Sunday, February 15, 2026
হাসিনার লুটপাটতন্ত্র যেভাবে সুশাসন ও অর্থনীতিকে তছনছ করে দিল by মইনুল ইসলাম
কমিটিকে সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরশাসনে বাংলাদেশের অর্থনীতির হালহকিকত গভীরভাবে পর্যালোচনা করে তিন মাসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন সরকারের কাছে প্রদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
কমিটি ১ ডিসেম্বর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের শ্বেতপত্রটির খসড়া প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। শ্বেতপত্রটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘উন্নয়ন বয়ানের ব্যবচ্ছেদ’ (ডিসসেকশান অব আ ডেভেলপমেন্ট ন্যারেটিভ)। প্রায় ৩৯৬ পৃষ্ঠার খসড়া প্রতিবেদনে রয়েছে ২৪টি অধ্যায়। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দাবি করেছেন যে হাসিনার শাসনামলের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ‘চামচা পুঁজিবাদ’ (ক্রনি ক্যাপিটালিজম) থেকে সরাসরি ‘চোরতন্ত্রে’ (ক্লেপ্টোক্রেসি) রূপান্তরিত হয়েছে।
২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনা ভূমিধস বিজয় অর্জন করেন। ক্ষমতাসীন হওয়ার পরই দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের লাগামহীন তৎপরতা শুরু করেন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়স্বজন। কেউ কেউ বলেন যে এই প্রক্রিয়ায় সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী উৎসাহিত করতেন। এই শ্বেতপত্র হাসিনার কথিত উন্নয়ন বয়ানের আড়ালে লুকানো ‘অবিশ্বাস্য লুটপাটতন্ত্রের একটি নির্মোহ ব্যবচ্ছেদের দলিল’ হিসেবে টিকে থাকবে। শ্বেতপত্রের একটি নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ করলে নিচের বিষয়গুলো প্রধানভাবে উঠে আসবে।
এক.
শ্বেতপত্র কমিটির গবেষণায় উঠে এসেছে, স্বৈরশাসক হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের লুটপাটতন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার হিসেবে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার লুণ্ঠিত হয়ে বিদেশে পাচার হয়েছে। সবচেয়ে বেশি লুণ্ঠনের শিকার হয়েছে ব্যাংকিং ও ফিন্যান্সিয়াল, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, ভৌত অবকাঠামো এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাত। শ্বেতপত্রে খাতওয়ারি লুণ্ঠনের তথ্য-উপাত্ত উদ্ঘাটন করে লুণ্ঠিত অর্থের প্রাক্কলন প্রকাশ করা হয়েছে।
শ্বেতপত্রে মোট ২৮টি দুর্নীতির পদ্ধতির মাধ্যমে লুণ্ঠন প্রক্রিয়াকে বিশ্লেষণে নিয়ে আসা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, ভারত ও কয়েকটি ‘ট্যাক্স হেভেন’ সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচারের সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। লুটেরা রাজনীতিবিদদের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় অলিগার্ক ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের খেলোয়াড়, দুর্নীতিবাজ আমলা, ঠিকাদার ও মধ্যস্বত্বভোগী, হাসিনার আত্মীয়স্বজন এবং ‘ইনফ্লুয়েন্স প্যাডলার’ ও ‘হুইলার-ডিলাররা’ এই লুটপাটতন্ত্রের প্রধান চরিত্র।
এই লুটেরারা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে দেশের নির্বাহী বিভাগ, সিভিল প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ, আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো, সরকারি রাজস্ব আহরণ বিভাগগুলো ও বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণকারী বিভাগগুলোকে চরম দুর্নীতিগ্রস্ত করে ফায়দা হাসিলের অংশীদার করে ফেলেছে। দেশের বিনিয়োগ ও রাজস্ব আহরণকে তারা দুর্বল করে ফেলেছে। ধস নামিয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনকে তছনছ করে দিয়েছে।
দুই.
কানাডায় ৪৭ বিলিয়ন থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। দুবাইয়ে ৯৭২ জন বাংলাদেশির রিয়েল এস্টেট সম্পত্তি রয়েছে। মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ কার্যক্রমে ঘরবাড়ি কিনেছেন ন্যূনতম ৩ হাজার ৬০০ বাংলাদেশি। সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে প্রতিবছর গড়ে ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
তিন.
সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী মুস্তফা কামালের নির্দেশে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০১৪ সাল থেকে ‘উপাত্ত কারসাজি’–এর কেন্দ্রে পরিণত হয়। প্রতিবছর জিডিপি বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে মাথাপিছু জিডিপি বাড়িয়ে দেখানোর জন্য দেশের মোট জনসংখ্যাকে কমিয়ে দেখানো হয়েছে।
বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে দেশের রপ্তানি আয়কে। মূল্যস্ফীতির হারকে সব সময় কমিয়ে দেখানো হয়েছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী জনসংখ্যাকে কম দেখানো হয়েছে, যাতে দারিদ্র্য নিরসনে সরকারের সাফল্যকে বাড়িয়ে দেখানো যায়।
দেশের জনগণের জন্মহার ও মৃত্যুহারকে কমিয়ে দেখানো হয়েছে, যাতে জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধির হারকে কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দেখানো যায়। একই সঙ্গে দেশের ‘টোটাল ফার্টিলিটি রেট’কে কম দেখানো হয়েছে, যাতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সরকার সফল হচ্ছে বলে প্রচার করা যায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি আয় আগের বছরে সাবেক সরকার যতখানি দেখিয়েছিল, তার চেয়ে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার কমে গেছে।
চার.
দেশের সাতটি মেগা প্রকল্পের ব্যয় প্রাথমিক প্রাক্কলনের চেয়ে ৭০ শতাংশ বাড়িয়ে অর্থ লুটপাট করা হয়েছে। এর আনুমানিক পরিমাণ ৮০ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা। এই মেগা প্রকল্পগুলো হচ্ছে পদ্মা সেতু প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প, ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প, পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-মাওয়া-যশোর-পায়রা রেলপথ প্রকল্প, চট্টগ্রাম-দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্প, পায়রা বন্দর প্রকল্প ও মাতারবাড়ী কয়লাচালিত বিদ্যুৎ প্রকল্প। এই প্রকল্পগুলোর যথাযথ ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’ ও ‘কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস’ না করার কারণে এই ৭০ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাত সৃষ্টি হয়েছে।
পাঁচ.
দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ পৌনে সাত লাখ কোটি টাকা। শ্বেতপত্র কমিটি প্রকৃত খেলাপি ঋণকে ‘ডিসট্রেসড অ্যাসেট’ নামে অভিহিত করেছে। শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়েছে যে এই ডিসট্রেসড অ্যাসেট দিয়ে সাড়ে ১৩টি মেট্রোরেল কিংবা সাড়ে ২২টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যেত। অবৈধ হুন্ডি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৪ লাখ কোটি টাকা। ১০টি ব্যাংক ‘টেকনিক্যালি দেউলিয়া’ হয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে দুটি ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত আর বাকি আটটা ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক। এগুলোতে তারল্যসংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
বড় ধরনের ঋণ লুটপাটের শিকার হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ও বেসিক ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংক ও অন্য শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো থেকে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংকঋণ, প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে লুটেরারা।
ছয়.
দেশের শেয়ারবাজার থেকে কমপক্ষে ২৭ বিলিয়ন ডলার সরাসরি আত্মসাৎ করা হয়েছে। নানা রকম কারসাজির মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে এক ট্রিলিয়ন টাকার (এক লাখ কোটি) বেশি লুটপাট করেছে কয়েকজন চিহ্নিত ব্যক্তি। ২০১০-১১ সালের শেয়ারবাজারের পরিকল্পিত ধসের কারণ অনুসন্ধানে গঠিত কমিটির রিপোর্টকে কোনো পাত্তা দেওয়া হয়নি। ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে হারিয়ে ফেলেছে।
সাত.
দেশের জনগণের আয়বৈষম্য-পরিমাপক জিনি সহগ ২০২২ সালে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছে গেছে। বিশ্বব্যাংকের জরিপে যে ৭২টি দেশ তাদের আয়বৈষম্য রিপোর্ট করেছে, তার মধ্যে এর চেয়ে বেশি জিনি সহগের মান ব্রাজিল, কলম্বিয়া ও পানামা—এই তিন দেশে বিদ্যমান। তার চেয়েও ভয়াবহ অবস্থানে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশের সম্পদবৈষম্যের পরিমাপক জিনি সহগ, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালে যেটা শূন্য দশমিক ৮২ থেকে শূন্য দশমিক ৮৪–এ পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশ এখন একটি মারাত্মক উচ্চ আয়বৈষম্য ও সম্পদবৈষম্যের দেশ।
আট.
দেশের মাথাপিছু প্রবৃদ্ধির হারকে ১৯৯৫ সাল থেকে কয়েক শতাংশ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। এ জন্য উন্নয়ন অর্থনীতিবিদদের অনেকে বাংলাদেশের এই জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে ‘প্যারাডক্স’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। স্বৈরশাসকের পতনের পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সাবেক সরকারের প্রক্ষেপিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে কমে ৫ দশমিক ৮ শতাংশে এসে দাঁড়াবে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে।
নয়.
আনুমানিক ৭৭ হাজার কোটি থেকে ৯৮ হাজার কোটি টাকা ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের কবজায় চলে গেছে বলে শ্বেতপত্রে জানানো হয়েছে। ৭০ হাজার কোটি টাকা থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজনীতিবিদদের করায়ত্ত হয়েছে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই আমলা ও রাজনীতিবিদদের স্ত্রী-সন্তানেরা পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে।
● ড. মইনুল ইসলাম, অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক

Tuesday, February 9, 2016
সরকার কেন মুনাফা করবে? by মইনুল ইসলাম
গত ১৬ জানুয়ারি প্রথম আলোতে প্রকাশিত কলামে আমি জ্বালানি তেলের দাম কমানোর জন্য নীতি-প্রণেতাদের অনুরোধ জানিয়েছিলাম। কারণ, দাম না কমানোর যুক্তিগুলো বহু আগেই খোঁড়া যুক্তিতে পর্যবসিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দেড় বছর আগের পর্যায় থেকে ধাপে ধাপে কমে এক-পঞ্চমাংশেরও নিচে নেমে আসা সত্ত্বেও এই গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দামের ধস নামার সুবিধা থেকে জনগণকে বঞ্চিত করা কোনো যুক্তিতে গ্রহণযোগ্য নয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, কর্তৃপক্ষ যেন পণ করেছে যে তারা কোনো যুক্তির তোয়াক্কা করবে না। (প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে নানা কৌশলে ক্ষমতাসীন জোট এত ব্যতিব্যস্ত রেখেছে যে এই ইস্যুতে জনমতকে সংগঠিত করে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তোলার ক্ষমতাও তাদের তিরোহিত হয়ে গেছে। আর গৃহপালিত বিরোধী দল জাতীয় পার্টি যে এই ইস্যুতে সরকারকে বিব্রত করবে না, সরকার সেটা বোঝে।) কিন্তু জ্বালানি তেল এবং বিদ্যুৎ নিয়ে সরকারের মুনাফাবাজি অনৈতিক এবং ‘হাফ-বেকড অর্থনীতি’।
জ্বালানি তেল এবং বিদ্যুৎ বর্তমান যুগে একটি উন্নয়নগামী দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম মুখ্য চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। আমাদের দেশে জনগণের এক-তৃতীয়াংশের কাছে স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও আজও বিদ্যুৎ পৌঁছানো যায়নি। মহামতি লেনিনকে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পর জিজ্ঞেস করা হয়েছিল বিপ্লব কী? লেনিন জবাব দিয়েছিলেন, বিপ্লব মানে হলো দেশকে বিদ্যুতায়িতকরণ (রেভল্যুশন ইজ ইলেকট্রিফিকেশন)। এই অগ্রাধিকারের ফলে ৮৭ লাখ বর্গমাইল আয়তনসম্পন্ন তদানীন্তন বিশ্বের এই সর্ববৃহৎ দেশটিকে ১৯১৭ সালের বিপ্লবের মাত্র ১৬ বছরের মধ্যেই ১৯৩৩ সালে বিদ্যুতায়নের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছিল। (বাংলাদেশের আয়তন মাত্র ৫৫ হাজার ৫৬১ বর্গমাইল।) গণচীনও ১৯৪৯ সালের বিপ্লবের দুই দশকের মধ্যে সারা দেশকে বিদ্যুতায়িত করেছিল। অথচ আমরা স্বাধীনতা অর্জনের ৪৫ বছর পরও এই অবশ্যকরণীয় কাজটি করতে পারলাম না! আরও লজ্জাজনক হলো, ২০০১-০৬ সালে বিদ্যুৎ খাতে এ দেশের বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার অবিশ্বাস্য ব্যর্থতার ইতিহাস রচনা করেছিল। তাদের পাঁচ বছরের শাসনামলে টঙ্গীতে একটি ৮০ মেগাওয়াটের ‘পিকিং প্ল্যান্ট’ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণের আর কোনো ব্যবস্থা করা যায়নি, শুধু বিদ্যুতের খাম্বা স্থাপন করে শত শত কোটি টাকা লুটপাটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ফলে ২০০১ সালের ৪ হাজার ২০০ মেগাওয়াট থেকে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন-সক্ষমতা ২০০৬ সালের শেষে ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছিল পুরোনো বিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলোর উৎপাদন বন্ধ বা হ্রাস পাওয়ার কারণে। লোডশেডিং ওই সময়ে কী ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল, সেটা জনগণ নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি। এই বিপর্যয় থেকে বর্তমান সরকার জনগণকে উদ্ধার করেছে বলা চলে। (এর জন্য ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেও কৃতিত্ব দিতে হবে।) গত সাত বছরে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বেড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে।
আমরা জানি যে সরকার স্বল্প মেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করার প্রয়োজনে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনের একটি ইমার্জেন্সি কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল, যে প্ল্যান্টগুলোর ঠিকাদারি বোধগম্যভাবেই ক্ষমতাসীন জোটের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী/শিল্পপতি এবং জোটের নেতা-কর্মীরাই বাগিয়ে নিয়েছেন। ওই ঠিকাদারিগুলো অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় সরকারি প্রকল্প অনুমোদনের প্রচলিত নিয়মকানুনগুলো অনুসরণ করা হয়নি সময় বাঁচানোর অজুহাতে এবং এ জন্য যেন দুর্নীতির মামলা-মোকদ্দমা করা না যায়, সে জন্য একটি ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ও জারি করা হয়। ওয়াকিবহাল মহলের জানার কথা যে কর্তৃপক্ষের কারও কারও যোগসাজশে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল প্ল্যান্টগুলো থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার জন্য ব্যয়সাশ্রয়ী সরকারি খাতের প্ল্যান্টগুলোকে অনেক সময় অব্যবহৃত রাখা হচ্ছিল। স্বল্পমেয়াদি এই জরুরি ব্যবস্থার পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আমদানি করা কয়লাভিত্তিক বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনের মাধ্যমে ২০২৪ সালে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান সরকারের এসব পদক্ষেপ যে দেশকে একটা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শঙ্কা থেকে রক্ষা করেছে, সেটা এখন দেশে-বিদেশে প্রশংসিত।
অনেক বেশি ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উৎপাদন সত্ত্বেও যে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল প্ল্যান্টগুলোকে চরম সংকট মোকাবিলার জন্য স্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোকে কয়েক বছর আগেই ধাপে ধাপে বিদায় করার কথা ছিল। কিন্তু ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে রহস্যজনকভাবে কালক্ষেপণ লক্ষ করা যাচ্ছে। ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে দহরম-মহরম রক্ষাকারী এসব প্ল্যান্টগুলোর মালিকেরা জোর-তদবির চালিয়ে তাঁদের ভাড়ায় বিদ্যুৎ বিক্রয়ের ঠিকাদারির মেয়াদ বারবার নবায়ন করিয়ে নিচ্ছেন এবং এর পেছনে নগদ নারায়ণের ভূমিকা থাকার অভিযোগ উঠেছে। এই স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নও ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করা হচ্ছে বলে কয়েকজন বিশ্লেষক অভিযোগ তুলেছেন। আরও গুরুতর ব্যাপার হলো, এখন যখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে, তখন ওপরের হিসাবনিকাশগুলো সব ওলটপালট হয়ে গেছে। জ্বালানি তেলের উচ্চ দামের সময় ওই রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলোতে ডিজেল এবং ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে যেহেতু বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছিল, তাই ওগুলোতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ছিল ১৫ থেকে ২০ টাকা। (ওগুলো থেকে বিদ্যুৎ না কিনলেও মিনিমাম চার্জ পরিশোধ করার নিয়ম রয়েছে।) আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়তে বাড়তে যখন ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১৫০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল, তখন তার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দামকে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে এ দেশে বাড়ানো হয়নি অর্থনীতিতে ওই দাম বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাবের বিবেচনায়। ফলে সরকারকে প্রচুর ভর্তুকি দিতে হয়েছে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল প্যান্টগুলো থেকে বিদ্যুৎ কিনে ওই বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট গড়ে ছয় টাকায় বা তারও কমে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করতে হওয়ায়। ওই ভর্তুকির বোঝা বহন করতে হয়েছে একদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে এবং অন্যদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে। তাই এই দুটো সংস্থাকে বাজেট-সহায়তা ও ঋণসহায়তা দিতে হয়েছে সরকারকে। (সরকারের বাজেট ঘাটতিকে সামাল দেওয়ার জন্য কিছুদিন আগেও বিদ্যুতের সক্ষমতা অব্যবহৃত রেখে ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হতো, এটা এখন অনেকে হয়তো ভুলে গেছেন!) কিন্তু তেলের আন্তর্জাতিক দাম গত দেড় বছরে ক্রমাগত কমে ৩০ ডলারের নিচে চলে আসায় বর্তমানে নিচে উল্লিখিত মুনাফাবাজির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে:
১) বর্তমানে প্রতি লিটার অকটেন উৎপাদন খরচ কমে দাঁড়িয়েছে ৫০ টাকারও কম আর পেট্রলের উৎপাদন খরচ পড়ছে ৪০ টাকার মতো। অথচ দেশে এক লিটার অকটেনের বর্তমান দাম ৯৯ টাকা এবং পেট্রলের দাম ৯০ টাকা। তার মানে, এই দুটো পণ্যে ১০০ শতাংশের বেশি মুনাফা করছে পেট্রোলিয়াম করপোরেশন।
২) এ দেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রীত জ্বালানি তেল ডিজেলের লিটারপ্রতি আমদানি খরচ পড়ছে ৪০ টাকার কম। অথচ এক লিটার ডিজেল বিক্রি করা হচ্ছে ৬৮ টাকায়। এ ক্ষেত্রে মুনাফার হার ৭০ শতাংশ।
৩) ফার্নেস অয়েলের ক্রয়মূল্য পড়ছে ২৫ টাকা। বিক্রয়মূল্য নির্ধারিত রয়েছে ৬২ টাকা। অতএব, এ ক্ষেত্রে মুনাফা করা হচ্ছে ১৪৮ শতাংশ।
৪) ১১টি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কোম্পানিকে এখন সরাসরি জ্বালানি তেল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অতএব, তাদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ এখন ছয় টাকার নিচে নেমে এসেছে। অথচ পিডিবি বিদ্যুতের গড় বিক্রয়মূল্য পাচ্ছে ছয় টাকার বেশি। তাহলে তাদের লোকসান হচ্ছে কীভাবে? আর সরকারি ভর্তুকি লাগছে কোথায়? এমতাবস্থায় দাম বাড়ানোর আবদারের কী যুক্তি? সামিট পাওয়ারের জনৈক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও ব্যাপারটা স্বীকার করেছেন। (যেসব রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট এ সুবিধা পায়নি, তারা সরকারি দাম ৬২ টাকায় এক লিটার ফার্নেস অয়েল কিনছে অথবা ৬৮ টাকায় ডিজেল কিনছে এবং তাদের খরচ পড়ছে ইউনিটপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা। ওই দামে সরকার বিদ্যুৎ কিনছে তাদের কাছ থেকে, ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ইউনিটপ্রতি ৯ থেকে ১৪ টাকা। পিডিবিকে লোকসানের অজুহাতে ভর্তুকি প্রদানের এই তেলেসমাতি কার স্বার্থে?)
ওপরের হিসাবগুলোর আলোকে বলতে চাই, দেশবাসী জ্বালানি তেল এবং বিদ্যুৎ নিয়ে সরকারের মুনাফাবাজি থেকে রেহাই পেতে চায়। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন তাদের টার্মস অব রেফারেন্স অনুযায়ী সরকারের আজ্ঞাবহ না হয়ে জ্বালানি তেলের বর্তমান আন্তর্জাতিক দামের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করে জ্বালানি তেল এবং বিদ্যুতের অভ্যন্তরীণ দাম সমন্বয়ের সাহস দেখাতে পারলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো দূরে থাক, কমানোই এখন যৌক্তিক। এই পরিপ্রেক্ষিতে অনতিবিলম্বে কমিশন কর্তৃক ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৪০ টাকা, ফার্নেস অয়েলের দাম ২৫ টাকা, কেরোসিনের দাম ২০ টাকা, পেট্রলের দাম ৬০ টাকা এবং অকটেনের দাম ৭০ টাকায় পুনর্নির্ধারণের দাবি সময়োপযোগী মনে করি।
মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Tuesday, February 2, 2016
বিচারপতির ওপর বিএনপির অহেতুক আক্রমণ by মইনুল ইসলাম
উল্লেখ্য, পঞ্চম সংশোধনীর প্রবক্তা জিয়াউর রহমান অবৈধ সামরিক শাসনের গায়ে ‘সিভিলিয়ান ডেমোক্রেসির’ জোব্বা পরানোর উদ্দেশ্যে সুবিধা-শিকারি রাজনীতিবিদ, সামরিক অফিসার, সিভিল আমলা ও ব্যবসায়ীদের জড়ো করে প্রথমে জাগদল এবং পরে বিএনপির জন্ম দিয়েছিলেন। সে কারণে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের কাছে যে বিচারপতি খায়রুল হক শত্রু হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন হাইকোর্টের রায়ের পর থেকেই। পরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ওই রায় চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করায় বিএনপি সরাসরি ওই ইস্যুতে বিচারপতি খায়রুল হককে গালমন্দ করতে পারছে না, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা–সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় প্রদানের পর তাঁকে উদ্দেশ করে অপমানজনক গালাগালের তুবড়ি ফোটাচ্ছেন বিএনপির বাক্যবাগীশ নেতারা।
সম্প্রতি তাঁরা প্রধান বিচারপতির একটা বক্তব্যের কারণে বিচারপতি খায়রুল হককে ব্যক্তিগত আক্রমণ করার স্বর্ণ-সুযোগ পেয়ে গেছেন। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা সম্প্রতি তাঁর মতামত ব্যক্ত করেছেন যে বিচারপতিরা অবসর গ্রহণের পর চাকরিরত থাকাকালীন তাঁদের প্রদত্ত সংক্ষিপ্ত রায়কে পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায়ে পরিণত করে তাতে স্বাক্ষর করার যে রেওয়াজ এ দেশের উচ্চ আদালতে চালু রয়েছে, সেটাকে তিনি সংবিধান পরিপন্থী মনে করেন। কারণ, তিনি মনে করেন, বিচারপতিরা সংবিধান সমুন্নত রাখার যে শপথ নেন, অবসর গ্রহণের পর তা আর বলবৎ থাকে না। ভবিষ্যতে তিনি এই প্রথাটি আর চলতে দেবেন না বলে অঙ্গীকার ঘোষণা করেছেন। (অবসর গ্রহণের চার বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও কোনো কোনো বিচারপতির নাকি লিখিত রায় লিখে স্বাক্ষর প্রদানের কাজ সম্পন্ন করার সময় হয়নি।) বলা বাহুল্য, তাঁর এই মতামত সারা দেশের আইনজ্ঞ ও সংবিধান-বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, যদিও তিনি অতীতে প্রদত্ত কোনো রায় এর ফলে অবৈধ হবে না বলে স্পষ্ট মত প্রদান করেছেন। রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রধান বিচারপতির এই বক্তব্য তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। বিএনপির সংকটাপন্ন রাজনীতির জন্য এই ইস্যুটা টনিক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের ব্যাপারে আমি পক্ষে-বিপক্ষে কিছু বলতে চাই না। তবে সংক্ষিপ্ত রায় যেহেতু শপথের অধীনে থাকাকালীনই দেওয়া হয়েছে, অতএব পরে এর পূর্ণাঙ্গ লিখিত ব্যাখ্যাসংবলিত রায়ে ওই সংক্ষিপ্ত রায়ের কোনো ব্যত্যয় না করা হলে সেটা অসাংবিধানিক কেন হবে, সেটা বোঝা যাচ্ছে না। আর এই প্রথা তো এ দেশে বহুদিন ধরেই চালু রয়েছে, কেউ তো প্রশ্ন তোলেননি? অসমাপ্ত রায়গুলো লিখে জমা দেওয়া না হলে বিচারপতি শামসুদ্দিনের পেনশনের ফাইলে স্বাক্ষর করা হবে না মর্মে যে সিদ্ধান্ত প্রধান বিচারপতি গ্রহণ করেছিলেন, সেখান থেকেই এই ইস্যুটির উৎপত্তি বলে ধারণা করা যাচ্ছে। বিচারপতি শামসুদ্দিনও দাবি করে চলেছেন, ‘এই প্রথা ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বহু দেশেই প্রচলিত রয়েছে। সুদূর পাকিস্তান আমল থেকেই এ দেশে প্রথাটি বহাল রয়েছে।’ তিনি এ প্রসঙ্গে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, বিচারপতি মোস্তাফা কামাল ও বিচারপতি খায়রুল হকের নাম উল্লেখ করেছেন।
অপরদিকে, বিএনপির পক্ষ থেকে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ভারত ও পাকিস্তানে সম্প্রতি অবসরকালীন রায় লেখা নিষেধ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন। বোঝা যাচ্ছে, এটা হয়তো অদূর ভবিষ্যতে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট মামলার বিষয়ে পরিণত হবে এবং শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমেই এর ফয়সালা হবে। সে জন্য, বিএনপি যদি সুনিশ্চিত অবস্থান গ্রহণ করে যে প্রধান বিচারপতির এহেন মন্তব্যের কারণে বিচারপতি খায়রুল হক কর্তৃক লিখিত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল–সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়টি ‘বাতিলযোগ্য’ হয়ে গেছে, তাহলে কালবিলম্ব না করে তাদের রিট করাই হবে যৌক্তিক পদক্ষেপ। কিন্তু তা না করে বিএনপির বিভিন্ন নেতা যেভাবে অশিষ্ট ভাষায় বিচারপতি খায়রুল হকের বিরুদ্ধে আক্রমণ শাণাচ্ছেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর গ্রেপ্তার দাবি করা চরম অশিষ্টতারই পরিচায়ক।
আমার মতে, বিএনপির নেতারা অহেতুক বিচারপতি খায়রুল হককে অপমান করছেন। যেহেতু নিজের সমর্থনে পত্রপত্রিকায় বা গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়াটা তাঁর পক্ষে শোভন হবে না, তাই এহেন একতরফা গালাগাল ভদ্রজনোচিত নয়। আইনকানুন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ব্যক্তিমাত্রই স্বীকার করবেন যে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে ‘অসাংবিধানিক’ ঘোষণাসংবলিত রায় একটি ঐতিহাসিক রায়। তবে এ সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়েও ভিন্নমত ছিল এবং ৪-৩ সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিদের মতামতের ভিত্তিতেই ওই রায় প্রদত্ত হয়েছিল। আবার, ঐকমত্য পোষণকারী বিচারপতিদের লিখিত ব্যাখ্যায় ভিন্নতা ছিল। ওই ভিন্নমতগুলো প্রদান করতে অস্বাভাবিক বিলম্ব হওয়াতেই ওই রায়ের চূড়ান্ত লিখিত ও স্বাক্ষরিত ভার্সনটি প্রকাশে ১৬ মাস সময় লেগে গিয়েছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিদের সংক্ষিপ্ত রায়ে বলা হয়েছে, নির্বাচিত সংসদ চাইলে আরও দুইবারের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখতে পারবে। লিখিত ব্যাখ্যায় বিচারপতি খায়রুল হক ‘নির্বাচিত সাংসদদের’ মধ্য থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদস্যদের নিযুক্ত করার কথা লিখেছেন, যা মূল রায়ের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। কিন্তু মূল লিখিত রায় প্রকাশের আগেই নির্বাচিত সংসদ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে ফেলেছে, যেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে সংসদ আর প্রয়োজনীয় মনে করেনি। এর দায় কেন বিচারপতি খায়রুল হকের ওপর বর্তাবে? এটা একান্তই সংসদের এখতিয়ারভুক্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
প্রকৃতপক্ষে, বিএনপির নেতা-কর্মীরা বিচারপতি খায়রুল হককে অহেতুক ‘নন্দ ঘোষ’ বানাচ্ছেন! তাঁদের কাছে হয়তো কখনোই এ সত্য গ্রহণযোগ্য হবে না যে জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনকে কোনো বিবেকবান বিচারক কোনো আইনি যুক্তিতেই বৈধতা দিতে পারেন না। সামরিক শাসনকে ‘লেজিটিমেসি’ প্রদানের জন্য ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দলবিধি আদেশ জারি করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন সামরিক সরকারপ্রধানের পদের সর্বময় ক্ষমতা অপব্যবহার করে রাষ্ট্রের গোয়েন্দা এজেন্সিগুলোর ব্ল্যাকমেল বা লোভনীয় টোপের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল গঠন করে জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে সেটাকে জিতিয়ে এনে সামরিক শাসনের গায়ে গণতন্ত্রের লেবাস পরালেই অবৈধ ক্ষমতা দখলকে যে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া যায় না, সেটাই এ দেশের হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করার রায় দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
আমার দৃঢ়বিশ্বাস, এই ঐতিহাসিক রায় যুগ যুগ ধরে নন্দিত হবে এবং এ জন্য বিচারপতি খায়রুল হকের ভূমিকাও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁকে ছোট করার জন্য বিএনপির মরিয়া প্রয়াস আদতে বিএনপির প্রশ্নবিদ্ধ জন্মবৃত্তান্তকেই বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। অর্থের লোভে কিংবা পদের লোভে তিনি এই রায়গুলো দিয়েছেন—এই হাস্যকর প্রলাপগুলো অচিরেই বন্ধ করা হোক। অবসরে যাওয়ার পর বাংলাদেশের একাধিক প্রধান বিচারপতি আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন। বিচারপতি এ টি এম আফজাল, বিচারপতি মোস্তাফা কামাল, বিচারপতি তাফাজ্জল ইসলাম এ ক্ষেত্রে নিকট অতীতের নজির। তাঁদের মধ্যে দুজনকে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারই নিয়োগ দিয়েছিল। তাহলে, বিচারপতি খায়রুল হক একই পথ অনুসরণ করে কীভাবে দোষ করলেন?
বিএনপি নিজেদের ক্ষীয়মাণ জনপ্রিয়তাকে পুনরুদ্ধারকল্পে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণা, ২৫ মার্চের রাতে বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তার, ২৬ মার্চের বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা—সবকিছুকে নিয়ে একের পর এক বিতর্ক সৃষ্টি করছে। স্বীকৃত ইতিহাসকে অস্বীকার করে এসব আবোলতাবোল বক্তব্য দিয়ে তারা কী ফায়দা হাসিল করতে চাইছে? বিএনপির জন্মের আগের ইতিহাসকে তাদের নিজের মতো করে সাজিয়ে নেওয়ার বদমতলব কি পরিত্যাগ করার সময় আসেনি? ১৯৭৮ সালে জন্ম নেওয়া বিএনপির ১৯৪৭-১৯৭১ সালের সংগ্রামের ইতিহাসকে অস্বীকার করার কী যুক্তি থাকতে পারে? ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে পণ্ডিতি করে নতুন নতুন তত্ত্ব আবিষ্কারের মাধ্যমে তারেক রহমান বিএনপির রাজনীতিকে কোথায় দাঁড় করাতে চাইছেন?
৩০ লাখ শহীদ সম্পর্কে পাকিস্তান প্রশ্ন তুলতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের তিন দফায় প্রধানমন্ত্রীর কুরসিতে বসা খালেদা জিয়া ৪৫ বছর পর পাকিস্তানের এই প্রোপাগান্ডায় শরিক হবেন কেন? কাকে কী মেসেজ দিতে চাইলেন তিনি? আর ভুল স্বীকার না করে কিছু কিছু পদলোভী বিএনপি নেতা যেভাবে খালেদা জিয়ার এই মারাত্মক ভুলকে বাহবা দিয়ে চলেছেন, সেটা কি আদতেই বিএনপির উপকার করছে? বিএনপির ভুলের পর ভুলের এই কাফেলায় বিচারপতি খায়রুল হককে টার্গেট করাটাও একটা বড় ভুল মনে করি।
বিচারপতিদের অবসর গ্রহণের পর সংক্ষিপ্ত রায় লেখা এবং স্বাক্ষর করার বিরুদ্ধে প্রধান বিচারপতির ঘোষিত অবস্থানকে অবলম্বন করে আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অদূর ভবিষ্যতে সংবিধানে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন এক্ষণে বিএনপির জন্য দিবাস্বপ্নের শামিল হবে। আর এই উদ্দেশ্যে বিচারপতি খায়রুল হককে যতই বিতর্কিত করা হোক না কেন, তিনি দেশবাসীর কাছে শ্রদ্ধাভাজনই থাকবেন।
মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Sunday, January 24, 2016
উন্নয়ন করছেন, দুর্নীতিও বন্ধ করুন by মইনুল ইসলাম
অন্যদিকে, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির নিয়মানুযায়ী ভাষণের পরদিন এর প্রতিক্রিয়ায় তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের মাধ্যমে বিএনপির পক্ষ থেকে মঈন খান ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করলেন যে দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে নয়, লুটপাটের মহাসড়কে অবস্থান করছে। বিএনপির এই দাবিকেও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ, দেশের এই ব্যাধিটিও অতি পুরোনো ও দুরারোগ্য। কঠোর হাতে এই ব্যাধির যথাযোগ্য চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময়ের সদিচ্ছা সরকার গত সাত বছরে দেখিয়েছে বলা যাবে না। আমার দৃষ্টিতে এই মুহূর্তে এটাই জাতির অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে ‘এক নম্বর প্রতিবন্ধক’। মানে, এ দেশের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির রাশ টেনে ধরা গেলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নয়, এত দিনে ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যেত। দেশের অর্থনীতি যে উড়াল দিয়েছে, তা নিচের আশা-জাগানিয়া সাফল্যগুলো প্রমাণ করছে:
১. ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৮২ শতাংশই দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল, কিন্তু ২০১০ সালের হাউস হোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে মোতাবেক দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারী জনসংখ্যার অনুপাত ৩১ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০১৬ সালে দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানকারীদের হার জনসংখ্যার ২৩ শতাংশে নেমে গেছে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে।
২. মোটা ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ম্ভরতা অর্জন করেছে। ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের খাদ্যশস্যের চাহিদা মেটানোর জন্য ধান লাগত বার্ষিক দেড় কোটি টন, অথচ ধান উৎপাদন ছিল মাত্র ১ কোটি ১০ লাখ টন, ঘাটতি ছিল প্রায় ৪০ লাখ টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ধান উৎপাদন ৩ কোটি ৮৪ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে, যার ফলে দেশ মোটা ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে এখন খাদ্য রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন করেছে। গত ৪৫ বছরে দেশের মাছ উৎপাদন বেড়েছে ছয় গুণ। মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে চতুর্থ। শাকসবজি উৎপাদনও বেড়েছে প্রায় চার গুণ।
৩. ১৯৮১-৮২ অর্থবছরে এ দেশের জিডিপির অনুপাত হিসাবে বৈদেশিক ঋণ/অনুদান ১৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এই অনুপাত জিডিপির ১ শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে। আরও স্বস্তিকর হলো, বৈদেশিক ঋণ/সাহায্যের ৯৮ শতাংশই এখন প্রকল্প ঋণ, মাত্র ২ শতাংশ খাদ্যসাহায্য। বাংলাদেশ এখন আর পণ্য সাহায্য নেয় না। অথচ সত্তরের দশকে গড়ে প্রায় ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ বৈদেশিক সাহায্য নেওয়া হতো খাদ্যসাহায্য হিসেবে, ৪০ দশমিক ৮ শতাংশ নেওয়া হতো পণ্য সাহায্য হিসেবে আর বাকি ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ ছিল প্রকল্প ঋণ। আমাদের রাজনীতিবিদ এবং আমলারা প্রকল্প থেকে মার্জিন আত্মসাৎ করার লোভে এখনো প্রকল্প ঋণ গ্রহণের বদখাসলত ছাড়তে পারছেন না, নইলে এখন বৈদেশিক ঋণ না নিলেও বাংলাদেশের অর্থনীতির কোনোই ক্ষতি হবে না।
৪. বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের চলতি হিসাবে দুই বছর বাদে গত ১০ বছর ধরে উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হচ্ছে। বাণিজ্য ভারসাম্যের ঘাটতি পূরণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিট্যান্স যথেষ্ট প্রমাণিত হচ্ছে। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ২৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, ভারতের পরই। পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৬ বিলিয়ন ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বৈধ পথে প্রেরিত রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার। আরও ৮-১০ বিলিয়ন ডলার হুন্ডি ও অন্যান্য অপ্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থনীতিতে প্রবেশ করছে (হয়তো ডলার আসছে না)। এই বিপুল রেমিট্যান্স প্রবাহ গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের জোয়ার সৃষ্টি করেছে।
৫. বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ছিল ৩১ বিলিয়ন ডলার, মানে ৩১০০ কোটি ডলার। অথচ, ১৯৮১-৮২ অর্থবছরে তা ছিল মাত্র ৮২ কোটি ডলার। তৈরি পোশাক ছাড়াও চামড়া, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, সিরামিক পণ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য এবং মৎস্য রপ্তানির প্রবৃদ্ধি প্রতিবছর আশাব্যঞ্জক থাকছে। চীনের পর এখন পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানিকারকে পরিণত হয়েছে।
৬. বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার প্রতিবছর ৬ শতাংশের বেশি হচ্ছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্নীতি-লুটপাট কমাতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির হারকে ৮ শতাংশে উন্নীত করা যাবে।
৭. বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংক প্রবর্তিত ÿক্ষুদ্রঋণ পদ্ধতি প্রান্তিক অবস্থানের ভূমিহীন নারীদের কাছে ব্যাংকঋণ পৌঁছে দেওয়ার সফল ও লাগসই ব্যবস্থা হিসেবে বিশ্ব-স্বীকৃতি পেয়েছে নোবেল পুরস্কার জয় করার মাধ্যমে। ক্ষুদ্রঋণব্যবস্থার কিছু নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য সত্ত্বেও প্রান্তিক অবস্থানের উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠীর কাছে পুঁজি সরবরাহের এই পদ্ধতিগত উদ্ভাবনকে আরও গ্রহণযোগ্য ও টেকসই করাটাই এখন জাতির চ্যালেঞ্জ।
৮. ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির প্রশংসনীয় অগ্রগতি বাংলাদেশের আনাচকানাচে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিপ্লবের সুফল পৌঁছে দিচ্ছে। দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ১৩ কোটি এখন মোবাইল টেলিফোনের আওতায় চলে এসেছে, যার খরচ দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে সর্বনিম্ন। দেশের সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করে।
৯. বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ আসছে শিল্প খাত থেকে, ১৮ শতাংশ আসছে কৃষি খাত থেকে আর ৫২ শতাংশ আসছে টারশিয়ারি (প্রধানত সেবা ও বাণিজ্য) খাত থেকে। জিডিপি কম্পোজিশনের এই উল্লেখযোগ্য রূপান্তর দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত ও টেকসই হওয়ার লক্ষণ।
অন্যদিকে, উন্নয়নের পথে যাত্রা সত্ত্বেও সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতির সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জন ও পুঁজি লুণ্ঠনের ‘সিস্টেমের’ দৌরাত্ম্য গত সাত বছরে একবারেই কমেনি। এর ফলে সাধারণ মানুষ যেমন দৈনন্দিন জীবনে ঘুষ-দুর্নীতির তাণ্ডবে দিশেহারা, তেমনি সরকারের প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পে যে দুর্নীতির মচ্ছব চলছে, সেটা প্রকটভাবে ধরা পড়ছে। প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলিত ব্যয়ের কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।
কয়েকটি উদাহরণ দেখুন: ঢাকার মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নির্মাণব্যয় শেষ পর্যন্ত প্রতি বর্গমিটারে যা দাঁড়িয়েছে, সেটা অস্বাভাবিক। পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশিপের (পিপিপি) নির্মিত এই প্রকল্পে যেভাবে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যয় বাড়ানো হয়েছে, সেটা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। খবর নিয়ে দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন জোটের সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যবসায়ী-ঠিকাদারদের বিভিন্ন মহলকে বখরা দিয়ে মূল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি এই অবিশ্বাস্য খরচ ফাঁপানোর কাজটি সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। প্রকল্প চালু হওয়ার পর চুক্তির শর্তাবলি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান দুই বছর ধরে কয়েক গুণ বেশি হারে টোল আদায় করে যাওয়া সত্ত্বেও সরকার রহস্যজনকভাবে বিষয়টির আইনি সুরাহার প্রক্রিয়া ঝুলিয়ে রেখেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে চার লেনে প্রশস্তকরণ প্রকল্পের খরচ প্রাক্কলিত ব্যয়ের প্রায় চার গুণ বেড়ে যাচ্ছে। শুধু বিলম্বের ওজর দেখিয়ে এত বেশি ব্যয়বৃদ্ধিকে জায়েজ করা যাবে না। কারণ, গত সাত বছরে নির্মাণসামগ্রীর আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ দাম এত বেশি বাড়েনি যে তা দিয়ে প্রকল্পের কয়েক গুণ ব্যয়বৃদ্ধিকে যৌক্তিক প্রমাণ করা যাবে। এই বড় প্রকল্পটির পাশাপাশি সড়ক-সম্পর্কীয় সব প্রকল্পের খরচ দফায় দফায় বাড়ানো এখন রুটিনে পরিণত হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথকে ডাবল ট্র্যাক করার প্রকল্পের ব্যয়ও কয়েক গুণ বাড়িয়ে ফেলা হয়েছে। রেলওয়ের তাবৎ প্রকল্প বিলম্বিত হওয়াই নিয়মে পরিণত হয়েছে।
মোদ্দা কথা হলো, প্রকল্প মানেই উন্নয়ন—এটা আমাদের রাজনীতিতে বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত হয়েছে বহুদিন আগেই। আর প্রকল্প থেকে রাজনীতিবিদ, আমলা ও ব্যবসায়ী-ঠিকাদারেরা মার্জিন আহরণ করে অনর্জিত আয়-রোজগার করার বিষয়টিও এখন আমাদের ধাতস্থ হয়ে গেছে। বিএনপির তুলনায় এ ব্যাপারে বরং আওয়ামী লীগের পারঙ্গমতা কিছুটা কম বলে ধারণা রয়েছে। অতএব, দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে উত্তীর্ণ হলে যে পাল্লা দিয়ে রাজনৈতিক-আমলাতান্ত্রিক-ব্যবসায়িক পুঁজি লুণ্ঠন বাড়াই স্বাভাবিক, সেটা বিএনপির নেতারাও ভালোভাবে জানেন। আমার মতে, লুটপাটের মহাসড়কে অবস্থানের ব্যাপারে বিএনপির এহেন মন্তব্য যদি সুস্পষ্ট তথ্য-উপাত্তভিত্তিক হয়, তাহলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সেগুলোকে আমলে নিয়ে কার্যকর তদন্ত শুরু করলে এবং অভিযোগগুলোকে আইনি প্রক্রিয়ার অধীনে নিয়ে এলে জাতি উপকৃত হবে। বিরোধী দল বলেই চলেছে, দুদক শুধু অতীতের ক্ষমতাসীন মহলের দুর্নীতি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করায় বেশি পারদর্শিতা প্রদর্শন করছে। এ ব্যাপারে দুদককে সাবধানতার সঙ্গে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতেই হবে। আমিও মনে করি ‘স্বাধীন’ দুদকের আরেকটু বেশি সাহসী হওয়ার প্রয়োজন অনস্বীকার্য।
প্রধানমন্ত্রী বারবার বলে চলেছেন, তাঁকে কেনা যায় না। তাঁর এই সাহসী বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে তাঁকে দুর্নীতিবাজ ও পুঁজি লুটেরাদের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। তাঁর এবং তাঁর দলের জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের এটাই একমাত্র পথ। তাঁর সরকারের সাফল্যগুলোকে বরবাদ করার জন্য দুর্নীতিই হবে প্রতিপক্ষের হাতে সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র। এই অস্ত্রকে ভোঁতা করার প্রয়োজনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে এবং অবিলম্বে।
ড. মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Sunday, January 17, 2016
তেলের দাম না কমানোর সিদ্ধান্ত আর কত দিন? by মইনুল ইসলাম
আন্তর্জাতিক বাজারে যখন তেলের দর প্রায় দেড় শ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল, তখন বাংলাদেশে ওই দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন ধরনের পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়নি। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্তকে ভুল বলা যাবে না, কারণ জ্বালানি তেল মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনীতির উৎপাদনশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘স্ট্র্যাটেজিক’ অনুঘটক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এর ফলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে প্রচুর লোকসানের ধকল সামলাতে হয়েছিল। একপর্যায়ে ভর্তুকি দিয়ে এই লোকসানের কিয়দংশ মেটাতে গিয়ে সরকারকেও বিশাল বাজেট ঘাটতির কবলে পড়তে হয়েছিল। ওই সময় বাজেট ঘাটতিকে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানির দাম কয়েক দফায় বাড়ানো সত্ত্বেও ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলচালিত প্ল্যান্টগুলোর বিদ্যুতের উৎপাদন ক্যাপাসিটি অব্যবহৃত রেখে ঘনঘন লোডশেডিং করে উৎপাদন ও জনজীবনকে বিপর্যস্ত করা হয়েছে প্রায় এক বছর। দাম বৃদ্ধির পরও ওই সময় পেট্রল ও অকটেন ছাড়া অন্য ধরনের তেলের প্রকৃত খরচ মেটানো যায়নি, যার ফলে ডিজেল, কেরোসিন ও ফার্নেস অয়েলের মতো জ্বালানি পণ্যের দামের সঙ্গে খরচের পার্থক্য মেটাতে সরকারের ভর্তুকিও বন্ধ করা যায়নি, আবার পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসানও তেমন কমানো যায়নি।
এরপর যখন তেলের আন্তর্জাতিক দামে ধস নামতে শুরু করেছে, তখন সরকার তেলের দাম বর্তমান পর্যায়ে অপরিবর্তিত রাখায় সরকারি ভর্তুকি কমতে কমতে শূন্য হয়ে যায় এবং পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসানের অঙ্কও দ্রুত কমতে কমতে শূন্য হয়ে উল্টো তাদের মুনাফার অঙ্ক দ্রুত স্ফীত হতে থাকে। অর্থমন্ত্রী ও জ্বালানি উপদেষ্টা দুজনই যাবতীয় দাবির মুখে তেলের দাম না কমানোর পক্ষে নানা যুক্তি দিয়ে তাঁদের ওই সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। একপর্যায়ে তেলের দাম না কমানোর পক্ষে উত্থাপিত তাঁদের যুক্তিগুলো দুর্বল হতে হতে এখন খোঁড়া যুক্তির রূপ পরিগ্রহ করেছে।
তর্কের খাতিরে ওই যুক্তিগুলোর পুনরুল্লেখ করছি। জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী নিজেই অর্থনীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনকারী মেধাবী অর্থনীতিবিদ এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমাদের কাছে আলোকবর্তিকাস্বরূপ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন। অর্থমন্ত্রী ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের মেধাবী ছাত্র ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। সিএসপি হওয়ার পর তিনিও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে মাস্টার্স করেছেন এবং তাঁর সুদীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক ক্যারিয়ারে বেশির ভাগ সময় তিনি অর্থনৈতিক নীতি–সংক্রান্ত নানা নীতিনির্ধারক পদে দায়িত্ব পালনের কারণে তাঁকেও একজন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ঝানু অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমি শ্রদ্ধা করি। তেলের দাম না কমানোর পক্ষে তাঁদের যুক্তিগুলো আমিও গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। গত দেড় বছরে যেভাবে তাঁরা সরকারের একটা বিশাল ঘাটতির বোঝা হালকা করে ফেলেছেন, সেটাকেও আমি ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করার পক্ষে। কিন্তু এক ব্যারেল অশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক দাম ৩০ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসার পরও তেলের অভ্যন্তরীণ দাম আকাশচুম্বী রেখে শুধু পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মুনাফা ফাঁপানোর লক্ষ্যে এবং সরকারের রাজস্ব খাতে সুবিধা আদায় করে নেওয়ার অবস্থানকে আরও দীর্ঘকাল ধরে রাখাকে অর্থনীতির একজন ছাত্র হিসেবে আর সমর্থনযোগ্য মনে করতে পারছি না। কারণ, জ্বালানি তেল তো আর ১০টি পণ্যের মতো পণ্য নয়, এটা অর্থনীতির গতি-প্রকৃতিকে এত মৌলিকভাবে প্রভাবিত করে যে তেলের দাম না কমানোর নীতিটা এখন পুরো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে জোয়ার আনার বিশাল একটা সুযোগ থেকে দেশকে বঞ্চিত করে চলেছে। ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার এ বছর সাড়ে ৮ শতাংশ অতিক্রম করে গেছে, কিন্তু আমরা এখনো ৭ শতাংশই ছুঁতে পারলাম না। ভারতে জ্বালানি তেলের অভ্যন্তরীণ দামকে যেভাবে ধাপে ধাপে কমিয়ে অর্থনীতিতে এর সুফলগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তা থেকে কি আমাদের কিছুই শিক্ষণীয় নেই?
উল্লিখিত ওই সেমিনারে জ্বালানি উপদেষ্টা কিছু বাস্তবতা উল্লেখ করে তেলের দাম কমানোর পক্ষে ড. বিরূপাক্ষ পালের উত্থাপিত যুক্তিগুলো নাকচ করার প্রয়াস নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এ দেশে দাম বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হলে বিক্রেতারা যত দাম বাড়ানো যৌক্তিক, তার কয়েক গুণ দাম বাড়িয়ে মুনাফাবাজিতে মেতে ওঠেন, অথচ বিশ্ববাজারে কোনো পণ্যের দাম কমে গেলে এ দেশে ওই পণ্যের দাম যৌক্তিকভাবে কমিয়ে ক্রেতাদের তাঁরা দাম কমার ফায়দাটা পাওয়ার সুযোগ দেন না। উদাহরণ ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, মসলাপাতি ইত্যাদি পণ্যের আন্তর্জাতিক দাম সম্প্রতি বেশ কমে গেলেও বাংলাদেশের ভোক্তারা এর সুবিধা পাননি। তিনি আরও বলেছেন, কোনো অজুহাত পেলেই পরিবহনমালিকেরা ভাড়া বাড়ানোর মওকা নিতে মোটেও দেরি করেন না, অথচ এখন যদি ডিজেলের দাম সরকার কমিয়ে দেয়, তাহলেও তাঁরা পরিবহনের ভাড়া কমাবেন না। বরং ভাড়া না কমানোর জন্য নানা ওজর দেখিয়ে তাঁদের খরচ সাশ্রয়ের ফলে উদ্ভূত মুনাফাটুকু নিজেদের ভাগেই টেনে নেবেন। ভাড়া একবার বাড়াতে পারলে আবার বাড়ানোর সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন এ দেশের বিক্রেতারা, এটাই এ দেশের বাজার-সংস্কৃতি। এই যুক্তিগুলো আসলে এ দেশের সরকার ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতারই পরিচায়ক। বাজার-শাসন বা মার্কেট-গভর্নেন্স যে মুক্তবাজার অর্থনীতির সাফল্যের প্রাণভোমরা ধারণ করে রয়েছে, সেটা বুঝতে অনেক দিন লাগবে আমাদের শাসক মহলের। যৌক্তিক মুনাফা করা আর মুনাফাবাজি করা এক কথা নয়। আর মুনাফাবাজির সুযোগ করে দেওয়া লুটপাটকে মেনে নেওয়া বৈকি! অন্যদিকে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ও দাম ব্যবস্থা চালু করার জন্য ভোক্তাস্বার্থ রক্ষার যে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়, তার ধারেকাছেও যাইনি আমরা। (এ দেশে পরিবহনমালিক ও শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নের নেতা বনে যান মন্ত্রী, অযোগ্য চালক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে মানুষ খুনের ক্রিমিনাল অপরাধ করলেও তাঁদের যথাযোগ্য শাস্তি দেওয়ার বিপক্ষে সংঘ-শক্তি জয়ী হয়ে যায়। অতএব এ দেশে ক্রেতাস্বার্থ অবহেলিত থাকাটাই স্বাভাবিক।)
উপদেষ্টা মহোদয় যুক্তি দেখিয়েছেন যে তেলের দাম কমানো হলে বিনিয়োগ বাড়বে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা সত্য নয়। তেলের দাম কমানোর যুক্তি প্রদর্শনের সময় এসব বাস্তবতা বিবেচনা করাই সমীচীন হবে। তাঁর যুক্তি উপেক্ষা করা যাবে না। কিন্তু জ্বালানি তেলের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ ভোগ্যপণ্য, মূলধিন পণ্যের ক্ষেত্রে এর ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিংকেজেস এতই সুদূরপ্রসারী যে দাম কমানোর সম্ভাব্য প্রভাবকে তিনি অবমূল্যায়ন করছেন বলে মনে হচ্ছে। এত দিন ধরে শুধু পেট্রল ও অকটেনের দাম বেশি রেখে মুনাফা করে ডিজেল এবং কেরোসিনে প্রদত্ত ভর্তুকি কিঞ্চিৎ মেটানো হতো। কিন্তু এখন তো ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও কেরোসিনেও মুনাফা করছে পেট্রোলিয়াম করপোরেশন—এর কী অর্থনৈতিক যুক্তি থাকতে পারে? এই তিনটি পণ্য ধনীদের ভোগ্যপণ্য নয়। কেরোসিন তো সমাজের দরিদ্র জনগণের জ্বালানি, তাই এখানে তো সব সময় ভর্তুকি দেওয়াই সমীচীন। ডিজেল থেকে মুনাফা করাও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে গর্হিত কাজ। অন্ততপক্ষে ভর্তুকি না দিলেও যা উৎপাদন খরচ, তার বেশি দাম নেওয়া সমর্থনযোগ্য নয়। আর ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের দাম কমলে বিদ্যুতের দাম কমানোর যুক্তি শক্তিশালী হবে। তাই আমার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব, পেট্রল ও অকটেনে লিটারপ্রতি ১০ টাকা মুনাফা রেখে দাম নির্ধারণ করা হোক, যার ফলে পেট্রলের দাম ৬০ টাকা এবং অকটেনের দাম ৭০ টাকায় নামিয়ে আনা যাবে। ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের দাম ৪০ টাকায় নামিয়ে আনলেও পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের কিছু মুনাফা থাকবে। কেরোসিনে কিছু ভর্তুকি অব্যাহত রাখার সুপারিশ করছি, ২০ টাকার নিচে কেরোসিনের লিটারপ্রতি দাম নির্ধারণ করলেই চলবে।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত হয়েছে যে অশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক দাম ৪০ ডলারের কমে (বর্তমানে ৩০ ডলার) কয়েক মাস ধরে স্থিতিশীল থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন নাকি ৬১ ডলারে এক ব্যারেল তেল কিনে চলেছে তাদের মান্ধাতা আমলের ক্রয়নীতির কারণে। অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে দুজন মেধাবী ও ঝানু অর্থনীতিবিদের দীর্ঘ নেতৃত্ব সত্ত্বেও এটা কীভাবে চলছে? পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উচ্চ বেতনের অতিরিক্ত কত ধরনের ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন, সে সম্পর্কে দেশবাসী কি সঠিকভাবে অবগত আছেন? আমার মনে হয় না। এদিকে একটু নজর দেওয়া প্রয়োজন নয় কি? আর সরকার যে তেল আমদানির ওপর শুল্ক, ভ্যাট ও কর বাবদ পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আহরণ করে থাকে, তা কি আমরা ভালোভাবে জানি?
পুরো তেল আমদানি, পরিশোধন, বিপণন ক্ষেত্রে যে মুনাফাবাজি চলছে, সেটা কি বন্ধ হবে না?
ড. মইনুল ইসলাম, অধ্যাপক: অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Monday, December 28, 2015
দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতেই হবে by মইনুল ইসলাম
বাংলাদেশের এবারের (মানে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের) জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হবে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন কৌশিক বসু পুনরুল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ওই প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ হবে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে। অধ্যাপক বসু বাংলাদেশের ১২ বছর ধরে এই ধারাবাহিক ৬ শতাংশের বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনকে বিশ্বের গুটিকয় সফল উন্নয়নশীল দেশের বিরল সাফল্যের নজির বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। জাতি হিসেবে আমাদের এ জন্য গর্ববোধ করা উচিত। তাঁর ইতিবাচক ও প্রশংসামূলক মন্তব্য আমাদের উজ্জীবিত করবে। তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে অবকাঠামোর ঘাটতি দ্রুত কাটিয়ে ওঠা গেলে এবং ‘আমলাতন্ত্র কমালে’ বা ‘আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে’ বাংলাদেশের জিডিপি, জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে পৌঁছে যাবে। এখানেই তিনি কিছুটা আড়াল রেখে একটু ঘুরিয়ে যে কঠিন কথাটা বলতে চেয়েছেন, পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে এই কলামে তা সরাসরি বলছি আমি। এর মাধ্যমে তিনি দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমানোর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের ইস্যুতে পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংক নিজেদের ঋণপ্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিয়েছে, এটা সবার জানা। বিষয়টি এখনো কানাডার একটি আদালতের মামলায় বিচারাধীন। তাই বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদের দুর্নীতির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে অনেক বেশি সাবধানতা অবলম্বন করাই স্বাভাবিক। ওই দুর্নীতির অভিযোগের সত্যাসত্য সম্পর্কে কিছু বলেননি তিনি। প্রসঙ্গটি পাশ কাটানোর জন্য তিনি বললেন, ওটা ছিল খারাপ ইতিহাস। কিন্তু ওই খারাপ ইতিহাস থেকে একটা খুব ভালো ফল বেরিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ সাহস করে যে নিজস্ব অর্থায়নে এত বড় একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার অকৃপণ প্রশংসা করেছেন। এ ধরনের সাহসী অবস্থান গ্রহণ সাত–আট বছর আগে বাংলাদেশের জন্য অচিন্তনীয় ছিল, কিন্তু যখন বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ২৭ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে, তখন এই সাহস মানায় বৈকি! কোনো বিতর্ক সৃষ্টি না করে কী সুন্দর জবাব!
কিন্তু তাঁর মতো একজন মেধাবী অর্থনীতিবিদের তো বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে দুর্নীতির ইস্যু কোনোমতেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সে জন্যই বেশ কয়েকবার তাঁর সাক্ষাৎকারে ঘুরেফিরে দুর্নীতির প্রসঙ্গটি এসেছে। কারণ, বিবেকের দ্বারা পরিচালিত হয়ে কোনো উন্নয়ন–চিন্তাবিদ যদি বাংলাদেশের উন্নয়ন-অনুন্নয়ন নিয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করেন তাহলে তাঁকে বলতেই হবে যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে ‘টেক অফ’ (উড্ডয়নের সূচনা বা উড্ডয়ন সম্ভাবনা) সারা বিশ্ব পর্যবেক্ষণ করছে, তাকে টেকসই করতে হলে বা স্থায়িত্ব দিতে হলে উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের লাগাম টেনে ধরতে হবে। কারণ, প্রতিবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারের ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ হারিয়ে যাচ্ছে এই দুর্বৃত্তদের বেলাগাম অপকর্মের শিকার হয়ে এবং ক্ষমতাসীনদের মার্জিন আহরণের অপরাজনীতির কারণে। প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলে থাকেন, তাঁকে কেনা যায় না। আমরা তাঁকে বিশ্বাস করতে চাই। কিন্তু দুর্নীতি দমনে তাঁর সরকারের ভূমিকা পর্যালোচনা করলে এই একটি ব্যাপারে তাঁর সরকারের সঙ্গে তাঁর পূর্বসূরি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের তেমন গুণগত পার্থক্য তো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ২০০১-০৬ মেয়াদের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সাংসদ, বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মী এবং সর্বোপরি ‘হাওয়া ভবনের’ যুবরাজ ও তাঁর ইয়ার-দোস্তদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাগুলোর অধিকাংশই শুরু করেছে ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের প্রবল ক্ষমতাধর দুর্নীতি দমন কমিশন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতা-কর্মীও ওই সময় মামলার আসামি হয়েছিলেন, যদিও আওয়ামী লীগ ২০০১-০৬ মেয়াদে বিরোধী দলে থাকায় বোধগম্য কারণে তাদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা অনেক কম ছিল। বেশ কিছু রাঘববোয়াল ব্যবসায়ী-শিল্পপতিও দুর্নীতির জালে ধরা খেয়েছিলেন জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন দুদকের দুর্নীতিবিরোধী অভূতপূর্ব প্রতিরোধযুদ্ধে। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য যে আইনগত ও পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে ওই সময়ে রুজু করা মামলাগুলোর কার্যক্রম পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতে ভণ্ডুল হয়ে গিয়েছিল। এর ফলে আইনগত ত্রুটি নতুন আইনের মাধ্যমে সংশোধন করে মামলাগুলো আবার শুরু করতে হয়েছে।
আরও দুর্ভাগ্যজনক হলো, ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জারি করা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অধ্যাদেশকে তামাদি হয়ে বাতিল হতে দিয়ে এর পরিবর্তে যে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন পাস হয়েছে, তাতে দুদককে অনেকটা ‘নখদন্তহীন ব্যাঘ্রে’ পরিণত করে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন খোদ দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান। উপরন্তু অভিযোগ উঠেছে যে ক্ষমতাসীন জোটের নেতা-কর্মীদের মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নিয়ে দুদক শুধু অতীতের সরকারের কর্তাব্যক্তিদের দুর্নীতি নিয়েই তদন্ত এবং মামলা চালানোয় বেশি আগ্রহ ও পারদর্শিতা প্রদর্শন করছে।
বিরোধী মহলের এহেন যে অভিযোগ অহরহ শোনা যাচ্ছে সে ব্যাপারে দুদককে সাবধানতার সঙ্গে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতেই হবে। কারণ, সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমতাসীন মহলের দুর্নীতির অভিযোগগুলো বেশি গুরুত্ব পাওয়া স্বাভাবিক, এগুলো অপেক্ষাকৃত তরতাজা বলে। স্বীকার করে নিতে হবে, গত ছয় বছরে দুর্নীতি যে মোটেও কমেনি, সেটা সাধারণ মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবের কল্যাণে প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে ওগুলো সবিস্তারে ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দুদক তো অভিযোগগুলোর বেশির ভাগই তদন্ত এবং মামলা পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে না। অতএব, দুদক যে দুর্নীতি উদ্ঘাটনে একপেশে অবস্থান নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে, তাতে ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতি ও লুটপাটকে ছাইচাপা দেওয়া যাচ্ছে না। বরং এ ধরনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ দুদকের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অবশ্য এটাও বলতে হবে, বিএনপি-জামায়াত সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বিশেষত খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান যেভাবে দুর্নীতি মামলাগুলোর বিচার–প্রক্রিয়াকে প্রলম্বিত করছেন, তাও সৎসাহসের পরিচায়ক নয়।
অন্যদিকে, এটা এখন সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে যে বাংলাদেশের অর্থনীতি স্বাধীনতা-উত্তর সত্তর ও আশির দশকের বহুল উচ্চারিত ‘দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র’ থেকে ইতিমধ্যে মুক্ত হয়ে ক্রমেই প্রবৃদ্ধির ‘ভার্চুয়াস সার্কেলে’ উত্তীর্ণ হয়ে উন্নয়নের পথে ধাবিত হয়েছে। খয়রাতনির্ভরতার গ্লানিকর অবস্থান পেছনে ফেলে উৎপাদন ও বাণিজ্যনির্ভর গতিশীল অর্থনীতি হিসেবে দেশের এই আশাপ্রদ অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার বিপদটাও কৌশিক বসুর মূল্যায়নে উঠে এসেছে। জঙ্গিবাদের ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য তাণ্ডবের মধ্যেই এই বিপদ নিহিত। তাই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও রুখে দাঁড়াতে হবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাঁর আশাবাদী উচ্চারণগুলো প্রমাণ করছে যে উন্নয়নের স্বর্ণ-সম্ভাবনা এখন বাংলাদেশকে আবাহন জানাচ্ছে। প্রবৃদ্ধির এই ক্রমবর্ধমান জোয়ার অব্যাহত রাখতে পারলে বাংলাদেশ যে অতি দ্রুত মধ্যম আয়ের একটি উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে, উন্নয়ন-চিন্তাবিদদের মধ্যে এই বিষয়ে মোটামুটি মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলা চলে।
কৌশিক বসুর প্রেসক্রিপশন, গণতন্ত্রই সবচেয়ে কার্যকর সরকারব্যবস্থা। যতই ত্রুটিপূর্ণ হোক, গণতন্ত্রকেই এগিয়ে নিতে হবে। কিন্তু তাঁর যে অব্যক্ত কথাটা জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই তা হলো, এই উজ্জ্বল ভবিষ্যতের যাত্রাপথে এক নম্বর বাধা দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের অব্যাহত ধারা। আমি বুঝি না প্রধানমন্ত্রী কেন এই দুর্নীতিবাজ ও পুঁজি লুটেরাদের বিরুদ্ধে এখনো সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন না। তাঁর এবং তাঁর দলের জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের এটাই একমাত্র পথ। তাঁর সরকারের সাফল্যগুলোকে বরবাদ করার জন্য দুর্নীতিই হবে প্রতিপক্ষের হাতে সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বিএনপি নেত্রী বেগম জিয়া ও তাঁর ছেলের মারাত্মক চালের ভুলে শেখ হাসিনা ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশশাসন চালিয়ে যাওয়ার যে স্বর্ণসুযোগ পেয়ে গেছেন, সে সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে দেশের অর্থনীতিকে সত্যিকার অর্থে একটা শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারলে জনগণ বিএনপি-জামায়াতের পাকিস্তান-পসন্দ নেতিবাচক রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। শুধু ধর্মের দোহাই দিয়ে ভোটের রাজনীতিতে ফায়দা হাসিলের যে অপকৌশল বিএনপির রাজনীতির মূল ফোকাস রয়ে গেছে, আগামী তিন বছরে তাকে অকার্যকর করতে হলে রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি উভয়ের বিরুদ্ধেই সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
ড. মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Friday, December 4, 2015
টিআইবিকে তুলাধোনা নয়, মূল সংকটে হাত দিন by মইনুল ইসলাম
সাংসদদের মধ্যে এই বিষয়ে যাঁরাই বক্তব্য দিয়েছেন তাঁরা সবাই টিআইবির ওপর খড়্গহস্ত হয়েছেন। পুতুল নাচের ইঙ্গিতটা খুবই স্পর্শকাতর। এটা যে ব্যক্তিগতভাবে সব সাংসদকেই আঘাত করবে, সেটা টিআইবি কর্তৃপক্ষের বোঝা উচিত ছিল! এরই প্রতিক্রিয়ায় টিআইবিকে বিএনপির দালাল বলে গালাগাল করা হয়েছে। একজন তো সরাসরি এটাকে বিএনপির অঙ্গসংগঠনের তকমা দিয়ে দিয়েছেন। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ছদ্মবেশে গেঁড়ে বসা সামরিক শাসকদের ব্যাপারে টিআইবির নীরবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে অভিযোগ তুলেছেন, ‘তখন টিআইবির গণতন্ত্রপ্রীতি কোথায় লুকিয়েছিল? তারা তো বরং ওই সরকারের প্রশংসাই করেছিলেন!’ আরও অভিযোগ উঠেছে যে টিআইবি সংসদকে জনগণের কাছে, সর্বোপরি দেশ-বিদেশের মিডিয়ায় হেয়প্রতিপন্ন করেছে। অতএব, টিআইবিকে তাদের এসব ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য প্রত্যাহার করে সংসদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। নচেৎ, টিআইবি কর্তৃপক্ষকে সংসদে ডেকে পাঠিয়ে কৈফিয়ত তলব করা হোক। প্রয়োজনে টিআইবির দেশীয় কার্যক্রম বন্ধ করারও হুমকি দিয়েছেন কেউ কেউ। আইন ও সংসদবিষয়ক কমিটি টিআইবির সনদ বাতিলের সুপারিশ করেছে। তবে ধারণা করি, ক্ষমতাসীন জোট বা সংসদ সেই ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে না। কারণ তাতে ক্ষমতাসীনদেরই বেশি ক্ষতি হবে।
সংসদের অকার্যকারিতা ও অপচয় নিয়ে টিআইবি আগেও বেশ কয়েকটা গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এবারের প্রতিবেদনেও আপত্তিকর কিছু আছে বলে মনে হয় না। তবে সংবাদ সম্মেলনের কোনো কোনো মন্তব্য একটু বেশি কড়া বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। বিশেষত, সংসদের ‘লেজিটিমেসি’ বিতর্কটা যেহেতু এখন জাতীয় রাজনীতির মূল ফোকাসে রয়েছে, তাই এই স্পর্শকাতর বিষয়ে মন্তব্য করার সময় টিআইবি আরেকটু সাবধানতা অবলম্বন করলে ভালো হতো। টিআইবি যেহেতু সরকারি দুর্নীতি, অনিয়ম ও অবৈধ কার্যক্রম তাদের গবেষণা, সভা-সেমিনার, জনসচেতনতা সৃষ্টিধর্মী কর্মকাণ্ড এবং প্রকাশনাসমূহের মাধ্যমে ফোকাস করার উদ্দেশ্যে নিবেদিত প্রতিষ্ঠান, তাই এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিয়ত ক্ষমতাসীন সরকারের কোপদৃষ্টিতে পড়াই স্বাভাবিক।
কারণ, এ দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন দল বা জোটগুলো ৪৪ বছর ধরে জনগণকে সুশাসন কিংবা দুর্নীতিবিরোধী শাসন উপহার দেওয়া দূরে থাক, বরং প্রতিটি সরকারই যেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে দুর্নীতি, লুটপাট ও কায়েমের প্রতিযোগিতায় মজে রয়েছে। এর ফলে, এ দেশের রাষ্ট্রচরিত্রই এখন দেশের উন্নয়নের পথে ‘এক নম্বর বাধা’ হিসেবে ভূমিকা পালন করছে। বার্লিনে অবস্থিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বিবেচনায় যখন ২০০১ সালে বাংলাদেশ দুর্নীতির ধারণা সূচক বা ‘করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স’-এর কান্ট্রি র্যা ঙ্কিং মোতাবেক ‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন’ ঘোষিত হয়েছিল, তখন ওই চ্যাম্পিয়নশিপ ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ভরাডুবি ঘটানোর পেছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল বলে অনেকে মত দিয়েছিলেন।
অস্বীকার করার জো নেই যে ওই নির্বাচনের প্রচারণায় দুর্নীতির বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপকে বিএনপি-জামায়াত অত্যন্ত সফলভাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছিল, যা মোকাবিলা করতে পারেনি আওয়ামী লীগ। যেমন ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী তাঁর এক টেলিভিশন প্রোগ্রামের সিরিজে যে নাটকীয় ভঙ্গিতে রসিয়ে রসিয়ে দুর্নীতির কাহিনিগুলো সবিস্তারে বর্ণনা করতেন, সেগুলো ওই প্রোগ্রামগুলোকে জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছিল, যার সুফল ঘরে উঠেছিল বিএনপি-জামায়াতের। অতএব, বোধগম্য কারণেই আওয়ামী লীগ খাপ্পা হয়ে আক্রমণ শানিয়েছিল টিআইবির ওই সময়ের চেয়ারম্যান দেশের বরেণ্য অর্থনীতিবিদ প্রয়াত প্রফেসর মোজাফ্ফর আহমদের বিরুদ্ধে, যদিও ওয়াকিবহাল মহলের জানার কথা যে ওই র্যা ঙ্কিং প্রণয়নের কাজটি করে বার্লিনের মূল প্রতিষ্ঠানটি, বাংলাদেশের চ্যাপ্টার নয়।
এরপর যখন ২০০২, ২০০৩, ২০০৪ ও ২০০৫—এই চার বছর পরপর আরও চারবার বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ঘোষিত হলো তখন তার দায়ভার এসে পড়ল তদানীন্তন ক্ষমতাসীন জোট বিএনপি-জামায়াতের ওপর। অতএব, ওই চার বছর টিআইবির বিরুদ্ধে আক্রমণের ও গালাগালির জোয়ার বইয়ে দিত বিএনপি। ওই সময়ে আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াত সরকারকে ওই চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য তুলাধোনা করতে ছাড়েনি, বলা বাহুল্য। ঘটনাক্রমে, রোটেশন অনুযায়ী ওই সময়ে টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন দেশের সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষাবিদ প্রফেসর খান সারওয়ার মুরশিদ। অতএব, তাঁর নেতৃত্বাধীন টিআইবিকে সরাসরি আওয়ামী লীগের দালাল বানিয়ে দিয়েছিলেন বিএনপির নেতারা। একবার বিএনপির তদানীন্তন সেক্রেটারি জেনারেল মান্নান ভূঁইয়াকে এক সভায় টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে নিজ চেয়ার ছেড়ে এসে টিআইবির তখনকার গবেষণা পরিচালক (বিআইডিএস থেকে ডেপুটেশনে কর্মরত) প্রয়াত বন্ধু এস আই লস্করকে শাসাতেও দেখা গিয়েছিল। মান্নান ভূঁইয়ার মতো একজন জননেতাকে টেলিভিশনের খবরে ওই ভূমিকায় দেখে আমি নিজেই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। ওই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে আমাকেও ওই পর্যায়ে কলম ধরতে হয়েছিল দৈনিক সংবাদ-এ।
পরপর পাঁচবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জনের সে দুর্ভাগ্য গত এক দশকে বাংলাদেশের আর হয়নি। কিন্তু, এখনো কান্ট্রি র্যা ঙ্কিং অনুযায়ী দুর্নীতিগ্রস্তের বিচারে নিচের দিক, মানে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের দশ-বারোটি দেশের কাতারেই রয়ে যাচ্ছে প্রতিবছর। এই লজ্জা থেকে আমরা সহজে নিষ্কৃতি পাব বলে মনে হচ্ছে না। গত এক দশকে কিন্তু যতবারই টিআইবির কোনো গবেষণা ফলাফল প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে, প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দল বা জোট তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, দুর্নীতি ও দুঃশাসন যেহেতু প্রধানত সরকারি দল বা জোটেরই কাজ, তাই ওগুলো উদ্ঘাটিত হলে ক্ষমতাসীন দল বা জোটই জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। আর, বিরোধী দলগুলো এই প্রচারের সুবিধেটুকু ঘরে তুলছে, জনগণের কাছে তারা সাধু-সজ্জন বনে যাচ্ছে। এবারও আওয়ামী লীগ নেতারা টিআইবিকে ‘দেশদ্রোহিতার অপরাধে’ অভিযুক্ত করেছেন এবং বিএনপির দালাল বানিয়ে দিচ্ছেন। কারণ, টিআইবি প্রতিবেদনের ‘গায়ে জ্বালা ধরানো’ সমালোচনার সুফল বিএনপি-জামায়াতের বাক্সে জমা হয়ে তাদের সংকটাপন্ন রাজনীতিকে সঞ্জীবনী টনিকে চাঙা করে তুলতে পারে। টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সম্মানিত চেয়ারপারসন দেশের মানবাধিকার সংগ্রামের অগ্রণী ব্যক্তিত্ব অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, যিনি আমার সহপাঠী। তাঁকে বা তাঁর নেতৃত্বাধীন টিআইবিকে বিএনপির দালাল বললে সেটা খুবই হাস্যকর ঠেকছে, কিন্তু রাজনৈতিক স্পর্শকাতর একটি বিষয়ে তাঁদের আরেকটু যত্নবান হওয়া উচিত ছিল বলে মনে করি।
এটুকু মেনে নিতে হবে যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে অবৈধ না হলেও ওই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদেরও ‘পপুলার লেজিটিমেসি’ নেই। কিন্তু, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট যেভাবে ২০১৪ সালের নির্বাচন-পূর্ববর্তী সংলাপে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে গোঁ ধরে পুরো সংলাপকে ভন্ডুল করে দিয়েছিল, তাও কোনো গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক অবস্থান হতে পারে না। বিএনপিকে মেনে নিতে হবে যে অদূর ভবিষ্যতে সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনা যাবে না। তারপরও বিলেতে বসে হুকুমদারির মাধ্যমে ২০-দলীয় জোটের রাজনৈতিক অধিপতি ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদানকারী তারেক রহমানের অবিমৃশ্যকারী সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্বকে বিনা প্রতিবাদে মেনে নিচ্ছেন জোটের ঝানু নেতারা। তাঁরা না পারছেন তারেক জিয়াকে থামাতে, না পারছেন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে। কারণ, বেগম জিয়া তাঁর পুত্রকে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীর আসনে অধিষ্ঠিত করার মিশনে আজও মরিয়া। আর তারেক রহমানের একের পর এক বালখিল্য পদক্ষেপে, উচ্চারণে ও আচরণে দেশের রাজনীতিতে উত্তাপ সঞ্চারিত হচ্ছে এবং সংঘাত ও সন্ত্রাসের তাণ্ডব সৃষ্টির মওকা পেয়ে যাচ্ছে জামায়াত-শিবির। এমতাবস্থায়, দেশের দুই প্রধান দল বা নেত্রীর মধ্যে সংলাপ সৃষ্টির কোনো সুযোগ কি এখন রয়েছে? মহাজোট তারেক রহমানের এহেন অবিমৃশ্যকারী কর্মকাণ্ডের ফায়দা নিচ্ছে এবং তাদের এ জন্য দোষ দেওয়া যাবে না।
আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, জামায়াত-শিবিরের নানা পকেট সংগঠনের মাধ্যমে ‘কিলিং অপারেশন’ চালিয়ে দেশটাতে সিরিয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে ‘গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের’ দাবি আদায়ের খায়েশ কারও থাকলে সেটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক হবে। ধারাবাহিকভাবে গুপ্তহত্যার জন্য যে ঘাতক গোষ্ঠী তাদের একাত্তরের চেহারাটা আরও একবার জাতিকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, বেগম জিয়া একটিবারও
কি তাদের বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য দিয়েছেন? গণতন্ত্র না থাকায় সন্ত্রাস ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে বলে বিএনপি নেতাদের বারবার উচ্চারিত বুলি কি সন্ত্রাসী বাহিনীকে আশকারা দেওয়ার শামিল নয়?
গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম তো নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ হতে পারে না! আবার, ২০১৯ সালের আগে কোনো সংলাপ হবে
না বলে ক্ষমতাসীন মহাজোটের পক্ষ থেকে যে একগুঁয়েমি প্রদর্শন করা হচ্ছে, তা-ও সমর্থনযোগ্য নয়। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই এক নদী রক্ত দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলাম আমরা, এ কথা আমরা কখনোই ভুলব না।
মইনুল ইসলাম: প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Saturday, November 14, 2015
রূপপুর প্রকল্পে ১,৩৫০ কোটি ডলার ব্যয় কি যৌক্তিক? by মইনুল ইসলাম
প্রাক্কলিত নির্মাণব্যয় ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারের মধ্যে ১ হাজার ২০০ কোটি ডলার ঋণ হিসেবে দেবে রাশিয়া, বাকি ১৫০ কোটি ডলার বাংলাদেশ ব্যয় করবে। রাশিয়ার ঋণের সুদের হার হবে ৪ শতাংশ, যা ১০ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ২৮ বছরে বাংলাদেশকে সুদাসলে পরিশোধ করতে হবে। রাশিয়ার রোসাটম নামের যে প্রতিষ্ঠানটি এই প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি করেছে, তারা প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে আনুমানিক ৬০ বছর আয়ু হবে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের। নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর এক বছর রোসাটম প্ল্যান্টটি পরিচালনা করবে। খুবই উদ্বেগজনক হলো, ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার যখন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট প্রকল্প গ্রহণের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন এর প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩০০ কোটি ডলার থেকে ৪০০ কোটি ডলার।
ওপরের তথ্যগুলো অর্থনীতির একজন ছাত্র হিসেবে আমার কাছে মোটেও স্বস্তিদায়ক মনে হয়নি। আমি পরমাণুবিজ্ঞানী না হলেও প্রকল্প মূল্যায়নের (প্রজেক্ট ইভ্যালুয়েশন) উচ্চতর কোর্সগুলোর সঙ্গে পরিচিতির কারণে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা নিরূপণের মাপকাঠি সম্পর্কে অবহিত। সে জন্যই আমার আশঙ্কা হচ্ছে, যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে তার ভিত্তিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট নির্মাণ দেশের জন্য ভবিষ্যতে একটি বিপজ্জনক ফাঁদে পরিণত হতে যাচ্ছে। তাই এই প্রকল্প থেকে সুযোগ থাকলে এখনো বাংলাদেশের সরে আসা সমীচীন হবে।
বাংলাদেশের মতো একটি অতি ঘনবসতিপূর্ণ দেশে পাবনার রূপপুরে, মানে দেশের মাঝখানে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট নিরাপদ কি না, সেটি এমনিতেই একটি বিতর্কিত বিষয়। বাংলাদেশে ২০০৯-১০ সালে ওই ইস্যুকে ঘিরে পরমাণুবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং প্রযুক্তি বিশারদদের মধ্যে জমজমাট বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, যেগুলো খুব আগ্রহ নিয়ে পড়লেও বিতর্কে অংশগ্রহণ করিনি অনধিকার চর্চা হবে ভেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী গত ৭০ বছরে সংঘটিত পারমাণবিক প্রকল্পের ভয়াবহ কয়েকটি দুর্ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের থ্রি মাইলস আইল্যান্ড, ইউক্রেনের চেরনোবিল ও জাপানের ফুকুশিমার খবর পত্রপত্রিকায় পড়েই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তাম এই ভেবে যে চেরনোবিল যদি ইউক্রেনের বিরল বসতি অঞ্চলে অবস্থিত না হয়ে বাংলাদেশের রূপপুরে অবস্থিত হতো, তাহলে ওই নিউক্লিয়ার মেল্টডাউনের ফলে চেরনোবিলের চারপাশের আনুমানিক ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের নানাবিধ ক্ষতির পরিবর্তে বাংলাদেশে নিঃসন্দেহে ক্ষতি হতো এর চেয়ে অনেক বেশি! (যেহেতু তেজস্ক্রিয়তার কারণে সৃষ্ট প্রাণঘাতী রোগগুলো সঙ্গে সঙ্গে হয় না, তাই মানুষের মৃত্যুসংখ্যা নিরূপণ কঠিন হয়।)
আমরা অনেকেই এখন ভুলে গেছি যে ওই মেল্টডাউনের ২৯ বছর পরেও চেরনোবিলের চারদিকের কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাকে এখনো মানব বসতির অযোগ্য ঘোষণা করে ওই এলাকাকে বিরানভূমি (ওয়েস্টল্যান্ড) করে রাখতে হয়েছে, প্রাণঘাতী তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি এখনো অতি বিপজ্জনক থাকায় ওই এলাকায় প্রটেক্টিভ আবরণ ছাড়া আজও কোনো মানবসন্তানের যাওয়া বিপজ্জনক। পারমাণবিক দুর্ঘটনা নিরোধের ব্যবস্থা যতই অত্যাধুনিক হোক না কেন, তা যে সুনামির মতো প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতে প্রায় অকার্যকর প্রমাণিত হতে পারে, তার নজির সৃষ্টি হয়েছে জাপানের ফুকুশিমায়। ওই দুর্ঘটনা ভয়াবহ পরিণতি সৃষ্টি করার আগেই তার অভিঘাতকে সীমিত করা গেছে, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী ক্ষতির আশঙ্কা এখনো জাপানকে ব্যতিব্যস্ত রেখেছে।
বাংলাদেশের যমুনা নদীর তলদেশ দিয়ে ‘যমুনা ফল্ট’ নামের একটি ‘টেকটোনিক ফল্ট’ রয়েছে, তাই বাংলাদেশের মাঝামাঝি অঞ্চলকে ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমাদের অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে খোদ যমুনা নদীর জন্মই হয়েছে প্রায় ৪০০ বছর আগে সংঘটিত এ অঞ্চলের মহা-ভূমিকম্পের কারণে, যার ফলে ব্রহ্মপুত্র নদের প্রধান প্রবাহ পুরোনো খাতের পরিবর্তে জামালপুর থেকে বর্তমান যমুনা নদীর খাতে প্রবাহিত হচ্ছে। পুরোনো ধারাটি ক্ষীণকায় হয়ে জামালপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে ভৈরবে এসে মেঘনা নদীতে মিলিত হয়েছে। ওই ধরনের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প হলে রূপপুর পারমাণবিক রি-অ্যাক্টরের যে ÿক্ষতি হবে না এবং লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটাবে না, তার গ্যারান্টি কী? এই মহাপ্রলয়ের ঝুঁকি কেন নিচ্ছি আমরা? এত বিশাল বিপদের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের সরকার কেন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট নির্মাণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে, তা বোঝা মুশকিল। অবশ্য, স্বীকার করতে কুণ্ঠিত নই যে বিষয়টা বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও পরিবেশবিদের এখতিয়ারভুক্ত বিধায় আমার মতামতকে এ ক্ষেত্রে অপাঙ্ক্তেয় বিবেচনা করলে নীতিপ্রণেতাদের দোষ দেওয়া যাবে না।
কিন্তু আমার আপত্তি প্রকল্পের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার কারণে। প্রকল্প শুরু হওয়ার আগেই ৩০০–৪০০ কোটি ডলারের প্রকল্পকে যেভাবে ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারের প্রকল্পে রূপান্তরিত করে ফেলা হলো, তাতে প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত ২,০০০ কোটি ডলারের ‘সাদা হাতি’-তে পরিণত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। আর ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের যে প্রাক্কলিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলা হচ্ছে, তা-ও অর্জনযোগ্য না হওয়ার আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বাস্তবে যদি বিষয়টা এ রকম হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে রূপপুরে বিদ্যুতের ইউনিট-প্রতি উৎপাদন খরচ বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যান্য বিকল্প প্রযুক্তির তুলনায় অনেক কম হবে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তার ভিত্তি দুর্বল হতে বাধ্য। গত ২৯ অক্টোবর ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় একজন লেখক উল্লেখ করেছেন যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-প্রতি বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ নাকি মাত্র তিন টাকা কুড়ি পয়সা পড়বে। ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার প্রকল্প ব্যয় ধরে যে এই উৎপাদন খরচ হিসাব করা হয়নি, সেটা নিশ্চিত।
আমার অভিমত, এই মহাগুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক হিসাবটা আবারও ভালোভাবে যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন দেশের খ্যাতনামা স্থপতি ইয়াফেস ওসমান। তাঁর বিশেষজ্ঞ জ্ঞান, দক্ষতা এবং সততা প্রশ্নাতীত। তাই তাঁর ওপর আমাদের ভরসাও বেশি। কিন্তু আমার কেন জানি সন্দেহ হচ্ছে যে নয়-দশ বছরে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা খরচ করে প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা হচ্ছে, তা দেশের জন্য একটা ‘মহা-অপচয়’ হতে চলেছে, যা মহা-বিপর্যয়করও হতে পারে। আবার, প্রকল্পের শেষে গিয়ে যদি দেখা যায় যে প্রকল্পের প্রকৃত খরচ ২,০০০ কোটি ডলার বা ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তাহলে তো ব্যাপারটা পুরো অর্থনীতির জন্য বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। আমরা হয়তো বেঁচে থাকব না, কিন্তু এ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের সবাইকে অভিশাপ দেবে। কারণ, সুদাসলে ঋণটা তাদেরই পরিশোধ করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে দুর্নীতির অজুহাতে হাত গুটিয়ে নিয়েছিল, তখন বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রস্তাব যাঁরা দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে আমিও ছিলাম। অনেক দেশি-বিদেশি পণ্ডিত ও পরামর্শক ওই পদক্ষেপকে অগ্রহণযোগ্য দুঃসাহস আখ্যা দিয়েছিলেন, কিন্তু আমাদের অবস্থানই সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। এবারও ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আমার আশঙ্কাটি জাতিকে জানাচ্ছি, যদিও ইতিমধ্যে বেশ কিছু অর্থ রূপপুর প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য ব্যয় হয়ে গেছে, তবু এটুকু ক্ষতি স্বীকার করতে হলেও এই প্রকল্প থেকে বাংলাদেশের সরে আসাই সমীচীন হবে। পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহার করলে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ অনেক কম পড়ে, সেটা মোটামুটি আমাদের জানা আছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো জনাকীর্ণ দেশের জন্য এই প্রযুক্তি তেমন লাগসই (অ্যাপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজি) নয়, তা-ও বোঝা প্রয়োজন। আর, ১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারের এই বিশাল অর্থের অন্য কোনো অধিকতর উপযোগী ব্যবহারের ক্ষেত্র কি আমাদের নেই?
রূপপুরের প্রকল্প এলাকাটি পাকিস্তান আমলেই পরমাণু প্রকল্পের জন্য সরকার অধিগ্রহণ করেছিল, ৪৭ বছর ধরে সেটা খালি পড়ে রয়েছে। এত দিন আমাদের সামর্থ্য ছিল না এত বড় প্রকল্প গ্রহণের। এখন ইনশা আল্লাহ অর্থনীতি ক্রমেই শক্তিশালী হওয়ায় আমরা এত বড় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার সাহস পাচ্ছি। কিন্তু আমার বিবেচনায় পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের চেয়ে আরও অনেক বেশি প্রয়োজনীয় একটি প্রকল্প আমাদের অগ্রাধিকার দাবি করছে। আমার মতে, গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পটি দেশের জন্য অনেক বেশি গুরুত্ববহ, যেটা বহু বছর ধরে ঝুলে আছে অর্থায়ন করা যাচ্ছে না বিধায়। বিশেষত, ফারাক্কা বাঁধের বিপর্যয়কর অভিঘাতগুলো বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পুরো এলাকাকে যে ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, তা মোকাবিলা করার জন্য গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফারাক্কার পানি শুষ্ক মৌসুমে এতই অকিঞ্চিৎকর হয়ে পড়েছে যে ফারাক্কা বাঁধের ভাটিতে গঙ্গা-পদ্মার প্রবাহ থেকে জন্ম নেওয়া দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীগুলো মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে, যার ফলে ওগুলো ক্রমেই ভরাট হয়ে যাচ্ছে, ওগুলোর পানির লবণাক্ততা বাড়ছে এবং যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরায় বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সমস্যা তীব্র আকার ধারণ করছে। গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প এসব নেতিবাচক অভিঘাত নিরসন করবে বলে আমার দৃঢ়বিশ্বাস। ওই প্রকল্পে বেশ কিছু বিদ্যুৎ উৎপাদনেরও সম্ভাবনা আছে। আর, রূপপুর প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা জায়গায় একটি বৃহদাকার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও গড়ে তোলা যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কি বিষয়গুলো আরেকবার ভেবে দেখবেন?
মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Saturday, November 7, 2015
রাজনীতিতে ব্যবসায়ী, দায় মুক্তবাজার অর্থনীতির by মইনুল ইসলাম
প্রকৃতপক্ষে এ সমস্যাটার মূল রয়ে গেছে অর্থনীতির দুর্বৃত্তায়নের মধ্যে, যার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হলো রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন ও বৈশ্যকরণ। বিশেষত, এ দেশের ব্যবসায়ীরা যেহেতু প্রধানত বাণিজ্যনির্ভর ‘মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি’ হিসেবে বিকশিত হয়ে থাকেন, তাই রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন মহল ও আমলাদের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া তাঁদের বিকাশ দুরূহ। রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণও তাঁদের ব্যবসায়িক সাফল্য ত্বরান্বিত করার প্রয়োজনেই। ১৯৯১ সালে ভোটের রাজনীতি চালু হওয়ার পর এ প্রবণতায় আরও গতি সঞ্চার হয়েছে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটে কারা নির্বাচিত হয়েছিলেন, আর ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ এবং ২০১৪-এর নির্বাচনে ব্যবসায়ীরা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কত শতাংশ সংসদ সদস্যের প্রার্থিতার মনোনয়ন বাগিয়েছেন, তা বিবেচনা করলেই রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের ক্রমবর্ধমান দাপট কোথায় পৌঁছে গেছে, তা বুঝতে অসুবিধা হবে না। এ সম্পর্কে সুসংবদ্ধ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে অনুন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতির তত্ত্বগুলোতে। আমাদের দেশের পুঁজিপতিদের রাষ্ট্রের ওপর ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ সঠিকভাবে বোঝার জন্যই এই তত্ত্বগুলোর আলোকে উপস্থাপন করছি আজকের কলামের আলোচনা।
অনুন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতি স্কুলের পথিকৃৎ পল বারান মুৎসুদ্দি পুঁজি ও মুৎসুদ্দি সরকার কনসেপ্ট দুটিকে অর্থনীতিশাস্ত্রে প্রবর্তন করেছেন। তিনি মুৎসুদ্দি পুঁজি বা প্রচলিত অর্থে দালাল পুঁজি কনসেপ্টটির সংজ্ঞা দিয়েছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর নব্য ঔপনিবেশিক বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শিল্পায়িত দেশগুলোর বহুজাতিক করপোরেশনের পণ্যের বাজারজাতকরণ নেটওয়ার্কে তৃতীয় বিশ্বের পুঁজিপতিদের ছোট তরফ বা এজেন্টের ভূমিকা পালনের বিষয়টিকে ফোকাস করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইন্ডেন্টর, আমদানিকারক, সোল এজেন্ট, পরিবেশক, অ্যাসেমব্লি প্ল্যান্ট স্থাপনকারী শিল্পপতি, ফ্র্যাঞ্চাইজি কিংবা সেলস এজেন্টের ভূমিকা পালনের মাধ্যমে যেসব বাণিজ্যনির্ভর পুঁজিপতি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় মুনাফা আহরণে ব্যাপৃত থাকে, তাদেরই পল বারান মুৎসুদ্দি পুঁজির এই সংজ্ঞার মাধ্যমে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন, যেটা একটা প্রিন্সিপাল এজেন্ট সম্পর্ক নির্দেশ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যে নব্য সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, তাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক বিনিয়োগ ও বহুজাতিক করপোরেশন, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতা সংস্থা, এনজিও, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বিশ্বায়ন—এগুলো সবই সুনির্দিষ্ট ডাইমেনশন হিসেবে ভূমিকা পালন করে চলেছে। দু-দুবার স্বাধীনতা অর্জন সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজও এই বিশ্বব্যবস্থার প্রান্তীয় পুঁজিবাদী একটি রাষ্ট্র।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পেলেও বাংলাদেশকে ২৪ বছর ধরে পাকিস্তানের নব্য ঔপনিবেশিক শোষণ-লুণ্ঠনের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে স্বাধীনতার পথ বেছে নিতে হয়েছিল। আর তাই রাষ্ট্রের চার মূলনীতিতে গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেয়েছিল। কিন্তু পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পাকিস্তানের স্টাইলে পুঁজিবাদী বিশ্ব প্রভুদের মক্কেলরা এই রাষ্ট্রের কর্ণধার হয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পুঁজিবাদের যে মডেলটা আবারও চালু করে দিয়েছিল, তাতে যে ধরনের পুঁজির বিকাশ এ দেশে ঘটেছে, তার চরিত্র প্রধানত মুৎসুদ্দি পুঁজির। এই পুঁজি চরিত্রগতভাবেই বাণিজ্যমুখী হবে অধিক মুনাফার লোভে। এই পুঁজিকে শিল্প খাতের বিকাশে নিয়োজনের যত প্রয়াসই চালানো হোক না কেন, তাকে শিল্প খাতে ধরে রাখা কঠিন হবে। তাই শিল্প স্থাপনের জন্য উদার ব্যাংকঋণ প্রদান করা হলেও পাচার হয়ে গেছে বাণিজ্যে এবং অনেকে ক্ষেত্রে চোরাচালানে। ব্যাংকঋণের সহায়তায় আমদানি করা শিল্প প্ল্যান্ট-যন্ত্রপাতির খরচ ওভার ইনভয়েসিং করে বিদেশে পুঁজি পাচার করে দেওয়া হয়েছে। জিয়াউর রহমানের আমলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই উদার পৃষ্ঠপোষকতার জোয়ারে শামিল হতে বাধ্য করা হয়েছিল।
আবার আশির দশকে স্বৈরাচারী এরশাদের আমলে আমদানি উদারীকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে; রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানাকে বেসরকারি মালিকানায় অর্পণের প্রক্রিয়াকে জোরদার করা হয়েছে; বেসরকারি মালিকানার ব্যাংক ও বিমা কোম্পানি গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু এতত্সত্ত্বেও উদার সহায়তাপুষ্ট শিল্পায়নের প্রয়াস কয়েকটা ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে তেমন সফলতা পায়নি। বরং দ্রুত আমদানি উদারীকরণ করতে গিয়ে চোরাচালানকে উসকে দেওয়া হয়েছে, কারণ আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের তুলনায় এ দেশের উদারীকরণের গতি মাত্রাতিরিক্ত থাকায় নতুন নতুন পণ্য চোরাচালানিদের কাছে আদান-প্রদানের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ আমদানি-বিকল্প দ্রব্য উৎপাদনকারী শিল্পগুলো রুগ্ণতার নিশান তুলে দিয়ে ঋণখেলাপি পুঁজিপতিদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছে। এখানেই মুৎসুদ্দি পুঁজির কনসেপ্টটা আমাদের বিষয়টি ব্যাখ্যায় সাহায্য করবে। বিশ্ব পুঁজিবাদ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে জাতীয় বুর্জোয়ার বিকাশের চেয়ে মুৎসুদ্দি পুঁজির বিকাশেই আগ্রহী। এ জন্যই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে অবাধ করার তাগিদে গ্যাট-এর আট রাউন্ড পার হয়ে এসে ১৯৯৫ সাল থেকে ডব্লিউটিওর সাম্রাজ্যে প্রবেশ করেছে বিশ্ববাসী। বাজার দখলের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে উন্নত দেশগুলো তৃতীয় বিশ্বকে আধিপত্য-পরনির্ভরতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রাখতে চাইছে।
আমাদের বুঝতে হবে, মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু করার নামে দেশের বিনিয়োগযোগ্য পুঁজিকে মুৎসুদ্দি পুঁজিপতির সিন্দুকে পাচার করার ব্যবস্থা জোরদার করলেই শিল্পায়ন হয়ে যাবে, এটা অতি সরলীকরণ। ওই পুঁজির একাংশ হয়তো অ্যাসেমব্লি প্ল্যান্ট টাইপের ‘পার্ভার্স’ শিল্প স্থাপনে অপচয় হবে, বাকিটা দুর্নীতির অর্থনীতির নিয়ম অনুসারে লুণ্ঠিত হয়ে যাবে। আমি আবারও বলছি, বাংলাদেশে বর্তমানে বাজার অর্থনীতি নিয়ে যে ধরনের মাতামাতি চলেছে, তাতে পুঁজি সর্বোচ্চ মুনাফা পাচ্ছে বাণিজ্য এবং চোরাচালান থেকে। এ বাজারে দেশীয় পণ্য মার খাচ্ছে, অথচ বাজারের ক্রমবর্ধমান অংশ চলে যাচ্ছে বিদেশি পণ্যের দখলে। পুঁজি পাচার হয়ে যাচ্ছে চোরাচালানে, নয়তো পালিয়ে যাচ্ছে বিদেশে। এ দেশের পুঁজি গিয়ে জমা হচ্ছে রাজনীতিবিদ, সামরিক অফিসার এবং সিভিল আমলার গোপন সিন্দুকে, নয়তো তাঁদের এবং ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে পলাতক পুঁজির অবয়বে বিশ্বের নানা দেশে, টরন্টোর ‘বেগমপাড়া’ কিংবা মালয়েশিয়ার ‘সেকেন্ড হোম’ যার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে যে প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশের ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের চলতি হিসাব বা কারেন্ট অ্যাকাউন্টে উদ্বৃত্ত থাকার প্রবণতা পরিবর্তিত হয়ে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৭ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে, যার পেছনে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির শ্লথগতির পাশাপাশি আমদানি প্রবৃদ্ধির হারের বিশাল উল্লম্ফন প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। খাতওয়ারি আমদানির প্রবৃদ্ধি বিবেচনা করে দেখা যাচ্ছে, শূন্য শুল্কহার সুবিধাভোগকারী মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ২০১৪-১৫ অর্থবছরে অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পরিষ্কারভাবে জানান দিচ্ছে যে ওভার ইনভয়েসিং পদ্ধতিতে দেশ থেকে পুঁজি পাচার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি কানাডাপ্রবাসী এক আত্মীয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল টরন্টোর বেগমপাড়া সম্পর্কে। তিনি টরন্টোয় থাকেন, তাই বেগমপাড়া সম্পর্কে ভালোই খোঁজখবর রাখেন। তিনি জানালেন, ওখানকার প্রায় ৮০ শতাংশই পোশাকমালিকদের পরিবার, বাকি ২০ শতাংশের মধ্যে প্রকৌশলী, আমলা এবং রাজনীতিবিদদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনই সংখ্যাগুরু।
তবু বলব, বাংলাদেশ গত সাড়ে তিন দশকে তৈরি পোশাকশিল্প, ওষুধশিল্প, কৃষিজাত দ্রব্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সিরামিকস, জাহাজ নির্মাণ, চামড়াজাত দ্রব্য ও পাদুকাশিল্পের মতো রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোর বিকাশে প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু অনেক জ্ঞানপাপী স্বীকারই করতে চায় না যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের চমকপ্রদ বিকাশ মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে হয়নি, মাল্টি ফাইবার অ্যারেঞ্জমেন্টের (এমএফএ) কোটাব্যবস্থার সুযোগ নিয়েই এর দ্রুত বিকাশ সম্ভব হয়েছে। এমএফএ বিলুপ্ত হওয়ার পর এখন বাংলাদেশের ওভেন গার্মেন্টস ও নিটওয়্যার শিল্প তুলনামূলক সুবিধা এবং ‘প্রতিযোগিতা সক্ষমতার’ জোরেই এগিয়ে যাচ্ছে; যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দয়ায় বা করুণায় নয়।
শিল্পায়নের এই সাফল্যকে আমরা খাটো করছি না, কিন্তু তারপরও মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলব, রাজনীতিকে ব্যবসায়ীদের মুনাফা অর্জনের লোভনীয় ক্ষেত্রে পরিণত করার যে প্রবণতা জোরদার হয়ে চলেছে, তা দেশের জন্য কল্যাণকর হবে না। তৈরি পোশাকশিল্পের সাফল্যের আসল দাবিদার এ দেশের নারী শ্রমিকেরা হলেও এই সাফল্যের জোয়ারে অবগাহন করে এ দেশে কয়েক হাজার ব্যবসায়ী অতি দ্রুত কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছেন। একই সঙ্গে ওনারা এবং অন্যান্য বাণিজ্যনির্ভর মুৎসুদ্দি পুঁজিপতি গোষ্ঠী প্রধানত ব্যাংকঋণের ফায়দাভোগী হয়ে এ দেশে গত চার দশকে পুঁজি লুণ্ঠনে কামেলিয়ত হাসিল করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মোতাবেক দেশে এখন ৫৪ হাজারের বেশি কোটিপতি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ত্যাগী ও জনদরদি রাজনীতিবিদদের হটিয়ে দিয়ে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক আমলা ও সিভিল আমলা এবং মুৎসুদ্দি পুঁজিপতিদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ক্রমেই রাষ্ট্রক্ষমতার প্রবল প্রতাপান্বিত ভাগীদারে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। রাজনীতিতে এখন দখলদারি প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা চলছে প্রধানত এঁদের মধ্যেই।
ব্যবসায়ীদের রাষ্ট্রক্ষমতার ভাগীদার হওয়ার এই প্রতিযোগিতা রাজনীতির মাধ্যমে জনকল্যাণে ব্রতী হওয়ার প্রতিযোগিতা নয়, রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবসার কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের জন্যই এই রাজনীতি। মহামান্য রাষ্ট্রপতির ক্ষোভ এই অশুভ প্রবণতার বিরুদ্ধে। তাঁকে এ জন্য সাধুবাদ জানাতেই হবে। তবে আজন্ম একটি রাজনৈতিক পরিবারের ত্যাগ-তিতিক্ষার পরিবেশে জীবন কাটানো প্রধানমন্ত্রী রাজনীতিকে এভাবে ব্যবসার হাতিয়ারে পরিণত করা যে জাতির জন্য অমঙ্গলজনক, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন, আশা করি।
ড. মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Saturday, October 17, 2015
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ: আইএস বনাম জামায়াত-শিবির by মইনুল ইসলাম
তারপর গত ছয় মাস তাদের রহস্যজনক নীরবতা দেখে কেউ যদি ভেবে থাকেন যে জামায়াত-শিবির তাদের কৌশল পাল্টেছে, তবে মারাত্মক ভুল হবে। কারণ, তারা শক্তি সঞ্চয়ের জন্যই এই ছয় মাস তাদের কর্মকাণ্ড কিছুটা কমিয়ে দিয়ে প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি জোরদার করেছে। জামায়াত নেতাদের ফাঁসির রায় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ায় দলটির প্রকাশ্য তৎপরতা কমে যায়। গত ছয় মাসে বিএনপির যাবতীয় নর্তন-কুর্দন-আন্দোলন-সংগ্রাম যে মাঠে মারা গেছে, তা এত দিনে পরিষ্কার হয়ে গেছে। অতএব, ক্ষমতাসীন জোটের সাময়িক জয় হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি জামায়াত-শিবিরের জঙ্গি তাণ্ডবের ওপর ভর করে মহাজোট সরকারকে উৎখাতের যে খোয়াব দেখেছিলেন, তা আপাতত ভেস্তে গেছে।
কিন্তু যখন আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ও মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায় বাস্তবায়নের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসছে, তখন জামায়াত-শিবিরের ‘গৃহযুদ্ধ’ও যে আবার পুরোদমে চাঙা হবে, তাতে সন্দেহ নেই। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্সের গোয়েন্দা এজেন্সিগুলোর কাছে জামায়াত-শিবিরের এই আসন্ন তাণ্ডবের অশনিসংকেত ঠিকই পৌঁছে গেছে এবং ওই সংকেত পেয়েই অস্ট্রেলিয়া তাদের ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর নিরাপত্তার আশঙ্কায় স্থগিত করেছে। পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকাও তাদের নারী ক্রিকেট দলের সফর বাতিল করেছে।
এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ সফর চলাকালে একজন নিরীহ ইতালীয় নাগরিক সিজার তাবেলাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে বিশ্বের প্রচারমাধ্যমগুলোতে ঝড় তুলতে সক্ষম হয়েছে ঘাতক বাহিনী। আর আইএসের নামে ত্বরিতগতিতে ওই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র বলে মার্কা মেরে দিয়েছে তারা। এর কয়েক দিন যেতে না যেতেই রংপুরে নিহত হলেন জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি। এই দুজন নিরীহ, নির্বিরোধী এবং এ দেশের জনগণের উন্নয়ন প্রয়াসে নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিকে হত্যা করা যে কত পৈশাচিক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আসলে এই দুটো হত্যাকাণ্ডের জন্য যতই আইএস জঙ্গিদের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হোক না কেন, এই হত্যাকাণ্ডগুলো জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব পুনরারম্ভের আলামতই তুলে ধরছে। আমার মনে হচ্ছে, আগামী দিনগুলোতে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যতই এগিয়ে আসবে, ততই দলটির তাণ্ডব জনজীবনকে পর্যুদস্ত করে দিতে চাইবে। প্রধানমন্ত্রীও বিদেশভ্রমণ থেকে ফিরে তাঁর সংবাদ সম্মেলনে এ আশঙ্কাই ব্যক্ত করেছেন।
বিগত ছয় মাস রাজনৈতিক অঙ্গনে যে তুলনামূলক স্থিতি বিরাজ করছিল, তাতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কিছুটা স্বস্তি অনুভব করতে পারেন। আমার আশঙ্কা, অচিরেই আবার পূর্ণোদ্যমে জামায়াত-শিবির মাঠে নামবে, দেশের সংঘাতমূলক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও আবার বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে যাবে। এই অবস্থাকে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাহরিয়ার কবির গত বছর ‘টম অ্যান্ড জেরি শো’ অভিহিত করে হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন। জামায়াতকে নিষিদ্ধ করলে তারা খুনখারাবি শুরু করে দেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন অর্থমন্ত্রী মহোদয়। মাঝেমধ্যে মন্ত্রীরা জামায়াত-শিবিরের ব্যাপারে গরম-গরম কথা বললেও এদের যে নিষিদ্ধ করা হবে না, সেটা বোঝা যাচ্ছে। আমার বিশ্বাস, জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ না করে একটা ঐতিহাসিক ভুল করছে ক্ষমতাসীন জোট। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে জামায়াত-শিবির আজও স্বীকার করেনি। পাকিস্তানের দখলদার সেনাবাহিনীকে সমর্থন দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই দলের পূর্বসূরি জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা-কর্মী-ক্যাডাররা যে গণহত্যা-লুণ্ঠন-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগ-ধর্মান্তরিতকরণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছিল, তার জন্য এখনো তারা অনুশোচনা করেনি, জাতির কাছে ক্ষমাপ্রার্থনাও করেনি। তাই এই স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির এ দেশে রাজনীতি করার অধিকার আছে বলে মনে করি না। এদের সঙ্গে ‘টম অ্যান্ড জেরি শো’ খেলাও মহাবিপদ ডেকে আনবে বলে মনে করি।
দেশবাসীকে আবারও মনে করিয়ে দিতে চাই, জামায়াত-শিবির একটি ফ্যাসিবাদী সংগঠন। তারা ধর্মকে পুঁজি করে এ দেশের রাজনীতিতে সন্ত্রাস ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা জবরদখলের উন্মত্ত ও প্রাণঘাতী অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় হওয়ার পর টিভি ক্যামেরার সামনে সাংবাদিকদের উদ্দেশে জামায়াতের একাধিক নেতা দম্ভভরে এই ‘গৃহযুদ্ধ’ শুরুর ঘোষণা দিয়েছিলেন। (এই হুমকির দায়ে ২০১৩ সালের ৯ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ জামায়াতের নেতা রফিকুল ইসলাম খান ও সাংসদ হামিদুর রহমান আযাদকে তিন মাসের কারাদণ্ড ও তিন হাজার টাকা জরিমানা করেছিলেন। সূত্র: প্রথম আলো, ১০ জুন, ২০১৩)।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম একটি সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছেন: জামায়াত-শিবির আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী মৌলবাদী সংগঠনের বাংলাদেশি চ্যাপ্টার। মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড, ইন্দোনেশিয়ার জামাহ ইসলামিয়া, পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামী, আফগানিস্তানের তালেবান, সৌদি আরব ও আফগানিস্তান থেকে উত্থিত আল-কায়েদা, সাম্প্রতিক কালের ইরাক ও সিরিয়ায় ‘ইসলামিক স্টেট’ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধরত ও ভিডিও ক্যামেরার সামনে মানুষের শিরশ্ছেদ বা মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো নারকীয় নিষ্ঠুরতার জন্মদাতা আইএস, আফ্রিকার আল-শাবাব ও বোকো হারাম—এগুলোর যে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, সেটাই জামায়াত-শিবিরেরও অভিন্ন নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশে জেএমবি, হুজি, জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি), আনসারুল্লাহ, হিযবুত তাহ্রীর, হিযবুত তাওহীদ, আল-কায়েদা ইন্ডিয়ান কমান্ড, তালেবান দক্ষিণ এশিয়া কমান্ড ও এবারের আইএস—এ ধরনের হরেক কিসিমের নাম নিয়ে একেক সময় একেক জঙ্গিগোষ্ঠীর যে তাণ্ডব পরিলক্ষিত হয়ে থাকে, সেগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন সংগঠনের আলাদা আলাদা অপারেশন হিসেবে বিবেচনা করা হলে মারাত্মক ভুল হবে।
এগুলো একই বৃক্ষের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা বৈ তো নয়, কথায় বলে, ‘রসুনের কোয়া অনেকগুলো হলেও গোড়া একটাই’! প্রয়োজনমাফিক এসব ‘পকেট সংগঠনের’ জন্ম দিতেই থাকবে জামায়াত-শিবির ও তাদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশে জামায়াত-শিবিরই যাবতীয় জঙ্গি সংগঠন ও জঙ্গিগোষ্ঠীর সূতিকাগার। অতএব যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজনে জামায়াত-শিবিরকে মডারেট মুসলিম রাজনৈতিক দলের ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করে এর পক্ষে ওকালতি করে, তখন আমাদের সাবধান হতে হবে। মনে রাখতে হবে, জামায়াতে ইসলামীর জন্মই হয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে। আর আমেরিকার সিআইএ জামায়াত-শিবিরকে আশির দশকে আফগানিস্তানে সরাসরি ব্যবহার করেছে। তালেবানও সৃষ্টি করেছে পাকিস্তানের আইএসআই। এমনকি আইএসকেও যুক্তরাষ্ট্রই সৃষ্টি করেছে। সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েত এদের মদদদাতা।
এটা পরিষ্কার যে বিদেশি হত্যার মাধ্যমে দেশে আবারও ‘গৃহযুদ্ধ’ শুরু করার পাঁয়তারা চলছে। প্রতিপক্ষের হাত-পায়ের রগ কাটা বা হাতের কবজি কেটে নেওয়া, কাটা কবজি ছুরির আগায় গেঁথে বিজয় মিছিল করা, গলা কেটে মানুষ খুন করা, পুলিশের কাছ থেকে রাইফেল কেড়ে নেওয়া, ফ্লাইং কিক মারা, বোমা বানানো, গ্রেনেড ছুড়ে শত শত মানুষকে খুন-জখম করা, দেশের ৬৫টি স্থানে একই সঙ্গে বোমা ফাটানো, রেলের ফিশপ্লেট অপসারণ করে ট্রেন লাইনচ্যুত করা, ট্রেনের বগি পোড়ানো, হাজার হাজার গাছ নির্বিচারে ধ্বংস করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ব্রাশফায়ার করা কিংবা শিক্ষক বাসে বোমাবাজি করে শিক্ষকদের জখম করা, বাসে পেট্রলবোমা মেরে মানুষ পুড়িয়ে মারা—এসব বর্বরতার রেকর্ড জামায়াত–শিবির, বিএনপি ও তাদের সহযোগীরা সৃষ্টি করেছে। এসব কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে জামায়াত–শিবির ক্যাডারদের পদোন্নতি মেলে, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি হয়, সুযোগ-সুবিধা বাড়ে। গ্রেপ্তার হলে পরিবারের দেখভাল করা হয়, বাজার পর্যন্ত করে দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। মামলা চালানোর পুরো খরচ বহন করা হয়। কোনো ক্যাডার নিহত হলে পরিবারকে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়, আহত হলেও চিকিৎসার খরচ ও ভাতা দেওয়া হয়। মানে এটা পুরোদস্তুর একটা সিভিল বাহিনী।
আওয়ামী লীগ যদি এহেন একটি বিপজ্জনক আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনকে শক্তি সঞ্চয়ের সুযোগ করে দেয়, তাহলে তাদের কপালে দুঃখ আছে, জাতির কপালেও দুঃখ আছে। আমি আবারও বলছি, এই ঘাতক অপশক্তিকে এ দেশের রাজনীতি থেকে উৎখাত করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করার বিকল্প নেই।
মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
Saturday, October 10, 2015
সোনাদিয়া সমুদ্রবন্দর কি ভূরাজনীতির শিকার? by মইনুল ইসলাম
![]() |
| চট্টগ্রাম বন্দর এখন আর বড়সড় জাহাজের সমুদ্রবন্দর নেই, তা লাইটারেজ পোর্টে পরিণত হয়েছে |
বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে অনেক দূর অগ্রগতি হয়েছিল, বেশ কয়েক বছর আগে জাপানের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ ব্যাপারে ফিজিবিলিটি স্টাডিও সম্পন্ন করা হয়েছিল। সে ফিজিবিলিটি স্টাডিতে ২৫ বছরে ৫৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি গভীর সমুদ্রবন্দরের পর্যায়ক্রমিক উন্নয়নের প্রাক্কলন করা হয়েছিল। ধাপে ধাপে ওই বন্দরটি উন্নয়নের কথা ছিল। গভীর সমুদ্রবন্দরটি আঞ্চলিকভাবে প্রধানত বাংলাদেশ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সেভেন সিস্টার্স (আসাম, মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা ও মিজোরাম), নেপাল, ভুটান, চীনের ইউয়ান ও সিচুয়ান প্রদেশ এবং মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলীয় কিছু প্রদেশ দ্বারা ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর জন্য বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার মিলে বিসিআইএম ইকোনমিক করিডর (যেটিকে কুনমিং ইনিশিয়েটিভ বলা হয়) গঠন করার ব্যাপারেও চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছিল।
এর মধ্যে চীন সোনাদিয়া বন্দরে বিনিয়োগের জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং ২০১২ সালে চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট (তদানীন্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট) শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন গভীর সমুদ্রবন্দরটি নির্মাণে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়ার জন্য। পরবর্তী সময়ে আলাপ-আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতবার যখন চীন সফরে গেলেন, তখন একটি সমঝোতা স্মারক চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। ওই পর্যায়ে ভারত এই প্রকল্পের ব্যাপারে তাদের নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে বলে অভিযোগ আছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে প্রধান কারণ হলো, কোনো কোনো দেশ চীনকে বঙ্গোপসাগরে সহজ প্রবেশাধিকার দিতে নারাজ, এটি তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে। এর ফলে শেখ হাসিনার চীন সফরের সময় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টি শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়ে যাওয়ায় সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
কারণ, ইতিমধ্যে মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেছে এবং মিয়ানমার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ফলে সোনাদিয়া সমুদ্রবন্দর ও বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে চীনের যে একটা সড়ক ও রেলপথে যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছিল, সেখান থেকেও মিয়ানমার সরে এসেছে। বলতে গেলে, অদূর ভবিষ্যতে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের বিষয়টি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এর আগে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় চীন একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের সঙ্গে যখন সম্পর্ক ভালো ছিল, তখন সিতওয়েতেও (আগের আকিয়াব) চীন একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে দিয়েছিল। অন্যদিকে, পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের গোয়াদারেও একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীন অর্থায়ন করেছে, যেটা ভারতের অপছন্দের। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাহিন্দা রাজাপক্ষে হেরে গেছেন এবং পরে সংসদ নির্বাচনে তিনি নিজে জিতলেও তাঁর দল হেরে গেছে। সুতরাং প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার নেতৃত্বাধীন শ্রীলঙ্কা সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আবার বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে এবং চীনের সম্পর্ক অনেকখানি শীতল হয়ে পড়েছে। অতএব সত্যের খাতিরে বলতে হবে, যদিও ভারত চীনকে অন্তর্ভুক্ত করে আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলছে, কিন্তু আসলে ভারত চীনকে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে তার ভূরাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছে। এর ফলে আঞ্চলিক সহযোগিতার পুরো বিষয়টিই এখন বাধাগ্রস্ত হয়ে গেছে।
সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রকল্পটি যে আসলে বাংলাদেশের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের মধ্যে আর অন্তর্ভুক্ত নেই, সেটা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী স্বীকারও করেছেন।
প্রকৃত বাস্তবতা হলো কয়লা এবং এলএনজি আমদানির জন্য মহেশখালীর মাতারবাড়িতে জাপানের অর্থায়নে একটি বন্দর-সুবিধা গড়ে তোলা হচ্ছে, যে বন্দরটি গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রয়োজন হয়তো কিছুটা মেটাবে। ইতিমধ্যে সেখানে প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং কাজ শুরু করা হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের পায়রা নদীর মোহনায় পায়রা বন্দর নামে আরেকটি বন্দর গড়ে তোলার জন্য জোরেশোরে কাজ শুরু হয়েছে এবং প্রাথমিক কাজের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব ফান্ড থেকে এই পায়রা বন্দরটি গড়ে তোলার জন্য অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সুতরাং পায়রা বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সেভেন সিস্টার্সের সমুদ্রের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের বন্দর-সুবিধা ব্যবহারের প্রয়োজন মিটবে, আর বাকিটার জন্য ভারত একটা
বিকল্প ব্যবস্থা করেছে কালাদান রিভার প্রজেক্টের মাধ্যমে। এই প্রজেক্টটির মাধ্যমে সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলো মিজোরাম হয়ে মিয়ানমারের সিতওয়ে বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হবে। এই প্রজেক্টের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে এবং কিছুদিনের মধ্যেই তা সম্পন্ন হলে সেভেন সিস্টার্সের জন্য একটি বিকল্প জলপথ ভারতের দিক থেকে খুলে যাবে। দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোর প্রতি সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিশেষ দুর্বলতা থাকা স্বাভাবিক, সেহেতু পায়রা বন্দরটি দ্রুত গড়ে তোলা হচ্ছে। এমনকি বলা হচ্ছে এটি আঞ্চলিক গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রয়োজন মেটাবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো এ দাবির ভিত্তি নেহাত দুর্বল।
সরকার বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জনপ্রিয়তা অর্জনে পায়রা বন্দর গড়ে তুলছে, এই বন্দরের অর্থায়নও করা হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের টাকায়। প্রতারণার অভিযোগটি উঠছে এখানেই। চট্টগ্রামের জনগণের স্বার্থে আঘাত এলে সবার আগে প্রতিবাদ জানান মহিউদ্দিন চৌধুরী, এটা নব্বই দশকের স্টিভিডোিরং সার্ভিসেস অব আমেরিকা (এসএসএ) সংকটেও প্রমাণিত। চট্টগ্রাম তার উন্নয়নের ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়াতেই তিনি এবারও প্রতিবাদে নেমেছেন।
প্রকৃতপক্ষে, চট্টগ্রাম বন্দর এখন আর বড়সড় জাহাজের সমুদ্রবন্দর নেই, তা লাইটারেজ পোর্টে পরিণত হয়েছে। কারণ, চট্টগ্রাম বন্দরে ৯ মিটারের বেশি ড্রাফটের (গভীরতার) জাহাজ ঢুকতে পারে না। জাহাজগুলো আউটার অ্যাংকরেজে নোঙর করে, অথবা একেবারে কুতুবদিয়ার কাছাকাছি অবস্থান করে। আউটার অ্যাংকরেজ বা কুতুবদিয়া থেকে লাইটারেজ ভেসেলের মাধ্যমে মালামালগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে আসা হয়। অথবা সরাসরি সিঙ্গাপুরে মাদার ভেসেলগুলো মালপত্র নামিয়ে দেয়, তারপর কনটেইনার ভেসেলের মাধ্যমে সেগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে আসা হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের এই সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্য খুব যত্নবান প্রয়াস আমরা দেখতে পাচ্ছি না। কারণ, কয়েক বছর আগে কর্ণফুলী নদীতে যে ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রজেক্ট নেওয়া হয়েছিল, সেটা অসমাপ্ত অবস্থায় পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। প্রজেক্টের প্রায় অর্ধেক অর্থ লোপাট করে দিয়ে ঠিকাদার ভেগেছেন, ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের তেমন কিছুই হয়নি। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়েনি। একই সঙ্গে কর্ণফুলী নদীর খাঁড়ির গভীরতা বাড়ার পরিবর্তে গত দু–তিন বছরে আরও কমেছে।
সুতরাং এই যে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতি একধরনের বিমাতাসুলভ অবহেলার দৃষ্টিভঙ্গি, সেটা আসলে দেশের জন্য খুব একটা স্বাস্থ্যকর দৃষ্টিভঙ্গি নয়। এটা সংকীর্ণ আঞ্চলিক দোষে দুষ্ট। আমি মনে করি, গভীর সমুদ্রবন্দরের বিষয়টি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও কৌশলগত গুরুত্বের দাবিদার একটা প্রকল্প। পায়রা বন্দর নির্মাণকে আমরা স্বাগত জানাই। অদূর ভবিষ্যতের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ অর্থনীতিতে তৃতীয় এই বন্দর নিঃসন্দেহে অবদান রাখবে, আঞ্চলিক প্রয়োজনও কিছুটা মিটবে এর মাধ্যমে।
সবাইকে আবারও মনে করিয়ে দিতে চাই, একটু সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা থেকে পুরো বাংলাদেশের যে সমুদ্র উপকূল, এর একটা বিরাট সম্ভাবনা আছে আঞ্চলিক ব্যবহারের জন্য। কেবল বাংলাদেশ নয়, ভারতের সেভেন সিস্টার্স, নেপাল, ভুটান, চীন, মিয়ানমার এমনকি থাইল্যান্ডের কিছু এলাকাকেও বাংলাদেশের এই সমুদ্র উপকূলের অর্থনৈতিক পশ্চাদ্ভূমি হিসেবে বিবেচনার সুযোগ আছে। এই সুযোগটার সদ্ব্যবহার না করে আমরা যে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজটি পরিত্যাগ করেছি বলে মনে হচ্ছে, সেটা দেশের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। ভারত যদি চীনকে সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ থেকে বিরত রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে
চাপ দেয়, তাহলে বাংলাদেশ সরকারের উচিত ওই বন্দর নির্মাণের বিকল্প অর্থায়নের জন্য ভারতকে চাপ দেওয়া। এ ব্যাপারে ভারতকে একতরফা সুবিধা প্রদান বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব পরিপন্থী বলে মনে করি।
ড. মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (1997)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...









