Tuesday, May 12, 2015

জামায়াত বুদ্ধিজীবীদের ভাবনায় বিএনপির ভবিষ্যৎ

জামায়াত বুদ্ধিজীবীরা মনে করেন রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্থানের পরে বিএনপি টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। জামায়াতে ইসলামীর তিন বুদ্ধিজীবীর এই  বিরল বিএনপি ভাবনা সম্প্রতি ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রকাশিত ‘লিমিটস অব ইসলামিজম জামায়াতে ইসলামী ইন কনটেম্পরারি ইন্ডিয়া অ্যান্ড বাংলাদেশ’ বইয়ে ছাপা হয়েছে। বইটির লেখক কলকাতা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মইদুল ইসলাম। বইটিতে বাংলাদেশ ও ভারতের জামায়াতে ইসলামীকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ইসলামিজমের ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করেছে। বহুক্ষেত্রে ভারত ও জামায়াতের নেতৃবৃন্দের চিন্তাভাবনায় কিভাবে সমসাময়িক আঞ্চলিক ও বিশ্ব পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটে তার একটা তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। জামায়াতের তিনজন বুদ্ধিজীবীর সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হয়েছে। বইয়ের তথ্যমতে ২০০৯ সালের জুনে লেখক ঢাকায় এসে নিজেই পৃথকভাবে তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।
ওই বইয়ে সাক্ষাৎকারদাতা ও তাদের পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে এভাবে: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের অধ্যাপক চৌধুরী মাহমুদ হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এটিএম ফজলুল হক। 
 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের অধ্যাপক চৌধুরী মাহমুদ হাসান বলেন, ‘জামায়াত বর্তমানে একটি সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক ও গবেষণা সেল না থাকার সংকটে ভুগছে। বিএনপি দুর্বল হয়ে গেলে জামায়াত সাফল্যের সঙ্গে ভারত বিরোধী ও আওয়ামী লীগ বিরোধী বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটা একটা প্রকৃত সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দেবে। কারণ বেগম খালেদা জিয়ার পরে বিএনপি টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। বিএনপি মতাদর্শগতভাবে একটি শিথিল এবং অসংগঠিত সংগঠন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এটিএম ফজলুল হক বলেন, জামায়াত সমর্থক জনগোষ্ঠী স্বভাবগতভাবে অধিকতর নরম এবং কথাবার্তা অপেক্ষাকৃত কম বলেন। তাদের বেশির ভাগই অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতো পেশাদার সংগঠক নন। আরেকটি মারাত্মক সমস্যা হলো, জামায়াতকে একটি গতিশীল আদর্শগত দল হিসেবে গড়ে তুলতে তাদের বৃদ্ধিবৃত্তিক অবদান রাখার বিষয়ে ঘাটতি আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মতো বিএনপি কোন আদর্শগত সংগঠন নয়। বিএনপি বাম, ডান ও মধ্যপন্থিদের একটি কৌতূহলোদ্দীপক মিশ্র সংগঠন, অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগ থেকেই আওয়ামী লীগের একটি আদর্শগত উত্তরাধিকার ছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সাধারণ ভোটারদের কাছে টানতে অনেক বেশি পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছে। এমনকি যারা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ছিল, তাদেরকে দলীয় টিকিট প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। উপরন্তু তারা জাতীয় পার্টির মতো জোট শরিককে অনেক বেশি স্বাধীনতা দিয়েছে।’
অধ্যাপক ওমর ফারুক আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের স্মৃতিশক্তি ভীষণ দুর্বল। আগের সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহারের চেয়ে তারা বরং সর্বশেষ ক্ষমতাসীন দলের সরকারের  দুষ্কর্ম মনে রাখেন।’
ঢাকার সরকারি আলীয়া মাদরাসার গণিতের শিক্ষক এবং জামায়াত সদস্য বলেন, ‘২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াত প্রায় ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনের মতোই ভোট ভাগাভাগি করেছে। তবে ২০০৮ সালে প্রিজাইডিং অফিসার ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নির্বাচন পরিচালনা ও ভোট গণনায় ব্যাপক অনিয়মের আশ্রয় নেন। তাই সেখানে কোন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। তবে বিএনপির দুর্নীতি অবশ্যই একটি ইস্যু ছিল।’

ফার্স্ট ক্লাস নির্বাচন ও গণতন্ত্রের ভীষণ বিজয় by শাহদীন মালিক

বাংলাবাজার গার্লস স্কুল কেন্দ্রে সরকারি দলের প্রার্থীর
পক্ষে ব্যালটে সিল মেরে ধরা পড়েছেন নির্বাচনী কর্মকর্তা
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ইদানীংকালের বক্তব্য-ভাষণের কিছু কথাবার্তার ব্যাপারে মনে মনে সমালোচনামূলক চিন্তাগুলো নিয়ে কাগজে–কলম ঠেকাব ঠেকাব করছিলাম। ভাগ্যিস তা করিনি, লিখলে বা তা প্রকাশিত হলে হাটে হাঁড়ি ভাঙার মতো সব জারিজুরি ফাঁস হয়ে যেত। অধম যে নিতান্তই অর্বাচীন, একেবারে গোমূর্খ তা প্রথম আলোর পাঠকমাত্রই অতি সহজেই বুঝতে পারতেন। অবশ্য এমন নয় যে পাঠককুল সেটা অনুধাবন করেন না, তবে একটা সান্ত্বনা আছে, যেহেতু অকাঠ মূর্খের মতো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইদানীংকালের নির্বাচনসংক্রান্ত বক্তব্যের সমালোচনা করে কিছু লিখিনি, সেহেতু বোকামিটা কিছুটা আড়াল করা গেছে!
একেবারে সাচ্চা রিপোর্টারের মতো অন্য কারও বক্তব্য হুবহু উদ্ধৃত করার ক্ষমতা বা দক্ষতা নেই। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রচণ্ডভাবে অনুভূতিতাড়িত বক্তব্যগুলোর কথা বলতে গিয়ে কিছুটা এদিক-সেদিক হয়ে যেতে পারে। তবে আসল কথা তুলে ধরতে চেষ্টার কমতি হবে না। সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবার যে কথাগুলো বলছিলেন তার সারবত্তা ছিল অনেকটা এ রকম—বিএনপি ও তার দোসররা জঙ্গিবাদী। খোদ বিএনপি সরাসরি জঙ্গিবাদী দল না হলেও (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঠিক এভাবে বলেননি, অধম তাঁর মূল কথা ঠিক রেখে নিজের মতো করে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলছি) নিঃসন্দেহে জঙ্গিবাদের ইন্ধনদাতা, সাহায্যদাতা, মদদদাতা ইত্যাদি। লোকজন, টাকাপয়সা, অর্থ, বুদ্ধি, সমর্থন, আশ্বাস—সবকিছু দিয়ে বিএনপি জঙ্গিবাদের অহরহ সাহায্য করছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় বক্তব্য ছিল বিএনপির তথাকথিত আন্দোলনের নামে নির্মমতা আর নৃশংসতা নিয়ে। অর্থাৎ পেট্রলবোমায় লোক মারা নিয়ে। বিএনপি আন্দোলনের নামে প্রায় তিন মাস ধরে আগুনে পুড়িয়ে লোক মেরেছে। বীভৎসভাবে, নির্মমভাবে শিশু, নারী, নিরীহ বাসচালক, চালকের সহকারী, যাত্রী—সবাইকে মেরেছে। স্কুল-কলেজের ছাত্রী, এমনকি অন্তঃসত্ত্বা নারী—কেউ রেহাই পায়নি। মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে দিনের পর দিন যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে তাদের অনেকের মৃত্যু হয়েছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মার্চ-এপ্রিল মাস বা তারও আগে থেকে বক্তব্যের তৃতীয় অংশ ছিল বিএনপির তথাকথিত অবরোধ-হরতাল-আন্দোলনের কারণে দেশের অর্থনীতির সমূহ ক্ষতি। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত বাজারে পাঠাতে না পারার কারণে কৃষিজাত পণ্য, উৎপাদনকারী কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি। প্রধানমন্ত্রী বলেননি, কিন্তু অবরোধের কারণে মক্কেল আসতে না পারার কারণে অধম গোছের আইনজীবীদেরও দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। অবশ্য সেটা বড় কথা নয়। আসল কথা, অর্থনীতি প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়ে গিয়েছিল। তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। যা হোক জঙ্গিবাদ, পুড়িয়ে মানুষ মারা, অর্থনীতিকে ধ্বংস করা—এসবের জন্য যারা দায়ী, তাদের তো আর এ দেশের মানুষ—ভোটাররা ভোট দিতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বুঝেছিলেন, জেনেছিলেন যে ওদের এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ মাতৃভাষার জন্য রক্ত দেওয়া, অসাম্প্রদায়িক, অর্থাৎ আপামর ভালো নাগরিক ভোট দেবে না, ভোট দিতে পারে না। পাকিস্তানপন্থী বা পাকিস্তানিদের দালালরা কোনো ভোটারকে প্ররোচিত করতে পারবে না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের রাজনীতিতে পাকিস্তানপন্থীদের গভীর ষড়যন্ত্রের দিকে মাঝে মাঝে অঙ্গুলি নির্দেশনা দেন। পুরোপুরি পশ্চিমা না হলেও স্বাধীনতার পর অর্ধশতাব্দী তো পার হতে চলল। এ দেশে এখনো কারা পাকিস্তানপন্থী? এই যে এক মাস ধরে আমরা ক্রিকেটে পাকিস্তানিদের যে পেদানি দিচ্ছি, তাতে উল্লসিত না হয়ে খেলা শেষে ঘরের দরজা বন্ধ করে পরাজয়ের দুঃখে হু হু করে কেউ কেঁদেছেন বলে তো শুনিনি। অবশ্য পাকিস্তানের পরাজয়ে যাঁরা কান্নাকাটি করেছেন, তাঁরাই বোধ হয় পাকিস্তানপন্থী। পুলিশ, ডিবি, এনএসআই, র্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআইসহ আরও বহু সংস্থার মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় তাঁদের ব্যাপারে খোঁজখবর পান। এই ধরেন মাহমুদুর রহমান মান্না আর সাদেক হোসেন খোকার কথোপকথন, টেলিফোনে ঢাকা থেকে সেই নিউইয়র্ক। এতে বোঝা যায় ষড়যন্ত্র কত গভীর, একেবারে বিশ্বব্যাপী।।
২....
আর তাই ঠিকই জেনেছিলেন, বুঝেছিলেন যে ঢাকা আর চট্টগ্রামের ভোটাররা বিএনপিকে ভোট দেবে না। জঙ্গিবাদ, মানুষ পুড়িয়ে মারা, দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করা, ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা ব্যাহত করার জন্য হরতাল দেওয়া, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার চেষ্টা— এত সব বদকাজ যাদের স্বভাবজাত, সেই বিএনপিকে তো আর বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক জনগণ ভোট দিতে পারে না। ২৮ এপ্রিলের তিন সিটি নির্বাচনে তা-ই হয়েছে।
যেহেতু ভোটাররা বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে আসলেই ভোট দিতেন না, তাই তাঁদের পক্ষ হয়ে আওয়ামী-সমর্থকেরা তাঁদের সেই কাজটি অনেকটাই সহজ করে দিয়েছেন। সবাই তো আর দেশপ্রেমিক না, কিছু লোক এত কিছুর পরও হয়তো বিএনপি মার্কায় সিল মারতেন। তাই তাঁদের মার্কায়ও কিছু সিল মারা হয়েছে। ধারণা করছি, সব কর্মীর সাক্ষরতা জ্ঞান সমান না, তাই হয়তো না বুঝে বিএনপির মার্কায় সিল কিছু বেশিই মেরে দিয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনের আগে সিল মারার ট্রেনিংয়ের ব্যাপারে একটু সতর্ক হতে হবে। অবশ্য নৌকা, ধানের শীষ, লাঙ্গল (দাঁড়িপাল্লা থাকবে না, কারণ জামায়াত নির্বাচন করতে পারবে না) ইত্যাদি পুরোনো মার্কা। ভুল হবে না।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে ভোট পড়েছিল খুবই অল্প, ৫ জানুয়ারি ২০১৪-তে ভোট পড়বে না জেনে নির্বাচনেই আসেনি; আর গত দুই-তিন বছরের অপকর্মের কারণে সিটি নির্বাচনে যে ভোট বিএনপির বাক্সে পড়বে না, সেটা সবার আগে বুঝতে পেরেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। হয়েছেও তা-ই।
৩....
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশ্লেষণ যদি আমরা বিবেচনায় নিই, যা তিন সিটি নির্বাচনের ফলাফলে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে—তাহলে এটা এখন দাবি করার সময় এসেছে যে যদি আমাদের রাজনীতিতে অচিরেই কোনো গুণগত পরিবর্তন না আসে, অর্থাৎ বিএনপির জায়গায় শক্তিশালী কোনো বিরোধী দলের আবির্ভাব না হয়, তত দিন নির্বাচন-টির্বাচনের দরকার নেই। বিদেশিরা আমাদের বাস্তবতা অনুধাবন না করে চেঁচামেচি করবে। হয়তো তাদের মুখ বন্ধ করার জন্য নির্বাচনের তারিখ-টারিখ দিতে হবে। তবে ফলাফল তো জানা আছে, তাই কর্মীদের দিয়ে নৌকা মার্কাতে সিল দেওয়ার জন্য কেন্দ্র, বুথ ইত্যাদি করতে হবে, প্রিসাইডিং অফিসার, পুলিশ ইত্যাদি নিয়োজিত করতে হবে। একটা নির্বাচন কমিশনও লাগবে। সবচেয়ে ভালো হয় বর্তমান নির্বাচন কমিশনকেই আরও বছর দশেকের জন্য রেখে দিলে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি আর ২৮ এপ্রিলের সুষ্ঠু, সঠিক এবং বিউটিফুল নির্বাচন করার পুরস্কার হিসেবে তারা আরও ১০ বছর থাকতেই পারেন, থাকা উচিত।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও সফল হয়েছে। কাগজ-কলমে এখনো নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী আছি। কমিশন যেহেতু সুষ্ঠু, সঠিক, ভালো কাজ করছে, সেহেতু তাদের পক্ষে আর ওকালতি করা সাজে না। অবশ্য স্বীকার করতেই হবে, কমিশনও ইদানীং অধমের কোনো সাহায্য-সহযোগিতা কামনা করেনি। তাদের আর দরকারও নেই। তাই ইস্তফাপত্রটা পাঠিয়ে দেব।
যেটা বলছিলাম, শুধু স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচন নয়, অন্যান্য নির্বাচনেও ভোটাররা তো পাকিস্তানপন্থী, জঙ্গিবাদী, মানুষ পুড়িয়ে মারা, অর্থনীতি ধ্বংস করা, দুর্নীতিপরায়ণ ক্ষমতালোভী জোচ্চরদের ভোট দিতে পারেন না। এই সুবাদে প্রথম আলোর পাঠককুলকে জানিয়ে রাখি, আমাদের বার কাউন্সিলের নির্বাচন ২০ মে। ওই নির্বাচনে সারা দেশের হাজার পঞ্চাশেক আইনজীবী ভোট দিয়ে তিন বছরের জন্য বার কাউন্সিলের ১৪ জন সদস্য নির্বাচিত করবেন। একটা খন্দকার মাহবুব হোসেন, মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রমুখের সমন্বয়ে বিএনপি প্যানেল। অন্যটি ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, মতিন খসরু, জেড আই খান পান্না, শ ম রেজা প্রমুখের সমন্বয়ে আওয়ামী প্যানেল।
বিজ্ঞ আইনজীবী ভোটাররা যেহেতু শুধু আইন মান্যকারী নন, নৈতিকতা মান্যকারীও বটে, তাই তাঁরা জঙ্গিবাদী, মানুষ পোড়ানো ইত্যাদি ইত্যাদি প্যানেলে তাঁদের ভোট দেওয়ার কথা নয়। তাই প্রত্যাশিত ফলাফল নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে—ডিসি, এসপি, স্থানীয় আওয়ামী নেতাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে হবে। বার কাউন্সিলের নির্বাচন একই দিনে প্রতিটি জেলা বারে হয়। তাই স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া প্রয়োজন। আর প্রয়োজন তরুণ আওয়ামী আইনজীবীদের মধ্যে কিছু ‘সিল মারা বিশারদ’
তৈরি করা। হাতে সময় আছে প্রায় আরও তিন সপ্তাহ।
৪....
কী দাঁড়াল? দাঁড়াল, প্রথমত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ দেশের মানুষ কেন কাকে ভোট দেবে, সেটা সবার আগে সবচেয়ে বেশি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কথা শুনে অন্যরাও সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু এই অধমের বুদ্ধিশুদ্ধি খুবই সীমিত। তাই অনেক দেরিতে হলেও ২৮ এপ্রিলের সিটি নির্বাচনের ফলাফলে প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন বক্তব্যের যথার্থতা এই অধম বুঝতে পেরেছে।
যেহেতু বিএনপিকে আর কেউ ভোট দেবেন না, সেহেতু ২০১৪ সালে শুরু হওয়া ‘ম্যানেজড ইলেকশন’ পন্থাটাই বজায় রাখতে হবে। সিটি নির্বাচনের পর এই ‘ম্যানেজড’ পন্থাটা বার কাউন্সিল দিয়ে শুরু করে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের বেলায়ও ক্রমান্বয়ে প্রয়োগ করা যায়। দরকার হলে ২০৪১ সাল পর্যন্ত যাতে দেশকে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত করার প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনায় কেউ বাধা সৃষ্টি করতে না পারে।
সবশেষে তিন সিটির তিন নবনির্বাচিত মেয়রকে অভিনন্দন। হয়তো অনেকে আপনাদের বলতে পারেন বা সমালোচনা করতে পারেন এই বলে যে আপনাদের বিজয়ের আইনি, নীতি, নৈতিকতার ভিত্তি নেই। প্লিজ ওতে দমে যাবেন না বা দুঃখ পাবেন না। কারণ, এ দেশ থেকে আমরা নীতি, নৈতিকতা আর আইনকে ঝেঁটিয়ে বিদায় দিয়েছি। সব ইলেকশনই ম্যানেজড। সবাইকে অভিনন্দন।
ড. শাহদীন মালিক: অাইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

নিখোঁজ সালাহ উদ্দিন শিলংয়ে মানসিক হাসপাতালে গ্রেফতার, রাতে মেঘালয় যাচ্ছেন স্ত্রী

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন সালাহ উদ্দিনের স্ত্রী
হাসিনা আহমেদ । ছবি: গোলাম মর্তূজা, প্রথম আলো
সর্বশেষ আপডেট :>১২ মে ২০১৫, মঙ্গলবার, ৫:৫১
নিখোঁজ বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদকে পাওয়া গেছে। তার স্ত্রী হাসিনা আহমেদ জানিয়েছেন, সালাহ উদ্দিন ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে একটি মানসিক হাসপাতালে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে শিলং পুলিশ জানিয়েছে, সোমবার সালাউদ্দিন (৫৪) নামে একজনকে আটক করা হয়েছে। সে অনুপ্রবেশকারী ছিল। এ ব্যাপারে তদন্ত চলছে।
মঙ্গলবার বেলা ৩টার দিকে  সংবাদ সম্মেলনে হাসিনা আহমেদ বলেন, সালাহ উদ্দিন আহমেদ শিলংয়ের মিমহ্যানজ মেন্টাল হসপিটালে চিকিৎসাধীন আছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই প্রথমে আমাকে ফোন করে বলে আপনার স্বামী আপনার সাথে কথা বলবেন। এরপর আমি তার সাথে কথা বলি।
হাসিনা আহমেদ বলেন, ‘উনি বলেছেন, আমি বেঁচে আছি। মোটামুটি সুস্থ আছি।’ সেখানে দ্রুত পৌঁছে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
হাসিনা আহমেদ বলেন, হাসপাতালের এক চিকিৎসক ফোন করে সালাহ উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেয়। তিনি সুস্থ আছেন বলে জানিয়েছেন।
তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, যাতে তিনি দেশে ফিরে আসতে পারেন সেজন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।
দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, দেশবাসী ঘটনার পর থেকেই আমাদের পরিবারের সঙ্গে ছিলেন। আমাদের সাহস দিয়েছেন। দোয়া করেছেন। দেশবাসীর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।
উল্লেখ্য, গত ১০ মার্চ রাতে নিখোঁজ হয়েছিলেন বিএনপির এই নেতা।
এদিকে স্থানীয় দৈনিক শিলংস টাইমস খবর দিয়েছে, সোমবার মেঘালয়ের গলফ গ্রীণ এলাকায় ঘোরাফেরা করার সময় সালাউদ্দিন আটক করে স্থানীয় পুলিশ। এসময় তাকে অপ্রকৃতিস্থত দেখচ্ছিল।  এরপর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সালাউদ্দিনকে আটকের খবর প্রকাশের পর মেঘালয় পুলিশ মঙ্গলবার দুপুরে তাকে মাসনিক হাসপাতাল থেকে স্থানীয় হাসপাতালে স্থানান্তর করে। বিকালে সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে বলে মেঘালয় পুলিশ গণমাধ্যমকে জানিয়েছে।
সালাহ উদ্দিন আহমেদের সন্ধান চেয়ে ১১ মার্চ রাতে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গুলশান ও উত্তরা পশ্চিম থানায় যান তাঁর স্ত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য হাসিনা আহমেদ। তবে কোনো থানাই তাঁর জিডি গ্রহণ করেনি।
সালাহ উদ্দিন আহমেদকে খুঁজে বের করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে স্মারকলিপি দেন তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমেদ।
রাজধানীর উত্তরার একটি বাড়ি থেকে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ১০ মার্চ—এমন অভিযোগ করে থানা পুলিশের পাশাপাশি উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন সালাহ উদ্দিনের পরিবার।
সালাহ উদ্দিনকে আনতে রাতে মেঘালয় যাচ্ছেন স্ত্রী -মানবজমিন
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিনকে দেশে আনতে ভারতের মেঘালয়ে যাচ্ছেন তার স্ত্রী সাবেক এমপি হাসিনা আহমেদ। আজ রাতে ছোট বোন জামাই মাহবুবুল কবির মুনমুন ও এক নিকটাত্মীয়কে নিয়ে রওনা হবেন তিনি। বিকালে মাহবুবুল কবির মুনমুন মানবজমিন অনলাইনকে জানান, ভিসা প্রসেসিংয়ের জন্য পাসপোর্ট নিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনে  যাচ্ছি। আশা করছি ভিসা হয়ে গেলে রাতেই রওনা হব। আমার সঙ্গে হাসিনা আপা ও এক আত্মীয় যাবেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইংয়ের কর্মকর্তা শায়রুল কবির খান জানান, ভিসা প্রসেসিংয়ের জন্য বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবিহ উদ্দিন আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে সালাহ উদ্দিন ভাইয়ের ছোট ভায়রা ভারতীয় হাইকমিশনে গেছেন। উল্লেখ্য, গত ১০ মার্চ রাতে সালাহ উদ্দিন আহমেদকে উত্তরার একটি বাসা থেকে সাদা পোশাকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ দুইমাস ধরে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর পক্ষ থেকেও তাকে গ্রেফতারের বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে ভারতের মেঘালয়ের পাসতোর হিলসে মেঘালয় ইস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরো সাইন্স (মিমহাস) হসপিটালের কর্তৃপক্ষ সালাহ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রীকে ফোন দেন। এসময় সালাহ উদ্দিন তার স্ত্রীকে পাসপোর্টসহ যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দেশে আনার কথা বলেন।

সরকারের সমালোচনায় বন্যা

লেখক ও ব্লগার অভিজিত রায়কে হত্যার পর পেরিয়ে গেছে আড়াই মাস। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত পরিচালনা করছে। তবে এখনও পর্যন্ত হত্যাকান্ডে জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এক সাক্ষাৎকার দেন অভিজিতের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। ওই হামলার পর প্রথম বিশদ কোন সাক্ষাৎকার নেয়া হয় অভিজিতের স্ত্রীর। স্বামীর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত তদন্তে বাংলাদেশ সরকার আরও তৎপর না হওয়ায় সমালোচনা করেন বন্যা। তিনি বলেন, এটা ছিল সুপরিকল্পিত, আগে থেকেই সাজানো- বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের অংশ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের কেউ আমার কাছে না আসার বিষয়টি আমাকে আরও বেশি বেদনাহত করেছে। এটা অনেকটা এমন যে, আমার কোন অস্তিত্ব নেই এবং তারা মৌলবাদীদের ভয়ে ভীত। বন্যা পাল্টা-প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, বাংলাদেশ কি পরবর্তী পাকিস্তান বা আফগানিস্তান হতে চলেছে? অবশ্য, এফবিআইয়ের কয়েক প্রতিনিধি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে জানিয়েছেন বন্যা। তিনি বলেন, আমরা জানতাম ওরকম একটা দেশে যে কোন কিছু ঘটতে পারে ও আমরা আগে থেকেই সতর্ক ছিলাম। তিনি বলেন, অভিজিতকে একটাই মাত্র হুমকি দেয়া হয়। কিন্তু, আমরা সেটাকে তেমন গুরুত্ব দেইনি। অন্যথায়, আমরা যেতাম না (বাংলাদেশে)।  গত ২৬শে এপ্রিল বইমেলা প্রাঙ্গন-সংলগ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি’তে চাপাতি হামলা চালানো হয় নিরীশ্বরবাদে বিশ্বাসী লেখক ও ব্লগার অভিজিত রায়ের ওপর। সে হামলায় নিহত হন অভিজিত এবং স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হন তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। একটি আঙুল হারাতে হয় তাকে। সাক্ষাৎকারের সময় তার হাতে ব্যান্ডেজ বাধা ছিল। ছিল না বাম হাতের বুড়ো আঙুল।

জাতিসংঘের ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশী পাচার প্রসঙ্গ

জাতিসংঘের নিয়মিত প্রেস-ব্রিফিংয়ে গতকাল উঠে এলো বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গা অভিবাসী উদ্ধার ও মানব পাচার বন্ধ প্রসঙ্গ। গতকাল ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার সমুদ্র উপকূল থেকে ৪টি বোটে থাকা থাইল্যান্ড অভিমুখী প্রায় ১,৪০০ অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুনের ডেপুটি-মুখপাত্র ফারহান হকের কাছে প্রশ্নকর্তা সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল আনসারী বিষয়টি উল্লেখ করে মানবপাচার বন্ধে জাতিসংঘের পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চান। জবাবে ফারহান হক মানব পাচারকে গুরুতর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, জাতিসংঘ বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদন এবং জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক কার্যালয় (ইউএনওডিসি) নানা পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে মানবপাচার বন্ধে কাজ করে চলেছে। অভিবাসীদের সুরক্ষা দিতে ও তাদের জীবন বাঁচানোর বিষয়টি নিশ্চিতে জাতিসংঘের পদক্ষেপের পাশাপাশি সমুদ্রের দায়িত্বে নিয়োজিত সব পক্ষকে সর্বাগ্রে পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। নিচে সংবাদ-সম্মেলনের বাংলাদেশ অংশটুকু তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: ফারহান, আপনাকে ধন্যবাদ। গত রোববার ইন্দোনেশিয়া  থেকে (ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার সমুদ্র উপকূল থেকে) ১,৪০০ বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়েছে। আপনি যেমনটি অবগত আছেন যে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সহস্রাধিক অভিবাসীকে ল্যাঙ্কাওয়ি দ্বীপের অগভীর সমুদ্রে মানবপাচারকারীরা পরিত্যাগের পর মালয়েশিয়ার সৈকতে নামেন (বোট থেকে) তারা। মানবপাচার বন্ধে জাতিসংঘ ঠিক কি করছে? কারণ, এটা এ অঞ্চলে ঘটছে।
ডেপুটি মুখপাত্র: হ্যাঁ, আপনি ঠিক বলেছেন। মানবপাচার অত্যন্ত গুরুতর ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা মানবপাচার সমস্যার বিষয়ে কথা বলেছি। আপনি যেমনটি জানেন যে, কিছুদিন আগে বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা অভিবাসীদের মৃত্যুর কারণ হয়েছে মানবপাচার এবং আমরা সেটা গত সপ্তাহে উল্লেখ করেছি। আমাদের উদ্বেগের একটি অংশ হলো, যেমন ভূমধ্যসাগর নিয়ে, গভীর সমুদ্রে অভিবাসী ইস্যু মোকাবিলায় সব প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে প্রাথমিকভাবে অভিবাসীদের জীবন বাঁচাতে বিশেষ প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তা। বহু মানুষ বিপদে পড়েন এবং পাচারকারীদের কর্মকা-ের কারণেও তারা বিপদে পড়েন। যারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করতে চান তাদের সঙ্গে পাচারকারীরা যে আচরণ করে, তা বিবেচনায় পাচারকারীরা বেশ লুণ্ঠন বা দস্যুপরায়ণ হয়ে উঠেছে। আপনি যেমনটি অবগত আছেন যে, আমরা বিভিন্ন চুক্তি এবং জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক কার্যালয়ের (ইউএনওডিসি) কর্মকান্ডের মাধ্যমে মানব পাচারের ইস্যুগুলো নিয়ে কাজ করা চেষ্টা করেছি। কিন্তু, মানুষের জীবন রক্ষা করা যায়, সেটা নিশ্চিতে সমুদ্রের দায়িত্বে নিয়োজিত পৃথক ও তাছাড়া সব পক্ষকে প্রথমত ও সর্বাগ্রে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

দুপুর হতে হতে নির্বাচনটি মারা গেল by এ কে এম জাকারিয়া

বিশ্বরোড দিয়ে এগিয়ে মালিবাগ বাজার ছাড়িয়ে বাঁয়ে নেমে গেছে শহীদ বাকি সড়ক। এই সড়কের বাঁয়ে, মানে পশ্চিমে ঢাকা উত্তরের ২৩ নম্বর ওয়ার্ড আর ডানে পূর্ব দিকে ঢাকা দক্ষিণের ১ নম্বর ওয়ার্ড। দুই ঢাকার দুই ওয়ার্ডের নির্বাচন কেমন হচ্ছে, তা দেখতে গতকাল সকাল সকালই সেখানে হাজির ছিলাম। বিশ্বের অনেক দেশে নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে ঢোকার ও বের হওয়ার সময় ভোটারদের ওপর জরিপ চালানো হয় কার অবস্থা কী সেটা বোঝার জন্য। আমাদের দেশে সে সুযোগ নেই, এখানে সাংবাদিকদের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মানে কেউ কোনোভাবে অনিয়ম বা কারচুপি করছে কি না, কাউকে ভোট দিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে কি না, সব প্রার্থী সমান সুযোগ পাচ্ছেন কি না, প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো পক্ষপাত করছে কি না—এসব দেখা।
আগের দিন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল ভোটে কারচুপির আশঙ্কা নিয়ে। ধারণা করেছিলাম, ঢাকা সিটি নির্বাচনে অন্তত ভোটকেন্দ্র বা বুথ দখল করে ভোট দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটবে না। তাই তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, নির্বাচনে অন্য কোনোভাবে অনিয়ম হচ্ছে কি না, তা টের পাওয়ার উপায় কী? তিনি বলেছিলেন, সিটি নির্বাচনে একজন ভোটারকে তিনটি ব্যালট দেওয়া হবে এবং একজন ভোটারের ভোট দিতে ৩ থেকে ৫ মিনিট সময় লাগবে। যদি ৩ মিনিটও ধরা হয়, তবে এক ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০টি ভোট পড়ার কথা। যদি এর চেয়ে বেশি পড়ে, তবে মনে করতে হবে যে কোথাও সমস্যা আছে। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগে এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছি, আর বিরোধী দল-সমর্থিত প্রার্থীদের এজেন্টরা ভোটকেন্দ্রে আছেন কি না বা ভোট নিয়ে তাঁরা কী বলছেন, সেটা জানার চেষ্টা করব বলে ঠিক করে রেখেছিলাম।
ঢাকা দক্ষিণের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটকেন্দ্র খিলগাঁও সরকারি উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে যখন পৌঁছাই, তখন সাড়ে নয়টা। ভোটকেন্দ্রের বাইরে তখন জমজমাট দশা। তবে এই উৎসবে সরকারি দলের লোকজনই শামিল আছেন। ভেতরে অবশ্য বুথগুলোতে তেমন ভিড় চোখে পড়ল না। কেন্দ্রের নিচতলায় ১ নম্বর বুথে সকাল ১০টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টায় ভোট পড়েছে ৫৫টি। ২ নম্বর বুথে ৫৩টি। প্রতি ঘণ্টায় ২০টি ভোটকে সর্বোচ্চ মানলে বেশি ভোট পড়েছে। দোতলায় মহিলা ভোটারদের দুটি বুথে গিয়েছি, ৪ নম্বর বুথে ভোট পড়েছে ৪৪টি এবং ৫ নম্বর বুথে ২৫টি। চারটি বুথের তিনটিতেই বিএনপি-সমর্থিত মেয়র পদপ্রার্থী মির্জা আব্বাসের এজেন্ট পাওয়া গেল। একটিতে কেন নেই জিজ্ঞেস করতেই অন্য সব এজেন্ট বলে উঠলেন, ‘আমরা কী করে বলব?’ সব এজেন্ট গলায় প্রার্থীদের প্রতীকের ব্যাজ ঝুলিয়েছেন, কিন্তু মির্জা আব্বাসের এজেন্টের গলায় নেই। এক এজেন্টকে জিজ্ঞেস করলাম, ব্যাজ কই? তিনি বললেন, ‘ভাই, বুঝেনই তো অবস্থা।’ তবে ভোট ঠিকমতোই হচ্ছে বলে জানালেন মির্জা আব্বাসের এই তিন এজেন্টের সবাই।
খিলগাঁও সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের পাশেই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও খিলগাঁও গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র। একেবারে পাশাপাশি তিনটি কেন্দ্র। এরশাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি বুথে গিয়েও মির্জা আব্বাসের এজেন্টদের দেখা মিলল। সাড়ে ১০টা নাগাদ সেখানে ভোট পড়েছে একটিতে ৫৫, অন্যটিতে ৪৯।
দক্ষিণ থেকে এবার ঢাকা উত্তরে। ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের নূরবাগ মসজিদ কেন্দ্রে সোয়া ১১টার দিকে ভোটারদের শান্তিপূর্ণভাবেই ভোট দিতে দেখা গেল। কেন্দ্র ২-এর ২ নম্বর বুথে তখন পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৬১টি। মেয়র পদের প্রার্থীদের নিয়ে এখানে তেমন উত্তেজনা নেই। যত উত্তেজনা আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী সর্দার ফয়সাল বাশার ফুয়াদ ও স্বতন্ত্র বা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মোস্তাক আহমেদের মধ্যে। কেন্দ্র থেকে বের হয়ে তালতলা মোড়ে আসতেই দেখি লোকজনের দৌড়াদৌড়ি, একজনের পিঠ দিয়ে রক্ত ঝরছে। জানা গেল ফুয়াদ-সমর্থিত কর্মীদের হাতে ছুরিকাহত হয়েছেন মোস্তাক-সমর্থক জুয়েল। রাস্তায় তখন জটলা, আশপাশের দোকানপাটের ঝাঁপ নামতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে মোস্তাক-সমর্থিতদের মধ্যে পড়ে চড়-থাপড় খেলেন ফুয়াদের কর্মী দেলোয়ার। এসব থামানোর কেউ নেই, না পুলিশ, না বিডিআর, না র্যাব।
পরে জেনেছি, এই উত্তেজনা এখানেই থামেনি। বেলা দেড়টার দিকে খবর পেলাম আওয়ামী লীগ-সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী ফুয়াদ যখন নূরবাগ মসজিদ কেন্দ্র থেকে তালতলা মোড়ের দিকে আসছিলেন, তখন পেছন থেকে তাঁকে ছুরি মারা হয়েছে। খিলগাঁওয়ের খিদমাহ হাসপাতালে তাঁর ক্ষত জোরা দেওয়ার জন্য সেলাই দেওয়া হচ্ছে।
সকালের দিকে ভোটকেন্দ্রগুলোতে যে শান্ত পরিস্থিতি ছিল, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে তা পাল্টাতে থাকে। খিলগাঁও মাটির মসজিদের কাছে চৌধুরীপাড়া প্রাইমারি স্কুল কেন্দ্রে পৌঁছার আগেই কেন্দ্রের ভেতরে একদফা হাঙ্গামা হয়ে গেছে। পৌনে ১২টায় কেন্দ্রে ঢুকে মনে হলো এখানে ভোটের বারোটা বেজেছে। কয়েকটি বুথে ভোট নেওয়া চলছে, তবে ভোটারের সংখ্যা হাতেগোনা। আর দুটি বুথে তখনো ভোট নেওয়া বন্ধ। এ সময় কোথা থেকে এক ব্যক্তি এসে কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের ব্যালট পেপারের একটি মুড়ি দেখালেন। বললেন, একটু আগে এই বইয়ের সবগুলো পাতা ছিঁড়ে সিল মেরে ব্যালট বাক্সে ঢোকানো হয়েছে। জানতে চাইলাম, কার পক্ষে সিল মারা হয়েছে? তিনি রেডিও প্রতীকে (আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীর প্রতীক) সিল দেওয়া একটি ব্যালট পেপার দেখিয়ে বললেন, এটা তাদের কাজ। পাশের বুথে পাওয়া গেল প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে, অনেকটা হতাশ হয়েই সেখানে বসে আছেন একটি বেসরকারি ব্যাংকের এই কর্মকর্তা। জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন? ‘আমি দেখছি’ বলেই তিনি রুম থেকে বের হয়ে গেলেন।
হাজীপাড়ার ইকরা বাংলাদেশ স্কুল কেন্দ্রে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেলা পৌনে একটা। এই কেন্দ্রে গোলযোগ ও বুথে ঢুকে সিল মারার অভিযোগের কথা শুনছিলাম চৌধুরীপাড়া প্রাইমারি স্কুল কেন্দ্রে থাকতেই। ভোটকেন্দ্র তখন অনেকটাই ফাঁকা। বুথ ১-এ গিয়ে দেখা গেল এজেন্টরা অলস বসে আছেন, কোনো ভোটার নেই। তখন পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৭৭টি। পাশের ২ নম্বর বুথে তখন দু-তিনজন ভোটার। সেখানে বিএনপি-সমর্থিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী আবুল মেছেরের নির্বাচনী এজেন্ট আসিফ অভিযোগ করলেন, ৩০ মিনিট আগে কিছু লোক জোর করে বুথে ঢুকে কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের ব্যালট পেপারের বই নিয়ে ভেতরে গিয়ে সিল মেরে বাক্সে ফেলেছেন। এমন অভিযোগের মুখে পাশে দাঁড়ানো নির্বাচনী কর্মকর্তারা আমতা-আমতা করছিলেন। কত ভোট পড়েছে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ১৩৯টি। কাউন্সিলর পদের ব্যালট পেপারের সিল মেরে যেগুলো বাক্সে ঢোকানো হলো, সেগুলোর কী হবে? তাঁরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন, কোনো জবাব নেই। কেন্দ্রের বাইরে তখন অনেক পুলিশ-বিডিআর, ভোটার বলে তখন আর কেউ নেই। দুপুর হতে হতে নির্বাচনটি যেন মরেই গেল!
আবার ফিরে আসি ঢাকা দক্ষিণের ১ নম্বর ওয়ার্ডে। খিলগাঁও সরকারি কলোনি উচ্চবিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রেও তখন ভোটারের খরা। মহিলা ভোটারদের ১ নম্বর বুথে বেলা সোয়া একটা পর্যন্ত মোট ভোট পড়েছে ১৩০টি। বুথ ২-এ ভোট পড়েছে ১৪৯টি। খাঁ খাঁ দুটি বুথেই মির্জা আব্বাসের এজেন্টদের পাওয়া গেল। জানালেন ভোট ঠিকমতো হচ্ছে। বিএনপি এই সিটি নির্বাচন বর্জন করেছে, এ খবর আগেই পেয়েছি। এজেন্ট দুজন এর কিছুই জানেন না! মনে হলো রাজনীতির সঙ্গে এ দুই নারী পোলিং এজেন্টের কোনো সম্পর্ক নেই।
সুষ্ঠুভাবে এই নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে অনেক শঙ্কা ছিল, কিন্তু এই নির্বাচন অনেক আশাও জাগিয়েছিল। চৌধুরীপাড়া প্রাইমারি স্কুল কেন্দ্রে হাঙ্গামার পর যখন ভোটকেন্দ্র ফাঁকা আর বাইরে মানুষের ভিড়, তখন কে যেন একজন বলছিলেন, ‘সরকার একটা সুযোগ নষ্ট করল। এই ভোটটা ভালো করলে সরকারেরই লাভ হইতো।’
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

লাদেন হত্যার কাহিনী কি তাহলে মিথ্যা?

ওসামা বিন লাদেন হত্যার মার্কিন অভিযানের গল্প কি তবে বানানো ছিল। এতোদিন এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেনি কেউ। কিন্তু এবারে এমন এক ব্যক্তি যুক্তি প্রদর্শন করে অ্যাবোটাবাদের ওই মার্কিন অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাতে সন্দেহের ভাঁজ পড়ছে অনেকের কপালে। তিনি হলেন সিমুর হার্শ। অনুসন্ধানি সাংবাদিকতা জগতে জায়ান্টদের মধ্যে একজন। ক্যারিয়ারের শুরুতে ‘মাই লাই হত্যাযজ্ঞের’ ঘটনা প্রকাশ করে সাড়া ফেলেছিলেন। ১৯৬৮ সালে ভিয়েতনামে মার্কিন সেনাদের হাতে শ’ শ’ নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তি হত্যার ইতিবৃত্ত ছিল সেখানে। এরপর সামনে এনেছেন ইরাকের আবু গারিব কারাগারে মার্কিন সেনাদের হাতে বন্দিদের নির্যাতনের ঘটনা। এবারে তিনি দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা লাদেন অভিযানের আসল ঘটনা ধামাচাপা দিয়েছে। আর তার এ দাবি নিয়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়। হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মুখপাত্র নেড প্রাইস এক বিবৃতিতে সিমুর হার্শের দাবি ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন। সিমুর বলেছেন, ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন নেভি সিলদের অভিযানে ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার যে গল্প হোয়াইট হাউজ শুনিয়েছে সেটা লুইস ক্যারোলের লেখা রূপকথার সামিল। সিমুর হার্শ প্রবন্ধটি লিখেছেন লন্ডন রিভিউ অব বুকসে। তার একটি মর্যাদাসম্পন্ন অবস্থান থাকার কারণে ওই প্রবন্ধ ব্যাপক আকর্ষণ কেড়েছে ইতোমধ্যে। লন্ডন রিভিউ অব বুকসে প্রকাশ হবার পর ওয়েবসাইটে এতো পরিমান ট্রাফিক বেড়ে যায় যে, চাপ সামলাতে না পেরে সাইটই সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। লাদেন অভিযানের সময় ওবামা প্রশাসনের কর্মকর্তারা যেসব দাবি করেছিলেন সিমুর হার্শের নতুন প্রতিবেদনে তুলে ধরা মূল যুক্তিগুলো অনেকটাই সেগুলোর পরিপন্থী। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেছেন, মার্কিন ও পাকিস্তানি কর্মকর্তারা অ্যাবোটাবাদে লাদেনের অবস্থান সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন। লাদেনকে ধরার অভিযানে তারা একে অপরকে সহায়তা করেছেন। এরপর তারা প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার বড় ধরণের এক সম্পৃক্ত হন। আর এতে জড়িত ছিলেন উভয় রাষ্ট্রের বিভিন্নপর্যায়ের কর্মকর্তারা। সিমুর হার্শের প্রবন্ধের প্রধান দাবিগুলো মূলত একজন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তার বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে। ওই কর্মকর্তার নাম অবশ্য প্রকাশ করা হয় নি। তিনি যেসব দাবি করেছেন সেগুলো হলো:
->    ২০১১ সালে উত্তর পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে যে বাড়িতে বিন লাদেন আত্মোগোপন করে ছিলেন এবং যেখানে মার্কিন নেভি সিল অভিযান চালিয়েছিল সেখানে কোন বন্দুকযুদ্ধ হয় নি। বা সিল এজেন্টরা কোন বিপজ্জনক ও অপরিচিত স্থানেও যায়নি। বরং সেটা ছিল সাজানো যেখানে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী পাঁচ বছর ধরে লাদেনকে বন্দী রেখেছিল। তারা ¯্রফে লাদেনকে সিল বাহিনীর জন্য সেখানে রেখে দেয় যারা অভিযানের দিন রাতে সেখানে হেলিকপ্টারে পৌঁছায়।
->    অভিযানে সিলদের সঙ্গে ছিল পাকিস্তানের শক্তিশালী মিলিটারি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর একজন এজেন্ট। তিনি অ্যাবোটাবাদের ওই বাড়ির পুরো এলাকা ঘুরিয়ে দেখান সিল এজেন্টদের। আর সেদিন যে কয়টি গুলি ছোড়া হয়েছিল সেগুলো ছিল শুধু লাদেনকে হত্যার জন্য ছোড়া গুলি। এ ছাড়া কোন গোলাগুলি হয় নি।
->   অভিযানের পর একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা বিবৃতি দিয়েছেন যে, সিআইএ বিন লাদেনের এক বার্তাবাহকের গতিবিধি শনাক্ত করে অ্যাবোটাবাদের ওই বাড়ি পর্যন্ত। আর অবস্থাগত প্রমাণ সাপেক্ষে বিন লাদেন সেখানে আছে বলে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু এটা সত্যি নয়। ইসলাসাবাদে মার্কিন দূতাবাসে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি তথ্য দিয়ে যায় যে, বিন লাদেন অ্যাবোটাবাদে আছে।
->    অ্যাবোটাবাদের বাড়িতে লাদেনের রক্ষণাবেক্ষণে অর্থায়ন করেছে সৌদিআরব।
->    পাকিস্তানী এক আর্মি ডাক্তার বিন লাদেনের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন যা প্রমাণ করেছিল যে লাদেন অ্যাবোটাবাদে ছিল। ওই প্রমাণ যুক্তরাষ্ট্রকে দেয়া হয়েছিল। কাজেই সেখানে লাদেন ছিল কিনা তা নিয়ে অভিযানের পরে ওবামা প্রশাসনের কর্মকর্তা সেসব তথাকথিত অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন তা মিথ্যা।
->    সিমুর হার্শের মতে সবথেকে ‘ডাহা মিথ্যা’ হলো পাকিস্তানের সবথেকে সিনিয়র দুই সামরিক নেতা- সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানি ও আইএসআই মহাপরিচালক জেনারেল আহমেদ সুজা পাশাকে অ্যাবোটাবাদে মার্কিন অভিযানের বিষয়ে আগে থেকে জানানো হয় নি।
সংক্ষেপে সিমুরের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও তার শীর্ষ অনেক উপদেষ্টারা ওই অভিযানের প্রায় সবকিছু নিয়েই মিথ্যা বলেছেন। যে অভিযানের অনুমোদন দেয়াটা কিনা প্রেসিডেন্ট ওবামা অন্যতম অর্জন বলে বিবেচিত।
সিএনএন-এ লিখিত প্রতিবেদনে সংবাদ সংস্থাটির জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক পিটার বার্গেন সিমুর হার্শের যুক্তি ও দাবিগুলো খ-ন করেছেন। তিনি লিখেছেন, লাদেন অভিযান নিয়ে সিমুর হার্শের বক্তব্য আবোল তাবোল অর্থহীন কথাবার্তা। এসব দাবি অসংখ্য প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ আর সাধারণ বোধশক্তির সঙ্গে এককথায় অসঙ্গতিপূর্ণ। অ্যাটোবাদে লাদেনকে হত্যা করতে ছোড়া গুলি ছাড়া আর কোন গোলাগুলি হয় নি সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এমন দাবিতে ওই মিশনে থাকা দুই সিল এজেন্ট ম্যাট বিসোনেট এবং রবার্ট ও’নেইলের ঘটনার বিবরণ উপেক্ষা করা হয়। তারা জনসমক্ষে বলেছেন যে, ওই রাতে আরও কয়েকজন নিহত হয়। এর মধ্যে লাদেনের দুই দেহরক্ষী, তার এক ছেলে, এবং এক দেহরক্ষীর স্ত্রী ছিল। তাদের বিবরণ অনেক মার্কিন কর্মকর্তার বিবরণের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ যারা আমার সঙ্গে বা অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। বার্গেন আরও লিখেছেন, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী অ্যাবোটাবাদের ওই বাড়ি গুড়িয়ে দেয়ার আগে বাইরে থেকে সেখানে যাওয়া একমাত্র ব্যক্তি ছিলাম আমি। পুরো বাড়ির অবস্থা ছিল ল-ভ-। সবখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল ভাঙা কাচ। বাড়ির অনেকগুলো স্থানে ছিল অনেক গুলির চিহ্ন। যেসব স্থানে বিন লাদেনের সহচর আর পরিবারকে উদ্দেশ্য করে গুলি করেছিল সিল সদস্যরা। আর একটি ক্ষেত্রে গুলি বিনিময় হয়েছিল তার একজন দেহরক্ষীর সঙ্গে। ঘটনাস্থল থেকে প্রমাণ মেলে, লাদেন হত্যার রাতে অনেক গুলি ছোড়া হয়েছিল। সাধারণ বোধশক্তি থেকে যে কেউ বুঝবে যে অ্যাবোটাবাদে থাকাকালীন বিন লাদেনের খরচ সৌদি আরব বহন করেছে এমন ধারণা হাস্যকর। লাদেনের মূল লক্ষ্য ছিল সৌদি রাজ পরিবারকে উৎখাত করা যে কারণে ১৯৯৪ সালে তার সৌদি নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছিল। সৌদি আরব তাদের সবথেকে বড় শত্রুর খরচ কেন বহন করবে? সাধারণ ধারণা থেকে এও বোঝা যায়, লাদেন যদি পাকিস্তানিদের হাতে বন্দী থাকতো আর মার্কিন সরকার যদি সেটা জানতো তাহলে দু’দেশের সবথেকে সহজ উপায় হতো মার্কিনীদের হাতে গোপনে লাদেনকে হস্তান্তর করা। পাকিস্তানে মার্কিন সেনা অভিযান চালানো নয়। পাকিস্তানীরা এর আগে একাধিকবার কয়েকজন আল কায়েদা নেতাকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৯/১১ এর অপারেশনাল কমান্ডার খালিদ শেখ মোহাম্মদ ও অপর গুরুত্বপূর্ণ আল কায়েদা নেতা আবু ফারাজ আল লিবি। এমন আরও কিছু পাল্টা যুক্তি তুলে ধরে পিটার বার্গেন প্রশ্ন করেছেন কেন ওই ঘটনা ধামা চাপা দেবে যুক্তরাষ্ট্র। বার্গেন আরও লিখেছেন, সিমুর হার্শ তার ১০হাজার শব্দের লেখায় সূত্র হিসেবে একমাত্র যে ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছেন তিসি আসাদ দুররানী। যিনি ৯০ এর দশকের শুরুতে আইএসআই প্রধান ছিলেন। লাদেন অভিযান হবার প্রায় দু দশক আগে। সিমুর দুররানীকে তার নানা যুক্তির প্রতি সহমত বলে তুলে ধরেন। তার লেখা পড়ার পর আমি দুররানিকে ইমেইল করেছিলাম। দুররানি বলেছেন, লাদেন অ্যাবোটাবাদে লুকিয়ে ছিল আর সে বিষয়টি আএসআই জানতো তেমন কোন প্রকার তথ্যপ্রমাণ নেই। কিন্তু তারপরও তিনি এ ধারণা করতে পারেন যে এর সম্ভাবনা থাকতে পারে। এটা সিমুরের দাবির পক্ষে জোরালো কোন সমর্থন নয়। প্রতিবেদনে শেষে বার্গেন লিখেছেন, নিশ্চিতভাবে সব ধরণের বিষয়ই সম্ভব। কিন্তু সাংবাদিকতা এবং ইতিহাস রচনা ক্ষেত্রে তথ্যপ্রমাণকে দেখা হয় সম্ভাবনাকে নয়।

সীমা ছাড়াচ্ছে পুলিশ- ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক

যে পুলিশ অভিজিৎকে কোপানো দেখেও কিছু করেনি, যারা বর্ষবরণের জমায়েতে নারী লাঞ্ছনা সন্ত্রাস থামাতে উদ্যোগী হয়নি, তারাই প্রতিবাদকারীদের ওপর লাঠি ও জলকামান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পেড়। পুরুষ পুলিশ সদস্যদের দ্বারা প্রতিবাদী ছাত্রীদের লাঞ্ছনা ও প্রহার অসভ্যতারই নামান্তর। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ করি।
একই ঘটনায় ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা দুভাবে প্রহৃত হলেন: একবার টিএসসিতে নারীদের বাঁচাতে গিয়ে, আরেকবার নারী লাঞ্ছনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে। প্রথম ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা এখনো ‘অজ্ঞাত’ রইলেও দ্বিতীয় ঘটনায় অভিযুক্ত স্বয়ং পুলিশ! কতিপয় পুলিশ সদস্য যেভাবে ছাত্র ইউনিয়নের এক প্রতিবাদী ছাত্রীর শরীরে বুটের লাথি ও লাঠি চালনা করেছেন, তা নিপীড়নের সমতুল্য।
গত রোববার ছাত্র ইউনিয়নের পূর্বঘোষিত প্রতিবাদ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশপ্রধানের কার্যালয়ে স্মারকলিপি প্রদান করতে গেলে এ ঘটনা ঘটে। এতে ২১ জন আহত হন এবং পাঁচজনকে আটক করা হলেও রাতে তাঁরা ছাড়া পান। গণমাধ্যমে প্রচারিত ছবি ও সংবাদ থেকে স্পষ্ট যে পুলিশ শান্তিপূর্ণ মিছিলের পেছন থেকে সাঁজোয়া যান ও ট্রাক চালিয়ে দিলে শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত হন। এর পরই পুলিশ ছাত্রছাত্রীদের ওপর নির্বিচার হামলা চালায়। একজন নারী কর্মী গাছের আড়ালে আশ্রয় নিয়েও পুলিশের নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি! বর্ষবরণে নারী লাঞ্ছনাকারীদের প্রতিহত করা কিংবা ঘটনার ২৭ দিন পরও একজন অভিযুক্তকেও আটকে ব্যর্থ যে পুলিশ, তারাই প্রতিবাদীদের ওপর ষোলো আনা ‘বীরত্ব’ দেখাতে দ্বিধা করেনি।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশ অত্যন্ত উগ্র ও অসংযত আচরণ করেছে। রোববারের ঘটনায় সরকার একজন পুলিশ কনস্টেবলকে সাময়িক বরখাস্ত করলেও অন্যদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া দুর্ভাগ্যজনক। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ী সবার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই। পাশাপাশি যে ঘটনার জন্য এই প্রতিবাদ, সেই পয়লা বৈশাখের নারী লাঞ্ছনাকারীদের অবিলম্বে আটক করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।

পূর্ণ গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রা: কিছু প্রস্তাবনা

দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল কর্তৃক নির্বাচনের ওপর অত্যাধিক গুরুত্বারোপের ফলে অর্থবহ ও পূর্ণ গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশের অভিযাত্রা অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন অবশ্যই একমাত্র সাংবিধানিক, আইনসিদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ পদ্ধতি। নির্বাচনের মাধ্যমে বৈধতা ও ম্যান্ডেট প্রাপ্ত হয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার শুভ সূচনা করে থাকেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তাই অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অপরিহার্য। তবে কার্যকর ও অর্থবহ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শুধু নির্বাচনই যথেষ্ট নয়। আর একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নির্বাচনের ওপর অত্যাধিক গুরুত্বারোপের কারণে আমাদের সংবিধানের ১১ ধারায় অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশকে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জনআকাক্সক্ষা অনেকটাই অপূর্ণ রয়ে গেছে।
বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, সিভিল সার্ভিস ও গণমাধ্যমের মতো বেশ কয়েকটি পরীক্ষিত ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ উত্তরাধিকারসূত্রেই পেয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের নেতৃবৃন্দ, স্বজ্ঞানে কিংবা অজ্ঞানে, এটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, নির্বাচনের পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক হিসেবে গড়ে তোলা, দায়িত্বশীল বিরোধী দলের উপস্থিতি এবং বৃহত্তর স্বার্থে অতীত ও বর্তমানের কিছু কিছু বিষয়ে আপস-মীমাংসার মানসিকতা থাকা গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য অপরিহার্য। বরং তারা তাদের ক্ষমতাবৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে গণতন্ত্রকে সেøাগান হিসেবে ব্যবহার করছেন এবং শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানসমূহকে এই অভিলাষ বাস্তবায়নের পথে বাধা হিসেবেই দেখছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাদেরকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় উৎসাহিত করে, যার অনিবার্য পরিণতি এসব প্রতিষ্ঠানের নগ্ন দলীয়করণ। এই প্রক্রিয়ার অশুভ ফলাফল সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও সঞ্চালিত হয় এবং যে কোন উপায়ে নির্বাচনে জয়লাভ রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য জীবন-মরণ সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়।
১৯৯১ সালে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের পর থেকে আমাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়া যেন অবিশ্বাস, কূটকৌশল, সন্ত্রাস, টাকার খেলা, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে প্রাণঘাতী দ্বন্দ্ব এবং শেষমেশ যে কোনভাবে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান- এই অশুভ চক্রের মধ্যে আটকে পড়েছে। পাঁচ বছর পর পর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। ১৯৯১ সালের পর থেকে এ যাবত অনুষ্ঠিত চারটি নির্বাচনের মধ্যে দুটিতেই নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নটির মীমাংসা অনেক নিরপরাধ জীবন ও সরকারি সম্পত্তি বিনষ্টের বিনিময়ে সম্ভব হয়েছে।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্বে আবার নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার প্রশ্নটি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী কার্যত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকেই একেবারে বিলুপ্ত করে দেয়, যার বিরোধিতা বিরোধী দল অব্যাহতভাবেই করে আসছিল। এই বিলুপ্তি বিরোধী দলকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের জন্য আন্দোলনে নামতে বাধ্য করে। শুরুতে এ আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকলেও সরকারের অনমনীয় অবস্থানের কারণে তা ক্রমান্বয়ে সহিংস রূপ নেয়। তবে বিরোধীদলের এই আন্দোলন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতা বিরোধী জোটকে চলতি বছরের ৫ই জানুয়ারি থেকে দেশব্যাপী নির্বিচার সন্ত্রাসের মাধ্যমে নিরীহ জনগণের জীবননাশের দিকে ধাবিত করে। তবে এ আন্দোলন যেমন সরকারকে সন্ত্রস্ত করতে পারেনি, তেমনি বিরোধী জোটও তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনে সফল হয়নি।
সন্ত্রাসের ফলে সংঘটিত হতাহতের ঘটনা ছিল অভূতপূর্ব। এই বর্বরোচিত কর্মকা- দরিদ্র জনগণকে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কৃষক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীগণ তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনায় চরম সংকটের সম্মুখীন হন। দেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সংকটাপন্ন ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, কারণ তারা তাদের নির্ধারিত প্রাত্যহিক শিক্ষাক্রম কিংবা সময়সূচি অনুযায়ী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারছিল না। দেশের অর্থনীতি ইতিমধ্যে বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে এই ক্ষতি আরও ভয়াবহ হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। আরও আশঙ্কার বিষয় এই যে, দেশের নাগরিকদের নির্দ্বিধায় ও নির্ভয়ে তাদের উদ্বেগ ও মতামত প্রকাশের সুযোগ আজ অনেকটাই সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। বস্তুত, নাগরিকদের কণ্ঠস্বর এখন অনেকটাই রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। অনেক নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্জনই আজ গুরুতর হুমকির মুখে পড়েছে, যা আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয়।
আমরা একদল নিরপেক্ষ উদ্বিগ্ন নাগরিক নিজেদের বিবেক ও সম্মিলিত দায়িত্ববোধের তাগিদে দেশের এই দুঃসহ রাজনৈতিক সমস্যার একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে ঐকমত্য সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতির সামনে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা প্রকাশে উদ্বুদ্ধ হয়েছি। ১৯৯১ সালের পর থেকে বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা জানি যে, প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে একটি অস্থায়ী নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা আমাদের এই জটিল রাজনৈতিক সংকটের একটি সাময়িক ও অতি সরলীকৃত সমাধান মাত্র। কিন্তু এই সমস্যার শেকড় আমাদের জটিল সামাজিক-রাজনৈতিক গতিধারার আরও গভীরে প্রোথিত। বাংলাদেশের জনগণ দেশের নেতিবাচক রাজনীতিতে আজ অতিষ্ঠ এবং তারা এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি চায়। তাই আমাদের প্রস্তাবনার মূল লক্ষ্য হলো, দেশের বিদ্যমান সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার নিরসনকল্পে একটি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা। আমরা এই পৌনঃপুনিক সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সমস্যা থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে চাই, এবং তা করা দরকার সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের মাধ্যমে। নয়তো আমাদের আশঙ্কা যে, এই নির্বাচনী গণতন্ত্রের উৎপীড়ন (ঃুৎধহহু ড়ভ বষবপঃড়ৎধষ ফবসড়পৎধপু) আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার এক স্থায়ী দুষ্টক্ষততে পরিণত হবে।
আমরা উদ্বিগ্ন নাগরিকবৃন্দ সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই যে, রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলসমূহকেই পরিবর্তনের মূল রূপকার হিসেবে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। সে জন্য রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলসমূহকে সংবেদনশীল ও দায়িত্ববান হতে হবে এবং সংকট উত্তরণে এসব প্রস্তাবনা অথবা সকলকে সম্পৃক্ত করে সৃষ্ট অনুরূপ একটি ‘পথ নির্দেশিকা’ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। আমরা নিশ্চিত যে, একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজল্পের বাংলাদেশী নাগরিক। রাজনৈতিক কর্মকা-ে সাধারণ নাগরিকদের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন হলে রাজনৈতিক দলসমূহও জনগণের শ্রদ্ধা ও আস্থা অর্জনে সক্ষম হবে।
আমাদের প্রস্তাবনা :
উপরোক্ত সূচনা বক্তব্যের আলোকে এবং বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের জটিলতা ও স্পর্শকাতরতা অনুধাবন করে আমরা উদ্বিগ্ন নাগরিকবৃন্দ একটি সীমিত কর্মসূচির প্রস্তাবনা প্রকাশ করতে চাই। বর্তমান সংকটের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানকল্পে সংবিধানের কিছু সংশোধনী ও বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানসমূহের পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে আমরা নিম্নের প্রস্তাবনা পেশ করছি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, প্রস্তাবিত সংস্কারসমূহ বাংলাদেশের রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি সাধন করবে। আমাদের প্রস্তাবনা দুটি বড় ভাগে বিভাজন করা যেতে পারে: (১) সংবিধানের সংশোধনী ও (২) প্রতিষ্ঠানসমূহের পুনর্বিন্যাস।
আমরা উদ্বিগ্ন নাগরিকবৃন্দ বিশ্বাস করি যে, সকলের অংশগ্রহণ ও আলোচনার স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংবিধানের সংশোধন ও প্রতিষ্ঠানসমূহের পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে আরও বিস্তারিত কর্মসূচি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এই অন্তর্ভুক্তিকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই একটি সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি বেরিয়ে আসবে। আমরা আশা করি যে, প্রধান রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এই কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণে সম্মত হবেন। এই প্রক্রিয়ায় প্রধান রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দই নেতৃত্ব প্রদান করতে হবে, যদিও বিষয়ের প্রকৃতি ও জটিলতা বিবেচনা করে অন্যান্য স্বার্থ-সংশ্লিষ্টদেরও এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। আমরা উদ্বিগ্ন নাগরিকবৃন্দ প্রয়োজনে এক্ষেত্রে একটি গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।
আমরা উদ্বিগ্ন নাগরিকবৃন্দ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, শাসন ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও ন্যায়পরায়নতা সম্পর্কে সাধারণ জনগণের আস্থা মূলত নির্ভর করে বিভিন্ন পর্যায়ের সরকার ও একই পর্যায়ের বিভিন্ন নির্বাহীর মধ্যে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের যথোপযুক্ত বণ্টনের ওপর। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশের মধ্যে আরও অধিকতর কার্যকর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য (পযবপশং ধহফ নধষধহপবং) নির্দিষ্ট করা জরুরি। একইসঙ্গে জরুরি সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে সেগুলো পরিচালনার জন্য উপযুক্ত আইনি বিধানের প্রবর্তন। প্রাথমিক পর্যায়ে আইনজ্ঞ ও প্রথিতযশা পার্লামেন্টেরিয়ান, শিক্ষাবিদ, সংসদ ও সংসদের বাইরের বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতা এবং বিশিষ্ট নাগরিকদের সমন্বয়ে একটি ‘বিশেষজ্ঞ কমিশন’ গঠন করা যেতে পারে। কমিশন প্রণীত সুপারিশমালা পার্লামেন্টে বিবেচিত ও আলোচিত হতে পারে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে পারেন।
বাংলাদেশের সামনে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রয়েছে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে নিম্নেবর্ণিত বিষয়াদির ওপর অধিক মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।
কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয় (পূর্ণাঙ্গ তালিকা নহে)
১. রাষ্ট্রপতি পদের পূর্ণ স্বাধীনতা; রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের পদ্ধতি; প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ
২. রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য (পযবপশং ধহফ নধষধহপবং):
ক) যে সমস্ত বিষয়ে রাষ্ট্রপতির নিরঙ্কুশ ক্ষমতা থাকবে।
খ) রাষ্ট্রপতির অনুমোদন ক্ষমতা, ঐচ্ছিক ক্ষমতা ও ভিন্নমত প্রদানের ক্ষমতা।
গ) প্রধানমন্ত্রীর কর্তব্য ও দায়িত্ব পুনঃনির্ধারণ।
ঘ) দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদের উপযোগিতা।
৩. নির্বাচন পদ্ধতি সম্পর্কে নতুন ভাবনা: বিদ্যমান ফার্স্ট পাস্ট দি পোস্ট পদ্ধতি, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব কিংবা মিশ্র পদ্ধতি।
৪. সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভূমিকা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে সেগুলো পরিচালনের জন্য উপযুক্ত আইনি বিধান।
৫. সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা রেখে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক সংসদীয় আসন সংরক্ষণ।
৬. নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের কাছে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ, ক্ষমতা ও সম্পদ হস্তান্তর এবং সেই লক্ষ্যে কার্যকর আইনি বিধান।
৭. সংসদীয় আসনের ভোটারগণ কর্তৃক তাদের নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে প্রত্যাহারের বিধান।
৮. সংবিধানের ৭০ ধারায় দলীয় সংসদ সদস্যদের সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট প্রদানে যে বাধা আরোপিত আছে তা রহিতকরণ।
৯. জাতীয় ও স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির ওপর গণভোট গ্রহণের আবশ্যিক বিধান।
প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়াদি
আমরা উদ্বিগ্ন নাগরিকবৃন্দ মনে করি, রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে পুনরুজ্জীবিত ও শক্তিশালী করা এবং এগুলোকে সকল ধরনের দলীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা প্রয়োজন। এসব প্রতিষ্ঠান যে কোন গণতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো বিনির্মাণের অবিচ্ছেদ্য অনুসঙ্গ। এগুলো হলো গণতান্ত্রিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সোপান এবং এগুলোর স্বাধীন ও দায়বদ্ধভাবে কাজ করার জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা আবশ্যক। নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সেবা প্রদান, তাদের নাগরিক অধিকারসমূহ সমুন্নত রাখা, সরকারকে জবাবদিহি করা তথা সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এগুলোর ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট যোগ্যতার ভিত্তিতে উপযুক্ত লোক নিয়োগের জন্য আইন প্রণয়নসহ গণশুনানির ব্যবস্থা করা দরকার। প্রশাসনিক, সংসদীয় ও নাগরিক সমাজ কর্তৃক যথাযথ নিরীক্ষা এই প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য এগুলোর শীর্ষ পদে পেশাদার ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে সুনামসম্পন্ন ও জনবান্ধব ব্যক্তিদেরকে নিয়োগ দেয়া আবশ্যক। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এসব কর্মকর্তাগণ একটি গ্রহণযোগ্য প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবেন এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
রাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্রাঞ্চের নিম্নোক্ত সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ সংস্থাসমূহ সংস্কারের জন্য নির্দিষ্ট করা যেতে পারে। (এটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা নয়)
১. জাতীয় সংসদ
২. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
৩. বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন
৪. সরকারি কর্ম কমিশন
৫. দুর্নীতি দমন কমিশন
৬. তথ্য কমিশন
৭. মানবাধিকার কমিশন
গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলসমূহের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশও অতীব জরুরি। রাজনৈতিক দলের প্রাথমিক সংস্কার প্রচেষ্টা নিম্নলিখিত বিষয়াদির মধ্যে নিবিষ্ট করা যেতে পারে:
৮. রাষ্ট্র-বহির্ভূত (হড়হ-ংঃধঃব) প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজনৈতিক দল:
ক. রাজনৈতিক দলসমূহের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা
খ. দলসমূহের আর্থিক স্বচ্ছতা
গ. শিক্ষক, ছাত্র, পেশাজীবী সংগঠন এবং সরকারি স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত ও বিধিবদ্ধ সংস্থাসমূহের অথবা বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়ে গঠিত বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনসমূহকে দলের কাঠামো থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্তকরণ
ঘ. রাজনৈতিক দলসমূহের বিদেশী শাখা বিলুপ্তকরণ
ঙ. দলের নেতৃবৃন্দের সাধারণ সদস্যদের নিকট জবাবদিহিতা
চ. দলের নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়ন এবং দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে সাধারণ সদস্যদের ভূমিকা
ছ. দলীয় কমিটিসমূহে নারীদের যৌক্তিক প্রতিনিধিত্ব
স্বায়ত্তশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহেরও জরুরি সংস্কার প্রয়োজন। এসব প্রতিষ্ঠানের নিম্নোক্ত সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে:
৯. স্বায়ত্তশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ:
ক. একটি বিকেন্দ্রীকরণ নীতি প্রণয়ন এবং ওই নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করার লক্ষ্যে আইনের পুনর্বিন্যাস
খ. স্থানীয় সরকার সংস্থাসমূহের কাঠামো ও নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার
গ. স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতকরণ
ঘ. দায়িত্ব ও কর্তব্য হস্তান্তর
ঙ. কর্মকর্তা ও কর্মচারী হস্তান্তর
চ. স্থানীয় সরকার কমিশনের সুপারিশ মোতাবেক জাতীয় বাজেটের একটি অংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে হস্তান্তর
ছ. সুনির্দিষ্ট ম্যান্ডেটসহ স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন
জ. সংরক্ষিত আসন পদ্ধতির সংস্কার
ঞ. স্থানীয় সরকার সংস্থাসমূহের অধিক্ষেত্র অন্য কর্তৃপক্ষের আগ্রাসন থেকে মুক্ত রাখা
১০. নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম:
শাসন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি বলিষ্ঠ ও সক্রিয় নাগরিক সমাজ এবং স্বাধীন গণমাধ্যম বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টির গুরুত্বও অপরিসীম। সেই লক্ষ্যে একটি যথোপযুক্ত আইনি কাঠামো প্রয়োজন, যাতে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে নিম্নোক্ত বিষয়াবলী অন্তর্ভুক্ত থাকবে:
ক. কর্তৃপক্ষীয় ভয়-ভীতি মুক্ত একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নাগরিক সমাজের প্রতিষ্ঠা নিশ্চিতকরণ
খ. নাগরিক সমাজ যাতে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে পারে তা নিশ্চিত করতে তাদের কার্যপরিধি সঙ্কুচিত করার প্রচেষ্টাকে নিবৃতকরণ
গ. নাগরিক সমাজের বিভক্তিকরণে ‘ক্রনিজম’ বা কর্তৃপক্ষের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের বিলোপ সাধন
ঘ. নাগরিক সমাজের জন্য একটি আচরণবিধি প্রণয়ন
ঙ. গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অর্থবহ বিকাশের জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ
চ. প্রেস ইন্সটিটিউট-এর প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন
উপসংহার
অনেক প্রতিকূলতার মুখে আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহ অতীতে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে এবং অনেক বিষয়ে ঐকমত্যে উপনীত হয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯০ সালে রাজনৈতিক দলসমূহ গণতান্ত্রিক উত্তরণের লক্ষ্যে একটি ‘যৌথ ঘোষণা’ প্রণয়ন করেছিল। আমরা আশা করি যে, আমাদের রাজনীতিবিদগণ আবারও সাহসিকতা ও প্রজ্ঞা প্রদর্শন করে দেশে বিদ্যমান সমস্যাসমূহ সমাধানে ঐকমত্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবেন এবং বাংলাদেশের জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণের জন্য একটি কর্ম-পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেবেন। এই ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি জাতীয় সনদ প্রস্তুত হতে পারে, যেটি সংশ্লিষ্ট সকলের স্বাক্ষরের মাধ্যমে একটি নতুন সামাজিক চুক্তিতে পরিণত হবে।
আমরা উদ্বিগ্ন নাগরিকবৃন্দ বিশ্বাস করি যে, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, বিশ্বাস ও সহনশীলতা সত্যিকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি। আমরা আরও বিশ্বাস করি যে, আমাদের অভিজ্ঞ ও দায়িত্বশীল রাজনীতিবিদগণ এ ধরনের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে সক্ষম- কারণ অতীতে এ ধরনের সহযোগিতামূলক পদক্ষেপের বহু নিদর্শন তারা দেখেছেন। আজ সময় এসেছে বিভাজনের রাজনীতিকে পেছনে ফেলে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে অন্তর্ভুক্তিকরণ ও সমঝোতার দিকে এগিয়ে যাওয়া। অতীতের বিভেদ ও প্রতিবন্ধকতাসমূহের ঊর্ধ্বে উঠে সম্মিলিতভাবে কাজ করার জন্য বর্তমান সময়ের চাইতে ভাল সময় আর হতে পারে না। কতগুলো সুস্পষ্ট মূল্যবোধে বিশ্বাস ১৬ কোটি বাংলাদেশীর এই দেশটিকে বিশ্বসভায় তার যথোপযুক্ত স্থানে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এখন ভবিষ্যতের দিকে আমাদের দৃষ্টি প্রসারিত করতেই হবে।
উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের পক্ষে ১০ মে ২০১৫ তারিখে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত।

সিলেটে সিসি ক্যামেরায় ভেসে উঠলো রাহুলের খুনিদের মুখ by ওয়েছ খছরু

 সিসি ক্যামেরার চিত্র, ইনসেটে গ্রেপ্তারকৃত অভিজিৎ
ড্রেনে মিলেছিল সিলেটের রাহুলের গলাকাটা লাশ। সকালের দিকে স্থানীয় লোকজন লাশ দেখে পুলিশকে খবর দেন। লাশ উদ্ধারের পর পুলিশ শুরু করে তদন্ত। কিন্তু রাহুলকে কারা খুন করেছে- তার কোন হদিসই পাওয়া যাচ্ছিল না। ড্রেনের পাশে মাদার কেয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও কোন তথ্য দেয়নি। আশপাশের লোকজনের মুখেও ছিল কুলুপ আঁটা। ফলে ঘটনার পর রাহুল খুনের কোন কিনারাই করতে পারছিল না পুলিশ। এমন সময় পুলিশের সিসিটিভি ক্যামেরা ইউনিটের সদস্যরা নেন প্রযুক্তির সহায়তা। নগরীর রিকাবীবাজারের মাদার কেয়ার হাসপাতালের সামনে রাখা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। আর ফুটেজেও ভেসে উঠে খুনিদের চেহারা। রাতের আঁধারে কিভাবে খুন হলো রাহুল তারও প্রকাশ পায় দ্রুত। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়- লাশ উদ্ধারের আগের দিন অর্থাৎ গত ৪ঠা এপ্রিল রাত ৮টায় কয়েক জন যুবক রিকাবীবাজার এলাকার রাস্তায় আক্রমণ করে রাহুলকে। এ সময় যুবকরা বার বার রাহুলকে নিয়ে প্রান্তিক চত্বর এলাকায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু রাহুল তাদের হাত থেকে রক্ষা পেতে পাশেই থাকা মাদার কেয়ার হাসপাতালে ঢুকার চেষ্টা করছিল। এই অবস্থায় যুবকরা বেধড়ক মারধর করে রাহুলকে। এই মারপিটের মুখেই রাহুল এক সময় আশ্রয় নেয় মাদার কেয়ার হাসপাতালের ভেতরেই। পরক্ষণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কলাপসেবল ফটক লাগিয়ে দেয়। গোটা রাতের ফুটেজ তল্লাশি করে পুলিশ দেখতে পায় রাহুল আর হাসপাতাল থেকে বের হয়নি। অবশেষে পরদিন সকালে হাসপাতালের পাশেই ছড়ার মধ্যে তার গলাকাটা লাশ পাওয়া যায়। অথচ ঘটনা সম্পর্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও আশপাশের লোকজন কোন তথ্যই দেননি পুলিশকে।
পুলিশ সিসিটিভি ক্যামেরায় হামলাকারী ৬-৭ জন লোকের ছবি সংগ্রহ করে। এরপর তাদের তথ্য সংগ্রহে চালায় অনুসন্ধান। পুলিশ খবর নিয়ে জানতে পারে হামলাকারী সিলেটের রিকাবীবাজার এলাকার ছাত্রলীগ কর্মীরা। আর ঘটনাকালীন সময়ে নেতৃত্বে ছিল ছাত্রলীগ কর্মী অভিজিৎ। পুলিশ অভিজিতের খোঁজ নিতে থাকে।  আর পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর অভিজিৎ খুনের ঘটনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছে। অভিজিতের দেয়া বক্তব্য ও সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজের মিল রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত অভিজিতের পুরো নাম অভিজিৎ দাস। তার বাড়ি সুনামগঞ্জ শহরের আমরিয়া সরদারপুর জয়নগর বাজার গ্রামে। তার পিতা স্কুল শিক্ষক। গত ৫ই এপ্রিল সিলেট নগরীর রিকাবীবাজার মাদার কেয়ার পলি ক্লিনিক ও ইয়াকুব ম্যানশনের মাঝের ড্রেন থেকে রাহুল আহমদের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। ড্রেনের উপর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও।
রাহুল আহমদের গ্রামের বাড়ি বরিশালে। সে আগে সনাতন ধর্মের অনুসারী ছিল। বিয়ের পর সে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। সিলেট নগরীর বাগবাড়িতে একটি ভাড়া বাসায় পরিবারসহ বসবাস করতো রাহুল। রাহুল কখনও নিজেকে যুবলীগ আবার কখনও যুবদল নেতা বলে পরিচয় দিতো। এ ঘটনায় পুলিশ তখন মাদার কেয়ার পলি ক্লিনিকের নাইটগার্ড তারেক আহমদ সুমন ও ওয়ার্ডবয় মো. ইসরক উদ্দিনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করে।
স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, রাহুল অনেক দিন ধরেই রিকাবীবাজার এলাকার আড্ডা দিতো। এ কারণে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সে ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করতো। নগরীর আলীয়া মাদরাসা মাঠ থেকে শুরু করে রিকাবীবাজার পয়েন্ট এলাকা পর্যন্ত ফুটপাতের ভাসমান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদার টাকা তুলতো। এ নিয়ে রাহুলের সঙ্গে বিরোধ ছিল স্থানীয় ছাত্রলীগের কর্মীদের। রিকাবীবাজার এলাকায় ছাত্রলীগের দুটি গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে। ওই দুটি গ্রুপ আবার মদন মোহন কলেজ ছাত্রলীগ কেন্দ্রিক। একটি গ্রুপের নেতা ছিল অভিজিৎ। ছাত্রলীগের কোন পদ-পদবিতে না থাকলেও সে অনেকটা উগ্র-আচরণের কারণে ব্যবসায়ীদের কাছে আতঙ্কময় হয়ে উঠেছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিজিৎ এক সময় রাহুলের কাছে ফুটপাতের চাঁদা দাবি করে। এ নিয়ে রাহুলের সঙ্গে অভিজিৎ ও সহকর্মীদের বিরোধ চলছিল। খুনের আগে বেশ কয়েকবার অভিজিৎ ও তার সহকর্মীরা রাহুলকে হুমকিও দিয়েছিল। এসব ঘটনায় ৪টা জুলাই রাতে অভিজিৎ ও তার সহযোগিরা রিকাবীবাজার এলাকায় রাহুলের উপর হামলা চালিয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে জানিয়েছে, রাহুলকে ছাত্রলীগ কর্মী অভিজিতের কবল থেকে রক্ষা করার পর সে হাসপাতালের চতুর্থ তলার দিকে চলে যায়। এরপর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। পর দিন তার লাশ পাওয়া গেছে। এদিকে, পুলিশের পক্ষ থেকে রাহুল হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সকল আসামি ইতিমধ্যে শনাক্ত করা শেষ হয়েছে। স্থানীয় সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ থেকে তাদেরকে শনাক্ত করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। ওই হত্যাকাণ্ডে ৬ থেকে ৭ জন জড়িত রয়েছে। সিলেটের লামাবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রবিউল ইসলাম মাসুম জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত অভিজিৎ খুনের ঘটনা স্বীকার করলেও অনেক কিছুই লুকাচ্ছে। এ কারণে আদালতে তার ৭ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। বিকালে অভিজিৎকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। এ ঘটনায় লাশ উদ্ধারের পরপরই রাহুলের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছিল। সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. রহমত উল্লাহ জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত অভিজিৎ খুনের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে। অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক ও ডিভিআর মেশিন জব্দ করে।

ক্যামেরনের মন্ত্রীরা

নিজের প্রথম একদলীয় মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ গুছিয়ে এনেছেন বৃটেনের পুনঃনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। এবারের মন্ত্রিসভায় উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, বেশ কয়েকজন নারী মন্ত্রীর অন্তর্ভুক্তি ও পদন্নোতি। তবে শীর্ষ মন্ত্রীদের সবাই গতবারের পদেই রয়ে গেছেন। নতুন ২ জন নারী মন্ত্রী যুক্ত হয়েছেন। এরা হলেন- অ্যাম্বার রুড, যিনি জ্বালানি ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে কাজ করবেন। প্রিতি প্যাটেল কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। লন্ডনের মেয়র বরিস জনসন মন্ত্রিসভায় থাকবেন না। তবে টোরি দলের রাজনৈতিক মন্ত্রিসভায় অংশ থাকবে তার। এ খবর দিয়েছে বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ান। নিচে মন্ত্রী ও পার্লামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ পদধারীদের সমপর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু তথ্য উল্লেখ করা হলো।
জর্জ অসবোর্ন: চ্যান্সেলর অর্থাৎ অর্থমন্ত্রী হিসেবে আগের পদেই রয়ে গেছেন জর্জ অসবোর্ন। তিনি একই সঙ্গে ফার্স্ট সেক্রেটারি অব স্টেট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন। অর্থাৎ বৃটেনের প্রধানমন্ত্রীর পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী এখন তিনিই। ধারণা করা হচ্ছে, ক্যামেরনের ডানহাত বলে পরিচিত অসবোর্ন কার্যত গতবারের উপ-প্রধানমন্ত্রী নিক ক্লেগের স্থানটিই পেলেন।
থেরেসা মে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিজের আগের পদে রয়ে গেছেন থেরেসা মে। তাকে ভাবা হয় দলের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নেতা। গত ৫০ বছরে বৃটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এতকাল কেউ দায়িত্ব পালন করেনি।
ফিলিপ হ্যামন্ড: ক্যামেরনের গতবারের মেয়াদে সর্বশেষ যে মন্ত্রিসভার রদবদল হয়, তখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পদে উন্নীত হন ফিলিপ হ্যামন্ড। সেবার উইলিয়াম হেগের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন তিনি। এবারও দায়িত্ব পাচ্ছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের।
মাইকেল ফেলন: চতুর্থ শীর্ষ মন্ত্রণালয় অর্থাৎ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধানের পদেও অদলবদল আসেনি। মাইকেল ফেলন এবারও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। অবশ্য নির্বাচন চলাকালে বিরোধী লেবার দলের প্রধান এড মিলিব্যান্ডকে উদ্দেশ্য করে তার করা মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। তখন তিনি বলেছিলেন, এড মিলিব্যান্ড লেবার দলের নেতৃত্ব পেতে নিজের ভাইয়ের পিঠে ছুরি মেরেছিলেন। তিনি এবার যুক্তরাজ্যের পিঠে ছুরি মেরে প্রধানমন্ত্রী হতে চান।
মাইকেল গোভ: সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও টাইমস পত্রিকার সাংবাদিক মাইকেল গোভের পদাবনতি হয়েছিল গতবারের রদবদলে। সেবার শিক্ষামন্ত্রী থেকে চিফ হুইপ হয়েছিলেন তিনি। তবে এবার তাকে আবারও শীর্ষ পদে ফিরিয়ে এনেছেন ক্যামেরন। এবার তিনি দায়িত্ব পালন করবেন লর্ড চ্যান্সেলর ও বিচারমন্ত্রী হিসেবে।
ক্রিস গ্রেলিং: সাবেক বিচারমন্ত্রী ক্রিস গ্রেলিং-এর পদাবনতি হয়েছে। সেখানে তার অনেক শত্রু ছিল বলে ধারণা করা হতো। তবে এবার তিনি পাচ্ছেন হাউস অব কমন্সের নেতা ও পরিষদের লর্ড প্রেসিডেন্টের পদ। এ পদে সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী উইলিয়াম হেগ দায়িত্ব পালন করেছেন একসময়।
নিকি মরগান: নিকি মরগান পাচ্ছেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এবং নারী ও সমতা বিষয়ক মন্ত্রীর পদ।
মার্ক হার্পার: এবার পার্লামেন্ট চিফ হুইফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মার্ক হারফার। তিনি যুক্তরাজ্যের সাবেক অভিবাসন মন্ত্রী। অথচ একসময় ধরা পড়ে, তার ঘরের ক্লিনার নিজেই অবৈধ অভিবাসী! এর পর তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এবার তাকে বেশ কঠিন দায়িত্বই দেয়া হয়েছে। পার্লামেন্টে নিজের দলের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণের ভার তার ওপর।
লেডি টিনা স্টোয়েল: তিনি দায়িত্ব পালন করবেন পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসের নেতা হিসেবে। বিস্টনের এ ব্যারোনেস একজন কারখানা শ্রমিকের কন্যা।
অ্যাম্বার রুড: খুব দ্রুতই পদোন্নতি পেয়েছেন অ্যাম্বার রুড। মন্ত্রিসভায় জ্বালানি ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। সাবেক বিনিয়োগ ব্যাংকার অ্যাম্বার এর আগে এ মন্ত্রণালয়েরই আন্ডার-সেক্রেটারি ছিলেন। এবার তিনি লিব-ডেম দলের এড ডাভের স্থলাভিষিক্ত হলেন।
সাজিদ জাভিদ: দলে সাজিদ জাভিদকে ভাবা হয় উদীয়মান তারকা হিসেবে। একাধারে ভারতীয় ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সাজিদ জাভিদ সংস্কৃতি মন্ত্রী থেকে বাণিজ্য মন্ত্রীতে পদোন্নতি পেয়েছেন। তিনি স্থালভিষিক্ত হয়েছেন ভিন্সে ক্যাবলের।
প্রিতি প্যাটেল: প্রিতি প্যাটেল পেয়েছেন কর্মসংস্থান মন্ত্রীর পদ। নির্বাচনী প্রচারণার সময় নিয়মিতই টিভিতে দেখা যেত তাকে। এর আগে এ পদে ছিলেন ইস্থার ম্যাকভে। নির্বাচনে হেরে পদ খুইছেন ম্যাকভে।
বরিস জনসন: লন্ডনের মেয়র বরিস জনসনের ভবিষ্যৎ বেশ সম্ভাবনাময়। কেউ কেউ তাকে ক্যামেরনের উত্তরসূরিও ভাবেন। এবারই প্রথম এমপি হয়েছেন তিনি। কিন্তু ২০১৬ সাল পর্যন্ত লন্ডনের মেয়রের দায়িত্ব ঠিকঠাকভাবে করতে চান বলে মন্ত্রী হতে চান না তিনি। কিন্তু ক্যামেরনের রাজনৈতিক মন্ত্রিসভায় অংশ থাকবে তার।
জন হুইটিংডেল: প্রবীণ টোরি এমপি জন হুইটিংডেল হবেন সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও ক্রিড়া বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

হাসপাতালের কারসাজি ৯৯ ভাগ ডেলিভারি সিজারে by মাহমুদ মানজুর

গার্মেন্ট শ্রমিক ঝুমুরের তীব্র প্রসব বেদনা। মাতুয়াইল শিশু ও মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সিঁড়ির গোড়ায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। ডাক্তার দেখার আগেই সেবিকা এসে দেখে যান। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেবিকা এসে জানান বাচ্চার অবস্থা ভয়ঙ্কর। উল্টে আছে। এছাড়া, বাচ্চার শরীর স্বাস্থ্য ভাল। নরমাল ডেলিভারি সম্ভব নয়।  এখনই সিজার না করালে সন্তান অথবা মা যে কোন একজনকে হারাতে হবে। নিরুপায় ঝুমুর। কি করবেন তিনি? তার স্বামীও দিশাহারা। হাতে এত টাকাও নেই। ডাক্তার সবসময় বলে আসছিলেন নরমাল ডেলেভারি হবে। তাহলে এমন কি হলো যে সিজার করতে হবে? কোন উত্তর নেই ঝুমুরের। অবশেষে ভয় আর আতঙ্ক নিয়েই তিনি অপারেশন থিয়েটারে যান। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুত্র সন্তান জন্ম দেন তিনি। সিজারের মাধ্যমেই তাকে সন্তান জন্ম দিতে হয়েছে। আর এভাবেই প্রতিদিন শত শত মা তার সন্তান জন্ম দিচ্ছে সত্যিকারের গর্ভের স্বাদ না নিয়ে। হাসপাতালে গেলেই ডাক্তার, নার্স দ্রুত সিজারের পরামর্শ দেন। এ জন্য প্রতিটি হাসপাতালেই কাজ করে একটি চক্র। তাদের কারসাজিতেই মায়েরা পা দেন সিজারে।  গত এক সপ্তাহে ঢাকার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল সরজমিন ঘুরে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। কাঁচপুর ব্রিজ এলাকার গার্মেন্টস কন্যা ঝুমুরের সঙ্গে কথা হয় শুক্রবার সকাল ১১টায়। কোলে ফুটফুটে পুত্র সন্তান। নাম রেখেছেন জহিরুল ইসলাম। ঝুমুর বলেন, স্বামী-শাশুড়ির আপত্তি সত্ত্বেও ডাক্তারের পরামর্শে সিজার করিয়েছি। কারণ ডাক্তার বলেছেন, জহিরুলের শরীর-স্বাস্থ্য নাকি বেশ ভালো। তাই নরমাল ডেলেভারি হলে ওর এবং আমার ক্ষতি হতে পারে। কোলের হ্যাংলা পাতলা জহিরুলকে দেখিয়ে ঝুমুর বলেন, ‘এই দেখেন আমার জহিরুলের নাকি শরীর-স্বাস্থ্য বেশ ভালো! হেগো ‘‘আলতাসুনুগ্রাম’’ রিপোর্টে নাকি মোটা-তাজা আইছে। এই বইলা তাড়াহুড়া করে আমার অপারেশন করছে। ১৫ হাজার টাকা খরছ গেছে।’ যাত্রাবাড়ী এলাকার লেগুনার ড্রাইভার শফিক খন্দকার। উদভ্রান্তের মতো ছুটোছুটি করছেন শিশু-মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের উপর-নিচে। আলাপ করে জানা গেছে, স্ত্রীকে বৃহস্পতিবার ভর্তি করিয়েছেন। শুক্রবার যে কোন সময় স্বাভাবিক ডেলিভারির কথা। ডাক্তার তাই নিশ্চিত করেছেন। তবে শুক্রবার দুপুর নাগাদ চিত্র পাল্টে গেছে। কর্তব্যরত নার্স জানিয়েছেন, বাচ্চা নাড়াচাড়া করছে না। এটা নাকি খুব খারাপ লক্ষণ। নার্স আরও বলেছেন, এভাবে বসে না থেকে দ্রুত সিজার করিয়ে ফেলাই ভালো। বেশি লাগবে না। হাজার দশেক টাকা হলেই ডাক্তারকে বলে সিজারের ব্যবস্থা করে দিবেন ঐ নার্স। শফিক খন্দকার ধারকর্জ করে পকেটে হাজার পাঁচেক টাকা নিয়ে অনাগত বাচ্চা ও তার মায়ের সু-চিকিৎসার কথা ভেবে হাসপাতালে এসেছেন। এরমধ্যে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দুই হাজার টাকা শেষ। সিজারের টাকা যোগাড় করতে স্বজনদের দ্বারস্থ হচ্ছেন। তার উপর মাথায় ঘুরছে বড় একটা প্রশ্ন- স্ত্রীর গর্ভের অনাগত সন্তান সুস্থ আছে তো? সুস্থ থাকলে নড়াচড়া করবে না কেন? তাইতো দিন এনে দিন খাওয়া শফিক খন্দকার এখন টাকার জন্য দিকভ্রান্ত। শুক্রবার নগরীর অন্যতম এই মা ও শিশু স্বাস্থ্য হাসপাতালের অন্তত ৮ জন রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা হয়। যাদের প্রত্যেকেই সিজার করিয়েছেন। সিজার করার কারণ হিসেবে প্রত্যেকের বর্ণনা প্রায় একই। এসব প্রসঙ্গে হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি অসম্মতি জানান। বলেন, আমার দায়িত্ব রোগীদের চিকিৎসা দেয়া। কথা হয় সেবিকা সেলিনার সঙ্গে। তিনি জানান, এই হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন নবজাতক জন্ম নেয়। এর মধ্যে ১৩ থেকে ১৮ জনই সিজার রোগী। অর্থাৎ সরকারি এই চিকিৎসা কেন্দ্রে আগত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৯৮ ভাগই সিজারের শিকার হচ্ছেন।
হুবহু একই চিত্র মিলেছে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত নামকরা আজিমপুর মেটারনিটি (মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান) হাসপাতালে। হাসপাতাল সূত্রমতে, এখানে প্রতিদিন নবজাতক জন্মের সংখ্যা ২৫ থেকে ৩০ জনের মধ্যে ওঠানামা করে। এরমধ্যে স্বাভাবিক প্রসবের ঘটনা একটি দুটির বেশি নয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক বললেন, সন্তান প্রসবের জন্য এখন রোগী এবং চিকিৎসক উভয়পক্ষই সিজারকে নিরাপদ এবং ঝামেলামুক্ত মনে করেন। তাই সিজারের সংখ্যা বাড়ছে। এই চিকিৎসক আরেকটি উল্লেখযোগ্য তথ্য দেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন যে দু’একটি স্বাভাবিক প্রসবের ঘটনা ঘটে সেগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনার মতো। দেখা যায়, প্রচণ্ড প্রসব বেদনা নিয়ে একজন রোগী এলেন। আসার পর তার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার আগেই স্বাভাবিক প্রসব হয়ে গেল। যেটা তিনি বাসায় কিংবা গাড়িতে থাকলেও হতো। অর্থাৎ আমাদের এখানে স্বাভাবিক প্রসব মূলত সারপ্রাইজ গিফটের মতো।
হাসপাতাল প্রাঙ্গণে কথা হয় এনজিও কর্মী মনিরুল ইসলামের সঙ্গে। ৫ বছরের ফুটফুটে কন্যা মুনিয়াকে নিয়ে তিনি পায়চারি করছিলেন মেটারনিটি প্রাঙ্গণে। কথায় কথায় তিনি জানান, খুব দোটানার মধ্যে আছি। স্ত্রীকে ভর্তি করিয়েছি। শনিবার সম্ভাব্য ডেট ছিল ডেলিভারির। কিন্তু ব্যথা উঠেনি। ডাক্তাররা বলছেন অপেক্ষা না করে সিজার করিয়ে ফেলতে। কিন্তু আমার স্ত্রী কাটাছিঁড়ায় ভয় পায়। তাছাড়া, আমাদের প্রথম বাচ্চা স্বাভাবিক ভাবেই হয়েছে। আল্লাহর রহমতে কোন সমস্যা হয়নি। ভালোর জন্য হাসপাতালে এনে ভুল করলাম কিনা, বুঝতে পারছি না। এই এনজিও কর্মী আরও জানান, সিজারের বিষয়ে আপত্তি করলেই ডাক্তার-নার্সদের মুখ কালো হয়ে যায়। তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে।
মনিরুল ইসলামের সঙ্গে কথা শেষ করতে না করতে দেখা গেল আরেক হৃদয়বিদারক ঘটনা। নবজাতক শিশু কোলে নিয়ে বিলাপ করতে করতে এম্বুলেন্স থেকে নামলেন বয়োবৃদ্ধ ফাতেমা খাতুন। জানা যায়, কোলের বাচ্চাটি তার নাতনি। ৮ই মে ছেলের বৌ-এর সিজার হয়েছে। জন্মের পর নাতনীর শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হচ্ছে। তাই হঠাৎ করে বললো বাচ্চাকে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যেতে, কারণ এখানে আইসিইউ নেই। ফাতেমা খাতুন নাতনীকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যালে ছুটে গিয়েছেন। কিন্তু তারা ভর্তি না করিয়ে ফেরত দিয়েছেন। এরমধ্যে নাতনীর নড়াচড়াও প্রায় বন্ধ। হাউমাউ করে কান্নারত ফাতেমা খাতুনকে আজিমপুর মেটারনিটির কর্তব্যরত ডাক্তার বললেন, ঝামেলা না করে দ্রুত শিশু হাসপাতালে নিয়ে যান। ‘তোরা জোর জবরদস্তি করে আমার বৌ’র পেট কাটছোস। আমার নাতনীর কিছু হইলে আমি তোদের ছাড়ুম না।’- এই বলে পঞ্চাশোর্ধ ফাতেমা খাতুন শিশু হাসপাতালের উদ্দেশে রওয়ানা দেন।
এদিকে পরিসংখ্যান মতে একই ফলাফল মিলেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের গাইনি বিভাগ থেকেও। একটি সূত্রে জানা যায়, সারা দেশ থেকে প্রতিদিন প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন প্রসূতি রোগী আসেন এখানে। যার ৯৯ ভাগই নানা কারণে সংকটাপন্ন। ফলে ঐ ৯৯ ভাগ রোগীকেই সাধারণত অস্ত্রোপচার করানো হয়।
অন্যদিকে ঢাকার মগবাজারে অবস্থিত আদ-দীন হাসপাতাল মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মা ও শিশুর জন্য অন্যতম আস্থার জায়গা। সরজমিন গিয়ে এই হাসপাতালেও মিলেছে একই চিত্র। শনিবার এই হাসপাতালে আসা নাসরিন-ইমন দম্পতির সঙ্গে কথা হয়। ইমন জানান, প্রথম সন্তান হিসেবে স্ত্রী ও অনাগত সন্তানের প্রতি বাড়তি সচেতনতা অবলম্বন করছেন প্রথম থেকে। স্ত্রীর গর্ভের বাচ্চার বয়স নয় মাস। তবে অতি সমপ্রতি নাসরিনের শরীরে পানি জমে খানিকটা ফুলে গেছে। তাই এদিন ডাক্তারের পরামর্শ নিতে এসেছেন। ডাক্তার পরামর্শ দিয়েছেন পানির পরিমাণ বাড়তে থাকলে ১০ মাসের আগেই সিজার করাতে হবে। অন্যদিকে তাদের পূর্ব পরিচিত ধাত্রীর ভাষ্য, ‘শরীরে এমন একটু আধটু পানি আসেই। এটা কোন ঘটনা না। এই বাচ্চা ঘরেই আরামছে নরমাল ডেলেভারি হইবো। সিজার করাইলে ডাক্তারেগো ব্যবসা ভালো। ১০ মিনিটে ২০ হাজার টাকা কামাইবো। তাই হেরা সবাইরে সিজারের কথাই কয়।’’
এদিকে ডাক্তার এবং ধাত্রীর এমন বিপরীতমুখী কথা শুনে দিন যত গড়াচ্ছে ততই দুশ্চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছেন নাসরিন-সুমন দম্পতি। এই হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তাররা এই বিষয়ে কথা বলতে না চাইলে কথা হয় ঝিনুক নামের একজন সিনিয়র সেবিকার সঙ্গে। তিনি বলেন, এখন নরমাল ডেলেভারির চল নাই। সব সিজার। সেবিকা আরও জানান, এই হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ নবজাতক জন্ম নেয়। এরমধ্যে দু’একটি নরমাল ডেলেভারির ঘটনা ঘটে। তার তথ্যমতে এরমধ্যে অধিকাংশ গর্ভবতী নারীই নাকি সিজার পদ্ধতিকে স্ব-ইচ্ছায় বেছে নেন, আর তাতে ডাক্তারদেরও সমর্থন থাকে।
দেশের স্বনামধন্য বিশেষজ্ঞদের মতে সিজার নয়, স্বাভাবিক প্রসবই মা ও বাচ্চার জন্য উত্তম পন্থা। উন্নত বিশ্বে সিজার হচ্ছে সন্তান প্রসবের জন্য সর্বশেষ উপায়। অথচ বাংলাদেশে সেই উপায়কে নিয়ে আসা হয়েছে সবার আগে। তাইতো সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের প্রবণতা বেড়েছে আশংকাজনক হারে। খোদ চিকিৎসকরাই বলছেন, এখন দেশের প্রায় সিংহভাগ নারী মাতৃত্বের অমৃত স্বাদ গ্রহণ করছেন সিজারের মাধ্যমে। অথচ এই সিজারের কারণে মা এবং সন্তান দু’জনেই পতিত হচ্ছেন দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগের ঘেরাটোপে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিদ্যা বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রথম ও দ্বিতীয় সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে ব্যথা ওঠার ১৮ ঘণ্টা অতিক্রম হলে সিজার করা দরকার হতে পারে। তৃতীয়, চতুর্থ ও পরবর্তী সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর সিজারের সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। যেকোন কারণে মা ও শিশুর জীবন বিপন্ন হলে, প্রসবের রাস্তা ছোট থাকলে, গর্ভফুল বা পাসেন্টা অস্বাভাবিক অবস্থায় থাকলে, প্রসব পথ আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ বন্ধ থাকলে, জরায়ুতে সঠিক স্থানে সন্তান না থাকলে, মায়ের একলামসিয়া বা প্রিএকলামসিয়া, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও সিজারিয়ানের সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
নগরীর সেন্ট্রাল হাসপাতাল থেকে এমনই এক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন কলাবাগানের আরিফা জামান। তিনি বলেন, প্রথম থেকেই সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম আমাদের প্রথম সন্তান স্বাভাবিক ভাবেই পৃথিবীর আলোয় চোখ মেলবে। টানা ১০ মাস নিয়মিত চেকআপ, হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ভালোই চলছিলাম। তেমন কোন সমস্যাই হয়নি ১০ মাসে। ডাক্তার ডেলিভারির একটা সম্ভাব্য তারিখ দিলেন ৮ই এপ্রিল। স্বাভাবিক ভাবেই আমরা ৮ই এপ্রিল ডাক্তারের কাছে যাই। তিনি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিলেন। সন্ধ্যায় নতুন করে সব পরীক্ষা করলেন। হাসিমুখে বললেন, দুশ্চিন্তার কারণ নেই। আপনাদের ইচ্ছে পূরণ হবে। সব ঠিকঠাক। আমি শতভাগ নিশ্চিত স্বাভাবিক ভাবেই আমার কন্যা সন্তান পৃথিবীর আলোয় চোখ মেলবে। না, শেষ পর্যন্ত হলো না। ঐদিন রাতেই ডাক্তার হুট করে এসে আমার স্বামীকে বললেন, দেখুন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। সবচেয়ে নিরাপদ হয় আজ রাতেই সিজার করিয়ে ফেলা। তাতে করে মা এবং বাচ্চা দু’জনেরই মঙ্গল হবে। বাকিটা আপনাদের সিদ্ধান্ত। কোন রকম কারণ ছাড়া ডাক্তারের হঠাৎ এমন কথায় দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। পরে একরকম মনের ভয়েই সিজারের সিদ্ধান্ত নিতে হয় আমাদের।
দেশে আশংকাজনক হারে সিজারের প্রবণতা বেড়েই চলেছে- এমন মত প্রকাশ করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের প্রসূতি ও ধাত্রী বিভাগের পরামর্শক ডা. ফারজানা ডালিয়া বলেন, সিজার এখন স্বাভাবিক ঘটনায় দাঁড়িয়ে গেছে। দিন যত এগুচ্ছে এর প্রবণতাও বাড়ছে। যা মোটেই সুখকর সংবাদ নয়। এরজন্য শুধু এক শ্রেণীর অসাধু ডাক্তার-হাসপাতালকে দায়ী করলে সমস্যার সমাধান হবে না। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ইদানীং শহরকেন্দ্রিক সিংহভাগ মা ও তার পরিবার সিজার নামক শর্টকার্ট পদ্ধতিতে সন্তান জন্ম দিতে চান। তারা স্বাভাবিক প্রসবের জন্য ২/৩ দিন অপেক্ষা এবং প্রসবের ব্যথা সহ্য করতে চান না। এটাই হলো বর্তমান সময়ের নির্মম বাস্তবতা।

পুলিশের অপরাধ খুঁজে পায় না পুলিশ, বেড়েই চলছে অপরাধ প্রবণতা by নুরুজ্জামান লাবু

একের পর এক অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে পুলিশ। কিন্তু পুলিশের অপরাধ তদন্ত করতে গিয়ে ‘অপরাধ’ খুঁজে পায় না পুলিশ। কথিত ইমেজ রক্ষার নামে আড়াল করা হচ্ছে পুলিশের অপরাধ কর্মকাণ্ড। অথচ গুটি কয়েকজনের জন্য পুরো বাহিনীর সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা অপরাধী পুলিশ সদস্যকে শাস্তি নয়, বাঁচানোর জন্যই নানা চেষ্টা-তদবির করেন। ফলে অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে পুলিশ কর্মকর্তারা। তদন্তের নামে চলে দীর্ঘ সময় ক্ষেপণ করা হয়। একপর্যায়ে ভুক্তভোগীরাও হতাশ হয়ে পিছুটান দেয়। আবার ভুক্তভোগীদের ভয়-ভীতি দেখানোও তো হরহামেশাই ঘটছে। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে এমন বেশ কয়েকটি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। গত ২রা ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পল্লবী এলাকায় নাহিদ নামে এক যুবককে  অপহরণের পর চাহিদা মতো অর্থ না পাওয়ায় হত্যার অভিযোগ উঠেছে। পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক তৌহিদুল আরেফিন এবং সহকারী উপ-পরিদর্শক সুব্রত রায় এই অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন নাহিদের পরিবারের সদস্যরা। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে এর স্বপক্ষে বিস্তর প্রমাণাদিও দিয়েছেন। এত বড় অপরাধের পরও সেই দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কোনও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। উল্টো পুলিশের মিরপুর জোনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দুই পুলিশ সদস্যের পক্ষ নিয়েই কথা বলছেন। বিষয়টি তদন্তের নামে ইতিমধ্যে তিন মাস সময় ক্ষেপণ করেছেন। তবু এর কোনও সুরাহা হয়নি। এমনকি ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে আদালতে মামলা দায়েরের পর আদালত তা গোয়েন্দা পুলিশকে তদন্ত করতে বলে। গোয়েন্দা পুলিশও কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে নিলেও সেই তদন্ত শেষ করেনি। নাহিদের বোন শিলা বলছেন, উল্টো অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্য ও তাদের সহযোগীরা তাকে এবং ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের নানাভাবে হয়রানি ও হুমকি দিয়ে আসছে।
রাজধানীর কাফরুল এলাকার ১৭ বছরের এক কিশোরীর সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলেন ডিএমপির মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী কমিশনার শেখ রাজিবুল হাসান। প্রথম স্ত্রীর কথা গোপন রেখে ও মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়ে ওই কিশোরীকে তুলে নিয়ে যান তিনি। একপর্যায়ে গোপনে তাকে বিয়েও করেন। প্রথম দিকে সেই কিশোরীকে তুলে নেয়ার কথা অস্বীকার করলেও পরে সেই কিশোরীকে পরিবারের কাছে ফেরত দেন। কিশোরীর পরিবারের সদস্যরা থানা ও র‌্যাবের কাছে অপহরণের অভিযোগ করেন। কিন্তু ঘটনার সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তা জড়িত বলে কোনও পদক্ষেপ নেয়নি তারা। বর্তমানে কিশোরীকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করলেও এনিয়ে কোনও বাড়াবাড়ি না করার হুমকি দিয়ে আসছেন সেই পুলিশ কর্মকর্তা। অসহায় পরিবারটি ভয়ে চুপসে আছে। আর বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই সদস্যকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে সংশ্লিষ্ট ডিসির কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আর কোনও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা কোনও অভিযোগ না পাওয়ার কথা বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন।
গত বছরের মাঝামাঝিতে পল্লবী থানায় জনি নামে এক বিহারীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। জনির সঙ্গে আটককৃত অন্যদের সামনেই এ ঘটনা ঘটলেও সেটি ‘হার্ট অ্যাটাক’ বলে চালিয়ে দেয়া হয়। তৎকালীন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা অভিযুক্ত এসআই জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু এর কিছুদিন পর বদলি হয়ে একই পুলিশ কর্মকর্তা মিরপুর থানায় নির্যাতন করে সুজন নামে এক ঝুট ব্যবসায়ীকে হত্যা করেন। সেই ঘটনাও প্রথম দিকে ‘হার্ট অ্যাটাক বলে চালানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা শুরু হলে সেই পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এখনও অধরা রয়েছে তার সহযোগী দুই পুলিশ সদস্য। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথমবারেই এসআই জাহিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলে ঝুট ব্যবসায়ী সুজনকে মরতে হতো না।
গত অক্টোবর মাসে শেরেবাংলানগর থানার এসআই আনোয়ার পরকীয়ার জের ধরে এক গাড়িচালককে ধরে নিয়ে পায়ে গুলি করে সন্ত্রাসী বানানোর চেষ্টা করে। এমনকি ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্রও উদ্ধার দেখানো হয়। কিন্তু পরে জানা যায় সবই সাজানো নাটক। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও সেই অস্ত্রের বিষয়টি এখনও সুরাহা হয়নি। অস্ত্রটি এসআই আনোয়ার কোথায় পেয়েছিলেন তা জানা যায়নি এখনও। জানা গেছে, পুলিশের ইমেজ রক্ষার নামে অনেক বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে তদন্তে থাকা খোদ পুলিশ কর্মকর্তারাই।
সম্প্রতি একই ঘটনা ঘটেছে ব্লগার অভিজিৎ হত্যাকাণ্ড ও পয়লা বৈশাখে টিএসসিতে একাধিক নারীর শ্লীলতাহানির ঘটনায়। অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আশেপাশে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও এগিয়ে না যাওয়ায় দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি উঠে আসে। কিন্তু পুলিশের তদন্তে কোনও অবহেলা খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর শ্লীলতাহানির ঘটনায় কয়েক বখাটেকে ধরে যেই পুলিশ কর্মকর্তার হাতে সোপর্দ করা হয়েছিল। তিনি তাদের ছেড়ে দিয়েছিলেন। ব্যবস্থা নেয়া হয়নি তার বিরুদ্ধেও।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ নূরুল হুদা বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সুপারভিশনের অভাবেই অধস্তনরা সাধারণ বা ফৌজদারি অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এটি বন্ধ করতে হলে অপরাধে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি দিয়ে দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে। যাতে অন্য কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সাহস না পায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরাধ দমনের নামে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধেই জড়িয়ে পড়ছে পুলিশ। সাধারণ মানুষের কাছে ক্রমশ পুলিশ একটি আতঙ্কের নাম হয়ে উঠছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুটি কয়েক দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্যের কারণে পুরো বাহিনীর দুর্নাম হচ্ছে। এমনকি অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার কারণে পুলিশ সদস্যদের মাঝেও অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. জিয়া রহমান বলেন, বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য পুলিশ বাহিনীর আমূল পরিবর্তন দরকার। এই বাহিনীতে বর্তমানে কমিটমেন্ট এবং রিসোর্সের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, রাজধানীসহ সারা দেশে প্রতিমাসে গড়ে ১২ শতাধিক ছোট-বড়  অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গত তিন বছরে অর্ধ লক্ষাধিক অভিযোগ জমা পড়ছে পুলিশ সদর দপ্তরের সিকিউরিটি সেল এবং ডিসিপ্লিন বিভাগে। গত বছরেই প্রায় ১৫ হাজার অভিযোগ জমা হয়েছে। এ ছাড়া ২০১২ সাল থেকে ২০১৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত দুর্নীতি ও শৃঙ্খলাভঙ্গসহ নানা অপরাধে পুলিশের বিভিন্ন পদমর্যাদার ৩৪ হাজার ১২৯ জন পুলিশ সদস্য শাস্তি পেয়েছেন। এর মধ্যে বড় ধরনের অপরাধে গুরুদণ্ড হয়েছে ২ হাজার ৪শ পুলিশ সদস্যের। লঘু দণ্ড পেয়েছে ৩১ হাজার ৭২৯ পুলিশ সদস্য।
পুলিশ সদর দফতরের ডিসিপ্লিন অ্যান্ড প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড শাখার তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১২ সাল থেকে ২০১৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত ১১৪ জন ইন্সপেক্টরকে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। এর মধ্যে ১০৯ জনকে লঘু দণ্ড এবং ৫ জন ইন্সপেক্টর গুরু দণ্ড পান। এর মধ্যে ২০১২ সালে ৪৬ ইন্সপেক্টর, ২০১৩ সালে ৩৯ জন ইন্সপেক্টর এবং গত বছরের জুন পর্যন্ত ২৯ ইন্সপেক্টরকে বিভিন্ন অপরাধে শাস্তি দেয়া হয়।

পেটানোর পর ক্ষমা চেয়ে প্রেমিকার কাছে চিঠি

প্রিয়, আমি আসলে এমন নই। আমি এমনটা চাইনি। আমায় ক্ষমা করে দিও। এমনটা আর কখনই হবে না, কথা দিলাম। প্রেমিকার অভিমান ভাঙাতে এমন অনেকেই করেন। তবে এটি কি জানেন, স্ত্রী বা প্রেমিকাকে নির্মমভাবে প্রহারের পরও অনেক স্বামী বা প্রেমিকা ক্ষমা চেয়ে চিঠি, এসএমএস বা ই-মেইল পাঠান? ঠিক এমনটিই ঘটেছে র‌্যাকুয়েলের ক্ষেত্রে। তাকে পেটানোর পর ক্ষমা চেয়ে চিঠি লিখেন তার প্রেমিক। আকুতি-মিনতি ঝরে পড়া চিঠিগুলো দেখে গলে যান র‌্যাকুয়েল। আবারও ফিরে যান প্রেমিকের কাছে। এর ঠিক পাঁচ সপ্তাহ পর আবারও র‌্যাকুয়েলের গায়ে হাত তুলেন তার প্রেমিক। এবার তিনি আর ক্ষমা চাইবার সুযোগ দেননি প্রেমিককে। প্রেমিকের হাতে নির্দয় প্রহারের পর মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
নিজ সঙ্গীদের হাতে সহিংস আক্রমণের শিকার পেরুর নারীদের ২৫টি ঘটনা নিয়ে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। বইয়ের নাম ‘পেরু, ডোন্ট ডাই ফর মি’। সে বইয়েই প্রকাশিত হয়েছে র‌্যাকুয়েলের চিঠিটি। শুধু চিঠিই নয়, বইয়ে স্থান পেয়েছে ঘাতক বা প্রহৃতা প্রেমিক/স্বামীদের অনুনয়-অনুরোধ মাখা বিভিন্ন ইমেইল, এসএমএসও। দুই অংশে লেখা বইটিতে চিঠি, ই-মেইল ও এসএমএস-এর পরেই বর্ণিত হয়েছে, ওই ঘটনাগুলোর পরের গল্পগুলো। প্রথম অংশে হুবহু চিঠি, মেইল ও এসএমএস-এর ছবি হুবহু ছাপানো হয়েছে। অনেকগুলো গল্পই ছিল র‌্যাকুয়েলের গল্পের মতো। বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন বইয়ের খবর। সেখানে দেখা গেছে, চিঠিতে ‘শপথ করে বলছি, আমি আসলে এমন নই’, ‘আমি উদ্দেশ্যমূলকভাবে এমনটা করিনি’ এবং ‘আমি এমনটা আর করবো না’- এ বাক্যগুলো স্থান পেয়েছে বেশি। বারবার প্রেমিকাকে বাগে আনতে এমন শব্দ চয়ন করেছে প্রেমিকরা। বিশ্বে নারীদের জন্য সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দেশসমূহের একটি লাতিন আমেরিকার দেশ পেরু। প্রায়ই সেখানে নারীরা সঙ্গীর সহিংস আচরণের শিকার হন। সরকারি তথ্যমতে, গত ছয় বছরে পেরুতে নিজ প্রিয়তমের হাতে খুন হয়েছেন ৬৮০ জন নারী। এ ধরনের অপরাধের জন্য অবশ্য পেরু সরকার কঠোর শাস্তির কথা ঘোষণা করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০০৫ সালে একটি গবেষণা করে। সেখানে দেখা গেছে, পেরুর ৬১ শতাংশ নারীই তার পুরুষ সঙ্গীর কাছ থেকে শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এটি ছিল গবেষণা করা ১০টি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ হার। বাকি ৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। এছাড়া গবেষণা হয়েছে ব্রাজিল, ইথিওপিয়া, জাপান, নামিবিয়া, সামোয়া, সার্বিয়া অ্যান্ড মন্টেনিগ্রো, থাইল্যান্ড ও তাঞ্জানিয়ার নারীদের ওপরও।
ওই গবেষণায় দেখা গেছে, পেরুর ৪৯ শতাংশ নারীই ‘মারাত্মক শারীরিক সহিংসতা’র শিকার হয়েছেন। তাদের প্রতি করা সহিংস আচরণের মধ্যে রয়েছে ঘুষি, লাথি, টানা-হেঁচড়া, হুমকি ও কোন কিছু দিয়ে করা আঘাত।
‘পেরু, ডোন্ট ডাই ফর মি’ ছবিটিতে চিত্রায়িত হয়েছে দেশটির নারীদের প্রতি এমন সহিংস আচরণের চিত্র। বইটির মুখবন্ধ লিখেছেন নোবেল বিজয়ী পেরুভিয়ান লেখক মারিও ভারগাস লোসা। তিনি আহ্বান জানিয়েছেন, এ সমস্যা সমাধানের নতুন পথ খোঁজার। কেননা, অনেক নারীই সোচ্চার হতে ভয় পায়। একই কথা বলছে বইটির সম্পাদনার কাজে জড়িত একজন। তিনি নারীদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। বইয়ে বর্ণিত হওয়া নারীদের বেশির ভাগই প্রহারের শিকার হয়েছেন। এদের অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। কেউ বা মারাও গেছেন।
বই থেকে দুটি গল্প
গিয়াকার্লো তার স্বামী অ্যান্ড্রিয়াকে লিখেছিলেন, তুমি জানো যে, আমি তোমাকে ভালবাসি। যদিও আমি একটি ভুল করে ফেলেছি। তবে এমনটা আর কখনই ঘটবে না। প্রেমিকের লেখা চিঠিতে মন নরম হয় অ্যান্ড্রিয়ার। কিন্তু ফিরে যাওয়ার পর সে প্রেমিকই টুলবক্স দিয়ে আঘাত করে থেঁতলে দেয় অ্যান্ড্রিয়ার মুখ।
ভিক্টর তার প্রেমিকা কার্লার কাছে লিখেছেন, আমি শুধু চেয়েছি যে, তুমি অনুধাবন করো, তুমিই কেবল আমার প্রেয়সী। আমি এটা ভেবে পাগল হয়েগিয়েছিলাম যে, তুমি কিভাবে আরেকজনের জন্য আমাকে ছেড়ে চলে যেতে পারলে। আমি উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলাম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু আমি জানি, এমনটা আর কখনই হবে না। ঠিক এক বছর পর, কার্লা গর্ভবতী হন। এরপরই প্রেমিকের প্রহারে তার গর্ভপাত ঘটে। কার্লা আর কখনই সন্তান ধারণ করতে পারবে না।

‘ছুমন্তর’ ধোপাজান মুঠোয় বন্দি সুনামগঞ্জ by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

ধোপাজান। সুনামগঞ্জের সদর ও বিশ্বম্ভরপুর দুই উপজেলাজুড়ে বয়ে চলা নদী। সীমান্তঘেঁষা ডলুয়ার ওপারের পাহাড়ের গা বেয়ে এ নদীতে বালু বয়ে আসে। এ বালুই হাজার মানুষের জীবিকার উপায়। ধোপাজান বালুমহাল। কেউ আয় করেন গতর খাটিয়ে কেউবা পুঁজি খাটিয়ে আর তার সঙ্গে জোরও খাটান কেউ কেউ। যেখানে জীবিকা সেখানে আয়ের নানা পথ থাকে। থাকে ফন্দি-ফিকিরও। বালুমহাল ইজারা নিতে তাই আগ্রহীদের কমতি নেই। জোর খাটিয়ে-কৌশলে ইজারা নেয়ারও চেষ্টা চলে। তোফাজ্জল হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী বাংলা ১৪২১ সাল পর্যন্ত তিন বছর ধরে ইজারা নিয়ে টোল আদায় করছিলেন বালু উত্তোলনকারীদের কাছ থেকে। অভিযোগ, বছর গড়িয়ে নতুন বছর এলেও তিনি জোর করে এখনও টোল আদায় করে যাচ্ছেন। তোফাজ্জলকে জোর খাটানোর জোর জুগিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের পরিচয়ধারী একটি মহল। বিনিময়ে তিনি তাদের ‘খোশ’ রাখছেন নগদ নারায়ণ দিয়ে। যার জোগান আসছে ধোপাজান বালুমহাল থেকেই। তোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে এমন  বোঝাপড়ার কারণে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব থেকে।
ধোপাজান বালুমহাল আয়ের এক বিশাল ক্ষেত্র। প্রতিদিন এখানে খাটেন ৫০ হাজার শ্রমিক। প্রায় দুই শ’ কার্গো, আড়াই শ’ ভলকেট (বাল্কহেড) আর ২০ হাজার বারকি নৌকার আনাগোনায় ব্যস্ত থাকে ধোপাজান নদী। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ধোপাজান বালুমহাল থেকে একদিনে যা আয় হয় ‘ক্ষমতার জোরে’ এর চেয়েও কম টাকায় ইজারা নিয়ে ১৪১৯ বঙ্গাব্দ থেকে মহালটি ভোগ করে আসছেন তোফাজ্জল। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ধোপাজান বালুমহাল থেকে দৈনিক ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা আয় করলেও জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে গত দুই বছরে (১৪১৯ ও ১৪২০ বঙ্গাব্দ) এ মহাল থেকে সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে মাত্র ২১ লাখ ৪২ হাজার টাকা। ১৪২১ বঙ্গাব্দেও জমার অঙ্কে তেমন হেরফের হয়নি। ১৪২১ বঙ্গাব্দে জমা হয়েছে ১০ লাখ ২৮ হাজার- যা ভ্যাট ও উৎস করসহ দাঁড়িয়েছিল ১২ লাখ ৩৪ হাজার ২শ’।
তোফাজ্জল হক ক্ষমতাসীন দলের পরিচয়ে ধোপাজানের দখল ধরে রাখলেও ক্ষমতাসীন দলের নেতারাই বলছেন, ধোপাজান বালুমহাল এতো কম টাকায় ইজারা দেয়া মোটেই উচিত হয়নি। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ও সদর আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালাম সম্প্রতি সুনামগঞ্জ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির এক সভায় ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, তাকে দিলেও তিনি ধোপাজানের জন্য বছরে দুই কোটি টাকা দিতে প্রস্তুত আছেন।
তোফাজ্জল ধোপাজান বালুমহালটি প্রথম ইজারা পান ১৪১৯ সালে। পরের বছরও তার কাছেই ইজারা থাকে। আরও ইজারা চান তিনি। মেয়াদ শেষে প্রশাসনের কাছে ইজারা দাবি করেন একসঙ্গে তিন বছরের জন্য। কিন্তু ‘বালুমহাল ও মাটি বিধিমালা ২০১১’ অনুসারে কোন বালুমহাল তিন বছর মেয়াদে ইজারা দেয়ার বিধান নেই। তোফাজ্জল ২০১৪ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনে রিট করেন (নং ১২৯৯)। ধোপাজান বালুমহালটি ইজারা চান ১৪২১ থেকে ১৪২৩ সাল পর্যন্ত। বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. হাবিবুল গণির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ তোফাজ্জল হোসেনের কাছ থেকে শুধু ১৪২১ সালের জন্য খাজনা গ্রহণের নির্দেশ দেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসনকে। মন ভরে না তোফাজ্জল হোসেনের। বালুমহাল ইজারা সংক্রান্ত বিধিবিধান জানা সত্ত্বেও ২০১৪ সালের ২০শে এপ্রিল ইজারার মেয়াদ ১৪২১ থেকে ১৪২৩ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করার জন্য সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক বরাবরে আবেদন করে বসেন। সুচতুর তোফাজ্জল ভালই বুঝতে পারেন জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত তার অনুকূলে যাবে না। তাই দ্রুতই তিনি উচ্চ আদলতে আরও একটি রিট করে একই প্রার্থনা করেন (নং ৫৪৫৯)। সে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের ৭ই জুন সপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি জাফর আহমদের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ তিন বছরের ইজারা বিষয়ে কোন আদেশ না দিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে তোফাজ্জল হোসেনের ২০১৪ সালের ২০শে এপ্রিলের আবেদনের নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে রিটের পক্ষ-বিপক্ষ উভয়ের প্রতি স্থিতাবস্থা জারি করেন। তবে পূর্বের রিটের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ধোপাজান বালুমহাল থেকে টোল আদায় করতে থাকেন তোফাজ্জল। চলতি বছরের ২৩শে ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক দেবজিৎ সিংহ ঢাকার সলিসিটর উইংয়ে একটি চিঠি দেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘বালুমহাল ও মাটি বিধিমালা ২০১১’ অনুসারে কোন বালুমহাল তিন বছর মেয়াদে লিজ চুক্তি সম্পাদনের কোন বিধান নেই। তাই উচ্চ আদালতের জারিকৃত স্থিতাবস্থা প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এদিকে শেষ হয়ে যায় ১৪২১ সালও। কিন্তু এরপরও জোর করেই টোল আদায় করে চলেছেন তোফাজ্জল। এ ক্ষেত্রে আদালতের ‘স্থিতাবস্থা’কে কৌশলে নিজের পক্ষে উপস্থাপন করছেন। যদিও এরই মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ইব্রাহিমপুর গ্রামের মৃত আবদুর রহমানের ছেলে মো. আফতাব মিয়ার লিভ টু আপিল (নং: ৯৭৫)-এর পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিক গত ১৬ই এপ্রিল হাইকোর্ট ডিভিশনের স্থিতাবস্থার আদেশ স্থগিত করেছেন ।
জোর-জবরদস্তিতে তোফাজ্জল হোসেনকে ভরসা যোগাচ্ছেন ‘আওয়ামী লীগ নেতা’ পরিচয়ধারী জনৈক জিয়াউল হক। অদৃশ্য এক খুঁটির জোরে সুনামগঞ্জজুড়ে প্রভাব বিস্তারকারী জিয়াউল হকই তোফাজ্জলকে আশ্রয় দিচ্ছেন। আর তাদের দাপট ধোপাজান পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে পুরো সুনামগঞ্জেই। কারণ ‘টাকার খনি’ ধোপাজানের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকে তার হাতে বাঁধা পড়ে সুনামগঞ্জের রাজনীতি-পুলিশ প্রশাসনসহ সবকিছু নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। ধোপাজানের মন্ত্রে বশ করা যায় সবকিছুই। তাই যে কোন কৌশলে-উপায়ে বালুমহালের দখল ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর তারা। বিরুদ্ধ বাতাসেও যাতে ধোপাজানের দখল ছাড়তে না হয় সে ব্যবস্থাও রয়েছে তাদের। বালুমহালের পথে পথে রয়েছে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয়। ‘নিরাপত্তা’ দেখভালের জন্য রয়েছে নিজস্ব বাহিনী। সে বাহিনীতে রয়েছে সুনামগঞ্জজুড়ে আতঙ্ক জাগানিয়া মুখগুলোরই আনাগোনা। তাই সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে টোল আদায় করলেও কেউই প্রতিবাদের সাহস পান না।