Saturday, November 10, 2018

গোয়েন্দাজাল-৮: সিরিয়া সরকারের ভিতরে মোসাদ এজেন্ট! by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

ইলি কোহেন। সিরিয়া সরকারের উচ্চতম স্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। এছাড়া তিনি ছিলেন তখনকার সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সম্ভবত এ জন্যই সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য তাকে বিবেচনা করা হচ্ছিল। গোলান উপত্যকায় সিরিয়ার প্রতিরক্ষা, সিরিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর লড়াই এবং সিরিয়ার সামরিক অস্ত্রের বিষয়ে বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ একটি পরিকল্পনা দিয়েছিলেন তিনি। একবার সেনাবাহিনীকে ছায়া দেয়ার জন্য সিরিয়ার সুরক্ষিত স্থানগুলোতে বৃক্ষরোপণের নির্দেশ দেন তিনি। লাগানো হলো গাছ। তা বড়ো হলো।
কিন্তু এতে সুবিধা হলো ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনীরই। এতে তারা ওই গাছগুলো দেখে সহজেই তাদের টার্গেট ঠিক করতে পারলো। আসলে ইলি কোহেন ছিলেন গোপনে ইসরাইলের গুপ্তচর। তিনি সিরিয়ার সেনাদের ছায়া দেয়ার জন্য গাছ রোপনের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তার নির্দেশমতোই কাজ হয়েছে। ফলে ইসরাইলের সেনারা খুব সহজেই সিরিয়ার সেনাদের অবস্থান চিহ্নিত করতে পেরেছে। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি সিরিয়া সরকারের একেবারে কাছে ঘেকে দেশের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি করেছেন। এ সময়ে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল রাজনৈতিক, সামরিক উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে। তাকে বানানো হয়েছিল সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টা। সিরিয়ার গুপ্তচরবৃত্তি বিরোধী কর্তৃপক্ষ তার সেই গোপন অধ্যায় জেনে যায়। ফলে তাকে আটক করা হয়। সামরিক আইনে তাকে অভিযুক্ত করা হয়। তাকে শাস্তি হিসেবে দেয়া হলো মৃত্যুদন্ড। ১৯৬৫ সালে সেই মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। কিন্তু তাকে গ্রেপ্তারের আগে তিনি যেসব গোয়েন্দা তথ্য ইসরাইলের কাছে পাচার করেছেন তাতে ৬ দিনের যুদ্ধে ইসরাইল জয়ী হয়।
১৯৭৮ সালের ১লা এপ্রিল। দামেস্ক ও জর্ডানের মধ্যবর্তী প্রধান টেলিফোনের লাইনে স্পর্শকাতর এক ফাঁদ পেতে রাখলো ইসরাইল। তাতে সিরিয়ার সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কমপক্ষে ১২ জন নিহত হন।
নিহত হন জেনারেল আনাতোলি কুনতসেভিচ। সিরিয়াকে নার্ভ গ্যাস তৈরিতে তিনি সহায়তা করে আসছিলেন বলে সন্দেহ করা হয়। বলা হয়, ১৯৯০ এর দশক থেকেই তিনি এ কাজে যুক্ত। এর বিনিময়ে সিরিয়া সরকারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পেয়েছেন তিনি। ২০০২ সালের ৩রা এপ্রিল তিনি বিমানে করে ভ্রমণ করার সময় রহস্যজনকভাবে মারা যান। অভিযোগ আছে, তাকে হত্যার জন্য দায়ী মোসাদ।
২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে দামেস্কে স্বয়ংক্রিয় এক ফাঁদে পড়ে হামাসের সামরিক শাখার সিনিয়র সদস্য ইজজ এল দিন শেইখ খলিল নিহত হন।
সিরিয়ার পারমাণবিক কর্মকা-ের প্রধান ছিলেন কমান্ডার মুহাম্মদ সুলাইমানের অধীনে কাজ করেন এমন সিরিয়ার কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি করে মোসাদ। এর ফল হিসেবে তারা দেখতে পায় সিরিয়ায় তৈরি করা হচ্ছে পারমাণবিক চুল্লি। কিন্তু সিরিয়াকে তো এভাবে বাড়তে দেয়া যায় না। তাই ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে ইসরাইলের বিমান বাহিনী ওই পারমাণবিক চুল্লি ধ্বংস করে দেয়। এর এক বছর পরে হত্যা করা হয় মুহাম্মদ সুলাইমানকে।  তিনি ছিলেন সিরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির প্রধান। তাকে ২০০৮ সালে হত্যা করা হয়। তখন তিনি তারতাস সমুদ্র সৈকতে পায়চারী করছিলেন। একটি বোট থেকে উড়ন্ত গুলিতে তিনি সেখানে নিহত হন।
২০০৭ সালের ২৫ শে জুলাই আল সাফির রাসায়নিক অস্ত্রের মজুদাগার বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ইরানের ১০ জন প্রকৌশলী ও ১৫ জন সিরিয়ান কর্মকর্তা নিহত হন। এ জন্য সিরিয়ার গোয়েন্দারা তদন্ত করে দায় চাপায় মোসাদের ঘাড়ে।
দামেস্কে ১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে বোমা হামলা হয়। এর জন্য দায়ী করা হয় হিজবুল্লাহর কিছু নেতাকে। তার মধ্যে অন্যতম ইমাদ মুগনিয়ে অন্যতম। কিন্তু তাকে ২০০৮ সালে দামেস্কে হত্যা করা হয়।
২০১০ সালের আগস্টের শুরুতে রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার উপ প্রধান ইউরি ইভানভের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় তুরস্কের সমুদ্র সৈকতে। অভিযোগ করা হয়, তাকে হত্যায় মোসাদ জড়িত। সিরিয়ার লাতাকিয়ার কাছ থেকে তিনি গুম হয়ে গিয়েছিলেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইতে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে হত্যা করা হয় হামাসের সামরিক সিনিয়র কমান্ডার মাহমুদ আল মাহবুবকে। এ হত্যায়ও মোসাদ জড়িত বলে সন্দেহ করা হয়। এ নিয়ে তদন্ত হয়। সিসিটিভি সহ অন্যন্য তথ্য প্রমাণ যাচাই করে দেখা যায়, এই হত্যা মিশনে ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করে কমপক্ষে ২৬ জন গোয়েন্দা এজেন্ট সেখানে প্রবেশ করেছিল। এসব এজেন্ট মাহবুবের হোটেল কক্ষে প্রবেশ করে তাকে বৈদ্যুতিক শক দেয়। জিজ্ঞাসাবাদ করে। তার দরজা ভিতর দিক থেকে বন্ধ করা ছিল। যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাত পুলিশ ও হামাস ঘোষণা দিয়েছে যে, এই হত্যার জন্য দায়ী ইসরাইল, তবে এ হত্যাকা-ে মোসাদ সরাসরি জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় নি। যেসব এজেন্ট ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করে প্রবেশ করেছিল তার মধ্যে ৬ জনেরই ছিল বৃটিশ পাসপোর্ট। ইসরাইলে অবস্থান করছিল তারা। তাদের জাতীয়তার পরিচয় ব্যবহার করে পাসপোর্ট ক্লোন করা হয়। পাওয়া যায় পাঁচটি আইরিশ পাসপোর্ট। আরো ছিল অস্ট্রেলিয়ার পাসপোর্ট, জার্মান পাসপোর্ট, ফরাসি পাসপোর্ট। সংযুক্ত আরব আমিরাতের পুলিশ বলেছে, হামলাকারীদের কয়েকজনের আঙ্গুলের ছাপ ও ডিএনএন প্রমাণ হিসেবে পেয়েছেন তারা। এরপর দুবাইয়ের তখনকার পুলিশ প্রধান বলেন, আমি নিশ্চিত এ কাজ করেছে মোসাদ। এই হত্যাকান্ডের জন্য আমি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মোসাদ প্রধানকে গ্রেপ্তারের অনুরোধ পাঠিয়েছি দুবাইয়ের প্রসিকিউটরদের কাছে।

আমি আশাবাদী ২০১৪ সালের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি হবে না -ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ by মরিয়ম চম্পা

আগামী নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক হবে এমন চিত্র এখনো দেখা যাচ্ছে না। তবে এটা নির্ভর করছে সরকারের সদিচ্ছার ওপর। এমনটাই মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং বিশিষ্ট  অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এমনটাই মনে করেন। তিনি বলেছেন, সরকার যদি বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে মিটিং-মিছিল ও জনসভা করতে না দেয়, ছাত্র সংগঠনগুলোকে বাধা দেয় এবং দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি চলতে থাকলে গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, ১৯৯১ ও ’৭০ সালের নির্বাচনী আবহ ও পরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি। সে জন্য আমি একটু শঙ্কিত। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে যথেষ্ট রাজনীতিকরণ করা হয়েছে।
সম্প্রতি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় কার্যালয়ে মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক সংকটসহ নানা ইস্যুতে খোলামেলা আলোচনা করেন।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এ অবস্থার পরও আমি মনে করি সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকে তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। তবে আমি আশাবাদী ২০১৪ সালের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি হবে না।    
জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের কারণে আগামী নির্বাচনে একটি চাপ সৃষ্টি করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা দেখেছি বিএনপিকে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী চাপের মধ্যে রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় আমি মনে করি ঐক্যফ্রন্ট একটি ভালো উদ্যোগ। এর ফলে চাপ সৃষ্টি করবে যে একটি ভালো নির্বাচন হোক। সবার যদি অভিন্ন লক্ষ্য থাকে তাহলে সরকারও কিন্তু চাপের মুখে একটি ভালো নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে।  
স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে সাধারণ জনগণের ভোটাধিকার ফিরে পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাষ্ট্রের জনগণই সকল ক্ষমতার অধিকারী। কাজেই প্রত্যেককে ভোটাধিকার দেয়া রাষ্ট্রের একটি পবিত্র দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। সবাই নিজের ইচ্ছামতো ভোট  দেবেন। কেউ কোনো বাধার সৃষ্টি করবে না। গণতন্ত্রের চর্চাটা কিন্তু নমিনেশন থেকে শুরু করে ভোট প্রদান পর্যন্ত থাকতে হবে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে মনে হয়েছিল উৎসবের একটি আমেজ। কেউ ভয় পায় নি। খোলা মনে সবাই ভোট দিয়েছে। এখন ভোট মানেই ভয়ের একটি ব্যাপার। দ্বিধা কাজ করে ভোট দিতে যাবো কি যাবো না? ১৯৭০ সালে সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেয়ার ফলেই আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। ভোটাধিকার দেয়ার ফলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সবাই অবাধ ও স্বাধীনভাবে ভোট দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে।
অর্থনৈতিক অগ্রগতি প্রসঙ্গে প্রখ্যাত এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বাংলাদেশের যে উন্নয়নগুলো আমরা ধারাবাহিকভাবে দেখছি সেখানে প্রবৃদ্ধি ৬-এর বৃত্ত থেকে ৭-এ চলে এসেছে। রেমিটেন্স ও এক্সপোর্টসহ অন্যান্য বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে আমরা মোটামুটি ভালো একটি অর্জন করেছি। সূচকের পরিমাণে আমরা ভালো একটি অবস্থানে আছি। কিন্তু এর পেছনের প্রকৃত উন্নয়নটা সর্বব্যাপী হয়েছে কি-না সেক্ষেত্রে আমাদের যথেষ্ট দুর্বলতা রয়ে গেছে। উন্নয়নের প্রকৃত সুফল কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষের মধ্যে পৌঁছে দিতে পারি নি।
বেকারত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষার যে মান এবং ধরন এটা যদি চাহিদার সঙ্গে না মেলে তাহলে তো বেকারত্ব সৃষ্টি হবেই। কাজেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো বাস্তবমুখী করতে হবে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ইন্টারেকশনটা খুবই কম। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে তাদের মধ্যে একটি ইন্টারেকশন থাকে যে, তারা কি ধরনের শিক্ষা চায়। কি ধরনের লোক চায়। সে অনুযায়ী তাদের প্রশিক্ষিত করা হয়। এখন সময় এসেছে আমাদের দেশেও এটা করার। একই সঙ্গে দেশের শিক্ষার মানকে আরো নিশ্চিত করাটাও খুব জরুরি।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র এবং উন্নয়ন দুটি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এটাকে আলাদা করে দেখা যাবে না। অর্থাৎ উন্নয়ন এবং গণতন্ত্র হচ্ছে মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। অনেকেই অনেক সময় আর্গুমেন্ট করে বলে যে আগে উন্নয়ন হোক তার পরে গণতন্ত্র। এটা মোটেও ঠিক নয়। অমর্ত্য সেন তার বইতে লিখেছেন গণতন্ত্র ছেড়ে কেনো উন্নয়ন করবো? গণতন্ত্রের সঙ্গে উন্নয়নের একটি ফ্রেমওয়ার্ক থাকতে হবে। আর গণতন্ত্রের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট বিষয় হচ্ছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। যেটা আমাদের এখানে নেই। এক্ষেত্রে পদে পদে দুর্নীতি হয়। দীর্ঘসূত্রতা থাকে। টেকসই উন্নয়ন হয় না। টেকসই উন্নয়নের জন্য চাই ধারাবাহিকতা।
গণতন্ত্রকে বাদ দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। একটি সরকার উন্নয়ন করবে অন্যজন এসে বিল্ডার্প করবে। কিন্তু একনায়কতন্ত্র সরকার ব্যবস্থায় একজন উন্নয়ন করবে আরেক জন এসে বলবে- এটা ঠিক হয় নি। কাজেই দুটোই থাকতে হবে। শুধু উন্নয়ন থাকলে হবে না। সঙ্গে গণতন্ত্র থাকতে হবে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সম্প্রচার নীতিমালা আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেকোনো ইস্যুতে সামাজিকভাবে তথ্যের আদান-প্রদান ও বাকস্বাধীনতার অধিকার অবাধ থাকতে হবে। এটা না থাকলে সামাজিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। তবে দেশ এবং রাষ্ট্রের স্বার্থে কিছু স্পর্শকাতর বিষয় প্রকাশ করা যাবে না। সম্প্রতি নতুন আইনের দোহাই দিয়ে বলা হয়েছে কোনো কিছু করা যাবে না, বলা যাবে না। এটা কিন্তু ঠিক না। এই আইনের মাধ্যমে কিছু লোককে এমন ক্ষমতা দেয়া হয়েছে- এতে করে ক্ষমতার অপব্যবহার হতে পারে। যেকোনো পাওয়ার বা আইনের যেন অপব্যবহার না করা হয় সে জন্য ব্যালেন্স থাকতে হবে। তথ্য অধিকার আইন যদি অবাধ না থাকে সেখানে উন্নয়ন কিন্তু একপেশে হয়ে যায়। তথ্য অধিকার আইনের মূল উদ্দেশ্য থাকবে মানুষের স্বাভাবিক মূল্যবোধ বজায় রাখা। এবং রাষ্ট্র পরিপন্থি নয় ও জনস্বার্থ ব্যাহত করে এসব বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। অর্থাৎ সব জিনিস যখন সূর্য্যের আলোতে চলে আসবে তখন লোকজন সেসব বিষয়ে জানবে। প্রকাশ পাবে। এজন্য বলা হয় যে, ‘সান সাইন ইজ দ্য বেস্ট অ্যান্টিসেপ্টিক’। কারণ অন্ধকারে থাকলে গুজব হবে। অপপ্রচার হবে।
ক্ষমতা হস্তান্তরের শান্তিপূর্ণ উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, এখনকার রাজনীতি অনেকটা ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। রাজনীতিবিদদের একে অন্যের প্রতি এক ধরনের হিংসাত্মক মনোভাব থাকে। রাজনীতিবিদরা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি করে বলেই আজকে এই হাল। এখানে এত বেশি ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয় যেটা উন্নত বিশ্বে দেখা যায় না। তিনি বলেন, আমার মনে হয় ক্ষমতা হস্তান্তর সমঝোতামূলক হওয়া উচিত। এবং রাজনীতিতে আরো ভালো যোগ্যতাসম্পন্ন লোককে আসতে হবে। আমাদের দেশে রাজনীতি এবং ব্যবসা এই দুটোকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছি আমরা। এ থেকে নিস্তার পেতে হলে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভালো লোক ও শিক্ষিত লোক আসতে হবে। এই ধরনের লোকেরা আসলেই রাজনীতি তার স্বরূপ ফিরে পাবে।
কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের বিষয়ে ড. সালেহউদ্দিন বলেন, দুটি আন্দোলনই ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও যুক্তিসঙ্গত আন্দোলন। নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা থেকে এই আন্দোলন দুটো হয়েছে। আমি মনে করি তরুণদের মধ্যে সুশাসন ও ন্যায়ের বিষয়টি এখানে প্রজ্বলিত হয়েছে। ওরাই আমাদের পথ দেখিয়েছে। এবং এটাই সার্বিকভাবে দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের জন্য খুবই জরুরি। কারণ কোটার ফলে ভালো ও মেধাসম্পন্ন লোক আসতে পারে না। এক্ষেত্রে প্রথমত মেধার ওপর জোর দেয়া এবং বিশেষ শ্রেণির জন্য কিছু কোটা বহাল রাখতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা ঠিক আছে। কিন্তু এটাকে নাতি-নাতনি পর্যন্ত টেনে নেয়াটা মনে হয় যুক্তিসঙ্গত নয়।
গায়েবি মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ফৌজদারি আইনে বলা হয়েছে- একজন ব্যক্তি যদি সাধারণ কোনো অন্যায় করে তাহলে তাকে সময় দিতে হবে। সিরিয়াস অপরাধ হলে ওয়ারেন্ট দেবে। কিন্তু এখন গায়েবি মামলার নামে হঠাৎ করে কাউকে চেনা নাই জানা নাই তার নামে মামলা দেয়া হচ্ছে। মৃত ব্যক্তি, প্রবাসী এমনকি বজ্রপাতেও মামলা হচ্ছে। এগুলো বেশিরভাগই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। এগুলো সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা উচিত।  
সিভিল সোসাইটি সম্পর্কে তিনি বলেন, সিভিল সোসাইটির কাজ হলো সর্বজন স্বীকৃত কতগুলো অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারকে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করা। এখন সিভিল সোসাইটিগুলোর কিছু অংশ নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির বিষয়ে তৎপর। এভাবেই সিভিল সোসাইটি কিন্তু দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। সমস্যা হচ্ছে এখন সরকার সিভিল সোসাইটির ওপর সন্দেহ পোষণ করে। তারা সিভিল সোসাইটিকে দেখতে পারে না। সরকার ভাবে তারা আমাদের বিপক্ষে কাজ করছে। অথচ সিভিল সোসাইটি হচ্ছে সমাজের থার্ড আই বা তৃতীয় নয়ন। এই বিষয়টি সরকার তথা রাজনীতিবিদরা যদি উপলব্ধি করতে পারে তাহলেই তারা সফল। স্বাধীনতার ৪৭ বছরে সিভিল সোসাইটি অনেক ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে। যেটা গর্ব করার মতো। সিভিল সোসাইটির কাজ এবং গ্রহণযোগ্যতা কিন্তু এখন কমে আসছে। অথচ তাদের অনেক কিছুই করার আছে।

খুব শিগগিরই দেখা যাবে দুনিয়া অচল -মানবজমিনকে প্রফেসর ইউনূস

এখনই পথরেখা ঠিক না করলে ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে বিপর্যয় থেকে বাঁচানো যাবে না বলে সতর্ক করেছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পৃথিবী নামের এই গ্রহকে একটি মহাকাশ যানের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, এই যানের যাত্রীরা শুধু যাত্রী  হয়ে থাকলে ভবিষ্যৎ গন্তব্যহীন। পৃথিবীকে সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়িয়ে গন্তব্যে নিতে হলে শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের চালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। বর্তমান বিশ্ব যে পথে এগোচ্ছে তাতে খুব শিগগিরই বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে। জার্মানির ওল্ফসবার্গে সোস্যাল বিজনেস একাডেমিয়া কনফারেন্সের ফাঁকে মানবজমিন- এর সঙ্গে আলাপে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, বিশ্বে সম্পদের কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা একটি টাইমবোমার মতো অবস্থার দিকে যাচ্ছে। এটি যে কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয়ে পৃথিবীর জন্য সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। একইভাবে পরিবেশ দূষণও হতে পারে ধ্বংসের আরেক কারণ।
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন,  আমি বলছি যে পৃথিবী একটা গ্রহ, যেটা একটা মহাকাশ যাত্রার স্পেসশিপ এর মতো। আমরা কি এটার যাত্রী, না আমরা এটার ক্রু? আমরা যদি যাত্রী হিসেবে বিবেচনা করি এটার কোনো চালক নেই, তাহলে এটা আমাদের ভয়ঙ্কর সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যাবে। এটা নির্দিষ্ট কোনো স্থানে যাচ্ছে না। তো আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে যে আমরাই এটার ক্রু, আমরাই এটা পরিচালনা করি। আমরা যার যার পেশায় আছি আমাদের লক্ষ্য হবে এটাকে নির্দিষ্ট দিকে নিয়ে যাওয়া। আমি মনে করি আমরা যারা শিক্ষক, শিক্ষা প্রসারে নিয়োজিত আছি আমি তাদের বলছি পাইলট। তারা আসলে অনেকদূর ভবিষ্যৎ দেখতে পান, তারা পথ নিদের্শক। যে পথে আমরা চলছি বর্তমানে আমাদের পাইলটের নির্দেশে এটা একটা বিপর্যয়ের পথ, আমরা একটা ভয়াবহ পথের দিকে এগোচ্ছি। কারণ এটা যে দিকেই তাকাই মনে হয় এই শতাব্দী পার হবার মতো সময় হাতে নাই। তাই আমাদের গবেষক, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা যারা করেন, তাদের ঠিক করতে হবে আমাদের গন্তব্য কোন দিকে হবে। সেদিক থেকেই আমি বলছি, আমাদের নতুন গতিপথ ঠিক করতে হবে।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এই যে প্লাস্টিক, এমন অবস্থার দিকে চলে যাচ্ছে যে, শুধু প্লাস্টিকই আমাদের সর্বনাশ করে দিতে পারে। সার্বিক পরিবেশকে ধরলে দেখা যাবে এমন একটা অবস্থানে চলে যাচ্ছি তা চললে  বড় জোর ২০ বছর বা ৩০ বছর টেনেটুনে ৩২ থকে ৩৫ বছর পার করতে পারবো।  কিন্তু এ শতাব্দী পার করার মতো শক্তি নাই। আবহাওয়ার কারণেই আমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে। পৃথিবী আর বাসযোগ্য থাকবে না আমাদের জন্য।
তিনি বলেন, সমস্ত সম্পদ কেন্দ্রীভূতকরণ হচ্ছে। এটা এমন পর্যায়ে চলে গেছে এটা আর সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারবে না, নিজেই এটা ভেঙে পড়বে, এটা অনেকটা টাইম বোমের মতো। টাইম বোমের মতো বিস্ফোরণে চলে যাবে। খুব শিগগিরই দেখা যাচ্ছে আমরা অচল হয়ে যাচ্ছি, দুনিয়া অচল হয়ে পড়ছে। আমরা যন্ত্রের হাতে বন্দি হয়ে পড়ছি। এগুলো একেকটাই একটা সর্বনাশের পথ। তো আমাদের এগুলো থেকে পরিত্রাণ পেতে হবে।
বিখ্যাত গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ভক্সওয়াগনের সদর দপ্তরে মঙ্গলবার শুরু হওয়া দুইদিনের সম্মেলনের আয়োজক ইউনূস সেন্টার ও গ্রামীণ ক্রিয়েটিভ ল্যাব। সামাজিক ব্যবসায় আন্তঃবিভাগীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণাকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে এ কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১২টি দেশ থেকে ইউনূস সোস্যাল বিজনেস সেন্টারের প্রতিনিধি হিসেবে প্রায় ১৫০ জন শিক্ষাবিদ ও গবেষক এতে অংশ নিচ্ছেন। কনফারেন্সে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, সামাজিক ব্যবসায় অর্থায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে মোট ১৯টি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন হবে। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস কনফারেন্সের উদ্বোধন করেন।
সম্মেলনে গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান ইউনিভার্সিটির প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ক্যাম ডোনাল্ডসন, ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট ফর সোস্যাল বিজনেসের পরিচালক প্রফেসর আন্দ্রে গ্রোভ, তাইওয়ানের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ইউনূস সোস্যাল বিজনেস সেন্টারের পরিচালক ড. মার্ক শেন, ফ্রান্সের সোস্যাল বিজনেস চেয়ারের পরিচালক প্রফেসর বেনেডিক্ট ফাব্রি তাভিগনট, অস্ট্রেলিয়ার লা ত্রোব বিজনেস স্কুলের ইউনূস সোস্যাল বিজনেস চেয়ারের পরিচালক প্রফেসর, ড. গিলিয়ান সুলিভান মর্ট, জার্মান ইউনিভার্সিটি অব উপের্টালের প্রফেসর ড. ক্রিস্টিন ভকম্যান, মালয়েশিয়ার সেন্টার অব সোস্যাল ইনোভেশনের প্রধান ড. শাহরিনা মুহাম্মদ নরদিন, মেক্সিকোর অটোনোমাস ইউনিভার্সিটি অব বাজা ক্যালিফোর্নিয়া প্রফেসর ড. আলেজান্দ্রো মুঙ্গারেসহ আরো অনেকে বক্তব্য রাখেন। যেসব দেশে সদ্য ইউনূস সোস্যাল বিজনেস সেন্টার চালু হয়েছে, তাদের প্রতিনিধিরাও কনফারেন্সে অংশ নিচ্ছেন। এছাড়া, দু’দিনব্যাপী কনফারেন্সে সাংহাইয়ের জিয়াও তং ইউনিভার্সিটির প্রফেসর প্রদীপ কুমার রায় ‘সোস্যাল বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ফর বেল্ট অ্যান্ড রোড কান্ট্রিস’ বিষয়ের উপর বিশেষ বক্তৃতা করেন। সামাজিক ব্যবসায় প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার বিষয়ে পরিপূরক বক্তৃতা ছাড়াও কনফারেন্সে গ্রুপভিত্তিক আলোচনা করেন অংশগ্রহণকারীরা।
সোস্যাল বিজনেস অ্যাকাডেমিয়া কনফারেন্সের আগে ২৯শে জুন ভারতে ‘সোস্যাল বিজনেস ডে’ উপলক্ষে এ বিষয়ে আরেকটি কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। তাতে যোগ দেন বিভিন্ন দেশের ইউনূস সেন্টার ও সোস্যাল বিজনেস সেন্টারের প্রধান ও শীর্ষ কর্মকর্তারা।  এবারের কনফারেন্স উপলক্ষে সামাজিক ব্যবসা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপর গবেষণা প্রতিবেদন চাওয়া হয়। সোস্যাল বিজনেস অ্যাকাডেমিয়া কনফারেন্সের আয়োজকদের কাছে মোট ৫২টি প্রতিবেদন জমা পড়ে। এর থেকে ৩৭টি কনফারেন্সের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়।
সোস্যাল বিজনেস অ্যাকাডেমিয়া কনফারেন্স-২০১৮ এর আয়োজক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে বিশ্বের ২৮টি দেশে মোট ৬৪টি ইউনূস সোস্যাল বিজনেস সেন্টার রয়েছে। এছাড়া, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আরো ৪৫টি ইউনিভার্সিটি ইউনূস সোস্যাল বিজনেস সেন্টার চালু করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

লিবারেল ও তরুণ আমেরিকানদের মধ্যে ইসরাইলপ্রীতি কমছে

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইলের বিচারমন্ত্রী আয়েলেত শাকেদ যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক দলের সমর্থকদের মধ্যে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন কমার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ইহুদী আমেরিকানদের এক সভায় তিনি বলেন, ইসরাইলের জন্য বিষয়টি কৌশলগত ইস্যু। তার ভাষ্য, ‘দুই সপ্তাহ আগে একটি জরিপের ফল দেখে আমি দুই রাত ঘুমাতে পারি নি।’
ইসরাইল ইস্যুতে আমেরিকায় চালানো সাম্প্রতিকতম একটি জরিপের ফল দেখে শাকেদ নিশ্চয়ই আঁতকে উঠবেন। জরিপের ফলাফল থেকে ইঙ্গিত মিলছে যে, ইসরাইল ইস্যুতে জনসমর্থন হ্রাসের প্রবণতা শ্লথ হওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। ডেমোক্রেট দলীয় সমর্থক, তরুণ ভোটার, আফ্রিকান আমেরিকান ও হিস্প্যানিক আমেরিকানদের মধ্যে ইসরাইলের সুনাম ক্রমেই ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
ইকোনমিস্ট ও ইউগভের করা জরিপে দেখা গেছে, ডেমোক্রেট দলীয় ভোটারদের মধ্যে মাত্র ২৫ শতাংশ ইসরাইলকে আমেরিকার ‘মিত্র’ হিসেবে বিবেচনা করে। তবে রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে ৫৭ শতাংশ ইসরাইলকে মিত্র মনে করে।
ইসরাইলি পত্রিকা হারেৎসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই জরিপ থেকে দেখা যাচ্ছে ইসরাইলের প্রতি মার্কিনীদের সমর্থনের তারতম্য ঘটে লিঙ্গ, বয়স, অর্থনৈতিক অবস্থা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে। বয়স্ক, সচ্ছল ও রক্ষণশীল শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের মধ্যে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন সবচেয়ে বেশি। তবে তরুণ, উদারমনা (লিবারেল), সংখ্যালঘু ও নারীদের মধ্যে এই সমর্থন সবচেয়ে কম।
কিন্তু এ ধরণের জরিপের ফল কি ইসরাইল সমর্থকদের মধ্যে সত্যিই দুশ্চিন্তা জন্ম দেয়? +৯৭২ ম্যাগাজিনে কর্মরত ইসরাইলি সাংবাদিক ইদো কনরাড বলেন, ‘ইসরাইলি ইহুদী জনগোষ্ঠীর মধ্যে একদল নিশ্চয়ই আছেন যারা দেশের ক্রমহ্রাসমান সুনাম নিয়ে উদ্বিগ্ন।
কিন্তু ইসরাইলি ইহুদীদের মধ্যে বেশিরভাগের মধ্যেই হয়তো রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনীহা চলে এসেছে। নয়তো তারা নেতানিয়াহু সরকারের উগ্র-জাতীয়তাবাদের সমর্থক হয়ে উঠছেন।’
এ বছরের জানুয়ারিতে পিউ রিসার্চ সেন্টার জানায়, ইসরাইল ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান সমর্থকদের মতের ব্যবধান ১৯৭৮ সালের পর এত চওড়া কখনই হয়নি। এই পরিবর্তনশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে রাজনৈতিক মাঠেও।
যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বের লড়াইয়ে বার্নি স্যান্ডার্সের চেষ্টা এখানে প্রণিধানযোগ্য। এছাড়া ডেভিড ফ্রায়েডম্যানকে ইসরাইলে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগও আরেক ধরণের উদাহরণ।
বিভিন্ন ধরণের ফ্যাক্টর এখানে কাজ করেছে। ফিলিস্তিন নিয়ে বছরের পর বছর ধরে আমেরিকার তৃণমূল পর্যায়ে কাজ হয়েছে। ২০১২ সালে প্রকাশ্যে বারাক ওবামার বিরুদ্ধে রিপাবলিকান প্রার্থী মিট রমনিকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর সমর্থন প্রদানকে ভালো চোখে দেখেনি ডেমোক্রেটরা। এছাড়া বারাক ওবামার ইরান নিয়ে আলোচনা ভ-ুল করার ইসরাইলি প্রচেষ্টাও অনেককে বিরক্ত করেছে। এছাড়াও, যেমনটি ব্রুকিংস ইন্সটিটিউটের গবেষক ও সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শ্যাপিরো জানুয়ারিতে লিখেছেন, অনেক আমেরিকান এখন ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা শুরু করেছেন।
নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক ফিলিস্তিনি থিংক-ট্যাংক আল-শাবাকার ইউএস পলিসি ফেলো জেনা আঘা বলেন, ‘সাম্প্রতিক মাস ও বছরগুলোতে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন দলীয় ইস্যু হয়ে উঠেছে। অনেক লিবারেল গাজায় ইসরাইলের কর্মকা- নিয়ে শুধু প্রশ্নই তুলছেন না। ইসরাইলের প্রতি প্রশ্নহীন সমর্থনের যৌক্তিকতাকেও কাঠগড়ায় তুলছেন।’
এছাড়াও বিশ্বজুড়ে উগ্রদক্ষিণপন্থী সব দল ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে ইসরাইল। যা অনেক উদারনৈতিক মানুষ ভালো চোখে নেন নি। যেমন, বৃটিশ ইসলামোফোবিক প্রচারক টমি রবিনসনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে আমেরিকা-ভিত্তিক ইসরাইলপন্থী গোষ্ঠীসমূহ। এমনকি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেতানিয়াহু হাঙ্গেরির জাতিগত-জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান, আজারবাইজানের স্বৈরশাসক ইলহাম আলিয়েভ, ফিলিপাইনের তীব্র বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট রড্রিগো দুতের্তেকে স্বাগত জানিয়েছেন, সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি ব্রাজিলের কট্টর ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জেয়ার বলসানোর নির্বাচনী বিজয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বলসানো ইসরাইল সফর ও ইসরাইলস্থ ব্রাজিলীয় দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
৩০ই অক্টোবর হারেৎস এক সম্পাদকীয়তে লিখেছে, ‘এই অনুসিদ্ধান্তে আসা কঠিন নয় যে, ইসরাইলি সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের অন্যত্র কট্টর ডানপন্থী গোষ্ঠীসমূহকে চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মিত্র হিসেবে বিবেচনা করছে।’
দৃশ্যত ইসরাইলের এই কট্টর ডানপন্থার আলিঙ্গন ও উদারমনা বামপন্থীদের থেকে দূরে সরে যাওয়াটা এখানেই থেমে থাকবে না। বরং, আরও বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্রেটদের মধ্যে তৃণমূল তৎপরতা ক্রমেই বাড়ছে। আসছে মধ্যবর্তী নির্বাচনে গণহারে ডেমোক্রেটরা ভোট দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন ডেমোক্রেটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নেবে সামনে।
ইসরাইলের চ্যানেল ১০ নিউজ চ্যানেলের বৈদেশিক সংবাদ বিষয়ক প্রধান সম্পাদক এয়াল নাদাভ সম্প্রতি লিখেছেন, ‘যেদিন ওরবান, দুতের্তে, ট্রাম্প কিংবা তাদের মতো নেতারা ক্ষমতা থেকে বিদায় নেবে, সেদিনের পর কী হবে? যারা ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসতে পারেন তাদের সঙ্গে কি ইসরাইলের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে? কিংবা, রাজনৈতিক জনসমর্থন রয়েছে?’
(আল জাজিরা অবলম্বনে)