Friday, April 3, 2026

‘উলঙ্গ রাজা’: যে যুদ্ধে সবাই হেরে যাচ্ছে by সালেহ উদ্দিন আহমদ

যারা যুদ্ধ করে, তাদের মধ্যেই কারও হার হয়, কারও জিত হয়—এটাই স্বাভাবিক। যারা গোলাগুলি করে না, মিসাইল ছোড়ে না; তাদের হারও নেই, জিতও নেই। তবে ইরান যুদ্ধ এক ব্যতিক্রমী যুদ্ধ—এমন এক যুদ্ধ যাতে কারোই কোনো জয় নেই, জয় হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। এই যুদ্ধে প্রতিটি দেশই হেরে যাচ্ছে এবং প্রতিটি দেশের প্রত্যেক মানুষেরই হার হচ্ছে।

এই পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি হার, যারা যুদ্ধ শুরু করেছিল তাদের। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন যুদ্ধ শুরু করেছিল, তখন ভাবছিল দুই দিনের ব্যাপার। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বুঝিয়েছিলেন, খামেনিকে হত্যা করলেই ইরানিরা সব দলবেঁধে সরকারের বিপক্ষে রাস্তায় নামবে এবং তখন ইরানের শাহের ছেলে ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি গিয়ে সরকার গঠন করবেন। তারা অল্প সময়েই যুদ্ধে জিতে জয় ছিনিয়ে নেবে। কিন্তু হলোটা কী?  

বিখ্যাত কার্টুনিস্ট ইলা ব্যারন গার্ডিয়ান পত্রিকায় ‘সম্রাটের নতুন পোশাক’ শিরোনামে একটি কার্টুন এঁকেছেন। সেখানে ট্রামকে উলঙ্গ অবস্থায় একটা মিসাইল দিয়ে লজ্জা ঢেকে এগিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে, আর সামনে নেতানিয়াহু তাঁকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এই একটা কার্টুন অনেক ঘটনা প্রকাশ করেছে, যা সম্ভবত এক হাজার শব্দেও প্রকাশ করা যেত না।

এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দুর্বলতাগুলোকে দারুণভাবে উলঙ্গ করেছে। পৃথিবীর সর্বশক্তিশালী রাষ্ট্র, যার যুদ্ধভান্ডারে রয়েছে সব বিচিত্র যুদ্ধ সরঞ্জাম, কিন্তু যুদ্ধের এক মাসের মাথায় তাদের অবস্থা যে কী অসহায় ও উলঙ্গ হয়ে পড়েছে, তা প্রকাশ পেয়েছে এই কার্টুনে।

ট্রাম্প ও তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সস্তা ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক মিসাইলের বিরাট অংশ এরই মধ্যে নিঃশেষ করে ফেলেছেন। একটা টমাহক মিসাইলের দাম ২ দশমিক ৬ থেকে ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার। সিবিএস নিউজের খবরে প্রকাশ যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর মাত্র ৯০টি টমাহক তৈরি করে। খবরে প্রকাশ, এখন পেন্টাগন ইউক্রেনকে দেওয়া যুদ্ধ সরঞ্জাম এনে ইরান যুদ্ধে জোগান দিচ্ছে।

অনেক মার্কিন নাগরিক আছেন, যদিও তাঁদের দেশ যুদ্ধ করছে, কিন্তু যুদ্ধের এত খোঁজখবর রাখেন না। যুদ্ধের খোঁজ না রাখলেও, পকেটের খোঁজ সবাইকে রাখতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র শিল্পোন্নত দেশ, এ দেশের অনেক জিনিসই উৎপাদিত হচ্ছে জ্বালানি তেল খরচ করে।

যদিও গত দুই বছরে বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অনেক হইচই হয়েছে, তবে এক পরিসংখানে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ গাড়ি বিদ্যুৎ–চালিত। গ্যাস স্টেশনগুলোতে তেলের দাম বেড়ে গেছে প্রায় ৪০ শতাংশ, ক্যালিফোর্নিয়াতে তারও বেশি। যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমস সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে লিখেছে, ‘ইরানে চলমান যুদ্ধের পরিধি ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে; এর ফলে পেট্রলের ক্রমবর্ধমান মূল্যের প্রভাব আমেরিকান ভোক্তারা ইতিমধ্যেই অনুভব করতে শুরু করেছেন—আর ধারণা করা হচ্ছে, খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও সেই পথেই বাড়ছে।

মুদ্রাস্ফীতি ও কর্মসংস্থান বাজারের মন্থর গতিতে এমনিতেই দিশাহারা ভোক্তাদের কাছে এই যুদ্ধের নেতিবাচক পরিণতি এখন আরও একটি নতুন আর্থিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এমনকি আজই যদি এই সংঘাতের অবসান ঘটে, তবু এর অর্থনৈতিক প্রভাব সম্ভবত দীর্ঘস্থায়ী হবে।

এই যুদ্ধে নানাভাবে সবচেয়ে কোণঠাসা হয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্ররোচনায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই যুদ্ধে জড়িয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের জনমত এখন নেতানিয়াহুকে দায়ী করছে এই যুদ্ধের জন্য। ট্রাম্পের ‘মাগা’ (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) আন্দোলনের অনেক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব এখন তুমুল ইসরায়েলবিরোধী। এর মধ্যে রয়েছেন টাকার কার্লসন ও মেগ্যান কেলি—দুজনেই সাবেক ফক্স নিউজ হোস্ট, এখন দুজনেরই রয়েছে তুমুল জনপ্রিয় টক শো।

যুদ্ধেও ইরানের সঙ্গে পাল্লা দিতে ইসরায়েল দারুণ হিমশিম খাচ্ছে। ইসরায়েলের সেনাবাহিনী প্রধান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর (আইডিএফ) জনবলসংকট প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আইডিএফ নিজেই ধ্বংস হওয়ার আগে, আমি ১০ নম্বর লাল সিগন্যাল ওঠাচ্ছি।’

তাদের বিধ্বংসী অস্ত্রের ভান্ডারও শেষের পথে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ইরানের সস্তাদরি ড্রোনকে তারা আর প্রতিহত করবে না। এদিকে প্রতিদিন হাজার হাজার ইসরায়েলি নাগরিক দিনে একাধিকবার আশ্রয়শিবিরে দৌড়াচ্ছেন।

যুদ্ধ শেষে দেখা যেতে পারে যে সবচেয়ে বড় হার হয়েছে ইসরায়েলের। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, এমনও হতে পারে যুদ্ধ শেষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েলকে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করবেন। কারণ, ট্রাম্প হারা পক্ষে থাকতে পছন্দ করেন না এবং যারা তাঁকে বিভ্রান্ত করেছে তাদের সাজা দিয়ে তিনি নিজের গর্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাইবেন।

ইউরোপের দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে যোগ না দেওয়াতে ট্রাম্প দারুণ খেপেছেন। ন্যাটো জোটের ভবিষ্যৎ যে অন্ধকার, তা ট্রাম্প এখনই বলে দিয়েছেন। ইউরোপের লোকেরাও জ্বালানি তেল নিয়ে দারুণ সংকটে। ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য পুরা ইউরোপ রাশিয়ার জ্বালানি বর্জন করছিল। এখন তাদের কী হবে?

রাশিয়া একসময় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সমান প্রতিযোগী; ইরান যুদ্ধে আরেকবার টের পাওয়া গেল, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সামরিক প্রতিযোগিতায় তারা যে কত অপ্রাসঙ্গিক! এই যুদ্ধে চীনের হারও কম নয়। তারাও মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল। তাদের উন্নয়ন থমকে গেছে এবং বিশ্বজুড়ে তাদের যে রপ্তানি বাণিজ্য তা–ও হুমকির মুখে।

সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো। সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত এবং ওমান—এই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে দিয়েছিল নিজেদের নিরাপত্তার জন্য। উদ্দেশ্য ছিল বাইরের সব প্রতিঘাত থেকে যুক্তরাষ্ট্রই তাদের রক্ষা করবে। এখন হিতে বিপরীত হয়েছে। মার্কিন সামরিক ঘাঁটির জন্যই ইরান এসব দেশে হামলা করছে।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয়দের চা-শিঙাড়াতেও লাগছে ইরান যুদ্ধের আঁচ। ১৪০ কোটি মানুষের রান্নার জ্বালানি হিসেবে অপরিহার্য গ্যাস এলপিজি প্রায় ৮৫ শতাংশই আমদানি করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। যুদ্ধের জন্য ভারত এলপিজির সরবরাহ বাণিজ্যিক কাজে একদম কমিয়ে দিয়েছে। তাই ক্যানটিন, হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে জ্বালানিসংকট তীব্র হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে ভারতে অনেক খাবারের দোকানের মেনু থেকে বাদ পড়ছে জনপ্রিয় আইটেম শিঙাড়া। এমনকি ভারতের কিছু জায়গায় চিরচেনা চায়ের সেই উত্তাপ ও সুবাসও যেন হারিয়ে যেতে বসেছে।

আমাদের দেশে এখনো সরকারি ভর্তুকির বদৌলতে চা–শিঙারাতে যুদ্ধের আঁচ লাগেনি। বাংলাদেশের নতুন সরকার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে বহুমুখী সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। যুদ্ধের জন্য এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে ডিজেল ও পেট্রলের দাম ১০৮ থেকে ১৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশ সরকার স্থানীয় বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি। তাতে করে সাময়িকভাবে ভোক্তাদের ওপর চাপ পড়েনি।

সংবাদপত্রের এক খবরে প্রকাশ, বাংলাদেশে জ্বালানি তেল মজুত করা হচ্ছে গ্রামে গ্রামে, বাড়িতে, দোকানে ও গোয়ালঘরে। এটা যে কী বিপজ্জনক, একটা বাড়িতে আগুন লাগলে, বাড়ির পর বাড়ি, গ্রামের পর গ্রাম পুড়ে যেতে পারে। ইরান যুদ্ধ আমাদের বাড়ির কাছেই সংকট ও বিপদ বাড়াচ্ছে।

বাজারে উৎকণ্ঠা রয়েই গেছে, কোনো কোনো পেট্রলপাম্পে ক্রেতাদের ৮–১০ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে তেলের জন্য। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেছেন, ‘প্রতিদিন সরকার ১৬৭ কোটি টাকা জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দিচ্ছে।’ এভাবে ভর্তুকি দিলে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ খুব অল্প সময়েই নিঃশেষ হয়ে যাবে।

এই যুদ্ধে অগণিত বাংলাদেশি শ্রমজীবী মানুষ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অনিশ্চিত দিন কাটাচ্ছে। দেশে তাঁদের পরিবার ও স্বজনদের উৎকণ্ঠা বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে সামনে যে বড় ধরনের পরিবর্তন হবে, তা নিয়ে বিশ্লেষকেরা এর মধ্যেই ভবিষ্যদ্বাণী করছেন। ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতির চাপ ও উৎকণ্ঠা বিপর্যয়ে ঠেকাতে পারে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘সংঘাত ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র’ ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রায় এক মাস অতিবাহিত হওয়ার পর একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘এটি এখন স্পষ্ট যে ইরান এবং বৃহত্তর এই অঞ্চলের ওপর যুদ্ধের পরিবেশগত মাশুল অত্যন্ত ব্যাপক হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। যুদ্ধের এই পর্যায়ে পরিবেশের প্রতি প্রধান হুমকি হলো সংঘাতজনিত দূষণ; যার প্রভাব জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি স্থলজ ও জলজ বাস্তুতন্ত্র এবং মাটি ও ভূগর্ভস্থ জলাধারের মতো প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর পড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। ইরানের জন্য জলাশয়গুলোর দূষণ বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে; কারণ সেখানে দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এমনিতেই পানির উৎসগুলো ব্যাপকভাবে নিঃশেষ হয়ে গেছে।’

ইরানের অবস্থাও খুব খারাপ। একটি দেশের ওপর দুটি দেশের সর্বাধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের হামলা যদি এত দিন ধরে চলে তাহলে কী ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। তারা তাদের অন্তত ১২ জন শীর্ষস্থানীয় নেতা হারিয়েছে, প্রায় দুই হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। তবু ইরান সম্মান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ইরানের প্রেসিডেন্টের ছেলে ইউসেফ পেজেশকিয়ান লিখেছেন, ‘ইরানে কিছুই স্বাভাবিক নেই।’ এই যুদ্ধ নিয়ে যে প্রশ্নগুলো পৃথিবীর প্রতিটি লোকের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, ইউসেফ কি অবলীলাক্রমে সেই প্রশ্নগুলো তুলে আনলেন, ‘আমরা আর কত দিন লড়ব? চিরকাল? ইসরায়েলের সম্পূর্ণ ধ্বংস ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার পর্যন্ত? ইরানের সম্পূর্ণ ধ্বংস বা আত্মসমর্পণ পর্যন্ত?’

কারও কাছে কি এসব প্রশ্নের উত্তর আছে? শেষ পর্যন্ত এসব প্রশ্নের উত্তর যা–ই দাঁড়াক না কেন, যুদ্ধ শেষে কোনো জয়ী লোককে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এ জন্যই নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মনীষী বার্নার্ড শ বলেছিলেন, যুদ্ধ শুধু ঠিক করে কে অবশিষ্ট রইল।

* সালেহ উদ্দিন আহমদ, শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

ইরান যুদ্ধসহ বিভিন্ন নীতির প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ করেন দেশটির অসংখ্য মানুষ। ২৮ মার্চ ২০২৬
ইরান যুদ্ধসহ বিভিন্ন নীতির প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ করেন দেশটির অসংখ্য মানুষ। ২৮ মার্চ ২০২৬। ছবি: রয়টার্স


গর্জনকারী ধোঁয়া by অচিন সেন

আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে কোনো এক ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা আফ্রিকা মহাদেশের জাম্বিয়া রাজ্যের একটি ছোট শিল্পশহর চিংগোলায় যাইÑ অভিজিৎ ছেলের কংকোলা কপার মাইনস প্রাইভেট লিমিটেডে চাকরি সূত্রে অবস্থানকালে আমরা জাম্বিয়ার দ্রষ্টব্য স্থানগুলো দেখার সুযোগ পাই। সেই দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে জাম্বিয়ার লিভিংস্টোন প্রদেশের ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত আমার দেখা দেশ-বিদেশের প্রাকৃতিক সৃষ্টি সম্ভারের এক অন্যতম আশ্চর্য। সেই অর্থে এটি কোনো পরিকল্পনামাফিক ভ্রমণ নয়।

ভিক্টোরিয়া ফলস চিংগোলা থেকে সাতশত কিলোমিটার দূরে লিভিং স্টোন প্রদেশের দক্ষিণ প্রান্তে। যাত্রাপথ মসৃণ আফ্রিকা মহাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত সাউথ আফ্রিকা থেকে উত্তরে মিশর পর্যন্ত বিস্তৃত হাইওয়ে- আফ্রিকার বিভিন্ন রাজ্যগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক সূত্রে সংযোগকারী রাজপথ। হাইওয়ের দু’পাশের জনপদগুলো দূরে দূরে এবং জনবিরল। ফলে রাস্তাঘাট অতিমাত্রায় ভিড়ে আক্রান্ত নয়। তাই কোথাও যানজট দেখা যায়নি। পাশের লেনগুলো দিয়ে মালাবোঝাই ট্রাক কন্টেনারগুলো ছুটে চলেছে অন্তত একশ’ কিলোমিটার বেগে আপনাপন গন্তব্যভিমুখে। আমাদের পক্ষে সাতশত কিলোমিটার পথ একদিনে অতিক্রম করা অসম্ভব কিছু ছিল নাÑ আবার অনায়াসলদ্ধও নয়। তাই অসচ্ছন্দ ভেবে যাত্রাপথে বিরতি ঘটাই। জাম্বিয়ার রাজধানী লুসাকায় এক রাত্রি হোটেল বাস নিই।
পরের দিন সকাল সকাল প্রাতঃরাশ সেরে হোটেল থেকে লিভিং স্টোন অভিমুখে যাত্রা করি। এখনো বেশ খানিকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। সফর লম্বা হলেও রাস্তার ধকল অনুভূত হয়নি। ফেব্রুয়ারি মাস ওখানে বর্ষাকাল। যাত্রাপথে মাঝেমধ্যে বৃষ্টি নামে। কিন্তু বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। আমার ধারণার বিপরীতে রাস্তার দু’ধারে সবুজ পত্রপল্লবে শোভিত বৃক্ষসারি। আমার ধারণা ছিল গোটা আফ্রিকা মহাদেশটাই রুক্ষ্ম, শুষ্ক।
কিন্তু একটা জিনিসের অভাব চোখে পড়ার মতো। রাস্তার ধারে আমাদের দেশের মতো চায়ের দোকান মেলা ভার। চায়ের তৃষ্ণা মেটাতে যেখানে হোটেল কিংবা মোটেল পাওয়া যায় সেখানে যাত্রাবিরতি নিতে হয়। তবে বাক্যবিনিময়ে ভাষা সমস্যা হয় না। স্থানীয় লোকজন শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে সকলেই ইংরেজি ভাষায় অভ্যস্ত- কারণ ইংলিশ জাম্বিয়ায় সরকারি ভাষা হিসেবে বিবেচিত ১৯৬৪ সালে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরেও। যাই হোক, লোকজন, জলবায়ু, ভূপ্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে হতে ঘণ্টা চারেকের মধ্যেই জাম্বিয়ার সাউদার্ন প্রদেশ লিভিং স্টোনে পৌঁছে গেলাম। বেলা থাকতে থাকতে পূর্ব নির্দিষ্ট হোটেলে আশ্রয় পেলেও বহু আকাক্সিক্ষত ভিক্টোরিয়া ফলস দর্শনে আর শরীর নিতে চাইলো না। এখানে সূর্যাস্ত যায় সন্ধ্যা আটটায়। আটটার মধ্যেই ডিনার সেরে নিঝুম সন্ধ্যায় দূর থেকে ভেসে আসা রাগাশ্রয়ী গর্জন- কখনো বিস্ফারিত, কখনো স্তিমিত, শুনতে শুনতে কখন যে হোটেলের সুসজ্জিত বিছানায় নিদ্রায় ঢলে পড়েছি বুঝতে পারিনি- চোখের পাতা যখন নির্মিলিত হয়, তখন পরদিন সকাল সাতটা। তখনো শুনতে পাচ্ছি- সমুদ্রের পাড় ভাঙা ঢেউয়ের মতো অবিরাম নিরলস গর্জন জানান দিচ্ছে।
ভিক্টোরিয়ার এই আহ্বান উপেক্ষা করা আমাদের আর তর সইছিল না। তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা রওনা দিলাম ভিক্টোরিয়া অভিমুখে। হোটেলের অনতিদূরে ভিক্টোরিয়ার আবিষ্কর্তা ডেভিট লিভিং স্টোনের খোদাই করা মর্মর মূর্তি। স্কটল্যান্ড অধিবাসী ডেভিড লিভিং স্টোন একজন খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী মিশনারি এবং অনুসন্ধানকারী যিনি ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দে সুরিয়া এথনিক গ্রুপের প্রধান ঝবশবষরঃঁ-র সহায়তায় দুর্ভেদ্য জলজঙ্গলে ঘেরা গ্রহের সর্ববৃহৎ জলপ্রপাত ভিক্টোরিয়া ফলস আবিষ্কার করেন। সেই থেকে বিশ্বের এক ভয়ংকর সুন্দর প্রাকৃতিক সম্ভারের দরজা খুলে যায় বিশ্ববাসীর কাছে। ভিক্টোরিয়া ফলস কেবলমাত্র ভ্রমণ পিপাসুদের আকর্ষণ করে না- দলে দলে আসতে থাকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করতে।
অভিজিৎ চাকরি সূত্রে জাম্বিয়ায় দশ/বার বছর প্রবাসী থাকায় বেশ কয়েকবার লিভিং স্টোনে ভিক্টোরিয়া ফলস দর্শনে আসে- তাই আমাদের পথ প্রদর্শন এবং ফলস দর্শনে আর গাইড নেয়ার দরকার পরে না। তার কথামতো মস্তক আবরণ এবং বর্ষাতী পরিহিত হয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়ি। যত অগ্রসর হতে থাকি ভিক্টোরিয়ার গর্জন ক্রমশ বাড়ছেÑ শুনতে পাই। এইবার বুঝতে পারলাম, ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাতের নাম স্থানীয় ভাষায় গড়ংর-ড়অ-ঞঁহরধ কেন বলা হয়। গড়ংর-ড়অ-ঞঁহরধ কথার অর্থ ঞযব ধসড়ৎব ঃযধঃ ঞযঁহফরৎং. যতই এগোই জলীয় বাষ্পের ধোঁয়া ঊর্ধ্বপানে উঠতে দেখতে পাই। ১.৭ কিলোমিটারব্যাপী জলরাশি ১০০ মিটার নিচে গিরিসংকটে ভয়ঙ্কর গর্জনে আছড়ে পড়ছেÑ ফলে জলানু বাষ্পে পরিণত হয়ে ঊর্ধ্বাকাশে উঠে উষ্ণ বায়ুমণ্ডলের সংস্পর্শে পুনরায় তরলায়িত হয়ে বৃষ্টি আকারে নিচে পতিত হচ্ছে। সেই বিনা মেঘে বৃষ্টির বহর এমনই যে, সামনের যা কিছু দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।
উচ্চতায় ও ব্যপ্তিতে যথাক্রমে ৩৫৪ ফুট এবং ৫৬০৪ আকারের ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহত্তম প্রাকৃতিক ওয়াটার ফলস হিসেবে বিশ্বকোষে স্বীকৃত। ভিক্টোরিয়ার উচ্চতা উত্তর আমেরিকার নায়াগ্রা ফলসের দ্বিগুণ। গড়ংর-ড়অ-ঞঁহরধ-’র জল গর্জে পতিত হয়ে আফ্রিকার চতুর্থ বৃহত্তম নদী জাম্বেজি নদীতে মিশে প্রবাহিত হচ্ছে। জাম্বেজি জিম্বাবুয়ে এবং জাম্বিয়া রাজ্যের সীমারেখা এবং এই দু’টি দেশ ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত দ্বারা পর্যটকদের অবশ্যই দর্শনীয় স্থান। হেলিকপ্টারে উড়ে যাওয়ার সময় আমাদেরও উপর থেকে জলপ্রপাত, নেবানাল পার্ক, জাম্বেজি নদী এবং আরও অনেক কিছু দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।
১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে লিভিং স্টোন দ্বারা ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত আবিষ্কার হওয়ার পর আফ্রিকা মহাদেশের এই অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চলের পরিচিতি অনেকগুণ বেড়ে যায়- শুধু পর্যটনকে ঘিরে নয়, খনিজ-বনজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল হয়ে ওঠে সম্পদ আহরণকারীদের কাছে এক লোভনীয় কেন্দ্র- উল্লেখ্য ডাইমন্ড, তাম্র, এমনকি সোনার খনিজ আকর, বহুমূল্য বনজ গাছপালা এবং গাছদণ্ড ও প্রাণীজ চর্ম এর বিশাল ভাণ্ডার। ১৮৯০ সালে এই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার আহরণ করতে এগিয়ে আসে এক দুঃসাহসিক বৃটিশ নাগরিক সিসিল রোডস তিনি জাম্বেজি নদীর উত্তরাশেং তার কর্মকাণ্ডের সূচনাপর্বে স্থাপন করেন ব্রিটিশ সাউথ আফ্রিকা কোম্পানি। ঠিক আমাদের দেশে যেমন বৃটিশ ধুরন্ধররা বাণিজ্যকল্পে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।
সিসিল রোডস তার কাজের সুবিধার্থে ঐ ছোট ভূখণ্ডকে দুই ভাগে ভাগ করে জাম্বেজির উত্তর ভাগের নাম দেন উত্তর রোডেশিয়া এবং পরবর্তীকালে দক্ষিণাংশের নামকরণ করেন দক্ষিণ রোডেশিয়া। বৃটিশ রুল চলাকালীন উপরোক্ত দেশ দু’টি বিশ্বে উত্তর রোডেশিয়া এবং দক্ষিণ রোডেশিয়া নামেই রাজনৈতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু ১৯৬৪ সালে ডেভিড কেনেথ কাউন্ডার নেতৃত্বে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর উত্তর রোডেশিয়ার নাম সর্বসম্মতিক্রমে স্বীকৃত হয় জাম্বিয়া এবং ১৯৮০ সালে রবার্ট মোগাবের নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ রোডেশিয়া পৃথিবীর মানচিত্রে জিম্বাবুয়ে নামে পরিচিতি লাভ করে।
আর ডেভিড লিভিং স্টোনই বৃটিশ সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়ার নামেই জলপ্রপাতটির নামকরণ করেন ‘ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত’। 

গর্জনকারী ধোঁয়া

‘যাত্রা’ হবে, না ‘কাওয়ালি’ হবে...

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫ঃ নাম ঘোষণার পর থেকেই আলোচনায় ছিল ‘দেলুপি’। টিজার, পোস্টার থেকে মুক্তির তারিখ ঘোষণা—সবকিছুতেই ছিল ব্যতিক্রমী স্পর্শ। আজ শুক্রবার প্রকাশ্যে এল সিনেমাটির ট্রেলার। প্রায় পৌনে দুই মিনিটের এই ট্রেলারে ফুটে উঠেছে খুলনার প্রত্যন্ত অঞ্চলের জীবন, রাজনীতি, ভালোবাসা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যাত্রাশিল্পীদের সংগ্রাম এবং সাধারণ মানুষের টিকে থাকার লড়াই।

এর আগে প্রকাশিত টিজারে দেখা গিয়েছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সরকার পতনের ছায়া। আজকের ট্রেলারে সেই ঘটনার পরের সময়—সরকারবিহীন দেশের অনিশ্চয়তা ও ভয়, প্রতিধ্বনির মতো ভেসে এসেছে। ট্রেলারের এক চরিত্রের সংলাপেই যেন মিশে আছে পুরো ছবির প্রেক্ষাপট—‘দেশের পরিবেশ-পরিস্থিতি যা, তাতে যাত্রা হবে না কাওয়ালি হবে, বুঝে উঠতে পারছি না।’

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ‘দেলুপি’ খুলনায় মুক্তি পাবে আগামী ৭ নভেম্বর আর ঢাকাসহ সারা দেশের প্রেক্ষাগৃহে দেখা যাবে ১৪ নভেম্বর থেকে। এই সিনেমার মধ্য দিয়েই বড় পর্দায় অভিষেক ঘটছে নির্মাতা মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের। স্থানীয় গল্প, মানুষের অনুভব আর মাটির গন্ধ—এ তিনটিই তাঁর নির্মাণের মূল সুর।

তাওকীর ইসলাম বলেন, ‘আমি গণমানুষের কথা বলতে চেয়েছি সব সময়। সাধারণ মানুষের গল্প সাধারণ মানুষকে নিয়েই বলতে চাই। আমার নির্মাণগুলোতে চেষ্টা থাকে স্থানীয় অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে কাজ করার। “দেলুপি”তেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।’
সিনেমার সব অভিনেতাই খুলনার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দা। অভিনয় করেছেন চিরনজিৎ বিশ্বাস, অদিতি রায়, রুদ্র রায়, মো. জাকির হোসেনসহ অনেকে।
প্রথমবার সিনেমায় অভিনয় করেছেন চিরনজিৎ বিশ্বাস। ‘দেলুপি’ সিনেমাতে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি খুবই আনন্দিত, এই সিনেমাতে অভিনয় করতে পেরে। আমার মনে হয়, এই সিনেমাতে অভিনয় করে আমার অভিনয় স্কিল অনেকখানি ডেভেলপ করতে পেরেছি। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই টিমের সঙ্গে কাজ করে আমি খুবই আনন্দিত।’

চিরনজিৎ বলেন, ‘পরিচালক-প্রযোজকসহ টিমের প্রত্যেকটা মানুষ, সবাই মিলে আমাকে খুবই সাহায্য করেছে। আমি নতুন মানুষ, প্রথমবার সিনেমা করছি, তাঁদের কাছ থেকে খুবই সাহায্য পেয়েছি। এতে আমি অভিনয়ের জন্য আরও বেশি ইন্সপায়ার হয়েছি। পরিশেষে বলব, আমি খুবই কৃতজ্ঞ সবার কাছে যে আমি “দেলুপি” সিনেমাতে অভিনয় করতে পেরেছি।’

অন্যদিকে নূপুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন অদিতি রায়। তিনি বলেন, ‘“দেলুপি”তে অভিনয় অভিজ্ঞতা আমার খুবই ভালো। আমি কখনো এ রকম কাজ করিনি। এটাই আমার প্রথম কাজ। এর আগে আমি যাত্রায় অভিনয় করেছি। সেখান থেকে এই জায়গায় আসা; যাত্রা অভিনয় আর এখানকার অভিনয়ে আলাদা। তবে মঞ্চের আর পর্দায় দুটো অন্য রকম ছিল। সেদিক থেকে নতুন একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে আমার “দেলুপি” থেকে। সব মিলিয়ে অনেক ভালো অনুভূতি এটা।’

তিনি আরও বলেন, ‘নিজেকে বড় পর্দায় দেখব, এটা আসলে একটা স্বপ্নের মতো লাগছে আমার। তবে আমার অনেক ইচ্ছা ছিল যে কোনো একদিন হয়তো সবাই আমাকে টিভির পর্দায় দেখবে। সেই ইচ্ছাটা যে আমার এইভাবে পূরণ হবে, সেটা আমি কখনো ভাবিনি।’
‘দেলুপি’ টিমের পক্ষ থেকে দর্শকদের সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সিনেমার প্রযোজকের ভাষায়, ‘আমরা চাই দর্শক “দেলুপি”তে নিজেদের গল্প খুঁজে পাক—এই মাটির, এই মানুষের গল্প।’

‘দেলুপি’ খুলনায় মুক্তি পাবে আগামী ৭ নভেম্বর
নাম ঘোষণার পর থেকেই আলোচনায় ‘দেলুপি’। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সৌজন্যে

গলিপথ থেকে বলিউড বাদশা শাহরুখ খান

মেট গালা অভিষেক। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সময়, প্ল্যাটফরম আর প্রজন্ম পেরিয়েও শাহরুখ খান রয়ে গেছেন অমলিন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও ভাইরাল হয়ে উঠছেন বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খান। আজ তার ৬০তম জন্মদিন। অভিনন্দন বাদশাহ। তিনি সব শ্রেণির মানুষের ভালোবাসা অর্জন করেছেন। অভিনয় দক্ষতায় জেনারেশন জেড বা জেন জি’র কাছেও তিনি সমান গ্রহণযোগ্য। তারা তাকে রিমিক্স করে। মিলেনিয়ালরা তার সঙ্গে বড় হয়েছে। বেবি বুমাররা দেখেছে তার উত্থান। ভারত এবং ভারতের বাইরে কোটি কোটি মানুষের কাছে শাহরুখ খান (এসআরকে) আজও হিন্দি সিনেমার অন্যতম পরিচিত ও প্রভাবশালী মুখ। আজ তিনি ৬০ বছর পা দিলেন। এই অভিনেতা নানা ভাইরাল মুহূর্তের জন্ম দিয়েছেন। মে মাসে তিনি প্রথম ভারতীয় পুরুষ অভিনেতা হিসেবে মেট গালার রেড কার্পেটে হেঁটেছেন। জুনে এড শিরানের ‘স্যাফায়ার’ গানে একটি বিশেষ উপস্থিতি দিয়েছেন। আর অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার স্কুইড গেম তারকা লি জং-জায়ের সঙ্গে রিয়াদে একটি সেলফিতে ভাইরাল হয়েছেন। ভক্তরা সেটাকে বলেছেন ‘শতাব্দীর সেরা কোলাব’। গুগল ট্রেন্ডস দেখাচ্ছে, তার জনপ্রিয়তা মরিশাস থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে। প্রশ্ন হলো-  কীভাবে তার ‘মিথ’ সময়, দেশ, প্ল্যাটফরম পেরিয়ে আজও টিকে আছে?

মিথের আড়ালের মানুষ: ১৯৯২ সালে আত্মপ্রকাশের পর শাহরুখ খান এ পর্যন্ত ৮০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি ছিলেন প্রেমের প্রতীক ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’ (১৯৯৫)তে- যা আজও মুম্বইয়ের একটি সিনেমা হলে চলছে। তিনি ছিলেন একজন লাঞ্ছিত হকি কোচ, মুক্তির সন্ধান করছেন ‘চক দে! ইন্ডিয়া’ (২০০৭)-তে। আর সাম্প্রতিক ‘জওয়ান’ (২০২৩)-এ তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী নায়ক। সেখানে তিনি ছয়টি ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন, প্রতিটি তার পূর্বের চরিত্রগুলোর প্রতিধ্বনি। এই ছবির জন্যই তিনি সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মান পান। জার্মান ভাষার বলিউডমুখী ম্যাগাজিন ইশক-এর প্রধান সম্পাদক ভেরা ওয়েসেল বলেন, এসআরকে এমনভাবে আবেগ জাগাতে পারেন, যা অন্য কোনো অভিনেতার পক্ষে সম্ভব নয়। এমনকি তার ভক্তরাও ব্যাখ্যা করতে পারেন না কেন তার এমন প্রভাব। একবার মার্কিন টিভি হোস্ট ডেভিড লেটারম্যানকে তিনি মজা করে বলেছিলেন, আমি শাহরুখ খানের মিথের একজন কর্মচারী।

ভক্তদের চোখে শাহরুখ:
অর্থনীতিবিদ ও শাহরুখপ্রেমী শ্রেয়না ভট্টাচার্য তার বই ‘ডেমপারেটলি সিকিং  শাহরুখ খান’ (২০২১)-এ নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে শাহরুখের মিথকে বিশ্লেষণ করেছেন। তার মতে, শাহরুখ খান এমন এক প্রতীক, যার মাধ্যমে ভারতীয় নারীরা- বিভিন্ন বয়স, শ্রেণি, অঞ্চল ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে- নিজেদের আকাক্সক্ষা, হতাশা ও স্বাধীনতার অনুসন্ধানকে ব্যক্ত করেছে। একজন অভিবাসী গৃহকর্মীর কাছে শাহরুখের পর্দায় পরিবারের কাজে সাহায্য করা বা কোমল আচরণ ছিল বিরল স্বীকৃতি- এমন দেশে যেখানে পুরুষদের ‘কেয়ার লেবার’-এ অংশগ্রহণ বিশ্বের অন্যতম কম। উচ্চবিত্তদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ভারতীয় উদার অর্থনীতির মেধার প্রতীক। আর প্রথম প্রজন্মের নারী পেশাজীবীদের জন্য তার সিনেমা ছিল সামাজিক চাপে দমে যাওয়া আত্মার প্রশান্তি- যারা বিবাহের বদলে ক্যারিয়ার বেছে নিয়েছিলেন। শ্রেয়না ভট্টাচার্য বলেন, ১৫ বছর ধরে আমি তার নারীভক্তদের জীবন, ভালোবাসা ও কর্মজীবন অনুসরণ করেছি। আমি জানি শাহরুখ খানকে ঘিরে একক কোনো তত্ত্ব দেয়া অসম্ভব- প্রত্যেকে তার ওপর নিজেদের আলাদা স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা আর কল্পনা প্রতিফলিত করেছে।

জেনারেশন জেডের রিমিক্সে: ‘৯০-এর দশকের বয়ব্যান্ডগুলোর মতো, শাহরুখের ভক্তরাও সময়ের সঙ্গে বেড়ে উঠেছেন- অনেকেই তাদের সন্তানদের মধ্যেও সেই ভালোবাসা ছড়িয়ে দিয়েছেন। তার প্রবাসী ভারতীয় চরিত্রগুলো ৩.৫ কোটি ভারতীয় প্রবাসীর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি করেছে এবং অনেক বিদেশি দর্শককেও হিন্দি সিনেমায় টেনেছে। ভেরা ওয়েসেল বলেন, ভারত এখন বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দেশ ও বিশাল বাজার। শাহরুখ খানের তারকাখ্যাতি ছড়াতে আলাদা প্রচেষ্টা লাগে না। তিনি যোগ করেন, এড শিরানের মতো শিল্পীদের পক্ষে শাহরুখের সঙ্গে কাজ করা কেবল স্বাভাবিক নয়, বুদ্ধিদীপ্তও। এখনকার তরুণ প্রজন্মের কাছেও শাহরুখ খান ‘মিম’, ‘টিকটক’ ও ‘রিমিক্স’-এর ভাষায় বেঁচে আছেন। তার বিখ্যাত গান ও হাত মেলানো, বাহু মেলে ধরা ভঙ্গি নতুন করে ভাইরাল হচ্ছে। কানাডীয়-ভারতীয় র‌্যাপার টেশারের ‘ইয়াং শাহরুখ’ গানটি, যা ‘কভি খুশি কভি গম’ (২০০১)-এর একটি গান থেকে নেয়া, ইউটিউবে ২ কোটির বেশি ভিউ পেয়েছে। আর শাহরুখ নিজেও সেই গানে নেচেছেন। বৃটিশ গায়িকা দুয়া লিপার ‘লেভিটেটিং’ গানটি মেশানো হয়েছিল শাহরুখের ‘বাদশাহহ’ (১৯৯৯)-এর ‘ও লাড়কি যা’ গানের সঙ্গে, যা তিনি মুম্বইয়ে লাইভ কনসার্টে পরিবেশন করেন। দর্শকদের মধ্যে ছিলেন শাহরুখের মেয়ে সুহানাও, যিনি সেই মুহূর্তটি ইনস্টাগ্রামে হৃদয়চিহ্নসহ পোস্ট করেন।

সময়ের ওপারে এক আইকন: ভেরা ওয়েসেল মনে করেন, শাহরুখ খানের স্থায়ী প্রভাবের পেছনে তার অসাধারণ ব্যবসায়িক বুদ্ধি আছে। তিনি ছিলেন প্রথম দিকের ভারতীয় তারকাদের একজন, যিনি অনলাইনে ভক্তদের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তুলেছিলেন। ইনস্টাগ্রামে তার ৪৮.৮ মিলিয়ন অনুসারী আছে, যেখানে তিনি নিয়মিত বড় বড় ব্র্যান্ডের প্রচারণা করেন। ওয়েসেল বলেন, তিনি যখনই কথা বলেন- সিনেমায় হোক বা প্রকাশ্যে- সবসময় আশার বার্তা দেন, সরল ভাষায়, রসিকতার ছোঁয়ায়। আর তার মতে, ফ্যাশন ও ট্রেন্ড বদলায়, কিন্তু শাহরুখ খানের জনপ্রিয়তা একদম কালজয়ী।

https://mzamin.com/uploads/news/main/187738_1.webp

‘মশা মারতে কামান দাগা’ কথাটি যেভাবে এল by মাহবুব আলম

সে অনেক আগের ঘটনা। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পর ইংরেজরা লর্ড ক্লাইভকে নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শনে যান। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী একবার তাঁরা কলকাতা পরিদর্শনে আসেন। লর্ডের আগমন উপলক্ষে আলাদা প্যান্ডেল বানানোর পাশাপাশি উঁচু সিংহাসনের মতো কিছু চেয়ারও বসানো হয়। অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে লর্ড ক্লাইভ যখন বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, তখনই হামলা শুরু হয় তাঁর ওপর।

না! মানে বাংলার কেউ হামলা করেনি; করেছে মশা! একটি নয়, দুটি নয়, হাজার হাজার মশার অতর্কিতে আক্রমণ। এমন আক্রমণে দিশাহারা হয়ে স্ক্রিপ্টের বাইরে গিয়ে কথা বলতে শুরু করেন লর্ড ক্লাইভ।

‘আই উইল ডেস্ট্রয় বেঙ্গল, সরি, প্রোটেক্ট বেঙ্গল অ্যাট অ্যানি কস্ট। ফর গডস সেক, সামওয়ান প্লিজ ব্রিং সাম গানস অ্যান্ড শুট দিস মসকিউটোস।’

অবস্থা বেগতিক দেখে ইংরেজরা ওখানেই অনুষ্ঠান শেষ করেন। তবে ঘটনাস্থল থেকে লর্ড ক্লাইভসহ অন্যদের ওপর আক্রমণকারী তিনটি মশাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যান তাঁরা।

ইংরেজ শাসকদের কামড়ানোর অপরাধে বন্দী করা হয় এই তিন মশাকে। পরদিন তাদের আদালতে উপস্থিত করা হলে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ডে কী হয়, এ নিয়ে মশা তিনটির কোনো ধারণাই ছিল না। কারণ, এর আগে কামড়ানোর অপরাধে মানুষের চড়থাপ্পড় খেলেও কখনো রিমান্ডের খপ্পরে তারা পড়েনি। ছিদ্রহীন নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় একটা ছোট রুমে রাখা হলো তাদের।

‘দোস্ত, আমরা কাকে কামড়ালাম যে আমাদের এভাবে ধরে নিয়ে এল?’ প্রথম মশা বলল।

‘মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তিকে কামড়েছি। দেখিসনি, রক্তটা একটু ভিন্ন স্বাদের ছিল।’ দ্বিতীয় মশার জবাব।

‘ওটা রক্ত ছিল? ধুর শ্লা, আমি আরও ভাবছিলাম বাঙ্গির জুস খাচ্ছি। একদমই পানসে।’ তৃতীয় মশার গলায় হতাশার সুর।

পরদিন মস্ত বড় গোঁফ নিয়ে ইংরেজ জেলার আসেন মশাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে।

‘ইউ টাইনি ব্লাড সাকারস, হাউ ডেয়ার ইউ বাইট আওয়ার লর্ড?’দাঁত কটমট করে জানতে চাইলেন জেলার।

‘দুঃখিত মশাই, আমরা সবাই বাংলা মিডিয়ামের মশা। ইংরেজি বুঝি না। বাংলার ব্যবস্থা করেন।’

মশাদের উত্তর বুঝতে তাৎক্ষণিকভাবে বাংলা অনুবাদক হিসেবে ইংরেজদের প্রিয় ব্যক্তি মীর জাফরকে নিয়ে আসা হলো। মীর জাফরের মাধ্যমেই চলল জিজ্ঞাসাবাদ।

‘লর্ড ক্লাইভকে কামড়ানোর দায়ে যে তোদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা ফাঁসি হতে পারে, সেটা তোরা জানিস?’ জানতে চাইলেন জেলার।

‘খাওয়ার মধ্যে তো শুধু একটু রক্তই খাই। আপনাদের মতো তো আর যা পাই তা-ই চিবাই না। সেই সামান্য খাবারের দায়েও ফাঁসি? এ তো দেখছি রীতিমতো অন্নপাপ! বাপরে বাপ!’ সমস্বরে দুই মশা বলে উঠল।

‘চুপ করো। তোমরা স্যারের গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যাঘাত ঘটিয়েছ। এর জন্য শাস্তি অবধারিত।’

‘আপনারা যে কয়েল জ্বালিয়ে, স্প্রে ছিটিয়ে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটান, সেটার দায়ে আমরা কখনো কাউকে গ্রেপ্তার করেছি? এই তো সেদিন আমার গার্লফ্রেন্ড এডিসকে নিয়ে নর্দমায় বসে একটু একান্তে সময় কাটাচ্ছিলাম। কোথা থেকে কে যেন এসে স্প্রে মেরে দিল। স্প্রের আঘাতে আমার গার্লফ্রেন্ডের একটা ডানা গেল ভেঙে। কী দরকার ছিল আপনাদের ওকে ডানাকাটা পরি বানিয়ে দেওয়ার? কই, এর জন্য তো আমি আপনাদের কাউকে গ্রেপ্তার করিনি, কারও বিরুদ্ধে মামলাও করিনি।’ প্রথম মশা জবাব দিল।

‘যত বড় হুল নয় তত বড় কথা! চুপ থাকো, বেয়াদব কোথাকার।’ রেগে গেলেন জেলার।

‘শাস্তি যদি দিতেই হয়, তাহলে আমরা যা করেছি, সেই একই কাজ লর্ডকেও করতে বলুন। বলুন আমাদের কামড় দিতে। তাহলেই সমান সমান হয়ে যায়।’ দ্বিতীয় মশা প্রস্তাব দিল।

এমন সময় লর্ড ক্লাইভের আগমন ঘটল।

‘বাহ্, এমন প্রস্তাবের তারিফ না করে আর পারছি না। সেনাপতি, এদের নিয়ে আর নাটক করা লাগবে না। এখনই আমার ছেলের কাছ থেকে স্টিলের রুলারটা নিয়ে আসো। রুলার দিয়ে চটাস করে বাড়ি দিয়ে ওদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করো। এক্ষুনি!’ আদেশ দিলেন ক্লাইভ।

‘স্যার, এত চুপচাপ, বিনে পয়সায় মশা মেরে ফেললে চলবে?’ কানের কাছে ফিসফিস করে বলেন সেনাপতি। ‘এসব কাজে বড়সড় একটা প্রকল্প হাতে না নিলে হয়? প্রকল্প হবে, কথাবার্তা হবে, হাজার হাজার স্বর্ণমুদ্রা খরচ হবে…মোট কথা আওয়াজ হতে হবে। তবেই না লোকজন জানবে, লর্ড একটা কিছু করছেন…।’

সেনাপতির কথা শুনে লর্ড ক্লাইভের বুদ্ধির বাতি জ্বলে উঠল। তুড়ি দিয়ে তিনি বললেন, ‘স্পিকিং অব আওয়াজ…আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে। মশাগুলোর ওপর কামানের গোলা ছুড়লে কেমন হয়? মশা মরবে। আবার আওয়াজও হবে।’

পরদিন ঢাকঢোল পিটিয়ে কামানের মাথায় মশা দুটিকে বেঁধে কয়েক রাউন্ড গোলা ফুটিয়ে দেওয়া হলো। আশ্চর্য! একটা মশাও মরল না। বরং কামানের গোলায় বসে কোনো প্রকার ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়াই মশাগুলো আছড়ে পড়ল এসে বাংলাদেশে!

এভাবেই এই ‘অর্ধেক পাখি, অর্ধেক পোকা’ প্রাণীটির আগমন ঘটে ঢাকায়। সেই থেকে শুরু করে আজ ২৬৭ বছর পর এক বিশাল রাজ্যের অধিকারী এরা। কামড়ানোর দায়ে একসময় যাদের জেলে পাঠানো হতো, তারাই এখন মানুষকে কামড়িয়ে হাসপাতালে পাঠায়!

‘মশা মারতে কামান দাগা’ কথাটি যেভাবে এল

মৃত্যু নিয়ে মাসুদ আলী খান যা বলেছিলেন

‘যথেষ্ট পেয়েছি। আমি সন্তুষ্ট। জীবন নিয়ে কোনো খেদ নেই আমার।’ মৃত্যুর দুই বছর আগে প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এভাবেই বলেছিলেন মাসুদ আলী খান। দীর্ঘ সেই সাক্ষাৎকারে কথা বলেছিলেন নিজের কাজ নিয়ে। মৃত্যু নিয়েও প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন। কী বলেছিলেন তিনি।

জন্মদিন উপলক্ষে নেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয় জন্মদিন নিয়ে। মাসুদ আলী খান বলেছিলেন, ‘অনেকে জন্মদিনটা ভীতিকর মনে করে। অনেক এ-ও ভাবে, বয়স এত বছর হয়ে গেল! আমার কাছে এটা খুবই সহজাত ব্যাপার। তাই আমি ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করি।

বয়স কমে যাচ্ছে, মৃত্যুর দিকে এক বছর এগিয়ে গেলাম—এমনটা কখনোই ভাবি না। মৃত্যুর যথাসময়েই আসবে, এটা নিয়ে অযথা ভেবে মাথা খারাপ করার কোনো মানে হয় না। ছোটবেলায় তো কখনো জন্মদিন উদ্‌যাপন করা হতো না। এখন নাতি-নাতনিরা আছে, ওরা দাদা-নানার জন্মদিন মনে করিয়ে দেয়।’

ফেলে আসা জীবন নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ ছিল না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘এখন আহ্বান করছি মৃত্যুর। মনে হয়, দেখলাম তো অনেক, আর কীই-বা দেখার আছে, পাওয়ার আছে। যদিও মানুষ বলে, পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কখনো শেষ হয় না। আমার তা কখনোই মনে হয় না। যথেষ্ট পেয়েছি। আমি সন্তুষ্ট। জীবন নিয়ে কোনো খেদ নেই আমার।’ জন্ম ও মৃত্যু বিষয়ে তাঁর ভাবনা ছিল এমন, ‘জন্মে মানুষের যেমন হাত নেই, মৃত্যুতেও নেই। তবে ইদানীং একটা জিনিস আমাকে খুব কষ্ট দেয়। ভাবতে থাকি, আমার খেলার সাথি যারা ছিল, অভিনয়ে, খেলাধুলায়—চারদিকে তাকালে দেখি, এখন আর কেউ নেই।

আমি যাদের কথা মনে করতে পারি, তারা কেউ নেই। কদিন আগে গ্রামে গিয়েছিলাম, সম্পর্কে ভাই হয়, মজিবুর রহমান খান, দেখলাম, তিনি শুধু বেঁচে আছেন। এসব ভাবলে খুব বেদনা দেয়।’

বরেণ্য এ অভিনেতা এখন আর নেই। ২০২৪ সালেই এই দিনে অর্থাৎ ৩১ অক্টোবর রাজধানীর নিজ বাড়িতেই মৃত্যু হয়েছে এই গুণী অভিনেতার। আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। মাসুদ আলী খানের জন্ম ১৯২৯ সালে ৬ অক্টোবর মানিকগঞ্জের পারিল নওধা গ্রামে।

সাত দশকের অভিনয়জীবন তাঁর। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র—তিন মাধ্যমে সমানতালে কাজ করেছেন। ‘কূল নাই কিনার নাই’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘একান্নবর্তী’, ‘পৌষ ফাগুনের পালা’ নাটকে যেমন অভিনয় করেছেন, তেমনি ‘নদী ও নারী’, ‘দুই দুয়ারি’, ‘মাটির ময়না’, ‘মোল্লাবাড়ীর বউ’ চলচ্চিত্রেও ছিল তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2024-05%2F3d4fb897-5de5-41ef-a7f6-e29e223c08d7%2Fm_thumb.jpg?rect=0%2C0%2C2700%2C1800&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
আজ মাসুদ আলী খানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। কোলাজ

তরুণদের নাখোশ করে ‘বুড়োদের যুদ্ধ’ চালাচ্ছেন ট্রাম্প by স্টিফেন ওয়েরদাম

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার খবরটা ২০২৬ সালের সঙ্গে যেন একেবারেই মিলছে না। মনে হচ্ছে, পুরোনো কোনো গল্প আবার ফিরে এসেছে।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা, চাপ দিয়ে সরকার ফেলে দেওয়া—এসব তো ৯/১১–পরবর্তী সময়ের নব্যরক্ষণশীলদের পুরোনো চিন্তা। তখনকার নেতারা এসব নিয়ে ভাবতেন। এখনকার কলেজপড়ুয়া তরুণদের জন্মই তখন হয়নি। এরপর যেসব মার্কিন প্রেসিডেন্ট এসেছেন, তাঁদের প্রায় সবাই বলেছিলেন—মধ্যপ্রাচ্যে সরকার বদলে দেওয়ার যুদ্ধ আর করা হবে না। সবচেয়ে জোর গলায় এ কথা বলেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সেই পুরোনো পথেই আবার হাঁটা শুরু হয়েছে।

‘ইউএসএ’ লেখা ক্যাপ পরে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প এক রাতে ভিডিও বার্তায় ইরানে হামলার ঘোষণা দিলেন, তখন তাঁর কথাবার্তায়ও যেন পুরোনো দিনের ছাপই বেশি ছিল। ইরান এখনই বড় কোনো বিপদ তৈরি করেছে—এমন কিছু তিনি বোঝানোর চেষ্টাই করেননি; বরং ১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গঠনের পর থেকে ইরান কী কী করেছে—সেই পুরোনো ঘটনাগুলোই একে একে তিনি বলে গেছেন। যেমন ‘ডেথ টু আমেরিকা’ স্লোগান, মার্কিন দূতাবাস দখল—এসব বহু আগের কথা তিনি বলে গেছেন।

এসব বলতে বলতে ট্রাম্প আসলে বুঝিয়ে দিলেন, এই যুদ্ধ আজকের পরিস্থিতির জন্য নয়, ভবিষ্যতের জন্যও নয়—এটা যেন পুরোনো হিসাব চুকানোর চেষ্টা। এমনকি তিনি নিজেই এই যুদ্ধকে হালকাভাবে ‘ছোট্ট অভিযান’ বলেও উল্লেখ করেছেন।

এই যুদ্ধের বেমানান চরিত্র শুধু নেতাদের বয়সে নয়, আমেরিকার সমাজেও স্পষ্ট। ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে এই যুদ্ধের সমর্থন তুলনামূলক বেশি। বয়স যত কমছে, যুদ্ধের সমর্থনও তত কমছে। ৩০ বছরের নিচের তরুণদের মধ্যে মাত্র পাঁচজনের একজন এই যুদ্ধকে সমর্থন করে। এ কারণেই একে অনেকেই ‘বুমার যুদ্ধ’ (১৯৪৬ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে ‘বুমার’ বলে। অর্থাৎ ২০২৬ সালে এই প্রজন্মের বয়স হবে প্রায় ৬২–৮০ বছর) বলছেন।

অদ্ভুতভাবে এই যুদ্ধবিরোধী মনোভাবই হয়তো যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করেছে। মিলেনিয়াল ও জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতি দ্রুত কমে যাওয়ায় ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হয়তো ভেবেছেন—এখনই শেষ সুযোগ। এখনই যদি ইরানের সরকারকে সরানো না যায়, ভবিষ্যতে আর পারা যাবে না।

এই যুদ্ধকে একদিকে যেমন পুরোনো সময়ের ‘শেষ চিৎকার’ মনে হয়, তেমনি এতে একধরনের আশা-নিরাশার মিশ্র অনুভূতি আছে। হতাশা এ কারণে যে এত শিক্ষা নেওয়ার পরও এমন হামলা হওয়া উচিত ছিল না। আর আশার কারণ—হয়তো ভবিষ্যতে এমন যুদ্ধ আর দেখা যাবে না। এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের মতো হয়ে উঠতে পারে, যেমনটি ব্রিটেন ও ফ্রান্সের জন্য হয়েছিল। ওই সময় সুয়েজ সংকটের জেরে মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের প্রভাব বিস্তারের দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটে।

সুয়েজ সংকটের সময় সে সময়কার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশ ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ওপর চাপ দিয়ে যুদ্ধ থামিয়েছিলেন। কিন্তু আজকের বিশ্বে অবশ্য এমন কোনো শক্তি নেই, যে আইজেনহাওয়ারের মতো চাপ দিয়ে আমেরিকাকে যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করতে পারবে।

তবে এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কতটা সামরিকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং কৌশলগতভাবে কতটা শৃঙ্খলাহীন হয়ে উঠেছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহেই তারা বিপুল পরিমাণ উন্নত অস্ত্র এমন এক অঞ্চলে ব্যবহার করেছে, যেটিকে মাত্র চার মাস আগেও নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তাকৌশলে কম গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছিল।

ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিপত্রেই লেখা ছিল—মধ্যপ্রাচ্য আর আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্র নয়; যেখানে স্বাভাবিকভাবে পরিবর্তন আসে, সেখানেই উৎসাহ দিতে হবে, বাইরে থেকে কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো সেই নীতির সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটা হচ্ছে।

এর মধ্যেই নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে—ট্রাম্প হয়তো ইরানে স্থলবাহিনী পাঠাতে পারেন। লক্ষ্য হতে পারে ইস্পাহানে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দখল করা অথবা সেই খারগ দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, যেখান দিয়ে ইরানের বেশির ভাগ তেল রপ্তানি হয়। এমন কোনো পদক্ষেপ নিলে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়বে, আর পুরো অঞ্চলে ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কাও তীব্র হবে।

এই যুদ্ধ শেষ হলেও যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আরও গভীরভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে। যুদ্ধবিরতি হলেও তা হবে নড়বড়ে। এদিকে উপসাগরীয় মিত্রদেশগুলো (সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার) খুব দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আরও শক্ত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাইতে পারে।

ইরানের বর্তমান হামলা যেমন আরব দেশগুলোকে আতঙ্কিত করছে, তেমনি তারা আশঙ্কা করছে—একটি প্রতিশোধপরায়ণ ও আরও কট্টরপন্থী ইরান ভবিষ্যতে কী করতে পারে। ফলে তারা চাইবে, আবার হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র যেন সরাসরি তাদের হয়ে যুদ্ধে নামে। তখন আমেরিকান জনগণকে বোঝানো হবে—শক্তি প্রদর্শনই শান্তির একমাত্র পথ।

কিন্তু বাস্তবতা হলো যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে আজকের এই পুরোনো ধাঁচের যুদ্ধই ভবিষ্যতের নিয়ম হয়ে উঠতে পারে।

* স্টিফেন ওয়েরদাম, কার্নেগি এন্ডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের আমেরিকান স্টেটক্রাফট প্রোগ্রামের সিনিয়র ফেলো
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিকদের বিক্ষোভ
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিকদের বিক্ষোভ। রয়টার্স