Friday, February 12, 2016

শাম্মির ‘কিস ইভেন্ট’

নতুন ধরণের হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করেছেন ব্লগার শাম্মি হক। বর্তমানে জার্মানিতে অবস্থানরত এ ব্লগার অভিযোগ করে বলেছেন, বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে একটি ইভেন্টের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ ইভেন্টের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে একটি বিমান টিকেট কাটা হবে। তারপর কাউকে জার্মানিতে পাঠানো হবে তাকে ধর্ষণ করতে! শাম্মি নিজে এ অভিযোগের কথা জানিয়েছেন টাইমস অব ইন্ডিয়া’র কাছে।
শাম্মি আক্তার ইস্টিশন.কমে ব্লগিং করেন। সম্প্রতি, তিনি ও তার পার্টনার ব্লগার অনন্য আজাদ সম্প্রতি ‘কিস অব লাভ’ নামে একটি ফেসবুক ইভেন্ট খুলেছেন। ইভেন্টে অংশগ্রহণকারী যুগলদের ঢাকায় ভালোবাসা দিবসে প্রকাশ্যে পর¯পরকে চুমু খাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে!
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, শাম্মি ও অনন্য আজাদ ‘ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে’ এ ইভেন্টে যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তরুণ-তরুণীদের। জার্মানি থেকে শাম্মি লিখেছেন, ভালোবাসা দিবসে, নিজেদের ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতে চাওয়া জুটিদের হয়রানি করতে পুলিশ বাড়াবাড়ি করে। প্রেমিক-যুগলদের ওপর হয়রানি এতটাই বেশি হয় যে, তারা এ দিন হাতে হাত ধরেও হাঁটতে পারেন না। আমরা শুনেছি যে, ভারতে কোন যুগল প্রকাশ্যে চুমু খেলে তারা গ্রেপ্তার হয়ে যেতে পারে। ভালোবাসার প্রকাশ ঘটানোর বিরুদ্ধে সব পদক্ষেপের প্রতিবাদে, আমরা ভালোবাসা দিবসে প্রকাশ্যে চুমু খেতে যুগলদের আহ্বান জানিয়েছি।
তবে তিনি নিজেই যখন ঢাকায় নেই, তখন এ ধরণের ইভেন্ট আয়োজন ও সফল করা কঠিন নয় কি? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি জার্মানিতে গিয়েছি বাধ্য হয়ে। আমি নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যেতে চাই বলেই, আমি এখানে বাস করছি।’ তার মতে, তার বর্তমান ঠিকানায় বসবাসের বিষয়টি ঢাকায় এ নতুন আন্দোলন পরিচালনায় বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। তিনি বলেন, ‘আমার এখনও অনেক বন্ধু আছে বাংলাদেশে, যারা বিভিন্ন আন্দোলনের সঙ্গে স¤পৃক্ত। তাদের সঙ্গে কথা বলা শেষে, আমি এ ইভেন্ট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার বন্ধুরা এ ইভেন্ট পালন করবে। অনন্য ও আমি অনলাইনে আমাদের কাজ সারছি।’
শাম্মি এ ইভেন্টে তার শারীরিক উপস্থিতির গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। ‘কিন্তু যে ধরণের হুমকি আমরা এখন পাচ্ছি, আমাদের জন্য দেশে ফিরে যাওয়া অসম্ভব। তারপরও আমি চেষ্টা করেছি ফিরে যেতে। কিন্তু এখন, আমি ভীত। নারী হওয়ায় অন্যদের চেয়ে আমি অনেক বেশি হুমকি পাই। আগে আমার ইনবক্সে হুমকি দেয়া হতো। এখন আমাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেয়া হয়। এক ব্যক্তি আমার মাথার বিনিময়ে ১০ লাখ রুপি সমমূল্যের অর্থ দেয়ার কথা ঘোষণা দিয়েছে!’, জানালেন শাম্মি।
আরও ভীতিজনক হুমকি হলো, এক রাজনৈতিক নেতা একটি অর্থ আদায়ের ইভেন্ট খুলেছেন। সেখান থেকে সংগৃহীত অর্থে কাউকে জার্মানি পাঠানো হবে। ‘তারা একটি টিকেট কেনার জন্য অর্থ সংগ্রহ করছে। যাতে করে আমাকে ধর্ষণের জন্য জার্মানিতে কাউকে পাঠানো যায়! এটা ভয়াবহ! কিন্তু আমি আমার লেখালিখি ছাড়ব না। আমি জার্মানিতে নিরাপদ বোধ করছি। এখান থেকেই আমি লেখালেখি অব্যাহত রাখবো,’ বললেন তিনি।
শাম্মি আরও বলেন, ঢাকা, আর দেশে নিজের পরিবার ও বোনের সঙ্গে ঝগড়ার কথা ভাবলেই তার চোখ ভিজে উঠে। বলে যান শাম্মি, ‘আমি কীভাবে ভুলবো আমার হোটেল থেকে চুপিসারে বেরিয়ে অনন্যের সঙ্গে পলাশি মোড়ে চা খাওয়ার কথা? কিংবা কোন হরতালের দিনে আমার স্কুটি মোটরসাইকেলে অনন্যকে চড়িয়ে সারা শহরে ঘুরে বেড়ানোর কথা? এখন আবার বইমেলা চলছে। আমি পাগলের মতো একে মিস করি।’ প্রসঙ্গত, ব্লগার অনন্য আজাদও ক্রমাগত হুমকির মুখে কয়েক মাস আগে জার্মানি পাড়ি দিয়েছেন। তিনি লেখক হুমায়ুন আজাদের ছেলে।
বিয়ে স¤পর্কেও কথা বলেন শাম্মি। তার মতে, ভালোবাসা হলো বিশ্বাসের বস্তু। বিয়ে করলেই সঙ্গীর প্রতি বিশ্বাস স্থাপিত হয় না। বিয়ের ধারণাতে তার বিশ্বাস নেই। কারণ, বিয়েতে কেবল দু’ জন মানুষ একটি কাগজে স্বাক্ষর করেন। তার প্রশ্ন, একটি স্বাক্ষরের মাধ্যমেই কি সঙ্গীর সঙ্গে আস্থা ও বিশ্বাসের স¤পর্ক সৃষ্টি হয়ে যায়?
ইভেন্ট স¤পর্কে শাম্মি বলেন, কলকাতা থেকেও তরুণদের সমর্থন পাচ্ছেন তিনি। ‘জাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দারুণ। তারা আমাকে গ্রহণ করেছে। তারা এ-ও জানিয়েছে কীভাবে তারা এ আন্দোলন কলকাতায় শুরু করার সময় সমস্যায় পড়েছে। তাদের আন্দোলনের ভিডিও তারা আমাকে পাঠিয়েছে,’ জানান শাম্মি।
যেহেতু ঢাকার ইভেন্টে তারা উপস্থিত থাকতে পারছেন না, সেহেতু তারা ভ্যালেন্টাইন্স ডে’তে কী করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, অনন্যের সঙ্গে ১৪ই ফেব্রুয়ারিতে একটি ‘কিস ফটো’ ফেসবুকে আপলোড করার চিন্তা আছে তার মাথায়!

সিরিয়ায় রক্তসাগরের জন্য দায়ী যুক্তরাষ্ট্র : এরদোগান

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েব এরদোগান বলেছেন, সিরিয়ার বর্তমান ‘রক্ত সাগরে’র জন্য দায়ী ওয়াশিংটন। এর আগে রাশিয়া বা অন্যান্য শত্রুভাবাপন্ন দেশকে নিয়ে কড়া মন্তব্য করলেও এই প্রথম তার সমালোচনার মুখে পড়লো ন্যাটোভুক্ত মিত্রদেশ যুক্তরাষ্ট্র। এ খবর দিয়েছে সিএনএন।
এরদোগানের বক্তব্য, আইএস ছাড়াও অন্যান্য গোষ্ঠীর দ্বারা সৃষ্ট বিপদের ভয়াবহতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে, সিরিয়ান কুর্দি যোদ্ধাদের সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা না দিয়ে, উল্টো সামরিক সহায়তা দেয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
ক্ষুদ্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি (যুক্তরাষ্ট্রকে) অনেকবার বলেছি, তোমরা কি আমাদের সঙ্গে আছ, নাকি সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে?’
এরদোগানের মুখে ওয়াশিংটনের এমন সমালোচনা চোখে পড়ার মতো। যদিও, কুর্দিদের প্রতি তার দেয়া সমালোচনামূলক বক্তব্য নতুন নয়। বেশ কয়েক দশক ধরেই আঙ্কারার চোখে শত্রু হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে সিরিয়ার জাতিগত এ সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে সহিংসতাকে বেছে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে সংগঠনটির বিরুদ্ধে। আঙ্কারা বর্তমানে এ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়ছে। দেশটিতে কুর্দি গোষ্ঠিটিকে সত্যিকার হুমকি হিসেবে দেখা হয়। তুরস্কের মিত্ররাষ্ট্রসমূহ এ লড়াইয়ে তেমন জড়িত ছিল না। কিন্তু সিরিয়ায় আইএস’র উত্থাণের ফলে সব সমীকরণ পাল্টে গেছে। কারণ, আইএস-বিরোধী লড়াইয়ে স্থলপথে এ বাহিনীকে এখন কাজে লাগাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ক্ষোভ এরদোগানের।
সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জন কিরবি বলেন, আমাদের মিত্র দেশসমূহের সঙ্গে আমরা সবসময় একমত হতে পারি না। সিরিয়ায় আইএস-বিরোধী লড়াইয়ে সবচেয়ে কার্যকর বাহিনীর অন্যতম কুর্দি যোদ্ধারা। আমরা তাদের সহায়তা দিয়েছি। আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।
জন কিরবির এ বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পেটের ভেতর ইয়াবা! by আসাদুজ্জামান

অভিনব উপায়ে টেকনাফ থেকে ইয়াবা আনা হচ্ছে ঢাকায়। স্কচটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে ইয়াবা কলার মধ্যে ঢোকানো হয়। পরে ওই কলা গিলে খেয়ে ঢাকায় চলে আসেন পাচারকারীরা।
সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া দুই নারী শুক্রবার আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ কথা জানিয়েছেন। এই দুজনের পেট থেকে মোট এক হাজার ৮৫০টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক আজিজুল ইসলাম বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন।
মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ২৬ জানুয়ারি রাজধানীর মতিঝিল এলাকার শতাব্দী টাওয়ারের সামন থেকে দুই নারীকে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। পরে তাঁদের স্বামীবাগের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে এক্স-রে করানো হয়। সেখানেই ধরা পড়ে, এই দুজনের পেটে ইয়াবা রয়েছে। পরে তাঁদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের সহায়তায় দুই দিনে ওই দুই নারীর পায়খানার সঙ্গে ৭৪টি ইয়াবার প্যাকেট বের হয়। প্যাকেট থেকে সর্বমোট এক হাজার ৮৫০ টি ইয়াবা জব্দ করা হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিদর্শক বীথি চ্যাটার্জি প্রথম আলোকে বলেন, পেটের মধ্যে করে ইয়াবা আনার কথা আদালতের কাছে স্বীকার করেছেন এই দুই নারী। জবানবন্দি রেকর্ডের পর তাঁদের কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।
জবানবন্দিতে এই দুই নারী বলেছেন, ইয়াবার মালিক টেকনাফের ইয়াবা ব্যবসায়ী লালু ও আলেয়া। প্রথমে ইয়াবাগুলো স্কচটেপ দিয়ে মুড়িয়ে কয়েকটি প্যাকেট করেন। পরে এগুলো কলার মধ্যে ঢোকানো হয়। এরপর ওই কলা গিলে খান। এভাবেই ইয়াবা টেকনাফ থেকে ঢাকায় আনেন। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে অভিনব এই পদ্ধতিতে ইয়াবা এনেছেন বলে তাঁরা বিচারকের কাছে স্বীকার করেছেন। ইয়াবার চালান আনার জন্য তাদের পাঁচ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ছিল।
আদালত চত্বরে দাঁড়িয়ে দুই নারীর একজন প্রথম আলোকে বলেন, অভাবের সংসার। বাধ্য হয়ে পেটের মধ্যে করে ইয়াবা আনতে চেয়েছিলাম। তাই ধরা পড়েছি। একই কথা বলেন অন্য নারীও।

সিরিয়ায় নিহত ৪ লাখ ৭০ হাজার -যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে প্রতিবেদন

সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বাহিনী ও বিদ্রোহীদের মধ্যে প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ। এই সংখ্যা জাতিসংঘ ঘোষিত সংখ্যার দ্বিগুণ। এর বাইরে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৪৫ শতাংশ সিরীয়। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
সিরিয়া যুদ্ধে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সিরিয়ান সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের (এসসিপিআর)’ একটি প্রতিবেদনে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের বিভীষিকায় পড়ে সিরিয়ার জাতীয় সম্পদ ও অবকাঠামো প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। নিহত হয়েছে ৪ লাখ ৭০ হাজার লোক। দেড় বছর আগে পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এ ব্যাপারে জাতিসংঘ যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছিল এটি তার প্রায় দ্বিগুণ। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ সংখ্যা আড়াই লাখ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাকল্যে সিরিয়ার জনগণের সাড়ে ১১ শতাংশই নিহত বা আহত হয়েছে। ‘আরব বসন্ত’ নামে পরিচিত স্বৈরাচারবিরোধী তথাকথিত গণ-অভ্যুত্থানের জোয়ার সিরিয়াতেও এসে লাগে ২০১১ সালে। ওই বছরের মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছরে এই জোয়ারের সুফল না মিললেও এই সময়ে হতাহত হয়েছে বিরাটসংখ্যক জনগোষ্ঠী।
প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট করে আহত ব্যক্তির সংখ্যা বলা হয়েছে ১৯ লাখ। যুদ্ধ শুরুর আগে ২০১০ সালে সিরিয়ার মানুষের গড় আয়ু যেখানে ছিল ৭০ বছর, সেটাই ২০১৫ সালে নেমে দাঁড়ায় ৫৫ বছর ৪ মাসে। দেশটির অর্থনীতির সার্বিক ক্ষতির পরিমাণও নিতান্ত কম নয়, আনুমানিক ২৫ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার।
এসসিপিআরের মতে, নিহত ৪ লাখ ৭০ হাজার লোকের মধ্যে প্রায় ৪ লাখই মারা গেছে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ সহিংসতার শিকার হয়ে। বাকি ৭০ হাজার মারা গেছে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধের ঘাটতিতে, সংক্রামক ব্যাধিতে, খাবার ও পানির অভাবে। পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা ও নিরাপদ থাকার স্থানের অভাবও মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
প্রতিবেদনের মূল রচয়িতা রাবি নাসের গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘যথাযথ পদ্ধতি অবলম্বন করে এই গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। তাই নিহত বা আহত ব্যক্তিদের সংখ্যার ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত। ভবিষ্যতে পরোক্ষভাবে মৃত্যুর হার আরও বাড়বে।’
রাবি আরও বলেন, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তথ্য সংগ্রহের সুযোগে ঘাটতি থাকার কারণে জাতিসংঘের পরিসংখ্যানে প্রকৃত প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি উঠে আসেনি, যেটা এ গবেষণা প্রতিবেদনে এসেছে।
নিহত সিরীয়দের ওই বিপুল সংখ্যা এমন এক সময়ে উদ্ঘাটিত হলো, যখন আলেপ্পোর পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আশঙ্কা অনেক বেড়ে গেছে। রুশ বিমান হামলা ও ইরানি মিলিশিয়াদের সহায়তায় আলেপ্পো অভিমুখে বাশার বাহিনীর অগ্রযাত্রার প্রেক্ষাপটে বৃহত্তম এই সিরীয় শহর একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। শহরটির নিয়ন্ত্রণকারী সিরীয় বিদ্রোহী বাহিনী এখানকার আটকে পড়া হাজার হাজার বাসিন্দার সহায়তায় দ্রুত এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস গত বুধবার বলেছে, সিরিয়ার উত্তরে লড়াই তীব্রতর হওয়ায় অর্ধলক্ষ লোক নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালিয়ে গেছে। তাদের খাবার ও পানি দরকার।
এই অবস্থার মধ্যে মিউনিখে গতকাল বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ এক বৈঠকে বসার কথা ছিল। সিরিয়ায় রক্তপাত বন্ধের লক্ষ্যে গৃহীত আন্তর্জাতিক শান্তি আলোচনার উদ্যোগ সম্প্রতি অচলাবস্থায় পড়ার প্রেক্ষাপটে দুই নেতার এ বৈঠকের দিকে তাকিয়ে আছেন অনেকে। জাতিসংঘ-সমর্থিত জেনেভা শান্তি আলোচনা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে সিরিয়াবিষয়ক নীতিতে বড় পরিবর্তন না আনলে সেটাও সম্ভব হবে না বলে মনে করা হচ্ছে।

ক্রসফায়ারে বিচার বিভাগ? by ডক্টর তুহিন মালিক

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধান বিচারপতির সাক্ষাৎ
এক. বেশ ক’দিন ধরে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং সদ্য অবসরপ্রাপ্ত আপিল বিভাগের বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের মধ্যে চলা বাকযুদ্ধ যেন থামতেই চাচ্ছে না। দুই পক্ষের এই বাকযুদ্ধে ইতোমধ্যেই মারাত্মক হতাহত হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি (ত্রয়োদশ সংশোধনী) বাতিলের রায়ের বৈধতার প্রশ্নটি। আরো হতাহত হয়েছে সংবিধানের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিলের রায়সহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী, দশম পার্লামেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈধতা পর্যন্ত। এমনকি এতে করে পুরো বর্তমান সরকারের সাংবিধানিক অবৈধতাও আজ জনমনে স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। আর দু’পক্ষের এই ক্রসফায়ারে সরাসরি নিহত হয়েছে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের অবসর গ্রহণের ১৬ মাস পর লেখা তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বাতিলের রায়টি। কিন্তু তাতেও যেন ক্ষান্ত হচ্ছে না। এর সাথে প্রায় প্রতিদিনই যেন বিচার বিভাগে নতুন নতুন সঙ্কটের জন্ম দিয়ে চলেছেন সদ্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। অবসরে যাওয়ামাত্রই তিনি নিত্যদিন হরেক রকমের সভা, সেমিনার, টকশোয়ে গিয়ে বর্তমান প্রধান বিচারপতিকে শান্তি কমিটির সদস্য থেকে শুরু করে রাজাকার বলে ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছেন। এমনকি বর্তমান প্রধান বিচারপতিকে তিনি খালেদা জিয়ার প্রধান মুখপাত্র বলেও দাবি করছেন। অবসরের সাথে সাথেই বিচারপতি মানিক খালেদা জিয়ার বাসভবন ঘেরাও করেছেন। খালেদা জিয়াকে রাজনীতি ও দেশ থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্নের রাজনৈতিক স্লোগানও দিয়েছেন। অথচ তখনো তার হাতে ৬৮টি মামলার রায় অলিখিত অবস্থায় জমা পড়ে আছে।
দুই. অন্য দিকে, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা তার মেয়াদের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে লিখিত বিবৃতিতে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেন, ‘অবসরের পর বিচারপতিদের লেখা রায় বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থী’। তিনি আরো বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা বাংলাদেশের সংবিধান, আইনের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ গ্রহণ করেন। কোনো বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর তিনি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে গণ্য হন বিধায় তার গৃহীত শপথও বহাল থাকে না। আদালতের নথি সরকারি দলিল। একজন বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর আদালতের নথি নিজের কাছে সংরক্ষণ, পর্যালোচনা বা রায় প্রস্তুত করা এবং তাতে দস্তখত করার অধিকার হারান।’ বিচারপতি মানিক এতে আরো যেন ক্ষেপে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণের গাছতলায় প্রেস কনফারেন্স করে প্রধান বিচারপতিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বক্তব্য দেন। জবাবে প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টের অনুমতি ছাড়া কোর্ট প্রাঙ্গণে সব ধরনের প্রেস কনফারেন্স নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় মানিক সাহেব প্রধান বিচারপতির সব নির্দেশ অমান্য করার প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে উল্টো বরং প্রধান বিচারপতিকেই হুমকি দিয়ে সতর্ক করেন।
তিন. এর মধ্যে গত পরশু সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমীন চৌধুরী বলেন, ‘বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বিচার বিভাগ ও সুপ্রিম কোর্টের সর্বনাশ করছেন। বিচারপতি মানিক তার আচরণে প্রমাণ করেছেন যে, তিনি হতাশাগ্রস্ত, উন্মাদ।’ বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদে থাকা সাবেক একজন প্রধান বিচারপতি যদি একজন বিচারককে উন্মাদ বলে সাব্যস্ত করেন, তাহলে সেই ‘উন্মাদ’ বিচারকের লেখা সংবিধান সংশোধনী বাতিলের রায় কতটা বৈধ বলে গণ্য হবে? অন্য দিকে, বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বরাবরই প্রকাশ্যে গণমাধ্যমে বলে আসছেন, ‘আমি মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি মামলার রায় দিয়েছি। জামায়াত নেতা সাঈদীকে তো আমি ছাড়া আর কেউ ফাঁসি দেয়নি।’ বিচারপতি মানিক ২০১৫ সালের ১ অক্টোবর অবসরে গিয়ে ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় জমা দিয়ে মাওলানা সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। বিচারপতি মানিক অবসরে গিয়ে এই তিন মাসের মধ্যেই মিডিয়া, টকশো, মিটিং, মিছিল করে প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন, তিনি রাজনৈতিক দলের নেতা এবং একমাত্র তিনিই মাওলানা সাঈদীকে ফাঁসি দিয়েছেন। এক দিকে তিনি রাজপথে মিছিল করে খালেদা জিয়ার বাড়ি ঘেরাও করছেন, অন্য দিকে তিনি মাওলানা সাঈদীর ফাঁসির রায় লিখছেন। এখন সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমীন চৌধুরীর সাব্যস্ত মতে, বিচারপতি মানিক যদি উন্মাদই হন, তাহলে অবসরে গিয়ে তার লেখা মাওলানা সাঈদীর ফাঁসির রায়ও বা কী করে বৈধ বলে গণ্য হবে? আর এমনিতেও তো বর্তমান প্রধান বিচারপতির বক্তব্য মতে, অবসরের পর বিচারপতিদের লেখা রায় বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থী।
চার. আসলে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক প্রধান বিচারপতি হওয়ার রেসে হেরে যাওয়ার পরপরই তার সাথে প্রধান বিচারপতির মধ্যে সাংঘাতিক সঙ্ঘাতের জন্ম নেয়। বিচারপতি মানিককে ব্রিটিশ নাগরিক উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি তার রায় লেখা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তার বেতন, পেনশন ও সব সুযোগ-সুবিধা বন্ধ রাখার আদেশ দান করেন। এ নিয়ে চিঠি, পাল্টা চিঠি, মানহানির অভিযোগ, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘন ও বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অযোগ্যতার অভিযোগ আনেন বিচারপতি মানিক। সবশেষে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রধান বিচারপতির অভিসংশন (অপসারণ) চেয়ে বিচারপতি মানিক চিঠি পর্যন্ত পাঠান, যা তখন সারা বিশ্বে বিরল একটি ঘটনারও জন্ম দেয়। তবে বেশ আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, রাষ্ট্রপতির কাছে প্রধান বিচারপতির অভিসংশন (অপসারণ) চেয়ে বিচারপতি মানিকের চিঠি বঙ্গভবনে পৌঁছার আগেই মিডিয়ার মাধ্যমে দেশবাসীর হাতে চলে এলে বিচার বিভাগের এই অন্দরকলহ মানুষের মুখে মুখে চলে আসে। শুধু তাই নয়, এর আগেও বিচারপতি মানিককে লেখা প্রধান বিচারপতি মহোদয়ের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের সব চিঠি এবং তার পাল্টা চিঠিগুলোও গণমাধ্যমসহ সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুতগতিতে চলে আসে। বিচারপতি মানিকের চিঠিগুলোয়ে বিচার বিভাগ ও প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য সর্বসাধারণ অবগত হওয়ায় এই চলমান অন্দরকলহ একসময় রূপ নেয় প্রকাশ্য যুদ্ধে। এতে মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, যেখানে বিচার বিভাগের গায়ে অবমাননার সামান্য অভিযোগে আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ছয় মাসের কারাদণ্ড মাথা পেতে নিতে হয়, সেখানে প্রধান বিচারপতিসহ পুরো বিচার বিভাগকে হাসি-তামাশায় রূপান্তর করেও কোনো অবমাননার অভিযোগ আনা হচ্ছে না কেন? কারণ বিচারপতি মানিক বিচারপতি থাকাকালে আওয়ামী লীগ সরকারের যেসব দলীয় এজেন্ডা আদালতের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেছেন, তা দলের ইতিহাসে কখনো কোনো প্রধান নেতাও এর আগে করে দেখাতে পারেননি। তাই বিচারপতি মানিকের খুঁটির জোর কোথায় তা আইন অঙ্গনের সবার জানা ছিল বলেই তিনি এখনো এতটা দুরন্ত, প্রতিরোধহীন। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল, আইনমন্ত্রী, বার কাউন্সিল কিংবা সুপ্রিম কোর্ট বারের নেতারা পর্যন্ত বুঝে গেলেন তাকে থামানো কঠিন। কিন্তু এতদিন পর এখন আস্তে আস্তে করে মুখ খুলছেন অনেকে। স্বয়ং আইনমন্ত্রী গত পরশু বিচারপতি মানিকের নাম শুনেই ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির এক আলোচনা সভায় তার অংশগ্রহণের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলেন। অ্যাটর্নি জেনারেলও দেখছি এখন চেষ্টা করছেন কিছুটা মুখ খোলার। কিন্তু এই মুখ খুলতে খুলতে যে বেলা পার হয়ে গেছে! বিচার বিভাগকে রক্তাক্ত করে তর্কযুদ্ধের ক্রসফায়ারের গুলি এখন যে সরকারের গায়েই গিয়ে বিঁধেছে।
পাঁচ. বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ নতুন কিছু নয়। গতবারের সংসদের ১৪তম অধিবেশনে তোফায়েল আহমেদসহ আওয়ামী লীগের একাধিক সিনিয়র নেতা বিচারপতি মানিককে সংসদে তুলোধনা করেছেন। তোফায়েল আহমেদ বিচারপতি মানিককে তখন ‘স্যাডিস্ট’ বলেও অভিহিত করেন। তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদ পর্যন্ত তখন বিচারপতি মানিকের বিরুদ্ধে রুলিং দিয়েছিলেন। স্পিকার তখন কটাক্ষ ভাষায় বলেছিলেন, ‘সাধারণ মানুষ বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে’। তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদ এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। আবার তার কাছেই বর্তমান প্রধান বিচারপতির অভিসংশন (অপসারণ) চেয়ে আবেদন করে রেখেছেন রুলিং পাওয়া সেই বিচারপতি মানিক। তার বিরুদ্ধে মারাত্মক মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ পর্যন্ত জমা দেয়া আছে। কিন্তু তার খুঁটির জোর এতই শক্ত যে, এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে শত অভিযোগ দাখিল করলেও কোনো কাজ হয়নি। বরং বিচারপতি থাকাকালে তিনি তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার রুল পর্যন্ত জারি করেছিলেন। দেশের অসংখ্য গুণী মানুষকে তিনি তার এজলাসে অপমানজনকভাবে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। রাস্তায় তার গাড়ি ট্রাফিক সিগনালের লাল বাতিতে আটকে দেয়ার অপরাধে ট্রাফিক পুলিশকে কান ধরে ওঠবস করিয়েছেন। পুলিশের আইজির পর্যন্ত চাকরি চলে যায় তাকে সম্মান না করার কারণে। অর্থাৎ, তার মানে, তিনি বিচারকের পদে থাকতেই তোফায়েল আহমেদের ভাষ্য মতে, ‘উন্মাদ’ ছিলেন। এখন তো সাবেক চিফ জাস্টিজও একই কথা বলছেন। তাই একজন ‘উন্মাদের’ দেয়া ফাঁসির আদেশ জনগণের চোখে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে তা সময়ই বলে দেবে। এরই মধ্যে গত বুধবার বিচারপতি মানিকের বিরুদ্ধে দুদকে তথ্য গোপনের অভিযোগ দায়ের করেছেন এক আইনজীবী। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি দ্বৈত নাগরিক হলেও বিচারপতি নিয়োগ পাওয়ার সময় কাগজপত্রে এর কোনো তথ্য দেননি, যা প্রচলিত আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আরেক আইনজীবী গত মঙ্গলবার বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে বিচারপতি মানিকের জাজশিপ প্রত্যাহারের আবেদনও জানান।
ছয়. সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমীন চৌধুরী স্পষ্টত বলে দিয়েছেন, ‘অবসরের পর রায়ের অর্ডার পোরশন পরিবর্তন করে লেখা রায় ফৌজদারি অপরাধ বলে গণ্য হবে’। এতে করে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের অবসর গ্রহণের ১৬ মাস পর লেখা তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বাতিলের রায়ের বৈধতাটি বড় ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে গেছে। কারণ, অবসরের ১৬ মাস পর তার লেখা পূর্ণাঙ্গ রায় আগের দেয়া মূল রায়ের মৌলিক অংশগুলোকে পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছিল। এই মামলার রায়ে প্রকাশ্য আদালতে ঘোষণা করা হয়েছিল, সংসদ চাইলে দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাখতে পারবে। কিন্তু অবসরের ১৬ মাস পর বিচারপতি খায়রুল হকের লেখা রায়ে এই দুই মেয়াদের অংশটি বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় লেখা হয়। আর এ কারণেই মানুষের মনোযোগের জায়গাটুকুও এতদিন পর কেবল এটুকুতেই সীমাবদ্ধ। বিচারকদের অবসরের পর লিখিত রায়গুলো বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থী হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বাতিলের রায়সহ সংবিধানের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিলের রায়গুলোও কি তাহলে বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থী বলে অবৈধ বিবেচিত হবে? অবসরের পর লিখিত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় কি বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থী বলে অবৈধ বিবেচিত হবে? বিচারপতিরা সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ গ্রহণ করেন বিধায় তারা যদি এভাবে সংবিধান পরিপন্থী রায় লেখেন, তাহলে তারাও কি সংবিধান লঙ্ঘনের অপরাধে অভিযুক্ত বলে গণ্য হবেন? আর সুপ্রিম কোর্ট যেহেতু সংবিধানের অভিভাবক; তাই প্রধান বিচারপতি তার ওপর অর্পিত সংবিধান সুরক্ষার দায়িত্ব পালনে কি এতদিন ব্যর্থ ছিলেন?
এসব বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থী রায়ের জন্য এতবড় জাতীয় বিপর্যয়, সহিংসতা, হানাহানি ও সঙ্কটের সৃষ্টি হলো তার দায়দায়িত্বই বা কে নেবে? আর দেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে তার সম্মতিতেই তো এক বছর ধরে অসংখ্য মামলার রায় বিচারকেরা অবসরে গিয়ে লিখেছেন, সেগুলোর দায়দায়িত্বই বা তিনি নেবেন কি-না? এতে সবচেয়ে বড় সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় অবৈধ বিবেচিত হলে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি তখন বৈধ বলে গণ্য হবে। পাশাপাশি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন, দশম সংসদ, প্রধানমন্ত্রীসহ বর্তমান সরকার- সবই বেআইনি ও অসাংবিধানিক বলে গণ্য হবে। অনিবার্যভাবেই সংবিধান লঙ্ঘনের দায়ে বড় ধরনের বিপর্যয় ও ভয়াবহ সঙ্কটের মুখে পড়বে রাষ্ট্রের প্রথমসারির গুরুত্বপূর্ণ সব ব্যক্তি। এতে সরকারের জন্যও বড় ধরনের বিপর্যয় অপেক্ষারত। দেশের মানুষ তো বটেই, বহির্বিশ্বে সরকারের বৈধতা নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়বে। নিরপেক্ষব্যবস্থায় সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়তে হবে সরকারকে। ভবিষ্যৎ সরকারও বড় ধরনের রসদ পেয়ে গেল সংবিধান লঙ্ঘনের দায়ে বর্তমান শাসকদের বিচারের মুখোমুখি করার।
শীর্ষ নিউজ, ঢাকা : ‘অবসরের পর রায় লেখা সংবিধান পরিপন্থি’ এ সংক্রান্ত প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এ বি এম নুরুল ইসলাম।
সুপ্রীম কোর্টের ল’ রিপোর্টার্স ফোরামে সাংবাদিকদের কাছে এ মন্তব্য করেন তিনি।
আইনজীবী এ বি এম নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের প্রধান বিচারপতি প্রথমদিন যে কথাটি বলেছেন তা ঠিকই বলেছেন।’
তিনি বলেন, ‘প্রধান বিচারপতির বক্তব্যের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। এ ব্যাপারে আমাদের শ্বাসনতন্ত্রের আর্টিক্যাল ৯৯ ও ১৪৮’ এ সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোনো বিচারপতি আর বিচার সংক্রান্ত কোনো কাজ করতে পারবে না।’
‘আমাদের কাছে বহু প্রমাণ আছে, দুই থেকে তিন বছর আগে প্রকাশ্য কোর্টে রায় হয়েছে কিন্তু রায়গুলো এখনও পর্যন্ত লিখিত আকারে প্রকাশ হয়নি’, যোগ করেন তিনি।
বিচারকদের স্বদিচ্ছাই পারে সময়মতো রায় প্রকাশ করতে- এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘নিম্ন আদালতে স্ট্রোনোগ্রাফার পান না জজেরা। তারা সারারাত ধরে হাতে লিখে রায় প্রকাশ করেন। এখানে (সুপ্রীম কোর্টে) তো তারা (বিচারকরা) স্ট্রোনোগ্রাফার পাচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘রায় দেরিতে প্রকাশে আমরা (আইনজীবীরা) মক্কেলদের কাছে বিভ্রান্ত হচ্ছি এবং দেশবাসী সুবিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’
‘আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রায় ২০ বার উদ্যোগ নিয়েছি। তবুও এর কোনো সুরাহা হয়নি’ বলেন তিনি।
লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজ্ঞ ও
সংবিধানবিশেষজ্ঞ
e-mail: drtuhinmalik@hotmail.com

ব্লগারদের নিরাপত্তায় সরকারের পদক্ষেপ জানতে চেয়েছে ইইউ

ব্লগার ও মুক্তমনা লেখকদের নিরাপত্তায় সরকারের নেয়া পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চেয়েছেন সফররত ইউরোপীয় পার্লামেন্ট প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য জ্যাঁ ল্যাম্বার্টের নেতৃত্বে পার্লামেন্ট মেম্বার রিচার্ড হাওইট, ইভান স্টিফেন, সাজ্জাদ করিম গতকাল সফরের প্রথম দিনেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মিজানুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তারা এ নিয়ে জানতে চান। দেশের সার্বিক মানবাধিকার ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ঢাকায় আসা ইইউ প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর এমপির সঙ্গে। ভিন্ন ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত ওই দুই বৈঠকে দেশের শ্রম পরিস্থিতি বিশেষত রানা প্লাজা পরবর্তী বাংলাদেশের শ্রমমানের উন্নয়নের বিষয়ে সরকারের ভাষ্য জানতে চান তারা। পার্বত্য অঞ্চলের শান্তি বিশেষত সম্পাদিত শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়েও জিজ্ঞাসা ছিল তাদের। দিনে সিরিজ মিটিংয়ের পর সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যায় ইইউ পার্লামেন্ট প্রতিনিধি দল। প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় সংসদ কার্যালয়ে ওই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। আজ সফরের দ্বিতীয় দিনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের সঙ্গে ইইউ দলের বৈঠক হবে।
মানবাধিকার কমিশনে বৈঠক: ইউরোপীয় পার্লামেন্ট প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকের পর মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, নিহত ব্লগার এবং এ সংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা জানতে চেয়েছেন। যে সব ব্লগার এবং মুক্তমনা লেখককে হুমকি দেয়া হয়েছে তাদের নিরাপত্তার বিষয়েও জানতে চেয়েছেন তারা। তাদের সঙ্গে আলোচনায় শ্রমিকদের অধিকার, যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি স্থান পায় জানিয়ে মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান বলেন, দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়ে তাদের ব্রিফ করা হয়েছে।
‘বিজনেস কাউন্সিল’ গঠনের উদ্যোগ: ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বাংলাদেশের বাণিজ্য সমন্বয়ে ‘বিজনেস কাউন্সিল’ গঠন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। গতকাল ইইউ পার্লামেন্ট প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকের পর মন্ত্রী উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, কিছুদিনের মধ্যেই আমরা ‘বিজনেস কাউন্সিল’ গঠন করব। বাংলাদেশে ইইউর ৮টি দেশের দূতাবাস আছে। এই আট দেশ সদস্য থাকবে। মন্ত্রী বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সদস্য নিয়ে এই কাউন্সিল হবে। তা ছাড়া প্রাইভেট সেক্টরের লোকদেরকে রাখা যায় কি-না, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে পরামর্শ করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৮টি দেশ বাংলাদেশে কিভাবে ব্যবসা করবে, আমরা কিভাবে রপ্তানি করব- এগুলো সমন্বয় করবে বিজনেস কাউন্সিল। ব্যবসা বাণিজ্য আরও কিভাবে সমৃদ্ধশালী করা যায়- সেটা হবে কাউন্সিলের মূল কাজ। প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, আমাদের বিনিয়োগ পলিসি সম্পর্কে তারা জানতে চেয়েছেন। আমরা বলেছি, আমাদের ইনভেস্টমেন্ট পলিসি খুব লিবারেল। এখানে শতভাগ মূলধন আমরা অ্যালাউ করি। এখানে লাভ এবং মূলধন যে কোনো সময় নিয়ে যেতে পারবে। ডাবল ট্যাক্সেশন এড়ানোর ব্যবস্থা আমাদের রয়েছে। এখানে ট্যাক্স দিলে ওই দেশে দিতে হবে না। ওইখানে ট্যাক্স দিলে এখানে দিতে হবে না। বাংলাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাসও দেয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, এই পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার ৮০০ কারখানা পরিদর্শন করেছে অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্স এবং ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভ। ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভ ১৫৪৯টি, অ্যাকর্ড ১৩৫৬ এবং অ্যালায়েন্স ৮২৯টি কারখানা পরিদর্শন করেছে। এর মধ্যে ৩৭টি ঝুঁকিপূর্ণ আর আংশিক ঝুঁকিপূর্ণ ৪০টি কারখানা আমরা বন্ধ করে দিয়েছি। বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা শতকরা দুই ভাগের কম দাবি করে তোফায়েল বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো ‘গ্রিন ফ্যাক্টরিতে’ রূপান্তরিত হতে চলেছে। আমরা ইতিমধ্যে কয়েকটা উদ্বোধন করেছি। আরও প্রায় ৭০টির মতো পাইপলাইনে আছে। আমাদের কারখানাগুলো ‘কম্‌প্লায়েন্ট’ কারখানায় রূপান্তরিত হতে চলেছে। ইবিএ (এভরিথিং বাট আর্মস) ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি বাণিজ্যিক সুবিধা, যার আওতায় বাংলাদেশসহ স্বল্পন্নোত দেশগুলো অস্ত্র ছাড়া সব পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে থাকে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি না থাকলে কি হবে- এই প্রশ্ন উঠেছে। আমরা এটা আলোচনা করেছি। ইউরোপীয় ইউনিয়নে অন্য পদ্ধতি আছে। অন্য অনেক দেশকে ‘জিএসপি প্লাস’ সুবিধা দেয়। আমরা ২০২১ সালে আপগ্রেডেশনের পরিকল্পনা করছি। প্রশ্নটা তখন উঠবে।” মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল-মামুন, ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ ডেলিগেশন প্রধান রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়েদুন অন্যান্যের মধ্যে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

প্লিজ, বলুন তো ১/১১র সময়ে কয়জন ভয় পাননি? by গোলাম মাওলা রনি

ঘটনার দিন কী বার ছিল এবং তারিখই বা কী ছিল তা আজ আর মনে নেই। তবে সেই কুলক্ষুনে ঘটনার স্মৃতি ভুলবার নয়। আমি তখন বর্তমানের তুলনায় অনেক সচ্ছল এবং ব্যস্ত একজন ব্যবসায়ী। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি মইন উদ্দিন-ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন অদ্ভুত এবং অভিনব এক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার আগে পর্যন্ত সচল রাজনীতির মাঠে আমি ফরিদপুর জেলার একটি সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন লাভের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। মনোনয়নপ্রাপ্তি এবং নির্বাচনে জয়লাভের জন্য যা যা দরকার ছিল তা আমি অতি নিষ্ঠার সাথে করে আসছিলাম ২০০১ সালের পর থেকেই। দলের প্রতি মমত্ববোধ এবং রাজনৈতিক মনমানসিকতার কারণে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীর সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সহমর্মিতা ছিল। বিকেলে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে যাওয়া, সন্ধ্যার পর নেত্রীর কার্যালয়ে হাজিরা দেয়া এবং দুপুরে সমমনা নেতাকর্মীদের সাথে একত্রে খাবার খাওয়া রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু ১/১১র পরের দিন মনে হলো রাজনীতির মাঠে অগ্ন্যুৎপাত হয়েছে- পরিচিত কাউকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ৮-১০ দিন পর দু-একজনের সাথে যা-ও দেখা হলো, তারা সবাই নেত্রীকে দোষারোপ করলেন এবং বললেন, জীবনে আর রাজনীতিই করতে চান না- বাকিটা জীবন বউবাচ্চা নিয়ে নিরাপদে কাটাতে চান।
১/১১র প্রথম বছরটি ছিল বাহারি সাসপেন্স, থ্রিল এবং অ্যাডভেঞ্চারে পরিপূর্ণ। যত সচ্ছল এবং মুক্তচিন্তার মানুষজন হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিল। দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী, আমলা-কামলা এবং রাজনীতিবিদেরা পড়লেন মহাসঙ্কটে। প্রথমে ১০০ চিহ্নিত দুর্নীতিবাজের তালিকা প্রকাশ করা হলো। দ্বিতীয় দফায় আরো ১০০ জনের তালিকা সংযুক্ত করা হলো। হাতেগোনা অল্প কয়েকজন বাদে তালিকার অভিযুক্ত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সারা বাংলাদেশে এন্তার অভিযোগ ছিল। লোকজন বলাবলি করছিল, সামরিক আদালতে দুর্নীতিবাজদের বিচার করা উচিত। অনেকে আবার তাদের ক্রসফায়ারে দিয়ে মেরে ফেলার কথাও বলাবলি করতে লাগল। জনসমর্থনের হালনাগাদ দশা দেখে ১/১১র কুশীলবরা আনন্দে নাচানাচি আরম্ভ করলেন। তারা দুদক পুনর্গঠন করলেন আর পুনর্গঠিত দুদক দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভীতিকর গান রচনা করে তা নাচন-কুর্দনসহকারে টেলিভিশনগুলোতে প্রচার করতে থাকল। সেনা কর্মকর্তা, এনএসআই, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং দুদক মিলে একটি শক্তিশালী কমিটি বানাল দুর্নীতিবাজদের জিজ্ঞাসাবাদ, তাদের সম্পদের খোঁজখবর করা এবং তাদের শাস্তির আওতায় আনার জন্য।
চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের বিরাট অংশটি পালিয়ে গেল। সামান্যসংখ্যক ধরা পড়ল। রাজনীতির মাঠ ফাঁকাÑ সবাই শুধু ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি জপছে। এ অবস্থায় রাজনীতিবিদ, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও ব্যবসায়ীদের একটি বিরাট গ্রুপ ১/১১র কুশীলবদের সাহায্য সহযোগিতা দিতে এগিয়ে এলেন অথবা তাদের এগিয়ে নিয়ে আসা হলো। এ ঘটনা ঘটল মে-জুন মাসের দিকে। কিন্তু তার অনেক আগেই বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের গ্রেফতারকৃত শীর্ষ নেতারা তাদের দলীয় প্রধানের বিরুদ্ধে যাচ্ছেতাই স্বীকারোক্তি দিলেন। যারা গ্রেফতার আতঙ্কে ভুগছিলেন, তারা যেকোনো শর্তে তৎকালীন মইন উদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকারের কাছে দেহ-মন মাথাসহ আত্মনিবেদন করতে পাঁচ পায়ে দাঁড়িয়ে গেলেন (মানুষের হাত-পা এবং নাক যখন একত্রে মাটি স্পর্শ করে কারো সামনে অবনত হয়, তখন তাকে পাঁচ পায়ে দাঁড়ানো বলে)। ১/১১র কুশীলবরা এই সুযোগটি পুরোমাত্রায় কাজে লাগালেন। আওয়ামী লীগের অফিসগুলো যারা দখলে নিয়ে নিলেন, তারা নিজেদের সংস্কারবাদী হিসেবে জাতির সামনে পরিচয় করিয়ে দিলেন। অন্য দিকে, আওয়ামী সংস্কারবাদীদের তুলনায় বিএনপির সংস্কারবাদীরা দুর্বল ছিলেন। তারা বিএনপি অফিস দখল নিতে পারলেন না। ফলে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের যৌথ মহড়ায় সংস্কারবাদীরা একদিন অল্প কিছুক্ষণের জন্য নয়া পল্টনস্থ বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিসটির তালা ভেঙে সেখানে ঢুকলেন এবং সংক্ষিপ্ত টিভি সাক্ষাৎকার দিয়ে কেটে পড়লেন।
১/১১র সময়ে সংঘটিত ঘটনাবলি এবং আমার একটি নির্মম অভিজ্ঞতার কথা হঠাৎ করেই মনে পড়ল ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদকের হাল আমলের করুণ অবস্থা দেখে। সরকারদলীয় জোট এখন যেকোনো মূল্যে তাদের শ্রেণিশত্রু। তাদের চলার পথের বাধা বলে বিবেচিত পথের কাঁটাগুলো এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূল করার অছিলা খুঁজে বেড়াচ্ছে। সরকারি দল মনে করে. ড. ইউনূস, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এবং ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের ত্রিভুজীয় প্রচেষ্টা, সমর্থন এবং মদদের কারণে ১/১১ প্রলম্বিত হয়েছিল এবং তাদের নেত্রীকে জেলে ঢোকানো হয়েছিল। আগামী দিনে ত্রিভুজটি যেন পুনরায় কোনো ক্রিয়া-বিক্রিয়া শুরু করতে না পারে এ জন্য তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দিতে বর্তমান সময়কে বেছে নিয়েছে। সব দিক বিবেচনায় সরকার এখন সর্বোচ্চ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে তাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। বিদেশের যেসব পরাশক্তি বিরূপ ছিল, তারাও কারণে-অকারণে সরকারকে তোষণ করছে। অর্থনীতি তুঙ্গে- সরকারের বিদেশী বন্ধুরা তাদের প্রতি সমর্থন আরো জোরালো করেছে। কাজেই আগামী দিনে ক্ষমতায় আসার পথের কাঁটা এবং পচা শামুকগুলো তারা যথাসময়ে উপড়ে ফেলতে পরিকল্পিত পথেই এগোচ্ছে।
ডেইলি স্টার সম্পাদকের বিচার চেয়ে সজীব ওয়াজেদ জয়ের স্ট্যাটাস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জয়ের কথাবার্তা যে যেভাবেই মূল্যায়ন করুন না কেন, আমি কিন্তু তার কথার মধ্যে সব সময়ই সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার ইঙ্গিত পেয়েছি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বহু আগে তিনি বলেছিলেনÑ আমার কাছে তথ্য আছে যে, আগামীতে আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় আসবে। তার সেদিনের সেই আগাম তথ্য যে কতটা নির্ভুল ছিল তা দেশবাসী ইতোমধ্যেই টের পেয়েছেন। বর্তমান সরকারে তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। তারেক রহমান কিংবা হাওয়া ভবনসংক্রান্ত বদনামির মতো কোনো কলঙ্ক গত সাত বছরে তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। ২০০১ সালের বিএনপি-জামায়াত সরকারে তারেকের যে প্রভাব ও প্রতিপত্তি ছিল তার চেয়ে বর্তমান সরকার এবং সরকারি দলে জয়ের প্রভাব কোনো অংশে কম তো নয়ই; বরং অনেক অনেক বেশি। এ অবস্থায় তার কর্মকুশলতা, মেধা ও যোগ্যতা নিয়ে যারা প্রশ্ন করতে চান আমি তাদের দলে নেই।
মাহফুজ আনাম যদি প্রথম থেকেই সতর্ক হতেন তাহলে তাকে বর্তমানের ফ্যাসাদে পড়তে হতো না। আগামী দিনে তিনি যদি সাহসের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা না করেন তবে অনাহূত বহু ঝামেলা তাকে গ্রাস করবে এবং একই কায়দায় প্রথম আলো এবং মতিউর রহমানও ফেঁসে যাবেন। সাংবাদিকতার পেশাগত জীবনে আমার সুযোগ হয়েছিল দু’জনের সাথেই কাজ করার। আমি যখন মাহফুজ আনামকে চিনতাম, তখন তিনি পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক। এস এম আলী সম্পাদক। রিয়াজ সাহেব প্রধান প্রতিবেদক, আমানুল্লাহ কবির বার্তা সম্পাদক, শহীদুজ্জামান খান নগর সম্পাদক এবং খলিলুর রহমান অ্যাসোসিয়েট এডিটর হিসেবে নিয়োগ লাভ করে রিপোর্টার ও সহ-সম্পাদকদের রোজ প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন। অন্য দিকে, মাহফুজ আনাম এবং তৌফিক সাহেব দেখাশোনা করতেন প্রশাসনিক এবং অর্থ ও বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত বিষয়। আমার জানা মতে, মাহফুজ আনাম একজন নিরেট ভদ্রলোক এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভয়ানক লাজুকও বটে। হঠাৎ করে উত্তেজিত হওয়া তার একটি রোগ, যাতে আক্রান্ত হয়ে সেদিন এটিএন নিউজের টকশোতে কথা বলতে গিয়ে তিনি ফেঁসে গেছেন। অথচ তিনি যদি হাসিমুখে বলতেন, বর্তমান সরকারের অনেক মন্ত্রী-এমপি ১/১১র সময়ে তিনিসহ আরো অনেক সম্পাদকের কাছে নিয়মিত ধরনা দিতেন, যাতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বেশি বেশি প্রতিবেদন ছাপা না হয়, তাহলে উপস্থাপিকা মুন্নি সাহা হয়তো ঘটনার গভীরে ঢোকার চেষ্টা করতেন না।
বাংলাদেশের ১/১১ দেশের বাইরের কেউ ডেকে আনেননি। দেশের কোনো বর্ণ-সম্প্রদায়ও ডেকে আনেনি। দেশের রাজনীতিবিদেরাই ১/১১র জনক-জননী। ১/১১ তে পয়দা হওয়া সন্তানসন্ততিদের তাদের রাজনীতিবিদ জনক-জননীরাই প্রথম স্বাগত জানিয়েছিল এবং সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার জন্য সর্বতো সাহায্য-সহযোগিতা করেছিল। জনক-জননীর আগ্রহ উৎসাহ ও উদ্দীপনার কারণে পাড়া-প্রতিবেশীরা নবজাতকের পাশে দাঁড়ায়। সন্তানগুলো যে কুলাঙ্গার ছিল, তা বাবা-মা টের পায় চার-পাঁচ মাস পর আর পাড়া-প্রতিবেশী টের পায় সাত-আট মাস পর। সবাই মিলে যখন কুলাঙ্গার সন্তানকে বাগে আনার চেষ্টা চালায়, তখন অবাধ্য সন্তান শুরু করে তাণ্ডব। সেই তাণ্ডবে কমবেশি সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তার চেয়েও বেশি মাত্রায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে পুরো দেশ। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে একমাত্র মরহুম রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান এবং মরহুম খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পরিবার-পরিজন ইচ্ছে করলে ১/১১ নিয়ে বড় কথা বলতে পারেন। বাকিদের অবস্থা কমবেশি একই সমান্তরালে ছিল।
১/১১ নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। আমার ব্যবসা-বাণিজ্য, ধনসম্পদ এবং রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নিয়ে কুশীলবরা চেষ্টা করলেও যে কোনো ত্রুটি বের করতে পারবে না, সে ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম। ফলে ওই সময়ের আতঙ্কিত জনপদে সবচেয়ে দামি গাড়িতে চড়ে বুক ফুলিয়ে চলতে আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছিল না। অধিকন্তু অন্য একটি কারণে আমি মনে মনে পুলক অনুভব করছিলাম। আমার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রথম ১০০ জন শীর্ষ দুর্নীতিবাজের তালিকায় স্থান করে নেন এবং পালিয়ে গিয়ে নিজেকে রক্ষা করার প্রয়াস চালান। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে এসে বিভিন্ন কারণে আমার মন খারাপ হতে থাকে। কুশীলবরা টাকার বিনিময়ে অনেকের সাথে দফারফা করছে এবং ব্যবসায়ী ও নিরীহ বিত্তশালীদের ফাঁদে ফেলতে ১৯৭১ সালের হানাদার বাহিনীর মতো দোসর পয়দা করেছে, এমন খবরে আমি প্রমাদ গুনতে থাকি। অন্য দিকে, নির্বাচনী এলাকার নতুন বিভাজন করার ফলে ফরিদপুর জেলায় একটি সংসদীয় আসন কমে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হলে প্রথমে যে আমার নির্বাচনী আসনটি বিলুপ্ত হবে, সেই খবর শোনার পর মন আরো খারাপ হতে শুরু করল।
সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে দেশের বিভিন্ন অংশে বন্যা দেখা দেয়। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ত্রাণকার্য পরিচালনার জন্য চেষ্টা করছিল, কিন্তু অর্থাভাবে পেরে উঠছিল না। দলের তামাম কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমানের বাসা থেকে। সভানেত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর জিল্লুর চাচার সহকারী লিটন এবং খালেদ মাহমুদ চৌধুরী (বর্তমানে এমপি) বেশির ভাগ সময় জিল্লুর রহমান সাহেবের সাথে থাকতেন আর টিভি ক্যামেরাগুলো দলবেঁধে তাকে পাহারা দিত সারাক্ষণ। মহিলাদের মধ্যে ডা: দীপু মনি, নাজমা আকতার, মাহবুব আরা গিনি নিয়মিত সেখানে হাজিরা দিতেন। আমি একদিন জাহাঙ্গীরকে আমার অফিসে ডেকে জিল্লুর চাচাকে ত্রাণকাজ চালানোর জন্য কিছু টাকা দিতে চাইলাম। সে জিজ্ঞাসা করল, কত টাকা দেবেন। আমি বললাম, লাখ পাঁচেক। পরের দিন টাকাসহ জিল্লুর চাচার বাসায় গেলে তিনি মতিয়া চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাক (মরহুম), খালিদ মাহমুদ চৌধুরী প্রমুখকে ডেকে সবার সামনে আমার হাত থেকে টাকা নিলেন ত্রাণকাজ চালানোর জন্য। আসার সময় তিনি বললেন, পারলে ছাত্রলীগের ত্রাণে একটু সহযোগিতা করো এবং ওমুক ওমুককে একটু দেখে রেখো। আমি গুলশান থেকে সোজা মধুর ক্যান্টিনে চলে এলাম। ছাত্রলীগের সাবেক সেক্রেটারি নাজমুলসহ শতাধিক নেতাকর্মী আমাকে স্বাগত জানাল। ছাত্রলীগ সভাপতি রিপনকে ফোন করে আমার ধানমন্ডির বাসায় ডেকে আনলাম এবং আরো অনেককে আমার বাসা বা অফিসে নিমন্ত্রণ করলাম। আমার তৎপরতার খবর রটে গেল। আমি এক দিকে ১/১১’র কুশীলবদের টার্গেটে পরিণত হলাম। অন্য দিকে, আওয়ামী লীগের কারাবন্দী নেতারা হররোজ চিরকুটের মাধ্যমে এবং প্রবাসে পলাতকরা টেলিফোন কল করে নানা ফুট ফরমাসে ব্যস্ত রাখতে একটুও কৃপণতা দেখাল না।
ঘটনার দিন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। আমার শরীরটা কয়েক দিন ধরে ভালো যাচ্ছিল না। আমি বারডেমে আমার এক ডাক্তার বন্ধুর রুমে বসে প্রেসারটা চেক করছিলাম। বন্ধুটি প্রেসারযন্ত্র আমার হাতে বেঁধে যখন চেক করছিল, ঠিক তখন মোবাইলে আমার অফিস থেকে ফোন এলো। অপর প্রান্তের কথা শুনে আমার মেজাজ তেত্রিশ ডিগ্রি চরমে পৌঁছাল। ডাক্তার বন্ধু বললেন- কী হলো? এতক্ষণ তো প্রেসার ভালোই ছিল। ফোন আসার পর হঠাৎ করেই অনেক বেড়ে গেল। কোনো সমস্যা! আমি মুচকি হেসে বললাম, এখন প্রেসার মাপতে হবে না। আমার অফিসে এই মুহূর্তে যৌথ বাহিনী তল্লাশির নামে তাণ্ডব চালাচ্ছে- আমাকে খুঁজছে। আমার কথা শুনে ডাক্তার বন্ধুর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তিনি কোনো কথা বলতে পারলেন না। আমার হাত থেকে প্রেসার যন্ত্র খুলে নেয়ার সময় তার হাত দু’টি থরথর করে কলাপাতার মতো কাঁপতে লাগল। আমি টেলিফোন করে যৌথ বাহিনীর তল্লাশি কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। তাদের বোঝালাম- আমি পলাতক নই। তারা যদি অফিসে অপেক্ষা করেন তবে আমি এক ঘণ্টার মধ্যে উপস্থিত হবো- নতুবা তারা ইচ্ছে করলে বারডেম থেকেও আমাকে গ্রেফতার করতে পারেন। অন্য দিকে, তারা যদি চান তবে অবিলম্বে আমি নিজেই স্বল্পতম সময়ের মধ্যে তাদের ক্যাম্পে উপস্থিত হতে পারি। তারা ক্যাম্পের ঠিকানা দিলো এবং আমি দ্রুত সেখানে উপস্থিত হলাম। আমাকে একজন সিনিয়র মেজর সাহেবের সামনে নেয়া হলো। তিনি বেশ গম্ভীর হয়ে আমার ফাইলটির পাতা উল্টাতে থাকলেন। তারপর আমার বিরুদ্ধে নিম্নলিখিত অভিযোগটি উত্থাপন করলেন- ‘সজীব ওয়াজেদ জয় যখন সস্ত্রীক প্রথম বাংলাদেশে এসেছিলেন তখন তার সংবর্ধনার যাবতীয় ব্যয় আপনি বহন করেছিলেন। মোট কত টাকা দিয়েছিলেন- কেন দিয়েছিলেন এবং এত টাকা কোথায় পেলেন?’
মেজর সাহেবের কথা শুনে আমি হেসে দিলাম। বললাম, ‘সজীব ওয়াজেদ জয়ের আগমনী সংবর্ধনার ব্যয় বহন করার জন্য আওয়ামী লীগে আমার চেয়েও অনেক অনেক গুণ ধনী অনেকে রয়েছেন। এমন একটি অনুষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহের জন্য আওয়ামী লীগের নির্ভরতার তালিকায় আমি এখনো স্থান লাভ করতে পারিনি। তাই টাকা পরিশোধের সুযোগ আসেনি। তবে হ্যাঁ! যদি আমার কাছে সেই সুযোগ আসত তবে অবশ্যই আমি সানন্দচিত্তে টাকা পরিশোধ করতাম। আমার কথা শুনে মেজর সাহেবসহ অন্য কর্মকর্তারা হাঁ করে রইলেন...।

‘শূন্য’ রানে গোটা দল অলআউট!

গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা ক্রিকেট। তাই বলে এতো অনিশ্চয়তা! বর্তমান ক্রিকেটে ২০ ওভারে ২০০ রান অসম্ভব নয়। কিন্তু সেখানে মাত্র ২০ বলে গোটা দল অলআউট! আর স্কোর বোর্ড ‘০’! হ্যা, ঠিকই দেখছেন স্কোর বোর্ড শূন্য। তারমানে ২০ বলের মোকাবিলায় কোনো রান যোগ করতে পারেননি দলের ১১ জন ব্যাটসম্যান! বিস্ময়, বিস্ময় আর বিস্ময়! অবাক হলেও ঘটনা সত্যি। খবরটি দিয়েছে ‘বিবিসি’র মতো সংবাদমাধ্যম। ইংল্যান্ডের কেন্টারবুরিতে একটি ইনডোর ম্যাচে মুখোমুখি হয় ব্যাপচাইল্ড ক্রিকেট ক্লাব ও ক্রাইস্ট চার্চ বিশ্ববিদ্যালয় দল। ক্রাইস্ট চার্চ আগে ব্যাগে গিয়ে করে ১১৯ রান। এই রান তাড়া করতে নেমে ব্যাপচাইল্ডের কোনো ব্যাটসম্যান একটি রানও করতে পারেননি। এমন কি অতিরিক্ত থেকেও কোনো রান আসেনি। মাত্র ২০ বলে (৩.২ ওভার) অলআউট ১০ জন ব্যটসম্যান! ১১ জন ক্রিকেটারের মধ্যে মাত্র ১ জন খেলোয়াড় ব্যাটে বলের ‘মিলন’ করতে পারেন। তাও একবারই। তবে সেই বলটাও ফিল্ডারের হাতে ধরা পড়ে। আর বাকি ৩ ওভার ১ বল শুধু ডট আর আউট। আর এমন অবাক করা তথ্য বিবিসি’কে নিশ্চিত করেছে ইংল্যান্ডের ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড। ব্যাটসম্যানদের এমন ‘কা-ে’ বৃহস্পতিবার যে মাঠে খেলা হয় সে মাঠের নামও পাল্টে গেছে। কেন্টারবুরির মাঠটিকে এখন সবাই ‘গ্রাউন্ড জিরো’ নামেই ডাকছে।

বিশ্বের প্রথম ‘সুখমন্ত্রী’ নিয়োগ দিল সংযুক্ত আরব আমিরাত

‘সুখমন্ত্রী’ নিয়োগ দিয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধানমন্ত্রী। সম্প্রতি তিনি পাঁচ বছরের মধ্যে তার দেশকে বিশ্বের ‘সেরা পাঁচটি দেশের একটি’তে রূপান্তরিত করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। জনগণের সুখ-দুঃখ দেখার জন্য বুধবার ঘোষিত নতুন মন্ত্রীসভায় একজন সুখ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। এ খবর দিয়েছে এনবিসি নিউজ।
২০০৬ সালে বিশ্বের ষষ্ট ধনী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধানমন্ত্রী হন শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ। বৃটেনে পড়াশুনা করা এ ব্যবসায়ী ও আমলা ১৯৮৫ সালে এমিরেটস এয়ারলাইন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার বর্তমান মন্ত্রীসভায় রয়েছে পাঁচজন নারী। এর মধ্যে ‘সুখমন্ত্রী’ও রয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক উহুদ আল রুমি এখন থেকে সুখ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করবেন। আল রুমি এর আগে ছিলেন দুবাইয়ের ইকোনমিক পলিসির প্রধান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বলেন, আল রুমির দায়িত্ব, সামাজিক মঙ্গল ও সন্তুষ্টির জন্য সরকারী নীতি প্রণয়ন ও চালনা করা। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, আরব আমিরাতে সুখ কেবল আশা নয়, এ নিয়ে পরিকল্পনা, প্রকল্প ও নির্নায়ক থাকবে। তিনি সুখকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জীবনযাত্রার অংশ বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি সুখ নিয়ে প্রচুর কবিতাও লিখেছেন। এ কবিতাসমূহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিতও হয়েছে।

বাংলাদেশ তার পথ হারিয়েছে by কুলদীপ নায়ার

ঢাকায় পৌঁছার পর আপনার বুঝতে খুব বেশি সময় লাগবে না যে, এটাই সেই দেশ, যা তার বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। দূরবর্তী ও শোষণকারী পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে পূর্ব পাকিস্তানিদের যে বৈপ্লবিক চেতনা উদ্দীপ্ত করেছিল তার বিন্দুমাত্রও এখন নেই।
আরও খারাপ বিষয় হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কতটা কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠেছেন! তার বিরোধী দল বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা কমেছে।
যদি কোন দেশ তার পায়ের বেঁড়ি ছিড়তে চায় তাহলে তাদেরকে পরাধীন করে রাখতে পারবে না কোন দেশÑ এটা প্রমাণ করতে ৪৫ বছর আগে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জেগেছিল এ দেশের মানুষ ও মুক্তিবাহিনী। তাদের তেমন অস্ত্রশস্ত্র ছিল না। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বিরাট মাপের একজন নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন তার নেতা। কিন্তু তিনি যখন ঢাকা সফর করলেন এবং ঘোষণা দিলেন উর্দুই হবে রাষ্ট্রীয় ভাষা তখনই তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন শেখ মুজিব।
পাকিস্তানে বসবাসকারী বাঙালিদের পরিচয় ছিল পশ্চিমাদের আধিপত্যের অধীনে। তারা বুঝতে পারলেন তাদের বাস্তবধর্মী পরিচয়ের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হচ্ছে পাঞ্জাবি সংস্কৃতি। যখন তারা তাদের সংস্কৃতিকে হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করলেন তখনই পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তাদের ওপর শুরু করে নৃশংসতা।
এমনকি, শেখ মুজিব যখন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন তখন তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন এটা সহ্য করতে পারেন নি তখনকার পশ্চিম পাকিস্তানের মূল শক্তি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। পূর্ব পাকিস্তানের পতনের জন্য যদি কাউকে দায়ী করা হয় তাহলে তিনি হলেন ভুট্টো। তিনি এককভাবে ক্ষমতা হাতে রাখতে চেয়েছিলেন।
শেখ হাসিনার মূল বিরোধিতা আসে জামায়াতে ইসলামীর দিক থেকে, যারা এখনও ধর্মের কার্ড ব্যবহার করছে। জামায়াতকে দেখা হয় পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে। বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানিরা যে নৃশংসতা চালিয়েছিল সে বিষয়ে এখনও পর্যন্ত জামায়াত পরোক্ষভাবে হলেও নিন্দা জানায় নি।
আমি মনে করেছিলাম জামায়াতে ইসলামীর বয়স্ক নেতাদের ফাঁসি দেয়াতে মনোভাবে বিরাট কোন পরিবর্তন আসবে। কিন্তু আমার বিস্ময়ের বিষয় হলো, আমি দেখলাম যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের ফাঁসি দেয়াতে জনগণ খুশি।  পাকিস্তান একটি ইসলামিক দেশ এবং ইসলামিক উম্মার একটি অংশ। তাই হয়তো পাকিস্তানের ভূমিকার বিষয়ে নীরব জামায়াত।
একসময় বামদের একটি শক্তি হিসেবে দেখা হতো। তারা তাদের ক্যাডার সহ সেই আবেদন হারিয়েছে। পেশাদারিত্ব আকর্ষণ করছে তরুণদের। ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছেন। কারণ, সরকারের প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে ঘুষ দুর্নীতি। এই ধারা সারা বাংলাদেশে বিদ্যমান।
তবু মন্দের ভাল যে, জনগণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পছন্দ করে। প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের মাধ্যমে তারা তাদের বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটায়। বেশি দিন আগের কথা নয়, জনগণের অসন্তোষ এক সময় রাজপথে বিক্ষোভে রূপ নিতো। তাতে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হতো। বিলম্বে হলেও এর প্রভাব পড়তো জনগণের ওপর। বাজারঘাটে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যেত। কলকারখানা বন্ধ হয়ে যেত। এতে শুধু তাদেরই ক্ষতি হতো। তারা বুঝতে পেরেছে যে, তৈরি পোশাক উৎপাদনের পরিবেশ ধ্বংস করার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির উন্নতি হচ্ছে না। এই শিল্পটি হলো রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একমাত্র বড় উৎস। চালিকাশক্তি হলো সম্পদ, যা গুটিকয় হাতে জমা থাকে। তারা শুধু ব্যবসায়ই নির্দেশনা দেয় তা নয়। একই সঙ্গে রাজনীতিতেও নির্দেশনা দেয়। অনেক শিল্পপতি রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিবিশেষকে পার্লামেন্টে যাওয়ার জন্য অর্থ দিয়ে থাকেন, যাতে তারা রাজনীতিতে তাদের প্রভাব বজায় রাখতে পারেন। সরকারের গৃহীত কর্মসূচিতে তারা প্রভাব ধরে রাখতে পারেন।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মতো বাংলাদেশে মিডিয়ার স্বাধীনতা শুধু নামমাত্রই। সম্পাদকদের স্বাধীনতা আছে এতটুকুই যে, তাদের মালিক তাদের কাছে কি চান। আদর্শগতভাবে, অর্থনৈতিকভাবে ও সামাজিকভাবে বাংলাদেশ কোন পথে ধাবিত হচ্ছে এ প্রশ্নটি আমি অনেকজনকে করেছিলাম। রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এক শিক্ষাবিদ আমাকে বললেন, বাংলাদেশ তার পথ হারিয়েছে এবং তিনি জানেন না কোন পথে ধাবিত হচ্ছে দেশ।
শেখ হাসিনার প্রধান শক্তি হলো নয়া দিল্লি, যারা তাদের পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেছেন তার প্রতি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রকাশ্যে বলছে যে, নিজের কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের কারণে ভারতের ভাবমূর্তিও নষ্ট করছেন হাসিনা। তিনি কোন সমালোচনা সহ্য করেন না। তার সমালোচকরা ক্ষতির মুখে পড়ে, যাতে তারা বুঝতে পারেন তিনি ও ভারত সমার্থক হয়ে উঠেছেন।
বাংলাদেশে কখনো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে বলে মনে হয় না। তা সত্ত্বেও যদি নির্বাচন হয় তাহলে আগেভাগেই বলে দেয়া যায় যে, শেখ হাসিনা পরাজিত হবেন না। জামায়াতের সঙ্গে আঁটঘাট বাঁধার কারণে বেগম খালেদা জিয়াও নিজের জনপ্রিয়তা  বাড়াতে পারেন নি। প্রকৃত অর্থে তিনি শাস্তির মুখোমুখি, যা তিনি এড়াতে পারবেন বলে মনে হয় না।  
যা হোক একটি বিষয় নিশ্চিত যে, যখনই নির্বাচন হোক খালেদা এবার তা বর্জন করবেন না। বিএনপি বুঝতে পেরেছে যে, জাতীয় সংসদে যদি তাদের সামান্য সংখ্যক সদস্যও থাকেন তাহলে তারা জনগণের কাছে শেখ হাসিনার ভুলভ্রান্তিগুলো তুলে ধরতে পারবেন। দেশের স্বার্থ এখন যেভাবে দেখা হয় আগে কখনো সেভাবে দেখা হয়নি। কারণ, এখন হাসিনা ও খালেদা দু’জনের বিষয়েই মানুষের মোহমুক্তি ঘটেছে। তবে এ দু’বেগমই বাংলাদেশের জন্য অনিবার্য পরিণতি। তাতে জনগণের কাছে তারা যতটাই অজনপ্রিয় হোন না কেন।
কুলদীপ নায়ার। ভারতের বর্ষীয়ান সাংবাদিক, কলামনিস্ট, মানবাধিকার কর্মী, লেখক। ভারতীয় পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষে একজন মনোনীত সদস্য ছিলেন তিনি।
দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার অনুবাদ

গণতন্ত্র নানা দিক থেকে আক্রান্ত by হায়দার আকবর খান রনো

ইদানীং উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্রের বিতর্কটি মাঝেমধ্যে জমে উঠছে। অথবা প্রশ্নটি এভাবেও উত্থাপিত হচ্ছে, উন্নয়ন আগে, না গণতন্ত্র আগে। যেন একটা আরেকটার বিকল্প। আসলে এ রকম প্রশ্নই অবান্তর। বরং কদিন আগে (গত ৩০ জানুয়ারি) প্রথম আলোর সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে কবি সোহরাব হাসান যে প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন, সেইটাই যথেষ্ট সংগত প্রশ্ন। তিনি প্রশ্ন আকারে যে কথাটি বলেছেন, তা হলো, ‘মধ্য আয়ের স্বপ্ন দেখা বাংলাদেশে তো “নিম্নমানের” নির্বাচন হতে পারে না। যে জাতি তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিতে উন্নীত হতে পারে, সেই জাতি একটি ভালো নির্বাচন কেন করতে পারবে না?’
এটা বেদনাদায়ক হলেও সত্য যে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে ভালো নির্বাচন আমরা খুব কমই পেয়েছি। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি আমলে (১৯৯১-৯৬) মাগুরা উপনির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ ওঠার পরিণামে সরকার বদল ও সংবিধানে পরিবর্তন এসেছিল। তারপর সব আমলেই মাগুরার মতন বা তার চেয়েও বেশি ত্রুটিপূর্ণ, অথবা আরও স্পষ্ট করে বললে কারচুপিতে ভরপুর নির্বাচন হয়ে এসেছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন তো ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। সে প্রসঙ্গ না হয় নাই-বা তুললাম। কিন্তু তারপর যে উপজেলা, ঢাকা, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও সর্বশেষ পৌরসভার নির্বাচন হয়েছে, সেগুলোকে আর যা-ই হোক, নির্বাচন বলা যায় কি না, সে প্রশ্ন তো আছেই। পৌরসভা নির্বাচনের পরপরই কিশোরগঞ্জের এক দলীয় সভায় সরকারের মন্ত্রী এবং শাসক দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বাজিতপুরের নির্বাচন প্রসঙ্গে যে মন্তব্য করেছেন, তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। সরাসরি কারচুপির কথাটা না বললেও নির্বাচন যে ত্রুটিপূর্ণ ছিল, সে ইঙ্গিত তাঁর কথায় স্পষ্ট ছিল। তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচন বিষয়ে কিছু কিছু বিষয় আমি মেনে নিতে পারি না।...যদি আমরা বাজিতপুরে পরাজিত হতাম, তাহলে কি আমাদের সরকারকে উচ্ছেদ করে দিত?’
প্রশ্নটা আমারও। এটা একটা মানসিকতার প্রকাশমাত্র। সবকিছু দখল করতে হবে, বৈধ অথবা অবৈধভাবে, যেভাবেই হোক না কেন। রাজনৈতিক পদ, নির্বাচিত পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য, টেন্ডার, জমি, সম্পদ এবং যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা—সবকিছুই। সৈয়দ আশরাফ স্পষ্টভাষী এবং এই বিকৃত মানসিকতার ঊর্ধ্বে। তাই এমন কথা তিনি স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করতে পেরেছেন।
এরূপ দখলি মানসিকতা কিন্তু রাজনৈতিক কারণেই তৈরি হয়। নির্বাচনে যদি কেন্দ্র দখল হয়ে থাকে এবং যাদের দ্বারা এই দখলি কাজ সম্পন্ন হয়, তারা শুধু কেন্দ্র দখল করেই নিশ্চুপ থাকবে না। তারা বেপরোয়া হয়ে উঠবে। তারা আরও কিছু দখল করতে চাইবে। যে তরুণ মাস্তানগোষ্ঠীকে এই কাজে ব্যবহার করা হবে, তারা এরপর চাইবে জমি দখল, সম্পত্তি দখল, টেন্ডার বাক্স দখল এবং এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারী দখল পর্যন্ত। এই কাজে প্রশাসন ও পুলিশকে যদি ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেই প্রশাসন ও পুলিশও একপর্যায়ে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে আপেক্ষিক স্বাধীনতা ভোগ করবে। যেহেতু তাদের হাতে ক্ষমতা থাকে, অতএব ক্ষমতার অপব্যবহারও করবে দ্বিধাহীন চিত্তে। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই। বরং এটাই জগতের স্বাভাবিক ধর্ম।
আমরা শাসক দলগুলোর নিম্নপর্যায়ের নেতা, উপনেতা ও মাস্তানদের উৎপাত দেখেছি। পাশাপাশি প্রশাসন ও পুলিশ-র্যাবের কিছু সদস্যের অপকর্মও দেখছি। এই দুই অংশের মধ্যে একটা সমঝোতা আছে। সরকারদলীয় লোকেরা অপকর্ম করলে থানায় মামলা হয় না। আবার কখনো কখনো তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বও তৈরি হয়। গত বছর আগস্ট মাসে ঢাকায় পুলিশের মহাপরিদর্শকের সভাপতিত্বে যেসব জেলার পুলিশ সুপারদের সভা হয়েছিল, তার কিছু কিছু খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। জানা গেছে, একাধিক পুলিশ সুপার অভিযোগ করেছেন, ‘মাঝেমধ্যে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা এসে নানা তদবির করেন। বিশেষ করে টেন্ডার নিয়ে বেশি ঘাপলা। আরও আছে খাসজমি দখল।...মাঝেমধ্যে ভয়ে ওই নেতাদের বিরুদ্ধে কথা বলা যায় না।’
কয়েকজন সাংসদ ও স্থানীয় নেতার কথা আমরা জানি, যাঁরা বড় বড় অপরাধ করলেও পুলিশ কিছুই করতে পারে না। সন্ত্রাসী লালন, জমি দখল, মাস্তানিতে অংশগ্রহণ ইত্যাদি তাঁরা করেন পুলিশের সামনেই অথবা পুলিশের সহায়তায়। হয়তো পুলিশ বাধ্য হয়েই তাঁদের অপকর্মে সাহায্য করে অথবা চোখ বুজে থাকে। কিন্তু এর বিনিময়ে পুলিশের অসৎ সদস্যরাও কি কিছু আদায় করে নেবেন না? ৫ ফেব্রুয়ারির প্রথম আলোতে সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান ‘সংস্কার নিয়ে পুলিশের জবানবন্দি’ শিরোনামে এক চমৎকার নিবন্ধ লিখেছেন। সেখানে তিনি কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে আড্ডার বিবরণ দিয়েছেন। সেই অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতায় পুলিশ কর্মকর্তারা অনেক সরল স্বীকারোক্তি করেছেন। তার মধ্যে একজন বলেছেন, ‘এই যে নির্বাচন হলো, আমরা কিন্তু করে দিয়েছি। কিন্তু প্রতিবেদন সেভাবে এল না।’ তারপর সাংবাদিক ও লেখক মিজানুর রহমান খান বলছেন, ‘তাঁদের এই কথায় ইঙ্গিত আছে যে সেলফ সেন্সরশিপ বেড়ে গেছে।’
তাই সব খবর সংবাদপত্রে আসে না। শাসক দলের নিচের তলার নেতা ও মাস্তানদের খবরও যেমন আসে না, তেমনি আসে না পুলিশের সব অপকর্মের খবর। তবু লোকমুখে অনেক কিছুই জানাজানি হয়। দেশে বস্তুত আইনের শাসন নেই। যা আছে তা হলো একেকটি ছোট ছোট এলাকায় একেক প্রভাবশালী ব্যক্তির শাসন এবং অবশ্যই তা পুলিশের সহযোগিতায়। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান গত বছর আগস্ট মাসে একবার বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকলে আইন তাকে স্পর্শ করে না।’ এই কথায় মনে হতে পারে যে পুলিশ বুঝি বড় নিরুপায়, বড় অসহায়। কথাটা এক অর্থে সত্য। কিন্তু পুরো সত্য নয়। কারণ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সাহায্য করার বিনিময়ে তারা নিজেরাও অনেক সুবিধা আদায় করে নেয়, ঠিক যেমন উপরতলার রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ হয়ে নির্বাচনে মাস্তানি করার বিনিময়ে ছোট স্তরের মাস্তানরা অন্যত্র নানা ধরনের সুযোগ আদায় করে নেয়, যার মধ্যে টেন্ডার বাক্স দখল থেকে জমি দখল পর্যন্ত পড়ে।
তাই দেখি মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানই আবার একই সঙ্গে এ কথাও বলেছেন যে ‘পুলিশের স্পর্ধা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌঁছেছে।’ ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিটে পুলিশের কজন সদস্য ও তাদের সোর্সের দ্বারা আগুনে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণকারী চা-দোকানদার বাবুল মাতবরকে দেখতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেছেন। সম্প্রতি কোনো কোনো পুলিশ সদস্যের সন্ত্রাসী কাজ প্রকাশ হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা গোলাম রাব্বী ও সিটি করপোরেশনের এক কর্মচারী এভাবে পুলিশি সন্ত্রাসের কবলে পড়ে নির্যাতিত হয়েছেন। এভাবে পুলিশ সদস্যদের দুর্নীতি ও নির্যাতন করার কয়েকটি ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়ে। আসলে এসব কিছুই নতুন নয়। সাধারণ মানুষ সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই পুলিশকে বন্ধু হিসেবে দেখেনি, বরং ভয়ের চোখে দেখে এসেছে।
অন্যদিকে, জনপ্রতিনিধি বলে যাঁদের পরিচিতি ছিল, ‘নিম্নমানের নির্বাচন’ ও ‘আইনের শাসনের অনুপস্থিতিতে’ সাধারণ মানুষ তাঁদের অধিকাংশকে আর আপনজন বলে ভাবে না। কী করেই-বা ভাববে? যেমন ধরা যাক, গাইবান্ধার যে ‘নির্বাচিত’ সাংসদ ১২ বছরের বালককে পায়ে গুলি করেও সহজেই জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসেন, দল কর্তৃক বহিষ্কৃতও হন না, বহাল তবিয়তে সাংসদও থেকে যান, তাঁকে জনগণ কী চোখে দেখবে? তিনি ‘অসীম ক্ষমতার’ প্রতীক। জনগণ ভয় করবে, কিন্তু আপনজন মনে করে কাছে ঘেঁষবে না। পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক কর্তৃত্ব মিলে তৃণমূলে যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তাতে গণতন্ত্র বলে কিছু থাকছে না।
আমাদের দেশে গণতন্ত্র আরেক দিক দিয়েও আক্রান্ত হচ্ছে। সেটা হচ্ছে জঙ্গি মৌলবাদ। এরা অন্ধকারের সরীসৃপের মতো। কখন, কোনো দিকে, কাকে ছোবল দেবে জানা নেই। এ বড় ভয়ংকর অবস্থা। গত বছরই চারজন লেখক ও একজন প্রকাশক এদের চাপাতির ঘায়ে রক্তাক্ত হয়ে নিহত হয়েছেন। এদের হাতে নিহত হয়েছেন বিদেশি নাগরিক, মন্দিরে উপস্থিত হিন্দু নাগরিক, শিয়া ধর্মাবলম্বী মানুষ এবং আরও অনেকে। শুধু যে এই কয়েকজন নিহত হয়েছেন তাই নয়, ওরা যে পরিবেশ তৈরি করেছে, তাতে মুক্তবুদ্ধির চর্চাই নিহত হতে চলেছে। এরা চরিত্রগতভাবে ফ্যাসিস্ট। কোনো যুক্তি মানে না। কোনো তর্কে বা আলোচনায় আসে না। এরা অন্ধকারের প্রাণী এবং খুবই ভয়ংকর।
এদের কাজ ইসলাম ধর্মবিরোধী এবং গণতন্ত্রবিরোধী। এদের গুলি, বোমা, চাপাতি ও হত্যা দ্বারা যেকোনো দিন বাংলাদেশে তাদের লক্ষ্য (সেটা কী তাও ভালো করে জানা যায় না) অর্জিত হবে না, সেটাও তারা বোঝে না। তবে তারা যেটা করতে পেরেছে, তা হলো এই জঙ্গিবাদী তৎপরতা দেখিয়ে সরকারকে অনেক বেশি কর্তৃত্ববাদী করে তুলেছে। অন্যদিকে, প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি মৌলবাদী জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে প্রায় জামায়াতি ভাবাদর্শের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। ফলে সরকারের বিরোধীপক্ষে থাকলেও বিএনপিকে গণতান্ত্রিক শক্তি বলে কেউ মনে করছে না। দুঃখজনকভাবে এটাও সত্য যে সরকারও নানাভাবে মৌলবাদী ভাবাদর্শের কাছে কিছুটা আপস করে চলেছে। এই প্রসঙ্গে সোহরাব হাসানের আরেকটি লেখা থেকে (দীপনদের আমরা কী করে ভুলে যাই?’ প্রথম আলো, ৬ ফেব্রুয়ারি) থেকে কিছুটা উদ্ধৃত করা অসংগত হবে না।
‘জঙ্গি হামলার জন্য এত দিন আমরা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির ওপর সব দোষ চাপিয়েছি। কিন্তু সাত বছর ধরে তো স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিই ক্ষমতায়। তারপরও মৌলবাদী-জঙ্গিগোষ্ঠী এত আস্ফালন কীভাবে দেখায়?...তাহলে কি ক্ষমতাসীনদেরই কেউ সেই অন্ধকারের শক্তির সঙ্গে আঁতাত করেছেন?’
এ বড় কঠিন প্রশ্ন! দুই কথায় উত্তর দেওয়া কঠিন। তবে এটুকু বলা যায় যে কর্তৃত্ববাদী শাসন ও মৌলবাদী সন্ত্রাস—এই দুইয়ের বাইরেই প্রকৃত গণতন্ত্রী-ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির সন্ধান করতে হবে। সেই শক্তি এখনো রাজনৈতিকভাবে দুর্বল। কিন্তু এ ছাড়া ভরসার জায়গাই-বা আর কোথায়?
হায়দার আকবর খান রনো: রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি।

‘হোয়েন টু রব আ ব্যাংক’ by শওকত হোসেন

স্টিভেন ডি লেভিট মার্কিন অর্থনীতিবিদ আর স্টিফেন জে ডুবনার সাংবাদিক। একজন অর্থনীতি জানেন, আরেকজন পারেন লিখতে। দুজনে মিলে বের করলেন বই—ফ্রিকোনমিকস। অর্থনীতির বই মানেই যাঁরা রসকষহীন কিছু একটা মনে করতেন, তাঁদের ধারণা আমূল পালটে দিলেন এই দুজন। তাঁরা সবশেষ যে বইটি বের করেছেন, আমার আগ্রহ সেটি নিয়েই। নাম হোয়েন টু রব আ ব্যাংক।
যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়ার শেলডন ন্যাশনাল ব্যাংকে অভিনব এক ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা পাওয়া গেল বইটিতে। ব্যাংকটির মালিক উইলিয়াম গেইজার। তাঁরই মেয়ে বার্নি গেইজার কাজ করতেন ক্যাশ বিভাগে। ১৯৬১ সালের এক সকালে গ্রেপ্তার হলেন বার্নি। অভিযোগ ২০ লাখ ডলার আত্মসাতের। ৩৭ বছর ধরে তিনি এই অর্থ সরিয়েছেন। বার্নির নাম ইতিহাসে লেখা হয়ে আছে। কারণ, এর আগে আমানতের অর্থের বিমা করার বাধ্যবাধকতা ছিল না। এ ঘটনার পর আইন বদলাতে হয়।
তবে স্টিভেন লেভিট ও স্টিফেন ডুবনার ঘটনাটি তুলে এনেছেন অন্য কারণে। বার্নি গেইজার ব্যাংকে চাকরি করার সময় কখনো ছুটি নেননি। হিসাবের দুটি খাতা ছিল তাঁর। বার্নির ভয় ছিল, ছুটি নিলে অন্য যিনি তাঁর জায়গায় কাজ করবেন, সব ধরে ফেলবেন। তাই বছরের পর বছর বিনা ছুটিতে কাজ করে গেছেন। বদলি হলে হয়তো আত্মসাতের সুযোগটা পেতেন না বার্নি। মজার ব্যাপার হলো, পাঁচ বছর জেল খেটে মুক্তি পাওয়ার পর বার্নিকে ব্যাংক নজরদারি করার কাজে নিয়োজিত করেছিল সরকার। ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ফাঁকফোকর তাঁর চেয়ে আর বেশি কে জানবে?
বার্নি গেইজারের অর্থ আত্মসাৎকে তাহলে আমরা ডাকাতি বলছি কেন? বলছি, কারণ কোনো কোনো আত্মসাৎকে ডাকাতির পর্যায়েই ফেলা যায়। এই তো সেদিন (৩ ফেব্রুয়ারি) আমাদের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বললেন, ‘বেসিক ব্যাংকে দুর্নীতি হয়েছে আর সোনালী ব্যাংকে হয়েছে ডাকাতি।’ অনেকের নিশ্চয়ই মনে আছে, হল-মার্ক কেলেঙ্কারিতে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার মধ্যে একমাত্র সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা (শেরাটন) শাখা থেকেই আত্মসাৎ হয়েছিল সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। এই শাখার ব্যবস্থাপক পদে এ কে এম আজিজুর রহমান নিয়ম অনুযায়ী তিন বছরের জায়গায় ছিলেন টানা পাঁচ বছর। একে তো আমরা ডাকাতি বলতেই পারি।
একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ দিয়েও ব্যাংক ডাকাতদের দেখা যায়। আল পাচিনোর ভক্তরা নিশ্চয়ই ১৯৭৫ সালের সেই বিখ্যাত চলচ্চিত্র ডগ ডে আফটারনুন দেখেছেন। প্রথমবারের মতো ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে দেখল ভুল সময়ে এসেছে তারা। তখন দিনের নগদ জমা প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া শেষ, ক্যাশে আছে মাত্র ১ হাজার ১০০ ডলার। গল্পের শেষটা তো আরও মর্মান্তিক। আল পাচিনোর প্রতি সহানুভূতিটাই থেকে যায় সিনেমাটির শেষে।
স্টিভেন ডি লেভিট আর স্টিফেন জে ডুবনারও একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন ব্যাংক ডাকাতদের। ২০০৯ সালের ব্যাংক ডাকাতির কিছু পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই। ওই বছর ছিল অর্থনীতিতে মন্দা। অথচ আগের বছরের তুলনায় ব্যাংক ডাকাতির সংখ্যা ছিল কম। এ তথ্য বিশ্লেষণ করে লেভিট ও ডুবনার বলছেন, হতে পারে ব্যাংক ডাকাতেরা খুব ভালো করেই জানে ব্যাংকগুলোর দুরবস্থার কথা।
তবে ব্যাংক ডাকাতদের যে অর্থনীতি জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার, এমন কথাও কিন্তু অর্থনীতিবিদেরা বলছেন। তিন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ সাসেক্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ব্যারি রেইলি এবং সারে ইউনিভার্সিটির নেইল রিকম্যান ও রবার্ট উইট ব্যাংক ডাকাতি নিয়ে একটি অর্থনৈতিক তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, অপরাধও একধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এর মুনাফা আছে, লোকসান আছে, ঝুঁকি আছে এবং এর রিটার্ন বা প্রাপ্তিও আছে। এ কাজেও উপকরণ ব্যবহার করতে হয়, শ্রম দিতে হয়, পুঁজি বিনিয়োগ করতে হয় এবং এর একটি ব্যয়ও আছে।
ব্যাংক ডাকাতি নিয়ে অনেকেরই একটি রোমান্টিক ধারণা আছে। দু-তিনজনের একটি দল নিয়ে বন্দুক ঠেকিয়ে কোটি কোটি অর্থ বস্তায় ভরে দে ছুট। তারপর সারা জীবন বসে বসে খাও। কিন্তু এই তিন অর্থনীতিবিদ বলছেন, বিষয়টি আসলে সে রকম নয়। তাঁরা মোট ব্যাংক ডাকাতির সংখ্যা, ডাকাতি করা অর্থের পরিমাণ ও ধরা পড়ার হার বিচার-বিশ্লেষণ করে বলেছেন, ২০০৫ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে সংঘটিত ব্যাংক ডাকাতির ক্ষেত্রে একেকজনের গড় আয় হয়েছে ১২ হাজার ৭০৬ পাউন্ড। এই অর্থ দিয়ে সারা জীবন বসে বসে খাওয়ার কোনো উপায়ই নেই। ব্রিটেনে সে সময় যাঁদের পূর্ণ কাজ ছিল, তাঁদের গড় আয় ছিল বছরে ২৬ হাজার পাউন্ড। সুতরাং, একবার ব্যাংক ডাকাতির অর্থ দিয়ে বড়জোর ছয় মাস কাটানো যেত। এরপরেই নামতে হবে আবার ব্যাংক ডাকাতিতে। একাধিকবার ব্যাংক ডাকাতি মানেই ধরা পড়ার আশঙ্কাও বেশি। তিন অর্থনীতিবিদ গবেষণার সবশেষে বলেছেন, ‘ব্যাংক ডাকাতি খুবই খারাপ ধারণা। একটি ব্যাংক ডাকাতি থেকে যে প্রাপ্তি, তা থেকে খুব খোলামেলাভাবেই বলা যায়, রাবিশ (দ্য রিটার্ন অন অ্যান এভারেজ ব্যাংক রবারি ইজ, ফ্রাঙ্কলি, রাবিশ)।’
আমরা জানি, আমাদের অর্থমন্ত্রী প্রায়ই ‘রাবিশ’ শব্দটি ব্যবহার করেন। এই যে সোনালী ব্যাংকে ডাকাতি হওয়ার কথা এখন বলছেন, তিন বছর আগেও তিনি একে রাবিশ বলেছিলেন। ২০১৩ সালের ৩০ মার্চ সিলেটে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘দুষ্টু প্রতিষ্ঠান হল-মার্ক জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করেছে। হল-মার্কের এমডি জেলে রয়েছে, তার শাস্তি হবেই। বিষয়টি নিয়ে বুদ্ধিজীবী ও ব্যাংকাররা হইচই শুরু করেছেন। তাঁদের কথাবার্তা বোগাস ও রাবিশ। সারা পৃথিবীতে ব্যাংকিং খাতে জালিয়াতি হয়। বাংলাদেশেও হয়েছে। তবে এটা তেমন ভয়ংকর কিছু নয়।’
ওই তিন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে ব্যাংক ডাকাতিকে যতই নিরুৎসাহিত করুন না কেন, বাংলাদেশে কিন্তু এর উল্টোটা। এখানে ঝুঁকি অনেক কম, লাভ বেশি। বাংলাদেশে ‘ধনিক গোষ্ঠীর লুটপাটের কাহিনি’ মূলত ব্যাংক ডাকাতিরই গল্প। সেই জিয়া-এরশাদের জামানা থেকে শুরু, এখনো চলছে। ধরন পাল্টেছে মাত্র। শুরুতে ছিল ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে মেরে দেওয়া। এখন পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে অবলোপন করা আছে আরও প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ ব্যাংক আর ফেরত পাবে না বলেই ধরা যায়। তাহলে এটা ব্যাংক ডাকাতি না তো কী!
তবে ‘ব্যাংক ডাকাতি’র ধরনও পাল্টেছে। নতুন প্রবণতা হচ্ছে ব্যাংকের মালিক বা প্রতিনিধি সেজে অন্যকে অর্থ আত্মসাতের অবাধ সুযোগ দিয়ে নিজেও লাভবান হওয়া। হল-মার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি এরই উদাহরণ। এ জন্য অর্থনীতির তত্ত্ব মেনে উপকরণ, শ্রম বা পুঁজি নিয়োগেরও তেমন প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন কেবল সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের। আর এই সম্পর্কের জোরেই সরকারি ব্যাংকে চেয়ারম্যান ও পরিচালক হয়ে অর্থমন্ত্রীর ভাষায় এখানে ‘ব্যাংক ডাকাতি’ বেশ সফলভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। কোনো ঝুঁকি নেই। ধরা পড়ার প্রশ্নও নেই। খুব বেশি হইচই হলে শেষ ভরসা দুদক তো ‘দায়মুক্তি’র সার্টিফিকেট নিয়ে বসেই আছে।
তাহলে বিখ্যাত সেই গল্পটা বলি। দুজন মিলে ঠিক করল ব্যাংক ডাকাতি করবে। একজন অভিজ্ঞ ডাকাত, আরেকজন নতুন, শিক্ষানবিশ। এক সকালে তারা একটা বন্দুক নিয়ে চলে গেল ব্যাংকে। তারপর চিৎকার করে বলল, ‘কেউ নড়বেন না। যে যেখানে আছেন, সেখানেই শুয়ে পড়ুন। মনে রাখবেন, টাকার বিমা আছে, টাকার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, কিন্তু জীবনটা আপনার।’—এ হচ্ছে মন বদলের ধারণা। অর্থাৎ, প্রথাগত চিন্তাভাবনা বদলে দাও, ভালো কাজে দেবে।
এক নারী একটু অন্যভাবে বসে ছিলেন। সহজেই চোখ যায় সেদিকে। অভিজ্ঞ ডাকাতটা তাকে বলল, ‘শালীন হয়ে বসুন। মনে রাখবেন, এটি ডাকাতি, ধর্ষণ না।’—এর নাম হচ্ছে পেশার প্রতি একনিষ্ঠ থাকা। প্রশিক্ষণ যেখানে, তাতেই মনোনিবেশ করা উচিত।
এরপর তারা সব টাকা ব্যাগে ভরল। এবার শিক্ষানবিশ ডাকাতটা বলল, ‘ওস্তাদ, গুনে দেখি কত পেলাম।’ অভিজ্ঞ ডাকাত ধমক দিয়ে বলল, ‘দূর বোকা, এত টাকা কী করে গুনব! তারচেয়ে টিভি খুলে বসে থাকো, জানতেই পারবে কত টাকা পেলাম।’—এর নাম হচ্ছে অভিজ্ঞতা। আজকাল কাগুজে দক্ষতার চেয়ে অভিজ্ঞতাই বেশি দামি।
ডাকাত দুজন চলে যাওয়ার পর ব্যাংকের এক সহকারী এবার ম্যানেজারকে বলল, ‘স্যার, দ্রুত পুলিশকে খবর দেন।’ ম্যানেজার মৃদু হেসে বলল, ‘আরে অপেক্ষা করুন। আগে ডাকাতির সমপরিমাণ পাঁচ কোটি টাকা দ্রুত সরিয়ে ফেলুন।’—এর নাম হচ্ছে স্রোতের পক্ষে হাঁটা। বিপরীত পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসা।
ওই রাতে সংবাদে বলা হলো, ১০ কোটি টাকা ডাকাতি হয়েছে। শুনে দুই ডাকাত বারবার গুনেও পাঁচ কোটি টাকার বেশি অর্থ পেল না। এবার প্রচণ্ড রাগ হলো তাঁদের। শিক্ষানবিশ ডাকাতটা বলল, ‘এটা কী হলো? আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাঁচ কোটি টাকা ডাকাতি করলাম। আর ওই ব্যাংক ম্যানেজার বসে বসেই তুড়ি মেরে পাঁচ কোটি টাকা আয় করে ফেলল! তাহলে চোর-ডাকাত হওয়ার চেয়ে শিক্ষিত হয়ে ব্যাংক ম্যানেজার হওয়াই তো ভালো।’—এর নাম হচ্ছে জ্ঞানই শক্তিই, শিক্ষাই সবচেয়ে মূল্যবান।
ব্যাংকের ওই ব্যবস্থাপক এবার খানিকটা হেসে ভাবল, ‘যাক, ব্যাংকের এই পদে আসতে দুই কোটি টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। তারপরেও তিন কোটি টাকা লাভ।’—এর নাম হচ্ছে সুযোগের সদ্ব্যবহার।
তাহলে কে বড় ডাকাত?
শওকত হোসেন: সাংবাদিক।
massum99@gmail.com

হাফিজুর–আবু বকরদের জন্য দুফোঁটা অশ্রু by সোহরাব হাসান

হাফিজুর মোল্লা ও আবু বকর সিদ্দিক
হাফিজুর মোল্লা ও আবু বকর সিদ্দিক দুজনই গরিব মা-বাবার সন্তান। তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন পড়াশোনা করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে মা-বাবার দুঃখ ঘোচাবেন—এ আশায়। কিন্তু তাঁরা পারলেন না। যেমন পারেননি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবায়ের। যেমন পারেননি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাঈদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তাপস পাল। শাহজালালের সুমন চন্দ্র দাস।
ছয় বছরের ব্যবধানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি ঘটনায় যে দুজন ছাত্র করুণ মৃত্যুর শিকার হলেন, তার নেপথ্যে সরকার-সমর্থক ছাত্রসংগঠনটির কতিপয় নেতা-কর্মীর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। টাঙ্গাইলের দিনমজুর বাবার সন্তান আবু বকর সিদ্দিক পড়তেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে। থাকতেন স্যার এফ রহমান হলে। ২০১০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে মারা যান তিনি। তাঁর মৃত্যুর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ অনেকেই হত্যার বিচার করা হবে বলে ওয়াদা করেছিলেন। কিন্তু ছয় বছর পর এখন দেখা যাচ্ছে, হত্যা মামলার তদন্তই ঠিক হয়নি। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, পুলিশের তদন্তে ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতে আবু বকর মারা যান বলে জানানো হলেও সেই অস্ত্রটি কী, তা উল্লেখ করা হয়নি। ঘটনার কোনো আলামত রাখা হয়নি। ফলে মামলাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে খোদ সরকারপক্ষের কৌঁসুলিরাই সন্দিহান। তাঁদের মতে, তদন্ত যথাযথ হয়নি। মামলাটি পুনরায় তদন্তের দাবি রাখে।
ঘটনার পর একই হলের আবাসিক ছাত্র ওমর ফারুক বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন। তিনি নিজেও ওই ঘটনায় আহত হয়েছিলেন। আবু বকর হত্যা মামলাটির তদন্ত শেষে এফ রহমান হল শাখা ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি সাইদুজ্জামান ফারুকসহ আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় শাহবাগ থানার পুলিশ। পরে বাদীর নারাজি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে সিআইডি মামলাটির অধিকতর তদন্ত করে এবং ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর অভিযোগপত্র দেয়। তাতে আগের আটজনসহ আরও দুজনকে অভিযুক্ত করা হয়। আসামিদের সবাই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী।
মামলাটি বর্তমানে ঢাকার ৪ নম্বর অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। মামলার ২২ জন সাক্ষীর মধ্যে ইতিমধ্যে আটজন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। যাঁদের মধ্যে সাতজনই প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী এবং তাঁরা ওই হলের তৎকালীন ছাত্র ও একজন আবাসিক শিক্ষক।
মামলার নথিতে থাকা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, শক্ত ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতে আবু বকরের মাথা থেঁতলে যায়। কিন্তু পুলিশের দুটি অভিযোগপত্রের কোথাও বলা হয়নি, ভোঁতা অস্ত্রটা কী জিনিস। শুধু বলা হয়েছে, স্যার এ এফ রহমান হলের সিট দখলকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। আসামিরা রড, লাঠি, হকিস্টিক দিয়ে মারামারি করেছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু কোন কোন আসামির অস্ত্রের আঘাতে আবু বকর নিহত হন, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা নেই।
আবু বকরের বড় ভাই আব্বাস আলী বলেছেন, ‘এটা তো নিশ্চিত, আমার ভাইকে কেউ না কেউ হত্যা করেছে। যারাই খুন করেছে, তাদের ফাঁসি চাই।’
কিন্তু বাংলাদেশে যে গরিব মানুষের সব চাওয়া পূরণ হয় না, সেটি হয়তো আব্বাস আলী জানেন না।
দ্বিতীয় ঘটনার শিকার ফরিদপুরের অটোরিকশাচালক ইসহাক মোল্লার ছেলে হাফিজুর মোল্লা। মাস খানেক আগে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে। কিন্তু এই শহরে তাঁর কোনো আত্মীয়স্বজন ছিল না, যঁাদের বাসায় থাকতে পারেন। মেসে বা বাসাভাড়া নিয়ে থাকার সামর্থ্যও তাঁর নেই। তাই ছাত্রলীগের ‘বড় ভাইদের’ ধরে হাফিজুর উঠেছিলেন সলিমুল্লাহ মুসলিম (এস এম) হলে। থাকতেন দোতলার দক্ষিণ পাশের বারান্দায়। হলের বারান্দায় আরও অনেকে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে কে কোথায় থাকবেন, কে সিট পাবেন, কে পাবেন না—সেসব এখন আর হল প্রশাসন ঠিক করে না। ঠিক করেন ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনটির ‘বড় ভাইয়েরা।’ বিএনপি আমলে ছাত্রদল, আওয়ামী লীগ আমলে ছাত্রলীগ।
পত্রিকার খবর অনুযায়ী, হলে ওঠার বিনিময়ে হাফিজুরকে ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে তালিম নিতে যেতে হতো। কিন্তু শীতের রাতের ধকল সইতে পারেননি তিনি। ফলে আক্রান্ত হন নিউমোনিয়া ও টাইফয়েডে। চলে যান গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের পূর্ব শ্যামপুরে। শারীরিক অবস্থা বেশি খারাপ হলে ভালো চিকিৎসার জন্য রওনা দেন ঢাকায়। ১ ফেব্রুয়ারি রাতে পথেই তিনি মারা যান।
এই মৃত্যুর জবাব কী? এটি কি কেবলই শারীরিক অসুস্থতা, না এর পেছনে আমাদের অসুস্থ ছাত্ররাজনীতিও দায়ী? হাফিজুরের সহপাঠী ও পরিবারের অভিযোগ, শীতের মধ্যে বারান্দায় থাকা এবং রাতের বেলায় ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে যাওয়ার কারণে হাফিজ ঠান্ডায় আক্রান্ত হন। অসুস্থ অবস্থায় তীব্র শীতের মধ্যেও হাফিজকে গত ২৬ জানুয়ারি রাতে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা বাইরে থাকতে হয়। তাঁকে প্রায়ই অন্য কর্মীদের সঙ্গে হলের মাঠে ‘গেস্টরুম’ করতে হতো। গেস্টরুম হচ্ছে ছাত্রলীগের একটি দলীয় রীতি। একটি নির্দিষ্ট সময়ে ছাত্রলীগের কনিষ্ঠ কর্মীদের সঙ্গে জ্যেষ্ঠরা বসে আলাপ-আলোচনা করেন। এ সময় তাঁদের ছাত্রলীগ করতে বা হলে থাকতে হলে কী করতে হবে, সে সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক দিদার মুহাম্মদ নিজামুল ইসলাম জোর করে হাফিজুরকে কর্মসূচিতে নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, ‘কোনো ধরনের সমস্যা হলে আমাকে বলত। কিন্তু সে এ নিয়ে আমাকে কখনোই কিছু বলেনি।’ দিদার হলে তুললেও ছাত্রলীগের অন্য কেউ যে হাফিজুরকে গেস্টরুম কর্মসূচিতে পাঠাননি, সে কথা হলফ করে বলা যাবে না। বিভিন্ন হলে ছাত্রলীগের নানা গ্রুপ থাকে। এক গ্রুপের কর্মীকে অন্য গ্রুপে নিতে জবরদস্তি করার ঘটনাও আছে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হাফিজ আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন। তাই যদি হয়, সেটি আরও গুরুতর। অসুস্থ অবস্থায় কে বা কারা তাঁকে রাতের ডিউটিতে পাঠিয়েছে, সেটি তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
হাফিজুরের বাবা ইসহাক মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত সপ্তাহের বুধবার হাফিজ ঢাকা থেকে বাড়ি এসেছিল। প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে এসেছিল। কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, “আমি আর বাঁচব না।” জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী হয়েছে। ও জানায়, শীতের মধ্যে বাইরে “ডিউটি” করতে হয়। ওই দিন নাকি সে ওদের বলেছে, তার শরীরটা ভালো না। ডিউটিতে যেতে পারবে না। কিন্তু তারপরও মাঠে নিয়ে গিয়ে রাত সাড়ে নয়টা থেকে একটা পর্যন্ত দাঁড় করিয়ে রেখেছে।’
একজন অসুস্থ তরুণকে রাত নয়টা থেকে একটা পর্যন্ত মাঠে দাঁড় করিয়ে রাখা কী ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি? এসব যাঁরা করেন, তাঁরা কীভাবে নিজেদের সুস্থ রাজনীতির বাহক বলে দাবি করেন। নবীনদের ছাত্রসংগঠনে আনার জন্য তাঁরা সভা-সমাবেশ করে দলীয় নীতি ও কর্মসূচি বোঝাতে পারেন। কিন্তু রাতের বেলায় চার ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে তালিম হবে কেন?
সন্তান হারিয়ে হাফিজুরের বাবা এখন দিশেহারা। মা পাগলপ্রায়। কিন্তু মা-বাবার আহাজারি আমাদের হৃদয়হীন সমাজকে এতটুকু নাড়া দিতে পেরেছে বলে মনে হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সলিমুল্লাহ হল কিংবা হাফিজুর যে বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন, সেই বিভাগের সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছে। কেউ তাঁর মৃত্যুতে শোক জানায়নি। মা-বাবার খোঁজ নেয়নি। এমনকি যে ছাত্রসংগঠনটির নেতারা হাফিজুরকে নিজেদের কর্মী বলে দাবি করেছেন, সেই সংগঠনটিও তাঁর শোকাহত মা-বাবাকে সামান্য সমবেদনা জানানোরও প্রয়োজন বোধ করেনি।
আবু বকর ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের শিকার হয়েছেন। হাফিজুর ছাত্র সংঘর্ষের শিকার না হলেও গেস্টরুম কর্মসূচির নামে চালু হওয়া অপসংস্কৃতিরই বলি হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কি এই তথাকথিত গেস্টরুম সংস্কৃতি সম্পর্কে অবহিত? অবহিত হলে তারা এর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে? আর অবহিত না থাকলে হাফিজুরের মৃত্যুর দায় তারাও এড়াতে পারে না। শিক্ষার পাশাপাশি ক্যাম্পাসে অবস্থানরত সব শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।
এ ব্যাপারে সবচেয়ে নিষ্ঠুর মন্তব্য করেছেন সলিমুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষ। তাঁর দাবি, বারান্দায় থাকলেও নিউমোনিয়া হতে পারে, না থাকলেও হতে পারে। আরও অনেকে বারান্দায় ছিলেন, তাঁদের নিউমোনিয়া হয়নি; কিন্তু হাফিজুরের হয়েছে। প্রকারান্তরে তিনি হাফিজুরকেই তাঁর মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছেন। দায়িত্বশীল প্রাধ্যক্ষই বটে!
কয়েক বছর আগে শহীদুল্লাহ্ হলে ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে না যাওয়ার কারণে বেশ কিছু ছাত্রকে সারা রাত হলের বাইরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল। সেবার কর্তৃপক্ষ অন্যায়ের বিচার করলে হয়তো হাফিজুরকে শীতের রাতে নিউমোনিয়ায় ভুগে এভাবে মরতে হতো না।
হাফিজুরের গরিব বাবা জানেন, তিনি কখনো সন্তানকে ফিরে পাবেন না। তাই আকুতি জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে যেন আর কারও সন্তানকে হাফিজুরের ভাগ্য বরণ করতে না হয়। নিজের সন্তানের বিনিময়ে অন্যদের সন্তানকে নিরাপদ দেখতে চেয়েছেন এই মহান বাবা।
কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কি সন্তানহারা বাবার এই আকুতি শুনতে পাবে? তারা কি ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির নামে চলা অপসংস্কৃতি ও জবরদস্তি বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে? না প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনহীন ক্যাম্পাসে সরকার-সমর্থক ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সব অপকর্ম প্রশ্রয় দিতে থাকবে?
ডাকসুর সাবেক সহসভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মুক্তির দাবিতে নব্বইয়ের কয়েকজন ছাত্রনেতার বিবৃতির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক এক অনুষ্ঠানে ক্যাম্পাসে লাশ ফেলার চক্রান্ত হচ্ছে জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু নিকট অতীতে যাঁরা এই ক্যাম্পাসে লাশ ফেলেছেন, কাউকে কিন্তু সরকার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিচারের মুখোমুখি করতে পারেনি।
আবু বকর সিদ্দিক হত্যার বিচার এবং হাফিজুরের মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তই পারে ক্যাম্পাসকে নিরাপদ রাখতে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

শিক্ষায় বৈষম্য এবং এক শিক্ষকের আক্ষেপ by আমিরুল আলম খান

পল্লীতীর্থ। খুলনার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রধান শিক্ষক শিবপদ পাল মহাশয়। গিয়েছিলাম আমার পেশাগত কাজে। আলাপ জমল সে সূত্রেই। হাতে সময় ছিল। তিনি যেন আমার চোখ খুলে দিলেন চৌকস কিছু কথায়। বললেন দেশে শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্যের কথা। বললেন দেশের সরকারি প্রাইমারি স্কুলগুলোর অব্যবস্থাপনার কথা।
সরকারি প্রাইমারি স্কুলে আসে সমাজের গরিব ঘরের ছেলেমেয়েরা। অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলেমেয়েরা যাচ্ছে কিন্ডারগার্টেনে। সেখানে ইংরেজি শেখানো হচ্ছে। তাতে চাকরির ভালো সুযোগ আছে তাদের জন্য, ইংরেজি জানার সুবাদে। পাল মশাই বলছিলেন শিক্ষার বর্তমান পদ্ধতির কথা। ‘আগে আমরা শেখাতাম বর্ণানুক্রমিক উপায়ে, এখন বাক্যানুক্রমিক উপায়ে। আমরা এখন যে পদ্ধতিতে পড়াচ্ছি, তাতে শিশুরা শিখছে কম।’ তাঁর মতে, এ পদ্ধতিতে ইংরেজি শেখানো হয়তো সহজ; কিন্তু বাংলা পাঠদানে এটা ততটা কার্যকর নয়।
আমি তাঁকে কারণ জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি জবাব দিলেন, ইংরেজি বর্ণের মাত্র দুটি রূপ ক্যাপিটাল ও স্মল। বাংলায় বড় হাত-ছোট হাতের বর্ণ নেই সত্য, কিন্তু বর্ণের বহু রূপ আছে। ইংরেজি বর্ণগুলো পাশাপাশি বসে শব্দ তৈরি হয়। সেখানে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ পাশাপাশি বসে। বাংলায়ও পাশেই বসে, কিন্তু তার নানা রূপ। সাধারণভাবে শব্দের প্রথমে স্বরবর্ণের রূপ অপরিবর্তিত থাকলেও মধ্যে এবং শেষে তার রূপবদল ঘটে। স্বরবর্ণ শুধু পাশেই বসে তা নয়, বর্ণের ওপরে-নিচেও বসে। ব্যঞ্জনবর্ণও যুক্ত হতে পারে পাশে এবং ওপর-নিচে, গায়ে গায়ে। বাংলা স্বরবর্ণের রূপান্তরকে বলি ‘কার চিহ্ন’। আর ব্যঞ্জনবর্ণের যুক্ত হওয়াকে বলি ‘ফলা চিহ্ন’। এই কার চিহ্নে এবং ফলা চিহ্নে স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণের রূপ বদলে যায়। বর্ণভেদে যুক্ত হওয়ার ধরন আলাদা হতে পারে। যেমন কৃ (ক+ঋ) এবং হৃ (হ+ঋ)। তিনি বললেন, বাক্যানুক্রমিক শিক্ষার ফলে শিশুরা বাক্য শিখছে, কিন্তু বানান শিখছে না। ফলে তারা লিখতে পারে না। এটা একটা বড় সমস্যা।
পাল মশাই মনে করেন, বাংলা বর্ণমালা খুবই বিজ্ঞানসম্মত। তিনি এই বর্ণমালার জন্য গর্ববোধ করেন। তিনি ব্যঞ্জনবণের্র বর্গওয়ারি আলোচনা করে তা কতখানি বিজ্ঞানানুগ তা ব্যাখ্যা করছিলেন। তাঁর প্রশ্ন, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের প্রেসক্রিপশন আমরা অন্ধের মতো অনুকরণ করব কেন? কেন আমরা আমাদের ভাষার বৈশিষ্ট্যগত দিক উপেক্ষা করে বর্ণ, আ-কার, ও-কার, ফলা না শিখিয়ে বাক্যানুক্রমিক পদ্ধতির ব্যর্থ অনুকরণ করব?
এ প্রসঙ্গে কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক গ্রন্থাগারিক খন্দকার ফজলুর রহমান আমাকে স্বরবর্ণহীন এক চিঠির উল্লেখ করলেন। উনিশ শতকে ঢাকা শহরে পড়তে আসা এক কিশোর স্বর এবং ব্যঞ্জন উভয় বর্ণ শিখেছে বটে, শেখেনি কার চিহ্ন। সে তার বাবার কাছে টাকা চেয়ে কার চিহ্নহীন এই পত্র লেখে, ‘ঢক শহর খরচ বড় বশ টক পঠত ন পঠত ভত মর যয়।’ কার চিহ্ন দিয়ে পড়ে দেখুন কী লিখেছে পুত্র তার বাবাকে: ‘ঢাকা শহরে খরচ বড় বেশি। টাকা পাঠাতে না পাঠাতে ভাত মারা যায়।’
পাল মশাইয়ের সব প্রশ্নের জবাব আমার জানা নেই। এসব কথা ভাষা-পণ্ডিতদের জানার কথা। তবে তাঁর কথায় যুক্তি আছে বলে আমার মনে হয়েছে। বাংলা ভাষার যারা বিরুদ্ধাচরণ করে, করে ইংরেজির পক্ষে ওকালতি, পণ্ডিতজনের দায়িত্ব তাদের জবাব দেওয়া।
প্রতিটি ভাষার আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। প্রতিটি ভাষা শিক্ষার আছে আলাদা পদ্ধতিও। বাংলা ভাষা শেখাতে ইংরেজির অন্ধ অনুকরণ তাই বাঞ্ছিত না-ও হতে পারে। কিন্তু এই সহজ সত্যটি হয়তো আমরা বুঝি না। তবে এ কথা তো মানতে হবে যে উনিশ শতকে পাদরি কেরি সাহেবরাই তো আমাদের বাংলা ভাষাকে ‘সভ্য’ বানানোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তাঁদের মগজের ইংরেজি বাক্যরীতি তাই বাংলায় শিকড় গেড়েছে! আর এখন উন্নয়নের মহা মাতবররা আমাদের ওপর অহর্নিশ শিক্ষার ওহি নাজেল করে চলেছেন। সরকারি টাকা নিতে ওসব ফরমাশ না শুনলে কি চলে?
শিক্ষায় বৈষম্যের প্রশ্নে পাল মশাই বললেন, কিন্ডারগার্টেন (কেজি) পদ্ধতি আধুনিক, উন্নত। উন্নত দেশে এখন এ পদ্ধতি সর্বত্র অনুসৃত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে প্রাথমিক ও কেজি আলাদা প্রতিষ্ঠান। ধনীর দুলালেরা পাচ্ছে কেজি পদ্ধতিতে শেখার সুযোগ। কিন্তু দরিদ্র ঘরের ছেলেমেয়েরা সে সুযোগ পাচ্ছে না। তাঁর অভিমত, দেশে কেজি পদ্ধতি সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু করা উচিত। তাঁর সোজাসাপটা প্রশ্ন, সারা দেশে সবার জন্য একই পদ্ধতি অনুসৃত হবে না কেন? কেন বই ও সিলেবাসের মধ্যে পার্থক্য থাকবে? সূর্যের আলোয় সবার সমান অধিকার। শিক্ষার অধিকারও সবার জন্য সমান হওয়া বাঞ্ছনীয়।
তিনি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুললেন, যারা কেজি স্কুল থেকে পাস করবে, তাদের কেন চাকরির সুযোগ বেশি থাকবে? দক্ষতা কাজ পাওয়ার সুযোগের প্রথম ও প্রধান শর্ত। ভাষাগত দক্ষতা তার শীর্ষে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটির কারণে আজকের শিশুর ভাষাগত ত্রুটি দূর করা যাচ্ছে না। শিশুরা শিখছে যান্ত্রিকভাবে। আনন্দ পাচ্ছে না। আনন্দ ছাড়া শিক্ষা অসম্ভব। আমাদের শিশুদের প্রাণের উচ্ছলতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
আমাদের আইনে লেখা নেই যে কেজি স্কুলের ছাত্রের চাকরির আলাদা সুযোগ থাকবে। কিন্তু ইংরেজি জানলে চাকরির সুযোগ সত্যিই বেশি। তাই সুযোগটা পায় ওই ইংরেজি মিডিয়ামে পড়া ছেলেমেয়েরাই। কিন্তু ইংরেজি জানার সুযোগ তো সবার জন্য সমান করা হয়নি। তা ছাড়া এই দেশে গরিব, অশিক্ষিত ঘরের ছেলেমেয়েদের ইংরেজি শেখার সুযোগ কোথায়? অথচ চাকরিটা তো তারই বেশি প্রয়োজন। যার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, সেই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত!
পালবাবু কিছু সমাধানের কথাও বলেছেন। তাঁর মতে, আমাদের পুরো সিলেবাস পর্যালোচনা করা দরকার। পাঠ হতে হবে আনন্দদায়ক। ফরমায়েশি লেখক দিয়ে বই লেখানোর বদলে মৌলিক বই পাঠ্য করা উচিত। সমাজের মানুষকে স্কুলের দেখভালের দায়িত্ব দিতে হবে। প্রয়োজনীয় এবং উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের নানা অতিরিক্ত কাজের দায়িত্ব (বিভিন্ন জরিপ, ভোটার তালিকা প্রণয়ন, নির্বাচন, সপ্তাহে অনাবশ্যক থানা শিক্ষা অফিসারের অফিসে হাজিরা দেওয়া, অফিসারদের বা নেতাদের অভ্যর্থনার নামে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা ইত্যাদি) থেকে মুক্তি দিতে হবে। তাঁরা শুধু শিক্ষাদানের কাজে ব্যস্ত থাকবেন। তাঁদের জন্য সম্মানজনক বেতনকাঠামো, সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বিশ্বাস করেন, শুধু সদিচ্ছা থাকলেই এগুলো করা সম্ভব।
হয়তো শিবপদ বাবুর সুপারিশে কেউ কান দেবে না। তবু কথাগুলো আমাকে ভাবিয়েছে নানা কারণে। যাঁরা তৃণমূলে কাজ করছেন, সমস্যার গভীরে যাওয়া তাঁদের পক্ষে যতটা সহজ, অন্যের পক্ষে তা নয়। শিবপদ বাবুর কথা আমাদের ভেবে দেখতে হবে। না হলে যে ক্যানসারে আমাদের ভাষাশিক্ষা আক্রান্ত হচ্ছে, তা একদিন গোটা ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দেবে।
আমিরুল আলম খান: সাবেক চেয়ারম্যান, যশোর শিক্ষা বোর্ড।
amirulkhan7@gmail.com