Showing posts with label সেলিনা হোসেন. Show all posts
Showing posts with label সেলিনা হোসেন. Show all posts

Wednesday, February 19, 2020

বইমেলার দিগন্ত-ছোঁয়া আকাশ by সেলিনা হোসেন

২০১৭ সালের ডিসেম্বরের ২১ তারিখে শুরু হয়েছিল খড়দহ বইমেলা। ১৮ বছর ধরে এই বইমেলা বছরে একবার আয়োজিত হচ্ছে। আমার কখনো এই বইমেলায় যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তবে এই বইমেলার খবর পত্রিকায় পড়েছি। যাদের এই বইমেলায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল তাদের কাছে বইমেলা সম্পর্কে গল্প শুনেছি। তারা ভালোলাগার কথাই বেশি করে বলত। আমার ধারণা হয়েছিল ছোট বইমেলার বড় পরিসর নিয়ে খড়দহ বইমেলা লেখক-পাঠকের প্রাণের বইমেলা হয়েছে। এ বছর মেলা আয়োজক কমিটি সিদ্ধান্ত নেন যে এখন থেকে বাংলাদেশের একজন লেখককে এই মেলার উদ্বোধনী দিনে আমন্ত্রণ জানান হবে। বইমেলা কমিটির সিদ্ধান্ত আমার পক্ষে আসে। বইমেলার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন শ্রী কাজল সিনহা। আমি উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য মানস চক্রবর্তীর কাছ থেকে আমন্ত্রণ পত্র পাই। খড়দহ বইমেলা দেখার সুযোগ আমি পাই। সেদিন মঞ্চে অনেকে ছিলেন। ছিলেন কথাসাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী। সবার বক্তৃতার পরে গান গেয়েছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন।
খড়দহ মেলার পরিসর অনেক বড় নয়। চারদিকের বসতির মাঝে একটি মাঠ ব্যবহৃত হয় এই মেলার জন্য। দেখলাম ৪০টি বইয়ের স্টল আছে। মাঠভর্তি মানুষের উপস্থিতি দেখে মনে হয়েছে ছোট বইমেলার বড় দিগন্ত। মেলাজুড়ে মানুষের উপস্থিতি বইয়ের হাত ধরে। এমন দৃশ্যটি আমার মাঝে সীমান্ত পেরিয়ে আসার আনন্দ আকাশ-ছোঁয়া করে ফেলে। এই বইমেলার যে বিষয়টি আমার আরও ভালো লেগেছে তাহলো ঘনবসতির মাঠে অনুষ্ঠিত মেলা মানুষের দোরগোড়ার আয়োজন। শিশুদের হাত ধরে বাবা-মায়েরা মেলায় আসছে। বই কিনছে। গাড়ি ভাড়া করে দূরে কোথাও যেতে হচ্ছে না। হাতের কাছে এত বই না কিনে কি উপায় আছে! দুচারটা তো কিনতেই হয়। এভাবে বইমেলার ছোট আয়োজনে মানুষ হাতের কাছে বই পায়। বই পৌঁছে যায় বড়দের কাছে, ছোটদের কাছেও। খড়দহ মেলা প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আমি প্রাণের টান অনুভব করি।
একজন লেখক হিসেবে বইমেলা আমার কাছে আপন অস্তিত্বের মতোই একটি বিষয়। বাংলা একাডেমিতে ৩৪ বছর চাকরি করে অমর একুশে গ্রন্থমেলা আমি দেখেছি খুব কাছে থেকে প্রতিদিন, প্রতিটি সময়ে। এর চরিত্র শুধু বই প্রকাশ এবং বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই বইমেলা ভাষা আন্দোলনের শহীদের রক্তে প্রতিষ্ঠিত বাংলা একাডেমি কর্তৃক আয়োজিত এবং একুশে ফেব্রুয়ারির উপলক্ষ হলেও সারা মাস জুড়ে বইমেলার আবেদন জাতীয় মননের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমি জানি না সারা মাস জুড়ে অন্য কোনো দেশে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় কি না। বাংলা একাডেমি আয়োজিত ফেব্রুয়ারি বইমেলাটি আমাদের একদম নিজস্ব বইমেলা। নিজেদের লেখক, নিজেদের প্রকাশনা এবং নিজেদের ভাষার পাঠকের মহাসম্মেলন এই মেলাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। জাতিসত্তার এমন অসাধারণ রাখিবন্ধন করেছে আমাদের অমর একুশে গ্রন্থমেলা।
এছাড়াও আমি বিভিন্ন সময়ে ভারতের তিনটি প্রদেশের বইমেলায় আমন্ত্রিত হয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। ১৯৯৬ সালে প্রথম যাই দিল্লিতে। ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ দিন ধরে চলেছিল এই মেলাটি। এটি ছিল দিল্লির দ্বাদশ বিশ্ব বইমেলা। মেলার থিম ছিল ‘সার্ক দেশসমূহ’। সার্কদেশসমূহের সাতজন লেখক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। মেলার উদ্বোধন করেছিলেন পাকিস্তানের কবি আহমদ ফরাজ। আমাকে দেয়া হয়েছিল ইংরেজি ও হিন্দি বইয়ের তালিকা (ক্যাটালগ) অবমুক্ত করার জন্য। সাতটি দেশের সাতজন লেখকই কিছু না কিছু করেছিলেন। বইমেলাটির আয়োজন করেছিল ‘ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া। আমার লিখিত ভাষণে আমি বলেছিলাম, ‘আমি মনে করি বইমেলা এমন সম্মেলনের ও অঙ্গীকারের প্রতীক, যা একটি বিশেষ দেশের সীমানাকে ছাড়িয়ে যায়। বই যেভাবে দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনা হ্রাস করে মানুষকে শান্তি ও সৌহার্দ্যরে পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তেমনটি আর কিছু পারে বলে আমি মনে করি না এবং বইমেলাই আমি বিশ্বাস করি, মারণাস্ত্র, সামরিক শাসন, স্বৈরাচার, অসাম্য এবং অন্য যা কিছু মানুষকে মানুষ হিসেবে খর্ব করে, তার বিরুদ্ধে শপথ উচ্চারণ করার এবং নিজেদের আত্মাকে বিকিয়ে না দেয়ার জন্য অঙ্গীকার ঘোষণার সর্বোত্তম সুযোগ এনে দেয়। এই বিশ্বমেলা আয়োজনের জন্য আমি ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়াকে অভিনন্দন জানাই।’ মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল দিল্লির প্রগতি ময়দানে। পাশাপশি বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান। অসংখ্য লেখক, অজস্র বই আমার জন্য ছিল এক বিপুল অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন দেশ থেকে, বিশেষ করে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লেখক এবং প্রকাশকরা আমার মনোযোগ কেড়েছিল। তাদের সঙ্গে কথা বলে আমি অনেক কিছু জানতে পারি। মোজাম্বিক থেকে এসেছিলেন একজন নারী, তার নামটা ভুলে গেছি, তিনি অত্যন্ত কর্মনিষ্ঠ মহিলা। তার নিজের প্রকাশনা সংস্থা ছিল এবং আফ্রিকার কোনো একটি বইয়ের সংগঠনের তিনি সভাপ্রধান ছিলেন।
ওয়াইএমসিএ’র গেষ্ট হাউসে আমরা একসঙ্গে ছিলাম। তার প্রকাশনা সংস্থা থেকে বেশ কয়েকটি বই কিনি। পরিচয় হয়েছিল দিল্লির ‘কালি ফর উইম্যান’-এর স্বত্তাধিকারী উর্বশী বুটালিয়ার সঙ্গে। তার সংস্থাটি সে সময়ে নারী বিষয়ে বই প্রকাশের জন্য বেশ নাম করেছিল। উর্বশী এখন জুবান (Zuban) নামে প্রকাশনা সংস্থা চালায়। প্রগতি ময়দান একটি বিশাল এলাকাজুড়ে, অনেক সময় এই মাথা থেকে ঐ মাথায় যেতে গাড়ি ব্যবহার করছিল মেলা কর্তৃপক্ষের লোকজন। অন্যথায় সাধারণের জন্য গাড়ি প্রবেশ নিষেধ। ব্যাংক, পোস্ট অফিস, টেলিফোন অফিস ইত্যাদিসহ প্রয়োজনীয় সবকিছুই ছিল সে মেলা প্রাঙ্গণে। পরে শুনেছিলাম এই ময়দানটি বিভিন্ন ধরণের মেলা আয়োজন করার জন্য স্থায়ী জায়গা। প্রগতি ময়দানে গিয়ে পরিচিত হওয়ার অসংখ্য মানুষ এখনো আমার স্মৃতির এক গভীর সঞ্চয়। বইমেলা আমার জন্য দেশের সীমানা তুলে দিয়েছিল প্রত্যক্ষভাবে।
পরে যে বইমেলাটি আমাকে টেনেছে সেটি হলো ‘আগরতলা বইমেলা। ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত হয় অষ্টাদশ আগরতলা বইমেলা।
ঐ বইমেলায় উপস্থিত থাকার জন্য আমি নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম ত্রিপুরা সরকারের তথ্য, সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রী জীতেন্দ্র চৌধুরীর কাছ থেকে। বইমেলা আয়োজিত হয়েছিল ‘রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবন’ প্রাঙ্গণে। বইমেলার উদ্বোধক ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী কবি অনিল সরকার। বিশেষ অতিথি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গ্রন্থাগার মন্ত্রী নিমাই পাল এবং ত্রিপুরার প্রবীণ কথাসাহিত্যিক বিমল চৌধুরী। প্রদীপ জ্বালিয়ে বইমেলা উদ্বোধন করা হলে সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে উঠে পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে আলোর মালা। অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলা ও ককবরক ভাষায় রবীন্দ্রনাথ লিখিত জাতীয় সঙ্গীত পরিবশেন করে শিল্পীরা। আয়োজনটি ছোট ছিল কিন্তু প্রাণের আবেগে ভরপুর ছিল। স্থানীয় লেখকরা আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। তাদের আলোচনা থেকে ত্রিপুরা সাহিত্যের একটি ধারণা পাওয়া যায়। কয়েকদিন ত্রিপুরা থেকে তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে বইমেলার আবহকে আমার একটি ভিন্নমাত্রার অনুষঙ্গ মনে হয়েছিল। ছোট আয়োজনটি মাতিয়েছিল অনেক বেশি করে।
কলকাতার বইমেলায় আমি অনেকবার গিয়েছি। এই বইমেলাটিও আমার জন্য অনেক বড় একটা স্মৃতি হয়ে আছে। কারণ, মাতৃভাষায় লেখা বই কিন্তু অন্যদেশ ও সংস্কৃতির মানুষের কথা তাই এই বইমেলায় যেতে তাগিদ অনুভব করি। ১৯৯৯ সালে কলকাতা বইমেলার থিম ছিল ‘বাংলাদেশ’। আমাকেও একটি প্রবন্ধ পড়তে হয়েছিল। সেবার গড়ের মাঝে বইমেলা হয়েছিল।
এই মেলায় একটুখানি ধাক্কা খাই, কারণ প্রতিষ্ঠিত লেখকরা ভালো ব্যবহার করেননি। বাংলাদেশ থিম কান্ট্রি হলেও বাংলাদেশের লেখকদের আলোচনা অনুষ্ঠানের সময় তারা মেলায় উপস্থিত থেকেও আড্ডা দিয়েছেন অন্যত্র। মনে হয়েছিল, লেখকদের সঙ্গের দরকার নেই। বই কেনা হোক আনন্দের। লেখকদের উদাসীনতা দেখে ভেবেছিলাম এই বইয়ের প্রাচুর্য কিন্তু লেখকদের হৃদয় খোলা নয়। বই চাই, লেখকের উষ্ণতা চাই না এটা তো হয় না, যেটা আমি দিল্লি কিংবা আগরতলায় পাইনি।
দিল্লি এবং আগরতলায় যেসব লেখকের সঙ্গে দেখা হয়েছে তারা বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। সালটা মনে নেই, মনে আছে কোনো এক সময়ে ঢাকার ‘মুক্তধারা’র স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজের বইয়ের পসরা বসিয়েছিলেন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। ঘাসের উপর চট বিছিয়ে রেখে দেয়া বইগুলো ফুলের মতো ফুটেছিল।
পাঠক উবু হয়ে বসে বই দেখেছিলেন। মনে হচ্ছিল এ এক অন্য জগৎ। এই মেলাকে আস্তে আস্তে বড় হতে দেখেছি। স্টল তৈরি হতে দেখেছি। ছোট পরিসরে মেলার আয়োজন দেখেছি। এসব সত্তর দশকের কথা। মানুষের ভিড় কম ছিল। স্টলের সংখ্যা কম ছিল। ঘুরে ঘুরে বই দেখার আনন্দ ছিল বেশি। বই খুঁজতে ঠেলাঠেলি করতে হয়নি। অনায়াসে পেয়ে যেতাম নিজের পছন্দের বই।
আশির দশকে মেলার বড় পরিবর্তন হয়। ১৯৮৪ সালে বইমেলার আনুষ্ঠানিক নাম রাখ হয় ‘অমর একুশে বইমেলা।’ এ বছর একাডেমি প্রাঙ্গণের বিভিন্ন জায়গায় মাটি ফেলে ভরাট করে মেলার আয়তন বাড়ানো হয়। মাটি ফেলা হয় পুকুরের পশ্চিম পাড়ে। ভরাট করা হয় বর্ধমান ভবনের উত্তর ও ক্যাফেটেরিয়া ভবনের দক্ষিণ দিক। আশির দশকে এটি একটি দিক ছিল যে মেলার আয়তন বাড়ানো। আরেকটি দিক ছিল এই বছরে মেলার দিনও বাড়ানো হয় ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আগে একুশের বইমেলার সময় ছিল মাত্র কয়েকদিন। এ সময়ের বইমেলা উদ্বোধন করতেন দেশের বরণ্যে কেউ।
মেলার এমন পরিবেশে বিশ্বাস করতাম বইমেলা মানুষের সাংস্কৃতি চেতনাকে পরিশীলিত করে। তথ্য প্রযুক্তির এই সময়েও বলতে চাই বইয়ের বিকল্প নেই। বড় করে শ্বাস নিলে একুশের চেতনায় প্লাবিত হয়ে থাকা মেলা প্রাঙ্গণ জাতির ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ জায়গা।
নব্বইয়ের দশকে বইমেলা আরো বড় হয়। বইমেলা উদ্বোধন করতে আসেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। এখন পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। এই অনুষ্ঠান বিভিন্ন চ্যানেলে সরাসারি প্রচারের ব্যবস্থা করার ফলে দেশের দূর অঞ্চলের মানুষ দেখতে পাচ্ছে।
প্রতিদিন বইমেলার খবর প্রচারিত হয় দৈনিক পত্রিকা ও ইলেক্ট্রনিক চ্যানেলে। এভাবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের নানা কর্মকাণ্ড একুশের বইমেলাকে সম্প্রসারিত করেছে। ফলে সমস্যা দেখা দিয়েছে জায়গার। তাই প্রশ্ন উঠেছে বইমেলাকে অন্য কোথাও সরিয়ে নেয়া যায় কিনা তা ভেবে দেখার জন্য। বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী ময়দানের বিশাল প্রাঙ্গণ জুড়ে বইমেলা আয়োজিত হয়।
আরও একটি বইমেলার কথা উল্লেখ করতে চাই। এই বইমেলার আয়োজন করেছিল আদিবাসী মান্দি জনগোষ্ঠী। বইমেলার স্লোগান ছিল ‘বই হোক মান্দিদের আত্মবিকাশের মন্ত্র।’ আত্মবিকাশের অর্থ অনেক বড়, আমি মনে করি বইমেলা দিয়ে শুধু বই কেনা বা পড়ার অভ্যাসটা গড়ে তোল নয়। এর অর্থ নিজের বিকাশকে পূর্ণাঙ্গ করা। ব্যক্তিমর্যাদাকে বিকশিত করা এবং জাতিগোষ্ঠীর মর্যাদাকে রাষ্ট্রীয় অধিকার আদায়ের মধ্য দিয়ে সমুন্নত করা। বই আত্মবিকাশের সহায়ক শক্তি। আজকের এই আলোকিত মুখের কাছে আমার দাবি, তারা তারুণ্যপ্রদীপ্ত হয়ে বইয়ের মাধ্যম নিজেদের যোগ্য করে তুলবে।
মান্দী ভাষার উদীয়মান তরুণ কবি মিঠুন রাকসাম যখন এই বইমেলার আয়োজন করে, এটি কোনো সামান্য ঘটনা নয়, এটি একটি শুভ, বি-শা-ল ঘটনা। আমরা যখন বলব যে আমাদের বৈচিত্র্য আছে, আমাদের জাতিসত্তার মধ্যে যে বৈচিত্র্য আছে, যাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে সারা বিশ্বের দরবারে যেতে পারবে, বলতে পারবে- এই আমি, এই আমার মান্দি জনগোষ্ঠী, এই আমি, এই আমার আইন, এই আমার ইতিহাস, এই আমার ঐতিহ্য, এই আমার গল্প, এই আমার কবিতা, এই আমার নাটক, এই আমার পাহাড়, মধুপুরের গড়, পর্বত-জঙ্গল সবকিছুর ভেতরে আমাদের অস্তিত্ব আছে। এই অস্তিত্বের যে ভবিষ্যৎ নিয়ে আজকের বইমেলার শুরু, উদ্বোধন তার ভেতর দিয়ে।
বই কোনো একটি কাগজের পাতা নয়, বই কোনো একটি দুই মলাটের কোনো কিছু নয়, বই একটি অসাধারণ শক্তি। আমি মনে করি, আজকের প্রযুক্তির দিনে, বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট, ইমেইল, মোবাইল, সবকিছুর পরও বই আমাদের সেই শক্তি, যে শক্তির ভেতর দিয়ে আমরা আমাদের নিজেদের আবিষ্কার করতে পারি। প্রতিটি লেখা প্রতিটি অক্ষর আমাদের জীবন হয়ে থাকবে।
ইদানিং বাংলাদেশের প্রকাশকরা বিভিন্ন স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বইমেলার আয়োজন করে। তাদের লক্ষ্য ছেলেমেয়েদের হাতের নাগালে বই পৌঁছে দেয়া। একবার ছায়ানট ভবনের নালন্দা স্কুলে আয়োজিত হয়েছিল বইমেলা। আমি আমন্ত্রিত অতিথি ছিলাম। দেখলাম ছেলেমেয়েরা বই কিনছে। ষষ্ঠ শ্রেণির একটি মেয়ে আমার ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসটি এনে আমাকে বলল, ‘আপনার এই বইটি আমাকে দিতে হবে। আমার কাছে যে টাকা ছিল তা শেষ হয়ে গেছে।’ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি বই আর বইমেলার বিষয়টি গভীর ভালোবাসায় দেখতে পাই। আমি ওর মাথায় হাত রেখে বলি, ‘মাগো তোমার যে বই ভালোলাগে তা নাও। টাকার কথা ভাবতে হবে না।’ একটি বইয়ের জন্য ও দাবী জানিয়েছে, আবদার করেনি। বইমেলার সার্থকতা এখানে।
এমন অনেক ছোট ছোট বইমেলার নানা অভিজ্ঞতা আমার আছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে গিয়েছিলাম হুগলির কোন্নগরের নবগ্রাম হীরালাল পাল কলেজে। অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল কলেজের বাংলা বিভাগ। হুগলি শহরে অনেক ছোটবড় বইমেলা দেখে প্রাণমাতানো আনন্দ নিয়ে দেশে ফিরে আসি। বারবারই ভাবি এভাবে বইমেলা মানবজীবনের প্রগতির ধারাকে অক্ষুণ রাখবে। জনজীবনের অধিকারের লড়াইয়ে প্রেরণা দেবে।
জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষা রক্ষার সহায়ক শক্তি হবে। যত ছোট আকারের হোক না কেন কোনো জনগোষ্ঠীর ভাষা বিলুপ্ত হবে না। বইমেলা ধারণ করবে মানবজাতির সৃজনশীল মেধা। বিকশিত হবে জ্ঞান। চর্চিত হবে শুভ ও কল্যানের বোধ।
২০১৯ সালের ৫ জানুয়ারি খড়গপুর বইমেলায় আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় অনুষ্ঠিত এই মেলা আমার সামনে আর এক দিগন্ত। লেখক-পাঠকের মিলনমেলায় স্নাত হই। নিজের বইয়ের নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় পাঠককে।
আমরা সবাই জানি বইয়ের সীমান্ত নেই। সীমান্ত ছাড়িয়ে বই পৌঁছে যায় মানুষের কাছে। এশিয়ার মানুষ হয়ে জানতে পারি আফ্রিকার সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের রূপরেখা। জানতে পারি ইউরোপ-আমেরিকা-ল্যাটিন আমেরিকার জীবন। বই মানবজাতির অক্ষয় সাধনা।

Friday, August 9, 2019

রবীন্দ্রনাথ, বাঁশি ও বাংলার সুর by সেলিনা হোসেন

কৈশোর এবং যৌবনের এই মধ্যবর্তী সময়ে রচিত ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ কাব্যগ্রন্থে বাঁশি একটি বিশিষ্ট উপাদান। এ বাঁশি কৃষ্ণের বাঁশি। তারপরও রবীন্দ্রনাথ একই সূচনায় লিখেছেন, ‘পদাবলী শুধু কেবল সাহিত্য নয়, তার রসের বিশিষ্টতা বিশেষ ভাবের সীমানার দ্বারা বেষ্টিত।

বাঁশি বাংলার সংস্কৃতিতে নিজস্ব সুর। বাঁশির সুর আমাদের জীবনে একটি অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। আমার বিবেচনায় তার কারণ মূলত তিনটি। এক. আমাদের বাঁশির গঠনের বিশিষ্টতা। সাধারণ মানুষের হাতে তৈরি এ বাঁশি একদিকে জীবিকার উপকরণ, অন্যদিকে সাধারণের মধ্যে অসাধারণ। আমাদেরই মাটিতে জন্মানো বাঁশ দিয়ে তৈরি, কিন্তু পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় যে ধরনের বাঁশি ব্যবহৃত হয় সেগুলোর মতো নয়। দুই. আমাদের লোকসঙ্গীতে দুটি যন্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়- বাঁশি ও একতারা। আমাদের লোকসঙ্গীতের একটি বিশেষ ধারায় বাঁশি প্রাধান্য লাভ করে। সে ধারাটি ভাটিয়ালি গানের ধারা। তিন. আমাদের পুরাণ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে বাঁশির যোগ আছে। এর প্রমাণ শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি। শ্রীকৃষ্ণের বাঁশিতে রাধা আকুল হন। সে বাঁশির সুরে নারী-পুরুষের সম্পর্কের অনুষঙ্গ থাকে, আধ্যাত্মিকতার গভীরতা থাকে এবং সে বাঁশির সুর যুগ-যুগান্তর পেরিয়ে এখনো আমাদের মনোজগতে ধ্বনিত হয়।
বাঁশি-সংক্রান্ত যে ঐতিহ্য রবীন্দ্রনাথ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন, সে ঐতিহ্যকে তিনি তাঁর নিজস্ব দর্শন, অনুভবের প্রতীকে পরিণত করেন। রবীন্দ্রনাথের বাঁশি জীবনের অপূর্ণতাকে পূর্ণতার সমান্তরালে স্থাপন করে আমাদের। কবির উপলব্ধির মধ্য দিয়ে এসব কবিতার সত্য মানুষকে জীবন-উপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথের বাঁশি লৌকিক এবং অলৌকিক অনুভবের আলোছায়ায় সম্পৃক্ত করে আমাদের। আমরা তাঁর রচনায় কখনো দৃশ্যমান বাঁশির সুর শুনি, কখনো অনুক্ত উচ্চারণে সে সুর আমাদের মাঝে জেগে থাকে। তার বাঁশির সুর শুধু ব্যক্তি জীবনকে নয়, ভেঙে দেয় ব্যক্তি জীবনের গণ্ডিকে। সে বাঁশি সমষ্টির হয়। কখনো দিকনির্দেশনারও কাজ করে।
ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি কাব্যগ্রন্থের সূচনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘বোম্বাইয়ে মেজদাদার কাছে যখন গিয়েছিলুম তখন আমার বয়স ষোলোর কাছাকাছি, বিলাতে যখন গিয়েছি তখন আমার বয়স সতেরো। নতুন-প্রকাশিত পদাবলি নিয়ে নাড়াচাড়া করছি, সে আরো কিছুকাল পূর্বের কথা। ধরে নেয়া যাক, তখন আমি চোদ্দোয় পা দিয়েছি।’
কৈশোর এবং যৌবনের এই মধ্যবর্তী সময়ে রচিত ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ কাব্যগ্রন্থে বাঁশি একটি বিশিষ্ট উপাদান। এ বাঁশি কৃষ্ণের বাঁশি। প্রেমের প্রতীক, জীবনের আর্তি। তারপরও রবীন্দ্রনাথ একই সূচনায় লিখেছেন, ‘পদাবলী শুধু কেবল সাহিত্য নয়, তার রসের বিশিষ্টতা বিশেষ ভাবের সীমানার দ্বারা বেষ্টিত। সেই সীমানার মধ্যে আমার মন স্বাভাবিক স্বাধীনতার সঙ্গে বিচরণ করতে পারে না। তাই ভানুসিংহের সঙ্গে বৈষ্ণবচিত্তের অন্তরঙ্গ আত্মীয়তা নেই। এই জন্য ভানুসিংহের পদাবলী বহুকাল সংকোচের সঙ্গে বহন করে এসেছি। একে সাহিত্যের একটা অনধিকার প্রবেশের দৃষ্টান্ত বলেই গণ্য করি।’
প্রথম গানটি লিখেছিলুম একটা স্লেটের উপরে, অন্তঃপুরের কোণের ঘরে-
‘গহনকুসমকুঞ্জমাঝে
মৃদুল মধুর বংশি বাজে।’
‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ কাব্যগ্রন্থে বাঁশি উপস্থাপিত হয়েছে সরাসরি- তার সুর এবং সুরের ব্যঞ্জনা নিয়ে।
যেমন :

ছয় সংখ্যক পদাবলী : ইতি ছিল নীরব বংশীবটতট,
কথি ছিল ও তব বাঁশি?
সাত সংখ্যক পদাবলী : শুন সখি, বাজত বাঁশি
গভীর রজনী, উজল কুঞ্জপথ
চন্দ্রম ডারত হাসি।

এমনকি উনিশ সংখ্যক পদাবলী, যার শুরু : মরণ রে,/ তুহুঁ মম শ্যাম সমান- এই পদাবলীতে বাঁশি এসেছে এভাবে :
দূর সঙে তুহুঁ বাঁশি বজাওসি,
অনুখন ডাকসি, অনুখন ডাকসি
রাধা রাধা রাধা!

আগেই বলেছি শ্রীকৃষ্ণের এই বাঁশি রবীন্দ্রনাথকে অনুপ্রাণিত করেছিল। অন্তঃপুরের কোণের ঘরে বসে স্লেটের উপর লেখা দুটি পঙ্ক্তির মধ্যে যে বাঁশি তিনি বাজিয়েছিলেন, পরবর্তী জীবনে সে বাঁশিকে আরও বিচিত্রতর করেছেন।

‘পুনশ্চ’ কাব্যে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা আছে, তার নাম ‘বাঁশি’। এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বাঁশির সুরকে নানা প্রতীকী ব্যঞ্জনায় ব্যবহার করেছেন। এই ব্যবহার কখনো সরাসরি, কখনো অনুচ্চারিত। তিনি আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানির মধ্যে কোনো তফাৎ খুঁজে পাননি। কেননা মৃত্যু নামক সত্যের কাছে বাদশা কিংবা সাধারণ মানুষের কোনো পার্থক্য নেই। মৃত্যুর বাস্তবতা অভিন্ন। এক বৈকুণ্ঠের দিকে সবাইকেই যেতে হয়। তিনি বলেন : ‘আকবর বাদশার সঙ্গে/হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই/বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে/ছেঁড়াছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে এক বৈকুণ্ঠের দিকে।’
মৃত্যুর সঙ্গে বাঁশির এই যোগ আমাদেরকে অর্ফিয়াসের বাঁশির কথাও মনে করিয়ে দেয়। প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যু হলে অর্ফিয়াস পাতালের দেবতাকে খুশি করেছিলেন বাঁশি বাজিয়ে। বাঁশির সুরে মুগ্ধ দেবতা অর্ফিয়াসের স্ত্রীকে মর্ত্যে ফিরিয়ে দেয়ার আবেদন মঞ্জুর করেন। শর্ত ছিল পাতালের দরজা পার হওয়ার আগে পর্যন্ত অর্ফিয়াস পেছন ফিরে তাকাতে পারবে না। কিন্তু পাতালের দরজা পার হওয়ার আগে নিজেকে সামলাতে পারেনি অর্ফিয়াস। ভাবে, পিছে পিছে আসছে তো ইউরিডাইস? মুহূর্তে ঘুরে তাকালে শর্ত ভঙ্গের অপরাধে অদৃশ্য হয়ে যায় ইউরিডাইস। বুক-ভাঙা আর্তনাদ নিয়ে ফিরে আসে অর্ফিয়াস। বেদনার এক অদৃশ্য বাঁশির সুর ঘিরে থাকে অর্ফিয়াসকে। ‘বাঁশি’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথও বেদনার এক হিম-শীতল অনুভব ছড়িয়ে দিয়ে শেষ করলেন এভাবে :

‘এ গান যেখানে সত্য/অনন্ত গোধূলিলগ্নে/সেইখানে/বহি চলে ধলেশ্বরী; তীরে তমালের ঘনছায়া; আঙিনাতে/ যে আছে অপেক্ষা করে, তার/পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।’
এই পঙ্ক্তির মধ্যেও অদৃশ্য বাঁশির করুণ সুর আছে, সেটা অলৌকিক বাঁশি- এ বাঁশি অনন্ত গোধূলিলগ্নে বাজে, যার কাল পরিসীমা নেই, যে বেদনা মানুষের জীবনের চিরসত্য, রবীন্দ্রনাথ বাঁশির সঙ্গে তার যোগ সবচেয়ে বেশি নিবিড় দেখেছেন। ‘ঘরেতো এলো না সে তো, মনে নিত্য আসা যাওয়া/পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।’
কেন ‘বাঁশি’ কবিতায় এমন গভীর কষ্ট? বাঁশি ছাড়া কি অন্য নাম হতে পারতো না কবিতাটির? ‘কিনু গোয়ালার গলি’ দিয়ে যে কবিতার শুরু সেটা শেষ হয়েছে ধলেশ্বরী নদীর পাড়ের একটি গ্রামে একজন অপেক্ষারত নারীর ছবির মধ্যে। বাঁশির সুর যে রূঢ় বাস্তব ভুলিয়ে দিতে পারে এবং এক স্বপ্নময়, ছায়াময়, মোহময় জগতে তার উত্তরণ ঘটাতে পারে, এই বোধই এই কবিতাকে পাঠকের মনের কাছে নিয়ে যায়। এই ‘বাঁশি’ রবীন্দ্রনাথের নিজের।
‘পলাতকা’ কবিতায় একটি পোষা হরিণ এবং পাহাড় থেকে আনা একটি কুকুরছানা এক সঙ্গে খেলে বেড়ায় এবং বড় হতে থাকে। এর মধ্যে হঠাৎ করে একদিন ফাল্গুন মাসে দক্ষিণের পাগল হাওয়া বইতে শুরু করে এবং হরিণ যেন কার উদাস করা বাণী হঠাৎ শুনতে পায়। তারপর একদিন বিকেলবেলায় হরিণ মাঠের পর মাঠ পার হয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।
‘সম্মুখে তার জীবনমরণ সকল একাকার/অজানিতের ভয় কিছু নেই আর।’
হরিণের বুকে বহু যুগের ফাল্গুন দিনের সুরে বাঁশি বেজে ওঠে এবং কোথায় কোনদূরে তার আপনজন আছে তার খোঁজে সে বেরিয়ে পড়ে এবং কখনো আর ফেরে না। এই কবিতায় বসন্তের সঙ্গে বাঁশি এক হয়ে যায় এবং বসন্তের ডাক প্রেমের যে অনুভব সৃষ্টি করে তা এই কবিতার মুখ্য বিষয় হয়ে যায়। এখানে প্রকৃতির একটি বিশেষ তাৎপর্য আছে। বসন্তের বাঁশি যখন প্রকৃতিতে বেজে ওঠে তখন তা কেবল মানুষকে আকুল করে না, সমস্ত প্রকৃতিকেই বিহ্বল করে দেয়। এই বিহ্বল করে দেয়ার মধ্য দিয়ে বাঁশি এই কবিতায় একটি বিশেষ মাত্রা লাভ করে।
রবীন্দ্রনাথের একটি গান এমন : ‘আমার একটি কথা বাঁশি জানে, বাঁশিই জানে/ভরে রইল বুকের তলা, কারো কাছে হয়নি বলা/কেবল বলে গেলেম বাঁশির কানে কানে।’
বাঁশি এখানে মানুষ, তার ওপর ব্যক্তিত্ব আরোপ করা হয়েছে। এ বাঁশির কান আছে। বুকের ভেতরের যে কথাটি অন্য কাউকে বলা যায় না, তা বাঁশিকে বলা যায়, অর্থাৎ বাঁশির সুরে সেই না বলা কথা ঘন যামিনীর মাঝে ফুটে ওঠে। এভাবে একটি ভাবনা থেকে আর একটি ভাবনায় প্রবেশ করা যায়, যেখানে বাঁশি অদৃশ্য। কিন্তু আপাত সরল অর্থের অন্তরালে মনে হয় বাঁশিকে যে ব্যক্তি ভেবে নিজের কথা বলে সে নারী। বাঁশি এ গানে নারী-জীবনের প্রতীক। যেন বাঁশি নিজেই এখানে বাঁশিওয়ালার ভূমিকা পালন করছে।
রবীন্দ্রনাথের ‘শ্যামলী’ কাব্যগ্রন্থে একটি কবিতার নাম ‘বাঁশিওয়ালা’। একে যদি আমি নারীবাদী কবিতা বলি তাহলে কি ভুল বলা হবে? এই কবিতায় বাঁশির সুর শুনে একটি নারীর জেগে ওঠার কথা তিনি জানিয়েছেন। বলছেন : ‘তোমার ডাক শুনে একদিন/ঘরপোষা নির্জীব মেয়ে/অন্ধকার কোণ থেকে/বেরিয়ে এল ঘোমটা খসা নারী।’
এ নারী রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে দেখা মানুষ। তার পরিচয় এমন : ‘আমি তোমার বাংলাদেশের মেয়ে। সৃষ্টিকর্তা পুরো সময় দেননি/আমাকে মানুষ করে গড়তে/রেখেছেন আধাআধি করে।’
যখন বাঁশিওয়ালা বাঁশি বাজায় তখন এই মেয়ে শুনতে পায় তার নতুন নাম। তার বেলা কাটে না। জোয়ার-জলের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। মুক্তিপারের খেয়া তার সামনে দিয়ে ভেসে যায়, ভেসে যায় ধনপতির ডিঙা। তার সামনে দিয়ে চলতি বেলার আলোছায়াও ভেসে যায়। তখন সে শুনতে পায় বাঁশির ডাক। বলে, ‘এমন সময় বাজে তোমার বাঁশি/ভরা জীবনের সুরে/মরা দিনের নাড়ির মধ্যে/দবদবিয়ে ফিরে আসে প্রাণের বেগ।’
বাঁশিওয়ালাকে তার প্রশ্ন, ‘কী বাজাও তুমি।’ তার ধারণা সেই সুর অন্যের মনে হয়তো কোনো ব্যথা জাগায়, কিন্তু ও নিজে শুনতে পায় দক্ষিণা হাওয়ার নবযৌবনের গান। শুনতে শুনতে ওর মনে হয়- ‘যে ছিল পাহাড়তলির ঝিরঝিরে নদী/তার বুকে হঠাৎ উঠেছে ঘনিয়ে/শ্রাবণের বাদলরাত্রি।’
বাঁশির সুর এভাবে তাকে সাহসী নারী করে তোলে। সকালে উঠে সে নিজের ভেতর দেখতে পায় ঝিরঝিরে নদীর পরিবর্তন। যে নদীর প্রবল স্রোত পাড় ভেঙে ফেলছে এবং পাথরগুলো ঠেলে সরিয়ে ফেলতে চাইছে। সে বাঁধভাঙা জোয়ারের তাড়নায় অনুভব করে :
‘আমার রক্তে নিয়ে আসে তোমার সুর।/ঝড়ের ডাক, বন্যার ডাক/ আগুনের ডাক/পাঁজরের উপরে আছাড় খাওয়া/মরণসাগরের ডাক/ঘরের শিকল-নাড়া উদাসী হাওয়ার ডাক।’

পর মুহূর্তে পাল্টে যায় বাঁশির প্রতীক- কবি বলেন ‘বজ্রে, তোমার বাজে বাঁশি, সে কি সহজ গান/সেই সুরেতে জাগব আমি, দাও মোরে সেই কান’- একদম ভিন্ন চিত্রকল্প। এ বাঁশি জীবনের ভিন্ন একটি দিককে উদ্ভাসিত করে। ‘অশান্তির অন্তরে যেথায় শান্তি সুমহান’- সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বাঁশি প্রতিবাদী সুরে বেজে ওঠে।
গীতবিতানে অসংখ্য গানে রবীন্দ্রনাথ বাঁশির প্রতীক, বাঁশির চিত্রকল্প নানা ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করেছেন। ব্যক্তি থেকে সমষ্টি, সমষ্টি থেকে জাতি, জাতি থেকে দেশ সর্বত্র রবীন্দ্রনাথের বাঁশির সুর প্রবাহিত হয়ে গেছে। এ বাঁশি বাংলার, এ বাঁশি বাঙালির।
যখন বলেন, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি/চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস/আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি’- তখন জগৎ-সংসার তোলপাড় করে। ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে চলে যায় অনুভবের তীব্রতা। মাটি থেকে, প্রকৃতি থেকে, লোকালয় থেকে প্রতিটি মানুষের হৃদয় মথিত হয়ে যে শব্দ বেরিয়ে আসে তার নাম দেশপ্রেম। রবীন্দ্রনাথের বাঁশি দেশপ্রেমের প্রতীক।
বাঁশিকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা, এমন কি বাঁশির উল্লেখ পর্যন্ত করা, কোনো কবির অবশ্য কর্তব্য হতে পারে না। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও এটি অবশ্য কর্তব্য ছিল না। তবু রবীন্দ্রনাথ বাঁশিকে তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেছেন, বাঁশিকে প্রতীক করে তুলেছেন এবং বাঁশির চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে মানব হৃদয়ের গভীর অনুভব ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। বাংলা ভাষায় অন্য যাঁরা কবিতা রচনা করেছেন, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের সমকালে কিংবা তাঁর পরবর্তীকালে, তাঁদের মধ্যে খুব বেশি সংখ্যক কবি বাঁশির এ ধরনের ব্যবহার করেছেন বলে আমার জানা নেই।
রবীন্দ্রনাথ একান্তভাবেই বাংলার ও বাঙালির কবি। বিশ্বের নানা বিষয় অনুভবে ধারণ করা সত্ত্বেও তিনি বিশেষভাবে বাংলারই কবি। অন্যদিকে, বাঁশি বাংলার প্রাণের সুরকে বিশেষভাবে ধারণ করে, এটিই সম্ভবত প্রধান কারণ। যার জন্য রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বাঁশি একটি বিশেষ স্থান লাভ করেছে। অন্য কথায় রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বাঁশি বাংলার প্রাণের সুরকে ধরে রাখে।
বাংলার জীবন বাঁশির চিত্রকল্পের ভেতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথের গানে, কবিতায়, গদ্য রচনায় বারবার ব্যবহৃত হয়েছে। বাঁশিকে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্বের একটি মূল বিষয় এখানে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। তিনি আবহমানতাকে, ঐতিহ্যকে, আশপাশের পরিচিত জগতকে আত্মস্থ করে নেন এবং তাদের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই নিজের কণ্ঠস্বরকে স্থাপন করেন। এ কারণে বাংলার প্রতিদিনের সুর রবীন্দ্রনাথের নিজের সুর হয়েও বাংলার চিরায়ত সুর হয়, আবার রবীন্দ্রনাথের সুর হয়েও স্রোতস্বিনীর মতো বাংলার সুরই থেকে যায়। এজন্য রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে সব সময়ের মতো নতুন হয়ে থাকেন।