Showing posts with label আদিবাসী. Show all posts
Showing posts with label আদিবাসী. Show all posts

Wednesday, September 10, 2025

কারাগারে আটক বম নাগরিকেরা কবে স্বজনের কাছে ফিরবে by মিলিন্দ মারমা

আশির দশকের কবি হাফিজ রশিদ খান বাংলাদেশে আদিবাসী জীবনের প্রথম কাব্যকার বলে বিবেচিত। আদিবাসীদের জীবন ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি প্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ কাব্য গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন ‘আদিবাসী কাব্য’ নামে, যেখানে প্রকাশ ঘটেছিল আদিবাসীদের বর্ণিল জীবন ও সেই জীবনের প্রতি নির্ভেজাল ভালোবাসা, পক্ষপাত ও মমত্ববোধ।

গ্রন্থের ভূমিকায় শুরুতেই রয়েছে একটি সহজ-সরল স্বীকারোক্তি: ‘সত্তর দশকের শেষ দিকে একটি আদিবাসী তরুণীর প্রেমে পড়ি। বোমাং সার্কেলের রাজপুণ্যাহ দেখতে গিয়ে। সে ছিল পরমারূপসী আর অত্যন্ত মিষ্টভাষী। ডিভাইন লাভ বা বেহেশতি প্রেমের সেই অনুভূতিগুলো আজও আমাকে ভাবায়। আমি সেই মেয়েটার স্বপ্নময়তায় আদিবাসী পল্লি এলাকায় অনেক ঘুরেছি।

অনেকের তিরস্কার, অনেকের পুরস্কার পেয়েছি। আবার দুঃখ-দারিদ্র্যজীর্ণ অনেক আদিবাসী মানুষের অসম্ভব সুন্দর আর ভালো মনের প্রকাশও লক্ষ করেছি। আমার স্বীকার করতে ভালো লাগে: আগের জন্মে আমি আদিবাসীই ছিলাম। টিলার ওপর ছিল আমাদের ঘর। লাউয়ের খোলে করে জল আনতাম অনেক দূরের ঝরনা থেকে, জুমচাষে আসত জীবিকা। নাপ্পি ও তরকারি পেলে সবচেয়ে ভালো মনে পেটপুরে খেতাম। বুনোহাঁস আর কালো হরিণের মাংসে আমাদের পালা-পার্বণগুলো বেশ জমত। আমার সেসব স্পষ্ট মনে পড়ে—আমি তো জাতিস্মর।’

এই স্বীকারোক্তিকে আমরা ‘কাব্যসত্য’ বলেই আপাতত মেনে নিই। আসলেই তো। কবিরা হচ্ছেন মানবজাতির জাতিস্মর। বহুকাল ধরে মানুষের চেতনার মধ্যে যে স্বপ্ন ও অভিজ্ঞতা পুঞ্জীভূত রয়েছে, কবিরা সে অভিজ্ঞতা নিজের চেতনায় ধারণ করেন। সমালোচকদের মতে, আদিবাসী মানুষের চেতনার মধ্যে যে স্বপ্ন ও অভিজ্ঞতা পুঞ্জীভূত আছে, তিনি সে অভিজ্ঞতা নিজের চেতনায় ধারণ করতে পেরেছেন। সেই অর্থে তিনি অবশ্যই একজন ‘জাতিস্মর’।

‘আদিবাসী কাব্য’ নিয়ে তিনি সবার সামনে মেলে ধরেছিলেন এক অপরূপ সৌন্দর্যের সুষমামণ্ডিত কার্পাসমহল। কবি হওয়াতেই হয়তোবা, পাহাড়ে থাকাকালে রীতিমতো তাঁকে কন্দর্পবাণে, অর্থাৎ প্রেম দেবতার বাণে বারবার আহত হতে হয়েছিল। তা না হলে তাঁর কবিতায় প্রেম প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠবেই–বা কেন! ব্যক্তিপ্রেমের অন্বেষণে বেরিয়ে কবি আবিষ্কার করেছিলেন, একটি জনপদ ও সংস্কৃতির যুগ্ম সত্তাকে চিহ্নিত করে তিনি বিনির্মাণ শুরু করেছেন কবিতার।

একজন বম আদিবাসী তরুণীকে নিয়ে অক্ষরবৃত্তে লেখা তাঁর একটি কবিতায় ফুটে ওঠে বম তরুণীদের সহজ–সরল, নম্র, ভদ্র, কোমল, মিষ্টি, কোমল ব্যক্তিত্ব আর স্বভাবের প্রতিচ্ছবি। সিয়ামপুই বম লনচেয়ো হচ্ছেন একজন বম আদিবাসী তরুণী। তাঁর ভাঙা ভাঙা বাংলা উচ্চারণ কবির কাছে কেমন মিষ্টি আর আদুরে লাগত।

প্রতিটি বিকেলে হতো তাঁদের দেখাসাক্ষাৎ। দেখা হলে নম্র ভঙ্গিতে পদ্মের মুদ্রায় দুহাত কপালে ঠেকিয়ে উচ্চারণ করত মেয়েটা, ‘নমস্কার, স্যার।’ এক জোছনার বন্যায় প্লাবিত ঝকঝকে রুপালি রাতে কবির মনে পড়ে গিয়েছিল সেই তরুণীকে। তরুণীর ভীরুতা যেন রূপান্তরিত হলো খরগোশের নম্র আর কোমল স্বভাব বা চলনের মধ্যে। সবুজ সবুজ দূর্বাঘাসে সাদা আর নানা রঙের খরগোশের ভীরু ভীরু বিচরণ। ফলে জন্ম হলো একটি কবিতার:

কচি ঘাসের নেশায় খরগোশ
ত্রস্ত চোখ
শাদা আর এলোমেলো রঙে...
সুন্দরী সিয়ামপুই বম লনচেয়ো
বুনোফুলের প্ররোচনায়
প্রেমে খাবি খাওয়া তোমার আশেক
আদরের কেশর ফোলায়...
তুমি
সারামুখে সন্ন্যাসিনী-হাসি
মাংসল পদ্মের মুদ্রায়
দূর-দেবতার চোখে চোখে
সাজালে পরমা
একটা কোমল নমস্কার...
(বুনোফুলের প্ররোচনায়, আদিবাসী কাব্য, ১৯৯৭, কবি হাফিজ রশিদ খান)

কবি যখন সিয়ামপুই বম লনচেয়ো নামের তরুণীকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন, তখন তিনি আসলে একটি ব্যক্তিকে নয়; বরং গোটা বম জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকেই তুলে ধরেছিলেন। তরুণীর ভদ্রতা, নম্রতা, কোমলতা ও মিষ্টি স্বভাব কেবল ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য নয়, এটি পুরো জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক প্রতিফলন।

কবির দৃষ্টিতে বম তরুণী হয়ে ওঠেন এক বহুমাত্রিক প্রতীক। তিনি প্রেমিকা, তিনি প্রকৃতির কোমলতার অংশ, আবার তিনি আধ্যাত্মিক সত্তারও প্রতীক। তাঁর মধ্যে ফুটে ওঠে গোটা বম জনগোষ্ঠীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্বাক্ষর। ফলে এই কবিতা কেবল প্রেমানুভূতির প্রকাশ নয়; বরং প্রেম, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়ের এক নান্দনিক সমাহার।

বমদের মধ্যে নিজেদের ভাষায় তুমুল ঝগড়াবিবাদ চলতে থাকলেও অন্য কারও পক্ষে ঝগড়া চলছে বলে সেটা বুঝে ওঠা কখনো সম্ভব হয় না। বরং মনে হতে পারে, তারা মৃদু স্বরে খোশগল্প করছে। কারণ, রাগান্বিত হলেও তাদের স্বভাবে একে অপরের প্রতি চিৎকার–চেঁচামেচি কিংবা অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজের কোনো রেওয়াজ নেই। তাদের ভাষা, উচ্চারণ ও আচরণে কোনো অশ্রাব্যতা, খিস্তিখেউড় বা আক্রমণাত্মকতা নেই। এটি এমন এক সাংস্কৃতিক শালীনতা, যা আজকের পটভূমিতে নিতান্তই বিরল।

সম্প্রতি এই নম্র-ভদ্র-নিরীহ জনগোষ্ঠীর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। কয়েক বছর ধরে এই জনগোষ্ঠীর নারীসহ বেশ কয়েকজন মানুষ কারাগারে অন্তরিণ। কেউ কেউ চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছেন। ২১ আগস্ট  কুকি–চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট দমনের নামে সাধারণ বম জনগণের ওপর গণগ্রেপ্তারের ৫০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে নারী-শিশুসহ শতাধিক নিরপরাধ বম নাগরিক বিনা বিচারে কারাগারে বন্দী আছেন।

বিচারবহির্ভূত এই দমননীতি শুধু মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন নয়, এটি বাংলাদেশের সংবিধান ও ন্যায়বিচারের মূলনীতির প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা। ইতিমধ্যে কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও চিকিৎসাবঞ্চনার কারণে তিনজন বম পুরুষ কারাগারে মারা গেছেন। বর্তমানে শতাধিক মানুষ, যাঁদের মধ্যে গুরুতর অসুস্থ রোগীও আছেন, এখনো বন্দী অবস্থায় অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

এ অন্যায় দেখে দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ বম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংহতি জানিয়েছেন। গত ২১ আগস্ট একযোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের ওয়ালে পোস্ট দিয়ে অধিকারকর্মীরা এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। একযোগে একই দিনে দাবি তুলেছেন নিরীহ ব্যক্তিদের মুক্তিদানের।

বান্দরবান জেলার রুমার বেথেলপাড়া এবং থানচির শাহজাহানপাড়া। এই দুটি পাহাড়ি গ্রামের সাতজন বম নারী ৫০০ দিন ধরে কারাগারে দিন গুনছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শিউলি বম (থ্যালাসেমিয়া রোগী), আলমন বম (কলেজপড়ুয়া), জিংরুনএং বম (মা–বাবাহারা), লালসিংপার বম (দেবর নিখোঁজ, পিতা কারাগারে), জিংরেমঙাক বম (স্বামী নিখোঁজ), লালনুনজির বম (বিবাহিতা) এবং ভানইনকিম বম (ছোট ভাই বন্দী)।

অভিযোগ ছিল ভয়াবহ—ব্যাংক ডাকাতি আর অস্ত্র লুট। কিন্তু গ্রামবাসী সবাই জানতেন, এসব অভিযোগ তাঁদের জীবনের সঙ্গে কোনো দিনও মেলেনি। অবশেষে দীর্ঘ ৫০০ দিনের মাথায়, ২১ আগস্ট তাঁরা চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান। মুক্তির সেই মুহূর্তে হয়তো বা আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল বেদনা। কারণ, তাঁদের স্বজনেরা কেউ এখনো বন্দী, কেউবা নিখোঁজ।

তাঁদের গল্পগুলো যেন একই সূত্রে গাঁথা—অভিযোগ, গ্রেপ্তার, অনিশ্চয়তা আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মুক্তির স্বাদ। কিন্তু এই মুক্তির মধ্যেও তাঁদের মনে রয়ে গেছে শূন্যতা। কারণ, শতাধিক বম নাগরিক এখনো কারাগারের ভেতরে দিন গুনছেন আর পরিবারগুলো প্রতিদিন অপেক্ষা করছে—কবে তাঁরা ফিরবেন ঘরে!

বম লাইভস ম্যাটার নামক অধিকারকর্মীদের পরিচালিত একটি ফেসবুক পেজে (২৩ আগস্ট, ২০২৫) বলা হয়েছে, ‘কুকি–চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের ব্যাংক ডাকাতির ঘটনার পরে গত বছর এপ্রিল মাসে বান্দরবানে গণগ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানে প্রায় ২০০ জন বম আদিবাসী নাগরিককে কোনো উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়াই নির্বিচারে আটক করা হয়। আটককৃত অনেকেই শারীরিকভাবে অসুস্থ এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।

‘একদিকে তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই, অন্যদিকে অনেকের জামিনের আবেদন বারবার প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। ২৬ মে উচ্চ আদালত থেকে চারজন বম নারীর জামিন হয়, সেই জামিনের আদেশ জুনের ৩ তারিখ আপেলেট ডিভিশন থেকে খারিজ করে দেওয়া হয়।

‘সম্প্রতি ৯ জন নারী এবং ৪ জন শিশুকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখনো ১৪ জন নারী কারাবন্দী। তাদের মধ্যে আছেন ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত লালনুন কিম বম। আরও আছেন আলসারের রোগী ল্যারি বম। আটককৃত পুরুষদের মধ্যে ৩২ জন জামিন পেয়েছেন। আটককৃতদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা টাকাপয়সার অভাবে জামিনের আবেদনও করতে পারেন নাই।’

একই ফেসবুক পেজের (২৪ আগস্ট ২০২৫) আরেকটি পোস্টে বলা হয়েছে, ‘৫০৩ দিন বিনা বিচারে কারাবন্দী থাকার পর আলসার রোগী লেরি বমসহ আরও ৪ জন বম নারী আজ ২৪ আগস্ট ২০২৫ তারিখে অবশেষে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন।

এই দীর্ঘ সময়ে তাঁদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সপক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেখতে পারেনি, তদন্তে হয়নি কোনো অগ্রগতি, কিন্তু জামিনের আবেদন নাকচ করা হয়েছে বারবার। এখন রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন না করলে তাদের মুক্তি নিশ্চিত হবে। আমরা উচ্চ আদালতের আদেশ দ্রুত কার্যকর করে লেরি বমসহ সকলের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানাই।’

একই ফেসবুক পেজের (১ সেপ্টেম্বর ২০২৫) আরেকটি পোস্টে বলা হয়েছে: ‘রামথাং, টিনা ও গিলবার্ট—তিনজনই কলেজের শিক্ষার্থী। বেথেলপাড়ায় গণগ্রেপ্তারের সময় তাদের আটক করা হয়। আটককালে প্রত্যেকের বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর।

রামথাং (১৮): নটর ডেম কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন রামথাং। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে তাকে জামিন দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল গত বছরের অক্টোবর মাসে। কিন্তু তাঁর জামিনের শুনানি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে স্থগিত হয়ে যায়। বাবা-মা নিম্ন আদালতে জামিনের জন্য আবেদনের পেছনে দেড় লাখ টাকার বেশি খরচ করেছেন, তারপরও জামিন পাননি রামথাং। বর্তমানে তাঁর মামলা হাইকোর্টে প্রক্রিয়াধীন।

টিনা (১৮): টিনা সেন্ট জোসেফ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী। ম্যাজিস্ট্রেট ও জজ কোর্টে টিনার জামিনের আবেদন করলেও সেগুলো নাকচ হতে থাকে। কাছাকাছি সময়ে উচ্চ আদালত থেকে একই মামলায় দশজন পুরুষের জামিন হওয়ায় তাঁর অভিভাবকেরা আশান্বিত হয়ে হাইকোর্টেই আপিল করেন। ২৬ মে ২০২৫ তারিখে হাইকোর্ট জামিন মঞ্জুর করেন। কিন্তু তার কিছুদিন পরই রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে ৩ জুন ২০২৫ তারিখে চেম্বার কোর্ট থেকে সেই জামিন স্থগিত করে দেওয়া হয়। বর্তমানে তাঁর জামিনপ্রক্রিয়া বান্দরবানের নিম্ন আদালতে চলমান।

গিলবার্ট বম (১৮): তিনি ঢাকার একটি কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। গণগ্রেপ্তারের সময় তিনি বাড়িতে ছুটিতে ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর থেকেই তাঁর মামলার জামিনপ্রক্রিয়া বারবার জটিল হয়ে ওঠে। বান্দরবান জেলা আদালতে জামিনের আবেদন করা হলেও প্রতিবারই তা নাকচ হয়। দীর্ঘ সময় ধরে কোনো আইনি প্রক্রিয়াই কার্যকর না হওয়ায় গিলবার্ট এখনো চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী রয়েছেন। পরবর্তী সময়ে মামলা উচ্চ আদালতে এলেও এখন পর্যন্ত শুনানি আদৌ হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি।

একটি বিষয় লক্ষণীয় যে অপরাধের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকার ফলে উচ্চ আদালত থেকে জামিন দেওয়া হলেও সেগুলো বারবার আটকে দেওয়া হচ্ছে, রাষ্ট্রপক্ষের দিক থেকে প্রবল আপত্তির মাধ্যমে। নিরপরাধ বম নারী, পুরুষ ও শিক্ষার্থীরা এখনো কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন। এটি মূলত রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন ব্যক্তি আর নীতিনির্ধারকদের প্রান্তিক মানুষের প্রতি চরম অসংবেদনশীলতা আর দায়িত্বজ্ঞানহীনতার বহিঃপ্রকাশ।

হয়তোবা আদিবাসী হিসেবে জন্ম গ্রহণ না করলে কারও পক্ষে কোনো দিনই তাঁদের জীবনের বঞ্চনাকে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে না। আদিবাসী জীবনের প্রথম কাব্যকার কবি হাফিজ রশিদ খান আদিবাসীদের সংস্পর্শে এসে ‘জাতিস্মর’ হয়ে উঠেছিলেন। কারণ, আদিবাসীদের চেতনায় যে স্বপ্ন ও অভিজ্ঞতা পুঞ্জীভূত আছে, তিনি সেই অভিজ্ঞতা নিজের চেতনায় ধারণ করতে পেরেছেন। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরাও যেদিন এ রকম ‘জাতিস্মর’ হয়ে উঠবেন, সেদিনই হয়তো তাঁরা আদিবাসীদের জীবনের বঞ্চনা ও যন্ত্রণার কথা উপলব্ধি করতে পারবেন। মমতার সঙ্গে একাত্মবোধ করতে পারবেন আদিবাসী সত্তার সঙ্গে।

* মিলিন্দ মারমা, লেখক ও অধিকারকর্মী
- ই-মেইল: milinda.marma@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

সাধারণ বম জনগোষ্ঠীর ব্যানারে কেএনএফ কর্তৃক ব্যাংক ডাকাতি ও অস্ত্র লুটের ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন।
সাধারণ বম জনগোষ্ঠীর ব্যানারে কেএনএফ কর্তৃক ব্যাংক ডাকাতি ও অস্ত্র লুটের ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন।

Wednesday, October 9, 2019

সাওতালরা যেন নিজ ভূমে পরবাসী by পিয়াস সরকার

গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম এলাকা। যেখানে আধিবাসী সাওতালদের বসবাস। দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষগুলো মাথা গুজার জায়গা একমাত্র এটাই। কিন্তু এই বাসস্থানটিও কেড়ে নেয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে অনেক আগে থেকেই। এই হুমকিটাই সত্য হল। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে তাদের করা হলো বাসস্থান ছাড়া। স্থানীয় প্রভাবশালীদের রোশানল ও ভূমির লালসার শিকার হন তারা।
২০১৬ সালের ৬ই নভেম্বর হামলা, অগ্নিসংযোগ করে বিতারিত করা হয় তাদের। শুধু তাই নয় হামলা-মামলায় জর্জরিত করে রাখা হয়েছে তাদের।
ফিরতে পারছেন না নিজের ভিটায়। পাশের গ্রামে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সেখানেও হামলার শিকার হচ্ছেন।
বিজন ভারর্ডিক, বয়স প্রায় ৭০। এই মহিলা কান্না জড়িত কণ্ঠে জানান, ছোট বেলা থেকে যেখানে বড় হয়েছেন সেই বাড়িতে যেতে পারছেন না। এতো বছর পরেও প্রশাসনের কোন উদ্যোগ না নেয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।
একই এলাকার বাসিন্দা জয়ান হালদার বলেন, আমাদের কী অপরাধ? আমরা কেন বাড়ি ছাড়া? ভূমি দখলে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ জড়িত তারপরেও কেন বিচার পাই না। যেখানে মাথা গুজে বেঁচে আছি, এখন সেখানেও শান্তি নেই। গ্রামে যেতে পারি না।
১৭ জুলাই বুধবার ভূমি পুরুদ্ধার ও  বিচারের দাবিতে তারা স্মারক লিপি দিতে এসেছেন রংপুর পুলিশ কমিশনারের কাছে। এ সময় সাতটি দাবি উত্থাপন করেন তারা। এরমধ্যে অন্যতম তাদের ১৮৪৩ স্থান ফিরিয়ে দেয়া। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিচার অন্যতম।
সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাস্কে বলেন, আমরা কী এই দেশের মানুষ না? আমরা কী অন্য এলাকা থেকে এসেছি? তবে এই দেশের বাসিন্দা হয়ে কেন নিগ্রহের শিকার হতে হবে? কেন বিচার পাবো না। আজ আমরা কয়েক বছর ধরে মানবেতর জীবন যাপন করছি। আমাদের কী দেখার কেউ নেই?
তারা স্মারকলিপি পেশ করেন রংপুরের ডি আই জি দেবদাস ভট্টাচার্জর কাছে। তিনি বলেন, এই মামলার তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেন্টিগেশন (পিবিআই)। আমার তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে দ্রুত আপনারা এর সুফল পাবেন। আর আপনাদের নিরাপত্তা কোন ঝুকি নেই। এরপরেও সমস্যা হলে তাতক্ষনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Wednesday, September 4, 2019

অ্যামাজনের আগুনকে কেন ‘গণহত্যা’ বলছে আদিবাসীরা? by হুমায়ূন কবির

লক্ষ-কোটি প্রাণের আধার অ্যামাজনের বেসরকারিকরণের মধ্য দিয়ে একে কৃষি ও খনি সেক্টরের কাছে হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেছিলেন ক্ষমতাসীন উগ্র ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারো। ক্ষমতায় আসীন হয়ে তিনি হাঁটছেন সেই পথেই। এরইমধ্যে গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ ভয়াবহভাবে জ্বলছে মানুষ-সৃষ্ট কারণেই। পরিবেশবাদীদের মতে, এই আগুন নেভাতে সরকারের কোনও উৎসাহ নেই। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী দখলদার বনখেকো মানুষ আর খনি ব্যবসায়ীদের আধিপত্যই হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে অ্যামাজনের ভবিষ্যৎকে। আর গবেষকরা সেখানকার সাম্প্রতিক আগুনের মধ্যে আদিবাসীদের অস্তিত্বের হুমকির নিশানা খুঁজে পেয়েছেন। আগুনে পুড়ে যাওয়া বনের বৃক্ষরাজি আর হুমকিতে পড়া লক্ষকোটি প্রাণ রক্ষার জন্য প্রাণপন লড়ছেন বন-সংলগ্ন ওইসব মানুষ। এক খোলা চিঠিতে তারা পরিস্থিতিকে মানবিক ও পরিবেশগত দুর্যোগ আখ্যা দিয়েছে। তাদের বোঝাপড়ায়,  বৃক্ষসহ সমস্ত প্রাণীই মানুষের মতোন। সে কারণেই অ্যামাজনের আগুনে লক্ষ-কোটি প্রাণ ঝরে পড়ার ঘটনায় গণহত্যার আলামত খুঁজে পেয়েছে তারা।
অ্যামাজনের আদিবাসী মানুষের বাড়ি-ঘর ধ্বংস নতুন কিছু নয়। ১৬ শতাব্দীতে পর্তুগীজরা তাদের জমি লুট করার পর থেকে এই দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতার সঙ্গে থাকতে হচ্ছে তাদের। বলসোনারোর অধীনে তাদের ভাগ্য আরও বিপন্নতায় পর্যবসিত হয়েছে। ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর বলসোনারোর কর্মকাণ্ডে শুরু থেকেই স্পষ্ট হয়েছে যে, তার কাছে আদিবাসীদের অস্তিত্বের প্রশ্ন প্রাধান্যের তলায় অবস্থান করছে। জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার কয়েক দিন পর থেকে বলসোনারো ব্রাজিলের আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য আদিবাসী বিষয়ক ব্যুরো-এফইউএনএআই বাতিলসহ আনুষ্ঠানিক ফেডারেল সুরক্ষা ভেঙ্গে ফেলতে শুরু করেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রেসিডেন্টের কথা ও কর্মকাণ্ডের পরিণতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে এসে পৌঁছেছে।

অবৈধভাবে বন উজাড় করার ঘটনা তদন্ত করতে এপ্রিলে ব্রাজিলের অ্যামাজনের আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর ভূখণ্ডে সফর করেছিলেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পরিবেশ ও সংকটের প্রধান রিচার্ড পিয়ারহাউস। সে সময় তিনি জানতে পারেন, ভূমিদখলকারীরা মানুষকে প্রত্যক্ষভাবে হুমকি দিচ্ছে এবং ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। অনিদ্রা রোগে আক্রান্ত ২২বছর বয়সী একজন মায়ের কথা বলেছেন তিনি, নিকটবর্তী এলাকায় গোলাগুলির শব্দ সত্ত্বেও যিনি সন্তানদের ঘুম পাড়াতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অ্যামাজন অঞ্চলের আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্বকারী বেশ কয়েকটি গ্রুপ বৃহস্পতিবার এক খোলা চিঠিতে পরিবেশগত ও মানবিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। এই ভয়ানক আগুনকে তাদের ‘অস্তিত্বের জন্য হুমকি’ উল্লেখ করে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক মানবাধিকার দূত ও মানবাধিকার কমিশনারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানিয়েছে তারা।

গত বছরের এই সময়ের তুলনায় এ বছর জানুয়ারি থেকে অ্যামাজনে আগুনের পরিমাণ ৮৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ওই রেইনফরেস্টের পরিবেশগত গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞান বিষয়ক পরিচালক অ্যানে অ্যালেরসার স্যাটেলাইটের চিত্র বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরিবেশ বিষয়ক ওয়েবসাইট আর্থারকে বলেছেন, ‘এটা ভীতিকর বটে কারণ, আমরা কেবল মৌসুমের শুরুতে আছি।’ পিয়ারহাউস আর্থারকে বলেন, ‘আমরা আদিবাসী ভূমি হিসেবে স্বীকৃত যে ভূমি নথিভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি, সেখানে বন উজাড়করণ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে, তারা অবৈধভাবে প্রবেশ করেছে এবং আদিবাসী ভূমির বন কাটছে।’ তবে আর্থারকে কেউ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়নি যে, এই আগুন আদিবাসী ভূমি ও গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছেছে কিনা। কয়েক সপ্তাহ ধরে যে আগুন জ্বলছে এতে কোনও সন্দেহ নেই। গবাদি পশুর রাখালরা চারণভূমির জন্য অবৈধভাবে ভূমি পরিষ্কার করছে, ঘটনাচক্রে সয়াবিন কৃষকদের কাছে জমিও বিক্রি করছে; এর প্রভাব পড়ছে গিয়ে আদিবাসী মানুষের ওপর, যারা রেইনফরেস্টের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে।

এই বছরের শুরুতে এক তদন্ত শেষে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছিল, পারা রাজ্যের আরারা ও রোনদোনিয়া রাজ্যের উরু-ইউ-ওয়াও-ওয়াও ও কারিপুনা এই তিন ভূখণ্ডের ২৩ আদিবাসীর একটি গ্রুপ  তাদেরকে জানিয়েছে, তাদেরকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তারা জানিয়েছিল,  বিগত বছরের তুলনায় এবার গ্রামের খুব কাছে ভূমি দখলকারীরা গাছ কাটছে। এই অবৈধ কার্যক্রম রাতে সম্পাদন করে তারা। অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, আদিবাসী জমিতে গত কয়েক বছরে আসা ২৪ জন মানুষ এখন শত শত মানুষে পরিণত হয়েছে। পিয়ারহাইস বলছেন, ‘জ্বলন্ত মৌসুমে আমরা যা দেখছি, তা এর তীব্রতা।’ ব্রাজিলের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কারিপুনা ভূখণ্ড সফর শেষে নাসার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সংস্থা জানিয়েছে, গত বছরের তুলনায় এই বছর জানুয়ারি থেকে এই পর্যন্ত চারগুণ বেশি অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত ২৫টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এই বছর ইতোমধ্যেই সেখানে আগুন লেগেছে ১০১টি।

১৬ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আবাস জিংজু পার্ক ও কায়াপো রাজ্যের আদিবাসী ভূখণ্ডের সাম্প্রতিক আগুনকে ‘রিং অব ফায়ার/ আগুনের কুণ্ডলী’ আখ্যা দিয়েছেন ম্যারিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিদ্যার অধ্যাপক জ্যনেট চারনেলা। আর্থারকে তিনি বলেন, বাসিন রাজ্যে আদিবাসী কৃষকরা যেভাবে আগুন জ্বালায় তার সঙ্গে এই আগুনের মিল নেই। বরং আদিবাসীদের কারণে এই অগ্নিসংযোগকারীরা অঞ্চলগুলি এড়িয়ে চলে। আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করা চারনেলা আর্থারকে বলেন, ‘আদিবাসীদের অনেক ভূমি হুমকির মুখে। বড় আগুন দ্বারা বাতাস দূষিত হচ্ছে। আদিবাসীদের ক্রিয়া তৎপরতার জন্য অবশ্যই রেইনফরেস্ট থাকতে হবে। মাছের জন্য নদী থাকতে হবে। এই ছোট ফ্লটগুলোতে খাদ্য জম্মাতে তাদের অবশই বনভূমি রাখতে হবে।’

আর্থারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বননির্ভর মানুষগুলোর জন্য অ্যামাজনের সাম্প্রতিক আগুন অস্তিত্বের হুমকি সদৃশ। এই সম্প্রদায়গুলোর যাওয়ার মতো সুপারমার্কেট ও ফার্মেসি নাই। তাদের আছে অ্যামাজন। এই বন তাদের সব ধরনের সেবা দেয়। এখানে তারা শিকার করে, মাছ ধরে ও ঘর নির্মাণের জন্য উপাদানগুলো সংগ্রহ করে। এইসব কারণেই আদিবাসী মানুষেরা বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে বাস করে। তারা  বনের ওপর আগ্রাসন চালায় না, কেননা তারা জানে, এতে বন তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বনে যখন আগুন লাগছে, সেই আগুন লাগছে আদিবাসীদের কপালেও। বনের যে অংশে কৃষকরা চাষ করতেন, শিকার করতেন- তা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন তারা। বাস্তুপ্রক্রিয়ার মানে হলো পারস্পরিকতা। সে কারণে বনের যে অংশে আগুন লাগেনি সেখানেও আগুনের প্রভাব পড়েছে। অনেক ভূমি শুষ্ক হচ্ছে, এলাকাজুড়ে খরা পরিস্থিতি আরও শোচনীয় পর্যায়ে যাচ্ছে।

গবেষণার জন্য অ্যামাজনের আদিবাসীদের সঙ্গে কাজ করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর ফিল্ড মিউজিয়ামের সংরক্ষণ জীববিজ্ঞানী লেসলি ডে সৌজা আর্থারকে বলেন, ‘বাস্তুতন্ত্রের কার্যক্রম পরিবর্তন করে, যে কোনও সময় আপনি একটি অঞ্চলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাতে পারেন, যেভাবে সমস্ত জীববৈচিত্র্য সেই বাস্তুতন্ত্রের উপর নির্ভরশীল। আপনি যখন ওই পরিবেশে বাস করছেন, আপনি সম্পূর্ণরূপে এই উপাদানগুলোর ওপর নির্ভরশীল। আপনিও এই নিয়মের অংশ।’

অগ্নিকাণ্ডের ব্যাপকতার পর অ্যামাজনের মধ্য দিয়ে হেঁটেছেন ডে সৌজা। তিনি সাপ, গিরগিটি, কোরালসহ আরও ছোট প্রাণীর মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন, যারা আগুন থেকে পালাতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘মারত্মক ধ্বংসস্তুপের মধ্যে দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলাম। যেন একটা যুদ্ধক্ষেত্র।’ এই ধ্বংসের প্রভাব আদিবাসীদের বেঁচে থাকার সক্ষমতাকে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। লন্ডন ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞানী রাফায়েলা ফ্রায়ের মোরেইলা আর্থারকে বলেন, ‘অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠী গাছ ও অপরাপর প্রাণকে মানুষের থেকে আলাদা করে দেখে না। ওইটা তাদের সাংস্কৃতিক বোধ।’ তারা মানবাধিকার ও পরিবেশগত অধিকারের মধ্যে পার্থক্য করে না। তিনি এক ইমেইল বার্তায় আর্থারকে বলেন, ‘আজকে আমরা বনে যে ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রত্যক্ষ করছি; অনেক সম্প্রদায় এটাকে কেবল বাস্তু হত্যা হিসেবে নয়, গণহত্যা হিসেবে অনুধাবন করছে।’

Wednesday, August 21, 2019

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ: ত্রিপুরার চাকমা গ্রুপ

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ হিসেবে দাবি করেছে ত্রিপুরায় বসবাসরত চাকমা সম্প্রদায়। তারা জাতিগত নির্যাতনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কাছে বিচারও দাবি করেছে। স্বাধীনতার ৭০ বছর পর তারা এই দাবি করল বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় রোববার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

আগরতলা থেকে দেবরাজ দেবের লেখা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছর চাকমা ন্যাশনাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া ও ত্রিপুরা চাকমা স্টুডেন্স এসোসিয়েশন ত্রিপুরার ১১টি স্থানে ১৭ আগস্টকে ‘কৃষ্ণ দিবস’ হিসেবে পালন করেছে। স্থানগুলো হচ্ছে আগরতলা, কাঞ্চনপুর, পেচারথাল, কুমারঘাট, মনু, চাইলেঙ্গতা, চৌমনু, গন্দচেরা, নতুনবাজার, সিলাচরি ও বিরচানদ্রমানু। তারা ২০১৬ সাল থেকে দিবসটি পালন করছে বলে দাবি করেছে।

আগরতলায় ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস.কমকে চাকমা ন্যাশনাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া ত্রিপুরা সাধারণ সম্পাদক উদয় জ্যোতি চাকমা বলেন, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের হাতে চট্টগ্রাম পার্বত্য এলাকা হস্তান্তর করে যে ঐতিহাসিক অবিচার করা হয়েছে তার প্রতিবাদে এই বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়।

চাকমা গ্রুপটির রাজ্যের সহ-সভাপতি অনিরুদ্ধ চাকমা বলেন, চাকমা জনগণের বিরুদ্ধে অস্থিতিশীলতা, জাতিগত শুদ্ধি অভিযান ও অবিচার করার মাধ্যমে যে নির্যাতন ও যন্ত্রণা দেয়া হয়েছে, তার বিরুদ্ধে আগের বছরগুলোর মতো আমরা এই কৃষ্ণ দিবস পালন করছি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে ঐতিহ্যগতভাবে অন্তত ১০টি জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বাস করে। এদের মধ্যে রয়েছে চাকমা, মার্মা, টিপরা, চাক, মুরুং, খুমি, লুসাই, বম, পাঙ্গো ও মগ। এলাকাটির আয়তন প্রায় ৫,১৩৮ বর্গ মাইল। এর সীমানা উত্তরে ত্রিপুরা, দক্ষিণে মিয়ানমারের আরাকান পাহাড়, পূর্বে মিজোরামের লুসাই পাহাড় ও আরাকান পাহাড়, এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম জেলা। স্বাধীনতার সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের ৯৮.৫ ভাগ অধিবাসী ছিল বৌদ্ধ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্য। কিন্তু তবুও স্যার সাইরিল র‌্যাডক্লিফের নেতৃত্বাধীন বাউন্ডারি কমিশন এলাকাটিকে পাকিস্তানের ভূখণ্ড বলে ঘোষণা করেন।

চাকমা নেতা শ্রেয়া কুমার চাকমা ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার সদরদফতর রাঙ্গামাটিতে ভারতের তেরাঙ্গা পতাকা উড্ডয়ন করেছিলেন। দুই দিন পর রেডিওতে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় যে এই এলাকাটি হবে পাকিস্তানের। ২১ আগস্ট পাকিস্তানি বাহিনী তেরাঙ্গা পতাকাটি নামিয়ে ফেলে। এরপর থেকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম পর্যন্ত চাকমা নেতাদেরকে ভারতের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এতে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকে জাতিগত নির্যাতনের অভিযোগ তুলে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমারা কয়েক ধাপে ভারতীয় এলাকায় আশ্রয় প্রার্থনা করেন। ১৯৮৬ সালে ত্রিপুরা ও মিজোরামের বিভিন্ন শিবিরে ৫০ হাজারের বেশি লোক আশ্রয় নেয়। পরে তাদের অনেককে অরুনাচলে সরিয়ে নেয়া হয়। চাকমা উদ্বাস্তুদের শেষ গ্রুপটি ২০১৩ সালে ত্রিপুরায় আশ্রয় চায়। তাদের পরে ফিরিয়ে দেয়া হয়।

এতে আরো বলা হয়, বিক্ষুব্ধ চাকমারা আগরতলার টিবি এসোসিয়েশন হলে এক সমাবেশের আহ্বান করেছে। তারা ‘ঐতিহাসিক অবিচারের’ অভিযোগে বিক্ষোভে অংশ নেয়।

তারা বাংলাদেশের পার্বত চট্টগ্রাম এলাকা আবার ভারতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। তারা আরো দাবি করেন, সেখানে বসবাসরত চাকমা ও অন্যান্য সম্প্রদায় এখনো ভারতকে তাদের ‘কল্পিত আবাসভূমি’ বিবেচনা করে।

Monday, November 19, 2018

বন্ধ্যাকরণের ভুক্তভোগী কানাডীয় আদিবাসী নারীদের ক্ষতিপূরণ দাবি

আদিবাসী নারীদের অজ্ঞাতে বা তাদের স্পষ্ট সম্মতি ব্যতিরেকে বন্ধ্যাকরণের যেসব ঘটনা ঘটেছে সেসবের ক্ষতিপূরণ দাবি করে অন্তত ৬০ জন ভুক্তভোগী  মামলা দায়ের করেছেন। কানাডার সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় এসব আদিবাসী নারীর ফ্যালোপিয়ান টিউব কেটে ফেলা হয়েছে বা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা আর গর্ভধারণ করতে না পারেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান জানিয়েছে, সংশ্লিষ্টরা একে স্পষ্টভাবেই বর্ণবাদী কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
২০১৫ সালের দিকে প্রথম এই খবর প্রকাশিত হয় যে কানাডায় স্পষ্ট সম্মতি ব্যতিরেকে আদিবাসী নারীদের বন্ধ্যাকরণ হচ্ছে। সাসকাচুয়ান প্রদেশের চার নারী ওই সময় প্রথম মুখ খুলেছিলেন। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রদেশের স্বাস্থ্য বিভাগ একটি তদন্ত শুরু করে এবং অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে। বন্ধ্যাকরণের আইনেও পরিবর্তন আনা হয় তখন। কিন্তু ক্ষতিপূরণের যে মামলা হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে ২০১৭ সালে এসেও আদিবাসী নারীর সম্মতি ব্যতিরেকে বন্ধ্যাকরণের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
ক্ষতিপূরণের দাবিতে মামলাটি এখনও আদালতে গৃহীত হওয়ার অপেক্ষায় আছে। ৬০ জনের নারীর ক্ষতিপূরণের মামলা করার প্রেক্ষিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, এ বিষয়ে কানাডার সরকারের ওপর চাপ দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন জানানো হবে। এদিকে মানবাধিকার কর্মীরা দাবি তুলেছেন, কানাডা যেন নারীর অজ্ঞাতে এমন বন্ধ্যাকরণ না করে। সংস্থাটির পক্ষে জ্যাকেলিন হ্যানসেন বলেছেন, ‘যে নারীর শরীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও সেই নারীর। কিন্তু তা কেড়ে নিতে দেখা যাচ্ছে।’
নারীদের এভাবে বন্ধ্যাকরণ একদিকে যেমন চিকিৎসা শাস্ত্রের নৈতিকতা বিরোধী তেমনি আইনত অবৈধ। কিন্তু ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, বন্ধ্যাকরণের আগে তাদেরকে শুধু বলা হয়েছিল, যদি তারা ‘প্রক্রিয়াটি’ বাস্তবায়নে রাজি না হন তাহলে তারা তাদের নবজাতকের মুখ দেখতে পারবেন না।
আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য সিনেটর ভন বোয়ের মনে করেন, যতটা অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে তার চেয়েও বেশি মাত্রায় এমন ঘটনা ঘটেছে। তিনি তার এক সহযোগীর সঙ্গে যৌথভাবে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সাসকাচুওয়ানের নারীদের বিষয়ে। তিনি কানাডার সংবাদমাধ্যমের কাছে বলেছেন, ‘এমন ঘটনা সাসকাচুয়ান ঘটেছে। রেজিনাতে ঘটেছে। উইনিপেগে ঘটেছে। এমন ঘটনা সেসব স্থানে ঘটেছে যেসব স্থানে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ বেশি।’
ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের আইনজীবী অ্যালিসা লোমবার্ড মনে করেন এমন আচরণ স্পষ্টতই বর্ণবাদী। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মানুষকে বংশবৃদ্ধি করতে না দেওয়া। তার ভাষ্য, ‘এই নারীরা ও তাদের সম্প্রদায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিপূরণ তাদের পাওনা যেহেতু এই ক্ষতি তাদের বয়ে বেড়াতে হবে।’

Wednesday, October 3, 2018

‘দলিত-সমতল আদিবাসীদের অধিকার সুরক্ষায় গণমাধ্যমের অংশগ্রহণ জরুরি’

প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেছেন, দলিত ও সমতল আদিবাসীদের অধিকার সুরক্ষায় সরকারি সংস্থার পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) ‘দলিত ও সমতলের আদিবাসীদের অধিকার নিশ্চিতকরণে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সাংবাদিকদের এক ফেলোশিপ প্রোগ্রামে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সমাজ থেকে বৈষম্য দূর করতে। প্রতিটা মানুষ সে ধনী হোক, গরিব হোক, আদিবাসী হোক কিংবা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হোক, মানুষ হিসাবে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল এদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা। এক কথায় সমাজে সাম্যতা প্রতিষ্ঠা করা। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সংবিধান প্রণয়নের সময়ও সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সংবিধানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক এ উপদেষ্টা বলেন, সমতলের আদিবাসীদের অধিকার নিশ্চিতকরণ ও তাদের আর্থিক সহায়তা দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর অধীন ‘স্পেশাল এফেয়ার্স ডিভিশন’ কাজ করে।
সেইসঙ্গে যেসব এলাকাতে দলিত ও সমতল আদিবাসীরা রয়েছে, সেসব এলাকার জেলা প্রশাসকদের সপ্রণোদিত হয়ে তাদের খোঁজখবর নেয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে পরিপ্রেক্ষিতের নির্বাহী পরিচালক ও ক্রিয়েটিভ মিডিয়া লিমিটেডের চেয়ারম্যান সৈয়দ বোরহান কবীর বলেন, আমাদের গণমাধ্যম অনেক বেশি এখন রাজনৈতিক আক্রান্ত হয়ে গেছে। সব সংবাদপত্রই এখন রাজনীতিতে ভরাক্রান্ত। কিন্তু আমি মনে করি সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক কথাবার্তা ছাড়াও প্রান্তিক মানুষদের কথা শুনতে চান। গণমানুষের কথা শুনতে চান। সবাই এখন সমাজের নিম্নবিত্তদের কথা শুনতে চান, তাদের স্বপ্নের কথা জানতে চান। গণমাধ্যমের দায়িত্বই হচ্ছে ঐসব প্রান্তিক মানুষদের কথা তুলে ধরা। যেন তাদের অধিকার সংরক্ষিত হয়। তিনি আরো বলেন, দলিত ও সমতল আদিবাসীরা স্কুলে কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হতে পারে না। এমনকি ভালো কোনো রেস্টুরেন্টেও বসে খেতে পারে না। সবাই এখন ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ নিয়ে কথা বলছে। কিন্তু পাঁচ বছর ধরে আটকে আছে ‘বৈষম্য বিলোপ আইন’। এটা নিয়ে কেউই কোনো কথা বলে না। তাই দলিত ও সমতল আদিবাসীদের অধিকার সুরক্ষায় ‘বৈষম্য বিলোপ আইন’ পাসের ব্যাপারে গণমাধ্যমকর্মীদের আরো সোচ্চার হতে আহ্বান জানান তিনি। এ ছাড়াও গণমাধ্যমে গবেষণামূলক কাজের জন্য জাতীয় প্রেস ক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। এ সময় একুশে টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, নির্দিষ্ট কিছু দিবসে কিংবা উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা না ঘটলে প্রান্তিক ও বঞ্চিত এ জনগোষ্ঠীর খবরাখবর সাধারণত গণমাধ্যমে আসে না। সাংবাদিকতা হচ্ছে চেলেঞ্জিং পেশা। এটা হচ্ছে বুদ্ধিজীবীদের পেশা। সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠায় তাদেরই আগে এগিয়ে আসতে হবে। গাজী টেলিভিশন (জিটিভি)-র প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আমাদেরই তৈরি। যতদিন না আমরা আমাদের নিজ নিজ তাড়না থেকে দলিত ও সমতল আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে না আসবো ততদিন এ সমাজে কিছুতেই বৈষম্যতা দূর হবে না।
অনুষ্ঠানে বক্তারা দলিত ও সমতল আদিবাসীদের অধিকার সুরক্ষায় নিয়মিত রিপোর্টিং ও ফিচার প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য প্রিন্ট মিডিয়ার প্রতি আহ্বান জানান। এ ছাড়াও ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমসমূহ জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান নির্মাণ ও প্রচারে গণমাধ্যমগুলোর মালিক ও নীতিনির্ধারণী মহলকে অনুরোধ জানান বক্তারা।
সাংবাদিকদের ফেলোশিপ প্রোগ্রামে হেক্স/ইপারের প্রতিনিধি মুজাহিদুল ইসলাম, ক্রিয়েটিভ মিডিয়া লিমিটেডের গবেষণা ও পরিকল্পনা প্রধান অয়ন দেবনাথসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

Wednesday, May 30, 2018

গারোদের জীবন by ওমর ফারুক সুমন

ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী উপজেলা হালুয়াঘাটের আঁচকিপাড়া, ঝলঝলিয়া, জখমকূড়া, বুটিয়া পাড়া, গাবড়াখালি, ঘিলাভূই, নালিতাবাড়ীর পানিহাতা, বারোমারীসহ আশপাশের উপজেলার গারো আদিবাসীদের দিনকাল ভালো যাচ্ছে না। এসব সীমান্তের পাহাড়িয়া অঞ্চলের গারোদের জীবনমানে প্রতিনিয়ত চলছে বাঁচার লড়াই। কেউ নেয় না তাদের  খোঁজ-খবর। সরকার আসে সরকার যায় উন্নয়ন হয় অনেক কিছুর। কিন্তু সীমান্তবর্তী পাহাড়ি গারোদের ভাগ্যের কোনো উন্নয়ন হয় না- কথাগুলো আক্ষেপের সুরে বলেন হালুয়াঘাট উপজেলার কড়ইকান্দা গ্রামের গারো নারী ধরনী রিছিল। তার ভাষায় অভাব-অনটন, দুঃখ-দুর্দশাই যেন হালুয়াঘাট উপজেলার গারোদের নিত্যদিনের সঙ্গী। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গারো পাহাড়ের পাদদেশে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত পাহাড়ি জনপদ ময়মনসিংহ জেলার গারো পাহাড়। জানা গেছে, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও  নেত্রকোনা জেলার ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ী, নেত্রকোনার দুর্গাপুর, ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া  উপজেলায় গারো, হাজং, কোচ, বানাই, হদি, বর্মন ও বংশীসহ বিভিন্ন জাতি-গোত্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী মিলে প্রায় ৫০ হাজার পরিবারের বসবাস। এদের মধ্যে ৭০ ভাগ নৃতাত্ত্বিক পরিবারের সদস্যরা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। অথচ এককালে এদের সবকিছুই ছিল। ছিল  গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ, গোলা ভরা ধান। কিন্তু  কালের আবর্তনে সবকিছু হারিয়ে আজ তারা দিশেহারা। এখন এদের অধিকাংশের নেই নিজস্ব  কোনো জমি-জমা। এসব জনগোষ্ঠীর পরিবারের সদস্যরা বন বিভাগের জমির উপর ঘর-বাড়ি নির্মাণ করে বসবাসের পাশাপাশি শ্রম বিক্রিসহ নানাভাবে পরিবারের সদস্যদের জীবন জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। বাকি ৩০ ভাগ নৃতাত্ত্বিক জসগোষ্ঠীর পরিবারের সদস্যদের জমি থাকলেও বন্য হাতির তাণ্ডবে গত ১২/১৪ বছর ধরে তাদের জমিতে কোনো ফসল উৎপাদন করতে পারছে না। এ কারণে অনেক জমি জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী সন্ত্রাসীরা। নানাভাবে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে। ফলে এ উপজেলার নৃ-তাত্ত্বিক এখন দিনমজুর ভূমিহীনে পরিণত হয়েছে। জানা যায়, নালিতাবাড়ি উপজেলার বাকাকুড়া গ্রামের রঘুনাথ কোচের দুই একর রেকর্ডিয় জমি সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে চাষাবাদ করতে না পেরে সে এখন পথে নেমেছে। এ ছাড়া নওকুচি গ্রামের পাজাই কোচনীদের জমি দখল করে নিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মহিলারাই ক্ষেতে খামারে, মাঠে-ময়দানে এমনকি সংসারের সব কাজ কর্ম করে থাকে। আর পুরুষরা বাড়িতে বসে তাদের ছেলে মেয়েদের দেখাশোনা করে থাকে। তবে, অতীতের তুলনায় অনেক পুরুষ এখন আর ঘরে বসে থাকতে চাইছে না। বছরে দুই মাস আমন ও ইরি বোরো মৌসুমে এ উপজেলার নারী-পুরুষ শ্রমিকরা কৃষির উপর শ্রম বিক্রি করে যা পায় তাই দিয়ে কোনো রকমে পরিবারের সদস্যদের জীবন জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। বাকি ১০ মাস তাদের থাকতে হয় বেকার, নির্ভর করতে হয় গারো পাহাড়ের বনাঞ্চলের উপর। মহিলারা গারো পাহাড় থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ ও তা বাজারে বিক্রি করে পরিবারের সদস্যদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। কিন্তু গারো পাহাড়ে আগের মতো এখন আর জ্বালানি কাঠ পাওয়া যায় না। যা কিছু পাওয়া যায় তাও আবার আনতে দিচ্ছে না বন কর্মকর্তা, কর্মচারী ও অংশীদাররা। দীর্ঘ ৪০ বছরেও এখানে গড়ে উঠেনি শ্রমিকদের জন্য কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। ফলে বর্তমানে  ময়মনসিংহ-শেরপুর ও নেত্রকোনা জেলার ছয় উপজেলায় নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর দুঃখ কষ্টের শেষ  নেই। অনেকের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিয়েছে বন্য হাতির দল। ১২/১৪ বছর ধরে পাহাড়ি এলাকার মানুষ প্রতিনিয়ত বন্য হাতির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে আছে। গজনী গ্রামের মনেন্দ্র কোচ, হালচাটী গ্রামের সুরেন্দ্র  কোচ জানান- কেরোসিন কিনতে হয় তাদের। প্রথম দিকে সরকারিভাবে এবং বিভিন্ন জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে হাতি তাড়ানোর জন্য কেরোসিন বিতরণ করা হলেও এখন তা হচ্ছে না। এখন আর কেউ খোঁজ খবর নেয় না। সরকারিভাবে কয়েকটি জেনারেটর দেয়া হয়েছিল হাতি তাড়ানোর জন্য। এসব জেনারেটর আর চোখে পড়ে না। এক সময় পাহাড়ি জনপদের মানুষ পাহাড়ে জুম চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু পাহাড় উজাড় ও বন্য হাতির তাণ্ডবে জুম চাষ হারিয়ে গেছে। বন্য হাতির তাণ্ডবে অনেকে গৃহহীন। সরজমিন অনুসন্ধানে  দেখা গেছে, সহায় সম্বলহীন এসব মানুষের এখন নেই  পেটে ভাত, পরনের কাপড়। পাহাড়ি আলু নানা ধরনের বন্য প্রাণী শিকার করে খেয়ে না খেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করে আসছে। এসব মানুষ খুব পরিশ্রমী হয়ে থাকে। তাদের উন্নয়নের জন্য এনজিও বিভিন্ন কাজ করে আসলেও তা শুধু কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। হালুয়াঘাটের জয়রামকূড়া গ্রামের পল সুরেশ বানোয়ারি বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী গারোদের জীবনযাত্রা এখন আগের তুলনায় উন্নয়নের দিকে। গারোরা এখন শিক্ষাগ্রহণসহ কর্মসংস্থানের জন্যে ঢাকা শহরে যাওয়ায় জীবনমান উন্নত হয়েছে। ভবিষ্যতে যারা অতিদরিদ্র তাদের সংকট অনেকাংশে লাঘব হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। আচকিপাড়া গ্রামের সুফলা ম্রং(৫৫) জানান, সাবেক ট্রাইবাল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান বিজয় ম্রংয়ের কারণে তারা তাদের সব সম্পত্তি হারিয়েছেন। এ রকম আরো অনেক গারোই অভিযোগ করেছেন তাদের এই  নেতার বিজয় ম্রংয়ের বিরুদ্ধে। শেরপুর জেলার পাঁচটি উপজেলার মধ্যে শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া উপজেলায় গারোদের সংখ্যা সবচেয়ে  বেশি। এরা নানাদিক থেকে এগিয়ে গেছে। গারো নারী-পুরুষ দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মক্ষেত্র তৈরি করে নিয়েছে। আর নানাদিক থেকে অবহেলিত ও পিছিয়ে রয়েছে কোচ সমপ্রদায়ের লোকজন। তাদের অভিযোগ ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন  থেকেও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এখানে তুলনামূলকভাবে পায়নি ভিজিডি ভিজিএফ কার্ড, বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা। শিক্ষায়-দীক্ষায়ও কোচ সমপ্রদায়ের লোকেরা রয়েছে অনেক পিছিয়ে।

Friday, April 13, 2018

সাঙ্গু নদীতে ভাসলো বিজুর ফুল! by নুরুল কবির

বান্দরবানে শুরু হলো চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান ফুল বিজু। বৃহস্পতিবার সকালে বান্দরবানের সাঙ্গু নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সমপ্রদায়ের বর্ষবরণ বিজু ও বিষু শুরু হয়েছে। এ উপলক্ষে ভোর থেকে তরুণ-তরুণীরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নানা সাজে সেজে ফুল বিজুতে অংশ নেয়। এ সময় তারা নানা রকমের ফুল নদীর জলে ভাসিয়ে দেয়। এদিকে পাড়ায় পাড়ায় চলছে পিঠা-পুলি তৈরির আয়োজন ও নানা রকমের সবজি দিয়ে পাচন রান্নার কাজ। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের ফুল বিজু শুক্রবার মূল বিজু ও শনিবার গইজ্জা পইজ্জা। তিনদিন তারা বর্ষবরণ উৎসব পালন করে।

স্থানীয় হিমেল চাকমা বলেন, প্রতিবছরই বর্ষবরণে চাকমারা নানা আয়োজন করে থাকে। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে পাচন খাওয়া, পিঠা তৈরিসহ নানা আয়োজনে তারা সবাই অংশগ্রহণ করে।  এদিকে তঞ্চঙ্গ্যা সমপ্রদায় বর্ষবরণে বালাঘাটায় ঐতিহ্যবাহী ঘিলা খেলায় মেতে উঠেছে। তরুণ-তরুণীরা দল বেঁধে এই খেলা খেলছে। ঘিলা পাহাড়ি একটি গাছের ফল। এটিকে তারা পবিত্র মনে করে। তাই নতুন বছরের শুরুতে বর্ষবরণে তঞ্চঙ্গ্যারা পাহাড়ে পাহাড়ে ঘিলা খেলার আয়োজন করে। এবার শহরের বালাঘাটা বিলকিস বেগম স্কুল মাঠে বড় আকারে ঘিলা খেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে তঞ্চঙ্গ্যারা।এদিকে, সাংগ্রাই কমিটি সাধারণ সম্পাদক কো কো চিং জানান, মারমাদের বর্ষবরণ সাংগ্রাইয়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার সকাল শোভযাত্রার মাধ্যমে সাংগ্রাই উৎসব শুরু হবে বান্দরবানে। শনিবার সাঙ্গু নদীর তীরে চন্দনের পানিতে বৌদ্ধমূর্তিকে স্নান করানো হবে।
রোববার শহরের রাজার মাঠে অনুষ্ঠিত হবে সাংগ্রাইয়ের মৈত্রী পানি বর্ষণ বা জলকেলি উৎসব। মারমা তরুণ-তরুণীরা একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে বরণ করে নেবে নতুন বছরকে। স্বচ্ছ পানির ধারা ধুয়ে মুছে দিবে পুরনো বছরের যত দুঃখ গ্লানি। এছাড়া পাড়ায় পাড়ায় পিঠা তৈরির আয়োজনও থাকছে সাংগ্রাই উৎসবে। শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে ত্রিপুরা সমপ্রদায়ের বৈসু উৎসব। তারা নেচে-গেয়ে  বৈসু পালন করে থাকে।

রাঙ্গামাটিতে বিজু উৎসব by আলমগীর মানিক

গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে গতকাল থেকে পাহাড়ে শুরু হয়েছে চাকমাদের বিজু, মারমাদের সাংগ্রাই ও ত্রিপুরাদের বৈসুক উৎসব। ভোরে চাকমা রাজবাড়ী ঘাটে আদিবাসী ফোরামের সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন খীসা নদীতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে এই উৎসবের সূচনা করেন। এ সময় পাহাড়ি চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও ত্রিপুরা সমপ্রদায়ের নারী-পুরুষ এ সময় কাপ্তাই হ্রদের পাড়ে ফুল ভাসান। অনুষ্ঠানে উৎসব কমিটির সদস্য বিজয় কেতন চাকমা, ইন্দ্র দত্ত তালুকদার সহ চাকমা সমপ্রদায়ের বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। এদিকে ত্রিপুরা সমপ্রদায়ের লোকজন শহরের গর্জনতলী এলাকায় গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে বৈসুক উৎসবের সূচনা করেন। এ সময় সাবেক পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার উপস্থিত ছিলেন। ঐতিহ্য অনুযায়ী গতকাল পানিতে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে তিন দিনের সর্বজনিন উৎসব শুরু হয়। আগামীকাল ১৩ই এপ্রিল উদযাপিত হচ্ছে মূল বিজু। আগামী ১৪ই এপ্রিল অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ গোজ্যাপোজ্যে দিন ও বর্ষবরণ উৎসব।

Saturday, November 4, 2017

শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে উপজাতিদের বাধা by কাজী সোহাগ

পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর স্বাক্ষর হওয়া শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে উপজাতিরা। আওয়ামী লীগ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন্ন করতে ও পার্বত্য এলাকায় নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে তারা এ উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী ২রা ডিসেম্বর শান্তিচুক্তির ২০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে বিগত ২০ বছরে এর বাস্তবায়নে সরকার বেশ আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে। যদিও পার্বত্যবাসীদের অভিযোগ, দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পেরিয়ে গেলেও বাস্তবায়ন হয়নি চুক্তির মৌলিক অনেক বিষয়। বাস্তবে দেখা যায় চুক্তির বেশির ভাগই বাস্তবায়িত হয়েছে।
শান্তিচুক্তি বিশ্লষণ করে জানা যায়, এ পর্যন্ত শান্তিচুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টির পূর্ণ বাস্তবায়ন, ১৫টির আংশিক বাস্তবায়ন এবং ৯টি ধারার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এছাড়াও তিন পার্বত্য জেলায় হস্তান্তরযোগ্য ৩৩টি বিষয়/বিভাগের মধ্যে এ পর্যন্ত রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদে ৩০টি এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে ২৮টি বিষয়ে/দপ্তর হস্তান্তর করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, চুক্তির কিছু কিছু ধারা বাংলাদেশ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে অবশিষ্ট চুক্তি বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার চুক্তির যে ধারাগুলো বাস্তবায়িত হয়নি সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। এরপরও আঞ্চলিক উপজাতি সংগঠনের নেতা ও কতিপয় বুদ্ধিজীবী ক্রমাগত শান্তিচুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ করে যাচ্ছেন। সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক থাকলেও আঞ্চলিক উপজাতি রাজনৈতিক দলসমূহের বিরূপ মনোভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। পার্বত্য জেলা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা বলেন, আঞ্চলিক উপজাতি সংগঠনগুলোর এ ধরনের নেতিবাচক মনোভাব থাকলে সরকারের একার পক্ষে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। চুক্তি বাস্তবায়নে সকলকে শান্তিপূর্ণ ও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যদিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ ২১ বছরের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত এবং রক্তক্ষরণের অবসান ঘটে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অন্য কোনো তৃতীয়পক্ষের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এই শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয় যা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল উদাহরণ। সংশ্লিষ্টরা জানান, শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে এবং এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। চুক্তির সুফল হিসেবে উপজাতি শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, তাদের দলের অন্যান্য সদস্য এবং পাহাড়ের সাধারণ মানুষ বেশকিছু সুবিধা ভোগ করছে। বাংলাদেশের সমতলের জেলাগুলোর মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলোতেও বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামোগত সুবিধা গড়ে উঠেছে। সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ করে ইতিমধ্যে পাহাড়ের সব উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যন্ত পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে স্বাধীনতার আগে ১৯৭০ সালে মাত্র ৪৮ কিলোমিটার রাস্তা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য অঞ্চলে নির্মাণ করেছে প্রায় ১৫৩৫ কিলোমিটার রাস্তা, অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্ট। পার্বত্য জেলার অধিবাসীরা জানান, পার্বত্যাঞ্চলে মোতায়েনরত সেনাবাহিনীকে ছয়টি স্থায়ী সেনানিবাসে প্রত্যাবর্তন, সামাজিক উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ উন্নয়নসহ প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ৩ পার্বত্য জেলায় ৪১ হাজার ৮৪৭ জনকে বয়স্ক ভাতা, ২২ হাজার ৪১০ জনকে বিধবা ভাতা, ৭ হাজার ৩১১ জনকে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা এবং ৯৮১ জন প্রতিবন্ধীকে শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের আওতায় এ অঞ্চলে ১ হাজার ৪৬টি সমিতির মাধ্যমে ৫২ হাজার ১৭২ জন সদস্যের দারিদ্র্যবিমোচন তথা জীবনমান উন্নয়ন করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া আশ্রয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ৬২৩টি পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে আগে যেখানে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ ছিল না সেখানে নির্মিত হয়েছে ১টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১টি মেডিকেল কলেজ। হাইস্কুল ও কলেজের সংখ্যা যেখানে ছিল মাত্র ১১টি সেটা এখন ৪৭৯টি। প্রায় প্রতিটি পাড়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। শিক্ষার হার ২ ভাগ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৪৪ দশমিক ৬২ ভাগে পৌঁছেছে। যেখানে বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষার হার ৫৯ দশমিক ৮২ ভাগ সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার হার ৭৩ ভাগ। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালিদের শিক্ষার হার ২৩ ভাগ । সংশ্লিষ্টরা জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামে কারিগরী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ১টি থেকে ৩টি করা হয়েছে, হাসপাতালের সংখ্যা ৩টি থেকে ২৫টিতে উন্নীত হয়েছে। যেখানে কোনো খেলার মাঠ ছিলো না সেখানে ৫টি স্টেডিয়াম নির্মিত হয়েছে। কলকারখানা, ক্ষুদ্র কুটির শিল্প ১৯৩টি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে এখন ১৩৮২টিতে উন্নীত হয়েছে। ফলে সরকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টায় পার্বত্য চট্টগ্রামে এককালের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রভূত উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে। পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরকার চাকরি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে উপজাতিদের জন্য ৫ ভাগ সংরক্ষিত কোটার ব্যবস্থা করেছেন, উপজাতিদের সরকারি ট্যাক্সের আওতামুক্ত রেখেছেন। এ সবই করা হয়েছে তাদের আর্থ-সামাজিক ও জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে। সরকারের দেয়া এসব সুবিধা ভোগ করে শিক্ষা, চাকরি এবং জীবনযাত্রার মানের ক্ষেত্রে উপজাতিদের ব্যাপক উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে। দিন দিন এ অবস্থার আরও উন্নতি হবে। শান্তিচুক্তির সুফল ভোগ করে উপজাতিদের বর্তমান জীবন যাত্রার মান, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রসরতা প্রভৃতি বিবেচনা করে এ কথা বলা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন আর বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া কোনো জনপদ নয়। শান্তিচুক্তিতে বলা হয়েছে, পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা অস্ত্র সমর্পণ করবে, সন্ত্রাস ও অপরাধের রাস্তা ত্যাগ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে। কিন্তু বাস্তবে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তারা বলেন, আজও খুন, ধর্ষণ, অপহরণ ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধের স্বর্গরাজ্য পার্বত্য চট্টগ্রাম। পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা নতুন করে আরো বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সংগ্রহ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। এখনও একই ধরনের সন্ত্রাসী-কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ইউপিডিএফ, জেএসএস (সন্তু) এবং জেএসএস(সংস্কার) নামে তিন উপজাতি সশস্ত্র সংগঠন। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত মানুষের কাছ থেকে নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে জোর জবরদস্তি করে চাঁদা আদায় করে যাচ্ছে। পাহাড়ের কোথায় কখন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা কার ওপর হামলে পড়বে তা নিয়ে সার্বক্ষণিক উৎকণ্ঠায় থাকতে হচ্ছে পাহাড়ি-বাঙালি শান্তিপ্রিয় মানুষগুলোকে।

Monday, August 10, 2015

প্রকৃতিই ভরসা আদিবাসী কোচদের

শেরপুরে নালিতাবাড়ী উপজেলার খলচন্দা গ্রামে যাওয়ার
সেতুটি দুই বছর আগে দেবে যায়। আজও এটি সংস্কার
করা হয়নি। গত শুক্রবার তোলা ছবি l প্রথম আলো
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নে বনঘেঁষা ছোট একটি গ্রাম খলচন্দা। এখানে আদিবাসী ৫০টি কোচ পরিবারের তিন শতাধিক সদস্য বাস করে। আধুনিক জীবনের ছোঁয়া লাগেনি এই গ্রামে। এ গ্রামের বাসিন্দারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার সুযো থেকে বঞ্চিত। খাদ্য, বস্ত্রসহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য প্রকৃতির ওপরই তাদের নির্ভর করতে হয়। আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। এই দিবসে তাদের জীবন-জীবিকা ও নানা ধরনের সমস্যা তুলে ধরার জন্য এই প্রতিনিধি সরেজমিনে খলচান্দা গ্রামে যান। সেখানে গিয়ে কয়েকজন আদিবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই গ্রামের সবাই কোচ সম্প্রদায়ের। এখানে কোচ সম্প্রদায়ের ৫০টি পরিবা বাস করে। এ গ্রামের নারী ও পুরুষেরা কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। এ ছাড়া পাহাড় থেকে লাকড়ি সংগ্রহ ও বাঁশ দিয়ে ঢোল তৈরি করে তাঁরা সংসার চালান। অধিকাংশ বাড়িতে কাঁচা পায়খানা। এ গ্রামে বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) পরিচালিত তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত একটি বিদ্যালয় ছাড়া নেই কোনো সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ পাড়ার শিশুরা সাধারণত পড়ালেখা করে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড়দের সঙ্গে চাষাবাদের কাজে জড়িয়ে পড়ে। সারা গ্রামে চারটি নলকূপ থাকলেও বছরের বেশির ভাগ সময় নষ্ট থাকে। তাই মাটির কূপ ও নদীর পানিই তাদের ভরসা। কোনো রোগ হলে তাদের ছুটে যেতে হয় সাড়ে তিন কিলোমিটার পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে মিশনারি হাসপাতালে। সেখানে না যেতে পারলে ২০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে যেতে হয় উপজেলা সদরে। গ্রামটিতে কোনো পাকা সড়ক নেই। শুষ্ক মৌসুমে কাঁচা সড়কে চলাফেরা করতে পারলেও বর্ষায় চলাচলে সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
আদিবাসী গৃহবধূ মায়াদেবী কোচ (৪০) বলেন, ‘ভাঙা ব্রিজের ওপর দিয়া প্রায় আধা মাইল দূর থাইকা দুই বেলা পানি আইনা চলি। এতে আমগর বিরাট কষ্ট অয়। মেঘ (বৃষ্টি) অইলে রাস্তা দিয়া হাঁটন যায় না। সরকার যদি আমগরে গ্রামে রিং টিউবওয়েলের ব্যবস্থা কইরা দিত, বিরাট উপকার অইত।’
সতীশ কোচ (৫০) বলেন, ‘আমরা কষ্ট কইরা যেইটুকু ধান লাগাই, হাতি আইসা সব খাইয়া ফালায়। জীবন রক্ষার লাইগা তহন মশাল জ্বালাইয়া সবাই রাইত জাইগা হাতি পাহারা দিই। সরকার যদি আমগরে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করত, তাইলে হাতির অত্যাচার থাইকা কিছুডা রক্ষা পাইতাম।’
কোচপাড়ার মণ্ডল (প্রধান) সুবরন্ত কোচ (৭১) বলেন, ‘প্রকৃতির দয়ায় আমরা কোনো রহম বাইচ্চা আছি।’
নালিতাবাড়ী টাইটেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লুই নেংমিঞ্জা জানান, সব দিক থেকেই এই ৫০টি কোচ পরিবার অবহেলিত। বিষয়টি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।
পোড়াগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ম আজাদ মিয়া বলেন, গ্রামটিতে বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। তবে তাড়াতাড়ি বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হবে। ওই গ্রামে যাওয়ার জন্য সেতু নির্মাণসহ সড়ক সংস্কারের বিষয়টি দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।

Friday, August 7, 2015

এক ভয়ার্ত সাঁওতালপল্লি থেকে বলছি... by ফারুক ওয়াসিফ

অনি​শ্চয়তার মুখে এ রকমই থতমত সমতলের আদিবাসীরা
মেয়েটির নাম অনীতা—অনীতা হেমব্রম। বাড়ির দাওয়ার মাটির থামের আড়াল থেকে লজ্জায় মুখ বের করতেই পারছিল না। তাদের উঠানের গাছের ডালিম সবুজাভ হলুদ, দেয়ালে আলপনা আঁকা; কেমন এক শান্তি শান্তি পরিবেশ। অনীতার প্রিয় তৃষ্ণার্ত কাকের গল্প, প্রিয় কবিতার নাম ‘শোভা’, প্রিয় গান ‘আমার সোনার বাংলা’। অথচ সোনার বাংলার বাঙালিরাই তাদের বিপদের সর্বনাম।
সবার চোখের জলই সমান নোনা, সবার রক্তই সমান লাল। কিন্তু তা হয়তো নয়। উত্তরবঙ্গের পার্বতীপুরের গহিন মেঠোপথের মাথায় যে গ্রামটির নাম চিড়াকুটা, সেখানকার মানুষের সবই কম। তাদের জমি কম, রক্ত কম লাল, চোখের পানি কম নোনা, অত্যাচার-নির্যাতনও যেন তাদের গা-সওয়া। কমই যদি না হবে, তাহলে এত সহ্য করে কীভাবে? বাঙালির পক্ষে বাঙালি, মুসলমানের ডাক আরেক মুসলমানে শোনে, হিন্দু ও খ্রিষ্টানদেরও সহায়-শক্তি আছে এ দেশে—কিন্তু আদিবাসী সাঁওতালদের কিছুই নেই। চিড়াকুটার সাঁওতাল উচ্ছেদ হলে শিমুলজুড়ির সাঁওতালেরা তাদের আশ্রয় দিতে ভয় পায়। এত ‘নেই’-এর মধ্যেও খুব করে ‘আছে’ তাদের গায়ের রং, চেহারার ধাঁচ আর সাঁওতালি ভাষার বুলি। এই থাকাতেই মস্ত বিপদ। হোটেল-রেস্তোরাঁয় তাদের পাতে কেউ খায় না। তাদের কোনো যুবকের স্বজাতির বাইরের কাউকে ভালোবাসা মানে মৃত্যু ডেকে আনা। তাদের মর্যাদা ও সম্পত্তি দুটোই যেন লুটপাটের বিষয়।
এ বছরের ২৪ জানুয়ারির ঘটনা। সকালবেলা চিড়াকুটার কৃষকেরা তাঁদের জমিতে গিয়ে দেখেন, পাশের গ্রামের জনৈক জিয়ারুল-জহুরুল ভ্রাতৃদ্বয় লোকজন নিয়ে হাল চষা শুরু করেছেন। বাধা দিলে তাঁদের একজন পিস্তল বের করেন। সাঁওতালি রক্তে সুপ্ত হুলের স্মৃতি জেগে ওঠে। সাঁওতালি তিরে এক বাঙালির প্রাণ যায়। যথারীতি পুলিশ এসে ২৩ সাঁওতালকে আটক করে। পুলিশ যাওয়ামাত্রই চারপাশের হাজার হাজার বাঙালি মুসলমান নামধারী হামলাকারী ‘পিঁপড়ার মতো আসি’ ঘরদোর লুট করে, বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, ছিনিয়ে নেয় গবাদিপশুসহ অস্থাবর সব সম্পদ। তারপরও অটুট তাদের অপার্থিব সরলতা, সাঁওতালি ঐক্য আর আধুনিক হাহাকার।
এর প্রায় পাঁচ মাস পর ১ জুলাই চিড়াকুটায় গিয়ে পেলাম মধ্যবয়সী চ্যালচিউস হেমব্রমকে। কথা বলতে বলতে উত্তেজনায় তড়পাচ্ছিলেন। বলছিলেন ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের বীর নেতা সিধো-কানো-চাঁদ-ভৈরব ভাই ও তাঁদের ফুলমণি বোনের কথা। কিন্তু যেই বললাম, ‘আপনারা তো সংখ্যায় কম, পারবেন কী করে?’ বাতাস–হারা পতাকা যেমন মিইয়ে পড়ে, লোকটার গলার স্বরও তেমনি নেমে যায়: ‘ওদিকে ভারত এদিকে বাংলাদেশ, কী করব, কোথায় যাব? সংখ্যায় তো আমরা কম! আমারও মারবা ইচ্ছা করে, কিন্তু পারি না!’
পার্বতীপুর থেকে রওনা দিলে মোটরসাইকেলে দুই ঘণ্টার পথ চিড়াকুটা। পথের মধ্যে অবিরত সবুজের সমারোহ, বৃষ্টিভেজা খেতগুলো ধান রোপার জন্য প্রস্তুত। মাটির বা পাকা রাস্তার ওপর ধানের খড় আর ভুট্টা শুকাতে দেওয়া। বৃষ্টিজমা খেতে বা খালে বাচ্চা-বুড়ো মাছ ধরছে। কোথাও কোনো বিপর্যয়ের চিহ্ন নেই। শুধু চিড়াকুটা গ্রামের জমিগুলো ফাঁকা, চাষবাস বন্ধ। পুরো গ্রামে সরকারি স্কুলঘরে পুলিশ ক্যাম্প। আরও এগোলে সাঁওতালপল্লির মাটির ঘরবাড়ি। পাঁচ মাস আগের আগুনের দাগ এখনো এদিকে-ওদিকে। কয়েকটি অঙ্গার হওয়া গাছ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভাঙাচোরা টিনের বেড়া, চালহীন কিছু ঘর সাক্ষ্য দিচ্ছে, পাঁচ মাসেও ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা যায়নি। সেদিনের পর এলিজাবেথ টুডুর রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না। দুঃস্বপ্নের মধ্যে ফিরে ফিরে আসে সেদিনের হামলার স্মৃতি।
মধ্যবয়সী বিমলা মুর্মুর চোখে এখনো ভাসে সেই সব দৃশ্য: ‘হিসাব ছাড়া লোক আসছে সেদিন আমার ঘরে। আমার দুই ড্রাম চাল, টিভি, সাইকেল, সেলাই মেশিন, হাঁড়িকুড়ি, জামা-কাপড়—সব নিয়ে গেছে।’ গ্রামের মধ্যে এটিই সবচেয়ে অবস্থাপন্ন বাড়ি। গ্রামের একমাত্র টেলিভিশনটাও তাদেরই ছিল। বিমলার দুঃখ, ‘সেলাই মেশিন আমার জান, সেটাও নিয়ে গেল! তারা আমার পায়ে বাড়ি দিল, গলায় টিপে ধরে কোমরে হাত দিয়ে মোবাইল নিতে গেল। আমি দৌড় দিলাম—এত পুরুষ আমার পেছনে। কেউ বলতেছে ম্যারা ফেল। তখন লালমাটি গ্রামের মোস্তফা চৌকিদার আমারে বাঁচাইল! কিন্তু মোবাইল আর পাইলাম না।’
৬৫ বছরের বৃদ্ধ লক্ষণ টুডুর হাহাকার লুট হওয়া পোয়াতি গরুটার জন্য। ‘এত দিনে গরুটা মনে হয় বিয়াইছে’ বলে হাতের লাঠি দিয়ে মাটিতে আঁকিবুঁকি করতে থাকেন। মেসেস টুডুর বিমারি স্বামী জেলখানায়, বাড়িটা মাটির সঙ্গে মেশানো, ওর মধ্যেই ছিল তাঁর খাসি বিক্রির ১০ হাজার টাকা—তা–ও পুড়েছে। ওদের ধারণা, এখন যারা গ্রাম পাহারা দিচ্ছে তারা তাদের পুলিশ, আর যারা গ্রামবাসীদের ধরে নিয়ে গেছে তারা ‘ওদের পুলিশ’। ওদের ধারণা, ‘বঙ্গবন্ধু দেশের ব্যাপার আর সিধো-কানো সংস্কৃতির ব্যাপার।’ ওদের ধারণা, ‘যা বলব সত্যই বলব, মিথ্যা বলব কেন?’ ওদের ধারণা, বউ পেটানো ছাড়া আর কোনো অপরাধ তারা করে না। ওরা মনে করে, সাঁওতালদের মধ্যে কানা-খোঁড়া, চোর-ডাকাত-ভিখারি কিছু নাই। ওদের ধারণা, মারামারি-লুটপাট করলে ‘নিজের জাতের ওপরই ঘিন্না লাগবে!’ ওদের বিশ্বাস, ‘আমরা জয় পাব, কারণ সরেজমিনে লড়াই করছি, আর ওরা তো ভূমিদস্যু।’
অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় সাঁওতালেরা পাকিস্তানি মিলিটারি হটিয়ে রংপুরকে অল্প সময়ের জন্য স্বাধীন করেছিল। কিছুদিন আগেও গ্রামে ফুটবল খেলা হলে সাঁওতাল-বাঙালি মিলেমিশে ‘লাফাত’। জাত নিয়ে ছি ছি করত না! কিন্তু মাঝখানে চলে এসেছে ভূমি। সেই ইংরেজ আমল থেকে জমির অধিকার, অরণ্যের অধিকার, মর্যাদার অধিকার বাঁচাতে সাঁওতালেরা লড়ে যাচ্ছে।
দুই...
আগের দিন ছিল ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৬০তম বছরপূর্তি। এ উপলক্ষে দিনাজপুর শহরে জমায়েত হয়েছিল কয়েক হাজার সাঁওতাল নারী-পুরুষ-শিশু। দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে বাসে করে, ভটভটিতে চড়ে তারা এসেছে রোদে পুড়তে পুড়তে। এর আয়োজন করে আদিবাসী পরিষদ ও দিনাজপুরের নাগরিক সমাজ। তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা। সবার দাবি, সমতলের আদিবাসীদের জন্য স্বতন্ত্র ভূমি কমিশন হোক। সেখানে যতজনের সঙ্গে কথা বলেছি, অধিকাংশেরই জমি নিয়ে হয় সরকারের বিভিন্ন বিভাগ, নয়তো এলাকার প্রভাবশালী বাঙালিদের সঙ্গে বিরোধ চলছে। কোথাও সরকারের বন বিভাগ তাদের জমিকে বনাঞ্চল ঘোষণা করে দখলে নিচ্ছে। দিনাজপুরের হাজী দানেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পাটকলসহ অনেক প্রতিষ্ঠানই সাঁওতালদের জমির ওপর নির্মিত।
এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মী তাঁদের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে দাবি করলেন, ৮০ শতাংশ সাঁওতালি জমি নিয়েই গন্ডগোল চলছে। চিড়াকুটার যে ৪৩ একর ৩৩ শতক জমি নিয়ে বিবাদ, তার ১৯ একর ১৭ শতক জমিতে অনাদিকাল থেকে সাঁওতালেরাই চাষবাস করছিল। কিন্তু বিষয়বুদ্ধি নেই বলে, আর শিক্ষা-দীক্ষার অভাবে এসব জমির দলিল-রেকর্ড তারা করে উঠতে পারেনি। আর পারলেই-বা কী, ভূমি দপ্তর, সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশে নকল দলিলের ভিত্তিতে সেই সব জমি কেড়ে নেওয়া খুবই সহজ। আমেরিকায় একসময় স্বর্ণ শিকারিরা গোল্ড রাশের জন্ম দিয়েছিল, বাংলাদেশে এখন চলছে ভূমিদস্যুদের ল্যান্ড রাশ তথা ভূমিগ্রাসের ছিনিমিনি খেলা। এই খেলায় সাঁওতাল-আদিবাসীসহ প্রান্তিক হিন্দু-মুসলমান বাঙালির জেতার সম্ভাবনা খুবই কম।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সমস্যা নিরসনে একটা ভূমি কমিশন সরকার গঠন করেছে। অনুরূপ কমিশন সাঁওতালদেরও দাবি। এর জন্য আইন লাগবে, লাগবে ভূমি প্রশাসনের দুর্নীতি বন্ধ করা। কিন্তু কে করবে?
তিন...
দিনাজপুর থেকে পার্বতীপুরে যাওয়ার পথে এক স্কুলের মাঠে দুজন মানুষকে ঘুরে ঘুরে ঢোল আর মাদল বাজাতে দেখে থামি। মাঠের প্রান্তে সাদা কাপড়ের প্যান্ডেলে প্রমাণ আকারের দুই যোদ্ধামূর্তি। হাতে তির-ধনুক আর পুরু গোঁফ দেখে চিনতে পারি, সাঁওতাল বিদ্রোহের নায়ক, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের পথপ্রদর্শক সিধো ও কানোর মূর্তি। পাশেই আদিবাসী কমিউনিটি সেন্টার। সেখানকার মণ্ডপে প্রতি সন্ধ্যায় বাতি দেওয়া হয়, ঢোল-মাদলের নাচে আর পুষ্পে সাঁওতালদের জাতীয় বীরদের শ্রদ্ধা জানানো হয়। মাঠের দুই পাশে বালক ও বালিকাদের জন্য আলাদা দুটি বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয় ও কমিউনিটি সেন্টারের এত জমি কোথা থেকে এল? জটলার ভেতর থেকে জবাব দিলেন হাড্ডিসার প্রৌঢ় একজন। হাসতে হাসতে বুকে হাত দিয়ে বললেন, ‘আমি দিসি।’
অবাক চোখে লুঙ্গি-শার্ট পরা ছোটখাটো মানুষটার ফোকলা মুখটায় তাকিয়ে থাকি।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, ঢোল-মাদল নিয়ে ওরা উঠে দাঁড়াল। কোথায় যায়? বলে, নসিপুরে এক বাড়িতে বিয়া। সেখানে বাজনা বাজাব, নাচব। আর কী করব?
হারিয়ে ফেলার আগেই এই আদিবাসী দাতা হাতেম তাইয়ের নাম জানতে চাইলাম। আকাশি রঙের শার্টের বুক পকেটের কাছটায় আবারও হাত দিয়ে মানুষটা উত্তর করে, ‘আমার দাদা ডুলু মুর্মু, বাবা মঙ্গল মুর্মু আর আমি নরেশ মুর্মু। এই সব জমি আমাদের দান।’
এখন কত জমি আছে আপনার?
চলে যাওয়ার আগে অবলীলায় হা হা হা হেসে লোকটা বলে, ‘কিসসু নাই।’
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

Wednesday, July 1, 2015

সাঁওতাল বিদ্রোহের উত্তরাধিকার by নজরুল ইসলাম

আজ মহান সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৬০তম বার্ষিকী। ১৬০ বছর আগে ১৮৫৫-৫৬ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভগনাডিহি গ্রামে বীর সিধু-কানুর নেতৃত্বে এ বিদ্রোহ হয়েছিল। ইতিহাসে যা সাঁওতালি ‘হুল’ বা সাঁওতাল বিদ্রোহ নামে পরিচিত। শাসনব্যবস্থার িভত শক্ত করতেই ইংরেজ শাসক গোষ্ঠী অন্যায়, শোষণ ও নিপীড়নের পথ বেছে নিয়েছিল, তাদের আক্রমণ থেকে আদিবাসী সাঁওতাল জনগোষ্ঠীও বাদ যায়নি।
সেদিনের সাঁওতালি হুল ছিল ইংরেজ শাসক গোষ্ঠী ও তাদের দালাল জমিদার শ্রেণি, সুদখোর মহাজন, নিপীড়ক প্রশাসনের বিরুদ্ধে সংঘটিত প্রথম শক্তিশালী সশস্ত্র প্রতিবাদ। সিপাহি বিদ্রোহের কিছুদিন আগেই এটি সংঘটিত হয়। সাঁওতালি জাতি তার নিজ ভূমিতে স্বাধীন সাঁওতালি রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবিতে সেদিন গর্জে উঠেছিল। সিধু-কানুর গ্রাম ভগনাডিহিতে ২০-২৫ হাজার সমবেত সাঁওতালি প্রকাশ্য সমাবেশে এ বিদ্রোহের ঘোষণা দেয়। বিদ্রোহ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। নিম্নবর্গের হিন্দু, ডোম, তেলীসহ অন্যান্য জাতিসত্তার মানুষেরাও শোষণ থেকে মুক্তির আশায় এ বিদ্রোহে অংশ নেয়। ১৮৫৫-৫৬ সালে সাঁওতালি ‘হুল’ ইংরেজ শাসনের শক্ত ভিত্তিমূলে আঘাত হানে।
ইংরেজ নীলকুঠিতে ও জমিদারদের বাড়িতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের মধ্য দিয়ে বিদ্রোহ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ইংরেজ বাহিনীর আধুনিক মারণাস্ত্রের সামনে সাঁওতালি তির-ধনুক, বর্শা, টাঙ্গি বেশি দিন টিকতে পারেনি। বিদ্রোহের নেতা সিধু-কানু গ্রেপ্তার হলে বিদ্রোহীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। তাদের মনোবল ভেঙে পড়ে। ইংরেজদের নথি থেকে জানা যায়, সেদিন বিদ্রোহ দমনের নামে বহু গ্রাম আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। হাজার হাজার সাঁওতালকে গ্রেপ্তার করে জেলে পোরা হয়। বিদ্রোহের মহান নেতা সিধু-কানুকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে এ বিদ্রোহে অংশ নেওয়া হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়, এটা গণহত্যার শামিল।
সেদিনের সাঁওতাল বিদ্রোহের রক্তাক্ত পথ ধরে মুণ্ডা বিদ্রোহ, তেলেঙ্গানা বিদ্রোহ, টংক আন্দোলন, তেভাগা ও পরবর্তীকালের ভারতের নকশালবাড়ি আন্দোলনসহ আরও অনেক আন্দোলন হয়েছে। সে কারণে মহাশ্বেতা দেবীর সেই উক্তি যেন এখনো সত্য ‘আদিবাসীরা আজও যেখানে হকের লড়াই লড়ছে, সে লড়াই সিধু-কানু ও বিরসা মুণ্ডাদের ফেলে যাওয়া লড়াই। শালবনে ফুল ফোটার যেমন শেষ নেই, আদিবাসীদের লড়াই সংগ্রামের তেমন শেষ নেই।’
লেখক: চেয়ারম্যান, আদিবাসী গবেষণা পর্ষদ।

Saturday, June 13, 2015

নির্ভয়াদের তালিকা দীর্ঘতর হচ্ছে by ইলিরা দেওয়ান

বর্তমানে দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা ভয়াবহভাবে বেড়ে চলেছে। একই সঙ্গে বিচারহীনতার সংস্কৃতিও এমন প্রকট হয়েছে, দুর্বৃত্তরা একটার পর একটা ঘটনা ঘটাচ্ছে, কিন্তু পুলিশ কোনো দুর্বৃত্তকে ধরতে পারছে না। এ যেন বাংলা সিনেমার অবধারিত চিত্র, পরবর্তী দৃশ্য আসার আগেই দর্শক বুঝে নেয়, পরের দৃশ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে!
২১ মে আদিবাসী এক কর্মজীবী নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতনের ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় চলছে। এটি নারী নির্যাতনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। নারীর ওপর ক্রমবর্ধমান সহিংসতারই ধারাবাহিকতা। আমরা দিল্লির নির্ভয়ার কথা ভুলে যাইনি। দিল্লির ঘটনায় বাকরুদ্ধ হয়েছিলাম। আমার দেশে দিল্লি ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে কিন্তু খুব বেশি সময় লাগেনি! মাস খানেক পরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে আমার দেশের ‘নির্ভয়া’ প্রথম আক্রান্ত হয়েছেন। এরপর নির্ভয়াদের তালিকা দীর্ঘতরই হচ্ছে। আমরা চলতি মে মাসের পরিসংখ্যান থেকে নারীর নিরাপত্তাহীনতার ভয়াবহ চিত্রকে উপলব্ধি করতে পারি—২১ মে ঢাকার ঘটনা, ১১ মে সোনারগাঁয়ে চলন্ত বাসে পোশাকশ্রমিককে ধর্ষণ, ১৩ মে ময়মনসিংহে বাসচালক ও সহকারী এক তরুণীকে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়, ৩ ও ১ মে যথাক্রমে ঢাকার আশুলিয়া ও চট্টগ্রামে ট্রাঙ্ক ও লাগেজে দুই তরুণীর লাশ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ট্রেনে, নৌকায়, ট্রাকে, প্রাইভেট কার থেকে নামিয়ে নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এ তো শুধু চলন্ত যানে নির্যাতনের চিত্র; এর বাইরেও নারী নির্যাতনের মাত্রা কতটা মারাত্মক আকার নিয়েছে, সেটি পত্রিকার পাতা খুললেই বোঝা যায়। হঠাৎ নারী নির্যাতন বেড়েছে তা কিন্তু নয়; দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্লিপ্ততা আর নিশ্চুপতা দুর্বৃত্তদের এসব সন্ত্রাসমূলক কাজে প্রশ্রয় বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অনেকে মনে করছেন।
অবশেষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দুই দুর্বৃত্তকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে। তারপর সন্দেহ যায় না, শেষ পর্যন্ত বিচার হবে তো। এমনিতেই দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনায় অপরাধীর শাস্তি পাওয়ার ঘটনা বিরল। তদুপরি মেয়েটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, কখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গ্রেপ্তার অভিযান শুরুর আগেই আসামিরা সীমানা পেরিয়ে নিরাপদে চলে যায়। কখনো আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে আসামিরা বেরিয়ে আসে। বর্ষবরণে নারী লাঞ্ছনার ঘটনায়ও সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও ‘দুষ্টু ছেলেদের’ চিহ্নিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক মাস সময় লেগেছে।
আদিবাসী মেয়েটিকে নির্যাতনের সময় এক দুর্বৃত্ত বলেছে, মেয়েটি ‘উপজাতি’ বলে তাঁকে তুলে নেওয়া হয়েছে (সূত্র: প্রথম আলো)। দুর্বৃত্তদের এখানেও লাভের গুড়! আক্রান্ত মেয়েটি জাতিগত ও ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘু। সুতরাং দুর্বৃত্তদের আর বিচারের মুখোমুখি হতে হবে না! পাহাড় ও সমতলে আদিবাসী নারীর ওপর নির্যাতনের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। কিন্তু সেসব ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় না বললেই চলে। আর যারা হাতেনাতে ধরা পড়ে, তারাও আইনের ফাঁক গলিয়ে দায়মুক্তি পেয়ে যায়। নির্যাতনকারীরা অধিকাংশই হয় কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী, নয়তো কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর ছত্রচ্ছায়ায় প্রশ্রয় পেয়ে থাকে। ফলে বিচারের হাত তাদের ছুঁতে পারে না। বিচারহীনতা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি তাই দুর্বৃত্তদের আদিবাসী নারীর ওপর নির্যাতনে আরও বেশি প্রলুব্ধ করছে।
আমরা বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে এ-ও জেনেছি, পয়লা বৈশাখে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক আদিবাসী ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের দায়ে ছাত্রলীগের পাঁচ কর্মীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাতে হয়। কিন্তু যৌন নিপীড়নকারী হিসেবে সোনার ছেলেদের এ শাস্তি কি যথেষ্ট? প্রচলিত আইনে কেন তাঁদের বিচার হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে বলে তাঁদের চিরতরে বহিষ্কার করেছে। তাই প্রচলিত আইনে ফৌজদারি কার্যবিধি মোতাবেক এ যৌন নিপীড়কদের বিরুদ্ধে পুলিশের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
দেশে নারী নির্যাতন বেড়ে চলেছে, কিন্তু এসব ঘটনার কোনো সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হচ্ছে না। রাষ্ট্র নারীদের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে। নির্যাতিত মেয়েটি অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনটি থানায় গেলেও থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তারা তাঁর মামলা গ্রহণ করেননি। ঘটনা জানার পরেও তিন থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে ভুক্তভোগীকে সহায়তা করেনি এটি, নিঃসন্দেহে দায়িত্ব অবহেলার চরম দৃষ্টান্ত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ গড়িমসি ভাব থেকে এটি স্পষ্ট যে নারী নির্যাতনের ঘটনাকে তারা কীভাবে মূল্যায়ন করে। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে এমনিতে সাধারণ জনগণের মধ্যে আস্থাহীনতার সংকট তৈরি হয়ে আছে। এ সংকট কাটানোর জন্য সেদিন দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সুস্পষ্ট জবাবদিহি থাকা বাঞ্ছনীয়। একইভাবে ওই সব থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরও দায়িত্বে অবহেলার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার।
থানা-পুলিশের এমন দায়িত্বহীন আচরণে স্বাভাবিকভাবে ভুক্তভোগী মেয়েটির মানসিক অবস্থা আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাই এ মুহূর্তে মেয়েটির স্বাভাবিক মানসিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য রাষ্ট্রের উচিত উন্নত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা। বিভিন্ন মিডিয়ায় মেয়েটির আবাসস্থলের ঠিকানা প্রকাশ পাওয়ায় তাঁর পরিবার বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। মেয়েটি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের নিতে হবে। এ ঘটনার পর মেয়েটির জীবিকা বন্ধ হয়ে যাবে, এতে সন্দেহ নেই। তাই মেয়েটির ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।
এত অনিয়ম, অনিশ্চয়তা, বিচারহীনতা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতির মধ্যেও আমাদের মাঝে আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছেন নির্যাতনের শিকার সেই আদিবাসী মেয়েটি। এ মামলায় তিনি ‘লড়াই’ করে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এত কম সময়ে মানসিক ও শারীরিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে তিনি যে দৃঢ়তা ও সাহসের পরিচয় দিয়েছেন, তা দেশের বিবেক ও মনুষ্যবোধকে আরেকবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন ‘আমরাই নির্ভয়া! সব বাধা পেরিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে পারি’।
ইলিরা দেওয়ান: হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।
ilira.dewan@gmail.com

Sunday, May 31, 2015

কল্পনা চাকমা অপহরণ- ১৯ বছর পর শুনানি by জোবাইদা নাসরীন

মাসটি জুড়েই নারীর ওপর নিপীড়নের খবর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের ঘটনার পর সর্বশেষ গারো মেয়েটির মাইক্রোবাসে গণধর্ষণ—কোনোটিই বিচ্ছিন্ন নয়। বরং সবই নারীর ওপর ধারাবাহিক নিপীড়নের চিত্র। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং তদন্তে গড়িমসি, সময়ক্ষেপণ এ ধরনের নির্যাতনের অনুঘটকগুলোকে ধারালো করে। যার কারণে নিপীড়ন বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে আরও বেশি শক্তি নিয়ে এগিয়ে চলে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির একটি বড় উদাহরণ কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলা। ১৯ বছর ধরে চলছে এই মামলার কাজ। মামলার ২২তম শুনানি হবে আজ ২৭ মে।
কল্পনা চাকমা আমার বন্ধু ছিল। ছিল বললে ভুল হবে। কারণ, পার্বত্য চট্টগ্রাম মানেই আমার কাছে এখনো কল্পনা চাকমা। অপহরণের দিন পর্যন্ত কল্পনা চাকমা ছিলেন অবিভক্ত হিল উইমেন ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক, পাহাড়ের প্রতিবাদী মুখ। বলার অপেক্ষা রাখে না কেন তাকে অপহৃত হতে হয়েছে। পাহাড়ে নির্যাতন আর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়ছিল কল্পনা। ঘনিয়ে এল ১৯৯৬-এর সাধারণ নির্বাচন। কল্পনা জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে এসেছিল ইপিজেডে একটি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা দিতে। অপহৃত হওয়ার সপ্তাহ খানেক আগে সেই সময়ে আমার সঙ্গে তার দেখা। ১১ জুন নির্বাচনের রাতেই কল্পনাকে অপহরণ করা হয় তার গ্রামের বাড়ি রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার নিউ লাল্যাঘোনা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে। অপহরণের পরদিন কল্পনা চাকমার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বড় ভাই কালিন্দী কুমার চাকমা বাদী হয়ে স্থানীয় থানায় একটি মামলা করেন। কল্পনার অপহরণ নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে তোলপাড় চলে। প্রতিবাদ ওঠে। সেই প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্মারক নং স্ব.ম.(রাজ-২) পার্বত্য ৩/৫ (অংশ) ৭/৯/৯৬ তারিখে দ্য কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট ১৯৫৬-এর ৩ প্যারার ক্ষমতাবলে তিন সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করে। এই কমিটি ১৯৯৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রিপোর্ট পেশ করে। কিন্তু কোনো সরকারই এই রিপোর্ট প্রকাশ করেনি। ১৯৯৬ সাল থেকে এই পর্যন্ত ৩৫ জন কর্মকর্তার হাতে ঘুরেছে মামলা। নেওয়া হয়েছে ৯৪ জনের সাক্ষ্য।
মামলা দায়ের করার ১৪ বছর পর ২০১০ সালের ২১ মে মামলাটির প্রথম চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। ১৪ বছর তদন্তাধীন থাকার পর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আসামিদের ‘অজ্ঞাতনামা’ উল্লেখ করে প্রতিবেদন পেশ করা হয়। বাদী ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে নারাজি দিলে পরবর্তী সময়ে অধিকতর তদন্তের জন্য আদালত মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করেন। সিআইডি দুই বছর সময় নিয়ে অবশেষে ২০১২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতে গত ১৩ জানুয়ারি ২০১৩ রাঙামাটি মুখ্য হাকিম আদালতে মামলাটির প্রথম দফা শুনানি হয় এবং ১৬ জানুয়ারি আদালত অধিকতর তদন্তের জন্য রাঙামাটি জেলা এসপিকে আদেশ দেন। সেই নতুন তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতেই অনুষ্ঠেয় শুনানি। এই মামলার সর্বশেষ তদন্ত করেছেন রাঙামাটিতে দায়িত্বে থাকা সাবেক এসপি আমেনা বেগম। এখন তিনি আবার বদলি হয়ে গেছেন। নিয়মমাফিক নতুন তদন্ত কর্মকর্তা আসবেন। আবারও আবেদন পড়বে নতুন তদন্তের। আর এভাবেই ফাইলের ফিতা খোলা হবে, বন্ধ করা হবে।
কিন্তু মামলার সুরাহা হবে না। বরং নতুন মামলাটি চালিয়ে নিচ্ছেন যাঁরা, তাঁরা বলছেন, ভিকটিমকে না পেলে তদন্ত শেষ করতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। ফলে এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরো তদন্ত প্রক্রিয়াই। গত বছরের জুনে আদালতে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মামলার ঘটনাটি যেহেতু দেড় যুগ আগের, ১৮ বছরে ভিকটিমের চেহারার পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। যেহেতু এই মামলার মূল সাক্ষী ভিকটিম কল্পনা নিজেই, তাই ওই কল্পনা উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত কিংবা তার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না পাওয়া পর্যন্ত মামলার তদন্ত শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে মামলার ভিকটিম কল্পনা চাকমাকে উদ্ধারের জোর তৎপরতা অব্যাহত আছে।’ (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন, ২৫ মে ২০১৫) কল্পনাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য যে মামলা, অপহরণের বিচারের জন্য যে মামলা, সেই মামলায় এখন কল্পনাই একমাত্র সাক্ষী? তার সাক্ষ্যই একমাত্র অবলম্বন?
যেকোনো অপরাধের ঘটনা তদন্তে প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা। অথচ তদন্ত কমিটি আশ্চর্যজনকভাবে প্রত্যক্ষদর্শী কালিন্দকুমার ও লালবিহারী চাকমার সাক্ষ্যকে গুরুত্ব দেয়নি। বরং খারিজ করা হয়েছে নানা ছুতায়। লালবিহারী চাকমা (তদন্ত রিপোর্টের ২ নম্বর সাক্ষী) স্পষ্টভাবেই অপহরণকারীদের মধ্যে তিনজনকে চিনতে পেরেছিলেন এবং তাদের সঙ্গে থাকা জিনিসপত্রের বিবরণ দিয়েছিলেন। কল্পনার ভাইদের অভিযোগ, মামলার আলামত নষ্ট করা হয়েছে অপহরণকারীদের অব্যাহতি দেওয়ার জন্য। কিন্তু পুলিশের এফআইআরে এই চিনতে পারা অপরাধীদের নাম না লিখে ‘অজ্ঞাত’ লেখা হয়।
বর্তমানে কল্পনা চাকমা অপহরণ মামলাটি রাঙামাটি জেলা পুলিশ সুপারের অধীনে পুনঃ তদন্তাধীন। গত মে মাসে মামলার প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার কথা থাকলেও তদন্ত কর্মকর্তা তা দিতে সমর্থ হননি। বরং তিনি এ মামলার তদন্তভার থেকে অব্যাহতি চেয়ে মামলাটি আবারও সিআইডির কাছে হস্তান্তরের জন্য আবেদন করেছেন। তদন্ত কমিশন, পুলিশ, সিআইডি—ফাইল ঘুরছে, ঘুরবে…তারপর?
আমরা চাই ধর্ষণের শিকার গারো নারীটি বিচার পাক। আজ থেকে ২০ বছর আগে ঢাকায় ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন আরেক গারো নারী মারিয়া মারাক। বিচার হয়নি সেটিরও। গিদিতা রেমাকেও আমরা ভুলিনি। মরিয়ম মুর্মুকে ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত ছিল না ওরা। গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছিল তাঁর লাশ। একাত্তরের তিন লাখ নারী ধর্ষণকে আমরা এখনো সবচেয়ে কষ্টের জায়গা হিসেবে মনে করি এবং ‘হায়েনা’দের নির্যাতন হিসেবে চিহ্নিত করি। কিন্তু স্বাধীন দেশেই প্রতিদিনই যৌন হয়রানি, ধর্ষণ ঘটছে। সেখানে ১৯ বছর পর অপহরণের শিকার পাহাড়ি যোদ্ধা কল্পনার তদন্তকারী কর্মকর্তা বলছেন, এই মামলার ভিকটিম কল্পনা নিজেই, তাই তাকেই সাক্ষ্য দিতে হবে। তাই মনে হয়, ‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।’
জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
zobaidanasreen@gmail.com

Thursday, May 28, 2015

চলন্ত মাইক্রোবাসে ধর্ষণ- ধর্ষকদের ফাঁসি চান গারো ছাত্ররা

আদিবাসী তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ফাঁসির
দাবিতে গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মৌন মিছিল করে
বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন l ছবি: প্রথম আলো
রাজধানীতে চলন্ত মাইক্রোবাসে আদিবাসী তরুণীকে গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ফাঁসির দাবি করেছে বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন। এই দাবিতে গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) রাজু ভাস্কর্যে মুখে কালো কাপড় বেঁধে মানববন্ধন ও মৌন মিছিল করেছে। এ ছাড়া ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে একই স্থানে দুপুরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।
বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠনের ঢাকা মহানগর শাখার আয়োজনে সন্ধ্যায় মৌন মিছিলে অংশ নেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি লেনার্ড সুবিট, সাবেক সভাপতি পিন্টু হাউই, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি লিটন নন্দী প্রমুখ। এ সময় সংগঠনের পক্ষ থেকে আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় নদ্দা নতুন বাজারে বিক্ষোভ মিছিল ও গণসমাবেশ, সন্ধ্যা সাতটায় রাজু ভাস্কর্যে মোমবাতি প্রজ্বালন, কাল শুক্রবার সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়।

Tuesday, May 26, 2015

মাইক্রোবাসে আদিবাসী তরুণী ধর্ষণ- জড়িত যুবকদের চিহ্নিত করার দাবি পুলিশের

রাজধানীতে মাইক্রোবাসে তুলে আদিবাসী এক তরুণীকে গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িত যুবকদের চিহ্নিত করার দাবি করেছেন মামলাটির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের দাবি, ওই যুবকদের খুব দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে। তবে চিহ্নিত যুবকেরা কারা, সে ব্যাপারে এখনই কিছু জানাতে অপারগতা জানিয়েছেন তাঁরা।
গত বৃহস্পতিবার রাতে ভাটারা থানা এলাকায় যমুনা ফিউচার পার্কের একটি দোকানের কর্মী ওই গারো তরুণীকে মাইক্রোবাসে তুলে গণধর্ষণ করে কয়েকজন যুবক। পরে তাঁকে উত্তরা এলাকায় মাইক্রোবাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। ওই তরুণী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) চিকিৎসাধীন।
এ ঘটনায় ওই তরুণীকে নিয়ে তাঁর পরিবার মামলা করতে বিভিন্ন থানায় যায়। কিন্তু এক থানার পুলিশ মামলা না নিয়ে আরেক থানায় যেতে বলে তাঁদের হয়রানি করে। পরে শুক্রবার ভাটারা থানার পুলিশ মামলা নেয়।
পুলিশ যমুনা ফিউচার পার্কের বিভিন্ন স্থান ও ফিউচার পার্কসংলগ্ন বিভিন্ন ভবনের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে। পুলিশ এসব ফুটেজ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। বিষয়টি তদারকির জন্য তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে ঢাকা মহানগর পুলিশ।
ধর্ষণ ও নারীর ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনার প্রতিবাদে গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করে বাংলাদেশ গারো ছাত্র সংগঠন (বাগাছাস)। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্ক থেকে কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথে চলন্ত মাইক্রোবাসে পালাক্রমে ধর্ষণের শিকার হন এক আদিবাসী তরুণী। বিক্ষোভকারীরা ওই তরুণীর ধর্ষণকারীদের বিচার দাবি করে l প্রথম আলো
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা গতকাল সোমবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ফুটেজ দেখে ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে চিহ্নিত করা গেছে। তাঁদের অবয়বও স্পষ্ট। ফুটেজ আরও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যেই গ্রেপ্তারি অভিযান শুরু হবে।
তবে কমিটির প্রধান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) শেখ নাজমুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কিছু বলা যাচ্ছে না।
ওই তরুণীর বড় বোন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘটনার পর আমার বোন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। জানি না পুলিশ কী করছে। তবে আসামিরা ধরা না পড়া পর্যন্ত আমাদের মনে কোনো শান্তি নাই।’ তিনি বলেন, ‘টার্গেট করে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এখন আদিবাসী বলেই কি এমনটা করা হলো, নাকি অন্য কোনো কারণ, তা বুঝতে পারছি না।’
নিন্দা-প্রতিবাদ: গারো তরুণীকে ধর্ষণের প্রতিবাদে ও জড়িত ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ যৌন-সন্ত্রাস বন্ধের দাবিতে গতকালও বিক্ষোভ-সমাবেশ করেছে বেশ কয়েকটি সংগঠন। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গণবিক্ষোভ করে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন। এতে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, যৌন-সন্ত্রাসের কবল থেকে প্রথম শ্রেণিতে পড়া শিশু থেকে তরুণী, বৃদ্ধ নারী—কেউই রেহাই পাচ্ছেন না। এ দেশের মানুষের নাগরিক মর্যাদা নেই।
বিকেল চারটার দিকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্র। সমাবেশে বক্তারা গারো তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। এ ছাড়া গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

Sunday, May 24, 2015

কি ঘটেছিল সেই রাতে- আদিবাসী তরুণী গণধর্ষণ: ক্ষোভ, প্রতিবাদ সর্বত্র by রুদ্র মিজান

প্রতিদিনের মতোই কর্মস্থল থেকে বের হন আদিবাসী তরুণী। অন্যান্য দিনের চেয়ে বাসের সংখ্যা ছিল কম। কিছুটা জায়গা হেঁটে সামনের বাসস্টপেজের দিকে এগোতেই ঘটে ঘটনাটি। আচমকা একটি মাইক্রোবাস থামে তার সামনে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুই যুবক তাকে কোলে করে গাড়িতে তোলে। এর মধ্যে এক যুবক তার মুখ চেপে ধরে। তার পরেই একের পর এক দুর্বৃত্তদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন ওই তরুণী। বিভীষিকাময় ওই রাতের কথা এভাবেই স্বজনদের কাছে বর্ণনা করেছেন তিনি। পুলিশের কাছে পাঁচ নির্যাতনকারীর চেহারার বর্ণনা দিয়েছেন। এর মধ্যে এক যুবকের নামও জানিয়েছেন। নির্যাতিতা তরুণীর বর্ণনা অনুসারে বারিধারা, বাড্ডা, গুলশান, বনানী এলাকার বিত্তশালী বখাটে থেকে শুরু করে সন্ত্রাসী ও ছিনতাইকারীদের তালিকা নিয়ে মাঠে নেমেছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট থানা ছাড়া ন্যক্কারজনক এই ঘটনার তদন্তে নেমেছে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। শিগগিরই ধর্ষকদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলেই আশা করছে পুলিশ।
গতকাল সরজমিন ঘটনাস্থ কুড়িল বিশ্বরোডে গিয়ে দেখা গেছে, ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২৫০ ফুট দক্ষিণে বসুন্ধরা আবাসন এলাকার ফটক। ঘটনাস্থল থেকে সামনের দিকে আরও প্রায় ২৫০ ফুট দূরত্বে কুড়িল ফ্লাইওভার। এই দুটি স্থানে প্রতিরাতেই পুলিশের পিকআপ ভ্যান অবস্থান করতে দেখা যায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ঘটনাস্থলের পেছনে বাসস্ট্যান্ড। ঘটনাস্থল থেকে দু-এক মিনিট হাঁটলেই কুড়িল মোড়। সেখানেও যাত্রী উঠায়-নামায় বাসগুলো। ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ৯টার দিকে বাস না পেয়ে কুড়িল মোড়ের দিকে হাঁটছিলেন ওই তরুণী। নির্যাতিতা ওই তরুণী তার স্বজনদের জানিয়েছেন, তাকে জোর করে ছাই রঙের মাইক্রোবাসে উঠানোর পরই দুই জন দুই পাশ থেকে তাকে চেপে ধরে। চিৎকার করার চেষ্টা করলে মুখ আরো চেপে ধরে তাদের একজন। অন্য দুজন তার হাত ধরে রাখে। চিৎকার করলে গুলি করে মেরে ফেলবে বলে হুমকি দেয় তারা। হুমকিতে ভয় পেয়ে যান ওই তরুণী। গাড়িতে ছিলো পাঁচ যুবক। তাদের প্রত্যেকের বয়স ২২ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে। যুবকদের একজন গাড়ি চালাচ্ছিল। বাকি চারজনই ব্যস্ত ছিল ওই তরুণীকে নিয়ে। এসময় তারা উচ্চ আওয়াজে গান ছেড়ে দেয়। প্রথমেই যুবকরা তার ওড়না টেনে ফেলে দেয়। তারপর মাইক্রোবাসের মধ্যের সিটে ফেলে একের পর এক নির্যাতন করতে থাকে। বারবার তাদের কাছে অনুনয় করেছেন তিনি। বলেছেন, ভাই আমাকে এবার ছেড়ে দেন। আপনাদের বোন মনে করে আমাকে ছেড়ে দেন।
দুর্বৃত্তরা তখন হেসেছে। এমনকি একে একে পাঁচ জনই ওই তরুণীকে পাশবিক নির্যাতন করেছে। চালক যুবকটি যখন নির্যাতন করে তখন আরেক যুবক গাড়ি চালাচ্ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, তারা পাঁচ জনই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। গাড়িতে তারা পানীয় পান করেছে। তবে তা কোন ধরনের পানীয় তা বলতে পারেননি নির্যাতিতা তরুণী। গাড়িতে নির্যাতন চলাকালীন ওই তরুণী বারবার বাসায় যাওয়ার আকুতি জানালে দুর্বৃত্তরা জানতে চায়, বাসা কোথায়। বাসার ঠিকানা জানানোর পর রাত পৌনে ১১টার দিকে উত্তরা পূর্ব থানা এলাকার জসিম উদ্দিন সড়কে নামিয়ে দেয় তাকে। নির্যাতিতা তরুণীর বরাত দিয়ে তার ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, ঘটনার সময় দুর্বৃত্তদের একজনের ফোনে কল এলে তা রিসিভ করছিল না সে। এ সময় অন্য যুবক তাকে নাম ধরে ফোন রিসিভ করতে বলে। তদন্তের স্বার্থে ওই নামটি গণমাধ্যমে প্রকাশ না করতে অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ। ওই নাম ও তাদের চেহারার বর্ণনা অনুসারে কয়েক জনের একটি তালিকা করেছে পুলিশ। তালিকা অনুসারে শুক্রবার রাত থেকেই বিভিন্ন স্থানে অভিযান শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে দায়েরকৃত মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ভাটারা থানার পরিদর্শক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, নির্যাতিতার বর্ণনা অনুসারে তালিকা করে বিভিন্নস্থানে অভিযান চালানো হয়েছে। সন্দেহমূলক ব্যক্তিদের আটক করলেই তরুণীকে দিয়ে শনাক্ত করানো হবে। ধর্ষকদের দেখলে চিনতে পারবেন বলে জানিয়েছেন নির্যাতিতা তরুণী।
কুড়িল বিশ্বরোড এলাকার যে দোকানের সামনে থেকে ওই তরুণীকে তোলে নিয়ে যাওয়া হয় ওই দোকানের নাম সিনহা মটরস। ঘটনার সময় দোকানটি বন্ধ ছিল। এমনকি পাশের সোনালী ফার্মেসিটিও বন্ধ ছিল। সিনহা মটরসের মালিক সবুজ মিয়া জানান, রাত ৯টার দিকে দোকান বন্ধ করে চলে যান তিনি। পার্শ্ববর্তী  নিউ তাজ ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস খোলা থাকলেও তরুণী তুলে নেয়ার দৃশ্য দেখতে পাননি তিনি। এই প্রতিষ্ঠানের মালিক জাকির হোসেন বলেন, যমুনা ফিউচার পার্কের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছেলেমেয়েরা এখান থেকে বাসে উঠা-নামা করেন। মুখ চেপে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার কারণেই তিনি শব্দ শুনতে পাননি বলে জানান। ওই দুটি দোকানের পাশে চা বিক্রি করেন মুহাম্মদ বাবুল। সাধারণত রাত ১০টা পর্যন্ত তার চায়ের দোকান খোলা থাকলেও ওই দিন সন্ধ্যায় তিনি দোকান বন্ধ করে দেন। বাবুল বলেন, সন্ধ্যায় বৃষ্টি হওয়ার কারণে দোকান বন্ধ করে দিই। যমুনা ফিউচার পার্কের দ্বিতীয় তলার যে পোশাকের শো-রুমে ওই তরুণী কাজ করেন সেখানে গেলে কথা হয় ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানের সহকারী ইনচার্জ মুহাম্মদ ইব্রাহিম জানান, প্রায় পাঁচ মাস ধরে এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন ওই তরুণী। কেউ তাকে উত্ত্যক্ত করেছে বলে কোনদিন অভিযোগ করেননি তিনি। ওই প্রতিষ্ঠানের সহকর্মী সেলসগার্ল কাকলী বলেন, ওই তরুণী বেপরোয়া চলাফেরা করতেন না। কেউ তাকে উত্ত্যক্ত করতো বলেও জানা নেই।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান জোনের উপ-কমিশনার খন্দকার লুৎফুল কবির সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ধর্ষণকারীরা তরুণীর পূর্ব পরিচিত না। তবে ধর্ষকদের মধ্যে একজনের নাম ও অন্যদের চেহারার বর্ণনা জানা গেছে। এ ঘটনায় সিসি ক্যামেরার কোন ফুটেজ পাওয়া যায়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ধর্ষণকারীদের শনাক্ত করতে কয়েকটি টিম কাজ শুরু করেছে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশও তদন্তে নেমেছে। ওই তরুণীকে গাড়িতে উঠানোর স্থান এবং পুরো রাস্তায় যেখানে যেখানে মনে করতে পারবে সে স্থানগুলোকে তদন্তের আওতায় থাকবে। সেসব স্থানে সিসি ক্যামেরা থাকলে তার ফুটেজ সংগ্রহ করা হবে। গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে গুলশানে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
ঘটনার পর শুক্রবার দুপুরে ভাটারা থানায় এ বিষয়ে মামলা করা হয়। মামলার পর পরই নির্যাতিতা তরুণীকে তেজগাঁওয়ের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। গতকাল সকাল ১১টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ওই তরুণীর মেডিক্যাল পরীক্ষা করানো হয়। পরীক্ষা শেষে দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান মো. হাবিব-উজ-জামান চৌধুরী বলেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় গণধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। সাত দিনের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হবে বলে জানান তিনি। ওই তরুণীর শারীরিক পরীক্ষা করেছেন মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক প্রভাষক ডা. মমতাজ আরা।  উল্লেখ্য, ওই তরুণী বড় বোনের সঙ্গে উত্তরায় থাকেন খালার বাসায়। তাদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর উপজেলায়।
ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন
রাজধানীতে চলন্ত মাইক্রোবাসে তরুণীকে গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। গতকাল বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে আয়োজিত এক মানববন্ধন থেকে এ দাবি জানানো হয়। বিকাল পাঁচটায় রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ‘গারো ছাত্র ইউনিয়ন’ এবং ‘যৌন নিপীড়ন বিরোধী নির্দলীয় ছাত্রজোট’ সংগঠনের ব্যানারে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতাধিক শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশ নেয়। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা মুখে কালো কাপড় বেঁধে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানান। এসময় তাদের হাতে ‘হে রাষ্ট্র নারীর নিরাপত্তা কোথায়?’, ‘আর কতো নারীর সম্ভ্রম দিলে রাষ্ট্র তুমি জাগবে?’, ‘ধর্ষণকারীদের ফাঁসি চাই’, ‘নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করো’ ইত্যাদি লেখা সম্বলিত প্লাকার্ড শোভা পায়। ঘন্টাব্যাপী মানববন্ধন শেষে আলোক প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে  প্রতিবাদ কর্মসূচি শেষ হয়। এদিকে আদিবাসী তরুণীকে গণধর্ষণের ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে এসব সংগঠনের পক্ষ থেকে।

Wednesday, March 11, 2015

আদিবাসী নারী শ্রমনির্ভর কাজে বেশি by পার্থ শঙ্কর সাহা

রাজধানীর ফার্মগেটে একটি বিউটি পারলারের মালিক কুহেলি ক্যাটরিনা আজিম। মান্দি বা গারো এই নারী পাঁচ বছর আগে পারলারটি খোলেন। ২০০০ সাল থেকে বিউটি পারলারে কাজ করছেন ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার এই আদিবাসী নারী। মাতৃতান্ত্রিক গারো সমাজে পরিবারের প্রধান ও সম্পদের মালিক নারী। এই সমাজের কুহেলি এতিমদের স্কুলে এসএসসি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জীবনের প্রয়োজন, একই সঙ্গে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার ইচ্ছা—এই দুইয়ে মিলে পারলারে কাজ শুরু করলাম। দেখলাম, কোনো কাজ খারাপ না।’ এখন দাঁড়িয়েছেন নিজের পায়ে। তিনি জানান, এখন ঢাকায় ১২টি বিউটি পারলারের মালিক গারো নারীরা।
বিভিন্ন সূত্রমতে, রাজধানীতে বিউটি পারলারে কাজ করেন প্রায় পাঁচ হাজার গারো মেয়ে। দেশের নানা স্থানের পারলারেও গারো মেয়েরা আছেন। অন্য আদিবাসী নারীরাও আছেন পারলার, তৈরি পোশাকশিল্পসহ শ্রমনির্ভর বিভিন্ন পেশায়। তবে সরকারি চাকরি, বেসরকারি বড় পদ ও উদ্যোক্তা হিসেবে আদিবাসী নারীদের উপস্থিতি হাতে গোনা। আদিবাসী নেতারা বলছেন, এর কারণ শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা।
গারো ইনডিজিনাস মিচিক অ্যাসোসিয়েশনের করা ‘বিউটি পারলারে মান্দি মেয়েরা কেমন আছেন?’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার বিউটি পারলারে কর্মরত গারো মেয়েদের ৫০ শতাংশের বেশি টাঙ্গাইলের মধুপুর বনের বাসিন্দা। আদিবাসী নেতা সঞ্জীব দ্রং বলেন, ‘একসময় অনন্যোপায় হয়েই গারো মেয়েরা রাজধানীর পথে পা বাড়িয়েছিলেন। তাঁরা আজ নিজেদের অবস্থান করে নিয়েছেন।’
ঢাকায় বিদেশি দূতাবাস, বিদেশি নাগরিকদের গৃহকর্মী, নার্সিং পেশায়ও গারো নারীরা কাজ করছেন। পোশাকশিল্পে কর্মরত আদিবাসী নারীদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সম্পর্কে সরকারি বা বেসরকারিভাবে গ্রহণযোগ্য তথ্য নেই।
আদিবাসীদের সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে পোশাকশিল্পে আদিবাসী কর্মীর সংখ্যা অন্তত ২০ হাজার, যাঁদের ৬৫ শতাংশই নারী। তাঁরা মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের। সাভার ইপিজেডে পাহাড়ি আদিবাসীর সংখ্যা বেশি হলেও সমতলের মান্দি, সাঁওতাল, ওঁরাও কর্মীরাও আছেন। সাভার ইপিজেড এলাকায় আদিবাসী কর্মীর সংখ্যা ১৫ হাজারের কম নয়, যাঁদের ৭০ শতাংশই নারী। তাঁদের একজন তাপসী চাকমা। বাড়ি রাঙামাটির শুভলং উপজেলার শিলছড়ি গ্রামে। এসএসসি পাস করে তিনি বছর পাঁচেক আগে পোশাকশিল্পে যোগ দেন। বললেন, ‘যদি এলাকায় কাজের সুযোগ থাকত, তাহলে হয়তো এত দূরে আসতাম না। তবে এসে খারাপও হয়নি।’
তবে বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আদিবাসী নারীরা এখনো বেশ পিছিয়ে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৯১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৩ লাখ ৫২ হাজার ২৬৯ জন নারী চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন। বাংলাদেশের যে চারটি জেলার মানুষ সবচেয়ে কম বিদেশ যায়, তার মধ্যে আছে বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও শেরপুর। রাঙামাটির নারী সংগঠন সিমওয়ান্তির পরিচালক টুকু তালুকদার বলেন, ‘নিরাপত্তাহীনতা ও তথ্যপ্রাপ্তির অভাবই আদিবাসী নারীদের বিদেশে কম যাওয়ার কারণ।’
সরকারি ও বেসরকারি বড় চাকরিতে আদিবাসী নারী এখনো হাতে গোনা। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি জাতিসত্তার মধ্যে বম, লুসাই, পাংখো, খিয়াং, খুমি, মুরং, ত্রিপুরা জাতিগোষ্ঠীর কোনো নারী বিসিএস কর্মকর্তা নেই। সমতলের বৃহত্তম আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী সাঁওতালদের তিনজন নারী বিসিএস কর্মকর্তা। কোনো নারী বিসিএস কর্মকর্তা নেই সমতলের মুন্ডা, মাহালি, পাহাড়িয়া, মাহাতো জাতিগোষ্ঠীরও।
পার্বত্য তিন জেলায় তিনটি আদালতে পাঁচজন পাহাড়ি নারী আইনজীবী আছেন। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে দুজন করে। আর বান্দরবানে একজন। রাঙামাটির আইনজীবী সুস্মিতা চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইন পেশায় পাহাড়ি নারীরা এলেন পার্বত্য চুক্তির পর। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এই পেশায় আরও নারী আসবেন।’
শিল্পের উদ্যোক্তা হিসেবে পাহাড়ি নারীদের সোনালি অতীত থাকলেও এখন তা ফিকে। মঞ্জুলিকা চাকমা ১৯৬৫ সালে পোশাক তৈরির প্রতিষ্ঠান বেইন টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে রাঙামাটিতে ২০টির মতো পোশাক তৈরির প্রতিষ্ঠান আছে। বেইন বাদে বাকি সবই বাঙালি মালিকানায়। মঞ্জুলিকা চাকমা বলেন, ‘উদ্যোক্তা হিসেবে আদিবাসী নারীদের দাঁড়ানোর পথে প্রধান অন্তরায় পুঁজির অভাব। ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা সুবিধা পান না তেমন।’
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন জানান, পার্বত্য তিন জেলা মিলিয়ে বেসরকারি সাহায্য সংস্থা বা এনজিওর সংখ্যা এখন ১৪০টি। এর মধ্যে নারীপ্রধান হিসেবে থাকা এনজিওর সংখ্যা ১৩টি। উত্তরাঞ্চল, যেখানে ১৬ লাখ আদিবাসীর বাস, সেখানে নারীপ্রধান হিসেবে আছে—এমন এনজিওর সংখ্যা দুটি।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহযোগিতায় পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান ‘চিটাগং হিল ট্রাক্টস ডেভেলপমেন্ট ফ্যাসিলিটি (সিএইচটিডিএফ)’ নামে দাতাদের উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট আদিবাসী কর্মীর ৭০ শতাংশই পুরুষ, নারী ৩০ শতাংশ। সিএইচটিডিএফের জেন্ডার বিশেষজ্ঞ ঝুমা দেওয়ান বলেন, ‘আদিবাসী নারীরা মাঠপর্যায়ে কাজ করলেও ব্যবস্থাপনা বা নীতিনির্ধারণে তাঁরা নেই। এর মূল কারণ, উচ্চশিক্ষিত আদিবাসী নারীর সংখ্যা কম। দারিদ্র্যই এর বড় কারণ।’
দারিদ্র্য ও শিক্ষার কম হারের পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতাকেও আদিবাসী নারীর পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে মনে করেন আদিবাসীদের মানবাধিকার সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারপারসন চৈতালী ত্রিপুরা। তিনি বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দূরে হওয়ার কারণে অনেকেই লেখাপড়া পড়া ছেড়ে দিয়েছে, পার্বত্যাঞ্চলে এমন ঘটনা আছে অনেক। স্কুলে যেতে নিগ্রহের ঘটনা এখনো ঘটছে।’