Friday, May 10, 2019

মিনিটে ৬ কিলোমিটার গতিতে চলবে ট্রেন!

বিশ্বের দ্রুততম গতির বুলেট ট্রেন নিয়ে বহু আগেই কাজ শুরু করেছিল জাপান। এবার এই বুলেট ট্রেন পরীক্ষামূলক চালনা শুরু করল দেশটি। আজ শুক্রবার ট্রেনটির পরীক্ষামূলক চালনা শুরু হয়। পুরোদমে চালু হওয়ার পর এটি ঘণ্টায় ৩৬০ কিলোমিটার বেগে ছুটবে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটার বেগে ছুটতে সক্ষম ট্রেনটি পুরোদমে চলতে শুরু করবে ২০৩০ সাল নাগাদ। আর আজ থেকে শুরু হওয়া এর পরীক্ষামূলক চালনা চলবে আরও তিন বছর। শিনকানসেন বুলেট ট্রেনের আলফা-এক্স প্রযুক্তির এ ট্রেন ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটার বেগে চলতে সক্ষম হলেও, বাস্তবে এটি তার পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাবে না। পুরোদমে চালু হওয়ার পর এটি ঘণ্টায় ৩৬০ কিলোমিটার বেগে ছুটবে, যা নিঃসন্দেহে একে বিশ্বের দ্রুততম ট্রেনে পরিণত করবে।
চীনের ফাক্সিং ট্রেন এর কাছে নিশ্চিতভাবেই হার মানবে, যার গতি শিনকানসেনের কাঙ্ক্ষিত গতির চেয়ে ঘণ্টায় অন্তত ১০ কিলোমিটার কম।
জাপানের তৈরি এ নতুন বুলেট ট্রেনের নকশাটিও বেশ দারুণ। চোখা নাকের ট্রেনটিতে থাকছে ১০টি বগি।
পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেনটি জাপানের সেনডাই ও আমোরি শহরের মধ্যে চলাচল করবে। প্রতি সপ্তাহে দুবার করে এটি চলাচল করবে। ২৮০ কিলোমিটার দূরত্বের এ দুই শহরে ট্রেনটি মধ্যরাতের পর চলাচল করবে। এই পরীক্ষামূলক চলাচলের সময় ট্রেনটি যত গতিই তুলুক না কেন, তাতে রেকর্ড বইয়ের পাতা উল্টানোর মতো কোনো ঘটনা ঘটবে না। কারণ ২০১৫ সালেই পরীক্ষামূলকভাবে চালানো ম্যাগনেটিক ট্রেন ঘণ্টায় ৬০৩ কিলোমিটার বেগে চলে সব রেকর্ড নিজের করে নিয়েছে, যা ভাঙাটা নিশ্চিতভাবেই অনেক কঠিন।
শিনকানসেন বুলেট ট্রেনের আলফা-এক্স প্রযুক্তির এ ট্রেন ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটার বেগে চলতে সক্ষম। ছবি: এএফপি

দু’দশকে বন্ধ হয়েছে এক হাজারের বেশি সিনেমা হল by কামরুজ্জামান মিলু

বিনোদনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম সিনেমা। আর এই সিনেমা দেখার জন্য চাই প্রেক্ষাগৃহ বা হল। দেশে কেমন ছিল সিনেমা হলের সূচনাকাল? অতঃপর ক্রমে হলের সংখ্যা বেড়ে চলা, এসবের আধুনিকায়নের পথ পেরিয়ে দেশজুড়ে সিনেমা হলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সাজানো হয়েছে ধারাবাহিক প্রতিবেদন বাংলাদেশের সিনেমা হল। লিখেছেন কামরুজ্জামান মিলু। আজ প্রকাশ হচ্ছে এর পঞ্চম ও শেষ পর্ব দু’দশকে বন্ধ হয়েছে এক হাজারের বেশি সিনেমা হল।
সিনেমার ব্যবসা যখন ছিল তুঙ্গে তখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় একের পর এক সিনেমা হল নির্মাণ হয়। অথচ সেই সিনেমা হলের ব্যবসায় নেমেছে ধস। নিভে যাচ্ছে একের পর এক সিনেমা হলের আলো। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির এক তথ্যে জানা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে সিনেমা হল চালু রয়েছে মোট ১৭৪টি।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সারা দেশে এই সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৩৫টি। সিনেমা হলে দর্শকের আনাগোনা কমে যাওয়া, বেশিরভাগ সিনেমা ফ্লপের খাতায় নাম লেখার পাশাপাশি ব্যবসায়িক বিপর্যয়সহ নানা কারণে গত দু’দশকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এক হাজারের বেশি সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে।
শুধু তাই নয়, এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেক কর্মী পেশা পরিবর্তনও করেছেন। এদিকে এসব কারণে আগামী ১২ই এপ্রিল থেকে চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির নেতারা সারা দেশের সব সিনেমা হল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের এই ঘোষণায় সম্প্রতি সায় দিয়েছে বুকিং এজেন্ট সমিতি। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আওলাদ হোসেন উজ্জল বলেন, মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায় আমার একটি সিনেমা হল আছে। নাম ‘স্বপ্নপুরী’। আগে এই উপজেলায় চারটি সিনেমা হল ছিল। এখন আমারটাসহ ‘ঝুমুর’ নামে আরেকটি সিনেমা হল টিকে আছে। আসলে সিনেমা হতে হবে সিনেমার মতো। নাটক নির্মাণ করে সিনেমা হলে চালালে তো দর্শক আসবে না। এ ধরনের ছবি ঢাকার সিনেমা হলে চললেও এখানে চলে না। যে কারণে সারা দেশের সিনেমা হলে ধীরে ধীরে দর্শক কমেছে।
৩৬ শতাংশের বেশি জায়গা বিশিষ্ট আমার সিনেমা হলটি ১০ কোটি টাকা দিয়ে কিনতে চাওয়া হয়েছিল। চায়নার একটি কর্পোরেট অফিস করার কথা ছিল এখানে। কিন্তু আমি বিক্রি করিনি এবং সিনেমা হলটি এখনো বিক্রি করতে চাই না। আমি চাই সিনেমা হলের সেই রমরমা ব্যবসাটা আবার ফিরে আসুক। সেই অপেক্ষায় রয়েছি। তিনি আরো জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা শহরেই এখন সিনেমা হল নেই। রাঙ্গামাটির মতো পর্যটন শহরে নেই কোনো সিনেমা হল। আগে এখানে তিনটি হল ছিল। নরসিংদী জেলা শহরে ছবিঘর, মিতালী, সংগীতা, সুরভী নামে চারটি সিনেমা হলের একটিও এখন চালু নেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে তিনটি হলের সবকটিই এখন বন্ধ। সিনেমা হল নেই ঝালকাঠি, নড়াইল, পঞ্চগড়, রাজশাহী ও কুমিল্লায়। নেত্রকোনা জেলা শহরে হীরামন নামে একটিমাত্র সিনেমা হল আছে এখন। এ ছাড়া পটুয়াখালী, দিনাজপুর, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুরে বর্তমানে মাত্র একটি করে সিনেমা হল চালু আছে। যেখানে আগে এসব জায়গায় তিন-চারটি করে সিনেমা হল ছিল।
রাজধানীর পরেই চলচ্চিত্রের বড় বাজার ছিল চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, যশোর। প্রদর্শক সমিতির দেয়া তথ্যমতে, গত দু’দশকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বন্ধ হয়ে গেছে ২০টি সিনেমা হল। হারিয়ে গেছে অলঙ্কার, লায়ন্স, সানাই, রঙ্গম, সাগরিকা, বনানী কমপ্লেক্স, নূপুর, জলসা, গুলজার, উপহার, রিদম, উজালা, আকাশ, মেলোডি, সিনেমা কর্ণফুলী। ঢাকার মধ্যে পুরান ঢাকার গুলিস্তান, নাজ, সদরঘাটের রূপমহল, মুন, স্টার, আরমানিটোলার শাবিস্তান, এলিফ্যান্ট রোডের মল্লিকা, বাসাবোর অতিথি, আগমন, ইসলামপুরের লায়ন, চকবাজারের তাজমহল, পোস্তগোলার মেঘনা, যমুনা, ডায়না, নারায়ণগঞ্জের মিনতি, কাওরান বাজারের পূর্ণিমা এবং সবশেষ বংশালের মানসী হলটির মূল মিলনায়তন ভেঙে সেখানে মার্কেট করা হয়েছে।
এদিকে একসময় যশোরের পরিচিতি ছিল সিনেমা হলের শহর হিসেবে। সেখানকার ২১টি সিনেমা হল থেকে কমতে কমতে এখন মাত্র ২টি চালু আছে। খুলনায় সিনেমা হল ছিল ১১টি। এখন আছে তিনটি। সিলেটের সাতটির মধ্যে একটি এবং রংপুরের পাঁচটি সিনেমা হলের মধ্যে বর্তমানে একটি টিকে আছে। এ প্রসঙ্গে চলচ্চিত্র প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরু বলেন, বিভিন্ন জায়গায় সিনেমা হল বন্ধ হচ্ছে দেশের জন্য এটি খুবই দুঃখজনক সংবাদ। ভালো মানের ছবির অভাব ও হলের ভালো পরিবেশ না থাকা অবশ্যই সিনেমা হল বন্ধের জন্য দুটি কারণ। তবে সবচেয়ে মূল্যবান বিষয় হচ্ছে গুদামঘর মার্কা সিনেমা হল এখন আর কোথাও চলবে না।
সারা দেশে এখন আধুনিক সিনেমা হল নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে। সিনেপ্লেক্সের মতো করে আধুনিক হলে দর্শকরা এখন সিনেমা দেখতে চান। ১২০০ সিটের মতো বিশাল সিনেমা হল এখন আর চলবে না। কম আসন হলেও সুসজ্জিত ও সুন্দর পরিবেশের আধুনিক সিনেমা হল নির্মাণ হলে সিনেমা ব্যবসা অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াবে। পাশাপাশি লোকাল ডিশ লাইনে বাংলা সিনেমা দেখানো বন্ধ করতে হবে এবং টেলিভিশনেও প্রতিদিন অবাধে সিনেমা দেখানোর বিষয়টির নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। নির্দিষ্ট দিনে ছোট পর্দায় দর্শকদের সিনেমা দেখানো দরকার। কারণ, গ্রামের বাজারে চায়ের দোকানে বসে দর্শকরা এসব সিনেমা দেখতে থাকে। এর ফলে সিনেমা হলে গিয়ে আর সিনেমা দেখার আগ্রহ তাদের থাকছে না।
একের পর এক সিনেমা হলও তাই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, যেসব সিনেমা হলের মালিকরা সিনেমা হল বন্ধ করেছেন তাদের সহজ শর্তে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে আধুনিক সিনেপ্লেক্স বানানোর জন্য আগ্রহী করতে হবে। আর সিনেপ্লেক্সের মতো ফুডকোর্টসহ আধুনিক সিনেমা হল নির্মাণ করলে আমার বিশ্বাস অবশ্যই সিনেমা হল চলবে।

হাতপাখায় জীবিকা ৫ শতাধিক পরিবারের by এস আলম তুহিন

তালপাতার পাখা তৈরি করে সংসার চালাচ্ছেন মাগুরা জেলার- নিজনান্দুয়ালী, বাটিকাডাঙ্গা, সদর উপজেলার জগদল, মাধবপুর, শ্রীপুর উপজেলার জোকা, মহম্মদপুর উপজেলার নহাটা ও শালিখার দরিশলই, গঙ্গারামপুর, পরিয়াট, রায়পুর গ্রামের প্রায় ৫’শতাধিক পরিবার।
শহরতলীর নিজনান্দুয়ালী গ্রামের পাখার মহাজন আব্দুল মান্নান জানান, তালপাখার জন্য ছোটগাছের পাতার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। আগে এ অঞ্চলে পর্যাপ্ত তালপাতা পাওয়া গেলেও এখন আগের মতো পাতা মেলে না। দূর-দূরান্ত থেকে পাতা কিনে আনতে হয়। গাছ থেকে ১শ’ পাতা কিনতে হয় ৫শ’ টাকায়। তবে,  শ্রমিক লাগিয়ে পাতা কেটে বাড়িতে পৌঁছাতে খরচ হয় ৭শ’ থেকে ৮শ’ টাকা। যার একেকটি পাতা থেকে মাত্র দুটি করে পাখা তৈরি হয়। যাবতীয় খরচ মিটিয়ে একটি পাখা বানাতে খরচ পড়ে ১০ থেকে ১৫ টাকা।
বাজারে একেকটি ভালোমানের তালপাখার খুচরা দাম ২৫ থেকে ৩৫ টাকা। ১শ’ পাখার মহাজনি দাম প্রায় ১৪শ’ থেকে ১৬শ’ টাকা। তবে ঘরে বসেই এই সব পাখা বিক্রি হয়ে যায় তার। পাইকাররা তার বাড়ি থেকেই পাখা কিনে নিয়ে যান। শালিখার পরিয়াট গ্রামের ছায়েদুল ও শহরের বাটিকাডাঙ্গা গ্রামের আব্দুল ছাত্তার জেলার সবচেয়ে বড় পাইকারি পাখা বিক্রেতা। তাদের বাড়িতে সব সময় ১০/১৫ হাজার পাখা মজুত থাকে। এ দু’জন ছাড়াও এ জেলার মহাজনদের কাছ থেকে ঢাকা, খুলনা, পাবনা, রাজশাহী ও কুষ্টিয়া থেকে ক্রেতারা পাখা কিনে নিয়ে যায়। পাখা বিক্রেতা আব্দুল মান্নান (৭৫) জানান, ৬০ বছর ধরে এ পাখা শিল্পের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছি। ২০ পয়সা থেকে আমার জীবনে পাখা বিক্রি শুরু করি। বিগত বছরগুলোতে সারা দিন শহরে ঘুরে ঘুরে পাখা বিক্রি করে বেড়িয়েছি। কিন্তু এখন আর বেশি ঘুরতে হয় না। সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের আর এক পাখা বিক্রেতা আক্কাস আলী জানান, আমি প্রায় পাঁচ বছর ধরে পাখা বিক্রি করছি। শুধুমাত্র চৈত্রের শুরুতেই আমি হাতপাখা বিক্রি করি। মাগুরা সদর হাসপাতালে প্রতিদিন আমার প্রায় ২০-৩০টা পাখা বিক্রি হয়। এ ছাড়াও শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে আমি পাখা বিক্রি করি। শালিখা উপজেলার পরিয়াট গ্রামের বিধবা আখিরন্নেছা (৬০) বলেন, তালপাখাই আমার সংসার টিকিয়ে রেখেছে। ৩০ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর ছয় ছেলেমেয়ে নিয়ে আমি অসহায় হয়ে পড়ি। এ সময় উপায় না পেয়ে বাবার বাড়ি থেকে শিখে আসা পাখা তৈরির কাজ শুরু করি। এখন আর খাওয়া-পড়ার চিন্তা করতে হয় না। পাখার কারিগররা জানান, তালপাখা তৈরিতে দরকার হয় তালপাতা, বাঁশের শলাকা, কঞ্চি, সুতা-সুই ও রং। প্রথমে শুকনা তালপাতা কয়েক ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে জাগ দিতে হয়। জাগ দেয়া শেষে তালপাতা পানি থেকে তুলে বাঁশের কঞ্চির সাহায্যে কলম লাগিয়ে রোদে শুকানো হয়। এরপর ধারালো ছুরি দিয়ে গোল করে ছেটে আগে থেকে রং করে রাখা বাঁশের শলাকা দিয়ে সুই-সুতায় বাঁধা হয়। পাখাকে আকর্ষণীয় করতে বিভিন্ন রংয়ের সুতা দিয়ে নকশা করা হয়ে থাকে। তবে নিজস্ব পুঁজি না থাকায় অধিকাংশ পাখার কারিগর এ শিল্পে শ্রম বিক্রি করে থাকেন।

যে কারণে কার্যকারিতা হারাচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

অযাচিতভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বাড়ছে। এতে করে অনেক ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যহানির ঝুঁকিতে পড়ছে রোগীরা। অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, চিকিৎসকরা এ ধরনের ওষুধ বেশি ব্যবহার করায় এবং রোগীরা ওষুধ ঠিকমতো না খাওয়ায় জীবাণু হয়ে উঠেছে ওষুধ প্রতিরোধী। বিভিন্ন অলিগলির দোকানিরাও এখন ডাক্তার! দোকানদাররা শুধু অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েই ক্ষতি করেন না, বেশির ভাগ সময় তারা অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো কোর্স না দিয়ে দুই-এক ডোজ প্রদান করেন। যেটা রোগীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বাইরের দুনিয়ায় রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার পরামর্শ তো দূরের কথা, ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির কোনো নিয়ম নেই। অথচ দেশে এই ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ উদাসীন বলে উল্লেখ করেন বিশেষজ্ঞরা।
অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি ও খাওয়া উচিত নয়।
দোকানদাররা কেন প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি করবেন? অযাচিতভাবে ছোট-খাটো রোগের কারণে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করলেও বড় রোগে অ্যান্টিবায়োটিকে আর কাজ করবে না। কঠিন কোনো ব্যাধি সহজে সারবে না। বিষয়টি নিয়ে সত্যিকার অর্থে ভাববার সময় এসেছে। এভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার চলতে থাকলে একসময় অ্যান্টিবায়োটিক তার কার্যকারিতা হারাবে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য তা হবে মারাত্মক হুমকি। তিনি বলেন, দেশে বেশকিছু কারণে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়ছে। গ্রাম্য হাতুড়ে ডাক্তার কর্তৃক অনুমাননির্ভর বিনা প্রেসক্রিপশনে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি এবং ব্যবহার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের হাতে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের সংখ্যা দিনে দিনে কমে আসছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় সংক্রামক রোগ বেশি, অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনও বেশি। কিন্তু বিশ্বে যত ওষুধ তৈরি হচ্ছে তার মাত্র নয় ভাগ কেনে উন্নয়নশীল দেশগুলো। উন্নত দেশগুলোর দৃষ্টি এখন অসংক্রামক ব্যাধির দিকে। উন্নত দেশগুলো নতুন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরিতে খুব একটা আগ্রহী নয়। কাজেই বিষয়টি বেশ উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, একদিকে যেমন আরও নতুন নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার হওয়া প্রয়োজন তেমনি একই সঙ্গে সরকার ও সাধারণ মানুষের উচিত হবে অ্যান্টিবায়োটিকের সুচিন্তিত ব্যবহার নিশ্চিত করা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলেছে: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারে জীবাণুগুলো ওষুধ প্রতিরোধী এবং ওষুধের বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব না হলে অচিরেই খুব সাধারণ সংক্রমণ, সামান্য কাটাছেঁড়া থেকে মৃত্য হবে মানুষের। বিশ্বের ১১৪টি দেশ থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর প্রথম প্রতিবেদন দিয়েছে।
সাধারণত ব্যাকটেরিয়া, প্যারাসাইট, ভাইরাস অথবা ছত্রাকজনিত কারণে সৃষ্ট রোগের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করার ঝুঁকির বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাধারণ স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মকর্তা। বিশ্বব্যাপী অনেক সংক্রমণের ঘটনাই একটি নিত্যদিনের বিষয়। নিউমোনিয়ায় সংক্রমিত হয় ফুসফুস, মূত্রনালীতে, রক্তপ্রবাহে সংক্রমণ ঘটে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় ডায়রিয়ার সংক্রমণ এবং যৌনসংসর্গের কারণেও বিভিন্ন যৌনরোগ সংক্রমণের বিস্তার ঘটে। বিশ্বের সর্বত্রই নিয়মিতভাবে এসব সংক্রমণ ঘটছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেসব রোগের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে সেসব দেশে ওইসব রোগ মোকাবিলার ক্ষমতা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও রক্তের সংক্রমণের জন্য দায়ী সাতটি আলাদা ধরনের ব্যাকটেরিয়া নিয়ে গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করা হয়। বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের রোগীদের ওপর দু’টি প্রধান অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করে দেখা গেছে, এগুলো আর কাজ করছে না। এদের একটি কার্বাপেনম। নিউমোনিয়া, রক্তে প্রদাহ ও নবজাতকদের দেহে প্রদাহের মতো রোগ নিরাময়ে এই অ্যান্টিবায়োটিকটি ব্যবহৃত হয়।
অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, চিকিৎসকরা এ ধরনের ওষুধ বেশি ব্যবহার করায় এবং রোগীরা ওষুধ ঠিকমতো না খাওয়ায় জীবাণু ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে। মূত্রতন্ত্রের প্রদাহে যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে গত শতকের আশির দশক থেকে তা খুব কম কাজ করছিল। বর্তমানে এ রোগের ওষুধ একেবারেই অকার্যকর হয়ে গেছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়।
দেশে জীবাণুগুলো ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে ওঠার অন্যতম কারণগুলোর একটি ওষুধের দোকানগুলোতে কোনো ধরনের ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ বিক্রি করা। অনেক সময় দেখা যায়, ওষুধ বিক্রেতারাই হয়ে ওঠেন ডাক্তার। সামান্য জ্বর সর্দিতেও বাছ-বিচার না করে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে বলেন, এটা খান ঠিক হয়ে যাবে। এটি অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
ডাক্তারদের চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্রে ত্রুটির বিষয়টি তুলে ধরে অনেক চিকিৎসকই বলেন, আমরা ডাক্তারদের একটি সমস্যা আছে। অনেক সময় দেখা যায়, যেখানে অল্প মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক বা পুরনো একটি অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েই কাজ হবে সেখানে রোগীকে দ্রুত আরোগ্য করার জন্য ডাক্তাররা সর্বশেষ জেনারেশনের অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার পরামর্শ দেন। অথচ এ ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের প্রিজার্ভ করার কথা বা নির্দিষ্ট কোনো রোগে ব্যবহার করার কথা। সামান্য রোগে দ্রুত আরোগ্যের জন্য এসব অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ক্ষতিকর। এভাবেও অ্যান্টিবায়োটিক তার কার্যকারিতা হারায়। কোনোক্রমেই রেজিস্টার্ড ডাক্তার ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করা যাবে না।
ডাক্তারদের সর্বশেষ জেনারেশনের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ব্যাপারে আরও সংযমি হতে হবে। রোগীদের অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স পূর্ণ করার ব্যাপারে জোর দিতে হবে। অসুখ ভালো হয়ে গেলেও অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স অবশ্যই পূরণ করতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবস্থাপত্রে লেখার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার কথা উল্লেখ করে তারা বলেন, চিকিৎসাপত্রে অ্যান্টিবায়োটিক পরামর্শ দেয়ার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা যেমন- কী ধরনের ওষুধ পল্লী চিকিৎসক প্রেসক্রিপশন করতে পারবেন সে সম্পর্কে বিধিনিষেধের অভাব রয়েছে। পাশাপাশি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো তাদের বর্ণিত মাত্রার ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চয়তা দেয় না বলেও জানান বিশেষজ্ঞরা। অ্যান্টিবায়োটিক ভবিষ্যতে ব্যবহার করার জন্য ঘরে সংরক্ষণ করা যাবে না। এতে ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট হয়। অ্যান্টিবায়োটিক সিরাপ একবার ব্যবহারের পর কিছুদিন গ্যাপ হয়ে গেলে সেই সিরাপের মেয়াদ দীর্ঘদিন থাকলেও তা ব্যবহার করা যাবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. সীতেশ চন্দ্র বাছার বলেন, দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহারের কারণে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বেশি হচ্ছে। এ কারণে মানবদেহে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে রেজিস্ট্যান্সের পরিমাণ বাড়বে। এর প্রভাবে মৃত্যুর ঘটনাও বাড়বে। বাড়বে স্বাস্থ্যসেবা খরচ। তিনি বলেন, সাতদিনের কোর্স সাতদিনই খেতে হবে। কমও নয়, বেশিও নয়। না হলে রোগটি পুনরায় ফিরে আসতে পারে বা বিভিন্ন ইনফেকশন দেখা দিতে পারে। নিজে নিজে চিন্তা করে খাওয়া যাবে না। তিনি আরো বলেন, ওষুধের দাম যাতে রোগীর ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে থাকে, সেদিকে নজর দিতে হবে। ওষুধটা  কার্যকরী ও নিরাপদ হতে হবে। অনেক সময় নেতিবাচক ট্রিটমেন্ট-এর কারণে রোগীকে বেশি হাসপাতালে থাকতে হয়। ফলে খরচ বেড়ে যায়। সেটাও দেখতে হবে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এটা একটা সমস্যা। এ বিষয়কে মাথায় রাখতে হবে, যদিও বাংলাদেশ একটু উন্নত হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স মারাত্মক হচ্ছে বলে এই বিশেষজ্ঞ উল্লেখ করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে আমাদের সচেতনতা  নেই। শিক্ষিত-নিরক্ষর সবার মধ্যেই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার প্রবণতা বেশি। তাই সারা দেশের ফার্মেসিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান্ট চূড়ান্ত পর্যায়ে। এটা বাস্তবায়ন হলে অ্যান্টিবায়োটিকের যত্রতত্র ব্যবহার বন্ধ হবে।

ফেসবুকে সম্পর্ক তৈরির নামে ফাঁদ by রাফসান জানি

রাজধানীর পুরান ঢাকার যুবক রায়হান আবদুল্লাহ (ছদ্মনাম)। ২০১৮ সালের আগস্টে তাকে ফেসবুকে নিতিশা নামে একজন বন্ধু হওয়ার অনুরোধ পাঠায়। নিতিশার পরিচয় নিশ্চিত না হয়েই অনুরোধ গ্রহণ করেন রায়হান। হাই, হ্যালো দিয়ে কথা শুরু। ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জার ও মোবাইলে কথা হতো তাদের। একদিন দু’জন দেখা করতে সম্মত হন। নভেম্বরে বনানীর একটি রেস্টুরেন্টে দেখা হয় তাদের। আলাপচারিতা ও খাওয়া দাওয়া শেষে ফেরার পথে গাড়িতে করে নামিয়ে দেওয়ার কথা বলে রায়হানকে একটি প্রাইভেটকারে উঠিয়ে নেন নিতিশা। রাত সাড়ে ১০টার দিকে গাড়িটি বনানী থেকে বের হয়ে মহাখালী ওভারব্রিজ হয়ে বের হয়। পরে বিজয় সরণি ক্রস করার সময় রায়হানের নাকে কিছু একটা স্প্রে করেন নিতিশা। মুহূর্তেই অজ্ঞান হয়ে যান রায়হান। পরদিন সকালে তার জ্ঞান ফেরে। তখন রায়হান জানতে পারেন, তাকে অপহরণ করা হয়েছে।
নিতিশা নামের যে মেয়েটি ভুয়া পরিচয় দিয়ে রায়হানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। মূলত সে অপহরণকারী চক্রের সদস্য।
রায়হান জানান, অপহরণের পর তার পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরে দুই লাখ টাকা দেওয়া হলে রায়হানকে তিনদিন পর ছেড়ে দেওয়া হয়। ছেড়ে দেওয়ার আগে নিতিশার সঙ্গে রায়হানের কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি তুলে রাখে অপহরণকারীরা। তখন তাকে হুঁশিয়ার করে বলে দেওয়া হয়, ছাড়া পাওয়ার পর পুলিশ, র‌্যাব বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে গেলে ছবিগুলো ভাইরাল করে দেওয়া হবে।
হুমকি পেয়ে রায়হান আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে যাননি। কারণ হিসেবে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, একেতো ছবিগুলো ছড়িয়ে পরার ভয়, তার ওপর স্ত্রী আছে। নারীঘটিত অভিযোগ ও ছবি ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে আর মামলা করিনি। আমি চেয়েছিলাম, যা হয়েছে তা যেন আর না বাড়ে।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা এমন ঘটনায় অবশ্যই তাদের সহায়তা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। কারণ আইনের আওতায় না আসায় অপরাধীরা ফের অপরাধের সুযোগ পায়।
তারা বলছেন, সবার আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপরিচিত কারও সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে। পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানো ঠিক না। এতে ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং টিমের এডিসি নাজমুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘না জেনে ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ায় কারও সঙ্গে পরিচিত হওয়া উচিত না, কোনও সম্পর্কে যাওয়া যাবে না। যার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুক্ত হতে যাচ্ছেন তাকে সঠিকভাবে জানতে হবে। এমনকি তার ঠিকানা নিশ্চিত হতে হবে।’
ফাঁদে পড়ে কেউ ভিকটিম হলে অবশ্যই পুলিশকে অভিযোগ করার অনুরোধ করেছেন এডিসি নাজমুল। তিনি বলেন, কেউ যদি ভিকটিম হন, তাহলে পুলিশকে জানাতে হবে। এ বিষয়ে লজ্জা পাওয়া যাবে না। আমরা অভিযোগ পেলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবো। তা না হলে পরে অন্য কেউ ভিকটিম হবে।
সম্প্রতি ফেসবুকের মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপন করে প্রতারণা ও অপহরণের অভিযোগে দুটি সংঘবদ্ধ চক্রকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৪। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছেন দুই অপহৃত ব্যক্তি।
গত ৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে মিরপুর-১০ থেকে অপহরণ করা হয় ডা. মোনায়েমুল বাশার (৪০) নামে এক হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসককে। অভিযোগ পেয়ে ৪ এপ্রিল ভোর সাড়ে ৬টার দিকে অভিযান চালিয়ে নগদ ২৭৫০০ টাকাসহ অপহরণ চক্রের ৬ সদস্যকে আটক করা হয় এবং ভিকটিমকে উদ্ধার করে র‌্যাব-৪ এর সদস্যরা।
একইভাবে গত ১২ এপ্রিল কলাবাগান থেকে অপহৃত হন মো. রায়হান নামে এক ব্যক্তি। তার কাছ থেকে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ নেয় অপহরণকারীরা। অপহরণের ছয় দিন পর (১৭ এপ্রিল) রায়হানকে সাভারের আমিন বাজার থেকে উদ্ধার করে র‌্যাব। একইসঙ্গে গ্রেফতার করা হয়েছে অপহরণকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে।
র‌্যাব-৪ এর সিপিসি-১ এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর কাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমিন বাজার থেকে যে চক্রটিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তারা একজন নারীকে ব্যবহার করে ফাঁদ পাততো। এরপর দেখা করার কথা বলে, টার্গেটেড ব্যক্তিকে সুবিধামতো স্থানে নিয়ে যেতো তারা। পরে অপহরণ করে আগে থেকে ঠিক করে রাখা বাসায় নিয়ে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় তরতো।’
র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা এ ধরনের বেশ কয়েকটি প্রতারকচক্রকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছি। কিন্তু অনেক ভিকটিম ঘটনার পর পুলিশ বা র‌্যাবকে জানাতে চায় না। কারণ ছেড়ে দেওয়ার সময় ভিকটিমের সঙ্গে নারীর অন্তরঙ্গ ছবি তুলে রাখে অপহরণকারীরা। পাশাপাশি হুমকি দেওয়া হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের সহায়তা নিলে ছবিগুলো ভাইরাল করে দেওয়া হবে। এই হুমকিতে ভয় পেয়ে ভিকটিম ছাড়া পেয়ে আর কোনও অভিযোগ করে না।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপরিচিত কারও সঙ্গে পরিচিত হতে হলে অবশ্যই যাচাই বাছাই করে পরিচিত হওয়া উচিত বলে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। না হয় এ ধরনের প্রতারণা এবং অপহরণের ঘটনা ঘটতে থাকবে। প্রতারকদের কৌশল সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে। ডিজিটাল মাধ্যমে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি এর সদ্ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে।

যেভাবে প্রাণে বাঁচলেন বিমানের যাত্রীরা by দীন ইসলাম

খারাপ আবহাওয়ার কারণে ফ্লাইটটি অবতরণে সমস্যা হচ্ছিল। প্রথম দফায় নামতে ব্যর্থ হয়ে আকাশে চক্কর দিচ্ছিল কিছু সময়। দ্বিতীয় দফায় যখন নামতে যায় তখনই এটি রানওয়ে থেকে ছিটকে আছড়ে পড়ে পাশের খালি জায়গায়। ৩৪ আরোহী নিয়ে ড্যাশ বিমানটি যেভাবে আছড়ে পড়ে তাতে বড় প্রাণহাণির ঘটনাও ঘটতে পারতো। বিমানটি মাটিতে আছড়ে পড়ে প্রায় তিন টুকরো হয়ে গেলেও সৌভাগ্যক্রমে এটিতে আগুন ধরেনি। এতে প্রাণে বেঁচে যান যাত্রীরা। ফ্লাইটে থাকা যাত্রীদের ভাষ্য রানওয়েতে নামার পর যখন পাইলট শামীম নজরুল বিমানের নিয়ন্ত্রণ হারাতে যাচ্ছিলেন  তখন বুদ্ধি খাটিয়ে তিনি বিমানের ইঞ্জিন বন্ধ করে দেন। এতে বিমানের সব ধরণের বৈদ্যুতিক সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
এতে আগুন লাগেনি। বিমানযাত্রীরা বলছেন পাইলটের তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তার কারণে বড় প্রাণহানি থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে।
এছাড়া দুর্ঘটনায় পড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ড্যাশ-৮ কিউ-৪০০ (রেজিস্ট্রেশন নং এস২-এজিকিউ) উড়োজাহাজটি এর আগে কয়েক দফা দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়।
২০১৫ সালে এপ্রিলে মিশরের স্মার্ট এভিয়েশন থেকে লীজ নেয়া হয় এ এয়ারক্রাফটি। আট বছর দুই মাস বয়সী এ উড়োজাহাজটি অপারেশনের উপযোগী না হলেও প্রতিদিন চার-পাঁচটি রুটে চালানো হতো। বিমান সূত্রে জানা গেছে, মিশরের স্মার্ট এভিয়েশন কোম্পানির কাছ থেকে ২০১৫ সালের এপ্রিলে ৫ বছরের জন্য দুটি ড্যাশ ৮ কিউ-৪০০ উড়োজাহাজ (রেজিস্ট্রেশন নং এস২-এজিকিউ ও এস২-এজিআর)  লীজে আনে বিমান। এই উড়োজাহাজের ভাড়া বাবদ বিমান কর্তৃপক্ষকে প্রতি মাসে ১ লাখ ৬৮ হাজার ডলার অর্থ খরচ করতে হচ্ছে।
বিমান সূত্রে জানা গেছে, দূর্ঘটনায় পড়া উড়োজাহাজটি গত ৬ই মার্চ হায়দরাবাদ থেকে সি-চেক (বড় ধরনের মেরামত) সেরে দেশে আসার পথেই এয়ারক্রাফটটির ইঞ্জিনের ওপরে থাকা ব্ল্যাংকেট পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ফলে ইঞ্জিন অস্বাভাবিক উত্তপ্ত হয়ে পড়ে এবং ইঞ্জিন অয়েল বিপজ্জনক মাত্রায় চলে আসে। তখন আকাশেই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। কিন্তু অল্পের জন্য রক্ষা পায়। যদিও বিমানটিতে ওই সময় কোনো যাত্রী ছিল না। সেদিন এয়ারক্রাফটটির নিউমেটিক লাইনের পাইপে ক্ল্যাপ খোলা ছিল। যে কারণে, অয়েল লিক করায় এই সমস্যা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ই মার্চ ব্ল্যাংকেট পুড়ে যাওয়ার পর কানাডার-বোম্বারডিয়ান কোম্পানির প্রতিনিধিরা এসে উড়োজাহাজটিকে চলাচলের ঘোষণা দিলে বিমান আবার সেটিকে অপারেশনে নিয়ে আসে। তার দুই মাসের মধ্যেই বিধ্বস্ত হলো সেটি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিন টুকরো হয়ে যাওয়ায় উড়োজাহাজটি বিমান বহরে আর যুক্ত হতে পারবে না। এর আগে গত ২৫শে জানুয়ারি এয়ারক্রাফটটিকে ভারতের হায়দারাবাদের ‘জিএমআর অ্যারো টেক কোম্পানি’তে পাঠানো হয় ‘সি-চেক’ করানোর জন্য। ১৫ দিনে ‘সি-চেক’ শেষ করার কথা থাকলেও সময় লেগে যায় প্রায় দেড় মাস। আবার সমস্যা সারানোর বদলে নতুন সমস্যা তৈরি করে এয়ারক্রাফটটিকে ঢাকায় পাঠানো হয়। এ ঘটনার পর ‘জিএমআর অ্যারো টেক কোম্পানি’র সি-চেকের কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হক জানান, কিছুদিন আগে হায়দারাবাদ থেকে সি- চেক সেরে দেশে ফেরার পথে আকাশে বিকল হওয়া এয়ারক্রাফটিকে কেন অপারেশনে রাখা হচ্ছে- তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে পরিস্থিত বুঝে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি করা হবে। আগামীতে বিমানবহরে লিজের নামে নিম্নমানের উড়োজাহাজ যোগ করা বন্ধ করব। এদিকে উড়োজাহাজটি ভারত থেকে ঠিক করে আনার দুই মাস না যেতেই আবারও দুর্ঘটনার কবলে পড়ল বিমানের এজিকিউ। জরাজীর্ণ এই এয়ারক্রাফট গত বুধবার বিকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে। বিমানটিতে পাইলটের দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন শামিম নজরুল। মিয়ানমারের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ২২মিনিটে দেশটির ইয়াংগুন বিমানবন্দরের রানওয়েতে ওই দুর্ঘটনা ঘটে।
বিমানটিতে পাইলট ও কেবিন ক্রুসহ মোট ৩৪ জন আরোহী ছিলেন। ৩০ জন আরোহীর মধ্যে একজন শিশু, পাইলট ও কেবিন ক্রু ছিলেন আরও চারজন। তাদের মধ্যে আহত ১৯ জনকে ইয়াংগুনের নর্থ ওকলাপা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার তদন্তে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে এ কমিটি করা হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের চিফ অব ফ্লাইট সেফটি শোয়েব চৌধুরীকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে। তিনিসহ এ কমিটিতে রয়েছেন ছয়জন। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ জানান, বিমানে চিফ অব ফ্লাইট সেইফটি ক্যাপ্টেন শোয়েব চৌধুরী ৬ সদস্যের তদন্ত দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ড্যাস ৮-কিউ ৪০০ উড়োজাহাজটির ক্ষতি নিরূপণে বিমানের গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারদের একটি দল মিয়ানমারে গেছে।
শাকিল মেরাজ বলেন, ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ওই উড়োজাহাজের আরোহীদের মধ্যে মোট ১৮ জনকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করেছিল। তাদের মধ্যে চারজনকে বুধবার রাতেই প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দেয়া হয়েছে। বাকিদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে একটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি বলেন, মিয়ানমারে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা সেখানে আছেন। তারা সার্বক্ষণিক খোঁজ খবর নিচ্ছেন, তদারকি করছেন। যে ১৪ জন সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের সর্বোচ্চ ভালো চিকিৎসা দেয়ার জন্য যা যা করা দরকার, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে তার সবকিছুই করা হচ্ছে। শাকিল মেরাজ বলেন, বিমানের কান্ট্রি ম্যানেজার মীর আক্তার সেখানে আছেন, গতকাল সন্ধা থেকে সার্বক্ষণিক আপডেট নিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত সব ঠিক ঠাক আছে।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যাত্রীদের জন্য যে ধরনের সাপোর্ট লাগবে সেটা বিমানের পক্ষ থেকে দেয়া হবে। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় কথা হল, এই দুর্ঘটনায়, আমাদের যাত্রী এবং ক্রু, সবাই নিরাপদে আছেন, বড় কোনো সমস্যা হয়নি। তাদের চিকিৎসা চলছে, আশা করছি তারা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। এর আগে মিয়ানমার থেকে বুধবার যে যাত্রীদের নিয়ে বিমানের ওই ফ্লাইটের ফেরার কথা ছিল, তারা ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দরে আটকা পড়েছিলেন। তাদের নিয়ে আসার জন্য বিমানের বিশেষ ফ্লাইট বিজি ১০৬০ রাতে ঢাকা থেকে মিয়ানমার পাঠানো হয়। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার ভোর পৌনে ৫টায় ১৭ জন অপেক্ষমাণ যাত্রীকে নিয়ে ফ্লাইটটি ঢাকায় ফেরে। বিমানের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দূর্ঘটনায় পড়া উড়োজাহাজটিতে আগুন না ধরলেও ফিউজিলাজ ভেঙে তিন টুকরো হয়েছে। ফরোয়ার্ড প্যাসেঞ্জার ডোরের পেছনে এবং রিয়ার সার্ভিস ডোরের ঠিক পেছনে কাঠামো ভেঙে গেছে। উড়োজাহাজের তলাও ফেটে গেছে। ডান পাশের ডানাও জোড়া থেকে ভেঙে গেছে।
এ অবস্থায় উড়োজাহাজটি মেরামত করে পূণরায় ব্যবহার করা সম্ভব না। এ বিষয়ে শাকিল মেরাজ বলেন, আমরা যেটুকু ছবিতে দেখেছি, একটা হিউজ ইমপ্যাক্ট তৈরি হয়েছে অ্যাক্সিডন্টের পর, বডির স্ট্রাকচারাল ড্যামেজ হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করার জন্য বিমানের পক্ষ থেকে গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারদের একটি টিম সেখানে গেছেন। তারা সেখান থেকে এসে অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট দিলে আমরা মিডিয়া আপডেট দেব। এদিকে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দরে অবতরণের সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে যেসব যাত্রী আহত হয়েছেন, তাদের চিকিৎসা খরচ ও ক্ষতিপূরণ দেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। শাকিল মেরাজ বলেন, উড়োজাহাজটি বীমার আওতায় রয়েছে। বীমার শর্ত অনুসারে আহত যাত্রীরা ক্ষতিপূরণ পাবেন। তবে কে কতটা আহত হয়েছেন এসব পর্যবেক্ষণ করে বীমা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। জানা গেছে, দূর্ঘটনায় পড়া ওই ফ্লাইটে বাংলাদেশের ১৫ জন, চীনের পাঁচ জন, মিয়ানমারের তিন জন, ডেনমার্কের একজন, ফ্রান্সের একজন, ব্রিটেনের দু’জন, কানাডার একজন ও ভারতের একজন যাত্রী ছিলেন। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, চীনের দু’জন, মিয়ানমারের দু’জন, ভারতের একজন, কানাডার একজন ও বাংলাদেশের ১২ জন যাত্রী।

আপনিও আছেন গুগলের নজরদারিতে!

কোথায় নেই গুগল! গুগল কিংবা গুগলের কোনো পণ্য বা সেবা ছাড়া একটি দিন পার করার কথা কল্পনা করাও দিন দিন প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে। গুগল ম্যাপ থেকে শুরু করে ইউটিউব—উঠতে–বসতে আমরা গুগলের কোনো না কোনো কিছু ব্যবহার করছিই।
গুগল আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে, তার প্রমাণ মিলবে পরিসংখ্যানেও। প্রতি মাসে ১০০ কোটির বেশি মানুষ গুগলে কিছু না কিছু সার্চ করছেন, মাসে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ ইউটিউব ব্যবহার করছেন, একই সময়ে প্রায় ১২০ কোটি লোক জিমেইল ব্যবহার করছেন। বিশাল এই ব্যবহারকারীর সংখ্যাই জানান দিচ্ছে, মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা দিন দিন সহজ থেকে সহজতর হয়ে পড়ছে গুগলের জন্য। কিন্তু যাঁরা গুগল বা গুগলের পণ্য ব্যবহার করছেন, গুগল কি শুধু তাঁদের তথ্যই সংগ্রহ করছে? নাকি যাঁরা গুগল ব্যবহারকারী নন, তাঁদের তথ্যও জমা হয়ে যাচ্ছে গুগলের তথ্যভান্ডারে? ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডগলাস সি স্মিডট চেষ্টা করেছেন এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার।
এ প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রথমে জানতে হবে গুগল কীভাবে তাদের ব্যবহারকারী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। যখন একজন ব্যবহারকারী জিমেইল, ইউটিউব কিংবা গুগলের অন্য যেকোনো সেবায় তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলছেন বা লগ ইন করছেন, তখনই গুগলের তথ্যভান্ডারে তাঁর ব্যক্তিগত সব তথ্য জমা হয়ে যাচ্ছে। এটি হলো গুগলের তথ্য সংগ্রহের সক্রিয় পদ্ধতি।
তবে গুগলের তথ্য সংগ্রহ করার আরও একটি ‘পরোক্ষ’ পদ্ধতি রয়েছে, যেটি কিনা অনেক ব্যবহারকারীই জানেন না। মোবাইলের ব্যাকগ্রাউন্ডে সচল থাকা অ্যাপস কিংবা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেও ব্যবহারকারীর তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে গুগল। এই দুই উপায়ে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে অনলাইনের তো বটেই, মানুষের বাস্তব জীবনের তথ্যও চলে যাচ্ছে গুগলের হাতে। আর জমা করা এসব তথ্য দিয়ে প্রত্যেকের জন্য আলাদা প্রোফাইলও বানিয়ে ফেলছে তারা।
গবেষণা বলছে, গুগল সারা দিনে যত তথ্য সংগ্রহ করে, তার দুই–তৃতীয়াংশই করে এই ‘পরোক্ষ’ উপায়ে। ধরুন, আপনি গুগল বা গুগলের কোনো পণ্য ব্যবহার করছেন না, কিন্তু এরপরও গুগল আপনার ব্যক্তিগত তথ্য খুব সহজেই তাদের ভান্ডারে জমা করে ফেলতে পারে। কীভাবে করে, সেটিই গবেষণা করে দেখাতে চেয়েছেন স্মিডট।
ধরুন, আপনি কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে কিংবা অনলাইনে কোনো সংবাদের লিংকে ঢুকে সংবাদটি পড়তে পড়তে অফিসে যাওয়ার জন্য বের হলেন। আপনার ফোনে যদি কোনো কারণে জিপিএস প্রযুক্তিটি চালু করা থাকে, তাহলে নিশ্চিত থাকতে পারেন, এই অল্প সময়ের মধ্যেই আপনার ব্যক্তিগত পছন্দ–অপছন্দের তথ্য জমা হয়ে গেছে গুগলের তথ্যভান্ডারে। জিপিএস ব্যবহার করে গুগল ম্যাপ আপনার লোকেশন জেনে নেবে এবং আপনার ফোনের আইপি অ্যাড্রেসটিও তাদের জানা হয়ে যাবে।
এরপর আপনি যে সংবাদটিতে ক্লিক করলেন, সেটিকে ভিত্তি করে গুগল আপনার পছন্দ কিংবা রুচি সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা দাঁড় করাবে। এরপর থেকে আপনি যখনই অনলাইনে সংবাদ খোঁজার জন্য ঢুকবেন, দেখবেন আশ্চর্যজনকভাবে সেই ধরনের সংবাদগুলো ঘুরেফিরে আপনার সামনে আসছে। এটি সম্ভব হয়, কারণ আপনার অজান্তেই গুগল আপনার পছন্দ–অপছন্দ মিলিয়ে আপনার একটি প্রোফাইল তৈরি করে ফেলেছে।
শুধু তা–ই নয়, আপনি যে গানটি শুনলেন, সেটিকে ভিত্তি করেও গুগল আপনার প্রোফাইল সমৃদ্ধ করবে। এরপর থেকে আপনি যখনই কোনো গান শুনতে যাবেন, দেখবেন আপনার সামনে সেই একই ধরনের গান কিংবা সেই গানসংক্রান্ত বিজ্ঞাপন এসে হাজির হচ্ছে। এসবই সম্ভব হচ্ছে গুগল আপনার তথ্য সংগ্রহ করে রাখছে বলে।
এবার ধরুন, আপনি অফিসে বসে ভাবছেন দুপুরে কী খাবার খাওয়া যায়। কষ্ট করে বাইরে না গিয়ে আপনি মোবাইলের অ্যাপের মাধ্যমে কোনো একটি রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার অর্ডার করলেন। ব্যস, গুগল আবারও আপনার সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করে ফেলল। কোন দোকান থেকে খাবার কিনলেন, কোন ধরনের খাবার কিনলেন—সবকিছুই রেকর্ড করে রাখবে গুগল। এরপর থেকে আপনি যখনই অনলাইনে খাবার অর্ডার করতে যাবেন, দেখবেন ওই একই ধরনের খাবারের সাজেশনই আসছে আপনার সামনে। আর যদি কোনো কারণে খাবারের দামটা গুগল পে সার্ভিস দিয়ে পরিশোধ করে থাকেন, তাহলে আপনার ক্রেডিট কার্ড বা ডেবিট কার্ড–সংক্রান্ত তথ্যও জমা হয়ে থাকবে গুগলের কাছে।
এরপর ধরুন, অফিস থেকে ফেরার পথে আপনি মোবাইলের অ্যাপের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং কোম্পানি থেকে কোনো গাড়ি ডেকে আনলেন এবং গাড়িতে বসে ইউটিউবে ফুটবল ম্যাচের ভিডিও দেখতে দেখতে বাড়ি ফিরলেন। এতে করে আরও একবার আপনি গুগলের কাছে নিজের তথ্য জানান দিয়ে দিলেন। এরপর থেকে যখনই আপনি ভিডিও দেখতে ঢুকবেন, দেখবেন আপনার সামনে বারবার ফুটবল ম্যাচের নানা রকম ভিডিও চলে আসছে।
গবেষক ডগলাস সি স্মিডট এ কারণেই বলছেন, ‘গুগলের তথ্য সংগ্রহের বেশির ভাগটাই ঘটে যখন একজন ব্যবহারকারী সরাসরি গুগলের কোনো পণ্যের সঙ্গে সংযুক্ত থাকেন।’
গুগলের তথ্য সংগ্রহের অন্যতম বড় মাধ্যম হলো গুগল ক্রোম। আজকাল অনেকেই নিজেদের স্মার্টফোন কিংবা ল্যাপটপে গুগল ক্রোম ব্যবহার করছেন। পরিসংখ্যান বলছে, মাসে ২০০ কোটির বেশি মানুষ গুগল ক্রোম ব্যবহার করে। এই গুগল ক্রোম অনলাইনে ব্যবহারকারীদের গতিবিধির সামগ্রিক পর্যবেক্ষণ করে এবং সেগুলো গুগলের তথ্যভান্ডারে জমা করে। এমনকি যেসব ফোনে গুগল অপারেটিং সিস্টেম নেই (যেমন অ্যাপলের আইওএস), সেগুলোতেও নিজস্ব উপায়ে তথ্য সংগ্রহ করে নেয় গুগল।
অর্থাৎ আপনি গুগল ব্যবহার করুন বা না করুন, গবেষণা বলছে, গুগলের হাত থেকে আপনার নিস্তার নেই!

চীনে যেভাবে একটি শহরকে ‘জেলখানায়’ রূপ দেয়া হয়েছে

চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রাচীন শহর কাশগড়। এ শহরের হাজার হাজার উইঘুর ও অন্যান্য মুসলিমকে গ্রেপ্তার করে আটক রাখা হয়েছে বিভিন্ন ক্যাম্পে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কড়া নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু ওই ক্যাম্পগুলোর বাইরে যেসব উইঘুর আছেন, তারা কি ভালো আছেন? কার্যত তারা বন্দি জীবন যাপন করছেন। এ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।
এতে বলা হয়েছে চীন নিয়ন্ত্রণের একটি কড়া নেটওয়ার্ক বিস্তার ঘটিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটির কমিউনিস্ট পার্টি তাদের কর্তৃত্ববাদকে আরো জোরালো করেছে। প্রতিবেশীদের বানানো হয়েছে তথ্যপ্রদানকারী বা ইনফরমার।
শিশুদের ধরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। নজরদারি করা হয় মসজিদগুলোতে। এ বিষয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক লিখেছেন, আমরা সেখানকার বাস্তব জীবন কেমন তা প্রত্যক্ষ করতে বেশ কয়েকবার কাশগড় পরিদর্শন করেছি। স্থানীয়দের সাক্ষাৎকার নিতে পারি নি। কারণ, বিদেশি সাংবাদিকদের এমন সাক্ষাৎকার দিলে তাতে তাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আমাদেরকে অব্যাহতভাবে নজরদারি করছিল পুলিশ। সর্বত্রই ছিল এক রকম বিধিনিষেধ।
প্রতি ১০০ গজ দূরত্বে পুলিশের চেকপয়েন্ট। সেখানে তারা বন্দুক, ঢাল নিয়ে অবস্থান করছে। তাদের অনেকে আবার উইঘুর। এ কাজে কিছু উইঘুরকে নিয়োগ না দিলে নজরদারি করাটা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। মুসলিম সংখ্যালঘুদের লাইনে দাঁড়িয়ে প্রদর্শন করতে হয় তাদের সরকারি পরিচয়পত্র। বড় বড় চেকপয়েন্টে তাদের থুঁতনি উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। ছবি তোলা হয়। তারপর তাদের শনাক্ত করে সিদ্ধান্ত দেয়া হয় তারা যেতে পারবেন কিনা। কখনো কখনো উইঘুর মুসলিমদের মোবাইল ফোন নিয়ে নেয় পুলিশ। তা চেক করে দেখে তারা এমন কোনো সফটওয়্যার ইন্সটল করেছে কিনা, যা দিয়ে ফোনকল ও ম্যাসেজ মনিটরিং করা যায়।
চীনের সর্ব পশ্চিমে সিনজিয়ান। এখানকার মানুষগুলো মনে করে তারা এর চেয়েও বেশি মধ্য এশিয়ার। এখানে আছে জাতিগত সংখ্যালঘু- উইঘুর, কাজাখ, তাজিক। বসবাসকারী হ্যান চীনাদের চেয়ে তাদের সংখ্যা বেশি। এসব জাতিগত সংখ্যালঘুর বেশির ভাগই সুন্নী মুসলিম। তাদের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষা।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিককে বেশ কয়েকবার একজন পুলিশ কর্মকর্তা থামিয়েছেন। তার মোবাইল ফোন চেক করেছেন। দেখেছেন তাতে কি কি ছবি আছে। যদি স্পর্শকাতর কিছু থাকে তাহলে তা তিনি ডিলিট বা মুছে দিয়েছেন। কখনো কখনো তাদের এই পছন্দ বা অপছন্দের বিষয়টি কোনো কিছু বিবেচনা করে হয় না। একজন পুলিশ কর্মকর্তা একটি উটের ছবি মুছে দিয়েছেন। কিন্তু কেন? এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, চীনে কেন বলতে কোনো প্রশ্ন নেই।
উইঘুরদের জন্য এই নজরদারি আরো বেশি পরিব্যাপ্ত। প্রতিবেশীরা মনিটরিং করে বিশেষ কোনো পরিবারের ওপর। পুলিশ ও নজরদারি কর্মকর্তারা যেকোনো উইঘুরকে প্রশ্ন করতে পারে। তাদের বাড়িঘর তল্লাশি করতে পারে। তিন বছর আগে কাশগড় থেকে তুরস্কে পালিয়ে গিয়েছেন দিলনুর। তারপর থেকে তিনি সিনজিয়ানে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারেন নি। তবে তিনি তল্লাশির বিষয়টি স্মরণ করতে পারেন। তিনি বলেন, সকাল বা রাত হোক কোনো কিছুর পরোয়া না করেই তল্লাশি চালানো হয়। তারা যখনই চায় তখনই তল্লাশি করতে পারে, যেকোনো সময়ে। আটক ব্যক্তিদের বাচ্চাদের এতিমের মতো নিয়ে যাওয়া হয়েছে দূরে। আমরা জানি না তাদের সংখ্যা কত। তবে সরকার বলছে, শুধু গত বছরে কাশগড়ে এমন ৭০০০ শিশুকে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। সর্বত্রই বিরাজমান নজরদারিকারী ক্যামেরা বসানো। রাস্তা, ঘরের দরজা, দোকান, মসজিদ- সব স্থানেই এমন ক্যামেরা বসানো। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক লিখেছেন, আমরা শুধু একটি সড়কের এক অংশে এমন ২০টি ক্যামেরা গণনা করে দেখেছি। একটি ছোট্ট দোকানে স্থানীয় অনেক মানুষ প্রতিদিন সমুচা কিনতে যান। এই দোকানটিতে এবং এর পাশের প্রতিটি দোকানে এমন ক্যামেরা বসিয়ে মনিটরিং করা হচ্ছে। এসব ক্যামেরা ও চেকপয়েন্টের মাধ্যমে জনগণ সম্পর্কে তথ্য শুষে নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এসব ছবি, তথ্য কে যাচাই করে দেখছে?
এই প্রযুক্তি বিক্রি করে চীনা কোম্পানিগুলো প্রচুর অর্থ আয় করছে। তারা যেন সায়েন্স ফিকশনের অলৌকিকত্বকে বাস্তবে দেখাতে চাইছে। লেজার ব্যবহার করে লোকজনকে ধরতে সহায়তা করছে। কিন্তু সিনজিয়ানে যদি আপনি সময় কাটান তাহলে দেখতে পাবেন রাষ্ট্রীয় নজরদারির এই বিষয়টি অধিকন্তু আঘাত করার হাতুড়ির সমতুল্য। এর মাধ্যমে নির্বিচারে, বাছবিচারহীনভাবে জনগণকে ভীতির মধ্যে রেখে তাদের ওপর মনিটরিং করা হচ্ছে।
এই ভীতিকর পরিস্থিতি কাজও করছে। ওই সাংবাদিক লিখেছেন, আমরা শহরের কয়েকটি মসজিদপরিদর্শন করেছি, যা তখনও খোলা ছিল। এমন একটি মসজিদ হলো শহরের বিখ্যাত ঈদ গা মসজিদ। সেখানে শুক্রবার জুমার নামাজের দিন মাত্র কয়েক ডজন মুসল্লি যোগ দিয়েছিলেন। এর দু’চার বছর আগে, এ নামাজ আদায় করতে এখানে আসতেন কয়েক হাজার মুসল্লি। এখানে নামাজ আদায় করতে আসা মুসল্লিদের প্রথমে নিবন্ধিত করা হয়। তারপর তাদেরকে নিরাপত্তা তল্লাশির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এরপরই মসজিদের ভিতরে প্রবেশ করতে পারেন। মসজিদের ভিতরে বসানো আছে নজরদারি করা ক্যামেরা। এই ক্যামেরা দিয়ে পুলিশ মনিটরিং করে ভিতরে কি হচ্ছে।
শিশুদের পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। দিলনুর বলেছেন, কিন্ডারগার্টেনে ছোট্ট ছোট্ট শিশুদের তারা জিজ্ঞেস করে- তোমার বাবা-মা কি পবিত্র কোরআন পড়েন? আমার মেয়ের এক সহপাঠী একদিন বলেছিল- আমার মা আমাকে পবিত্র কোরআন শিক্ষা দেন। এর পরের দিন তারা কোথায় গেছেন বা তাদের কি হয়েছে কেউ বলতে পারেন না।
কাশগড়ে যে ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে তার মধ্য দিয়ে শহরকে নিয়ন্ত্রণ করা আরো সহজ হয়ে গেছে। শহরের পুরনো অংশ, মাটির তৈরি বাড়িগুলোর বেশির ভাগই ভেঙেচুরে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। সরকার বলেছে, এটা করা হয়েছে নিরাপত্তা ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য। সেখানে সড়ক প্রশস্ত করা হয়েছে। এর ফলে নজরদারি ও টহল সহজ হয়েছে। অনেক এলাকায় এখনও ধ্বংস চালিয়ে সেখানে পুনর্গঠন করা হচ্ছে এভাবে। ইটের তৈরি নতুন বাড়িগুলো অধিক আরামদায়ক। কিন্তু উইঘুররা তাদের পুরনো বাড়িঘরের জন্য, পুরনো প্রতিবেশীদের জন্য বেদনাবোধ করেন। নতুন করে সাজানো এসব এলাকা দেখে পর্যটকরা বিস্মিত হন। কিন্তু তাদের ওইসব শিবির, যেখানে উইঘুরদের আটক রাখা হয়েছে, সেখান থেকে দূরে রাখা হয়।
২০১৬ সালের আগস্টে কাশগড়ের দক্ষিণে একখণ্ড জমি ছিল ফাঁকা। এখন সেটা নতুন করে ‘রি-এডুকেশন’ সেন্টার বানানো হয়েছে। তাতে আছেন প্রায় ২০ হাজার মানুষ। সরকার বলছে, এটা হলো একটি ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা গেছে, এই ক্যাম্পটি ২০ লাখ বর্গফুট এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এটাই এখানকার একমাত্র শিবির বা ক্যাম্প নয়। কাশগড়ে এমন ১৩টি ক্যাম্প আছে। তা এই ক্যাম্পটির আকারকে ছাড়িয়ে গেছে। গত বছর তার আয়তন ছিল এক কোটি বর্গফুটেরও বেশি।
পর্যটকরা ফিরে যান সেখানে। কিন্তু বহু উইঘুর এখনও বসবাস করছেন ক্ষয়ক্ষতির আতঙ্ক নিয়ে। মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া একটি মন্তব্য, একজন প্রতিহিংসামূলক প্রতিবেশী, একটি ভীতসন্ত্রস্ত শিশু- এসবের কারণে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হতে পারে। চালানো হতে পারে তল্লাশি। আর গন্তব্য হতে পারে কুখ্যাত ওইসব শিবির।

জাপানি যুবরাজ কী চমক দেখাবেন?

প্রথম, প্রথম আর প্রথম। জাপানের যুবরাজ নারুহিতো ও তাঁর স্ত্রী যুবরাজ্ঞী মাসাকো দেশের সম্রাট পরিবারে অনেক ‘প্রথম’ যোগ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করা, বেশ কয়েকটি ভাষা জানা এবং বহু বছর বিদেশে বসবাসের অভিজ্ঞতা রাজ পরিবারের সদস্য হিসেবে তাঁদের করেছে অনন্য। এর আগে সম্রাট পরিবারে একসঙ্গে এত গুণের অধিকারী আর কেউ ছিলেন না। জাপানের মানুষ তাঁদের কাছে নতুন কিছু প্রত্যাশা করছেন। দেখা যাক, তাঁরা কী চমক দেখান?
জাপানের সম্রাট-সম্রাজ্ঞী হিসেবে বিশ্বদরবারে নিজেদের তুলে ধরার প্রস্তুতি চলছে তাঁদের। আশা করা হচ্ছে, সম্রাটের দপ্তরকে তাঁরা আরও বেশি আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাবেন। একই সঙ্গে দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াবেন।
কূটনীতিক হিসেবে অভিজ্ঞতা রয়েছে ৫৫ বছর বয়সী সম্রাজ্ঞী মাসাকোর। উইলসন সেন্টারের বিশ্লেষক শিহোকো গোতো এ ব্যাপারে বলেন, নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে রাজপরিবারের এই দুই সদস্যের জন্য প্রচুর সুযোগ রয়েছে সেই সব কারণ দেখার, যা যোগাযোগের বিষয়টাকে কিছুটা হলেও দূরে রেখেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে রাজপরিবার কতটা এগিয়ে গেছে, তা উল্লেখ করেন শিহোকো। সম্রাট হিরোহিতো সাধারণ মানুষের কাছে ছিলেন দেবতুল্য। তিনি বলেন, ব্যতিক্রমী পটভূমি থেকে উঠে এসেছে এই দম্পতি। সাধারণ মানুষের বিষয়ে আগ্রহ তাঁদের আছে। এসব মানুষের আরও কাছে যেতে দক্ষতা বাড়াতে হবে।
সম্রাট আকিহিতো ও তাঁর স্ত্রী সম্রাজ্ঞী মিচিকো সাধারণ মানুষের কাছে ছুটে যেতেন। বিশেষত, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরে ভীতসন্ত্রস্ত ভুক্তভোগীদের সাহায্য করতে এগিয়ে যেতেন তাঁরা। গত দুই শতাব্দীর মধ্যে আকিহিতোই প্রথম কোনো সম্রাট, যিনি অসুস্থতা ও বার্ধক্যের কারণে জীবিত অবস্থায় সিংহাসন ত্যাগ করছেন। পদত্যাগের পর তিনি নিজ দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেছেন কি না, তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে।
রাজকীয় পারিবারিক সংস্থার সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘স্বভাবতই সম্রাট আকিহিতোর কর্মজীবন নিয়ে দুই ধরনের মতবাদ রয়েছে। এক. সম্রাট হিসেবে তাঁর কাজ ছিল সাধারণ মানুষের কাতারে দাঁড়িয়ে সবার দেখভাল করা, দুই. সম্রাটের একমাত্র কাজই হচ্ছে প্রার্থনা করা। তবে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে দুটি বিকল্পই আমাদের হাতে আছে বলে আমি মনে করি না। একজন সম্রাট যদি কেবল প্রার্থনায় মগ্ন হয়ে দিন কাটান, তবে মানুষের বিশ্বাস বা সমানুভূতি অর্জন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।’
সম্রাট নারুহিতো (৫৯) তাঁর বাবা-মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চান। তাঁর মতে, রাজতন্ত্রের এখন সময় এসেছে বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার। পর্যবেক্ষকদের দাবি, নারুহিতো যদি সত্যিই সবার সঙ্গে কথা বলে তাদের কাছে যেতে পারেন, তবে জাপানের অস্তিত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রাজপরিবারের মর্যাদা বাড়বে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং রাজপরিবারের নারীদের নিয়ে বইয়ের লেখক রিকা কায়ামা বলেন, ‘সময়ের চাহিদায় রাজপরিবারের সদস্যদের এখন প্রয়োজনীয় মাত্রায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্ত হওয়ার সময় এসেছে। যদি বার্তা প্রকাশের সুযোগ না থাকে, তবে ইনস্টাগ্রামে ছবি দিতে পারেন তাঁরা।’ দেশ-বিদেশের দর্শকদের সঙ্গে সেলফি নেওয়া নারুহিতো ও মাসাকো যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসব ছবি প্রকাশ করতে পারেন বলে তিনি মনে করেন।
অনেক দিন ধরে একধরনের সমস্যায় ভুগেছেন মাসাকো। তা হচ্ছে একধরনের মানিয়ে নেওয়ার সমস্যা। বিশেষত, এ কারণেই প্রায় এক দশক ধরে জনসমক্ষে বের হননি মাসাকো। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ক্ষমতায় সাবেক সম্রাজ্ঞী মিচিকোকে ‘নিখুঁত’ বলা হতো। প্রায়ই দরিদ্র বা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্মদিনের শুভেচ্ছা পাঠানোর রীতি দেখে ধারণা করা হচ্ছে, মাসাকো খুব দ্রুতই তাঁর সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
মধ্যযুগীয় নদী পরিবহন ব্যবস্থার ওপর অধ্যয়ন করা নারুহিতো পরিবেশগত বিষয়ে দারুণ সচেতন। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও কথা বলেন তিনি। পরিবর্তনবিমুখ জাপানের পালে নতুন হাওয়া লাগাতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। শুরুর দিকে অবশ্য আকিহিতো ও মিচিকোও সমালোচিত হয়েছিলেন। মিচিকো যখন হাঁটু গেড়ে মানুষকে সান্ত্বনা দিতেন কিংবা কারও সঙ্গে করমর্দন করতেন, তখন সাম্রাজ্যের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে।
এখন সময় কেবল অপেক্ষার। জাপানিরা অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছেন নারুহিতো-মাসাকোর পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য। তাঁদের প্রত্যাশা, নতুন এই প্রজন্ম পারবে ব্যক্তিত্বের ছাপ ফেলে সেকেলে রীতিনীতি মুছে মানুষের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিতে।