Showing posts with label রোকনুজ্জামান পিয়াস. Show all posts
Showing posts with label রোকনুজ্জামান পিয়াস. Show all posts

Wednesday, September 16, 2026

যে প্রকল্পে বদলে গেল ওদের জীবন by রোকনুজ্জামান পিয়াস

নরসিংদীর সোহেল মিয়া। সৌদি আরবে এসি লাগাতে গিয়ে উঁচু বিল্ডিং থেকে পড়ে মারাত্মক আহত হন। কিন্তু কোম্পানি তার চিকিৎসা না করিয়ে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। দেশে ফিরে তিনি রেইজ প্রকল্পের সহযোগিতায় প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে প্রশিক্ষণ নেন। এরপর প্রকল্প থেকে নগদ প্রণোদনা ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের বীমা দাবির ৫০ হাজার টাকা দিয়ে একটি পোলট্র্রি ফার্ম করেন। ওই ফার্ম থেকে বর্তমানে তার মাসিক আয় ৩০ হাজার টাকা। নারায়ণগঞ্জের সুলতানা সংসারে সচ্ছলতা আনতে ২০১৪ সালে লেবাননে যান। কিন্তু ভাগ্য তার সুপ্রসন্ন হয়নি। ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। দেশে ফিরে গৃহকর্মীর কাজ করেন। এই অবস্থায় রেইজ প্রকল্পের কথা জানতে পারেন। সেখান থেকে কাউন্সেলিং নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ফিন্যানশিয়াল লিটারেসি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। প্রকল্প থেকে নগদ প্রণোদনাও দেয়া হয়। ওই টাকা দিয়ে সেলাই মেশিন এবং কিছু কাপড় কিনে নিজ গ্রামে চালু করেন ছোট্ট একটি টেইলার্স। এখন তার মাসিক আয় ১০-১২ হাজার টাকা। শুধু সোহেল মিয়া বা সুলতানা নয়, রেইজ (রিকভারি অ্যান্ড এডভান্সমেন্ট অব ইনফরমাল সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট) প্রকল্পের আর্থিক, মানসিক ও টেকনিক্যাল সহায়তায় নতুন দিনের স্বপ্ন দেখছেন স্বর্বস্ব হারানো ও কর্মহীন হয়ে দেশে ফেরা ভাগ্যবিড়ম্বিত প্রায় দুই লাখ কর্মী। এরমধ্যে প্রায় দেড় লাখ কর্মীর স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। এ ছাড়া নির্ধারিত বাজেটে নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মীকে সেবা দেয়ার পরও অর্থ উদ্বৃত্ত রয়েছে। এ অর্থে অতিরিক্ত আরও অর্ধলক্ষাধিক কর্মীকে প্রকল্পের আওতায় আনা হচ্ছে। সফল এ প্রকল্পটিকে ইতিমধ্যে বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে মনে করা হচ্ছে। স্বীকৃতিস্বরূপ ‘বিশ্বব্যাংক ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়েছে। যা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ।

জানা যায়, করোনা মহামারীর কারণে ২০২০ সালে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৫ লাখ কর্মী চাকরি হারিয়ে দেশে ফেরত আসেন। এসব প্রত্যাগত কর্মী তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে অভাব-অনটনে নিদারুণ কষ্টে দিনানিপাত করছিলেন। এ সময় তাদের কর্মক্ষম করে তোলার জন্য গ্রহণ করা হয় বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় রিইন্টিগ্রেশন কর্মসূচি। নানা প্রক্রিয়া শেষে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে যাত্রা শুরু হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় রিইন্টিগ্রেশন প্রকল্পের। বস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডকে।
২০২৩ সালে ৩০শে জুলাই মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। মেয়াদ ধরা হয় ২০২৬ সালের ৩০শে জুন পর্যন্ত। প্রাথমিকভাবে ৪২৭ কেটি ৩০ লাখ ৩৫ হাজার টাকার এ প্রকল্পে ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে শেষমেশ বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫১৮ কোটি ৩০ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে ২ কোটি ৩০ লাখ ৩৫০০০ টাকা সরকারের তহবিল থেকে এবং অবশিষ্ট ৫১৬ কোটি টাকা বিশ্বব্যাংক সহজশর্তে ঋণ দেয়। প্রকল্পের মাধ্যমে উদ্যোক্তা, আত্মকর্মসংস্থান, পুনরায় বিদেশ গমন এবং চাকরি প্রাপ্তিতে প্রকল্প থেকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। সারা দেশে বিদেশফেরত কর্মীদের সেবা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি ২৭টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এতে করে কর্মীরা এসব প্রতিষ্ঠান থেকে  হতে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তাসহ তাদের কাঙ্খিত সেবা সহজেই পায়। একটি রেফারেল সিস্টেমের মাধ্যমে এসব সেবা প্রদান করা হয়। এছাড়া নিবন্ধিত সেবাগ্রহীতা কর্মী ও তার পরিবারের সদস্যরা স্বনামধন্য হাসপাতাল থেকে স্বল্প খরচে চিকিৎসা পাচ্ছেন।

সূত্রমতে, ৩৫টি জেলায় স্থাপিত ‘প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার’-এর মাধ্যমে প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব সেন্টারের মাধ্যমে কাউন্সেলিং ও পরামর্শ নিয়ে প্রত্যাগত অসহায় অভিবাসী কর্মীরা নানাখাতে সম্পৃক্ত হয়ে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে গ্রোসারি শপ, কাপড়ের ব্যবসা, ড্রাইভিং, পোলট্রি, ডেইরি, ছাগল ও গরু পালন, বিফ ক্যাটারিং, ফলের বাগান, বাণিজ্যিক কৃষি ও মৎস্য চাষ ইত্যাদি। এছাড়া মেশন, টেইলারিং অ্যান্ড ড্রেস মেকিং, ইলেকট্রিশিয়ান, কন্সট্রাকশন, কার্পেন্টার, পেইন্টার, ওয়েলডিং, গোল্ড স্মিথ, রড বাইন্ডিং, মোবাইল সার্ভিসিং, টাইলস ফিটিং, ইন্ডাস্ট্র্রিয়াল, অটো মেকানিক, কাটিং মাস্টার,  প্লাম্বার, সেলুন, ইলেকট্রিক, ফার্নিচার, কনফেকশনারি, স্যানিটারি, গার্মেন্টস পণ্য, ফর্মেসি, হার্ডওয়্যার, জুতা, অটো পার্টস, থাই গ্লাস, রাইস মিল, মিষ্টি, স্টেশনারি, হোটেল,  চায়ের দোকান, ভেজিটবল, ফলসহ নানা ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। শুধু ব্যবসা নয়, প্রকল্পের মাধ্যমে বেসরকারি চাকরিতে যুক্ত হয়েছেন ৫ হাজারেরও বেশিসংখ্যক কর্মী। প্রকল্প থেকে উপকারভোগীদের অনেকে ফ্রিল্যান্সিং, শিক্ষক, বাবুর্চি, ইমাম, মুয়াজ্জিন, শেফ, গ্রাম্য চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ারসহ নানা পেশা বা কাজে যুক্ত হয়েছেন। তথ্য বলছে, রেইজ প্রকল্পটিকে বিশ্বব্যাংক অন্যান্য দেশের জন্য রোল মডেল হিসেবে দেখছে। তাদের নিজস্ব সমীক্ষায় এটিকে সবচেয়ে ভালো প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি এ প্রকল্পকে বিশ্বব্যাংকের মর্যাদাপূর্ণ ‘বিশ্বব্যাংক ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ এ ভূষিত করা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক, ড. এটিএম মাহাবুব-উল করিম বলেন, আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ বেকার কর্মীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। এছাড়া অতিরিক্ত ৫৩০০০ ফেরত প্রবাসীকে উপকারভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি আরও ২০ হাজার জনকে দক্ষতা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। ৩৫টি প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার স্থাপন করে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে সারা দেশে কর্মীদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পেরেছি। ভবিষ্যত নিয়ে হতাশ হয়ে যাওয়া এসব কর্মীরা এখন স্বাবলম্বী হয়ে পরিবার নিয়ে ভালো আছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র প্রকল্প হিসেবে ‘রেইজ প্রকল্প’ বিশ্বব্যাংকের এওয়ার্ড পেয়েছে। যা জাতি হিসেবে গর্বের। প্রকল্পটি অব্যাহত থাকলে আরও বিদেশফেরত কর্মীরা জীবিকা অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। বেকারত্বের অভিশাপমুক্ত হবে লাখও কর্মী।

mzamin

Tuesday, October 8, 2019

বুয়েট ভিসি, অনেক প্রশ্ন by রোকনুজ্জামান পিয়াস

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আরবার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের দেড় দিন পার হয়েছে। কয়েক দফা জানাজা শেষে লাশ দাফনও হয়ে গেছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম এখনও পর্যন্ত ঘটনাস্থলে আসেননি। আবরারের দাফনেও অংশ নেননি। দেখা তো দূরের কথা, কথা বলেননি আবরারের অভিভাবক, স্বজন বা সহপাঠিদের সঙ্গে। তাকে ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না।
যদিও শুরুতে বলা হয়েছিলো তিনি অসুস্থ। তাই তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে যেতে পারেননি।
কিন্তু সময় গড়িয়েছে, আর হত্যার লোমহর্ষক সব কাহিনী বেরিয়ে এসেছে, পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, রাজধানীর গন্ডি পেরিয়ে আবরার রাষ্ট্র হয়ে গেছে। দলমত নির্বিশেষে ফুঁসে ওঠেছে সারাদশের ছাত্রসমাজ। দেশ ছাড়িয়ে সংবাদ শিরোনাম হয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। সামাজিক মাধ্যমজুড়ে আবরার বন্দনা আর ভালোবাসায় শোকাভিভূত, ক্ষুব্ধ, প্রতিবাদ মুখর মানুষ। ঘৃণার বিষবাষ্প ছুঁড়ে দিয়েছে খুনীদের প্রতি। অথচ তখনও নিবর ভিসি সাইফুল ইসলাম।
স্বয়ং ছাত্রলীগ খুনের ঘটনায় জড়িত নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে, বহিস্কার করেছে, শাস্তি চেয়েছে, কিন্তু সাড়া মেলেনি ভিসির। তখনও চুপ, নির্লিপ্ত তিনি। প্রয়োজন মনে করেননি ঘটনাস্থলে যাওয়ার, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার, আবরারের অভিভাবক-স্বজনদের সান্তনা দেয়ার। ফোন করে খোঁজ-খবর নেয়ার সাধারণ সৌজন্যবোধটুকুও নেই তার। ধরেননি ফোনও।
এক মায়ের সন্তান আবরার এখন লক্ষ মায়ের। আবরারের পিতার চোখের পানি গড়িয়েছে লক্ষ পিতার চোখ হয়ে। আবরার এখন আর এক পরিবারের নেই। অসংখ্য পরিবার তার, সারাদেশের ছাত্রসমাজ তার সহপাঠি, ভাই, বন্ধু। অথচ যার অভিভাবকত্বে উচ্চশিক্ষার এই বিদদ্যাপীঠে পা রেখেছিলেন আবরার, সেই ভিসির টিকিটিও পায়নি ছাত্ররা।
প্রশ্ন ওঠেছে তাহলে তিনি কোথায় আছেন? আর কেনই বা তার এই নির্লিপ্ততা। শিক্ষার্থীরা বলছেন, একজন ভিসি সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিভাবক। শিক্ষার্থীরা বিপদে-আপদে তার কাছেই যাবেন। তিনিও ছুটে আসবেন তাদের দুঃসময়ে। সমাধান দিতে না পারেন, অন্তত: সান্তনার বাণী শুনাবেন, সহানুভূতি জানিয়ে ছাত্রদের পাশে থাকবেন, ব্যথিত হবেন। কিন্তু তিনি যেনো একেবারে অজ্ঞাত কোন স্থানে চলে গেছেন।

গতকাল থেকেই শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে ভিসিকে আশা করছিলেন। তার মুখ থেকে বিচারের আশ্বাস শুনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেটি আর চাওয়া নেই, হয়ে গেছে পূর্ণাঙ্গ দাবি। ঘটনাস্থলে না আসার জবাবদিহিতা। কিন্তু এরপরও আসেননি ভিসি সাইফুল।
এই অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক মিজানুর রহমান আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন আজ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে। আর এসেই তোপের মুখে পড়েন শিক্ষার্থীদের। প্রশ্নবানে জর্জরিত হন। ভিসিকে না পেয়ে শিক্ষার্থীরা সকল রাগ-ক্ষোভ উগরে দেন তার ওপর। শিক্ষার্থীরা জানতে চান, আপনি কোথায় ছিলেন? হলে পুলিশ আসলো কি করে? ইত্যাদি। এর সঠিক জবাব তিনি দিতে পারেননি। এরপরই ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তার পদত্যাগের আহ্বান জানান। শিক্ষার্থীদের জেরার মুখে ভিসি কোথায় আছেন তা জানেন না বলে জবাব দেন।
ভিসিকে ফোন দেন ছাত্রকল্যাণ পরিচালক। কয়েকবার ফোনে বিজি পান। এরপর তার (ভিসি) ফোন বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা ভুয়া ভুয়া বলে আওয়াজ তোলেন।
তবে মিজুনুর রহমান সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ছাত্র রাজনীতি থাকার প্রয়োজন নেই। বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের আশ্বাসও দেন তিনি।
এদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি। আন্দোলনকারীরা ভিসিকে স্বশরীরে হাজির হয়ে জবাবদিহি করার জন্য বিকাল ৫টা পর্যন্ত সময় বেধে দিয়েছেন।
অপরদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন বুয়েট ভিসি। এ কারণে তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে যাননি, তবে যাবেন। আজ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে সমসাময়িক রাজনৈতিক ইস্যুতে ডাকা এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
শিক্ষকরা দাবি করেছেন, ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম সুস্থ্য রয়েছেন। এমনকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চলমান ক্যাম্পাস পরিস্থিতি নিয়ে তার বাসায় আলোচনাও হয়েছে। সেখানে শিক্ষকরা ক্যাম্পাসের সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন। গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন ছাত্রকল্যাণ পরিচালক মিজানুর রহমান। বলেন, ভিসি স্যার সুস্থ্য, তবে তিনি আন্দোলন কিভাবে সামাল দেবেন সে ব্যাপারে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্ধে রয়েছেন।

Tuesday, September 17, 2019

সৌদি থেকে এক কাপড়ে ফিরলেন ১৭৫ জন by রোকনুজ্জামান পিয়াস

মেহেরপুরের সেলিম রেজা। সৌদি আরবে গেছেন ২০০৬ সালে। এর মধ্যে দু’বার ছুটিতে বাড়িও এসেছিলেন। কিন্তু শেষবার যখন ছুটি শেষ করে সৌদি ফিরেন, তখনই  জীবনের চরম বাস্তবতা দেখলেন। মাসের পর মাস কাজ করেছেন কিন্তু বেতন পাননি। বাধ্য হয়ে পালিয়েছেন। নতুন মালিক দিয়ে আকামা করেছিলেন। কিন্তু সেই আকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই মালিক হুরুপ (বাতিল) করে দিয়েছে। বছর পার না হতেই নতুন আকামা করে দেয়ার নাম করে আবারও ১০ হাজার রিয়াল দাবি করেন মালিক। উপায় না পেয়ে সেলিম নিজেই পুলিশের কাছে ধরা দেন। এরপর ২০ দিন ডিপোর্টেশন সেন্টারে রেখে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয় তাকে।
সেলিম রেজা রোববার রাতে দেশে ফেরেন। রাত ১১টা ৭ মিনিটে সৌদি এয়ারলাইন্সের এসভি-৮০৪ ফ্লাইটে করে তার সঙ্গে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান আরও ১৭৪ বাংলাদেশি। সেলিমের মতো তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরেছেন তারাও।

এসব কর্মীরা ফিরেছেন এক কাপড়ে। তাদের কেউ ফিরেছেন খালি পায়ে, কারও মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চেহারায় ক্লান্তির ছাপ, কেউবা ফিরেছেন কর্মস্থলের পোশাকেই। তাদের সকলের হাত ছিলো খালি। একবারে শুণ্য, নিঃস্ব হয়ে ফিরেছেন তারা। বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফেরার সম্বলটুকুও ছিলো না তাদের। রাতেই ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ডের সহযোগিতায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম বিমান বন্দরে খাবার সরবরাহসহ নিরাপদে বাড়ি পৌঁছানোর জরুরি সেবা দিয়েছে।

সেলিম জানান, তিনি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন সেটি ছিলো একটি নির্মাণ কোম্পানি। ৫ হাজার কর্মী কাজ করতো। ছাঁটাই করতে করতে বর্তমান কর্মীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ২০০ জনে। কিন্তু এই ২০০ জনও ঠিকমতো বেতন পাচ্ছেন না। আকামা থাকার পরও অনেককে কোন কারণ ছাড়াই ধরে নিয়ে যাচ্ছে সেদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আবার অনেকে বেতন না পেয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন অন্যত্র। দীর্ঘদিনের তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে সেলিম জানান, সৌদি আরবজুড়ে বিদেশি শ্রমিকদের মধ্যে এক ধরনের অরাজকতা বিরাজ করছে। ছাড় পাচ্ছেন না বৈধ কাগজপত্র থাকা কর্মীরাও। অধিকাংশ কর্মীই বেতন পাচ্ছেন না মাসের পর মাস।

ফেরত আরেকজন টাঙ্গাইলের কালিহাতি উপজেলার মনির হোসেন। বছর দুয়েক আগে ৫ লাখ টাকা খরচ করে তিনি দেশটিতে হাউজ ড্রাইভারের কাজ নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ওই মালিকের অধীনে কোন কাজই ছিলো না। তাই মালিকের অনুমতি নিয়েও মোটা অঙ্কের উৎকোচ দিয়ে অন্যত্র কাজ নেন তিনি। কিন্তু আকামা মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন আকামা করে দেয়নি মালিক। এদিকে, পূর্বে যেখানে কাজ করতেন সেখানে বেতন না পাওয়ায় আরেক জায়গায় কাজ খুঁজতে বের হন। আর তখনই পুলিশ তাকে পাকড়াও করে। এরপর ১৪দিন ডিপার্টটেশন সেন্টারে থাকার পর তাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

ফিরে আসা এই ১৭৫ জনের একজন চাঁদপুরের বাবুল হোসেন। তার অভিযোগ, সৌদিতে ৬ মাসের বৈধ আকামা থাকা সত্ত্বেও কর্মস্থল থেকে ধরে তাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তার কোন কথা শোনেনি সে দেশের প্রশাসন। প্রত্যেকের অভিযোগ প্রায় একই।
ফেরত কর্মীরা জানান, প্রতিদিন শত শত কর্মীকে সেদেশের প্রশাসন গ্রেপ্তার করছে। রিয়াদ ডিপার্টেশন ক্যাম্পে এখনও হাজার খানেক বাংলাদেশি কর্মী বন্দি রয়েছেন।

টাঙ্গাইলের আলিম, নরসিংদীর মো. জোবাইর, লক্ষ্মীপুরের ফরিদ, মুন্সিগঞ্জের শরিফ হোসেন, মেহেরপুরের সেলিম রেজাসহ অনেকের অভিযোগ তাদের বৈধ আকামা থাকা সত্ত্বেও তাদের জোরপূর্বক ধরে জেলখানা পাঠিয়ে দিচ্ছে। এরপর কিছুদিন সেখানে রেখে দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে।

কয়েকজন কর্মীর অভিযোগ, তাদের কফিল (মালিক) আকামা নতুন করে নবায়ন করেনি বা আকামা বাতিল করে দিয়েছে। ফলে তাদের আর সেদেশে থাকতে দেয়া হচ্ছে না। এক্ষেত্রে সৌদিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস তাদের কোন সহযোগিতা করেনি বলেও অভিযোগ করেন ফিরে আসা এসব কর্মীরা। তারা বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এখনই ব্যবস্থা না নিলে বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে সৌদি আরবের শ্রমবাজারে।

দেশটির সংবাদ মাধ্যম সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রম এবং আবাসন আইন অমান্য করায় সৌদি সরকার অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩৮ লাখ বিদেশিকে আটক করেছে। ২০১৭ সাল থেকে দেশটির সরকার এই আটক অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আটক ৩৭ লাখ ৯০ হাজার ১৭৩ জনের মধ্যে ২৯ লাখ ৫০০ জন আবাসন আইন অমান্য, ৫ লাখ ৮৩ হাজার ৬০২ জন শ্রম আইন অমান্য এবং ২ লাখ ৪৭ হাজার ২২০ জনকে সীমান্ত আইন অমান্য করায় আটক করা হয়েছে।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুন থেকে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৫২১ জন বিদেশি আটক হয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে ৯ লাখ ৪০ হাজার ১০০ বিদেশিকে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

অবৈধ একজনও সৌদিতে থাকতে পারবে না: এদিকে, রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের বরাতে আমাদের কূটনৈতিক রিপোর্টার জানান, সৌদি আরবে অবৈধ বাংলাদেশীদের দেশে ফেরানো নিয়ে এক অরাজক পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। দেশটিতে কত অবৈধ রয়েছে তা খোদ সৌদি সরকারও জানে না। তবে তাদের ধরতে সৌদি পুলিশ প্রতিদিনই অভিযান চালাচ্ছে ২০১২ সাল থেকে। লাখে লাখে অবৈধরা ধরা পড়ছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশীও আছেন। তাদের নাগরিকত্ব যাচাই এবং ট্রাভেল পাস ইস্যুর জন্য চাপ বাড়ছে দূতাবাসের ওপর। অনেক আগে সৌদি পাড়ি জমানো কিছু রোহিঙ্গাও আসছেন ট্রাভেল পাসের জন্য। ফলে, নাগরিকত্বের বিষয়টি নিশ্চিত না হয়ে কাউকেই ট্রাভেল পাস ইস্যু করা যাচ্ছে না।

ঢাকা থেকে নাগরিকত্বের রিপোর্ট পেতে সময় লাগছে। এক কর্মকর্তা বলেন, সৌদি আরবে এখনও বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে রোহিঙ্গাদের যাওয়া অব্যাহত রয়েছে। দেশটিতে তারা বিশেষ সুবিধা পায়। ফলে, ওই মোহ তাদের সৌদির প্রতি আগ্রহী করে তুলছে। অসাধু পাচারকারীরা সূযোগটি নিচ্ছে। তারা মোটা অংকের বিনিময়ে সৌদি আরবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদশী পাসপোর্ট দিয়ে পাচার করছে। নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, গত ৬ মাসে লাখো বাংলাদেশী পাসপোর্টধারী সৌদি আরব গেছেন। এর মধ্যে ’শ খানেক রোহিঙ্গা থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে এটা নিশ্চিত যে অবৈধ হয়ে পড়া একজন রোহিঙ্গাকেও বাংলাদেশে ফেরার ট্রাভেল পার্স ইস্যু করেনি রিয়াদস্থ দূতাবাস। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, একজন অবৈধও সৌদি থাকতে পারবেন না। তবে আশার দিক হচ্ছে বাংলাদেশি যারা অবৈধ হওয়ার কারণে দেশে ফিরছেন তারা নতুন করে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে দেশটিতে ফের যেতে পারবেন। আগে ২ বছরের মধ্যে রি-এন্ট্রির সুযোগ ছিল না। এখন সেই বাধা কেটেছে। দু’বছর নয়, পরদিনই তারা চাইলে বৈধভাবে সৌদি যেতে পারবেন।

Saturday, August 24, 2019

কিশোরী রাতারাতি হয়ে ওঠেন যুবতী! by রোকনুজ্জামান পিয়াস

আমেনা খাতুন। ১৬ বছরের কিশোরী। দরিদ্র পরিবারের সন্তান। এই বয়সেই তাকে সংসারের হাল ধরতে বিদেশ পাড়ি জমাতে হবে। তাকে পাঠাতে পারলে লাভবান হবে দালালও। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তার বয়স। তাই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ভূয়া জন্মনিবন্ধনের সার্টিফিকেট এনে পাসপোর্ট করানো হয়েছে। তারপরই গৃহকর্মীর কাজে তাকে সৌদি আরব পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।
এ কাজে অবশ্য তাকে দালাল নিজেই বুদ্ধি-পরামর্শ ও সহযোগিতা করেছে। আবার মর্জিনা বেগম পঞ্চাশোর্ধ। স্বামী নেই। দুই সন্তান। তিনিও দালালের খপ্পরে পড়ে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তার ক্ষেত্রেও বয়সই বাধা। এখানেও মুশকিলে আছান হয়ে আসে সেই দালাল। ভূয়া জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেটে বয়স কমিয়ে দেয়া হয়েছে তার।

এভাবেই কিশোরী থেকে রাতারাতি হয়ে ওঠছেন ২৫ বছরের যুবতী। আবার ৫০-৬০ বছরের বৃদ্ধাও বয়স কমিয়ে হয়ে যাচ্ছেন যুবতী। দালাল এবং ইউনিয়ন পরিষদের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজসে চলছে এই ভূয়া সার্টিফিকেটের কারসাজি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মংসংস্থান মন্ত্রণালয়ও তাদের দায় এড়াতে পারে না। কারণ, বিদেশ যাওয়ার চূড়ান্ত ছাড়পত্র তারাই দেয়। তাদেরও দায় রয়েছে বয়স যাচাই-বাছাইয়ের।

শুধু আমেনা খাতুন বা মর্জিনা খাতুন নয়, গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে যারা বিদেশ যাচ্ছেন, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অধিকাংশের ক্ষেত্রেই কারসাজি করে বয়স বাড়ানো-কমানো হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবসহ মধ্যেপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশী গৃহকর্মীদের ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতনসহ নানা ধরনের নিপীড়ন চালানোর কথা প্রায়ই গণমাধ্যমে ওঠে আসছে। যারা গৃহকর্তার নিকট থেকে পালাতে পারছেন, তাদের বর্ণনায় ওঠে আসছে লোমহর্ষক কাহিনী। এই সকল নির্যাতনের শিকার নারীদের একটি বড় অংশ অল্প বয়সী।

নারী অভিবাসনের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত বয়স ২৫-৪৫ বছর। কিন্তু তাদের একটি বড় অংশই ২৫ বছরের নিচে। দালালরা অল্প বয়সী এসব নারীদেরকে ২৫ বছর বা তার বেশি দেখিয়ে জন্মনিবন্ধন তৈরি করে দিচ্ছে। এদিকে জন্মনিবন্ধন থাকার কারণে হরহামেশাই তারা পাসপোর্ট পেয়ে যাচ্ছে।

পরবর্তী ধাপে মেডিকেল পরীক্ষাতেও পার পেয়ে যাচ্ছে এসব নারীরা। যেহেতু মেডিকেল পরীক্ষায় বয়স নির্ণয় বাধ্যতামূলক না। আর জনশক্তি ব্যুরো থেকে প্রশিক্ষণ ও ছাড়পত্র পেয়ে যাচ্ছে সহজেই।  তাদের ভাষ্য, এক্ষেত্রে তারা অসহায়।

বিদেশ যাওয়ার শেষ ধাপ বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন। তারাও অন্যদের ওপরে দায় চাপিয়ে দায় সারছেন।

এমন দায়িত্বহীনের বলি হয়েছেন সীমা, আদুরী, জিয়াসমি, তুলির মতো ১৪-১৫ বছর বয়সী অসংখ্য কিশোরী। যারা শিশু থেকে দালালদের কারসাজিতে হয়ে যাচ্ছে ২৫ বছর বয়সী নারী। আর স্বপ্নের প্রবাস থেকে ফিরতে হচ্ছে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে, কারও অঙ্গহানী হচ্ছে আর কেউবা দেশে ফিরছেন অন্তঃসত্ত্বা হয়ে।

অভিবাসী কর্মীদের নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা উন্নয়নকর্মীরা বলছেন, এই পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় বয়স নির্ণয় পরীক্ষাও বাধ্যতামূলক করা দরকার। ২৫ বছরের নিচে নারীদের স্বাস্থ্যপরীক্ষায় আনফিট দেখানোর বিধান চালু হলে অনেক সমস্যা এড়ানো সম্ভব হবে।

Wednesday, June 26, 2019

ভূমধ্যসাগর ট্র্যাজেডির লোমহর্ষক বর্ণনা: ‘প্রস্রাব খেয়ে গলা ভিজিয়েছি’ by রোকনুজ্জামান পিয়াস

মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে ভয় দেখিয়ে তোলা হয় ট্রলারে। ৩৫ জনের ট্রলারে ৭০ জনকে। এরপর ভাসিয়ে দেয়া হয় সাগরে। ট্রলারে কোনো দক্ষ মাঝি ছিল না। ছিল না খাবার পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। প্রতিকূল আবহাওয়ায় তাই একমাত্র ভরসা ছিল সৃষ্টিকর্তার করুণা। সামনে অনিশ্চিত সময় আর উত্তাল সাগরের মাঝে   ছোট্ট ট্রলারে গাদাগাদি করে থাকা মানুষের সামনে ইউরোপে স্বপ্নের যাত্রার সঙ্গে ছিল মৃত্যুর হাতছানি। এভাবেই পার হয়েছে দু’দিন।
খাবার-দাবার, পানিও নিঃশেষ হয়ে যায় একেবারে। আরও একদিন কেটে যায় না খেয়ে। সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাপিয়ে কয়েক ফোঁটা পানির জন্য হাহাকার দেখা দেয় ট্রলারযাত্রীদের মধ্যে। শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে কারও কারও। এই অবস্থায় নিজের প্রশ্রাবে গলা ভেজানোর আশায় শেষমেষ সেটাই পান করে কেউ কেউ। ২২ দিন সাগরে ভেসে ফিরে আসা মাদারীপুর সদর উপজেলার আপাসী গ্রামের মোখলেস মাতব্বরের ছেলে রাসেল মাতব্বর এভাবেই বর্ণনা করেন সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতা। তার সঙ্গে আরও ৬৪ বাংলাদেশি একবুক স্বপ্ন নিয়ে ইতালি যাওয়ার জন্য সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে নির্মম এই বাস্তবতার শিকার হন। সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তার গলা ধরে আসে। বলেন, এ অভিজ্ঞতা ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের চেয়ে ভয়াবহ। মনে হলে গা শিহরে ওঠে। এরই মধ্যে বেঁচে থাকার ক্ষীণ আলো দেখতে পায় হতভাগ্য এই ট্রলারযাত্রীরা। অদূরে দেখা মেলে মিশরীয় একটি জাহাজের। কিন্তু কাছে না ভিড়ে, উদ্ধার না করে নির্দিষ্ট দুরত্ব বজায় রাখে জাহাজটি। অবশেষে ড্রামের সঙ্গে নিজের শরীর বেঁধে কেউ কেউ ঝাঁপ দেয় সাগরে। উদ্দেশ্য, মিশরীয় জাহাজটির দৃষ্টি আকর্ষণ। অবশেষে সফল হয় তারা। এরপর আরও ১৮ দিন অনাহারে-অর্ধাহারে কাটে সেই জাহাজে। এই প্রতিবেদকের কাছে রাসেল মাতব্বর বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া এবং লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে সাগরে আটকে পড়ার সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন দীর্ঘসময়।
রাসেল জানান, ২০১৮ সালের ২২শে ডিসেম্বর তিনি লিবিয়া যান। যুদ্ধবিধস্ত দেশটিতে বাংলাদেশ তার কর্মী পাঠানো নিষিদ্ধ করায় দালালরা তাকে বিকল্প পথে পাঠায়। এজন্য ৫ লাখ টাকা নেয় দালালরা। সেই অভিজ্ঞতাও খুব সুখকর ছিলো না। মূলত: প্রতারণা করে দেশটিতে পাঠানো হয় তাকে। সেখানে ৬ মাস অবস্থান করার পর লিবীয় এবং বাংলাদেশি দালালরা তাকে আড়াই লাখ টাকায় ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেয়। তার সঙ্গে ছিলো আরও অনেক বাংলাদেশি। একটি বড় জাহাজে করে ইতালি উপকূলে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো দালালরা।
রাসেল শুরু করেন এভাবে- দালালদের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ২২শে রমজান তারা ইতালির উদ্দেশ্যে জাহাজে ওঠার জন্য লিবিয়ার জোয়ারা থেকে রওনা দেন। তাদের মরুভূমির ভেতর দিয়ে ৫ কিলোমিটার হাঁটিয়ে একটি দ্বীপ এলাকায় নিয়ে যায় লিবীয় দালালরা। তাদের সঙ্গে ছিলো আরও ৫০ জন বাংলাদেশি।
এর মধ্যে রাসেলসহ ২১ জনকে একটি কক্ষে রাখে। ইফতারের সময় আবারও ডাক পড়ে তাদের। রাসেল বলেন, আমরা ইফতার ঠিকমতো করতেও পারিনি। এরইমধ্যে দালালরা এসে বলে এখনই রওনা দিতে হবে। ওই অবস্থায় আবারও ৫ কিলোমিটার হাঁটিয়ে আরেকটি দ্বীপে নিয়ে যায়। পরদিন সকালে সাগরপাড়ে নিয়ে ট্রলারে উঠতে বলে। কিন্তু আমরা ট্রলারে যাবো না বলে জানিয়ে দিই। বলি, ট্রলারে নয়, জাহাজে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা আড়াই লাখ করে টাকা দিয়েছি।
রাসেল বলেন, এ কথা বলার পরই তারা পিস্তল বের করে আমাদের মাথায় ঠেকায়। বলে, ‘যদি ট্রলারে না উঠিস তো গুলি করে মেরে সাগরে ভাসিয়ে দেবো।’ পরে ভয় দেখিয়ে জোর-জবরদস্তি করে ৩৫ জন করে দুটি ট্রলারে মোট ৭০ জনকে তোলে। এদের মধ্যে বাংলাদেশি ছিলো ৬৪ জন। পরে ওই অবস্থায় দুই ট্রলারে দু’জন করে মাঝিসহ আলাদাভাবে রওনা দেয়। সাগরে ভাসার ৬ ঘন্টা পর দুই ট্রলার আবারও একসঙ্গে হয়। তিনি বলেন, অন্য ট্রলার থেকে বাকি ৩৫ জনকেও আমাদের ট্রলারে তুলে দেয়া হয়। তাদেরকে ট্রলারের নিচের ডেকে রাখে। পরে চারজন মাঝি খালি ট্রলার নিয়ে ফিরে যায়। আমাদের ট্রলারে কোন মাঝি না থাকায় একজন মিশরীয় ব্যক্তি হাল ধরেন। এই ট্রলারের ওপরে ৩৫ জন আর নিচের ডেকে ৩৫ জন। সারাদিন আবহাওয়া অনুকূলে ছিলো। সাগরও শান্ত ছিলো। কিন্তু রাতে আবহাওয়া ভয়াবহ আকার ধারন করে। সাগর উত্তাল হয়ে ওঠে। ১০ থেকে ১২ ফুট উঁচু হয়ে ঢেউ ট্রলারের সঙ্গে আছড়ে পড়ে। এ সময় নিচের যাত্রীরা ওপরে ওঠে আসে। চিৎকার-চেচামেচি আর কান্নার রোল পড়ে যায়। রাসেল বলেন, তখন কারো কথা মনে হয়নি। শুধু আল্লাহর নাম নিয়েছি। বলেছি, এবার যদি বেঁচে যাই আর কখনো এমন ভুল করবো না। এভাবে রাত পার হয়েছে। পরদিন সকালেও একইরকম দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া। এভাবে মৃত্যু আশঙ্কায় উত্তাল সাগরে দ্বিতীয় দিনও পার হয়। ট্রলারের তেলও শেষ হয়ে যায়। তৃতীয়দিন সকালে সাগর কিছুটা শান্ত হয়। ওইসময় একটি মিশরীয় জাহাজ আসে। তাদের কাছে কাকুতি-মিনতি জানাই উদ্ধারের জন্য। কিন্তু তারা উদ্ধার না করেই এবং তেল না দিয়ে চলে যায়।
তবে তারা আধাকিলোমিটার দূরে অবস্থান করে আমাদের ওপর দৃষ্টি রাখে। এর আগেই খাবার-দাবার ও খাবার পানি শেষ হয়ে গিয়েছিলো। ‘পানি পানি’ বলে চিৎকার করতে থাকি। কোন উপায় না পেয়ে নিজের প্রস্রাব নিজেই খেয়ে কোন রকম জান বাঁচাই। এরপর রাত আসে। কান্নাকাটি আর আহাজারি বাড়তেই থাকে। দূরে মিশরীয় জাহাজের বাতি দেখা যায়। এভাবে সেই রাতও পার হয়। পরদিন সকালে ১০-১২ জন নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকে। মনে হয়েছিলো- তারা মারা গেছে। পরে ধাক্কা দিয়ে দেখা যায়, বেঁচে আছে। এই অবস্থায় বাঁচার কোন আশাই আর ছিলো না। তখনও মিশরীয় জাহাজ সেখানে অবস্থান করছিলো। আমাদের ধারনা হয়েছিলো- ট্রলার ডুবে গেলে তারা আমাদের উদ্ধার করতে আসবে।
রাসেল বলেন, ৪র্থ দিন রশি দিয়ে ড্রামের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে সাগরে ঝাঁপ দিই। আমার সঙ্গে আরও ১০ থেকে ১২ জন এভাবে ঝাঁপ দেয়। উদ্দেশ্য মিশরীয় জাহাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। এরই মধ্যে ড্রাম নিয়ে সাঁতরে তিনজন জাহাজে পৌঁছায়। তারা ওই তিনজনকে উদ্ধার করে। পরে তাদের কাছে দুর্ভোগের কথা শুনে ট্রলারযাত্রীদের উদ্ধার করে জাহাজে তোলে। ওই জাহাজে তাদের কাটে আরও ১৮দিন।  সেখানেও অনাহারে-অর্ধাহারে কেটেছে তাদের। তিনি জানান, মিশরীয় জাহাজের নাবিকরা তাদের ইতালিতে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু পরে তারা জানায়, ইতালি তাদের গ্রহণ করবে না। এই অবস্থায় তারা তিউনিশিয়া সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারাও ট্রলারযাত্রীদের নিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে বাংলাদেশ সরকারের লোকজন যায়। রাসেল জানান, বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা আমাদের বুঝিয়ে দেশে ফেরার পাঠানোর ব্যবস্থা করে। পরে কিছুদিন আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এর ক্যাম্পে রাখে। সেখান থেকেই শুক্রবার ১৭ জনকে দেশে পাঠানো হয়। তিনি বলেন, কমকর্তারা জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে বাকিদেরকেও দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
রাসেল সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বলেন, আল্লাহ আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন। আর কেউ যেনো দালালের প্রলোভনে পড়ে এমন পরিস্থিতির শিকার না হয়। 
সূত্র জানিয়েছে, রাসেলের সঙ্গে দেশে ফেরা আরও ১৬ জন হলেন, মাদারীপুরের মোহাম্মদ লাদেম মাতব্বর, রাজিব মাতবর, জুয়েল সিজাল, আজাদ রহমান, পিয়ার আলী (২৯), আকমন মাতব্বর (২০), মীর আজিজুল ইসলাম (৩৭), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আবু বকর সিদ্দিক, শাহেজুল খাদু (২৫), ইদ্রিস জমাদ্দার (২৪), নিয়ামত শিকদার (১৮), নোয়াখালীর রফিকুল ইসলাম, চাঁদপুরের শফিকুল ইসলাম, শরিয়তপুরের রাকিব হোসেন, মৌলভীবাজারের জিল্লুর রহমান, সুনামগঞ্জের শিপন আহমেদ।

Friday, June 21, 2019

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তিন কুতুব by রোকনুজ্জামান পিয়াস

তিন কুতুবের কাছে জিম্মি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। খামারবাড়ির এই অধিদপ্তরের সার্বিক কার্যক্রম তারাই দেখভাল করেন। অনেক সময় নিজের কাজের গন্ডি ছাড়িয়ে অন্য দপ্তরে হস্তক্ষেপ করেন তারা। নিয়োগ, বদলি, পদায়ন, টেন্ডার সবকিছুতেই রয়েছে তাদের হাত। নিয়োগ-বদলি-পদায়নে একচ্ছত্র প্রভাব থাকায় বেশিরভাগ নিয়োগই হয় তাদের নিজের এলাকা থেকে। অভিযোগ রয়েছে, এসব  অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। অধিদপ্তরের এই তিন কুতুব হলেন, প্রশাসন ও অর্থ শাখার উপ-পরিচালক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, প্রশাসন শাখার উপ পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান এবং প্রশাসন শাখার অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মো. বনি আমিন।
এই তিনজন প্রত্যেকেই ৪ থেকে ৫ বছর ধরে প্রশাসন শাখায় নিয়োজিত।
অধিদপ্তরের ৩০-৩২ জন কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্টতা বজায় রেখে গড়ে তুলেছেন বিশাল সিন্ডিকেট। তাই তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস নেই কারো। গত তিনবছরে বেশির ভাগ নিয়োগ, পদায়ন হয়েছে তাদের ইচ্ছামাফিক, তাদের নিজের এলাকার লোকজন, আত্মীয়-স্বজনদের। নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ-পদোন্নতি বাণিজ্য চলছেই। এছাড়া নন রেসপনসিভ কোম্পানিকে টেন্ডার পাইয়ে দিতেও তাদের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রাপ্ত নথিতে দেখা গেছে, ২০১৬ সালের ১লা নভেম্বর ১২১ কর্মচারীকে নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মচারী ময়মনসিংহ অঞ্চলের। উপ-পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেনের বাড়ি জামালপুরে হওয়ায় তিনি ওই অঞ্চলের লোকজনকে অধিক গুরুত্ব  দিয়েছেন। নিজের ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজনও রয়েছেন নিয়োগ পাওয়াদের তালিকায়। বাকিরা নিয়োগ পেয়েছেন প্রশাসন শাখার আরেক উপ-পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান ও অতিরিক্ত উপ-পরিচালক বনি আমিনের মাধ্যমে। তাদের বাড়ি টাঙ্গাইলে।
জানা যায়, নিয়োগসহ প্রত্যেকটি কার্যক্রম কৃষি অধিদপ্তরের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু এ নিয়োগের ক্ষেত্রে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি। বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, এই ১২১ জন কর্মচারীর ৬০ শতাংশ মোয়াজ্জেম হোসেন এবং ৪০ শতাংশ মাহবুব ও বনি আমিনের কোটায় নিয়োগ পেয়েছেন। পরীক্ষায় ভালো করেও নিয়োগ পাননি অনেকে। অথচ পেছনের সারি থেকে এসে অনেকে চাকরি করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ বলেই এটি তারা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেনি। ওই সময় নিয়োগের বিষয়টি খামারবাড়িতে ব্যাপক আলোচিত হলে মহাপরিচালকের পক্ষে তৎকালীন অর্থ ও প্রশাসন শাখার পরিচালক আবদুল আজিজ এ ব্যাপারে ২০১৭ সালের ২২শে জুন একটি গণবিজ্ঞপ্তি দেন। ওই বিজ্ঞপ্তিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক চলমান বিভিন্ন পদের নিয়োগ কার্যক্রমসহ মাঠ পর্যায়ে অত্র অধিদপ্তর তথা বর্তমান সরকারের চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে একশ্রেণীর প্রতারকচক্র সক্রিয় রয়েছে। এমতাবস্থায় এ ধরনের প্রতারকচক্র কর্তৃক আর্থিক প্রস্তাব প্রদান অথবা মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমকে ব্যহত করে এমন কোন অপতৎপরতা চালালে তা দ্রুত তাকে অথবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অবহিত করতে সকলকে অনুরোধ জানানো হলো।’ অনেকে মনে করেন, এই অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে এমন একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেন আবদুল আজিজ।
শুধু নিয়োগ নয়, পদোন্নতিতেও কৃষি অধিদপ্তরে যথাযথ আইন মানা হয়নি। চলছে স্বেচ্ছাচারিতা।  অতি স্বল্প সময়ে তিনটি পদোন্নতি পেয়েছেন এমন উদাহরণও রয়েছে অনেক।
এছাড়া ব্লক পোস্ট অর্থ্যাৎ যেসব পদ থেকে পদোন্নতির নিয়ম নেই সেসব পদেও একাধিক পদোন্নতি হয়েছে। বিধি অনুযায়ী ঝাড়ুদার ও নৈশ প্রহরী পদ থেকে কোন পদোন্নতি হয় না। কিন্তু ১৯৮৯ সালের ১লা নভেম্বর ২০তম গ্রেডে ঝাড়ুদার পদে নিয়োগ পাওয়া অর্থকরী ফসল উইংয়ের মো. রফিকুল ইসলাম কয়েকটি পদে পদোন্নতি পেয়ে ১৪ তম গ্রেডে উচ্চমান সহকারী পদে উন্নীত হয়েছেন। এমএলএসএস আমির হোসেন। তার নিয়োগ ক্রপস উইংয়ে। কিন্তু তিনি কাজ করেন উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ে। যদিও এ উইংয়ে কাজ করার জন্য ৩ জন এডিডি (কিউসি), ৩ জন রসায়নবিদ, উচ্চমান সহকারি, প্রধান সহকারি রয়েছেন। তাদের মাসিক বেতন প্রায় ৭ লাখ টাকা। কিন্তু তারা কেউ কীটনাশক সংক্রান্ত রাসায়নিক পরীক্ষা করেন না। ক্রপস উইং থেকে এসে এ সকল কাজ করেন পিয়ন আমির হোসেন। এছাড়া রেজিস্ট্রেশন, লাইসেন্স নবায়নও তিনিই করেন। উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের উপ-পরিচালক মো. ফখরুল হাছানের ছত্রছায়ায় তিনি এসব কাজ করেন। এখানে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। আমির হোসেন তার স্ত্রীর নামে সারাদেশে বিসিআইসি’র সার ডিলারের অনুমোদন নিয়ে দিয়েছেন। উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ে মো. আমিনুর রহমান, মো. রিপন মিয়া, প্রশাসন ও পার্সোনাল ইউংয়ের মো. মোফাজ্জেল হোসেন, সরজমিন উইংয়ের মো. সাইফুল ইসলাম অফিস সহকারি বনাম মুদ্রাক্ষরিক (১৫ তম গ্রেড) হিসেবে ২০০৪ সালে নিয়োগ পান। তারা পদোন্নতি পেয়ে প্রধান সহকারি (১৩ তম গ্রেড) হয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির নানা অভিযোগ রয়েছে। অথচ অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও ২০০০ সালের আগে যোগদান করা অনেকেই তাদের মতো তিনটি পদোন্নতি পাননি।
প্রশাসন ও পর্সোনাল উইংয়ের ফারুক মিয়া পিয়ন (২০ তম গ্রেড) থেকে পদোন্নতি পেয়ে প্রধান সহকারি (১৩তম গ্রেড) এবং উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের মো. নাসির উদ্দিন পিয়ন পদ থেকে পদোন্নতি পেয়ে উচ্চমান সহকারি (১৪তম গ্রেড) হয়েছেন। প্রশাসনিক শাখায় এদের ব্যাপারে কোন তথ্য নেই, তবে সার্ভিস বুকে আছে। তাদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি এক টেন্ডার নিয়ে বড় ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে কৃষি অধিদপ্তরে। ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে দেশের বিভিন্নস্থানে সৌরশক্তি এবং আধুনিক জল সংরক্ষণ প্রযুক্তির সমপ্রসারণে প্রায় ২৫ কোটি টাকার একটি ই-জিপি টেন্ডার আহ্বান করা হয়। এতে ৫টি প্রতিষ্ঠান টেন্ডার দাখিল করে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, মেসার্স হক ইন্টারন্যাশনাল, মো. শামীম আহমেদ, মোহাম্মদ বিল্ডার্স, এমএস জিয়াউল ট্রেডার্স এবং মুশফিরা ট্রেডার্স। সব শর্ত পূরণ না করতে পারায় টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির বিবেচনায় একমাত্র এমএস জিয়াউল ট্রেডার্স ছাড়া বাকি চারটি অবৈধ (টেকনিক্যালি নন-রেসপনসিভ) ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু মূল্যায়ন কমিটির মতামতকে বিবেচনায় না নিয়ে মেসার্স হক ইন্টারন্যাশনালকে কাজটি দিতে সুপারিশ করা হয়েছে। যদিও তারা মূল্যায়ন কমিটির বিবেচনায় টেকনিক্যালি নন-রেসপনসিভ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া এ কাজে তাদের পূর্ব অভিজ্ঞাতাও নেই। সূত্র জানিয়েছে, এ প্রতিষ্ঠানটির মালিকের বাড়ি টাঙ্গাইলে। এই টেন্ডার পাইয়ে দিতে, প্রশাসন ও অর্থ শাখার উপ-পরিচালক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, প্রশাসন শাখার উপ পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান এবং প্রশাসন শাখার অতিরিক্ত উপ-পরিচালক মো. বনি আমিনের হাত রয়েছে।
এ ব্যাপারে খামারবাড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখার পরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহ আলম বলেন, আমি নতুন এসেছি। তাই এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারছি না।
এসব অভিযোগের ব্যাপারে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ মীর নূরুল আলম বলেন, ওই নিয়োগের সময় আমি ছিলাম না। গত জানুয়ারিতে এখানে এসেছি। তবে যতটুকু জানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ-এর মাধ্যমে পরীক্ষা হয়েছে। খাতাও উনারা দেখছেন। কে খাতা দেখছেন তা কেউ জানে না। আর এই কমিটিতে যখন ভাইভা হয়, তখন মন্ত্রণালয়ের লোকজন ছিলেন, বাইরের লোকজন ছিলেন, আমাদের ডিপার্টমেন্টের লোকজন ছিলেন। আমার জানামতে, অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। পদোন্নতি নিয়ে যেসব অভিযোগ সেসব ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিবেন বলেও জানান মহাপরিচালক। এছাড়া, টেন্ডারের ব্যাপারে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে অনেক আলোচনা হয়েছে। ওই প্রজেক্টের সংশ্লিষ্ট পিডিকে সরিয়ে নতুন পিডি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এটা আবার রিটেন্ডার হবে বলেও জানান মীর নূরুল আলম।

Saturday, October 6, 2018

সৌদি থেকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে বাংলাদেশিদের: ১০ দিনে শূন্যহাতে ফিরেছেন ৫০০ by রোকনুজ্জামান পিয়াস

খালি পা। পরনে ময়লা কাপড়। মলিন মুখ। মাথা নিচু করে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে আসেন শাহ আলম। ২২ বছর বয়সী এই যুবকের বাড়ি চাঁদপুর সদর উপজেলায়। ১ বছর ৫ মাস আগে তিনি সৌদি আরব গিয়েছিলেন। দেশটিতে যেতে খরচ হয়েছিল সাড়ে ৬ লাখ টাকা। কিন্তু যাওয়ার পর থেকেই ভোগান্তি পিছু ছাড়েনি।
কখনো বেকার, কখনো দিনভিত্তিক চুক্তিতে কাজ করে কোনোরকম থাকা-খাওয়া চলেছে তার। এরই মধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই গত ১৯শে সেপ্টেম্বর সৌদি পুলিশ তাকে আটক করে। কাগজপত্র কেড়ে নিয়ে সোজা পাঠিয়ে দেয় সফর জেলে। সেখান থেকেই গতকাল পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে দেশে। তার সঙ্গে ফেরত এসেছে আরো ১৪৯ জন বাংলাদেশি। সৌদি এয়ারলাইন্সের এসভি-৮০৬ নম্বর ফ্লাইটে দুপুর ২টা ১০ মিনিটে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। এদের কেউ কেউ বিমানবন্দরে নেমেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ফেরত আসা এই কর্মীদের অভিযোগ, তাদের কাছে সব ধরনের বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও কোনো কারণ ছাড়াই ধরে ধরে পাঠিয়ে দিচ্ছে দেশে। ফেরত আসা কর্মীদের মধ্যে যেমন রয়েছেন দীর্ঘদিন দেশটিতে অবস্থান করা, তেমনি রয়েছেন অতি সম্প্রতি যাওয়া বাংলাদেশিরাও। জানা গেছে, গত ১০ দিনে প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি দেশে ফিরে এসেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে গত ২৬শে সেপ্টেম্বর ৮০ জন, ৩রা আগস্ট ১৪৪ জন, বৃহস্পতিবার ফিরেছেন ১৭০ জন। এছাড়া এর মধ্যেই বিভিন্ন ফ্লাইটে শ’খানেক কর্মী দেশে ফিরেছেন। আগামীকাল আরো ১০০ জনের ফেরত আসার কথা রয়েছে। ফেরত আসা কর্মীরা বলছেন, সামনে তাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ধারদেনা করে বিদেশ যাওয়ায় অনেকে বাড়ি ফেরা নিয়েও দোটানায় রয়েছেন। তবে কি কারণে তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে এ ব্যাপারে সরকারের দায়িত্বশীল কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গতকাল শাহজালাল বিমানবন্দরে কথা হয় সৌদি ফেরত এসব কর্মীর সঙ্গে। শাহ আলম জানান, তিনি গত বছরের ১৩ই এপ্রিল আপন ফুফাতো ভাইয়ের মাধ্যমে সৌদি আরব যান। তাকে ইলেক্ট্রিকের কাজ দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। বলেছিল, থাকা-খাওয়া খরচ বাদে তার আয়-রোজগার হবে মাসে ৮০-৯০ হাজার টাকা। এই চিন্তা করে তিনি সাড়ে ৬ লাখ টাকা ধারদেনা করে সে দেশে পাড়ি জমান। কিন্তু দেশটিতে যাওয়ার পর প্রথম ৪ মাস কাটে বেকার জীবন। ওই সময় তিনি কোনরকম একবেলা-আধাবেলা খেয়ে দিন পার করেছেন। এরপর তাকে মরুভূমির একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ দেয়া হয়। সেখানে কাজ করেন ৪-৫ মাস। ওই সময় তিনি বাড়িতে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকাও পাঠিয়ে ছিলেন। এরপর আবারো বেকার হয়ে পড়েন। কোম্পানি তাকে দিয়ে কাজ করালেও আর বেতন দেয়নি। এক সময় পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়েন। এর মধ্যে পেট চালানো এবং থাকার জন্য মাঝে মাঝে দু’একদিন এদিক-সেদিক কাজ করেন।
কিন্তু তাও নিয়মিত না। এই অবস্থায় গত ১৯শে সেপ্টেম্বর কাজে যাওয়ার সময় সকালে পুলিশ তাকে কোনো কারণ ছাড়াই আটক করে। শাহ আলমের দাবি, তার ভিসার মেয়াদ, বৈধ আকামাসহ সবই ছিল। কিন্তু সেগুলো দেখালেও কোনো কাজ হয়নি বরং কাগজপত্র নিয়ে সফর জেলে পাঠিয়ে দেয়। এরপর সেখানে কাটে ১৬ দিন। ওই জেলেও ছিল কষ্টের জীবন। তিনি বলেন, এই ১৬ দিন এক কাপড়েই ছিলাম। ওই কাপড়েই ফেরত এসেছি। তিনি আরো বলেন, গাদাগাদি করে থাকতে হতো। ফলে পরদিনই অসুস্থ হয়ে পড়ি। তার মতো বেশিরভাগ লোকজনই অসুস্থ হয়ে পড়ে সফর জেলে। কিন্তু কোনো ধরনের চিকিৎসা বা ওষুধপত্র দেয়া হয়নি। শাহ আলম জানান, এখন বাড়ি ফিরবো না। কারণ, পাওনাদাররা তাকে নাজেহাল করবে। তাই আপাতত তিনি ঢাকায় এক বন্ধুর কাছে উঠবেন।
একই ফ্লাইটে আসা বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উত্তরদাত গ্রামের শামীম হোসেন বলেন, তিনি মনজিল ভিসায় সৌদি আরব গিয়েছিলেন ৬ মাস আগে। খরচ হয়েছিল সাড়ে ৫ লাখ টাকা। কিন্তু যাওয়ার পর কপিল (মালিক) আকামা করে দেয়নি। পরে আকামার জন্য ওই কপিলকে আরো ২৪০০ রিয়াল (৫৩ হাজার টাকা) দেন তিনি। আকামাও পান। কিন্তু বৈধ সব কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তাকে গত ২২ তারিখে ধরে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, আমি মদিনা এলাকার একটি দোকানে সাবান কিনতে গেলে পুলিশ ধরে। প্রথমে থানায় এরপর সফর জেলে পাঠায়। সেখান থেকে দেশে। তিনি বলেন, সফর জেলের ১৪ দিন তার জীবনের সবচেয়ে পীড়াদায় ছিল। বলেন, ১৫ জনের থাকার জায়গায় তারা ৯০-১০০ জন রাখে। একবেলা ডাল-ভাত, দুই বেলা ১টা করে রুটি দেয়া হয়। তিনি বলেন, এই ৬ মাসে তিনি ২৪০০ রিয়াল আয় করেছেন যার মধ্যে থাকা-খাওয়াতে প্রতি মাসে ৫০০-৬০০ রিয়াল খরচ হয়েছে। তিনি কাজি এয়ার ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরব যান বলে জানান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর থানার আখানগর গ্রামের বাদল মিয়ারও একই অভিযোগ। তিনি ৬ লাখ টাকা খরচ করে ক্লিনার ভিসা নিয়ে সৌদি গেছেন ৩ মাস আগে। সব ধরনের বৈধ কাগজপত্র তার কাছে রয়েছে। কিন্তু পুলিশ সেগুলো কেড়ে নিয়ে তাকে সফর জেলে পাঠায়। একই জেলার নাসির উদ্দিন বলেন, কপিলের সঙ্গে তার মতবিরোধ হওয়ায় তাকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়। এরপর ২০-২৫ দিন জেলে কেটেছে তার। বলেন, তার কাছেও বৈধ কাগজপত্র ছিল। নাসির অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ দূতাবাসের লোকজন সফর জেলে গেলেও তাদের সঙ্গে কোনো কথা বলেনি। বরং তিরস্কার করতেন। তিনি আরো বলেন, তাদের মোবাইল রাখার জন্য ২০ রিয়াল এবং ব্যাগ রাখার জন্য ২৫ রিয়াল পুলিশকে দিতে হয়। অন্যথায় সেগুলো তারা নিজেরাই রেখে দেয়।
চল্লিশোর্ধ নাটোরের জুবায়ের বিমানবন্দরের ২নং টার্মিনালে থেকে বের হয়েই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, দেড় বছর আগে তিনি সৌদি গেছেন। তার আকামার মেয়াদ আছে এখনো ৭ মাস। এই অবস্থায় কোনো কারণ ছাড়াই তাকে আটক করে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তার দেশে ফেরত আসার কথা এখনো বাড়ির কেউ জানে না। এই অবস্থায় তিনি বাড়ি ফিরতে চান না। তবে কোথায় যাবেন তাও জানেন না।
এদিকে বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, নারীকর্মীদের সঙ্গে গণহারে পুরুষকর্মী ফেরত আসা শুরু হয়েছে। শাহজালালের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহকারী পরিচালক তানভীর আহমেদ জানান, সৌদি থেকে ফেরত আসাদের মধ্যে ৬ বছর আগে যাওয়া লোকজন যেমন আছেন, তেমনি সম্প্রতি যাওয়া কর্মীরাও আছেন। তিনি বলেন, ফেরত আসা এসব কর্মী অভিযোগ করছেন, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তাদের আটক করে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তবে আসল কারণ দূতাবাস বলতে পারবে। কি কারণে তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে- এ ব্যাপারে সরকারে দায়িত্বশীল পর্যায়ের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Friday, September 21, 2018

সৌদি থেকে ফিরে আসা নারীদের মুখে লোমহর্ষক বর্ণনা by রোকনুজ্জামান পিয়াস

হাতে হলুদ রঙের একটি ছোট পলিথিন ব্যাগ।এরমধ্যে একসেট পুরোনো জামাকাপড়। ধীর পায়ে বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে আসলেন। চেহারায় অসুস্থতার ছাপ। যেন নড়াচড়ার শক্তি হারিয়েছেন।কোথা থেকে আসছেন- জিজ্ঞেস করতেই, অনেকটা ভাবলেশহীনভাবে চেয়ে থাকলেন। এরপর অনেকটা বিরক্তি নিয়েই বললেন, সৌদি থেকে। কণ্ঠে ক্ষোভ আর চোখে-মুখে হতাশা। চোখ ছলছল করছে। আর কিছু জিজ্ঞেস করতেই হাঁটা দিলেন সামনের দিকে। তবে যাওয়ার সময় বললেন, পারলে সৌদিতে আর মেয়ে মানুষ পাঠাইয়েন না।
ওরা বহুত খারাপ। আমাদেরকে মানুষই মনে করে না। যা ইচ্ছা, তাই ব্যবহার করে। চল্লিশ পেরোনো এই নারীর বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলায়। মাস ছয়েক আগে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি আরব গেছেন। বেতন পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো কপালে জুটেছে অমানসিক নির্যাতন। মঙ্গলবার রাত ১১টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একে-৫৮৪ নম্বর ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান এই নারী। এর আগে সৌদির গৃহকর্তার নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন দেশটিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের রিয়াদস্থ সেইফ হোমে।
সৌদি আরব যাওয়ার সময় যে কাপড়ে গিয়েছিলেন, সেই কাপড়েই ফিরেছেন তিনি। তার সঙ্গে একই ফ্লাইটে দেশে ফিরেছেন আরো ৪২ নারীকর্মী। যারা প্রত্যেকেই একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। এদের একজন লুৎফা খাতুন। তিনি বলেন, তাকে ১২ দিন ধরে একটি কক্ষে আটকে রেখেছিল গৃহকর্তার ছেলে। পরে মৃত্যুমুখে পতিত হলে তাকে রাস্তায় ফেলে আসা হয়। সেখান থেকে উদ্ধার করে সেইফ হোমে রেখে আসে পুলিশ। তিনি প্রায় একবছর কাজ করলেও গৃহকর্তা কোনো বেতন দেননি। ফেরত আসা নারীদের অভিযোগ, তারা নিয়মিত বেতন পাননি, ঠিকমতো খেতে দেয়া হয়নি। এ ছাড়া সবারই অভিযোগ, মালিকের হাতে মারধরসহ নানাধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার এই নারীদের দেশে ফেরার সময় বিমানবন্দরে তাদের সার্বিক সহযোগিতা দেয় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন, বোর্ডের সহকারী পারিচালক জাহিদ আনোয়ার, তানভীর আহমেদ, উপসহকারী পরিচালক আবদুল কাদেরসহ অন্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। এ ছাড়া ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের পক্ষ থেকে ফেরত আসা এ  নারীদের প্রত্যেককে খাবার সরবরাহ করা হয়। দূরের নারীকর্মীদের আশকোনাস্থ ব্র্যাকের লার্নি সেন্টারে থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
বিএমইটির তথ্যমতে, গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে এ পর্যন্ত আড়াই লাখেরও বেশি বাংলাদেশি নারী সৌদি আরবে গেছেন। ১৯৯১ সাল থেকে দেশটিতে নারী কর্মীরা যাওয়া শুরু করে। তবে ব্যাপকভাবে শুরু হয় ২০১৫ সালের পর থেকে। ওই বছর ২০ হাজার ৫২ জন নারীকর্মী দেশটিতে যায়। এরপর থেকে প্রতিবছরই এ সংখ্যা বাড়তে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে ৬৮ হাজার ২৮৬ জন, ২০১৭ সালে ৮৩ হাজার ৩৫৪ জন নারীকর্মী সৌদি আরব যান। আর চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে দেশটিতে নারীকর্মী গেছেন ৪৯ হাজার ৬৪০ জন।
এদিকে নারীকর্মী যাওয়ার পর থেকেই অতিরিক্ত কাজ করানো, মারধর, শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আসতে থাকে। এসব কারণে দেশটিতে ফিলিপাইন, নেপাল এবং ইন্দোনেশিয়া তাদের নারীকর্মী পাঠানো বন্ধও করে দেয়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশি নারীকর্মীদের চাহিদা বাড়ে দেশটিতে। কিন্তু নারীদের ওপর নির্যাতন হবে না- এমন শর্তে বাংলাদেশ কর্মী পাঠালেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। বরং ফেরত আসা নারীদের ভাষ্যমতে, নির্যাতন থেমে নেই। সংশ্লিষ্ট গৃহকর্তার বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এই নির্যাতনের কারণ কেউ জানতে পারে না।
এমনকি বাংলাদেশ দূতাবাসেরও তেমন কিছু করার নেই এক্ষেত্রে। জানা গেছে, বিভিন্ন সময় গৃহকর্তার নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা নারীরা দেশটির বাংলাদেশ দূতাবাসের রিয়াদ ও জেদ্দার দুটি সেইফ হোমে আশ্রয় নেন। ফিরে আসা নারীরা জানান, প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০-৬০ জন নারী সেখানে আশ্রয় নেন। বর্তমানে শুধু রিয়াদের সেইফ হোমেই রয়েছে দুই শতাধিক নারী গৃহকর্মী।  
মঙ্গলবার রাতে কথা হয় ফেরত আসা নারী নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার বাসিন্দা লুৎফা খাতুনের সঙ্গে। তিনি জানান, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তার গ্রামের দালাল জয়নালের মাধ্যমে সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে যান। কিন্তু যে বাসায় তাকে কাজ দেয়া হয় সেই বাসার মালিক, মালিকের স্ত্রী এবং ছেলে প্রায় প্রতিদিনই নানা কারণে মারধর করতো। খেতে দিত না। এতে করে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময়ে তাকে চিকিৎসাও করায় নি। বাড়ির সব কাজ তাকেই করতে হতো। অনেক সময় মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হতো। কিন্তু গত একবছরে এক মাসের বেতনও তাকে দেয়া হয়নি। বেতন চাইলে মাঝে মাঝে গৃহকর্তার স্ত্রী কাগজে তার সই নিতো। কিন্তু টাকা দিতো না।
তিনি বলেন, গৃহকর্তার ছেলে ছিল খুবই খারাপ। তাকে নানা কারণে প্রায়ই মারধর করতো। তাদের এই নির্যাতন থেকে বাঁচতে পালিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করেছেন কিন্তু পারেননি। লুৎফা খাতুন জানান, ২ মাস আগে একদিন তাদের কাপড়চোপড় ইস্ত্রি করছিলাম। এ সময় গৃহকর্তার ছেলে মিথ্যা ও তুচ্ছ কারণে তাকে মারধর করে। তিনি বলেন, ওইদিন মাগরিবের সময় থেকে এশা পর্যন্ত তাকে একটানা মারধর করে। রড দিয়ে বেধড়ক পেটায়, উপর্যুপরি লাথি মারতে থাকে।
ওইদিনের বীভৎসতার কথা বলতে গিয়ে লুৎফা খাতুন কেঁদে ফেলেন। তার সারা শরীরে আঘাতের ক্ষত রয়েছে বলে জানান। এ সময় তিনি হাতের আঘাতের চিহ্ন দেখান। লুৎফা বলেন, ‘ওইদিন পালিয়ে যাওয়ার সময় গৃহকর্তার ছেলের খালাতো ভাই আমাকে দেখে ফেলে। পালাতে বাধা দেয়। পরে নির্যাতনের কথা জানিয়ে পা জড়িয়ে ধরি। তিনি আমাকে একটি বাসায় নিয়ে গিয়ে গৃহকর্তার ছেলেকে খবর দেন। সেখানেও তাকে মারধর করে। এ সময় গৃহকর্তার ছেলেকে তিরস্কার করে ওই আশ্রয়দাতা। তিনি বলেন, সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় গৃহকর্তার মায়ের বাড়িতে।
সেখানে দোতলার একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। সেই ঘরে একদিন কেটে যাওয়ার পরও তাকে কোনো খাবার দেয়া হয়নি। পরদিন ওই বাসায় এক কাজের মহিলা বিষয়টি টের পেয়ে গোপনে খাবার দেয়। এরপর ওই রুমে আরো ১২ দিন রাখা হয় তাকে। কিন্তু এর মধ্যে একদিনও তাকে খাবার দেয়া হয়নি। অবশেষে ১২ দিন খাবার না খাওয়ায় তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। তার নড়াচড়ার শক্তি ছিল না। পরে নিশ্চিত মৃত্যু হবে মনে করে তাকে রাস্তায় ফেলে আসে। সেখান থেকে দুই ব্যক্তি উদ্ধার করে পুলিশের কাছে নিয়ে যায়। থানায় তাকে খাবার দেয়া হয়। পুলিশ সব কথা শুনে তাকে সফর জেলে পাঠায়। সেখানে একমাস অবস্থানের পর মঙ্গলবার দেশে পাঠানো হয়।
একই ফ্লাইটে ফেরা নরসিংদীর শিল্পী রানী শাহা বলেন, তিনি রিয়াদের সেইফ হোমে ছিলেন। বলেন, তাদের সঙ্গে মানসিক ভারসাম্য এক নারী আসছিলেন। কিন্তু দুবাই বিমানবন্দর থেকে তাকে আর পাওয়া যায়নি। তার খবর কেউ বলতে পারছেন না। তিনি জানান, প্রতিদিনই সেইফ হোমে নির্যাতিত নারীরা আসছেন। তারা আসার আগেও প্রায় ৫০ জন নতুন করে এসেছে। এ ছাড়া আরো দুই শতাধিক নারীকর্মী রিয়াদের সেইফ হোমে অবস্থান করছেন।
এদিকে মঙ্গলবার রাতে বিমানবন্দরে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট ওই ফ্লাইট ছাড়াও বিভিন্ন ফ্লাইটে অনেক নারীই ফেরত আসছেন। বিমানবন্দরে কর্মরত সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় প্রতিদিনই অসংখ্য নারী ফেরত আসেন। কিন্তু সেসব খবর অনেকেই জানেন না।

Saturday, September 8, 2018

এবার সিন্ডিকেট সৌদি আরবে by রোকনুজ্জামান পিয়াস

মালয়েশিয়ার পর এবার জনশক্তি প্রেরণে নতুন সিন্ডিকেট গড়ে উঠছে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমবাজার সৌদি আরবে। হাতেগোনা কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সির সমন্বয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে ‘ড্রপ বক্স’ নামের এই সিন্ডিকেট। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এই পদ্ধতি কার্যকর হলে দেশটিতে কর্মী প্রেরণে জিম্মি হয়ে পড়বে প্রায় সহস্রাধিক রিক্রুটিং এজেন্সি। বাড়বে জটিলতা। ইতিপূর্বে মালয়েশিয়ার সিন্ডিকেট নিয়ে এজেন্সি ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অস্বস্তি ছিল।
গত ৩১শে আগস্ট সেই সিন্ডিকেট  ভেঙে দিয়েছে মালয়েশিয়ার নতুন সরকার। কিন্তু সপ্তাহ না পেরোতেই সৌদি আরবের এই নতুন সিন্ডিকেটের গুঞ্জন আবারো অস্বস্তিতে ফেলেছে সংশ্লিষ্টদের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে সিন্ডিকেট চূড়ান্ত হয়ে গেছে। তবে কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। জানা গেছে, ২০-২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে এই ‘ড্রপ বক্স’ সিন্ডিকেট গড়ে উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের বিনিময়ে সিন্ডিকেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে নির্দিষ্ট কিছু এজেন্সি। তবে ড্রপ বক্সের কর্ণধার বলছেন, এটি সৌদি দূতাবাসের সিদ্ধান্ত। তারা তাদের সুবিধার্থে নতুন এই পদ্ধতি চালু করতে চাচ্ছে। 
সূত্র জানায় লাইসেন্সধারী প্রায় ১২০০ রিক্রুটিং এজেন্সির প্রায় প্রতেকেই সৌদি আরবে কর্মী পাঠাতে পারে। এক্ষেত্রে সৌদি দূতাবাসের সত্যায়িত চাহিদাপত্রের বিপরীতে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে কর্মী প্রেরণের নিয়োগানুমতি সংগ্রহ করে। কর্মীর ভিসা সংগ্রহের জন্য ঢাকার সৌদি দূতাবাসে প্রত্যেক রিক্রুটিং এজেন্সি প্রয়োজনীয় কাগজ পত্রসহ পাসপোর্ট স্ব-স্ব উদ্যোগে জমা দেয়।
বর্তমানে প্রচলিত নিয়মানুযায়ী সৌদি দূতাবাসের দেয়া গোপন ইন্টারনেট পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে প্রত্যেক কর্মীর জন্য ভিসা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ভিসা ফি যেমন, ইনজাজ নেট ফি ও ওয়েবসাইটে মেডিকেল স্ট্যাটাস আপডেট ফি ইত্যাদি অনলাইনে পরিশোধ করা হয়। অতঃপর অনলাইনে ওই কর্মীর একটি বারকোড পাওয়া যায়। বারকোডটি কর্মী প্রেরণকারী এজেন্সি, সৌদি আরবের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, সেদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও সৌদি মন্ত্রণালয়ের বাইরে কেউ জানে না।
কর্মীর নাম, পাসপোর্ট নাম্বার, কর্মীর বারকোড, ভিসা নাম্বার, মালিকের নাম, মালিকের ঠিকানা, মালিকের ফোন নাম্বার ও কর্মীর কর্মস্থল, কর্মীর পেশা ইত্যাদি প্রয়োজনীয় ডাটা সম্বলিত ভিসা আবেদন ফরম সৌদি দূতাবাসে জমা প্রদান করা হয়। যা একটি রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য। ভিসা আবেদন পত্রের সঙ্গে এনজাজ ডকুমেন্ট, এমপ্লয়মেন্ট এগ্রিমেন্ট, কর্মীর পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ছাড়পত্রসহ দূতাবাসের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করতে হয়। এরপর ভিসা আবেদনপত্র জমা করার পর সকল তথ্যাদি যাচাই করে সঠিক বলে প্রমাণিত হলে পাসপোর্টে ভিসা প্রদান করে। ভিসাসহ ওই পাসপোর্ট সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি সংগ্রহ করে। এই প্রক্রিয়া সবক’টি এজেন্সি স্বাধীনভাবে কর্মী নিতে পারে। কিন্তু নতুন গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রায় ১২০০ এজেন্সিকে সিন্ডিকেটের অন্তর্ভুক্ত গুটিকয় এজেন্সির ওপর নির্ভরশীল হতে হবে। 
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, সৌদি দূতাবাসের সঙ্গে যোগসাজশে গ্রিন ল্যান্ড ওভারসিজ মালিক মো. আবদুল হাই এর নেতৃত্বে ২০-২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির সমন্বয়ে এই সিন্ডিকেট গড়ে উঠছে। তাদের মাধ্যমে সৌদির ভিসা সংগ্রহের এই পদ্ধতিকে তারা ‘ড্রপ বক্স’ বলছে।
সূত্র আরো জানিয়েছে, ড্রপ বক্স পদ্ধতি চালু করার জন্য ইতিমধ্যে সৌদি অ্যাম্বাসির সঙ্গে তাদের কয়েকদফা বৈঠক হয়েছে। আবদুল হাইয়ের অফিসেও বিভিন্ন সময়ে এই বিষয়ে বৈঠক হয়েছে। গঠন করা হয়েছে একটি কমিটি। বৈঠকে ড্রপ বক্সের সভাপতি মনোনীত করা হয়েছে আবদুল হাই নিজেই। ড্রপ বক্সের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ওই ২০-২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি সৌদি অ্যাম্বাসিতে ভিসা জমা দেয়ার চূড়ান্ত তালিকাভুক্তির লক্ষ্যে ইতিমধ্যে সৌদি দূতাবাসের কর্মকর্তারা বিভিন্ন অফিস পরিদর্শন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি পররাষ্ট্র বা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানে না। তবে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রণালয় থেকেই বিষয়টি চূড়ান্ত করা হচ্ছে।  
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ড্রপ বক্সের নামে নতুন এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সৌদি আরবে কর্মী প্রেরণ করা হলে নানাবিধ সমস্যা তৈরি হবে। তারা বলছেন, যেসকল এজেন্সি ড্রপ বক্সের তালিকাভুক্ত থাকবে সৌদি নিয়োগকর্তা শুধু তাদেরকেই চিনবে। নিয়োগকর্তা মনে করবে, বাংলাদেশ থেকে এরাই শুধু কর্মী পাঠাবে।
জনশক্তি ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই পদ্ধতির আওতায় নির্ধারিত এজেন্সি তাদের ভিসা সংগ্রহের জন্য পাসপোর্টসহ আবেদনপত্র সৌদি অ্যাম্বাসিতে জমা দিলে ব্যবসায়িক গোপনীয়তা হারাবে। একইসঙ্গে অন্যান্য রিক্রুটিং এজেন্সির নিয়োগকর্তার তথ্যাদিও জানবে তারা। এতে করে ড্রপ বক্সের আওতাধীন এই সিন্ডিকেট একচেটিয়া ব্যবসা করবে। বাকি এজেন্সিগুলো বঞ্চিত হবে। নিজেদের মধ্যে অন্তঃকলহের কারণে ভিসা সংক্রান্ত সকল ধরনের মূল কাগজপত্র জমাদানের পরেও এটা নকল বা জাল বলে সংশ্লিষ্ট এজেন্সিকে ব্লক করে দেয়ার প্ররোচনা তৈরি হবে।
এ ব্যাপারে গ্রিনল্যান্ড ওভারসিজের মালিক আবদুল হাই বলেন, এরকম একটি পদ্ধতির কথা চিন্তা করছে সৌদি আরবের দূতাবাস। বিষয়টি নিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক এ ব্যাপারে আলোচনা হচ্ছে। তবে এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, চূড়ান্ত কিছু হয়নি। চূড়ান্ত হতে অনেক সময় লাগবে বলেও জানান তিনি। আবদুল হাই বলেন, ড্রপ বক্স নামের এই পদ্ধতিকে সিন্ডিকেট বলা যাবে না।
এটা মূলত: তাদের সার্ভিস সেন্টার। বলেন, বর্তমানে যে পদ্ধতি চালু রয়েছে তাতে অ্যাম্বাসিতে ভোগান্তি হয়। প্রায় ১২০০ এজেন্সি সেখানে ভিড় করে। এছাড়া কূটনৈতিক জোনে তাদের অ্যাম্বাসি স্থানান্তর হলে ভোগান্তি আরো বাড়বে। এসব বিষয় বিবেচনা করে তারা (সৌদি অ্যাম্বাসি) চাচ্ছে, সার্ভিস সেন্টারের  মাধ্যমে ভিসা প্রসেসিং করতে। এক্ষেত্রে ড্রপ বক্সের বাইরে থাকা এজেন্সিগুলো সমস্যায় পড়বে কিনা জানতে চাইলে আবদুল হাই বলেন, তাদের সুবিধার্থেই এই পদ্ধতির কথা ভাবছে সংশ্লিষ্টরা। তিনি এই পদ্ধতির নেতৃত্বে কিনা জানতে চাইলে বলেন, আমাদের বিষয়টি তদারকি করার জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান সাকিরুল ইসলাম বলেন, মালয়েশিয়ার সিন্ডিকেট নিয়ে দীর্ঘদিন কথা হয়েছে। অবশেষে সেই সিন্ডিকেটের নানা অনিয়ম ধরা পড়েছে। এখন যদি সৌদিতে একই ধরনের সিন্ডিকেট হয় তাহলে আবারও নানা সমস্যার মুখে পড়বে দেশটির অভিবাসন খাত। সবচেয়ে বড় বিষয় অভিবাসন ব্যয় বাড়বে। সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়েছে পড়বে অনেকে। সেক্ষেত্রে দেশটিতে কর্মী প্রেরণে বড় ধরনের হুমকির সম্মুখীন হবে। এই ধরনের সিন্ডিকেট যেনো গড়ে ওঠতে না পারে সেদিকে সরকারের নজর রাখা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
বায়রার সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন স্বপন বলেন, এমন একটি পদ্ধতির কথা আমরা শুনেছি। এই ড্রপ বক্স পদ্ধতিতে ৩০-৩৫টি এজেন্সি থাকবে বলে জানতে পেরেছি। ড্রপ বক্স পদ্ধতি চালু হলে অন্য এজেন্সিগুলো তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিএমইটির মহাপরিচালক সেলিম রেজা বলেন, নতুন এই পদ্ধতির ব্যাপারে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। কেউ জানায়নি।

Tuesday, September 4, 2018

মালয়েশিয়ায় ধরপাকড় চলছেই, আত্মগোপনে বহু বাংলাদেশি by রোকনুজ্জামান পিয়াস

মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার মধ্যরাত থেকে গতকাল রোববার রাত পর্যন্ত আটক করা হয়েছে দেড় সহস্রাধিক বিদেশি নাগরিককে। যাদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক। আটককৃতদের ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশিসহ অবৈধভাবে কর্মরত এসব বিদেশি নাগরিকদের বৈধ হওয়ার জন্য কয়েকদফা সুযোগ দেয় দেশটির সরকার। এরমধ্যে যারা এই সুযোগ গ্রহণ করেনি তাদের ধরতেই অভিযান চলছে। এদিকে এই ধরপাকড়ের ভয়ে প্রায় কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মক্ষত্রে যাচ্ছেন না। গ্রেপ্তার আতঙ্কে তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অভিযানের মধ্যে গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে যেতে গিয়ে বেশ কয়েকজন শ্রমিক আহতও হয়েছেন। এদিকে মালয়েশিয়ার নির্মাণখাত ও বিভিন্ন শিল্পকারখানায় কর্মরত বাংলাদেশিসহ বিদেশি শ্রমিকদের উপস্থিতি কমেছে। বিপাকে পড়েছেন কারখানার মালিকরাও। সূত্র জানায়, আটক বিদেশি নাগরিকদের ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। এসব ডিটেনশন ক্যাম্পের পরিবেশ অনেকটাই বসবাসের অযোগ্য।
সূত্র জানায়, মালয়েশিয়ায় যারা পাচারকারীদের মাধ্যমে ট্রলারে বা পার্শ্ববর্তী দেশের বিভিন্ন রুট দিয়ে অবৈধ পথে এসেছেন তাদের বৈধতার আর কোনো সুযোগ নেই। মালয়েশিয়া সরকারও তাদের আর কোনো সুযোগ দিতে চায় না। মালয়েশিয়ায় কর্মরত এসব অবৈধ কর্মীদের বৈধ হওয়ার জন্য গত ৩১শে আগস্ট পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে যারা আবেদন করেছেন তারা ধরপাকড় থেকে রেহায় পাচ্ছেন। অন্যথায় যারা এই সুযোগ নেননি তারা পড়েছেন বিপাকে। এরপর শুক্রবার মধ্যরাত থেকে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে পুলিশ। রাজধানীর কুয়ালালামপুর, পেরাক, জোহর বারু, কোতা বারু, কেলান্তান, কেদাহ, আলোর সেতার, মালাকাসহ দেশটির প্রত্যন্ত প্রদেশগুলোতেও ব্যাপক অভিযান অব্যাহত আছে।
সূত্রমতে, গত তিনদিনে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের চিহ্নিত করতে ১২ হাজারের বেশি বিদেশি নাগরিকের পারমিট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। এরমধ্যে ১ হাজার ৫৪৭ জনই অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যাদেরকে ইমিগ্রেশন বিভাগে হস্তান্তর করা হয়েছে।
যারা বৈধপথে অর্থাৎ পোর্ট অব এন্ট্রি দিয়ে মালয়েশিয়ায় এসেছেন তাদেরকে রিহায়ারিং বা পুনঃনিয়োগ প্রক্রিয়ায় বৈধ হওয়ার সুযোগ দেয়া হয় আগামী ৩১শে আগষ্ট পর্যন্ত। কিন্তু যারা পোর্ট অব এন্ট্রি দিয়ে আসেননি বা অন্য অবৈধ পথে গেছে তাদের আর বৈধতার সুযোগ নেই। এছাড়া যারা দেশটিতে ১০ বছরের বেশি সময় অবস্থান করছেন বা যাদের বয়স ৪৫ বছর পেরিয়ে গেছে তাদেরকে ৩১শে আগস্টের মধ্যে দেশ ছাড়তে আল্টিমেটাম দিয়েছিলো দেশটির সরকার। কিন্তু এই সুযোগ যারা গ্রহণ করেননি তারাও পাকড়াও হচ্ছেন। তাদেরও দেশটিতে অবস্থানের আর কোনো সুযোগ দেবে না বলে জানিয়েছিল।
সূত্র জানায়, দালাল চক্র ও একশ্রেণির মালিকদের অবহেলার কারণে প্রচুর সংখ্যক বাংলাদেশি বৈধ হওয়ার এই সুযোগ নিতে পারেননি। বৈধ প্রক্রিয়াকরণে জটিলতার কারণে অনেকেই দালালদের দ্বারস্থ হন। দালালরা তাদেরকে বৈধকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেন। ফলে প্রতারিত কর্মীরা দালালদের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে সময় পেরিয়ে যায়। তারা আর বৈধ হতে পারেন না। এমনই একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসির। তিনি দেশটিতে একটি গ্রিলের কারখানায় কাজ করেন। ৪ বছর আগে তিনি দেশটিতে গিয়েছিলেন। তার ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ ছিলো দুই বছরের। এরপর তিনি তার পারমিটের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য এক দালালের শরণাপন্ন হন। তাকে ৯ হাজার রিঙ্গিত দেন। কিন্তু ওই দালাল অর্থ পেয়েই কেটে পড়ে। এরপর থেকে নাসির দুই বছর ধরে অবৈধ হিসেবেই কাজ করে যাচ্ছেন। নাসির বলেন, গত দুইবছর ধরে তিনি বিভিন্ন সময় পুলিশকে টাকা দিয়ে সেখানে অবস্থান করছেন। বর্তমানে আবারো ধরপাকড় শুরু হওয়ায় তিনি আত্মগোপনে আছেন। কাজেও যেতে পারছেন না। নাসিরের মতো লাখ লাখ বাংলাদেশি দেশটিতে গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে কেউ কেউ অবস্থা বুঝে ঝুঁকি নিয়েই কাজে যাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মালয়েশিয়ায় অনেক মালিক ও দালাল অবৈধ কর্মীদের বৈধ হতে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলেন। তারা এসব কর্মীকে বোঝান মালয়েশিয়ান সরকার আবারো এই সুযোগ দেবে তাদের। কিছুদিন পর ধরপাকড়ও বন্ধ হয়ে যাবে। এ কারণেও অনেকে বিভ্রান্তিতে পড়ে বৈধতার সুযোগ নিতে পারেননি বা দেশে ফিরে আসেননি।
দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মো. ইলিয়াস বলেন, মাঝে-মধ্যেই দেশটির সরকার অবৈধদের ধরতে এই ধরনের উদ্যোগ নেয়। তার আগে দেশত্যাগ বা বৈধ হওয়ার জন্য একটি সময়সীমা বেঁধে দেন। কিন্তু কেউ কেউ সেই সুযোগ গ্রহণ করলেও বেশির ভাগই এর বাইরে থাকে। ফলে এই সময়টাতে আতঙ্কে থাকে অবৈধভাবে কর্মরত বাংলাদেশিসহ বিদেশি নাগরিকরা। কি কারণে বাংলাদেশিরা এই সুযোগ নিতে চান না এমন প্রশ্নের জবাবে এই ব্যবসায়ী বলেন, অভিযান চলার কিছুদিন পরই বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অনেকের ধারণা এমন হয়েছে, কিছুদিন পরই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এই ভরসায় তারা সরকারের এই সুযোগ না নিয়ে অভিযানের কয়েকদিন আত্মগোপনে থাকে। এছাড়া তিনি বৈধকরণ প্রক্রিয়ার জটিলতার কথাও তুলে ধরেন। বলেন, বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে অধিক কার্যকর হতো। এছাড়া অভিবাসন ব্যয় কমানোর কথাও বলেন, ব্যবসায়ী মো. ইলিয়াস।

Wednesday, August 22, 2018

সৌদি থেকে নির্যাতিত নারীর করুণ আর্তি by রোকনুজ্জামান পিয়াস

ভাই আমাকে বাঁচান। আমাকে নিয়ে যান। না হলে আমি মরে যাবো। একরাতে ছেলে আসে, আর এক রাতে বাপ আসে। আমি আর থাকতে পারছি না। আমার ঠ্যাং বেয়ে রক্ত পড়ছে। আমাকে বাঁচান ভাই, আমাকে বাঁচান। সৌদি আরবে গৃহকর্মে যাওয়া এক নারী গতকাল মোবাইল ফোনে এভাবেই তার দুর্দশার কথা তুলে ধরে দেশে ফেরার  আকুতি জানান।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের মিডিয়া শাখার এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথোপকথনে তিনি তার এই দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। ওই নারী জানান, তিনি ৪ মাস আগে সেদেশে গেছেন। দেশটির আল বাহার এলাকার একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ দেয়া হয়েছে তাকে। একমাস সেখানে ভালোই ছিলেন। কিন্তু এরপর থেকেই তার ওপর শুরু হয়েছে নির্যাতন।
নির্যাতিত নারীর বাড়ি খুলনা জেলায়। তার ছোট বোন রুমা জানান, ১৫ বছর আগে তার বোনের স্বামী মারা যান। একমাস পর তার ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। এরপর তিনি রাজমিস্ত্রি জোগালের কাজ নেন। সৌদি যাওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ওই কাজেই নিয়োজিত ছিলেন। সেখানে দিনমজুরের কাজ করে যা পেতেন তা দিয়েই দু’জনের পেট চালাতেন। একইসঙ্গে ছেলের লেখাপড়ার খরচও চালাচ্ছিলেন।
রুমা জানান, হঠাৎ করেই তার বোন জানান, সৌদি আরব যাবেন। সেখানে গৃহকর্মীর কাজ করবেন। আয়-রোজগার ভালো। এতে তার ছেলেটা ভালোভাবে লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হবে। রুবি বলেন, আমরা তাকে বিদেশ যেতে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু কথা শোনেনি। বলেছেন, তার ছেলের ভবিষ্যতের জন্য তাকে যেতে হবে। কে তাকে সৌদি আরব যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে জানতে চাইলে নির্যাতিতার বোন জানান, সে যেখানে কাজ করতো সেখানকার একব্যক্তি তাকে পরামর্শ দেয়।
ওই ব্যক্তির স্ত্রীও একই সময় সৌদিতে যান। তিনিও এখন খুব কষ্টে আছেন। তার ওপরও বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালাচ্ছে সৌদির গৃহকর্তারা। নির্যাতিতার ছোট বোন বলেন, সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর তার বোন বলেছিলেন তিনি ভালো আছেন। কিন্তু কিছুদিন পরই তিনি তার কষ্টের কথা জানান। রোজার ঈদের দিন ফোন করে অনেক কান্নাকাটি করেন। বলেন, ওইদিন তিনি শুধু পানি খেয়ে ছিলেন। তাকে কোন খাবার দেয়নি। গৃহকর্তারা খাবার পরও তাকে থালা-বাসন ধুতে দিয়েছে। মাঝে মাঝে তাকে কোনো খাবার দেয় না। একদিন ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে একটা আপেল খেয়েছিল, সেদিন তাকে অনেক মারধর করে।
সব কাজ ছাড়াও ওই বাড়িতে দু’জন বয়স্ক মানুষ থাকে যারা চলাফেরা করতে পারে না। তার বোন তাদের পরিচর্যাসহ পেশাব-পায়খানা পরিষ্কার করেন।
এদিকে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির কাছে ধর্না দিয়েও নির্যাতিতাকে ফেরত আনার কোনো উপায় না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের শরণাপন্ন হন। শুধু ওই নারীই নন। সংস্থাটি একই সময়ে আরো ১৭ নির্যাতিত নারীর পরিবারের কাছ থেকে একই ধরনের অভিযোগ পান। পরে গত ২৫শে জুলাই তাদেরকে ফেরত আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে অভিযোগ জানান। একইসঙ্গে বেসরকারি এ সংস্থাটি নির্যাতিতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন।
গতকাল খুলনার এই নির্যাতিত নারীর সঙ্গে মোবাইলে কথা হয় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের এক কর্মকর্তার। ওই কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড মানবজমিনের হাতে এসেছে। রেকর্ডের কথোপকথন হুবহু তুলে দেয়া হলো-
কাঁদতে কাঁদতে হতভাগা এই নারী ব্র্যাক কর্মকর্তাকে বলেন, আপনি আমার আপন ভাই, আমাকে বাঁচান, রাত্রিরি...। এক রাত্রিরি ছেলে আসে, আরেক রাত্রিরি বাবা আসে। আমার জানডা বোরোয় যাচ্ছে। ‘ওই জায়গায়’ হালিস বেরোয় গেছে। জানডা বেরোয় যাচ্ছে। থাকতি পারতিছি নে ভাই। আমারে একটু বাঁচান ভাই। আমারে একটু নিয়ে যান ভাই। (কাঁদতে কাঁদতে) ওরে ভাই, আমি মরে গিলাম ভাই। কতদিন সেখানে গেছেন জিজ্ঞেস করলে ওই নারী জানান, চার মাস হলো গেছেন। এর মধ্যে এক মাস তিনি ভালো ছিলেন। বলেন, ‘চার মাসে একমাস ভালো ছিলাম আর তিন মাসে আমার জানডা বেরোয় গেছে ভাই। আমি এখানে থাকলে বাঁচতি পারবো নানে।’ ওই বাড়ি থেকে বের হয়ে পুলিশের কাছে যাওয়ার সুযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না ভাই, বাইর হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনটা গেটে তালা দিয়ে রাখে।’ তিনি বলেন, ‘ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা কলি নেই না। খালি একটা বড়ি দেয়। ডাক্তারের কাছে নিলি আমি দেহাবানে, কয়ে দিবানে, তাইতি নেয় না।’ নারী বিলাপ করতে করতে আবারো বলেন, আমাকে বাঁচান ভাই। না হলি, আমি বাংলাদেশে যাতি পারবো নানে। আমাকে নিয়ে যান। আমি বাংলাদেশে কাজ করে খাবানে। একেনে কাজ করতি পারবো নানে। আমার ঠ্যাং বেয়ে বেয়ে রক্ত পড়ছে। এ সময় নারী অঝোরে কান্না করতে থাকেন। একইসঙ্গে ভীতসন্ত্রস্ত মনে হয় তাকে। 
জানা গেছে, খুলনার ওই নারী গত ৩রা এপ্রিল আল মিনার ওভারসিজ (আরএল নং- ১২৩৫) নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরব যান। এ ব্যাপারে এজেন্সির মালিক মো. আকতার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এ ব্যাপারে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, এসব নারীদের সৌদি পাঠাচ্ছে রিক্রুটিং এজেন্সি। তারাই তাদের বিদেশ পাঠিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। কিন্তু যখন তারা বিপদে তখন এসব এজেন্সি কোন দায় নিতে চায় না। উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে তারা খারাপ আচরণ করে। তিনি বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিলেই কেবল তারা এসব অসহায় ভুক্তভোগী এসব নারীদের দায়ভার নিতে বাধ্য হবে। এ ছাড়া সৌদিতে আমাদের নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, সেদেশ নারীকর্মী পাঠানোর ব্যাপারে নতুন করে ভাববার সময় হয়েছে।

Wednesday, August 1, 2018

রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তা, চ্যালেঞ্জের মুখে জামায়াতের রাজনীতি: আরিফের চমক by রোকনুজ্জামান পিয়াস ও ওয়েছ খছরু

সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১৩২ কেন্দ্রের ফলে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ৯০৪৯৬ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি আওয়ামী লীগের বদরউদ্দিন আহমদ কামরান নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ৮৫৮৭০ ভোট। এ সিটির ১৩৪ টি কেন্দ্রের মধ্যে গোলযোগের কারণে দুটি কেন্দ্রে ভোট স্থগিত রয়েছে। এ দুই কেন্দ্রের মোট ভোটার ৪৭৮৭। দুই কেন্দ্রে ভোট স্থগিত থাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে আরিফুল হক চৌধুরীকে বিজয়ী ঘোষণা করেনি নির্বাচন কমিশন। রিটার্নিং কর্মকর্তা আলীমুজ্জামান জানিয়েছেন মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। দিনভর দখল অনিয়মের অভিযোগের পর রাতে ফল ঘোষণা নিয়ে অনেক নাটকীয়তা হয়েছে। নগরীর ইনডোর স্টেডিয়ামে নির্বাচন কমিশনের ফলাফল ঘোষণা কেন্দ্রে থেকে ফল ঘোষণা শুরুর পর থেকেই এ নাটকীয়তার শুরু। সর্বশেষ রাত ১১টায় রির্টারিং কর্মকর্তা ১১১টি কেন্দ্রের ফল ঘোষণা করার পর দীর্ঘক্ষণ আর ফল ঘোষণা হয়নি। এই ১১১কেন্দ্রে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী সাড়ে চার হাজার ভোটে এগিয়ে ছিলেন। এসময় ফল ঘোষণা কেন্দ্রে উপস্থিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিছবাহ উদ্দিন সিরাজ প্রত্যাশিত ফল আসছে না জানিয়ে ফলাফল ঘোষণা স্থগিত রাখতে ইসি কর্মকর্তাদের অনুরোধ করেন। তিনি বের হয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই রিটার্নিং কর্মকর্তা ১৩২ কেন্দ্রের ফল ঘোষণা করেন। ফল ঘোষণার পর বিজয়ী আরিফুল হক চৌধুরী তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এ বিজয় সিলেটের জনগণের। তিনি তার নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, সবকিছু ভুলে আমাদের আবার সিলেটবাসীকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করতে হবে। সব কেন্দ্রের ফল ঘোষণার পর বিএনপির নেতাকর্মীরা নগরীতে বিজয় মিছিল করেন। দিনের শুরুতে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে এজেন্ট বের করে দেয়া এবং কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দেয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী। তবে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন শাহাদাৎ বরণ করলেও তিনি মাঠ ছেড়ে যাবেন না। দুপুরের পর ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ আসা নির্বাচন স্থগিত করার দাবি জানিয়েছিলেন তিনি। যদিও সন্ধ্যায় ফলাফল আসা শুরুর পর ফল ঘোষণা কেন্দ্রে হাজির হন বিদায়ী এ মেয়র। তিনি ফল ঘোষণার শেষ পর্যন্ত ইনডোর স্টেডিয়ামেই অবস্থান করেন।  এদিকে নির্বাচনে নিজের কেন্দ্রেই হেরেছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। তিনি সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের ভোটার। এই কেন্দ্রের ভোটের ফলে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে ১৩০ ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন তিনি। সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীকে আরিফুল হক চৌধুরী পেয়েছেন ৭৭৬ ভোট। নৌকা প্রতীকে কামরান  পেয়েছেন ৬৪৬ ভোট।
এদিকে, সিলেটের এই নির্বাচনে স্বতন্ত্র ব্যানারে লড়া জামায়াতের প্রার্থী এহসানুল মাহবুব জুবায়ের পেয়েছেন ১০,৯৫৪ ভোট। এতো প্রচার-প্রচারণার পরও জামায়াত প্রার্থীর এতো কম ভোট পাওয়া দলটির রাজনীতিকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
এমন ভোট আগে দেখেনি সিলেট
‘শান্তির’ শহরে আজব কিসিমের এক নির্বাচনের সাক্ষী হলো সিলেটের মানুষ। ভোটের মাঠে এবার এমন কিছু দেখলো, যা আগে কখনো দেখেনি তারা। কেন্দ্র দখল, ভোট ডাকাতি, বিরোধীপক্ষকে মারধর, পুলিশের সহযোগিতায় জালভোট, প্রতিপক্ষ এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া, ভোটারদের ভোট প্রদানে বাধা, দুপুরেই ব্যালট পেপার শেষÑ কি ছিল না এই নির্বাচনে। নগরবাসী বলছে, এমন ভোট তারা আগে কখনো দেখেনি। হামলার শিকার হয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। দায়িত্বরত সাংবাদিকরাও এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। একের পর এক কেন্দ্র দখলের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান গণমাধ্যম কর্মীরা। কিন্তু ক্যামেরা তাক করা মাত্রই পুলিশসহ সদলবলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাদের ওপর। এসব ঘটনার নির্বাক দর্শক হওয়া ছাড়া কিছুই করার ছিল না তাদের। গতকাল সিলেট সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কেন্দ্রে ঘুরে এমন চিত্র চোখে পড়েছে। ভোট দিতে না পেরে হা-হুতাশ করে অনেকেই ক্ষোভ নিয়ে কেন্দ্র ছেড়েছেন।
সকাল সাড়ে ৮টা। পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ের পুরুষ ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ২টি ছাড়া আর কোনো বুথেই নেই ধানের শীষের এজেন্ট। জিজ্ঞেস করলে পোলিং অফিসারের কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসার ইশতিয়াক আহমেদ চৌধুরীর কক্ষে নির্দিষ্ট সময় পরপর তিন দফা গিয়ে দেখা যায় তার কক্ষটি ছিল তালাবদ্ধ। পনের মিনিট পর চতুর্থবারের মতো তার কক্ষে গেলে দেখা মেলে। এ সময় ধানের শীষের এজেন্ট নেই কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা তিনি বলতে পারবেন না। তাদেরকে কার্ড দেয়া হয়েছে, না আসলে তার কিছুই করার নেই। একই বিদ্যালয়ের মহিলা ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোনো কক্ষেই ধানের শীষের এজেন্ট নেই। এদিকে ওই কেন্দ্রে অবস্থানকালীন একের পর এক বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে নৌকার প্রতিপক্ষ প্রার্থীকে বের করে দেয়ার খবর আসতে থাকে।
নগরীর ২০নং ওয়ার্ডের হাতেম আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়েও দেখা যায় একই চিত্র। সেখানেও কোনো এজেন্ট পাওয়া যায়নি। বুথের সামনে জটলা পাকিয়ে একদল যুবক বুথের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এ সময় ওই কেন্দ্রে থেকে একা বের হচ্ছিলেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি জানান, ২০নং ওয়ার্ডের কোনো কেন্দ্রেই তার এজেন্টদের আসতে দেয়া হয়নি।
সোয়া ১০টার দিকে টিলাগড় এলাকার এমসি কলেজের ভোট কেন্দ্রে ঢুুকতেই পুলিশি বাধার মুখে পড়তে হয়। পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, সাংবাদিকদের কেন্দ্রে ঢোকা নিষেধ। তাদেরকে তেমন নির্দেশনাই দেয়া হয়েছে। পরে বাধা উপেক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ করলেও বুথে ঢুকতে দেয়া হয়নি। এ সময় দায়িত্বরত প্রিজাইডিং অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তার কক্ষেও ঢুকতে দেয়া হয়নি। আনসার সদস্যরা তার রুমের সামনে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। তাদের সাফ জবাব, স্যারের সঙ্গে দেখা করা যাবে না। ভোট কেন্দ্রের কয়েকজন অভিযোগ করেন, তার রুমেই জাল ভোট দেয়া হচ্ছে। শাহজালাল উপশহর একাডেমিতে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রের বাইরে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের মহড়া। কেন্দ্রের ভিতরে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রে ভোটারের লম্বা লাইন থাকলেও ৫নং বুথের সামনে জটলা। এ সময় ধানের শীষের পোলিং এজেন্ট লিয়াকত হোসেনকে বের করে দেয় নৌকার সমর্থকরা। এ নিয়ে কিছু সময়ের জন্য সেখানে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। পরে একে একে সব প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়। এই অবস্থায় ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মহিম উদ্দিন বলেন, কেন্দ্র শান্ত রয়েছে। এজেন্টদেরকে বের করে দেয়ার বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, কেউ স্বেচ্ছায় বেরিয়ে গেলে তার কিছুই করার নেই। ওই কেন্দ্রে অবস্থানের সময়ই খবর পাওয়া যায়, নগরীর পাঠানটুলা শাহজালাল জামেয়া ইসলামীয়া কামিল (এমএ) মাদরাসায় সংঘর্ষ চলছে।
১২টার দিকে ওই কেন্দ্রে পৌঁছলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সোয়া ১১টার দিকে কেন্দ্রের বাইরে আখালিয়ার দিক থেকে কামরান সমর্থকরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে করতে কেন্দ্রের দিকে এগুতে থাকে। এ সময় উল্টো দিক থেকে ঘড়ি প্রতীকের সমর্থক ছাত্রশিবিরের লোকজনও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল ছোঁড়ে। এতে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবির এলাকা থেকে সরে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পরপরই আওয়ামী লীগ প্রার্থীর একদল সমর্থক কেন্দ্রে ঢুকে পড়ে। এ সময় পুলিশের সহযোগিতায় তারা কেন্দ্রের ভেতর থেকে সব ভোটারকে বের করে দেয়। কেন্দ্রের সব বুথ তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। ওই কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, দোতলা ও তিনতলার সব ক’টি বুথ দখলে। বুথের বাইরে একদলের জটলা, ভেতরে আরেকদল জাল ভোটের মহোৎসব চালাচ্ছে। এ সময় জটলা ঠেলে ছবি তুলতে গেলে নয়া দিগন্তের ফটো সাংবাদিক বাপ্পির ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয় বুথের সামনে অবস্থান করা পুলিশের এসআই রহমাতুল্লাহ মিয়া। পরে তোলা ছবিটি ডিলিট করে তার ক্যামেরা ফেরত দেন তিনি। ধাক্কা দিয়ে সাংবাদিক বাপ্পিকে নিচ তলায় নামিয়ে দেন। শুধু পুলিশ কর্মকর্তা রহমাতুল্লাহই নন, বেশির ভাগ পুলিশ সদস্যই ক্যামেরা তাক করা মাত্রই সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন। পরে আবারো জাল ভোটের মহোৎসব দেখতে ভবনের তিনতলায় ওঠে ছবি তোলার চেষ্টা করলে এই প্রতিবেদকের মোবাইল ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে পুলিশ ও নৌকার সমর্থকরা। ছবি না ওঠানোর শর্তে সেখানে অবস্থান করলে দেখা যায়, ভেতরে একদল ব্যালটে সিল মারছে, আর দরজা বন্ধ করে পাহারায় আছে সুঠামদেহি এক যুবক। পুলিশ সেখানে ভোটারদের যেতে বাধা দিচ্ছেন। বিশেষ করে এসআই রহমাতুল্লাহ ও কয়েকজন কনস্টেবল এ ব্যাপারে অতি উৎসাহী ভূমিকা পালন করছিলেন। সাংবাদিকরা নির্বাক দর্শক হয়ে জাল ভোটের মহোৎসব চেয়ে চেয়ে দেখেন। আধাঘণ্টা পর নিচ তলার একটি বুথে এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এক যুবক জাল ভোটের ব্যালট সাংবাদিকদের দেখাতে উদ্যত হন। এ সময় নৌকার সমর্থক ও পুলিশ গিয়ে তাকে রুমে আটকে রাখে। পুলিশ ওই রুমে ঢুকে তাকে বেদম মারধর করে। পরে তাকে পুলিশি ভ্যানে তুলে দেয়া হয়। এরও আধাঘণ্টা পর জালভোট দিয়ে দলে দলে লোকজন নিচে নামে। এ সময় আরেক যুবক জাল ভোট দেয়ার কথা সাংবাদিকদের জানালে পুলিশ তাকে বেদম মারধর করে। ওই ঘটনার ভিডিও ধারণ করায় এই প্রতিবেদকের মোবাইল আরেক দফা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। ঘটনার শুরুতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সিলেটের এক স্থানীয় সাংবাদিক জানান, ঘটনা শুরুর কিছুক্ষণ পর এরশাদুল হক ও আশিক নামে দুই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনার প্যানিক ছড়াচ্ছেন।’ ঘটনার পর থেকে ওই কেন্দ্রে আর কোনো সাধারণ ভোটারকে প্রবেশ করতে দেয়নি পুলিশ। অনেকে ভোট দিতে গেলে জানানো হয়, ব্যালট পেপার শেষ!
বেলা দুইটার আগে-পরে বিভিন্ন কেন্দ্র দখলের খবর আসতে থাকে। সুবিদবাজার এলাকার ব্লু-বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কোনো ভোটারকে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। ওই কেন্দ্রের ভেতরে তখনো জাল ভোট চলছিল। এ সময় ছবি তুলতে গেলে আবারো সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ। ঘণ্টাখানেক পরে সাধারণ ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেয় পুলিশ। তবে আইডি কার্ড দেখিয়ে। অনেকে ভোটার নাম্বার বললেও কার্ড দেখাতে না পারায় কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হয়নি। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. নাবিল আহমেদ অভিযোগ করেন, তাকে একঘণ্টা ধরে কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। এ সময় ওই প্রতিষ্ঠানের মহিলা ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনরত পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, দু’জন করে ভোটার ভেতরে ঢুকবে। তারা ভোট দিয়ে বাইরে বের হয়ে গেলে পরবর্তী দু’জন ঢুকবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুপুর একটা থেকে দুইটা পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার ভোট কেন্দ্রে পুলিশ সাধারণ ভোটারদের প্রবেশে বাধা দেয়। ওই সময়ই কেন্দ্র দখল করে জালভোটের মহোৎসব চলে। এদিকে এবারের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পরিবেশ দেখে নগরবাসী বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাদের ভাষ্য, অতীতে সিলেটে এমন ভোট কেউ দেখেনি। এতে ভোটারদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই ভোট সিলেটের ঐতিহ্য ‘সম্প্রীতি’কে নষ্ট করে দিয়েছে।

যেভাবে ভোট স্থগিত হয় দুই কেন্দ্রে: সব হিসাবই আরিফের পক্ষে by রোকনুজ্জামান পিয়াস

বিজয়ী হতে কোনো হিসাবই আর বাধা নয় বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর। সোমবার নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর রিটার্নিং কর্মকর্তা তাকে  বিজয়ী ঘোষণা না করলেও সকল হিসাব-নিকাশই এখন তার পক্ষে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অবস্থা থেকে আরিফের পিছিয়ে পড়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। বিজয়ের আনুষ্ঠানিকতা বাকি মাত্র। যে দুটি কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিতের কারণে চূড়ান্ত বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি, সেখানেও রয়েছে আরিফের আধিপত্য। সূত্র বলছে, কেন্দ্র দুটির প্রায় ৪০ ভাগ ভোট কাস্ট হওয়ার পর নির্বাচন স্থগিত করা হয়। ওই সময়ও কেন্দ্রে ছিল ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। বিএনপি বলছে, এই ফলাফলের পেছনে সিলেটের মানুষের আওয়ামী লীগ বিরোধী মনোভাব কাজ করেছে। একইসঙ্গে ভোট কেন্দ্রে এজেন্টদের দৃঢ় অবস্থান অনেকটা ইতিবাচক ভূমিকা  রেখেছে। তারা বলছে, ১৩৪ কেন্দ্রের মধ্যে ১৩টি কেন্দ্রে তাদের এজেন্ট ছিল না। নির্বাচনের সার্বিক ফলাফল বিবেচনায় এনে জামায়াতের ব্যাপারেও কেন্দ্রে একটি মেসেজ দিতে চায় দলটি। এদিকে নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা আলীমুজ্জামান বলছেন, স্থগিত দুই কেন্দ্রের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেবেন। আগামী সপ্তাহেই পুনঃনির্বাচন সম্পন্ন হতে পারে এমনটাও আভাস দেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। সব ঠিক থাকলে, আবারও নগরপিতার আসনে বসতে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না আরিফুল হকের।
সিলেট সিটি করপোরেশনে ১৩৪টি কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৪৪ জন এবং নারী ১ লাখ ৫০ হাজার ২৮৮ জন। ফল ঘোষিত হয়েছে ১৩২টি কেন্দ্রের। এতে দেখা গেছে, ১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৫৬ জন ভোটার ভোট দিয়েছেন। ৭ হাজার ৩৬৭টি ভোট বাতিল হয়েছে। বাকি দুই কেন্দ্র ২৪নং ওয়ার্ডের ১১৬নং কেন্দ্র বোরহান উদ্দিন (রহ.) মাদরাসা ও ২৭নং ওয়ার্ডের ১৩৪নং কেন্দ্রের হবিনন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভোট স্থগিত করা হয়। ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নিয়ে জোরপূর্বক জালভোট দেয়ার অভিযোগে কেন্দ্র দুটির ভোট স্থগিত করা হয়।  প্রাপ্ত ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ওই দুই কেন্দ্র ছাড়াই ভোট কাস্ট হয়েছে প্রায় ৬২ শতাংশ। গতবার অর্থাৎ ২০১৩ সালের নির্বাচনেও কাস্ট হওয়া ভোটের হার ছিল ৬২ শতাংশ।
১৩২ কেন্দ্রে আরিফুল হক চৌধুরীর ধানের শীষ পেয়েছে ৯০ হাজার ৪৯৩ ভোট। অন্যদিকে নৌকা প্রতীকে কামরান পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৮৭০ ভোট। প্রধান এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর ভোটের ব্যবধান ৪ হাজার ৬২৬। ভোটের এই ব্যবধান এবং স্থগিত কেন্দ্রের ভোটার সংখ্যা এক জটিল সমীকরণ সৃষ্টি করেছে। জটিল এই সমীকরণে আরিফুল হক চৌধুরীকে হারিয়ে সিলেটের মেয়র হতে পারেন বদর উদ্দীন কামরানও। তবে সেটি একদিকে যেমন জটিল, তেমন অসম্ভবও বটে। ভোটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, কামরানকে জয়ী হতে হলে স্থগিত দুটি কেন্দ্রের সব ভোটার ভোট দিতে হবে এবং ১৬১ ভোট বাদে সব ভোট পেতে হবে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে। দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধানের চেয়ে স্থগিত কেন্দ্রের ভোট সংখ্যা কম হলে সোমবারই চূড়ান্ত বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হতো আরিফুল হক চৌধুরীকে। কিন্তু সিলেটে দুই স্থগিত কেন্দ্রের ভোটার সংখ্যা ৪৭৮৭টি। অর্থাৎ দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধানের চেয়ে ১৬১টি ভোট বেশি। এ কারণেই বিধি মোতাবেক আরিফুল হককে বিজয়ী ঘোষণা করা যায়নি।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী গাজী সৈয়দ বোরহান উদ্দিন (রহ.) মাদরাসা কেন্দ্রে  ভোটার সংখ্যা ২ হাজার ২২১ জন এবং হবিনন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ২ হাজার ৫৬৬ জন। এই দুই কেন্দ্রে আবারো ভোট দিতে হবে ভোটারদের। তাদের ভোটেই চূড়ান্ত হবেন নগরপিতা। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৩২ কেন্দ্রের মতো এই দুই কেন্দ্রে ৬২ শতাংশ ভোট কাস্ট হলে আরিফই হবেন চূড়ান্ত বিজয়ী। এমনকি এই ৬২ শতাংশের সব ভোট যদি কামরান পান তারপরও। অন্যদিকে শতভাগ ভোট কাস্ট হলে সেখানে মাত্র ৮১ ভোট পেলেই জয় নিশ্চিত ৪ হাজার ৬২৬ ভোটে এগিয়ে থাকা আরিফের। আর শতভাগ কাস্ট হওয়ার পর আরিফ যদি তার কম পায় তবে কামরানই পরবেন বিজয়ের মালা।
তবে ওই দুই কেন্দ্রের ভোটারদের সমর্থনের বাস্তবতায় সে সম্ভাবনা একেবারেই নেই। ওই এলাকার ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১১৬নং কেন্দ্রে আরিফের আধিপত্য অনেক আগে থেকেই। সেখানে অন্য কোনো প্রার্থী এগিয়ে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই। একই অবস্থা ১৩৪নং কেন্দ্রেও। এখানেও বরাবরই আরিফের সমর্থন বেশি। এ কারণেই ওই কেন্দ্রে আরিফের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ভোট ডাকাতি করতে যায়, এ অভিযোগ সেখানকার ভোটারদের।
নির্বাচনের দিনের ঘটনা বর্ণনা করে বোরহান উদ্দিন (রহ.) মাদরাসার ১১৬নং কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসার ইমন চন্দ্র দাস মানবজমিনকে জানান, সকাল থেকেই তার কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ চলছিল। সাড়ে ১১টার দিকে হঠাৎ কিছু উচ্ছৃঙ্খল যুবক বুথের বাইরে হট্টগোল সৃষ্টি করে। পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে না গেলেও বোঝানোর চেষ্টা করে। এ সময় তাদের সঙ্গে পুলিশের ধাক্কাধাক্কি হয়। পরে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে তারা বুথের মধ্যে গিয়ে জোরপূর্বক ব্যালট ছিনিয়ে নেয়। বুথের এজেন্টরা তাৎক্ষণিকভাবে জানালে কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়। পরে আনুষ্ঠানিকভাবে দুইটার দিকে কেন্দ্রের নির্বাচন স্থগিত করা হয়। ওই সময় কত ভোট কাস্ট হয়েছিল তিনি জানান, ৩৫-৪০ শতাংশ মতো ভোট কাস্ট হয়েছিল। এ ছাড়া ভোটারের লম্বা লাইন ছিল। এরা কারা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এজেন্টরা তাকে জানিয়েছেন নৌকার পক্ষে সিল মারছিল তারা।
স্থগিত অপর কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার সারোয়ার জাহান মাহমুদ মানবজমিনকে বলেন, ১২টার কিছু সময় আগে কেন্দ্রের ভেতর আগে থেকেই অবস্থান করা দুষ্কৃতকারীরা হঠাৎ বুথে প্রবেশ করে। তারা ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেয়। পরে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করেন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে পরামর্শ করে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন স্থগিত করা হয়। প্রিজাইডিং অফিসার বলেন, হট্টগোল হওয়ার পূর্বপর্যন্ত প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়েছিল।
বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর ব্যাপারে দলটির সিলেট মহানগর সহসভাপতি সালেহ আহমেদ খসরু বলেন, ভোট ডাকাতি সত্ত্বেও বিএনপির জয়ের পেছনে সিলেটের মানুষের আওয়ামী লীগকে ঘৃণা করার কারণে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি। আপামর ভোটার নীরব ভোট বিপ্লব ঘটিয়েছে। তিনি এই জয়ের পেছনে এজেন্টদের ভূমিকাকে প্রাধান্য দেন। তিনি বলেন, অনেক কেন্দ্রে মারধর করে তাদের এজেন্ট বের করে দেয়। তারপর আবারও তারা বুথে গিয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি বলেন, ভোট ডাকাতি না হলে, বিএনপির সঙ্গে কোনো প্রতিযোগিতায় আসতো না আওয়ামী লীগ। তিনি বলেন, এই নির্বাচন প্রমাণ করে, সিলেটের বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থকরা দেশের অন্য যেকোনো জায়গার তুলনায় আলাদা। জামায়াতের ব্যাপারে তিনি বলেন, তারা নিজেদেরকে অনেক বেশি প্রভাব সৃষ্টিকারী মনে করেছিল। এই নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের জনসমর্থন দেখা গেছে। সিলেটের ভোটের মাঠের এই চিত্র জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে জামায়াতের সঙ্গে গড়ে ওঠা জোটে প্রভাব পড়বে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সিদ্ধান্ত নেবেন।
উল্লেখ্য, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি কামরানের সঙ্গে এটি ছিল আরিফুল হকের দ্বিতীয় ভোটযুদ্ধ। ২০১৩ সালে প্রথম লড়াইয়ে কামরানকে ৩৫ হাজার ভোটে হারিয়েছিলেন তিনি।

Tuesday, July 31, 2018

সিলেটে নজিরবিহীন ভোট by রোকনুজ্জামান পিয়াস

‘শান্তির’ শহরে আজব কিসিমের এক নির্বাচনের সাক্ষী হলো সিলেটের মানুষ। ভোটের মাঠে এবার এমন কিছু দেখলো, যা আগে কখনো দেখেনি তারা। কেন্দ্র  দখল, ভোট ডাকাতি, বিরোধীপক্ষকে মারধর, পুলিশের সহযোগিতায় জালভোট, প্রতিপক্ষ এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া, ভোটারদের ভোট প্রদানে বাধা, দুপুরেই ব্যালট পেপার শেষ- কি ছিল না এই নির্বাচনে। নগরবাসী বলছে, এমন ভোট তারা আগে কখনো দেখেনি। হামলার শিকার হয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। দায়িত্বরত সাংবাদিকরাও এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। একের পর এক কেন্দ্র দখলের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান গণমাধ্যম কর্মীরা। কিন্তু ক্যামেরা তাক করা মাত্রই পুলিশসহ সদলবলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাদের ওপর। এসব ঘটনার নির্বাক দর্শক হওয়া ছাড়া কিছুই করার ছিল না তাদের। গতকাল সিলেট সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কেন্দ্রে ঘুরে এমন চিত্র চোখে পড়েছে। ভোট দিতে না পেরে হা-হুতাশ করে অনেকেই ক্ষোভ নিয়ে কেন্দ্র ছেড়েছেন।
সকাল সাড়ে ৮টা। পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ের পুরুষ ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ২টি ছাড়া আর কোনো বুথেই নেই ধানের শীষের এজেন্ট। জিজ্ঞেস করলে পোলিং অফিসারের কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসার ইশতিয়াক আহমেদ চৌধুরীর কক্ষে নির্দিষ্ট সময় পরপর তিন দফা গিয়ে দেখা যায় তার কক্ষটি ছিল তালাবদ্ধ। পনের মিনিট পর চতুর্থবারের মতো তার কক্ষে গেলে দেখা মেলে। এ সময় ধানের শীষের এজেন্ট নেই কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেটা তিনি বলতে পারবেন না। তাদেরকে কার্ড দেয়া হয়েছে, না আসলে তার কিছুই করার নেই। একই বিদ্যালয়ের মহিলা ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোনো কক্ষেই ধানের শীষের এজেন্ট নেই। এদিকে ওই কেন্দ্রে অবস্থানকালীন একের পর এক বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে নৌকার প্রতিপক্ষ প্রার্থীকে বের করে দেয়ার খবর আসতে থাকে।
নগরীর ২০নং ওয়ার্ডের হাতেম আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়েও দেখা যায় একই চিত্র। সেখানেও কোনো এজেন্ট পাওয়া যায়নি। বুথের সামনে জটলা পাকিয়ে একদল যুবক বুথের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এ সময় ওই কেন্দ্রে থেকে একা বের হচ্ছিলেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি জানান, ২০নং ওয়ার্ডের কোনো কেন্দ্রেই তার এজেন্টদের আসতে দেয়া হয়নি।
সোয়া ১০টার দিকে টিলাগড় এলাকার এমসি কলেজের ভোট কেন্দ্রে ঢুুকতেই পুলিশি বাধার মুখে পড়তে হয়। পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, সাংবাদিকদের কেন্দ্রে ঢোকা নিষেধ। তাদেরকে তেমন নির্দেশনাই দেয়া হয়েছে। পরে বাধা উপেক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ করলেও বুথে ঢুকতে দেয়া হয়নি। এ সময় দায়িত্বরত প্রিজাইডিং অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তার কক্ষেও ঢুকতে দেয়া হয়নি। আনসার সদস্যরা তার রুমের সামনে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। তাদের সাফ জবাব, স্যারের সঙ্গে দেখা করা যাবে না। ভোট কেন্দ্রের কয়েকজন অভিযোগ করেন, তার রুমেই জাল ভোট দেয়া হচ্ছে। শাহজালাল উপশহর একাডেমিতে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রের বাইরে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের মহড়া। কেন্দ্রের ভিতরে গিয়ে দেখা যায়, কেন্দ্রে ভোটারের লম্বা লাইন থাকলেও ৫নং বুথের সামনে জটলা। এ সময় ধানের শীষের পোলিং এজেন্ট লিয়াকত হোসেনকে বের করে দেয় নৌকার সমর্থকরা। এ নিয়ে কিছু সময়ের জন্য সেখানে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। পরে একে একে সব প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়। এই অবস্থায় ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মহিম উদ্দিন বলেন, কেন্দ্র শান্ত রয়েছে। এজেন্টদেরকে বের করে দেয়ার বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, কেউ স্বেচ্ছায় বেরিয়ে গেলে তার কিছুই করার নেই। ওই কেন্দ্রে অবস্থানের সময়ই খবর পাওয়া যায়, নগরীর পাঠানটুলা শাহজালাল জামেয়া ইসলামীয়া কামিল (এমএ) মাদরাসায় সংঘর্ষ চলছে।
১২টার দিকে ওই কেন্দ্রে পৌঁছলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সোয়া ১১টার দিকে কেন্দ্রের বাইরে আখালিয়ার দিক থেকে কামরান সমর্থকরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে করতে কেন্দ্রের দিকে এগুতে থাকে। এ সময় উল্টো দিক থেকে ঘড়ি প্রতীকের সমর্থক ছাত্রশিবিরের লোকজনও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল ছোঁড়ে। এতে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবির এলাকা থেকে সরে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পরপরই আওয়ামী লীগ প্রার্থীর একদল সমর্থক কেন্দ্রে ঢুকে পড়ে। এ সময় পুলিশের সহযোগিতায় তারা কেন্দ্রের ভেতর থেকে সব ভোটারকে বের করে দেয়। কেন্দ্রের সব বুথ তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। ওই কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, দোতলা ও তিনতলার সব ক’টি বুথ দখলে। বুথের বাইরে একদলের জটলা, ভেতরে আরেকদল জাল ভোটের মহোৎসব চালাচ্ছে। এ সময় জটলা ঠেলে ছবি তুলতে গেলে নয়া দিগন্তের ফটো সাংবাদিক বাপ্পির ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয় বুথের সামনে অবস্থান করা পুলিশের এসআই রহমাতুল্লাহ মিয়া। পরে তোলা ছবিটি ডিলিট করে তার ক্যামেরা ফেরত দেন তিনি। ধাক্কা দিয়ে সাংবাদিক বাপ্পিকে নিচ তলায় নামিয়ে দেন।
শুধু পুলিশ কর্মকর্তা রহমাতুল্লাহই নন, বেশির ভাগ পুলিশ সদস্যই ক্যামেরা তাক করা মাত্রই সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন। পরে আবারো জাল ভোটের মহোৎসব দেখতে ভবনের তিনতলায় ওঠে ছবি তোলার চেষ্টা করলে এই প্রতিবেদকের মোবাইল ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে পুলিশ ও নৌকার সমর্থকরা। ছবি না ওঠানোর শর্তে সেখানে অবস্থান করলে দেখা যায়, ভেতরে একদল ব্যালটে সিল মারছে, আর দরজা বন্ধ করে পাহারায় আছে সুঠামদেহি এক যুবক। পুলিশ সেখানে ভোটারদের যেতে বাধা দিচ্ছেন। বিশেষ করে এসআই রহমাতুল্লাহ ও কয়েকজন কনস্টেবল এ ব্যাপারে অতি উৎসাহী ভূমিকা পালন করছিলেন। সাংবাদিকরা নির্বাক দর্শক হয়ে জাল ভোটের মহোৎসব চেয়ে চেয়ে দেখেন। আধাঘণ্টা পর নিচ তলার একটি বুথে এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এক যুবক জাল ভোটের ব্যালট সাংবাদিকদের দেখাতে উদ্যত হন। এ সময় নৌকার সমর্থক ও পুলিশ গিয়ে তাকে রুমে আটকে রাখে। পুলিশ ওই রুমে ঢুকে তাকে বেদম মারধর করে। পরে তাকে পুলিশি ভ্যানে তুলে দেয়া হয়। এরও আধাঘণ্টা পর জালভোট দিয়ে দলে দলে লোকজন নিচে নামে। এ সময় আরেক যুবক জাল ভোট দেয়ার কথা সাংবাদিকদের জানালে পুলিশ তাকে বেদম মারধর করে। ওই ঘটনার ভিডিও ধারণ করায় এই প্রতিবেদকের মোবাইল আরেক দফা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। ঘটনার শুরুতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সিলেটের এক স্থানীয় সাংবাদিক জানান, ঘটনা শুরুর কিছুক্ষণ পর এরশাদুল হক ও আশিক নামে দুই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনার প্যানিক ছড়াচ্ছেন।’ ঘটনার পর থেকে ওই কেন্দ্রে আর কোনো সাধারণ ভোটারকে প্রবেশ করতে দেয়নি পুলিশ। অনেকে ভোট দিতে গেলে জানানো হয়, ব্যালট পেপার শেষ!
বেলা দুইটার আগে-পরে বিভিন্ন কেন্দ্র দখলের খবর আসতে থাকে। সুবিদবাজার এলাকার ব্লু-বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কোনো ভোটারকে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। ওই কেন্দ্রের ভেতরে তখনো জাল ভোট চলছিল। এ সময় ছবি তুলতে গেলে আবারো সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ। ঘণ্টাখানেক পরে সাধারণ ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেয় পুলিশ। তবে আইডি কার্ড দেখিয়ে। অনেকে ভোটার নাম্বার বললেও কার্ড দেখাতে না পারায় কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হয়নি। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. নাবিল আহমেদ অভিযোগ করেন, তাকে একঘণ্টা ধরে কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। এ সময় ওই প্রতিষ্ঠানের মহিলা ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনরত পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, দু’জন করে ভোটার ভেতরে ঢুকবে। তারা ভোট দিয়ে বাইরে বের হয়ে গেলে পরবর্তী দু’জন ঢুকবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুপুর একটা থেকে দুইটা পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার ভোট কেন্দ্রে পুলিশ সাধারণ ভোটারদের প্রবেশে বাধা দেয়। ওই সময়ই কেন্দ্র দখল করে জালভোটের মহোৎসব চলে। এদিকে এবারের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পরিবেশ দেখে নগরবাসী বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাদের ভাষ্য, অতীতে সিলেটে এমন ভোট কেউ দেখেনি। এতে ভোটারদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই ভোট সিলেটের ঐতিহ্য ‘সম্প্রীতি’কে নষ্ট করে দিয়েছে।

Friday, July 27, 2018

এমন ভোট সিলেট আগে দেখেনি by রোকনুজ্জামান পিয়াস

সিটি নির্বাচনে এবার এমন অনেক কিছুই ঘটছে, যা সিলেটের মানুষ আগে কখনো দেখেনি। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ধরপাকড়, তল্লাশি, হুমকি-ধমকি, হামলা-মামলা এ শহরে এই প্রথম। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের ধরনেও রয়েছে নতুনত্ব। স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, জোট রাজনীতিতে এটি নতুন মেরুকরণ। সম্প্রীতির শহর সিলেটবাসীর কাছে নির্বাচন পূর্ববর্তী এ চিত্র একবারেই অচেনা। যুগযুগ ধরে লালিত ঐতিহ্যে এবার চিড় ধরেছে। তাদের মতে, আপাত: দৃষ্টিতে পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, এর রেশ নির্বাচনের পরেও প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রচারণার ইতিহাস বলে, সব সময় সরকারবিরোধী পক্ষই নির্বাচন বানচালের অভিযোগ আনে। কিন্তু সিলেটে এক্ষেত্রেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আওয়ামী লীগ প্রার্থী বদর উদ্দিন কামরান নিজেই নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনছেন। এজন্য তিনি তার প্রতিপক্ষের ওপর দায়ভার চাপাচ্ছেন। তবে নির্বাচনী মাঠের এসব নেতিবাচক কার্যক্রমের পাশাপাশি কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে এবার।
প্রথমবারেরমতো বর্ষা মৌসুমে কাদা-পানি মাড়ানো ছাড়াই নির্বিঘ্নে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। ভোটাররা যানজটের ভোগান্তি থেকেও কিছুটা মুক্তি পেয়েছেন। গত নির্বাচনে প্রার্থীদের ইশতেহারে শুধু পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছিলো। কিন্তু এবার পরিকল্পনার পাশাপাশি সাবেক মেয়ররা অতীতে নগরীর উন্নয়নে তাদের গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রমের কথাও তুলে ধরেছেন। ভোট ভাগাভাগিতেও নতুন মাত্রা পেয়েছে এবারের সিলেট সিটি করপোরেশ নির্বাচনে। এবারই প্রথম মেয়র পদে সর্বোচ্চ সংখ্যক ৭ জন মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছেন, যদিও বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী বদরুজ্জামান সেলিম পরবর্তীতে দলীয় প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে মাঠ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
২০০১ সালের ৩১শে জুলাই সিলেট পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা হয়। এরপর থেকে এ মহানগরীর নগরপিতার আসনে বসেছেন দু’জন। একজন আওয়ামী লীগের বদর উদ্দিন কামরান, অপরজন বিএনপি’র আরিফুল হক চৌধুরী। এর মধ্যে কামরান ছিলেন ২ মেয়াদে টানা ১০ বছর। এরপর ২০১৩ সালে নগরের দায়িত্ব নেন আরিফুল হক চৌধুরী। এবার চতুর্থবারের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এ সিটিতে। দেশের অন্যান্য সিটির মতো এখানেও দলীয় প্রতীকে প্রথম মেয়র নির্বাচন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ছোটখাটো দু’-একটি অভিযোগ ছাড়া পূর্বের তিনটি নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ছিলো। নগরবাসী ও প্রার্থী নিজেরাও সে কথা স্বীকার করছেন। গণসংযোগে বারবার তারা উল্লেখও করছেন বিষয়টি। বলছেন, সিলেট সম্প্রীতির শহর। শান্তিপ্রিয় মানুষের বসবাস। রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে মানুষ এ ঐতিহ্যকে লালন করেছে। কিন্তু এবার নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই সেই সম্প্রীতি নষ্ট হচ্ছে। এ অভিযোগ প্রায় প্রত্যেক প্রার্থীর। বিশেষ করে, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থী আওয়ামী লীগের বদর উদ্দিন কামরান ও বিএনপি’র আরিফুল হক চৌধুরী একে-অপরের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগে লিপ্ত।
প্রার্থীদের এসব অভিযোগ ছাড়াও মাঠ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সিলেটে এবার এমন কিছু ঘটনা ঘটছে যা এ সিটির মানুষের কাছে একেবারেই নতুন। ইতিমধ্যে বেশকিছু ঘটনায় মানুষ বিস্মিত। প্রতিদিনই ঘটে যাওয়া এসব নেতিবাচক ঘটনায় নগরবাসী তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হারানোর আশঙ্কা করছেন।
বুধবারও সিলেটে ককটেল হামলায় আহত হয়েছেন পুলিশের এক উপ-পরিদর্শক (এসআই)। আহত এসআই রায়হান আহমদ দক্ষিণ সুরমার কদমতলী ফাঁড়িতে কর্মরত। ওইদিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে দক্ষিণ সুরমার হুমায়ুন রশীদ চত্বর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খায়রুল ফজল জানান, রাতে থানা থেকে মোটরসাইকেলযোগে কদমতলী ফাঁড়িতে যাচ্ছিলেন এসআই রায়হান। হুয়ায়ুন রশীদ চত্বর এলাকায় যাওয়ার পর একদল যুবক মিছিল সহকারে এসে তাকে লক্ষ্য করে কয়েকটি ককটেল নিক্ষেপ করে। ককটেল বিস্ফোরণে রায়হান আহত হন।
তাকে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এদিকে কারা বা কোন প্রার্থীর পক্ষে মিছিল নিয়ে এসে হামলা করা হয়েছে সে বিষয়টি নিশ্চিত হতে না পারলেও বিএনপি’র ৪৮ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে অবশ্য ঘটনার পরপরই কেউ কেউ মন্তব্য করেছিলো, বিরোধীপক্ষের বিরুদ্ধে নতুন মামলা সাজাতে এ ঘটনা। গত ২৪শে জুলাই ভোররাতে পুলিশ আটক করে বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হকের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ও ঘনিষ্ঠজন জুরেজ আবদুল্লাহ গুলজারকে।
তাকে আগের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২২শে জুলাই আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী কামরানের একটি নির্বাচনী ক্যাম্পে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায়ও অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। সোমবার ভোররাতে আরিফের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব কেন্দ্রীয় বিএনপি’র ক্ষদ্র ঋণ বিষয়ক সহ-সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাককে গ্রেপ্তারে তার বাসায় অভিযান চালানো হয়। তাকে না পেয়ে তার ছেলে রুম্মান রাজ্জাককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিএনপি’র দাবি, তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। একই রাতে সিলেট ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সাঈদ আহমদ, ছাত্রদল নেতা এনামুল হক ও জুনেল আহমদকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এর আগে ধানের শীষ প্রতীকের কর্মী বাদল, রাসেল, সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ১৯শে জুলাই এক সংবাদ সম্মেলন থেকে বের হয়ে আসার পর পুলিশ কেন্দ্রীয় বিএনপি’র নেতৃবৃন্দ ও  মেয়র প্রার্থী আরিফুল হকের গাড়িতে তল্লাশি করে। দুই কর্মীকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ২১শে জুলাইয়ে সিলেট পুলিশের উপ-কশিনার (দক্ষিণ) এর কার্যালয়ের সামনে অবস্থানের জের ধরে শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ।
১৮ই জুলাই বিকাল ৪টার দিকে নগরের মাছিমপুর এলাকায় কাউন্সিলর প্রার্থী মোস্তাক আহমদ ও ফারুক আহমদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে একজন আহত হয়। এলাকাবাসী জানায়, মারামারি, ভাঙচুর ছাড়াও ওই সময় তারা বন্দুকের গুলির শব্দ শোনেন। এদিকে গত নির্বাচনে বিএনপি’র সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচন করলেও এবার পৃথকভাবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে জামায়াত। সিলেটে এটাও জোট রাজনীতির নতুন মেরুকরণ। এসব ঘটনার পাশাপাশি এবার নগরীতে উন্নয়নের ছোঁয়াও অনেকটা নতুনরূপে ধরা দিয়েছে। নির্বাচনের সামনে সে বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। নগরবাসীর দীর্ঘদিনের ভোগান্তি জলাবদ্ধতা অনেকটা নিরসন হয়েছে।
অপ্রীতিকর ঘটনার প্রেক্ষিতে সিলেট আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, বিএনপি ও জামায়াতের কাজ হচ্ছে আগুন দেয়া, বোমা নিক্ষেপ করা। তারা এই সংস্কৃতি থেকে এখনো বের হতে পারেনি। তারা শুরু থেকেই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এ ধরনের ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। এদিকে পুলিশের ওপর ককটেল নিক্ষেপের ঘটনায় হতবাক হয়েছেন বিএনপি’র মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি গতকাল নগরীর শাহী ঈদগাহ্‌ এলাকায় গণসংযোগকালে বলেন- কারা এই ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে সেটি খুঁজে বের করা দরকার।
এসব ঘটনায় অযথা কাউকে হয়রানি করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় দক্ষিণ সুরমা থানার ওসি খায়রুল ফজল মানবজমিনকে জানিয়েছেন- পুলিশ হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চালাচ্ছে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে কারণে ওই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে জানান তিনি। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার পরিতোষ ঘোষ জানিয়েছেন, পুলিশ কাউকে হয়রানি করছে না। যারা ঘটনা ঘটাচ্ছে, পুলিশ আইন অনুসারে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। সিলেট সুজন সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আগে থেকেই যদি নির্বাচন কমিশন কঠোর অবস্থানে থাকতো, তাহলে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতো না।

Friday, June 15, 2018

জর্ডানফেরত এক নারীর কান্না: গর্ভের সন্তানটি কী পরিচয়ে বাঁচবে by রোকনুজ্জামান পিয়াস

ভ্যানচালক পিতা বাজার-ঘাটে যেতে পারেন না। তার ভ্যানেও কেউ উঠতে চায় না। মানুষ তাকে এড়িয়ে চলে। বাড়িতে মাকেও গালমন্দ শুনতে হয়। কথায় কথায় পাড়া-প্রতিবেশীর রোষানলে পড়েন তিনি। সমাজে এখন তারা একঘরে। কেউ মেশে না, কথা বলে না, কোনো ধরনের লেনদেন করতে চায় না তাদের সঙ্গে। এই অবস্থায় পৃথিবীর আলো-বাতাস তাদের কাছে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। কারণ, তাদের অবিবাহিত মেয়েটি সন্তানসম্ভবা। ৮ মাসের গর্ভবতী। মেয়েটি জর্ডানে গিয়েছিলেন বাবার সংসারের সচ্ছলতা আনতে। কিন্তু সেখানে একটি চক্রের হাতে পড়ে দীর্ঘদিন ধরে যৌন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। যার ফলশ্রুতিতে এসেছে তার গর্ভের এই সন্তান। এদিকে সন্তান প্রসবের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ছে পরিবারের সদস্যদের। এই সন্তান নিয়ে এখন তিনি  কোথায় যাবেন, কোন পরিচয়ে বেড়ে ওঠবে সন্তান? এ ভাবনা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। রোববার রাতে রাজধানীর আশকোনায় অবস্থিত ব্র্যাক লার্নি সেন্টারে কথা হয় মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার এ হতদরিদ্র পিতার এই হতভাগা মেয়ের সঙ্গে। কথা বলতে বলতে মাঝে মধ্যেই খেই হারিয়ে ফেলছিলেন এই নারী। বারবারই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলেন। অন্তঃসত্ত্বা জর্ডানফেরত মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি ২০১৪ সালের শুরুর দিকে জর্ডান গিয়েছিলেন গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে। সেদেশে পৌঁছানোর পর তাকে একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ দেয়া হয়। মাসিক বেতন নির্ধারিত হয় ১৫ হাজার টাকা। মালিক ভালো হলেও তার ছেলে প্রায়ই তাকে নির্যাতন করতো। মারধর করতো। এই নির্যাতন থেকে রেহাই পেতে একদিন তিনি ওই বাসা থেকে পালিয়ে যান। এরপর আশ্রয় নেন পূর্বপরিচিত মানিকগঞ্জেরই আরেক মেয়ে সোনিয়া খাতুনের কাছে। সে তাকে কাজ দেয়ার কথা বলে নিয়ে যায় তার বাড়িতে। নির্যাতিত মেয়েটি সেখানে গিয়ে দেখেন পাঁচ তলা বাড়ির পুরোটাই ভাড়া নিয়েছে সোনিয়া। ওই বাসাতেই প্রায় অর্ধশত মেয়ে। তিনি এত মেয়ে একসঙ্গে থাকার কারণ জানতে চান। সোনিয়া তাকে জানায়, এরা যে কাজ করে, তাকেও একই কাজ করতে হবে। তখন সেখান থেকে চলে যেতে চাইলে বাধা দেয়া হয়। ফলে বাধ্য হয়ে সেখানেই থেকে যান তিনি। এরপর চলতে থাকে তাকে দিয়ে অসামাজিক কাজ করানোর চেষ্টা। রাজি না হলে চলে মারধর, নির্যাতন। জোর করে মদ খাওয়ানো হয়। এরপর একের পর এক পুরুষ পাঠানো হয় তার কাছে। বলেন, আমার কাছে প্রতিদিনই ৪-৫ জন করে পুরুষ মানুষ পাঠাতো। কখনো কখনো একসঙ্গে দু’জন করে আসতো। তাদের কাছে অনুনয়-বিনয় করেও রেহাই পাইনি। উল্টো মারধর করতো, জোর করে মদ খাওয়াতো। এতে করে মাঝে মাঝে বমিও করে দিতাম। কিন্তু নিস্তার পেতাম না। নির্যাতিত মেয়েটি জানান, প্রতি বৃহস্পতিবারে রাতে তাদের ওপর নির্যাতন বেশি হতো। ওইদিন রাতে খদ্দেররা আসতো, সারারাত থাকতো, এরপর শুক্রবার সকালে চলে যেতো। যারা আসতো তারা কারা- জানতে চাইলে মেয়েটি জানান, বিভিন্ন দেশের লোক ছিল এরা। বিশেষ করে ইন্ডিয়ান, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কান। দু’একজন বাংলাদেশিও যেতো তাদের কাছে। ওইসব খদ্দেররা তাকে কোনো টাকা পয়সা দিতো কিনা জানতে চাইলে বলেন, কোনো টাকা-পয়সা দিতো না। সব দিতো সোনিয়ার কাছে। সেই তাদের কাছে লোক পাঠাতো। বাড়িতে কিছু টাকা-পয়সা পাঠানোর জন্য অনুনয় বিনয় করলেও সোনিয়া কোনো টাকা দেয়নি তাকে। বরং উল্টো মারধর করতো। সোনিয়া মদ খেয়ে এসে তার বুট জুতা এবং কোমরের বেল্ট দিয়ে বেধড়ক পেটাতো। তার ইন্ডিয়ান স্বামী নিষেধ করলেও শুনতো না। এভাবে এক বছর পর সেখান থেকে পালিয়ে যাই। পাশেই এক দোকানে একটি বাঙালি মেয়ের সঙ্গে দেখা হয়। সে তার মালিকের বাড়িতে নিয়ে যায়। তাকে অন্য একটি বাড়িতে কাজ দেয়। কিন্তু কিছুদিন পর সোনিয়া তাকে সেখান জোর করে নিয়ে আসে। ওই বাড়িতে কাজ করার কোনো কাগজপত্র না থাকায় বাড়ির মালিকও তাকে বাধা দিতে পারেনি। এরপর তাকে ফিরিয়ে এনে বেদম মারধর করেছে। মেয়েটির বাবার কাছে ফোন দিয়ে বলেছে, তার মেয়ে কোথা থেকে আকাম করে আসছে। তাই মারধর করেছি। মেয়েটি বলেন, সোনিয়া তার বাড়িতে প্রায়ই ফোন দিয়ে বলতো তাদের মেয়ে পতিতাবৃত্তি করে। এ কথা বলার কারণ, তার পিতা-মাতা যেন তাকে গ্রহণ না করে। কথা বলার একপর্যায়ে মেয়েটি কেঁদে ওঠেন। বলেন, আমার প্রতিদিনই খুব কষ্ট হতো। বাধা দিলে আরো বেশি নির্যাতন চালাতো। এভাবে একসময় তিনি এই কষ্টে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। এরমধ্যে সোনিয়া একবার দেশে আসে। ওই সময় চেষ্টা করেছিলো পালাতে কিন্তু বাড়ির মালিক তাকে পালাতে দেয়নি। সোনিয়ার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তার বাবা দেখা করে। মেয়েকে ফেরত পাঠাবে বলে কথা দেয়। কিন্তু জর্ডান ফিরে গিয়ে কথা রাখেনি সে। একইভাবে নির্যাতন চালায়। বরং মাত্রা বাড়তে থাকে। এক সময় অসুস্থ হয়ে পড়লে সোনিয়া তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এরপর দু’মাস কাটে জেলে। পরে তাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। নিপীড়িত মেয়েটি বলেন, গত ১৭ই এপ্রিল তাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তিনি ক্রমেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে আল্ট্রাসনোগ্রাম করালে চিকিৎসক জানান, তিনি ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এ সময় গর্ভপাত করানোরও উপায় ছিল না বলে জানান তিনি। বলেন, তিনি এখন ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ঘটনাটি ইতিমধ্যে এলাকায় জানাজানি হয়েছে। সমাজ তাদের একঘরে করে রেখেছে। তার পিতা ভ্যান চালান। তিনি বাজার-ঘাটে যেতে পারেন না। তার ভ্যানেও কেউ ওঠতে চায় না। কথা বলে না। পাড়া-প্রতিবেশীরা তাকে ও তার মাকে নানাভাবে গালমন্দ করে। তাদের বাড়িতে কেউ আসে না। তারা কোনো বাড়িতে যেতে পারেন না। তিনি বলেন, আব্বাও আমাকে খুব গালমন্দ করে। আমার খুব খারাপ লাগে। কথাটি বলতে বলতে, ডুকরে কেঁদে ওঠেন তিনি। পাড়ার মানুষ আরো খারাপ ভাষায় বলে। সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর কী করবেন জানতে চাইলে তিনি অসহায় দৃষ্টিতে তাকান। এরপর বলেন, আমি তো রাখতে পারবো না। তিনি জানান, তার নানী বলে, তোর তো বিয়ে হয়নি, তুই ক্যামনে রাখবি এই সন্তান? বলেন, কাউকে পালতে দেবো। কাকে পালতে দেবেন জানতে চাইলে বলেন, তাও জানি না। মেয়েটিকে বিশেষভাবে দেখাশুনা করছেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম। তাকে আর্থিকসহ নানা ধরনের সহযোগিতাও দিচ্ছে তারা। সোমবার বিদেশফেরত নির্যাতিত যে ২২ জন নারীকর্মীকে জনপ্রতি এক লাখ টাকার চেক ও দু’টি নতুন শাড়ি দেয়া হয় জর্ডানফেরত এই নারীও তাদের মধ্যে একজন।

Wednesday, May 30, 2018

মমতাজের ঠিকানা এখন মানসিক হাসপাতাল by রোকনুজ্জামান পিয়াস

সাতক্ষীরার প্রত্যন্ত এক গ্রামের মমতাজ খাতুন। স্বামী পরিত্যক্তা। পিতা-মাতার সংসারেও নিত্য অভাব-অনটন। সেই সংসারেই ঠাঁই হয়েছে তার। সঙ্গে একমাত্র ছেলে। ওই ছেলেই তার বেঁচে থাকার অবলম্বন। সে এখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। ভাগ্যবিড়ম্বিত এই নারী স্বপ্ন দেখতেন, ছেলে একদিন বড় হবে। উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হবে। ভালো চাকরি করবে। ছেলের ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে তাই সৌদি আরব পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্য প্রতারণা করেছে তার সঙ্গে। প্রথম ৬ মাস নিয়মিত বেতনের টাকা পাঠালেও গত তিন মাস ধরে খোঁজ ছিল না মমতাজের। পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন দুশ্চিন্তায়। অবশেষে খোঁজ মিলেছে তার। ফিরে এসেছেন সৌদি আরব থেকে। তবে এ এক অন্য মমতাজ। এখন তিনি মৃত্যু ভয়ে ভীত।
সারাক্ষণ বিড়বিড় করেন। এই অবস্থায় তার ঠিকানা হয়েছে রাজধানীর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। হাসপাতালের ৩০৮ নং কক্ষের ১ নং বেডে ভর্তি করিয়ে তাকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। গত শুক্রবার ভোর সাড়ে চারটায় দেশে ফেরার পর ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগিতায় তাকে হাসপাতালটিতে ভর্তি করা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সৌদি আরবে গৃহকর্মে যাওয়া নারীদের অধিকাংশই শারীরিক, মানসিক ও যৌনসহ নানা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। প্রতিদিনই একাধিক নারী দেশে ফিরে আসছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি সংখ্যক দেশে ফিরছেন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে। মমতাজ ছাড়াও বিভিন্ন সময় বেশ কয়েকজন নারী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দেশে ফিরেছেন। গত রোববার নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরা ৪০ নারীর মধ্যে মনোয়ারা নামে এক নারী মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। ফিরে আসা নারীরা জানিয়েছেন, দেশটিতে গৃহকর্তার নির্যাতনের শিকার হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারানো আরো বেশ কয়েকজন নারী দূতাবাসের সেফ হোমে অবস্থান করছেন।
জাতীয় মানসিক হাসপাতালে কথা হয় সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া গ্রামের রুদ্রপুর গ্রামের মমতাজের ভাই আফজালের সঙ্গে। তিনি জানান, তার বোন স্বামী পরিত্যক্তা। একমাত্র ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। ছেলের কথা চিন্তা করেই নয় মাস আগে পাশের গ্রামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে তিনি সৌদি গিয়েছিলেন। প্রথম ৬ মাস নিয়মিত বেতন পাঠাতেন। ওই সময় প্রতিমাসে একবার করে কথা হতো। গত তিনমাস ধরে তার বোন ফোন করেনি। বেতনও পাঠাননি। বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। পরে গত শুক্রবার সকালে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মকর্তা আল আমিন নয়ন তাকে ফোন করে জানান, তার বোন দেশে এসেছে। তাকে অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) অফিসে রাখা হয়েছে। আফজাল বলেন, ওই অফিসে গিয়ে বোনকে দেখে হতভম্ব হয়ে পড়ি। তিনি এক কাপড়ে সৌদি থেকে এসেছে। আফজাল বলেন, ওই সময় তার বোন বলছিলো, ‘আমার মা-বাবা, ভাই-বোনকে মেরে ফেলেছে। তাদের কেটে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রেখেছে।’ এছাড়া সবসময় সে বিড়বিড় করে কথা বলে। কার সঙ্গে সে কথা বলছে জানতে চাইলে বলে, ‘তোরা বুঝবি না। আমি যার সঙ্গে কথা বলছি সে ঠিকই বুঝছে।’ মাঝে মাঝে বলে, ‘ওরা আসছে, মেরে ফেলবে।’ তিনি বলেন, পরে নয়ন তার বোনকে মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যান। তার সহযোগিতায় এখানে ভর্তি করা হয়। জানা যায়, ৩২ বছর বয়সী মমতাজ খাতুন গত বছরের ২৯শে সেপ্টেম্বর রিক্রুটিং এজেন্সি বিএস ইন্টারন্যাশনাল-এর মাধ্যমে সৌদি আরব যান। শুক্রবার দেশে ফেরার পর বিমানবন্দরে তাকে উত্তেজিত অবস্থায় দেখা যায়।
এ সময় বিমানবন্দরের দায়িত্বে থাকা এক নারী পুলিশকে মারধর করেন তিনি। একপর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়েন। তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় বিমানবন্দরের কর্তব্যরত ডাক্তারের পরামর্শে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মকর্তারা তাকে জরুরিভিত্তিতে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নেন। হাসপাতালের চিকিৎসক পরীক্ষা করে তাকে মানসিক হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু অভিভাবক না থাকার কারণে সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রাতে ওকাপ-এর শেল্টারে পাঠানো হয়। রাতে মমতাজের মা ও ভাই পৌঁছার পর রোববার সকালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে গত তিন মাসে মমতাজের সঙ্গে কি ঘটনা ঘটেছিলো সে ব্যাপারে কিছুই জানা যায়নি। কীভাবে তিনি দূতাবাসের সেফ হোমে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাও অজানা রয়ে গেছে। মমতাজ সুস্থ না হলে হয়তো প্রকৃত ঘটনা রহস্যাবৃতই থেকে যাবে।
নরসিংদী জেলার শিবপুরের ঝর্ণা বেগম। গত ৮ মাস আগে তিনি সৌদি আরব গিয়েছিলেন। পরিবারের অমতেই তিনি দেশটিতে যান। সেখানে যাওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অবশেষে দেশে ফিরে আসলেই খোঁজ মেলে তার। গত ২২শে মার্চ বিমানবন্দরে পরিবারের সদস্যরা তাকে পায় মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায়। এরপর চলে চিকিৎসা। কিন্তু এখনো পুরোপুরি সুস্থ নন তিনি। তার ভাই লোকমান জানান, তার ওপর নানান ধরনের নির্যাতন চালানো হয়েছে। প্রায় ৬ মাস দেশটিতে অবস্থান করলেও কোনো বেতনাদি পাননি। তিনি বলেন, পুরোপুরি সুস্থ হতে এখনো সময় লাগবে। টাকা পয়সার অভাবে নিয়মিত চিকিৎসা করানো সম্ভব হয় না বলেও জানান তিনি। ঝর্ণার সঙ্গে একই দিন দেশে ফেরেন আরেক মানসিক ভারসাম্যহীন ফরিদপুরের আকলিমা। জানা গেছে, বিভিন্ন সময় দেশে ফিরে আসা মানসিক ভারসাম্যহীন এসব নারীদের কাউন্সেলিং করছে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।
এ ব্যাপারে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, এ পর্যন্ত কতজন সৌদি ফেরত নারী পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে যেসব নারীরা ফেরত আসছেন তারা সবাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তিনি বলেন, ফেরত আসা প্রত্যেক কর্মীই নানা ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। অনেককে ফ্যামিলি গ্রহণ করছে না, কেউ সমাজে স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারছে না। কেউ একঘরে হয়ে পড়েছেন। এতে করে তারা ভয়ঙ্করভাবে ট্রমাটাইজ হয়ে পড়ছে। সেই অর্থে প্রত্যেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তিনি আরো বলেন, এসব মানসিক বিপর্যস্ত মানুষের জন্য প্রথম দরকার কাউন্সেলিং। তাদের সংস্থায় কাউন্সেলিং ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমান ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এ ধরনের ৬টি কেস তত্ত্বাবধান করছে। সংস্থা তাদের নিয়মিত কাউন্সেলিং দিয়ে আসছে।