Saturday, June 20, 2026

সিএনএনের বিশ্লেষণ: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে ‘বিজয়ী’ চীন

ফেব্রুয়ারির শেষে যখন ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী বোমাবর্ষণ শুরু হয়, তখন চীনের নেতারা আরেকটি মিত্র সরকারের নেতৃত্বচ্যুত হওয়ার এক বাস্তব সম্ভাবনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। ঠিক যেমনটি ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে ঘটেছিল।

তবে কয়েক মাস পরেই সেই চিত্র পুরোপুরি পালটে গেছে। ইতিমধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের স্থায়ী অবসানে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তবে ইরানের সেই সরকারের পতন ঘটেনি বরং এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে।

অন্যদিকে বেইজিংয়ের নিজস্ব কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে, কারণ দেশটি একের পর এক বিদেশি নেতাদের আতিথেয়তা দিয়েছে এবং নিজেকে শান্তির প্রবক্তা হিসেবে তুলে ধরেছে। এমনকি এই যুদ্ধে চীনের প্রতিক্রিয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে বারবার প্রশংসাও পেয়েছে।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি সংঘাতের ফলে সৃষ্ট ঐতিহাসিক জ্বালানি সংকটও তার অনেক প্রতিবেশীর চেয়ে ভালোভাবে মোকাবিলা করেছে- বিশেষ করে বিপুল কৌশলগত তেলের মজুদ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন গ্রহণের কারণে।

চলতি সপ্তাহে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে হওয়া চুক্তির ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। দেশটির একজন মুখপাত্র বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে সক্রিয় ভূমিকা পালনে বেইজিং প্রস্তুত রয়েছে।

এই চুক্তিতে বেইজিংয়ের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, জানতে চাইলে চীনা মুখপাত্র লিন জিয়ান কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকার কথা নিশ্চিত করেননি। তবে তিনি যুদ্ধ শেষ করার জন্য চীনের ‘ক্লান্তিহীন’ প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরতেও দ্বিধা করেননি।

গত বুধবার ফ্রান্সে এক জি-৭ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, আমি চীনকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, প্রেসিডেন্ট শি’কেৃ তিনি নিরপেক্ষ ছিলেন, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, এবং আমি এর প্রশংসা করি। সিএনএন বলছে, চীনা নেতারা ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ অমান্য করতে তার দেশের নৌ শক্তি ব্যবহার করেননি।

এনিয়ে ট্রাম্প আরও বলেছেন, তারা তা করেনি। প্রেসিডেন্ট শি আমাকে সাহায্য করেছেন। তিনি সাহায্য করার চেষ্টা করেছেন এবং আমার মনে হয়, তিনি সম্ভবত এর সমাধানেও সাহায্য করেছেন।

সংঘাত চলাকালীন চীন একটি সতর্ক কূটনৈতিক পথ অবলম্বন করেছিল। দেশটি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার নিন্দা জানায় এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরানের তেল কেনা অব্যাহত রাখে। তবে দেশটি উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগও রেখেছিল।

সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সাথে সাথে বহু বিদেশি নেতা বেইজিং সফর করেছেন– যাদের মধ্যে গত মাসে ট্রাম্প, তার কয়েকদিন আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং সংঘাতের প্রধান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের নেতারাও রয়েছেন।

শান্তিচুক্তির প্রাথমিক আলোচনা পর্যায়ে তেহরান চেয়েছিল, চীন চুক্তির বাস্তবায়নে একজন গ্যারান্টর বা নিশ্চয়তাদানকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করুক। তবে এ ধরনের আনুষ্ঠানিক ও সম্ভাব্য জটিল দায়িত্ব গ্রহণে বেইজিং খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।

গত বুধবার চীনের শীর্ষ কূটনীতিক ওয়াং ই ফোনে আরাঘচির সঙ্গে কথা বলেছেন এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল যথাযথভাবে সামলানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

ওয়াং বলেছেন, শান্তির ভোর উদিত হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পরবর্তী ধাপের সাফল্য নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ কতটা আন্তরিকভাবে তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে এবং সব ধরনের হস্তক্ষেপ দূর করতে সক্ষম হয় তার ওপর।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী চুক্তিতে চীন নেপথ্যে কতটা কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করেছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে বুধবার একটি সমঝোতা স্মারকে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির শর্ত নির্ধারণে ৬০ দিনের আলোচনা পর্ব শুরু হয়েছে।

সিএনএন বলছে, সংঘাতের সময় বিভিন্ন দেশের নেতাদের দেশটিতে সফর এমন একটি বার্তা তুলে ধরেছে যে, অন্যরা যখন যুদ্ধ করছে, তখন চীন নিজেকে দায়িত্বশীল বৈশ্বিক শক্তি ও প্রভাবশালী শান্তি-মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র অন্তর্বর্তী চুক্তি অনুযায়ী আলোচনার পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করছে। এই মুহূর্তে পর্যবেক্ষকেরা গভীরভাবে লক্ষ্য রাখছেন- এই সংঘাত থেকে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী লাভ করল, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক ক্ষতি ডেকে এনেছে।

চীনে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র প্রভাবিত বিশ্বব্যবস্থার বিরোধিতা দেশটির পররাষ্ট্রনীতির একটি মূল নীতি, সেখানে রাজনৈতিক চিন্তাবিদরাও এই সংঘাত বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে, তা নিয়ে আলোচনা করছেন।

কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলছেন, এই সংঘাত কি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি তথাকথিত ‘সুয়েজ মুহূর্ত’ হয়ে উঠছে কি না- যা ১৯৫০’এর দশকে সুয়েজ খালের ওপর বৃটেনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে।

ওই ঘটনা ব্যাপকভাবে বৃটেনের আন্তর্জাতিক প্রভাব হ্রাস এবং বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানের একটি পূর্বাভাসমূলক মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়।

শাংহাইয়ে ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক সুন দেগাং চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত এক মতামত লেখায় প্রশ্ন তোলেন- সুয়েজ সংকটের সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ওপর যে দৃশ্য ছায়া ফেলেছিল, তা কি এখন হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে?

তিনি বলেন, শীতল যুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্বের ‘একক পরাশক্তি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। তবে এবার দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ওয়াশিংটন যেমন ভেবেছিল ততটা সর্বশক্তিমান প্রমাণিত হয়নি, এবং গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের অনুপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটব্যবস্থা ক্রমেই বিভক্তির লক্ষণ দেখাচ্ছে।

এই প্রশ্নটি এখন পশ্চিমেও আলোচিত হচ্ছে, তবে চীনে কিছু কণ্ঠ আরও স্পষ্টভাবে বলছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ থেকে বেইজিং কৌশলগতভাবে লাভবান হয়েছে।

এ ছাড়া চীনের রাজনৈতিক ভাষ্যকার হু শিজিন লিখেছেন, এই সংঘাত বিশ্বে চীনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকেও প্রভাবিত করেছে। এটি দেখিয়েছে যে শক্তি সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত পরিকল্পনার ক্ষেত্রে চীন কতটা সফল, এবং তার শান্তিপূর্ণ ‘উন্নয়ন পথ’-এর প্রতি আকর্ষণও বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ান সম্পর্কিত সামগ্রিক প্রতিরোধ সক্ষমতাকে “উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল” করেছে। তার মতে, এর মাধ্যমে দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের সীমাবদ্ধতা এবং এমনকি এককভাবে বিচ্ছিন্ন প্রতিপক্ষ ইরানের বিরুদ্ধেও একটি পূর্ণাঙ্গ পশ্চিমা জোট গঠন করতে তাদের ব্যর্থতা।

হু শিজিনের ভাষায়, এসব ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাবের সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনে দিয়েছে। 

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে ‘বিজয়ী’ চীন

ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি by আমিন আশরাফ

ছোটবেলা থেকেই মাথায় একটা ভূত চেপেছিল। ইতিহাসের ভূত। নাওয়া-খাওয়া ভুলে হাজার পৃষ্ঠার মোটা মোটা বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে পড়ে থাকতাম। বই যত বড় হতো, মনে আনন্দ হতো তত বেশি। মনে হতো, বেশ কিছুদিনের খোরাক জুটে গেল। এই নিয়ে বাবা আর চাচার বকা কম শুনতে হয়নি।

দিন ফুরোলো। সময়টা সম্ভবত দু’হাজার পাঁচ কিংবা সাত। এক ঈদের বাজারে মুসলিম জাহানের ঈদসংখ্যায় হাতে এলো শফীউদ্দীন সরদারের ‘বারো ভূঁইয়ার উপাখ্যান’। ঈদের আমেজ শেষ হওয়ার আগেই গোগ্রাসে গিলে ফেললাম পুরো উপন্যাস। আর তা পড়তে গিয়েই চমকে উঠলাম। বুকের ভেতর একটা তীব্র আফসোস মোচড় দিয়ে উঠল। মসনদে আলা ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানীটি নাকি আমাদের বাড়ির একেবারে কাছেই! কালের জ্বলন্ত সাক্ষী হয়ে বয়ে চলা নরসুন্দা নদীর পাড় ঘেঁষেই তার অবস্থান। নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো—এত কাছে ইতিহাসের এমন গৌরবময় ঐতিহ্যের সিংহদ্বার, অথচ আমি ছাড়া আর কার তা অজানা ছিল!

কুফা আর মফস্বল শহরের অটো কিংবা সিএনজিচালকদের মুখে ‘জঙ্গলবাড়ি-জঙ্গলবাড়ি’ শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে যেত রোজ। কিন্তু এই জঙ্গলবাড়ির আড়ালে যে এক হার-না-মানা মহাবীরের নাম লুকিয়ে আছে, তা তখনো জানা ছিল না।

রমজানের এক কুয়াশামাখা ভোর। চারপাশটা কেমন যেন আবছা, রহস্যময়। ঘর থেকে বের হলাম জঙ্গলবাড়ির উদ্দেশে। সঙ্গে জুটে গেল তারাবির নামাজের কজন ছোকরা মুসল্লি।

গাঁয়ের ছেলে হলেও বড় হয়েছি মফস্বল শহরে। অনেক দিন পর এমন মাটির গন্ধমাখা গ্রামের মেঠোপথে পা রাখা। কিশোরগঞ্জ থেকে যে গ্রামটায় তারাবি পড়াতে এসেছি, তার নাম হাত্রাপাড়া। সঙ্গের ছেলেগুলো জানাল—বেশি দূরে নয় হুজুর, হাঁটতে হাঁটতেই ঈশা খাঁর রাজ্যে পৌঁছে যাওয়া যাবে। ভোরের তিরতিরে ঠান্ডা বাতাসে শরীর ও মন কেমন যেন চনমনে হয়ে উঠল। ইচ্ছে করছিল ছোটবেলার মতো আনন্দে একটু দৌড়াদৌড়ি করি। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলাম, এই পিচ্চিদের সামনে আবার ‘প্রেস্টিজ’ চলে যাবে না তো! নিজেকে সামলে নিলাম।

যতই এগোচ্ছি আমার সঙ্গে ছেলেগুলোর উৎসাহ ততই বাড়ছে। হঠাৎ একজন আঙুল উঁচিয়ে বলল, ‘এই যে দেখুন, হুজুর! এটা কিন্তু সাধারণ রাস্তা ছিল না, রাজপথ ছিল। এই পথ দিয়েই ঈশা খাঁ তার বিশাল বাহিনী নিয়ে আসা-যাওয়া করতেন।’

থমকে দাঁড়ালাম। চেয়ে দেখি, জৌলুস হারানো পথটা আজ আর রাজপথ নেই। ভেঙে যাওয়া ইট-সুরকিগুলো যেন বোবা সাক্ষী হয়ে পড়ে আছে। এই বুক চিরেই তো ইতিহাসের মহানায়ক এককালে তার তেজি ঘোড়া ছুটিয়েছিলেন! চোখের সামনে যেন একটা সিনেমার দৃশ্য ভেসে উঠল—বুকের ভেতর বেজে উঠল তলোয়ারের ঝনঝনানি, মসনদে আলা ঈশা খাঁর দুর্গজয়ের দৃশ্য।

সে এক ইতিহাস। ১৫৮৫ সাল। মসনদে আলা ঈশা খাঁ বর্তমান কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার এই জঙ্গলঘেরা দুর্গে আক্রমণ করেন। তখন এই দুর্গে রাজত্ব করতেন কোচ রাজা লক্ষ্মণ হাজরা ও রাম হাজরা। ঈশা খাঁ তাদের পরাজিত করে নিজের পতাকায় মুড়ে নেন জঙ্গলবাড়ি দুর্গ।

হাঁটতে হাঁটতে যখন জঙ্গলবাড়ির ঠিক সিংহদ্বারে পৌঁছালাম, মনে হলো সত্যি এক পরিপাটি জঙ্গলরাজ্যে এসে হাজির হয়েছি। প্রকৃতির সবুজ আয়োজন যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। অপূর্ব, ছায়াঢাকা এক জঙ্গলবাড়ি। ভাবতেই অবাক লাগে, একসময় এই নিঝুম গ্রামটাই ছিল এক জ্যান্ত বীরের রাজত্ব! যেখানে দিনরাত ঘোড়ার খুরের শব্দে আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠত। বাতাসের বুকে উড়ে বেড়াত ধূলিঝড়। রাস্তার দুপাশের নাম না জানা গাছগুলো পাতা নাড়িয়ে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, নেপথ্যে থেকে তারা ফিসফিসিয়ে বলছে, ‘এসো পিচ্চিরা, আমার কাছে এসো। আমিই তোমাদের শোনাব মসনদে আলা ঈশা খাঁর জানা-অজানা সেই সাচ্চা দাস্তান।’

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে চেনা ছবিটা স্পষ্ট হয়। মোগল সম্রাট আর ইংরেজদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বাংলার অসহায় জমিদাররা গোপনে ঈশা খাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ১৫২৯ সালের ১৮ আগস্ট জন্মেছিলেন এই বীর। বাবা সোলায়মান খাঁ ছিলেন আফগানিস্তানের সোলায়মান পার্বত্য অঞ্চলের এক দলপতির বংশধর। সুলতান নুসরত শাহের রাজত্বকালে তারা বাংলায় আসেন। নিজের একনিষ্ঠ চেষ্টায় ঢাকা ও ময়মনসিংহের উত্তর-পূর্ব অংশ নিয়ে এক স্বাধীন রাজ্য গড়ে তোলেন সোলায়মান খাঁ। কিন্তু নিয়তির খেলা ভিন্ন ছিল। দুবার বিদ্রোহ করার পর ১৫৪৮ সালে তিনি নিহত হন। ঈশা খাঁর বয়স তখন মাত্র ১৯। পিতৃব্য কুতুবউদ্দীনের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন তিনি।

বাংলার জমিদারদের সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ঈশা খাঁ আফগানিস্তান থেকে ১ হাজার ৪০০ অশ্বারোহী, ২১টি যুদ্ধনৌকা আর প্রচুর গোলাবারুদ নিয়ে ত্রিপুরা রাজ্যে এসে নামেন। সেখান থেকে প্রথমে কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি এবং পরে সোনারগাঁও দুর্গ দখল করেন। সোনারগাঁওয়ের প্রাচীন নাম ছিল সুবর্ণগ্রাম। ঈশা খাঁ ত্রিপুরা রাজ্যের রাজা চাঁদ রায়ের কন্যা এবং কেদার রায়ের বোন স্বর্ণময়ীকে বিয়ে করেন। স্বর্ণময়ী পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তার নাম রাখা হয় সোনাবিবি। আর সেই প্রিয়তমা স্ত্রীর নাম অনুসারেই বাংলার রাজধানীর নামকরণ করা হয় ‘সোনারগাঁও’।

সম্রাট আকবরের কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন ‘মসনদে আলা’ উপাধি। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, দিল্লির রাজসিংহাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী সুলতান দাউদ কররানীকে এক যুদ্ধে সাহায্য করায় তিনি এই উপাধি পেয়েছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীতে মোগলদের আগ্রাসন থেকে বাংলাকে রক্ষা করতে বারো ভূঁইয়াদের নেতা, দূরদর্শী সুশাসক ঈশা খাঁ ১৫৯৭ সালে মোগল সেনাপতি মানসিংহকে পরাজিত করে বাংলার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখেন। সোনারগাঁওকে কেন্দ্র করে তিনি স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন বুনেছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতার প্রথম বীজ বোধহয় তিনিই বুনেছিলেন। তার সাহস আর দেশপ্রেমের গল্প আজও রক্তের ভেতর তরতাজা শিহরন জাগায়।

দুর্গের ভেতরে পা রাখতেই চোখে পড়ল একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। গায়ে তার স্পষ্ট মোগল স্থাপত্যশৈলীর ছাপ। ৪৪ ফুট দৈর্ঘ্য আর ১৮ ফুট প্রস্থের মসজিদটির ছাদে তিনটি গম্বুজ যেন আকাশপানে চেয়ে আছে। প্রতিটি কোণে একটি করে চোখধাঁধানো মিনার। পুব দিকে ১১ ফুটের একটা খোলা বারান্দা। শুনলাম, স্থানীয় মুসল্লিরা এখনো এখানে নিয়মিত নামাজ পড়েন।

মসজিদের পাশেই পাকা করা কিছু কবর। ছোকরাগুলো এক হাত দেখিয়ে বলল, ‘হুজুর, এখানে কোনো একটা কবর বোধহয় ঈশা খাঁর হবে।’

মনে মনে হাসলাম। বড় হয়ে ইতিহাস পড়ে জেনেছি—এগুলো ঈশা খাঁর আত্মীয়দের কবর। ঈশা খাঁ জঙ্গলবাড়ির এই মাটিতে ঘুমিয়ে নেই। জীবনের শেষ দিনগুলোয় তিনি বিভিন্ন দুর্গে ঘুরে বেড়াতেন। ১৫৯৯ সালে মহেশ্বরী পরগনার অন্তর্গত বক্তারপুর দুর্গে গিয়ে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সে বছরই ১৭ সেপ্টেম্বর প্রায় ৭০ বছর বয়সে এই সিংহপুরুষ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ থানার বক্তারপুর গ্রামে আজও তিনি সমাহিত আছেন।

প্রায় ৪০ একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই জঙ্গলবাড়ি দুর্গটি ঈশা খাঁ সামন্ত রাজার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার পর নতুন করে সংস্কার করেছিলেন। দুর্গের তিনদিকে পরিখা খনন করে নরসুন্দা নদীর সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন, যাতে পুরো জঙ্গলবাড়ি একটা সুরক্ষিত ব-দ্বীপের মতো দেখায়।

আজ সেই জৌলুস আর নেই। ইতিহাস এখানে এক নির্জীব, ক্লান্ত সাক্ষী মাত্র। একটু সামনে এগোতেই উত্তর-দক্ষিণে লম্বা ইটের পাঁচিল দিয়ে ভাগ করা দুটি চত্বর চোখে পড়ল। স্থানীয়রা একে বলে ‘প্রাসাদ প্রাচীর’। দুর্গের দক্ষিণে একটা ভাঙা তোরণ, তার সামনে ‘করাচি’ নামের পূর্বমুখী একতলা ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে জরাজীর্ণ অবস্থায়। তোরণের পেছনে ‘অন্দরমহল’; আর বাড়ির সামনে রয়েছে সেই পুরোনো আমলের খনন করা একটি দীঘি, যার স্থির জল অতীতে ডুব দিতে বাধ্য করে। দুর্গের ভেতরের দরবারঘরটি সংস্কার করে এখন ‘ঈশা খাঁ স্মৃতি জাদুঘর ও পাঠাগার’ করা হয়েছে। সেখানে রয়েছে ঈশা খাঁর কিছু ছবি, তার বংশধরদের তালিকা আর টুকরো কিছু নিদর্শন।

দুর্গের বাইরে তাকালে মাটির বুকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায় অসংখ্য প্রাচীন ইটের টুকরো আর মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ। প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলেন, এগুলো নাকি মুসলমানরা আসারও আগের নিদর্শন। তবে দুর্গের ভেতরে ঈশা খাঁর বাসভবনের ধ্বংসাবশেষ এখনো কালের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে। ছাদ ধসে গেলেও দরবার কক্ষের অনেকটাই চেনা যায়। পান্থশালায় এখনো ১০-১২টি কক্ষের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়।

ভগ্নপ্রায় প্রাসাদের ভেতরে ঘুরঘুর করার সময় ভেতরের লোকজন কেমন যেন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। বিনয়ের সঙ্গে বললাম, ‘একটু দেখতে এসেছি।’

আমার পরনে হুজুরদের পোশাক দেখে তারা খাতির করে একটা চেয়ার এনে বসতে দিল। গল্পে গল্পে জানতে পারলাম, এই বাড়িতে সর্বশেষ বসবাস করে গেছেন ঈশা খাঁর চতুর্দশ বংশধর দেওয়ান ফতেহ আলী দাদ খাঁ। ২০১৩ সালে তিনি মারা যান। বর্তমানে তার ছেলে দেওয়ান মামুন দাদ খাঁ পরিবার নিয়ে কিশোরগঞ্জ শহরের রথখলা এলাকায় থাকেন। মাঝে মাঝে এসে তারা নিজেদের এই আদিপুরুষের দুর্গটি দেখে যান।

যাওয়ার বেলায় শুনলাম, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ নাকি আশ্বাস দিয়েছে এই দুর্গটি সংস্কার করার। খুব জলদিই নাকি কাজ শুরু হবে।

ফিরে আসার সময় নরসুন্দার পাড়ে দাঁড়িয়ে যখন জঙ্গলবাড়ির দিকে তাকালাম, গোধূলির আলোয় মনে হলো—ইতিহাস কখনো মরে না; সে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ফিসফিস করে কথা বলে। কেবল শোনার মতো কান থাকা চাই।

ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়ি

সমাবেশে লোক ভাড়া করে বেশি মাথা দেখানো কী ফল দেয় by সালেহ উদ্দিন আহমদ

রাজধানীতে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সভা হয়ে গেল। এখনো হচ্ছে। বড় বড় রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে জুলাই আন্দোলনের ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন ‘সদ্যোজাত’ দল—সবাই, এই আন্দোলন মাসে সভা করেছে।

সরকারও পিছিয়ে নেই, তারাও জুলাই সনদ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সভা করেছে সংসদ ভবনের সামনে। এই মাসটাতে প্রতিটি সভাই জাতির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ—বিভিন্ন অঙ্গীকার ও তথ্যে ভরপুর।

যাঁরা সভাগুলোয় যোগ দিয়েছেন বা যাঁরা অন্যভাবে সভাগুলোর প্রতি নজর রেখেছেন, তাঁদের জন্য এতসব গুরুগম্ভীর তথ্য সম্ভবত মনে রাখা খুব সহজ নয়। তবে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, সবার জন্য সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জুলাই সনদ নিয়ে নেতারা যা যা বলেছেন, সেগুলো মোটাদাগে সবাই স্মরণ করবেন।

তবে একটা জিনিস সবাই মনে রাখবেন। সেটা হলো ‘হেড কাউন্ট’। কোন দলের সভায় কত লোক হলো, কাদের সভায় রাস্তা কতটুকু উপচে উঠেছিল এবং যানবাহন কতক্ষণ বন্ধ ছিল—এই জিনিসগুলো আলোচনায় এসেছে।

আমাদের রাজনীতিবিদদের দরকার হেড কাউন্ট বা মাথার হিসাব। কারা সভায় কত মাথা আনতে পারলেন, তা দিয়ে জনপ্রিয়তা মাপা হয়ে থাকে। সমাবেশে যত বেশি হেড কাউন্ট, টিভি সংবাদ ও পত্রিকায় জনসভার ছবিও তত ভালো দেখাবে।

তবে জনসভার হেড কাউন্ট দল বিচারে বা জনপ্রিয়তার দৌড়ে যে খুব প্রভাব ফেলে, তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। বিগত সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের প্রতিটি জনসভায় উপচে পড়া ‘মাথা’ থাকত। কিন্তু জনতার স্বতঃস্ফূর্ত হেড কাউন্টের কাছে তারা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি।

জনসভায় হেড কাউন্ট জিনিসটা আমাদের রাজনীতিতে অনেক দিন ধরে চলে আসছে। একাত্তরের আগে দেখেছি, রাজনৈতিক দলগুলো বাস পাঠিয়ে ডেমরা, তেজগাঁও থেকে শ্রমিকদের নিয়ে আসত। প্রয়োজন হলে কাঁটাবন বস্তি থেকেও লোক আসত। তাতেই ভরে যেত পল্টন ময়দান। ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শেখ মুজিবের সভা ভরাতে বাস-ট্রেনের প্রয়োজন হয়নি, মানুষ নিজেদের উদ্যোগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছিল।

মাওলানা ভাসানী যখন পল্টনে সভা করতেন, তখন অন্য দলের লোকজনও ওখানে যেত। কারণ, তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা সব সময়ে তুঙ্গে ছিল। তাঁর সভায় ডান দিকে টুপি মাথায় তাঁর ভক্ত ও মুরিদেরা থাকতেন, বাম দিকে লাল ঝান্ডা হাতে বা লাল পট্টি কপালে বেঁধে তাঁর রাজনৈতিক অনুসারীরা বসতেন। দক্ষিণপন্থী-বামপন্থী কোনো হাঙ্গামা হতো না। সবাই মন দিয়ে তাঁর সাম্যের বাণী শুনতেন। মাওলানা ভাসানী হেড কাউন্ট নিয়ে কখনো খুব মাথা ঘামাতেন না, যা ভাবতেন তাই বলতেন, আর যা বলতেন তা-ই করতেন।

এখন সময় পাল্টে গেছে। সবকিছু এখন ফাইভ স্টারভিত্তিক। দলের কাজকর্ম সব এখন ফাইভ স্টার ভবনে। রাজনৈতিক দলের ইফতার হবে ফাইভ স্টার হোটেলে। নেতাদের গাড়িবহর হবে ১০০টি গাড়িতে। দলের জনসভায় লোক আনানো হবে রেলগাড়িতে।

জনসভার জন্যও কোনো সীমারেখা নেই। মাঠ-ময়দান, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল চত্বর সবই বৈধ। রাজনৈতিক দলগুলোর অঢেল টাকা। তার কিছুটা সভা-সমিতিতে হেড কাউন্ট বাড়াতে খরচ হবে, সেটাই স্বাভাবিক।

১৯ জুলাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহাসমাবেশ উপলক্ষে বাইরে থেকে সমর্থকদের ঢাকায় আনার জন্য চার জোড়া বিশেষ ট্রেন ভাড়া করা হয়েছিল। ইসলামী আন্দোলনও গাড়ি ও লঞ্চ ভাড়া করে বাইরে থেকে লোক এনে ইদানীং ঢাকায় সভা করেছে। আমির আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘সারা দেশ থেকে কয়েক হাজার গাড়ি রিজার্ভ করা হয়েছে।’

আগে ছাত্ররা সভা করত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায়। বটতলায় সমাবেশ করাটাই ছিল তাদের গর্ব। একুশে যেত শহীদ মিনারে। এখন ছাত্রদের দলগুলো রাজনৈতিক দলগুলোকে পাল্লা দিচ্ছে। বাস-ট্রেন ভাড়া করে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ‘ছাত্র’ আনছে তাদের ‘ছাত্রসভায়’ যোগ দিতে।

জনসমর্থন দেখাতে রাজধানীতে ৩ জুলাই ছাত্রদল ও এনসিপির পৃথক সমাবেশ হয়েছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে, জনসভায় হেড কাউন্ট বাড়াতে ছাত্রদল চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত ২০ বগির বিশেষ ট্রেন ভাড়া করেছে।

প্রথম আলোর খবরে প্রকাশ, ঐতিহাসিক জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ অনুষ্ঠানে সারা দেশ থেকে ছাত্র-জনতা আনতে আট জোড়া ট্রেন ভাড়া করেছে সরকার। এসব ট্রেনে করে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ছাত্র-জনতাকে ৫ আগস্ট ঢাকায় নিয়ে আসার কর্মসূচি নেওয়া হয়। আট জোড়া ট্রেনের জন্য প্রায় ৩০ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও দেশের সব টিভি চ্যানেলে এই অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে, তবু বাইরের থেকে লোক আনতে হয়েছে। কারণ, সরকারের প্রয়োজন হেড কাউন্ট।

রাজনীতির আরেকটা হেড কাউন্টের বর্ণনা আশা করি এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। কিছু রাজনৈতিক দলের সভায় এই হেড কাউন্ট সবার চোখে পড়বে—স্টেজের ব্যানারে একটা ফ্যামিলি ট্রি-এর ছবি। বিএনপির ব্যানারে হেড কাউন্ট থাকে তিন—জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান। আওয়ামী লীগের ব্যানারে হেড কাউন্ট দুই—শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনা; তৃতীয়জন তারা এখনো ঠিক করে উঠতে পারেনি।

এক শ বছর পরে, এই দল দুটির ব্যানারে ফ্যামিলি ট্রি আরও বড় হবে, হেড কাউন্টও স্বভাবত আরও অনেক বাড়বে!

যুক্তরাষ্ট্রে খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও তাঁর রিপাবলিকান পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কে, তা বলতে পারবেন কি না, সন্দেহ আছে। কারণ, ওদের ব্যানারে কোনো ফ্যামিলি ট্রি নেই।

একক হেড কাউন্টের বিষয়টাও এখন বলা যেতে পারে। শেখ হাসিনার সময় টিভি স্ক্রিনের ওপরের বাঁ দিকের কোনায় শেখ মুজিবের একটা মাথার ছবি প্রায়ই দেখা যেত বছরের প্রায় দশটা মাস। স্বাধীনতা দিবস, ৭ মার্চ, মৃত্যুদিবস, জন্মদিবস, বিজয় দিবস, পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগমন দিবস ইত্যাদি সব দিবসে মাসব্যাপী অনুষ্ঠান থাকত। এই একক হেড কাউন্টটা শেখ মুজিবের মর্যাদা বাড়াতে কোনো সাহায্য করেনি।

এখন ইন্টারনেট-যুগে আমাদের শহরে গ্রামে প্রায় প্রতিটি জায়গায় ইন্টারনেট সংযোগ আছে। আমাদের জাতীয় দলের একজন বড় নেতা লন্ডনে বসে প্রায় প্রতিদিন বাংলাদেশে তাঁর সমর্থক ও দলীয় নেতাদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়ালি কথা বলছেন। ঢাকার জনসভায়ও তিনি ভার্চ্যুয়ালি যোগ দিয়েছেন।

সুতরাং সশরীর হাজির হয়ে দলের হেড কাউন্ট বাড়াতে হবে, এই যুগে এ ধারণাটা অচল। হেড কাউন্ট বাড়াতে সভাস্থল থেকে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগ স্থাপন করা যেতে পারে। যার যত সংযোগ এবং প্রতি সংযোগের স্ক্রিনে যত লোক দেখছেন, তার তত হেড কাউন্ট।

রাজনৈতিক দলগুলো ভাড়া করা গাড়িতে বাইরের থেকে লোকজন নিয়ে এসে আরও বড় প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারেন। যদি কোনো অর্বাচীন প্রশ্ন করে বসেন—বাইরের থাকে আনা লোকগুলোও কি ভাড়াটে? আড়াই কোটি লোকের শহরে হেড কাউন্ট দেখাতে, তাদের শহরের বাইরের থেকে লোক আনতে হবে কেন?

আজকাল আমাদের রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতারা প্রায় সবাই পুরোমাত্রায় ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে গেছেন। নেতাদের আগের দিনের মতো ঢাকার বাইরে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে সভা-সমিতি করতে দেখা যায় না। সেটাও একটা কারণ হতে পারে ঢাকার সভার হেড কাউন্ট বাড়ানোর। নেতারা যাবেন কেন জনগণের কাছে, জনগণকেই আসতে হবে তাঁদের কাছে! জনগণ হলো রাজনৈতিক দলের হেড কাউন্ট।

* সালেহ উদ্দিন আহমদ, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- ই-মেইল: salehpublic711@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে একটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশ
রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে একটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশ। প্রতীকী ছবি

পুকুরের মাছকে প্রতিদিন খাওয়ানো হয় পাঁচ হাজার কেজি মরিচ

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টঃ চীনের দক্ষিণাঞ্চলে মাছের একটি পুকুরের খবর এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। পুকুরের মালিক জানিয়েছেন, তিনি প্রতিদিন তাঁর পুকুরের মাছকে নানা ধরনের পাঁচ হাজার কেজি মরিচ খাওয়ান। তাঁর দাবি, এতে মাছগুলো দেখতে আরও চকচকে হয় এবং স্বাদেও ভালো লাগে।

পুকুরটি চীনের হুনান প্রদেশের চাংশায় অবস্থিত। এই এলাকা চীনের ঝাল খাবারের জন্য বিখ্যাত। সম্প্রতি এই পুকুরের মাছকে মরিচ খাওয়ানোর ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে এটি ভাইরাল হয়ে যায়।

পুকুরটি দেখভাল করেন ৪০ বছর বয়সী মাছচাষি জিয়াং শেং ও তাঁর স্কুলজীবনের বন্ধু কুয়াং কে।

কুয়াং বলেন, পুকুরটির আয়তন প্রায় ১০ একর। এখানে দুই হাজারের বেশি মাছ আছে। এসব মাছকে নিয়মিত নানা ধরনের মরিচ খাওয়ানো হয়।

পুকুরের মালিক বলেন, ‘এসব মাছকে আমরা দিনে প্রায় পাঁচ হাজার কেজি মরিচ খাওয়াই। এতে মাছের শরীরের গঠন আরও সুন্দর হয়, স্বাদ উন্নত হয়। আঁশগুলো ঝকঝকে সোনালি রঙের মতো দেখায়।’

কুয়াং আরও বলেন, ‘শুরুর দিকে মাছ মরিচ খেতে চাইত না। কিন্তু যখন ঘাস আর মরিচ একসঙ্গে দিই, তারা ঘাস না খেয়ে মরিচই খেতে পছন্দ করছে। আমরা ঝাল খেলে পানি খাই। তারা তো পানিতেই থাকে, তাই ঝাল লাগলে বেশি পানি খেয়ে নেয়।’

জিয়াং ব্যাখ্যা করে বলেন, মানুষের মতো মাছের স্বাদগ্রহণের ক্ষমতা নেই। তারা মূলত ঘ্রাণের মাধ্যমে খাবার চেনে। তাই মরিচের ঝাল তাদের সমস্যা হয় না।

কুয়াং বলেন, বিক্রি হয়নি বা নষ্ট হতে চলেছে, এমন মরিচ তাঁরা স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে বিনা মূল্যে পান। এতে খরচ কমে এবং ঘাস চাষের ঝামেলাও করতে হয় না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একজন ব্যবহারকারী মজা করে লিখেছেন, মাছ এখন মানুষের মতো হয়ে যাচ্ছে। কিছু জায়গায় মানুষই এত মরিচ খেতে পারে না।

আরেকজন লিখেছেন, ‘এ যেন আগে থেকেই মসলা মাখানো মাছ। শুধু সামান্য সিচুয়ান মরিচ, আদা, রসুন আর পেঁয়াজকুচি দিলেই দেখতে যেমন সুন্দর হবে, খেতেও তেমন স্বাদ হবে।’

মরিচ

ইসরাইলকে এক হাত নিলেন জেডি ভ্যান্স: ‘সব সমস্যার সমাধান শুধু হত্যা করেই করা যায় না’

ইসরাইলকে এক হাত নিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি ইরানের সাথে করা চুক্তিকে অবজ্ঞা করার জন্য নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানানো ইসরাইলি মন্ত্রীদের তীব্র ভর্ৎসনা করেছেন। ইসরাইলি কর্মকর্তা ও যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইল পন্থী দলগুলোর সমালোচনার জবাবে তিনি কঠোর বার্তা দেন।

ইসরাইলকে এক হাত নিয়ে তিনি বলেন, ‘সব সমস্যার সমাধান শুধু হত্যা করেই করা যায় না’। একই সাথে তিনি জোর দিয়ে বলেন, চূড়ান্ত চুক্তি ছাড়া ইরান কোনো ছাড় পাবে না। হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে নতুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার সময় তিনি উগ্র-ডানপন্থী মন্ত্রিসভার সদস্যদের বিরুদ্ধে আমেরিকার সমর্থনের প্রতি কৃতজ্ঞতা না থাকার অভিযোগ তোলেন।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি ডাকনাম ব্যবহার করে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আপনারা বিবির মন্ত্রিসভার কিছু মানুষকে দেখেছেন, যারা সামনে এসে এই চুক্তির সমালোচনা করেছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে খুব ব্যক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ওপর আক্রমণ চালিয়েছেন। তবে নেতানিয়াহুকে তিনি তার এই প্রকাশ্য ক্ষোভ থেকে ছাড় দিয়েছেন।

ইসরাইলকে কঠোর বার্তা দিয়ে ভ্যান্স বলেন, প্রথমত, ডনাল্ড ট্রাম্পই বর্তমান সময়ে সমগ্র বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান যিনি ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূতিশীল। এবং তিনি বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তির রাষ্ট্রপ্রধান। আমি যদি ইসরাইল সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকতাম, তবে পুরো বিশ্বে আমার একমাত্র শক্তিশালী যে মিত্র অবশিষ্ট আছে, আমি হয়তো তার ওপর আক্রমণ করতাম না। তিনি আরও বলেন, অন্য যে বিষয়টি আমি বলব তা হলো, গত তিন মাসে আপনাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করা প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের তিন ভাগের দুই ভাগই তৈরি হয়েছে আমেরিকানদের হাতে এবং সেগুলোর খরচ জোগানো হয়েছে আমেরিকান করদাতাদের ডলারে।

ভ্যান্স উপসংহার টেনে বলেন, ইসরাইলের সমস্যা ডনাল্ড ট্রাম্প নন। ইসরাইলের কেউ যদি মনে করে থাকেন যে তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, তবে তাদের বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতি অনুধাবন করা উচিত। ভ্যান্সের এই মন্তব্যগুলো মূলত ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভিরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। নেতানিয়াহুর এই উগ্র-ডানপন্থী সহযোগীরা উভয়েই ইসরাইলকে এই চুক্তির শর্তগুলো উপেক্ষা করার আহ্বান জানান এবং এটিকে দেশের নিরাপত্তার জন্য একটি হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন।

লেবাননে উভয় পক্ষকেই তাদের চুক্তির শর্ত মেনে চলতে হবে: লেবানন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে ভ্যান্স বলেন যে, তিনি এখনো সেখানে ইসরাইল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে কিছু সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন, তবে তিনি আশা করেন উভয় পক্ষই চুক্তিটি মেনে চলবে। তিনি বলেন, আমরা আশা করি হিজবুল্লাহ ইসরাইলিদের লক্ষ্য করে রকেট এবং ড্রোন হামলা চালাবে না। তবে আমরা এটাও আশা করি যে, ইসরাইলিরাও লেবাননে বেপরোয়া আচরণ করবে না। উভয় পক্ষকেই তাদের চুক্তির শর্ত মেনে চলতে হবে। পরে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, আমরা লেবানন, হিজবুল্লাহ এবং ইসরাইলসহ সব ফ্রন্টে একটি সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি আশা করি।
সূত্র: টাইমস অব ইসরাইল

দক্ষিণ লেবাননে চার ইসরাইলি সেনা নিহত
ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে লড়াইয়ের সময় তাদের ৪ সেনা নিহত হয়েছে। সেনাবাহিনী নিহত চারজনের মধ্যে একজনের পরিচয় প্রকাশ করেছে। তিনি হলেন লেফটেন্যান্ট ডর গেদালিয়া বেন সিমহন (৩২), যিনি ৫২তম ব্যাটালিয়ন এবং ৪১তম ব্রিগেডের কমান্ডার ছিলেন। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকে হামলা বন্ধের আহ্বান জানানো সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহ সদস্য এবং তাদের অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানায় ইসরাইলের সেনাবাহিনী। এক বিবৃতিতে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বিভাগ (আইডিএফ) রাতভর দক্ষিণ লেবাননে অসংখ্য হামলা চালানোর কথা স্বীকার করেছে এবং বলেছে, হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাবেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে তাদের নিজেদের সেনাও হারাতে হচ্ছে যুদ্ধের ময়দানে।