Monday, October 11, 2010

টম গান্-এর কবিতা : ‌’যিশু ও তার মা’

সবেধন পুত্র মোর, আমার চেয়েও বেশি ঈশ্বরের তুই
থেকে যা এখানে এই নাশপাতি গাছের বাগানে।
সুপ্রচুর ফলভারে এইখানে গাছেরা আনত
তৃপ্ত আর পরিমিত রঙের বাহারে উদ্ভাসিত;
বার্ধক্যপীড়িত হয়ে তারা যেই কাঁদে, নোনাজল
নয় কোনো, সুমধুর অলস সিরাপে অশ্রু ঝরে।

“আমার নিজের আমি আর আমি থাকি না নিজের”

তাকে দেখে মনে হতো বেগানা নাগর,
চুপচাপ সে-বিদেশি,পদ্মডাঁটা হাতে নিয়ে
এসেছিল আমার দুয়ারে;
ঈশ্বরের জোড়াচক্ষু, ইউসুফেরও চোখের অধিক গনগনে
তার চোখে চোখ রেখে
কী হলো আমার আমি কী করে বোঝাই?

ছিলাম নিজের আমি আর আমি থাকিনি নিজের।

আর এই জনাবারো শ্রমশীল লোক, এরা কারা?
তোর কথা মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝি না:
শিখিয়েছি আমি তোকে বুলি; রেখেছি পাখির নামগুলি
যে কোনো শিশুর মতো তুই
দেখাতি ওদের যারা দীর্ঘ পরিযায়ী।
ভিড় থেকে দূরে গিয়ে তুই ফের হয়ে যারে চুপ

“আমার নিজের আমি আর আমি থাকি না নিজের”

আমি যেই কথা বলি মুখভার কেন তোর বাপ?
এই তোর মালামাল, চাকু ও করাত
আর এই হাতুড়িটা বেঞ্চির ওপর। দিনে দিনে
হয় মাপা এইখানে তোর এ-জীবন,
মাপজোক নিয়ে তুই আসবাব বানাস যেমন;
আর আমি পত্নী হেন তোকে দেবো পাঠ;

আমার নিজের হবো আর হবো কেবলই আমার

ইচ্ছেমতো যথাতথা বয়ে চলে বেয়াড়া বাতাস
দিলখোশ না হলে কি কেউ চলে তার অনুরূপ?
আজও মনে পড়ে, তুই গিয়েছিলি আলাপ জমাতে
পশমের আলখাল্লাধারী যতো পণ্ডিতের সাথে।
কানে এলো শহরের তীব্র হট্টগোল;
এ-অশুভ যন্ত্রখানি কে বয়ে বেড়ায়?

“সে তার নিজের আর নয় সে নিজের”

মাড়িয়ে সবুজ আর দ্রুত-তৃণ গালিচা মাড়িয়ে
দেখি এক আজগুবি ছায়া এসে পড়ে
ও মানিক, এই পেটে তোকে আমি ধরেছি রে একা!
ছিলো না নিকটে কোনো কবিরাজ নাড়ি কাটবার;
ডাকবো না তোকে আমি প্রভু বলে ওরে
সবেধন পুত্র মোর, দে আমায় সাড়া!

“আমার নিজের আমি আর আমি নই তো নিজের।”

(Jesus And His Mother)
========================
(টম গান (Thom Gunn; ১৯২৯-২০০৪)
টম গান্-এর জন্ম ১৯২৯ সালে, ইংল্যান্ডের কেন্ট অঞ্চলের গ্রেইভসেন্ড-এ। বাবা-মা দু’জনেই ছিলেন সাংবাদিক। তাদের যখন ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় টমের বয়স তখন ১০। আর টমের যখন ১৫ বছরে পা, তার মা হলেন আত্মঘাতী। মহিলা ছিলেন যাকে বলে সাহিত্য-শিল্পকলার উঁচু দরের সমঝদার। অল্প বয়সেই টমের মধ্যে তিনি সঞ্চারিত করেন সাহিত্যপ্রেম। এ-সুবাদে ওই বয়সেই মার্লো, মিল্টন, শেলি, কিটস, শেক্সপিয়র, টেনিসনদের কবিতা আর মহৎ সব লেখকের গদ্যরসে আপ্লুত হয় তার মন.!
১৯৫০ সাল। টম গান্ ভর্তি হন ক্যাম্ব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে। এর আগের দু’বছর কাটান সেনাদলে আর ৬ মাস পারিতে। ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কবিতার বই ফাইটিং টার্ম। বোদ্ধা পাঠক-সমালোচক মহলে দারুণ সাড়া জাগায় তা। প্রখ্যাত সমালোচক জন প্রেস লেখেন, ‘এই বই যুদ্ধোত্তরকালে প্রকাশিত হাতেগোনা বইগুলোর একটি যা প্রত্যেক সিরিয়াস পাঠকের সংগ্রহে রেখে পড়া চাই।’ গত শতকের মধ্য পঞ্চাশে টম তার সমকামী প্রেমিকের সঙ্গে পাড়ি জমান আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে। সান ফ্রান্সিসকো হয় তার পরবর্তী জীবনের ঠিকানা। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ইভর উইন্টার্সের সঙ্গে এক বছরের ফেলোশিপও করেন।
পরের দশকগুলোতে প্রকাশিত তার কবিতা-বইগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : দ্য সেন্স অব মুভমেন্ট (১৯৫৭), মাই স্যাড ক্যাপ্টেনস (১৯৬৯), টাচ্ (১৯৬৭), মোলি (১৯৭১), টু দ্য এয়ার (১৯৭৪), জ্যাক স্ট্র’জ ক্যাসল্ (১৯৭৬), সিলেকটেড পোয়েমস ১৯৫০-১৯৭৫ (১৯৭৯), দ্য প্যাসেজেস অব জয় (১৯৮৩), ম্যান উইথ দ্য নাইট সোয়েটস (১৯৯২), সিলেকটেড পোয়েমস অব টম গান্ অ্যান্ড টেড হিউজ (১৯৬২)।
১৯৭০ ও ১৯৮০-র দশকে টমের কবিতা আবর্তিত হতে থাকে তার ঝড়ো ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা, ড্রাগাসক্তি, সমকাম আর এইডস-এর মতো আপাত বিসদৃশ বিষয়কে ঘিরে। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত ম্যান উইথ দ্য নাইট সোয়েটস তার এইডস-আক্রান্ত বন্ধুদের নিয়ে লেখা এক আধুনিক শোকগাথা। এই বই আধুনিক ইংরেজি কবিতার একটি মাইলফলক বলে বিবেচিত। এই বইয়ের মধ্য দিয়ে ‘‘টম গান কবিতাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন হারিয়ে যাওয়া সেই লাবণ্য যা একালের কবিতায় বিরলদৃষ্ট।’’
বইটির ব্যাপারে সমালোচক নিল পাওয়েলের সপ্রশংস মন্তব্য:‘‘টম গান কবিতাকে ফিরিয়ে নিয়েছেন সে-ই কেন্দ্রে যা সে প্রায় হারাতে বসেছিল।’’ এ-বইয়ের জন্য ১৯৯৩ সালে টম গান লেনর মার্শাল কবিতা পুরস্কারে (Lenore Marshall Poetry Prize) ভূষিত হন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনে তার আরও বেশ কটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বস কিউপিড (২০০০), ফ্রন্টিয়ার্স গসিপ (১৯৯৮), কালেকটেড পোয়েমস (১৯৯৪)। প্রবন্ধের বইও লিখেছেন টম গান। এদের একটির নাম কবিতার মুহূর্ত (Occassions of Poetry, UK edition 1982, US edition1999)
প্রচলিত বিষয়বস্তুর বাইরে গিয়ে টম গান এমন এমন বিষয়কে কবিতার উপজীব্য করেছেন এক কথায় যেগুলোকে বলা যায় বিসদৃশ আর অভাবিতপূর্ব। কখনো কখনো সেগুলো খ্রিষ্টীয় ক্যাথলিক বিশ্বাসের পায়ে কুড়াল হেনেছে অবলীলায়। সমালোচকদের ভাষায় যেগুলো ‘daring subject matter’। কিন্তু আপাত বিসদৃশ বিষয়বস্তুকেও তিনি করে তোলেন শিল্প। এ কবি বরাবরই ছিলেন পুরনো আঙ্গিকপ্রেমী। ছন্দ ছিলো তার ব্যসন ও আনন্দ। কালেভদ্রে মুক্তছন্দের পথে পা বাড়ালেও চিরকাল প্রচলিত ছন্দো-সৌষ্ঠবেই সমর্পিত থেকেছেন এই কবি।
২০০৪ সালে তার দ্বিতীয় স্বদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জীবনাবসান হয় টম গান্-এর।
====================


bdnews24 এর সৌজন্যে
অনুবাদ: জুয়েল মাজহার

এই কবিতা গুলো পড়া হয়েছে...
free counters

৪৫টি চর্যাপদের কাবিতা অনুবাদ করেছেন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

(ছুটন্ত সেই হরিণের আর যায় না দেখা খুর…)

স্কুলজীবনের শেষের দিকে, ১৯৭৮-৭৯ নাগাদ আমার নিত্যকার বাংলা বাজারের ফুটপাত পরিক্রমার সময়ে আরও অনেক পাঠ্যাপাঠ্যের সাথে হরলাল রায়ের চর্যাগীতিকা নামে একখানা বইও আমার শেলফে উঠে আসে। প্রথমবার নাড়াচাড়া করতে গিয়ে বুঝতে পারি যে এ ক্যালকুলাস, “শিশুদের জন্য নহে”। তারপর, হয়তো কলেজে উঠে বইটা আবার সাহস ক’রে পড়তে গিয়ে (হরলাল রায়ের গদ্যায়নের বদৌলত) একটা কবিতায় গিয়ে চম্‌কে উঠলাম একেবারে : “দুলি দুহি পীটা ধরণ ন যাঅ। / রুখের তেন্তলী কুম্ভীরে খাঅ। / আঙ্গণ ঘরপণ সুন ভো বিআতী। / কানেট চোরে নিল আধরাতী। / সসুরা নিদ গেল বহুড়ী জাগঅ। / কানেট চোরে নিল কা গই মাগঅ। / দিবসহি বহুড়ী কাউই ডর ভাঅ। / রাতী ভইলে কামরূ জাঅ। / অইসন চর্যা কুক্কুরীপাএ গাই। / কোড়ি মাঝে একু হিঅহি সমাই।” (চর্যা ২, কুক্কুরীপা)। নেশা ধ’রে গেল। একের পর এক পঙ্‌ক্তি তারপর থানা গাড়ল এসে মাথার ভিতরে। আরও কিছু বইয়ের খোঁজখবর হ’ল নানা লাইব্রেরিতে, দোকানে, আবছা-আবছা সন্ধ্যা-সন্ধ্যা আলাপপরিচয় হ’তে লাগল শ্রমণ-কবিদের সাথে। শেষে আরও কয়েক বছর পর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন, প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষে বোধ করি, কয়েকটা কবিতার তরজমা হ’য়ে গেল, আর আরও কিছুদিন পর সহপাঠী বন্ধু কবি সৈয়দ তারিকের নির্বন্ধে ইংরেজি বিভাগের তৎকালীন জর্নাল, প্রতীতি-তে দশটি অনুবাদ বেরোলে পর শিক্ষক অধ্যাপক ফকরুল আলম যেচে এসে প্রশংসা করলেন (তদ্দিন অবধি তাঁর-আমার সম্পর্কটা বড়একটা মধুর ছিল না বটে)। আর আমার প্রাণ ভ’রে গেল। আর ধীরে ধীরে সবক’টারই অনুবাদ হ’য়ে গেল ১৯৮৮-র মধ্যে। বই হ’য়ে (অন্তউড়ি) বেরুল পরের বছর ১লা বৈশাখ…

আমার অন্য সমস্ত বইয়ের মতো এটাও বাজারে বড়একটা পাওয়া যায় নি কখনও, বিক্রি হওয়া দূরে থাক।

অনেক বছর পর আমি অনুবাদগুলো কম্পিউটারে কম্পোজ করতে গিয়ে কিছু সংশোধন করবার সুযোগ পেলাম। কোনো বুদ্ধিভ্রষ্ট প্রকাশক রাজি হ’য়ে গেলে আবার প্রকাশিত হ’তে পারবে হয়তো।

চর্যাপদ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার ইচ্ছা আমার আছে, যদিও সময় নাই। নেই-নেই ক’রে এ নিয়ে পড়েছি মন্দ না। কিন্তু এই কবিতাগুলির কোনো সত্যিকারের সাহিত্যিক আলোচনা আজ অব্দি দেখি নি। শুনেছিলাম যে আমার অজ্ঞাতসারে সুভাষ মুখোপাধ্যায় চর্যাপদগুলোকে আমারই মতো আধুনিক বাংলা পদ্যে প্রতিসর্জন করেছিলেন। সে-বইটি কখনও দেখি নি। হয়তো তাতে চমৎকার কোনো সাহিত্যিক আলোচনা ছিল, কিন্তু হায় তা আমার দেখা হ’ল না।

চর্যাপদে প্রতীকের যেমন বহুমাত্রিক, শিক্ষিত, সচেতন প্রয়োগ আমি দেখেছি, তেমন তার পরেকার কোনো বাংলা কবিতায় দেখি নি। রবীন্দ্রনাথে না, এমনকি জীবনানন্দেও না। তেমন দেখি নি মানে কিন্তু একেবারে দেখি নি তা নয়, মারতে আসবেন না না-বুঝে। এ নিয়ে বড়লেখক কেউ লিখে না ফেললে আমিই লিখব পরে, যদি ও যেমন পারি, কিন্তু ততদিন, পাঠক, এই তরজমাগুলির স(হায়)হায়তায় চর্যাপদে মনোনিবেশ করুন (যদি জীবনে আর কোনো কবিতা পড়বেন না, এমন পণ ক’রে না-ফেলে থাকেন, বা এমনকি ক’রেও থাকেন)। স্বাগতম্।

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ ॥

চর্যা-১
লুই


শরীরের গাছে পাঁচখানি ডাল–
চঞ্চল মনে ঢুকে পড়ে কাল।
দৃঢ় ক’রে মন মহাসুখ পাও,
কী-উপায়ে পাবে গুরুকে শুধাও।
যে সবসময় তপস্যা করে
দুঃখে ও সুখে সেও তো মরে।
ফেলে দাও পারিপাট্যের ভার,
পাখা ভর করো শূন্যতার–
লুই বলে, ক’রে অনেক ধ্যান
দেখেছি, লভেছি দিব্যজ্ঞান।

চর্যা-২
কুক্কুরী


কাছিম দুইয়ে উপচে পড়ে ভাঁড়,
গাছের তেঁতুল কুমিরের খাবার,
ভেদ নাই আর ঘরে-আঙিনাতে,
কানেট চোরে নিল অর্ধরাতে–
শ্বশুর ঘুমে, বধূ একা জাগে,
কানের কানেট কার কাছে সে মাগে?
দিনে বধূ কাকের ডরে কাঁপে,
রাতদুপুরে সে-ই ছোটে কামরূপে!
কুক্কুরীপার চর্যা এমনই যে
কোটির মাঝে একজন তা বোঝে।

চর্যা-৩
বিরূপা


এক সে শুঁড়িনি, ঢোকে দুইখানি ঘরে,
চিকন বাকলে মদ্য ধারণ করে।
সহজে এ-মদ চোলাই করো রে, তবে
অজর অমর দৃঢ়স্কন্ধ হবে।
দশমীর দ্বারে ছদ্ম আমন্ত্রণ
দেখে, খদ্দের সেদিকে ধাবিত হ’ন–
পসরা সাজানো চৌষট্টি ঘড়ার,
খদ্দের ঢুকে বা’র হয় না রে আর।
একটাই ঘড়া, অতি-সরু মুখ তায়–
বিরু বলে, ঢালো ধীরে ধীরে ঘড়াটায়।

চর্যা-৪
গুণ্ডরী


জঘনের চাপে, যোগিনী, আলিঙ্গন দে!
দিন কেটে যাক পদ্ম-বজ্র-বন্ধে।
মুখ-ভরা তোর কমলের রস, চুমুর চুমুকে খাব।
একমুহূর্ত না যদি থাকিস তাহলেই ম’রে যাব।
খেপে গেছি আমি, যোগিনী আমার, মেয়ে,
ঊর্ধ্বলোকেই করেছি যাত্রা মণিমূল বেয়ে বেয়ে–
শাশুড়ির ঘরে তালাচাবি হ’ল আঁটা
চাঁদ-সূর্যের দু’পাখা পড়ল কাটা।
গুণ্ডরী বলে, আমি সুরতের হেতু
নর-নারী-মাঝে ওড়ালাম কামকেতু।

চর্যা-৫
চাটিল


ভবনদী বয় বেগে গহিন গভীর,
মাঝগাঙে ঠাঁই নাই, পঙ্কিল দু’তীর–
চাটিল ধর্মের জন্য সাঁকো গড়ে তায়,
পারগামী লোক তাতে পার হ’য়ে যায়।
অদ্বয়-কুঠারে চিরে মোহতরু, তার
তক্তা জুড়ে নির্বাণের সাঁকো হ’ল দাঁড়।
চেয়ো না ডাইনে বাঁয়ে এ-সাঁকোয় চ’ড়ে,
দূরে নয়, বোধি আছে নিকটেই ওরে।
কীভাবে ওপারে যাবে, যারা যেতে চাও,
অনুত্তর স্বামী গুরু চাটিলে শুধাও।

চর্যা-৬
ভুসুকু


কারে করি গ্রহণ আমি, কারেই ছেড়ে দেই?
হাঁক পড়েছে আমায় ঘিরে আমার চৌদিকেই।
হরিণ নিজের শত্রু হ’ল মাংস-হেতু তারই,
ক্ষণকালের জন্য তারে ছাড়ে না শিকারী।
দুঃখী হরিণ খায় না সে ঘাস, পান করে না পানি,
জানে না যে কোথায় আছে তার হরিণী রানি।
হরিণী কয়, হরিণ, আমার একটা কথা মান্ তো,
চিরদিনের জন্য এ-বন ছেড়ে যা তুই, ভ্রান্ত!
ছুটন্ত সেই হরিণের আর যায় না দেখা খুর–
ভুসুকুর এই তত্ত্ব মূঢ়ের বুঝতে অনেক দূর।

চর্যা-৭
কানু

আলিতে কালিতে পথ আটকায়,
তাই দেখে কানু বিমনাঃ, হায়!
কানু বলে, কই করব রে বাস?
যারা মন জানে তারা উদাস।
তিন জন তারা, তারা যে ভিন্ন,
কানু বলে, তারা ভবচ্ছিন্ন।
এই আসে তারা, এই হয় হাওয়া
বিমনাঃ কানু এ’ আসা ও যাওয়ায়।
নিকটেই জিনপুর: কীভাবে
মোহান্ধ কানু সেখানে পালাবে?

চর্যা-৮
কম্বলাম্বর


করুণা-নৌকা পূর্ণ সোনায়,
রুপা রাখবার জায়গা কোথায়?
যাও রে, কামলি, আকাশের দেশে–
জন্ম গেলে কি আর ফিরবে সে?
খুঁটি উপড়িয়ে, কাছি খুলে শেষে,
বাও রে, কামলি, গুরু-উপদেশে।
গলুইতে চ’ড়ে চৌদিকে চাও,
হাল তো নাই, কে বাইবে এ-নাও?
বাঁয়ে আর ডানে চেপে চেপে গেলে
ঠিক পথ পেয়ে মহাসুখ মেলে।

চর্যা-৯
কানু


উপ্‌ড়ে কালের শক্ত খুঁটি
বিবিধ ব্যাপক বাঁধন টুটে
সহজ-নলিনীকুঞ্জে ঢুকে
মাতাল কানাই তৃপ্ত, সুখে।
হাতির যে-প্রেম হাতিনির তরে
তথতা সে-মদ বর্ষণ করে,
ষড়্গতি স্বস্বভাবে শুদ্ধ,
ভাবাভাবে কিছু নয় বিরুদ্ধ–
দশ দিকে রেখে দশ রতন
বিদ্যা-করীকে করি দমন।

চর্যা-১০
কানু


লো ডোমনি, তোর নগর-বাইরে ঘর,
নেড়া বামুন আমায় স্পর্শ কর্‌!
আ লো ডোমনি, তোরে আমি সাঙ্গা করব ঠিক,
জাত বাছে না কানু, সে যে নগ্ন কাপালিক।
একখানি সে পদ্ম, তাতে চৌষট্টিটা পাপড়ি,
তার উপরে ডোমনি নাচে, কী নৃত্য তার, বাপ রে!
ডোমনি, তোরে প্রশ্ন করি, সত্যি ক’রে বল্,
কার নায়ে তুই এপার-ওপার করিস চলাচল?
আমার কাছে বিক্রি করিস চাঙাড়ি আর তাঁত,
নটের পেটরা, তোর জন্যেই, দিই না তাতে হাত।
তোর জন্যেই, হ্যাঁ লো ডোমনি, তোর জন্যেই যে
এই কাপালিক হাড়ের মালা গলায় পরেছে।
পুকুর খুঁড়ে মৃণাল-সুধা করিস ডোমনি পান–
ডোমনি, তোরে মারব আমি, নেব রে তোর প্রাণ!

চর্যা-১১
কানু


দৃঢ়করে ধরা নাড়ির তরু
বাজে অনাহত বীর-ডমরু
কানু যোগাচার সাধন করে,
একাকার ঘোরে দেহ-নগরে।
আলি-কালি পায়ে নূপুর ক’রে
সূর্য-চাঁদের মাকড়ি প’রে
ষড়্‌রিপু ক’রে ভস্মসার
পরে সে মোক্ষমুক্তাহার।
মেরে সে শাশুড়ি ননদ শালি
এবং মায়াকে, কানু কাপালিক।

চর্যা-১২
কানু


খেলতে ব’সে দাবা করুণা-পিঁড়ায়
জিতেছি ভববল গুরুর কৃপায়:
রাজাকে আটকাই দুইমুখা চালে,
সামনে জিনপুর তাই তো কপালে।
প্রথমে গজ চেলে বড়েগুলি, আর
পাঁচটি আরও ঘুঁটি খেয়ে ফেলি তার,
মন্ত্রী দিয়ে শেষে রাজাকেই খাই,
কিস্তিমাত ক’রে ভববল পাই–
ভালোই দান চালি, কানু বলে এই,
চৌষট্টিটা ছঁক গুনে গুনে নেই।

চর্যা-১৩
কানু


ত্রিশরণ-নায়ে, আট কামরায়
এ-দেহ ভাসিয়ে দেখি
আমারই আপন দেহে মিলে যায়
শূন্য-করুণা, এ কী!
স্বপ্ন ও মায়া জেনে এ-জীবন,
ভবনদী তরলাম,
মাঝগাঙে এক ঢেউয়ের মতন
অনুভব করলাম।
পাঁচ তথাগতে দাঁড় ক’রে দেহ-নায়ে
কানু পার্থিব মায়াজাল ত’রে যায়।
গন্ধ রস ও স্পর্শ থাকুক
নিদ্রাবিহীন স্বপ্নের মতো,
শূন্যে, মনেরে মাঝি ক’রে, সুখ–
সঙ্গমে কানু হ’ল নির্গত।

চর্যা-১৪
ডোমনি


পারাপারের নৌকা চলে গঙ্গা-যমুনায়,
মাতঙ্গিনী, যোগীকে পার করে সে-খেয়ায়।
সাঁঝ ঘনাল, বাও রে, ডোমনি, জোরসে চালাও না’,
গুরুর কৃপায় জিনপুরে ফের রাখব আমার পা।
পাঁচটি বৈঠা পাছ-গলুইয়ে, পিঁড়ায় বাঁধা দড়ি,
আকাশ-সেঁউতি দিয়ে নৌকা সেচো পড়িমরি।
সূর্য-চাঁদের লাটাই-দু’টি গোটায় এবং খোলে,
ডাইনে বাঁয়ে পথ নাই রে, যাও বরাবর চ’লে!
পয়সাকড়ি নেয় না ডোমনি, স্বেচ্ছায় পার করে;
বাইতে যে-জন জানে না, সে ঘুরে ঘুরে মরে।

চর্যা-১৫
শান্তি


স্বয়ং-সংবেদন-স্বরূপ বিচারে
অলখ হয় না লক্ষণ;
সোজা পথে গেল যে-যে, আর হয় না রে
তাদের প্রত্যাবর্তন!
কূলে-কূলে ঘুরে ঘুরে বেড়িয়ো না, মূঢ়,
সোজা পথ এই সংসার–
ভুল পথে তিলার্ধ না যেন রে ঘুরো,
কানাত-মোড়ানো রাজ-দ্বার।
মোহের মায়ার এই মহাসিন্ধুর
না-বুঝিস কূল আর থৈ,
নাও নাই, ভেলা নাই, দেখ যত দূর,
নাথে না শুধাও, পাবে কই।
শূন্য এ পাথারের পরিসীমা নেই,
তথাপি রেখো না মনে দ্বিধা–
অষ্টসিদ্ধিলাভ হবে এখানেই
হামেশা চলিস যদি সিধা।
শান্তি বলেন, বৃথা মরিস না খুঁজে,
তাকাস নে বামে দক্ষিণে;
সোজা পথে অবিরত চল্ চোখ বুজে,
সহজিয়া পথ নে রে চিনে।

চর্যা-১৬
মহীধর

তিনটি পাটে কৃষ্ণ হাতির অশান্ত বৃংহণ,
শুনে, বিষয়-সমেত ভীষণ ‘মার’-এর আন্দোলন;
মত্ত গজেশ ছুটে গিয়ে শেষটায়
গগন-প্রান্ত ঘুলিয়ে ফ্যালে তেষ্টায়;
পাপপুণ্যের শক্ত শিকলটি এ
ছিঁড়ে ফেলে, স্তম্ভটি উপড়িয়ে,
গগন-চূড়ায় নির্বাণে মন প্রবেশ করল গিয়ে।
মন মহারস-পানে মত্ত হয়,
তিনটি ভুবন উপেক্ষিত রয়,
পাঁচ বিষয়ের নায়কের যে শত্রু কেউ নয়!
খররবিকিরণে মন গগন-গাঙে সাঁতরায়–
ডুবলে কিছুই যায় না দেখা!–মহীধরে কাতরায়।

চর্যা-১৭
বীণা


সূর্য হ’ল লাউ আর তার হ’ল চন্দ্র,
অবধূতি চাকি হ’ল, অনাহত দণ্ড;
হেরুক-বীণাটি বেজে ওঠে, সখী ও লো,
করুণায় শূন্য-তন্ত্রী বিলসিত হ’ল–
আলি-কালি দুই সুর হ’ল তাতে বন্দি,
গজবর, সমরস বীণাটির সন্ধি।
করতলে করপার্শ্ব চাপ দিলে পরে
বত্রিশ তন্ত্রীতে সব পরিব্যাপ্ত করে–
বজ্রাচার্য নৃত্য করে, দেবী ধরে গান,
বুদ্ধনাটকের তবে হয় অবসান।

চর্যা-১৮
কানু


পার ক’রে দেই তিনটি ভুবন অবহেলায়
সুপ্ত থেকে মহাসুখের মহালীলায়।
ডোমনি রে, তোর ভাবকালির পাই না কোনো ঠিক,
পিছনে তোর কুলীনজন, সঙ্গে কাপালিক!
বিচলিত করলি, ডোমনি, সবকিছুকেই,
চাঁদটিকে তোর টলিয়ে দেওয়ার কারণ তো নেই!
বিরূপা কয় কুলোকে যদিও তোরে,
জ্ঞানী জনে রাখে গলায় মালা ক’রে।
কানু বলে, কামাতুরা রে চণ্ডালী,
তিনভুবনে তুলনাহীন তোর ছিনালি!

চর্যা-১৯
কানু


ভব নির্বাণ, পটহ মাদল;
মন ও পবন, কাঁসি আর ঢোল;
দুন্দুভি বাজে জয়-জয়-রবে,
কানু-ডোমনির আজ বিয়ে হবে।
ডোমনিকে বিয়ে ক’রে জাত গেল,
শ্রেষ্ঠ ধর্ম যৌতুক পেল;
কাটে নিশিদিন সুরত-রঙ্গে,
রজনি পোহায় যোগিনী-সঙ্গে–
যে-যোগী মজেছে ডোমনির পাঁকে
প্রাণ গেলে তবু ছাড়ে না সে তাকে।

চর্যা-২০
কুক্কুরী


হলাম নিরাশ, স্বামী ক্ষপণক, হায়,
আমার বেদনা ভাষায় কওয়া না যায়।
বিয়ালাম গো মা, আঁতুড়ের খোঁজ নাই,
নাই কোনোকিছু, এখানে যা-কিছু চাই।
প্রথম প্রসব আমার, বাসনাপুট,
নাড়িটা কাটতে-কাটতেই, হ’ল ঝুঁট!
পূর্ণ আমার হ’ল নবযৌবন,
ঘটল মায়ের বাপের উৎসাদন।
কুক্কুরী ভনে, এ-জগৎ চির-স্থির,
যে জানে এখানে, সে-ই শুধু হয় বীর।

চর্যা-২১
ভুসুকু

গভীর নিশীথে এখানে ওখানে চ’রে
অমৃতভক্ষ মূষিক আহার করে–
বায়ুরূপী ঐ মূষিকেরে, যোগিবর,
আনাগোনা-রোধকল্পে, ঘায়েল কর্‌।
চপল মূষিক, মাটি খুঁড়ে থাকে গর্তে,
জেনে তার ঠাঁই, ধাও তাকে বধ করতে।
কৃষ্ণ মূষিক, আঁধারে সে অগোচর,
আনমনা ধ্যানে হ’য়ে যায় সে খেচর,
উড়াম-বা’রাম অস্থির সে-মূষিক
যতখন গুরু না-দেখান তাকে দিক্।
ভুসুকু ভনয়: বিচরণ শেষ হ’লে
সেই মূষিকের সব বন্ধন খোলে।

চর্যা-২২
সরহ


নিজ মনখানি বেঁধে ভবনির্বাণে
মিথ্যাই লোক ফেরে তার সন্ধানে–
অচিন্তনীয় কিছুই জানি না, মন,
কীরূপে জন্ম, কীরূপে হয় মরণ।
জীবনে-মরণে নাই কোনো বিচ্ছেদ,
জীবিতে ও মৃতে নাই রে কোনোই ভেদ।
জন্ম-মৃত্যু-ভয়ে ভরা যার বাসা
সে ক’রে মরুক রসরসায়ন আশা;
ত্রিদশে ভ্রমণ করে যে সচরাচর
কীভাবে কভু-বা হবে সে অজরামর?
কর্মে জন্ম, নাকি সে জন্মে কর্ম?
সরহ বলেন, বড়ই ঘোরালো ধর্ম!

চর্যা-২৩
ভুসুকু


ভুসুকু, তুমি শিকারে গেলে, মারবে পাঁচ জনে,
একাগ্রতা নিয়ে তখন যেয়ো পদ্মবনে।
বিহানে যারা জিন্দা, রাতে তারা মৃত্যুলোকে,
শিকার-বিনা মাংস পেতে ভুসুকু বনে ঢোকে।
মায়াজালের ফাঁদেই মায়া-হরিণ পড়ে মারা–
তারাই বোঝে, সদ্গুরুকে জিগেশ করে যারা।

চর্যা-২৬
শান্তি

তুলা ধুনে ধুনে পাওয়া গেল আঁশ,
আঁশ ধুনে ধুনে আর কিছু নেই,
বোঝা তো গেল না কী যে হেতু তার–
শান্তি বলেন–ভাবো যেভাবেই।
তুলা ধুনে ধুনে খেলাম শূন্যতাকে,
পরে তো হলাম শূন্য নিজেই।
কাদা-ভরা পথ, দু’বার যায় না দেখা,
চুলেরও ঢোকার সামর্থ্য নেই।
কার্য কারণ কিছু নয়, কিছু নয়,
স্বয়ং-সংবেদন এ, শান্তি কয়।

চর্যা-২৭
ভুসুকু


আধেক রাতভর পদ্ম ফোটে রাশি-রাশি,
হ’ল রে বত্রিশ যোগিনী-দেহ উল্লাসী।
চাঁদটা পার হ’য়ে যায় রে অবধূতি-সেতু,
রত্ন গুণে হয় সহজ চির-প্রকাশিত।
নির্বাণের খালে চালানো হ’ল শশধরে,
মৃণালে সরোবর পদ্ম যেরকম ধরে।
বিরমানন্দ যে বিলক্ষণ পরিশুদ্ধ
যে বোঝে এইখানে, কেবল সে-ই হয় বুদ্ধ।
ভুসুকু বলে তবে, পেয়েছি তার সাথে মিলে
সহজানন্দের নিত্য মহাসুখ-লীলে!

চর্যা-২৮
শবর

উঁচু পর্বতে বাস করে এক শবরী বালা,
ময়ূরপুচ্ছ পরনে, গলায় গুঞ্জামালা।
মত্ত শবর, পাগল শবর, কোরো না গোল,
সহজিয়া এই ঘরনিকে নিয়ে দুঃখ ভোল্।
নানা গাছপালা, ডালপালা ঠ্যাকে আকাশ-তলে;
একেলা শবরী কুণ্ডলধারী বনস্থলে।
ত্রিধাতুর খাটে শবর-ভুজগ শেজ বিছায়,
নৈরামনির কণ্ঠ জড়িয়ে রাত পোহায়,
কর্পূরযোগে হৃৎ-তাম্বূল চিবায় সুখে,
আত্মাহীনার আসঙ্গ তার মত্ত বুকে–
গুরুবাক্যের ধনুকের তিরে আপন মন
গেঁথে ফেলে লভো পরিনির্বাণ, পরম ধন।
কোথায় লুকালে, শবর আমার, অন্ধকারে?
খুঁজব তোমাকে কোন্ গিরিখাতে, কোন্ পাহাড়ে?

চর্যা-২৯
লুই


ভাব-ও হয় না, না-যায় অভাবও,
এমন তত্ত্বে কী-বা জ্ঞান পাব?
লুই বলে, বোঝা ভীষণ কষ্ট,
ত্রিধাতু-বিলাসে হয় না স্পষ্ট।
যা-কিছু অরূপ, যা অতীন্দ্রিয়
আগম-বেদে কি তা ব্যাখ্যনীয়?
কী জবাব দেব–জলে বিম্বিত
চাঁদ সে সত্য, নাকি কল্পিত?
লুই বলে, কোনো কিছু নাই জানা,
কই আছি, নাই তারই যে ঠিকানা।

চর্যা-৩০
ভুসুকু


করুণার কালো মেঘ নিরন্তর ফুঁড়ে
ভাব-অভাবের দ্বন্দ্ব যায় ভেঙেচুরে।
আকাশে উদিত এক অতি-অপরুপ!
দ্যাখো রে, ভুসুকু, তার সহজ স্বরূপ।
ইন্দ্রিয়ের জাল টুটে যাবে, জানো যদি,–
মনের গহনে পাবে উল্লাসের নদী।
আনন্দ লভেছি বুঝে বিষয়-বিশুদ্ধি,
চাঁদের আলোর মতো বিকশিত বুদ্ধি;
এ-আলোকই ত্রিলোকের একমাত্র সার–
কেটে গেছে ভুসুকুর মনের আঁধার।

চর্যা-৩১
আর্যদেব


কী জানি কেমন ঘরে ঢুকলুম,
ইন্দ্রিয়-মন হ’য়ে গেল গুম।
করুণা-ডমরু শুধু বেজে যায়,
আর্যদেবের ঠাঁই নিরালায়।
অসংবেদনে ট’লে ঢোকে মন
চন্দ্রকান্তি চন্দ্রে যেমন–
দূর ক’রে ভয়, ঘৃণা, লোকাচার
চেয়ে চেয়ে দেখি শূন্য-বিকার।
ছেড়ে দিয়ে লোকলজ্জা সকল
আর্যদেবের সকলই বিকল।

চর্যা-৩২
সরহ

নাদ নয়, আর বিন্দুও না, সূর্য-চন্দ্র নয়,
চিত্তরাজা স্বস্বভাবে বাঁধন-মুক্ত হয়।
সোজা পথটা সামনে রেখে ধরিস না পথ বাঁকা,
লঙ্কা যা’স না, এই তো বোধি, নিজের মধ্যে ঢাকা!
আয়না নে’য়ার দরকার নাই কাঁকন-পরা হাতে,
নিজের মন না-বুঝলে নিজে, কী আর হবে তাতে?
ওগো যোগী, যাবে যদি ভবনদীর পার,
দুর্জনেরে সঙ্গে নিলে পার পাবে না আর।
ডাইনে-বাঁয়ে ভ’রে আছে নালা ডোবা খাল,
সরহ কয়, বাপু, তোমার সোজা রেখো হাল।

চর্যা-৩৩
ঢেণ্ঢন

টোলায় আমার ঘর, প্রতিবেশী নাই;
অন্নহীন, নাই তবু ইষ্টির কামাই!
ব্যাঙ কি কামড় মারে সাপের শরীরে?
অথবা দোয়ানো দুধ বাঁটে যায় ফিরে?
বলদে বিয়ায় আর গাভি হয় বন্ধ্যা,
পিঁড়ায় দোয়ানো হয় তাকে তিন সন্ধ্যা–
যে জ্ঞানী সবার চেয়ে, অজ্ঞান সে ঘোর;
সবার চেয়ে যে সাধু, সেই ব্যাটা চোর!
শিয়াল-সিংহের যুদ্ধ চলে অনুক্ষণ–
লোকেরা বোঝে না, তাও বলেন ঢেণ্ঢন।

চর্যা-৩৪
দারিক


শূন্য-করুণা, কায়-বাক্-চিৎ, এই অভিন্নাচারে
বিলাসে দারিক মত্ত হলেন আকাশের পরপারে।
অলক্ষ্যকেই বিলোকন ক’রে, মহাসুখ-অভিসারে
বিলাসে দারিক মত্ত হলেন আকাশের পরপারে।
কী তোর মন্ত্রে, কী তোর তন্ত্রে, কী ধ্যান-ব্যাখ্যানেই?
অপ্রতিষ্ঠ মহাসুখ যদি, নির্বাণ তবে নেই।
দুঃখ ও সুখ সম জ্ঞান ক’রে, ইন্দ্রিয়-উপভোগ,
আপন-পরের ভেদ ভুলে যেতে, দারিক করেন যোগ।
রাজা রাজা রাজা, আছে যত রাজা, সবাই ফক্কিকার–
দ্বাদশ দেশের রাজা এ-দারিক, লুইপাদ গুরু যার।

চর্যা-৩৫
ভদ্র

এতকাল আমি ছিলাম অন্ধ স্বমোহাবেশে,
সদ্গুরু রোগ সারিয়ে দিলেন সদুপদেশে।
এতকাল মন নিমগ্ন ছিল মনের তলে,
আকাশ যেমন ঢ’লে প’ড়ে যায় সাগরজলে।
দশ দিকে ছিল মহাশূন্যের মহা-আঁধার,
এ-মনে ছিল না পাপপুণ্যের কোনো বাধা।
বজ্র আমাকে খাওয়াল সে শেষে মোক্ষফল,
মহাতৃপ্তিতে পান করলাম আকাশজল–
ভাদে বলে, আমি ভাগ্যকে দিয়ে জলাঞ্জলি
নিজ মন খেয়ে, সুখদুঃখের ঊর্ধ্বে চলি।

চর্যা-৩৬
কানু

তথতার মারে শূন্য বাসনা-আগার,
উজাড় করেছি সব মোহের ভাঁড়ার;
বেঘোর সহজ নিদে উলঙ্গ কানাই,
এই ঘুমে আত্ম-পর ভেদাভেদ নাই,
চেতনা-বেদনা নাই–খুলে আবরণ
সুখময় ঘুমে কানু হ’ল অচেতন।
স্বপনে হেরিনু আমি, শূন্য ত্রিভুবন
গমনাগমনহীন ঘানির মতন–
সাক্ষী জালন্ধরীপাদ–কারণ, আমায়
পণ্ডিতে চেনে না পাশমুক্ত অবস্থায়।

চর্যা-৩৭
তাড়ক

আমিই যদি আমাতে নেই, কীসের তবে ভয়?
মহামুদ্রা লাভের আশা আমার জন্য নয়।
সহজেরে বোঝ্ রে, যোগী, ভুলিস না রে ভবী,
চতুষ্কোটি মুক্ত যেমন, তেম্নি মুক্ত হবি।

যেরকম ইচ্ছা হবে সেরকমই থাকো,
সহজিয়া পথটাকে ভুলে যেয়ো না কো;
মেঢ্র ও অণ্ডের ক্রিয়া জাহের, সাঁতারে,
বাতেনি যা, বুঝি কোন্ তরিকায় তারে?
তাড়ক বলেন, বড় গুরু সমস্যাটা,
যারা বোঝে, তাদের গলায় ফাঁস আঁটা।

চর্যা-৩৮
সরহ


দেহরূপ নায়ে বৈঠা মন,
হাল ধরো সদ্গুরুর বচন,
মন স্থির ক’রে ব’সো গো নায়ে,
পারে যাওয়া নাই অন্য উপায়ে।
সহজে নৌকা গুণ টেনে নাও,
হে মাঝি, যেয়ো না আর-কোথাও।
পথে পথে আছে ডাকাতের ভয়,
ভব-দরিয়ার ঢেউয়ে, বিলয়।
কূল ধ’রে, স্রোতে বাইলে উজানে
নৌকা ঢুকবে সোজা আসমানে।

চর্যা-৩৯
সরহ

মন রে, আমার স্বপ্নেও তুই হায়
আপন দোষে আছিস অবিদ্যায়!
মন, কী ক’রে আর গুরুবচন–
বিহারে তুই করবি পর্যটন?
গগনকোণে আজব হুহুঙ্কার–
বঙ্গে জায়া নিয়ে গেলি, আর
বিজ্ঞান তোর হ’ল যে মিসমার!
অদ্ভুত এই ভবের মোহে, মন,
পরকেও তুই দেখিস রে আপন–
জগৎ যেন জলের মুকুর, আত্মা
সহজে হয় শূন্য ও লাপাত্তা।
চিত্ত আমার, নিত্য পরবশ,
বিষ গিলেছিস ফেলে সুধারস।
ঘরে-বাইরে কে আছে কে জানে,
দুষ্ট কুটুম দুঃখ শুধু হানে,
ইচ্ছা লাগে মারতে তাদের প্রাণে–
দুষ্ট বলদ থাকার চেয়ে তবে
শূন্য গোয়াল অনেক ভালো হবে!
একলা থাকি সুখে ও স্বচ্ছন্দে,
জগৎ দূরে যাক–সরহ বন্দে।

চর্যা-৪০
কানু

মনোগোচর যা, তা-ই ধোঁকা,
আগমপুথি, তসবিমালা।
অতীন্দ্রিয় সহজ আমি
ব্যাখ্যা করি কোন্ ভাষাতে?
বৃথাই, গুরু, শিষ্যটিকে
মাথামুণ্ডু চাও বোঝাতে,
কথায় বাড়ে প্রমাদ শুধু–
গুরু সে বোবা, শিষ্য কালা!
কানু বলেন, সহজ এই:
বোবায় বোঝে, বললে কালা।

চর্যা-৪১
ভুসুকু


এ-জগৎ অনুৎপন্ন আদিতে, ভ্রান্তিতে প্রতিভাত।
রজ্জুকে যে সর্প ভাবে তাকে কি কামড়ায় চন্দ্রবোড়া?
অদ্ভুত হে যোগী, মিছা কোরো না তোমার হাত নোনা,
বাসনা টুটবেই, যদি জগতের রীতি বুঝতে পারো।

যেন, মরু-মরীচিকা, গন্ধর্বনগরী, মুকুরের
প্রতিবিম্ব, বাত্যাবর্তে ঘন হ’য়ে শিল-হওয়া জল,
যেন বহুবিধ খেলা খেলে চলে বন্ধ্যার দুলাল–
খেলে খরগোশের শিং, বালুতেল, আকাশকুসুমে–

রাজপুত্র ভুসুকুপা বলে, সব এরকমই বটে,
গুরুর শরণ নাও, যে এখনও আছো ভ্রান্ত পথে।

চর্যা-৪২
কানু


শূন্যে পূর্ণ চিত্ত সহজে,
কাঁধ ভেঙে গেলে দুঃখ নেই;
কানু ম’রে গেছে, তোমরা কহ যে–
সে আছে ত্রিলোকে সবখানেই।
দৃশ্যলোপে যে বুক-দুরুদুরু,
ঢেউ কি কখনও শোষে সাগর?
দেখে না চক্ষু-বিহীন মূঢ়
দুধে-মিশে-থাকা দুধের সর।
আসে না যায় না কেউ এ-ঠাঁই,
এই বুঝে কানু আছে তোফাই।

চর্যা-৪৩
ভুসুকু

ফোটে সহজিয়া মহাতরু ত্রৈলোক্যে।
শূন্য-স্বভাবে বন্ধনহীন নয় কে?
সমরসে মনোরত্ন আকাশে মেশে,
পানিতে যেমন পানি মেশে নিঃশেষে।
পর নাই তার, যার কেউ নাই আপনা;
জন্ম হয় নি যার, সে কখনও মরে না।
ভুসুকু বলেন, প্রকৃতির রীতি এই:
আনাগোনা আর ভাবাভাবে স্থিতি নেই।

চর্যা-৪৪
কঙ্কণ


শূন্যে শূন্য মিললে তবে
সকল ধর্ম উদিত হবে।
অনুখন আছি এ-সংবোধে:
বোধির বিততি মাঝ-নিরোধে।
বিন্দু-নাদ না-ঢোকে হিয়ায়,
একটি চাইলে আরটি যায়!
কোত্থেকে এলে, সেইটে জানো,
মাঝখানে থেকে আঘাত হানো।
ভনে কলকল কাঁকনপাদে,
সবকিছু বুঁদ তথতা-নাদে।

চর্যা-৪৫
কানু


পঞ্চেন্দ্রিয় শাখা মন-তরুটাতে,
আশারূপ ফল পাতা শোভা পায় তাতে।
সদ্গুরু কাটে তরু বচন-কুড়ালে;
কানু বলে, এ-জীবন পাবে না, ফুরালে।
সেই তরু বাড়ে পাপপুণ্যের জলে,
বিদ্বান্ কাটে তারে গুরু-কৃপা-বলে।
তরুটার ছেদ-ভেদ না-জানে যে-বোকা
পৃথিবী সত্য ভেবে খায় সে যে ধোঁকা।
শূন্য সে-তরুবর, আকাশ কুড়াল–
শিকড়ে বসাও কোপ, ছেঁটো না রে ডাল।

চর্যা-৪৬
জয়নন্দী

স্বপ্ন যেমন বহু অদেখা দেখায়
অন্তরে সংসার তেম্নি যে হায়!
শেষ হ’লে হৃদয়ের মোহজাল বোনা
থেমে যায় মন-পথে যত আনাগোনা।
না সে পোড়ে, না সে ভেজে, ছিঁড়েও না মন,
দ্যাখো মায়া-মোহে তার দৃঢ় বন্ধন।
ছায়া-মায়া-কায়া এরা সমান সবাই,
নানা শোভা ধরে তার উভয় পাখাই।
তথতা-সাধনে করো শুদ্ধ হৃদয়,
আর পথ নাই–জয়নন্দী ভনয়।

চর্যা-৪৭
ধর্ম


কমল-কুলিশ মাঝে হলাম মিলিত,
চণ্ডালী সমতা-যোগে হ’ল প্রজ্বলিত।
ডোমনির কুঁড়েঘরে আগুন লেগেছে,
আগুন নেবাই চাঁদ দিয়ে পানি সেচে।
জ্বালা খুব তেজি, তবু কোনো ধোঁয়া নেই,
মেরুশীর্ষ নিয়ে পশে সোজা গগনেই।
পোড়ে ব্রহ্মা, হরিহর, পুড়ে হয় মুক্ত
তামার শাসনপট্ট, নবগুণযুক্ত।
ধামপাদ বলে, আজ সব স্পষ্ট জানি,
পঞ্চনালে উঠে গেল নির্বাণের পানি।

চর্যা-৪৯
ভুসুকু


বজ্রনৌকা বেয়ে পাড়ি দেই পদ্মা খাল,
দেশ লুট ক’রে নিল অদয় বঙ্গাল।
ভুসুকু, বাঙালি হলি আজ থেকে ওরে,
নিজের ঘরনি গেল চাঁড়ালের ঘরে।
জানি না কোথায় ঢুকে মন হ’ল ভ্রষ্ট,
জ্বলন্ত পঞ্চপাটন, ইন্দ্রিয় বিনষ্ট।
সোনা-রুপা কিছু আর রইল না বাকি,
নিজ পরিবারে তবু মহাসুখে থাকি–
নিঃশেষ হয়েছে যদি চৌকোটি ভাঁড়ার
জীবন-মরণে নাই প্রভেদ আমার।

চর্যা-৫০
শবর

গগনে তৃতীয় বাড়ি, হৃদয়ে কুঠার,
কণ্ঠলগ্না রমণীয়া নৈরামনি নারী–
শবর শূন্যতা-সঙ্গে সুখে আছে ভারি
ঝেড়ে ফেলে মায়া-মোহ-দ্বন্দ্ব-দুঃখ-ভার।
মহাশূন্যোপম অই বাড়িটির পাশে
ফুটেছে সুন্দর কত কার্পাসের ফুল,
এলিয়ে দিয়েছে চাঁদ জোছনার চুল,
আকাশকুসুম যেন ফুটেছে আকাশে।
খেতে খেতে পেকে ওঠে চিনা ও কাউন
শবরী শবর মাতে, ভুলে যায় সব;
চার-বাঁশের চেঁচাড়িতে শবরের শব
দাহ করা হয়–কাঁদে শিয়াল-শকুন।
দশ দিশে পিণ্ড পায় মৃত ভবমত্ত,
শবর নির্বাণ লভে, যায় শবরত্ব।
===================


bdnews24 এর সৌজন্যে
অনুবাদ: সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ


এই কবিতা গুলো পড়া হয়েছে...
free counters

ঢাকঢোলের হাট! by সালেহিন রাহাত

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে এবারও বসছে ঢাকঢোলের হাট। বসবে উপজেলা সদরের পুরাতন বাজারে। আসন্ন শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারও কটিয়াদীতে ১১ ও ১২ অক্টোবর ৫০০ বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী ঢাকঢোলের হাট বসছে। জনশ্রুতি বলে, ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি স্থানীয় সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ই সর্বপ্রথম তাঁর রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার উত্তরে চারিপাড়া গ্রামে ছিল রাজার প্রাসাদ। আজও রাজার আমলে খনন করা কোটামন দিঘিটির মনোরম দৃশ্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। পূজা উপলক্ষে রাজপ্রাসাদ থেকে সুদূর বিক্রমপুর (মুন্সিগঞ্জ) পরগনার বিভিন্ন স্থানে বার্তা পাঠানো হয় ঢাক, ঢোল, বাঁশিসহ বাদ্যযন্ত্রীদের আগমনের জন্য। সে সময় নৌপথে বাদ্যযন্ত্রীরা কটিয়াদী-মঠখোলা সড়কের পাশে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে যাত্রাঘাট নামক স্থানে পূজার দুই দিন আগে আসতেন। পরবর্তী সময়ে পার্শ্ববর্তী মসূয়া গ্রামে বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষ হরি কিশোর রায় চৌধুরীর বাড়িতে মহা ধুমধামে পূজা শুরু হয়। সেই সঙ্গে চলে বিভিন্ন পূজায় বাদ্যযন্ত্রের প্রতিযোগিতা। দিন দিন পূজার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন জমিদারের মধ্যে ঢাকের হাটের স্থান নির্ধারণ নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। অবশেষে যাত্রাঘাট থেকে স্থান পরিবর্তিত হয়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরবর্তী আড়িয়াল খাঁ নদের তীরবর্তী কটিয়াদী পুরাতন বাজারের প্রেসক্লাবের কাছে ঢাকের হাট বসতে থাকে। বৃহত্তর ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিলেট, ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক দুর্গাপূজার আয়োজক এই হাট থেকে পূজার দু-এক দিন আগে ভাড়ায় বায়না দিয়ে বাদ্যযন্ত্রীদের নিয়ে যান। আজও বিক্রমপুর ভাটি অঞ্চল ও কুমিল্লা হাওরাঞ্চল থেকে শত শত বাদ্যযন্ত্র এ হাটে আসে। ঢাক, ঢোল, সানাই; বিভিন্ন ধরনের বাঁশি-কাঁসিসহ হাজার হাজার বাদ্যযন্ত্রের পসরা বসে এখানে। নাচসহ বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে বাদ্যযন্ত্রীরা গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে থাকেন। সাধারণত একটি ঢাক পাঁচ হাজার, ঢোল দুই হাজার, বাঁশি প্রকারভেদে দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ব্যান্ড পার্টি ছোট ১৫ থেকে ২৫ হাজার এবং বড় ৩০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ভাড়া হয়। বাদ্যযন্ত্রীরা পূজামণ্ডপে বাজনা বাজিয়ে দর্শক ও ভক্তদের আকৃষ্ট করে থাকেন।
বাংলাদেশের আর কোথাও এ ধরনের বাদ্যযন্ত্রের হাট নেই।
উপজেলা চেয়ারম্যান লায়ন আলী আকবর ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবুল কাসেম বলেন, ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট কটিয়াদী উপজেলার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। উপজেলা প্রশাসন আগত ঢুলিদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিয়ে থাকে।
কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সাংসদ এম এ মান্নান বলেন, ‘এ ঐতিহ্য আমাদের গর্ব।’ তিনি কটিয়াদীতে দুর্গাপূজা বিসর্জনের জন্য একটি স্থায়ী দশমী ঘাট নির্মাণে সার্বিক সহযোগিতার আশ্ব্বাস দেন। এ ব্যাপারে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পূজার আগে আগত বাদ্যযন্ত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নেই। ফলে নানা সমস্যায় ভুগতে হয়। এ ছাড়া কটিয়াদীতে সব প্রতিমা একত্রে একটি নির্দিষ্ট স্থানে আরতি দিয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়। কিন্তু এর জন্য কোনো নিজস্ব ভূমি নেই। কটিয়াদী ডিগ্রি কলেজ মাঠে বিসর্জন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

সিপিএম ও কিছু পর্যবেক্ষণ by তানভীর মোকাম্মেল

২০১১-এর প্রথম পর্বে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মধ্যে সাধারণ অনুভূতি হচ্ছে যে আগামী নির্বাচনে সিপিএমকেন্দ্রিক বাম জোট সরকার নির্বাচনে হেরে যাবে। প্রায় ৩২ বছর ধরে শাসন করতে থাকা সিপিএমের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনেকে উদ্বিগ্ন।
এটা স্বীকৃত সত্য যে আমরা বাঙালিরা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজে তেমন ভালো নই বা কষ্টেসৃষ্টে একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেলেও তা বেশি দিন টেকে না। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে না ভেঙে টিকে রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সিপিএম। সিপিএমের একটা সর্বভারতীয় কাঠামো থাকলেও দলটির শক্তির ভরকেন্দ্র মূলত বাংলায় এবং বাঙালি কমরেডরাই দলটির ভিত্তি ও প্রসারে মূল। কিন্তু আজ দলটির ভবিষ্যৎই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই সিপিএম পশ্চিমবঙ্গে শাসনের একটা নিজস্ব ধারা গড়ে তুলেছিল। কিন্তু মনে হচ্ছে, সে ধারায় বড় রকম ভাঙন লেগেছে এবং নতুন চর জাগছে মমতা ব্যানার্জি ও তাঁর তৃণমূলের ভোটব্যাংকে। আর বিক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের সে দীর্ঘ তালিকায় রয়েছেন সিপিএমের নেতা-কর্মীদের কারও কারও দাদাগিরি ও দুর্নীতিতে ক্ষুব্ধ বাঙালি ভদ্রলোক মধ্যবিত্ত, সাবেক চীনপন্থী ও মহাশ্বেতা দেবীর মতো রাজনীতিসচেতন বুদ্ধিজীবীরা, আছে ভোট না-পাওয়া কংগ্রেসি, পশ্চিমবঙ্গের পুরোনো বনেদি বড়লোক পরিবারগুলো, মায় মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরাও। এমনকি মমতার পক্ষে যাঁরা দলে দলে যোগ দিচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন স্রেফ সুযোগসন্ধানীরাও এবং ‘চিরন্তন সরকারি দলের’(!) সম্ভাব্য লোকজন। মমতা ব্যানার্জির মা-মাটি-মানুষের ভূয়োদর্শনের পেছনে পাড়ায় পাড়ায় আরও জমায়েত হচ্ছে ‘ওলটপালট করে দে মা লুটেপুটে খাই’ দর্শনের লুম্পেনরাও।
পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা সিপিএমকে সমর্থন করার আর কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না। গত দুই দশকে বাজার অর্থনীতির যেটুকু সুফল তাঁরা ভোগ করা শুরু করেছেন এবং যে বৈষয়িক সম্ভাবনা সামনে দেখছেন, তার ফলে ষাট ও সত্তরের দশকের ত্যাগ ও সংগ্রামের মানসিকতায় তাঁরা আর নেই। সিপিএমকে তাঁদের আসলেই আর প্রয়োজন নেই। আর ভারতের অর্থনীতির সাম্প্রতিক বিকাশে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো পশ্চিমবঙ্গেও সচ্ছল মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়ছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে যে সিপিএমের নেতৃত্বটা মধ্যবিত্ত হলেও কর্মী-বাহিনী ও ভোটব্যাংকের বড় অংশটাই তো ছিল কৃষক, শ্রমজীবী ও সমাজের নিম্নবর্গের মানুষ। তাদের মধ্যে সিপিএমের সমর্থন কেন ও কতটা কমেছে? এ বিষয়টা এখনো কিছুটা ধোঁয়াশা এবং এ বিষয়টার ওপরই নির্ভর করছে সিপিএম আগামী নির্বাচনে সুনিশ্চিত ভরাডুবির হাত থেকে বাঁচতে পারবে কি না।
এখন প্রশ্ন, একসময়ের এত দৃঢ় গণভিত্তিক দল সিপিএমের হলোটা কী? কেন তাদের কর্মী ও নেতাদের মধ্যেও ইদানীং এক ধরনের হতাশা ও পরাজয়বাদিতার ঝোঁক? মাত্র কয়েকটি পুরসভা ও স্থানীয় ছোটখাটো নির্বাচনে হেরেই কেন মনে হচ্ছে যে সিপিএমের দম ফুরিয়ে আসছে? বিরোধীরা যতই প্রচার করুক, সিপিএমের প্রথম সারির নেতারা এখনো সৎ ও সাধারণ জীবনযাপন করেন। তবে নিম্ন ও মধ্যস্তরের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগটা আবার বেশ ব্যাপক। তা ছাড়া একটা দল হিসেবেই সিপিএম যেন আজ কিছুটা তাত্ত্বিক সংকটে পড়েছে। সিপিএম বরাবরই ছিল একটা প্রায়োগিক দল। অর্থাৎ কোনো সুনির্দিষ্ট মতাদর্শ ছাড়া অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়ার দল। এতে বিভিন্ন সময় নির্বাচনে জিততে ও সরকার চালাতে তাদের কিছুটা সুবিধা জুটেছিল বটে, কিন্তু মতাদর্শের দৃঢ়তা ছাড়া কোনো একশিলাভূত পার্টি দীর্ঘদিন চালানো কঠিন। সিপিএমকে আজ হয়তো সেই মূল্যটাই দিতে হচ্ছে।
তা ছাড়া ইতিহাসের একাধিক বাসে সময়মতো চড়তে সিপিএম ব্যর্থ হয়েছে। ভূমি সংস্কার ও অপারেশন বর্গা করে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের নিচুতলার মানুষদের সিপিএম ক্ষমতায়িত করতে পেরেছিল বটে, কিন্তু প্রয়োজন ছিল জনগণের চেতনা উন্নয়নে পরবর্তী স্তরে যাওয়া। শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কিছু দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পদক্ষেপ নেওয়া, যা তারা পারেনি বা করেনি। শিক্ষার ক্ষেত্রে সিপিএম যা করেছে তা হচ্ছে, শিক্ষকদের বেতন বাড়িয়েছে বা নতুন আরও দলীয় ক্যাডারদের শিক্ষক হিসেবে চাকরি দিয়েছে। এসব কাজ জনগণের কাছে কোনো ‘শিক্ষা-বিপ্লব’ নয়, বরং পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি বা শিক্ষাকে দলীয়করণ বলেই মনে হয়েছে কেবল।
সিপিএম অবশ্য তাদের এসব কর্মকাণ্ডকে ক্ষমতার পরিখা-যুদ্ধ বলে ভেবেছে। ফলে জনগণের যত কমিটি ছিল, তা পাড়ার পূজা কমিটি হোক বা শ্মশান কমিটিই, সবকিছুই দলীয় কর্মীদের দ্বারা দখল করার চেষ্টা করেছে। এতে জনগণ কেবল বিরক্তই হয়েছে বা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগগুলো হারিয়ে গেছে। বোঝা যায়, ক্ষমতার পরিখা-যুদ্ধ সম্পর্কে গ্রামসির ধারণাটা সিপিএমের নেতারা নেননি বা নিলেও ভুল পাঠ নিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গের সিপিএমের আরেক সমস্যা হচ্ছে, দলটির সর্বভারতীয় কেন্দ্রীয় পলিটব্যুরোতে বাংলার বাইরের নেতাদের খবরদারি ও ছড়ি ঘোরানো। সিপিএমের এই সর্বভারতীয় নেতাদের সরকার চালানোর কোনো অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের মতামতই পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম সরকারের কোনো কোনো সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের অনেকেরই পশ্চিমবঙ্গের মানুষের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে অভিজ্ঞতারও অভাব আছে এবং বিষয়গুলো তাঁরা দেখতে চেষ্টা করে থাকেন বিমূর্ত তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে। সর্বভারতীয় সিপিএমের নেতারা একসময় জ্যোতি বসুকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে দেননি এবং তাতে বাংলার ভাবমূর্তি ও রাজনীতির ক্ষতিই হয়েছে। আজও পারমাণবিক চুক্তি ও অন্যান্য কিছু প্রশ্নে বাংলার বাইরের সিপিএমের নেতারা এমন গোঁ ধরে বসে থাকেন, যেসব ইস্যুর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ তাদের বাস্তব জীবন ও স্বার্থের কোনো প্রত্যক্ষ যোগ দেখতে পায় না। প্রশ্ন উঠতে পারে, পশ্চিম বাংলার সিপিএমের নেতারা, যাঁরা সারা ভারতের সিপিএম দলটির সবচেয়ে বড় অংশ, তাঁরা অবাঙালি এসব নেতার খবরদারি মেনে চলেন কেন? একটা কারণ বোধহয় যা কিছু পশ্চিমা, তার প্রতি আমাদের বাঙালিদের সহজাত হীনম্মন্যতাবোধ! আরেকটা কারণ, এ ধরনের সভায় উপস্থিত থেকেছেন সিপিএমের এমন এক নেতা যেটা বললেন তা হচ্ছে, সিপিএমের বাঙালি নেতাদের ইংরেজি ভাষাটা কম জানা। সর্বভারতীয় পর্যায়ে নেতা হতে হলে ইংরেজিতে ভালো বলিয়ে-কইয়ে হতেই হবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের সিপিএমের নেতারা তাঁদের এক ‘আদিপাপে’ ভুগছেন। তাঁরা নিজেরাই একসময় পশ্চিমবঙ্গে ইংরেজি ভাষাকে অবহেলা করেছিলেন। আর তার কারণে বিশ্বায়নের এই যুগে পশ্চিমবঙ্গ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিপিএমের নেতা-কর্মীদের মধ্যেও বেড়েছে মফস্বলীয়তা, যা একটি আন্তর্জাতিকতাবাদী মার্কসবাদী দলের জন্য এক বড় সীমাবদ্ধতা।
সাধারণভাবে বামপন্থার প্রতি যাঁরা এত দিন আকর্ষণ বোধ করেছেন, দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের সেসব লেখক-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীও আজ সিপিএমের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে ফেলছেন অথবা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। তবে বুদ্ধিজীবীদের ভেতর সিপিএমের বিরুদ্ধে ও তৃণমূল কংগ্রেসের সপক্ষে সবচেয়ে বড় সমর্থক হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে যাঁদের ‘আনন্দবাজার গোষ্ঠীর লেখক-সাহিত্যিক’ বলা হয়। সৎ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আনন্দবাজার পত্রিকাটির অবশ্য তেমন সুনাম নেই। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যসহ সিপিএমের নেতারা প্রায়ই বলে থাকেন, আনন্দবাজার অনেক মিথ্যা ও অর্ধসত্য খবর ছাপে। আনন্দবাজার সিপিএমের নেতাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যর্থতা ও দুর্নীতি ফলাও করে প্রচার করে থাকে, কিন্তু একজন প্রশাসক হিসেবে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যর্থতাগুলোকে বেমালুম চেপে যায়। ভারতের সাম্প্রতিক রেল দুর্ঘটনাগুলোর সংখ্যা ও ভয়াবহতা স্মরণ করুন! যা হোক, আনন্দবাজার সম্পর্কে সিপিএম একটা কৌতুক চালু করেছে এবং তা পশ্চিমবঙ্গে ইদানীং বেশ চলছে। কৌতুকটা হচ্ছে, মর্ত্যে কেউ কোনো মিথ্যা কথা বললে স্বর্গে ঢং করে একটা ঘণ্টা বেজে ওঠে। একদিন রাত ১২টার দিকে শোনা গেল স্বর্গে ঢং ঢং করে খুব ঘন ঘন ঘণ্টা বাজছে এবং বেজেই চলছে। অনেকটা জেলখানার পাগলা ঘণ্টির মতো। দেবতারা যে যেখানে ছিলেন, সব ফেলে ছুটে ভগবানের কাছে এলেন, কী ব্যাপার? ভগবান খুব শান্তভাবে সবাইকে বললেন, ‘ও কিছু না। মর্ত্যের কলকাতা শহরে আনন্দবাজার পত্রিকা ছাপা হচ্ছে!’
তবে যে পত্রিকার প্রচারসংখ্যা ১২ লাখ, তার একটা ব্যাপক প্রভাব জনমানসের ওপর পড়েই। আর বাংলার এপারেই হোক কিংবা ওপারে, ছাপার অক্ষরে কিছু দেখলে বাঙালি কি আর নেপথ্যের সত্যটা জানতে চায়? বাঙালি চিরকালই বিশ্বাসপ্রবণ জাতি!
আগামী নির্বাচনে তৃণমূল অবশ্য একা সিপিএমের বিরুদ্ধে লড়বে না। তার সাথি হবে কংগ্রেস। যাঁকে দিল্লিতে কংগ্রেস নেতৃত্বের উত্তরসূরি ভাবা হয়, সেই রাহুল গান্ধী তাই ঘন ঘনই পশ্চিমবঙ্গ সফর করছেন। কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে এখন অবশ্য অনেকটাই মরা হাতি। তবে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা (তা যত সাদাই হোক না কেন!) সিপিএমের নেতাদের চেয়ে স্নিকার্স পরা এবং জর্জ ক্লুনির মতো তিন দিনের খোঁচা খোঁচা দাড়িসহ সুদর্শন তরুণ রাহুল গান্ধীর একটা আলাদা আবেদন তো আছেই করপোরেট-জগতে চাকরি করা বা চাকরি খোঁজা তরুণ-তরুণীদের কাছে! তা ছাড়া কেন্দ্রে রয়েছে কংগ্রেস সরকার। সেটাও পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেসের পালে কিছু হাওয়া জোগাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের আজ এক বড় সমস্যা জঙ্গলমহল ও লালগড় অঞ্চলে মাওবাদীদের সশস্ত্র তৎপরতা। একজনের পর একজন আঞ্চলিক সিপিএমের নেতা মাওবাদীদের হাতে খুন হয়েছেন ও হচ্ছেন। সিপিএমও ছেড়ে কথা কইছে না। তবে মাওবাদীদের সঙ্গে দহরম-মহরম করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বোধহয় আগুন নিয়েই খেলছেন। পশ্চিম মেদিনীপুর-ঝাড়খন্ড অঞ্চলের এসব মাওবাদীর সঙ্গে বাংলাদেশের মাধ্যমে আইএসআইয়ের যোগাযোগ বিচিত্র নয়। পুরুলিয়ায় জঙ্গলে অস্ত্র ফেলতে যে বিমান গিয়েছিল, তা বাংলাদেশ থেকেই উড়ে গিয়েছিল। সে ঘটনা এখনো রহস্যাবৃত। চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক মামলার মতো এ ঘটনারও সঠিক তদন্ত হলে এই অস্ত্র পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও তাদের পেছনে পাকিস্তানের আইএসআইয়ের সম্পর্ক উন্মোচিত হলে বিস্মিত হব না। ফলে জঙ্গলমহলের সশস্ত্র মাওবাদীদের সঙ্গে তৃণমূলের নেত্রী যেভাবে খায়খাতির করছেন, তার জন্য তাঁকে আখেরে মূল্য দিতে হতে পারে। ভারতের বা যেকোনো দেশেরই ভরসা হচ্ছে গণতন্ত্র, সশস্ত্র সংঘাত নয়।
পশ্চিমবঙ্গের আরেক অস্থির এলাকা দার্জিলিং। পাহাড়ি মানুষের প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনার ফলে সেখানেও অসন্তোষের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে। মমতা ব্যানার্জি দার্জিলিংয়ে গিয়ে যথারীতি পাহাড়িদের নানা গালভরা প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন। এসব প্রতিশ্রুতি হয়তো সাবধানে দেওয়া ভালো। কারণ, নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় গেলে এসব প্রতিশ্রুতি যে তাঁকেই পূরণ করতে হবে!
যেটা প্রশ্ন, এই সার্বিক ক্ষয়ের বিরুদ্ধে সিপিএম কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? তৃণমূল যতটা আবেগায়িত একটা দল, ততটা সুসংগঠিত নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া তাদের অন্য কোনো নেতাও তেমন নেই। আর কেবল সিপিএমের বিরোধিতা ছাড়া তৃণমূলের কোনো মৌলিক বা নীতিগত বক্তব্যও নেই। এ রকম নীতি ছাড়া একদল কেবল সিপিএমের বিরোধিতার আবেগ দিয়ে কতটা কী করতে পারবে, সেটাও দেখার বিষয়। সম্প্রতি কিছু ভিন্ন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। যে নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুরের জমি রক্ষার আন্দোলন করে তৃণমূল সিপিএমকে বেকায়দায় ফেলা হয়েছিল, আজ সেখানে রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কারখানা গড়তে চাইলে সিপিএমের লোকজনই ‘জমি রক্ষা কমিটি’ গড়েছেন! পাশার দান উল্টে যাচ্ছে! তা ছাড়া সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রেসিডেন্সি কলেজের মতো নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে সিপিএমের সমর্থক ছাত্রসংগঠনই জিতেছে। বোঝা যাচ্ছে, সুশিক্ষিত তরুণদের কাছে সিপিএমের আবেদন খুব কমেনি, বরং তৃণমূলের স্থূল আবেগময়তাই তেমন কল্কে পাচ্ছে না। তা ছাড়া নির্বাচন এখনো কয়েক মাস বাকি। এর মধ্যে অনেক হিসাব-নিকাশ ও অনুপাতই পাল্টে যেতে পারে। সিপিএম একটা সংগঠিত বড় দল। একটা নির্বাচনে হারলেই তাদের সবকিছু বিলীন হয়ে যাবে না। তবে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী দেখে সিপিএময়ের অনেকে বসে পড়তে বা দলত্যাগ করতে পারে, যেমনটি ইঁঁদুরেরা পালিয়ে যায় ডুবন্ত জাহাজ থেকে। অবশ্য তাতে সিপিএমের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার খুব কারণ নেই। ৩২ বছর অবিচ্ছিন্নভাবে ক্ষমতায় থাকার ফলে নানা রকম সুবিধাবাদীদের বেনোজল যেভাবে দলটিতে ঢুকেছিল, তারা বেরিয়ে গেলে দলটা বরং সুস্থই হবে।
আবার এর বিপরীতটাও ঘটতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়লে একটা একশিলাভূত পার্টি কিন্তু তাসের ঘরের মতোই ভেঙে পড়তে পারে। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির দুই কোটি সদস্য ছিল। মাত্র কয়েক সপ্তাহে তা প্রায় শূন্যে এসে ঠেকেছে। সিপিএমের সামনে সে বিপদটাও আছে।
সম্প্রতি কলকাতায় সংগীতশিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে একটা নাটক দেখতে গিয়েছিলাম। তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক হালচাল কেমন বুঝছেন? তিনি তখন আমাকে তাঁর একটা ছড়া শোনালেন:
‘আঙ্গুলে ছাপ বোতামে চাপ
এদিকে পাপ ওদিকে পাপ
এদিকের পাপ হো’ল অনেকদিন
ওদিকে পাপকে এবার সুযোগ দিন’;
আমার যা বোঝার আমি বুঝলাম!
আগামী কয়েক মাস আসলেই তাই পশ্চিমবঙ্গবাসীর জন্য একটা কৌতূহলী সময়। আর সিপিএমের জন্য এ তো এক অগ্নিপরীক্ষা। কারণ, আগামী নির্বাচন দলটির জন্য কেবল একটা বিশেষ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের প্রশ্ন নয়, একটা মতাদর্শের সমস্যা ও সম্ভাবনারও এক ধরনের ফয়সালা তা।
তানভীর মোকাম্মেল: প্রাবন্ধিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ by সাইফুদ্দীন চৌধুরী

প্রায়ই অভিযোগ শোনা যায়, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজনীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। দায়ী করা হয় ছাত্র-শিক্ষকদের। নির্জলা মিথ্যা কথা কেউই হয়তো একে বলবেন না। তবে সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে আমাদের এই দেশের সব ক্ষেত্রেই এদের রয়েছে অনেক বড় ভূমিকা। সাতচল্লিশের দেশ ভাগের পরপরই পাকিস্তানি শাসকদের দুঃশাসনের বিষয়গুলো শনাক্ত হলে তার প্রতিকারের জন্য সংঘবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলে ছাত্র এবং তাদের পরামর্শদাতা শিক্ষকেরা। বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধ অবধি সব আন্দোলন, মিছিল, সংগ্রামে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনে ছাত্রদের রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক। স্বাধীনতাযুদ্ধের মদদদাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চিহ্নিত করে শীর্ষস্থানীয় অধ্যাপকদের হত্যা করা হয়েছে। আন্দোলন-সংগ্রামেই শুধু নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতিসহ সব ক্ষেত্রেই যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই শিক্ষকেরা অধ্যয়ন করেন, অধ্যাপনা করেন, গবেষণা করেন। নিজে শিখে ছাত্রদের শেখান। নতুন নতুন জ্ঞানের উদ্ভাবন সকল পর্যায়ের শিক্ষকের দায়িত্ব-কর্তব্য হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর ন্যস্ত এই দায়ভারের চাপটা একটু বেশিই। এই শিক্ষকেরাই শিক্ষার্থীর লুপ্ত শক্তিকে জাগিয়ে তুলে কর্মজীবনে প্রবেশের পথ তৈরি করে দেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক স্বশাসন রক্ষার লক্ষ্যে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়—এসব প্রতিষ্ঠানে যাতে আধুনিক সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ বহাল থাকে। সামান্য কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি থাকলেও স্বীকার করতেই হবে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এই অধ্যাদেশ আসলেই অপরিহার্য। এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়ভার নিয়ে পরিচালিত হলেও এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও তৃতীয় বিশ্বের আমাদের মতো রাষ্ট্রে একজন সাধারণ নাগরিক ছাড়া কিছু নয়। তাঁরা শিক্ষক হয়ে পেশাদারির ভূমিকা পালন করেন, রাষ্ট্রের অন্যদের মতো চাকরি করেন না। দেশে দেশে এই শিক্ষকদের কিন্তু অনেক বেশিই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পশ্চিম দেশীয় পণ্ডিত হেনরি অ্যাডাম তো বলেছেনই, ‘এই শিক্ষকদের প্রভাব নেই কোথায়?’
১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেসকোর উদ্যোগে আয়োজিত আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী শিক্ষকদের এটি একটি মৌলিক সনদ। ইউনেসকোর এই সনদে বলা হয়, শিক্ষকেরা সব কর্মকাণ্ডের কারিগর, জাতি গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা তাঁদেরই। মর্যাদাবান ও উপযুক্ত নাগরিক তাঁরাই তৈরি করেন। এই শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে মর্যাদার ক্ষেত্রে যেন কোনো ত্রুটি না ঘটে, রাষ্ট্রকে তা দেখতে হবে।
প্যারিস কনভেনশন সূত্রে, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকেরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে কতটা অধিকার ভোগ করে থাকেন, তার জবাব অনেকটা প্রশ্নবিদ্ধ। কতটা লজিস্টিক সুবিধা পান রাষ্ট্রের কাছ থেকে এই শিক্ষকেরা? এই শিক্ষকদের এক একজন যথার্থ একাডেমিশিয়ান হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে প্রধান অন্তরায় হলো অর্থসংকট। শিক্ষকেরা যাতে ওই দায় মেটাতে বহির্মুখী না হন, এমনকি অধিক অর্থ পাওয়ার প্রত্যাশায় দেশত্যাগ না করেন, রাষ্ট্রের উচিত তার প্রেক্ষিত অনুসন্ধান করা।
হয়তো এসব কথা চিন্তা করেই বর্তমান সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বছর খানেক আগে গণমাধ্যমে মন্তব্য করেছিলেন যে শিক্ষকদের জন্য আলাদা একটি বেতনকাঠামো প্রদানের বিষয় বিবেচনা করা হবে। এমন কথাও শোনা গিয়েছিল যে সার্কভুক্ত অন্য সব দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে ওই বেতনকাঠামো প্রণীত হবে। কার্যত তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় অনেকে মনে করছেন, আমলাতন্ত্রের কুদৃষ্টিতে পড়ে তা ‘শীতল প্রকোষ্ঠে’ চলে গেছে। আরও বলা হয়, এই আমলাতন্ত্রই হায়ারারকি বিধি প্রণয়ন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদা নিচে নামিয়ে রাখছে। এ জন্য প্রচলিত ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে’ দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকেরা আসন গ্রহণ করছেন ঊনবিংশতিতম কাতারে, অপরদিকে তস্য ছাত্র শীর্ষ আমলা হওয়ার সুবাদে বসেছেন তিন কাতার সামনে। তাই-ই শুধু নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যেরাও বসছেন ওই আমলার পেছনের সারিতে। দেশের পদস্থ সরকারি চাকরিজীবীদের এ অবস্থানে এসে পৌঁছানোর অবশ্য শক্তিশালী প্রেক্ষাপটও আছে। শুধু আমাদের দেশেই নয়, সমগ্র উপমহাদেশেই ঔপনিবেশিক আমল থেকে আমলাতন্ত্রের একটি পরিকাঠামো গড়ে ওঠে। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার এ দেশে তাদের অনুগত রাজকর্মচারীদের নাম রাজধানী কলকাতার ক্যালকাটা গেজেট পত্রিকায় প্রকাশ করত। ইংল্যান্ডের মহারানির আশীর্বাদপুষ্ট ভাগ্যবানেরা হতেন ওই গেজেটে প্রকাশিত গেজেটেড অফিসার। নেটিভদের ইংরেজ সরকারের কাজ করানোর ঐতিহ্য এখনো আমাদের দেশের সরকার রাজপুরুষ সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বহাল রেখেছে বলেই তারা কুলীন-গেজেটেড অফিসার। কতগুলো সাধারণ ঘটনা চোখে পড়লে বিব্রত হতে হয়। দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদমর্যাদার শিক্ষকের কোনো সরকারি দলিলের ছায়ালিপিতে সত্যায়ন গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না, যত জুনিয়রই হোক, রাজকর্মচারীর সত্যায়ন বৈধ। বিষয়গুলো বিসদৃশ নয় কি? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদা সংরক্ষণের লক্ষ্যে বিষয়টির প্রতি সরকারের নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভালো অবস্থা চাইলে দরকার দক্ষ শিক্ষক, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাকর্ম। নজর দিতে হবে, কোনো অবস্থায়ই যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই শিক্ষকদের ক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ বিঘ্নিত না হয়, মর্যাদাহানিকর কোনো ঘটনা যেন না ঘটে। ব্রেইন-ড্রেইন ঘটিয়ে তাঁরা যেন অন্যত্র চলে যেতে না চান, দেশত্যাগ না করেন। নিজেদের অর্জিত অভিজ্ঞতা, মেধা যেন নিজের দেশেই তাঁরা প্রয়োগ করার সুযোগ পান। এসবের ব্যত্যয় ঘটলেই তো ঘটে যায় যত সব বিপত্তি। বিশ্ব শিক্ষক দিবসে এসব বিষয় ভাবারই পথ তৈরি করে দিয়েছে। নতুন নতুন জ্ঞানের জন্য, বিজ্ঞানের অভিনব উদ্ভাবনের জন্য, সমাজের পরিবর্তন আনার জন্য এই শিক্ষকদের ভূমিকা অটুট রাখার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। এই শিক্ষকদের অবস্থা কোনো কারণেই যেন কলুষিত না হয়, রাষ্ট্রকেই তা দেখতে হবে।
ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী: গবেষক। অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
pr_saif@yahoo.com

বন্দর নিয়ে আপাতত স্বস্তি, কিন্তু... by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

চট্টগ্রাম বন্দরের সাম্প্রতিক অবস্থা নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার কিছুটা আঁচ পাওয়া গেল সম্প্রতি এক গোলটেবিল বৈঠকে। খোদ নৌপরিবহনমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই তাঁর পদত্যাগ দাবি করে ব্যবসায়ী-শিল্পপতি-আমদানিকারকেরা জানিয়ে দিলেন, তাঁদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।
বন্দরের কর্মকাণ্ডে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও সংসদীয় কমিটির অযাচিত হস্তক্ষেপকে এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেছেন অধিকাংশ বক্তা। আশ্চর্যের বিষয়, নানা বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেও এ বৈঠকের মাত্র এক দিন পর এক সংবাদ সম্মেলনে বন্দর শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারাও বন্দরের দুরবস্থার জন্য আঙুল তুললেন একই মন্ত্রণালয় ও সংসদীয় কমিটির বিরুদ্ধে।
মন্ত্রী শাজাহান খান অবশ্য ব্যর্থতা প্রমাণিত হলে পদত্যাগ করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু সেই ব্যর্থতা আর কখন এবং কী পরিস্থিতিতে প্রমাণিত হবে, সেই প্রশ্ন সরাসরি তাঁকে করেছেন ব্যবসায়ীরা। মন্ত্রী সংসদীয় কমিটির পক্ষেও সাফাই গেয়েছেন। তিনি বলেছেন, সংসদীয় কমিটি তাঁর মন্ত্রণালয়ে খবরদারি করতে পারে না। তাদের সব সুপারিশও তিনি আমলে নেন না, শুধু বন্দরের জন্য হিতকর এমন কিছু সুপারিশ তিনি গ্রহণ করেন।
মন্ত্রী অস্বীকার করলেও বেসরকারি বার্থ অপারেটর নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা এবং এর আগে দু-দুবার দরপত্র আহ্বান করেও তা বাতিল করার প্রক্রিয়ার মধ্যেই সন্দেহের বীজ উপ্ত রয়েছে। বন্দর ব্যবহারকারী ও শ্রমিক সংগঠনগুলো মনে করে, নির্দিষ্ট ছয়টি বার্থ অপারেটর প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্যই দীর্ঘসূত্রতার আশ্রয় নিয়েছে মন্ত্রণালয়। এই ছয় বার্থ অপারেটর, সংসদীয় কমিটি এবং মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একধরনের আঁতাতের অভিযোগও তুলতে চান সংশ্লিষ্ট লোকজন। বলা হচ্ছে, বারবার দরপত্র আহ্বান করা হলেও ‘তালগাছ আমার’ সিদ্ধান্তে অটল থাকার কারণেই সুরাহা হয়নি এ সংকটের।
বার্থ অপারেটর নিয়োগের জন্য প্রথমবার দরপত্র আহ্বান করা হলে ২৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল। পরের বার শর্ত কিছুটা শিথিল করা হলে দরপত্র দিয়েছিল ২৬টি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আইনের ফাঁক বের করে তৃতীয়বার দরপত্র দেওয়ার জন্য বেশ কিছু কঠিন শর্ত আরোপ করা হলে মাত্র নয়টি প্রতিষ্ঠান এতে অংশ নেয়। এ ক্ষেত্রে যা ছিল প্রায় অনিবার্য, অর্থাৎ, সেই ছয় বার্থ অপারেটর প্রতিষ্ঠানের ভাগ্যের শিকে ছিঁড়েছে।
এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই, যত তাড়াতাড়ি বেসরকারি বার্থ অপারেটর নিয়োগ করা হবে, তত দ্রুত বন্দরের অস্থিতিশীলতা কাটবে। ৩ অক্টোবর ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি বার্থ অপারেটর নিয়োগ অনুমোদন করেছে। প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিয়ে এর কার্যাদেশও দেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এই সপ্তাহ থেকে নিয়োগ পাওয়া ছয় বার্থ অপারেটর কোম্পানি বন্দরে কাজ শুরু করতে পারবে। এর ফলে ছয় বার্থ অপারেটর নিয়োগ নিয়ে যত অনিয়মের প্রশ্নই থাকুক, আপাতত বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে স্বস্তি নেমে আসবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ফলে মন্দের ভালো হিসেবে এ ব্যবস্থাই মেনে নিতে হবে আমাদের।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, এ সমাধান কতটা দীর্ঘস্থায়ী? মূলত বেসরকারি বার্থ অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি চালু হয় গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। সন্দেহ নেই, তখন বন্দর পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছিল। তখন ডক শ্রমিক পরিচালনা বোর্ড বিলুপ্ত করা হয় এবং বার্থ অপারেটরদের সরাসরি শ্রমিক নিয়োগের সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু একটি অনির্বাচিত সরকার যেভাবে শ্রমিকদের স্বার্থ উপেক্ষা করতে পারে, তা একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। বর্তমান সরকার বন্দর শ্রমিক ফেডারেশনের সঙ্গে চুক্তি করেছে। যাচাই-বাছাই করে শ্রমিক পুনর্বহাল, চিকিৎসা, আবাসন, চাকরির নিরাপত্তা ইত্যাদি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি আছে সেই চুক্তিতে। এখন বেসরকারি অপারেটরদের দায়িত্ব সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা। তবে ডক শ্রমিক পরিচালনা বোর্ড যেহেতু নেই, এখন বন্দর কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে দেখভালের জন্য একটি কমিটি করে দিতে পারে। সম্প্রতি ডক বন্দর শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশন যাচাই-বাছাই করা শ্রমিকদের নিয়োগসহ কয়েকটি দাবিতে আবার আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। শ্রমিকদের মধ্যে ছোটখাটো সংঘর্ষের খবরও পাওয়া গেছে। এসবই বন্দরের স্থিতিশীলতার জন্য অশনিসংকেত। আমরা আশা করব, এ ক্ষেত্রে সম্মিলিত উদ্যোগ ও শুভবুদ্ধির জয় হবে। ধ্বংসাত্মক কর্মসূচিতে না গিয়ে দেনদরবারের পথে যাওয়ার পরামর্শ দিতে চাই শ্রমিকনেতাদের। সদ্যগঠিত বন্দর উপদেষ্টা পরিষদও এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখতে পারে। মোট কথা, বন্দর ব্যবহারকারীদের পাশাপাশি শ্রমিকদের কল্যাণের বিষয়টি যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি কারণে-অকারণে বন্দরকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের প্রবণতাও বন্ধ করতে হবে শ্রমিক সংগঠনগুলোকে।
আরেকটি বিষয় ভেবে দেখতে বলি সংশ্লিষ্ট সবাইকে। বর্তমানে বেসরকারি বার্থ অপারেটর নিয়োগের ক্ষেত্রে যে শর্ত আরোপ করা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, শুধু চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের অভিজ্ঞতা আছে এমন প্রতিষ্ঠানই যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ, বেসরকারি অফ-ডক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের অভিজ্ঞতা, এমনকি মংলা বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের অভিজ্ঞতা আছে এমন প্রতিষ্ঠানও যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, যে ছয়টি বার্থ অপারেটর প্রতিষ্ঠানকে তিন বছরের জন্য কাজ দেওয়া হয়েছে, মেয়াদ শেষে তারাই আবার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। কারণ, অন্য অপারেটররা তো অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগই পেল না। তিন বছর পর এ ছয়টি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে যেকোনো মূল্যের প্রস্তাব দিলে তা-ই মেনে নিতে বাধ্য হবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। আমাদের ধারণা, সরকারি সংগ্রহবিধি (পিপিআর), স্ট্যান্ডার্ড টেন্ডার ডকুমেন্টস (এসটিডি) এবং বার্থ অপারেটরের সংজ্ঞা-সম্পর্কিত গেজেট—এ তিন সরকারি আইনের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা না গেলে বন্দরের বার্থ পরিচালনা উল্লিখিত ছয়টি প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হবে। বিষয়টি আমলে নেওয়ার সময় এখনই।
বেসরকারি বার্থ অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত। আগেই বলেছি, এ সিদ্ধান্ত বন্দর ব্যবহারকারীদের জন্য স্বস্তিদায়ক। এখন বন্দরের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার কাজটি করতে হবে দ্রুত। জেটিতে জাহাজের গড় অবস্থানের সময় কমিয়ে আনা, বিদেশি জাহাজমালিকেরা যাতে এ বন্দরকে নিরাপদ ভাবতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং দেশের আমদানি-রপ্তানিকারকদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে সবার আগে।
চট্টগ্রাম বন্দরকে বৈদেশিক বাণিজ্যের গেটওয়ে বলছি আমরা। অথচ এ বন্দরের সম্ভাবনার মাত্র ৬০ শতাংশ ব্যবহূত হচ্ছে এখন। বাকি ৪০ শতাংশ ব্যবহারের জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রশ্নে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও মতৈক্যের বিকল্প নেই। অদূর ভবিষ্যতে ট্রানজিট বাস্তবায়নের জন্যও এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন অপরিহার্য।
ট্রানজিট নিয়ে বিতর্ক চলছে দীর্ঘদিন। গত জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরকালে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে স্বাক্ষরিত যৌথ ইশতেহারে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরকে প্রতিবেশী দেশগুলোর ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়। বর্তমান সরকার ট্রানজিটের পক্ষে যে অবস্থান নিয়েছে, তাতে ব্যবসায়ীসহ প্রায় সব মহলেরই সমর্থন আছে বলে মনে হয়। ট্রানজিটের মাধ্যমে পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্য, নেপাল, ভুটান ও চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের অবাধ যোগাযোগ হলে খুলে যাবে বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার। বিএনপি ও সমমনা কিছু রাজনৈতিক দল রাজনীতির খাতিরে বিরোধিতা করলেও এর প্রয়োজন ও গুরুত্ব যে তারাও উপলব্ধি করেছে, তার প্রমাণ তো আমরা আগেই পেয়েছি। ১৯৭২ সালে ভারতের সঙ্গে করা নৌ-ট্রানজিট প্রটোকল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে নবায়ন করা হয়েছে, পরবর্তীকালে বিএনপির খালেদা জিয়াও ওই চুক্তি নবায়ন করেন। ফলে ট্রানজিট নিয়ে বিএনপির আন্দোলনের চেষ্টা হালে পানি পাবে বলে মনে হয় না।
সব মিলিয়ে এ প্রাকৃতিক বন্দরটি এখনো অর্থনৈতিক অগ্রগতির অনেক স্বপ্ন দেখাচ্ছে আমাদের। অনিয়ম, দুর্নীতি, সিদ্ধান্তহীনতা ও অদক্ষতার কারণে বারবার হোঁচট খায় সেই স্বপ্ন। আমাদের স্বপ্ন বাঁচবে বন্দর বাঁচলে।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwa_chy@yahoo.com

বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ

মানুষের চেতনা গঠনের মূলে আছে স্মৃতি। এ জন্য সারা বিশ্বেই দেখা যায়, কোনো সমাজ যে চেতনা সবার মাঝে সঞ্চারণ করতে চায়, তার চিহ্ন ও প্রতীক সাধারণের দৃষ্টিগ্রাহ্য রাখতে তারা সচেষ্ট থাকে। কিন্তু যে চেতনায় আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করেছিলাম, দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, সেগুলোর ব্যাপারে আমরা অনেকটা উদাসীন থেকেছি। ফলে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বধ্যভূমিগুলোর বেশির ভাগই এখনো অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। ইতিহাসের নিদর্শন ধীরে ধীরে স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। এবার সরকার ১৭৬টি বধ্যভূমি সংরক্ষণ এবং স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। দেরিতে হলেও এ উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ।
বধ্যভূমিগুলো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগীদের নৃশংসতা এবং জনগণের বিরুদ্ধে তাদের অপরাধের সাক্ষ্য দিচ্ছে। অথচ দেশের অধিকাংশ বধ্যভূমি এখন যে করুণ অবস্থায় আছে, তা সাধারণ মানুষকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ধারণা দিতে খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারছে না। তাই পরের প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার জন্য এ জায়গাগুলো সংরক্ষণ করা আবশ্যক।
স্বাধীনতার জন্য এবং দেশকে শত্রুমুক্ত করতে গিয়ে বাংলাদেশের যে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। আত্মোৎসর্গকারী এই শহীদেরা যে চেতনা ধারণ করে লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তা শুধু অতীতের বিষয় নয়, যাবতীয় অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তা আজও আমাদের প্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের স্মৃতি সব সময়ই সজীব ও প্রাণবন্ত। এই স্মৃতি আমাদের সামনে এগিয়ে চলতে সহায়তা করে। তাই প্রত্যাশা করি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখতে এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আমাদের প্রেরণার উৎস হিসেবে এ জায়গাগুলো গড়ে তোলা হবে এবং সরকারের বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হবে।

নাটোরে উপজেলা চেয়ারম্যান হত্যা

সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের হাতে একজন উপজেলা চেয়ারম্যানের নৃশংস হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক প্রতিহিংসারই বহিঃপ্রকাশ বলে প্রতীয়মান হয়। সংবাদপত্রে সহিংসতার যে ছবি ছাপা হয়েছে, টেলিভিশনে যে চিত্র দেখানো হয়েছে, তাতে দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও উদ্বিগ্ন। এমন ঘটনা রাজনীতির জন্য কলঙ্কের ও সরকারের জন্য লজ্জার বিষয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। ঘটনাটি জনমনে যে অভিঘাত সৃষ্টি করেছে, তার প্রতি সাড়া দিয়ে সেই ব্যবস্থা দ্রুত ও কঠোরভাবেই নেওয়া প্রয়োজন। নইলে এ ঘটনার দায় থেকে সরকার, ক্ষমতাসীন দল মুক্ত হতে পারবে না।
নাটোরের বনপাড়ায় পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় একজন নেতাকে স্বাগত জানাতে বিএনপি মিছিল বের করলে সরকারি দলের নেতা-কর্মীরা তাতে হামলা চালান। এতে ব্যবহূত হয় আগ্নেয়াস্ত্র, লাঠিসহ ধারালো হাতিয়ার। অভিযোগ রয়েছে, তাণ্ডবে বিএনপির ৪০ জন নেতা-কর্মী আহত হলেও পুলিশ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এখানেই শেষ নয়, দুষ্কৃতকারীরা দায়িত্বরত চার সাংবাদিকের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে চড়াও হতেও দ্বিধা করেনি। তাঁদের দুজনের মাথা ফেটে গেছে এবং একজনের পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে, অন্যজনও গুরুতর আহত। এ ঘটনার জেরে নাটোরের রাজনীতি উত্তপ্ত তো হলোই, জাতীয় রাজনীতিতেও এর প্রতিক্রিয়া পড়বে স্বাভাবিকভাবেই। নাটোরে হরতাল ঘোষিত হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় বিএনপিও কর্মসূচি নিয়েছে।
নিহত সানাউল্লাহ নূর কেবল বনপাড়া পৌর বিএনপির সভাপতিই ছিলেন না, ছিলেন নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান। তাই এ ঘটনা কেবল বিরোধী দলের ওপরই আক্রমণ নয়, একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তথা গণতন্ত্রের ওপর আঘাত বলেও বিবেচিত হবে। অতীতে বিএনপি জোট সরকারের সময়ে এ ধরনের ঘটনা জনগণকে সন্ত্রস্ত করেছিল এবং বিপন্ন করেছিল আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের অস্তিত্বকে। তারই পুনরাবৃত্তি কোনোভাবে কাম্য নয়।
জনগণের চোখের সামনে একজন জনপ্রতিনিধির ওপর এ ধরনের হামলা ও পরিণতিতে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি একটি সুস্থ সমাজে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের স্থান রাজনীতিতে হওয়ার কথা নয়। রাজনীতিতে এ ধরনের নিষ্ঠুরতা চলতে পারে না। ক্ষতিটা সরকারেরই বেশি, তাই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষী ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্বও তার ওপর বর্তায়। কাদের প্রশ্রয়ে এসব ঘটছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি।
সারা দেশেই সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড লক্ষ করা গেছে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা এসব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থই হচ্ছেন না, মাঝেমধ্যে অসহিষ্ণু প্রতিক্রিয়াও দেখাচ্ছেন, যা থেকে দলীয় কর্মীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। অসহিষ্ণু ও বৈরী রাজনীতির শিকার হলেন বনপাড়ার উপজেলা চেয়ারম্যান সানাউল্লাহ নূর। আওয়ামী লীগের নিষ্ঠাবান কর্মী-সমর্থকদেরও এ ঘটনায় কলঙ্কিত করা হলো। এই দায় তাঁরা কেন নেবেন? কেন সরকারই বা এই অনাচার সইবে? এ ঘটনায় বিএনপির নেতা-কর্মীদের ক্ষুব্ধ হওয়া স্বাভাবিক। হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গৃহীত কর্মসূচিও শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হবে আশা করি। সরকারের উচিত নাটোরের নৃশংস ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে দলীয় কর্মীদের সহিংস কর্মকাণ্ড থেকেও নিবৃত্ত করতে হবে। অপরাধ করে দলীয় নেতা-কর্মীরা পার পেয়ে গেলে অপরাধ বাড়তেই থাকবে। সেই অবস্থা কোনো সভ্য সমাজে কাম্য নয়। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অপরাধীদের শাস্তিই পারে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে।

ডিএসইতে দরপতন, সাধারণ সূচক কমেছে ১৮৭.৭৯ পয়েন্ট

ঢাকার শেয়ারবাজারে গত কয়েক দিনের অব্যাহত চাঙাভাবের পর আজ রোববার নতুন সপ্তাহের শুরুতে ব্যাপক দরপতন হয়েছে। ১৫ দিনেরও বেশি সময় ধরে শেয়ারবাজারে চাঙাভাব বিরাজ করছিল।
এদিকে, আজ রোববার শেয়ারবাজারের ব্যাপক দরপতনকে অনেক বিনিয়োগকারীই ডিএসই ও সিএসইর গতকালের সংবাদ সম্মেলনের প্রভাব হিসেবে মনে করছেন।
ডিএসইতে আজ সাধারণ মূল্যসূচক ১৮৭ দশমিক ৭৯ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে ৭২৯২ দশমিক ৫৪ পয়েন্টে। লেনদেনের শুরুতে সাধারণ সূচক ১৩৪ পয়েন্ট কমে যায়। কিছুক্ষণ পর সূচক কিছুটা বাড়ে। কিন্তু দুপুর ১২টার দিকে সাধারণ সূচক আবার ১৩১ দশমিক ৭০ পয়েন্ট কমে যায়। এরপর থেকে সাধারণ সূচক ক্রমান্বয়ে নিম্নগামী হয়। এদিকে ডিএসইতে আজ মোট দুই হাজার ৩৬৪ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, যা গতদিনের চেয়ে ৪৩৭ কোটি টাকা কম।
আজ শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া প্রায় সব ক্যাটাগরির শেয়ারের দাম কমেছে। লেনদেন হওয়া মোট ২৪০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের মধ্যে দাম বেড়েছে ২৫টির, কমেছে ২১২টির আর দাম অপরিবর্তিত ছিল তিনটি প্রতিষ্ঠানের।
লেনদেনে শীর্ষ পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো— প্রিমিয়ার ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স সার্ভিসেস, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ও বেক্সিমকো।
আজ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ফুওয়াং সিরামিকসের শেয়ারের দাম। এছাড়া এপেক্স ওয়েভিং, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংক দাম বাড়ার শীর্ষ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে।
এ ছাড়া দাম কমে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষ পাঁচটি প্রতিষ্ঠান হলো—ইমাম বাটন, এইমস ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, কেয়া কসমেটিকস, ঢাকা ফিশারিজ ও কন্টিনেন্টাল ইনস্যুরেন্স।
আজ ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল ৩,১৬,৮০৬ কোটি টাকা।

নাইজেরিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগে ব্যাংক কর্মকর্তার কারাদণ্ড

দুর্নীতি, প্রতারণা ও অবৈধভাবে অর্থ-সম্পদ হস্তান্তর করার নির্দেশ দেওয়ার জন্য নাইজেরিয়ার একটি ব্যাংকের সাবেক প্রধানকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সিসিলিয়া ইব্রু নামের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হস্তান্তরের অভিযোগ আনা হয়েছে। গত শুক্রবার লাগোসের একটি আদালত এই রায় ঘোষণা করেন। খবর, বিবিসি অনলাইনের।
সিসিলিয়া ইব্রু ছিলেন নাইজেরিয়ার ওসেনিক ব্যাংকের সিইও। তাঁর বিরুদ্ধে আনা ২৫টি প্রতারণা ও দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে তিনটি প্রমাণিত হয়েছে। ২০০৯ সালে নাইজেরিয়ায় যে নয়টি ব্যাংক দেউলিয়া ঘোষিত হয়, তাতে তাঁর বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আবুজা থেকে বিবিসির সংবাদদাতা ক্যারোলিন ডাফিয়েল্ড জানান, এই বিচার নাইজেরিয়ার অর্থনৈতিক জগতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। যে তিনটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, এর প্রতিটির জন্য তাঁকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তাঁর ছয় মাস কারাভোগ করলেই চলবে।
এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে নাইজেরিয়ার দুর্নীতি দমন এজেন্সির প্রধান ফরিদা ওয়াজিরি বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধে নাইজেরিয়া যে সফলতা দেখাচ্ছে, এই বিচার তারই ইঙ্গিত বহন করে।

ইউয়ানের মূল্য বাড়ানোর কথা বলল যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থসচিব টিমোথি গেইথনার চীনকে অন্যান্য দেশের মুদ্রা বিনিময় হারের বিপরীতে ইউয়ানের মূল্য বাড়ানোর কথা বলেছেন। ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক অলোচনায় তিনি এ কথা বলেন। খবর বিবিসি অনলাইনের।
টিমোথি বলেন, যেসব দেশ রপ্তানি খাতের ওপর অধিক নির্ভরশীল, তাদের উচিত আর্থিক নীতিমালা পরিবর্তন করা। নীতিমালা পরিবর্তন না করলে বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে যেতে পারে। বিশ্বের প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোকে মুদ্রা বিনিময় হারের নীতির ক্ষেত্রে আরও নমনীয় এবং বাজার-সংশ্লিষ্ট হতে হবে।
এদিকে, বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে আঘাতের জন্য ধনী দেশের মুদ্রা বিনিময় হারের নীতিকে দায়ী করেছে চীন।
আইএমএফের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে মুদ্রা বিনিময় হারের নীতি নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। চীনের মুদ্রা ইউয়ানের বিপরীতে ডলারের বিনিময় হারের নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছে, ইউয়ানের দাম না বাড়ানোয় চীনের রপ্তানিকারকেরা অসম প্রতিযোগিতার সুবিধা পাচ্ছেন।

বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে আইএমএফ উদ্বিগ্ন

চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৮০ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। মন্দা কাটিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি অনেকটা জোরালোভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রভাবে প্রবৃদ্ধির এই হারের পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি।
তবে এই প্রবণতা অব্যাহত থাকার বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহে রয়েছে আইএমএফ। যে কারণে আগামী বছর অর্থাৎ ২০১১ সালে এসে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার কমে ৪ দশমিক ২০ শতাংশ হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির এই প্রবৃদ্ধিকে যথেষ্ট যৌক্তিক মনে করলেও বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা যে রয়ে যাচ্ছে, তাও উল্লেখ করেছে আইএমএফ। পাশাপাশি মুদ্রার দর নামিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন দেশের মধ্যে একটি মুদ্রা লড়াই আসন্ন বলেও শঙ্কা প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিষ্ঠানটির ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস’ (ডব্লিউইও) প্রতিবেদনে এসব আশা ও শঙ্কার কথা বলা হয়েছে। এতে আরেক দফা মন্দার কোনো আশঙ্কা করা হয়নি, যা ইতিবাচকভাবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। তবে সার্বিকভাবে আইএমএফ যে উদ্বিগ্ন, তার স্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে এই প্রতিবেদনে।
আবার অনেকে মনে করছেন, প্রতিষ্ঠানটি অতিমাত্রায় উদ্বিগ্ন, যার তেমন কোনো ভিত্তি নেই। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, সুদের হার নিম্ন পর্যায়ে আছে, বাজেট ঘাটতি চাহিদা বাড়াতে সহায়তা করছে, সরকারগুলোও প্রণোদনার জন্য আরেক দফা অর্থ খরচ করতে প্রস্তুত।
অন্যদিকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো মন্দার সময় লোক ছাঁটাই করেছিল এবং মজুরি কমিয়েছিল। ফলে এখন তাদের হাতেও প্রচুর অর্থ আছে। সুতরাং, উদ্বিগ্ন হওয়ার তেমন প্রয়োজন নেই।
কিন্তু আইএমএফ মূলত দুটি কারণে উদ্বিগ্ন। প্রথমত, পশ্চিমা উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় বেসরকারি খাত এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। তারা ভোগ-চাহিদা যথেষ্ট শক্তিশালী না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকে রাখা অর্থ ব্যয় করতে রাজি নয়। অথচ গণব্যয় কমিয়ে ও কর বাড়িয়ে বিরাট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সরকারি প্রয়াস এগিয়ে নিতে হলে বেসরকারি খাতকে সক্রিয় হয়ে উঠতে হবে। এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন রপ্তানি বাড়ানো। আর এখানেই রয়েছে দ্বিতীয় সমস্যাটি।
কারণ প্রধানত, যেসব দেশে পণ্য রপ্তানি করা হবে, সেসব দেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে বড় ধরনের উদ্বৃত্ত রয়েছে। চীন, জাপান, জার্মানিসহ তেল উৎপাদক দেশগুলো অধিকতর আমদানি করে এই উদ্বৃত্তাবস্থা কমিয়ে আনতে তেমন আগ্রহী নয়। এ জন্য তাদের তেমন চাপ দেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই।
আর তাই আইএমএফের প্রতিবেদনে বিরাট মজুদ গড়ে তোলার পরিবর্তে চীনা মুদ্রা ইউয়ানের দর বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কারণ, আইএমএফ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে চীনের ওপর সে রকম কোনো চাপ তৈরি করা সম্ভব নয়।
আর বিশ্বমন্দার মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক শক্তির ভারসাম্য পশ্চিম থেকে পুবের দিকে স্থানান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়াটি জোরালো হয়েছে। এই পরিস্থিতিকে আইএমএফ ভারসাম্যহীনতা বলে মনে করছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুসারে চলতি বছর উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সমন্বিত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ১০ শতাংশ হবে, যা আগামী বছর কমে ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ হতে পারে। অন্যদিকে উন্নত বিশ্বের ক্ষেত্রে এই হার প্রাক্কলন করা হয়েছে যথাক্রমে ২ দশমিক ৭০ শতাংশ ও ২ দশমিক ২০ শতাংশ।
প্রতিষ্ঠানটির শঙ্কা, পশ্চিমা উন্নত অর্থনীতিগুলোয় নতুনভাবে যে দুর্বলতা দেখা দিয়েছে, তা আবার এশিয়াসহ উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি: আইএমএফের পূর্বাভাস অনুসারে চলতি অর্থবছর (২০১০-১১) বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হবে ৬ দশমিক ৩০ শতাংশ। সরকার অবশ্য চলতি অর্থবছর সাড়ে ছয় শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে।
অন্যদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও (এডিবি) চলতি অর্থবছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৩০ শতাংশ হবে, যা গত মাসে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুকে পূর্বাভাস দিয়েছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুসারে, চলতি অর্থবছর বাংলাদেশের বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়াবে ৭ দশমিক ৪০ শতাংশ।
এ ছাড়া আইএমএফ মনে করছে, চলতি অর্থবছর বাংলাদেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের উদ্বৃত্ত হবে জিডিপির ১ দশমিক ১০ শতাংশ। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে বড় ধরনের উদ্বৃত্তাবস্থা বজায় রয়েছে।

পাটের মোড়ক বাধ্যতামূলক হলে বন্ধ কারখানাগুলো চালু হবে

বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমএ) বলেছে, জাতীয় সংসদে বাধ্যতামূলকভাবে পাটজাত মোড়ক ব্যবহার বিল-২০১০ পাস হওয়ায় দেশের বন্ধ পাটকলগুলো পুনরায় চালু হবে এবং নতুন নতুন পাটকল স্থাপিত হবে। ফলে দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকার সমস্যা লাঘব হবে।
বিলটি পাস করার জন্য বিজেএমএ সাংসদদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছে, এর ফলে দেশে উৎপাদিত সব কাঁচা পাট মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে পাটপণ্য প্রস্তুত করে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি ও রপ্তানি হবে। উপরন্তু অভ্যন্তরীণ বাজারে পাটপণ্যের মোড়কের এক বিশাল বাজার সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পাটশিল্প অবদান রাখতে সক্ষম হবে। বদৌলতে পাটের হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসবে।
বিজেএমএর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলা হয়। এতে বলা হয়, বিলটি পাসের ফলে দেশের কৃষক-শ্রমিকসহ পাটশিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় তিন কোটি মানুষ দীর্ঘদিনের দুর্দশা থেকে উত্তরণের একটি স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে পেয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিটিতে আরও বলা হয়, কৃত্রিম মোড়ক ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে এবং এর কাঁচামাল আমদানিতে প্রচুর পরিমাণে বিদেশি মুদ্রা ব্যয় হয়। সে জন্য সরকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার জন্য পাটের মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার যে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়েছে তা প্রশংসনীয়। কারণ এটি বারবার ব্যবহার করা যায় এবং পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না।

এনামুলের ‘মিশন’ দক্ষিণ আফ্রিকা

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়ার পর থেকেই আম্পায়ারিংয়ে আছেন এনামুল হক (মনি)। সাবেক এই টেস্ট ক্রিকেটার এবার দক্ষিণ আফ্রিকা-জিম্বাবুয়ে ওয়ানডে সিরিজে নিরপেক্ষ আম্পায়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশের কোনো আম্পায়ার এই প্রথম আইসিসির পূর্ণাঙ্গ দুই সদস্য-সংশ্লিষ্ট দেশের ম্যাচ পরিচালনা করতে যাচ্ছেন। সিরিজে ব্লমফন্টেইন, পচেফস্ট্রুম ও বেনোনিতে তিনটি ম্যাচ পরিচালনা করবেন তিনি। আন্তর্জাতিক প্যানেলভুক্ত আম্পায়ার এনামুল হকের ভাষায়, ‘এটি শুধু আমার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, দেশের জন্যও একটি অর্জন।’

টেন্ডুলকার-মুরালির সঙ্গে সাকিব

শচীন টেন্ডুলকার ও মুত্তিয়া মুরালিধরনের সঙ্গে ২০১১ বিশ্বকাপের প্রচারণায় থাকছেন সাকিব আল হাসান।
বিশ্বকাপের স্থানীয় আয়োজক কমিটির টুর্নামেন্ট পরিচালক আলী আহসান (বাবু) কাল জানিয়েছেন, ‘বিশ্বকাপ সামনে রেখে অচিরেই দেখা যাবে তিন আয়োজক দেশের তিন ক্রিকেটারকে নিয়ে বানানো প্রচারণামূলক ভিডিও। ভারতের শচীন টেন্ডুলকার ও শ্রীলঙ্কার মুত্তিয়া মুরালিধরনের সঙ্গে এতে আছেন বাংলাদেশের সাকিব আল হাসানও।’
বিশ্বকাপের স্থানীয় স্পনসর বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন চাইলে বিশ্বকাপের সময় তুলে ধরতে পারে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পকে। ‘প্রেসবক্সের সজ্জায় বা বিশেষ বিশেষ ল্যান্ডমার্কে কিছু সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে এই সুযোগটা নিতে পারে পর্যটন করপোরেশন’—বলেছেন আলী আহসান।
বেঙ্গালুরুতে গত ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর হয়েছে বিশ্বকাপ কেন্দ্রীয় আয়োজক কমিটির (সিওসি) পরিচালনা কমিটির সভা। ৬ সেপ্টেম্বর হয়েছে সিওসির সভা। কাল দেশে ফিরে আলী আহসান জানিয়েছেন, বিশ্বকাপের কেন্দ্রীয় আয়োজক কমিটির (সিওসি) খাতায় বাংলাদেশের ভেন্যু সংস্কারকাজ ‘সন্তোষজনক’ নম্বরই পাচ্ছে। তিনি আশাবাদী, নির্ধারিত সময়ের আগেই আইসিসিকে বিশ্বকাপের ভেন্যু বুঝিয়ে দিতে পারবে বাংলাদেশ।
আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব ভেন্যুর কাজ শেষ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাঠাতে হবে আইসিসির কাছে। আর ভেন্যু পর্যবেক্ষণের কাজ ১৮ থেকে ২১ নভেম্বরের মধ্যে শুরু হয়ে চলবে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ‘ভেন্যু পর্যবেক্ষণ শ্রীলঙ্কায় শুরু হয়ে আমাদের হবে সবার শেষে। আমি জেনেছি, তার আগেই আমাদের ভেন্যুগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ শেষ হয়ে যাবে’—বলেছেন টুর্নামেন্ট পরিচালক। বাংলাদেশ আশাবাদী থাকলেও ভেন্যুর সংস্কারকাজে ভারত ও শ্রীলঙ্কা ভারতের মুম্বাই এবং শ্রীলঙ্কার কলম্বোর ভেন্যুর কাজের অগ্রগতিতে সন্তোষজনক নয়।
বাংলাদেশের চারটি স্টেডিয়ামে সংস্কারকাজ চলছে এবং তাতে আসনসংখ্যা কমে যাচ্ছে এসব স্টেডিয়ামের। চূড়ান্তভাবে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের মোট আসনসংখ্যা হবে ২৬৪৩৪, চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্টেডিয়ামের ১৬০৪৪, ফতুল্লা স্টেডিয়ামের ১৮০০৭ এবং বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ২৫১৫৭। আগামী বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামেই হবে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। আড়াই ঘণ্টার অনুষ্ঠান শুরু হবে বিকেল সোয়া ৫টায়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ১৪টি দলের খেলোয়াড়দেরই অংশগ্রহণের সম্ভাবনা আছে।
বেঙ্গালুরুর পরিচালনা কমিটির সভায় প্রতিটি দলের সদস্যসংখ্যা, উইকেটের ধরন, মাঠের আয়তন, দর্শকদের সুবিধা-অসুবিধা, নিরাপত্তা, ভিসা-প্রক্রিয়া, টিকিট, পয়েন্ট পদ্ধতি ইত্যাদি বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়েছে। আলী আহসান জানিয়েছেন, ১৫ জন খেলোয়াড়সহ প্রতিটি দল সর্বোচ্চ ২৩ সদস্যের হবে। অতিরিক্ত সদস্যের খরচ বহন করতে হবে সংশ্লিষ্ট বোর্ডকে। বিশ্বকাপে সমান বাউন্সের উইকেট বানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাউন্ডারি রোপের ভেতর মাঠের আয়তন রাখতে বলা হয়েছে ৭০ থেকে ৮০ গজের ভেতর (বাংলাদেশ রাখবে ৭৫ গজ)। এ ছাড়া বিশ্বকাপ উপলক্ষে ভারতের ভিসা-প্রক্রিয়া সহজ করারও আশ্বাস দিয়েছেন বিসিসিআই সভাপতি শারদ পাওয়ার।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, বিশ্বকাপে ‘ওয়ান ওভার এলিমিনেটর’ পদ্ধতি কার্যকর হবে নকআউট পর্যায়ে। গ্রুপ পর্বের কোনো ম্যাচ টাই হলে দুই দলই সমান পয়েন্ট পাবে।

সমতায় আফগানিস্তান

আইসিসি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে হারের জ্বালা একটু হলেও কেনিয়া ভুলেছিল ঘরের মাঠে তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ম্যাচে জিতে। কিন্তু তাদের সেই জয়ের আনন্দে হতাশার প্রলেপ লাগতেও সময় লাগল না। গতকাল দ্বিতীয় ওয়ানডেতেই ৬ উইকেটে জিতে সিরিজে সমতায় ফিরেছে আফগানিস্তান। আফগান বোলারদের তোপের মুখে কেনিয়া ১৩৯ রানেই অলআউট। আসগর স্টানিকজাইয়ের ৫৫ ও মোহাম্মদ শাহজাদের ৩৭ রানের ইনিংসে ২৭ ওভারেই আফগানিস্তান ১৪৩/৪। আগামীকাল শেষ ম্যাচটি তাই সিরিজ নির্ধারণী ‘ফাইনাল’।

ক্লাব শিরোপা পশ্চিমবঙ্গের

নামে ক্লাব কাপ; খেলেছে ভারতের দুটি প্রাদেশিক দল, নেপাল ও জাপানের জাতীয় দল এবং বাংলাদেশের দুটি ক্লাব! মিজান আন্তর্জাতিক ক্লাব কাপ কাবাডির শিরোপাটা শেষ পর্যন্ত গেল পশ্চিমবঙ্গে। কাল ফাইনালে ১৪-১০ পয়েন্টে বাংলাদেশ জেলকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছে পশ্চিমবঙ্গ।
এর আগে দিনের প্রথম সেমিফাইনালে জাপান ৫২-১১ পয়েন্টে আসাম কাবাডি দলকে এবং পরের সেমিফাইনালে পশ্চিমবঙ্গ ২৯-১৪ পয়েন্টে বাংলাদেশ জেলকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে।

ইতালির বাধা আয়ারল্যান্ড

বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনের ছিল চোট-সমস্যা। ইতালির ভয় ছিল ম্যাচটি উত্তর আয়ারল্যান্ডের মাঠে বলে। গত বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নরা চোট-সমস্যাকে জয় করে লিথুয়ানিয়াকে হারিয়েছে ৩-১ গোলে। তবে বেলফাস্ট জয় করা হয়নি চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালির, উত্তর আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে ফিরেছে তারা।
লিথুয়ানিয়াকে নিয়ে স্পেন ভয়ে ছিল জাভি হার্নান্দেজ, সেস ফ্যাব্রিগাস, ফার্নান্দো তোরেসসহ ৬-৭ জন নিয়মিত খেলোয়াড়ের চোট থাকায়। তবে তাঁদের বদলি হিসেবে যাঁরা খেলেছেন, তাঁরা ঠিকই উতরে দিয়েছেন স্পেনকে। বিশেষ করে বলতে হয় ফার্নান্দো লরেন্তের কথা। জোড়া গোল করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন তোরেস ফিরে এলে তাঁর সঙ্গে স্ট্রাইকিং জুটি বাঁধার সামর্থ্য তাঁর আছে। দলের অন্য গোলটি ডেভিড সিলভার।
স্পেনের সঙ্গে লিথুয়ানিয়ার শক্তির যেমন মেরু-পার্থক্য ইতালির সঙ্গে উত্তর আয়ারল্যান্ডেরও তাই। গত ২৪ বছরে উত্তর আয়ারল্যান্ড বড় কোনো টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ করে নিতে পারেনি। বাছাইপর্বই সার তাদের জন্য। তবে সম্প্রতি নিজেদের মাঠে বড় দলগুলোকে রুখে দেওয়ার একটা অভ্যাস তারা গড়েছে। স্পেন ও ইংল্যান্ডকেও তারা বেলফাস্ট থেকে শূন্য হাতেই বিদায় করেছে। ইতালিকেও তাই শূন্য উপহার দেওয়ার পণ করেছিলেন উত্তর আয়ারল্যান্ডের কোচ নাইজেল ওরথিংটন।
গোলের দিক দিয়ে শূন্য হাতে ফেরালেও একটা পয়েন্ট পেয়েছে ইতালি। তবে ৩ ম্যাচে ৭ পয়েন্ট নিয়ে ‘সি’ গ্রুপের শীর্ষে তারা। উত্তর আয়ারল্যান্ড ৪ পয়েন্ট নিয়ে আছে ৫ নম্বরে। ৬ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে এস্তোনিয়া।
ইতালির গোলরক্ষককে এদিন একা পেয়েও ডেভিড হিলি যদি গোল করতে ব্যর্থ না হতেন তাহলে মনে হয় পুরো ৩ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের দ্বিতীয় স্থানে থাকত উত্তর আয়ারল্যান্ড। সেটা হয়নি, তবে এ নিয়ে আক্ষেপ নেই কোচ ওরথিংটনের, ‘কঠিন এক ম্যাচই ছিল এটা। আর তাতে আমরা যতটা ভালো খেলতে পারি ততটা ভালো না খেলেই একটি পয়েন্ট পেয়েছি।’
এদিকে ইউরো বাছাইপর্বে শুরু থেকেই ধুঁকতে শুরু করা পর্তুগাল ডেনমার্ককে হারিয়েছে ৩-১ গোলে। নানির জোড়া গোলের সঙ্গে গোল করেছেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। জয় পেয়েছে গত বিশ্বকাপের রানার্সআপ হল্যান্ডও। মলদোভার বিপক্ষে ন্যূনতম ব্যবধানের জয়টি ইয়ান হান্টেলারের গোলে।
ইউরো বাছাইপর্বে পরশু এর বাইরে বলার মতো আছে সান মারিনোর বিপক্ষে হাঙ্গেরির ৮-০ গোলের জয় এবং দুটি হ্যাটট্রিক। ৮ গোলের ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছেন সালাই। আর স্লোভেনিয়াকে ফারো দ্বীপপুঞ্জের বিপক্ষে ৫-১ গোলে জেতাতে হ্যাটট্রিক করেছেন মাতাভ।

লাভ বেশি লোকসানও

বিশ্বের নামীদামি ক্লাবগুলো টাকার বস্তা নিয়ে দলবদলের বাজারে ঝাঁপিয়ে পড়ে কেন? মাঠের সাফল্য আসুক না-আসুক বাণিজ্য নিশ্চিত। গত দু-তিন মৌসুমে মাঠের সাফল্য কী, প্রায় জানেই না রিয়াল মাদ্রিদ। তার পরও গত মৌসুমেও স্প্যানিশ ক্লাবটি অর্জন করেছে রেকর্ড মুনাফা। রেকর্ড মুনাফা হয়েছে ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডেরও। কিন্তু ১০ কোটি পাউন্ডের বেশি মুনাফা করলেও আসলে লোকসান হয়েছে ৮ কোটি ৩৬ লাখ পাউন্ড লাকসান! ক্লাবের মার্কিন মালিকের বিনিয়োগ করা অর্থের সুদ, পুনর্বিন্যাস করা ঋণই এই লোকসানের কারণ। লোকসানের খবরে হতাশ ম্যানইউ সমর্থকেরা। তবে তারা শঙ্কামুক্ত থাকতে পারছে, কারণ দেনা মেটাতে আর কোনো তারকা খেলোয়াড়কে বিক্রি করবে না ম্যানইউ। প্রধান নির্বাহী ডেভিড গিল জোর দিয়ে বলছেন, রুনি কিংবা এক্স-ওয়াই-জেড—কাউকেই বিক্রি নয়, উল্টো নতুন খেলোয়াড় কেনার মতো টাকা ম্যানইউর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে গচ্ছিত আছে।

আরেকটা অস্ট্রেলীয় দিন

এবার ট্র্যাকে বেওয়ারিশ কুকুর ঢুকে পড়ার ঘটনা—দিল্লির কমনওয়েলথ গেমস নিয়ে বিতর্ক যেন শেষই হতে চায় না। শেষ হতে চায় না আরেকটা ব্যাপারও। অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্য। আরেকটি দিন শেষ হলো পদক-তালিকায় অস্ট্রেলিয়ার পতাকা শীর্ষে থেকেই।
২০ কিলোমিটার হাঁটায় ছেলে এবং মেয়েদের বিভাগে পদকও গেছে অস্ট্রেলিয়ার দখলে। ছেলেদের বিভাগে জারেড সোনা জিতেছেন। মেয়েদের বিভাগে ক্লেইরে। সম্পর্কে এঁরা আবার স্বামী-স্ত্রী! মেয়েদের সাঁতারেও অস্ট্রেলিয়ানদের জয়জয়কার। ব্যাঙ্গালোরে রিকি পন্টিং না পারলেও সব মিলিয়ে পদক-তালিকায় অস্ট্রেলিয়া কিন্তু এদিকে ঠিকই সেঞ্চুরি করে ফেলল। ৫০টি সোনা, ২৭টি রুপা ও ৩০টি ব্রোঞ্জ মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার পদকসংখ্যা ১০৭।
সাইক্লিংয়ের পর অস্ট্রেলিয়ার সোনার খনি হয়ে উঠেছে সাঁতার। নির্দিষ্ট করে বললে অ্যালিসিয়া কাউটস আর লিজেল জোন্স। কাল ৪–১০০ মিটার মিডলেতে সোনা জিতে কাউটস এই কমনওয়েলথ গেমসে নিজের ব্যক্তিগত সোনার মেডেলের সংখ্যাটা নিয়ে গেছেন পাঁচে। সব মিলে কমনওয়েলথ গেমসে জোন্সের সোনা জয়ের সংখ্যাটাও গিয়ে দাঁড়িয়েছে দশে। কমনওয়েলথ গেমসে ১০টি সোনা জয়ের রেকর্ড আছে আর মাত্র দুজনের। সেই দুজনও অস্ট্রেলিয়ান সাঁতারু—সুসান ও’নিল আর ইয়ান থর্প।
শ্যুটিংয়ে অবশ্য স্বাগতিক ভারতেরই আধিপত্য। কাল ৫০ মিটার রাইফেল থ্রি পজিশনে সোনা জিতেছেন গগন নারাং। এ আসরে তাঁর চতুর্থ সোনা। জিমন্যাস্ট লরেন মিশেলও এই গেমসে জিতেছেন চারটি পদক। পদক-তালিকায় ভারতের সোনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২। ইংল্যান্ডেরও। তবে মোট পদকের হিসাবে এগিয়ে থাকায় তালিকায় ভারতের ওপরে ইংল্যান্ড। নারাংয়ের সাফল্যের দিনে স্বাগতিকেরা একটু হয়তো বিষাদ-আক্রান্তও হয়েছে। সানিয়া মির্জা যে টেনিসে মেয়েদের এককের ফাইনালে উঠেও হেরে গেছেন।
চোখে পড়ার মতো তেমন কোনো পারফরম্যান্স নাইজেরিয়া-নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলো করতে পারছে না। তবে মাঝেমধ্যে দু-একটা সোনা এসব দেশের অ্যাথলেটরাও জিতে নিচ্ছেন। কাল যেমন ফ্রি-স্টাইল সোনা কুস্তির ৯৬ কেজি ওজন শ্রেণীতে সোনা জিতেছেন নাইজেরিয়ার সিনভি বোল্টিক। আর মেয়েদের শটপুটের সোনা গেছে নিউজিল্যান্ডের অলিম্পিক ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ভ্যালেরি অ্যাডামসের গলায়।

সন্দেহের তালিকায় আরও চারজন

সাময়িক বহিষ্কৃত ত্রয়ী নেই, এটা জানা কথাই। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট-ওয়ানডে দলে কামরান আকমল, ইয়াসির হামিদ, শোয়েব মালিক ও উমর আমিনের অনুপস্থিতি ছড়িয়ে দিল অন্যরকম গুঞ্জন। এই চারজন ক্রিকেটারও নাকি স্পট ফিক্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। এ কারণেই নেওয়া হয়নি তাঁদের!
গুঞ্জনটা উসকে দিচ্ছেন কামরানের চিকিৎসক। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) জানিয়েছিল, এই উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যানকে না নেওয়ার কারণ তাঁর অসুস্থতা। কিন্তু তাঁর চিকিৎসক বলছেন, কামরানের অস্ত্রোপচারটি ছিল খুবই ছোট। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচের আগে তিনি ফিট হয়ে উঠতেন। তাই শুধু ফিটনেসই তাঁর বাদ পড়ার একমাত্র কারণ হতে পারে না।
উমর আমিনের অপরাধ, বাজিকর মাজহার মাজিদের সঙ্গে তাঁকে আলাপ করতে দেখা গেছে একটা ভিডিও ফুটেজে। যদি ফর্মই কারণ হতো, তাহলে তাঁকে পাকিস্তান ‘এ’ দলের হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে পাঠানো হতো ফর্ম পুনরুদ্ধারে। ওই দলেও রাখা হয়নি বলেই ধারণা করা হচ্ছে, পিসিবির রোষানলে পড়ে গেছেন এই ব্যাটসম্যান।
তবে পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাই বিস্মিত, এই দুঃসময়েও ইউনুস খানের মতো পরীক্ষিত ব্যাটসম্যানকে দলে ফেরানোয়। অধিনায়ক পাওয়া যায়নি বলে শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৯ টেস্ট খেলা মিসবাহ-উল-হককেই বেছে নিতে হয়েছে। স্রেফ অহংবোধ থেকেই পিসিবি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে করেন সাবেক প্রধান নির্বাচক ইকবাল কাশিম। আরেক সাবেক প্রধান নির্বাচক আবদুল কাদির বলছেন, এই দুঃসময়ে দুই পক্ষকেই পেছনের কথা ভুলে হাতে হাত মেলানো উচিত।
এমন সমালোচনার মুখে পিসিবির বর্তমান প্রধান নির্বাচক মহসিন খান বলছেন, মিসবাহ ছাড়া তাঁদের সামনে বিকল্প ছিল না, ‘ব্যাটিংয়ের শক্তি বৃদ্ধি হয় এমন একজন সিনিয়র খেলোয়াড় দরকার ছিল আমাদের। প্রথম পছন্দ ছিল ইউনুস খান। কিন্তু বোর্ডের সবুজ সংকেত না পাওয়ায় মিসবাহকে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা।’
অধিনায়ক হয়ে দলে ফেরার ক্ষেত্রে মিসবাহর পক্ষে গেছে তাঁর ফিটনেস ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তিও। মহসিনের ভাষায়, ‘দলে এমন অনেক খেলোয়াড় আছে যাদের শৃঙ্খলাগত সমস্যা রয়েছে। মিসবাহ এমন একজন খেলোয়াড় যার রয়েছে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি। সে পুরোপুরি পেশাদার এবং দেশের সবচেয়ে ফিট ক্রিকেটারদের একজন।’ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মিসবাহ ধারাবাহিক পারফর্মার নয়, এটা মেনে নিয়েও তাঁর দলভুক্তির পক্ষে পাকিস্তানের প্রধান নির্বাচকের যুক্তি, ‘সে যেকোনো মুহূর্তে জ্বলে উঠতে পারে। পেন্টাগুলার কাপ এবং ন্যাশনাল ওয়ানডে কাপে ভালো করেছে সে, এটা ভালো লক্ষণ।’
পাকিস্তান দলে সিনিয়র ক্রিকেটারদের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই কিনা, রানা নাভেদ-উল হাসানের এক বছরের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ শেষের আগেই তুলে নিয়েছে পিসিবি।

মিলানে আবার কাকা-রোনি

গ্রীষ্মের দলবদলের পুরোটা সময়েই বাতাসে ভেসে বেড়িয়েছে একটা গুঞ্জন, এসি মিলান ছেড়ে যাচ্ছেন রোনালদিনহো। শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের সমঝোতায় মিলানেই থেকে গেছেন ব্রাজিলিয়ান তারকা। কিন্তু দুই মাস যেতে না-যেতেই আবার গুঞ্জন, জানুয়ারিতেই নাকি মিলান ছাড়তে পারেন! কিন্তু ‘রোনি’ এবারও জানিয়ে দিলেন, মিলানেই ভালো আছেন, শিগগিরই মিলানকে ছাড়ছেন না।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানাতে গিয়ে ফ্রান্স মিডিয়াকে রোনালদিনহো জানিয়েছিলেন, লিগ ওয়ানে ক্যারিয়ার শেষ করবেন। বলেছিলেন, প্যারিস সেন্ট জার্মেইতেই ক্যারিয়ারের সমাপ্তি দেখছেন তিনি। তাঁর মন্তব্য বিভ্রান্তি ছড়ায় মিলানে। কিন্তু রোনালদিনহো স্কাই স্পোর্ত ইতালিয়াকে বলেছেন এটা সত্য নয়, ‘জানুয়ারিতে ক্লাব ছাড়ছি না আমি। আমি মিলানে ভালো আছি। ক্লাব সভাপতির প্রতি আমার আস্থা আছে।’
ওদিকে আরেক ব্রাজিলিয়ান তারকা কাকা জানুয়ারিতেই রিয়াল মাদ্রিদ ত্যাগ করছেন বলে খবর। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে, মিলান বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, কাকা রোনালদিনহোর সঙ্গে যোগাযোগ করেই ফিরতে চাইছেন মিলানে।
কাকার রিয়াল ত্যাগের গুঞ্জন জোরেশোরেই বইছে। কিন্তু মাদ্রিদ ছেড়ে কোথায় যাবেন? সাবেক ক্লাব এসি মিলান ও ইন্টার মিলানকে জড়িয়ে গুঞ্জন আছে। কিন্তু ইতালিয়ান ক্লাব দুটি নাকি ফ্রান্সের করিম বেনজেমার প্রতি ঝুঁকেছে। তাই ইংল্যান্ডে চোখ পড়েছে কাকার। যেতে পারেন চেলসি, ম্যানচেস্টার সিটি কিংবা লিভারপুলে।
রোনালদিনহো অবশ্য এসি মিলানেই দেখতে চান কাকাকে। আগাম শুভেচ্ছাই যেন জানিয়ে রাখলেন তিনি স্বদেশি সতীর্থকে, ‘কাকা? এই ক্লাবে (এসি মিলানে) সে ইতিহাস গড়েছে। যদি সে ফিরে আসে, তাকে স্বাগতই জানানো হবে।

ফেডারেশন কাপ ফুটবল

চট্টগ্রাম আবাহনী ও বাংলাদেশ পুলিশের ম্যাচ দিয়ে গ্রামীণফোন ফেডারেশন কাপ ২০১০ মাঠে গড়াচ্ছে আজ। কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী ম্যাচটি শুরু হবে বেলা সাড়ে ৩টায়। উল্লেখ্য, টুর্নামেন্টের প্রথম পর্বের খেলাগুলো দর্শকেরা বিনা টিকিটেই উপভোগ করতে পারবে।

নাগাতোমোর মেসি-রোমাঞ্চ

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে জাপানের ১-০ গোলের জয়কে অপ্রত্যাশিত বলতে পারেন। তবে সার্জিও বাতিস্তার দলকে রুখে দিতে অনেক পরিকল্পনা সাজিয়ে দলকে মাঠে নামিয়েছিলেন জাপানের নতুন কোচ আলবার্তো জাকেরনি। তিনি জানতেন, আর্জেন্টিনাকে রুখতে হলে সবার আগে আটকাতে হবে মেসিকে। এই অতিগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটা তিনি যাঁকে দিয়েছিলেন, সেই ইউতো নাগাতোমো মেসিকে আটকাতে পেরে, মেসির মুখোমুখি হতে পেরে দারুণ রোমাঞ্চিত।
মেসিকে আটকাতে গিয়ে বারবারই মেসির সঙ্গে বল দখলের লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। বারবারই মেসির মুখোমুখি হতে পারাটা নাগাতোমোর জন্য ছিল দারুণ এক উপলব্ধি, ‘মেসির বিপক্ষে প্রতিটি মুহূর্তই ছিল দারুণ। আবারও তাঁর বিপক্ষে খেলতে চাই আমি।’

২৮ মিনিটেই ‘দর্শক’ শারমিন

দিল্লির মেট্রো রেল চোখের পলকে আসে আর যায়। শারমিন আক্তার (রত্না) শ্যুটিং করেন এর চেয়েও দ্রুত।
কতটা দ্রুত তা হিসাব করে দেখুন। মেয়েদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে ৪০ শটের জন্য সময় সর্বোচ্চ ৭৫ মিনিট। কাল শারমিনের শ্যুটিং শেষ মাত্র ২৮ মিনিটে! এরপর তিনি দর্শক। তখনো বাকি ১৫ জনের অনেকে প্রথম গুলিই ছোড়েননি! এক বিচারক অবাক হয়ে শারমিনকে বললেন, ‘তোমার শেষ! অন্যরা দেখছি কেবল তৈরি হচ্ছে!’
শারমিন এভাবেই শ্যুটিং করতে অভ্যস্ত। কিন্তু এদিন বৈশাখী ঝড়ের মতো শুরুটা অ্যান্টি-ক্লাইমেক্সে রূপ নিল। দ্বিতীয় শটই লক্ষ্যচ্যুত, প্রথম দশ শটের তিনটি ৯। শেষ পর্যন্ত ৪০০-তে নিজের সেরা ৩৯৮ থেকে ৪ কম—৩৯৪। এই স্কোর করে কমনওয়েলথ গেমসের মঞ্চে দলীয় পদক জেতা অসম্ভব, অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে চুপ মেরে বসে থাকা শারমিনের তা ভালোই জানা ছিল।
পরিস্থিতির দাবিতে ভালো স্কোর করার তাগিদ ছিল সাদিয়া সুলতানার ওপর। কিন্তু চাপের মুখে এই কিশোরীর অবস্থা চিড়েচ্যাপ্টা। চার সিরিজের প্রথমটিতেই হারালেন ৪ পয়েন্ট! শেষ পর্যন্ত ঠেলে-ধাক্কিয়ে স্কোর নিতে পারলেন ৩৯০ পর্যন্ত।
৮০০-তে বাংলাদেশের দলীয় স্কোর ৭৮৪। ছেলেদের ‘ব্যর্থতার’ পর যে ইভেন্ট বাংলাদেশের শেষ ভরসা, সেটির দলীয় বিভাগে ওয়েলসের সঙ্গে সমান স্কোর। টাইয়ে বাংলাদেশ পঞ্চম। বাংলাদেশের চেয়ে মাত্র এক স্কোর বেশি নিয়ে শক্তিশালী ভারত পেল ব্রোঞ্জ। শেষ মিনিটে নিষ্পত্তি প্রথম দুটি স্থানের। মালয়েশিয়া সোনা, সিঙ্গাপুর রুপা।
আসিফ হোসেন খান ও আবদুল্লাহ হেল (বাকি) ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে ব্রোঞ্জ আনলেও খুশি নয় শ্যুটিং দল। সবাই তাকিয়ে ছিল মেয়েদের ১০ মিটারের দিকে। গত ফেব্রুয়ারিতে এই ড. কারনি সিং শ্যুটিং রেঞ্জেই কমনওয়েলথ শ্যুটিংয়ে এই ইভেন্টে দলগত সোনা জিতেছিলেন শারমিন ও সাদিয়া। তাই কাল ‘একটা কিছু’ হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল।
মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুরই এটিকে কঠিন করে দিল। এই দুটি দলের অগ্রযাত্রা বুলেট ট্রেনের মতো। জানা গেল, কমনওয়েলথ শ্যুটিংয়ে মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুর আসেইনি। নইলে কি বাংলাদেশ তখন সোনা জিততে পারত!
তাইবি নূর সুরানির ৩৯৮, সতীর্থ হালিম নূর আউনির ৩৯৫—সোনাজয়ী মালয়েশিয়ার স্কোর ৭৯৩। জিয়ান ৩৯৪ ও জিয়াং উইং জেসমিনের ৩৯৬ নিয়ে সিঙ্গাপুর ৭৯০। ৪০০-তে ৪০০ করে ২০০৪ এশিয়ান এয়ারগান শ্যুটিংয়ে রেকর্ড গড়া ভারতের সোমা সিদ্ধার্থ এদিন করেছেন ৩৯৭। সতীর্থ যাদব কবিতা খুব খারাপ করায় (৩৮৮) সোমার লড়াই বিফলে গেছে।
নিজের পারফরম্যান্সে অবশ্য খুশি সোমা। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় উচ্ছ্বসিত ছিলেন, ‘৩৯৭ ভালো স্কোর। চেষ্টা করছিলাম রেকর্ড ছুঁতে। হলো না, তবে আমি খুশি।’ বাংলাদেশের শ্যুটারদের ব্যাপারে জানতে চাইলে হেসে উঠলেন হো হো করে, ‘তারা খুবই ভালো। দু-তিন বছর ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাওয়ার মতো মান অর্জন করেছে।’
কথাটা হয়তো ঠিক। কিন্তু প্রতিযোগিতা মঞ্চে বাংলাদেশের শ্যুটাররা যে স্নায়ুচাপ ধরে রাখতে পারছেন না! নিজেদের সেরা থেকে দুজনই ছিলেন বেশ দূরে। আরও ২-৩ স্কোর অবলীলায় করতে পারতেন শারমিন-সাদিয়া। তাহলে দলীয় ব্রোঞ্জ অন্তত জুটত।
সাদিয়া সুলতানার আক্ষেপ, ‘শুরু থেকে আমি ছন্দ পাচ্ছিলাম না। প্রথম দুই সিরিজেই ৭ পয়েন্ট নষ্ট। অনুশীলনে ৩৯৬-৯৭-ও হয়, কিন্তু কম্পিটিশনে এসে বিরাট চাপ অনুভব করছিলাম।’
শ্যুটিং রেঞ্জে বাংলাদেশ দলের এই হতাশার অংশীদার ছিলেন শেফ দ্য মিশন নূরুল ফজল (বুলবুল)। নিজেই বললেন, ‘ভবিষ্যতে এদের আরও ঘষেমেজে ভালো ট্রেনিং দিয়ে আনতে হবে। ভালো কোচ লাগবে। একটু চেষ্টা করলেই পদক আসবে। দেশে গিয়ে এসব ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতেই হবে। নইলে যেনতেনভাবে গেমসে এসে লাভ নেই।’
লাভক্ষতির হিসাব পরে। আজ ব্যক্তিগত বিভাগে ১৬ জন শ্যুটার আজ ৪০টি করে শট নেবেন। সেরা ৮ জন যাবেন ফাইনালে। শেষ আশা হিসেবে ফাইনালে যদি কিছু হয়, নইলে যমুনায় হবে সব আশার জলাঞ্জলি!

কিউইরা তবু যেন আনন্দভুবনে

বিশালাকৃতির কিছু ফোম রাখা আছে। বেশ কয়েকজন সেগুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছেন। কয়েকজন আবার সেই ফোমগুলোকে পেছন থেকে ঠেলা দিচ্ছেন। দুজন আবার জুডো-কারাতে অনুশীলনে ব্যস্ত। কয়েকজন জগিং করছেন দুই হাত দুই পাশে মেলে ওড়ার ভঙ্গিতে। নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটারদের দেখে কাল মনে হচ্ছিল যেন খাঁচা থেকে সদ্য মুক্তি পাওয়া এক ঝাঁক পাখি।
ব্যাপারটা সে রকমই। আসলে তাঁদের ছোট্ট খাঁচা থেকে এনে একটু বড় খাঁচায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আগের দিন তাঁরা ছিলেন এক প্রকার হোটেল রুমে বন্দী। সেখান থেকে কাল মিরপুর সোহ্রাওয়ার্দী ইনডোর স্টেডিয়ামের একটু বড় পরিসরে। এতেই যেন কিউই ক্রিকেটারদের আনন্দগুলো ডানা মেলে দিল। হইহুল্লোড়, হাসি-ঠাট্টা-তামাশায় ভরপুর দলটাকে দেখে কে বলবে সিরিজে পিছিয়ে থাকা দল? ‘বিশ্বকাপের আদর্শ প্রস্তুতি’ বলে অনেক ঢাকঢোল পেটানো সিরিজে তারা মাঠেই নামতে পারছে না, মেজাজটা তাদের বিগড়ে থাকারই কথা!
রহস্য ভেদ হলো ব্রেন্ডন ম্যাককালামের কথায়। সাবেক সহ-অধিনায়ক জানালেন এই দলটার চরিত্রই নাকি এ রকম, ‘আমরা সব সময়ই এমন হইহুল্লোড় করি, সব সময়ই আমরা হাসি-ঠাট্টায় মেতে থাকি। নিউজিল্যান্ডের যতগুলো দলে আমি খেলেছি, তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর দল।’ আসল কাজটা কিন্তু হাসি-তামাশার আড়ালে চাপা পড়ে যায়নি। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ইনডোর স্টেডিয়ামে যথেষ্টই ঘাম ঝরিয়েছে তারা। কালকের সূচিতে ছিল শুধুই ফিটনেস ট্রেনিং। কোচ মার্ক গ্রেটব্যাচ তাই মাঠেই আসেননি। দুই দিন পর কাল সূয্যিমামার দেখা পাওয়া গেলেও শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের আউটফিল্ড পুরোপুরি শুকায়নি। বাধ্য হয়ে তাই যেতে হয়েছে ইনডোরে।
কিউইদের কিন্তু এতে খুব একটা বেজার মনে হলো না। বরং বাংলাদেশের আতিথেয়তায় ম্যাককালাম মুগ্ধ, ‘সত্যি বলছি, আমাদের খুব ভালো যত্ন নেওয়া হচ্ছে। দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেসে গেছে, খুব বেশি খেলার সুযোগ আমরা পাইনি। কিন্তু বৃষ্টি নিয়ে কারও কিছু করার নেই। ট্রেনিং সুবিধা ভালো, মাঠ ভালো, দারুণ একটা হোটেলে আমরা আছি, সব মিলিয়ে বাংলাদেশের আতিথেয়তায় আমরা মুগ্ধ। সবাই বাংলাদেশ সফরটা খুব উপভোগ করছে।’ কিন্তু বাংলাদেশ সফরের ১১ দিন হয়ে গেলেও ম্যাচ খেলতে পেরেছে একটা মাত্র, সেটাও বৃষ্টির থাবায় ছোট হয়ে আসা, কিউইরা কি সত্যিই হতাশ নন? ম্যাককালামের কণ্ঠে ভেট্টোরি-টেলরদের সেই পুরোনো কথাই, ‘ম্যাচ খেলতে না পারাটা খুবই হতাশার। তবে আবহাওয়ার ওপর কারও কোনো হাত নেই, এটা নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করারও কোনো মানে হয় না। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে আমরা যেন প্রস্তুত থাকি এবং সুযোগ আসলে সেটা কাজে লাগাতে পারি। আবহাওয়া ভালো থাকলে আরও তিনটি খেলা আমরা পাচ্ছি। পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার সুযোগ আমাদের আছে।’
বৃষ্টির কল্যাণে পাওয়া বাড়তি সময়টুকুকে কিন্তু হেলাফেলায় কাটাননি ম্যাককালামরা। অপ্রত্যাশিত অবসরটুকুুকে কাজে লাগিয়েছেন ভবিষ্যতের পুঁজি গড়তে, ‘জিমে প্রচুর সময় কাটাচ্ছি, এই সফর দিয়ে লম্বা আন্তর্জাতিক মৌসুমের সূচনা হচ্ছে, যেখানে বিশ্বকাপটাও আছে। তা ছাড়া একসঙ্গে প্রচুর সময় কাটাচ্ছি আমরা। খাওয়া, আড্ডা দেওয়া, কার্ড খেলা, কম্পিউটার গেমস খেলা, টিভি দেখা—সবই আমরা একসঙ্গে করার চেষ্টা করছি। দলের বন্ধনটা এতে আরও দৃঢ় হবে।’
সিরিজ জিততে হলে নিউজিল্যান্ডকে এখন জিততে হবে টানা তিন ম্যাচ। তবে তারা এখন এগোতে চায় ম্যাচ বাই ম্যাচ, আগে সমতা ফেরানো, তারপর এগিয়ে যাওয়া। একটা ম্যাচ জিতেই বাংলাদেশ যেন উড়তে না থাকে, ইঙ্গিতে সেই সতর্কবার্তাও দিয়ে গেলেন, ‘একটা ম্যাচ দিয়ে আপনি কিছুই বিবেচনা করতে পারেন না। সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়ও এক ম্যাচে ব্যর্থ হতে পারে।’
সাকিবরা শুনছেন তো!

১৯ ম্যাচ পর নতুন সূচনা

একটা সময়ে বাংলাদেশ দলের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল সম্ভবত ওপেনিং জুটিতে। দলের এই জায়গাটাই ছিল সবচেয়ে পরিবর্তনশীল। কার সঙ্গে কার জুটিটা ভালো হয়, কার সঙ্গে কারটা খারাপ—সেটা বোঝাও ছিল কঠিন।
তামিম ইকবাল ও ইমরুল কায়েস দিনবদলের গান শোনালেন। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে গত ৫ অক্টোবর চলতি সিরিজের প্রথম ওয়ানডের আগে এ বছর বাংলাদেশ যে ১৯টি ওয়ানডে খেলেছে, তার সব কটিতেই ওপেনিং জুটিতে তামিম-ইমরুল। বাংলাদেশের ওপেনিং জুটিতে এটা বিরল ঘটনা। নতুন বলের বিপক্ষে দারুণ সফল এই জুটি—মোট ২১ ম্যাচে (২০০৮ এর দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের দুই ম্যাচেও তাঁরাই ছিলেন ওপেনিং জুটিতে) একসঙ্গে ইনিংস শুরু করে এই জুটিতে এসেছে ৬৫৪ রান।
তামিমের ইনজুরি ছেদ না টানলে এই হিসাবটা আরও বড় হতে পারত। সেটা না হওয়ায় বাংলাদেশ দল ১৯ ম্যাচ পর দেখল ইমরুল কায়েস ও শাহরিয়ার নাফীসের আরেকটি ওপেনিং জুটি। শুধু ওপেনিং জুটিতে কেন, শাহরিয়ার-ইমরুল একসঙ্গে প্রথম ওয়ানডেই তো খেললেন গত ৫ অক্টোবর! শাহরিয়ারের আন্তর্জাতিক অভিষেক ২০০৫ সালের জুনে আর ইমরুলের ২০০৮-এর অক্টোবরে হলেও শাহরিয়ার মাঝে আইসিএলে চলে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে দুজনের একই ড্রেসিংরুমে থাকার সুযোগ হয়নি। তবে এ বছরের জানুয়ারিতে ভারতের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টটা দুজনই খেলেছেন। উইকেটে গিয়ে দেখা হয়নি তার পরও। দুই ইনিংসেই আগে আউট হয়ে যাওয়ায় তিন নম্বরে নামা শাহরিয়ারের সঙ্গে জুটি বাঁধা হয়নি ইমরুলের।
প্রথমবারের মতো তাঁদের জুটি হলো এবার নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জেতা প্রথম ওয়ানডেতে। তা ৩৪ রানের জুটিতে কেমন লাগল শাহরিয়ারের নতুন সঙ্গ? কাল ইনডোরে নেট প্র্যাকটিস করতে যাওয়ার পথে ইমরুল বললেন, ‘শুরুতে একটু সমস্যা হচ্ছিল। কিন্তু উনি অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। পরে মানিয়ে নিয়েছি। সমস্যা হয়নি।’ তামিমের সঙ্গে ইমরুলের বোঝাপড়াটা হয় দারুণ। ইমরুল এক প্রান্ত ধরে রাখেন তো অন্য প্রান্তে ঝড় তোলেন তামিম। শাহরিয়ার-ইমরুলের ক্ষেত্রে ‘গেম প্ল্যান’ ভিন্ন করে দিয়েছে টিম ম্যানেজমেন্টই। শাহরিয়ার জানান, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে খেলার পরামর্শই দেওয়া হয়েছে তাঁদের, ‘আমরা সিচুয়েশন অনুযায়ী খেলব। মারার বলে মারব, ভালো বলকে সমীহ করব। যা করার দুজন একই রকম করব—এটাই বলা হয়েছে টিম ম্যানেজমেন্ট থেকে।’
তামিমের সঙ্গে ২২ ম্যাচে ইনিংস শুরু করার অভিজ্ঞতা আছে শাহরিয়ারের। তবে ইমরুলের সঙ্গে প্রথম জুটি বাঁধার অভিজ্ঞতাটাও খারাপ নয় বললেন এই বাঁহাতি ওপেনার, ‘যেকোনো পর্যায়ের ক্রিকেটেই ইমরুলের সঙ্গে প্রথম ওপেন করলাম। খারাপ লাগেনি। আগে একসঙ্গে না খেললেও সেন্টার উইকেটের প্র্যাকটিসে আমরা জুটি বেঁধে ব্যাটিং করেছি। বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে সেখানেই, নিজেদের মধ্যে ব্যাটিং নিয়ে কথাবার্তাও হয়েছে।’
ইমরুলকে নিয়ে নয়, ওই ম্যাচে বরং নিজেকে নিয়েই চাপে ছিলেন প্রায় আড়াই বছর পর ওয়ানডেতে ফেরা শাহরিয়ার, ‘এত দিন পর খেলতে নেমেছি, টেনশনে তো থাকবই। তার পরও আত্মবিশ্বাস ছিল ভালো খেলতে পারব। কিন্তু ভেট্টোরির খুব ভালো একটা বলে বোল্ড হয়ে গেলাম।’
আড়াই বছর পর ফিরে ৩৫ রানের ইনিংস খুব খারাপ নয়। তবে ঘুরেফিরে ‘তামিমের জায়গায় এসেছেন, তামিমের অভাব পূরণ করতে পারবেন তো’ জাতীয় প্রশ্ন শুনে একটু যেন বিব্রত শাহরিয়ার। সুযোগ পেয়ে কাল নিজের অবস্থানটা পরিষ্কার করে নিলেন তামিমের দেড় বছর আগে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু করা এই ব্যাটসম্যান, ‘তামিম ইনজুরিতে, আমি সেই সুযোগে দলে এসেছি—ব্যাপারটা এটুকুই। আমি নতুন খেলোয়াড় নই। সবাই আমার সামর্থ্য জানে এবং সেজন্যই দলে এসেছি। টিম ম্যানেজমেন্ট থেকেও আমাকে আমার খেলাই খেলতে বলা হয়েছে। চেষ্টা করব নিজের সেরাটা দিয়ে দলে জায়গা ধরে রাখতে।’
মাঠের বাইরে থেকেও কি একটা লড়াই টের পাচ্ছেন তামিম ইকবাল?

উইলিয়াম ব্লেইক-এর কবিতা

সংজ্ অভ ইনোসেন্স্ থেকে

উইলিয়াম ব্লেইক-এর করা সংজ্ অভ ইনোসেন্স্বইয়ের টাইটেল প্লেট

উপক্রম

বাজাচ্ছিলাম বাঁশি যখন সুখের সুরে,
বাজাচ্ছিলাম বাঁশি যখন উপত্যকায়,
একটা মেঘে দেখতে পেলাম এক শিশুরে,
মোহন হাসি হেসে শিশু বলল আমায়:

“মেষশিশুকে নিয়ে গান-এক শুনিয়ে দাও!”
সুখের সুরে বাঁশিতে গান উঠল বেজে।
“বাঁশিওয়ালা, গানটি তুমি আবার বাজাও!”
তাই বাজালাম, কিন্তু শুনে কাঁদল সে যে!

“দাও, ফেলে দাও আনন্দিত বাঁশি তোমার,
গানখানি গাও গলা ছেড়ে, সুখের সুরে!”
গাইলাম তাই ঐ গানটাই ফের একবার,
সুখের সুরে ফের কাঁদালাম ঐ শিশুরে।

“বাঁশিওয়ালা, ব’সো এবার, লেখো এ-গান
পুথির পাতায়, সবাই যেন পড়তে পারে।”
বলতে-বলতে করল শিশু অন্তর্ধান–
হানা দিলাম খাগড়া-বনে, নদীর পাড়ে,

খাগড়া দিয়ে বানাই একটা গ্রাম্য কলম,
স্বচ্ছ জলে আলতা গুলে বানাই কালি;
গান লিখে যাই, আনন্দিত, আর মনোরম,
শুনে সকল শিশু বাজায় করতালি।

রাখাল

কী সুন্দর রাখালের ঐ মেষপাল!
তাদের চরায় সে যে সকাল-বিকাল।
পালের পিছনে ছুটে কোনো ক্লান্তি নাই,
গলায় মধুর গানে শুধু প্রশংসা-ই–

কারণ, সে শোনে, মেষশাবকের ডাকে
সজীব জবাব দেয় সুখী মাতা-মেষ;
পালক সতর্ক, তাই পাল সুখে থাকে,–
রাখাল কাছেই আছে–জানে তারা বেশ।

মুখর শ্যামলিমা

ভোরের সূর্য উঠল,
আকাশে পুলক ফুটল,
ঘণ্টার টংটং
বসন্ত স্বাগতং,
দোয়েল কোয়েল সব
পাখি করে কলরব,
মেলায় মুহুর্মুহু
ঘণ্টার টং-এ কুহু,
আমরা মাতি খেলায়
মুখর শ্যামলিমায়।

হাসে বুড়ো হরিদাস,
মাথা-ভরা সাদা কাশ,
পিঁপুল-গাছের তলে
বুড়োর আড্ডা চলে,
আমাদের দেখে হাসে,
কত ছবি মনে আসে,
তারাও তো শৈশবে
এম্নি মেতেছে সবে
সারাটা-দিন খেলায়
মুখর শ্যামলিমায়।

আমরা শ্রান্ত হই,
ক’মে আসে হৈচৈ,
সূর্য অস্তে নামে,
আমাদেরও খেলা থামে,
মায়ের কোলের কোণ
খোঁজে সব ভাই-বোন,
পাখি যথা যায় ফিরে
তন্দ্রা-আঢুল নীড়ে:
আয় ঘুম, ঘুম আয়,
তিমির শ্যামলিমায়।

মেষশাবক

মেষশিশু, শোন্ প্রশ্ন এ,
বল্ তো, তোকে গড়ল কে?
আহার দিল, বিহার দিল,
গোচর-ঘাসে, র্ঝনা-পাশে;
কাপড় দিল পশমি নরম
আরামদায়ক, সফেদ, গরম;
গলায় দিল কোমল সু-স্বর,
অধিত্যকায় তুলিস লহর–
মেষশিশু, শোন্ প্রশ্ন এ,
বল্ তো, তোকে গড়ল কে?

দিচ্ছি আমি এর উত্তর,
শোন্ রে কে যে স্রষ্টা তোর:
মেষশিশু কয় সবাই তাকে,
নিজ-কে নিজে এ-ই সে ডাকে–
সেও তো নম্র, নরমসরম,
পলকা, ছোট্ট, সেও আজনম;
মানুষ, মেষের আমরা শাবক,
তার নামে নাম আমরা পাবো।
মেষশিশু, পা’স্ প্রভুর আশিস্!
মেষশিশু, পা’স্ প্রভুর আশিস্!

কুঁড়ি

চলচঞ্চল চড়–ই ওরে,
ঘনসবুজ পাতার মেঘে
সুখী কুঁড়ি-এক দেখছে তোরে,
তুইছুটিস তিরের বেগে–
দ্যাখ্, তোর বাসা আছে
আমার বুকের কাছে।

চারু চিতলোল বাবুই ওরে,
ঘন-সবুজ পাতার ভিড়ে
সুখী কুঁড়ি-এক শুনছে তো রে
তুইকাঁদছিস ফিরে-ফিরে–
বাবুই, বাবুই, আছে!
আমার বুকের কাছে।

চিম্‌নি-ঝাড়ুদার

যখন আমি এতটুকুন, মা যে গেল ম’রে,
কথাও ভালো ফোটে নি, বাপ দিল বিক্রি ক’রে,
কাঁদতেও খুব পারি নি যে ওঁয়া ওঁয়া ওঁয়া–
তাই তো তোমার চিম্নি ঝাড়ি, তাই তো ছাইয়ে শো’য়া।

ঐ তো ছোট্ট লাভলু মিয়া, চেঁচাচ্ছিল খুব
ন্যাড়া হবার সময়–আমি বলি তাকে, “চুপ!
লাভলু বোকা, মাথায় যদি না-থাকে তোর চুল,
চুলে জটা হবে না আর লাগলে কালি-ঝুল।”

এই শুনে সে শান্ত হ’ল। সেই সে রাতেই, যখন
ঘুমে অচৈতন্য, লাভলু দেখতে পেল স্বপন:
আবুল ভুলু মণ্টু–হাজার চিম্‌নি ঝাড়ুদার,
বন্দি সবাই কালো-কালো কফিনে যে যার;

ফেরেস্তা এক এলো একটা দিব্য চাবি-হাতে,
খুলল কফিন–সবাই মুক্তি পেলো। সাথে-সাথে
নেচে, হেসে সবুজ মাঠে খেলল ঘুরে-ঘুরে,
গোসল করল নদীতে, গা শুকাল রোদ্দুরে–

ন্যাংটা এবং ফর্সা–সবাই ঝুড়িটুরি ফেলে
চড়ল মেঘে, খেলল তারা বাতাসে গা মেলে;
লাভলুকে কয় ফেরেস্তা, “তুই হ’লে ভালো ছেলে,
বিভু হবে বাবা রে তোর, যাবে না সে ফেলে।”

ঘুম ভাঙে ওর, আমরাও সব ভোর না-হ’তেই উঠি,
ঝুড়ি নিয়ে, ঝাড়ু নিয়ে, কাজের জন্য ছুটি;
ঠাণ্ডা সকাল, লাভলু তবু গরম আছে সুখে–
ফুর্তিতে কাজ করো যদি, শীত লাগে না বুকে।

হারিয়ে-যাওয়া ছেলে

“ও বাপি! বাপি! তুমি যাচ্ছ কোথায়?
হাঁটতে পারি না যে অমোন জোরে!
আমার সাথে তুমি কথা কও, বাপি,
হারিয়ে যাব তবে পিছনে প’ড়ে!”

অন্ধকার রাত, বাবা কাছে নেই,
ছেলেটা ভিজে গেছে শিশিরে, জলে,
কাদায়-ভরা পথে কাঁদল বেচারা,
কুহেলি উড়ে কই যায় যে চ’লে–

ফিরে-পাওয়া ছেলে


হারিয়েছিল পথ বিজন জলায়
ছেলেটা–ঘুরে-ফিরে আলেয়া-ধাঁধায়
কেঁদেছে–তারপর এসেছে ঈশ্বর
বাবার মতো সেজে, ধবল জামায়;

খেয়েছে চুমু সেই শিশুর মুখে,
নিয়েছে মা’র কাছে হাতটি ধ’রে–
ছেলেকে খুঁজে-খুঁজে, গভীর দুখে
পাণ্ডু হ’য়ে যে-মা রয়েছে প’ড়ে।

হাসির গান


হাসছে যখন সবুজ বনটা খুশিতে ডগমগ,
গালে-ঢেউয়ের-টোল–নদীটা হাসিতে ঝকমক,
আমাদের এই মজায়, দমকা রোল ওঠে বাতাসে,
সেই শব্দে, পাহাড় মুখে রুমাল দিয়ে হাসে,

যখন খুশি মাঠটি দেখায় সবুজ দাঁতের পাটি,
সেই ছবিটার মধ্যে যখন হাসে ঘাসপোকাটি,
হাসে মৌরি, হাসে সুজন, হাসে জোনাকি,
চাঁদের মতো গোল-মুখে সব হি হি হা হা হি

বাতির ছায়াটিতে যখন ছবির পাখি হাসে,
মাদুর-ভরা জাম, বাদামের, লিচুর হাসি আসে,
এসো, আমার পাশে ব’সো, প্রাণ জাগিয়ে দি
মধুর হাসির ঐকতানে হি হি হা হা হি

দোলনার গান

মধুর স্বপন, ছায়াটি দিয়ো রে
এই সুন্দর শিশুর শিয়রে,
পুলকনদীর মদির স্বপন,
আমুদে, নীরব, জোছনা-মগন।

নরম, গরম, সুমধুর ঘুম,
আমার সোনার চোখে দাও চুম,
ঘুমের পরি-রা, এই শিশুকে
দোলাও, দোলাও কোমল বুকে!

মধুর হাসি-রা, যাও ঘুরে-ফিরে
আমার সুখের ঠোঁটে, রাত্তিরে।
সুমধুর হাসি জননীর মুখে
সমস্ত রাত ভ’রে দিক সুখে।

অফুট কাঁদন, ঘুঘুর শ্বাস,
না-টানুক তোর ঘুমের রাস,
মধুর কাঁদুনি, মৌ-মৌ হাসি
সারারাতভর বাজাক সে বাঁশি।

ঘুমাও ঘুমাও তুষ্ট শিশুটি,
সকলের চোখ এখন নিদুটি,
পুলকিত ঘুম ঘুমাও ঘুমাও,
মা যখন কাঁদে, তুমি ঘুম যাও!

কচি-মুখে তোর, অ মোর সোনা লো,
দেখি যেন, আহা, স্বর্গের আলো;
তোমার স্রষ্টা একদা ঝুঁকে
আমার মুখেও–কেঁদেছে সুখে।

তোমার, আমার, সবার তরেই
কেঁদেছে–যখন শিশু সে নিজেই;
তার সোনামুখ–জানিস খোকন,
তোর মুখে হেসে উঠছে এখন?

তোমার, আমার, সবারই মুখে
হাসি-মুখে দেখি ঐ শিশুকে!
শিশুর হাসিই তার হাসি, হায়–
স্বর্গ-পৃথিবী সুখে ঘুম যায়।

ঐশী স্বরূপ


করুণা দয়া ভালবাসা ও শান্তি
কষ্টকালে ডাকে সবাই এদের,
ধন্যবাদ দেয় এদেরই কেবল
ঝঞ্ঝা থেমে গেলে বিপদাপদের।

করুণা দয়া ভালবাসা ও শান্তি
বিধাতা–যে সবার পিতার মতন;
করুণা দয়া ভালবাসা ও শান্তি
মানুষ–শিশু তার, পরম যতন।

কারণ দয়া মানবাত্মারূপিণী,
করুণা মানুষের মুখেই সে হাসে,
ঐশীরূপ ভালবাসা মানুষের,
শান্তি থাকে তার গায়ের লেবাসে।

কাজেই সঙ্কটে মানুষেরা সব
সর্বদেশে আর সর্বাঞ্চলে
করুণা দয়া ভালবাসা ও শান্তি
ঐশীরূপে ডাকে এদের সকলে।

মানুষমাত্রেই সমপূজনীয়,
তুর্কি, য়িহুদি, বা নাস্তিক ঘোর–
করুণা দয়া ভালবাসা ও শান্তি
-আকারে বিভু থাকে মানুষে বিভোর।

পুণ্য বৃহস্পতিবার

পুণ্য বৃহস্পতিবারে বাচ্চাগুলি অমল-আনন
নীল লাল আর সবুজ জামায় হেঁটে যাচ্ছে দু’জন-দু’জন
আগে-আগে পুরুত সচল, যষ্টি-হাতে তুষারধবল
ঢুকল সবাই সাধু পলের গির্জায় টেম্‌স নদীর মতন

আহা কী জনতা এটা লন্ডনের এই কুসুমনিচয়
বসেছে সব দলে-দলে স্বীয় প্রভায় প্রতিভাময়
গুঞ্জনশীল এই জনতা এই জনতা মেষের জাত
হাজার-হাজার ছেলেমেয়ে তুলছে তাদের পুণ্য হাত

প্রবল ঝ’ড়ো হাওয়ায় যেন মেলল তারা সুরের পাল
স্বর্গ-গাঙে কিংবা যেন সুসংহত বজ্রমাল
নীচে দীনের অভিভাবক প্রৌঢ় ভাঁজে করুণা-সুর
নইলে দুয়ার থেকে কোনো হুর খেদাবার ঝুঁকি প্রচুর

ধাত্রীর গান

যখন বাছাদের মুখর আমোদের
প্রতিধ্বনি শুনি পাহাড়ে
আমার সুখী বুকে হৃদয় থাকে সুখে,
নিখিল-নিশ্চল, আহা রে!

বাছারা ফিরে আয়, সুজ্জি ডুবে যায়,
শিশিরে ভ’রে ওঠে মেঠো ঘাস;
আজ না খেলা আর, সময় ঘুমাবার,
না-রাঙে যতখন পুবাকাশ।

ধাই মা, তুমি ভালো, দ্যাখো-না, আছে আলো,
এখুনি যায় নাকি ঘুমোনো?
একটু খেলা বাকি, আকাশে ওড়ে পাখি,
ভেড়ারা মাঠে চরে এখনও।

ঠিকাছে, র্ক খেলা যাবৎ আছে বেলা,
আসবি পরে সোজা বিছানায়–
শুনেই, কোলাহলে দস্যিগুলি তোলে
পাহাড়ে রুনুরুনু পুনরায়।

শিশু খুশি


“আমার কোনো নাম তো নেই,
দু’দিন বয়েস মোটে–”
কী নাম ধ’রে ডাকব তোরে তবে?
“খুশি আমি সবতাতেই,
নামটি খুশি-ই হবে।”
খুশি রে, তোর খুশি-ই যেন জোটে!

ছোট্ট খুশি, মিষ্টি খুশি,
ছোট্ট খুশি, দু’দিন বয়েস মোটে–
ছোট্ট খুশি, ডাকি তোরে,
মিটমিটিয়ে হাসিস, ওরে,
আমিও গাই আদর ক’রে:
খুশি রে, তোর খুশি-ই যেন জোটে!

স্বপ্ন

একদা স্বপন এক ফেলেছিল ছায়
দেবদূত-সুরক্ষিত আমার শয্যায়:
ঘাসে শুয়ে থেকে, আমি দেখি যেন চেয়ে,
পথ হারিয়েছে এক পিপীলিকা-মেয়ে।

বিক্ষিপ্ত, সন্ত্রস্ত, ব্যস্ত দেখি আমি তারে,
হেঁটে-হেঁটে ক্লান্ত, শ্রান্ত, অন্ধ অন্ধকারে,
ধস্তাধস্তি ক’রে-ক’রে পানিতে কাদায়
বুক-ফাটা আর্তনাদে বলল সে হায়:

“হা আমার খোকা-খুকু! কেঁদে বুঝি সারা,
বাপের ছটফটানি দেখে দিশাহারা,
বাইরে তাকায় শুধু ছোট্ট মাথা তুলে,
কাঁদে আর কাঁদে শুধু, খাওয়া-শো’য়া ভুলে!”

কথা শুনে আমি কেঁদে ফেলি করুণায়:
একটা জোনাকি এলো, এসেই শুধায়,
“রাতের প্রহরী আমি এই মধুবনে,
কে কাঁদো গো, কেন কাঁদো, কোন্ ব্যথা মনে?

“পথ হারিয়েছ, বাছা? খুঁজে দিতে হবে?
আলো জ্বেলে রাখলাম। ওঠো, মেয়ে, তবে।
গুবরেটা রোঁদ দেবে, সব ওর চেনা,
ওর সাথে চ’লে যাও, বিপদ্ হবে না।”
-------------------------

সংজ্ অভ এক্সপিরিয়েন্স্ থেকে

উইলিয়াম ব্লেইক-এর করা সংজ্ অভ এক্সপিরিয়েন্স্ বইয়ের টাইটেল প্লেট

ঢেলা আর নুড়ি

“ভালবাসা” আত্মতুষ্টি চায় না কখনও,
আপনার জন্যে তার চিন্তা নাই কোনো,
নিত্য করে আত্মত্যাগ পরের কারণে,
স্বর্গের উদ্যান রচে নরকের বনে।

এ-গান, মাটির ঢেলা গাইছিল সুখে,
পশুদের পদচিহ্ন আঁকা যার বুকে।
হেনকালে, ঝরনার একটা কাঁকর
খোনা স্বরে ক’রে গেল বকর-বকর:

নিজেরই আনন্দ শুধু চায় “ভালবাসা”,
পর-কে সে বলি দেয় আপন তুষ্টিতে,
পরের দুঃখের ধন সে গ্রাসে মুষ্টিতে,
স্বর্গ-কে সে ক’রে তোলে শয়তানের বাসা।

পুণ্য বৃহস্পতিবার

কিবা এক পুণ্য দৃশ্য উদিত
ধনী এই সুফল দেশে দিবারাত,
শিশুরা দুর্দশাতে পতিত–
সুশীতল, হাড়-কঞ্জুস কৃপার হাত!

ও-কাঁপা ত্রস্ত কান্না, গান নাকি সে?
এই গান হচ্ছে গাওয়া খুশিতে?
এতজন দুধের শিশু গরিব কিসে?
এদেশের খেত কি ভরা ভুসিতে?

কখনও হয় না এদের সূর্যোদয়।
জমি সব ঊষর এবং স্যাঁৎসেঁতে।
কাঁটাতে রাস্তা এদের গম্য নয়।
আজীবন বসত এদের কাল্ শীতে।

কেননা, যেথায় ওঠেন সূর্যদেব,
যেখানেই বৃষ্টির জল বর্ষায়,
খাদ্যের হয় না অভাব বাচ্চাদের;
দৈন্যের ত্রাস মনে না-অর্সায়।

চিম্‌নি-ঝাড়ুদার

ছোট এক কালো জীব সফেদ তুষারে
কাঁদে ওঁয়া-ওঁয়া, আহা, কাঁদে শতধারে!
বল্ তোর বাপ কই, মা-ই বা কোথায়?
প্রার্থনা করতে তারা গিয়েছে গির্জায়।

কারণ, ছিলাম সুখে খাগড়ার ঝাড়ে,
শীতের তুষারে হেসেছিলাম মধুর–
কাফনের থান তারা পরাল আমারে,
শেখাল করুণ গান, মরণবিধুর।

এবং যেহেতু আমি আজও নাচি, গাই,
বাবা-মা ভেবেছে, তারা করে নাই ক্ষতি–
প্রভু, রাজা, পুরোহিতে তাই তো প্রণতি,
আমাদের দুর্দশার ঘটক তারা-ই।

ধাত্রীর গান

যখন সবুজ মাঠে বাছারা খেলায় মাতে
ফিসফিস শুনি আমি, ভীত:
হারানো যৌবন-দিন করে মন উদাসীন,
মুখ হ’য়ে যায় পাণ্ডু, পীত।

ছেলেমেয়ে এসো তবে, সূর্য ডুবে গেছে কবে,
চতুর্দিকে শিশির-সম্পাত,
হেমন্তের দিনগুলি কেলিতে করেছ ধূলি,
ছদ্মবেশে আসে শীত-রাত।

অসুস্থ গোলাপ

ও গোলাপ, অসুস্থ তুমি যে!
সূচিভেদ্য অন্ধকার রাতে
যে-অদৃশ্য কীট উড়ে আসে
প্রমত্ত ঝড়ের সাথে-সাথে

তোমার রাতুল সুখে-ভরা
বিছানাটি খুঁজে পেয়েছে সে,
আর তার চোরাগোপ্তা প্রেমে
তোমার জীবন যায় শেষে।

মাছি

ছোট্ট মাছি ওরে,
তোরফুল-ফাগুনের খেলা
আমারঅবোধ হাতের ঠেলা
দিল বন্ধ ক’রে।

আমিও কি নই
একটামাছি তোর মতোই?
কিংবা তুইও কি ন’স
আমার মতোই, মানুষ?

কারণ আমিও, মাছি,
তোর মতো গাই, নাচি,
যাবৎ কোনো অন্ধ হাত
আমারপাখায় চালায় কাঁচি–

চিন্তা যদি জীবন,
তথাশক্তি ও প্রাণবায়ু,
চিন্তা থেমে গেলেই
যদিশেষ হ’য়ে যায় আয়ু,

আমি তবে হই
একটা সুখী মাছি,
খোঁজ নিয়ে কাজ নেই
আমিম’রে না বেঁচে আছি।

শার্দূল

জ্বল্ছ, শার্দূল! জ্বল্‌ছ জ্বল্‌জ্বল
ঝল্‌সে রাত্রির এই বনাঞ্চল!
কোন্ চিরঞ্জীব হাত, কোন্ ঈক্ষণ
বাঁধ্ল ঐ কায়, ভীষ্ম, চিক্কণ?

সে কোন্ আসমানে, গহিন দরিয়ায়
ভীষণ ও-চোখের আগুন জ্বলেছিল?
দুঃসাহসী কোন্ পাখায় ভেসে, হায়,
সে কোন্ তেজি হাত সে-তেজে হাত দিল?

কোন্ কাঁধ, কোন্ কারুকর্মের চর্‌কায়
ঐ হৃৎপিণ্ডের আঁশগুলি সে বোনে?
কবে থেকে ঐ ভীম মর্মটা তড়্পায়?
কোন্ বিভীষণ-হাতে? কোন্ ভীম-চরণে?

কোন্ হাতুড়ি? কোন্ শিকলি?–আর
কোন্ উনুনে ছিল ঘিলু তোমার?
কোন্ নেহাই? কোন্ বজ্র-মুঠি
ঐ তরাসে পরিয়ে দিল খুঁটি?

যেসময় তারারা সব ছুঁড়েছে বর্শা তাদের
ভিজিয়ে অশ্রুজলে চাঁদোয়া ফর্সা চাঁদের,
তিনি কি হেসেছিলেন আপনার সৃষ্টিসুখে?
গড়েছে যে তোরে, সে-ই গড়েছে মেষশিশুকে?

শার্দূল! শার্দূল! উজ্জ্বল ভায়
ঝল্‌সাও রাত্রির কান্তার-ছায়!
মৃত্যুঞ্জয় কোন্ হাত, কোন্ ঈক্ষণ
মূর্ছায় ভীম কা’য় সৃষ্টির নিক্বণ?

(আদি অনুবাদ)

বাঘ ও বাঘ! জ্বলছ জ্বল্‌জ্বল্‌
ঝল্‌সে দিয়ে রাতের বনতল;
কোন্ অমর চোখ বা কোন্ হাত
বাঁধে তোমার ভীষণ অনুপাত?

কোন্ গগনে, গহিন দরিয়ায়
ঐ চোখের আগুন জ্বলেছিল?
সাহসী কে সে ভেসে কোন্ পাখায়
ভয়াল হাতে আগুনে হাত দিল?

কোন্ সে কাঁধ, কোন্ সে কারুকর্মে
ঐ হিয়ার তন্তুজাল বোনে?
ধুকপুকুনি কবে শুরু ও-মর্মে,
কোন্ সে ভীম-হাতে, ভীম-চরণে?

কোন্ হাতুড়ি, কোন্ শিকলি, আর
কী-চুল্লিতে ছিল ঘিলু তোমার?
কোন্ নেহাই, কোন্ বজ্রমুঠি
ঐ তরাসে পরিয়ে দিল খুঁটি?

তারারা যবে বর্শা ছোঁড়ে নীচে,
তাদের আঁসু-জলে আকাশ ভেজে :
তার ঠোঁটে কি ফোটে হাসির লেশ?
যে তোরে গড়ে, সে-ই কি গড়ে মেষ?

বাঘ ও বাঘ! জ্বলছ জ্বল্‌জ্বল্
ঝল্‌সে দিয়ে রাতের বনতল;
কোন্ অমর চোখ বা কোন্ হাত
সাহসী অবলীলায় বাঁধে ও-অনুপাত?

আমার সুন্দর গোলাপচারা

পথে যেতে, দেখি এক, ফুটে আছে আহা,
ফাল্গুন-দুর্লভ ফুল, আলো ক’রে বন–
সুন্দর গোলাপচারা আছে যে আমার,
তাই সেই ফুল আমি করি নি চয়ন।

গোলাপচারার কাছে ফিরে গিয়ে আমি
দিনরাত পরিচর্যা করেছি কত-না,
অথচ ঈর্ষায় পুড়ে, গোলাপ আমার,
ফিরিয়ে দিয়েছে শুধু কাঁটার যাতনা।

আহ্ সূর্যমুখী

আহ্, সূর্যমুখী! ক্লান্ত, সময়ের ভারে,
গুনে-গুনে সবিতার ব্যস্ত পদপাত:
খোঁজো কি সে-মরূদ্যান, স্বাদু ঝরনারে,
যেখানে ফুরায় সব ভ্রমণ-প্রমাদ?

যেখানে তরুণ, আহা, কৃশ, কামনায়,
পাণ্ডুরা কুমারী, অবগুণ্ঠিতা অমায়,
গোর থেকে জেগে উঠে দু’-বাহু বাড়ায়–
সেখানে আমার সূর্যমুখী যেতে চায়।

শিউলি

রাতুল গোলাপ ফুটিয়ে দেয় যে কাঁটা,
ছাগলও জাগায় বাগানো শিঙের ভয়,
শুধু এ-শিউলি–সুন্দর, সাদামাটা,
ব্যথা-ভীতি-হীন প্রেম ঢালে অব্যয়।

প্রেমের বাগান

একদিন গিয়ে দেখি প্রেমের বাগানে,
যেখানে সবুজ ঘাসে সকাল-বিকেল
খেলতাম, দেখি, তার ঠিক মাঝখানে
স্থাপিত হয়েছে এক উটকো চ্যাপেল।

আর সেই চ্যাপেলের রুদ্ধ ছিল দ্বার,
“মা কুরু!” লিপিবদ্ধ ছিল দ্বারে তার;
তখন ফিরেছি সেই বাগানে আবার
যেখানে প্রস্ফুট ছিল বহু ফুল-ঝাড়।

গিয়ে দেখি–ঝাড়গুলি কবর-স্তবক,
ফুল সব হ’য়ে গেছে সমাধিফলক,
কালো-বেশ পুরুতেরা করে সেথা ঘোরাফেরা,
কাঁটালতা দিয়ে বাঁধে আমার সুখের সাধে।

লন্ডন

প্রতিটা চার্টার-করা পথে ঘুরে মরি,
কাছেই চার্টার-করা টেম্স্ ব’য়ে যায়;
এবং, প্রতিটা মুখে নিরীক্ষণ করি,
দুর্বলতা, বেদনার চিহ্ন শোভা পায়।

প্রত্যেকটি মানুষের প্রতিটা কান্নায়,
প্রতিটি শিশুর ভীত চিৎকারে থামি,
প্রতি কণ্ঠস্বরে, প্রতি নিষেধাজ্ঞায়,
মন-গড়া হাতকড়া–আরও শুনি আমি

কীভাবে চিম্নি-ঝাড়–দারের রোদন
ক্রমশঃ-কালচে সব গির্জাকে শাসায়,
দুর্ভাগা সেনার দীর্ঘনিঃশ্বাসমোচন
প্রাসাদ-প্রাকারগুলি রুধিরে ভাসায়–

কিন্তু নিশুতিতে পথে সর্বাধিক শুনি
কীভাবে, যৌবনবতী বেশ্যার সম্পাত
করে নবজাতকের অশ্রুকে আলুনি,
শবযাত্রা ক’রে তোলে বাসরের রাত।

মানব-বিমূর্তি


করুণা করব তবে কাকে
কেউ যদি গরিব না-থাকে?
দয়া কাকে করব, সকলে
সমপরিমাণে সুখী হ’লে?

অন্যোন্য ভীতি-তে শান্তি আসে,
স্বার্থপর প্রেম তার পাশে;
ক্রূরতা তখন জাল ম্যালে,
সাবধানে তার গুঁটি ফ্যালে।

ব’সে প’ড়ে পবিত্র শঙ্কা-য়
অশ্রুজলে মৃত্তিকা ভেজায়;
পাদমূলে তার অতঃপর
গেড়ে বসে বিনয়-শিকড়।

আর তার মাথার উপর
ছায়া ফ্যালে রহস্য সত্বর;
শুঁয়াপোকা আর মাছি মিলে
রহস্যের পাতা চলে গিলে।

ছলনা-র ফল ফলে, লাল
টকটকে, মধুর, রসাল–
তার ঘন ছায়ার ভিতরে
দাঁড়কাক নীড় তার গড়ে।

সমুদ্রের আর পৃথিবীর
দেবতারা খোঁজে, প্রকৃতির
ভিতরে সে-গাছ বৃথা–এর
জন্ম যে মগজে মানুষের!

শিশু শোক

গোঙাচ্ছে মা আমার, বাবা কাঁদে ব’সে,
দেখলাম, ভয়ানক পৃথিবীতে প’শে,
উলঙ্গ, অসহায়, চিল-চিৎকারে,
পিশাচ যেন-বা এক মেঘের আঁধারে।

বাবার শক্ত হাতে করি ছটফট,
বৃথাই ছিঁড়তে চাই ন্যাকড়া-ল্যাঙট,
অবশেষে ক্লান্তিতে থাকি হাই দিতে–
অভিমান ক’রে বসি মা-র মাইটিতে।

বিষবৃক্ষ

রাগ হ’ল এক বন্ধুর ’পরে,
বললাম তাকে, রাগ গেল ম’রে।
শত্রুর ’পরে যখন রুষ্ট,
বলি নি, সে-ক্রোধ হয়েছে পুষ্ট।

দিনরাত আমি উৎকণ্ঠায়
অশ্রুর সেচে বাঁচিয়েছি তা’য়,
হাসির রৌদ্রে তাতিয়েছি তারে,
এবং কপট ভদ্র-ব্যাভারে।

তর্‌তর্‌ ক’রে চারা গেল বেড়ে,
মহীরুহ হ’ল, আর ডালে তার
ফলল লোভন ফল এক, বেড়ে–
জানতে দিলাম,–ফলটা আমার।

কালো রাত্রির ঘোমটার ফাঁকে
আমার বাগানে ঢুকেছিল চোর,–
গাছটির নীচে–দেখলাম তাকে–
ম’রে প’ড়ে আছে–যেই হ’ল ভোর।

অন্যান্য

দেবদূত


চোর-কে সেধেছিলাম পেড়ে দিতে আতা:
রাখে নি সে কথা।
নারী-কে বলেছিলাম দিতে কিছু সুখ:
শরমে, সে কেঁদেকেটে ফিরিয়েছে মুখ।

আমি ফিরে গেলে এক দেবদূত এলো:
চোরটাকে চোখ টিপে দিয়ে
হাসল নারীর দিকে চেয়ে,
না-ব’লে কোনোই কথা, নীরব কৌতুকে,
নিজ-হাতে আতা পেড়ে খেলো;
আর, বিনা-বাধায় নারীকে
টেনে নিল বুকে।

ক’-পঙ্‌ক্তি

পৃথিবীটা দেখতে কে চাও
একটি বালির কণায়?
কিংবা স্বর্গ–দেখবে কি তাও
বুনো ফুলের সোনায়?
চাও যদি কেউ, হাতের মুঠায়
ধোরো অনন্তকে;
আর মহাকাল, যদি সে এক
লহমাতে ঢোকে।

কখনও প্রেয়সীকে বোলো না


কখনও প্রেয়সীকে বোলো না, “ভালবাসি”,
প্রেম সে ফোটে না তো কথার লতা ঘিরে।
বরং সঁ’পে দিয়ো বাতাসে প্রেমরাশি,
আড়ালে থেকে, সে-ই জানাবে ধীরে-ধীরে।

বলেছি আমি, হায়, বলেছি প্রেয়সীকে,
হৃদয় দেখিয়েছি প্রচুর উচ্ছ্বাসে;
জমেছে, কেঁপেছে সে, তাকিয়ে তার দিকে;
আহা, সে পালিয়েছে সমূহ সন্ত্রাসে!

আমাকে প্রিয়তমা যখন গেল ছেড়ে,
পর্যটক এক অকুস্থলে এলো,
আড়ালে থেকে, আর মৃদু ঘা মেরে-মেরে
দেখল সব-ই, তবু গেল না–কী যে পেলো!

(আদি অনুবাদ)


জানাতে চেয়ো না বৃথাই তোমার প্রেম,
প্রেম কি কখনও কথায় প্রকট হয়?
কারণ, শান্ত সমীরণ, মোলায়েম,
অদৃশ্য থেকে ধীরে ধীরে তা ভনয়।

হায়, আমি বলেছিলাম প্রিয়াকে, হায়,
দেখিয়েছিলাম সমস্ত এ-হৃদয়,
কম্প্র, শীতল, সভিয় মুমূর্ষায়–
হায় হায় চ’লে গেল যে সে সে-সময়!

প্রেয়সী আমার যেতে-না-যেতেই, এক
পর্যটকের ঘটল অভ্যুদয়,
অদৃশ্য থেকে, ধীরে ধীরে অতিশয়–
আহা, এইবার কোনো বিরূপতা নয়!

নিন্দুকেরা

পরিবাদ ক’রে যাও ভলতের, রুসো,
পরিবাদ ক’রে যাও, যদিও বৃথাই;
ওড়াও কুলোর ধুলো প্রতিকূল বাতাসে, যা ফের
উড়ে পড়ে তোমাদেরই বেয়াড়া মাথায়।

আর, প্রতি-ধূলিকণা মণি হ’য়ে যায়
অলোক আলোকরশ্মি স্পর্শ ক’রে গায়ে;
উড়ে এসে অন্ধ করে বিনিন্দক চোখ,
ইস্রেলের পথে মেনে তবু তারা বিলায় আলোক।

ডেমোক্রিটাসের যত অণুপরমাণু,
আর নিউটনের আলোর কণিকারা
বালি হ’য়ে শুয়ে থাকে লোহিতসাগর-পারে
ইস্রেলের তাঁবুগুলি যেখানে দেদীপ্যমান তারা।

গান

কী-সুখে ঘুরেছি আমি মাঠ থেকে মাঠে,
বসন্তের সুধাপাত্রে দিয়েছি চুমুক,
তারপর দেখি, হায়, আলোকের বাটে
উড়ে চলে প্রেমের কুমার, স্মিতমুখ।

আমার চুলের জন্যে দিয়েছে সে লিলি,
রাতুল গোলাপ দিয়ে ললাটে আমার;
ঘুরিয়েছে কুঞ্জে তার, শুভ্র, নিরিবিলি,
স্বর্ণালি পুলক বাড়ে যেইখানে তার।

ভিজেছে আমার পাখা মধু-হিমিকায়,
তাতিয়েছে সবিতা আমার দীপ্র স্বর;
আটকাল মলমল-জালে সে আমায়,
ঢোকাল সোনালি এক খাঁচায় তারপর।

সে ব’সে আমার গান ভালবেসে শোনে,
খুনসুটি করে কত, হাসে কুতূহলে;
আমার সোনালি পাখা ছিঁড়ে ফ্যালে টেনে,–
আমার বন্দি-ত্ব নিয়ে টিটকারিও চলে।

এপিগ্রাম

ফ্ল্যাক্সম্যান-কে


আমাকে তুমি ব্যঙ্গ করো,
“পাগল” ব’লে পাও যে সুখ–
তোমাকে আমি, ব্যঙ্গ নয়,
সোজা-ই বলি, “আহাম্মুক”।

হান্ট্-কে

তুমি বলো, ফিউজিলি বড় শিল্পী নয়,
আমি বলি, এইটেই তার শ্রেষ্ঠ পরিচয়।

হান্ট্-কে ২

আমাকে তারা “পাগল” বলে; তোমাকে বলে “হাঁদা”–
কা’কে যে তারা ঈর্ষা করে, বলতে পারো, দাদা!

হেইলি-কে

তব বন্ধুতা হরদম ব্যথা হানে এ-হৃদয়ে, সাথি রে!
এবার শত্রু হও রে আমার বন্ধুত্বের খাতিরে।

স্টট্‌হার্ড্-কে

স্টট্হার্ড্ ছিলেন তাঁর আঁতুড়-ঘরেতে
ভীষণ গরিব আর ভীষণ বুড়োটে।
বড় আর ধনী হ’য়ে–এমনই নসিব–
এখনও বুড়োটে, আর এখনও গরিব!

জনাব ক্রমেক

চতুর বজ্জাত এক আমি চিনতুম . . .
জনাব ক্রমেক নাকি? সেলামালিকুম!

জনাব প–

আমাকে যে বন্ধু-সম ভালবাসে না সে,
বন্ধুদের কাছ থেকে তো লাভের আশা করে–
বরং শুধু এই কারণেই আমায় ভালবাসে:
হাসতে যেন পারে, আমি আছাড় খেলে পরে।

রয়াল অ্যাকাডেমির প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে

জাতি যখন বুড়িয়ে যায়, শিল্পের তেজ জুড়িয়ে যায়,
সকল শাখায় গেড়ে বসে বেসাতি;
গরিবগুর্বো আর বুড়োরা বেঁচে থাকে টাকার তোড়ায়,
জন্মায় সব গরিব, এবং অশীতি।

একটা এপিটাফ


এখানে শায়িত আছে জন ট্রট, মানবজাতির বন্ধু তিনি,
একজনও শত্রু রেখে যান নি।
প্রাচীন কবিরা বলে, বন্ধু পাওয়া ছিল নাকি কঠিন ব্যাপার,
আজকে তাদের জন্য রাস্তায় পা-ফেলাই ভার।

স্যর জশুয়া রিনল্ড্‌জ্‌

যবে-না মরিল স্যর জশুয়া রিনল্ড্‌জ্‌
হইল হতমানিত সমস্ত প্রকৃতি–
রানির কানেতে মহারাজা ঢালে এক অশ্রুবিন্দু, তাজা,
তাহাতে পাণ্ডুর তার সব ‘প্রতিকৃতি’।

যাজকের প্রশ্নের উত্তর

‘ভেড়ার কাছে শেখো না কেন
শান্তিপূর্ণতা?’
‘চাই না তব হস্তে মম
পশম-চূর্ণতা।’
==================
উইলিয়াম ব্লেইক (William Blake, ১৭৫৭-১৮২৭), অঙ্কন: Thomas Phillips, ১৮০৭
==================================



bdnews24 এর সৌজন্যে
অনুবাদ: সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

এই কবিতা গুলো পড়া হয়েছে...
free counters