Monday, September 15, 2025

নেতানিয়াহু যুদ্ধাপরাধী, নিউইয়র্ক এলে তাঁকে গ্রেপ্তারে পুলিশকে নির্দেশ দেবেন জোহরান

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক নগরের ডেমোক্রেটিক দলীয় মেয়র প্রার্থী জোহরান মামদানি বলেছেন, তিনি মেয়র নির্বাচিত হলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই শহরে এলে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে নিউইয়র্ক পুলিশকে (এনওয়াইপিডি) নির্দেশ দেবেন। নিজের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

গত শুক্রবার দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জোহরান মামদানি বলেছেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে তিনি যুদ্ধাপরাধী মনে করেন। তিনি গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছেন বলে জোহরান অভিযোগ করেন।

জোহরান বলেন, ইসরায়েলের নেতা নিউইয়র্কে এলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) যে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন, সেটির প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁকে বিমানবন্দরেই গ্রেপ্তার করা হবে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব এবং কেউ কেউ বলছেন, এভাবে তাঁকে গ্রেপ্তার করলে ফেডারেল আইনেরও লঙ্ঘন ঘটতে পারে, তা সত্ত্বেও জোহরানের প্রতিশ্রুতি সম্ভবত নিউইয়র্কেও প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। কারণ, এই নগরেই ইহুদি সম্প্রদায়ের বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করেন।

গাজায় ইসরায়েলের নৃশংস ও নির্বিচার হামলার পর নিউইয়র্কের মানুষের মধ্যে সাধারণভাবে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে সমর্থন প্রকাশ পাচ্ছে। তারপরও জোহরানের এই প্রতিশ্রুতি ইহুদি নেতাদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করবে।

মেয়র প্রার্থিতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলাকালে জোহরান আগেও বলেছিলেন, নিউইয়র্ক এলে তিনি নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করবেন। গত বৃহস্পতিবারের সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর সেই বক্তব্যকে আবারও সমর্থন করলেন। বরং তিনি এ নিয়ে বিস্তারিতভাবে জানিয়ে বলেন, নেতানিয়াহু এই নগরে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই তিনি তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশক আদেশ দেবেন।

ডেমাক্র্যাট মেয়র প্রার্থী বলেন, ‘এটা এমন একটি কাজ, যা আমি বাস্তবায়ন করতে চাই’।

নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের আইন সভার সদস্য এবং আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের জরিপে এগিয়ে থাকা জোহরান বলেন, কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় ডেমোক্র্যাট নেতাদের এমন সিদ্ধান্ত দেখাতে হবে, যেখানে কেন্দ্রীয় সরকার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

জোহরান কেভিন নিউসমের ২০০৪ সালের একটি সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেন। ওই সময় তিনি সান ফ্রান্সিসকোর মেয়র ছিলেন। তিনি সমকামী দম্পতিদের বিয়ের লাইসেন্স ইস্যু করে ফেডারেল আইনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

জোহরান বলেন, ‘এটা এমন এক মুহূর্ত যখন আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারব না। এটি এমন একটি সময়, যখন শহর ও রাজ্যগুলোকে আমাদের নিজেদের মূল্যবোধ, আমাদের নিজেদের মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।’

যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সদস্য নয় এবং ওই আদালতের কর্তৃত্ব স্বীকৃতি করে না। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের ওপর এই আদালতের কোনো আইনগত আধিকার নেই।’

নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তারা অনুরোধে সাড়া দেয়নি। অবশ্য গত জুলাইয়ে তিনি বলেছিলেন, জোহরান মামদানির হুমকি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন। নিউইয়র্কে ইসরায়েলের কনস্যুলেটের এক মুখপাত্র এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

জোহরান মামদানি বলেছেন, তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকেও গ্রেপ্তার করবেন। আইসিসি ২০২৩ সালে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।

এই মেয়র প্রার্থী বলেন, ‘আমার ইচ্ছা এই শহরকে এমন এক জায়গা তুলে আনতে হবে, যেখানে আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করা হয়।’

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আইসিসি থেকে জারি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার লক্ষ্যে নিউইয়র্ক পুলিশকে নেতানিয়াহু বা পুতিনকে গ্রেপ্তার করতে বললে জোহরান প্রায় নিশ্চিতভাবে ফেডারেল সরকারের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়াতে পারেন।

কলম্বিয়া ল স্কুলের অধ্যাপক ম্যাথিউ সি ওয়্যাক্সম্যান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে এমন কোনো গ্রেপ্তারের ঘটনা কখনো ঘটেনি। আমার মতে, এই বক্তব্যটা বড়জোর রাজনৈতিক কৌশল। কঠোরভাবে গৃহীত আইন-অনুমোদিত কোনো নীতি নয়।’

জোহরান মামদানি ইসরায়েলের ঘোর সমালোচক এবং গাজার এই যুদ্ধে তার সমালোচনা তীব্রতর হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য মতে, ইসরায়েলি নৃশংসতায় গাজায় প্রায় ৬৫ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

গাজায় দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের হামলার সঙ্গে সঙ্গে ডেমোক্র্যাট নেতাদের একাংশ নেতানিয়াহুর প্রতি চরম বিরক্ত হয়ে উঠেছেন। কংগ্রেসের কিছু বিশিষ্ট ইহুদি নেতা বলেছেন, তাঁর এই যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী তাঁর ও ইসরায়েলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, নিউইয়র্কবাসী ইসরায়েল ও গাজায় হামলা নিয়ে জোহরান মামদানির অবস্থানকে সমর্থন করছেন। আর জরিপে সম্ভাব্য ইহুদি ভোটারদের মধ্যে জোহরান কিছুটা এগিয়ে ছিলেন। তাঁদের প্রায় ৩০ শতাংশের সমর্থন তাঁর প্রতি। বর্তমান মেয়র এরিক অ্যাডামস ও সাবে গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমোর প্রতিও সমর্থন ঠিক তাঁর কাছাকাছি।

মেয়র প্রতিযোগিতায় জোহরানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ড্রু কুমো ইসরায়েলের প্রবল সমর্থক। আইসিসি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর তিনি স্বেচ্ছায় তাঁর আইনি দলে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় বলা হয়েছিল, নেতানিয়াহু গাজা উপত্যকায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত।

আইসিসির নিজস্ব কোনো পুলিশ বাহিনী নেই। আদালতদের আদেশ বাস্তবায়ন সদস্য দেশগুলোর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর নির্ভর করে। যেসব দেশ আইসিসির সদস্য তারা ওই পরোয়ানা কার্যকর করতে বাধ্য।

২০০২ সালের ‘আমেরিকান সার্ভিসমেম্বারস প্রটেকশন অ্যাক্ট’ নামের ফেডারেল আইনে স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় সংস্থাগুলোকে ওই আদালতের সঙ্গে সহযোগিতা থেকে বাধা দেওয়া হয়েছে। অবশ্য ওই আইনে একটি সংশোধনী আছে যা যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ বা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে ন্যায়বিচারের জন্য সহায়তা করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

অবশ্য প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অধীনে গ্লোবাল ক্রিমিনাল জাস্টিসের জন্য নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত বেথ ভ্যান শাক বলেছেন, এমন গ্রেপ্তারে তাত্ত্বিকভাবে ওই ধারা ব্যবহার করে সম্ভব হতে পারে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, অতীতে অন্তত দুজনের বিরুদ্ধে আইসিসির সক্রিয় পরোয়ানা থাকার পর তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। মার্কিন হেফাজতে আসার পর তাঁদের আটক করা হলেও ওইসব গ্রেপ্তার যুক্তরাষ্ট্রে ঘটেনি।

তবে বেথ ভ্যান বলেন, নিউইয়র্ক পুলিশের কীভাবে সেই ধরনের গ্রেপ্তার করার ক্ষমতায় থাকবে, তা স্পষ্ট নয়।

প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে একই দায়িত্ব পালনকারী আরেক বিশেষজ্ঞ টড বুকওয়াল্ড বলেন, ওই সংশোধনী রাজ্য বা স্থানীয় কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করার অধিকার দেবে না।

নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে জোহরান মামদানি বলেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে থাকা অবস্থায় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যেগুলোর কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

এই গ্রীষ্মে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে এক বৈঠকে নেতানিয়াহু বলেছেন, তিনি জোহরান মামদানির মন্তব্য নিয়ে ভাবছেন না। তাঁকে গ্রেপ্তারের সম্ভাব্যতা ‘কিছু দিক থেকে হাস্যকর’ বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

নেতানিয়াহু হুমকি দিয়ে এও বলেন, ‘আমি ট্রম্পের সঙ্গে সেখানে যাব এবং দেখা হবে।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প জোহরান মামদানিকে উদ্দেশ্যে করে যোগ করেছেন, তিনি ভালো আচরণ করুন। নইলে তিনি বড় সমস্যায় পড়বেন।

জোহরান মামদানি
জোহরান মামদানি। ছবি: এএফপি

‘কাতার নিঃসঙ্গ নয়, পাশে আছে আরব ও ইসলামিক বিশ্ব’

কাতার নিঃসঙ্গ নয়। তার পাশে আছে আরব ও ইসলামিক বিশ্ব। কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরাইলের নৃশংস হামলার পর আরব ও ইসলামিক নেতাদের জরুরি সম্মেলনের প্রস্তুতি মিটিংয়ে এ অভয়বাণী দিযেছেন আরব লিগের সেক্রেটারি জেনারেল আহমেদ আবুল গেইতি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আরব নিউজ। এতে বলা হয়, তিনি রবিবার ইসরাইলের কড়া সমালোচনা করেছেন। সতর্কতা দিয়ে বলেছেন, একটি অপরাধের সময় নীরবতা আরও অপরাধের জন্য পথ তৈরি করে দেয়।

দোহায় বসছে এই জরুরি সম্মেলন। সেখানে আবুল গেইত বলেন- এই সামিট নিজেই একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে। তা হলো- কাতার একা নয়। এর পাশে আছে আরব ও ইসলামিক বিশ্ব। তিনি সতর্ক করে বলেন, গাজায় যে গণহত্যা চলছে সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্ব দু’বছর ধরে নীরবতা অবলম্বন করছে। এর সরাসরি ফল হলো ইসরাইলের হামলা। উল্লেখ্য, গত ৯ই সেপ্টেম্বর হামাসের কয়েকজন কর্মকর্তার দোহা’র বাড়ি লক্ষ্য করে অপ্রত্যাশিত হামলা চালায় ইসরাইল। এর ফলে পুরো বিশ্বে নিন্দার ঝড় ওঠে। ফলে আরব ও ইসলামিক দেশগুলোর টনক নড়েছে। তারা জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে। এর আগেও যখন গাজাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া শুরু হয়েছে, তখন থেকেই এসব দেশ বা সংগঠন জোরালো নিন্দা প্রকাশ করেছে।

ব্যাস, ওই পর্যন্তই। ফলে ইসরাইল দেখেছে গাজাবাসীকে মেরে শেষ করে দিলেও তাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলার কেউ নেই। তাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। ইসরাইল ভাল করেই জানে, গাজার মাটিকে যদি ‘দোযখের আগুনে’ জালানো হয়, তবু ইসরাইলকে কেউ কিছু করতে পারবে না। ফলে এবারের এই সম্মেলন যখন আয়োজন করা হয়েছে, তা কিন্তু গাজায় গণহত্যার প্রতিবাদে নয়। এটা আয়োজন করা হয়েছে দোহায় হামলার কারণে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারির মতে, সোমবার এই সামিটে কাতার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইসরাইলি হামলার একটি খসড়া প্রস্তাব বিবেচনা করা হবে। তার কথায় এটা স্পষ্ট যে, এটা দোহা হামলাকে কেন্দ্র করে। যখন এই সম্মেলন হচ্ছে, তখন গাজায় রক্তগঙ্গা বইয়ে দিচ্ছে ইসরাইল।

একই প্রস্তুতিমুলখ মিটিংয়ে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মেদ বিন আবদুল রাহমান আল থানি আন্তর্জাতিক দুনিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দ্বিমুখী অবস্থান নেয়া বন্ধ করতে। একই সঙ্গে এটাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে ইসরাইলকে শাস্তি দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সম্মেলন শুরুর আগে মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদে লাতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। এ সময় তারা আরব-ইসলামিক ঐক্যের বিষয়টিকে জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন। এ অঞ্চলে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অভিন্ন স্বার্থ ও স্থিতিশীলতার জন্য সমন্বয়ের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তারা। দোহা সম্মেলনে যোগ দিতে রোববারই সেখানে পৌঁছেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, ইরাকি প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল সুদানি। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। সম্মেলনে যোগ দেয়ার কথা রয়েছে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগানের। 

https://mzamin.com/uploads/news/main/180133_Abul-1.webp

ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির পথে একমাত্র বাধা নেতানিয়াহু: পরিবারের অভিযোগ

গাজায় হামাসের হাতে এখনো জিম্মি ইসরায়েলিদের মুক্তি এবং শান্তি চুক্তির পথে ‘একমাত্র বাধা’ দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। জিম্মি ও নিখোঁজ ইসরায়েলি পরিবারের সদস্যদের সংগঠন ‘দ্য হোস্টেজেস অ্যান্ড মিসিং ফ্যামিলিজ ফোরাম’ এই অভিযোগ করেছে।

ফোরামটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছে, গত সপ্তাহে কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরায়েলের হামলা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ‘প্রতিবার যখনই একটি চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়, নেতানিয়াহু তখনই সেটি ভন্ডুল করে দেন।’

গত মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) দোহায় বিমান ও ড্রোন হামলা চালায় ইসরায়েল। হামাস জানিয়েছে, এতে তাদের পাঁচ সদস্য এবং কাতারের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।

গত শনিবার নেতানিয়াহু বলেন, কাতারে হামাস নেতাদের নির্মূল করা গেলে জিম্মিদের মুক্তি ও যুদ্ধের অবসানে প্রধান বাধা দূর হবে। হামাস যুদ্ধবিরতির সব চেষ্টা ভেস্তে দিয়ে গাজা যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

কাতারে হামলায় সৃষ্ট উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইসরায়েল সফরে এসেছেন। সফরে তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এ হামলার কারণে বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে ইসরায়েল।

কাতারে হামলার বিষয়ে নেতানিয়াহুর ব্যাখ্যা ভালোভাবে নেননি জিম্মিদের স্বজনেরা। তাঁরা বলেছেন, জিম্মিদের মুক্ত করতে ব্যর্থ নেতানিয়াহু। এই ব্যর্থতা ঢাকতে নতুন অজুহাত তৈরি করতে তিনি কাতারে হামলা করেছেন।

জিম্মিদের পরিবারের সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘কাতারে পরিকল্পিত হামলা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে, ৪৮ জিম্মিকে ফিরিয়ে আনা এবং যুদ্ধ শেষ করার পথে একমাত্র বাধা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নিজেই।’

পরিবারগুলো বলছে, ক্ষমতা ধরে রাখতে সময়ক্ষেপণের জন্য নেতানিয়াহু যেসব অজুহাত তৈরি করছেন, সেগুলোর অবসান ঘটানোর সময় এসেছে। নেতানিয়াহুর সময়ক্ষেপণের কারণে ৪২ জিম্মির মৃত্যু হয়েছে। যারা কোনোমতে বেঁচে আছেন তাঁদের জীবনও এখন হুমকির মুখে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-14%2F08wr7yft%2Fhostage-family.jpg?rect=0%2C0%2C640%2C427&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
হামাসের হাতে জিম্মিদের মুক্তির দাবিতে ইসরায়েলে বিক্ষোভ করছেন মানুষ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

আমি শিবভক্ত, ‘বিষ’ গিলতেও রাজি: মোদি

বিরোধী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শাণিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, জনগণই তার আসল কর্তা ও ‘রিমোট কন্ট্রোল। তাদের সামনেই তিনি নিজের বেদনা প্রকাশ করেন। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আরজেডি-কংগ্রেসের একটি নির্বাচনী সভা থেকে তার এবং প্রয়াত মা হীরাবেন মোদিকে লক্ষ্য করে করা কটূক্তি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি শিবভক্ত এবং এই ধরনের গালিগালাজের ‘বিষ’ গিলতে প্রস্তুত। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। আসামের দরং জেলায় এক জনসভায় একাধিক প্রকল্প উদ্ধোধন করেন মোদি। সেখানে তিনি বলেন, আমি জানি পুরো কংগ্রেস শিবির আমার দিকে আঙুল তুলবে। বলবে- মোদি আবার কাঁদছে। কিন্তু জনগণই আমার ভগবান।

যদি তাদের সামনে আমি আমার দুঃখ প্রকাশ না করি, তবে কোথায় করব? তারাই আমার দেবতা, আমার রিমোট কন্ট্রোল। আমার আর কোনো রিমোট কন্ট্রোল নেই। সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারে বিহারে আরজেডি-কংগ্রেসের মঞ্চ থেকে কটূক্তি করা হয় মোদিকে নিয়ে। কংগ্রেস দাবি করেছে, তাদের কোনো নেতা সেই সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন না। পরে আরও বিতর্ক তৈরি হয় কংগ্রেস একটি এআই ব্যবহার করে তৈরি করা ভিডিও প্রকাশ করলে। তাতে মোদির মায়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। ‘রিমোট কন্ট্রোল’ প্রসঙ্গটির রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। অতীতে মোদি অভিযোগ করেন, ইউপিএ সরকারের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে নিয়ন্ত্রণ করতেন সোনিয়া গান্ধী।

বর্তমান কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গেকেও গান্ধী পরিবারের ‘রিমোট কন্ট্রোল’ বলে কটাক্ষ করেন তিনি। তবে তার এ বক্তব্য বার বার অস্বীকার করেছে কংগ্রেস। প্রধানমন্ত্রী জানান, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব শর্মা তাকে কংগ্রেস সভাপতি খাড়গের এক মন্তব্যের কথা মনে করিয়ে দেন। ভারত সরকার যখন কিংবদন্তি গায়ক ভূপেন হাজারিকাকে ভারতরত্নে ভূষিত করে, তখন খাড়গে বলেন মোদি ‘গায়ক-নৃত্যশিল্পীদের’ পুরস্কার দিচ্ছেন। যদিও ২০১৯ সালে খাড়গে কংগ্রেস সভাপতি ছিলেন না, তবুও ওই মন্তব্যে বিতর্ক তৈরি হয়। পরে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ড. ভূপেন হাজারিকা আমাদের দেশের অন্যতম প্রতিভাবান শিল্পী।

সংগীত, কবিতা, সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে তার অবদান অসামান্য। তার সৃষ্টিকর্ম আসামের সংস্কৃতি ও শিল্পকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিয়েছে। মোদি বলেন, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের পর স্বীকার করেন যে, উত্তর-পূর্বের মানুষের ক্ষত সারেনি। আজকের কংগ্রেস সেই ক্ষতে নুন ছিটাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, দশকের পর দশক কংগ্রেস আসাম শাসন করেছে। অথচ ব্রহ্মপুত্রের ওপর মাত্র তিনটি সেতু বানিয়েছে ৬০-৬৫ বছরে। অথচ আপনাদের আশীর্বাদে আমরা মাত্র এক দশকে ছয়টি নতুন সেতু নির্মাণ করেছি। তাই স্বাভাবিকভাবেই আপনারা আমাদের কাজে সন্তুষ্ট এবং আশীর্বাদ দিয়েছেন। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কংগ্রেসের আমলে সন্ত্রাস হলে তারা নীরব থাকত। এখন আমাদের সেনারা ‘অপারেশন সিঁদুর’ চালিয়ে পাকিস্তানের প্রতিটি কোণ থেকে সন্ত্রাস উপড়ে ফেলছে।

কিন্তু কংগ্রেস পাকিস্তান সেনার পক্ষে দাঁড়ায়। পাকিস্তানের মিথ্যাই কংগ্রেসের এজেন্ডা হয়ে ওঠে। তাই কংগ্রেস থেকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। অভিবাসন প্রসঙ্গে মোদি বলেন, কংগ্রেসের ‘সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ভোটব্যাঙ্ক’ এবং তারা দেশের কথা কখনো ভাবেনি। আজ কংগ্রেস দেশবিরোধী ও অনুপ্রবেশকারীদের রক্ষক হয়ে উঠেছে। তারা ক্ষমতায় থাকাকালে অনুপ্রবেশকে উৎসাহিত করেছে, আর এখন চায় অনুপ্রবেশকারীরা স্থায়ীভাবে দেশে থেকে ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করুক।

mzamin

ডাকসুর কী প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়তে যাচ্ছে by এ কে এম জাকারিয়া

ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের বড় জয়ের নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে। একেক জন একেক দিককে গুরুত্ব দিয়ে এই ফলাফলকে ব্যাখ্যা করছেন। নিজের বিচার-বিবেচনা, রাজনৈতিক বিশ্বাস ও অবস্থান এবং উইশফুল থিংকিং বা নিজের চাওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে এগুলো মানুষ গ্রহণ করবে বা করবে না। এমন কোনো সঠিক ব্যাখ্যা আমরা পাব না যা সব মানুষের কাছে যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য মনে হবে। এসব আলোচনা চলতেই থাকবে।

ডাকসু কার দখলে থাকল, জাতীয় রাজনীতিতে তা কোনো প্রভাব ফেলে কিনা তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আছে। কিন্তু ‘জাতীয় রাজনীতি’ সব সময়েই ডাকসুকে গুরুত্ব দেয়। এ জন্য জোর জবরদস্তির ঘটনাও ঘটেছে। তা ব্যালট বক্স ছিনতাই (১৯৭৩ সালের নির্বাচন) বা আগে ব্যালট বক্স ভরে রাখাসহ নানা কৌশলে( ২০১৯ সালের নির্বাচন) যেভাবেই হোক না কেন। আবার ক্ষমতাসীন দল যখন মনে করে ডাকসুতে তাদের জেতার সুযোগ নেই তখন তারা নির্বাচনই দেয় না।

এবারের ডাকসু নির্বাচন হয়েছে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এবং একটি রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের পর বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষ পরিস্থিতি নানা সময়ে তৈরি হয়েছে এর কোনোটির মাত্রাগত গভীরতাই জুলাই অভ্যুত্থান বা শেখ হাসিনাকে উৎখাতের সঙ্গে তুলনীয় নয়। সেই ঘটনার এক বছরের মাথায় অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে আমরা দেখলাম পুরোনো বা প্রচলিত কোনো হিসাব-নিকাশ কাজ করেনি।

বাংলাদেশে সব আমলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের কার্যক্রম ‘নিষিদ্ধ’ ছিল। ছাত্র সংগঠনগুলো মিলে মিশে সিদ্ধান্ত নিয়েই তা ‘কার্যকর’ করেছে। কিন্তু গত ১৫ বছরে কীভাবে কী ঘটেছে তা ছিল আমাদের জানা বোঝার বাইরে। শিবিরের লোকজন যে ‘গুপ্ত শিবির’ হিসেবে ছাত্রলীগে আশ্রয় নিয়ে কাজ করে গেছে তা আমরা জেনেছি গত বছর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে-পরে। সেই অর্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র শিবিরে প্রকাশ্য কার্যক্রমের বয়স মাত্র ১ বছর। তাদের এই বিপুল বিজয় অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত।

গত ১৫ বছরে দেশে নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। একতরফা নির্বাচন ও দিনে-রাতে ব্যালট বাক্স ভরে ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর জনসমর্থন বা শক্তি-সামর্থ্য মাপার কোনো সুযোগ হয়নি।

এই দলের এত ভাগ ভোট, ওই দলের কম-বেশি এত ভাগ ভোট বা অমুক পন্থীদের ভোট এত ভাগ- এমন একটি হিসাব-নিকাশ যে আমরা করি তার ভিত্তি আসলে ২০০৮ সাল বা এর আগের নির্বাচনগুলো। গত ১৬ বছরে নতুন ভোটার হিসেবে একটি বড় জনগোষ্ঠী যুক্ত হয়েছে এবং তাদের অধিকাংশই কখনো ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। এই নতুন ভোটারেরা কোনো রাজনৈতিক দল বা শক্তিকে ভোট দেবে তা আমাদের জানা-বোঝার বাইরে।

জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি একসময় নানা মহল থেকে উঠেছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হতে পারেনি। দেশ এখন জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী বছর ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম ভাগে নির্বাচন হওয়ার কথা। এর আগে শুধু কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ডাকসুর নির্বাচন হয়েছে। জাকসুর নির্বাচন গতকাল হয়েছে। রাকসু ও চাকসুর নির্বাচন বাকি আছে। বলা যায় জাতীয় নির্বাচনের আগে ছোট এবং ভিন্ন পরিসরে হলেও এই চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-সংসদের নির্বাচনই এক অর্থে দলগুলোর সমর্থন ও রাজনৈতিক শক্তি-সামর্থ্য ও সাংগঠনিক ক্ষমতা পরীক্ষার একটি ক্ষেত্র। এর মধ্যে ডাকসুর প্রভাব স্বভাবতই সবচেয়ে বেশি।

প্রথম আলো শিরোনাম করেছে, ‘ডাকসুর ফলাফলে বিএনপি বিব্রত, জামায়াত উচ্ছ্বসিত’। কিন্তু ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল কি শুধু দল দুটির  ‘উচ্ছ্বাস’ আর ‘বিব্রত’ হওয়ার মধ্যেই আটকে থাকবে? নাকি জাতীয় রাজনীতিতেও নতুন হিসাব নিকাশের সূচনা ঘটাবে? বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের সময় যখন এগিয়ে আসছে।

আমরা জানি যে গণ-অভ্যুত্থানের পর এক বিশেষ পরিস্থিতিতে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এই নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তার কথা শোনা যায়। গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রত্যাশিত সংস্কার বা জুলাই সনদ নিয়ে এখনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ রয়ে গেছে। ডাকসুর ফলাফল অন্তত বিএনপি ও জামায়াতের কৌশল ও চিন্তা-ভাবনায় কতটা পরিবর্তন আনে সেটাই এখন দেখার বিষয়। এই দল দুটির রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানের যে কোনো পরিবর্তন সামগ্রিক রাজনৈতিক হিসাব নিকাশে পরিবর্তন ঘটাবে।

আগেই বলেছি ডাকসুর নির্বাচনের ফলাফল ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের বড় জয় নিয়ে নানা বিশ্লেষণ হচ্ছে। এর মধ্যে সংগঠনটির কৌশল বদল, প্রার্থী মনোনয়ন থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে নিজেদের উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নেওয়া নানা উদ্যোগের বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে।

বলা হচ্ছে, শিবিরের এসব কৌশল কাজে দিয়েছে। এমনকি আমরা দেখলাম ডাকসুর শিবির প্যানেলের নির্বাচিতরা রায়ের বাজারে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে গিয়ে দোয়া-খায়ের করেছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতও কি এসব কৌশলকে দস্তুর মানবে? মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে, নারী ইস্যুতে জামায়াতের রাজনীতিতে কি কোনো পরিবর্তন আসবে?

ছাত্রদলের পরাজয়ের বিভিন্ন কারণের মধ্যে তাঁদের প্রস্তুতিহীনতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার অভাব যেমন আলোচিত হয়েছে তেমনি সংগঠনটির ভাবমূর্তির সমস্যার বিষয়টিও অনেকের আলোচনায় পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে চরিত্রগত বিবেচনায় ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল একই সঙ্গে উচ্চারিত দুটি নাম। তবে গত ১৫ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের অপকর্ম ও অত্যাচার-নির্যাতন সব মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সেই দুঃসহ সময় ক্যাম্পাসে ফিরে আসুক তা শিক্ষার্থীরা কোনো ভাবেই চাইবে না।

কিন্তু এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীরা সম্ভবত ছাত্রদলের ওপর ভরসা করতে পারেনি। কারণ ছাত্রদলের ইতিহাসও এ ক্ষেত্রে খুব ভালো নয়। তা ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ছাত্রদলসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের বিরুদ্ধে দখলদারি ও চাঁদাবাজির যত অভিযোগ উঠেছে সেটাও শিক্ষার্থীদের ছাত্রদল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণ বলে অনেকে মনে করেন। এসব নানা বিবেচনায় ডাকসু নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা বিকল্প হিসেবে ছাত্র শিবিরকে বেছে নিয়েছে।

জাতীয় রাজনীতিতে যদি একই হিসাব-নিকাশ কাজ করে তবে দল হিসেবে বিএনপির জন্য তা বিপদের বিষয়। নির্বাচনের আর ৫ মাসের মতো সময় আছে। এই সময়ের মধ্যে তারা নিজেদের কতটা বদলাতে পারবে? দলটির স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের নানা অপকর্ম সম্ভাব্য ভোটারদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখে গেছে দৃশ্যমান উদ্যোগ থাকলেও গত ১ বছরে বিএনপি এই নেতা-কর্মীদের ঠেকাতে বা থামাতে পারেনি। ডাকসু নির্বাচনের ফলাফলের পর এটা বলা যায় যে, বড় দল হিসেবে বিএনপি আগামী নির্বাচনে জয়ী হবেই—   এমন আত্মবিশ্বাসও দলটির জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।

রাজনৈতিকভাবে যারা জামায়াত ও শিবিরের ঘোরতর বিরোধী তাদের অনেকে মনে করেন ডাকসুতে শিবিরের জয় ঠেকাতে শিবির বিরোধী সংগঠনগুলোর জোট গড়ে মাঠে নামা উচিত ছিল। জাতীয় নির্বাচনে জোট গড়ার ক্ষেত্রে ডাকসুর এই অভিজ্ঞতা প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচনী জোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো মধ্যে যে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ ও আলোচনা চলছিল ডাকসু নির্বাচনের পর সেই আলোচনা নিশ্চিতভাবেই ভিন্ন মাত্রা পাবে। ডাকসুতে এনসিপির ছাত্র সংগঠনের খারাপ ফল জাতীয় রাজনীতিতেও তার দর-কষাকষির ক্ষমতা কমাতে পারে।

ডাকসুতে শিবিরের জয়ের সুবিধা জাতীয় বা নির্বাচনী রাজনীতি জামায়াত পেতে পারে বা নাও পেতে পারে। কারণ তা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সতর্ক হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। বিএনপির মতো বড় দল এখন আর জামায়াতের শক্তিকে খাটো দেখবে বলে মনে হয় না। তারা এখন  নিশ্চয়ই হিসাব-নিকাশ করেই জামায়াতকে মোকাবিলার কৌশল নেবে। বোঝা যাচ্ছে, সামনের জাতীয় নির্বাচনে ডাকসুর ফলাফল প্রভাব হতে পারে নানামুখী।

* এ কে এম জাকারিয়া, প্রথম আলোর উপসম্পাদক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের উল্লাস। রাজু ভাস্কর্যের সামনে, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের উল্লাস। রাজু ভাস্কর্যের সামনে, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: প্রথম আলো

ইরান যে তিন কারণে পারমাণবিক অস্ত্র বানাবে না by আশরাফুর রহমান

বিশ্বরাজনীতিতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি একটি বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ইস্যু। পশ্চিমা শক্তিগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, বহু বছর ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান নাকি গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চাইছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) বা যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আজ পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি, যা এ দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করে। অন্যদিকে ইরান শুরু থেকেই বলে আসছে যে তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণরূপে শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত।

প্রশ্ন হলো, যদি ইরান সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে চাইত, তাহলে গত দুই দশকে তা তৈরি করেনি কেন? আর যদি তা না-ই চায়, তাহলে উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাচ্ছে কেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে হলে ইরানের ধর্মীয় অবস্থান, কৌশলগত চিন্তা, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির দ্বিচারিতা একত্রে বিশ্লেষণ করতে হবে।

ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা ও নৈতিক অবস্থান


২০০৩ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি একটি ঐতিহাসিক ফতোয়া জারি করেন। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়, ‘পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি, মজুত কিংবা ব্যবহার ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম।’ এ সিদ্ধান্ত শুধুই ধর্মীয় নয়, বরং একটি নৈতিক অবস্থানও, যেখানে নিরীহ মানুষ হত্যাকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। পারমাণবিক বোমা শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে না, বরং শহর, জনপদ ও লাখ লাখ নিরীহ মানুষের প্রাণ হরণ করে। ইসলামের যুদ্ধনীতিতে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

ইরান মনে করে, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার শুধু মানবতার বিরুদ্ধে নয়, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিরুদ্ধে চরম অন্যায়। হিরোশিমা-নাগাসাকির দৃষ্টান্ত এ বিষয়ে যথেষ্ট প্রমাণ দেয়।

কৌশলগত ও সামরিক বাস্তবতা

অনেকের ধারণা, পারমাণবিক অস্ত্র থাকলেই একটি দেশ নিরাপদ থাকে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। পাকিস্তান ১৯৯৮ সালে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করলেও ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযানে অংশ নিতে বাধ্য হয়। উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্রধারী হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে। এমনকি রাশিয়া, যাদের বিশ্বের সর্বোচ্চ পারমাণবিক অস্ত্র মজুত রয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধে ন্যাটোর সঙ্গে কৌশলগতভাবে চাপে পড়েছে। ইসরায়েলও অঘোষিত পারমাণবিক অস্ত্রধারী হওয়া সত্ত্বেও ইরানের ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ’-এ বড় ধরনের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে।

এ বাস্তবতা ইরানকে বুঝিয়ে দিয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্র নয়, কার্যকর প্রতিরোধক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। তাই তারা শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, চালকবিহীন বিমান বা ড্রোন এবং কৌশলগত অস্ত্র নির্মাণে জোর দিয়েছে।

রাজনৈতিক ঝুঁকি ও আন্তর্জাতিক চাপ

এ কথা সত্য যে পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর প্রয়োজনীয় ইউরোনিয়াম ইরানের রয়েছে। ইচ্ছা করলেই তা পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর প্রয়োজনীয় ৯০ মাত্রায় সমৃদ্ধ করা সম্ভব। কিন্তু তারপরও ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে যাচ্ছে না। ধর্মীয় বাধা অতিক্রম করে ইরান যদি পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে যায়, তাহলে অন্তত তিনটি বড় ঝুঁকি সামনে চলে আসবে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। এগুলো হলো—

১. কঠোর নিষেধাজ্ঞা: ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরানের বিরুদ্ধে নানা নিষেধাজ্ঞা দিতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৫ সালের পর থেকে ইরান–সম্পর্কিত দেড় হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। নতুন করে মার্কিন কিংবা জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে জনগণের ওপর চাপ আরও বাড়বে।

২. মিত্রদের সমর্থন হারানো: রাশিয়া ও চীনের মতো মিত্রদেশগুলোর পক্ষেও তখন ইরানকে প্রকাশ্য সমর্থন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এনপিটির সদস্য হিসেবে তারা চাইবে না নতুন কেউ পারমাণবিক শক্তিধর হোক।

৩. ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলা: গত ১৩ ও ২২ জুন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। তাদের অভিযোগ ছিল ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর কাছাকাছি রয়েছে। আর যদি বোমা বানায়, তাহলে তারা সম্মিলিতভাবে হামলা চালাবে, এতে সন্দেহ নেই।

আন্তর্জাতিক চুক্তি ও দ্বিমুখিতা

ইরান ১৯৬৮ সালের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) সদস্য। সেই অনুযায়ী, তারা শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের অধিকার রাখে। ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) অনুযায়ী, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত রাখে এবং আইএইএর পরিদর্শনে সম্মতি দেয়। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন একতরফাভাবে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়, ফলে ইরানও কিছু ক্ষেত্রে অবস্থান পাল্টায়।

এরপরও ইরান ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন করেনি, যেটি অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজন। তা সত্ত্বেও গত ১৩ জুনের হামলার আগে আইএইএ ইরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে এবং কয়েক দিন পরেই ইসরায়েল হামলা চালায়। পরে যুক্তরাষ্ট্রও হামলায় যুক্ত হয়। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান সংস্থাটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং আইএইএর সঙ্গে সম্পর্ক স্থগিত করে। সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসির সফরের অনুরোধও প্রত্যাখ্যান করে।

ইরান কেন উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে

যদিও ইরান সরকার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে এবং সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি একটি ধর্মীয় ফতোয়া জারি করে একে ‘হারাম’ ঘোষণা করেছেন, তারপরও দেশটি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্লেষকেরা একে চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে দেখছেন।

এই সমৃদ্ধকরণ ইরানের জন্য কয়েকটি কৌশলগত সুবিধা আনে।এক. আলোচনায় প্রভাব বাড়ানো। বিশেষ করে জেসিপিওএ চুক্তি পুনরুজ্জীবনের জন্য প্রয়োজনে অল্প সময়ের মধ্যে অস্ত্র-মানের ইউরেনিয়ামতৈরির সক্ষমতা অর্জন। দুই. আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সমতা আনা। যেমন ইসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার ও সৌদি পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষাপটে এবং জাতীয় মর্যাদা ও প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে পারমাণবিক প্রযুক্তি রক্ষা।

সুতরাং বোমা বানানোর ঘোষণা না দিলেও ইরান এমন একটি অবস্থান গ্রহণ করেছে, যাতে প্রয়োজনে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করা যায় এবং এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করা সম্ভব হয়।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের দ্বিচারিতা

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিরুদ্ধাচরণ করলেও ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগে ওয়াশিংটন নিজেই তেহরানকে পারমাণবিক প্রযুক্তি সরবরাহ করেছিল। কিন্তু বিপ্লবের পর সেই ইরানকেই হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে ইসরায়েল কখনোই এনপিটিতে স্বাক্ষর করেনি। কিন্তু ধারণা করা হয়, তারা ৮০ থেকে ৪০০টি পারমাণবিক বোমার মালিক। কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাই তাদের জবাবদিহির আওতায় আনে না। অথচ যুক্তরাষ্ট্র তেল আবিবকে সব ধরনের সহয়তা দিয়ে যাচ্ছে। এই দ্বিচারিতাকে বিশ্লেষক নোয়াম চমস্কি অভিহিত করেছেন, ‘যে অস্ত্র ইসরায়েলের হাতে নিরাপত্তা, সেটি ইরানের হাতে হুমকি—এটাই বিশ্বরাজনীতির ভণ্ডামি।’

শক্তি নয়, নীতি

ইরান জানে, পারমাণবিক বোমা কেবল নৈতিকভাবে নয়, কৌশলগতভাবেও আত্মঘাতী। তাই তারা অস্ত্রের নয়, নীতির পথ বেছে নিয়েছে। শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং সেই অধিকার রক্ষাই ইরানের লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক সমাজের উচিত এ অবস্থানকে সম্মান জানিয়ে কূটনৈতিক সমাধানে এগিয়ে আসা। চাপ নয়, সংলাপই পারে উত্তেজনার পথ থেকে বিশ্বকে ফিরিয়ে আনতে। একটি ন্যায্য ও নিরাপদ বিশ্ব গড়তে হলে দ্বিচারিতা নয়, চাই আন্তরিকতা ও সম্মানভিত্তিক অংশগ্রহণ।

* আশরাফুর রহমান, রেডিও তেহরানের সাংবাদিক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

সামরিক মহড়া চলাকালে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের অজ্ঞাত স্থান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ১৯ জানুয়ারি ছবিটি প্রকাশ করে ইরান
সামরিক মহড়া চলাকালে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের অজ্ঞাত স্থান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ১৯ জানুয়ারি ছবিটি প্রকাশ করে ইরান। ছবি: রয়টার্স

আবুধাবিতে এত ‘জায়েদ’ কেন by মাহমুদুল হাসান

পথের রেখায় ক্লান্তির ছাপ নেই। শাঁই শাঁই করে ছুটে যায় গাড়ি। কিন্তু গন্তব্য কোথায়? তীব্র গরমের দেশে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত জীবনের আড়ালে রঙিন কোনো ভুবনেই হয়তো হারান ভ্রমণবিলাসীরা। মরুভূমির বালুচর দেখে মেটান মনের সাধ।

অচেনা সেই জগৎ আড়ালে রেখে দৃশ্যমান আবুধাবির দুনিয়ায় পথ চলতে চলতে যেখানেই যাবেন, খুঁজে পাওয়া যাবে শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানকে। আবুধাবি শহরটাই যেন জায়েদময়। ভিনদেশি পরিব্রাজক কিংবা দরকারি কাজে ছুটে এসে প্রথম যে গন্তব্যে নামবেন, সেটির নামই তো শেখ জায়েদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর!

সেখান থেকে বেরিয়ে পথ চলতে চলতে প্রায়ই দেখা মেলে রাস্তার ধারের বড় সাইনবোর্ড, যাতে লেখা ‘শেখ জায়েদ সড়ক’। পথের ধারে চিহ্ন এঁকে দেওয়া একটু পরপর—ডান কিংবা বাঁ দিকে গেলে ভিন্ন ভিন্ন যে গন্তব্য, সেসবের বেশির ভাগের নামেও জায়েদ। আরব সাগরের যে জেলে–জীবন তাঁদের একসময় বাঁচিয়ে রাখত, এখন সেখানে গড়ে ওঠা বন্দরটার নামও জায়েদ পোর্ট।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে এসে এশিয়া কাপ কাভার করতে গন্তব্য মাঠ, কী নাম? শেখ জায়েদ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম। প্রেসবক্সে বড় করে ছবি টাঙিয়ে রাখা তাঁর। স্টেডিয়ামের বাইরেও সারি সারি মাঠ। চাইলে ভাড়া নিয়ে বাস্কেটবল, টেনিস কিংবা অন্য কোনো প্রিয় খেলা খেলা যায়। এই পুরো কমপ্লেক্সটারও একটা নাম আছে—শেখ জায়েদ স্পোর্টস হাব।

একটু অসতর্কতা ‘জায়েদ–বিভ্রাটে’ ফেলে পকেট থেকে বাড়তি দিরহামও খসিয়ে দিতে পারে। এক বিদেশি সাংবাদিক যেমন গাড়ি ভাড়ার অ্যাপে শেখ জায়েদ স্টেডিয়ামের জায়গায় তাড়াহুড়া করে জায়েদ বিমানবন্দরে ক্লিক করে ফেলেন। যতক্ষণে তা টের পাওয়া যায়, ততক্ষণে অনেক দেরি।
কিন্তু আবুধাবিতে এত ‘জায়েদ’ কেন? এক বাক্যে উত্তর—শহরটা তো জায়েদেরই! বছর ষাটেক আগেও পানি আর বিদ্যুৎহীন জেলেদের যাযাবর জীবন এখানকার মানুষের নিয়তি ছিল। পাতার তৈরি ছাদ আর তাঁবুতে ছিল থাকার ব্যবস্থা। সেই জীবনে ইমারত গড়ে দেওয়ার কৃতিত্বটা তো শেখ জায়েদ বিন সুলতান নাহিয়ান নামের স্বপ্নদ্রষ্টারই।

আবুধাবির রাজপরিবারের সদস্য জায়েদ শুরুতে ছিলেন ভাই শেখ শাখবাদের নিয়োগ করা গভর্নর। বছরে ৩ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ড পেতেন সেই সূত্রে। ভোগ–বিলাস ছেড়ে তা বিনিয়োগ শুরু করেন কৃষি আর উন্নয়নকাজে। তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে তখনই।
এর মধ্যেই সৌভাগ্যের পরশ ছুঁয়ে যায় আরবকে। ১৯৫৮ সালে খুঁজে পাওয়া যায় তেলের খনি, বালু থেকে বেরিয়ে আসে তেল। সেটি যে পৃথিবীর গন্তব্যেও বদলের শুরু, তখন তা বুঝতে পেরেছিলেন খুব কম মানুষই। যেমন বুঝতে পারেননি আবুধাবির তখনকার শাসক শাখবাদও। আরবের হাজার বছরের ঐতিহ্যেকে আঁকড়ে থাকার প্রাণান্ত চেষ্টা করে গেছেন তিনি।

১৯৬৬ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শাখবাদকে সরিয়ে আবুধাবির নিয়ন্ত্রণ নেন জায়েদ। মানুষের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন ছিল তাঁর আগে থেকেই। সুযোগটা এরপর তিনি কাজে লাগাতে শুরু করেন পুরোদমে। কিন্তু ধাক্কা খেতে শুরু করেন ১৯৬৮ সাল থেকে ব্রিটিশরা সৈন্য সরিয়ে নিতে শুরু করলে। আমিরাতের রাজ্যগুলোর অন্তঃকোন্দল থেকে দূরে সরিয়ে রাখছিল ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশদের সঙ্গে করা ওই চুক্তি।

নতুন সংকট জায়েদের সামনে খুলে দেয় নতুন দিগন্তেরও। প্রায় ৩ বছরের চেষ্টায় ১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর আরবের ছয় প্রদেশ আবুধাবি, দুবাই, শারজা, হুজাইরা, আজমান ও উম্মু আল খাইনকে জোড়া লাগিয়ে সৃষ্টি হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের। অবধারিতভাবেই দেশটির প্রথম রাষ্ট্রপতি হন শেখ জায়েদ। পরের বছর আমিরাতে যোগ হয় রাস–আল খাইমা নামের আরও একটি প্রদেশ।

হাসপাতাল, স্কুল, রাস্তাঘাট নির্মাণ শুরু হয়। কাজের বিনিয়মে বেতন পেতে শুরু করে আমিরাতের মানুষ। তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে আমিরাতজুড়ে বাড়তে থাকে ইমারত, প্রশস্ত সড়ক। আমিরাতের মানুষের জীবনে নেমে আসে নতুন বসন্ত। বদলে যায় তাঁদের ভাগ্য।

মরুভূমির জীবনে ভর করে বিলাসিতা। তাতেও নেতৃত্ব দেন শেখ জায়েদ। তাঁর কীর্তিময় স্মৃতি ধরে রাখতেই আজ পথে পথে তাঁর নাম। শুধু তো আর আমিরাত নয়—পাকিস্তানের একটি বিমানবন্দর আর লন্ডনের স্কুল অব ইকোনমিকসের একটি লেকচার সেন্টারের নামকরণও হয়েছে তাঁর নামে।  
২০০৪ সালের ২ নভেম্বর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করা শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান এখনো বেঁচে আছেন আমিরাতের স্থাপনা আর সড়কে। আরবদের কাছে যেন এই কীর্তিমানের মৃত্যু নেই। তাতে যদি ভিনদেশি মানুষের একটু বিভ্রাট হয়ও, তাতে কী আর করা!

শেখ জায়েদ মসজিদ, আবুধাবি
শেখ জায়েদ মসজিদ, আবুধাবি। শেখ জায়েদ মসজিদের ওয়েবসাইট

কুষ্টিয়ায় দাফন সম্পন্ন: আমরা আম্মার শেষ ইচ্ছাটাই পূরণ করেছি: ফরিদা পারভীনের ছেলে নাহিল by তৌহিদী হাসান

‘আম্মা যখন অসুস্থ ছিলেন, তখন তাঁর শেষ ইচ্ছাটা ছিল কুষ্টিয়াতে একবার আসতে চান। এবং ওনার (আম্মা) শেষ ইচ্ছাটা ছিল তাঁর মা–বাবার কবরে তাঁকে শায়িত করা হোক। আমরা ওনার শেষ ইচ্ছাটাই পূরণ করছি।’

লালনসংগীতের বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীনের জানাজার আগে এসব কথা জানালেন তাঁর ছেলে ইমাম নাহিল। জানাজা শেষে রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে কুষ্টিয়া পৌর গোরস্তানে মা–বাবার কবরে চিরশায়িত করা হয় ফরিদা পারভীনকে। এ সময় সেখানে তাঁর দুই ছেলে ইমাম নাহিল, ইমাম নিমেরী, এক মেয়ে জিহান ফারিয়াসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

গত শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীন (৭১)। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। রাত ৮টা ২৩ মিনিটে ফরিদা পারভীনের মরদেহ বহনকারী ফ্রিজিং গাড়ি ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া পৌর গোরস্তানে এসে পৌঁছায়।

সেখানে অনুষ্ঠিত জানাজায় লালন একাডেমির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন, চিন্তক ও কবি ফরহাদ মজহার অংশ নেন। ফরিদা পারভীনের জানাজা পড়ান কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মোল্লা মো. রুহুল আমীন।

জানাজার আগে ফরিদা পারভীনের ছেলে ইমাম নাহিল তাঁর মায়ের জন্য দোয়া চেয়ে বলেন, ‘কুষ্টিয়াতেই আমার আম্মার বেড়ে ওঠা। এখানে থেকেই তাঁর জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন। তাঁর কোনো অন্যায় যদি হয়ে থাকে, সন্তান হিসেবে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। কুষ্টিয়ার কথা আম্মা সব সময় বলতেন।’

ফরহাদ মজহার বলেন, ‘কুষ্টিয়া হলো নদীয়া। এই নদীয়ার ভাবের কথা ফকির লালন জানে কি তা। বিশাল ভাবের জগৎ। সেই বিশাল ভাবের জগৎটা একেবারে অন্ধকারের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছিল। ফরিদা পারভীনের মাধ্যমে এটা সামনে এসেছে। ফরিদার গানের যে মাধুর্য, তার গলার যে মাধুর্য, তার যে বিশেষভাবে পরিবেশনার ভঙ্গি, সাধু জগতে অত্যন্ত পরিচিত। এখানকার যে ভাবসংগীত, সেটার দীর্ঘ ইতিহাস আছে, সেই দীর্ঘ ইতিহাসের যে সুতাটা ছিঁড়ে গিয়েছিল, সেই সুতাটা ফরিদা পারভীন বেঁধে দিয়েছেন।’

জানাজা শেষে জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সারা বিশ্বের জন্য আজকের সংগীতাঙ্গনে একটা শোকের ছায়া। তাঁকে শত শত বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ মনে রাখবে। আমরা শোকাহত। বাংলাদেশে সংগীতাঙ্গনে তাঁর যে অবদান, তা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। তিনি একজন গুনী মানুষ ছিলেন। কুষ্টিয়াবাসীর অন্তরে দীর্ঘদিন থাকবেন।’

১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়া থানায় জন্ম নেওয়া ফরিদা পারভীন গানে গানে কাটিয়েছেন ৫৫ বছর। বাবার চাকরির সুবাদে বিভিন্ন জেলায় যেতে হয়েছে তাঁকে। শৈশবে যখন মাগুরায় ছিলেন, তখন ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে সংগীতের হাতেখড়ি হয়। ১৯৫৭-৫৮ সালে চার-পাঁচ বছর বয়সে তাঁকে গানে হাতেখড়ি দিয়েছিলেন ওস্তাদ কমল চক্রবর্তী। এরপর যেখানেই থেকেছেন, সেখানেই বিভিন্নজনের কাছে গানের তালিম নিয়েছেন তিনি। স্বরলিপি দিয়ে নজরুলের গান হারমোনিয়ামে ও কণ্ঠে তোলার কাজটি তিনি ওস্তাদ মীর মোজাফফর আলীর কাছেই প্রথম শেখেন। ১৯৬৮ সালে তিনি রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত নজরুলসংগীতশিল্পী নির্বাচিত হন।

স্বাধীনতার পর লালন সাঁইজির গানের সঙ্গে ফরিদা পারভীনের যোগাযোগ, তখন তিনি কুষ্টিয়ায় থাকতেন। সেখানে তাঁদের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন মোকছেদ আলী সাঁই। ১৯৭৩ সালে ফরিদা পারভীন তাঁর কাছেই ‘সত্য বল সুপথে চল’ গান শেখার মাধ্যমে লালন সাঁইজির গানের তালিম নেন। মোকছেদ আলী সাঁইয়ের মৃত্যুর পর খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁইয়ের কাছে লালনগীতির তালিম নেন। লালন সাঁইজির গানের বাণী ও সুরকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে ফরিদা পারভীনের অবদান সর্বজনস্বীকৃত। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বদরবারেও তিনি লালন সাঁইয়ের বাণী ও সুরকে প্রচারের কাজে নিয়োজিত ছিলেন।

লালনগীতিতে অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে একুশে পদক পান ফরিদা পারভীন। এর বাইরে ১৯৯৩ সালে ‘অন্ধ প্রেম’ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত ‘নিন্দার কাঁটা’ গানটির জন্য শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী (নারী) হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি ২০০৮ সালে জাপানের ফুকুওয়াকা পুরস্কার লাভ করেন।

ফরিদা পারভীনের দাফনের সিদ্ধান্তে স্বামী-সন্তানদের মতবিরোধ,অতঃপর... by মনজুর কাদের

তখন রাত ১১টা পেরিয়েছে। কর্মব্যস্ত হাসপাতালেও তখন সুনসান। আইসিইউ করিডরও নিস্তব্ধ। লিফটে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে যেতেই মানুষের আনাগোনা। আগত মানুষদের কেউ এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করছেন। আছে টেলিভিশনের ক্যামেরা। লালনসংগীতের বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীনের মৃত্যুসংবাদ শুনে ছুটে এসেছেন সাংবাদিকেরাও। আছেন শিল্পীর পরিবার, স্বজনেরাও। ততক্ষণে সবাই জেনে গেছেন, গতকাল শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে চিরতরে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন ফরিদা পারভীন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

হাসপাতালের বিছানায় প্রাণহীন ফরিদা পারভীনের নিথর দেহ। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের বাইরে তখন পরিবারের সদস্যরা। এক পাশে চেয়ারে বসে কাঁদছিলেন স্বামী বংশীবাদক গাজী আবদুল হাকিম, অন্যপাশে ফরিদা পারভীনের দুই সন্তান—এম আই নাহিল ও জিহান ফারিয়া। স্বামীর চাওয়া, ফরিদা পারভীনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানো শেষে ঢাকার মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা। কিন্তু ছেলে-মেয়ের চাওয়া মাকে নিয়ে যাবেন কুষ্টিয়ার পৌর শহরে, সেখানে বাবা-মায়ের কবরে সমাহিত করা হবে। স্বামী–সন্তানেরা আলাদা করে এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বিবৃতিও দেন।

৭১ বছর বয়সী শিল্পী ফরিদা পারভীন জীবনের শেষ কয়েক বছর কিডনি রোগের জটিলতায় ভুগছিলেন। ডায়ালাইসিসের পরও তাঁর শিল্পীসত্তা কখনো ক্লান্ত হয়নি। হাসপাতালের বিছানায় থেকেও তাঁর মনে ছিল গান। অবশেষে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে না–ফেরার দেশে চলে গেলেন। সেই সঙ্গে বাংলার সংগীতের আকাশের উজ্জ্বল এক নক্ষত্র অস্ত গেল। নিভে গেল এক কণ্ঠস্বর, যে কণ্ঠ শুনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম লালনকে নতুনভাবে চিনেছে।

চিকিৎসকেরা চেষ্টা করেছিলেন শেষ পর্যন্ত—ডায়ালাইসিস, ভেন্টিলেশনে ফেরানো যায় কি না ফরিদা পারভীনকে। কিন্তু আর ফেরানো যায়নি। এর মধ্য দিয়ে ১৪ দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা ফরিদা পারভীনের জীবনাবসন হয়। মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পরপরই আলোচনায় আসে, কোথায় সমাহিত করা হবে বরেণ্য এই শিল্পীকে? ঢাকায় দাফন হলে শিল্পীজীবনের সহকর্মী, তাঁর অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী সহজে শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন—এমনটাই মত দিয়েছেন গাজী আবদুল হাকিম। আবার কুষ্টিয়া তাঁর শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিভরা জায়গা, যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন মা-বাবা, শিল্পীরও চাওয়া তাঁকে যেন মা–বাবার কবরে সমাহিত করা হয়—এমনটাই মত দিয়েছেন নাহিল ও জিহান। হাসপাতালে এ নিয়ে ঘণ্টাখানেক ধরে চলে আলোচনা। অবশেষে সিদ্ধান্ত হয়, ফরিদা পারভীনের শেষ ঠিকানা হবে কুষ্টিয়া।

ফরিদা পারভীনের ছেলে এম আই নাহিল গতকাল রাতে প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন, তাঁরা আজ রোববার সকাল সকাল মাকে কুষ্টিয়ায় নিয়ে যেতে চান। ঢাকায় কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা করতে চান না। যত দ্রুত মাকে দাফন করা হবে, ততই মঙ্গল। তবে গাজী আবদুল হাকিমের বক্তব্য ছিল এ রকম, ‘শিল্পী ফরিদা পারভীন রাষ্ট্রের সম্পদ। তাই আমার চাওয়া, তাঁকে যেন সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শহীদ মিনারে নেওয়া হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে জানাজা শেষে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়। ফরিদা পারভীনের হাতে গড়া গানের স্কুল “অচিন পাখি”তে শেষবারের মতো ঘুরিয়ে নেওয়া হয়।’

গাজী আবদুল হাকিম ও ফরিদা পারভীনের আগের সংসারের সন্তানদের চাওয়া যখন বিপরীতমুখী, তখন এ নিয়ে অভিভাবক পর্যায়ের কয়েকজন হাসপাতালের ভেতরই আলোচনায় বসেন। একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকায় যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা হবে, কিন্তু চিরনিদ্রায় শায়িত হবে কুষ্টিয়ার পৌর কবরস্থানে, যেখানে শিল্পীর বাবা দেলোয়ার হোসাইন ও মা রওফা বেগমকে সমাহিত করা হয়েছে। ছেলে নাহিল বললেন, ‘আমার মায়ের অসিয়ত ছিল, তাঁকে যেন তাঁর বাবা-মায়ের কবরে দাফন করা হয়। এটা তিনি লিখেও দিয়ে গেছেন।’ ছেলের কথা শুনে একপর্যায়ে মেনে নেন গাজী আবদুল হাকিমও।

সন্তানদের চোখে তখন জল, মুখে একধরনের শান্তি—মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণের তৃপ্তি। আবদুল হাকিমও যেন সন্তানদের চাওয়া পূরণ করতে পেরে স্বস্তি পেলেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি একসময়ের জনপ্রিয় গীতিকার ও সুরকার আবু জাফরের স্ত্রী ছিলেন। তাঁদের সংসারে এক মেয়ে ও তিন ছেলে। আবু জাফরের লেখা-সুর করা অনেক গানই তাঁর কণ্ঠে অমর হয়ে আছে। যেমন ‘এই পদ্মা এই মেঘনা’, ‘তোমরা ভুলে গেছো মল্লিকাদির নাম’, ‘নিন্দার কাঁটা’। তবে দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছেদ ঘটলেও গানই ছিল তাঁর চিরসঙ্গী। এরপর ২০০৫ সালের ১৭ জানুয়ারি বংশীবাদক গাজী আবদুল হাকিমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে জড়ান ফরিদা পারভীন। তাঁদের দুজনের সংসারে কোনো সন্তান ছিল না।

হাসপাতালের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ফরিদা পারভীনের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর তেজকুনীপাড়ার বাসায়। সকাল সাড়ে ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হয় মরদেহ, যাতে সাধারণ মানুষ শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে পারেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা শেষে বেলা একটায় ফরিদা পারভীনের মরদেহ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা রওনা হয়েছেন কুষ্টিয়ায়। বাদ মাগরিব তাঁকে সেখানে সমাহিত করা হবে।

এক আসরে লালনের গান গাইছেন ফরিদা পারভীন, পাশে বাঁশি বাজাচ্ছেন স্বামী গাজী আবদুল হাকিম
এক আসরে লালনের গান গাইছেন ফরিদা পারভীন, পাশে বাঁশি বাজাচ্ছেন স্বামী গাজী আবদুল হাকিম। ফাইল ছবি

কাতার ও উপসাগরীয় দেশগুলো কীভাবে ইসরায়েলের হামলার জবাব দেবে

মিডল ইস্ট আইঃ আমরা বিভিন্ন সংঘাতের মধ্যস্থতা করি, কখনো বিভিন্ন সংঘাতে নিরপেক্ষ থাকি, কখনোবা শান্তির দূত হিসেবে ভূমিকা রাখি—কাতারের এমন একটি গর্ব ছিল।

কিন্তু সেই কাতারেই প্রথমবারের মতো বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলে। এতে করে জ্বালানি তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ পারস্য উপসাগরের ছোট দেশটি ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল।

গত মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় হামাস কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে ইসরায়েলের আকস্মিক হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন কাতারের নিরাপত্তা কর্মকর্তা। তবে হামাসের শীর্ষ কোনো নেতা নিহত হননি।

দোহায় হামলার মধ্য দিয়ে ইসরায়েল নতুন এক সীমারেখা অতিক্রম করেছে। এবারই তারা উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) কোনো সদস্যরাষ্ট্রে হামলার দায় স্বীকার করল।

কাতার জিসিসির এমন এক সদস্যরাষ্ট্র, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের আঞ্চলিক সদর দপ্তর (সেন্টকম) অবস্থিত। সেখানে আট হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।

এখন কাতার কীভাবে ইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়া জানাবে, সেদিকে চোখ রাখছে সবাই।

লন্ডনের কিংস কলেজের উপসাগরীয় নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, ‘স্বল্প মেয়াদে কাতার সেই হাতিয়ারগুলোই ব্যবহার করবে, যেগুলোতে তারা সবচেয়ে দক্ষ। তা হলো কূটনীতি ও আইন।’

ক্রিগ আরও বলেন, ‘জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বা সাধারণ পরিষদ যেখানে সম্ভব, সেখানেই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য প্রস্তুতি শুরু করেছে কাতার।’

আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক ক্রিস্টিন দিওয়ান বলেন, আরব লিগ, ৫৭ সদস্যবিশিষ্ট ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থাসহ (ওআইসি) অন্যান্য যৌথ প্ল্যাটফর্ম থেকেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিন্দামূলক বিবৃতি আদায়ের চেষ্টা করবে দোহা।

ক্রিস্টিন মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের মধ্যে এই হামলাকে কেন্দ্র করে কোনো মতপার্থক্য থাকলে তা শক্তিশালীভাবে সামনে আনা এবং ইসরায়েলের ওপর যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ সৃষ্টি করাই হবে এসব তৎপরতার মূল উদ্দেশ্য।’

মঙ্গলবার হামলার পর কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, এ ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানাতে একটি আইনজীবী দল গঠন করা হয়েছে।

কিন্তু কাতারের তরফে ইসরায়েলের হামলার সামরিক প্রতিশোধ নেওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করেন লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস ক্রিগ।

ক্রিগ বলেন, ‘কাতারের সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর কোনো ইচ্ছা নেই, সেই সক্ষমতাও নেই। মধ্য মেয়াদে প্রতিরোধকৌশল নিয়ে চিন্তাভাবনায় তাদের মনোযোগ থাকবে বলে মনে হচ্ছে।’

ক্রিগ আরও বলেন, ‘ইরানের হামলার বিরুদ্ধে কীভাবে সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে কাতারের সামরিক উপদেষ্টারা আগে থেকেই ভাবছিলেন। এখন তাঁরা ইসরায়েলকে কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, তা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করছেন।’

গত জুনে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে কাতারে অবস্থিত দেশটির সামরিক ঘাঁটি আল উদেইদে হামলা চালিয়েছিল তেহরান। খুব হিসাব-নিকাশ করেই এ হামলা চালানো হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রকে পরোক্ষভাবে সতর্ক করতে আগেভাগেই কাতারকে জানিয়েছিল ইরান। ফলে দোহা ও ওয়াশিংটন আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পেরেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহার করে ইরানের কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছিল।

কিন্তু মঙ্গলবার এমন প্রস্তুতির কোনো সুযোগই ছিল না।

কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘দোহা কীভাবে ক্ষেপণাস্ত্রবৃষ্টি সামাল দিতে পারে, তা আমরা ইরানের হামলার সময় বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছি। কিন্তু ইসরায়েল এমন অস্ত্র ব্যবহার করেছে, যা আমাদের রাডার শনাক্ত করতে পারেনি।’

কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কিন দাবি অস্বীকার করে বলেন, ‘ইসরায়েলের হামলার বিষয়ে ওয়াশিংটন আমাদের আগে থেকে সতর্ক করেনি।’ ‘হামলার ১০ মিনিট’ পরই যুক্তরাষ্ট্রের তরফে তাঁদের কাছে সতর্কতা এসেছিল বলে জানান তিনি।

ক্রিগ বলেন, ‘কাতার নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে যেভাবে কল্পনা করেন, এ হামলা সেটার ওপর এক বড় ধাক্কা।’

এই নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, ‘এখন আকাশ প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। সম্মিলিত নিরাপত্তাবলয় তৈরির বিষয়ে জিসিসির মধ্যে নতুন উদ্যোগ দেখা যাবে। কৌশলগত অংশীদারত্বে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করা হবে।’

উপসাগরীয় দেশগুলোর ‘যৌথ ক্ষোভ’

কাতারে ইসরায়েলের হামলার একটি অনিচ্ছাকৃত ফল হলো বছরের পর বছর ধরে গভীর মতপার্থক্যে বিভক্তি উপসাগরীয় দেশগুলো একে অপরের কাছাকাছি চলে এসেছে।

কাতারের প্রতি সংহতি জানাতে গত বুধবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ দোহায় যান। গতকাল বৃহস্পতিবার যান সৌদি আরবের যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান।

গবেষক ক্রিস্টিন দিওয়ান বলেন, ‘কাতারের ওপর ইসরায়েলের হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে যৌথ ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একটি প্রতিবেশী রাজতন্ত্রের ওপর বিমান হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশ নিজেদের মধ্যকার মতপার্থক্য সাময়িকভাবে মুলতবি রেখেছে। একটি রাজতন্ত্রের নিরাপত্তার বলয় ভেঙে যাওয়াটা তাদের সবার ওপর প্রভাব ফেলেছে।’

ইসরায়েলের হামলাকে জিসিসিভুক্ত দেশগুলো নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখতে পারে। এ ক্ষেত্রে কাতারের সঙ্গে প্রতিবেশী কিছু দেশের ২০১৭ সালের সুপরিচিত বিবাদ বাধা হয়ে না–ও দাঁড়াতে পারে। কারণ, দোহায় ইসরায়েলের হামলা এই সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে।

২০১৭ সালের জুন থেকে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি আরব, ইউএই, বাহরাইন ও মিসর সাড়ে তিন বছরের সর্বাত্মক অবরোধ বা নাকাবন্দী ঘোষণা করেছিল। কাতারের বিরুদ্ধে তারা ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা এবং সন্ত্রাসবাদের সমর্থনের অভিযোগ এনেছিল। কাতার এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে নাকাবন্দী প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

আনুষ্ঠানিকভাবে সেই বিবাদের অবসান হলেও দেশগুলোর মধ্যে এখনো কিছু মতপার্থক্য রয়ে গেছে। কিন্তু কোনো উপসাগরীয় দেশে ইসরায়েলের সরাসরি হামলা অঞ্চলটিকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।

উপসাগরীয় বিশেষজ্ঞ এবং বেকার ইনস্টিটিউটের ফেলো ক্রিস্টিয়ান উলরিকসেন মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, ‘কাতারের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে যেসব বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ভাষা অন্যান্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি কড়া। এ ক্ষেত্রে বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। কারণ, কিছু আগপর্যন্ত তাদের সঙ্গে দোহার সম্পর্কে টানাপোড়েন ছিল।’

ক্রিস্টিয়ান বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের হামলাকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে বর্ণনা করেছে। এটি অঞ্চলটির অন্যান্য দেশের ‘মনোযোগ’ এড়ায়নি।

সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেও এমন একটি ধাক্কা খেয়েছিল। ২০১০ সালে হামাসের সশস্ত্র শাখার জ্যেষ্ঠ অস্ত্র সংগ্রহ কর্মকর্তা মাহমুদ আল-মাভহুহকে দুবাইয়ের একটি হোটেল রুমে হত্যা করা হয়েছিল।

ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এ হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু ইসরায়েল এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। আবার বিষয়টি অস্বীকারও করেনি।

সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের মধ্যে অল্প কিছুদিন উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু তাতে করে দুই দেশের গোপন সহযোগিতা কখনো বন্ধ হয়নি।

এক দশক পর ২০২০ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি হয়, যা আব্রাহাম চুক্তি হিসেবে পরিচিত। এতে সবার আগে সই করেছিল আমিরাত ও বাহরাইন।

গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা (জেনোসাইড) নিয়ে নিন্দা জানালেও আমিরাত বা বাহরাইন কেউ আব্রাহাম চুক্তি প্রত্যাহার বা স্থগিত করেনি। কিন্তু কাতারের ওপর হামলা এ পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।

ক্রিস্টিন দিওয়ান বলেন, ‘কাতারের ওপর হামলা সম্ভাব্য চরম সীমারেখা (রেড লাইন) বলে মনে হচ্ছে। জিসিসি সদস্যদেশের ভূখণ্ডে আঘাতকে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর সামষ্টিক হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।’

এ হামলার পর ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পুনর্মূল্যায়নের ব্যাপারে চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে বলেও মনে করেন ক্রিস্টিন।

এই বিশ্লেষক বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ে ইসরায়েলকে এখন ইরানের সমতুল্য হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। সমস্যা হলো, যুক্তরাষ্ট্র এ হুমকি মোকাবিলায় সমাধান হিসেবে পথ দেখাতে পারছে না।’

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস

কাতারসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশ নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অংশীদার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে আসছিল। কিন্তু তা সত্ত্বে ওয়াশিংটন এমন একটি দেশে ইসরায়েলের হামলা ঠেকাতে পারেনি, যেখানে হাজার হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছেন। এটা কাতারকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে ভেবে দেখতে উৎসাহিত করবে।

ক্রিস্টিয়ান উলরিকসেন বলেন, ‘২০১৯ সালে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় এবং ২০২২ সালে আবুধাবিতে হুতিদের হামলার পরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এর পর থেকে কৌশলগত ও নিরাপত্তায় বৈচিত্র্য আনতে দেশগুলো প্রক্রিয়া শুরু করে।’

এ বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করেছে। জ্বালানি তেল উত্তোলন ও সরবরাহকারী দেশগুলোর সংগঠন ওপেক প্লাস জোটের সদস্য রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নেও দেশগুলো মনোযোগ দেয়। পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি আগ্রাসী মনোভাব কিছুটা শিথিল করেছে সৌদি আরব ও আমিরাত।

সৌদি আরব ২০২৩ সালে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছে। একই সময়ে ইয়েমেনে হুতিদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। আর কাতারের সঙ্গে বিবাদ শেষ হওয়ার পর তুরস্কের সঙ্গেও সমন্বয় বৃদ্ধি করেছে।

ক্রিস্টিয়ান উলরিকসেন প্রসঙ্গক্রমে বলেন, রিয়াদ ও আবুধাবি নিরাপত্তা ও কূটনীতির ক্ষেত্রে বৈচিত্র্যের চেষ্টা করলেও একই সময়ে কাতার ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত করছে।

২০২২ সালে জো বাইডেন প্রশাসন কাতারকে মেজর নন-ন্যাটো মিত্রের মর্যাদা দেয়। নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার জন্য এটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে ন্যাটো সদস্য না হয়েও দেশটির অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা পাওয়ার কথা রয়েছে। সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের এ অংশীদারত্ব নেই।

কিন্তু মঙ্গলবারের হামলা এমন অংশীদারত্বের বিশ্বাসযোগ্যতায় ফাটল তৈরি করেছে। ক্রিস্টিয়ান উলরিকসেন বলেন, ‘এ হামলা দোহার হিসাব-নিকাশে কোনো পরিবর্তন আনে কি না, সেটা দেখার বিষয়।’

ক্রিস্টিন দিওয়ান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করা হলেও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ক্রিস্টিন দিওয়ান আরও বলেন, ‘কাতারের জন্য সেন্ট্রাল কমান্ডের আঞ্চলিক সদর দপ্তর (সেন্টকম) বা সৌদি আরবের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি। এটিই দ্বিধাদ্বন্দ্বের মূল বিষয়।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-12%2Fpaivi4xz%2FQuatar-1.jpg?rect=116%2C0%2C1182%2C788&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসরায়েলের বিমান হামলার পর ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে। কাতারের রাজধানী দোহায়, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি

ইসরায়েলের একের পর এক হামলায় নিহত হামাসের যেসব শীর্ষ নেতা

ইসরায়েলের হামলার শিকার হচ্ছেন একের পর এক হামাস নেতা। গতকাল মঙ্গলবারও কাতারের রাজধানী দোহায় সংগঠনটির নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কাতারে নির্বাসনে থাকা হামাস নেতা খলিল আল–হায়াকে হত্যার উদ্দেশ ছিল তাঁদের। তবে ইসরায়েলের এই হামলায় নিজেদের নেতাদের কোনো ক্ষতি হয়নি বলে জানিয়েছে হামাস।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় হামলা শুরু করে ইসরায়েল। তার পর থেকে ২৩ মাসের বেশি সময়ে হামাসের বেশ কয়েকজন বড় নেতাকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। চলুন, একনজরে দেখে নেওয়া যাক তাঁদের পরিচয়—

মোহাম্মদ সিনওয়ার: মোহাম্মদ সিনওয়ার ছিলেন হামাসের বর্ষীয়ান নেতা। সংগঠনটির সামরিক শাখার প্রধান ছিলেন তিনি। গত মে মাসে তাঁকে হত্যা করে ইসরায়েল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার মূল পরিকল্পনাকারী বলা হয় ইয়াহিয়া সিনওয়ারকে। মোহাম্মদ সিনওয়ার তাঁর ছোট ভাই। ইয়াহিয়ার মৃত্যুর পর হামাসের নেতৃত্বে আসেন মোহাম্মদ সিনওয়ার।

ইয়াহিয়া সিনওয়ার:
২০২৪ সালের অক্টোবরে গাজায় ইয়াহিয়া সিনওয়ারকে হত্যা করে ইসরায়েল। সে সময় ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু ছিলেন তিনি। হামাসপ্রধান ইসমাইল হানিয়া ইরানে নিহত হওয়ার পর ২০২৪ সালের জুলাই মাসে হামাসের হাল ধরেন ইয়াহিয়া সিনওয়ার।

ইসমাইল হানিয়া: ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ইরানের রাজধানী তেহরান সফরে গিয়েছিলেন ইসমাইল হানিয়া। তখন বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাঁকে হত্যা করে ইসরায়েল। ২০১৭ সাল থেকে হামাসের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। নিউইয়র্ক টাইমস–এর খবর অনুযায়ী, তেহরানে তিনি কক্ষে অবস্থান করছিলেন। সেখানে গোপনে বিস্ফোরক স্থাপন করে রেখেছিলেন ইসরায়েলি গোয়েন্দারা।

মোহাম্মদ দেইফ:
মোহাম্মদ দেইফ ছিলেন হামাসের সামরিক শাখার কমান্ডার। তাঁকে ৭ অক্টোবর হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে ধারণা করা হয়। দেইফকে সাতবার হত্যার চেষ্টা করেছিল ইসরায়েল। পরে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানায়, ২০২৪ সালের মার্চে গাজার খান ইউনিস এলাকায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের বোমার আঘাতে মৃত্যু হয় তাঁর।

মারওয়ান ইসা:
২০২৪ সালের মার্চ মাসে ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন হামাসের সামরিক শাখার ডেপুটি কমান্ডার মারওয়ান ইসা। মোহাম্মদ দেইফ ও ইয়াহিয়া সিনওয়ারের পাশাপাশি তিনিও ইসরায়েলের বড় লক্ষ্যবস্তু ছিলেন।

যাঁরা এখনো বেঁচে আছেন: প্রথমেই বলতে হবে ইজ আল–দিন আল–হাদাদের কথা। মোহাম্মদ সিনওয়ারের মৃত্যুর পর তিনিই এখন হামাসের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ নেতা। এরপর রয়েছেন খলিল আল–হায়া। বর্তমানে তাঁকে হামাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যদের মধ্যে রয়েছেন খালেদ মেশাল, মোহাম্মদ দারবিশ, নিজার আওয়াদাল্লাহ ও জাহের জাবারিন। এর মধ্য ২০০৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত হামাসের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন খালেদ মেশাল।

নিহত হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ছবি হাতে হুতি সমর্থকদের বিক্ষোভ
নিহত হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ছবি হাতে হুতি সমর্থকদের বিক্ষোভ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

গল্প- ঠান্ডা রক্ত বা এনআরসির দিনে প্রেম by মিথিলেশ ভট্টাচার্য

ওই যে লালমাটির ছোট্ট গলিপথ, পুরোটা না, শুধু মুখটুকু, কোনো কোনোদিন বেশ রঙিন, ফুরফুরে আর প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে সিক্তার উপস্থিতিতে। সিক্তা ঝলমলে সালোয়ার-কামিজে, নির্ভার মেজাজে, ছাতা মাথায় এসে দুদ- দাঁড়ায় গলিমুখে একটা অটোরিকশা ধরার আশায়। তবে রোজই এখানে দাঁড়িয়ে তার ভাগ্যে রিকশা জোটে না। খানিকটা পথ উজিয়ে মেইন রোডে গিয়ে রিকশা ধরতে হয়। মাঝেমধ্যে লালমাটি-গলিপথের বিপরীত গলির যতীনের গাড়িতে কখনো লিফট পেয়ে যায় সে; দুজনের বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় যদি মিলে যায় তবে। যেমন আজ -।

যতীনের লাল রঙের সেকেন্ডহ্যান্ড ফিয়াট গলিমুখে পড়ে রোজকার মতো ক-মুহূর্ত স্থির ও সতর্ক, রাস্তার দুপাশের পথচারী ও ছোট-বড় গাড়ির সম্ভাব্য আনাগোনার ব্যস্ততায়, আর সে-সময় ওর দৃষ্টি পড়ে সিক্তার ওপর বা গলিমুখে সিক্তার খানিক ফুটে ওঠা তার চাতকদৃষ্টি চুম্বকের মতো টেনে নেয়। আর ওদিকেও, সিক্তার লম্বাটে ফেসিয়াল করা মসৃণ চেহারায়, রক্তরাঙা ঠোঁটে স্মিত হাসির ঝিলিক -।

গাড়িটা রাস্তার ওপাশে নিয়ে গিয়ে চালক সাজু সিক্তার সামনে দাঁড় করায়। ওকে নিতে হবে বিলক্ষণ জানে সে। যতীন দরজা খুলে যথারীতি সিক্তাকে আহ্বান করে : এসো! আজ আবার ওর সঙ্গে একটু জরুরি দরকারও আছে তার। তবে এক্ষুনি কথাটা বলে আবহাওয়াকে ভারী করতে চায় না সে।

এই যে সিক্তাকে গাড়িতে তুলে নেওয়া, তা কিন্তু রোজ রোজ ঘটে না। মাঝেমধ্যে সকালবেলা বাজারে যাওয়ার সময় সিক্তার সঙ্গে গলিমুখে বা রাস্তার পাশে দেখা হলে যতীন অবশ্যই তাকে তুলে নেয় গাড়িতে। যে-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাজ করে সিক্তা, তা বড়জোর দুই কিলোমিটার দূর এবং এটুকু পথ তাকে প্রায়ই দশ টাকা অটোভাড়া খরচ করে পাড়ি দিতে হয়। মাসের মধ্যে দু-চারদিন যতীন গাড়িতে লিফট দেয় তাকে।

ওদের দুজনের পরিচয় দেখতে দেখতে বেশ কবছর হয়ে গেল। মুখোমুখি গলির বাসিন্দা হলেও দুজনের মধ্যে পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা কিছুই হয়তো হতো না। একই পাড়ায় পাশাপাশি বাস করেও অনেকেই তো বছরের পর বছর পরিচিত মুখ হয়েও অপরিচিত থেকে যায়। যতীন আর সিক্তার মধ্যেও ওরকম সম্পর্কই হতো যদি না এক নেমন্তন্নবাড়িতে সিক্তার তার প্রতি কৌতূহলী হয়ে ওঠা, পাশে দাঁড়ানো, ঘনিষ্ঠ আচরণভঙ্গি, স্মিত হাসির বাক্সময় দৃষ্টি ওসব চোখে না পড়ত। এখন যতীনের মনে হয়, হঠাৎ করে তার প্রতি ওরকম মনোযোগী হয়ে ওঠেনি সিক্তা। ব্যাপারটি নিশ্চয় বহুদিন থেকেই ওর মনের কোনো অতল কোণে জন্মেছিল, যার প্রকাশ ঘটে নেমন্তন্নবাড়ির খোলা পরিবেশে।

নেমন্তন্নবাড়িতে খাবার পর মুখ ধোয়ার জায়গা করা হয়েছিল মেইন রোডের পাশে। দু-তিনটি বালতিতে জল ও কয়েকটি মগ রাখা ছিল। যতীন যখন মগ নিয়ে হাতে জল ঢালতে যাবে, তখন একটু চমকে দেখতে পেয়েছিল পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ানো সিক্তাও তার সুডৌল হাতটি ধারার নিচে পেতে দিয়েছে। ওর শ্যামলা চেহারায় স্মিত হাসির ঝিলিক।

তারপর থেকে পথে কোথাও দেখা হলে বা হঠাৎ করে দুজন মুখোমুখি পড়ে গেলে সিক্তার হাসিমাখা ঝলমলে চেহারা ও কৌতূহলী দৃষ্টি যতীনকে সবিশেষ আলোড়িত ও উজ্জীবিত করে দিত। মাঝেমধ্যে এমনও হয়েছে, পথচলতি অন্যমনস্ক তার দিকে নির্নিমেষ দৃষ্টির সিক্তাকে হঠাৎ লক্ষ করে অবাক যতীন খুব উৎফুল্লও বোধ করেছে।

এবং তারপরের ঘটনাক্রম দিয়েই আজকের এই কাহিনির শরীর তৈরি হয়েছে।

গলিপথ ছেড়ে কিছুদূর এগিয়ে এসে তেল নেওয়ার জন্য সাজু গাড়ি ঢোকাল সত্যম পেট্রল পাম্পের প্রশস্ত চত্বরে। ছিমছাম, সাজানো-গোছানো পাম্পের এপাশ-ওপাশ একপলক চেয়ে দেখে সিক্তা যতীনকে বলে, এনআরসির ফরম ফিলাপ করেছেন?

না। করিনি এখনো। অবহেলা-মেশানো উদাস সুরে বলে যতীন।

আমাদেরটা হয়ে গেছে -। ভারমুক্ত কণ্ঠে বলে সিক্তা।

তাই, কে করেছে? এবার একটু আগ্রহের গলায় জানতে চায় যতীন।

কে আবার, বাবা নিজেই করেছে।

তোমার বাবা ওসব জানেন?

জানে তো। পাড়ার বেশকজনকে হেল্পও করেছে।

কিন্তু ফরমের অনেক কলম তো আমার কাছে বেশ কনফিউজিং লেগেছে, – দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বলে যতীন।

তাহলে বাবার কাছে চলে আসুন!

বলছ – ? যতীন সিক্তার চোখে চোখ রাখে।

হ্যাঁ। বাবা বুঝিয়ে দেবে আপনাকে – উৎসাহের সুরে বলে সিক্তা।

ঠিক আছে যাব। তোমার মোবাইল নম্বরটা দাও তো, – প্যান্টের পকেটে হাত ভরে নিজের মোবাইল বের করে আনে যতীন। অনেকদিন থেকেই একান্তে কথা বলার অভিপ্রায়ে সিক্তার মোবাইল নম্বরটা জানার সুতীব্র কৌতূহল তার। কিন্তু সেরকম সুযোগ হচ্ছিল না। আজ হাতের কাছে সুযোগ এসেছে।  ভেতরে বেশ উৎফুল্ল বোধ করে যতীন।

হাতের মুঠোয় ধরা নিজের মোবাইলের দিকে তাকিয়ে সিক্তা বলে, আমারটা কেন, ঘরের ল্যান্ড নম্বর দিচ্ছি, পাশে আমার নামটা লিখে রাখবেন – !

এ-কথা শুনে একটু দমে যায় যতীন। ওর নম্বরটি দিতে চাইছে না কেন। ঠিক আছে, বলো, – মিয়ানো কণ্ঠে বলে যতীন।

আচ্ছা, সিক্তা নিজের মোবাইল নম্বরটি দিতে চায় না কেন, ওর কি যতীনের সঙ্গে একান্তে কথা বলতে ইচ্ছা করে না? তবে তাকে দেখতে পেলে কেন হাসিমুখে সাড়া দেয়, নির্বিবাদে চড়ে বসে গাড়িতে? যত দুর্বলতা তো ও-ই দেখিয়েছিল প্রথমে। তবে কি যতীনের মতো মধ্যবয়স্ক, বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে লাভ নেই ভেবে সিক্তার ওরকম আচরণ? সুঠামদেহী, সুদর্শন যতীনের রূপই ওকে শুরু থেকে পতঙ্গের মতো আকর্ষণ করেছে, এখন হয়তো বাস্তব সত্যের মুখোমুখি হয়ে ক্রমে মোহভঙ্গ হচ্ছে ওর!

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে যতীনের ঘন শিহরণ ফড়িঙের ডানার মতো চঞ্চল মনে সহসা কিম্ভূত সব শব্দ ও ভাষায় আকীর্ণ এনআরসি ফরমের কথা মনে পড়ে। কারো সঙ্গে ভাগ করতে ইচ্ছা করে ভেতরে ঘনিয়ে ওঠা সব চিন্তা ও প্রশ্নের আঘাতকে। পাশে বসে থাকা সিক্তার দিকে একপলক তাকায় যতীন। ও কি ওসব চিন্তা ও প্রশ্নের সুবিচার করতে পারবে?

পিতৃ-মাতৃ কেন, মুরব্বি কেন? কী ধরনের বাংলা শব্দ ওগুলো? পিতৃ-মাতৃর মতো তৎসম শব্দ তো বাংলায় ব্যবহার হয় না। আর আঞ্চলিক সিলেটি শব্দ ‘মুরব্বি’ তো শিষ্ট ভাষায় কেউ লেখে না। ‘প্রাতিষ্ঠানিক মুুরব্বি’, ‘আইনি অভিভাবক’, ওরকম ক্লিশে শব্দবন্ধ কেন? কথাগুলো ভেবে মনে মনে বেদনাবোধ করেছে যতীন। এনআরসি নিয়ে সবাই এত উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত যে, ওসব কথা নিয়ে ভাবনার, কথা বলার অবকাশ কারো নেই!

বলবে কি সে-কথাগুলো সিক্তাকে, ও কি বুঝতে পারবে তার অন্তর্গত ক্ষোভ ও বেদনার গূঢ় কারণ? সিক্তা তো একশভাগ বাঙালি। ও কি খবরের কাগজ পড়ে, নিজের ভাষা নিয়ে ভাবে? ওকে দেখলে কিন্তু ওরকম মনে হয় না। দেখেছে সে বর্তমান প্রজন্মকে, সবাই জীবিকা আর ক্যারিয়ার নিয়ে এত ব্যস্ত যে, অন্যদিকে তাকানোর মতো অবকাশ নেই যেন। আসন্ন অস্তিত্ব-সংকট যে কত গভীর ও ব্যাপক সে-সম্পর্কে সবাই কেমন অজ্ঞান, উদাসীন!

পাম্প ছেড়ে পথে বেরোতেই ওপারের একটি দোকানের শোকেস আড়াল বিজ্ঞাপনে চোখ পড়ে যতীনের : এখানে এনআরসির জন্য ফটো তোলা হয়। শুধু এই দোকানটিই নয়, শহরের যত্রতত্র এমন বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গেছে। যতীনের নিজের পাড়ায় নিজামের দোকানের একটি বিজ্ঞাপন বেশ কৌতূহলোদ্দীপক : এখানে বিনামূল্যে এনআরসির ফরম ফিলাপ করা হয়। সৌজন্যে, হরেকেষ্ট দাস। অতিপরিচিত রাজনৈতিক পার্টির সক্রিয় সদস্য!

এনআরসির ফরম সংগ্রহের দিনের একটি ঘটনার কথা প্রায়ই মনে পড়ে যতীনের। সেদিন দুপুরবেলা সেও অন্যদের মতো পাড়ার ক্লাবঘরে গিয়েছিল ফরম আনতে। নানা বয়সের পরিচিত মহিলা ও পুরুষে ক্লাবঘর গমগম করছিল। ভিড়ের মধ্যে বয়োবৃদ্ধ, পাড়ার সম্মানিত বাসিন্দা উমাপদবাবুও লাঠিহাতে হাজির ছিলেন। সরকারি কর্মচারী যারা টেবিল-চেয়ার পেতে বসে কাজ করছিল, তিনি সেখানে ফরম হাতে নিয়ে সহসা কাঁপা-গলায় আবেগভরা সুরে অতিবিখ্যাত কবিতার দুটি লাইনের একটি শব্দ বদল করে আবৃত্তি করে উঠেছিলেন :

কী যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে

কভু পার্টিশন-বিষে (আশী বিষে) দংশেনি যারে!

ভেতরের সুতীব্র মর্মবেদনার এমন মোক্ষম বহিঃপ্রকাশ যতীনকে আমর্ম কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেদিন। সত্যি, সাপের বিষ যেমন লহমায় গোটা শরীরে ছড়িয়ে মানুষকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়; পার্টিশন বিষও তো তেমনি লাখো কোটি লোকের এমনই দশা করেছে। যে ভয়ংকর কূটাঘাত ছিন্নমূল মানুষকে শুধু শুধু তাড়িয়ে মারছে – !

লক্ষ করেছে যতীন, এনআরসি নিয়ে শহর-গ্রামে তুমুল উথালপাথাল, হইহই কা-, আতঙ্ক, এমনকি আত্মহননের মতো চরম দুঃখজনক ঘটনা! জীবন-জীবিকা নির্বাহের রক্ত জল করা-বিবিধ কাজকামের ভেতরে, অবকাশ যাপনের স্বল্প অবসরে উচ্চ-নিচ সবার একমাত্র চর্চা এনআরসি। এই ভূম-লে লাখো মানুষের বর্তমান অস্তিত্বের অমোঘ নিয়ন্তা হয়ে যেন দেখা দিয়েছে এনআরসি। বুড়োবুড়ি, যুবক-যুবতী, প্রৌঢ়-প্রৌঢ়া সবাই আগপাশতলা তটস্থ ওই একটিমাত্র বজ্রনির্ঘোষের দোর্দ-প্রতাপে!

ঘুম থেকে উঠেই ইস্ত্রি করা পাটভাঙা জামাকাপড় পরে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ছুটছে এনআরসির জন্য ফটো তোলার তাগিদে, ফরম ফিলাপের জন্য হন্যে হয়ে একে-তাকে অনুনয়-বিনয় করতে বা মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে কাজ সম্পন্ন করতে। এদের মধ্যে অনেকেই আবার বাংলায় ছাপা ফরম দেখে বিরক্ত। ইংরেজিতে হলেই যেন ভালো ছিল – এরকম মনোভাব। নিজের মাতৃভাষা যে-লোক ভালো জানে না, সে আবার ইংরেজিতে কেমন করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে, ভেবে পায় না যতীন!

এনআরসির জন্য ফটো উঠিয়েছেন যতীনদা? সিক্তা কৌতূহলী সুরে যতীনকে শুধায়।

না। এখনো উঠাইনি। তুমি – তোমরা?

আমি এখনো ফটো তুলিনি। বাবা আর মা একসঙ্গে গিয়ে ফটো উঠিয়ে এসেছে গতকাল।

সিক্তা এখনো ফটো তোলেনি জেনে হঠাৎ করে যতীনের মনে একঝলক রোমান্টিক হাওয়া ওঠে। সে সিক্তার দিকে তাকিয়ে ঝটিতি প্রস্তাব দেয়, এখন ফটো ওঠাবে নাকি?

এখন? একটু বিস্ময়ের কণ্ঠে বলে সিক্তা।

হ্যাঁ, এখন! উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে যতীন। তাদের যৌবন-বয়সে তো ওরকম ছিল, প্রেমিকাকে সঙ্গে নিয়ে যুগলে ফটো তোলা। সিনেমাহলের অন্ধকারে পাশাপাশি সিটে বসে সিনেমা দেখা, হাতে হাত রাখা, কখনো-বা প্রেমিকার উন্নত বুকে কনুই দিয়ে চকিত সুখস্পর্শ, – কথাগুলো ভাবতে ভাবতে যতীন আড়চোখে সিক্তার সুডৌল স্তনের দিকে তাকায়। ক্লিভেজের আলো-আঁধারে মুখ গুঁজতে বড্ড সাধ হয় মুহূর্তে।

এখন তো অফিসে যাব, পরে ওঠাব। সিক্তা যতীনের প্রস্তাব এড়ানোর চেষ্টা করে।

এখন হলেই তো ভালো ছিল, দুজনে একসঙ্গে ফটো ওঠাতাম।

ফটো তো সিঙ্গল ওঠাতে হবে -। সিক্তা সামান্য হেসে বলে।

জানি। তবে তোমার সঙ্গে একটা ফটো ওঠানোর বড্ড ইচ্ছা। এরকম সুযোগ তো সবসময় হবে না।

কেউ যদি দেখে ফেলে?

দেখবে কেন, নিজের কাছে রেখে দিলেই হবে।

না না। মা সবসময় আমার ব্যাগ খুলে দেখে, আপনার সঙ্গে ফটো দেখতে পেলে হাজারটা প্রশ্ন করবে! একটু ভীতু সুরে বলে সিক্তা।

ঠিক আছে, ফটোটা না হয় আমার কাছেই থাকবে। যতীন নাছোড়বান্দা।

আপনার ঘরেও তো লোক আছে দেখার, তখন? সিক্তা যতীনের স্ত্রীর প্রতি ইঙ্গিত করে কথাটা বলে।

তা আছে। সেটা আমি ম্যানেজ করে নেব। যতীন প্রত্যয়ের সঙ্গে বলে।

ঠিক আছে, তবে আজ না, আরেকদিন -।

আরেকদিন কবে হবে। যতীন ঈষৎ হতাশ গলায় বলে।

খুউব শিগগির – সিক্তা হালকা হাসে।

সত্যি বলছ তো? সন্দিগ্ধ সুরে যতীন প্রশ্ন করে।

আরে বাবা বললাম তো, – আচ্ছা, আপনি লিগ্যাসি ডাটা জোগাড় করেছেন – ? সিক্তা দ্রুত প্রসঙ্গান্তরে যায়।

ওসব জোগাড় হয়ে গেছে। লিগ্যাসি ডাটা, পুরনো ভোটার লিস্ট,  মাইগ্রেশন কার্ড – শেষের দুটি নথির কথা উচ্চারণ করেই বেশ ক-মুহূর্তের জন্য দূরমনস্ক হয়ে পড়ে যতীন।

ভোটার লিস্টে কত পুরনো পরিচিত সব নাম! নামগুলোয় চোখ বোলাতে বোলাতে যতীনের স্মৃতিতে বহুকালের পুরনো পাড়ার শান্ত-সুন্দর ছবি ভেসে উঠেছিল। সে-সময়ের কত কত নামিদামি নির্লোভ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, নাট্যকার, খেলোয়াড়, সমাজসেবকের নাম পড়তে পড়তে রোমাঞ্চিত হয়ে পড়েছিল যতীন। সেই সোনার দিনকাল আর সহজ-সরল লোকেরা যে কোথায় হারিয়ে গেল! সবচেয়ে বেশি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছিল সে ‘উদ্বাস্তু তালিকাভুক্ত ফরম’ নামক সেই পোকায় কাটা কাগজখানা দেখে। কী যে মায়া হচ্ছিল তার! বাবার নাম, মায়ের নাম, দিদি ও দাদার নাম, ছোটভাইয়ের নাম – সব মৃত মানুষ মুহূর্তের তরে জেগে উঠেছিল যতীনের চোখের সামনে। পরম মমতায় নামগুলোর ওপর হাত বোলাচ্ছিল সে, যেন একদার ফেলে আসা দেশ-বাড়ির শরীর হাতড়াচ্ছিল। এক দেশের মাটিতেই এপার-ওপার – লাখো কোটি নিঃস্ব, রিক্ত মানুষ দিশেহারা হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছিল; আজো ওই ছোটা বিরামহীন – !

----দুই----

আর অল্পদূর এগোলেই সিক্তার ডায়াগনস্টিক সেন্টার। ওখানে সে নেমে যাবে। কিন্তু যতীন ওর সঙ্গ ছাড়তে চাইছিল না। কেন জানি আজ ওর পাশে থাকতে ইচ্ছা হচ্ছিল। যদিও সিক্তার মনোভাব বোঝার কোনো উপায় নেই। যতীনের দেখা পেলে, সঙ্গ পেলে সিক্তা বেশ উৎফুল্ল হয়, এটা সে বেশ বুঝতে পারে। তবে শুধু ওটুকুই, এর বেশি গণ্ডি পেরোতে চায় না সিক্তা। অথচ আগল ভেঙে বেরিয়ে আসার এটাই ছিল উপযুক্ত সময় – ভাবে যতীন। চারদিক এনআরসির ঝড়ে ল-ভ-। বিভ্রান্ত, দিশেহারা মানুষ। কোনোদিকে দৃষ্টি স্থির করে তাকানোর অবসর নেই কারো। সে আর সিক্তা এই উথালপাথাল সময়েই তো ভেসে যেতে পারে উন্মাদ প্রেমের জোয়ারে। যদিও এ-মুহূর্তে ভাবনাটা খুবই স্বার্থপরের মতো, তবু ভেতরে জেগে ওঠা বিপুল প্রেমের আবেগকে কীভাবে বাগ মানাবে যতীন – !

আমি আজ তোমার ওখানে যাব ভাবছি – সহসা বলে ওঠে যতীন।

কেন – ? সিক্তা সপ্রশ্ন-দৃষ্টিতে তাকায় যতীনের মুখের দিকে।

সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না দিয়ে যতীন সিক্তার দিকে দুদ- স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর মৃদু সুরে বলে, জানো, ইদানীং আমার একটা অদ্ভুত ফিলিং হচ্ছে – !

কী রকম?

কাউকে কথাটা বলিনি এখনো। একটু ইতস্তত ভঙ্গিতে বলে যতীন।

আমাকে বলতে পারেন, যদি আপত্তি না থাকে।

আপত্তি কেন হবে, আমার কাজটা যে তোমার ওখানেই, শুধু ভাবছি কথাটা তুমি বিশ্বাস করবে কি না – !

বলেই দেখুন, বিশ্বাস করা না করা তো পরের ব্যাপার -।

জানো, বেশ কিছুদিন থেকে লক্ষ করছি আমার শরীরের কোথাও কেটে গেলে যে-রক্ত বেরোয় তা বেশ ঠান্ডা – !

ঠান্ডা? প্রশ্নের ঢংয়ে ঈষৎ চমকের সঙ্গে শব্দটা উচ্চারণ করে সিক্তা।

ভাবছি শরীরের ভেতরে কোনো বড় রোগ বেঁধে গেল কি না! ভয় ও চিন্তা-মেশানো সুরে বলে যতীন।

এ-কথার পিঠে চট করে কোনো কথা না বলে সিক্তা যতীনের বিষণœ ও গম্ভীর চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকে।

কিছুদিন আগে নারকেল কাটতে বসে হঠাৎই দায়ের কোপ পড়ে যায় আমার বাঁহাতের পিঠে। সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। আমি ডানহাত দিয়ে জায়গাটা চেপে ধরি। আর তখনই টের পাই রক্তটা কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা – ! শুধু ওই হাতই নয়, আমার ডান পায়ের বুড়ো আঙুলের ডগা হোঁচট লেগে ফেটে যায়, তখনো লক্ষ করেছি রক্তটা বেশ ঠান্ডা – !

সিক্তার মুখে কোনো কথা জোগায় না। সে নির্বাক ভঙ্গিতে চোখ বড় করে বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে থাকে যতীনের দিকে।

এতদিন তো জানতাম ব্যাঙের রক্ত ঠান্ডা। মানুষের শরীরের রক্ত তো সবসময়ই গরম আর এখন তো পরিস্থিতির চাপে আরো বেশি গরম, আমার শরীরের রক্তও তো বেশি গরম হওয়া উচিত, কী বলো – । জানো, আমার কেমন ভয় হচ্ছে, অস্বস্তি হচ্ছে – !

থামে যতীন। গাড়ির জানালাপথে বাইরে তাকায়।

তারপর আবার সিক্তার দিকে ফিরে সামান্য উত্তেজিত গলায় বলে, মাঝেমধ্যে আমার কী মনে হয় জানো সিক্তা, ওই যে লোকগুলো সব এনআরসির জন্য উদ্ভ্রান্ত হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছে, ওদের রক্তও কি আমার মতো ঠান্ডা, সবাইকে ধরে ধরে পরীক্ষা করলে কেমন হয় – !

গাজায় সংঘাত বন্ধে ‘প্রধান বাধা’ নেতানিয়াহু, অভিযোগ ইসরায়েলি নাগরিক সংগঠনের

ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান সংঘাত বন্ধে এবং উপত্যকাটি থেকে জিম্মিদের মুক্ত করার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সবচেয়ে বড় বাধা। জিম্মিদের মুক্তির দাবি প্রচার চালানো ইসরায়েলে সবচেয়ে বড় নাগরিক সংগঠন এ অভিযোগ করেছে। সংঘাত দীর্ঘ মেয়াদে চলার জন্য নেতানিয়াহু হামাসকে দায়ী করার পর এমন অভিযোগ তোলা হলো।

সংগঠনটির নাম হোস্টেজ অ্যান্ড মিসিং ফ্যামিলিস ফোরাম। গতকাল শনিবার তাদের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘কাতারকে লক্ষ্যবস্তু করে যে হামলা চালানো হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ থাকে না এবং এটাই প্রমাণিত হয় যে জিম্মিদের ফেরানো ও সংঘাত বন্ধে একটিই বাধা রয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। যখনই (যুদ্ধবিরতির) চুক্তি সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছায়, নেতানিয়াহু তা নস্যাৎ করে দেন।’

এর আগে শনিবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট করেছিলেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাতে এর আগে গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা নস্যাৎ হওয়ার জন্য হামাসকে দায়ী করেন তিনি। বলেন, কাতারে অবস্থান করা হামাস নেতাদের হত্যা করা গেলে সংঘাত বন্ধ হবে। গাজার বাসিন্দাদের নিয়ে হামাসের ওই নেতাদের কোনো মাথাব্যথা নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

নেতানিয়াহুর এই অভিযোগকে একটি ‘অজুহাত’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে হোস্টেজ অ্যান্ড মিসিং ফ্যামিলিস ফোরাম। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জিম্মিদের মুক্তি করতে ব্যর্থ হয়ে এখন এসব অভিযোগ তুলছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর উদ্দেশ্য, সংঘাত থামাতে আরও সময়ক্ষেপণ করা এবং ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা। এই সময়ক্ষেপণের ফলে গাজায় বন্দী জিম্মিদের জীবন আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস। এতে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন। ইসরায়েল থেকে জিম্মি করা হয় প্রায় আড়াই শ জনকে। তাঁদের মধ্যে এখনো ৫০ জন গাজায় রয়েছেন। ওই হামলার পর ৭ অক্টোবর থেকেই গাজায় নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। এই সময়ে উপত্যকাটিতে প্রায় ৬৫ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

গাজায় ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকেই জিম্মিদের মুক্ত করতে ইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ হচ্ছে। শনিবার সন্ধ্যায়ও তেল আবিবে বিক্ষোভ করেন হাজার হাজার ইসরায়েলি। সেখানে সংঘাত বন্ধ এবং জিম্মিদের ফিরিয়ে আনার দাবির পাশাপাশি গত মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানানো হয়।

সংঘাতের মধ্যেই ইসরায়েলে রুবিও

গাজায় ২৩ মাসের বেশি সময় ধরে সংঘাত চলছে। গত মাস থেকে আবার গাজা নগরী দখলে তীব্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এরই মধ্যে আজ রোববার ইসরায়েলে পৌঁছেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। দোহায় ইসরায়েলের হামলা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করার পর এই সফর করলেন রুবিও।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশ কাতার। গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সঙ্গেও জড়িত রয়েছে দেশটি। শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার আগে সাংবাদিকদের রুবিও বলেন, কাতারে হামলা নিয়ে ‘খুশি’ নন ট্রাম্প। তবে এ হামলার জন্য ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন আসবে না। গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টার প্রভাব নিয়ে দুই দেশ আলোচনা করবে।

ইসরায়েলের গিয়ে আজ নেতানিয়াহুর সঙ্গে জেরুজালেমের ওয়েস্টার্ন ওয়াল ভ্রমণের কথা রুবিওর। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক ব্রিয়ান কাটিউলিস বলেন, যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ব্যাপক নিষ্ক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধবিরতির জন্য ইসরায়েলকে রুবিও চাপ দেবেন বলে মনে হয় না।

গাজার দিকে ‘ফ্লোটিলা’

ইসরায়েলের হামলা ও অবরোধের কারণে গাজায় ত্রাণের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এই অবরোধের বিরুদ্ধে এবং উপত্যকাটিতে ত্রাণ সরবরাহ করতে শনিবার তিউনিসিয়া থেকে নৌযানের বহর নিয়ে রওনা দিয়েছেন ৪০ দেশের অধিকারকর্মীরা। এই বহরকে বলা হচ্ছে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা বা জিএসএফ। এই বহরে ৪০টির বেশি নৌযান ও ৫০০ থেকে ৭০০ জনের মতো অধিকারকর্মী রয়েছেন।

তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলুর খবরে বলা হয়েছে, ওই অধিকারকর্মীদের মধ্যে রয়েছেন ফ্রান্সের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সদস্য রিমা হাসান। এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘গাজায় যে গণহত্যা চলছে, তার জন্য আমাদের সরকারগুলো দায়ী।’ জলবায়ু নিয়ে কাজ করা সুইডিশ অধিকারকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও জিএসএফকে সমর্থন জানাচ্ছেন।

এ আগে গত সপ্তাহে ফ্লোটিলার দুটি নৌযান তিউনিসিয়ার রাজধানী তিউনিসে নোঙর করা অবস্থায় হামলার শিকার হয়। নৌযান দুটি হলো ‘ফ্যামিলি’ ও ‘আলমা’। অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ওই নৌযানগুলোর একটিতে ড্রোন হামলা চালানো হয়। এই হামলার সঙ্গে ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2024-10-07%2Fdpsipwt0%2FNetanyahu.jpg?rect=0%2C0%2C2066%2C1377&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি: এএফপি

গাজার ‘অবশিষ্ট কণ্ঠস্বর’ শরিফ কীভাবে জীবনবাজি রেখে ইসরায়েলি বর্বরতা তুলে ধরেছেন

গাজা সিটিতে গত রোববার ইসরায়েলের ড্রোন হামলায় আল-জাজিরার পাঁচ সাংবাদিক নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ২৮ বছর বয়সী প্রতিবেদক আনাস আল-শরিফ। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তিনি প্রতিবেদন তৈরি করছিলেন। নিহত বাকি চারজন হলেন প্রতিবেদক মোহাম্মদ কুরেইকেহ, ক্যামেরাম্যান ইব্রাহিম জাহের, মোহাম্মদ নওফল ও মোআমেন আলিওয়া।

সাংবাদিকদের ব্যবহৃত তাঁবুতে সুনির্দিষ্ট হামলার ঘটনায় জাতিসংঘ, কাতার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে সোচ্চার সংস্থাগুলো কঠোর নিন্দা জানিয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, শরিফ ‘হামাসের সন্ত্রাসী সেলের’ প্রধান ছিলেন। কিন্তু এর কোনো প্রমাণ তাঁরা দেখাতে পারেনি। শরিফ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। এ ছাড়া আল-জাজিরা ও গণমাধ্যমের অধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলোও তা প্রত্যাখ্যান করেছে। বিবিসির তথ্যমতে, সংঘাত শুরুর আগে শরিফ হামাসের একটি মিডিয়া টিমের সঙ্গে কাজ করতেন।

সাংবাদিকদের অধিকারবিষয়ক সংস্থা কমিটি ফর দ্য প্রটেকশন অব জার্নালিস্টের সিইও জোডি গিন্সবার্গ বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, শরিফের হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।

গাজা সিটিতে ‘অবশিষ্ট একমাত্র কণ্ঠস্বর’

গাজায় যুদ্ধের সময় আনাস আল-শরিফ আল-জাজিরার অন্যতম শীর্ষ প্রতিবেদক হিসেবে পরিচিতি পান।

শরিফ গাজা উপত্যকার উত্তরের জনবহুল জাবালিয়া এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। আল-জাজিরার সঙ্গে প্রায় দুই বছর কাজ করেছেন বলে জানিয়েছে গণমাধ্যমটি।

আল-জাজিরা ইংলিশের বার্তাপ্রধান সালাহ নেগম বলেছেন, যুদ্ধ চলাকালে শরিফ গাজার ভেতর থেকে প্রতিদিন মানুষের দুর্দশা ও সেখানে সংঘটিত হামলার খবর পৌঁছে দিতেন।

আনাস আল-শরিফের পরিবারে স্ত্রী, চার বছরের মেয়ে শাম এবং এক বছরের ছেলে সালাহ রয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে তিনি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অমান্য করে গাজার উত্তরের এলাকা থেকে সংবাদ সংগ্রহের কাজ চালিয়ে গেছেন। এ কারণে তিনি পরিবার থেকে দীর্ঘ সময় দূরে ছিলেন।

এ বছরের জানুয়ারিতে শরিফ ও তাঁর স্ত্রীর অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে যৌথ পোস্টে দুই সন্তানের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল একটি ছবি শেয়ার করা হয়। ছবিটির ক্যাপশনে বলা হয়েছে, ১৫ মাসের যুদ্ধে প্রথমবারের মতো তিনি ছেলে সালাহর সঙ্গে দেখা করতে পেরেছেন।

শরিফ গাজার পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত সরাসরি সম্প্রচারে হাজির হতেন এবং বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করতেন।

শরিফ তাঁর সহকর্মীদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বাহিনীর নৃশংস ও নির্বিচার হামলার খবর তুলে ধরেছিলেন। এর মধ্যে ছিলেন আল-জাজিরার বিশিষ্ট সাংবাদিক ইসমাইল আল-ঘৌল ও ক্যামেরাম্যান রামি আল-রিফি। তাঁরা দুজনেই ২০২৪ সালে গাজা সিটিতে একটি বিমান হামলায় নিহত হন।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শরিফদের বাড়ি লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বাহিনী হামলা চালালে তাঁর বাবা নিহত হন। মারা যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি গাজা সিটিতে তীব্র ইসরায়েলি বোমাবর্ষণের খবর পোস্ট করেছিলেন।

আল-জাজিরার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মোহাম্মদ মোয়াদ তাঁকে ‘গাজা সিটিতে অবশিষ্ট একমাত্র কণ্ঠস্বর’ বলে অভিহিত করেছেন।

আল-জাজিরার অ্যারাবিক চ্যানেলের ইনপুট ব্যবস্থাপক রায়েদ ফাকিহ বলেন, শরিফ ছিলেন সাহসী, নিবেদিতপ্রাণ এবং সৎ। এসব কারণেই তিনি একজন সফল সাংবাদিক হতে পেরেছিলেন। বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর লাখ লাখ অনুসারী রয়েছেন।

ফাকিহ আল-জাজিরার ব্যুরো ও প্রতিবেদকদের দেখভাল করেন। শরিফের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘তাঁর নিষ্ঠা তাঁকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যেখানে অন্য কোনো সাংবাদিক পৌঁছান না। বিশেষ করে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, এমন সব জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছিলেন তিনি। একজন সত্যিকারের সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সততা তাঁকে উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হতে দেয়নি।

ফাকিহ জানান, যুদ্ধ চলাকালে তিনি অনেকবার শরিফের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।

শেষ কথোপকথনে শরিফ তাঁকে জানিয়েছেন, তিনি ক্ষুধা ও অনাহারে ভুগছেন এবং এত কম খাবার খেয়ে বেঁচে থাকা অনেক কঠিন।

শরিফ মনে করতেন, গাজাবাসীদের কষ্টের কথা সবাইকে জানানোই তাঁর একমাত্র কাজ। তিনি নিজেও তাঁদের মতো ক্ষুধা ও কষ্টে ভুগছিলেন এবং প্রিয়জনদের জন্য শোক জানাচ্ছিলেন।

শরিফের বাবা ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে নিহত হয়েছিলেন। সেভাবে চিন্তা করলে, তিনি সব গাজাবাসীর দুঃখ, ব্যথা ও ধৈর্যের প্রতীক ছিলেন। মৃত্যুর মুখেও তিনি থেমে যাননি। কারণ, এটা এমন এক গল্প, যা অবশ্যই সবার জানা প্রয়োজন।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানায়, নিহত আরেক সাংবাদিক ৩৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ কুরেইকেহও ছিলেন দুই সন্তানের বাবা। শরিফের মতো তিনিও যুদ্ধ চলাকালে গাজার উত্তরের সীমান্তবর্তী এলাকায় মাসের পর মাস তাঁর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন।

আল–জাজিরা অ্যারাবিক জানায়, রোববার সন্ধ্যায় হামলার কয়েক মিনিট আগে কুরেইকেহর শেষ সরাসরি সম্প্রচার হয়েছিল।

ইসরায়েলের অভিযোগ, নেই প্রমাণ

শরিফের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসী সেলের’ নেতৃত্বের অভিযোগ ইসরায়েলের। কিন্তু তাদের কাছে নেই পর্যাপ্ত প্রমাণ।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আনাস আল-শরিফকে ‘সাংবাদিকের ছদ্মবেশে হামাসের সন্ত্রাসী সেলের প্রধান’ হিসেবে অভিযুক্ত করেছে। ইসরায়েলিদের লক্ষ্য করে তিনি রকেট হামলা চালিয়েছেন বলে তারা দাবি করেছে। তবে তারা এসব অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ দেখাতে পারেনি।

আইডিএফ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের কাছে এমন নথি রয়েছে, যা ‘তর্কাতীতভাবে’ শরিফের হামাসের সঙ্গে সামরিক যোগসূত্র প্রমাণ করে। এসবের মধ্যে রয়েছে কর্মী তালিকা, সন্ত্রাসী প্রশিক্ষণের কাগজপত্র, ফোন ডিরেক্টরি ও বেতন–সংক্রান্ত তথ্য।

ইসরায়েল গাজা উপত্যকার উত্তরের হামাস সদস্যদের তালিকাসংবলিত কিছু স্ক্রিনশট প্রকাশ করেছে। এতে আহত সদস্যদের তথ্য এবং বাহিনীর ইস্ট জাবালিয়া ব্যাটালিয়নের ফোন ডিরেক্টরি বলে ধারণা করা একটি অংশও রয়েছে।

ইসরায়েল এর আগেও শরিফের বিরুদ্ধে হামাসের সামরিক শাখার সদস্য হওয়ার অভিযোগ তুলেছিল। শরিফ ও তাঁর নিয়োগকর্তা আল-জাজিরা কঠোরভাবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতাবিষয়ক সংস্থা রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) ইসরায়েলের এ অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।

আরএসএফ বলেছে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে থামাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শক্ত পদক্ষেপ না নিলে আরও অনেক সাংবাদিককে বেআইনিভাবে হত্যা করা হতে পারে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-12%2Fndxguwdh%2FANASGAZAJOUNRALIST.avif?rect=0%2C111%2C1900%2C1267&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গাজা সিটিতে আরব আহলি (ব্যাপটিস্ট) হাসপাতালের কাছে সংবাদ পরিবেশন করছেন আনাস আল-শরিফ। ১০ অক্টোবর ২০২৪ ছবি: এএফপি