Saturday, February 14, 2026

সংস্কার বাস্তবায়নে সব দলের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা আছে: -আলী রীয়াজ

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আইনি বিবেচনার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাকেই বড় করে দেখছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, ‘আইনগত বিবেচনার চেয়েও রাজনীতিতে প্রথম এবং প্রধান বিবেচনাটা আপনাকে রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। …আমরা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, জনরায় হয়েছে, আবার রাজনৈতিক দলের প্রতিও জনগণের সমর্থন দেখা গেছে। ফলে এর মধ্যে একটি সমন্বয় করতে হবে। সমন্বয়ের দায়িত্বটা রাজনীতিকদের।’

আজ শনিবার সকালে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আলী রিয়াজ এ কথা বলেন। সদ্য অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফলের বিষয়ে জানাতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার গঠন করতে যাওয়া দল বিএনপির কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আলী রীয়াজ বলেন, সার্বভৌম জনগণের অভিপ্রায় হিসেবে এই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলেরই এ বিষয়ে নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা আছে। তিনি বলেন, ‘কেবল লিখিত আইনের বিবেচনার চেয়ে রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে সেভাবেই বিবেচনা করবেন বলে আশা করি।’

আলী রিয়াজ আরও বলেন, গণভোটে যে প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে, তার ভিত্তিতেই জনরায় এসেছে। বিএনপি সব সময় জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। তাই আশা করা যায়, দেশ পরিচালনা ও সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে দলটি জনগণের এই প্রত্যাশা বিবেচনায় নেবে।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, দলগুলো যেমন নিজেদের ইশতেহার দিয়েছে, তেমনি দলের শীর্ষ নেতারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষেও জনগণকে আহ্বান জানিয়েছেন। সুতরাং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়া কেবল সরকারের এজেন্ডা নয়; এটি রাষ্ট্রের এবং সব রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা।

আলী রীয়াজ বলেন, দলগুলোর ইশতেহারের মধ্য দিয়ে মানুষ যেটা অনুমোদন করেছে, সেটা কিছুটা পরোক্ষ; কিন্তু গণভোটের মধ্য দিয়ে সংবিধানের বড় রকমের সংস্কারের যে প্রস্তাব, সেটা দেশের জনগণ সরাসরি অনুমোদন করেছে। এটাকে জনরায় হিসেবে দেখতে হবে। সংস্কারের জন্য জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তি হিসেবে দেখতে হবে।

সংস্কার বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, কাজটি কীভাবে এগোচ্ছে তার ওপরই অগ্রাধিকার নির্ভর করবে। তবে সুনির্দিষ্ট আদেশে উচ্চকক্ষ গঠনের কথা থাকায় এটি ছয় মাসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবেন ক্ষমতাসীন দল ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলো।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে আলী রিয়াজ বলেন, ‘গণভোটের মধ্য দিয়ে সংস্কারের বিষয়ে যে সুস্পষ্ট গণরায় প্রকাশিত হয়েছে, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর। রাষ্ট্র সংস্কারের ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দল অঙ্গীকারবদ্ধ। ক্ষমতাসীন দল এবং জাতীয় সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো এবং সংসদের বাইরেও যেসব রাজনৈতিক দল আছে তাদের সবার প্রতি আহ্বান হচ্ছে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যম ঐক্যবদ্ধভাবে এই গণরায় বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।’

নতুন কোনো ভূমিকায় তাঁকে দেখা যাবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আলী রীয়াজ বলেন, ‘আমি আমার পেশায় ফিরে যেতে চাই এবং সেটা যত দ্রুত সম্ভব।’

সংবাদ সম্মেলনে শুরুতে গণভোটের প্রচার ও জনসচেতনতা তৈরির কাজে সহযোগিতা করার জন্য সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আলী রীয়াজ। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার ও প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

সদ্য অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফল নিয়ে সংবাদ সম্মেলন। আজ শনিবার সকালে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে
সদ্য অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফল নিয়ে সংবাদ সম্মেলন। আজ শনিবার সকালে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে। ছবি: প্রথম আলো

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনে লাভ হবে পুতিনের by লিওনিদ রাগোজিন

ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে হুমকি বাড়ানোকে সহজেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালি বলে উড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু বিষয়টি এতটাই বড় সংঘাতের সঙ্গে জড়িত যে একে সীমিত প্রভাবের আঞ্চলিক ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ইউক্রেনের মতোই ভেনেজুয়েলা এখন বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর দর-কষাকষির একটি হাতিয়ার হয়ে উঠছে। এর মানে এই নয় যে বিশ্ব নিশ্চিতভাবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে। যদিও সেই আশঙ্কা সব সময়ই থাকে। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রধান দুই চরিত্র ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিন এখন সংঘাতের চেয়ে পারস্পরিক লাভজনক লেনদেনের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন। তাই বৈশ্বিক যুদ্ধের চেয়ে বৈশ্বিক সমঝোতার সম্ভাবনাই এখন বেশি মনে হয়।

ভেনেজুয়েলা কোনো বড় শক্তি নয়। তবু দেশটি বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি চীন, ইরান ও রাশিয়ার রাজনৈতিক মিত্র। এই দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে। এই তিন দেশের মধ্যে ভেনেজুয়েলা প্রশ্নে সবচেয়ে জটিল অবস্থানে রয়েছে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ক্রেমলিনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। তবে এর মধ্যেই কিছু সম্ভাব্য লাভও আছে। ২০২৫ সালের শুরুতে ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফিরতেই রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের পরিস্থিতি হঠাৎ একধরনের অংশীদারত্বে ফিরে যায়।

যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। তারা প্রায় নিরপেক্ষ অবস্থান নেয়। তবে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া চালু রাখে। জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের সর্বশেষ সংস্করণে যুক্তরাষ্ট্র ‘সরাসরি হুমকি’ তালিকা থেকে রাশিয়ার নামও বাদ দেয়। ট্রাম্পের উদ্যোগে ইউক্রেন নিয়ে শান্তি আলোচনা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে পুতিনের বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে যুদ্ধটি তাঁর শর্তেই শেষের দিকে যাচ্ছে।

এই সবকিছু বিবেচনায় নিলে বোঝা যায়, ভেনেজুয়েলার মতো দূরের এবং রাশিয়ার মূল স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কহীন বিষয় নিয়ে ক্রেমলিন এখন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করবে না । রাশিয়া কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ লাতিন আমেরিকান সরকারকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠবে না। ভেনেজুয়েলার প্রতি রাশিয়ার সমর্থন সব সময়ই ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর কতটা চাপ দিচ্ছে, তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত থাকবে।

নিকোলাস মাদুরোর সরকারের সম্ভাব্য পতন ক্রেমলিনের জন্য পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মতো কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্রের শাসন পরিবর্তনের নেশার কারণে যেসব দেশে রাশিয়ার ঐতিহ্যগত মিত্ররা ক্ষমতা হারিয়েছে, সেখানে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রাশিয়ার আছে। এখানে একটি নির্দয় রাজনৈতিক হিসেবেও কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ভেনেজুয়েলায় সামরিক হামলা চালায়, তাহলে সেই পদক্ষেপ থেকে পাওয়া ভূরাজনৈতিক লাভ সম্ভাব্য ক্ষতির চেয়েও বেশি হতে পারে রাশিয়ার। কারণ, এতে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রশ্নে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র নৈতিকভাবে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের ‘নিজস্ব উঠানে’ সামরিক শক্তি দিয়ে নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারে, তাহলে রাশিয়া কেন নিজের অঞ্চলে একই কাজ করতে পারবে না?

সাধারণভাবে রাশিয়ানরা নিজেদের পুরোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রক্ষক হিসেবে দেখে। তারা নিজেদের পররাষ্ট্রনীতিতে চূড়ান্ত রক্ষণশীল মনে করে। তাদের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব একটি সংশোধনবাদী শক্তি, যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার জন্য দায়ী। ইউক্রেন যুদ্ধকে তারা সেই সংশোধনবাদ ঠেকানোর একটি উপায় হিসেবে দেখে। তবে তাদের যুক্তি হলো যদি পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই না থাকে, আর তার জন্য পশ্চিমাই দায়ী হয়, তাহলে নতুন একটি ব্যবস্থার জন্য দর–কষাকষি করা যাক।

এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র তার পশ্চিম গোলার্ধে নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করবে, আর রাশিয়া সাবেক সোভিয়েত অঞ্চলগুলোতে নিজের প্রভাব বজায় রাখবে। রাশিয়ার জন্য আদর্শ পরিস্থিতি হবে, যদি যুক্তরাষ্ট্র বছরের পর বছর ভেনেজুয়েলায় জড়িয়ে পড়ে। তবে মাদুরো দ্রুত ক্ষমতা হারালেও সেটা তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য। সবকিছু স্থির হওয়ার পর পরিস্থিতি হয়তো একধরনের লেনদেনের মতো দেখাবে। যেমন রাশিয়ার শর্তে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী একটি ভেনেজুয়েলা।

* লিওনিদ রাগোজিন, রিগাভিত্তিক একজন সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তারে অনূদিত

ভেনেজুয়েলা এখন পরাশক্তিগুলোর দর-কষাকষির একটি হাতিয়ার হয়ে উঠছে
ভেনেজুয়েলা এখন পরাশক্তিগুলোর দর-কষাকষির একটি হাতিয়ার হয়ে উঠছে। ছবি: রয়টার্স

জামায়াতের বড় উত্থান, সর্বোচ্চ ভোট by আব্দুল্লাহ আল জোবায়ের

দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন জোট-নির্ভর দল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজস্ব শক্তির প্রদর্শন করেছে।

৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট হওয়া এই নির্বাচনে বেসরকারি ফলাফলে দলটি এককভাবে ৬৮টি আসনে জয় পেয়েছে, যা তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ। জোটগত হিসাবে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭। ফলে সরকার গঠনের পর্যায়ে না পৌঁছালেও বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে জামায়াত।

বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসনে এবং জোটগতভাবে ২১২টিতে জয় পেয়েছে। তবে ৬৮টি আসনে জামায়াতের একক জয় দলটির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। কারণ, ১৯৯৬ সালে এককভাবে নির্বাচন করে পেয়েছিল ৩টি আসন।

বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করে ১৯৯১ সালে ১৭টি, ২০০১ সালে ১৫টি ও ২০০৮ সালে ২টি আসনে জয় পেয়েছিল জামায়াত। সেই তুলনায় এবারের ফল দলটির জন্য ঐতিহাসিক মোড়।

১৭ বছর পর জামায়াত নিজস্ব নেতৃত্বে জোট গড়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। সরকার গঠনের মতো আসন না পেলেও জোটগত ৭৭ আসন প্রাপ্তিকে জামায়াতের বড় উত্থান হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

জামায়াতে ইসলামী অতীতে রাজধানী ঢাকায় একটি আসনও পায়নি। কিন্তু এবার ঢাকা মহানগরের ১৫টি আসনের মধ্যে ৬টিতে জয় পেয়েছে—ঢাকা-৪, ৫, ১২, ১৪, ১৫ ও ১৬। এ ছাড়া জোটের প্রার্থী ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জয়ী হয়েছেন ঢাকা-১১ আসনে।

এ ছাড়া ঢাকার আরও পাঁচটি আসনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। ঢাকা-৭, ৮, ১০, ১৩ ও ১৭—এই আসনগুলোতে জামায়াত বা জোটের প্রার্থীরা হেরেছেন কম ভোটের ব্যবধানে। এর মধ্যে ঢাকা-১০ আসনে ৩ হাজার ৩০০ ভোটের ব্যবধানে আর ঢাকা-৭ আসনে ৬ হাজার ১৮৩ ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় আরও অনেক আসনে হারলেও দলটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পেয়েছে।

উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমে সাফল্য

ফলাফলের ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের উত্তরাঞ্চল—রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল—খুলনা বিভাগ জামায়াতের সাফল্যের প্রধান ক্ষেত্র। খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টিতে, রংপুরের ৩৩টির মধ্যে ১৬টি এবং রাজশাহীর ৩৯টির মধ্যে ১১টি আসনে জয় পেয়েছে।

সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, নীলফামারী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সব আসনে জয় দলটির আঞ্চলিক প্রভাবের গভীরতা দেখায়। রংপুর ও কুড়িগ্রামের সব আসন জোটগতভাবে জয়ী হওয়াও তাৎপর্যপূর্ণ; এর মধ্যে দুটি আসন পেয়েছে শরিক এনসিপি।

তবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে বিএনপি এগিয়ে। ঢাকার ৭০টির মধ্যে ৮টি এবং চট্টগ্রামের ৫৮টির মধ্যে ৩টি আসনে জামায়াত এককভাবে জয় পেয়েছে। সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে কেবল জোটের শরিক খেলাফত মজলিস একটি আসন পেয়েছে।

ভোট-সমীকরণের রূপান্তর

এবারের নির্বাচনে তরুণ ও নারী ভোটারদের একটি অংশ জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছে—এমন আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাফল্যকেও কেউ কেউ এর প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখছেন।

গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী তরুণদের দল এনসিপির সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য বা জোটও একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

এই ক্ষেত্রে নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষক নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিমের পর্যবেক্ষণে কয়েকটি বিষয় এসেছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জামায়াত রক্ষণশীল ডানপন্থী পরিচয় থেকে মধ্য-ডানপন্থী দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করেছে এবং অনেকাংশে সফল হয়েছে। এত দিন বিএনপিকে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী ঘরানার ভোটগুলোর প্রধান জিম্মাদার মনে করা হতো। এই ক্ষেত্রে জামায়াতকে সহযোগী মনে করা হতো। এবার সেই ভোটে জামায়াত ভাগ বসাতে পেরেছে। এ ছাড়া দলটি নিজেদের ‘ক্ষমতামুখী নয়, পরিবর্তনের পক্ষে’ শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। এর প্রভাবও তরুণদের মধ্যে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে জামায়াতের এই উত্থান নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল শুক্রবার ঠাকুরগাঁওয়ে নিজ বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেছেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট শাসন ছিল।যখনই গণতন্ত্র চাপা থাকে, মানুষের কণ্ঠ রোধ করা হয়, তখন উগ্রবাদী শক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে—সেটাই এ দেশে ঘটেছে। জামায়াতের যেটুকু উত্থান হয়েছে, তা আওয়ামী লীগের কারণেই হয়েছে। তাদের দমন-পীড়নমূলক শাসন, বিরোধী দলকে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না দেওয়া, নির্বাচন করতে না দেওয়ার কারণে এটা হয়েছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-13%2Fnbvsqy25%2FCapture.PNG?rect=0%2C0%2C760%2C507&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। গতকাল রাজধানীর মগবাজারে দলীয় কার্যালয়ে। ছবি: জামায়াতের ফেসবুক পেজ

ইরানে কয়েক সপ্তাহ হামলা চালানোর মতো প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন বাহিনী

রয়টার্সের এক্সক্লুসিভঃ ইরানে কয়েক সপ্তাহ সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা মাথায় রেখে প্রস্তুত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন দুই মার্কিন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ কথা বলেছেন।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্দেশ দিলেই হামলা শুরু হবে। ওই কর্মকর্তারা বলেন, যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আগে দেখা যেকোনো সংঘাতের তুলনায় এটি অনেক বেশি গুরুতর রূপ নিতে পারে।

এই পরিকল্পনা সংবেদনশীল হওয়ায় ওই কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তবে পরিকল্পনার খবর বাইরে আসা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক তৎপরতায় নিশ্চিতভাবে চাপ বৃদ্ধি করবে।

গত সপ্তাহে ওমানের রাজধানী মাসকাটে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কূটনীতিকেরা। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে ওমানের মধ্যস্থতায় এ আলোচনা শুরু হয়।

যদিও বৈঠকের আগেই ট্রাম্প ওই অঞ্চলে সামরিক শক্তি জড়ো করায় নতুন করে সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। একটি বিমানবাহী রণতরির নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নৌবহর পাঠিয়েছেন ট্রাম্প।

মার্কিন কর্মকর্তারা গতকাল শুক্রবার বলেন, পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে আরও একটি বিমানবাহী রণতরি পাঠাচ্ছে। এর সঙ্গে কয়েক হাজার অতিরিক্ত সেনা, যুদ্ধবিমান, গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার এবং হামলা চালানো ও হামলা প্রতিহত করার সক্ষমতাসম্পন্ন আরও নানা সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হচ্ছে।

শুক্রবার নর্থ ক্যারোলাইনায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাদের সামনে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ট্রাম্প আরও বলেন, ‘কখনো কখনো ভয় তৈরি করতে হয়। সত্যি বলতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে এটাই একমাত্র উপায়।’

দীর্ঘ মেয়াদে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ‘ইরান ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে সব বিকল্পই খোলা আছে। তিনি যেকোনো ইস্যুতে নানা মতামত শোনেন। তবে শেষ পর্যন্ত দেশের স্বার্থ এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য যা সবচেয়ে ভালো, সেটি বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।’

পেন্টাগন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ওই অঞ্চলে দুটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি পাঠিয়েছিলেন ট্রাম্প।

যদিও জুনে চালানো ‘মিডনাইট হ্যামার’ নামে ওই অভিযান মূলত একক মার্কিন হামলা ছিল। মার্কিন স্টেলথ বোমারু বিমান যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল। জবাবে, ইরান কাতারে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে খুব সীমিত পরিসরের পাল্টা হামলা চালায়।

ঝুঁকি বাড়ছে

মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, এবার যে পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তা আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

একজন কর্মকর্তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে মার্কিন সামরিক বাহিনী শুধু পারমাণবিক অবকাঠামো নয়, ইরানের রাষ্ট্রীয় ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত স্থাপনায়ও হামলা চালাতে পারে।

এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট করে কোনো তথ্য দিতে অস্বীকার করেছেন ওই কর্মকর্তা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযান মার্কিন বাহিনীর জন্য অনেক বেশি ঝুঁকির হবে। কারণ, ইরানের কাছে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র আছে। পাশাপাশি ইরানের পাল্টা হামলা আঞ্চলিক সংঘাতের সম্ভাবনাও বাড়িয়ে দেবে।

ওই একই কর্মকর্তা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র খুব ভালো করে জানে, ইরান পাল্টা হামলা চালাবে। ফলে কয়েক দিন ধরে পাল্টাপাল্টি হামলার একটি চক্র তৈরি হবে।

হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগন পাল্টা হামলা বা আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি।

ট্রাম্প বারবার তেহরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ বিরোধ দমনকে কেন্দ্র করে ইরানে হামলার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন।

গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, কূটনৈতিক সমাধানের বিকল্প ‘খুব যন্ত্রণাদায়ক, খুবই যন্ত্রণাদায়ক’ হবে।

জবাবে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড হুঁশিয়ার করে বলেছে, ইরানের ভূখণ্ডে হামলা হলে তারা যেকোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালাতে পারে।

জর্ডান, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্কসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি আছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বুধবার ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি বলেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলে এতে এমন কিছু উপাদান অবশ্যই থাকতে হবে, যা ইসরায়েলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

আর ইরান বলেছে, তারা পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে শর্ত হলো, নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। আর পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার আলোচনার সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়টি যুক্ত করা যাবে না।

ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শন করতে চাইছে
ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শন করতে চাইছে। ছবি: কোলাজ

পঞ্চগড়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের তালা খোলা বিএনপি নেতা বললেন, সেটি গুদামঘর

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিন পঞ্চগড়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ের তালা খোলা–সংক্রান্ত ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধান। গতকাল শুক্রবার রাত ১১টার দিকে জেলা শহরের পুরাতন ক্যাম্প এলাকায় সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে আবু দাউদ প্রধান দাবি করেন, ঘটনাস্থলটি চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয় ছিল না। বরং তিনি সেটিকে একটি গুদামঘর হিসেবেই জানতেন। তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নষ্ট করা এবং সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

আবু দাউদ প্রধান বলেন, তিনি পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) তিনবারের সাবেক চেয়ারম্যান। গতকাল সকালে গ্রামের বাড়ি থেকে শহরে আসার পথে চাকলাহাট বাজারে লোকজনের জটলা দেখে সেখানে যান। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পারেন, জামায়াতে ইসলামীর এক কর্মী একটি গুদামঘরের তালার চাবি দিচ্ছিলেন না। পরে তিনি ওই কর্মীকে চাবি দিতে বললে তালা খুলে দেওয়া হয় এবং চাবিটি বাজার বণিক সমিতির সভাপতির কাছে জমা রাখা হয়।

স্থানীয় বিএনপির এই নেতার ভাষ্য, ‘এ সময় আমি ঘরটি গুদামঘর বলেই জানতাম। সেখানে কোনো চেয়ার, টেবিল বা কোনো রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ড ছিল না। ঘটনার সময় আমি লোকজনকে সামলাতে গিয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে কে কী বক্তব্য দিয়েছেন—তা আমি বুঝে উঠতে পারিনি। পরে শুনেছি সেখানকার ভিডিও আওয়ামী লীগ অফিস খুলে দেওয়া হয়েছে বলে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’

এর আগে গতকাল দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে বক্তব্য দিচ্ছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান বুলেট। সেখানে উপস্থিত ছিলেন আবু দাউদ প্রধান, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য ও সাবেক ইউপি সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আনিসুজ্জামান স্বপনসহ আরও অনেকে। আওয়ামী লীগ কার্যালয় খুলে দেওয়ায় আবু দাউদ প্রধানকে ধন্যবাদ জানাতে দেখা যায়।

সংবাদ সম্মেলন করে বক্তব্য দেন পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধান। গতকাল শুক্রবার রাতে পঞ্চগড় জেলা শহরের পুরাতন ক্যাম্প এলাকায়
সংবাদ সম্মেলন করে বক্তব্য দেন পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধান। গতকাল শুক্রবার রাতে পঞ্চগড় জেলা শহরের পুরাতন ক্যাম্প এলাকায়। ছবি: প্রথম আলো

ইরানে সরকার পরিবর্তন হওয়াকেই ‘সবচেয়ে ভালো’ মনে করছেন ট্রাম্প

ইরানে সরকার পরিবর্তন হওয়াকেই ‘সবচেয়ে ভালো উপায়’ বলে মনে করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়াতে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর ঘোষণার মধ্যেই ট্রাম্প এমন মত প্রকাশ করলেন।

গতকাল শুক্রবার নর্থ ক্যারোলাইনার ফোর্ট ব্র্যাগ সামরিক ঘাঁটিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। এ সময় এক সাংবাদিক তাঁর কাছে জানতে চান, তিনি ইরানে সরকার পরিবর্তন চান কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘মনে হয়, সেটাই সবচেয়ে ভালো হবে।’

ট্রাম্পের এ মন্তব্য এখন পর্যন্ত ইরানের ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত করার সবচেয়ে প্রকাশ্য আহ্বান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এমন সময় তিনি এ কথা বললেন, যখন কিনা পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে ইরানকে একটি চুক্তিতে রাজি করানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ট্রাম্প।

এর আগে হোয়াইট হাউসে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরানের ওপর চাপ বৃদ্ধি করতে বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড খুব শিগগির মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা দেবে।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যদি কোনো চুক্তি করতে না পারি, তবে আমাদের এটার প্রয়োজন পড়বে।’

ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে দেশটির নেতা নিকোলা মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় থেকে এই বিশাল জাহাজ ক্যারিবীয় সাগর এলাকায় অবস্থান করছে। আরেক বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অবস্থান করছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জায়গায় কাকে দেখতে চান, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি শুধু বলেছেন, ‘এমন মানুষ আছেন।’

এর আগে ইরানে সরকার পরিবর্তনের জোরালো আহ্বান থেকে ট্রাম্পকে কিছুটা সরে আসতে দেখা গিয়েছিল। তিনি তখন সতর্ক করে বলেছিলেন, এমনটা হলে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। যদিও তিনি খামেনির বিরুদ্ধে একের পর এক হুমকি দিয়ে গেছেন।

গত মাসে ইরানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে তা দমনে কঠোর অভিযান শুরু করে দেশটির সরকার। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এতে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তখন ট্রাম্প বলেছিলেন, বিক্ষোভকারীদের সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছে। তবে পরে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে বেশি গুরুত্ব দেন।

এখন বিক্ষোভের মাত্রা কিছুটা কমে এলেও ইরানের শেষ শাহের ছেলে রেজা পাহলভি বিক্ষোভ দমনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। নির্বাসিত রেজা পাহলভি মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে বলেন, নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঠেকাতে মানবিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি দেশ-বিদেশের ইরানিদের আবারও আন্দোলনে নামার আহ্বান জানিয়েছেন।

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবু গত সপ্তাহে তারা ওমানে পারমাণবিক ইস্যুতে বৈঠক করেছে। নতুন করে আলোচনার তারিখ এখনো ঠিক হয়নি।

পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, ইরান গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে। তবে তেহরান এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

এপস্টিন ‘মন্দ প্রকৃতির লোক’: পুলিশ কর্মকর্তাকে ফোনে ট্রাম্প

কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে একসময় বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। তবে তিনি দাবি করেছেন, ২০০৮ সালে এপস্টিন প্রথম অপরাধী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই তিনি সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন।

ফ্লোরিডার সাবেক এক পুলিশপ্রধান জানিয়েছেন, ২০০৬ সালে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে একটি ফোনকল পেয়েছিলেন। তখন বর্তমান প্রেসিডেন্ট তাঁকে বলেছিলেন, জেফরি এপস্টিনের আচরণ সম্পর্কে ‘সবাই’ জানে।

সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত এফবিআইয়ের নথিতে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

নথিটি হলো ২০১৯ সালে পাম বিচের সেই সাবেক পুলিশপ্রধানের সঙ্গে এফবিআইয়ের এক সাক্ষাৎকারের লিখিত রেকর্ড। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ বিভাগ এপস্টিনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে ফোন করে বলেছিলেন,‘যাক বাবা, ভালো হয়েছে যে আপনারা তাঁকে থামাচ্ছেন। সবাই জানত, তিনি এত দিন ধরে এসব করছেন।’

পুলিশ কর্মকর্তার নাম নথিতে মুছে দেওয়া হলেও সেখানে তাঁকে এপস্টিন তদন্তের সময়কালে পাম বিচ পুলিশপ্রধান হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি হলেন মাইকেল রাইটার, যিনি ‘মায়ামি হেরাল্ড’-কে নিশ্চিত করেছেন, তিনি ট্রাম্পের কাছ থেকে সেই ফোনকলটি পেয়েছিলেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বিষয়ে এপস্টিন–সংক্রান্ত যেকোনো অন্যায়ের কথা ক্রমাগত অস্বীকার করে আসছেন এবং বলছেন, তিনি এপস্টিনের অপরাধ সম্পর্কে জানতেন না। তবে এই কথিত ফোনকলটি সম্পর্কে ট্রাম্প আসলে কী জানতেন এবং কখন থেকে জানতেন—তা নিয়ে আরও প্রশ্ন তোলার দাবিকে জোরালো করে তুলেছে।

২০১৯ সালে যখন নারী পাচারের দায়ে ফেডারেল এজেন্টরা এপস্টিনকে গ্রেপ্তার করেছিলেন, তখন সাংবাদিকেরা ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই কলঙ্কিত অর্থদাতার ব্যাপারে তাঁর কোনো ‘সন্দেহ’ ছিল কি না। ট্রাম্প বলেছিলেন: ‘না, আমার কোনো ধারণা ছিল না। আমার কোনো ধারণাই ছিল না। আমি বহু বছর ধরে তাঁর সঙ্গে কথা বলিনি।’

এপস্টিন ফাইলের সর্বশেষ কিস্তিতে প্রকাশিত এফবিআইয়ের সাক্ষাৎকারের সারাংশ অনুযায়ী পুলিশ কর্মকর্তা রাইটার বলেছেন, ২০০৬ সালের জুলাইয়ে ফোন করে ট্রাম্প তাঁকে বলেছিলেন, তিনি এপস্টিনকে তাঁর ‘মার-এ-লাগো’ ক্লাব থেকে বের করে দিয়েছেন। নিউইয়র্কের মানুষ জানতেন, তিনি (এপস্টিন) একজন ঘৃণ্য লোক।

রাইটার আরও দাবি করেন, গিলেন ম্যাক্সওয়েলকে ওই এপস্টিনের ‘সহযোগী’ বলেও ট্রাম্প তাঁকে বলেছিলেন। ট্রাম্প বলেন, তিনি অত্যন্ত মন্দ প্রকৃতির মানুষ। তাই, তাঁর ওপর নজরদারি রাখা উচিত।’

গিলেন ২০২১ সালে এপস্টিনের জন্য অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের প্রলুব্ধ করার জন্য দোষী সাব্যস্ত হন।

এফবিআইকে পুলিশ কর্মকর্তা রাইটার আরও বলেন, ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তিনি একবার এপস্টিনের আশেপাশে ছিলেন যখন সেখানে কিশোরীরা ছিল এবং ট্রাম্প সেখান থেকে ‘দ্রুত বেরিয়ে গিয়েছিলেন’।

নথি অনুসারে রাইটার বলেন, ফ্লোরিডা পুলিশ যখন এপস্টিনের তদন্ত করছিল, তখন যাঁরা প্রথম দিকে ফোন করেছিলেন ট্রাম্প ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন।

২০০৬ সালে পাম বিচ পুলিশ অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগে এই কলঙ্কিত অর্থদাতার বিরুদ্ধে তদন্ত করছিল। মামলাটি পরে ফেডারেল প্রসিকিউটরদের কাছে হস্তান্তর করা হয়, যারা ২০০৮ সালে এপস্টিনের সঙ্গে বিতর্কিত আপস করেন। একটি বিতর্কিত চুক্তির মাধ্যমে তাঁকে আরও গুরুতর অভিযোগ থেকে রক্ষা করা হয়েছিল।

বিবিসিকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিচার বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘২০ বছর আগে প্রেসিডেন্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, এমন কোনো সমর্থনযোগ্য প্রমাণ আমাদের জানা নেই।’

গতকাল মঙ্গলবার ব্রিফিংয়ে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিটকে এই ফোনকল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এটি ‘২০০৬ সালে ঘটে থাকতেও পারে, আবার না–ও পারে। আমি এর উত্তর জানি না।’

লেভিট আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব সময় যা বলেছেন তা হলো, তিনি জেফরি এপস্টিনকে তাঁর মার-এ-লাগো ক্লাব থেকে বের করে দিয়েছিলেন। কারণ, তিনি একজন অসভ্য মানুষ ছিলেন। এই ফোনকলের দাবিও সেই সত্যতাকেই সমর্থন করে। যদি এটি ঘটে থাকে, তবে এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরু থেকে যা বলে আসছেন, সেটারই প্রমাণ দেয়।’

বিবিসি এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে পুলিশ কর্মকর্তা রাইটারের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে।

নব্বইয়ের দশকে ট্রাম্প ও এপস্টিনকে একসঙ্গে সামাজিক অনুষ্ঠানে এবং ছবিতে দেখা গেছে। তবে প্রেসিডেন্ট ও হোয়াইট হাউস বারবার বলেছে, ২০০৪ সালের দিকে এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করার আগে তিনি তাঁর অপরাধ সম্পর্কে অন্ধকারে ছিলেন। এপস্টিন প্রথম গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক বছর আগেই ট্রাম্প সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন বলে দাবি করা হয়।

ট্রাম্প বলেছেন, এপস্টিন মার-এ-লাগো থেকে তাঁর কর্মচারীদের ‘চুরি’ বা ভাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে যখন তিনি জানতে পারেন, তখন তাঁদের দুজনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

জুলাই মাসে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি এটি শুনে তাঁকে বলেছিলাম, আমরা চাই না আপনি আমাদের লোকদের নিয়ে যান। তিনি তখন ওই কাজ থেকে বিরত হন। তবে কিছুদিন পর তিনি আবারও একই কাজ করেন। তখন আমি তাঁকে বলি, এখান থেকে বের হও।’

এই কথিত ফোনকলের খবরটি এমন সময় এল, যখন গিলেন গত সোমবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট কমিটির সামনে ভার্চ্যুয়ালি সাক্ষ্য দিয়েছেন।

ওভারসাইট কমিটির চেয়ারম্যান জেমস কোমার জানিয়েছেন, রুদ্ধদ্বার জবানবন্দির সময় গিলেন প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান। এ সময় তিনি তাঁর নীরব থাকার সাংবিধানিক অধিকারের (পঞ্চম সংশোধনী) সুযোগ নেন।

এপস্টিনের যৌন নির্যাতনের জন্য কিশোরী মেয়েদের পাচারের দায়ে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন গিলেন ম্যাক্সওয়েল।

গিলেনের আইনজীবী দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি তাঁকে ক্ষমা করার প্রতিশ্রুতি দেন, তবে তিনি পূর্ণাঙ্গ এবং সততার সঙ্গে কথা বলতে প্রস্তুত।

ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, গিলেনকে ক্ষমা করার ব্যাপারে এখনো কোনো চিন্তাভাবনা করেননি তিনি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-11%2F8t2kuu24%2FUntitled-7.png?rect=0%2C0%2C620%2C413&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জেফরি এপস্টিন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলি নৃশংসতার আঘাত কাটাতে বক্সিং প্রশিক্ষণে গাজার মেয়েরা

ইসরায়েলের হামলায় বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের গাজা। সহায়-সম্বল হারিয়ে উপত্যকার আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছেন লাখ লাখ মানুষ। এরই মধ্যে বালুর ওপর কোনোরকমে গড়ে তোলা হয়েছে একটি বক্সিংয়ের রিং। সেখানে লড়াইয়ে নামার আগে অপেক্ষায় কয়েকজন ফিলিস্তিনি কিশোরী। ইসরায়েলের নৃশংস হামলার মানসিক আঘাত কাটাতেই এখানে এসেছে তারা।

এ চিত্র দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের। সেখানে বক্সিংয়ের রিংটি গড়ে তুলেছেন ওসামা আইয়ুব। আগে উত্তরে গাজা নগরীতে তাঁর একটি বক্সিং ক্লাব ছিল। তবে ইসরায়েলি হামলায় বাড়িসহ ক্লাবটি ধ্বংস হয়ে যায়। পালিয়ে খান ইউনিসে আসার পর নতুন উদ্যমে আবার বক্সিং প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছেন তিনি। এখানে যেসব কিশোরী বক্সিং শেখে, তারাও ওসামার মতো বাস্তুচ্যুত।

এই কিশোরীদের বয়স ৮ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। সপ্তাহে তিন দিন তাদের বক্সিং শেখান ওসামা। বিনিময়ে কোনো অর্থ নেন না। ওসামা বলেন, সংঘাত ও বোমাবর্ষণের প্রভাব এই মেয়েগুলোর ওপর পড়েছে। কেউ কেউ পরিবার বা প্রিয়জনকে হারিয়েছে। তাদের মনের ভেতরে কষ্ট রয়েছে। এ থেকে তারা মুক্তি চায়। তাই আবেগ প্রকাশের একটি উপায় হিসেবে বক্সিংকে বেছে নিয়েছে।

ছোট পরিসরে হলেও নিজের বক্সিং প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি গড়ে তুলতে ওসামাকে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত গাজায় হাতের কাছে যা পেয়েছেন, তা দিয়েই কাজ সেরেছেন তিনি। ওসামার ভাষায়, বক্সিং রিংটি তৈরি করা হয়েছে কাঠ দিয়ে। রিংয়ে কোনো ম্যাট বা নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। তাই খুদে বক্সারদের পাশে দাঁড়াতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সাহায্যের কথা ১৬ বছর বয়সী প্রশিক্ষণার্থী রিমাসের মুখেও। বিদেশিরা তাদের জন্য গ্লাভস আর জুতা পাঠাবে—এ আশায় রয়েছে সে। আর ওসামার প্রশিক্ষণকেন্দ্রে বক্সিং শিখে বিশ্বমঞ্চে ফিলিস্তিনের প্রতিনিধিত্ব করতে চায় ১৪ বছর বয়সী গাজাল রাদওয়ান।

তার কথায়, ‘আমি বক্সিং শিখছি নিজেদের চরিত্র গঠনের জন্য। স্বপ্ন দেখি ভবিষ্যতে একজন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার। অন্য দেশের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে লড়াই করার। আমি চাই, পৃথিবীজুড়ে ফিলিস্তিনের পতাকা উড়ুক।’

আশ্রয়শিবিরের তাঁবুর মাঝে বক্সিং প্রশিক্ষণে ফিলিস্তিনি মেয়েরা। গত সোমবার গাজার খান ইউনিসে
আশ্রয়শিবিরের তাঁবুর মাঝে বক্সিং প্রশিক্ষণে ফিলিস্তিনি মেয়েরা। গত সোমবার গাজার খান ইউনিসে। ছবি: এএফপি

পঞ্চগড়ে বিএনপি নেতার উপস্থিতিতে খুলে দেওয়া হলো আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের তালা

পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধানের উপস্থিতিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের চাকলাহাট ইউনিয়ন কার্যালয়ের তালা খুলে দেওয়া হয়েছে। আজ শুক্রবার সকালে উপজেলার চাকলাহাট বাজারে এ ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

আবু দাউদ প্রধান চাকলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি ওই ইউনিয়নের মেহেরপাড়া এলাকার বাসিন্দা। এ বিষয়ে আবু দাউদ প্রধান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজ সকালে চাকলা বাজারে যাওয়া পর কয়েকজন আমাকে এসে বললেন, “আওয়ামী লীগ অফিসে যে তালা লাগায় রাখছে, এটা নিয়ে সেখানে উত্তেজনা বিরাজ করছে।” তখন আমি বললাম, উত্তেজনা তৈরি করা যাবে না। যে যে অবস্থানে আছেন, শান্তিপূর্ণভাবে থাকেন। আমরা এক এলাকার মানুষ সবাই সহাবস্থানে থাকব। কেন তালা দেবে? পরে তালা খুলে দিতে বলি। জামায়াতের লোকজন তালা লাগিয়ে দিয়েছিল, তারাই আবার তালা খুলে দিয়েছে। এটা মূলত এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য, এখানে কোনো দলীয় সিদ্ধান্ত নেই। এটা নিয়ে এখন অনেকে ষড়যন্ত্র করে ভিডিও ছড়িয়ে দিচ্ছে।’

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ১ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান (বুলেট)। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধান। তাঁর পাশে চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য ও ইউপির সাবেক সদস্য আবুল হোসেন ও পঞ্চগড় জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনিসুজ্জামান (স্বপন)। তাঁদের সামনের দিকে অন্তত ৩০ জনের বেশি মানুষ।

ভিডিওতে কামরুজ্জামান বলেন, ‘বিএনপি বিপুল আসনে সারা বাংলাদেশে সরকার গঠনের পথে, এই প্রথম মুহূর্তে পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সংগ্রামী সভাপতি, চাকলাহাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জননেতা জনাব আবু দাউদ প্রধান; তিনি প্রথমেই যে কাজটি করেছেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতি, তথা আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা–কর্মীদের প্রাণের যে সংগঠন, আমাদের চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগকে তিনি আজকে তালামুক্ত-অবমুক্ত করেছেন।’

কামরুজ্জামান আরও বলেন, ‘যারা এই দেশটাকে পাকিস্তান বানাতে চেয়েছিল, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের প্রতিটি দলকে নিশ্চিহ্ন করার চিন্তাভাবনা করে বাড়িতে-অফিসে হামলা করে বন্ধ করে রেখেছিল, সেই অফিস আজকে প্রথমে তিনি চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ অফিস অবমুক্ত করলেন। আমরা চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগসহ সব অঙ্গ–সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে তিনার কাছে আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’

ফেসবুকে ওই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনা শুরু হয়েছে। পঞ্চগড়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা ও জাসাস নেতা ইউনুস শেখ তাঁর কমেন্টে লিখেছেন, ‘পঞ্চগড় সদর থানার সভাপতিকে কে দায়িত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার জন্য, আমার বোধগম্য হলো না।’

উল্লেখ্য, সদর, তেঁতুলিয়া এবং আটোয়ারী উপজেলা নিয়ে গঠিত পঞ্চগড় -১ আসনে বেসরকারি ফলাফলে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মুহম্মদ নওশাদ জমির। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ১৬৯ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনসিপির প্রার্থী সারজিস আলম শাপলা কলি প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯ ভোট।

পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধানের উপস্থিতিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের চাকলাহাট ইউনিয়ন কার্যালয়ের তালা খুলে দেওয়া হয়েছে। আজ শুক্রবার সকালে উপজেলার চাকলাহাট বাজারে
পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধানের উপস্থিতিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের চাকলাহাট ইউনিয়ন কার্যালয়ের তালা খুলে দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার সকালে উপজেলার চাকলাহাট বাজারে। ছবি : ভিডিও থেকে নেওয়া

নির্বাচনী অনিয়মের সুষ্ঠু সমাধান চেয়েছেন জামায়াতের আমির

সদস্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের কিছু আসনে অনিয়ম নিয়ে ওঠা প্রশ্নের সুষ্ঠু সমাধান চেয়েছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাতে মগবাজারে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জামায়াতারে কার্যনির্বাহী কমিটি ও ১১ দলীয় জোটের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।

জামায়াতের আমির দলের সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার, এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মামনুল হকের ফলাফল নিয়ে কথা বলেন। এসব বিষয়ে সুষ্ঠু বক্তব্য এবং কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান ডা. শফিকুর রহমান।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নাসীরুদ্দীনের ওখানে যেকারণে একসেপ্ট করা হয়েছে তা মামুনুল হকের এখানে বাতিল হয়েছে। সেক্রেটারির আসনসহ বেশকিছু আসনে এমন হয়েছে। যাদের আসনে এমন হয়েছে তারা প্রতিকার চাইবেন। সুনির্দিষ্ট তারিখের ভেতর প্রতিকার না হলে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। যা হচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে। বন্ধ না হলে আমরা বাধ্য হবো যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে।

তিনি আরও বলেন, বেশ কিছু জায়গায় হঠাৎ ফলাফল বন্ধ। এগিয়ে থাকলেও হারিয়ে দেয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় কষ্ট করে আমাদের ফল ধরে রাখতে হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ফলাফল ঘসামাঝা করা হয়েছে। পরিবর্তন করা হয়েছে। সেন্টার দখল করে যা করা হয়েছে তা ভিন্ন উদাহরণ। বিদেশি পর্যবেক্ষকরা যা দেখেছে তা তারা তুলে ধরবেন জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, আমরাও তুলে ধরবো। আমরা কালো অধ্যায়ের রাজনীতি আবারও চালু হোক, তা চাই না।
ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ চান জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের ভদ্রতা ও ইতিবাচক আচরণকে দুর্বলতা মনে করলে ভুল করবেন। কারণ ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জানানোর পরেও বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় কর্মী সমর্থকদের ওপর হামলা হচ্ছে। এটা ফ্যাসিবাদী লক্ষণ। ফ্যাসিবাদ আবারও দেখা দিলে তা দুর্ভাগ্য। এ দায় তাদের ওপর আসবে। ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশে থাকতে হলে ঐক্য নিয়েই থাকতে হবে। সংবিধানের আলোকে সবাই সমান। সবার জন্য একই নীতি হতে হবে। যদি ফ্যাসিবাদ ফিরে আসে আবারও তাহলে আমরা ছাড় দেব না।

জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা বলতে চাই, আমরা আজকে থেকে আপনাদের সঙ্গে আরও শক্তভাবে থাকব। তরুণ সমাজ বুকের রক্ত দিয়ে যা দিয়ে গেছে, যেমন দেশ চেয়েছে, আমরা যা বলেছি আগে তা বাস্তবায়ন করতে আমরা লড়ে যাব। আমাদের অবস্থান আপামর জনগণের পক্ষে। আমাদের বাধ্য করা হলে রাজপথেও আমরা নামব।নিয়মতান্ত্রিকভাবে ১১ দলকে চলতে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ১১ দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে। অনেকে ঋণখেলাপিদের সুযোগ দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনকে বলব- আরপিও যাদের কাভার করে না, তাদের ফলাফল স্থগিত করে এর সুরাহা করুন।

গণভোটে হ্যাঁ জিতেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাই সনদ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। বাস্তবায়ন না হলে আমরা কণ্ঠ চালিয়ে যাব। অনেক নিয়মবহির্ভূত কাজ করার পরও একটা দল সন্তুষ্ট হতে পারছে না, উল্টো অভিযোগ করছে। আমাদের প্রশ্ন- তারা আর কী চায়?

নির্বাচনী অনিয়মের সুষ্ঠু সমাধান চেয়েছেন জামায়াতের আমির