Showing posts with label আশরাফুল ইসলাম. Show all posts
Showing posts with label আশরাফুল ইসলাম. Show all posts

Wednesday, December 4, 2024

ফরমায়েশি মামলা তদন্ত করে পুরস্কার পেয়েছিলেন কাহ্‌হার by আশরাফুল ইসলাম

১৯৭২ সালে এসআই (সাব-ইন্সপেক্টর) পদে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন আবদুল কাহ্‌হার আকন্দ। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৯ বছরেরও বেশি সময় চুক্তিতে পুলিশে চাকরি করেছেন তিনি। এ সময় পেয়েছেন পুলিশ সুপার এবং অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে ‘বিরল’ পদোন্নতি। এর সবই সম্ভব  হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ আশীর্বাদে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, জেলহত্যা মামলা, ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা, বিডিআর বিদ্রোহ মামলাসহ রাজনৈতিক বিভিন্ন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন কাহার আকন্দ। মামলা তদন্তের নামে শেখ হাসিনার মিশন বাস্তবায়নই ছিল তার কাজ। এর মাধ্যমে তিনি শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত এবং আস্থাভাজন হয়ে উঠেছিলেন। ফলে পুলিশ বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক পাঁচবার বিপিএম এবং পিপিএম পদক দেয়া হয়েছে কাহার আকন্দকে।

২০১৯ সালে পুলিশের চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর থেকেই তিনি এমপি পদে প্রার্থী হতে এলাকায় জনসংযোগ শুরু করেন। অথচ ওই মেয়াদে তার কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনে এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন সাবেক আইজিপি, রাষ্ট্রদূত ও সচিব নূর মোহাম্মদ। কিন্তু সবাইকে অবাক করে এবং সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদকে বাদ দিয়ে বিগত নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন পান কাহার আকন্দ। তবে নির্বাচনী দৌড়ে সফল হতে পারেননি তিনি। আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে ধরাশায়ী হন। শেখ হাসিনার কাছের মানুষ হওয়ায় এরপরও তাকে নিয়ে এলাকায় আলোচনা ছিল- কাহার আকন্দ মন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। তিনি নিজেও মন্ত্রিত্ব পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন। তার কাছের মানুষজনকে বলেছিলেনও, নেত্রী (শেখ হাসিনা) তাকে মন্ত্রী করবেন। কিন্তু ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লব তার সেই স্বপ্ন ভেঙে দেয়। কিশোরগঞ্জ ও কটিয়াদী থানায় দায়ের হয় ৩ মামলা। অপকর্মের দায় থেকে বাঁচতে দেশ ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরদিন ৬ই আগস্ট কাহার আকন্দ নিরাপদে দেশ ছেড়েছেন বলেও তার কাছের অনেকগুলো সূত্র জানিয়েছে। তবে অনেকেই বিষয়টি বিশ্বাস করছেন না। তারা মনে করছেন, দেশেই কোথাও আত্মগোপনে রয়েছেন কাহার আকন্দ।
এদিকে মানবজমিনের অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, সামান্য একজন দারোগা হিসেবে চাকরি শুরু করা কাহার আকন্দের পারিবারিক অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। বাবা মৃত মেহেদি আকন্দ ছিলেন কটিয়াদী উপজেলার সহশ্রাম ধূলদিয়া ইউনিয়নের পূর্বপুরুড়া গ্রামের একজন দরিদ্র কৃষক। বনগ্রাম আনন্দ কিশোর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন তিনি। বাড়ি থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরের এ বিদ্যালয়ে তিনি হেঁটে যাতায়াত করতেন। সেখান থেকেই ১৯৬৭ সালে তিনি এসএসসি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন মহকুমা সদরের গুরুদয়াল সরকারি কলেজে। সেখান থেকে ১৯৬৯ সালে এইচএসসি পাস করেন। তখন তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে তিনি পুলিশে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসআই পদে চাকরি নেন। চাকরির ধারাবাহিকতায় ধাপে ধাপে হন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) তিনি পদোন্নতি লাভ করেন। চাকরির বেশিরভাগ সময়ই তার কেটেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)। আওয়ামী লীগের ১৯৯৬ জামানায় শুরু হয় তার স্বর্ণযুগ। ১৯৯৬ সালের ১৪ই নভেম্বর সংসদে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হলে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান আবদুল কাহার আকন্দ। এরপর তিনি জেলহত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফেরে। একই সঙ্গে চাকরিতে ফেরানো হয় চাকরিচ্যুৎ সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) কাহার আকন্দকে। ২০০৯ সালের ২৮ই জানুয়ারি চাকরি ফেরত পাওয়ার একদিন পরই তিনি অবসরে যান। কিন্তু অবসর থেকে ফিরিয়ে এনে আবদুল কাহার আকন্দকে চুক্তিতে সিআইডিতে বিশেষ পুলিশ সুপার করা হয়। চুক্তিতে ফিরেই কাহার আকন্দ ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব নেন। ২০১১ সালের ৩রা জুলাই আসামির তালিকায় আরও ৩০ জনকে যোগ করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেন কাহার আকন্দ। সম্পূরক অভিযোগপত্রে তারেক রহমানসহ চারদলীয় জোট সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও বিএনপি-জামায়াত নেতাদের নাম ঢুকিয়ে দেন কাহার আকন্দ।
অনুসন্ধান এবং কাহার আকন্দের ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, কাহার আকন্দের ফর্মুলা ছিল তদন্তে শেখ হাসিনার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো। শেখ হাসিনার মিশন বাস্তবায়ন করাই ছিল তার কাজ। এর মাধ্যমে তিনি শেখ হাসিনার আনুকুল্য পাওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক ফ্লাট-প্লট ও বাড়ি করা ছাড়াও কানাডাতেও তিনি একাধিক বাড়ি করেছেন। এ ছাড়া গড়েছেন বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। একটি সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-এর জামানায় খিলগাঁওয়ের তালতলার কাহার আকন্দ একটি বহুতল ভবন করেছেন। আওয়ামী লীগের বিগত ১৫ বছরের শাসনামলে তিনি রাজধানীর বসুন্ধরাসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় একাধিক ফ্লাট-প্লট ও বাড়ি করেছেন। এক সময় তিনি তালতলা’র বাসায় থাকলেও সর্বশেষ তিনি বসুন্ধরা এলাকার ফ্লাটে থাকতেন। দেশ ও দেশের বাইরে মিলিয়ে অন্তত হাজার কোটি টাকার মালিক বনেছেন কাহার আকন্দ। এ ছাড়া তার ভাই স্থানীয় সহশ্রাম ধূলদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম আকন্দের নামেও বিপুল পরিমাণ সহায়-সম্পদ করেছেন।

mzamin

Monday, October 14, 2024

ব্যাকফুটে চুন্নু, গ্রেপ্তার নাকি পুনর্বাসন! by আশরাফুল ইসলাম

বাংলাদেশের রাজনীতির এক আলোচিত-সমালোচিত চরিত্র জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। অন্য একটি রাজনৈতিক দলের নেতা হয়েও বিগত ১৫ বছরেরও বেশি সময়ে আওয়ামী শাসনামলে ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। এমপি থেকে শুরু করে মন্ত্রিত্ব পর্যন্ত সব স্বাদই নিয়েছেন। আলোচনা রয়েছে, ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন থেকে অন্য রাজনৈতিক দলগুলো যখন নির্বাচন বয়কট বা বর্জনের পথে হাঁটে, তখন জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে নেয়ার ক্ষেত্রে কৌশলী ভূমিকা রাখেন মুজিবুল হক চুন্নু। মহাজোটের অংশীদার হিসেবে তখন তিনি হাসিনা সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে চুন্নু তার নিজ আসন কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) এর প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে আওয়ামী লীগকে সরিয়ে দেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত ড. মিজানুল হক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে সরকারি দলের সহযোগিতায় ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির মাধ্যমে তাকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য হন মুজিবুল হক চুন্নু। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর পুরস্কার হিসেবে মুজিবুল হক চুন্নু মন্ত্রিসভায় শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এরপর ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর রাতের ভোটের নির্বাচনেও মুজিবুল হক চুন্নুর কৌশলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোটের সঙ্গী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয় জাতীয় পার্টি।

মহাজোট প্রার্থী হিসেবে চুন্নু ‘লাঙ্গল’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। সে নির্বাচনে আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরার স্বীকারোক্তি তিনি নিজেই দিয়েছেন। ২০২২ সালের ৩১শে জুলাই নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে জাতীয় পার্টির সংলাপে তিনি বলেছিলেন, ‘রাতে কিন্তু কাজটা (ভোট দেয়া) হয়। হয় মানে কী, আমরাই করাইছি। কী বলবো এটা হয়। এটা হয় না, ঠিক না।’ এর আগে ২০২১ সালের ৯ই অক্টোবর জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান থেকে মুজিবুল হক চুন্নুকে মহাসচিব করা হয়। তাকে মহাসচিব করার ব্যাপারেও সরকারি দল আওয়ামী লীগ এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তদবির ছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে। জাতীয় পার্টির একাধিক সূত্র বলছে, সর্বশেষ গত ৭ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে মহাসচিব হিসেবে প্রায় একক সিদ্ধান্তে চুন্নু জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে নিয়ে যান। এমনকি গত ৭ই জানুয়ারির নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসন থেকে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় মুজিবুল হক চুন্নু তার নির্বাচনী পোস্টারে নিজেকে ‘জাতীয় পার্টি মনোনীত ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত’ প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করেন। সে সময় বিষয়টি বেশ সমালোচিত হয়। এদিকে গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর শুরুর দিকে বেশ স্বস্তিতেই ছিলেন মুজিবুল হক চুন্নু। ৫ই আগস্ট সেনাপ্রধানের সঙ্গে জাতীয় পার্টির বৈঠক এবং ৩১শে আগস্ট প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে জাতীয় পার্টির প্রতিনিধি দলে ছিলেন মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের বিরোধিতার মুখে পরবর্তীতে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে ডাক পায়নি জাতীয় পার্টি। এতে জাতীয় পার্টির পাশাপাশি দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বিপাকে পড়েন। এ রকম পরিস্থিতির মধ্যেই গত ৬ই অক্টোবর রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলায় মুজিবুল হক চুন্নুকে আসামি করা হয়।

 বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিকে ঘিরে গত ৫ই আগস্ট রাজধানীর আজমপুর এলাকায় গুলিতে নিহত আলমগীর হোসেন (৩৪) এর মা মোসা. আলেয়া বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে করা এ মামলায় ৬নং আসামি করা হয়েছে মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুকে। ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে এটি মুজিবুল হক চুন্নুর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া প্রথম ও একমাত্র মামলা। এরপর থেকেই অনেকটা ব্যাকফুটে রয়েছেন মুজিবুল হক চুন্নু। তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার বিষয়টি তার নিজ জেলা কিশোরগঞ্জে জানাজানি হওয়ার পর সেখানে মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া তার নিজ এলাকার মানুষ মুজিবুল হক চুন্নুকে এ মামলায় অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। এ পরিস্থিতি চুন্নু কীভাবে সামাল দিবেন, সেটিই এখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে শনিবার (১২ই অক্টোবর) জাতীয় পার্টি আয়োজিত ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সকল থানা নেতৃবৃন্দের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় মুজিবুল হক চুন্নু বলেছেন, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ বরাবরই আমাদের অনৈতিকভাবে বিভিন্ন চাপে রেখে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করেছে। তাদের কাছে অনেক সময় আমরা জিম্মিও ছিলাম।

এখন কোনো চাপ নেই তাই আমরা স্বাধীনভাবে আমাদের রাজনৈতিক কর্মকৌশল প্রণয়ন করে জনগণকে প্রকৃত সেবা দেয়ার লক্ষ্যে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হবো। জনগণ আমাদেরকেই সমর্থন করবে। এজন্য ধৈর্য্য ধারণ করে কারও কোনো উস্কানিতে বিভ্রান্ত না হয়ে পার্টির সকল সাংগঠনিক কার্যক্রমে একাগ্রতার সহিত অংশগ্রহণ করতে হবে এবং জনগণকেও উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দলীয় ফোরামে চুন্নু যাই বলেন না কেন, আওয়ামী লীগকে সর্বগ্রাসী হয়ে উঠতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল জাতীয় পার্টি এবং এক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকায় ছিলেন মুজিবুল হক চুন্নু। তাই বর্তমান পরিস্থিতি জাতীয় পার্টি কিংবা চুন্নু কারওরই অনুকূলে নয়।
বিশেষ করে চুন্নুর বিরুদ্ধে বেশি সরব আলোচনা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হবেন কি-না, সেটি নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। এ পরিস্থিতি সামাল দিয়ে তিনি পুনর্বাসিত হন কি-না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

mzamin


Wednesday, September 4, 2024

কটিয়াদী পাকুন্দিয়ায় সুলতানের সাম্রাজ্য by আশরাফুল ইসলাম

কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সদ্য সাবেক সংসদ সদস্য পাকুন্দিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক এডভোকেট মো. সোহ্‌রাব উদ্দিনের একমাত্র ছেলে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এসএম তৌফিকুল হাসান সাগর। কটিয়াদী ও পাকুন্দিয়ার মানুষের কাছে তিনি ‘সুলতান’ নামেই বেশি পরিচিত। দীর্ঘদিন আগে তার নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে একটি ভয়ঙ্কর সশস্ত্র বাহিনী, যার নাম সুলতান বাহিনী। আস্থাভাজন ৩০-৪০ জন তরুণ-যুবকদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় এই বাহিনী। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের টিকিটে বিনা ভোটে এমপি হন তার বাবা এডভোকেট সোহ্‌রাব উদ্দিন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলে বঞ্চিত হন সোহ্‌রাব। নূর মোহাম্মদ এমপি থাকার সময়ে বেশ কয়েকবার তার লোকজনের সঙ্গে পাকুন্দিয়ায় সুলতান বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। সুলতান বাহিনী এতটাই ভয়ঙ্কর ও অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত থাকতো যে, এমপি নূর মোহাম্মদ সমর্থক এবং পুলিশকে তারা মাঠেই দাঁড়াতে দিতো না। এই বাহিনীর উপর ভর করেই বিগত ৭ই জানুয়ারির নির্বাচনে কেন্দ্রের পর কেন্দ্র দখলের মাধ্যমে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য হন সোহ্‌রাব।

স্থানীয়রা বলছেন, নির্বাচনের পর আরও ভয়ঙ্কররূপে আবির্ভূত হয় সুলতান বাহিনী। এই বাহিনী হয়ে ওঠে কটিয়াদী ও পাকুন্দিয়ার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক। এমপি বাবাকে সামনে রেখে দুই উপজেলার সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করতেন সুলতান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের ম্যানেজিং কমিটি, কালিয়াচাপড়া সুগার মিলের যন্ত্রাংশ ও মালামাল পাচার, বালুমহাল, টিসিবি ডিলারসহ সবকিছুই হতো সুলতানের হাতের ইশারায়। সুলতান নিজেই দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতির পদ দখল করেন। মাত্র ৭ মাসেই এসব খাত থেকে অন্তত অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নেন সুলতান। এ ছাড়া তার নেতৃত্বে কিশোরগঞ্জ জেলা জুড়ে গড়ে ওঠে ভারতীয় চোরাই চিনির একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। চোরাই এসব চিনি যেতো রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে। চিনি চোরাচালান থেকে সুলতান বিপুল অঙ্কের টাকা কামালেও সংসদ সদস্য বাবার সুবাদে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান তিনি। গত ৮ই মে অনুষ্ঠিত পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে এমপি’র সমর্থনের জন্য তৎকালীন পাটুয়াভাঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এমদাদুল হক জুটনের কাছ থেকে সুলতান ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। সে সময় বিষয়টি বেশ আলোচিত হয়। সুলতানকে টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে এমপি’র সমর্থন লাভের পরপরই মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন ১৬ই এপ্রিল এমদাদুল হক জুটন ইউপি চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হন। নির্বাচনের দিন সুলতান বাহিনী তার পক্ষে ভোটে ব্যাপক অনিয়মসহ একাধিক কেন্দ্র দখলে ভূমিকা রাখে। এরপর ফলাফল ঘোষণার সময়ে জালিয়াতির মাধ্যমে এমদাদুল হক জুটনকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। এ ব্যাপারে প্রতিদ্বন্দ্বী এক প্রার্থী নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করলে ভোটভর্তি ব্যালটবাক্স আদালতের জিম্মায় রাখা হয়। সর্বশেষ ছাত্র আন্দোলনের সময় গত ৪ঠা আগস্ট সোহ্‌রাব ও তার ছেলে সাগরের নেতৃত্বে পাকুন্দিয়া থানার ওসি আসাদুজ্জামান টিটুসহ থানা পুলিশ ও সুলতান বাহিনী মিলে পাকুন্দিয়া সদরে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। ৫ই আগস্ট পটপরিবর্তনের পর সুলতান বাহিনী উপজেলার দরগা বাজারে সোহ্‌রাবের বাসভবনকে ঘিরে শক্ত অবস্থান নেয়। সুলতান বাহিনীর পাহারায় গত ১২ই আগস্ট সেখানে একটি সভাও হয়। কিন্তু ছাত্র-জনতার ক্ষোভের বিষয়টি আঁচ করতে পেরে গত আগস্ট পিতা-পুত্র পাকুন্দিয়া ত্যাগ করেন।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ২০১৪ সালের পর সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্দ আত্মসাতসহ ব্যাপক টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি ছিল সুলতান বাহিনীর নিত্যনৈমত্তিক কাজ। এমপির ক্ষমতার প্রভাবে মামলার জালে ঘায়েল করা হতো প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের। এমপিকে প্রধান অতিথি করা ছাড়া এলাকায় কোনো অনুষ্ঠান করা যেতো না। রাজনৈতিক, ক্রীড়া, সামাজিক প্রতিটি অনুষ্ঠানে সোহ্‌রাবকে প্রধান অতিথি করতে হতো। এর ব্যত্যয় হলে সে অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করে দেয়া হতো। এ ছাড়া সোহ্‌রাবের সেই মেয়াদে সড়কবাতি প্রকল্পের টেন্ডার বাগিয়ে নিয়ে তার ছেলে সাগর কয়েক কোটি টাকা কামাই করেন। ২০১৯ সালের মে মাসে সাগর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের শোভন-রাব্বানী কমিটিতে টাকার বিনিময়ে সহ-সভাপতি পদ বাগিয়ে নেন। সে সময় এ নিয়ে বেশ বিতর্ক হয়। এর প্রেক্ষিতে সহ-সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন সাগর। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ১৪ই নভেম্বর প্রকাশিত কেন্দ্রীয় যুবলীগের ২০১ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে নির্বাহী সংসদের সদস্য হিসেবে স্থান পান তিনি। যুবলীগের এই পদকে পুঁজি করে সাগর তার সুলতান বাহিনীর মাধ্যমে এলাকায় আধিপত্য ধরে রাখেন। ৫ বছর বিরতির পর সোহ্‌রাবের সর্বশেষ এমপির মেয়াদে মাত্র ৭ মাসেরও কম সময়ে অন্তত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তার ছেলে সাগর। এর মধ্যে কটিয়াদী ও পাকুন্দিয়া এই দুই উপজেলার বালু খাত থেকেই আড়াই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। পিতা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর পরই নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে সাগর জানিয়ে দেন, ‘টাকা খরচ করে আমরা এমপি হয়েছি, এখন আমি সুদে-আসলে সে টাকা তুলবো। এ নিয়ে যেন কারও কোন কথা না শুনি।’ এরপরই শুরু হয় সুলতানের টাকা কামানোর মিশন। এসব ব্যাপারে কথা বলার জন্য সোমবার বিকাল ৫টা ৩৬ মিনিটে এসএম তৌফিকুল হাসান সাগর এর মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।


Saturday, August 17, 2024

বাবা মুক্তিযোদ্ধা না হলেও ডিবি হারুনের চাকরি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় by আশরাফুল ইসলাম

ডিএমপি’র সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদের বাবা আবুল হাশেম হাসিদ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৭ সালে মুক্তিযোদ্ধা সনদ ভাগিয়ে নেন তিনি। ভুয়া এই সনদ ব্যবহার করে হারুন ২০তম বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় পুলিশে চাকরি নেন। কেবল হারুন নয় তার অপর ছোট তিন ভাইও মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা নিয়েছেন। এর মধ্যে দ্বিতীয় জিয়াউর রহমান মাদকদ্রব্যে ও তৃতীয় জিল্লুর রহমান পুলিশে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেন। এ ছাড়া সবার ছোট এবিএম শাহরিয়ার মুক্তিযোদ্ধা কোটায় মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। বর্তমানে জিয়াউর রহমান মাদকদ্রব্যের এসআই ও জিল্লুর রহমান পুলিশের ইন্সপেক্টর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া ডা. এবিএম শাহরিয়ার বড় ভাই হারুনের প্রতিষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাজধানীর মিরপুরে হারুনের টাকায় একটি হাসপাতালের অংশীদার হিসেবে সেটি পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদের তৎকালীন ডেপুটি স্পিকার মো. আবদুল হামিদের প্রভাবে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় জায়গা পান হারুনের বাবা আবুল হাশেম হাসিদ। কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন কমান্ডার ফজলুল হক চাপে পড়ে আবুল হাশেম হাসিদকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রত্যয়ন দেন। তখন তৎকালীন মিঠামইন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড থেকে প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি জামুকাতে লিখিতভাবে অভিযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু সে প্রতিবাদ ও অভিযোগ আমলে নেয়া হয়নি।

মিঠামইন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার কোরবান আলী বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, হারুন অর রশীদের বাবা আবুল হাশেম হাসিদ ঘাগড়া ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামের বাসিন্দা। মুক্তিযুদ্ধের সময় পক্ষে বা বিপক্ষে তিনি কোনো ভূমিকা রাখেননি। সে সময় গ্রামের খুব সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন আবুল হাশেম হাসিদ। তার গোষ্ঠীর লোকজন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতায় ভূমিকা রেখেছিলেন। এগুলো এলাকার সবাই জানে। সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ডেপুটি স্পিকার থাকার সময়ে আবুল হাশেম হাসিদকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন। ঘাগড়া ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন কমান্ডার ফজলুল হক চাপে পড়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আবুল হাশেম হাসিদকে প্রত্যয়ন দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা এর বিরোধিতা করেছিলাম। তৎকালীন মিঠামইন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার এডভোকেট রফিকুল আলম রতন এবং আমি জামুকাতে লিখিতভাবে অভিযোগও করেছিলাম। কিন্তু ক্ষমতার প্রভাবের কারণে আমাদের সেই অভিযোগের ফাইলই খুঁজে পাইনি। তবে আমরা যেটি সত্য, সেটি সব সময় বলে এসেছি। আবুল হাশেম হাসিদ মারা যাওয়ার পর তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় যখন দাফন করা হয়, তখন আমরা অনেকেই সে সময় যাইনি। অনেকে আবার চাপে পড়ে গিয়েছেন। জানা গেছে, গাজীপুরের পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত থাকার সময় হারুন অর রশীদের বাবা আবুল হাশেম হাসিদ ২০১৬ সালের ৭ই এপ্রিল মারা যান। পরদিন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সাবেক ডিবি প্রধান হারুন কিশোরগঞ্জের আজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সূর্যসেন হলে থাকতেন তিনি। ১৯৯৬ সালের ১২ই জুনের নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন ডেপুটি স্পিকার মো. আবদুল হামিদ এডভোকেটের স্নেহভাজন হওয়ার কারণে তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০০০ সালে হারুন মুক্তিযোদ্ধা কোটায় পুলিশে চাকরি নেন। তৎকালীন ডেপুটি স্পিকার মো. আবদুল হামিদ এডভোকেটের সুপারিশে তিনি ভাইভাতে শতভাগ নাম্বার পান। এ নিয়ে সে সময় পত্র-পত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়।


Friday, August 21, 2020

‘তার মতো এমন মানবদরদি খুবই বিরল’ by আশরাফুল ইসলাম

আইভি রহমান। পুরো নাম জেবুন্নাহার আইভি। ২১শে আগস্টে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ২৪শে আগস্ট আজন্ম রাজনৈতিক এই নেতা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। তার চির প্রস্থানে জন্মস্থান ভৈরবের মানুষ হারায় তার একান্ত সুহৃদ, প্রিয় আইভি আপাকে। পৈশাচিক গ্রেনেড হামলায় প্রিয় আইভি আপার গুরুতর আহত হওয়ার খবর পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে পুরো ভৈরব। পরদিন ২২শে আগস্ট ভৈরবে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকা হয়। হরতালে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান আবদুল কুদ্দুস (৩২) নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মী।
নিহত কুদ্দুসের পরিবার বিচার না পেলেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের নামে দায়ের করা হয় ৩টি মিথ্যা মামলা।

ওই সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে দৈনিক মানবজমিন-এর ভৈরব প্রতিনিধি মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ২২শে আগস্ট দিনটি ভৈরববাসীর জন্য এক কালোদিন। ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমান আহতসহ হতাহতের ঘটনার প্রতিবাদে ২২শে আগস্ট ভৈরবে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকা হয়। স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ এ হরতাল আহ্বান করে। হরতালের সমর্থনে ভোর থেকে নেতাকর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে ভৈরব বাজার আওয়ামী লীগ অফিসে জড়ো হন। এ সময় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী সুবর্ণ এক্সপ্রেস আন্তঃনগর ট্রেনটি ভৈরব বাজার রেলজংশনের মনমরা রেলসেতুর কাছে পিকেটারদের কবলে পড়ে। উত্তেজিত জনতা ট্রেনটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পুলিশ আওয়ামী লীগ কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলি ও টিয়ার শেল ছোড়ে। গুলিতে আবদুল কুদ্দুস নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হন। ঘটনার পর উত্তাল হয়ে পড়ে ভৈরব। এ ঘটনায় পুলিশ ভৈরবের ২ শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ৩টি মিথ্যা মামলা করে। মিথ্যা মামলা করায় আওয়ামী লীগ লাগাতার কর্মসূচি দেয়। পুলিশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি চালায়। গ্রেপ্তার আতঙ্ক ও হয়রানির আশঙ্কায় অনেকে ভৈরব ছাড়তে বাধ্য হন। পুলিশ দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ অফিস অবরুদ্ধ করে রাখে।

সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম বলেন, সর্বদা পরিশ্রমী, অক্লান্ত ছুটে চলা আইভি রহমান আজ স্মৃতির সাদা ফ্রেমে বাঁধা নিশ্চুপ ছবি হলেও, ভৈরববাসী আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার কাছে তিনি জীবন্ত, চলমান। তিনি বেঁচে আছেন তার কর্মের মধ্য দিয়ে।

ভৈরব মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক উলফাত আরা জাহান জানান, ১৯৯৬ সালে তিনি যখন ভৈরব মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন, আইভি রহমান তখন কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান। ভৈরবে আসলেই তিনি ডাকতেন। কথা ও কাজে এক ছিলেন তিনি। দেশীয় খাবার খেতে পছন্দ করতেন তিনি। শুঁটকির ভর্তা ছিল তার প্রিয় খাবার। ১৯৯৮ সালে মহিলা সংস্থার অফিস নির্মাণ ছাড়াও মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানের লক্ষ্যে তিনি ভৈরব বাজারে মহিলা সমবায় মার্কেটের জন্য জায়গা বরাদ্দের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। উলফাত আরা জাহান বলেন, নারী উন্নয়ন ও নারী অধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার এমন মানুষ আর দেখা যায় না। গ্রেনেড হামলার ঘটনার মাত্র এক সপ্তাহ আগেও তিনি ভৈরবে এসেছিলেন।

সে সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে উলফাত আরা জাহান বলেন, ওই বছর ভৈরবে বন্যা হয়েছিল। নিজ এলাকার দুর্গত মানুষের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলেন তিনি। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে জলাবদ্ধ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বাড়ি বাড়ি ছুটে গিয়ে তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ত্রাণসামগ্রী। জন্মস্থান ভৈরবে তিনি আজীবন এভাবে নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে বেঁধে রেখেছিলেন। বাংলাদেশ মহিলা সমিতির সভানেত্রী ও জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতির অবৈতনিক প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে এখানকার নারীদের উন্নয়ন এবং সমাজের অবহেলিত শিশু, প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে তিনি ব্যাপক কাজ করেন। সেসব অসহায় মানুষের কাছে আইভি রহমান এখনো দেবীতুল্য। উলফাত আরা জাহান জানান, একেবারেই সাধারণ জীবনযাপন করতেন আইভি রহমান। পরতেন সুতির শাড়ি। আমৃত্যু মানুষকে ভালোবেসে গেছেন, তাদের ভালোবাসা পেয়েছেন। মানুষকে অকাতরে দান করলেও সেসব প্রচার করতেন না তিনি। তার মতো এমন মানবদরদি খুবই বিরল।

১৯৪৪ সালের ৭ই জুলাই কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব শহরের চণ্ডিবের গ্রামের ঐতিহ্যবাহী সভ্রান্ত এক পরিবারে তার জন্ম। পিতা মরহুম জালাল উদ্দিন আহমেদ ছিলেন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ এবং ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ। মা হাসিনা বেগম ছিলেন আদর্শ গৃহিণী। ৮ বোন ও ৪ ভাইয়ের মধ্যে আইভি পঞ্চম। ছেলেবেলা থেকেই আইভি ছিলেন শান্ত স্বভাবের, তবে প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। তার ব্যক্তিত্ব, গাম্ভীর্যপূর্ণ স্বভাবের জন্য তাকে বাইরে থেকে খুব কঠিন মনে হলেও, আদতে তিনি ছিলেন খুবই দরদি মনের মানুষ। যারা মিশেছে, কাছে গেছে তারাই পেয়েছে অপরিসীম ভালোবাসা, আদর, মমতা আর সহযোগিতা। প্রথম দর্শনেই আইভিকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন রাজনীতির প্রবাদ পুরুষ প্রয়াত প্রেসিডেন্ট মো. জিল্লুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে নবম শ্রেণি পড়ুয়া আইভির সঙ্গে ১৯৫৮ সালের ২৭শে জুন প্রয়াত প্রেসিডেন্ট মো. জিল্লুর রহমানের বিয়ে হলে নামের পরে ‘রহমান’ যুক্ত হয়। এ নামেই তিনি পরিচিতি পান দেশব্যাপী। শুধু আওয়ামী রাজনীতির জন্য নয়, আইভি রহমান বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সঙ্গে পারিবারিকভাবেও জড়িত ছিলেন। তার বড় বোন শামসুন্নাহার সিদ্দিক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানার শাশুড়ি। একমাত্র ছেলে বিসিবি সভাপতি ও সংসদ সদস্য নাজমুল হাসান পাপন, দুই মেয়ে তানিয়া বখ্‌ত ও তনিমা রহমান ময়না এবং তাদের ছেলেমেয়ে ও স্বামী জিল্লুর রহমানকে নিয়ে তার পারিবারিক জীবন ছিল খুবই গোছানো। গ্রেনেড হামলায় আহত হয়ে আইভি রহমানের মৃত্যুর পর তাই বিষাদভরা কণ্ঠে মো. জিল্লুর রহমান জানিয়েছিলেন, ‘আইভিকে ছাড়া আমি জীবন্মৃত।’ ভৈরবের বাড়ির ‘গৃহকোণ’ নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘আইভি ভবন’। এই বাড়িটিতে ভৈরববাসীর সঙ্গে আইভি রহমানের নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে আইভির অসামপ্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বর্ণাঢ্য জীবনের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মহিলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। একই সঙ্গে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭১ সালে আইভি রহমান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি ভারতে গিয়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালে জাতীয় মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী হন। ১৯৭৮ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের মহিলা বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৮০ সালে কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আইভি রহমান চলে গেছেন বার বছর হলো। কিন্তু ভৈরবে ‘আইভি ভবন’ আছে আগের মতোই। সেখানে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে এসে অশ্রু-পুষ্পে ভৈরববাসী স্মরণ করেন তাদের প্রিয় নেত্রী আইভি রহমানকে। বাংলার এই কৃতী সন্তানের স্মরণে ভৈরবের কমলপুরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে নির্মাণ করা হয়েছে ‘আইভি রহমান গেইট’। চণ্ডিবের গ্রামের নিজ বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে ‘স্মৃতিস্তম্ভ’। ভৈরব জিল্লুর রহমান সরকারি মহিলা কলেজের একটি ছাত্রীনিবাসের নামকরণ করা হয়েছে তার নামে। আইভি রহমান নিহত হওয়ার পর তার নামে ভৈরবে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছিল এলাকাবাসী। কিন্তু সেটি আজও উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

Monday, September 16, 2019

গোয়ালঘরে মা by আশরাফুল ইসলাম

কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার শাহেদল বড়বাড়ির অশীতিপর বৃদ্ধা শমলা বিবি। ৪  ছেলে ও ৪ মেয়ের জননী তিনি। ৪ মেয়ে থাকেন স্বামীর সংসারে। ছেলেদের সবাই  মোটামুটি  স্বচ্ছল । রয়েছেন স্বামীও। কিন্তু তিনি আরেক স্ত্রী গ্রহণ করায় খোঁজ  নেন না শমলা বিবির।

৯০ বছর বয়সী এই বৃদ্ধার নামে দুই শতক জায়গা ছিলো। সেটিও লিখে দিয়েছেন ছোট দুই ছেলে হেলাল উদ্দিন ও নিজাম উদ্দিনের নামে। এরপর থেকে ছেলেরাও আর তার কোন খোঁজ নেন না। স্বামী-সন্তান থেকেও যেন কেউ নেই শমলা বিবির।

শমলা বিবির ছেলেরা স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন আর পরিপাটি সুন্দর ঘরে বসবাস করেন। কিন্তু মায়ের স্থান হয়নি তাদের সঙ্গে। অগত্যা পরিত্যক্ত মালামালের মতো তারও ঠাঁই হয়েছে বাড়ির গোয়ালঘরে। গোয়ালঘরের এক কোণে মাথা গুজে খেয়ে, না খেয়ে দিন কাটে তার।

গত দু’বছর ধরে গোয়ালঘরে গরুর পাশাপাশি নোংরা পরিবেশের মধ্যে একটি ভাঙা চৌকিতে শুয়ে দিন পার করছেন এই সর্বংসহা নারী। সেই গোয়ালঘরে জ্বলে না কোন বৈদ্যুতিক বাতি। এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠের মতোই সেখানে দিন-রাত কাটে তার। গোয়ালঘরের গোমূত্রের গর্ত, আবর্জনা আর নোংরা পরিবেশে মশার অসহনীয় উৎপাতকে সঙ্গী করে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুকেই নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন এই জনমদুঃখী মা।

শমলা বিবির এই অসহায়ত্ব পীড়া দেয় ঢাকা থেকে স্বামীর সঙ্গে বাড়িতে বেড়াতে আসা মেয়ে নূরজাহান বেগমকে। ভাই হেলাল উদ্দিনকে তার বৈদ্যুতিক মিটার থেকে মায়ের থাকার ঘর গোয়ালঘরে বৈদ্যুতিক বাতির সংযোগ দিতে বলেন। কিন্তু মাস শেষে তার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল বহন করতে হবে বলে বৈদ্যুতিক বাতির সংযোগ দিতে অস্বীকৃতি জানান হেলাল। মায়ের দুর্ভোগ আর দুর্দশা সইতে না পেরে স্বামী মানিক মিয়াকে হোসেনপুর থানায় অভিযোগ দিতে পাঠান নূরজাহান।

গতকাল শনিবার দুপুরে মানিক মিয়া অভিযোগ নিয়ে হোসেনপুর থানায় গেলে বিষয়টি জানতে পারেন হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলী। অভিযোগ শুনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলী সেই মাকে দেখতে হোসেনপুর থানার অফিসার ইনচার্জ শেখ মো. মোস্তাফিজুর রহমান ও অফিসার ফোর্সসহ বিকালেই ছুটে যান উপজেলার শাহেদল বড়বাড়িতে।

হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলীকে শমলা বিবি জানান, দুই বছর ধরে তিনি গোয়ালঘরে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন। সারাদিন গোয়ালঘরে, একবারও কেউ তার খোঁজ নিতে আসে না। এই বয়সটাই যেন তার কাছে এক বিরাট অভিশাপ।

এ সময় হোসেনপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলী স্থানীয় দুই ইউপি সদস্যকে ডেকে আনেন। দুই ইউপি সদস্যসহ স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতিতে শমলা বিবিকে ছোট ছেলে নিজাম উদ্দিনের ঘরে তুলে দেন তারা। শমলা বিবির ভরণপোষণের দায়িত্ব নেন দ্বিতীয় ছেলে ইমান উদ্দিনের ব্যবসায়ী ছেলে ওমর ফারুক। এছাড়া ৪ ছেলে গিয়াস উদ্দিন, ইমান উদ্দিন, হেলাল উদ্দিন ও নিজাম উদ্দিন ১০ দিনের মধ্যে নতুন ঘর নির্মাণ করে দেয়ার লিখিত অঙ্গীকার করেন।

এ ব্যাপারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সোনাহর আলী বলেন, শমলা বিবির চার ছেলে নতুন ঘর নির্মাণ করার অঙ্গীকার করেছেন। তবে সেই অঙ্গীকার তারা কতটা রাখেন সেটি বলা যাচ্ছে না। এ কারণে পুলিশের পক্ষ থেকে তারা এই দুখিনী মায়ের থাকার জন্য একটি নতুন ঘর নির্মাণ করে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। নতুন ঘর নির্মাণ করে দেয়া ছাড়াও এই মায়ের থাকার জন্য যাবতীয় জিনিসপত্রের ব্যবস্থাও করে দেবে পুলিশ।

Tuesday, August 20, 2019

ভ্রমণপিপাসুরা ছুটছে কিশোরগঞ্জের হাওরে by আশরাফুল ইসলাম

বর্ষার হাওর এখন কূলহীন সাগর। চারদিকে বিশাল জলরাশি। এর বুকে বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোর একেকটাকে ছোট দ্বীপের মতো লাগে। দূর থেকে মনে হয়, কচুরিপানা হয়ে যেন পানিতে ভাসছে গ্রামগুলো। হাওরজুড়ে গলা ডুবিয়ে থাকে হিজল গাছের সারি। পানির নিচ থেকে জেগে ওঠা করচের বন, হাঁসের ডিমের মতো সাদা ফল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বরুন গাছ, কিংবা গাঙ্গেয় মিঠা পানিতে শুশুকের লাফ-ঝাঁপ দেখলে বিনোদিত না হয়ে পারা যায় না। এই সৌন্দর্য মন কাড়ে যে কারও। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য যেন সৌন্দর্যের বিপুল পসরা সাজিয়ে বসে আছে হাওর।
প্রতি বর্ষাতেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ঘুরতে আসেন এই হাওরে। এবারের ঈদ যেন দর্শণার্থীদের আরো বেশি হাওরপ্রেমী করে তুলেছে। মানুষজন দলবেঁধে ছুটছেন হাওরের বিভিন্ন মনোরম স্থানে। জেলার হাওরের পাড়ে পাড়ে এখন ভ্রমণপিপাসুদের কলরব। তাদের বাঁধভাঙা ঢল আর উচ্ছ্বাসে মাতোয়ারা হাওর যেন পরিণত হয়েছে পর্যটনের এক স্বর্গপুরীতে। শুকনো মৌসুমে হাওর মানে মাইলের পর মাইল ফসলি জমি, ধুলোউড়া মেঠোপথ, রুপালি নদী। বর্ষায় এই রুপালি নদীগুলোই ফুঁসে উঠে। দুই তীর ছাপিয়ে প্লাবিত করে ফসলি মাঠ। এই প্লাবিত মাঠই বর্ষার হাওর। হাওর অধ্যুষিত অন্যতম একটি জেলা কিশোরগঞ্জ। এই বর্ষায় অন্যবছরের চেয়ে হাওরে পানি তুলনামূলকভাবে বেশি এসেছে। এই পানির টানে এবারের ঈদে হাওরের বেশ কয়েকটি স্থানে ঢল নেমেছে দর্শনার্থীদের। এরমধ্যে রয়েছে করিমগঞ্জ উপজেলার চামড়াঘাট, বালিখলা ও হাসানপুর ব্রিজ, ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সংযোগ সড়ক ও বেড়িবাঁধ, শিমুলবাঁকের হিজলবন, মিঠামইনের কামালপুরে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদের বাড়ি, দিল্লির আখড়া, নিকলী বেড়িবাঁধ, ছাতিরচরের হিজলবন এবং তাড়াইলের হিজলজানি হাওর।
কিশোরগঞ্জ জেলা শহর থেকে সবচেয়ে কাছে হাওরের স্পর্শ পাওয়া যায় করিমগঞ্জ উপজেলার বালিখলা এলাকায়। বালিখলা থেকে মিঠামইনে যাওয়ার পথে হাওরের পানিতে ভাসছে একটি সেতু। হাসানপুর গ্রামের পাশে গড়াভাঙ্গা নদীর উপর নির্মিত এই সেতুটি হাসানপুর ব্রিজ নামে পরিচিত। প্রায় ১৫৭ মিটার দীর্ঘ ব্রিজের সাথে রয়েছে ১.১৭ কিলোমিটার অলওয়েদার সড়ক ও ১.৬৫ কিলোমিটার সাবমার্সিবল সড়ক। এবারের ঈদে জেলার হাওরের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দপর্যটকের ঢল নেমেছে বালিখলা এলাকায়। বালিখলা এলাকায় সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে তারা হাওরের বিপুল সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। অনেকেই আবার হাওরের বহমান পানির স্রোতে গা ভাসিয়ে দিচ্ছেন। বালিখলা ঘাট থেকে নৌকা ভাড়া নিয়ে অনেকেই ছুটছেন হাওর ভ্রমণে। নৌকাযোগে ছুটে যাচ্ছেন অদূরের হাসানপুর ব্রিজে। সেখানে ফটোসেশন, আড্ডা আর ঘুরেফিরে সময় কাটানোর পাশাপাশি ব্রিজের সাবমার্চেবল সড়ক অংশে পা ভেজাচ্ছেন হাওরের জলে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাওরের সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিন ভ্রমণপিপাসু মানুষ দলবেঁধে ছুটে আসছেন।
বালিখলা ও হাসানপুর ব্রিজ ছাড়াও হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলীতে রয়েছে বেশ কয়েকটি বেড়িবাঁধ। নির্মিত হচ্ছে উপজেলাগুলোর সংযোগ সড়ক। এসব বেড়িবাঁধ বা সড়কে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে তাকালে ৩০-৩৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো গ্রাম চোখে পড়ে না। বাঁধ বা সড়কে দাঁড়িয়ে হাওর দেখা সাগর দেখার মতোই উপভোগ্য। হাজারো দর্শনার্থী রোজ ছুটছেন হাওরের নির্মল বাতাসে বুকভরে নিঃশ্বাস নেয়ার পাশাপাশি হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য।
হাওরের নান্দনিক স্থানের মধ্যে দর্শনার্থীদের কাছে পছন্দের একটি নাম নিকলী বেড়িবাঁধ। নিকলী উপজেলা সদরে হাওরের ঢেউয়ের কবল থেকে রক্ষা করতে ২০০০ সালে প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ এই বেড়িবাঁধটি নির্মাণ করা হয়। পরে ২০১০ সালে নিকলী উপজেলা পরিষদের সামনের প্রতিরক্ষা দেওয়াল বাঁধটিকেও বেড়িবাঁধ আকারে করে এর সাথে সংযুক্ত করা হয়। এরপর থেকেই দীর্ঘ ৬ কিলোমিটারের এই হাওর রক্ষা বাঁধটিকে কেন্দ্র করে নিকলী পর্যটন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। বর্ষা এলেই জেলা সদরসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন নিকলীতে। ফলে ঈদের আগে থেকেই দর্শণার্থীরা নিকলী বেড়িবাঁধে ভিড় জমাতে থাকেন। ঈদের পর থেকে নির্মল আনন্দের খোঁজে দর্শনার্থীরা বেছে নিয়েছেন হাওরের এই স্থানটিকেই। ফলে সকাল থেকে সন্ধ্যা এমনকি রাত পর্যন্ত সব বয়সীদের উপচে পড়া ভিড় সেখানে লেগেই রয়েছে। এছাড়া নিকলী উপজেলা সদরের সঙ্গে রাজধানী ঢাকাসহ জেলা সদরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ থাকায় সেটিও দর্শনার্থীদের আগ্রহী করছে। নিকলী বেড়িবাঁধ থেকে ইঞ্জিন চালিত নৌকা ও স্পিডবোট ভাড়ায় নিয়ে দর্শণার্থীরা হাওরের মাঝে ভেসে বেড়ানোরও সুযোগ পাচ্ছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, এবারের ঈদের পরের দিন থেকে নিকলীতে প্রতিদিন লাখো মানুষ ভিড় করছেন। রোদারপুড্ড সেতু থেকে শুরু হওয়া দর্শনার্থীদের এই ভিড় দেখতেও চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। দর্শনার্থীরা শুধু হাওর-ই দেখছেন না, ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে নামছেন গোসল, জলকেলি ও সাঁতারে।
হাওরে বর্ষা থাকে বছরের প্রায় ছয় মাস। পানি আসতে শুরু করে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ থেকে। শেষ হয় আশ্বিন-কার্তিকে। এই পুরো সময় জুড়েই হাওরে পর্যটকদের ভিড় থাকে। শ্রাবণ মাস শেষে এখন ভাদ্র মাস চলছে। হাওরে টুইটম্বুর পানি। ঈদের ছুটিতে হাওরদর্শন যেন ঈদের আনন্দকে আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। ঈদের আমেজে প্রতিদিনই হাওরে ছুটছেন লাখো মানুষ। যেন এক মহামিলনের উৎসবে মাতোয়ারা বিনোদনপ্রেমীরা।
দর্শনার্থীরা বলছেন, প্রতিদিন হাওরে হাজার হাজার মানুষ আসছেন একটু নির্মল আনন্দময় পরিবেশে সময় কাটাতে। হাওরের মতো এমন পরিবেশ এখন আর কোথাও দেখা যায় না।
হাওরে ঘুরতে আসা দর্শণার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক রয়েছে কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ। এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ বিপিএম (বার) বলেন, হাওরের এবার দর্শনার্থীদের বিপুল সমাগম ঘটছে। তবে দর্শনার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে ভ্রমণের ব্যাপারে সচেতন থাকা উচিত। নিরাপত্তার বিষয়ে আমাদের পুলিশ সবসময় প্রস্তুত রয়েছে।

Thursday, August 8, 2019

খেলাপি ঋণের পাহাড় by আশরাফুল ইসলাম

মার্চ শেষে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা ; তিন মাসে বেড়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা ; এক বছরে বেড়েছে ২২ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা।
এক শ্রেণীর প্রভাবশালী ব্যক্তি ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে আর শোধ করছেন না। ঋণদুর্বৃত্তদের অপকর্মের খেসারত গুনতে হচ্ছে গোটা জাতিকে। বলা চলে দেশের ব্যাংকিং খাতে ইচ্ছেকৃত ঋণখেলাপির সংখ্যা বাড়ছে, যার জন্য দায়ী কিছু বড় ঋণখেলাপি। তারা ব্যাংক থেকে নানা কৌশলে ঋণ নিচ্ছেন। কিন্তু আর ফেরত দিচ্ছেন না। আর এ বড় ঋণখেলাপির কারণে সামগ্রিকভাবে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমে গেছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে গত মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। তিন মাস আগে অর্থাৎ ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। আর গত বছরের মার্চে ছিল ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। আর এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২২ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। এর বাইরে ঋণ অবলোপন, বারবার ঋণ পুনঃতফসিল ও ঋণ পুনর্গঠনের হিসাব মেলালে প্রকৃত খেলাপি ঋণ আরো অনেক বেশি হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বছরের শুরুতেই অর্থমন্ত্রী ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুযোগ দেয়ার কথা ঘোষণা করেন। ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১৫ বছরের জন্য ঋণ নবায়নের কথা বলেন। যদিও পরে তা সার্কুলার করে ১২ বছর করা হয়েছে। এসব কারণে যেসব ব্যবসায়ী নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতেন, তারা আর ঋণ পরিশোধে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার এটা অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতের ঋণ বিতরণ ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে মোট ঋণের ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশই খেলাপি।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, মার্চ শেষে সরকারি খাতের ৬ ব্যাংকের ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা ঋণের ৫৩ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা খেলাপি। গড়ে ব্যাংকগুলোর ৩২ দশমিক ২০ শতাংশ ঋণই খেলাপি হয়ে গেছে।
বেসরকারি খাতের দেশীয় ৪০টি ব্যাংকের ঋণ ৭ লাখ ৫ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর ৪৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা খেলাপি, যা মোট ঋণের ৭ দশমিক ০৮ শতাংশ।
ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালকেরা নিজেদের মধ্যে ঋণ আদান-প্রদান করছেন। যে উদ্দেশ্যে এসব ঋণ নেয়া হচ্ছে, তার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। ঋণের অর্থ পাচারও হচ্ছে। এর সাথে জড়িয়ে পড়েছেন ব্যাংকের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও। ফলে খেলাপি ঋণের ভয়াবহতা প্রকাশ পাচ্ছে।
বিদেশী ৯টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ মার্চ শেষে হয়েছে ২ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর ৬ দশমিক ২০ শতাংশ ঋণ খেলাপি। এসব ব্যাংক ঋণ দিয়েছিল ৩৬ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।
বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলোর ১৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ ঋণই খেলাপি। এসব ব্যাংক ঋণ দিয়েছিল ২৪ হাজার ৬০২ কোটি টাকা।
জানা যায়, গত বছরের শেষ দিকে বিপুল অঙ্কের ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে নিয়মিত করা এবং আদায় জোরদায় করায় খেলাপিঋণ তিন মাসের ব্যবধানে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমে ৯৩ হাজার কোটি টাকায় নেমেছিল। কিন্তু নবায়ন করা খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়ায় আবার ওই ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। এতে চলতি বছরে খেলাপি ঋণ আবার লাগামহীনভাবে বাড়তে শুরু করেছে। এর কারণ হিসেবে অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলো তাদের অডিট রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাই সেখানে ভালো অবস্থান দেখাতেই কূট কৌশল প্রয়োগ করে থাকে ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে অন্যতম হলো খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল বা নবায়ন। আর বছরের শেষ সময়ে এসে এই সুবিধা দেয়া-নেয়ার প্রবণতাও বাড়ে। এ ছাড়া শেষ সময়ে ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার করা হয়। কিন্তু বছরের শুরুতেই ঋণ পুনঃতফসিল যেমন কম হয়, তেমনি আদায় কার্যক্রমেও গতি থাকে না।
সূত্র বলছে, ২০১৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের বিশেষ সুবিধা দিতে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনে (নিয়মিত) বিশেষ ছাড় দেয়া হয়। ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই আড়াই বছরেই এ সুযোগ নেন দেশের বড় শিল্প গ্রুপ। এর আওতায় ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি সাপেক্ষে প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিত করা হয়েছিল। এর বাইরে বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় ব্যাংকগুলো নিজেরা আরো ৬৪ হাজার ৮৬২ কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করে। সবমিলে ওই সময় পর্যন্ত মোট ১ লাখ ১৩ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকার ঋণ বিশেষ সুবিধায় নিয়মিত করা হয়ে। পরে ব্যাংক খাতে ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে এরকম ১১টি ব্যবসায়ী গ্রুপকে ১৫ হাজার ২১৮ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত এসব ঋণ গ্রাহকেরা যথাসময়ে ফেরত দিচ্ছে না। ফলে তা আবার খেলাপি হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মূলত দুইটি কারণে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। একটি খেলাপিদের বিশেষ সুযোগ দেয়া এবং অপরটি দুর্নীতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়া। গত ডিসেম্বরে বিশেষ সুবিধায় যেসব ব্যবসায়ী ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই খেলাপি ঋণ নবায়ন করেছিলেন, ওই সব ঋণ আবার খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। কারণ এ সময়ে ব্যবসাবাণিজ্যের কোনো উন্নতি হয়নি। এর বাইরে ব্যাংকিং খাতে যেসব দুর্নীতি হয়েছে তার একটিরও বিচার হয়নি। বরং তাদের রক্ষায় আরো নীতিসহায়তা দেয়া হয়েছে। সাম্প্রতি খেলাপি ঋণ কমাতে যেসব নীতিমালা করা হয়েছে, এসবই ভুল। এতে ভুল বার্তা দেয়া হয়েছে। সে কারণে কেউ টাকা দিচ্ছে না। ধীরে ধীরে এটি আরো খারাপ পরিণতির দিকে যাচ্ছে। সুশাসনের ঘাটতি, পরিচালকদের ঋণ ভাগাভাগি ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় সমস্যাÑ এসব কারণে খেলাপি ঋণ না কমে ক্রমেই বাড়ছে।

Tuesday, August 6, 2019

কিশোরগঞ্জে সৌরভ ছড়াল ‘নাইট কুইন’ by আশরাফুল ইসলাম

রাতের আঁধার আলো করে ফোটে ফুলটি। যে কারণে ফুলটিকে ডাকা হয় ‘নাইট কুইন’ নামে। রাতের সঙ্গে রয়েছে নাইট কুইন ফুলের বিশেষ সম্পর্ক। সন্ধ্যা থেকেই একটু একটু করে ফোটার প্রস্তুতি নিতে নিতে গভীর রাতে তার অপার সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হয় ফুলটি। সারা রাত সৌন্দর্য আর সৌরভ বিলিয়ে ভোরের আলোয় মিলিয়ে যায়। ‘এক রাতের রানী’ নাইট কুইন ফুলকে ধরা হয় সৌভাগ্য আর পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে। বলা হয়, যার বাড়িতে এ ফুল ফোটে তার বাড়িতে সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে আসে ফুলটি! কিশোরগঞ্জ শহরেও গত মঙ্গলবার রাতে প্রকৃতির অবদানস্বরূপ ফুটেছিল বিস্ময়ঘেরা ‘নাইট কুইন’ ফুল। শহরের আলোরমেলা এলাকায় জেলা জজের বাসভবনের টবে একটি নয় ফুটে দু’টি নাইট কুইন।
এছাড়া ফোটার অপেক্ষায় রয়েছে আরো একাধিক ফুল। রাত ১০টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, মৃদু সৌরভে ভরা নাইট কুইন ফুল দেখতে সাদা রঙের পদ্ম ফুলের মতো। গাছের পাতা থেকে জন্ম নেয়া ফুল দু’টি দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি মন মাতানো গন্ধ। যেন প্রকৃতিপ্রেমীরদের জন্য এক অনন্য উপহার। কিশোরগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ মো. সায়েদুর রহমান খান জানান, সন্ধ্যা থেকেই ফুল দু’টি প্রস্ফুটিত হচ্ছিল। রাত বাড়ার সাথে সাথে নাইট কুইন ফুল দু’টি নিজেদের সৌন্দর্য মেলে ধরে সৌরভ ছড়াতে থাকে। জেলা ও দায়রা জজ মো. সায়েদুর রহমান খান বলেন, ফুলটিকে সচরাচর দেখা যায় না। দুর্লভ এই ফুলের জন্ম হয় পাতা থেকে। আর সেই পাতা থেকেই প্রস্ফুটিত হয় অসাধারণ নাইট কুইন ফুল। পাতার যেকোনো দিকে ছোট একটি গুটির মতো বের হয়। এই গুটি আস্তে আস্তে বড় হয়ে ফুলে পরিণত হয়। জেলা ও দায়রা জজ মো. সায়েদুর রহমান খানের সহধর্মিণী জেলা যুব উন্নয়ন কেন্দ্রের সিনিয়র প্রশিক্ষক নাজমুন নাহার কাদীর জানান, তিনি আগে কখনো নাইট কুইন ফুল দেখেননি। এখানে এসে গাছটি দেখার পর থেকেই পরিচর্যা করেছেন আর দিন গুনছেন ‘কবে দেখা মিলবে রাতের রানীর’। অবশেষে মঙ্গলবার রাতে গাছটিতে দুটি নাইট কুইন ফুল চোখে পড়ে তার। বিস্মিত চোখে বিস্ময়কর রাতের রানীর সৌন্দর্য আর সৌরভ উপভোগ করেছেন তিনি। নাজমুন নাহার কাদীর এর সঙ্গে আলাপচারিতার মাঝেই নাইট কুইন ফোটার খবরে একনজর দেখতে জেলা জজের বাসভবনে বিচার বিভাগের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা সপরিবারে ছুটে আসেন। নাজমুন নাহার কাদীর বলেন, বাসায় নাইট কুইন ফুল ফুটেছে, এই আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেও ভীষণ ভালো লাগছে।

Tuesday, July 23, 2019

বর্বর প্রেমিক পিয়াসের হাতেই ধর্ষণের শিকার হয় রিমা by আশরাফুল ইসলাম

পাকুন্দিয়ায় নানার বাড়িতে নবম শ্রেণির ছাত্রী স্মৃতি আক্তার রিমা (১৪) গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত পিয়াস মিয়া (১৮) কে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। র‌্যাব-১৪, সিপিসি-২, কিশোরগঞ্জ ক্যাম্পের কোম্পানী অধিনায়ক লে. কমান্ডার, বিএন এম শোভন খানের নেতৃত্বে র‌্যাবের একটি বিশেষ টিম শনিবার রাতে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ পশ্চিম মাদার বাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার হওয়া পিয়াস মিয়া পাকুন্দিয়া উপজেলার চরফরাদী গ্রামের সৌদি প্রবাসী রুবেল মিয়ার ছেলে। সে পাকুন্দিয়া পাইলট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির কারিগরি শাখার ছাত্র। রিমাকে অপহরণের পর গণধর্ষণ করে হত্যা মামলার সে ২নং আসামি। পিয়াসকে গ্রেপ্তারের পর রোববার দুপুরে র‌্যাব-১৪, সিপিসি-২, কিশোরগঞ্জ ক্যাম্পে এক প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। প্রেস ব্রিফিংয়ে কোম্পানী অধিনায়ক লে. কমান্ডার, বিএন এম শোভন খান জানান, পিয়াস মিয়া এ ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী। প্রেমের অভিনয়ে সে কিশোরীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে।
সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে গত ১৭ই জুলাই রাতে সুকৌশলে স্কুল ছাত্রীকে নানার বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে প্রথমে সে নিজে ধর্ষণ করে এবং পরে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের নিয়ে গণধর্ষণ করে। র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পিয়াস মিয়া ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। লে. কমান্ডার, বিএন এম শোভন খান জানান, গত বৃহস্পতিবার সকালে পাকুন্দিয়া উপজেলার চরফরাদী ইউনিয়নের গাংধোয়ারচর গ্রামে নানার বাড়ির পাশে পুকুর পাড়ের একটি বরই গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় রিমার লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পরপরই র‌্যাবের একটি চৌকস আভিযানিক দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ছায়া তদন্ত শুরু করে। এছাড়া তথ্য উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যমে ঘটনায় জড়িত আসামিদের সনাক্ত করে গ্রেপ্তারের জোর চেষ্টা চালায়। এরই ধারবাহিকতায় এ ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারী ও ধর্ষণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত মামলার এজাহারনামীয় ২নং আসামি পিয়াস মিয়াকে তারা গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্যও র‌্যাবের অভিযান চলমান রয়েছে।
লে. কমান্ডার বিএন এম শোভন খান জানান, পিয়াসের বাবা রুবেল মিয়া সৌদি আরব থাকার সুযোগে পিয়াস উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। এলাকায় বখাটেপনা ছাড়াও সে ইয়াবায় আসক্ত ছিল। সে ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে একবার গ্রেপ্তারও হয়েছিল।
র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে পিয়াস জানিয়েছে, দুই মাস আগে রিমার সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর সুবাদে রিমা নানাবাড়িতে আসলে পিয়াস তার সঙ্গে দেখা করতো। ঘটনার রাতেও পিয়াসের ডাকে রিমা ঘর থেকে বের হয়। পরে বাড়ির পুকুরপাড়ে নিয়ে গিয়ে রিমাকে সে প্রথমে ধর্ষণ করে। এ সময় জাহিদ ও তার অন্য বন্ধুরা পাহারায় ছিলো। পিয়াসের পর পালাক্রমে অন্যরা মেয়েটিকে ধর্ষণ করে।
পিয়াস সম্পর্কে তার স্কুল পাকুন্দিয়া পাইলট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আফছর উদ্দিন আহম্মদ মানিক জানান, সে স্কুলে আসতো না। তার মাথার চুলের স্টাইল ছিল অন্যরকম। বছর দু’য়েক আগে বিদ্যালয়ে ছাত্রদের চুল রাখার ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপের পরও সে তার চুলের স্টাইলের পরিবর্তন করেনি। ফলে সেলুনে নিয়ে গিয়ে তার চুল কাটানো হয়।
প্রধান শিক্ষক আফছর উদ্দিন আহম্মদ মানিক বলেন, বর্বর ও নৃশংস এই ঘটনায় পিয়াস জড়িত থাকায় ও গ্রেপ্তার হওয়ায় আমরা তাকে বিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করবো। এজন্যে সোমবার মিটিং করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সৌদি প্রবাসী রুবেল মিয়ার এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে পিয়াস ছোট। বাবার অবর্তমানে একমাত্র ছেলে পিয়াস এই বয়সেই উচ্ছৃঙ্খলতায় ডুব দেয়। পিয়াস এবং তার বন্ধুদের বখাটেপনায় এলাকাবাসী ছিলেন দিশেহারা। পিয়াস তার বন্ধুদের নিয়ে বাড়িতেই ইয়াবার আড্ডা বসাতো। এলাকার মেয়েদের উত্যক্ত করতো। রিমা হত্যাকাণ্ডের পর তার বাড়িতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম এবং কনডম পাওয়া যায়।
নিহত স্মৃতি আক্তার রিমা পার্শ্ববর্তী হোসেনপুর উপজেলার জামাইল গ্রামের মৃত আবুল হোসেনের কন্যা ও হোসেনপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণির ছাত্রী। গত বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে পাকুন্দিয়া উপজেলার চরফরাদী ইউনিয়নের গাংধোয়ারচর গ্রামে নানার বাড়ির পাশে পুকুর পাড়ের একটি বরই গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওইদিনই বিকালে কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল মর্গে স্মৃতি আক্তার রিমার লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্তে ধর্ষণের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মো. হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন। এ ঘটনায় শুক্রবার রাতে নিহত স্কুল ছাত্রীর মা আঙ্গুরা খাতুন বাদী হয়ে পাকুন্দিয়া থানায় মামলাটি (নং-৮) করেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩)/৭ ধারায় দায়ের করা এই মামলায় জাহিদ মিয়া (২০), পিয়াস মিয়া, রুমান মিয়া (১৮) ও রাজু মিয়া (১৮) এই চার জনের নামোল্লেখ এবং অজ্ঞাত আরও ৫-৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার চার আসামির মধ্যে জাহিদ মিয়া পাকুন্দিয়া উপজেলার চরফরাদী গ্রামের খুরশিদ মিয়ার ছেলে, পিয়াস মিয়া একই গ্রামের সৌদি প্রবাসী রুবেল মিয়ার ছেলে, রুমান মিয়া গ্রামেরই ফারুক মিয়ার ছেলে ও রাজু মিয়া একই গ্রামের কফুল উদ্দিনের ছেলে। মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, বিয়েতে ব্যর্থ হয়ে রিমাকে অপহরণের পর জোরপূর্বক গণধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পাকুন্দিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এসএম শফিকুল ইসলাম জানান, র‌্যাব গ্রেপ্তারের পর পিয়াসকে রোববার বিকালে পাকুন্দিয়া থানায় হস্তান্তর করেছে। এছাড়া মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।

Tuesday, June 25, 2019

সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ঋণে আটকে যাচ্ছে ব্যাংকের তহবিল by আশরাফুল ইসলাম

বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার দীর্ঘ মেয়াদে বেশি ঋণ নিচ্ছে। এতে জনগণের আমানতের অর্থ সরকারের কোষাগারে দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে যাচ্ছে। ফলে বেসরকারি খাতে ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা যেমন আটকে যাচ্ছে, পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির হিসাবে ব্যাংকের মূলধন ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। আবার বাজেট ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় ঋণনির্ভরশীলতা বেড়ে যাচ্ছে। এতে বেড়ে যাচ্ছে ঋণ পরিচর্চা ব্যয়; অর্থাৎ সুদব্যয়ে জনগণের ঘাড়ে ঋণের বোঝাও বেড়ে যাচ্ছে।
আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি অর্থায়নে দেশের ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৮ হাজার ৯৪ কোটি টাকা। আর স্বল্পমেয়াদি ১৯ হাজার ২৭০ কোটি টাকা; অর্থাৎ ব্যাংকব্যবস্থা থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি এবং ৪০ শতাংশ স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ৮-৯ বছর আগেও ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার স্বল্প মেয়াদে বেশি ঋণ নিত। বলা চলে বেশির ভাগ ঋণই নেয়া হতো স্বল্প মেয়াদ অর্থাৎ ১ বছরের কম সময়ের জন্য। ২৮ দিন, ৬৪ দিন, ২৮০ দিন ও ৩৬৪ দিন মেয়াদের জন্য সরকার বেশি হারে ঋণ নিত। কিন্তু সরকারের এ ঋণ নেয়ার ধরন পাল্টায় ২০০৯ সাল থেকে। আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দোহাই দিয়ে সরকার স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিবর্তে বেশি হারে দীর্ঘমেয়াদি ৫ বছর, ১০ বছর, ১৫ বছর ও ২০ বছর মেয়াদি বেশি হারে ঋণ নিতে থাকে। বর্তমানে ২৮ দিন মেয়াদের ঋণ নেয়া বন্ধ রয়েছে। প্রসঙ্গত, ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার দু’টি পদ্ধতিতে ঋণ নেয়। এর মধ্যে একটি ট্রেজারি বিল ও অপরটি ট্রেজারি বন্ড। এক বছরের কম সময়ের জন্য ঋণকে ট্রেজারি বিল বলা হয়। আর এক বছরের বেশি সময়ের জন্য নেয়া ঋণ হলো ট্রেজারি বন্ড।
দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ নেয়ায় সরকারের পুঞ্জীভূত ঋণের স্থিতি বাড়তে থাকে। এতে এক দিকে যেমন ব্যাংকের তহবিল দীর্ঘ মেয়াদে সরকারের কোষাগারে আটকে যাচ্ছে, পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। অন্য দিকে মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে পড়ে প্রকৃত অর্থে ব্যাংকের মূলধনও ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। কারণ ১০০ টাকা দিয়ে যে পণ্য আজ কেনা যাবে, ১০ বছর বা ২০ বছর পর ১০০ টাকায় ওই পণ্য অর্ধেকও কেনা যাবে না। এভাবেই ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে ব্যাংকের মূলধন।
ব্যাংকব্যবস্থা থেকে গত দুই বছরে সরকারের ঋণ নেয়ার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত অর্থবছরে (২০১৭-১৮) সরকার বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে দীর্ঘ মেয়াদে ৫৩ শতাংশ ও স্বল্প মেয়াদে ৪৭ শতাংশ ঋণ নেয়। চলতি অর্থবছরের (২০১৮-১৯) বাজেটে দীর্ঘ মেয়াদে ৫৭ শতাংশ ও স্বল্প মেয়াদে ৪৩ শতাংশ ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ৫৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬৮ শতাংশ করা হয়েছে। বিপরীতক্রমে স্বল্প মেয়াদে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ৪৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩২ শতাংশ করা হয়েছে। এভাবেই দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ নেয়ার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটের বেশির ভাগ অর্থাৎ ৫১ হাজার ৩৪০ কোটি টাকাই বরাদ্দ রাখা হয়েছিল সুদ পরিশোধের জন্য, যা কিনা অনুন্নয়ন বাজেটের একক খাত হিসেবে সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ। আর সামগ্রিক বাজেটের ১১ দশমিক ১ শতাংশ। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে তা ৪৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা করা হয়েছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ছিল ৪৫ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা। আর আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে ৫৭ হাজার ৭০ কোটি টাকা ঋণের সুদ পরিশোধের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে; যা অনুন্নয়ন বাজেটের ১০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং একক খাত হিসেবে তৃতীয় সর্বোচ্চ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫২ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকরা জানান, দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা সরকার না কমালে একসময় বেসরকারি খাতে ঋণ কমে যাওয়ায় নতুন নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন কমে যাবে। ফলে কাক্সিক্ষত হারে কর্মসংস্থান বাড়বে না। বেড়ে যাবে বেকারত্বের হার; যা জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ কারণে বাজেট ঘাটতি কমিয়ে এনে বিকল্প অর্থের সংস্থান বাড়াতে হবে।

Wednesday, June 5, 2019

শোলাকিয়ায় বৃষ্টিস্নাত জনসমুদ্র by আশরাফুল ইসলাম

প্রতিবারের মতো এবারও দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হলো কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায়। বুধবার মুষলধারে বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়তে আসা দেশ-বিদেশের কয়েক লাখ মুসল্লির ভিড়ে জনসমুদ্রে পরিণত হয় শোলাকিয়া ময়দান। দেশের সর্ববৃহৎ এ জামাতে অংশগ্রহণ করতে সকাল থেকেই মুসল্লিদের ঢল নামে জেলা শহরের পূর্বপ্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত শোলাকিয়া ঈদগাহের উদ্দেশ্যে। বৃষ্টিতে ভিজে, ছাতা ও জায়নামাজ মাথায় দিয়ে মুসল্লিরা সমবেত হন শোলাকিয়া ঈদগাহে।
জামাত শুরুর আগেই সাত একর আয়তনের শোলাকিয়া মাঠ পূর্ণ হয়ে যায়। আগত মুসল্লিদের অনেকে মাঠে জায়গা না পেয়ে পার্শ্ববতী রাস্তা, তিনপাশের ফাঁকা জায়গা, নদীর পাড় ও শোলাকিয়া সেতুতে জায়গা করে নিয়ে জামাতের জন্য দাঁড়িয়ে পড়েন। রাতের টানা বৃষ্টির পর সকালে শুরু হয় অঝর ধারায় বৃষ্টি। এতে ঈদগাহ ময়দান, রাস্তা ও আশেপাশের এলাকা কর্দমাক্ত হলেও এর উপর পলিথিন ও জায়নামাজ বিছিয়ে মুসল্লিরা প্রস্তুতি নেন জামাতের।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানের ইমাম মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসঊদ ২২ মিনিট দেরিতে ঈদগাহ ময়দানে পৌঁছান। কর্দমাক্ত মাঠ আর কয়েক ঘন্টার টানা বৃষ্টিতে মুসল্লিরা ¯œাত হলেও আল্লাহর সান্নিধ্য ও অনুকম্পা পেতে ব্যাকুল ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য তা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বৃষ্টিতে ভিজেই বৃহত্তম এ ঈদ জামাতের নামাজ আদায় করেছেন। সকাল ১০টা ২৪ মিনিটে প্রতিকূল পরিবেশ ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে শোলাকিয়ার দেশের সর্ববৃহৎ এ ঈদ জামাতে নামাজে শরিক হন তাঁরা।
জনশ্রুতি রয়েছে যে, এ মাঠে পরপর সাতটি ঈদের জামাত আদায় করলে এক কবুল হজ্বের সওয়াব পাওয়া যায়। সে জন্য শোলাকিয়া মাঠ গরীবের মক্কা নামেও পরিচিত। মাঠের সুনাম ও জনশ্রুতির কারণে ঈদের বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও সারাদেশের বিভিন্ন জেলা তথা ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, গাজীপুর, নরসিংদী, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, জামালপুর, খাগড়াছড়ি, শেরপুর, যশোর, খুলনা ও চট্রগ্রামসহ অধিকাংশ জেলা থেকে শোলাকিয়ায় মুসল্লিদের সমাগম ঘটে। এদের অনেকে ওঠেন হোটেলে, কেউবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ও মাঠ পরিচালনা কমিটির ব্যবস্থাপনায় শোলাকিয়া ঈদগাহ সংলগ্ন কুমুদিনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আবার অনেকেই কোথাও জায়গা না পেয়ে রাত কাটান জেলা সদরের বিভিন্ন মসজিদে। ঈদের দিন শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে অংশগ্রহণকারী মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে চলাচল করেছে ২টি স্পেশাল ট্রেন। একটি ট্রেন ভৈরব থেকে সকাল ৬টায় ছেড়ে আসে এবং অন্যটি ময়মনসিংহ থেকে সকাল পৌনে ৬টায় ছেড়ে আসে।
১৮২৮ সালে অনুষ্ঠিত ঈদের প্রথম বড় জামাতের হিসাব অনুযায়ী শোলাকিয়া ময়দানে এবার ছিল ১৯২তম ঈদ জামাত। জামাতকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বিপুল সংখ্যক পুলিশ, আর্মড পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি সদস্যদের কঠোর নিরাপত্তা ও নজরদারিতে শান্তিপূর্ণভাবে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। মাঠের চারপাশে বসানো হয় নিরাপত্তা চৌকি। মাঠের ৩২টি প্রবেশ পথে চেকপয়েন্ট বসিয়ে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে মুসল্লিদের দেহ তল্লাশি করা হয়। সকাল ১০টায় জামাত শুরু হওয়ার কথা থাকায় রেওয়াজ অনুযায়ী ১৫, ৫ ও ১ মিনিট আগে শর্টগানের ফাঁকা গুলির আওয়াজ করে নামাজের প্রস্তুতির সংকেত দেওয়া হয়। কিন্তু ইমামের বিলম্বে পৌঁছার কারণে জামাত শুরু হয় ১০টা ২৪ মিনিটে। জামাতে এবারও ইমামতি করেন মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসঊদ। জামাত শেষে ইমাম তাঁর বয়ানে দেশ ও জাতির উন্নতি, সমৃদ্ধি এবং মুসলিম উম্মাহর সংহতি ও ঐক্য কামনা করেন। এছাড়া দেশ-জাতি ও মুসলিম উম্মাহর জন্য মঙ্গল কামনা এবং পাপ থেকে মুক্তির জন্য বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন তিনি। লাখো মুসল্লিদের উচ্চকিত হাত আর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার আমীন, আমীন ধ্বনিতে এ সময় মুখরিত হয়ে উঠে পুরো ঈদগাহ এলাকা।
ঈদ জামাত শুরুর আগে ঈদগাহ মাঠ পরিচালনা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী, পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ বিপিএম (বার), কিশোরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র মাহমুদ পারভেজ ও ঈদগাহ মাঠ পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাহদী হাসান মুসল্লিদের স্বাগত ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন।
জনশ্রুতি রয়েছে যে, ১৮২৮ সালে প্রথম বড় জামাতে এই মাঠে একসঙ্গে ১ লাখ ২৫ হাজার অর্থাৎ সোয়ালাখ মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করেন। এই সোয়ালাখ থেকে এ মাঠের নাম হয় ‘সোয়ালাখিয়া’, যা উচ্চারণ বিবর্তনে হয়েছে শোলাকিয়া। অপর একটি ধারণা হচ্ছে, মোগল আমলে এখানে পরগনার রাজস্ব আদায়ের একটি অফিস ছিল। সেই অফিসের অধীন পরগণার রাজস্বের পরিমাণ ছিল সোয়া লাখ টাকা। এটাও ‘শোলাকিয়া’ নামকরণের উৎস হতে পারে। তবে প্রথম ধারণাটি জনসাধারণের মাঝে অধিক প্রচলিত রয়েছে।
এ ঈদ জামাতকে উপলক্ষ করে জেলা প্রশাসন, পৌর প্রশাসন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মুসল্লিদের শুভেচ্ছা জানিয়ে মাঠ সংলগ্ন রাস্তায় তোরণ নির্মাণ, ব্যানার-ফেস্টুন টানানো, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, জরুরী স্বাস্থ্য সেবা প্রদান, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাসহ বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ার সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি ও কর্মব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মত।
শত ব্যস্ততা, নানা সমস্যা আর প্রাকৃতিক বৈরিতাকে উপেক্ষা করে এক কাতারে দাঁড়িয়ে ধনী-গরীব সকলে নামাজ আদায় করেন শোলাকিয়া ঈদ জামাতে। তাঁদের সবার উদ্দেশ্য একটাই যেন কোন অবস্থাতেই হাত ছাড়া হয়ে না যায় জামাতে অংশগ্রহণ, পাপ থেকে মুক্তি আর আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ। ধনী-গরীবের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সাম্য ও  সুন্দরের ভিত্তিতে এক নতুন সমাজ গড়ার এই শিক্ষা নিয়েই জামাত শেষে বাড়ির পথে শোলকিয়া ছাড়েন তাঁরা।

Wednesday, May 15, 2019

বাসচালকের সহকারীর স্বীকারোক্তি by আশরাফুল ইসলাম

চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়া হত্যার ঘটনায় বাসচালক নূরুজ্জামান নূরুর পর এবার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে হেলপার লালন মিয়া (৩২)। গতকাল বিকালে কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আল-মামুন বাসের হেলপার লালন মিয়ার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে হেলপার লালনকে কিশোরগঞ্জ জেলা   কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাজিতপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. সারোয়ার জাহান ১৬৪ ধারায় হেলপার লালন মিয়ার স্বীকারোক্তি দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে গত ১১ই মে মামলার প্রধান আসামি স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসের চালক নূরুজ্জামান নূরু আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। বাসচালক নূরুজ্জামান নূরুর পর হেলপার লালন মিয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ায়, চাঞ্চল্যকর এই মামলার তদন্তে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাসের হেলপার লালন মিয়া আদালতে দেয়া তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বাসচালক নূরুজ্জামান নূরুর মতো একই ধরনের তথ্য দিয়েছে। নূরুর মতোই হেলপার লালন মিয়া পাশবিক এই গণধর্ষণের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে।
জবানবন্দিতে লালন জানিয়েছে, বাসচালক নূরুর খালাতো ভাই বোরহান স্বর্ণলতা পরিবহনেরই হেলপার। কিন্তু ঘটনার দিন ৬ই মে তার ডিউটি ছিল না। স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসটি (ঢাকা মেট্রো ব-১৫-৪২৭৪) ঢাকা থেকে পিরিজপুরে আসার পথে, বোরহান কাপাসিয়া উপজেলার বীর উজুলী থেকে বাসটিতে ওঠে। বাসটি কটিয়াদী পার হওয়ার পর বাসে বাসচালক নূরু, হেলপার লালন ও নূরুর খালাতো ভাই বোরহান এই তিনজন ছিল। কটিয়াদী থেকে পিরিজপুরের পথে একজন মধ্যবয়সী বাস থেকে নেমে পড়লে তানিয়া একা হয়ে পড়েন। এসময় বাসের ভেতরে তানিয়াকে একা পেয়ে ধর্ষণ করার ফন্দি আঁটতে থাকে চালক নূরু, হেলপার লালন মিয়া ও তাদের সহযোগী বোরহান। বাসটি বাজিতপুর উপজেলার বিলপাড় জামতলী নির্জন স্থানে একটি কলাবাগানের কাছে এলে বাসের সব জানালা লাগিয়ে দেয় তারা। তখন পেছনের একটি আসনে বসা ছিলেন তানিয়া। এ সময় চালক নূরু তার আসন ছেড়ে হেলপার লালনকে বাস চালাতে দেয়। লালন বাস চালানোর সময়ে বোরহান ও নূরু মেয়েটিকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। পরে নূরু ড্রাইভিং সিটে বসলে লালনও মেয়েটিকে ধর্ষণ করে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র আরো জানায়, মামলার প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত ইতিমধ্যে পুলিশের কাছে এসে গেছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনও তারা পেয়ে গেছেন। বোরহান, নূরুজ্জামান ও লালন মিয়া পালা করে তানিয়াকে ধর্ষণ করে। পরে মৃত্যু নিশ্চিত করতে তানিয়াকে বাস থেকে ফেলে দেয়। বাস থেকে ফেলে দেয়ার সময় তানিয়ার শরীর পেছনের দিকে ছিল বলে তানিয়ার মাথা সড়কে আঘাত করে। তাই তানিয়ার মাথার পেছনের অংশ মারাত্মকভাবে ফেটে গিয়ে দু’ভাগ হয়ে যায়। মাথার পেছনের দিকের দু’টি হাড় ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যায়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও দীর্ঘ সময় চিকিৎসা না পাওয়ায় তানিয়ার মৃত্যু হয়।
আদালত ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৬৪ ধারায় দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হেলপার লালন মিয়া ওইদিন যা যা হয়েছে সমুদয় ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে। তার দেয়া তথ্যের সঙ্গে বাসচালক নূরুজ্জামান নূরুর জবানবন্দির মিল খুঁজে পাওয়া গেছে। দু’জনের জবানবন্দিতেই প্রথম ধর্ষণকারী হিসেবে বোরহানের নাম উঠে এসেছে। কিন্তু ঘটনার ৯ দিন পার হলেও এ ঘটনার অন্যতম আসামি ধর্ষক বোরহানকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাজিতপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. সারোয়ার জাহান বলেন, বোরহানকে গ্রেপ্তারে চিরুনি অভিযান চলছে। বোরহানের বাড়ি গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। সেখানে পুলিশ যোগাযোগ করে তার সম্পর্কে খোঁজখবর করেছে। কিন্তু সে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে রয়েছে। তবে বোরহান পুলিশের জালে ধরা পড়বেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে সোমবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জমা পড়া ময়নাতদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, ধর্ষণ শেষে তানিয়াকে হত্যা করা হয়। তানিয়ার শরীরের অন্তত ১০টি স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মাথার  পেছনের আঘাত ছিল সবচেয়ে গুরুতর। ভারী কিছু দিয়ে আঘাতের ফলে তার মাথার পেছনের খুলি ফেটে দুই ভাগ হয়ে যায়। এ ছাড়া মাথার পেছনের দিকের দু’টি হাড় ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেছে। ধর্ষণের পর মাথার এই আঘাতের কারণেই মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে তানিয়ার মৃত্যু হয়।
গত ৬ই মে রাতে তানিয়া হত্যাকাণ্ডের পরদিন ৭ই মে রাতে নিহত শাহিনুর আক্তার তানিয়ার পিতা মো. গিয়াস উদ্দিন বাদী হয়ে বাসের চালক নূরুজ্জামান নূরু, হেলপার লালন মিয়া, হাসপাতালে তানিয়ার মরদেহ আনয়নকারী আল আমিন এবং পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ আল মামুন এই চারজনের নামোল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা বেশ কয়েকজনকে আসামি করে বাজিতপুর থানায় ধর্ষণ ও হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন। মামলার এজাহারভুক্ত চার আসামির মধ্যে বাসচালক নূরুজ্জামান নূরু ও হেলপার মো. লালন মিয়া এই দু’জন ছাড়াও কটিয়াদীর কাউন্টার মাস্টার মো. রফিকুল ইসলাম রফিক, লাইনম্যান মো. খোকন মিয়া ও পিরিজপুর কাউন্টার মাস্টার মো. বকুল মিয়া ওরফে ল্যাংড়া বকুলকে ঘটনার রাতেই গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে বাসের চালক মো. নূরুজ্জামান নূরু গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার টোক নয়নবাজার ইউনিয়নের সালুয়াটেকি গ্রামের মৃত গিয়াস উদ্দিনের ছেলে, হেলপার মো. লালন মিয়া একই ইউনিয়নের বীর উজুলি গ্রামের মৃত আব্দুল হামিদের ছেলে, মো. রফিকুল ইসলাম রফিক একই উপজেলার বাড়িসাবর ইউনিয়নের লোহাদি গ্রামের নজর আলীর ছেলে, মো. খোকন মিয়া কটিয়াদী উপজেলার ভোগপাড়া এলাকার দুলাল মিয়ার ছেলে এবং মো. বকুল মিয়া ওরফে ল্যাংড়া বকুল বাজিতপুর উপজেলার পিরিজপুর ইউনিয়নের নিলখী মৃত আব্দুস শহিদ ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গত ৮ই মে আদালত গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ আসামির প্রত্যেককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৮ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুরের পর ওইদিন তাদের রিমান্ডে নেয়া হয়। তাদের মধ্যে বাসচালক নূরুজ্জামান নূরু ও বাসের হেলপার লালন মিয়া আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
নিহত শাহিনুর আক্তার তানিয়া কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুরী ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের মেয়ে। তিনি ঢাকার ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কল্যাণপুর শাখায় সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কর্মস্থল ঢাকা থেকে বাড়িতে আসার জন্য গত ৬ই মে বিকালে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে স্বর্ণলতা পরিবহনের একটি বাসে (ঢাকা মেট্রো ব-১৫-৪২৭৪) ওঠেন শাহিনুর আক্তার তানিয়া। স্বর্ণলতা পরিবহনের বাস মহাখালী থেকে কটিয়াদী হয়ে বাজিতপুর উপজেলার পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত চলাচল করে। বাসে ওঠে তানিয়া তার বাবাকে জানান, তিনি পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ডে নামবেন। কিন্তু বাড়িতে ফিরতে দেরি হওয়ায় রাত সাড়ে ৮টায় তানিয়ার মোবাইলে ফোন করে নম্বরটি বন্ধ পান বাবা গিয়াস উদ্দিন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে ফোন করে এক ব্যক্তি গিয়াস উদ্দিনকে জানায়, তার মেয়ে বাস দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে এবং বর্তমানে সে কটিয়াদী হাসপাতালে রয়েছে। এ খবর পেয়ে স্বজনেরা হাসপাতালে গিয়ে তানিয়াকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পড়ে থাকতে দেখেন।

Sunday, May 12, 2019

ধর্ষণের পর শাহিনুরের মাথার খুলি ফাটিয়ে দেয় ধর্ষকরা by আশরাফুল ইসলাম

স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসের চালক নূরুজ্জামান নূরু, হেলপার লালন মিয়া এবং বোরহান এই তিনজনে মিলে পালাক্রমে ধর্ষণ করে নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়াকে। ঘটনাটিকে সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দিতে তানিয়াকে বাস থেকে নিচে ফেলে দেয়া হয়। গত সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে এই ঘটনার সোয়া দুই ঘণ্টা পর রাত পৌনে ১১টার দিকে স্বর্ণলতা পরিবহনের কটিয়াদীর কাউন্টার মাস্টার মো. রফিকুল ইসলাম রফিক এবং স্বর্ণলতা পরিবহনের সুপারভাইজার আল আমিন তানিয়ার নিথর দেহ কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। পাশবিক অত্যাচার ও বাস থেকে ফেলে দিয়ে গুরুতর আহত হওয়ার পর দুই ঘণ্টারও বেশি সময় চিকিৎসা না পেয়ে তানিয়ার মৃত্যু হয়। শনিবার রাতে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এদিকে ধর্ষণকাণ্ডে ব্যবহৃত স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসটি (ঢাকা মেট্রো ব-১৫-৪২৭৪) পুলিশ জব্দ করার পর আলামত ও নমুনা সংগ্রহ করেছে সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট। শনিবার বিকালে ময়মনসিংহের সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিটের একটি টিম বাজিতপুর থানায় রাখা বাসটি থেকে আলামত ও নমুনা সংগ্রহ করেন। অন্যদিকে ময়নাতদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, তানিয়ার মাথার পেছন দিকে ভারি কিছু দিয়ে আঘাত করে ধর্ষকরা।
এতে তার মাথার পেছনের খুলি ফেটে যায়। কিশোরগঞ্জ সিভিল সার্জন সূত্র জানিয়েছে, এ প্রতিবেদন বাজিতপুর থানায় হস্তান্তর করা হবে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাজিতপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. সারোয়ার জাহান জানান, বাসচালক নূরুজ্জামান নূরু ও হেলপার লালন মিয়া রিমান্ডে নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। তারা জানিয়েছে, ঘটনার সময়ে বাসটিতে বাসচালক নূরু ও হেলপার লালন মিয়া ছাড়াও বোরহান নামে আরেকজন ছিল। বোরহান নূরুর খালাতো ভাই এবং বাসটির অপর হেলপার। তার বাড়িও গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। তাকে ধরতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে বলেও তিনি জানান।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসটি পিরিজপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়ার সময় চালকের আসনে বসে হেলপার লালন মিয়া বাসটি চালাচ্ছিল। রাত ৮টার দিকে পথে গজারিয়া এলাকায় একটি কলাবাগানের পাশে বাসটি থামিয়ে তানিয়ার উপর পাশবিক অত্যাচার চালানো হয়। তানিয়ার চিৎকার যেন বাইরে না যায় এজন্যে বাসের দরজা-জানালা বন্ধ করে দেয়া হয়। লালনকে চালকের আসনে রেখে বাসচালক নূরু মিয়া হামলে পড়ে তানিয়ার উপর। তানিয়া সর্বশক্তি দিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে গেলে বাসে থাকা অপর হেলপার বোরহান তানিয়াকে ধরে রাখে। এ সময়ে লালন ধীরে ধীরে বাসটি চালাতে থাকে। চলন্ত বাসটিতে তিন ধর্ষকের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে বাসেই লুটিয়ে পড়ে তানিয়া।
পরে ঘটনাটিকে সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দিতে তানিয়াকে বাস থেকে নিচে ফেলে দেয় ধর্ষক। এতে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তানিয়া। রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় সড়কে পড়ে থাকেন তানিয়া। এ অবস্থায় তানিয়া বাস দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন জানিয়ে তাকে রাত সাড়ে ৮টার দিকে পিরিজপুর বাজারের সততা ফার্মেসিতে নেয়া হয়। সততা ফার্মেসির হাবিবুর রহমান মেয়েটিকে দেখে তাকে দ্রুত কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। বাসের চালক ও হেলপার মেয়েটিকে একটি সিএনজিতে তুলে দিয়ে হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করে। কিন্তু অচেনা কোন মেয়েকে একা হাসপাতালে নিতে কোন সিএনজি রাজি না হওয়ায় তানিয়াকে আবারও বাসে তুলে নেয় ধর্ষকদল। প্রায় দুই ঘন্টা মুমূর্ষু তানিয়াকে নিয়ে এখানে-সেখানে ঘুরাফেরার পর কটিয়াদীর কাউন্টার মাস্টার মো. রফিকুল ইসলাম রফিক এবং সুপারভাইজার আল আমিন একটি সিএনজিতে করে তানিয়ার নিথর দেহ কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। ততক্ষণে তানিয়া চলে যান না ফেরার দেশে।
নিহত শাহিনুর আক্তার তানিয়া কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুরী ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের মেয়ে। তিনি ঢাকার ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন ডিপ্লোমা নার্স ছিলেন। কর্মস্থল ঢাকা থেকে বাড়িতে আসার জন্য গত সোমবার বিকাল ৩টায় ঢাকার বিমানবন্দর থেকে স্বর্ণলতা পরিবহনের একটি বাসে (ঢাকা মেট্রো ব-১৫-৪২৭৪) ওঠেন। স্বর্ণলতা পরিবহনের বাস মহাখালী থেকে কটিয়াদী হয়ে বাজিতপুর উপজেলার পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত চলাচল করে। বাসে ওঠে তানিয়া তার বাবাকে জানান, তিনি পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ডে নামবেন। কিন্তু বাড়িতে ফিরতে দেরি হওয়ায় রাত সাড়ে ৮টায় তানিয়ার মোবাইলে ফোন করে নম্বরটি বন্ধ পান বাবা গিয়াস উদ্দিন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে ফোন করে এক ব্যক্তি গিয়াস উদ্দিনকে জানায়, তার মেয়ে বাস দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে এবং বর্তমানে সে কটিয়াদী হাসপাতালে রয়েছে। এ খবর পেয়ে স্বজনেরা হাসপাতালে গিয়ে তানিয়াকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পড়ে থাকতে দেখেন।
এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ মামলার তদন্তের সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য রোববার ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন কিশোরগঞ্জের আসছেন বলে পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ, বিপিএম (বার) জানিয়েছে।
এদিকে পাশবিক এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কিশোরগঞ্জে ক্ষোভ বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। শনিবার সকালে জেলা শহরের আখড়াবাজার ব্রীজ সংলগ্ন সড়কে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে মানবাধিকার নাট্য পরিষদ কিশোরগঞ্জ জেলা শাখা, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন কিশোরগঞ্জ জেলা শাখাসহ একাধিক সংগঠন। কর্মসূচিতে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট অশোক সরকার জেলা পাবলিক লাাইব্রেরিব সম্পাদক অ্যাডভোটেক মোজাম্মেল হক খান রতন, জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সংস্কৃতি কর্মী অসীম সরকার বাধন, অনলাইন এক্টিভিস্ট শিপন করিম, জেলা মানবাধিকার নাট্য পরিষদের সভাপতি হারুন আল রশীদ, জেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক এনায়েত করিম অমি প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। পরে শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। বক্তারা চলন্ত বাসে নার্স তানিয়াকে গণধর্ষণ শেষে হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান এবং জড়িতদের ফাঁসির দাবি জানান।
তানিয়া ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় শনিবার কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় আরও কয়েকটি মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এসব মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন অংশ নেয়। এসব কর্মসূচি থেকে তানিয়া ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের ফাঁসির দাবি জানান এবং মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারের দাবি জানানো হয়।

Friday, April 12, 2019

সোহেল রানার পিতার চিকিৎসা চলবে কীভাবে? by আশরাফুল ইসলাম

কতই বা বয়স হয়েছিল সোহেল রানার। মাত্র ২৪ বছরের ছোট্ট জীবনটাই পরের জন্য বিলিয়ে দিয়ে গেছেন। তিনি হারিয়ে  যাননি হাওরের বিশালতায়। বরং হাওরের জলে লিখে গেছেন গৌরব আর ত্যাগের ইতিবৃত্ত। অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন অসীম সাহসিকতায় আত্মত্যাগের অসামান্য নজির। বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে আটকে পড়াদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে উৎসর্গ করেছেন নিজের জীবন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাকে সমাহিত করা হয়েছে বাড়ির আঙিনার প্রিয় শিমুল ছায়ায়। চোখের জলে সোহেল রানাকে শেষ বিদায় জানালেও কান্না থামেনি পরিবারের।
পাগলের মতো ছেলের কবরের দিকে ছুটে যান মা হালিমা খাতুন। সোহেল রানার কবরের দিকে তাকিয়ে চোখের জলে ভাসেন বাবা, ভাই-বোন, স্বজনেরা।
ছোটবেলা থেকেই ভীষণ মিশুক আর পরোপকারী ছিলেন সোহেল রানা। চরম দারিদ্রতাও কেড়ে নিতে পারেনি তার মুখের হাসি। হাওরের বিশালত্বের মতোই উদার ছিল তার হৃদয়জমিন। অন্যের দুঃখে হতেন সমব্যথী। নিজের সামান্যটুকুও বিলিয়ে দিতেন নিরন্নের মধ্যে। ছেলেকে কবরে শোয়ানোর পরও মা হালিমা খাতুনকে বিলাপ করে বলেন, ‘ফহিন্নীর ঘরে ক্যারে আল্লাহ এমন সোনা দিছিল’।
কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার চৌগাংগা ইউনিয়নের কেরুয়ালা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক নূরুল ইসলামের পাঁচ ছেলে-মেয়ের মধ্যে সোহেল রানা ছিলেন দ্বিতীয়। সবার বড় বোন সেলিনা আক্তার। তারপর সোহেল রানা, রুবেল মিয়া (২৩), উজ্জ্বল মিয়া (২১) ও দেলোয়ার হোসেন (১৫)। বাবা নূরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইসিসের রোগী। তিনি পার্শ্ববর্তী বর্শিকূড়া হাওরে পত্তনি জমিতে জিরাত চাষ করেন। বাবাকে সহায়তা করতে সোহেল রানা ছুটে যেতেন হাওরের জিরাত ঘরে। সেখানে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে ফলাতেন সোনালী ধান। ভাইয়েরা মিলে নদীতে মাছ ধরে বিক্রি করেছেন বাজারে। কৈশোরেই বসেছেন অটোরিকশার চালকের আসনে। ২০১০ সালে এসএসসি পাশের পর অর্থাভাবে নিজের পড়ালেখা বন্ধ করে দিলেও বন্ধ হতে দেননি ভাই-বোনদের লেখাপড়া।
ফলে সোহেল রানার এইচএসসি পাশের আগেই ছোট ভাই রুবেল ২০১৩ সালে এইচএসসি পাস করেন। অটোরিকশা-টমটম চালিয়ে আর প্রাইভেট টিউশনি করে সোহেলের এইচএসসি পাশের বছরে আরেক ছোট ভাই উজ্জ্বল এসএসসি পাস করেন। ২০১৬ সালে এইচএসসি পাস করা উজ্জ্বল করিমগঞ্জ সরকারি কলেজে বিবিএ তৃতীয় বর্ষে এখন পড়ছেন। ২০১৫ সালে ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সে ফায়ারম্যান হিসেবে যোগ দেয়ার পর থেকেই সোহেলই ছিলেন পরিবারের আশার আলো। সোহেলের চাকরির সামান্য বেতনেই চলতো অসুস্থ বাবার চিকিৎসা। টেনে-টুনে চলতো ছোট তিন ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ।
চৌগাংগা শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত সোহেল রানার সহপাঠী ছিলেন পার্শ্ববর্তী মাওরা গ্রামের সোহেল। নামের সাথে মিল থাকায় দু’জনের মধ্যেই ছিল গভীর ঘনিষ্ঠতা। গাজীপুরের একটি সোয়েটার কোম্পানিতে কর্মরত সোহেল জানান, সোহেল রানা স্কুলজীবন থেকেই মানুষের সাথে সম্পর্ককে খুব মূল্য দিতেন। কখনো কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন না। কারো মনে আঘাত দিয়েও কিছু বলতেন না। স্কুলে টিফিনের সময়ে বন্ধুদের সাথে নিজের টাকায় টিফিন কিনে ভাগাভাগি করে খেতেন। সহপাঠী কারো বিপদে পড়ার খবরে সাথে সাথে ছুটে যেতেন।
কেরুয়ালা গ্রামের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসে সোহেল রানাই ছিলেন প্রথম চাকুরে। ২০১৫ সালে সোহেল রানার ফায়ার সার্ভিসে যোগ দেয়ার পর সেবাধর্মী এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি ঝোঁক তৈরি হয় অনেক তরুণের। ছুটিতে সোহেল রানা বাড়িতে এলে তাদের অনেকেই ছুটে যেতেন সোহেল রানার কাছে। গ্রামের মধ্যে আদর্শ হয়ে ওঠা সোহেল রানাকে দেখে অনুপ্রাণিত হতেন তারা। তাদেরই একজন মো. শরিফ মিয়া। ২০১৮ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর তিনি ফায়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সে।
বর্তমানে তিনি তাড়াইল ফায়ার স্টেশনে কর্মরত রয়েছেন। মো. শরিফ মিয়া বলেন, ভাইকে (সোহেল রানা) দেখেই ফায়ার সার্ভিসের চাকরিতে আমি অনুপ্রাণিত হই। ফায়ার সার্ভিসের চাকরির জন্য দরখাস্ত থেকে শুরু করে নিয়োগ এবং যোগদান পর্যন্ত সব কাজেই ভাই আমাকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করেছেন। তার অকৃত্রিম সহযোগিতার জন্যই আমি ফায়ার সার্ভিসের চাকরিতে যোগ দিতে পেরেছি। কিন্তু আমাদের জীবনটাকে সাজিয়ে দিয়ে ভাই এমনভাবে চলে যাবেন, স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। কেরুয়ালা গ্রামের বাড়িতে টিনের জরাজীর্ণ একটি চৌচালা ঘর সোহেল রানাদের। সেই ঘরটিকে দু’ভাগ করে এক অংশে চাচা রতন মিয়া ও তার পরিবার এবং অন্য অংশে সোহেল রানার বাবা নূরুল ইসলাম পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। রতন মিয়ার পাঁচ ছেলে সন্তানের মধ্যে সবার বড় মোশারফ হোসেন দশম শ্রেণির ছাত্র। মোশারফ বলেন, ভাই (সোহেল রানা) আমাদের কখনো চাচাতো ভাই মনে করতেন না। আপন ভাইয়ের মতোই তিনি আমাদের আদর-স্নেহ দিতেন। আপন ভাইদের জন্য নতুন জামাকাপড় কিনলে আমাদের জন্যও কিনতেন। সাত জন্মেও মানুষ এমন চাচাতো ভাই পায় কিনা জানি না!
সোহেল রানা স্থানীয় কেরুয়ালা জামে মসজিদে কোরআন শিক্ষা, চৌগাংগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে চৌগাংগা শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যায় তার লেখাপড়া। এই সময়ে অটোরিকশা ও টমটম চালিয়ে পরিবারকে সহায়তা করেছেন। এভাবে দুই বছর পাঠবিরতির পর করিমগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে ২০১৪ সালে এইচএসসি পাস করেন। এইচএসসি পাশের পর ২০১৫ সালের মাঝামাঝিতে ফায়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সে। ট্রেনিং শেষে মুন্সীগঞ্জ নদীঘাট ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে প্রথম যোগদান করেন সোহেল রানা। সেখানে মাস চারেক দায়িত্ব পালন করার পর থেকে তিনি কুর্মিটোলা ফায়ার স্টেশনে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। সর্বশেষ গত ১৫ই মার্চ ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন সোহেল রানা। ছুটি শেষে ২৩শে মার্চ তিনি কর্মস্থলে যোগ দেন। কর্মস্থলে যোগ দেয়ার মাত্র ৫দিন পরেই ২৮শে মার্চ ঘটে বনানীর এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা।
সোহেল রানার ছোট ভাই রুবেল মিয়া জানান, পরিবার থেকে বারবার তাগিদ দিয়েও তাকে বিয়ে করানো যায়নি।
রুবেল বলেন, ভাই-ই ছিলেন আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর মৃত্যু আমাদের স্তব্ধ করে দিয়েছে।
সোহেল রানার বাবা নূরুল ইসলাম বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে জানান, গত ২৩শে মার্চ ছুটি শেষে চাকরিতে যাওয়ার সময়ে সোহেল বলেছিলো, ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে এসে তোমাকে ধান কাটায় সাহায্য করবো। ধান তোলা শেষে বাবাকে চিকিৎসা করাবেন বলেও জানিয়েছেন। কিন্ত বনানীর আগুন সোহেলের সব স্বপ্ন-আশা কেড়ে নিয়েছে।
নূরুল ইসলাম বলেন, সোহেলই ছিল আমার আশার আলো। সেই আলো অহন নিইভ্যা গিয়ে আমরার জীবনটা অহন আন্ধাইর অইয়া গেছে।

বীরের মৃত্যু নেই by আশরাফুল ইসলাম

জন্ম তার কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত হাওরের এক প্রান্তিক কৃষক পরিবারে। দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেড়ে উঠতে হয়েছে। পরিবারের আটপৌরে জীবনে সচ্ছলতার আশা ছিল আকাশ ছোঁয়ার মতোই। বালক বয়সেই হাওরের জিরাত ঘরে থেকে প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে পত্তনি জমিতে ফলিয়েছেন ধান।
আধপেটা খেয়ে চলেছে দিনের পর দিন। অটোরিকশা-টমটম চালিয়ে পাঠবিরতি দিয়ে করেছেন লেখাপড়া। দেশসেবার আশা নিয়ে যোগ দিয়েছিলেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ফায়ারম্যান হিসেবে। কে জানতো এমন দুর্গম হাওর বালকই একদিন দেখাবেন অসীম সাহসিকতায় আত্মত্যাগের অসামান্য নজির।
উদ্ভাসিত হবেন বীরের মহিমায়। অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে অকাতরে বিলিয়ে দেবেন নিজের জীবন। বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে আটকা পড়াদের জীবন বাঁচাতে গিয়ে গুরুতর আহত সোহেল রানাকে আর বাঁচানো যায়নি। চিকিৎসকদের প্রাণান্ত চেষ্টা আর দেশবাসীর অফুরান প্রার্থনাকে ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তার মৃত্যুতে কাঁদছে পুরো দেশ। এই অগ্নিযোদ্ধার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ছুটে যান আগুন নেভানো ও আটকেপড়া ব্যক্তিদের উদ্ধার করতে। ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মীদলে ছিলেন কুর্মিটোলা ফায়ার স্টেশনের ফায়ারম্যান সোহেল রানাও। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের উঁচু ল্যাডারে উঠে আগুন নেভানোর পাশাপাশি ভবনে আটকে পড়াদের উদ্ধারে সক্রিয় ছিলেন সোহেল রানা। অসীম সাহসিকতায় অগ্নিকুণ্ড থেকে বের করে এনে জীবন বাঁচিয়েছেন অনেকের। কিন্তু বিধি বাম! হঠাৎ ল্যাডারটি বন্ধ হয়ে গেলে বিপাকে পড়েন সোহেল। কেননা ল্যাডারের বাস্কেটে তখন ভবন থেকে উদ্ধার করা পাঁচ-ছয় জন রয়েছেন। ফলে বাস্কেটে জায়গা হচ্ছিলো। উদ্ধার করা ব্যক্তিদের ঝুঁকির কথা ভেবে সোহেল রানা ল্যাডারের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন। তখনই ঘটে চরম দুর্ঘটনাটি। ল্যাডারে পা আটকে গিয়ে ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে যায় সোহেলের ডান পায়ের হাড়। টান পড়ে কোমরে বাঁধা সেফটি হুকেও। মই থেকে পিছলে পড়ে বিপজ্জনকভাবে ঝুলছিলেন তিনি।
পেটে চাপ লেগে নাড়িভুঁড়িও থেঁতলে যায়। কিছুক্ষণ পরেই অজ্ঞান হয়ে যান সোহেল রানা। নিয়ে যাওয়া হয় সিএমএইচ-এ। সিএমএইচ-এর আইসিইউতে ভেন্টিলেশনে রেখে দেয়া হয় চিকিৎসা। সহকর্মীরা দিয়েছেন ব্যাগের পর ব্যাগ রক্ত। কিন্তু কিছুতেই আশার আলো দেখছিলেন না চিকিৎসকরা। এ রকম পরিস্থিতিতে গত ৪ঠা এপ্রিল সোহেল রানার চিকিৎসার খোঁজ নিতে গিয়ে যত দ্রুত সম্ভব উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরদিনই ৫ই এপ্রিল সন্ধ্যা পৌনে ৭টায় একটি এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সোহেল রানাকে সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানকার চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১৭ মিনিটে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ফায়ার ফাইটার সোহেল রানা।
সোমবার গভীর রাতে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে সোহেল রানার যখন হৃদস্পন্দন থেমে যায়, তখনো ছেলের সুস্থতা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় নিদ্রাহীন রাত পার করছিলেন মা হালিমা বেগম। সকাল ৭টার দিকে যখন একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন তিনি, তখনই আসে মায়ের অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দেয়া খবরটা। সিঙ্গাপুর প্রবাসী মামাতো ভাই শফিকুল ইসলাম ফায়ারম্যান সোহেল রানার ছোটভাই রুবেল মিয়াকে মুঠোফোনে জানান সোহেল রানার মারা যাওয়ার চরম দুঃসংবাদটি। এরপর থেকেই পরিবারটিতে চলছে মাতম আর আহাজারি।
নিহত ফায়ারম্যান সোহেল রানা (২৪) কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার চৌগাংগা ইউনিয়নের কেরুয়ালা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক নূরুল ইসলামের ছেলে। তার মায়ের নাম হালিমা খাতুন। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে দ্বিতীয় এবং ভাইদের মধ্যে সবার বড় সোহেল রানা। বড় বোন সেলিনা আক্তার বিবাহিত, ছোট তিন ভাইয়ের মধ্যে রুবেল মিয়া (২৩) উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক প্রথমবর্ষের ছাত্র, উজ্জ্বল মিয়া (২১) করিমগঞ্জ সরকারি কলেজে বিবিএ তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং সবার ছোট দেলোয়ার হোসেন (১৫) চৌগাংগা শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণির ছাত্র।
সোমবার দুপুরে ফায়ারম্যান সোহেল রানার কেরুয়ালা গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনের চৌচালা ঘরটির জরাজীর্ণ দশা। বাড়িভর্তি শোকাহত লোকজন। মা হালিমা খাতুন বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন। পাগলপারা সোহেলের মাকে সান্ত্বনা দেয়া ভাষা নেই আত্মীয়স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীর। ঘরের এক কোণে পড়ে থেকে বড় বোন সেলিনা ভাই হারানোর শোকে বিলাপ করছেন। কাঁদছেন আত্মীয়স্বজন আর পাড়াপড়শীরাও।
স্বজনেরা জানান, সোহেল রানার বাবা নূরুল ইসলাম প্যারালাইসিসের রোগী। তিনি পার্শ্ববর্তী বর্শিকূড়া হাওরে পত্তনি জমিতে জিরাত চাষ করেন। ছোট তিন ভাইয়ের মধ্যে ছোটভাই দেলোয়ার হোসেন পড়ালেখার পাশাপাশি অন্যের অটোরিকশা ভাড়ায় চালায়। ফায়ার সার্ভিসে সোহেলের চাকরি হওয়ায় আশার আলো দেখেছিল পরিবারটি। ফায়ারম্যান সোহেল রানার চাকরির সামান্য বেতনই ছিল পরিবারের মূল উপার্জন। সোহেল রানা নিজে উদ্যোগী হয়ে কয়েক বছর ধরে ছোটভাই বিবিএ শিক্ষার্থী উজ্জ্বল মিয়াকে ফায়ার সার্ভিসে চাকরির জন্য চেষ্টা করে আসছিলেন। কিন্তু তিন বারের চেষ্টায়ও লিখিত পরীক্ষার বাঁধা পেরোতে পারেনি উজ্জ্বল মিয়া। এরপরও মা হালিমা খাতুনের আশা ছিল, ছেলের চাকরি আয়ে জরাজীর্ণ ঘরটি ভেঙে নতুন ঘর উঠাবেন, ছেলেকে বিয়ে করাবেন। কিন্তু সকল আশা ভরসা ভেঙে চুরে শেষ হয়ে গেছে তার।
সোহেল রানা স্থানীয় কেরুয়ালা জামে মসজিদে কোরআন শিক্ষা, চৌগাংগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে চৌগাংগা শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যায় সোহেল রানার লেখাপড়া। এই সময়ে অটোরিকশা ও টমটম চালিয়ে পরিবারকে সহায়তা করেছেন। এভাবে দুইবছর পাঠবিরতির পর করিমগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে ২০১৪ সালে এইচএসসি পাস করেন। এইচএসসি পাসের পর ২০১৫ সালের মাঝামাঝিতে ফায়ারম্যান হিসেবে যোগ দেন ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সে। ট্রেনিং শেষে মুন্সীগঞ্জে প্রথম যোগদান করেন সোহেল রানা। সেখানে মাস চারেক দায়িত্ব পালন করার পর থেকে তিনি কুর্মিটোলা ফায়ার স্টেশনে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
সোহেল রানার ছোটভাই রুবেল মিয়া জানান, সর্বশেষ গত ১৫ই মার্চ ছুটিতে বাড়ি এসেছিলেন সোহেল রানা। ছুটি শেষে ২৩শে মার্চ তিনি কর্মস্থলে যোগ দেন। কর্মস্থলে যোগ দেয়ার মাত্র ৫দিন পরেই ২৮শে মার্চ ঘটে বনানীর এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মর্মন্তুদ ঘটনা।
রুবেল বলেন, ভাই-ই ছিলেন আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর মৃত্যু আমাদের স্তব্ধ করে দিয়েছে। সামনে আমাদের জীবন অন্ধকার। এখন একমাত্র সরকারই পারে আমাদের এই অকুলপাথার থেকে বাঁচাতে।
সিঙ্গাপুর প্রবাসী মামাতো ভাই শফিকুল ইসলামের বরাত দিয়ে ফায়ারম্যান সোহেল রানার ছোটভাই রুবেল মিয়া জানান, সোমবার বাংলাদেশ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সিঙ্গাপুর থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সোহেল রানার মরদেহ দেশে পাঠানো হবে। রাত সাড়ে ১০টায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটির অবতরণ করার কথা রয়েছে। মঙ্গলবার সোহেল রানার মরদেহ কেরুয়ালা গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হবে। স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে গ্রামের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
বিকাল ৪টার দিকে রুবেলের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে হাওর থেকে বাড়িতে ফিরেন সোহেল রানার বাবা নূরুল ইসলাম। তখনও তিনি জানতেন না, তার আদরের ধন সবাইকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছে দূরে বহুদূরে। বাড়িভর্তি মানুষজন আর স্ত্রী-কন্যা-স্বজনদের কান্না আর আহাজারি দেখে তিনি নির্বাক হয়ে যান। বুঝতে পারেন, সোহেল রানার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শেষ আশার প্রদীপটিও যে নিভে গেছে। তাঁর চোখের কোণ বেয়ে নীরবে ঝরে পড়ে অশ্রুবিন্দু।
সোহেল রানার বাল্যবন্ধু শহীদুল ইসলাম জানান, সোহেল খুব বন্ধুবৎসল ছিল। তার মাঝে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ ছিল না। মানুষের সঙ্গেশার তার অসাধারণ একটি গুণ ছিলো। যে কারণে সে সহজেই সবার সঙ্গে মিশতে পারতো।

Friday, January 11, 2019

৪২ বছরে ২৬৫০টি কবর খনন করেছেন মনু মিয়া by আশরাফুল ইসলাম

মনু মিয়া শেষ ঠিকানার কারিগর। মনের গহিনের পরম দরদ আর অপার ভালবাসা দিয়ে তিনি সাজান মুসলিম সমপ্রদায়ের শেষ ঠিকানা- কবর। কারো মৃত্যু সংবাদ কানে আসামাত্রই খুন্তি, কোদাল, ছুরি, করাত, দা, ছেনাসহ সহায়ক সব যন্ত্রপাতি নিয়ে ছুটে যান কবরস্থানে। মানুষের অন্তিম যাত্রায় একান্ত সহযাত্রীর মতো তিনি বাড়িয়ে দেন তার আন্তরিক দু’হাত। এভাবেই কবর খননের কাজ করে তিনি পার করে দিয়েছেন তার ষাট বছরের জীবনের সুদীর্ঘ ৪২টি বছর। কোনো ধরনের পারিশ্রমিক কিংবা বকশিশ না নিয়ে এ পর্যন্ত ২৬৫০টি কবরের খনন করেছেন।
ব্যতিক্রমী পন্থায় মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ সেবাপরায়ণতার এক অনন্য প্রতীক- জীবনের অন্তিম যাত্রায় মাটিরঘরের নিবেদিত শিল্পী মনু মিয়া। দূরের যাত্রায় দ্রুত পৌঁছাতে নিজের ধানীজমি বিক্রি করে কিনেছেন একটি ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠে তুলে নেন তার যাবতীয় হাতিয়ার-যন্ত্র।
সেই ঘোড়ায় সওয়ার হয়েই শেষ ঠিকানা সাজাতে মনু মিয়া এখন ছুটে চলেন গ্রাম থেকে গ্রামে।
কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি ইউনিয়নের আলগাপাড়া গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্ম মনু মিয়ার। পিতা আবদুল হেকিম মিয়া এবং মাতা সারবানুর দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে মনু মিয়া তৃতীয়।
ছোটবেলায় মনু মিয়া ছিলেন অত্যন্ত ডানপিটে ও দুরন্ত স্বভাবের। সে কারণে বাবা আবদুল হেকিম মিয়া ছেলেকে স্কুলে পাঠালেও লেখাপড়ায় এগোতে পারেননি। বরং স্কুল কামাই করে বন্ধুদের সঙ্গে হা-ডু-ডু, ডাংগুলি ও ফুটবল নিয়ে মাঠে পড়ে থাকার পাশাপাশি নানা রকম দুষ্টুমিই ছিল তার কাজ। এরপরও ছোট ছেলে হিসেবে বাবা-মায়েরর খুব আদরের ছিলেন মনু মিয়া। কৈশোরেই তার আবদার রক্ষা করতে বাবা আবদুল হেকিম মিয়াকে ঘোড়া পর্যন্ত কিনে দিতে হয়েছিল। হাসিখুশি আর হৈ-হল্লায় মেতে থাকা মনু মিয়ার জীবনে হঠাৎ করেই ঘটে ছন্দপতন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে মনু মিয়া তার মাকে হারান। মায়ের কবরে বাবা, বড় ভাই আর আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে একমুঠো মাটি দিয়ে তাকে শেষ বিদায় জানানোর সময়েও মনু মিয়া বুঝতে পারেননি, তাকে কতটা স্নেহবঞ্চিত করে চলে গেছেন মা!
খুব অল্পদিনেই যখন মায়ের অভাবটা বুঝতে শুরু করলেন, তখন থেকে মনু মিয়াও শামিল হলেন বদলে যাওয়ার মিছিলে। কারো মৃত্যু সংবাদ শুনলেই, তার মানস পর্দায় ভেসে ওঠতো স্নেহময়ী জননীর মুখ। মাটির ঘরের শেষ বিছানায় কেমন কাটছে তার দিন? কেমন আছেন মা? এসব খুব ভাবাতো মনু মিয়াকে। ব্যাকুল হৃদয়ে মায়ের কবর জিয়ারতের জন্য ছুটে যেতেন কবরস্থানে। কবরস্থানে এভাবে যাওয়া-আসা থেকেই স্থানীয় গোরখোদকদের সঙ্গে মনু মিয়া একদিন কবর খননের কাজে অংশ নেন।
প্রথম সেই দিনের কথা বলতে গিয়ে মনু মিয়া বলেন, আমি তখন কিছুই বুঝতে পারিনি। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল, আমি যেন আমার মায়ের শেষ ঠিকানাটা সাজিয়ে দিচ্ছি। এরপর থেকে যখনই সুযোগ পেয়েছি, তখনই তাদের সঙ্গে কবর খননের কাজে অংশ নিয়েছি। এভাবে একসময় এ কাজটার প্রতি আমার অন্যরকমের একটি ভাললাগা জন্মে গেল। কোনো কারণে যদি একটি কবর খোদায় শরিক হতে না পারতাম, মনে হতো কি যেন মিস করেছি।
মনু মিয়া জানান, তিনি ছোটবেলায় স্থানীয় গোরখোদকদের সঙ্গে প্রথম প্রথম আত্মীয়স্বজনের কবর খননের কাজে অংশ নিতেন। ক্রমশ দক্ষতা বাড়তে বাড়তে এক সময় এ কাজটিকেই তিনি জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। এরপর থেকে টানা ৪২ বছর ধরে অকৃত্রিম আবেগে তিনি নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন কবর খননের কাজে।
একজন নিখুঁত সুদক্ষ গোরখোদক হিসেবে তার সুনাম রয়েছে দুর্গম হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, শাল্লা, আজমিরীগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহে। কবর খনন করার জন্য নিজের খরচায় তিনি খুন্তি, কোদাল, দা, করাতসহ সমস্ত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরি করে নিয়েছেন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ কাজে তার পারদর্শিতা এবং আন্তরিকতা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। নিজ গ্রাম বা দূরবর্তী গ্রাম, যেখান থেকে যখনই কারো মৃত্যু সংবাদ পান, আবেগতাড়িত দরদ নিয়ে ছুটে যান মনু মিয়া। তিনি কবর খোঁড়ার বিনিময়ে কারো কাছ থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করেন না। এমনকি যাতায়াত খরচটুকুও না। আর এ কারণেও মনু মিয়া পাচ্ছেন মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর সম্মান। তিনি নিজেও বার্ধক্যের কিনারায় দাঁড়িয়ে। ফলে কবর খোঁড়ার কাজে তিনি নিয়োজিত হন এক বিষাদময় আবেগে।
মনু মিয়ার সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, তিনি ঢাকার বনানী কবরস্থানসহ দেশের নানা প্রান্তে গোর খনন করে এ পর্যন্ত ২৬৫০টি গোর খনন করেছেন। কোথাও বেড়াতে গিয়ে যদি কারো মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছেন তো তিনি সেখানে ছুটে গিয়ে গোর খননে শামিল হয়েছেন। এমনো হয়েছে, ভীষণ অসুস্থ অবস্থায় তিনি বিছানা ছেড়ে ওঠতে পারছেন না। কিন্তু কারো মৃত্যু সংবাদ তার কানে এসেছে, সে অবস্থায় তিনি কবরস্থানে ছুটে গিয়ে তার গোর খনন করেছেন। শুরুর দিকে তার স্ত্রী রহিমা বেগম মাঝে মাঝে এ বিষয়ে কথাবার্তা বললেও মনু মিয়ার এ কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও একাগ্রতার কারণে তিনিও স্বামীকে যতটা সম্ভব মানসিক সমর্থন দিয়ে চলেছেন।
উদাসীন ও সাদা মনের এ মানুষটি আমৃত্যু তার এ কাজ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা রাখেন। তার মতে, মানুষের জন্য এমনিতে কিছু করতে না পারলেও তার শেষ ঠিকানাটা তো সাজিয়ে দিতে পারছেন। আর এটাই তার সুখ।
মনু মিয়া আরো জানান, এ কাজ করতে গিয়ে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের নিকট থেকে যে ভালোবাসা পাচ্ছেন, এটাও তার পরম শান্তির। তাই শরীরে শক্তি-সামর্থ্য থাকলে আমৃত্যু এ কাজটি তিনি চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা রাখেন। দূরের যাত্রায় দ্রুত পৌঁছাতে নিজের ধানিজমি বিক্রি করে কিনেছেন একটি ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠে যাবতীয় হাতিয়ার-যন্ত্র তুলে নিয়ে ঘোড়ায় সওয়ার হয়েই শেষ ঠিকানা সাজাতে মনু মিয়া এখন ছুটে চলেন গ্রাম থেকে গ্রামে। মনু মিয়া বলেন, আমি সেই দিনটির অপেক্ষায় আছি, যখন আমার কবর খনন করার জন্য আমারই মতো কেউ নিঃস্বার্থ মন নিয়ে খুন্তি-কোদাল হাতে এগিয়ে আসবেন।
মনু মিয়ার স্ত্রী রহিমা বেগম বলেন, এমনও হয়েছে, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তিনি (মনু মিয়া) বিছানা ছেড়ে ওঠতে পারছেন না। এরকম অবস্থায়ও কারো মৃত্যু সংবাদ কানে এলে ছুটে গেছেন কবর খুঁড়তে। তাদের কোনো সন্তান নেই। মানুষের ভালোবাসাই সন্তানের চেয়েও তাদের বড় সম্পদ বলে মন্তব্য করেন রহিমা বেগম।

Tuesday, October 9, 2018

‘কপাল ভালো বউডা আমার বাইট্টা’ by আশরাফুল ইসলাম

প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, আমার রাজনীতির ৫৮ বছর হয়ে গেছে। আর রাজনীতির স্কুল কলেজ গুরুদয়াল হলেও এই কিশোরাগঞ্জের মাটি আর এই কিশোরগঞ্জের মানুষ আমার রাজনীতির বিশ্ববিদ্যালয়। এখানকার মানুষের কাছে আমি রাজনীতি শিখেছি। আমি রাজনীতি করার সময়ে কিশোরগঞ্জে রিকসা সংগঠন করেছি, রিকসাওয়ালা ভাইদের নিয়েও আমি রাজনীতি করেছি। মুঠে শ্রমিক, ঠেলা গাড়ি শ্রমিক এদেরকে নিয়েও আমি রাজনীতি করেছি, সংগঠন করেছি। হোটেল রেস্টুরেন্ট শ্রমিক তাদেরকে নিয়েও আমি রাজনীতি করেছি। প্রতিটি শ্রমজীবি মানুষকে নিয়ে রাজনীতি করেছি।
প্রেসিডেন্ট বলেন, এই কিশোরগঞ্জবাসীর দোয়ায় আমার মতো একজন সাধারণ মানুষ বাংলাদেশের দুই দুইবার প্রেসিডেন্ট হয়েছি। এটা আমার বড়ো পাওয়া।
আমি মনে করি, এ পাওয়া আমার না সমস্ত কিশোরগঞ্জবাসীর এই পাওয়া। আমি জানি, কিশোরগঞ্জবাসী আমার জন্য দোয়া করেছে। তারা আমার সাফল্য কামনা করেছে। তাদের আন্তরিক কামনাতেই হয়তো আমি দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হয়েছি। আসলে এটা চরম পাওয়া এইজন্য যে, এ উপমহাদেশে এরকম দ্বিতীয় নজির আর নেই।
সোমবার বিকালে কিশোরগঞ্জ সদরের সরকারি গুরুদয়াল কলেজ মাঠে প্রেসিডেন্টকে দেয়া গণসংবর্ধনায় তিনি এসব কথা বলেন। টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় কিশোরগঞ্জবাসীর পক্ষ থেকে কিশোরগঞ্জের কৃতিপুরুষ মো. আবদুল হামিদকে এই গণসংবর্ধনা দেয়া হয়।
প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ বলেন, আজকে গুরুদয়াল কলেজের এই মাঠে এসে আমার অতীতের অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেলো। এই যে গুরুদয়াল কলেজ এ মাঠ থেকে আমার রাজনীতি শুরু যদিও স্কুলে থাকতে আমি রাজনীতি করেছি দুই বছর। আমার রাজনীতির নেতৃত্ব এই গুরুদয়াল কলেজ থেকে শুরু। ১৯৬১ সালে আমি মেট্রিক পাস করে গুরুদয়াল কলেজে ভর্তি হই। ৬১ সালে তদানিন্তন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ফটো ভাঙ্গা দিয়ে শুরু করেছিলাম।
প্রেসিডেন্ট যোগ করেন, আমার মনে পড়ে, এই গুরুদয়াল কলেজের তখন প্রিন্সিপাল ছিলেন ওয়াসিমুদ্দীন স্যার। শিক্ষকেরা সাধারণত ভালো ছাত্রদেরকে পছন্দ করেন। কিন্তু ওয়াসীমুদ্দীন স্যারসহ যারা তখন শিক্ষক ছিলেন, কেন জানি না আমি ভালো ছাত্র না হওয়া সত্ত্বেও আমাকে পছন্দ করতেন। সেটা আমি আজো জানি না। তারা আমাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন।
প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ বলেন, আমি প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত পর সে সময় যে গণসংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল, সে সংবর্ধনায় আমার ছোট ভাই সৈয়দ আশরাফ উপস্থিত ছিল। আমার দুঃখ লাগে, সে আজ পাশে নাই। কারণ সে অসুস্থ। তবে আমি আশা করি এবং পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে দোয়া করি, আপনারাও করবেন, সে যেনো অচিরেই আমাদের মাঝে ফিরে আসে। আবারো যেনো সে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারে।
প্রেসিডেন্ট গণসংবর্ধনা মঞ্চে থাকা সহধর্মিণী রাশিদা হামিদের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বলেন, ৬১ সালে আমার দীর্ঘ রাজনীতি শুরু করলেও আজ থেকে ৫৪ বছর আগে ৬৪ সালে বিয়ে করেছিলাম। আমি কলেজে ছাত্রলীগ করার সময় তখন কোনো ছাত্রী রাজনীতিতে আসতে চাইতো না। তখন কি করব এই সবেদন নীলমনি ঘরে একজন আছে, সেই ছাত্রীটাকেই ছাত্রলীগ বানিয়েছিলাম। আবার আওয়ামী লীগে যখন মহিলারা আসতো না, তাকে নিয়েই শুরু করলাম। তাঁর অবদান আমি অস্বীকার করি না। কারণ সে ৬৪ সালে বিয়ের পর থেকে ছাত্রজীবনে যে ছাত্র ভাইয়েরা আসতো, তাদেরকে চা বানিয়ে খাইয়েছে। তখন গ্যাস ছিল না, লাকড়ির চুলা আর কেরোসিনের চুলায় চা বানিয়ে খাইয়েছে। তিনি রসিকতা করে বলেন, আমার কপাল ভালো, বউডা আমার বাইট্টা। যদি বেশি লম্বা-টম্বা থাকতো, তাহলে মনে হয় চা বানাইতে বানাইতে কোমরডা বাঁকা হইয়া যাইতো।
তিনি বলেন, আপনারা ট্রেনের দাবি করেছেন, এটা যৌক্তিক দাবি। ভৈরব এসে ট্রেন আধ ঘন্টা থেকে এক ঘন্টা অপেক্ষা করে ইঞ্জিন ঘুরিয়ে কিশোরগঞ্জ আসতে হয়। যাওয়ার সময় আবার ইঞ্জিন ঘুরিয়ে ভৈরবে আধ ঘন্টা-এক ঘন্টার জন্য থাকতে হয়। এ জন্য একটা বাইপাস করে দিলেই ট্রেন সরাসরি কিশোরগঞ্জ আসতে পারে। এটার জন্য আমি ডিও লেটার দিয়েছি। আমি কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফিরেই খুব দ্রুত রেল মন্ত্রী ও রেল সচিবকে আমি বঙ্গভবনে ডাকবো। এ ব্যাপারে যেনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয় এবং আমাদের ট্রেনের যে সমস্যা এগুলো দূর করা হয়। আমি প্রথম প্রেসিডেন্ট হয়ে কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস নামে একটি ট্রেন বাড়িয়েছিলাম। চাহিদার প্রয়োজনে এখন আবার একটা নতুন ট্রেনের দরকার এবং ট্রেনের কোচ এবং বগি বাড়ানো প্রয়োজন।
গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জেলা সদর ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলা থেকে নানা সাজে বাদ্য বাজিয়ে এবং বর্ণাঢ্য মিছিল নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ হাজির হন।
এর আগে দুপুর সোয়া ২টার দিকে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ হেলিকপ্টারযোগে কিশোরগঞ্জ শহরের আলোর মেলা এলাকার শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্টেডিয়ামে অবতরণ করেন। সেখান থেকে সার্কিট হাউসে যাওয়ার পর প্রেসিডেন্টকে গার্ড অব অনার দেয়া হয়। পরে বিকাল সাড়ে ৩টায় প্রেসিডেন্ট সরকারি গুরুদয়াল কলেজ মাঠের গণসংবর্ধনাস্থলে পৌঁছান। প্রেসিডেন্টের তিন দিনের এই সফরের দ্বিতীয় দিন  প্রেসিডেন্টকে পেশাজীবনের স্মৃতি বিজড়িত জেলা আইনজীবী সমিতিতে সংবর্ধনা দেয়া হবে। বেলা সাড়ে ১১টায় জজ কোর্ট প্রাঙ্গণে কিশোরগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

Tuesday, April 3, 2018

প্রেমিকের অস্বীকৃতি, জীবন দিলো এইচএসসি পরীক্ষার্থী শান্তা by আশরাফুল ইসলাম

প্রেমিকের কপট ফাঁদে শারীরিক সম্পর্কের পর বিয়েতে অস্বীকৃতি জানানোয় শান্তা আক্তার নামে এক এইচএসসি পরীক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার বদলে তাকে চলে যেতে হয়েছে দুনিয়া ছেড়ে। আত্মহত্যা করতে গিয়ে স্বজনদের চোখ ফাঁকি দিতে না পারলেও টানা ৭দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার দুপুরে সবাইকে ফাঁকি দিয়ে চলে যায় শান্তা। পরীক্ষা শুরুর দিনই তাকে সমাহিত করা হয় শেষ ঠিকানায়।
শান্তা আক্তার কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার রশিদাবাদ ইউনিয়নের ব্রাহ্মণকচুরী গ্রামের ফিরোজ মিয়ার মেয়ে। কিশোরগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ছিল শান্তা। সোমবার থেকে শুরু হওয়া এইচএসসি পরীক্ষায় তার অংশ নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রেমিকের প্রতারণায় এর এক সপ্তাহ আগে গত ২৬শে মার্চ সকালে ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায় শান্তা। স্বজনেরা টের পেয়ে দ্রুত তাকে উদ্ধার করে মুমূর্ষু অবস্থায় কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু অবস্থা খারাপ দেখে হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তকে ঢাকায় রেফার্ড করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ বেড না পাওয়ায় তাকে ভর্তি করা জাপান-বাংলাদেশ ফেন্ডশীপ হাসপাতালে। সেখানে দুই দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ভর্তি করা হয় সেন্ট্রাল হসপিটালে। সেখানেই চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় রোববার দুপুরে মৃত্যু হয় তার।
পরিবার ও এলাকাবাসী জানায়, প্রতিবেশী লাল মিয়ার মাস্টার্স পড়ুয়া ছেলে মাইনুল হোসেনের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিলো শান্তার। টানা ৪ বছর ধরে চলা এই প্রেমের সুবাদে শান্তাকে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে শান্তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তুলে কপট প্রেমিক মাইনুল। বিয়ের জন্য শান্তা প্রায়ই মাইনুলের সঙ্গে পীড়াপীড়ি করলেও কৌশলে তা এড়িয়ে যেতো মাইনুল। এ পরিস্থিতিতে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে গত ২৫ মার্চ মাইনুল প্রেমিকা শান্তাকে নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে অন্যত্র গিয়ে রাত্রিযাপন করে। পরে পারিবারিকভাবে বিয়ের ব্যবস্থা করবে, এমন আশ্বাস দিয়ে শান্তাকে পরদিন ২৬শে মার্চ ভোরে বাড়িতে পাঠায়। বিষয়টি দু’পক্ষের পরিবারও অবগত হয়। কিন্তু বাড়িতে পাঠানোর পর সুর বদলে যায় মাইনুলের। এ নিয়ে কয়েক দফা শান্তার সাথে ফোনে ঝগড়া হয় মাইনুলের। এক পর্যায়ে শান্তাকে বিয়ে করা সম্ভব নয়, বলে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে জানায় মাইনুল। প্রেমিকের এই বিশ্বাসভঙ্গের বেদনায় আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয় শান্তা। ওইদিনই (২৬শে মার্চ) সকাল ৯টার দিকে নিজ ঘরে ফ্যানের সাথে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে শান্তা।
নিহত শান্তার বড় ভাই মিজান জানান, ওড়না পেঁচিয়ে শান্তাকে ঝুলে পড়ার দৃশ্য দেখে তার চাচী চিৎকার দিলে দ্রুত অন্য সদস্যরা শান্তাকে নিচে নামিয়ে আনে। মুমূর্ষু অবস্থায় দ্রুত তাকে কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। এ ব্যাপারে রশিদাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ইদ্রিস মিয়া বলেন, মাইনুল আর শান্তার প্রেমের বিষয়টি নিয়ে কয়েক মাস আগে দু’পরিবারের লোকজনদের নিয়ে দরবার শালিশ হয়। ছেলের পরিবার মেয়েকে বিয়ে করাতে রাজি নয়। ছেলে বিয়ে করতে পারবে না, এমন কথা শুনার পরই আত্মহত্যার চেষ্টা চালায় মেয়েটি। এদিকে, শান্তার মৃত্যুর খবর গ্রামে পৌঁছার পর থেকে ঘরে তালা দিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে প্রেমিক মাইনুল ও তার পরিবারের সদস্যরা। এ ব্যাপারে নিহত শান্তার বাবা ফিরোজ মিয়া বাদী হয়ে প্রেমিক মাইনুল ও মাইনুলের বাবা লাল মিয়াকে আসামি করে আত্মহত্যার প্ররোচণার অভিযোগে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলা করেছেন।

Tuesday, March 13, 2018

‘সোনার ছেলে’ আরিফুল by আশরাফুল ইসলাম

ঢাকা বিভাগের হয়ে যুব গেমস সাঁতারে পুলে ঝড় তুলেছেন নিকলীর তরুণ সাঁতারু আরিফুল ইসলাম। পাঁচটি ইভেন্টে অংশ নিয়ে পাঁচটিতেই স্বর্ণপদক জিতে নিয়েছেন এই সাঁতারু। এই কীর্তিতে যুব গেমসের সেরা সাঁতারু হলেন হাওরের এই বালক। রোববার বাংলাদেশ যুব গেমসের সাঁতার ডিসিপ্লিনে আরিফুলের হাত ধরে তিনটি সোনা আসে ঢাকা বিভাগের। সৈয়দ নজরুল ইসলাম জাতীয় সুইমিং কমপ্লেক্সে ৫০ মিটার ফ্রি-স্টাইল, ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোক ও ১০০ মিটার ফ্রি-স্টাইলে প্রথম হন আরিফুল। এর মধ্যে ৫০ মিটার ফ্রি-স্টাইলে ২৫.২২ সেকেন্ড সময় নিয়ে স্বর্ণ জেতেন তিনি।
আরিফুলের প্রিয় ইভেন্ট ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে স্বর্ণ জিতেন ৩১.৩৭ সেকেন্ড সময় ব্যয় করে। এছাড়া ১০০ মিটার ফ্রি-স্টাইলে ৫৫.৭১ সেকেন্ডে স্বর্ণ জিতেন তিনি।
রোববারের মতো সোমবারও দাপট দেখিয়েছেন আরিফুল। রোববারের তিনটির পর সোমবার আরিফুলের হাত ধরে আরো দুটি সোনা আসে ঢাকা বিভাগের। ১০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোক এবং ২০০ মিটার ফ্রি-স্টাইলে প্রথম হয়েছেন আরিফুল। এর মধ্যে তিনি ১০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে ১.০৮ মিনিট এবং ২০০ মিটার ফ্রি-স্টাইলে ২.১২ মিনিট সময় নিয়েছেন। বিকেএসপির সাঁতারু আরিফুল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ ক’বছর ধরেই নিজেকে মেলে ধরছেন। আসছে কমনওয়েলথ গেমসে অংশ নেবেন এই সাঁতারু। পাঁচটি ইভেন্টে স্বর্ণ জিতে উচ্ছ্বসিত আরিফুলের ভাবনাতেও তাই কমনওয়েলথ গেমসে ভালো করার তাগিদ। আরিফুল বলেন, স্বর্ণপদক জিতে অবশ্যই ভালো লাগছে। তবে খুব বেশি খুশি হওয়ার কিছু নেই। কারণ, এই আসরকে আমি কমনওয়েলথ গেমসের প্রস্তুতি হিসেবে নিয়েছি। ওখানে ভালো কিছু করে দেখাতে চাই। আর এই আসরে স্বর্ণ জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী ছিলাম।
নিকলি হাওরের উথালপাতাল পানির স্রোতকে হার মানিয়ে নতুন স্বপ্নের পথে দুর্বার গতিতে ছুটে চলেছেন আরিফুল। ‘সোনার ছেলে’ আরিফুলের লক্ষ্য এখন তাই সেরাদের সেরা হওয়ার।