Wednesday, April 8, 2015

‘আমরা রাজনীতির শিকার’ by মানসুরা হোসাইন

ট্রাকের শ্রমিক ফারুক কটনবার্ড দিয়ে নিজের হাত পরিষ্কার করছেন।
পাশে তাঁর স্ত্রী বসে আছেন। ছবি সাবিনা ইয়াসমিন
খালেদা জিয়া তো জামিনে ছাড়া পাইছে, বাসায় চইল্যা গেছে, আর আমরা অন্ধকারে। হাসিনা ক্ষমতা টিকাইয়্যা রাখার জন্য তাঁর জায়গাতেই আছে। খালি আমরা সাধারণ মানুষ পুইড়া মরতাছি। সাধারণ মানুষের দেশে থাকার কি অধিকার নাই? সাধারণ মানুষের স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থাকব? একমাত্র ছেলেরে মানুষ করার স্বপ্ন দেখছিলাম। এখন নিজে আবার উইঠা দাঁড়াতে পারমু কি না, তারই ঠিক নাই।’
আজ বুধবার দুপুরে খেদ ঝেড়ে এসব কথা বলেন ট্রাকমালিক ইকবাল হোসেন। গত ৫ মার্চ গভীর রাতে ট্রাকে লাকড়ি নিয়ে ভালুকা থেকে মানিকগঞ্জে যাচ্ছিলেন ইকবাল হোসেন। রাত সাড়ে তিনটার দিকে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হন তিনি। দুদিন আগে ইকবালের অস্ত্রোপচার হয়েছে। পা থেকে মাংস নিয়ে হাতে লাগানো হয়েছে। আজ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের পঞ্চম তলায় ইকবাল হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। কথা হয় হরতাল-অবরোধে দগ্ধ আরও কয়েকজনের সঙ্গে। ইকবাল হোসেনের মতো অন্যদের কণ্ঠেও ক্ষোভ আর হতাশা। তাঁরা নিজেদের এ পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না।
ইকবালের এক ছেলে। বয়স মাত্র নয় বছর। পড়াশোনায় ভালো। তাই ছেলেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন। কিন্তু সে গুড়ে এখন বালি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা তো কিছুই পাইলাম না। ট্রাকটার বয়স মাত্র আট মাস। ৪১ লাখ টাকা দিয়ে কিনছিলাম। ৬০ কিস্তির মধ্যে মাত্র আট কিস্তি দিছি। আর সেই ট্রাক চোখের সামনে ছাই হইয়া গেল!’
ইকবাল বলেন, ‘কানে এখন প্রচণ্ড ব্যথা। ইনজেকশন দিয়া ব্যথা কমাইতে হয়। ডান হাতের আঙুল সোজা করতে পারি না। এই হাত ঠিক না হইলে তো সবই শেষ।’
সুমন মিয়া (১৭) ইকবাল হোসেনের ট্রাকের সহকারী। সুমন ওই সময় ঘুমাচ্ছিল। তারও একই অবস্থা। সুমনের বাবা শওকত হোসেন গাছ থেকে পড়ে হাত-পা ভেঙে এখন অচল। কাজ করতে পারেন না। তিন মেয়ের মধ্যে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এক মেয়ে পড়াশোনা করছে। সুমনই ছিল পরিবারের একমাত্র রোজগেরে। ৫ মার্চ বার্ন ইউনিটে ভর্তির পর ৬০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছে সুমন।
ছেলের এ পরিণতিতে শওকত বলেন, ‘আমরা যদি রাজনীতি করার পাইতাম, তাইলে তো শাহেনশাহের মতন চলতে পারতাম। আমরা সাধারণ নিরীহ মানুষ। ছেলের এই অবস্থার লাইগ্যা রাগ কইরা আর কারে কী কমু? কইলেই কেডা শুনব? ’
মো. খোকন গুলিস্তানের চপ্পল ব্যবসায়ী। গত ২৩ জানুয়ারি পেট্রলবোমায় দগ্ধ হন তিনি। এক চোখে এখন দেখতে পান না। বাম হাত পেটের সঙ্গে লাগিয়ে দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। নাভি ও নাভির চারপাশে গর্ত হয়ে গেছে। সেখান থেকে দূষিত রক্ত ঝরছে। অস্ত্রোপচারের পর আজ ২১ দিন পর প্রথম বসতে চেষ্টা করেন। তবে তখনই রক্ত পড়া শুরু হয়। আবার শুতে চান খোকন। তীব্র ব্যথায় আর শুতে পারছিলেন না। খোকনের দুই আত্মীয় চেষ্টার পর ব্যর্থ হয়ে পাশের রোগীর এক স্বজনকে ডাকেন। তারপর তাঁকে শোয়ানো সম্ভব হয়।
খোকন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা পেয়েছেন।
ট্রাকের শ্রমিক আরব আলী গত ২২ মার্চ পেট্রলবোমায় দগ্ধ হন। তাঁর সঙ্গে ট্রাকে ছিলেন আরও নয়জন। এর মধ্যে আরব আলীর পরিবারেরই ছিলেন চারজন। ঘটনার পর পাঁচজন মারা গেছেন। আরব আলীর চাচা ও এক চাচাতো ভাইও মারা গেছেন।
আরব আলী বলেন, ‘হাত দিয়া কাজ করতাম। এখন হাতের যে অবস্থা হইছে, তা দিয়া আর কাজ করতে পারুম না। এখন সরকার যদি কিছু কইরা দেয়।’
চাঁদপুরে পেট্রলবোমায় দগ্ধ ট্রাকের সহকারী রুবেল হোসেন বিয়ে করেননি। বাবা ট্রাকচালক ছিলেন। অসুস্থতার জন্য এখন আর ট্রাক চালাতে পারেন না। রুবেল কাজ করে বোনের বিয়ে দিয়েছেন। এক ভাই ফারুককে ডিগ্রি পর্যন্ত পড়িয়েছেন। এখন রুবেলের হাত, মুখ, দুই পাসহ প্রায় পুরো শরীরই পুড়ে গেছে।
রুবেলের ভাই ফারুক বলেন, ‘আমরা রাজনীতির শিকার। রাজনীতির তো একটা নিয়ম আছে। সাধারণ মানুষ মাইরা তো রাজনীতি হইতে পারে না। যারা রাজনীতি করে, তারা তো ভালো আছে। আমরা তো ভালো নাই। আমাদের পাশে তো কেউ দাঁড়াইল না। আমার পড়াশোনা বন্ধ হইয়া গেছে। আমার ভাইয়ের ভবিষ্যৎ কে করে দেবে? জীবিকার জন্য বের হইতেই হয়। পথে বের হওয়া কি অপরাধ?’
রুবেলের মা ফরিদা বেগম ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, ‘আমার তিন ছেলেমেয়েই মূল সম্পদ। আমার যে সম্পদ সংসার চালাইত, সে এখন মরতে বসছে। আমার সংসার পানিতে পইড়া গেছে। চোখের সামনে ছেলের কষ্ট আর সহ্য হয় না।’
তিন ছেলেমেয়ের জনক ট্রাকের শ্রমিক ফারুক জানালেন, তাঁর তিন ছেলেমেয়েই পড়াশোনা করে। তবে এখন লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। ২৩ মার্চ ঘটনার পর থেকে ফারুক ও তাঁর স্ত্রী হাসপাতালে, ছেলেমেয়েরা বাড়িতে।
ফারুক বলেন, ‘আমি কোনো রাজনীতি করি না। যারা আমার এই অবস্থা করছে, তারা দেখতাছে আমার অবস্থা। এখন ভাত কিনা যে খামু, তারও অবস্থা নাই। এই পর্যন্ত অনুদান পাইছি ২০ হাজার টাকা। মেয়েরা বাড়ি থেইক্যা ফোন কইরা কান্দে। তারা কয়, আব্বা আমরা কী খামু?’
কথাগুলো বলতে বলতে ফারুকের চোখ দিয়ে পানি পড়ে। তাঁর স্ত্রী পরম মমতায় তা মুছে দেন।
বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন পার্থ শংকর পাল জানালেন, হরতাল-অবরোধে দগ্ধ হয়ে এ পর্যন্ত বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়েছে ১৮১ জন। এর মধ্যে মারা গেছে ২২ জন। এখন পর্যন্ত ভর্তি আছে ২১ জন। একবার চিকিৎ​সা নিয়ে বাড়ি ফেরার পর তিনজন আবার ভর্তি হয়েছেন।

সবাই খুশি হলে পুরস্কারের মূল্য বেড়ে যায় -সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আনিসুজ্জামান

স্বাধীনতা পদক ও পদ্মভূষণ প্রাপ্তিতে গতকাল বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের
পক্ষ থেকে ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়
আয়োজকেরা বলছিলেন খুবই সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান। মুষলধারে বৃষ্টি সেটাকে আরও সংক্ষিপ্ত করে ফেলবে বলে শঙ্কা হলো। তবে বৃষ্টির মাঝেই একে একে এলেন অতিথিরা। একজন কৃতবিদ্য মানুষকে সংবর্ধনা জানানো হবে। মানুষটি সম্প্রতি স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন। ভারত থেকে পেয়েছেন পদ্মভূষণ পদক। তিনি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে তাঁকেই সংবর্ধনা জানাল বেঙ্গল ফাউন্ডেশন।
আনুষ্ঠানিকতার শুরুতে আয়োজকদের পক্ষে লুভা নাহিদ চৌধুরী তাঁর সম্পর্কে একটি লিখিত শ্রদ্ধাঞ্জলি পাঠ করেন। মানুষটির অবদান তাতে অনেকটাই ফুটে ওঠে। তাতে বলা হয়, ‘জাতীয় যেকোনো সংকটে ও মানুষের মঙ্গল-আকাঙ্ক্ষায় সমাজজীবনে যে সংগ্রাম চলছে, তাতে নেতৃত্বের দায় বহন করেন তিনি। গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত সমাজের যে স্বপ্ন জাতি লালন করে, তা বাস্তবায়নের প্রয়াসে তিনি আমাদের উৎসাহিত করেন।’
আনিসুজ্জামান সম্পর্কে বলতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে পারিবারিক সম্পৃক্ততার নানা স্মৃতি তুলে ধরেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের।
আনিসুজ্জামান বলেন, ‘পুরস্কার পেতে সবার ভালো লাগে। আমিও ব্যতিক্রম নই। যখন দেখি, এতে চারপাশে সবাই খুশি হয়েছে, তখন পুরস্কারের মূল্য অনেক বেড়ে যায়। পুরস্কার পেলে নাকি দায়িত্ব বেড়ে যায়। জীবনের যে পর্যায়ে পৌঁছেছি, তাতে খুব বেশি দায়িত্ব পালনের আর সুযোগ নেই।’
অনুষ্ঠান উপলক্ষে তাঁকে একটি উপহার দিতে চেয়েছিলেন আয়োজকেরা। আনিসুজ্জামানের এই অর্জনের জন্য যাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি তাঁর স্ত্রী সিদ্দিকা জামান। শিল্পী রোকেয়া সুলতানার সাম্প্রতিক একটি চিত্রকর্ম উপহার হিসেবে তুলে দেওয়া হয় সিদ্দিকা জামানের হাতে। সে সময় মঞ্চে ছিলেন আবদুল খালেক মেমোরিয়াল স্কুলের চেয়ারপারসন মমতাজ খালেক।
উপস্থিত অতিথিদের গান শোনান শিল্পী ইফফাত আরা দেওয়ান, লাইসা আহমেদ, বুলবুল ইসলাম ও অদিতি মহসিন।

বাংলাদেশের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পদক্ষেপ নেয়ার এখনই সময়

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে অবশ্যই নিজেদের মতপার্থক্যগুলো দূরে সরাতে হবে। গতকাল গালফ নিউজের এক সম্পাদকীয়তে এ কথা বলা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়াকে দেশটির একটি দুর্নীতি-বিরোধী আদালত জামিন দিয়েছে। তাকে জামিন দেয়ার সিদ্ধান্ত তার ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যকার উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত করতে পারে। দেশের স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে নিজেদের শত্রুতা অবশ্যই দূরে রাখতে হবে দু’ নেত্রীকে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া। তার বিরুদ্ধে চ্যারিটেবল ফান্ড সংক্রান্ত দু’টি দুর্নীতি মামলা রয়েছে। সহিংসতা উস্কে দেয়া ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। খালেদার মামলা দুটোকে ‘রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ অভিযোগ বলেই প্রচার করে তার সমর্থকরা। অপরদিকে সরকার অবধারিতভাবেই বিশ্বাস করে অন্য কিছু। তবে এ নিয়ে সন্দেহ নেই যে, বাংলাদেশ রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার এক অতল গহ্বরে ঘুরপাক খাচ্ছে। দেশটির অর্থনীতির ধ্বংস অনুমান করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের জন্য এখনই পদক্ষেপ নেয়ার সময়। বিবদমান দুই নেত্রীকে নিজেদের মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে অর্থপূর্ণ সংলাপের জন্য আহ্বান জানানো উচিত।

বৃহস্পতিবার ১১টায় কামারুজ্জামানের সাথে আইনজীবীদের সাক্ষাৎ by হাবিবুর রহমান

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের রিভিউ রায়ে বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আজ বুধবার বেলা ৫টা ৫১ মিনিটে কারাগারে রায়ের কপি পৌঁছায়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলী রায়ের কপি গ্রহণ করেন। এরপর তিনি নিয়ম অনুযায়ী রিভিউ আবেদন খারিজের রায় কামারুজ্জামানকে পড়ে শোনান।
অন্যদিকে ডিফেন্স আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির জানান, আগামীকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় কামারুজ্জামানের সাথে আইনজীবীদের সাক্ষাতের অনুমতি দিয়েছেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারা কর্তৃপক্ষ। তিনি বলেন, নির্ধারিত সময় আমরা কামারুজ্জামানের সাথে সাক্ষাৎ করব। রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টি সাক্ষাতের পর বলতে পারব।
এর আগে আজ বেলা পৌনে ৩টায় প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিরা কামারুজ্জামানের রিভিউ রায়ের কপিতে স্বাক্ষর করেন। বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী রায় লিখেন এবং অন্য বিচারপতিরা এতে সম্মতি দেন। বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর রায়ের কপি আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠানো হয়। এরপর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শেষে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রর অফিস থেকে রায়ের কপি ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।
বিকেল ৪টা ৪৬ মিনিটে আপিল বিভাগের সাহকারী রেজিস্ট্রার মোঃ মেহেদী হাসান রায় ট্রাইব্যুনালে পৌঁছে দেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মোঃ আফতাবুজ্জামান রায়ের কপি গ্রহণ করেন। এরপর ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারপতিরা কামারুজ্জামানের রিভিউ রায় গ্রহণ করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। বেলা ৫টা ২৮ মিনিটে ট্রাইব্যুরনাল থেকে রায়ের কপি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া ফ্যাক্সযোগেও রায়ের কপি কারাগারে পাঠানো হয়। রায়ে কপি ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসে পাঠানো হয়। আজ বিকেলে কামারুজ্জামানের রিভিউ রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েব সাইটে প্রকাশ করা হয়।
গত রোববার মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত রায়ের বিরুদ্ধে কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদনের শুনানি গ্রহণ শেষে সোমবার খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ।
২০১৩ সালের ৯ মে কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুাল-২। ওই রায়ে বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করেন কামারুজ্জামান। গত বছরের ৩ নভেম্বর কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ। রায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখেন আদালত। এরপর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি কামারুজ্জামানের আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত করা হয়। গত ৫ মার্চ আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় কামারুজ্জামানের আইনজীবীরা মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন দায়ের করেন।

বিয়ে করবেন রোকেয়া প্রাচী

অভিনেত্রী ও আবৃত্তিকার রোকেয়া প্রাচী আবারো বিয়ে করবেন। দ্বিতীয় স্বামী আসিফ নজরুলের সাথে বিচ্ছেদের পর এখন দুই সন্তান নিয়ে আছেন প্রাচী। কিন্তু সম্প্রতি তার বড় মেয়ের অনেক অনুরোধের পর তিনি বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে তার স্বজনরা জানিয়েছেন। তবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তিনি আরো সময় নেবেন বলে ঘনিষ্ঠদের জানিয়েছেন। প্রাচী চান দুই কন্যার সঙ্গে নতুন স্বামীর বোঝাপড়াটা যাতে সুন্দর হয় বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পাত্র পছন্দ করবেন। এজন্য কিছুটা সময় নিয়ে আগামী বছরই হয়তো বিয়ে করবেন।
এর আগে সার্জেন্ট আহাদকে প্রাচী বিয়ে করেন। এ সংসারে তার এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু ঘাতকের হামলায় নিহত হন সার্জেন্ট আহাদ। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক ও টকশোর পরিচিত মুখ এবং কলামিস্ট অধ্যাপক আসিফ নজরুলকে বিয়ে করেন। কিন্তু আসিফ নজরুল জনপ্রিয় কথাশিল্পী মরহুম হুমায়ূন আহমেদের কন্যা শিলা আহমেদকে বিয়ে করেন। এর আগেই আসিফ-প্রাচী সংসার ভেঙ্গে যায়। তাদের ঘরেরও একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।

মহিলাদের পাশ্চাত্য পোশাক পরার প্রবণতা বাড়াচ্ছে ধর্ষণের ঘটনা: ভারতীয় মন্ত্রী

ভারতের মহিলারা যত বেশি পাশ্চাত্য সংস্কৃতি আঁকড়ে ধড়ছেন, দেশটিতে তত বাড়ছে ধর্ষণ! গোয়ার কারখানা মন্ত্রী দীপক ধাভালিকরের স্ত্রীর এই মন্তব্য ঘিরে আগেই তৈরি হয়েছিল বিতর্ক। এবার মন্ত্রী স্বয়ং স্ত্রীর মন্তব্যের স্বপক্ষে গলা চড়ালেন। ধর্ষণের কারণ হিসাবে সরাসরি মহিলাদের পোশাককে দায়ী করলেন তিনি। ''মহিলারা এখন যে ধরণের পোশাক পরেন, তা ধর্ষণের মত ঘটনার প্রবণতা বৃদ্ধি করে।'' মন্তব্য ধাভালিকারের। আজ তাঁর স্ত্রীর মন্তব্য সম্পর্কে গোয়ার কারখানা মন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া জানতে চায় সংবাদসংস্থা পিটিআই। স্ত্রী, লতার বক্তব্যকে সম্পূর্ণ সমর্থন করে ধাভালিকরের মন্তব্য ''যখন মহিলারা হিন্দু ধর্মের সংস্কৃতি মেনে চলতেন, তখন ধর্ষণের মত ঘটনা ঘটত না। এখন, লোকজনের আচার ব্যবহার বদলেছে। বদলেছে পোশাক-পরিচ্ছদও, আর তার সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ধর্ষণ।
লতা ধাভালিকর বিতর্কিত ডানপন্থী গেরুয়া সংগঠন Sanatan Sauns-এর নেত্রী। রবিবার মারেগাঁওতে একটি প্রকাশ্য সভায় গোয়ার সমস্ত অভিভাবককে তাঁদের সন্তানদের মিশনারি স্কুলে ভর্তি না করার আবেদন জানান তিনি। এই সভাতেই তিনি দাবি করেন পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবেই ভারতে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে।
মন্ত্রী নিজের স্ত্রীর মন্তব্যকে সমর্থন করে বলেছেন ''কনভেন্ট স্কুলগুলো আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে কতটুকু জানে? যান, কনভেন্ট স্কুলের পড়ুয়াদের সঙ্গে কথা বলে দেখুন। তারপর সিদ্ধান্ত নিন। আমাদের প্রকৃত সংস্কৃতি সম্পর্কে ওদের কোনও ধারণাই নেই।''
''হিন্দু প্রতিষ্ঠানগুলি মনে করে ভারতীয় সংস্কৃতি ও ধর্মের প্রসারণ প্রয়োজন। পাশ্চাত্য সংস্কৃতি আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিকে গিলে খাচ্ছে। আমি লতার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত।''
দিলীপ ধাভালিকরের বড় ভাই সুদিন ধাভালিকরও গোয়ার রাজ্য মন্ত্রী। গত বছর তিনি গোয়ার বিচগুলোতে বিকিনি নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। তাঁর এই দাবি ঘিরেও চরম বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
সূত্র : জি-নিউজ।

মানবিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে ইয়েমেন: নিহত ৫৬০, আহত ১,৭৬৮

ইয়েমেনে মানবাধিকার পরিস্থিতি ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত। এমন আশঙ্কার মধ্যেই প্রকাশিত নতুন এক পরিসংখ্যানে ৫৬০ জন নিহত হওয়ার তথ্য দেয়া হয়েছে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার বিষয়ক সংগঠন ইউনিসেফের পর গতকাল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ পরিসংখ্যানে জানিয়েছে, দেশটিতে গত ৩ সপ্তাহে ১,৭৬৮ বেশি মানুষ আহত ও লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। হতাহতদের অধিকাংশই বেসামরিক মানুষ। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। এর আগে ইউনিসেফের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছিল, নিহতদের মধ্যে ৭৪টি শিশু রয়েছে। আহত হয়েছে আরও ৪৪ শিশু। ইয়েমেনে হুদি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোট বাহিনীর বিমান হামলা শুরুর পর গত ১৩ দিনে মানবিক বিপর্যয় গুরুতর অবস্থায় পৌঁছেছে। এদিকে প্রথম মানবিক সহায়তার পদক্ষেপ হিসেবে রেড ক্রসের ত্রাণবাহী একটি কার্গো বিমান আজ ইয়েমেনে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির জেনেভাভিত্তিক এক মুখপাত্র সিতারা জাবিন বলেন, একটি কার্গো বিমান ১৭ টন চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে জর্ডানের রাজধানী আম্মানে অবস্থান করছে। বিমানটি আন্তর্জাতিক জোটের সবুজ সঙ্কেতের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমতি পেলে, আজই কার্গো বিমানটির ইয়েমেনের রাজধানী সানায় অবতরণের করবে। কিছুদিনের মধ্যেই আরও ৩৫ টন ত্রাণ সামগ্রী পাঠানো হবে ইয়েমেনে। প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও, অনুমতি সাপেক্ষেই তা পাঠানো হবে। সিতারা জাবিন বলেন, চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো ইয়েমেনে না পৌঁছালে, বহু মানুষ মৃত্যুবরণ করবে বলে শঙ্কায় আছি আমরা। বিশেষজ্ঞ সার্জনদের একটি দলও ইয়েমেনের অ্যাডেনে যাওয়ার জন্য রয়েছেন অনুমতির অপেক্ষায়। গত সোমবারও ভয়াবহ লড়াইয়ের ঘটনায় অ্যাডেন পরিণত হয়েছিল মৃত্যুপুরিতে। রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিল বহু লাশ।

সিরীয় বংশোদ্ভূত লন্ডনে সাবেক ইমাম গুলিতে নিহত

ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনের পশ্চিমাঞ্চলের ওয়েম্বলি এলাকা থেকে এক সিরীয় নাগরিকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ওয়েম্বলির এক সড়কে নিজ গাড়িতে বসা অবস্থায় তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। পুলিশের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহতের নাম আবদুল হাদি আরওয়ানি। গত মঙ্গলবার বুকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায় তাকে। ঘটনাস্থলেই বিশেষজ্ঞরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি পশ্চিম লন্ডনের একটি মসজিদে ইমামের দায়িত্ব পালন করতেন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা আইএনএস। সিরিয়ায় জন্মগ্রহণকারী আরওয়ানি পশ্চিম লন্ডনের অ্যাক্টন এলাকার আন-নূর মসজিদের সাবেক ইমাম ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। স্পষ্টবাদী স্বভাবের জন্য পরিচিত ছিলেন তিনি। আরওয়ানি সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরোধী ছিলেন এবং এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময় তিনি বক্তব্যও রেখেছেন। সম্প্রতি তিনি মৃত্যুর হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। ইসলামী শরীয়াহ মতে বিয়ে ও তালাক বিষয়ে দায়িত্বরত কর্তৃপক্ষের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হতো তাকে। অধিকাংশ সময় কাজী হিসেবে লন্ডনেই তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালন করতেন। হত্যার ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। এরই মধ্যে লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আর কোন তথ্য জানা যায়নি।

মাত্রাছাড়া ফেসবুকিংয়ের বিপত্তি

বেশি সময় ধরে ফেসবুক ব্যবহারে বিষণ্নতা বাড়ে
যত বেশি ফেসবুক ব্যবহার করবেন মানসিকভাবে তত বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেবে। দেখা দেবে বিরক্তি, এমনকি বিষণ্নতাও পেয়ে বসবে। কমে যাবে ভবিষ্যতের উন্নতির আশা। সাম্প্রতিক এক গবেষণার ফল এমনটিই বলছে।
বেশি সময় ধরে ফেসবুক ব্যবহার করলে কী ধরনের সমস্যা হয় তা নিয়ে একটি গবেষণা করেছেন মার্কিন গবেষকেরা। ফেসবুক ব্যবহারের সময়ের তুলনা করে গবেষকেরা দাবি করেছেন সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটটি বেশি সময় ধরে ব্যবহার করলে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর তার প্রভাব পড়ে। হাউসটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা জানিয়েছেন, বেশিক্ষণ ধরে ফেসবুক ব্যবহার করায় বিষণ্নতা বাড়ে।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, নতুন ও পুরোনো বন্ধুদের মধ্যে যোগাযোগের কার্যকর মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে ফেসবুক। কিন্তু অনেকেই ফেসবুক নিয়ে দীর্ঘ সময় কাটান। ফেসবুকে বন্ধুদের জীবনের ঘটনা নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করেন এবং নিজের জীবনের সঙ্গে মেলাতে থাকেন। এতে তাঁর মধ্যে বিষণ্নতা বাড়তে থাকে।
সোশ্যাল অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে গবেষণা সংক্রান্ত এই প্রবন্ধ।
গবেষণা প্রসঙ্গে হাউসটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও গবেষণা প্রবন্ধের লেখক মাই-লি স্টিয়ারস জানিয়েছেন, ‘ফেসবুকে মানুষ নিজেকে জাহির করার প্রবণতা দেখায়, এটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে মানুষ খারাপ ঘটনার চেয়ে ফেসবুকে তার ভালো ভালো ঘটনা বেশি শেয়ার করে। আমরা এটা যদি বুঝতে না পারি এবং অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করতে থাকি তবে ফেসবুকের বন্ধুদের ঠিকভাবে মাপা যাবে না।’
১৮ থেকে ৪২ বছর বয়সী প্রতিদিন ফেসবুক ব্যবহার করেন এমন ১৫৪ জন ব্যক্তিকে নিয়ে গবেষণা চালান স্টিয়ারস ও তাঁর গবেষক দল।
দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে, যাঁরা দীর্ঘসময় ধরে ফেসবুক ব্যবহার করেছেন তাঁদের মধ্যে বিষণ্নতার লক্ষণ দেখা যায়। এসব লক্ষণের মধ্যে রয়েছে উন্নত ভবিষ্যতের জন্য হতাশা, দুঃখ ভাব, পার্থিব জিনিস নিয়ে বিরক্তি।
এর আগেও সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ব্যবহার ও বিষণ্নতার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে। ২০১০ সালে কানাডার গবেষকেরা এ সংক্রান্ত একটি গবেষণা করেন যাতে রোমান্টিক সম্পর্কের মধ্যে ফেসবুক ঈর্ষা সৃষ্টি করে সে তথ্য পাওয়া যায়। ২০১৩ সালে জার্মান গবেষকেরা একটি গবেষণা করেন যাতে ফেসবুক ব্যবহারে মানুষের মধ্যে হিংসা বাড়ে বলে গবেষণায় উঠে এসেছিল।
অবশ্য, গবেষকেরা বিষণ্নতার জন্য সরাসরি ফেসবুককে দোষ দেননি। তাঁদের মধ্যে ফেসবুক ব্যবহারের সময় অন্যদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করা হলে তাতে সমস্যা বাড়ে।
এ ছাড়া ফেসবুক তৈরির বছর ছয়েক আগে ১৯৯৮ সালে কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের করা এক গবেষণায় অনলাইনের ব্যবহার মানুষের মধ্যে বিষণ্নতা বাড়াচ্ছে বলে উঠে এসেছিল। গবেষকেরা বলছেন, গত এক দশক ধরেই সামাজিক পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ কমে যাওয়া, সামাজিক পরিমণ্ডলে বন্ধুত্বের সংখ্যা কমে আসার মতো বিষয়গুলো ঘটছে। এ ছাড়া একাকিত্ব ও বিষণ্নতা বাড়াচ্ছে ইন্টারনেটের ব্যবহার।
গবেষক স্টিয়ারস বলেন, ‘ডিজিটাল জগতে শত শত বন্ধু থাকলেও কিংবা তৎক্ষণাৎ বার্তা আদান-প্রদানের সুযোগ থাকলেও মানুষ একাকী ও দুঃখবোধ করতে থাকে। সামান্য কিছু ছবি দেখে বন্ধুর জীবনের আসল চিত্র বোঝা সম্ভব হয় না।’
গবেষক স্টিয়ারস পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘আমি মানুষকে ফেসবুক নিয়ে নিজের মূল্যায়ন করতে বলব, আসলেই কী ফেসবুক যোগাযোগ বা মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকতে কাজে লাগছে না কি বিষণ্নতা বাড়িয়ে দিচ্ছে? যদি সত্যি ফেসবুক কাজ না করে তবে তা থেকে দূরে থাকাই ভালো।’

‘যেকোনো প্রকারে’ জিতলে হেরে যায় জনগণ by আলী ইমাম মজুমদার

ঢাকার দুটি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়েছে। এর প্রচার-প্রক্রিয়া আইনানুগভাবে নির্ধারিত সময়ের আগেই শুরু হয়ে গেছে। এমনকি তফসিল ঘোষণার আগেই বিলবোর্ডে ছেয়ে গিয়েছিল মহানগর দুটি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সময় নির্ধারণ করে এগুলো নামিয়ে ফেলার নির্দেশনা দিলেও অনেক ক্ষেত্রে তা পালিত হয়নি। এ নির্দেশ পালনে অবজ্ঞার জন্যও শাস্তি পেতে হয়নি কাউকে। এমনকি নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরও দায়িত্বশীল পদে আসীন কেউ কেউ নিয়ম ভেঙে প্রচারণা চালাচ্ছেন। একজন তো এমনও বলেছেন বলে সংবাদপত্রে উল্লেখ করা হয় যে ‘তিনটি সিটি করপোরেশনে অবশ্যই যেকোনো প্রকারে আমাদের জিততে হবে।’
এ সংবাদটি যথার্থ নয় বলে প্রতিবাদ হয়েছে, তবে অত্যন্ত দুর্বল ভাষায়। কিন্তু প্রতিবেদক তাঁর বক্তব্য যথার্থ বলে দাবি করেছেন। আর খবরটি একাধিক সংবাদপত্রেই এসেছে। এ ধরনের বক্তব্য একজন নয়, আরও কেউ কেউ দিয়েছেন। আর আচরণবিধি? সেটা অনেকটাই কাজির গরুর মতো। কেতাবেই তা আছে। আইনত নির্দলীয় নির্বাচন হলেও দলীয়ভাবে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। অনেক প্রার্থীর বিলবোর্ড, পোস্টার, ব্যানারে শোভা পাচ্ছে প্রার্থী ব্যতীত সেই দলের নেতাদের ছবি। এমনকি জাতির জনকের ছবিও। নির্বাচন কমিশন দেখেও না দেখার অবস্থানে আছে। রিটার্নিং কর্মকর্তারাও আছেন এ বিষয়ে অনেকটা গা-ছাড়া অবস্থায়। কমিশন বা তাদের প্রতিনিধিদের এরূপ নির্লিপ্ততার সুযোগ নেবে সবল পক্ষ। সবলতা হতে পারে সরকারি ক্ষমতা, অর্থ কিংবা ক্যাডারদের তাণ্ডব। আর এসব নির্বাচনের ফলাফলকে করবে প্রভাবিত। এমনকি নির্বাচনব্যবস্থাটির প্রতি জনগণের সাম্প্রতিক কালের ক্রমহ্রাসমান আস্থার মনোভাবকে আরও জোরদার করতে পারে।
উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রায় ১৩ বছর পর ঢাকায় সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চলমান আন্দোলন ও নৈরাজ্যের মুখে এ ঘোষণাটি সুড়ঙ্গের অন্য প্রান্তে অনেকটা আলোকরশ্মির মতো বলে দাবি করা চলে। কেননা, সরকারি দলের পাশাপাশি আন্দোলনকারী প্রধান দলটি এই নির্বাচনগুলোতে অংশ নিতে সক্রিয় হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, তাদের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে তাদের সত্যিকার অর্থে নির্বাচনমুখী করতে পারলে সব পক্ষেরই লাভ। বিশেষ করে দেশবাসীর। এই তিনটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, রাষ্ট্রক্ষমতায় কোনো পরিবর্তন আসবে না। তাই যেকোনো মূল্যে এগুলোতে বিজয়ী হতে সরকারদলীয় কারও কারও প্রত্যয় আত্মঘাতী হতে পারে। বরং দৃশ্যমান নিরপেক্ষতা ও বিরোধী দলের প্রচার-প্রচারণা চালাতে উপযুক্ত সুযোগ দিলে সরকারের মর্যাদা বাড়বে। গণতন্ত্রের ভিত হবে শক্তিশালী। অবশ্য আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী অন্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের আচরণবিধি ভঙ্গ না করার জন্য সতর্ক করে দিয়েছেন। তাঁর এ বক্তব্য প্রশংসনীয়। আমরা আশা করব, সবাই এটা মেনে চলবেন।
কিন্তু বারবার পোড় খাওয়া এ দেশের জনগণ ভালো কিছু হবে, এমনটি বিশ্বাস করতে শঙ্কিত। বিরোধী দলের গত তিন মাসে লাগাতার হরতাল-অবরোধ, এরই আড়ালে নাশকতা আর নাশকতা দমনের নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু, বিরোধী দলকে নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনে বাধা, সরকারি দলের রণহুংকার আর এই সুযোগে উগ্র মৌলবাদীদের উত্থানের প্রচেষ্টা—এ সবকিছুই জনগণকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। তবু তারা বারবার আশায় বুক বাঁধে। তেমনি ক্ষীণ আশা নিয়ে অপেক্ষায় আছে এই নির্বাচন তিনটির সফল পরিণতি দেখার।
যেকোনো প্রকারে নির্বাচনে জয়লাভের যে বাসনা, তা নতুন বা অভিনব নয়। আমরা তা দেখেছি বারবার। স্থানীয় ও জাতীয় উভয় নির্বাচনে। সম্ভবত এটা অনেকটা পাকিস্তান আমলের উত্তরাধিকার। ১৯৫৮ সালে তখনকার পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারির পর ‘গণভোট’ শব্দটির সঙ্গে আমরা পরিচিত হই। প্রেসিডেন্ট পদ দখলকারী ব্যক্তির প্রতি আস্থার বিপরীতে একটি কালো বাক্স ছিল। সেই কালো বাক্স গণভোটে জিততে পারে না। তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কখনো কোথাও জেতেনি। ১৯৬৫ সালে সেই প্রেসিডেন্ট একটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে আরেক মেয়াদের জন্য তাঁর শাসনক্ষমতা ‘নিশ্চিত’ করেন। এ ধরনের গণভোট আর নির্বাচনই ছিল যেকোনো প্রকারে জয়লাভের প্রচেষ্টা। এর সঙ্গে জনগণের তেমন কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না, বরং বৈরী ছিল তারা। তবে তিনি জয়ী হয়েছিলেন। সে ধরনের শাসনব্যবস্থায় নানাবিধ বৈষম্যে ক্ষুব্ধ বাঙালি তাদের জাতীয়তার সংজ্ঞা নতুনভাবে খুঁজে নিল। যাত্রা করল নতুন পথ ধরে। সেই পথেই প্রবল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায় মুক্তিযুদ্ধ। প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ। ভেঙে যায় পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি। আজও অবশিষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রধান সংকট শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা।
আমরা ১৯৭১ সালে স্বাধীন হলাম। স্বাধীনতার প্রধান চেতনা ছিল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেশ শাসিত হবে। বলাবাহুল্য, সেই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আসবেন জনগণের সমর্থনকে ভিত্তি করে; যেকোনো মূল্যে নয়। দুর্ভাগ্য আমাদের, আবার আমরা যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকার দুই-দুটি গণভোট দেখলাম। ১৯৮৮-র ভোটারবিহীন নির্বাচনও দেখলাম। তবে গণতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে নির্বাচিত দুটি সরকারের অধীনে ১৯৯৬-এর ফেব্রুয়ারি আর ২০১৪-এর জানুয়ারির নির্বাচনও দেখেছি। শেষোক্তটিতে তো অধিকাংশ প্রার্থীই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। আবার এ ধরনের নির্বাচনে আরেকটি ব্যর্থ চেষ্টা হয়েছিল ২০০৭-এর জানুয়ারিতে। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার মাসাধিককালের মধ্যেই ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। ২০১৪-এর নির্বাচন নিয়ে সংকট এখনো কাটেনি।
আলোচনা করা যেতে পারে, যেকোনো মূল্য বলতে প্রকৃত অর্থে কী বোঝায়। নির্বাচন একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রক্রিয়া। দলগত বা ব্যক্তিগত যেভাবেই হোক, নির্বাচনে জিততে জনসমর্থন লাভ করতে হবে। তা করতে নির্বাচনী বিধিমালার আওতায় ব্যাপক জনসংযোগ একটি নির্দোষ ও অপরিহার্য প্রক্রিয়া। তবে এটা করতে বেশ কিছু ক্ষেত্রে কালোটাকার লেনদেন হয়। আর তা করে ক্ষমতায় থাক বা না থাক যেকোনো পক্ষ। প্রার্থী ও দলের অতীত কার্যক্রম এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় সহযোগিতা বা অগ্রহণযোগ্য নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আয়ত্তে নিয়ে বা অগ্রাহ্য করে ভোটকেন্দ্র দখল। ভোটার না গেলেও সিল মেরে ভোটের ফলাফল প্রভাবান্বিত করা। মূল প্রতিদ্বন্দ্বীরা নির্বাচন থেকে সরে গেলে সাধারণত ভোটাররা উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। ভোটকেন্দ্রে যান না। এ ক্ষেত্রে সংঘাত ছাড়াই ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আর তা না হলে সংঘাতে গিয়ে। তবে এ ধরনের জয়ের মূল্য কিন্তু খুব চড়া। ভোটারবিহীন আর কারচুপিপূর্ণ নির্বাচনের সঙ্গে জনগণের তেমন সম্পর্ক থাকে না।
সূচনাতেই উল্লেখ করা হয়েছে, তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণের উদ্যোগ উৎসাহজনক। স্থানীয় সরকার নির্বাচন বলে এবং কাউন্সিলর পদে প্রার্থীদের প্রচেষ্টায় তৃণমূল পর্যায়ে ভোটাররা ভোট দিতে উৎসাহী হবেন। এই নির্বাচনগুলো সফল হলে জাতীয় রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আর এগুলো সফল করতে সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলসমূহ ও প্রার্থীরা সবার সমভাবে সচেতন থাকার আবশ্যকতা রয়েছে। আম্পায়ারের ভূমিকায় থাকা নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত দৃঢ়তার কোনো ছাপ রেখে অগ্রসর হতে পারেনি। আইন ও বিধি প্রয়োগে তাদের সক্রিয় উদ্যোগ অত্যাবশ্যক। সম্প্রতি সংবাদপত্রে প্রকাশিত কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে একটি নেতিবাচক চিত্র এসেছে। কমিশনের নামে এর প্রধানই সব দায়িত্ব নিচ্ছেন। এটা অসংগত এবং সংবিধানের বিচ্যুতি। নির্বাচন-প্রক্রিয়াকে জোরদার করতে কমিশনের এ অবস্থান নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
যা-ই হোক, সরকারপ্রধানের সাম্প্রতিক সময়ের বক্তব্যের প্রতিফলন সরকারের কাজেও থাকবে আশা করা যায়। বিরোধীদলীয় প্রার্থীরা ছোটখাটো বিচ্যুতি উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা সফল নির্বাচনের জন্য অত্যাবশ্যক। সব পক্ষেরই যেকোনো প্রকারে জয়লাভের মানসিকতা বর্জন করতে হবে। কেননা, এরূপ জয়ে হেরে যাবে জনগণ।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

এলিয়েনের ‘সুস্পষ্ট’ প্রমাণ!

এক দশকের মধ্যেই এলিয়েনের সুস্পষ্ট প্রমাণ হাজির করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে নাসা।
আসলেই কী ভিনগ্রহবাসী বা এলিয়েনদের দেখা মিলবে? দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের মনে এই প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই এলিয়েনদের খুঁজে পাওয়া কিংবা তাদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি নিছকই বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির বিষয় বলেই মনে করেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার কয়েকজন বিজ্ঞানী আছেন যাঁরা জানিয়েছেন, ‘আমরা এলিয়েনদের খুঁজে পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছি, বড় জোর আর ১০ বছর লাগবে।’ ২০২৫ সালের মধ্যেই এলিয়েন খুঁজে পাওয়ার ‘সুস্পষ্ট প্রমাণ’ হাজির করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নাসার বিজ্ঞানীরা। নাসার গবেষকেরা বলেছেন, ‘এই সৌরজগতে আমরাই শুধু নই, আমাদের জানাশোনার বাইরে এই সৌরজগতের কোথাও প্রাণের উদ্ভব ঘটতে পারে। নাসা তা প্রমাণ করার খুব কাছে চলে এসেছে।’
গতকাল মঙ্গলবার নাসার প্রধান বিজ্ঞানী অ্যালেন স্টেফান এক প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে নাসার এই প্রতিশ্রুতির কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আগামী এক দশকের মধ্যে এলিয়েনের খোঁজ পাওয়া যাবে; যা হবে পৃথিবীর মধ্যে সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। আমি মনে করি, আমরা এক দশকের মধ্যেই পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো খানে জীবনের অস্তিত্বের খোঁজ পেয়ে যাব। আমরা জানি কোথায় তাঁদের খুঁজে পাওয়া যাবে বা তাদের কীভাবে খুঁজতে হবে। আমাদের হাতে প্রযুক্তি রয়েছে আর আমরা তা প্রয়োগ করছি। আমি মনে করি, আমরা ঠিক পথেই আছি।’
স্পেস ডটকমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমাদের মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সিতেই এলিয়েন বা ভিনগ্রহবাসীর অস্তিত্বের একাধিক চিহ্ন রয়েছে। নাসার কেপলার স্পেস টেলিস্কোপের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের এই ছায়াপথে পৃথিবী ও মঙ্গলের মতো পাথুরে গ্রহ বেশি। সেই তুলনায় বৃহস্পতি বা শনির মতো গ্যাসীয় গ্রহের সংখ্যা কম। তাই অধিকাংশ তত্ত্বই বলে, পাথুরে গ্রহগুলো জীবনধারণের উপযোগী হতে পারে।
নাসার অ্যাস্ট্রোফিজিকস বিভাগের পরিচালক পল হার্জ মিল্কি ওয়ে ছায়াপথকে ‘আর্দ্র স্থান’ বলে উল্লেখ করেছেন। এখানে মহাকাশীয় মেঘের পানির অস্তিত্ব দেখা যায় বলেই তাঁর মত।
এলিয়েন বা ভিনগ্রহবাসীর খোঁজে নাসার বর্তমান পরিকল্পনা হচ্ছে, মঙ্গল গ্রহের বরফাচ্ছাদিত চাঁদ ইউরোপাতে আরও বেশি রোভার পাঠানো। এ ছাড়াও হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দাবি করেছেন, তাঁরা জটিল গাণিতিক নকশার রেডিও সংকেত ধরতে পেরেছেন যা কোনো বুদ্ধিমান ভিনগ্রহবাসীর পাঠানো সংকেত হতে পারে।
তবে কী সত্যিই দেখা মিলবে এলিয়েনদের? যেভাবে গবেষক, বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তারা উঠেপড়ে লেগেছেন ১০ বছরের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন করে ফেলা অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে কী?

উত্তরে তাবিথই ভরসা বিএনপির?

ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু ঢাকা উত্তরে এখনো প্রার্থীই চূড়ান্ত করতে পারেনি বিএনপি। দলটি এখনো চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টুর জন্য অপেক্ষা করছে। সূত্র জানায়, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ও মিন্টুর বিপক্ষে গেলে তাঁর ছেলে তাবিথ আউয়ালকে সমর্থন দেওয়ার কথা জোর দিয়ে ভাবছে বিএনপি। তাঁকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
অবশ্য উত্তরে বিকল্পধারার যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরীকে প্রার্থী করার জন্য বিএনপির একটি অংশ তৎপর। মাহী নিজেও আজ বুধবার সংবাদ সম্মেলনে সব জাতীয়তাবাদী শক্তির সমর্থন চেয়েছেন। তবে মাহী দাবি করেছেন, বিএনপির সমর্থনের জন্য তিনি কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। এদিকে বিএনপি-জোটের একটি অংশ সরাসরি মাহীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিএনপির কয়েকজন প্রভাবশালী জ্যেষ্ঠ নেতাও তাঁর বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে আবদুল আউয়াল মিন্টুকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিএনপি। সে জন্য উত্তরে বিএনপির আর কোনো নেতা মেয়র পদে প্রার্থী হননি। বিএনপির সূত্র জানায়, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আশঙ্কা ছিল মিন্টুর মনোনয়ন ইচ্ছাকৃতভাবে বাতিল করা হতে পারে। এ জন্য তিনি মিন্টুকে একজন বিকল্প প্রার্থীও ঠিক করতে বলেছিলেন। মিন্টু বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিবের নাম বলেছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়া তাতে সায় না দেওয়ায় পরবর্তীতে ছেলে তাবিথের নামেও মনোনয়নপত্র তোলার ব্যবস্থা করেন মিন্টু।
মিন্টুর মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশন বাতিল করলেও তাবিথ বৈধ প্রার্থী। কিন্তু ছেলেকে নির্বাচনে রাখতে মিন্টু ইচ্ছাকৃত ভুল করেছেন-এমন সমালোচনার মুখে নির্বাচন করতে অনিচ্ছার কথা জানান তাবিথ আউয়াল। বিএনপির সূত্র জানায়, গত সোমবার রাতে তাবিথ আউয়াল ও তাঁর মা নাসরিন আউয়ালকে ডেকে পাঠান খালেদা জিয়া। এ সময় প্রার্থী হতে চান না বলে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ায় খালেদা জিয়া তাবিথকে মৃদু ভর্ৎসনা করেন বলে জানা গেছে। সেই সঙ্গে মিন্টুর জন্য শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করার পাশাপাশি তাবিথকে মানসিকভাবে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন। প্রার্থিতার বিষয়ে জানতে চাইলে তাবিথ আউয়াল গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি তো আছিই। এখন বাবার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।’
এর আগে খালেদা জিয়ার বাসা থেকে বের হয়ে অবশ্য তাবিথ প্রথম আলোকে বলেছিলেন, কোনো রাজনৈতিক আলোচনা হয়নি। দীর্ঘদিন পর খালেদা জিয়া বাসায় ফিরেছেন, এ জন্য তাঁর মা তাঁদের নিয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর থেকে মেয়র পদে মনোনয়ন নিয়েছেন বিএনপিদলীয় সাবেক সাংসদ মাহী বি. চৌধুরী। বিএনপির একটি অংশ তাঁকে সমর্থন দেওয়ার পক্ষে। নির্বাচন করতে অনিচ্ছুক-তাবিথের এমন বক্তব্যের পর মাহীর সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কিন্তু এর মধ্যে বিএনপি ও জোটের একটি অংশ সরাসরি মাহীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের শরিক পাঁচটি দল তাঁকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি তুলেছে।
আপত্তির কারণ জানতে চাইলে বিএনপি-জোটের শরিক বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, বিকল্পধারা ২০-দলীয় জোটের কেউ না। চলমান আন্দোলনে তারা কখনো হরতালের পক্ষে, কখনো বিপক্ষে কথা বলেছে। জোট গঠনের সময় বিকল্পধারা আসেনি। কারণ হিসেবে বলেছিল, যুদ্ধাপরাধীদের দল আছে জোটে। এখন এই জোটের সমর্থন চাওয়া সুবিধাবাদী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ।

দুই শিবিরে দুই চিত্র

শুরু হয়েছে সিটি নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা। গতকাল থেকে সীমিত আকারে প্রচারের সুযোগ এলেও আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা প্রথম দিন থেকেই মাঠে নেমেছেন ঘটা করে। ব্যাপক শোডাউন দিয়ে প্রার্থীরা প্রচারণা চালিয়েছেন বিভিন্ন এলাকায়। অন্যদিকে বিরোধী জোট সমর্থিত প্রার্থীদের কারও দেখা মেলেনি মাঠে। প্রথম দিনে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের কেউ প্রচারণায় নামেননি। গতকাল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এ চিত্র। প্রচারণা ঘিরে দুই রাজনৈতিক শিবিরে লক্ষ্য করা গেছে দুই রকম রূপ। তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সীমিত আকারে প্রচারণা শুরু হয়েছে। ঢাকার দুই সিটিতে সকাল থেকে মাঠে নামেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা। দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ায় নেতাকর্মীদের নিয়ে তারা প্রচারণা শুরু করেছেন। অন্যদিকে মাঠে নামেনি বিএনপি। তফসিল অনুসারে আগামী ২৮শে এপ্রিল ভোট গ্রহণ হবে। সাধারণত প্রতীক বরাদ্দের আগে প্রার্থীরা প্রচারণা চালাতে পারেন না। তবে ভোট গ্রহণের ২১ দিন আগে সীমিত আকারে প্রচারণা চালাতে পারেন। গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু করেন ঢাকা উত্তরের আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আনিসুল হক। সকালে তিনি সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে ফুল দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। শহীদদের আত্মার মাগফিরাত এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় তিনি মোনাজাতেও অংশ নেন। সাবেক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী ফারুক খান, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, এমপি তারানা হালিমসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তার সঙ্গে ছিলেন। সাভার থেকে ফিরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান তিনি। এরপর তিনি মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ও রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে রাজধানীর কাওরান বাজার এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে আনিসুল হকের প্রচার কর্মসূচি শুরু হয়। সেখানে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে গণসংযোগের পাশাপাশি তিনি আধুনিক ঢাকা গড়ে তোলার জন্য সবার সহযোগিতা কামনা করেন। আনিসুল হক বলেন, অতিরিক্ত জনবসতির কারণে ঢাকা শহরে সমস্যার শেষ নেই। তবে সুযোগ পেলে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বাসযোগ্য ঢাকা শহর গড়ে তোলার কাজ শুরু করতে চান। এদিকে বেলা ১১টায় মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারের যাত্রাবাড়ী প্রবেশমুখে পথসভা করার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন সাঈদ খোকন। সেখানে সমবেতদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ঢাকা সিটি করপোরেশন একটা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এটা মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘদিন ধরে এ সেবা ঝিমিয়ে পড়েছে। এ কারণে মানুষকে নানা বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হচ্ছে। আমি যদি আপনাদের ভোটে মেয়র নির্বাচিত হতে পারি তাহলে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে আবার সেবা সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলবো। ঢাকার সাবেক মেয়র প্রয়াত মোহাম্মদ হানিফের কথা স্মরণ করে তার ছেলে খোকন বলেন, আমার বাবা মানুষের জন্য তার জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। আমিও মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করবো। হানিফ ফ্লাইওভার থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু করার কারণও ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, এ ফ্লাইওভার আমার বাবার আত্মত্যাগেরও সাক্ষী হয়ে আছে। এখান থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু করে আমি বলতে চাই- ঢাকাবাসী আসুন, উন্নয়নের ধারায় সম্পৃক্ত হন। আমি আমার পিতার আদর্শের অনুসারী হিসেবে ঢাকার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে চাই। আপনারা এখানে যারা আছেন, তারা ঢাকাবাসীর কাছে আমার জন্য ভোট চাইবেন। মেয়র নির্বাচিত হলে সিটি করপোরেশনে নাগরিক সেবা পেতে বিড়ম্বনার অবসান করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। টোল কাউন্টারের পাশে সাঈদ খোকনের প্রচারণা শুরুর এ আনুষ্ঠানিকতার সময় ফ্লাইওভার থেকে গাড়ি বেরোনো কিছুক্ষণের জন্য আটকে যায়। পরে ফ্লাইওভারের বাইরের ফটকের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন সাঈদ খোকন ও তার সঙ্গীরা। সেখানেও কিছুক্ষণের জন্য গাড়ি আটকে যায়। পরে ফ্লাইওভারের পশ্চিমপাশে চানখাঁরপুলে এসে প্রচারণা চালান খোকন। ফ্লাইওভারে টোল প্লাজায় আলাদা আলাদা না এক সঙ্গে টোল দেয়া হবে তা নিয়ে সাঈদ খোকনের কর্মীদের সঙ্গে নিরাপত্তা কর্মীদের বচসা হয়। এরপর বিকালে নিজের নির্বাচনী অফিস উদ্বোধন করেন সাঈদ খোকন। রাজধানীর ২৫ বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে মিলাদ অনুষ্ঠানের পর গতকাল বিকালে অফিসটির কার্যক্রম শুরু হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা দক্ষিণেন আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়কারী আবদুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাওছার, সদস্য সুজিত রায় নন্দী প্রমুখ।
এদিকে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ কোন সিটিতেই গতকাল বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে কোন প্রচারণা দেখা যায়নি। দক্ষিণে দলের প্রার্থী হিসেবে মির্জা আব্বাস চূড়ান্ত হলেও তিনি একাধিক মামলার আসামি। মির্জা আব্বাস বা তার সমর্থকদের কোন তৎপরতা দেখা যায়নি। তবে ৯ই এপ্রিল থেকে মির্জা আব্বাস প্রকাশ্যে আসতে পারেন বলে জানা গেছে। ওদিকে উত্তর সিটি করপোরেশনে বিএনপি এখনও প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রার্থী নিয়ে জটিলতায় পড়েছে দলটি। অন্য কাউকেও বিএনপির পক্ষ থেকে সমর্থন দেয়া হয়নি।

দুই কূটনীতিককে নিয়ে বেকায়দায় পররাষ্ট্র দপ্তর

দুই কূটনীতিকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগে অস্থির পররাষ্ট্র দপ্তর। করণীয় নির্ধারণে দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে। তদবিরও চলছে পক্ষে-বিপক্ষে। নীতিনির্ধারকরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে। সহযোগী-সহকর্মীরা বিব্রত। অভিযোগ আমলে নিয়ে কাতারে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। আর শিক্ষানবিশ এক কূটনীতিককে চাকরি স্থায়ী না করার কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে সরকারকে। পররাষ্ট্র দপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, জুনিয়র ওই কূটনীতিকের গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে দেশের ইমেজ। নেদারল্যান্ডস-এর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কেও এটি মারাত্মকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পররাষ্ট্র দপ্তরের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, একটি ইলেক্ট্রনিক পণ্য চুরির অভিযোগে দু’মাস আগে হেগে আটক হয়েছিলেন প্রশিক্ষণে যাওয়া কূটনীতিক শিশির মাহবুব শহিদ। সেখানে ৩৫০ ইউরো জরিমানাও হয় তার। কূটনীতিক হওয়ায় ডাচ্‌ পুলিশ তাকে জেলে না পাঠিয়ে দূতাবাসের জিম্মায় ছেড়ে দেয়। ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা না ঘটে সে জন্য ট্রেনিং শেষে দেশে ফেরার পর অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কি ব্যবস্থা নেয় তা নেদারল্যান্ডসকে জানানোর শর্তও ছিল। গত  ফেব্রুয়ারিতে এ ঘটনাটি ঘটে। কিন্তু এতদিনেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এতে বিরক্তি প্রকাশ করে নেদারল্যান্ডস। এক কূটনৈতিক পত্রে (নোট ভারবাল) ডাচ্‌ সরকার ঢাকাকে ঘটনার আদ্যোপান্ত জানায়। সেখানে কেবল শিশিরের ঘটনাই নয়, আটক অবস্থায় ডাচ্‌ পুলিশকে দেয়া তার জবানবন্দির স্পর্শকাতর বিষয়গুলোও অবহিত করা হয়। ডাচ্‌ নোট ভারবালে দেয়া তথ্যমতে, জিজ্ঞাসাবাদ কালে শিশির পুলিশকে জানান, কেবল তিনি নন, তার আগেও কয়েকজন এমন কাণ্ড ঘটিয়েছেন। এতে তিনি উৎসাহিত হয়েছেন বলেও দাবি করেন। পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, গত দু’মাস ধরে বিষয়টি ছাইচাপা দেয়ার চেষ্টাতেই লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেছে। ঘটনার চেয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে বিলম্বকেও গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করছে দেশটি। এ নিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে জানিয়ে দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, দেরিতে হলেও তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ৯ সহকর্মীসহ শিশিরের আগামী ৯ই এপ্রিল ট্রেনিং সম্পন্ন করে মন্ত্রণালয়ে যোগদান করার কথা। তিনি যোগদানের সুযোগ পেলেও আপাতত তার চাকরি স্থায়ী হচ্ছে না। পরবর্তী ফর্মে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আভাস দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, তাকে চাকরিচ্যুত করার চাপ রয়েছে। তবে ওই প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ। এদিকে মন্ত্রণালয়ের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, কাতারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত  সৈয়দ মাসুদ মাহমুদ খন্দকারকে ফিরিয়ে আনতে হচ্ছে। তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে লিখিত নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ১লা এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম আদিষ্ট হয়ে পররাষ্ট্র সচিব  মো. শহীদুল হককে  চিঠি দিয়ে ওই নির্দেশ জারি করেন জানিয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। দুই লাইনের ওই চিঠিতে কোন ধরনের কারণ দর্শানো ব্যতিরেকে রাষ্ট্রদূতকে ফেরত আনার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে কি অভিযোগ বা ঠিক কী কারণে তাকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে চিঠিতে তার উল্লেখ না থাকলেও একাধিক সূত্র জানায়, তার বিরুদ্ধে কাতারস্থ বঙ্গবন্ধু  সৈনিক লীগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অভিযোগ করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাওয়ার পর ওই সংগঠনের সভাপতি পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও সচিবের কাছে অভিযোগ করেছিলেন জানিয়ে একটি সূত্র জানায়, রাষ্ট্রদূতের উসকানিতে কাতার আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের ডাকা সংবাদ সম্মেলনে সন্ত্রাসী হামলার গুরুতর অভিযোগ ওঠেছে। কাতারের ইস্ট-ওয়েস্ট রেস্টুরেন্টের ওই সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু  সৈনিক লীগ কাতার শাখার সভাপতি সফিকুল ইসলাম প্রধান আহত হয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করা হয়। গত বছরের ২১শে অক্টোবর একটি অনুষ্ঠানের জন্য দূতাবাসের কার্যক্রম বন্ধ রাখাসহ উপযুক্ত সেবা না দেয়া, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনারও  অভিযোগ আনা হয় দূতাবাস প্রধানের বিরুদ্ধে। পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে দূতাবাস থেকে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেলেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করছে পররাষ্ট্র দপ্তর। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাকে ঢাকায় রিপোর্ট করতে এরই মধ্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের সিটি নির্বাচন প্রসঙ্গ- সহিংসতা প্রশমনের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত

জাতিসংঘের নিয়মিত সংবাদ-সম্মেলনে সংস্থাটির মহাসচিব বান কি মুনের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিকের কাছে গতকাল বাংলাদেশের আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জাতিসংঘের অংশগ্রহণের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। প্রযুক্তিগত বা অন্য ধরনের সহায়তার মাধ্যমে নির্বাচনে জাতিসংঘের অংশগ্রহণের বিষয়টি সরকারের অনুরোধের ওপর নির্ভর করে বলে জানান মুখপাত্র। বাংলাদেশে চলমান সহিংসতা প্রশমনে সমাধান বের করার লক্ষ্যে সম্প্রতি সব রাজনৈতিক দলকে একসঙ্গে কাজ করার যে আহ্বান জানিয়েছেন বান কি মুন, তা পুনর্ব্যক্ত করেন ডুজাররিক। নিচে জাতিসংঘের প্রেস-ব্রিফিংয়ে প্রশ্নোত্তর পর্বে বাংলাদেশ অংশটুকু তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমি গত ৩রা এপ্রিল কয়েকটি প্রশ্নের জবাবে জাতিসংঘ মহাসচিব বা আপনার বিবৃতিটি  দেখেছি, যেখানে মূলত বলা হয়েছে, এ নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি চমৎকার এবং সেটা সম্ভবত ভালো। কিন্তু, দেশটিতে (বাংলাদেশে) বেশ কিছু অভিযোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে, যেমন- বিরোধী দলের কয়েকজন প্রার্থী এখনও জেলে রয়েছেন এবং মানুষকে নিবন্ধন করতে বাধা দেয়া হচ্ছে। আমি জানতে চাই, এ বিষয়ে প্রশংসা ছাড়া আরও কিছু কি বলার আছে? এবং বিশেষ করে এ নির্বাচনগুলোতে জাতিসংঘের কি কোন ভূমিকা রয়েছে বা জাতিসংঘ কি কোন ভূমিকা রাখতে আগ্রহী?
মুখপাত্র: না, আমার আর কিছু বলার নেই। অবশ্যই, সরকারের অনুরোধের ভিত্তিতেই যে কোন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে থাকে জাতিসংঘ। সেটা প্রযুক্তিগত সহায়তা বা অন্য যে কোন ধরনের সহায়তা প্রদানের মাধ্যমেই ঘটুক না কেন। গত সপ্তাহে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন সব রাজনৈতিক দলকে (সহিংসতা) প্রশমনের লক্ষ্যে সমাধানের উপায় খুঁজে বের করার জন্য যে উৎসাহ দিয়েছেন, তার বাইরে আমার কাছে নতুন করে যোগ করার মতো কিছু নেই।

কেজরিওয়ালকে দেয়া গাড়ি ফেরত চাইল সমর্থক

অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে উপহার দেয়া গাড়িটি ফেরত চেয়েছেন আম আদমি দলের এক পুরনো সমর্থক। দলের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে হতাশ হয়েই যে তিনি তার নীল রঙের ওই ওয়াগন-আর ফেরত চাইছেন তা বলাই বাহুল্য। গত কয়েকদিনে কেজরিওয়ালের দল থেকে প্রথম সারির পাঁচ নেতাকে বহিষ্কারের পর এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করলেন যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী ওই সমর্থক। ইন্ডিয়া টিভি। প্রবাসী কুন্দন শর্মা পেশায় একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।
বর্তমানে তিনি দিল্লিতে অবস্থান করছেন। সম্প্রতি এক টুইটারে তিনি আম আদমি নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে উপহার হিসেবে দেয়া ওয়াগন-আর ফেরত চেয়েছেন। শুধু গাড়ি নয়, কুন্দন শর্মা এবং তার স্ত্রী সারদা দলকে যেসব অর্থ সহায়তা দিয়েছেন, সেগুলোও ফেরত চেয়েছেন তিনি। এর আগে ভারতের এক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে দেয়া সাক্ষাৎকারে কেজরিওয়ালের ওই সাবেক ভক্ত তার গাড়ি উপহারের বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা গাড়িটি খুব বেশিদিন ব্যবহার করিনি। দলের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট হয়েই আমি এটি এএপিকে দিতে চেয়েছিলাম। এ নিয়ে প্রথমে নিজের মধ্যে একটু দ্বিধা ছিল। কিন্তু দিল্লির নির্ভয়া ঘটনায় দলের অবস্থান আমাকে অভিভূত করে। আমার সব দ্বিধা কেটে যায়। আমি এটি কেজরিওয়ালকে দান করি।’

রুবেল এখন মডেল

পেসার রুবেল হোসেন এবার মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। বাংলাদেশের গতিতারকা টেলি কমিউনিকেশন কোম্পানি রবির নতুন বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়েছেন। রবির নতুন বিজ্ঞাপনে ‘জ্বলে উঠুন আপন শক্তিতে’ তাকে দেখা যাবে টিভি পর্দায়। মডেল হিসেবে জাতীয় দলের পেসার রুবেলের প্রথম কাজ এটি। রবিও বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে প্রথমবারের মতো কোনো ক্রিকেটারকে বেছে নিয়েছে। মঙ্গলবার এফডিসিতে বিজ্ঞাপনটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে।
কাল রুবেল হোসেন বলেন, ‘মডেল হচ্ছি বা হব- এসব নিয়ে আমার কোনো ভাবনা নেই। আমার একমাত্র লক্ষ্য ক্রিকেট। তবে এ ধরনের কোনো অফার এলে কাজ করতে পারি।’ বিজ্ঞাপনের মডেল হলেও সিনেমা বা নাটকে অভিনয় করার কোনো আগ্রহ নেই বলে জানান রুবেল। এই ডান-হাতি পেসারের ধারণা, সামনে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে ভালো করবে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন আগের সেই দল নই। আমরা তা প্রমাণ করেছি, বাংলাদেশ অনেক বদলে গেছে। আমাদের দলে অনেক ভালো ব্যাটসম্যান আছে। আমরা তা পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে দেখাতে চাই।’ বাংলাদেশ ক্রিকেটে লীগের (বিসিএল) মাধ্য দিয়ে নিজেকে আরও শানিয়ে নিচ্ছেন বলে জানান রুবেল।

চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ সব সময়ই অনেক বেশি

*বর্তমানে কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন?
**ইমাম রিপনের পরিচালনায় নতুন ধারাবাহিক ‘নয়া হিটলার’ নাটকের কাজ শুরু করছি। আরও একটি ধারাবাহিকের কাজের কথা হয়েছে। আপাতত কাজ বন্ধ আছে। এছাড়া চলতি ধারাবাহিকের কিছু কাজ করছি।
*চলতি ধারাবাহিক নাটকগুলোতে দর্শক সাড়া কেমন?
**আমার অভিনীত বেশ কয়েকটি নাটক বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার হচ্ছে। ভালো দর্শক সাড়া পাচ্ছি। দর্শক আমাকে ভালোভাবে গ্রহণ করেছে বলে মনে হয়।
*খণ্ড নাটকে কাজ করছেন?
**আসলে খণ্ড নাটক করার ইচ্ছা থাকলেও কাজ করার খুব একটা সময় হয়ে ওঠে না। সারা বছর ধারাবাহিক নাটকে অনেক বেশি সময় দিতে হয়। তাই খণ্ড নাটকে কাজ কম করি। বিশেষ উপলক্ষ ছাড়া খুব একটা করা হয় না।
*চলচ্চিত্রের কাজের কী খবর?
**চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহটা সব সময়ই আমার অনেক বেশি। তবে ‘এক কাপ চা’ ছবিতে অভিনয়ের পর মনমতো কাজ পাচ্ছি না। ভালো একটি সুযোগের অপেক্ষায় আছি। ভালো কাজের সুযোগ পেলে হাতছাড়া করব না।
*ঈদের কাজের প্রস্তুতি কেমন নিচ্ছেন?
**ঈদের জন্য কাজ করছি কিন্তু পুরোপুরিভাবে এখনও শুরু করিনি। ঈদ উপলক্ষে দুটি নাটকের কাজ শেষ করেছি। আরও কয়েকটি কাজের কথা চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে কাজ খুব তাড়াতাড়ি শুরু করব।
সাদিয়া ন্যান্সি

বড় পদোন্নতিতেও ‘বঞ্চনা’, প্রশাসনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, পিএসদের জয়জয়কার

‘গণপদোন্নতি’ নিয়ে জনপ্রশাসনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বেশ কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন যোগ্য থাকার পরও তাঁদের পদোন্নতি ‘বঞ্চিত’ করা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় দিয়েও অনেককে বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে।
সব মিলিয়ে ৮৭৩ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিতে গিয়ে আরও কয়েক শ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি ‘বঞ্চিত’ করা হয়েছে বলে পদোন্নতি না পাওয়া কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন। অন্যদিকে পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তারা বেজায় খুশি। বিশেষ করে যেসব কর্মকর্তা যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব হয়েছেন তাঁরা বেশি খুশি হয়েছেন। কারণ, এই পদগুলোকে প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গাড়িসহ অন্যান্য সুযোগসুবিধাও বেশি। তবে পদ না থাকার কারণে অতিরিক্ত সচিব হয়েও অনেককে উপসচিবের দপ্তরেই কাজ করতে হবে।
বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেছেন, জনপ্রশাসনে চার বছর ধরে ঢালাও পদোন্নতি হলেও পদগুলোকে সে অনুযায়ী উন্নীত (আপগ্রেড) করা হয়নি, নতুন করে পদ সৃষ্টি করা হয়নি। এ কারণে পদোন্নতি হলেও নতুন পদে বদলি বা পদায়নে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি বেশ জটিল। এর পরও কিছু কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যেমন এখন যুগ্ম সচিবদের পদে অতিরিক্ত সচিবদেরও পদায়নের সুযোগ করা হয়েছে।
জনপ্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ১৯৮৫ বিসিএস পর্যন্ত কর্মকর্তারা অবসরে না যাওয়া পর্যন্ত এই সমস্যা কাটবে না। কারণ, ওই বিসিএস পর্যন্ত মাত্রাতিরিক্ত কর্মকর্তা রয়েছেন।
গতকাল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, আরেক কর্মকর্তা নিজ কার্যালয়ে ছেড়ে মন খারাপ করে বসে আছেন। জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, বিসিএস মেধা তালিকায় তাঁর চেয়ে অন্তত পেছনে থাকা ২৬ জন কর্মকর্তার পদোন্নতি হয়েছে, কিন্তু তাঁকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি।
একটি মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ১১তম বিসিএসের মেধা তালিকায় প্রথম পাঁচে থাকা এক কর্মকর্তা (জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব) চার দফায় পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন। এ রকমভাবে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের বেশ কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা তাঁদের অভিযোগের কথা জানান।
পিএসদের জয়জয়কার: নতুন পদোন্নতিতে দলীয় পরিচয় ও আস্থাভাজন কর্মকর্তারা প্রাধান্য পেয়েছেন। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব, সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও বিভিন্ন সংস্থা প্রধানের অন্তত ৩২ জন একান্ত সচিব (পিএস) পদোন্নতি পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত সচিব-১ সাজ্জাদুল হাসান ও একান্ত সচিব-২ নমিতা হালদার যুগ্ম সচিব থেকে পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত সচিব হয়েছেন। তাঁদের দুজনকেই গতকাল আবার প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব ১ ও ২ হিসেবে নতুন করে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, পদ ছাড়া কোনোভাবেই পদোন্নতি দেওয়া ঠিক নয়। আর পদোন্নতিতে যদি দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি হয়ে থাকে তা দুঃখজনক।

সিটি নির্বাচনে বোঝা যাবে পানি কোথায় গড়ায় -বিশেষ সাক্ষাৎকারে : রফিক-উল হক by মিজানুর রহমান খান

বিশিষ্ট আইনজীবী রফিক-উল হক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ও এলএলবি ডিগ্রি নেন। ১৯৬০ সালে কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। পরবর্তীকালে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছেন ১৯৯০ সালে।
প্রথম আলো : সিটি নির্বাচন কি সুষ্ঠু রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে?
রফিক-উল হক : সন্ত্রাসী তৎপরতা গত কয়েক দিনে কিছুটা হলেও ঠান্ডা হয়েছে। আসলে নির্বাচন দিলেই মানুষ কেমন ঠান্ডা হয়ে যায়। আমাদের দেশের মানুষ ইলেকশন-পাগল। বার কাউন্সিল বা বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচন, ইউপি বা মেয়র—যেমনই হোক, নির্বাচন পেলেই মানুষ খুশি।
প্রথম আলো : সিটি নির্বাচন কেমন হবে বলে মনে করেন?
রফিক-উল হক : মিডিয়ার সক্রিয় ভূমিকার কারণে এখন নির্বাচনে কারচুপি করা খুব দুরূহ। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে বলে আশা করি।
প্রথম আলো : আবদুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়ন বাতিল হওয়াকে কীভাবে দেখেন?
রফিক-উল হক : তিনি বেকুবের মতো কাজ করেছেন। তিন বছর হলো প্রস্তুতি নিয়ে সমর্থক নিয়েছেন আরেক এলাকা থেকে।
প্রথম আলো : এ ছাড়া তাঁর অন্য কি সমস্যা ছিল?
রফিক-উল হক : মিন্টুর যমুনা রিসোর্টের ইজারা বাতিল করে গত বুধবার সরকার আদেশ দিয়েছে। আদেশে রোববার (আজ) ১০টার মধ্যে সেনাবাহিনীকে ওই জমির দখল নিতে বলেছিল। ওই জমির পাশেই ছিল আর্মি ক্যাম্প। চুক্তিতে থাকা সালিসির বিধান ছিল। সেটা না মেনে ওই আদেশ দেয়। আমি এর ওপর আদালতের স্থগিতাদেশ পেলাম।
প্রথম আলো : ওই আদেশটা কি কাকতালীয়?
রফিক-উল হক : আমার মনে হলো, মিন্টু যখন নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথা বললেন, তখনই এই আদেশটা পাস হলো। এখন ভেবে দেখুন সরকারের সততার কী অবস্থা! আমি জানি না, এর অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে। আদেশটা এল শুক্র ও শনি মাঝে রেখে, রোববারে তারা দখল নেবে। আমি জানামাত্র সারা রাত খেটে পরদিনই জেলা আদালত থেকে স্থগিতাদেশটা পেলাম। প্রায় ১৬০ বিঘা জমি ৩০ বছরের ইজারা। মিন্টু ১৮ কোটি টাকা দিয়েছেনও। ১৯৯৯ সালে শেখ হাসিনার আমলে মিন্টুকে ইজারাদানের সিদ্ধান্ত হলো আর ২০০২ সালে বেগম জিয়ার আমলে তা কার্যকর হলো। যমুনা সেতুর পাশের ওই রিসোর্টে শেখ হাসিনা তিনবার ও বেগম খালেদা জিয়া একবার গিয়ে থেকেছেন।
মিন্টুর ছেলের প্রার্থিতার বিষয়ে আমি জানি না। তবে আমার ধারণা, ঢাকা উত্তরে আমার জামাতা আনিসুল হক জয়ী হবেন। দক্ষিণে হানিফের ছেলে (সাঈদ খোকন)। এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা। চট্টগ্রামে মনজুর জিতবেন। আবার এও বলি, আমাদের মানুষের সাধারণ মজ্জাগত প্রবণতা হলো ক্ষমতাসীন দলকে হারানো। ঢাকা বার, বার কাউন্সিল ও সুপ্রিম কোর্ট বারে তা-ই দেখা গেল।
প্রথম আলো : অনেকের মতে সিটি নির্বাচন দুধারি তরবারি। বিএনপি হারলে বলবে, কারচুপির আশঙ্কাই সত্যি। আর জিতলে বলবে, সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। এই নির্বাচন কি সংকটকে শিথিল, নাকি আরও গভীরতর করতে পারে?
রফিক-উল হক : আপনার এই কথা এখানে বলে লাভ নেই। ব্রিটেনের আসন্ন নির্বাচনে রক্ষণশীলেরা ভাবছে, তারা এবার এককভাবে জয়ী হবে আর লেবার ভাবছে তারা আসবে। আমরা এসব ভাবতে পারি না।
প্রথম আলো : বিএনপি ইসিকে সেনা মোতায়েন, অফিসের তালা খুলতে এবং হাজার হাজার আসামি ছেড়ে দিতে বলেছে।
রফিক-উল হক : এটা কি বলা সম্ভব যে নির্বাচনে অংশ নিতে জেল থেকে সবাইকে বের করে দেওয়া হোক। জামিন তো ব্যক্তিগতভাবে নিতে হবে। রাজনীতিক হিসেবে বলা যায়, একজন বিবেচনাবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে আপনি বলবেন?
প্রথম আলো : সংকট উত্তরণে একটা অ্যামনেস্টি হতে পারে। সুনির্দিষ্ট মামলা না থাকা, সন্দেহভাজন হিসেবে পাইকারি আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দিয়ে সরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে পারে।
রফিক-উল হক : হ্যাঁ, এটা সম্ভব। খুব ভালো যুক্তি। কিন্তু ৫৪ ধারায় আর কতজন বন্দী আছেন? পিন্টু তো শাস্তি পেয়েছেন, তিনি কী করে দাঁড়াবেন?
প্রথম আলো : আচ্ছা, এত বড় একটা সংকটের মধ্যে বিএনপির মিন্টুর বোকাটে ত্রুটি, পিন্টুর মতো দণ্ডিতকে দাঁড় করানোটা বিএনপির শক্তি, না দুর্বলতার নির্দেশক? জনগণের সঙ্গে মশকরা কি না?
রফিক-উল হক : আপনি নীতিকথা বলছেন, এর উচ্চ রাজনৈতিক মূল্য আছে। যে দল বলছে দেশে গণতন্ত্র চাই, তার দলে কি গণতন্ত্র আছে? আসল তন্ত্র হলো ক্ষমতা কী করে পাব। আমরা আসলে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি না।
প্রথম আলো : আওয়ামী লীগ মনে হচ্ছে এই কার্ডটাই খেলছে। তারা বলে, বিএনপি এলে জঙ্গি-জামায়াতের আরও উল্লম্ফন ঘটবে। তার চেয়ে গণতন্ত্রহীনভাবে ও ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে তাদের শাসনটাই দীর্ঘ হোক।
রফিক-উল হক : আপনি দেখবেন, যে যতই বলুক, হেসে-খেলে আওয়ামী লীগই পরবর্তী পাঁচ বছর টিকে যাবে।
প্রথম আলো : তার মানে, ২০১৯ সালের আগে আপনি কোনো নির্বাচনের সম্ভাবনা দেখেন না?
রফিক-উল হক : নির্বাচন (স্থানীয় সরকার) বা দু-একটা উপনির্বাচন ইত্যাদি হবে। কিন্তু সাধারণ নির্বাচন নয়।
প্রথম আলো : তাহলে আপনার কথা হলো, সিটি নির্বাচনের ফলাফল যেমনই হোক না কেন, তা কোনো মধ্যবর্তী সাধারণ নির্বাচন ত্বরান্বিত করছে না?
রফিক-উল হক : আগাম নির্বাচনের কথা আওয়ামী লীগ একবার বলে ফেলেছিল। এখন মেয়র নির্বাচনে তারা যদি জিতে যায়, তাহলে তারা মধ্যবর্তী নির্বাচনের ধার দিয়েও যাবে না। কারণ, তারা জানে, বাংলাদেশের ইতিহাস হলো যে দল ক্ষমতায় থাকে, নির্বাচন দিলে তারা হেরে যায়।
প্রথম আলো : যে সহিংসতা ও দম বন্ধ করার মধ্য দিয়ে জাতি যাচ্ছে, সেটাও কি ২০১৯ পর্যন্ত তাদের নিত্যসঙ্গী হতে পারে?
রফিক-উল হক : আচ্ছা, বলুন তো বিএনপির প্রধানের সঙ্গে কে আছেন, যিনি বা যাঁরা বিএনপির হয়ে লড়াই করছেন? মওদুদরা কোথায়? মাহবুবউদ্দিন খোকনের অর্ধেক কথা বোঝা যায় না। খন্দকার মাহবুব একজন আছেন।
প্রথম আলো : যে রাষ্ট্রে সালাহ উদ্দিনকে গুম করা যায়, সেই রাষ্ট্রে কী করে আশা করা চলে, কেউ প্রতিবাদে সরব হবেন?
রফিক-উল হক : তার মানে আপনি রাজনীতি করবেন, জেলে যেতে ভয় পাবেন। অতীতের নেতারা জেল-জুলুম...
প্রথম আলো : অনেকের মতে, এখানে বিরাট গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে। এখন আর প্রথাগত জেল-জুলুমে থেমে নেই, গুম-খুনে চলে গেছে। কী বলবেন? সেলফ সেন্সরশিপ বাড়ছে কি না?
রফিক-উল হক : ইলিয়াস আলী ও সালাহ উদ্দিনের ধারা চলতে থাকবে? সালাহ উদ্দিনের ব্যাপারে সরকার একটা তথ্য বিবরণী পর্যন্ত দিল না। দেশে প্রেস ফ্রিডম যেটা আছে, তা কোনো দিন ছিল না, সেলফ সেন্সরশিপ আপনাদের ব্যাপার। আমার মনে হয়, পরিস্থিতি যদি এভাবে চলে আর বিএনপি একটু শক্ত হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সরকার একটা মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে। সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদের শর্তমতে, ১৫৪ আসনে ‘প্রত্যক্ষ ভোট’ হয়নি। সংবিধান লঙ্ঘনের কারণেও একটা মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়া উচিত। অবশ্য সবে ১৪ মাস কাটল। এখনই পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। সিটি নির্বাচনে দেখা যাক, কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে গড়ায়। আর সংকট নিরসনে পদে পদে আমেরিকা ও ভারত মানে বিদেশিদের টেনে আনাকে আমি ঘৃণা করি।
প্রথম আলো : সিটি নির্বাচনে সেনা মোতায়েন দরকার?
রফিক-উল হক : এটা বিএনপি বলেছে। সেনারা আসুক বা না আসুক, তাতে কোনো পার্থক্য হবে না। সেনারা না এলে আওয়ামী লীগ কারচুপি করবে, এটা আমি বিশ্বাস করি না।
প্রথম আলো : বিএনপি আর কত দিন চলমান অকার্যকর ও জনভোগান্তির অবরোধ-হরতাল করে যাবে? একে নিয়ন্ত্রণে আইনের কথা মুখে বলা হয় কিন্তু প্রাণহানি ও লাখ-কোটি টাকা ক্ষতির দায় কারও ওপর বর্তানো হয় না। 
রফিক-উল হক : আমি বিশ্বস্ততার সঙ্গে আশা করব, রাজনীতিকেরা যা-ই করুন, এ ধরনের কোনো কর্মসূচি ভবিষ্যতে আর না দেন। এর বিরুদ্ধে একটা আইন হতে পারে।
প্রথম আলো : দুর্নীতি দমন কেমন চলছে? গত ছয় বছরেও আপিল বিভাগে কারও দণ্ডের চূড়ান্ত ফয়সালা হয়নি?
রফিক-উল হক : আমি প্রথমেই বলব, দুদকই সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবাজ। প্রিন্স মুসা এত বড় কাণ্ড ঘটালেন। দেহরক্ষী নিয়ে তিনি দুদকে গেলেন, এরপর কোনো সাড়াশব্দ শুনেছেন? কারণ, তাঁর প্রভাবশালী আত্মীয় আছে। এত দিন পর্যন্ত দুদক চলছে, কারও এখনো শাস্তি হয়নি। ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের  হয়েছিল, আমি মামলা করে স্থগিতাদেশ নিয়েছিলাম, সেটা এখনো বিচারাধীন। আপনি বলুন, শাস্তি হয়েছে কারও?
প্রথম আলো : হবে কীভাবে বলুন, দুদক তো কেবল মামলা করতে পারে। আপনার মতো তারকা আইনজীবীরা যখন প্রক্রিয়াগত ত্রুটির
কথা বলে স্থগিতাদেশ নেন, তখন তো মামলা চলতে পারে না। এক-এগারোতে শতকরা ৯০ ভাগের বেশি দুর্নীতি মামলা স্টে হয়েছিল, এখন তা পাঁচ ভাগে নেমেছে।
রফিক-উল হক : সেটা তো সব দেশেই ঘটে। দুদকের মামলায় অনেক ঘাপলা থাকে। দুর্নীতি উচ্ছেদে একটা বিপ্লব দরকার।
প্রথম আলো : আপনি ৫৫ বছর আইন পেশায়, স্মরণ করতে পারেন কি, সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত কতগুলো দুর্নীতির মামলার চূড়ান্ত ফয়সালা দেখেছেন?
রফিক-উল হক : তা পারি না। তবে হাইকোর্টে ১০০ বিচারক হলে আপিল বিভাগের বিচারকের সংখ্যা ২০ হওয়া উচিত।
প্রথম আলো : এক-এগারোতে আপনি কত মামলায় স্টে পেয়েছিলেন? অন্তত ১০০ মামলায় দাঁড়িয়েছিলেন?
রফিক-উল হক : আমার মনে নেই। (হেসে) ও বুঝেছি, আপনি ইনকাম ট্যাক্সের লোক!
প্রথম আলো : বেগম রওশন এরশাদ কি একটি মামলায় হাজির না হতে কমিশন চেয়েছেন? খুলে বলবেন?
রফিক-উল হক : হ্যাঁ, সম্প্রতি এই সরকারের দেওয়া ব্যাংকের মধ্যে রওশন পেয়েছেন একটি। নতুন ব্যাংক পেতে সৎ পথে অর্জিত ৪০০ কোটি টাকা লাগে। রওশনের লাইসেন্স হস্তান্তর নিয়ে কোম্পানি কোর্টে মামলা হয়েছে। এখন রওশন এরশাদ বিরোধী দলের নেতা হয়ে বলছেন, তিনি পর্দানশিন নারী। তাই আদালতে হাজির হতে অপারগ। তাই তিনি কমিশন চেয়েছেন। এ নিয়ে কথা বলতে লজ্জিত বোধ করি।
প্রথম আলো : তাঁর ব্যাংক প্রাপ্তি দুর্নীতি নয়?
রফিক-উল হক : দুর্নীতির বাপ। আরেক তরুণ আইনজীবী ৪০০ কোটি টাকা কোথায় পেলেন? দুর্নীতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে, বেরোতে সময় লাগবে।
প্রথম আলো : শুরুটা কীভাবে? উঁচু স্তরে তো আগে থামাতে হবে।
রফিক-উল হক : তরুণ প্রজন্ম করবে। বি. চৌধুরীর ছেলে। শেখ হাসিনার ছেলে। নাজিউর রহমানের ছেলে। এমনকি তারেক; তিনি অনেক বেশি পরিপক্ব। তাঁরা পারবেন। 
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
রফিক-উল হক : ধন্যবাদ।

এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে মান্না

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাকে কেন্দ্রীয় কারাগার
থেকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে নেওয়া হয়
অসুস্থ মাহমুদুর রহমান মান্নাকে গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকেরা জানান, বুকে ব্যথা অনুভব করায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মান্নাকে কাল প্রথমে বারডেম হাসপাতাল ও পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) শয্যা ফাঁকা না থাকায় ওই দুটি হাসপাতাল তাঁকে ভর্তি নেয়নি। এরপর তাঁকে হৃদরোগ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর আগে গত ৩১ মার্চ মান্নাকে কারাগার থেকে বারডেমে নেওয়া হলেও সিসিইউতে শয্যা ফাঁকা না থাকায় সেখানে তাঁকে ভর্তি নেওয়া হয়নি। ওই দিনই বারডেম থেকে তাঁকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু মেডিকেল থেকে জানানো হয়, কারা কর্তৃপক্ষ এখানে ভর্তির বিষয়ে অনুরোধ না করায় তারা ভর্তি নিতে পারবে না। ওই দিনই মান্নাকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়।
মান্নার আইনজীবী আবদুল মান্নান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বারবার বলছি, চিকিৎসকেরাও বলছেন, উনি গুরুতর অসুস্থ। ওনার হার্টে ব্লক ও উচ্চ রক্তচাপ আছে। বহুদিন ধরে উনি স্পন্ডিলাইটিসের রোগী। তার পরও তিনি সুচিকিৎসা পাচ্ছেন না।’
আইনজীবী বলেন, এসব চিকিৎসা কারা হাসপাতালে নেই বলেই ওনাকে বাইরে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার দাবি জানানো হয়। উচ্চ আদালতও সেই নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু তার পরও তা প্রতিপালনে এতদিন লাগার বিষয়টি দুঃখজনক।
মান্নার আইনজীবীরা জানান, প্রথম দফায় ১০ দিনের রিমান্ড শেষ হওয়ার পর তাঁকে দ্বিতীয় দফায় আরেকটি মামলায় ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিন দিনের মাথায় অসুস্থ হলে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই তাঁকে আবার জেলে নেওয়া হয়। তখন থেকে অসুস্থ এই ব্যক্তিকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল।
এদিকে মান্না সুচিকিৎসা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করে আসছিল তাঁর পরিবার। চিকিৎসকেরা সিসিইউতে রাখার পরামর্শ দিলেও তাঁকে এক সপ্তাহ ধরে কারাগারে সাধারণ ওয়ার্ডে রাখা হয়। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন তাঁর পরিবারের সদস্য ও নাগরিক ঐক্যের নেতারা।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট সূত্র জানায়, গতকাল দুপুরের দিকে পুলিশ মান্নাকে কারাগারে নিয়ে যান। এই হাসপাতালের পরিচালক এস টি এম আবু আজম প্রথম আলোকে বলেন, মান্নার হৃদযন্ত্রের রক্তনালিতে আগে থেকেই ব্লক ছিল। হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে আসার পর তাঁর একটি ইসিজি করা হয়েছে। এতে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
আজ বুধবার মেডিকেল বোর্ড বসিয়ে মান্নার সুচিকিৎসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও পরিচালক জানিয়েছেন।
মান্নার স্ত্রী মেহের নিগার প্রথম আলোকে বলেন, ২ এপ্রিল কারাগারে ওনার সঙ্গে সর্বশেষ দেখা হয়েছে। আজ জানতে পারলেন, উনি হাসপাতালে। এর আগে তাঁকে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নেওয়া হলেও সিসিইউতে শয্যা ফাঁকা না থাকার কথা বলে কারাগারে পাঠানো হয়।
মান্নার স্ত্রী আরও বলেন, সিসিইউ না পেলে তাঁকে অন্তত কেবিনে ভর্তি রেখে চিকিৎসা করা যেত। কিন্তু অসুস্থ শরীরে তাঁকে বারবার কারাগারেই ফেরত পাঠানো হয়। এমনকি একজন বিশিষ্ট নাগরিক হলেও তাঁকে ডিভিশন না দিয়ে সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে রাখা হয়েছে।
আইনজীবী মান্নান খান জানান, প্রবাসীর সঙ্গে টেলিফোন আলাপ ও উসকানির মামলায় জামিন আবেদন গতকাল মহানগর দায়রা জজ আদালত নাকচ করে দিয়েছেন। এখন তিনি উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। তাঁর মতে, কোন প্রবাসীর সঙ্গে মান্না ফোনে আলোচনা করেছিলেন, তাঁকে চিহ্নিত করা না গেলে মামলা গুরুত্বহীন হয়ে যায়। তা ছাড়া যে উসকানির অভিযোগ আনা হয়েছে, তেমন কোনো ঘটনা বাস্তবে ঘটেনি। এ ছাড়া এর আগে সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে কথোপকথন মামলায় রিমান্ডের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা আবেদনও আদালত খারিজ করে দেন।

চিকিৎসার খরচ মেটাতে বছরে ৪০ লাখ মানুষ দরিদ্র হচ্ছে -হোসেন জিল্লুর

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে বছরে ৪০ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্যবিমার কথা বলা হলেও এখনো সরকার তা চালু করতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ অসংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ এবং এর খরচের ধাক্কা মোকাবিলা করা।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে হোসেন জিল্লুর এসব কথা বলেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় শুরু হতে যাওয়া সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা বা ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ (ইউএইচসি) বিষয়ে তিন দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন উপলক্ষে এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী সভাপতি হোসেন জিল্লুর বলেন, গড় আয়ু বাড়লেও মানুষের স্বাস্থ্যের কী উন্নতি হয়েছে, তা ভেবে দেখা দরকার। প্রতি বছর প্রায় আট হাজার নতুন চিকিৎসক পেশায় যুক্ত হলেও তাঁদের মান নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে। মানসম্পন্ন সেবা ব্যয়বহুলতার কারণে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সফলতা অর্জন করলেও অসংক্রামক রোগের প্রকোপ মোকাবিলা করাই এখন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
হোসেন জিল্লুর বলেন, ৯-১১ অনুষ্ঠেয় সম্মেলনে স্বাস্থ্য খাতের মাঠ পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করে বাস্তবায়নযোগ্য একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে। সম্মেলনে ৭২টি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হবে। থাইল্যান্ডে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা কর্মসূচি কীভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে, তা বর্ণনা করবেন দেশটির উপস্বাস্থ্যমন্ত্রী সোমসাক চুনহারাস। বিশ্ব ব্যাংক ও রকফেলার ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় পিপিআরসি এই সম্মেলনের মূল উদ্যোক্তা হলেও ইতিমধ্যে ১০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন এ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সম্মেলন আয়োজনে ৪০ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক আজাদ খান, সাবেক স্বাস্থ্যসচিব এ এম এম নাসিরউদ্দিন, সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন রিসার্চ, বাংলাদেশের পরিচালক এ কে এম ফজলুর রহমান।

অসহিষ্ণুতা আর নৃশংসতার বিরুদ্ধে মানুষ by আনু মুহাম্মদ

সমাজে ধর্মান্ধ, মতান্ধ, দলান্ধ, ক্ষমতান্ধ আর অর্থান্ধদের দাপট বাড়ছেই। এর ফলে বাংলাদেশ এখন অসহিষ্ণুতা আর নৃশংসতার উর্বর ভূমি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অন্ধত্বের সহযোগী সীমাহীন লোভ আর সংবেদনহীনতা। এর শিকার হয়ে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন নামে, অকালমৃত্যুর শিকার হচ্ছে মানুষ, ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে সমাজ আর অসংখ্য পরিবার। বলপ্রয়োগের বিস্তারে চিন্তা, মত, রাজনৈতিক তৎপরতার পরিসর সংকুচিত হচ্ছে। রাজনীতিকে বানানো হয়েছে অসহিষ্ণু সহিংস তৎপরতায়। একের পর এক আঘাতে ক্লান্ত সমাজ, ক্ষোভ, ঘৃণা, প্রতিবাদ জানানোর পথ ও ভাষা খুঁজে পাওয়াও যেন কঠিন কিংবা অর্থহীন। যে কেউ যেকোনো স্থানে দগ্ধ হতে পারেন, খুন হতে পারেন, যেকোনো স্থান থেকে গুম হতে পারেন। অদৃশ্য কিংবা মুখোশধারী ঘাতকদের বিচরণে ‘আইনের শাসন’ ‘গণতন্ত্র’ পরিহাসের বিষয়।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি লেখক, গবেষক অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ড এই নিষ্ঠুর ও নৃশংস সময়ের বহিঃপ্রকাশ। আগের অনেক ঘটনায় আমরা দেখেছি, এ রকম খুনের পর সমাজে প্রতিক্রিয়া হলে কয়েক দিন চোটপাট হয়, উল্টোপাল্টা গ্রেপ্তার হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আসল খুনিদের পাওয়া যায় না। অভিজিতের ক্ষেত্রে সেটাও হয়নি। মুখস্থ কথাবার্তাও কম। এর এক মাসের মাথায় ওয়াশিকুর খুন হলো, ‘হিজড়া’ নামে পরিচিত তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা মানুষেরা এই খুনিদের না ধরলে আদৌ কেউ ধরা পড়ত কি না সন্দেহ। এসব খুনের পেছনে ধর্মের নাম ব্যবহার হয়, কিন্তু কোনো ধার্মিক মানুষ বিচার ও শাস্তি নির্ধারণের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন? তদন্তের রহস্যজনক গতিবিধির কারণে খুনি আর এর মূল পৃষ্ঠপোষকদের জাল আড়ালেই থেকে যায়। সমাজে স্বচ্ছভাবে এসব বিষয়ে আলোচনাও অগ্রসর করা যায় না।
অভিজিৎ হত্যার সময় পুলিশের ‘দায়িত্বে কোনো অবহেলা ছিল না’ বলে এক মাসের ‘তদন্ত’ শেষে পুলিশ বিভাগ জানিয়েছে! আসলে পুলিশ ও র্যা বের কথা এখন কে বিশ্বাস করে? বছরের পর বছর বিনা বিচারে খুন, সম্প্রতি একের পর এক গুম নিয়ে মিথ্যা ভাষণ থেকে কারও বুঝতে অসুবিধা হয় না যে তাদের কথা বিশ্বাস করা যায় না। সালাহ উদ্দিন গুম হয়েছেন পুলিশ-র্যা বের হাতে, এই বিষয়টি তাঁর পরিবার নিশ্চিত করে বলছে। পুলিশ-র্যা ব অস্বীকার করে যাচ্ছে যথারীতি, কিন্তু গুম হওয়া ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার কোনো তৎপরতাও তাদের নেই। বিএনপি নেতা বলে সালাহ উদ্দিন নিয়ে বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে, কিন্তু না জানা গুমও যে অনেক, তা পত্রিকার খবর খেয়াল করলে বোঝা যায়। অনেকগুলোই রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক নেই।
এ ছাড়া সন্ত্রাস, পেট্রলবোমা, ধর্মীয়, জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে তৎপরতা দেখা যায় তাতেও মনে হয়, আসল অপরাধীদের শনাক্ত করতে এবং তাদের ধরতে কোনো সমস্যা আছে। পুলিশ ও র্যা বের দক্ষতা নিয়ে আমার প্রশ্ন খুবই কম, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন হাজার। কোথাও দুর্নীতি, কোথাও ‘ওপরের নির্দেশ’–এ আটকা পড়ে আছে জনগণের টাকায় প্রতিপালিত নানা বাহিনী। লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে, অভিজিৎ, ত্বকীও সাগর-রুনির মডেলে প্রবেশ করছে। প্রথমে সিদ্ধান্ত ‘খুনি ধরা যাবে না’, তারপর তদন্তের খেলা, এটাই হচ্ছে এই মডেল।
ত্বকী হত্যার দুই বছর হয়ে গেল। তদন্ত হয়েছে, অপরাধী শনাক্তও হয়েছে, কিন্তু তার পরও আটকে আছে বিচারকাজ। কারণ, অভিযুক্ত পরিবারের হাত অনেক লম্বা। সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের তিন বছর পার হয়ে গেছে, তার হত্যাকারীদের বিচার তো দূরের কথা, তদন্তের ঘোরপ্যাঁচই কাটছে না। ঢাকার মিরপুরের কালশীতে বাইরে থেকে ঘরের তালা আটকে গানপাউডার ঢেলে শিশু-নারীসহ নয়জন মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে। কোনো তদন্তের খবরই পাওয়া যায় না, বিচার তো দূরের কথা। অথচ এখানেও অভিযুক্ত চেনাজানা। এর বাইরে চলছে পেট্রলবোমা আর ক্রসফায়ারের হত্যাকাণ্ড। সে জন্য এ ক্ষেত্রে কথাটি এখন অতিশয়োক্তি নয় যে বাংলাদেশ এখন সন্ত্রাস, নিরাপত্তাহীনতা, অসহিষ্ণুতা আর বিচারহীনতার দেশ। অনেকে এর জন্য পুলিশি অদক্ষতাকে দায়ী করেন। কিন্তু বাস্তবতা তা বলে না। ‘ওপরের নির্দেশ’, ক্ষমতাবানদের প্রভাব বা সিদ্ধান্তের কোনো বাধা না থাকলে অপরাধী শনাক্ত করা, খুঁজে বের করা যে তাদের পক্ষে খুবই সম্ভব, তার বহু প্রমাণ আছে। সমস্যা দক্ষতার নয়, সমস্যা সিদ্ধান্তের।
পুলিশ-র্যা বের সক্রিয়তা বরং এখন অনেক বেশি বিচারবহির্ভূত খুন আর বিনা বিচারে আটক রাখায়। গ্রেপ্তার এখন যেমন একদিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত, তেমনি এটি বাণিজ্যেরও উৎকৃষ্ট ক্ষেত্র। অর্থ উপার্জনের উন্মাদনা সর্বত্র, ‘উন্নয়ন’ আর ভোগের জোয়ার। এই উন্মাদনায় সরকারের প্রায় প্রতিটি বিভাগ তার সুবিধা বা এখতিয়ার অনুযায়ী বাণিজ্য করছে। নিয়োগ-বাণিজ্য হয়ে কেউ যখন নিয়োগ পায়, তখন তাকে অন্য বাণিজ্য করে পোষাতে হয়। সেটা পুলিশ, আনসার বা শিক্ষক—যে-ই হোক না কেন! গ্রেপ্তার-বাণিজ্য, ভর্তি-বাণিজ্য, প্রশ্নপত্র-বাণিজ্য, কোচিং-টিউশনি-বাণিজ্য, চিকিৎসা-বাণিজ্য, তদবির-বাণিজ্য—সবকিছুই তাই এখন ‘স্বাভাবিক’ অর্থ উপার্জনের মাধ্যম।
সম্প্রতি হাইকোর্ট হরতাল-অবরোধের নামে নাশকতা–সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন। হরতাল-অবরোধ আহ্বানকারীদের কাছ থেকে হতাহত ব্যক্তিদের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায় করার বিষয়েও রুল দিয়েছেন। আমরা এর পাশাপাশি এটাও আশা করতে পারি যে মাননীয় আদালত ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধের নামে বিনা বিচারে নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা, গুম ও পাইকারি গ্রেপ্তারের মাধ্যমে নিরীহ মানুষকে হয়রানি এবং গ্রেপ্তার-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেবেন।
এ দেশে কিছু লোকের লোভের বলি হয়ে মানুষের অকালমৃত্যু আসলে খুবই সহজ! কিছুদিন আগে মংলায় ভবন ধসে মারা গেলেন শ্রমিকেরা। সারা দেশেই নির্মাণ খাতের জোর দাপট এখন। জিডিপি প্রবৃদ্ধির বড় অংশ যে ওখান থেকেই আসছে, তার হিসাব বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএসে) আছে। কিন্তু খরচ কমানোর জন্য দায়িত্বহীন, নিরাপত্তাহীন নির্মাণকাজে কত শ্রমিকের জীবন গেছে, আর কতজন পঙ্গু—সে হিসাব বিবিএস রাখে না। তার আগে লঞ্চ ডুবে মারা গেলেন অনেকে, ৭০ জন নারী-পুরুষ ও শিশুর লাশ দুই দিনের মধ্যেই শনাক্ত হয়েছে। ‘আল্লাহই এভাবে মৃত্যু লিখে রেখেছিলেন’ স্বজনেরা বরাবর হয়তো এই বিশ্বাসের মধ্যেই সান্ত্বনা খোঁজেন। কিন্তু তাতে কি স্বজনদের কষ্ট লাঘব হয়? তাতে কি অপরাধীদের দায়মোচন হয়? ত্রুটিপূর্ণ আনফিট সব লঞ্চ নদীতে, বাস সড়কে। বছর বছর এসব মরণ বাহনের সার্টিফিকেট আর অনুমতির বিনিময়ে কর্তাব্যক্তিদের গাড়ি-বাড়ি নিশ্চিত হয়, ব্যাংক-ব্যালান্স মোটা
হয়। জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তাদের মেদ বাড়ে বহুজনের জীবন হরণের ব্যবস্থা করে। একটু খোঁজ করলে ঢাকার বহু দামি গাড়ি আর অট্টালিকায়, বিভিন্ন সময়ের মন্ত্রী-কর্তাব্যক্তির শরীরে তাই ভবনধস, লঞ্চডুবি আর বাস ‘দুর্ঘটনায়’ মৃত মানুষের গন্ধ পাওয়া যাবে। নিহত, নির্যাতিত, নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজনদের কান্নার আওয়াজ শোনা যাবে।
বিশ্বজুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ চলছে ১৪ বছর ধরে। এটা বস্তুত সন্ত্রাস দমনের যুদ্ধ নয়, এটি হলো সন্ত্রাস দমনের নামে লুণ্ঠন, দখল, আধিপত্য তৈরির একটি বৈশ্বিক কূটকৌশল। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ বহু দেশই এই কূটকৌশলের জালে আটকা পড়েছে। ২০০১ থেকে এই স্লোগানের অধীনে অনেক জনপদ ধ্বংস হয়েছে, প্রায় ১৫ লাখ মানুষ খুন হয়েছে, তার কয়েক গুণ বেশি মানুষ বিপর্যস্ত। এর ফলে আরও সন্ত্রাস বেড়েছে। আল-কায়েদা ধ্বংস করার কথা বলে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়াকে এখন চিরস্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে রূপান্তরিত করা হয়েছে। ফলাফল: আল-কায়েদা থাকল, যোগ হলো আইএস, বোকো হারামসহ অনেক গ্রুপ। একদিকে মুসলিমবিদ্বেষ, অন্যদিকে সন্ত্রাস দমনের নামে সন্ত্রাসী হামলা, দখল, লুণ্ঠন, গণহত্যা ও ধ্বংসের কারণে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন অসহিষ্ণু দিকহারা গোষ্ঠীর। এই মুখোশ নীতি পুরো বিশ্বকে অস্থির, নিরাপত্তাহীন, সহিংস করে তুলছে।
জাতিগত, লিঙ্গীয় বা ধর্মীয় পরিচয়, বর্ণ, মত, ভাষা বা অঞ্চল ইত্যাদি কখনো কোনো মানুষের অপরাধ হতে পারে না। অথচ এসব বিষয় নিয়ে অসহিষ্ণুতা, ‘ব্যাটাগিরি’ সমাজে, এমনকি নতুন প্রযুক্তির মঞ্চ ফেসবুকেও আলোচনা ও বিতর্কের পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত করে তুলছে। কুৎসা, হিংসা, দ্বেষ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, অপমান, মিথ্যাচার ঢেকে দিচ্ছে মতের সঙ্গে মতের বিতর্কের পরিসর। প্রত্যেক মানুষের ধর্মে বিশ্বাস, ধর্মের নির্দিষ্ট তরিকা অনুসরণ কিংবা অবিশ্বাস, নির্দিষ্ট বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করার অধিকার আছে। প্রত্যেক মানুষের এই বিশ্বাসের প্রতি সম্মান জানাতে হবে। এই সম্মান রেখেই যেকোনো ধর্মমত পর্যালোচনার অধিকার সমাজে রক্ষা করতে হবে। কুৎসার সঙ্গে পর্যালোচনার তফাত বোঝার সক্ষমতাও সমাজে তৈরি হবে এই পরিসর তৈরি হলে। কথা বলা ও লেখার কারণে যদি আক্রমণ আসে, তখন নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন আরও বেশি কথা বলা ও লেখা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করলে যদি নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়, তাহলে নিরাপত্তার জন্য দরকার অন্যায়ের বিরুদ্ধে আরও বেশি মানুষ জড়ো করা।
সমাজের ভেতর চিন্তা ও প্রতিরোধের শক্তি ছাড়া ভরসা করার আর কী আছে আমাদের?
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu

নির্বাচন গণতন্ত্র হত্যার কলকাঠি হতে পারে না by সিরাজুর রহমান

আধুনিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতির উদ্ভব হয়েছে বহু নিরীক্ষা আর অভিজ্ঞতার ফসল হিসেবে। ক্ষমতা নিয়ে কাড়াকাড়ি, হানাহানি এবং মাঝে মধ্যেই গৃহযুদ্ধে মানবসমাজ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। বিকল্প ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর-পদ্ধতির জন্য বহু তল্লাশি করে রাষ্ট্রনীতির পণ্ডিতেরা গণতন্ত্রকে আবিষ্কার করেছিলেন। অবশ্য গণতন্ত্রের ধ্যান-ধারণার উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন প্রাচীন গ্রিসে অ্যারিস্টটল। লক্ষ্য ছিল জনগণ নিজেদের অভিপ্রায় অনুযায়ী শাসক নির্বাচন করবে, এতে প্রশাসনে সাধারণ মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে। অবশ্য এ পদ্ধতি যে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত, সে কথা তারাও হলফ করে বলেননি। আর আজকের বাংলাদেশে আমরা ব্যতিক্রমগুলোর জের হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। নির্বাচন গণতান্ত্রিক পদ্ধতির প্রথম ও প্রধান অপরিহার্য অঙ্গ। বলা যায়, নির্বাচন গণতন্ত্রের সোপান। ক্ষমতার নেশা কর্তাব্যক্তিদের পেয়ে বসলে বহু ধরনের সমস্যা-সঙ্কট দেখা দেয়। প্রথমে আসে আলস্য এবং এর জের ধরে দুর্নীতি, অত্যাচার, নির্যাতন ও গৃহযুদ্ধ। গণতন্ত্রের গোড়ার দিকে চিন্তাবিদেরা চাইতেন নির্বাচন যাতে ঘন ঘন হয়। দুই নির্বাচনের মাঝে তিন বছরের বেশি মেয়াদ তাদের কেউ কেউ আদর্শস্থানীয় মনে করেননি। একটানা বেশি দিন গদিতে থাকলে শাসকদের গদির মোহে পেয়ে বসতে পারে। জনসাধারণ হতাশ হয়। এরা বিকল্প শাসক নির্বাচিত করতে চায়। সুযোগ না পেলে শক্তি প্রয়োগ করে এরা ক্ষমতা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। রাষ্ট্রীয় শক্তিগুলো (পুলিশ, র‌্যাব ও সেনা) ব্যবহার করে গণ-আন্দোলন প্রতিরোধ করা হলে অশান্তি, হানাহানি, রক্তপাত ও শেষতক গৃহযুদ্ধ শুরু হতে বাধ্য। বাংলাদেশে এখন শেষ দুই পর্যায় চলছে। গণতন্ত্র শেকড় গেড়ে বসলে ব্যয়সাকুল্য এবং প্রশাসনিক সুবিধার লক্ষ্যে কোনো কোনো দেশ নির্বাচিত সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়িয়েছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কোনো কোনো দেশে সংসদের মেয়াদ চার বছরে সীমিত করা হয়েছে। পণ্ডিতেরা নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতির চাবিকাঠি হিসেবে পরিকল্পনা করেছিলেন। বাংলাদেশের চরম দুর্ভাগ্য, এ দেশে বর্তমান অবৈধ সরকার গণতন্ত্রকে ভণ্ডুল করার কলকাঠি হিসেবেই নির্বাচন পদ্ধতিকে ব্যবহার করতে চায়। সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিত্বমূলক প্রশাসন অসম্ভব করে তোলার জন্য ২০০৯ সাল থেকেই প্রশাসন, পুলিশ, র‌্যাব, বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ দলীয়করণ করে ফেলা হয়। এরপর অত্যন্ত বিতর্কিতভাবে সংবিধান পরিবর্তন করে সুস্থ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের শেষ আশা-ভরসাও মুছে ফেলা হয়েছে। এরই ফসল আমরা দেখতে পেয়েছি, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। দেশের সব বিরোধী দল এবং পণ্ডিত ও শুভেচ্ছাসম্পন্ন মানুষ অজস্রবার সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন। হুঁশিয়ার করে দিয়েছে বিশ্ব সমাজও। সবাই একবাক্যে বলেছেন, সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন না হলে সে নির্বাচনের কোনো বৈধতা থাকবে না। কিন্তু সরকার জাতিসঙ্ঘ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সব মিত্র দেশ এবং সাহায্যদাতা সব রাষ্ট্র ও সংস্থার পরামর্শ অগ্রাহ্য করে এক তরফাভাবে সে তারিখে নির্বাচনের ঘোষণা দেয়, যদিও জানা ছিল যে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দল সে নির্বাচনে অংশ নেবে না। শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর এই বলে বিশ্ব সমাজকে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন যে সংবিধানের রীতি রক্ষার্থে তিনি নির্বাচন দিতে বাধ্য হচ্ছেন। একবার সে নির্বাচন হয়ে গেলে এবং সংবিধানের চাহিদা মিটলে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছে নতুন নির্বাচন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের প্রতিশ্রুতি মেনে চলেননি। ঘুমন্ত কর্মচারী আর অলস কুকুর নির্ধারিত তারিখের সপ্তাহখানেক আগেই দলীয়কৃত নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করে যে ৩০০ সদস্যের সংসদে আওয়ামী লীগের ১৫৪ জন সদস্য ইতোমধ্যেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে গেছেন। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ নির্বাচনের আগেই নিজেদের সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় গরিষ্ঠতা পাকা করে নিলো। নির্দিষ্ট তারিখে আওয়ামী লীগের ক্যাডার আর র‌্যাব-পুলিশ ছাড়া ভোটকেন্দ্রগুলোর কাছাকাছি কোনো জনমানুষ দেখা যায়নি। ঘুমন্ত নির্বাচনী কর্মকর্তা এবং অলস বেওয়ারিশ কুকুর-সর্বস্ব বহু ভোটকেন্দ্রের ছবি বিশ্ব মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। শতাধিক ভোটকেন্দ্র তো উত্তেজিত জনতা পুড়িয়েই দিয়েছিল। কিন্তু সরকারের নতজানু নির্বাচন কমিশন কয়েকজন মন্ত্রীর চাপে ও উপস্থিতিতে রিপোর্ট দেয় যে আওয়ামী লীগ ৪০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পেয়েছে। বিশ্ব সমাজ এখনো শেখ হাসিনাকে তার ১৯ ডিসেম্বর ২০১৩ সালের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সবার গ্রহণযোগ্য সাধারণ নির্বাচন দেয়ার তাগিদ দিচ্ছে। কিন্তু সরকার বলে দিয়েছে যে ২০১৯ সালের আগে নির্বাচন দিতে তারা রাজি নয়। ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে সরকার ছয় বছর ধরে গড়িমসি করেছে। মাঝপথে এরা রাজধানী মহানগরীকে দুই ভাগে বিভক্ত করে সে বিতর্ক দিয়ে আরো দীর্ঘ সময় নষ্ট করে। লক্ষণীয় যে বিভক্তি শেখ হাসিনার একটা পরম অভিপ্রেত রাজনৈতিক কৌশল। ১৯৮১ সালের মে মাসে রাজনীতিতে প্রবেশের সময় থেকে তিনি সব সময় জাতীয় ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করেছেন। জনসাধারণের মুক্ত ভোটে সদ্য নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে গদিচ্যুত করে জেনারেল এরশাদ যখন সামরিক স্বৈরতন্ত্র চালু করেন শেখ হাসিনা, তখন বলেছিলেন যে এই পরিবর্তনে তিনি অখুশি হননি। আওয়ামী লীগের মুখপত্র (অধুনালুপ্ত) বাংলার বাণী পত্রিকা সামরিক স্বৈরতন্ত্রের সাফল্যের জন্য মুনাজাত করে সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছিল। বিশ্ববাসীকে তার সরকারের বৈধতা দেখানোর প্রয়োজনে এরশাদ ১৯৮৬ সালের মে মাসে সংসদ নির্বাচন ডাকেন। আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল যৌথ বৈঠক করে সে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু জাতীয় ঐক্যের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে মাত্র দুই দিন পর জামায়াতকে দলে টেনে শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন যে আওয়ামী লীগ ৬ মে তারিখের নির্বাচনে অংশ নেবে। এরশাদের প্রতি আওয়ামী সমর্থন জেনারেল এরশাদ ১৯৯০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তার সামরিক স্বৈরতন্ত্র বহাল রাখতে পেরেছিলেন। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপস-বিমুখ গণ-আন্দোলনের জোয়ারের মুখে সামরিক স্বৈরতন্ত্র এত দীর্ঘস্থায়ী হতে পেরেছিল হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সমর্থনের কারণে। তবে সে সমর্থন সব সময় সরল পথে চলেনি। ‘৮৬ সালের নির্বাচনের পর হাসিনা বেঁকে বসেন। তিনি ঘোষণা করেন যে তামাশার নির্বাচনে গঠিত সংসদে আওয়ামী লীগ যোগ দেবে না। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণ-আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে উঠলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করার জন্য আওয়ামী লীগের ভেতর থেকেও হাসিনার ওপর চাপ আসে। তখন থেকে সর্পিল পথে তিনি কখনো আন্দোলনের আর কখনো এরশাদের পক্ষে থেকেছেন বলে মনে হচ্ছিল। শেষে ছাত্র-জনতার চাপ অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠলে শেখ হাসিনা খালেদা জিয়ার সাথে একযোগে (একত্রে নয়) আন্দোলনে নামেন এবং এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সে সময়ে বাংলাদেশের উল্লসিত, অনুপ্রাণিত মানুষগুলোর চোখ-মুখ আমার আজো মনে আছে। মনে হচ্ছিল গোটা জাতি লৌহ-দৃঢ় একতা গড়ে তুলেছে, তারা স্বৈরতন্ত্রকে বরাবরের জন্য কবর দিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক রাষ্ট্রপ্রধান প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ নিখুঁত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আয়োজন করেছেন। ভোট দিতে অধীর হয়ে উঠেছে প্রতিটি নরনারী। বাংলাদেশের এই অপূর্ব নির্বাচন দেখতে বিশ্বের সব অংশ থেকে এসেছেন শত শত সংবাদদাতা ও পর্যবেক্ষক। শেষ মুহূর্তে সব কিছু ভণ্ডুল করে দিলেন শেখ হাসিনা। নির্বাচনের দু’দিন আগে ৪৫ মিনিটের টেলি-ভাষণে তিনি আগাগোড়া খালেদা জিয়া ও জিয়া পরিবারকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করলেন। নিখুঁত নির্বাচন আর খালেদা জিয়ার বিজয়ের প্রশংসা করে বিশ্ব পর্যবেক্ষকরা দেশে ফিরে গেলেন। প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে বর্তমান হানাহানির শুরু সেখানেই। প্রাচীন খনার বচন আবারো সত্যি প্রমাণিত হলো: ‘ভাণ্ড ভরা দুগ্ধ মাঝে বিন্দু পরিমিত/ গোমূত্র পড়িলে তাহা হয় বিদূষিত।’ সিটি নির্বাচন ও পুলিশি বিজয় রাষ্ট্রীয় নির্বাচন দিতে চরম আপত্তির মধ্যে সরকার ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন করপোরেশনের নির্বাচন ঘোষণা করেছে। নির্বাচন অনুষ্ঠান ও ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত সরকারের এই চালের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হবে না। তবে লক্ষণ এখনো খুব ভালো মনে হচ্ছে না। নির্বাচনের মোটামুটি তারিখ স্থির করে সরকার এবং সে অনুযায়ী সঠিক তারিখ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। বাংলাদেশে আজগুবি ব্যতিক্রম দেখা গেল। সরকার ঘোষণা করেছিল যে জুন কিংবা জুলাই মাসে নির্বাচন হবে। কিন্তু পুলিশ-প্রধান ঘোষণা দিলেন যে নির্বাচনের উপযুক্ত তারিখ হবে ২৮ এপ্রিল। সে তারিখটাই মেনে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনে প্রথম জয় হলো পুলিশের। কারোরই এখন অজানা নেই, দেশটা এখন পুরোপুরি পুলিশি রাষ্ট্র। শুধু তাই নয়। পুলিশ, র‌্যাব ও বর্ডার গার্ড বাহিনীর প্রধানেরা এ দেশে দেশপ্রেম ও ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ সম্বন্ধে লেকচার দেন, মন্ত্রীদেরও বক্তৃতার অনুপ্রেরণা জোগান এবং পিতৃস্নেহে ক্ষমতাসীনদের সংরক্ষণ দেন বলে মনে হয়। বাংলাদেশে মন্ত্রী আর পুলিশের ব্যবধান এখন ঘুচে গেছে। নির্বাচন কমিশনের মেরুদণ্ডহীনতার কথা সবাই জানেন। যেসব নির্বাচন বিধি এদের আমানত, সেগুলোও এরা বলবৎ করতে পারেন না। সব দেশেই আইন আছে নির্বাচনের কত দিন আগে থেকে প্রার্থীরা প্রচারণা চালাতে পারবেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম কিন্তু নির্বাচন হবে বলে ঘোষণার সময় থেকেই পোস্টার আর হোর্ডিংয়ে ছেয়ে গিয়েছিল। সে বাবদ কারো সাজা হয়েছে বলে শোনা যায়নি। অনেক আগে থেকেই স্থির করা আছে যে এসব পৌর নির্বাচন হবে নির্দলীয়। কিন্তু স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সে আইন লঙ্ঘন করেছেন গণভবনে তার প্রিয় প্রার্থীদের প্যারেড করিয়ে। বছরের শুরু থেকে (৬ জানুয়ারি) বিএনপি ও ২০ দলের ঐক্যজোট সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে অবরোধ-হরতাল ইত্যাদি কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। বিরোধী দলগুলোর উল্লেখযোগ্য যেসব নেতাকে পাওয়া গেছে পুলিশ তাদের ধরেছে। এদের অনেককে জেলে পুরে রাখা হয়েছে, সাবেক এমপি ও বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদসহ কেউ কেউ তো গুম হয়ে গেছেন। হাজার হাজার ভুয়া মামলা করা হয়েছে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। নির্বাচিত হলেও গদি পাবেন তো? গ্রেফতার ও গুম হওয়ার ভয়ে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরা যে যেখানে পেরেছেন আত্মগোপন করে আছেন। সরকারের হয়তো দ্বিমুখী উদ্দেশ্য ছিল। এরা ভেবেছিল গ্রেফতারের ভয়ে বিএনপির কেউ তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেবেন না। তেমন অবস্থায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচনের মতো ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে এরা দখলি স্বত্ব দাবি করবে। আর মনোনয়ন জমা দেয়া ও প্রচারের উদ্দেশ্যে এরা বেরিয়ে এলে গ্রেফতার করার জন্য পুলিশ তো প্রস্তুত আছেই। সেটা বিরোধী জোটের, বিশেষ করে বিএনপি নেতাদের জন্য গভীর দুশ্চিন্তার কারণ। নির্বাচনে অংশ নেয়া-না নেয়ার তাৎপর্যগুলো তাদের পীড়াদায়কভাবে চিন্তা করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এরা নির্বাচনে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরা জানেন নির্বাচনে কিছুটাও সততা থাকলে এরা আকাশচুম্বী গরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হবেন এবং আওয়ামী লীগের জনসমর্থনের দাবির অসত্যতা সারা বিশ্বের কাছেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। তবে বিএনপির প্রার্থীরা গ্রেফতারের ভয়ে নিজেরা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করতে যাননি। আত্মীয় কিংবা আইনজীবীরা তাদের হয়ে সে কাজটি করেছেন। অনেকে সে ক্ষেত্রে নানাধর্মী বাধার মুখে পড়েছেন। আর নির্বাচন হলেই বা কি? গাজীপুর, রাজশাহী, খুলনাসহ কয়েকটি সিটি করপোরেশনে তো নির্বাচন হয়েছিল এবং বিএনপি প্রার্থীরা সেখানে বিপুল গরিষ্ঠতায় বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু কোথায় এখন তারা? চরম অবৈধ ও বিতর্কিতভাবে সরকার জনসাধারণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সরিয়ে আওয়ামী লীগের কর্মীদের বসিয়ে দিয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি অবজ্ঞার দৃষ্টান্ত সর্বত্র। সম্প্রতি জেলা আইজীবীদের বারগুলোর নির্বাচন হয়েছে। সর্বত্রই বিএনপি-জামায়াতের সমর্থক আইনজীবীরাই বিজয়ী হয়েছেন। কিন্তু সরকার সেসব নির্বাচন গ্রাহ্য করতে রাজি নয়। কী অর্থ করা যায় এই মনোভাবের? নির্বাচন ব্যবস্থাকে তারা পরিহাসের ব্যাপারে পরিণত করেছে। নির্বাচনের সত্যিকারের প্রয়োজন যেখানে গণতন্ত্র গঠনে সেখানে গণতন্ত্রের নামে বিবাদ-বিসম্বাদ ও হানাহানি সৃষ্টি করে তারা গণতন্ত্রকে ধ্বংসই করতে চায়। তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে বাঁদরামি হলে বিশ্ববাসীর মনে সে বিশ্বাস আরো পাকাপাকি গেড়ে বসবে।
(লন্ডন, ৩১.০৩.১৫)   সিরাজুর রহমান: বিবিসিখ্যাত প্রবীণ সাংবাদিক
serajurrahman34@gmail.com