Sunday, August 19, 2018

সিধুকে কী বললেন পাকিস্তানি সেনাপ্রধান কামার বাজওয়া?

পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন তার ক্রিকেট জীবনের সতীর্থ সাবেক ভারতীয় ক্রিকেটার নভোজিৎ সিং সিধু। শপথ অনুষ্ঠানে সিধুকে আলিঙ্গন করেছেন ইমরান খান, সেই সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়াও। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি লিখেছে, সিধুর সঙ্গে বাজওয়ার হওয়া কথোপকথনের বিষয়ে আগ্রহী অনেকেই। সিধুকে কী বলেছিলেন বাজওয়া? সিধু নিজেই জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের সদিচ্ছার কথা তার কাছে উল্লেখ করেছেন পাকিস্তানি সেনাপ্রধান। পাশাপাশি পাকিস্তানে অবস্থিত শিখ তীর্থস্থানে ভারতীয়দের যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে দেশটির আগ্রহের কথাও জানিয়েছেন তিনি সিধুকে।
গত মাসের ২৫ তারিখ পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল নির্বাচন। তাতে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ পেয়েছিল সবচেয়ে বেশি আসন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসন না পেলেও তারা জোট গঠন করে পাকিস্তান মুত্তাহিদা মজলিসের সঙ্গে। গত শনিবার ইমরান নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের বেশ কয়েক জন সাবেক ক্রিকেটার। আর বড় আকর্ষণ হিসেবে সেখানে হাজির হয়েছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটার নভোজিৎ সিং সিধু, যিনি নেজে এখন পাঞ্জাব থেকে নির্বাচিত কংগ্রেসের সংসদ সদস্য। ইমরান অবশ্য শুধু সিধুকে নন সুনীল গাভাস্কার ও কপিল দেবকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তবে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন শুধু সিধু।
নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরে দেওয়া ভাষণে ইমারন খান বলেছিলেন, ভারত সুসম্পর্কের জন্য এক পা আগলে তার সরকার দুই পা আগাবে।ভারতের প্রতি পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে ইমরান দায়িত্ব নিলে, এমন আশাবাদের কথা সিধু আগেই বলেছিলেন। এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘ইমরান ভালো কিছুর দিকেই আগাবেন। আর ভালো যেকোনও কিছু খারাপ যেকোনও কিছুর চেয়ে গ্রহণযোগ্য।’ শপথ অনুষ্ঠানে সিধুকে বসানোর ব্যবস্থা করানো হয়েছিল একেবারে সামনের সারিতে, পাকিস্তানের শীর্ষ রাজনীতিবিদদের সঙ্গে। সেখানে ইমরান সিধুকে জোরে জড়িয়ে ধরেন এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান।
সামনের সারিতে বসা সব রাজনীতিবিদদের সঙ্গে তিন বাহিনী প্রধানরা এক এক করে শুভেচ্ছা বিনিময় করছিলেন। একসময় বাজওয়া উপস্থিত হন সিধুর সামনে। সেখানে তিনি সিধুকে আলিঙ্গন করেন। বাজওয়া সিধুকে বলেন, ‘আমি একজন জেনারেল, যে ক্রিকেটার হতে চেয়েছিল।’ তদের আলাপ এরপর সিরিয়াস বিষয়ের দিকে যতে শুরু করে। সিধুর জবানিতে এনডিটিভি জানিয়েছে জেনারেল কামার বাজওয়ার ভাষ্য, পাকিস্তান শান্তি চায়। ২০১৯ সালে শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানকের ৫০০ তম জন্মদিনে পাকিস্তানে অবস্থিত কারতারপুরে ভারতীয়দের যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে পাকিস্তান।
শিখ ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন, কারতারপুরের শিখ তীর্থস্থানটিতে গুরু নানক তার জীবনের শেষ সময় অতিবাহিত করেছেন। শিখরা অনেক দিন ধরেই ভারত সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন, যেন তারা কারাতপুরে যাওয়ার বিষয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা করেন। তীর্থস্থানটিতে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে পাকিস্তান ও ভারত ১৯৯৮ সালে সমঝোতায় উপনীত হয়েছিল। কিন্তু তা কখনও বাস্তবায়িত হয়নি।
এনডিটিভি লিখেছে, পাকিস্তানের শান্তি প্রত্যাশার ঘোষণাকে ভারত গুরুত্বে সঙ্গে নেয় না। ভারতের ধারণা, পাকিস্তানের এসব বক্তব্য লোক দেখানো। তবে গুরু নাকের স্মৃতিবিজড়িত কারতারপুরের তীর্থস্থানটিতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়ার ঘোষণা প্রসঙ্গে নভোজিৎ সিং সিধু বলেছেন, ‘এটা একটা স্বপ্ন সত্য হওয়ার মতো বিষয়। এটা একটা পরিবর্তন এবং যে কোনও পরিবর্তনই আশা জাগানিয়া। আশা অদৃশ্যকেও দেখতে পায়, অসম্ভবকেও জয় করতে পারে।’ কামার বাজওয়া সিধুকে শেষে বলেছেন, ‘আমরা আরও ভালো কিছু করার চেষ্টা করব।’ সিধুর প্রত্যাশা, সম্পর্কের উন্নয়নে ভারত এক কদম আগাবে।
সিধুর পাকিস্তান সফর নিয়ে ভারতে বিজেপির রাজনীতিবিদরা সমালোচনা করেছেন। হরিয়ানার আনিল ভিজ বলেছেন, পাকিস্তানি আমন্ত্রণ গ্রহণ করাটা ‘অবিশ্বস্ততার’ পরিচায়ক! বিজেপির নেতা সম্ভিত প্যাটেল মন্তব্য করেছেন, সিধুর ইমরান খানের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পাকিস্তান যাওয়াটা ‘লজ্জাজনক কাজ।’ পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাটা দরকার বোঝাতে সিধু হিন্দুদের ধর্মীয় গ্রন্থ বেদ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘যোগাযোগের অভাবে বিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দেয়।’

তুরস্কের প্রতি সংহতি জানিয়ে তুর্কি মুদ্রা কিনছেন পাকিস্তানিরা

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মুখে অর্থনৈতিক সংকটের কবলে পড়া তুরস্কের প্রতি সংহতি জানিয়ে তুর্কি মুদ্রা লিরা কিনছেন পাকিস্তানিরা। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে ‘বাই লিরা’ বা ‘লিরা কিনুন’ শীর্ষক তিনদিনের এক ক্যাম্পেইনের ডাক দিয়েছেন দেশটির রাজনীতিক, সুশীল সমাজ ও সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাক্টিভিস্টরা। শনিবার এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সি।
ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে রাজধানী ইসলামাবাদ, করাচি, লাহোরসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে লিরা কিনছেন পাকিস্তানিরা। দেশটির রাজধানীতে এ ক্যাম্পেইনের সবচেয়ে বড় আয়োজন অনুষ্ঠিত হয় ইসলামাবাদ প্রেস ক্লাবে। পাকিস্তানি রাজনীতিক ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্টরা যৌথভাবে এর আয়োজন করেন।
রাজনীতিক কাজী হুসাইন আহমেদের পুত্র ড. আসিফ লুকমান কাজী বলেন, পাকিস্তানি ও তুর্কিরা একই জাতি। তুরস্ক সবসময়ই পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়ে গেছে। এখন তাদের আমাদেরকে প্রয়োজন। আমরাও তাদের পাশে আছি।
তিনি বলেন, তুর্কি লিরা সংগ্রহ এবং তুরস্কের পণ্য কেনার এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
আজাদ কাশ্মিরের এমপি আবদুল রাশিদ তুরাবি বলেন, তুরস্কের সরকার ও জনগণের প্রতি সংহতি জানাতে আমরা এখানে একত্রিত হয়েছি। প্রতিটি দেশেরই নিজস্ব আইন অনুযায়ী কাজ করার অধিকার রয়েছে। অন্য দেশের ওপর হস্তক্ষেপের অধিকার কোনও দেশের নেই। সার্বভৌমত্ব রক্ষার সব অধিকার তুরস্কের রয়েছে।
স্থানীয় মানি এক্সচেঞ্জ থেকে ২০০ তুর্কি লিরা কিনেছেন করাচির স্মল ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ হামিদ। তিনি বলেন, তুর্কি জনগণকে তাদের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে তাদের নিজেদের একা ভাবার কোনও কারণ নেই। পাকিস্তানের জনগণ তাদের পাশে আছে।
পাকিস্তানের পাশাপাশি তুর্কি লিরা কিনছেন কাতারি নাগরিকরাও। সংকট উত্তরণে গত ১৫ আগস্ট তুরস্কে এক হাজার ৫০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেন কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি। ওই ঘোষণার পর আঙ্কারায় নিযুক্ত কাতারের রাষ্ট্রদূত সালিম বিন মুবারাকা আল শাফি বলেন, ‘২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সময় যেমন কাতার তুরস্কের পাশে ছিল, তেমন করে ভবিষ্যতেও তুর্কি ভাইদের পাশে থাবে কাতার। তুরস্ককে অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে বের করে আনতে কাতারের নাগরিকরা প্রচুর পরিমাণে তুর্কি লিরা কিনেছে।’
এদিকে শনিবার দলীয় এক অনুষ্ঠানে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান বলেছেন, যারা আমাদের কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে চায় তাদের কাছে তুরস্ক আত্মসমর্পণ করেনি এবং করবেও না। আমরা তাদের খেলা দেখবো এবং তাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবো।

ইমরানের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী যুক্তরাজ্য, চীন, তুরস্ক, ইরান

রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান, থেরেসা মে এবং হাসান রুহানি
পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী যুক্তরাজ্য, চীন, তুরস্ক ও ইরান। শনিবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরান খান দায়িত্ব গ্রহণের পর তাকে পাঠানো শুভেচ্ছা বার্তায় নিজ নিজ দেশের এমন অবস্থানের কথা জানান দেশগুলোর নেতারা। তারা আশাবাদ জানিয়েছেন, ইমরানের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।
শনিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পিটিআই নেতা ইমরান খানের শপথগ্রহণের পর থেকেই আসতে শুরু করে বিশ্বনেতাদের ফোন ও শুভেচ্ছা বার্তা। এ তালিকায় রয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে, ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানিসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা। এছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর ফোনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র সঙ্গে কথা বলেছেন ইমরান খান। ওই ফোনালাপের পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দফতর ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, নির্বাচনে জয় এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় ইমরান খানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে।
টুইটারে দেওয়া এক পোস্টে থেরেসা মে বলেছেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে কথা বলে ভালো লেগেছে। যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তানের মধ্যে গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের দুই দেশের একসঙ্গে করার মতো প্রচুর কাজ রয়েছে।
ফোনালাপে শিগগিরই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের ব্যপারে একমত হন দুই নেতা।
ইমরান খানকে পাঠানো এক চিঠিতে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান তার সফলতা কামনা করেছেন।
চিঠিতে এরদোয়ান বলেন, আমি সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করি যে আমাদের মধ্যে বিদ্যমান ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার সম্পর্ক আগামী দিনগুলোতে আরও সমৃদ্ধ হবে; যা দুই দেশের জনগণের জন্য কল্যাণ ও সমৃদ্ধি বয়ে নিয়ে আসবে।
তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলেন, তুরস্কের সংকটকালে আপনি যে সংহতি প্রদর্শন করেছেন তাতে আমাদের দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস, আপনার সৎ নেতৃত্ব তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সহায়ক হবে।
শনিবার ইমরান খানকে অভিনন্দন জানিয়ে লেখা এক চিঠিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় আপনাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। ইসলামাবাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও সহযোগিতা বাড়াতে তেহরান প্রস্তুত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শপথগ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে ইরান যাবেন ইমরান খান। এরপর তিনি সৌদি আরব সফর করবেন।
চীনের প্রেসিডেন্ট লি কেকিয়াং ইমরানকে অভিনন্দন জানিয়ে দেওয়া বার্তায় বলেছেন, চীন ও পাকিস্তান সব সময়ের বন্ধু। বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও উভয়দেশের সম্পর্ক ছিল ভালো ও স্থিতিশীল। চীন-পাকিস্তান উন্নয়ন সম্পর্ক নিয়ে ইমরানের ইতিবাচক মন্তব্যেরও প্রশংসা করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র হেদার নোয়ার্ট নিজের অফিসিয়াল টুইটারে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, আমরা পাকিস্তানের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের শপথগ্রহণকে স্বীকৃতি দেই এবং তাকে স্বাগত জানাই। পাকিস্তান এবং এই অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য নতুন বেসামরিক সরকারের সঙ্গে কাজ করার জন্য অপেক্ষা করছে ওয়াশিংটন।
এছাড়া সম্প্রতি পাকিস্তানে নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূত আলেক্সি দেদভ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শুভেচ্ছা বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন ইমরানের কাছে। ওই বার্তায় পুতিন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। সূত্র: ডন।

ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষায় জাতিসংঘের নতুন প্রস্তাব, ইসরায়েলের প্রত্যাখ্যান

দখলকৃত সীমানায় ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য নতুন প্রস্তাব দিয়েছে জাতিসংঘ। সাধারণ পরিষদের অনুরোধে সংস্থাটির মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের দেওয়া এক প্রতিবেদনে এসব প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে রয়েছে দখলকৃত এলাকায় ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সুরক্ষা জোরালো করতে সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর খসড়া। প্রস্তাবে অন্যান্য বিকল্পের পাশাপাশি ওই অঞ্চলের সুরক্ষার জন্য জাতিসংঘের অধীনে বাহিনী গঠনের কথা বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে প্রতিবেদনটি বিতরণ করেছে জাতিসংঘ। তবে প্রস্তাবগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েল। আর সুরক্ষা বাহিনী গঠনে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের দরকার হবে। ইসরায়েলের আপত্তির কারণে তাদের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডলইস্ট আই এ খবর জানিয়েছে।
চলতি বছরের মার্চে ‘গ্রেট রিটার্ন অব মার্চ’ কর্মসূচি শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি সেনাদের হামলায় ১৭১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এরপর সমস্যার সমাধানের জন্য প্রস্তাব দেওয়ার জন্য মহাসচিবকে অনুরোধ জানায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। ১৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষায় চারটি সম্ভাব্য বিকল্পের খসড়া প্রস্তাব করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। এতে ফিলিস্তিনিদের জন্য সহায়তা বাড়ানো থেকে শুরু করে জাতিসংঘের অধিকার পর্যবেক্ষক পাঠানো এবং জাতিসংঘের অনুমোদনে পুলিশ ও সেনা মোতায়েন বা নিরস্ত্র পর্যবেক্ষক রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।
গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী স্বীকৃতি দিয়ে সেখানে মার্কিন দূতাবাস সরানোর ঘোষণা দেন। এরপরই ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের একক উদ্যোগ মেনে নেবে না তারা। তাই শান্তি উদ্যোগের ক্ষেত্রে এক ধরনের শূন্যতার মধ্যেই ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষায় নতুন প্রস্তাব দিল জাতিসংঘ। বেশ কয়েক বছর আগে সর্বশেষ ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের পরাশক্তিগুলো এখন ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শান্তি প্রক্রিয়া ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যে ওই পরিকল্পনা সামনে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প এই পরিকল্পনাকে শতাব্দীর সেরা চুক্তি আখ্যা দিলেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, চুক্তিতে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী বানানোর প্রস্তাবের পাশাপাশি ভবিষ্যত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে পূর্ব জেরুজালেমকে রাখা হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেন্ডেন্টে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক রবার্ট ফিস্ক পরিকল্পনাটি সম্পর্কে বলেছেন, টাকার বিনিময়ে ফিলিস্তিনিদের অধিকার কিনতে চাইছেন ট্রাম্প। জাতিসংঘ কূটনীতিকরা মার্কিন শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলতে শুরু করেছেন, ওই পরিকল্পনা চিরদিন অসম্ভব হয়েই থাকবে।
এদিকে জাতিসংঘের নতুন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে শুক্রবার (১৭ আগস্ট) বিবৃতি দিয়েছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলি দূত ড্যানি ড্যানোন। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের কাছ থেকে ফিলিস্তিনি জনগণকে রক্ষার উপায় দেখানোর পরিবর্তে জাতিসংঘের উচিত নিজেদের জনগণকে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে থাকা ফিলিস্তিনি নেতৃত্বকেই দায়বদ্ধ রাখা।’ তিনি বলেন, প্রতিবেদনে দেওয়া পরামর্শগুলো শুধুমাত্র ফিলিস্তিনিদের অব্যাহত বর্জন তত্ত্বকেই সক্রিয় করবে।
জাতিসংঘের অধীনে কোন সুরক্ষা বাহিনী গঠন করতে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের দরকার পড়বে। তবে ইসরায়েলের আপত্তি রয়েছে এমন প্রস্তাব তাদের মিত্ররাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র নিজের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে আটকে দিতে পারে।
শুক্রবার ফিলিস্তিনি জাতিমুক্তি আন্দোলনের সংগঠন হামাসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মিডলইস্ট আই’কে বলেন, ফিলিস্তিনি অঞ্চল থেকে সব ধরনের হামলা বন্ধের বিনিময়ে ইসরায়েল গাজা উপত্যকার সব ক্রসিং খুলে দেওয়া ও উপত্যকাটি থেকে সাইপ্রাস পর্যন্ত সমুদ্র পথে প্রবেশাধিকারের প্রস্তাব দিয়েছে। মিসরীয় মধ্যস্থতার এই চুক্তি নিশ্চিত হলে গাজা ও এর নিয়ন্ত্রক সংগঠন হামাসের জন্য তা বিশাল স্বস্তি আনবে। তবে পশ্চিম তীরের রামাল্লা থেকে হামাসের সঙ্গে পুনর্মিলন বিষয়ক ফাতাহ কর্মকর্তা আজম আল-আহমাদ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, হামাস ‘শত্রুতাপূর্ণ পরিকল্পনা’য় যুক্ত হতে যাচ্ছে। এতে ফিলিস্তিনিদের একতা নষ্ট হবে। বৃহস্পতিবার মিডলইস্ট আই’কে তিনি বলেন, ‘গাজায় যুদ্ধবিরতি বিষয়ে ইসরায়েলের সমঝোতা বা গাজার জন্য আলাদা করে বন্দোবস্ত করার মাধ্যমে হামাস নিজে একটি শত্রুতাপূর্ণ পরিকল্পনায় যুক্ত হচ্ছে। এর অর্থ হচ্ছে তারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুযায়ী ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।’ 
হামাসের একটি সূত্র বলেছে, হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে মিসরীয় মধ্যস্থতায় একটি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তির ব্যাপারে ‘গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘শতাব্দীর চুক্তি’র অংশ হিসেবে এটা করা হচ্ছে। ওই সূত্রের মতে, হামাসের নিরস্ত্রীকরণসহ সুড়ঙ্গ খোড়া বন্ধ করা ও গাজায় বন্দি বা নিখোঁজ হওয়া ইসরায়েলিদের মুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইসরায়েল তাদের ঐতিহাসিক দাবিগুলো বাদ দিয়েছে। এছাড়া গাজায় পানি, বিদ্যুৎ ও সুয়ারেজসহ মানবিক প্রকল্প চালুর জন্যও হামাস চাপ দিচ্ছে। তবে তার মতে, আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হলো হামাসকে সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকার দেওয়ার সময় নির্ধারণ। এছাড়া এই সমুদ্র পথের অন্যান্য আইনগত বিষয় নিয়েও কাজ করা হচ্ছে।

আত্মমর্যাদা ও মানবাধিকারের স্বপক্ষে একক কণ্ঠস্বর -নিউ ইয়র্ক টাইমসে নিবন্ধ by জেমস এস্ট্রিন

আগস্টের ৬ তারিখ শহিদুল আলমকে যখন ঢাকার একটি আদালত কক্ষে নেয়া হচ্ছিল, তিনি তখন কাতরাচ্ছিলেন। হাতকড়া পরা শহীদুলের চারপাশে তখন পুলিশ। হঠাৎ তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন যে, তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। ঠিক আগের রাতেই তাকে ৩০ জনেরও বেশি সাদা পোশাকধারী কর্মকর্তা বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়।
আন্তর্জাতিকভাবে প্রখ্যাত এই আলোকচিত্রী, শিক্ষক ও মানবাধিকার কর্মী আল জাজিরায় একটি সাক্ষাৎকার ও বেশকিছু ফেসবুক লাইভ ভিডিওতে বক্তব্য রাখার পরপর গ্রেপ্তার হন। সেখানে সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সরকারের সহিংস প্রতিক্রিয়ার কড়া সমালোচনা করেন তিনি। শহীদুল আলমসহ ওই প্রতিবাদ কাভার করতে যাওয়া অনেক ফটোসাংবাদিককে পুলিশ ও শাসক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন সশস্ত্র গোষ্ঠী আক্রমণ করে।
তার বিরুদ্ধে এখন বাংলাদেশের আইসিটি আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে। এই আইনানুযায়ী কেউ অনলাইনে সরকারের সমালোচনা করলে কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে। অন্তত ১১ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাকে কারাগারে থাকতে হবে। এই সপ্তাহে তার জামিন আবেদন দাখিল করা হলেও শুনানি হবে ওই দিন।
বহু মানবাধিকার সংস্থা এবং সাংবাদিকতা ও ফটোগ্রাফি বিষয়ক বিভিন্ন সংস্থা বেশ জোরালোভাবে তার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানিয়েছে। কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্ট বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের প্রতি অনতিবিলম্বে সাংবাদিকদের ওপর হামলা বন্ধ ও শহীদুল আলমকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ডেপুটি পরিচালক ওমর ওয়ারাইখও তার নিঃশর্ত মুক্তি চেয়েছে। তিনি বলেন, ‘কাউকে শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণভাবে নিজের মতপ্রকাশের কারণে আটক করার মধ্যে কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।’
বাংলাদেশে ৩ দশকেরও বেশি সময় ধরে ফটোগ্রাফির সঙ্গে জড়িত শহীদুল আলম। তিনি বড় ঘটনাবলী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ক্ষমতার পালাবদল, গার্মেন্ট শ্রমিকদের মৃত্যু এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে লড়াই নিয়ে কাজ করেছেন। নিজের ছবির মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের সরকার ও সামরিক বাহিনীকে বাকস্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের গুম নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।
একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি অসংখ্য তথ্যচিত্রনির্মাতা তৈরিতে সহায়তা করেছেন। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করেছেন। ৩০ বছর ধরে তার পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইন্সটিটিউট বহু প্রতিভাবান আলোকচিত্রীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। বাংলাদেশে একটি চমৎকার আলোকচিত্রী সম্প্রদায় থাকার সুনাম তৈরিতে সহায়তা করেছেন তিনি। ১৯৯৯ সালে তিনি যেই ছবি মেলা উৎসব চালু করেছেন, তাতে যোগ দিতে বিশ্বের বহু জায়গা থেকে আলোকচিত্রীরা আসেন ঢাকায়। ১৯৮৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দৃক ফটো এজেন্সি। এর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশি আলোকচিত্রীদের কর্ম বিশ্বব্যাপী বিক্রির ব্যবস্থা করেছেন।
পশ্চিমা গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতেও দ্বিধা করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের মতো দেশ কীভাবে চিত্রিত হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে একচ্ছত্র ক্ষমতা কেবল পশ্চিমাদেরই। ২০১৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘দরদী গল্পমালা বাংলাদেশের মনন ও অর্থনীতির অনেক ক্ষতি করেছে। বাংলাদেশের ছবি ব্যবহার করে এক ধরনের উপনিবেশিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশকে সবাই শুধু দারিদ্র্য ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চেনে।’
শহীদুল আলম মানেন যে, দারিদ্র্যও বাংলাদেশের গল্পের অংশ। তবে রিপোর্টিং যখন শুধু দারিদ্র্যকে কেন্দ্র করে হয়, তখন এর মাধ্যমে এক ধরনের ক্ষতিকর সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই উপস্থাপিত হয়। পশ্চিমা মিডিয়া বা তাদের নিয়োগ দেয়া বিদেশি সাংবাদিকরা বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে, এমনটা হয়েছে খুবই কম।
তার ভাষ্য, ‘একটি আফ্রিকান প্রবাদ আছে, যেটাকে আমি প্রাসঙ্গিক মনে করি। সেটি হলো, ‘যতদিন পর্যন্ত সিংহ নিজের গল্প বলার মতো কাউকে খুঁজে না পাবে, ততদিন শিকার নিয়ে হওয়া গল্পে শুধু শিকারিরই গুণগান গাওয়া হবে।’ আমাদের গল্প আমাদেরকেই বলতে হবে। আমাদেরকে নিশ্চিত করতে হবে যে আমাদের বিষয়বস্তুর প্রতি আমরা সংবেদনশীল ও শ্রদ্ধাশীল হবো। পাশাপাশি, মানুষকে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তাতে যেন তার আত্মমর্যাদা ঠিক থাকে।’
পশ্চিমা শ্বেতাঙ্গ আলোকচিত্রী বা অন্য কেউ বাংলাদেশের গল্প বলুক, তাতে তার আপত্তি নেই। কারণ, বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গিকেও চ্যালেঞ্জ করার লোক থাকতে হবে। তবে বাংলাদেশের গল্প বলার ক্ষেত্রে পশ্চিমা আলোকচিত্রীরাই একচ্ছত্র এখতিয়ার পাবে, তা নিয়ে শহীদুলের ভীষণ আপত্তি।
আজ থেকে ২৫ বছর আগে শহীদুল আলম ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোর মতো বৈশ্বিক ফটোগ্রাফি বিষয়ক সংস্থাকে বলতে থাকেন যে, বিশ্বের সব দেশের আলোকচিত্রীকেই সহায়তা দিতে হবে। প্রতিযোগিতার বিচারকদের মধ্যে বৈচিত্র্য থাকতে হবে। তখন শহীদুলের সঙ্গে তাল মেলানোর কেউ ছিল না। অথচ, আজ অনেকেই পূর্বধারণাবশত উপস্থাপনার বিরুদ্ধে তার লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন।
এই বছর নিউ ইয়র্ক পোর্টফোলিও রিভিউতে যেসব ফটোসাংবাদিক ও সম্পাদক অংশ নিয়েছেন তারা কাছ থেকে দেখেছেন ফটোগ্রাফি নিয়ে তার অনুরাগের কিয়দাংশ। তিনি বেশ দারুণ এক আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন নিউ ইয়র্ক টাইমসের লেন্স ব্লগের অন্যতম সম্পাদক ডেভিড গঞ্জালেজের সঙ্গে। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্গানিক কেমিস্ট্রিটে পিএইচডিধারী শহীদুল একটি কথা প্রায়ই বলে থাকেন, সেটি ওই অনুষ্ঠানেও তিনি বলেছেন। সেটি হলো, তিনি ‘তৃতীয় বিশ্বে’র মতো শব্দগুচ্ছ পরিহার করেন। তার মতে, বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষই এই তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বে বসবাস করেন। সুতরাং, তিনি একে বলেন ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের বিশ্ব’ (মেজরিটি ওয়ার্ল্ড)।
২০০৭ সালে তিনি মেজরিটি ওয়ার্ল্ড ফটো এজেন্সি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি আফ্রিকান, লাতিন আমেরিকান ও এশিয়ান আলোকচিত্রীদের জন্য সুযোগ ছড়িয়ে দিয়েছেন। গত বছর তিনি উইমেন ফটোগ্রাফি, ডাইভারসিফাই, এভরিডে প্রজেক্ট ও নেটিভ এজেন্সির সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘রিক্লেইম।’ এই সংস্থাটির উদ্দেশ্য হলো নারী ও বৈচিত্র্যময় ব্যাকগ্রাউন্ডের অধিকারী মানুষের জন্য ফটোগ্রাফির সুযোগ বিস্তৃত করা।
নিজের ক্যারিয়ারে শহীদুল আলম বহুবার বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের মুখোমুখি হয়েছেন। ২০১৩ সালে ভিন্নমতাবলম্বীদের বলপূর্বক অন্তর্ধান নিয়ে তার আলোকচিত্র প্রদর্শনী শুরুর কয়েক মিনিট আগে পুলিশ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু দমে না গিয়ে, শহীদুল আলম ও তার সহযোগীরা গ্যালারির বাইরে সড়কের ধারে ওই প্রদর্শনী চালিয়ে যান। ২০০৯ সালে দৃক গ্যালারিতে তিব্বতের ওপর ছবির প্রদর্শনী আয়োজন করেন। কিন্তু চীন সরকার বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিয়ে দাঙ্গা পুলিশের মাধ্যমে ওই প্রদর্শনী বন্ধ করায়। ১৮ বছর আগে তার দৃক গ্যালারি ছিল সরকারবিরোধী কর্মীদের বৈঠকস্থল। তখন একদিন রাতে শহীদুল আলমকে রিকশায় একদল লোক আটকায়। তার কম্পিউটার নিয়ে যায়। আর তাকে ৮ বার ছুরিকাঘাত করে।
হুমকি ও আক্রমণ সত্ত্বেও, মানবাধিকার এবং গণতন্ত্র, সাম্য ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতে ফটোগ্রাফির শক্তি ব্যবহারে শহীদুল আলমের অঙ্গীকারে এতটুকু চিড় ধরেনি। ২০০৭ সালে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কী পদচ্ছাপ ফেলে গেলাম সেটা আমার কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আমি কীভাবে বিশ্বকে প্রভাবিত করলাম বা করলাম না। আমি কিছু পন্থায় চেয়েছি হস্তক্ষেপ করতে, যাতে করে যেই পৃথিবীতে আমার বসবাস, সেটিকে আমি যেভাবে পেয়েছি, তার চেয়ে ভিন্ন অবস্থায়-মঙ্গলের পথে-রেখে যেতে পারি।’
(জেমস এস্ট্রিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকার লেন্স ব্লগের অন্যতম সম্পাদক। তার এই নিবন্ধ নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে অনূদিত।)

ইরানের বিরুদ্ধে পম্পেওর পুরোনো অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ও বাস্তবতা

ইরানে ইসলামি বিপ্লব বিজয়ের পর গত ৪০ বছর ধরে আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে নানা ভিত্তিহীন অভিযোগ আরোপ ও শত্রুতামূলক আচরণ করে আসছে। আমেরিকার একটি বড় অভিযোগ হচ্ছে ইরান সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন দিচ্ছে। আর এ অজুহাতে তারা এ পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে বহু পদক্ষেপ নিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৮মে পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়ার পর এবং ইরানের বিরুদ্ধে ফের নিষেধাজ্ঞা বলবত করার পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ১২টি শর্তে ইরানের সঙ্গে সংলাপে বসার প্রস্তাব দেন। এসব শর্তের মধ্যে আমেরিকার স্বেচ্ছাচারী মনোভাব ফুটে উঠেছে যা ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের স্বাক্ষরিত পরমাণু সমঝোতার স্পষ্ট লঙ্ঘন। ওই ১২টি শর্তের মধ্যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থেকে বিরত থাকা, মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাবলীতে হস্তক্ষপে বন্ধ করা এবং ইসরাইল বিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রামীদের সমর্থন না দেয়ার দাবি জানানো হয়েছে। আমেরিকার দৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্যে হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো প্রতিরোধ যোদ্ধারা হচ্ছে সন্ত্রাসী।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও গতকাল (শুক্রবার) আবারো ইরানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের প্রতি সমর্থন দেয়ার অভিযোগ তুলে দাবি করেছেন, "ইরান মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বে অস্ত্র ছড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।" তিনি ইরানের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিদ্বেষী নীতির প্রতি সমর্থন জানিয়ে আরো দাবি করেছেন, ইরানের উত্থান ঠেকানোর জন্য নিয়োজিত কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে শামিল হতে মিত্র দেশগুলোর প্রতিও আহ্বান জানান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেও।
পম্পেও এমন সময় ইরানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের প্রতি সমর্থন দেয়ার অভিযোগ তুলেছেন যখন আমেরিকা সৌদি আরবের সহযোগিতায় মধ্যপ্রাচ্যে তৎপর দায়েশসহ অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর প্রতি সর্বাত্মক সাহায্য সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। অথচ এটা সবারই জানা আছে ইরান এ অঞ্চলে উগ্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইরাক ও সিরিয়ায় দায়েশ সন্ত্রাসীদের প্রতি আমেরিকা ও সৌদি আরবের সরাসরি সহযোগিতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যসহ সারাবিশ্বে সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। বিষয়টি খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও স্বীকার করেছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরাক ও সিরিয়াসহ আরো কয়েকটি দেশে সন্ত্রাসীদের প্রতি মার্কিন সমর্থনের কারণে এ অঞ্চলে চরম নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি ও গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। সন্ত্রাসীদের প্রতি আমেরিকার সমর্থনের প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে এ অঞ্চলে ইসরাইল বিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রামীদের দুর্বল করে দেয়া।
যাইহোক, ইসলামি ইরান তার সংবিধান অনুযায়ী বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো প্রতিরোধ শক্তিগুলোকে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।

এক যুবকের মমিকে ঘিরে রহস্য

মমি। ছোট্ট একটা শব্দ। কিন্তু তারই মধ্যে অমোঘ রহস্যের হাতছানি। হাজার হাজার বছর আগেকার পৃথিবীর দিনকাল ভেসে ওঠে চোখের সামনে। সেই সঙ্গে অবধারিত অতিলৌকিক সব আখ্যান। লেখকের কল্পনা হোক বা হলিউডের রুপোলি পর্দা— মমির আবেদন সর্বজনবিদিত। তুতেনখামেনের অভিশপ্ত মমি হোক বা অন্য ফারাওদের মমি— সাধারণ মানুষদের পাশাপাশি গবেষকদেরও কৌতূহলের শেষ নেই। এ নিয়ে নতুন নতুন আবিষ্কারও তাই হয়ে চলেছে। সম্প্রতি এক বহু পুরনো মমিকে ঘিরে নতুন আবিষ্কারের কথা সামনে এল। জানা গেল, ফারাওদের আগেও মমি প্রথা চালু ছিল প্রাচীন মিশরে! চাঞ্চল্যকর এই খবরে স্বাভাবিক ভাবেই উত্তেজিত কৌতূহলী মানুষরা।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘লাইভসায়েন্স.কম’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ওই মমিটি পাওয়া গিয়েছিল গত শতাব্দীর একেবারে গোড়ায়। ১৯০১ সাল থেকে ইতালির তুরিন মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে মমিটি। মোটামুটি ভাবে ৩৭০০ থেকে ৩৫০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দের সময়কালের ওই মমিটি সম্পর্কে এতদিন সকলের ধারণা ছিল, ওই মমিটি কৃত্রিম ভাবে সংরক্ষিত হয়নি। কোনও দুর্যোগের পরে মরুভূমিতে প্রাকৃতিক ভাবেই ওই দেহটি সংরক্ষিত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গবেষকরা এখন জানতে পেরেছেন, ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী ওই যুবকের দেহটিকে কৃত্রিম ভাবেই সংরক্ষণ করা হয়েছিল। স্বাভাবিক ভাবেই এহেন আবিষ্কারে মমির ইতিহাস নিয়েই নতুন করে ভাবতে হচ্ছে গবেষকদের। কেননা, গবেষকদের এই দাবির অর্থ, এতদিনের জানা সময়েরও ১ হাজার বছর আগেই এই বিদ্যা আয়ত্ত করেছিল মিশরের মানুষ।
গত ১৫ অগস্টে ‘জার্নাল অফ আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স’-এ প্রকাশিত হয়েছে গবেষণাপত্রটি। ওই গবেষক দলের অন্যতম গবেষক অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বাসিন্দা জানা জোন্স জানিয়েছেন, মমিটির ডান কবজি, ধড় খুঁটিয়ে পরীক্ষা করার পরে বোঝা গিয়েছে সেটিকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষা করা হয়েছে দেহের সঙ্গে থাকা ব্যাগটিও। দেখা গিয়েছে, জৈব তেল, প্রাণীজ চর্বি ও আরও বহু পদার্থের প্রলেপ দিয়ে কাপড়ে মোড়ানো হয়েছিল দেহটি। উদ্দেশ্য অবশ্যই সংরক্ষণ।
ওই মমিটি এত প্রাচীন, যখন লেখার ভাষাও আবিষ্কৃত হয়নি। সম্ভবত মুখে মুখেই ওই সংরক্ষণের প্রক্রিয়া প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাহিত হয়েছে। গবেষকরা জানাচ্ছেন, ওই সময়ের মানুষের মধ্যে মরণোত্তর জীবন সম্পর্কে অটুট বিশ্বাস ছিল। তারা চাইত দেহটি সংরক্ষণ করতে। আর সংরক্ষণের পদ্ধতিও তারা আবিষ্কার করে ফেলেছিল।
কবেকার এক যুবকের শরীর এইভাবেই প্রাচীন পৃথিবীর দরজা আচমকাই যেন খুলে দিয়েছে বিজ্ঞানীদের সামনে। তাঁরা বিস্মিত হয়ে লক্ষ করছেন, সেই সুদূর অতীতেও মানুষ চারপাশের প্রাকৃতিক উপাদানকে কাজে লাগিয়েই কীভাবে দেহ সংরক্ষণের আশ্চর্য পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলেছিল।
সূত্র- এবেলা