Showing posts with label খোলা চোখে. Show all posts
Showing posts with label খোলা চোখে. Show all posts

Saturday, February 14, 2015

সরকার তার দায়িত্ব এড়াতে পারে না by হাসান ফেরদৌস

দায়িত্বভার গ্রহণের সময় সরকারের প্রত্যেক সদস্যকে শপথ নিতে হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রিসভার প্রত্যেক সদস্যকেও নিতে হয়েছে। সেই শপথ অনুযায়ী তাঁরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, দেশের প্রতিটি মানুষের জানমাল রক্ষা করবেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। দেড় মাস ধরে অব্যাহত হরতাল ও অবরোধের কারণে সারা দেশে অচলাবস্থা নেমে এসেছে। প্রতিদিন নিহত হচ্ছে নিরীহ মানুষ। এসএসসি ও সমমানের প্রায় ১৫ লাখ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিপর্যয়ের মুখে দেশের অর্থনীতি। এসবের কোনোটাই ঘটবে না—ক্ষমতা গ্রহণের সময় সরকার সে বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। যেভাবেই দেখুন, হরতাল-অবরোধের জন্য বিরোধী জোট দায়ী—শুধু এই কথা বলে সরকারের দায়িত্ব শেষ হয় না, হতে পারে না। যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তা যেভাবেই হোক সমাধান খোঁজার দায়িত্ব সরকারের। সাধারণ নাগরিক হিসেবে এ কেবল আমাদের প্রত্যাশা নয়, এটা আমাদের দাবিও।
জ্বালাও-পোড়াও ও পেট্রলবোমা ছোড়ার যে রাজনীতি বিরোধী জোট অনুসরণ করছে, তা ধ্বংসাত্মক, এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। দেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে তারা যদি ক্ষমতা দখলের কোনো স্বপ্ন দেখে থাকে, তা যে অলীক কল্পনা, সে কথাও আমরা অনায়াসেই বলতে পারি। ধরা যাক, বাঁকা কোনো পথে তাঁরা শেষতক নিজেদের মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছালেন। কিন্তু তারপর তাঁরা কোথায় সৌধ গড়বেন? এতগুলো মানুষের কবরের ওপর?
অন্যদিকে, বিরোধী জোটের সঙ্গে কোনো সংলাপ নয়, কারণ তারা সন্ত্রাসী—এই যুক্তিতে গোঁ ধরে বসে আছে সরকার। এটাও কোনো কাজের কথা নয়। পুলিশ দিয়ে বা আধা সামরিক বাহিনী নামিয়ে দেশের সব জেলখানা হয়তো ভরানো সম্ভব, কিন্তু এভাবে সংকটের সমাধান হবে না। কারণ, চলমান সংকট শুধু নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক নয়, এর মূল চরিত্র রাজনৈতিক। যে সংকট রাজনৈতিক, তা সমাধানের লক্ষ্যে সবচেয়ে যা জরুরি, সরকার মনে হয় সেটি করতেই নারাজ। সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের এই মনোভাব খুব বাস্তবসম্মত বলে মনে হয় না।
প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথা বলা মানেই সরকারের হার মেনে নেওয়া—এমন যুক্তিতে যদি কেউ সংলাপের বিরোধিতা করেন, সেটি খুব অর্থপূর্ণ হবে না। আসলে এটি একটি সামন্ততান্ত্রিক মনোভাব। পাশাপাশি দুই জমিদার একে অপরের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকেই যাচ্ছে বা একে অন্যের মাথা না ফাটানো পর্যন্ত ভাড়াটে লেঠেল দিয়ে লাঠালাঠি করেই যাচ্ছে। ঢালিউড-বলিউডের ছবিতে এমন ঘটনা হরহামেশাই ঘটে। এই লাঠালাঠির পরিণতি কী, তা আমাদের জানা—দুই পক্ষই একসময় দেউলিয়া হয়ে শুধু পরিধেয় বস্ত্রটি নিয়ে মাঠ ছাড়বে। এখন যে রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তা বলিউডি ফিল্ম থেকে খুব বেশি ভিন্ন কিছু নয়। রাজনীতিকেরা যদি নিজেরা একে অপরের সঙ্গে লাঠালাঠি করে পথে বসতে মনস্থ করে থাকেন, তাতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু চলতি লাঠালাঠির ফলে শুধু তাঁরা নন, পুরো দেশই মাঠে বসার উপক্রম হয়েছে। এই সাধারণ সত্যটি দেশের অধিকাংশ মানুষ বোঝে। বিদেশি কূটনীতিকেরা পর্যন্ত আমাদের সেই বিপদের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। শুধু হুঁশ আসছে না তাঁদের, যাঁরা নিজ নিজ কাচের দেয়ালঘেরা ঘরে বসে অন্যের দিকে পাথর ছুড়ছেন।
নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে চলতি সংকটের সমাধান সম্ভব, এই হিসাব কষে যাঁরা নিশ্চিন্তে বসে আছেন, তাঁরা হিসাবে বোধ হয় ভুল করেছেন। প্রত্যেক বিরোধী রাজনীতিক ও তাঁদের সমর্থকদের জেলে না ঢোকানো পর্যন্ত জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতি থামবে না। কারণ, তাঁরা ধরে নিয়েছেন নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠার এটিই একমাত্র পথ। এই হরতাল-অবরোধের পথ ধরে একসময় এরশাদকে হঠানো গেছে, খালেদা জিয়ার ভেজাল নির্বাচন ঠেকানো গেছে। বিরোধী জোট সে অভিজ্ঞতায় পুষ্ট হয়ে এখন ২০১৪ সালের ভেজাল নির্বাচনের ফলাফল উল্টে দিতে চাইছে। যদি কোনো পক্ষই পিছু না হটে, তার ফল দাঁড়াবে যে এই দুই জমিদার একে অপরকে খাক করবে, সঙ্গে খাক হব আমরা।
কিন্তু এর বিকল্প পথও তো আছে। আর সেটি হলো দুই পক্ষের মুখোমুখি সংলাপ। রাজনৈতিক নেতৃত্বের শীর্ষ পর্যায়ে যে সংলাপ হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা নিউইয়র্কে সরকার ও বিরোধী পক্ষের বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। আমার বিবেচনায় এটি বিরোধী পক্ষের একধরনের ছাড়। আলোচনার শর্ত হিসেবে বিএনপি-প্রধান যে সাত দফা প্রস্তাব দিয়েছেন, তা থেকে খোকার প্রস্তাব কিঞ্চিৎ ভিন্ন। সংলাপের আগে সরকারের পদত্যাগের দাবির মতো কোনো পূর্বশর্ত তিনি হাজির করেননি। সরকার চতুর হলে অনায়াসে এই ছাড়কে কাজে লাগিয়ে বিরোধী জোটের সঙ্গে আলোচনার শুরুতে সম্মতি জানাতে পারত। হোক না মাঝপর্যায়ে এ আলোচনা, কিন্তু তেমন সংলাপ শুরু হলেই আন্দোলনের তাপ কমবে। তার সঙ্গে কমবে মানুষের ভোগান্তি।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা রাষ্ট্রপতির মধ্যস্থতায় সংলাপ শুরুর প্রস্তাব দিয়েছেন। সে প্রস্তাব মাটিতে পড়তে না পড়তেই সরকারপ্রধান নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, যাঁরা প্রস্তাব রেখেছেন, তাঁদের একজন ছাড়া সবাইকে ঢালাওভাবে ওয়ান-ইলেভেনের মতলববাজদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন। এমনকি সরকারের অবস্থানের ব্যাপারে যাঁরা ভিন্নমত পোষণ করেন, বিশেষত টক শোতে নরম-গরম কথা বলা যাঁদের অভ্যাস, প্রধানমন্ত্রী তাঁদের তালিকা তৈরির হুমকিও দিয়েছেন। এর চেয়েও ভয়াবহ কথা শোনা গেছে পুলিশ প্রশাসন থেকে। তারা বলেছে, একটি লাশ পড়লে তারা দুটি লাশ ফেলবে। এই প্রথম সম্ভবত কোনো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের এক কর্মকর্তা প্রকাশ্যে বিচার-প্রক্রিয়ার বাইরে হত্যাকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গাইলেন।
এসবই নিয়মতান্ত্রিক পথ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত। গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘদিন সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ন্যায্য দাবি যে দলটি বরাবর করে থাকে, এখন সেই দলের হাতেই ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের মৃত্যুর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সেই মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব, কিন্তু তার জন্য ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ দূরে সরিয়ে দেশের স্বার্থকে সবার আগে রাখা দরকার। এই সাধারণ সত্যটি যদি আমাদের নির্বাচিত নেতারা না বোঝেন, তাহলে তার চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে!
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

Saturday, January 31, 2015

কোকো কাহিনি by হাসান ফেরদৌস

আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুতে যে রকম মাতম দেখছি, তাতে রীতিমতো আঁতকে উঠেছি। কোনো পত্রিকায় দেখিনি কেউ দুই লাইন লিখে ব্যাখ্যা করেছেন যে তিনি মালয়েশিয়ায় পড়ে ছিলেন কেন? কী অসুখে কোকো মারা গেলেন, তারও কোনো বিবরণ পড়িনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার এই ছেলে যে আইন থেকে পালিয়ে বাঁচার জন্য মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, কেউ সে কথা ঘুণাক্ষরেও উল্লেখ করেনি। তাঁর নামে জেলে ঢোকানোর হুকুমনামা ছিল; কই, সে কথাও কেউ সবিস্তারে জানায়নি। সত্য লুকানোর এ কাজে বিরোধী জোট আগ্রহী হবে তা বুঝি, কিন্তু দেশের পত্রপত্রিকার এতে কী স্বার্থ, তা তো আমার মাথায় আসে না। যাঁরা জানেন না, তাঁদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, কোকো রহমান সম্ভবত বাংলাদেশের একমাত্র ব্যবসায়ী-রাজনীতিক, যাঁর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার নিজ গরজে আদালতে মামলা করেছে এবং সেই মামলার বিবরণ সবিস্তারে সবাইকে জানিয়েছে। অভিযোগ, তহবিল তছরুপ। মার্কিন বিচার বিভাগের করা অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রায় ৩০ লাখ ডলার হাতিয়ে নিয়েছেন কোকো। ২০০৯ সালে করা এই মামলায় বলা হয়েছে, জার্মানির সিমেন্স এজি ও চীনের চায়না হার্বার ইঞ্জিনিয়ারিং নামে দুটি বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে কোকো তাঁর মায়ের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাজ এ দুই কোম্পানিকে জুটিয়ে দিয়েছেন। চায়না হার্বারের জন্য যে কাজ তিনি জুটিয়ে দেন, সেটি ছিল চট্টগ্রাম বন্দরে নতুন জেটি নির্মাণ। অন্যদিকে, সিমেন্স জুটিয়েছিল মোবাইল টেলিফোনের একটি ব্যবসা। তারা যে ঘুষের মাধ্যমে সরকারি কাজ জোটানোর চেষ্টা করেছে, সে কথা সিমেন্স এজি ও তার বাংলাদেশি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান স্বীকার করে সব দায়ভার মেনে নিয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগের কাছে তারা স্বীকার করে যে ২০০১ সালের মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত তারা মোট ৫৩ লাখ ১৯ হাজার ৮৩৯ মার্কিন ডলার ঘুষ দিয়েছে। এই ঘুষের টাকা প্রথমে জমা পড়ে একটি মার্কিন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। পরে সেখান থেকে তা পাচার হয়ে যায় সিঙ্গাপুরে কোকোর অ্যাকাউন্টে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুসারে ঘুষ দিয়ে দেশে বা বিদেশে কাজ আদায়ের চেষ্টা অবৈধ। এই মর্মে একটি আন্তর্জাতিক আইনও রয়েছে। টাকাটা যেহেতু মার্কিন ব্যাংকের মাধ্যমে পাচার হয়েছে, ফলে তা মার্কিন এখতিয়ারের অন্তর্ভুক্ত। সে কারণেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এই টাকা পাচারের ঘটনাটি তদন্ত করে। এই মামলার পুরো বিবরণ যাঁরা পড়তে আগ্রহী, তাঁরা দয়া করে মার্কিন বিচার বিভাগের নিম্নলিখিত ওয়েবসাইট ভ্রমণ করুন: (http://www.justice.gov/archive/opa/pr/2008/December/08-crm-1105.html) বলাবাহুল্য, বুদ্ধি করে টাকাটা যদি মোনাকো, সুইজারল্যান্ড বা সাইপ্রাসের কোনো ব্যাংকের মাধ্যমে পাচার হতো, কোকো হয়তো বিপদে পড়তেন না। বাংলাদেশ বা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের কোকোরা এভাবে নিজেদের গরিব দেশ থেকে বছরে প্রায় এক হাজার কোটি ডলার বিদেশের ব্যাংকে পাচার করে থাকেন। এই হিসাব আমার মনগড়া নয়, বিশ্বব্যাংকের। কোকোর পাচার করা টাকার কিয়দংশ পরে বাংলাদেশ সরকার সিঙ্গাপুর সরকারের সহায়তায় উদ্ধারে সক্ষম হয়। উদ্ধারকৃত অর্থের মোট পরিমাণ ২৬ লাখ ৬১ হাজার ৭০ ডলার। কোকোর বিরুদ্ধে মামলা শুরু হয়েছিল সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিশেষ আদালত কোকোকে তাঁর অনুপস্থিতিতে ছয় বছরের জেলসহ তাঁর পাচার করা ২০ কোটি টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন। এই মামলা যখন আদালতে ওঠে, বিএনপির তরফ থেকে যথারীতি বলা হয়েছিল, এ সবই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই তাঁর বিরুদ্ধে কেন মামলা করবে, আর সিঙ্গাপুরই বা কেন অন্যের পাচার করা টাকা বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে, তার কোনো ব্যাখ্যা দলের কর্তাব্যক্তিরা দেশের মানুষের জ্ঞাতার্থে হাজির করেননি। বাংলাদেশের বিশেষ আদালত যদিও কোকোকে দেশে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছিলেন, সরকার যে সেই চেষ্টা আন্তরিকভাবে করেছে, তারও কোনো প্রমাণ নেই। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাদের অনুমতি নিয়েই কোকো চিকিৎসার নামে প্রথমে আসেন থাইল্যান্ডে। অনুমান করি, পাচার করা টাকা ফেরত দেওয়ার পরও তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিস্তর রেস্ত/ জমা ছিল। থাইল্যান্ডে তাঁকে যে জামাই আদরে বিনা মূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়েছে, সে কথা মনে হয় না। থাইল্যান্ড থেকে মালয়েশিয়ায়। বউ-বাচ্চা নিয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সে দেশে তিনি বহাল তবিয়তেই ছিলেন। মোটেও লুকিয়ে-ছাপিয়ে থাকেননি। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মাঝেমধ্যে খোঁজখবর নিয়ে তাঁর তবিয়তের সর্বশেষ বুলেটিন দেশবাসীকে জানিয়েছেন। এ তো গেল হাতেনাতে ধরা পড়া এক অপরাধ। কোকোর অন্য কম প্রকাশিত ও প্রচারিত অপরাধ ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে ঘিরে। এই ভদ্রলোক জীবনে পেশাদারি ক্রিকেট খেলেননি, কিন্তু ক্রিকেট ব্যাপারটা যে টাকা বানানোর একটা কারখানা, তিনি সেটা বেশ ভালো বুঝতে পেরেছিলেন। মায়ের দোয়া নিয়ে তিনি এই বোর্ডের অবৈতনিক উপদেষ্টার পদটি অলংকৃত করেন এবং পরে সেই বোর্ডের ‘ডেভেলপমেন্ট কমিটি’র প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যে কয়েক বছর কোকো ও তাঁর বান্ধবেরা এখানে ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ পান, সে সময় ক্রিকেট বোর্ড হয়ে উঠেছিল তাঁদের খাস তালুক। এহেন কোকোর মৃত্যুর পর ঢাকায় তাঁর জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছে। পত্রিকায় ও টিভির পর্দায় সেই ঢল দেখেছি আমি। একজন প্রমাণিত অর্থ পাচারকারী ও জেল পলাতক আসামি, তাঁকে মহানায়কের সম্মানে চিরবিদায় জানাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ। মৃত মানুষের নামে নাকি মন্দ বলতে নেই। কিন্তু সত্য কীভাবে লুকিয়ে রাখা যেতে পারে, সে বুদ্ধি তো আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে আসছে না। বস্তুত, কোকোর এই মহানায়কসুলভ সম্মানে বিস্মিত হওয়ার কিছুই নেই। দুর্নীতিকে আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ হিসেবে মেনে নিয়েছি। আমরা ধরেই নিয়েছি, যাঁরা ক্ষমতায় বসেন, তাঁরা ও তাঁদের বশংবদেরা ইচ্ছেমতো গৌরী সেনের মাল পকেটে ঢালবেন, আমরা দেশের মানুষ স্মিত হেসে তা দেখেও না দেখার ভান করব। নির্বাচনের সময় এলে সেই তস্করদেরই ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসাব। কথায় বলে, যেমন দেশ তেমন তার নেতা। আমার তবু ভাবতে ইচ্ছা করে, এমন একটা সময় আসবে, যখন চোরকে আমরা জেলে ঢোকাব, মসনদে বসাব না। যত দিন তা না হচ্ছে, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে বিশ্বসভায় আমাদের স্থান মিলবে না।
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

Sunday, October 12, 2014

মোদি: মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ by হাসান ফেরদৌস

মোদিকে বাহবা জানিয়ে কলাম লিখতে হবে, তা আমার কল্পনাতেও ছিল না। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষ করে নিউইয়র্কে তাঁকে দেখে কিঞ্চিৎ উষ্মার সঙ্গেই কবুল করছি, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে মুগ্ধ করেছেন। মোট ৮৮ জন সফরসঙ্গী নিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে কেবিনেট সদস্য ছিলেন একমাত্র পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক বিতর্কে ভাষণ তো ছিলই, এর বাইরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠক, কংগ্রেসের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসে ভাষণ, এ দেশের প্রথম সারির ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়, ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে প্রবাসী ভারতীয়দের নিয়ে অনুষ্ঠান। আরও ছিল সেন্ট্রাল পার্কে কনসার্টে একঝলক উপস্থিতি। এর বাইরে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক তো ছিলই। মোদি একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা মাথায় রেখে এই সফরে এসেছিলেন। ঠিক ২০০ পারিষদ ও হাফ ডজন মন্ত্রী নিয়ে আনন্দ সফর নয়। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাঁর একটি ‘মেসেজ’ ছিল যে ভারতের প্রতিনিধি হয়ে তিনি এসেছেন, সে ভিন্ন এক ভারত। এক অতি পুরোনো সভ্যতার তিনি প্রতিনিধি, কিন্তু সেই পুরোনোর ওপর গড়ে উঠেছে এক নতুন সংস্কৃতি, যার ভিত্তিতে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি, শিক্ষা ও বিজ্ঞান। জাতিসংঘে মোদি হিন্দিতে ভাষণ দেন। সম্ভবত অটল বিহারি বাজপেয়ির পর তিনি দ্বিতীয় ভারতীয় সরকারপ্রধান, যিনি রাষ্ট্রসভায় হিন্দিতে ভাষণ দিলেন। ওবামাসহ অধিকাংশ রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে আলাপচারিতার সময় হিন্দিতেই কথা বলেছেন। এমনকি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যে পাঁচ থেকে দশ মিনিট তাঁর সৌজন্য কথোপকথন হয়, তাতেও মোদি হিন্দিতেই কথা বলেছেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিজের হিন্দিজ্ঞানে মোদিকে বিস্মিত করেন বটে, কিন্তু নিজ ভাষায় অটল থেকে মোদি কিন্তু ‘ভাষাকন্যার’ কাছ থেকে নিজের জন্য বাড়তি নম্বর আদায় করে নিলেন।

ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ২০ হাজার ভারতীয়র সামনে মোদি এক ঘণ্টা ভাষণ দেন কোনো কাগজ ছাড়া। বিজেপি নেতা, কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই অনুষ্ঠানটি ছিল সব ভারতীয়র জন্য উন্মুক্ত। তাদের সবাই যে বিজেপি-সমর্থক, অথবা মোদির রাজনীতির প্রতি সদর্থক মনোভাব পোষণ করেন, তা-ও নয়। কিন্তু এই এক দিন, আমার মনে হয়েছে প্রায় সব ভারতীয় তাদের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক সংবর্ধনা জানিয়েছে। অল্পবিস্তর প্রতিবাদী লোক যে ছিল না, তা নয়; কিন্তু মোদির ‘রাজসম্মানে’ তা কোনো বিঘ্নের কারণ হয়নি। মোদিও তাদের বিমুখ করেননি। এমনিতে ভারতীয়রা নিজেদের মধ্যে যখন কথা বলে, নিজের দেশ ও তার রাজনীতিকদের বংশোদ্ধার ছাড়া অন্য কথা মুখে জোটে না। কিন্তু সেদিন—এবং তার পর—যত ভারতীয়র সঙ্গে আমার দেখা ও কথা হয়েছে, তারা প্রায় সবাই ভারতীয় হিসেবে গভীর শ্লাঘা বোধ করেছে। নিজের দেশ ও নেতা নিয়ে এর আগে ভারতীয়দের এমন প্রীত দেখিনি। এমন আশাবাদের বার্তাও শোনা যায়নি।
কী নিয়ে বললেন মোদি? তিনি জানালেন এক নতুন ভারতের কথা, যিনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে পূর্ণ আস্থাবান। অন্য সবার চেয়ে ভারত ভিন্ন কারণ তার রয়েছে গণতন্ত্র, তরুণ জনশক্তি সোয়া কোটি মানুষের এক বিশাল বাজার। একসময় ভারত বলতে বোঝাত সাপুড়ে, আজ সে পরিচিত কম্পিউটারের ‘মাউস’-এর জন্য। মঙ্গল গ্রহে নভোযান পাঠাচ্ছে সে। প্রবাসী ভারতীয়দের বললেন, ‘দেশে থাকো কি বিদেশে, ভারতে বিনিয়োগ করো।’ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানালেন, ভারত এখন বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যে প্রস্তুত। নিজেদের দুর্বলতা ঢাকার কোনো চেষ্টা করলেন না। স্বীকার করলেন, ভারত এখনো গরিব, সে দেশের অধিকাংশ মানুষের এখনো শৌচাগার নেই৷ অহেতুক ফালতু আইনের মারপ্যাঁচে সেখানে ব্যবসায়ী যেমন, তেমনি সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ। এখনো দুর্নীতি সর্বত্র। সরাসরি বললেন, ‘এসব আমি বদলাতে চাই। প্রতিদিন যদি একটি করে ফালতু আইন বাতিল করতে পারি, তাহলে আমার চেয়ে সুখী আর কেউ হবে না।’
মোদি এই সফরে হোয়াইট হাউসের কাছ থেকে কী সম্মান পেয়েছেন, আমি তার ফিরিস্তি দেব না। শুধু এটুকু বলি, প্রেসিডেন্ট ওবামা নিজে টুরিস্ট গাইড হয়ে মোদিকে মার্টিন লুথার কিং মেমোরিয়াল ঘুরে দেখিয়েছেন। এমন ঘটনা দ্বিতীয় ঘটেছে কি না, আমার জানা নেই। ওবামা ও মোদি যৌথভাবে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় উপসম্পাদকীয় লিখেছেন, সেটিও দক্ষিণ এশিয়ার জন্য প্রথম। মোদি আমাকে আশান্বিত করেছেন, সঙ্গে সঙ্গে ভীতও হয়েছি। মোদি শুধু ভারতীয় হিসেবে নন, একজন হিন্দু ভারতীয় হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। নিজের ধর্মপরিচয় জামার হাতলে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখার আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, দুর্গাপূজা উপলক্ষে নয় দিনজুড়ে যে নবরাত্রি উৎসব, তার অংশ হিসেবে তিনি এই পুরো সময় উপোস থাকবেন। অতি আচারমুখী ও রক্ষণশীল হিন্দু ছাড়া আর কেউ নবরাত্রিজুড়ে উপোস থাকেন, সে কথা শুনিনি। আচারসম্মত হিন্দু হিসেবে মোদি সে কাজ করতেই পারেন, কিন্তু নিজের ধর্মীয় পরিচয় তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবেন, সেটা কাম্য নয়। তিনি উপোস আছেন, সে কথা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসে তাঁর সম্মানে রাষ্ট্রীয় ভোজ, সবাই মুরগি-মুসাল্লাম চিবোচ্ছে, মোদি লেবু-জল দিয়ে আহার সারছেন। ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ভারতীয়দের কিঞ্চিৎ উপহাসের সঙ্গে বলেছেন, তাদের গলায় জোর নেই কেন, উপোস তো রয়েছেন তিনি। বস্তুত সে ভাষণ শুরুই করেন ‘ভারত মাতা কি জয়’, এই স্লোগানে। জনসংঘ ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী আরএসএস দীর্ঘদিন থেকে এই স্লোগান ব্যবহার করে আসছে। একইভাবে তারা ‘বন্দে মাতরম’ স্লোগানটিও ব্যবহার করে হিন্দু চেতনার সঞ্চারে। ভারতীয় মুসলমানদের কাছে উভয় স্লোগানই সাম্প্রদায়িকতার চিহ্ন বহন করে, সে জন্য দিল্লি জামে মসজিদের ইমাম আহমেদ বুখারি তাঁদের ‘ইসলামবিরোধী’ বলে তাঁর নিন্দা করেছিলেন। মোদি সে কথা জানেন, জেনেশুনেই সেই স্লোগান দিচ্ছেন, কারণ তিনি সবার আগে নিজের হিন্দু পরিচয়টি তুলে ধরতে চান।
এখানেই আমার ভয়। স্বাধীনতার পর প্রথম ভারতীয় নেতারা খুব সচেতনভাবে নিজেদের অসাম্প্রদায়িক—সেক্যুলার—পরিচয় তুলে ধরতে আগ্রহী ছিলেন। অধিকাংশ ভারতীয়—তা দেশেই হোক বা বিদেশে—নিজেকে কখনো বুক ফুলিয়ে হিন্দু বলে পরিচয় দেয়নি। মোদি সেই ঐতিহ্য পাল্টাতে চান। বিষয়টা যাতে একদম গোড়া থেকেই ভারতীয়দের মাথায় ঢোকে, সে জন্য মোদি সরকার দেশের স্কুলের পাঠ্যপুস্তক নতুন করে লেখার উদ্যোগ নিয়েছেন। এ কাজের দায়িত্ব পড়েছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী শিক্ষক দীননাথ বাতরার ওপর। এই সেই লোক, যাঁর আপত্তির কারণে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়েন্ডি ডনিজারের হিন্দুধর্মবিষয়ক গ্রন্থ ভারতে নিষিদ্ধ করা হয়। বাতরা বিশ্বাস করেন, ভারতের সেক্যুলার রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে দেশে হিন্দু ঐতিহ্য অবহেলিত হয়েছে। তিনি এর পরিবর্তন চান। গুজরাটে পাঠ্যপুস্তক রচনার দায়িত্ব পেয়ে বাতরা সাহেব ছাত্রদের ‘অখণ্ড ভারত’-এর স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন। এই অখণ্ড ভারতের যে মানচিত্রটি তিনি রচনা করেন, তাতে কেবল আজকের ভারত নয়, উপমহাদেশের অন্য সব দেশ—পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কাও অন্তর্ভুক্ত। বাতরা এখন শুধু গুজরাট নয়, পুরো ভারতের জন্য পাঠ্যপুস্তক রচনায় নেতৃত্ব পাচ্ছেন। ব্যাপারটা এতটাই উদ্বেগজনক যে নিউইয়র্ক টাইমস-এর মতো পত্রিকাকে সম্পাদকীয় লিখে প্রতিবাদ জানাতে হয়েছে। টাইমস-এর কথায়, মোদি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, সেটি ভালো কথা। ‘কিন্তু ঐতিহাসিক বস্তুনিষ্ঠতার স্থান যদি দখল করে নেয় (হিন্দুত্ববাদী) ভাবাদর্শ,’ তাহলে তেমন শিক্ষা ভারতের প্রতিবেশীদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হবে।
মোদি যে ধর্মকে—তাঁর হিন্দুত্ববাদকে—রাজনৈতিক তাস হিসেবে ব্যবহার করতে চান, গত মাসে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে তার এন্তার প্রমাণ মিলেছে। এই নির্বাচনে প্রধান প্রচারক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন স্বামী রামদেভ, যাঁর মুখ্য স্লোগান ছিল ‘হিন্দুধর্ম বাঁচাও’। মুসলমানদের ‘লাভ জিহাদ’ চক্করে পড়ে ভারতীয় মেয়েরা ধর্মান্তরিত হচ্ছে। এদের রক্ষা করতে হবে। বলাই বাহুল্য, রামদেবের উর্বর মস্তিষ্কোদ্ভূত এই প্রচারণার কারণেই উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিজেপি রীতিমতো বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদির বয়স ছয় মাসও নয়। যে নতুন ভারতের স্বপ্ন তিনি দেখাচ্ছেন, অধিকাংশ ভারতীয়ই তাতে অনুপ্রাণিত বোধ করছে। কিন্তু হিন্দুত্ববাদের উত্থান যদি সে স্বপ্নের অন্তর্গত হয়, তাহলে আশান্বিত হওয়ার বদলে ভীত হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না।
নিউইয়র্ক
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

Friday, April 18, 2014

মোদি-জ্বরে বঙ্গবীর by হাসান ফেরদৌস

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীকে ঠিক বৈদেশিক নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ বোধ হয় বলা যায় না। তবে তিনি কয়েক বছর ভারতে কাটিয়েছেন, কাজেই নিজেকে ভারত বিশেষজ্ঞ বলে দাবি তো করতেই পারেন। তো, সম্প্রতি কাদের সিদ্দিকী জানিয়েছেন, ভারতে মোদি আসছে, আর সে ভয়ে আওয়ামী লীগের হাঁটুতে কাঁপুনি শুরু হয়েছে।

Saturday, February 8, 2014

খোলা চোখে- বিচারপতি, এবার হবে তোমার বিচার by হাসান ফেরদৌস

আইনের হাত অনেক দীর্ঘ। সেই দীর্ঘ হাত এখন ক্রমেই খালেদা জিয়াকে আঁকড়ে ধরছে। খালেদার আমলে অনেক অঘটনই ঘটেছে, তবে যে দুটি ঘটনা আর সব ঘটনাকে ছাপিয়ে যায় তা হলো ২০০৪ সালের এপ্রিলে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা এবং সে বছরের ২১ আগস্টের রক্তাক্ত গ্রেনেড হামলা।

Friday, February 7, 2014

খোলা চোখে- বিচারপতি, এবার হবে তোমার বিচার by হাসান ফেরদৌস

আইনের হাত অনেক দীর্ঘ। সেই দীর্ঘ হাত এখন ক্রমেই খালেদা জিয়াকে আঁকড়ে ধরছে। খালেদার আমলে অনেক অঘটনই ঘটেছে, তবে যে দুটি ঘটনা আর সব ঘটনাকে ছাপিয়ে যায় তা হলো ২০০৪ সালের এপ্রিলে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা এবং সে বছরের ২১ আগস্টের রক্তাক্ত গ্রেনেড হামলা।
শেষের ঘটনাটি এখনো রহস্যাবৃত, কিন্তু প্রথমটির অবগুণ্ঠন খুলে গেছে। দীর্ঘ তদন্ত ও বিচার-প্রক্রিয়া শেষে রায় হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ১৪ জনের ফাঁসির রায় ঘোষিত হয়েছে। তাঁরা খালেদা জিয়ার আমলে মন্ত্রিসভার সদস্য ও গোয়েন্দা বিভাগের হর্তাকর্তা ছিলেন। সেই সরকারের যিনি প্রধান, যাঁর নাকের ডগায় এমন ঘটনা ঘটেছিল, সেই খালেদা জিয়া এখনো অভিযুক্ত হননি। তদন্ত ও বিচারের রায়ে দুটি জিনিস স্পষ্ট।

এক. ১০ ট্রাক অস্ত্র অবৈধভাবে পাচারের ঘটনাটি প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) সাদেক হাসান রুমী নিজে প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছিলেন। তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী, যিনি এই মামলার অন্যতম অপরাধী, তাঁর সাক্ষ্য থেকেও জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে অস্ত্র ধরা পড়ার ঘটনাটি নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন।
দুই. খালেদা জিয়া ঘটনার কথা জেনেছিলেন, অথচ এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। প্রমাণিত হয়েছে যে তাঁর সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশেই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। চট্টগ্রামের স্থানীয় পুলিশ এ নিয়ে থানায় মামলা করেছিল, কিন্তু পরে মামলাটি গোয়েন্দা বিভাগের কাছে হস্তান্তরিত হয়। তারা এ নিয়ে কার্যত কিছুই করেনি। খালেদার আমলে এ বিষয়ে মামলা করা হয় এবং তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়—এ কথা ঠিক। কিন্তু সেই কমিটির কোনো প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি, কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। উল্টো পুরো ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা হয়।
অপরাধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হলেও সেই ঘটনার প্রতিকার করেননি—এ জন্য খালেদা জিয়াকে অভিযুক্ত করা যায়। সব দেশের অপরাধ আইনেই অপরাধের সাথিকে—আইনের ভাষায় অ্যাকমপ্লিস ও অ্যাকসেসরি—বিচারের সম্মুখীন করার বিধান রয়েছে। ১৮৭২ সালের ভারতীয় সাক্ষ্য আইন (এভিডেন্স অ্যাক্ট) অনুসারে, যেকোনো ব্যক্তি যদি কোনো অপরাধ বিষয়ে জ্ঞাত থাকেন, সংঘটিত অপরাধ বিষয়ে জানা সত্ত্বেও এ বিষয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অবহিত না করেন, বিচার ও তদন্তকাজে বাধা সৃষ্টি করেন, অথবা বিচার ধামাচাপা দিতে চান বা তা বিলম্বিত করার চেষ্টা করেন, তাহলে তেমন ব্যক্তি অপরাধী বলে বিবেচিত হবেন।
এই আইন, যা এখনো আমাদের দেশে ফৌজদারি আইনের উৎস, তা অনুসারে খালেদা জিয়াকে যে ১০ ট্রাক মামলার অন্যতম আসামি করা যেত, তা বোঝার জন্য আইনজ্ঞ হতে হয় না। আমরা এখন জানি, অস্ত্রগুলো আসছিল চীন থেকে, আর তা যাচ্ছিল আসামে বিচ্ছিন্নতাবাদী দল উলফার জন্য। উলফার সামরিক প্রধান পরেশ বড়ুয়া পুরো ঘটনা বাংলাদেশের প্রভাবশালী কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ সমর্থনে ঘটাতে চেয়েছিলেন। এই প্রভাবশালী কর্তৃপক্ষের একটি হাওয়া ভবন বলে জনশ্রুতি আছে। আদালত তাঁর রায়ের পর্যবেক্ষণেও ঘটনার সঙ্গে হাওয়া ভবনের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করেছেন। পরেশ বড়ুয়া দেশের এই প্রভাবশালীদের ছাতার নিচেই নিরাপদে ছিলেন। সরকারের অভ্যন্তরে, গোয়েন্দা বিভাগের কর্তাব্যক্তিদের তত্ত্বাবধানে এতসব কাণ্ড ঘটবে, আর প্রধানমন্ত্রী জানবেন না, তা কী করে হয়?
একই কথা ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনা নিয়ে। সেই ঘটনায় আওয়ামী লীগের প্রথম সারির এক নেত্রীসহ মোট ২৩ জন নিহত হন। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর তখনো নিজ দায়িত্বে সমাসীন। হাওয়া ভবনে বসে খালেদা-পুত্র তারেক তখনো সমান্তরাল সরকার পরিচালনা করছেন, তাঁর মায়ের জ্ঞাতসারে, সম্ভবত তাঁর সমর্থনে। এই হাওয়া ভবনেই আওয়ামী লীগের সভায় গ্রেনেড হামলাকারীরা বৈঠক করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী, তাঁর সরকার সে সময় নানাভাবে চেষ্টা করেছে গ্রেনেড হামলার সব দায়-দায়িত্ব উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাতে। একদম নিরীহ একজন জজ মিয়াকে সেই হামলায় জড়িয়ে নাটকের চেষ্টাও হয়েছে। এত সব কাণ্ড হবে, অথচ দেশের প্রধানমন্ত্রী কিছু জানবেন না, এ কেমন করে হয়? এ ব্যাপারে খালেদা নিজে কোনো ব্যাখ্যা দেননি। ঘটনার জন্য কোনো দায়দায়িত্ব নেওয়া, অথবা বিচারে ব্যর্থতার জন্যও কখনো দুঃখ প্রকাশ করেননি। পরে খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগই সে ঘটনার জন্য দায়ী বলে অভিযোগ করেছেন, যদিও সে বিষয়ে কোনো প্রমাণ দেওয়ার প্রয়োজন দেখেননি।
সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর সময়ে ঘটে যাওয়া সব ঘটনার জন্য দেশের প্রধানমন্ত্রী দায়ী নন, তা মানি। কিন্তু সে ব্যাপারে সরকারপ্রধান দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। দেশে যখন ভালো কোনো ঘটনা ঘটে (যেমন ধরুন, ক্রিকেট খেলায় বড় ধরনের জয়, অথবা নতুন কোনো সেতু নির্মাণ), তার জন্য সরকারপ্রধান কৃতিত্ব দাবি করবেন, অথচ বড় ধরনের ব্যর্থতা, তা গ্রেনেড হামলাই হোক বা ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান, তার জন্য নিজের কোনো দায়দায়িত্ব নেই বলে পাশ কাটাবেন, তা কোনো কাজের কথা নয়।
খালেদা জিয়ার আমলে যত অঘটন ঘটেছে, তার প্রতিটির জন্য তিনি দায়ী নন, কিন্তু এর প্রতিটির দায়দায়িত্ব তাঁর—এ কথা কোনোভাবে এড়ানো যাবে না। অপরাধের জন্য যদি দায়ী না-ও হন, অথবা তাঁর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না-ও হন, সেই অপরাধের প্রতিকার অথবা তার সুবিচার বিধান সরকারের প্রধান নির্বাহী হিসেবে সে দায়িত্ব যে তাঁর, এ কথায় তো ভুল নেই। অতএব, সেই দায়িত্ব পালনের ব্যর্থতার দায়ভারই বা তিনি এড়াবেন কী করে? হাওয়া ভবনের দুরাচার, তাঁর আমলের আকাশসমান দুর্নীতি, ১০ ট্রাক অস্ত্র ও ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা—এর কোনোটির জন্যই খালেদা জিয়া কেবল নিজ দায়িত্ব স্বীকার করেননি, সামান্য দুঃখও প্রকাশ করেননি। বিস্ময়ের কথা হলো এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কিছু কথা-চালাচালি ছাড়া সরাসরি কেউ খালেদা জিয়াকে কোনো প্রশ্ন করেননি। তথ্যমাধ্যম থেকেও এ বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা হয়নি।
এখন সময় বদলেছে। আইনের লম্বা হাত এবার একটু একটু করে এগিয়ে আসছে। ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায় ঘোষিত হওয়ার পর এখন তো আর গোপন নেই যে, খালেদা জিয়া আর কিছু না হোক, বড় ধরনের এক অপরাধের কথা জেনেও প্রতিকার করেননি। তাঁর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, গোয়েন্দাপ্রধান—তাঁরা সবাই প্রশ্নাতীতভাবে সেই অপরাধের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিচারের রায় ঘোষিত হয়েছে। তাহলে খালেদা জিয়া কেন এখনো বিচারের কাঠগড়া এড়িয়ে থাকবেন? সাবেক সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি হয়তো সরাসরি বিচার থেকে অব্যাহতি দাবি করতে পারেন, কিন্তু তা হবে অপরাধেরই স্বীকারোক্তি। এর ফলে আইনগতভাবে অব্যাহতি পেলেও তাঁকে এ নিয়ে প্রশ্ন কেন করা যাবে না?
আমাদের আশা, এবার তিনি বাধ্য হবেন এ কথা জানাতে, ১০ ট্রাক অস্ত্র আটক ও ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার বিষয়ে তিনি কী জানতেন, কখন তা জেনেছেন এবং প্রতিকার হিসেবে কী ব্যবস্থা নিয়েছেন। আইন কী করবে জানি না, কিন্তু দেশের মানুষ হিসেবে সেই প্রশ্ন করার অধিকার আমাদের আছে। তথ্যমাধ্যমেরও উচিত হবে খালেদাকে সরাসরি সেই প্রশ্ন করা।
একটা সময় ছিল, যখন দেশের রাজা যা খুশি করতেন, যাকে খুশি তাকেই শূলে চড়াতে পারতেন। মানবসভ্যতা সেই সামন্ততান্ত্রিক স্বেচ্ছাচারের যুগ অতিক্রম করেছে গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতায় প্রবেশের মাধ্যমে। আইনের চোখে সবাই সমান, এটি কেবল কথার কথা নয়, এটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম মৌল ভিত্তি। আমরা সেই রকম দায়বদ্ধ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ করতে চাই।
এ কথা প্রমাণের একটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ হবে সাবেক এই সরকারপ্রধানকে এক বা একাধিক অপরাধের দোসর হিসেবে আইনের দাঁড়িপাল্লায় টেনে তোলা।

হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

Friday, January 10, 2014

খোলা চোখে- সংখ্যালঘু রাজনীতির ‘সফট টার্গেট’ by হাসান ফেরদৌস

যাদের দিকে ঢিল ছুড়লে পাটকেল খাওয়ার ভয় নেই, যাদের বাড়িতে আগুন দিলে পাল্টা আগুন লাগার উদ্বেগ নেই, যাদের দু-চারজন খুন বা ধর্ষণ হলে ফিরতি খুন বা ধর্ষণের আশঙ্কা নেই—এমন মানুষজনই হলো ‘সফট টার্গেট’।

খোলা চোখে- সংখ্যালঘু রাজনীতির ‘সফট টার্গেট’ by হাসান ফেরদৌস

যাদের দিকে ঢিল ছুড়লে পাটকেল খাওয়ার ভয় নেই, যাদের বাড়িতে আগুন দিলে পাল্টা আগুন লাগার উদ্বেগ নেই, যাদের দু-চারজন খুন বা ধর্ষণ হলে ফিরতি খুন বা ধর্ষণের আশঙ্কা নেই—এমন মানুষজনই হলো ‘সফট টার্গেট’।
বাংলাদেশের জন্মের গোড়া থেকেই সংখ্যালঘু হিন্দুরা সে রকম ‘সফট টার্গেট’ হয়ে থেকেছে। একাত্তরে পাকিস্তানিরা বেছে বেছে হিন্দুদের ওপর হামলা করেছে। লক্ষ্য, হিন্দু জনগোষ্ঠীকে উৎখাতের মাধ্যমে ‘ফাইনাল সলিউশন’ অর্জন। পাকিস্তানিরা আর নেই, কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর চার দশকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ থামেনি। তার সর্বশেষ প্রমাণ মিলল ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর দেশজুড়ে সংখ্যালঘু উৎখাতের নতুন তাণ্ডবে।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিটি নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু গ্রাম আক্রান্ত হয়। লক্ষ্য, এসব গ্রামের লোকজন যাতে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার দুঃসাহস না করেন। নির্বাচন শেষে আবারও তাঁরা আক্রান্ত হন, হুমকি ও শাসানি সত্ত্বেও কেউ কেউ ভোটকেন্দ্রে গেছেন এবং তাঁদের পছন্দের দলের বাক্সে ভোট দিয়েছেন, তার শাস্তি হিসেবে। এবারের সংখ্যালঘু আক্রমণের কারণও খুব ভিন্ন কিছু নয়। বাংলাদেশের হিন্দুরা বরাবরই আওয়ামী লীগকে নিজেদের রক্ষাকর্তা ভেবে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছেন, তা তারা সত্যি সত্যি রক্ষাকর্তা হোক বা না-ই হোক। প্রতিপক্ষ বিএনপি ও জামায়াত, যারা যেকোনো মূল্যে নির্বাচন ঠেকাতে বদ্ধপরিকর ছিল, বড় কর্তার গায়ে কুটোটি ছোঁয়াতে না পারলেও ঝাঁপিয়ে পড়েছে কুটোটি তুলে ধরার সাধ্য নেই যাদের, এমন সব অসহায় মানুষের ওপর। আক্রান্ত হয়েছে যশোরের মালোপাড়ার মৎস্যজীবী পরিবার, ঠাকুরগাঁওয়ের হিন্দুবাজার, দিনাজপুরের নিম্নবিত্ত হিন্দু গ্রাম। যারা আক্রান্ত হয়েছে, তাদের অধিকাংশ এমনিতেই সমাজের প্রান্তবর্তী মানুষ, তার ওপর ধর্মীয় সংখ্যালঘু। নিজেরা দুর্বৃত্তদের পরিকল্পিত হামলার প্রতিরোধ করবে, সে ক্ষমতা তাদের নেই। সে কথা জেনেই এসব গ্রাম বা মহল্লা বেছে বেছে নেওয়া হয়েছে।
আক্রমণ হবে, এ কথা পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের যেমন জানার কথা, তেমনি জানার কথা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কর্তাব্যক্তিদেরও। এঁদের কারও পক্ষ থেকেই কোনো আগাম পাহারাদারির ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে নিজের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায়ভার এঁরা কেউই এড়াতে পারেন না। পুলিশ বা প্রশাসন ‘ওপরওয়ালার নির্দেশ নেই’ বলে পাশ কাটাতে পারে, কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতারা দায়িত্ব এড়াবেন কী বলে? হিন্দুদের তাঁরা চিরকালই নিজেদের ‘ভোটব্যাংক’ বিবেচনা করে এসেছেন। কিন্তু যাদের ওপর সংখ্যালঘু হিন্দুদের এত আশা, তারা কেউ কথা রাখে না। আগেও না, এবারেও না। চোর পালালে যেমন পুলিশ আসে, তেমনি ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হওয়ার পর এসব গ্রামে নিরাপত্তা টহল বসেছে। নাগরিক কমিটি গঠিত হয়েছে। সরকারের নেতারাও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির হুমকি দিয়েছেন। এ সবই বাতাসে তলোয়ার ঘোরানো ছাড়া আর কিছু নয়। যারা সব খোয়াল, এই কথার ফুলঝুরিতে তাদের কোনো লাভ হবে না।
এখন চোখের জল ফেলা ও কপাল চাপড়ানো ছাড়া মালোপাড়ার চন্দনা বিশ্বাস বা দেয়াপাড়ার কালীদাসী সরকারের অন্য আর করার কী আছে?
বাংলাদেশে একদল মানুষ আছে, যারা বরাবর হিন্দুদের ওপর নির্যাতন বা তাদের প্রতি বৈষম্যকে ভারতপন্থী বুদ্ধিজীবীদের বানানো গপ্প বা ‘মিথ’ বলে চালানোর চেষ্টা করে থাকে। ২০০১ সালে নির্বাচনের পর হিন্দুদের ওপর যে অভাবনীয় নির্যাতন হয়, দেশের পত্রপত্রিকা তার সচিত্র বিবরণ ছেপেছিল। ছাপলে কী হবে, ক্ষমতায় অধিষ্ঠ হয়েই বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে সেসব বাজে কথা বলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া হয়। পার্লামেন্টে একজন হাফ মন্ত্রী এমন কথাও বললেন, কোথাও কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। ঘটার সুযোগ থাকলে তিনি নিজেও তাতে অংশ নিতেন। তাঁর কথা শুনে সংসদের হলভর্তি মানুষ হেসে কুটি কুটি হয়েছিলেন।
আশার কথা, এবার বিএনপির নেত্রী মুখ ফুটে সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। নিজের দলের বা ঘনিষ্ঠ দোসর জামায়াতের অংশগ্রহণের কথা তিনি স্বীকার করেননি, তবে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বন্ধের ব্যাপারে সোচ্চার থাকার জন্য নিজ দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নির্দেশ পাঠিয়েছেন। সেটাও একধরনের স্বীকারোক্তি। নিদেনপক্ষে, এ যাত্রায় তাঁর দলের কোনো নেতা যে ‘নির্যাতন হলে আমরাও হাত লাগাতাম’ জাতীয় কথা আগ বাড়িয়ে বলেননি, তাকে একধরনের ‘প্রগ্রেস’ বলা যায় বৈকি!

মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, একটা দেশ ও তার মানুষ কতটা সভ্য, তা বোঝার একটা উপায় সে দেশের মানুষ নিজেদের দরিদ্র ও প্রান্তবর্তী মানুষ, বিশেষ করে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার কীভাবে রক্ষা করে, তা থেকে। গান্ধী নিজে সে অধিকার রক্ষায় নিজের জীবন পর্যন্ত খুইয়েছিলেন। সভ্যতার এই মানদণ্ডে আমরা বাংলাদেশের মানুষ খুব যে এগিয়েছি, তা বলা যাবে না। হিন্দু পেটানো আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর যে হারে হিন্দু দেশত্যাগ করেছে, তা থেকেই ব্যাপারটা টের পাওয়া যায়। একসময় বাংলাদেশে হিন্দুর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ ছিল। এখন তা কমতে কমতে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে এসে ঠেকেছে। নিজের ভিটামাটি ছেড়ে এরা কেউ শখ করে দেশ ছাড়ে না, বিদেশে এদের অভ্যর্থনার জন্য কোনো তোরণও নির্মিত হয়নি। অথচ দেশের মন্ত্রী থেকে পাতিবুদ্ধিজীবী—সবাই একবাক্যে বলবেন, সব দোষ হিন্দুদের। ওদের এক পা এ দেশে, এক পা ও দেশে।
কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর সদস্যদের বেছে বেছে নির্যাতন বস্তুত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। রাজনৈতিক গোলযোগের সূত্র ধরেও যদি তেমন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে তাদের বিচারের সুযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন, এসব ঘটনার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের সুযোগ রয়েছে। একই অপরাধে কেনিয়ার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও তাঁর সহকারীকে বিচারে হাজিরা দেওয়ার জন্য হেগে তলব করা হয়েছে।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব একা সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের নয়। দেশের মানুষেরও। যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তারা আমাদের প্রতিবেশী, আমাদের ভাই ও বন্ধু। চোখের সামনে নির্যাতনের যেসব ঘটনা ঘটছে, তার প্রতিটি যথাযথ নথিবদ্ধ করা ও তদন্তের সব আলামত সযত্নে রক্ষা, যারা এসব ঘটনার সাক্ষী, তাদের আশু দায়িত্ব। অপরাধ করেও শুধু প্রামাণিক নথিপত্রের অভাবে যেন কেউ রেহাই না পায়, তা নিশ্চিত করার এখনই সময়।
নিউইয়র্ক

হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

Friday, January 3, 2014

খোলা চোখে- কূটনীতি বনাম রাজনীতি by হাসান ফেরদৌস

আমাকে মাফ করবেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের যে দাবি কোনো কোনো মহল থেকে তোলা হচ্ছে, সে ব্যাপারটা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। সে দেশের পার্লামেন্টে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, তা আমরা জানি।
কাউকে নিন্দা বা সমর্থন করে পার্লামেন্টে এ ধরনের রুটিন প্রস্তাব গ্রহণ তো নতুন কোনো ব্যাপার নয়। মার্কিন কংগ্রেসে হরহামেশাই কাউকে না কাউকে গালমন্দ করে প্রস্তাব উঠছে। সে একধরনের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। কিন্তু রাজনীতি ও কূটনীতি তো এক নয়, এই দুটোকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেললে চলবে কী করে!

পত্রিকার পাতায় অথবা রাজনৈতিক সমাবেশে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের দাবি উঠলে তাতে ভ্রু কুঁচকানোর কিছু নেই। কিন্তু এমন দাবির পক্ষে সমর্থন যদি সরকারের ভেতর থেকে আসে, তাহলে মাথা চুলকাতে হয় বইকি! বাংলাদেশ সরকারের একজন বর্ষীয়ান মন্ত্রী, যিনি নিজে একসময় কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, মুখ ফসকে বলে বসেছেন, পাকিস্তান একটি বর্বর দেশ। কথাটা শুনে ভড়কে গেছি। পুরো একটা দেশকে বর্বর বলে ফেললাম! সেখানে এখনো কয়েক লাখ বাঙালি স্থায়ীভাবে বাস করে। একাত্তরে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় জেলে যেতে হয়েছে, এমন মানুষও পাকিস্তানে আছে। পাকিস্তানি শাসকদের, অথবা সে দেশের জামায়াত বা ইমরান খানের মতো সুযোগসন্ধানী রাজনীতিকের নাম ধরে ‘বর্বর’ বা আরও কঠিন-কঠোর মন্তব্য করলে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকত না। কিন্তু পুরো একটা দেশ ও সে দেশের মানুষ?
ভারত-পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিদেশীয় চুক্তিতে ১৯৭৪-এ আমরা পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের বিচারের দাবি তুলে নিয়েছি। যে ১৯৫ জন সেনাসদস্যকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, পাকিস্তান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সে নিজেই তাদের বিচার করবে। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি পাকিস্তান রাখেনি। একটা ‘অলিখিত’ পাল্টা শর্ত ছিল, পাকিস্তান নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশকে অবিলম্বে স্বীকৃতি দেবে। তখন ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। তারপর বিভিন্ন সময়ে একাত্তরে অপরাধের জন্য পাকিস্তানের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনার দাবি আমরা তুলেছি। বিএনপি সরকারের আমলে ২০০২ সালে পাকিস্তানি সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফ বাংলাদেশ সফরে এলে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ‘অতিথি মন্তব্য খাতা’য় ১৯৭১-এ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের জন্য ‘দুঃখ’ প্রকাশ করেছিলেন। পরে, রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সেই দুঃখ প্রকাশের জন্য মোশাররফকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন এবং উভয় দেশকে বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব নিয়ে সামনে এগোতে পরামর্শ দিয়েছিলেন।
এসব কোনো কিছুতেই পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর প্রতি একাত্তরে তাদের ভূমিকার জন্য আমাদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ বন্ধ হয়নি, হবেও না। আমি এই পত্রিকাতেই মোশাররফের দুঃখ প্রকাশকে ‘লোক দেখানো ব্যাপার’ হিসেবে অভিহিত করে মন্তব্য করেছিলাম, আমাদের দেশের পাতি মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী যে যা-ই বলুন না কেন, পাকিস্তানকে ঘৃণা করার অধিকার তাঁরা কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবেন না। এমনকি পাকিস্তান যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা করে, তা-ও নয়। কারণ, এই ঘৃণার অধিকার যেন এক মশাল, যা আমাদের স্মৃতিতে একাত্তরের ইতিহাসকে জাগিয়ে রাখে, তার আগুন জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব আমার, আমাদের প্রত্যেকের।
কিন্তু তাই বলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ হোক, এমন দাবি অযৌক্তিক।
আমরা চাই বা না চাই, ভৌগোলিক কারণে দক্ষিণ এশীয় দেশ হিসেবে আমরা একই ভূখণ্ডের অধিবাসী, প্রতিবেশী। সব প্রতিবেশীর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুসম্পর্ক থাকুক, আমরা তা-ই চাই। এর এক কারণ, সুসম্পর্কের বদলে উত্তেজনা বিরাজ করলে তার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়বে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে। যেমন, বৈরিতার সুযোগ নিয়ে পাকিস্তান আমাদের দেশে সন্ত্রাসী রাজনীতি ‘রপ্তানি’ করতে পারে। আমাদের নির্বাচনী রাজনীতিতেও তারা নাক গলাতে পারে। পারে কেন, তারা সে চেষ্টা করে এবং আমাদের কোনো কোনো দল তার পুরো ফায়দা আদায় করে নেয়, এ তো একদম অজ্ঞাত ব্যাপার নয়।
নাশকতামূলক কাজে পাকিস্তানের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ ও প্রত্যক্ষ মদদ কোনো বানানো গল্প নয়, প্রতিবেশী ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে তা স্পষ্ট। ২০০৮ সালে পাকিস্তান-সমর্থিত সন্ত্রাসীদের নৃশংস হামলার রক্ত-দাগ এখনো মুছে যায়নি। সে কথা বারবার স্মরণ করে ভারতের রাজনীতিকেরা অথবা কলম লেখিয়েরা যত গরম গরম কথাই বলুন, সরকারি পর্যায়ে কিন্তু ভারত উল্টো পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। সন্ত্রাসবাদকে রুখতে হলে এই দুই দেশকেই একযোগে কাজ করতে হবে, এ কথা ভারত ও পাকিস্তানের নেতারা উভয়েই প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন।
পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য আরেক কারণ বাণিজ্যিক। মোট পরিমাণ বা মূল্যমানের হিসাবে আমাদের দুই দেশের বাণিজ্য তেমন উল্লেখযোগ্য নয়, কিন্তু সে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। গত বছর সেপ্টেম্বরেই তো বাংলাদেশ থেকে একটি বাণিজ্য প্রতিনিধিদল পাকিস্তানে গিয়ে তাদের সঙ্গে ৮০ লাখ ডলারের বাণিজ্য চুক্তি করল। এই চুক্তির ফলে পাকিস্তান থেকে আমরা তৈরি ফ্যান ও তার খুচরাংশ এবং শুকনো ফলমূল আমদানি করব। বলা বাহুল্য, পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো দেশ (যেমন ভারত অথবা চীন) থেকেও আমরা এসব আমদানি করতে পারি। কিন্তু সব কৌশলগত পরিকল্পনাবিদই জানেন, নিজের সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখতে নেই। চীন ও ভারতের ওপর আমরা এমনিতেই নানাভাবে নির্ভরশীল। সেই নির্ভরতা আরও বৃদ্ধি পেলে যেকোনো বাণিজ্যিক চুক্তিকালে নিজের স্বার্থ ধরে রাখার মতো কবজির জোর আমাদের থাকবে না। (আমাদের কোনো কোনো ভগিনী ও জায়া যে পাকিস্তানে বানানো তৈরি পোশাক ছাড়া তাঁদের ঈদ সম্পূর্ণ হলো না বলে ভাবেন, সে-ও তো একদম মিথ্যা কথা নয়! অনুমান করি, দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক বন্ধ হলে সেসব বোন-ভাবীর আহাজারি থামানো খুব সহজ হবে না।)
যদি খেলাধুলার মতো ‘ফালতু’ বিষয়ের কথাও ধরি, এই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদের দাবিতে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে, সে ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়বে। সহিংসতার ছুতোয় পাকিস্তানি ক্রিকেট দল ২০১৪ সালে এশিয়া কাপ ও বিশ্ব টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতায় যোগ না-ও দিতে পারে। বাংলাদেশে আমরা সবাই এমনিতেই ক্রিকেটপাগল। নিজের দেশের মাটিতে এমন সম্মানজনক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানের সুযোগ সে পেয়েছে, তার জন্য অপেক্ষা করছে প্রতিটি ক্রিকেট-প্রেমিক। এখন সে চেষ্টায় এক বিন্দু চুন বা গোবর এসে লাগলে, তাতে আমাদের নিজেদেরই ক্ষতি।
এ তো গেল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কথা। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে আমাদের ভাগ্য এক সুতোয় বাঁধা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্ষেত্রে আমরা বৃহৎ শক্তিগুলোর বৈরিতার মুখে রয়েছি। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় সুবিধাজনক শর্ত অর্জনের জন্য জেনেভাভিত্তিক বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় একযোগে, অথবা যৌথভাবে, পূর্বাহে গৃহীত সাধারণ সম্মতির ভিত্তিতে অংশগ্রহণ করে থাকে। এর ফলে একটা লড়াকু অবস্থান গ্রহণ আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে। ভূপৃষ্ঠের তাপ বৃদ্ধি আমাদের জন্য একটি জীবন-মরণ সমস্যা। এ ব্যাপারে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো অভিন্ন অবস্থান নেওয়ায় ধনী দেশগুলোর ‘আমরা যা বলব, তোমাদের তা-ই মানতে হবে’, এমন ঔপনিবেশিক দৃষ্টভঙ্গি কিছুটা হলেও বদলানো গেছে।
কেন পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ধরে রাখা দরকার, তার পক্ষে আরও ১৪টা যুক্তি তুলে ধরা যায়। কিন্তু আমাদের যে ব্যাপারটা বোঝার ও ভাবার, তা হলো কূটনীতি ও রাজনীতিকে আলাদা রাখার প্রয়োজনীয়তা। যার যার নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে এক বা একাধিক প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিতেই পারে। আমাদের পাশের বাড়ির মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাই ধরুন। পশ্চিম বাংলার স্বার্থ রক্ষার যুক্তিতে খোলামেলাভাবেই তিনি বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছেন। এটি তাঁর ঘরোয়া রাজনীতি, বাংলাদেশবিরোধিতার তাস ব্যবহার করে নিজের ভোটব্যাংক তিনি স্ফীত করেছেন। ঠিক একইভাবে কেন্দ্রে বিজেপি পাকিস্তানবিরোধী তাস ছিটিয়ে আগুন ধরার ব্যবস্থা করছে। বলাই বাহুল্য, তারও ওই এক কারণ, ভোট। কিন্তু কেন্দ্রে ক্ষমতায় এলে মমতা বা নরেন্দ্র মোদি দুজনেই আগ বাড়িয়ে পাকিস্তান সফরের উদ্যোগ নেবেন। আর সেটি হলো কূটনীতি।
ইংল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী চার্চিল একসময় মন্তব্য করেছিলেন, ‘কূটনীতি হলো এমন একটা “আর্ট” যে, তুমি কাউকে “জাহান্নামে যাও” বলবে এমনভাবে, যেন সে তোমার কাছে এসে সেখানে যাওয়ার ঠিকানা খোঁজ করে।’ আড়াই হাজার বছর আগে চীনা সমরবিশেষজ্ঞ সান জু পরামর্শ দিয়েছিলেন, যুদ্ধের সর্বোত্তম পথ হলো, একটা গুলি খরচ না করেও শত্রুকে ঘায়েল করা। আমি অনুমান করি, সান জুর আর্ট অব ওয়ার আমাদের নীতিনির্ধারকেরা কেউ পড়েননি। কিন্তু তাঁরা চার্চিলের পরামর্শটা তো নিতে পারেন।
প্রতিবেশী দেশ, সে যদি শত্রুও হয়, তার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ অথবা গোটা দেশটাকেই ‘বর্বর’ বলে ঢালাওভাবে গাল দেওয়া শুধু উত্তম কূটনীতি তো নয়ই, তাকে বুদ্ধিমনস্ক রাজনীতিও বলা যাবে না।
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

Thursday, January 2, 2014

খোলা চোখে- কূটনীতি বনাম রাজনীতি by হাসান ফেরদৌস

আমাকে মাফ করবেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের যে দাবি কোনো কোনো মহল থেকে তোলা হচ্ছে, সে ব্যাপারটা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। সে দেশের পার্লামেন্টে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, তা আমরা জানি।

Friday, December 6, 2013

খোলা চোখে- মুক্তিযুদ্ধ না গণতন্ত্র? by হাসান ফেরদৌস

এক অর্থহীন, অযৌক্তিক বাদানুবাদে, সোজা বাংলায় এড়ে তর্কে আমাদের ‘বাচাল শ্রেণী’ মেতে উঠেছেন। এঁদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলাদেশের জন্য কোনটা বেশি জরুরি: গণতন্ত্র, না মুক্তিযুদ্ধ?

Friday, November 29, 2013

খোলা চোখে- সত্য-মিথ্যা ও রাজনীতির ঘোলা জল by হাসান ফেরদৌস

গল্পটা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হককে নিয়ে; তবে এর সত্য-মিথ্যা আমার পক্ষে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একবার এক নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় একটা বই হাতে নিয়ে হক সাহেব বললেন, ‘আমি পবিত্র কোরআন হাতে নিয়ে বলছি, নির্বাচিত হলে আপনাদের প্রত্যেকের বকেয়া কৃষিঋণ মাফ করে দেব।’

Friday, November 1, 2013

খোলা চোখে- নির্বাচন, তারপর কী? by হাসান ফেরদৌস

বাংলাদেশে এখন আলোচনার একটাই বিষয়—রাজনীতি। পত্রপত্রিকা, টিভি বা ইন্টারনেট যা-ই বলুন—সবখানেই আলোচনা ঘুরেফিরে ওই এক বিষয়েই, তাও মুখ্যত নির্বাচন যথাসময়ে হবে কি না, আর হলে তাতে জিত হবে কার।

Friday, October 25, 2013

খোলা চোখে- আমেরিকায় ‘চাকা বন্ধের’ শিক্ষা by হাসান ফেরদৌস

আমেরিকার ‘চাকা বন্ধ’ থেকে একাধিক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে, শুধু আমেরিকার জন্য নয়, বাংলাদেশের জন্যও। পাক্কা ১৬ দিন বন্ধ থাকার পর আমেরিকার কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ফের খুলেছে।

Friday, October 11, 2013

খোলা চোখে- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দিদিগিরি’ by হাসান ফেরদৌস

ইন্দর কুমার গুজরাল একসময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। অল্প সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন। সেই সময়ের মধ্যেই তিনি ভারতের প্রতিবেশীদের সঙ্গে ‘দাদাগিরি’র বদলে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

Friday, September 27, 2013

খোলা চোখে- আমেরিকার কূটনীতিতে পালাবদল? by হাসান ফেরদৌস

প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর পঞ্চমবারের মতো জাতিসংঘের বার্ষিক অধিবেশনে ভাষণ দিলেন বারাক ওবামা।

Saturday, August 31, 2013

খোলা চোখে- খারাপ, তবে এতটা খারাপ? by হাসান ফেরদৌস

ছবিটা আপনাদের খুবই চেনা, তবু আলোচনার সুবিধার্থে তা আরেকবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক। বলছি দুটি রাজনৈতিক দলের কথা,

Saturday, July 27, 2013

রিকশা ভাড়ার দৌরাত্ম্য by সনেট দেব

আমাদের দেশে শহরের মধ্যে সড়ক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম রিকশা। কিন্তু শহরাঞ্চলে এই কয়েক বছরে রিকশা ভাড়া দেড় থেকে দুই গুণ বেড়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে রিকশাচালকরা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি বা সংসার চালাতে না পারার নানা কাহিনী বলে থাকেন।

খাদ্যে রাসায়নিক দূষণ by নওরীন ওশিন

খাদ্য দূষণ নিয়ে সবাই শঙ্কিত। দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য অধিক উৎপাদনের লক্ষ্যে কৃষিজমিতে ব্যবহৃত হচ্ছে নানা ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ এবং কীটনাশক।

শিশুশ্রম বন্ধ করুন by আসিফ আল আজাদ

শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ। সাংবিধানিক ও আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও দেশের অধিকাংশ শিশু নানাভাবে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত। অনেক শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত।