Wednesday, September 9, 2026

বাংলাদেশসহ একাধিক রাষ্ট্রকে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রাখল ইসরায়েল

‘হাই হলি ডেজ’ বা ইহুদিদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব সামনে রেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসরায়েলি নাগরিক ও ইহুদিদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকি বেড়েছে বলে সতর্ক করেছে ইসরায়েলের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল (এনএসসি)। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

দ্য জেরুজালেম পোস্ট এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

রোববার (০৬ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত হালনাগাদ মূল্যায়নে এনএসসি জানায়, ইসরায়েলি ও ইহুদিদের লক্ষ্য করে হামলার সুযোগ খুঁজছে বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠন ও একক হামলাকারী। তবে এটিকে নতুন কোনো ভ্রমণ সতর্কতা হিসেবে বিবেচনা না করে বর্তমান ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।

এনএসসির মতে, ইরান, হিজবুল্লাহ ও হামাসের সঙ্গে ইসরায়েলের চলমান সংঘাত দেশের বাইরেও ইসরায়েলি নাগরিকদের জন্য হুমকি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলবিরোধী বক্তব্য ও উসকানি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং ব্যক্তিগত হামলাকারীদের মধ্যে হামলার আগ্রহ বাড়াচ্ছে।

সংস্থাটি আরও সতর্ক করেছে, ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে বড় ধরনের বিক্ষোভ হতে পারে, যার কিছু সহিংস রূপ নিতে পারে। একই সময়ে ইসরায়েলি ও ইহুদিদের লক্ষ্য করে হামলার প্রচেষ্টাও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

এনএসসি বলেছে, বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলি ও ইহুদিদের জন্য প্রধান সন্ত্রাসী হুমকি হিসেবে ইরান ও দেশটির মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দেখা হচ্ছে। হামাসও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী অবকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।

এ ছাড়া ইসরায়েল ও ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধে হামলার আহ্বান জানিয়েছে হুতিরা, এমন তথ্যও মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে সোমালিল্যান্ডসহ আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণকারী ইসরায়েলিদের লক্ষ্য করে হামলার আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে এনএসসি।

ইরানের আশপাশের দেশগুলোর মধ্যে আজারবাইজান, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ইরানি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঝুঁকিতে বিশেষভাবে সংবেদনশীল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

জর্ডান, কাতার, সোমালিল্যান্ড এবং মিসর, সিনাই উপদ্বীপসহ ইসরায়েলের সর্বোচ্চ ‘লেভেল ৪’ ভ্রমণ সতর্কতার আওতায় রয়েছে। এসব এলাকায় ভ্রমণ বা অবস্থান এড়িয়ে চলতে ইসরায়েলিদের পরামর্শ দিয়েছে এনএসসি।

এ ছাড়া ইরাক, ইয়েমেন, ইরান, সিরিয়া ও লেবানন ইসরায়েলি নাগরিকদের জন্য নিষিদ্ধ গন্তব্য হিসেবে বহাল রয়েছে। সৌদি আরবেও ভ্রমণে আইনি বিধিনিষেধ রয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ, সোমালিয়া, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, লিবিয়া ও আলজেরিয়ার নামও উল্লেখ করেছে ইসরায়েলি নিরাপত্তা পরিষদ। এসব দেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। এমনকি বাংলাদেশিদের জন্যও ইসরায়েলে ভ্রমণের অনুমতি নেই। পাশাপাশি পাসপোর্টেও ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দ যোগ করেছে বাংলাদেশ।

সূত্র: জেরুজালেম পোস্ট

তেল আবিবের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীরা। ছবি: জেরুজালেম পোস্ট
তেল আবিবের বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীরা। ছবি: জেরুজালেম পোস্ট

হারেৎজের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত নেতানিয়াহুর

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সংবাদমাধ্যম হারেৎজের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হারেৎজের সাংবাদিক শ্লোমি এলদারসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধেও মামলা করা হবে বলে জানিয়েছে নেতানিয়াহুর কার্যালয়। খবর আলজাজিরার।

নেতানিয়াহুর অভিযোগ, হারেৎজ একটি ‘মিথ্যা’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এবং সেখানে ‘মনগড়া’ ভাবে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার প্রায় দেড় সপ্তাহ আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান নেতানিয়াহুকে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন।

হারেৎজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউএই প্রেসিডেন্ট সরাসরি নেতানিয়াহুকে ওই হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। তবে নেতানিয়াহু এ বিষয়ে ইসরায়েলের গোয়েন্দা ও সামরিক কর্তৃপক্ষকে কিছু জানাননি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট ও নেতানিয়াহুর মধ্যে প্রায় ৪৫ মিনিটের ফোনালাপ হয়। তখন আমিরাতের প্রেসিডেন্ট ওই কথোপকথনে সতর্ক করে বলেন, হামাসের তৎকালীন নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছেন। এতে ব্যাপক রক্তপাতের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে এবং আব্রাহাম অ্যাকর্ডসও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

হারেৎজের দাবি, নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়ায় আমিরাতের প্রেসিডেন্ট বিস্মিত হয়েছিলেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, গাজা পরিস্থিতি নিয়ে জেরুজালেম সবকিছুর ওপর নজর রাখছে। হামাস কোনো পদক্ষেপ নিলে তা পশ্চিম তীর থেকে আসার সম্ভাবনাই বেশি এবং ইসরায়েল যে কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত।

তবে এসব দাবি পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন নেতানিয়াহু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত তার সঙ্গে ইউএই প্রেসিডেন্টের কোনো ফোনালাপ বা কথোপকথনই হয়নি।

এদিকে নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রীর ফোনকলের রেকর্ড ‘খুব সতর্কতার সঙ্গে’ পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেখানে ইউএই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কোনো কথোপকথনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এই কারণেই হারেৎজ ও সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নেতানিয়াহু। তার দাবি, ইউএই প্রেসিডেন্টের সতর্কবার্তা পাওয়ার যে তথ্য প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

সূত্র: আলজাজিরা

৭ অক্টোবরের ফোন রেকর্ড নিয়ে নেতানিয়াহুর সহযোগীকে জিজ্ঞাসাবাদ। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
৭ অক্টোবরের ফোন রেকর্ড নিয়ে নেতানিয়াহুর সহযোগীকে জিজ্ঞাসাবাদ। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

অবৈধ ইসরাইলি বসতিগুলোর বিরুদ্ধে ফ্রান্স-যুক্তরাজ্যসহ ১২ দেশের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি জনবসতিতে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস হামলা এবং অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের প্রতিবাদে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডাসহ ১২টি দেশ ইসরাইলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা জানিয়েছে। ইউরোপীয় ও পশ্চিমা জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক যৌথ বিবৃতিতে এই ঘোষণা দেওয়া হয়।

দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে- যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন ও সুইডেন। এসব দেশ তাদের নিজ নিজ আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ইসরাইলের অবৈধ বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্যের আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপের প্রক্রিয়া শুরু করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছে।

যৌথ বিবৃতিতে ১২ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেন, পশ্চিম তীরে ইসরাইল সরকারের সাম্প্রতিক কার্যক্রম দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে। বসতি স্থাপনকারীদের অভূতপূর্ব সহিংসতা ও নতুন এলাকা দখলের আগ্রাসী মনোভাব পরিস্থিতিকে দ্রুত অবনতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলেও সতর্ক করেন তারা।

বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ইসরাইল সরকারকে অবিলম্বে তাদের বেসামরিক প্রশাসনিক ক্ষমতা ও অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার জন্য সঠিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ ও ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা মানবতাবিরোধী অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করার তাগিদ দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, পূর্বে আয়ারল্যান্ড ও স্পেন এককভাবে ইসরাইলি বসতির পণ্যের বিরুদ্ধে বাণিজ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। অন্যদিকে ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে যৌথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আহ্বান জানিয়ে আসছিল, যা কিছু সদস্য দেশের আপত্তির মুখে এতদিন বিলম্বিত হয়। নতুন এই ১২ দলীয় ঐকমত্যের ফলে ইসরাইলি অবৈধ বসতির ব্যবসা-বাণিজ্য বিশ্ববাজার থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অবৈধ ইসরাইলি বসতিগুলোর বিরুদ্ধে ফ্রান্স-যুক্তরাজ্যসহ ১২ দেশের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা

ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা এখন নির্বাচনি প্রচারের হাতিয়ার

ইসরাইলে পুরোদমে শুরু হয়েছে নির্বাচনি প্রচার । রাজনৈতিক দলগুলো চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা জমা দেওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগেই ক্ষমতাসীন জোটের সদস্যরা একে অপরকে টেক্কা দিতে মাঠে নেমে পড়েছেন।

ডানপন্থি সমর্থকদের উজ্জীবিত এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভিডিওর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার সর্বশেষ পোস্টগুলোর একটিতে তিনি ভোটারদের সতর্ক করে বলেন, জনমত জরিপে প্রায়ই এগিয়ে থাকা গাদি আইজেনকোট আসলে ইসরাইলি বামপন্থিদের এবং ফিলিস্তিনি নাগরিক মানসুর আব্বাসের জন্য একটি ‘ট্রোজান হর্স’ (ছদ্মবেশে থাকা এমন কেউ যিনি ভেতর থেকে ক্ষতিসাধন করেন) ।

অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের প্রচারণার বড় অংশজুড়ে রয়েছে অবৈধ বসতি স্থাপন। তার বেশ কয়েকটি ভিডিওতে অধিকৃত পশ্চিম তীরে তিনি যে কথিত ‘বিপ্লব’ ঘটিয়েছেন, তার প্রশংসা তুলে ধরা হয়েছে।

জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অত্যন্ত সক্রিয়। তিনি ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য এবং ফিলিস্তিনি বন্দিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ভিডিও নিয়মিত পোস্ট করছেন। এমনকি এআই দিয়ে তৈরি আরেকটি ভিডিওতে ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যও দেখানো হয়েছে।

বেন-গভির পরে এসব ভিডিও সরিয়ে নিলেও ততক্ষণে সেগুলো লাখ লাখ বার দেখা ও ডাউনলোড করা হয়ে গেছে।

এমন তীব্র রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন আর কোনো বিস্ময়কর বিষয় নয়; বরং তা এখন নির্বাচনি প্রচারে ভোট টানার একধরনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা

ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা এখন নির্বাচনি প্রচারের হাতিয়ার
ছবি: সংগৃহীত

পারস্য উপসাগরের পানিতে ভয়াবহ তেলদূষণের শঙ্কা

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক সংঘাত ক্রমেই সমুদ্রপথে ছড়িয়ে পড়ছে। তেলবাহী ট্যাংকার ও অন্যান্য জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে পারস্য উপসাগরে বড় ধরনের তেল ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন ঘটনা ঘটলে উপসাগরের উপকূল, মৎস্যসম্পদ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়। এর তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র আরো তিনটি ইরানি ট্যাংকারে হামলা করেছিল। এর আগে ইরান হরমুজ প্রণালির কাছে একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ও একটি নৌবিধ্বংসী জাহাজের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল বলে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছিল।

পাল্টাপাল্টি হামলায় হরমুজ এখন সম্ভাব্য বড় পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে পড়েছে। এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি বহনকারী ট্যাংকার চলাচল করে। কোনো বড় ট্যাংকারে হামলা হলে আগুন লাগা, জাহাজ ডুবে যাওয়া কিংবা বিপুল পরিমাণ তেল সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হওয়ার অপেক্ষায় ছিল ৪২টি তেলবাহী ট্যাংকার। আরও শত শত জাহাজ বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চল ও ওমান উপসাগরে অপেক্ষা করছিল অথবা ধীরগতিতে চলছিল। অপেক্ষমাণ ট্যাংকারগুলোর মধ্যে ১৮টি তেল বহন করছিল। এসব ট্যাংকারের সম্মিলিত ধারণক্ষমতা প্রায় ১৭ লাখ ৬০ হাজার ঘনমিটার তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, যা প্রায় ১ কোটি ১১ লাখ ব্যারেল তেলের সমপরিমাণ।

যুদ্ধ শুরুর পর অন্তত ৭৫টি জাহাজে হামলা হয়েছে এবং অন্তত ২১ জন নাবিক নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে দুটি ঘটনায় ছোট আকারের তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে এবং ছয়টি জাহাজে আগুন লেগেছে।

ওমানের উপকূলেও ইতোমধ্যে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। ‘ক্যারোলিন বেজেঙ্গি’ নামের একটি ট্যাংকার জুনের শুরুতে বিস্ফোরণের আশঙ্কার কথা জানানোর পর ওমানের উপকূল থেকে প্রায় ৪১ কিলোমিটার দূরে আটকে যায়। জাহাজটিতে প্রায় ৮ লাখ ব্যারেল তেল ছিল। ওমানের পরিবেশ কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, এই তেল ছড়িয়ে পড়লে রাস মাদরাকা এলাকার প্রায় ৪০ কিলোমিটার উপকূল এবং মাসিরাহ দ্বীপ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

৩ আগস্ট ‘মিনোয়ান পাইওনিয়ার’ নামের লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী একটি বাল্ক ক্যারিয়ার ওমানের উপকূলে অজ্ঞাত একটি বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আগুন ধরে যায়। পরে স্যাটেলাইট ছবিতে কেশম ও সিররি দ্বীপের কাছে তেলের স্তর দেখা যায়। তবে কেশমের তেলের স্তরটি ওই জাহাজ থেকেই ছড়িয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান কেন্দ্রের গবেষকদের মতে, ১৯৮০-এর দশক থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি তেলদূষণ একটি বড় সমস্যা। উপসাগরের উপকূলজুড়ে লবণাক্ত পানি শোধনাগার, বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেল স্থাপনা ও শোধনাগার গড়ে ওঠায় সামুদ্রিক পরিবেশের ওপর মানুষের চাপ আরও বেড়েছে।

১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পরিবেশগত ক্ষতির কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। সে সময় কুয়েতের তেলকূপে আগুন দেওয়ার পর বিপুল পরিমাণ তেল উপসাগরে ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ কুয়েত থেকে সৌদি আরবের আবু আলী দ্বীপ পর্যন্ত ৭৭০ কিলোমিটারের বেশি উপকূল তেল ও আলকাতরায় ঢেকে গিয়েছিল। এতে উপকূলীয় পরিবেশ ও সামুদ্রিক প্রাণীর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা আবারও দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা থেকে জানা গেছে, স্যাটেলাইট ছবির ভিত্তিতে মার্চ মাসে উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তেল ছড়িয়ে পড়ার পরিমাণ চার গুণ বেশি ছিল। জাহাজগুলো হরমুজে আটকে থাকার কারণে সেগুলোর আশপাশেও তেল নিঃসরণের ঘটনা দেখা গেছে।

তেল পানির ওপর ভেসে থেকে সামুদ্রিক প্রাণী, প্রবালপ্রাচীর ও ম্যানগ্রোভ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। উপসাগরের অগভীর ও প্রায় বদ্ধ জলভাগে দূষণের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মাছ, কচ্ছপ, ডুগং ও পরিযায়ী পাখির পাশাপাশি মৎস্যসম্পদের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে মাছের ডিম ও লার্ভা তেলদূষণের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।

এই পরিস্থিতি শুধু সামুদ্রিক পরিবেশ নয়, মানুষের পানির সরবরাহের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ মানুষ প্রধানত সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করে পানীয় ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করে। ইরানের দক্ষিণ উপকূলেও বেশ কয়েকটি ডিস্যালিনেশন বা লবণাক্ত পানি শোধনাগার রয়েছে। সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়লে এসব স্থাপনার কাঁচা পানির মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং শোধন প্রক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি হতে পারে।

তবে সালতান কাবুস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হুসেইন সামহ আল-মাসরুরি বলেছেন, ঝুঁকির মাত্রা নির্ভর করবে তেল ছড়িয়ে পড়ার স্থান, সমুদ্রস্রোত, পানি গ্রহণের স্থানের দূরত্ব ও গভীরতা এবং ব্যবহৃত শোধন প্রযুক্তির ওপর। আধুনিক পর্যবেক্ষণ ও উন্নত শোধনব্যবস্থা ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে। তবে দূষিত পানি শোধনাগারে প্রবেশের আগেই শনাক্ত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে হরমুজকে ঘিরে চলমান সামরিক সংঘাতের প্রভাব এখন শুধু জ্বালানি সরবরাহ বা নৌ চলাচলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তেলবাহী জাহাজে হামলা অব্যাহত থাকলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পরিবেশ এবং উপসাগরীয় কোটি কোটি মানুষের পানি ও জীবিকার ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

সূত্র: রয়টার্স ও আল-জাজিরা

পারস্য উপসাগরের পানিতে ভয়াবহ তেলদূষণের শঙ্কা

ফাঁসির আতঙ্কে আ.লীগের পলাতক নেতারা, হাসিনার সিদ্ধান্তে চরম ক্ষোভ ও হতাশা

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও সাবেক মন্ত্রীদের মধ্যে এখন তীব্র আতঙ্ক, হতাশা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। দলের সভাপতি শেখ হাসিনা দিল্লিতে অবস্থান করলেও তার সঙ্গে প্রবীণ ও পরীক্ষিত নেতাদের চরম দূরত্ব তৈরি হয়েছে। একদিকে মৃত্যুদণ্ডের ভয় এবং অন্যদিকে দলীয় প্রধানের দিক থেকে কোনো খোঁজখবর না পাওয়া ও তার একতরফা সিদ্ধান্তে পলাতক এসব নেতাদের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এখন প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে।

নেতাদের এই ভয় ও ক্ষোভের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। কলকাতার নিউটাউনের একটি ফ্ল্যাটে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও লুকোচুরি করে দিন কাটানো এই নেতা নিজের হতাশা আর চেপে রাখতে পারেননি। সম্প্রতি দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক একটি সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে দেশে ফিরে প্রতিশোধ নেওয়ার যে আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আসাদুজ্জামান কামাল। নানকের এমন ফাঁকা আস্ফালনে ক্ষুব্ধ হয়ে কামাল বলেন, নানক বললেই কি ইচ্ছেমতো দেশে ফেরা যায়? তার গলায় ইতিমধ্যেই ফাঁসির দড়ি ঝুলছে। যদি এই ধরনের কঠোর আইনি নির্দেশ বা ফাঁসির সাজা নানকের ওপর থাকত, তবে কি তিনি এভাবে বুক ফুলিয়ে কথা বলতে পারতেন?

চরম আতঙ্কে দিন কাটানো আসাদুজ্জামান কামাল জানান, তার ওপর ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কড়া নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তিনি ভয়ে আছেন যে, তার মুখ থেকে সামান্য কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য বের হলেই তাকে ধরে বাংলাদেশ সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে। নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, তার তো ফাঁসি হবে, আর নানক বেঁচে যাবেন; তাই তিনি কোনোভাবেই এভাবে দেশে ফিরতে চান না। একসময়ের দাপুটে এসব মন্ত্রীরা আজ অর্থকষ্ট, পুলিশি গ্রেপ্তারের ভয় এবং বন্দিদশার মতো মানবেতর জীবন পার করছেন। অথচ বিপদের এই চরম মুহূর্তে শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসে থাকলেও তাদের কোনো খোঁজ নিচ্ছেন না। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও আজ পুরোপুরি কোণঠাসা ও নেত্রীর সুনজর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

নেতাদের এই হতাশার আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলেছে শেখ হাসিনার একটি সাম্প্রতিক বার্তা। কলকাতার একটি সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ইঙ্গিত দেন যে, তার অনুপস্থিতিতে দলের জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য ও তার ফুফাতো ভাই শেখ ফজলুল করিম সেলিম সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশের মধ্যে প্রকাশ্য বিদ্রোহ দেখা দেয়। কলকাতার নিউ টাউনে শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল উদ্দিনের বাসায় গোপনে জড়ো হয়ে দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান।

ওই গোপন বৈঠকে আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মির্জা আজমসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা উপস্থিত ছিলেন। তারা সরাসরি অভিযোগ করেন যে, শেখ সেলিম দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত ছিলেন এবং নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তার আচরণ অত্যন্ত খারাপ। গত পনেরো বছরে তদবির ছাড়া কোনো দলীয় কাজে তাকে পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে নেতারা বলেন, যিনি দলের সাথে সম্পর্ক রাখেননি তাকে সভাপতির দায়িত্ব দিলে কেউ তা মেনে নেবে না। দলের এই দুঃসময়ে শেখ সেলিমের বদলে অন্য নেতাদের মূল্যায়ন করার জন্য তারা শেখ হেলালের মাধ্যমে শেখ হাসিনার কাছে বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করেন।

সব মিলিয়ে ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত করুণ। একদিকে দেশে ফিরলে মৃত্যুদণ্ড বা গ্রেপ্তারের নিশ্চিত আতঙ্ক, অন্যদিকে দলের প্রধান শেখ হাসিনার অবিবেচক সিদ্ধান্ত ও তাদের প্রতি চরম অবহেলা পুরনো নেতাদের দিশেহারা করে তুলেছে। বিপদের দিনে নেত্রীর এমন স্বার্থপর আচরণ ও কিছু নেতার আত্মপ্রচারের রাজনীতিতে তারা নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন। দলের ভেতরে তৈরি হওয়া এই গভীর ফাটল ও অনাস্থা আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের অস্তিত্বকেই এখন চরম সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে।

ফাঁসির আতঙ্কে আ.লীগের পলাতক নেতারা, হাসিনার সিদ্ধান্তে চরম ক্ষোভ ও হতাশা
ছবি: উপরের বাঁ থেকে- আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক; নিচের বাঁ থেকে- মির্জা আজম ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম।

গৃহযুদ্ধের আগে একদল সন্তান দরকার ইলন মাস্কের

তথ্যচিত্রে সাবেক প্রেমিকাঃ ইলন মাস্কের ব্যাপারে মুখ খুলেছেন তার সাবেক প্রেমিকা ও এক সন্তানের মা সেন্ট ক্লেয়ার। প্রখ্যাত তথ্যচিত্র নির্মাতা অ্যালেক্স গিবনির নতুন তথ্যচিত্র ‘মাস্ক’-এ ক্লেয়ার জানান, মাস্ক তাকে এক ক্ষুদে বার্তায় বলেছিলেন যে সম্ভাব্য ‘গৃহযুদ্ধের আগেই তার একদল সন্তান প্রয়োজন’। তবে মাস্ক নির্দিষ্ট করে কোন গৃহযুদ্ধ বুঝিয়েছেন তা বলেননি। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে তথ্যচিত্রটির উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে কথা বলতে গিয়ে তিনি মাস্কের এই বিপজ্জনক মানসিকতা ও প্রভাব নিয়ে কথা বলেন। এ খবর দিয়েছে গার্ডিয়ান। সেন্ট ক্লেয়ারের সঙ্গে ২০২৪ সালে মাস্কের একটি ছেলে সন্তান হয়, তবে পরবর্তীতে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। সেন্ট ক্লেয়ার জানান, একটি গোপনীয়তা চুক্তিতে (এনডিএ) স্বাক্ষরের বিনিময়ে মাস্কের দল তাকে এককালীন ৪ কোটি ডলার এবং প্রতি মাসে ১ লাখ ডলার দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে তিনি স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানালে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে নেয়া হয়।

ভেনিস উৎসবে সেন্ট ক্লেয়ার বলেন, এক্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাস্ক এমন বিভিন্ন উত্তেজনা উসকে দিচ্ছেন যার বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই। এটি এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না হলে ভবিষ্যতে বিপর্যয়কর বিভাজন ডেকে আনতে পারে। ২০২২ সালে টুইটার (বর্তমান এক্স) কেনার পর থেকেই মাস্ক নিজের রাজনৈতিক মতামত ও এজেন্ডা প্রচারে প্ল্যাটফর্মটিকে ব্যবহার করে আসছেন। চার ঘণ্টার এই তথ্যচিত্রটি তৈরি করতে তিন বছর সময় ব্যয় করেছেন নির্মাতা অ্যালেক্স গিবনি। তিনি জানান, মানবসভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার বিষয়ে মাস্কের তীব্র ভীতি ও উদ্বেগের মূল সম্ভবত দক্ষিণ আফ্রিকায় কাটানো তার শৈশবের কঠিন ও ট্রমাটিক অভিজ্ঞতার মধ্যে নিহিত। গিবনি আরও মন্তব্য করেন, মাস্কের গল্প কোনো নতুন প্রযুক্তির বিপ্লব নয়, বরং শেয়ারের দাম ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সম্পদ ও ক্ষমতা বাড়ানোর পুরনো কৌশলেরই এক নতুন রূপ।

গৃহযুদ্ধের আগে একদল সন্তান দরকার ইলন মাস্কের

ইয়েমেনে ফের যুদ্ধ, সানা ও লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণে নতুন লড়াই

ইয়েমেনে আবারও তীব্র হয়ে উঠেছে যুদ্ধ। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পর কয়েক বছর তুলনামূলক শান্ত থাকার পর দেশটিতে এখন সবচেয়ে বড় ধরনের সংঘাতের মুখোমুখি হচ্ছে হুতিরা ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার।

চলতি সপ্তাহে হুতিদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী। তায়েজ, আল-বায়দা ও আল-জাওফ প্রদেশে লড়াই তীব্র হয়েছে। আল-জাওফকে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজধানী সানার অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ হিসেবে দেখা হয়।

অন্যদিকে হুতিরা দাবি করেছে, তারা সরকারি বাহিনীর কয়েকটি অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবেও হামলা চালিয়েছে তারা। সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করছে।

সংঘাতের নতুন এই পর্যায়ে ইয়েমেন সরকার হুতিদের কাছ থেকে রাজধানী সানা পুনর্দখলের লক্ষ্য নিয়েছে। একই সময়ে দুপক্ষই বাব আল-মানদাব প্রণালির আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাব আল-মানদাব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর একটি। ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করার পর এই নৌপথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ২০২৩ সাল থেকে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে নিয়মিত হামলা চালিয়ে আসছে হুতিরা।

বিশ্লেষকদের মতে, আগের তুলনায় এবার ইয়েমেন সরকারের সমর্থক বাহিনী বেশি সংগঠিত ও শক্তিশালী। তবে দ্রুত জয় পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ইয়েমেনি-আমেরিকান বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশা মনে করেন, এই সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার বদলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের রূপ নিতে পারে।

চলতি বছরের শুরুতে দক্ষিণ ইয়েমেনের কিছু এলাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের কাছ থেকে পুনর্দখল করে সরকারি বাহিনী। এরপর সরকারবিরোধী বিভিন্ন বাহিনীকে একটি সামরিক কাঠামোর অধীনে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য হুতিদের মোকাবিলা করা।

তবে হুতিরা এখনও শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হিসেবে টিকে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, তারা পিছু হটলে উত্তরাঞ্চলের সাদা, হাজ্জাহ, সানা ও আশপাশের এলাকায় ঘাঁটি গেড়ে দীর্ঘমেয়াদি লড়াই চালাতে পারে।

ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতও ইয়েমেনের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক সংঘাতের সুযোগ নিয়ে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার হুতিদের বিরুদ্ধে বড় অভিযান চালানোর সুযোগ পেয়েছে।

সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালেদ বাতারফির মতে, হুতিরা এখন শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে সীমাবদ্ধ নেই। তারা লোহিত সাগরের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ও আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোর ওপরও প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

সম্প্রতি সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে হুতিদের হামলায় ৭৩ জন আহত হয়েছে। হামলায় দেশটির কয়েকটি তেল ও জ্বালানি স্থাপনাতেও আগুন লাগে। এতে ইয়েমেনের সংঘাত আবারও সরাসরি সৌদি-হুতি নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইয়েমেনের সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য বাব আল-মানদাব প্রণালি। সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্যও এই নৌপথের গুরুত্ব বেড়েছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধের কারণে।

হরমুজ ও বাব আল-মানদাব—দুটি নৌপথ একই সময়ে গুরুতরভাবে বিঘ্নিত হলে এর প্রভাব ইয়েমেন বা সৌদি আরবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, সামনে ইয়েমেনে আরও বড় পরিসরে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে। সরকারি বাহিনী আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও হুতিদের দ্রুত পরাজিত করার সম্ভাবনা কম। বরং ইয়েমেন আবারও দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।

সূত্র: আলজাজিরা

হুতি যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে সৌদি-সমর্থিত ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সের হামলা। ছবি: এএফপি
হুতি যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে সৌদি-সমর্থিত ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সের হামলা। ছবি: এএফপি

ইসরাইলের কৌশলগত বলয়ে ঢুকেছে গ্রিস, তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনায় নতুন মাত্রা

গ্রিস ও ইসরাইলের মধ্যে সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা পূর্ব ভূমধ্যসাগরের ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ৩১ আগস্ট দুই দেশ প্রায় ৩ বিলিয়ন ইউরোর একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার আওতায় গ্রিসের জন্য ইসরাইল একটি সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ নামে পরিচিত এই প্রকল্পে ডেভিডস স্লিং, বারাক এমএক্স, স্পাইডার এবং বহুমুখী রাডারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তিটিকে দুই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

লেখক মুরাত আসলান এই চুক্তিকে শুধু অস্ত্র কেনাবেচা হিসেবে দেখেননি। তার মতে, এর মধ্য দিয়ে গ্রিসের নিরাপত্তা কাঠামো ক্রমেই ইসরাইলি প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে। এমনকি ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ নামটিকেও তিনি প্রতীকীভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। গ্রিক পুরাণের বীর অ্যাকিলিসের বিপরীতে তিনি হিব্রু ‘আয়িল’ শব্দের উল্লেখ করেছেন, যার অর্থ আব্রাহামের কাহিনিতে বিকল্প হিসেবে উৎসর্গ করা ভেড়া। তার যুক্তি, গ্রিসের কৌশলগত স্বনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত ‘অ্যাকিলিস’ শেষ পর্যন্ত অন্যের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত ‘আয়িল’-এ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

চুক্তিটির সামরিক গুরুত্ব অবশ্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গ্রিসকে ডেভিডস স্লিং, বারাক এমএক্স, স্পাইডার এবং এমএমআর রাডারসহ একটি বহুস্তরীয় আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরিতে সহায়তা করবে ইসরাইল। গ্রিসের বৃহত্তর ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী বছরগুলোতে দেশটি আরো বিপুল অর্থ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার পরিকল্পনা করছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সংগ্রহ এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছ থেকে অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনাও এর সঙ্গে যুক্ত।

এথেন্সের দৃষ্টিতে এর প্রধান কারণ তুরস্ক। এজিয়ান সাগর ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সমুদ্রসীমা, দ্বীপগুলোর সামরিকীকরণ, মহীসোপান, জ্বালানি সম্পদ এবং সাইপ্রাসকে ঘিরে গ্রিস ও তুরস্কের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোটাকিস সম্প্রতি এজিয়ান সাগরে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত আঞ্চলিক জলসীমা সম্প্রসারণের অধিকার নিয়ে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, গ্রিস কীভাবে নিজেদের সশস্ত্র করবে সে বিষয়ে কারও অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

অন্যদিকে তুরস্কের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। আঙ্কারা পূর্ব এজিয়ান দ্বীপগুলোর সামরিকীকরণের বিরোধিতা করে এবং গ্রিসকে ১৯২৩ সালের লওজান চুক্তি ও ১৯৪৭ সালের প্যারিস শান্তি চুক্তির বাধ্যবাধকতা মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, তুরস্ক অন্য দেশের ভূখণ্ড দখল করতে চায় না, কিন্তু নিজেদের অধিকার লঙ্ঘনও মেনে নেবে না।

এই অবস্থায় গ্রিস-ইসরাইল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে কী প্রভাব ফেলবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। ইসরাইলের দৃষ্টিতে তুরস্ক ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে। সিরিয়ায় ইরানের প্রভাব কমে যাওয়া, রাশিয়ার আঞ্চলিক ভূমিকার পরিবর্তন এবং তুরস্কের সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির ফলে ইসরাইল পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নতুন কৌশলগত সমীকরণ তৈরি করতে চাইছে—এমন যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে।

গ্রিস, ইসরাইল ও গ্রিক সাইপ্রিয়ট প্রশাসনের মধ্যে সামরিক, জ্বালানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও গত এক দশকে বেড়েছে। ফলে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে একটি ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে ওঠার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন প্রতিরোধ, বিমান প্রতিরক্ষা এবং সামরিক প্রযুক্তির সহযোগিতা। অন্যদিকে তুরস্কও সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’সহ নতুন নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে। ফলে পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণ ক্রমেই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।

তবে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি মানেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া নয়। গ্রিস যদি তার আকাশ প্রতিরক্ষা, রাডার ও সামরিক কমান্ড কাঠামোর বড় অংশ বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল করে তোলে, তাহলে সংকটের সময়ে সেই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনা নিয়ে কৌশলগত নির্ভরতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে তুরস্কের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে গ্রিস যদি এমন একটি আঞ্চলিক সংঘাতের কাঠামোর অংশ হয়ে যায়, যার সিদ্ধান্ত এথেন্সের হাতে পুরোপুরি নেই, তাহলে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়লেও কৌশলগত স্বাধীনতা কমতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।

তবে গ্রিসের অবস্থানও একেবারে ভিন্ন। প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিটসোটাকিস বলেছেন, ইসরাইলের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে তিনি সৌদি আরব ও অন্যান্য আরব দেশের সঙ্গে সম্পর্কও বাড়াতে চান। অর্থাৎ এথেন্সের লক্ষ্য শুধু ইসরাইল কেন্দ্রিক জোট তৈরি করা নয়; বরং পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করা—এমনটাই গ্রিক সরকারের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়।

আর এখানেই সামনে আসে ‘অ্যাকিলিস’ নামটির আরেকটি অর্থ। গ্রিসের জন্য প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যদি ক্রমাগত অন্য রাষ্ট্রের অস্ত্র, প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেই নিরাপত্তার মূল্যও বিবেচনা করতে হয়। সামরিক জোট একদিকে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে, অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগও বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে তৈরি হতে পারে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও পাল্টা জোটের একটি চক্র।

গ্রিস ও তুরস্ক উভয়ই ন্যাটোর সদস্য। ফলে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাত হলে সেটি শুধু দ্বিপক্ষীয় সংকট থাকবে না; ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও চাপ তৈরি করবে। ১৯৯৬ সালের কার্দাক সংকটের সময়ও যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়েছিল। তাই বর্তমান উত্তেজনা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়, তার প্রভাব পূর্ব ভূমধ্যসাগরের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গ্রিস ও তুরস্কের বিরোধের রাজনৈতিক সমাধান এখনো সামরিক সক্ষমতার বাইরে রয়ে গেছে। এজিয়ান ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সমুদ্রসীমা, সাইপ্রাস এবং দ্বীপগুলোর সামরিকীকরণ নিয়ে মতপার্থক্য কেবল নতুন ক্ষেপণাস্ত্র বা রাডার দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। বরং সামরিক ভারসাম্যের পাশাপাশি সরাসরি সংলাপ, আস্থা তৈরির ব্যবস্থা এবং বাধ্যতামূলক বিরোধ-নিষ্পত্তির কাঠামো প্রয়োজন।

অতএব ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ গ্রিসের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিঃসন্দেহে বাড়াতে পারে। কিন্তু এই ব্যবস্থা একই সঙ্গে গ্রিস-ইসরাইল কৌশলগত সম্পর্ককে আরও গভীর করবে এবং তুরস্কের সঙ্গে নিরাপত্তা প্রতিযোগিতাকেও তীব্র করতে পারে। শেষ পর্যন্ত গ্রিসের সামনে আসল প্রশ্ন হতে পারে—আরও শক্তিশালী অস্ত্রভাণ্ডার গড়া, নাকি এমন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা, যেখানে তুরস্ক ও গ্রিস পরস্পরকে স্থায়ী শত্রু হিসেবে না দেখে বিরোধগুলো রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কারণ অস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধের সমাধান করতে পারে না।

সূত্র: ডেইলি সাবাহ ও এপি নিউজ

ইসরাইলের কৌশলগত বলয়ে ঢুকেছে গ্রিস, তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনায় নতুন মাত্রা

ফের যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে সৌদি আরব ও হুথি বিদ্রোহীরা

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনঃ সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে হুথিদের সাম্প্রতিক হামলায় ৭৩ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হওয়ার পর ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে রিয়াদ। হামলায় সৌদি আরবের কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং কোথাও কোথাও আগুন ধরে সাময়িকভাবে কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।

২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর থেকে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে তাদের সংঘাত চলছে। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযান শুরু হলেও দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ২০২২ সালে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে আবারও সংঘাত তীব্র হয়েছে। হুথিরা দাবি করেছে, সৌদি আরব গত তিন দিনে ইয়েমেনে ১২১টি বিমান হামলা চালিয়েছে। সৌদি সরকার এ দাবি সরাসরি মন্তব্য না করলেও ইয়েমেন সরকার হুথিদের সামরিক শক্তিবৃদ্ধির ওপর কয়েকটি বিমান হামলার দায় স্বীকার করেছে।

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান বলেছেন, কূটনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং সৌদি আরব শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। তবে দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তারা দ্বিধা করবে না।

মঙ্গলবার হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিকমাধ্যমে জানান যে, সৌদি আরবে তাদের সাম্প্রতিক হামলাগুলো ছিল পাল্টা পদক্ষেপ। তিনি অভিযোগ করেন, গত তিন দিনে সৌদি আরব ইয়েমেনে ১২১টি বিমান হামলা চালিয়েছে; এর মধ্যে একটি হামলায় একটি কারাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে বন্দিরা চাপা পড়েন।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেন বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি বলেছেন, দেশটি ‘আবারও বড় আকারের যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে।’ তিনি বলেন, উত্তেজনা প্রশমন অসম্ভব নয়, তবে বাস্তবতার নিরিখে তা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।

স্থানীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, গত সপ্তাহে ইয়েমেনে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে। হুথিরা এমন কিছু এলাকা দখলের চেষ্টা চালায় যা তাদের লোহিত সাগরের নৌ-চলাচলের পথগুলোর ওপর আরো বেশি নিয়ন্ত্রণ এনে দিতে পারত।

সৌদি কর্মকর্তারা হুথিদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা করে আসছিলেন, কিন্তু গবেষণা সংস্থা চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক গবেষক ফারিয়া আল-মুসলিমির মতে, ‘এখন আর তা এড়িয়ে যাওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘আজকের ঘটনাপ্রবাহ এই যুদ্ধে সৌদি আরবের সম্পৃক্ততাকে আরো ত্বরান্বিত করবে।’

হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ ও তেল রপ্তানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা আরো বাড়ার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামও বাড়তে পারে। সর্বশেষ হামলার পর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৯ ডলারে উঠেছে।

তবে সৌদি আরব নতুন করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে গেলে হুথিদের পুরোপুরি পরাজিত করার বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বরং হুথিদের দুর্বল করে ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমাধানকে নিজেদের অনুকূলে আনার চেষ্টা করতে পারে রিয়াদ।

২০১৫ সালের সৌদি সামরিক অভিযান ইয়েমেনে দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি করেছিল এবং বিপুল প্রাণহানি ঘটলেও হুথিদের ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব হয়নি। ফলে এবারও বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি সৌদি আরবের জন্য যথেষ্ট বেশি।

ফের যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে সৌদি আরব ও হুথি বিদ্রোহীরা
ইয়েমেনের সানায় পাহারারত হুথি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

‘ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা কোনো ভবন বা যন্ত্রপাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়’

ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা কোনো ভবন বা যন্ত্রপাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেশটির জ্ঞান, দৃঢ় সংকল্প ও দক্ষ মানবসম্পদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই কোনো ধরনের সামরিক শক্তি ব্যবহার করেও এই সক্ষমতা পরিবর্তন করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে তেহরান। খবর ইরনার।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের প্রতিনিধিদল এসব কথা জানায়।

বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের আগ্রাসনে ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। পারমাণবিক প্রযুক্তির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দেশটির প্রবেশাধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। তবে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা একটি গর্বিত জাতির জ্ঞান, দৃঢ় সংকল্প ও মানবসম্পদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই সক্ষমতা কেবল ভবন বা যন্ত্রপাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, স্থাপনায় হামলা চালানো যেতে পারে এবং বিজ্ঞানীদের হত্যা করা হতে পারে। কিন্তু মানুষের মধ্যে যখন বিজ্ঞান শিকড় গেড়ে বসে, তখন তা টিকে থাকে, বিকশিত হয় এবং এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। ইরানের বাস্তবতা এটাই কোনো শক্তিই এটি পরিবর্তন করতে পারবে না।

আইএইএর বৈঠকে ইরানি প্রতিনিধিদল জানায়, দেশটির পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অর্জিত সাফল্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, সঞ্চিত জ্ঞান, বিশেষায়িত মানবসম্পদ এবং নিজস্ব যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো উন্নয়নের ফল। এর মাধ্যমে ইরান একটি পরিণত ও টেকসই বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলেছে, যা দেশের প্রয়োজনের বড় একটি অংশ পূরণ করছে।

ইরানের পারমাণবিক প্রযুক্তি কৃষি, পরিবেশ সুরক্ষা, ফসলের উন্নয়ন, কীটপতঙ্গ ও রোগ নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য সংরক্ষণ এবং পানি ও সার ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

চিকিৎসা ও শিল্প খাতেও রেডিওআইসোটোপ উৎপাদন ও ব্যবহার, বিকিরণ প্রয়োগ ও জীবাণুমুক্তকরণ এবং বিকিরণভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারে ইরান সক্ষমতা অর্জন করেছে। এসব কার্যক্রমে বিকিরণ সুরক্ষা, পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ ও শনাক্তকরণ সক্ষমতাও ব্যবহার করা হচ্ছে।

বৈঠকে ইরান একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য বিধিনিষেধেরও সমালোচনা করে। দেশটির প্রতিনিধিদল জানায়, কয়েক দশক ধরে এসব অবৈধ পদক্ষেপ ইরানের প্রযুক্তিগত সহায়তা, জ্ঞান ও প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত করেছে।

ইরানের দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপ শান্তিপূর্ণভাবে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের রাষ্ট্রগুলোর অবিচ্ছেদ্য অধিকারের পরিপন্থি। একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) আওতাধীন উন্নত দেশগুলোর শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার উন্নয়নে সহযোগিতার বাধ্যবাধকতার সঙ্গেও এসব পদক্ষেপ সাংঘর্ষিক।

ইরানি প্রতিনিধিদল আইএইএকে এসব বিধিনিষেধের প্রভাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানায়। সংস্থাটির নীতিনির্ধারণী অঙ্গগুলোর উচিত এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ বন্ধের আহ্বান জানানো।

বিবৃতিতে আইএইএর প্রতিবেদনে একতরফা নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক আগ্রাসনের কারণে ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর পড়া প্রভাবের কোনো উল্লেখ না থাকায় হতাশা প্রকাশ করে তেহরান।

প্রতিবেদনটি সাধারণ সম্মেলনে উপস্থাপনের আগে আইএইএকে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইরান।

সূত্র : ইরনা

ইরানের পারমাণবিক প্রদর্শনীতে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। ছবি : এএফপি
ইরানের পারমাণবিক প্রদর্শনীতে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। ছবি : এএফপি

কবিগুরুর গান–কবিতা নিয়ে সুর-ছন্দে আনন্দময় সন্ধ্যা

প্রকাশ ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ বসন্ত কিংবা বৈশাখ, বর্ষা অথবা শীত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান সব সময়ই সময়োপযোগী। আর ললিত কণ্ঠে গীত সেই গান শুনতে পাওয়া যে অপার আনন্দের, সে কথাও নতুন করে বলার নেই। সোমবার হেমন্তের মৃদু শীতের সন্ধ্যায় কবিগুরুর গানের সঙ্গে বাড়তি প্রাপ্তি ছিল তাঁর কবিতার আবৃত্তি আর নৃত্য পরিবেশনা। ফলে শ্রোতা-দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল ‘আলোকের এই ঝরনাধারায়’ নামের আয়োজনটি।

১ ডিসেম্বর ২০২৫ সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকায় সুইডেন দূতাবাস ও এইচএসবিসি বাংলাদেশ যৌথভাবে কবিগুরুর গান, আবৃত্তি, নৃত্যের এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বনানীর শেরাটন হোটেলের বলরুমে। সুধীজনদের সঙ্গে কবিগুরুর অনন্য সৃজনকর্মের আনন্দ উপভোগের পাশাপাশি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ছিল এই আয়োজনের লক্ষ্য।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই মঞ্চের নেপথ্যজুড়ে বিশাল ডিজিটাল পর্দায় কবিগুরুর জীবন ও কর্মের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। এরপর সংক্ষিপ্ত আলোচনায় সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অসামান্য সৃজনপ্রতিভায় ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাঁর রচনায় মানবতা, প্রকৃতি, উচ্চতর জীবনদর্শন প্রকাশিত হয়েছে। সৃজনশীলতার কোনো ভৌগোলিক সীমান্ত নেই বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কালজয়ী সৃজনকর্ম বিশ্বজনীনতা লাভ করেছে। তিনি বলেন, এ ধরনের শিল্প, সংস্কৃতি, সৃজনশীল আয়োজনের মধ্য দিয়ে দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক জানাশোনা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও নিবিড় হবে।

এইচএসবিসির নির্বাহী পরিচালক মাহবুব উর রহমান দর্শকদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গান ও কবিতা সারা বিশ্বে প্রচারিত হয়েছিল। বাস্তবিক অর্থেই তিনি বিশ্বনাগরিকে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি আমাদের দেশে অবস্থান করে তাঁর অনেক কালজয়ী রচনাকর্ম করেছেন। আমাদের জন্য গর্বের বিষয়, তাঁর গান আমাদের জাতীয় সংগীত। তাঁর রচনা আমাদের সব সময় মানবিকতা বোধ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে।’

অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন নাট্যজন ত্রপা মজুমদার। তিনি কবির সৃজনসম্ভার উপভোগের আহ্বান জানান অতিথিদের।

কবিতা আর গানের অনেকটা যুগলবন্দীর মতো ছিল প্রথম পর্বের পরিবেশনা। আবৃত্তিশিল্পী ডালিয়া আহমেদ কবির বিভিন্ন কবিতা, গান ও রচনার বিশেষ অংশ মূল ও ইংরেজিতে আবৃত্তি করেন। পরে গান পরিবেশন করেন অদিতি মহসিন। আবৃত্তি ও গান মিলিয়ে একটি পরিবেশন। ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর’ দিয়ে শুরু করছিলেন ডালিয়া আহমেদ। পরে অদিতি মহসিন গাইলেন, ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’। পরের আবৃত্তি ‘তুমি একটু কেবল বসতে দিও কাছে’, প্রথম চরণের পর পুরোটাই ইংরেজিতে। আবৃত্তির পর গানটি গেয়ে শোনানো হলো শ্রোতাদের।

‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি’ আবৃত্তির পরে ছিল গান ‘সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে’। ডলিয়া পাঠ করলেন ‘নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার অধিকার’; অদিতি গাইলেন ‘বঁধু, কোন আলো লাগল চোখে’।

এরপর লিপিকা থেকে ‘একটি চাহনি’ পাঠ, পরের গানটি ‘কী সুর বাজে আমার প্রাণে/ আমিই জানি মনই জানে’।

বাঙালির প্রাণের সঙ্গে মিলে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের সুর। তাই তাঁর গানে কান পাততেই হয়। প্রথমে আবৃত্তি হলো বাংলা ও ইংরেজিতে ‘আমি কান পেতে রাই’। পরে সুরে সুরে ‘কোন গোপনবাসীর কান্নাহাসির/ গোপন কথা শুনিবারে—বারে বারে/ কান পেতে রই।’

আত্মশক্তির কথা বহুবার মনে করিয়ে দিয়েছেন কবিগুরু তাঁর বহু রচনায়। ডালিয়ার আবৃত্তিতে এল সেই বাণী ‘চিত্ত যেথা ভয় শূন্য/উচ্চ যেথা শীর’। অদিতি শেষ করলেন ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’ গেয়ে।

আনন্দের গান দিয়ে শুরু, দেশপ্রেমের গানে গানে গানের পালা শেষ হলে ওয়ার্দা রিহাব ও তাঁর সহশিল্পীরা পরিবেশন করেন ‘আকাশভরা সূর্যতারা’, ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ এবং ‘আলোকের এই ঝরনাধারায়’ গানের সঙ্গে তিনটি নৃত্য। আনন্দময় সময় ভেসে গেল সুরের ভেলায়।

‘আলোকের এই ঝরনাধারায়’ অনুষ্ঠানে আবৃত্তি ও সংগীতের যুগল পরিবেশনায় বাঁয়ে ডালিয়া আহমেদ ও অদিতি মহসিন। সোমবার সন্ধ্যায় বনানীর শেরাটন হোটেলের বলরুমে
‘আলোকের এই ঝরনাধারায়’ অনুষ্ঠানে আবৃত্তি ও সংগীতের যুগল পরিবেশনায় বাঁয়ে ডালিয়া আহমেদ ও অদিতি মহসিন। বনানীর শেরাটন হোটেলের বলরুমে। ছবি: প্রথম আলো

মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় স্মৃতিসৌধ চুয়াডাঙ্গার আট কবর

মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী–ভাষ্যঃ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বেশ কবছর ধরে বই আকারে প্রকাশ করছে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সংগৃহীত ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী–ভাষ্য’। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতেই তাদের এই উদ্যোগ। জাদুঘরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে শিক্ষার্থীরা পরিচিতজনদের সঙ্গে আলাপ করে একাত্তরের স্মৃতিভাষ্য লিখিতভাবে পাঠায়। ফলে এই কর্মসূচি এক অর্থে বিনিময়। যেখানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বয়ে নিয়ে যাচ্ছে ইতিহাস এবং শিক্ষার্থীরা যোগান দিচ্ছে ইতিহাসের ভাষ্য। বলার অপেক্ষা রাখে না, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আমাদের বড় শক্তি। তাই শিক্ষার্থীদের পাঠানো এসব স্মৃতিভাষ্য থেকে বাছাই করা ৩১টি কাহিনি প্রকাশ করছে প্রথম আলো।

সংগ্রহকারী: রাবেয়া আক্তার, দশম শ্রেণি, খ শাখা, এম এ বারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, চুয়াডাঙ্গা

বর্ণনাকারী: মো. আলী আজগর ফটিক, রেলপাড়া, চুয়াডাঙ্গা, বয়স: আনুমানিক ৫৯ বছর
সংগ্রহকারী ও বর্ণনাকারীর সম্পর্ক: নাতনি–নানা

১৯৭১ সালে ভারতের বিহার রাজ্যের চাকুলিয়ায় প্রথম ব্যাচে গেরিলা ট্রেনিং করি আমি। মাত্র ৪২ দিনের মাথায় গেরিলা ট্রেনিং শেষ করি আমরা। যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়ি।

আমরা ছিলাম আলমডাঙ্গার ৮ নম্বর সেক্টরের অধীন। কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা ও ফরিদপুরের উত্তরাংশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল এই সেক্টর।

আমি এই যুদ্ধে বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন গ্রাম, যেমন সাতগাড়ি, দিঘড়ি, মেছরদাড়ি, কুলচারা, ডোমবার চর ইত্যাদি গ্রামে হেঁটে রাতদিন পার করেছি।

একদিন শুনলাম, গ্রামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণ হবে। তখন তাড়াতাড়ি বাড়ি যাই। গিয়ে দেখি, আমার মা ভাতের চুলায় লাকড়ি দিচ্ছেন। এ অবস্থায় মাসহ আমরা তিন ভাইবোন অনেক কষ্টে মাঠঘাট পেরিয়ে লক্ষ্মীপুর জেলার দলটা নামক জায়গার একটা স্কুলে গিয়ে আশ্রয় নিই।

ওখানে আমার বড় বোন অনেক অসুস্থ হয়ে পড়ে। পাশের বাড়ির কুয়া থেকে পানি উঠিয়ে তার মাথায় ঢেলে সুস্থ করে তুলি। এর পরের দিনগুলো ছিল অনেক কষ্টের। আমাদের চোখের সামনে অনেক গ্রাম, মাঠ, ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে শেষ করেছিল পাকিস্তানি সেনারা।

অনেক মা-বোনের ওপর নির্যাতন করে পাকিস্তানি শোষকেরা। অনেক যুবক, বৃদ্ধের দুই হাত বেঁধে গুলি করে মেরেছিল পাকিস্তানি সেনারা।

পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা সহ্য করতে না পেরে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। সে সময় যোগ দিই বিভিন্ন অপারেশনে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা থানার অন্তর্গত নাটুকা রতনপুরে।

১৯৭১ সালের ৫ আগস্ট সম্মুখযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি। ওই যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ২৪ জনকে খতম করি আমরা। আমাদের মধ্যে শহীদ হন আটজন।

এই আটজন শহীদ হলেন—

* হাসান জামান (গোকুলখালী, চুয়াডাঙ্গা)

* খালেদ সাইফুদ্দিন তারেক (পোড়াদহ, কুষ্টিয়া)

* রওশন আলম (আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা)

* আলাউল ইসলাম খোকন (চুয়াডাঙ্গা শহর)

* আবুল কাশেম (চুয়াডাঙ্গা শহর)

* রবিউল ইসলাম (মোমিনপুর, চুয়াডাঙ্গা)

* কিয়ামুদ্দিন (আলমডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা)

* আফাজ উদ্দিন (দামুড়হুদা, চুয়াডাঙ্গা)

পরে চুয়াডাঙ্গার জগন্নাথপুর গ্রামের মানুষ রাস্তার পাশে দুটি কবরে চারজন করে আটজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার লাশ দাফন করেন। কালক্রমে এই আট মুক্তিযোদ্ধার কবরকে ঘিরেই স্থানটির নামকরণ হয় ‘আট কবর’।

এখানে পরবর্তী সময়ে একটি মুক্তমঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। পাশেই তৈরি হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রহশালা। বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের রাজধানী মুজিবনগর এখান থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে।

১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলে দীর্ঘ ৯ মাস। ৯টি মাস ছিল আমাদের জন্য বড় কষ্টের। কত মানুষ স্বজন হারিয়েছেন, কত যে বিচিত্র মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে!

অনেক যুদ্ধ, অনেক জীবন, অনেক রক্ত, অনেক মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে পেয়েছি আমরা এক টুকরা লাল–সবুজের পতাকা আর স্বাধীন ভূখণ্ড, যার নাম বাংলাদেশ।

এখনো সেসব দিন চোখের সামনে ভেসে ওঠে, যা কোনো দিন ভোলার মতো নয়।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-01%2Ffxszggrf%2FIMG-20251130-WA0194.jpg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় স্মৃতিসৌধ চুয়াডাঙ্গার আট কবর। ছবি: প্রথম আলো