Friday, March 27, 2026
২০০ বছরের পুরোনো কারাগারের একমাত্র রাজনৈতিক বন্দী by রুমিন ফারহানা
২০১৯ সাল। একাদশ সংসদ নির্বাচন মাত্র শেষ হয়েছে। রাজনীতিতে হতবিহ্বল ভাব। কেউ ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না কী হলো এটা। জয়ী-বিজিত কোনো পক্ষই স্বস্তিতে নেই। সে সময় প্রতি সপ্তাহে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যেতাম আমি। যেতাম দেশনেত্রী, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মামলায়, যেতাম ওনাকে কাছ থেকে দেখতে। উনি তখন ২০০ বছরের পুরোনো সেই বিশাল কারাগারের একমাত্র রাজনৈতিক বন্দী। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই পড়ত মামলার তারিখ। মামলার দিনগুলোতে নিচতলায় বসা কোর্টে আনা হতো ওনাকে। হুইলচেয়ারে আসতেন তিনি। যে মানুষটিকে জেলে যাওয়ার আগের দিনও স্বাভাবিকভাবে হেঁটে গাড়িতে উঠতে দেখেছি আমি, সেই মানুষটি নিজের পায়ে আর উঠে দাঁড়াতে পারেননি। এটা যে কত বড় ধাক্কা ছিল আমাদের জন্য, সেটি বলে বোঝানো কঠিন।
ছোট্ট ওই কোর্টরুমে পুলিশ, আইনজীবী আর সাংবাদিক গিজগিজ করত, সঙ্গে তো গোয়েন্দা সংস্থার লোক আছেই। উনি এলে আমি গিয়ে দাঁড়াতাম ঠিক ওনার হুইলচেয়ারটার পাশে। খুব আস্তে প্রায় ফিসফিস করে যতটুকু সম্ভব খবর দেওয়ার চেষ্টা করতাম তাঁকে। উনি বলতেন খুবই কম, শুনতেন বেশি। কিছু বলতে চাইলে হুইলচেয়ারের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়তাম আমি, যাতে পুলিশের কান বাঁচিয়ে কথাগুলো শুনতে পারি। পুরোটা সময়ই তাঁকে ঘিরে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকত মহিলা পুলিশ। তাদের কান বাঁচিয়ে কথা বলা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এর মধ্যেই কথা চালিয়ে যেতাম যতটুকু পারি। তিনি কিছু নির্দেশ আমাকে দিতেন সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে বলার জন্য, সেগুলো আমি তাঁদের জানাতাম। মামলার শুনানি শেষ হলে ওই দিনের মতো কারাগারের ভেতর নিয়ে যাওয়া হতো তাঁকে। এ সময়টা আমি তাঁর পাশ থেকে সরে যেতাম। দাঁড়াতাম ভেতরের মূল ফটকের পাশে, যেখান দিয়ে যাবেন তিনি। শেষবারের মতো একবার তাকাতেন। শান্ত, স্থির দৃষ্টি। হাসতেন কখনো কখনো একটু, যেন সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। যে মানুষটিকে আমি হেঁটে গিয়ে গাড়িতে উঠে কোর্টে যেতে দেখেছি, কী করে এক মাসের ব্যবধানে তিনি চলনশক্তি হারালেন, তা আজও আমার কাছে এক বিস্ময়। একদিন হয়তো এই সত্য প্রকাশ পাবে। অনাগত কালের কোনো প্রজন্ম হয়তো উদ্ঘাটন করবে এই সত্যগুলো। জানবে কেমন ছিল বাংলাদেশের রাজনীতি।
যা-ই হোক, ফিরে আসি আগের কথায়। তাঁকে সেখানে একা রেখে ঘরে ফেরার যে তীব্র কষ্ট, সেটি কি বুঝতে পারতেন তিনি? না হলে কেন মৃদু হাসি দিয়ে আশ্বস্ত করার এই চেষ্টা ছিল তাঁর? প্রতিশোধ আর জিঘাংসার রাজনীতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে রাজনীতি থেকে সরানোর চক্রান্ত কত ঘৃণ্য হতে পারে, তার উদাহরণ হয়ে থাকবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি আওয়ামী সরকারের নির্মম আচরণ। সেই সঙ্গে অন্যায়ের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপস না করে ৭৬ বছর বয়সে সব ধরনের ঝুঁকি নিয়ে কারাগারকে বেছে নেওয়ার যে দৃষ্টান্ত বেগম জিয়া তৈরি করলেন, সেটিও লেখা থাকবে ইতিহাসে। তিনি চাইলেই পারতেন আপস করতে, কারাগারে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে, পারতেন ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিরোধী দলের নেতা হতে, ২০১৮ সালে বিদেশ থেকে না ফিরতে। কিন্তু ১/১১ সরকারের সময়ই বেগম জিয়া স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, এই দেশ ছাড়া তাঁর কোথাও আর কিছু নেই, এই দেশের মানুষই তাঁর সব।
বেগম খালেদা জিয়ার মামলার সুবাদে বহু বছর পর কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে মনে হয়েছিল কিছুই ভুলিনি আমি। এরশাদ সরকারের সময় যখন আমি নিতান্তই একজন শিশু, তখন বাবাকে দেখতে বহুবার যেতে হয়েছে কারাগারে। পুরোনো সেই স্মৃতি মিলিয়ে দেখি বদলায়নি কিছুই। এমনকি বিল্ডিংয়ের ভেতরের সেই হলুদ রংটাও না। নোনাধরা দেয়ালগুলোও আছে ঠিক আগের মতোই। লোহার গরাদ বসানো সেই জানালাগুলোও পাল্টায়নি কেউ। যেন ২০০ বছরের কালের সাক্ষীকে একইভাবে রাখতে হবে যত দিন রাখা যায়। লোহার দরজা দিয়ে ঢুকেই হাতের ডানে প্রথমে জেলারের রুম। এরপর মোটামুটি বড় একটা ঘর (যেখানে আদালত বসত), তারপরই আরেকটা লম্বা টানা ঘর, যার এক পাশে সারি সারি জানালা, যেখান দিয়ে বাইরে তাকালে জেলের ভেতরটা অনেকখানি দেখা যায়। ভেতরটা যত দূর দেখা যায় সবুজ, সুন্দর। ছোট-বড় মিলিয়ে গাছের কমতি নেই। আসলে এতবার গেছি এই কেন্দ্রীয় কারাগারে যে ভোলা অসম্ভব। বাবাকে রেখে আসার সময় প্রতিবার একটা শূন্যতা, একটা তীব্র কষ্ট, হাহাকার কাজ করত। মনে হতো, আবার কবে দেখব? বাবাকে ছাড়া বাড়িটা কেমন সব সময় খালি খালি মনে হতো। ছোট আমি হয়তো বুঝিয়ে সবটা বলতে পারতাম না, কিন্তু বাবা জেলে গেলে অসুস্থ হয়ে পড়তাম। হয়তো কোনো কারণ ছাড়াই ভীষণ জ্বর, নয়তো পড়ে গিয়ে ব্যথা পাওয়া। মা বলতেন, বাবাকে ধরে নিয়ে গেলে নাকি আমাকে নিয়ে ভয়ে থাকতেন বেশি—এই বুঝি কিছু একটা হয়। প্রতিবার হতোও তা-ই। তবে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, তখনো গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা রাজবন্দীদের সঙ্গে অসদাচরণ আজকের মতো এতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। তাই বাবা গ্রেপ্তার হলে কখনো আর না-ও ফিরতে পারেন—এমন ভয় মা কিংবা আমি কখনো পাইনি। স্বাধীন বাংলাদেশে এরশাদের পর আর কোনো সরকার জেলে নেয়নি বাবাকে। আর এ কারণেই আমার জীবনে ’৯০-এ এরশাদের পতন অতি আনন্দময় ঘটনাগুলোর একটি।
বাবা যখন জেলে থাকতেন, তখন বাসায় কেবল ছোট্ট আমি, মা আর কর্মচারীরা। সকালে মা চলে যেতেন অফিসে। সারা দিন আমি একা। তবে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ। কবির ভাই (রান্না করতেন), জয়নাল ভাই (বাসা দেখাশোনা), বাবুল ভাই (ড্রাইভার) কিংবা রওশনের মা যাঁরা ছিলেন, তাঁরা পরিবারের সদস্যের চেয়ে বেশি বৈ কম ছিলেন না। ছোট্ট আমাকে যেভাবে ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখে বড় করেছেন তাঁরা, আজকের দিনে এমনটা চিন্তাও করা যায় না। জয়নাল ভাইয়ের বড় মেয়ে ছিল আমার বয়সী। অজপাড়াগাঁয়ে রেখে আসা শিশুকন্যাটির প্রতি জমিয়ে রাখা সব স্নেহ ‘কাবুলিওয়ালা’র মিনির মতোই ঢেলে দিয়েছিলেন আমার প্রতি। আমার মা ছিলেন খুব কড়া মেজাজের আর শক্ত ধাঁচের মানুষ। তার ওপর সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক পরিবার থেকে এসে স্বামীর রাজনীতি, জেলজীবন—সবকিছু মানিয়ে নিয়ে একা সংগ্রামের ধকল তো ছিলই। মায়ের শাসন আর বকুনি থেকে আমাকে বাঁচাতে কত চেষ্টা যে ছিল জয়নাল ভাইয়ের। মাকে আমরা সবাই ভীষণ ভয় পেতাম। কেউ তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে কখনো কথা বলেছি বলে মনে পড়ে না। তার ওপর অতি দুষ্টু বাচ্চা বলতে যা বোঝায়, আমি ছিলাম তা-ই। বাবা জেলের বাইরে থাকলে বাবা আর না থাকলে এই চারজন কতবার যে আমার হয়ে মিথ্যা দোষ কবুল করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। মাকে নিয়ে আমাদের মধ্যে একটা মজার কথা প্রচলিত ছিল। আমরা বলতাম, মা বাসায় থাকলে ভুলেও বাড়িতে কাক-চিল বসে না। তবে মজার বিষয় হলো, ঘরের বাইরে মা ছিলেন অতি মার্জিত, ভদ্র, কঠোর কিন্তু শান্ত মেজাজের মানুষ।
বাবা ছিলেন গৌরবর্ণের ঋষি পুরুষ। জেলের ভেতর দেখা করার সময় পার হলে সোজা হেঁটে যেতেন ভেতরে, যেন পেছনে কেউ নেই, কিছু নেই। আজ মনে হয়, হয়তো কষ্ট হতো তাঁর পেছনে ফিরে দেখতে, যেখানে চিন্তিত-বিষণ্ন স্ত্রী, শিশুকন্যা দাঁড়িয়ে আছে। রাজনীতিবিদদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়। ত্যক্তবিরক্ত হয়ে সব দায় তাঁদের ঘাড়ে চাপানোর খেলাও পুরোনো। কিন্তু একজন রাজনীতিবিদ আর তাঁর পরিবারই শুধু জানে ঠিক কিসের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাদের। রাজনীতিবিদদের দোষত্রুটি আছে, ভুলভ্রান্তি আছে, কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু হাজার দোষত্রুটি সত্ত্বেও রাজনীতিবিদের বিকল্প কেবল রাজনীতিবিদই, অন্য কেউ নয়। অবশ্য আমি যে সময়ের রাজনীতিবিদের কথা বলছি, তখনো রাজনীতিবিদেরা আজকের মতো লুম্পেন ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেননি। রাস্তার লোক রাজনীতি করে কোটিপতি—এটা হালের সংস্কৃতি। ঋণখেলাপি, কালোবাজারি, ব্যবসায়ী আর আয়ের কোনো বৈধ উৎস ছাড়াই কোটিপতি—এরাই সংসদের মেজরিটি।
![]() |
| গ্রাফিকস: প্রথম আলো |
Sunday, February 15, 2026
আমি একা এমপি হইনি, আমার পাঁচ লাখ ভোটার এমপি হয়েছেন -সাক্ষাৎকারে রুমিন ফারহানা
প্রথম আলো: শুরুতেই এই বিজয়ের বিষয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাই।
রুমিন ফারহানা: প্রথমেই আমি মহান সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি আমাকে মাঠে টিকে থাকার শক্তি ও সাহস দিয়েছেন। আমার এলাকার নেতা–কর্মী ও আসনের প্রত্যেক ভোটারের প্রতি আমি ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞ। তাঁরা আমাকে সাহস দিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন এবং পাশে থেকেছেন। তাঁরা অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন; শ্রম দিয়েছেন। একেকজন কর্মী কতটা কষ্ট করেছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। দিনের পর দিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেছেন। অনেকেই ঠিকমতো ঘুমাননি। এই জয় আমার একার নয়, এটি আমার নেতা–কর্মীদের জয়। এমনকি যাঁরা আমাকে ভোট দেননি, কঠোর সমালোচনা করেছেন বা অশোভন ভাষায় আক্রমণ করেছেন, তাঁদের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। কারণ, তাঁদের আচরণ অনেক সাধারণ মানুষকে আমার পক্ষে আরও দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করেছে। আমার আসনের প্রায় পাঁচ লাখ ভোটারের প্রত্যেকের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
প্রথম আলো: ভোট নিয়ে আপনার সন্তুষ্টি কতটা?
রুমিন ফারহানা: আমি পরিষ্কারভাবে বলছি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তা ছাড়া এই এলাকায় সুষ্ঠু ভোট সম্ভব হতো না। প্রশাসন পুরোপুরি আমার বিপক্ষে ছিল। প্রশাসন যেকোনো মূল্যে বিএনপির জোটের প্রার্থীকে জেতানোর চেষ্টা করেছে। শুরু থেকেই প্রশাসন আমার সঙ্গে বৈষম্যমূলক, অবমাননাকর আচরণ করেছে। বিএনপির নেতা–কর্মীরা সমানে আইন ভঙ্গ করলেও প্রশাসন চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। প্রশাসন কানা–বোবা হয়ে ছিল। তবে সেনাবাহিনী কার্যকর ভূমিকায় না থাকলে আমি ভোট করতে পারতাম না। পুলিশও সহযোগিতা করেছে। যেখানেই অনিয়ম হয়েছে, আমি সেনাবাহিনীকে জানিয়েছি। তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছে। কেউ আমার কাছে কোনো অনৈতিক সুবিধা দাবি করেনি, আমিও কাউকে কিছু দিইনি।
প্রথম আলো: আপনি বিএনপির রাজনীতি করতেন। দল মনোনয়ন না দেওয়ায় স্বতন্ত্র নির্বাচন করলেন। ধানের শীষে নির্বাচন না করায় ভোটের মাঠে কি কোনো প্রভাব পড়েছিল?
রুমিন ফারহানা: নিশ্চিতভাবেই ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। তার কারণ, গত ১৮ মাসে বিএনপি যা করেছে, আমি যদি তাদের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতাম, সেই কর্মকাণ্ডের দায় আংশিকভাবে আমার ওপরও আসত। তবে আমি ওই সময় প্রকাশ্যে অনেক বিষয়ে সমালোচনা করেছি। ফলে দল মনোনয়ন না দেওয়াটা আমার জন্য এক অর্থে আশীর্বাদই হয়েছে। আমার ব্যক্তিগত কাজ, পারিবারিক ঐতিহ্য ও এলাকার মানুষের আস্থা—এসব মিলিয়েই আমি জয় পেয়েছি। বিএনপির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকাটা আমার জন্য সুবিধাজনক হয়েছে বলেই মনে করি।
প্রথম আলো: নির্বাচনের সময় আপনাকে ও আপনার সহযোগীদের বহিষ্কার করা হয়েছিল। ভবিষ্যতে দল ফেরাতে চাইলে আপনার অবস্থান কী হবে?
রুমিন ফারহানা: এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্তভাবে কিছু ভাবিনি। সময়ই সিদ্ধান্ত দেবে।
প্রথম আলো: আপনার জয়ে নারী ভোটারদের ভূমিকা কতটা ছিল?
রুমিন ফারহানা: নারীদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি ছিল। অনেকে বলছেন, স্বামী হয়তো অন্য প্রার্থীকে সমর্থন করেছেন, তবে স্ত্রী বলেছেন, তিনি আমাকে ভোট দেবেন। আমি নারী ভোটারদের আশ্বাস দিয়েছি, তাঁরা সহজে আমার কাছে আসতে পারবেন; নিজেদের সমস্যা জানাতে পারবেন এবং আমি তাঁদের পাশে দাঁড়াব, যা অন্য অনেক প্রার্থীর পক্ষে কঠিন। নারীরা আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। বলা যায়, তাঁদের একচেটিয়া সমর্থন আমি পেয়েছি। তাই তাঁদের প্রতি আমার দায়বদ্ধতাও অনেক বেশি।
প্রথম আলো: ভোটের প্রচারণায় আপনি অনেক সাধারণ মানুষের আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে যদি বলেন...
রুমিন ফারহানা: গত দুই সপ্তাহে আমার এলাকায় ৪০-৫০টি কর্মসূচি হয়েছে। সপ্তাহে দু-তিনটিও হয়েছে। একটি টাকাও নেতা–কর্মীরা আমার কাছ থেকে নেননি। নির্বাচনের সময় দরিদ্র মানুষ এক হাজার টাকা এনে দিয়েছেন। মধ্যবিত্তরা এক-দুই লাখ টাকা দিয়েছেন। অনেক প্রান্তিক মানুষ তাঁদের এক বছরের সঞ্চয় এনে দিয়েছেন। আমি নিতে চাইনি, তবু তাঁরা জোর করে দিয়েছেন। এ কারণে আমি বলি, আমি একা এমপি হইনি, আমার পাঁচ লাখ ভোটার এমপি হয়েছেন।
প্রথম আলো: সংসদ সদস্য হিসেবে আপনার কাজের তালিকায় অগ্রাধিকার কী থাকবে?
রুমিন ফারহানা: আমার প্রথম অগ্রাধিকার অবকাঠামো, বিশেষ করে রাস্তাঘাট। দ্বিতীয়ত, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। আমাদের এখানে গ্যাসক্ষেত্র আছে, কিন্তু অনেকের ঘরে গ্যাস নেই। আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ গ্যাস পাবে, এটা নিশ্চিত করতে চাই। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, মন্দির-মসজিদসহ শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকায়ন করতে চাই। আশুগঞ্জ একটি বাণিজ্যকেন্দ্র। এখানে গ্যাস, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও বন্দর আছে। এসব সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে চাই, যাতে কর্মসংস্থান তৈরি হয়।
প্রথম আলো: সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলা সদরকে পৌরসভা করার বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পাবে?
রুমিন ফারহানা: অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে চাই।
প্রথম আলো: এবারের সংসদেও নারী প্রতিনিধিত্ব কম থাকছে। নারীর অধিকার ও সম–অধিকার নিয়ে আপনি কতটা সোচ্চার থাকবেন?
রুমিন ফারহানা: আমি অবশ্যই সোচ্চার থাকব। তবে এটিও মনে রাখতে হবে যে কারও অধিকার কেউ কাউকে এনে দেয় না, অর্জন করে নিতে হয়। ধরুন, আমাকে তো দল মনোনয়ন দেয়নি। দল কি জানত না, আমার এলাকায় আমার কী অবস্থান? আর যদি না জেনে থাকে, সেটা দলের ব্যর্থতা। কিন্তু দল মনোনয়ন দেয়নি। আমাকে দাঁড়িয়ে যেতে হয়েছে আল্লাহ্র ওপর ভরসা করে; মানুষের ওপর ভরসা করে। বিএনপি নারীদের বিষয়ে খুব সম–অধিকারের কথা বলে। আমরা তো দলে এ কারণেই গিয়েছিলাম যে নারী হিসেবে আমি বৈষম্যের শিকার হবে না। তারা কেন ৩ শতাংশ নারী মনোনয়ন দেয়? বিএনপিতে নারীদের এই অবস্থান জানলে আমি কখনোই বিএনপি করতাম না।
প্রথম আলো: জাতীয় সংসদে আপনি স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে থাকবেন। সরকারি দলে থাকলে কি সুবিধা বেশি হতো?
রুমিন ফারহানা: আমি তা মনে করি না। বরাদ্দ সবার জন্য সমান। সততার সঙ্গে কাজ করতে চাইলে স্বতন্ত্র হিসেবেও সম্ভব। কেউ যদি অযথা বাধা দেন, তার জবাব জনগণ দেবে।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
রুমিন ফারহানা: আপনাদেরও ধন্যবাদ।
![]() |
| রুমিন ফারহানা |
Thursday, February 12, 2026
নিজের তিন কর্মীকে বিনা দোষে আটকের অভিযোগ রুমিন ফারহানার
আজ সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে শাহবাজপুর উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রুমিন ফারহানা নিজের ভোট দেওয়ার পর সাংবাদিকদের এসব অভিযোগ করেন।
ভোট কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে রুমিন ফারহানা বলেন, ভোট শুরু হয়েছে দুই ঘণ্টা হয়েছে। সারা দিনের ভোট বাকি। ফলে এখনই বলা যাবে না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমার তিনজন কর্মীকে বিনা দোষে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া নয়টি ভোটকেন্দ্রে আমার এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি আমি পুলিশ আর্মি ও প্রশাসনকে জানিয়েছি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকাল রাত ১ টার পর আশুগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও পূর্ব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র থেকে আনোয়ার হোসেন মৃধা ও নূর আলমকে আটক করে পুলিশ। আর গত রাতে আশুগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের সোহাগপুর আছিয়া সফিউদ্দীন আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্র থেকে যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা নাছির মুন্সিকে আটক করে পুলিশ। তারা তিনজন রুমিন ফারহানার পক্ষের কর্মী।
জানতে সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মনজুর কাদের ভূইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ভোট কেন্দ্রে নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের আটক করা হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ৯ জন প্রার্থী থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আটজন। এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা ও বিএনপি জোটের প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবের মধ্যে। জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য জিয়াউল হক মৃধা গত রোববার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।
![]() |
| ভোট দিচ্ছেন রুমিন ফারহানা। ছবি: প্রথম আলো |
Monday, January 26, 2026
‘জাল ভোট ও কারচুপি প্রতিরোধে কেন্দ্রের পাহারায় থাকবেন’
আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়া তথা সরাইল আশুগঞ্জের এই অবস্থা কেন। আমি যদি বলি আমাদের এই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শিক্ষা-দীক্ষা সংস্কৃতি ইতিহাস ঐতিহ্য রাজনীতি সর্বদিকে বাংলাদেশের টপ জেলার মধ্যে একটি। তারপরও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এমন দুর্দশা কেন? আমি তো অন্তত স্বতন্ত্র হই আর যা-ই হই এই দুর্দশা মেনে নেবো না। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৫ বছর পরও আমাদের এই এলাকা আদৌ আলোর মুখ দেখেনি। আমাকে একটিবার সুযোগ দেন। নতুন করে জাগরণের লক্ষ্যে এইবারের ভোটটা আমার হাঁস মার্কায়-ই হবে। ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন এক বোন বলেছেন, হাঁস পালনে দ্রুত বংশ বৃদ্ধি পায়। ডিমও দেয়। ভালো আয়ও করা যায়। আমার মা-বোন যেন ঘরে বসেই সংসারের কিছু খরচ রোজগার করে দিতে পারেন। অবসর সময়ে সেই প্রশিক্ষণ আমরা দেয়ার ব্যবস্থা করবো, ইনশাআল্লাহ্। এলাকার উন্নয়ন ও রাস্তাঘাট সম্পর্কে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সবচাইতে অবহেলিত দুই উপজেলা সরাইল ও আশুগঞ্জ। সরাইলের মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত হচ্ছে এই পাঁচ গ্রাম। আজকে দেড়/দুই ঘণ্টা গাড়িতে নৌকায় ২০ মিনিট তারপর আধা ঘণ্টা থেকে ৪৫ মিনিট আবার সিএনজিতে। তাহলে আমার প্রিয় ভাই বাবা চাচা মা চাচি ও বোনেরা এখান থেকে কীভাবে যাতায়াত করেন? আমি আজকে আমার প্রথম নির্বাচনী সভা থেকে ওয়াদা করছি- এমপি হতে পারলে ভূঁইশ্বর থেকে পরমানন্দপুর পর্যন্ত পাকা রাস্তা ও ব্রিজ করে দেবো। এখানকার ভাইয়েরা তাদের কোটি টাকা মূল্যের ভোট দিয়ে এমপি মন্ত্রী বানায়। তারা হয়তো তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। আমাকে স্থানীয় একজন মুরুব্বি বললেন, একটা স্কুল ও কলেজ হয়েছে। কিন্তু স্কুল কলেজে কাজ আটকে থাকলে তো হবে না। এটা যদি একটি দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন এলাকা হয়, তাহলে মানুষ কীভাবে উন্নয়নের ছোঁয়া পাবে? কী করে আধুনিক জীবনযাত্রার ছোঁয়া পাবে। এর আগে রুমিন ফারহানা একই ইউনিয়নের কালিশিমুল গ্রামে এক সংক্ষিপ্ত নির্বাচনী সভায় হাঁস মার্কা বিষয়ে বলেন, ‘এই মার্কা উপর থেকে কোনো ওহি নাজিল হয়ে হঠাৎ কইরা একজন অজানা মানুষকে বসাইয়া দেয়ার মার্কা নয়। এই মার্কা এমন একজন মানুষের মার্কা, যাকে গত ১৫ বছর অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপনারা লড়াই করতে দেখেছেন। যখন আপনাদের ভোট চুরি হয়ে গেছে। তখন হাঁস মার্কার প্রার্থী একা হয়েও দাঁড়িয়ে সংসদে প্রতিবাদ করেছে। ৫৫ বছর আপনারা ভোট দিয়েছেন ঠিকই।
কিন্তু এলাকার কোনো পরিবর্তন হয়নি। হাঁস মার্কা হলো সেই পরিবর্তন সূচনা করার মার্কা। হাঁস মার্কা সাধারণ মানুষের মার্কা। কোনো দলের নয়, জনগণের মার্কা। অন্যায়ের বিরুদ্ধের মার্কা। হাঁস মার্কা দুর্নীতির বিরুদ্ধের মার্কা।’ তিনি সভায় উপস্থিত গ্রামবাসীকে অনুরোধ করে বলেন, আপনাদের ৩৩০০ ভোটের মধ্যে যেন ৩ হাজার ভোট কাস্ট হয়। আর সেই ৩ হাজার ভোটই যেন হাঁস মার্কায় হয়। আমার এলাকার সাধারণ ভোটার দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষদের মার্কা হাঁস। আপনার নিজের অস্তিত্বের প্রশ্নে, এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে, পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে এই মার্কায় ভোট দেবেন। এটি চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য, জায়গা দখল বাণিজ্য ও অবৈধভাবে বালু বাণিজ্য প্রতিরোধের মার্কা। মনে রাখবেন আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি একটা জাল ভোটও যেন কেউ দিতে না পারে। একটি কেন্দ্রেও যেন কোনো ধরনের কারচুপি না হয়। আপনারা সবাই ভোটের পাহারায় থাকবেন।

Sunday, January 25, 2026
আমি স্বতন্ত্র হই আর যা-ই হই, এই দুর্দশা মেনে নেব না: রুমিন ফারহানা
শুক্রবার সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম পরমানন্দপুরে নির্বাচনী জনসভায় এসব কথা বলেন রুমিন ফারহানা।
রুমিন ফারহানা ‘হাঁস’ প্রতীক পাওয়ার পর আজ শুক্রবার সরাইল উপজেলার পরমানন্দপুর গ্রামে প্রথম নির্বাচনী প্রচারণায় নামেন। সেখানে জনসভায় তিনি বলেন, ‘আল্লাহ যদি আমাকে আপনাদের উসিলায় এমপি করেন, যে-ই সরকারে আসুক না কেন, আমি একজন স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে সরকারকে বাধ্য করব এই এলাকার উন্নয়ন করার জন্য। স্কুল–কলেজ–মাদ্রাসা, মন্দির–মসজিদের উন্নয়নের জন্য কেবল সরকারি বরাদ্দ নয়, আমি আমার নিজস্ব উদ্যোগে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, যেন এই অবহেলিত জনপদের উন্নয়ন হয়।’
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আজকে এই পাঁচ গাঁও (পরমানন্দপুর, বরইচারা, ফতেহপুর, হরিপুর ও ষাটবাড়িয়া) থেকে আমার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হচ্ছে। আমরা জানি, সরাইল-আশুগঞ্জ উপজেলা দুটো বাংলাদেশের মধ্যে সবচাইতে অবহেলিত উপজেলা। আমি বলেছি, এই দুই উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে অবহেলিত এলাকা কোনটি। আমাকে বলা হলো—এই পাঁচ গাঁও। আমি আজকে দেড়–দুই ঘণ্টা গাড়িতে যাত্রা করছি, ২০ মিনিট নৌকায় যাত্রা করছি। তারপর ৪৫ মিনিট থেকে প্রায় এক ঘণ্টা অটোরিকশায় যাত্রা করছি, তা–ও আবার বালুর রাস্তা। সমাবেশে আইসা আমি বলি, মা-বইনেরা যেমন ভর্তা বানায়, আমি সে রকম ভর্তা হইয়া গেছি। তাইলে আমার মা-বোন-ভাইয়েরা, তারা কী করে চলাচল করে?’
এলাকার উন্নয়নের অঙ্গীকার করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমি আজকে আমার প্রথম নির্বাচনী জনসভা থেকে ওয়াদা করছি, ভূইশ্বর থেকে পরমানন্দপুর সড়কে একটা ব্রিজ করে দেওয়া আমার নির্বাচনী ওয়াদা। শুধু ব্রিজ নয়, আমাদের পাকা রাস্তাও হইতে হবে। এই এলাকাটা যদি দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন এলাকা হয়, তাহলে মানুষ কীভাবে উন্নয়নের ছোঁয়া পাবে? মানুষ কী করে আধুনিক জীবনযাত্রার ছোঁয়া পাবে? আমি আমার প্রথম নির্বাচনী জনসভা থেকে আশ্বস্ত করছি, এখানে (পাঁচ গ্রামে) সেতু ও পাকা রাস্তার ব্যবস্থা করব।’
ভোটারদের উদ্দেশে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘হাঁস হইল সমৃদ্ধির প্রতীক, হাঁস হইল ভাগ্য পরিবর্তনের প্রতীক, হাঁস হইল নতুন শান্তির প্রতীক। সুতরাং এইবারের ভোটটা হাঁস মার্কায় হবে। আপনারা একটিবার সুযোগ দিন। এইবারে ভোটটা আমার হাঁস মার্কায় চাই।’
নির্বাচনী জনসভায় সভাপতিত্ব করেন পাকশিমুল ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড শাখা বিএনপির সভাপতি সিরাজ খান। উপস্থিত ছিলেন সরাইল উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আইয়ুব হোসেন সরদার, উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি হোসেন মিয়া, উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক উসমান খাঁন, উপজেলা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল বারেক প্রমুখ।
![]() |
| ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় সরাইল উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়নের পরমানন্দপুর গ্রামের মসজিদসংলগ্ন মাঠে। ছবি: প্রথম আলো |
Sunday, January 18, 2026
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২: নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে রুমিন ফারহানা, ‘দিস ইজ দ্য লাস্ট টাইম, আই ওয়ার্নিং ইউ’
উপজেলা প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন বলেন, আজ বিকেলে ইসলামাবাদ গ্রামে উঠান বৈঠক করছিলেন রুমিন ফারহানা। তিনি বক্তব্য রাখার একপর্যায়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে নিয়ে সেখানে হাজির হন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরিয়ার হাসান খান । এ সময় রুমিন ফারহানা বৈঠকস্থলের পাশে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এ–সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উদ্দেশে রুমিন ফারহানাকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি পারলে থামাই দেন। আজকে আপনাকে ভদ্রতার সঙ্গে বলছি। নেক্সট টাইম কিন্তু ভদ্রতা দেখাব না।’ এ সময় পাশে থাকা এক ব্যক্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচিয়ে বলতে শোনা যায়, ‘আপনাদের তারা বুইড়া আঙুল দেখায়, আপনারা কিছুই করতে পারেন না।’ এ সময় রুমিন ফারহানা বৃদ্ধাঙ্গুলি উঁচিয়ে বলেন, ‘আপনাদের তারা এই রকম দেখায়।’
এ সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে বলতে শোনা যায়, ‘কে এমন করে?’ প্রত্যুত্তরে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘খোঁজ নেন, প্রশাসনে বইসা আছেন। আমি যদি না বলি, এখান থেকে বাইর হইতে পারবেন না। এক্সকিউজ মি স্যার, দিস ইজ দ্য লাস্ট টাইম, আই ওয়ার্নিং ইউ।’ তখন ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ‘আচরণবিধি ভঙ্গ হলে আমাদের তো আসতে হবেই।’ উত্তরে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘সব জায়গাতেই হচ্ছে। আপনারা কিছুই করতে পারেন না।’ এ সময় রুমিন ফারহানার অনুসারীরা ‘ঠিক, ঠিক’ বলে চিৎকার করতে থাকেন।
আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান ও উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আলমগীর খাঁর বিরুদ্ধে ১৩ জানুয়ারি জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে আচরণবিধি ভঙ্গের লিখিত অভিযোগ দেন রুমিন ফারহানা। এর পরদিন হাবিবুর রহমান এক সমাবেশে ওই অভিযোগকে ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি’ দেখান।
রুমিন ফারহানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার প্রতিপক্ষের জোটের প্রার্থী ও তার লোকজন প্রতিদিন স্টেজ করে সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করে আইন ভঙ্গ করছে। আমাকে আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক টিস্যু পেপার বলছে, নর্তকী বলছে। আমি অভিযোগ দিয়েছি। এর উত্তরে তারা বৃদ্ধাঙ্গুল দেখাচ্ছে, আমি বিষয়টি ম্যাজিস্ট্রেটকে স্যার সম্বোধন করে বলেছি। তারা (প্রশাসন) আমার প্রতিটি উঠান বৈঠকে আইনের অপপ্রয়োগ করছে। আমি একটি হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করি, কোনো স্টেজ করি না। এতে প্রতিদিন বাধা দিচ্ছে, জরিমানা করছে। আজ ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। এর আগেও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। কিন্তু তাদের কোনো বাধা দিচ্ছে না।’
সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা আবু বকর সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আচরণবিধি ভঙ্গ করায় তাঁকে (রুমিন ফারহানা) অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আইন সবার জন্য সমান। আমরা আশা করি, সবাই আইন মেনে চলবেন। ওনার যদি অভিযোগ থাকে, তবে উনি অভিযোগ দিতে পারেন।’
সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক ছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী হতে দীর্ঘদিন ধরে মাঠে ছিলেন। কিন্তু আসনটিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে জোটের প্রার্থী করা হয়েছে। দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে রুমিন ফারহানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় গত ৩০ ডিসেম্বর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
![]() |
| নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে রুমিন ফারহানার বাগবিতণ্ডার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত |
ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসন: কিছু কেন্দ্রে ভোট আগের রাতে করে ফেলার পরিকল্পনা হচ্ছে: রুমিন ফারহানা
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সরাইল উপজেলা সদরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আলীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে কর্মী–সমর্থকদের উদ্যোগে আয়োজিত এক উঠান বৈঠকে রুমিন ফারহানা এ কথা বলেন।
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আল্লাহ যদি আপনাদের ভোটে আমাকে সরাইল–আশুগঞ্জের এমপি নির্বাচিত করেন, সরাইল–আশুগঞ্জে আমি পৌরসভা করার উদ্যোগ গ্রহণ করব। শুধু তা–ই নয়, আমি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সবার জন্য ভালো স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করব। এলাকার রাস্তাঘাট, স্কুল–কলেজ, মসজিদ–মাদ্রাসার উন্নয়ন করব ইনশা আল্লাহ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গ্যাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় না দিয়ে অন্যখানে যেতে দেব না। যদি করতে না পারি, পাঁচ বছর পর আপনারা আমাকে আর ভোট দিয়েন না।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনের এই স্বতন্ত্র প্রার্থী বলেন, ‘অনেকে বলেন, স্বতন্ত্র এমপি হলে আপনি কীভাবে উন্নয়ন করবেন? আমি বলি, স্বতন্ত্র হই আর যা–ই হই। ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা কিন্তু আমাদের আছে। সুতরাং সরকারের কাছে যদি আমার এলাকার মানুষের ন্যায্য দাবি নিয়া যাই, আর সরকার যদি সেইটা না শোনে, তবে ঢাকা–সিলেট হাইওয়ে সড়কের আশুগঞ্জ থেকে বুধন্তি পর্যন্ত (৩৪ কিলোমিটার) বন্ধ করে দেব।’
ভোটারদের উদ্দেশে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমার অসুস্থ মাকে ঢাকায় আল্লাহর হাওলা করে রেখে আসছি। আপনারা যদি আমারে ফিরাইয়া দেন, তবে আমার আর যাওয়ার জায়গা নাই। আমি আপনাদের দিকে তাকাইয়ে দলের ডাক শুনি নাই। আমি আপনাদের দিকে তাকাইয়ে ঢাকা শহরের আরাম–আয়েশের জীবন ফালাইয়ে এইখানে আসছি। আপনারা যদি আমাকে আপনাদের কাছে টেনে না নেন, আমার চারপাশে আর কিচ্ছু থাকবে না। আগামী ১২ তারিখ পর্যন্ত আপনারা আমার ভোটের আমানতকারী হবেন। আমার ভোটের জিম্মা আমি আপনাদের হাতে দিলাম।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনে বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। রুমিন ফারহানা এই আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। গত ৩০ ডিসেম্বর তাঁকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়।
![]() |
| উঠান বৈঠকে কথা বলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সরাইল উপজেলা সদরের আলীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে। ছবি: প্রথম আলো |
Tuesday, January 13, 2026
দলের পদ গেলেও এলাকার মানুষ আমাকে ছেড়ে যায় নাই: রুমিন ফারহানা
আজ সোমবার বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শাখাইতি গ্রামে এক উঠান বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমাকে যখন দল মনোনয়ন দেয়নি, তখন অনেকেই আমাকে বলেছেন, আপনি তো সংরক্ষিত আসনে এমপি হতে পারতেন, আপনি তো উচ্চকক্ষেও যেতে পারতেন। আপনি কেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হইলেন? দল যদি ক্ষমতায় যায়, আপনার তো অনেক ভালো অবস্থা হইতে পারত। এসব ছেড়ে কেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেন? আমি বললাম, এলাকার মানুষের কষ্ট, পরিশ্রম, তাঁদের অর্থ ব্যয়, তাঁদের ভালোবাসা ও আমার প্রতি তাঁদের বিশ্বাস আমাকে আজকে এত দূর নিয়ে আসছে।’
বিএনপি থেকে বহিষ্কারের বিষয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আজকে দল নেই বলে আমি আমার মানুষদের ফালাই দিয়ে চলে যাব—আমি সেইটা করব না। এই কারণেই দলে আমার পদ গেছে। আমি বলেছি, পদ গেছে ঠিক আছে, আমার মানুষ তো আছে। দল যদি জোটকেও দেয়, আমার মানুষের ভালোবাসা তো আমাকে ঘিরে রাখছে। সুতরাং আপনারা যতক্ষণ আমার পাশে আছেন, পৃথিবীর কোনো শক্তি নাই ইনশা আল্লাহ আমাকে আমার লক্ষ্য থেকে সরাই দেয়। আমার লক্ষ্য হচ্ছে, অবহেলিত সরাইল-আশুগঞ্জ উপজেলা দুটিকে মডেল উপজেলা করা।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের এই স্বতন্ত্র প্রার্থী বলেন, ‘আপনাদের বাপ-দাদাদের ভোটে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আমার বাবা (ভাষাসংগ্রামী অলি আহাদ) স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে এই আসন থেকে জয় পেয়েছিলেন। কিন্তু আমার বাবাকে কাজ করতে দেওয়া হয় নাই। আমার বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল। আমি বিজয়ী হয়ে আমার বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনে বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। রুমিন ফারহানা এই আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। গত ৩০ ডিসেম্বর তাঁকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়।
![]() |
| উঠান বৈঠকে বক্তব্য দেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। আজ সোমবার বিকেলে সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের শাখাইতি গ্রামে। ছবি: প্রথম আলো |
Friday, January 9, 2026
'এটা আমার নতুন অধ্যায়ের সূচনা'- বহিষ্কারের আদেশের পর বললেন রুমিন ফারহানা
তবে যেহেতু স্বতন্ত্র নির্বাচন করছেন, তাই বহিষ্কারের ঘটনা ঘটবে জানতেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মঙ্গলবার ভোরে খালেদা জিয়া মারা যান। পরে সকাল এগারোটায় বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির এক বৈঠকে মিজ ফারহানাসহ নয়জনকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরে গতকালই বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করায় মিজ ফারহানাসহ নয় জনকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
মিজ ফারহানা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বহিষ্কার আদেশ এসছে এটা স্বাভাবিক। এটাতো হবেই। তবে উনি যেদিন চলে গেলেন সেদিনই বহিষ্কার আদেশ আসাটা, এটাকে আমি বলবো যে, এটা আল্লাহর একটা ইশারাও বটে।"
"যিনি আমাকে এনেছিলেন, যার ছায়ায় আমি ছিলাম, তিনি যেদিন চলে গেলেন, বিএনপির সাথে আমার যাত্রাও সেদিনই শেষ হলো," বলেন তিনি।
শোকের দিনে স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠক নিয়ে প্রশ্ন
বাবা অলি আহাদ মারা যাওয়ার পর ২০১২ সালে রাজনীতিতে হাতেখড়ি পেশায় আইনজীবী মিজ ফারহানার। বাবা রাজনীতিবিদ হলেও বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না।
ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহালের দাবিতে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন করছিলো। সে সময় বিএনপির আন্তর্জাতিক কমিটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে পথচলা শুরু করেছেন মিজ ফারহানা।
পরবর্তী সময় মিজ ফারহানাকে বিএনপির পক্ষে গণমাধ্যমে বেশ সরব হয়ে উঠতে দেখা গেছে।
২০১৮ সালের নির্বাচনের পর বিএনপির মনোনীত সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য রুমিন ফারহানার সংসদে একটি বক্তব্য নিয়ে মূলত ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। মিজ ফারহানা তার বক্তব্যের শুরুতেই যখন বলেন যে, এই সংসদ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়, তখন সরকার দলীয় সংসদ সদস্যরা ব্যাপক শোরগোল শুরু করেন।
ওই সময় নানা ইস্যুতে সংসদ অধিবেশনে মন্তব্যের কারণে রুমিন ফারহানা আলোচনায় ছিলেন। একপর্যায়ে সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউটও করেন তিনিসহ বিএনপির এমপিরা।
মিজ ফারহানা জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার 'আহ্বানে, অভিভাবকত্বে এবং ছায়ায়' গত ১৭ বছর বিএনপির সাথে ছিলেন।
অনেক সময়ই বয়স এবং অভিজ্ঞতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলেও খালেদা জিয়া তাকে দলে অনেক বড় বড় কাজ দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিনেই বিএনপির বৈঠক করে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে রুমিন ফারহানা বলেন, "সাধারণত বাঙালি সংস্কৃতি বলেন বা পশ্চিমা সংস্কৃতিই বলেন, মৃত্যুর একটা ভাবগাম্ভীর্য আছে। এরকম দিন আমরা সাধারণত কোনো রকম সিদ্ধান্তে যাই না"।
"খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিন, যেখানে রাষ্ট্রীয় শোক... সেদিন দলের স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং হওয়া, বহিষ্কার আদেশ আসা... আমি জানি না, বাংলাদেশের মানুষ এটাকে কীভাবে নেবে," বলেন সদ্য বহিষ্কৃত এই বিএনপি নেত্রী।
এই বহিষ্কার আদেশই বিএনপির সাথে মিজ ফারহানার 'যাত্রা শেষের ক্লিয়ার ইনডিকেশন' বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির যে রাজনীতি তাতে তার অবস্থান কোথায়? এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি তিনি।
জীবনে ' নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও নতুন যাত্রা '
দলীয় সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই গত ১০ বছর ধরে ব্রাক্ষণবাড়িয়া - ২ আসনে নির্বাচনের জন্য রাজনীতি, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিলেন বলে দাবি করেন মিজ ফারহানা।
এর আগে, ওই আসনে ২০১৮ সালে বিএনপি নেতা উকিল আব্দুস সাত্তার নির্বাচন করেছিলেন।
পরে ২০২৩ সালে মি. সাত্তার দল পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
সে সময় ওই আসনে নির্বাচন করতে দলের হাই কমান্ড নির্দেশ দিয়েছিল বলে দাবি করেন রুমিন ফারহানা।
আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার ওই আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের এক নেতাকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে।
পরে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন মিজ ফারহানা।
"আমি গত ১০ বছর ধরেই কাজ করছিলাম। এখন হঠাৎ করে জুনায়েদ আল হাবিব জোটের প্রার্থী আসাটা আমার জন্য একটু বিস্ময়কর ছিলো," বলেন তিনি।
বিএনপি মঙ্গলবার যে নয় জনকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানায় তাদের প্রত্যেকেই আগামী সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন।
তবে, বিএনপিতে দলীয় রাজনীতির সমাপ্তি হলেও মিজ ফারহানা এটিকে তার জীবনে 'নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও নতুন যাত্রা' বলে মনে করেন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জোটের প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কতটুকু সাড়া পাবেন এমন প্রশ্নে জানান, এলাকার মানুষের চাওয়ার প্রেক্ষিতেই একা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
"রাজনীতিতে এমপি বা মন্ত্রী হওয়া এগুলো একেকটা ঘটনা। কিন্তু রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা অনেক বড় একটা ব্যাপার। আমি একজন রাজনীতিবিদ হতে চাইছি," বলেন মিজ ফারহানা।

Tuesday, December 30, 2025
মনোনয়নপত্র দাখিল করে রুমিন ফারহানা বললেন, ‘এই ভোট হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানা।
আজ সোমবার দুপুরের পর রুমিন ফারহানা নিজে উপস্থিত হয়ে সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আবুবকর সরকারের কাছে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।
মনোনয়নপত্র দাখিলের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের বোঝার বাইরে। আল্লাহর এই পরিকল্পনায় আমার বাবা ৭৩ সালে আওয়ামী লীগের জোয়ারের বিপক্ষে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছেন। রাব্বুল আলামিনের কী অদ্ভুত পরিকল্পনা! ২০২৬ সালে এসে ধানের শীষের জোয়ারের বিপক্ষে আমাকে স্বতন্ত্র লড়াই করতে হচ্ছে। আল্লাহর পরিকল্পনা ও তাঁর বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া মানুষের বোঝার বাইরে।’
এরপর সমর্থদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আপনারা যে মার্কা চান, সেই মার্কাই আমার, আপনারা কী মার্কা চান?’ উত্তরে অনুসারীরা বলে ওঠেন, ‘হাঁস’, ‘হাঁস’।
সরাইল-আশুগঞ্জ উপজেলাকে বাংলাদেশের অবহেলিত দুটি উপজেলা উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা প্রশ্ন তোলেন, ‘স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও সরাইল-আশুগঞ্জের অবস্থা বেহাল কেন? কেন কোনো সংসদ সদস্য এই বেহাল অবস্থার পরিবর্তন আনল না? সরাইল-আশুগঞ্জের মানুষ কেন তাদের ন্যায্য পাওনা বুঝে পাইল না?’
বিএনপিকে ইঙ্গিত করে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘এবার সময় আসছে পরিবর্তনের। এই ভোট হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এই ভোট হবে জুলুমের বিপক্ষে। এই ভোট হবে ১৭ বছর যেই মহিলা মাঠে ছিল, তার পক্ষে। এই ভোট হবে যখন আপনারা মামলা–হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তখন যে মানুষ আপনাদের পক্ষে সংসদে এবং সংসদের বাইরে কথা বলেছে, এই ভোট হবে তার পক্ষে।’
এর আগে গত বুধবার রুমিন ফারহানার পক্ষে সরাইলের ইউএনওর কাছ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন উপজেলা যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আলী হোসেন। আজ মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় রুমিন ফারহার সঙ্গে ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি হোসেন মিয়া উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক উসমান খাঁ ও উপজেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আইয়ুব হোসেনসহ কয়েক শ অনুসারী।
রুমিন ফারহানার মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবকারী হয়েছেন শাহবাজপুর ইউনিয়ন বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মোশাররফ হোসেন আর সমর্থনকারী হয়েছেন প্রচার সম্পাদক জোনায়েদ খান।
আজ বেলা দুইটার দিকে রুমিন ফারহানা উপজেলা সদরে উপস্থিত হন। এ সময় তাঁর শত শত অনুসারী, নেতা–কর্মী মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনে সরাইল উপজেলা সদরে উপস্থিত হন।
ধানের শীষের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনটি বিএনপির সমঝোতার মাধ্যমে শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে ছেড়ে দিয়েছে। এ আসনে প্রার্থী করা হয়েছে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনটি বর্তমানে সরাইল, আশুগঞ্জ এবং বিজয়নগর উপজেলার চান্দুরা ও বুধন্তী ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। রুমিন ফারহানার পৈত্রিক বাড়ি বুধন্তী ইউনিয়নে। বর্তমানে তিনি সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা।
আসনটিতে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৪৪৮ জন।
![]() |
| ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র জমা দেন রুমিন ফারহানা। সোবার দুপুর আড়াই দিকে তোলা ছবি। ছবি: প্রথম আলো |
Sunday, September 1, 2019
একজন রোহিঙ্গাও ফেরত পাঠানোর ক্ষমতা সরকারের নেই by রুমিন ফারহানা

কথাটা মনে পড়লো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক একটা মন্তব্য দেখে। দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন করতে ব্যর্থ হয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার যাবতীয় রাগ চাপিয়ে দেন রোহিঙ্গাদের ওপরে। ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি বলেন—‘এখন তো তারা খুব সুখে আছে। কিন্তু সুখে খুব বেশিদিন থাকবে না।’ শুধু সেটাও না, রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা অনেক দেশি-বিদেশি সংস্থার বিরুদ্ধেও তিনি বিষোদগার করেছেন, নজরদারিসহ ব্যবস্থা গ্রহণের এক ধরনের হুমকিও দিয়েছেন। অনুমান করি রোহিঙ্গা এবং ওইসব সংস্থার ওপরে রাগ চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের ব্যর্থতাজনিত মেজাজ খারাপ কিছুটা হলেও তার কমেছে।
এমন একটা জাতিগোষ্ঠী প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন তারা আরামে আছে যারা পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত, নিপীড়িত জনগোষ্ঠী। কুতুপালংয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছে এই মানুষগুলো, পাহাড় কেটে তৈরি করা এই শিবির অতিবৃষ্টিতে ভেঙে পড়ে মুহূর্তেই শত শত বা হাজার হাজার মানুষ মাটিচাপা পড়ে মারা যাওয়ার ঝুঁকিতেও আছে। অথচ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী তারা ‘আরামে আছে’। পৃথিবীর ইতিহাস বলে চূড়ান্তভাবে নিপীড়িত না হলে কেউ কখনও নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে শরণার্থীর জীবন বেছে নেয় না।
কতটা অমানবিক হলে, কতটা অসংবেদনশীল হলে একজন মানুষ এরকম একটা মন্তব্য করতে পারেন, সেটা ভাবতেও অবাক লাগে। অথচ এদের আশ্রয় দিয়েই খুব বাহবা কুড়ানো হয়েছিল মানবতার সেবা করার। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার পর অনেকে এটাকে ‘নোবেল’ পাওয়ার যোগ্য হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।
একটা সুখ অবশ্য রোহিঙ্গাদের আছে—তাদের বেঁচে থাকাজনিত সুখ। হোক একেবারে মানবেতর জীবন, তবুও কোনও সেনাবাহিনী এসে নির্বিচারে তাদের মেরে ফেলবে না, গ্রামের পর গ্রাম আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ঝলসে দেবে না, কিংবা তাদের নারীরা গণধর্ষণের শিকার হবে না কোনও সেনাবাহিনী বা আরেক জাতিগোষ্ঠী দ্বারা। মায়ের কোল থেকে দুধের শিশুকে কেড়ে নিয়ে কেউ শূন্যে ছুড়ে উল্লাস করবে না, মায়ের চোখের সামনে সন্তান কিংবা স্ত্রীর সামনে স্বামীকে নৃশংসভাবে হত্যা করবে না।
আমরা কেন এটা আশা করি বিনা শর্তে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতে পারবে, যেখানকার দুঃসহ স্মৃতি দগদগে ঘায়ের মতো এখনও তাদের তাড়া করে ফেরে! তাদের নাগরিকত্ব পাওয়া, তাদের জমিজমা ফেরত পাওয়া, ক্ষতিপূরণ পাওয়া, নিজভূমে নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া, রোহিঙ্গা পুলিশের সঙ্গে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন, অপরাধীদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার এসব নিশ্চয়তা না পেলে কেন তারা ফেরত যাবে? আমি যদি রোহিঙ্গা হতাম তাহলে তো আমি শর্তহীনভাবে ফেরত যেতাম না। জীবনের নিশ্চয়তাটুকু থাকলে মানবেতর জীবনযাপন, অন্য কোথাও জীবনের নিশ্চয়তাহীন জীবনের চাইতে ভালো, এমনকি সে জীবন যদি হয় রাজকীয় জীবনও।
বড় মাত্রায় রোহিঙ্গা সংকট বিবেচনায় নিলে ২০১৭ সালেরটি তৃতীয় ঘটনা। এর আগে ১৯৭৮ এবং ১৯৯২ সালে একইরকম ঘটনা ঘটেছিল। ঘটনাচক্রে দু’বারই বিএনপি ছিল ক্ষমতায়। এবং দু’বারই বাংলাদেশ অত্যন্ত সফলভাবে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে পেরেছিল। অন্যান্য অনেক কূটনৈতিক সাফল্যের সঙ্গে বিএনপি নিশ্চিতভাবেই এই সাফল্য খুব জোর গলায় দাবি করতে পারে।
অথচ এবার রোহিঙ্গারা আসার পর থেকে আমরা একের পর এক কূটনৈতিক ব্যর্থতা দেখতে পাচ্ছি। রোহিঙ্গাদের ওপরে ভয়ঙ্কর নিপীড়ন চালিয়ে দেশত্যাগে বাধ্য করা নিয়ে যখন হাতেগোনা কয়েকটি দেশ বাদে জাতিসংঘসহ সারা পৃথিবী সোচ্চার, তখন আমরা দেখলাম অবিশ্বাস্যভাবে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে একটা দ্বিপক্ষীয় অ্যারেঞ্জমেন্ট স্বাক্ষর করলো। জাতিসংঘসহ অনেক দেশই তখন বাংলাদেশের এই চুক্তি স্বাক্ষর করা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছিল।
বলা বাহুল্য এই স্বাক্ষর করাটা, বিষয়টাকে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে পরিণত করে। এতে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ নষ্ট হয়ে যায়। এই ব্যাপারে মিয়ানমারকে কোথাও কোনও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হলে তারা এই অ্যারেঞ্জমেন্টকেই সামনে নিয়ে এসে বলে এটা আমাদের দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বিষয়।
অবাক ব্যাপার এই সরকারই আবার যখন বাংলাদেশে কোনও শক্তিশালী দেশের মন্ত্রী বা সরকারপ্রধান সফরে আসেন তখন বাংলাদেশ থেকে প্রত্যেককে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে কাজ করার অনুরোধ জানানো হয়। সেই তথাকথিত অ্যারেঞ্জমেন্ট যদি অকার্যকর প্রমাণিত হয় (এটা আসলে প্রমাণিত হয়েছে অনেক আগেই) তাহলে এই তথাকথিত অ্যারেঞ্জমেন্ট আগেই বাতিল করা হয়নি কেন?
এই পরিস্থিতিতেই আরও অবিশ্বাস্য ঘটনা আছে। গত বছর বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য নতুন চুক্তি করে, তাতে সপ্তাহে ১৫০০ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার কথা বলা হয়। সহজ পাটিগণিত বলে এই সংখ্যায় রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়া হলে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত যেতে সময় লাগবে ১৫ বছরের বেশি। এভাবেই একের পর এক যাচ্ছেতাই চুক্তি করার নামে বাংলাদেশ সরকার মূলত মিয়ানমার সরকারের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। এমনকি মিয়ানমারের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে বাংলাদেশ এখন রোহিঙ্গা শব্দটিও ব্যবহার করে না। নতজানু পররাষ্ট্রনীতির এরচেয়ে বড় উদাহরণ খুব বেশি নেই।
ইতিহাস বোধসম্পন্ন এবং ভূরাজনীতি সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা রাখা একজন মানুষ রোহিঙ্গা ইস্যুর জটিলতা সম্পর্কে না বোঝার কারণ নেই। রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো নানারকম স্বার্থের হিসাবে জড়িয়ে পড়েছে। মালাক্কা প্রণালী বাইপাস করার স্বার্থে বিকল্প সমুদ্রবন্দর (কিউকপিউ) তৈরি করে জ্বালানি পরিবহন, রাখাইন প্রদেশের ওপর দিয়ে চীন পর্যন্ত সরাসরি জ্বালানি পাইপলাইন এবং রাখাইন প্রদেশের নানা অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি এসব কারণে চীনের খুব গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ আছে। আবার ভারতের পূর্বের সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোতে বিকল্প একটা পরিবহন পথের জন্য রাখাইনের সিত্তাউ বন্দর ব্যবহার করে কালাদান প্রজেক্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আবার যেহেতু এই দুই দেশ সেখানে জড়িয়েছে, তাই আরো অনেক দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না করার স্বার্থে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে অনেক রক্ষণশীলভাবে কথা বলছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কখনও ন্যায়নীতি বা মানবিকতার সঙ্গে জড়িত না, এটা একেবারেই স্বার্থের হিসাব। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো যে মিয়ানমারকে ছাড় দিচ্ছে, সেটা শুধু তাদের স্বার্থের কারণে। প্রশ্ন হলো একই দেশগুলো কেন আমাদের স্বার্থ দেখছে না? ভারত চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের তো ব্যবসাসহ নানা রকম স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা আছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে সেটা মিয়ানমারের তুলনায় অনেক বেশিও। কিন্তু আমরা তো কাউকে পাশে পেলাম না।
আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালে ব্যালট পেপারে একটি সিল পড়ার আগেই নির্বাচিত হয়ে গিয়েছিল। এরপর ২০১৮ সালে তো নির্বাচনের আগের দিন রাতে ব্যালট পেপারে সিল মেরে ন্যক্কারজনকভাবে ক্ষমতায় থেকে যায়। এভাবে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার কারণে তাদের পেছনে যেহেতু জনগণের শক্তি নেই, তাই নৈতিকভাবে দুর্বল সরকারটি কোনও শক্তিশালী দেশের সঙ্গে দরকষাকষিতে মোটেও সুবিধাজনক অবস্থায় থাকে না। তাদের মনে সারাক্ষণ ভয় কাজ করে, দেশের পক্ষে জনগণের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিতে গিয়ে তারা গদিচ্যুত হয়ে পড়ে কিনা।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন না হওয়ায় আজ এর ওপর কাল তার ওপর চাপিয়ে নানা কিছু সরকার করতে পারে। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান এই সরকার কিছু করতে পারবে না, এটা আমি স্পষ্টভাবেই বলতে চাই। এরকম ম্যান্ডেটহীন একটা সরকার যেকোনও আন্তরাষ্ট্রিক দরকষাকষিতে ন্যূনতম সুবিধা করতে পারবে, এরকম বিভ্রমে সরকারের অনুগত তথাকথিত কূটনীতিক এবং বিশ্লেষকরা ভুগলেও আমি ভুগি না।
![]() |
| রুমিন ফারহানা |
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2005)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...








