Thursday, August 28, 2025

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু মূলত ‘জেনোসাইড পুরস্কারের’ যোগ্য by গিডিয়ন লেভি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয়ের স্বপ্ন দেখেন; তিনি দেখেন যে অসলোয় তাঁর হাতে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হচ্ছে। অথচ তাঁর জন্য সঠিক জায়গা হলো হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান কার্যালয়। দুনিয়ায় ট্রাম্প ছাড়া আর কোনো অ–ইসরায়েলি নাগরিক নেই, যিনি গাজায় রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। অথচ তিনি যদি চাইতেন, তাহলে একমাত্র তিনিই একটি মাত্র টেলিফোনে এই ভয়াবহ যুদ্ধ থামাতে পারতেন, পারতেন ইসরায়েলি জিম্মিদের প্রাণ রক্ষা করতে।

কিন্তু তিনি তা করেননি। যুদ্ধ থামাতে ফোন করা তো দূরে থাক, ট্রাম্প ইসরায়েলের যুদ্ধযন্ত্রকে নিয়মিতভাবে অর্থ, অস্ত্র ও মদদ দিয়ে যাচ্ছেন, যেন গাজায় কোনো কিছু ঘটেনি। আর তিনি এতেই মোহাচ্ছন্ন হয়ে আছেন। গত সপ্তাহে তিনি বরং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে একজন ‘সমর নায়ক’ বলে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে নিজেও এই সন্দেহজনক সম্মানের ভাগীদার হওয়ার গৌরব ছাড়তে চাননি। তাই ‘আমার তো মনে হয় আমিও তাই’ বলে দাবি করেছেন।

তার মানে গাজায় যে গণহত্যা ঘটিয়ে চলেছে, জেনোসাইড ঘটিয়ে চলেছে, এমন একজনকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বীরযোদ্ধা মনে করছেন! আবার যিনি একবার বর্ষণের জন্য বোমারু বিমান পাঠিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে একটি ঝুঁকিহীন অভিযান পরিচালনা করেন, তাঁকেও সমর নায়ক মনে করেন! এই তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির মনোভঙ্গি।

ট্রাম্পকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে যুক্ত করার মানে হলো দিনকে রাত বানানো, মিথ্যাকে সত্যি দেখানো। এর আরও মানে হলো এই শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধের জন্য অপরাধী ব্যক্তিকে একযোগে নোবেল পুরস্কার জয়ী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র আর দালাই লামা বানিয়ে ফেলা। ডোনাল্ড ট্রাম্প আর নেলসন ম্যান্ডেলাকে একই নৌকায় তুলে দেওয়া। এহেন চরম উপহাসের কোনো পরিসীমা নেই। আর এই উপহাস করা হতে যাচ্ছে আমাদের ত্যাগের বিনিময়ে।

নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প অবশ্য একটি পুরস্কার পেতেই পারেন। সৌভাগ্যবশত কিংবা দুর্ভাগ্যবশত সেই পুরস্কারটা এখনো প্রবর্তিত হয়নি। সেটি হলো ‘জেনোসাইড পুরস্কার’।

দুটি মারাত্মক প্রতিবেদন গত শুক্রবার প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলো থেকে এই যুদ্ধের জেনোসাইডমূলক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আর কোনো সন্দেহ থাকে না। জাতিসংঘ সমর্থিত সমন্বিত খাদ্যনিরাপত্তা ধাপ শ্রেণীকরণ (আইপিসি), যা বিশ্বের খাদ্যসংকট বিষয়ে শীর্ষস্থানীয় নির্ভরযোগ্য আভাস প্রদানকারী) নিশ্চিত করেছে যে গাজা নগরীর পাঁচ লাখ মানুষ ও পরিবেশ দুর্ভিক্ষের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এই ক্ষুধার্ত নগরী দখল নিতে যাচ্ছে। ট্রাম্পও এই নৃশংস দখলদারি অভিযানকে সবুজ সংকেত দিয়েছেন আন্তর্জাতিক সমর্থন ও অস্ত্র দিয়ে।

একই সময়ে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন অনলাইন সাময়িকী +৯৭২ ম্যাগাজিনের হিব্রু সংস্করণ এবং বিলেতের দ্য গার্ডিয়ান ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার উপাত্ত ফাঁস করে দিয়ে দেখিয়েছে যে গাজা যুদ্ধে আইডিএফের হাতে নিহত ফিলিস্তিনির ৮৩ শতাংশই বেসামরিক নাগরিক। এই হার সম্প্রতিকালের সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধগুলো যেমন বসনিয়া, ইরাক ও সিরিয়ার যুদ্ধের চেয়েও অনেক বেশি।

তার মানে আইডিএফের নিজস্ব উপাত্ত অনুসারেই যুদ্ধে নিহত প্রতি ছয়জন ফিলিস্তিনির মাত্র একজন বন্দুকধারী ব্যক্তি। আর প্রতি ছয়জনের পাঁচজন হলো নিরীহ বেসামরিক নাগরিক। যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। আমরা প্রথমে সন্দেহ করেছিলাম, তারপর জেনে গেছি যে এটা হলো জেনোসাইড। আর পেছনে আছে আমেরিকা।

ট্রাম্প তো এই যুদ্ধ চালাতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে রেখেছেন। তার পরও তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার দুঃসাহস দেখান। আমেরিকার অনেক মানুষও তাঁদের প্রেসিডেন্টের পিঠ চাপড়াচ্ছে। অথচ হোয়াইট হাউস থেকে একটি মাত্র টেলিফোন করে গাজায় এই নিধনযজ্ঞ থামিয়ে দেওয়া যায়। ব্যাপক ও সর্বাধুনিক গোয়েন্দা যন্ত্রপাতির সম্ভারসহ বিশাল বাজেটের ১৬টি সংস্থা সঙ্গে থাকার পরও ট্রাম্প বলেছেন, তিনি টেলিভিশনে দেখেছেন, গাজায় ‘সত্যিই অনাহার’ ঘটেছে।

কিন্তু টেলিভিশন তাঁকে দৃশ্যত যথেষ্ট মর্মাহত করেনি। তাঁর তো উচিত ছিল ইসরায়েলকে নির্দেশ দেওয়া যে তাৎক্ষণিকভাবে এবং পুরোদমে যুদ্ধবিরতি করা। আবার নেতানিয়াহুর ইসরায়েল বিশ্বরোষ উপেক্ষা করতে পারে না। অথচ গাজায় জেনোসাইড ঠেকাতে অন্য দেশগুলো যখন ইসরায়েলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছে, তখন ট্রাম্প আবার তাদের বাধা দিতে যা যা করার সবাই করছেন। ইউরোপ তো এগিয়ে এসেছিল; কিন্তু ট্রাম্পের ভয়ে থমকে গেছে, যেমনটা থেমে আছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।

ইহুদি আমেরিকান রাজনীতিবিদ রন ডেরমের আবার ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার একজন সদস্য। তিনিই হোয়াইট হাউস ও এর ১৬টি গোয়েন্দা সংস্থাকে মিথ্যা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে রক্ত হলো আসলে বৃষ্টি আর এ বৃষ্টি আমেরিকার জন্য আশীর্বাদের। ফলাফল গাজায় উপকূলীয় অবকাশযাপন নগর-পরিকল্পনার পিতা মানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এখন পরিণত হয়েছেন একজন স্বঘোষিত কাহনীয়তে (প্রয়াত উগ্র ইহুদি রাবাই মেয়ার কাহনের অনুসারী; যিনি ইসরায়েলে বসবাসকারী সব আরবকে ইসরায়েল ও ইহুদিদের শত্রু অভিহিত করতেন।); আর এ জন্য তিনি আবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দাবি করছেন।

* গিডিয়ন লেভি, ইসরায়েলি সাংবাদিক। হারেৎজ–এ প্রকাশিত লেখাটি ইংরেজি থেকে বাংলায় রূপান্তর করেছেন আসজাদুল কিবরিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি: রয়টার্স

জাতিসংঘের সতর্কবার্তা: গাজায় দুর্ভিক্ষ আরও ছড়াচ্ছে

জাতিসংঘের কর্মকর্তা ও ত্রাণ সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে গাজায় দুর্ভিক্ষ এখন বাস্তবতা। সেখানে ইসরায়েলের অবরোধ ও বোমাবর্ষণের কারণে জরুরি প্রাণরক্ষাকারী সাহায্য বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শিশুরা ক্রমশ ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে। বুধবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে দেয়া এক কঠোর বক্তব্যে কর্মকর্তারা বলেন, গাজায় দুর্ভিক্ষ ও ব্যাপক ক্ষুধা হচ্ছে এক ‘কৃত্রিম’ ও ‘মানবসৃষ্ট বিপর্যয়’। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক উপপ্রধান জয়েস মুসিয়া পরিষদকে জানান, গাজা সিটির অবস্থান করা উত্তর-কেন্দ্রীয় গাজা গভর্নরেটে দুর্ভিক্ষ নিশ্চিতভাবে চলছে এবং সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ এটি দক্ষিণের দেইর আল-বালাহ ও খান ইউনিস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। তিনি বলেন, বর্তমানে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ অনাহার, দারিদ্র্য ও মৃত্যুর মুখে রয়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ এই সংখ্যা ৬ লাখ ৪০ হাজার ছাড়াতে পারে। গাজায় এমন কোনো মানুষ নেই যে ক্ষুধার প্রভাব থেকে মুক্ত। তিনি আরও জানান, কমপক্ষে ১ লাখ ৩২ হাজার পাঁচ বছরের নিচের শিশু তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে।

এর মধ্যে ৪৩ হাজারেরও বেশি শিশুর আগামী মাসগুলোতে জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে। মুসিয়া বলেন, এই দুর্ভিক্ষ কোনো খরা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়। এটি একটি সৃষ্ট বিপর্যয়- একটি সংঘাতের পরিণতি, যা ব্যাপক বেসামরিক মৃত্যু, ধ্বংস ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির কারণ। বুধবার এর আগে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে যে ২৪ ঘণ্টায় ক্ষুধা ও অপুষ্টির কারণে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে দুইজন শিশু। এর ফলে যুদ্ধে গাজায় ক্ষুধা সম্পর্কিত মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৩১৩, যার মধ্যে ১১৯ জন শিশু। অন্যদিকে ইসরাইল বুধবার আহ্বান জানায় আন্তর্জাতিক ক্ষুধা পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশনকে (আইপিসি) গাজা নিয়ে তাদের প্রতিবেদনের ফলাফল প্রত্যাহার করতে। ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ইডেন বার তাল গত সপ্তাহের রিপোর্টকে আখ্যা দেন গভীর ত্রুটিপূর্ণ, অপেশাদার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রত্যাশিত মান থেকে বহু দূরে। তবে বুধবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্য শুধু যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আইপিসি ও তাদের কাজের প্রতি সমর্থন জানায়। ১৪ সদস্যের দেয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, গাজায় দুর্ভিক্ষ অবশ্যই অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। শিশু সুরক্ষা সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন-এর প্রধান ইঙ্গার অ্যাশিং তার বক্তব্যে বিশ্বশক্তিগুলোকে নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে সহায়তাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করেন।

তিনি বলেন, গাজার দুর্ভিক্ষ উপস্থিত। এটি এক কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ। মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ। গাজার শিশুদের পরিকল্পিতভাবে অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। এটি যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে অনাহারের নগ্নতম রূপ। তিনি বর্ণনা করেন, ক্লিনিকগুলো অপুষ্ট শিশুতে ভর্তি, যারা এখন নীরব হয়ে পড়েছে। শিশুদের আর কান্নার শক্তিও নেই। তারা শুধু শুয়ে থাকে- হাড়জিরজিরে, ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।
অ্যাশিং বলেন, শিশুদের আঁকা ছবিগুলো এখন বদলে গেছে। আগে যেখানে শান্তি, শিক্ষা ও স্বপ্ন আঁকা হতো, সেখানে এখন কেবল খাবার আর মৃত্যু কামনা ফুটে উঠছে। তিনি বলেন, মার্চে পূর্ণ অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে শিশুরা ক্রমশ বলতে শুরু করেছে তারা খাবার চায়, রুটি চায়। গত কয়েক সপ্তাহে আরও বেশি শিশু জানাচ্ছে তারা মৃত্যুকামনা করছে।

এক শিশু লিখেছে,  আমি চাই জান্নাতে যাই যেখানে আমার মা আছেন। জান্নাতে ভালোবাসা আছে, খাবার আছে, পানি আছে। জাতিসংঘে দুর্ভিক্ষ সতর্কবার্তার মধ্যেই গাজার হাসপাতালগুলো নতুন ইসরাইলি হামলার খবর দিয়েছে। খান ইউনিসে কুয়েত বিশেষায়িত ফিল্ড হাসপাতালে এক ড্রোন হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন শিশু ও এক নারী। আহত হয়েছেন আরও ২১ জন। বিতর্কিত ইসরাইলি ও মার্কিন-সমর্থিত জিএইচএফ ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রের কাছে ইসরাইলি হামলায় কমপক্ষে ১২ জন নিহত হয়েছেন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবারগুলো বেঁচে থাকার কৌশল শেষ করে ফেলছে। অভিভাবকেরা নিজেদের খাবার সন্তানদের খাওয়াচ্ছেন। কিন্তু অনিয়মিত ও অপ্রতুল সাহায্য পৌঁছানোয় পরিস্থিতি ভয়াবহ হচ্ছে।

mzamin

গাজা নগরী খালি করতেই হবে, হুঁশিয়ারি ইসরায়েলের

ফিলিস্তিনের গাজা নগরীর আরও ভেতরে ঢুকে পড়েছেন ইসরায়েলি সেনারা। ট্যাংক নিয়ে হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে সেখানকার বাড়িঘর। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে দিগ্‌বিদিক পালাচ্ছেন নগরীর বাসিন্দারা।

গতকাল মঙ্গলবার গভীর রাতে গাজা নগরীর উত্তর সীমানায় অবস্থিত এবাদ-আলরহমান এলাকায় প্রবেশ করে ইসরায়েলি বাহিনী। এ সময় তারা বিভিন্ন আবাসিক ভবনে গোলাবর্ষণ করে। এতে অনেকে আহত হন। বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয় অসংখ্য বাসিন্দাকে।

এবাদ-আলরহমান থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে গাজা নগরীর জালা স্ট্রিট অবস্থিত। সেখানকার বাসিন্দা সাদ আবেদ (৬০) বলেন, ‘হঠাৎ শুনতে পেলাম এবাদ-আলরহমানে ট্যাংক ঢুকে পড়েছে। এর মধ্যে বিস্ফোরণের শব্দ তীব্র হতে থাকে। দেখি মানুষজন আমাদের এলাকায় পালিয়ে আসছে। যুদ্ধবিরতি না হলে আমাদের বাড়ির সামনেই ট্যাংক দেখতে পাব।’

ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা গাজা নগরীতে নতুন করে অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের দাবি হামাসের শেষ ঘাঁটি সেখানে অবস্থিত। অপরদিকে উপত্যকাটির প্রায় ২২ লাখ মানুষের অর্ধেকই এখন সেখানে বসবাস করছেন।

হামলার কারণে ইতিমধ্যে হাজার হাজার মানুষ এলাকা ছেড়েছেন। তবে নগরীর খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের নেতারা বলেছেন, তাঁরা সেখানেই অবস্থান করবেন। কারণ, গাজা নগরী ছেড়ে দক্ষিণ দিকে পালানোর চেষ্টা মৃত্যুদণ্ডের শামিল।

এদিকে গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আরবি ভাষার মুখপাত্র আভিচাই আদ্রেয়ি বলেন, ‘গাজা নগরী খালি করতেই হবে। আমি নিশ্চিত করতে চাই, দক্ষিণাঞ্চলে বিশাল ফাঁকা এলাকা রয়েছে। এ ছাড়া গাজার মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন আশ্রয়শিবির এবং আল-মাওয়াসিতেও ফাঁকা জায়গা রয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, গাজা নিয়ে আজ হোয়াইট হাউসের একটি বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সভাপতিত্ব করার কথা রয়েছে। তিনি জানান, এ বছরের মধ্যেই ফিলিস্তিনে চলমান ইসরায়েলের যুদ্ধের মীমাংসা হবে।

অপরদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সারের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় উপত্যকাটিতে অনাহার ও অপুষ্টির কারণে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুটি শিশু রয়েছে। এ নিয়ে যুদ্ধের মধ্যে এখন পর্যন্ত অনাহারে ৩১৩ জনের মৃত্যু হলো; যার মধ্যে ১১৯টিই শিশু। এ সময় ইসরায়েলি হামলায় গাজা উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৭৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৮ জন ত্রাণপ্রত্যাশী।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় নৃশংস হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। এতে উপত্যকাটিতে ৬২ হাজার ৮১৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬২৯ জন।

ভেনিসে বিক্ষোভ

গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনের প্রতিবাদে ইতালির ভেনিসে বিক্ষোভ হয়েছে। গতকাল ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের প্রধান ভবনের বাইরে এ বিক্ষোভ হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের হাতে ‘ফিলিস্তিন মুক্ত কর’ এবং ‘গণহত্যা বন্ধ কর’ প্ল্যাকার্ড ছিল।

এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজ দেশে যুদ্ধের জন্য সমালোচিত হচ্ছেন। গতকাল মঙ্গলবার হাজার হাজার ইসরায়েলি দেশের বিভিন্ন জায়গায় সমাবেশ করেছেন। তাঁরা যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানিয়ে গাজায় হামাসের হাতে জিম্মিদের মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-27%2Feu91ltcn%2F2025-08-26T135443Z1500276037RC2ZEGA43ISPRTRMADP3ISRAEL-PALESTINIANS-GAZA-1756294594.webp?rect=1%2C0%2C770%2C513&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইসরায়েলি সেনাদের হামলা থেকে বাঁচতে গাজা নগরী ছাড়ছেন বাসিন্দারা। ছবি: রয়টার্স

গ্রিনল্যান্ডে গোপন তৎপরতা, মার্কিন শীর্ষ দূতকে তলব করেছে ডেনমার্ক

কোপেনহেগেনে নিযুক্ত মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করেছে ডেনমার্ক। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা গ্রিনল্যান্ডে গোপন তৎপরতা চালাচ্ছেন—এমন অভিযোগে দেশটিতে নিযুক্ত শীর্ষ মার্কিন কূটনীতিককে বুধবার তলব করেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ডেনমার্কের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘ডিআর’ একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এ গোপন তৎপরতার খবর জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন নাগরিকদের উদ্দেশ্য গ্রিনল্যান্ডের সমাজে ঢুকে পড়া এবং ডেনমার্ক থেকে দ্বীপটিকে বিচ্ছিন্ন করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করার পক্ষে প্রচার চালানো। তবে ওই ব্যক্তিরা কারা, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি।

ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন বলেন, রাষ্ট্রের (ডেনমার্ক) অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ করার যেকোনো চেষ্টা অগ্রহণযোগ্য। এ অবস্থান থেকেই মার্কিন কূটনীতিককে তলব করা হয়েছে।

এদিকে ডেনমার্কের গোয়েন্দা সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা চালানোর জন্য গ্রিনল্যান্ডকে নিশানা করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মন্তব্য জানার জন্য ডেনমার্কে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বিবিসি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন সময় বলেছেন, ডেনমার্কের আধা স্বায়ত্তশাসিত গ্রিনল্যান্ডের দখল নিতে চান তিনি। কোপেনহেগেন এই অঞ্চলে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করছে না বলে অভিযোগ করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

কয়েক মাস আগে গ্রিনল্যান্ড সফর করেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। ওই সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, ‘আপনারা অন্য কোনো দেশকে নিজ ভূখণ্ডের সঙ্গে একীভূত করতে পারেন না।’

ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বিবিসিকে বলেন, বিভিন্ন বিদেশি শক্তি গ্রিনল্যান্ডের বিষয়ে এবং সেখানে ডেনমার্কের অবস্থান নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে। এ বিষয়ে সরকার অবগত।

ডেনমার্ক পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখে এসেছে দেশটি। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর গ্রিনল্যান্ড দখলে ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ডেনিশরা অবাক হয়েছেন।

বরফে ঢাকা গ্রিনল্যান্ডের একটি শহর
বরফে ঢাকা গ্রিনল্যান্ডের একটি শহর। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ফ্রান্সে ইহুদিবিদ্বেষ অভিযোগ তোলায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে তলব

ফ্রান্স ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে এমন অভিযোগ করায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত চার্লস কুশনারকে তলব করবে ফ্রান্স। এরই মধ্যে এ বিষয়ে জানিয়ে দিয়েছে ফ্রান্স। এ খবর দিয়ে অনলাইন বিবিসি বলছে, কুশনার নিজে ইহুদি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জামাই ডারেড কুশনারের পিতা। সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রনকে উদ্দেশ্য করে এক খোলা চিঠিতে মন্তব্য করেন তিনি। গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফ্রান্সে ইহুদিদের প্রতি বিদ্বেষ তীব্রভাবে বেড়েছে বলে দাবি করেন কুশনার। ইসরাইলের সমালোচনার প্রতিধ্বনি করে তিনি লিখেছেন, ফ্রান্সে প্রায়দিন রাস্তায় হামলার শিকার হতে হচ্ছে ইহুদিদের। সিনাগগ বা স্কুলে ভাঙচুর চলছে। ইহুদিদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হচ্ছে। এমনকি কিন্ডারগার্টেনেও ইহুদিবিদ্বেষী ঘটনার কথা আপনার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে।

তিনি ম্যাক্রনকে ইসরাইলবিরোধী সমালোচনা কমানোর আহ্বান জানান এবং বলেন, আমি প্রস্তুত আছি ফ্রান্সের নেতাদের সঙ্গে কাজ করে একটি কার্যকর পরিকল্পনা তৈরির জন্য। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ফ্রান্স এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। এগুলো একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। একই সঙ্গে তারা ভিয়েনা কনভেনশন ১৯৬১-এর কথা উল্লেখ করে জানায়, কোনো রাষ্ট্রদূতের বিদেশি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অনুমতি নেই। এই চিঠি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গেও মিলে যায়। গত সপ্তাহে ম্যাক্রনকে চিঠি লিখে নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়ার উদ্যোগ নিয়ে ম্যাক্রন ইহুদিবিদ্বেষ উসকে দিচ্ছেন।

ফ্রান্স আগামী সেপ্টেম্বরে ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়ার পরিকল্পনা করছে। ঘোষণার সময় ম্যাক্রন বলেন, আমাদের ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। তার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে এবং ইসরাইলকে পূর্ণ স্বীকৃতি দিয়ে ও নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে সবার নিরাপত্তায় অবদান রাখতে হবে। অন্য কোনো বিকল্প নেই। ম্যাক্রন আগেও প্রকাশ্যে বলেছেন, ইহুদিবিদ্বেষ ফরাসি মূল্যবোধের পরিপন্থি। এ কারণে গাজা সংঘাতের পর ইহুদিদের উপাসনালয় ও কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলে আক্রমণ চালায়। এতে প্রায় ১২০০ জন নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর জবাবে ইসরাইল গাজায় হামলা চালায়। সেখানকার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ইতিমধ্যে ৬২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। সম্প্রতি গাজা সিটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা পর্যবেক্ষক সংস্থা জানিয়েছে, অর্ধেকেরও বেশি মানুষ ক্ষুধা, নিঃস্বতা ও মৃত্যুর মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে আছেন। অন্যদিকে ইসরাইল এই প্রতিবেদনের সত্যতা অস্বীকার করে একে নির্লজ্জ মিথ্যা বলে দাবি করেছে।

ফিলিস্তিন নিয়ে সৌদি আরব এবার সাহস দেখাবে কি by বিল এমট

গত মাসে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ যখন ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, তখন ট্রাম্প বিষয়টিকে তুচ্ছ বলে মন্তব্য করেছিলেন। এরপর ব্রিটেনও একই পরিকল্পনার ঘোষণা দেয়। ট্রাম্প সেটিকেও গুরুত্ব দেননি। জার্মানি সম্প্রতি ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। ট্রাম্প সেই সিদ্ধান্তকেও আমলে নেননি।

বরং তিনি গত সপ্তাহে নেতানিয়াহুকে এবং নিজেকেও যুদ্ধাপরাধী নয়, বরং যুদ্ধনায়ক হিসেবে আখ্যা দিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে মতবিরোধ আরও স্পষ্ট করে তুলেছেন। একই সঙ্গে তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের আলাস্কা সফরের সময় তাঁকে ‘লালগালিচা’ সংবর্ধনা জানিয়ে তাঁর সঙ্গে যথেষ্ট সদয় আচরণ করেছেন।

ইউরোপীয় নেতারা যতই প্রশংসা বা চাটুকারিতার মাধ্যমে এসব বিরোধ আড়াল করার চেষ্টা করুন না কেন, তা প্রায়ই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুর ক্ষেত্রে সমস্যাটি ভিন্ন ধরনের। কারণ, এই বিরোধ আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই প্রকাশ্যে আসবে।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হবে ৯ সেপ্টেম্বর। সেখানে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ এবং ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, যদি এর আগে ইসরায়েল ও হামাস যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছাতে না পারে এবং ইসরায়েল ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি না দেয়, তবে তারা পরিষদে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে।

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি সম্ভব হলেও বর্তমান ইসরায়েলি সরকার যে দুই রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি কোনো প্রতিশ্রুতি দেবে, তার সম্ভাবনা নেই। মিসর ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির জন্য যে আলোচনা চলছে, তা নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে বলা হচ্ছে, এটি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে এটি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে ইসরায়েলের শর্তের ওপর, যা অনুযায়ী হামাসকে অস্ত্র জমা দিতে হবে।

যুদ্ধবিরতি আলোচনা নিয়ে সবচেয়ে আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি হলো, হামাস হয়তো ১৯৯০-এর দশকে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি বা আইআরএর মতো পথ বেছে নিতে পারে। হামাস নামটি আরবি একটি সংক্ষিপ্ত রূপ, যার পূর্ণরূপ ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স মুভমেন্ট।

আইআরএ সেই সময়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই ছেড়ে রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হয়েছিল। ইসরায়েলও হামাসের কাছ থেকে একই রকম পদক্ষেপ আশা করছে। যদি হামাস এ শর্ত মেনে নেয়, তবে তাদের পুরস্কার হিসেবে প্যালেস্টাইনি ন্যাশনাল কাউন্সিলের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। এটি চলতি বছরের শেষ নাগাদ হতে পারে।

তবে আইরিশ পরিস্থিতির সঙ্গে হামাসের তুলনা পুরোপুরি সঠিক নয়। ১৯৯৮ সালে আইআরএ শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করতে সম্মত হয়েছিল। তবে তারা শর্ত দিয়েছিল, এটি হবে কেবল চুক্তির অন্যান্য অংশ সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়নের পর। বাস্তবে আইআরএর অস্ত্র ধ্বংস বা জমা দিতে সাত বছরের বেশি সময় লেগেছিল এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডে এখনো অনেকে বিশ্বাস করে না, আইআরএ বা তাদের প্রোটেস্ট্যান্ট প্রতিদ্বন্দ্বীরা সব অস্ত্র ত্যাগ করেছিল। এ কারণেই ইসরায়েল দাবি করছে, হামাস যুদ্ধবিরতির আগে অস্ত্র জমা দিক, পরে নয়।

এখন মূল প্রশ্ন হলো, ইসরায়েলি সরকার গাজায় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে কত দিন আগ্রহী। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে পুতিনের মতোই নেতানিয়াহুরও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা রয়েছে বলে মনে হয়।

গত সপ্তাহে ইসরায়েলি সরকার পশ্চিম তীরে নতুন একটি বসতি স্থাপন পরিকল্পনা অনুমোদন দিয়েছে। এটি ওই অঞ্চলকে দুই ভাগে ভাগ করে দেবে। এই সিদ্ধান্ত দুই রাষ্ট্র সমাধানের প্রতি তাদের অবজ্ঞাকে স্পষ্ট করেছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করেছেন এবং বলেছেন এটি দুই রাষ্ট্র সমাধানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। জার্মানিও এই নিন্দায় যোগ দিয়েছে।

গাজায় যুদ্ধ এবং দুই রাষ্ট্র সমাধান নিয়ে নেতানিয়াহুর অবস্থান বদলানোর একমাত্র উপায় হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সরাসরি নিন্দা। কিন্তু এর কোনো ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। ফিলিস্তিন ইস্যুতে ট্রাম্পকে মনোযোগী করতে পারবে কেবল আরব দেশগুলোর নেতাদের প্রতিনিধিদল, যার নেতৃত্ব দিতে হবে সৌদি আরবকে।

তাই আগামী মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন অত্যন্ত সরব এবং বিতর্কিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং অন্যান্য দেশ যদি চায়, তাদের ফিলিস্তিন স্বীকৃতির সিদ্ধান্ত আরব রাষ্ট্রগুলোকে প্রভাবিত করুক, তবে তাদের জোরালো অবস্থান নিতে হবে।

সাধারণত আরব দেশগুলোর কূটনৈতিক ধরন সংযত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যদি আরব রাষ্ট্রগুলো সাহস দেখিয়ে ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা না করে, তবে গাজার যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠবে এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি কার্যকর সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বপ্ন চিরতরে দাফন হয়ে যাবে।

* বিল এমট, দ্য ইকোনমিস্ট–এর সাবেক সম্পাদক
- এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-26%2Fkay7sagt%2Ftrumpfinalreuters.jpg?rect=0%2C0%2C960%2C640&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গত মে মাসে রিয়াদে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: রয়টার্স