Monday, July 1, 2013

জটিল সমীকরণে রাজনীতি ও নির্বাচন by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

দেশের রাজনীতি এক জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। চলমান সমীকরণে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আশা সুদূরপরাহত। যে কোনো নির্বাচনে পরাজয় নিশ্চিত জানতে পারলে সেটা রাজনীতির জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। বর্তমানে একটি রাজনৈতিক দল সামনের নির্বাচনে তাদের পরাজয় নিশ্চিত জেনে গেছে। তাই আগামী নির্বাচন প্রশ্নে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল দুই মেরুতে অবস্থান করছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার আশা অবান্তর। আগামী নির্বাচন যথাসময়ে হবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দিন দিন বাড়ছে। একাধিক রাজনৈতিক নেতা দেশে নির্বাচন না হওয়ার আশংকা করছেন। এরশাদ সাহেব বলেছেন, দেশে নির্বাচন নাও হতে পারে, কাজী জাফর আহমদ ও কর্নেল (অব.) অলি আহমদ দেশে নির্বাচন না হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তারা অভিজ্ঞ রাজনীতিক, তাদের কথার অবশ্যই তাৎপর্য আছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্বাচন না হওয়ারই ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী কয়েক দিন আগে সংসদে বলেছেন, তত্ত্ব্াবধায়ক চাইলে দেশে নির্বাচনই হবে না। তার এ কথায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এটি পরোক্ষভাবে নির্বাচন না হওয়ারই আলামত হিসেবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে প্রতীয়মান হয়। নির্বাচন না হলেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে স্বপদে বহাল থাকার এখতিয়ার পঞ্চদশ সংশোধনীতে সুনিশ্চিত করা হয়েছে। এ সংশোধনী একটি দুরভিসন্ধিকে সামনে রেখেই করা হয়েছে। যাতে দেশে নির্বাচন না হলেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অনন্তকাল পদে বহাল থাকতে পারেন। এমন সুবিধা সংবিধান যেখানে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়েছে, সেখানে পরাজয় সুনিশ্চিত জেনে কেন তিনি নির্বাচনের ঝুঁকি নিতে যাবেন।
প্রধানমন্ত্রী যখন মনে করবেন, তার দল নির্বাচনে জেতার মতো পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন তিনি নির্বাচনের কথা চিন্তা করতে পারেন। ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাইলে দেশে নির্বাচন হবে না’- এ কথার তাৎপর্য এখানেই। এখন প্রশ্ন হল, প্রধানমন্ত্রী কি দেশে নির্বাচন না দিয়ে পারবেন? তখন রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কি তার হাতে থাকবে? সব দল নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিলে তিনি একা কী করবেন?
দেশের রাজনীতিতে একটা মেরুকরণ অবধারিত বলেই প্রতীয়মান হয়। ১৮ দলের সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন আবির্ভূত হওয়া শক্তি হেফাজতে ইসলাম ও বি. চৌধুরীর বিকল্প ধারা। পাইপলাইনে আছে এরশাদ সাহেবের জাতীয় পার্টি, আসম রবের জেএসডি ও কাদের সিদ্দিকীর দলসহ আরও কিছু দল। এই দলগুলো যদি এক প্লাটফর্মে সমবেত হয়, তাহলে বাকি থাকল সাম্যবাদী দল, ইনু সাহেবের জাসদ ও মেনন সাহেবের ওয়ার্কার্স পার্টিকে নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দল। এ ১৪ দলের মধ্যে ওয়ান ম্যান শো পার্টিও আছে এবং আওয়ামী লীগের বাইরে অন্যদের নিজস্ব কোনো ভোট ব্যাংক নেই। পক্ষান্তরে বিএনপির যেমন নিজস্ব ভোট ব্যাংক আছে, তেমনি হেফাজত, জামায়াত ও জাতীয় পার্টিরও নিজস্ব ভোট ব্যাংক আছে। এরা সম্মিলিতভাবে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটের অধিকারী। বলা বাহুল্য, সম্প্রতি দেশের চার প্রান্তে অনুষ্ঠিত হওয়া চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে গড় ভোটের অংকে আওয়ামী লীগ শতকরা ২৮ ভাগ ভোট পেয়েছে। সেই হিসাবে আগামী নির্বাচনে ৭০ শতাংশ ভোট যদি এক পক্ষে যায়, তাহলে নির্বাচনের ফলাফলটা কী দাঁড়াবে তা সহজেই অনুমেয়। অন্তত ভোটের রাজনীতিতে এটিকে ব্যালেন্স করা অসাধ্য। এ সত্য অনিবার্য মনে করে সামনের নির্বাচনকে জটিল করে তোলা কোনোভাবেই সমীচীন হবে না।
মনে রাখতে হবে, নদীর স্রোত ও বাতাসের গতিবেগ যেমন আটকে রাখা যায় না, তেমনি মানুষের আবেগও আটকে রাখা যায় না। নির্বাচনের জন্য মানুষ উদগ্রীব হয়ে আছে। চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ততা তার সুস্পষ্ট উদাহরণ। নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো পথে পা বাড়ালে জনগণ দাঁতভাঙা জবাব দেয়ার জন্য প্রস্তুত বলেই প্রতীয়মান হয়। কাজেই একটি পক্ষপাতহীন ও গ্রহণযেগ্য নির্বাচনই চলমান সংকট সমাধানের একমাত্র পথ। এর মাধ্যমেই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হাতবদল হতে পারে। দেশ ও মানুষের ভালো চাইলে এ পথকেই অনিবার্য মনে করতে হবে রাজনীতিকদের।
বাংলাদেশকে ঘিরে পরাশক্তি ও আঞ্চলিক শক্তির বিশেষ তৎপরতা লক্ষণীয়। ক্ষমতার হাতবদলকে পুঁজি করে তারা তাদের স্বার্থ হাসিল করতে মরিয়া। এ সময়কে তারা মোক্ষম সময় মনে করে ক্ষমতার হাতবদলকে জটিল করার কাজে রত আছে বলেই প্রতীয়মান হয়। তারা চায় বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে কর্তৃত্ব কায়েম করতে। তারা চায় বাংলাদেশের তেল-গ্যাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে। আর এসব করতে হলে রাজনীতিকে অশান্ত করে তুলতে হবে। ক্ষমতার হাতদবলই রাজনীতিকে অশান্ত করার মোক্ষম সময়। অশান্ত রাজনীতিই সবকিছু তছনছ করতে পারে, তৈরি করতে পারে সুযোগের ক্ষেত্র; আর এই সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করতে প্রস্তুত পরাশক্তি ও আঞ্চলিক শক্তি।
এখন প্রশ্ন হল, বাংলাদেশের রাজনীতিকরা কি তাদের এ সুযোগ তৈরি করে দেবেন? যদি না দিতে চান তাহলে জাতীয় স্বার্থে অন্তত রাজনীতিকদের এক হতে হবে, ক্ষমতার হাতবদলকে শান্তিপূর্ণ করতে হবে; প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করতে হবে, পরমতসহিষ্ণুতা ও শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে হবে। গণতন্ত্রকে নিরবচ্ছিন্ন রাখতে এর কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অব্যাহত রাখার বিষয়টি এখন সর্বতোভাবে বর্তমান সরকারের ওপরই নির্ভর করছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে পক্ষপাতহীন নির্বাচনের ব্যবস্থা করলে জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি দেশও এক অনিবার্য বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে দেশে গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা বিপন্ন হওয়ার আশংকা দেখা দেবে; বৃদ্ধি পাবে সংঘাত-সহিংসতা।
রাজনৈতিক সহিংসতায় গত কয়েক মাসে প্রচুর সম্পদ ধ্বংস হয়েছে, প্রচুর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। একই জাতি ও ধর্মের মানুষের মধ্যে এই আÍঘাতী ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করলে বোঝা যায়, ক্ষমতার পালাবদলকে কেন্দ্র করে সুকৌশলে জাতিকে ভয়ানক বিভক্তির দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে; যাতে এই জাতি বিপন্ন জাতিতে পরিণত হয়। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, রাষ্ট্রের ভিত্তিও জনগণ; জনগণকে বিপন্ন করে রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। কাজেই রাজনৈতিক সহিংসতায় আর যাতে কোনো প্রাণ ঝরে না যায়, আর যাতে কোনো মায়ের বুক খালি না হয়। সাংঘর্ষিক ও প্রতিশোধমূলক রাজনীতি পরিহারের জন্য স্থিতিশীল আবহ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এর জন্য সবাইকেই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। দুরভিসন্ধি ত্যাগ করতে হবে। বর্তমানে দেশের রাজনীতিতে যা কিছু ঘটে চলেছে, তাকে এক পরিকল্পিত দুরভিসন্ধি ছাড়া অন্য কিছু বলার উপায় নেই।
দেশকে অপূরণীয় ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে গঠনমূলক, সহনশীল ও পরিপক্ব রাজনীতির কোনো বিকল্প নেই। আপনি কত বড় রাজনীতিক সেটি বড় কথা নয়, আপনার কর্মকাণ্ড দেশের জন্য কতটা ইতিবাচক ও মঙ্গলজনক- জাতির কাছে সেটিই বড় বলে বিবেচিত। জাতির কাছে একটি সত্য দিবালোকের মতো উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে- বর্তমান সরকার ইচ্ছা করলে দেশকে যে কোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারে। আমরা প্রত্যাশা করব, সরকার তা-ই করবে, অন্ধকার দূর করে দেশকে আলোর পথে নিয়ে আসবে। তাহলে জাতি হয়তো তাদের নতুন চোখে দেখবে, নির্বাচনে তারা ভালো ফলাফল করতে পারবে।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সরকার সতর্কবার্তাটি বুঝতে পেরেছে কি? by সুলতান মাহমুদ রানা

গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম ইতিবাচক শর্ত নির্বাচনে জনগণের অবাধ অংশগ্রহণ। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে নির্বাচনে কে হারল আর কে জিতল তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনগণের অবাধ অংশগ্রহণ। গত ১৫ জুন অনুষ্ঠিত হল চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। এ নির্বাচনে সরকারদলীয় জোটের ভরাডুবি হয়েছে। নির্বাচনে জনগণের অবাধ অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছতার বিষয়ে কোনো প্রশ্নই ওঠেনি। সরকার-সমর্থিত প্রার্থীদের হারিয়ে বিরোধী জোটের প্রার্থীরা বিজয়ের মুকুট ঘরে তুলেছে। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করাকে বড় জয় হিসেবে দেখার চেষ্টা করে সান্ত্বনার পথ খুঁজছে সরকার। উল্লেখ্য, স্থানীয় নির্বাচন হলেও জাতীয় নির্বাচনের কাছাকাছি দূরত্ব হওয়াতে নির্বাচনী ফলাফলে ভিন্ন মাত্রা রয়েছে। ২০০৮ সালে চার সিটির নির্বাচনে মহাজোট-সমর্থিতদের বিজয়ের কয়েক মাস পরেই নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের বিজয় হয়।
চার সিটির নির্বাচন যেহেতু সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে, সেহেতু সরকার এখন এটা বলার সুযোগ পাচ্ছে যে, আগামী সাধারণ নির্বাচনও দলীয় সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু হবে। অর্থাৎ বিরোধী দলের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে অযৌক্তিক প্রমাণ করার চেষ্টা করছে সরকার। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চার সিটি নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, তারা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে আসবে না। এটা ঠিক যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন এক বিষয় নয়। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনী ফলাফল দিয়ে সরকার পরিবর্তন হয় না। গুরুত্বের বিবেচনায় জাতীয় সংসদের সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচনের পার্থক্য রাত-দিন।
যে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান লক্ষ্য হল নির্বাচনের মাধ্যমে বা বৈধ উপায়ে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া। নির্বাচনে জয়লাভ করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য একটি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল সর্বাÍক শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা করে। আমাদের দেশেও এর ব্যতিক্রম হয় না। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ফলাফলে আওয়ামী লীগের কাছে পরিষ্কার হল, সরকারের জনপ্রিয়তার মাত্রা নেমে এসেছে অনেক নিচে; সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করার পরিস্থিতি কঠিন বটে। এক্ষেত্রে বিএনপিকেও বুঝতে হবে যে, তাদের এই জয়জয়কার নিজেদের জনপ্রিয়তার কারণে নয় বরং এর পেছনে রয়েছে সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস। এক্ষেত্রে সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাসের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ দলীয় কোন্দলও সরকার-সমর্থিত প্রার্থীদের পরাজয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে দাবি করা যায়।
তবে এ ফলাফলকে সরকার ও বিরোধী দলের জন্য পরীক্ষামূলকও বলা যায়, কারণ সরকারের জনপ্রিয়তার মান বাড়াতে না পারলে জাতীয় নির্বাচনে ফলাফল এভাবেই মঞ্চস্থ হতে পারে। আবার বিরোধী দলেরও সাবধান থাকতে হবে ভোট বাক্সকে ভবিষ্যতে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর জন্য। কাজেই কোনো পক্ষ ভুল করলে আসন্ন সংসদ নির্বাচনের ফলাফলেও পরিবর্তন হতেই পারে।
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতির খেলায় ১৯৯১ সালের পর দেশের কোনো ক্ষমতাসীন দলই পরবর্তী নির্বাচনে সরকার গঠন করতে পারেনি। ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একদলীয় নির্বাচনী নাটক মঞ্চস্থ করার পর টানা দ্বিতীয় মেয়াদে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণ করলেও বৈধতার সংকটে স্থায়িত্ব লাভ করতে পারেনি। আবার ২০০৬ সালে ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় মেয়াদে আসার জন্য বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বৃদ্ধি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অনুগত ব্যক্তিকে বসাতে চেয়েছিল বিএনপি। তার পরিণতি কী হয়েছে তা আমরা সবাই দেখেছি। এবার আওয়ামী লীগও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানকে বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনী প্রস্তুতির পথে পা বাড়াচ্ছে। ইতিমধ্যেই আদালতের দোহাই দিয়ে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। নির্দলীয় সরকার ছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবমুক্ত থাকবে- এ কথা খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
চার সিটির তিনটিতেই ব্যাপক উন্নয়ন কাজ করেছিলেন বিদায়ী মেয়ররা। নির্বাচনের আগে ধারণা করা হয়েছিল, উন্নয়ন কাজ দেখে যদি জনগণ ভোট দেন তাহলে রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালে সরকার-সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, চারটি সিটিতেই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, স্থানীয় উন্নয়ন করে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া যায় না, এ জন্য দরকার জাতীয় উন্নয়ন এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে জনবান্ধব ইস্যু।
ভরাডুবির কারণ কী তা ইতিমধ্যেই নানাভাবে পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনে টকশোর মাধ্যমে বিভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপিত হয়েছে। তবে স্থানীয় জনগণ সবাই একবাক্যে বলেছেন, এ রকম নিরপেক্ষ নির্বাচন আগে কখনও তারা দেখেননি। এ ধরনের প্রতিবন্ধকতাহীন নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। স্থানীয় জনগণের এমন মতামত অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। দলীয় সরকারের অধীনে এত ভালো নির্বাচন আগে কখনও দেখা গেছে কিনা আমি জানি না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, দেশের সিভিল সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্র্রদায় নিরপেক্ষভাবে সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সাধুবাদ জানিয়েছে সরকারকে। নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। তারা এখন জোর দিয়ে বলতে পারে, তাদের পক্ষে নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব। ঢাকা সফররত কমনওয়েলথ মহাসচিব কমলেশ শর্মা একটি পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছেন, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ছে। সেই সঙ্গে পরাজিত হয়েও সরকার তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে। পরাজিতরা নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে বিজয়ীদের মিষ্টিমুখ করাচ্ছেন। অভিনন্দন জানাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বিএনপি সমর্থিত নবনির্বাচিত মেয়রদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। এ ধরনের অভিনন্দন বার্তাকে নিঃসন্দেহে গণতন্ত্রের ইতিবাচক সংস্কৃতি হিসেবেই বিবেচনা করা যায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কখনোই পরাজিত প্রার্থীকে অভিনন্দন জানানো কিংবা নির্বাচনকে নির্দ্বিধায় মেনে নেয়ার সংস্কৃতি ছিল না। সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিশেষত ৯১-পরবর্তী জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের কোনো নির্বাচনেই পরাজিত প্রার্থী ফলাফল মেনে নেয়নি। কাজেই রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের লক্ষণ গণতন্ত্র বিকাশের মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে বলেই আমরা আশা করছি।
লেখক : সুলতান মাহমুদ রানা : শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

চার সিটি নির্বাচনে ইসির দুর্বল ভূমিকা by মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের জরুরি শাসনামলে গঠিত ড. হুদা নির্বাচন কমিশন ২০১২ সালের ফেরুয়ারি মাসে পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ করার পর মহাজোট সরকার কর্তৃক কাজী রকিব কমিশন গঠিত হয়। এ কমিশন গঠনকালে সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আইন তৈরির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কমিশনকে অধিকতর স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে সরকার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। এর পরিবর্তে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে কমিশন গঠন করেছে। ওই অনুসন্ধান কমিটিতে সুশীল সমাজের সদস্য বা কোনো গণনির্বাচিত প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত না করে সরকারের বেতনভূক কিছু কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কাজেই অনুসন্ধান কমিটি বা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে রাজনৈতিক দলের লোক দেখানো আলোচনার একটি প্রয়াস দেখানো হলেও বাস্তবে নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়োগে সরকারের ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটে। কারণ চলমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ উপেক্ষা করে কাজ করা সম্ভব হয় না।
চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের সোয়া বছর আগে ক্ষমতাসীন হয়ে কাজী রকিব কমিশন স্বাধীনভাবে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করতে পারেনি। প্রথমত, এ কমিশন পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট হওয়ায় কাজ শুরু করার পর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত নিতে কমিশন সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্যের সমস্যা হয়। কোনো রাজনৈতিক দল বা ভোটারদের দাবি না থাকা সত্ত্বেও সাবেক হুদা কমিশন ইভিএমে নির্বাচন করার যে পরিকল্পনা করে, সে বিষয়টির কথাই ধরা যাক। রকিব কমিশনের সামনে প্রথমেই সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে কিনা সে সিদ্ধান্তটি জরুরি হয়ে দেখা দেয়। ড. হুদা কমিশন চেয়েছিল, নতুন কমিশন তাদের কাজের ধারাবাহিকতা এগিয়ে নেবে। কিন্তু যেহেতু হুদা কমিশন সুনামের সঙ্গে কাজ করতে পারেনি (ওই কমিশনের বিরুদ্ধে বিএনপির সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করে ওই দলটিকে ভাঙা এবং পরে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া, বিতর্কিত ইভিএম মেশিনে ভোট গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং তিন মাসের সময়সীমা ভেঙে দুই বছর ক্ষমতায় থাকা ফখরুদ্দীন সরকারের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ ছিল), সে কারণেই হয়তো রকিব কমিশন হুদা কমিশনের সবকিছু মেনে নেয়নি। এর পরিবর্তে নতুন কমিশন হুদা কমিশনের কিছু কাজে দুর্নীতির উপস্থিতি পেয়ে ওই প্রকল্পগুলো বাতিল করে জনগণের আস্থা অর্জন করার চেষ্টা করে।
ড. হুদা কমিশন আন্তরিকভাবে চেয়েছিল যাতে রকিব কমিশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। কিন্তু ইসির পাঁচ সদস্যের মধ্যে ঐকমত্য না থাকায় কমিশন এ ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। বিষয়টি খুবই জরুরি ছিল। কারণ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করতে হলে তার জন্য দীর্ঘ পূর্বপ্রস্তুতি ও ব্যাপক অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পর এ ব্যাপারে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সিইসি ৫ মার্চ সাংবাদিকদের বলেন, সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত বর্তমান কমিশন গ্রহণ না করলেও সব রকম প্রস্তুতি রাখা হবে, যাতে নির্বাচনের আগে এ নিয়ে কোনো ঝামেলা না হয়। সিইসির ওই বক্তব্য থেকে অনুধাবন করা যায়, নির্বাচন কমিশন ইভিএম ব্যবহার প্রসঙ্গে তখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেনি। ইভিএমে নির্বাচনের সঙ্গে যেখানে ব্যাপক আর্থিক খরচ জড়িত, সেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগেই ইভিএম ব্যবহারের প্রস্তুতি গ্রহণ করে পরে ইভিএমে নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে যে বিশাল আর্থিক ক্ষতি হবে, তার দায়িত্ব কে নেবে- সে সম্পর্কে ওই সময় সিইসি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
পরবর্তীকালে ক্ষমতায় আসার চার মাস পর ২০১২ সালের ২২ জুন নির্বাচন কমিশন ইভিএম প্রসঙ্গে আরও বৈঠক ও আলাপ-আলোচনা করে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এ রকম একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়ার পরও রকিব কমিশন ড. হুদা কমিশনের প্রভাববলয় থেকে বের হতে পারেনি। কারণ তা না হলে জুন মাসের সিদ্ধান্ত ভুলে গিয়ে ১৬ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জাবেদ আলী দশম সংসদ নির্বাচনে আংশিকভাবে ইভিএম ব্যবহার হতে পারে বলে আবারও জানাতেন না। তিনি বলেন, ‘বিগত কমিশন ইভিএম নিয়ে যে সূচনা করেছিল, তাদের লক্ষ্য ও আমাদের লক্ষ্য এক। জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের কথা বিগত কমিশনও বলেনি। বিধিবিধানও করেনি। বলা হয়েছিল, স্থানীয় সব পর্যায়ে ইভিএম চালু করার পর মানুষ অভ্যস্ত হলে সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হবে।’ রকিব কমিশন জানত যে, নাসিক নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারকারী কেন্দ্রগুলোর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সদরের ২১টি, সিদ্ধিরগঞ্জের ১১টি এবং বন্দরের ৬টি ভোটকেন্দ্রে বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট নষ্ট হয়েছিল। কমিশন এও জানত, বাংলাদেশী ইভিএমগুলো এর প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বুয়েট ছাড়া অন্য কোনো সমজাতীয় দেশী বা বিদেশী গবেষণা প্রতিষ্ঠান দিয়ে পরীক্ষা করানো হয়নি। দেশেও বিরোধী দল থেকে যারা এ ইভিএম হ্যাকপ্র“ফ নয় দাবি করে এ ইভিএম কিভাবে হ্যাক করা সম্ভব তা প্রমাণের সুযোগ চেয়েছিলেন, তাদের সে সুযোগ দেয়া হয়নি। এমন অনিশ্চয়তা ও জটিলতার মধ্যেও কাজী রকিব কমিশন সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে অনুষ্ঠিত যুগোপৎ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্য অ্যাসিড টেস্ট হিসেবে বিবেচিত চারটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কেন আবার আংশিক ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিল, তা বোধগম্য নয়।
চার সিটি নির্বাচনে আংশিক ইভিএম ব্যবহার করতে গিয়ে কমিশনকে বিভিন্নমুখী জটিলতায় পড়তে হয়। বরিশালে পলিটেকনিক কলেজ কেন্দ্রে নির্বাচনী কর্মকর্তারা ইভিএম কার্ড খুলে ফেলায় ভোটারদের মধ্যে ভোট নষ্ট হওয়ার আশংকা তৈরি হয়। রাজশাহীর টিটি কলেজ কেন্দ্রের ছয়টি বুথের একটি বুথে গৃহীত ৩১০টি ভোট গণনা করতে না পেরে ওই বুথের ভোট বাদ দিয়েই প্রিসাইডিং অফিসারকে কেন্দ্রের নির্বাচনী ফলাফল হিসাব করে দু’সপ্তাহ পর ২৯ জুন ওই কেন্দ্রে সাধারণ কাউন্সিলর পদের জন্য ইভিএমের পরিবর্তে ব্যালট পদ্ধতিতে পুনরায় ভোট গ্রহণ করতে হয়। এ রকম যে হবে, তা অনেক আগেই অনুমিত হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জের ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে কমিশনের উচিত ছিল চার সিটি নির্বাচনে ইভিএমে ভোট গ্রহণ থেকে বিরত থাকা। কিন্তু কমিশন তা থাকেনি। চার সিটি নির্বাচনে কিছু কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করে ধাক্কা খাওয়ার পর আগামী জুলাইয়ে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কমিশন ইভিএম ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার শাহ নেওয়াজ বলেছেন, ‘সম্প্রতি রাজশাহী সিটি নির্বাচনে একটি কেন্দ্রে ইভিএম নিয়ে ঝামেলা দেখা দেয়ার কারণে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে না। রাজশাহীতে ইভিএমে কেন সমস্যা দেখা দিয়েছেÑ এ কারণ খুঁজে বের করার পর অন্য কোনো নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করার কথা চিন্তা করব।’ ইভিএম ব্যবহার নিয়ে কাজী রকিব কমিশনের কর্মকাণ্ডের সতর্ক পরীক্ষা একটি সুপরিচিত গ্রামীণ প্রবাদকে মনে করিয়ে দেয় : গাধা পানি খায়, তবে ঘোলা করে খায়।
এবার চার সিটি নির্বাচনের আচরণবিধি প্রসঙ্গে আসা যাক। আলোচ্য চার সিটি নির্বাচনে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের তীব্র প্রতিযোগিতা চলে। প্রার্থীদের নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার ব্যাপারে ইসি জোরালো ভূমিকা পালন করতে পারেনি। বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকায় সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীর নামে অসংখ্য রঙিন বিলবোর্ড, ব্যানার দেখা গেলেও এবং সে প্রসঙ্গে ইসিতে অভিযোগ আনা হলেও কমিশন এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। রাসিক নির্বাচনে সিডিউল ঘোষণা করার পর পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীকে নির্বাচনী প্রচারণায় এগিয়ে রাখার হীন উদ্দেশ্যে নতুন গ্যাস সংযোগ দিয়ে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করলেও সেক্ষেত্রে কমিশন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। খুুলনায় শ্রম প্রতিমন্ত্রী নির্বাচনী এলাকায় আচরণবিধি ভঙ্গের মতো কাজ করলেও কমিশন তাকে কিছুই বলেনি। সিলেটে নির্বাচনী প্রচারণায় পৌরসভার মেয়র এবং উপজেলা চেয়ারম্যানরা সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর পরও কমিশন ওইসব গাড়ি আটক করতে পারেনি। তবে কমিশন ১৪ জন উপজেলা চেয়ারম্যানকে নির্বাচনী প্রচারণায় সরকারি গাড়ি ব্যবহার করার কারণে শোকজ করে। এ ছাড়া কালো টাকার ব্যবহার এবং ভোট ক্রয় রোধেও ইসি ইতিবাচক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। এর দৌড় কেবল শোকজ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে কেন? কমিশন যদি আচরণবিধি ভঙ্গের কারণে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানকে নির্বাচনের সময়ের জন্য সাসপেন্ড করাতে পারত, যদি নির্বাচনে ব্যবহারের জন্য উপজেলা চেয়ারম্যানদের গাড়ি থানায় নিয়ে আটকে রাখতে পারত, তাহলে প্রার্থীরা নির্বাচনী আচরণবিধি পালনে যতœবান হতেন। কমিশন তা না করে এ ব্যাপারে ঢিলেঢালাভাবে শোকজ করেই দায়িত্ব শেষ করেছে।
চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বড় আকারে সন্ত্রাস না হলেও কিছু বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস হয়েছে। বরিশালে দুই বড় দল সমর্থিত প্রার্থীর মধ্যে সংঘর্ষে এক প্রার্থী লাঞ্ছিত হয়েছেন। বিরোধী দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর দেহরক্ষী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়া ভয়-ভীতি প্রদর্শন, ছোটখাটো হুমকি-ধমকি ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার বিষয় ছিল। প্রার্থীদের পক্ষ থেকে দাবি থাকা সত্ত্বেও ইসি সংশ্লিষ্ট সিটিগুলোতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনার ব্যবস্থা করেনি। নির্বাচনে শান্তি-শৃংখলা রক্ষায় সেনা মোতায়েনের দাবি থাকা সত্ত্বেও কমিশন সে দাবি না মানায় এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। সেনা মোতায়েন করা হলে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনা কম ঘটত এবং বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসের ঘটনা অনেকটাই হ্রাস পেত। বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী জাতিসংঘের অধীনে বিদেশে নির্বাচনে শান্তি-শৃংখলা রক্ষায় ভূমিকা পালন করে কৃতিত্ব অর্জন করলেও দেশের নির্বাচনে শান্তি-শৃংখলা রক্ষায় তাদের ব্যবহারে নির্বাচন কমিশন কেন কার্পণ্য দেখায়, তা বোধগম্য নয়।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে অনুষ্ঠিত চারটি বড় শহরের সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন সমগ্র জাতি গুরুত্বের সঙ্গে নিলেও এবং যুগপৎ সরকারি ও বিরোধী দল এ নির্বাচনকে তাদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের পরিমাপক হিসেবে গ্রহণ করলেও ইসি এ নির্বাচনটিকে তেমন গুরুত্ব দিয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়নি। ১৫ জুন নির্বাচনের দিন সমগ্র জাতি যখন কেমন নির্বাচন হয়, মারামারি-কাটাকাটি বা ভোট ডাকাতি হয় কিনা এসব জানতে উদগ্রীব, টিভির পর্দায় চোখ রাখতে ব্যস্ত, তখন নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে ছিল নির্বিকার। সিইসি ওইদিন অফিসে গেছেন বেলা ১টার পর। চারটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনী কর্মকাণ্ড মনিটর করার জন্য চারজন কমিশনারকে দায়িত্ব দেয়া হলেও নির্বাচনের দিন সকালে এ চারজনের মাত্র একজনকে কমিশন অফিসে উপস্থিত দেখা যায়। নির্বাচনী এলাকা থেকে সিইসি ও অন্য কমিশনারদের নির্বাচনী এলাকা পরিদর্শনের অনুরোধ করা সত্ত্বেও তারা নির্বাচনী এলাকায় না গিয়ে রাজধানীতে অবস্থানে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
আলোচ্য নির্বাচনগুলো ছিল স্থানীয় সরকার নির্বাচন, যা সংবিধান অনুযায়ী নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু নির্বাচনগুলোতে চরম দলীয় প্রবণতা বৃদ্ধি পেলেও নির্বাচন কমিশন নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করে। বস্তুত নির্বাচনগুলোকে নির্দলীয় রাখার ব্যাপারে ইসি কোনো ভূমিকাই গ্রহণ করেনি। নির্বাচন কমিশন প্রার্থীদের এ নির্বাচনের নির্দলীয় চরিত্রের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উভয় দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রচারণায় আসতে নিরুৎসাহিত করতে পারত। কিন্তু কমিশন তা করেনি। বড় বড় জাতীয় ইস্যু উত্থাপন এবং দলীয় কেন্দ্রীয় নেতাদের অংশগ্রহণে একটি নির্দলীয় নির্বাচন পূর্ণ দলীয় রূপ নেয়া সত্ত্বেও কমিশনের নীরবতা তার খামখেয়ালিপনা ও দুর্বলতাকেই তুলে ধরে। এসব বিবেচনায় আলোচ্য চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে রকিব কমিশনের ভূমিকাকে প্রশংসা করা যায় না। এ নির্বাচন পরিচালনার মধ্য দিয়ে কমিশন তার পেশাদারিত্ব এবং স্বাধীন ও শক্তিশালী ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

দুনৌকায় পা দিয়ে নদী পার হওয়া যায় না by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীন শেষ পর্যন্ত দু-তিন দিন আগে জামিনে মুক্ত হয়েছে। তার এই মুক্তির জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। আমিও পুড়িয়েছি। শুধু একজন ভালো লেখক হিসেবে নয়, আরেকটি কারণে সে আমার স্নেহভাজন। আসিফ আমাদের বিখ্যাত কথাশিল্পী প্রয়াত শামসুদ্দীন আবুল কালামের আপন ভাগ্নে। এই পরিবারটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। তার বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াত শিবিরের প্রচারণা, সে নাস্তিক। নাস্তিক হওয়া কোনো অপরাধ নয়। অপরাধ হলে নাস্তিকদের দ্বারা প্রচারিত দর্শন ও তত্ত্বে (যেমন- কমিউনিজম) কেউ বিশ্বাসী হতে পারত না। বিখ্যাত দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর এবং প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ সাইয়েদুর রহমান প্রকাশ্যে নাস্তিক ছিলেন, নাস্তিকতা প্রচার করেছেন। কিন্তু সে জন্য তারা অভিযুক্ত ও দণ্ডিত হননি। দণ্ড হয় ধর্মের বা ধর্মীয় মহামানবদের অবমাননা করা হলে। ব্রিটেনে খ্রিস্টান ধর্মের সমালোচনা, এমনকি বিরোধিতা করাও অপরাধ নয়। কিন্তু এই ধর্মের অবমাননা করা হলে এ যুগেও অসম্মানকারীকে শাস্তি দেয়ার জন্য ব্লাসফেমি আইন আছে। যদিও তার ব্যবহার এখন নেই বললেই চলে।
আসিফের সব লেখা নয়, কিছু লেখা আমি পড়েছি। তাতে ধর্মীয় বিধিবিধানের কঠোর সমালোচনা আমার চোখে পড়েছে। কিন্তু ধর্মবিশ্বাস ও মহানবীর (সা.) অবমাননামূলক মন্তব্য আমার চোখে পড়েনি। আসিফ আমাকে বলেছে, তার এবং শাহবাগ-সমর্থক আরও কোনো কোনো ব্লগারের নাম ব্যবহার করে জামায়াত-শিবিরের লোকরা ধর্ম ও মহানবীর (সা.) অবমাননাসূচক মন্তব্য প্রচার করেছে। শুধু তার নয়, শাহবাগ সমর্থক অন্য ব্লগারদের নামেও করেছে। উদ্দেশ্য ছিল শাহবাগ আন্দোলন এবং তার সমর্থক তরুণ ব্লগারদের ধর্মের অবমাননাকারী হিসেবে প্রচার করা এবং শাহবাগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করে তাকে ব্যর্থ করা।
আসিফের এই অভিযোগটি যে একেবারে অসত্য নয়, যারা সে সময় আমার দেশ কাগজটির এই ব্লগারদের সবার বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক এবং বানোয়াট প্রচারণা লক্ষ্য করেছেন তারা সবাই জানে। এই প্রচারণারই বলি হয়েছে আসিফের এক ব্লগার বন্ধু রাজীব। তাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তার আগেই আসিফকে কুপিয়ে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়। সে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে থাকার সময়েও তার ওপর আবারও হামলা চালানোর হুমকি দেয়া হয়। আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে অনুরোধ জানিয়েছিলাম আহত আসিফকে বাঁচাতে তার জন্য একটা পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করতে। তিনি আমার অনুরোধে কর্ণপাত করেননি। আসিফের ওপর হামলাকে কোনো গুরুত্বই দেননি। ফলে আসিফকে হত্যায় ব্যর্থ হয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই আরেক ব্লগার রাজীবকে হত্যা করে জামায়াত-শিবিরের ঘাতকরা। ঢালাওভাবে শাহবাগ মঞ্চের সমর্থক অধিকাংশ ব্লগারকে ধর্মের অবমাননাকারী হিসেবে গ্রেফতার করে হেফাজত ও জামায়াতিদের তুষ্ট করার চেষ্টা হয়েছে। সবচেয়ে শক্তিশালী গণজাগরণ মঞ্চটিকে বিতর্কিত, নিন্দিত এবং শেষ পর্যন্ত নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। তার সুদূরপ্রসারী ফল আমরা লক্ষ্য করছি সাম্প্রতিক সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন পর্যন্ত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমি অনুরোধ করেছিলাম আহত আসিফকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য। তার পুলিশ গুরুতর আহত আসিফকে দীর্ঘ সময়ের জন্য জেলে নিক্ষেপ করে এই অনুরোধ উল্টোভাবে রক্ষা করেছে। তার জামিনের আবেদনও বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল।
আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দোষ দিই না। কিন্তু তার উপদেষ্টাদের অনেকেই (মন্ত্রী এবং উপদেষ্টা) কোন জগতের বাসিন্দা তা আমি জানি না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে হেফাজতিদের অভ্যুদয় আকস্মিক মনে হতে পারে; কিন্তু তা যে পূর্বপরিকল্পিত তা বুঝতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা কেন ব্যর্থ হলেন, তা আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানের অগম্য। হেফাজতি সমস্যা সমাধানের জন্য তারা দু’মুখোনীতি অনুসরণ করেছেন।
একদিকে ৫ মে রাতে তারা হেফাজত সমাবেশ ভাঙার জন্য নূ্যূনতম শক্তি প্রয়োগ করেও হাজার হাজার মানুষ হত্যার বানোয়াট অপবাদ নিয়েছেন। অন্যদিকে পর্দার আড়ালে হেফাজতিদের তুষ্ট করার জন্য শাহবাগ মঞ্চ ভেঙেছেন; নির্দোষ ব্লগারদেরও গ্রেফতার করেছেন। শুনেছি (কতটা সঠিক জানি না) হেফাজতিদের দলে টানার জন্য বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দু’পক্ষ থেকেই লাখ নয়, কোটি কোটি টাকার লেনদেন করা হয়েছে। হেফাজতিরা নাকি দু’পক্ষ থেকে টাকা কামিয়েছে। ধর্ম নিয়ে এমন ব্যবসা বর্তমান দুনিয়ার আর কোথাও হয়েছে বলে আমার জানা নেই। তাতে দেশের গণতান্ত্রিক শক্তি লাভবান হয়েছে কি? হেফাজতিরা তুষ্ট হয়েছে কি? চারটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে হেফাজতিদের ভূমিকা এবং নির্বাচনের ফল কী বলে? হেফাজতিদের ঢাকা অবরোধের হুমকির পর যখন সরকারের এক মন্ত্রী হুমকি দিয়েছেন তাদের দমন করা হবে এবং অন্য মন্ত্রী হাটহাজারিতে ছুটেছেন হেফাজত নেতাকে এই বলে শান্ত করার জন্য যে, তাদের অধিকাংশ দাবিই সরকার মেনে নিয়েছে; তখন মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেনন এই মর্মে সরকারের জন্য সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন যে, ‘সরকারের জন্য আম এবং ছালা দুই-ই যাবে।’ চার চারটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে প্রমাণিত হয়েছে, মেনন সরকারের জন্য বড় কঠিন এবং সঠিক সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন। চার চারটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শোচনীয় পরাজয়ের পর এখন সামনে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। আমার আরেকটি লেখায় লিখেছি, এই নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য স্ট্যালিনগ্রাডের যুদ্ধ। এই যুদ্ধেই হয়তো নির্ধারিত হবে আগামী সাধারণ নির্বাচনে (যদি যথাসময়ে নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠিত হয়) আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে ক্ষমতায় থাকতে পারবে কিনা! যদি তারা না পারে, তাহলে রাশেদ খান মেননের প্রোফেসিই আরও সত্য হবে- অর্থাৎ আওয়ামী লীগের জন্য আম ও ছালা দুই-ই যাবে। যদি কোনোক্রমে তারা গাজীপুর নির্বাচনে বৈধভাবেও জয়ী হয়, তাহলেও বিএনপি তার স্বভাবসুলভ চিৎকার শুরু করবে, ‘আমাদের জয় ছিনতাই করা হয়েছে।’ এজন্য ফখর মির্জারা তো তৈরি হয়েই আছেন।
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের আর চার-পাঁচ দিন বাকি। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হবে কিনা তা নিয়ে আমার মনে অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। ঠিক এই সময় গাজীপুর সম্পর্কে এক আওয়ামী লীগ নেতাকে টেলিফোন করে জানতে চাইলাম, তাদের অবস্থা কী? তিনি আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন, অবস্থা ভালোর দিকে। আমরা হেফাজতিদের ভাগ করে ফেলতে পেরেছি। তাদের এক অংশ আমাদের প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছে। অন্য অংশ দিচ্ছে বিএনপি প্রার্থীকে। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীও প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। সুতরাং গাজীপুরে আমাদের জয় অনেকটাই নিশ্চিত।
তাকে বলেছি, আপনার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক। কিন্তু হেফাজতিদের সমর্থন লাভ সম্পর্কে যে কথা বলছেন, তাতে খুব আশ্বস্ত হতে পারছি না। ব্রিটিশ আমলের এক বিখ্যাত নির্বাচনের গল্প বলে এর কারণটা দর্শাতে চাচ্ছি। ত্রিশের দশকের কথা। অবিভক্ত বঙ্গের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মুসলিম লীগ নেতা খাজা নাজিমুদ্দীন এবং কৃষক প্রজা পার্টির নেতা একে ফজলুল হক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নির্বাচন হচ্ছিল পটুয়াখালী কেন্দ্রে। এই পটুয়াখালী ছিল নাজিমুদ্দীনের জমিদারের অন্তর্ভুক্ত। তিনি এলাকার জমিদার। তার ওপর দু’হাতে টাকা ছড়াচ্ছেন। ফজলুল হকের অত টাকা নেই। সুতরাং সবাই ধরে নিয়েছিল, নির্বাচনে নাজিমুদ্দীন জয়ী হবেন।
নির্বাচনের দিন মাঠের মধ্যে পাশাপাশি হক সাহেব ও নাজিমুদ্দীনের নির্বাচনী ক্যাম্প। নাজিমুদ্দীনের শিবিরের ভোটদাতাদের জন্য পোলাও-কোর্মা ইত্যাদি খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হক সাহেবের শিবিরের ভোটদাতাদের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে কেবল পান-তামাকের। হক সাহেব মাঝে মাঝেই ভোটদাতাদের উদ্দেশ করে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘ভাই সাহেবেরা, নাজিমুদ্দীন আপনাদের জমিদার। বড় লোক। তাই আপনাদের জন্য পোলাও-কোর্মার ব্যবস্থা করতে পেরেছেন। আমি গরিব এবং গরিবের বন্ধু। তাই আপনাদের জন্য শুধু পান-তামাকের ব্যবস্থা করতে পেরেছি। আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ, আপনারা নাজিমুদ্দীন সাহেবের ক্যাম্পে প্রথম যান। পোলাও-কোর্মা খান। তারপর ভোটকেন্দ্রে ঢুকে আমাকে ভোটটা দিয়ে আমার ক্যাম্পে এসে পান-তামাক সেবন করুন।’ হক সাহেবের আবেদনে পটুয়াখালীর ভোটদাতারা তা-ই করেছিল। হক সাহেবের কাছে নাজিমুদ্দীন বিপুল ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন।
গল্পটি বলে আওয়ামী লীগ নেতাকে বললাম, আজকাল মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদেরও আর বোকা মনে করবেন না। তারা অনেক চালাক-চতুর হয়ে গেছে। এমনও হতে পারে, তারা গাজীপুর নির্বাচনে দুই পক্ষ থেকেই নগদ কড়ি লুটবে; ভান করবে আওয়ামী প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছে; আসলে সমর্থনটা দেবে বিএনপি প্রার্থীকেই। গাজীপুরে জয়ী হতে হলে আওয়ামী লীগকে প্রকৃত জনসমর্থনের ওপরই নির্ভর করতে হবে। দু’মুখো নীতি দ্বারা বা দুই নৌকায় পা দিয়ে নদী পার হওয়া যাবে না।
আওয়ামী লীগ একটি বিরাট গণতান্ত্রিক পার্টি। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের রাজনীতির অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে। এই অভিজ্ঞতা থেকেই তাদের বোঝা উচিত রাজনীতিতে কৌশল অবশ্যই থাকবে। কিন্তু নীতিভ্রষ্টতাকে তারা যেন কৌশল বলে না ভাবেন। এক সময়ে জামায়াতের সঙ্গে সমান্তরাল আন্দোলন, ফতোয়া চুক্তি আওয়ামী লীগকে কোনো বেনিফিট দেয়নি; বরং তার রাজনৈতিক অবস্থানকে বিতর্কিত ও দুর্বল করেছে। হেফাজতি সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে তাদের ৫ মের শক্ত ভূমিকা (বিএনপি-জামায়াতের অপপ্রচার সত্ত্বেও) দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে। এ সম্পর্কে সরকারের পূর্বাপর ভূমিকা প্রশংসিত হয়নি; বিতর্কিত হয়েছে এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণের পর শেখ হাসিনা অত্যন্ত সাহসী ও কৌশলী ভূমিকার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আমলে দলটির যে ইডিওলজিক্যাল অবস্থান ছিল, সেই অবস্থান থেকে ক্রমেই দূরে সরে এসেছে। বিএনপি-জামায়াত জোটের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের যে ইডিওলজিক্যাল যুদ্ধ, সেই যুদ্ধ থেকে সরে এসে আওয়ামী লীগ তাকে কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ে পরিণত করে জয়ী হতে চেয়েছে। ফলে তার মিত্রের সংখ্যা কমেছে। শত্র“ সবল হয়েছে।
এখন লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আওয়ামী লীগের শত্র“ কেবল বিএনপি-জামায়াত এবং হেফাজত জোট নয়; দেশের তথাকথিত সুশীল সমাজ, একশ্রেণীর বড় এনজিও এবং মিডিয়া, ড. ইউনূস ও ড. কামালের ক্যাম্প, ট্রান্সপারেন্সি, সুজন ইত্যাদি উদ্দেশ্যপরায়ণ এলিটদের চ্যাটারিং ক্লাবগুলো বর্তমান আওয়ামী সরকারের চারদিকে ব্যূহ তৈরি করে বিরুদ্ধ অবস্থান নিয়েছে। তাতে গণতন্ত্র, সেকুলারিজম গোল্লায় যাক পরোয়া নেই। আওয়ামী লীগ প্রমাণ করতে পারছে না, মুক্তিযুদ্ধের মৌল আদর্শ গণতন্ত্র ও সেকুলারিজমের তারা এখনও শক্তিশালী প্রহরী। শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চ ভেঙে দেয়া আওয়ামী লীগের একটি বড় ভুল। হেফাজতিদের বিশ্বাস করা ও তোল্লা দেয়া আরেকটি বড় ভুল। গণতান্ত্রিক শিবিরের মহাজোট শক্তিশালী না করা এবং শরিক দলগুলোকে সমান সুযোগ-সুবিধা না দিয়ে নিষ্ক্রিয় করে রাখাও বড় ভুল। ভারত ও আমেরিকার সমর্থন আওয়ামী লীগের জন্য স্থায়ী রবে এই ধারণাটা সঠিক নয়। টিকফা চুক্তি স্বাক্ষরে সম্মত হওয়ার পরও প্রেসিডেন্ট ওবামা কর্তৃক বাংলাদেশকে জিএসপির সুবিধা দান স্থগিত করার ঘোষণা তার প্রমাণ।
দেশে যদি আওয়ামী লীগ সরকার জনসমর্থন হারায়, তাহলে বিদেশী মিত্রদেরও সমর্থন তার পেছনে থাকবে না। এখন বিশ্ব জগতের কোথাও নীতি-নৈতিকতার বালাই নেই, আছে সুবিধাবাদিতা। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভাগ্যে জয়-পরাজয় যা-ই ঘটুক, তাকে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের নীতিগত অবস্থানে ফিরে যেতে হবে। জনগণের সমর্থন নিয়ে কেবল ক্ষমতার যুদ্ধে নয়, ইথিওলজিক্যাল যুদ্ধেও নামতে হবে। আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে, তারা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে জানে। তাকে প্রমাণ করতে হবে, সে হারানো জনসমর্থন ফিরিয়ে এনে আরও বিরাটভাবে ক্ষমতায় ফিরে আসতেও জানে। গাজীপুর নির্বাচন তাকে সেই পথ দেখাক।

বারাক ওবামার প্রতি ম্যাশেলের কৃতজ্ঞতা

গ্রাসা ম্যাশেল
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, তাঁর স্ত্রী মিশেল ওবামা এবং দুই মেয়ে মালিয়া ও সাশা—সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন নেলসন ম্যান্ডেলার স্ত্রী গ্রাসা ম্যাশেল। গত শনিবার এক বিবৃতিতে গ্রাসা ম্যাশেল বলেন, ‘তাঁরা আমাকে ফোন করে ম্যান্ডেলার অসুস্থতার ব্যাপারে সান্ত্বনা দিয়েছেন। আমাদের সন্তানদের সঙ্গে দেখা করেছেন। এগুলোর মধ্য দিয়ে ওবামা পরিবারের আন্তরিকতা প্রকাশ পেয়েছে, যা তাঁদের পারিবারিক বৈশিষ্ট্য। আমি তাঁদের সান্ত্বনায় সম্মানিত বোধ করছি এবং শক্তি ও অনুপ্রেরণা পাচ্ছি। ওবামা পরিবারের এই সৌজন্যবোধের কথা ইতিমধ্যে মাদিবাকে জানিয়েছি।’ টাইমস।

এমকিউএম প্রধান আলতাফের পদত্যাগ নাটক

পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্টের (এমকিউএম) প্রধান আলতাফ হুসেইনের পদত্যাগ নিয়ে গতকাল রোববার নাটকের অবতারণা হয়। ভোরে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে কয়েক ঘণ্টা পরই এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন তিনি।
আলতাফ গত শনিবার রাতে যুক্তরাজ্য থেকে টেলিফোনে পাকিস্তানের গণমাধ্যমকে জানান, এমকিউএমের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ইমরান ফারুক হত্যার ঘটনা তদন্তে ব্রিটিশ পুলিশকয়েক দিন আগে তাঁর বাসায় তল্লাশি চালিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নৈতিক কারণে তিনি দলীয় প্রধানের পদ থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। খবর শুনে এমকিউএমের শত শত কর্মী করাচির আজিজাবাদ এলাকায় সমবেত হয়ে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে আলতাফকে অনুরোধকরেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সকাল ১০টার দিকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেন আলতাফ। ইমরান ফারুক ছিলেন এমকিউএমের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তখন দলের নাম ছিল মোহাজির কওমি মুভমেন্ট। ১৯৮৪ সালে দলের প্রধান হন আলতাফ। ডন।

ম্যান্ডেলার কারণে ইউরোপ সফর স্থগিত করলেন ক্লার্ক

ফ্রেডারিক ডি ক্লার্ক
নেলসন ম্যান্ডেলার শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় শনিবার ইউরোপ সফর স্থগিত করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী আমলের শেষ প্রেসিডেন্ট ফ্রেডারিক ডি ক্লার্ক।  ১৯৯৩ সালে ম্যান্ডেলার সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন ক্লার্ক। স্ত্রী এলিটাসহ তাঁর ইউরোপ সফরে যাওয়ার কথা ছিল। ক্লার্ক ফাউন্ডেশনের বিবৃতিতে বলা হয়, সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লার্ক ও তাঁর স্ত্রী এলিটার বিশেষ কাজে ইউরোপ সফরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নেলসন ম্যান্ডেলার শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তা স্থগিত করা হয়েছে। ফুসফুসে সংক্রমণের কারণে গত ৮ জুন থেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কিংবদন্তিপ্রতিম বর্ণবাদবিরোধী নেতা ম্যান্ডেলা। বিবিসি।

উত্তরাখন্ডের বন্যায় এখনো তিন হাজার নিখোঁজ

ভারতের ভয়াবহ বন্যাকবলিত রাজ্য উত্তরাখন্ডে এখনো প্রায় তিন হাজার পর্যটক ও তীর্থযাত্রী নিখোঁজ রয়েছে। তবে তাদের মধ্যে কতজনের প্রাণহানি হয়েছে, তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। গতকাল রোববার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এ কথা জানান। গত ১৫ জুন উত্তরাখন্ডে প্রবল মৌসুমি বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় আকস্মিক বন্যা হয়। এতে পাহাড়ি ওই অঞ্চলে ব্যাপক ভূমিধস হয়। বন্যায় এ পর্যন্ত হাজার খানেক মানুষের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করেছেন কর্মকর্তারা। বন্যাকবলিত এলাকা থেকে আটকে পড়া লক্ষাধিক মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। এরপর দুর্গম অঞ্চলে আটকে পড়া লোকজনকে উদ্ধারের জন্য কয়েক হাজার সেনা হেলিকপ্টার নিয়ে উদ্ধার তৎপরতা চালিয়েছেন। উত্তরাখন্ডের মুখ্যমন্ত্রী বিজয় বহুগুণা গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা যে তথ্য পেয়েছি, সে অনুযায়ী এখনো তিন হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছে।’ মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা দেন, নিখোঁজ হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে কোনো ব্যক্তির সন্ধান না পাওয়া গেলে তার পরিবারকে পাঁচ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রাণহানির সঠিক সংখ্যা হয়তো কখনোই জানা যাবে না। কারণ, অনেক মৃতদেহ পানিতে ভেসে গেছে কিংবা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে। গত শনিবার রাজ্যের একজন আইনপ্রণেতা মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন। তবে মুখ্যমন্ত্রী এ সংখ্যাকে ‘অনুমাননির্ভর’ বলে উড়িয়ে দেন। এএফপি।

ভারতের কাশ্মীরে সেনাদের হাতে দুজন নিহত, উত্তেজনা

ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের প্রত্যন্ত একটি গ্রামে গতকাল রোববার বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর সেনাদের গুলিতে এক কিশোর নিহত হয়েছে। গ্রামবাসী শনিবার রাতে সেনাদের গুলিতে একজনের মৃত্যুর প্রতিবাদ করছিলেন। কাশ্মীরের পুলিশপ্রধান আবদুল গণি মীর এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। আবদুল গণি বলেন, একদল ভারতীয় সেনা সন্দেহভাজন জঙ্গিদের পাকড়াও করতে শনিবার রাতে শ্রীনগরের ২৫ কিলোমিটার উত্তরে মারকোন্দাল গ্রামে অভিযান চালায়। এ সময় তাঁদের গুলিতে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর মারা যায়। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন গ্রামবাসী। পরে তাঁরা গতকাল ভোরে সংঘবদ্ধ হয়ে সেনাদের লক্ষ করে ইট-পাথর নিক্ষেপ করেন। জবাবে সেনারা গুলি চালান। এতে একজন নিহত ও তিনজন আহত হয়। কর্মকর্তারা জানান, পুলিশ দুটি ঘটনারই তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ উভয় ঘটনায় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
নিহত কিশোরের এক চাচা বলেন, গভীর রাতে বাড়ির বাইরে দুটি গাড়ি দেখতে পেয়ে তাঁরা ঘর থেকে বের হন। মনে করেছিলেন, কেউ তাঁদের গবাদিপশু চুরি করতে এসেছে। কিন্তু ঘর থেকে বের হতেই সেনাসদস্যরা তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে তাঁর ভাইপোর মাথায় গুলি লাগলে সে ঘটনাস্থলেই মারা যায়। সেনাবাহিনীও এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে তদন্ত শুরু করেছে। মেজর জেনারেল আর আর নিমবদকার সাংবাদিকদের বলেন, কোনো সেনাসদস্য দোষী প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এএফপি।

আফগান শান্তি আলোচনায় সহায়তার আশ্বাস নওয়াজের

তালেবানের সঙ্গে শান্তি চুক্তিতে পৌঁছার বিষয়ে ইসলামাবাদ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনকে আশ্বস্ত করলেন নওয়াজ শরিফ। ক্যামেরন গতকাল রোববার পাকিস্তান সফর করেন। নওয়াজ শরিফ সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর ক্যামেরনই প্রথম বিদেশি নেতা হিসেবে ইসলামাবাদ সফরে গেলেন। প্রতিবেশী দুই দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক সম্প্রতি তিক্ত হয়ে উঠেছে। কাবুল ও ইসলামাবাদ পরস্পরের প্রতি আস্থাহীনতায় ভুগছে। আফগানিস্তান সফর শেষে গতকাল দুই দিনের সফরে পাকিস্তানে যান ক্যামেরন। সম্প্রতি তালেবান জঙ্গিরা কাতারের রাজধানী দোহায় একটি কার্যালয় খুলেছে। এ নিয়ে আফগান সরকারের সঙ্গে তাদের বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের অভিযোগ, ওই কার্যালয় প্রবাসী কোনো সরকারের দূতাবাসের ধরনের। তাই তালেবানের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। যুক্তরাষ্ট্র দোহায় তালেবানের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় বসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ক্যামেরনের সঙ্গে বৈঠক শেষে নওয়াজ বলেন, ‘আমরা আশা করি, আফগানিস্তানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাজ্য চেষ্টা অব্যাহত রাখবে।’ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে বর্তমানে ৩০ লাখ আফগান শরণার্থী রয়েছে। আফগানিস্তানের চলমান সংকট মোচনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে চায় ইসলামাবাদ, যাতে ওই শরণার্থীরা সসম্মানে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে। আফগানিস্তানের শান্তি আলোচনায় ইসলামাবাদের ইতিবাচক ভূমিকা রাখার ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেছি।’ অন্যদিকে ক্যামেরন বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, পাকিস্তানের স্বার্থেই স্থিতিশীল, সমৃদ্ধিশালী ও গণতান্ত্রিক আফগানিস্তান দরকার। আবার আফগানিস্তানের স্বার্থে দরকার স্থিতিশীল, সমৃদ্ধিশালী ও গণতান্ত্রিক পাকিস্তান। আমি জানি, এ উদ্দেশে আপনি (নওয়াজ শরিফ) ও কারজাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবেন।’ আগামী বছর আফগানিস্তান থেকে ন্যাটো সেনাদের প্রত্যাহার করা হবে। এর আগেই দেশটির তালেবানের সঙ্গে শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বোমা হামলায় নিহত ১৫: পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়িবহর লক্ষ্য করে চালানো এক হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৫ জন নিহত এবং অন্তত ২৮ জন আহত হয়েছে। গতকাল পেশোয়ারের উপকণ্ঠে এ হামলা চালানো হয়। পেশোয়ারের সরকারি লেডি রিডিং হাসপাতালের মুখপাত্র জামিল শাহ হতাহতের এ সংখ্যার সত্যতা নিশ্চিত করে এএফপিকে জানান, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনটি শিশু রয়েছে। এএফপি।

দক্ষিণ আফ্রিকায় ওবামার সফর নিয়ে উত্তাপ নেই

দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ সরকারের শোষণের বিরুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গরা যে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, জোহানেসবার্গের সোয়েটো ছিল তার প্রাণকেন্দ্র। সেই সোয়েটোয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উপস্থিতি সত্যিকার অর্থেই ঐতিহাসিক ঘটনার মর্যাদা পেতে পারত। কিন্তু তা হলো না। ওবামার উপস্থিতি নিয়ে সোয়েটোর মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাস-উন্মাদনা দেখা তো গেলই না, বরং সেখানে একদল বিক্ষোভকারী ওবামার পররাষ্ট্রনীতির নিন্দা জানিয়ে স্লোগান দিল। অবশ্য সোয়েটোর রাজপথ দিয়ে জোহানেসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রশ্নোত্তর পর্বে যোগ দিতে যাওয়ার সময় ওবামাকে সেই বিক্ষোভের দৃশ্য দেখতে হয়নি। তাঁর গাড়িবহর আসার আগেই পুলিশ শব্দ গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের তাড়িয়ে দেয়। ওবামার সফরের ব্যাপারে আফ্রিকার মানুষের উদাসীনতা দেখানোর একটা কারণ হতে পারে, তারা হোয়াইট হাউসে কয়েক বছর ধরে কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্টের উপস্থিতি দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। আফ্রিকার বহু মানুষ আবার মনে করে, ওবামা আলাদা ধরনের কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন। আগের প্রেসিডেন্টদের মতো একই নীতি মেনে চলছেন তিনি। সোয়েটোর এক তরুণ যেমন বললেন, ‘অন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে ওবামার কোনো পার্থক্য নেই। যুক্তরাষ্ট্র এখনো আগের মতোই অন্য দেশগুলোর ওপর তার আদেশ-নিষেধ চাপিয়ে যাচ্ছে।’ অবশ্য এমন অনেককে পাওয়া গেছে, যাঁরা ওবামাকে পছন্দ করেন। ৪০ বছর বয়সী অ্যালেক্স মোটলুং ওবামাকে এক নজর দেখার জন্য সোয়েটোর রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু ওবামার গাড়িবহর এত দ্রুত চলে গেল যে গাড়ির কাচ ভেদ করে দৃষ্টি সে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারল না। এর আগে প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমার সঙ্গে বৈঠক করার পর যে যৌথ সংবাদ সম্মেলন হয়, তাতে জুমা প্রেসিডেন্ট ওবামাকে নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে তুলনা করে বসলেন। এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। অনেকে বলছেন, দেশের মানুষের জন্য ২৭ বছর জেল খাটা ম্যান্ডেলার সঙ্গে ওবামার তুলনা করা বাতুলতামাত্র। আবার অ্যালেক্স মোটলুংয়ের মতো অনেকে মনে করেন, ওবামার অর্জন ম্যান্ডেলার অর্জনকেও ছাড়িয়ে গেছে। মোটলুং বলেন, ওবামা প্রমাণ করেছেন যে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়, এমনকি কৃষ্ণাঙ্গ হয়েও একটি শ্বেতাঙ্গপ্রধান দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়া সম্ভব। উল্লেখ্য, দুজনই নিজ নিজ দেশের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট। অনেক বিশ্লেষকের মতে, কেনীয় বংশোদ্ভূত হওয়া সত্ত্বেও ওবামা ‘স্বভূমি’ আফ্রিকার জন্য তেমন কিছুই করেননি। তাঁরা বলছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে এখন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরালো করা বেশি জরুরি।

শেষ পর্যন্ত গ্লাসটনবুরি উৎসবে রোলিং স্টোনস!

উৎসবে মিক জ্যাগার
যুক্তরাজ্যের গ্লাসটনবুরি সংগীত উৎসব চলে আসছে ৪৩ বছর ধরে। কিন্তু এবারই প্রথম এই নামী উৎসবে গান গাইল সে দেশেরই বিশ্বখ্যাত ব্যান্ড দল রোলিং স্টোনস। আর এ ঘটনাকে উৎসবের ‘৪৩ বছরের সেরা মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেছেন উৎসবের আয়োজক।  ইংল্যান্ডের সমারসেটের ছোট্ট শহর গ্লাসটনবুরিতে অনুষ্ঠিত এ উৎসব যুক্তরাজ্যে রক সংগীতের সবচেয়ে মর্যাদাকর আয়োজন। গত শনিবার রাতে এতে কয়েক লাখ দর্শকশ্রোতা উপস্থিত ছিল। অনুষ্ঠানে ২০টি গান পরিবেশন করে রোলিং স্টোনস। তারা প্রথমেই পরিবেশন করে ‘ইটস ওনলি রক এন রোল (বাট আই লাইক ইট)’। কিংবদন্তিপ্রতিম মিক জ্যাগারের কণ্ঠে এ গান শুরুর সঙ্গে সঙ্গে দর্শকেরা উল্লাসে মেতে ওঠে। গান শেষে রোলিং স্টোনস ব্যান্ডের সদস্যরা একে একে মঞ্চ থেকে নেমে আসেন। মঞ্চে ওঠেন উৎসবপ্রধান স্থানীয় কৃষক মাইকেল ইভিসও। তিনি বলেন, ‘ওরা (রোলিং স্টোনস) শেষ পর্যন্ত এখানে গান করল। করলও অসাধারণ।’ ইভিস বলেন, ‘গ্লাসটনবুরির ৪৩ বছরের ইতিহাসে এটাই সেরা মুহূর্ত।’ প্রথম গানটি গাওয়ার পর আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান জ্যাগার (৬৯)। তিনি বলেন, ‘এখানে গান করতে পারাটা বিশাল কিছু।’ তিনি রসিকতা করে বলেন, ‘অবশেষে অনেক বছর পর তাঁরা (আয়োজকেরা) আমাদের এখানে আনতে সফল হয়েছেন। অনেক ধন্যবাদ গ্লাসটনবুরি।’ বিবিসি।

রাশিয়াকেই স্নোডেনের গন্তব্য ঠিক করতে হবে

মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) সাবেক কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেনের গন্তব্যের ব্যাপারে রাশিয়াকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট রাফায়েল কোরেয়া। গত শনিবার রাতে তিনি এ মন্তব্য করেন।
এর আগে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে কথা হয় কোরেয়ার। একটি বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কোরেয়া বলেন, স্নোডেন ইকুয়েডরের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন। কিন্তু রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রক্রিয়া শুরু করতে তাঁকে অবশ্যই ইকুয়েডরের ভূখণ্ডে আসতে হবে। তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে স্নোডেনের গন্তব্যের বিষয়ে সমাধান রুশ কর্তৃপক্ষের হাতে। কোরেয়া বলেন, ‘আমরা এই পরিস্থিতিতে পড়তে চাইনি। উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের সঙ্গে স্নোডেনের যোগাযোগ রয়েছে। স্নোডেনকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে অ্যাসাঞ্জ ইকুয়েডর সরকারের কাছে সুপারিশ করেছেন।’ স্নোডেন গত ২৩ জুন হংকং ছেড়ে রাশিয়া যান। তিনি তখন থেকে মস্কোর শেরেমেয়িতেভো বিমানবন্দরের ট্রানজিট এলাকায় অবস্থান করছেন। মস্কো বলছে, স্নোডেন মূল রুশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করেননি এবং তিনি যেকোনো স্থানে যেতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের ওপর প্রশাসনের নজরদারির কথা ফাঁস করায় স্নোডেনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দেশটির সরকার। বাইডেন-কোরেয়া ফোনালাপ: স্নোডেন বিষয়ে কথা বলতে শনিবার রাফায়েল কোরেয়াকে ফোন করেন বাইডেন। কোরেয়া জানান, স্নোডেনকে ইকুয়েডরে রাজনৈতিক আশ্রয় না দিতে তাঁর প্রতি অনুরোধ জানান বাইডেন। অত্যন্ত মার্জিতভাবে তাঁর প্রতি এই অনুরোধ জানানো হয়। এর জবাবে কোরেয়া বলেন, ‘ফোন করার জন্য ধন্যবাদ। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মনোযোগী। এই পরিস্থিতিতে আমরা পড়তে চাইনি। স্নোডেন তাঁর আবেদন নিয়ে ইকুয়েডরের ভূখণ্ডে প্রবেশ করলে আমরা প্রথম যার মতামত নেব, তা হলো যুক্তরাষ্ট্র।’ পরে বেসরকারি টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কোরেয়া বলেন, ‘স্নোডেনকে আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের মতামত নেব। কিন্তু এ ব্যাপারে আমাদের সরকারই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।’ এএফপি ও বিবিসি।

ইইউর কার্যালয়েও আড়ি পেতেছিল যুক্তরাষ্ট্র

এবার যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর আড়ি পাতার অভিযোগ উঠেছে। জার্মানির বহুল প্রচারিত সাময়িকী ডের স্পিগেল গত শনিবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ে আড়ি পেতেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ব্যাপারে দ্রুত বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়েছেন ইইউ পার্লামেন্টের প্রধান মার্টিন শুলজ। ডের স্পিগেল লিখেছে, মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) সাবেক কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেনের কাছ থেকে তারা এ তথ্য পেয়েছে। ২০১০ সালের মার্কিন গোপন নথির বরাত দিয়ে ডের স্পিগেল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) ওয়াশিংটনে ইইউর অভ্যন্তরীণ কম্পিউটার নেটওয়ার্কে ও নিউইয়র্কে ইইউর কার্যালয়ে আড়ি পাতে। এনএসএ এভাবে আড়ি পেতে ইইউর কোনো তথ্য নিয়েছে কি না এবং নিলেও কোন ধরনের তথ্য নিয়েছে, তা জানা যায়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন প্রশাসন জার্মানির অন্তত ৫০ লাখ ফোন কল, ই-মেইল ও টেক্সট মেসেজে নজরদারি করেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বাণিজ্য ও সামরিক বিষয় নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যাঁরা আলোচনা করছেন, তাঁদের জন্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। ইইউ পার্লামেন্টের প্রধান মার্টিন শুলজ গত শনিবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এ অভিযোগসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে মার্কিন কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের পক্ষ থেকে এ আহ্বান জানাচ্ছি আমি।’ শুলজ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, এ অভিযোগ সত্যি হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্কে ‘বড় ধরনের প্রভাব’ পড়বে। ডের স্পিগেল-এর প্রতিবেদনের ব্যাপারে লুক্সেমবার্গের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেন অ্যাসেলবর্ন বলেন, এ ঘটনা সত্যি হলে তা হবে চরম বিরক্তিকর। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে মিত্রদের ওপর আড়ি পাতার পরিবর্তে নিজের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ওপর নজরদারি করা। মার্কিন কর্তৃপক্ষ ডের স্পিগেল-এর প্রতিবেদনের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি। ‘জার্মানি তৃতীয় শ্রেণীর অংশীদার’: মার্কিন গোপন নথির বরাত দিয়ে ডের স্পিগেল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন কর্তৃপক্ষের করা শ্রেণীবিভাগ অনুযায়ী জার্মানি যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় শ্রেণীর অংশীদার। ইউরোপের যেকোনো দেশের চেয়ে জার্মানির ওপর বেশি নজরদারি করে মার্কিন প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্র চীন, ইরাক বা সৌদি আরবের ওপর যেমন নজরদারি করে, জার্মানির ওপরও সে পর্যায়েই নজরদারি করে। ইইউর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আড়ি পাতার অভিযোগের ব্যাখ্যা দাবি করেছেন জার্মান বিচারমন্ত্রী স্যাবাইন স্নারেনবার্গার। তিনি বলেন, এ খবর স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। বিবিসি ও রয়টার্স।

মিসরের গত এক বছরের ঘটনাক্রম

২০১২
৩০ জুন: মিসরের প্রথম বেসামরিক ও ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট হিসেবে মোহাম্মাদ মুরসির শপথ
১২ আগস্ট: সেনাবাহিনীর ক্ষমতা খর্ব করে সংবিধানের একটি অংশ বাতিল ও সেনাপ্রধানকে বরখাস্ত
২২ নভেম্বর: নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে মুরসির ডিক্রি জারি
৩০ নভেম্বর: ইসলামপন্থী প্রাধান্যপুষ্ট সাংবিধানিক গণপরিষদে মুরসির প্রণীত খসড়া সংবিধান গৃহীত
৮ নভেম্বর: প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধির ডিক্রি রদ
১৫ ও ২২ নভেম্বর: দুই দফা গণভোটে নতুন সংবিধান পাস।
এর পরই দুপক্ষের মধ্যে উত্তজনা বাড়তে থাকে
২০১৩
২৪ জানুয়ারি: মুরসিবিরোধী বিক্ষোভকারী ও পুলিশের সংঘর্ষে নিহত ৬০
২ জুন: নতুন সংবিধানের খসড়া প্রণয়নকারী সিনেটকে সুপ্রিম কোর্টের অকার্যকর ঘোষণা।
২১ জুন: বিরোধীদের বিক্ষোভের আগে মুরসির লক্ষাধিক সমর্থকের শক্তিপ্রদর্শন
২৯ জুন: মুরসিকে আরও ‘গঠনমূলক’ হতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আহ্বান
৩০ জুন: তাহরির স্কয়ারে মুরসিবিরোধী বিক্ষোভ
সূত্র: এএফপি

আবার উত্তাল তাহরির স্কয়ার, মুরসিকে ‘লাল কার্ড’

প্রেসিডেন্ট মুরসির পদত্যাগের দাবিতে কায়রোর তাহরির
স্কয়ারে গতকাল বিক্ষোভ করে লাখো মানুষ, ছবি: রয়টার্স
মিসরের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির এক বছর পূর্তির দিনে গতকাল রোববার তাঁর পদত্যাগ চেয়ে কায়রোতে বিক্ষোভ করেছে লাখো মানুষ। আগের ঘোষণামতো তারা আরব বসন্তের সময় মোবারকবিরোধী আন্দোলনের জন্য খ্যাত তাহরির স্কয়ারে জড়ো হয়। আরবিতে ‘ইরহাল! ইরহাল!’ (দূর হও! দূর হও!) স্লোগান লেখা লাল রঙের অসংখ্য প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন প্রদর্শন করে মুরসির অপসারণ দাবি করে তারা। বিরোধীদের প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে মুরসি সমর্থকেরাও কায়রোর আরেক প্রান্তে কয়েকটি শিবিরে জড়ো হয়। দুই পক্ষের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশটিতে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো সংঘাতের খবর পাওয়া যায়নি। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইসলামপন্থী নেতা মোহাম্মদ মুরসির দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূরণ হয়েছে গতকাল রোববার। এক সপ্তাহ আগে এই দিনেই তাঁর পদত্যাগ চেয়ে দেশব্যাপী তুমুল বিক্ষোভ করা হবে বলে ঘোষণা দেয় বিরোধীরা। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী গণবিক্ষোভে যোগ দিতে তাহরির স্কয়ারে শনিবার রাতেই হাজার হাজার বিক্ষোভকারী তাঁবু ফেলে জড়ো হতে শুরু করে। গতকাল সন্ধ্যা নাগাদ পুরো চত্বর জনসমুদ্রে পরিণত হয়। এ সময় ‘মুরসি বিদায় হও’, ‘জনগণ এ সরকারের পতন চায়’—এ ধরনের স্লোগানে গোটা এলাকা প্রকম্পিত হয়। ইব্রাহিম হামুদা নামের একজন বিক্ষোভকারী বলেন, ‘এটি দ্বিতীয় বিপ্লব। তাহরির বিপ্লবের প্রতীক। এখান থেকেই গণ-অভ্যুত্থানের যাত্রা শুরু হলো।’ বিরোধীরা দাবি করেছে, প্রায় দুই কোটি ২০ লাখেরও বেশি মানুষ দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানিয়ে একটি আবেদনপত্রে স্বাক্ষর করেছে। তাহরির স্কয়ার থেকে বিক্ষোভ করে প্রেসিডেন্ট মুরসির কার্যালয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, হোসনি মোবারকের পতন ঘটিয়ে মুরসিকে বিশ্বাস করে ক্ষমতায় বসানো হলেও তিনি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক সমস্যার সমাধান করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের অভিযোগ, মুরসি নিজের ও তাঁর ইসলামপন্থী দল ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য খেয়ালখুশিমতো প্রশাসন ও বিচার বিভাগে সংস্কার করেছেন এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা-কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছেন। তাহরির স্কয়ারের বাইরে বিরোধীদের নিরাপত্তাচৌকি বসিয়ে সেখানে ‘ব্রাদারহুডের প্রবেশ নিষেধ’ লেখা ফলক টাঙাতে দেখা যায়। অন্যদিকে, কায়রোর অন্য প্রান্তে নাসের সিটি ও এর আশপাশে মুরসির সমর্থনেও কয়েক হাজার লোক জড়ো হয়েছে। তারা বলছে, নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের শামিল। সাম্প্রতিক সময়ে মিসরের জনগণ স্পষ্টতই দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এক দলে রয়েছে মুরসির ইসলামপন্থীরা। বিরোধী শিবিরে রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ ও কট্টর ইসলামপন্থীরা। গতকাল মিসরের জাতীয় দৈনিকগুলোতে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। আল গোমুহুরাইয়া পত্রিকার প্রথম পাতায় মুরসির সমর্থক ও বিরোধীদের দুই শিবিরের দুটি ছবি ছেপে প্রধান শিরোনাম করা হয় ‘দীর্ঘতম দিন’। সরকারি দুটি পত্রিকার শিরোনাম ছিল ‘আতঙ্কে আচ্ছন্ন মিসর’ ও ‘আগ্নেয়গিরির মুখে মিসর’। ইতিমধ্যে প্রভাবশালী সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যদি বড় ধরনের সহিংসতা হয় এবং তা নিয়ন্ত্রণে বেসামরিক প্রশাসন ব্যর্থ হয় তাহলে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হবে’। বিবিসি, এএফপি ও রয়টার্স।