Saturday, August 8, 2026

স্কুল মাঠে মলত্যাগ করলেন প্রধান শিক্ষক, পরিষ্কার করালেন শিক্ষার্থীদের দিয়ে

ভারতের বিহার রাজ্যের মাইহার জেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে মদ্যপ অবস্থায় বিদ্যালয়ে আসা, বিদ্যালয়ের ভেতরে মাঠেই মলত্যাগ করে সেই মল শিক্ষার্থীদের দিয়ে পরিষ্কার করানো, পান খেয়ে বিদ্যালয়জুড়ে পিক ফেলা এবং নিয়মিত পাঠদান না করানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগের পর ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে সাময়িক বরখাস্তের প্রস্তাব জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দপ্তরে পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তা।

অভিযোগ উঠেছে, আমুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কোল নিয়মিত নির্ধারিত সময়ে বিদ্যালয়ে আসেন না। অনেক দিন তিনি সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টার দিকে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকেরা। তার অনুপস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা তদারকিহীন অবস্থায় বিদ্যালয়ে ঘোরাফেরা করে এবং নিয়মিত ক্লাসও হয় না বলে অভিযোগ।

শিক্ষার্থীদের আরো অভিযোগ, ওই শিক্ষক মদ্যপ অবস্থায় বিদ্যালয়ে আসেন এবং কখনো কখনো বিদ্যালয়ের ভেতরেই মলত্যাগ করেন। পরে শিক্ষার্থীদের দিয়ে তা পরিষ্কার করান। তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে, তাকে মল পরিষ্কার করতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং এ সময় শিক্ষক তাকে গালিগালাজও করেন।

এক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, স্যার মাতাল হয়ে আসেন। স্কুলের ভেতরে মলত্যাগ করেন এবং আমাদের দিয়ে পরিষ্কার করান। তিনি পান খান এবং স্কুলের বিভিন্ন জায়গায় পিক ফেলেন।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পানের পিকের দাগ বিদ্যালয়ের দেয়ালসহ বিভিন্ন স্থানে দেখা যায়। নিয়মিত পাঠদান না হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের মধ্যাহ্নভোজ কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে বলে দাবি করেছেন অভিভাবকেরা।

এক শিক্ষার্থীর মা রাধা দ্বিবেদী অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষক শিশুদের দিয়ে শুধু মেঝে পরিষ্কারই করান না, তাদের পানি আনতেও বাধ্য করেন। তার দাবি, শিক্ষকের বিদ্যালয়ে আসার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। মদ্যপ অবস্থায় এসে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতেও পারেন না।

আরেক অভিভাবক ক্রান্তি যাদবের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক সাধারণত বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে বিদ্যালয়ে আসেন। তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। ফলে শিক্ষক মদ্যপ অবস্থায় থাকলে শিক্ষার্থীরা কার্যত তদারকিহীন হয়ে পড়ে। মধ্যাহ্নভোজও নিয়মিত দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অভিভাবক রুক্মিণী বুনকারও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তার দাবি, শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো খাবার বা পানি পাচ্ছে না এবং তাদের নিয়মিত পড়াশোনাও হচ্ছে না। বিদ্যালয়ে কার্যকর তদারকি না থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে অভিযোগ তার।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয়ে গিয়ে ওই প্রধান শিক্ষককে ট্যাবলেটে ইউটিউব ভিডিও দেখতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে বিদ্যালয়ের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা গুটখার পিকের দাগ সম্পর্কে জানতে চাইলে দৃশ্যত মদ্যপ অবস্থায় থাকা ওই শিক্ষক বলেন, ‘আমরা পরিষ্কার করে দেব।’

বিষয়টি ইতোমধ্যে শিক্ষা বিভাগের নজরে এসেছে বলে জানিয়েছেন ব্লক শিক্ষা কর্মকর্তা (বিইও) রাজেশ দ্বিবেদী। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টার প্রধানের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে সাময়িক বরখাস্তের প্রস্তাব জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিইও)-এর দপ্তরে পাঠানো হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের দিয়ে মল পরিষ্কার করানোর অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা শিশুদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয় বলে মনে করছেন অভিভাবকেরা। এখন প্রশাসনিক তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটা প্রমাণিত হয়, সেটিই দেখার বিষয়।

সূত্র: এনডিটিভি

স্কুল মাঠে মলত্যাগ করলেন প্রধান শিক্ষক, পরিষ্কার করালেন শিক্ষার্থীদের দিয়ে

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আঞ্চলিক শক্তির জন্ম দেবে ‘মক্কা চুক্তি’?

এটি ছিল ঐতিহাসিক ঘোষণা। শুক্রবার তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। গত বছর রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে হওয়া একই ধরনের একটি চুক্তির ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই নতুন এই প্রতিরক্ষা জোট গড়ে উঠেছে।

‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স প্যাক্ট’ নামে পরিচিত এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, এই চুক্তি এমন একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক জোটের সূচনা করতে পারে, যা ইসরাইল ও ইরানের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকবে এবং উভয় দেশের ব্যাপারেই সতর্ক থাকবে।

আঞ্চলিক হুমকির মুখে শক্তি ও ঐক্যের বার্তা দিতে চাইলেও তিন দেশই চুক্তিটিকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সতর্ক রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তিন দেশই আঞ্চলিক প্রতিপক্ষদের অযথা উসকে না দেয়ার ব্যাপারে সতর্ক। পাশাপাশি, জোটের কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য দুই দেশ ঠিক কতটা বাধ্যতামূলকভাবে সামরিকভাবে পাশে দাঁড়াবে, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।

কিলোয়েন গ্রুপের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হারলান উলম্যান আলজাজিরাকে বলেন, ‘আমরা এখনো মক্কা চুক্তির ঘোষণাটি দেখিনি। আমরা মনে করছি, এতে বলা হয়েছে, একজনের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এখানে “উচিত” শব্দটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর অর্থ এই নয় যে, অবশ্যই (সামরিকভাবে) জড়াতে হবে।’

এই তিন দেশের জন্য হুমকিগুলোও দূরের কোনো বিষয় নয়। গত ফেব্রুয়ারি থেকে পাকিস্তান আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতে জড়িয়ে আছে। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গেও কয়েক দিন ধরে গোলাগুলি বিনিময় করেছে ইসলামাবাদ।

অন্যদিকে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সৌদি আরব তেহরান ও দেশটির মিত্রদের হামলার শিকার হয়েছে একাধিকবার।

তুরস্কও বহু বছর ধরে দেশের ভেতরে ও বাইরে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে লড়াই করে আসছে। ইসরাইলের সঙ্গেও দেশটির উত্তেজনা বেড়েছে। তবে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কীভাবে তিন দেশকে এসব সংঘাতে জড়িয়ে ফেলতে পারে, তা এখনো পরিষ্কার নয় বলে মনে করেন উলম্যান।

তিনি বলেন, ‘ধরা যাক, ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবে হামলা চালাল। তাহলে কি তুরস্ক এতে জড়িয়ে পড়বে? পাকিস্তান কি জড়িয়ে পড়বে? সেটাই এখন দেখার বিষয়।’

বদলে যাচ্ছে আঞ্চলিক সমীকরণ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা গেছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরাইলে হামলা এবং এরপর গাজায় ইসরাইলের চালানো যুদ্ধ ও ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে কয়েক দশকের উত্তেজনাও শেষ পর্যন্ত একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে, যার এখনো অবসান হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য ও এর বাইরের দেশগুলো নতুন বাস্তবতার সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেবে এবং পরবর্তী পর্যায়ের জন্য কীভাবে প্রস্তুত হবে, তা নিয়ে হিসাব-নিকাশ করছে।

পারস্পরিক হুমকির মুখে অনেক দেশই অতীতের মতপার্থক্য পাশে সরিয়ে বাস্তববাদী নীতিকে এগিয়ে নেয়ার পথ বেছে নিচ্ছে। তুরস্ক ও সৌদি আরব এর অন্যতম উদাহরণ। ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পর দুই দেশের মধ্যে গভীর বিরোধ তৈরি হয়েছিল, যা কয়েক বছর স্থায়ী হয়।

তবে ২০২২ সালের মধ্যে রিয়াদ ও আঙ্কারা তাদের পুরোনো মতপার্থক্য অনেকটাই পাশে সরিয়ে রাখে। সৌদি আরব তখন পুরো অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা কমানোর কৌশল অনুসরণ করছিল, আর তুরস্ক অর্থনীতি শক্তিশালী করার দিকে নজর দিচ্ছিল।

এরপর থেকে ইসরাইল ও ইরান মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নে চাপ প্রয়োগ করে আসছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চাপই পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মতো দেশগুলোকে আরও কাছাকাছি আসতে ভূমিকা রেখেছে।

প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলাই লক্ষ্য

মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হলো তিন দেশের ওপর সম্ভাব্য যেকোনো হুমকি প্রতিহত করার সক্ষমতা তৈরি করা। আল জাজিরার প্রতিবেদক ওসামাহ বিন জাভিদ বলেন, তিন দেশই জোটে ভিন্ন ধরনের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে এসেছে।

তিনি বলেন, ‘প্রতিটি দেশই অনন্য সক্ষমতা নিয়ে এসেছে। পাকিস্তানের রয়েছে যুদ্ধে অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী, বিপুল অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা এবং পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার- মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো দেশের মধ্যে এটিই একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার।’

অন্যদিকে তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো সদস্য হিসেবে বিশ্বমানের ড্রোন প্রযুক্তি ও অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে এসেছে। আর সৌদি আরব দিচ্ছে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক শক্তি।’

যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান প্রশ্নের মধ্যেই নতুন সামরিক জোট ও নতুন ধরনের প্রতিরোধব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়েছে।

সৌদি আরব এবং তুলনামূলকভাবে তুরস্কও দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে বলে মনে করছে বিভিন্ন দেশ। ফলে অনেক দেশই বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুঁজছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান অগ্রাধিকার বলে মনে হচ্ছে। এতে অন্য মার্কিন মিত্রদের প্রয়োজনে ওয়াশিংটন কতটা তাদের রক্ষা করতে প্রস্তুত, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

উলম্যান বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, মিত্রদের নিজেদেরই নিজেদের রক্ষা করতে হবে। আমার কাছে এটা পরিষ্কার যে, আমাদের মিত্ররা অন্যদিকে তাকাচ্ছে।

ইসরাইল ও ইরান- কারা সবচেয়ে বড় হুমকি?

ইসরাইল ও ইরানকে আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে দেখা হলেও মক্কা চুক্তির তিন স্বাক্ষরকারী দেশই সতর্কতার সঙ্গে বলেছে, এই জোট কোনো নির্দিষ্ট বাইরের শক্তিকে লক্ষ্য করে গঠিত হয়নি।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরাইল ও ইরানের কাছ থেকে আসা ঝুঁকি স্পষ্ট। বিন জাভিদ বলেন, তিন দেশের জন্যই ইসরাইল আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় হুমকি। এই হুমকির তালিকায় ইরানের অবস্থানও খুব কাছাকাছি। বিশেষ করে সৌদি আরবের জন্য, তেহরান ওয়াশিংটনের স্বার্থে হামলা চালানোর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

অঞ্চলের অনেকের মতে, ২০২৩ সালের পর ইসরাইল দেখিয়েছে যে তারা আলোচনার বদলে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে বিরোধ মেটাতেই বেশি আগ্রহী। অথচ একসময় ইসরাইল সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য জোর চেষ্টা চালিয়েছিল।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও সম্প্রতি একটি উদীয়মান ‘সুন্নি অক্ষ’ নিয়ে সতর্ক করতে শুরু করেছেন। তবে তিনি এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেননি।

বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দিতে পারে এবং সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ শক্তিগুলোকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক- তিন দেশেই সুন্নি মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।

অন্যদিকে, ইরান ইতোমধ্যে সৌদি আরবে হামলা চালিয়েছে। ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীও দেশটিতে হামলা করেছে। জবাবে সৌদি আরব ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর ওপর ইরাকে হামলা চালিয়েছে।

নতুন সদস্য আসবে?

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে কি না, সেটিও এখনো অনিশ্চিত। মিসর, কাতার, সিরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো দেশগুলো এতে যোগ দিতে পারে কিনা, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

এ ধরনের জোটের সুবিধা অবশ্যই রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিভক্ত। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিভক্তিই ইসরাইল ও ইরানের মতো আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় তাদের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ।

তবে অতীতের বিভক্তি ও ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থের কারণে জোটের সম্প্রসারণ নিশ্চিত নয়।

উদাহরণ হিসেবে সিরিয়ার কথা বলা যায়। দীর্ঘ ১৩ বছরের ভয়াবহ সংঘাতের পর এখন দেশটি যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে মনোযোগ দিচ্ছে। ইসরাইলের উত্তর সীমান্তে সিরিয়ার অবস্থানের কারণে এমন কোনো চুক্তিতে যোগ দিতে দেশটি দ্বিধায় পড়তে পারে, যা ইসরাইলের কাছে নেতিবাচকভাবে বিবেচিত হতে পারে।

মিসরও অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অতীতে আঞ্চলিক নৌপথ ও বাণিজ্যিক জাহাজ সুরক্ষায় সৌদি নেতৃত্বাধীন একটি জোটে যোগ দিতেও মিসর দ্বিধা করেছিল। কারণ, এতে দেশটি আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা ছিল।

সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক জোটের সম্ভাব্য আরেক সদস্য হতে পারে ইউএই। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়েমেনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের অবস্থান এই তিন দেশের থেকে বারবার আলাদা হয়েছে। ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করাও এর একটি বড় উদাহরণ।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইলের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য করা আব্রাহাম অ্যাকর্ডসও এমন একটি আঞ্চলিক বলয় তৈরি করেছে, যা মক্কা জোটের দেশগুলোর তুলনায় ইসরাইলের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত হতে পারে।

সত্যিই কি নতুন ‘অক্ষ’ তৈরি হচ্ছে?

মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সম্পর্ক ও পরিবর্তনশীল সমীকরণ শুক্রবারের চুক্তির পরপরই একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে- এমন ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। গত কয়েক দশকে এই অঞ্চলে জোট ও মিত্রতার সমীকরণ বহুবার বদলেছে। ভবিষ্যতেও তা বদলাতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জোটের প্রকৃত সক্ষমতা বোঝা যাবে তখনই, যখন এটি বাস্তব কোনো সংকটে পরীক্ষার মুখে পড়বে। ইসরাইল ও ইরান ইতোমধ্যে দেখিয়েছে, তারা যুদ্ধে যেতে এবং এর পরিণতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত।

কিন্তু সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান কি একে অপরের জন্য একই ধরনের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত?

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা তিন দেশকে সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে। আর তখনই তাদের সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে দেবে—সত্যিই কি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল ও ইরানকে ঘিরে বিদ্যমান দুই মেরুর বাইরে তৃতীয় কোনো আঞ্চলিক শক্তির অক্ষ গড়ে উঠছে?

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আঞ্চলিক শক্তির জন্ম দেবে ‘মক্কা চুক্তি’?

বিপাকে যুক্তরাষ্ট্র, ‘যুদ্ধ অবসানে পথ’ খুঁজছেন শীর্ষ জেনারেল

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ব্যক্তিগত আলোচনায় ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদেরকে স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ যুক্তরাষ্ট্রকে খুঁজে বের করতে হবে। কারণ, সংঘাত আরও বাড়াতে বর্তমানে যে সামরিক বিকল্পগুলো রয়েছে, সেগুলো উল্টো ফল দিতে পারে এবং শুধু বিমানশক্তি ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হওয়ার সম্ভাবনা কম। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে সিএনএন।

একটি সূত্র সরাসরি বলেছে, কেইন যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে- এমন মত শুধু কেইনের একার নয়।

দুইটি সূত্র জানিয়েছে, সংঘাত আরও বাড়ানোর সামরিক বিকল্প নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা কেইন সিআইএ পরিচালক জন র‌্যাটক্লিফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন। একই সঙ্গে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাব্য পথ নিয়েও তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

সম্প্রতি শীর্ষ এই মার্কিন জেনারেল ট্রাম্পের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ও একই ধরনের মত পোষণকারী উপদেষ্টার সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করেছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করা এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের আগে সবাইকে একই অবস্থানে নিয়ে আসা।
সূত্রগুলো বলেছে, এর মাধ্যমে মার্কিন সেনা স্থলভাগে না নামিয়েও যেসব সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব, সেগুলোর সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি স্পষ্ট করাই ছিল লক্ষ্য।

ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যান্য শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তার সঙ্গে কেইনের ইরান যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে একটি সূত্র সিএনএনকে বলেন, আমার মনে হয়, সামরিক বাহিনীকে সুরক্ষিত রাখতেই তিনি এভাবে এগোচ্ছেন।

ট্রাম্প ইরানে স্থলসেনা পাঠানোর ধারণার ব্যাপারে ধারাবাহিকভাবে অনাগ্রহ দেখিয়েছেন। এর পরিবর্তে তিনি এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে বিমান হামলার মাধ্যমে ইরানকে তার শর্তে একটি চুক্তিতে রাজি করানো সম্ভব।

তবে সাম্প্রতিক আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কেইন ও ট্রাম্প প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, এমন ফল অর্জনের সম্ভাবনা কম। তাই তারা প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত সীমার মধ্যেই অন্য বিকল্প তৈরির চেষ্টা করছেন।
প্রায় ছয় মাস ধরে চলা এই যুদ্ধের শুরুতে কয়েক সপ্তাহ ধরে দাবি করা হয়েছিল যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। যুদ্ধটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে এখনো তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার ট্রাম্পের অঙ্গীকারই রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে বলছেন যে, প্রেসিডেন্ট যে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়েছেন, তা শেষ করার কোনো সহজ সামরিক সমাধান নেই- বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

সিএনএনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে কেইনের মুখপাত্র জোসেফ হলস্টেড বলেন, চেয়ারম্যানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট, প্রতিরক্ষামন্ত্রী বা অন্য শীর্ষ নেতাদের গোপন আলোচনার বিষয়ে আমরা কথা বলি না। এসব আলোচনার বিষয়ে যারা প্রত্যক্ষভাবে অবগত ছিলেন না, এমন সূত্রের এজেন্ডাচালিত বর্ণনা নিয়েও আমরা মন্তব্য করি না।
তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দলে কেইনের ভূমিকার প্রশংসা করে সিএনএনকে বলেন, জেনারেল কেইন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দলের অসাধারণ সম্পদ। আর ‘অপারেশনস এপিক ফিউরি, মিডনাইট হ্যামার এবং অ্যাবসলিউট রিজলভ’-এর ব্যাপক সাফল্যই এর প্রমাণ।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, জেনারেল সব সময় কমান্ডার-ইন-চিফকে নির্ভুল, পক্ষপাতহীন তথ্য এবং বিভিন্ন বিকল্প দেন। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য যা সবচেয়ে ভালো মনে করেন, সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন প্রেসিডেন্ট।
সিএনএন বলছে, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও সিআইএ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

‘বিমানশক্তিরও সীমাবদ্ধতা আছে’
ইরান যুদ্ধ এই মুহূর্তে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দলের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা মনে করছেন, সামরিক নীতি, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়ন এবং বাস্তব বিবেচনা সবকিছুই প্রমাণ করে যে কেইন গত মাসের শেষ দিকে এক প্রকাশ্য শুনানিতে আইনপ্রণেতাদের যা বলেছিলেন, সেটিই বাস্তবতা হলো, বিমানশক্তিরও সীমাবদ্ধতা আছে।

এই কারণেই জুলাইয়ের শেষ দিকে সংঘাত বাড়াতে নতুন করে আরও ব্যাপক হামলা চালানোর পরিকল্পনা নিয়ে কেইন ও ট্রাম্প প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারা সতর্ক ছিলেন। সংঘাত বাড়ালে এর সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে তাদের উদ্বেগ ছিল। তবে ট্রাম্প প্রাথমিকভাবে তার ভাষায় একটি “ব্যাপক” অভিযান অনুমোদনের জন্য প্রস্তুত ছিলেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
ওই সূত্র অবশ্য অভিযানের সুনির্দিষ্ট বিবরণ জানায়নি।

সূত্রটি আরও বলেছে, অভিযানের পক্ষে ছিল শুধু সেন্টকমের কিছু অংশ। ইসরাইলও মোটামুটি সংঘাত বাড়ানোর ওই অভিযানের পক্ষে ছিল বলে তিনি জানান।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সঙ্গে কথা বলার পর শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প পিছিয়ে আসেন। তার প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, ওই মিত্ররা ইরানের পাল্টা হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, বিশেষ করে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার ভয় ছিল। তবে ভবিষ্যতে ওই পরিকল্পিত হামলা চালানোর সম্ভাবনা ট্রাম্প পুরোপুরি বাতিল করেননি।

সিএনএন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কিছু গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়াও এ সিদ্ধান্তে ভূমিকা রেখেছে। একাধিক সূত্র বলেছে, শুধু কেইন নয়, উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারাও মার্কিন প্রশাসনকে সতর্ক করেছেন যে অত্যাধুনিক মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি দেখা দিলে ট্রাম্প সংঘাত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলা ঠেকাতে তাদের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এর আগে ট্রাম্প বারবার ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দিয়েছেন। তবে সূত্রগুলো বলেছে, এমন হামলায় ইরান আত্মসমর্পণ করবে- এমন সম্ভাবনা কম। কেইনও প্রকাশ্যে এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন। বরং এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইরানের পাল্টা হামলার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বাড়বে।
একাধিক সূত্রের মতে, এ ধরনের হামলা ইরানের জনগণকে আরও বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। এতে সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ বাড়ার বদলে উল্টো শাসকগোষ্ঠীর প্রতি জনসমর্থন তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া ট্রাম্প ইরানের সেতুতে বোমা হামলার কথাও বিবেচনা করেছেন। তবে দ্বিতীয় একটি সূত্রের মতে, এতেও কার্যকর ফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ওই সূত্র বলেছে, আসলে আর খুব বেশি কিছুতে হামলা করার নেই। কারণ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের স্থাপনাগুলো যেন এক ধরনের ‘হোয়াক-আ-মোল’ খেলা। বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমা হামলা চালালে তা প্রকাশ্যে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হবে।

ট্রাম্পকে সামলাতে সতর্ক কেইন
তবে কেইন উদ্বেগের কথা জানালেও ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখার ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন। প্রেসিডেন্টের কাছে সামরিক বিকল্পগুলোর সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক তুলে ধরার সময় তিনি কীভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করছেন, সে ব্যাপারেও সতর্কতা অবলম্বন করেছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখতে তিনি অনেক চেষ্টা করেছেন। এক পর্যায়ে নিয়মিত প্রেসিডেন্টকে ব্রিফ করার জন্য হোয়াইট হাউসে একটি অফিস পাওয়ার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। সেখানে গেলে যাতে অত্যন্ত নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে পারেন, সেটিও এর একটি কারণ ছিল বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

গত মাসের শেষ দিকে ট্রাম্প ও অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের এক বৈঠকে কেইন সংঘাত বাড়ানোর সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। যার মধ্যে ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের ইতোমধ্যে কমে যাওয়া গোলাবারুদের মজুত।
আলোচনাটি সম্পর্কে অবগত দুই সূত্র জানিয়েছে, এভাবে সতর্ক করাই ছিল তার দায়িত্ব পালনের অংশ।

তবে একই বৈঠকে কেইন প্রেসিডেন্টকে এটিও স্পষ্ট করে দেন যে, ট্রাম্প যদি ওই অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে “আমরা অবশ্যই তাদের ব্যাপকভাবে ধ্বংস করতে পারব” -বৈঠকের বিষয়ে অবগত একটি সূত্র কেইনের বক্তব্যের এমন ব্যাখ্যা দিয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত আলোচনায় কেইন আরও সরাসরি বিমানবাহিনীরশক্তির সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন। যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়ে শুধু বোমাবর্ষণের মাধ্যমে ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়- এমন মতও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন বলে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তৃতীয় একটি সূত্র জানিয়েছে।

কেউ কেউ মনে করেন, ট্রাম্পের সঙ্গে কেইন যথেষ্ট দৃঢ়ভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন না। চলতি বছরের শুরুতে ট্রাম্পের সঙ্গে কেইনের কথোপকথন এবং যুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনা নিয়ে সামরিক নেতাদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত আলোচনার তুলনা করে কেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের যোগাযোগ সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র সিএনএনকে বলেছিল, তিনি অবশ্যই অনেক কিছু চেপে যাচ্ছেন।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের প্রভাব নিয়ে কেইন আরও সরব হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। সিএনএন এর আগে জানিয়েছিল, সংঘাত বাড়ানোর বিকল্প নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে অন্তত দুটি সাম্প্রতিক বৈঠকে কেইন বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কমে যাওয়া গোলাবারুদের মজুত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে একই সময়ে ওই বৈঠকগুলোতে কেইন এটিও বলেছেন যে, ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বাড়ানোর এমন কোনো অভিযান অনুমোদন করলে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ওপর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম।

এটি কেইনের জন্য এক ধরনের সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষার বিষয়। ব্যক্তিগত আলোচনায় তিনি বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, দেশের শীর্ষ জেনারেল এবং সামগ্রিকভাবে সামরিক বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে চান তিনি- যদিও ট্রাম্প উভয়কেই রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

যুদ্ধ শুরুর আগেই অস্ত্রের মজুত নিয়ে সতর্কতা
যুদ্ধ শুরুর আগেও কেইন ও অন্যান্য সামরিক কর্মকর্তা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুতে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ইসরাইল ও ইউক্রেনকে সহায়তার জন্য ব্যবহৃত অস্ত্রের ক্ষেত্রে এ উদ্বেগ ছিল।
এখন জ্যেষ্ঠ মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত “বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে”। এর ফলে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত অবস্থান তুলে ধরার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করায় ট্রাম্পও ক্রমশ হতাশ হয়ে উঠেছেন বলে আগে একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে।

সিএনএন তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, সংঘাত বাড়ানোর সম্ভাব্য বিকল্প নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে অন্তত দুটি সাম্প্রতিক বৈঠকে কেইন কমে যাওয়া মার্কিন গোলাবারুদের মজুত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, যুদ্ধের কারণে মার্কিন গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসায় ট্রাম্প আরও হতাশ হয়েছেন। গত সপ্তাহে ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার বৈঠকেও তিনি এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

গোলাবারুদের ঘাটতি

পেন্টাগন ও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডকে সম্প্রতি তাদের সামরিক কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করতেও বাধ্য করেছে বলে সিএনএন জানিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, সেন্টকমের এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা সম্প্রতি ইমেইলের মাধ্যমে নতুন ও প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে সৃজনশীল উপায়ে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি ও শাস্তি দেয়ার উপায় জানতে চেয়েছেন। বিষয়টি সম্পর্কে আগে অবগত সূত্রগুলো এ তথ্য জানিয়েছিল।
নতুন ধারণা চাওয়া খারাপ কিছু নয়, বিশেষ করে বর্তমান যুদ্ধের পরিস্থিতিতে। তবে সূত্রগুলো বলেছে, যুদ্ধ শুরুর ছয় মাস পর এমন ধারণা চাওয়া পরিস্থিতি ভালোভাবে এগোচ্ছে না- এমন একটি নীরব স্বীকারোক্তি।

পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্র বলেছে, যুদ্ধ শুরুর আগে নয়, যুদ্ধের মাঝখানে এসে এসব বিকল্প খুঁজতে হলে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে যায়।
জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান হিসেবে ইরানে হামলার সামরিক বিকল্প তৈরির দায়িত্ব কেইনের। তবে যুদ্ধ শুরুর আগেও পেন্টাগনে অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকে তিনি বড় ধরনের অভিযান চালানোর সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক নিয়ে সরব ছিলেন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো জানিয়েছে, তখনও তিনি এমন অভিযানের ব্যাপকতা, জটিলতা এবং সম্ভাব্য মার্কিন সেনা হতাহতের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

অন্যদিকে, যুদ্ধ শুরুর আগে ট্রাম্প নিজের এক পোস্টে কেইনের নাম উল্লেখ করে দাবি করেছিলেন, তার শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা মনে করেন, ইরানের সঙ্গে তখন শুরু হতে যাওয়া দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতটি “সহজেই জেতা যাবে।”
যুদ্ধ প্রায় ছয় মাসে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে চেয়ারম্যান হিসেবে কেইনের ভূমিকা নিয়ে আগে থেকে থাকা কিছু সমালোচনা আবারও সামনে এসেছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত পরিচালনায় তার তুলনামূলক কম অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
কেইন কীভাবে বর্তমান সংকট মোকাবিলা করছেন এবং একই সঙ্গে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক সামলাচ্ছেন, সে বিষয়ে অবগত একটি সূত্র বলেছে, এ বিষয়ে তিনি তার সক্ষমতার সীমার বাইরে চলে গেছেন।

তবে কেইন একা এমন অবস্থানে নেই। প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা এবং বাইরের বিশ্লেষকরাও একমত যে, ইরানকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে হলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাতে হবে, যাতে স্থলসেনা মোতায়েনের প্রয়োজন হতে পারে। এমন অভিযানে হাজার হাজার মার্কিন সেনার প্রাণহানির ঝুঁকি রয়েছে।

পেন্টাগন সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য পরিকল্পনা করে থাকে। ফলে এ ধরনের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রশাসনের কেউই এমন চরম পদক্ষেপ নেয়ার পক্ষে অবস্থান নেননি।

এ কারণে কেইন ও অন্য কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে, কম মাত্রার সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পদক্ষেপও নেতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। একই সঙ্গে তারা এমন একটি ‘বেরিয়ে আসার পথ’ খুঁজছেন, যা অন্তত প্রেসিডেন্টকে একটি ‘প্রতীকী বিজয়’ তুলে ধরার সুযোগ দেবে। সেই বিজয় তিনি মার্কিন জনগণের কাছে উপস্থাপন করতে পারবেন, আবার সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার পথও বন্ধ হবে না।
এর শুরু হতে পারে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার বিষয়ে একটি চুক্তির মাধ্যমে।

বিপাকে যুক্তরাষ্ট্র, ‘যুদ্ধ অবসানে পথ’ খুঁজছেন শীর্ষ জেনারেল

গানগুলো যেন পুরোনো ডায়েরির পাতায় লেখা অনুভূতি by কাউসার খান

প্রকাশ ০৮ অক্টোবর ২০২৫ঃ ডায়েরির পাতা খুললে যেমন মনে আসে পুরোনো দিনের কথা, তেমনি সিডনির এক সন্ধ্যায় সেই স্মৃতির পাতা ছুঁয়ে গেলেন শিল্পী নিজাম উজ্জ্বল। হারমোনিয়াম, তবলা, সেতার, গিটার ও কি-বোর্ডের সুরে মিশে ছিল বাংলা গান আর গজলের গল্প—নস্টালজিয়ায় ভরা সেই আয়োজনের নাম ছিল ‘ডায়েরির পাতা থেকে’।

গত ৪ অক্টোবর ২০২৫ রোববার সন্ধ্যায় সিডনির হার্স্টভিল সিভিক থিয়েটারে সিডনি মিউজিক ক্লাব আয়োজন করে বৈঠকি এই সংগীত সন্ধ্যার। দর্শকে পরিপূর্ণ মিলনায়তনে নিজাম উজ্জ্বল যখন একে একে গাইছিলেন পরিচিত সুরগুলো, তখন মনে হচ্ছিল—এ যেন প্রবাসের নয়, ঢাকার কোনো পুরোনো দিনের সংগীত সন্ধ্যা।

প্রথম পর্বে উজ্জ্বল গেয়েছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় গান ‘পাহাড়ের কান্না দেখে’, ‘এই পদ্মা এই মেঘনা’ ও ‘শুধু কি আমার ভুল’। সেই গানগুলো যেন ডায়েরির পুরোনো পাতায় লেখা অনুভূতির মতো শ্রোতাদের মনে জাগিয়ে তোলে অতীতের আবেগ। দ্বিতীয় পর্বে তিনি গেয়ে শোনান ‘হোশ ওয়ালো কো খবর কিয়া’, ‘দুনিয়া কিসি কে পেয়ার মে’সহ গজল, যা মিলনায়তনে তৈরি করে এক নীরব মুগ্ধতা। শেষ পর্বে ‘দামাদাম মাস্ত কালান্দার’-এর ছন্দে উঠে দাঁড়ান শ্রোতারা—বৈঠকি গানের আসর পরিণত হয় উৎসবে।
অনুষ্ঠান শেষে নিজাম উজ্জ্বল প্রথম আলোকে বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার বহুজাতিক সমাজে বাংলা গান পৌঁছে দেওয়া আমার লক্ষ্য। বাংলাদেশের কালজয়ী গীতিকার ও শিল্পীদের গান এখানে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছি।’

প্রবাসী দর্শক আতিকুর রহমান বলেন, ‘সিডনিতে অনেক অনুষ্ঠান হয়, কিন্তু এমন বৈঠকি মেজাজে বাংলা গান শোনার সুযোগ খুব কম। উজ্জ্বলের গায়কি আর যন্ত্রশিল্পীদের বাজনা আমাদের পুরোনো দিনের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।’ সাংস্কৃতিক কর্মী আবিদা রুচি বলেন, ‘প্রবাসে থেকেও এভাবে নিজেদের গান শুনতে পারা আনন্দের।’

আসরে যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন সুবীর গুহ, ইয়াসির পারভেজ, শাহরিয়ার জামাল, নীলাদ্রি চক্রবর্তী ও সোহেল খান। উপস্থাপনায় ছিলেন নোরা পারভেজ। সিডনি মিউজিক ক্লাবের সদস্য শিখা গমেজ বলেন, ‘বিদেশে বসে বাংলা গানের শুদ্ধ চর্চা ও নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এটি আমাদের প্রচেষ্টা।’
উপস্থিত দর্শকের মতে, এ সন্ধ্যার প্রতিটি গান যেন একেকটি ডায়েরির পাতা—যেখানে লেখা ছিল সুর, তাল আর স্মৃতির গল্প। সিডনির সেই বৈঠকি সংগীত আসর প্রবাসী শ্রোতাদের মনে রয়ে গেল এক সুরভরা স্মৃতি হয়ে।

 ‘ডায়েরির পাতা থেকে’ আসরে উজ্জ্বল
‘ডায়েরির পাতা থেকে’ আসরে উজ্জ্বল। প্রথম আলো

ইরান যুদ্ধ বন্ধের বার্তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র - অস্ত্রের মজুত কমেছে বলে স্বীকার করেছেন ট্রাম্প

যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইতিবাচক বার্তা পাচ্ছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের সংকট দেখা দিয়েছে—এমন খবরের মধ্যে বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে ইরানের সঙ্গে আলোচনার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী করিম ঘারিবাবাদি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তাঁরা একধরনের বার্তা পাচ্ছেন। এসব বার্তার প্রকৃতি কেমন কিংবা বার্তা কোথা থেকে আসছে—সে বিষয়ে মুখ খোলেননি তিনি। তবে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে বার্তাগুলো ইতিবাচক।

ঘারিবাবাদি বলেছেন, ‘ইরানিদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে নিতে হলে তাঁদের প্রথমে ওমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিষয়টি সুরাহা করতে হবে। সেখানে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে এবং হরমুজ প্রণালিতে নতুন সীমানা নির্ধারণ করতে হবে।’

তবে যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ‘যুদ্ধ বন্ধ হবে শিগগিরই। হরমুজ প্রণালি নিয়ে চুক্তি সন্নিকটে।’

ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। সেই সঙ্গে মার্কিন সামরিক বাহিনী কিছু অস্ত্রের মজুত–সংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে বলে স্বীকার করেন তিনি।

গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এ কথা বলেন। ইরান যুদ্ধ প্রসঙ্গে এ সময় ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, এটা খুব শিগগিরই শেষ হবে। আমার মনে হয় না, তারা আর খুব বেশি দিন টিকে থাকতে পারবে।’

গত মঙ্গলবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সঙ্গে পাঁচ মাসের যুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনী অত্যন্ত নিখুঁতভাবে হামলা চালানোর সক্ষমতাসম্পন্ন দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের বড় অংশ ব্যবহার করে ফেলেছে। গত বৃহস্পতিবার মার্কিন অস্ত্রের মজুত নিয়ে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে তিনি বলেন, ‘কিছু নির্দিষ্ট ধরনের শক্তিশালী অস্ত্রের সীমাহীন মজুত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আছে। তবে অন্য কিছু অস্ত্রের মজুত তুলনামূলকভাবে কম।’

ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা খাতের কোম্পানিগুলো নতুন নতুন উৎপাদন কারখানা তৈরি করছে। এর মধ্যে প্যাট্রিয়ট ও টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানাও আছে। অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন—এমন তথ্য প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন পোস্ট।

হরমুজ পরিস্থিতি অনিশ্চিত

সাময়িক উত্তেজনা প্রশমনের পর হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি আবারও চরম অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ইরানের কেশম দ্বীপের আশপাশে নতুন করে আবারও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তারা যাদের ‘শত্রুভাবাপন্ন লক্ষ্যবস্তু’ বলছে, তাদের বিরুদ্ধে চালানো অভিযানের অংশ হিসেবেই এই বিস্ফোরণ ঘটেছে।

এমন এক সময়ে এই ঘটনা ঘটল, যখন হরমুজ প্রণালিতে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ জোরদারে তেহরানের পার্লামেন্টে একটি খসড়া বিল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত এই আইনের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলোর নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে এবং এই নিয়ম অমান্যকারীদের ওপর জরিমানা ধার্য করা হবে।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিদ্যমান আস্থাভিত্তিক ঘাটতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও মন্তব্য করেছেন। তিনি ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে সামরিক হুমকি ও কূটনৈতিক আহ্বানের মধ্যবর্তী দোদুল্যমান নীতির অভিযোগ তুলেছেন।

অভ্যন্তরীণ পরিসরে ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় কিরমান প্রদেশ থেকে ২১ জনকে গ্রেপ্তারের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে কাজ করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

এমন এক পরিস্থিতিতে এসব ঘটনা ঘটছে, যখন দেশের দক্ষিণ অংশের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকার মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল সুসংহত করতে একটি সাময়িক চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে এসেছে ইরান ও ওমান।

এডেন উপসাগরে নোঙর করে রাখা জাহাজের পাশ দিয়ে নৌকায় করে যাচ্ছেন লোকজন। গত বৃহস্পতিবার বাব আল-মানদেব প্রণালির ইয়েমেন উপকূলের কাছে। হুতিদের হুমকির মুখে এ নৌপথে জাহাজ চলাচল কমে গেছে
এডেন উপসাগরে নোঙর করে রাখা জাহাজের পাশ দিয়ে নৌকায় করে যাচ্ছেন লোকজন। গত বৃহস্পতিবার বাব আল-মানদেব প্রণালির ইয়েমেন উপকূলের কাছে। হুতিদের হুমকির মুখে এ নৌপথে জাহাজ চলাচল কমে গেছে। ছবি: এএফপি

ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে হিজবুল্লাহ, কীভাবে বদলে যাচ্ছে তাদের যুদ্ধকৌশল

হিজবুল্লাহ—লেবাননের সশস্ত্র একটি গোষ্ঠী। ইরানপন্থী হিসেবে পরিচিত। একসময় হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, এ গোষ্ঠী আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু সেসব দিন পেছনে ফেলে নিজেদের নতুন করে সংগঠিত করেছে হিজবুল্লাহ।

সময়টা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিক। হিজবুল্লাহ তখন চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি পার করছে। হিজবুল্লাহ সদর দপ্তরে বোমা ফেলে ইসরায়েল। একটি, দুটি, তিনটি নয়; পরপর ৮০টি। ধ্বংস হয়ে যায় কার্যালয়। হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের অনেকে নিহত হন। তাঁদের মধ্যে সংগঠনের প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ ছিলেন।

ধারণা করা হয়, ইসরায়েলিরা হাসান নাসরুল্লাহর অবস্থান শনাক্ত করে ফেলেছিল। মাটির ৬০ ফুট নিচেও তিনি নিরাপদ ছিলেন না। হিজবুল্লাহর কমান্ডারদের সন্দেহ ছিল, ইসরায়েল তাঁদের মুঠোফোনে আড়ি পাতছে। তাঁরা কী বলছেন এবং কী করছেন—সবই জেনে যাচ্ছে। এমনকি হাজারো পেজার ও ওয়াকিটকিতে বিস্ফোরক বসানো হয়েছিল। এতে হিজবুল্লাহর মারাত্মক ক্ষতি হয়েছিল।

এমন পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহর বেঁচে থাকা কমান্ডারেরা মুঠোফোন ব্যবহার বন্ধ করে দেন। তাঁরা মোটরসাইকেল ও স্কুটারে চলাচল শুরু করেন। তাঁরা লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলের হারেত হরেইক ও শিয়াহসহ বিভিন্ন এলাকায় জড়ো হন। সম্মিলিতভাবে এই এলাকা ‘দাহিয়েহ’ নামে পরিচিত।

হিজবুল্লাহর কমান্ডারেরা মনে করছিলেন, সবকিছুই ফাঁস হয়ে গেছে। হাসান নাসরুল্লাহর মতো সর্বোচ্চ নেতা যদি নিরাপদ না থাকেন, তাহলে তাঁদের আর কেউ নিরাপদ নন।

এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহ তাদের সর্বশেষ বিকল্প পরিকল্পনাটি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি এমন একটি পরিকল্পনা, যা বাস্তবায়ন করতে হবে—এমনটা হিজবুল্লাহ কমান্ডারেরা ভাবেননি। দাহিয়েহ এলাকায় কমান্ডারেরা একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা শুরু করেন। বেকারি, ব্যাংকের কোনো শাখা, এমনকি মুঠোফোনের দোকান—কোথায় দেখা করেননি তাঁরা।

ওই সময় হিজবুল্লাহর কমান্ডারদের যোগাযোগের একমাত্র উপায় ছিল এভাবে সামনাসামনি দেখা করা। কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়নি। সম্ভবও ছিল না। তাঁদের এভাবে দেখা করার মূল্য উদ্দেশ্য দুটি। এক, সংকটময় সময় কাটিয়ে হিজবুল্লাহকে আবারও সক্রিয় করার পরিকল্পনা করা। দুই, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের সম্ভাব্য স্থল অভিযান মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু করা।

আর এভাবেই শুরু হয় হিজবুল্লাহর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা। ধ্বংসের মুখ থেকে উঠে আসে হিজবুল্লাহ। সংগঠনের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হয়।

হিজবুল্লাহর এই ঘুরে দাঁড়ানোর যাত্রা সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন এমন সাতজনের সঙ্গে কথা বলেছে মিডল ইস্ট আই। সংবাদমাধ্যমটি কথা বলেছে হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সূত্র, লেবাননের রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা ও কয়েকজন আরব কূটনীতিকের সঙ্গেও। তাঁদের প্রায় সবাই নাম–পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।

তাঁদের ভাষ্য, শুরুর দিকে বড় ধরনের সংশয় থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে হিজবুল্লাহ। সামরিকভাবে বড় ধাক্কা খাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে হিজবুল্লাহ কীভাবে নিজেদের বাহিনীকে পুনর্গঠন করেছে, সেই বিষয়ে তাঁরা বিস্তারিত জানিয়েছেন। এমনকি হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনা নিয়েও তাঁরা কথা বলেছেন।

২০২৩ সালের পর থেকে লেবাননে ইসরায়েলিদের দুটি যুদ্ধে ইরানের ভূমিকা, হিজবুল্লাহর অর্থনৈতিক সংকট, শিয়াদের একটি অংশের অসন্তোষসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে এসব ব্যক্তির কথায়, মতামতে।

ইসরায়েলে হামলা ‘ভুল’ ছিল

পর্দার অন্তরালে থাকা হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের অনেকেই মনে করেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামলা চালানোটা বড় আর ঐতিহাসিক ভুল ছিল। সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র জানায়, হামলার সিদ্ধান্ত সরাসরি হাসান নাসরুল্লাহর কাছ থেকে এসেছিল। এমনকি হিজবুল্লাহর সর্বোচ্চ নির্বাহী পরিষদ শুরা কাউন্সিলের ভেতরেও এ নিয়ে ভিন্নমত ছিল।

চলতি মাসের শুরুর দিকে এ বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলের আর্মি রেডিও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে দাবি করা হয়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর ধরে হামাস আর হিজবুল্লাহর মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর উদ্ধার করা বলে দাবি করা কিছু অভ্যন্তরীণ নথির উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় হামাসের নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহকে সমন্বিত ও আকস্মিক হামলায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

এ বিষয়ে হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, সীমান্ত ও সম্পদ বিভাগের প্রধান এবং সাবেক সংসদ সদস্য নাওয়াফ মুসাওয়ি বলেন, ‘এসবই কেবল প্রচার। বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।’

তবে নাম–পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা হিজবুল্লাহর কয়েকজন যোদ্ধার মতে, ইসরায়েলের ওই প্রতিবেদনে কিছুটা সত্যতা থাকলেও থাকতে পারে।

বছরের পর বছর ধরে ইরান এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ জোট একটি কৌশল গড়ে তুলেছে। এ জোটে রয়েছে কয়েকটি রাষ্ট্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠী। এই কৌশলের নাম ‘ইউনিটি অব ফ্রন্টস’। এর লক্ষ্য চারদিক থেকে হুমকি সৃষ্টির মাধ্যমে ইসরায়েলকে ঘিরে ফেলা।

সোলাইমানি–নাসরুল্লাহর ভূমিকা

এই কৌশলের মূলে ছিলেন দুজন ব্যক্তি। দুজনই এখন প্রয়াত। তাঁদের একজন ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। অন্যজন হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ। নিজের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব, সামরিক সাফল্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নাসরুল্লাহ মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন। আরবিতে সাবলীল কাসেম সোলাইমানি বহু যুদ্ধের অভিজ্ঞ ছিলেন। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অভিজাত কুদস ফোর্সের প্রধান ছিলেন তিনি।

সোলাইমানি ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম তদারকি করতেন। প্রয়োজনে সরাসরি নির্দেশনাও দিতেন। এর মধ্যে ছিল ইরাকের শিয়া আধাসামরিক বাহিনী, ইয়েমেনের হুতিরাও। ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছেও তাঁর যথেষ্ট প্রভাব ছিল।

সোলাইমানি আর নাসরুল্লাহর কর্মতৎপরতার মিল বোঝাতে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র ২০১২ সালের একটি ঘটনার কথা তুলে ধরে। সূত্রটির দাবি, ওই সময় নাসরুল্লাহকে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছিলেন সোলাইমানি। উদ্দেশ্য ছিল, সিরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারকে সমর্থন দেওয়া।

সূত্রটি জানায়, সোলাইমানির এমন প্রস্তাবের জবাবে নাসরুল্লাহ বলেছিলেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন। আমাদের সিরিয়ায় যাওয়া উচিত। তবে আমাদের আরও আগেই যাওয়া উচিত ছিল।’

বাঁকবদলের মুহূর্ত

২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় কাসেম সোলাইমানি নিহত হন। এ ঘটনাকে বড় বাঁকবদলের মুহূর্ত হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ জোট তাদের অন্যতম প্রধান কৌশলগত নেতৃত্বকে হারায়। ‘ইউনিটি অব ফ্রন্টস’ কৌশলও ধীরে ধীরে গতি হারাতে শুরু করে।

হিজবুল্লাহর অন্তত তিনটি সূত্রের দাবি, মূলত এ কারণে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস এককভাবে ইসরায়েলে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। দুটি সূত্র জানায়, ওই হামলার পর ইরানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির-আব্দোল্লাহিয়ান বৈরুতে যান। ওই সফরের সময় তিনি নাসরুল্লাহকে জানান, তেহরান যুদ্ধে (গাজা যুদ্ধ) শুধু নৈতিক সমর্থন দিতে প্রস্তুত।

ইরানের নেতাদের মতো নাসরুল্লাহ নিজেও আশঙ্কা করছিলেন, বড় ধরনের হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এ কারণে তিনি সীমিত পরিসরে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাই তিনি ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর ইসরায়েলের দিকে সীমিত পরিসরে রকেট হামলার নির্দেশ দেন। ওই সময়ে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচারে বোমাবর্ষণ চলছিল।

তবে হাসান নাসরুল্লাহর বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রাদওয়ান ফোর্সের বিশেষ অভিযান ইউনিটের প্রধান ইব্রাহিম আকিল। বিরোধিতাকারীদের ভাষ্য ছিল, ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে নামলে পুরো শক্তি নিয়েই নামতে হবে। আর সেটা সম্ভব না হলে যুদ্ধে জড়ানো একেবারে উচিত হবে না।

বড় সংঘর্ষ এড়ানো

এরপর বছরখানেক ধরে লেবানন–ইসরায়েল সীমান্তজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলা চালায় হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েল। এ সময়ে দুপক্ষের মধ্যে ৭ হাজার রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা এবং বিমান ও কামানের গোলাবর্ষণ হয়।

এসব হামলা চলে পুরো ‘ব্লু লাইনে’। জাতিসংঘ নির্ধারিত এ সীমানা কার্যত লেবানন-ইসরায়েলের সীমান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে প্রাণহানির দিক থেকে বড় ক্ষতি হয় লেবাননের। দেশটিতে ২ হাজার মানুষ নিহত হন। ইসরায়েলের সীমান্তের দক্ষিণে নিহত হন ৭০ জন।

যদিও হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা ইসরায়েলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সেনাকে উত্তর সীমান্তে আটকে রাখতে সক্ষম হয়। এতে গাজার পাশাপাশি আরেকটি ফ্রন্টে মনোযোগ দিতে হয় ইসরায়েলকে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চল থেকে প্রায় ৬০ হাজার ইসরায়েলি বাসিন্দাকে সরিয়ে নিতে হয়।

দুপক্ষ শুরুর দিকে বেশকিছু অলিখিত সীমার মধ্যে থেকে হামলা চালায়। উভয় পক্ষের মধ্যে এমন এক ধরনের বোঝাপড়া ছিল, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জবাব একই ধরনের হামলায় দেওয়া হবে। হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ সতর্ক করে বলেছিলেন, বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় হামলা হলে তার জবাব দেওয়া হবে তেল আবিবে হামলা চালিয়ে।

ধীরে ধীরে সেই সীমা অতিক্রম করতে শুরু করে ইসরায়েল। সেই সঙ্গে হিজবুল্লাহর প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে, সেটিও পরীক্ষা করতে থাকে ইসরায়েলি বাহিনী। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দাহিয়েহ এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা সালেহ আল-আরুরি নিহত হন।

এর প্রতিক্রিয়ায় হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের মাউন্ট মেরনের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক রকেট হামলা চালায়। হিজবুল্লাহর দুটি সূত্র বলেছে, তেল আবিবের বদলে ওই ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করার কারণ, আরুরি ছিলেন ফিলিস্তিনি, লেবাননের নাগরিক নন। কাজেই এর জবাবও সীমিত রাখা হয়েছিল।

ছয় মাস পর হিজবুল্লাহর শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ফুয়াদ শুকুর ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন। এর জবাবে ইসরায়েলের দিকে এক হাজার রকেট ছোড়ার পরিকল্পনা করেছিল হিজবুল্লাহ। কিন্তু ইসরায়েল আগে হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহর বেশির ভাগ রকেট উৎক্ষেপণকেন্দ্র ধ্বংস করে দেয়।

পেজার–ওয়াকিটকি বিস্ফোরণ

হিজবুল্লাহর অন্তত দুটি সূত্রের দাবি, পাল্টা জবাবের পরিকল্পনার পুরোটা সময় আড়ি পেতে শুনেছিল ইসরায়েল। তাই আগেই হামলা চালাতে পেরেছিল দেশটি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এসে হিজবুল্লাহর নিরাপত্তা আর গোয়েন্দা ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশের ব্যাপকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল হাজারো পেজার ও শত শত ওয়াকিটকিতে বিস্ফোরণ ঘটায়।

ইসরায়েলের সমর্থকেরা এ অভিযানকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে আখ্যা দেন। অনেকেই একে জেমস বন্ড চলচ্চিত্রের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেন। হিজবুল্লাহর সরবরাহ ব্যবস্থায় ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে অনুপ্রবেশ করে যোগাযোগযন্ত্রে বিস্ফোরক বসিয়েছিল ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ।

এসব বিস্ফোরণে প্রায় ৪০ জন নিহত হন। আহত হন আরও কয়েক হাজার মানুষ। মোসাদের তৎকালীন প্রধান ডেভিড বার্নিয়া এই অভিযানকে ‘আমাদের মিশন বাস্তবায়নের একটি স্পষ্ট উদাহরণ’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। হামলার স্মরণে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সোনার তৈরি একটি পেজার উপহার দেন।

হিজবুল্লাহর সূত্রগুলো স্বীকার করে নিয়েছে, এটি ছিল তাদের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা। তবে তাদের দাবি, শেষ পর্যন্ত এই অভিযান সফল হয়নি।

১৭ সেপ্টেম্বর বিস্ফোরিত পেজারগুলো সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর মতে, প্রকৃত লক্ষ্য ছিল ওয়াকিটকি। এগুলো আকারে বড় ছিল। বেশি বিস্ফোরক রাখা হয়েছিল। মাঠপর্যায়ের যোদ্ধারা এগুলো ব্যবহার করতেন। অন্যদিকে পেজার মূলত বার্তা পাঠানো বা সদস্যদের ডেকে পাঠানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। এগুলোর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অযোদ্ধা কর্মকর্তাদের কাছে ছিল।

সূত্রগুলোর দাবি, ২০২২ সাল থেকে হিজবুল্লাহর কাছে ত্রুটিযুক্ত পেজার সরবরাহ করতে শুরু করে ইসরায়েল–সমর্থিত কোম্পানি। হামলার সময় এমন প্রায় ২ হাজার ৫০০টি পেজার ছিল। ওয়াকিটকি নিয়ে অভিযানটি এক দশক ধরে অত্যন্ত গোপনে চলছিল। দুটি সূত্রের দাবি, ১৮ সেপ্টেম্বরের অভিযানের সময় ১৫ হাজার ওয়াকিটকি গুদামে সংরক্ষিত ছিল। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেগুলো তখন বন্ধ অবস্থায় ছিল।

এ সংখ্যাগুলো মোসাদের একজন এজেন্টের আগে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি দাবি করেছিলেন, ইসরায়েলের একটি গোপন ছদ্মবেশী কোম্পানি হিজবুল্লাহকে প্রায় ১৬ হাজার ওয়াকিটকি সরবরাহ করেছে। ওই সময় হামলায় হাজারো পেজার ধ্বংসের পরদিন চালানো অভিযানে মাত্র কয়েক শ ওয়াকিটকি বিস্ফোরিত হয়েছিল। যদিও ওয়াকিটকির বিস্ফোরণের ক্ষতি ছিল বেশি।

দ্বিতীয় দিনের হামলায় অন্তত ২৫ জন নিহত হন। আর প্রথম দিনের হামলায় নিহত হয়েছিলেন ১২ জন।

হিজবুল্লাহর দুটি সূত্রের দাবি, তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় ইসরায়েল। কারণ, মোসাদ হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ আলোচনা আড়ি পেতে শুনছিল। তাদের ধারণা ছিল, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকেই হিজবুল্লাহ ও ইরান বুঝতে পারে, যুদ্ধ আর সীমিত রাখা সম্ভব হবে না। এরপর বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর এ নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। সেই বৈঠকে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনায় আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে স্থল অভিযানও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এর আগে হিজবুল্লাহর একটি পরিদর্শন দল তাদের পেজারগুলো নিয়ে বারবার সন্দেহ প্রকাশ করছিল। এগুলো নিরাপত্তাসংক্রান্ত অন্তত দুটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। তারপরও সন্দেহ কাটেনি। তাই আরও পরীক্ষা–নিরীক্ষার জন্য কয়েকটি নমুনা ইরানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

হিজবুল্লাহ–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এ সিদ্ধান্ত ইসরায়েলকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে। আর দেশটি আগেই হিজবুল্লাহর ওপর আক্রমণ করে বসে।

হিজবুল্লাহর বিপর্যয়ের শুরু

টানা ৬৬ দিন ধরে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে জোরালো বিমান ও স্থল অভিযান চালায় ইসরায়েল। একের পর এক আঘাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে হিজবুল্লাহ। এ অভিযানে শুধু হাসান নাসরুল্লাহ নন, তাঁর চাচাতো ভাই ও উত্তরসূরি হাশেম সাফিউদ্দিন নিহত হন। ইব্রাহিম আকিল ও তাঁর নেতৃত্বাধীন রাদওয়ান ফোর্সের কয়েকজন কমান্ডারসহ হিজবুল্লাহর সামরিক নেতৃত্বের অনেকে নিহত হন।

ইসরায়েলের হামলায় হিজবুল্লাহর প্রায় পুরো ইউনিট ধ্বংস হয়ে যায়। ধ্বংস করা হয় গোলাবারুদের গুদামও। হামলায় হিজবুল্লাহর যেসব কমান্ডার বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই মুঠোফোন ব্যবহার করেননি। এ কারণে তাঁরা ইসরায়েলের নজরদারি এড়াতে সক্ষম হন।

এ পরিস্থিতিতে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন ইউনিটে লড়াই চালিয়ে যান হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা। তাঁরা ইসরায়েলিদের অগ্রযাত্রা ধীর করে দেন। উত্তরাঞ্চলে হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের ওপর কতটা ভয়াবহ আঘাত নেমে এসেছে, সে সম্পর্কে তাঁদের অনেকেরই ধারণা ছিল না।

দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা যখন ইসরায়েলি বাহিনীকে ব্যস্ত রাখছিলেন, তখন ঘনিষ্ঠ এই মিত্রকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসে তেহরান।

হিজবুল্লাহর অন্তত দুটি সূত্রের ভাষ্য, তাদের সামরিক কাঠামো ইরানের আইআরজিসির আদলে গড়ে তোলা। এ কাঠামোয় হিজবুল্লাহর একেকজন কমান্ডারের বিপরীতে একজন করে সমকক্ষের ইরানি কর্মকর্তা থাকেন। হিজবুল্লাহর বিভিন্ন ইউনিট ও বিভাগের প্রধান এবং তাঁদের উপপ্রধানেরা নিহত হওয়ার পর সেসব ইরানি কর্মকর্তারা শূন্যতা পূরণে লেবাননে আসেন।

একটি সূত্র জানায়, তাঁদের মধ্যে ছিলেন কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানির উত্তরসূরি ইসমাইল কানি। কুদস ফোর্সের লেবানন শাখার প্রধান আব্বাস নিলফোরুশান হিজবুল্লাহর সদর দপ্তরে হামলার সময় হাসান নাসরুল্লাহর সঙ্গে নিহত হন।

হিজবুল্লাহর বিশ্বাস, তাদের টিকে থাকার সক্ষমতা ইসরায়েলকে বিস্মিত করেছিল। শেষ পর্যন্ত এ কারণে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় বলে সংগঠনের সূত্রগুলোর দাবি। হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর ভাষ্য, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ধারণা করেছিলেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে এবার রাজনৈতিকভাবে হিজবুল্লাহকে দুর্বল করা যাবে। এর ফলে সেনাদের জীবন আর ঝুঁকিতে ফেলতে হবে না।

লেবানন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি ধারণা জোরালো হতে থাকে। সেটি হলো, হিজবুল্লাহ কার্যত ‘ধ্বংস’ হয়ে গেছে। অনেকে মনে করেন, হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা মাত্র ২০ শতাংশে নেমে এসেছে, কার্যত তারও কম রয়েছে। একই সঙ্গে এই মতও জোরালো হয়, লেবাননকে পুরোপুরি ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে হিজবুল্লাহর অধ্যায়ের অবসান ঘটাতে হবে।

আরব এক কূটনীতিকের ভাষ্য, হিজবুল্লাহর এমন দুর্বল অবস্থানে সৌদি আরব খুশি ছিল। ওই কূটনীতিকের দাবি, মিসর ও ফ্রান্স হিজবুল্লাহকে বোঝানোর চেষ্টা করে, সবচেয়ে শক্তিশালী অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে তাদের সময় শেষ হয়ে এসেছে। এই দুই দেশ মনে করত, হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের উচিত সম্মানজনকভাবে সরে যাওয়ার সুযোগ নেওয়া।

টিকে থাকার লড়াই

হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর ভাষ্য, ওই সময় তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ছিল টিকে থাকা। এ কারণে তাঁরা বড় ছাড় দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। এর মধ্যে সিরিয়ায় বাশার আল–আসাদের সরকারের পতন হিজবুল্লাহকে আরও দুর্বল করে দেয়। আল–আসাদের সরকারকে টিকিয়ে রাখতে এক দশক ধরে লড়েছে হিজবুল্লাহ। এতে হিজবুল্লাহ জনবল, অর্থ ও আরব বিশ্বের মানুষের সমর্থনের অনেকটা হারিয়েছে।

যাই হোক, লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার দিনই সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের বড় ধরনের অভিযান শুরু হয়। তখন আসাদকে আবারও রক্ষা করার মতো অবস্থায় ছিল না হিজবুল্লাহ। যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে বলা হয়েছিল, লিতানি নদীর দক্ষিণ থেকে হিজবুল্লাহর বাহিনী সরিয়ে নেওয়া হবে। পরে বিভিন্ন দেশ ও লেবাননের রাজনৈতিক দলগুলো দাবি তোলে, হিজবুল্লাহকে আরও উত্তরে সরে যেতে হবে।

একজন আরব কূটনীতিক মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘আসাদের পতনের পর অবস্থান বদলে যায়। দাবি ওঠে, শুধু লিতানির দক্ষিণ নয়, উত্তর দিক থেকেও হিজবুল্লাহকে সরে যেতে হবে। অথচ আমরা সবাই জানতাম, এটি মূল চুক্তির অংশ ছিল না।’ এই কঠোর অবস্থান হিজবুল্লাহকে আরও অনড় করে তোলে।

হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের ভাষ্য, ‘২০২৪ সালের নভেম্বরের পর হিজবুল্লাহ সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়েছিল। এমনকি জুনে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধেও তারা অংশ নেয়নি। তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা এবং লেবাননের পক্ষ থেকে গ্রহণযোগ্য কোনো রাজনৈতিক পথ না দেওয়ায় হিজবুল্লাহ আর নমনীয় অবস্থানে থাকতে পারেনি।

আত্মরক্ষা থেকে আক্রমণ

খোলা চোখে দেখে মনে হতে পারে, ১৫ মাসের যুদ্ধবিরতির সময় হিজবুল্লাহর সামরিক শাখা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে, পড়ছে। যদিও ইসরায়েল একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল। এ সময়ে প্রায় ৩ হাজার বিমান ও ড্রোন হামলা এবং গোলাবর্ষণ করা হয়। হিজবুল্লাহর বেশির ভাগ কমান্ডার এবং তাঁদের উত্তরসূরিদের হত্যার পর ইসরায়েল পরবর্তী স্তরের নেতৃত্বকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।

এদিকে ইসরায়েলি সেনা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সীমান্তে পাঁচটি সামরিক ঘাঁটি শক্তিশালী করে এবং সেগুলোর পরিসর বাড়ায়। সীমান্তঘেঁষা শিয়া-অধ্যুষিত শহর ও গ্রামগুলো প্রায় পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। হিজবুল্লাহর একটি সূত্র জানায়, সীমান্ত এলাকা এখন ফুটবল মাঠের মতো সমতল। সেখানে একটি ভবনও দাঁড়িয়ে নেই। নেই কোনো বাড়ি কিংবা মসজিদ।

এত কিছুর পরও হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো পাল্টা জবাব দেখা যায়নি। এতে অনেকের ধারণা হয়, দলটি হয় অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে, নয়তো প্রতিরোধ গড়ে তোলার সাহস নেই। তবে বাস্তবে হিজবুল্লাহ তাদের সামরিক কাঠামোয় বড় ধরনের পুনর্গঠন চালাচ্ছিল। লক্ষ্য ছিল, আবারও ইসরায়েলকে মোকাবিলা করার সক্ষমতা অর্জন করা।

হিজবুল্লাহর দুটি সূত্র মিডল ইস্ট আইকে বলে, তাদের সামরিক শাখা আগের তুলনায় অতিরিক্ত বড় ও জটিল হয়ে পড়েছিল। এটি ছিল ধীরগতির। কার্যকরভাবে পরিচালনা করাটাও কঠিন ছিল। যুদ্ধ সেই দুর্বলতাকে আরও প্রকট করে তোলে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ধাপে ধাপে পুরো সামরিক কাঠামো পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় হিজবুল্লাহ।

যুদ্ধে গেরিলা কৌশল

হিজবুল্লাহর সূত্রগুলো জানিয়েছে, পুনর্গঠনের সময় প্রতিটি ইউনিট ও বিভাগকে একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়াত হিজবুল্লাহ কমান্ডার ইমাদ মুগনিয়াহর গেরিলা যুদ্ধকৌশল অনুসরণ করা হয়। প্রতিটি ইউনিটকেই আগেভাগে নির্ধারিত বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

যুদ্ধের সময় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশ ছাড়াই যাতে এসব ইউনিট কার্যকরভাবে অভিযান চালাতে পারে, সে লক্ষ্যে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ছিল—গুলি শেষ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা আর থাকবে না। প্রয়োজন হলে যোদ্ধারা নিজেদের অবস্থান ছেড়ে পিছু হটতে পারবেন।

এ বছরের মার্চে এই নতুন কৌশলের প্রথম বড় পরীক্ষা হয়। সবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করেছে। হিজবুল্লাহর সূত্রগুলো বলে, যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা হয়। খামেনি হিজবুল্লাহর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নেতা ছিলেন। লেবাননের অনেক শিয়া মুসলিম তাঁকে অনুসরণ করতেন। খামেনি নিহত হওয়ার জবাবে সীমান্ত পেরিয়ে ছয়টি রকেট ছোড়া হয়।

হিজবুল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের আড়ালে লেবাননে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালাতে যাচ্ছে ইসরায়েল—তাঁদের ধারণা ছিল এটা। তাই আগাম পদক্ষেপ হিসেবে ওই রকেট হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একটি সূত্রের ভাষ্য, মার্চে রকেট ছোড়ার সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাঈম কাসেমের ছিল।

এ সিদ্ধান্তে ইরানের সমর্থন ছিল বলেও সূত্রটি দাবি করেছে। আরেকটি সূত্রের দাবি, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার জবাব হিজবুল্লাহর আরও আগেই দেওয়া উচিত ছিল বলে মনে করছিল ইরান। তবে হিজবুল্লাহ সে সময় ভিন্ন হিসাব কষেছিল বলে সূত্রটি জানায়।

ভিডিও গেম ও ড্রোন

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এখন ‘গেমিং ক্যাফের’ ছড়াছড়ি। জেরুজালেম, তেহরান কিংবা কায়রো—সবখানেই দেখা যায় এমন দৃশ্য। অন্ধকার ঘরে তামাকের ধোঁয়ার মধ্যে বসে তরুণেরা ফিফা বা ফার্স্ট-পারসন ভিউ (এফপিভি) শুটিং গেমের প্রতিযোগিতায় মত্ত।

বৈরুতের দাহিয়ায় হিজবুল্লাহর অভিজ্ঞ সদস্যরা এসব দেখে হতাশ হতেন। তাঁদের ধারণা ছিল, মার্কিন প্রোগ্রামারদের বানানো কাল্পনিক যুদ্ধের খেলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট করছে নতুন প্রজন্ম। ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ করা প্রবীণ যোদ্ধাদের কাছে মনে হতো, তরুণেরা আগের মতো কঠোর নেই।

তবে তাঁরা হয়তো তখনো জানতেন না, এ তরুণেরাই পরের যুদ্ধে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবেন।

২০২৬ সালের মার্চে আবার যুদ্ধ শুরু হয়। ইসরায়েলি সেনারা লিতানি নদীর দক্ষিণে এবং এর বাইরের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন। তাঁরা প্রায় ৩০০টি অবস্থান গড়ে তোলেন। এর মধ্যে ছিল ব্যক্তিগত বাড়ি, পরিত্যক্ত সামরিক ঘাঁটি, এমনকি ক্রুসেডের আমলের একটি দুর্গও।

আগের যুদ্ধগুলোয় তীব্র লড়াইয়ের কেন্দ্র ছিল বিনতে জুবাইলের মতো শহর। কিন্তু নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ সেসব এলাকা ছেড়ে দেয়। তবু নিরাপদ ছিল না ইসরায়েলি বাহিনী। ২ মার্চের পর থেকে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের ওপর ধারাবাহিক হামলা চালানো হচ্ছে। লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণে প্রায় ২০ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন।

হিজবুল্লাহর লক্ষ্য ছিল, ইসরায়েল যেন কোনো অবস্থান স্থায়ী ঘাঁটিতে পরিণত করতে না পারে। ২০২৪ সালে সীমান্তের পাঁচটি ঘাঁটির ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছিল। এ কৌশল বাস্তবায়নে হিজবুল্লাহ এখন ড্রোনের ওপর বেশি নির্ভর করছে। ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিটি বড় বড় সংঘাতে নতুন কোনো অস্ত্র সামনে আনার প্রবণতা রয়েছে হিজবুল্লাহর। এর মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের কৌশলগত উদ্ভাবনী সক্ষমতার বার্তা দিতে চায়।

২০০৬ সালের যুদ্ধে হিজবুল্লাহ ব্যবহার করেছিল করনেট অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র। এটি ইসরায়েলের সাঁজোয়া যান ভেদ করতে সক্ষম হয়েছিল। এতে যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের কৌশলগত চমক তৈরি হয়। এবার তারা ব্যবহার করছে এফপিভি (ফার্স্ট পারসন ভিউ) ড্রোন। এই ড্রোন ফাইবার-অপটিক কেব্‌লের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে ইলেকট্রনিক জ্যামিং বা সংকেত ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি কমে আসে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্বল্পমূল্যের কিন্তু প্রাণঘাতী এই ড্রোনকে ‘বড় হুমকি’ বলে উল্লেখ করেছেন। এই ড্রোন লক্ষ্যবস্তুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হামলা চালায়। একই সঙ্গে পুরো হামলার ভিডিও ধারণ করে।

ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের মতো লেবাননেও ভিডিও গেম সংস্কৃতি থেকে দক্ষ ড্রোনচালক তৈরি হয়েছে। অন্তত দুটি সূত্র জানিয়েছে, এখন হিজবুল্লাহর ড্রোনচালকদের বড় অংশই লেবাননের গেমাররা।

অস্ত্রের আধুনিকায়ন

প্রযুক্তিটি একেবারে নতুন নয়। ২০২৪ সালের যুদ্ধেও হিজবুল্লাহ এ ধরনের ড্রোন ব্যবহার করেছিল। তবে এরপর এর উৎপাদন অনেক বেড়েছে। ড্রোনগুলোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন এগুলো আরও বেশি বিস্ফোরক বহন করতে পারে। ফলে ইসরায়েলের মারকাভা ট্যাংকের জন্য এগুলো আরও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।

হিজবুল্লাহর সুবিধা হলো, ড্রোন তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ তাদের কাছে আগে থেকেই ছিল। ২০২৪ সালের যুদ্ধে হিজবুল্লাহ প্রথমবারের মতো আলমাস-১ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। এটি ফাইবার-অপটিক প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র। এতে টেলিভিশন ও তাপচিত্রনির্ভর নির্দেশনা ব্যবস্থা রয়েছে।

হিজবুল্লাহর দাবি, এটি ইসরায়েলের একটি স্পাইক ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি আগেই তাদের হাতে এসেছিল। তবে একটি সীমাবদ্ধতা ছিল। এতে ব্যবহৃত ফাইবার-অপটিক কেব্‌লের দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার। কাজেই আন্তসীমান্ত সংঘর্ষে ক্ষেপণাস্ত্রটির কার্যকারিতা কিছুটা সীমিত ছিল।

চলতি বছরের যুদ্ধের বেশির ভাগই লেবাননের সীমান্তের ভেতরে হয়েছে। তাই আলমাস ক্ষেপণাস্ত্রের স্বল্পপাল্লা নিয়ে বড় কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। আলমাসের জন্য মজুত রাখা বিপুল পরিমাণ ফাইবার-অপটিক কেব্‌ল পরে এফপিভি ড্রোন তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।

হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, আগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গুণগত সামরিক সুবিধা পেতে নিজেদের সশস্ত্র শাখাকে শক্তিশালী করেছিল হিজবুল্লাহ। এখন কৌশল বদলেছে। প্রযুক্তির ওপর বেশি নির্ভর করা হচ্ছে। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ ড্রোন।

বর্তমানে কাগজে-কলমে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতি চলছে। ১৬ এপ্রিল থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। যদিও দুপক্ষের মধ্যে হামলা, পাল্টা হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। লেবাননের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ সরাসরি ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সংঘাত থেকে লেবাননকে আলাদা রাখা।

যদিও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে স্বাভাবিক জীবন দ্রুত ফিরবে, এমন কোনো ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। হিজবুল্লাহর সূত্র ও লেবাননের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি যুদ্ধের শেষ নয়, সাময়িক বিরতি মাত্র।

আগের সেই হিজবুল্লাহ নেই

২০২৬ সালের আগস্টে এসে হিজবুল্লাহর অবস্থান কী?

এটা নিশ্চিত, হিজবুল্লাহ সামরিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে ছোট ইউনিটভিত্তিক গেরিলা কৌশলে ঝুঁকে যাওয়ার কারণে তারা কিছুটা কার্যকারিতা ধরে রাখতে পেরেছে।

সর্বশেষ দুটি যুদ্ধে হিজবুল্লাহর কতজন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন, তার কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব নেই। হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর ধারণা, নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ৪ হাজার থেকে ১০ হাজারের মধ্যে হতে পারে। তাঁদের বেশির ভাগই ২০২৪ সালের যুদ্ধে নিহত হন।

হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে, ২০২৩ সালে যে হিজবুল্লাহ ছিল, এখন আর সেই হিজবুল্লাহ নেই। সূত্রটি বলে, একসময় হিজবুল্লাহর বিশাল রকেট ভান্ডার ছিল। সীমান্তজুড়ে শক্ত অবস্থান ছিল। তারা ইসরায়েলের জন্য বাস্তব ও বড় হুমকি ছিল। অঞ্চলজুড়ে, এমনকি আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত সরবরাহ ও সাহায্য পাওয়ার একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তাদের ছিল।

একসময় গ্যালিলি অঞ্চলে ঢোকার যে পরিকল্পনা বা আকাঙ্ক্ষা হিজবুল্লাহর ছিল, এখন আর তা নেই। হিজবুল্লাহর একটি সূত্র বলছে, এখন তাদের উদ্দেশ্য জেরুজালেমকে নয়, বরং লেবাননকে রক্ষা করা।

ঘনিষ্ঠ সূত্রটি আরও বলে, নাঈম কাসেমের বিষয়ে অনেকেই বলেছিলেন, তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিশমার ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু রূপান্তরের সময়টাতে তিনি ধীরে ধীরে সংগঠনকে আবার গড়ে তুলছেন।

নাঈম কাসেমের অবদান

নানামুখী তীব্র চাপের মধ্যেও হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব টিকে আছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও দেখাতে পেরেছে। নাঈম কাসেমকে মহাসচিব করার সিদ্ধান্তটি শুরুতে অনেকের বিদ্রূপের মুখে পড়েছিল।

হাসান নাসরুল্লাহর মতো ব্যক্তিগত ক্যারিশমা নাঈম কাসেমের নেই। আবার হাশেম সাফিউদ্দিনের মতো ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বও তাঁর নেই। নাসরুল্লাহ ও সাফিউদ্দিন দুজনই ‘সাইয়্যেদ’ ছিলেন। অর্থাৎ তাঁরা নিজেদের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর বংশধর বলে দাবি করতেন।

তবু নাঈম কাসেম কঠিন সময়ে হিজবুল্লাহকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি নিজেও ইসরায়েলের হত্যাচেষ্টার লক্ষ্যবস্তু। এ বছরের শুরুর দিকে নাঈম কাসেম সংগঠনে বড় ধরনের পুনর্গঠন করেন। নিজের নেতৃত্বের ধরন অনুযায়ী দলকে সাজান। প্রভাবশালী কয়েকজনকে পেছনের সারিতে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে পুরো প্রক্রিয়া বড় কোনো সংকট ছাড়াই শেষ হয়।

হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে, নাঈম কাসেম প্রমাণ করেছেন, তিনি সংগঠনকে ধরে রাখতে জানেন। পুরো দলকে পুনর্গঠন ও ঐক্যবদ্ধ করতেও সক্ষম তিনি।

হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতাদের প্রায় সবাই বিভিন্ন সময় নিহত হয়েছেন। তবে প্রতিষ্ঠাকালীন প্রজন্মের কয়েকজন নেতা এখনো দায়িত্বে আছেন। তাঁদের মধ্যে নাঈম কাসেম ও হিজবুল্লাহর সংসদীয় ব্লকের প্রধান মোহাম্মদ রাদ আছেন। দ্বিতীয় প্রজন্মের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা এখন সামনে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে হাসান ফাদলাল্লাহ অন্যতম। সময়ের সঙ্গে সংগঠনে তাঁর প্রভাব বেড়েছে।

এ বিষয়ে নাওয়াফ মুসাওয়ি বলেন, ‘আমরা একটি প্রতিরোধ আন্দোলন। আমাদের নেতারা সব সময় নিহত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তাই প্রতিটি দায়িত্বশীল নেতার বিকল্প হিসেবে আরেকজনকে প্রস্তুত রাখা হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম প্রজন্মের নেতারা নিহত হয়েছেন। দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতারাও নিহত হয়েছেন। তৃতীয় প্রজন্মের অনেক নেতা আর নেই। তবু প্রতিরোধ চলবে।’

মুসাভির ভাষ্য, ইসরায়েলের গোয়েন্দাদের কাছে হিজবুল্লাহর প্রথম, দ্বিতীয় আর তৃতীয় প্রজন্মের নেতাদের সম্পর্কে বিশদ তথ্য ছিল। কিন্তু এখন তাঁরা এমন একটি নতুন প্রজন্মের মুখোমুখি, যাঁদের সম্পর্কে ইসরায়েলিদের কাছে তেমন কোনো তথ্য নেই।

ইরানের ভূমিকা

এমন দুর্বল অবস্থায় অনেকের মনে হতে পারে, হাসান নাসরুল্লাহর সময়ের তুলনায় এখন হিজবুল্লাহকে পরিচালনায় ইরানের ভূমিকা বেড়েছে। তবে বিভিন্ন সূত্র বলছে, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন হিজবুল্লাহর সঙ্গে মাঠপর্যায়ে ইরানি উপদেষ্টার সংখ্যা কম।

হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলে, ‘আমার মনে হয়, এই সময়ে ইরানের উপস্থিতি সবচেয়ে কম। এর কারণ মূলত সরবরাহ–সংক্রান্ত জটিলতা। সিরিয়া এখন আর ইরানিদের জন্য উন্মুক্ত নয়। আকাশপথেও যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে।’

রাজনৈতিক ও কৌশলগত পর্যায়ে সমন্বয় রয়েছে উল্লেখ করে সূত্র আরও জানায়, এই সমন্বয় এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। সূত্রটির মতে, এ অঞ্চলের এবং হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে ইরানের ওপর। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের আলোচনা ও সংঘাতের গতিপ্রকৃতির ওপর।

ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ তেহরান ও হিজবুল্লাহর সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরান এমন কোনো সমঝোতায় যেতে রাজি নয়, যেখানে লেবাননের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে না—এমনটাই মনে করছে হিজবুল্লাহ–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

বদলাচ্ছে রাজনৈতিক বাস্তবতা

লেবানন রাষ্ট্রের সঙ্গে হিজবুল্লাহর সম্পর্ক এখন সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। গত ২ মার্চ ইসরায়েলের ভূখণ্ডে হিজবুল্লাহর হামলার পর পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। এরপর লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম হিজবুল্লাহর সামরিক তৎপরতা নিষিদ্ধ করেন। একই সময়ে প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেন। এতে রাষ্ট্র ও হিজবুল্লাহর দূরত্ব বেড়ে যায়।

বিভিন্ন সূত্র বলছে, ২০২৪ সালে ইসরায়েলের আগ্রাসনের পর হিজবুল্লাহর ভেতরে ভবিষ্যৎ নিয়ে জোরালো আলোচনা হয়েছে। সশস্ত্র আন্দোলন থেকে শুধু রাজনৈতিক দলে রূপ নেওয়া যায় কি না, সেটিও আলোচনায় ছিল।

হিজবুল্লাহ এরই মধ্যে লেবাননের পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় দল। বহু বছর ধরে তারা দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিষ্ঠার সময় হিজবুল্লাহ ছিল প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরোধী। লেবাননের সাম্প্রদায়িক ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থায় গড়ে ওঠা গোষ্ঠীভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ছিল।

সময়ের সঙ্গে টিকে থাকা ও শক্তি ধরে রাখতে হিজবুল্লাহ সেই রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মতোই আচরণ করতে শুরু করেছে, যাদের একসময় তারা ঘৃণা করত। ২০১৯ সালের সরকারবিরোধী গণ–আন্দোলনের সময়ও হিজবুল্লাহ বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার পক্ষ নেয়। তারা আন্দোলনকে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দেয়। এমনকি আন্দোলনকারীদের অবস্থানস্থল ভেঙে দিতে নিজেদের সমর্থকদেরও পাঠায়।

নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে চাপ

হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে, সংগঠনের ভেতরে নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এটি কীভাবে হতে পারে বা এর ফলাফল কী—এসব নিয়েও কথা হচ্ছে। তবে যুদ্ধ চলাকালে এ ধরনের কোনো প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নাঈম কাসেমের জন্য কোনো বিষয়ই একেবারে নিষিদ্ধ নয়।’

যদিও হিজবুল্লাহর ভেতরে এমন একটি অংশ আছে, যারা মনে করে, নিরস্ত্রীকরণ কিংবা রাষ্ট্র বা পশ্চিমাদের কোনো ছাড় দেওয়া উচিত হবে না। এমনই একটি সূত্র বলে, ‘আমার মনে হয়, হিজবুল্লাহর আবার আশির দশকের মতো হয়ে ওঠা উচিত। ব্যাপক বোমা হামলা ও হত্যার পথে ফিরে যাওয়া উচিত। তবে এটা মোটেও সহজ নয়।’

ইসরায়েল ও আন্তর্জাতিক মহলের একটি অংশ লেবাননের সেনাবাহিনীর ওপর হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। এটা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। লেবাননে অনেকের শঙ্কা, এমন হলে দেশে আবার গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে।

এমনকি দ্য ইকোনমিস্ট সাময়িকী গত মাসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লেবাননের সেনাবাহিনীর প্রতি আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। লেখা হয়েছে, ‘ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু তা কোনোভাবেই নিষ্ক্রিয় থাকার অজুহাত হতে পারে না। সেনাবাহিনীকে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে।’

এ বিষয়ে মুসাওয়ি বলেন, ‘আমার মনে হয় না, লেবাননে কেউ দখলদারত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে থাকা শক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে। কারণ, তা হলে লেবানন ধ্বংস হওয়ার আগেই তাদের নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনতে হবে।’

লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া সমঝোতাকে অনেকে আত্মসমর্পণের শামিল মনে করছেন। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এটি নিয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রূপ করেছেন। তবু এই সমঝোতা হিজবুল্লাহকে রাজনৈতিকভাবে আরও কিছুটা সময়–সুযোগ করে দিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

** মিডল ইস্ট আইয়ে ৫ আগস্ট প্রকাশিত নিবন্ধটি লিখেছেন সংবাদমাধ্যমটির মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি দানিয়েল হিলটন এবং বৈরুতভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক আদম শামসেদ্দিন
- অনুবাদ করেছেন অনিন্দ্য সাইমুম

সংগঠনের পতাকা হাতে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা
সংগঠনের পতাকা হাতে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা। ফাইল ছবি: এএফপি

ফারিণ এবার শাকিবের নায়িকা

প্রকাশ ১৫ নভেম্বর ২০২৫ঃ একসঙ্গে দুটি সুখবর। একটি তাসনিয়া ফারিণ নিজেই জানিয়েছেন, অন্যটি একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পোস্টের সূত্রে জানা গেছে।

হঠাৎই এক ফেসবুক পোস্টে তাসনিয়া ফারিণ জানান, তাঁর নামের আগে এবার যোগ হচ্ছে নতুন পরিচয়। তিনি এখন আর শুধু অভিনেত্রীই নন, প্রযোজনায়ও নাম লেখাচ্ছেন। তাঁর প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের নাম ‘ফড়িং ফিল্মস’। ভক্তদের সুখবরটা জানিয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাসে ফারিণ লিখেছেন, ‘নতুন অধ্যায়ের শুরু। “ফড়িং ফিল্মস” আমার প্রোডাকশন হাউস। সবাই আমার জন‍্য দোয়া করবেন।’ প্রযোজক হিসেবে ফারিণকে শুভকামনা জানিয়েছেন সহকর্মীরা।    

এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরুতে কী নির্মাণ করতে যাচ্ছেন, ফোনে জানতে চাইলে আপাতত কিছুই বলতে চাইলেন না অভিনেত্রী। তবে ফড়িং ফিল্মসের ফেসবুক পেজে লেখা হয়েছে, ‘তাসনিয়া ফারিণের নতুন যাত্রা। সীমানা ছাড়িয়ে উড়ার গল্প। এই মাসে প্রথম প্রযোজিত কাজ প্রকাশ পাবে।’ একটি সূত্র জানায়, একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমার প্রযোজক হয়েছেন ফারিণ। ছোট থেকেই শুরু করতে চান।

এদিকে বেশ কিছুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল, ‘প্রিন্স’ সিনেমায় শাকিব খানের সঙ্গে কাজ করতে যাচ্ছেন ফারিণ। চুক্তিবদ্ধও হয়েছেন তাঁরা। তবে এই নিয়ে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কখনোই নিশ্চিত কিছু জানায়নি। অবশেষে গতকাল প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ঘোষণা দিয়েছে, ‘প্রিন্স’ সিনেমার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন ফারিণ। চুক্তিবদ্ধ হচ্ছেন এমন হাসিমুখের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে ফারিণ লিখেছেন, ‘আমার নতুন যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে। হৃদয় ভরা ভালোবাসা। তৈরি হচ্ছি “প্রিন্স”–এর জন্য।’

আগামী ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে সিনেমার শুটিং শুরু হবে। শুরু থেকেই সিনেমার শুটিংয়ে অংশ নেবেন ফারিণ। সিনেমার পরিচালক আবু হায়াত বলেন, ‘সিনেমার একদম শুরু থেকেই শাকিব খান ও ফারিণের অংশ দিয়ে দৃশ্য ধারণ হবে। আমরা সিনেমার প্রিপ্রোডাকশনের কাজ প্রায় সব শেষ করেছি। আগামী সপ্তাহ থেকে আমরা টানা শুটিংয়ের আগপর্যন্ত রিহার্সাল করে যাব।’ ‘প্রিন্স’ আগামী ঈদুল ফিতরে মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-10-27%2F9v3s6svi%2Ftasniafarin17549979003697513134904117388414278851.jpg?rect=119%2C0%2C1215%2C810&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
তাসনিয়া ফারিণ। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে