Saturday, September 20, 2014

ষোড়শ সংশোধনী- বিচার বিভাগের পায়ে বেড়ি পরানো? by মাহ্ফুজ আনাম

পাঠকদের কি ১৯৫০-এর দশকে সিয়ামের (আজকের থাইল্যান্ড) রাজা চুলালোংকমের ওপর নির্মিত চমৎকার ছবি দ্য কিং অ্যান্ড আইয়ের কথা মনে আছে? এ ছবিতে রাজা যখন দেখলেন তাঁর সন্তানদের জন্য যে ইংরেজ গভর্নেস রেখেছিলেন, তিনি তাঁর চেয়ে লম্বা, তখন রাজা গভর্নেসকে বলেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি যেন সব সময় হাঁটুর ওপর বসে থাকেন।

বাংলাদেশে আমরা দেখছি, প্রধানমন্ত্রীর ওপর কোনো মাথা নেই। না, শুধু ক্ষমতার দিক থেকে নয়, খ্যাতির দিক থেকেও (অধ্যাপক ইউনূসের কথা স্মরণ করুন)। এসব আমরা দেখে আসছি, সেটা আমাদের গা-সহাও হয়ে গেছে। কিন্তু গত বুধবার থেকে আমাদের পরিষ্কারভাবে বলা হলো, প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে বড় কোনো প্রতিষ্ঠানও থাকতে পারে না।
সেদিন আমাদের সংবিধানে সর্বসম্মতভাবে পাস হলো যে সংসদই এখন থেকে বিচারপতিদের অভিশংসন করবে (এটা একটা অসাধারণ আইনই বটে, কারণ একজন সাংসদও এর অন্যথা ভাবেননি। ফলে আমাদের মাননীয় সংসদে গণতন্ত্রের কেমন চর্চা হয়, সেটাও বোঝা গেল)।
‘সংসদের ক্ষমতায়ন’ বলতে প্রকৃতই কী বোঝায়, তা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই।
আমাদের দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার আছে। এই ব্যবস্থায় এর সব সদস্যই সমান আর তার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ‘সব সমানদের মধ্যে প্রথম’ হওয়ার কথা। শেখ হাসিনার প্রতি সুবিচার করলে বলতে হবে, এটা কখনোই আমাদের দেশে ছিল না। ১৯৯১ সালে আমরা সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় ফিরে গেলেও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার চৌহদ্দি নির্ধারণ করতে গিয়ে আমরা এই ‘প্রথম’টা শুধু রেখে দিয়েছি, আর ‘সমানদের মধ্যে’ ব্যাপারটা ঝেড়ে ফেলে দিয়েছি। ফলে সংসদ কখনোই একটি স্বাধীন সত্তা ছিল না, সব সময়ই তা রাবার স্ট্যাম্পের মতো কাজ করেছে৷ যার ভূমিকা ছিল শুধু নেতার ইচ্ছার ‘বৈধতা’ দেওয়া, ‘অনুমোদন’ শব্দটা ব্যবহার করার কথা ভাববেনও না। সেখানে কোনো বিতর্ক, আলোচনা করার অবকাশ ছিল না, আর নেতার ইচ্ছা চ্যালেঞ্জ করার কথা তো ‘অচিন্তনীয়’—যেখান থেকে সবচেয়ে ভালো ‘সম্মিলিত সিদ্ধান্তে’ সবচেয়ে ভালো নীতিটা গ্রহণ করা যায়। কী দুঃসাহস, ‘নেতার সিদ্ধান্ত’ বাদ দিয়ে ‘সম্মিলিত সিদ্ধান্ত’!
দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আমাদের সংসদে কখনো গঠনমূলক বিতর্ক হয়নি৷ যা হয়েছে, তা মূলত সরকারের তীব্র সমালোচনা ও গোলমাল সৃষ্টি করা, ওয়াকআউট, সংবাদ সম্মেলন ও রাজপথের কর্মসূচি। এসব কারণেই আমাদের সংসদ জীবন্ত (মূলত একটানা সংসদ বর্জনের কারণেই তা সরগরম থেকেছে, এটা ছিল মারাত্মক ভুল) থেকেছে, কোনো গঠনমূলক কারণে নয়। হ্যঁা, একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত বর্জন জনমত গঠনে সহায়ক হয়, কিন্তু ধারাবাহিক বর্জনের কারণে সবকিছু শেষ হয়ে গিয়েছে।
বর্তমান সংসদে এসবের কোনো বালাই নেই। যে সংসদের বিরোধী দল থেকেও মন্ত্রী আছেন (দুনিয়াতে এটাই একমাত্র নজির), সেখানে ‘সরকারদলীয় ও বিরোধীদলীয়’ আসনের মধ্যে কোনো ভেদরেখা থাকে না। এটা একটা প্রহসন, সংসদের জীবনীশক্তিও এর মধ্য দিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়।
ফলে ‘রাজার মাথার’ ওপর শুধু স্বাধীন বিচার বিভাগের মাথাই থাকতে পারত, কিন্তু এখন সেই বিচার বিভাগকেও সর্বক্ষমতাময় নির্বাহী বিভাগের কাছে মাথা নত করতে হবে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন এই ষোড়শ সংশোধনী আর কেনই বা সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকতে হবে। এমন কী হলো যে সংসদের হাতে এমন ক্ষমতা দরকার, যাতে তারা এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে পারে। আমাদের সর্বোচ্চ বিচারালয় কি এতই অদক্ষ, অপরিপক্ব, নীতিবিবর্জিত, আস্থাহীন বা নিজের ওপর লাগাম টানতে অক্ষম হয়ে পড়েছেন যে সংসদের মতো ‘বাইরের’ একটি প্রতিষ্ঠানকে বিচার বিভাগের ‘আত্মমর্যাদা’ ফিরিয়ে আনতে হস্তক্ষেপ করতে হবে?
আমাদের সন্দেহ, এই সংশোধনীর উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। সেটা হলে বিচার বিভাগের ‘রাজনৈতিকীকরণ’ ঘটবে এবং সেটা আর স্বাধীন থাকবে না। তখন আর আদালত থাকবে না, সেটা হয়ে যাবে ‘ক্যাঙারু আদালত’? তখন সভ্য জগতে ‘জঙ্গলের রাজত্ব’ সৃষ্টি হবে, যদিও আমরা এখন পর্যন্ত নিজেদের সেই সভ্য জগতের অধিবাসী হিসেবে দাবি করি।
আরও একবার সংবিধানে একটি মৌলিক পরিবর্তন এল তেমন কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই। এমনকি পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় এর ছলচাতুরী নিয়ে যে আলাপ-আলোচনা হয়েছিল, সেটাও এবার হয়নি। এই ষোড়শ সংশোধনী একটি মৌলিক পরিবর্তন, কারণ এর মাধ্যমে ‘রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ’ আরেকটি অঙ্গের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। মানে বিচার বিভাগ চলে যাবে আইন বিভাগের অধীনে, যেটা আবার এখন পুরোপুরি নির্বাহী বিভাগের অধীনে। ফলে বিচার বিভাগকে আইন বিভাগের অধীনে নিয়ে আসার নামে আসলে এটাকে নির্বাহী বিভাগের অধীনে নিয়ে আসা হলো। ষোড়শ সংশোধনী পাস করার ধরনটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
এ সংশোধনীর পক্ষে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে এর মাধ্যমে ১৯৭২-এর সংবিধানে ফেরত যাওয়া হলো। এটা কি কোনো যুক্তি হতে পারে? বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বয়স এখন ৪৩ বছর, এই সময়ে আমরা অনেক কিছু শিখেছি। ১৯৭২-এর সংবিধানের সবকিছুই পূতপবিত্র, ব্যাপারটা তো এমন নয়। যেমন ২০১১ সালে আমাদের সংবিধানে একটি বিধান যুক্ত করে সামরিক আইন জারি দেশদ্রোহের শামিল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যার জন্য যেকোনো সময় শাস্তি প্রদান করা যাবে। ১/১১-এর পরিপ্রেক্ষিতে এটা ঠিকই আছে বলে আমরা মনে করি। কিন্তু এ বিধানটি ১৯৭২-এর সংবিধানে ছিল না। কথা হচ্ছে, ১৯৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়ার নামে কি এই প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটিও কি আমরা বাদ দেব?
আরেকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন প্রস্তাবনাসহ প্রায় ৫০টি অনুচ্ছেদ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে এগুলো কোনো ভবিষ্যৎ সংসদই সংশোধন করতে পারবে না। এটা গণতন্ত্রের নীতির সঙ্গে একেবারেই যায় না। আমরা যদি বিশ্বাস করি যে ‘জনগণই সব ক্ষমতার উৎস’, তাহলে একটি সংসদ (নবম সংসদ) কীভাবে ভবিষ্যতের ভোটার ও সংসদের কাছে প্রয়োজনীয় বোধ হয়, এমন আইন প্রণয়ন থেকে বিরত রাখতে পারে? আশা করি, আমরা জনগণের ক্ষমতায় বিশ্বাস করি।
এসব অনুচ্ছেদের ‘সংশোধন অযোগ্যতার’ বিধান আসলে অন্য সব সংসদের চেয়ে নবম সংসদই শ্রেয়তর, এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে প্রণয়ন করা হয়েছে। আমরা আসলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আদেশ দিচ্ছি, যেটা করার কোনো আইনি ও নৈতিক অধিকার আমাদের নেই। এটা অসংগত, ১৯৭২-এর সংবিধান থেকে মৌলিক ‘বিচ্যুতি’। ফলে ১৯৭২-এর সংবিধানের প্রতি এই দরদ আসলে একটা প্রহসন, ‘রাজার’ মাথার ওপর যে একটা মাথা ছিল, সেটা কেটে ফেলার লক্ষ্যে বারবার এর দোহাই দেওয়া হচ্ছে।
অন্যান্য দেশেও এ বিধান আছে বলে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, সেটাও আসলে অন্য যুক্তিগুলোর মতো খোঁড়া। আমাদের সংসদের নির্বাচিত সাংসদেরা (১৫৩ জন অনির্বাচিত সাংসদের কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম) কি অন্য দেশের সংসদের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারেন? ওসব দেশের সংসদ কি অকারণ বর্জনের মধ্য দিয়ে পঙ্গু হয়ে পড়েছে? সেসব দেশে কি আমাদের সংসদের মতো সরকারি ও বিরোধী নেতাদের নামে কুৎসা রটনা করা হয়? সেসব দেশের সাংসদদের শুধু অর্থ বিলে সরকারের পক্ষে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দেশনা থাকে। কিন্তু সেখানকার সাংসদেরা কি সব ক্ষেত্রে নিজ দলের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য, মানে ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ কি সেসব দেশে আছে? কোনো দেশের সংসদে ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’ বা ‘বাজেট আলোচনায়’ অন্য দলের সদস্যদের গালি দেওয়া হয়? প্রায় সব দেশেই সংসদীয় রেওয়াজ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। আর আমরা কি পারস্পরিক গালাগাল দেওয়া ছাড়া আর কোনো প্রথা তৈরি করতে পেরেছি? কোন দেশের সংসদে অর্ধেকের বেশি সাংসদ বিনা নির্বাচনে নির্বাচিত হন?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আমাদের সংসদে একজন সদস্য তাঁর দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন না। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল কোনো বিচারপতিকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নিলে সেটা বাস্তবায়িত হবেই, এর অন্যথা হওয়ার সুযোগ নেই। আর দলগুলোর ভেতরে কী হয়, আমরা তা জানি৷ ফলে কখন ও কেন এ রকম সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তাও আমরা বুঝি।
ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে, এর মাধ্যমে শুধু এটাই নিশ্চিত হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য আত্মঘাতী হবে। এরূপ অবস্থা থেকে বাঁচতে হলে একটি পৃথক আইন করে তার আওতায় এই সংশোধনী কার্যকর করতে হবে। আইনবিদদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে এই আইন প্রণয়ন করতে হবে, যাতে কোনো বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার স্বচ্ছ ও সঠিক তদন্ত হয়৷ এ ক্ষেত্রে উচ্চ বিচারালয়কে যুক্ত করা যেতে পারে—ভারত, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অন্যান্য দেশে যা করা হয়েছে।
এই লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে, নির্বাহী বিভাগ ও সংসদকে প্রাসঙ্গিক আইন প্রণয়নে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার তাগাদা দেওয়া।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
মাহ্ফুজ আনাম: সম্পাদক, ডেইলি স্টার।

মুজিব-তাজউদ্দীনের বিচ্ছেদই বাংলাদেশের ট্র্যাজেডি by সোহরাব হাসান

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘বাঙালির ইতিহাস নাই।’ আর এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে ইতিহাসচর্চার চেয়ে ইতিহাস দখলেই আমাদের আগ্রহ বেশি। যাঁরা ইতিহাস নির্মাণ করেন, তাঁদের ইতিহাস দখল করার প্রয়োজন হয় না।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসচর্চার সমস্যা হলো, এক পক্ষ অন্য সবাইকে বাদ দিয়ে একজন নেতা ও একটি দলকে পুরো কৃতিত্ব দিতে চায়, অন্যদের ভূমিকা খাটো ও অগ্রাহ্য করে। আরেক পক্ষ সেই নেতার অবদান অস্বীকার করতে নানা কল্পকাহিনির আশ্রয় নেয়। সাম্প্রতিক কালে আরও একটি বিষয় লক্ষ করা যাচ্ছে যে ইতিহাসের ঘটনাপরম্পরা বাদ দিয়ে অনেকে এর দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন নিয়ে অযথা বিতর্ক করছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন ‘নতুন রাষ্ট্রপতিত্বও’ সেই কল্পকাহিনির অংশ।
দুই
একজন মানুষ তখনই নেতা হয়ে ওঠেন, যখন তিনি তাঁর নেতৃত্বগুণে একটি জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেন; একজন মানুষ তখনই নেতা হয়ে ওঠেন, যখন তিনি নীতিতে অটল থাকেন, কোনো অবস্থায় হুমকি বা প্রলোভনের কাছে নতি স্বীকার করেন না; একজন মানুষ তখনই নেতা হয়ে ওঠেন, যখন জাতির চরম দুর্দিনেও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হন না।
কথাগুলো মনে পড়ল শারমিন আহমদের তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা বইটি পাঠ করে। এ বইয়ে তিনি কেবল একজন স্নেহশীল পিতার প্রতিকৃতিই নয়, একটি জাতির জয়-পরাজয়ের প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন; নানা ধাপ ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যে জাতি স্বাধীনতাসংগ্রামের দীর্ঘ ও দুরূহ পথ পাড়ি দিয়েছে। তিনি লিখেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা হলে তাজউদ্দীন আহমদ তার সার্থক রূপকার।
শারমিন আহমদের বইটি লেখার সূচনা ১৯৭৯ সালে, জিয়াউর রহমানের শাসনামলে, যখন স্বাধীনতার সিপাহসালারদের নাম উচ্চারণ করা যেত না। ক্ষমতার ভারী বুটের নিচে চাপা দেওয়া হচ্ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার গৌরব। শারমিন আহমদ বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেন, বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের নায়কদের নিয়ে অনেক কাজ হলেও বাংলাদেশে কিছুই হয়নি। এমনকি পাঠ্যবইয়েও দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ঠাঁই পাননি। তাঁকে নিয়ে কোনো গবেষণা বা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা নেই। সব দেশে এ কাজটি করে থাকেন দলীয় বৃত্তের বাইরের লেখক-বুদ্ধিজীবীরা, তথা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। কিন্তু বাংলাদেশে এদলে-ওদলে বিভক্ত হয়ে তাঁদের কেউ ক্ষমতাসীন দলের, কেউবা বিরোধী দলের অনুগ্রহ লাভে ব্যস্ত। তাই, ইতিহাসের নামে ব্যক্তিস্তুতি কিংবা কুৎসা রচনাই প্রাধান্য পাচ্ছে।
আলাপচারিতায় শারমিন আহমদ জানান, এই বেদনাবোধই তাঁকে তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা লিখতে উদ্বুদ্ধ করে। তাঁর ভাষায়, ‘বইটি সময়ানুক্রমিকভাবে শুরু করেছি ষাটের দশকের শুরুতে আমার জন্মলাভ হতে এবং শেষ করেছি ১৯৭৫ সালে নভেম্বর মাস আব্বুর অনন্তলোক যাত্রায়।’ শারমিন আরও জানান, দেশের বাইরে যখন তিনি নিজের পরিচয় দেন, তখন তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নায়ক তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধাবনত হন। তাঁর দৃঢ়বিশ্বাস, ‘বাংলাদেশ একদিন তার প্রয়োজনেই খুঁজে বের করবে তাজউদ্দীন আহমদকে।’
শারমিন বর্ণিত সময়টি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ, সবচেয়ে আলোকসঞ্চারী ও ঘটনাবহুল। এই সময়েই শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনে তাজউদ্দীন আহমদকে বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে পান; এই সময়েই ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষিত হয়, অাগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্তরা জাতীয় বীরের মর্যাদা লাভ করেন; এই সময়েই উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে আইয়ুবশাহির পতন ঘটে। এরপর সত্তরের নির্বাচন ও একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ স্বাধীনতার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করে। এই আন্দোলন-সংগ্রামের প্রতিটি পর্বে তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গী। কিন্তু স্বাধীনতার পর তাঁদের সেই বন্ধন অটুট থাকেনি।
মেয়ে হিসেবে বাবা তাজউদ্দীন আহমদের প্রতি শারমিন ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি জানাবেন কিংবা স্মৃতিচারণা করবেন, এটাই স্বাভাবিক; বইয়ের বড় অংশজুড়ে আছে লেখকের শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিচারণা, আছে একটি রাজনৈতিক পরিবারের সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনার ছবি। আছে ময়মনসিংহ কারাগারে বন্দী বাবা তাজউদ্দীন আহমদকে দেখতে যাওয়া, মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ফ্ল্যাটে মা-ভাইবোনদের সঙ্গে থাকলেও বাবার সান্নিধ্য থেকে দূরে থাকা—এ রকম টুকরা টুকরা অজস্র স্মৃতি।
কিন্তু শারমিন ইতিহাস বিচারে যথাসম্ভব বস্তুনিষ্ঠ থাকতে চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে যে বিতর্ক চলে আসছে ৪৩ বছর ধরে, লেখক তাঁর গবেষণার মাধ্যমে একটি উপসংহারে এসেছেন, যা ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল হতে পারে। তিনি এক জায়গায় লিখেছেন, ২৫ মার্চ রাতে তাজউদ্দীন আহমদ যখন বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন, তখন তিনি পাকিস্তানিদের হাতে প্রমাণ রাখবেন না বলে এড়িয়ে যান। এমনকি বাসা ছেড়ে কোথাও আত্মগোপনে যেতেও অস্বীকৃতি জানান।
শারমিনের আক্ষেপ, বইয়ের এই তথ্যটুকু নিয়ে একশ্রেণির পাঠক তাঁর ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে গালাগাল করেছেন। তাঁর সঙ্গে দেশি-বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির যোগসূত্র বের করার অপপ্রয়াস চালিয়েছেন। কিন্তু তাঁরা বইয়ের পরবর্তী অধ্যায়গুলো পাঠ করার প্রয়োজন বোধ করেননি। করলে এমন কিছু তথ্য পেতেন, যা এর আগে কেউ বলেননি, লিখেননি।
ইতিহাসের সত্যসন্ধানী হিসেবে শারমিন আহমদ দুজন ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার নিয়ে দেখিয়েছেন যে বঙ্গবন্ধু তাঁর বিশ্বস্ত সহযোগী তাজউদ্দীন আহমদের অনুরোধে স্বাধীনতার লিখিত ঘোষণা পাঠ না করলেও বিকল্প উপায়ে তিনি সেই ঘোষণা দেন। এর সাক্ষী ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহযোগী হাজি গোলাম মোরশেদ। তাঁর সাক্ষাৎকার উদ্ধৃত করে লেখক আমাদের জানাচ্ছেন, ‘...এরপর এগারোটা বেজে গেল, বারোটা বাজে বাজে, এমন সময় একটি টেলিফোন আসল। বলে, “আমি বলধা গার্ডেন থেকে বলছি। মেসেজ পাঠানো হয়ে গিয়েছে, মেশিন নিয়ে কী করব?” অমি মুজিব ভাইয়ের কাছে দৌড়ে গেলাম। বললাম, মেসেজ পাঠানো হয়ে গিয়েছে। উনি (বঙ্গবন্ধু) বললেন, “মেশিনটা ভেঙে ফেলে পালিয়ে যেতে বল।”’ ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে হাজি গোলাম মোরশেদও ৩২ নম্বর থেকে গ্রেপ্তার হন।
বার্তাটি যিনি পাঠিয়েছিলেন, তিনি হলেন শহীদ প্রকৌশলী নুরুল হক। ২৯ মার্চ মহাখালীর ওয়্যারলেস কলোনির বাসভবনে ঢুকে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। ২৫ মার্চ দুপুরে তিনি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ট্রান্সমিটারটি খুলনা থেকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন।
এই হলো তাজউদ্দীনকন্যা শারমিনের অনুসন্ধান ও উদ্ঘাটন।
আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রধান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানই। তিনি ধাপে ধাপে একটি নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে নিয়ে গেছেন। অন্য বাঙালি নেতাদের চেয়ে বেশি জেল–জুলুম সহ্য করেছেন (দেখুন অসমাপ্ত আত্মজীবনী)। এ কথা যেমন সত্য, তেমনি অসত্য নয় যে তাঁর অনুপস্থিতিতে শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারটি পরিচালনা করেছিলেন।
শারমিন আহমদের ভাষায়, বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন অনন্য সেতুবন্ধ। যত দিন তাঁরা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার পর কুচক্রী মহল তাঁদের মধ্যে বিচ্ছেদ তৈরি করে। আর দেশের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা হলো মুজিব ও তাজউদ্দীনের বিচ্ছেদ, যা কেবল এ দুই নেতাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়নি, জাতিকেও অনেক পিছিয়ে দিয়েছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধটি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পরিচালিত হলেও দলের ভেতরে সবার মত ও পথ এক ছিল না। কেউ বড় পাকিস্তান ভেঙে ছোট পাকিস্তান করতে চেয়েছিলেন। খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে একাংশ পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশনের চেষ্টা চালিয়েছিল। দলের যুব নেতাদের দাবি ছিল, বঙ্গবন্ধু তাঁদেরই সবকিছু করার দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। তাঁরা মুজিব বাহিনী নামে আলাদা একটি বাহিনী গঠন করেন মুজিবনগর সরকারের অনুমোদন না নিয়েই। এসব নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেতরে উপদলীয় কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অনেকের মতে, এই কোন্দলে ভারত সরকারেরও ভূমিকা ছিল। ‘তারা সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখতে চায়নি।’
এসব উপদলীয় কোন্দলের ঊর্ধ্বে থেকে এবং নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে মানুষটি মুক্তিযুদ্ধকে সফল করতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন, যুদ্ধের মধ্যেও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পরিকল্পনা করেছেন, তিনি তাজউদ্দীন আহমদ। তিনি মুক্তিযুদ্ধকে কেবল আওয়ামী লীগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি বলে মওলানা ভাসানী, মণি সিংহ প্রমুখকে নিয়ে সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন, ভিন্ন দলের কর্মীদেরও মুক্তিবাহিনীতে নেন, দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরোধিতা সত্ত্বেও। তিনি চেয়েছিলেন, সবার জন্য মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন একটি দেশ।
দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যখন জানতে চাইলেন, আপনাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে সহায়তা করতে হলে তো ‘আইনানুগ একটি সরকার প্রয়োজন, সেই মুহূর্তেই তাজউদ্দীন আহমদ অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, যার রাষ্ট্রপতি হবেন শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব থাকবে নিজের হাতে। তিনি একক সিদ্ধান্তে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তৈরি করলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় সরকারের শপথ অনুষ্ঠান করলেন। আর নতুন দেশের রাজধানীর নাম দিলেন মুজিবনগর, নেতা শেখ মুজিবের নামে।
তাজউদ্দীন আহমদ স্বপ্ন দেখেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গঠিত বাংলাদেশ হবে পৃথিবীর অন্যতম আদর্শ রাষ্ট্র, যেখানে ধর্মের বিভেদ থাকবে না, অর্থনৈতিক বৈষম্য থাকবে না, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র হবে সেই রাষ্ট্রের মূল নীতি। তিনি সব মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে জাতীয় মিলিশিয়া বাহিনী গঠনে উদ্যোগ নিয়েছিলেন; যদিও পরবর্তীকালে সেই উদ্যোগ পরিত্যক্ত হয়।
তিন
স্বাধীন বাংলাদেশে তাজউদ্দীন আহমদের অনেক স্বপ্নই অপূর্ণ থেকে গেছে। অর্থমন্ত্রী হিসেবে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে তিনি কতটা সফল হয়েছেন, তা নিয়ে তর্ক থাকতে পারে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে কিংবা স্বাধীনতার পর পৌনে তিন বছর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এমন দৃষ্টান্ত কেউ দিতে পারবেন না। এখানেই ছিল তাঁর বিশিষ্টতা ও অনন্যতা।
শারমিন এমন এক পিতা ও নেতাকে নিয়ে বই লিখেছেন, যিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির ব্যতিক্রমী মানুষ, যিনি মঞ্চের সামনে নয়, নেপথ্যে থেকে কাজ করতে ভালোবাসতেন, নিজে নয় মাস মুক্তিযুদ্ধটি পরিচালনা করলেও কখনো তাঁর কৃতিত্ব নিতে চাননি।
লেখককে অভিনন্দন।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

আসুন, বেশি করে কথা বলি! by কে এম জাকারিয়া

‘জ্ঞানী লোকেরা কথা বলেন কারণ তাঁদের বলার কিছু আছে আর বোকারা কথা বলেন কারণ তাঁদের কিছু বলতে হবে।’ বলে গেছেন দার্শনিক প্লেটো। মানে, জ্ঞানী ও বোকাভেদে কথার মানে ভেদ হতে পারে কিন্তু কথা বলা থেকে কেউই বিরত থাকে না। মানুষের কথা বলার এই যে বিকট ইচ্ছা, তার ওপর ভর করে ভালোই ব্যবসা করে যাচ্ছে মুঠোফোন কোম্পানিগুলো। তারা কথা মাপে, তবে কথার ‘কোয়ালি’ (মান) নয়, ‘কোয়ান্টি’ (পরিমাণ)। জ্ঞানী বা আমাদের মতো বোকা সবই মিলেমিশে এখানে একাকার। কারণ, ‘কিছু বলার থাকলে’ বলা বা ‘কিছু বলতে হবে’ বলে বলা— যা-ই হোক না কেন, সবাইকেই পয়সা গুনতে হয় ‘টকটাইম’ ধরে। এরপরও কথা বলে পয়সা খরচ করতে কারও যেন কসুর নেই। এমন সুযোগ সরকার নেবে না কেন? যত খুশি কথা বলো, কিন্তু সরকারকেও ট্যাক্স দাও। যত কথা, তত ট্যাক্স!
সরকার দেশের উন্নয়ন করতে চায় আর এর জন্য দরকার যথেষ্ট অর্থকড়ি। অনেক ভেবেচিন্তে সরকার তার আয়-রোজগার বাড়ানোর একটি পথ খুঁজে পেয়েছে; মোবাইল ফোনে কথা বলার ওপর সারচার্জ। এটা আদায় হবে ‘উন্নয়ন সারচার্জ’ নামে। ১০০ টাকার কথা বললে এক টাকা সরকারকে দিতে হবে, খুবই সামান্য। যে বা যিনি কথা বলে ১০০ টাকা খরচ করতে পারবেন, তিনি এ জন্য এক টাকা বাড়তিও দিতে পারবেন। খুব চেপে হিসাব করে দেখা গেছে, এতে বছরে সরকারের বাড়তি আয় হতে পারে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে খরচ হবে এই টাকা।
উন্নয়ন চাইলে ও সরকারের উন্নয়নকাজে সহায়তা করতে চাইলে মুঠোফোনে বেশি কথা বলা এখন একটি পথ হতে পারে। যত বেশি ফোনে কথা বলা, ততই সরকারকে সহায়তা করা। মুঠোফোনে কথা বলার খরচ বেড়ে যাচ্ছে এই ভয় না পেয়ে মোবাইল কোম্পানিগুলোর বরং উচিত এই ‘দেশপ্রেম’ থিমকে কাজে লাগিয়ে নতুন বিজ্ঞাপন ও প্রচারণায় নেমে পড়া। তবে বিপদ হচ্ছে, যতই কম হোক এই সারচার্জ অনেকের মধ্যে মানসিক যন্ত্রণার সৃষ্টি করতে পারে। কেউ হয়তো ভাবতে পারেন, দেশ কোথায় গেল, কথা বলতে গেলেও ট্যাক্স গুনতে হবে!
প্লেটোর তত্ত্ব অনুযায়ী, জ্ঞানী বা বোকা কথা বলায় কেউ কম যান না। এর মধ্যে আমরা আবার তর্ক-বিতর্ক-কথাবার্তা পছন্দ করা জাতি। অমর্ত্য সেন তো ভারতীয়দের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচিতিসংক্রান্ত প্রবন্ধমালার বইয়ের শিরোনামই দিয়েছেন তর্কপ্রিয় ভারতীয়। অমর্ত্য সেন ভারতীয় বটে, তবে বাঙালিও। লিখেছেন ‘আমরা কথা বলতে ভালোবাসি।’ আমরা বাংলাদেশের লোকজনও কী কম যাই! কোনো বিষয়ে মত দেওয়া, প্রশ্ন তোলা ও তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পড়তে আমাদের জুড়ি নেই। কারও মনে এই বেয়াড়া প্রশ্ন উঠতেই পারে; কথা বলার জন্য সারচার্জ নাহয় দিলাম, কিন্তু এই টাকার পুরোটা উন্নয়নের কাজে লাগবে তো? দুর্নীতির নানা খবরের শিরোনামগুলো ভেসে উঠবে কারও কারও মনে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থা মনে পড়ে যাবে অনেকের। এই টাকা ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়ে যেতে পারে—এমন ভয়ও ঢুকবে কারও কারও মনে! এমন ভাবনাগুলো ঠেকানোর কোনো পথ নেই। ‘ভাবনার’ ওপর তো আর সারচার্জ বসানো যাবে না!
কথা বলার জন্য এই যে সারচার্জ গুনতে হবে জনগণকে, সেই টাকা অবশ্য সরাসরি আদায় করবে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। মোবাইল ফোন অপারেটররা গ্রাহকদের কাছ থেকে বিলের সঙ্গে কথা বলার সারচার্জ আদায় করে তা এনবিআরের কোষাগারে জমা দেবে। সরকার আয় বাড়ানোর এই যে একটি নতুন খাত খুঁজে পেয়েছে, তা খুবই সম্ভাবনাময়। আমরা এত বেশি কথা বলি যে সব ধরনের কথা বলার ওপর সারচার্জ আরোপ ও আদায় করতে পারলে সম্ভবত আমাদের আর বিদেশি সাহায্য বা বিশ্বব্যাংক ধরনের কারও ওপর কখনোই নির্ভর করতে হবে না।
তবে শুরুতে সব ধরনের কথা বলার ওপর ‘সারচার্জ’ আরোপ করা না গেলেও আপাতত আরও কিছু ক্ষেত্রে তা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। টিভি ‘টক শো’গুলো নিয়ে সরকারের বিরক্তি-অস্বস্তির শেষ নেই। এই টক শোগুলোতে কথা বলার ওপর ‘উন্নয়ন সারচার্জ’ আরোপ করলে কেমন হয়! টিভি টক শোতে কত মিনিট কথা বললে কত সারচার্জ দিতে হবে, তা সরকার বা এনবিআর ঠিক করে দিতে পারে। টিভি কর্তৃপক্ষ মাসের শেষে বক্তাদের সম্মানী থেকে সেই পরিমাণ টাকা কেটে এনবিআরের কোষাগারে জামা দেবে। এনবিআরের তেমন কিছুই করতে হবে না, লোকবল বাড়ানোরও দরকার পড়বে না। সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভেবে দেখতে পারে।
তবে এই সারচার্জ শুধু সরকারবিরোধী বা ভিন্নমতের টক শো বক্তাদের ওপর কার্যকর করলেই ভালো (সরকারবিরোধী টক শো বক্তারা এতে খুব নাখোশ হবেন বলে মনে হয় না। ‘সারচার্জ’ দিয়ে হলেও যদি সরকারের বিরুদ্ধে বেশি কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায়, ক্ষতি কী!)। সরকারের বিরুদ্ধে যত বেশি কথা বলতে চাও বলো, সমালোচনা করতে চাইলে করো, কিন্তু সারচার্জ দাও! এতে গণতন্ত্রের প্রতি সরকারের শ্রদ্ধা-ভক্তির বিষয়টি যেমন নিশ্চিত হবে, আবার কিছু আয়ও হবে! এটা দিয়ে শুরু হোক, পরে নাহয় আওতা আরও বাড়ানো যাবে। সামনের কোনো সন ঠিক করে সরকার ‘গোল’ নির্ধারণ করতে পারে, যখন সব ধরনের কথা বলার ওপর সারচার্জ বসানো যাবে!
জ্ঞানী বা বোকা কেউই যেহেতু কথা না বলে থাকতে পারে না, তাই আসুন, আমরা সবাই বেশি করে কথা বলি, সারচার্জ দিই ও সরকারের উন্নয়নকাজে সহায়তা করি!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

কিশোরী কন্যাদের যৌন হয়রানির কথা শুনুন by শান্ত নূরুননবী

যখন জাতিসংঘ ও ইউনিসেফের গবেষণাসূত্রে আমরা বাংলাদেশের নারীদের এমনকি স্বামী কর্তৃক যৌন নিপীড়নের ভয়াবহ তথ্য জেনে লজ্জিত, তখন খুলনা রেলওয়ে বালিকা গার্লস স্কুলের মেয়েরা যৌন হয়রানির বিপক্ষে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে শুরু করেছে এক অভিনব আন্দোলন।

খুলনার সংস্কৃতিকর্মী টুকুর নেতৃত্বে এই স্কুলের মেয়েরা একটি মর্মস্পর্শী নাটক মঞ্চস্থ করছে তাদের স্কুল ক্যাচমেন্টস এলাকায়। নিজেদের ও সহপাঠীদের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতাকে উপজীব্য করেই এ নাটক তৈরি হয়েছে। স্কুলের মিলনায়তনে বসে মাত্র ২০ মিনিটের এই মঞ্চনাটক দেখে শত শত দর্শকের মতো আমারও চোখ ভিজে উঠেছিল। নাটকের শুরুতে আছে প্রতীকী অন্ধকারের আবহ। কিশোরী মেয়েরা স্কুলে যেতে ভয় পাচ্ছে। কারণ, পথের ধারের চায়ের দোকানে বখাটেরা যৌন হয়রানি করার জন্য ওত পেতে বসে থাকে। প্রতিবেশী চাচাতো ভাই বা বন্ধুর সঙ্গে স্কুলে যেতে অস্বীকার করছে, কেননা সেও যৌন হয়রানকারী হিসেবে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত হয়েছে কিশোরীর কাছে। প্রাইভেট শিক্ষকের রূপও কিশোরীদের কাছে হয়ে উঠেছে ভীতিকর। আমাদের কিশোরী কন্যাদের আত্মস্থ দৃষ্টির সামনে কেবলই অন্ধকার।
যদিও এসব কথা মা-বাবা ও শিক্ষকদের জানিয়ে লাভ হয় না। তাঁরা মনে করেন, এসবে কিশোরীদেরই দোষ আছে। কিশোরীরা আজকাল এমন সব পোশাক পরছে, এমনভাবে মাথা উঁচু করে চলতে শুরু করেছে যে বখাটে ছেলেরা, এমনকি বয়স্ক পুরুষেরাও যৌন হয়রানকারী হয়ে উঠতে প্ররোচিত হচ্ছে। পাড়ার মুরব্বিরাও এসব নিয়ে বলাবলি করছেন।
কিন্তু কিশোরীর যে স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে, খেলতে মন চায়, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে বাঁচতে ইচ্ছে করে জীবনের ছোট ছোট আনন্দের মধ্যে। নিজের মতো করে স্বপ্ন দেখতে, চলতে পারে না বলে কিশোরী হতাশ হয়। অথচ ঘরেই যখন আত্মীয় পুরুষ যৌন হয়রানকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়, সে কথা কাউকে বলা যায় না। প্রথা ভেঙে মা-বাবার কাছে এ ধরনের ভীতিকর ঘটনার কথা বললেও তাঁরা বিশ্বাস করেন না অথবা অবিশ্বাস করার ভান করে চুপ করে থাকেন। কোনো কোনো কিশোরী বা কন্যাশিশু এভাবে এতটাই হতাশ হয়ে পড়ে যে আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নেয়। তখন কি মা-বাবার সামনে মেয়েটির আত্মা উপস্থিত হয়ে মনে করিয়ে দেয় না যে এ ধরনের অমানবিক মৃত্যুর জন্য দুর্ভাগা কিশোরীর মা-বাবা তাঁদের দায় এড়াতে পারেন না? শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা কি আদৌ অনুতপ্ত হন কিশোরীর এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির জন্য? অনুতাপ চোখে পড়ে কি আইন প্রয়োগকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থা বা রাষ্ট্রের অভিভাবকদের?
খুলনা রেলওয়ে গার্লস স্কুলের কিশোরীরা সবাই নিম্নবিত্ত পরিবারের। তাদের অভিভাবকদের ৯০ শতাংশই শ্রমজীবী, জানালেন স্থানীয় কাউন্সিলর এবং এই স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি। তাই বলে এটা ভাবার কারণ নেই যে কেবল নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েরাই যৌন হয়রানির শিকার হয়। খুলনার ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি স্কুলের শিক্ষার্থী মুন্নির বাবা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। মুন্নিদের এক সহপাঠী ওদের স্কুলের সব মেয়ের সঙ্গেই বেপরোয়া আচরণ করছিল। মুন্নি বাবাকে বলারই সাহস পায়নি এ কথা। মাকে বলার পর মা পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রধান শিক্ষককে জানাতে।
ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাঁর সহকর্মী ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে পরামর্শ করে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত এক বাবার সেই ছেলেটিকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেও তিনি এটা করেছিলেন। তিনি বলেন, আমার শিক্ষার্থীরা আমার সন্তানের মতো। তাদের ভালোর জন্য প্রয়োজনে কঠোর সিদ্ধান্ত তো নিতেই হবে। অবশ্য ছেলেটির মা চান তার আচরণের জন্য এবং শর্ত সাপেক্ষে তার বহিষ্কারাদেশ যেন প্রত্যাহার করা হয়। এ ঘটনা মুন্নিদের উদ্বুদ্ধ করে স্কুলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সব মেয়েদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে। এরপর মুন্নি তার পাড়ায়ও বন্ধুদের নিয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের কমিটি গঠন করেছে। প্রথম প্রথম পাড়ার লোকদের কটাক্ষ তো ছিলই, এমনকি মা-বাবাও খুব একটা উৎসাহ দেননি। এখন মুন্নিদের পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেকেই।
কেবল খুলনা নয়, সারা দেশেই আমাদের কিশোরী কন্যারা অনিরাপদ। একা চলার স্বাধীনতা ও সাহস তারা প্রায় হারিয়ে ফেলেছে। আমরাও কোনো দিন আমাদের কিশোরী কন্যাদের অন্তর্গত বিপর্যয়ের গল্প শোনার সময় করে উঠতে পারি না! আমরা দরিদ্ররা তো বটেই, এমনকি সচ্ছলরাও এ পরিস্থিতির সহজ সমাধান হিসেবে কন্যার অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়াকে বিকল্প ভাবছি। ধ্বংস করছি তার শিক্ষার অধিকার, স্বপ্ন দেখার অধিকার ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে উন্নত ভবিষ্যৎ রচনা করার সম্ভাবনাকে। অথচ আমরা তো ব্যস্ত থাকি কিশোরী কন্যার ভবিষ্যৎ সুখের কথা ভেবে কেবলই রোজগারের পেছনে। কিন্তু যখন দেশের দুই-তৃতীয়াংশ কিশোরীকে ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ের বন্ধনে বন্দী হতে হয়, তখন সুখ ভেসে যায় সংসারের ভারে, প্রজননস্বাস্থ্য ঝুঁকির বিপদগ্রস্ততায়।
মা-বাবা হওয়ার দায় অনেক। কন্যাশিশুর যৌন নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবন-দক্ষতা ও আত্মনির্ভরশীল ভবিষ্যৎ জীবনের পথ রচনা করার দায়িত্ব আমাদের সবার। কেবল নিজের কন্যার ভবিষ্যৎই সব নয়। দেশের সব কিশোরী কন্যার কথা শোনার সময় আমাদের থাকতে হবে। তাদের দোষ না দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। কিশোরীদের যৌন হয়রানির আক্রমণ থেকে নিরাপদ রাখতে শিক্ষাব্যবস্থায় যথাযথ প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। স্কুলগুলোতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি বেশ ঘটা করেই গঠন করা হয়েছিল। সেগুলো সক্রিয় করে তোলার ও বজায় রাখার ব্যবস্থাপনা কিংবা তদারকি কোনোটাই চোখে পড়ে না। কেন আমরা আমাদের সন্তানদের প্রতি এতটা উদাসীন? আসুন, কিশোরী কন্যার কথা শুনি, বিশ্বাস করি, পাশে থাকি।
শান্ত নূরুননবী: উন্নয়নকর্মী।
shantonabi@gmail.com

দড়ি লাফের দারুণ ৭ স্বাস্থ্য উপকারিতা by কাজী আরিফ আহমেদ

স্কিপিং বা দড়ি লাফ আবহমান কাল থেকে বাংলার গ্রাম-গঞ্জ, মফস্বল শহর বা শহরতলির সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাগুলোর একটি। তবে বড় শহরগুলোতে দড়ি লাফ ততোটা জনপ্রিয় নয়। দড়ি লাফ অ্যারোবিক ব্যায়াম হিসেবে অপ্রতিস্থাপনীয়। বড় শহরগুলোতে খেলার মাঠ প্রায় না থাকা যেমন একটি সমস্যা, একই সঙ্গে অভাব রয়েছে পিতামাতাদের সচেতনতার। তবে দড়ি লাফের জন্য মাঠের প্রয়োজন নেই। বাড়িতে সামান্য একটু জায়গাই দড়ি লাফের জন্য যথেষ্ট। ছেলেমেয়েরা এখন কম্পিউটারের প্রতি এতোটাই ঝুঁকে পড়ছে যে, স্বাভাবিক খেলাধুলোর চর্চা প্রায় বিদায় নিতে বসেছে। খেলা বিনোদনের পাশাপাশি দারুণ ব্যায়াম। শারীরিক পরিশ্রম হয় ও বেশ ঘাম ঝরে, সারা জীবন অন্তত এ ধরনের একটি খেলা নিয়মিত খেলা উচিত। সেটা হতে পারে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, লন টেনিস, টেবিল টেনিস বা অন্য কোন খেলা। অনুষঙ্গ হিসেবে থাকতে পারে স্কিপিংয়ের মতো হালকা ব্যায়াম। হাঁটা, জগিং, সাইক্লিং, সাঁতার, দৌড়ানো এগুলো তো আছেই। তবে একসঙ্গে বেশি নয়। শরীরের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সুস্থ রাখতে যোগব্যায়ামও অপরিহার্য। সঙ্গে মেডিটেশনটা যোগ করে নেয়া যেতে পারে। দিনে আধ থেকে ১ ঘণ্টার চর্চাই শরীর সুস্থ ও সবল রাখার জন্য যথেষ্ট। আর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খেলা ও ব্যায়ামের মাত্রাটাও কমিয়ে আনতে হবে। বয়স অনুযায়ী কতোটুকু ব্যায়াম করতে হবে, তা নির্ধারনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, অভিজ্ঞ ক্রীড়াবিদ বা ব্যায়াম প্রশিক্ষকের পরামর্শ নিতে হবে। আজকের বিষয় যেহেতু দড়ি লাফ, তাই চমৎকার এই ব্যায়ামটির প্রধান ৭টি উপকারিতা নিচে উপস্থাপন করা হলো:

১) অতিরিক্ত ওজন ও পেট কমাতে: মাত্র ৩০ মিনিট দড়ি লাফিয়ে আপনি ৪৫০ ক্যালোরি পোড়াতে পারেন। শুনলে অবাক হবেন যে, ১০ মিনিট দড়ি লাফাতে আপনার যে শারীরিক পরিশ্রম হয়, তা মাত্র ৮ মিনিটে ১ মাইল দৌড়ানোর সমান। পুরো শরীরের অতিরিক্ত ওজন বা পেট যেটাই কমাতে চান, সেটা নিয়মিত স্কিপিংয়ের মাধ্যমে সম্ভব। তাই আজই একটি স্কিপিং রোপ বা লাফানোর দড়ি বানিয়ে নিন বা কিনে নিন। তবে প্রথমদিকে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রেখে যতোটা স্কিপিং করা সম্ভব, ততোটা স্কিপিং করুন। দম অনুযায়ী আস্তে আস্তে সময়টা বাড়ান।
২) সুস্থ-সবল হার্ট ও ফুসফুসের জন্য: হার্ট ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে নিয়মিত দড়ি লাফের অভ্যাস। দম বাড়াতে, শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া ও ছাড়ার ক্ষেত্রে দড়ি লাফ বেশ কার্যকরী। হার্টও সারা শরীরে বেশি রক্ত সরবরাহ করবে, যা আপনার শরীরের বিভিন্ন অংশের টিস্যুগুলোতে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টি-উপাদান পৌঁছে দেবে।
৩) মাংসপেশীর গঠন সুন্দর ও বলিষ্ঠ করতে: নিয়মিত স্কিপিংয়ের ফলে আপনার শরীরের ওপরের ও নিচের অংশ অর্থাৎ কোমর থেকে পায়ের পাতার মাংসপেশীর গঠন সুন্দর ও দৃঢ় হয়। ওপরের অংশও বলিষ্ঠ হয় যেহেতু আপনি দড়ি লাফানোর জন্য আপনার হাত ও কাঁধ ব্যবহার করছেন।
৪) নমনীয়তা, ভারসাম্য, সমন্বয় ও মনোযোগ বাড়াতে: দড়ি লাফের অভ্যাসে আপনার শরীর আগের চেয়ে অনেক বেশি নমনীয় হবে এবং আপনার শরীরের ভারসাম্য ও সমন্বয় রাখতে সাহায্য করবে। স্কিপিংয়ের সময় যেহেতু আপনার মস্তিষ্কের দুটি অংশই সমানভাবে সক্রিয় থাকে, সেজন্য যে কোন কাজে আপনার মনোযোগও বাড়তে থাকে।
৫) অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে: স্কিপিংয়ের ফলে আপনার শরীরের হাড়ের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়, হাড়ের ক্ষয় রোধ করে এবং অস্টিওপোরোসিস জাতীয় মারাত্মক সমস্যা থেকে দূরে রাখে।
৬) মসৃণ, উজ্জ্বল ও সজীব ত্বকের জন্য: দড়ি লাফের সময় আপনার ক্যালোরি খরচ হয় এবং অল্প সময়ে পর্যাপ্ত পরিশ্রম হয়। শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে বিষাক্ত উপাদানগুলোর অনেকটাই বেরিয়ে যায়। এতে আপনার ত্বকের উজ্জ্বলতা, মসৃণতা ও সজীবতা বৃদ্ধি পায়।
৭) রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ও ইতিবাচক মানসিকতার জন্য: যে কোন ব্যায়ামই রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। স্কিপিংটা হতে পারে যে কোন খেলার বেশ সহজ বিকল্প। বেশি সময়েরও প্রয়োজন নেই এতে। কিন্তু, নিয়মিত দড়ি লাফের চর্চাতে আপনার শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকটা বেড়ে যাবে এবং মনও থাকবে স্বতঃস্ফূর্ত, চাঙ্গা, প্রাণবন্ত ও ফুরফুরে। মানসিকতা নেতিবাচক থাকলে, তা হয়ে উঠবে ইতিবাচক। তাই আজ থেকেই স্কিপিংটা আপনার নিত্যদিনের চর্চার তালিকায় যোগ করে নিন এবং সুস্থ থাকুন।

যুক্তরাজ্যে রয়ে গেল স্কটল্যান্ড

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ও স্কটল্যান্ডের
স্বাধীনতাকামী নেতা অ্যালেক্স স্যামন্ড।
ফল ঘোষণার পর। রয়টার্স
রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায় ছিল স্কটল্যান্ডবাসী। কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষায় ছিল পুরো বিশ্বই। স্কটল্যান্ডে শুক্রবারের নতুন সকালে কি বিশ্বের নবীনতম সার্বভৌম রাষ্ট্রের আবাহন হবে, না কি ৩০৭ বছরের সম্পর্কের বন্ধনই বেশি পোক্ত প্রমাণিত হবে। না, শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের করুণ রাগিনী বাজেনি। ভোটের মাধ্যমে স্কটল্যান্ডবাসী জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা যুক্তরাজ্যের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকলেই বেশি ভালো থাকবেন। গণভোটে হেরে যাওয়ার পর পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার অ্যালেক্স স্যামন্ড। গতকাল এডিনবরায় সাংবাদিকদের তিনি জানান, নভেম্বরে নিজ দলের বার্ষিক সম্মেলনের সময় দলের নেতার পদ ছাড়বেন এবং পরে ফার্স্ট মিনিস্টারের পদ থেকেও তিনি পদত্যাগ করবেন। এদিকে, স্কটল্যান্ডের গণভোটের রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট মার্টিন শুলৎজ, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট হোসে ম্যানুয়েল বারাসো ও ন্যাটোর মহাসচিব আন্ড্রেস ফগ রাসমুসেন। খবর রয়টার্স, বিবিসি ও এএফপির। গণভোটের এই ফলে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন ঐক্যপন্থীরা। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন আগেই বলে রেখেছিলেন, যুক্তরাজ্য ভেঙে যাচ্ছে, এটা দেখা তাঁর জন্য হৃদয় ভেঙে যাওয়ার সমান মনে হবে। গতকাল ফল প্রকাশের পর তিনি স্কটল্যান্ডবাসীর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা প্রশ্নে গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয় স্বাধীনতাকামীদের বহুল প্রতীক্ষিত এ গণভোট। ভোটার ছিলেন ৪২ লাখের কিছু বেশি। ভোট পড়ার হার ছিল খুবই উঁচু—৮৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
সে হিসাবে, স্বাধীন হওয়ার জন্য ‘হ্যাঁ’ ভোট দরকার ছিল ১৮ লাখ ৫২ হাজার ৮২৮টি। তবে গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত ফলে দেখা গেছে, স্বাধীনতার পক্ষে ১৬ লাখ ১৭ হাজার ৯৮৯ জন স্কট ভোট দিয়েছেন। আর ‘না’ ভোট পড়েছে ২০ লাখ ১,৯২৬টি। তার মানে, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থেকে যাওয়ার পক্ষের শিবির স্বাধীনতাকামীদের বিরুদ্ধে শতাংশের হিসাবে ৫৫-৪৫ ব্যবধানে জিতে গেছে। স্কটল্যান্ডের মোট এলাকা ৩২টি। এর মধ্যে বৃহত্তম নগর গ্লাসগোসহ মাত্র চারটিতে জিতেছে হ্যাঁ ভোট। এগুলো হচ্ছে ডান্ডি (৫৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ), গ্লাসগো (৫৩ দশমিক ৪৯), ওয়েস্ট ডানবার্টনশায়ার (৫৩ দশমিক ৯৬) ও নর্থ লানার্কশায়ার (৫১ দশমিক ০৭)। রাজধানী এডিনবরাসহ বাকি ২৮টিতেই না ভোট বেশি পড়েছে। গণভোটের আগে প্রচারণার সময় প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন স্কটল্যান্ডবাসীকে না ভোট দেওয়ার জন্য আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ওই অঞ্চলের জন্য অধিকতর ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার। সেসব প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হবে বলে গতকাল জানিয়েছেন তিনি। স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেওয়া স্কটদের উদ্দেশে ক্যামেরন বলেন, ‘আমি আপনাদের কথাও শুনেছি। যুক্তরাজ্যের লোকজন যে উপায়ে শাসিত হচ্ছে, তাতে পরিবর্তন আনার জন্য এটা একটা সুযোগ।’ অন্যদিকে স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাণপুরুষ অ্যালেক্স স্যামন্ড পরাজয় মেনে নিয়ে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। স্যামন্ড বলেন, ‘এটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই জয়। তাই কোনো বিরোধ নয়।’ স্বাধীনতার বিপক্ষে প্রচারাভিযানের নেতা অ্যালিস্টার ডার্লিং বলেছেন, স্কটল্যান্ডবাসী পরিবর্তন চেয়ে যে বার্তা দিয়েছেন, তা অবশ্যই শোনা হবে।

বন্ধ হয়ে যাচ্ছে গার্মেন্টের দরজা by হাফিজ উদ্দিন

খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে দেশের পোশাক খাতের অন্যতম এলাকা হিসেবে পরিণত হয় সাভার। তবে শ্রমিক আন্দোলন, কারখানা ভাঙচুর, শ্রমিক নির্যাতন ও রাজনীতিক অস্থিরতাসহ বিভিন্ন কারণে একের পর এক পোশাক কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছে মালিক পক্ষ। বছর জুড়েই বিভিন্ন ইস্যুতে অব্যাহত শ্রমিক আন্দোলনের কারণে গত দেড় বছরে এ এলাকার ছোট ও মাঝারি ধরনের শতাধিক কারখানা বন্ধ হলেও কিছুদিন পর অনেকেই আবার নতুন করে শুরু করেছে উৎপাদন। তবে বেশ কয়েকটি কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। ফলে কারখানা বন্ধের কারণে বেকার হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার শ্রমিক। অনেকেই গ্রামে ফিরে গেছে। শিল্প পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল এলাকায় ৭ শতাধিকেরও বেশি পোশাক কারখানায় কয়েক লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করেন। এদের মধ্যে গত দেড় বছরে শ্রমিক আন্দোলন, কারখানা ভাঙচুর ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া ও ঠিকমত অর্ডার সরবরাহ করতে না পারায় আশুলিয়ার জিরানী এলাকার লিবার্টি ফ্যাশন লিমিটেড, ভলিভদ্র এলাকার ইন্ট্রাকো সোয়েটার, নয়ারহাট এলাকার নুরজাহান এ্যাপারেলস লিমিটেডসহ সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের ২০/২৫টি পোশাক কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আশুলিয়ার ভলিভদ্র এলাকার ইন্ট্রাকো সোয়েটার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সফিউল আলম বলেন, তাদের কারখানায় প্রায় ৮শ’ শ্রমিক কাজ করতো। বিরোধী দলের ডাকা হরতাল, অবরোধের সময় বিদেশী বায়ারদের কারখানায় আসতে অনেক অসুবিধায় পড়তে হয়। এছাড়াও এদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক বিদেশী বায়ার বিনিয়োগ করতে অনীহা প্রকাশ শুরু করেন। ফলে কারখানায় ক্রমশই অর্ডার কমতে থাকে। যার কারণে আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে পড়তে হয়। শ্রমিকদের বেতন ঠিকমতো প্রদান করতে না পারায় তারাও আন্দোলন শুরু করেন। একপর্যায়ে গত বছরের ডিসেম্বর মাসের দিকে কারখানাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন তিনি। জিরানী এলাকার লিবার্টি ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, তার কারখানায় প্রায় দুই হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। রানা প্লাজার ঘটনার পর থেকে তার কারখানাটি ঝুঁকিপূর্ণের মিথ্যা অভিযোগ এনে বন্ধ করে দিতে বাধ্য করা হয়। একপর্যায়ে তিনিও কারখানাটি বন্ধ করে দিয়ে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিদেশী বায়ারদের অর্ডার কমতে শুরু করে। এতে বিভিন্ন কারখানা আর্থিক সঙ্কটের মুখে পড়ে সময় মতো শ্রমিকদের বেতন প্রদানেও ব্যর্থ হয়। এছাড়াও ঠিক সময়ে মালামাল রপ্তানি করতে না পারায় অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় তাদের। একপর্যায়ে শ্রমিক অসন্তোষের মুখে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন বলে জানালেন নুরজাহান এ্যাপারেলসের মালিক সফিউল আলম। অপরদিকে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণার পর থেকেই শ্রমিকদের বাড়তি মজুরি দিতে না পারায় সাভারের হেমায়েতপুর এলাকার এ এইচ ড্রেসেস, দস্তগীর অ্যাপারেলস, পৌর এলাকার আড়াপাড়া মহল্লার ফেয়ার নিটিং লিমিটেড, জামগড়া এলাকার জামী ফ্যাশনসহ সাভার ও আশুলিয়ার আরও বেশ কয়েকটি ছোট ছোট পোশাক কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব কারখানাগুলোর মধ্যে অধিকাংশই বড় কারখানার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাদের কাছ থেকে সাব-কন্ট্রাক কাজের ওপর ভিত্তি করেই তাদের প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হতো। পোশাক কারখানা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির দাবিতে সৃষ্ট লাগাতার আন্দোলনের কারণে ছোট কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন সময় মতো শেষ করতে পারেনি। এতে তারা বিশেষ ক্ষতির মুখে পড়ে যায়। এছাড়াও ছোট কারখানাগুলো বড় কারখানার ওপর নির্ভরশীল থাকায় নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণার পর থেকেই ওইসব বড় কারখানাগুলো শ্রমিকদের অতিরিক্ত মজুরি গুনতে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। তারা ছোট কারখানায় সাব-কন্ট্রাকে কাজ না দিয়ে নিজেদের কারখানায় শ্রমিকদের বাড়তি প্রেসার দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করাতে শুরু করেন। এ সময় কাজ না পাওয়ার কারণে অনেক কারখানা মালিক মূলধন হারিয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। এরপর পোশাক কারখানা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ হওয়ার পর অনেক কারখানা মালিক শ্রমিকদের বেতন ভাতা পরিশোধ করতে বিপাকে পড়ে যান। তখন তারা উৎপাদন খরচ কমাতে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু করেন। তাতে আবার দেখা দেয় বিপত্তি। শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে শ্রমিকরা আবারও আন্দোলন করতে পথে নামেন। এমন পরিস্থিতিতে সাভার ও আশুলিয়ার ছোট ছোট কারখানা মালিক রাতারাতি কারখানা বন্ধ করে নোটিশ ঝুলিয়ে দেয়। সাভারের আড়াপাড়া এলাকার ফেয়ার নিটিং লিমিটেড কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এইচ হাশেমি বলেন, তার কারখানায় ৫শ’ শ্রমিক কাজ করতেন। তাদের কারখানা ছোট হওয়ায় বিদেশী বায়াররা কাজ দিতে অনীহা প্রকাশ করতো। আর এ কারণেই বড় কারখানার ওপর তাদের নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়। তবে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণার পর থেকেই শ্রমিকদের অতিরিক্ত মজুরির টাকা পুষিয়ে নিতে কারখানার মালিকরা ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। মালিকরা তাদের কাজ ছোট কারখানায় না দিয়ে শ্রমিকদের ওপর বাড়তি প্রেসার দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। আর এ কারণেই কাজ না পেয়ে তার কারখানায় বেশ কয়েক মাসের গ্যাস ও বিদুৎ বিল বকেয়া পড়ে যায়। এছাড়াও শ্রমিকদের বেতন বকেয়া থাকায় তারা কাজ বন্ধ করে দেয়। একপর্যায়ে তিনি কারখানাটি বন্ধ করার ঘোষণা দেন। এছাড়া সম্প্রতি বন্ধ হয়ে যাওয়া একাধিক কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বড় পোশাক কারখানাগুলো বেশীরভাগ সময়ই তাদের অতিরিক্ত উৎপাদনের জন্য ছোট কারখানার ওপর নির্ভরশীল থাকেন। তবে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণার পর থেকেই ওইসব বড় কারখানার মালিকপক্ষ তাদের কাজ ছোট কারখানায় না দিয়ে নিজের কারখানাতেই উৎপাদনের চেষ্টা করেন। এর ফলে ছোট কারখানাগুলো কাজের অর্ডার স্বল্পতার কারণে আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে পড়েন। একপর্যায়ে তারা কারখানা বন্ধ করে দেয়া ছাড়া কোন উপায় থাকে না। গামের্ন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রেন সাধারণ সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, সাভার আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে গত দেড় বছরে ২০/২৫টি পোশাক কারখানা বিভিন্ন জটিলতায় মালিকপক্ষ স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছেন।

ভারতের মুসলমানরা ভারতের জন্য বাঁচবে: নরেন্দ্র মোদি

নরেন্দ্র মোদি
ভারতের মুসলমানরা ভারতের জন্য বাঁচবে। ভারতের জন্য প্রাণও দেবে। তারা ভারতের খারাপ চাইবে না। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মার্কিন টিভি চ্যানেল সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন। গতকাল শুক্রবার সাক্ষাৎকারটি প্রচারিত হয়। প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই মোদির প্রথম সাক্ষাৎকার। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়া ও এএফপির। আল-কায়েদার প্রধান আয়মান আল জাওয়াহিরি সম্প্রতি এক ভিডিওবার্তায় ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ায় সংগঠনটির কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা দেন। তাঁর এ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে সিএনএনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ফরিদ জাকারিয়া তাঁর প্রতিক্রিয়া জানতে চান। জবাবে মোদি বলেন, ‘আমার মনে হয়,
তারা ভারতের মুসলমানদের সঙ্গে অন্যায় করছে।.. আল-কায়েদা ভারতে সদস্য পেতে বেগ পাবে।’ মোদি আরও বলেন, তিনি এ ব্যাপারে কথা বলার মতো কোনো বিশ্লেষক নন। কিন্তু পৃথিবীতে মানবতা সুরক্ষিত হবে কি না, মানবতায় বিশ্বাসীরা ঐক্যবদ্ধ হবেন কি না—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। তাঁর মতে, এটি মানবতার সংকট, কেবল একটি দেশ বা গোষ্ঠীর সংকট নয়। সাক্ষাৎকারে মোদি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে প্রভাব ফেলে—এমন বেশ কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলেন। তিনি স্বীকার করেন, দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে অনেক উত্থান-পতন চলছে। তবে তাদের সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলেই তিনি আশা প্রকাশ করেন। মোদি বলেন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধনে আবদ্ধ।
এ বাঁধন আরও মজবুত হবে। চলতি মাসের শেষে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হওয়ার কথা। গত মে মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটাই হবে তাঁর প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর। নিজ রাজ্য গুজরাটে ২০০২ সালের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দমনে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে মোদির যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। এ বছরের মে মাসে ক্ষমতায় আসে মোদির দল বিজেপি। তিনি নিযুক্ত হন নতুন প্রধানমন্ত্রী। সেই থেকে মোদির কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ওবামা প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায় গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল দিল্লিতে মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
নয়াদিল্লি ছেড়েছেন জিনপিং: তিন দিনের আলোচিত ভারত সফর শেষে গতকাল নয়াদিল্লি ছেড়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। পিটিআই জানায়, বিদায়ের আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে নিজের শহর জিয়ান সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট।

ভাঙনের মুখে বিএনপি জোট by সেলিম জাহিদ

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট ভাঙনের মুখে পড়তে যাচ্ছে। সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামার আগেই বিএনপিকে মানসিকভাবে দুর্বল বা নিঃসঙ্গ করার লক্ষ্যে জোটে ভাঙন ধরাতে সরকারের পক্ষে তৎপরতা চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জোটের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানান, বিএনপি জোট থেকে অন্তত পাঁচটি শরিক দলকে বের করে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। এ কাজে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি অবসরে যাওয়া একাধিক সামরিক কর্মকর্তা কাজ করছেন বলে তাঁদের কাছে তথ্য আছে। এরই মধ্যে শরিক দুটি দল ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি) ও বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টির ২০-দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়াটা প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গেছে।
বিএনপির একটি সূত্র জানায়, বিষয়টি নিয়ে জোটনেত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও ওয়াকিবহাল। তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে পাল্টা কৌশল নিয়েও ভাবছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও বিএনপি এবং ১৮-দলীয় জোটে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা হয়। তখন একাধিক শরিক দলকে নির্বাচনে আনতে ওই সব দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সাংসদ ও মন্ত্রী করার টোপ দেওয়া হয়েছিল। সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এখন আবার নতুন করে একই তৎপরতা গতি পেয়েছে। তবে এবার বিএনপিকে সরাসরি না ভেঙে দলটির শীর্ষ নেতাদের মামলা দিয়ে বিপর্যস্ত করার কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন দলটির নেতারা। পাশাপাশি বিএনপিকে মানসিকভাবে দুর্বল বা নিঃসঙ্গ করতে জোটে বড় আকারে ভাঙন ধরানোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
এর মধ্যে ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি) ও বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি যৌথভাবে আজ শনিবার দুপুর ১২টায় রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেছে। সংবাদ সম্মেলনে এনডিপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আলমগীর মজুমদার ও ইসলামিক পার্টির মহাসচিব এম এ রশীদ প্রধান জোট ছাড়ার ঘোষণা দিতে পারেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গত রাতে এম এ রশীদ প্রধান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপি জোটে অনেক দিন ধরে আছি। সেখানে আমরা উপযুক্ত সম্মান পাচ্ছি না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করেও কিছুই করতে পারলাম না। এখন দেশ-জাতির কল্যাণে এবং গণতন্ত্র রক্ষায় নতুন কিছু তো করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের কিছু চিন্তাভাবনা আছে। সংবাদ সম্মেলনে সেগুলো জানাব।’
আর আলমগীর মজুমদার আজ শনিবারই জোট ছাড়ার ঘোষণা দেবেন কি না, তা নিশ্চিত করেননি। তিনি গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত দিনেও জোটে আমাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর কোনো সুরাহা হয়নি। সংবাদ সম্মেলনে দলের চেয়ারম্যান এবং জোটের প্রধান দল বিএনপির সমালোচনা করব।’
এর মধ্যে ইসলামিক পার্টির চেয়ারম্যান আবদুল মোবিন সস্ত্রীক হজে গেছেন। আর এনডিপির চেয়ারম্যান গোলাম মোর্তুজাকে বাদ দিয়েই আলমগীর মজুমদারের নেতৃত্বে দলটি জোট ছাড়ছে বলে জানা গেছে। গোলাম মোর্তুজা আজকের সংবাদ সম্মেলনকে ‘২০-দলীয় জোটকে ভাঙার চক্রান্ত’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘কেউ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় জোট ছেড়ে যেতে চাইলে যেতে পারে, তবে এনডিপির নেতা-কর্মীরা বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটেই থাকবেন। এটা আমাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।’
এ ছাড়া জোবায়দা কাদের চৌধুরী (সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বোন) ও আতিকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ মুসলিম লীগও ২০-দলীয় জোট থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
এর আগে গত ২৪ আগস্ট বিএনপি জোট ছাড়ার ঘোষণা দেন ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান শেখ শওকত হোসেন নিলু। তারও আগে শেখ আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী-ন্যাপ) ২০-দলীয় জোট ছেড়ে যায়। যদিও শওকত হোসেন জোট ছাড়ার আগেই ১১ আগস্ট জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে তাঁকে ডাকা হয়নি। বিএনপির পক্ষ থেকে তাঁকে বৈঠকে আসতে মানা করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বিএনপির জোট থেকে বের হওয়া দলগুলোকে নিয়ে ‘ডেমোক্রেটিক ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট’ নামে আরেকটি জোট গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শেখ শওকত হোসেন এর নেপথ্যে কাজ করছেন। ২৫ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে এ জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটবে বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন শওকত হোসেন।
‘ডেমোক্রেটিক ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট’-এ ২০-দলীয় জোটের আরও অন্তত তিনটি দলের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা আছে। নতুন এ জোট গঠনের নেপথ্যে একটি গোয়েন্দা সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে। সরকারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা এ কাজের তত্ত্বাবধান করছেন এবং তিনি গত কয়েক মাসে বিএনপি জোটের শরিক একাধিক দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার মনে হয় জোটে ভাঙন ধরাতে সরকারের ইন্ধন আছে। ভবিষ্যতে আন্দোলন এবং নির্বাচনে বিএনপি জোটকে দুর্বল করতেই এটি করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, অতীতেও এ ধরনের অনেক তৎপরতা দেখা গেছে। কিন্তু শেষ বিচারে তাতে কোনো সাফল্য অর্জিত হয় না। কারণ, জনগণ এসব বুঝতে পারে।

‘নীতিমালা নয় ন্যায়মালা চাই’

সম্প্রচার নীতিমালার প্রেক্ষাপটে টকশো। আলোচনায় অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, গণমাধ্যম গবেষক, সাংবাদিক আর টকশো ব্যক্তিত্বরা। প্রায় সবাই একবাক্যে সমালোচনা করলেন সম্প্রচার  নীতিমালার। এ নীতিমালাকে ভীতিমালা হিসেবে অভিহিত করে তা বাতিলের দাবি জানালেন তারা। বিকল্প পার্লামেন্ট হিসেবে টকশোর ভূমিকার কথাও বললেন কেউ কেউ। আলোচনায় এলো ৫ই জানুয়ারি পরবর্তী নতুন বাস্তবতাও। চ্যানেল আই’র ১৬ বছর পদার্পনে আয়োজন করা হয় এ আলোচনার। সাংবাদিক নাঈমুল ইসলাম খানের সঞ্চালনায় মূল প্রবন্ধ উত্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস। তিনি বলেন, সাংবাদিকতার প্রথম পাঠ হচ্ছে- পৃথিবীর সমস্ত সরকার মিথ্যাবাদী। সরকারগুলো তথ্য লুকায়। সাংবাদিকদের কাজ হচ্ছে সে তথ্য বের করে আনা। টকশো এখন অনেকটাই বিকল্প পার্লামেন্টের ভূমিকা পালন করছে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ৫ই জানুয়ারি পরবর্তী সময়ে কর্তৃত্ববাদী আকাঙ্ক্ষা নতুন মাত্রায় উপনীত হয়েছে। আমরা অদ্ভুত এক গণতান্ত্রিক বাস্তবতায় উপনীত হয়েছি। ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, বাংলাদেশের সংসদে যখন কোন বিতর্ক হয় না সে সময় টকশোতেই বিতর্ক হচ্ছে। যে বিতর্ক আমজানতাকে দেশ নিয়ে ভাবতে উদ্ধুদ্ধ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকে উদ্ধৃত করে বলেন, জাস্টিস শব্দের মধ্যে নীতি এবং ন্যায় দু’টি বিষয় রয়েছে। নীতিমালা হচ্ছে- নিয়ন্ত্রণমূলক। আমাদের প্রয়োজন হচ্ছে ন্যায়মালা। নিউজটুডে সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী যখন টকশো নিয়ে লিখেন তখন বুঝতে হবে টকশোর গুরুত্ব রয়েছে। চ্যানেল আই’র পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ বলেন, গণমাধ্যমে যেটুকু স্বাধীনতা ভোগ করছে তা কেউ গণমাধ্যমের হাতে তুলে দেয়নি। নিজ যোগ্যতায় গণমাধ্যম তা অর্জন করেছে। মানবজমিন প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, কোন ধরনের সম্প্রচার নীতিমালারই প্রয়োজন নেই। পাঁচটি টিভি চ্যানেল বন্ধ করতে কোন নীতিমালার প্রয়োজন পড়েনি। সকালের খবর পত্রিকার সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু বলেন, সম্প্রচার নীতিমালা অপ্রয়োজনীয় এবং তা প্রত্যাহার করা উচিত। সাংবাদিক অজয় দাশগুপ্ত বলেন, সদিচ্ছার ওপর ভিত্তি করেই আসলে গণমাধ্যমকে চলতে হয়। সিনিয়র সাংবাদিক ফরিদ হোসেন বলেন, গণমাধ্যমের জন্য নীতিমালা প্রয়োজন। গণমাধ্যমের ওপর সরকার যে হস্তক্ষেপ করছে তার জন্য বহুলাংশে সাংবাদিকরাই দায়ী।
সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান বলেন, সম্প্রচার নীতিমালা সংবিধানের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। সাংবাদিক আশরাফ কায়সার বলেন, সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ন্ত্রণমূলক। কি যোগ্যতার ভিত্তিতে লাইসেন্স দেয়া হবে তার জন্যই নীতিমালা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু নীতিমালায় তা নিয়ে শুধু একটিমাত্র বাক্য আছে। সাপ্তাহিক সম্পাদক গোলাম মোর্তোজা বলেন, যে উদ্দেশ্যে নীতিমালা চাওয়া হয়েছিল সে উদ্দেশ্যে নীতিমালা দেয়া হয়নি। গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যই এ নীতিমালা দেয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শামীম রেজা বলেন, টকশো বহুমাত্রিক আলোচনার জায়গা তৈরি করেছে। যদিও টকশোতে বেশির ভাগ আলোচনা হয় রাজনীতি নিয়ে। আনন্দ আলো সম্পাদক রেজানুর রহমান বলেন, শহরের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রামেও টকশো জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। চ্যানেল আই ভবনে অনুষ্ঠিত আলোচনায় শুরুতে সবাইকে স্বাগত জানান সাংবাদিক কাজল ঘোষ।
মূল প্রবন্ধে রোবায়েত ফেরদৌস আরও বলেন, গণতন্ত্র শুধু একটি শাসন ব্যবস্থা নয়। গণতন্ত্র একটি মূল্যবোধের নাম। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যে সাংবাদিক সরকারের বিরুদ্ধে তথ্য প্রকাশ করবে সরকারেরই দায়িত্ব সে সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যেমন সংসদে সরকারি দলের দায়িত্ব বিরোধী দল যেন তাদের সমালোচনা করতে পারবে সে পরিবেশ নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, টকশোকে আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি জনপরিসর বা পাবলিক স্ফেয়ার হিসেবে। জনপরিসর এমন পাটাতন যেখানে নাগরিকরা রাষ্ট্র সরকার ও সমাজের বিবিধ সমস্যা বা ইস্যু নিয়ে কথা বলতে পারবে। টিভি টকশো সে কাজটিই করে থাকে। টকশোর মধ্য দিয়ে টেলিভিশন নাগরিকদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক তোলার সুযোগ তৈরি করে দেয়। কেউ কেউ টকশোকে বিকল্প পার্লামেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এ অর্থে, যখন আমাদের সংসদ ঠিকমতো কাজ করে না, সংসদে যখন সরকারি দল ও বিরোধী দলের কোন বিতর্ক হয় না, সংসদের বাইরেও তাদের মধ্যে যখন কোন সম্মুখ সংলাপ হয় না, তখন টকশোই একমাত্র ফ্লাটফর্ম হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে, যেখানে সরকারি দল, বিরোধী দল তো বটেই সংসদে কখনও আসন পায়নি এমন অনেক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও কথা বলার, বিতর্ক তোলার সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু এর পরও প্রশ্ন থাকে আমাদের টিভি টকশোগুলো কি সত্যিকার অর্থেই জনপরিসরের শর্ত পূরণ করতে পারছে। এখানে কি সবার কথা বলার সুযোগ আছে? গ্রামের প্রান্তিক মানুষ, শিক্ষাবঞ্চিত নারী-পুরুষ কিংবা ঢাকার বাইরে জনবুদ্ধিজীবীদের কতজন টকশোতে অংশ নিতে পারেন? কতজন নারী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, নারী অর্থনীতিবিদ টকশোতে অংশ নেন। মোটা দাগে আমাদের টকশো তো শহর অভিমুখী, ধনিক অভিমুখী, এলিট অভিমুখী, পুরুষ অভিমুখী এবং তথাকথিত শিক্ষক অভিমুখী। বাংলাদেশে গ্রামীণ সমাজে পুকুরঘাটের আড্ডাকে কি আমরা জনপরিসর বলতে পারি? আমাদের চা স্টল, হাটবাজার বা নাপিত শালা কি আসলেই জনপরিসর? ভারতীয় প্রেক্ষাপটে দীপেশ চক্রবর্তী আড্ডাকে জনপরিসর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বৃটিশবিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের সময় ঘরে ঘরে গোপন আলোচনা হতো, সেখানে আলোচনার এজেন্ডা ঠিক করতেন পুরুষ, আলোচকও থাকতেন পুরুষ, নারীও থাকতেন তবে তা কেবল চা-চানাচুর পরিবেশনের সময়। তিনি বলেন, অনেকে বলেন টকশোগুলো গণতন্ত্রের প্রহরীর ভূমিকা পালন করছে। টকশোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও দর্শকপ্রিয়তা পায় পলিটিক্যাল টকশো। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে টকশো নিয়ে বিস্তর গবেষণা হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিভাবে টকশোগুলোতে আলোচনার এজেন্ডা ঠিক হয়? কারা ঠিক করেন? এজেন্ডা ঠিক থাকলেই কি আলোচকরা সে ফ্রেমে কথা বলেন। টকশো উপস্থাপনা করতে গিয়ে দেখেছি অনেককে প্রশ্ন করলে তারা বলেন, আমি আমার কথাটা বলি, তারপর আপনার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। রোবায়েত ফেরদৌস সম্প্রচার নীতিমালার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি একে নিয়ন্ত্রণমূলক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কি কোন বন্ধুরাষ্ট্র এবং শত্রুরাষ্ট্রের তালিকা আছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত সে তালিকা প্রকাশ করা। তিনি বলেন, আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পথে আমাদের আরও অনেক দূর অবধি যেতে হবে। যেতে হবে গণতন্ত্রকে সতেজ টাটকা আর ফুরফুরে রাখার তাগিদে। আমরা চাই জানালা খোলা থাকুক- এতে ধুলোবালি কিছু আসবে। কিন্তু বিশ্বাস করুন সবচেয়ে বেশি আসবে আলো।
অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, গ্রামসীর তত্ত্ব অনুযায়ী যখন কোন দেশে ফ্যাসিজম চালু হয় তখন রাজনৈতিক দল বলে কিছু থাকে না, তখন গণমাধ্যমকে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা পালন করতে হয়। বাংলাদেশে যেহেতু কোন দলের মধ্যে গণতন্ত্র নেই, তাই মিডিয়াকে ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে। তবে টকশো বিকল্প সংসদ নয়। কারণ সংসদের দায়িত্ব হচ্ছে আইন তৈরি করা। টকশো কোন আইন তৈরি করে না। তিনি বলেন, আমাদের রাজনীতিবিদদের কোন লেখার প্রয়োজন হয় না। তাদের ভাষণ দিতে জানলেই চলে। তিনি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ নামকরণের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বলেন, রিপাবলিকের মধ্যেই তো পাবলিক রয়েছে। তিনি গণমাধ্যমের জন্য ন্যায়মালা প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন দুটি নীতি সব সময়ই অনুসরণ করতে হবে। প্রথমত, কোন ব্যক্তিগত আক্রমণ করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, ঘৃণা প্রচার করা যাবে না।
অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, সরকারের চিন্তায় বড় ধরনের জট লেগেছে। সম্প্রচার নীতিমালা এক ধরনের ভীতিমালা। সরকার ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে এ নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এ নীতিমালা প্রণয়নের পর সব মিডিয়া ভয়ে আছে। তাই একে ভীতিমালা বলাই যৌক্তিক। তিনি বলেন, আমার খুব প্রিয় একটি কবিতা আছে। লোকের কথায় নয় ঘটনায় মন দাও।
সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, টকশো এবং খবর দুটোই জনপ্রিয়। ২০-২৫ বছর ধরে শত সমস্যার পরও জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেতো। কিন্তু ৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় নতুন উপাদান তৈরি হয়েছে। কর্তৃত্ববাদী আকাঙ্ক্ষা নতুন মাত্রা পেয়েছে। জনগণের কণ্ঠ উচ্চকিত হয় কিন্তু কোন ফল হয় না। এক দশক পর নাগরিক সমাজও অসহায় অবস্থায় রয়েছে। কর্তৃত্ববাদী শাসকরা নাগরিক সমাজের চেয়ে অনেক চালাক। শাসকরা এখন অনেক অস্ত্র ব্যবহার করছে। এ অবস্থায় এখন পরামর্শের মূহুর্ত নয় এখন হচ্ছে উপলব্ধির সময়। আমাদের বলতে হবে আমরা ভয় পাইনি।
শাইখ সিরাজ বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোর নিজস্ব কোন নীতিমালা নেই। এটা সত্য, আমরা নীতিমালা চেয়েছিলাম। কিন্তু কি প্রেক্ষাপটে তা চেয়েছিলাম তা-ও বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের আগ থেকেই নানা জায়গা থেকে নানা রকমের নির্দেশনা আসতো। নানা দুর্যোগের সময় আমাদের নানা রকম নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে টকশো নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। ঢাকার বাইরেও অনেক প্রতিভাবান মানুষ রয়েছে। আমাদের উচিত সেইসব মানুষদের টকশোতে নিয়ে আসা। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গণমাধ্যমের অবদানের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আইন করে কেউ গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে সফল হয়নি। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সময়ও আমরা আমাদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার ছিলাম। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ও সাংবাদিকরা সাহসী ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন। সম্প্রচার নীতিমালা একটি বাজে আইন। এ আইন বাতিল ঘোষণা করা প্রয়োজন। মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার তিনটি টিভি চ্যানেল বন্ধ করেছে। জরুরি অবস্থার সরকার একটি এবং বিএনপি সরকার একটি টিভি চ্যানেল বন্ধ করেছিল। এজন্য তাদের কোন নীতিমালা লাগেনি। তিনি বলেন, দুই জন রাজনীতিবিদ বই লিখে কি বিপদে পড়েছেন তা আপনারা দেখেছেন। টকশো’র কারণেও অনেকে বিপদে পড়েন। নানা ধরনের লিস্ট আসছে। এখন আবার অনেকে নিজ থেকেও টকশোতে আসতে চাচ্ছেন না। আসলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে কোন কিছুরই পরিবর্তন হবে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলের ইতিহাস যখন লেখা হবে তখন দুটি কারণে সেখানে চ্যানেল আই’র নাম অবশ্যই থাকবে। একটি হচ্ছে টকশো এবং অন্যটি বিনোদন। মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু বলেন, আজ বাসায় বসে বিস্মিত হয়ে স্কটল্যান্ডের গণভোট দেখছিলাম। কিভাবে একটি দেশের স্বাধীনতা নিয়ে ভোটের মাধ্যমে মানুষ তাদের মতামত দিয়েছে। যুদ্ধ নেই, লড়াই নেই। অথচ আমরা এখানে কেউ কাউকে মানি না। সামান্য নির্বাচন নিয়েও লিপ্ত হই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে। তিনি বলেন, সম্প্রচার নীতিমালা  অনাবশ্যক। এটি হয়তো বিরোধীদের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হবে। সংবাদপত্রের পর্যালোচনার ক্ষেত্রে একটি আওয়ামী লীগ একটি বিএনপির সংবাদ নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন নেই। শামীম রেজা বলেন, টকশোকে আমি বিকল্প সংসদ বলতে রাজি নই। ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আমরা কথা বলতে পছন্দ করি। পেটে ভাত না থাকলেও আমরা কথা বলতে চাই। যে কারণে আমাদের এখানে টকশোগুলো বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। মিজানুর রহমান খান বলেন, সাংবাদিক নিজেরা যদি একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে রাখতেন তাহলে সরকার নীতিমালা চাপিয়ে দিতে পারতো না। সরকারের কাছে সবকিছু চাওয়ার একটি অভ্যাস আমাদের রয়ে গেছে। অজয় দাশগুপ্ত বলেন, ১/১১ এর রাতে জরুরি অবস্থা জারির পরপরই সংবাদ মাধ্যমের ওপর কোন ধরনের নিয়ন্ত্রণ আসেনি। সে রাতে আমরা সমকাল অফিসে বসে আলোচনা করছিলাম সেন্সরশিপ ছাড়া জরুরি আইন বা সামরিক শাসন টিকে কি না। বাংলাদেশে ২০০১ সাল ব্যতীত কখনোই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর হয়নি। এ বিষয়টিও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। ফরিদ হোসেন বলেন, আমরা যারা টকশোতে অংশ নেই আমাদেরও সমালোচনা রয়েছে। একই দিনে আমরা একই পোশাকে একাধিক টকশোতে অংশ নিয়ে থাকি। এটা হয়তো ঠিক প্রধানমন্ত্রীকে সাংবাদিকদেরই কেউ কেউ সম্প্রচার নীতিমালা করার পরামর্শ দিয়েছেন। সম্পাদক পরিষদ এখন নীতিমালার কথা বলছেন, কিন্তু আগে কেন তারা নীতিমালা তৈরির কথা বলেননি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর সঙ্গী হিসেবে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় অনেক সাংবাদিক-সম্পাদককে আমরা বিদেশ যেতে দেখি। তাদের দ্বারা কি নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা সম্ভব। পৃথিবীর কোন দেশে দুস্থ সাংবাদিকদের অর্থ দেয়া হয় এবং তা প্রচারিত-প্রকাশিত হয় তা আমি কখনোই শুনিনি। আশরাফ কায়সার বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির পেছনে সংবাদ মাধ্যমের কি কোন অবদান নেই। গণমাধ্যমের সে অবদান কেন আজ অস্বীকার করা হচ্ছে। যখন নীতিমালা ছিল না তখন কি গণমাধ্যম দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেনি। অলিখিত নীতিমালার মাধ্যমে আমাদের সম্পাদকরা সব-সময়ই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছেন। নীতিমালা লাইসেন্সের ব্যাপারে বিস্তারিত কোন কিছু না বলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে আওয়ামী লীগের লোকেরা লাইসেন্স পান, বিএনপির আমলে বিএনপির লোকেরা লাইসেন্স পান। দক্ষ ও যোগ্য লোকরা টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স পান না। গোলাম মোর্তোজা বলেন, সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়নে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার কথা বলা হয়েছে। অথচ যেসব বিষয়ে কখনোই কোন আলোচনা হয়নি সেসব বিষয়ও সম্প্রচার নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ নীতিমালা কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক। পুরো ধমক ও গায়ের জোরে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হচ্ছে। রেজানুর রহমান বলেন, গ্রামের মানুষও এখন গভীর রাত জেগে টকশো দেখে থাকে। টকশো আলোচকদের সবাইকেই তারা চিনেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে একইদিন এক আলোচক একাধিক   টকশোতে অংশ নেন। এটা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। টকশোতে নতুন মানুষ আনা প্রয়োজন। গ্রামের মানুষকেও টকশোতে আলোচনায় অংশ নেয়া প্রয়োজন।

ওয়ান অ্যান্ড অনলি ওয়ান শেখ হাসিনা

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে একটি দুর্নীতি মামলার বিচারক নিয়োগ বিষয়ে ছিল ওই আবেদন। আদালতের এ সিদ্ধান্তে এখন খালেদা জিয়ার বিচার শুরু করবার পথ পরিষ্কার হয়ে গেছে। তার বিরুদ্ধে প্রয়াত স্বামী জিয়াউর রহমানের স্মৃতিতে স্থাপিত দাতব্য ট্রাস্ট থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউটররা। স্বাধীনতার সময়কার সেনাবাহিনীর একজন নেতা ছিলেন জিয়াউর রহমান। পরে প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন তাকে হত্যা করা হয়। অর্থ আত্মসাতের এ মামলায় দোষী প্রমাণিত হলে দেশের ২য় সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান এ নারীর কারাদণ্ড হতে পারে। আর আদালতের এ রায়ে দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান নারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্তৃত্ব আরও জোরদার হলো। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের ৮ মাস পরে এ ঘটনা ঘটলো। খালেদা জিয়ার বিএনপি ওই নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচনের সময় শেখ হাসিনা খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দি করে রাখে আর বিএনপির রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ করে। কোন বিরোধী দল ছাড়া শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের জন্য এটা ছিল নিশ্চিত সহজ এক জয়। নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের আহ্বানের মধ্যে একরকম বিচলিত শুরুর পর তার সরকার এখন বেশ স্বাচ্ছন্দ্যকর অবস্থায় উপনীত হয়েছে। কিছু সহানুভূতিশীল ব্যক্তি যুক্তি দেখান যে শেখ হাসিনার শাসন ন্যায়সঙ্গত। সেটার কারণ হতে পারে দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের সফলতা। ২০০৯ সালে তিনি ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে দারিদ্র্যের হার দ্রুত কমে এসেছে। ২০০৬ সালে খালেদা জিয়া সরকারের স্বজনপ্রীতি আর অযোগ্য শাসণের যখন অবসান হয়- যে সময় দুই নারীকে যখন সেনাবাহিনী আটক করেছিল; সে সময়ের তুলনায় অর্থনীতি এখন দ্বিগুণ বড়। অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনী আবিষ্কার করে দেশ চালানোটা তারা যতটা উপভোগ্য মনে করেছিল ততটা নয়। তখন থেকে তারা পেছনের আসনে অবস্থান নিয়েছে। সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশন থেকে বছরে ৫০০ মিলিয়ন ডলার আয় করে। অস্ত্রের বাজেট ভালো বৃদ্ধি পেয়েছে। আর সেনাবাহিনীর ব্যবসা পোর্টফোলিওতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে আরও একটি বিলাসবহুল হোটেল আর একটি খামারবাড়ি। এদিকে, শেখ হাসিনার সরকার তাদের শাসন স্থায়ী করতে আদালতে কতৃত্ব স্থাপন, মিডিয়া সমালোচকদের বাক্‌রোধ আর সংবিধান নিয়ে নাড়াচাড়া করা অব্যাহত রেখেছে। সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। আর তাদের মিত্র সাবেক স্বৈরশাসক এরশাদের দল জাতীয় পার্টি বিশ্বস্ত বিরোধী দল হিসেবেই আচরণ করছে। ১৭ই সেপ্টেম্বর সংসদ বিচারকদের অভিশংসন ক্ষমতা দিয়ে একটি সংবিধান সংশোধনী পাস করে। আগামী সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া বিএনপির তেমন কোন উপায় নেই। আগামী ২০১৯-এর আগে যা আয়োজন হওয়া প্রয়োজন। বিএনপির দাবি আওয়ামী লীগ অলিক চিন্তার বশবর্তী। যদিও অর্থনীতির গতি সম্প্রতি কিছুটা শ্লথ হয়েছে, ব্যাংকিং খাত খারাপ হালে রয়েছে আর আইনশৃঙ্খলা টালমাটাল। তারপরও বড় কোন সঙ্কট আসন্ন বলে দৃশ্যমান নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকার বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। একটি বিতর্কিত ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত গণহত্যা ও অন্যান্য অপরাধের বিচারের দীর্ঘ বিলম্বিত রায় সরকার ঝুলিয়ে রেখেছে। প্রায় সকল অভিযুক্তই হচ্ছে জামায়াতে ইসলামির সদস্য। ১৭ই সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট জামায়াতের একজন নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ড লঘু করেছে। গত বছর যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ রাজপথে মারাত্মক অস্থিরতার সূত্রপাত ঘটায়। যুদ্ধাপরাধ বিচারের রায় বাতিলের সর্বশেষ আদেশটি ইঙ্গিত করে, রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে এগুলো প্রয়োজনীয়তা কার্যত ফুরিয়েছে। সম্ভবত বিস্ময়করভাবে সামপ্রতিক একটি জনমত জরিপ অনুসারে নির্বাচনের আগের তুলনায় সরকার এখন আরও বেশি জনপ্রিয়। বিএনপি বলছে, জরিপটি ত্রুটিপূর্ণ। দলটি যুক্তি দেখিয়েছে, তারা গত বছর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শাসকদল আওয়ামী লীগকে হারিয়েছে। একই সঙ্গে এ বছরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগও এনেছে। হয়তো জনমত জরিপটি এক ধরনের নিয়তি মেনে নেয়ার প্রতিফলন ঘটিয়েছে সরকারের সমালোচনা করে লাভ কী, যেখানে আপাতত বিরোধীদল হিসেবে বিকল্প কিছু নেই? বিএনপি কিভাবে লড়াইয়ে ফিরবে, সেটা আরও কিছুটা সময় অস্পষ্ট থাকবে। সংসদের বাইরে, এ দলের রাজনীতিবিদরা এখন ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য ক্যাডারদের ওপর নির্ভরশীল, যা তারা আগে রাষ্ট্র থেকে পেতেন। একসময় নিজের স্বামীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন যারা সেসব উপদেষ্টাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত বেগম জিয়া দৃঢ়ভাবে বলছেন, সাধারণ নির্বাচন বয়কট করার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, দলের সংস্কার চলছে এবং লন্ডনে নির্বাসিত তার ছেলে তারেক রহমান রাজনীতিতে ফিরবেন। বেগম জিয়া ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি ‘সেই মহিলা’র মতো প্রতিশোধ নিতে আগ্রহী নন। তারেক রহমান প্রত্যবর্তন করলে যদিও দলটিতে কিছুটা তারুণ্যের সঞ্চার হবে, তবে তার উত্থান দেশে বিএনপিকে বিভক্ত করবে ও বিদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করবে। ২০০৮ সালে উইকিলিকসে প্রকাশিত ফাঁস হওয়া মার্কিন তারবার্তায় দেখা যায়, মার্কিন কূটনীতিকেরা বলেছিলেন, বাংলাদেশে যা কিছু ভুল হচ্ছে, তার বেশির ভাগের জন্য তারেক রহমান ও তার অন্তরঙ্গ বন্ধুদের দায়ী করা যেতে পারে। তারেক রহমানের সমর্থকরা বলেন, তার বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে যে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, সেসব আসলে করেছে তারা, যারা তারেকের সঙ্গে নিজেদের সমপর্কের অপব্যবহার করেছে। বিএনপির মা-পুত্র দু’জনের প্রত্যাবর্তনে খুশি না হয়ে, ইসলামপন্থি দলগুলোর ব্যাপারে ভ্রূক্ষেপ না করে সহ অন্যান্য কারণে বিদেশী সরকারগুলো এখন শেখ হাসিনার সঙ্গেই ব্যবসা করতে সন্তুষ্ট। সমপ্রতি পরাজিত হওয়া ভারতের কংগ্রেস দলের গান্ধী পরিবারের সঙ্গে যেমন সমপর্ক ছিল শেখ হাসিনার, বর্তমান ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তেমন ঘনিষ্ঠ সমপর্ক নেই। তবুও তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে দৃঢ় সমপর্কের ব্যাপারে আগ্রহী। মোদি অর্থনৈতিক সমপর্ক ও ইসলামি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে উভয়ের সাধারণ লড়াইয়ের দিকে গুরুত্বারোপ করছেন। চীন যতক্ষণ পর্যন্ত সমুদ্র বন্দর পাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত উন্মুক্ত সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। কয়েক দিন আগেই জাপান ৬০০ কোটি ডলার ঋণ হিসেবে দেয়ার অঙ্গীকার করেছে। রাশিয়া ও বাংলাদেশ দুটি পারমাণবিক জ্বালানি চুল্লির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা যাচাই করছে। তবুও দ্বিধা রয়ে গেছে, এসব আসলে কোথায় স্থাপিত হবে। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের নামে একটি উপগ্রহ উৎক্ষেপণে দরপ্রস্তাব করছে বিদেশীরা। অন্য কথায় একটি বিশাল ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন সত্ত্বেও সবই শেখ হাসিনার অনুকূলে। কোনো কার্যকর বিরোধী দল না থাকায় তিনি খুব কম চাপে রয়েছেন। শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী যদি মনে করেন ২০১৯-এ টানা তৃতীয়বার জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম, তাহলেই হয়তো তিনি নিজের শাসনকাল দীর্ঘায়িত করার আশায় একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের ডাক দিতে পারেন। আপাতত, অন্তহীন এ লড়াইয়ে জিতে চলেছেন এক নারী।

বিশেষ দূতের কাজ কি? by নিয়াজ মাহমুদ

৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে নানা নাটকীয়তার পর প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এ দায়িত্ব পাওয়ার প্রায় আট মাস চলে গেছে। এই সময়ে তিনি কি দায়িত্ব পালন করেছেন এ নিয়ে প্রশ্ন সর্বত্র। বিশেষ দূত হিসেবে নিজের দায়িত্ব কি তা জানতে একবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও গিয়েছিলেন এরশাদ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সে সময় তাকে কিছু জানাতে পারেনি। দায়িত্ব পাওয়ার পর এরশাদ ব্যক্তিগত সফরে একবার ভারত গেছেন। পার্টি প্রধান হিসেবে চীন যাবেন। কিন্তু বিশেষ দূত হিসেবে তিনি এখন পর্যন্ত বিদেশ সফরে যাননি। নিজের দায়িত্ব নিয়ে এমন দোলাচলে থাকলেও এরশাদ শুরু থেকেই মন্ত্রী মর্যাদায় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। তার পেছনে সরকারি কোষাগার থেকে মাসিক খরচ প্রায় ৫ লাখ টাকা। গত আট মাস ধরে  জাপা চেয়ারম্যান মাসিক বেতনসহ সরকারি সব  সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একজন পূর্ণমন্ত্রীর বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন তিনি। নিয়মিত তুলছেন বেতন। সরকারি পাজেরো গাড়ির পাশাপাশি তার জন্য রয়েছে ৯ জন ব্যক্তিগত স্টাফ। জাতীয় সংসদে একটি অফিস। এরশাদের ব্যক্তিগত সচিব মেজর (অব.) খালেদ আক্তার এরশাদের বেতন উত্তোলনের বিষয়টি মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছেন। ১২ই জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের দায়িত্ব পান এরশাদ। এর ৫৩ দিন পর ৫ই মার্চ তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়েছিলেন নিজের কাজ সম্পর্কে জানতে। যদিও মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কেউ এরশাদকে এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানাতে পারেনি। বলা হচ্ছিল মধ্যপ্রাচ্যসহ কয়েকটি দেশে সরকারের দূত হিসেবে এরশাদ সফর করবেন। এবং এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করবেন। কিন্তু এ পর্যন্ত এমন কোন উদ্যোগও দেখা যায়নি। কয়েক মাস আগে কয়েকটি দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেছিলেন মাত্র। সম্প্রতি দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নাজেহাল জাপা দৃশ্যত দুইভাগে বিভক্ত। এমন অবস্থায় বেশ কিছু দিন ধরে বিরোধী দলে থেকে সরকারের অংশ নেয়ার সমালোচনা এড়াতে দলীয় মন্ত্রীদের পদত্যাগের কথা বলা হচ্ছিল দলে। এরশাদ নিজেও একাধিকবার এ বিষয়ে কথা বলেন। মন্ত্রীদের পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা চলাকালেই দলের মন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা প্রশ্ন তুলেন মন্ত্রীদের পদত্যাগের আগে এরশাদকেই পদত্যাগ করতে হবে। কারণ, তিনিও মন্ত্রী মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে আছেন। বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদের অনুসারী নেতারাও এমন যুক্তি দিচ্ছেন। এমন অবস্থায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- মন্ত্রীরা নিজ নিজ দপ্তর চালালেও মন্ত্রী মর্যাদার বিশেষ দূতের কাজ কি? ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন ও নানা নাটকীয়তার পর গত বছর ১২ই ডিসেম্বর রাতে এরশাদকে বাসা  থেকে সিএমএইচএ নেয়া হয়। পরে রংপুর ৩ আসন থেকে এমপি হিসেবে শপথ নেন তিনি। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়ে সিএমএইচ থেকে বাসায় ফেরেন এরশাদ। নির্বাচন বর্জন করলেও ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ৪০ জন এমপি হয়েছেন। এদিকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিলেও এরশাদ ক্ষণে ক্ষণে সরকারেরই সমালোচনা করছেন। তিনি দাবি করছেন, আওয়ামী লীগ-বিএনপি ব্যর্থ। তিনি বলছেন, দেশে সুশাসন নেই। মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারে না। আইনের শাসন অনুপস্থিত। এভাবে দেশ চলতে পারে না। নিজের পদ নিয়ে নিজ দলেই যখন প্রশ্নের মুখে তখন হঠাৎ করেই দলের প্রেসিডিয়াম থেকে দুই প্রভাবশালী নেতাকে বহিষ্কার করেন তিনি। তাদের একজন এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা এবং অন্যজন বিরোধী দলের চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী। এই বহিষ্কারের ঘটনা দলে নতুন করে টানাপড়েনের সৃষ্টি করে। বিরোধী দলের উপনেতা নিয়োগ নিয়ে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হলেও এখন তা রওশন এবং এরশাদের ক্ষমতার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। যদিও এরশাদ দাবি করছেন জাতীয় পার্টিতে কোন বিরোধ নেই। তার নেতৃত্বেই পার্টি চলছে।

অনিশ্চয়তায় অর্ধলক্ষ শিক্ষার্থী by নুর মোহাম্মদ

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) গাফিলতিতে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধলক্ষ শিক্ষার্থী। সমপ্রতি ১২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮টি শাখাকে কালো তালিকাভুক্ত করার পর সেখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মাঝে এ অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ইউজিসির তালিকায় ৪৮টি শাখা থাকলেও প্রকৃত সংখ্যা ১৮৯টি। এই পরিস্থিতির জন্য মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির সদিচ্ছার অভাবকেই মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন দিয়ে অতীতে সব ব্যর্থতা থেকে নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করে। শিক্ষার্থী ও অভিভাকরা বলছেন, আমরা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখেই এ সব শাখায় ভর্তি করিয়েছি। এগুলো অনুমোদন নেই সরকার তো আগে বলেনি। সেখানে অধ্যয়নরত এসব শিক্ষার্থীর দায় কে নেবে? এমন প্রশ্নে শিক্ষামন্ত্রী  বলছেন, কতিপয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে আর সনদ বাণিজ্য করতে দেয়া হবে না। শিক্ষার্থীদের বাঁচাতেই আমাদের এই উদ্যোগ। অন্যদিকে এটাকে গা-বাঁচানোর অজুহাত আখ্যা দিয়ে শিক্ষাবিদরা বলছেন, টিআইবি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব অপকর্ম হতো তা উন্মোচন করার পর মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি নিজেদের দায় সারাতে শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে। তারা বলছেন, টিআইবি’র অভিযোগগুলো গত কয়েক বছর সংবাদ মাধ্যমে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও ঘুম ভাঙেনি সংশ্লিষ্টদের। তাদের দাবি, ইউজিসি’র এই সতর্কতা জারি আসলে কোন লাভ হয়নি। কারণ গত কয়েক দিনে ধরে এসব বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকায় নানা চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে শিক্ষার্থী টানার চেষ্টা করছে। এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির সার্বিক কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে ‘মাথা ব্যথা বলে মাথা কেটে ফেলার অ্বস্থা।’ এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, এটি বলতে দ্বিধা নেই যে, কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বেপরোয়া হওয়ার পেছনে সরকারই দায়ী। কারণ, সঠিক সময়ে সরকার তাদের ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এ কারণে তার আজ ইউজিসির বিরুদ্ধে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে সাহস পায়। তিনি বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় আদালতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপকর্ম সঠিকভাবে উপস্থাপন না করায় বারবার তারা পার পেয়ে যাচ্ছে। আদালতে সঠিক তথ্যটি উপস্থাপন করতে না পারলে আদালত ন্যায়বিচার করবে কিসের ভিত্তিতে। এ মামলাগুলো পরিচালনার জন্য ইউজিসির আইন শাখাকে আরও গতিশীল করার তাগিদ দেন তিনি। ইউজিসির সাবেক সদস্য ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, গণবিজ্ঞপ্তিটি আক্ষরিক অর্থে সঠিক হলেও এটি কোন স্থায়ী সমাধান না। সরকার ইচ্ছা করলেই এক মাসের মধ্যে এই মামলাগুলোকে একটি পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু কে করবে এ কাজ? কারণ মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির অনেক কর্মকর্তা এ বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আদালতের ‘স্টে অর্ডার নিয়ে সনদ বাণিজ্য, অননুমোদিতভাবে ক্যাম্পাস পরিচালনা, অবৈধ ক্যাম্পাস খুলে সনদ বাণিজ্য, অনুমোদনহীন কোর্স ও কারিকুলামে পাঠ্যদান, মালিকানা দ্বন্দ্ব, ট্রাস্টি বোর্ডে বিভক্তি ইত্যাদি কারণে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে প্রায় অর্ধশতাধিক মামলা চলছে উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালতে। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা করে সার্টিফিকেট বিক্রি অভিযোগ রয়েছে এই ইউনিভার্সিটিগুলোর বিরুদ্ধে। এসব কারণে ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে সতর্ক হওয়া পরামর্শ দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিচ্ছে ইউজিসি। শিক্ষামন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, দেশে ৭৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অন্তত ১৫টির বিরুদ্ধে ‘শিক্ষা-বাণিজ্য’ করার অভিযোগ রয়েছে। উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির মওসুম শুরু হয়েছে। এই সময়টি কাজে লাগাতে পুরো ব্যস্ত সনদবিক্রিধারী এসব বিশ্ববিদ্যালয়। এ সময়টাকে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে সরকারও একটি দায়সারা বিজ্ঞাপন দিচ্ছে পত্রিকায়। এ বিষয়ে তারেক শামসুর রেহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে এই বিজ্ঞাপন তো আর স্থায়ী সমাধান না। সরকারকে স্থায়ী সমাধান অর্থাৎ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করার উদ্যোগ নিতে হবে। মন্ত্রণালয় তথ্যমতে, বর্তমানে ১৩ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১টি মামলা হাইকোর্টে রয়েছে। এর মধ্যে ২৮টি রিট পিটিশন। ৮টি মামলা নিম্ন আদালতে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অন্য আরেকটি সূত্রের দাবি, বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত মামলা ৪৫টি। এর মধ্যে প্রাইম ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, দারুল ইহসান, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম, বিজিসি ট্রাস্ট, নর্দার্ন, আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজিসহ অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মামলা চলছে। অন্যদিকে ইউজিসি কর্মকর্তা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদেরকে কাজ করতে দিচ্ছে না। মামলা সংত্রুান্ত বিষয় দ্রুত নিষ্পত্তি করতে বারবার তাগিদ দিলেও বরাবর নিষ্ক্রিয়তা দেখিয়েছে মন্ত্রণালয়। সুপারিশ করা ছাড়া এই মুহূর্তে  ইউজিসির আর কাজ নেই। এই অবস্থায় মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির রশি টানাটানিতে চরম অনিশ্চতায় পড়েছেন এসব ক্যাম্পাসে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা। মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) ড. আতফুল হাই শিবলী জানান, আদালতের স্টে অর্ডার নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালালেও নতুন করে শিক্ষার্থী ভর্তির ব্যাপারে কোন অর্ডার দেয়নি আদালত। আমাদের উদ্যোগের কারণে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ অথবা ভর্তি কার্যত্রুম বন্ধ রয়েছে বলেও দাবি তার।

লম্পট বন্ধুর পাল্লায় পড়ে সম্ভ্রম হারিয়ে কলেজছাত্রী দিশাহারা

মাত্র দুই মাসের পরিচয়। প্রেমিক মোহনকে বিশ্বাস করে তাকে মনপ্রাণ উজাড় করে ভালবেসেছিলেন কলেজছাত্রী (১৮)। স্বপ্ন দেখেছিলেন ঘর বাঁধার। দিন দিন তাদের প্রেম গাঢ় থেকে গাঢ় হয়। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক প্রেমিক মোহনের মনে ছিল অন্য চিন্তা। যে প্রেমিকাকে সে ভালবেসেছিল, বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেই প্রেমিকাকেই ফুঁসলিয়ে বন্ধু রিয়াজের বাসায় নিয়ে ধর্ষণ করেছে দু’জন মিলে। সম্ভ্রম হারিয়ে কলেজছাত্রী প্রেমিকা এখন দিশাহারা। বর্তমানে তার ঠাঁই হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। প্রতারক প্রেমিক মোহন ও তার লম্পট বন্ধু রিয়াজকে আসামি করে মিরপুর থানায় মামলা করেছেন কলেজছাত্রীর পিতা। মোহন ও রিয়াজ এখনও গ্রেপ্তার বা আটক হয়নি। তাদের খুঁজছে পুলিশ। ঘটনাটি ঘটেছে গত মঙ্গলবার মিরপুরের পশ্চিম মণিপুরিপাড়ায়। মিরপুর থানা পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নির্যাতনের শিকার কলেজছাত্রী রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী। পিতা গার্মেন্ট ব্যবসায়ী। পিতা-মাতা ও পরিবারের অন্য সদস্যের সঙ্গে তিনি থাকেন মোহাম্মদপুর পিসিকালচার হাউজিং এলাকায়। দুই মাস আগে কলেজে যাওয়ার পথে মোহনের সঙ্গে পরিচয় হয় মেয়েটির। ধীরে ধীরে দু’জনের ভাললাগা। প্রতারক প্রেমিক মোহন মোহাম্মদপুর এলাকায় একটি এমব্রয়ডারি হাউসে মাসিক বেতনে কাজ করে। থাকে পশ্চিম আগারগাঁও এলাকায়। প্রেমিকের কাছে নিজেকে সে পরিচয় দেয় বায়িং হাউসের বড় কর্মকর্তা হিসেবে। সরল বিশ্বাসে কলেজছাত্রী তাতেই মনপ্রাণ উজাড় করে দেয় মোহনকে। মঙ্গলবার প্রেমিক মোহন ও কলেজছাত্রী সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায়। সন্ধ্যায় তাদের সঙ্গে মিলিত হয় মোহনের বন্ধু রিয়াজ। মোহন রিয়াজের সঙ্গে মিলে পরিকল্পনা করে প্রেমিকাকে নির্জন কোন জায়গায় নিয়ে যাওয়ার। কলেজছাত্রীকে দু’জনে মিলে নিয়ে যায় পশ্চিম মণিপুরিপাড়ার ১/বি প্লটের ১২৪ নম্বর বাসায়। সেখানে রাত ১০টা পর্যন্ত মোহন ও রিয়াজ মিলে কলেজছাত্রীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। একপর্যায়ে তারা ওই ছাত্রীকে তার মোহাম্মদপুরের বাসার সামনে ফেলে রেখে যায়। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে গেলেও মেয়ে বাসায় না ফেরায় তাকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকেন মেয়ের পিতা ও মা। অসুস্থ মেয়ে বাসায় ফিরলে তাকে জিজ্ঞাসা করেন কোথায় সে ছিল, কেন বাসায় ফিরতে এত দেরি হলো। ঘটনা শুনে দিশাহারা ও হতভম্ব পিতা, মা মেয়েকে নিয়ে যান স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে ওসিসিতে তাকে ভর্তি করা হয় বৃহস্পতিবার ভোরে। মিরপুর থানা পুলিশ জানিয়েছে, বুধবার নির্যাতিত কলেজছাত্রীর পিতা বাদী হয়ে মোহন ও রিয়াজের নামে নারী ও নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করেছেন। তবে দু’জনের কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ আরও জানিয়েছে, মেয়েটিকে যে ফ্ল্যাটে ধর্ষণ করা হয়েছে ফ্ল্যাটটি রিয়াজের ফুফাতো ভাইয়ের। ফ্ল্যাটের মালিক দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসী। এ জন্য এ ফ্ল্যাটের দায়িত্ব পায় রিয়াজ। ফ্ল্যাটের চাবি ও ফ্ল্যাটের দেখাশোনা সে-ই করতো। মিরপুর থানার এসআই (উপপরিদর্শক) আতাউর রহমান মেডিকেল পরীক্ষার জন্য নির্যাতিত মেয়েকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। তিনি বলেন, মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়ায় তার কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভব হয়নি। তিনি নির্যাতিত ছাত্রীর আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে জেনেছেন, মোহন নামের এক যুবকের সঙ্গে ওই কলেজছাত্রীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তবে তা বেশিদিন হয়নি। প্রেমের ফাঁদে ফেলে মঙ্গলবার মেয়েটিকে পশ্চিম মণিপুরিপাড়ার ওই বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মোহন, রিয়াজ ও মেয়েটি ওই বাসায় অবস্থান করে। রাতে মেয়েটি ফিরতে চাইলে মোহন ও রিয়াজ নানা টালবাহানা করে সময়ক্ষেপণ করে। একপর্যায়ে দু’জন মিলে মেয়েটিকে শারীরিক নির্যাতন করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি)’র সমন্বয়ক ডা. বিলকিস বেগম মানবজমিনকে বলেন, নির্যাতিতা মেয়েটির প্রাথমিক শারীরিক পরীক্ষা করা হয়েছে। আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। এ জন্য তাকে কয়েক দিন হাসপাতালে থাকতে হবে। এ সময় তাকে আমরা পর্যবেক্ষণে রাখব। মামলা তদন্ত করছেন মিরপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাইনুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে আসামি মোহন ও রিয়াজ পরিকল্পিতভাবেই কলেজছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে। ভিকটিম আমাদের কাছে বলেছে মোহনের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তবে দু’জন আসামির কারও পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা আমরা এখনও খুঁজে পাইনি। এ জন্য তাদের গ্রেপ্তার করতে একটু সমস্যা হচ্ছে।

বস্তিতে বেড়ে ওঠা বিশ্বসেরা এক ফিল্ম স্টার by ইমরান আলী

ষাট-সত্তরের দশকে যারা হলিউডের মুভি দেখতেন তাদের কাছে সোফিয়া লরেন পরিচিতি এক নাম। ১৯৩৪ সালে রোমের একটি হাসপাতালের দাতব্য ওয়ার্ডে জন্মগ্রহণ করেন আন্তর্জাতিক এ ফিল্ম স্টার৷ পুরো নাম সোফিয়া ভিলানি সাইক্লোন। লরেনের মা রোমিলদাকে বিয়ে করতে আগেই অস্বীকার করেছিলেন বাবা রিকার্ডো৷ ১৯৩৪ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর জন্মের কিছুদিন পরই মা আর মেয়েকে আশ্রয় নিতে হয়েছিলো ইতালির জরাজীর্ণ এক বস্তিতে৷ কেউ কি অনুমান করতে পেরেছিলো একরকম অবিভাবকহীন এই মেয়েই এক সময় বিশ্বব্যাপি আলোচিত হবে । বস্তিতে আশ্রয় নেয়া চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটে মা এবং মেয়ের৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে রোমিলদা আর মেয়ে সোফিয়ার দারিদ্রতা যেন শেষ সীমায় অতিক্রম করেছিলো। আর তাই বেশিরভাগ সময়ই তাদেরকে অনাহারে থাকতে হত। ১৯৪৮ সালের দিকে যখন তাদের কিছুটা আর্থিক সচ্ছলতা আসে তখন এক সুন্দরী প্রতিযোগিতায় নাম লেখান ১৪ বছর বয়সি সোফিয়া৷ এক লাফে উঠে যান বিচারকদের রায়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে। ওই প্রতিযোগিতায় সোফিয়া দৃষ্টি কাড়েন ৩৭ বছর বয়সী চলচ্চিত্র পরিচালক কার্লো পন্টির৷ তিনিই সোফিয়াকে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ করে দেন৷ এর পর থেকে সাফল্যের পথে ঘুরতে থাকে সোফিয়ার ভাগ্যের চাকা। পরিচালক কার্লো পন্টিই বিয়ে করেন সোফিয়াকে। চলচিত্রে সবার নজর কেড়ে তার নাম হয়ে উঠে সোফিয়া লরেন। ১৯৫২ সালে লা ফ্যাভোরিটা এবং ১৯৫৩ সালে এইডা ছবিতে অভিনয় করে হলিউডে শক্ত ভাবে পা রাখেন এই ইটালীয়ান দেবী এই সোফিয়া লরেন। ১৯৫৭ সাল। অভিনয় করেন প্রথম আমেরিকান ছবি বয় ইন আ ডলফিন-এ ৷ সুপারস্টার ক্যারি গ্রান্টের সহশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন দ্য প্রাইড অ্যান্ড দ্য প্যাশন ও হাউসবোট ছবিতে৷ লা সাইওসায়ারা-তে অভিনয় করে ১৯৬০ সালে সেরা অভিনেত্রী হিসেবে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন সোফিয়া৷ অভিনয় করেন পল নিউম্যান, মার্লন ব্র্যান্ডো, গ্রেগরি পেক, চার্লটন হিউসটনদের মতো নামকরা সব অভিনেতাদের সঙ্গে। একাডেমি অফ মোশন পিকচার্স আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস থেকে বিশেষ সম্মাননা পাওয়া এই অভিনেত্রীর বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে ভারি হতে থাকে খ্যাতি আর পুরস্কার। শুধু অস্কারই জিতেননি একাধারে পাঁচটি গোল্ডেন গ্লোব এওয়ার্ডও কিন্তু তার দখলে। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য হলিউডি ছবির মধ্যে এল সিড, দ্য ফল অফ দ্য রোমান এম্পায়ার, অ্যারাবেস্ক, ম্যান অফ লা মাঞ্চা এবং দ্য ক্যাসান্ড্রা ক্রসিং অন্যতম। সংসার জীবনে দুই ছেলের জননী সোফিয়া লরেন হঠাৎ করে অভিনয় থামিয়ে দিলেও ৬০ বছর বয়সে প্রিট-আ-পোর্টার ছবি দিয়ে আবারো দর্শকদের মাতিয়ে তুলেন। ২০০৯ সালে তার অভিনীত শেষ ছবি নাইন এ কাজ করে দীর্ঘ বিরতিতে যান এই  বিশ্ব আলোচিত সোফিয়া লরেন। বস্তি থেকে উঠে আসা বিশ্বসেরা এই অভিনেত্রীর আজ জন্মদিন। সারা দুনিয়ায় অগণিত দর্শকের ভালোবাসায় শিক্ত হবেন এমনই প্রত্যাশা।

শিক্ষায় বৈষম্য by শামীমুল হক

সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি/আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে/আমি যেন সেই কাজ করি ভাল মনে। ছোটবেলায় জোরে চিৎকার করে অন্য শিশুদের মতো আমরা দু’ভাইবোনও পড়েছি এই কবিতা। মুখস্থ করেছি। শুধু তাই নয়, মা এসে বলতেন, ‘শুধু মুখস্থ করলেই হবে না, এই কবিতার মতো তোমরা নিজেরাও চলবে।’ চলতে পেরেছি কিনা সেদিকে যাচ্ছি না। তবে, আমার সন্তানদের শিশুবেলায় চিৎকার করে পড়তে শুনেছি-আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে/ ঢাক ঢোল ঝাঁঝর বাজে/ বাজতে বাজতে চললো ঢুলি/ ঢুলি গেল কমলাফুলি/ কমলাফুলির বিয়েটা/ সূর্যি মামার বিয়েটা। এই কবিতা পড়ে তারা কি শিখেছে তারাই জানে। শিক্ষকরা কেমন তৃপ্তি পেয়েছেন তারাই বলতে পারেন। ক্লাস থ্রিতে পড়ি। মনে পড়ে নূর মিয়া স্যার বেত নিয়ে ক্লাসে যেতেন। আগের দিনের দেয়া বাড়ির পড়া শিখে না এলে শুরু করতেন মার। নূর মিয়া স্যার ছিলেন খাটো গড়নের। মারতে গিয়ে তিনি লাফাতেন। সেই দৃশ্য এখনও যেন চোখ বুজলে দেখতে পাই। আজ নূর মিয়া স্যার নেই। উনার শেখানো পথে এগিয়ে চলছি। স্যার বলতেন, তোরা বড় হলে আমরা সুখী হবো। আমরা বড় হবো। গর্ব করে বলতে পারবো-ওই যে যাচ্ছে আমার ছাত্র যে কিনা আজ বড় অফিসার। আজ আইন করে শিক্ষকদের ক্লাসে বেত নেয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোন শিক্ষক কোন শিক্ষার্থীকে বেত দিলে তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। ফলে শিক্ষকরা আর ক্লাসে বেত নেন না। তাদের কথা- কি দরকার। বেহুদা ঝামেলায় জড়ানো। তার চেয়ে যেমনি আছি তেমনিই থাকি। এতে লাভ অনেক। আগে রাত-দিন পড়েও পাবলিক পরীক্ষায় দেখা গেছে পাস করেছে ৪১ শতাংশ। কিংবা ৩৬ শতাংশ। এখন নাকি লিখলেই পাস। সেই লেখা ভুল কিংবা শুদ্ধ তা দেখা যাবে না। ছাত্র লিখেছে তাকে নাম্বার দিতে হবে। এ অবস্থায় খাতা দেখতে গিয়ে পাসের হার ৯৭ শতাংশ। প্রশ্ন হলো- শিক্ষার হার বাড়ছে ঠিকই, শিক্ষার মান বাড়ছে কি? আগে পরীক্ষা নেয়া হতো বছরে ৪টি। আর পরীক্ষার কথা শুনলেই শিক্ষার্থীদের চাপ বেড়ে যেতো। পড়ালেখায় মনোযোগ বাড়িয়ে দিতো। ফলে যারা পাস করেছে তারা লেখাপড়া করেই পাস করেছে। আর এখন পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে দু’টি। মন্ত্রণালয় থেকে এমন আদেশ পাঠানো হয়েছে জেলা-উপজেলায়। সেখান থেকে স্কুলে স্কুলে। ফলে স্কুলগুলো দু’টোর বেশি পরীক্ষা নিতে পারছে না। কারণ পরীক্ষা নিলেই  উপজেলা শিক্ষা অফিস নড়েচড়ে বসছে। কোথাও কোথাও পরীক্ষা বন্ধ করে দিচ্ছে। এটা হলো গ্রামের চিত্র। কিন্তু শহরে? না, এর কোনটিই পালন করা হচ্ছে না। তারা মডেল টেস্টের নামে ঠিকই ৪টি পরীক্ষা নিচ্ছে। এবং শিক্ষার্থীদের পড়ার চাপে রাখছে। ফলে শহরের শিক্ষার্থীরা মানের দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের শিক্ষার্থীরা পড়ে থাকছে পেছনেই। শহরে আর গ্রামে সৃষ্টি হচ্ছে বিরাট ব্যবধান। এ ব্যাপারে শহরের এক নামী স্কুলের প্রধান শিক্ষকের মন্তব্য হলো- মন্ত্রণালয় কি এমনিতেই আমার স্কুলকে সেরা দশে পৌঁছে দেবে? তারা কি এমনিতেই শিক্ষার্থীদের জিপিএ-৫ দিয়ে দেবে? না। তাহলে আমি কেন আমার ছাত্রছাত্রীদের ভালর জন্য ব্যবস্থা নেবো না? ১০টি পরীক্ষা নিতে হলে প্রয়োজনে তা-ই নেবো। এখানে মন্ত্রণালয় উপদেশ দেবে কোন যুক্তিতে? অন্যদিকে গ্রামে অবস্থিত এক মাধ্যমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য- কি করবো? দু’টি পরীক্ষার ব্যবস্থা মানে হলো শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় অমনোযোগী করে  তোলা। আমরা এর বেশি পরীক্ষা নিতে পারছি না। আগে ক্লাস পরীক্ষা নিতাম। এখন তা-ও পারছি না। ফলে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হচ্ছে। পাবলিক পরীক্ষায় দেখা যায় জিপিএ-৫ কিংবা জিপিএ ৪-এর সংখ্যা একেবারে কম। তার মানে হলো- পড়ালেখার মান বাড়ছে না। পাসের হার বাড়ছে ঠিকই। এমন পাস করে ছাত্রছাত্রীরা বেশি দূর এগোতে পারবে না। অন্যদিকে কোচিং নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও শহরে দিব্যি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে কোচিং ব্যবসা চলছে সমানে। নতুন নতুন পদ্ধতিতে কোচিং সেন্টারে হচ্ছে লেখাপড়া। অভিভাবকরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন কোচিং সেন্টারগুলোতে। বিপরীতে গ্রামের স্কুলের শিক্ষার্থীরা প্রাইভেটও পড়তে পারছে না নিজের স্কুলের শিক্ষকদের কাছে। মন্ত্রণালয়ের বাধার কারণে শিক্ষকরা ভয়ে কাউকে পড়াতে চাইছেন না। এ অবস্থায় শহর আর গ্রামে শিক্ষার বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। শিগগিরই এদিকে নজর দিতে হবে। নইলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ।