Wednesday, July 8, 2015

স্বস্তির সময়ে ‘বিশেষ আইন’ কেন? by এ কে এম জাকারিয়া

সেই ২০১০ সাল থেকে বিদ্যুৎ খাতের জন্য একটি বিশেষ আইন কার্যকর রয়েছে। এ পর্যন্ত দুই দফা এই আইনের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৪ সালে বাড়ানো হয়েছে আরও চার বছরের জন্য। ভারতের দুটি কোম্পানির সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপারে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর এই ‘বিশেষ আইনের’ বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে। ভারতীয় কোম্পানি দুটির সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে এই আইনের আওতায়। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এ ধরনের বিশেষ আইনের আওতায় তা করা যায় কি না। বা এর চেয়েও মৌলিক প্রশ্ন—এখন এই আইনের আদৌ দরকার আছে কি না।
২০০৯-১০ সালে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কী ছিল, সেটা আমাদের ভুলে যাওয়ার কথা নয়। যেভাবেই হোক, বিদ্যুৎ উৎপাদনের এমন একটি অবস্থান থেকে সরকার ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) বিল, ২০১০’ সংসদে উত্থাপন করে। লক্ষ্য হচ্ছে, ‘কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও গৃহস্থালি কাজের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করিবার লক্ষ্যে উহাদের উৎপাদন বৃদ্ধি, সঞ্চালন, পরিবহন ও বিপণনের নিমিত্ত দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের সুবিধার্থে এবং প্রয়োজনে বিদেশ হইতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আমদানি করিবার পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন এবং জ্বালানি-সম্পর্কিত খনিজ পদার্থের দ্রুত আহরণ ও ব্যবহারের নিমিত্ত অনুসরণীয় বিশেষ বিধান’ প্রণয়ন। সংসদে তা পাস হয়। তখন আইনটি হয়েছিল দুই বছরের জন্য।
যেকোনো ‘দ্রুত’ ও ‘বিশেষ’ আইনের নানা বিপদ থাকে। এ ধরনের আইনে দায়মুক্তির যে বিষয় থাকে, তা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির নীতির সঙ্গে মেলে না। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা ভাগ-বাঁটোয়ারার আশঙ্কা থাকে জোরালো। বিদ্যুৎ খাতের এই বিশেষ আইনে ‘সরকার ও সরকারি মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রণাধীন সব প্রতিষ্ঠান, এই আইনের অধীন বিদ্যুৎ বা জ্বালানির দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধি, সঞ্চালন, পরিবহন ও বিপণন-সংক্রান্ত যেকোনো পরিকল্পনা গ্রহণ বা বিদেশ হইতে বিদ্যুৎ বা জ্বালানি আমদানি ও উহার সঞ্চালন, পরিবহন ও বিপণন-সংক্রান্ত যেকোনো পরিকল্পনা গ্রহণ ও উহার দ্রুত বাস্তবায়নের নিমিত্ত যেকোনো প্রস্তাব গ্রহণ’ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে বলা আছে, ‘এই আইনের অধীনে কৃত বা কৃত বলিয়া বিবেচিত কোনো কার্য, গৃহীত কোনো ব্যবস্থা, প্রদত্ত কোনো আদেশ বা নির্দেশের বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালতের নিকট প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’ বা সবকিছুকেই ‘সরল বিশ্বাসে কৃত’ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ‘এই আইন বা তদাধীন প্রণীত বিধি, সাধারণ বা বিশেষ আদেশের অধীন দায়িত্ব পালনকালে সরল বিশ্বাসে কৃত বা কৃত বলিয়া বিবেচিত কোনো কার্যের জন্য কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনো প্রকার আইনগত কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না।’
এ ধরনের বিধানসহ ২০১০ সালে বিলটি যখন সংসদে ওঠে, তখন আইনজীবী শাহদীন মালিক এ ধরনের বিধানকে সামরিক আইনের বিধিবিধানের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘এটা দুঃখজনক যে আমাদের সংসদ সামরিক আইনের মডেলে আইন প্রণয়ন করছে।’ (দ্য ডেইলি স্টার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১০)। দুই বছরের জন্য পাস হওয়া সেই আইন প্রথম দফায় আরও দুই বছর বেড়েছে, দ্বিতীয় দফায় বেড়েছে আরও চার বছর। শুরুতে এই আইনের আওতায় ছোট ছোট ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়েছে। আর এখন চার হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের সমঝোতা স্মারক সই হচ্ছে!
‘বিশেষ’ আইন করা হয় বিশেষ পরিস্থিতিতে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এই আইন যখন করতে হয়েছিল, তখন আসলেই ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ বিরাজ করছিল। কমবেশি সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সর্বোচ্চ উৎপাদনক্ষমতা ছিল তিন হাজার ২০০ মেগাওয়াট। রাজধানী ঢাকায় তখন ১২ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের রেকর্ড আছে। এমন পরিস্থিতিতে এই বিশেষ আইনের লক্ষ্য ছিল দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন। সমালোচনা থাকলেও এই আইন কাজে দিয়েছে। সরকারের পক্ষে দ্রুত অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়েছে। সেই দুঃসহ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেছে।
আগেই বলেছি, ‘দ্রুত’ ও ‘বিশেষ’ আইনের কিছু বিপদ থাকে। দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলেও বিশেষ আইনের সুযোগ নিয়ে অনেক অযোগ্য উদ্যোক্তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ পেয়েছেন। নিয়ম মেনে ও নির্দিষ্ট সময়ে তাঁরা বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে পারেননি। ফলে ‘দ্রুত’ উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্যও সব ক্ষেত্রে পূরণ হয়নি। পরিস্থিতি বিবেচনায় এসব ‘বিপদ’ মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। এসবের বিনিময়ে আমরা লোডশেডিং থেকে মুক্তি পেয়েছি। এই যে স্বস্তির পরিস্থিতি, এর কৃতিত্ব নিশ্চয়ই সরকারের। কিন্তু অবস্থা যদি সত্যিই ‘স্বস্তির’ হয়, তবে ‘বিশেষ’ আইনটির এখন কী দরকার!
বিশেষ আইন বা ব্যবস্থা সব সময়ই স্বল্পমেয়াদি বিষয়। বিদ্যুৎ খাতের ২০০৯-১০ সালের সেই ‘বিশেষ পরিস্থিতি’ এখন আর নেই। ফলে দফায় দফায় এই আইনের মেয়াদ বাড়ানো এবং এখনো সেই আইন কার্যকর রেখে বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির ক্ষেত্রে তা কাজে লাগানোর কোনো সুযোগ নেই। সাধারণভাবে বললে, এ আইনের মূল ব্যাপারটি ছিল টেন্ডার এড়ানো ও সময় বাঁচানো। এখন সেই পরিস্থিতি নেই। বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে সরকারের এখন একটি মহাপরিকল্পনা। সেখানে ২০৩০ সাল নাগাদ ৩৮ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৪০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। কোন প্রাথমিক জ্বালানি থেকে কত শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে, তারও নির্দেশনা রয়েছে। এসব কোনো স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নয় যে এটা বাস্তবায়ন করতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিহীন এই বিশেষ আইনের দরকার পড়বে।
আর সবচেয়ে বড় কথা, দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি আমরা সামাল দিয়ে এসেছি। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে এখন আমরা যে বাস্তবতার মধ্যে রয়েছি, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিদ্যুৎ ও জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. তামিমের ভাষায় তা হচ্ছে ‘লিস্ট কস্ট এক্সপানশন’, অর্থাৎ সাশ্রয়ী সম্প্রসারণ। কুইক রেন্টালের মতো দামি ও ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবর্তে সাশ্রয়ী ও বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। এগুলো আর যা-ই হোক, ‘দ্রুত’ বিদ্যুৎ উৎপাদনের আওতায় পড়বে না। ভারতের যে দুটি কোম্পানির সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, এই ‘বিশেষ’ ও ‘দ্রুত’ আইনের আওতায় তার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ পেয়েছে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে (১০ জুন ২০১৫)। কিন্তু যদি তা বাস্তবায়নের দিকেও এগোয়, তার পরও সবকিছু ঠিক করে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘দ্রুত’ বিদ্যুৎ উৎপাদন আইনের আওতায় পড়ে কীভাবে?
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ভারতের দুই কোম্পানির সঙ্গে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী রিলায়েন্স গ্রুপ তৈরি করবে আমদানি করা এলএনজি (তরল গ্যাস)–নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র। চার ইউনিটে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে তিন হাজার মেগাওয়াট। অন্যদিকে, আদানি গ্রুপ তৈরি করবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। দুই ইউনিটে মোট উৎপাদন হবে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালে যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে, তার ২৫ ভাগ গ্যাস থেকে হওয়ার কথা। রিলায়েন্সের সঙ্গে সমঝোতার ক্ষেত্রে হয়তো এ বিষয়টি বিবেচনায় ছিল। কিন্তু আমদানি করা এলএনজিকে আবার গ্যাসে রূপান্তর করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কতটা সাশ্রয়ী হবে, সেটা অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। বিশ্ববাজারে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ কমে যাওয়ায় এলএনজির দামও কমেছে। কিন্তু বর্তমান দামের ওপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্তে আসা কঠিন। বছর খানেক ধরে তেলের দাম কম থাকলেও ২০১৬ সাল থেকে আবার তেলের দাম বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ৪ জুন ভিয়েনায় ওপেক তেলমন্ত্রীদের এক বৈঠকের সূত্রে তেল ও গ্যাসশিল্প-সংক্রান্ত নিউজ পোর্টাল রিগজোন এমনই ইঙ্গিত দিয়েছে। দেখা যাচ্ছে, বর্তমান দামেই ভারতের অন্ধ্রে তৈরি করা রিলায়েন্সের এলএনজি-নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন খরচ এত বেশি পড়ছে যে তা চালানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশে এ ধরনের প্রকল্প পোষাবে কীভাবে?
সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি মাথায় রেখেই মহাপরিকল্পনায় ৫০ ভাগ বিদ্যুতের উৎপাদন কয়লাভিত্তিক করার কথা বলা হয়েছে। আদানির সঙ্গে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমঝোতা স্মারকের বিষয়টি সেই বিবেচনায় মহাপরিকল্পনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। গুজরাটভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি এখন ভারতের বেসরকারি খাতে সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। গত মে মাসের হিসাব অনুযায়ী, আদানি এখন ভারতে কয়লাভিত্তিক মোট ১০ হাজার ৪৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
রিলায়েন্স বা আদানি—এ ধরনের যেকোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপারে সমঝোতায় যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প কী করে বিশেষ আইনের আওতায় (যা ‘সরল বিশ্বাসে কৃত’ হিসেবে বিবেচিত হবে) বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কোনো বালাই থাকবে না!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

বিভক্তির কবলে বিশ্বাস by উৎপল রায়

সিভিল সোসাইটি। ১৮ শতকে এ ধারণা দুনিয়াব্যাপী জনপ্রিয়তা লাভ করে। তবে নিশ্চিতভাবেই এর ইতিহাস আরও দীর্ঘ। সক্রেটিসও সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি ছিলেন। যিনি বিশ্বাস করতেন পাবলিক আর্গুমেন্টের মাধ্যমে দ্বন্দ্বের নিরসন সম্ভব। রাষ্ট্রের দেয়া মৃত্যুদণ্ড মেনে যিনি হেমলক পান করেন, কিন্তু নিজের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হন না। ধারণাগতভাবে মনে করা হয়, সিভিল সোসাইটি হচ্ছে বেসরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যারা জনগণের ইচ্ছা এবং কল্যাণের জন্য কাজ করে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সিভিল সোসাইটি পশ্চিমা গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ।
বাংলাদেশেও সিভিল সোসাইটির গৌরবোজ্জ্বল অতীত রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের জীবন বলিদান করেছেন সিভিল সোসাইটির বহু মানুষ। তাদের মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় প্রিয় পতাকা। লোভ ছিল, কিছুটা হলেও বিভক্তি অতীতেও ছিল। তবে এখনকার মতো কখনওই নয়। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামল থেকেই এ প্রচলন শুরু হয়। নানা সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে ‘রাজার’ প্রতি সমর্থন জানান সিভিল সোসাইটির কিছু কিছু সদস্য। এরপর ক্রমশ বিভক্তি জোরালো হয়েছে বাংলাদেশে। ভেতর থেকে অনেকটা দুই ভাগ হয়ে যান মানুষ। এ বিভক্তির কালো ছায়া এসে পড়ে সিভিল সোসাইটির ওপরও। কিছুদিন আগেতো অনেকটা ঘটা করেই দুই ভাগ হয়ে যান বাংলাদেশে সিভিল সোসাইটির একটি বড় অংশ। একদিকে শত নাগরিক, অন্যদিকে সহস্র নাগরিক। এ বিভক্তি সবচেয়ে বড় আঘাত হানে বিশ্বাসে। সিভিল সোসাইটির বক্তব্য এখন আর সেভাবে নাড়া দেয় না জনসাধারণকে। এ যেন বিভক্তির এক অন্ধকার কালো অধ্যায়। এ বিভক্তি নিয়ে কি বলছেন সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরা। ধারাবাহিকভাবে এ প্রশ্নের জবাব খুঁজবে মানবজমিন। আজ ছাপা হলো সিভিল সোসাইটির পাঁচ উজ্জ্বল প্রতিনিধির বক্তব্য-
এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমাদের দেশে শুরু থেকেই সিভিল সোসাইটি তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি। সুশীল সমাজের বিভক্তির কারণটাও অত্যন্ত সহজ ও স্পষ্ট। কেউ এ দলের, নয়তো ও দলের রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, নিচ্ছে। ছোটখাটো সুবিধার জন্যই মূলত এ বিভক্তি। এটা সবাই জানে। তিনি বলেন, দেশের কমন কোন ইস্যুতে সুশীল সমাজের উদ্যোগ যে একেবারে ছিল না তেমন নয়। দেশের স্বার্থে অনেকেই এগিয়ে এসেছেন। যেমন কিছুদিন আগে শামসুল হুদা সাহেবের (সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদা) একটি ভাল উদ্যোগ ছিল। সুশীল সমাজের অনেকেই তার ডাকে সাড়া দিয়ে তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। এ ছাড়া টিআইবি (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ), সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক), সিপিডি (সেন্টার ফল পলিসি ডায়ালগ) এ ধরনের সংগঠনও জাতীয় ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই যোগ্য ব্যক্তি ও সংগঠন যদি উদ্যোগ নেয় তাহলে হয়তো সুশীল সমাজ বা বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর বিভক্তিটা কমে আসবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. একে আজাদ চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, সুশীল সমাজ আলোকিত মানুষের একটা অংশ তারা ব্যক্তি বা দলের ঊর্ধ্বে ওঠে নিরপক্ষেভাবে কাজ করবে এটাই নিয়ম। তবে, বুদ্ধিভিত্তিক চর্চা সবসময়ই একই রকম হবে বিষয়টি এমন নয়। আমাদের দেশে যেমন বিভক্তি রয়েছে। পশ্চিমা দেশেও সুশীল সমাজে বিভক্তি রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলদেশের সিভিল সোসাইটিতে বিভক্তিও দেখছি আবার একতাবদ্ধতাও দেখছি। ব্যক্তির আদর্শিক অবস্থান, দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য, একমুখিতার কারণে সুশীল সমাজে বিভক্তি থাকে। মতবাদে ভিন্নতা থাকে। তবে, একটা বিষয়ে তারা সবাই এক। তারা দেশের ও জনগণের মঙ্গল চায়। হয়তো একেকজন একেকভাবে চায়। কিন্তু গণতন্ত্রের স্বার্থে প্রায় সবাই কথা বলে। আশা করবো তারা ব্যক্তি ও দলের ঊর্ধ্বে ওঠে তারা কাজ করবে। 
সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজনের সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ প্রসঙ্গে বলেন, আমিতো এখন কোন সিভিল সোসাইটি দেখি না। এখন সব রাজনৈতিক সোসাইটি। সব ফায়দাতন্ত্রের রাজনীতির কবলে পড়েছে। রাজনীতির কারণেই সিভিল সোসাইটি বিভক্ত হয়ে গেছে। রাজনীতির কবলে ফেলে আমাদের সিভিল সোসাইটি ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আগে এতটা বিভক্তি ছিল না। ১৯৯১ সালের পর থেকেই সুশীল সমাজের অনেকেই রাজনৈতিক দলের পদলেহন করেছে। নিজের সুবিধার জন্য রাজনৈতিক দলের সাফাই গাইছে। শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনজীবী কেউ বাদ যাচ্ছে না। সবার মধ্যেই বিভক্তি। যখন যে দল সরকারে যায় তখনই সুশীল সমাজের কিছু অংশ সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে। বিভিন্ন সময়ে সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছে। কেউ উত্তরা, গুলশানে প্লট নিচ্ছে, কেউ ইউনিভার্সিটির ভিসি হয়ে রাজনৈতিক দল ও সরকারের গুণগান করছে। এ কারণেই আমাদের সিভিল সোসাইটিটা এতদিনেও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এ থেকে উত্তরণের কোন পথতো আমি দেখছি না। তবে, ফায়দাতন্ত্রের রাজনীতি যদি বন্ধ করা যায়, রাজনৈতিক সুবিধা নেয়া থেকে বিরত থাকা যায় তবেই সিভিল সোসাইটির বিভক্তি কমে আসবে। না হলে এ বিভক্তি ঘুচবে না।
সুশীল সমাজের বিভক্তির কারণ রাজনৈতিক বলে মনে করেন নারীনেত্রী খুশী কবির। তিনি বলেন, সুশীল সমাজের বিভক্তি আগেও ছিল, এখনও আছে। এরমধ্যে কিছুটা রাজনৈতিক কারণতো অবশ্যই আছে। তবে, সুশীল সমাজ যে একীভূত ছিলনা তা নয়। স্বৈরশাসক এরশাদের আমলে, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে, নিকট অতীতে শাহবাগ জাগরণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে সুশীল সমাজের ইতিবাচক ভূমিকা আমরা দেখেছি। এক্ষেত্রে ব্যক্তি নিজেকে কিভাবে দেখছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। খুশী কবির বলেন, যখন কেউ চিন্তা করে যে, তার কর্মকাণ্ড কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার মতপার্থক্যের কারণ হতে পারে বা তার কাজকর্মে তা প্রভাব হিসেবে কাজ করে তখনই তার চিন্তা-ভাবনা বদলে যায়। তাই আমাদের দেখতে হবে ব্যক্তি রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে না রাজনীতি ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, সুশীল সমাজ বলতে আমরা বুঝি যারা কোন রাজনৈতিক দলের নয়। তারা কোন দলও সমর্থন করে না। যারা মূলত কোন রাজনৈতিক দলের বক্তব্য সমর্থন করে, রাজনৈতিক দলের কথার পুনরাবৃত্তি করে তারা আসলে সুশীল সমাজের পর্যায়ে পড়ে না। যারা দলীয় সমর্থক তারাতো তাদের দলীয় অবস্থানটাকে পুনর্ব্যক্ত করার চেষ্টা করবেই। এর বাইরে যারা বিভিন্ন ইস্যুতে ভূমিকা পালন করে কিন্তু কোন দলের সমর্থক নন তাদের মধ্যে কিছুটা ভিন্নমত থাকতেই পারে। তবে, এটাকে আমি বিভক্তি বলবো না।

খালি খালি গুজব রটেনি

দিনভর চাঞ্চল্য। নানা নাটকীয়তা। আকস্মিক সিদ্ধান্ত। তবে দিনের শেষে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী পদে আপাতত বহালই আছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। গতকাল সকালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) বৈঠকে প্রভাবশালী এ মন্ত্রীকে সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্তই হয়েছিল। যদিও পুরো বিষয়টিকে গুজব হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি।
একনেকের বৈঠকে উপস্থিত সূত্রে জানা গেছে, ঘড়িতে তখন সকাল ১১টা। একনেকের সাপ্তাহিক বৈঠক মাত্র শুরু হয়েছে। শুরুতেই নিয়মিত এজেন্ডা হিসেবে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের দুটি এজেন্ডা আলোচনার জন্য আসে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এ সময় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না। তার জন্য ২৫ মিনিটের মতো অপেক্ষা করা হয়। এর পরও মন্ত্রীর খোঁজ না মেলায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত প্রকল্পটি প্রত্যাহারের কথা বলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে অসম্মতি জানান। এ সময় একজন মন্ত্রী বলেন, সৈয়দ আশরাফ তো নিয়মিতই অনুপস্থিত থাকেন। তখন প্রধানমন্ত্রীও এ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি (আশরাফ) মিটিং-টিটিংয়ে আসেন না, এজন্য সরিয়ে দিলে ভালো হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার সঙ্গে কথা বলেন। একনেক সভা থেকে ফিরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সহকর্মীদের সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে অব্যাহতি দেয়া সংক্রান্ত সারসংক্ষেপ ও প্রজ্ঞাপন তৈরি করার নির্দেশ দেন। এরপর এক ঘণ্টা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনেকটা ঝড়ের বেগে কাজ হয়। সৈয়দ আশরাফের অব্যাহতির প্রজ্ঞাপন জারি নিয়ে পুরোপুরি প্রস্তুতি নেয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এ বিভাগের এক সিনিয়র কর্মকর্তা মারফত সারসংক্ষেপটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়। এ সময় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তাকে ফাইলটি রেখে যাওয়ার জন্য বলা হয়। এদিকে, মুহূর্তের মধ্যেই সৈয়দ আশরাফের অব্যাহতির খবর ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। আওয়ামী লীগের ভেতরে-বাইরে তৈরি হয় তোলপাড়। সৈয়দ আশরাফের শুভাকাঙ্ক্ষীরাও তৎপর হয়ে ওঠেন। বিকাল চারটার পর সৈয়দ আশরাফকে আপাতত অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে না- এ বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত জানার পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব নিজ অফিস ত্যাগ করেন। বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার সময় অপেক্ষমাণ সাংবাদিকরা মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে মন্ত্রিসভার রদবদলের বিষয়ে জানতে চান। মোশাররফ হোসাইন বলেন, কিছু হয়নি, হলে আপনারা জানবেন। শোনা যাচ্ছে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে সরিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিসের প্রক্রিয়া। আমি তো কিছু জানি না। আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করার মতো কোন তথ্য আমার কাছে নেই। আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না।
দপ্তর হারাচ্ছেন, এমন খবরের প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গুজবে কান না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কিশোরগঞ্জ শহরের বাড়িতে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। কিশোরগঞ্জে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত ইফতার পার্টিতে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ছবিটি তোলা। ছবি: প্রথম আলো
ওদিকে, আরেকটি সূত্রে জানা গেছে, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম গতকাল তার নির্বাচনী এলাকা কিশোরগঞ্জে একটি ইফতার মাহফিলে অংশ নেন। কিশোরগঞ্জ যাওয়ার কারণে তিনি একনেক সভায় হাজির হননি। সরকারের শীর্ষপর্যায়ে বিষয়টি অবগত ছিল। সরকারের এক সিনিয়র মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফের অব্যাহতির বিষয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ক্ষোভের মুখে সৈয়দ আশরাফের অব্যাহতি নিয়ে কথা বলেছেন। এখন প্রধানমন্ত্রী তার কথা প্রত্যাহার করে নিতে পারেন। পুরো বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভর করছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, একনেক সভায় পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২ গতকালের সভার আলোচ্যসূচিতে ছিল। প্রকল্পটি অনুমোদন মিললে এর মাধ্যমে জাতীয় সংসদের প্রতিটি আসনের জন্য পল্লী, সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে ২০ কোটি টাকা হারে বরাদ্দ দেয়া হবে। এজন্য ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। প্রকল্পটি অনুমোদন নিয়ে এমপিদের মধ্য থেকে চাপ রয়েছে।
গুজবে কান না দেয়াই ভাল: সৈয়দ আশরাফ
স্টাফ রিপোর্টার, কিশোরগঞ্জ থেকে জানান, মন্ত্রিত্ব থেকে অব্যাহতির বিষয়টিকে ‘মিডিয়ার খবর’ বলে উল্লেখ করেছেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, মিডিয়ার খবর মিডিয়ার কাছ থেকেই জেনে নিন। এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না জানিয়ে তিনি বলেন, গুজবে কান না দেয়াই ভাল। গতকাল বিকালে কিশোরগঞ্জ শহরের খরমপট্টি এলাকার বাসভবনে এসে পৌঁছানোর পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ আশরাফ এসব কথা বলেন। নিজ আসন কিশোরগঞ্জ-১ (কিশোরগঞ্জ সদর-হোসেনপুর) এ দুই দিনের সরকারি সফরের প্রথম দিনে মঙ্গলবার বিকাল সোয়া ৬টায় কিশোরগঞ্জের বাসভবনে এসে পৌঁছান। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর বিকাল ৬টা ৪০ মিনিটে তিনি শহরের সমবায় কমিউনিটি সেন্টারে কিশোরগঞ্জ জেলা ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত ইফতার পার্টিতে যোগ দেন। সেখানে ইফতারের আগে মাত্র এক মিনিট বক্তৃতা করেন সৈয়দ আশরাফ। বক্তৃতায় তিনি কিশোরগঞ্জ ও হোসেনপুর উপজেলায় দুই দিন দুটি ইফতারে অংশ নিতে এসেছেন জানিয়ে ইফতার আয়োজকদের কৃতজ্ঞতা জানান। ইফতারে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক, জেলা প্রশাসক জিএসএম জাফরউল্লাহ্‌, পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন খানসহ দলীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এলজিআরডিমন্ত্রীর সফরসূচি সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সার্কিট হাউসে রাত্রিযাপন শেষে আজ দুপুরে সার্কিট হাউস সম্মেলন কক্ষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। পরে যশোদল গ্রামের নিজ বাড়ি পরিদর্শন ও সেখান থেকে ফিরে জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে দুস্থ নারীদের মধ্যে সেলাই মেশিন বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন। পরে সন্ধ্যায় হোসেনপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের ইফতার ও দোয়ার মাহফিলে যোগদান শেষে রাতেই ঢাকার বেইলি রোডের বাসভবনে ফিরবেন।

ইউরোজোনের নেতারা বললেনঃ গ্রিসের সর্বশেষ প্রস্তাবে ‘নতুন কিছু’ নেই

অ্যালেক্সিস সিপ্রাস
গ্রিসের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবে ‘নতুন কিছু’ নেই বলে জানিয়েছেন ইউরোজোনের নেতারা। গতকাল মঙ্গলবার ব্রাসেলসে ইউরোজোনের অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে গ্রিসের পক্ষ থেকে সর্বশেষ প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। এরপর ইউরোজোনের নেতারা এ কথা জানান। ওই বৈঠকের ধারাবাহিকতায় সেখানে গ্রিসের পরিস্থিতি নিয়ে সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে।
ঋণদাতাদের দেওয়া কৃচ্ছ্রসাধনের প্রস্তাব বিপুল ভোটে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর দাতারা নতুন প্রস্তাব চায় গ্রিসের কাছে। তাতে সাড়া দিয়ে গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সিস সিপ্রাস গতকাল ব্রাসেলসে ইউরোজোনের অর্থমন্ত্রীদের সম্মেলনে যান। খবর এএফপি ও বিবিসির। ব্রাসেলসে মূল সম্মেলন শুরু হওয়ার আগে গতকাল ইউরোজোনের বাকি ১৮ দেশের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব তুলে ধরে গ্রিস। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়, সর্বশেষ প্রস্তাবে তারা বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে। গ্রিস আশা করে, ‘গণভোটের ফলের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক লাভের একটি সমঝোতা হবে’। কিন্তু গতকালের বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে ইউরোজোনের অন্যতম অংশীদার জার্মানি বলছে, নতুন করে আলোচনার ‘এখন পর্যন্ত কোনো ভিত্তি’ নেই।
ব্রাসেলসে মূল সম্মেলন শুরু হওয়ার আগে গতকাল জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী।
 এদিকে গ্রিসের সংস্কার প্রশ্নে ইউরোজোনের দুই প্রধান অর্থনীতির দেশ জার্মানি ও ফ্রান্সের নেতাদের মতো শক্ত অবস্থানের প্রতিধ্বনি শোনা গেছে ইউরোজোনের মন্ত্রীদের মুখেও। গতকাল মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিক বৈঠক শুরু হওয়ার আগে তাঁরা সাবধান করে দিয়ে বলেছেন, গ্রিসের কাছে থেকে ‘যৌক্তিক সংস্কার’ প্রস্তাব না পেলে কোনো ফল হবে না। স্লোভাক অর্থমন্ত্রী পিটার কাজিমির বলেছেন, ‘একটি চুক্তি হবে, তা নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে সন্দিহান।’
ইউরোজোন থেকে গ্রিসের বিদায় হচ্ছে কি না, এ প্রশ্নের উত্তরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কমিশনার ভালদিস দমব্রোভসকিস বলেন, ‘যদি একে অপরের প্রতি বিশ্বাসী না হয়, যদি সংস্কার প্রশ্নে একটি যুক্তিযুক্ত প্রস্তাব না আসে, তবে বের হয়ে যাওয়ার প্রশ্ন অবান্তর নয়।’
গ্রিসের গত রোববারের গণভোটে ‘না’ বিজয়ী হলে নড়েচড়ে বসে ইউরোপ। সোমবারই জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ বৈঠক করেন প্যারিসে। বৃহৎ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ইসিবি) পরিচালনা পরিষদ জরুরি বৈঠক করে। তখন গতকালের বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়।

বি. চৌধুরীকে ঠেকাতে মরিয়া জামায়াত by কাজী সুমন

সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিকল্পধারার সভাপতি প্রফেসর বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিএনপিতে যোগ দেয়া ঠেকাতে নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে জামায়াত। এমন কি বিকল্পধারাকে ২০ দলীয় জোটে ভেড়ানোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে দলটি। জোটের কয়েকটি শরিক দলকে বাগে এনে তাদের প্রেসক্রিপশন দিচ্ছে। শরিক দলের নেতারা কাজ করছেন সেই প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী। কাজী জাফর আহমদের জাতীয় পার্টি ছাড়া জোটের কোন শরিক দলের ইফতার পার্টিতেও বি. চৌধুরীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এছাড়া বিকল্পধারা আয়োজিত ইফতার পার্টিতে যোগ না দিতে প্ররোচনা দিয়েছে। ওদিকে ৬ই জুলাই রাজধানীর হোটেল লেকসোরে ইফতার পার্টির আয়োজন করে বিকল্পধারা। ওই ইফতার পার্টিতে জামায়াতসহ বেশ কয়েকটি শরিক দলের নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এতে শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে বি. চৌধুরীর দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০০৪ সালে প্রেসিডেন্ট থাকাবস্থায় বি. চৌধুরীর সঙ্গে বিএনপির চেয়ারপারসনের দূরত্ব তৈরি হয়। ওই সময় তিনি বিএনপি ছেড়ে গঠন করেন বিকল্পধারা। এর প্রায় একযুগ পর ২০১৪ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি বি. চৌধুরীর অভিমান ভাঙাতে তার বারিধারার বাসায় যান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তখন থেকেই মূলত আলোচনা শুরু হয় বি. চৌধুরীর বিএনপিতে ফেরা নিয়ে। তবে তার দলের প্রভাবশালী এক নেতা বাধা হয়ে দাঁড়ান। তখনই আটকে যায় বিএনপিতে তার প্রত্যাবর্তন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে টানা তিন মাস আন্দোলনের পর বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। মামলা-হামলা, পুলিশি গ্রেপ্তার-নির্যাতনে দলটির নীতি-নির্ধারণী ফোরামের নেতারা অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েন। এরপর থেকেই বিএনপির বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বি. চৌধুরীর সরব উপস্থিতি দেখা যায়। গত ২৯শে মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদত বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় আবেগমাখা বক্তব্য রাখেন দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন এই মহাসচিব। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে দেয়া ওই বক্তব্যে বিএনপির জন্মের ইতিহাস, বিকাশ, জিয়াউর রহমানের ক্যারিশমেটিক নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ করণীয় বিশদভাবে তুলে ধরেন। এরপর বি. চৌধুরীকে নিয়ে বিএনপি নেতাদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। দলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একটি অংশ তাকে বিএনপিতে ভেড়াতে নেপথ্যে কাজ করেন। গত ১২ই জুন হোটেল সোনারগাঁওয়ে একটি বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে দেয়া বক্তব্যে বি. চৌধুরী বলেন, বিএনপি রাজনীতির জামায়াতনির্ভর হয়ে উঠেছে। আর এ কারণে চারদিক থেকে চাপে রয়েছেন খালেদা জিয়া। এ ধাপটি বেশিদিন থাকবে বলে মনে হয় না। দলটিকে বাঁচতে হলে চতুর্থ ধাপে জিয়াউর রহমানের রাজনীতির আদর্শে ফিরে আসতে হবে। এছাড়া সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারেও বিএনপির পাশে দাঁড়াতে চান বলে জানান তিনি।  এরপর থেকে বি. চৌধুরীর বিএনপিতে ফেরা নিয়ে জোর গুঞ্জন শুরু হয়। বিএনপির ভেতর থেকেও একটি বড় অংশ তাকে ফিরিয়ে আনার দাবি তুলেন। এছাড়া তারা জানান, এই মুহূর্তে বি. চৌধুরীর মতো ব্যক্তিসম্পন্ন ক্লিন ইমেজের রাজনীতিকের বিএনপিতে প্রয়োজন। একই বি. চৌধুরীর জামায়াত ছাড়ার বক্তব্যকে বিএনপির অনেকে সমর্থন করেন। ফাঁস হওয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি বজলুল করিম চৌধুরী আবেদের কথোপকথনেও সেটি স্পষ্ট হয়। কিন্তু বিষয়টি আঁচ করতে পেরে নেপথ্যে কলকাটি নাড়ে জামায়াত। সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতের পৃষ্টপোষকতায় জোটের যে কয়েকটি দল পরিচালিত হয় তাদের পক্ষে আনার চেষ্টা করছে। জামায়াতের ইফতার পার্টিতে ২০ দলীয় জোটের সমমনা দল হিসেবে বিকল্পধারাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। একইভাবে জোটের অন্য শরিক জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) ও ইসলামী ঐক্যজোটের ইফতার পার্টিতেও বি. চৌধুরীকে দেখা যায়নি। অথচ বিএনপি আয়োজিত প্রায় প্রতিটি ইফতার পার্টিতে উপস্থিত ছিলেন বি. চৌধুরী। এমনকি ড্যাবের ইফতার পার্টিতে পাঁচ মিনিট পরে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রাখেন। ওদিকে ৬ই জুলাই বিকল্পধারার ইফতার পার্টিতে জামায়াতসহ বেশ কয়েকটি দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ওই সূত্রটি জানিয়েছে, বি. চৌধুরী যাতে বিএনপিতে ভিড়তে না পারে সেজন্য নেপথ্যে কাজ করছে জামায়াত। শরিক দলের দ্বিতীয় সারির নেতাদের দিয়ে বিএনপি নেতাদের কাছে বি. চৌধুরীর বিরুদ্ধে বলানো হচ্ছে। জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মো. মোবারক হোসেন বলেন, বিকল্পধারার ইফতার পার্টির আমন্ত্রণের বিষয়ে আমার কাছে তথ্য নেই। এছাড়া অনেক ইফতার পার্টির আমন্ত্রণ পেলেও সবগুলোতে আমরা যাই না। তবে বিকল্পধারার সঙ্গে আমাদের কোন দূরত্ব নেই। এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদত হোসেন সেলিম বলেন, বি. চৌধুরী আমাদের সমমনা নয়। দাওয়াত দিলেও  উনার দলের ইফতার পার্টিতে যাবেন না বলে সরাসরি জানিয়ে দেন তিনি। বি. চৌধুরীকে নিয়ে জোট নেতাদের মধ্যে সামান্যতম আগ্রহ নেই। আর বিএনপি নেতাদেরও তাকে নিয়ে আগ্রহ আছে বলে আমার মনে হয় না। এখন বিএনপি বা জোটের খারাপ সময় বিদায় পাশে দাঁড়ানো কথা বলছেন। আবার সুবিধা মতো সময় হলে বেরিয়ে যাবেন। তিনি বলেন, গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বি. চৌধুরী প্রথমে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পরে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। তখন তিনি জামায়াতের বিরুদ্ধে কোন বক্তব্য দেননি। এখন সুযোগ পেয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে বলছেন। এগুলো সুবিধাবাদী বক্তব্য। তবে তাকে যদি বিএনপি কিংবা জোটে ভেড়ানো হয় তাহলে আমরা ২০ দলীয় জোট নেতারা জোটে থাকব কিনা এনিয়ে ভাববো। জোটের আরেক শরিক বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব গোলাম মোস্তফা বলেন, বি. চৌধুরী হলেন ব্রাহ্মণ আর আমরা হলাম নমশূদ্র। তাই আমাদের দাওয়াত দেয়নি। তবে আমাদের দাওয়াত দিলেও আমরা যাব না। কারণ তিনি ইদানীং জোট ভেঙে দিতে নানাভাবে প্ররোচনা দিয়েছেন। এছাড়া জামায়াতের বিরুদ্ধে নানা বক্তব্য দিয়েছেন।

ওবামাকে খুন করা সাংবিধানিক দায়িত্ব

বারাক ওবামা। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তিনি। বিশ্বের ক্ষমতাধর ওই ব্যক্তিকে খুন করার ঘোষণা দেয়ার আগে মানুষ হাজারো বার ভেবে দেখবেন এর পরিণাম কী হতে পারে। ৫৫ বছরের এক মার্কিন নাগরিক কিছু না ভেবেই বারাক ওবামাকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। সঙ্গে তিনি এও বলেছেন, তাকে নাকি হত্যা করা তার ‘সাংবিধানিক দায়িত্ব’। যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন রাজ্যের তোমাহ শহরের বাসিন্দা ব্রায়ান ডি ডাটচারকে (৫৫) এ জন্য বেশ ঝামেলায়ও পড়তে হয়েছে। প্রেসিডেন্টকে হত্যার হুমকি দেয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে স্থানীয় পুলিশ। কিন্তু কী কারণে তিনি ওবামার ওপর ক্ষেপেছেন? টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, ওবামা সম্প্রতি ওভার টাইম বেতন কাঠামোর সংস্কারের প্রস্তাব দেন। আর তাতেই তিনি অগ্নিমূর্তি ধারণ করেন।
বুধবার উইসকনসিনের লা ক্রসসি পাবলিক লাইব্রেরির নিরাপত্তায় দায়িত্বে থাকা এক কর্মীকে উদ্দেশ করে উচ্চস্বরে ব্রায়ান ডি ডাটচার বলেন, ‘অন্যায়ের প্রতিবাদকারী এখানে হাজির। আমার যদি সুযোগ থাকত তাহলে, আমি তাকে (ওবামা) বাইরে বের করে আনতাম এবং গুলি করে হত্যা করতাম।’এ ব্যাপারে একটি মামলার বিবরণীতে বলা হয়েছে, ‘ডাটচার এর আগে ফেসবুক পেজে লেখেন, এটাই সিদ্ধান্ত। বৃহস্পতিবার আমি লা ক্রসসিতে যাব। আশা করছি, আমি ভণ্ড প্রেসিডেন্টকে সেখানে গুলি করার সুযোগ পাব। তার খুন করা আমার সাংবিধানিক কর্তব্য।’ সেই সময় ওবামা লা ক্রসসিতে না থাকলেও পুলিশ বিষয়টি বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই নিয়েছে। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ডাটচার জানিয়েছেন, লা ক্রসসির একজন পুলিশ সদস্য তার ওই হুমকিকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া।

ইরাক বাহিনীর বাগদাদ হামলা!

ইরাকের যুদ্ধবিমান থেকে রাজধানী বাগদাদের ওপর ‘ভুল করে’ বোমা বর্ষণে অন্তত ৭ জন নিহত হয়েছে। বোমায় বিধ্বস্ত ভবনগুলো পরীক্ষা করে দেখছেন জরুরি সেবা দানকারীরা। সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, শুখোই যুদ্ধবিমান থেকে ‘যান্ত্রিক ত্র“টির কারণে’ বোমা বর্ষিত হয়েছে। সোমবারের ছবি এএফপি

থাইল্যান্ডে স্বৈরশাসনে পাল্টে গেছে গান গাওয়ার ধরন!

স্বৈরচারী শাসন পাল্টে দিয়েছে থাইল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী লোকসঙ্গীত ‘মো লাম’ গাওয়ার ধরন। ষাট-সত্তর দশকে থাইল্যান্ডের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ইশান অঞ্চলের এ গানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া থাকসিন সিনাওয়াত্রা আর তার সমর্থক ‘রেড সার্ট’-এর গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত করে এ শিল্প। বর্তমান জান্তা সরকারের আমলে ওই গান গাওয়াকে প্রশাসনবিরোধী মনে করা হয়। তাই এ গান গাওয়ার প্রবণতা ধীরে ধীরে কমে গেছে। হারিয়ে যাচ্ছে গাওয়ার ধরন।
সোমবার এএফপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক সময় ছেলে-বুড়ো সবার মুখে মুখে ধ্বনিত হতো ‘মো লাম’ সঙ্গীত। বলছিলেন বংশীবাদক সারুট শ্রীহকট। তিনি বলেন, ‘আমাদের তরুণরা পশ্চিমা সঙ্গীতের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এ ঐতিহ্যবাহী গান আধুনিক যন্ত্র গিটার আর ড্রামের সঙ্গে গাওয়া হয়। ফলে এর মর্মবাণী আগের মতো মানুষকে আকর্ষণ করে না।’

ফাঁড়া কাটলেও ফাঁস নামেনি

গ্রিসের ঋণ সংকটে দাতাদের আর্থিক পুনরুদ্ধার (বেইল আউট) প্রস্তাবের শর্ত মানা হবে না- তা সাফ জানিয়ে দিয়েছে দেশটির জনগণ। রোববারের গণভোটে চূড়ান্ত ফলে গ্রিসকে দাতাশক্তিদের আষ্টেপৃষ্টে বাঁধার ফন্দিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ গ্রিক ভোটার। এর ফলে প্রাথমিকভাবে ইউরোপের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী তিন মোড়লের সঙ্গে দর কষাকষিতে অতিরিক্ত শক্তি অর্জন করলেন গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সিস সিপরাস। ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপিয়ে দেয়া নীতিকে প্রত্যাখ্যানের অধিকতর সুযোগ পেলেন তিনি। আপাতদৃষ্টিতে গ্রিসকে চুষে খাওয়ার যে পাঁয়তারা ত্রয়ীদাতাশক্তি নিয়েছিল, তা এখন সহজেই বাস্তবায়ন করতে পারবে না। এ ফাঁড়া (বিপদ) থেকে বের হতে পারল এথেন্স। কিন্তু ইউরোপের সঙ্গে আপসটা কীভাবে হবে- তা নির্ধারণের আগেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে গ্রিক অর্থনীতি। গ্রিসের ব্যাংকগুলো মারাত্মক তারল্য সংকটে ভুগছে। আমদানি-রফতানি বন্ধ। এ অবস্থায় ইসিবির জরুরি অর্থ সাহায্য ছাড়া ব্যাংকগুলোকে সচল রাখা গ্রিসের পক্ষে বলতে গেলে অসম্ভব। ইউরোজোন থেকে ছিটকে পড়ার যে ফাঁস গলায় ঝুলে রয়েছে, তা এখনও খুলে ফেলা যায়নি। আজ (মঙ্গলবার) ইইউ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে তার একটা গতিপথ পরিষ্কার হতে পারে। বিবিসি এক বিশ্লেষণে জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহ ধরে গ্রিসের ব্যাংকগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। আজ (মঙ্গলবার) ব্যাংক খুলে দেয়ার কথা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক অব গ্রিসের সঙ্গে অন্যান্য ব্যাংক সিদ্ধান্ত নেয়ার অপেক্ষায় ব্যাংকের সেবা কতটা উন্মুক্ত হবে। ব্যাংকগুলোর ঘাড়ে উৎকণ্ঠার তরবারি ঝুলছে। খোলার পরপরই সব শাখা ক্যাশশূন্য হয়ে পড়বে। এখন সেখানে জরুরি অর্থ সহায়তা দেবে কিনা- তা ইসিবির সিদ্ধান্তের বিষয়। এখন গ্রিস যেটা পারে সেটা হচ্ছে, ইউরো ছেড়ে নিজস্ব মুদ্রায় ফিরে যাওয়া। সেটা হোক আগের ড্রাকমা কিংবা নতুন কোনো মুদ্রা। কিন্তু তাতেও বিরাট ক্ষতি। নতুন মুদ্রা প্রচলনের আগেই ব্যাংকের ভাণ্ডার শূন্য হয়ে যাবে।
তাতে পুরো অর্থনীতি ধসে পড়বে। ব্যাংকাররা বিবিসি সংবাদদাতাকে জানিয়েছেন, নতুন মুদ্রা চালু পর্যন্ত ক্রান্তিকাল পার হতে গেলেও ইউরোজোনের কাছ থেকে গ্রিস ব্যাংকগুলোর অন্তত ২৫ বিলিয়ন ইউরো ক্যাশ মুদ্রা প্রয়োজন। এছাড়া ড্রাকমা চালু হলে গ্রিকদের সঞ্চিত অর্থের মূল্যমানও কমে যাবে। আবার গ্রিসের কাছে বিদেশী মুদ্রা রিজার্ভ নেই বললেই চলে। বড়জোর ২-৩ বিলিয়ন স্বর্ণমুদ্রা রয়েছে। সেক্ষেত্রে জরুরি পণ্য, কাঁচামাল, খাদ্য, ওষুধ শেষ হয়ে গেলে নতুন করে আমদানি করতে পারবে না। কারণ বিদেশী ব্যবসায়ীরা গ্রিসের নিজস্ব মুদ্রায় বেচাকেনা করবে না। গ্রিস জিনিস কিনে তার দাম ড্রাকমায় পরিশোধ করতে গেলে তা খুব হাস্যকর হবে। রফতানি আয় দিয়েও পাওনা পরিশোধ করা যাবে না। কেননা, দেশটির রফতানি আয় জিডিপির মাত্র ১৩ শতাংশ। সব মিলিয়ে ইউরো ছাড়লে বিপদেই পড়বে গ্রিস। এদিকে, গ্রিসকে ইউরোজোনে রাখবে কি রাখবে না তা নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এতদিন ধরে জার্মানি, ফ্রান্স ও ব্যাসেলস হুশিয়ারি করে এসেছে, ‘না’ ভোট দিলে গ্রিসকে ইউরো মুদ্রা ছেড়ে ড্রাকমায় ফিরে যেতে হবে। কিন্তু ইউরোজোন ক্লাব থেকে গ্রিসকে বের করে দিয়ে লাভটা কী হবে? এতে একদিকে যেমন ইউরোপের ঐক্য বিনষ্ট হবে, আরকেদিকে দাতারা যে অর্থ দিয়েছে, সে অর্থ তবে ফেরত পাওয়া যাবে না। এতে জার্মানির বেশি ক্ষতি। আর ইসিবি এথেন্সের কাছ থেকে যে বন্ধকী সম্পত্তি নিয়ে রেখেছে (যা ৮৯ বিলিয়ন জরুরি অর্থ সহায়তার ৩৫ শতাংশ মূল্যমানের), গ্রিস ইউরো ছাড়লে ওই বন্ধকী সম্পত্তির মূল্যমান প্রায় অর্ধেক কমে যাবে। আর সেকারণেই না ভোটের বিরুদ্ধে ‘প্রকৃত প্রতিশোধ’ ইইউ নিতে পারবে না বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। ব্রাসেলসের ব্রুজেল থিংক ট্যাংকের গবেষক নিকোলাস ভারন বলেন, ‘ইইউ সদস্যরা গ্রিসকে আরেকটি সুযোগ দেবে। কিন্তু হাতে সময় খুব কম। আর সেটাই হতে পারে সর্বশেষ সুযোগ।’

জোড়া শতকে জয় দেখছে পাকিস্তান

গলে সিরিজের প্রথম টেস্টে খাদের কিনার থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ১০ উইকেটে জিতেছিল পাকিস্তান। পাল্লেকেলেতে সিরিজ নির্ধারণী তৃতীয় টেস্টেও প্রত্যাবর্তনের আরেকটি গল্প লিখে পাশার দান উল্টে দিয়েছে পাকিস্তান। কাল শান মাসুদ ও ইউনুস খানের জোড়া সেঞ্চুরিতে স্বাগতিক শ্রীলংকার মুঠো থেকে বেরিয়ে গেছে ম্যাচের লাগাম। প্রথম তিন দিন ব্যাকফুটে থাকা পাকিস্তান চতুর্থ দিন শেষে জয়ের সুবাস পাচ্ছে। ৩৭৭ রানের জয়ের লক্ষ্যে খেলতে নেমে চতুর্থ দিন শেষে তাদের সংগ্রহ দুই উইকেটে ২৩০। শান মাসুদ ১১৪ ও ইউনুস খান ১০১ রানে অপরাজিত আছেন। পাল্লেকেলে টেস্টে জিততে হলে টেস্টে চতুর্থ ইনিংসে নিজেদের সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়তে হবে পাকিস্তানকে। শ্রীলংকার মাটিতে চতুর্থ ইনিংসে ৩০০ রানের বেশি তাড়া করে জেতার রেকর্ড নেই কোনো অতিথি দলের।
সেই কীর্তি গড়তে আজ শেষ দিনে আরও ১৪৭ রান করতে হবে পাকিস্তানকে, হাতে আছে আট উইকেট। ৩৭৭ রানের কঠিন লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ১৩ রানেই দুই উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়েছিল পাকিস্তান। মহাকাব্যিক এক জুটিতে সেখান থেকে দলকে টেনে তোলেন মাসুদ ও ইউনুস। তৃতীয় উইকেটে তাদের ২১৭ রানের অবিচ্ছিন্ন যুগলবন্দি বদলে দিয়েছে ম্যাচের রং। মাসুদ পেয়েছেন ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি আর ইউনুস তুলে নেন তার ৩০তম টেস্ট সেঞ্চুরি। এর আগে পাঁচ উইকেটে ২২৮ রান নিয়ে চতুর্থ দিনের খেলা শুরু করা শ্রীলংকার দ্বিতীয় ইনিংস থামে ৩১৩ রানে। সর্বোচ্চ ১২২ রান করেন আঞ্জেলো ম্যাথিউস। অধিনায়কের সেঞ্চুরির পাশাপাশি ফিফটি তুলে নেন দিনেশ চান্দিমাল (৬৭)। পাকিস্তানের পক্ষে মাত্র ৫৮ রানে পাঁচ উইকেট নেন তরুণ পেসার ইমরান খান। এএফপি।
স্কোর কার্ড
শ্রীলংকা প্রথম ইনিংস ২৭৮
পাকিস্তান প্রথম ইনিংস ২১৫
শ্রীলংকা দ্বিতীয় ইনিংস ৩১৩ (থারাঙ্গা ৪৮, অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস ১২২, জেহান মুবারক ৩৫, চান্দিমাল ৬৭। ইমরান খান ৫/৫৮)
পাকিস্তান দ্বিতীয় ইনিংস
রান বল ৪ ৬
শান মাসুদ নটআউট ১১৪ ১৯৮ ১১ ১
শোহজাদ ব লাকমাল ০ ৩ ০ ০
আজহার ক চান্দিমাল ব প্রসাদ ৫ ১৪ ০ ০
ইউনুস খান নটআউট ১০১ ১৬৬ ৯ ০
অতিরিক্ত ১০
মোট (২ উইকেটে, ৬৩ ওভারে) ২৩০
উইকেট পতন : ১/০, ২/১৩।
বোলিং : প্রসাদ ১৩-২-৪২-১, লাকমাল ১২-২-৩৪-১, প্রদীপ ১০-২-৩২-০, ম্যাথিউস ৬-১-১৫-০, কৌশাল ২০-১-৯২-০, মুবারক ২-০-৯-০।

আসছে তিন তারকার ব্ল্যাকমানি

ঈদের পরই মুক্তি দেয়ার লক্ষ্যে চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে ‘ব্ল্যাকমানি’ চলচ্চিত্রটির প্রযোজনা ও পরিবেশনা সংস্থা ‘মুভি প্লানেট মাল্টিমিডিয়া’। ৭ আগস্ট ছবির মুক্তির তারিখ ধার্য করা হয়েছে। ছবিটি পরিচালনা করেছেন সাফি উদ্দিন সাফি। এতে প্রধান তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন চিত্রনায়িকা কেয়া, চিত্রনায়ক সাইমন ও টিভি অভিনেত্রী মৌসুমী হামিদ। এক বছর বিরতির পর সিনেমা হলে নতুন চলচ্চিত্র নিয়ে হাজির হচ্ছেন চিত্রনায়িকা কেয়া। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গত বছর সর্বশেষ নায়করাজ রাজ্জাকের আয়না কাহিনী ছবিতে আমাকে দেখা গিয়েছিল।
এবার আমার অনেক ভালোলাগার একটি চলচ্চিত্র নিয়ে দর্শকের মাঝে হাজির হতে যাচ্ছি। এটি আমার অনেক স্বপ্নের একটি চলচ্চিত্র। আমার বিশ্বাস চলচ্চিত্রটি দর্শককে মুগ্ধ করবে।’ চিত্রনায়ক সাইমন বলেন, ‘জি হুজুর এবং পোড়ামন ছবির পর ব্ল্যাকমানি আমার অনেক আশাজাগানিয়া একটি চলচ্চিত্র। এতে আমি আমাকে নতুনরূপে দর্শকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।’ এদিকে ‘ব্ল্যাকমানি’ দিয়েই মূলত রূপালী পর্দায় টিভি অভিনেত্রী মৌসুমী হামিদের অভিষেক ঘটতে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পরিচালকের ইচ্ছেমতো নিজেকে যথাযথভাবে আমার চরিত্রে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। এখন শুধু দর্শকের রায়ের অপেক্ষায়।’

সংযুক্তি চাই পানিরও -বিশেষ সাক্ষাৎকারে : আ​মীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী by সোহরাব হাসান ও রাহীদ এজাজ

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী
চারদেশীয় মোটরযান চুক্তির পর আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রথম আলো মুখোমুখি হয় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব হাসানরাহীদ এজাজ
প্রথম আলো : চার দেশের মধ্যে সই হওয়া মোটরযান চলাচল চুক্তিকে কীভাবে দেখেন?
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : বিশ্বায়নের যুগে আঞ্চলিক সমৃদ্ধির সুফল পেতে হলে সংযুক্তির (কানেকটিভিটি) প্রয়োজন। এটি শুধু সড়কপথে হলে হবে না, সব মাধ্যমে হতে হবে। সংযুক্তি যেমন সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথে হতে হবে, তেমনি বিদ্যুৎ-জ্বালানি, পানিরও অবাধ প্রবাহ বা সংযোগ জরুরি। অববাহিকাগত সহযোগিতার মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনা কীভাবে করা যায়, এর মাধ্যমে কীভাবে সব দেশ সুফল পেতে পারে, তা ভাবা উচিত। সড়ক সংযোগে হয়তো এক পক্ষ বেশি লাভবান হলো, অন্য সংযোগে আরেক পক্ষের লাভটা বেশি হবে। সব মিলিয়ে আঞ্চলিক যোগাযোগের মাধ্যমে সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে আন্তরিক চেষ্টা চালাতে হবে। এ অঞ্চলের সব অভিন্ন নদীর পানিপ্রবাহ ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের সামনে মেকং নদী কমিশনের উদাহরণ রয়েছে। মেকং নদী অববাহিকার দেশগুলো নিজেদের পানি বণ্টন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করছে। সমস্যা মিটিয়ে ফেলেছে। ভারতের সঙ্গে আমাদের যে অভিন্ন ৫৪টি নদী আছে, সেগুলোর জন্য একটি স্বাধীন তদারকি সংস্থার দরকার। পণ্যের চলাচলের পাশাপাশি পুঁজি ও মানুষের চলাচলও হয়ে থাকে। সুতরাং, সংযুক্তিটা সামগ্রিক হতে হবে। আর কাজগুলো করতে হবে সুনির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে। 
প্রথম আলো : এই যান চলাচল চুক্তি আঞ্চলিক বাণিজ্যে কতটা প্রভাব ফেলবে?
আমীর খসরু : আমি বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার পক্ষে। একে চার দেশের, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে নিয়ে যেতে হবে। তা না হলে সুফলটা আমরা পাব আংশিক, পুরোপুরি নয়। এখানেও সময়সীমা মাথায় রাখতে হবে। সড়কের পর সংযুক্তির বাকি ধাপগুলো কীভাবে হবে, সেটি ঠিক করতে হবে। যেমন নেপাল ও ভুটান থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের বিনিয়োগের সুযোগ আছে। ভারত ভুটান থেকে বিদ্যুৎ নিচ্ছে, আমরাও এ প্রক্রিয়ার অংশীদার হতে পারি। আঞ্চলিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগের মাধ্যমে সব দেশ উপকৃত হতে পারে।
প্রথম আলো : বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই সংযুক্তির সুফল বাংলাদেশ কতটা পাবে, এ নিয়ে বিএনপির মূল্যায়ন কী?
আমীর খসরু : বিএনপি সব সময় আঞ্চলিক সহযোগিতার পক্ষে। এ জন্যই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সার্ক সৃষ্টি করেছিলেন। সার্ক নিয়ে তাঁর চিন্তা ছিল এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন। আমরা খুশি যে নেহরুর দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি থেকে বেরিয়ে এসে ভারত বহুমাত্রিক আঞ্চলিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে।
প্রথম আলো : বিএনপি তো দুবার ক্ষমতায় ছিল। সে সময়ে এসব উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি কেন?
আমীর খসরু : বাংলাদেশ একা চাইলে তো পারবে না। আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য ভারতসহ অন্য সব দেশকেও এগিয়ে আসতে হবে। মোদি আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর জোর দিচ্ছেন, আগে তো ভারতের নীতিতে এটি ছিল না।
প্রথম আলো : বলা হচ্ছে, চারদেশীয় যান চলাচল চুক্তিতে ভারতের সুবিধা বেশি হবে। আপনি কি মনে করেন?
আমীর খসরু : ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহনের জন্য অনেক সময় ও টাকা খরচ হয়। এখন বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ওই অঞ্চলে পণ্য পরিবহনে ভারতের অনেক সাশ্রয় হবে, অর্থ ও সময় দুটোই। কাজেই চুক্তিতে ভারত লাভবান হবেই। প্রশ্ন হচ্ছে, এর বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পাবে। সুয়েজ খাল হওয়ার আগে আফ্রিকার দেশগুলোকে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হতো। সুয়েজ খাল হওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট হারে মাশুল ধরা হলো। প্রতিটি জাহাজকে ওই মাশুল দিতে হয়। সময় ও খরচের বিষয়টিকে বিবেচনায় এনে এই মাশুল ঠিক করা হয়েছে। প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে হলে নিজের পাওনাটাও বুঝে নিতে হবে।
প্রথম আলো : আপনি এখন সংযুক্তিকে দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে নেওয়ার কথা বলছেন। অথচ বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় ট্রান্স-এশিয়ান হাইওয়ে ও রেলওয়ের রুট নিয়ে অনেক সময় নষ্ট করেছেন।
আমীর খসরু : বিএনপি তো সিদ্ধান্ত দিয়েছিল। ট্রান্স-এশিয়ান হাইওয়েতে আমাদের প্রথম রুটটা টেকনাফ থেকে মিয়ানমার হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
প্রথম আলো : কিন্তু ভারত চেয়েছিল তামাবিল রুট হোক।
আমীর খসরু : ভারত তো চাইবেই। আমরা আমাদেরটা চাইব। আমরা যখন টেকনাফ হয়ে ট্রান্স-এশিয়ান হাইওয়েতে যেতে পারছি, তখন কেন উত্তর-পূর্ব ভারতের জটিল ও দুর্গম পথ ভারত ঘুরে যাব?
প্রথম আলো : কিন্তু এই বিতর্কে আমরা সময় নষ্ট করেছি কি না?
আমীর খসরু : রুট ঠিক করার জন্য এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত সব দেশকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে রুটটি চালু করতে পারিনি তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে।
প্রথম আলো : এবার মোদির ঢাকা সফরের সময় কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভাড়ার বাইরে অন্য কোনো মাশুল ধরা হচ্ছে না। একবার মাশুল না নিলে পরে সব ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য হবে কি না?
আমীর খসরু : দেখুন, মহাসড়কে চলাচলের জন্য আমরা টোল দিয়ে থাকি। আপনি যদি অবকাঠামো ব্যবহার করেন, তার জন্য তো আপনাকে পয়সা দিতে হবে। নাগরিকেরা যদি তাঁর দেশের অবকাঠামো ব্যবহারের জন্য পয়সা দেন, তবে অন্য দেশের লোকজন কেন দেবেন না! কাজেই ভারতের যাত্রীরাও বাংলাদেশের অবকাঠামো ব্যবহারের জন্য টোল দেবেন, এই নিয়মই হওয়া উচিত।
প্রথম আলো : মাশুলের বিষয়টি কীভাবে ফয়সালা হবে?
আমীর খসরু : সরকার নিজেই তো ট্যারিফ কমিশনকে দিয়ে এটি করিয়েছে। পরে কমিশনের ওই প্রতিবেদন তারা নেয়নি। এ ব্যাপারে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। বিনিয়োগের কতটা, কীভাবে ফেরত পাব, সেটি দেখতে হবে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক লাভের বিষয়টিও দেখতে হবে।  চুক্তির বিষয়টি জনগণকে স্বচ্ছতার সঙ্গে জানাতে হবে। বিনিয়োগে আমার লাভ কী, এর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া কী সেসবও জনগণকে জানাতে হবে। সহযোগিতার জন্য একটি বিষয়ের সুরাহা করে বসে থাকলে চলবে না। নদীর পানি বণ্টনের সমস্যার সমাধান করতে হবে। সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে হবে।
প্রথম আলো : বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আদানি ও রিলায়েন্সকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এটিকে কীভাবে দেখেন?
আমীর খসরু : এখানে আইনের শাসন বড় বিষয়। দায়মুক্তি পুরোপুরি আইনের শাসনের বিরুদ্ধে। অর্থনীতি, সমাজ, রাজনীতি—সবখানে দায়মুক্তি দিয়ে আমরা আইনের শাসন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। দায়মুক্তি সাময়িক সুফল আনে, কিন্তু তা টেকসই হয় না। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের সুবিধা দেওয়ার বেলায়ও ভারসাম্য রাখতে হবে।
প্রথম আলো : আপনি বাণিজ্যমন্ত্রী থাকতে ভারতের সঙ্গে ট্রান্সশিপমেন্টের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সফল হলেন না কেন?
আমীর খসরু : ভারত উন্নত দেশ আর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ। এই পরিপ্রেক্ষিতে যে তফাত ছিল, সেই জন্য এটি আর এগিয়ে নেওয়া যায়নি। তা ছাড়া এখন আঞ্চলিক উদ্যোগে ভারত যেভাবে সহযোগিতা করছে, তখন সেভাবে সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।
প্রথম আলো : ভারতের প্রতি বিএনপির অবস্থান দৃশ্যত কি পরিবর্তন হয়েছে?
আমীর খসরু : ভারত কেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ সবার প্রতি বিএনপির নীতি অপরিবর্তনীয় রয়েছে। সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে দেশ ও জনগণের মঙ্গলের কথা ভেবে এগিয়ে চলার নীতি আমাদের। সুতরাং, বিশেষ কোনো দেশের প্রতি বেশি, কোনো দেশের প্রতি কম, এমনটা হওয়ার সুযোগ নেই।
প্রথম আলো : এটাই যদি হয়, তবে মোদির সফরের আগে কেন বিএনপি জোর দিয়ে বলেছে, ‘আমরা ভারতবিরোধী নই?’
আমীর খসরু : এক পক্ষ যেহেতু এ সফরকে রাজনৈতিক মূলধন হিসেবে প্রচার করেছে, তার জবাবেই বিএনপি এটা বলেছে। ভারতের কাছে সরকারের নিজেকে আরও ঘনিষ্ঠ করার যে চেষ্টা, সেটার জবাব দিয়েছে বিএনপি। বিএনপি নিজে থেকে কিছু বলেনি।
প্রথম আলো : পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের চুক্তির সুফল কতটা আসবে?
আমীর খসরু : পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের সমাধান অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। কারণ বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্য যায় সীমিত আকারে। ভারত থেকে পণ্য আসে বিপুল পরিমাণে। ভারত রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা না পেলেও বাংলাদেশ পাচ্ছে। এ ছাড়া রয়েছে অশুল্ক বাধার সমস্যা। বাণিজ্য বাড়াতে হলে দ্রুত এই সমস্যার সমাধান জরুরি।
প্রথম আলো : বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চলের সুফল কীভাবে আসবে।
আমীর খসরু : বিনিয়োগ আমরা সব সময় চাই। বিনিয়োগ হলে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। সেবা খাতের সুযোগ বাড়বে, রপ্তানিও বাড়বে।
প্রথম আলো : দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে নতুন করে মাশুল নির্ধারণের কথা বলা হচ্ছে। এটিও কি সময়সীমা বেঁধে দিয়ে করা উচিত?
আমীর খসরু : এটি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সুরাহা করা উচিত। এটি দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখলে বাংলাদেশই ক্ষতিগ্রস্ত  হবে। তবে ভারতের সঙ্গে বসার আগে বাংলাদেশকে এসব বিষয়ে নিজের অবস্থান ঠিক করতে হবে। কারণ সরকার ট্যারিফ কমিশনের প্রস্তাব মেনে নেয়নি। বিকল্প কী হবে সেটি তাহলে সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। সবগুলো বিষয় জনসমক্ষে আনতে হবে।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
আমীর খসরু : ধন্যবাদ।

নাজিব রাজাকের দুর্নীতির ৯টি ডকুমেন্ট প্রকাশ

প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে প্রায় ৭০ কোটি ডলার দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে তোলপাড় চলছে মালয়েশিয়ায়। এরই মধ্যে আর্থিক ওই দুর্নীতির কমপক্ষে ৯টি ডকুমেন্ট প্রকাশ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। বলা হচ্ছে, ১এমডিবি তহবিল থেকে নাজিব রাজাকের ব্যক্তিগত তহবিলে স্থানান্তর হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি ডলার। এ অভিযোগে গতকাল মালয়েশিয়া সরকার কমপক্ষে ছয়টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছে। ধারণা করা হচ্ছে এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ওই অর্থ স্থানান্তরের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। মালয়েশিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল গনি পাতাইল, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর জেতি আকতার আজিজ, পুলিশ মহাপরিদর্শক খালিদ আবু বকার ও মালয়েশিয়ার দুর্নীতি বিরোধী কমিশনের প্রধান আবু কাশিম মোহাম্মদ একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। তাতে তারা বলেছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে দুটি ব্যাংকের ১৭টি অ্যাকাউন্টের ডকুমেন্ট নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। চলমান তদন্তে সহায়তার জন্য তা করা হয়েছে। তবে তারা ওই ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টধারীর নাম প্রকাশ করে নি। উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে কৌশলগত উন্নয়ন বিষয়ে একটি তহবিল গঠন করেন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। এর উদ্দেশ্য ছিল নতুন নতুন শিল্প কারখানার উন্নয়ন ও রাজধানী কুয়ালালামপুরকে বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। এ তহবিলের নাম দেয়া হয়েছিল ‘ওয়ান মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বেরহাদ’ (১এমডিবি)। এ তহবিলের শতভাগ মালিকানা ছিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের। এই অর্থ মন্ত্রণালয়ের আবার প্রধান প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। এ সংস্থা থেকে ঋণ দেয়া হয়েছে। বর্তমানে এখানে রয়েছে ১১০০ কোটি ডলার। এ তহবিলের সমালোচকদের মধ্যে রয়েছেন নাজিব রাজাকের ক্ষমতাসীন দলের কিছু সদস্য। অভিযোগ করা হয়েছে, ওই তহবিল ঋণ নিয়েছে খুব বেশি অঙ্কের। তবে এ ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। এরই মধ্যে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল রিপোর্ট করেছে যে, এই তহবিলের প্রায় ৭০ কোটি ডলার স্থানান্তরিত হয়েছে নাজিবের ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। এর স্বপক্ষে তারা  বেশকিছু ডকুমেন্ট প্রকাশ করেছে। এ কারণে, প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের আইনজীবী ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রকাশক ডো জোনসের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ জন্য তিনি নিউ ইয়র্কভিত্তিক আইনজীবীদের সঙ্গে শলাপরামর্শ করছেন। সেখানে পত্রিকাটির প্রকাশকের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করা হবে। নাজিব রাজাকের ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বলেছেন, ডো জোনসের কাছে চিঠি দেয়ার আগে আমরা আইনগত পদক্ষেপ সম্পন্ন করছি। গত শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে এক তদন্তকারীকে উদ্ধৃত করে। তবে ওই তদন্তকারীর নাম তারা প্রকাশ করে নি। ওই রিপোর্টে বলা হয়, ১এমডিবি তহবিলের ৭০ কোটি ডলার স্থানান্তর হয়েছে নাজিব রাজাকের ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। এরপরই তারা গতকাল একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে ‘গভর্নমেন্ট ডকুমেন্টস ফ্রম প্রোব অব নাজিব রাজাক’ শিরোনামের প্রতিবেদন। এতে তারা কথিত এ দুর্নীতির স্বপক্ষে ডকুমেন্টগুলো প্রকাশ করে। বলা হয়, এগুলো তারা পেয়েছে মালয়েশিয়ান সরকারের তদন্ত থেকে। এতে দেখা যায়, ২০১৩ সালের মার্চ, ২০১৪ সালের ডিসেম্বর ও ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে নাজিবের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা হয়েছে। আরেকটি ডকুমেন্ট বলছে, ২০১৪ সালের ২০শে জানুয়ারি নাজিবের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়ে একটি চিঠি। কিছু ডকুমেন্টে এএম ইসলামিক ব্যাংক বেরহাদ-এর অ্যাকাউন্টে পাওয়া গেছে পাঁচটি অঙ্ক। এই পাঁচটি অঙ্ক নাজিব রাজাকের অ্যাকাউন্ট নম্বরের সঙ্গে মিলে যায়। গতকাল এর আগে দুর্নীতি তদন্তের জন্য গঠন করা হয়েছে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স। ওই কমিটি এক বিবৃতিতে বলেছে, এই তহবিলের অর্থ স্থানান্তরের সঙ্গে যুক্ত এমন ছয়টি ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। তবে নাজিব রাজাক তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বলা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নাজিবের অফিস থেকে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতির ওপর আস্থা খর্ব করতে, সরকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একজন প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু মানুষ সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে ওই সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি কারা বিবৃতিতে তার কিছুই বলা হয় নি। অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ বলেছেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশকে বিব্রতকর অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয় নি তার সময়ে। গতকাল তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক দেশকে বিব্রতকর এক অবস্থায় নিয়ে গেছেন। মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিফাহ আমান অভিযোগ করেছেন যে, নিউ ইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে কথা বলে দেশকে বিব্রতকর অবস্থায় নিয়ে গেছেন মাহাথির মোহাম্মদ। এর জবাবে মাহাথির বলেন, আনিফাহ’র জানা উচিত যে, ১এমডিবি দুর্নীতির কথা বিশ্বজুড়ে পরিচিত বিষয়। এর পরিবর্তে আনিফাহ’র লজ্জা পাওয়া উচিত ছিল। কারণ, বিদেশী বিশেষজ্ঞরা তদন্ত করে দেখিয়েছেন যে মালয়েশিয়ায় দুর্নীতি হচ্ছে। বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় যে ১০টি দেশে তার মধ্যে অন্যতম মালয়েশিয়া। আনিফাহ এ  বিষয়ে বিব্রত হন না।

গাফফারের বিচার ও নাগরিকত্ব বাতিলের দাবি আল্লামা শফীর

আল্লাহর ৯৯ নাম নিয়ে ‘বিতর্কিত’ বক্তব্যের অভিযোগে লেখক-কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরীর নাগরিকত্ব বাতিল ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফি। তিনি বলেছেন, তা না হলে  একের পর এক ইসলাম অবমাননা ও মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে দেশকে বিশৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যেতে ষড়যন্ত্র চালতে থাকবে। মঙ্গলবার বিকালে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ কথা বলেন হেফাজতের আমির। আব্দুল গাফফার চৌধুরীর বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে হেফাজত আমির বলেন, “শান্তি-শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতির বিরুদ্ধে উসকানিদাতা এসব ষড়যন্ত্রকারীদের শক্ত হাতে দমন ও প্রতিহত করার জন্য আমি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।” ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি ও বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে একে বাংলাদেশের মুসলিম জাতিসত্তার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র বলে মনে করেন শাহ আহমদ শফী। হেফাজত আমিরের প্রেস সচিব মাওলানা মুনির আহমদ স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে হেফাজত আমির বলেন, “ইসলাম অবমাননার মতো জঘন্য ঘটনার ধারাবাহিকতায় উলামা-মাশায়েখ ও তৌহিদি জনতার শত প্রতিবাদ সত্ত্বেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনোরূপ শাস্তিমূলক পদক্ষেপ না নেয়ায় ইসলামবিরোধী নাস্তিক-মুরতাদরা দ্বিগুণ উৎসাহে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে যাচ্ছে। দেশ ও জাতির শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে এসব বন্ধ করা জরুরি।” হেফাজত আমির বলেন, “মুরতাদ আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে জামাই আদরে ছেড়ে দেয়ার ঘটনায় উৎসাহিত হয়েই আব্দুল গাফফার চৌধুরী ইসলামের বিশ্বাস ও চিরায়ত মূল্যবোধের বিরুদ্ধে অবমাননাকর বক্তব্য দেয়ার সাহস  পেয়েছে। মহান আল্লাহর ৯৯ নাম, রাসূল (সা.)সহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর বিষয়ে ঔদ্ধত্যপূর্ণ চরম জাহেলি বক্তব্য দিয়ে ইহুদিদের এজেন্ট গাফফার চৌধুরী মুরতাদ লতিফ সিদ্দিকীদের কাতারে শামিল হয়ে নিজেকে আল্লাহদ্রোহী ও ইসলামবিরোধী হিসেবে প্রমাণ করেছে।” আল্লাহর ৯৯ নাম কাফের-দেবতাদের সঙ্গে তুলনা ও মন্তব্য করে গাফফার চৌধুরী পরিপূর্ণ মুরতাদে পরিণত হয়েছেন দাবি করে হেফাজতের আমির বলেন, “আল্লাহ-রাসূল (সা.), পর্দা-হিজাব ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে জঘন্য ধৃষ্টতাপূর্ণ বক্তব্যের পর কোনো ব্যক্তি মুসলমান থাকে না। গাফফার চৌধুরীর বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বাতিল এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার করতে হবে। এমন ব্যক্তির ইসলামি নাম ব্যবহার করার কোনোই অধিকার নেই।” বিবৃতিতে বলা হয়, “সরকারের উচিত দেশের ১৫ কোটি মুসলমানের হৃদয়ের ক্ষত অনুভব করে এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া। অন্যথায় দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা একের পর এক ইসলাম অবমাননা ও মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে দেশকে বিশৃঙ্খলার দিকে নিয়ে যেতে ষড়যন্ত্র চালাতে থাকবে।”

‘বিচার করা যাবে, অপমান করার অধিকার নেই’ -মুক্তিযোদ্ধাদের বিবৃতি

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরউল্লাহর বিরুদ্ধে ফের আদালত অবমাননার মামলা দায়েরের আবেদনের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধারা। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ‘আমরা রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা’ নামে একটি সংগঠন এ প্রতিবাদ জানায়। বিবৃতিতে মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, ডা. জাফরউল্লাহর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা দায়েরের আবেদনে আমরা বিস্মিত ও মর্মাহত হয়েছি। একজন মুক্তিযোদ্ধা খুন করলে তার ফাঁসি হতে পারে, চুরি করলে তার বিচার হতে পারে, কিন্তু বাক-স্বাধীনতার পক্ষে বিবৃতি দেয়ায় জাফরউল্লাহর মতো বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকারের খাঁচায় আবদ্ধ করে অপমান করার অধিকার কোন বিচারকের নেই। বিবৃতিতে তারা বলেন, যে কোন আদালতের গঠনমূলক সমালোচনা সেই আদালতকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলে। কিন্তু যে বিচারকগণ আদালতের রায়ের মাধ্যমে  জাফরউল্লাহর মতো মুক্তিযোদ্ধাকে অপমান করেছেন আসলে তারা মহান মুক্তিযুদ্ধকে অসম্মান করেছেন। আমরা রাজাকারের বিচারের আদালতে কোন মুক্তিযোদ্ধার সম্মানহানি দেখতে চাই না। বিবৃতিতে এ ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তারা বলেন, যেসব নামধারী মুক্তিযোদ্ধা জাফরউল্লাহ’র মতো মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদন করেছেন তাদের অসৎ উদ্দেশ্য মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ।  মুক্তিযোদ্ধাদের বিভক্ত করার সব ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তারা। বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা হলেন- মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, মে. জে. (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক, কর্নেল (অব.) মনীষ দেওয়ান, ফারুক-ই আজম বীরপ্রতীক, নঈম জাহাঙ্গীর, মিজানুর রহমান বীরপ্রতীক, মেজর (অব.) আক্তার আহমেদ বীরপ্রতীক, মেজর (অব.) মিজানুর রহমান, মেজর (অব.) মঞ্জুর আহমেদ বীরপ্রতীক, মেজর (অব.) মনিবুর রহমান, ফতেহ আলী চৌধুরী, ডা. আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বীরপ্রতীক, হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক, ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, এড. ফজলুর রহমান, শাহ মো. আবু জাফর, কমরেড খালেকুজ্জামান ভূঁইয়া,  শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, কর্নেল (অব.) জয়নুল আবদিন, মেজর (অব.) আসাদুজ্জামান, শফিউজ্জামান খোকন, আবেদুর রহমান, সাদেক আহমেদ খান, সৈয়দ আবুল বাশার, হাজী আবুল হোসেন, প্রকৌশলী আবদুল হালিম, মনিরুল ইসলাম ইউসুফ, শহীদ বাবলু, প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম, প্রকৌশলী ড. শাহ আলম, মোকছেদ আলী মঙ্গোলিয়া, মোজাফফর আহমেদ, মহিউদ্দিন আহমেদ শাহজাহান, আবদুল মজিদ, সহিদুল ইসলাম চৌধুরী মিলন, নুরুল ইসলাম, নুরুল আমিন, আবু হানিফ, এএসএম মোস্তফা কামাল, এইচ আর সিদ্দিকী সাজু, আবদুল জব্বার, রেজাউল করিম, শাহাবুদ্দিন রেজা, খালেদা আহমেদ, আবদুল হাকিম, আবদুল আহাদ, আতিকুর রহমান, আবদুল জলিল, আবদুর রাজ্জাক ভূঁইয়া রাজা, এড. আবুবকর সিদ্দিকী, প্রফেসর আবদুল কাইয়ুম, হাজী আফসারউদ্দিন, হারুনুর রশিদ, এড, রফিকুল ইসলাম, মহসিন উদ্দিন দুলাল, মহসিন সরকার, সৈয়দ একরামুল হক, চৌধুরী আবু তালেব, ওয়ালীউল্লাহ বাবলু, মহসিন আলী খান, এড. গোলাম মোস্তফা, আই্‌য়ুব আলী রেজা, রফিকুল হক নান্টু, মো. রফিক, এমএ মালেক খান, গিয়াসউদ্দিন মৃধা, হান্নান পলাশ মোল্লা, ইঞ্জিনিয়ার হুমায়ুন কবির, কাজী আমিনুর রহমান, কাজী নাসির আহমেদ, সিরাজুল ইসলাম পাটোয়ারী, আবদুল মান্নান, আবদুল লতিফ, এমএ খালেক, মাসুক আহমেদ, কমান্ডার আফজাল হোসেন, মো. কুতুবউদ্দিন, গোলাম হোসেন, সিরাজুল ইসলাম বেগ, শাহাদাত হোসেন মানিক, সামাদ মোল্লা, মিজানউদ্দিন আহমেদ, মো. নাসিম, মঞ্জুর হোসেন মালু, মো. মোতালেব, ওয়াহেদ আলী, সালেহ মোহাম্মদ মোক্তার হোসেন, নূর হোসেন মোল্লা, আক্কাস আলী, কামরুল ইসলাম, ওয়াহিদুজ্জামান মিন্টু, খালেকুজ্জামান ফারুক, হারিসউদ্দিন, সৈয়দ হারুনুর রশিদ, আক্তার ফারুক তোতা, মোশারফ হোসেন, আতাউর রহমান মিন্টু, আবু তাহের, দেলোয়ার হোসেন ও ইয়াদ আলী।

দেশ-জাতির স্বার্থেই রেলকে চাঙ্গা করা জরুরি by সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ

১৮২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর স্টিম ইঞ্জিনের আবিষ্কারক জর্জ স্টিফেনসন ইংল্যান্ডে সাধারণ যাত্রীর জন্য ট্রেন চালু করেন। শুরুতেই সবাই বুঝতে পারে যে, এটি ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন হিসেবে গণ্য হবে। যার ফলে ১৮৩৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রেন চালু করা হয়। ইউরোপের জার্মানিতে ১৮৩৫ সালে, ইতালিতে ১৮৩৭, ফ্রান্সে ১৮৪৪ এবং স্পেনে ১৮৪৮ সালে ট্রেন চালু হয়। এমনকি ব্রিটিশ শাসিত ভারতের মুম্বাই এ ১৮৬০ সালে রেললাইন স্থাপিত হয়। বাংলায় ট্রেন চালু করা হয় ১৮৬২ সালে। এভাবেই গোটা বিশ্বে রেল নেটওয়ার্ক বিস্তৃতি লাভ করতে থাকে। পাকিস্তানের শোষণ নীতির পরেও রেলওয়ে বিভাগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রেলওয়ের একটি মানরক্ষা করে চলত। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, স্বাধীন বাংলাদেশের কিছু জননেতা রেলের মতো এহেন একটি আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী এবং অধিক পরিমাণ যাত্রী একসঙ্গে পরিবহনের ক্ষমতাসম্পন্ন বাহনের ক্ষতিসাধন করলেন। রেলওয়ে আজো ২৫ মার্চ ১৯৭১-এর অবস্থায় পৌঁছতে পারেনি। যদিও তথাকথিত উন্নতি দেখানোর জন্য কিছু আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হয়েছে। তবে এতে সময় রক্ষার কোনো বালাই নাই, পরিষেবার মানও নি¤œ পর্যায়ে।  রেলপথকে উন্নত করার জন্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী রেল মন্ত্রণালয় খুলেছেন এবং দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এ প্রসঙ্গে চীনের নেতাদের একটি উক্তির কথা মনে পড়ে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত মি. রাজীব গান্ধী চীন সফরে গেলে আলোচনা প্রসঙ্গে চীনের নেতা মি. দেং রাজীব গান্ধীকে বলেছিলেন, চীনের নাগরিককে তিনি বলেছেন, তাদের প্রথমে বিশ শতকের নাগরিকের যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। তারপর একুশ শতকের কথা। সে সময় একুশ শতকের আগমন নিয়ে খুব মাতামাতি চলছিল। চীনের নেতাদের প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতা আজ চীনকে বিশ্বের দরবারে সর্বোচ্চ স্থানে নিয়ে গেছে। কথাটা মনে পড়ল যে প্রসঙ্গে সেটা হয়তো এত গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাংলাদেশ রেল বিভাগের প্রসঙ্গে এ কথা মনে পড়ল।
বঙ্গবন্ধুর পর যে সরকারগুলো ক্ষমতায় এসেছিল তারা রেলপথের উন্নতির তেমন কিছুই করেনি বরং এ ব্যাপারে উদাসীন ছিল। শুধু তাই নয়, একে পেছনে ঠেলে দিয়েছে। পূর্বে রেলওয়ে মন্ত্রণালয় ছিল। এর জন্য সংসদে পৃথক বাজেট উপস্থাপন করা হতো। পরে রেলবিভাগকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনা হলো। পৃথক বাজেট তো পরের কথা ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী দক্ষ কর্মচারীদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেকে বিদায় দেয়া হলো। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ২০১১ সালে রেলওয়ের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় চালু করলেন। রেলপথের উন্নতির জন্য তার আগ্রহের ২০ শালা পরিকল্পনা নেয়া হলো। এর অধীনে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার কথা। এই পরিকল্পনায় বড় একটা দিক হলো পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে  ঢাকার রেল যোগাযোগ স্থাপন করা। উল্লেখ্য, ঢাকার দক্ষিণে কোনো রেলপথ নেই। এছাড়া ট্রান্স এশিয়ার রেলপথের সঙ্গে বাংলাদেশের রেলওয়ের  সংযোগ স্থাপনের কথা রয়েছে। এমন পরিকল্পনার কথা শুনে আনন্দিতই হওয়ার কথা। কিন্তু রেলওয়ের বর্তমান অবস্থা চিন্তা করলে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব এ ব্যাপারে সবার মনে সন্দেহ দেখা দেয়ারই কথা। রেল দুর্ঘটনা একটি নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। গড়ে প্রতি ঘণ্টায় একটি ট্রেনও চলে না অথচ এর মধ্যেই একই লাইনে দুটি গাড়ি ঢুকে পড়ছে। কয়েকদিন আগে উত্তরবঙ্গের বগুড়া রেলস্টেশনে এ রকম ঘটনা ঘটে। একটি ট্রেনের চালকের উপস্থিত বুদ্ধির ফলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি বা জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। কয়েক সপ্তাহ আগে রাজবাড়ী স্টেশন থেকে একটি ইঞ্জিন চালক ছাড়া ২৭ কিমি. পথ অতিক্রম করে। এ একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। কত বড় মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারত তা কল্পনা করলেও শিউরে উঠতে হয়। জানি না এটি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে স্থান পেয়েছে কিনা। বহু রেলগেট একদম খোলা এবং এসব ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে দুর্ঘটনা ঘটে চলছে। জনবলের অভাবে এসব গেট অরক্ষিত রয়েছে। দু’বৎসরের বেশি সময় ধরে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে কয়েকশ’ কর্মী নিয়োগ করার জন্য। কিন্তু রাজনৈতিক চাপে নিয়োগ দেয়া বন্ধ করা দেয়া হয়। এর চেয়ে লজ্জার বিষয় আর কী হতে পারে। একজন সরকারি কর্মকর্তা যার পদবি মহাপরিচালক তিনি রেল বিভাগের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। পদমর্যাদায় বোধহয় সরকারের সচিব। উপমহাদেশের আমলাদের অনেকেই ঐতিহ্যগতভাবে দুর্নীতিপরায়ণ, অদক্ষ, মন্থর এবং জনবিমুখ। ইংরেজরা শিখিয়ে দিয়েছে যে আমলারা জনগণের প্রভু, সেবক নয়। ব্রিটিশরা প্রায় সাত যুগ আগে চলে গেলেও এই মানসিকতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। অতএব সরকারি অফিসের কাজকর্মের যে স্টাইল তাতে উন্নয়ন বা গণমুখী বা জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো কাজ-কর্ম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এ জন্য বিভিন্ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ বা কর্পোরেশন গঠন করে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হয়। আমাদের বাংলাদেশের কথা ধরা যাক। নদী পথের নাব্য সংরক্ষণ এবং নৌযান চলাচলের জন্য দুটো কর্তৃপক্ষ রয়েছে যাদের নাম বিআইডব্লিউটিএ এবং বিআইডব্লিউটিসি। বিমান চলাচলের জন্য রয়েছে বিমান কর্পোরেশন। বিমানবন্দর  রক্ষণাবেক্ষণের জন্য  প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। সড়ক পরিবহনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্ম্য অনেক। তারপরও ১৯৬১ সাল থেকে সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন চালু রয়েছে।
প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে রেল বিভাগের জন্য রয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী রেলওয়ে বোর্ড। পৃথক মন্ত্রণালয় এবং পৃথক বাজেট দুই-ই রয়েছে। আমাদের এখানেও রেলওয়ে বোর্ড ছিল। এছাড়া পরামর্শ প্রদানের জন্য একটি পরামর্শ কমিটি ছিল যেখানে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে সদস্য নেয়া হতো। আমাদের এখানে রেলওয়েকে একটা কর্পোরেশনে পরিণত করা হবে এমন কথা রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায় থেকে বলা হয়েছিল। ২০১৩-২০১৪ সালের বাজেট বক্তৃতায়ও এর উল্লেখ ছিল। এবারে বাজেট বক্তৃতায়  কোনো উল্লেখ নাই। এখানেই সবার প্রশ্ন। আবার কি রেলপথ কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছে? রেলওয়ের মতো একটি গণপরিবহনকে পঙ্গু করার সব প্রচেষ্টা করা হয়েছিল। রেলপথে যাত্রী এবং পণ্য পরিবহনে ব্যয় কম। তাছাড়া তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। যাত্রীদের মধ্যে যারা অধিক উচ্চ শ্রেণীতে ভ্রমণ করেন তাদের সুযোগ-সুবিধা ও আরাম অনেক বেশি। স্বাধীনতার পর কোথায় রেলপথ এবং রেলকে আধুনিকীকরণ করা হবে তা না করে সুপরিকল্পিতভাবে একে ধ্বংসের দিকেই ঠেলে দেয়া হচ্ছে অথচ বিশ্বের সর্বত্র সড়কপথ ও আকাশপথের ব্যাপক উন্নতি হলেও রেলপথকে কিন্তু একই ধরনের গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে এবং হয়েছেও। উন্নত দেশ যেমন ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান এবং চীনের ভেতর প্রতিযোগিতা চলে কে, কত  দ্রুতগামী ট্রেন চালু করতে পারে। বেইজিং থেকে লন্ডন পর্যন্ত ট্রেন চালু করার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। পৃথিবীর বড় তিনটি শহর যথা লন্ডন, নিউইয়র্ক এবং টোকিও শহর দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। ওখানে পাতাল রেলে যে পরিমাণ যাত্রী বহন করা হয়, তা যদি না করা হতো, তাহলে তিনটি শহর অচল হয়ে যেত। অবশ্য দিল্লি শহরের আকাশ এবং রেলপথেরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে। ঢাকা এখনই প্রায় অচল হয়ে গেছে। কিছুদিনের ভেতর একেবারে অচল হয়ে যাবে যদি অত্যন্ত দ্রুতভাবে মেট্রোরেল চালু করা না হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধ্বংসপ্রায় রেলপথকে উদ্ধার করার জন্য রেল মন্ত্রণালয় চালু করেছেন। তারই  উৎসাহে রেলকে ঘিরে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে কোনো অবস্থাতেই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না যদি রেলওয়ের বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো না বদলানো হয়। আমরা প্রত্যাশা করব যে, সরকার এই অচলায়তন ভেঙে ফেলতে সক্ষম হবে। লেখাটি শেষ করার আগে আবারো চীনের নেতা দেং কে স্মরণ করতে চাই। রেল বিভাগের ভিতকে মজবুত করতে হবে যেন উন্নয়ন প্রকল্পের ভার বহন করতে সক্ষম হয়। রেল বিভাগের দায়িত্বশীলদের সেই শক্তি ও মানসিকতা অর্জন করতে হবে।
লেখক: সাবেক ইপিএস ও কলামিস্ট। ব্যাংক, শেয়ারবাজার ও বীমাখাত বিশ্লেষক

আবারও সাংসদদের ইচ্ছাপূরণের প্রকল্প

জাতীয় সংসদের সাংসদেরা নিজেদের এলাকায় ইচ্ছামতো রাস্তাঘাট করতে পারবেন। এ জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থ দেওয়া হবে। প্রত্যেক সাংসদের অনুকূলে প্রতিবছর পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকবে। এভাবে আগামী চার বছরে প্রত্যেক সাংসদ মোট ২০ কোটি টাকা পাবেন।
সাংসদেরা এই অর্থ সরাসরি নিজেরা খরচ করতে পারবেন না। তাঁরা নিজ এলাকায় কোন কোন সড়ক তৈরি করতে হবে, কোন খালের ওপর সেতু লাগবে, কোথায় বাজার লাগবে, কোথায় নৌঘাট করতে হবে, তা ঠিক করে দেবেন। এখানে ওই সাংসদের ইচ্ছাই চূড়ান্ত। এরপর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সাংসদের সেই ইচ্ছা পূরণ করবে। এর আগে এ সরকারই একই ধরনের আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। পাঁচ বছর মেয়াদি সেই প্রকল্পে প্রতিবছর সাংসদেরা তিন কোটি টাকা করে বরাদ্দ পেয়েছেন।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ-সংক্রান্ত ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২’ অনুমোদন দেওয়া হয়। এ প্রকল্পে ব্যয় হবে ৬ হাজার ৭৬ কোটি টাকা। সাংসদদের ইচ্ছাপূরণে এ বিপুল অর্থ ব্যয় করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি মনিটরিং সেল থাকবে বলে জানা গেছে।
প্রকল্পটির আওতায় ২৮৪ জন সাংসদ নিজেদের এলাকায় প্রকল্প তৈরি করতে পারবেন। তবে দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন এলাকাভুক্ত ১৬ জন সাংসদ এবং সংরক্ষিত আসনের মহিলা সাংসদেরা এ প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার করতে পারবেন না। তাঁদের জন্য আলাদা প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
সাবেক ব্যয় পর্যালোচনা কমিশনের সদস্য ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক জায়েদ বখ্ত প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় এ ধরনের প্রকল্প নিলে অর্থ অপচয়ের ঝুঁকি থাকে। এ জন্য নজরদারি বাড়াতে হবে। তিনি মনে করেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে রাজনীতিবিদেরা চেষ্টা করবেন, যে এলাকায় তাঁর ভোট বেশি, সেখানে নতুন রাস্তাঘাট করবেন। হয়তো ওই এলাকায় একেবারেই রাস্তাঘাটের প্রয়োজন নেই।
জায়েদ বখ্ত-এর মতে, আগের প্রকল্পটিতে প্রথম পর্যায়ের কাজের প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়নি। কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি, বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে প্রকল্পের সুফল পৌঁছেছে কি না, তা দেখা দরকার।
গতকাল অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পের মেয়াদকাল ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত। প্রতি অর্থবছরে এ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে ১ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় ৬৪ জেলার ৪৬৬ কিলোমিটার উপজেলা সড়ক, ১ হাজার ৪৩০ কিলোমিটার ইউনিয়ন সড়ক এবং ৬ হাজার ১৭৩ কিলোমিটার গ্রাম সড়ক নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া প্রায় ৪ হাজার ৫৯৭ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। এর পাশাপাশি ১১১টি গ্রামীণ বাজার ও ৬৪টি নৌঘাট হবে। আর ১৫ হাজার ৩৫৫ মিটার সেতু নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্পটি নিয়ে একনেক সভার পরে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘বরাদ্দকৃত অর্থ সাংসদেরা নিজেরা সরাসরি ব্যয় করতে পারবেন না। তাঁরা তাঁদের পছন্দমতো তালিকা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠাবেন। এলজিইডি তা বাস্তবায়ন করবে।’
আওয়ামী লীগ সরকারের গত আমলে ২০১০ সালের ৯ মার্চ নেওয়া ৪ হাজার ৬৯১ কোটি টাকার একই ধরনের প্রকল্পে ২৭৯ জন সাংসদের অনুকূলে প্রতিবছর ৩ কোটি টাকা করে পাঁচ বছরে ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ডিসেম্বর মাসে প্রকল্পটি শেষ হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৪ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। কিন্তু এখনো প্রকল্পটির মূল্যায়ন করেনি পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।
মন্ত্রীদের আগ্রহ: প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলনকক্ষে গতকালের একনেক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রথমেই প্রকল্পটি পাসের জন্য ওঠানো হলে সেখানে অংশ নেওয়া একাধিক মন্ত্রী প্রকল্পটি নিয়ে আগ্রহ দেখিয়ে বক্তব্য দেন।
সভার দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘এ প্রকল্পটি দলের ভবিষ্যৎ। কেননা আমরাই বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটা আমাদের প্রমাণ করতে হবে।’
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, নির্বাচনের আগে জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিতে হয় যে নির্বাচিত হলে এ রাস্তা, ওই রাস্তা করব। এখন এসব রাস্তা তৈরির জন্য প্রধান প্রকৌশলীদের চাপ দিতে হবে না।’ কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, এ প্রকল্পটি নেওয়ার ফলে সাংসদদের পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এটা ভালো।
গতকাল মোট আটটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়। এতে মোট ব্যয় হবে ১০ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৮ হাজার ৭১০ কোটি টাকা, বাস্তবায়নকারী সংস্থা দেবে ৩৯৫ কোটি টাকা। আর প্রকল্প সাহায্য হিসেবে পাওয়া যাবে ১ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা।
পাস হওয়া প্রকল্পগুলোর অন্যতম হলো বর্ডার ম্যানেজমেন্ট ইকুইপমেন্ট ফর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ প্রকল্প (সংশোধিত), সীমান্ত এলাকায় বিজিবির ৬০টি বিওপি নির্মাণ, পুলিশ বাহিনীর ১৯টি ইউনিটে ১৯টি আধুনিক অস্ত্রাগার নির্মাণ, জাতীয় সংসদ ভবনের পূর্ত, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক সিস্টেমের উন্নয়ন, ছয়টি নতুন জাহাজ ক্রয়, উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়কে দীর্ঘ সেতু নির্মাণ এবং হাইটেক পার্কের জন্য মির্জাপুর ও মৌচাক স্টেশনের মধ্যবর্তী কালিয়াকৈরে একটি বি ক্লাস স্টেশন নির্মাণ প্রকল্প।

ভেজাল দুধের ৯টি কারখানা বন্ধ

ননির পানিতে পাওয়া যায় বড় বড় পোকা
পাবনার বেড়া উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত একটি কারখানায় গতকাল সোমবার অভিযান চালিয়ে প্রচুর ভেজাল দুধ ও এ দুধ তৈরির নানা উপকরণ উদ্ধার করেছেন।
এ দিন জেলার ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা এলাকায় আটটি নকল দুগ্ধজাত পণ্য তৈরির কারখানার সন্ধান পেয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এসব কারখানা সিলগালা (বন্ধ) করে দিয়েছেন এবং ১ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছেন।
আদালতসংশ্লিষ্ট তিন-চারজন কর্মকর্তা বলেন, বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া গ্রামের আমিরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল দুধ তৈরি করে আসছিলেন। এ জন্য তিনি তাঁর বাড়িতে গোপন কারখানা তৈরি করেন। সেখানে তিনি খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে প্রথমে তা থেকে আসল ননি তুলে নিতেন। এরপর ননিবিহীন দুধে নকল ননি মিশিয়ে ভেজাল দুধ তৈরি করতেন। নকল ননি তৈরি করার জন্য আধা লিটার নিম্নমানের পাম অয়েলের সঙ্গে আধা লিটার ভালো দুধ মিশিয়ে ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করা হতো।
গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বেড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম ফেরদৌস ইসলামের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত গতকাল সোমবার সকাল নয়টার দিকে আমিরুলের কারখানায় অভিযান চালান। আদালত সেখানে নয়টি ক্যান (প্রতি ক্যানে ৪০ লিটার) ও তিনটি প্লাস্টিকের ড্রামভর্তি (প্রতিটিতে ২০ লিটার) ভেজাল দুধ পান। এ ছাড়া সেখান থেকে প্রায় ২৫ লিটার পাম অয়েল, দুটি ব্লেন্ডার, দুধ থেকে ননি বের করার দুটি মেশিন উদ্ধার করা হয়। ভেজাল দুধ ঘটনাস্থলে নষ্ট করা হয়। অন্যান্য সামগ্রী আটকে থানায় সোপর্দ করা হয়।
গত বছরের ১১ ডিসেম্বর ভ্রাম্যমাণ আদালত আমিরুল ইসলামের কারখানায় অভিযান চালিয়ে প্রচুর ভেজাল দুধসহ দুধ তৈরির উপকরণ জব্দ করেন।
ভ্রাম্যমাণ আদালতে অন্যান্য কর্মকর্তার মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ফজলুল হক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর আবদুস সালাম।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম ফেরদৌস ইসলাম বলেন, যে জায়গাটিতে ভেজাল দুধ তৈরির কারখানা স্থাপন করা হয়েছিল, সেখানে গাড়িতে তো দূরের কথা, হেঁটে পৌঁছানোও কঠিন। ফলে সেখানে পৌঁছানোর আগেই কারখানার লোকজন পালিয়ে যান। তবে তাঁদের ধরা না গেলেও এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলাসহ পাবনার কয়েকটি উপজেলা থেকে পাঁচ-ছয়টি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান দুধ সংগ্রহ করে থাকে। দুধে কী পরিমাণ ননি আছে, তার ওপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠানগুলো দুধের মান ও দাম নির্ধারণ করে। এই সুযোগে অসাধু দুধ ব্যবসায়ীরা আসল দুধের সঙ্গে নকল ননিযুক্ত ভেজাল দুধ মিশিয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। রমজান মাস ও ঈদুল ফিতর সামনে রেখে সম্প্রতি বেড়া ও সাঁথিয়া উপজেলায় ভেজাল দুধের উৎপাদন ব্যাপক বেড়ে গেছে। এ নিয়ে গত শনিবার প্রথম আলোয় একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপা হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালত গতকাল পাবনার ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা গ্রামে অভিযান চালিয়ে নকল দুধ ও ঘি জব্দ করেন। পরে সেগুলো কারখানার আঙিনা ও আশপাশের পুকুরে ফেলে দেওয়া হয় l ছবি: প্রথম আলো
জেলার ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা এলাকায় ছানার পানিতে রাসায়নিক পদার্থ ও ময়দা মিশিয়ে দুধ তৈরি করা হচ্ছে। দুধের উচ্ছিষ্টের সঙ্গে রাসায়নিক পদার্থ ও পাম অয়েল মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ঘি। এ ছাড়া ময়লা আবর্জনার মধ্যে তৈরি হচ্ছে দুদ্ধজাত পণ্য। পাবনার দুগ্ধ সমৃদ্ধ এমন আটটি নকল দুগ্ধজাত পণ্য তৈরির কারখানার সন্ধান পেয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল ফরিদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মোমিনের নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে এসব কারখানা সিলগালা ও ১ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছেন।
ইউএনও শাহ মোমিন বলেন, দাম ও চাহিদা বাড়ায় একশ্রেণির ব্যবসায়ী নকল দুধ ও ঘি তৈরি শুরু করেছে। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ডেমরা গ্রামের রবিউল হোসেনের কারখানায় ভেজাল দুধ ও ঘি তৈরির প্রায় আড়াই লাখ টাকার ছানা, নাগ ডেমরা গ্রামের মুকুল হোসেনের কারখানার প্রায় ৩ লাখ টাকার ছানা, গোলকাটা গ্রামের জুয়েল ঘোষের কারখানায় দুধের ননির পানিতে পোকা ও তেলাপোকাসহ কীটপতঙ্গ পাওয়ায় কারখানার সকল মালামাল, নবঘোষের কারখানায় অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে ছানা সংরক্ষণ করায় সকল মালামাল এবং রতনপুর গ্রামের সুমন ঘোষের কারখানার সব দুগ্ধজাত পণ্য বাজেয়াপ্ত এবং কারখানাগুলো সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। এসব কারখানার মালিকেরা পালিয়ে যান।
তবে নকল ঘি তৈরির সময় হাতেনাতে ধরা পড়ায় দুলাল ঘোষের কারখানা থেকে ৫০ কেজি ঘি বাজেয়াপ্ত এবং কারখানাটি সিলগালা করে ১ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
অভিযান চলাকালে উপজেলার গোলকাটা গ্রামের নবঘোষের স্ত্রী লক্ষ্মী রানী ঘোষ বলেন, ‘আমরা নকল ঘি তৈরি করি না। ঘি তৈরির পর যে উচ্ছিষ্ট থাকে, সেই থেকে আবার ঘি বাইর হয়। এ জন্যি উচ্ছিষ্ট রাখি দেই।’

ভারতের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য বৈষম্য শিগগিরই দূর হবে না -সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী

ভারতের সঙ্গে চলে আসা বানিজ্য বৈষম্য খুব শিগগিরই দূর হবে না বলে সংসদে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ট্যারিফ, নন-ট্যারিফ যেসব পণ্যের সমস্যা রয়েছে তা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে বলে জানান তিনি। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে এনামুল হকের পক্ষে হুইপ শহিদুজ্জমান সরকার উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
একই প্রশ্নের জবাবে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ভারত-চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।  তবে এ বাণিজ্য ঘাটতিতে বাংলাদেশের তেমন ক্ষতি হচ্ছে না। মন্ত্রী বলেন, ভারতের সঙ্গে প্রধান বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি পোশাকে। তবে ভারতের বাজারে আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেন না ব্যবসায়ীরা। কারণ তাদের বাজারে তৈরি পোশাক এতো বেশি উৎপাদন হয় যে আমাদের তৈরি পোশাক সেখানে রপ্তানি করা লাগে না।
মন্ত্রী বলেন, বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সার্কভুক্ত দেশ ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ২০১১ সালের ৯ নভেম্বর ভারত থেকে বাংলাদেশকে তামাক ও মদ জাতীয় পণ্য ব্যতীত সব পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের সুযোগ দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের মধ্যকার শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূরীকরণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড এরিয়ার (সাফটা) আওতায় অন্য সার্কভুক্ত দেশ থেকে বহু পণ্যের শুল্কুমুক্ত সুবিধা পাওয়ার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
মন্ত্রী আরো বলেন, ভারতে রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্যে ভারতের গৌহাটি, কলকাতা, নয়াদিল্লী, শিলচর, মুম্বাই, রাঁচি ও ভুবনেশ্বরে বাংলাদেশি পণ্য সম্ভার পরিচিত করার জন্য নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশ নেয়া হচ্ছে। সার্কভুক্ত অন্য দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায়ও নিয়মিতভাবে অংশ নেয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।
এ কে এম শাহজাহান কামালের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ২৮ হাজার ১৪৪ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত আমদানির পরিমাণ ৩১ হাজার ৯৬৭ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভবিষ্যতে রপ্তানি আয় বৃদ্ধির জন্য সরকার নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে সুসংহত ও টেকসই রাখার পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে গতিশীল, বহির্মুখীকরণ ও রপ্তানি বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রতি তিন বছর অন্তর রপ্তানি নীতি তৈরি করা হয়। ত্রিবার্ষিক রপ্তানি নীতি ২০১৫-২০১৮-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। দেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে অধিক সংখ্যক পণ্যকে ভর্তুকি ও নগদ সহায়তার আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারকে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, জাপান, হংকং, ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, রাশিয়া, সিআইএসভুক্ত বিভিন্ন দেশ, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিলসহ নতুন নতুন বাজারে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া কোন কোন দেশে বাংলাদেশি পণ্যের একক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হচ্ছে। মন্ত্রী বলেন, বিদেশে নতুন নতুন বাজার অন্বেষণের লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির সমন্বয়ে বাণিজ্যক মিশন পাঠানো হচ্ছে। পণ্য পরিচিতি ও বহুমুখীকরণের জন্য প্রতি বছর জানুয়ারিতে এক মাসব্যাপী ঢাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার আয়োজন করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানসমূহ এ মেলায় অংশগ্রহণ করায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রপ্তানি আদেশ পাওয়া যায়। একই সাথে পণ্য পরিচিত বৃদ্ধি পায়।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বাণিজ্যিক মিশন খোলা হয়েছে। এ ছাড়া তুরস্ক, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় কমার্শিয়াল উইং খোলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টায় ইউরোপিয়ানভুক্ত সকল দেশ, ভারত, জাপান, চীন অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ইত্যাদি দেশে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া গেছে। বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
ফরমালিনের অপব্যবহার রোধে আমদানি নিয়ন্ত্রণ
নিজাম উদ্দিন হাজারীর এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর ফরমালিনের অপব্যবহার রোধে ফরমালিন আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। ইতিপূর্বে ফরমালিন অবাধে আমদানিযোগ্য হলেও বর্তমানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ব্যতিরেকে বিদেশ থেকে ফরমালিন আমদানি বন্ধে ২০১৪ সালের ১৩ আগস্টে এস আর ও জারি করা হয়েছে। এ ছাড়া ফরমালিনের অপব্যবহার রোধে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৫ প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত বিধিমালা জারির বিষয়টিও বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, ফলমূলসহ খাদ্যদ্রব্যে কেমিক্যালের অপব্যবহার রোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারিতে বিভিন্ন কেমিক্যালের মাধ্যমে ফল পাকানো বন্ধকরণে গাইডলাইন প্রণয়ন করা হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য গাইডলাইনটি বাস্তবায়ন ২০১৫ থেকে শুরু হয়েছে। এছাড়া রাসায়নিক জাতীয় দ্রব্যাদি আমদানির ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন ও রাসায়নিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।

প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ- অভিযোগ গুরুতর, তদন্ত হবে কী?

কাবিখা ও কাবিটা তথা কাজের বিনিময়ে খাদ্য অথবা টাকা কর্মসূচি এখন তছরুপ কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। প্রায় সব সরকারের আমলে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তৃণমূল পর্যায়ে নেওয়া উন্নয়ন কর্মসূচির বরাদ্দ আত্মসাতের ঘটনা ঘটে থাকে। সোমবারের প্রথম আলোয় দোহার-নবাবগঞ্জে কাজ না করে রাস্তার টাকা আত্মসাতের খবরে উঠে এসেছে সংরক্ষিত আসনের সাংসদ পিনু খানের নাম। কাগজে-কলমে রাস্তা নির্মিত হয়েছে দেখানো হলেও বাস্তবে সেখানে বিরাজ করছে ধানখেত। এটি বিরল ঘটনা নয়, বরং উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ আত্মসাতের ডুবোপাহাড়ের ভাসমান চূড়া এটি।
২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কাবিখা ও কাবিটা কর্মসূচির অর্থে চারটি সড়কের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাজ না হলেও সব টাকা তুলে নিয়ে গেছেন সাংসদ পিনু খান ও তাঁর ঘনিষ্ঠ লোকেরা। বরাদ্দের ১৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা ও ৫০ মেট্রিক টন গম নির্ধারিত কাজে ব্যয় না করে তিনি কী করেছেন, তা জানা দরকার। পিনু খান একাধারে আওয়ামী লীগের সাংসদ ও মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। সুতরাং তিনি কোনো অপকর্মে জড়িয়ে পড়লে এর দায় সরকার ও ক্ষমতাসীন দল—উভয়ের ওপরই বর্তায়। পিনু খানের পুত্র নেশাগ্রস্ত অবস্থায় দুই শ্রমজীবীকে হত্যার দায়ে বিচারের মুখোমুখি। সপরিবারে এত দুর্নীতি ও অনাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ যাঁর বিরুদ্ধে, কী করে তিনি সাংসদ ও দলের পদে বহাল থাকছেন? পিনু খানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন।
কাবিখা ও কাবিটার প্রচলন হয়েছিল তৃণমূলে একই সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে। কিন্তু দেখা যায় এটাই হয়ে উঠেছে সাংসদ থেকে শুরু করে উপজেলা ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এবং তৃণমূল প্রশাসনের দুর্নীতির অন্যতম ক্ষেত্র। এই দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারলে যে প্রান্তিক মানুষের জন্য উন্নয়ন কর্মসূচি, তা থেকে তাঁরা যেমন বঞ্চিত হবেন, তেমনি ব্যাহত হবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নও।
কাজ না করে রাস্তার টাকা আত্মসাৎ by নজরুল ইসলাম ও ইকবাল হোসেন
সরকারি কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে ইটের রাস্তা। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেল পুরোটাই খেত। ঢাকা জেলার দোহার-নবাবগঞ্জে এ রকম আরও একটি সড়ক রয়েছে, যা শুধুই কাগজে-কলমে।
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) ও কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচির টাকায় দুটি নতুন সড়কসহ মোট চারটি সড়কের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে কাজ করা হয়নি। সব টাকাই তুলে নিয়ে গেছেন স্থানীয় সাংসদ পিনু খান ও তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা।
মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এই ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সম্প্রতি আলোচিত হয়েছেন জোড়া খুনের ঘটনায়। তাঁর ছেলে বখতিয়ার আলম রনি নেশাগ্রস্ত অবস্থায় রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে গুলি করে দুই শ্রমজীবী মানুষকে খুন করেছেন। মামলা তদন্তে তিনি প্রভাব খাটিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। সাংসদ নিজেও সন্তানকে ছাড়িয়ে নিতে বিভিন্ন মহলে চেষ্টা-তদবিরও করছেন।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে সাংসদ পিনু খান গত শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পের সব কাজই তো হয়েছে। আর এ কাজ দেখার জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি ও বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আছেন। অতিবৃষ্টিতে রাস্তা কাদা হয়ে যাওয়ায় এমন অভিযোগ উঠতে পারে। পিনু খান তাঁর সন্তানকে বাঁচাতে প্রভাব খাটানোর কথাও অস্বীকার করে বলেন, তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আইন তার গতিতে চলছে।
ঢাকার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্র জানায়, সংরক্ষিত মহিলা আসন-২৩-এর সাংসদ (দোহার-নবাবগঞ্জের দায়িত্ব) পিনু খান গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কারকাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির (কাবিখা ও কাবিটা) আওতায় ঢাকা জেলার দোহার-নবাবগঞ্জে চারটি রাস্তা নির্মাণ, সংস্কার ও দুটি সোলার প্যানেল স্থাপনে ১৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা ও ৫০ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ পান।
প্রথম আলোর অনুসন্ধান ও সরেজমিনে দেখা গেছে, রাস্তা নির্মাণ-সংস্কার এবং সোলার প্যানেল বসানোর পুরো টাকা তুললেও কোনো কাজ করা হয়নি। এর মধ্যে দোহারে সড়কের কাজ গত বছরের ৩০ জুন এবং নবাবগঞ্জের সড়কের কাজ চলতি বছরের ৩০ জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা।
২০১৪ সালের জুনে দোহারের উত্তর জয়পাড়ায় হাকিমের বাড়ির মাথা থেকে হরমুজ আলী এবং মতি মোল্লার জমি থেকে চকের রাস্তা পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য সাংসদ পিনু খান ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ পান। গত ২১ জুন দোহারের উত্তর জয়পাড়া এলাকায় গিয়ে কোনো রাস্তা দেখা যায়ানি। নিচু জায়গায় ধঞ্চেগাছ, বড় বড় ঘাস ও আগাছা জন্মেছে। অথচ প্রকল্পের নথিপত্র অনুযায়ী সেখানে গাড়ি চলার উপযোগী এক নম্বর ইটের সলিং করা ২০ ফুট চওড়া রাস্তা করার কথা। এই রাস্তার ভাঙন রোধে নিরাপত্তা দেয়াল তৈরিরও কথা ছিল।
উত্তর জয়পাড়ার মোশারফ হোসেন বলেন, কাজ না করেই পিনু খান ও তাঁর লোকজন বিল তুলেছেন। তাঁর জমির ওপর দিয়ে কথিত রাস্তা দেখিয়ে টাকা তুলে মেরে দিয়েছেন তাঁরা।
এর পাশেই দোহারের উত্তর জয়পাড়ায় খুদি মুনশি ও বাদশার বাড়ি থেকে মহিউদ্দিনের বাড়ি পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারে ২০১৪ সালের জুনে পিনু খানের অনুকূলে কাবিখার আওতায় রাস্তা নির্মাণে ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাগজপত্রে সেখানে ইটের সলিং করে ২০ ফুট রাস্তা থাকার কথা। এ ছাড়া গজারি কাঠ ও ড্রামশিট গেঁথে রাস্তা রক্ষাকারী দেয়াল নির্মাণের শর্ত ছিল। কিন্তু সরেজমিনে রাস্তায় ইট ফেলার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। রাস্তাটির প্রস্থ ছয় ফুটের মতো। সেখানে দু-একটি বাঁশ ও কড়ইগাছের ডাল দিয়ে নামমাত্র নিরাপত্তা প্রাচীর করা হলেও বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই তা ভেঙে গেছে। ওই সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল দূরের কথা, একসঙ্গে কয়েকজন হেঁটে চলাও কষ্টকর।
স্থানীয় বাসিন্দা হৃদয় হোসেন বলেন, ইটের সলিং করা তো দূরের কথা, এখানে অল্প কিছু বালু ফেলা হয়েছে। একটু বৃষ্টিতেই রাস্তা দিয়ে চলাচলের অবস্থা থাকে না। বর্ষায় রাস্তা হাঁটুপানিতে ডুবে যায়। এলাকার অন্তত ১০ জন বাসিন্দা প্রথম আলোকে বলেন, সাংসদ পিনু খান ও দোহার উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান (বর্তমান ঢাকা জেলার ভাইস চেয়ারম্যান) আনারকলি ওরফে পুতুল কাজ না করে এসব টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
পাঁচজন করে সদস্য নিয়ে দুটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ছিলেন দোহার পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. আলমাছ উদ্দিন। তিনি দোহার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক। আওয়ামী লীগের এই নেতা প্রথম আলোকে বলেন, দোহার উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আনারকলি ওরফে পুতুলের অনুরোধে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার এক দিন আগে তাঁকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি করা হয়। তিনি বলেন, ‘প্রকল্প নিয়ে আসলে আমার কিছুই করার ছিল না। কাজ করার শর্তেই তাঁকে টাকা তোলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।’
অভিযোগের বিষয়ে আনারকলি দাবি করেন, বছর দেড়েক আগে উত্তর জয়পাড়ায় দুটি রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টির পানিতে তা ধুয়ে গেছে। ইটের সলিং করে রাস্তা করার কথা ছিল না। কিন্তু পিআইও কাজে ইটের সলিংয়ের রাস্তা করার শর্ত জুড়ে দেন।
দোহার উপজেলার পিআইও মো. হাবীব উল্লাহ মিঞা বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কয়েক দিন আগে সংসদ পিনু খানের প্রভাব খাঁটিয়ে তাঁর লোকজন বিল তুলে নেন। প্রকল্পের কাজ শেষ করবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন পিনু খানের লোকজন।
সরেজমিন নবাবগঞ্জের চার প্রকল্প: নবাবগঞ্জের ঝনঝনিয়া কবরস্থান থেকে শোল্লা ভবেশের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা পুনর্নির্মাণে সাংসদ পিনু খানের অনুকূলে কাবিখা কর্মসূচির আওতায় ২০ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর বাজারমূল্য চার লাখ টাকা। তবে সেখানে কোনো রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ খেত। এই জমিতে ধান চাষ করা হয়।
নবাবগঞ্জের শোল্লার নকুমুদ্দিনের বাড়ি থেকে বোয়ালি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা পুনর্নির্মাণে কাবিখার আওতায় গত ২৫ মে পিনু খানের অনুকূলে ২০ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেখানেও দেখা গেল এক কিলোমিটার দীর্ঘ কাঁচা রাস্তায় বেশির ভাগ অংশ খানাখন্দে ভরা।
পশ্চিম শোল্লার জামে মসজিদ, বোয়ালি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ও ঝনঝনিয়া কালীমন্দিরে সোলার প্যানেল নির্মাণে গত ২৫ মে পিনু খানের অনুকূলে কাবিখার আওতায় ১০ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু ঝনঝনিয়ায় গিয়ে কালীমন্দির খুঁজে পাওয়া যায়নি। গ্রামের বাসিন্দা রতন সরকারের বাড়িতে একটি লক্ষ্মীমন্দিরের খোঁজ মেলে। তবে বোয়ালি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে কিছুদিন আগে সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে।
দক্ষিণ শোল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সোলার প্যানেল স্থাপনে পিনু খানের নামে কাবিটার আওতায় দুই লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জহির উদ্দিন জানান, রোজার আগে স্কুলে সোলার প্যানেল স্থাপনের কথা শুনেছেন, কিন্তু এখনো স্থাপন করা হয়নি।
কাজ না করে টাকা তুলে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে নবাবগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. হাবীবউল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘কাজ হয়েছে কি না, তা তদারক করতে যাওয়ার সুযোগ হয়নি আমার। তা ছাড়া এমপি যেভাবে চান, সেভাবেই আমাদের চলতে হয়।’
নবাবগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাজিবুল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, সাংসদ পিনু খান তাঁর প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন কি না, সে বিষয়ে সরেজমিনে পরিদর্শন করা হবে।