Friday, January 24, 2014

মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ by রাজু আলাউদ্দীন

প্রত্যেক লেখকই তার লেখার মধ্যে জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে বহন করেন তার কালের চিহ্নগুলো আর এ চিহ্নগুলোর নজন্মদাতা যে-মানুষ তারও এক কোলাজ চিত্র তাতে প্রস্ফুটিত হয়ে থাকে। কিন্তু লেখক যেমন দৃশ্যমান ঘটনার চিত্রকর, তেমনি এ চিত্রের সব রঙের মাঝে নিজের কণ্ঠস্বরটিও অজান্তে চিত্রিত হয়ে ওঠে। শৈল্পিক উৎকর্ষতার পাশাপাশি সেই কণ্ঠ মানবিকতায় কতটা সুগভীর হয়ে ওঠে সেটাও আমাদের মনযোগকে আকর্ষণ না করে পারে না। আর্হেন্তিনার কবি ও চিত্রকর, কথাসাহিত্যক ও প্রাবন্ধিক অসবাল্দো স্বানাসিনি রবীন্দ্ররচনা পাঠ করতে গিয়ে মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথের সার্বজনীন আবেদনকে বুঝার চেষ্টা করেছেন। অসবাল্দো আমাদের কাছে প্রায় অজ্ঞাত এক নাম। ভাষিক বাধা পেরিয়ে তার খ্যাতি বা কর্মের উত্তাপ আমরা না পেলেও আর্হেন্তিনার (প্রচলিত উচ্চারণ আর্জেন্টিনা) গত শতাব্দীর পঞ্চাশ বা ষাটের দশকের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি বিশেষ ব্যক্তিত্ব হিসেবে নজর কেড়ে নিয়েছিলেন তার নানামুখী সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের জন্য। জন্মেছিলেন ১৯২৮ সালের ৮ ডিসেম্বর। লেখা আর আঁকার মধ্যে তার সৃষ্টিশীল সত্তার স্ফূরণ ঘটেছে। দেশে-বিদেশে প্রায় ৪৫টি প্রদর্শনী হয়েছিল তার চিত্রকলার। চিত্র সমালোচক হিসেবেও তার খ্যাতি ছিল স্পানঞলভাষী দেশগুলোয়। কথাসাহিত্য, কবিতা ও প্রবন্ধের বইয়ের সংখ্যা ষাটের ওপরে। দেশে-বিদেশে বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় অভিষিক্ত অসবাল্দো স্বানাসিনি মৃত্যুবরণ করেন।
অসবাল্দো কীভাবে রবীন্দ্রনাথে আগ্রহী হয়েছিলেন তার কোনো স্পষ্ট ইতিহাস আমাদের জানা নেই। তথ্য আকারে শুধু এটুকু জানা যায়, তিনি দুবার দুটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে। একবার ১৯৫১ সালে আর্হেন্তিক অনুবাদক এরিবের্তো চার্লসের অনুবাদে রবীন্দ্রনাথেরstray Birds-এর স্পানঞল অনুবাদ Aves Errantes গ্রন্থের জন্য একটি ভূমিকা হিসেবে আর এর ১০ বছর পর ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে SUR পত্রিকার প্রকাশিত রবীন্দ্র সংখ্যায়। SUR-এর লেখাটির শিরোনাম ছিল মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ (Tagore Humanista) তবে কোন লেখককে যত সহজে মানবতাবাদী হিসেবে প্রতিপন্ন করা সম্ভব ততটা সহজ নয় শিল্পের জটিল দ্বন্দ্বের মধ্য থেকে অনিষ্ট পরিচয়টিকে উদ্ধার করা। জটিলতার কারণ শিল্পের স্বভাবজাত নানা আভাসে, বিরোধাভাসে তা এমন সব সুক্ষ্ম রেখায় উৎকীর্ণ হয়ে থাকে যে, খুব সতর্কতা নিয়ে না তাকালে ভুল বুঝার অবকাশ তাতে থেকে যায়।
অসবাল্দো ‘মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক প্রবন্ধের শুরুতে এ সতর্কতা নিয়ে তাকাতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের গীতাজ্ঞলির ২৬নং কবিতার দ্বৈততাকে লক্ষ্য করেছিলেন এবং কবি যে এ দ্বৈততাকে ত্যাগ করছেন না সেটাকেও তিনি আমলে নিয়ে বুঝেছিলেন যে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা কবীর কিংবা রুমীর সর্বেশ্বরবাদী প্রতীকবাদের ভাবনা থেকে অনেক দূরে। তবে দূরত্ব যাই-ই হোক না কেন, মানবতাবিষয়ক ভাবনা আর শিল্পের মধ্যেকার দ্বন্দ্বমধুর সম্পর্কটি রবীন্দ্রনাথ কীভাবে রচনা করছেন তাই অসবাল্দোর মনযোগের বিষয়। নিজের শৈল্পিক অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো বুঝার চেষ্টা করতে গিয়ে বলেছিলেন যে-
‘মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথ জ্ঞানের প্রতিফলনকে প্রত্যাখ্যান করেন না, তবে মানবরূপে অবস্থিত ঐক্যগুলোতে ফিরে যেতে তিনি পছন্দ করেন, হয়তো একটি পথের সন্ধানে এই ফিরে যাওয়া কিংবা শুধুই কবিতা-প্রসূত যন্ত্রণার কারণেই এই ফিরে যাওয়া যে যন্ত্রণার কথা তু ফু স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন লি তাই পো’কে (আবারও কবিতার যন্ত্রণায় ভুগছ?)’
একদিকে কবিতার যন্ত্রণা অন্যদিকে মানবতার আকুতি... এ দুয়ের মাঝখানে শিল্পীর দ্বন্দ্বকে অসবাল্দো দেখতে চেয়েছিলেন সংবেদনশীল মনের সহযোগিতায়। রবীন্দ্রনাথ কীভাবে এর নিষ্পত্তি করছেন তা অসবাল্দোর কাছে ছিল খুবই কৌতূহলের বিষয়। নিষ্পত্তির সূত্রগুলোর সন্ধানে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা আর নাটকের মধ্যে পেন্ডুলামের মতো যাতায়াত করেছেন কৌতূহলের সুতায় ঝুলে থেকে। মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথের সন্ধানে তিনি রবীন্দ্রনাথের নাটকের মধ্যে কয়েকটি ধ্র“বসত্যের মুখোমুখি হলেন যা শৈল্পিক নির্মাণে বিরোধাভাসের সৌন্দর্যে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। অসবাল্দো পর্যবেক্ষণে আমরা দেখব, সন্ন্যাসী ভালোবাসার মধ্যে খুঁজে পায় যথার্থতা।
সন্ন্যাসী নাটকের চতুর্থ অংক থেকে তিনি সন্ন্যাসীর উদ্ধৃতি দিয়ে এ যথার্থতাকে নিশিত করে তোলেন : ‘কারণ সত্যিকারের অসীমতা রয়েছে সীমার মধ্যে আর প্রেমই কেবল সত্যকে চিনতে পারে...’
রবীন্দ্রনাথের এ সত্যের সঙ্গে তিনি তুলনা করতে গিয়ে স্মরণ করেছেন মধ্যযুগীয় জার্মান ধর্মতাত্ত্বিক মেইস্টার একহার্টকে (Eckhart)। একহার্ট বলেছিলেন, মানুষ আসলে ইশ্বর আর ইশ্বর আসলে মানুষ। তবে তুলনা করতে গিয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথের স্বাতন্ত্র্যকে ভুলে যাননি। বলেছেন, এই সত্যে পৌঁছার ধরন ভিন্ন।
জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে রবীন্দ্রনাথের দার্শনিক অবস্থান বুঝার জন্য তিনি এরপর আরও একবার তুলনার প্রসঙ্গটি সামনে নিয়ে আসেন রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর নাটকের সঙ্গে স্যামুয়েল বেকেটের waiting for Godot কে পাশাপাশি রেখে দেখিয়েছেন কীভাবে তারা ভিন্ন পথে ভিন্ন বার্তার ঘোষক হয়ে উঠেছে। অসবাল্দোকে অনুসরণ করে আমরা দেখতে পারি তিনি কীভাবে এ তুলনার পথে অগ্রসর হচ্ছেন-
‘অমলের (El Cartero del Rey) কোমলতা... সারল্যের মতোই তীব্রভাবে আকর্ষণীয় আর রাজার (ইশ্বরের প্রতীক) আগমনকে বাস্তবতার জন্য তীব্র ব্যাকুলতা এবং নিজের কৈশরিক স্বপ্নের প্রতিদান স্বরূপ একটা ক্ষতিপূরণ ও শিশুর বেদনার উপশমের লক্ষে একটা উদ্যোগ হিসেবেই দেখা উচিত। রাজা আর গডোট (বেকেট)... উভয়ে এক অভিন্ন প্রতীক, দুজনই দৃশ্যে অনুপস্থিত। কিন্তু এই চরিত্র দুটি পুরোপুরি আলাদা। পোজ্জোর উদাসীন নিষ্ঠুরতা বা লাকির মৃত্যুতে বেঁচে থাকার মতোই স্বচ্ছভাবে বেকেট যা তুলে ধরেন তা এস্ট্রাগন ও ভ­াদিমিরের যন্ত্রণা নয়, বরং এক বিচার। বিপরীতে, অমল বিচার ছাড়াই কোনো কিছু তৈরিতে সক্ষম এবং তাকে ঘিরে যে চরিত্রগুলো আবর্তিত তারাও; বাস্তবতা যখন তীব্র যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে, তখন বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার চেষ্টা করে তারা। প্রাচ্য এবং প্রতীচ্যের ভাবনা ও অনুভূতির ক্ষেত্রে যে পার্থক্য বর্তমান, বেকেট এবং রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও একই পার্থক্য নির্ধারণ করা সম্ভব।’
অসবাল্দোর রবীন্দ্র-বিচারের একটা বড় বৈশিষ্ট্য এই যে, তিনি রবীন্দ্রনাথকে তার নানা ধরনের প্রেক্ষিতে তো বটেই, এমনকি সেসব রচনাকে অন্য লেখকদের সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের স্বাতন্ত্র্যকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন। এটা ক্রমশ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ যে উৎসাহ ও উদ্দীপনায় গৃহীত হয়েছিলেন তা অটুট রয়েছে এক দীর্ঘ সময় ধরে। অটুট থাকার পেছনে যেটাকে প্রধান কারণ হিসেবে আমার মনে হয় তা হল রবীন্দ্রনাথকে তারা ইউরোপীয়দের মতো হুজুগের বশে নয় বরং তার রচনার বৈশ্বিক আবেদনকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন নিজেদের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখার কারণে।
রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে অসবাল্দো তার প্রবন্ধের শেষ স্তবকে যা বলেছেন তাতে এ বিশ্বাস আমাদের আরও নিশ্চিত হয়ে ওঠে-
‘পশ্চিমের অনেকেই রবীন্দ্রনাথের কাছে এসে তার রচনাকর্মে এমন এক প্রশান্তিকে খুঁজে পান যা পরে ভুলে যান তারা, ভুলে যাওয়ার কারণ হয়তো এই যে তাতে প্রবলভাবে দৃশ্যমান বৈপরীত্যহীন এক ধারাবাহিকতা কিংবা হয়তো এতে রয়েছে চূড়ান্ত সারল্যের মুখোশে সত্যের উপস্থিতি।’

নীল অপরাজিতা নান্দনিক শিল্প নির্মাণের প্রয়াস

নিজেকে প্রকাশ করা, নিজের ভাবনা-চিন্তাকে অপরের মনে সঞ্চালিত করার এক অদম্য বাসনা থাকে মানুষের মধ্যে। এটাই স্বাভাবিক মাধ্যম হিসেবে দেখতে পাই শিল্পে, কাজে, চিত্রে, ভাস্কর্যে। তবে শিল্পের রসগত দিক থেকে কবিতা ও চিত্রের মধ্যেকার দূরত্ব খুবই কম। কবিতা লিখিত হয় শব্দ দ্যোতনায় উপামা, প্রতীক, ছন্দ, চিত্রকল্পের শৈল্পিক বিন্যাসের মাধ্যমে। কবিতায় কবির নিজস্ব ভাবনা-চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে পারিপার্শ্বিকতাকে সঙ্গে করেই।
আজকের আলোচিত কবির বেলায় এর ব্যত্যয় ঘটেনি, আলোচিত কাজ গ্রন্থসহ তার কবিতায় দীর্ঘদিনের সঞ্চিত আবেগ, মান-অভিমান, ঘাত-প্রতিঘাত, সামাজিক ঐশর্যে, অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত, প্রত্যাশায় প্রাপ্তি, সাফল্য-ব্যর্থতার হাহাকার অনুরণিত হয়েছে। কারণ যখন আর্থসামাজিক টানাপোড়েন ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর চারধার ঘুণপোকার মতো কুরে কুরে খেতে থাকে তখন কবিসত্তাও পায়ের তলার মাটি খুঁজে পান না। নান্দনিক শিল্প হয়তো নির্মিত হয়।
এটি তার কবিতায় ফুটে ওঠে এভাবে।
ক. যতোই ভাবা যায়
ততোই ভাবনা যায় বেড়ে,
কোথা থেকে কি যেনো হয়ে যায়।
কোথায় আমার উৎপত্তি কোথায় বিনাশ
কিছুই যায় না বোঝা
শুধু ভাবতে ইচ্ছে করে তোমার কথা,
[সর্বত্র বিরাজমান-১]
কবিতাটি জীবনের বাস্তব দলিল যা কবি প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করেছেন নীরবে আর ভরে উঠেছে কবিতার পাতা, কাব্য গ্রন্থটির নামকরণের যথেষ্ট নাটকীয়তা ও বাস্তবতাস্পর্শী দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষণীয়। বিপঞ্চ স্বদেশ সমকালের একজন সত্যসন্ধ কবির পক্ষে নিস্পৃহ ও উদাসীন থাকা কিছুতেই সম্ভব নয়। আর জাগরণের অর্থ ও দ্রোহী মানুষের পদধ্বনির ভেতর সচকিত কবির পক্ষে এ আহ্বান খুবই সঙ্গত এবং প্রাসঙ্গিক।
খ. বুঝি না স্বর্গ নরক,
জানি না তার স্বাদ,
তাই তার প্রতি নেই কোন আগ্রহ,
শুধু বুঝি তোমার উপস্থিতির মাঝে
স্বাদ পাই স্বর্গের, আর
অনুপস্থিতিতে হৃদয়ে জাগে নরক যন্ত্রণা,
[স্বর্গের স্বাদ]
কবিতায় লক্ষ্য করার বিষয় যে, কালাতিক্রমের সঙ্গে কবিতার রূপকথা ও বিষয় বৈচিত্র্যে ও সম্প্রীতি পূর্ণময়ে গতিময়তা অণ্বেষার পথ খুঁজে নিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবে সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছু পাল্টে যায় কিন্তু কবির নিজস্ব যা তার প্রতিভার স্বাক্ষর এবং ভাষার যে সাবলীল উপস্থাপন তাতে কোনো চিড় ধরেনি। কবি কখনো স্বপ্ন ও ছন্দে মলিন নন বরং সূবর্ণ রেখায় বিচ্ছুরিত এবং নিঃসন্দেহে এক্ষেত্রে তার সময়ের কবিদের মধ্যে তিনি অগ্রণী, একজন কবির ধর্ম ব্যাপকার্থে সাধারণ মানুষেরই চাওয়ার প্রতিরূপক।
কবি তার প্রেমের কাছে ওয়াদাবদ্ধ কিন্তু সেই প্রেমিকের সঙ্গে মিলন অসম্ভব বৈরী সমাজ সংসারে সেই ব্যর্থ প্রেমের হাহাকার প্রতিধ্বনিত হয় এভাবে।
গ. প্রেমিক প্রেমে ডুবেস্বীয় সস্তিত্বহারায়
প্রেমময়ে লীনহয়ে যায়।
আধুনিক কবিতায় একটি প্রধান লক্ষণ এর আনুষঙ্গিকতা অস্তিত্বের নানাবিধ রহস্য গভীরতা, দ্বন্দ্ব দৈততার কাব্যিক উন্মোচনের যে আধুনিক কবিতা দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার উপরিতলের প্রান্তসমূহকেই ছুঁয়ে চায় বেশি করে, এই উপরিতলের মানুষের জীবন-যাপন, তার সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ প্রতিপাদ্য বিষয়।
যেমন ঘ. ডেকেছিলে স্বপ্নেরনীল অপরাজিতা বলে,
তাইতো তার চারা করেছি রোপণ বাড়ির লনে
একেই আনন্দের উৎস বলে মনে করি,
[নীল অপরাজিতা]
নাগরিকতা আর প্রতিনিয়ত বাস্তব জীবনের সংঘাত কবিকে জনিত করে বার বার অতীতের সুসময় শৈশব কিংবা যৌবনের ঊষালগ্নের সোনালী অতীত তাকে বার বার হাতছানি দেয়।
প্রতীক এবং রূপকের মিশ্রণে কবির সৎ স্বীকারোক্তির ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠে তার কাজ শরীর। এখানে কবি প্রেম-অপ্রেম, ঘৃণা ভালোবাসা, আলো-অন্ধকার একসঙ্গে প্রণীত হয়েছেন।
সৈয়দা নাজমুন নাহার
নীল অপরাজিতা ।। কুলসুম রশীদ
প্রকাশক সৈয়দা নাজমুন নাহার ।। প্রচ্ছদ কামরুল হাসান খান পিয়াল ।। মূল্য ২০০ টাকা পিয়াল প্রিন্টিং এন্ড পাবলিকেশন্স ।।

জিজেকের চোখে হলিউডি পারিবারিক ভাবাদর্শ by শাহনেওয়াজ চৌধুরী

গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ করেছেন নাহিয়ান আজাদ শশী ‘দি কিং’স স্পিচ’ ছবিতে ভাবি রাজার তোতলামির যথাযথ কারণ হয়তো এটাই যে সে তার নির্ধারিত প্রতীকী কাজ ও পদবি সম্পর্কে সঠিক ধারণা অর্জনে ব্যর্থ ছিল। একজন রাজা কেবল ঐশ্বরিক সমর্থনের জোরে রাজা- এ ধারণা পোষণের মাধ্যমে তিনি বেশ স্বল্প জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন এবং অস্ট্রেলিয়ান স্পিচ থেরাপিস্টের কাজ ছিল তার বুদ্ধিমত্তাকে এমন স্তরে নিয়ে যাওয়া, যাতে তার পক্ষে এটা ভাবা সম্ভব হয় যে সার্বভৌমত্ব একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। ফিল্মের একটি গুরুত্বর্পূণ দৃশ্যে দেখা যায় স্পিচ থেরাপিস্ট সিংহাসনে বসে আছেন এবং এটা দেখে ক্ষিপ্ত রাজা কেন তিনি সিংহাসনে বসেছেন তার কারণ জানতে চাইলেন এবং এ জবাবে কোচ পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বসলেন, ‘কেন নয়?’ তখন রাজা চিৎকার করে বললেন, ‘কারণ ঐশ্বরিক ক্ষমতা বলে আমিই রাজা’ এবং সে মুহূর্তে স্পিচ থেরাপিস্ট সন্তুষ্টির সঙ্গে মাথা নোয়ান এই ভেবে যে রাজা এখন বিশ্বাস করেন যে তিনিই রাজা। ফিল্মে দেখানো সমাধান বেশ ভালোই প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, রাজা ‘স্বাভাবিক’ হয়ে যান এবং তার অনিয়ন্ত্রিত আবেগ তৈরিকারী প্রশ্নের শক্তিও ধ্বংস হয়ে যায়।
‘দ্য কিংস স্পিচ’-এর মতোই যে ছবিটি ২০১১ সালে অস্কার জয় করেছে সেই ‘ব্ল্যাক সোয়ান’ ছবিটি কিন্তু আরও বেশি প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। এ ছবির ভূমিকায় বলা হয় এই যে যেখানে একজন পুরুষ তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে নিজেকে পুরোদমে নিয়োজিত করার পরও সাধারণ জীবনযাপন করতে পারে (‘ দ্যি কিং’স স্পিচ’), অপর দিকে একজন নারী যখন তার লক্ষ্য অর্জনে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করে (একজন ব্যালেরিনা হওয়ার জন্য) তখন সে ধ্বংসের পথে পা বাড়ায়। এ চিত্রনাট্য সহজেই সেই পুরনো কাহিনীর কথা মনে করিয়ে দেয় যেখানে একজন নারীকে শৈল্পিক প্রতিভার বিকাশ সাধনের স্বপ্ন ও তার সুখী শান্ত ব্যক্তিগত জীবনের মাঝে পরে ক্ষত-বিক্ষত হতে দেখা যায়।
‘ব্ল্যাক সোয়ান’ ও ‘দ্যি কিং’স স্পিচ’ দুটো ছবি চিরায়িত পুরুষ-শাসিত সমাজের পারিবারিক মূল্যবোধকে তুলে ধরে। যেখানে পুরুষদের থাকে প্রতীকী ক্ষমতার প্রতি সরল ধারণা আর নারীদের জন্য হল আড়ালে সরে যাওয়া। কিন্তু যখন গতানুগতিক ভাবাদর্শ একেবারে সরাসরি প্রকাশিত হয় না তখনও সামাজিক অবস্থান থেকে পারিবারিক জীবনের দিকে ফিরে আসা একটি স্পষ্ট ভাবাদর্শের নিদর্শন। যেমন গত বছর বের হওয়া রবার্ট রেডফোর্ডের ‘দ্য কোম্পানি ইউ কিপ’ যেখানে সাবেক প্রগতিবাদী দুজন বামপন্থীর নিজেদের অতীতের মুখোমুখি হওয়ার স্পর্শকাতর বিষয়কে তুলে ধরা হয়েছে।
রেডফোর্ড জিম নামক চরিত্রে অভিনয় করেন যিনি একজন বিপতিœক। তিনি ওয়েদার আন্ডারগ্রাউন্ডের সদস্য, ভিয়েতনামবিরোধী যুদ্ধের একজন সৈনিক এবং তিনি ব্যাংক ডাকাতি ও খুনের দায়প্রাপ্ত এক আসামি যিনি কি-না নিউইয়র্কের কাছাকাছি একজন অ্যাটর্নি সেজে নিজেকে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এফবিআই-এর কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছেন। যখন তার সত্যিকারের পরিচয় প্রকাশিত হয় তখন এফবিআই-এর কাছ থেকে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য তাকে অবশ্য তার সাবেক প্রেমিকা মিমিকে খুঁজে বের করতে হবে। যদি সে এটা করতে ব্যর্থ হয়, তবে তাকে সবকিছু হারাতে হবে এমনকি তার মেয়েকেও। যখন জিম, মিমির দেখা পান মিমি তাকে জানায় যে সে এখনও জিমের ওয়েদারমেন উদ্দেশ্যগুলোর প্রতি উৎসাহী এবং সে তার ৩০ বছর আগের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থী নয়। জিম তখন তীক্ষèভাবে এর উত্তরে বলেন, ‘আমি ক্লান্ত হইনি, আমি বিকশিত হয়েছি’। জিম এর পর মিমিকে অনুরোধ করেন তার মেয়ের স্বার্থে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে সাহায্য করার জন্য।
একজন সমালোচকের মতে, ‘দ্য কোম্পানি ইউ কিপ’ এমন এক সময়ের ব্যাপারে স্মৃতিবেদনাতুর করে তোলে যখন টেররিস্ট বলতে এমন মানুষের বোঝাত, যারা পরিচিত অ্যাংলো স্যক্সসন নাম বহন করে। তবে ছবিটি আমাদের রাজনৈতিক ও ভাবাদর্শিক বাস্তবতা থেকে প্রগতীবাদী বামপন্থা অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার অসহনীয় যন্ত্রণাকর সত্যটিকে তুলে ধরে। সেই আন্দোলনকারীদের মধ্যে যারা এখনও বেঁচে আছেন তারা এখন সহানুভূতিপূর্ণ জিন্দালাশের মতো, একটা যুগের স্মৃতি মাত্র, নতুন এক জগতের পথহারা আগন্তুক যেন। এটা বিস্ময়কর নয় যে রেডফোর্ড রক্ষণশীলদের আক্রমণের শিকার হয়েছেন টেরোরিস্টদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও সহযোগিতার মনোভাব পোষণের জন্য। এ ফিল্মের ব্যর্থতা হলও ওয়েদারমেনদের কাজকর্মের দিকে সম্মুখীন না হয়ে হিংসাত্মক কাজের পথ বেছে নেয়া। যেটা একটা বড় সমস্যা।
ছবিটি যৌবনের প্রবল কৌতূহলময় পথকে স্বীকৃতি দেয়, যা সহজেই হিংস আচরণে রূপ নিতে পারে। পরিণত সচেতনতা তৈরি হতে হবে এ ব্যাপারে যে কোনো রাজনৈতিক পন্থাই আমাদের পারিবারিক জীবন ও নিজ সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের হিংসাত্মক হতে বাধ্য করতে পারে না।
তারপরও বেড়ে ওঠা ও পারিবারিক দায়িত্ববোধের এই উল্লেখ কি প্রতিষ্ঠা করে যে এটি হল নিরপেক্ষ ও অরাজনৈতিক জ্ঞান, যা আমাদের রাজনৈতিক কার্যকালাপে জড়িত হওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি করে নাকি এটা ভাবাদর্শে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর একটি পন্থা? দ্বিতীয় উপায়টি শুধু হিংসাত্মক আচরণকে যুক্তিসঙ্গত করার মিথ্যা চেষ্টাকেই নয় বরং এটি নিজস্ব পন্থায় পর্যালোচনা ও বিচার করার আইনগত বাধ্যবাধকতাকেও পরিমাপ করে। এ ধরনের প্রতিশীল আত্ম অনুসন্ধান ব্যতীত আমরা আমাদের স্থিতিশীল ব্যক্তিগত জীবনের নিশ্চয়তা প্রদানকারী হিসেবে বিবেচিত বিদ্যমান আইনি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই অনুমোদন দিয়ে যাব। এটা বিস্ময়কর নয় যে, ‘দ্য কোম্পানি ইউ কিপ’ ছবিটির বিষয় হল নায়কের আইনি পুনর্বাসন এবং তাড়া করে বেড়ানো কোনো অন্ধকার অতীতবিহীন সাধারণ নাগরিক হওয়ার জন্য তার চেষ্টা।
এর মানে কি এটা যে পারিবারিক মূল্যবোধের উল্লেখকে ভাবাদর্শের ভ্রান্ত ধারণার অংশ ভেবে নিয়ে আমরা তাকে বর্জন করব? অবশ্যই নয়, এটি একটি প্রগতিশীল স্বাধীন বিষয় হিসেবে কাজ করতে পারে। যেমনটি দেখানো হয়েছে পরিচালক পানোস কোটরাসের দ্য ওমেনস ওয়ে’-তে। গল্পটি এরকম : ইয়োরগস ১৪ বছর পর জেল থেকে ছাড়া পান তার ১৭ বছর বয়সী ভাইকে খুনের অপরাধে যে কি-না ইয়োরগসের ৫ বছর বয়সী ছেলে লিওনিডাসের সঙ্গে যৌন খেলা খেলছিলেন। তার দীর্ঘ সময় কারাবাসের জন্য সে তার ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছে এবং এখন সে তার সন্ধানের চেষ্টা চালাচ্ছে। সে জেলের বাইরে তার প্রথম রাতটা এথেন্সের একটি কমদামি হোটেলে কাটায়, যেখানে তার স্ট্রেলা নামক একজন তরুণ লিঙ্গ পরিবর্তনকারী যৌনকর্মীর সঙ্গে পরিচয় হয়। তারা একসঙ্গে রাত কাটান এবং দ্রুতই তারা প্রেমে পড়ে যান। কিন্তু ইয়োরগস তাড়াতাড়ি বুঝতে পারেন স্ট্রেলা হল লিওনিডাস, যে কিনা জেলে থেকে তার পিছু নিয়েছিল। সে শুধু তাকে দেখতে চেয়েছিল কিন্তু যখন ইয়োরগস তার দিকে এগিয়ে এলো সে তখন নিজেকে সামলে রাখতে পারেনি। ইয়োরগস দূরে চলে যায় এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। যদিও পরে আবার তাদের মধ্যে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তারা অবিষ্কার করে যে যদিও তারা তাদের যৌন সম্পর্ক বজায় রাখতে পারবে না কিন্তু তারা পরস্পরকে সত্যিই ভালোবাসে। শেষ দৃশ্যে দেখা যায় নববর্ষ উৎসব : স্ট্রেলা এবং তার কিছু বন্ধু ও ইয়োরগস তাদের বাসায় জড়ো হয়েছে, সঙ্গে একটি ছোট শিশু, যাকে স্ট্রেলা দত্তক নিয়েছে। শিশুটি তাদের ভালোবাসাকে এবং তাদের অচল অবস্থার এ সম্পর্ককে পূর্ণতা দেয়।
স্ট্রেলা ছবির হাস্যকর রকমের স্বাভাবিক সমাপ্তিকে ঘুরিয়ে দেয়। ছবির শুরুতে ইয়োরগস দুঃখের সঙ্গে আবিষ্কার করে এবং মেনে নেয় যে তার কাক্সিক্ষত নারী একজন লিঙ্গ পরিবর্তনকারী। স্ট্রেলা সহজভাবে ইয়োরগসকে বলে ‘আমি একজন রূপান্তরকারী, তোমার তাতে সমস্যা আছে?’ এবং এরপর তারা চুম্বন করে। এরপরে ইয়োরগস সত্যিকার অর্থে দুঃখের সঙ্গে আবিষ্কার করে যে স্ট্রেলা জেনেশুনে পিতার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে। তার প্রতিক্রিয়া ছিল ‘দ্যি ক্রাইং গেমস’ এর ফারগাসের মতো যখন সে ডিলের লিঙ্গ দেখেছিল। অভক্তি আর আতঙ্কে সারা শহর ছুটে বেড়িয়েও নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছে না তার সঙ্গে যা সে একটু আগে আবিষ্কার করেছে। ‘দ্যি ক্রাইং গেমস’ এর মতো ‘দ্য ওমেনস ওয়ে’-তে দেখানো হয় ভালোবাসার সাহায্যে মনের ক্ষতকে সারিয়ে তোলা, এক্ষেত্রে একটি সুখী পরিবার ও একটি ছোট ছেলের আগমন।
তবে রূপান্তরকারী যে নায়কের সন্তান এ আবিষ্কার কোনো অবচেতন কল্পনার বাস্তবায়ন নয়, ইয়োরগসের অভক্তির কারণ হল একটি বাহ্যিক ঘটনায় তার বিস্ময়। এ গল্পটিকে পিতা-পুত্রের শারীরিক সম্পর্ক হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। এখানে কিছুই ব্যাখ্যা করার নেই একেবারে স্বাভাবিক ও সত্যিকারের সুখী পরিবারের উল্লেখের মাধ্যমে ছবিটি শেষ হয়। সংক্ষেপে স্ট্রেলা হল আজকের আর্নস্ট লুবিটস্ক ফিল্ম যেখানে ‘স্বর্গীয় সমস্যা’ হল এটা আবিষ্কার করা যে আপনার প্রেমিকা আপনার ছেলে। এমনকি পরিবারটি যদি সব ঐশ্বরিক নিষেধাজ্ঞাকে লঙ্ঘন করেন তারপরও তারা স্বর্গের বর্ধিত অংশে একটি ‘ছোট্ট খালি রুম’ পাবেন। যেমন হাস্যরসাত্মকভাবে শয়তান লুবিটস্কের নায়ককে বলেছিল স্বর্গ অপেক্ষা করতে পারে।

অবোধ by শাহনেওয়াজ চৌধুরী

বলতে গেলে রোজই আড্ডাটা বসে। আমরা হাতেগোনা কয়েকজন যার যার অফিস শেষে পুরানা পল্টনের পরনো বইয়ের দোকানগুলোর কাছে প্রায় প্রতিদিন আড্ডা দেই। যেন অফিস শেষে আড্ডা না দিয়ে বাসায় গেলে রাতের ভাত হজম হবে না!
আমাদের আড্ডাসক্তির পূর্ণ প্রকাশ ঘটাতে বলতে হয়- বাসায় ফিরে মনের খুঁতখুঁতি কাটবে না, কী যেন বাকি রয়ে গেল! কী যেন বাকি রয়ে গেল!!
এই খুঁতখুঁতি থাকবে পরদিন আড্ডায় যোগ দেয়ার আগ পর্যন্ত। আমাদের আড্ডাস্থলের কাছাকাছি ফুটপাতের পুরনো বইয়ের দোকান ও তেলেভাজার দোকানটিকে ঘিরে আরো যাদের আড্ডা বসে তাদের ক্ষেত্রেও এমন হয় কিনা কে জানে!
আড্ডা বলতে মূলত শিল্প-সাহিত্য ঘিরে আলোচনা, ফাঁকে ফাঁকে চা-সিগারেট খাওয়া।
তবে এর মাঝে কখনোবা রাজনীতি, অর্থনীতিও উঠে আসে। আমাদের সীমিত জ্ঞানে এই দুই গরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথাবার্তা বলি আর এই ভেবে মনকে সান্তÍনা দেই- এ আমাদের সচেতনতা বোধ। আসলে আমাদের অবস্থা মোল্লার মতো, মসজিদ পর্যন্ত দৌড়। কেননা মধ্যবিত্ত মগজ দখলে থাকে মাস কাবারি হিসেব-নিকেষের। এর ফাঁক-ফোকরে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি জায়গা করে নেবার সুযোগ পায় না তেমন। যেটুকু পায় সেটুকু ওই মধ্যবিত্ত জীবনের স্বার্থেই। যেখানে আশা-আকাঙ্খার একচেটিয়া আধিপত্য।
আমাদের মধ্যে আজাদ ভাইয়ের এ ক্ষেত্রে দ্বিমত। তিনি বলেন, ‘যেহেতু এই দেশের খাই-পরি, সেহেতু দেশ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা না করা মূর্খতার সামিল।’
আজাদ ভাইকে খুশি করতে মানিক সায় দেয় তার কথায়- ‘আজাদ ভাই ঠিক বলেছেন। এটা অন্যায়। আমাদের পাশের দেশ ভারতকেই দেখুন না; মানুষগুলো না খেয়ে থাকবে তবু দেশপ্রেমে আকণ্ঠ ডুবে থাকে। সে তুলনায় আমরা...’
মানিকের ওপর রাগ ধরে তখন। ব্যাটা এমনভাবে বলে যেন অনেকবার ভারত ঘুরে এসেছে। অথচ খরচের ভয়ে ছয় মাসে একবার গ্রামে যায় না। কিন্তু আজাদ ভাইকে খুশি করতে এমনভাবে স্ব-উৎপাদিত যুক্তি সমেত কথা বলে, কোনোমতেই তা কৃত্রিম মনে হয় না। আর তাই মানিকের লাভ যা হবার হয়ে যায়। আজাদ ভাই একটি খ্যাতিমান পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক। তাকে খুশি করা মানে পত্রিকার কোনো এক সংখ্যায় গল্পকার ‘মানিক আকন্দ’ নামটি আলোকিত করে একটি গল্প ছাপা হয়ে যাবে!
কিন্তু জাফরও তো খুব লিখছে। এখানে-সেখানে ছাপাও হচ্ছে সেসব। তাকে কখনো জনসম্মখে তেলবাজিতে দেখা যায় না। জনসম্মখে তার অন্য রূপ। কোনো লেখা না ছাপলে কিংবা ছাপতে দেরি হলে সে যেমন সম্পাদকের গুষ্ঠি উদ্ধার করে ছাড়ে, তেমনি রাজনীতি প্রসঙ্গে কোনো কিছু না ভেবেই নিজের মন্তব্যটা ঝেরে ফেলে। এই যেমন মনিকের বক্তব্যের এনকাউন্টারে বলল, ‘ওসব দেশপ্রেম-টেশপ্রেম ছাই! আগে স্ব-প্রেম, পরে দেশপ্রেম। পেটে ভাত না থাকলে দেশপ্রেম জাগে নাকি?’
জাফরের কথাটা আজাদ ভাইয়ের পছন্দ না হবারই কথা। আমি তার কাছ ঘেঁষে দাড়ানো বলে সুবিধাগত কারণে আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন, ‘এখন কিন্তু স্বার্থপর লোকের দল ভারী, বুঝলে? তার নমুনা তো দখতেই পেলে।’
আমার কানের কাছে আজাদ ভাইয়ের ফিসফিস কারো চোখে, বিশেষ করে জাফরের চোখে পড়ার আগেই ত্রস্ত কণ্ঠে বললেন, ‘চলো চলো, চা হয়ে যাক আরেক প্রস্থ। কই, আধপাগলটা কোথায় গেল?’ এমনভাবে বললেন যেন অনেকক্ষণ যাবত চায়ের তেষ্টা দমিয়ে রেখেছেন!
পারভেজকে ‘আধপাগল’ বলে ডাকেন আজাদ ভাই। যদিও পারভেজের মাথায় গ্লগোল আছে কিছুটা; কথাবার্তা, আচার-আচরণে তার কিছু স্বরূপ ফুটেও ওঠে, কিন্তু তা খুব বেশি ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না।
পারভেজের সঙ্গে এই আড্ডার পরিচয়ের মাধ্যম আমি। কিন্তু পরবর্তীতে জানা গেল- আমার আগেও জাফরের সঙ্গে পারভেজের চেনাজানা। কিন্তু সেই চেনাজানায় চিড় ধরিয়েছে জাফরের স্বার্থপরতা প্রসুত দুর্ব্যবহার। এর মাঝে অনেক বছর কেটে গেছে, কিন্তু পারভেজের মনে জাফরের সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙনের রেশ এখনো প্রবল। লোকে বলে- মানসিক রোগীদের নাকি আত্মসম্মান বোধ প্রবল! মানসিক রোগ জনিত আত্মসম্মান বোধের কারণেই নাকি জাফরের সেই দুর্ব্যবহারই এখনো পারভেজকে তাদের দুজনের সম্পর্ক শিথিলের ক্ষেত্রে দূরত্বে রেখেছে কে জানে! কিন্তু পারভেজকে দেখা যায় আড্ডা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে ফুটপাতের পুরনো বইয়ের দোকানে কবিতার বই ঘাটতে। তবে এমনিতেও আড্ডার সূত্র ধরে এলেও ফুটপাতের পুরনো বইয়ের দোকানেই বেশি সময় কাটায় সে। কেবল ফুটপাতের বইয়ের দোকানে কোনো কবিতার বই ঘাটতে ঘাটতে কবির সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা চোখে পড়লে আজদ ভাইয়ের সঙ্গে তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করতে আসে, চা খেতে ডাক পড়লে আসে আর আড্ডার ভাঙনের আগে আগে এসে সৌজন্যতার খাতিরে কিছু সময় দেয়। কিন্তু রাষ্ট্রের রাজনীতি নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। কেবল নিয়মিত মানসিক রোগের ওষুধ কিনতে হয় বলে বছর বছর ওষুধের দাম বৃদ্ধি সম্পর্কিত অর্থনীতি নিয়ে কালেভদ্রে দু’চার কথা বলতে শোনা যায়। তাও বেশ নরম সুরে, গম্ভীর মেজাজে।
পারভেজকে আড্ডার একজন হিসেবে ধরে নিলেও সে আমাদের কাছে খুব বেশি পাত্তা পায় না। বলা যায় অবহেলার পাত্র। আমাদের ক’জনের মধ্যে আচরণ বা কথায় কেউ তা প্রকাশ না করলেও বুঝে নেয়া যায়। এর কারণ তার ওই পাগলামো।
একদিন জাফরের আসতে দেরি হচ্ছিল। আর পারভেজ আমাদের সবার আগে আড্ডায় এসে হাজির। যেখানে এসে জরো হয়ে চা খেতে খেতে খানিক সময় আড্ডা দেই আমরা, আজ সেখানে পারভেজকে ঘিরে একে একে জরো হতে থাকলাম আমরা।
আড্ডা একটু একটু করে জমতে শুরু করেছে। পারভেজকে দেখলাম কথা বলতে বলতে বার বার রাস্তার মোড়ের দিকে তাকাচ্ছে। আলোচনায়ও খুব বেশি মনোযোগ নেই। ব্যাপারটা আরো কিছুক্ষণ খেয়াল করলাম। তারপর বললাম, ‘কী ব্যাপার পারভেজ, তুমি বার বার ওদিকে তাকাচ্ছ কেন?’
‘জাফর আসছে কিনা দেখছি।’
‘ও, তুমি জাফরের অপেক্ষায় চাতক পাখি হয়েছ?’
‘চাতক পাখি অন্য কারণে হয়েছি।’ পারভেজ বলল।
‘কারণটা বলে ফেল।’ আজাদ ভাই বললেন।
‘আজকে জাফরের একটা ঘটনা বলব আপনাদের। অবশ্য এর সঙ্গে আমিও জরিত। জাফর আসতে দেরি করছে দেখে ঘটনা বলব ভাবলাম। কিন্তু আপনাদের আলাপের মাঝে ঢুকতে পারছি না। আর জাফর এসে পড়লে সুযোগটা মিস হবে।’
‘তাহলে আর দেরি কেন? বলে ফেল।’ আজাদ ভাই তাড়া দিলেন।
আজাদ ভাইয়ের কথায় সায় দিয়ে বলল, ‘ঠিক ঠিক, দেরি করার কী দরকার?’
জাফরের সঙ্গে আমার পরিচয় ‘রবীন্দ -নজরুল সাহিত্য সংসদে’। সাহিত্য চর্চার সুবাদে নিয়মিত যাতায়াত ছিল ওখানে। জাফরও যেত। সেখানে সাহিত্য আড্ডা হতো। আড্ডায় শিল্প-সাহিত্য নিয়ে কথা হতো। আমার পড়াশোনা আর সাহিত্যজ্ঞানের আলোকে কথা বলতাম। তারপর একদিন জাফরের সঙ্গে এক পত্রিকা অফিসে দেখা। আমাকে দেখেই উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘রবীন্দ -নজরুল সাহিত্য সংসদে’ খুব লেকচার দেয়া হয়, তাই না? ফের যদি ওখানে গিয়ে লেকচার দিতে দেখি, তো থাপড়াইয়া বের করেুু দেব।’ জাফরের কথায় আমি হতবাক। কী আশ্চর্য, জাফর আমার সঙ্গে এমন আচরণ করবে কেন? অনেক ভেবে পেলাম- ও আমার সাহিত্যবিষয়ক জ্ঞানের পরিধিকে হিংসে করে। নিজের পড়াশোনার বহর তো নগন্য, তাই অন্যেরটা সহ্য করতে পারে না। আর এ কারণেই জাফরকে এরিয়ে চলি। নগন্য জ্ঞানের পরিধি নিয়ে আড্ডায় ও যখন রাজনীতি, অর্থনীতি নিয়ে কথা বলে, তখন মনে মনে হাসি।
কথাগুলো বলে ফুটপাতের বইয়ের দোকানের দিকে হেঁটে গেল পারভেজ। আমরা একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। মুখে না বললেও আমাদের দৃষ্টি বলে দেয়- পারভেজের মানসিক সমস্যা থাকার কারণে ওর কথায় আমরা যতটুকু বিশ্বাস স্থাপন করতে পারি, তেমনি আচরণগত কারণে জাফরকে ততটুকুই বিশ্বাস করতে পারি, অর্থাৎ এ ধরনের কাজ সে ঘটাতে পারে।
এর পরদিন আড্ডা বসেনি আমাদের। মূলত আজাদ ভাই আসতে পারবেন না বলেই আড্ডা বসল না। কিন্তু সেই মনের খুঁতখুঁতি- কী যেন বাকি রয়ে গেল! কী যেন বাকি রয়ে গেল!! -এই অনুভূতি থেকেই হয়তো রাতে ফোন করলেন আজাদ ভাই। কথায় কথায় পারভেজের বলা সেদিনের প্রসঙ্গটা উঠল। আজাদ ভাইকে বিরক্ত মনে হলো। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেই ফেললেন- ‘পারভেজের মতো মানসিক রোগীর সঙ্গে মেশা যায়, কিন্তু জাফরের মতো মানসিকতা সম্পন্ন লোকের সঙ্গে মেশা যায় না। পারভেজকে আমরা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করি, কিন্তু ওর বোধ অনেক শানিত।’ একটু থেমে আজাদ ভাই বললেন, ‘এই বিষয়গুলো নিয়ে কিন্তু ভাবা দরকার।’
‘অবশ্যই আজাদ ভাই। কাল তো দেখা হচ্ছেই। তখন নাহয় আলাপ করা যাবে।’
‘আচ্ছা।’
কিন্তু পরদিনও আমাদের দেখা হলো না। যে কারণে দেখা হলো না, টিভিতে তার বিভৎসতা দেখে আমরা হতবাক। থেকে থেকে বেশ কয়েকবার ফোন করেছেন আজাদ ভাই। শেষ বারের ফোনে তার কণ্ঠে হতাশা ঝরে পড়ল- ‘আনিস, এ দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে আমাদের মুক্তি নেই!’
‘হ্যাঁ ভাই, তাই তো দেখছি।’
আমরা কথা বলতে বলতে টিভির পর্দায় আরেকটা বোমা ফাটতে দেখা গেল। জায়গাটিতে ধোঁয়াচ্ছন্নতা কেটে গেলে দেখা গেল একজন লোক রাস্তায় পড়ে আছে। শুধু প্রযুক্তির বদৌলতেই নয়, আমাদের টিভি সাংবাদিকদের সাহসিকতার জন্যও আজকাল অনেক কিছুই আমাদের অক্ষিগোচর হয়। তাই বলে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি তো দেখতে চাই না আমরা!
বউয়ের নিষেধ সত্ত্বেও এমন তা­বলীলার পরেরদিন পুরানা পল্টনে এলাম। টিভি পর্দায় সরাসরি সম্প্রচারে গতকালের দেখা সহিংস ঘটনাগুলো যেন বিশ্বাস হতে চাইছিল না। আজ সকাল থেকে গতকালের ধবংসলীলা দেখাচ্ছে টিভি চ্যানেলগুলো। বিশ্বাস-অবিশ্বাসে দুলতে দুলতে তাই যা দেখেছি তার সত্যতা মেলাতে চেষ্টা করলাম।
কাল টিভিতেই দেখেছি, ফুটপাতের যে বইয়ের দোকানের সামনে আমরা দাঁড়িয়ে চা খেতে খেতে আড্ডা দেই দুর্বৃত্তরা সেই দোকানটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। আমি দেখলাম দাউ দাউ করে জ্বলছে বইগুলো। তারপর পরই ফুটপাতের অন্যান্য বইয়ের দোকানগুলোতে আগুন জ্বলতে দেখলাম। দেখতে দেখতে বুক কাঁপছিল। আর আজ এসে দেখি দুর্বৃত্তের ধবংসলীলা অসভ্যতার মাপকাঠি পেরিয়ে আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগকে প্রবলভাবে হাতছানি দিয়ে ডাকছে!
আমাদের মতো শত শত মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ধবংসলীলা অবলোকন করছে আর ছিঃ ছিঃ করছে!
একজন পথচারী বলল, ‘ছিঃ ছিঃ তো নিজেদের করা উচিত। কেননা দেশ স্বাধীনের এত বছর পরেও দেশের শত্রুদের দেশকে রসাতলে নেবার এসব ষড়যন্ত্র আমরা চেয়ে চেয়ে দেখছি! আমাদের বোধ-বুদ্ধি লোপ পেয়ে গেছে!’
লোকের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে নানা রকম মন্তব্য কানে এলো।
আমরা আমাদের আড্ডাস্থলে এলাম।
জাফরের দিকে তাকিয়ে আজাদ ভাই জিজ্ঞেস করলেন- ‘কী জাফর, তুমি তো খুব বলো- আগে স্ব-প্রেম, পরে দেশপ্রেম। এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখেও কি কিছুটা দেশপ্রেম জাগবে না তোমার মনে? বুক কেঁপে উঠবে না? তা না হলে তোমার লেখকসত্ত্বা কলুশিত।’
জাফরের সেই পরনো সুরের কথা- ‘এই নষ্ট রাজনীতির দেশটাকে নিয়ে চিন্তা করে লাভ কী আজাদ ভাই?’
জাফরের প্রশ্নের জবাবে আজাদ ভাই কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।
মানিক আজাদ ভাইয়ের পুরনো কথা থেকে ধার করে বলল, ‘যেহেতু এই দেশের খাই-পরি, সেহেতু দেশ নিয়ে ভাবতে তো হবেই।’
‘অন্তত নিজের ভালোর জন্য হলেও ভাবতে হবে।’
আমার কথাটা পছন্দ হলো আজাদ ভাইয়ের। সোৎসাহে বললেন, ‘হান্ড্রেট পার্সেন্ট নির্ভেজাল এবং গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছ আনিস। তোমার এমন একটি মূল্যবান কথা সেলিব্রেট করা যাক। চলো, সবাইকে চা খাওয়াব।’
সময় মতো কোত্থেকে এসে হাজির হলো পারভেজ! তাকে দেখেই জাফর বলে উঠল- ‘আমরা চা খেতে যাচ্ছি, এই খবর কি বাতাসে ভেসে তোমার কাছে পৌঁছল? একদম সময় মতো কোত্থেকে হাজির হলে পারভেজ?’
জাফরের কথা পাত্তা দিল না পারভেজ। স্বভাবজাত ভঙ্গিতে আজাদ ভাইকে বলল, ‘খুব তো দেশের রাজনীতি-অর্থনীতি নিয়ে কথা বলেন আপনারা! একবার ভেবেছেন ক্ষমতার লোভে কোরআন পুড়িয়ে ফেলার মতো সাহস দেখাতে পারে ওরা! যে জাতি ক্ষমতার লোভে নিজের ধর্মগ্রন্থ পোড়াতে দ্বিধা করে না, সে জাতির আবার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভবিষৎ কী!’
পারভেজের কথা শুনে থ খেয়ে গেলাম আমরা। আজাদ ভাইকে দেখলাম অবাক চোখে পারভেজের দিকে তাকিয়ে আছেন। একটুক্ষণ পর পারভেজকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। ধরা গলায় বললেন, ‘আজ থেকে তোকে আর ‘আধপাগল’ বলে ডাকব না ভাই!’
আজাদ ভাইয়ের আবেগের কারণ খুঁজতে থাকলাম মনে মনে। চা খেতে খেতে কারণটা খুঁজেও পেলাম। কারণটা খুঁজে পেয়ে মনে মনে হাসলাম। একজন মানসিক রোগী, যাকে আমরা তেমন পাত্তা দেই না; সে যদি বোধের এমন উচ্চতায় উঠতে পারে, তাহলে আমরা...

ভাই, শান্তিতে থাকতে দিন

গণতন্ত্রে তাঁরাই দেশ শাসন করবেন, যাঁরা জনগণের প্রতিনিধি। জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে, এমন একটা নির্বাচনের মাধ্যমে এই প্রতিনিধিরা ক্ষমতায় আসবেন। তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের সমর্থনধন্য হবেন। কাজেই একটা সুন্দর, অর্থবহ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন গণতন্ত্রের একেবারে প্রাথমিক ও মৌলিক একটা শর্ত। তবে, এটা অন্যতম শর্ত। গণতন্ত্রের আরও কতগুলো শর্ত আছে, লক্ষণ আছে। আবার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থিতরাই কেবল দেশ চালাবে, গণতন্ত্রে তা সব সময় না-ও হতে পারে। দুটো উদাহরণ দিই। যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বুশ যখন দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হন, বাস্তবে তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিলেন কি না, এটা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু যেহেতু আদালত তাঁকে নির্বাচিত ঘোষণা করেছেন, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাটরা এবং তাঁদের দেশের সব মানুষ এটা মেনে নিয়েছিলেন। শুধু তাঁদের দেশের মানুষ মেনে নিয়েছিলেন, তা-ই বা বলি কেন, সারা পৃথিবীর মানুষ হাসিমুখে কিংবা বেজারমুখে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আর ভারতে তো হরহামেশাই কম ভোট পাওয়া দল বেশি ভোট পাওয়া দলের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় বসছে। সেটা পরোক্ষভাবে জনগণের সমর্থন নিয়েই ক্ষমতায় বসা। যাঁদের জনগণ ভোট দিয়েছেন, তাঁরা আবার সরকার গঠনের জন্য আমাদের সমর্থন দিয়েছেন, কাজেই আমরাই জনপ্রতিনিধি। এই নিয়ে নৈতিক বিতর্ক তোলা যায়, জনগণ কেন তোমাদেরই সরাসরি ভোটে জেতাল না, কাজেই তোমরা সেই রকম সরাসরি প্রতিনিধি কি? কিন্তু সেই প্রশ্ন কেউ তোলে না।
কারণ, আবারও বলি, নির্বাচন গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ও মৌলিক শর্ত বটে, কিন্তু গণতন্ত্রের আরও অনেক অপরিহার্য উপাদান আছে, যেগুলো না থাকলে নির্বাচিত সরকার থাকলেও আসলে গণতন্ত্র থাকে না। সেসব উপাদানের এক নম্বর হলো আইনের শাসন। তা ছাড়া আছে সরকারের জবাবদিহি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দক্ষতা ও কার্যকারিতা। আরেকটা হলো, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। একটা দেশে সব মানুষই সমান। রাজার ছেলেরও এক ভোট, রাস্তার ধারে পড়ে থাকা খঞ্জ ভিখারিরও এক ভোট। রাজার ছেলের যতটুকু মর্যাদা, রাখাল বালকেরও ততটুকু মর্যাদা। সেটা কে বিধান করবে? প্রতিনিয়তই তো আমরা দেখি, রাষ্ট্র, ক্ষমতাবানেরা কীভাবে ব্যক্তি মানুষের অধিকার খর্ব করে থাকে। তাহলে এই বিপুল বিশাল ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্র বা ক্ষমতাদর্পী শাসকদের হাত থেকে একজন ব্যক্তি মানুষ কীভাবে তার অধিকার রক্ষা করে চলবে? কে তাকে রক্ষা করবে? আইনের শাসন, স্বাধীন ও দক্ষ বিচার বিভাগ এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যম। কাজেই আমরা যদি গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে চাই, তাহলে ভোটের সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই আমাদের বলতে হবে আইনের শাসনের কথা, মানবাধিকারের কথা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা, বলতে হবে জবাবদিহির কথা। এই সরকার যে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, সেটা বিতর্কিত। কিন্তু বাস্তবে এটাই এখন আমাদের সরকার। বিএনপিকেও এখন বলতে হচ্ছে এই সরকারের সঙ্গেই আলোচনায় বসার কথা। আমেরিকানরা নির্বাচনের পরে প্রথম যে বিবৃতি দিয়েছিল, তাতেও আছে সরকারের সঙ্গেই আলোচনায় বসার সুপারিশ। অর্থাৎ এখন এই সরকারই সরকার, এই সরকার নিয়েই আমাদের চলতে হবে। সেটা কত দিন, তা উভয় পক্ষ মিলেমিশে ঠিক করুক। কিন্তু সরকার কী? সরকার তো আমাদের ম্যানেজার। একটা ফ্ল্যাট ভবনে একটা সমিতি থাকে। এক বছর বা দুই বছরের জন্য তারা নির্বাচিত হয়। কেউ সভাপতি, কেউ সাধারণ সম্পাদক, কেউ বা কোষাধ্যক্ষ। আমরা তাঁদের চাঁদা দিই। তার বিনিময়ে তাঁরা কোনো মাসোহারা নেন না, তাঁরা আমাদের বিদ্যুৎ বা পানির দেখভাল করেন, আমাদের নিরাপত্তা দেন, রক্ষণাবেক্ষণ করেন, মাঝেমধ্যে আমাদের বিনোদনেরও ব্যবস্থা করেন। মেয়াদ শেষে নতুন কর্মকর্তা নির্বাচিতও হন। তাঁরা আবার কর্মচারী নিয়োগ দেন, সুপারভাইজার, দ্বাররক্ষী। এখন এই সমিতির কর্মকর্তারা যদি এই দারোয়ান বা হিসাবরক্ষক নিয়োগের সময় ঘুষ খান, কিংবা নিজের ঘরে বেশি বিদ্যুৎ নিয়ে অন্যদের কম দেন, তাহলে কি হবে? এটা কখনো হয় না।
সরকারের কাজ আমাদের নিরাপত্তা দেওয়া, অবকাঠামোসুবিধা দেওয়া, আমাদের অর্থনীতি চালানো। তারা দেশের মালিক নয়। তারা দেশের সেবক। এই কথাটা সরকারি লোকজন ভুলে যান। কথায় আছে, ক্ষমতা মানুষকে নীতিভ্রষ্ট করে; চূড়ান্ত ক্ষমতা নীতিভ্রষ্ট করে চূড়ান্তভাবে। সারা পৃথিবীতে চিরটাকাল দুর্নীতি ছিল। কোথাও খুব কম, কোথাও খুব বেশি। আমাদের দেশে মোগল আমলে দুর্নীতি হয়েছে, ইংরেজ আমলে হয়েছে, পাকিস্তানি আমলে হয়েছে, স্বাধীন বাংলাদেশে তো দুর্নীতির সাগরে আমরা ভাসছি। কিন্তু এটার তো লাগাম টানতে হবে। কে টানবে? রাষ্ট্র যখন মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, কে তাকে বাধা দেবে? বিচার বিভাগকে দিতে হবে, নাগরিকদের উচ্চকণ্ঠ হতে হবে, সংবাদমাধ্যমকে সজাগ ও সোচ্চার থাকতে হবে। এই সরকারকে তা-ই বলব, যেহেতু আপনারা একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে এসেছেন, আপনাদের উচিত খুব বেশি করে ভালো ভালো কাজ করা। দেশের মানুষের উপকার হয়, এই রকম কাজ করতে থাকুন, যেন আপনার মেয়াদটার কথা স্বস্তির সঙ্গে স্মরণ করতে পারে। সেখানেই আসবে মানবাধিকার রক্ষার কথা। সত্য বটে, গত এক বছরে সারা দেশে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র, জামায়াত-শিবির বা এই ধরনের শক্তি যেভাবে হামলা করেছে, যেভাবে বাড়িঘর পুড়িয়েছে, যেভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, ব্যববসায়িক স্থাপনা, উপাসনালয়ে আক্রমণ করেছে, যেভাবে আওয়ামী লীগারদের হত্যা করেছে, তার প্রতিবিধানে শক্ত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। কিন্তু এই শক্ত হওয়াটাও যেন হয় আইনানুগ। মানবাধিকারের সব বিধান ও রীতি মান্য করে। দরকার হলে দ্রুত বিচার আদালত করুন, দরকার হলে স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল করুন। তবু স্বচ্ছ বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করুন। কোনো অপরাধী যেন ছাড়া না পায়, তেমনি বিনা বিচারে কাউকে যেন শাস্তি দেওয়া না হয়। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। নইলে ভবিষ্যতে ইতিহাস ক্ষমা করবে না। আমরা জানি, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নামে কীভাবে দাঙ্গায় উৎসাহিত করা হয়েছে, কীভাবে ব্যক্তি অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এসব সংবাদমাধ্যমের পক্ষে কথা বলার মুখ তারা নিজেরাই রাখেনি। তবু যা করা হয়, তা যেন করা হয় আইনের মাধ্যমে। এবং আইনটি যেন কালো আইন না হয়। এই সরকার যেহেতু একপক্ষীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত, কাজেই সরকারকেই এসব দিক সবচেয়ে বেশি সতর্কতার সঙ্গে রক্ষা করতে হবে। সাধারণত মানুষের প্রবণতা থাকে, যে নৈতিক দিক থেকে দুর্বল অবস্থানে থাকে, সে তত বলপ্রয়োগের চেষ্টা করে। এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে সবচেয়ে বেশি। আর দেশে ও বিদেশে একটা ব্যাপক জনমত তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর মতো মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে গঠিত দল, যারা গণ-আন্দোলনের নামে নৃশংসতার প্রমাণ একাত্তরে রেখেছে, এখনো রেখে চলেছে, তাদের বর্জন করার। এখন বিএনপি নেতারা তো টেলিভিশনগুলোর টক শোয় এবং সভা-সেমিনারে প্রকাশ্যে বলছেন, সরকার নিষিদ্ধ করে দিক জামায়াতে ইসলামীকে।
এই সুযোগ রাজনৈতিক নেতাদের গ্রহণ করতে হবে। বিএনপিকে বুঝতে হবে, জামায়াতের ভোট কখনো সাত থেকে আট শতাংশের বেশি ছিল না, সর্বশেষ জরিপে তা নেমে এসেছিল তিন শতাংশের নিচে। কিন্তু বিএনপি বা আওয়ামী লীগ যখন নির্বাচনে জয়লাভ করে, একাই জয়লাভ করার মতো জনপ্রিয়তা অর্জন করে বলেই করে। এই কলামে বহুবার বলা হয়েছে, বিএনপির উচিত সংবিধানের অধীনেই নির্বাচনে যাওয়া। বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগ চায় না বিএনপি নির্বাচনে আসুক, সে কারণেই তো বিএনপির নির্বাচন করা উচিত। আজ প্রমাণিত হয়েছে, শুধু আওয়ামী লীগ চায়নি বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ, কথা শুধু এতটুকুনই সত্য নয়, সত্য এই যে বিএনপিও চায়নি নির্বাচনে অংশ নিতে। তারা ভেবেছিল, তারা সরকারকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে তারপর নির্বাচনে যাবে। কিন্তু গণ-আন্দোলনের বদলে আমরা দেখেছি পেট্রলবোমা। আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষ, গরু ও সবজির ট্রাক। দেখেছি হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলা। দেরিতে হলেও বিএনপির নেতারা বুঝেছেন, সন্ত্রাস করে আন্দোলনে জেতা যায় না। এটা আরও আগে বুঝলে তাঁরাও ভালো করতেন, দেশের ও মানুষের এত ক্ষতিও হতো না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের অগ্নিঝরা ভাষণে একবারও আক্রমণ করার কথা বলেননি, সবচেয়ে কঠিন কথাটা ছিল, আমরা ভাতে মারব, পানিতে মারব। কিন্তু দম ফেলার আগেই তিনি বলেছেন, তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে ফিরে যাও, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। আর বলেছেন, এই বাংলার হিন্দু, মুসলিম, বাঙালি, অবাঙালি সবাইকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের, আমাদের যেন বদনাম না হয়। কথা শেষ করি। সরকারকে বলতে চাই, অপরাধীদের কঠোর হাতে দমন করুন, কিন্তু মানবাধিকার রক্ষা করে চলুন, বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত রাখুন, ভালো ভালো কাজ করে দেশের মানুষের চিত্ত জয়ের চেষ্টা করুন। বিএনপিকে বলব, যুদ্ধাপরাধী স্বাধীনতাবিরোধীদের বর্জন করুন। অহিংস আন্দোলন করুন। আন্দোলনে জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির চেষ্টা করুন। আমরা সামনের দিনগুলোয় শান্তি চাই। এখন যেখানেই যাই, সবাই বলে, ভাই, আমাদের শান্তিতে থাকতে দিন, কাজ করতে দিন, ছেলেমেয়েদের স্কুলে যেতে দিন, চলাফেরা করতে দিন। জনগণের এই চাওয়াটা যেন আমাদের নেতাদের কানে পৌঁছায়।
আনিসুল হক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।

বিশ্ব ইজতেমার উৎপত্তি ও বিকাশ

উপমহাদেশের মুসলমানদের ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে তাবলিগ জামাতের শুভ সূচনা হয়। বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও সাধক হজরত মাওলানা ইলিয়াস আখতার কান্ধলভি (১৮৮৫-১৯৪৪ খ্রি.) দাওয়াতে তাবলিগ জামাতের পুনর্জাগরণ করেন। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী দিল্লির দক্ষিণ পাশে অবস্থিত এক জনবিরল নীরব অঞ্চল ‘মেওয়াত’। চারিত্রিক বিপর্যস্ত ধর্মকর্মহীন, অশিক্ষিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন নামেমাত্র মুসলমান ‘মেও’ জনগোষ্ঠীকে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস, ধর্মের পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন ও কালেমার দাওয়াতি মর্ম শিক্ষাদান এবং বিভ্রান্তির কবল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রা.) তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম শুরু করেন। ১৩৪৫ হিজরিতে দ্বিতীয় হজ থেকে ফিরে এসে তিনি তাবলিগি গাশ্ত শুরু করলেন, জনসাধারণের মধ্যে কালেমা ও নামাজের দাওয়াত দিতে লাগলেন।
তাবলিগ জামাত বানিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বের হওয়ার দাওয়াত দিলেন, এভাবে গ্রামে গ্রামে সৎ কাজ করার জন্য জামাত তৈরি করে দিতেন। কয়েক বছর মেওয়াতে এ পদ্ধতিতে দাওয়াতি কাজ অব্যাহত থাকল। ১৩৫২ হিজরিতে তৃতীয় হজ পালনের পর তিনি বুঝতে পারলেন যে গরিব মেওয়াতি কৃষকদের পক্ষে দ্বীন শেখার সময় পাওয়া কষ্টকর। ঘরসংসার ছেড়ে মাদ্রাসায় দ্বীন শেখাও অসম্ভব। ওয়াজ-নসিহতের মাধ্যমে সামগ্রিক জীবন পাল্টে দেওয়া বা জাহেলি বিশ্বাসকে পরিবর্তন করাও সম্ভব নয়। তাই ক্ষুদ্র দল বা ছোট জামাত আকারে ইলমি ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোয় গিয়ে সময় কাটানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করলেন এবং ধর্মীয় পরিবেশে তালিম দিতে আরম্ভ করলেন। সেসব ধর্মীয় মজলিসে ওলামা-মাশায়েখদের ওয়াজ-নসিহতের পাশাপাশি তাদের দৈনন্দিন জীবনের নিয়মনীতি বাতলে দেওয়া হতো। মানুষ দ্বীনদার পরহেজগার লোকদের জীবনযাপন, কথাবার্তা, আচার-আচরণ, চালচলন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। শুরুতে তাবলিগি কার্যক্রম ব্যাপক সমর্থন পায়নি, কিন্তু ধীরে ধীরে এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মুখ নিঃসৃত শাশ্বত বাণী: ‘তোমার কাছে যদি কোনো বাণী থাকে, তা অন্যের কাছে পৌঁছে দাও। এ দাওয়াতি আহ্বানকে কেন্দ্র করেই পর্যায়ক্রমে তাবলিগের বিশ্বব্যাপী প্রচার ও প্রসার ঘটে। এ ব্যাপারে তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠাতা হজরত মাওলানা ইলিয়াস (রা.) অত্যন্ত ন্যায়নিষ্ঠা, ধৈর্য, পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনায় অপরিসীম ভূমিকা রাখেন।
তাবলিগ জামাতের দ্বিতীয় আমির মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভি (রা.)-এর যুগে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এ আন্দোলন সবচেয়ে বেশি ও শক্তিশালী ছিল। প্রথম ইজতেমা ১৯৪১ সালে দিল্লির নিজামউদ্দীন মসজিদের ছোট এলাকা মেওয়াতের নুহ মাদ্রাসায় আয়োজন করা হয়। এতে প্রায় ২৫ হাজার তাবলিগ দ্বীনদার মুসলমান অংশ নেন। এভাবে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে মেওয়াতের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার কিছু মানুষের কাছে দ্বীনের কথা প্রচারের মধ্য দিয়ে তাবলিগ জামাতের যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশে ১৯৪৬ সালে ঢাকার রমনা পার্কসংলগ্ন কাকরাইল মসজিদে তাবলিগ জামাতের বার্ষিক সম্মেলন বা ইজতেমা প্রথম অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামে তৎকালীন হাজি ক্যাম্পে ইজতেমা হয়, ১৯৫৮ সালে বর্তমান নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। তখন এটা কেবল ইজতেমা হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রতিবছর ইজতেমায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আশাতীতভাবে বাড়তে থাকায় ১৯৬৬ সালে ইজতেমা টঙ্গীর পাগার গ্রামের খোলা মাঠে আয়োজন করা হয়। ওই বছর স্বাগতিক বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা অংশ নেওয়ায় ‘বিশ্ব ইজতেমা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৬৭ সাল থেকে বর্তমান অবধি (২০১১ সাল থেকে দুই পর্বে) ‘বিশ্ব ইজতেমা’ টঙ্গীর কহর দরিয়াখ্যাত তুরাগ নদের উত্তর-পূর্ব তীরসংলগ্ন ডোবা-নালা, উঁচু-নিচু মিলিয়ে রাজউকের হুকুমদখলকৃত ১৬০ একর জায়গার বিশাল খোলা মাঠে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিবছর বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম-শহর-বন্দর থেকে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং বিশ্বের প্রায় ৫০ থেকে ৫৫টি দেশের তাবলিগি দ্বীনদার মুসলমান জামাতসহ ২৫ থেকে ৩০ লক্ষাধিক মুসল্লি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক ইসলামি মহাসম্মেলন বা বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নেন।
সাধারণত প্রতিবছর জানুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহের শুক্রবার আমবয়ান ও বাদ জুমা থেকে বিশ্ব ইজতেমার কার্যক্রম শুরু হয়। বিশ্ব ইজতেমার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, তিন দিন দেশ-বিদেশের ইমানদার ত্যাগী আলেম-ওলামাদের কাছ থেকে পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে বয়ান শুনে আখেরি মোনাজাত করে ইমান-আমলের দাওয়াত সারা বিশ্বে পৌঁছে দেওয়া। শুধু ইসলামি বয়ান শোনা কিংবা আখেরি মোনাজাতে প্রচুর লোকজনের অংশগ্রহণ করা ইজতেমার মূল উদ্দেশ্য নয়। লক্ষ্য হলো, যাতে বেশি তাবলিগ জামাত বের হয়। প্রতিবছর এক হাজার ৫০০ থেকে এক হাজার ৭০০ জামাত বিশ্ব ইজতেমা থেকে দেশে-বিদেশে এক চিল্লা (৪০ দিন), তিন চিল্লা (চার মাস), ছয় মাস ও এক বছরের জন্য আল্লাহর দ্বীনের তাবলিগ ও দাওয়াতের জন্য বের হয়। তাবলিগের প্রতি জামাতে ১৪ থেকে ১৫ জন মুসল্লি থাকেন। জামাত বের হওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রথমত, জামাতের সাথিদের ইমান-আমল ও ইলম অর্জন করা এবং আত্মশুদ্ধি হওয়া। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি মসজিদ থেকে জামাত বের করা। তৃতীয়ত, প্রতিটি মসজিদে পাঁচ আমল পরিপূর্ণ চালু করা (সপ্তাহে দুই দিন গাশ্ত করা, প্রতিদিন মাশওয়ারা করা, প্রতিদিন আড়াই ঘণ্টা দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া, প্রতিদিন মসজিদ ও বাড়িতে তালিম করা এবং মাসে তিন দিন তাবলিগে যাওয়া)। প্রতিটি জামাত নির্ধারিত এলাকার প্রতি মসজিদে দুই-তিন দিন করে থেকে তাওহিদ, রিসালাত, আখিরাত, ইমান ও আমলের দাওয়াত দেওয়া। এ বছর দেশের প্রতিটি মসজিদ থেকে একটি করে তাবলিগ-জামাত বের করার লক্ষ্য নিয়ে ৪৯তম বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com

নাগরিক সুবিধাবিহীন নগর রংপুর

রংপুরের একজন নাগরিকের জীবন যদি বিশ্লেষণ করা যায়, তাহলে দেখা যাবে—রংপুর বিভাগ এবং সিটি করপোরেশন হওয়ার পর তিনি বাসাভাড়া দেন আগের তুলনায় অনেক বেশি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করেন বেশি দামে, সন্তানকে স্কুলে দেবেন তার পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই, শিশুকে বিনোদনকেন্দ্রে পাঠাবেন তার কোনো ব্যবস্থা নেই, শহরে সড়কপথের ভোগান্তিতে পড়তেই হবে। রাতের শহরে একটু নিরিবিলি পথে একলা চললে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ার আশঙ্কা। হেডলাইট না জ্বালানো অটোরিকশায় চলতে হবে। মূল শহর ছেড়ে নগরের উপকণ্ঠে গেলেই পল্লী বিদ্যুৎ। ঘন ঘন লোডশেডিং। অসুস্থ হলেও সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে অপ্রতুল সেবা। এ রকম অযুত সমস্যা জীবনকে তিক্ত করে তোলে। যাঁরা রংপুরকে নিজেদের স্বপ্নের শহর বলে দাবি করতেন, তাঁদের হতাশ হওয়া ছাড়া আপাতত আর কোনো উপায় নেই। রংপুর এমন একটি নগর, যেখানে গ্রামীণ জীবনের সরল-সুন্দর আবহ নেই, নাগরিক জীবনের সুবিধাও নেই। নাগরিক জীবনের সুবিধা একেবারেই না থাকার কারণে রংপুরের জনজীবনের সুখশান্তি সুদূরপরাহত। প্রায় তিন বছর ধরে রংপুরের চার লেন সড়কের কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি সরকার। যেটুকু অংশে চার লেনের কাজ শেষ করেছে, সেটুকু অংশের দখলদারি ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের হাতে। শহরের প্রাণকেন্দ্র প্রেসক্লাব থেকে টাউন হল পর্যন্ত দুর্বিষহ যানজট লেগে থাকে। ঘনবসতিপূর্ণ নগরে নাগরিক জীবনে যে যোগাযোগব্যবস্থা থাকার কথা ছিল, তা হয়ে ওঠেনি।
রংপুর সিটি করপোরেশনের আয়তন ২০৩ বর্গকিলোমিটার। নতুন-পুরোনো মিলে ৩৩টি ওয়ার্ড। পুরোনো ওয়ার্ডের অনেকগুলো রাস্তা পাকা করা হয়নি। পাকা রাস্তাগুলোর অনেকগুলো চলাচল-অযোগ্য। সড়কবাতি নেই অধিকাংশ সড়কে। সড়ক চার লেনে উন্নীত করার নামে প্রাচীন বৃক্ষগুলো কেটে ফেলা হয়েছে, কিন্তু আর রোপণ করা হয়নি। ঐতিহ্যবাহী কারমাইকেল কলেজে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৭ হাজার। সেই কলেজে প্রবেশমুখের সড়ক এতটাই অপরিচ্ছন্ন এবং ঘিঞ্জি যে বোঝার উপায় নেই এখানে শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী কারমাইকেল কলেজ রয়েছে। অথচ, ওই স্থানে মুক্তিযুদ্ধের একটি দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য হতে পারে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল কলেজ, সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, জিলা স্কুল, পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজ—সবখানেই একটি করে ফুটওভার পাসের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। অনেক আন্দোলন, হরতাল শেষে রংপুরকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয়। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, সাবেক পৌর মেয়র, সাবেক সাংসদ শরফুদ্দীন আহমেদ নির্বাচিত হন রংপুরের প্রথম নগরপিতা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা তিনি কাজে লাগাবেন, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁর পদমর্যাদাই সুনির্দিষ্ট হয়নি। তার ওপর রাষ্ট্রীয় কাজে ঢাকা যাওয়ার পথে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি কিছুদিন ছিলেন অসুস্থ। রংপুর বিভাগীয় শহরে উন্নীত হওয়া এবং সিটি করপোরেশন বাস্তবায়নের পর থেকে জনসংখ্যা অত্যন্ত দ্রুত বেড়েছে।
বিভাগীয় কার্যালয়ে কাজের জন্য প্রচুর মানুষ এখন প্রতিদিন আসছে। জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি হলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই। পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকার কারণে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে ছিনতাই হচ্ছে, তুচ্ছ কারণকে কেন্দ্র করেও খুন হচ্ছে মানুষ। নগরায়ণের ফলে বৃদ্ধি পাওয়া জনসংখ্যার জন্য আলাদা করে থানা স্থাপনও হয়নি। রংপুরে বিনোদনের ব্যবস্থাই নেই। শিশুদের জন্যও বিনোদনকেন্দ্রের যথেষ্ট অভাব। একটি চিড়িয়াখানা, তা-ও শিশুদের জন্য অনুপযোগী। সুরভি উদ্যানটি কেবলই উপযোগী করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। রংপুরে একটি আধুনিক মিলনায়তন হওয়ার কথা ছিল। তা-ও বর্তমানে অনিশ্চিত। শিশু একাডেমী এবং শিল্পকলা একাডেমীতে যে পরিমাণে শিক্ষার্থীদের সংগীত-আবৃত্তি-চিত্রাঙ্কন শেখানো হয়, তা-ও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। খেলাধুলার পরিবেশও অনেক সীমিত পর্যায়ের। রংপুর বিভাগ এবং সিটি করপোরেশন হওয়ার পর থেকে রংপুরের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে অনেক। রংপুর সিটি করপোরেশনের মধ্যে অবস্থিত সব বাড়ির মালিক কিংবা যেকোনো ব্যবসায়ীদের আগের তুলনায় অনেক বেশি কর দিতে হয়। তাঁরা সেই করের টাকা আদায় করার চেষ্টা করেন ভাড়াটে কিংবা ক্রেতাদের কাছ থেকে। যেহেতু বাড়িভাড়া আইন কার্যকর নয় এবং আগের তুলনায় আয়কর দিতে হয় অনেক বেশি, তাই তাঁরা বাড়িভাড়া বৃদ্ধি করেছেন অনেক। ব্যবসায়ীরাও নিত্যপ্রয়োজনীয় সব দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি করেছেন। সিটি করপোরেশনের নীরবতার সুযোগ নিয়ে কোনো কারণ ছাড়াই অটোরিকশার ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে।
নগরজীবনে ব্যয় অধিক হেতু নগরে যাঁরা চাকরি করেন, তাঁদের নগরভাতা পাওয়ার কথা। কিন্তু সেই নগরভাতা না থাকার কারণে স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনযাপনে অনেকটাই নাভিশ্বাস উঠেছে। বিভাগীয় কার্যালয়সহ অনেক সরকারি, আধা সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার কার্যালয় গড়ে উঠছে রংপুরে। প্রতিদিন তাই বাড়ছে বসতি। কিন্তু, ছোট্ট জেলা শহর রংপুরের জন্য যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তা দিয়েই চলছে শিক্ষা দেওয়ার কাজ। সব বিভাগীয় শহরে রয়েছে মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। কিন্তু রংপুর শহরে সেই মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নেই। সরকারি-বেসরকারি যে প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তা এখানকার শিক্ষার্থীদের চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত কম। সরকারি উদ্যোগে আরও স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। রংপুরের নাগরিকদের নাগরিক সুবিধা প্রদান করতে চাইলে সবার আগে প্রয়োজন সরকারি সহযোগিতা। নতুন সিটি করপোরেশনকে সেবা প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রাথমিক অবস্থায় যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন হয়, সেই পরিমাণ অর্থ সরকারকে প্রদান করতে হবে। প্রয়োজনে প্রাথমিক অবস্থায় ১০ বছর মেয়াদি প্রকল্প হিসেবে এ নগরকে গণ্য করে এখানে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ-পয়োনিষ্কাশন-শিক্ষা-চিকিৎসা, বিনোদনকেন্দ্র-খেলার মাঠ-নিরাপত্তা-শপিং কমপ্লেক্স-উপযুক্ত সড়ক-জিমনেসিয়ামের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রকল্পটি এক কিংবা দুই ধাপে শেষ হতে পারে। তা নাহলে যখন নিজস্ব আয়ে সিটি করপোরেশন চলতে পারবে, তখনই রংপুরের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা যাবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করলে রংপুরকে একটি মডেল নগরে পরিণত করা সম্ভব। ঢাকা শহরের মতো তিক্ত অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও আমরা যদি পরিকল্পিত রংপুর নগর গড়ে তুলতে না পারি, সেটা হবে খুবই দুঃখজনক।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

মা আত্মহত্যা করতে পারেন না

সুনন্দা পুশকার
সুনন্দা পুশকারের ছেলে শিব মেনন বলেছেন, ‘আমার মায়ের দৃঢ় মানসিকতা ছিল। তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন না।’ এক বিবৃতিতে শিব মেনন এ কথা জানান। গতকাল বুধবার ওই বিবৃতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এই বিবৃতির মধ্য দিয়ে তিনি প্রয়াত সুনন্দার স্বামী ভারতের মানবসম্পদ প্রতিমন্ত্রী শশী থারুরের পক্ষেই অবস্থান নিলেন বলে মনে হচ্ছে। শিব মেনন তাঁর মায়ের মৃত্যু নিয়ে ইতিমধ্যে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন অসত্য ও জঘন্য উল্লেখ করে বলেন, ‘আমার মাকে যাঁরা চিনতেন, আমি বিশ্বাস করি না যে শশী আমার মাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতে পারেন; আর মেরে ফেলার চেষ্টা করবেন—এটা তো অকল্পনীয়! তাঁদের মধ্যে গভীর ভালোবাসা ছিল।’ শিব মেনন আরও বলেন, তাঁর মা মানসিক চাপে ছিলেন। সংবাদমাধ্যমের চাপ, উদ্বেগ ও বিভিন্ন ওষুধের ভুল মিশ্রণ—সব মিলিয়ে তিনি দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন। তাঁর মৃত্যু ছিল শান্তিপূর্ণ, ঘুমে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া।

থাইল্যান্ডে জরুরি অবস্থার মধ্যেই আন্দোলন চলবে

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে জরুরি অবস্থার মধ্যেই সরকারবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। জরুরি অবস্থার মধ্যে গতকাল বুধবার অজ্ঞাত বন্দুকধারীর গুলিতে সরকারপন্থী ‘লাল শার্ট’ আন্দোলনের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা আহত হন। প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার পদত্যাগের দাবিতে ব্যাংককে প্রায় দুই মাস ধরে বিক্ষোভ চলছে। প্রথমে অহিংস থাকলেও ক্রমে তা সহিংস হয়ে উঠছে। সহিংসতা ঠেকাতে গত মঙ্গলবার ব্যাংককসহ আশপাশের কয়েকটি প্রদেশে দুই মাসের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। পাঁচজনের বেশি ব্যক্তি সমবেত হওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া সন্দেহভাজন যেকোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে অন্তত এক মাস বন্দী রাখা যাবে। ব্যাংকক ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতে গণমাধ্যমের ওপরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। তবে গতকাল বুধবার পর্যন্ত জরুরি অবস্থা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সরকার বলছে, ২০১০ সালে ‘লাল শার্ট’ আন্দোলনকারীদের দমনে তৎকালীন সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল। তখন রাস্তায় সেনাবাহিনী নামানো হয়েছিল। কিন্তু এবার ইংলাকের সরকার তা করবে না। পুলিশই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেবে। ২০১০ সালে জরুরি অবস্থা চলাকালে সেনাবাহিনীর গুলিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রাপন্থী ‘লাল শার্ট’ আন্দোলনের অন্তত ৯০ জন কর্মী নিহত হন। সরকারের জরুরি অবস্থাকে পাত্তাই দিচ্ছেন না বিক্ষোভকারীরা।
তাঁরা বলছেন, ইংলাক পদত্যাগ করে ‘পিপলস কাউন্সিল’-এর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন চলবে। বিক্ষোভকারীদের মুখপাত্র আকানাত প্রমফান বলেন, ‘জরুরি অবস্থা জারির কোনো নোটিশ আমরা নিচ্ছি না। আমাদের কর্মসূচি আগের মতোই চলছে এবং তা চলবে।’ অব্যাহত গণ-আন্দোলনের মুখে ২ ফেব্রুয়ারি আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন ইংলাক। প্রধান বিরোধী দল এই নির্বাচন বর্জন করে ইংলাকের পদত্যাগের দাবিতে অনড় রয়েছে। আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে নির্বাচন পেছানোর জন্য গতকাল নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক আদালতকে অনুরোধ জানিয়েছে। এর আগে সরকারের কাছে নির্বাচন বন্ধের আহ্বান জানিয়ে ব্যর্থ হয় কমিশন। সরকারবিরোধী আন্দোলনে সহিংসতায় ইতিমধ্যে অন্তত নয়জন নিহত ও কয়েক শ বিক্ষোভকারী আহত হন। বিক্ষোভকারীরা ১৩ জানুয়ারি থেকে ‘ব্যাংকক অচল’ কর্মসূচি শুরুর পর কার্যত রাজধানী অচল হয়ে আছে। যদিও আন্দোলনকারীর সংখ্যা কমে আসছে। নগর পুলিশ ব্যুরোর এক বিবৃতিতে বলা হয়, গতকাল দুপুরে ব্যাংককের সাতটি সমাবেশ কেন্দ্রে বড়জোর পাঁচ হাজার বিক্ষোভকারী ছিলেন। এদিকে গতকাল সকালে উত্তর-পূর্ব থাইল্যান্ডে নিজ বাড়িতে অজ্ঞাতনামা এক বন্দুকধারীর গুলিতে ‘লাল শার্ট’ আন্দোলনের নেতা কাঁচাই প্রাইপানা আহত হন। তিনি স্থানীয় একটি রেডিওর উপস্থাপক। এএফপি ও বিবিসি।

কালের পুরাণ- শেখ হাসিনার যোগ-বিয়োগ by সোহরাব হাসান

শেখ হাসিনার নতুন মন্ত্রিসভায় আগের মন্ত্রিসভার ৫১ সদস্যের মধ্যে ৩৫ জনই বাদ পড়েছেন। ৪৯ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভায় আগের মন্ত্রিসভার আছেন মাত্র ১৮ জন। বাকিরা সবাই নতুন।
আগের সাতজন উপদেষ্টার মধ্যে বাদ পড়েছেন চারজন। এই যোগ-বিয়োগ কী ইঙ্গিত দেয়? এটাই ইঙ্গিত দেয় যে আগের পাঁচ বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাঁদের নিয়ে সরকার পরিচালনা করেছেন, তাঁদের অধিকাংশ ছিলেন অদক্ষ, অযোগ্য ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। অযোগ্য ও অদক্ষ না হলে তাঁরাও ১৮ জনের কাতারে এসে যেতেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নিয়মরক্ষার নির্বাচনে জয়ী হওয়া সহজ, কিন্তু মন্ত্রিসভায় ঠাঁই নেওয়া কঠিন। সে ক্ষেত্রে আগের আমলনামাটি অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী নিয়েছেন বলেই শুনেছি। যাঁদের সম্পর্কে পাঁচ বছর ধরেই লেখালেখি হয়েছে, যাঁরা নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগই বাদ পড়েছেন।

নির্বাচনের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, কোনো দুর্নীতিবাজের দায়িত্ব তিনি নেবেন না। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে তিনি সবাইকে অতীত থেকে শিক্ষা নিতে বলেছেন। কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বিপুল সম্পদ আহরণের উৎস খুঁজে বের করতে দুর্নীতি দমন সংস্থা (দুদক) মাঠে নেমেছে বলে পত্রিকায় খবর এসেছে। দুদকের সুমতি হোক।
বাদ পড়া মন্ত্রী-উপদেষ্টারা পাঁচ বছর বেশ দাপটের সঙ্গে ছিলেন, ভেতরের বা বাইরের সমালোচনা একেবারেই পাত্তা দেননি। তাঁদের কপাল পোড়ার কারণ নির্বাচনের আগেই যথারীতি সারা দেশে চাউর হয়ে গিয়েছিল। শোনা যায়, নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর বাদ পড়াদের কয়েকজন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ধরনাও দিয়েছেন। কাজ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সিদ্ধান্তে অটল। নির্বাচনের আগে যখন পত্রিকায় মন্ত্রী-সাংসদদের হলফনামায় ঘোষিত সম্পদের বিবরণ প্রকাশিত হচ্ছিল, তখনই নাকি তিনি মনস্থির করে ফেলেন কাকে রাখবেন, কাকে বাদ দেবেন। পাঁচ বছরের আমলনামা তো তাঁর হাতে ছিলই।
এখন বাদ পড়া ব্যক্তিদের কেউ কেউ বলছেন, দলে তাঁরা বেশি বেশি সময় দেবেন। আগে কেন দেননি, সেটিও মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। এঁদের অধিকাংশের সঙ্গে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের যোগাযোগ অত্যন্ত ক্ষীণ। তাঁরা কর্মীদের সমর্থনে নেতা হননি, সভানেত্রীর আশীর্বাদে হয়েছেন। এখন সেই আশীর্বাদটুকুও আলগা হয়ে গেছে।
শুধু মন্ত্রী-উপদেষ্টা নন, অনেক সাংসদও গত পাঁচ বছরে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাঁদের সম্পদের পরিমাণ দেখে নিজেরাও সম্ভবত লজ্জিত হয়েছেন, যে কারণে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশনে গিয়ে তাদের ওয়েবসাইট থেকে হলফনামা প্রত্যাহার করতে বলেছিল। আবদার আর কাকে বলে?
এই জনসেবকদের সৌভাগ্য যে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার মান এখনো সেই উচ্চতায় যায়নি, যেখানে মন্ত্রী-সাংসদদের হলফনামার বাইরে থাকা সম্পদের হিসাব বের করে আনবে। বিদেশে কোন আমলে কত টাকা পাচার হয়েছে, তার বিবরণী জনগণকে জানাবে। মন্ত্রী-সাংসদেরা হলফনামায় যেসব তথ্য-উপাত্ত দিয়েছেন, সেটুকুই সাংবাদিকেরা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে হুবহু তুলে দিয়েছেন। আর তাতেই সবার গা জ্বালা ধরেছে।
জনপ্রতিনিধি হওয়ার আগে তাঁদের কার কী সম্পদ ছিল, পাঁচ-দশ বছর পর কী পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন, তা ওয়েবসাইটে নয়, জনসমক্ষেই প্রকাশ করা উচিত। ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ মন্ত্রী-সাংসদদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করার ওয়াদা করেও কথা রাখেনি। আর এবারে ওয়াদার ধারে-কাছেও যায়নি। মানুষ সামনে এগোয়, আর আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো পেছনে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে চায়। জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাব পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরই চারদিকে হইচই পড়ে যায়। মন্ত্রী-সাংসদেরা ধনাঢ্য বাবা-চাচার দোহাই দেন। এসব দেখে নাকি ন্যাপ-প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের একটি কথা মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘শৈশবে গ্রামের বাড়িতে যাঁরা শানকিতে খেতেন এবং খালের পাড়ে গিয়ে প্রাতঃকর্ম সারতেন, তাঁরাই এখন গুলশান-বনানীর আলিশান ভবনে থেকে নিজেদের নব্য জমিদার ভাবেন।’
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত পুরোনো সহকর্মীদের রক্ষায় একটি খোঁড়া যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন, ‘গত পাঁচ বছরে মানুষের আয় বেড়েছে। অর্থনীতির আকার বড় হয়েছে। অতএব, মন্ত্রী-সাংসদদের আয় বাড়াটাও স্বাভাবিক।’ কিন্তু সেটি কত গুণ? বিশ্বব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী পাঁচ বছর আগে দেশের মানুষের বার্ষিক গড় আয় ছিল ৮৪৭ ডলার, আর এখন এক হাজার ৪৪ ডলার। অর্থাৎ পাঁচ বছরে মানুষের আয় দেড় গুণ বেড়েছে। কিন্তু মন্ত্রী-সাংসদদের আয় শতগুণ কিংবা তারও অনেক বেশি হলো কোন অলৌকিক উপায়ে, সেটি তদন্ত করে দেখা দরকার।
৫ জানুয়ারি যে নির্বাচনটি হয়ে গেল, তাকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বলা যাবে না, এতে জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বলেছেন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নির্বাচন। তাহলে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনটি হলে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়া অনেকেই যে মনোনয়ন থেকেও যে বাদ পড়তেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করায় তাঁরা ফাঁকা মাঠে গোল দিয়েছেন।
বাংলাদেশ বড় অদ্ভুত জায়গা। এখানে একটি ভালো নির্বাচন, একটি ভালো সংসদ ও সরকার দিতে পারে না। যার প্রমাণ আমরা পেয়েছি ২০০১ ও ২০০৯ সালে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের বিপুল বিজয় তাদের মাথা খারাপ করে দিয়েছিল। ফলে মন্ত্রী বাছাইয়ে যোগ্যতাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত প্রতিনিধির পাশাপাশি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানেরও প্রতিনিধি হিসেবে একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ পেয়েছিলেন। ফলে সরকারে দ্বৈত শাসন ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চেয়ে অধিক ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে হাওয়া ভবন।
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর গঠিত সরকারে দ্বৈত শাসন না থাকলেও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বাছাইয়ে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্যই অগ্রাধিকার পায়। অনেক জ্যেষ্ঠ নেতারই মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হয় না। প্রধানমন্ত্রী যাঁদের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও আস্থা রেখে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী করেছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই সেই মর্যাদা রক্ষা করতে পারেননি। একটি মন্ত্রিসভার স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র—দুটোই যদি পাঁচ বছর ধরে বিতর্ক ও প্রশ্নের মুখে থাকে, সেই মন্ত্রিসভাকে কী করে সফল বলা যায়?
সে সময়ে বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, তাঁর সরকারের মন্ত্রীরা স্যুটেড-বুটেড ও চৌকস না হলেও
সৎ ও যোগ্য! কিন্তু গত পাঁচ বছর পর দেখা গেল, তাঁর অধিকাংশ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী স্যুটেড-বুটেড ও চৌকস হওয়ার পরীক্ষায় পাস করলেও যোগ্যতা ও দক্ষতা দেখাতে পারেননি। দলের ভেতরে ও বাইরে সেই মন্ত্রিসভার ব্যাপক সমালোচনাকে তখন সরকার আমলে নেয়নি। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে রাখার জন্য যদি জেদ না ধরা হতো, তাহলে হয়তো বিশ্বব্যাংকের অর্থও পাওয়া যেত এবং পদ্মা সেতুর কাজও শুরু হতো।
গত কয়েক দিনে বিভিন্ন পত্রিকায় বাদ পড়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের আমলনামা ছাপা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ‘পুরোনো মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়া ৩৫ জনের মধ্যে অন্তত ২৮ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালনকালে নানা কারণে বিতর্কিত ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনসহ অদক্ষতা ও অযোগ্যতার অভিযোগ ছিল।’
নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পাঁচ বছরে তাঁদের অনেকের সম্পদ বেড়েছে বহুগুণ। মন্ত্রীদের চেয়ে তাঁদের স্ত্রীরা আরও বেশি ধনী হয়েছেন। কেউ কেউ প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক, বিমা ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন নিয়েছেন, স্ত্রীর নামে সম্পদ গড়েছেন।
প্রকাশিত খবরে আরও বলা হয়, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি দায়িত্ব পালনে চরম অযোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতার জন্য তাঁকে দায়ী করা হয়। প্রভাবশালী দেশগুলো তাঁর প্রতি বিরক্ত ছিল। আ ফ ম রুহুল হকের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালে পাঁচ বছরে তাঁর স্ত্রীর সম্পদ বেড়েছে ৭৮২ শতাংশ। এ সময়ে তাঁর ছেলে জিয়াউল হক বড় ব্যবসায়ী হয়েছেন। খাদ্য অধিদপ্তরের নিয়োগ নিয়ে সমালোচিত হয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক। নরসিংদী পৌরসভার মেয়র লোকমান হোসেন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাবেক শ্রমমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদের ভাইয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল।’
এখানেই শেষ নয়। আরও আছে। সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়মের মাধ্যমে পদস্থ কর্মকর্তাদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ দেওয়ার অভিযোগ আছে। অনিয়ম, দুর্নীতি, অযোগ্যতা, অদক্ষতা এবং বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার আরও অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে আছে, তাঁরা হলেন: সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মজিবুর রহমান ফকির, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা, সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আফছারুল আমীন, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদ, মৎস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আবদুল হাই।
দলের অন্দরমহলের উদ্ধৃতি দিয়ে ১৩ জানুয়ারি ডেইলি স্টার লিখেছে, ‘কতিপয় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীর অস্বাভাবিক ধন-সম্পদ বেড়ে যাওয়ায় বিরক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের মন্ত্রিসভায় না নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।’
তবে হলফনামায় সম্পদের যে বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে, সেটাই সব নয়। অনেকের প্রকাশিত সম্পদের চেয়ে অপ্রকাশিত সম্পদের পরিমাণই বেশি। আর যাঁরা কেবল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, তাঁদের হিসাবটাই আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু যাঁরা পাঁচ বছর ধরে উপদেষ্টা ছিলেন, যাঁরা দলের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের সম্পদের হিসাবটাও প্রধানমন্ত্রী একবার পরখ করে দেখতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে আরও একটি কথা বলতে হয়, দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত সবাই যেমন মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েননি, তেমনি বাদ পড়া সবাইও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকারের বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ নেই। তিনি নির্বাচন করেননি, আবার মন্ত্রীও হতে চাননি। এনামুল হক মোস্তফা শহীদ অসুস্থ থাকায় নির্বাচন করেননি। দুর্নীতি ও অনিয়মের দায়ে একাধিক উপদেষ্টা বাদ পড়েছেন বলে বাজারে কথা চালু আছে, কিন্তু তাঁদের চেয়েও বেশি দুর্নীতির অভিযোগ যে উপদেষ্টার নামে, তিনি বহাল তবিয়তে আছেন। অনুরূপ ধারণা আছে পুনর্বহাল হওয়া দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীর সম্পর্কেও। অন্যদিকে, মন্ত্রিসভায় নতুন যাঁরা এসেছেন, তাঁদের বেশির ভাগ পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির হলেও অন্তত তিনজনের বিরুদ্ধে আগের আওয়ামী লীগের আমলে ব্যাপক দুর্নীতি ও দখলবাজির অভিযোগ রয়েছে।
তার পরও বলব, ৫১ সদস্যের মন্ত্রিসভার ৩৫ জনকে ঝেড়ে ফেলা কম সাহসের ব্যাপার নয়। প্রধানমন্ত্রীর এই যোগ-বিয়োগের সুফল দেশবাসী পাবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

বিশ্বায়নের কাল- অঘটন-উত্তর বোধোদয়, নাকি রাজনীতি? by কামাল আহমেদ

ব্রিটেনে ইংরেজি শব্দ ‘হাইন্ডসাইট’ একটি বহুল প্রচলিত শব্দ। বিশেষ করে রাজনীতিকদের কাছে। যখনই কোনো কৈফিয়তের প্রশ্ন আসে, তখনই তাঁরা এই শব্দটি ব্যবহার করে ‘কী করিলে কী হইত’-এর বিভিন্ন সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরে তাঁদের নিজেদের অক্ষমতা বা না পারার যৌক্তিকতা ব্যাখা করে থাকেন।