড়িত। ২০১২ সালে পরিচালিত টিআইবি জরিপে উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল, দেশের শতকরা ৫৪ দশমিক ৮ ভাগ গৃহস্থ উৎকোচের বিনিময়ে ভূমিসেবা গ্রহণ করেছেন। ১২ মাসে তঁাদের দেওয়া ঘুষের পরিমাণ ২ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি।
তাই বেসরকারিভাবে হলেও ভূমি সমস্যা নিরসনে এই গবেষণালব্ধ ফলাফলকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। অনেক সময় বেসরকারি সংস্থার সুপারিশকে তুলনামূলক কম গুরুত্ব দেওয়া আমাদের আমলাতান্ত্রিক জনপ্রশাসনের একটি বৈশিষ্ট্য। আমরা আশা করব, এই গবেষণা ও এর সুপারিশগুলোকে বিবেচনায় নেওয়া হবে এবং তা প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক নিস্পৃহতার মধ্যে পড়বে না। বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার পক্ষে ভূমিসংক্রান্ত বিরোধের ভার বহন করা অসম্ভবের পর্যায়ে চলে গেছে। এ সমস্যা জনপ্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গ্রাম আদালত ও সার্বিকভাবে সমগ্র বিচার বিভাগকে ন্যুব্জ করে ফেলছে। সেমিনারে ভূমিমন্ত্রী এই সমস্যার জন্য সামরিক শাসকদেরই শুধু দায়ী করেছেন। কিন্তু একে আর বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। সামাজিক সংহতি বিনষ্ট, সহিংসতা বৃদ্ধি ও আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে ভূমি বিরাট ভূমিকা রাখছে। গবেষণার ভিত্তিতে করা সুপারিশমালা অবিলম্বে বিচার-বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার করা হোক।

ব্যবসার জন্য নীতিনৈতিকতা বিসর্জন দেয়ার এক গোপন কাহিনী by মোহাম্মদ হাসান শরীফ

মুসলিম ব্রাদারহুড কি সন্ত্রাসী সংগঠন? তারা এই দাবিই করেছিল। এই দাবিকে যৌক্তিকতা দিতেই ব্রিটিশ সরকার গঠন করেছিল তদন্ত কমিটি। সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত স্যার জন জেনকিনসকে করা হয়েছিল এই কমিটির প্রধান। না। তদন্তে ব্রাদারহুডের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ মেলেনি। তবে তদন্তে উঠে এসেছে এক প্রিন্সের প্রতিশোধ আগুনের ভয়াবহতা আর ব্রিটিশরা যে স্রেফ ব্যবসার জন্য ন্যায়-অন্যায়ের ধার ধারে না, তার বীভৎস চিত্র। ব্যবসা পাওয়ার জন্য ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত সত্যকে বিসর্জন দিয়ে ওই প্রিন্সের একটু সদয় দৃষ্টি পাওয়ার জন্য লালায়িত ছিলেন, সেটাও পাওয়া গেছে এই তদন্তে। মজার ব্যাপার হলো, যারা এই তদন্তের ব্যবস্থা করতে ব্রিটিশ সরকারকে বাধ্য করেছিল, প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাদের মধ্যেই দেখা দিয়েছে সবচেয়ে বেশি হতাশা।
এ প্রতিবেদনটি আসলে আরব আমিরাতের সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষটি এবং পাঁচ বছর ধরে তার রাজনীতি কিভাবে ব্রিটিশ-আমিরাতি সম্পর্কে পরিচালিত করেছে, সে কাহিনীই উঠে এসেছে।
গত নভেম্বরে গার্ডিয়ানে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ব্রাদারহুডের ওপর দমনপীড়ন চালানোর বিনিময়ে আকর্ষণীয় অস্ত্র ও তেল চুক্তির জন্য ক্যামেরনকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিল আমিরাত।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই কার্যক্রমে আমিরাতের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। তবে প্রধান ভূমিকায় ছিলেন আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান, উপসাগরীয় এলাকায় যিনি ‘এমবিজেড’ নামে পরিচিত।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট খলিফা বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানকে সাম্প্রতিক সময়ে খুব কম দেখা যায়, বা তার কথা শোনা যায়। গুজব রয়েছে খুবই অসুস্থ। এমন প্রেক্ষাপটে ‘এমবিজেড’ কার্যত দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অনেকে মনে করছে।
ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা
ব্রিটিশ তদন্ত প্রতিবেদনটি বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে ‘এমবিজেড’ এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি তার তীব্র বিদ্বেষের বিষয়টি।
অনেকে মনে করে, ২০১২ সালে ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসির মিসরের প্রেসিডেন্ট হওয়ার ঘটনাটি ছিল মোড় পরিবর্তনকারী। এই ঘটনার রেশ ধরেই ব্রিটিশ সরকার ২০১৪ সালের ১ এপ্রিল জেনকিন্সকে তদন্ত করার দায়িত্ব দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
ঘটনাপরম্পরা এবং উদ্দেশ্যের দিক থেকে এটাকে পুরোপুরি সত্যিই বলা যায়। ‘এমবিজেড’-এর কাছে মুরসির জয়ী হওয়া ছিল পুরো অঞ্চলে ব্রাদারহুডের বন্যায় ভেসে যাওয়া এবং স্বৈরতান্ত্রিক উপসাগরীয় অঞ্চলকে তাদের ইসলামি গণতন্ত্রের পতাকাতলে নিয়ে আসার সম্ভাবনার সূচনা।
ব্রাদারহুডের প্রতি ‘এমবিজেড’র বিদ্বেষ প্রকাশ্যে তেমনভাবে জানা ছিল না। অবশ্য পদস্থ একটি ব্রিটিশ সূত্র মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছে, ‘এমবিজেড’ ব্রাদারহুডের সদস্যও হতে পারতেন, অথচ তিনি হয়েছেন তার ভাষায় তাদের বিরুদ্ধাচরণের ব্যাপারে একাট্টা ব্যক্তি। তিনি বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন লোক কিন্তু বিষয়টিকে তিনি বহু দূর নিয়ে গেছেন।
গুজব রয়েছে, আমিরাতি ক্রাউন প্রিন্স ব্রাদারহুড সম্পর্কে বিদ্বেষপরায়ণ হওয়ার কারণ, তিনি মনে করেন, গ্রুপটি তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা হাসিলের জন্য ধর্মকে সঙ্গী করে নিয়েছে।
‘এমবিজেড’-এর অবস্থান বোঝা যেতে পারে স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের প্রিজম দিয়ে। এ ধরনের শাসক মনে করতে পারেন, তার ব্যাপকভাবে রক্ষণশীল ও ধার্মিক প্রজারা ব্রাদারহুডকে আকর্ষণীয় গ্রুপ বিবেচনা করে বসতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাদের আসন টলে যেতে পারে।
কায়রোতে মুরসির নির্বাচন ‘এমবিজেড’র এই আশঙ্কা জোরদার করেছিল। তবে তিনি আরো আগে থেকেই বেশ দীর্ঘ সময় ধরে অভ্যন্তরীণ ফ্রন্টে ব্রাদারহুডকে মোকাবেলা করে আসছিলেন।
‘এমবিজেড’ ২০০৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ব্রাদারহুড গ্রুপ আল-ইসলাহকে (তারা দাবি করে, তারা পুরোপুরি স্থানীয় সংগঠন, তাদের নজর কেবল সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের দিকেই) আন্তর্জাতিক সব সমমনা সংগঠনের সাথে তাদের কার্যক্রম ও সম্পর্ক ছিন্ন করতে বলেছিলেন।
ইসলাহ এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাদের নিজস্ব কার্যক্রম চালিয়ে গিয়েছিল, রাজনৈতিক সংস্কারের আহ্বান বাড়াচ্ছিল। পরবর্তী দশকে ইসলাহ ক্রমবর্ধমান নির্যাতনের মুখে পড়ে, তারা এখন নিষিদ্ধ, সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ, এর নেতারা হয় কারারুদ্ধ কিংবা বাধ্যতামূলকভাবে প্রবাসে রয়েছেন।
উইকিলিকসে প্রকাশিত মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের ক্যাবলে দেখা যাচ্ছে, ‘এমবিজেড’ বিশ্বাস করছেন, আমিরাতি সরকারে ইসলাহ অনুপ্রবেশ করেছে। তিনি আমেরিকান কর্মকর্তাদের বলেন, আমিরাতে নির্বাচন হলে ইসলাহ সহজেই জয়ী হবে।
আরব বিশ্বে ২০১১ সালে বিপ্লব প্লাবিত হওয়ার পর এসব অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ আঞ্চলিক বিষয়ে পরিণত হয়। ‘এমবিজেড’ দেখছিলেন, কিভাবে ব্রাদারহুডের সমর্থকেরা গণবিক্ষোভের সুযোগ নিয়ে আড়াল থেকে বের হয়ে আসছে, লিবিয়া থেকে তিউনিসিয়া এবং মিসর থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত দেশে দেশে সম্ভাব্য রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
মুরসি যখন ২০১২ সালের ২৪ জুন মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষিত হন, তখন ‘এমবিজেড’ আমিরাতে ইসলাহর বিরুদ্ধে অভিযানের তদারকি করছিলেন। ইসলাহর নেতাদের গ্রেফতার, কারারুদ্ধ করা হয়, গ্র“পটির নেতারা ক্ষমতাসীন পরিবারের হাত থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করতে গোপন ক্যু করার চক্রান্তে লিপ্ত বলে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়।
ঠিক এই পর্যায়ে মুসলিম ব্রাদারহুডের ব্যাপারে তদন্ত শুরু করতে ব্রিটিশ সরকার উদ্বুদ্ধ হয়।
আমিরাতের মুলা ও লাঠিনীতি
২০১৫ সালের নভেম্বরে গার্ডিয়ানে আবুধাবির গণসংযোগবিষয়ক নাটের গুরু এবং ব্রিটিশ নাগরিক সাইমন পিয়ার্সের একটি লিখিত নোট প্রকাশিত হয়। এতে ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে দমন অভিযান চালানোর বিনিময়ে ব্রিটেনকে কয়েক শ’ কোটি পাউন্ডের তেল ও অস্ত্রচুক্তির লোভ দেখানো হয়।
‘এমবিজেড’ যেসব স্থানে ব্রিটিশ সরকারকে শুদ্ধি অভিযান চালাতে বলেছিলেন, তার অন্যতম ছিল বিবিসি। তার মতে এই প্রতিষ্ঠানটিতে ‘ইসলামপন্থী সহানুভূতিশীলদের’ অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
যুক্তরাজ্যের প্রতি আমিরাতের মুলা ও লাঠি নীতিটি সূচিত হয় ২০১২ সালের জুলাই মাসে। ওই সময় আবুধাবির জাতীয় তেল কোম্পানির মহাপরিচালক আবদুল্লাহ নাসের আল-সুওয়াইদি স্পষ্টভাবে জানান, ওয়েল জায়ান্ট বিপিকে আমিরাতের নতুন ও আকর্ষণীয় তেলচুক্তির দরপত্রে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, যদিও দেশটিতে বিপি দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করেছে।
আগস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়, তেল দরপত্র থেকে বিপিকে বাদ (অন্তত আংশিকভাবে হলেও) রাখার কারণ হতে পারে, আরব বসন্তের প্রতি ব্রিটিশ সমর্থনে আমিরাতি ক্রোধ। আরো তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ঠিক এই সময়টাতেই বেশ কয়েকজন ইসলাহ নেতা লন্ডনে অবতরণ করে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করে।
একই সময়ে মানবাধিকার গ্রুপগুলো এই অভিযোগ প্রকাশ করতে থাকে, আমিরাতি কর্তৃপক্ষ ইসলাহ নেতাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। ব্রিটিশ পত্রিকাগুলোতে এসব প্রতিবেদন ফলাও করে প্রচারিত হওয়ায় আবুধাবির মধ্যে এই ধারণা দানা বেঁধে ওঠে, লন্ডন তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সম্ভাব্য বিশ্বাসঘাতকতার এই অনুভূতি সম্ভবত শিকড় গেড়েছিল যখন আবুধাবি দেখছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তাদের দীর্ঘ দিনের মিত্র হোসনি মোবারকের (২০১১ সালে গণবিক্ষোভের মুখে পদচ্যুত হওয়ার সময়) দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
মুরসির নির্বাচনের পর, রাজনৈতিক জোটের কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে। ওই সময় বিপি মিসরের গ্যাস খাতে ১১ বিলিয়ন ডলার প্রদানের প্রতিশ্র“তি দেয়। এই ঘোষণা দেয়ার সংবাদ সম্মেলনে ব্রাদারহুড নেতা ও ওই সময়ের মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক উপস্থিত ছিলেন।
‘এমবিজেড’-এর অসহায় অনুভূতি আরেক দফা বাড়ে ওই মাসেই। বিপির ঘোষণার পরপরই ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং ক্যামেরনের সাথে সাক্ষাতের জন্য মুরসিকে আমন্ত্রণ জানান।
পরের মাসে ইসলাহ নেতা সাইয়িদ নাসের আল তেনিজি (তিনি আমিরাতের বাইরে প্রবাস জীবনযাপন করছিলেন) ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে আমিরাতি দমন অভিযান নিয়ে গার্ডিয়ানের মতামত কলামে একটি লেখা প্রকাশ করেন। ইসলাহ নেতাদের গ্রেফতার ও নির্যাতনের অভিযোগ সম্পর্কে আলোচনার করা জন্য তেনিজিকে বিবিসি আরবি বিভাগে আমন্ত্রণ জানানো হয়। একের পর এক ঘটা এসব ঘটনা যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে আমিরাতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বড় ধরনের প্রচারণায় নামতে উদ্বুদ্ধ করে।
আমিরাত জুড়ে টুইটার হ্যাশট্যাগ #UK_supports_traitors ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের ভাষায় ইসলাহর প্রতি যুক্তরাজ্যের সমর্থনের নিন্দা জানানো হয় এতে। ২০১২ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝিতে ইসলাহের বিরুদ্ধে চালিত নির্যাতনের আলোকে ব্রিটিশ-আমিরাত জোটের তীব্র সমালোচনা করে সম্পাদকীয় লেখা হয়। এতে আবুধাবিতে লন্ডনের প্রতি ক্ষোভ বরং আরেক দফা বাড়ে।
ওই সম্পাদকীয় প্রকাশের এক সপ্তাহ পর ফিন্যান্সিয়াল টাইমস আমিরাতের এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, তেলবাণিজ্য থেকে বিপির বহিষ্কার ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়’। তবে সাথে সাথে এই হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করা হয়, ‘পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে দিলে’ যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে ‘সরে যাবে’ আমিরাত।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিপির বিরুদ্ধে হুমকি সম্ভবত আমিরাতের বিরুদ্ধে মিডিয়াকে সমালোচনা করার সুযোগ দেয়ায় ব্রিটেনের প্রতি ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তারা যদিও আবুধাবিকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, তারা মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, তবুও আমিরাতের ক্রোধ বাড়তেই থাকে।
খবরে প্রকাশ, ২০১২ সালের নভেম্বরেও বিপি আশা করছিল, তাদেরকে আবুধাবির কাছে আবারো উষ্ণভাবে গ্রহণযোগ্য করতে ব্রিটিশ সরকার সহায়তা করতে পারে। তখন, ৫ নভেম্বর, যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে ৬০০ বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যে ১০০টি সামরিক বিমান কিনতে আবুধাবিকে রাজি করানোর চেষ্টায় ক্যামেরন আমিরাত পৌঁছেন।
মিডিয়ায় এ সফরটিকে উচ্চকিত করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গী হতে মাত্র দু’জন সাংবাদিককে অনুমতি দেয়া হয়। লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র হিসেবে আমিরাতের সাথে সম্পর্ক আবার ঝালিয়ে নেয়া।
৬ নভেম্বর ব্রিটিশ ও আমিরাত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিরক্ষা ও শিল্প অংশীদারিত্ব ঘোষণা করে, কয়েক শ’ কোটি পাউন্ডের বিমান কেনার চুক্তিও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা বলা হয়, যদিও এই পর্যায়ে তা নিশ্চিত করা হয়নি। এটা সম্ভবত পিয়ার্সের (যারা তাকে চেনেন, তাদের মতে তিনি রাজনৈতিক খেলাটা বেশ ভালোই বোঝেন) নেতৃত্বাধীন আমিরাতের গণসংযোগ কৌশলবিদদের মুলা ও লাঠি নীতির সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করে করা হয়েছিল।
২০১২ সালের ২৮ নভেম্বর আবুধাবি ঘোষণা করে, তারা বিপির ১.৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদ কিনছে। এতে সুস্পষ্টভাবেই মনে হয়, যুক্তরাজ্য ও আমিরাতের মধ্যকার সম্পর্কের জটিলতা দূর হয়েছে। বিপিকে তখনো আমিরাতের তেল খেলায় ফিরতে দেয়া হয়নি, তবে তাদের খুব বেশি দিন দূরেও রাখা হয়নি। ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে ইতঃপূর্বে যে তেলচুক্তি থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছিল, সেটাতে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
ব্রিটিশ আপস ও পরিবর্তন
২০১৩ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাজ্যের জটিল ও পরস্পর সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক জোটে ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছিল আমিরাতি প্রেসিডেন্ট খলিফা রাষ্ট্রীয় সফরের দিয়ে এবং মিসরের ব্রাদারহুডের নেতাদের সাথে ক্যামেরনের একটি গোপন লাঞ্জ মিটিংয়ের মাধ্যমে।
ওই বছরের জুনে মিসরের সিনিয়র কর্মকর্তারা লন্ডনে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন পরবর্তী মাসে মুরসির পরিকল্পিত সফর নিয়ে। ওই সফরটি আর হতে পারেনি, কারণ ৩ জুলাইয়ের গণসমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানে সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি ক্ষমতা দখল করে মুরসিকে কারারুদ্ধ করেন।
মিসরে যেদিন মুরসিকে অপসারণ করার অভ্যুত্থানটি ঘটে, ওই একই দিনে আমিরাত তাদের দেশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের বৃহত্তম রাজনৈতিক বিচারের রায় প্রকাশ করে। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ইসলাহের ৬৯ নেতাকে সাত থেকে ১৫ বছরের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
ব্রিটেনে ব্রাদারহুডের জন্য এটা ছিল সন্ধিক্ষণ। মিসরের ক্ষমতা থেকে অপসৃত হওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার গ্রুপটির সাথে সম্পর্ক রাখেনি বললেই চলে।
আবুধাবির সাথে বাণিজ্য বাড়ানোর চেষ্টায় আমিরাত-যুক্তরাজ্য-ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক ত্রিভুজে আমূল পরিবর্তন ঘটে। আবুধাবির মুলা আর লাঠিনীতির জের ধরে কয়েক বিলিয়ন পাউন্ডের বিমান চুক্তিটি হওয়ার কথা থাকলেও আর কখনো সেটা আলোর মুখ দেখেনি। চুক্তিটি বাস্তবে রূপ দিতে ক্যামেরনের আরেকবার আমিরাত সফরের জন্য তুলে রাখা হয়।
কিন্তু ক্যামেরনের চেষ্টা বিফল হয়। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ঘোষণা করা হয়, ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা কোম্পানি বিএই সিস্টেমস আমিরাতি চুক্তি পেতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু অন্তত প্রকাশ্যে এ নিয়ে ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার মতো অবস্থায় যুক্তরাজ্য ছিল না। কারণ চলমান ও আকর্ষণীয় সুযোগ সুবিধা দেয়ার সামর্থ্য থাকায় আমিরাত দেশটির গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার বিবেচিত হচ্ছিল।
২০০৯ সালে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের। ২০১৩ সাল নাগাদ তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ বিলিয়ন। এই বাণিজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ হচ্ছিল যুক্তরাজ্যের পক্ষে।
২০১৪ সালের মার্চে নেদারল্যান্ডসে অনুষ্ঠিত ‘নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি সামিটের’ ফাঁকে ‘এমবিজেড’ ও ক্যামেরন বসে ‘আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অনেক ইস্যু’ নিয়ে আলোচনা করেন। এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, ১৭ এপ্রিল ক্যামেরন ঘোষণা করেন, ব্রাদারহুডের ব্যাপারে তদন্ত করার কথা ঘোষণা করেন। এর ৯ দিন পর এই তদন্তের অংশ হিসেবে জেনকিনস তার প্রথম আমিরাত সফরে আবু ধাবিতে সিনিয়র কর্মকর্তা খালদুন আল মুবারকের সাথে বৈঠক করেন।
যুক্তরাজ্য মিসরীয় ব্রাদারহুড থেকে দূরে সরে গেলেও ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে নিশ্চিত করা হয়, বেশ কয়েকজন ইসলাহ নেতাকে লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়া হয়েছে। এই ঘটনা স্পষ্টভাবেই আবুধাবিকে ক্রুদ্ধ করে।
মে মাসে আমিরাত ঘোষণা করে, তারা সামরিক প্রশিক্ষক হিসেবে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের ব্যবহার বন্ধ করে দেবে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে বলা হয়, যুক্তরাজ্য ইসলাহসহ ইসলামপন্থী গ্র“পগুলোর হুমকির বিষয়টি নীরবে মেনে নিয়েছে ধরে আমিরাত ক্রুদ্ধ হয়েছে।
অল্প সময়ের মধ্যে আবু ধাবির হতাশা আরো বেড়ে যায় এই গুজবে যে যুক্তরাজ্য ব্রাদারহুড-বিষয়ক তদন্ত গ্রুপটিকে সন্ত্রাসী হিসেবে অভিহিত করতে অস্বীকার করেছে। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে আবুধাবি ক্ষুব্ধ হতে পারে, এই আশঙ্কায় প্রতিবেদন প্রকাশ বিলম্বিত হতে পারে বলে খবর প্রকাশিত হতে থাকে।
কয়েক মাস পর এমবিজেড লন্ডনে ক্যামেরনের সাথে বৈঠক করেন। এর তিন দিন পর ১৯ অক্টোবর টেলিগ্রাফে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যে ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন অভিযান শুরু হবে।
তবে এর পরপরই মিডিয়ায় যা প্রকাশিত হয়, সেটা ছিল টেলিগ্রাফ ভাষ্যের বিপরীত। তাতে নিশ্চিত করা হয়, সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ থেকে ব্রাদারহুডকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে।
তবে ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণা করা যাচ্ছিল না বলে আমিরাতের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখতে ব্রিটিশ সরকার হিমশিম খাচ্ছিল। এটাই মিডিয়ায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছিল।
তেল মন্ত্র
জেনকিন্সের প্রতিবেদন প্রকাশের প্রেক্ষাপটে বিপি এখন অপেক্ষা করছে, তারা আবুধাবিতে তেল সুবিধাটি পায় কি না তা দেখার জন্য। আমিরাতি জ্বালানিমন্ত্রী সুহাইল আল মাজরুই টেলিগ্রাফকে বলেছেন, বিপি এখনো প্রতিযোগিতায় আছে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, আমিরাত এখনো মুলা আর লাঠিনীতির পথটিই আঁকড়ে ধরে আছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিমান চুক্তির মতো বিপিকেও জানানো হয়, আবুধাবির তেলে তাদের সুবিধা দেয়া হবে না। টেলিগ্রাফে খবর প্রকাশিত হয়, আমিরাতকে প্রভাবিত করতে যুক্তরাজ্যের ব্যর্থতার জের ধরে বিপি ৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিটি পেতে ব্যর্থ হলো।
২০১৫ সাল জুড়ে জেনকিন্স রিপোর্ট নিয়ে নানা রকম গুজব শোনা যেতে থাকে। কিন্তু ব্রিটিশ-আমিরাত সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে মনে করে তা প্রকাশ করা হয়নি। একই সময় যুক্তরাজ্য সফরকারী আমিরাতি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বলতে থাকেন, তাদের দেশে ব্যবসা করে যুক্তরাজ্য দ্বিগুণ টাকা বানাতে পারে।
এই রাজনৈতিক খেলার পুরোটাই এমবিজেড এবং ব্রাদারহুডের প্রতি তার ব্যক্তিগত ঘৃণার সাথে সংশ্লিষ্ট। তার দেশের অর্থ এবং যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য দেশে প্রভাব বিস্তারে তার সামর্থ্যই জেনকিন্সের তদন্ত শুরুর কাজ করেছে।
ব্রাদারহুডের ‘চরমপন্থীদের সাথে অত্যন্ত দ্ব্যর্থবোধক সম্পর্ক’ রয়েছে বলে পার্লামেন্টে ক্যামেরনের দেয়া মৃদুভাষার বিবৃতিটি আবু ধাবির ক্রাউন প্রিন্সকে সন্তুষ্ট করতে পারে কি না তা এখন দেখার বিষয়।
(মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে)

ফুটবলে মেয়েদের শালীন পোশাক পরা by শাহ্ আব্দুল হান্নান

নেপালে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব ১৪ বছর মেয়ে ফুটবল টিমের শিরোপা জয়ের খবর ও ছবি বিভিন্ন পত্রিকায় দেখে আমার এই লেখা। যেকোনো প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশে কোনো ক্রীড়া দলের বিজয় খবর আনন্দের। এশিয়ান ফুটবল কনফেড়ারেশন অনূর্ধ্ব ১৪ মেয়েদের আঞ্চলিক এই প্রতিযোগিতায় জয়ের খবরটিও হতে পারে আনন্দের। কিন্তু প্রতিযোগিতায় মেয়ে ফুটবলারদের পরা পোশাক বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ধর্মবিশ্বাস ও শালীনতাবোধের সাথে সাংঘর্ষিক মনে হতে পারে।
বেশির ভাগ মুসলিম দেশের মেয়ে ফুটবলাররা হাফপ্যান্টের পরিবর্তে ফুলপ্যান্ট পরে খেলে থাকে। অথচ এই প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে দেখা গেল বাংলাদেশের মেয়েরা হাফপ্যান্ট পরে ফুটবল খেলছে। এটি মুসলিম দর্শকদের চোখে বিব্রতকর মনে হয়েছে। বাংলাদেশের ফুটবল টিমের বেশির ভাগ মেয়েই মুসলিম। মুসলিম মেয়েদের জন্য শালীন পোশাক পরার নির্দেশনা রয়েছে। যার ব্যতিক্রম ইসলামি শরিয়াহ অনুমোদন করে না।
ইরান, আফগানিস্তান, সৌদি আরব, কাতার, পাকিস্তানসহ অনেক দেশের মেয়ে প্রতিযোগিতামূলক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে থাকে। এসব দেশের মুসলিম মেয়েরা ফুলপ্যান্ট এবং অনেক ক্ষেত্রে মাথা ঢেকে ফুটবল খেলে থাকেন। ফুটবল খেলতে গিয়ে দৌড়ানো বা বল নিয়ে পায়ের কারুকাজে তাদের কোনো সমস্যা লক্ষ করা যায় না। এসব দেশের কোনো কোনো টিম আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাফল্যও লাভ করেছে। এর মধ্যে কোনো কোনো দেশকে মেয়েদের প্রতিযোগিতার জন্য আলাদা স্টেডিয়াম তৈরি অথবা তাদের জন্য নির্ধারিত দিন সংরক্ষণ করতেও দেখা যায়।
ফুটবলের মতো ক্রিকেটও একটি জনপ্রিয় খেলা। এই প্রতিযোগিতায় সব দেশেই ছেলেদের মতো মেয়ে ক্রিকেটাররাও ফুলপ্যান্ট পরে খেলেন। বাংলাদেশী মেয়েরাও ফুলপ্যান্ট পরে বিভিন্ন ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন।
ইরান, আফগানিস্তান, সৌদি আরব, কাতারের মেয়েরা ফুলপ্যান্ট এবং ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে ফুটবল খেলে অনেক সাফল্যও পেয়েছেন। পর্দা বা শালীন পোশাক তাদের জয়ে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। এ ছাড়া একটি প্রতিযোগিতায় জয়ের চেয়েও মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নির্দেশের প্রতি অনুগত থাকার গুরুত্ব কম নয়।
প্রয়োজন বোধে কর্তৃপক্ষ মেয়েদের জন্য সপ্তাহে তিন দিন স্টেডিয়াম সংরক্ষিত করার বিষয় বিবেচনা করতে পারে। এটি হয়তো এ মুহূর্তে সম্ভব মনে নাও হতে পারে। তবে চাহিদা দেখা দিলে এটি বিবেচনা করা যেতে পারে। আর সব স্টেডিয়াম না হলেও যেখানে সম্ভব সেখানে এটি বিবেচনা করা যেতে পারে। আমি বাংলাদেশের ক্রীড়া কর্তৃপক্ষকে শরিয়াহর বিধানের বিষয়টিতে সম্মান জানানোর জন্য বিশেষভাবে আহ্বান জানাচ্ছি।

জোটে যোগ দিলেও সিরিয়া, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে সমর্থন দেবে না পাকিস্তান

সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ইসলামিক সামরিক জোটে পাকিস্তান যোগ দিতে পারে। কিন্তু তারা সিরিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে কোন অভিযানে সমর্থন দেবে না। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন। এতে বলা হয়, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ৩৪ জাতির এই জোটে হয়তো পাকিস্তান যোগ দিয়েছে। কিন্তু সিরিয়াকে অস্থিতিশীল করে তোলে বা তেহরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কে টান পড়তে পারে এমন কোন অভিযানে তারা সমর্থন দেবে না এই জোটকে। ওই কর্মকর্তারা বলেছেন, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র বিষয়ক সিনেটের স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে এমন নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সিনেটর নুজহাত সাদিক। এতে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ ও পররাষ্ট্র সচিব ইজাজ আহমেদ চৌধুরী। এ বৈঠকে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ইসলামিক সামরিক জোটে যোগ দেয়া না দেয়া প্রশ্নে আলোচনা হয়। এতে পাকিস্তানের ওপর সম্ভাব্য কি ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে তাও আলোচনা করা হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন সূত্রগুলো বলেছেন, পার্লামেন্টকে আস্থায় না নিয়ে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন এমন জোটে যোগ দেয়ার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে কমিটির অনেক সদস্য উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আতঙ্ক থেকে তারা এই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা যে আতঙ্ক প্রকাশ করেন তাতে বলা হয়েছে, নতুন গঠিত এই জোটটি ব্যবহার করা হতে পারে সিরিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে। তবে সূত্রমতে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তেমন আশঙ্কা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা সৌদি আরবের নেতৃত্বে ইসলামিক সামরিক জোটে সমর্থন দেবেন শুধু সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে। এ জন্যই তারা ওই জোটের শরীক। কর্মকর্তারা বলেছেন, সিরিয়া বিষয়ে পাকিস্তানের অবস্থান পরিষ্কার। তা হলো প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বাইরের হস্তক্ষেপের তীব্র বিরোধী তারা। এক কর্মকর্তা বলেন, সিরিয়া সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে পাকিস্তান। সৌদি আরবের নেতৃত্বে ইসলামিক সামরিক জোট এমন এক সময়ে গঠন করা হয়েছে যখন ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা শক্তিধর দেশগুলো পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তি করেছে। এ বিষয়টি হয়তো অনেক দেশ ভাল চোখে দেখছে না। তাই ইরানকে পাল্টা জবাব দিতে সৌদি আরব এমন জোট গঠন করেছে বলে পাকিস্তানের ওই বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করেন কয়েকজন সদস্য। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, সৌদি আরবের নেতৃত্বে এই জোটে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্তে ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক আক্রান্ত হবে না। এই জোট বিশেষ কোন দেশের বিরুদ্ধে নয়।

সব মামলায় জামিন পেলেন অনুপ চেটিয়া

 বহুল আলোচিত, ভারতের চোখে দুর্ধর্ষ রাষ্ট্রবিরোধী অনুপ চেটিয়া অবশেষে সবগুলো মামলায় জামিন পেলেন। তার বিরুদ্ধে বর্তমানে চারটি মামলা রয়েছে। বুধবার তিনি এর সর্বশেষ মামলাটি থেকে জামিন পেয়েছেন। এর আগে জামিন পেয়েছেন তিনটি মামলায়। ফলে তার এখন জামিনে মুক্তি পাওয়ার কথা। কিন্তু তার জামিনের খবর পাওয়া গেলেও তিনি মুক্তি পেয়েছেন কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায় নি। তবে তার হাস্যোজ্বল একটি ছবি প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, উপস্থিত সমর্থক, নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি হাত উপরে তুলে অভিনন্দনের জবাব দিচ্ছেন। তার সামনেই একটি গাড়ি। তিনি সেখান থেকে কোথায় গেছেন সে বিষয়ে কোন ইঙ্গিত দেয়া হয় নি রিপোর্টে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এএনআই। গত মাসে অনুপ চেটিয়াকে বাংলাদেশ থেকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়। ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট ফর আসাম (উলফা)-এর এই নেতাকে পেতে ভারত এতদিন ভীষণ তৎপর ছিল। বাংলাদেশ থেকে অনেকটা সতর্কতার সঙ্গে গত মাসে তাকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়। সেখান থেকে গোয়াহাটি কেন্দ্রীয় কারাগার হয় তার ঠাঁই। সেখানে একে একে তিনটি মামলায় তিনি জামিন পাওয়ার পর বুধবার তাকে সর্বশেষ মামলায় জামিন দেয় গোয়াহাটির সেশন জজ আদালত। সিনিয়র একজন আইনজীবী বলেছেন, জামিনের ক্ষেত্রে আদালত অনুপ চেটিয়াকে দুটি শর্ত দিয়েছেন। তা হলো তিনি মামলার তদন্তে কোন ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারবেন না। পূর্বানুমতি ছাড়া তিনি স্পেশাল জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের বিচার থেকে দূরে থাকতে পারবেন না। আসাম রাজ্য সরকার তার সব মামলার জামিনে অনাপত্তি জানানোর পর এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর অর্থ আসামে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে পরিচিত উলফাকে শান্তি আলোচনার টেবিলে আনা। সরকার উলফার সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানে যেতে চাইছে। সেই শান্তি সংলাপে অনুপ চেটিয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি মুক্তি পাবার পরই এই সংলাপ শুরু হতে পারে। বলা হয়েছে, আসামের বিদ্রোহী গোষ্ঠী উলফার অতীত ভুলের জন্য ক্ষমা করে দিতে বলেছেন অনুপ চেটিয়া। তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনার পক্ষেও। তাই তিনি তার ও তার দলের সব ভুল ক্ষমা করে দেয়ার দাবি করেছেন। অনুপ চেটিয়া উলফার সাধারণ সম্পাদক। তারা আসামকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করে এতদিন আন্দোলন করেছেন। সে আন্দোলন করতে গিয়ে তাদেরকে যেতে হয়েছে আন্ডারগ্রাউন্ডে। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি অনুপ্রবেশের দায়ে বাংলাদেশে আটক হয়ে জেল খেটেছেন। বাংলাদেশ থেকে তাকে ফেরত পাঠানোর পর তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআইয়ের হেফাজতে। ১৭ই নভেম্বর তাকে গোয়াহাটি নিয়ে যায় সিবিআই। সেকানে তাকে ট্রানজিট রিমান্ডের আবেদন করা হয়। কড়া নিরাপত্তা হেফাজতে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে তোলা হয়। তার বিরুদ্ধে ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রবেশ, ৬টি দেশের অবৈধ অর্থ কাছে রাখা ও অবৈধ অস্ত্র কাছে রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া তিনি হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি সহ বিভিন্ন মামলায় আসাম পুলিশের ওয়ান্ডেট তালিকাভুক্ত আসামী। অনুপ চেটিয়াকে ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশে আটক করা হয়। তারপর জেল খাটার পর গত ১১ই নভেম্বর তাকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ব্লু-ফিল্ম: তদন্তে নেমে পুলিশ দেখছে সল্টলেক হিমশৈলের চূড়া মাত্র

রাতের আপ বনগাঁ লোকাল। ঠাসা ভিড় মহিলা কামরায়। তারই মধ্যে সাদা কাগজের উপর কালো কালিতে ছাপা বিজ্ঞাপনটা চোখে পড়ে সুনীতার (নাম পরিবর্তিত)। ‘ফিল্ম-সিরিয়ালে নতুন মুখ চাই। অভিনয় করতে চান? নামী ডিরেক্টরের কাছে অভিনয় শিখে ফিল্মে অভিনয় করুন। যোগাযোগ করুন ... নম্বরে।’  কিন্তু, এই বিজ্ঞাপনই যে এক দিন তাঁকে অন্য এক জালে জড়িয়ে ফেলবে তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি তিনি।
ঠাকুরনগর থেকে সপ্তাহভর ওই তরুণী কাজের জন্য শহরে আসেন। সল্টলেকে একটা সংস্থায় টেলি কলার হিসেবে কাজ করেন। সাতসকালে বাড়ি থেকে বেরোতে হয়। ফিরতে ফিরতে সেই রাত। আর দূরত্বটাও তো কম নয়, প্রায় ৬৫ কিলোমিটার! তাঁর স্বামীও একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। সাধারণ গৃহবধূর জীবন চাননি বলেই কাজটা নিয়েছিলেন সুনীতা। আসলে, ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল, সিনেমার অভিনেত্রী হবেন। তাই বিজ্ঞাপনটা দেখেই মোবাইলে সেফ করে রেখেছিলেন যোগাযোগের নম্বরটা। ওই রাতেই বাড়ি ফিরে মোবাইল থেকে যোগাযোগ করেন তিনি। বেশ কয়েকটা ধাপ পেরিয়ে কাজে যোগ দেন। কিন্তু, ব্লু-ফিল্ম করার অভিযোগে গত সোমবার সল্টলেক থেকে বিধাননগর পুলিশ সুনীতা-সহ ২৮ জনকে গ্রেফতার করে।
আশ্চর্যের আরও বাকি ছিল। পুলিশের কাছে সুনীতা জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে তাঁর কোনও অপরাধ বোধ নেই। কারণ এটা তাঁর পেশা।
আর এটাতেই চিন্তার ভাঁজ পড়েছে পুলিশ কর্তাদের কপালে। তাঁদের মতে, সল্টলেকে ‘ব্লু ফিল্ম’-এর শুটিং আসলে হিমশৈলের চূড়া মাত্র। শুধু এখানে নয়, কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলা মিলিয়ে প্রায় ১০০টি এমন ছোট ছোট শুটিং-ইউনিট জাল বিছিয়ে রেখেছে। তাদের সেই ‘ব্লু-ফিল্ম’ বিক্রি হয় বিদেশে। কম বাজেটের এই সব ঘরোয়া পর্ন-ছবির আন্তর্জাতিক বাজারে বিশাল চাহিদা। কাজেই ফিচার এবং টেলি ফিল্মের পাশাপাশি একটা সমান্তরাল ইন্ডাস্ট্রি চলছে গোটা রাজ্যে। আর সেই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন, সাদামাটা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরাও। বাদ যাচ্ছেন না সাধারণ পরিবারের গৃহবধূরাও। যেমন সুনীতা। তদন্তকারীদের একটা সূত্র জানাচ্ছে, টি-শার্ট, জিন্‌স পরা সুনীতার চেহারায় মফস্‌সলীয় কোনও ছাপ নেই। বরং তাঁকে দেখলে মনে হয়, শহরেরই কোনও প্রতিষ্ঠানের কর্মরত মহিলা।
কী ভাবে সুনীতাদের এই ইন্ডাস্ট্রিতে নিয়ে আসা হয়?
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, মূলত তিন ভাবে ‘অভিনেতা-অভিনেত্রী’দের এই ধরনের কাজে নিয়ে আসা হয়। এক, ‘ফিল্ম-সিরিয়ালে নতুন মুখ চাই’ বলে বিজ্ঞাপন। দুই, যাঁরা এক বার এই পেশায় আসেন তাঁদের পরিচিতদের মধ্যে যাঁরা আগ্রহী তাঁদের ব্যবহার করা। তিন, এলাকাভিত্তিক ভাবে ‘এজেন্ট’ নিয়োগ করে ‘টোপ ফেলে’ ছেলেমেয়েদের এই কাজে নিয়ে আসা। যেমন বিজ্ঞাপন দেখে এসেছিলেন সুনীতা।
কী ভাবে?
তদন্তকারীদের তিনি জানিয়েছেন, প্রথম বার ফোন করার কয়েক দিন পর তাঁকে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডেকে পাঠানো হয়। ইন্টারভিউ শেষে ফোটো প্রোফাইল করানো হয় তাঁর। এরও দিন তিনেক পরে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হয়। নিজেকে ছবির পরিচালক বলে পরিচয় দিয়ে সেই ভদ্রলোক জানান, গোটা কয়েক শর্ট ফিল্মে অভিনয় করার পর সুনীতা ফিচার ফিল্মে সুযোগ পাবেন। আর এই সব স্বল্প দৈর্ঘের ছবির শুটিং হবে সল্টলেকে। ফিল্মে কোন ভূমিকায় অভিনয় করতে হবে তাঁকে? জবাব মেলে, ছোট ছোট গল্পের উপর ভিত্তি করে মূলত ‘বোল্ড’ প্রেমের দৃশ্য নির্ভর তৈরি হবে। মূল চরিত্রেই অভিনয় করবেন সুনীতা। ছোট ছোট সংলাপও থাকবে তাঁর মুখে। পুলিশের কাছে সুনীতা বলেন, ‘‘আমি কোনও হার্ডকোর পর্ন ছবিতে কাজ করিনি। ক্যামেরার সামনে শরীরের কোনও গোপন অঙ্গ তুলে ধরিনি।’’ তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, যে বিয়েবাড়ি ভাড়া করে ব্লু-ফিল্মের শুটিং চলছিল সেখান থেকে গোটা পঞ্চাশেক ভিডিও ক্লিপ উদ্ধার হয়েছে। তার ভেতর কী ধরনের ভিডিও আছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে, সল্টলেকের ওই ইউনিট এখনও পর্যন্ত যে ভিডিওগুলি ওয়েবসাইটে আপলোড করেছে তা মূলত সফ্‌ট-পর্ন বলে পুলিশের দাবি। ইন্ডাস্ট্রির কাছে যা মূলত ‘মশালা মুভি’ নামেই পরিচিত।
শুধু গৃহবধূ নন, নানা পেশার ছেলেমেয়েরাই ব্লু-ফিল্মে কাজ করতে আসছেন বলে পুলিশের দাবি। সল্টলেক-কাণ্ডে যাঁরা গ্রেফতার হয়েছেন তাঁরা সেই অর্থে পরিচিত কেউ নন। এমনকী পরিচালক বলে যে তিন জন দাবি করেছেন, তাঁদেরও টলিউড ইন্ডাস্ট্রি চেনে না। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, কেরিয়ারের শুরুর দিকে টলিউডের মাটিতে কোনও ভাবেই পা রাখতে পারেননি এঁরা। পরে দিল্লির একটা ওয়েবসাইটের তরফে এমন ছবি বানানোর প্রস্তাব আসে। এর পরই  ‘ফিল্ম-সিরিয়ালে নতুন মুখ চাই’ বলে বিজ্ঞাপন দিয়ে অভিনেতা-অভিনেত্রী জোগাড়ের কাজ শুরু হয়। অভিনেত্রীদের প্রতি দিনের পারিশ্রমিক আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। অভিনেতাদের জন্য বরাদ্দ পারিশ্রমিক যদিও বেশ কম, এক থেকে দেড় হাজার টাকা মাত্র। পরিচালকদের দাবি, একটা ১০ মিনিটের পর্ন-ছবির জন্য সারা দিনের শুটিং যথেষ্ট। এমনকী, কোনও ভাল ক্যামেরারও প্রয়োজন নেই এই কাজে। গোটা ছবির জন্য বাজেট ৩৫ হাজার টাকা মতন। পরিচালকের জন্য বরাদ্দ ২০ হাজার টাকা। দিল্লির ওই ওয়েবসাইট কোম্পানি এই ভিডিও নিয়ে কী করে? পরিচালকদের দাবি, তারা বিদেশি বিভিন্ন পর্ন-ওয়েবসাইট কোম্পানির কাছে এই ভিডিওগুলি বিক্রি করে।
ইন্ডাস্ট্রি যখন সমান্তরাল, টাকাপয়সা লেনদেনের ব্যবস্থা যখন বিশ্বব্যাপী— তখন হিমশৈলের এই চূড়া দেখে চোখে সরষের ফুল দেখছে পুলিশ।
সুত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

সুরুচির সবুজ নায়ক by আখতার হুসেন

এখলাস ভাই একবার কী প্রসঙ্গে যেন কথা বলতে গিয়ে একটু গর্ব-মেশানো সুরে, অবশ্যই কৌতুক করে বলেছিলেন, ‘শোনো, আমার যদি কোনো কিছুই না থাকে, এই সুন্দর সুঠাম মানুষটা তো আছি।’
সত্যি কথাই বলেছিলেন। যেখানেই যেতেন, সভা কিংবা সমিতিতে, ঘরোয়া কিংবা আড়ম্বরপূর্ণ কোনো অনুষ্ঠানে, এখলাস ভাইয়ের অমন চেহারা ও সুন্দর দেহসৌষ্ঠব সহজেই যে কারও চোখে পড়ত। সেই এখলাস ভাই শেষের দিকে নিজেকে একেবারে গুটিয়েই নিয়েছিলেন। কিছুটা শারীরিক কারণে, মূলত অকস্মাৎ চাকরি হারানোর অভিমানে। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। বাসায় গেলে সে কথাই বলতেন।
কিন্তু এখলাস ভাইয়ের জীবনের শেষ দিকের কথা এখন থাক। আমরা আসল মানুষটার কাছে ফিরে যাই। এখলাস ভাই মূলত পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। এ দেশে এসেছিলেন বিংশ শতকের ছয়ের দশকের প্রায় গোড়ার দিকে। পশ্চিমবঙ্গে থাকতে বামপন্থার রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশে আসার পর কেমন-কেমন করে যেন তাঁর সঙ্গে একটা সুন্দর সম্পর্ক গড়ে ওঠে চট্টগ্রামের বইঘরের স্বত্বাধিকারী সৈয়দ মোহাম্মদ সফির। আমি তাঁদের পরিচয় ও সম্পর্কগত এই বন্ধনকে বরাবর অভিহিত করেছি আমাদের সাহিত্যজগতের একটা ঐতিহাসিক বন্ধন বলে।
সত্যিই তো তাই! যখন আমাদের প্রকাশনা জগতে রীতিমতো অনুর্বরতা চলছে, চলছে নিষ্ফলতার কাল, নতুন কিছু করার প্রবণতা রহিত, তখন চট্টগ্রামের বইঘর থেকে যেসব বই বের হচ্ছে বিংশ শতকের ছয়ের দশকজুড়ে, তার মূলে আর কেউ নন, এখলাস উদ্দিন আহমদ। কবি আল মাহমুদকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে নিয়ে যাচ্ছেন গ্রন্থ-সম্পাদক হিসেবে তিনিই। আর ঢাকায় বসে পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করছেন এখলাস উদ্দিন আহমদ। ঘুরছেন লেখক-কবিদের দরজা থেকে দরজায়। আর প্রকাশিত বই, কি মুদ্রণ পরিপাট্যে, কি শিল্প-সৌকর্যে, যাকে বলে ‘ব্রেকথ্রো’ ব্যাপার। অবশ্য এ কথা না বললেই নয়, বইঘর থেকে প্রকাশিত যে বইটি প্রথম দেশজুড়ে সাড়া ফেলে দিয়েছিল, সেটির নাম ছড়ায় ছড়ায় ছন্দ (১৯৬৫)। দুই বাংলার ছড়াকারদের লেখায় সমৃদ্ধ সেই সংকলন। সম্পাদক এখলাস উদ্দিন আহমদ। ছড়ার সঙ্গে অলংকরণ করেছিলেন শিল্পী হাশেম খান। তুলনারহিত সেসব ছবি। আর প্রচ্ছদ করেছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। তারপর বের হয় টাপুর টুপুর সংকলন। আর্ট পেপারে ছাপা। বোর্ড বাঁধাই। এ উপলক্ষে বাংলা একাডেমিতে যে অনুষ্ঠান হয়, তা–ও স্মরণীয় হয়ে আছে অনেকের স্মৃতিতে। তারপর এখলাস উদ্দিন আহমদের সম্পাদনায় বের হয় আমাদের শিশুসাহিত্যের সামগ্রিক ইতিহাসে যে পত্রিকার অবদান অপরিসীম, সেই মাসিক টাপুর টুপুর। এই পত্রিকাটিকে ঘিরে জড়ো হয়েছিলেন কত যে শিশুসাহিত্যিক, সাহিত্যিক, শিল্পী—তার ইয়ত্তা নেই। কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খান, রফিকুন নবীদের পরপরই আছেন আবুল বারক আলভী ও আসেম আনসারী। সৈয়দ শামসুল হক তাঁর ছোটদের জন্য প্রথম উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে লিখছেন এই টাপুর টুপুর-এ। লিখছেন শওকত আলী। আমাদের যৌবনকালে আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম পত্রিকাটির জন্য।
এ পত্রিকা প্রকাশ করতে গিয়ে একবার এখলাস ভাইকে তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনেম খানের ধমক নাকি শুনতে হয়েছিল। কারণ আর কিছু নয়, ছড়াকার প্রণব চৌধুরীর ‘লাট সাহেবের জুতো’ শিরোনামে ছড়া প্রকাশ করার জন্য। তাতে ব্যঙ্গ করা হয়েছিল বাঙালিপুঙ্গব ওই গভর্নরকে, তবে লাট সাহেবের প্রতীকে।
আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, বিশেষত আটষট্টি থেকে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, এমনকি অসহযোগ আন্দোলনের সময়ও আমরা এখলাস ভাইকে শুধু আইয়ুবকে চটকানো ছড়া লিখতেই দেখিনি, তাঁকে সক্রিয়ভাবে রাজপথেও দেখেছি। লেখক-শিল্পীদের কাতারে শামিল। স্লোগান দিচ্ছেন।
এখলাস ভাই এত কিছু করার পাশাপাশি নিজের লেখালেখিও চালিয়ে গেছেন সমান তালে। তাঁর বইয়ের সংখ্যাও কম নয়। সম্পাদিত সংকলনের সংখ্যাও অনেক। সাহিত্য-কৃতির স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন বাংলা একাডেমি, একুশে পদকসহ আরও অনেক দেশি-বিদেশি পুরস্কার ও সম্মাননা।
সত্যিই ভাবতে অবাক লাগে, অমন জীবন্ত, সুঠামদেহী মানুষটির হঠাৎ করে চলে যাওয়া। তাঁদের চারজনের একটা জুটি ছিল—হাশেম ভাই, নবী ভাই, এখলাস ভাই ও শাহাদত চৌধুরী। এই চারজনের জুটির মাথায় নানা প্ল্যান-প্রোগ্রাম গিজগিজ করত। হাসিখুশি থাকতেন সব সময়। সেই জুটির মধ্যমণি এখলাস ভাই নেই, নেই শাহাদত চৌধুরীও। বেঁচে আছেন কেবল হাশেম ভাই ও নবী ভাই। এই তো জীবন!
দেখতে দেখতে এখলাস ভাইয়ের চিরপ্রয়াণের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ ২৪ ডিসেম্বর। ২০১৪ সালের এই দিনেই তো তিনি আমাদের কাঁদিয়ে চলে গিয়েছিলেন।
আখতার হুসেন: শিশুসাহিত্যিক।

ইয়েমেনে বিমান হামলা: যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি আরব ‘মতভেদ’

ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের চলমান বিমান হামলা নিয়ে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে বলে মত কোনো কোনো পর্যবেক্ষকের।
ইয়েমেনে হামলার প্রসঙ্গ নিয়ে সবশেষ কিছু ঘটনাপ্রবাহের ভিত্তিতে পর্যবেক্ষকেরা ওই মত দেন।
ইয়েমেনে হামলার বিষয়টি নিয়ে গত মঙ্গলবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি অধিবেশন হয়। অধিবেশনটি যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে আহ্বান করা হয়েছিল। সেখানে সমালোচনার মুখে পড়ে সৌদি আরব।
সপ্তাহকাল আগে ঢাকঢোল পিটিয়ে সৌদি আরব ৩৪ জাতির সন্ত্রাসবিরোধী জোট গঠনের কথা ঘোষণা করে। সন্ত্রাস দমনে সৌদি আরব যথেষ্ট করছে না—এই সমালোচনার জবাব দিতে তারা এমন পদক্ষেপ নিয়েছে বলে অনেকের ধারণা। তবে এবার দেশটি এক ভিন্ন বিষয়ে সমালোচনার মুখে পড়ল।
জাতিসংঘ ছাড়াও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগ, চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে ইয়েমেনে ভয়াবহ মানবিক দুর্যোগ সৃষ্টি হয়েছে। দেশটিতে সৌদি আরবের যুদ্ধবিমানের বেপরোয়া বোমা বর্ষণের ফলে সেখানে লাখো মানুষ দুর্ভিক্ষের মুখে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুসারে, নথিবদ্ধ করা গেছে—এমন নিহত ইয়েমেনির সংখ্যা দুই হাজার ৭০০ ছাড়িয়েছে। অনেক স্কুল ও হাসপাতাল হয় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে, নয়তো ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
গত মঙ্গলবার নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনার ইয়েমেনে এই মানবিক বিপর্যয়ের জন্য সরাসরি সৌদি আরবের দিকে আঙুল তোলেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনার বলেন, বেসামরিক নাগরিকের ওপর বিদ্রোহীরাও হামলা চালাচ্ছে। তবে অধিকাংশ হামলার জন্য দায়ী সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট।
একই বৈঠকে জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক দপ্তরের সহকারী প্রধান কিউং-ওয়াকাং জানান, অব্যাহত বিমান হামলার কারণে ইয়েমেনে কমপক্ষে ২০ লাখ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। সেখানকার স্বাস্থ্যব্যবস্থাও প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
বৈঠক শেষে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য এক যৌথ বিবৃতিতে ইয়েমেনে সংঘর্ষ থামাতে অবিলম্বে শান্তি আলোচনা শুরু করার জন্য সব পক্ষের কাছে আবেদন জানান। কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই আলোচনা শুরুর আবেদন জানিয়ে ওই বিবৃতিতে বলা হয়, শুধু আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।
ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব জোটের পরিচালিত বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্র গোড়া থেকেই সমর্থন দিয়ে আসছে। সৌদি আরবের যুদ্ধবিমানগুলোকে জ্বালানি সরবরাহ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে এই অভিযানে সাহায্য করছে যুক্তরাষ্ট্র।
ইয়েমেনের যুদ্ধে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচিত হচ্ছে সৌদি আরব। দেশটিতে সৌদি জোটের হামলার পেছনে মার্কিন সমর্থন থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দিকেও সমালোচনার তর্জনী তাক করা আছে।
বৈঠকে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সামান্থা পাওয়ার স্বীকার করেন, সৌদি জোটের বিমান হামলার ফলে বেসামরিক জানমালের ক্ষয়ক্ষতি উদ্বেগের কারণ সৃষ্টি করেছে। বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি যাতে না ঘটে, সে ব্যাপারে সতর্কতা গ্রহণের জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন রাখেন তিনি।
এর আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় সামান্থা পাওয়ার বলেন, ইয়েমেনে যাতে সব আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলা হয়, রিয়াদের কাছে নানাভাবে সে কথার গুরুত্ব প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের আমন্ত্রণেই নিরাপত্তা পরিষদে বক্তব্য দেন জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনার।
কোনো কোনো পর্যবেক্ষকের মতে, ইয়েমেন নিয়ে সবশেষ এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে অনুমান হয়, ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে চলতি আঁতাতে সম্ভবত চিড় ধরেছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয় বিশ্বশক্তির সমঝোতার ব্যাপারে ওবামা প্রশাসনের আগ্রহ সৌদি আরবের মোটেই মনঃপূত হয়নি। এ ব্যাপারে নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করতে নতুন সৌদি বাদশাহ সালমান চলতি বছরের মে মাসে ক্যাম্প ডেভিডে ওবামার ডাকা আরব দেশগুলোর শীর্ষ বৈঠকে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ ফেলো স্টুয়ার্ট প্যাট্রিক নিউইয়র্ক টাইমসের কাছে মন্তব্য করেছেন, সৌদি আরব ইয়েমেনে যেসব অস্ত্র ব্যবহার করছে, তার অধিকাংশই যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি। সেখানে মানবিক পরিস্থিতির অবনমন ঘটলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অবশ্যই বিব্রতকর হবে।
ইয়েমেনে সৌদি বোমা বর্ষণে উদ্বিগ্ন হলেও সে দেশে অবশ্য মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধের কোনো লক্ষণ নেই।
সৌদি বাদশাহকে খুশি করতেই ওয়াশিংটন গত সেপ্টেম্বরে এক বিলিয়ন ডলারের এক নতুন অস্ত্র সরবরাহ চুক্তি স্বাক্ষর করে। ওই চুক্তির অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো সর্বাধুনিক মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ সৌদি আরবের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

আচরণবিধি লঙ্ঘন চলছেই: কুষ্টিয়ায় থানার সামনে নারীদের ওপর হামলা

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় কৃষক দলের স্থানীয় নেতাকে হত্যা এবং দিনাজপুরের বিরামপুরে বিএনপির মেয়র প্রার্থীকে কুপিয়ে জখমের পর এবার কুষ্টিয়ার খোকসায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থী ও এক কাউন্সিলর প্রার্থীর নারী সমর্থকদের ওপর হামলা করেছে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীর সমর্থকেরা।
নরসিংদীতে আওয়ামী লীগ ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে তিনজন আহত হয়েছে। এ ছাড়া অন্তত ১১টি পৌরসভায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী এবং বিএনপির প্রার্থীরা।
কুষ্টিয়ার খোকসা পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আলাউদ্দীন ও আল মাছুম মোর্শেদ এবং কাউন্সিলর প্রার্থী নাফিজ আহম্মেদের স্বজনদের চাঁদাবাজি মামলায় আসামি করার প্রতিবাদে গতকাল বুধবার কয়েক শ নারী থানা ঘেরাও করেন। এ সময় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তারিকুল ইসলামের ৫০-৬০ জন সমর্থক লাঠিসোঁটা নিয়ে নারীদের ওপর হামলা চালায়। এতে অন্তত ৩০ জন আহত হন। তবে প্রার্থী তারিকুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী, কাউন্সিলর প্রার্থী এবং তাঁদের স্বজনদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও মারধরের অভিযোগে দুটি পৃথক মামলা হওয়ায় তাঁদের নির্বাচনী প্রচার কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
এর আগে গত মঙ্গলবার রাতে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষক দলের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নজরুল ইসলাম বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণা শেষে বাড়ি ফেরার পথে খুন হন। একই রাতে দিনাজপুরের বিরামপুর পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থী ও বর্তমান মেয়র আজাদুল ইসলামকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা।
শাহজাদপুর: সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী হালিমুল হকের বিরুদ্ধে প্রচারের মাইক ভাঙচুর, পোস্টার ছেঁড়া, নির্বাচনী কার্যালয় ভাঙচুর, কর্মী-সমর্থকদের মারপিট ও অস্ত্র দেখিয়ে হুমকির অভিযোগ করেছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থী মো. আবদুর রহিম।
যশোর: যশোরের কেশবপুর পৌরসভায় বিএনপি প্রার্থী ও বর্তমান মেয়র আবদুস সামাদ অভিযোগ করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে অরুচিকর প্রচারণা চালানো এবং কর্মীদের ভয় দেখানো হচ্ছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থী রফিকুল ইসলাম পাল্টা অভিযোগ করেছেন, মেয়রের ভাগনে বুলবুল আহম্মেদ তাঁর কর্মীদের হুমকি দিচ্ছে। নওয়াপাড়া পৌরসভায় স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী ফারুক হোসেন অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সুশান্ত দাসের কর্মীরা তাঁর কর্মীদের মারপিট করেছে এবং নির্বাচনী কার্যালয় স্থাপন করতে দিচ্ছে না।
মৌলভীবাজার: মৌলভীবাজার পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি নির্বাচনী কার্যালয় করার এবং কর্মীদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ এনেছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী অলিউর রহমান। এ নিয়ে অলিউর রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৃথক দুটি লিখিত অভিযোগ করেছেন।
শিবগঞ্জ: চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী কারিবুল হক অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী ময়েন খান ও তাঁর লোকজন তাঁকে হুমকি এবং তাঁর কর্মীদের মিথ্যা মামলায় জড়ানোর হুমকি দিচ্ছেন।
নাটোর: নাটোরে বিএনপির মেয়র প্রার্থী শেখ এমদাদুল হক আল মামুন অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় সাংসদ মো. শফিকুল ইসলামের ছোট ভাই সাগর ইসলাম তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন। তবে সাংসদ বলেছেন, এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।
কলাপাড়া: পটুয়াখালীর বাউফল পৌরসভার মেয়র জিয়াউল হক গাড়িবহর নিয়ে কলাপাড়া পৌরসভায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিপুল চন্দ্র হাওলাদারের পক্ষে গণসংযোগ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
লাকসাম: কুমিল্লার লাকসাম পৌরসভায় বিএনপির মেয়র প্রার্থী শাহনাজ আক্তারের পক্ষে গতকাল পুলিশি পাহারায় প্রচারণা চালিয়েছেন বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির প্রচার সম্পাদক জয়নুল আবদীন ফারুক।
বরগুনা: বরগুনা সদরে ২১ ডিসেম্বর জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিজয় শোভাযাত্রা ও সমাবেশে সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর উপস্থিতিতে ভোট চাওয়ার অভিযোগে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কামরুল আহসানকে কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। বরগুনার বেতাগীতে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে পাঁচ মেয়র ও সাত কাউন্সিলর প্রার্থীকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
পঞ্চগড়: গত মঙ্গলবার রাত আটটার পর শব্দবর্ধনকারী যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে জনসভা করায় পঞ্চগড় পৌরসভার আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাকিয়া খাতুনকে কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
কুষ্টিয়ার খোকসায় গতকাল দুপুরে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও এক কাউন্সিলর প্রার্থীর নারী সমর্থকেরা থানার সামনে বিক্ষোভ দেখান। এ সময় আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সমর্থকেরা তাঁদের ওপর হামলা চালান l ছবি: প্রথম আলো