Thursday, July 24, 2025

ক্ষুধা গাজায় বোমার মতো মানুষ মারছে, ২৪ ঘণ্টায় ১০০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা

ফিলিস্তিনের গাজায় অনাহারে আরও অন্তত ১০ ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে উপত্যকাটিতে ক্ষুধা ও চরম অপুষ্টিতে ভুগে অন্তত ১১১ ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। অনাহারে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশই শিশু। ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছেন গত কয়েক সপ্তাহে।

এদিকে গাজায় ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ১০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৪ জন ত্রাণ নিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলেছে, এ বছর এখন পর্যন্ত অপুষ্টিজনিত কারণে গাজায় যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী ২১টি শিশু রয়েছে।

ডব্লিউএইচও গত মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রায় ৮০ দিন গাজায় কোনো খাদ্য সরবরাহ করতে পারেনি। সংস্থাটি বলেছে, এখন যে খাদ্যসহায়তা চালু হয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

১১১টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজায় গণহারে মানুষ অনাহারে রয়েছে। অথচ গাজার বাইরে টনকে টন খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী পড়ে রয়েছে। ত্রাণ বিতরণের জন্য সহায়তাকারী সংস্থাগুলোকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

গাজার মধ্যাঞ্চলের দেইর আল-বালাহ থেকে আল–জাজিরার প্রতিনিধি তারেক আবু আজ্জুম বলেছেন, ‘ক্ষুধা এখন বোমার মতোই প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। পরিবারগুলো আর পর্যাপ্ত খাবার চাইছে না, তারা এখন যা হোক কিছু একটা চাইছে।’

গাজার বাসিন্দারা এ পরিস্থিতিকে একটি ধীর, যন্ত্রণাময় মৃত্যুর প্রক্রিয়া বলে বর্ণনা করছেন; যা বাস্তবে তাঁদের সঙ্গে ঘটছে। তারেক আবু আজ্জুম বলেন, ‘এটি একটি পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ। ইসরায়েলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে এটা চাপিয়ে দিচ্ছে।’

ইসরায়েল মার্চ থেকে গাজায় কোনো পণ্য প্রবেশ করতে দেয়নি। মে থেকে সামান্য পরিমাণে ত্রাণ ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে। ওই ত্রাণও মূলত বিতরণ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল–সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ)। সংগঠনটির ত্রাণ বিতরণ কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক আছে।

জিএইচএফের ত্রাণকেন্দ্রগুলোর আশপাশে ত্রাণের আশায় ভিড় করা ফিলিস্তিনিদের ওপর নিয়মিত হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটছে।

জাতিসংঘ ও অন্যান্য ত্রাণসহায়তা প্রদানকারী সংগঠনগুলো বলছে, ইসরায়েল গাজায় প্রবেশ ও বহির্গমন নিয়ন্ত্রণ করে। তারা গাজায় ত্রাণসহায়তা পৌঁছানোর পথ বন্ধ করে রেখেছে। আর ইসরায়েলি সেনারা মে থেকে ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলোর কাছে শত শত ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করেছেন।

জাতিসংঘ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির জরুরি অবস্থাবিষয়ক পরিচালক রস স্মিথ বলেন, ‘গাজায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আমাদের একটি ন্যূনতম শর্তাবলি পূরণ করতে হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টিতে আমি জোর দিতে চাই তা হলো, আমাদের বিতরণকেন্দ্র এবং ত্রাণবাহী গাড়িবহরের কাছে কোনো সশস্ত্র বাহিনী থাকা চলবে না।’

অধিকৃত ফিলিস্তিন অঞ্চলের ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধি রিক পিপারকর্ন বলেন, ত্রাণ নিতে আসা মানুষের ওপর একের পর এক হামলার ফলে গাজায় অবশিষ্ট থাকা কিছু হাসপাতাল এখন ‘বৃহৎ ট্রমা ওয়ার্ডে’ পরিণত হয়েছে।

পিপারকর্ন আরও বলেন, খাদ্যের এমন চরম সংকট চলছে যে মানুষ স্বাভাবিক কাজকর্মই করতে পারছে না। এমনকি খাদ্যসংকটে সাংবাদিক, শিক্ষক, ডব্লিউএইচওর নিজস্ব কর্মীরাও নিজেদের কাজ করতে পারছেন না।

গাজা নগরের আল-শিফা হাসপাতালের চিকিৎসক নূর সরাফও সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘মানুষ দিনের পর দিন না খেয়ে থাকছে। এখন তারা অনাহারে মারা যাচ্ছে। অনেক সময় চিকিৎসকেরা খাবার পান না, তবু তাঁরা কাজ করে যান।’

 মোসাব আল-দেবসের বয়স ১৪ বছর। তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে সে। আল-শিফা হাসপাতাল থেকে তোলা
মোসাব আল-দেবসের বয়স ১৪ বছর। তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে সে। আল-শিফা হাসপাতাল থেকে তোলা। ছবি: রয়টার্স

শত শত মুসলিমকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে বিতাড়ন করেছে ভারত

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট: সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ শত শত জাতিগত বাঙালি মুসলিমকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ আখ্যা দিয়ে প্রক্রিয়াগত আইন মানা ছাড়াই বাংলাদেশে বিতাড়ন করেছে। তাদের অনেকেই বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর ভারতীয় নাগরিক। ২০২৫ সালের মে মাস থেকে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার জাতিগত বাঙালি মুসলিমদেরকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার অপারেশন তীব্র করেছে। বিশেষত আইনি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ভারতে প্রবেশ বন্ধ করার জন্য এটা করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দীর্ঘ এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে। তারা ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া এভাবে বেআইনিভাবি লোকজনকে অন্য দেশে ঠেলে দেয়া অবশ্যই বন্ধ করতে হবে সরকারকে।

পরিবর্তে খেয়ালখুশিমতো আটক ও দেশ থেকে বের করে দেয়ার বিরুদ্ধে যথাযথ সুরক্ষামুলক ব্যবস্থা প্রতিজনের জন্য নিশ্চিত করতে হবে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ইলেন পিয়ারসন বলেন, ভারতীয় নাগরিকসহ দেশ থেকে বাঙালি মুসলিমদের খেয়ালখুশিমতো বের করে দেয়ার মাধ্যমে ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার বৈষম্যে ইন্ধন দিচ্ছে। তাদের দাবি যে তারা কেবল অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ করছে। এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ তারা প্রক্রিয়াগত অধিকার, দেশীয় আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডকে উপেক্ষা করছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে এসব বিষয়ে ১৮ জন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেয় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এর মধ্যে আছেন ৯টি ঘটনায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা ও তাদের পরিবার। এর মধ্যে আছেন ওইসব ভারতীয় নাগরিক, যাদেরকে বাংলাদেশে জোর করে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল, পরে তারা ভারতে ফিরেছেন। এছাড়া আছেন যেসব ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে তাদের পরিবারের সদস্য। ওই আটক ব্যক্তিরা এখনও নিখোঁজ।

এ নিয়ে ৮ই জুলাই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের অনুসন্ধান সম্পর্কে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি লেখে। তবে তারা কোনো জবাব দেয়নি। রিপোর্টে আরও বলা হয়, ভারত সরকার এখনো বিতাড়িতদের কোনো সরকারি সংখ্যা জানায়নি। তবে বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড জানিয়েছে, ৭ মে থেকে ১৫ জুনের মধ্যে ভারত ১৫ শতাধিক মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। তার মধ্যে প্রায় ১০০ জন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা শরণার্থী। আটক এসব মুসলিমের বেশির ভাগই দরিদ্র শ্রমিক। আসাম, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, ওড়িশা ও রাজস্থানের বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে পুলিশ সেই মুসলিমদের আটক করে সীমান্তরক্ষীদের হাতে তুলে দিচ্ছে। সীমান্তরক্ষীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা আটক ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব যাচাই না করেই মারধর ও হুমকি দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে। পরে প্রমাণিত ভারতীয় নাগরিকদের অনেককেই ফের দেশে নিতে হয়েছে। এ অভিযান শুরু হয় এ বছর এপ্রিলে জম্মু ও কাশ্মীরে হিন্দু পর্যটকদের ওপর বন্দুকধারীদের হামলার পর। এরপর পুলিশ মুসলিমদের হয়রানি শুরু করে, নাগরিকত্ব দাবি অগ্রাহ্য করে, ফোন, নথি ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করে। ফলে তারা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ হারায়।

আসামের বাসিন্দা ৫১ বছর বয়সী সাবেক শিক্ষক খায়রুল ইসলাম জানান, ২৬ মে বিএসএফ তার হাত বেঁধে মুখে কাপড় গুঁজে ১৪ জনের সঙ্গে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠায়। তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশে যেতে অস্বীকার করলে বিএসএফ কর্মকর্তা আমাকে পেটায়। চারবার রাবার বুলেট ছোড়ে। দুই সপ্তাহ পর তিনি ভারতে ফিরতে সক্ষম হন। বিজেপি নেতারা বহুবার বাংলাদেশের অভিবাসীদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে অভিহিত করেছেন এবং একই শব্দ ব্যবহার করে ভারতের মুসলিমদেরও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হেয় করেছেন। মে মাসে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজ্যগুলোকে নির্দেশ দেয় ৩০ দিনের মধ্যে ‘অবৈধ অভিবাসী শনাক্ত ও বিতাড়ন’ করতে এবং প্রত্যেক জেলায় আটককেন্দ্র গড়ে তুলতে। এরই মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের কাছে ২৩৬০ জনের নাম পাঠিয়েছে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৮ই মে ভারতকে চিঠি দিয়ে এই ‘পুশ-ইন’ বা গণবিতাড়নকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দেয় এবং জানায়, তারা কেবল নিশ্চিত বাংলাদেশি নাগরিকদের সঠিক প্রক্রিয়ায় নেবে। এছাড়াও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ প্রায় ১০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আসাম থেকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয় এবং আরও ৪০ জনকে মিয়ানমারের সমুদ্রসীমায় লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে ভাসিয়ে দেয়। তাদেরকে বলে, সাঁতরে তীরে পৌঁছাতে। মিয়ানমার বিষয়ক জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিউর টম অ্যানড্রুজ বলেন, এটা ভয়াবহভাবে আইনের লঙ্ঘন। তিনি একে মানবিকতার পরিপন্থী ও আন্তর্জাতিক ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতির লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বিতাড়ন করা মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। সরকারকে অবশ্যই বিতাড়নের কারণ জানানো, আইনগত প্রতিনিধিত্বের সুযোগ, আপিলের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি দিতে হবে এবং আটক ব্যক্তিদের খাবার, চিকিৎসা, আশ্রয় ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের (নারী, শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী) জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে।

ইলেন পিয়ারসন বলেন, ভারত সরকার অবৈধ অভিবাসন রোধের নামে হাজারো অসহায় মানুষকে ঝুঁকিতে ফেলছে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক নীতি প্রয়োগ করে তারা ভারতের দীর্ঘদিনের শরণার্থী রক্ষার ইতিহাসকে ধ্বংস করছে। ইন্টারন্যাশনাল কোভ্যানেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস এবং ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অন দ্য ইলিমিনেশন অব অল ফর্মস অব রেসিয়াল ডিসক্রিমিনেশনের অধীনে প্রতিজন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা আছে ভারতের। একই সঙ্গে বর্ণ, গোত্র, জাতীয়তা, বংশগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো মানুষকে নাগরিকত্ব বঞ্চিত করা প্রতিরোধ করার বাধ্যবাধকতা আছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া যেকোনো ব্যক্তিকে ভারতের আটক ও তাকে বহিষ্কার করা মৌলিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন। এক্ষেত্রে তাদেরকে পুরোপুরি আইনি প্রক্রিয়া মেনে চলা উচিত। কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করতে হবে যে, নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা এবং সীমান্তরক্ষীরা যেন অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ না করে। যারা শক্তির অপব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ আছে, তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বহীন তদন্ত করতে হবে। যারা এর জন্য দায়ী হবেন তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ শৃংখলা ভঙ্গের শাস্তি দিতে হবে অথবা বিচার করতে হবে। যেসব মানুষকে বহিষ্কারের জন্য আটক রাখা হয়েছে তাদেরকে পর্যাপ্ত খাবার, আশ্রয় ও মেডিকেল সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং পঙ্গুসহ প্রান্তিক পর্যায়ে থাকা মানুষদের বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে সরকারকে।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে প্রবেশ করা লোকজনকে বিতাড়ন করছে। যদিও বিতাড়িতদের মধ্যে কয়েক ডজন বলেছেন তারা বাংলাদেশি নাগরিক, অনেকেই জোর দিয়ে বলেছেন তারা নন। প্রক্রিয়াগত আইন না মানায় বহু ভারতীয় নাগরিক- যাদের বেশির ভাগই বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম, অবৈধভাবে তারা বিতাড়িত হয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার বারবার বলেছে, ভারতের এ একতরফা পদক্ষেপ বিদ্যমান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করছে এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা ‘আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী স্বচ্ছ, যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়া’ অনুসরণ করে এসব ঘটনা মোকাবিলা করে। বিতাড়িতদের মধ্যে কমপক্ষে ৩০০ জন আসাম রাজ্যের বাসিন্দা। সেখানে ২০১৯ সালে বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছে এবং প্রায় ২০ লাখ মানুষকে নাগরিকত্বের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। বাকি বিতাড়িতদের অনেকেই বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম। তারা কাজের সন্ধানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য থেকে গুজরাট, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা ও দিল্লিতে গিয়েছিলেন।

আসামের ত্রুটিপূর্ণ নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়া
আসামে দীর্ঘদিন ধরে যেসব বাঙালিকে ‘অ-আদিবাসী’ বা ‘অ-প্রকৃত’ বাসিন্দা সন্দেহ করা হয়, তারা পক্ষপাতদুষ্ট নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ার শিকার হয়ে আসছেন। ১৯৬৪ সাল থেকে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয়গুলো নির্ধারণ করছে ফরেনার্স ট্রাইবুনালস- যা আধা-বিচারিক আদালত হিসেবে কাজ করে। রাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এসব ট্রাইবুনাল ১,৬৫,৯৯২ জনকে ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব ট্রাইবুনালের কাজকর্ম অস্বচ্ছ।

প্রায়শই বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক এবং প্রক্রিয়াগত অধিকার লঙ্ঘনকারী তারা। একবার কোনো ট্রাইবুনাল কাউকে নির্দোষ ঘোষণা করলেও, আবার একই বা ভিন্ন ট্রাইবুনালে তার বিরুদ্ধে মামলা করা যায়। এমনকি নথিতে নামের বানান সামান্য অমিল, লিখিত বিবৃতিতে কিছু তথ্য বাদ পড়া, বা সাক্ষ্যে ছোটখাটো অসঙ্গতি থাকলেও নাগরিকত্ব দাবি খারিজ হয়ে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে নিজের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগও দেয়া হয় না। তাদের অনুপস্থিতিতেই রায় দিয়ে দেয়া হয়। আসামের আইনজীবীরা বলছেন, এটি মূলত হয় কারণ সীমান্ত পুলিশ যথাযথ তদন্ত করে না এবং ভুক্তভোগীদের সময়মতো নোটিশ দেয় না। ১৯৮৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত এ ধরনের প্রক্রিয়ায় ৬৩,৯৫৯ জনকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করা হয়েছে।

২০১৯ সালের আগস্টে আসামে পরিচালিত ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এনআরসি) নামক বিতর্কিত ও বৈষম্যমূলক যাচাই প্রক্রিয়া থেকে ১৯ লাখেরও বেশি মানুষ বাদ পড়েন- অনেকেই যারা বহু বছর, এমনকি সারাজীবন ভারতে বসবাস করেছেন আছেন তারাও। বাদ পড়াদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হয় ফরেনার্স ট্রাইবুনালের মাধ্যমে। মে মাসে আসামের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব শর্মা স্বীকার করেন, কর্তৃপক্ষ ৩৩০ জন সন্দেহভাজন ‘অবৈধ অভিবাসী’কে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে রাজ্য ফরেনার্স ট্রাইবুনাল ছাড়াই মানুষকে বিতাড়ন করবে, এমনকি তাদের নাম যদি এনআরসি তালিকায় থাকে তবুও। তিনি বলেন, পুশব্যাক চলতেই থাকবে এবং বিদেশি শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া, যা এনআরসি-র কারণে থেমে ছিল, আবার দ্রুত শুরু হবে। এবার যদি কাউকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, আমরা তাকে ট্রাইবুনালে পাঠাব না; সরাসরি ঠেলে দেব। প্রস্তুতি চলছে।

যদিও তিনি আশ্বাস দেন যে যাদের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত আপিল ট্রাইবুনাল বা আদালতে মুলতবি আছে, তাদের বিতাড়ন করা হবে না, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে যে অনেক মুলতবি আপিল থাকা সত্ত্বেও লোকজনকে আটক করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। বারপেটা জেলার ৫১ বছর বয়সী এক দিনমজুরকে ২০১৪ সালে তার অনুপস্থিতিতে রায় দিয়ে ‘অবৈধ অভিবাসী’ ঘোষণা করা হয়, যদিও তার পরিবারের বাকিরা নয়। তার আপিল সুপ্রিম কোর্টে মুলতবি, তবুও ২৪ মে কর্তৃপক্ষ তাকে আটক করে। দুই দিন পর গভীর রাতে বিএসএফ তাকে বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়ে জোর করে পাঠিয়ে দেয়। তিনি বলেন, আমি মৃত মানুষের মতো বাংলাদেশে ঢুকলাম। ভেবেছিলাম তারা (বিএসএফ) আমাকে গুলি করে মেরে ফেলবে, কেউ জানবেও না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটার পর তিনি ও আরও পাঁচজন স্থানীয় গ্রামবাসীদের সহায়তায় একটি নদী দ্বীপের মাধ্যমে ভারতে ফেরত আসেন। তিনি দাবি করেন, ভারতীয় বিএসএফ সৈন্যদের উপস্থিতিতে তারা প্রবেশ করলেও কেউ তাদের আটকায়নি। তার আইনজীবী বলেন, এটি সুপ্রিম কোর্টের আদেশের স্পষ্ট লঙ্ঘন। আইনজীবী বলেন, আদালতের আদেশ যাচাইয়ের কোনো পদ্ধতি ছিল না। তিনি জামিনের কোনো শর্ত লঙ্ঘন করেননি।

খায়রুল ইসলামকেও অবৈধভাবে বাংলাদেশে পাঠানো হয়, যদিও তার নাগরিকত্ব সংক্রান্ত মামলা সুপ্রিম কোর্টে মুলতবি। ২০১৬ সালে ফরেনার্স ট্রাইবুনাল তাকে অবৈধ অভিবাসী ঘোষণা করে। ২৩ মে রাতে স্থানীয় পুলিশ মরিগাঁও জেলার বাড়ি থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায়। তিনি জানান, তিনি দুই দিন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ‘নো-ম্যানস-ল্যান্ড’-এ কাটিয়েছেন। তার স্ত্রী বলেন, এক বাংলাদেশি সাংবাদিকের তোলা ভিডিও দেখে তিনি জানতে পারেন তার স্বামী বাংলাদেশে রয়েছেন।

প্রক্রিয়াগত অধিকার লঙ্ঘনের ফলে আসামের বহু পরিবার এখন অসহায়। কারবি আংলং জেলায় ২৩ মে রাতে পুলিশ ৪৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে আটক করে। তার পরিবার জানায়, কোনো কারণ জানানো হয়নি। পরিবারটি জানায়, জানুয়ারি ২০২৪-এ ফরেনার্স ট্রাইবুনাল তার পক্ষে রায় দিয়েছিল। কিন্তু তারা যখন ট্রাইবুনালে যান, জানতে পারেন এপ্রিল মাসে তার অনুপস্থিতিতেই নতুন রায় দিয়ে অবৈধ অভিবাসী ঘোষণা করা হয়েছে। পরিবারটি তার অবস্থান জানে না এবং জুনে গৌহাটি হাইকোর্টে আবেদন করেছে।

২৪ মে বারপেটায় পুলিশ মালেকা খাতুনকে (৬৭) আটক করে। তার ছেলে ইমরান আলী খান বলেন, আমি জানি না কীভাবে তাকে ফেরত আনব। তিনি জানান, মালেকা খাতুন চলাফেরায় অক্ষম এবং দৃষ্টিশক্তি দুর্বল। একা অবস্থায় ২৭ মে রাত ৩টার দিকে বিএসএফ তাকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়। ২৯ মে তিনি বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার কিছু গ্রামবাসীর ফোন ব্যবহার করে ছেলেকে ফোন করেন। তিনি জানান, প্রায় ছয় বছর তিনি কোকরাঝাড় আটককেন্দ্রে কাটিয়েছেন। ২০২৪ সালে জামিনে মুক্তি পান। নয় ভাইবোনের মধ্যে একমাত্র তাকেই অবৈধ অভিবাসী ঘোষণা করা হয়। তার মামলাও গৌহাটি হাইকোর্টে চলছে।

২৫ মে বারপেটায় ৪৪ বছর বয়সী আরেকজনকে আটক করে পরদিন বাংলাদেশে পাঠানো হয়। তার ছেলে জানান, ৩০ মে তিনি বাংলাদেশের জামালপুর জেলা থেকে ফোন করেন, বিএসএফ তাকে বলেছিল, যদি সীমান্ত পেরিয়ে ফেরত আসতে চেষ্টা করে, গুলি করবে। তার ছেলে জানান, তার বাবা তিন দিন হেঁটে রাস্তায় শুয়ে ছিলেন। পরে একটি মসজিদে আশ্রয় পান। পরিবারের একমাত্র সদস্য হিসেবে তাকেই অবৈধ অভিবাসী ঘোষণা করা হয়েছে। তার মামলাও গৌহাটি হাইকোর্টে আপিলাধীন। আসামের আইনজীবীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বহু মানুষকে নির্বিচারে আটক করা হয়েছে। আইনজীবী আমান ওয়াদুদ বলেন, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য একটি সঠিক আইনি প্রক্রিয়া আছে, যেখানে উৎস দেশকে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু এখানে মানুষকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আর কেউ জানে না তারা কোথায় আছে।

২৭ মে ওয়াদুদ ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ দায়ের করলেও এখনো কোনো সাড়া পাননি। ৫ জুন, ১০০-র বেশি কর্মী, আইনজীবী ও শিক্ষাবিদ ভারত সরকারকে উন্মুক্ত চিঠিতে আহ্বান জানান যে, আসামে এসব বিতাড়ন বন্ধ করতে হবে, কারণ এগুলো জীবন ও সমতার অধিকার লঙ্ঘন করছে। তারা লিখেছেন, পুশব্যাকের ফলে মানুষ চরম বিপদের মুখে পড়ছে। কারণ এতে তারা বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীদের গুলির মুখে বা অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে পড়ছে।

বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম অভিবাসী শ্রমিকদের লক্ষ্য করে দমননীতি
বিজেপি-শাসিত কয়েকটি রাজ্য দরিদ্রতায় বসবাসরত বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর দমননীতি বাড়িয়েছে, তাদের নাগরিকত্ব যাচাই না করেই। মহারাষ্ট্রে, কর্তৃপক্ষ পশ্চিমবঙ্গ (যা বাংলাদেশের সীমানা সংলগ্ন) থেকে আসা অভ্যন্তরীণ অভিবাসীদের আটক ও বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। মুম্বইয়ে অন্তত সাতজন পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিককে আটক ও বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল, যাদের ফিরিয়ে আনা হয় শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার পর। ৩৪ বছর বয়সী নাজিমউদ্দিন শেখ, পশ্চিমবঙ্গের এক রাজমিস্ত্রি, পাঁচ বছর মুম্বইয়ে কাজ করার পর ৯ জুন আটক হন এবং বাংলাদেশে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, পুলিশ তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মোবাইল ফোন নিয়ে নেয় এবং নাগরিকত্ব প্রমাণকারী নথি ছিড়ে ফেলে। এরপর তাকে আরও শতাধিক লোকের সঙ্গে বিএসএফ বিমানে করে ত্রিপুরা (বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন) নিয়ে যায়।

তিনি বলেন, আমরা ভারতীয় বললেও (বিএসএফ) শুনছিল না। বেশি কথা বললে তারা মারছিল। পিঠ ও হাতে লাঠি দিয়ে আঘাত করেছিল। আমাদের মারধর করে বলছিল, আমরা যেন নিজেদের বাংলাদেশি বলি। নাজিমউদ্দিন শেখ জানান, তাকে আটজনের সঙ্গে বাংলাদেশে ঢুকতে বাধ্য করা হয়। বাংলাদেশের এক গ্রামে পৌঁছে স্থানীয়রা তাকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে সাহায্য করে এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) কাছে নিয়ে যায়। ১৫ জুন, বিজিবি তাকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে ফিরিয়ে দেয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোর সমালোচনা করে বলেন, বাংলা ভাষায় কথা বলা কি অপরাধ? এভাবে আপনি বাংলা ভাষাভাষী সবাইকে বাংলাদেশি বলে প্রমাণ করছেন, লজ্জা হওয়া উচিত।

গুজরাটে, এপ্রিল-মে মাসে সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, আহমেদাবাদের চান্দোলা লেক ও সিয়াসাত নগর এলাকায় কর্তৃপক্ষ ১০,০০০-এর বেশি স্থাপনা-বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ধ্বংস করেছে কোনো প্রক্রিয়া ছাড়াই। কর্তৃপক্ষ দাবি করে, এগুলো ছিল ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের’ বসতি। এসব ভাঙচুর ২০২৪ সালের নভেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায় লঙ্ঘন করে, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা আছে, ভাঙচুরের আগে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

জুনে জাতিসংঘ মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা এসব ভাঙচুরের নিন্দা করে বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা বা বিদেশি নাগরিকত্ব কখনোই কোনো আইনি সুরক্ষা ছাড়া জোরপূর্বক উচ্ছেদের অজুহাত হতে পারে না।

এই অভিযানের অংশ হিসেবে আহমেদাবাদে ৮৯০ জনকে আটক করা হয়, যার মধ্যে ২১৯ জন নারী ও ২১৪ জন শিশু। তাদের শহরের রাস্তায় চার কিলোমিটার হাঁটিয়ে প্রকাশ্যে শোভাযাত্রা করানো হয়। গুজরাট কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা রাজ্যজুড়ে প্রায় ৬,৫০০ জনকে আটক করেছে এবং সতর্ক করে দেয়, যে কেউ অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয় বা সহায়তা দেবে, কঠোর শাস্তির মুখে পড়বে।

৩ মে, পশ্চিমবঙ্গ অভিবাসী শ্রমিক কল্যাণ বোর্ডের সভাপতি ও সংসদ সদস্য সমীরুল ইসলাম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে চিঠি দিয়ে লেখেন, ‘বহু ক্ষেত্রে, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বাসিন্দাদের গুজরাটে বৈধ পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও আটক করা হচ্ছে। আরও ভয়াবহ হলো, সম্পূর্ণ বাংলা ভাষাভাষী বসতিগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে, পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ নথি ধ্বংস হচ্ছে এবং পরিবারগুলো জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হচ্ছে।’

mzamin

ক নিলে চাঁদা, খ নিলে ডোনেশন, গ নিলে ইয়ানত, ঘ নিলে হাদিয়া! by সারফুদ্দিন আহমেদ

মিটফোর্ডে ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদকে প্রকাশ্যে প্রস্তরযুগীয় কায়দায় পাথর মেরে জানে মারার পর জানা যাচ্ছে, এলাকার যে দাদারা তাঁকে চাঁদাবাজ আখ্যা দিয়ে মেরেছেন, তাঁরাই বড় চাঁদাবাজ। তাঁরা মূলত রাজনৈতিক জীব। আওয়ামী আমলে অফিশিয়ালি অপজিশনে আর বর্তমানে আনঅফিশিয়ালি পজিশনে থাকা যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল তাঁদের আসল বল। তাঁরা এসব দলের মারদাঙ্গাধর্মী নেতা-কর্মী।

গণভবন পতনের পর দেশ লুটেপুটে খাওয়ার মতো এলোমেলো হয়ে গেছে ভেবে যাঁরা আনন্দে বাঙ্গিফাটা হয়ে চান্দার ধান্ধায় টেকনাফ টু তেঁতুলিয়া, নীলক্ষেত টু খিলক্ষেত ছলে এবং বলে দখলে নিয়েছেন, সেই কৃতিসন্তানদের মধ্যে এই নেতাকর্মীরাও আছেন।

৫ আগস্টের পর বিএনপি ছাড়াও জামায়াত এবং এনসিপিসহ অন্যান্য নতুন পুরোনো দলের বুড়ো থেকে খোকা এবং সিকি থেকে আধা নেতাদের চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং তদবিরবাজির খবর দেখতে পাচ্ছি। তবে বলশালী খলদের দখল আর তদবির ছাপিয়ে আলোচনায় এখন চাঁদা।

চাঁদা, মানে চান্দা কোনো ধান্দার জিনিস না। এক সময় পাড়া-মহল্লায় মসজিদ-মক্তব, পাঠশালা-পাঠাগার গড়ার মতো মহৎ কাজের খরচ যোগাতে আদা-ব্যাপারী ফকিরজাদা থেকে জাহাজ-কারবারি সাহেবজাদা চাঁদা দিতেন। গাঁও গেরামে পাগার পারাপারের সাঁকো লাখো লোকের হাসিমুখে দেওয়া চাঁদার টাকায় হতো। এখনো হয়তো হয়। দাদা-পরদাদার আমল থেকে চাঁদার চল চলছে। সেই চাঁদায় কালি ছিল না। সেই চাঁদা কালা ছিল না, ছিল সাদা।

পরে সাদা চাঁদায় ‘বাজি’ ঢুকে পড়েছে। চাঁদাবাজিতে হাজিপাড়া-কাজীপাড়া একাকার হয়ে গেছে। ‘দালান উঠছে তাও রাজনীতি, দালান ভাঙছে তাও রাজনীতি’র মতো বাড়ি কিনলে নতুন চাঁদের মতো চাঁদাবাজ উদয় হচ্ছে, বাড়ি বেচলেও বাজ পড়ার মতো ফাজিল চাঁদাবাজ নাজিল হচ্ছে। টং দোকান থেকে শপিং মলে ছলেবলেকৌশলে তলে তলে চাঁদাবাজি চলে।

আওয়ামী চাঁদাবাজি অস্ত গেছে। এখন এসেছে নতুন চাঁদাবাজ, তাঁকে ছেড়ে দিতে হচ্ছে স্থান। মোবাইল মনিটরে ঝুঁকে ফেসবুকে ঢুকে দেখছিলাম, মোহাম্মাদপুরের এক যুবদল নেতা বলছেন, ‘আওয়ামী লীগের চাঁদাবাজরা পালাইছে, এলাকায় কেউ চাঁদা তোলার নাই। কেউ তাল পাইতাছে না, তাই আমি হাল ধরছি।’

কারওয়ানবাজার–কাপ্তানবাজার–ঠাঁটারীবাজার–রাজাবাজারে হাজার হাজার ‘রাজা’র উদয় হয়েছে। ফেসবুকে ভেসে আসা আরেক ভিডিওতে দেখেছি, গাজীপুরে রাম দা আর চাপাতিধারী জনাবিশেক স্যাঙাত নিয়ে যুবদলের এক ‘রাজা’ হ্যান্ডমাইকে অমায়িক হুমকি দিয়ে খোলাবাজারে রীতিমতো বাজনা বাজিয়ে ‘খাজনা’ আদায় করছেন। মুরগির ছাও ছো মেরে নেওয়া বাজের মতো চাঁদাবাজ পেয়াদায় আদায় করছেন ‘খাজনা’।

ষোলো বছরের না খাওয়া গাল হা করে যে রাহু লম্বা গলায় সব গিলতে চাচ্ছে, তাকে বাহু তুলে বাধা দেবে এমন কাউকে দেখা যাচ্ছিল না।

আজিমপুর গোরস্থান, মানে কবর থেকেও এক বিএনপি নেতার ‘তোলা’ তোলার খবর আমরা জেনেছি। গুগলে ‘বিএনপির চাঁদাবাজি’ লিখে সার্চ দিলে এই সংক্রান্ত সংবাদের অন্ত মিলবে না।

গত ১৩ জুলাই রোববার ঝালকাঠিতে এসে পথসভায় সবাইকে অভয় দিয়ে এনসিপির নেতা নাহিদ ইসলাম বলছিলেন, ‘যারা চাঁদাবাজির রাজনীতি করতে চায়, তাদের বিদায় হবে হাসিনার মতো।’ নতুন বাংলাদেশে নতুন নেতার এই কথা নতুন আশা জাগিয়েছিল।

সমস্যা হলো, ওই দিনই একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। সে ভিডিওতে দেখা যায়, এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ইমামুর রশিদ ইমন গাড়িতে বসা এক নারীর কাছ থেকে সাত লাখ টাকা নিচ্ছেন।

ভিডিওতে ইমনকে উদ্দেশ করে ওই নারীকে বলতে শোনা যায়, ‘ভাই’কে দশ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আছে সাত লাখ। ইমন বলছিলেন, ‘এখানে যে সাত লাখ আছে, তা ভাই জানে?’ নারী বললেন, ‘জানে।’

ধরা যাক, ওই নারীর নাম সাদিয়া। ভিডিও দেখে মনে হয়েছে, সাদিয়ার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার জন্য ইমনকে ‘ভাই’ পাঠিয়েছেন।

ভিডিওটি যিনি ফেসবুকে পোস্ট করেছেন, তাঁর ভাষ্যমতে, সাদিয়া একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। বিভিন্ন প্রজেক্টে কাজ পাওয়ার আশায় এনসিপি নেতাদের বাসায় বিভিন্ন সময় তিনি প্রায় ৪৮ লাখ টাকা পৌঁছে দিয়েছেন।

ধরে নিচ্ছি, এই টাকা চাঁদার টাকা না। ধারণা করি, এই টাকা কোনো জুলাই বীরের তদবিরের হাদিয়া। কোন ‘ভাই’ নিয়েছেন সাদিয়ার হাদিয়া, তা দিয়া আপাতত কাজ নাই। তবে ‘সমন্বয়ক’ পরিচয়ে চাঁদা আদায়ের অল্পবিস্তর গল্প সারা দেশেই শোনা যাচ্ছে।

এর আগে আমরা এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন ‘জনগণমনঅধিনায়ক’-এর বিরুদ্ধে ‘বীরোচিত’ তদবিরবাজির অভিযোগ শুনেছি।

এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব থাকাকালে হাজি সাহেবের মতো দেখতে গাজী সালাউদ্দিন তানভীর ডিসি নিয়োগে প্রভাব খাঁটিয়ে দলটির ভাবমূর্তি খাটো করেছেন। তিনি কাগজ-কলম থেকে তরি-তরকারির মতো দরকারি জিনিসের সরকারি কেনাকাটার কমিশন বিজনেসেও বিজি ছিলেন বলে দুদকের তদন্তে দেখা যাচ্ছে।

উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার এপিএস থাকাকালে ফাঁকতালে মোয়াজ্জেম হোসেন শতকোটি টাকার সম্পদ হাতিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে।

হাজার হাজার মানুষের রক্তে ভেজা জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্যে জন্ম নেওয়া এনসিপির অনেকের সঙ্গে এ ধরনের অযাচিত অর্থযোগের যোগসাজশের অভিযোগও আমরা পেয়েছি।

কোনো রকমের কামাই রোজগার ছাড়াই এনসিপি গত রমজানে কন্টিনেন্টাল হোটেলে সদ্যোজাত পলিটিক্যাল পার্টি হিসেবে ইফতার আর ডিনার পার্টি দিয়েছিল। সেই খরচের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তাঁরা বলেছিলেন, এই টাকা চাঁদা হিসেবে ব্যবসায়ীরা দিয়েছেন। তবে সেই ব্যবসায়ীদের ‘অনুরোধে’ তাঁরা তাঁদের নাম বলেননি।

তারও আগে গণ অধিকার পরিষদের নেতারা দল চালানোর বল বাড়ানো বাবদ ক্যাশে ও বিকাশে দেশি-প্রবাসীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলেছিলেন। দলটির এক ‘গুরু’ সেই টাকা ফাঁকা করা শুরু করেছিলেন বলেও জোর জনশ্রুতি আছে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জামায়াতের সমাবেশ থেকে নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন, ‘চাঁদা নিতে দেব না, দুর্নীতি সহ্য করব না।’ কিন্তু বেশ আগে থেকেই চাঁদাবাজির জামাতে জামায়াত নেতাদেরও কাতারবন্দী হতে দেখা গেছে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বেদনাজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, কুড়িগ্রামের রাজীবপুরে জামায়াত নেতা আনিসুর রহমান অন্য সব চাঁদাবাজের সুরে সুর ধরেছেন। চাঁদা আদায়ে রহমানও রহম করেননি। তিনি মামলা সামলানোর কথা বলে এক ব্যবসায়ীর কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা চেয়েছেন।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় জামায়াতের ‘ত্যাগী নেতাদের’ আদাজল খেয়ে চাঁদাবাজিতে নেমে ইয়ানতের খিয়ানত করতে দেখা গেছে।

আসলে আমাদের উদীয়মান, উদিত, এমনকি অস্তমান রাজনীতিকেরাও চাঁদাঅন্তপ্রাণ। বিতাড়িত আওয়ামী চাঁদাবাজির কথা নতুন করে বলার কিছু নাই। বিএনপি সেই জায়গা দখল করেছে বলে জামায়াতের দিক থেকে অভিযোগ আসার পর মেজাজ হারিয়ে মির্জা আব্বাস বলেছেন, ‘আমরা নিলে চাঁদা, আর জামাত নিলে হাদিয়া!’

আসলে সাদিয়াদের দেওয়া হাদিয়া দিয়া যেহেতু দলের লোক চলে, সেহেতু তা না দিয়া কাঁদিয়া কাঁদিয়া শুধু বিস্কুট কিংবা চা দিয়া তাঁদের বোঝানো কঠিন।

অনেকে বলছেন, ‘বিএনপি নিলে চাঁদা, এনসিপি নিলে ডোনেশন, জামায়াত নিলে ইয়ানত, চরমোনাই নিলে হাদিয়া, গণঅধিকার নিলে বিকাশ।’ কিন্তু দিন শেষে যা দিতে হবে এবং যা না দিলে ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা আসবে, তার আদি নাম চাঁদা।

তবে লাল চাঁদ হত্যার পর চাঁদাবাজের দাদাগিরি বাধা খাচ্ছে। মেপে কথা বলা লোকও খেপে গেছে। ভিডিওতে দেখলাম, কেরানীগঞ্জে পাবলিক চারদিক ঘিরে খুঁটিতে বাঁধা এক জুটি চাঁদাবাজের ঝুঁটি ধরে টুঁটি টেনে ছিঁড়ে ফেলার হুমকি দিচ্ছে; রাজধানীতে চাঁদা নিতে আসা দাদাদের বুড়ো থেকে বালক বয়সী সিএনজি চালক ও সাধারণ লোক প্রতিরোধ করেছেন; নরসিংদীতে তিল তিল করে গড়ে তোলা ব্যবসা থেকে চাঁদা তোলা ঠেকাতে ব্যবসায়ীরা মিছিল করেছেন, কিল একটাও মাটিতে পড়বে না জেনে চাঁদাবাজ ফটকেরা সটকে পড়েছেন।

অনেক বাস স্ট্যান্ড, টেম্পু স্ট্যান্ড বা বাজারে গত কয়েক দিন চাঁদাবাজি বন্ধ আছে। কালেকটররা মারের ভয়ে কোনো কোনো লোকেশনে কালেকশনে যাচ্ছেন না।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সম্প্রতি একটি বেসরকারি টিভিকে বলেছেন, তাঁরা রাজনীতি করবেন মানুষের জন্য, দলও চালাবেন মানুষের টাকায়। গণচাঁদা বা ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে দল চালানো হবে বলে তাঁদের নিজেদের মধ্যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে।

নাহিদ বলেছেন, ‘আমরা চাই এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে একজন রিকশাওয়ালাও আমাদের দলকে সমর্থন করতে পারেন, প্রবাসে থাকা একজন ভাই বা বোনও যেন আমাদের তহবিলে চাঁদা দিতে পারেন।’ তিনি বলেছেন, ‘যারা করাপ্টেড অলিগার্ক বা দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী, তাদের কাছ থেকে আমরা কোনো চাঁদা নেব না।’

গণচাঁদায় স্বচ্ছভাবে দল চালানোর নজির আছে। ভারতের আম আদমি পার্টি ২০১৩ সালে চালু করেছিল অনলাইন ডোনেশন প্ল্যাটফর্ম। ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড, ইন্টারনেট ব্যাংকিং-এর মতো ডিজিটাল মাধ্যমে সেখানে জনগণ চাঁদা দিত। চাঁদার হিসাবপত্র উন্মুক্ত ছিল। দাতার সম্মতি সাপেক্ষে তাঁর নাম, ঠিকানা, চাঁদার পরিমাণ এবং সময় সাইটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রকাশিত হতো। চাঁদার তালিকা প্রতিদিন হালনাগাদ হতো। মোট কত টাকা জমা পড়েছে, তা সবাই দাঁড়ি–কমাসহ দেখতে পেত। দল কোথায় কী পরিমাণ খরচ করছে, সেই তথ্যও সবাই দেখতে পেত। মোদি সরকার অনেক চাঁদা দাতাকে হয়রানি করায় ২০১৪ সালে সেই সাইট বন্ধ করে দেওয়া হয়।

গণচাঁদার এই ধারণা রাজনীতিকেরা ধারণ করতে পারলে রাজনীতির মান এবং সম্মান বহুদূর যেত। তবে তার আগে গণচাঁদায় দলের চলা উচিত এবং চাঁদা তুলে দলের নেতার চলা উচিত না—এই উচিত বুঝ সব দলের বুঝে আসতে হবে। তা কি আর হবে? হলেও হবে কবে?

* সারফুদ্দিন আহমেদ, প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
- ইমেইল: sarfuddin2003@gmail.com

ষোলো বছরের না খাওয়া গাল হা করে যে রাহু লম্বা গলায় সব গিলতে চাচ্ছে, তাকে বাহু তুলে বাধা দেবে এমন কাউকে দেখা যাচ্ছে না
ষোলো বছরের না খাওয়া গাল হা করে যে রাহু লম্বা গলায় সব গিলতে চাচ্ছে, তাকে বাহু তুলে বাধা দেবে এমন কাউকে দেখা যাচ্ছে না। কার্টুন: খলিল রহমান

সুযোগ নিতে পারেন আপা by শামীমুল হক

হাসু আপা, আপনাকে সালাম জানিয়ে আজ শুরু করছি। জানি মন ভালো নেই। আর মন ভালো না থাকলে কোনো কিছুই ভালো থাকে না- এটা সবাই জানে। কথায় আছে, আল্লায় যারে দেয় ছাপ্পর ফাইরা দেয়। বর্তমানে দেশের যে অবস্থা তাতে মনে পড়ছে এ কথাটিই। দিন দিন আপনার জন্য স্বস্তির বাতাসই যেন ধেয়ে আসছে। বাংলাদেশের রাজনীতি আজ স্পষ্টতই দুই শিবিরে বিভক্ত। এ সুযোগ আপনি নিতে পারেন অনায়াসেই। অথচ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো আপনি এবং আপনার দল আওয়ামী লীগকে ঘৃণার চোখে দেখে। এটা আপনি খুব ভালো করেই জানেন। এই যে ১৬ই জুলাই গোপালগঞ্জে আপনার দল ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা যা দেখালো এনসিপিকে সত্যিই এ সময়ে বিরাট এক সাহসের ব্যাপার। নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ দেখিয়ে দিয়েছে নিষিদ্ধ হলেও তারা মাঠে ময়দানেই আছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে, সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করেও কোনো সুফল পায়নি প্রশাসন। আচ্ছা আপা, আপনিই বলুন-এ সময়ে এসে আপনার নিজ জেলার লোকজন আপনার জন্য যা করেছে তা চিরদিন মনে রাখার মতো। অবশ্য করবেইবা না কেন? আপনি গোপালগঞ্জের মেয়ে হয়ে গোপালগঞ্জকে যেভাবে সাজিয়েছেন, গোপালগঞ্জের মানুষকে যা দিয়েছেন এর প্রতিদান দিচ্ছে এখন তারা। আপনার ভাগ্যও বটে। তবে, কারও বাড়িতে কোনো মেহমান গেলে তাকে আপ্যায়ন করতে হয়। আপনার দল এ কেমন আপ্যায়ন করলো? যা নিয়ে সারা দেশে ফের আওয়ামী লীগ কাঠগড়ায়। যদিও আগে থেকেই আঁচ করা যাচ্ছিল কিছু একটা হবে। আগের দিন এনসিপি নেতা সারজিস আলম কেন যে পদযাত্রার বদলে মার্চ টু গোপালগঞ্জ লিখলেন তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তা তিনিই জানেন। এমনটা লেখায় উত্তেজনার পারদ জমতে থাকে। যার বহিঃপ্রকাশ হলো এই হামলা। সংঘর্ষ। হতাহতের ঘটনা। আপা, এখানে দেখি আপনার ডিজাইন ফলো করছে প্রশাসন। কারফিউ দিয়ে ব্যাপক ধরপাকড় করা হয়েছে। আরও কতো কিছু হয় কে জানে? কিন্তু যত কিছুই হোক আপনার দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই। এখানেই দুঃখটা আপা।

সুপ্রিয় আপা, রাজনীতিতে মেঘ কালো অন্ধকার এখন। এতে আপনি খুশিই হবেন এটা হলফ করে বলা যায়। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কিন্তু এটা বুঝছে না। এরা যার যার স্বার্থ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যেকেই নিজেকে বড় মনে করছে। একে অপরের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দিচ্ছে। সভা- সমাবেশে একে অপরের গিবত গাইছে। আপনি পালিয়ে যাওয়ার এক বছরের মাথায় দেশের রাজনীতিতে এমন ঘনঘটা হবে কেউ কল্পনাও করেনি। গত সপ্তাহে পুরনো ঢাকায় সোহাগ হত্যাকাণ্ড নিয়ে সারা দেশ ক্ষোভে ফুঁসে উঠে। তাৎক্ষণিক এ হত্যাকাণ্ডের জন্য বিএনপিকে দায়ী করে মিছিল বের হয়। ওই মিছিল থেকে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দেয়া হয়। অবশ্য দিনে দিনে পরিষ্কার হচ্ছে খুনের রহস্য। সোহাগ হত্যাকাণ্ড নিয়ে তদন্ত চলছে। এ নিয়ে আর কথা না বাড়ানোই ভালো। সত্যি বলতে কী এই সোহাগ হত্যাকাণ্ড নিয়েও আরেক রাজনীতির চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু, আপা সেটা সাকসেস হয়নি। অর্থাৎ নিখুঁত ছিল না। যাকগে রাজনীতি মানেই হলো রাজার নীতি। আপনারা একেকজন একেকভাবে মেটিকুলাস ডিজাইন করেন। একেকজন একেকভাবে বাস্তবায়ন করেন। সবার লক্ষ্য থাকে ক্ষমতা। এই ক্ষমতাই খেয়েছে সব কিছু। কেউ ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ডিজাইন করে। কেউ ক্ষমতা থেকে ক্ষমতাবানদের সরানোর জন্য ডিজাইন করে। আবার ক্ষমতাবানরা আজীবন ক্ষমতা ধরে রাখার ডিজাইন করে। আবার কেউ নিজে ক্ষমতাশালী এটা দেখানোর জন্য ডিজাইন করে। এই ডিজাইন করতে গিয়ে কেউ হঠাৎ ভুল চালে কুপোকাত হয়ে যায়। যেমনটা আপনার বেলায় হয়েছে। আজীবন ক্ষমতায় থাকার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করেন সবার মতামতকে উপেক্ষা করে। এক্ষেত্রে নিখুঁতভাবে আদালতকে ব্যবহার করেন। কিন্তু কই গেল আপনার এই ডিজাইন। ছাত্রদের আন্দোলনে আপনার সব ডিজাইন মিইয়ে যায় হাওয়ায়। আফসোস হয়- এই ডিজাইন না করলে পাঁচ বছর পর পর ক্ষমতায় আসতে পারতেন। আপনাকে দল ও দেশকে লজ্জায় ডুবিয়ে পালাতে হতো না। এখনো যারা নানা ডিজাইন করছে তাদের ভাবা উচিত দেশের স্বার্থ। নিজের স্বার্থকে পেছনে রেখে সামনে এগিয়ে যাওয়া উচিত। তা না করে কোনো কোনো দল মনে করছে আমি যা বলি সেটাই করতে হবে। অন্যথায় এটা মানি না। এ গোঁ ধরা তাদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে- সেটা আপনার পরিণতি দেখেও তারা শিখেনি। এখানেও আপনি সফল। কারণ আপনার দেখানো পথেই হাঁটছে সবাই।

আপা, আপনাকে জানানোর জন্য বলছি, দেশে যে দলগুলোর মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়েছে তা ভালো লক্ষণ নয়। এর রেশ কোথায় গিয়ে পড়ে আল্লাহ মালুম। আরেকটি সুখবর দেই আপনাকে। পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবি উঠেছে। কেউ কেউ তো বলছেন পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন না হলে তারা নির্বাচনে যাবেন না। আমি মনে করি এমনটা হলে আপনার জন্য বড় সুখবর। কারণ দেশের ত্রিশ ভাগের বেশি ভোট আপনার দলের। আজ না হউক দশ বছর পর হলেও আওয়ামী লীগ অন্যরূপে নির্বাচনে অংশ নেবে। তখন ত্রিশ ভাগ ভোট যদি আপনার দলের বাক্সে যায় তাহলে ৯০টি আসন আপনার নিশ্চিত। আর আপনার সঙ্গীরাও তো রয়েছেই। সারা দেশে তারা সবাই মিলে পাঁচ পার্সেন্ট ভোট পেলে ১৫টি আসন তাদের। এখানেও আপনি এবং আপনার দল এগিয়ে থাকবে। অন্যদিকে যারা পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন দাবি করছে তারা সারা দেশে কতো পার্সেন্ট ভোট পাবে নিজেরাই জানে না। একমাত্র জামায়াত ভালো সংখ্যক পার্সেন্টেজ পাবে। আমি ভেবে পাই না যারা সারা দেশে এক-দুই পার্সেন্ট ভোট পাবে তারা কেন পিআর পদ্ধতি নিয়ে লাফাচ্ছে? হ্যাঁ, এক-দুই পার্সেন্ট ভোট পেলে তিন থেকে ছয়টি আসন পাবে। এতটুকুই তাদের লাভ। কিন্তু তারা নিজেদের অজান্তেই আপনার দল আওয়ামী লীগের উপকার করে দিচ্ছে সেটি তারা ভাবছেন না।

আপা, আপাগো-জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রায় প্রতিদিনই দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করছে। সেখানেও একেক দলের একেক মত। অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরেও দলগুলো একমতে পৌঁছাতে পারেনি। আর কবে তারা একমতে পৌঁছাবে? না। লক্ষণ বলে একমতে পৌঁছাতে কঠিনই হবে। দলগুলো এখন যে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে তার পরিণতি কি হয় জানি না। তবে, এতসব সংস্কার একসঙ্গে না করে শুধুমাত্র নির্বাচন সংক্রান্ত সংস্কার সম্পন্ন করে নির্বাচন দিলে অনেক ভালো হতো। কিন্তু এ ভালোটা কে বুঝাবে বলুন। আপনার শাসনামলে আপনার অনেক ভুল কাজের সমালোচনা করলে আপনি যেমন ছ্যাঁক করে উঠতেন এখনো এমন দল আছে তাদের ভুলের সমালোচনা করলে ছ্যাঁক করে উঠে। এই ছ্যাঁক করে উঠাটাই ফ্যাসিস্টের আলামত। আর ফ্যাসিস্টের পতন কখনোই কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। প্রকৃতিই ফ্যাসিস্টকে শায়েস্তা করে। শুধু অপেক্ষা সময়ের।

প্রিয় আপা, জামায়াতের মহাসমাবেশ থেকে যে বার্তা দেয়া হয়েছে তা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলবে বলে মনে হয়। এটাতেও আপনার লাভ। এখন সামনে শুধু আপনার লাভ আর লাভ দেখছি। এভাবে অপেক্ষা করুন। দেখবেন একদিন আলোর দিশা পাবেন। আরেকটি কথা না বললেই নয়, আপনার পুত্র জয় চব্বিশের আন্দোলনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ সংবলিত আপনার যে ফোনালাপ তাকে ২০১৪ সালের বলে জানিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তার মানে জয় বুঝাতে চেয়েছে- সে সময় থেকেই আপনি মানুষ মারার লাইসেন্স দিয়ে দিয়েছেন। আচ্ছা আপা এসব বিষয়ে কী জয় চুপ থাকতে পারে না? নাকি সেও আপনার মতো সকল বিষয়ের বিশেষজ্ঞ? যদি আপনার মতো হয়ে থাকে তাহলে অন্যকথা। না হলে, তাকে বলুন সব বিষয়ে কথা না বলতে। এতে হিতে বিপরীত হয়।

যাকগে আপা, অনেক কথাই বলা হলো। গোপালগঞ্জ থেকে এনসিপির ওপর হামলা, গুলি। পিআর পদ্ধতি, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। এসবগুলোর পেছনে তাকালে কেন জানি মনে হয় সবকিছু আপনার মনমতো হচ্ছে। সবশেষে বলবো-আপনি ভালো থাকুন সব সময়। আজ এখানেই রাখছি।

সূত্র- জনতার চোখ 

mzamin


মাহাথিরের চোখে সত্যি কি আনোয়ার ইব্রাহিমের রাজনৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে?

মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গন ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী তুন ড. মাহাথির মোহাম্মদের মুখোমুখি অবস্থানে। কয়েক দশকের পুরনো সম্পর্ক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবার আবারও প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যেখানে ক্ষমার বৈধতা, নির্বাচনী নৈতিকতা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্ন উঠে এসেছে প্রবলভাবে।

সাম্প্রতিক একাধিক বক্তব্য ও ফেসবুক পোস্টে মাহাথির মোহাম্মদ আনোয়ার ইব্রাহিমের নেতৃত্ব, নৈতিকতা এবং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। মাহাথির মোহাম্মদের অভিযোগ, আনোয়ার ইব্রাহিম জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রধানমন্ত্রী হননি। তিনি নির্বাচনে হেরে গিয়ে বিভিন্ন পরাজিত দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছেন। এর ফলে জনগণের প্রকৃত রায় উপেক্ষিত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

আরও স্পর্শকাতর ইস্যু সেখানে উঠে এসেছে যে, মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাধারণ ক্ষমা। ২০১৮ সালে মাহাথির মোহাম্মদ যখন দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন, তখন তার শাসনামলেই আনোয়ার ইব্রাহিম রাজক্ষমার মাধ্যমে মুক্তি পান এবং রাজনীতিতে ফিরতে সক্ষম হন। তবে এখন মাহাথির মোহাম্মদ বলছেন, তিনি সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পরামর্শ অনুযায়ী, এবং তখন তা সঠিক বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এ বিষয়ে আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন উঠে এসেছে। সম্প্রতি তুন মাহাথির মোহাম্মদের ভাষায়, আনোয়ার ইব্রাহিমের ক্ষমা বৈধ না হলে তার সংসদ সদস্য হওয়া এবং প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত থাকার বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

মাহাথির মোহাম্মদ, প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ তুলেছেন যে, তিনি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছেন। তিনি বলেছেন, একসময় যিনি রিফর্মাসি আন্দোলনের নেতা ছিলেন, আজ তিনিই প্রতিনিয়ত মিথ্যাচার ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছেন। সাধারণ মানুষ আনোয়ারের নেতৃত্বে হতাশ হয়ে “ডাউন আনোয়ার” স্লোগানে রাস্তায় নামছে বলে মাহাথির দাবি করেন। বিশেষ করে আলোর সেতার এলাকায় এই স্লোগান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় আনোয়ার ইব্রাহিম মাহাথিরকে সরাসরি জবাব না দিলেও সম্প্রতি পুলাউ বাতু পুতেহ ইস্যুতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মাহাথিরের ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য করেন। রাজপরামর্শ কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই দ্বীপের সার্বভৌমত্ব বিষয়ে ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় এবং পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে মামলাভুক্ত না হওয়ার সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। আনোয়ার ইব্রাহিম এ প্রসঙ্গ টেনে তুলে বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন এখানে একটি বড় ধরনের ভুল হয়েছিল, তবে মাহাথিরের বয়স বর্তমানে ১০০ বছর হওয়ায় মানবিক বিবেচনায় মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। তার ভাষায়, “তিনি কি দোষী ছিলেন না? ছিলেন। আমরা কি ব্যবস্থা নিতে পারি? পারি। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে তা করব না।” দেশটির বারনামা সহ প্রায় সবকটি গণমাধ্যম ফলাও করে এসব খবর দিয়েছে।

এই অবস্থানে মালয়েশিয়ার বাংলাদেশী কমিউনিটিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দ্বিধাবিভক্ত। একদল মনে করছেন, তুন ড. মাহাথিরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার মধ্যে মানবিকতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রকাশ রয়েছে। অন্যদিকে অনেকেই মনে করছেন, এটি জবাবদিহিতার ব্যত্যয়, যেখানে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী দোষী প্রমাণিত হলেও বয়সের দোহাই দিয়ে আইনের বাইরে রাখা হচ্ছে।

বর্তমানে মালয়েশিয়ার রাজনীতি সেই পুরনো দ্বন্দ্বে মাহাথির মোহাম্মদ বনাম আনোয়ার ইব্রাহিম। কিন্তু এবার দ্বন্দ্বটি কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে নৈতিকতা, আইনগত বৈধতা, এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে। দুই নেতার মধ্যে পারস্পরিক দোষারোপ ও মতবিরোধের এই পর্যায়ে মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা এখন সময়ই বলবে।

mzamin

ভারতে উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে ককপিটের কণ্ঠস্বর

ভারতে এয়ার ইন্ডিয়ার উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে অনেকেই আশা করেছিলেন, এবার দুর্ঘটনাটি সম্পর্কে একটা মীমাংসা হবে। গত মাসে গুজরাটে হওয়া এ দুর্ঘটনায় ২৬০ জন নিহত হন।

কিন্তু ১৫ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনটি জল্পনাকল্পনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিবেদনের সংযত ভাষা সত্ত্বেও এর একটি তথ্য তদন্তকারী, উড়োজাহাজ বিশ্লেষক এবং সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগাচ্ছে।

আকাশে ওঠার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ১২ বছরের পুরোনো বোয়িং–৭৮৭ উড়োজাহাজের জ্বালানি সরবরাহের দুটি সুইচই (ফুয়েল-কন্ট্রোল সুইচ) হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায়।

ককপিটের ভয়েস রেকর্ডিংয়ে শোনা যায়, একজন বিমানচালক আরেকজনকে জিজ্ঞেস করছেন, তিনি ‘কেন এটা বন্ধ করেছেন’। উত্তরে দ্বিতীয়জন বলছেন, তিনি বন্ধ করেননি। তবে কোন বিমানচালক কোন কথাটা বলেছেন, রেকর্ডিং থেকে তা বোঝা যায়নি। মাটি ছেড়ে উড়ে যাওয়ার সময় সহবিমানচালক উড়োজাহাজটি চালাচ্ছিলেন। আর ক্যাপ্টেন তদারক করছিলেন।

জ্বালানি সুইচগুলো পরে আবার উড়ন্ত অবস্থায় যেমন থাকে, তেমন অবস্থানে নেওয়া হয়। এতে ইঞ্জিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবারও চালু হয়। বিধ্বস্ত হওয়ার সময় একটি ইঞ্জিন শক্তি ফিরে পেয়ে সচল হচ্ছিল। কিন্তু অন্যটি মাত্র চালু হয়েছিল, শক্তি ফিরে পায়নি। উড়োজাহাজটি এক মিনিটের কম সময় আকাশে ছিল। এরপর গুজরাট রাজ্যের আহমেদাবাদ শহরের একটি আবাসিক এলাকায় ভেঙে পড়ে।

প্রাথমিক প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর বিভিন্ন অনুমাননির্ভর তত্ত্ব সামনে এসেছে। সম্পূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন পেতে এক বছর কিংবা আরও বেশি সময় লাগতে পরে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ‘গত মাসে এয়ার ইন্ডিয়ার উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার তদন্তে পাওয়া নতুন তথ্য ককপিটে থাকা জ্যেষ্ঠ পাইলটের দিকে নজর ঘুরিয়ে দিচ্ছে।’

ইতালির সংবাদপত্র করিয়েরে দেলা সেরা দাবি করেছে, তাদের সূত্র বলেছে ফার্স্ট অফিসার (সহবিমানচালক) বারবার ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন তিনি ইঞ্জিন বন্ধ করেছিলেন।

ওই ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন ছিলেন ৫৬ বছর বয়সী সুমিত সভারওয়াল। সহবিমানচালক ছিলেন ৩২ বছর বয়সী ক্লাইভ কুণ্ডার। উড়োজাহাজটি তিনি চালাচ্ছিলেন। তাঁদের দুজনের ১৯ হাজার ঘণ্টার বেশি উড়োজাহাজ চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল, যার প্রায় অর্ধেকটাই বোয়িং ৭৮৭-এ। ফ্লাইট চালানোর আগে দুজনই স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

এ ধরনের জল্পনাকল্পনা ফাঁসের ঢেউ তদন্তকারীদের বিচলিত করেছে। আর বিষয়টি ভারতীয় বিমানচালকদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

গত সপ্তাহে দুর্ঘটনার প্রধান তদন্ত সংস্থা ভারতের দুর্ঘটনা তদন্ত ব্যুরোর (এএআইবি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘কিছু কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম পছন্দসই এবং যাচাই না করা তথ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত টানার চেষ্টা করছে।’ বিজ্ঞপ্তিটি বলছে, তদন্ত চলমান থাকার সময় এ ধরনের কর্মকাণ্ড দায়িত্বজ্ঞানহীন।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ডের চেয়ারওম্যান জেনিফার হোমেনডি তদন্তে সহায়তা করছেন। তিনি এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে লিখেছেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো ‘অপরিণত ও অনুমাননির্ভর’। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনার তদন্তে অনেক সময় লাগে।

তড়িঘড়ি করে বিমানচালকদের দায়ী করার প্রচেষ্টাকে ‘হঠকারী’ ও ‘অত্যন্ত অসংবেদনশীল’ বলে এর নিন্দা জানিয়েছে ভারতের উড়োজাহাজ চালকদের সংগঠন ইন্ডিয়ান কমার্শিয়াল পাইলটস অ্যাসোসিয়েশন। চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

ভারতীয় বিমানচালকদের আরেকটি সংগঠন এয়ারলাইন পাইলটস অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার প্রধান স্যাম থমাস বিবিসিকে বলেন, ‘স্বচ্ছতাকে ডিঙিয়ে জয়ী হয়েছে অনুমান।’ তিনি ককপিট ভয়েস রেকর্ডারের পাশাপাশি উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণের ইতিহাস ও নথিপত্র পর্যালোচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কানাডাভিত্তিক একজন উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা তদন্তকারী বলেছেন, প্রতিবেদনে কথোপকথনের যে অংশটি প্রকাশিত হয়েছে, তা কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা বলে।

ওই তদন্তকারী বলেন, যদি ‘পাইলট বি’ ভুলবশত বা অজান্তেই সুইচগুলো চালু করে থাকেন, পরে তিনি তা অস্বীকার করতেই পারেন।

‘কিন্তু “পাইলট এ” যদি ইচ্ছাকৃত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সুইচগুলো নাড়াচাড়া করে থাকেন, তাহলে তিনি হয়তো জেনেবুঝেই ওই প্রশ্ন করেছেন। কারণ, তিনি জানতেন ককপিট ভয়েস রেকর্ড তদন্ত করা হবে। এভাবে তিনি মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দিতে এবং নিজের দায় এড়াতে চাইতে পারেন,’ বলেন কানাডার ওই তদন্তকারী।

ওই তদন্তকারী বলছেন, এএআইবি শেষ পর্যন্ত যদি শনাক্ত করতেও পারে কে কোন কথা বলেছেন, তবু নিশ্চিতভাবে জানা যাবে না যে জ্বালানির সুইচ কে বন্ধ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা হয়তো কখনোই এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানতে পারব না।’

ভারতের দুর্ঘটনার তদন্তকারীরা বিবিসিকে বলেছেন, জ্বালানি সুইচগুলো হাত দিয়ে বন্ধ করার যথেষ্ট পোক্ত প্রমাণ আছে বলে মনে হচ্ছে। তবু সব সম্ভাবনার জন্য ‘মন খোলা রাখা’ এখনো গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু কিছু বিমানচালকের মতে, উড়োজাহাজের ফুল অথরিটি ডিজিটাল ইঞ্জিন কন্ট্রোল (এফএডিইসি) ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এফএডিইসি ইঞ্জিনের অবস্থা ও কর্মক্ষমতা পর্যবেক্ষণে রাখে।

প্রাথমিক প্রতিবেদনে ককপিট ভয়েস রেকর্ডারের (সিভিআর) সম্পূর্ণ ট্রান্সক্রিপ্ট বা লিখিত বয়ান প্রকাশ করা হয়নি। শুধু উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার আগের কয়েক মুহূর্তের একটি কথোপকথন প্রকাশ করা হয়েছে।

বেছে বেছে এটুকু বয়ান প্রকাশ করায় প্রশ্ন উঠেছে যে তদন্তকারী দল কি কথোপকথনকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পেরেছে; কিন্তু সংবেদনশীলতার কারণে তা চেপে গেছে? নাকি তারা এখনো তা নিশ্চিত হতে পারেনি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে তাদের আরও সময় দরকার?

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ডের (এনটিএসবি) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক পিটার গোয়েলজ বলেছেন, ভারতের তদন্ত সংস্থার উচিত বিমানচালকদের কণ্ঠস্বর শনাক্ত করে পুরো রেকর্ডিংয়ের লিখিত বয়ান প্রকাশ করা।

পিটার গোয়েলজ বলেন, উড়ালের সময় উড়োজাহাজে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে তা ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডারে (এফডিআর) ধরা পড়ত। পাশাপাশি এমন ত্রুটি ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে সতর্কবার্তা দিত। সেগুলো বিমানের কর্মীরা নিশ্চিতভাবে খেয়াল করতেন এবং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতেন।

তদন্তকারীরা তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উড়োজাহাজ নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক বিমান দুর্ঘটনা তদন্তকারী শন প্রুচনিকি বলেন, ‘আমাদের সতর্ক হতে হবে। কারণ, সুইচগুলো বন্ধ করা হয়ে থাকলে সেটাকে বিমানচালকের ইচ্ছাকৃত ভুল, আত্মহত্যা বা অন্য যেকোনো কিছু বলে ধরে নেওয়াটা সহজ কাজ। কিন্তু আমাদের হাতে যে সীমিত তথ্য আছে, তার ভিত্তিতে এ ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।’

এদিকে বাজারে নানা বিকল্প তত্ত্ব ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ কয়েকটি ভারতীয় সংবাদপত্র উড়োজাহাজের লেজে বৈদ্যুতিক আগুন লাগাকে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছে।

কিন্তু প্রাথমিক প্রতিবেদন স্পষ্ট করেছে যে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন বন্ধ হয়েছিল; কারণ দুটি জ্বালানি সুইচই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ফ্লাইট রেকর্ডার এই তথ্যকেই নিশ্চিত করেছে। একজন স্বাধীন তদন্তকারী আরও বলছেন যদি উড়োজাহাজের পেছনে আগুন ধরে থাকে, তাহলে সেটি দুর্ঘটনার পর ঘটেছে বলে মনে হয়। ছিটকে পড়া জ্বালানি বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাটারি থেকেও আগুন লাগতে পারে।

গত সপ্তাহে এএআইবির প্রধান জিভিজি যুগান্ধর জোর দিয়ে বলেন, প্রাথমিক প্রতিবেদনের লক্ষ্য হলো কী ঘটেছে, সে সম্পর্কে তথ্য দেওয়া।

জিভিজি যুগান্ধর বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও সময় দিতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এখনো তদন্ত চলছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার মূল কারণ এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ থাকবে। প্রযুক্তিগত বা জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নতুন কিছু পেলে সেটা সবাইকে জানানো হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

আহমেদাবাদের বি জে মেডিকেল কলেজের একটি ছাত্রাবাসের ওপর আছড়ে পড়ে উড়োজাহাজটি। ভবনে আটকে যায় সেটির পেছনের অংশ। গুজরাট, ভারত
আহমেদাবাদের বি জে মেডিকেল কলেজের একটি ছাত্রাবাসের ওপর আছড়ে পড়ে উড়োজাহাজটি। ভবনে আটকে যায় সেটির পেছনের অংশ। গুজরাট, ভারত। ফাইল ছবি: রয়টার্স