Thursday, July 3, 2025

২৯০ আরোহীসহ ইরানের উড়োজাহাজ কেন ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ধ্বংস করেছিল যুক্তরাষ্ট্র by অনিন্দ্য সাইমুম

ইরানের আকাশে ১৯৮৮ সালের ৩ জুলাই বিধ্বস্ত হয় ইরান এয়ারের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ। মার্কিন যুদ্ধজাহাজ থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে মাঝ আকাশেই ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে যায় উড়োজাহাজটি। নিহত হন ২৯০ আরোহীর সবাই। ইতিহাসে এটা ‘ফ্লাইট ৬৫৫ ট্র্যাজেডি’ নামে পরিচিত। ওই ঘটনার বর্ষপূর্তি আজ। আজকের দিনে ঘটনাটির আদ্যাপান্ত নিয়ে প্রথম আলোর এই আয়োজন—

সুন্দর রোদেলা সকাল। ঝাঁ–চকচকে নীল আকাশ। পারস্য উপসাগরের ওপর দিয়ে বইছে ঝিরিঝিরি মিঠে হাওয়া। এমন চমৎকার আবহাওয়ায় উড়াল দিয়েছিল একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ। এতে দেশি-বিদেশি ২৭৪ জন যাত্রী আর ১৬ জন ক্রু ছিলেন। কে ভেবেছিলেন, এটাই হবে এই ২৯০ জনের শেষ উড়াল। মুহূর্তের মধ্যে একটি ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে এসে আঘাত হানবে উড়োজাহাজটিতে। মাঝ আকাশেই সেটি ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে যাবে, এমনটাই-বা কে ভেবেছিলেন।

ঘটনাটি ১৯৮৮ সালের আজকের দিন অর্থাৎ ৩ জুলাইয়ের। ঘটনাস্থল পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি। চমৎকার আবহাওয়ায় হরমুজ প্রণালিঘেঁষা ইরানের বন্দর আব্বাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড়াল দেয় ইরান এয়ারের ফ্লাইট ৬৫৫। এয়ারবাস এ-৩০০ মডেলের যাত্রীবাহী উড়োজাহাজটির গন্তব্য ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই। সঙ্গে মোট ২৯০ জন আরোহী। এরপরই বিশ্বের আকাশসেবা খাতের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডির শিকার হয় উড়োজাহাজটি।

সময় মাত্র ৭ মিনিট

ঘড়িতে তখন সকাল ১০টা ৪৭ মিনিট। নির্ধারিত সময়ের আধা ঘণ্টা পর ইরানের বন্দর আব্বাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড়াল দেয় ফ্লাইট ৬৫৫। ওই সময় নিরাপত্তার জন্য হরমুজ প্রণালিতে মোতায়েন করা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসেন্স। সেখান থেকে উড়োজাহাজটি লক্ষ্য করে পরপর দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়।

দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের একটি উড়ে গিয়ে আঘাত হানে ফ্লাইট ৬৫৫-এ। মাঝ আকাশে ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে যায় ইরানের ওই উড়োজাহাজ। প্রাণ হারান ২৯০ আরোহীর সবাই। তখন ঘড়িতে সকাল ১০টা ৫৪ মিনিট। অর্থাৎ উড্ডয়নের মাত্র ৭ মিনিটের মাথায় ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস হয় উড়োজাহাজটি।

যুদ্ধের সময়ের উৎকণ্ঠা

ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ধ্বংসের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তুমুল প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এ ঘটনার ব্যাপক নিন্দা জানানো হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইরানের আকাশসীমায় দেশটির একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ কেন ধ্বংস করলে যুক্তরাষ্ট্র? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একটু পেছনে যেতে হবে। বুঝতে হবে তখনকার সময়টাকে। উপলব্ধি করতে হবে ইরান, বিশেষত হরমুজ প্রণালির কৌশলগত অবস্থান ও গুরুত্বকে।

১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন একটি যুদ্ধের সূচনা হয়। ইতিহাসে এই যুদ্ধ ইরান-ইরাক যুদ্ধ নামে পরিচিত। কেউ কেউ একে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ বলেন। থেমে থেমে আট বছর ধরে চলে দুই দেশের যুদ্ধ। ১৯৮৮ সালের আগস্টে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধের লাগাম টানা হয়।

যা–ই হোক, ফ্লাইট ৬৫৫ যখন ধ্বংস করা হয়, অর্থাৎ ১৯৮৮ সালের জুলাই মাসে তখনো ইরান ও ইরাকের মধ্যে যুদ্ধ চলছিল। ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের তখনো এক দশক পার হয়নি। এর মধ্যেই দেশটি বড় একটি যুদ্ধে জড়িয়েছে। যুদ্ধের সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের (বিশেষত জ্বালানি বাণিজ্যের) কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় ছিল ইরান। একই উদ্বেগ ছিল ইরাকের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোরও।

হরমুজের নিরাপত্তায় যুদ্ধজাহাজ

যুদ্ধের সময়ের কয়েকটি ঘটনা জানলে তখনকার সময় আর পরিস্থিতি বোঝাটা সহজ হবে। তখন ইরান যেকোনো মূল্যে পারস্য উপসাগর হয়ে ইরাকের জ্বালানি তেল রপ্তানি বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর। এ জন্য জ্বালানিবাহী নৌযানে মাইন পেতে রাখা, রকেট ছুড়ে জ্বালানিবাহী নৌযান ধ্বংস—নিত্যদিন এমন নানা তৎপরতা চলছিল। তেহরানের বিরুদ্ধে ইরাকও একই ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছিল।

এর মধ্যে ১৯৮৭ সালের একদিন একটি ইরাকি যুদ্ধবিমান ভুল করে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রিগেট ইউএসএস স্টার্কে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ইরানের জ্বালানিবাহী ট্যাংকার মনে করায় এই ‘ভুল’ হয়। এতে ৩৭ জন মার্কিন নাবিক নিহত হন। নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কায় পড়ে যায় পশ্চিমারা।

১৯৮৮ সালের ১৪ এপ্রিল পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রিগেট ইউএসএস স্যামুয়েল বি রবার্টসে মাইন পাতে ইরানিরা। এর ফলে জাহাজটি প্রায় দুই টুকরা হয়ে যায়। এর চার দিন পর প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের একটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয় মার্কিন নৌবাহিনী।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালির পাশে আন্তর্জাতিক জলসীমায় মোতায়েন করা হয় যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ভিনসেন্স। এর উদ্দেশ্য ছিল দুটি—এক, হরমুজ প্রণালি হয়ে চলাচল করা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দুই, ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে তেহরানকে কৌশলগত চাপে রাখা।

এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান সরকার হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তায় এফ-১৪ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে সেখান থেকে সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর বন্দর আব্বাসে। কাজেই এই বিমানবন্দর তখন সামরিক ও বেসামরিক—দুই কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। মার্কিনদের আশঙ্কা ছিল ইরান এফ-১৪ যুদ্ধবিমান থেকে মার্কিন নৌযানে হামলা চালাতে পারে।

‘ভুল’ থেকে ট্র্যাজেডি

ফ্লাইট ৬৫৫ ট্র্যাজেডির আগের দিন ইরানের একটি এফ-১৪ যুদ্ধবিমান মার্কিন নৌযানের কাছাকাছি চলে আসে। পরে ক্রুজার ইউএসএস হেলসি থেকে সতর্ক করা হলে ইরানের যুদ্ধবিমানটি ফিরে যায়।

যা–ই হোক, ৩ জুলাই সকালে ইউএসএস ভিনসেন্স আরেকটি মার্কিন ফ্রিগেট ইউএসএস মন্টেগোমারির পাশাপাশি থেকে লড়াইয়ে নিয়োজিত ছিল। তখন হরমুজ প্রণালিতে ইরানের গানবোটগুলোর সঙ্গে গোলাগুলি চলছিল। কারণ, ইরানি নৌযানগুলো একটি পাকিস্তানি ট্যাংকারের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছিল। যেকোনোভাবে পাকিস্তানি নৌযানটিকে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার করে দেওয়া ছিল মার্কিন যুদ্ধজাহাজটির উদ্দেশ্য।

ইউএসএস ভিনসেন্সের ক্যাপ্টেন ছিলেন উইলিয়াম সি রজার্স তৃতীয়। মার্কিন নৌবাহিনীর তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সকাল ১০টা ৪৭ মিনিটের পর ক্যাপ্টেন রজার্স একটি বার্তা পান। তাতে বলা হয়, ইরানের ‘অজ্ঞাত’ একটি উড়োজাহাজ ইউএসএস ভিনসেন্সের দিকে এগিয়ে আসছে। ইরানি উড়োজাহাজটিকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেটি সাড়া দেয়নি।

মার্কিন নৌবাহিনীর তদন্তে আরও বলা হয়েছে, ইরানের যাত্রীবাহী উড়োজাহাজটি অনুমোদিত বাণিজ্যিক বিমানপথে ছিল। নিচে হরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের বিষয়ে উড়োজাহাজটিকে আগাম সতর্ক করা হয়নি। এমনকি রাডারে শনাক্ত হওয়ার পর মার্কিন যুদ্ধজাহাজ থেকে সতর্কবার্তা পাঠানো হলেও ইরানি উড়োজাহাজের পাইলট সাড়া দেননি।

এই পরিস্থিতিতে ক্যাপ্টেন রজার্স মনে করেন, ইরানিরা হয়তো মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলার জন্য এফ-১৪ যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে। তিনি ‘বিপদ বুঝে’ অতিদ্রুত প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নেন। মার্কিন যুদ্ধজাহাজটি থেকে পরপর দুটি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যায়। এর একটির আঘাতে আকাশেই ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে যায় ইরানের যাত্রীবাহী উড়োজাহাজটি।

পরবর্তী সময় তদন্ত প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী বলে এটা একটি ‘মর্মান্তিক ও দুঃখজনক দুর্ঘটনা’ ছিল। এর সবই হয়েছিল সকাল ১০টা ৪৭ মিনিট থেকে ১০টা ৫৪ মিনিট, অর্থাৎ মাত্র ৭ মিনিটের মধ্যে।

ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, এ ঘটনা আন্তর্জাতিক জলসীমায় ঘটেছে। যদিও পরে সেটা ভুল প্রমাণিত হয়। উড়োজাহাজটি ইরানের আকাশসীমায় থাকা অবস্থাতে হামলার শিকার হয়েছিল। বলা হয়, অনুমোদিত বাণিজ্যিক বিমানপথে উড়োজাহাজটি নির্ধারিত গতির চেয়ে ধীরে আসার কারণে এই ‘ভুল’ হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আদালতে ইরান

ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে উড়োজাহাজ ধ্বংস এবং ২৯০ আরোহীকে ‘হত্যার’ অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যায় ইরান। দেশটি ১৯৮৯ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনে।

শুরু হয় বিচারকাজ, তবে বিচার শেষ হয়নি, বরং সমঝোতার ভিত্তিতে এই মর্মান্তিক ইতিহাসের ইতি টানা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সমঝোতায় পৌঁছায়। উড়োজাহাজ ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ বাবদ ইরানকে প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার দেয় ওয়াশিংটন। আর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই ঘটনায় ‘গভীর সহানুভূতি’ জানানো হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই সমঝোতার জেরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত থেকে অভিযোগ তুলে নেয় ইরান। এই ঘটনায় ব্যাপক আলোচনা–সমালোচনা হয়। ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবার থেকে শুরু করে দেশি–বিদেশি অধিকারকর্মী—অনেকেই নিন্দা জানান।
সরব হয়েছিলেন রুহানি

সময়টা ২০১৯ সাল। ইরানে তখন ক্ষমতায় প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। ফ্লাইট ৬৫৫ ট্র্যাজেডির বর্ষপূর্তির সময় মন্ত্রিসভার বৈঠকে রুহানি চাপা পড়া বিষয়টি নতুন করে সামনে আনেন। তোপ দাগেন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। ওই সময় বন্দর আব্বাস বিমানবন্দরের নতুন নাম রাখা হয় ‘ফ্লাইট ৬৫৫ শহীদ বিমানবন্দর’।

মন্ত্রিসভার বৈঠকে রুহানি বলেছিলেন, এটা কেউ বিশ্বাস করবে না যে এয়ারবাসের মতো বড়সড় একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজকে যুদ্ধবিমান ভেবে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ভুল করবে। আর যদি ভুল করেও থাকে, তাহলে কি এফ-১৪–কে হামলা করে বসবে? এফ-১৪ কোনো বোমারু বিমান নয়। এটি শুধু বাধা দেওয়ার কাজে আর ডগফাইটে ব্যবহৃত হয়। এতে আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র থাকে না।

ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট রুহানি ওয়াশিংটনের সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘এমন ভুল গ্রহণযোগ্য নয়।’ ক্ষমা চাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওরা (মার্কিনরা) এ জন্য ইরানি জাতির কাছে আজও ক্ষমা চায়নি। যুদ্ধজাহাজের ক্যাপ্টেনকে শাস্তি দেয়নি, বরং পুরস্কৃত করেছে। মার্কিনরা ঠান্ডামাথায় বড় অপরাধ করেছে।’

ইউএসএস ভিনসেন্সের ক্যাপ্টেন রজার্সকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সম্মানজনক ‘লিজিওন অব মেরিট’ পদক দেওয়া হয়েছে। পেশাজীবনে ‘অসামান্য অবদানের’ স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯০ সালে তাঁকে এই পদক দেওয়া হয়। যদিও তখন ফ্লাইট ৬৫৫ ট্র্যাজেডির কথা কিছুই উল্লেখ করা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বারবার ফ্লাইট ৬৫৫ ট্র্যাজেডিকে ‘ভুল’ বলা হয়েছে। ক্ষমা না চাইলেও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ‘সহানুভূতি’ জানানো হয়েছে। উল্টোদিকে ইরানিদের কাছে নিহত ২৯০ জন শহীদের মর্যাদা পেয়েছেন। ইরানের জনগণ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে ৩ জুলাই শোক আর বেদনার দিন। ৩৭ বছর পর আজও তাঁরা শোকের মধ্যে সান্ত্বনা খুঁজছেন।

তথ্যসূত্র: সিএনএন, ইরান ফ্রন্ট পেজ নিউজ ও ব্রিটানিকা।

সাগরে ফ্লাইট ৬৫৫-এর রেপ্লিকা ভাসিয়ে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ করছেন ইরানিরা
সাগরে ফ্লাইট ৬৫৫-এর রেপ্লিকা ভাসিয়ে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ করছেন ইরানিরা। ফাইল ছবি: এএফপি

জলের কুমির যেভাবে গেল নাইক্ষ্যংছড়ির পাহাড়চূড়ায় by আব্দুল কুদ্দুস

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু পাহাড়ে গড়ে উঠেছে দেশের একমাত্র কুমির প্রজনন খামার। প্রায় তিন হাজার কুমির রয়েছে এই খামারে, যার মধ্যে এক হাজারের বেশি রপ্তানিযোগ্য হলেও আইনি জটিলতায় তা আটকে আছে এক যুগ ধরে। দর্শনার্থীরা কুমির দেখতে এলেও খামারের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

‘জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ’—বহু পুরোনো এই বাগ্‌ধারাই বলে দিচ্ছে, এ দেশে স্মরণাতীতকাল থেকেই কুমিরের অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু জলের কুমির পাহাড়চূড়ায় বসবাসের খবর যে কাউকে চমকে দিতে পারে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু এলাকার পাহাড়চূড়ায় সত্যিই দেখা মিলবে কুমিরের। তা–ও এক-দুটি নয়, কয়েক হাজার।

তুমব্রুর পাহাড়চূড়ায় রয়েছে দেশের একমাত্র বাণিজ্যিক কুমিরের খামার। ২৫ একরের ওই একটি খামারে আছে ছোট–বড় মিলিয়ে ৩ হাজার কুমির। রাস্তার পাশে একাধিক বেষ্টনীতে দেখা মেলে বাচ্চা কুমিরের লাফালাফি। কিছু বেষ্টনীতে গাছের গুঁড়ির মতো নিশ্চল পড়ে আছে কুমিরের দল। কিছু কুমির মুরগি খেতে ব্যস্ত। পাহাড়ের নিচে একাধিক জলাধারেও রয়েছে কুমির। খামারে নিয়মিত ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। ঘুরে ঘুরে কুমির দেখেন। কুমিরের জীবনচক্র জানার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ পাহাড়চূড়ায় খামার গড়ার ইতিহাস, কুমিরের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন।

সম্প্রতি নাইক্ষ্যংছড়ির ওই খামার ঘুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। এখানকার কর্মীরা জানালেন, বিদেশে কুমির রপ্তানির উদ্দেশ্যে খামারটি গড়ে তোলা হয়। তবে এখনো মেলেনি রপ্তানির অনুমতি। এ জন্য খামারটি লাভের মুখ দেখতে পারেনি এখনো।

খামার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এপ্রিল মাস থেকে কুমিরের প্রজনন মৌসুম শুরু হয়। এখনো মৌসুম চলছে। এর মধ্যে ডিম ফুটে বেশ কিছু ছানারও জন্ম হয়েছে। এ মৌসুমে প্রায় ২০০টি ছানার জন্ম হয়েছে। আগামী আগস্ট মাস পর্যন্ত আরও ১৫০টি ছানা হবে। সব মিলিয়ে খামারে কুমিরের সংখ্যা দাঁড়াবে তিন হাজারের কাছাকাছি।

যেভাবে কুমিরের খামার


নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু এলাকাটি লেক আর পাহাড়ঘেরা। এমন মনভোলানো নিসর্গের মধ্যে ২০০৮ সালে ২৫ একর জায়গায় প্রতিষ্ঠা পায় দেশের একমাত্র কুমির প্রজনন খামার। নাম ‘আকিজ ওয়াইল্ডলাইফ ফার্ম লিমিটেড’।

২০১০ সালে ৫০টি কুমির দিয়ে শুরু খামারের প্রজনন কার্যক্রম। এর ছয়-সাত বছরের মাথায় জন্ম নেয় দুই হাজারের বেশি কুমির। খামারে এখনো রপ্তানি উপযোগী এক হাজারের বেশি কুমির পড়ে আছে, কিন্তু আইনি জটিলতায় এক যুগের বেশি সময়ে একটি কুমিরও বিদেশে রপ্তানি করা যায়নি। তাতে খামারটি লাভের মুখ দেখছে না।

খামার কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, ২০১০ সালে অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে ৫০টি লোনাপানির কুমির দিয়ে প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ৫০টি কুমিরের মধ্যে স্ত্রী কুমির ছিল ৩১টি। গত ১৪ বছরে কুমিরগুলোর ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানো হয়েছে।

প্রাপ্তবয়স্ক হতে কুমিরের সময় লাগে ৮ থেকে ১০ বছর। মাদি কুমির ৪০ থেকে ৮০টি পর্যন্ত ডিম দেয়। ডিম ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৮০ থেকে ৯০ দিন ইনকিউবেটরে রেখে বাচ্চা ফোটানো হয়। বাচ্চার বয়স দুই বছর হলে লিঙ্গ শনাক্ত করা যায়। লোনাপানির কুমির সর্বোচ্চ বাঁচে ১০০ বছর। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে খামারটি গড়ে তোলা হলেও রপ্তানি বন্ধ থাকায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। কুমির রপ্তানি করতে হলে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগে।

কুমির দেখে মুগ্ধ দর্শনার্থী

সম্প্রতি খামারে গিয়ে দেখা গেছে, বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ হেঁটে হেঁটে কুমির দেখছেন। মুঠোফোনে তুলছেন ছবি। কেউ কুমিরের দিকে ছুড়ে মারেন চিপস, বিস্কুট। বেষ্টনীর পাকা দেয়ালের ভেতরে থাকায় কুমির মানুষকে আক্রমণ করতে পারে না।

পাহাড়চূড়ায় পাকা দেয়ালের সারিবদ্ধ ৮-৯টি কক্ষে (বেষ্টনীতে) রাখা আছে ১ হাজারের বেশি কুমির। বেশির ভাগ ছানা। ওজন ৫ থেকে ১০ কেজি। একটি কক্ষে ১০০ থেকে ২০০টি কুমিরছানা থাকছে গাদাগাদি করে। কয়েকটি কক্ষে বাচ্চার সঙ্গে দেখা মেলে বড় কুমিরও। কক্ষগুলোর ওপরে ছাউনি নেই। দর্শনার্থীরা বেষ্টনীর বাইরে দাঁড়িয়ে কুমিরের দৌড়ঝাঁপ দেখেন। প্রজনন মৌসুম বলে গত এপ্রিল থেকে দর্শনার্থীর সমাগম সীমিত রাখা হয়েছে।

খামার দেখতে হলে ৫০ টাকার টিকিট কাটতে হয়। টিকিটের গায়ে লেখা থাকে, ‘কুমির হিংস্র প্রাণী, তাই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। ইট, পাথর, পানির বোতল ইত্যাদি নিক্ষেপ করবেন না। এই টিকিট ৩০ মিনিট অবস্থানের জন্য প্রযোজ্য।’

স্ত্রী ও স্কুলপড়ুয়া দুই ছেলে–মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে খামার দেখতে আসেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমান। আধঘণ্টা খামার দেখে মুগ্ধ পরিবারের সদস্যরা। তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালে প্রথমবার খামার দেখতে এসেই মুগ্ধ হয়েছি। এ কারণে এবার পরিবার নিয়ে এলাম।’

খামারের ইনচার্জ (তত্ত্বাবধায়ক) জীবন খান বলেন, খামারে বর্তমানে কতটি কুমির আছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। গণনা করাও কঠিন। ১০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কুমিরের পরিচর্যা করছেন। তবে সব মিলিয়ে খামারের কুমিরের সংখ্যা ২ হাজার ৯০০–এর বেশি হতে পারে।

খামারের একজন কর্মী (কুমির সংরক্ষক) বলেন, কুমিরছানাদের মুরগি আর গরুর মাংস কিমা করে দিনে একবার খাওয়াতে হয়। বড় কুমিরকে খাওয়ানো হয় সপ্তাহে একবার। পূর্ণবয়স্ক কুমিরকে বেশি খেতে দেওয়া হয় না। বেশি খেলে কুমিরের শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমে। তখন স্ত্রী কুমির ডিম দিতে পারে না।

প্রতি কেজি মাংস ৩০ ডলার

খামার কর্তৃপক্ষ জানায়, সরকারের অনুমতি পেলে কুমিরগুলো রপ্তানি করা হবে। রপ্তানির জন্য কুমিরের ওজন ২০ থেকে ২৫ কেজি এবং লম্বায় ৫ ফুট হতে হয়। খামারে এমন কুমিরের সংখ্যা এখন ১ হাজারের বেশি। এগুলো বিদেশে রপ্তানির উপযোগী হয়েছে। বিদেশে কুমিরের প্রতি কেজি মাংস বিক্রি হয় ৩০ ডলারে। সে হিসাবে প্রতিবছরই প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার সুযোগ রয়েছে।

খামারের একটি কুমির। প্রতিদিন এসব কুমির দেখতে প্রচুর দর্শনার্থী হাজির হন। সম্প্রতি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ধুমধুমের পাহাড়ে দেশের একমাত্র কুমির প্রজনন খামারে
খামারের একটি কুমির। প্রতিদিন এসব কুমির দেখতে প্রচুর দর্শনার্থী হাজির হন। সম্প্রতি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ধুমধুমের পাহাড়ে দেশের একমাত্র কুমির প্রজনন খামারে। ছবি-প্রথম আলো

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে পেন্টাগনের মূল্যায়নে কী বেরিয়ে এল

ইরানে মার্কিন হামলায় দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি এক থেকে দুই বছর পিছিয়ে গেছে বলে গোয়েন্দা তথ্য মূল্যায়ন শেষে জানিয়েছে পেন্টাগন। এর আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে তেহরানের এ কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়ে গেছে।

গতকাল বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের মুখপাত্র শন পারনেল বলেন, ওয়াশিংটনের হামলায় ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে এ হামলাকে ‘সাহসী অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।

শন পারনেল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা অন্তত এক থেকে দুই বছরের জন্য তাদের (ইরান) কর্মসূচি দুর্বল করে দিয়েছি। প্রতিরক্ষা বিভাগের গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণে এ মূল্যায়ন উঠে এসেছে।’

যুক্তরাষ্ট্র গত ২১ জুন বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমানের সহায়তায় ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় ব্যাপক বোমা হামলা চালায়। তখন থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার বলে আসছেন, এ হামলায় দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস হয়েছে।

ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে এমনভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

তবে গত মাসে ফাঁস হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রাথমিক গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, এ হামলায় ইরানের কর্মসূচির মূল উপাদানগুলো অক্ষত রয়ে গেছে এবং কাজ কিছু সময়ের জন্য বিলম্বিত হয়েছে মাত্র।

এদিকে ইরান তার পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত জানাতে কৌশলী ভূমিকা নিচ্ছে।

ইরানের কিছু কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় স্থাপনাগুলোর বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। তবে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, ট্রাম্প হামলার প্রভাব ‘অতিরঞ্জিত’ করে দেখাচ্ছেন।

ইসরায়েল-ইরান ১২ দিনের সংঘাতের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষ হয়ে ওই হামলা চালায়। এর ফলাফল নিয়ে এখনো কোনো স্বাধীন মূল্যায়ন প্রকাশিত হয়নি। ইরানের ভূগর্ভস্থ যেসব স্থাপনায় হামলা হয়েছে, বিশেষ করে সবচেয়ে বড় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র ফর্দোর ক্ষয়ক্ষতির পুরো চিত্র স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করেও বোঝা যাচ্ছে না।

ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুতের অবস্থান ও বর্তমান অবস্থা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে।

ইরানের পারমাণবিক নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা ও প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বলছে, হামলার পর আশঙ্কাজনক মাত্রায় তেজস্ক্রিয়তা বৃদ্ধির কোনো ইঙ্গিত তারা পায়নি; যেমনটা এ ধরনের হামলায় আশঙ্কা করা হয়ে থাকে। তবে জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইএর প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বলেছেন, ইউরেনিয়াম সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত কনটেইনারগুলোর হয়তো হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এমন তথ্য তাঁরা বাতিল করে দিচ্ছেন না।

গত সপ্তাহে সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রোসি বলেন, ‘আমরা জানি না, ওই পদার্থগুলো কোথায় রাখা হয়েছিল বা সেগুলোর কিছু হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কিছু হয়তো ধ্বংস হয়েছে, আবার কিছু হয়তো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।’

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আগে ফর্দো থেকে কিছু ট্রাক বেরিয়ে যাচ্ছে।

গ্রোসি বলেন, ইরান কয়েক মাসের মধ্যেই আবার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করতে পারে। উল্লেখ্য, সমৃদ্ধকরণ হচ্ছে ইউরেনিয়ামকে পারমাণবিক জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে তেজস্ক্রিয়তা বাড়ানো হয়।

ইরানের যেসব স্থাপনায় হামলা চালানো হয়, সেগুলো এর আগপর্যন্ত আইএইএর সরাসরি নজরদারির আওতায় ছিল। কিন্তু এখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অন্ধকারে। তা আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের নজরদারির বাইরে চলে গেছে।

ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের পর ইরানি পার্লামেন্ট একটি আইন পাস করেছে। সেখানে বলা হয়, আইএইএ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই সংস্থাটির সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিত করা হবে।

জেনেভা সনদ অনুযায়ী, যেসব স্থাপনায় ‘বিপজ্জনক শক্তি’ রয়েছে, যেমন বাঁধ, নালা বা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, তাতে হামলা চালানো নিষিদ্ধ।

ইসরায়েলের সঙ্গে ১৩ জুন সংঘাত শুরুর আগে তেহরান দাবি করেছিল, তারা ইসরায়েলের এমন কিছু নথি পেয়েছে যাতে দেখা যায়, আইএইএ তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে গোপন তথ্য ইসরায়েলকে সরবরাহ করছে। তবে সংস্থাটি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এদিকে গতকাল বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন আইএইএর সঙ্গে আবার সহযোগিতা শুরু করে।

বিবৃতিতে পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস বলেন, ‘এ মুহূর্তে যখন ইরানের শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধির পথে ফিরে আসার সুযোগ রয়েছে, তখন আইএইএর সঙ্গে সহযোগিতা স্থগিত করাটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।’

১৩ জুন ইসরায়েল সরাসরি কোনো উসকানি ছাড়াই ইরানের ওপর ব্যাপক হামলা চালায়। তারা দাবি করে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোচ্ছে, আর সেটিকে ঠেকাতেই এ আগাম হামলা।

তেহরান অবশ্য শুরু থেকেই পারমাণবিক বোমা তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের কাছে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার রয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে বিশ্বাস।

এ সংঘাতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় শত শত ইরানি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় পরমাণু বিজ্ঞানী, তাঁদের পরিবারের সদস্য ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারাও রয়েছেন।

ইসরায়েলে ইরানের পাল্টা হামলায়ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হামলায় নিহত হয়েছেন ২৯ জন।

উল্লেখ্য, সংঘাতের দশম দিনে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সমর্থন জানিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণ করে। জবাবে ইরান কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

কয়েক ঘণ্টা পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। উভয় দেশই যুদ্ধের ফলাফলকে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ বলে বর্ণনা করেছে।

ইসরায়েল বলছে, তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। কিন্তু ইরান বলছে, তারা সরকারের স্থিতিশীলতা, পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি টিকিয়ে রেখেই ইসরায়েলের লক্ষ্য ব্যর্থ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আগে ও পরে স্যাটেলাইটে তোলা ইরানের ফর্দো ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনার দৃশ্য। কোম, ইরান, ২০ জুন ২০২৫ (বাঁয়ের ছবি) ও ২২ জুন ২০২৫
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আগে ও পরে স্যাটেলাইটে তোলা ইরানের ফর্দো ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনার দৃশ্য। কোম, ইরান, ২০ জুন ২০২৫ (বাঁয়ের ছবি) ও ২২ জুন ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্পের ‘গ্রেট’ আমেরিকা কি ‘চীনপন্থী’ হয়ে যাচ্ছে by জ্যাকব ড্রেয়ার

একসময় অনেক মার্কিন বিশ্বাস করতেন, চীন যদি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থায় অংশ নেয়, তাহলে ধীরে ধীরে তারা যুক্তরাষ্ট্রের মতোই হয়ে যাবে।

প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তো একবার বলেই ফেলেছিলেন—চীন হয়তো একদিন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে উঠবে। তাঁর মতো অনেক মার্কিনের কাছে মনে হচ্ছিল, মার্কিন নেতৃত্বাধীন ‘নিওলিবারেল’ ব্যবস্থার চূড়ান্ত বিজয় আর দূরে নয়।

ক্লিনটন এবং অন্যরা অবশ্য সে সময় পুরোপুরি ভুল কিছু বলেননি। চীন সত্যিই অনেক বছর ধরে আমেরিকান ব্যবস্থার মূল কিছু দিক অনুসরণ করে গেছে।

ব্যবসায় উদ্যোগ, ভোগবাদের সংস্কৃতি এবং বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া—এসব ইস্যুতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে।

এর ফলে চীন হয়ে উঠেছে এক বিশাল শিল্পশক্তি। সেখানে তৈরি হয়েছে বড় একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে চীন এখন অনেক উন্নত। আর হুয়াওয়ে, লেনোভো, আলিবাবার মতো চীনা প্রতিষ্ঠান এখন বিশ্বজুড়ে পরিচিত ব্র্যান্ড।

চীনের ১৪০ কোটি মানুষ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ও সচ্ছল জীবনযাপন করছে।

এই পুরো পথচলায় চীন বারবার যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করেছে। কিন্তু যে বিষয়টি না আমেরিকানরা, না চীনারা—মূলত কেউই কল্পনা করেনি, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু চীন অনুসরণ করে গেছে, তা নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রও চীনের বহু নীতিকে চেতনে–অবচেতনে অনুসরণ করেছে।

আজকের দিনে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রভাব ও ভাবধারা বিস্তারের প্রতিযোগিতা চলছে, তখন মনে হচ্ছে, পেন্ডুলামের সেই দুলুনি এখন উল্টো দিকে যাচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আবার ক্ষমতায় ফেরা এটিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। দেখা যাচ্ছে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখন চীনের মতো আচরণ করছে। যেমন: গণতন্ত্রের ক্ষয়, কঠোর সীমান্তনীতি ও জাতীয়তাবাদ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন ইত্যাদি।

অর্থাৎ, একসময় চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো করে তোলার স্বপ্ন দেখা হলেও এখন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রই কিছু কিছু ক্ষেত্রে চীনের মতো হয়ে উঠছে।

আমি ২০০৮ সাল থেকে সাংহাইয়ে বসবাস করছি। তাই চীনের উত্থান আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। এটা ঠিক, যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে শিক্ষা পাওয়া উচিত, তা হলো, ‘নিজেদের জাতিগত পরিচয় বা মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত না হওয়া।’

চীন ঠিক এই কাজটাই করেছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কৌশল নিয়েছে, যেগুলো তাদের শক্তিশালী করে তুলবে—যেমন প্রযুক্তি, ভোক্তাবাদ, বিশ্ববাজারে সংযুক্ত হওয়া।

কিন্তু তারা কমিউনিস্ট পার্টির কর্তৃত্ব এবং রাষ্ট্রের সর্বত্র গভীর হস্তক্ষেপ—এই দুই মূল রাজনৈতিক কাঠামোকে হাতছাড়া করেনি। আর এই পথে তারা দারুণ সফল হয়েছে।

কিন্তু ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের এখন এমন একটা চেহারা নিচ্ছে, যা দেখে মনে হচ্ছে, তারা চীনের রাজনৈতিক মডেলকে অনুসরণ করছে। কিন্তু এটা তো যুক্তরাষ্ট্রের পরিচয়ের সঙ্গে যায় না।

মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন বা মাগা আন্দোলন ও এর নেতারা চীনের কমিউনিস্ট পার্টিকে প্রকাশ্যে শত্রু বলে দোষারোপ করেন।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তাঁদের কিছু কাজ সেই পার্টির মতোই আচরণ করে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে চীনা শাসনের সঙ্গেও তাঁদের শাসনের মিল পাওয়া যায়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও মাগা আন্দোলন—এই দুই পক্ষই কট্টর জাতীয়তাবাদী আগ্রাসী দেশপ্রেমে বিশ্বাসী।

দুই পক্ষই কারখানা ও উৎপাদন খাতে মনোযোগী; দুই পক্ষই অভিবাসনবিরোধী এবং উভয় শিবিরই এমন একটি দেশ চায়, যেখানে জাতিগত সংখ্যালঘুরা সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুগত হবে।

উভয় শিবিরই চায়, সবকিছুর ওপরে থাকবে একটি দমনকারী ক্ষমতাধর শাসক দল, যার নেতৃত্বে থাকবেন এমন এক স্বৈরাচারী নেতা, যিনি নিজেকে বড় করে দেখাতে সামরিক কুচকাওয়াজে অংশ নিতে পছন্দ করেন।

চীন তাদের অর্থনীতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। এতে বাণিজ্য অংশীদারদের বিভিন্ন বিরোধ বা সামান্য অপমানের জন্য শাস্তি দেওয়া যায়। ট্রাম্প প্রশাসনও এখন একই কাজ করে। তারা মার্কিন মিত্রদের ওপর এলোমেলো শুল্ক বসিয়ে বা নানা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিতে ভালোবাসে।

ভূরাজনৈতিকভাবে চীন মূলত সুবিধাজনক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। যেমন রাশিয়ার সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে তারা বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা কোনো আনুষ্ঠানিক জোট বা স্থায়ী মিত্রতার চেয়ে তাৎক্ষণিক লাভকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

চীন প্রতিবেশী দেশগুলোকে ভয় দেখায়, নানা সীমান্ত ও ভূখণ্ডসংক্রান্ত বিরোধ উসকে দেয়। তাদের মানসিকতা একবার স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন চীনের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়াং জিয়েচি। তিনি ২০১০ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কূটনীতিকদের সাফ বলেছিলেন:
‘চীন একটি বড় দেশ, আর অন্যান্য দেশ ছোট দেশ—এটাই বাস্তবতা।’

ট্রাম্পও এই মানসিকতার ধারক। তিনি জোট বা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে খুব একটা গুরুত্ব দেন না। তিনি বরং নিজের মিত্রদেরই ভয় দেখান, যেমন: তিনি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য বানানোর হুমকি দিয়েছেন, তিনি গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছেন, তিনি এমনকি মেক্সিকো উপসাগরের নাম বদলানোর চেষ্টা করেছেন।

একসময় চীন যুক্তরাষ্ট্রের মডেল অনুসরণ করে শিল্প খাত গড়ে তোলে এবং পশ্চিমা বিশ্বকে ধরতে চেয়েছিল। আজ বরং যুক্তরাষ্ট্রই পিছিয়ে পড়ার ভয় করছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশন চাকরি কেড়ে নেবে কি না; আমাদের কাজ, জীবনযাপন এবং সমাজে একে অপরের সঙ্গে মেলামেশার ধরন বদলে দেবে কি না—এসব নিয়ে দুই দেশের মানুষই এখন একরকম দুশ্চিন্তায় ভুগছে।

এই অভিন্ন সমস্যাগুলোর ফলে দুই দেশেই একধরনের জনভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ভাষ্য জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। চীনে প্রেসিডেন্ট সি চালু করেছেন ‘চাইনিজ ড্রিম’।

এটিকে এমন একটি দেশপ্রেমভিত্তিক স্বপ্ন হিসেবে দেখানো হচ্ছে, যেখানে চীন প্রাচীনকালের ঐশ্বর্য ও শক্তি ফিরে পাবে। আর ট্রাম্প যেন তাঁর ছোট ভাইয়ের মতো একই সুরে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগান দিয়ে টানা দুবার নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন।

কিন্তু বাস্তবতা দেখে যা মনে হচ্ছে, ট্রাম্প–যুগ শেষ হওয়ার পর যখন ধোঁয়া কেটে যাবে, তখন আমরা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে ‘গ্রেট এগেইন’ নয়, বরং ‘আরও দুর্বল’ শক্তি হিসেবে দেখতে পাব। আর তখন হয়তো আমাদের বুঝতে হবে—‘ছাত্রটাই মাস্টার হয়ে গেছে’।

- নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া
- ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ
* জ্যাকব ড্রেয়ার, সাংহাইয়ে বসবাসরত একজন মার্কিন সম্পাদক ও লেখক

চীনে প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং চালু করেছেন ‘চাইনিজ ড্রিম’। এটিকে এমন একটি দেশপ্রেমভিত্তিক স্বপ্ন হিসেবে দেখানো হচ্ছে, যেখানে চীন প্রাচীনকালের ঐশ্বর্য ও শক্তি ফিরে পাবে। আর ট্রাম্প যেন তাঁর ছোট ভাইয়ের মতো একই সুরে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগান দিয়ে টানা দুবার নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন।
চীনে প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং চালু করেছেন ‘চাইনিজ ড্রিম’। এটিকে এমন একটি দেশপ্রেমভিত্তিক স্বপ্ন হিসেবে দেখানো হচ্ছে, যেখানে চীন প্রাচীনকালের ঐশ্বর্য ও শক্তি ফিরে পাবে। আর ট্রাম্প যেন তাঁর ছোট ভাইয়ের মতো একই সুরে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগান দিয়ে টানা দুবার নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। ছবি: রয়টার্স

কঠোর জবাব মামদানির: শ্রমজীবিদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন ট্রাম্প

নিউ ইয়র্কে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মেয়র প্রার্থী জাহরান মামদানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ট্রাম্প সম্প্রতি তাকে গ্রেফতার ও দেশ থেকে বহিষ্কারের হুমকি দেন। এর জবাবে মামদানি বলেন, প্রেসিডেন্ট আমেরিকান জনগণকে বিভক্ত করার আগুনে ঘি ঢালছেন। ৩৩ বছর বয়সী এই ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট বলেন, ট্রাম্প আমাকে টার্গেট করছেন। কারণ তিনি জনগণের দৃষ্টি সরাতে চান। একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি কীভাবে শ্রমজীবী মানুষদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন, সেটা আড়াল করতে চান। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে মামদানিকে বলতে শোনা গেছে, আমি থামব না, আমি লড়াই চালিয়েই যাব। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। নিউ ইয়র্ক সিটির হোটেল ও গেমিং ট্রেডস কাউন্সিল সদরদপ্তরে এক সমাবেশে মামদানি বলেন, ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আমাকে গ্রেফতার করা উচিত, দেশ থেকে বের করে দেওয়া উচিত, এমনকি আমার নাগরিকত্ব বাতিল করা উচিত। তিনি এসব বলছেন একজনকে ঘিরে- যিনি এই শহরের ইতিহাসে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পরে প্রথম একজন অভিবাসী, প্রথম মুসলিম এবং প্রথম দক্ষিণ এশীয় হিসেবে মেয়র হতে চলেছেন। তিনি আরও বলেন, এটা কেবল আমার পরিচয় বা আমার চেহারা বা উচ্চারণের কারণে নয়- তিনি চাইছেন আমি যেসব বিষয়ের পক্ষে লড়াই করি, সেসব থেকে মনোযোগ সরাতে। আমি শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে লড়াই করি।

নিউ ইয়র্কের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমোকে হারিয়ে মামদানি চমক তৈরি করেন। এরপর থেকেই রিপাবলিকানদের আক্রমণের মুখে পড়েন তিনি। ট্রাম্প তাকে ‘কমিউনিস্ট’ ও ‘পাগল’ আখ্যা দেন এবং তার চেহারা নিয়েও কটাক্ষ করেন। জবাবে মামদানি বলেন, শ্রমজীবী মানুষের বিশ্বাসঘাতকতা ঢাকতেই তিনি এসব বলছেন- শুধু এই শহরে নয়, গোটা দেশেই। ট্রাম্প চান না আমরা তার বিতর্কিত বিল নিয়ে কথা বলি। ওই বিলের ফলে লাখো আমেরিকান স্বাস্থ্যসেবা হারাবে। ট্রাম্পের প্রস্তাবিত আইন ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’ প্রসঙ্গে মামদানি বলেন, এই বিল দরিদ্রদের মুখ থেকে খাবার কেড়ে নেবে। তার প্রথম প্রশাসনের মতোই ধনীদের পক্ষে একটি বিশাল সম্পদ জমানোর আয়োজন এটি। আবারও একই কাজ করছেন তিনি।

উল্লেখ্য, ট্রাম্প সম্প্রতি তার ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, এই কমিউনিস্ট পাগল নিউ ইয়র্ক ধ্বংস করতে চায়। কিন্তু আমি তা হতে দেব না। প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার হাতে সব কার্ড আছে। আমি নিউ ইয়র্ক সিটিকে আবার ‘হট’ ও ‘গ্রেট’ করে তুলব! এদিকে রিপাবলিকান নেতারা ট্রাম্পের এই ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’ নিয়ে বুধবার কংগ্রেসে ভোটাভুটির আগে নানা বিভ্রান্তিতে পড়ে যান। বিদ্রোহী সদস্যদের সমর্থন পেতে দীর্ঘ সময় দেরি হয়। প্রস্তাবিত বিলটি দেশের ঋণ অনেক বাড়িয়ে দেবে এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর ঐতিহাসিক আঘাত হানবে বলে মত দিয়েছেন সমালোচকরা। জাহরান মামদানি এই মুহূর্তে শুধু একজন প্রার্থী নন- তিনি হয়ে উঠেছেন এমন এক মুখ, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী, মুসলিম, দক্ষিণ এশীয় ও শ্রমজীবী জনগণের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আশার প্রতিনিধিত্ব করছেন।

mzamin

আমলাতন্ত্রের পরিবর্তন হয় না কেন by নুরুল হুদা সাকিব ও সাহাবুদ্দীন আহমেদ

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সুশাসন নিশ্চিতের লক্ষ্যে বিভিন্ন সরকার বিভিন্ন সময় নানা সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছিল, কিন্তু কোনোটি পর্যাপ্ত পরিমাণে সফল হতে পারেনি। সংস্কার প্রণয়নের সময় দৃশ্যপটের বাইরের অনেক উপাদানকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। ফলে সংস্কার উদ্যোগগুলো বাংলাদেশে ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের কর্তৃত্ববাদবিরোধী অঙ্গীকার আশা দেখালেও বাস্তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ হচ্ছে ‘সরকারি চাকরি অধ্যাদেশ (সংশোধিত), ২০২৫’ নিয়ে সচিবালয় অবরোধ কর্মসূচি। বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। অনুসরণের পরিবর্তে পৃথিবীর বিভিন্ন সফল প্রতিষ্ঠান এবং সংস্কারের প্রতি অনুকরণপ্রিয়তা আমাদের উদ্যোগগুলোকে আইসোমরফিক মিমিক্রিতে পরিণত করেছে। অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে দেখতে চমকপ্রদ হলেও এসবের কার্যকারিতা ঠিক বিপরীত। অনেক সময় বিভিন্ন দাতা প্রতিষ্ঠান, যেমন বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ প্রভৃতির চাপেও আমরা এ ধরনের সংস্কার গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে সিভিক কালচারের অনুপস্থিতি প্রকট। প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়নি এবং আমলাতন্ত্রের নিরপেক্ষতাও প্রশ্নবিদ্ধ। ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশে আমলাতন্ত্র ঔপনিবেশিক শাসন সুসংহত করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে এ কাঠামোর পরিবর্তন হয়নি। ১৯৯১ সালের পরও সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনীতিকীকরণ দেখা গেছে। বাংলাদেশের চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীগুলোতে (আইনজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, সরকারি কর্মচারী, এনজিও প্রভৃতি) রাজনৈতিক বিভাজন খুবই প্রকট এবং শক্তিশালী। বিগত সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল এবং বৈধতা অর্জনের জন্য সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের ব্যবহার করেছে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের আখের গোছানোর চেষ্টা করেছে। এ অবস্থায় শুধু আইন দিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। যেকোনো পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে এ আইনের অপব্যবহার হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা থাকে।

সরকারি চাকরিতে পদন্নোতি, বদলিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের পরিবর্তে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক ও রাজনৈতিক পরিচয় বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। দেখা গেছে, যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পুরস্কার পেয়েছেন, পরবর্তী সময়ে তাঁরা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আবার অনেকে শুদ্ধাচার পুরস্কার পেয়েছেন। কেননা তাঁরা পদোন্নতিবঞ্চিত। অর্থাৎ কাজের দক্ষতা ও সততা পেশাগত অগ্রগতির জন্য পর্যাপ্ত নয়। এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করার আশঙ্কা রয়েই যায়। অধ্যাদেশে আপিল করার সুযোগ থাকলেও বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে অনাস্থা সৃষ্টি করেছে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি অনেকটা কমলেও সময়ের পরিক্রমায় দিন দিন তা বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকার দুর্নীতির বিভিন্ন নেটওয়ার্ক ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এসব সংস্কারের প্রতি পূর্ণ আস্থা অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বিভিন্ন পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, সচিবদের একটি বড় অংশ এবং উপদেষ্টাদেরও কিছু অংশ অধ্যাদেশটি জারির বিপক্ষে ছিলেন, কিন্তু কয়েকজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার চাপে এটি জারি করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। এখানে উদ্দেশ্য মহান থাকলেও কৌশলগত ভুল রয়েছে। পর্যাপ্ত আলোচনা, বিতর্ক ও পরিস্থিতি বুঝে পরিমার্জন না করেই এটি জারি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। এখানে প্রকৃতপক্ষে অন্তর্ভুক্তিমূলক সুশাসনচর্চা অনুপস্থিত ছিল। ফলে এ অধ্যাদেশ যারা জারি করবে (যাদের আমরা এজেন্ট বলি), তারা এটি অনিচ্ছা সত্ত্বে আনুষ্ঠানিকতার খাতিরে মেনে নিয়েছে এবং বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করেছে। ফলে প্রিন্সিপাল বা নীতি প্রণয়নকারীদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এজেন্টের নিষ্ক্রিয়তা লক্ষণীয়। এই ধারাবাহিকতায় অধ্যাদেশটির বিরোধিতা করে প্রথমে সচিবালয়ে আমরা অবাধ্যতা দেখতে পাই। সচিবালয়ের বিভিন্ন কক্ষে তালা মেরে দেওয়া হয় এবং প্রায় সব সেবা প্রদান বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি মেনে না নেওয়া হলে এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়।

বিভিন্ন গোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল এই আন্দোলন ম্যানিপুলেট করতে শুরু করে। সরকারের এ সিদ্ধান্তকে এক দল সমালোচনা এবং এক দল সমর্থন দিয়ে নিজ নিজ প্রচার শুরু করে এবং রাজনৈতিক চর্চায় বহাল থাকে। এসব গোষ্ঠী এটিকে একটি রাজনৈতিক প্রচারণা হিসেবে বিবেচনা করেছে এবং এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা আগামীর নির্বাচনে একটি বৃহৎসংখ্যক ভোট পাবে বলে আশা রাখে। এরই ফলে একটি আপসের ইঙ্গিত লক্ষ করা যায়। সংস্কার প্রস্তাবে বিসিএসে বিভিন্ন ক্যাডারের মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে এবং প্রশাসনিক ক্যাডারদের অতিমাত্রায় প্রাধান্য দেওয়ার মতো সমস্যাগুলো দূর করা হয়নি। উপরন্তু প্রশাসনিক ক্যাডারদের সচিব হওয়ার ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ কোটা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ সরকারের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে দলীয় পরিচয়ভিত্তিক প্রমোশনের হিড়িক পড়েছিল, অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের কাজে ফিরিয়ে আনার মতো প্রবণতা লক্ষ করা গিয়েছে। ফলে আমলাতন্ত্র যে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হবে, এ বিশ্বাস জনমনে নেই বললেই চলে।

রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির অভাবেই সংস্কার প্রস্তাবে এ ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। ব্রিংকারহফ নামের এক গবেষক রাজনৈতিক ইচ্ছার (স্থানীয় উদ্ভাবন, বিশ্লেষণাত্মক কঠোরতা, স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্তকরণ, বিশ্বাসযোগ্য শাস্তি, ধারাবাহিকতা) যেসব বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন, তা এখানে অনুপস্থিত ছিল। এখানে সমস্যা সমাধানের স্থানীয় উদ্ভাবন নেই। পশ্চিমা কায়দায় আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ফলাফল পাওয়া যাবে বলে ধারণা পোষণ করা হয়েছে। অর্থাৎ একটি শক্তিশালী আইন থাকলে সবাই এটি মেনে চলবেন এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তি তাঁর ব্যক্তিস্বার্থ এড়িয়ে চলবেন। প্রকারান্তরে এখানে মাধ্যমকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সমাজে বিদ্যমান অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে ভালো ফল প্রত্যাশা করা যেতে পারত।

অংশীজনদের সম্পৃক্তকরণ রাজনৈতিক সদিচ্ছার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ওপরের স্তর থেকে নিচের স্তরে এগোনোর প্রক্রিয়া পরিহার করে, নিচ থেকে ওপরের স্তরে এগোনোর প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে সংস্কারের প্রতি অবাধ্যতা মোকাবিলা করা যেত। এ ছাড়া পদমর্যাদায় বড় কর্মকর্তাদের দুর্নীতির দায়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করলে স্বাভাবিকভাবেই অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দুর্নীতিবিমুখতা বাড়ত। অবশ্যই এসব কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে এবং ক্ষমতায় যে–ই আসুক না কেন, একটি কমিটমেন্ট নিশ্চিত করতে পারলে প্রতিটি সংস্কার সফল হবে। এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বিভিন্ন সংস্কার হাতে নিয়েছে।

তথাপি এ সরকারের স্বল্প মেয়াদ ও অরাজনৈতিক অবস্থান এসব বাস্তবায়নের জন্য একটি বৈধতার সংকট সৃষ্টি করেছে। এ সংস্কারগুলোকে যদি একটি সামাজিক চুক্তি হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে তা বাস্তবায়নের জন্য একটি নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক সরকার লাগবে। যদিও বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সুপারিশগুলো পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার সামান্যতম বাস্তবায়িত করেছিল। তবে ২০২৪ সালের ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকার। আগামী বাংলাদেশের রাজনীতি জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে বলে ধারণা করা যায়। ক্ষমতায় যে রাজনৈতিক দলই থাকুক না কেন, তারা সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপ অনুভব করবে বলে আশা রাখা যায়।

ড. নুরুল হুদা সাকিব, অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও
সাহাবুদ্দীন আহমেদ, প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
- মতামত লেখকদের নিজস্ব

চীনকে বাগে আনতে ট্রাম্পকে যে পথে হাঁটতে হবে by ই ফুসিয়ান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক আরোপের যে নীতি গ্রহণ করেছেন, তা অনেক সমালোচনার মুখে পড়েছে এবং সেই সমালোচনার পেছনে যুক্তিও আছে। কিন্তু ট্রাম্প যেটি বলছেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কলকারখানাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এটি একেবারে ভুল কিছু নয়।

সমস্যা হলো ট্রাম্পের ‘চিকিৎসা পদ্ধতি’। তিনি যেন অস্ত্রোপচার করতে চাচ্ছেন করাত দিয়ে, যা কিনা রোগীকেই মেরে ফেলতে পারে। অথচ দরকার ছিল আরও সূক্ষ্ম স্ক্যালপেল (অপারেশনের জন্য ব্যবহার্য ধারালো ছুরি)। সরলভাবে বললে, ট্রাম্প সমস্যার ধরন বুঝলেও তাঁর সমাধানের পথটা খুব রুক্ষ আর বিপজ্জনকভাবে বেছে নিয়েছেন।

বর্তমানে যেটা আমরা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যের নিয়মকানুন দেখি (যেমন বিভিন্ন দেশের মধ্যে পণ্যের লেনদেন ও ডলারের গুরুত্ব), তার সবকিছু তৈরি হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের ব্রেটন উডস নামের একটি জায়গায় অনুষ্ঠিত এক বড় সম্মেলনে। তখন ইউরোপ ছিল যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ আর যুক্তরাষ্ট্র ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি। ১৯৪৮ সালে ওই সম্মেলনের চার বছর পর দুনিয়ার অর্ধেকের বেশি পণ্য একা যুক্তরাষ্ট্রই তৈরি করত।

তবে সেই সময় যে ‘নির্ধারিত বিনিময় হার’ (ফিক্সড এক্সচেঞ্জ রেট) চালু করা হয়েছিল, মানে একেক দেশের মুদ্রার মান একভাবে বেঁধে দেওয়া হতো, তবে সেটি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো হয়নি। এর ফলে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশিল্প দুর্বল হতে শুরু করে। ১৯৫৩ সালে বিশ্বে উৎপাদিত সব পণ্যের ৫৫ শতাংশ যেটি একা যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করত, সেটি ১৯৭০ সালে ২৪ শতাংশে নেমে আসে।

এই অবস্থায় প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ১৯৭১ সালে বড় একটি সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মার্কিন ডলারকে সোনার মানের সঙ্গে যুক্ত থাকার নিয়ম থেকে আলাদা করে দেন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন খাতের অবস্থা কিছুটা স্থির হয়। পরবর্তী ৩০ বছর ধরে অবস্থা মোটামুটি একই রকম থাকে।

সরল করে বললে, যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় কারখানা ছিল দুনিয়ার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু ভুল নিয়মে তাদের উৎপাদন দুর্বল হয়। পরে কিছু বড় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তারা আবার নিজেদের অবস্থান কিছুটা ঠিক করে নেয়।

ডলারকে সোনার মান থেকে বিচ্ছিন্ন করার এক বড় প্রভাব হলো যুক্তরাষ্ট্র আগে যে আয় করত (অর্থাৎ রপ্তানি করে যা পেত), তার চেয়ে বেশি খরচ করা শুরু করে (অর্থাৎ আমদানি বেশি করে)। ফলে ধীরে ধীরে তারা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ঘাটতির দেশ হয়ে ওঠে। আর এই সুযোগে জাপান তাদের উৎপাদন খাত অনেক বড় করে তোলে।

এরপর ১৯৮৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর (জাপান, পশ্চিম জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য) সঙ্গে এক চুক্তি করে, যার মাধ্যমে ডলারের মূল্য কমিয়ে দেয়। এতে কিছুদিনের জন্য আমদানি কমে যায় এবং বাণিজ্যঘাটতি কিছুটা কমে। কিন্তু ১৯৯৪ সালে নাফটা নামে একটা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি চালু হয়, আর ২০০১ সালে চীন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যোগ দেয়। তখন ব্যাপক হারে সস্তা চীনা পণ্য মার্কিন বাজারে ঢুকতে থাকে।

২০০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দুটি বিষয় ঘটে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ও আমদানির অনুপাত ৬৫ শতাংশ থেকে কমে ৪৫ শতাংশে চলে আসে। মানে আমদানি বাড়ে, রপ্তানি কমে। দ্বিতীয় ঘটনাটি হলো, তাদের উৎপাদনের পরিমাণ, যা একসময় দুনিয়ার ২৫ শতাংশ ছিল, তা নেমে ১৬ শতাংশে নেমে যায়।

এই তথ্যগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প খাত ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে আর এর পেছনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি অনেকটা দায়ী। ট্রাম্প এই দুর্বলতার দিকটা ঠিকই ধরেছেন। তবে তিনি যে কৌশল নিচ্ছেন, যেমন সবার ওপর একসঙ্গে শুল্ক বসিয়ে দেওয়া, সেটি সমস্যা কমানোর বদলে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো চীন নিজেও তাদের অতিরিক্ত পণ্য উৎপাদন বা ওভারক্যাপাসিটি সমস্যার কারণে বেশ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। মানে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, চীনও সমস্যায় আছে।

শিশুরা অনেক কিছু ব্যবহার করে, যেমন খেলনা, জামা–কাপড়, খাবার, শিক্ষা, ইত্যাদি। তাই কোনো পরিবারে যত বেশি শিশু থাকে, তত বেশি খরচ হয়। কিন্তু চীনে অনেক দিন ধরে এক সন্তান নীতি চলায় এখন তাদের শিশুদের সংখ্যা অনেক কম। এর ফলে একদিকে যেমন পরিবার ছোট হয়েছে, অন্যদিকে তাদের খরচও কমে গেছে। এই কারণেই চীনে মানুষের আয় কম এবং তারা বাজারে খুব বেশি জিনিসপত্র কেনে না।

চীনের পরিবারগুলো যত কম খরচ করে, ততই চীনের ভেতরে (দেশের মধ্যে) জিনিসপত্র বিক্রি কম হয়। তাই তারা বাধ্য হয়ে অনেক পরিমাণে পণ্য তৈরি করে অন্য দেশে রপ্তানি করে। ২০২৩ সালে চীন প্রায় ১ দশমিক ৮৬ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা তাদের পুরো জিডিপির ১০ দশমিক ৫ শতাংশ।

এই জায়গাতেই যুক্তরাষ্ট্র একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ, মার্কিনরা অনেক জিনিস কেনেন ও ব্যবহার করেন। আবার ডলার হলো বিশ্বের প্রধান মুদ্রা, তাই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাজারে অনেক পণ্য কিনতে পারে এবং সব দেশই যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য বিক্রি করতে চায়। চীনের অতিরিক্ত পণ্যের জন্য তাই যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে বড় ক্রেতা। এই দুই দেশের এমন সম্পর্ককে ইতিহাসবিদেরা বলছেন ‘চিমেরিকা’ (চীন আর আমেরিকা মিলিয়ে এই নাম)।

এই সম্পর্ক শুরুতে দুই দেশের জন্যই উপকারী মনে হলেও পরে সমস্যা তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের শিল্প ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায়, কারণ, সস্তা চীনা পণ্য মার্কিন বাজারে ঢুকতে থাকে। আর চীনের ভেতরে নিজের মানুষের চাহিদা এত কম যে তারা সব সময় বাইরে পণ্য বিক্রি না করলে চলতে পারে না।

চীন এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছে। সেখানে এখন এক সন্তান নীতির পরিবর্তে এখন দুই সন্তান বা তিন সন্তান নিতে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ পরিবার এত কম আয় করে যে তারা আর বেশি সন্তান নিতে চায় না।

চীন সরকার এখন ভাবছে, তাদের কাছে তো অনেক ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করা তরুণ আছেন, তাই তাঁদের দিয়ে অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই তরুণেরা চাকরি খোঁজেন যেসব জায়গায়, সেখানে খুব কম চাকরি আছে। তাই দেশে বেকারত্ব বাড়ছে, নতুন বিয়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, যার মানে হচ্ছে জন্মহারও কমছে।

এসব সমস্যা সমাধানে যদি যুক্তরাষ্ট্র (বিশেষ করে ট্রাম্প) সব দেশের ওপর বড় বড় শুল্ক বসিয়ে দেয়, তাহলে শুধু চীন নয়, পুরো বিশ্ববাণিজ্যই বড় বিপদে পড়বে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের যে বিশাল বাণিজ্যঘাটতি, তার সঙ্গে চীনের অতিরিক্ত রপ্তানি ভারসাম্য তৈরি করে।

ট্রাম্প যদি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে চান, তাহলে সেটা চীন থেকেই করতে হবে। অর্থাৎ চীনের জন্মহার বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানোর ভেতরেই মূল সমস্যা নিহিত। কিন্তু এই কাজ শুল্ক বসিয়ে (ট্যারিফ দিয়ে) করা সম্ভব নয়। এটা করতে হলে চীনকে তার ভেতরের সমাজ ও অর্থনীতি নিয়ে বড় পরিকল্পনা করতে হবে।

* ই ফুসিয়ান, উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী। তিনি চীনের এক সন্তান নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

এক সন্তান নীতি থেকে সরে এসেছে চীন
এক সন্তান নীতি থেকে সরে এসেছে চীন। রয়টার্স