Saturday, May 16, 2015

গৃহকর্মী-শিক্ষার্থীদের ভিক্ষুক সাজিয়ে ভিক্ষুক সমাবেশ!

ভিক্ষুক সমাবেশের ব্যানার। ছবি: মানসুরা হোসাইন
ভিক্ষুক মোতাহার সমাবেশের পুরো সময়
সিঁড়ির কাছে বসে কাটান। ছবি: মানসুরা হোসাইন
ভিক্ষুক সমাবেশের উপস্থিতি (অতিথিসহ)। ছবি: সংগৃহীত
নিজেদের ভিক্ষুক হিসেবে পরিচয় দেওয়া কয়েকজন
অন্যদের ছবি তুলতে দেখে এগিয়ে এলেন একজন প্রবীণ নারী।
ছবি তোলার পর জানালেন তিনি ভিক্ষুক নন। ছবি: মানসুরা হোসাইন
সমাবেশে স্কুল পড়ুয়া কয়েকজন শিশু। ছবি: মানসুরা হোসাইন
আপনি কি ভিক্ষা করেন? প্রশ্ন শুনে চমকে উঠলেন ফুলজান বিবি। সজোরে মাথা নেড়ে বললেন, ‘না বাবা, আমি ভিক্ষা করি না’। শহরবানু বললেন, ‘আমি বাসা বাড়িতে কাজ কইরা খাই। কী লজ্জার কথা! ভিক্ষা করব ক্যান? ’
তাহলে এ অনুষ্ঠানে এসেছেন কেন? মাথায় কাগজের যে ক্যাপ লাগিয়েছেন তাতেও লেখা আছে-‘ভিক্ষার হাত বাড়াব না, কর্মে নিব শিক্ষা’। এ কথা শুনে তাঁরা জানালেন, এলাকার অনেকেই এখানে আনা হয়েছে, তাঁদের সঙ্গে তাঁরাও এসেছেন।
ক্যাপে কী লেখা আছে তা তাঁরা জানেন না। ‘এইডা কি মাথা থেইক্যা খুইল্যা ফালামু’ বলে একজন উল্টো প্রশ্ন করলেন।
ফুলজান বিবি, শহরবানু এসেছেন ‘জাতীয় ভিক্ষুক সমাবেশে’। আজ শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের উল্টো পাশে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ভবনে এ সমাবেশের আয়োজন করে ‘উৎস-উন্নয়ন ত্বরান্বিত সংস্থা’। তবে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁদের বেশির ভাগই ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত নন।
অনুষ্ঠান শুরুর কথা ছিল সকাল ১০টায়, শুরু হয় দুপুর ১২টায়। এ সময় প্রতিবেদক অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে কথা বলেন।
অনুষ্ঠানের পরে টেলিফোনে উৎস-উন্নয়ন ত্বরান্বিত সংস্থার নির্বাহী পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস প্রথম আলোকে জানান, অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন ১০০ জন। আর ভিক্ষুক ছিলেন ৪০০ জন। এই ৪০০ জনের সবাই কি ভিক্ষুক?—এ পশ্নের জবাবে জান্নাতুল বলেন, ‘জি, সবাই প্রফেশনাল ভিক্ষুক।’
প্রথম আলোর কাছে অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই জানিয়েছেন তাঁরা ভিক্ষুক নন, এবং আজকের আয়োজন সম্পর্কেও কিছু জানেন না—এমন কথা বলার পর জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘সবাই তো আর আসেনি। আর আমিও সবাইকে চিনি না।’
ভিক্ষুক সমাবেশকে কেন্দ্র করে আয়োজক সংস্থা একটি র‍্যালির আয়োজন করে। র‍্যালিতে পাঁচটি ঘোড়ার গাড়ি ছিল। ছিল ব্যান্ডের বাজনাও। তবে ঘোড়ার গাড়িতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গাজী মোহাম্মদ নুরুল কবীর, উৎসের নির্বাহী পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌসসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা ওঠেন। আর ভিক্ষুকদের কয়েকজন ঘোড়ার গাড়ির সামনে হেঁটে যান।
এ র‍্যালিতে ‘অজনা মাশরুম ফুড প্রোডাক্টস’ এর মোবাইল ভ্যানও অংশ নেয়। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, নারীরা বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাঁরা রাজধানীতে ভ্যানে করে মাশরুম বিক্রি করবেন। তবে সবুজ জমিনে ও লাল পাড়ের শাড়ি ও সাদা সবুজ পোশাক পরা নারীরা জানালেন, তাঁরা এ বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ পাননি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী। এর বাইরে প্রায় ২৫ জনের নাম ছিল বিশেষ অতিথির তালিকায়। তবে শেষ পর্যন্ত সবাই উপস্থিত হননি এবং সময় স্বল্পতার কারণে বক্তব্যও দেননি। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব তারিক-উল ইসলামসহ বিশেষ অতিথির হাতে উৎস সম্মাননা ২০১৫ তুলে দেওয়া হয়।
ভিক্ষুক সমাবেশে শিশু কিশোরের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। সমাবেশে মাথায় ক্যাপ লাগানো সজিব, রবিউলসহ বেশ কয়েকজন শিশু ও কিশোরীও জানাল, তারা স্কুলে পড়াশোনা করে। তাদের কেউ বা পরিবারের কেউ ভিক্ষা করে না।
ঝর্ণা মিরপুর ১২ নম্বরে একটি স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। তার বাবা খেতে কাজ করেন আর মা মানুষের বাসায় কাজ করেন। ঝর্ণাও অন্যদের মতোই এখানে কিছু না জেনেই এসেছে। তাদের সবাইকে গাড়ি ভাড়া করে আনা হয়েছে। আবার গাড়ি দিয়ে পৌঁছে দেওয়া হবে।
তবে উৎসের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করা পারভীন আক্তার বললেন, বাচ্চারা ভিক্ষা না করলেও তাদের বাবা, মা, দাদি, নানি কেউ না কেউ ভিক্ষা করে। তারা দেখতে এসেছে।
সমাবেশে স্বল্প সংখ্যক ভিক্ষুকও উপস্থিত ছিলেন। মিরপুরের কালাপানি এলাকার রূপবানকে ভিক্ষা করেন কি না জানতে চাইলে বলেন, ‘কাইল যে ঘরে খাওন ছিল না কেউ তো জিগাইনি আমি খাইছি কি না? ’
উৎস তো আপনাদের বিভিন্ন সহায়তা দিচ্ছে যাতে করে আপনাদের আর ভিক্ষা করতে না হয়-এ প্রশ্নের উত্তরে রূপবান বলেন, ‘তিন বছর আগে পাঁচ হাজার ট্যাহা দিছিল। কিন্তু এই ট্যাহা দিয়া কি কিছু করন যায়? ’
নাদিম জানালেন, তিনি রিকশা চালান, তবে তাঁর মা ভিক্ষা করেন। তাঁর ভাষায় ‘পেট তো চালাইতে হইবো।’ মারুফার এক হাত ও পায়ে শক্তি নেই। দেড় মাস বয়সী সন্তান কোলে নিয়েই তিনি ভিক্ষা করেন বলে জানালেন।
হাইকোর্ট এলাকা থেকে এসেছেন মোতাহার। ঠেলাগাড়িতেই বলতে গেলে তাঁর পুরো সংসার। তাঁর পাশেই বসা একই এলাকার শাহিদা ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটেন। আরও কয়েকজন প্রবীণ ভিক্ষুক বিএমএ ভবনের সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতেই পারেননি। তাঁরা সিঁড়ির কাছেই বসে থাকেন।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী বলেন, ‘মন্ত্রী হিসেবে যেদিন শপথ নেই তার তিন দিনের মাথায় এই মহিলার (জান্নাতুল ফেরদৌস) সঙ্গে পরিচয়। এ মহিলাকে গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। তিনি কারও কাছ থেকে কোনো সাহায্য না নিয়ে মাশরুম বিক্রি করে মনের আবেগ দিয়ে কাজ করছেন। তাঁর আরাধনা পূরণ হোক সেই আশীর্বাদ করি। আমার মন্ত্রণালয় এই মহিলাকে সর্বোত্তমভাবে সাহায্য করতে প্রস্তুত।’
মন্ত্রী গণমাধ্যমকর্মীদের সামান্য কিছুতে খুঁত না ধরে বৃহত্তম স্বার্থে জান্নাতুল ফেরদৌসের কার্যক্রম প্রচারের জন্য আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘বেতন ভাতা দিতে হবে না, স্বেচ্ছাশ্রম দেব। আমি ভিক্ষুকদের নিয়ে সরকারের শেল্টার হোম পরিচালনার দায়িত্ব চাই। কীভাবে দেবেন তা আমি জানি না।’
মন্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসের বক্তব্যের মধ্যে মঞ্চে বসেই জান্নাতুল ফেরদৌসকে দায়িত্ব দেওয়ার ঘোষণা দেন।
নির্বাহী পরিচালকের বক্তব্য: উৎস এনজিও ১৯৯৯ সাল থেকে কাজ করছে বলেও জানালেন জান্নাতুল ফেরদৌস। তবে এ পর্যন্ত কতজন ভিক্ষুককে পুনর্বাসন করা হয়েছে তা ‘লিস্টে লেখা নেই’ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে ভিক্ষুকসহ এ পর্যন্ত ৩ হাজারের বেশি মানুষের পুনর্বাসন করেছেন।
ভিক্ষুকদের দিয়ে মাশরুম চাষ করিয়ে সেই মাশরুম থেকে যে আয় তা দিয়েই ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন করেন বলেও জানালেন জান্নাতুল। তবে আজকের অনুষ্ঠানে যাঁরা মাশরুমের ভ্যান পেয়েছেন তাঁদের মধ্যে কেউ ভিক্ষুক নন। কেউ কেউ শিক্ষিত। কয়েকজন জান্নাতুল ফেরদৌসের আত্মীয়। একজন জানালেন, তাঁকে আনসারের প্রশিক্ষণের কথা বলে আনা হয়েছে। বাসাবাড়িতে কাজ করা মিরপুরের এক নারী জানালেন, তিনি আজকেই প্রথম এসেছেন। তবে জান্নাতুল ফেরদৌস দাবি করেন, তাঁদের সবাইকে মাশরুম চাষ নিয়ে সাত দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

সর্বগ্রাসী কোটা সংস্কারের উদ্যোগ নেই by নূর মোহাম্মদ

কোটায়পিষ্ট মেধাবীরা। সরকারি চাকরির ৫৬ ভাগই কোটাধারীদের দখলে। বাকি ৪৪ ভাগ মেধাবীদের। ভাল পরীক্ষা দিয়েও কোটার কাছে ধরা খেয়ে যাচ্ছেন মেধাবীরা। জুটছে না সরকারি চাকরি। ফলে দিনের পর দিন চাকরি না পাওয়ার হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছেন অনেকেই। এ রকম হতাশা থেকেই গত বছর ৩রা জুন আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী মাহবুব শাহীন। এদিকে কোটা ব্যবস্থাকে বৈষম্যমূলক হিসেবে চিহ্নিত করে একাধিক পর্যালোচনা ও রিপোর্ট প্রকাশিত হলেও কোন সরকারই এ নিয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এমনকি সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) প্রতি বছর তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে বারবার কোটা সংস্কারের সুপারিশ করলেও আমলে নিচ্ছে না জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারি চাকরির নিয়োগে প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতিনি ৩০ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, জেলা ১০ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ কোটা রয়েছে। সব মিলিয়ে কোটাই ৫৬ শতাংশ। অথচ পঞ্চম আদমশুমারি ও গৃহগণনা অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যা ১৪ কোটি ৯৭ লাখ ৭০ হাজার। এর মধ্যে ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ১৪১ জন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং ২০ লাখ ১৬ হাজার ৬১২ জন প্রতিবন্ধী। আর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দুই লাখ ৯ হাজার। এই হিসাবে মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ১০ শতাংশ নৃগোষ্ঠীর জন্য কোটা সংরক্ষিত আছে ৫ শতাংশ, ১ দশমিক ৪০ শতাংশ প্রতিবন্ধীর জন্য ১ শতাংশ এবং শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা রয়েছে। অন্যদিকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর চাকরির নিয়োগ পুরোটাই কোটার ভিত্তিতেই হয়। এতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতিনি ৩০ শতাংশ, নারী ১৫ শতাংশ, নৃগোষ্ঠী ৫ শতাংশ, জেলা ৩০ শতাংশ, এতিম ও প্রতিবন্ধী ১০ শতাংশ এবং আনসার-ভিডিপির জন্য ১০ শতাংশ কোটা রয়েছে।
এ বিষয়ে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) চেয়ারম্যান ইকরাম আহমেদ বলেন, জনপ্রশাসনে শূন্য পদ না রাখতে প্রচলিত কোটা পদ্ধতির পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত। এ সংস্কারের জন্য পিএসসি থেকে কয়েক দফার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এটার বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব সরকারের। আমরা কর্মকমিশনের মাধ্যমে সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থীকে বাছাই করেছি, ফলে দিন দিন সিভিল সার্ভিসের প্রতি মেধাবী শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ছে। একইভাবে পিএসসির ক্রেডিবিলিটি বা গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ছে।
২০০৮ সালে পিএসসির উদ্যোগে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা নিয়ে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সাবেক শিক্ষা সচিব কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। ওই বছরের মার্চ মাসে ‘কোটা সিস্টেম ফর সিভিল সার্ভিস রিক্রুটমেন্ট ইন বাংলাদেশ: এন এক্সপ্লোরেটরি’ শীর্ষক রিপোর্ট পিএসসির কাছে জমা দেন। একই বছরে কোটাব্যবস্থা সংস্কারে সুপারিশসহ রিপোর্টটি সরকারের কাছে জমা দেন তারা। আকবর আলি খান এই কোটাব্যবস্থাকে বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়ে বলেন, অধিকাংশ কোটাই অসাংবিধানিক ও ন্যায়নীতির পরিপন্থি। কোন কোটাই চিরদিন থাকতে পারে না। প্রত্যেক কোটার সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, দেশে যখন ১৭ জেলা ছিল তখন চালু হয় জেলা কোটা। পরে ১৭ জেলা ভেঙে ৬৪টি করা হলেও সেই কোটাই রয়ে গেছে। অন্যদিকে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে উপজাতি ও প্রতিবন্ধী কোটা সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে ২৫৭ ধরনের কোটা প্রচলিত আছে বলে তথ্য দেন সাবেক এই মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর চাকরিতে শতভাগ কোটা রয়েছে উল্লেখ করে রিপোর্টে বলা হয়, এ চাকরিগুলো বেশির ভাগ অদক্ষ ও কম গুরুত্বপূর্ণ বলা হলেও প্রকতপক্ষে তা পুরো সত্য নয়। এখানে কিছু পদে দক্ষতার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে আনসার-ভিডিপি কোটাকে বাংলাদেশ সংবিধানের ২৯(৩) অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করা হয়। রিপোর্টের সারসংক্ষেপে বিদ্যমান ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা কমিয়ে ১৫ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ এবং উপজাতি ৫ শতাংশ রাখার সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে জেলা কোটা তুলে দিয়ে জাতীয় মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়ার সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া স্বাধীনতার পরপরই বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত চাকরি পুনর্গঠন কমিশন ১৯৭৩ সালে আর ১৯৭৭-এ বেতন ও চাকরি-সংক্রান্ত রসিদ কমিশন কোটাপদ্ধতির সুস্পষ্ট বিরোধিতা করে। তাদের মতে, কোটাপদ্ধতি একটি শীর্ষ মানের জনপ্রশাাসন গড়ার প্রতিবন্ধক হবে। ১৯৯৩ সালে তদানীন্তন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. আইয়ুবুর রহমানের নেতৃত্বে চারজন সচিবের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি কোটাপদ্ধতিতে নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় মেধাকে অস্বীকারের নামান্তর বলে মন্তব্য করেন। ২০০০ সালে কোটা নিয়ে প্রতিবেদন দেন এ টি এম শামসুল হকের নেতৃত্বাধীন জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। সে প্রতিবেদনে কোটাব্যবস্থাকে সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলা হয়। কোটাব্যবস্থা কোন যৌক্তিক ভিত্তির দ্বারা সমর্থিত নয়, বরং এটা জনপ্রশাসনের গুণগত মান হ্রাসে প্রভাব ফেলছে।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, একদিকে সরকার মেধাবীদের সরকারি চাকরিতে আসার অনুরোধ করছে, অন্যদিকে কোটায় তাদের পিষ্ট করে রাখছে। কোটার কারণে মেধাতালিকায় অনেক নিচের প্রার্থীরাও গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় চাকরি পেয়ে যাচ্ছেন। সুতরাং, গোড়াতেই যেখানে গলদ, সেখানে মান উন্নয়নের প্রচেষ্টা তেমন সফল হওয়ার কথা নয়। যেমন বীজ, ফলন হবে তেমনই হওয়া কথা। বিদ্যমান কোটা জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার হওয়া প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিসিএস ও প্রথম শ্রেণীর সরকারি চাকরির নিয়োগে ৬০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়েও মেধাবীরা চাকরি পাচ্ছে না। অন্যদিকে বিসিএসে ৫০ শতাংশের কাছাকাছি নম্বর পেয়ে অনায়াসেই চাকরি মিলছে কোটাধারীদের। অন্যান্য সরকারি চাকরিতে কোটাধারীরা ৩৩ শতাংশ নম্বর পেয়ে চাকরি পাচ্ছেন। এ ছাড়া লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় কোটাধারীদের বিশেষ সুবিধা দেয়ার পরও যোগ্যপ্রার্থী পাওয়া যায় না। ফলে প্রতিটি বিসিএসে শূন্য থাকছে অসংখ্য পদ। পিএসসির বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত ৩০ ভাগ কোটার অল্পসংখ্যকই পূরণ হচ্ছে। গত ২১, ২২ ও ২৫তম বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত কোটা যথাক্রমে ১০ দশমিক ৮, ২ দশমিক ২ ও ৫ দশমিক ২ ভাগ পূর্ণ হয়। সর্বশেষ ৩৩তম বিসিএসেও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ২ হাজার ৭০২ শূন্যপদের বিপরীতে যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায় মাত্র ৪৩০ জন। আরও দেখা যায়, বিভিন্ন প্রাধিকার কোটায় যোগ্য প্রার্থী না থাকায় ২৮তম বিসিএসে ৮১০, ২৯তম ৭৯২, ৩০তম ৭৮৪, ৩১তম ৭৭৩, ৩২তম (বিশেষ) ১ হাজার ১২৪ এবং ৩৩তম বিসিএসে ৪৭৯টি (বেশির ভাগই সাধারণ ক্যাডার) শূন্যপদে সুপারিশ করতে পারেনি পিএসসি। প্রতি বছর এমনভাবেই যোগ্যপ্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও কোটাধারী না হওয়ায় শূন্যপদে নিয়োগ পাচ্ছেন না মেধাবীরা।
এদিকে শুধু সরকারি চাকরির নিয়োগে কোটা অনুসরণে বিধি ও বাধ্যবাধকতা থাকলেও বর্তমানে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের নিয়োগেও এ কোটাব্যবস্থা কার্যকর করা হচ্ছে। এভাবে কোটার সর্বগ্রাসী প্রয়োগের ফলে মেধাবীদের আর চাকরি পাওয়া সম্ভব নয় জানিয়ে ক্ষোভের সঙ্গে দুবার বিসিএস ভাইভা দেয়া জোবায়ের আবদুল্লাহ বলেন, এ কোটাব্যবস্থা সুস্পষ্ট বৈষম্যমূলক। এটি শিক্ষিত তরুণসমাজের সঙ্গে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়। এ কোটাব্যবস্থার সংস্কার সারা দেশের তরুণসমাজের দাবি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কামাল আবদুল নাসের বলেন, কোটা সমীক্ষা রিপোর্ট ও পিএসসি সুপারিশ বিষয়ে বেশ কিছু পর্যালোচনা আমাদের কাছে রয়েছে। তবে এসব নিয়ে আপাতত কোন পরিকল্পনা সরকারের নেই। যদিও এটি সংস্কার হওয়ার প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।
খোদ বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনও (পিএসসসি) বর্তমান কোটা ব্যবস্থাকে জটিল, দুরূহ ও সময়সাপেক্ষ উল্লেখ করে এর সংস্কার ও সরলীকরণে বারবার সুপারিশ করেছে। পিএসসি তাদের ২০০৯, ২০১১ ও ২০১৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বিদ্যমান কোটাব্যবস্থা সংস্কারের সুপারিশ করে বলে, বর্তমানের কোটা-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রয়োগ অত্যন্ত জটিল, দুরূহ ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। প্রচলিত কোটা পদ্ধতির জটিলতার কারণে উপযুক্ত প্রার্থী নির্বাচন শতভাগ নিখুঁতভাবে সম্পাদন করা প্রায় অসম্ভব। বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে উপযুক্ত প্রার্থী মনোনয়নের জন্য বর্তমানে প্রচলিত কোটা পদ্ধতির সরলীকরণ অপরিহার্য। গত বছর ২১শে ডিসেম্বর প্রস্তাবিত অষ্টম পে ও সার্ভিস কমিশনে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাবনা দেয়া হলেও কোটা সংস্কার নিয়ে কোন প্রস্তাবনা দেয়া হয়নি।
জানা গেছে, ১৯৭৭ সালে তৎকালীন পে ও সার্ভিস কমিশনের একজন সদস্য বাদে সবাই সরকারি নিয়োগে কোটাব্যবস্থার বিরোধিতা করেন। কোটার পক্ষে অবস্থা নেয়া এম এম জামান প্রচলিত কোটাগুলো প্রথম ১০ বছর বহাল রেখে ১৯৮৭ সাল থেকে পরবর্তী ১০ বছরে ধীরে ধীরে কমিয়ে দশম বছরে তা বিলুপ্ত করার পক্ষে মত দেন। কিন্তু পরে ১৯৯৭ সালেই এ কোটাব্যবস্থাকে আরও সম্প্রসারিত করে বর্তমানে ৫৬ শতাংশ বহাল আছে।

৬৮তম কান চলচ্চিত্র উৎসব- তারা ভরা দিন by ইকবাল হোসাইন চৌধুরী

গ্রিক চলচ্চিত্র পরিচালক ইয়োরগোস লানথিমোস (বাঁ থেকে তৃতীয়)
নির্মিত লবস্টার ছবির তারকাবহুল সংবাদ সম্মেলন। (বাঁ থেকে)
লিয়া সেদু, কলিন ফেরেল, র্যাচেল ভাইস, আরিয়ান লাবেদ
ও বেন হুইশ। গতকাল কান চলচ্চিত্র উৎসবে l ছবি: এএফপি
কাকে ফেলে কাকে দেখি! একদিকে হলিউড তারকা কলিন ফেরেল, ভাবী ফরাসি বন্ডকন্যা লিয়া সেদু, অভিনেত্রী র‌্যাচেল ভাইস, অভিনেতা জন সি রেইলি; আরেক দিকে উডি অ্যালেন, এমা স্টোন। কান উৎসব কাল মাতিয়ে রেখেছিলেন মূলত হলিউড তারকারাই। আর হলিউড তারকাদের আগমন মানেই সবখানে উপচে পড়া ভিড়। বাড়তি ছোটাছুটি।
হঠাৎ র‌্যাচেল ভাইস: এর মধ্যেই মাঝপথে দেখা পেয়ে গেলাম অভিনেত্রী র‌্যাচেল ভাইসের। কালো জাম্পস্যুটে অপরূপা। ছবি তোলার পালা শেষ করে ফিরছিলেন প্যালে ডে ফেস্টিভ্যালের পথে। সেখানেই আচমকা দেখা মিলল এই ব্রিটিশ-আমেরিকান অভিনেত্রীর।
সম্ভবত কড়া রোদে মেকআপ নষ্ট হওয়ার কারণে খানিক ছায়ায় দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গী সহযোগী রূপসজ্জাকরকে দেখছি দ্রুত তাঁর মেকআপ ঠিক করে দিতে। মেকআপ ঠিকঠাক করেই র‌্যাচেল আবার হাঁটা ধরেছেন তাঁর পথে। ইয়োরগোস লানথিমোসের লবস্টার ছবির তারকাবহুল সংবাদ সম্মেলন হয়ে গেছে কাল। র‌্যাচেল ভাইস, কলিন ফেরেলদের সদলবলে কান আগমন সেই সূত্রেই।
উডি যখন এলেন: কিন্তু উডি অ্যালেন যেন একাই এক শ। অভিনেত্রী এমা স্টোনসহ তিনি উৎসবে আসতেই সব মনোযোগ নিমেষে তাঁর দিকে। ৫০ বছরেরও বেশি সময়ের ক্যারিয়ার তাঁর। অস্কার মনোনয়ন পাওয়া বা অস্কার বিজয়—সবই এখন তাঁর কাছে একরকম ডালভাত। অভিনেতা ও নির্মাতা—দুই হিসেবেই আমেরিকান ছবির সত্যিকার এক আইকন।
অ্যানি হল, ম্যাচ পয়েন্ট, স্কুপ, ভিকি ক্রিস্টিনা বার্সিলোনা, থেকে হালের ব্লু জেসমিন। উডি অ্যালেনের ছবির সংখ্যাও যেন অগণিত। এবারে উডি অ্যালেনের ইরেশনাল ম্যান আছে কান চলচ্চিত্র উৎসবের আউট অব কম্পিটিশন বিভাগে। সেই সূত্রেই এই মার্কিন কিংবদন্তির কান চলচ্চিত্র উৎসবে আগমন।
সেই কালো চশমা, সেই পাকা চুল। গায়ে চেক শার্ট। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর। কিন্তু উডি অ্যালেন কথায় আর রসিকতায় কম যান না কিছুতেই।
উডি অ্যালেনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনার ছবির মানুষগুলো কেন প্রায়শ অবিশ্বস্ত? সম্পর্কগুলো কেন এত ভঙ্গুর? এটা কি এই সময়ের মানুষের সমস্যা?
উডি অ্যালেনের জবাব ছিল, ‘মানুষের বিশ্বস্ততা বা দ্বিচারী মনোভাব—কোনোটি আজকের সমস্যা নয়। সেই শেক্সপিয়ারের সময় থেকে এটা আছে। মানুষ সেই শুরু থেকে প্রবঞ্চক। সম্পর্কের এই ক্ষণস্থায়িত্ব কেবল আজকের সমস্যা নয়।’
ইরেশনাল ম্যান: উডি অ্যালেনের এবারের ছবিটিও সম্পর্কের জটিলতাবিষয়ক। ছবির গল্প একজন দর্শনের অধ্যাপককে নিয়ে। যিনি জীবনের কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
এমন সময়ে তিনি চলে যান এক প্রত্যন্ত গ্রামে। দাম্পত্য জটিলতায় আক্রান্ত দর্শনের অধ্যাপকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয় তাঁর ক্লাসের সেরা ছাত্রীটির। উডি অ্যালেন জানিয়েছেন, এমা স্টোনকে তিনি এই ছবির জন্য নাকি বাছাই করেছিলেন একদম হুট করেই।
‘ওর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। কোথায় যেন হুট করে দেখা হয়ে গেল। দেখেই আমার মনে হলো, বাহ্! মেয়েটা তো খুব সুন্দর। আবার অভিনয়ও দেখলাম ভালো। ব্যস, তাকে নিয়ে নিলাম।’ বলছিলেন উডি।
পাশ থেকে হেসে সায় দিলেন এমা স্টোন। গেল অস্কারে ঝড় তোলা বার্ডম্যান ছবির সুবাদে এমার বৃহস্পতি এমনিতেই তুঙ্গে। এবারে আবার উডি অ্যালেনের ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ। সময়টা বেশ ভালোই যাচ্ছে তাঁর।
ভারতের ছবি চোথি কোঠ
কাল দিবুসি হলে প্রদর্শিত হয়েছে ভারতীয় পরিচালক গুরবিন্দর সিংয়ের ছবি চোথি কোঠ। এই ছবি দিয়েই এবার কানে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে ভারত। ১৯৮৪ সালের পাঞ্জাবের পটভূমিতে তৈরি হয়েছে আন সার্টেন রিগার্ড বিভাগে জায়গা করে নেওয়া এই ছবি।
কাল ছিল হাঙ্গেরির সাউল ফিয়া ছবিরও উদ্বোধনী প্রদর্শনী। নির্যাতন ক্যাম্পের ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছে এই ছবি।
এদিকে, উৎসবে এরই মধ্যে জমে উঠেছে ভিলেজ ইন্টারন্যাশনাল অংশে নানা দেশের ছবি আর ঐতিহ্য তুলে ধরার প্রতিযোগিতা। গতকার সমকালীন ভারতীয় ছবির সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা ছিল ভারতীয় তাঁবুতে।
সিমেন দে লা ক্রিটিকসহ কান উৎসবের সঙ্গে চলমান নানা বিভাগের ছবির প্রদর্শনী ছিল দিনজুড়ে। সাগরপাড়ে সিনেমা দেখার আয়োজনে ছিল জাপানি কিংবদন্তি আকিরা কুরোসাওয়ার রেন-এর প্রদর্শনী।

ভারত চীনের পুনরুত্থান একবিংশ শতাব্দীর মাইলফলক

ভারত-চীনের সম্পর্কোন্নয়নে পরস্পরকে প্রতিশ্র“তি দিলেন দুই রাষ্ট্রপ্রধান। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তিনদিনের বেইজিং সফরে দুই দেশের আস্থা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে গুরুত্বারোপ করা হয়। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্কের নজির হিসেবে সই হয়েছে ১০০০ কোটি ডলারের ২৪টি চুক্তি। অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার জন্য ১০ বিলিয়ন ডলারের এসব চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর মোদি বলেন, দু’দেশের মধ্যে একাধিক বিতর্কিত বিষয় থাকলেও এ চুক্তি আগামী দিনে সুসম্পর্ক তৈরি করবে ভারত-চীনের। অন্যান্য চুক্তির মধ্যে রেলওয়ে, খনিজ ও খনি খাত, মহাশূন্য, পর্যটন, বাণিজ্য, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া উভয় দেশ অতিরিক্ত কনস্যুলেট জেনারেল ও চীন-ভারত থিঙ্ক ট্যাংক ফোরাম প্রতিষ্ঠার চুক্তিও করেছে। এ বছরটা চীনে ‘ইয়ার অব ইন্ডিয়া’ হিসেবে চিহ্নিত। আগামী বছরটাকে ভারতে চিহ্নিত করা হবে ‘ইয়ার অব চায়না’ হিসেবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর শুক্রবার এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘ভারত ও চীনের পুনরুত্থান একবিংশ শতাব্দীর এক মাইলফলক। দুই দেশের এ সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে আমাদের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সীমান্ত অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজার রাখতে সব ধরনের প্রচেষ্টা গ্রহণের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা আমরা পুনর্ব্যক্ত করেছি। একে অপরের স্বার্থের প্রতি আমাদের সংবেদনশীল হতে হবে।’ মোদি বলেন, ‘আমরা কিছু প্রাদেশিক সমস্যা নিয়েও আলোচনা করেছি। পারস্পরিক বিশ্বাস আরও শক্তিশালী করা এবং সতর্কতার সঙ্গে আমাদের মধ্যকার সমস্যা সমাধানের বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি।’
দুই দেশের অংশীদারিত্বের পূর্ণাঙ্গ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপদান করা থেকে উভয় দেশকে পিছিয়ে দিয়েছে এমন কিছু বিষয়ে চীনের কৌশল পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন।
মোদি আরও বলেন, ‘আমি ভিসা নীতি ও আন্তঃসীমান্ত নদী সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি কামনা করেছি এবং আমদের আঞ্চলিক কিছু উদ্বেগের বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আমি সীমান্ত অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সব প্রচেষ্টা গ্রহণে আমাদের শক্তিশালী অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছি।’
চীনাদের জন্য ই-ভিসার ঘোষণা মোদির : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার তিন দিনব্যাপী চীন সফরের দ্বিতীয় দিনে চীনা নাগরিকদের জন্য ইলেকট্রনিক বা ই-ভিসা চালু করার ঘোষণা দিয়েছেন। মোদি শুক্রবার বিকালে বেইজিংয়ে সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে বক্তৃতাকালে এ ঘোষণা দেন।
বক্তৃতায় নরেন্দ্র মোদি বলেন, ভারতীয়রা আগামী প্রজন্মের অবকাঠামো প্রকল্পে বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ করছে। তিনি বলেন, ভারত বীমা খাতে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এএফপি।

অস্বীকারের রাজনীতি by কাবেরী গায়েন

পয়লা বৈশাখে টিএসসি চত্বরে যে সংঘবদ্ধ যৌনসন্ত্রাসের ঘটনাটি ঘটেছে, সে বিষয়ে পুলিশ প্রশাসন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরের অস্বীকারের বিপরীতে দেশবাসী বিশ্বাস করেছে ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি লিটন নন্দীর নিজের ভাঙা হাতের সাক্ষ্যে দেওয়া বক্তব্যকে। তাই একজন-দুজন করে জড়ো হতে হতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী-শিক্ষক-সাংস্কৃতিক কর্মীর মানববন্ধন ২০ এপ্রিল কলা ভবন থেকে রাজু ভাস্কর্য হয়ে দোয়েল চত্বর পেরিয়ে কার্জন হল পর্যন্ত উপচে পড়েছে। একটি ছাত্র সংগঠনের ডাকে হাজার হাজার মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, এসব আন্দোলনে দেওয়া বক্তব্য এবং সামাজিক মাধ্যমে নানা প্রজন্মের নারীদের ক্রমেই নিজেদের অভিজ্ঞতার উন্মোচন এক অভূতপূর্ব জাগরণের সূচনা করেছে। সারা দেশের সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই বিষয়ে সংহতি জানিয়ে প্রতিবাদ ও মানববন্ধন অব্যাহত রেখেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, টিএসসি সহ আরো অনেক স্থানে নারীকে
বিবস্ত্র করে যৌন নির্যাতন করা হয়। হরণ করা হয় নারীর সতীত্বকে।
বর্ষবরণের নামে যা করা হয়েছে তার দায়ভার কে নেবে? এভাবে
বাংলা উৎসব গুলি বা নববর্ষতে যদি নারীর শ্লীনতাহানি,
নারীর প্রতি পাশবিক অত্যাচার,নববর্ষ মানে যদি হয়
আমার দেশের ধর্ষিতা মা-বোনদের করুন আর্তনাদ!
অথচ শুরুর দিন থেকেই পুলিশ প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ঘটনাটি অস্বীকার করা এবং লিটন নন্দীকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করতে চাওয়ার মরিয়া চেষ্টা দেখে মনে হয়েছে যেন লিটন নিজের হাতটি ভেঙে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করেছে। এসব অস্বীকারের বিপরীতে সারা দেশ লিটনকেই বিশ্বাস করেছে। প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার ধারাবাহিক চেষ্টা।
অস্বীকারপর্ব এক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এত বড় একটি আয়োজনে, যেখানে লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ হওয়ার কথা, সেখানে আইনশৃঙ্খলা ÿরক্ষাকারী বাহিনীকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। এত মানুষের ভিড়ে এমন ঘটনা ঘটা দুঃখজনক ও নিন্দনীয় হলেও এমনটি ঘটে যেতে পারে, সেটিও বোধগম্য। পুলিশ প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে এমন ঘটনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। কারণ, চালু থাকা সিসি টিভিতে কন্ট্রোল রুমে বসেই কোথায় কী হচ্ছে দেখে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। লিটন নন্দী বারবার বলেছেন যে তিনি ও তাঁর বন্ধু সুমন, অমিত, তুহিন, সাদ্দাম পুলিশের কাছে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে সোপর্দ করা সত্ত্বেও পুলিশ তাদের ছেড়ে দিয়েছে।
আগের ঘটনার বিচার কি হয়েছিল? এবারের ঘটনার বিচার ও কি হবে?
বস্ত্রহরণরত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল ছাত্রলীগ নেতা রাসেল ও
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গনিত বিভাগের ছাত্র ছাত্রলীগ নেতা আলম
শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রক্টর ঘটনাটিকে অস্বীকার করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন যে লিটন নন্দী ছাড়া এই ঘটনার কোনো সাক্ষী নেই, কোনো নারী তো কোনো অভিযোগ দেননি, এমনকি তিনি পুলিশকে সোপর্দ করার বিষয়ে লিটন নন্দীর দাবিকেও অস্বীকার করার জন্য পুলিশকেই সাক্ষ্য মেনেছেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত তো ছিল যে লিটন নন্দী যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র, যেহেতু তাঁর ভাঙা হাত একটি অস্বাভাবিক ঘটনাকে সাক্ষ্য দেয়, প্রথমে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে তিনি পুলিশ প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি চাইবেন। এ ঘটনায় লিটন নন্দী তো একজন প্রত্যক্ষদর্শী। কেন তাঁর সাক্ষ্য একজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য হিসেবে তিনি আমলে নিতে চাইলেন না, সেটিও বোধগম্য নয়।
প্রতিবাদ করতে গিয়ে হামলায় আহত লিটন নন্দী
অস্বীকারপর্ব দুই: পুলিশ প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে লিটন নন্দীর আনা অভিযোগকে প্রথমে উড়িয়ে দিতে চেয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে মাত্র কয়েক গজের মধ্যে পুলিশ বক্স, একই রাস্তার মাথায় শাহবাগ থানা এবং ১৯টি সিসি টিভি চালু থাকা সত্ত্বেও প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে টিএসসির মতো জায়গায় দিনের আলোতে এমন সংঘবদ্ধ ঘটনার দায় তারা এড়াতে পারে না। কাজেই ঢালাও অস্বীকার করা ছাড়া তাদের উপায় নেই। ঘটনার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী ও অংশগ্রহণকারী তুহিন দাস বারবার সুনির্দিষ্টভাবে দাবি করে গেছেন পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর আশরাফুল ইসলামের কাছে দুজনকে সোপর্দ করার কথা। প্রথম দিন পুলিশ অস্বীকার করেছে। ডিএমপির রমনা জোনের উপকমিশনার আবদুল বাতেন বলেছেন, এ ঘটনার কি কোনো ডকুমেন্ট আছে বা কোনো ছবি আছে? মাত্র একটি সিসি টিভির ফুটেজ প্রকাশিত হওয়ার পরই ঘটনাপ্রবাহ পাল্টে যেতে থাকে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ইব্রাহিম খান স্বীকার করেছেন যে ‘আশরাফের কাছে যে দুর্বৃত্তকে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আশরাফ তাকে ছেড়ে দেন। কারণ, তাঁকে আরেক জায়গায় যেতে হয়েছিল তাঁর সুপারভাইজারের নির্দেশে।’ (দ্য ডেইলি স্টার, ১৮ এপ্রিল, ২০১৫)
ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের পাশে (গোল চিহ্নত)
পয়লা বৈশাখে যৌন হয়রানির ঘটনায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতা
নিশাত ইমতিয়াজ বিজয়।
অস্বীকারপর্ব তিন: সিসি টিভির ফুটেজ প্রকাশের পরে পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাগুলোকে যখন আর অস্বীকার করতে পারলেন না, তখন যা দেখা গেছে ফুটেজে, সেসব ঘটনাকে ‘যৌন হয়রানি’ বলতে অস্বীকৃতি জানালেন। ভিডিও ফুটেজ দেখে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম বললেন, ‘এ পর্যন্ত কোনো নারীর বস্ত্র হরণের চিত্র পাওয়া যায়নি’, ‘যা পাওয়া গেছে, তা সামান্য ধাক্কাধাক্কি, যৌন হয়রানি নয়’। (দ্য ডেইলি স্টার, ওই) এমনকি তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যে লিটন কি একজন আদর্শ নাগরিকের কাজ করেছেন? টিএসসিতে যে পুলিশ ছিল, তাদের সাহায্য কি তিনি চেয়েছেন? ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বললেন, ‘নববর্ষে বিবস্ত্রের কোনো ঘটনা ঘটেনি।’ (সমকাল, ১৯ এপ্রিল) এসব উদ্ধৃতি আর না বাড়াই।
স্বীকৃতিপর্ব: জয়তু ফুটেজ: ঘটনাটি ঘটার একদিন পর্যন্ত গণমাধ্যমে বিষয়টি সেভাবে আসেনি অনলাইন পত্রিকা ছাড়া, তোলপাড় হয়েছে সামাজিক মাধ্যম। তবে ১৬ এপ্রিল থেকে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো এ বিষয়ে টক শো এবং লিটন নন্দীর বক্তব্য প্রচার করতে থাকে। ১৭ এপ্রিল থেকে সিসি টিভি ফুটেজ পরীক্ষা শুরু হলে প্রায় সব গণমাধ্যমেই বিষয়টি প্রকাশিত হতে থাকে গুরুত্বের সঙ্গে নাগরিক মতামতসহ। হাইকোর্টের নির্দেশ এ ক্ষেত্রে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দেরিতে হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ২০ এপ্রিল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডয়েচেভেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘যৌন নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, তারা বহিরাগত।’ এমনকি আবদুল বাতেন পর্যন্ত ডয়েচেভেলেকে বলেছেন, ‘আমরা সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করেছি। তাতে পয়লা বৈশাখের দিনে টিএসসিতে নারী লাঞ্ছনার সঙ্গে জড়িত তিন থেকে চারজনকে চিহ্নিত করতে পেরেছি।’
কালের যাত্রার ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি: প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকার-অস্বীকারের চাপান-উতোরের মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে লিটন নন্দী যদি তাঁর বন্ধু-সহযোদ্ধাদের সঙ্গে সেদিনের ঘটনায় রুখে না দাঁড়াতেন, তবে চাপা দেওয়া হতো ঘটনাটি। তাঁদের আন্দোলনের কারণেই গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে সব প্রজন্মের নারীরা জানাচ্ছেন পয়লা বৈশাখে, একুশের বইমেলায়, বসন্ত উৎসবে, বাজারে, গানের কনসার্টে তাঁদের ওপর অহরহ ঘটা যৌন হয়রানির অভিজ্ঞতা, যার কোনো প্রতিকার হয়নি কখনো। এ বছরও টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে বৈশাখী মেলা দেখতে এসে পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এ জাতীয় ঘটনা খুব বেশিই ঘটছে। প্রায়ই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ–জাতীয় ঘটনাগুলো চেপে রাখতে চেষ্টা করে মূলত দুটি কারণে। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তির কথা চিন্তা করে; দ্বিতীয়ত, এসব অপকর্মের সঙ্গে প্রায়ই ক্ষমতাসীন দলের লোকজন জড়িত থাকেন, যার সবশেষ উদাহরণ জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এ বছরের ঘটনা। ২০০০ সালের শুরুর দিনে এই টিএসসিতেই বাঁধন লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটেছিল। তখনকার সরকারদলীয় এক সাংসদ ঘোষণা দিয়েছিলেন, যদি কোনো মেয়ে থার্টি ফার্স্ট রাতে বাইরে আসে, তবে তার পরিণতিও হবে বাঁধনের মতো। সেই সাংসদকে এই কদর্য বক্তব্যের জন্য আইনের আওতায় আনা হয়নি, আনা হয়নি আইনের আওতায় ১৯৮৯ সালে ডাকসু নির্বাচনোত্তর রোকেয়া ও শামসুন নাহার হল সংসদের বিজয়ী নেতাদের মিছিলে পরাজিত ছাত্রসংগঠনের নেতাদের হামলার। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির মধ্যেই প্রশ্রয় পায় এসব অপরাধ।
‘যৌন নির্যাতন’বিরোধী আন্দোলন হলো সেই দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন, যেখানে দলমত-নির্বিশেষে সবার আন্তরিক অংশগ্রহণ প্রয়োজন। নববর্ষের মতো অসাম্প্রদায়িক উৎসবকে বিতর্কিত করার জন্য এবং জনপরিসরে নারীর অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার জন্য ধর্মীয় উগ্রগোষ্ঠীর উসকানি ও প্রচারণা এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে জোরারোপিত হয়। যেমন শফী হুজুর ইতিমধ্যেই এই ঘটনার জন্য নারীর পোশাককে দায়ী করে শুধু নববর্ষে নারীর অংশগ্রহণ নয়, বরং স্কুল-কলেজে নারীর পড়াশোনাও বন্ধ করতে বলেছেন। তাই রাষ্ট্রও এমন ঘটনায় মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারে না।
অতএব, দাবি পরিষ্কার। প্রথমত, এ ঘটনায় যারাই জড়িত হোক, প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। দ্বিতীয়ত, ঘটনার দিন পুলিশ প্রশাসন ১৩১টি ক্যামেরায় কন্ট্রোল রুমে এসব ঘটনা পরিষ্কারভাবে দেখেও (প্রথম আলো, ২১ এপ্রিল ২০১৫) কেন ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে, সেই বিষয়টিও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তে আসতে হবে, এটি কেবল শাহবাগ থানার এসআই আশরাফুল আলমকে প্রত্যাহার করার মাধ্যমে শেষ হতে পারে না।
উন্মোচিত হোক অস্বীকারের রাজনীতি। জয়যুক্ত হোক জনপরিসর নারীর জন্য বাধাহীন করার আন্দোলন।
ড. কাবেরী গায়েন: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বিয়ের পিড়িতে না বসলে বিড়ম্বনা -বিবিসি

অনেকদিন পর এক আত্মীয়র বিয়েতে গেছেন ৩৭ বছর বয়সী ব্যবসায়ী জর্জ ডি কস্তা।
বিয়ের দাওয়াতে গিয়ে কিছুক্ষণ পর তিনি নিজেই হয়ে গেলেন সম্ভাব্য একজন পাত্র।
অপরিচিত এক অবিবাহিত নারীকে তার পাশে বসিয়ে দিয়ে গায়েব হয়ে গেলেন আত্মীয়রা।
পাত্রী দেখতে আসেননি কিন্তু তবুও চালিয়ে যেতে হলও অস্বস্তিকর আলাপচারীতা।
কিছুক্ষণ পর আত্মীয়দের প্রশ্ন-- মেয়ে পছন্দ হয়েছে? মি: কস্তার না উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন-- কেন?
বাংলাদেশে জর্জ ডি কস্তার মতো অবিবাহিত মানুষদের প্রায়ই বিয়ে নিয়ে অযাচিত সব প্রশ্নের জবাব দিতে হয়।
এখনো বিয়ে করোনি? কেন? কবে করবে? ইত্যাদি।
পাড়ার চাচা অথবা দুঃসম্পর্কের খালাকে হাসিমুখে এসব প্রশ্নের জবার দিয়ে উতরে গেলেও জর্জ ডি কস্তা পার পাননি ঢাকা শহরে বাড়ি ভাড়া নিতে গিয়ে।
“প্রথমেই শুনতে হয় পরিবার নিয়ে থাকবো কিনা সেই প্রশ্ন। একা থাকবো শুনলেই বাড়িওয়ালাদের মধ্যে বিরূপ একধরনের মনোভাব দেখা যায়। বিষয়টা যেন একটা খুবই দৃষ্টিকটু ব্যাপার”
বাড়িভাড়া জোটে না বলে শেষ-মেষ আত্মীয় বা বাবা মায়ের সাথেই তাই থাকেন অনেক অবিবাহিত নারী পুরুষ।
বাংলাদেশে সামাজিক রীতিতে নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করেননি এমন মানুষদের জীবনাচরণের উল্টোটাই স্বাভাবিক।
একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ একটি নির্দিষ্ট বয়সে বিয়ে করে সংসারী হবেন তেমনটাই এখানে নিয়ম।
আর বিয়ের কদিন পর ছেলেপুলের দায়িত্ব নেবেন সেটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু ইদানীং এই সামাজিক রীতি বদলে বিয়ের পিড়িতে না বসা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে বাংলাদেশের শহরগুলোতে।
একটু বেশি বয়সে বিয়ের প্রবণতা পুরুষদের মধ্যে যেমন বাড়ছে তেমনি পড়াশোনা শেষ করে বিয়ের বদলে অনেক নারীও আগ্রহী হচ্ছেন পেশার দিকে।
তবে সামাজিক রীতেতে এই পরিবর্তনের সাথে সাথে বাড়ছে বিড়ম্বনায়ও।
৩৯ বছর বয়সী ঢাকার একজন আইনজীবী বলছিলেন, যত যোগ্যতাই তার থাকুক না কেন বাড়ি ভাড়া নিতে গিয়ে মিথ্যে বলতে হয়েছে অনেকবার।
সামাজিক প্রথার ব্যত্যয় করেছেন বলে তাকে পরতে হয়েছে সন্দেহের তালিকায়।
তিনি বলছিলেন, “প্রথমত মিথ্যা বলে বাসা নিতে হয়েছিল যে আমার সাথে আমার মা থাকবে। পরে যখন আমার বাসায় কোন বন্ধু বা পুরুষ সহকর্মী কাজে আসত তখন খেয়াল করতাম বাড়িওয়ালা বা প্রতিবেশীরা নজর রাখছে”
ভাল রোজগেরে এবং অনেকগুলো ডিগ্রিধারী এই নারী নিজের পাড়াতেই কখনো হয়ে উঠেছেন গুজব বা রসালো কানকথার উৎস।
“অনেকেই মনে করে বিয়ে হচ্ছে না তাহলে বোধহয় মেয়ের কোন খুত আছে। আবার ইচ্ছে করে বিয়ে করছি না এমন বুঝতে পারলে তারা ভাবতে থাকে কারণটা কি? সেগুলো নিয়ে পেছনে কথা বলা বা নানান নেতিবাচক চিন্তা তাদের মনের মধ্যে চলে আসে”
ভাড়া বাড়িতে পাড়ার ছেলেদের কাছে হয়রানির শিকার হয়ে এই আইনজীবী শেষ মেষ ফিরে গেছেন পরিবারের কাছে।
তবে সেই সুবিধা নেই জীবিকার তাগিদে ঢাকার বাইরে থেকে শহরে আসা অনেকের।
সেরকম একজন বলছিলেন বিয়ের আগে ঢাকায় একটা বাড়িতে উঠেছিলেন।
সেই বাড়িতে তাকে ব্যাচেলর বলে অনেক নিয়মকানুন দিয়ে দেয়া হয়েছিল।
“বাড়ির বারান্দায় যেতে পারতাম না। ছাদে যেতে পারতাম না। এমনকি জানালা খোলাও বারণ ছিল। তাই অফিস শেষ করে বন্ধ ঘরে থাকতে হতো। সেটাই এখানে নিয়ম”
নটা পাঁচটা অফিস আর তারপর জানালা বন্ধ ঘরে থাকা এইসব ব্যাচেলরদের প্রায়ই দেখতে হয় ‘এখানে ব্যাচেলরদের বাড়ি ভাড়া দেয়া হয়না’ এমন নোটিশ।
ঢাকার প্রায় সব বাড়িওয়ালাদের কাছে অবিবাহিত মানেই উটকো ব্যাচেলর মাত্র।
ঢাকার মগবাজারের নয়াটোলায় একটি বাড়ির মালিক রাজিয়া সুলতানা বলছিলেন অবিবাহিত ভাড়াটে নিয়ে তাদের বেশ আপত্তি কারণ অন্য ভাড়াটেদের বিষয়টা পছন্দ না।
তিনি বলছিলেন, “ওরা দেরি করে ঘরে ফেরে। প্রায়ই বান্ধবীরা রাত করে থাকত আর আমাদের বলা হতো বোন। এসব নিয়ে পরে আমার অন্য ভাড়াটেরা আপত্তি করলে ওদের বিদায় করে দিতে হয়েছে”
কোন বাড়িওয়ালা বিদায় করে দিলেও এই মানুষগুলো বাংলাদেশের সমাজেই থাকেন।
সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরিন বলছেন বাংলাদেশের সমাজ এখন একটি পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।
এই মানুষদের উপস্থিতি তারই নমুনা।
জীবনের প্রয়োজনেই প্রথাগত জীবনধারায় এই ধরনের পরিবর্তন আসছে।
ইদানীং শিক্ষায় পরিবর্তন হয়েছে সেটাও একটা কারণ।
অনেকক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কারণেও বাড়ছে দেরিতে বিয়ে করা মানুষের সংখ্যা।
মাহবুবা নাসরিনের মতে এই পরিবর্তন শুরু হলেও মানুষের মনোভাব অবশ্য বদলাচ্ছে বেশ ধীরে ধীরে।
একই সাথে বাংলাদেশের সমাজে রয়েছে ভিন্নতায় অরুচি।
নতুন ধরনের এই জীবনাচরণের জন্য প্রস্তুতও নয় বাংলাদেশের সমাজ।
অধ্যাপক নাসরিনের মতে সেখানেই দ্বন্দ্ব।
“বাংলাদেশে সামাজিকীকরণটাই হলও একটি বয়সের পর বিয়ে করে মানুষ সংসারী হবে। সবাই একই রকম হবে। অবিবাহিত নারী পুরুষের সংখ্যা বাড়লেও সমাজ বা রাষ্ট্র তাদের কোন ক্যাটাগরিতে ফেলে না”
অধ্যাপক নাসরিনের মতে বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে তৈরি হয়েছে অবিশ্বাসের সংস্কৃতি।
নিরাপত্তার আশংকা থেকে একটু ভিন্ন ধরনের মানুষের প্রতি তাই নেতিবাচক মনোভাব।
সেই মনোভাব না বদলানো পর্যন্ত জর্জ ডি কস্তার মতো মানুষেরা রয়ে যাবেন উটকো ব্যাচেলরের তালিকায়।

ঠগি by আলীম আজিজ

 এই গ্রামে যে সে আগে আসেনি এমন নয়, অনেকবারই এসেছে। এ গায়ের অলিগলি মেঠোপথ তার ভালোই চেনা, চেনা এ গায়ের কিছু অবস্থাপন্ন ঘর-গেরস্থের নামধামও। তবে প্রকাশ্যে দিনের আলোয় সে এসেছে হাতে গোনা কয়েকবার মাত্র, সাকল্যে তিন-চারবারের বেশি হবে না। তাও সে আসা ছদ্মবেশ ধরে। আজও পুরো না হলেও সে রকমই খানিকটা ঢেকেঢুকে নদীতীরে এসে পৌঁছাল সে। তার মূল কাজ যদিও বিষ্যুদবারে, আজ সে যাচ্ছে আগেভাগে নতুন কয়েকটা পথ চিনে নিতে। এবার আর তাকে পুরোনো পথে ফিরলে চলবে না। এক পথ দুবার ব্যবহার করার নিয়ম নেই। কিন্তু এ নিয়ম সে এরই মধ্যে কয়েকবার ভেঙেছে, কিন্তু আর দুঃসাহস দেখাতে মন সায় দিচ্ছে না। বরং আজ মন কেবলই কু ডাক ডাকছে। এ গায়ের সীমানায় আসার পর থেকেই কেমন যেন একটা অচেনা অনুভূতি ছেঁকে ধরেছে তাকে। আগে এ রকম কক্ষনো হয়নি! তাই এখন একবার ইচ্ছে হচ্ছে ফিরে যায়; কিন্তু সে উপায়ও নেই। গেল দিন ধানতারার হাটে কপাল খুব খারাপ গেছে। সামনে এখন হাট বলতে মঙ্গলবারের ওই কুশুরা আর তারপর বিষ্যুদবারের কালামপুরের হাট। কুশুরার হাটে গিয়ে তেমন ফায়দা হবে না, সে ভালোই জানে। ওটা ছোট হাট, ওখানে গরুর হাট নামে যেটা বসে তাকে ঠিক হাট বলা যায় না। দূরের ব্যাপারীরা কেউই আসে না ওই হাটে। আশপাশের দু-চার গায়ের গেরস্তের গরু নিয়েই ওই ছোট আকারের নামকাওয়াস্ত হাট। কাজেই এখন ভরসা বলতে ওই কালামপুরের হাটই। তবে মাশাআল্লা, হাট যদি বলতে হয় তো ওই ধানতারাকে পয়লা নম্বরেই রাখবে সে, তার পরই নাম করবে কালামপুরের। এই দুই হাটেই কম আর বেশি-চারপাশের গেরস্তরা তো আসেই, আসে দূর-দূরান্ত থেকে ব্যাপারীর দল, বেণিপুর, সুয়াপুর, বোলভাদ্দর, সখিপুর, দৌলতপুর—কত জায়গার নাম করবে সে।
কিন্তু গতকাল ধানতারার হাটবারটা তার এমনধারা হলো কেন, বড় অপয়া একটা দিন গেছে। কাল কী যে হলো, কত রকম কায়দা-কসরত করেও সে কোনো একটা ব্যাপারী দলের সঙ্গে ভিড়তে পারল না। সে এখন আর কোনো ঠিগ দলে নেই ঠিক। নিজেকে ঠিগও মনে করে না, তাও ঠিক। কারণ সর্দার নওশেরা জমাদারের খুনের পর দল বলে তাদের যা টিকে ছিল তা কি আর ঠিগ দল ছিল? নওশেরা জমাদারের সময় তাদের দল চলেছে বড় দাপে, যমুনাজুড়ে তাদের অবাধ বিচরণ ছিল। নৌকায় নৌকায় তারা ভাটিতে-উজানে কতজনের গলায় যে আঙ্গুছা পরিয়ে দিয়ে সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে সটকে পড়েছে। কতজনের যে পেছন থেকে ফাঁসের হেঁচকা টানে শিরদাড়া ভেঙে দিয়েছে। তখন তবিলে, তহবনের উল্টো ভাঁজে লুকানো থাকত তাদের মেস্টাপাটের চিকন ফাঁস। কিন্তু সে দিন গেছে নওশেরার সঙ্গে সঙ্গেই।
তবে কি, ঠিগ দল আর নেই ঠিক, কিন্তু মনে-প্রাণে এখনো তো সে ঠিগই। আর ঠিগ শুধু খুনি নয়, ঠিগ তো এক বিশ্বাসও। যে কারণে পুরোনো সেই অভ্যাসে আজও সে চারদিক দেখেশুনে পথে নামে, চোখ কান খোলা রেখে পথ চলে।
কিন্তু কাল ধানতারার হাট তার জন্য বড় যে খারাপ গেল, বড় উল্টাসিধা রকম গেল তার আরেকটা কারণ কি তার সর্দার নয়! জীবনে এ রকম কিছু ঘটতে পারে তা কি সে ঘুণাক্ষরেও কোনো দিন ভেবেছিল: যে নওশেরাকে সে নিজে দেখেছে কালামপুর থেকে দেড় ক্রোশ পুবে, বংশি নদীর কুমে বলরামের ছুরি বুকে নিয়ে ডুবে যেতে সে-ই কাল কী করে ধানতারার হাটে হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে উদয় হলো, এই হিসাব সে কিছুতেই মেলাতে পারছে না। নওশেরাকে দেখেই সে চিনেছে, স্বাস্থ্যটা সেই আগের মতোই আছে, বরং আরও যেন বলশালী হয়েছে, তবে পাঁচ বছরে একটা পরিবর্তন নওশেরার চেহারায় পড়েছে—মাথার অতি অহংকারের বাবরি চুল, যা একসময় কাঁধ পর্যন্ত নামত, সেই বাবরি যেন এখন কগোছা শনের নড়িমাত্র, নওশেরার সেই চুলের বাহার পুরোই গেছে, সেই জায়গায় নিষ্ঠুরভাবে কপালের টাক বিস্তৃত হয়ে মাথার অনেকখানিরই দখল নিয়ে ফেলেছে প্রায়। নওশেরার সেই পাকানো তেল চকচকে গোঁফ, তাও নেই; কিন্তু সেই সিংহের মতো তীব্র চোখ আছে এখনো, হাটের ভিড়ে আচমকা দুজনে মুখোমুখি পড়ে যাওয়ার পর, নওশেরা মুখটা সামান্য তুলে সেই যে তাকাল, সেই যে তার কলজে হিম করা পুরোনো দিনের মতো দৃষ্টি, সেটা মনে করে তার বুকের ভেতরটা এখনো কেমন হিম হয়ে আসল।
নওশেরার খুনের পর তাদের দলেরই এক ছুপা-রুস্তমের ছুরিকাঘাতে যেবার বলরাম মারা পড়ল, তখনই সে বুঝেছিল দল আর টিকবে না। টেকেওনি। নওশেরার কর্তৃত্ব অমান্য করার সাহস রাখত একমাত্র বলরাম, নওশেরা সেটা জানতও, কিন্তু পেশিশক্তির চেয়ে নওশেরার আস্থা ছিল মাথার শক্তিতে, সেটাই যে ঠিক ছিল, তার প্রমাণ নওশেরা বহুবার দিয়েছেও। কিন্তু অতি বুদ্ধিমানও ভুল করে। বলরাম সেই ভুলেরই সুযোগ নিয়েছিল বংশি নদীর কালো জলের কুমে। নেপথ্যে থেকে সে বলরামের এই কাজে সমর্থন জুগিয়েছিল ঠিক। কিন্তু যা ভেবেছিল তা হয়নি। বরং বলরাম মারা যাওয়ার পর দলটা আরও দুর্বল হয়ে পড়ল। আয়-রোজগার নেই, দলে থাকা না থাকা তখন তার কাছে সমান হয়ে গেল, তাই একদিন নিঃশব্দে দল ছাড়ল সে। এবং কেউ সেদিন তার পথ আগলে দাঁড়াল না। নওশেরা জমাদার থাকলে এমন হতো না কোনো দিন।
দল ছাড়ায় তার ক্ষতি হয়নি, একলা চলেছে এত দিন। কিন্তু নওশেরা ফিরে এসে কি একটা ঝামেলা তৈরি করল না এখন? প্রশ্নটা ঘুরেফিরেই তার মনে আসছে। নিহত নওশেরাকে সে পছন্দই করত, সে পছন্দের সুবাদেই কি সে তার নিজের মধ্যে, নওশেরাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়নি! তার আজকের বেশবাস, চলাফেরা সবই তো নওশেরা জমাদারের। গোপনে সেও নওশেরা হতেই চেয়েছে। এখন জীবিত নওশেরার পুনরাবির্ভাবে তাকে, বদলে যেতে হবে আবার। একটু মুশকিল হলো। তাতে কি! সে তো নওশেরা না। তবে নিজেকে নওশেরা জমাদার ভাবতে বেশ লাগত, কাজেকর্মে বেশ একটা স্ফূর্তি বোধ করত সে। লোকে যখন তাকে দেখে সভয়ে সরে গিয়ে, ফিসফিস করে কথা বলে, সে বড় মজা!
তার কারণেই কি রহস্যময় নওশেরা কারও কারও কাছে এখনো জীবিত না! কালামপুর, ধানতারা, গোয়াইলবাড়ির হাটে পাকানো গোঁফের, বাবরি চুলের নওশেরাকে নাকি এখনো দেখা যায়! এসব কথা, ফিসফাস যখন তার কানে আসে সে একাকী নিঃশব্দে হাসে আর ভাবে: নওশেরাকে এখনো দেখা যায়! দেখা তো যাওয়ারই কথা...বেশ ছিল এসব দিন। আসল নওশেরা জমাদার মৃত্যুর ওপার থেকে ফিরে এসেছে। সে ভুল দেখেনি। কিন্তু কী দরকার ছিল নওশেরার ফিরে আসার! তার অনুপস্থিতিতে বেশ তো চলছিল, দল ছেড়ে নিজের মতো করে নকল নওশেরার বেশে গরু ব্যাপারীদের নিয়ে ভালোই ছিল সে। আজও ওই একই উদ্দেশ্য নিয়েই তো এসেছিল এই বংশি নদীর পাড়ে, পরিকল্পনা ছিল, নদী পেরিয়ে বান্নাখোলা গ্রাম পর্যন্ত যাবে, তারপর উল্টোবাগে ঘুরে শিমুলিয়া হয়ে নদী পেরিয়ে ধামরাই দিয়ে উঠে চলে যাবে হম্ভাগ অবধি। বিষ্যুদবারে পুবের বেণিপুর থেকে আসা গরুর ব্যাপারী দলই ছিল তার মূল লক্ষ্য। হাট শেষে গরুর পাল নিয়ে ব্যাপারীরা রওনা দেবে দশ ক্রোশ দূরের গোয়াইলবাড়ির হাটের দিকে। তার আগে কালামপুরের হাট শেষে বান্নাখোলা আর ওলুনিয়া গ্রামের বিভিন্ন গেরস্তবাড়িতে রাতের খাওয়া-দাওয়া ও বিশ্রামের বন্দোবস্তে যাত্রাবিরতি করার কথা ওদের। গেরস্ত বাড়ির পাগাড়ঘেঁষা খোলা হালটে গরু রেখে রাতটুকু ঘুমিয়ে পুব থেকে আসা এই গরুর ব্যাপারী দল কাকডাকা সেই ভোরে আবার বেরিয়ে পড়বে পথে। এদের স্থানীয় পরিচয় পুবা। পশ্চিম থেকে এসে বরাবর পুবে যায়।
কোনো পুবাকেই একেবারে সর্বস্বান্ত সে করেনি কখনো, নওশেরা এটা খুব মেনে চলত। সাধারণত বাছাই করে তিনটে-চারটে গরু হাতিয়েই সটকে পড়ে সে। দল থেকে একটা-দুটো গরু খোয়া যাওয়ার ব্যাপারটা সকালের আগে পুবারা ঠিক ধরতেও পারে না। তবে যখন বুঝতে পারে তখন আসলে কিছু করারও থাকে না ওদের। ততক্ষণে সে চলে গেছে ওদের নাগালের বাইরে। গরুর পাল রেখে, সীমিত লোকবলের কারণে তাকে পিছু ধাওয়া করে ধরার আর কোনো উপায় নেই পুবাদের। দু-তিনটে গরুর ক্ষতি তখন বাধ্য হয়েই মেনে নেয় ওরা।
খানিকটা বিভ্রান্ত, অন্যমনস্ক মনে ঝকঝকে রোদ গায়ে মেখে বংশির কিনারে এসে দাঁড়াল সে। পারাপারের গুদারা-নৌকাটা মাত্র ঘাটে ভিড়ল। দুজন কামলা-কিষাণ চেহারার লোক লাফিয়ে নেমে তার পাকানো গোঁফের দিকে তাকিয়েই সভয়ে চোখ নামিয়ে গাঙের ঢাল বেয়ে উঠে গেল মাথা নিচু করে।
গুদারার নলখাগড়া বিছানো পাটাতনের ওপর দিয়ে হেঁটে গলুইয়ের কাছে এসে বসল সে। নৌকার পাটনি, বয়সে একেবারে ছোকড়া। তাকে একবার অপাঙ্গে দেখে নিয়ে কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘কনে যাইবেন?’
জবাব দেওয়ার আগেই পাড় থেকে এ সময় খিল খিল করে হাসির হররা তুলে নৌকায় এসে উঠল কম বয়সী দুটো মেয়ে। ঝলকে একটা মেয়ের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল তার, হাঁ করা মুখ বন্ধ করতেও যেন ভুলে গেল সে। চোখের পলক পড়ল না পর্যন্ত।
মেয়ে দুটো তার বিপরীত দিকে গুদারায় আড়াআড়ি পাতা তকতায় বসতে বসতে, একটা মেয়ে তার সঙ্গে চোখাচোখি হওয়া মেয়েটাকে কনুইয়ের গুঁতো দিয়ে বলল, ‘দ্যাখ, বেডায় কিমুন ড্যাবড্যাবাইয়া তর দিকে চাইয়া রইছে!’
‘দেখছি, বেডার বাবরি চুল দ্যাখ!’
‘বেডা কিমুন বেশরম...কিমুন ডাকাইত্যা চেহারা!’
‘কী সন্দুর মোছ! যেন্ চুবচুবা তেল বাইয়া পড়তাছে!’
সে এবার মুখে হাসির ঝিলিক তুলে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনারা কোন বাড়ির?’
এটা নিয়মবিরুদ্ধ, তার পেশায় স্থানীয় কারও সঙ্গে কোনো রকম বাতচিতে যাওয়ার নিয়ম নেই। কারও নজরে পড়া যাবে না, বিশেষ করে সে যখন কাজে বেরিয়েছে। কিন্তু নিয়মটা জেনেও সে ভঙ্গ করল আজ।সব ভুলে বান্নাখোলার নবা মুন্সীর মেয়েকে মুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে দেখল সে—পলকহীন: সবুজ কলাপাতা রঙের শাড়ি-পরা এক অপ্সরী। পরিকল্পনা ছিল: বান্নাখোলা গ্রামে সে ঢুকবে। হাটুরে মানুষের মতো কারও মনে কোনো রকম সন্দেহের উদ্রেক না করে একটু-আধটু আশপাশে ঘোরাঘুরি...তারপর গরু নিয়ে কোন পথে গেলে দ্রুত হম্ভাগের পথ পাওয়া যাওয়া যাবে—চিনে নিয়েই সেÊফ হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া। কিন্তু নদী পেরিয়ে এসে মেয়ে দুটোর পিছু নিয়ে তিনরাস্তার মাথায় ছোটগোলাঘর নামে পরিচিত মনিহারি দোকানটার সামনে এসে ফিরে না গিয়ে, বাঁশের বেঞ্চিতে বসে দোকানি লোকটার সঙ্গে অকারণ কথা চালাচালির চেষ্টা করল সে, যা সে কখনো করে না, গাঁটের পয়সায় দু-তিনটে পান কিনেও চিবাল। এসব কী করছে? নিজেকে নিজে সে চোখ ঠাউরে শাসন করলেও বিস্ময় নিয়ে খেয়াল করল যে মেয়েটাকে আরেকবার না দেখে এই গা ছেড়ে তার যেতে ইচ্ছে করছে না। দুপুরের দিকে মনোবাসনা মিটল তার, আবারও দেখা পেল সে সকালের সেই কলাপাতা-রঙা শাড়ির মেয়েটির। গোলাঘর ছেড়ে আরেকটু উজিয়ে এসে পথের পাশের বিশাল বড় দিঘির পাড়ের আমগাছের নিচে বসে দ্বিধান্বিত সে যখন নিজের সঙ্গে সওয়াল-জবাব করছে, আর কিছুক্ষণ দেখবে না রওনা হয়ে যাবে—এই ভাবনায় সে যে মুহূর্তে দ্বিখণ্ডিত, সে মুহূর্তেই দিঘির পাড়ে মেয়েটাকে আরেক দফা দেখে যেন তার বিষণ² দুপুর আবার ঝলমলিয়ে উঠল। ভেজা কাপড়ে পাড় বেয়ে উঠে এল মেয়েটা। ভেজা ল্যাপটানো কাপড়ে মোড়ানো যেন এক তরবারি। মেয়েমানুষ এত সুন্দর হয়!
আর তখুনি সিদ্ধান্তটা নিল সে। মুখে হাসি ফুটিয়ে, আমগাছের নিচ থেকে সরে এসে দাঁড়াল মেয়েটার সামনে। নবা মুন্সীর এই মেয়েটার নাম আল্লাদী। বাবা-মায়ের আদরের মেয়ে। তাই কথাবার্তায়ও বেশ ঠোঁটকাটা। ডাকাবুকোও। গুদারায় দেখা লোকটাকে এবার চোখ তুলে ভালো করে নজর করে দেখল সে। তখন পাশ থেকে দেখা বাবরি চুলের এই লোকটার মুখ দেখে কেমন এক ঘোর লাগা অনুভূতি সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল—এই তো সকালের কথা। আর এখন কাছ থেকে, মাত্র এক হাত দূর থেকে লোকটাকে দেখে সে হতাশই হলো। কই, খুব মর্দ ধরনের পুরুষ তো একে মনে হচ্ছে না? বিশালদেহী, এক সুপুরুষের যে ছবি তার মনে গাঁথা হয়েছিল, এ তো কিছুতেই সে রকম না! বরং সুপুরুষ তো এ না-ই, এখন কাছ থেকে দেখে নিতান্তই সাদামাটা একজন বলে মনে হচ্ছে। ‘এখানে আইলে আবার তোমার দেখা পামু? না, তুমি আমার লগে যাইবা?’ হঠাৎ কথা বলে ওঠে লোকটা। ‘দেখা পাইতে পারেন, বড় দিঘি নাওনের জায়গা...কিন্তু আপনের লগে যামু ক্যান?’ ধারালো গলায় জবাব দেয় আল্লাদী। নড়তে যেন ভুলে গেছে সে। তার শরীরজুড়ে বয়ে যাচ্ছে অদ্ভুত এক কাঁপন। একই সঙ্গে শুকিয়ে আসছে গলা। অস্থির লাগছে। এই এলাকা ছেড়ে অনেক আগেই তার সরে পড়া উচিত ছিল—এই সতর্কবার্তা মনে এলেও আরও একবার একে উপেক্ষা করল সে। এগিয়ে এল দুপা। বলল, ‘তুমি আমার সঙ্গে চলো। সোহাগ দিয়া ভইরা দিমু তোমারে।’
‘আপনে কেডা? আপনারে আমি চিনি?’
এই জবাবে আচমকা বেভুল এক রাগ উসকে ওঠে তার বুকের ভেতর, ঝটিতে হাত বাড়িয়ে মেয়েটার ডান হাত খামচে ধরল সে, ‘আমার সঙ্গে গেলেই চিনবা! চলো...!’
কথা শেষ করতে পারে না, তখনই চোখের কোনায় ধরা পড়ে আরেকটা দৃশ্য: দেখে উল্টো দিক থেকে ঝোলা কাঁধে শান্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে একটা লোক। এই দৃশ্যে পুরো শরীর থরথরিয়ে কেঁপে উঠল তার। দীর্ঘদেহী, নওশেরা জমাদারকে চিনতে তার কষ্ট হলো না একটুও। আচমকা অসুস্থ বোধটা যেন পুরোই গ্রাস করল তাকে। মাথাটা কি একটু টলে উঠল! এদিকে মেয়েটা তার হাত ছাড়িয়ে খানিক দূরে সরে গিয়ে তাকিয়ে আছে বিস্ময়ে। লোকটা হঠাৎ যেন পাথর বনে গেছে। ভূত দেখার মতো মুখচোখ সাদা হয়ে গেছে একদম। চোখাচোখি হলো। কিন্তু লোকটা এখন আর তাকে দেখছে না। ভয়ানক এক অবিশ্বাস নিয়ে সে তাকিয়ে আছে তার পেছনে আগোয়ান নতুন আগন্তুক লোকটার দিকে। এরপর যেন সবকিছু খুব দ্রুত ঘটল। মেলায় গোল চোঙার ভেতর দিয়ে দেখা দশ-বারো বছর আগের বায়োস্কোপের কথা মনে পড়ল, দৃশ্যগুলো যেন দ্রুত একটার পর একটা দৌড়ে সামনে চলে আসছে। ঢোলা জোব্বা গায়ে আগন্তুকটি প্রায় নিঃশব্দে লোকটার কাছে চলে এসেছে কখন। এক হাত দূরত্বে এসে থামল সে, এর মধ্যে কখন যেন ঝোলা থেকে তার হাতে উঠে এসেছে কালো, বাঁকানো, দীর্ঘ একটা ছুরি। ‘সবাই কি আর নওশেরা হইতে পারে রে!’ চাপা এই মন্তব্যের পরই একটা অস্ফুট আর্তনাদের মতো শুনল তরুণীটি। তারপর দেখল আগন্তুকের ছুরির পোচে পেট চেপে ধরে পড়ে যাচ্ছে লোকটা, ভুড়ি বেরিয়ে এসেছে তার হাতে। ‘মাগো’ বলে একটা চাপা আর্তচিৎকার করেই ভেজা কাপড়ে দৌড়াতে শুরু করল আল্লাদী। আগন্তুক তখন ঝুঁকে এসে প্রায় ফিসফিস করে বলছে, ‘ভাবছিলি পিঠে ছুরি মারলেই শ্যাষ নওশেরার, আবার নওশেরা সাজন!’
লোকটার চোখ উল্টে এসেছে, সে শুধু বলতে পারে, ‘আমি না ছুরি মারছে...বলরাম...’
তারপর বান্নাখোলার বড়পুকুরের রাস্তার ধারে নাম-পরিচয়হীন এক লাশ হয়ে পড়ে রইল সে। জোব্বা পরা আগন্তুকটি ততক্ষণে আবার হাঁটতে শুরু করেছে, যে পথে সে এসেছিল সেই পথেই মিলিয়ে যাচ্ছে আবার।
পূর্ববর্তী অংশ

সালাহউদ্দিনের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি, সিঙ্গাপুর যেতে চান by দীন ইসলাম

ভারতের মেঘালয়ের সিভিল হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। শনিবার সালাহউদ্দিন আহমেদকে দেখে এসে বিএনপি নেতা আব্দুল লতিফ জনি জানান, সালাহউদ্দিন আহমেদের শারীরিক অবস্থা ভালো না। তিনি অসুস্থ বোধ করছেন। তার কিডনি এবং হার্টে সমস্যা রয়েছে। এদিকে, দুই/তিন দিন ধরে সালাহউদ্দিনের সঙ্গে তার কয়েকজন আত্মীয় দেখা করার সুযোগ পেলেও আজ তাদের পুলিশের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। তাদেরকে বলা হয়েছে, কোন কিছু দেয়ার প্রয়োজন হলে পুলিশের কাছে দিতে। পুলিশই তা সালাহউদ্দিনের কাছে পৌঁছে দিবে।
এদিকে, আজও চিকিৎসকরা সালাহউদ্দিন আহমেদের স্বাস্থ্যের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তাকে দেখে এসে ডা. জি. গোস্বামী বলেন, আমরা তার সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। সালাহউদ্দিনের ওজন কমে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, আগে তার ওজন কত ছিল তা আমরা জানি না। তাই এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না।
ওদিকে, বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সালাউদ্দিন আহমেদ তাঁর দলীয় নেতা আব্দুল লতিফের কাছে শারীরিক অসুস্থতার অভিযোগ করেছেন। তিনি সিঙ্গাপুরের মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন না, সেটাও গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন মি. আহমেদ। তবে শিলং হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন তিনি মোটের ওপর সুস্থই আছেন, বড় কোনও সমস্যা নেই। এই পরিস্থিতিতে মি .আহমেদের স্ত্রী ভিসা যোগাড় করে ভারতে পৌঁছনোর পরে তাঁর পরিবার সিদ্ধান্ত নেবে কীভাবে ভারত থেকে বের কওে কোথায় নিয়ে যাওয়া যেতে পারে।
শুক্রবার বিকেলে সালাউদ্দিন আহমেদ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসা বি এন পি নেতা আব্দুল লতিফ জনিকে নিজের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে আর চিকিৎসার ব্যাপারে বেশ কিছু অভিযোগ করেছেন। মি. আহমেদ বলেছেন যে হার্ট আর কিডনির সমস্যা হচ্ছে, রাতে ঘুমোতে পারছেন না। দীর্ঘদিন ধরেই সিঙ্গাপুরে হৃদরোগের চিকিৎসা করান মি. আহমেদ। শিলং হাসপাতালে সব আধুনিক ব্যবস্থা নেই স্বাভাবিকভাবেই এখানে যে চিকিৎসা ঠিকমতো হচ্ছে না সেটা সালাউদ্দিন আহমেদকে উদ্ধৃত কওে জানিয়েছেন আব্দুল লতিফ। চিকিৎসকদের বক্তব্য আর সালাউদ্দিন আহমেদের নিজের বক্তব্যের মধ্যে একটা ফারাক তৈরি হয়েছে আর বারে বারে সিঙ্গাপুরের চিকিৎসার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। তাহলে কি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা করানোর জন্য নিয়ে যাওয়ার ভাবনা চিন্তা করা হচ্ছে তাঁর পরিবারের তরফে? এই ধারণা তৈরি হওয়ার পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি তথ্য। আব্দুল লতিফের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তাঁরা সালাউদ্দিন আহমেদকে বাংলাদেশে ডিপোর্টেশনের দাবী জানাবেন বা আবেদন করবেন কি না। তনি জবাব দেন, এটা সালাউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী ভারতে আসার পরে তাঁদের পরিবারই সিদ্ধান্ত নেবেন। মামলা কীভাবে পরিচালনা করা হবে আর কীভাবে ভারত থেকে মি. আহমেদকে বের করে নেয়া যায় আর কোথায় নেয়া যায়। এই, কোথায় নিয়ে যাওয়া যায়- কথার ওপর বাড়তি জোর দেন আব্দুল লতিফ। পুলিশের কয়েকটি সূত্র বলছে, গোয়েন্দা অফিসারদের সঙ্গে কথা বলার সময়েও সালাউদ্দিন আহমেদ সিঙ্গাপুরের কথা উল্লেখ করেছেন আর সেখানে চিকিৎসা করাতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

ছোট্ট একটু দুষ্টামি by শাহদীন মালিক

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর ও ছবি এসেছে। একজন ছাত্রী গাছের পেছনে লুকিয়ে ছিলেন। এক পুলিশ সদস্য তাঁর চুল ধরে টেনে এনে দিলেন বেদম উত্তমমধ্যম। বীরদর্পে, সদলবলে। মোটেও বোঝা যাচ্ছে না, তবে এত সংক্ষুব্ধ হওয়ার কী আছে। ১৩ মের প্রথম আলোর শেষ পৃষ্ঠার খবর অনুযায়ী, একটি নয়, দুটি নয়, ষাটের বেশি বিভিন্ন গোছের সংগঠন—মানবাধিকার, আইন সহায়তা, নারী অধিকারসহ হরেক কিসিমের সব সংগঠন—প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে পুলিশের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছে। এই সংগঠনগুলো মোটেই বুঝল না যে পুলিশ ছোট্ট একটু দুষ্টামি করছিল। পুলিশ সদস্যরা ভেবেছিলেন যে মেয়েটি কানামাছি বা চোর-চোর খেলার জন্য গাছের আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন। ছোটবেলার কানামাছি খেলায় যেমন গা ছুঁয়ে দিতাম, পুলিশ তেমনি একটু গা ছুঁয়ে দিতে গিয়েছিল। তবে হাজার হলেও পুলিশ তো, গা ছোঁয়াটা একটু ভীষণ জোরেশোরে হয়ে গেছে—চুল টানা, লাঠিপেটা, চড়-থাপ্পড়। দুষ্টামিটা একটু বেশিই হয়ে গেছে। তাই বলে এত তোলপাড়?
যেমন আইজিপি সাহেব বলেছেন, পয়লা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গুটি কয়েক ছেলে কিছু মেয়ের সঙ্গে দুষ্টামি করছিল। এতে এত বেশি হুলুস্থুল-চেঁচামেচির কী আছে? আর ব্যাপারটা যদি গুরুতরই হতো, তাহলে আশপাশের লোকজন ছেলেগুলোকে ধরে শায়েস্তা করল না কেন। অথবা দোষী ব্যক্তিদের ধরে পুলিশের কাছে নিয়ে এল না কেন?
আইজিপি সাহেবের অকাট্য যুক্তি। ১৩ মের প্রথম আলোর খবর থেকে জানলাম, উনি সবাইকে আইনের তালিমও দিয়েছেন—কোনো অপরাধ হতে দেখলে অপরাধীদের যেকোনো নাগরিক তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করতে পারবে। পয়লা বৈশাখের ঘটনায় যেখানে উপস্থিত লোকজন যেহেতু কাউকে গ্রেপ্তার করেনি, সেহেতু গুটি কয়েক ছেলে একটু দুষ্টামিই করছিল, এর বেশি কিছু নয়। এ রকম মারাত্মক বিশ্লেষণ-চিন্তা ও যুক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা আছে বলেই তো তিনি আইজিপি!
পুলিশের হাত থেকে রেহাই পেতে গাছের আড়ালে লুকিয়েছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের এই নেত্রী। কিন্তু পুলিশের এক সদস্য সেখান থেকে তাঁকে চুল ধরে টেনে আনেন। পেছন থেকে লাথি মারেন আরেক পুলিশ সদস্য। গলাধাক্কা দেন অপর পুলিশ সদস্য। গতকাল দুপুরে রাজধানীর শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সরণি থেকে ছবিগুলো তুলেছেন সাজিদ হোসেন
২...
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, প্রতীয়মান হয়েছে যে সালাহ উদ্দিন এত দিন আত্মগোপনে ছিলেন। তাজ্জব কি বাত! আমাদের গ্রাম পুলিশ আছে, আনসার আছে, আছে পুলিশ, সিআইডি, ডিবি এবং সবার ওপরে র্যা ব। আরও আছে বিজিবি। হাইকোর্টের আদেশ-নির্দেশ, মিডিয়া-সিভিল সোসাইটির তোলপাড়, অনেক মহলের প্রচণ্ড (অহেতুক) সমালোচনা—এত কিছুর মধ্যেও সালাহ উদ্দিন সাহেব পুরো দুই মাস সবাইকে ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপন করে থাকতে পারলেন? শুধু তা-ই নয়, সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ভারতের হাসপাতালে হাজির!
পুলিশের হাত থেকে রেহাই পেতে গাছের আড়ালে লুকিয়েছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের এই নেত্রী। কিন্তু পুলিশের এক সদস্য সেখান থেকে তাঁকে চুল ধরে টেনে আনেন। পেছন থেকে লাথি মারেন আরেক পুলিশ সদস্য। গলাধাক্কা দেন অপর পুলিশ সদস্য। গতকাল দুপুরে রাজধানীর শহীদ ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সরণি থেকে ছবিগুলো তুলেছেন সাজিদ হোসেন
সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচণ্ড আত্মমূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি। সালাহ উদ্দিন সাহেব সরকারি কর্মকর্তা, সাংসদ এবং প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। অর্থাৎ নিত্যনৈমিত্তিক কোনো ছিঁচকে চোর বা ভীষণ সন্ত্রাসী-অপরাধী নন। তাঁর মতো একজন লোক যদি দু-দুমাস এভাবে আত্মগোপন করে থাকতে পারেন, তাহলে কোনো সত্যিকার ভীষণ অপরাধী সহজেই ভাবতে পারে যে বাংলাদেশ লুকিয়ে থাকার জন্য অত্যন্ত উচ্চমানের আশ্রয়স্থল। অথবা সালাহ উদ্দিন সাহেবকে ওস্তাদ মেনে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে কীভাবে দীর্ঘ সময় আত্মগোপন করে থাকতে হয়, তার তালিম নিতে পারে।
ভুল স্বীকার দোষ অল্প। সালাহ উদ্দিন ‘আত্মগোপনে’ যাওয়ার সাত দিনের মাথায় ভেবেছিলাম, এই ‘আত্মগোপন’টা চিরস্থায়ী। এই ভুলের জন্য দুঃখ নেই। তিনি জীবিত ফিরে এসেছেন। সব ভালো যার শেষ ভালো।।
৩...
অনন্ত বিজয় দাশ খুন হয়েছেন। আগে খবরে শুনতাম, পত্রিকায় পড়তাম যে দুনিয়ায় অনেক দেশ আছে, যেখানে লেখালেখির কারণে, মত প্রকাশ করার কারণে জেল-জুলুম-নির্যাতন হয়, হত্যা হয়। গত কয়েক বছরে জেল-জুলুম-নির্যাতন বেশ কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অতীতে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক নিহতও হয়েছিলেন।
অনন্ত বিজয় দাশের হত্যার খবরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের যে প্রতিক্রিয়া, অর্থাৎ ‘হেডলাইন নিউজ’ আর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের যে উদ্বেগ, তাতে এটা স্পষ্ট যে তারা মনে করছে, বাংলাদেশে মত প্রকাশের জন্য হত্যা এখন রুটিন ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়তে থাকলে যা হয়, আমাদেরও তা-ই হচ্ছে। পুলিশ এখন ‘দুষ্টামি-দুষ্টামি খেলছে, অন্যকে দুষছে আর হত্যাকারীরা দল বেঁধে দিবালোকে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে চলছে। অপরাধীদের চিহ্নিত করে খুঁজে বের করে প্রমাণ সাপেক্ষে আদালতে বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করা—এটা বোধ হয় আমাদের পুলিশ আর পারবে না। পুলিশ এখন পারে মেয়েকে প্রকাশ্যে নির্যাতন করতে, গ্রেপ্তার-বাণিজ্য করতে আর...। থাক, আর বললাম না।
ড. শাহদীন মালিক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট, অধ্যাপক, স্কুল অব ল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।

ওরা ৭ জন, স্যার স্যার শব্দ শোনা গেছে ফেলে দেয়ার দুই ঘণ্টা আগে by দীন ইসলাম

ফেলে দেয়ার দুই ঘণ্টা আগে ‘স্যার স্যার’ শব্দ শুনেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। এ সময় একজনের মুখ থেকে ‘সাত জন’ এক সঙ্গে যাওয়ার প্রয়োজন আছে কিনা এ বিষয়টিও শুনেছেন। গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো জিজ্ঞাসাবাদে মেঘালয় পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তাকে এমনটাই জানিয়েছেন তিনি। এদিন বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে সিভিল হাসপাতালের আন্ডার ট্রায়াল প্রিজনার (ইউটিপি) রুমে গিয়ে গোয়েন্দা বিভাগের ইন্সপেক্টর জ্যোতিমালা সালাহউদ্দিনকে প্রায় আধাঘণ্টা জেরা করেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে টানা দ্বিতীয় দিনেরমতো জানতে চান নানা বিষয়। এ সময় সালাহউদ্দিন বৃহস্পতিবারের মতো পুরনো ঘটনা উল্লেখ করে নতুন করে আরও কিছু তথ্য দেন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যকে। তবে সালাহউদ্দিনের সঙ্গে গতকালও সাক্ষাৎ করেন সালাহউদ্দিনের আত্মীয় আইয়ুব আলী ও বাবলু। মানবজমিনকে তারা জানান, ভাই আমাদের নিষেধ করে দিয়েছেন যেন টুঁ শব্দটিও না করি। তাহলে নাকি তার (সালাহউদ্দিন) ক্ষতি হতে পারে। আমরা ভাইকে বিষয়গুলো বাইরের কাউকে জানাবো না বলে নিশ্চয়তা দিয়েছি। তারা বলেন, হাসিনা ভাবী আমাদের পাঠিয়েছেন যেন ভাইকে ঠিকভাবে দেখা শোনা করি। তার খোঁজ-খবর নিই। এ দায়বদ্ধতার কারণে ছুটে এসেছি। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা ভয় পাচ্ছি। আমাদের কপালে অন্য কোন খারাপ বিষয় আছে কিনা। সেটা দেশে ফেরার পর টের পাবো। দ্বিতীয় দিনের জিজ্ঞাসাবাদে সালাহউদ্দিন কি বলেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় আমরা পাশে ছিলাম না।
দ্বিতীয় দিনের জিজ্ঞাসাবাদেও নানা তথ্য: চোখ বেঁধে শিলং নিয়ে আসার বিষয়ে দ্বিতীয় দিনও গোয়েন্দা সদস্যকে বলেছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। তাকে নিয়ে আসার সময় কয়েক দফা গাড়ি বদলের কথাও বলেছেন তিনি। যে জায়গায় তাকে ফেলে যাওয়া হয় ওই জায়গাটি তিনি নিজেই উদ্ধার করেছেন। ফেলে যাওয়ার এক ঘণ্টা পর তিনি জানতে পারেন এলাকাটি শিলং গলফ লিংক এলাকা। এরপর স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় নিজেই পুলিশ স্টেশনে গিয়ে নিজের পরিচয় দেন বলে জানান। সালাহউদ্দিন জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, একটা জায়গায় গাড়ি বদলের সময় ‘স্যার স্যার’ শব্দ শোনা গেছে। এছাড়া সাত জনের বেশি দরকার নেই বলে কাউকে কাউকে বলতে শোনা গেছে। সালাহউদ্দিনের সঙ্গে ফেলে যাওয়া ব্যক্তিরা কেমন আচরণ করেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে গোয়েন্দা সদস্যকে তিনি জানান, আমার চোখ বন্ধ ছিল। তাই আচরণ কিভাবে বুঝবো। তবে ফেলে যাওয়ার আগের ঘণ্টাগুলোতে আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি তারা। সালাহউদ্দিনের আত্মীয়-স্বজনরা জানান, শিলংয়ে ফেলে যাওয়া ও পূর্বাপর কয়েক ঘণ্টা সম্পর্কেই জানতে চাইছেন গোয়েন্দারা। এর বাইরে গুম হওয়ার ৬২ দিন সম্পর্কে কিছুই জানতে চাইছেন না ভারতীয় গোয়েন্দারা।   
ভীত সালাহউদ্দিন ও তার শুভানুধ্যায়ীরা: উত্তরার বাসা থেকে তুলে নেয়ার টানা দুই মাস পর সীমান্তের ওপারে ‘মুক্ত’ সালাহউদ্দিন আহমেদের মনোবল ফিরতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসা স্বজনরা। দীর্ঘদিন আটকে রাখা ও মেঘালয়ে ‘চোখ বাঁধা’ অবস্থায় ছেড়ে দেয়ার পর শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন বিএনপির এ যুগ্ম মহাসচিব। এ কারণে তাকে প্রথমে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করেছিল মেঘালয় পুলিশ। পুলিশের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে কয়েকজন আত্মীয় সাক্ষাৎ করেছেন। তারা জানিয়েছেন ধীরে ধীরে তিনি মনোবল ফিরে পাচ্ছেন। তুলে নেয়ার পর থেকে তিনি কোথায় কিভাবে ছিলেন এ বিষয়েও তিনি কথা বলেছেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর এক অজানা আতঙ্ক তাকে ভর করছে। রাজনৈতিক সহকর্মীদের সালাহউদ্দিন জানিয়েছেন, কাউকে কোন কথা বলবি না। এমন কথার টের পাওয়া গেল বেলা সাড়ে ১২টার দিকে। সিভিল হাসপাতালের প্রিজন সেলের দিকে ওষুধ ও খাবার নিয়ে আসেন আইয়ুব আলী, বাবলু ও আরেকজন (নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যক্তিটির অনুরোধে নাম গোপন রাখা হলো)। এ সময় মিডিয়াকর্মীরা তাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তিটি রেগে গিয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ভাই আপনারা এইভাবে আমাদের ছবি তুলছেন কেন? আপনারা এভাবে ছবি তুলে বাংলাদেশে প্রকাশ করলে দেশে আমরা চলাফেরা করতে পারবো না। ভাইয়ের (সালাহউদ্দিন) মতো আমাদেরও গুম হয়ে যেতে হবে। ভাইকে দয়া করে ফেলে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের কেউ দয়া করে ফেলে যাবে না।
আইনজীবীকে নিয়ে সহ-দপ্তর সম্পাদক জনির মামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি: মেঘালয় বারের আইনজীবী রাকেশ মজুমদারকে সঙ্গে নিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে সালাহউদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিএনপি’র সহ- দপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি। ওই সাক্ষাতেই শিলং সদর পুলিশ স্টেশনে দায়ের করা মামলা নং- ১৪৩, তারিখ ১১ই মে ২০১৫ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এরপর প্রিজন সেল থেকে বাইরে বেরিয়ে মিডিয়া কর্মীদের দেখে অনেকটা জড়োসড়ো হয়ে যান জনি। আইয়ুব আলীকে সামনে এগিয়ে দিয়ে মিডিয়াকে এড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে যান। এরপর থেকে প্রায় একদিন লাপাত্তা হয়ে যান তিনি। সিভিল হসপিটালের কাছে পূর্বাশা হোটেলে প্রথমদিন উঠে ওই হোটেলটিও ছেড়ে দেন।
সোমবার সালাহউদ্দিনকে কোর্টে উঠানোর সম্ভাবনা বেশি: আজ ও কাল ভারতে সরকারি ছুটি। তাই অতি জরুরি না হলে মেঘালয়ে কোন নিম্ন আদালত বসবে না। রোববার ভিসা পেয়ে শিলংয়ে আসতে পারেন সালাহউদ্দিনের স্ত্রী সাবেক এমপি হাসিনা আহমেদ। তাই সব মিলিয়ে সোমবারের আগে সালাহউদ্দিনকে কোর্টে উঠানোর সম্ভাবনা কম। মেঘালয়ের পুলিশ সুপার (এসপি) এম. খাখরান এ বিষয়ে মানবজমিনকে জানালেন, ডাক্তারদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি মিললেই আমরা তাকে (সালাহউদ্দিন) কোর্টে তুলবো। এর বাইরে কিছু করতে পারছি না। কবে নাগাদ সেটা হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কাল (আজ) ও পরশু (কাল) সরকারি ছুটি। তাই রোববার বা সোমবারই তাকে কোর্টে উঠানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।  
সালাহউদ্দিনের সুস্থ বা অসুস্থতার সার্টিফিকেট দেবে ডাক্তার: সালাহউদ্দিন পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। চর্ম, কিডনি, হার্টসহ নানা অসুখ তাকে ভোগাচ্ছে। এ কারণে তাকে কোর্টে হাজির করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে পুলিশ সুপার (সিটি) বিবেক সিয়াম মানবজমিনকে জানান, সুস্থ বা অসুস্থতার সার্টিফিকেট দেবেন একমাত্র ডাক্তার। আমরা কিভাবে এর সার্টিফিকেট দেবো। ডাক্তারের সুস্থতার সার্টিফিকেট পেলে তাকে কোর্টে হাজির করা হবে। এর বাইরে আপাতত কিছু ভাবছি না।
ঘুপচি ঘরে থাকায় সালাহউদ্দিনের চর্মরোগ, গলব্লাডারে স্টোন
ঘুপচি ঘরে টানা দুই মাস থাকায় সালাহউদ্দিনের চর্মরোগ দেখা দিয়েছে। এছাড়া গলব্লাডারে বড় সাইজের স্টোন দেখা গেছে। গতকাল সিভিল হাসপাতালের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় এমনটাই ধরা পড়েছে বলে সালাহউদ্দিনের আত্মীয় আইয়ুব আলী মানবজমিনকে জানালেন। তিনি বলেন, ভাইয়ের কিডনি সমস্যা খুব একটা গুরুতর নয়। তবে হার্টের সমস্যাটা খুব বেশি গুরুতর। শিলংয়ের সিভিল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চর্মরোগের জন্য পাঁচ ধরনের ওষুধ দেয়া হয়েছে সালাহউদ্দিনকে। গতকাল এ ওষুধগুলো প্রথমবারের মতো তাকে দেয়া হয়। এর মধ্যে কয়েকটি ওষুধ বাহ্যিকভাবে লাগাতে হবে। আর কয়েকটি খেতে হবে। গতকাল বেলা সোয়া ১২টার দিকে সরেজমিন সিভিল হাসপাতালের আন্ডার ট্রায়াল প্রিজনার (ইউটিপি) রুমের সামনে গিয়ে দেখা যায়, এক নার্স সালাহউদ্দিনের কোন আত্মীয়-স্বজনকে ওষুধ কিনে এনে দেয়ার জন্য খুঁজছে। তবে ওই সময় সালাহউদ্দিনের কোন আত্মীয়- স্বজনকে খুঁজে পায়নি। পৌনে একটার দিকে সালাহউদ্দিনের আত্মীয়-স্বজনরা খাবার ও ওষুধ নিয়ে আসেন। সালাহউদ্দিনের আত্মীয় আইয়ুব আলী মানবজমিনকে জানান, প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ কিনে দেয়া হয়েছে। এগুলো সবই চর্ম রোগের ওষুধ। ভাইয়ের গলব্লাডারে স্টোনও ধরা পড়েছে। ডাক্তাররা বলেছেন, বদ্ধ ছোট ঘরের মধ্যে থাকলে এমন ধরনের চর্মরোগ হয়। তিনি বলেন, সিভিল হাসপাতাল বেশির ভাগ ওষুধই কিনে দেয়। হাসপাতালে যে ওষুধ নেই তা বাইরে থেকে কিনে দিতে হচ্ছে। বেলা দেড়টার দিকে সিভিল হাসপাতালের সামনে সরজমিনে দেখা যায়, প্লেট ও গ্লাস নিয়ে এসেছেন সালাহউদ্দিনের আত্মীয়-স্বজনরা। এরপর তাকে একটি খাওয়ার চামচও এনে দেয়া হয়।
‘ওজন কমেছে ১৫ কেজি’
তুলে নেয়ার পর দুই মাস নিখোঁজ ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ। এই সময়ে তিনি কোথায় কিভাবে ছিলেন এ প্রশ্নের জবাব মিলেনি এখনও। তবে এই সময়ে তিনি যে খুব ভাল ছিলেন না তা প্রমাণ হয় শারীরিক অবস্থা থেকে। ঘুপচি পরিবেশে থাকায় তার শরীরে চর্মরোগ দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। খাবার স্বল্পতা আর দুশ্চিন্তায় এই সময়ে ওজন কমেছে ১৫ কেজি। গতকাল বিকালে বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসে এ তথ্য জানিয়েছেন। হাসপাতালের বাইরে তিনি মানবজমিনকে বলেন, তিনি এখনও শারীরিকভাবে অসুস্থবোধ করছেন। তার বুকে ব্যথা বেড়েছে। কিডনি সমস্যা দেখা দিয়েছে। ওজন ১৫ কেজি কমেছে। তিনি বলেন, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা দেয়ায় সালাহউদ্দিন আহমেদ ভারত সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। অপহরণ ও কারা তাকে মেঘালয়ে ফেলে গেছে এ বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমেদ এখনও স্পষ্ট করে বলতে পারছেন না। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তার কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। ভারতে আইনী লড়াইয়ের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সালাহউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ শিলং আসবেন। তিনি আসলে এ বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।

সালাহ উদ্দিনকে নিয়ে রহস্য কাটছে না by রাহীদ এজাজ

বিএনপির নেতা সালাহ উদ্দিন আহমদকে নিয়ে রহস্যের জট খুলছে না। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ে তিনি কীভাবে প্রবেশ করলেন, তা কেউ বলতে পারছে না। স্থানীয় পুলিশ ও সালাহ উদ্দিনের এক আত্মীয়ের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য বিষয়টিকে আরও ঘোলাটে করেছে। পুলিশের দাবি, গত সোমবার শিলংয়ের গলফ কোর্স এলাকায় উদ্ভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরির সময় স্থানীয় লোকজন পুলিশকে খবর দেয়। এরপর পুলিশ তাঁকে আটক করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। আর আইয়ুব আলী নামে তাঁর এক আত্মীয়ের দাবি, শিলং পৌঁছে পুলিশের দপ্তরে সালাহ উদ্দিন আহমদ নিজেই গেছেন।
বিএনপির এই যুগ্ম মহাসচিব ঢাকার উত্তরার বাসা থেকে ‘নিখোঁজ’ হওয়ার দুই মাস পর গত মঙ্গলবার স্ত্রীকে ফোন করে জানান, তিনি বেঁচে আছেন এবং শিলংয়ে একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এরপর চার দিন চলে গেছে, শিগগিরই তাঁর দেশে ফেরার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
শিলংয়ের সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও আইনজীবীরা মনে করছেন, ইন্টারপোলের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কারণে সালাহ উদ্দিনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার আশঙ্কা রয়েছে। পাসপোর্ট ছাড়া ভারতে প্রবেশের অভিযোগে ‘ফরেনার্স অ্যাক্ট, ১৯৪৬’-এর ১৪ ধারা অনুযায়ী সালাহ উদ্দিন আহমদকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। ওই আইনের ১৪ ধারা অনুযায়ী পাসপোর্ট ছাড়া অনুপ্রবেশের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও আর্থিক জরিমানার বিধান রয়েছে।
এদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সালাহ উদ্দিন সিঙ্গাপুরে যাওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার বিকেলে শিলংয়ের সিভিল হাসপাতালে তাঁর সঙ্গে দেখা করার পর বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ গণমাধ্যমকর্মীদের এ তথ্য জানান।
আবদুল লতিফকে সালাহ উদ্দিন আহমদ জানান, বুকের ব্যথার কারণে রাতে তাঁর ভালো ঘুম হচ্ছে না। কিডনিতেও তিনি ব্যথা বোধ করছেন। তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি সিঙ্গাপুরে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করছেন। তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমদ শিলংয়ে পৌঁছানোর পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে অনুরোধ জানাবেন। তবে কবে তিনি শিলং আসছেন, এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জানতে চাইলে সালাহ উদ্দিনের স্ত্রী হাসিনা আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ভিসা পাননি। ভিসা পেলেই দুই স্বজনকে নিয়ে শিলং যাওয়ার পরিকল্পনা আছে।
গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো সালাহ উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করেন আবদুল লতিফ। গত বৃহস্পতিবার তিনি ছাড়াও এক নিকট আত্মীয় আইয়ুব আলী এবং বাংলাদেশের এক ব্যবসায়ী পুলিশি পাহারায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সালাহ উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করেন।
সালাহ উদ্দিনের অনুরোধের পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাঁর সঙ্গে স্থানীয় এক আইনজীবী দেখা করেছেন। জানা গেছে, মূলত ওই আইনজীবী তাঁর এক জ্যেষ্ঠ সহকর্মীর পক্ষ থেকে সালাহ উদ্দিনের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেন। তাঁর স্ত্রী শিলং আসার পর আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
পাসপোর্ট ছাড়া ভারতে প্রবেশের অভিযোগে সালাহ উদ্দিন আহমদকে আটকের পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। শিলংয়ের পুলিশ সুপার এম খারক্রাং গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, স্বাস্থ্যগত কারণে এখনো তাঁকে সেভাবে জেরা করা হয়নি। তবে কাল পুলিশের বিশেষ শাখার দুই কর্মকর্তা তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে তাঁর কাছ থেকে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
মানবাধিকার আইনজীবী বিশ্বজিৎ বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, সালাহ উদ্দিনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা হতে পারে। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ থেকে মেঘালয়ে অনুপ্রবেশকারীদের মুক্তির জন্য তিনি আদালতে দাঁড়িয়েছেন। এঁদের মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে মো. জিয়াউদ্দিন নামের সুনামগঞ্জের এক তরুণকে মুক্ত করেছেন।
বিশ্বজিৎ বড়ুয়া বলেন, সাধারণত অনুপ্রবেশের মামলা সুরাহা হতে দুই সপ্তাহের বেশি লাগার কথা নয়। তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক আইনে মামলা হলে বেশি সময় লাগতে পারে। যেহেতু সালাহ উদ্দিন আহমদ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং ইন্টারপোল এ প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে গেছে, তাই বিষয়টির সুরাহা হতে বেশি সময় লাগতে পারে।

‘সমাধান হতে হবে মানবিকভাবে’

আন্দামান সাগরের বিভিন্ন নৌকায় ভাসছে প্রায় ৮ হাজার বাংলাদেশী অভিবাসী ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা জরুরি ভিত্তিতে এসব শরণার্থীদের জন্য আঞ্চলিক মানবিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াই মূলত ছিল ওই শরণার্থীদের গন্তব্যস্থল। কিন্তু তিনটি দেশই সাফ জানিয়ে দিয়েছে, কোন নৌকাকেই তাদের দেশের সীমানায় ভিড়তে দেয়া হবে না। অপরদিকে সাগরে আটকে থাকা নৌকাতেই মানুষ মারা যাচ্ছে। হাজারো অভিবাসী রয়েছে জীবনের ঝুঁকিতে। এ জটিল সংকটের কি কোন সমাধান নেই? থাকলে সেটি কি? বৃটেনের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান এ ইস্যু নিয়ে চার বিশেষজ্ঞের মতামত প্রকাশ করেছে।
লিলিয়ান ফ্যান: ব্যাংকক ভিত্তিক লিলিয়ান ফ্যান এশিয়ার মানবিক ও সংঘর্ষ সংক্রান্ত ইস্যু নিয়ে বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যের ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইন্সটিটিউট (ওডিই) নামের একটি সংগঠনে রিসার্স অ্যাসোসিয়েট হিসেবে কর্মরত। আন্দামান সাগরে চলমান অভিবাসী সংকট নিয়ে তিনি বলেন, এর সমাধানটি হতে হবে মানবিকভাবে। নিশ্চিত করতে হবে, কোন জীবনহানি যাতে না ঘটে। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় সাময়িক সহায়তার পথ খুঁজতে হবে। তার ভাষ্য, আপনাকে আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি সমন্বিত সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে আপনাকে বার্মিজ সরকারের সঙ্গেও আলোচনা করতে হবে। বিশেষ করে দেশটির রাখাইন প্রদেশটি নিয়ে। সেখানে একটি পর্যায় পর্যন্ত পরিস্থিতির উন্নতি নিশ্চিত করতে হবে। যাতে করে সেখান থেকে জীবন বাঁচাতে রোহিঙ্গা মুসলিমদের পালিয়ে যেতে না হয়। তার মতে, এটি মূলত রাষ্ট্রহীনতা ও নাগরিকত্ব সমপর্কিত একটি ইস্যু। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সংগঠন আসিয়ানের এখনই উচিত হবে না, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের ইস্যুতে মিয়ানমারকে বেশি চাপ দেয়া। একে বরং মানবিকতা ও উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে অবস্থার উন্নতির লক্ষ্য হিসেবে ভাবতে হবে। শর্ত আরোপের দিকে নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে চূড়ান্ত নাগরিকত্ব ও মর্যাদার আলোচনাও চলতে থাকবে। এটি একটি লম্বা আলোচনা হবে; সহজও হবে না।
লিলিয়ান ফ্যান আরও বলেন, সাময়িক সমাধান হচ্ছে, যেসব দেশে শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীরা যাচ্ছে, সেখানে তাদের বসবাসের সংস্থান করা। একই সঙ্গে সমন্বিত এ ব্যবস্থার ওপর আসিয়ান অঞ্চলের দেশগুলোর নজর রাখার উপায়ও থাকতে হবে। একটি কর্মকৌশল ঠিক করতে হবে যাতে করে আগত অভিবাসীদের ব্যবস্থাপনার উপায় বের করা যায়। প্রত্যেক দেশে এ প্রচেষ্টা হয়তো কিছুটা ভিন্ন হবে। কিন্তু সামগ্রীক কৌশল হতে হবে এক। বাংলাদেশী অভিবাসীদের নিয়ে আলাদা চিন্তা করতে হবে। তাদের ব্যবস্থাপনা করতে হবে ভিন্ন উপায়ে।
তিনি বলেন, একটি জিনিস পরিষ্কার। সেটি হচ্ছে, তিনটি দেশই, অর্থাৎ থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এ ইস্যুটি অত্যন্ত কঠিনভাবে নিয়েছে। তারা বলছে, আমরা কোন অভিবাসী বোঝাই নৌকা দেখতে চাই না। এটা অত্যন্ত কঠিন একটি সিদ্ধান্ত। এটা আমাদের উপলব্ধি করতে হবে।
চার্লস সান্টিয়াগো: আসিয়ান পার্লামেন্টেরিয়ান ফর হিউম্যান রাইটস (এপিএইচআর)-এর চেয়ারম্যান চার্লস সান্টিয়াগো। এপিএইচআর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে মৌলিক চাহিদা নিশ্চিতের পক্ষে সেসব দেশের সাংসদদের একটি জোট। এপিএইচআর চেয়ারম্যান চার্লস সান্টিয়াগো মত দিয়েছেন, আসিয়ানের উচিত বিষয়টি মোকাবিলা করা। তার মতে, এটি এখন আর মিয়ানমারের একার ইস্যু নয়। এটি এখন আঞ্চলিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আঞ্চলিক পর্যায়েই এ ইস্যুটি মোকাবিলা করা উচিত। বার্মার ওপর চাপ প্রয়োগের কথা যদি বলি, তাহলে অনেক উপায়ই রয়েছে।
তার ভাষ্য, সমস্যাটির শুরু হয়েছে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানে বার্মিজ সরকার অস্বীকৃতি জানানোয়। রোহিঙ্গাদের অনেকের স্থান হয়েছে বিভিন্ন বন্দিশিবিরে। তাদের জাত, গায়ের রঙ ও ধর্মের কারণে তারা নির্যাতিত হয়। এর শেষ হতে হবে।
তিনি বলেন, আসিয়ানকে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। যাতে করে রাখাইন প্রদেশের মানুষের জীবনে কিছুটা পরিবর্তন আসে। এটি হবে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। স্বল্পমেয়াদী কৌশল হচ্ছে, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডকে আশ্রয়প্রার্থী মানুষকে সাময়িকভাবে হলেও গ্রহণ করতে হবে। এ মুহূর্তে আপনাকে মানুষের জীবন বাঁচাতে হবে আগে।
চার্লস সান্টিয়াগো বলেন, আসিয়ানের হস্তক্ষেপ না করার নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সেকেলে নীতিতে পড়ে থাকতে পারে না আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো। আমাদের চোখের সামনে এখন একটি মানবিক বিপর্যয় ঘটছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর উচিত দায়িত্বশীল আচরণ করা।
ড্যাভিড ম্যানি: ডেভিড ম্যানি অস্ট্রেলিয়ার রিফিউজি অ্যান্ড ইমিগ্রেশন লিগাল সেন্টারের পরিচালক। তিনিও মত দিলেন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার উচিত অভিবাসী বোঝাই নৌকাগুলোকে ফিরিয়ে দেয়া থেকে বিরত থাকা। বরং তাদের উদ্ধার করে মানবিক সাহায্য প্রদান করা। তার ভাষ্য, মানবিকতা হতে হবে রাজনীতির ঊর্ধ্বে। সীমান্ত বলপ্রয়োগের আগে সমুদ্রে উদ্ধারাভিযান পরিচালনা করা উচিত। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়াকে আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রদর্শন করতে হবে। নিজের সমস্ত ক্ষমতা ও সামর্থ্য দিয়ে হলেও সাগরে মানুষের জীবন বাঁচাতে হবে। একই সঙ্গে অভিবাসীদের প্রদান করতে হবে আর্থিক ও মানবিক সহায়তা। বহু আশ্রয়প্রার্থী বর্তমানে সাগরে আটকে আছে। তারা ক্ষুদায় ভুগছে। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
ওই মানুষদের উদ্ধারে যৌথ অভিযান পরিচালনার ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোগ নেয়া উচিত। এরপর অন্যান্য দেশের সঙ্গে যৌথভাবে শরণার্থীদের মৌলিক সহায়তা প্রদান করে; তাদের প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা উচিত। তাদের ফেরত পাঠালেই তারা যে বিপদ ও হতাশা থেকে অন্যদেশে পাড়ি জমাতে চায়, তার সমাধান হবে না। এটা কেবল মানুষকে এক জায়গা থেকে আরেক মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে। এ অঞ্চলের দেশগুলোকে সীমান্তে দুর্গ বানানো থামাতে হবে। সেসব দেশ ও আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের উচিত, একসঙ্গে ওই আশ্রয়প্রার্থী মানুষদের মূল সমস্যার সমাধানে কাজ করা। একই সঙ্গে তাদের উচিত মানবিক মর্যাদা, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে কর্মকৌশল শক্তিশালী করা।
জেফ লাবোভিটজ: জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম)-এর থাইল্যান্ড চীফ অফ মিশন হিসেবে কর্মরত আছেন জেফ লাবোভিটজ। তার চোখেও প্রথম সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে এলো, সমুদ্রে ভেসে থাকা মানুষদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অভিযান। একই সঙ্গে অভিবাসী বোঝাই নৌকাগুলোকে তীরে ভিড়তে অনুমোদন দেয়া। তার মতে, দেশগুলোর উচিত একসঙ্গে অনুসন্ধান চালিয়ে অভিবাসী বোঝাই নৌকাগুলো উদ্ধার করা। ২৯শে মে থাইল্যান্ডে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু সেটি হতে এখনও ২ সপ্তাহ বাকি। কিন্তু আমাদের আরও দ্রুত কাজ করতে হবে। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উচিত তথ্য ও স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি প্রকাশ করা। তারা এসব তথ্য নিয়ে আইওএমসহ অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে। এর দ্বারা অভিবাসীদের জন্য সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
জেফ লাবোভিটজ আরও বলেন, এ অঞ্চলের সব দেশকে দেখতে হবে, সমস্যার মূল কোথায় রয়েছে। তারা মানবপাচারের বিভিন্ন নেটওয়ার্ক সমপর্কে পরসপরের সঙ্গে তথ্য ভাগাভাগি করে। কিন্তু সেসব যথেষ্ট নয়। আমাদের যোগাযোগ, নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, যৌথ অভিযান, তথ্য ভাগাভাগি করা প্রয়োজন।

‘শতভাগ সফল’ প্রকল্পে ৬৩১ কোটি টাকার ঋণ অনিয়মিত -একটি বাড়ি একটি খামার: অনুসন্ধান by শরিফুজ্জামান

একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প
একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল গরু-ছাগল কিনে ‘অর্ধেক তোমার অর্ধেক আমার’—এ জাতীয় ভাগাভাগির মাধ্যমে। লুটপাট বন্ধ করতে চালু করা হয়েছিল দরিদ্রদের জন্য ক্ষুদ্র সঞ্চয়, যা প্রকৃতপক্ষে ক্ষুদ্রঋণে মোড় নেয়। এর মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে ‘শতভাগ সফল’ দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ে বিতরণ করা ৬৩১ কোটি টাকার ঋণ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া ৫ মে পর্যন্ত ৯৩৭ কোটি টাকা ব্যাংকে অলস পড়ে ছিল, যা থেকে প্রমাণিত হয়, সঞ্চয়ের প্রতি সদস্যের আগ্রহ কমে গেছে। কারণ, শর্ত অনুযায়ী সদস্যরা সঞ্চয় জমা না দেওয়ায় উৎসাহ বোনাসের এই টাকা ছাড় করা যাচ্ছে না। আবার টাকা ছাড় করতে না পারায় দরিদ্র মানুষ ঋণসুবিধাও পাচ্ছে না।
প্রতিটি বাড়িতে একটি খামার গড়ে তোলার লক্ষ্যে সদস্যদের সঞ্চয়ের বিপরীতে সমান পরিমাণ উৎসাহ বোনাস এবং সমিতিকে অনুদান হিসেবে দেওয়া এ প্রকল্পের তহবিল এখন (৫ মে পর্যন্ত) ২ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। আগামী বছরের জুন পর্যন্ত সরকার এ প্রকল্পে বরাদ্দ রেখেছে ৩ হাজার ১৬২ কোটি টাকা।
প্রকল্পের হিসাব বিবরণী অনুযায়ী, এর ২ হাজার ৭৭ কোটি টাকার মধ্যে আদায় হয়েছে ৫০৬ কোটি টাকা ও অনাদায়ি ৬৩১ কোটি টাকা। এ ছাড়া ৫১০ কোটি টাকা মাঠে থাকলেও তা পরিশোধের সময় হয়নি।
প্রায় দুই মাস ধরে পরিচালিত অনুসন্ধানে এ প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতি, ক্রমান্বয়ে দরিদ্র মানুষের হাতে টাকা আটকে যাওয়া এবং দারিদ্র্যকে পুঁজি করে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করাসহ প্রকৃত চিত্র আড়াল করার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের কাছে শুধুই কাগজে-কলমে ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। দারিদ্র্য বিমোচনে এটা সরকারের অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য সঞ্চয় গড়তে উৎসাহ জোগানো, খামার গড়তে ঋণ নেওয়া ও তা সময়মতো ফেরত দেওয়া। কিন্তু মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একদিকে সদস্যদের সঞ্চয়ের প্রবণতা কমছে, অন্যদিকে ঋণ আদায়ের হারও কমছে।
এর পরও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বক্তৃতা-বিবৃতিতে দাবি করছে, এটা ‘শতভাগ’ সফল একটি প্রকল্প। দেশের দারিদ্র্য কমে আসার ক্ষেত্রে এ প্রকল্পের ভূমিকাই মুখ্য বলে প্রচার করা হচ্ছে। এমনকি দেশে একজনও দরিদ্র থাকবে না, এমন স্বপ্ন দেখিয়ে আরও ৫ হাজার ১৬২ কোটি টাকা সরকারকে এই খাতে দিতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে, যা সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন।
অর্থনীতিবিদ এবং পিপলস পাওয়ার পার্টিসিপেশন ট্রাস্টের (পিপিআরসি) নির্বাহী পরিচালক হোসেন জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এ প্রকল্পের কারণে দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে, এমন দাবির কোনো ভিত্তি নেই। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ সরকারের বেশ কয়েকটি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প থাকলেও এ প্রকল্প সফল বা এর কারণে দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে, এমন দাবি ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া কিছুই নয়। কোন পদ্ধতি বা সূচকের ভিত্তিতে এ কথা বলছে, তা অজ্ঞাত ও অস্পষ্ট।
ক্ষুদ্র কৃষক উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এইচ এম আবদুল্লাহ বলেন, এ প্রকল্পের কার্যক্রম গ্রামীণ জনপদে কী ধরনের প্রভাব বিস্তার করছে, তা কোনো নিরপেক্ষ সংস্থা দিয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। (কার্যবিবরণী, জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটির সভা, ১৫ এপ্রিল ২০১৫)
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পের সফটওয়্যারে সব তথ্য উল্লেখ করা হলেও মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের সংখ্যা বা বকেয়া ঋণের চিত্র দেখানো হয়নি। এটাকে কৌশল আখ্যা দিয়ে প্রকল্পের একাধিক কর্মকর্তা জানান, যেকোনোভাবেই প্রকল্প সফল দেখানোর চেষ্টা চলছে। যদিও মাঠের বাস্তব চিত্র এমনটি নয়।
মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেয়াদোত্তীর্ণ বা কুঋণ হওয়ার বিষয়টি চাপা দিতে কেন্দ্র থেকে ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়ার মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে প্রায় সব ঋণই চলমান বলে দেখানো সম্ভব হবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ঋণ বিতরণের বিপরীতে আদায়, সঞ্চয় ও বকেয়ার তথ্যগুলো এ প্রকল্পের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। গত মার্চে দেশের বিভিন্ন জেলার ৪০ উপজেলা থেকে প্রকল্পের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো প্রতিবেদন সংগ্রহ করে বিশ্লেষকদের এ আশঙ্কার সত্যতা মেলে।
মাঠের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এসব উপজেলায় ওই মাসে ঋণ আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৮২ লাখ টাকা। অর্থাৎ আদায়ের হার ১৯ দশমিক ৫৩ এবং অনাদায়ি হার ৮০ দশমিক ৪৭।
উপজেলার প্রকল্প সমন্বয়কারীদের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলায় মার্চ মাসে ২২ লাখ ৯৯ হাজার টাকা আদায় করার কথা ছিল, আদায় হয়েছে মাত্র ৯৮ হাজার টাকা। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৩৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকার বিপরীতে ৬ লাখ ৯ হাজার টাকা, পাবনার সাঁথিয়ায় ২১ লাখ ১৬ হাজার টাকার বিপরীতে ৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা, শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে ১২ লাখ ৪৮ হাজার টাকার বিপরীতে ৫ লাখ ১১ হাজার টাকা আদায় হয়েছে। এমন ৪০টি উপজেলার তথ্য এ প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।
তবে প্রকল্প পরিচালক দাবি করেন, মাঠ থেকে প্রকল্প সমন্বয়কারীদের পাঠানো এসব তথ্য বিভ্রান্তিকর। তাঁর কাছে বিকল্প উপায়ে সংগৃহীত তথ্যই সঠিক।
অনুসন্ধানে আরও পাওয়া গেছে, মাঠপর্যায়ে খেলাপি হওয়ার প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বাড়ার কারণ বেশির ভাগ গরিব মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে এটি সঞ্চয়ের বিপরীতে সরকারের অনুদান। তাই আর ফেরত দিতে হবে না।
সমিতিগুলোর হালচাল: প্রথম আলোর পক্ষ থেকে কমপক্ষে ৩০টি সমিতির ব্যবস্থাপক ও প্রকল্পের মাঠকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া একটি বাড়ি একটি খামারের সাফল্যের ঢোল যেভাবে পেটানো হচ্ছে, তা বাস্তবসম্মত নয়। ৬০ জনের বেশির ভাগ সমিতিতে ৪০ থেকে ৪৫ জন সদস্য রয়েছেন এবং নিষ্ক্রিয় সদস্যের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক।
পঞ্চগড়ের শালবাহান লোহাকাচি গ্রাম উন্নয়ন সমিতিতে ৬০ সদস্যের মধ্যে নিয়মিত আছেন ৫১ জন, ঋণ নিয়েছেন ৪৮ জন, এঁদের মধ্যে খেলাপি ১৭ জন। অর্থাৎ ৬০ জনের মধ্যে সক্রিয় আছেন ৩১ জন। একই জেলার আটোয়ারী ছেপড়াঝাড়া গ্রাম উন্নয়ন সমিতির ৬০ জনের ১৪ জনই সঞ্চয় জমা দেন না। ৩৮ জন ঋণ নিলেও নিয়মিত শোধ করছেন ১০ জন, ২৮ জনই অনিয়মিত।
আবার ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ভেলাজান সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমিতির ৬০ জনের সবাই ঋণ নিয়েছেন, কোনো খেলাপি নেই। এমন সমিতি ৩০টির মধ্যে একটি পাওয়া গেছে।
একই জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় একজন মাঠকর্মীর আওতায় নয়টি সমিতির ৫৪০ জন সদস্য রয়েছেন। সেখানে প্রায় ৬০ শতাংশ সদস্যই ঋণখেলাপি। মাঠকর্মী নির্মল চন্দ্র সিংহ জানান, গত বছরের জানুয়ারিতে যোগ দেওয়ার পর তিনি আস্তে আস্তে ঋণ আদায়ের চেষ্টা করছেন। গমের মৌসুমে ঋণ শোধ করার অঙ্গীকার করেছেন প্রায় সবাই।
সমিতি, সদস্য ও সংকট: ২০০৯ সালের ১ জুলাই প্রকল্পের শুরু। এর দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় ২০১৩ সালের জুলাইয়ে। প্রকাশ্যে না হলেও আড়ালে-আবডালে বলা হচ্ছিল, গ্রামীণ ব্যাংকের বিকল্প হিসেবে এ প্রকল্প সারা দেশে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করে দারিদ্র্য বিমোচন করবে।
প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, ৬০ জন সদস্যের প্রত্যেকে মাসে ২০০ টাকা হিসাবে দুই বছরে ৪ হাজার ৮০০ টাকা সঞ্চয় করবেন। সরকার তাঁদের আরও ৪ হাজার ৮০০ টাকা দেবে। দুই বছরে ৬০ সদস্যের জমা হবে ৫ লাখ ৭৬ হাজার টাকা, এর সঙ্গে বছরে দেড় লাখ টাকা হিসাবে দুই বছরে ওই সমিতিকে সরকার মোট ৩ লাখ টাকা দেবে আবর্তক তহবিল হিসেবে। সব মিলিয়ে দুই বছরে একটি সমিতির সর্বোচ্চ ৯ লাখ টাকা সঞ্চয় হওয়ার কথা।
মোট ৪০ হাজার ১২১টি সমিতির মধ্যে (প্রতি সমিতির সদস্য ৬০ জন) পুরোনো সমিতি ১৭ হাজার ৩০০ এবং নতুন সমিতি ২২ হাজার ৮২১। মোট সদস্যসংখ্যা ২৪ লাখ ৭ হাজার ২৬০ জন। পুরোনো সমিতির অধিকাংশই এখন খেলাপি বা অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
দারিদ্র্যমুক্ত করার স্বপ্ন দেখিয়ে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের চেষ্টা
এ অবস্থা স্বীকার করে প্রকল্প পরিচালক প্রশান্ত কুমার রায় প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ৭০ ভাগ সমিতি ভালো চলছে। তাঁর মতে, নতুন ২৩ হাজার সমিতি পুরোনোগুলোর তুলনায় ভালো চলছে।
রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প: দেশজুড়ে এত বড় এবং এত টাকার প্রকল্প চললেও সরকারি বা বেসরকারি কোনো পর্যায়ে এর সর্বশেষ মূল্যায়ন হয়নি। এমনকি পরীক্ষা-নিরীক্ষা (পাইলটিং) ছাড়াই এত বড় কাজ শুরু হয়ে যায়।
পিপিআরসির নির্বাহী পরিচালক হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের অনেকগুলো সফল প্রকল্পের মধ্যে এটি স্থূল রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের শুরুটাই ছিল ত্রুটিপূর্ণ এবং পাইলটিং ছাড়া বড় বাজেটের এই বিশাল প্রকল্প নেওয়াটাই অন্যায় হয়েছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, সুচিন্তিত ও পরিকল্পিত না হওয়ায় এ প্রকল্পের গতি বারবার পরিবর্তন করতে হয়েছে। এর উদ্দেশ্য সুস্পষ্টকরণে চরম দুর্বলতা লক্ষ করা যায়। ফলে গরু-ছাগল দেওয়া শুরু করে তা ক্ষুদ্রঋণে মোড় নেয়, এরপর তা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়লে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের মাধ্যমে কাঠামোবদ্ধ করার চেষ্টা হচ্ছে, যদিও ব্যাংকটি কাজই শুরু করতে পারছে না।
আর শতভাগ সফল বলতে চান না: শতভাগ সফল দাবি করা প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক বলেন, এটা আর বলা ঠিক নয়। শতভাগ সফল হতে চাইলে সমিতির সব সদস্য, প্রকল্পের কর্মী, মাঠ প্রশাসন এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সর্বাত্মক সহযোগিতা দরকার।
এ প্রকল্পের কারণে দারিদ্র্য কমেছে এবং ভবিষ্যতে আরও কমবে—কোনো গবেষণা, মূল্যায়ন বা জরিপ ছাড়া এটা কিসের ভিত্তিতে বলছেন, জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক বলেন, সম্প্রতি কোনো মূল্যায়ন হয়নি, তবে আইএমইডি এটা করার কথা বলেছে।
প্রকল্পের মাঠকর্মীদের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশান্ত কুমার বলেন, ওদের নিজের ইউনিয়নে চাকরি দেওয়া হয়েছে, ১০ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হয়। তার পরও ওদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। এ জন্য ঋণ আদায়ের সক্ষমতার সঙ্গে বেতনের বিষয়টি যুক্ত করে দেওয়া হবে।