Tuesday, March 20, 2018

ছাত্রীর পোশাক নিয়ে শিক্ষকের মন্তব্যে তোলপাড় কেরালায়

ছাত্রীদের পোশাক নিয়ে এক শিক্ষকের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর অবস্থা বিরাজ করছে কেরালার ফারুক কলেজে। সেখানে মুসলিম পরিবারগুলোর এক জমায়েতে বক্তব্য রাখছিলেন ওই কলেজের সহকারী প্রফেসর জওহার মুনাবীর। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, মেয়েরা ঠিকমতো হিজাব পরে না। এতে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বক্ষদেশ প্রদর্শন করছে। যেন তারা ওয়াটারমেলন বা তরমুজের স্লাইস প্রদর্শন করছে।

শিক্ষকের এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে উত্তেজনা। ওই বক্তব্যকে যৌনতার পর্যায়ে ফেলা হয়েছে। বলা হচ্ছে, এটা অবমাননাকর মন্তব্য। ফলে সোমবার ওই কলেজে কয়েক দফা বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। বেশ কিছু ছাত্রী ওই বিক্ষোভে অংশ নেন। এসএফআই-এর ব্যানারে তারা প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেন। এর নাম দেয়া হয় ‘ওয়াটারমেলন মার্চ’।

তাদের এই বিক্ষোভ কলেজের প্রধান গেটে সমবেত হয়। এ সময় সব ছাত্রীর হাতে ছিল তরমুজের স্লাইস। তারা সবাই ওই শিক্ষকের শাস্তি দাবি করেন। তবে পুলিশ বিক্ষোভ ঠেকিয়ে দিয়েছে। ওদিকে কেএসইউ নামের একটি সংগঠনের নেতাকর্মরিা তরমুজের স্লাইস বিতরণের মধ্য দিয়ে তাদের বিক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এবিভিপি-এর কর্মীরা কলেজের গেটের সামনে একটি তরমুজ আছড়ে ফেলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ওদিকে শিক্ষকের ওই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এতে ওই শিক্ষক ছাত্রীদের পায়ের বড় অংশ প্রদর্শনের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ক্যাম্পসের শতকরা ৮০ ভাগ শিক্ষার্থীই হলো ছাত্রী।

তার আবার বেশির ভাগই মুসলিম। তারা পর্দা ব্যবহার করে। কিন্তু তা এতটাই উপরে উঠে থাকে যে তাতে তাদের পায়ের বেশির ভাগ অংশ প্রকাশ পায়। বিক্ষোভ হওয়ায় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের চেয়ারপারসন সুজা পি বলেছেন, আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে পড়ানোর কথা শিক্ষকদের। তাদের তো আমাদের শরীরের দিকে তাকানোর কথা নয়।

ত্রাণ সুবিধা পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ দেশ মিয়ানমার

ত্রাণ সুবিধা পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ দেশ হলো মিয়ানমার। গত ছয় মাসে যেসব মানুষ খারাপ পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন এবং তাদের ত্রাণ পাওয়া খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে তাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেয়ার অক্ষমতার শীর্ষে রয়েছে এই দেশটি। জেনেভাভিত্তিক এসিএপিএস তাদের এক গবেষণায় এ কথা বলেছে। সংস্থাটি ৩৭টি দেশের ওপর ৯টি সূচকের ভিত্তেতে গবেষণা চালায়। এর মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, মানুষকে ত্রাণ পাওয়ার সুবিধার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা। গবেষণা শেষে তারা একটি বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মিয়ানমার হলো সেই দেশ, যেখানে মানবিক ত্রাণ সুবিধা পাওয়ার অধিকার সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় গেছে। সেখানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ধারেকাছে ঘেঁষাও ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। ওদিকে বৃটিশ পার্লামেন্টারি কমিটি আরো একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে মঙ্গলবার। তাতে সতর্ক করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে বন্যা ও বিভিন্ন রোগে আরো কয়েক হাজার মানুষ মারা যেতে পারেন। ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ার স্টিফেন টুইগ এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য সময় দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে। তাই বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আহ্বান জানিয়েছেন দাতাদের। তিনি বলেছেন, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উদ্বাস্তৃ আরেকটি সঙ্কটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। আবহাওয়া পাল্টে যাচ্ছে। নিরাপত্তায় রয়েছে নাজুক অবস্থা। তাছাড়া বাংলাদেশে যেসব অস্থায়ী ক্যাম্পে তারা আশ্রয় পেয়েছেন তা রয়েছে ঝুঁকিতে। উল্লেখ্য, ২৫ শে আগস্ট রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতা শুরু পর জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছাড়তে বাধ্য হন। জাতি নিধনের শিকার হয়ে তারা আশ্রয় নেন বাঙলাদেশে। তবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এক্ষেত্রে যে অভিযোগ তা বরাবরই অস্বীকার করছে মিয়ানমার।

গোপন চুক্তিতে মুক্তি পেয়েছেন প্রিন্স আলওয়ালিদ

মুক্তি পেতে সৌদি আরবে সরকারের সঙ্গে গোপন চুক্তি করেছিলেন সেদেশেরই প্রিন্স আলওয়ালিদ বিন তালাল। তিনি কিংডম হোল্ডিংয়ের চেয়ারম্যান। দুর্নীতির অভিযোগে তাকে প্রায় তিন মাস আটক রাখা হয়েছিল। এরপর তিনি গোপন চুক্তি করে মুক্তি পেয়েছেন। তবে তার মুক্তির ব্যাপারে ‘কনফার্মড আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ব্লুমবার্গ টিভিকে দেয়া সাক্ষাতকারে তিনি এসব কথা বলেছেন। তার এই সাক্ষাতকারটি মঙ্গলবার প্রচারিত হয়। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এতে বলা হয়েছে, আলওয়ালিদ এখনও বিশ্বজুড়ে তার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের শতকরা ৯৫ ভাগ শেয়ারের মালিক। তিনি বলেন, সৌদি আরব সরকার ও আমার মধ্যে নিশ্চিত বোঝাপড়া হয়েছে। কনফিডেন্সিয়াল এবং গোপন চুক্তি হয়েছে। সেই চুক্তিকে আমার সম্মান করতেই হবে। সরকারের সঙ্গে এই চুক্তি চলমান অবস্থায় রয়েছে। তিনি দেশের ভিতরে সার্বভৌম সম্পদের যে তহবিল আছে তার সঙ্গে আভ্যন্তরীণ প্রকল্পে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা করছেন। উল্লেখ্য, সৌদি আরবের সবচেয়ে স্বীকৃত ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত প্রিন্স আলওয়ালিদ। তাকে সহ প্রায় এক ডজন প্রিন্সকে দুর্নীতির অভিযোগে রিয়াদের রিটজ কার্লটন হোটেলে বন্দি রাখা হয়েছিল ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের নির্দেশে। তার তিন মাস পরে ২৭শে জানুয়ারি মুক্তি পান তিনি। আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বেশির ভাগ বন্দিকে মুক্তি দেয়া হয়। এটর্নি জেনারেল বলেছেন, এতে রাষ্ট্রের তহবিলে এসেছে ১০০০০ কোটি ডলারের বেশি। তবে তিনি এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলেন নি। ওদিকে মুক্তির কয়েক ঘন্টা আগে রিটজ কার্লটন হোটেলে রয়টার্সকে প্রিন্স আলওয়ালি বলেছিলেন তিনি নির্দোষ এবং তার প্রতিষ্ঠানের ওপর পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ আছে। এখন বাতাসে নানা আলোচনা। কেউ বলছেন, প্রিন্স আলওয়ালিদ তার সম্পদের একটি অংশ সরকারকে দিয়ে মুক্ত হয়েছেন। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো তথ্য না থাকায় নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তার ওপর প্রিন্স আলওয়ালিদ বলেছেন, তিনি গোপন চুক্তির অধীনে মুক্ত হয়েছেন। কি ছিল সেই গোপন চুক্তিতে, তা হয়তো ইতিহাস বলবে ভবিষ্যতে। ব্লুমবার্গকে প্রিন্স আলওয়ালিদ বলেছেন, সৌদি আরবের ব্যবসায় তিনি বিনিয়োগ অব্যাহত রাখবেন। তার আংকেল বাদশা সালমান ও নিজের কাজিন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রতি তার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নেই। তিনি বলেছেন, ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান হলেন পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের চেয়ারম্যান। এর সঙ্গে তার আলোচনা চলছিল সৌদি আরবের ভিতরে বিনিয়োগ নিয়ে। তিনি বলেছেন, তাকে রিটজ কার্লটন হোটেলে আটক করার আগে থেকেই এ নিয়ে আলোচনা চলছিল। এ আলোচনায় তার ফোর সিজনস হোটেলটি পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের অধীনে রেড সি প্রজেক্টের আওতায় আনার কথা হচ্ছিল।

খালেদা জিয়ার দীর্ঘ কারাবাস, কোন পথে এগোবে বিএনপি

বাংলাদেশে বিরোধীদল বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন ৮ই মে পর্যন্ত স্থগিত করেছে সুপ্রিমকোর্ট।
তার আইনজীবীরা এই আদেশকে নজিরবিহীন এবং অপ্রত্যাশিত বলে বর্ণনা করেছেন। তারা বলছেন, এখন খালেদা জিয়া খুব সহসা মুক্তি পাচ্ছেন না। দলটির একাধিক নেতা স্বীকার করেছেন, এমন পরিস্থিতির জন্য বিএনপি প্রস্তুত ছিল না। তাদের মধ্যে নতুন করে এক ধরণের হতাশা তৈরি হয়েছে। তবে বিএনপি পরিস্থিতিটাকে বাস্তবতা হিসেবে ধরে নিয়ে নির্বাচন সামনে রেখে কৌশলে এগুতে চাইছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় পাঁচ বছরের সাজা নিয়ে কারাবন্দী খালেদা জিয়াকে হাইকোর্ট চার মাসের জামিন দিয়েছিল।
এখন সরকার এবং দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিমকোর্ট থেকে দেড় মাসেরও বেশি সময়ের জন্য জামিন স্থগিত হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলাটির বিচার কার্যক্রম চলেছে ১০ বছর ধরে। কিন্তু সেই বিচার কার্যক্রম এখনই শেষ হয়ে যাবে, এমনটা ধারণা করতে পারেননি বিএনপি'র শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। ফলে বিচার শেষে পাঁচ বছরের সাজা হওয়ার পর খালেদা জিয়াকে যখন জেলে নেয়া হয়েছে, সেই পরিস্থিতিতে এসে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেছে। বিএনপি নেতাদের অনেকের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে, খালেদা জিয়া কারাবন্দী হলেও অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে মুক্তি পাবেন, দলটিতে এমন ধারণাও তৈরি হয়েছিল। দক্ষিণ পশ্চিমে খুলনায় বিএনপির ভাল অবস্থান রয়েছে। সেখানকার বিএনপির একজন সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলছিলেন, খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘায়িত হবে, এ ব্যাপারে তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন না। "বিএনপি এটার জন্য প্রস্তুত ছিল না। এই যে নির্বাচন সামনে রেখে তাঁকে আটক রাখা হয়েছে। এর পিছনে বিএনপিকে ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র থাকতে পারে। নেতা-কর্মিদের মাঝে হতাশা দেখা দিতে পারে। নানান ধরণের ষড়যন্ত্রের মধ্যে বিএনপিকে ফেলতে পারে।"
বিএনপির এই নেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জু আরও বলেছেন, "বিএনপি বলুক যে বেগম জিয়ার মুক্তি না হলে তারা নির্বাচনে যাবে না। বিএনপি বলুক যে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা না হলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। এবং এধরণের প্রতিকূল পরিবেশে যাতে বিএনপি নির্বাচনে না যায়, তারই ষড়যন্ত্র চলছে।"
দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিএনপির তৃণমূলের নেতা-কর্মিদের অনেকের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে, তাদের শীর্ষ নেত্রীকে জেলে নেয়ার ঘটনায় বিএনপির সব পর্যায়ের নেতা কর্মিরা সক্রিয় হয়েছিল, সেটাকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচন সামনে রেখে জনগণকে সম্পৃক্ত করার কৌশল নিয়ে এগুনোর কথা দলের কেন্দ্র থেকে তাদের বলা হয়েছিল। কিন্তু এখন খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত হওয়ায় বিএনপি আবার হোঁচট খেয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
উত্তরের রাজশাহী থেকে বিএনপির একজন নেত্রী জাহান পান্না বলছিলেন, তাদের তৃণমুলে আবার যে হতাশা তৈরি হলো, তা কাটিয়ে উঠতে সময় প্রয়োজন হবে।
যদিও বিএনপিতে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে যে, খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেয়ায় মানুষের মাঝে একটা সহানুভুতির সৃষ্টি হয়েছে এবং গণসংযোগের মতো তাদের কর্মসূচিগুলোকে মানুষ সমর্থন করছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপির কর্মসূচি সরকারের উপর কোন চাপ তৈরি করতে পারেনি। সিনিয়র সাংবাদিক আমানউল্লাহ কবির বলছিলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির ইস্যুর কাছে এখন নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার বিএনপির দাবি চাপা পড়ে গেছে। "নির্বাচনের সময় সহায়ক সরকারের যে দাবি বিএনপি করেছিল, সেটা এখন 'ফরগট ইট' বা অতীত হয়ে গেছে। বিএনপি আর সে সুযোগ পাচ্ছে না। খালেদা জিয়ার কারাবাসের পর যে আন্দোলন গড়ে তোলার কথা ছিল, সেটা কিন্তু পারেনি। সব মিলিয়ে তাদের নেতৃত্বে এক ধরণের হতাশা এবং একই সাথে কনফিউশন সৃষ্টি করেছে" বলে মি. কবির মনে করেন।
বিএনপি নির্বাচনে যেতে চায়। সেই প্রেক্ষাপটে দলটি সতর্কতার সাথে এগুবে বলে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বলে আসছেন। এখনও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এখন খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত হওয়ায় তাদের দলে কিছুটা হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। এরপরও তাঁরা সতর্কতার সাথে এগুতে চান। "কিছুটাতো আপনার এতে ক্ষোভ হতাশা সবই সৃষ্টি হয়েছে সাধারণ নেতা-কর্মিদের। কিছুটা প্রভাবতো পড়বেই। তবে এটা ঠিক সরকারের দিক থেকে এটা আরেকটা প্রভোকেশন।যাতে দেশে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। আমরা সচেতনভাবে চেষ্টা করছি, প্রভোকেশনে ট্র্যাপ্ট না হতে|" বিএনপির নেতারা আরও বলছেন, জনগণকে সম্পৃক্ত করে এবং নেতা-কর্মিদের অংশগ্রহণ থাকে, এই ধরণের কর্মসূচিই তাঁরা অব্যাহত রাখতে চাইছেন।
তারা মনে করেন, একটা কঠিন সময় তারা পার করছেন, এই পরিস্থিতিতে তাদের সিনিয়র নেতারা ঐক্যবদ্ধ আছেন। তবে বিএনপি এখনও সরকারের উপর কোন চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি বলে বিশ্লেষকরা যে বলছেন, সেখানে দলটি ভিন্ন রাজনৈতিক কৌশল নেয়ার কথা বলছে। বিএনপি চাইছে, তাদের জোট এবং সরকারের জোটের বাইরে থাকা দলগুলোর সাথে যুগপৎভাবে কর্মসূচি নিয়ে এগুতে। এর মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে সব দলকে দাঁড় করানোর একটা চেষ্টা তাদের রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি

নিজেকে জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন by তোফায়েল আহমেদ

বঙ্গবন্ধু তার সমগ্র জীবনব্যাপী একটিই সাধনা করেছেন আর তা হচ্ছে, বাংলা ও বাঙালির মুক্তির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা। এই সাধনার শুরু ১৯৪৮ থেকে। '৪৭-এ দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, এই রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে আমরা বাঙালিরা নির্যাতিত-নিষ্পেষিত হবো। তাই '৪৮-এর জানুয়ারির ৪ তারিখে গঠন করেছিলেন ছাত্রলীগ এবং '৪৯-এর জুনের ২৩ তারিখে আওয়ামী লীগ। সেই থেকে ধাপে ধাপে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। মনে পড়ে '৭০-এ বরিশাল-পটুয়াখালী-ভোলা অঞ্চলে নির্বাচনী সফরের কথা। ২৪ ফেব্রুয়ারি ছিল ভোলায় নির্বাচনী জনসভা। এদিন ভোলার ইতিহাসে সর্ববৃহৎ গণসমাবেশে বঙ্গবন্ধু আমাকে আমি যা না তার চেয়ে অনেক বড় করে তুলে ধরে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তিনি ছোটকে বড় করে তুলতেন। যেসব জায়গায় সফর করতেন, সেখানকার নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডকে আবেগাপ্লুত বক্তৃতার মধ্য দিয়ে মানুষের কাছে বড় করে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতেন। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতাকে থানা আওয়ামী লীগের নেতা, থানা আওয়ামী লীগের নেতাকে জেলা আওয়ামী লীগের নেতা এবং জেলা আওয়ামী লীগের নেতাকে জাতীয় নেতায় রূপান্তরিত করে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হয়েছেন। ১৯৭১-এর ৩ জানুয়ারি। ঐতিহাসিক রেসকোর্স (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে নবনির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। সেদিন বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, '৬ দফা ও ১১ দফা আজ আমার নয়, আমার দলেরও নয়। এ আজ বাংলার জনগণের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। কেউ যদি এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, বাংলার মানুষ তাকে জ্যান্ত সমাধিস্থ করবে। এমনকি আমি যদি করি আমাকেও।' বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে কত স্মৃতি। '৭১-এর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের কথা। যে ভাষণে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করেছেন। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতা ঘোষণার প্রারম্ভে তিনি বলেছিলেন, 'এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।' আমার যখন মাত্র ২৯ বছর বয়স, তখন ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি আমাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় তার রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ করেন। দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা অর্জন করি সদ্য স্বাধীন দেশের উপযোগী বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান। শূন্য হাতে যাত্রা শুরু করে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে তিনি গড়ে তোলেন। বিশ্বের ১১৫টি দেশের স্বীকৃতি আদায় করে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করেন। আজ তার জন্মদিনে মনে পড়ছে '৭১-এর রক্তঝরা মার্চের ১৭ তারিখের কথা। সেদিন ছিল বঙ্গবন্ধুর ৫২তম জন্মদিন। অসহযোগ আন্দোলন চলছে। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা শেষে তখনকার প্রেসিডেন্ট ভবন অর্থাৎ পুরাতন গণভবন সুগন্ধা থেকে দুপুরে যখন তিনি ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাসভবনে ফিরে এলেন, তখন একজন সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেন- '৫২তম জন্মদিনে আপনার সবচাইতে বড় ও পবিত্র কামনা কী?' উত্তরে স্বভাবসুলভ কণ্ঠে বলেছিলেন, 'জনগণের সার্বিক মুক্তি।' এরপর সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছার উত্তরে বেদনার্ত স্বরে বলেছিলেন, 'আমি জন্মদিন পালন করি না, আমার জন্মদিনে মোমের বাতি জ্বালি না, কেকও কাটি না। এ দেশে মানুষের নিরাপত্তা নাই। আপনারা আমাদের জনগণের অবস্থা জানেন। অন্যের খেয়ালে যে কোনো মুহূর্তে তাদের মৃত্যু হতে পারে। আমি জনগণেরই একজন, আমার জন্মদিনই কি, আর মৃত্যুদিনই কি? আমার জনগণের জন্য আমার জীবন ও মৃত্যু। আমি তো আমার জীবন জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছি।' নিজের সবকিছুই জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। অতি সাধারণ জীবন ছিল তার। রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয়েও সরকারি বাসভবনে থাকতেন না। নিরাভরণ, ছিমছাম ৩২ নম্বরের বাড়িটিতেই আমৃত্যু থেকেছেন। বঙ্গবন্ধুর কথা এবং বক্তৃতায় প্রায় সময়ই উদ্ধৃত হতো রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত-জীবনানন্দের কবিতার চরণ। এত সাবলীল আর প্রাসঙ্গিকতায় তিনি কবিতা আবৃত্তি করতেন, মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে হতো। অগ্নিঝরা মার্চে একদিকে চলছে আলোচনার নামে ইয়াহিয়ার প্রহসন ও গণহত্যার আয়োজন এবং অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আসন্ন মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। এই মার্চেই টঙ্গীতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুলিতে বহু শ্রমিক হতাহত হয়। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের এক বিশাল মিছিল সমবেত হয় বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে। উত্তেজিত শ্রমিক শ্রেণির উদ্দেশে বক্তৃতাদান শেষে বিদ্রোহী কবিকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, 'যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,/ অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না-/ বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত, আমি সেই দিন হব শান্ত।' ২৫ মার্চের থমথমে দিনটির কথা মনে পড়ে। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বিদায় নেওয়ার সময় বলি, বঙ্গবন্ধু আমার তো মনে হয় তারা অবশ্যই আপনাকে গ্রেফতার করবে। দৃঢ়-প্রত্যয়ী বঙ্গবন্ধু বলেন, 'করুক না। তাতে কী? ওরা আমাকে আগেও গ্রেফতার করেছে এবং তাতে ওদের কোনো লাভ হয় নাই। ওরা যদি আমাকে মেরেও ফেলে তাতেও ওদের কোনো লাভ হবে না। আমার মৃত্যুর বদলা নিতে বাংলার মাটিতে হাজারো শেখ মুজিবের জন্ম হবে।'
গণহত্যা শুরুর প্রাক্কালে সাংবাদিক সাক্ষাৎকারে বিষাদাচ্ছন্ন স্বরে বলেছিলেন, 'আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে- এই বাংলায়...।' তিনি অন্তরে যা বিশ্বাস করতেন দেশের মানুষকে তা-ই বলতেন। একবার যা অঙ্গীকার করতেন জীবন দিয়ে হলেও তা বাস্তবায়ন করতেন। শুধু দেশের মানুষ নয়, বিশ্বের রাষ্ট্রনায়করা বঙ্গবন্ধুকে অপরিসীম শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। যেখানেই গিয়েছেন মানুষ তাকে আপন করে নিয়েছে। বিশেষভাবে মনে পড়ে '৭৪-এর ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের কথা। বঙ্গবন্ধুকে প্রথমেই অনুরোধ করা হয়েছিল- 'মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ইংরেজিতে বক্তৃতা করবেন।' কিন্তু প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার প্রতি সুগভীর দরদ ও মমত্ববোধ থেকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'আমি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করতে চাই।' বঙ্গবন্ধুর ৪৫ মিনিট বক্তৃতার শেষে সভাপতি নিজেই যখন দাঁড়িয়ে করতালি দিচ্ছেন, তখন স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়ক ও প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বিপুলভাবে করতালি দিয়ে আলিঙ্গন করে অভিনন্দিত করেছেন বঙ্গবন্ধুকে। '৭৫-এর জানুয়ারির ১১ তারিখের কথা আমার স্মৃতির মণিকোঠায় এখনও জ্বলজ্বল করে। এদিন বাংলাদেশ সামরিক একাডেমিতে প্রথম শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠানে বিদায়ী ক্যাডেটদের উদ্দেশে এক মর্মস্পর্শী বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, '...আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এ কথা বলছি না, তোমাদের জাতির পিতা হিসেবে আদেশ দিচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী অনেক হবেন, অনেক আসবেন, প্রেসিডেন্টও অনেক হবেন, অনেক আসবেন। কিন্তু জাতির পিতা একবারই হন, দু'বার হন না। জাতির পিতা হিসেবেই যে আমি তোমাদের ভালোবাসি, তা তোমরা জান। আমি তোমাদের বলছি, তোমরা সৎ পথে থাকবে, মাতৃভূমিকে ভালোবাসবে। মনে রেখো তোমাদের মধ্যে যেন পাকিস্তানি মনোভাব না আসে। তোমরা পাকিস্তানের সৈনিক নও, বাংলাদেশের সৈনিক। তোমরা হবে আমাদের জনগণের বাহিনী।' অতুলনীয় সংগঠক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। দলীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যেককে দেখতেন নিজ পরিবারের সদস্যের মতো। প্রতিটি নেতাকর্মীর বিপদ-আপদে তিনি তাদের পাশে দাঁড়াতেন পরম হিতৈষীর মতো। মমতা মাখানো সাংগঠনিক প্রয়াস নিয়ে কর্মীদের হৃদয় জয় করে নেওয়ার ব্যতিক্রমী এক ক্ষমতা ছিল তার। '৭২-এর ১৪ এপ্রিল আমি তখন গ্যাস্ট্রিক-আলসারে আক্রান্ত হয়ে হলি ফ্যামিলিতে চিকিৎসাধীন। বঙ্গবন্ধু আমাকে দেখতে এসেছেন। আমার একমাত্র কন্যা মুন্নী যখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে, তখন টিভিতে ওর অনুষ্ঠান দেখে ওকে স্নেহাশীষ জানিয়েছিলেন। অপরিসীম ভালোবাসা ছিল শিশুদের প্রতি। ছবি তুলতে ভালোবাসতেন। ফটোগ্রাফার অনেকেই প্রশ্ন করতেন, 'বঙ্গবন্ধু, আপনি এত ছবি তোলেন কেন?' বলতেন, 'ভবিষ্যতের মানুষ যারা, ওরা বড় হয়ে দেখবে কেমন ছিল ওদের নেতা।' বঙ্গবন্ধু যখন গণভবনে যেতেন, সামনে-পেছনে দুটি গাড়ি থাকত। রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যাল পড়লে আমাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ত। তখন এ রকম স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি ছিল না। একদিনের কথা খুব মনে পড়ে। একবার আমাদের গাড়ি সিগন্যালে দাঁড়ানো, হঠাৎ একটি শিশু কত বয়স হবে সাত কি আট, গাড়ির কাছে এসে বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ করে বলছে, 'স্লামুআলাইকুম, মুজিব সাহেব!' তৎক্ষণাৎ বঙ্গবন্ধু শিশুটির হাত ধরে আদর করলেন, ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আমি পাশে বসে দেখছি একজন রাষ্ট্রনায়কের শিশুদের প্রতি কী অপার ভালোবাসা, কী অপূর্ব মমত্ববোধ। আর এ জন্যই আমরা জাতির পিতার জন্মদিনটিকে 'জাতীয় শিশু দিবস' হিসেবে পালন করি। বঙ্গবন্ধু ছিলেন পরশ পাথরের মতো। দীর্ঘ ৯ মাস ১৪ দিন কারাবাসের পর পাকিস্তানের জিন্দানখানা থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে '৭২-এর ১০ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সর্বকালের সর্ববৃহৎ ঐতিহাসিক গণমহাসমুদ্রে তিনি বলেছিলেন, 'সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি।' অশ্রুসিক্ত নয়নে উচ্চকিত হয়েছিলেন এই বলে যে, 'কবিগুরু, তুমি এসে দেখে যাও, তোমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে, তুমি ভুল প্রমাণিত হয়েছো, তোমার কথা আজ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে...।' বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে তার একটা তহবিল থাকত আমার কাছে। এই তহবিল থেকে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন জনকে সাহায্য-সহায়তা করতেন। এর মধ্যে দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও বিরোধী দলের প্রতিপক্ষীয় লোকজনও ছিলেন। কিন্তু শর্ত ছিল, যাদের অর্থ সাহায্য দেওয়া হচ্ছে তাদের নাম-ঠিকানা গোপন রাখতে হবে, প্রকাশ করা যাবে না। বঙ্গবন্ধু কখনোই মানুষের মনে আঘাত দিয়ে কথা বলতেন না। তার রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল মার্জিত, কখনোই রাজনৈতিক বক্তব্যে ব্যক্তিগত বিষয়কে প্রাধান্য দিতেন না। বঙ্গবন্ধুর সময়ানুবর্তিতা, নিয়মানুবর্তিতা ছিল অসাধারণ। সময়ের এক চুল হেরফের হতো না, ঘড়ি ধরে অনুষ্ঠানাদিতে যেতেন। দলের নেতাকর্মী সকলের প্রতি ছিল গভীর মমত্ববোধ। তাদের কাজের মর্যাদা দিতেন, ভালোবেসে বুকে টেনে নিতেন। অফুরন্ত প্রাণশক্তির অধিকারী বঙ্গবন্ধুর সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল অপরিসীম। এক মুহূর্তে মানুষকে আপন করে নেওয়ার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা ছিল তার। নীতির প্রশ্নে ছিলেন অটল। '৭৪-এ দলের কাউন্সিলে দলীয় পদ ত্যাগ করে সভাপতির পদটি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তদস্থলে আসীন হয়েছিলেন শ্রদ্ধাভাজন জননেতা শহীদ কামারুজ্জামান সাহেব। '৫৭তে করেছিলেন বিপরীত কাজটি অর্থাৎ মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দলীয় পদে বহাল করেছিলেন নিজেকে। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নিজস্ব অবস্থান কোথায় হওয়া উচিত সেটি যেমন বুঝতেন, তেমনিভাবে কে কোথায় যোগ্যতর আসনে অধিষ্ঠিত হবেন, তাকে সে জায়গাটিতে বসিয়ে দিতে ভুল করতেন না। বজ্রকণ্ঠের অধিকারী বঙ্গবন্ধু ছিলেন অতুলনীয় বাগ্মী। আর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল বক্তৃতায় বিভিন্ন কবির কবিতা থেকে উদ্ধৃতি চয়ন, যা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। যে জন্য তাকে অভিহিত করা হয়েছিল 'রাজনীতির কবি' হিসেবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গুণবাচক বৈশিষ্ট্যের কথা বলে শেষ করা যাবে না। আমার পরম সৌভাগ্য হয়েছিল ইতিহাসের এই মহামানবের একান্ত সান্নিধ্যে আসার। আমার জীবন ধন্য। বঙ্গবন্ধু ছিলেন পরশ পাথরের মতো।
আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, বাণিজ্যমন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
failahmed69@gmail.com

আমার চারপাশের জগৎ, আইন ও মানবতা by সালেহা চৌধুরী



আমি সমকালে গাছ নিয়ে কলাম লিখেছি। আজকের লেখাতেও গাছ আছে; তবে এখানে আছে গাছ নিয়ে আমার অভিজ্ঞতার গল্প। গাছ নিয়ে কিছু লিখতে যাওয়ার আগে আমার দীর্ঘদিনের লন্ডন জীবনের গাছ বিষয়ে দুটি কিংবা তিনটি গল্প না বলে পারছি না। আমাদের লন্ডনের বাড়ির পেছনে একটা বাগান আছে।
সেখানে ফুল ও সবজি ফলে। কিন্তু ঠিক তার পেছনে ছিল এক বিশাল সিকামোর গাছ। সিকামো এমন এক গাছ, যা প্রতিদিন এক ইঞ্চি বাড়ে, ঘন সবুজ পাতায় চারপাশ ছেয়ে ফেলে। প্রায় আকাশছোঁয়া গাছটা আমার পেছনের প্রতিবেশীর। সিকামোর গাছটা যেভাবে সূর্য আলোর পথ বন্ধ করে রাখে, মনে হয় না আমার বাড়ির বাগানে যতটা ফুল ফোটার কথা তা ফোটে, যতটা ফসল হওয়ার কথা তা হয়। তা ছাড়া সে এমন পাতাবৃষ্টি করে প্রায় দিনই সেগুলো ঝাড়ূ দিয়ে বিনে ফেলতে হয়। একেবারে অসহ্য অবস্থা। যেহেতু গাছটা আমার নয়, আমি কিছুই করতে পারি না। একবার জানতে পারি, আমার পেছনের সেই প্রতিবেশী সপরিবারে হলিডেতে গেছে। আমি সুযোগ বুঝে মই দিয়ে প্রথমে আমার বাগানের শেডের ছাদে উঠি। শেডের ছাদে উঠে ধারালো করাত দিয়ে যতগুলো পারি ডাল কেটে দেই। সিকামোর গাছটা বেশ নরম জাতের গাছ। আমার ডাল কাটতে তেমন অসুবিধা হয় না। এরপর সেগুলো কাউন্সিলে ফোন করে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে যখন মনে মনে হাসছি, একদিন আমার পেছনের সেই প্রতিবেশী এসে দরজায় বেল নাড়ে। কথোপকথন ইংরেজিতে, আমি বাংলায় লিখছি।
সাহস তো আপনার কম নয়, আমার গাছের ডাল কাটেন!
কী করব, আমার বাগান আপনার গাছের জন্য প্রাণশূন্য হয়ে উঠছে!
কিন্তু এটা আইনত অন্যায়।
না, অন্যায় নয়। কারণ যদি অন্য বাড়ির গাছ কারও বাগান শেষ করে, তার বাগানে সেই গাছের যতগুলো ডাল এসে পড়ে, তা কাটার অধিকার তার আছে।
আপনি ঠিক বলছেন না। আপনি আইন জানেন না।
জানি এবং কাটার অধিকার আমার আছে, সেটাও জানি।
আমি আপনাকে 'সু' করব। আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।
নেবেন। আমি নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলি।
লোকটা রাগে গরগর করতে করতে চলে যায়। আমি বসে আছি, কখন আমার কোর্টে যাওয়ার ডাক পড়ে। তিন সপ্তাহ চলে যায়। একদিন দেখি সেই প্রতিবেশী তার বাড়ির বেড়া খুলে আবার নতুন করে বেড়া বাঁধতে শুরু করেছে এবং গাছটাকে আমার বাড়ির সীমানায় দিয়ে দিয়েছে। আমি তো অবাক। এটা আবার কী হলো? গাছটা কি তিনি আমাদের দান করলেন? পরে জানি তিনি যখন তার বাড়ির মানচিত্র নিয়ে উকিলের কাছে গেছেন, উকিল নাকি দেখেশুনে বলেছেন, ও গাছ আসলে আমাদের। ভুল করে তার সীমানায় চলে গেছে। এখন নতুন করে বেড়া দিয়ে তিনি সেই ভুল শোধরালেন। পরে আমার বাড়ির দেয়ালে যখন ফাটল দেখা দেয়, গাছের সার্জন এনে পুরো গাছটাই আমাদের কাটতে হয়। এখন সেই কাটা গাছের গুঁড়িটার ওপর বসি। আমার বাগান ফুলে ফুলময়। সূর্যের আলো ঠেকায় কে? পাঁচ রঙের গোলাপে পরিপূর্ণ বাগান। গোলাপ গাছ মাত্র ১৩টি। ফুল হয় অনেক। এরপরের গল্প এমন। আমাদের বাড়ির সামনে ছিল একটা লাল পাতার গাছ। আমাদের ও পাশের বাড়ির দেয়ালে ফাটল দেখা যায়। ইন্স্যুরেন্সের লোক এসে বলে গাছটা কেটে ফেলতে। কারণ গাছের দীর্ঘ শিকড় মাটি থেকে রস টেনে এমন কাণ্ড করেছে। এসব গাছ কাটে কাউন্সিল। এটা আমাদের গাছ নয়, সরকারি। যখন কাউন্সিলকে লেখা হয় ওরা বলে, এটা আমাদের কাজ নয়, আপনি ডিপার্টমেন্ট অব এনভায়রনমেন্টকে লিখুন। ওরা তখন জানায়, এটা তাদের কাজও নয়। লেখে- আপনি সোসাল সিকিউরিটি বিভাগকে লেখেন। আসলে পৃথিবীর সব সিভিল সার্ভিসই একরকম। আঠারো মাসে বছর। আমরা যখন চিঠি চালাচালিতে ব্যস্ত হঠাৎ এক ভয়ানক ঝড় হয়। সকালবেলা দেখি গাছটা শিকড়সুদ্ধ মাটিতে পড়ে আছে। পাশের বাসার গোয়েন আর আমার আনন্দ দেখে কে? ও খুব ধর্মভীরু মেয়ে বলে- আটলাস্ট গড হাজ ডান ইট। পরে আমাদের দু'জনের বাড়িতেই 'আন্ডারপিনিং' করতে হয়। মানে পুরো বাড়ির ফাউন্ডেশন বদলাতে হয়। এখন আমাদের দু'জনের বাড়িতে আর কোনো ফাটল নেই। এই বড় ঝড়ে একটা গাছ উপড়ে পড়েছিল আরও অনেক গাছের সঙ্গে। সেই প্রিয় গাছটি আমার বাড়ির কাছে গ্রিনিচ পার্কে ছিল। ১৪৫০-৬০-এর দিকে অষ্টম হেনরির স্ত্রী অ্যান বোলিন সেই গাছের নিচে বসে পিকনিক করতেন। পরে তাকে অষ্টম হেনরি সন্দেহ করে মুণ্ডু কেটে ফেলেন। তার একমাত্র মেয়ে ভবিষ্যতের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ছোটবেলায় এই গাছ ঘিরে নাচত। পাঁচশ' বছর আগের সেই গাছকে ঘিরে রেখেছিল একটা বন্য আইভির ঝাড়। সেই আইভির গাছটা এই পুরনো গাছের প্রাণ হয়ে তাকে রক্ষা করছিল। কিন্তু ১৯৮৪ সালের সেই ভয়ঙ্কর ঝড়ে অনেক গাছ পড়ে যায়। মন খারাপ হয়েছিল একটা পাঁচশ' বছরের পুরনো গাছের মৃত্যুতে। মন খারাপ হয়েছিল বন্য আইভির সেই দুরন্ত ঝাড় সাপের ফণার মতো বাতাসে দুলে এক ভাগ্যহত রানীর কথা বারবার মনে করিয়ে দিত তাকে আর দেখব না বলে। সেই সময় কিউ গার্ডেন নামের লন্ডনের বোটানিক্যাল গার্ডেনের অনেক দুর্লভ গাছ শিকড় উপড়ে মাটিতে পড়ে। আমার বাড়িতে কোনো বিশেষ অতিথি এলে আমি তাদের আমার বাড়ির আশপাশে নিয়ে যাই। শওকত আলী যখন লন্ডনে গিয়ে আমাদের বাড়িতে অতিথি হয়ে আসেন, আমি তাকে বাড়ির আশপাশে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলাম। তার পছন্দ হয় সেসব দিগন্ত ছোঁয়া মাঠ আর গাছ। সবুজ মেডো, শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ আর নির্জনতা। ওখান দিয়ে হাঁটতে গেলে অনেক কবিতা মনে পড়ে যায়। ওয়াশিংটন ডি সিতে ইংরেজি কবিতা প্রতিযোগিতায় যে কবিতা আমাকে 'রানার্স আপ' পুরস্কার এনে দেয়, সেটাও ওখানে প্রথম মাথায় এসেছিল। কবিতাটির নাম 'মোমেন্ট অব ক্রিয়েশন'। শওকত আলী যেই বেঞ্চটাতে কিছুক্ষণের জন্য বসেছিলেন, সেখানে সাঈদ ভাইকেও (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ) বসতে বলেছিলাম। তিনিও কিছুক্ষণের জন্য বসেছিলেন এবং সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল ও আরও অনেকে। শওকত ভাই আমাকে গাছেদের নাম মুখস্থ করতে বলেছিলেন। গাছ চিনতে বলেছিলেন। ওক, বার্চ, সিলভার বার্চ, পপলার, সিকামোর, উইলো, টিক, বক্স, পাইন এমন কিছু গাছ আমি ছাড়াও আরও কিছু গাছ জেনেছিলাম। সিলভার বার্চের কাণ্ড সাদা। তাই ও সিলভার বার্চ। আমার একটি বিশেষ প্রিয় গাছ আছে। নাম তার উইপিং উইলো। যে গাছ হ্রদ বা নদীর পাশে জন্মে। ক্রন্দসী নারীর মতো সে ঝুঁকে থাকে জলের দিকে। তাই ওকে সবাই বলে 'উইপিং উইলো'। মাও সে তুং একটি কবিতায় এই উইপিং উইলোর কথা বলেছেন- 'তুমি আমার উইপিং উইলো আর আমি তোমার প্রাউড পপলার। মাও সে তুংও এমন কবিতা লেখেন? সত্যি এই পৃথিবীতে কতই না অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে। রাস্তার পাশের গাছগুলোকে বছরে একবার ট্রিমিং করা হয়। শীতে পত্রশূন্য আর বসন্তে জেগে ওঠা। আমার বাড়ির কাছে আছে এক সাদা চেরি ফুলের গাছ। এক বসন্তে সেই গাছের তলা দিয়ে ছুটছিলাম একটা দরকারি ওষুধ আনতে। চেরির বৈভবীরূপে বেশ কিছুক্ষণ সেই গাছের তলায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। হাইড পার্কের মচমচে পাতার ওপর দিয়ে শরতে যে হেঁটে গেছে, সে কখনও তার সেই ঘটনার কথা ভুলে যেতে পারবে না। এবার গাছ সম্বন্ধে কিছু প্রয়োজনীয় কথা :আমাদের পৃথিবীর ভারসাম্য বজায় রাখতে গাছের প্রয়োজন অনেক। প্রতিদিন যে পরিমাণ গাছ কেটে ফেলা হয়, সে পরিমাণ লাগানো হয় না। প্রতি বছর ১৩ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি কেটে ফেলা হয়। যে জায়গার পরিমাণ গ্রিস দেশের সমান। বাংলাদেশের গাছ কেটে ফেলা হয় নির্মমভাবে। শালবন, সুন্দরবন সবকিছু শেষ হতে চলেছে। গাছের কারণে আমাদের পৃথিবীতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ কমতে থাকে। এই সিও-২-কে গ্রিনহাউস গ্যাসও বলা হয়। প্রতিদিন যে পরিমাণ গাছ কাটা হয়, হয়তো একদিন পৃথিবী গাছশূন্য হয়ে যাবে। তখন? পৃথিবীর ধ্বংস অনিবার্য।
ব্রিটেন এ কথা জানে। তারা নিয়মিত গাছ লাগায়। তবু সেখানে গাছের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। এই পৃথিবীর ৩০ ভাগ বনভূমির দেশ হলো- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়া, ব্রাজিল, চীন, অস্ট্রেলিয়া, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ইন্দোনেশিয়া, পেরু ও ভারত। এই পৃথিবীর ৩০ ভাগ জায়গা বনভূমিতে ঢাকা। আমাদের উচিত যেখানে যতটুকু খালি জায়গা আছে গাছ লাগানো। বাড়ির সামনে-পেছনে, ছাদে-ব্যালকনিতে। কত সব গাছ আছে যা থেকে দামি ওষুধও পাওয়া যায়। উইলো থেকে আসপিরিন। অর্জুন থেকে হার্টের ওষুধ। আর্নিকা গাছ থেকে ভাঙাচোরা মেরামতির ওষুধ। আরও কত কি। আমার বাড়িতে এই গাছের গুণাগুণের একটি বিশাল কলেবর বই আছে। পড়তে পড়তে অবাক হয়ে ভাবি, এই পৃথিবীতে কেবল গাছই তো মানুষের সব অসুখ সারাতে পারে। রেন ফরেস্ট এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অরণ্য। যার পরিমাণ ২.৫ মিলিয়ন স্কয়ার মাইল। একে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস। কারণ আমাজনের রেন ফরেস্ট এই পৃথিবীতে যত অক্সিজেন প্রয়োজন, তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ সরবরাহ করে। গাছ অক্সিজেন দেয়। টেনে নেয় পৃথিবীর ক্ষতিকারক গ্যাস কার্বন ডাই-অক্সাইড। এই কার্বন যত বাড়বে পৃথিবী তত বেশি ভয়াবহ জায়গা হয়ে উঠবে। এবার একটা গাছ কতটা কার্বন টেনে নেয় নিজের শরীরে বা ধরে রাখে, তার একটা হিসাব। একশ' বছরে একটা গাছ দুই টন কার্বন ডাই-অক্সাইড টেনে নেয়। ৫০ বছরে টেনে নেয় এক টন কার্বন। ২৫ বছরে টানে .৫ কার্বন ডাই-অক্সাইড। দশ বছরে টেনে নেয় ০.২ টন কার্বন এবং পাঁচ বছরে টেনে নেয় ০.১ টন কার্বন। গাছের নিচ দিয়ে হাঁটতে গেলে শরীর জুড়িয়ে যায় কেন আমাদের? ওরা আর কিছু নয়, কেবল আমাদের জন্য বিতরণ করে অক্সিজেন আর সবুজ আশ্বাস। এই গাছের ভবিষ্যৎ নিয়ে ২০০২-এর সেপ্টেম্বর মাসে একটা বড় কনফারেন্স হয় জোহানেসবার্গে। যাকে বলা যেতে পারে 'ওয়ার্ল্ড সামিট'। সেখানে প্রধান বিষয় ছিল- সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ফরেস্ট। গাছ যেভাবে শেষ হতে চলেছে সে নিয়ে শঙ্কিত প্রায় পৃথিবীর সব দেশের মানুষ। এই সমস্যার সমাধান না হলে আমাদের ভবিষ্যৎ কার্বনময়। প্রথমে যেমন গল্প দিয়ে শুরু করেছিলাম, তেমন একটা গল্প দিয়ে আমার রচনা শেষ করি। আমার স্বামী তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী লন্ডনের 'হারি নীল লিমিটেডের' সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। একবার চার্চ কমিশন বিল্ডিং বানাতে গিয়ে তাদের কাজ একটা গাছের কারণে বেশ কিছুদিন বন্ধ ছিল। কারণ কী? কারণ সেখানে একটা পাখি বেশ কতগুলো ডিম পেড়ে সেখানে তা দিতে শুরু করেছে। ফলে গাছ কাটা বন্ধ। তারপর যখন ডিম ফুটে বাচ্চা বেরোয়, সেগুলো একসময় আকাশে উড়তে শেখে, তখন গাছ কেটে কাজ শুরু করা হয়। ক্ষতির পরিমাণ প্রায় একশ' হাজার পাউন্ড। কেবল একটা গাছ আর কয়েকটা পাখি? মনে হয় পৃথিবীতে এখনও কোথায় মানবতার চাষ হয়।
ব্রিটেন প্রবাসী কথাসাহিত্যিক

আমাদের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে যেতে হবে

মঙ্গলবার ডিবিসি টেলিভিশনের রাজকাহন অনুষ্ঠানে খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান ও ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পথে বাংলাদেশের সামনে কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সে বিষয়ে আলোচনা করেন। এখানে ঈষৎ সংক্ষিপ্ত আকারে তা প্রকাশ হলো। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালন করেন নবনীতা চৌধুরী
ডিবিসি :সব ঠিক থাকলে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল হওয়ার পথে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো কী? বাংলাদেশেরই-বা সে প্রস্তুতি রয়েছে কি-না?
অধ্যাপক রেহমান সোবহান : প্রথমত, এটা টেকনিক্যাল ব্যাপার। এখানে একসাইটেড হওয়ার খুব প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের একটা টার্গেট থাকতে হবে। এখানে কেবল আয়ের (মাথাপিছু) ব্যাপার থাকবে না। আমাদের ট্রান্সফরমেশন ইকোনমি নিয়ে আসতে হবে। দেশি-বিদেশি নতুন বিনিয়োগ নিয়ে আসতে হবে। দেশীয় বিনিয়োগ কিছু হচ্ছে; কিন্তু সেগুলো খুব নির্দিষ্ট (খাতে) হয়ে যাচ্ছে, যেমন গার্মেন্ট শিল্প। আমাদের যেহেতু উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে যেতে হবে, সেহেতু বিনিয়োগের প্রসারণ দরকার। যেমন করেছে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, চীন। এখন ভিয়েতনাম এ পথে যাচ্ছে। মূল বিষয়টি হলো অর্থনীতির বৈচিত্র্যকরণ। সে প্রক্রিয়া এখানে পুরোপুরি শুরু হয়নি। এ ক্ষেত্রে বিশ্নেষণের ব্যাপার যে, সীমিত বৈদেশিক বিনিয়োগ কেন আসছে। এখানে সুশাসনের কথা প্রথমেই আসবে। তারপর ব্যাংক ব্যবস্থাপনা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও যথাযথ প্রকল্প সম্পাদন ইত্যাদি।
ডিবিসি :সেগুলোর সঙ্গে তো বিনিয়োগের সম্পর্ক রয়েছে। মানে প্রকল্পে দক্ষতা বাড়ানো...
রেহমান সোবহান :হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। এখন তো প্রকল্পে অত্যধিক খরচ করতে হয়। দেশে একটা রাস্তা তৈরি করতে খরচ বেশি হচ্ছে। আমরা যদি সর্বাধিক সুফল পেতে চাই, সেখানে দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। আমরা ইনভেস্টমেন্টের দিকে যাচ্ছি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হচ্ছে বটে; কিন্তু সেখানেও আমাদের রিসোর্সেস ও ইফিসিয়েন্সি বড় চ্যালেঞ্জ।
ডিবিসি :সিপিডি বলছে, সরকারকে নানা ধরনের স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বসে কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। আসলে সমন্বিত কৌশলটা কী? আমরা তো শুনি, কোন বছর কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, কত বিনিয়োগ আসবে- সে পরিসংখ্যান সরকার তো দিচ্ছে। এখানে নতুন কৌশলের প্রয়োজন কী?
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য :নতুন পরিস্থিতিতে নতুন কৌশলের প্রয়োজন পড়ে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য। আমরা যদি স্বল্পোন্নত দেশের সারি থেকে বের হই, নতুন পরিস্থিতির বিষয়ে বিবেচনা থেকেই নতুন কৌশলের কথা এসেছে। তার সঙ্গে বিদ্যমান কৌশল সামঞ্জস্য কি-না সেটাও বিবেচনা করে দেখতে হবে। আপনি উপস্থাপনায় মধ্যম আয়ের দেশের কথা বলেছেন, সে বিষয়ে কিছু বলা প্রয়োজন। আসলে আমাদের দেশ ২০১৫ সালেই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়ে গেছে। আমাদের অনেক মন্ত্রী-এমপি বলেন, ২০২১ সালে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবো- এটা ভ্রান্ত কথা। আসলে ২০২১ আমাদের মনের ভেতরে সুদৃঢ়ভাবে গেঁথে গেছে। তার আগেও যে আমরা করে ফেলতে পারি, এটা বোধ হয় তাদের বিবেচনায় নেই। আবার অনেকে বলেন, স্বল্পোন্নত থেকে আমরা ২০২১ সালে বেরোব- এটাও ঠিক নয়। স্বল্পোন্নত থেকে আমরা ২০২৪ সালে বেরোব। যা হোক, নতুন পরিস্থিতিটা কী। প্রথম কথা হলো, এটা থেকে বেরোলে আমাদের লাভটা কী হবে? লাভ হবে, বাংলাদেশ যে একটা বিকাশমান অর্থনীতি এবং সেটা যে তুলনীয় দেশের তুলনায় দ্রুততর হচ্ছে, সেখানে একটা আস্থার জায়গা সৃষ্টি হবে। ফলে বিদেশি যারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চায়, তাদের জন্য এটা ইতিবাচক সার্টিফিকেট বা আস্থার জায়গা সৃষ্টি হলো। এখন কথা হলো, এটাকে কীভাবে ব্যবহার করে আমরা বাস্তবে সুফল নিয়ে আসব। একটা দিক যে, হয়তো এটার ফলে আমরা শুল্ক্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারাব। যদি তা হারাই, সে ক্ষেত্রে রেহমান সোবহান যেটা বলেছেন, একটিমাত্র পণ্যের ওপর যে আমরা নির্ভরশীল- তাহলে পণ্যের বহুবিধকরণ লাগবে। বাজারের এক্সপানশন লাগবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার বা অন্য কোনো নতুন বাজারে প্রবেশের বিষয় আসবে। চীনের বাজারে বড়ভাবে যাওয়া, ভারতের বাজারে বড়ভাবে যাওয়ার বিষয় আসবে। যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন জিএসটি প্লাস। আমাদের প্লাসের ভেতরে ঢুকতে হলে আরও কিছু কাজ করতে হবে। আমাদের শ্রমিকের অধিকার দিতে হবে। মানবাধিকার লঙ্ঘন করা যাবে না ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের আগের চেয়েও অনেক বেশি সচেতন ও সৎ হতে হবে।
ডিবিসি :বাজার সুবিধা তো আমরা ২০২৪ পর্যন্ত পাব...।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য :২০২৪ নয়, ২০২৭ সাল পর্যন্ত। সে পর্যন্ত আমাদের বড় ধরনের ধাক্কা না-ও হতে পারে। আরেকটি বিষয় হলো, এখন আমরা যেভাবে অনুদান পাই, যেটা ফেরত দিতে হয় না। আমরা কীভাবে ঋণ পাই, সেটা দেখতে হবে। তখন আমাদের বিকল্প খুঁজতে হবে। চীন যেমন এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের বাইরে অবকাঠামোগত ব্যাংক তৈরি করেছে, সেখান থেকে কীভাবে ঋণ আনা যায়।
ডিবিসি : আমি রেহমান সোবহানের কাছে যাই। আপনাদের আলোচনাতে বারবার এ আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন যে, অনেকেই এ সার্টিফিকেট পেয়েছে, এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটিয়েছে। তারপর আর এগোতে পারেনি। সে বিপদটা কোন কোন দেশে হয়েছে এবং আটকে যাওয়ার বিপদগুলো কী?
রেহমান সোবহান :আটকে যাওয়ার অনেক বিষয় আছে। যারা এ অবস্থা পার হয়ে গেছে, তাদের দেখা দরকার। যেমন ভিয়েতনাম। তারা ডাইভারসিফাইড হয়েছে। এখন বাংলাদেশ তো ভাবছে, আমাদের ব্যাপক পরিচিতি আছে। রফতানি হচ্ছে, উন্নয়ন হচ্ছে। কিন্তু ভিয়েতনাম জনসংখ্যায় ছোট, জিডিপিতে ছোট। তাদের এক্সপোর্ট এখন দুইশ' বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এটা কেন হয়েছে? কারণ তারা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে গেছে। এমনকি তাদেরও পোশাক শিল্প রয়েছে। তারা দশ জায়গায় কম্পিট করছে। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করছে। ট্রাম্পের নীতি তাদের কোনো বাধা হয় কি-না সেটা দেখতে হবে। মূল বিষয় হলো, তারা ম্যানেজ করেছে। আমাদের চ্যালেঞ্জ এখানেই চলে আসে। এখন তো আমাদের হাতে প্রায় দশ বছর আছে। এই সময়ের মধ্যে কেমন করে একটা পলিসি নিতে হবে, কেমন করে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে- তা নিয়ে ভাবতে হবে।
ডিবিসি :আপনারা বলছেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতিটা ইউনিক। এখানে ছোট দেশে অনেক জনসংখ্যা, আমাদের চ্যালেঞ্জও অন্যরকম...।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য :হ্যাঁ, আমাদের চ্যালেঞ্জ ভিন্ন, এর প্রকাশ ও মাত্রায় ভিন্নতা রয়েছে। কেন এ প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে বারবার যে, আমরা স্বল্পোন্নত থেকে বেরোচ্ছি; কিন্তু উল্লাস না করে সতর্কতা কেন। যদিও আমরা একটা সার্টিফিকেট পাচ্ছি; কিন্তু অর্থনীতির বিচারে সেটা যে খুব শক্তিশালী সূচক, তা নয়। যেটা রেহমান সোবহানও বলেছেন। শক্তিশালী সূচক হলো, যদি অর্থনীতির ভেতরে উৎপাদনশীল খাতের প্রভাবটা বাড়ে। আপনার প্রক্রিয়াকরণ খাত ছোট, অবকাঠামোর সমস্যা রয়েছে, কৃষি শিল্পায়িত হয়নি। কম বিনিয়োগে অধিক উৎপাদনশীলতার বিষয়টিতে তেমন মনোযোগ নেই। যাতে তারা কম শ্রমে বেশি মজুরি পায়। আমরা বলি, স্বল্পোন্নত থেকে বের হওয়াটাই ফিনিশিং লাইন নয় বরং এটি একটি মাইলফলক। ফিনিশিং লাইনে পৌঁছাতে হলে আপনার অর্থনীতির রূপান্তর ঘটাতে হবে। সেই রূপান্তর ঘটানো ও চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা- এগুলো একসঙ্গে করার জন্য কৌশল প্রয়োজন। বাংলাদেশে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা আছে। কিন্তু এ পরিকল্পনা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হওয়ার টার্গেট নিয়ে করা হয়নি। এর মধ্যে আসছে এসডিজি। এগুলো কোনটা বৈশ্বিক পরিকল্পনার সঙ্গে যায়, কোনটাকে অগ্রাধিকার দেব- সে নীতিমালা নেই। আমরা সে গতিশীলতা তৈরি করতে পারব কি-না সে কথাই বলা হচ্ছে। আমরা উল্লাস করছি ঠিক, উল্লাসের সঙ্গে আমাদের যে দায়িত্ব এসে পড়েছে, সে ব্যাপারে সচেতনতা নেই।
ডিবিসি :এই যে মধ্যম আয়, নিম্নমধ্যম আয়, উন্নত, উন্নয়নশীল ও নানা সূচক ইত্যাদি পরিভাষায় বাস্তব উন্নয়নের চিত্র উঠে আসে কি-না?
রেহমান সোবহান :দেখা গেল কোনো দেশ শুধু পর্যটনের ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে গেল। কিংবা একটি দেশে ডায়মন্ড থেকেই ৫০ শতাংশ জিডিপি আসছে। ভুটান ইলেকট্রিক দ্রব্য দিয়ে এগোচ্ছে। বাংলাদেশ যেখানে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের ছোট্ট টি-শার্ট ও তার ডাইভারসিটি যেখানে বিশ্বকে মাত করছে, সেখানে দেশটির নিশ্চয়ই আরও সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের গ্রামের নারী শহরে এসে ফ্যাক্টরিতে কাজ করছে, সেখানেও তো শ্রমের একটা রূপান্তর হচ্ছে। তার শ্রম দিয়েই যে আমরা বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছি, সেটা আমাদের বুঝতে হবে। উদ্যোক্তারা আছে। আবার কেবল বড় ফ্যাক্টরিই নয়, ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে, শহরে-গ্রামে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঙালিরা কাজ করছে, যেটা অনেক দেশের নেই। আমাদের এত মেধা আছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। জনসংখ্যার কথা আসছে। আসলে জনসংখ্যা আমাদের শক্তি। যে দেশে ১৬ কোটি মানুষ আছে, সেটা তো একটা বাজার। এই বাজার এক্সপানশনের বিষয় আছে। যদি আমি বুঝতে পারি, এই প্রোডাক্টের প্রয়োজন আছে, সে প্রোডাক্ট উৎপাদনের বিষয় আছে। বাজার বাড়বে, আয় বাড়বে। আমার মনে আছে, প্রায় ২০ বছর আগে দক্ষিণ কোরিয়া ছিলাম। ওই সময় একজন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, ভবিষ্যতে শক্তিশালী দেশ হবে চীন। কারণ তার বড় বাজার আছে। আমার জনসংখ্যা বেশি, সে জন্য জনসংখ্যা রফতানির বিষয় আছে। যখন বিশ্বে সমস্যা দেখা দেয়, তখন আমরাও সমস্যাগ্রস্ত হই। কিন্তু চীনের অভ্যন্তরীণ বাজার আছে, ভোক্তা আছে, তার তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু এমনিতেই জনসংখ্যা সম্পদ হবে না।
ডিবিসি :তাহলে বছরের পর বছর ধরে যা নিয়ে কথা হচ্ছে, ব্যাপারটা কি এ রকম যে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হবে, গ্যাস দেব, বিদ্যুৎ দেব, বিনিয়োগ হবে, তারপর উন্নয়ন হবে- ব্যাপারটা কি সে রকম?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য :আসলে কোনো সূচকই কিন্তু বাস্তবতাকে ধরতে পারে না, ধারণ করে না। একেকটা সূচকের একেক ধরনের গুণাবলি রয়েছে। যেমন ধরুন- আমরা বলছি, আমাদের উত্তরণ হবে; কিন্তু এখানে তো বৈষম্যের হিসাব নেই। দেশে যে আয়বৈষম্য বাড়ছে, সেটার হিসাব এর ভেতর নেই। যিনি বৈষম্যের শিকার তিনি হয়তো বলবেন, কই- আমি তো কিছু পেলাম না। আবার এর মধ্যে জিনিসপত্রের দামের হিসাব নেই। আমরা যে উত্তরণের কথা বলছি, নিশ্চয়ই কেউ না কেউ বলবে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, কিসের উত্তরণ হচ্ছে? এ জন্য অর্থনীতিবিদরা এক হাতে কথা বলেন না। দুই হাতে কথা বলেন।
ডিবিসি :একজন দর্শক বলছেন, রফতানির কথা বেশি না ভেবে যদি আমরা আমদানি পণ্য দেশে উৎপাদন করি?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য :খুবই সুন্দর কথা, এটা নিঃসন্দেহে ভালো। আরেকটা কথা, অবকাঠামো খাতে বিদেশি বিনিয়োগ থাকলেও বড় কলকারখানায় উৎপাদনশীল খাতে তা কম। যেসব দেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়েছে, তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ কারও নীতিকথায় আসে না। তারা দেশের স্থিতিশীলতা দেখে, একটা দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ দেখতে চায়, সুশাসন দেখতে চায়, মানবাধিকার দেখতে চায়, গণতান্ত্রিক স্থায়িত্ব দেখতে চায়।
ডিবিসি :ড. রেহমান সোবহান, আপনাদের সিপিডির আলোচনায় বলেছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন কিংবা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুশাসন- এই বিষয়গুলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে দর্শকদের সম্পূরক প্রশ্ন, দুর্নীতি, ব্যাংক লুট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অনিয়ম ইত্যাদির মধ্যেও দেশ কীভাবে এগিয়ে যাচ্ছে?
রেহমান সোবহান :আসলে আমাদের দেশে প্রত্যেকটি ব্যক্তি কাজ করে, এ জন্য এগিয়ে যাচ্ছে। এটা আমার শক্তিশালী বাংলাদেশের একটি সুবিধা। আমাদের উদ্যোক্তা, শ্রমিক, নারী, ক্ষুদ্রঋণ, তারপর প্রবাসী সবাই তো কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের আশপাশে যা হচ্ছে, মানে অনিয়ম ইত্যাদি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
ডিবিসি :আপনি বলেছেন- কোরিয়া, চীন, তাইওয়ান প্রভৃতি দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তারা যে খুব গণতান্ত্রিক তা তো নয়। তাহলে এখানে গণতন্ত্র এত প্রয়োজন কেন?
রেহমান সোবহান :না, এখানে দুই ক্যাটাগরির দেশ। চীন ও ভিয়েতনামের অন্য ইতিহাস। তাদের ওয়ান পার্টি স্টেট। কমিউনিস্ট পার্টির অনেক সমস্যা আছে, তারপরও একটা বিষয় রয়েছে, তারা সবকিছু একটা ডিসিপ্লিনে রাখতে পারছে। কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়ায় এখন গণতন্ত্র শক্তিশালী। তার চেয়ে বড় কথা, এসব দেশে আইনের শাসন। তাদের ইতিহাস একরকম। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস তো অন্য। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশ স্বাধীন হয়েছে। বঙ্গবন্ধু তো গণতন্ত্রের জন্যই লাইম-লাইটে ছিলেন। আমাদের ডিএনএর মধ্যে রয়েছে গণতন্ত্র। এই ডিএনএর মধ্যে অন্য দেশের একটা প্রক্রিয়া এখানে চলবে না। তাতে আরও নানা রকম সংকট দেখা দেবে।
ডিবিসি :ড. দেবপ্রিয়, আপনি অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন। বাংলাদেশের সুশাসন. রাজনীতি ইত্যাদিও ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন কি-না?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য :আমি একটু আগের প্রশ্নে আসি। এত দুর্নীতি, এত স্বজনপ্রীতি, মেধার প্রতি বৈষম্য. লুটপাট ইত্যাদি যদি না থাকত, তাহলে চিন্তা করেন আমরা কোথায় চলে যেতাম? তাহলে আমরা ৫-৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করছি, আরও হয়তো ২ শতাংশ অর্জন সম্ভব ছিল কিংবা আজ যেটা করছি, সেটা ১০ বছরের আগেই করতে পারতাম। আরেকটা বিষয় হলো- এগুলো যেসব দেশে ঘটে, সেখানে যেভাবে উদ্যোক্তা শ্রেণিরা এগোয় বা সাধারণ মানুষ এগোয়, সেটা তারা এক ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা করে এগোয়। একে ইংরেজিতে বলে পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট। এর মাধ্যমে সে একটা জিনিস অর্জন করে, দুইটা ছেড়ে দেয়। কোন জিনিসটা ছেড়ে দেব, তা সে নির্দিষ্ট করে। হয়তো সে বাকস্বাধীনতা ছেড়ে দিচ্ছে, ছেলেমেয়ের শিক্ষা নিচ্ছে। কিন্তু একটা সময় আসতে পারে, যখন সে দেখবে, সে যে গুণমানসম্পন্ন শিক্ষা চাচ্ছে; তার বাকস্বাধীনতা নেই বলে সে মান পাচ্ছে না। তখন কিন্তু সামাজিক সমঝোতা না হয়ে গণবিস্ম্ফোরণ হয়। এটাই মধ্যবিত্ত শ্রেণির ইতিহাস। বাংলাদেশে আপনি পেছনে ফিরে দেখেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস তো এটাই, একাত্তর কিংবা ঊনসত্তরের ইতিহাসও এটি।
ডিবিসি :আপনারা কেবল ব্যক্তি উদ্যোগের কথা বললেন। রাজনৈতিক উদ্যোগও তো আছে। যেমন এ সরকারের ভিশন ২০২১। তারা এর মধ্যে অনেক কিছু অর্জন করতে চায়। এ রকম রাজনৈতিক উদ্যোগ ব্যক্তি উদ্যোগের প্রেরণা কি-না?
রেহমান সোবহান :বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ভিশনারি, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু সে ভিশন পূর্ণ করতে সব জায়গায়ই সায় লাগে। ভিশনই যথেষ্ট নয়। তার সঙ্গে দল, প্রশাসন, রাজনীতি, অর্থনৈতিক অবস্থা সবকিছুতেই সে ভিশনের বাস্তবায়নের বিষয় থাকতে হবে। আমাদের অভাব এখানেই।
ডিবিসি :রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সরকারের ধারাবাহিকতা কি-না? বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে তো অনেক কিছুই বদলে যায়?
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য :বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা মানেই একই সরকার নয়। একই সরকার নির্বাচিত হয়ে এলেও সে নতুন সরকার তৈরি করে। স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন- এগুলো এখন একসূত্রে গ্রথিত। যদি এগুলো না থাকে, তাহলে আরও বেশি অসুবিধা হচ্ছে। বিশ্ব এখন অনেক বেশি বৈরী হয়ে যাচ্ছে। ওই বৈরিতা আটকাতে হলে দেশের ভেতর স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক সমঝোতা যাতে না ভেঙে পড়ে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ।

'গণতান্ত্রিক একনায়কে'র যুগে বিশ্ব! by তপন মাহমুদ

ইতিহাসে 'আদিম সাম্যবাদ' বলে একটা বস্তুর হদিস পাওয়া যায়। বলতে গেলে সেটা প্রাগৈতিহাসিক আমলের কথা। তার পর নীলের পানি ভারত মহাসাগর পর্যন্ত গড়াল। কত ইতিহাস হলো! বিশ্বে গণতন্ত্র এলো। সেও তো অনেক আগের কথা। গ্রিসে নগর রাষ্ট্র উদ্ভবের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল। এরই মধ্যে দুনিয়া রাজা-বাদশাহদের যুগও দেখেছে একসঙ্গে। দেখেছে সুলতানি আমল। আর এ সময়ে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি ছিল ধর্ম। দুনিয়া সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পুঁজিবাদ পর্বে ঢুকল। নতুন ভাবনা নিয়ে সমাজতন্ত্র এলো। সফল হলো, ব্যর্থ হলো। পরবর্তীকালে বিশ্ববাসী ফ্যাসিবাদ নামে একটি ধারণার সঙ্গেও পরিচিত হলো। অল্প সময়ের ব্যবধানে দু'দুটি বিশ্বযুদ্ধের মুখোমুখি হলো দুনিয়া। এর পর শুরু হলো স্নায়ুযুদ্ধের আমল। ইতিহাসের এমন ধারাবাহিকতায়, নব্বই দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর অবসান হলো দুই মেরুর বিশ্বের। একক নেতা হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হলো আমেরিকা। দুনিয়াজুড়ে রফতানি হতে থাকল আমেরিকান বা পশ্চিমা মডেলের গণতন্ত্র। এই একই সময়ে স্বৈরতন্ত্রের খোলস বদলে বাংলাদেশও ঢুকল গণতন্ত্রের যুগে। এর মধ্যে হঠাৎ বিশ্ব-রাজনীতির একক আধিপত্য কমতে শুরু করল। বিশ্বশক্তি হিসেবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মাথা ঢুকাল চীন ও রাশিয়া।
অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রযুক্তির উন্নয়নে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বিশ্ব-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল ভারত, ব্রাজিল, জাপানের মতো রাষ্ট্র। শুধু বাংলাদেশেই না; নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে দুনিয়াজুড়ে গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা বাড়তে থাকল। এদিক দিয়ে অবশ্য অনেক আগে থেকেই এগিয়ে ছিল ইউরোপ। তারা এক রকম গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটাতে পেরেছিল। এর সঙ্গে এই মহাদেশের রাষ্ট্রগুলো একটা ইউনিয়ন করে সেখানেও গণতন্ত্রের চর্চা শুরু করল। বর্ণবাদী যুগের অবসান ঘটিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাতেও শুরু হলো গণতন্ত্রের নবযাত্রা। ভারতে কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান হতে থাকল। বিজেপিসহ আঞ্চলিক দলগুলোর গুরুত্ব বাড়তে থাকল। যদিও এর মধ্যে বহাল তবিয়তে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে টিকে থাকল বাদশাহ-আমিরদের শাসন। আরব বসন্ত একটা গণতান্ত্রিক ধাক্কা দিলেও শেষ পর্যন্ত খুব একটা বদলাল না আরব দুনিয়া। বাদশাহি শাসন নিয়ে টিকে আছে সৌদি আরবসহ অনেক রাষ্ট্র। আর এর বাইরে হাতেগোনা কমিউনিস্টশাসিত একদলীয় রাষ্ট্রগুলো। কিউবার সমাজতন্ত্র নিয়ে আলাপ করার মতো কিছু উপাদান থাকলেও চীনকে বলা যায় 'সমাজতন্ত্রের কাপড়ে মোড়ানো পুঁজিবাদী রাষ্ট্র'। আর উত্তর কোরিয়া হলো এমন এক রহস্যময় দেশ, যেখান থেকে ধেয়ে আসা মিসাইল ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না, জানা যায় না। মোটামুটি দীর্ঘ অবতরণিকা বাদ দিয়ে এবার আসল গল্পে আসা যাক। অনেক তন্ত্রমন্ত্রের মধ্যে গণতন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা দুনিয়াজুড়ে যে সবচেয়ে বেশি, তা নিয়ে খুব কম জনেরই সন্দেহ আছে। কিন্তু হালের বিপদ হলো, দুনিয়াজুড়ে গণতন্ত্রের নামেই শুরু হয়েছে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা। দলের ভেতরে বাড়ছে একক ব্যক্তির প্রভাব; খর্ব হচ্ছে সবার সমান ক্ষমতা ও অংশগ্রহণ। সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তার ক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদি ও একচ্ছত্র করতে শাসনতন্ত্র বদলেছেন। দুই দফার বেশি প্রেসিডেন্ট না থাকার বিধান বাতিল করেছে দেশটির ক্ষমতাসীন দল। ফলে চীনে একদলীয় শাসনে ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রটুকুও শেষ হয়ে গেল। দলের থেকে বড় হয়ে গেল ব্যক্তি। আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে প্রায় একই ঘটনা ঘটছে। তথাকথিত জাতীয়তাবাদ, বিশ্বব্যাপী মোড়লগিরি, উন্নয়ন ইত্যাকার উছিলায় ক্ষমতাকে একচ্ছত্র করতে উৎসাহী নেতাদের সংখ্যা বাড়ছে। তারা শুধু দলেই একক আধিপত্য ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই, রাষ্ট্রক্ষমতাও তার অধীনে রাখার চেষ্টা করছে। ফলে দেশে দেশে সংকুচিত হচ্ছে গণতন্ত্র চর্চা। নানাভাবে দমন হচ্ছে ছোট-বড় বিরোধী দল ও মত। আর এসব দেশে সিভিল সোসাইটিকেও কার্যত কোণঠাসা ও নানাভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত করে রাখা হচ্ছে। এই 'নয়া গণতান্ত্রিক মডেল'-এর জুতসই উদাহরণ বোধ হয় রাশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন। ২০০০ সালে ক্ষমতায় আসার পর, চেয়ার ওলটপালট করে তিনিই একবার প্রেসিডেন্ট, পরেরবার প্রধানমন্ত্রী। তবে যে পদেই থাকুন না কেন, ক্ষমতার নাটাই তার হাতেই ছিল। স্টালিনের পর তিনিই দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় আছেন। ১৮ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও পুতিন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কার্যত তা হতেই দেননি তিনি। এবার পুতিন তার প্রধান বিরোধী আলেক্সেই নাভালনিকে নির্বাচনে প্রার্থী হতেই দেননি। ইকোনমিস্ট লিখেছে, পুতিন নিজেকে রাশিয়ার রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরছেন, যিনি কিনা বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করছেন এবং 'বৃহৎ শক্তি' হিসেবে বিশ্বের সামনে নতুন রাশিয়াকে হাজির করেছেন। পুতিনের ডেপুটি চিফ অব স্টাফের অমর বাণী 'নো পুতিন, নো রাশিয়া'র মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে এই নির্বাচনেও ষষ্ঠবারের মতো ক্ষমতাসীন হওয়ার মন্ত্র। কিন্তু এর ফলে, দেশের গণতন্ত্রের যে মৃত্যু ঘটল, তার কি কোনো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হবে না, আজ কিংবা কাল? পুতিন মডেলের এমন অনেক উদাহরণও মিলবে বিশ্বজুড়ে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে হঠাৎ ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ঘোষণা করলেন, যেসব দল মেয়র ইলেকশনে অংশ নেয়নি, তারা পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না।
তিনি বললেন, রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে বিরোধী দলগুলো অদৃশ্য হয়ে গেল! ক্ষমতাকে একচ্ছত্র করতে কি অকাট্য যুক্তি! এর আগে ওই বছরের নভেম্বরে, নির্বাচনের আগমুহূর্তে, কলম্বিয়ার সর্বোচ্চ আদালত সে দেশের প্রধান বিরোধী দলকে ভেঙে দিয়েছে। কারণ, ক্ষমতাসীন দল সর্বোচ্চ আদালতের কাছে আবেদন করেছে- বিরোধী দল আমেরিকার সঙ্গে যোগসাজশ করে ক্ষমতায় আসার চক্রান্ত করেছে। আদালত শুধু দলকেই ভেঙে দেননি; সংসদে থাকা ১১৮ জন বিরোধী সদস্যকেও পাঁচ বছরের জন্য বহিস্কার করেছে। এর ফলে ক্ষমতায় আসার পথে আর কোনো বাধাই থাকল না তিন দশকের বেশি ক্ষমতায় থাকা পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী হু সেনের। মানবাধিকার সংগঠন এ ঘটনাকে আখ্যা দিয়েছেন 'কলম্বিয়ায় গণতন্ত্রের মৃত্যু' হিসেবে। নিজের ক্ষমতাকে একচ্ছত্র করতে প্রয়োজনীয় সবকিছু করারই নজির দেখিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান। গণভোটের মাধ্যমে তিনি তার নির্বাহী ক্ষমতাকে অগাধ করে নিয়েছেন। আর তিনিও যে দীর্ঘমেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকতে চান, তার রাস্তা পরিস্কার করতে তার বিরুদ্ধে থাকা বিরোধী শিবিরকে, তথাকথিত অভ্যুত্থানের অভিযোগে 'সাইজ' করে দিয়েছেন। এ ঘটনায় অন্তত ৪০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন একটি আদালত। প্রায় আট হাজার পুলিশ সদস্যকে তাদের পদ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। ৩০ জন গভর্নর ও অন্তত ৫০ জন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাসহ প্রায় ১০ হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে এ ঘটনার বলি হয়েছেন। বিশ্নেষকরা বলছেন, অভ্যুত্থান সামনে রেখে সামরিক ও বেসামরিক বাহিনী, সরকারি অফিস- সবখানে শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে নিজের মতের বাইরের লোকদের সরিয়ে নিজের ক্ষমতাকে নিস্কণ্টক ও একচ্ছত্র করেছেন এরদোগান। আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারত 'বৃহত্তম গণতান্ত্রিক' দেশ হিসেবে স্বীকৃত হলেও হালে সেখানে মোদি হাওয়া বইছে। দলের চেয়ে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ আসলে নরেন্দ্র মোদি। পরিবারতন্ত্র ও একক নেতৃত্বের যে অভিযোগ এতকাল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে করে আসছিল বিজেপি, সে দলেও এখন দিন দিন ব্যক্তির প্রভাব বেশি দৃশ্যমান। আর নরেন্দ্র মোদি তার ক্ষমতাকে যেভাবে উপভোগ করছেন, বিশ্বশক্তি হিসেবে নিজেদের আসন আরও শক্ত করার যে স্বপ্ন দেখছেন, তা মেটাতে তিনিও যে ক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদি করতে চাইবেন না, সেটা খুব সহজে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশেও টানা দু'মেয়াদে ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ ও তার জোটভুক্ত দলগুলো। এ সময়ে অর্থনীতিতে অনেক এগিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু রাজনীতিতে 'প্রকৃত বিরোধী দল' বলে কিছু নেই। আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও আওয়ামী লীগের 'যোগ্য বিকল্প' হিসেবে যে দাঁড়াতে পারবে, সেটা বলা মুশকিল। ফলে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে পারে বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট। এমতাবস্থায়, আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনা কোন পথে হাঁটেন, সেটাই দেখার বিষয়। ফলত, দেশে দেশে গণতন্ত্রের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ একটি রাষ্ট্রের সঠিক বিকাশ ও টেকসই উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্রের একটা অপরিহার্যতা আছে। আর গণতন্ত্র নিশ্চিত হতে পারে, দলের অভ্যন্তরে 'সবার সমান অংশগ্রহণমূলক চর্চা' ও রাষ্ট্রের সব দলের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে। পৃথিবীতে এমন গণতন্ত্রেরও নজির আছে, যেখানে অংশগ্রহণমূলক ও দলীয় ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটেছে। একক দল ও ব্যক্তির দীর্ঘমেয়াদে থাকার প্রয়োজন হয়নি। সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়

অ্যান্টার্কটিকায় ৪০৩ দিন নারী বিজ্ঞানীর

আগে কোনোদিনই তেমনভাবে তুষারের মধ্যে দিন কাটাননি। কিন্তু ৪০৩ দিন পর যখন তিনি ফিরলেন, তখন নিজের অজান্তেই তৈরি করে ফেলেছেন একটা রেকর্ড। তিনি মঙ্গলা মানি। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর প্রথম নারী বিজ্ঞানী। পরিবেশগত এক মিশনের জন্য এক বছরের বেশি সময় কাটালেন অ্যান্টার্কটিকায়। সেখানকার পরিবেশ নিয়ে গবেষণা চালাতেই এ মিশন, জানিয়েছেন মঙ্গলা। ২০১৬ সালের নভেম্বর। ২৩ সদস্যের একটি দল ইসরো থেকে রওনা হয়েছিল অ্যান্টার্কটিকার উদ্দেশে। দলটিতে একমাত্র নারী সদস্য ছিলেন ৫৬ বছরের মঙ্গলা মানি। গত বছর ডিসেম্বরে অ্যান্টার্কটিকায় গবেষণামূলক কাজ শেষের পর দেশে ফেরে দলটি। সম্প্রতি টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে মানি জানিয়েছেন, কেমন ছিল সেই দিনগুলো। তার কথায়, ‘খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল আমাদের মিশন। আমি একজন নারী হওয়ায় চ্যালেঞ্জটা ছিল আরও বেশি। কারণ, নারীদের থেকে পুরুষদের শারীরিক সক্ষমতা অনেকটাই বেশি।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘সেখানকার পরিবেশ অত্যন্ত শুষ্ক। যখনই আমরা ক্লাইমেট কন্ট্রোল রিসার্চ সেন্টারের বাইরে বের হতাম, তখন খুবই সতর্ক থাকতে হতো।’ মাইনাস ৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এতগুলো দিন কাটানোর জন্য কিভাবে নিজেকে তৈরি করেছেন? সেই প্রস্তুতির কথাও নিজের মুখে জানিয়েছেন ওই নারী বিজ্ঞানী। মিশনের দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার পর শুরু হয়েছিল শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রশিক্ষণ। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলে শারীরিক প্রশিক্ষণ। মানি জানিয়েছেন, এতগুলো দিন অ্যান্টার্কটিকায় কাটানোর সময় প্যাকেটজাত খাবারই ব্যবহার করেছেন তারা। একই সঙ্গে মনে রাখা হয়েছে পরিবেশ দূষণের দিকটাও। ৪০০ দিনের বেশি অ্যান্টার্কটিকায় সফলভাবে মিশন শেষ করার জন্য সহযাত্রীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন মঙ্গলাদেবী। সূত্র : আনন্দবাজার।

কুর্দিবিরোধী লড়াইয়ে ইরাকেও হস্তক্ষেপের হুমকি এরদোগানের

ওয়াইপিজি যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে তুরস্কের বাহিনী সীমান্ত বরাবর তাদের লড়াই অব্যাহত রাখবে। যদি প্রয়োজন পড়ে তা হলে উত্তর ইরাকেও হস্তক্ষেপ করা হবে বলে জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান।-খবর আরব নিউজের।
আফরিনে তুর্কি বাহিনীর চূড়ান্ত বিজয়ের পর সোমবার আঙ্কারায় বিচারক ও আইনজীবীদের সমাবেশে তিনি বলেন, উত্তর সিরিয়ার শহর কমিশলি থেকে শুরু করে ৪০০ কিলোমিটার পূর্ব পর্যন্ত হামলার লক্ষ্যবস্তু বানাতে যাচ্ছে তুরস্ক। তিনি বলেন, ওয়াইপিজি যোদ্ধাদের তাড়াতে মানবিজ, আইন আল আরব, তেল আবিয়াদ, রাস আল আইনও অভিযান চালানো হবে। তুরস্ক কুর্দি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের সামরিক অভিযান আরও প্রসারিত করলে ন্যাটোমিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে। সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে ওয়াইপিজি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র বলা হয় কুর্দি ওয়াইপিজি যোদ্ধাদের। আফরিন থেকে কুর্দিদের তাড়াতে গত দুই মাস ধরে অপারেশন অলিভ ব্রাঞ্চ চালায় তুরস্ক।

শত্রুদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রস্তুত চীন: শি জিনপিং

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার পর মঙ্গলবার এক জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়েছেন। দেশটিতে বিভাজন সৃষ্টির বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, বিশ্বে নিজের ন্যায়সঙ্গত স্থান ধরে রাখতে শত্রুদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে প্রস্তুত রয়েছে চীন।-খবর এএফপি।
ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনের সমাপনীতে তিনি এসব কথা বলেন। শীর্ষপর্যায়ের মার্কিন কর্মকর্তাদের তাইওয়ান সফরের অনুমতি দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন নীতিতে সই করার পর দিন দেয়া ভাষণে শি বলেন, বেইজিং যে কোনো মূল্যে তার ‘এক চীন নীতি’ রক্ষা করে চলবে। ‘এক চীন নীতি’ বলতে বোঝাচ্ছে- স্বশাসিত দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়াইন চীনের সঙ্গে পুনর্মিলনের অপেক্ষায় রয়েছে। গ্রেট হলে প্রায় তিন হাজার প্রতিনিধির সামনে দেয়া ভাষণে চীনা প্রেসিডেন্ট বলেন, দেশকে আলাদা করতে সব ধরনের ষড়যন্ত্র ও কর্মকাণ্ড ব্যর্থ করে দেয়া হবে। জনগণ সব ধরনের ষড়যন্ত্রের নিন্দা জানাবে এবং ইতিহাস তাদের শাস্তি দেবে। চীনা উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ দূর করতে তিনি বলেন, চীন কোনো দেশের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দেবে না। যারা অন্যকে হুমকি দিতে অভ্যস্ত, তারা সবাইকে হুমকি হিসেবে মনে করে।

মারধরকারী ছেলেকে কুপিয়ে খুন করলেন বাবা

প্রায় সময়েই বাবাকে মারধর করত ২৪ বছরের তরুণ ছেলে। বাবাও মুখ বুঝে মার সহ্য করতেন। কিন্তু রোববার মার খাওয়ার পর আর মাথা ঠিক রাখতে পারেননি ছেলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ বাবা। নিজ হাতে কুপিয়ে ছেলেকে হত্যা করে বসেন তিনি।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর দিনাজপুরের ডালখোলায় এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহত তরুণের নাম মঙ্গল সোরেন। তাকে হত্যার দায়ে বাবা বুলাই সোরেনকে আটক করেছে পুলিশ। পরিবারের দাবি, সম্প্রতি নেশার খপ্পরে পড়েন মঙ্গল। নেশার টাকার জন্য প্রায় সময়েই বাবাকে মারধর করতেন তিনি। রোববারও নেশার টাকার দাবিতে বাবাকে বেধড়ক মারধর করেন মঙ্গল। তখন ঘরে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে ছেলেকে কোপ দেন বুলাই। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান মঙ্গল। খবর পেয়ে পুলিশ এসে বাবাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়।

কুকুরের বাচ্চাটি বলছে ইহুদিরা তাদের নিজ ভূমিতে বসতি গড়ছে

অধিকৃত পশ্চিমতীরে ইহুদিদের অবৈধ বসতি স্থাপনকে সমর্থন দেয়ায় ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে কুকুরের বাচ্চা আখ্যায়িত করেছেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। সোমবার রামাল্লায় ফিলিস্তিনি নেতাদের এক বৈঠকে আব্বাস এ মন্তব্য করেন। জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণার পর ট্রাম্প প্রশাসনকে বয়কট করছেন ফেলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট। তবে তা সত্ত্বেও ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যে শান্তি পরিকল্পনা শুরু করার প্রত্যাশা করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মাহমুদ আব্বাস একই বৈঠকে গত সপ্তাহে গাজায় ফিলিস্তিনি প্রধানমন্ত্রী রামি হামদাল্লাহর গাড়িবহরে বোমা হামলার জন্য হামাসকে দায়ী করেন। এতে আলোচিত হামাস-ফাতাহর পুনর্মিলন বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। পশ্চিমতীরে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সমর্থন দিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড ফ্রিডম্যান বলেন, ইহুদিরা তাদের নিজস্ব ভূমিতে বসতি গড়ে তুলছে। তার এ মন্তব্যে ক্ষিপ্ত আব্বাস বলেন, কুকুরের বাচ্চাটি বলছে- ইহুদিরা তাদের নিজ ভূমিতে বসতি গড়ছে।
সে নিজেই একজন বসিতস্থাপনকারী। তার পরিবারও। আবার একই ব্যক্তি তেলআবিবের রাষ্ট্রদূত। তার কাছ থেকে আমরা কী আশা করতে পারি। আব্বাসের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ফ্রিডম্যান বলেন, তিনি আমাকে কুকুরের বাচ্চা বলে অভিহিত করেছেন। এটা ইহুদিবিদ্বেষ না রাজনৈতিক ডিসকোর্স, তা আপনাদের ওপর ছেড়ে দিলাম। আর আব্বাসের মন্তব্য অত্যন্ত অসঙ্গত বলে নিন্দা জানিয়েছেন মার্কিন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত জেসন গ্রিনব্লাট। তিনি বলেছেন, ঘৃণায় ভরা কথাবার্তা অথবা জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করা, এর মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে ফিলিস্তিনি নেতাকে। রাষ্ট্রদূত ফ্রিডম্যান ইসরায়েলের বসতিস্থাপন পরিকল্পনার একজন দৃঢ় সমর্থক। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মার্কিন দূতাবাস সেখানে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার পেছেনে প্রথম থেকে জোরালো ভূমিকা রাখা ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি অন্যতম।

টাকা নিয়ে উধাও জিএমজি অস্তিত্ব সংকটে ইউনাইটেড

চরম দুরবস্থায় পড়েছে শেয়ারবাজারে আসা দুই বিমান কোম্পানি। এর মধ্যে প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করে ৩শ’ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেছে বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন জিএমজি এয়ারলাইন্স। এছাড়াও রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে প্রায় ২৩০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আর ফেরত দেয়নি। অন্যদিকে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ। প্রতিষ্ঠানটি এখন নামেই টিকে আছে। ১০ টাকার শেয়ার ৪ টাকায় নেমে এলেও বিনিয়োগকারীরা প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার কিনছে না। আর এই দুই কোম্পানিতে সাধারণ বিনিয়োগকারী এবং ব্যাংকের ১ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা আটকে আছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি ঠেকাতে কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে টাকা আদায় করতে হবে। এ ব্যাপারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) ব্যবস্থা নিতে হবে। জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, কোম্পানির অবস্থা ভালো নয়। আইনি পদক্ষেপ নেয়া উচিত। তিনি বলেন, সিকিউরিটিজ আইনে অধিগ্রহণের সুযোগ থাকলে কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে বিএসইসিকে বিনিয়োগকারীদের টাকা পরিশোধ করতে হবে। তার মতে, বর্তমান আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে কোম্পানি আইনে তার দেউলিয়াত্ব প্রমাণ হলে বিনিয়োগকারীরা আদালতে যেতে পারে। সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করে জিএমজি। এতে ১০ টাকার প্রতিটি শেয়ার ৪০ টাকা প্রিমিয়ামসহ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৫০ টাকা নেয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় বাজার থেকে ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি। এরপর ১৬৬ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের এ প্রতিষ্ঠানটি আইপিওর (প্রাথমিক শেয়ার) মাধ্যমে প্রিমিয়ামসহ আরও ৩০০ কোটি টাকা সংগ্রহের আবেদন করে। কিন্তু কোম্পানির আর্থিক রিপোর্টে জালিয়াতি ধরা পড়ায় ২০১২ সালে আইপিও আবেদনটি বাতিল করে বিএসইসি। নিয়ম অনুসারে আইপিও আবেদন বাতিল করার পর প্লেসমেন্টের টাকা বিনিয়োগকারীদের ফেরত দিতে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে টাকা আটকে রেখেছে জিএমজি। কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জিএমজি এয়ারলাইন্স। পরের বছর থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী পরিবহন শুরু করে। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা ৭ বছর প্রতিষ্ঠানটি লোকসানি ছিল। এ সময়ে মোট লোকসানের পরিমাণ ৪২ কোটি টাকা। ২০০৬ এবং ২০০৭ সালে ১ কোটি টাকা মুনাফা দেখায়। কিন্তু ২০১০ সালে অলৌকিকভাবে বেড়ে যায় প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা।
ওই বছরের প্রথম ৯ মাসে প্রতিষ্ঠানটি ৭৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা মুনাফা দেখায়। তিন বছর পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে এ প্রতিষ্ঠান। শেয়ারবাজারে কারসাজি নিয়ে গঠিত খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ২০০৮ সালের স্থিতিপত্রে হঠাৎ করে ৩৩ কোটি টাকার পুনর্মূল্যায়ন উদ্বৃত্ত দেখানো হয়। এর ব্যাখ্যায় জিএমজি বলেছে, তাদের দুটি বিমানের সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে। তবে বিমান দুটি বেশ পুরনো। স্বাভাবিক নিয়মে পুরনো বিমানের সম্পদের দাম আরও কমার কথা। কিন্তু আলাদিনের জাদুর চেরাগের মতো দাম বাড়িয়ে দেখিয়েছে জিএমজি। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকে জিএমজির ২৩০ কোটি খেলাপি ঋণ রয়েছে। এই টাকা আদায়ে ২০১৬ সালে সালমান এফ রহমানের বাড়ির নিলাম ডাকা হয়েছিল। কিন্তু অদৃশ্য ইশারায় শেষ পর্যন্ত তা আটকে যায়। অন্যদিকে ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ইউনাইটেড এয়ার। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পরিশোধিত মূলধন ৮২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ৭০ দশমিক ৪৩ শতাংশ বা ৫৮৪ কোটি টাকা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং উদ্যোক্তাদের ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। কিন্তু বিএসইসির নিয়ম অনুসারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তাদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া এককভাবে প্রত্যেক পরিচালকের ২ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। গত ৬ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। পুরনো উড়োজাহাজ ব্যবহারের কারণে জ্বালানি খরচ বেশি। বিলম্বিত কর আমলে নেয়ার পর থেকেই মুনাফা কমে গেছে প্রতিষ্ঠানটির। এর আগে শেয়ারবাজার থেকে রাইট শেয়ার ছেড়ে অর্থ সংগ্রহ করে উড়োজাহাজ কেনা হলেও প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। বরং বেশি দামে উড়োজাহাজ কেনার অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। এরপর আর্থিক সংকট কাটাতে নতুন করে রাইট শেয়ার ছাড়তে চেয়েছিল তারা। কিন্তু উদ্যোক্তাদের ৩০ শতাংশ শেয়ার না থাকায় অনুমতি দেয়নি বিএসইসি। এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছেও ইউনাইটেড এয়ারের শত কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। বর্তমানে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার টাকায় ৪ টাকায়ও কেউ কিনছে না। এছাড়াও বিভিন্ন ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৩শ’ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে।

এভাবে বাঁচা যায় না বলে স্ত্রী-সন্তানকে খুন, আত্মহত্যার চেষ্টা

ঋণগ্রস্ত হয়ে স্ত্রী ও মেয়েকে খুন করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন এক ব্যক্তি। সোমবার বিকালে ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়ার মছলন্দপুর-১ নম্বর পঞ্চায়েতের বিশ্বাসহাটি এলাকায়। নিহত দুজন হলেন- মিঠু দেবনাথ (৩৫) ও তার মেয়ে পূজা।
আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার সকালে পূজার এএসসি পরীক্ষা ছিল। কিন্তু তাকে পরীক্ষা দিতে যেতে দেখা যায়নি। দেখা মেলেনি পূজার মা মিঠু দেবনাথেরও। এ ঘটনায় সন্দেহ হয়েছিল প্রতিবেশীদের। এ ব্যাপারে তারা পূজার বাবা শেখরকে প্রশ্ন করলে প্রথমে আমতা আমতা করেন তিনি। পরে বাড়ির মধ্যে ঢুকে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন শেখর। প্রতিবেশীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। এ সময় প্রতিবেশীরা ঘরের মধ্যে গন্ধটা পান। পরে পুলিশকে খবর দিলে মা ও মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রতিবেশীদের ভাষ্য, বাড়ি করতে গিয়ে অনেক ঋণ হয়েছিল শেখরের। এ কারণে মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন তিনি। শেখরের স্বীকারোক্তি, ‘এভাবে বাঁচা যায় না। আমি মরে গেলে ওদের কী হতো। তাই এই পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম।’

আফগানিস্তানে গুলবুদ্দিনের জনসভার কাছে বিস্ফোরণ, নিহত ৪

আফগানিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের জনসভার কাছে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত চারজন নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছেন। সোমবার আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশের রাজধানী জালালাবাদে মোটরসাইকেলে পেতে রাখা বোমার বিস্ফোরণে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে।
জালালাবাদের একটি ফুটবল স্টেডিয়ামে গুলিবুদ্দিনের জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে তার সমর্থকরা বাড়ি ফেরার সময় বোমাটি বিস্ফোরিত হয়। নানগারহার প্রদেশের গভর্নরের মুখপাত্র আতাউল্লাহ খোগিয়ানি জানান, হামলায় চারজন নিহত ও দুই শিশুসহ ১০ জন আহত হয়েছেন। উল্লেখ্য, সোভিয়েত আগ্রাসনবিরোধী নেতা ছিলেন গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার। রুশ দখলদারির অবসান হলে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে আসেন তিনি। ১৯৯৬ সালে তালেবান বিদ্রোহীরা তার সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে। পরে মার্কিন আগ্রাসনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন তালেবানরা। ওই সময় মার্কিন বাহিনীর হাতে তিনি বন্দিও হন। তবে গত বছর যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত আফগানিস্তানের সরকারের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরেন গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার।

ঘরেই তৈরি করুন সুস্বাদ ফলের কাস্টার্ড

বিয়ে-জন্মদিন যে কোনো অনুষ্ঠানে ফলের কাস্টার্ড না হলে কি চলে। বাসায় অতিথি আপ্যায়নে ও ছোট-বড় সবার পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে ঘরেই তৈরি করতে পারেন বাহারি ধরনের সুস্বাদু ফলের কাস্টার্ড। তবে এই ফলের কাস্টার্ড তৈরিতে আনতে পারেন ভিন্নতা। সবসময় একই রকমের ফলের কাস্টার্ড তৈরি না করে স্বাদ ও গন্ধে আনতে পারেন ভিন্নতা। তাই সহজেই রান্না করুন ফ্রুট কাস্টার্ড। আসুন জেনে নিন বাহারি রঙের ফ্রুট কাস্টার্ড কীভাবে তৈরি করবেন-
উপকরণ
তিন কেজি দুধ, কাস্টার্ড পাউডার তিন টেবিল চামচ, ডিম একটা, চিনি ৪০০ গ্রাম, আনার আধা কাপ, পেঁপে এক কাপ, আপেল এক কাপ, সাগর কলা দুই কাপ, ফ্রুটস কেক কোয়ার্টার পাউন্ড, চেরি ফল ১০টা, আঙুর এক কাপ, কাঠবাদাম কুচি এক চা চামচ, কিশমিশ এক চা চামচ।
প্রস্তুত প্রণালি
চিনিসহ তিন কেজি দুধকে ঘন করে এক কেজি করুন। একটি কাপে কাস্টার্ড পাউডারে ডিম ফেটে একসঙ্গে মিশ্রিত করে তা গরম দুধের ওপর ঢালুন এবং নাড়াচাড়া করতে থাকুন। অনবরত নাড়তে নাড়তে মিশ্রণটি ঘন হয়ে এলে তা ঠাণ্ডা করুন। একটি বড় বাটিতে প্রথমে ফ্রুটস কেকের টুকরো, এর পর পেঁপে, আপেল, কলার টুকরাগুলো সাজিয়ে তার ওপরে ঘন কাস্টার্ডের মিশ্রণটি চামচ দিয়ে ঢেলে দেবেন। এমনভাবে ঢেলে দেবেন, যাতে ফলগুলো ঢেকে যায়। এখন আনার, কাঠবাদাম, কিশমিশ, চেরি ফল, আঙুরগুলো খুব সুন্দর করে সাজিয়ে ফ্রিজে দু-তিন ঘণ্টা রেখে তা পরিবেশন করুন।

ঘাড়, মাথা ও বুক ব্যথা

ঘাড় ব্যথার নানা কারণগুলোর মধ্যে স্পন্ডাইলোসিস বা ঘাড়ের হাড় ক্ষয় অন্যতম। নারী পুরুষ যে কারও ঘাড় ব্যথা হতে পারে। তবে যারা ডেস্কে বসে কাজ করেন, যেমন- ব্যাংকার, কম্পিউটার ব্যবহার বেশি করেন এমন ব্যক্তি। তাছাড়াও যারা ঘরের কাজ যেমন- কাপড় ধোয়া, ঘর মোছা বা রান্না করার মতো কাজ করেন তারাও ঘাড় ব্যথায় আক্রান্ত হন।
স্পন্ডাইলোসিসের লক্ষণ : ব্যথা ঘাড় থেকে হাতে চলে যায়। অনেকের হাতে ঝিঁ ঝি ধরে। পিঠে বুকে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে। ঘাড় ডানে-বামে বা সামনে-পেছনে ঝোঁকাতে কষ্ট হয়। অনেকে উপরের দিকে তাকাতে পারেন না। অনেক রোগীই বলে থাকেন তাদের কোনো কোনো আঙ্গুল অবশ লাগছে বা ঠিক বোধ পাচ্ছেন না। সকালে ঘুম থেকে উঠে অনুভব করেন তার একটি হাত ঝিঁ ঝি লেগে আছে অথবা ঝিঁ ঝি লাগার কারণে মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে গেছে। এসব সাধারণ (কমন) উপসর্গ ছাড়াও অনেক রোগীই মাথা ঘোরা মাথাব্যথা বা বুকে ব্যথার কথা অভিযোগ করে থাকেন। এমনও রোগী আছে যারা বুক ব্যথার সঠিক কারণ নির্নয় করতে না পেরে নিজেকে হৃদরোগী ভাবেন। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই সামান্য একটি এক্স-রে করে দেখা যায় তিনি ঘাড়ের হাড় ক্ষয় রোগে ভুগছেন। একইভাবে মাসের পর মাস মাথা ঘোরা রোগের ওষুধ খেয়ে উপকার না পেয়ে পরে স্পন্ডাইলোসিস শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। তাই রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সাবধান হওয়া জরুরি।
চিকিৎসা : স্পন্ডাইলোসিসের সবচেয়ে কার্যকরী চিকিৎসা আইপিএম। কারণ নির্ণয় হওয়া মাত্রই চিকিৎসা শুরু করতে হবে। ব্যথা বা অন্যান্য উপসর্গ সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আইপিএম চালিয়ে যেতে হবে। নিয়ম মেনে চলাও চিকিৎসার সমান গুরুত্বপূর্ণ। সামনে ঝুঁকে কাজ না করা, পাতলা বালিশে ঘুমানো, সমান বিছানা ব্যবহার স্পন্ডাইলোসিস রোগীদের কষ্ট দ্রুত দূর করবে। ডায়াবেটিস, গ্যাস্ট্রিক আলসার এবং কিডনি রোগে আক্রান্তরা ব্যথানাশক ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকুন।
জটিলতা : ফ্রোজেন সোল্ডার স্পন্ডাইলোসিসের অন্যতম প্রধান জটিলতা। তাছাড়া রোগ জটিল আকার ধারণ করলে হাত শুকিয়ে যাওয়া বা আঙ্গুল অবশ হয়ে যাওয়াওর মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
চিফ কনসালট্যান্ট
এইচপিআরসি, সেক্টর-৪, উত্তরা, ঢাকা।
মোবাইল ফোন : ০১৮৭২ ৫৫৫ ৪৪৪

মুখরোচক চিলি পটেটো

আলু অনেকের প্রিয় একটি সবজি। শিশুরাও আলু খেতে বেশ পছন্দ করে। আলু দিয়ে তরকারি রান্না ছাড়াও তৈরি করা যায় বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক খাবার। তেমনি একটি খাবার হল চিলি পটেটো। বিকালের নাস্তায় বা চায়ের আড্ডায় খেতে পারেন চিলি পটেটো। সহজেই তৈরি করা যায় এবং খেতে সুস্বাদু বলে অনেকেই পছন্দ করেন এ খাবারটি। আসুন জেনে নিই কীভাবে তৈরি করবেন চিলি পটেটো-
উপকরণ
আলু, লবণ, কর্ণ ফ্লাওয়ার, তেল, রসুন, কাঁচামরিচ, আদা, রসুনের পেস্ট, পেঁয়াজের রিং, ক্যাপসিকাম, মরিচের গুঁড়ো, সয়াসস, চিনি, ভিনেগার ও চিলি সস।
প্রণালি
আলু কিছুটা মোটা করে কাটুন। এর পর এটি ভালো করে ধুয়ে লবণ ও কর্ণ ফ্লাওয়ার দিয়ে ভালো করে মেশান। একটি প্যানে তেল গরম করতে দিন। তেল গরম হয়ে এলে এতে আলুগুলো দিয়ে ভাজুন। বাদামি রং হয়ে এলে নামিয়ে ফেলুন। আরেকটি প্যানে তেলে রসুন কুচি, কাঁচামরিচ, পেঁয়াজের রিং, ক্যাপসিকাম কুচি দিয়ে ভাজুন। এর সঙ্গে মরিচ গুঁড়ো, সয়াসস, চিনি, ভিনেগার, লবণ এবং চিলি সস দিয়ে নাড়ুন। এবার এতে ভাজা আলুগুলো দিয়ে দিন। কিছুক্ষণ নাড়ুন। ব্যস তৈরি হয়ে গেল মজাদার চিলি পটেটো। এবার ফ্রাইড রাইস অথবা পোলাওয়ের সঙ্গে পরিবেশন করুন চিলি পটেটো।

ভুল সবই ভুল, যা জানি তা ভুল by শাহদীন মালিক

ভুলটা বোঝা গেল প্রথম আলোয় র‍্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদের সাক্ষাৎকারটা পড়ে (প্রথম আলো, ১৮ মার্চ)। ভুলটা আমাদের শ্রদ্ধেয় বেনজীর আহমেদের নয়। বিশিষ্ট ব্যক্তি, ভিআইপিদের নাম উচ্চারণ করা বা লেখার আগে, অর্থাৎ নামের আগে বিশেষণ ব্যবহার করা এখন অলিখিত নিয়ম। এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে খবর আছে। নেতা-নেত্রীর নামের আগে যত বেশি বিশেষণ ব্যবহার করা যায়, ততই মঙ্গল। বিশেষণ ব্যবহারকারী ব্যক্তি তাঁর নিজস্ব মঙ্গলের আশায় বিশেষণগুলো দীর্ঘায়িত করেন। দুই যুগ পেরিয়ে গেছে। তখন লন্ডনে থাকতাম। কী যেন একটা রাজনৈতিক ব্যাপারে-ব্যাপারটা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না, আর সেটা এই কলমের জন্য মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়-একটা পত্রিকায় ওই দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে লেখা এক সাংসদের (এমপি) চিঠি ছাপা হয়েছিল। জন মেজর তখন প্রধানমন্ত্রী। এমপি সাহেব চিঠিটা শুরু করেছিলেন ‘ডিয়ার জন’ সম্বোধনে। এই অধমের ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। অতিমাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সম্বোধন করছে শুধু ‘ডিয়ার জন’ বলে! দল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কেন যে বহিষ্কৃত হলেন না, তা আজও বুঝিনি। কার নামের আগে কয়টা বিশেষণ লাগাতে হয়, তার যথাযথ তালিম নেওয়ার জন্য তাঁর কিছুদিন বাংলাদেশে অবস্থান করা জরুরি। তিন ভিনদেশে ছাত্র ছিলাম। বহু শিক্ষকের সঙ্গে মোলাকাত হয়েছে। অভদ্র হয়ে গিয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ফার্স্ট ইয়ার থেকে। তখন থেকে অধ্যাপকদের নাম ধরেই ডাকার বা সম্বোধন করার বদভ্যাস গড়ে ওঠে। কাউকে কোনো দিন ‘ছার’ (স্যার) বলিনি। শব্দটা এখনো সহজে মুখ দিয়ে বেরোতে চায় না। সতর্ক থাকা ভালো, পাছে না ‘মাইন্ড’ করে ফেলেন। তাই শ্রদ্ধেয় বেনজীর আহমেদ। ভারতের সংবিধানে পইপই করে ‘টাইটেল’ ব্যবহার নিষেধ করে দিয়েছে। ব্যতিক্রম দুটো, যার সাদামাটা অর্থ হলো শিক্ষক আর সেনা কর্মকর্তারা টাইটেল ব্যবহার করতে পারবেন। অধ্যাপক ও মেজর জেনারেল চলে গা! যাহোক, আপাতত শ্রদ্ধেয়ই থাক।
২. শ্রদ্ধেয় বেনজীর আহমেদের সাক্ষাৎকার পড়ে উপলব্ধি হলো যে এক যুগ ধরে ক্রমান্বয়ে ভুল করে চলেছি। সাক্ষাৎকারের শিরোনাম ছিল ‘ “বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড” একটা ভুল শব্দ’। তাই তো, এত দিন ধরে ভুল শব্দ ব্যবহার করে বিরাট ভুল করে চলেছি। লিখছি আর ভাবছি, একজন সম্পাদক বছর দুয়েক আগে অকপটে একটা কথা স্বীকার করেছিলেন। তিনি বিগত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গোয়েন্দাদের সরবরাহ করা খবর যাচাই-বাছাই না করে ছাপার কথা স্বীকার করে তাকে ভুল হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এরপর এক শ পুরো না হলেও এক শর কাছাকাছি মামলা খেয়েছিলেন! অকপটে ভুল স্বীকার করার জন্য তো মামলা হওয়ার কথা নয়। সেটাই ভরসা। অবশ্য আরও ভরসা এটুকু যে বছরের পর বছর ধরে এই ভুল অগণিত ব্যক্তি এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা, এমনকি গণমাধ্যমও করে আসছে। আমাদের চরম সৌভাগ্য যে শ্রদ্ধেয় বেনজীর আহমেদ আমাদের সবার ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন; এ দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয় না। থ্যাংক ইউ! অবশ্য তিনি প্রশ্নও রেখেছেন-বিচার-অন্তর্ভুক্ত হত্যাকাণ্ড কোনটি।
৩. ভুল বুঝে অনেক ভুল বা খারাপ কাজ করা হয়ে যেতে পারে। আগের বাক্যটা স্বীকারোক্তি নয়, মূল্যায়ন। ভিন্ন মূল্যায়নের জন্য মামলা খাওয়া (!) উচিত নয়। যাহোক, যা বলছিলাম, বছর আড়াই আগে জাতীয় প্রেসক্লাবের বড় হলরুমে তিরিশের বেশি পরিবার সমবেত হয়েছিল। কারও ছেলে, কারও বাবা, স্বামী, ভাই নিখোঁজ। আমরা তাদের আহাজারি শুনেছিলাম প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে। তাদের প্রায় সবাইকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তারা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এই অফিস, ওই অফিসে ধরনা দিয়েছে। ছেলে হারানো বৃদ্ধ মা, বাবা হারানো বালকের কথা শুনতে শুনতে আমাদের অনেকের চোখের জল বাধ মানছিল না। পরদিন প্রায় সব পত্রিকাতেই স্বজনহারাদের আহাজারির বৃত্তান্ত ছাপা হয়েছিল। এখন বুঝতে পারছি-সবই ভুল। তাঁরা হয় আর্থিক-ব্যবসায়িক কারণে সটকে পড়েছেন; পারিবারিক বা বৈধ-অবৈধ প্রেমজনিত কারণে গা-ঢাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন; আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য এসব করেছেন। কেউই গুম হননি। মনটা প্রশান্তিতে ভরে উঠেছে। সাক্ষাৎকারে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত আছে-বিচার বিভাগ কি আর স্বাধীন! ধারণা করছি, নারায়ণগঞ্জের সাত ব্যক্তি প্রথমে নিজেদের মেরেছেন। মরার পর নিজের পেট কেটেছেন। তারপর দড়ি দিয়ে পায়ে-পেটে পাথর আর ভারী বস্তু বেঁধে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছেন। আর শেষে আমজনতা, মিডিয়া আর আইনজীবীদের চাপে পরাধীন বিচারক র‍্যাবের কর্মকর্তা আর তাঁদের সঙ্গী ব্যক্তিদের অকারণে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তির আদেশ দিয়েছেন। কারণ, র‍্যাব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম কিছুই করে না। সবই আমাদের ভুল ধারণা।
৪. শুধু ভুলটাই শোধরাতে পারছি, তা নয়। নতুন তথ্যও জেনেছি সাক্ষাৎকার থেকে। প্রথম আলো প্রশ্ন রেখেছিল-‘এভাবে সামরিক বাহিনীকে যুক্ত করে বিশ্বের কোথাও এ রকম বাহিনী আছে কি?’ জবাবে অতি শ্রদ্ধেয় বেনজীর আহমেদ বলেছেন, ‘না, এ ধরনের বাহিনী অনন্য।’ দুনিয়ায় কেউ বুঝল না আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেনাসদস্যদের সম্পৃক্ত রাখলে সুফল মেলে। বুঝল শুধু আমাদের সরকার আর র‍্যাব। আর র‍্যাব সৃষ্টির জন্য বর্তমানে ডান্ডাবেড়ি লাগানো যে ব্যক্তির ছবি প্রিজন ভ্যান থেকে নামার সময় মাঝেমধ্যে মিডিয়ায় দেখা যায়, অর্থাৎ লুৎফুজ্জামান বাবরের নাম উল্লেখ না করলে নিঃসন্দেহে ইতিহাস বিকৃতির অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। যারা র‍্যাবকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে, র‍্যাবের সঙ্গে এনগেজমেন্টে যাওয়ার দুঃসাহস দেখায়, তারা তো মরতেই পারে এবং মরছেও। এটাই স্বাভাবিক। মনে হচ্ছে সাক্ষাৎকারের মূল বক্তব্য ছিল এটাই। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সঠিক রাখার জন্য ‘লাইসেন্স টু কিল’ প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় ভুলটা এ জায়গায়। ইনিয়ে-বিনিয়ে এক দশক ধরে যে কথা বলে চলেছি এবং বলতেই থাকব তা হলো-সফল রাষ্ট্র। দুর্বল রাষ্ট্র আর ব্যর্থ রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য মূলত একটা ব্যাপারে। দুর্বল রাষ্ট্র নিজেকে সফল রাষ্ট্রে পরিণত করতে ক্রমান্বয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর বেশি বেশি করে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর বহিঃপ্রকাশ প্রধানত দুই ধরনের। প্রথমত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাজেট বাড়ে, প্রযুক্তি-অস্ত্রশস্ত্র বাড়ে আর সেই সঙ্গে কমে জবাবদিহি। আস্তে আস্তে ধরো, মারো থেকে ক্রমান্বয়ে অপহরণ, চাঁদাবাজি, জমি দখল ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের বিস্তৃতি ঘটে। সেই সঙ্গে প্রতিবাদীদের সংখ্যা কমতে থাকে। দ্বিতীয় বহিঃপ্রকাশ ঘটে ব্যাংক-বিমা, কনস্ট্রাকশন মেরামত, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ইত্যাদি। ফল হিসেবে রাষ্ট্রব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে ভঙ্গুর হতে থাকে। আর যার জবাবদিহি নেই, তাকে জবাবদিহি করার চেষ্টা করা অর্থহীন। এটা গণমাধ্যমের ভুল। প্রথম আলো এই ভুলটি করেছে।
ড. শাহদীন মালিক: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের আইনের শিক্ষক

তাঁরা না কংগ্রেস না বিজেপি

দেশের পরিস্থিতি বুঝে এবং আগামী বছরের লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন ফ্রন্ট গঠনের লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও বৈঠক করেছেন। বিজেপি ও কংগ্রেসের বাইরে নতুন ফ্রন্ট গড়তে চান দুই মুখ্যমন্ত্রী। গতকাল সোমবার পশ্চিমবঙ্গের সচিবালয় নবান্নে দুই মুখ্যমন্ত্রী বৈঠক করেন। পরে সংবাদ সম্মেলনে আলাদা ফ্রন্ট গড়ার কথা জানান কে চন্দ্রশেখর রাও। ২০১৪ সালের ২ জুন ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ ভেঙে গড়ে ওঠে নতুন রাজ্য তেলেঙ্গানা। এতে অন্ধ্র প্রদেশ আলাদা আর তেলেঙ্গানা আলাদা রাজ্য হিসেবে থেকে যায়। দুই রাজ্যেরই অভিযোগ, নরেন্দ্র মোদির সরকার তাদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করছে। রাজ্যের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে না। রাজ্য সরকারের সঙ্গে এই দ্বন্দ্বে অন্ধ্র প্রদেশের তেলেগু দেশম পার্টি বা টিডিপির নেতা ও অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জোট ছেড়েছেন। আবার তেলেঙ্গানার তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিতি বা টিআরএসের নেতা ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও বিজেপি ও কংগ্রেসের বাইরে থেকে কাউকে সরকার গঠন করার জন্য আহ্বান জানান। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও মোদিকে সরিয়ে জনগণের সরকার গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই দাবি নিয়ে এখন তিনি পুরো দেশে সোচ্চার। সভা-সমাবেশে মমতার অভিযোগ, দেশের অসাম্প্রদায়িকতার চরিত্রে কালি লেপন করছে বিজেপি। সাম্প্রদায়িকতার উসকানি দিচ্ছে। নোট বাতিল ও জিএসটি চালু করে দেশের অর্থনীতির ওপর আঘাত করছে। বাড়িয়ে দিয়েছে বেকার সমস্যা আর দ্রব্যমূল্য। তাই বিজেপি সরকারের আর দরকার নেই। আলোচনা শেষে তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রাও নবান্নে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দেশে এখন রাজনৈতিক পরিবর্তন জরুরি। বিজেপি ও কংগ্রেসবিরোধী ফ্রন্টের প্রয়োজন। তাই তিনি মমতার সঙ্গে বিজেপি ও কংগ্রেসবিরোধী ফ্রন্ট গড়তে চান। প্রতিটি রাজ্যের আঞ্চলিক দলগুলোকে নিয়ে এই ফেডারেল ফ্রন্ট গঠন করতে চান তাঁরা। বক্তব্য দেওয়ার সময় চন্দ্রশেখর রাওয়ের পাশে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতাও বলেছেন, রাজনৈতিক মঞ্চ গড়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে অনেক দলের সুসম্পর্ক রয়েছে। সেসব দলের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁরা নতুন একটি রাজনৈতিক মঞ্চ তৈরি করতে চান। মমতা বলেন, ‘আমরা ফেডারেল ফ্রন্ট চাই। রাজ্যগুলো মজবুত হলে দেশও মজবুত হবে। এই লক্ষ্য নিয়ে আমাদের এগোতে হবে। তাড়াহুড়ো নেই যে আজই করতে হবে। রাজনীতিতে সময় লাগে। তাই তো পরিস্থিতি এমনও হয়ে যায়, যখন একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ আসে। এর থেকে ভালো আর কী হয়?’ বিজেপিবিরোধী এই দুই মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠককে ‘গুরুত্বহীন চমক’ বলছেন দলের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। এই বৈঠককে উড়িয়ে দিয়ে তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, ‘কেন্দ্রে স্থিতিশীল সরকার রয়েছে বলে এবার আঞ্চলিক দলগুলো বাজার গরম করতে চাইছে।’

চড়ুই, বিড়াল, বস্তি ও ফায়ার সার্ভিস by সৈয়দ আবুল মকসুদ

ফায়ার সার্ভিস সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা, এর কর্মীরা অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধারকাজ করেন। পানির ভেতরে দুর্ঘটনা ঘটলে সেখানেও তাঁরা উদ্ধার তৎপরতা চালান। কিন্তু এর বাইরেও যে তাঁদের কাজের ক্ষেত্র কতটা বিস্তৃত, তা মাঝে মাঝে সংবাদমাধ্যমে আসে। গত দুই মাসে সে রকম কিছু খবর থেকে বোঝা যায় তাঁদের কর্মপরিধি কতটা বহুমাত্রিক। গত মঙ্গলবার রাজশাহী নগরের আলুপট্টি মোড়ে রাস্তার বিদ্যুতের তারে একটি ঘুড়ি আটকে যায়। ঘুড়ির সুতায় ঝুলছিল একটি চড়ুই পাখি। সহৃদয় একজন ফায়ার সার্ভিসে ফোন করলে তারা দ্রুত এসে চড়ুই পাখিটি উদ্ধার করে। ‘সঙ্গে সঙ্গে আকাশে উড়াল দেয় ছোট্ট পাখিটি।’ ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা জানান, পাখির একটি পায়ে সুতা আটকে ছিল। তাঁদের দুটি ইউনিট পাখিটি মুক্ত করার অভিযানে নেমেছিল। তিনি বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিস এখন দ্য লাইভ সেভিং ফোর্স। প্রতিটি প্রাণ রক্ষা আমাদের কর্তব্যের ভেতরেই পড়ে।’ এর কয়েক দিন আগে কুমিল্লায় একটি বিড়াল কীভাবে যেন এক উঁচু গাছের মগডালে গিয়ে আর নামতে পারছিল না। দুই দিন ওভাবে থাকার পর লোকজন ফায়ার সার্ভিসকে জানালে তারা এসে বিড়ালটিকে উদ্ধার করে। তারা উদ্ধার না করলে অনাহারে দুর্বল হয়ে অত উঁচু থেকে পড়ে হতভাগ্য বিড়ালটি হয়তো মারাই যেত। তার কয়েক দিন আগে আন্তর্জাতিক মাধ্যমের একটি খবর ছিল তাজ্জব হওয়ার মতো শুধু নয়, বড়ই বেদনার। ঘটনাটির অকুস্থল লন্ডনের একটি হাসপাতাল হলেও তাতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। প্রতিবেদনে তেমনটিই বলা হয়েছে। এক লোকের লিঙ্গে একটি আংটি ঢুকে গিয়েছিল। সাত-আটজন বিশিষ্ট সার্জন এবং পুরুষ ও নারী নার্স ওই আংটি খুলতে যখন গলদঘর্ম, তখন ডাক পড়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আট ঘণ্টা পর আংটিটি বের করা সম্ভব হয়। কীভাবে আংটিটি ওই প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের বিশেষ দেহযন্ত্রে ঢুকল এবং আটকে গেল, সে ব্যাপারে বিপন্ন ব্যক্তিটি কিছু জানাননি। যাহোক, লিঙ্গ থেকে আংটি উদ্ধারে চিকিৎসকেরা নন, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাই প্রধান ভূমিকা পালন করেন। খবরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ দুটি: পুরুষের বিশেষ অঙ্গে আংটি গিয়ে আটকে যাওয়া এবং ফায়ার সার্ভিস কর্তৃক তা উদ্ধার। ফায়ার সার্ভিসের মূল কাজ অবশ্য চড়ুই পাখি, বিড়াল বা কারও দেহযন্ত্রে আটকে যাওয়া আংটি উদ্ধার নয়। ওগুলো কখনো-সখনো করতে হয়। প্রধান কাজ আগুন নেভানো এবং কোথাও কোনো ভবনে বা পানিতে অথবা অন্য কোথাও মানুষ বা গবাদিপশু আটকা পড়লে তাদের উদ্ধার করা।
যেমন বাংলাদেশে পোশাকশিল্প কারখানায় আগুন লাগলে বা রানা প্লাজার মতো কোনো ভবন হাজার হাজার কর্মী নিয়ে ধসে পড়লে তাঁদের উদ্ধারকাজ চালানো। আমরা দেখেছি ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের জীবন বাজি রেখে রানা প্লাজা বা তাজরীনে উদ্ধারকাজ চালাতে। প্রশাসনের অবহেলার কারণে অন্ধ কূপে পড়ে যাওয়া জিহাদের মৃতদেহ উদ্ধার। পৃথিবীর কোনো কোনো দেশের বনভূমিতে যেমন দাবানল হয়, তার আগুন নেভাতে হয় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের; বাংলাদেশের বনভূমিতে দাবানলের প্রকোপ না থাকলেও বস্তিতে দাবানল খুব ঘন ঘনই ঘটে। ১২ মার্চ বাংলাদেশে দুটি বড় দুর্ঘটনার খবর ছিল। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয় কাঠমান্ডুতে। প্রাণহানি ঘটে ৫১ যাত্রীর। ঢাকার মিরপুর মোল্লাহপুরী বস্তিতে আগুনে পুড়ে ছাই হয় পাঁচ হাজারের মতো ঘর। সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে ২৫ হাজার মানুষ। উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার মর্মান্তিক ঘটনায় বস্তি ভস্মের ঘটনাটি আড়াল পড়ে যায়। পৃথিবীর বহু আধুনিক শহরের বাসিন্দার সংখ্যাও ২৫ হাজার নয়। আমাদের বস্তিগুলোতে যাঁরা বাস করেন, তাঁরা সবাই শ্রমজীবী ও উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। কেউ পোশাকশ্রমিক, কেউ কারখানার শ্রমিক, কেউ যানবাহনের চালক ও শ্রমিক, কেউ গৃহকর্মী, কেউবা ছোট দোকানদার-ব্যবসায়ী। এই রিপাবলিকে তাঁদের প্রয়োজন রয়েছে। এখন বস্তিবাসী কারও ঘরে রয়েছে একটি পুরোনো টেলিভিশন সেট বা ফ্রিজ। সব হারিয়ে আজ ২৫ হাজার মানুষ নিঃস্ব। এক সপ্তাহেও তাঁরা সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ বিশেষ পাননি, পুনর্বাসনের ব্যবস্থার তো প্রশ্নই আসে না। এক বাসিন্দা নার্গিস আক্তার বলেছেন, ‘সরকার নাই, এনজিও নাই। থালা নাই, বাটি নাই। পলিথিনে ভাত আইন্যা পলিথিনে কইরাই খাইতে হয়। এক কাপড়ে জানডা হাতে নিয়া বাইর হইছিলাম। সেই কাপড়েই আছি।’ (প্রথম আলো, ১৮ মার্চ, ঘটনার পাঁচ দিন পরে।) সাধারণত আমাদের দেশে বস্তিতে আগুন লাগে মধ্যরাতে, যখন ছেলেমেয়ে নিয়ে মানুষ ঘুমিয়ে থাকে। আকস্মিক কারণে হোক, রহস্যজনক কারণে হোক বা বোধগম্য কারণে হোক, আগুনে যখন দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে শত শত ঝুপড়িঘর, তখন ফায়ার সার্ভিস ছাড়া আর গতি নাই। তবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের কাজ আগুন নেভানো এবং আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করা; লুটপাটকারীদের তাড়ানো নয়। বাংলার মাটিতে বস্তিতে বা বাজারে আগুন লাগলে আগুনে পুড়ে যত জিনিস ছাই হয়, লুটপাটে খোয়া যায় তার চেয়ে বহু গুণ বেশি। মোল্লাহপুরীতেও তাই ঘটেছে। বস্তিতে আগুন লাগলে শুধু ফায়ার সার্ভিসের ওপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে পারেন না। আগের দিনে তাঁদের দায়িত্বই দেখা যেত সবচেয়ে বেশি। বড় বড় অগ্নিকাণ্ডে প্রশাসনের লোক, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, সমাজসেবী-সবাই ঝাঁপিয়ে পড়তেন। এখন দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে দেখার লোকের সংখ্যা বেড়েছে, সাহায্যের হাত বাড়ানো মানুষ বিলুপ্তপ্রায়। অথচ বস্তিগুলোর ‘খালা’দের ব্যবহার করছেন সমাজের কেউকেটারা, যাঁরা পাজেরো চালান। তাঁরা বস্তিতে ‘বাবা’র (ইয়াবার সংক্ষিপ্ত ও কথ্য রূপ) ছোটখাটো আড়ত গড়ে তুলেছেন। পোড়া বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনে এগিয়ে আসা তাঁদের ‘নৈতিক’ কর্তব্য। ফায়ার ব্রিগেড আগুন নেভায় বস্তির, কিন্তু বস্তিবাসীর বুকের ভেতরের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে সারা জীবন। মানুষের বুকের আগুন নেভানোর মতো অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র আজও উদ্ভাবন করেননি কোনো বিজ্ঞানী।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক

ব্যবসায়ী সজলের ফিরে আসা

যেকোনো বিবেচনাতেই হোক, শহীদপুত্র ব্যবসায়ী সজল চৌধুরীর ফিরে আসা একটি স্বস্তির বিষয়। তাঁর প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে যাঁরাই ভূমিকা রেখেছেন, তাঁরা ধন্যবাদার্হ্য। এ ধরনের অপহরণের পর কেউ কেউ ফিরে আসেন, কেউ কেউ ফেরেন না। কিন্তু সব ক্ষেত্রে যে সাধারণ মিলটি রয়েছে তা হচ্ছে এই অপহরণকারী চক্র সম্পর্কে আমরা আর কিছুই জানতে পারি না। এই চক্রকে চিহ্নিত করা যে দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তা তারা বিবেচনায় নেয় বলে মনে হয় না। ব্যবসায়ী সজল চৌধুরী অপহরণের ব্যাপারে ফিরে এসে নির্যাতনের যে বিবরণ দিয়েছেন, তাকে প্রাথমিকভাবে তদন্তযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সে ক্ষেত্রে শুরুতেই এটা খতিয়ে দেখা দরকার যে নগরীতে ব্যবসায়িক বা পারিবারিক কোনো বিরোধের পরিণতিতে এভাবে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের অপহরণ অভিযান এত সফলভাবে পরিচালনা করা কী করে সম্ভব হলো? এটা দুর্ভাগ্যজনক যে সে বিষয়ে আমাদের এলিট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর তরফে কোনো ব্যাখ্যা আমরা পাইনি। সজল চৌধুরীর বক্তব্যে র‍্যাবের প্রসঙ্গ এসেছে, সেই সূত্রে র‍্যাবের গণমাধ্যম মুখপাত্রকে আমরা কেবলই আত্মপক্ষ সমর্থন করতে দেখলাম। জনগণের কাছে সত্য প্রকাশের কোনো তাগিদ আমরা দেখলাম না। কারণ, র‍্যাব বা ডিবি বলে কোনো কথা নয়, সজল চৌধুরীকে যেভাবে অপহরণ করে ফেরত দেওয়া হয়েছে, তাতে সমাজে বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটা অজানা ভীতি ও আশঙ্কার বিস্তার ঘটতে পারে। ‘ডিবি’ পরিচয় দিয়ে তুলে নেওয়া বা দরজার চাবির রিংয়ে দৃশ্যত র‍্যাব-১–এর লোগো ব্যবহার করার মতো বিষয়গুলো ছদ্মবেশী ভাড়াটে গোষ্ঠীগুলোর পরিকল্পিত কৌশলের অংশ হতেই পারে। কিন্তু যখন যেটা ঘটেছে বা প্রতীয়মান হয়েছে, সেসবের অবিকল বিবরণ দেওয়া ভুক্তভোগীর মৌলিক অধিকার এবং সেসবই সরকারি তদন্ত সংস্থাগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। কিন্তু এসবের সত্যতা সম্পর্কে তদন্তের আগে কোনো মন্তব্য করা পেশাদারত্বের পূর্বশর্তগুলোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। যারাই সজল চৌধুরীকে তুলে নিক, এই ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক যোগসূত্রের কোনো ইঙ্গিত এখনো মেলেনি।
যেটা আপাতত পরিষ্কার সেটা হলো সজল চৌধুরী যেকোনোভাবেই হোক, ব্যক্তিগত স্বার্থের টানাপোড়েনের কারণে প্রতিহিংসার শিকারে পরিণত হয়েছিলেন। আরও আশঙ্কা হলো এ ধরনের প্রতিহিংসা মেটানোর জন্য নগরীতে বেসরকারি বাহিনী ভাড়া করা যায় এবং যারা এমনই সাফল্যের সঙ্গে অপারেশন পরিচালনা করতে পারে, যার সঙ্গে কোনো চৌকস বাহিনীর দক্ষতার সঙ্গে সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায়। অন্যদিকে বিষয়টিকে এখন যেভাবে বাহ্যত মূল্যায়ন করা হচ্ছে বা সন্দেহ করা হচ্ছে, তার সঙ্গে প্রকৃত ঘটনার মিল নাও থাকতে পারে। ফলে এই ঘটনার বিশ্বাসযোগ্য রহস্যভেদ ও কারা এই কাজটি করেছে তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করার বিষয়টি খুবই জরুরি। অপহরণের শিকার সজল চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের তরফে যেহেতু র‍্যাব ও ডিবির নাম উচ্চারিত হয়েছে, তাই অপহরণকারী চক্রকে ধরে তাদের প্রমাণ করা উচিত যে প্রকৃত অপকর্ম কারা করেছে। তা ছাড়া দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে এ ধরনের অপহরণকারীদের ধরে বিচারের মুখোমুখি করা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তা করতে না পারলে সেটা বাহিনীগুলোর ব্যর্থতা হিসেবেই বিবেচিত হবে। সজল চৌধুরীকে অপহরণকারীদের মতো বিপজ্জনক, চৌকস ও প্রশিক্ষিত গোষ্ঠী যদি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়, তবে যে কেউ এদের শিকারে পরিণত হতে পারে। আমরা এই ঘটনার বিভাগীয় ও বিচারিক তদন্ত দাবি করছি।

বড় নদীতে ছোট নৌযান

বড় নদীতে স্পিডবোট ও ছোট ট্রলার চলাচলের নিয়ম নেই। কিন্তু দেশের বড় বড় নদীতে নিয়ম লঙ্ঘন করে বেপরোয়া গতিতে চলছে এসব নৌযান। এতে করে যেকোনো সময় মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কিন্তু এসব দেখার যেন কেউ নেই। ১৫ মার্চ প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেঘনা, কীর্তনখোলা ও তেঁতুলিয়া নদীতে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে প্রচুরসংখ্যক স্পিডবোট, ট্রলার ও লঞ্চ চলাচল করছে। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের বিধি অনুযায়ী, বড় নদীতে ২০ মিটারের নিচের লঞ্চ ও ট্রলার চলাচল নিষিদ্ধ। কিন্তু এ নিষেধ মানা হচ্ছে না। অবাধে চলছে এ ধরনের নৌযান। একটি স্পিডবোটে আটজনের বেশি যাত্রী ওঠানোর নিয়ম না থাকলেও এর চেয়ে বেশি যাত্রী ওঠানো হয়। ট্রলারগুলোও অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে বেপরোয়া গতিতে চলাচল করছে। আবহাওয়া খারাপ হলে বা নদী হঠাৎ উত্তাল হয়ে পড়লে এসব নৌযানের দুর্ঘটনায় পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে স্পিডবোট উল্টে একজন চিকিৎসক ও তাঁর পরিবারের চারজন মারা যান। এর আগেও কয়েকটি দুর্ঘটনায় অনেক প্রাণহানি হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে এগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
নদীপথের শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএ ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের। কিন্তু তারা যে তাদের দায়িত্ব পালন করছে না, তা তো বোঝাই যাচ্ছে। কোথাও কোনো নজরদারি নেই। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুর ও পুরো বরিশাল বিভাগে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মাত্র একজন পরিদর্শক রয়েছেন। বিআইডব্লিউটিএর একজনও নেই। ফলে নিয়ম না মেনে বেপরোয়াভাবে চলা এসব নৌযানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো জনবলও নেই। বোঝাই যাচ্ছে দ্রুত লোকবল সংকটের সমাধান করা না গেলে কোনোভাবেই এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বিআইডব্লিউটিএ ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের যে হিসাব তুলে ধরা হয়েছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। এই দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, দৈর্ঘ্যে ২০ মিটারের নিচে এমন প্রায় ১০ হাজার লঞ্চ, ট্রলার ও স্পিডবোট দেশের নদীগুলোতে চলাচল করছে। এগুলোর প্রায় অর্ধেক চলাচল করছে বরিশাল, ভোলা ও দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য এলাকার নদীতে। আর ১৬ অশ্বশক্তির নিচের নৌযানের নিবন্ধন লাগে না বলে এগুলোর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এসব ছোট ছোট নৌযান বড় নদীতে চলাচল তো করছেই। এর পাশাপাশি এগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা না নিয়ে চালনা ও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। বড় নদীতে এসব নৌযানের চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য বিআইডব্লিউটিএ ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নদীগুলোতে নজরদারি বাড়াতে লোক নিয়োগ করতে হবে। নিয়ম লঙ্ঘনকারী নৌযানগুলোর মালিকদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

মিয়ানমারে গণতন্ত্র কত দূর এগোল? by মং জার্নি

অধ্যাপক অমর্ত্য সেন উন্নয়নকে চমৎকারভাবে ‘স্বাধীনতা’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় ‘উন্নয়ন’ শব্দটি তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে অমর্ত্য সেন যখন অধ্যাপনা করতেন, তখন তাঁর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিলেন মিয়ানমারের বর্তমান কার্যত সরকারপ্রধান অং সান সু চি। অমর্ত্য সেনের সেই ছাত্রীটি নিশ্চয়ই ‘উন্নয়ন’-এর মানে বোঝেন। এ কারণে তিনি তাঁর রাখাইনবিষয়ক উপদেষ্টামণ্ডলী এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের গণহত্যাকে ‘উন্নয়নের ঘাটতি’ হিসেবে তুলে ধরতে পরামর্শ দিয়ে রেখেছেন। তাঁরাও সমানে এই কথা বলে যাচ্ছেন। কিন্তু সু চি শিবিরের এই প্যাঁচানো কথার সত্যতায় গলদ রয়ে গেছে। সেটা হলো: (অর্থনৈতিক) উন্নয়নের অনুপস্থিতির কারণে কখনো গণহত্যা হয় না, মানবতাবিরোধী অপরাধও হয় না। সাধারণত সুশিক্ষিত ও সচ্ছল গোষ্ঠী ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে গণহত্যা চালায়। হিটলারের ঘনিষ্ঠ সহচরদের প্রায় সবাই হার্ভার্ড ও হামবুর্গ থেকে পাস করা উচ্চশিক্ষিত নাৎসি ছিলেন এবং ওয়াল স্ট্রিটের আইকন হিসেবে পরিচিত ধনকুবেরদের সঙ্গে তাঁরা খানাপিনা করতেন। অশিক্ষিত এবং না খাওয়া লোকজন খিদের জ্বালায় কিংবা অস্তিত্বসংকট থেকে বড়জোর রাস্তাঘাটে ছিঁচকে অপরাধ করে বেড়ায়। কিন্তু গণহত্যার অর্থ ব্যাপক। পরিকল্পিত ছক অনুযায়ী রাষ্ট্র যখন সংখ্যালঘুদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য শুদ্ধি অভিযানের মতো নৃশংস অভিযান চালিয়ে মানুষ মারতে থাকে, তখন সেটিকে গণহত্যা বলা যেতে পারে। কেউ যদি সু চির মিত্রদেশ যুক্তরাজ্যের কিংবা সু চির উপদেষ্টা দলের মধ্য থেকে আসা নীতিবিষয়ক ঘোষণাগুলোর দিকে লক্ষ করেন, তাহলে দেখতে পাবেন সু চির এই সরকার পুরো মাত্রায় কর্তৃত্ববাদী। গণতন্ত্রের ছিটেফোঁটাও এ সরকারে নেই। তাঁরা আত্মপ্রতারণার মতো বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বলছেন, উন্নয়নই হচ্ছে রাখাইন সমস্যার একমাত্র সমাধান। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সেনারা রাখাইনে ‘নিরাপত্তাজনিত উচ্ছেদ অভিযান’ শুরু করার পর রোহিঙ্গাদের যে অবস্থা হয়েছে, সেটিকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে সু চির ক্ষমতার অন্যতম অংশীজন সিনিয়র জেনারেল মিন অং লাই কয়েক দিন আগে একটি বিবৃতি দিয়েছেন।
তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে যে লড়াই হয়েছিল, সেই লড়াইয়ের ‘অমীমাংসিত বিষয়’ হচ্ছে এখনকার সহিংসতা। ক্ষমতার জন্য লালায়িত এসব বার্মিজ আমলা স্বীকারই করেন না মিয়ানমারে গণহত্যা কিংবা জাতিগত নিধন চলছে। ব্রিটিশ সরকারও তাদের স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকা অক্সফোর্ড পড়ুয়া সু চির পক্ষে জোর প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। রাখাইনে চালানো গণহত্যার দায় থেকে সু চিকে বাঁচানোর জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যরা সব ধরনের চেষ্টা করছেন। কিন্তু তারপরও শান্তিতে নোবেলজয়ী সু চিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের দৃষ্টিসীমার বাইরে রাখা সম্ভব হয়নি। নোবেলজয়ী পরিচয় ছাপিয়ে ক্রমেই তিনি ‘গণহত্যার সহযোগী’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছেন। তবে ব্রিটেনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক ফিল্ড সম্প্রতি সু চিকে ‘মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক উত্তরণের অধিনায়ক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বার্মা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে পৌঁছাতে আমি মনে করি এই অবস্থাতেও দেশটির গণতান্ত্রিক উত্তরণযাত্রাকে যুক্তরাজ্যের সমর্থন জানাতে হবে এবং দেশটির স্বাধীনতা, সহিষ্ণুতা ও বৈচিত্র্যকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করতে হবে।’ এফসিওর (ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিস) অবসরপ্রাপ্ত মাননীয় কর্মকর্তা (মার্ক ফিল্ড), ‘দীর্ঘমেয়াদি সমাধান’ বলতে আপনি কী বোঝাতে চান? রোহিঙ্গাদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য আজ থেকে ৪০ বছর আগে ১৯৭৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমার সরকার যে অভিযান শুরু করেছিল, তার ধারাবাহিকতাকেই কি আমরা ‘দীর্ঘমেয়াদি সমাধান’ হিসেবে ধরে নেব? সম্প্রতি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একটি শুনানি হয়েছে। সেখানে মিয়ানমারে গণতন্ত্রের উন্নয়নে আর্থিক সহায়তাদানকারী ওয়েস্টমিনস্টার ফাউন্ডেশন ফর ডেমোক্রেসির প্রতিনিধিদের বক্তব্য শোনা হয়। সেখানে ওই প্রকল্পের দুজন কর্মকর্তা স্বীকার করতে বাধ্য হন, তাঁদের এই প্রকল্প মিয়ানমারের কয়েক শ এমপির মধ্যে একজন এমপিও সৃষ্টি করতে পারেনি, যিনি রোহিঙ্গাদের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে পারেন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রাতিষ্ঠানিক নীতি হিসেবে ‘নো মুসলিম অফিসার’ নীতি মেনে চলে। সু চিও সেই নীতি অনুসরণ করে ইতিমধ্যে তাঁর দল এনএলডিকে মুসলিম প্রতিনিধিমুক্ত করে ফেলেছেন। মিয়ানমারে আধুনিক আইনসভা চালুর পর এবারই প্রথমবারের মতো মুসলিমবিহীন পার্লামেন্ট চলছে এবং এটির নিয়ন্ত্রণে আছে শান্তির দূত সু চির দল এনএলডি। পরিহাসের বিষয় সাবেক জেনারেল থেইন সেইনের আমলে মিয়ানমারের সুশীল সমাজ যতটা প্রকাশ্য হতে পারত, এখন সু চির আমলে তারা সেটুকুও পারে না। তবু যুক্তরাজ্যের মতো দেশের কর্মকর্তারা অবিরাম বলছেন, সু চিই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। এ কারণে তাঁরা তাঁর পাশে থাকবেন।
ইংরেজি থেকে অনূদিত।
মং জার্নি: মিয়ানমারের নির্বাসিত মানবাধিকারকর্মী