Saturday, June 4, 2016

ইউরোপে বাংলাদেশি অভিবাসন জালিয়াতচক্র!

ইউরোপে যাওয়ার ভুয়া কাগজ তৈরির দু'টি চক্রের ১৯ জনকে গ্রিস ও চেক প্রজাতন্ত্রে গ্রেপ্তার করেছে ইউরোপোল৷ আর এই চক্রের একটি বাংলাদেশীদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় বলে জানা গেছে৷ তবে আটকদের মধ্যে কতজন বাংলাদেশী তা জানা যায়নি৷ গত ২৫ মে এই দু'টি জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পুলিশ ইউরোপোল অভিযান পরিচালনা করে৷ ইউরোপোলের দাবি, গ্রিসের এথেন্সভিত্তিক দুটি চক্র এই জাল ট্রাভেল ডকুমেন্ট তৈরির সঙ্গে জড়িত, যার একটি বাংলাদেশিরা চালায়৷ ইইউ'র জাল পাসপোর্ট ও ভিসা তৈরি করে প্রতিটি তিন হাজার ৬০০ ডলার পর্যন্ত দামে বিক্রি করে তারা৷ কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এসব জাল কাগজপত্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়৷ ইউরোপোল বলছে, বাংলাদেশিদের চক্রটি গত বছর এসব কাগজপত্রের অন্তত ১২৬টি চালান কুরিয়ারে মাধ্যমে পাঠিয়েছে৷ জালিয়াতিতে জড়িত অন্য চক্রটি সুদানিদের এবং গত বছর তারা কুরিয়ারে পাঠিয়েছে ৪৩১টি চালান৷ এই অপরাধীরা বিভিন্ন সীমান্তে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে গ্রিসের পুলিশ জানায়৷ এথেন্স থেকে এই চক্রের ১৬ জন এবং চেক রিপাবলিক থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে ইউরোপোল জানিয়েছে৷
তবে জাল কাগজ ব্যবহার করায় আরো সাতজনকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেছে৷ গ্রিস ও অন্যান্য দেশে এসব কাজে জড়িত আরও প্রায় ১০০ জনকে এখনো খোঁজা হচ্ছে ৷ আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, এথেন্সভিত্তিক এই দুটি জালিয়াত চক্র পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, শেঙেন ভিসা (ইউরোপের ২৬টি দেশে অবাধে চলাচলের অনুমতিপত্র), ড্রাইভিং লাইসেন্স, শরণার্থীদের রেজিষ্ট্রেশন কার্ড ও রেসিডেন্স পারমিট জাল করে ৷ এ দুটি চক্রের পাশাপাশি চেক প্রজাতন্ত্রে আরেকটি চক্র সক্রিয় থাকার কথা জানিয়ে ইউরোপোল বলেছে, ওই চক্রটি চুরি হওয়া বা হারিয়ে যাওয়া পরিচয়পত্র ও ভ্রমণ সংক্রান্ত কাগজপত্র কেনে৷ তারপর এথেন্সের ওই চক্রগুলোর কাছে সেগুলো পাঠালে তারা তাতে ঘষামাজা করে মক্কেলদের ব্যবহারের উপযোগী করে ফেরত পাঠায়৷
এরপর চেক প্রজাতন্ত্র থেকে কুরিয়ারের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে তা পাঠানো হয়৷ এই চক্রটি ভুয়া শেঙেন ভিসা তৈরিতেও জড়িত বলে ইউরোপোল জানিয়েছে৷ বাংলাদেশের অভিবাসন বিষয়ক গবেষক এবং রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) সাবেক কর্মকর্তা মেরিনা সুলতানা ডয়চে ভেলকে জানান, ‘‘ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন অনেক কঠিন হওয়ায় সেখানে এইসব জালিয়াত চক্র গড়ে উঠেছে৷ গ্রিসের মতো অনেক দেশে এখনো অনেক অবৈধ বাংলাদেশি আছে৷ চাহিদা থাকায় এবং অর্থের লোভে সেখানে বাংলাদেশিরা জালিয়াতিতে জড়িয়ে পড়ছে৷'' তিনি বলেন, ‘‘মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এরকম চক্র আগে থেকেই আছে ৷ এখন ইউরোপেও এ ধরণের চক্র গড়ে উঠেছে৷ তবে এর সঙ্গে শুধু বাংলাদেশিরাই নয় অন্য আরো অনেক দেশের নাগরিকই জড়িত৷'' মেরিনা সুলতানা মনে করেন, ‘‘এই অপরাধী চক্রে বাংলাদেশিদের জড়িত থাকার বিষয়টি বাংলাদেশের ইমেজের জন্য ক্ষতিকর৷''

ভারতে পর্যটকের তালিকায় বাংলাদেশীরা দ্বিতীয়

ভারতের ভিসা পেতে হাজারো ঝক্কির অভিযোগের পরও, দেশটির পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ করা সাম্প্রতিকতম তথ্য বলছে, সে দেশে প্রতিবছর যত বিদেশী পর্যটক আসেন, তার মধ্যে বাংলাদেশীদের সংখ্যা আমেরিকানদের ঠিক পরেই।
দশ বছর আগে ভারতে আসা বিদেশী পর্যটকদের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান প্রথম দশের ভেতরেও ছিল না। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৬ সালে যেখানে ভারতে আসা বিদেশীদের দুই শতাংশেরও কম আসত বাংলাদেশ থেকে, সেটি এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪.১ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা পর্যটকের হার ১৫.১ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসাকাজ, ব্যবসায়িক প্রয়োজন এবং শপিং-এ বেশি আসেন। বাংলাদেশে বসে ভারতের ভিসা পাওয়া এখনও সহজ নয়, ভারত নিজেই স্বীকার করে ঢাকায় তাদের যা লোকবল, ভিসার চাহিদা তার অন্তত চারগুণ। কিন্তু সে সমস্যা সত্ত্বেও ভারতে বাংলাদেশী নাগরিকদের আসা প্রতি বছরই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তা সে আসার কারণটা নিউ মার্কেট বা নৈনিতাল, আজমির শরিফ বা অ্যাপোলো হাসপাতাল যাই হোক না কেন!

শিল্পাচর্য জয়নুল আবেদিন : তাঁর সমাজ চেতনা

সমাজে সচেতন মানুষ যারা তারা সাধারণত মানবতাবাদী হন। কারণ সমাজে বসবাসকারী মানুষদের সাতে তারা গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলেন। একান্ত আপন করে নেন তাদেরকে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদনি এমনই একজন সমাজ চেতন এবং মানবতাবাদী মানুষ ছিলেন। যিনি একবার জয়নুলের সান্বিধ্যে গেছেন তিনিই মনে করেছেন জয়নুল তাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন। তাকেই তিনি বেশি করে আপন করে নিয়েছেন। ফলে সকলেই ভেবেছেন মানুষকে আপন করে নেবার জাদুকরি ক্ষমতা আছে জয়নুলের মাঝে। জাদুকরি ক্ষমতার অধিকারী জয়নুলের ব্যবহার ও আচরণে মানবতাবাদের আদর্শ লক্ষ্য করে মানুষ অভিভূত হয়েছে। গভীর শ্রদ্ধায় নত হয়েছেন। অনেকেরই জানা মানবতা হচ্ছে- সমাজ ও সমাজের মানুষের প্রতি দৃষ্টি দেয়া। বিশ্ব তথা বিশ্বের মানব জাতির গুরুত্ব এবং আদর্শকে তুলে ধরা। প্রকৃতিগতভাবে সমাজে এবং বিশ্বে মানুষের স্থান কোথায় তা নির্ধারণ করাই হচ্ছে মানবতাবাদের প্রধান লক্ষ্য। প্রধান লক্ষ্য মানুষের মূল্য ও তার মর্যাদাকে নিরূপণ করা এবং তাকে যথাযথ মূল্য ও সম্মান দেওয়াও। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন তার সমগ্রজীবন সমাজ এবং সমাজের মানুষদের উন্নয়নের লক্ষ্যে উৎসর্গ করেছিলেন।
তিনি বলেছেন- ‘সমগ্র মানব জাতির জন্য সুন্দর জীবন নির্মাণ করাই হচ্ছে শিল্পকলার মৌল উদ্দেশ্য। জীবনে সুন্দরের প্রতিষ্ঠায় যে শক্তি বিরোধিতা করে, তাকে চিহ্নিত করাও এর লক্ষ্য। যে ছবি মানুষকে সুন্দরের দিকে নিয়ে যেতে পারে,সেটাই হচ্ছে মহৎ ছবি। যে শিল্পী তা পারেন তিনি মহৎ শিল্পী। আমার সারা জীবনের শিল্প-সাধনা ও শিল্প আন্দোলন আমার জীবনকে এবং আমাদের সবার জীবনকে সেই সুন্দরের দিকে নিয়ে যাবার আন্দোলন’ (এ, সাত্তার, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পৃ. ১১)। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন কতটা সমাজ সচেতন এবং মানবতাবাদী শিল্পী ছিলেন তা উল্লিখিত তার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট। মানবতাবাদী ও সমাজ সচেতন শিল্পী, মানব দরদি শিল্পী জয়নুল আবেদিন কোথাও মানবতার অবমাননা লক্ষ করলে রঙ-তুলি-কাগজ নিয়ে সেখানে ছুটে যেতেন। মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতেন এবং প্রতিবাদ জানাতেন সেসব মানবতা বিরোধী বিষয়ের চিত্র এঁকে প্রদর্শনীর মাধ্যমে। ১৯৪২-৪৩ সালে সমগ্র বাংলা জুড়ে যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তা ছিল এক শ্রেণী অর্থলোভী ক্ষমতাসীন মানুষেরই সৃষ্টি।
এই দুর্ভিক্ষের কারণে মানবতার যে চরম অবমাননা জয়নুল লক্ষ করেছিলেন তার প্রতিবাদ তিনি করেছিলেন তার বলিষ্ঠ তুলি ও কালির মাধ্যমে। অর্থাৎ তার সৃষ্ট দুর্ভিক্ষের রেখাঞ্চলের মাধ্যমে। আমাদের সমাজে দুঃখ এবং ক্ষতচিহ্ন অবলোকন করে শিল্পাচার্য যে সমস্ত দুঃখ-বেদনা এবং প্রবঞ্চনার দহন থেকে মানব সত্তাকে, মানুষের মর্যাদাকে, মূল্যবোধকে রক্ষা করতে সদা তৎপর ছিলেন। তার চিত্রাঙ্কনের উদ্দেশ্য ছিল দেশ, সমাজ ও সমাজের মানুষের কল্যাণের জন্য। তিনি তার চিত্রের মাধ্যমে দেশের মানুষকে, দেশকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। তিনি নিজে যেমন দেশ, দেশের মানুষকে ভালোবাসতেন, তেমনি দেশের সকল স্তরের মানুষকে দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসতে উদ্বুদ্ধ মকরতেন। আর এ জন্যই দেশের কোথাও কোনো কারণে দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে, দেশের মানুষকে অবমূল্যায়নের কোনো কারণ ঘটলে তিনি সেখানে ছুটে যেতেন। মানুষের অবর্ণনীয় দুর্দশার কথা রঙ-তুলির মাধ্যমে তুলে ধরতেন দেশ বিদেশের মানুষের সামনে। ১৯৭৪ দুর্ভিক্ষে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করলে জয়নুল আবারও অখণ্ড ভারতের ৪৩-এর দুর্ভিক্ষের চিত্রের মত বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষের চিত্র অঙ্কন করেছিলেন। জয়নুল অঙ্কিত এ চিত্রও কলকাতায় অঙ্কিত চিত্রের অনুরূপ।
কালো কালির সাহায্যে ব্রাশের বা তুলির ক্ষীপ্র টানে অভুক্ত হাড্ডিসার মা তার হাড্ডিসার মৃতপ্রায় সন্তানকে নিয়ে রাস্তায় বসে রয়েছে, এমন একটি বিষয়কে তুলে ধরবার মাধ্যমে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষেরঅবর্ণনীয় দৃশ্যকে ক্যানভাসে আবদ্ধ করে সে সময়কার দুর্ভিক্ষের কথা সকলকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষ নিশ্চয়ই ১৯৭০ সালে ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ ‘মনপুরা’র কথা ভুলে যায়নি। এ সময় বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূল অঞ্চলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় জলোচ্ছ্বাসের বিভীষিকাময় ছোবলে কয়েক লাখ উপকূলবাসী প্রাণ হারায়। মারা যায় অসংখ্য গবাদিপশু ও জীবজন্ত। আল্লাহ তায়ালার সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের, জীবজন্তু ও অন্যান্য পশুর মৃতদেহ গাদাগাদি হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। সে এক হৃদয়বিদারক মর্মস্পর্শী দৃশ্য। সমগ্র দেশের মানুষ এ খবরে বেদনাহত হয়েছিল। শিল্পী জয়নুলের হৃদয় নিদারুণ যন্ত্রণায় কাতর হয়ে উঠলো। মনপুরা বিপর্যয়ে মানুষ ও পশুর গাদা গাদা মৃতদেহ যেন জয়নুলকে কলকাতায় দুর্ভিক্ষের সময়কার হৃদয় বিদারক দৃশ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিলো। জয়নুল আবারও রচনা করলেন বাংলার মানুষের করুণ ইতিহাস। তিনি ২৯ ফুট দীর্ঘ স্ক্রোল চিত্রের মাধ্যমে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের করুণ ছবি আঁকলেন।
জয়নুলের তুলির শক্তিশালী রেখায় আবদ্ধ হয় বাংলাদেশের চির অবহেলিত মানুষদের মৃতদেহ। চিত্রের সর্বত্র মানুষ আর জীবজন্তুর গাদাগাদা মৃতদেহ। মৃত লাশের ধ্বংসস্তূপের শেষ প্রান্তে উপবিষ্ট বিধ্বস্ত এক জীবন্ত মানুষের উপস্থিতি সে সময়কার জীবন-মৃত্যুর রহস্য স্পষ্ট করেছে। ১৯৭০ সালে আঁকা শিল্পাচার্যের আর একটি দীর্ঘ স্ক্রোল চিত্রের নাম নবান্ন। নবান্ন গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের প্রাণের উৎসব। এ চিত্র না হলে বাংলার মানুষের আচার অনুষ্ঠান, পৌষ-পার্বণ ও নাইয়রের কথা আজকের এবং ভবিষ্যতের মানুষদের কাছে অজানাই থেকে যেত। ১৯৫০ সেন্টিমিটার দীর্ঘ নবান্ন চিত্রে শিল্পী বাংলার খেটে খাওয়া কৃষক শ্রেণীর সুখ-দুঃখের কাহিনী বর্ণনা করেছেন। কৃষকের ধান বোনা, ধান কাটা, ধান বহন করে বাড়ি নেয়া, ধান মাড়ানো, নতুন ধানের চাল প্রস্তুত প্রক্রিয়া, নবান্ন উৎসব এবং উৎসব শেষে নিঃস্ব হয়ে আবার অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যে পরিবার পরিজন নিয়ে বেরিয়ে পড়া, এগুলোই হচ্ছে চিত্রের বিষয়।
অখণ্ড ভারতের কলকাতায় যখন শিক্ষা উপলক্ষে জয়নুল অবস্থান করেছেন তখন ব্রিটিশদের অত্যাচার, জমিদার এবং কৃষক শ্রেণীর বৈপরীত্য, ব্রিটিশ এবং জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ভারত ভাগের প্রক্রিয়া, হিন্দু-মুসলমানদের দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত প্রভৃতি বিষয় জয়নুলকে আলোড়িত এবং চিন্তিত করে। আর এ সকল বিষয় জয়নুলকে মানবতাবাদী এবং সমাজ সচেতন হতে সাহায্য করে। জয়নুলকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশী বিচলিত করেছিল সেটি হচ্ছে- মানুষের প্রতি মানুষের অমানবিক আচরণ। দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত। ৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সময় জয়নুল এ সব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ করেছিলেন। উপরে বর্ণিত তথ্যচিত্র, পাকিস্তান সৃষ্টির পরের অভিজ্ঞতা এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের যুদ্ধবিগ্রহজনিত অশান্ত পরিবেশ জয়নুলকে সর্বদাই অশান্ত করে রেখেছিল। ফলে তাকে সবসময় তার শানিত তুলি-তরবারির সাহায্যে যুদ্ধে নিয়োজিত থাকতে হয়েছে। একের পর এক রচনা করেছেন বিপন্ন মানুষের ইতিহাস। সে ইতিহাস বাংলার ইতিহাস।
ইসরায়েল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামে লিপ্ত ফিলিস্তিনিদের যুদ্ধের ইতিহাস (১৯৭০) সহ আরব রাষ্ট্রসমূহের ইতিহাস। এমন জনদরদী, সমাজ সচেতন ও মানবতাবাদী শিল্পী বিশ্বে বিরল। তার সংগ্রামী চেতনা সমৃদ্ধ সফল শিল্পকর্মের জন্য বারবার তাকে আমাদের স্মরণ করতে হয়। স্মরণ করতে হয়। স্মরণ করতে এবং স্মরণ করাতে হয় এ জন্য যে, আমরা যেন তার আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে সমাজের, দেশের সকল অনাচার ও অন্যায় দূর করতে একতাবদ্ধ হতে পারি। যেন সমাজের অবহেলিত, নির্যাতিত এবং বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি। প্রতিবাদ করতে পারি

১০০ বছর পেরিয়ে চর্যাপদ : নির্যাতিত কবির নীরব বিদ্রোহ

চর্যাপদ আবিষ্কারের একশত বছর নিঃশব্দেই পার হয়ে গেল। ১৯০৭ সালে পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী  নেপালের রাজদরবার থেকে ‘চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়; শিরোনামের পুঁথি উদ্ধার করে রীতিমত সাহিত্যিক গবেষকদের মাঝে হইচই ফেলে দেন। বিশ্লেষিত হয় চর্যাপদের প্রতিটি অক্ষর। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সুকুমার সেন, প্রবোধচন্দ্র বাগচী, বিধূশেখর শাস্ত্রী, মণীন্দ্রমোহন বসু প্রমুখ পণ্ডিতদের বস্তুনিষ্ঠ গবেষণায় এ কথাই প্রমাণিত হয় নেপালে আবিষ্কৃত ‘চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়’ পুঁথির মাঝেই লুকিয়ে আছে বাংলা ভাষার অক্ষর এবং বাংলা সাহিত্য। অনুমিত হয় বিভিন্ন বৌদ্ধবিহারে বিভিন্ন সময়ে বৌদ্ধভিক্ষু, সহযানি মতবাদে দীক্ষিত সিদ্ধাচার্য্যরো এ পদগুলো রচনা করেছিলেন। চর্যাপদের কবির সংখ্যা ২৪ জন এবং তাদের রচিত চর্যা টীকার সংখ্যা ৫১টি আবিষ্কৃত হয়েছে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মনে করেন চর্যাপদের রচনাকাল (৬৫০ খৃ:-১১০০ খৃ:।) চর্যাপদের রচনাকাল সম্পর্কে বিভিন্ন পণ্ডিতদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও চর্যাপদ বিশ্লেষণে এ পদগুলোর রচনাকাল সম্পর্কে সম্যক একটি ধারণায় আসা যায়। এছাড়া এ ধারণাও অমূলক নয় যে চর্যাপদের কবিদের অবস্থান একস্থানে ছিল না বৃহৎ বাংলার বিভিন্ন বিহারে বিভিন্ন সময়ে বা কালে বৌদ্ধভিক্ষু সিদ্ধাচার্য্যরা এ দোঁহাগুলো রচনা করেছিলেন। সুতরাং নির্দিষ্ট একটি সময়কে ছকে ফেলে চর্যাপদের রচনাকাল নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
এরা যে সবাই বাঙালি ছিলেন তাও নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। চর্যাপদের কবি ভুসুকু বঙ্গাল নিজে বাঙালি কবি হিসেবে স্বীকার করেছেন তার রচিত চর্যাপদে। কালের মানদণ্ডে বিচার করতে হলে এবং পণ্ডিতদের গবেষণায় একথাই স্বীকার্য্য বৌদ্ধ ধর্মের ক্ষয়িষ্ণু কালেই এ পদগুলো রচিত হয়েছিল। নির্বাণে দেহসিদ্ধি ও গুরুভক্তির মাধ্যমে জাগতিক লোভ লালসাকে ঠেলে দিয়ে এবং ইহলৌকিক জগতে নর-নারীর নিগূঢ় প্রেমের মাধ্যমেই যে নির্বাণের পথ সুগম হয়। সে কথাটিই বৌদ্ধধর্মের সহযানি ভিক্ষুরা তাদের পদের রচনার মাধ্যমে তা প্রকাশ করতে চেয়েছেন। নিঃসন্দেহে সে পদগুলো ছিল বাংলার আদি অক্ষর নিংড়ানো পদ্যাকারে ছড়ানো কথামালা। বৌদ্ধ দোঁহা, বৌদ্ধ প্রার্থনা সঙ্গীত যাই বলি না কেন, এ দোঁহার পেছনে বাঙালির আবহমান লৌকিক জীবনের আনুুসঙ্গিক উপকরণাদির পাশাপাশি এক নীরব, কঠিন, প্রতিবাদ, দ্রোহের ভাষা লুকিয়ে আছে তাকে অস্বীকার করার কোনো জো নেই। পাল আমলে বৃহৎ বাংলায় নালন্দা বিহার, শালবন বিহার, ভাসু বিহার, বিক্রমশীলা বিহার, পাহাড়পুর বিহারের মতো এশিয়ার যে সুউচ্চ এবং উচ্চমার্গের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছিল এবং সে শিক্ষালয়ে দেশী বিদেশী হাজার হাজার শিক্ষার্থী এ সমস্ত বৌদ্ধ বিহারগুলোতে অধ্যায়নে ব্যাপৃত ছিল। এমন কি সুদূর চীন থেকে হিউএনসাঙ বৃহৎ বাংলার বিহারগুলোতে এসেছিলেন, ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষের দিকে এ বিহারগুলোর তখন ছিল যৌবনকাল। কিন্তু ইতিহাসের ঘটনা থেমে থাকেনি।
পালদের ক্ষমতা শেষ হবার পরপরই দাক্ষিণাত্যের সেনরা যখন ব্রাহ্মণ্যবাদ নিয়ে এল বাংলায় তখনই ইতিহাসের ঘটনা দ্রুত আবর্তিত হয়েছিল। তখনকার সময়ে বৌদ্ধতন্ত্র বাংলায় সেনেরা ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হয়ে উঠলো। শুরু হলো বৌদ্ধভিক্ষুদের সাথে সেন ব্রাহ্মণ্যবাদের গৃহযুদ্ধ। এ রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা হলো চরমভাবে কোণঠাসা। নির্যাতিত, নিপীড়িত বৌদ্ধ ভিক্ষু, সিদ্ধাচার্য্যদের হত্যা, নির্বাসনে পাঠানো হলো। তপ, যপ, মন্ত্রে ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা হয়ে উঠলো রাষ্ট্রের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। এশিয়ার সুউচ্চতম বৌদ্ধ বিহারগুলো রাতারাতি হয়ে গেল শিক্ষার্থীশূন্য। এক সময়ের অধ্যায়নরত হাজার হাজার দেশী-বিদেশী ছাত্রদের কলগুঞ্জনে যে শিক্ষালয়গুলো হীনযান, মহাযান, তন্ত্রযান, শূন্যযানের নিগূঢ় তত্ত্বের ব্যাখ্যায় মশগুল থাকতো সে শিক্ষালয়গুলো ব্রাহ্মণ্যবাদের নিগৃহে পরিণত হলো পরিত্যক্ত ভুতুড়ে এক জনবিরল আতঙ্কিত আশ্রমে। কয়েক যুগের, শত বছরের ব্যবধানে বিহারগুলো হয়ে উঠলো গভীর জঙ্গলাকীর্ণ। হিংস্র জন্তু এবং হিংস্র শ্বাপদের লীলাভূমিতে পরিণত হলো এশিয়ার বিখ্যাত বৌদ্ধ বিহারগুলো।
ড. নীহারঞ্জন রায় তাঁর ‘বাংলার ইতিহাস আদি পর্বে’ উল্লেখ করেছেন। ব্রাহ্মণদের দেয়া হলো গ্রামের পর গ্রাম, নিষ্করভূমি, রাজপুরোহিত হয়ে রাষ্ট্রের কলকাঠি নাড়লো ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য এবং ভিক্ষুরা হলো নির্বাসিত। প্রাণের ভয়ে পালালো সিদ্ধাচার্যরা তিব্বতে, আরাকানে, নেপালে, চীনে। পণ্ডিতদের ধারণা ‘চর্যাপদের’ পুঁথি নেপালে প্রাপ্তির কারণ এটাই প্রাণভয়ে ভীত বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যরা নেপালে আশ্রয় নেবার সময় চর্যাপদের পুঁথি সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। জাতপাতের সংগ্রাম, উচ্চবর্ণ নিম্নবর্ণের সংগ্রাম, ব্রাহ্মণদের নিগ্রহ, এমনকি শবরী বালিকাদের যৌন অত্যাচার, লুণ্ঠন, ডাকাতি, কামাচারের সে সময়ের দুঃসহ ছবি এবং তার নীরব প্রতিবাদ চর্যাপদের দোঁহার অন্তর্নিহিত বিষয়। ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং বৌদ্ধদের গৃহযুদ্ধে সাধারণ মানুষ যে সর্বশ্বান্ত হয়েছিল তার প্রমাণ। ‘টালত মোর ঘর নাহি পড়বেশী। হাঁড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী।’ (বস্তিতে আমার ঘর। কোনো প্রতিবেশী নেই। হাঁড়িতে ভাত নেই অথচ প্রতিদিনই প্রেমিকের ভিড়) নিরন্ন মানুষের ঘরে যেখানে ভাত নেই। সেখানে কামাতুর লোকের আগমন। এ সমস্ত কিসের সঙ্কেত।
অসহায় সর্বহারা নির্যাতিত মানুষেরা তখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। চর্যাপদের কবি বলেন- ‘কাহেরি যিনি মেলি অচ্ছহ কীসু বেটিল হাক পড়া চৌদিস’ (কাকে নিয়ে কাকে ছেড়ে কিভাবে যে আছি আমার চারপাশে ঘিরে তাক হাঁক পড়েছে) কাকে নিয়ে কাকে ছেড়ে, কার ছায়ায়, অবলম্বনে মানুষ নিরাপদ আশ্রয় পাবে! এ কিসের হাঁক, ণ্ডঙ্কার, একী মহাসেন, সামন্ত ব্রাহ্মণদের হাঁকডাক, ণ্ডঙ্কার! চর্যাপদের কবির পয়ারে তাইতো বোঝা যায়। শুধু ধর্ম বিভাজন নয় ঘর গেরস্থালীতে হামলা, নির্যাতনও চর্যাপদের দোঁহায় ফুটে উঠেছে। গৃহযুদ্ধের নির্মমতায় সর্বস্বান্ত এক গ্রাম্যবধূর কথা ‘সদুক্তি কর্ণামৃত’ পুঁথিতে বর্ণিত আছে। অঝোর ধারায় ছনের ঘরে ছাপিয়ে বৃষ্টি ঝরছে, বৃষ্টিতে আকীর্ণ উঠোনে ব্যাঙ, সাপ, ডাকছে। গৃহিণী তাঁর চ্ছিন্ন কাঁথা সেলাই করার জন্যে সুঁচ খুঁজছে। কিন্তু কোথায় পাবে সুঁচ, ঘরে এক মুষ্ঠি চাল বাড়ন্ত।’ চর্যাপদের কবিরা প্রান্তিকজনের কবি ছিলেন নিঃসন্দেহে। এ প্রান্তিকজনের কবিরা কলমযুদ্ধে নেমেছিলেন মহাসামন্তদের বিরুদ্ধে যেমন ‘নিতে নিতে ষিআলা ষিহে যম জুমহ’ শেয়ালের মতো ক্ষুদ্র প্রাণীও (প্রজা) সিংহের (রাজার) সাথে আসম যুদ্ধে টিকে থাকার জানবাজি সংগ্রামে লিপ্ত আছে। সে সময়ের কামাতুর সামন্তদের যৌন লিপ্সাও ছিল প্রবল ‘আলো ডোম্বি তো এ সম করিবে ম সাঙ’ এই ডোম্বী সমাজের চোখে এমন একজন জীব যাকে বিয়ে করতে চাইলে সমাজকে কঠিনতম অবজ্ঞা দেখানো সম্ভব হবে। উচ্চবর্ণের কী স্পর্ধা, কী জাত্যাভিমান, অহংকার, জঘন্য কামাতুর দৃষ্টি। উচ্চবর্ণের পাপাচারের বিরুদ্ধে এই যে বিদ্রোহ, বৌদ্ধদের দোঁহায় ও সাহিত্যে তা অনন্যসাধারণ ভূমিকা নিয়ে এসেছিল।
মুণ্ডিত ব্রাহ্মণদের নিয়ে চর্যাপদে প্রক্যাশ্য ব্যঙ্গও ছিল ‘ছইছোই যাই সো ব্রাহ্ম নড়িয়া।’ উচ্চশ্রেণীর আড়ম্বরতা তাদের রাজকীয় জীবনযাপন তার বিপরীতে অসহায়ত দরিদ্র সহায় সম্বলহীন মানুষের একমুঠো ভাতের জন্যে আর্তনাদ, ধর্মাচার বনাম ধর্মকে আশ্রয় করে উৎপীড়ন নির্যাতন চর্যাপদের দোঁহায় নিভৃতভাবে ফুটে উঠেছে। ‘ভাবন ছোই অভাব না জাই’ যারা দরিদ্র নিপীড়িত মানুষ তাদের কোনো ভাব হয় না এবং তাদের অভাবও বিদূরিত হয় না। নির্যাতিত কবিরা নির্বাসিত হয়েছেন। আধুনিক বিশ্বেও তার প্রমাণ আছে ভূরি ভূরি। স্বৈরশাসনের, একনায়কের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে গিয়ে কবি লেখকরা হন নির্যাতিত নিষ্পেষিত। নির্যাতিত কবিরা লাঞ্ছিত হন, অপহৃত হন কখনো মৃত্যুও বরণ করেন। চর্যাপদের কবি ভুসুকু বঙ্গাল লিখেছেন- ‘বাজ নাব দাড়ী পাউয়া খালে বাহিউ’/অদঅ বঙ্গাল দেশ লুড়িউ॥
আজি ভুসুকু বাঙ্গালী ভইনী/নিঅ ঘরিনী চণ্ডালে নেনী॥ ডহিঅ পাঞ্চ পাটন ইন্দি বিসআ নঠা।/ন জানামি চিঅ ঘোর কহি গই পইঠা।/সোন অ রূপ মোর ফিস্পিন থাকিউ’/চউকোড়ি ভণ্ডার মোর লইয়া সেস।/জীবন্তে মইলে নাহি বিশেশ॥’ (অনুবাদ) পথ খাল বেয়ে বজরা নৌকা পাড়ি দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ লুণ্ঠিত হয়ে গেল। আজ ভুসুকু বাঙালি হয়ে গেল। নিজের স্ত্রীকে চণ্ডালে নিয়ে গেছে। পঞ্চপাটন হলো দগ্ধ। নষ্টপ হলো ইন্দ্রিয় বিষয়। না জানি আমার মন কোথায় গিয়ে প্রবেশ করে। আমার সোনা ও রুপা কিছুই থাকলো না। নিজ পরিবারেই মহাসুখে থাকলাম। চারকোণা বিশিষ্টই আমার ভাণ্ডার শেষ করে দিল। জীবিত অথবা মৃত এ দুটোর মাঝে আমি কোনো পার্থক্য খুঁজে পাচ্ছি না।
চর্যাপদের কবি ভুসুকু নিজকে বাঙালি কবি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তার এ চর্যাপদ সে সময়ের অত্যাচারিত সমাজ ব্যবস্থার এক দুঃসহ চিত্রই প্রকাশ করে। সে সময়ের সামন্ত, মহাসামন্তদের দ্বারা অত্যাচারিত ভুসুকু কি নৌকা পাড়ি দিয়ে দেশান্তরী হচ্ছেন? বঙ্গাল দেশ লুণ্ঠনের কথা বলেছেন, নিশ্চয়ই সেই লুণ্ঠনের সীমা কোনো পাড়া, মহল্লা ব্যাপি ছিল না। সম্ভবত ভুসুকু যা দেখেছিলেন তা সর্বত্রই ছিল অত্যাচারের, নির্যাতন, লুণ্ঠনের এক ভয়াবহ নির্মম স্বাক্ষর। ভুসুকু হয়তোবা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন কিন্তু তার প্রিয়তমা স্ত্রীর পরিণতি ছিল হৃদয়বিদারক। কামাতুর মহাসামন্ত, ব্রাহ্মণেরা ভুসুকের শুধু সোনা রুপাই লুট করেনি তার স্ত্রীকেও অপহরণ করেছে। নিজ পরিবার নিয়ে ভুসুকু মহাসুখেই ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে তার ঘরবাড়ী, পঞ্চপাটন দগ্ধ হয়েছিল। সম্ভবত আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করা হয়েছিল, হতভাগ্য, বিস্মিত, আতঙ্কিত ভুসুকুর, অস্থীর মন এখন কোথায় গিয়ে ঠাঁই নেবে, ভুসুকু আজ তা বলতে পারে না। সে জীবিত কিংবা মৃত তার কোনো পার্থক্যই ভুসুকুম বুঝতে পারে না।
এক দিকে জীবন রক্ষা করার সংগ্রাম অন্য দিকে ভাতের সংগ্রাম, কী দুঃসহ শ্রেণী সংগ্রামকে বুকে চেপে চর্যাপদের কবিদের সময় পার হতে হয়েছে। চর্যাপদের কবি টেণ্ডনপাদের কবিতায় এভাবেই বিধৃত হয়েছে শ্রেণী সংগ্রাম এবং মুষ্ঠিবদ্ধ এক মুঠো ভাতের হাহাকার। ‘টলত মোর ঘর নাহি পর বেসী। হাঁড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী॥ বৈঙ্গস সাপ চড়িল জাই দুহিল দুধু কি বেন্টে সামাই॥ বলদ বিআনে গবিআ বাঁঝে। পীঢ়া দুহিআই এ তীনি সাঝে॥ জো সো বুধী সোহি নিবুধি। জো সো চোর সোহি সাধী॥ নিতি নিতি সিআলা সিহে সম জুঝই টেণ্ডন পা এর গীত বিরলে বুঝই॥ অনুবাদ বস্তিতে আমার ঘর, প্রতিবেশী নেই। হাঁড়িতে ভাত নেই কিন্তু মেহমান প্রতিদিনই আসছে। ব্যাঙ দেখছি সাপকে আক্রমণ করছে। দোয়ানো দুধ কী বাঁটে ফেরানো সম্ভব? বলদ প্রসব করল অথচ গাই বাঁঝা, পাত্র ভরে দোয়ানো হলো তিন সন্ধ্যা। যে বুদ্ধিমান দেখছি, সেই হচ্ছে নির্বোধ, যে চোর সেই সাধু হয়ে বসে আছে। প্রতিদিনই শেয়াল সিংহের সাথে যুদ্ধ করছে। টেণ্ডন পাদের গীত খুব লোকেই বুঝতে পারে। হাঁড়িতে ভাত নেই কিন্তু নিতিনিত্য এ মেহমান কারা?
এ মেহমান কী কামাতুর উচ্চবর্ণের লোকজন? ব্যাঙ কখনো সাপকে আক্রমণ করে না তাহলে কি অত্যাচারিত মানুষ কি উচ্চবর্ণের বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধে লড়েছিল, দোহানো দুধ যেমন বাঁটে প্রবেশ করানো সম্ভব নয় ঠিক তেমনি বলদেরও বাচ্চা প্রসব করা কল্পনার অতীত। এক অসম অস্থীর সমাজচিত্রই টেণ্ডনপাদ তার এ কবিতায় তুলে ধরেছেন। যেখানে চোর সাধু সেজে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে বসে থাকে যেখানে শৃগালের সাথে সিংহের নিত্য লড়াই চলে সে সমাজ এক ভয়ঙ্কর অস্থিতীশীল সমাজ, নিয়ম কানুনের বেড়াজাল ভেঙে যেখানে দুর্বৃত্তদের সমাজ ব্যবস্থার একটি দেশের কি হতে পারে কবি টেণ্ডনপাদ হয়তো ব্যাঙাত্মক বিশ্লেষণে তা যথার্থই তুলে এনেছেন। সহস্রাধিক বছর পেরোনো চর্যাপদের কবিদের নীরব আর্তনাদ ইতিহাসের বাঁক বদলের মোহনায় তা কি হারিয়ে গেছে?

অলস রুটি ও একটি সড়কের গল্প

আব্বার ওপর মেজাজ খারাপ হয়ে যায় প্রায়ই। ইদানীং বারবার বলার পরও তিনি মনে রাখতে পারেন না যে ছুটির দিন একটু দেরি করে ঘুম ভাঙে। কাজেই অন্তত নয়টার আগে ফোন দেয়ার দরকার নেই। কিন্তু আব্বা তা একেবারেই মনে রাখেন না। ছোটখাটো বিষয় যেমন ঠাণ্ডা কাশি জ্বরজারি হলেও ফোন দিয়ে পাগল বানিয়ে রাখেন ছেলেকে। নিজেও কষ্ট করেন আবার ছেলে নজরুল মুনশির মেজাজও টঙ করে রাখেন। এমনিতে প্রচণ্ড গরম। তার ওপর বিদ্যুতের লুকোচুরি খেলা তো সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হয়। আর ওই যে গান বাদ্য। গানের শব্দে ঘুমানো তো দায়, তার চেয়ে বড়ো কথা হলো হিন্দি গানের মিউজিক আর সব রক গানের বিকট শব্দে রাতের ঘুম হারাম মহল্লার সবার কিন্তু এর প্রতিবাদ করার সাহস নেই কারো। কোন পোড়া কপাল নিয়ে যে নজরুল মুনশি কবরের পাশে বাসা নিয়েছিল। কবরের পাশে সিটি করপোরেশনের কমিউনিটি সেন্টার। ওখানে প্রায়ই বিয়ে খতনা জন্ম বার্ষিকীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ছোটখাটো আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। এসব অনুষ্ঠানে গান বাজনা না হলে যেন পাপ হবে এটা মনে করেই চলে ধুম ধারাক্কা। পাশেই কবর। কবরে শুয়ে আছেন পীর আওলিয়া মুক্তিযোদ্ধার মতো অনেক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিরা।
তারাও রাতে ঘুমাতে পারেন না ‘লুঙ্গি ডান্সের’ মতো হিন্দি গানের শব্দে।ভয়ে ভয়ে কমিশনারকে বলেও কাজ হয়নি। মসজিদে ওয়াজ করানো হলো- তাতেও বন্ধ হয়নি এখন উলঙ্গ নৃত্য ও গানের আকাশ ফাটানো শব্দতরঙ্গ। শেষ পর্যন্ত নজরুল মুনশি নিজেই ঘোষণা দিয়ে আত্মহত্যা করবে বলে সিদ্ধান্ত নেয় এই নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্যে। আজব ব্যাপার, দুই দিন পরই ওখানে ছোট্ট নোটিশ বোর্ড টানানো : রাত দশটার পর এখানে কোনো অনুষ্ঠান, গান বাজনা নিষিদ্ধ। নোটিশ দাতার জন্য দোয়া করে সে, যেন মৃত্যুর পর আল্লাহ নোটিশ দানকারীকে জান্নাত দান করেন। আসলে এই কার্যক্রমটি ছোট্ট শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধার জন্য এবং সর্বোপরি অসুস্থ মানুষগুলো জন্য বন্ধ হওয়া অতীব প্রয়োজন ছিল। ধন্যবাদ সিটি করপোরেশনকে। অনেক বছর পর হলেও অন্তত একটি নোটিশ ঝুলেছে এখানে। অন্তত কিছুটা হলেও নির্যাতনের পথ বন্ধ হলো। ফোন পেয়ে ধড়মড় করে ওঠে সে। আব্বা রেগে যান। বলেন- তোমাকে সেই সকাল থাইকা ফোন দিতাছি। ধরো না কেন?
-আমি ঘুমাইছিলাম।
-অত বেলা পর্যন্ত ঘুমাইবা না। শরীর নষ্ট কইরো না। বেলা কইরা ঘুমাইলে শয়তানে শরীর টিপে। শরীরের অসুখ বান্দে।
-আব্বা আজকেতো ছুটির দিন।
-তো কি অইলো। দিন তো দিনই। শনি মঙ্গল সকল রাইত এক নিয়মে চলে। আমারে দেখছো এই আশি বছর বয়সে কোনো অনিয়ম করতে?
তর্ক না করে সে বলে- আচ্ছা বলেন কেন ফোন দিছেন?
-বাড়ির পাশের রাস্তার কাম শুরু অইবো।
-খুব ভালো সংবাদ। জন্মের পর থাইকা শুনতেছি সড়ক অইবো। এ বছর হেই বছর করতে করতে চল্লিশ বছর হইলো। তো আব্বা এই খরবটা আরেকটু পরে দিলে কী হইতো?
-শোন বেশি খুশির সংবাদ মনে কইরো না। টেকা লাগবো দশ হাজার। নজরুল ওঠে বিছানায় বসে। এবার সত্যি ঘুম কেটে যায় পুরোপুরি। বলে- টেকা লাগবো ক্যান?
সরকারি রাস্তা, টেকা লাগবো ক্যান আব্বা?
-তা ও লাগবো। এলাকার নেতারা আইছিল। বলছে মাটি দেন নাইলে টেকা দেন।
-অ বুঝছি। তাইলে ঠিক আছে, নেতাগো বিরুদ্ধে যাইয়েন না। ওনারা বলছে টেকা দিমু। আপনে চিন্তা কইরেন না। ওল্টাপাল্টা কিছু বইলেন না আব্বা, ঝামেলা করবো।
-ঠিক আছে টেকা পাঠাইয়া দিও। নাইলে বাড়িতে আইসো। রাখি।
দুই. নজরুল মুনশি ওঠে হাতমুখ ধুয়ে নিউজ পেপারে নজর দেয়। কুমিল্লায় তনু নামের এক যুবতী হত্যার খবর বেরিয়েছে। লোমহর্ষক কাহিনী। মনকে সান্ত্বনা দেয়- থাক, প্রতিদিনই পড়ছি হত্যা ধর্ষণ ছিনতাই আর রাজনৈতিক নেতাদের অনৈতিক কাজের ফিরিস্তি। হতে থাকুক আরো ঘটুক এসব, ঘটতে ঘটতে আমরা আরো নিঃশেষ হয়ে যাই। তার পর হয়তো একটা রেভ্যুলেশন আসবে। আসুক-নতুন আরেক ধারা চালু হোক এ দেশে। খুব দরকার পরিবর্তন। সে সন্তানদের খোঁজ নেয়। ওরা পড়াশোনায় ব্যস্ত। ভালো লাগল। আব্বার কাছ থেকে বাড়ির খবর শোনার পর সন্তানদের এ দৃশ্যটিও সত্যি তাকে সুখী করে। আসলে সুখ তো সন্তান পরিবার নিয়েই। চার পাশে কী হচ্ছে আজকাল কে অত খবর রাখে? তার পর রান্না ঘরে উঁকি মারে। শাশুড়ি আম্মা তার অলস রুটি বানানো নিয়ে ব্যস্ত। আম্মার এই রুটি বানানো পদ্ধতিটি সে বেশ এনজয় করে। গত মাস থেকে পারমানেন্ট হাউজ সেক্রেটারি পারমানেন্টলি বিদায় নিয়েছে।
মেয়েটি চলে যাবার পর সংসারের ভেতর অলসতার মাকড়সা জাল বুনে। এক সময় খাবার টেবিলে রকমারি নাশতা বা দুপুরের খাবারের দিকে তাকালে জিভে পানি এসে যেত। এখন আর সে রকম কিছুই হয় না। এ ছাড়া দিন দিন জিনিসপত্রে চড়া দামের কারণে সংসারের অনেক প্রয়োজনকে সঙ্কুচিত করে নিচে নামিয়ে আনা হয়েছে। এখন নজরুল মুনশি ভাবে সংসারের ‘অতীব প্রয়োজন’ কোন আইটেমটি। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ বালি ভরা ভেজা বস্তার মতো ভারী মনে হয় তার কাছে। অত বাড়তি খরচে তাই আগের মতো মাছ মুরগি ফল ফলাদি বা আয়েশ শখের হিসাবগুলো সংক্ষেপ করতে হয়েছে। তার ওপর মেয়েটি নেই, কে অত কষ্ট করে রুটি পরোটা বানিয়ে টেবিলে রাখবে? কে অত ফল বা সবজি-ডিম তৈরি করে ডেকে উঠবে- নাশতা রেডি...। জীবনের অলসতার সাথে নতুন এই অলস রুটি যোগ করে আম্মা টেবিলে দিয়ে বললেন- দেখো খাইতে পারো কি না। নজরুল এক পলক তাকিয়ে খাবার মুখে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস চেপে রেখে বলে- আম্মা আমার জন্য খুবই ভালো। ক’দিন বাজারের ব্রেড খেয়ে ব্লাড সুগার বেড়ে গেছে। থ্যাংকস আম্মা।
কিন্তু এই অলস রুটির নিয়মটা বলেন আম্মা। মুখে হাসি যোগ করে আম্মা বলেন- একদম সোজা। তুমিও পারবা। আটা পানিতে গুইলা শুধু তাওয়ায় সেক্বা। -বলেন কী আম্মা? অতো সোজা? তাইলে আপনারা না থাকলেও আমি নিজে কইরাই খাইতে পারমু। নাশতা সেরে স্ত্রীকে আব্বার ইনফরমেশনটি শোনায়। কথা শোনে নাজমা মহাখুশি। -বলো কী? যাক অনেক বছর হলো গাড়ি নিয়ে বাড়ি যেতে পারি না। এবার উঠোনে গাড়ি ঢুকবে। আহ্ কত শান্তি। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়–য়া তাদের মেয়ে আদিবা এ খবরে মায়ের গা জড়িয়ে ঢঙ করে বলে- আম্মু আমরা কবে দাদুর বাড়ি যাচ্ছি?
-যাবো। মাসখানেক লাগবে হয়তো রাস্তা শেষ করতে। মাটি শক্ত হতে আরো এক মাস। ওকে, তোমাদের সামার ভেকেশনে যাচ্ছি গ্রামের বাড়ি।
তিন. অফিসে নিজের রুমে নজরুল মুনশি। আজ একটু কাজ হালকা। পাশের মহামান্য রাষ্ট্রপতির বৃক্ষ বাগানে চিত্রা হরিণগুলো পায়চারী করছে। একেবারে রুমের পাশেই ওরা এসে গেছে। গুনে গুনে দেখে এগারোটি। বাচ্চা হরিণ। উপরে গাছের ডালে বড় বড় চিল ও অন্যান্য ক’টি পাখি বসে আছে। গেল সপ্তাহের ঝড়ে একটি গাছের ডাল ভেঙে গেছে। অদূরে ক’টি গাছে হলুদ ফুল ফুটেছে। এই বৃক্ষটির নাম জানে না সে। নাম জানা উচিত ছিল। নজরুল অনেক কিছুই জানে না। অনেক কম জানে। এ বিষয়টি স্ত্রী এবং ইংলিশ ভার্সনে পড়–য়া মেয়েটিও প্রমাণ করেছে। অথচ সে ভাবে কম জানাই শ্রেয়। প্রচণ্ড গরম আজ। টেম্পারেচার হয়তো চল্লিশ হতে পারে। ঘেমে যাচ্ছে। পিয়ন চায়ের কাপ নিয়ে গেল। ওর পেছনের অংশ চোখে পড়ে। ভাবে-ও কেমন আছে? ওর ক’টি বাচ্চা কোনো দিন প্রশ্ন করেনি। ওর বাড়ি কোথায় জানতে চায়নি। আসলে আমরা কেমন হয়ে যাচ্ছি দিন দিন। নাহ এটা ঠিক হলো না। অধীনস্থদের খোঁজ নিতে হয় মাঝে মধ্যে। কালকে ওকে দুই শ’ টাকা দিয়ে বলব শিশুদের জন্য কিছু নিয়ে যেতে। আব্বাকে টাকা পাঠাবে নাকি কয়েক ঘণ্টার জন্য বাড়ি যাবে তা ভাবছে। প্রবলেম যে একা যেতে ভালো লাগে না। ছোট ভাইকে সাথে নেবে। ওকে জানানোর জন্য মোবাইল হাতে নিতেই মেয়ের স্কুল থেকে মোবাইলে মেসেজ আসে আগামী জুলাই পর্যন্ত সব বকেয়া বেতন ও গাড়ি ভাড়া পরিশোধ করে এডমিট কার্ড নিতে হবে। কষ্ট হলো ভাবতে। ওপরে ফ্যান ঠিকমতো চলছে কি না একবার খেয়াল করে নজরুল মুনশি।
চার. ছোট ভাইকে নিয়ে বাড়ি আসে। আব্বার হাতে টাকা দিয়ে বাড়ির আশপাশটা ঘুরে দেখে। দখিনের পুকুরে মাছ আছে কি না জানে না। পশ্চিমের পুকুরে ছোট ভাই রীতিমতো মাছ চাষ করে। রশি ঘরের ওপর জাম্বুরা গাছ নজর পড়ে। জাম্বুরা ঝুলে আছে ক’টি-যেন দেখভাল করার কেউ নেই, অনাদরে অবহেলায় বিমর্ষ। আমগাছে বেশ আম আছে- ঝড় হলে বিপদ। কাঁঠালে ভরে আছে গাছগুলো। তার মন ভালো হয়। আব্বা-আম্মার জন্য মায়া হয়। এ বাড়ির পেছনে তাদের হাড়ভাঙা পরিশ্রম জড়ানো। শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে তার। তাদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য বাড়িটির একটি নিউ প্ল্যান করে মনে মনে। আব্বা টাকা দেয়ার জন্য ওই নেতাকে মোবাইল করে- আমার ছেলে আসছে, টেকা নিয়া যান। ছেলে চইলা যাইবো। একটু তাড়াতাড়ি আইসেন। কাউছার আসার আগেই আব্বার সাথে একটা শর্ট কাউন্সিলিং করে নজরুল। বলে- আমি তো নেতার সামনে যামু না। নেতারে ঘরে ডাইকেন না। ওই গোপাটে থাইক্কা টেকা দিয়েন। আমার ব্যাপারে কিছু বলার দরকার নেই। আব্বা ছেলের ভেতরের ভাব বোঝার চেষ্টা করেন। কিছু বলেন না।
টেকা নিয়া উঠোনের দখিন পাশে পায়চারী করেন। বললে হয়তো তিনি কাউছারকে নিয়ে উঠোনে চেয়ার পেতে বসতেন, গালগপ্প করতেন কিছু সময়। কিন্তু নজরুলের ওসব ভালো লাগে না। এমনিতে নিজের অভাব ঢেকে রেখে দান দক্ষিণা দিচ্ছে বলে মেজাজ খারাপ। তার ওপর আবার ঘুষখোরকে নিয়ে মোজ করা? কাউছার ঘাড় ঘুরিয়ে একবার বাড়ির ভেতরে কিছু দেখার চেষ্টা করে। ও অনেকটা বেটে এবং চেহারা কালো বিকৃত। মুখমণ্ডল বীভৎস আকার বললে অতিরিক্ত বলা হবে না। এই লোকটি এলাকার বিগ লিডার। সবাই তাকে ভয় বা সমীহ করে। ও যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকেই এক দমকা বাতাস এসে ঘরে ঢুকে। পচা দুর্গন্ধ, কোনো পশু মরার গন্ধ। সাধারণত গ্রামে কুকুর বিড়াল মরে গেলে এ রকম দুর্গন্ধ আসে। মনে হলো এই গন্ধ কাউছারের গায়ের গন্ধ। নজরুলের চোখে নাকে নেতার চেহারা ও গায়ের গন্ধ ভাসে। তার দম নিতে কষ্ট হয়।

১শ’ সন্তানের বাবা হওয়ার সাধ!

এখানে দেখা যাচ্ছে ১২ জনকে। কিন্তু আসলে তিনি ৩৫ সন্তানের জনক। পাকিস্তানের হাজী জান মোহাম্মদ খিলজির সন্তান-সন্ততির হিসাব এটি। তিন স্ত্রীর গর্ভে এখন পর্যন্ত ৩৫টি সন্তান জন্ম দিয়েছেন এই ৪৬ বছর বয়সী পাকিস্তানি।
তার জ্যেষ্ঠ সন্তানের বয়স ১৫ বছর এবং সদ্যই জন্ম নিয়েছে সর্বকনিষ্ঠ কন্যা দুটি। ১০০ সন্তানের বাবা হওয়ার অভীষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এবার চতুর্থ স্ত্রীর সন্ধানে নেমেছেন তিনি। শুক্রবারের ছবি এএফপি

সৌদি আরবে প্রধানমন্ত্রীকে উষ্ণ অভ্যর্থনা

জেদ্দা বিমানবন্দরে শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে
স্বাগত জানান সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফ
বিন আবদুল আজিজ -পিএমও
সৌদি আরবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছলে দেশটির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফ বিন আবদুল আজিজ তাকে অভ্যর্থনা জানান। এরপর সেনাবাহিনীর একটি চৌকস দল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অফ অনার দেয়। এ সময় তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়।   পরে ক্রাউন প্রিন্স নায়েফ প্রধানমন্ত্রীকে বিমানবন্দর থেকে কিং ফয়সাল রয়্যাল প্যালেসে নৈশভোজে নিয়ে যান। সেখান থেকে জেদ্দা রয়্যাল কনফারেন্স প্যালেসে যান শেখ হাসিনা। সফরকালীন সময়ে সেখানেই অবস্থান করবেন তিনি। বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের আমন্ত্রণে ৫ দিনের সরকারি সফরে বিকালে সৌদি আরবের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন প্রধানমন্ত্রী ও তার সফর সঙ্গীরা। সৌদি বাদশাহ সালমান দায়িত্ব নেয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের এ তেলসমৃদ্ধ দেশে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এটাই প্রথম সফর।
শুক্রবার রাতেই (সৌদি সময়) পবিত্র মক্কা নগরীর হারাম শরিফে ওমরাহ পালন করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। আজ বিকালে প্রধানমন্ত্রী জেদ্দায় এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রিয়াদে বাংলাদেশের চ্যান্সেরি কমপ্লেক্স এবং বাংলাদেশ ভবন নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। আগামীকাল রোববার জেদ্দা নগরীর আল আন্দালুসে সৌদি বাদশাহর আল সালাম প্রাসাদে প্রধানমন্ত্রী বাদশাহর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। সৌদি আরবে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, দ্বিপক্ষীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, বিভিন্ন প্রকল্পে সৌদি সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং হজ ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো আলোচনায় প্রাধান্য পাবে। এছাড়া রোববার সকালে জেদ্দা রয়্যাল কনফারেন্স প্যালেসে বেশ কয়েকজন সৌদি মন্ত্রী এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী বিমানে মদিনার উদ্দেশে জেদ্দা ত্যাগ করবেন। সেখানে মদিনা হিলটন হোটেলে অবস্থান করবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী মসজিদে নববীতে আসর এবং মাগরিবের নামাজ আদায় করবেন ও হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারত করবেন। প্রধানমন্ত্রী প্রিন্স মোহাম্মাদ বিন আবদুল আজিজ বিমানবন্দর থেকে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় (সৌদির স্থানীয় সময়) দেশের উদ্দেশে মদিনা ত্যাগ করবেন। সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে (ঢাকার সময়) প্রধানমন্ত্রী এবং তার সফর সঙ্গীদের বহনকারী বিমানটি হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের কথা রয়েছে।

ভেলোর অন্ধকার পৃথিবীতে ‘আলো’ ফুটবল

আজন্ম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সিলভিও ভেলো ফুটবল খেলেন। গোলও করেন। তাকে বলা হয় ‘দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী লিওনেল মেসি’। আর্জেন্টিনার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফুটবল দলের অধিনায়ক তিনি। আগস্টে রিও প্যারালিম্পিকে স্বর্ণ জয়ের স্বপ্ন তার। ভেলোর বয়স এখন ৪৫। এ বয়সেও তিনি ফুটবল খেলছেন। তার মুকুটে যোগ হয়েছে অনেক পালক। তিনটি বিশ্বকাপ ও দুটি কোপা আমেরিকায় তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন আর্জেন্টিনাকে। ২০০৪ প্যারালিম্পিকে রুপা জিতেছেন। ২০০৮-এ প্রথমবারের মতো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের ফুটবল আসর বসে। সেবার তিনি ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন।
প্রচণ্ড গতি, ক্ষুরধার ফুটবল-মস্তিষ্ক এবং ‘গোলাজোস’-এর জন্য সুবিদিত ভেলোকে প্রায়শই মেসির সঙ্গে তুলনা করা হয়। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফুটবলে তারাই খেলতে পারেন যারা ভেলোর মতো জন্মান্ধ। আর এ খেলায় গোলকে বলা হয় ‘গোলাজোস’। তার চোখের আলো নেই। পৃথিবী অন্ধকার। তবু ভেলোর কোনো দুঃখবোধ নেই। নেই কোনো অনুযোগ, আক্ষেপ। তার ধ্যান-জ্ঞান ফুটবল। এ খেলাটির প্রতি আশৈশব অনুরক্ত তিনি। বলেছেন, ‘প্রথম যখন বলের শব্দ শুনি, আমার কাছে মনে হয় আমি যেন সঙ্গীত শুনছি।’ ফুটবলের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে শৈশবে। এরপর যত দিন গেছে সেই অনুরাগ আরও গাঢ় হয়েছে। শৈশবে বন্ধুদের সঙ্গে সাইকেল চালানো এবং লুকোচুরি খেলতেন। যদিও কাউকে ধরতে পারতেন না, নিজেই হেসে একথা বলেন ভেলো। ১০ বছর বয়সে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের ফুটবলে তার হাতেখড়ি, ততদিনে ভেলো শিখে ফেলেছেন ফুটবল খেলাটা। চোখে না দেখলেও বন্ধুদের ফুটবল খেলার শব্দ তার কানে যেত। হাঁটুতে বল রেখে জাগলিং করা কিংবা এক পা থেকে আরেক পায়ে বল নেয়া- এসব তো আর দেখতে পারতেন না। শব্দ শুনে ঠাওর করতেন। নিজেকে শুধাতেন, ‘আমি তো চোখে দেখি না। কিভাবে না দেখে আমার পক্ষে ফুটবল খেলা সম্ভব?’
সমাধান বের করলেন একটি থলির ভেতর বল রেখে। তাতে শব্দ বেশি হয়। সেই শব্দ তার পা দুটিকে নিয়ে যায় বলের কাছে। ভেলোর প্রতিভা ও গতি চমকে দেয় তার ট্রেনারকে। ট্রেনার মারিয়ানো আরনাল তার ছেলেবেলার বন্ধু। আরনাল প্রথমদিকের অনুশীলনের স্মৃতিচারণ করেন হাসতে হাসতে, ‘ওর হাতের সঙ্গে আমার হাত বেঁধে দৌড়াতাম। কিন্তু এত জোরে দৌড়াত যে, শেষ পর্যন্ত আমাকে সাইকেলের সাহায্য নিতে হতো। তারপরও ওর সঙ্গে আমি পারতাম না। তাই বাধ্য হয়ে সাইকেল ছেড়ে আমাকে মোটরসাইকেল নিতে হল।’ পাঁচ সন্তানের বাবা ভেলো সম্প্রতি দাদা হয়েছেন। বুয়েনস আয়ার্সের বিখ্যাত ক্লাব বোকা জুনিয়র্সের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ফুটবল দলের পেশাদার খেলোয়াড় ভেলো। শৈশবের প্রিয় ক্লাবে খেলার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে তার। সম্প্রতি বোকা জুনিয়র্স তাকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিভার প্লেট থেকে নিয়ে এসেছে। যেখানে এক দশক ধরে তারকা খেলোয়াড় ছিলেন তিনি। এখন তার একটাই স্বপ্ন, ব্রাজিলে স্বর্ণপদক জেতা। ‘আমরা সেই পদক চাই’, তার দৃপ্ত উচ্চারণ। এএফপি।

সোনাক্ষি এবার সাংবাদিক

এবার সাংবাদিক হয়ে সবার সামনে আসছেন বলিউড নায়িকা সোনাক্ষি সিনহা। তবে বাস্তবে নয়। নতুন ছবিতে সাংবাদিক হিসেবেই দেখা যাবে তাকে। চরিত্রের প্রয়োজনে নানাভাবে নিজেকে হাজির করতে কমতির চেষ্টা রাখেন না এ বলিউড নায়িকা। সম্প্রতি তার নতুন সিনেমা ‘নূর’ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে অন্যান্য ছবির চেয়ে এতে তাকে দেখা যাবে একটু ভিন্ন চরিত্রে। সাংবাদিকের চরিত্রে অভিনয় করবেন তিনি। এ ছবির শুটিং শুরু হবে জুলাই মাসে।
ছবিটি পরিচালনা করেছেন সুনীল সিপ্পি। এখন চলছে লুক টেস্ট আর প্রি-প্রোডাকশনের কাজ। ছবিটি পাকিস্তানের সাংবাদিক সাবা ইমতিয়াজের উপন্যাস ‘করাচি ইউ আর কিলিং মি’-এর উপাখ্যান নিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ছবিতেই মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করছেন সোনাক্ষি সিনহা। নতুন ছবির জন্য তার লুকও নতুন। এক মাসের মধ্যে শুটিং শেষ করা হবে বলে প্রযোজনা সংস্থা জানিয়েছে। পরবর্তীকালে সব কাজ শেষ হলে বছরের শেষ নাগাদ ছবিটি মুক্তি পেতে পারে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ছবি নির্মাণ করা নিয়ে এরইমধ্যে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন সোনক্ষি।