Wednesday, August 24, 2022

মওলানা রুমির মসনবি শরিফ: সুলতান মাহমুদ গজনভী ও আয়ায by ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী

আমিরের নেতৃত্বে সিপাহিরা রাতে তালা ভেঙে আয়াযের কামরায় প্রবেশ করে। সতর্ক নজরদারিতে তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালায় সংরক্ষিত কক্ষে। কিন্তু একজোড়া ছেঁড়া জুতা আর জীর্ণশীর্ণ জুব্বাটি ছাড়া আর কিছু পেল না। তখন ভয়ে আতঙ্কে হলুদাভ হলো তাদের চেহারা। বাদশাহর কাছে কী কৈফিয়ত দেবে ভেবে পায় না। আয়াযের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে পরিণাম কী হবে তারা জানে। আবার আত্মস্থ হয়ে তারা বলল, এমন তো হতে পারে না।

সুলতান মাহমুদ গজনভীর প্রাণপ্রিয় গোলাম আয়ায। আয়ায কৃতদাস হয়ে এসেছিল সুলতানের দরবারে। এখন ঈর্ষণীয় রাজকীয় পদে সমাসীন। সুলতানের প্রিয়ভাজন হওয়ায় চারদিকে তার জয়জয়কার। আয়ায একজোড়া পুরোনো চামড়ার সেন্ডেল আর ছেঁড়া জুব্বা ঝুলিয়ে রেখেছিল একটি নির্জন কামরায়। রোজ দরবারে আসার আগে আয়ায সে কামরায় যায়। জুব্বা আর জুতার সামনে নিজের সঙ্গে কথা বলে আয়ায! তুমি সেই লোক, যার সম্বল ছিল পরিধানের এই ছেঁড়া আলখেল্লা আর পায়ে ছিল পুরোনো চপ্পল। কাজেই নিজেকে অত বড় মনে করো না। উচ্চাভিলাষী হইও না। সাবধান!
আপন যোগ্যতায় যারা বড় হয় তাদের শত্রুর অভাব হয় না। আয়াযের বেলায়ও ব্যতিক্রম হলো না। কাছের লোকেরা বাদশাহর কাছে গিয়ে নালিশ করল, জাঁহাপনা! আয়ায তার খাস কামরায় অনেক সোনাদানা জমা করেছে। একটি মটকা তো রতœালংকার হীরা-জহরতে ভর্তি। এ কামরার দরজায় সবসময় তালা ঝুলে। কারও প্রবেশাধিকার নেই। বাদশাহ বললেন, আমার আয়াযের কথা বলছ? তার এমনকি আছে, যা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখবে বা আমি জানব না?
কাহিনির প্রধান চরিত্রের বাদশাহ গজনীর অধিপতি সুলতান মাহমুদ। গজনী তখনকার বৃহত্তর ইরানের অংশ, বর্তমানে আফগানিস্তানের অন্তর্গত। তার পিতা ছিলেন গজনীর শাসক আবু মনসুর সাবুকতাগীন। ৩৮৭ হিজরিতে সুলতান মাহমুদ ক্ষমতায় আরোহণ করেন। একের পর এক দেশ জয়, দরবারে জ্ঞানী মনীষীদের সমাদর আর ভারতে ইসলামের বিজেতা হিসেবে তার খ্যাতি দুনিয়াজোড়া। ১৭তম ভারত অভিযানে তিনি সোমনাথ মন্দিরে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করেন। অসাধারণ বিচক্ষণ, জ্ঞানী, দূরদর্শী ও সাহসী যোদ্ধা সুলতান মাহমুদ গজনভী হিজরি ৪২১ সালে রাজত্বের ৩৩ বছরে ৫১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। প্রিয়ভাজন গোলাম আয়াযকে নিয়ে সুলতান মাহমুদের নানা আখ্যান ফারসি সাহিত্যের অলংকার।
আয়াযের বিরুদ্ধে সভাসদদের অভিযোগ শুনে সুলতান একজন আমিরকে নির্দেশ দিলেন, যাও, গভীর রাতে তার কামরায় অভিযান চালাও। তল্লাশিতে ধনরতœ যা পাবে, তোমাদের। একটি সুরতহাল রিপোর্ট জানিয়ে দেবে রাজসভার সবার কাছে। কারণ এত আদর, যতœ, সম্মান পেয়ে কেউ মাথায় উঠবে, সহ্য করা হবে না। গোপনে ধনরতœ জমা করার মতো হীন কাজ করার অধিকার তাকে কে দিয়েছে? সে কি তাহলে বাইরে প্রেম, ভক্তি, বিশ্বস্ততা আর উদ্দীপনা দেখায় আর ভেতরে ভেতরে আখের গোছায়? প্রেমের বিধান হলো, প্রকৃত প্রেমের সন্ধান যে পেয়েছে বন্দেগি ছাড়া অন্যকিছু করলে তার কুফরি হিসেবে গণ্য হবে।
সেনা অধিনায়ক আমির অভিযানের ছক আঁকলেন। ত্রিশজন বিশ্বস্ত সিপাহিসহ আয়াযের সংরক্ষিত কামরায় অভিযান চালাবেন গভীর রাতে। সিপাহিদের মনে আজ আনন্দের কোলাহল। কারণ তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলেই হীরা-জহরত যা কিছু পাবে তাদের হয়ে যাবে। অবশ্য আয়াযের প্রতি বাদশাহর মনে সন্দেহ অবিশ্বাস ছিল না। হিংসুকদের হাতেনাতে জব্দ করার জন্য তিনি এ সুযোগটি দিলেন। তারপরও আয়ায সম্পর্কে মনে কোনো সন্দেহের উদ্রেক হলে বাদশাহ তা দূর করেন আনমনে কথা বলে, আয়ায আমার, আমি আয়াযের। আয়াযের ব্যাপারে কেউ কিছু বলবে, আমি তা সহ্য করব না। আয়ায তো সাধারণ কোনো মানুষ নয়। অসাধারণ তার চলন, বলন, ব্যবহার। আয়াযের প্রশংসায় মওলানা রুমির চিন্তায় ভেসে উঠল একজন ‘ইনসানে কামেল’ এর প্রতিচ্ছবি। তার সামনে এখন ইনসানে কামেলের মহান সত্তার উদ্ভাস। সেই উদ্ভাসে প্রতিফলিত আল্লাহর গুণাবলির ঝলক। ফলে তিনি সব মানবীয় গুণ ও স্বভাবের কেন্দ্র। মহান চরিত্র সুষমায় সুবাসিত তার জীবন। তিনি আল্লাহর প্রিয়ভাজন। তার প্রশংসা করার সাধ্য মানুষের নেই। তিনি বাদশাহ নন; তবে বাদশাহর বাদশাহ, বাদশাহ নির্মাতা। তিনি সৃষ্টির সার নির্যাস। মওলানা যেন বোঝাতে চান তিনি আল্লাহর হাবিব মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)। তার উপমা সাগর। তার থেকেই দুনিয়ার মানুষ পায় সজীবতা, জীবনের স্পন্দন। মওলানা আরও বলেন, এই বর্ণনায় এসে আমার মনে পড়ে গেল হাতির দেশ হিন্দুস্তানের কথা। সে এখন কবিতার ক্ষেত-খামার দুমড়ে-মুচড়ে যাবে।
কাইফা য়া-তীন নাযমু লী ওয়াল কাফিয়া
বা-দা মা যাআত উসুলুল আফিয়া
আমার কীভাবে আসবে কবিতা অন্ত্যমিল
প্রেমের তাড়ায় যেখানে পালায় মনের স্বস্তি।
আল্লাহর প্রেমে আমি আত্মহারা। পাগলামি, উন্মতত্তা, উন্মাদনায় আমি বেসামাল। আয়ায আমি তোমার কিচ্ছা বলছিলাম। এখন তুমি আমার কিচ্ছা বল। মওলানা রুমি এখানে আধ্যাত্মিক সাধনার ফানা (নির্বাণ) ও বাকা (স্থিতি) এর জটিল বিষয়গুলোর বিশ্লেষণ করেছেন। যার অপার রহস্যের প্রান্তরে প্রবেশ করার জন্য আমাদের মসনবি পঞ্চম খ- অনুবাদ ও ব্যাখ্যার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এই গল্পের শুরু ১৭৬০ বয়েত থেকে আর শেষ ২১৬২ বয়েতে গিয়ে। কাজেই গল্পের ফাঁকে মওলানা কত আধ্যাত্মিক তত্ত্বরহস্য ব্যক্ত করেছেন অনুমান করাও কঠিন।
ফিরে আসি সুলতান ও আয়াযের গল্পের ধারাবাহিকতায়। আমিরের নেতৃত্বে সিপাহিরা রাতে তালা ভেঙে আয়াযের কামরায় প্রবেশ করে। সতর্ক নজরদারিতে তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালায় সংরক্ষিত কক্ষে। কিন্তু একজোড়া ছেঁড়া জুতা আর জীর্ণশীর্ণ জুব্বাটি ছাড়া আর কিছু পেল না। তখন ভয়ে আতঙ্কে হলুদাভ হলো তাদের চেহারা। বাদশাহর কাছে কী কৈফিয়ত দেবে ভেবে পায় না। আয়াযের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে পরিণাম কী হবে তারা জানে। আবার আত্মস্থ হয়ে তারা বলল, এমন তো হতে পারে না। এই জুতা-জুব্বা চোখে ধুলো দেওয়ার কৌশল। নিশ্চয়ই সোনা-জহরত মাটির নিচে লুকিয়ে রেখেছে সংগোপনে। শুরু হলো খননকার্য কামরার তলায়, এমনকি দেয়ালগাত্রে কোণায় কোণায়। কিন্তু কিছুর সন্ধান পেল না। কামরার দেয়াল, দরজা-জানালা যেন নীরবে সাক্ষ্য দিচ্ছিল আয়াযের সততার। তারা হতবাক। আয়াযের প্রতি সন্দেহ ও শত্রুতার জন্য লজ্জায় জড়োসড়ো। নিদারুণ হতাশা ও লজ্জা নিয়ে বেরিয়ে এলো আয়াযের কামরা থেকে। ক্ষমার আর্জির ভঙ্গিতে মাথায় দুহাত দিয়ে পরদিন হাজির হলো দরবারে।
তাদের দেখেই বাদশাহ বললেন, কী খবর তোমাদের? তোমাদের কাঁধের ঝুলি যে খালি, কী ব্যাপার? আয়াযের ধনরতœ কোথাও গোপন করে এখানে এসেছ নাকি? তারপরও তোমাদের চেহারায় আনন্দের ঝিলিক থাকার কথা। গাছের শিকড় মাটির নিচে পোঁতা হলে তার পাতা বাইরে পল্লবিত হয়। অনুরূপ যারা দুনিয়ায় ভালো কাজের সঞ্চয় গড়ে আখেরাতে তাদের চেহারা উজ্জ্বল হবে। আর যারা দুনিয়ার জীবনে মন্দের সদাই করে তাদের চেহারা হবে বিধ্বস্ত কদাকার।
বাদশাহর নিরাপত্তা বিভাগের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নির্বাক। নিজেদের অন্যায়-অপকর্মের জন্য বাদশাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। হামবড়া ভাব, রূঢ়-রুক্ষ স্বভাব আর মিথ্যা মামলার প্রায়শ্চিত্য ভোগার ভয়ে তারা আতঙ্কিত। এমনভাবে দাঁড়িয়েছে যেন নিজেরা নিহত হওয়ার তলোয়ার আর কাফন এগিয়ে দিয়েছে বাদশাহর সামনে। জাঁহাপনা! আমাদের প্রাণদ- দিলে তা আমাদের প্রাপ্য। আর যদি ক্ষমা করেন, তা হবে আপনার মহানুভবতা ও দয়ার প্রকাশ। আমরা যা করেছি, তা আমাদের স্বভাবের দোষ। আপনি বাদশাহ, আপনার কাছে আমাদের আশা, আপনার দয়া, ক্ষমা ও মহানুভবতার পরশ। মওলানার চেতনা এখানে গজনীর বাদশাহকে ছেড়ে আরশপানে উঁকি দেয়। তুমি যদি আমার পাপতাপ মাফ করে দাও, তা তো তোমার শানের জন্য মানায়। দিনের ধর্ম আলো দেবে, রাতের স্বভাব আঁধারের চাদরে আবৃত্ত করবে। তোমার দয়ার স্বভাব দিয়ে যদি আমাদের মাফ করে দাও, তোমার দান বখশিশের সাগরের পানি তো এতটুকুন কমবে না।
সুলতান মাহমুদ বললেন, না আমি তোমাদের ক্ষমা করতে পারব না। এ অধিকার আমি সংরক্ষণ করি না। কারণ তোমরা দোষ করেছ আয়াযের, তার মানহানি করেছ, মানহানির মামলায় তোমরা প্রত্যেকে আসামি। তোমাদের ক্ষমা করবে নাকি প্রতিশোধ নেবে, আয়াযই সিদ্ধান্ত দেবে।
সুলতান আয়াযকে ডেকে বললেন, আয়ায তুমি নির্দোষ। এরা হিংসার বশে তোমাকে পরীক্ষা করেছে। এখন তোমার ব্যাপারে সবধরনের খারাপ ধারণা পরিহার করে অনুতপ্ত হয়ে এসেছে। তারা লজ্জিত। তাদের বিচার তোমার হাতে।
আমার প্রতি আপনার দয়া অনুগ্রহ সীমাহীন। নচেৎ আমার অবস্থা তো সেই ছেঁড়া জুতা, জীর্ণ জুব্বার চেয়ে বেশি নয়- আয়ায বললেন। মওলানা রুমি (রহ.) এর ব্যাখ্যায় বলেন, আয়ায ঠিকই বলেছে, মানুষের আসল হলো এক ফোঁটা বীর্য আর তাতে রক্তের প্রবাহ। মানুষের যা কিছু আছে সব আল্লাহর দান। এই চেতনা যে মনে লালন করে অহংকার ও আত্মম্ভরিতা তাকে আক্রান্ত করতে পারে না। তবে আল্লাহর অফুরান দয়া-দানের হকিকত হলো-
বাহরে আন দা’দে আস্ত তা জুয়ী দিগর
তো মগূ কে নীস্তাশ জুয ইন কদর
তোমাকে দিয়েছে যেন আরও আরও চাও
বলো না যে, নেয়ামত এটুকুই, এর বেশি নাই।
আল্লাহ তায়ালা তোমাকে এত নেয়ামত দেওয়ার কারণ হলো, তুমি যাতে আরও নেয়ামত চাও। যেন এ কথা না বল যে, আমার জন্য এসব নেয়ামতই যথেষ্ট। তোমাকে দেওয়া বস্তুগত নেয়ামত সীমাহীন আধ্যাত্মিক ও নৈতিক নেয়ামত পাওয়ার পটভূমি।
আয়ায বললেন, এ ব্যাপারে বিচার করার, সিদ্ধান্ত দেওয়ার আমি কে? আকাশে যদি সূর্য দেদীপ্যমান থাকে গ্রহ-নক্ষত্রের অস্তিত্ব কি দৃশ্যমান থাকে? আপনার সামনে আমার অস্তিত্বের কী দাম আছে?
সুলতান বললেন, তুমি যে খাস কামরায় প্রতিদিন যাও তার রহস্য তাহলে বলো।
‘আমি যাই, যাতে নিজের অতীত ভুলে না যাই। আমি আগে কী ছিলাম, কত অসহায় ছিলাম, বাদশাহর দয়ায় এখন কোথায়, সেই শুকরিয়া, চেতনা যেন মনে জাগরুক থাকে। বর্তমান অবস্থার ওপর যেন মনে অহংকার না আসে। আসলে এভাবে একটি খাস কামরা রাখাই আমার ভুল হয়েছে। তাতে মানুষের মনে সন্দেহ জাগার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কামরার দরজায় যে তালা ঝুলালাম, তারও কি প্রয়োজন ছিল? হিংসুক কল্পনিকদের মাঝে এমন কাজটি করে সমালোচনার সুযোগ করে দিয়েছিলাম।’ এমন পরিস্থিতি এড়ানোর পথ তো নীরবতা। হে সাধক! তুমি কথার ফুলঝুরিতে ব্যস্ত। নীরবে একবার চিন্তা কর, আমলনামা কীভাবে হাতে আসবে? এখানে মানুষের যাবতীয় কাজকর্মের রেকর্ড হচ্ছে নীরবে নিঃশব্দে। ওখানে সে লিপি প্রকাশ হবে বাস্তবে। তবে এখানেই তুমি দেখতে পার, তোমার আমলনামা কী ডান হাতে পাবে, না বাম হাতে। তুমি এখনই যাচাই করে দেখ, তুমি যে যে কাজ করছ, তা কি ডান হাতের আমলনামার উপযুক্ত? তা না হলে বাম হাতে অবশ্যই আসবে।

>>(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, ৫খ. বয়েত-১৭৬০-২১৬২)

Tuesday, August 23, 2022

হাড় সুস্থ রাখতে করনীয়

হাড় আমাদের সমস্ত শরীরের ভার বহন করে। সুস্থ ও টেকসই হাড় পেতে হলে শৈশব থেকেই সচেতন হওয়া জরুরি। কেননা, পিক বোন মাস বা হাড়ের সর্বোচ্চ ঘনত্ব আমরা লাভ করি ৩০ বছর বয়সের আগেই। এরপর হাড়ের ঘনত্ব আর বাড়ে না, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে। হাড়ের সুস্থতা নির্ভর করে এই অল্প বয়সে অর্জিত হাড়ের ঘনত্ব, স্থিতিস্থাপকতা ও খনিজের ওপর।
তাহলে কী করে আমরা হাড়ের এই সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারি?
চাই যথেষ্ট খনিজ: একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দিনে ১০০০ মিলিগ্রাম ও নারীর ১২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম গ্রহণ করা উচিত। নারীদের অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্য পান করানোর সময় এবং মেনোপজের পর এই ক্যালসিয়ামের চাহিদা আরও বেশি। উচ্চ ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার হচ্ছে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, নানা ধরনের ছোট মাছ ও সামুদ্রিক মাছ, সবুজ পাতাযুক্ত শাক, বাদাম ইত্যাদি। শৈশব ও কৈশোর থেকে ভালো মানের ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার যথেষ্ট খেলে মজবুত হাড় পাওয়া সম্ভব।
ভিটামিন ডি: হাড় সবল রাখার জন্য পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি দরকার। সূর্যালোকে আছে এই ভিটামিন। তাই দিনের একটি সময় রোদে হাঁটাহাঁটি বা ব্যায়াম করা উচিত। এই অভ্যাস থাকা দরকার সব বয়সই। এ ছাড়া তৈলাক্ত মাছ, মাশরুম, ডিম ইত্যাদিতে আছে ভিটামিন ডি।
ব্যায়াম: নিয়মিত কায়িক শ্রম ও ব্যায়াম হাড়সন্ধিকে মজবুত করে। অল্প বয়সে তো বটেই, এমনকি বেশি বয়সেও নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম করতে পারলে হাড়ক্ষয় বা ভঙ্গুর হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে।
ওষুধ ও ধূমপান: ধূমপান হাড়ের ভঙ্গুরতা বাড়ায়। এ ছাড়া যাঁরা দীর্ঘদিন স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ, খিঁচুনির কিছু ওষুধ, মিথোট্রেক্সেট, ওমিপ্রাজল ইত্যাদি সেবন করেন, তাঁদের অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে।
রোগবালাই: কিছু কিছু রোগ, যেমন রিউমাটয়েড আরথ্রাইটিস, হাইপোগোনাডিজম ইত্যাদির কারণে হাড়ক্ষয় বেশি হয়। নারীদের মেনোপজের পর বেড়ে যায় হাড়ক্ষয়ের আশঙ্কা। তাই বয়স্ক নারীদের খাবারদাবার ও ব্যায়ামের দিকে বেশি সচেতনতা দরকার। যাঁদের সময়ের আগেই মেনোপজ হয়েছে (যেমন অল্প বয়সে জরায়ু ফেলে দেওয়া) তাঁরা চিকিৎসকের পরামর্শে হরমোন থেরাপি নিতে পারেন। হাড়ক্ষয়ের মাত্রা জানতে এখন বিশেষ পরীক্ষা করে নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেওয়া যায়। তাই প্রয়োজনে চিকিৎসা নিন।

Friday, August 19, 2022

উদ্যোক্তা হতে চাইলে কী পড়ব? by রাশেদুর রহমান

ছোটবেলায় আমরা সবাই ‘জীবনের লক্ষ্য’ রচনা পড়েছি। বই থেকে মুখস্থ করার সুবাদে প্রায় সবাই-ই খাতায় বড় হয়ে শিক্ষক কিংবা ডাক্তার হওয়ার কথা লিখতাম। কিন্তু মনের গহিনে কি এটাই সত্য?
ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, পাইলট ইত্যাদি জীবনের অনেক লক্ষ্যের ভিড়ে কিছু মানুষ উদ্যোক্তা হতে চান। অন্যের অধীনে চাকরি করার বদলে সমাজের আরও দশজনের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করতে চান। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পাড়ি দিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতায় এসব তরুণেরা নিজের স্বপ্ন পূরণে কোথায়, কী বিষয়ে পড়াশোনা করবেন, সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন। যিনি ডাক্তার হতে চান তিনি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবেন, প্রকৌশলী হতে চান যিনি, তার জন্য আছে নির্দিষ্ট পড়াশোনার ব্যবস্থা। কিংবা যদি বলি সেনাবাহিনীর সদস্য হওয়ার স্বপ্ন—সে ক্ষেত্রেও আছে নির্দিষ্ট নিয়মনীতি। কিন্তু একজন উদ্যোক্তা হতে চান যে ছেলে বা মেয়েটি, তিনি কী নিয়ে পড়াশোনা করবেন?
পড়া যায় যেকোনো বিষয়
আমাদের জীবনের লক্ষ্য কী হওয়া উচিত, সেটা যতটুকু না আমাদের মনস্তাত্ত্বিক চিন্তা–চেতনা, বিশ্লেষণ দ্বারা প্রকাশিত তার চেয়ে বেশি সমাজ-সংস্কৃতি আর চারপাশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাই কেউ উদ্যোক্তা হতে চাইলে বুঝতে হবে, তাঁর মধ্যে উদ্যোগী ও সৃজনশীল মনমানসিকতা সহজাতভাবেই আছে।
প্রথমত, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেখা যায় সাধারণত উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো পড়ালেখার বিষয় নেই, যেমনটা চিকিৎসক বা প্রকৌশলীদের জন্য আছে। আসলে না থাকার পেছনের কারণটা হলো উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে পড়ার প্রয়োজন নেই। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন কিংবা জীববিজ্ঞানের যে ছাত্রটা জীবনের আট আনা সময় ল্যাবে কাটিয়ে দিচ্ছেন, তিনি যেমন উদ্যোক্তা হতে পারেন ঠিক তেমনিভাবে ব্যবসা নিয়ে পড়াশোনা করা ছাত্রটাও স্টার্টআপের মালিক হয়ে যান একদিন। ব্যবসা করতে হলে ব্যবসা নিয়েই পড়তে হবে, এমন কোনো কথা নেই।
কিন্তু বিজ্ঞান আর ব্যবসার ছাত্রদের উদ্যোক্তা হওয়ার মধ্যে পার্থক্য হলো, বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক কাজ বেশি করেন, আর এ জন্যই তাঁদের ব্যবহারিক জ্ঞান বাস্তব জীবনে হাতে-কলমের কাজে সফল হতে সাহায্য করে। অন্যদিকে ব্যবসার শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কাজ করার তেমন একটা সুযোগ সব সময় থাকে না। কিন্তু তাঁদের কোর্স আউটলাইনগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, যেন তার মধ্যে উদ্যোগী মানসিকতার একটা বীজ বপন করা সম্ভব হয়। আমাদের দেশে ব্যবসা নিয়ে পড়াশোনা করা ছাত্ররা বিপণন জানেন, অর্থনীতি বোঝেন, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসার বাজার বোঝেন। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসার ছাত্রদের ‘অন্ট্রাপ্রেনারশিপ’ নামে একটা কোর্স করানো হয়। আজকাল দেখা যাচ্ছে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ‘অন্ট্রাপ্রেনারশিপ’ শেখানোর জন্য আলাদা করে বিভাগ চালু করছে।
প্রয়োজন বৈচিত্র্য
উদ্যোক্তা হওয়ার পূর্বশর্ত হলো নিজের মধ্যে সৃজনশীল মানসিকতা লালন করা। আমরা যদি দেখি আমাদের দেশের চারুকলার ছাত্রদের, তাহলে দেখব তাঁদের মতো এত সৃজনশীল খুব কম মানুষই হয়। নতুন কিছু সৃষ্টি করার মতো একটা সুন্দর মানসিকতা তাঁরা প্রায় প্রত্যেকেই নিজের মধ্যে লালন করেন। তাই খেয়াল করলে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন খাতে উদ্যোক্তা শ্রেণির একটি বড় অংশ আমাদের চারুকলার ছাত্রছাত্রীরা।
বিজ্ঞানের ছাত্রদের কথা বলবেন? দেশ এগোয় জ্ঞান-বিজ্ঞান আর গবেষণায়। গবেষণা নেই মানে উদ্ভাবন নেই আর উদ্ভাবন না থাকা মানে বাজারে নতুন কিছু নেই। পৃথিবীতে আপনি সফল কিংবা ব্যর্থ যত স্টার্টআপের দিকেই তাকাবেন, দেখবেন স্টার্টআপ যাঁরা করছেন, তাঁদের দলটির মধ্যে বৈচিত্র্য আছে। মেধা ও দক্ষতার বৈচিত্র্যের মধ্যে একটা ভারসাম্য আছে। অর্থাৎ যিনি বাজার বোঝেন, তাঁর সঙ্গে এমন একজনকে লাগবে যিনি বিজ্ঞান কিংবা গবেষণা করেন। তা না হলে দলে ইতিবাচক ‘সাইনার্জি ইফেক্ট’ (এমন একটি সম্মিলিত শক্তি, যা প্রত্যেকের শক্তির যোগফলের চেয়েও বেশি) আসে না।
অনেক বিষয়ের সমন্বয়
উদ্যোক্তা হতে হলে আপনার যেমন ফিন্যান্স, মার্কেটিং লাগে ঠিক তেমনি কম্পিউটার সায়েন্সের জ্ঞানও লাগে; আবার ব্যবসা যোগাযোগ ভালো বুঝলেও অর্থনীতির জ্ঞানটাও পাশাপাশি সমান থাকা লাগে। অর্থাৎ একজন উদ্যোক্তার মধ্যে যেসব গুণাবলি আপনি দেখবেন তার জন্য কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করা যথেষ্ট নয়। একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা পরিষ্কার করি। সাধারণত আমরা ধরেই নিই যে ব্যবসার ছাত্রদের মধ্যেই উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ বেশি। এখন মনে করুন ‘ক’ পড়ছে আন্তর্জাতিক ব্যবসা নিয়ে, ‘খ’ পড়াশোনা করে অর্থনীতি নিয়ে আর ‘গ’ পড়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। কে হবে উদ্যোক্তা? যে কেউই হতে পারে। আবার এদের কেউই না-ও হতে পারে। কেননা আন্তর্জাতিক বাজার বোঝে, কিন্তু অর্থনীতির ভাষা বোঝে না; তাহলে হবে না। আবার ল্যাবে দিন–রাত সময় দিচ্ছেন, কিন্তু আগামী দিনের পৃথিবীতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন না কিংবা ব্যবসার ভাষায় বললে গবেষণার মাধ্যমে বাজারে মুনাফা দেখছেন না, তাহলেও হবে না। কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ই আপনাকে ষোলো আনা জ্ঞানের প্যাকেজ দেবে না। আপনাকে শিখতে হবে, প্রতিদিন শিখতে হবে।
ইন্টারনেটের যুগে এখন তো এই শেখার কাজটা আরও বেশি সহজ হয়ে গেছে। পড়ছেন ফটোগ্রাফি নিয়ে, কিন্তু একটুখানি সময় করে অনলাইন কোর্স করার ওয়েবসাইট এডেক্স কিংবা কোর্সেরা থেকে ‘প্ল্যাটফর্ম বিজনেস’–এর ওপর একটা কোর্স করে ফেললেন। নিজের স্টার্টআপটা নিয়ে আগামীর যেকোনো পরিকল্পনায় যে বিষয়েই জ্ঞানের দরকার হোক না কেন, সবকিছুর জন্য এই প্ল্যাটফর্মগুলো এখন উন্মুক্ত।
ব্যবসা, বিজ্ঞান আর চারুকলার ভিড়ে মানবিকের শিক্ষার্থীদের কথা না বললেই নয়। ব্যবসা করবেন কিন্তু সমাজ ব্যবস্থা বুঝবেন না, ইতিহাস-সংস্কৃতি জানবেন না, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে সফল হওয়া দিবাস্বপ্ন। ‘ইতিহাস কথা বলে’ এ কথাটি এমনি এমনি বলা হয় না। আমরা সব সময় দেখি উচ্চশিক্ষায় ব্যবসার একজন ছাত্রকে সব সময়-ই সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি, একটা জাতির উত্থান-পতনের ইতিহাস নিয়ে কিছুটা হলেও জানতে হয়। কেন?
ধরুন, এই ভারতীয় উপমহাদেশের কথা। আমাদের একটা নিজস্ব জীবনদর্শন আছে, যার একটা বিশাল প্রভাব পড়ে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে। অর্থাৎ আপনি যখনই বড় পরিসরে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন আপনার মধ্যে লালন করবেন, তখনই আপনাকে পুরো বিশ্ব নিয়ে ভাবতে হবে। তখনই দরকার ইতিহাসের জ্ঞান। আবার ভাবুন নিজেকে একজন ব্যবসায়িক সত্তা হিসেবে, যিনি প্রতিনিয়ত নিজের কাস্টমারদের সঙ্গে দেনদরবার করছেন। তাঁদের মানসিকতা বুঝতে হলেও শুধু গবেষণার বাইরে এসে আপনার মনোবিজ্ঞানের কিছুটা জ্ঞান দরকার।
অর্থাৎ একজন উদ্যোক্তা অনেক গুণাবলির একটি সমন্বিত রূপ। যিনি যত জানেন তিনি তত সফল। কিন্তু সব জ্ঞানের প্যাকেজ আকারের কোনো বিষয় নেই যেখানে পড়লেই উদ্যোক্তা হওয়া যায়। আপনাকে অর্থনীতি, মার্কেটিং, মনোবিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান, ফাইন্যান্স, পরিসংখ্যান, ইতিহাস, সবকিছুই জানতে হবে।
তবে এসব সত্যির সঙ্গে আরেকটা কথাও ধ্রুব সত্য যে উচ্চশিক্ষায় শুধু অন্ট্রাপ্রেনারশিপের ওপর জোর দিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। যদি কেউ উদ্যোক্তা হতে চান তাঁর জন্য ব্যাবসন কলেজ একটি সেরা পছন্দ নিঃসন্দেহে। পাশাপাশি এমআইটি, হার্ভার্ডসহ যারাই যেখানে উদ্যোক্তানির্ভর পৃথিবী বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছে, সেই প্রতিষ্ঠানই আপনার জ্ঞানার্জনের জন্য ভবিষ্যৎ গন্তব্য হতেই পারে।
>>>লেখক: নির্বাহী পরিচালক, ইনোভেশন, ক্রিয়েটিভিটি অ্যান্ড অন্ট্রাপ্রেনারশিপ সেন্টার, সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Wednesday, August 17, 2022

স্বাস্থ্য উপকারিতায় তুলনাহীন তুলসি

তুলসি মোটেও মিষ্টি ধরনের কোন উদ্ভিদ নয়, যা খাদ্যে স্বাদ বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হয়।
এই সবুজ উদ্ভিদ ওসিমিয়াম টেনুইফ্লরাম (Ocimum tenuiflorum) বা তুলসি নামে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে বেশ পরিচিত। চোখের রোগ থেকে শুরু করে দাদ সারাতেও এটি ঔষধী উদ্ভিদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তুলসির পাতা থেকে বীজ, সবকিছুই শরীর-মন সুস্থ রাখতে বলবর্ধক হিসেবে কাজ করে থাকে। তুলসির বিভিন্ন অংশ যেসব চিকিৎসার জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে-
১. ব্রঙ্কাইটিস: তুলসির পরিষ্কার ফুল এর জন্য ব্যবহার করা হয়।
২. ম্যালেরিয়া: পাতা ও বীজ কালো গোলমরিচের সাথে ব্যবহার করা হয়।
৩. ডায়রিয়া, মাথা ঘুরানো ও বমিভাব: সম্পূর্ণ উদ্ভিদটিকে ব্যবহার করা হয় এ সমস্যার ক্ষেত্রে।
৪. চর্বি: এ ধরণের সমস্যার জন্য সম্পূর্ণ উদ্ভিদ দিয়ে ট্যাবলেট এবং মলম তৈরি করে ব্যবহার করা হয়।
৫. আলসার ও চক্ষু রোগ: এই উদ্ভিদটির অ্যালকোহল নির্যাস ব্যবহার করা হয়।
৬. পোকাকামড়: পাতা থেকে তেল সংগৃহীত করে ব্যবহার করা হয়।
বহু গবেষণায় মানুষের চিকিৎসার জন্য তুলসির ব্যবহার গবেষকরা সমর্থন করে থাকেন। পুষ্টির মান সহ এতে রয়েছে উচ্চমাত্রা সম্পন্ন: ভিটামিন এ ও সি, ক্যালসিয়াম, জিংক, ক্লোরোফিল।
তবে তুলসি পাতা প্রাকৃতিক ঔষধ হিসেবে গ্রহণ করলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে করা উচিৎ। এছাড়াও চিকিৎসকের অনুমোদনে কোনো ঔষধ সেবনরত অবস্থায় এটি সেবন বা ব্যবহার না করাই উত্তম।
তুলসি পাতার নানাবিধ শারীরিক উপকারিতার মাঝে প্রধান কয়েকটি উপকারিতা এখানে তুলে ধরা হলো।
কমায় মানসিক চাপ ও অশান্তি
আয়ুর্বেদ জার্নাল এবং ইন্টিগ্রেটেড মেডিসিন এর তথ্যানুযায়ী, ডায়াজেপাম এবং অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট ড্রাগস এর তুলনায় বেসিল এর মধ্যে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট এবং বিরোধী-উদ্বেগ বৈশিষ্ট্য বেশি রয়েছে। এক গবেষণায় তুলসি পাতা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ৫০০ মিলিগ্রামের মতো তুলসি গ্রহণ করেন তাদের মাঝে উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতা তুলনামূলক কম থাকে।  
আয়ুর্বেদিক অনুশীলনকারীরা পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তুলসি পাতা দিয়ে চা পান করতে, এটি ক্যাফেইনমুক্ত এবং প্রতিদিন পান করা যাবে। এছাড়া এই চা পানের মাধ্যমে যোগব্যায়াম সমপরিমাণ মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যাবে।
শরীরকে প্রাণবন্ত ও উৎফুল্ল করে
তুলসি পাতায় থাকা পর্যাপ্ত পরিমাণ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট শরীরকে ডিটক্স করতে সহায়তা করে। স্টাডিজ ট্রাস্টেড জানাচ্ছে, তুলসি শরীরকে বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান থেকে রক্ষা করে এবং ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করে সুস্থ রাখে। এতে করে শরীর প্রাণবন্ত ও উৎফুল্ল থাকে।
ইনফেকশন ও ক্ষত প্রতিরোধ করে
সার্জারি হওয়ার পরে ক্ষতস্থান দ্রুত ভালো হওয়ার জন্য তুলসি পাতা ব্যবহার করেন অনেকেই। তুলসি ক্ষতস্থানের শক্তি পুনঃরুদ্ধার করে, ক্ষত সারানোর সময় কমিয়ে আনে এবং দ্রুত কাজ করতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞানীরা জানান, তুলসি পাতা যেমন- মুখের আলসার, ব্রন, পুরনো দাগের মতো ইনফেকশন ও ক্ষত থেকে রক্ষা করে।   
রক্তে চিনির মাত্রা কমায়
যদি আপনার প্রিডায়বেটিস বা টাইপ-২ ডায়বেটিস থাকে, তবে তুলসি পাতা তা কমাতে সাহায্য করবে। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর উপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে- ওজন বেড়ে যাওয়া, রক্তে অধিক ইনসুলিন, উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপের মতো ডায়বেটিসের লক্ষণসমূহ কমাতে তুলসি কাজ করে। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, তুলসি ৩০ দিনে ২৪ শতাংশ ব্লাড-সুগার কমাতে পারে। তবে, খাদ্যাভ্যাসে এটি যুক্ত করার পূর্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
কমায় কোলেস্টেরলের মাত্রা
যেহেতু তুলসি পাতার কাজই হচ্ছে বিপাকীয় চাপ কমানো, তাই এটি ওজন ও কোলেস্টেরল কমাতেও কাজ করে। এটি ক্ষতিকর কোলেস্টেরল হ্রাস করে, ভালো কোলেস্টেরল বৃদ্ধি করে। তুলসি পাতা, তেল, তুলসি গুঁড়ার কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে থাকে।
সুস্থ রাখে পাকস্থলী
তুলসি প্রাকৃতিকভাবে পেটের সমস্যা আলসার থেকে প্রতিহত করে এবং প্রতিরক্ষা করে। উপকারী এই পাতা পেটের অ্যাসিড হ্রাস করে, মিউকাস নিঃসরণের মাত্রা বাড়ায়, মিউকাস কোষের আয়ু বৃদ্ধি করে। পেপটিক আলসার হলে বাজারের ওষুধ গ্রহণে পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে তুলসি -পাতা গ্রহণে উপকার দেখা দেবে।

Tuesday, August 16, 2022

ভারতের যে সম্প্রদায়ে পতিতাবৃত্তিকে ঐতিহ্য ভাবা হয়

ভারতে এখনও বেশিরভাগ পরিবারে মেয়ে সন্তানের চাইতে ছেলে সন্তানদের বেশি পছন্দ করে। কিন্তু যখন হিনা জন্মগ্রহণ করেন, তখন তার বাবা-মা রীতিমত উৎসব উদযাপন করেছিলেন।
দুর্ভাগ্যবশত, এই উদযাপনের পেছনে ছিল বিচিত্র একটি উদ্দেশ্য।
হিনা দেশটির পশ্চাৎপদ বাচ্ছারা সম্প্রদায়ের একজন সদস্য। এই সম্প্রদায়ে শত শত বছর ধরে এখন পর্যন্ত একটি প্রথা প্রচলিত আছে। যেখানে সম্প্রদায়ের সদস্যরা তাদের পরিবারে জন্ম নেয়া সবচেয়ে বড় মেয়েকে পতিতাবৃত্তির দিকে ঠেলে দেয়।
আর এই পতিতা বাণিজ্য শুরু হয় মেয়ের মাত্র ১০ থেকে ১২ বছর বয়সেই।
পরিবারের পুরুষ সদস্য থেকে শুরু করে বাকি সবার জীবন ওইটুকু মেয়ের আয়ের ওপরই নির্ভর করে।
কয়েকটি ক্ষেত্রে মেয়েটির আপন বাবা অথবা ভাই দালাল হিসেবে কাজ করে।
যখন এই মেয়েটির বয়স হয়ে যায়, তখন তার স্থলে জায়গা করে নেয় তারই ছোট বোন।
ভারতের এই সম্প্রদায়ে বাবা মা তাদের কন্যা সন্তানকে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করে
এভাবেই এই প্রথা সম্প্রদায়ের সবার গ্রহণযোগ্যতার ওপর ভর করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পালন হয়ে আসছে।
এই সম্প্রদায়ে বিয়েটাও হয় ভিন্নভাবে। এখানে বিয়ে দেয়ার সময় কনের পরিবার বরের পরিবারের কাছ থেকে বড় অংকের অর্থ দাবি করে। যেটাকে অনেকেই উল্টো যৌতুক হিসেবে আখ্যা দেন।
'আমার আর কি বিকল্প ছিল?'
হিনাকে জন্মের পর থেকে এই ধরণের জীবনের জন্য প্রস্তুত করা হয় এবং তারপরে খুব অল্প বয়সেই তাকে এই কাজে জোরপূর্বক ঠেলে দেয়া হয়।
বিবিসি হিন্দিকে তিনি বলেন, "আমাকে যখন এই পেশায় ঠেলে দেয়া হয়। তখন আমার বয়স মাত্র ১৫ বছর। পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে আমাকে আমার মা ও নানীর দেখানো পথেই চলতে হয়েছে।"
প্রতিদিন তার কাছে গ্রামীণ ধনী থেকে শুরু করে ট্রাক চালক পর্যন্ত একাধিক খদ্দের আসতো।
"১৮ বছর বয়সে, আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমার সাথে কত অন্যায় হয়েছে এবং ভীষণ রাগও হয়েছিল তখন। কিন্তু এ ছাড়া আমার আর কি-ই বা করার ছিল?
"যদি আমি এভাবে উপার্জন না করতাম তাহলে আমার পরিবার কীভাবে বাঁচত?"
হিনা ছোটবেলা থেকে তার সম্প্রদায়ের এই প্রথা দেখে বড় হয়েছেন।
ভারতের বাচ্ছারা সম্প্রদায়ের মানুষেরা সাধারণত ভীষণ দারিদ্র্যপীড়িত। পরিবারের জন্য উপার্জন এবং আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে তারা নারী সদস্যদের ওপর নির্ভর করে।
স্থানীয় এনজিওর সমন্বয়ক আকাশ চৌহানের মতে, " এই পেশার আসা এক তৃতীয়াংশের বেশি মেয়ে বয়সে অনেক ছোট।"
বাচ্ছারা, একসময় যাযাবর উপজাতি গোষ্ঠী ছিল। পরে তারা কেন্দ্রীয় রাজ্য মধ্য প্রদেশের তিনটি জেলায় ছড়িয়ে যায়।
এই সম্প্রদায়ের মানুষেরা বেশিরভাগ গ্রামীণ এলাকা বা মহাসড়কের পাশে থাকে, যেখানে ট্রাক ড্রাইভাররা বিরতি নিয়ে থাকে।

যে কৌশলে চলছে এই বাণিজ্য:

অল্প বয়সী মেয়েরা, যারা কিনা স্থানীয়ভাবে "খেলোয়াড়" হিসাবে পরিচিত, তারা দলবেঁধে না হলে একলা একলাই গ্রাহকদের অনুরোধ করার জন্য অপেক্ষা করে।
এছাড়া পথের দুই পাশে প্রায়শই ছোট দোকানের মত বুথ থাকে, সেখানে মেয়েটির দালাল হিসেবে তার ভাই না হলে বাবা, খদ্দেরকে নিমন্ত্রণ জানায়।
তারা চালকদের সাথে একটি চুক্তি করে, যা সাধারণত গ্রাহক প্রতি ১০০ থেকে ২০০ ভারতীয় রুপি হয়ে থাকে। ডলারের হিসাবে সেটা দেড় থেকে তিন ডলারেরও কম।
স্থানীয়দের মতে, একটি কুমারী মেয়ের জন্য সর্বোচ্চ দাম পাওয়া যায়। খদ্দের প্রতি সেটা পাঁচ হাজার রুপি বা ৭২ ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
এই প্রথায় সম্পৃক্ত এক তৃতীয়াংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক, এনজিও'র তথ্য।
এ নিয়ে বিবিসিকে হিনা বলেন, "প্রতিদিন, দিনের বেলা প্রায় চার থেকে পাঁচজন পুরুষ আসে। রাতের বেলা, আমরা হোটেল বা কাছাকাছি অন্য কোথাও যাই। সবসময় সংক্রমিত রোগে ভোগার ঝুঁকি ছিল,"
দ্য হিন্দু নামে ভারতের একটি জাতীয় পত্রিকা ২০০০ সালে এই ধরনের চিকিৎসার অবহেলার বিষয়টি তুলে ধরে প্রতিবেদন করে।
তারা জানিয়েছে যে এই সম্প্রদায়ের সাড়ে পাঁচ হাজার সদস্যকে পাওয়া গেছে যারা কিনা এইচআইভি পজিটিভ। শতাংশের হিসাবে এই আক্রান্তের হার সম্প্রদায়ের মোট জনসংখ্যার ১৫%। 
এসব খেলোয়াড়দের অনেক মেয়েরা গর্ভবতী হয়ে পড়ে। এই পেশায় আসায় কয়েক বছরের মাথায় হিনা একটি মেয়ে শিশুর জন্ম দেয়।
এই মেয়েরা প্রায়ই রাস্তার পাশে বিভিন্ন দোকানের কাছে অপেক্ষা করে।
মা হওয়ার পরও তাকে আরও বেশি বেশি পরিশ্রম করার জন্য চাপ দেয়া হতো।
"অনেক মেয়েরা এক পর্যায়ে গর্ভবতী হয়ে পড়লেও তাদের এই কাজ চালিয়ে যেতে হয়"
"সন্তানদের যত্ন নেওয়ার জন্য আরও অর্থ উপার্জন করতে চাপ দেয়া হয় তাদের," জানান হিনা।
একজন যৌনকর্মী হওয়ার অর্থ হচ্ছে যে সে তার সম্প্রদায়ের মধ্যে কাউকে বিয়ে করার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
অবশেষে, হিনা স্থানীয় এনজিও'র সহায়তায় এই প্রথা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন।
"এই জঘন্য প্রথার মধ্য দিয়ে যে মেয়েটি যায়,শুধুমাত্র সেই, এই সংগ্রামটা বুঝতে পারে। আমি জানি এটার অনুভূতিটা কেমন। তাই এই প্রথা চিরতরে উপড়ে দিতে আমি সহায়তা করে যাব।"
সামাজিকভাবে অনুমোদিত এই প্রথার উৎস নিয়ে অনেক তত্ত্ব আছে। তাদের মধ্যে একজন জানায়, কিভাবে নরমেডিক উপজাতিদের বাহিরাগত হিসেবে অর্থ উপার্জন করতে গিয়ে সংগ্রাম করতে হয়েছিল। পরে তারা এই যৌন বাণিজ্যকে দরিদ্রতা কাটিয়ে ওঠার উপায় বলে মনে করতে থাকে।

ভারতের আইন কি বলে?

ভারতে মেয়ের চাইতে ছেলে সন্তান পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকায় দেশটিতে লিঙ্গের অনুপাতে ভয়াবহ অসামঞ্জস্যতা দেখা যায়। কিন্তু বাচ্ছারা সম্প্রদায়ে এই সমস্যাটি পুরোই উল্টো।
আকাশ চৌহান বলেন, " এই সম্প্রদায়ের প্রায় ৩৩ হাজার সদস্য রয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ৬৫% নারী।"
বেশি সংখ্যক নারী হওয়ার একটি কারণ হল এই অঞ্চলে অল্প বয়সী মেয়েদের অবৈধভাবে পাচার করা হয়।
পুলিশ সুপার মনোজ কুমার সিং বিবিসিকে জানান, গত কয়েক মাসে আমরা এই এলাকা থেকে প্রায় ৫০টি মেয়েকে উদ্ধার করেছে।
বেশিরভাগ সময় এই মেয়েরা রাস্তার পথিকদের খদ্দের বানিয়ে থাকে।
"এমনকি আমরা দুই বছর বয়সী একটি মেয়েকেও খুঁজে পাই। তাকে এখন একটি শেল্টার হোমে পাঠানো হয়েছে।"
মনোজ বলেন, তারা ঘন ঘন এ ধরণের আক্রমণ চালান কিন্তু গভীরভাবে প্রোথিত এই প্রথা শুধুমাত্র সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমেই শেষ করা সম্ভব।
মধ্যপ্রদেশের, যেখানে এই সম্প্রদায় বসবাস করে, সম্প্রতি একটি আইন পাস করে যেখানে ১২ বছরের কম বয়সী শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়।
এছাড়া প্রাপ্তবয়স্ক কেউ, ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ের সাথে যৌন সম্পর্ক করলে তাদের কারাদণ্ড বাড়ানো হয়েছে। ভারতে সম্মতির জন্য ন্যূনতম বৈধ বয়স ১৮ বছর ধরা হয়।
কিন্তু এই ধরনের পদক্ষেপ পরিস্থিতি পরিবর্তন আনতে পারেনি।

সামনের পথটা কেমন

বাচ্ছারাসদের এই পতিতাবৃত্তির প্রথা পরিহারের উদ্দেশ্যে ১৯৯৩ সালে একটি প্রকল্প চালু করা হয়। কিন্তু এটি এখনও সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা হয়নি।
নারী ও শিশু কল্যাণ বিভাগের কর্মকর্তা রাজেন্দ্র মহাজন বলেন, "প্রতি বছর আমরা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার জন্য অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্যে প্রতিবছর বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকি, কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ আমাদের মানদণ্ডগুলো পূরণ করতে পারে নি।"
এই প্রথার মধ্যে থেকে অনেকেই সন্তান ধারণ করেন। এবং মেয়ে সন্তান হলে তার ভাগ্যেও এমন পরিণতি হয়।
জাবালি নামের এই প্রকল্পটি মূলত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সচেতনতার মাধ্যমে এই নারীদের পুনর্বাসনের উপর জোর দেবে।
এতে সরকারের সাহায্যসহ বা ছাড়া, পরিবর্তন ধীরে ধীরে হলেও আসছে।
এখন সম্প্রদায়ের অনেক অল্পবয়সী মেয়ে এই প্রথাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অন্যত্র চাকরি খুঁজে নিচ্ছেন বা আরও শিক্ষা গ্রহণ করছে। এছাড়া স্থানীয় কিছু উদ্যোগও সাহায্য প্রদান করছে।
হিনাও এখন এ ধরণের উদ্যোগের একটি অংশ- এই উদ্যোগের আওতায় তাকে ২০১৬ সালে উদ্ধার করা হয়েছিল।
হিনা বলেন, "আমি অন্যান্য মেয়েদের বোঝাই যে তারা এখানে এলে সাহায্য পাবে এবং এই পেশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। আমি এজন্য আমার সাধ্যমত যা পারি, করব।"
অলাভজনক এই প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয়ভাবে একটি কোচিং সেন্টার পরিচালনা করে। যেখানে ভিক্টিমদের বিনামূল্যে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
"এই মেয়েদের জোরপূর্বক এই পেশায় থাকতে বাধ্য হয়েছে কারণ তাদের চাকরির অন্য কোন উপায় নেই।
"শুধু শিক্ষা তাদের অগ্রসর হতে সাহায্য করতে পারে।" বলছেন হিনা।
হিনা মনে করেন, শিক্ষাই পারে মেয়েদের এ ধরণের প্রথা থেকে বের করে আনতে।

Saturday, August 13, 2022

পাইলস চিকিৎসায় রিং লাইগেশন by অধ্যাপক ডা: এ কে এম ফজলুল হক

আমরা সবাই জানি, সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সফল প্রয়োগের ফলে চিকিৎসাক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে অভাবনীয় অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। এমন একটি উন্নততর প্রযুক্তির ফলে আজ ৮০-৯০ শতাংশ পাইলস রোগ বিনা অপারেশনে এবং বিনা ব্যথায় নিরাময় করা সম্ভব।
১৯৫৪ সালে ডা: ব্লেইসডেল প্রথম এ যন্ত্রটি আবিষ্কার করেন এবং এর সাহায্যে তিনি বিনা অপারেশনে বহির্বিভাগে পাইলসের সফল চিকিৎসা পদ্ধতি প্রদর্শন করে সবার সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অবশ্য এর আগে ১৮৬৯ সাল থেকে বিনা অপারেশনে ইনজেকশনের মাধ্যমে পাইলসের চিকিৎসা শুরু হয়েছে। কিন্তু ইনজেকশনের সাফল্য আশাব্যঞ্জক ও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এটা শুধু প্রাথমিক পর্যায়ের পাইলসে ভালো ফল দিতে সক্ষম। বারবার ইনজেকশন দিয়ে অতিরিক্ত সুফল পাওয়া যায় না। এরূপ পরিস্থিতিতে ‘রিং লাইগেশন’ পদ্ধতি পাইলসের চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে। ১৯৬২ সালে ডা: জে ব্যারন এই যন্ত্রটির উন্নততর সংস্করণ বের করেন এবং দু’টি গবেষণা প্রবন্ধে তিনি প্রমাণ করেন যে, এ পদ্ধতিটি অত্যন্ত চমৎকার ফলাফল দিচ্ছে। এরপর বৃহদান্ত্র ও পায়ুপথ সার্জারিতে প্রথিতযশা আমেরিকান সার্জন ডা: মারভিন এল করম্যান একটি গবেষণা প্রবন্ধে প্রকাশ করেন এই নতুন যন্ত্রের সাহায্যে পাইলস চিকিৎসার অভাবনীয় সাফল্য। তিনি প্রমাণ করেন, এই যন্ত্রের সাহায্যে রিং লাইগেশন পদ্ধতিতে পাইলস রোগীদের ৮০ শতাংশ বিনা অপারেশনে চিকিৎসা করা সম্ভব।
কোন ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য : কয়েকটি সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সব পাইলস রোগীকে এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা সম্ভব। এ পদ্ধতিতে যাদের চিকিৎসা করা যাবে না তাদের উপসর্গগুলো হচ্ছে- বহিঃস্থিত পাইলস, যদি সাথে এনাল ফিশার বা ফিস্টুলা থাকে অথবা এমন পাইলস যা সবসময় বাইরে ঝুলে থাকে।
চিকিৎসা সংক্রান্ত খুঁটিনাটি : এ চিকিৎসায় একটি যন্ত্রের সাহায্যে পাইলসের মাংসপিণ্ডকে ধীরে ধীরে কাটার ব্যবস্থা করা হয়। এতে সাধারণত রোগীরা ব্যথা পান না। এ চিকিৎসার ফলে পায়ুপথের ভেতরের পাইলসগুলো আর ফুলে ওঠার সুযোগ পায় না। যেহেতু পাইলস তিন বা ততোধিক থাকে, তাই একবার চিকিৎসায় সম্পূর্ণ নিরাময় করা যায় না। এ কারণে কিছু দিনের ব্যবধানে দু-তিনবার এ পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হয়। চিকিৎসকের চেম্বারেই এ চিকিৎসা সম্ভব। সাধারণত অজ্ঞান বা অবশ করার প্রয়োজন নেই। কখনো কখনো ডুশ দিয়ে পেট পরিষ্কার করে নিতে হয়। চিকিৎসার পর কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর রোগী বাসায় চলে যেতে পারেন। মফস্বলের রোগীরা পর দিন চলে যেতে পারেন। চিকিৎসার আগে প্রকটস্কপি ও সিগময়ডস্পপি করে মলদ্বারের গভীরে অবশ্যই পরীক্ষা করে নিতে হবে। কারণ পায়ুপথে রক্তক্ষরণের অনেক কারণ রয়েছে, যার মধ্যে ক্যান্সার অন্যতম। অতএব, পায়ুপথে রক্ত গেলেই পাইলস হয়েছে বলে সবাই ধরে নেন। এ ধারণা ভুল। প্রথমত, পরীক্ষা করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রক্ত যাওয়ার সঠিক রোগ নির্ণয় করবেন। এরপর চিকিৎসার প্রশ্ন।
চিকিৎসার পর উপদেশ : কোষ্ঠ ব্যবস্থাপনা এমনভাবে করতে হবে যেন মলত্যাগে কষ্ট না হয়। কোষ্ঠকাঠিন্য ও পাতলা পায়খানা দুই-ই খারাপ। মাঝে মধ্যে রক্ত যেতে পারে। তবে চিকিৎসার সম্পূর্ণ কোর্স শেষ হলে আর রক্ত যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
হার্টের রোগীদের জন্য : অনেকে আছেন পাইলসে অবহেলা করেন। যদি এ অবস্থায় আপনার কোনোরূপ হৃদরোগ হয়, তাহলে হৃদরোগের চিকিৎসার আগে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আগে পাইলস অপারেশন করে আসার উপদেশ দেবেন। কারণ হৃদরোগ অপারেশনের পর রক্তজমাট বাঁধা নিরোধক ওষুধ খেতে হবে বহুদিন। তখন পাইলসের রক্ত যাওয়ার পরিমাণ বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যাবে। কারণ তখন আপনাকে এমন ওষুধ দেয়া হবে যাতে আপনার রক্ত জমাট বাঁধবে অনেক দেরিতে। এমনকি অনেক উচ্চ রক্তচাপের রোগী এসপিরিন/ডিসপ্রিন/ইকোসপিরিন জাতীয় ওষুধ নিয়মিত খাচ্ছেন। এগুলো দেয়া হয় হৃদরোগ প্রতিরোধের জন্য। ওষুধটি রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয়। এ অবস্থায় পাইলসের রক্ত বন্ধ করা খুবই কষ্টকর। অতএব অবহেলা না করে সময় থাকতে পাইলসের চিকিৎসা করে নেয়া জরুরি।
জটিলতা : চিকিৎসার পর রোগীর সামান্য অস্বস্তি লাগতে পারে। কারো কারো অল্প ব্যথা হতে পারে। চিকিৎসা চলাকালীন মাঝে মধ্যে রক্ত যেতে পারে।
>>>লেখক : বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথ বিশেষজ্ঞ, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, (অব) কলোরেকটাল সার্জারী বিভাগ, বিএসএমএমইউ, ঢাকা।
চেম্বার : ইডেন মাল্টি-কেয়ার হসপিটাল, ৭৫৩, সাতমসজিদ রোড, (স্টার কাবাব সংলগ্ন) ধানমন্ডি, ঢাকা। ফোন : ০১৭৫৫৬৯৭১৭৩-৬

Wednesday, August 10, 2022

টুথব্রাশে জীবাণু আক্রমণ করছে না তো?

আমরা অনেকেই ব্যবহারের পর টুথব্রাশ বাথরুমে রেখে দিই। এটি একেবারেই অনুচিত। বাথরুমে থাকা জীবাণু ভেজা টুথব্রাশে খুব সহজেই আক্রমণ করতে পারে। সুস্থ থাকতে চাইলে তাই টুথব্রাশ সংরক্ষণ করতে হবে স্বাস্থ্যকর উপায়ে।
  • টুথব্রাশ ব্যবহারের পর এমন স্থানে রাখবেন যেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করে। কারণ ভেজা টুথব্রাশ দ্রুত না শুকালে খুব সহজে জীবাণু বাসা বাধতে পারে। ব্যবহারের পর বেডরুমে কোনও স্ট্যান্ডে রেখে দিতে পারেন টুথব্রাশ।
  • টুথব্রাশ কভার ব্যবহার না করাই ভালো।
  • ব্যবহারের পর ভালো করে ধুয়ে তারপর রাখুন টুথব্রাশ।
  • তিন থেকে চার মাস পর পর বদলে ফেলুন টুথব্রাশ।
তথ্য: টাইমস অব ইন্ডিয়া

গর্ভবতী মায়ের পাইলস চিকিৎসা by অধ্যাপক ডা: এ কে এম ফজলুল হক

গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্য পরিচর্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ অবস্থায় কিছু বিশেষ সমস্যা দেখা দেয়। যেগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিশেষ অবস্থার কথা বিবেচনায় রেখে চিকিৎসা করা উচিত। অন্যথায় মা ও শিশুর স্বাস্থ্য হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। এরূপ একটি সমস্যা হচ্ছে গর্ভাবস্থায় মায়ের পাইলসে আক্রান্ত হওয়া।
গর্ভাবস্থায় শেষের দিকে মায়েদের পাইলসে আক্রান্ত হওয়া একটি সাধারণ ঘটনা এবং তা অনেকের হয়। এ সমস্যা আগে ছিল কিন্তু বর্তমানে এটির তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আবার গর্ভাবস্থার কারণে অনেকের এ সমস্যা নতুন করে শুরু হতে পারে। এ অবস্থায় পাইলস হওয়ার উল্লেখযোগ্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে- কোষ্ঠকাঠিন্য, হরমোনের পরিবর্তন, জরায়ুর স্ফীতির জন্য পেটের ভেতরের চাপ বৃদ্ধি পাওয়া, যার কারণে রক্ত চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়।
এ অবস্থায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাইলস বিনা অপারেশনে রক্ষণশীল চিকিৎসায় ভালো করা সম্ভব। প্রথমতো আমরা আসছি কোষ্ঠ ব্যবস্থাপনায়। মল যাতে শক্ত না হয় এবং মলত্যাগে কষ্ট না হয়, তার ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য বেছে খাবার খেতে হবে, যাতে কোষ্ঠকাঠিন্য না হয়। আঁশ বা ভরনবৎ জাতীয় খাবার খেতে হবে যেমন- শাকসবজি, ফলমূল এবং ইসবগুলের ভুসি। গরু ও খাসির গোশত কম খাওয়া ভালো।
এ ছাড়া প্রয়োজনে মল নরম করার ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এর যথেচ্ছ ব্যবহার ক্ষতিকর। এ ওষুধগুলো সঠিক মাত্রায় এবং সঠিক মেয়াদে ব্যবহার করা উচিত। অন্যথায় অভ্যাসে পরিণত হবে। সিজ বাথ অর্থাৎ গরম পানির ছ্যাঁক দেয়ায় উপকার পাওয়া যায়। এটির নিয়ম হচ্ছে আধগামলা গরম পানিতে লবণ দিয়ে নিতম্ব ডুবিয়ে ১০ মিনিট, দিনে ২-৩ বার বসে থাকতে হবে।
এতে যদি রোগীর উন্নতি না হয় তাহলে আমরা ইনজেকশন অথবা আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে বিনা অপারেশনে এবং বিনা ব্যথায় এর চিকিৎসা করতে পারি। যেহেতু ইনজেকশনের সফলতা আশাব্যঞ্জক ও দীর্ঘস্থায়ী হয় না, তাই পাইলসের চিকিৎসায় নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে এমন ব্যবস্থা যেমন- রিংলাইগেশন পদ্ধতি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারে।
রিংলাইগেশন পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে একটি ছোট্ট যন্ত্রের সাহায্যে পাইলসের চিকিৎসা করা হয়। এটি ডাক্তারের চেম্বারেই করা সম্ভব। কোনোরূপ অবশ বা অজ্ঞান করার প্রয়োজন নেই। চিকিৎসা-পরবর্তী কিছু দিনের ভেতর পাইলসটি নিজ থেকেই কেটে পড়ে যায়। পদ্ধতিটি প্রয়োগের সময় রোগী কোনোরূপ ব্যথা অনুভব করেন না। আমাদের শরীরে যেহেতু তিনটি পাইলস রয়েছে অতএব কিছু দিন পরপর এটি দুই-তিনবার করা প্রয়োজন হতে পারে। এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিখ্যাত আমেরিকান পাইলস বিশেষজ্ঞ ডা: মারভিন এল করম্যান বলেন, এ পদ্ধতিতে চিকিৎসার সাফল্য এত চমৎকার যে ৮০ শতাংশ পাইলস রোগী এ চিকিৎসায় সম্পূর্ণ নিরাময় হয়েছেন।
পদ্ধতিটি প্রয়োগের পর কিছু বিশেষ ওষুধ ও উপদেশ দেয়া হয়। এ জন্য কোনোরূপ কর্মবিরতি বা ছুটি নেয়ার প্রয়োজন নেই। চিকিৎসার পর রোগী রিকশা বা গাড়িতে করে অনায়াসে কিছুক্ষণ পরই বাসায় ফিরে যেতে পারেন।
এটি অত্যন্ত লাভজনক; কারণ এটি সময়, ঝুঁকি ও অর্থের সাশ্রয় করে। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যে, এটি অপারেশনের একটি যুক্তিসঙ্গত সফল বিকল্প পদ্ধতি। এতে অপারেশনের ঝুঁকিগুলো একেবারেই নেই।
অপারেশন : অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় আমরা সাধারণত পাইলসের অপারেশন এড়িয়ে থাকি। তবে পাইলসের জটিলতা যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, অপারেশন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই, তখন অপারেশন করাই শ্রেয়। বিশিষ্ট পাইলস বিশেষজ্ঞ ডা: সালিবী ২৫ জন অন্তঃসত্ত্বা মায়ের পাইলস অপারেশন করে এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, ওই গর্ভবতী মায়েদের বা তাদের সন্তানদের কোনো অসুবিধা হয়নি। তিনজন বাদে এ ২৫ জনের সবাই গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসে ছিলেন। এদের একজনের শুধু অপারেশন-পরবর্তী রক্তপাত হয়েছিল। এ থেকে আমরা এ সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পাইলস অপারেশনের কোনো অতিরিক্ত ঝুঁকি নেই।
>>>লেখক : বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথ বিশেষজ্ঞ, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, (অব:) কলোরেকটাল সার্জারি বিভাগ, বিএসএমএমইউ, ঢাকা।
চেম্বার : ইডেন মাল্টি-কেয়ার হসপিটাল, ৭৫৩, সাতমসজিদ রোড, (স্টার কাবাব সংলগ্ন) ধানমন্ডি, ঢাকা। ফোন : ০১৭৫৫৬৯৭১৭৩

Friday, August 5, 2022

আলো অন্ধকারে যাই by মাসউদ আহমাদ

ভ্যান থেকে যখন নামল সে, বহু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যা পেরিয়েছে বেশ আগেই। বাড়ির পরিবেশ বিষণœ। এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মুখগুলোও ছেয়ে আছে গভীর বিষাদে। সবাই রোমেলের জন্য অপেক্ষা করছিল। রোমেল বাড়ির সীমানায় পা রাখতেই আরেক দফা কান্নার দমক উঠল; মুহূর্তখানেক পর থেমেও এলো সবকিছু। বড় ভাইকে দেখল, দূরে দাঁড়িয়ে আছে রসালো চোখে। ছোট দু-বোন এসে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আকুল হয়ে কাঁদতে থাকলÑ ও ভাইরে, তুমি আস্যাছো... আমাহারে আর কেহু থাইকলো না গো... জানাজা শেষ হওয়ার পর, কেউ একজন বলে, মায়ের মুখটা বাপজিকে একটু দেখাও। মুহূর্তে মাথা ঘুরিয়ে সে বলে ওঠে, ‘না থাক।’ শেষ দেখাটা একটু দেখি ল্যাও, বাপ।
মতিঝিল থেকে শাহবাগ এমন কিছু দূরের পথ নয়, তবু চল্লিশ মিনিটের বেশি সময় লেগে গেল। শাহবাগে এসে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে রোমেল। এখন বাসায় গিয়ে টুক করে ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড যেতে হবে। কল্যাণপুর থেকে দূরপাল্লার বাসে করে উত্তরবঙ্গে, রাজশাহীতে।
শাহবাগ থেকে বাসাটা কাছেই, পরীবাগে। বাস থেকে নামার পর, আজ শাহবাগকে অন্যরকম লাগে। কেন লাগে? এমন অসময়ে অফিস ডে-তে খুব একটা আসা হয় না। শাহবাগ যেন এক স্মৃতিকুঞ্জ, ভাবে সে। কত আনন্দ-বেদনার গল্প জমে আছে বুকের তোরণে আমার, তার এবং অনেকের- শাহবাগকে ঘিরে। অজস্র সামান্যতর ও বিখ্যাত মানুষ হেঁটে গেছেন এই পথ হয়ে। বছর খানেক আগে শাহবাগের পটভূমিতে সে একটা কবিতাও লিখেছিল। কবিতা? আহা, যৌবনে কবিতার মতো কিছু রচনার চেষ্টা কে না করেছে।
কিন্তু রোমেলের নিজের ধারণা, তার কবিতায় সময়-পরিপার্শ্ব আর অনুভূতির টুকরো কণা ও বিভাগুলো এমনভাবে ধরা পড়ে, পুরনো হতে অন্তত মুহূর্ত কয়েক সময় নেবে।
মুহূর্ত? এখনকার অনেক কবিতা সেভাবেই ভূমিষ্ঠ হয়। দুপুরের রোদের তীব্র তাপ মোকাবেলা করার আগেই তো ঝরে পড়ে কবিতা নামের রচনাগুলো। এ এক নিয়তি। রোমেলের এক বন্ধু বলেছিলÑ নিয়তি নয়, প-শ্রম।
গত শতাব্দীতে শাহবাগের মোড়ে বৃষ্টিতে ভিজেছি নীলিমার পাশাপাশি, বিমুগ্ধ আলিঙ্গনে।
আজকাল বৃষ্টিতে খুব একটা ভেজা হয় না; এই সুযোগে ভালোবাসা ফিকে হয়ে যায়।
পথের দূরত্ব বাড়ে, দিন দিন
আজও বর্ষায় কিংবা বসন্তে শাহবাগের মোড়ে বৃষ্টির উৎসব জমে।
শুধু আমার আর রিকশার হুড ফেলে একা বৃষ্টিতে ভেজা হয় না আনন্দের বেদনায়।...
সহসা টুকরো একটি বাক্য মাথায় উঁকি দেয় রোমেলেরÑ দূরত্ব কি দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়, সম্পর্কে?
মুঠোফোনে সময়টা দেখে নেয় সে। এগারোটা পঞ্চাশ। মতিঝিলের অফিস পাড়ায়, সকালের তুমুল ভিড়-জ্যাম ও মানুষের কোলাহল ঠেলে বাস থেকে যখন নামে সে, একবারও কি ভাবতে পেরেছিল, কিছু সময় পরে আবার ফিরে আসতে হবে?
প্রতিদিনের মতো, অফিসের লিফটের সামনে লম্বা সারি পেরিয়ে একসময় সে বারো তলায় এসে নিজের ঘরে গিয়ে বসে। যথারীতি দুধ-চিনি ছাড়া লিকার চা এসে যায়। লেট লতিফ তখনও আসেনি, খেয়াল করে সে; আর তখন, অফিসে পৌঁছুনোর কুড়ি মিনিটের মধ্যে ফোনটা আসে। ফোন যিনি করেন, প্রায় ফুরিয়ে আসা সম্পর্কের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র বড় ভাই করিম শেখ; তিনি, ফোন করে কোনো ভূমিকায় না গিয়ে সরাসরি সংবাদটা দেনÑ ‘হ্যালো রোমেল, আজ সকালে মা মারা গেছে। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে আয়।’
টেলিগ্রাফের মতো সংক্ষেপে খবরটুকু দিয়েই তিনি নিঃশব্দ হয়ে যান। তখন খুব নীরবতা নামে ফোনে, ইথারের এপার ওপার।
চোখের পলকে চেনা অফিসঘরও ভীষণ অচেনা আর বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো লাগে রোমেলের। মুঠোফোনটা কোনোরকমে টেবিলে রেখে সামনের দিকে ঝুকে আসে। দু-হাতে মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ শূন্য অনুভূতি নিয়ে বসে থাকে। এসি ঘরে বসেও সে ঘামতে থাকে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। মাথাটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। ধাতস্থ হতে দু-দ- সময় লাগে। কিন্তু বস তার টেবিলের সামনে এসে কখন দাঁড়িয়েছেন, মাথায় হাত রেখে একই প্রশ্ন বারকয়েক জিজ্ঞেস করে ফেলেছেন, একদমই টের পায়নি। সে উঠে দাঁড়িয়ে যায় এবং কোনোমতে বলতে পারেÑ স্যার...
সাধারণত এই অফিসে ছুটি মেলে না। কিন্তু আজ অন্যরকম ব্যাপার ঘটে। মাসের একুশ তারিখ চলছে, ছুটি তো বটেই, বস রোমেলকে অগ্রিম স্যালারিও দিয়ে দেন। সান্ত¡না দেন। বাড়ি চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে দরজাও খুলে ধরেন।
রাস্তায় নেমে প্রথম যে কথাটি মনে আসে- মায়ের সঙ্গে শেষ কথাটুকুও আর হলো না...
বুক চিরে চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে রোমেলের।
মাকে শেষ কবে দেখেছে, দিনক্ষণের হিসাবটা ঠিক মেলাতে পারে না রোমেল। এখন যে-কোনো কিছুতেই হিসাব মেলানো কঠিন ঠেকে তার কাছে। কিন্তু মায়ের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। কী আশ্চর্য, এত দ্রুত মায়ের মুখখানা এমন অস্পষ্ট হয়ে উঠতে পারছে? হায়- নিয়তি!
নাগরিক ব্যস্ততা আর কাজের বাহানা, কিংবা সত্যিই কিছু কাজের দেয়াল থাকেও; দেয়ালগুলো আলুর বস্তার মতো। দু-হাতে সরিয়ে সামনের কুয়াশাময় দরজা খুলতে হয়। এসব করতে গিয়ে শরীরের চেয়ে মনটাই বরং ক্লান্ত ও বিপন্ন হয়ে চলে, দিনের পর দিন।
কিন্তু আজ সব কাজ ও ব্যস্ততা স্তিমিত হয়ে আসে রোমেলের। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই মনের ভেতর সাড়া ফেলে না।
সব মিলিয়ে ছ-ঘণ্টার মতো পথ। এই পথটুকুই ছয় মাসের পথ হয়ে যায়। কখনও বছর। মাকে দেখা হয়নি, ছ-ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে। কেন হয়নি? অভিমান? এই শহরে অভিমান বা ঠুনকো দুঃখ-সুখের কোনো মূল্য নেই, গুরুত্ব তো নয়ই। সেটুকু অনুধাবন করতে পেরিয়ে গেছে কয়েক বছর।
মা কতদিন বলেছেন- কবে বাড়ি আসবি, বাপ?
রোমেল এড়িয়ে গেছে- মা, জুন মাসের ক্লোজিং চলছে। আর প্রায় নিয়মিত হরতাল। এখন বাড়ি গেলে ফিরতে পারব না। অফিসে সমস্যা হবে।
তাহলে থাক, বাবা। কাজ শেষ হোক, পরেই আসিস।
কিন্তু, মাকে দেওয়া কথা আর রাখতে পারল না- ভেবে শ্বাস ভারি হয়ে আসে তার।
সিএনজি স্টার্ট বন্ধ করে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাম। একটা গাড়িও নড়ে না। ফার্মগেট পেরিয়ে আসাদ গেটের পরে কলেজ গেটে এসে গাড়িগুলো থিতু হয়েছে, দীর্ঘসময়। এই জ্যাম কখন ছুটবে কে জানে। -কখন কল্যাণপুর পৌঁছুব আমি? বাস ধরব? কখন বাড়ি পৌঁছুব? মাকে শেষ দেখাটুকুও কি দেখতে পাব না...
ভেতরে অস্থিরতা টের পায় রোমেল। আজ পরিষ্কারভাবেই সে বুঝতে পারে, মৃত্যু সবচেয়ে নির্মম। একপেশে সত্য। বাস্তব। মৃত্যু সব শেষ করে ফেলে জীবনের। সব রকম অজুহাত, ক্ষোভ এবং অভিমান...
গাড়ি স্টার্ট নিয়ে নিয়েছে। কল্যাণপুর থেকে বাস পাল্টে রাজশাহীগামী কোচে পুঠিয়া। পুঠিয়া থেকে রিকশাভ্যানে ধোপাপাড়া। সেখান থেকে ভ্যানে করে কুসুমপুর।
কিন্তু কুয়াশা। সিএনজি থেকে নেমেই রোমেলের মনে হয় সব চরাচর, এমনকি মনের আকাশটুকুও অভেদ্য কুয়াশার দেয়ালে আড়াল হয়ে আছে।
রোমেলের ঢাকার জীবনের স্থিতিকাল নেহায়েত কম নয়, বছর পনেরো তো হবেই। এই যে দীর্ঘ সময়, খুব কি পরিবর্তন এসেছে তার জীবনে- চিন্তা বা চরিত্রে? পনেরো বছরে সে একটুও লম্বা হয়নি, বরং কমেছে; তা নিশ্চিত করে বলা যায়। মাথার চুলও খোয়া গেছে বেশকিছু। এর মধ্যে বাবা গত হয়েছেন। বাবার সঙ্গে মায়ের সম্পর্কটা ছিল অদ্ভুতÑ চোর-পুলিশের মতো কি? হতে পারে। বৈঠকখানায় বাবার একটা বড় ফটোগ্রাফ ছিল। বাবা চলে যাওয়ার পর, মা এমনিতেই কথা কম বলতেন, আরও নিঃশব্দ হয়ে গেলেন। প্রায়ই গম্ভীর মুখে সেই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করতেন, একা।
একসময় নিজেকেই যেন শুধায় রোমেল : কতদিন পর বাড়ি যাচ্ছি আমি?
একটা বয়স্ক মহিলা সিএনজির বন্ধ দরজার ওপাশে ভিক্ষার জন্য হাত বাড়ায়; তখনই কথাটুকু মনে আসে। সচরাচর বাড়িতে সে যায় না। হয়তো বছরে, কিংবা দু-বছরে একবার যায়। এবং বাড়ি থেকে ফেরার সময় তার আচরণ ও চোখমুখ থেকে এমন ইঙ্গিত কেউ দেখে ওঠে না যে, সে আবার এই পথে আসবে। মাঝে মাঝে সে এত দীর্ঘ সময় বাড়ি যাওয়া থেকে বিরত থাকে যে, বাড়ি যাওয়ার কথা মনেও থাকে না। ঢাকা শহর মানুষের মনকে এমন ভোঁতা করেও রাখতে জানে!
কল্যাণপুরে নেমেই বাস পেয়ে যায় রোমেল। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা একটা পেরিয়েছে। তাড়াহুড়োয় কিছু খাওয়াও হলো না। অনেকদিন পর বাড়ি যাচ্ছে সে; কিন্তু মা আর নেইÑ ভাবতেই শ্বাস দ্রুততর হয়ে যায়। চোখ ফেটে জল আসে না ঠিক; কিন্তু গলার কাছে কিছু আটকে আছে মনে হয়। আর তাতে খুব অস্বস্তি লাগে।
গাবতলী ব্রিজ পেরিয়ে শ্যামলী পরিবহনের গাড়ি দ্রুতবেগে ছুটে চলে। কিন্তু তার চেয়েও দ্রুত গতিতে মনটা পেছনের দিকে ছুটে যায়। হঠাৎ মনে হয়, মা-ই একমাত্র ব্যক্তি যার কাছে সব অভিযোগ ও দাবি তোলা যায়Ñ খেতে দাও, ঘুম পাড়িয়ে দাও; নতুন জামা লাগবে, কুচকিতে এত চুলকায় কেন মা? শোনো মা, আমার কিন্তু এটা লাগবে। টাকা নাই, কিছু টাকা দাও। ভারি মুশকিল, তোমার বোনের মেয়েটা কিন্তু খুব জ্বালাচ্ছে...
এই শহরে এসে জীবনের কত কিছু শেখা হলো, কত কিছু খোয়া গেল হৃদয়ের। হিসাব মেলানো যায় না। হিসাব মেলাতে গেলেই ভাবনা আসে। ভাবনাটুকু মাথায় নিতে চায় না সে। ভাবতে যে সে পছন্দ করে না, এমন নয়। বিশেষ করে শুদ্ধতাকে নিয়ে ভাবতে। কিন্তু এখন যে-কোনোরকম ভাবনা বড় যন্ত্রণা দেয় তাকে।
জীবনকে সে পরিষ্কার দু-ভাগে ভাগ করে নিতে পেরেছে এখন। ঢাকার জীবন এবং ঢাকায় আসার আগের জীবন। যে জীবনে ঢাকা শহর নেই বা ছিল না কখনও- ঢাকার রূপ-গন্ধ-অভিজ্ঞতা নেই, সেই জীবন যত বর্ণিলই হোক, পূর্ণাঙ্গ নয়। এভাবে বলতে ইচ্ছে করে তার। কেবলই মনে হয়, স্বপ্ন ও কল্পনা বাস্তবায়নের শহর ঢাকা, স্বপ্ন ভঙ্গেরও কি নয়?
এতদিনেও একাই আছে রোমেল। মায়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে তাই এমন টুক করে বেরিয়ে পড়তে পেরেছে। বিয়ে করে সংসারী হয়ে গেলে কি পারত অফিস থেকে বেরিয়েই বাসে উঠে পড়তে?
আর বিয়ে! এই বৈরী মানসিক অবস্থার মধ্যেও নিজের মনেই একবার হেসে ওঠে সে। ঢাকায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর আছেন, রোমেলের পরিচিত। খুব মজার মানুষ সেই প্রফেসর। সৈয়দ বংশের মানুষ। ক্লাসে তিনি ইংরেজি পড়ান। বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি আছে ভদ্রলোকের। তার নানা ছিলেন আর এক ত্যাঁদড়, মজার লেখক হিসেবে তার নানার খ্যাতি গোটা বাংলাজুড়ে, আজও। অবশ্য তার কথা কে না জানে। প্রফেসর সাহেব একদিন বললেন, জানো রোমেল, নানা বলতেন, তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হচ্ছে বিয়ে করা। আর ভুল করে বিয়ে না হয় করলেনই; কিন্তু বেশি বয়সে বাচ্চার বাবা হওয়া- সেটি তার চেয়েও বড় ভুল।
প্রফেসরের গল্প শুনে রোমেল মুখ টিপে হাসে। -কিন্তু স্যার, মানুষের একটাই তো জীবন; বিয়ে না করলে এই জীবনটা কি সুন্দর বা আনন্দময় হয়? নতুন বউয়ের গন্ধ যে কখনও পেল না জীবনে, নীল ঘূর্ণি আঁচল ও রঙিন দোপাট্টার প্রান্ত যার নাকে বাড়ি খেল না- তার জীবনে কী আর থাকল, বলুন!
আচ্ছা, বেশ বলেছ তো তুমি...
------২------
বাড়ি পৌঁছুনোর পর...
ভ্যান থেকে যখন নামল সে, বহু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যা পেরিয়েছে বেশ আগেই। বাড়ির পরিবেশ বিষণ্ন। এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মুখগুলোও ছেয়ে আছে গভীর বিষাদে। সবাই রোমেলের জন্য অপেক্ষা করছিল। রোমেল বাড়ির সীমানায় পা রাখতেই আরেক দফা কান্নার দমক উঠল; মুহূর্তখানেক পর থেমেও এলো সবকিছু। বড় ভাইকে দেখল, দূরে দাঁড়িয়ে আছে রসালো চোখে। ছোট দু-বোন এসে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আকুল হয়ে কাঁদতে থাকলÑ ও ভাইরে, তুমি আস্যাছো... আমাহারে আর কেহু থাইকলো না গো...
জানাজা শেষ হওয়ার পর, কেউ একজন বলে, মায়ের মুখটা বাপজিকে একটু দেখাও। মুহূর্তে মাথা ঘুরিয়ে সে বলে ওঠে, ‘না থাক।’
শেষ দেখাটা একটু দেখি ল্যাও, বাপ।
রোমেল দেখতে রাজি হয় না। সবাই বেশ অবাক হয়। কিন্তু কেউ আর আপত্তি করে না। মায়ের যে মুখটি অন্তর্গত চোখে ধরা আছে রোমেলের, এখনকার ছবির সঙ্গে তা কিছুতেই মিলবে না। বিবর্ণ-ধূসর মুখ দেখে মাকে আরও পর করে দিতে চায় না সে।
কী যে হয় রোমেলের, হঠাৎ একদৌড়ে বাসস্ট্যান্ডে চলে যেতে ইচ্ছে করে। বুক ফেটে যেতে চায়, তবু কান্না আসে না। শুকনো চোখে সে একবার আকাশের দিকে তাকায়। আকাশ এত অন্ধকার। আজ অমাবস্যা নাকি?
সবার অলক্ষে সে বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ায়। উঠোনেও অনেক মানুষ, তার দিকে নরম চোখে তাকায়। এত মানুষ এত আলো; কিন্তু কেউ তাকে বসতে বলে না, এগিয়ে এসে হাতটি ধরে না। কলতলার ওপাশে ঝিঁঝিপোকার ডাক ভেসে আসে।
গাঢ় ভঙ্গিতে রাত বাড়তে থাকে।
>>গল্পে ব্যবহৃত কবিতাটি লিখেছেন তরুণ কবি ফেরারী কৌশিক।