Monday, July 4, 2016

অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতার অনুমিত ফলাফল এ হামলা -গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ

উগ্রপন্থা পর্যবেক্ষণ করেন, এমন অনেকের কাছে বাংলাদেশের ঢাকা হামলাটি ছিল এমন কিছু, যা পুরোপুরি আকাঙ্খিত ছিল। গত বছর ধরে, বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান সহিংসতা চাক্ষুষ করেছে। বিদেশী ও স্থানীয় Ñ যাদেরই উগ্রপন্থার শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেই চালানো হয়েছে হামলা। এদের মধ্যে আছে সেকুলার ব্লগার, মৌলবাদের সরব সমালোচক, ধর্মীয় সংখ্যালঘু যেমন হিন্দু ও খ্রিস্টান, পুলিশ কর্মকর্তা। এখন পর্যন্ত, সহিংসতা স্বল্পমাত্রার হামলার রূপ ধারণ করেছে। এসব হামলায় ছোট একদল জঙ্গি, এমনকি দুয়েকজন ছাপাতি বা অস্ত্রধারী জড়িত।
কিন্তু শুক্রবারের হামলা ছিল আরও উচ্চমাত্রার অপারেশন। প্রথমদিকের রিপোর্টে ইঙ্গিত রয়েছে, ৫ বন্দুকধারী, যাদের কাছে স্থানীয় পুলিশের অন্তত একটি হামলা ঠেকিয়ে দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ অটোমেটিক রাইফেল ও গ্রেনেড ছিল। অন্তত ১৮ মাস ধরে একটি বড় অপারেশন হতে পারে বলে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ ছিল পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। গত বছর ক’টনীতিক এলাকায় হামলা চালানোর জটিল একটি পরিকল্পনা চলার ইঙ্গিত পাওয়ার পর আরও বেশি সতর্ক হয়ে উঠে সবাই। জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলোর ওপরও আরও কড়া পদক্ষেপ নিতে ঢাকার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ বাড়তে থাকে।
কিন্তু তা আর কাজে দেয়নি। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার বরং এ পরিস্থিতির রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার দিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। বিরোধী দলের যা অবশিষ্ট আছে, তার ওপরই চলে দোষারোপ করেছে সরকার । নতুবা সোজাসাপ্টা আইএস বা আল কায়দার সঙ্গে জড়িত কোন জঙ্গি নেটওয়ার্কের উপস্থিতি অস্বীকার করেছে। অথচ, একের পর এক হত্যাকান্ডের দায় নিয়েছে এ সংগঠন দু’টি।
স্থানীয় ব্লগার ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা উৎসাহিত বা পৃষ্ঠপোষকতা করেছে এমন চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযানের বদলে সরকার বেশ ভালোই আপোষে এসেছে রক্ষণশীলদের সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রী বরং বলেছেন যারা ধর্মীয় সংবেদনশীলতার অবমাননা করেছেন তারাও তাদের পরিণতির জন্য কিছুটা দায়ী। পুলিশ সুরক্ষা যেসব ব্লগার চেয়েছে, তারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন।
তাহলে, এসব হামলার জন্য কারা দায়ী হতে পারে? শুক্রবার রাতে ইসলামিক স্টেট এ হামলার দায় স্বীকার করে তাদের আমাক বার্তাসংস্থার মাধ্যমে। কিন্তু সংস্থাটির সংশ্লিষ্টতা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। কার্যক্রম বিস্তারের সম্ভাব্য উর্বরভ’মি হিসেবে আল কায়দা ও আইএস Ñ উভয়েই বাংলাদেশকে বিবেচনা করছে। তাই তাদের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বীতা এখানে মূল চাবিকাঠি। নিজেদের প্রোপাগান্ডায় বাংলাদেশের কথা প্রতিনিয়ত উল্লেখ করেছে আইএস। অপরদিকে বাংলাদেশ নিয়ে পুরো একটি ভিডিও ক্লিপই বানিয়েছে আল কায়দা। দেশের মুসলমানদের প্রতি ওই ভিডিওতে আহবান জানানো হয়েছে ‘ধর্মত্যাগী’ শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে।
কিন্তু বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যে আইএস’র কর্মকান্ডের মূলকেন্দ্র থেকে অনেকটা দূরে। দক্ষিণ এশিয়ায় এ সংগঠনের কখনই শক্ত অবস্থান ছিল না। অপরদিকে আল কায়দা পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৮ সালে। ১৯৯৬ সালের পর এ অঞ্চলে সংগঠনটির স্থায়ী অবস্থান রয়েছে। এ অঞ্চলকে নিজেদের কৌশল ও অস্তিত্বের মূলকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করে আল কায়দা। ২০১৪ সালে, আল কায়দার নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরি আল কায়দা ইন সাউথ এশিয়া (একিউএসএ) নামে নতুন সহযোগী গোষ্ঠী সৃষ্টির ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, আফগানিস্তান থেকে তাদের অপারেশন বাংলাদেশে বিস্তৃত হয়েছে। এখন পর্যন্ত একিউএসএ কোন বড় ধরণের কিছু করতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এটাও সম্ভব যে, ঢাকার অভিযানই হতে পারে তাদের প্রথম চেষ্টা।
বাংলাদেশ কি পালটা জবাব দিতে পারবে? স্থিতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে কাজ করা বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোতে যথেষ্ট মার্কিন ও বৃটিশ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বিতর্কিত র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) অনেক সাহায্যপুষ্ট। তবে সংস্থাটির বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘণের অভিযোগ ব্যাপক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে সহিংসতা গণমাধ্যমে কিছু আগ্রহ জন্মিয়েছে বটে। কিন্তু গোটা দুনিয়ার নীতিনির্ধারকরা এদিকে নজরই দেননি। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ এশিয়ার মাঝে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত বাংলাদেশ কখনই ওয়াশিংটন ও লন্ডনের অগ্রাধিকার ছিল না। অর্থনীতির ওপর নজর আছে কিছুটা, যা এখন তুলনামূলকভাবে ভালো। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক বিরোধী, বহুত্ববাদ ও সহনশীল ঐতিজ্যের জন্য ক্রমেই সঙ্কুচিত হতে থাকা পরিবেশের দিকে মনোযোগ খুবই কম।
কিন্তু এ হামলার দরুন এসবের ইতি ঘটবে। এ হামলার পর দুনিয়ার অন্যতম বৃহৎ মুসলিম দেশটিতে সন্ত্রাসবাদের হুমকি উপেক্ষা করাটা ঢাকার কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

কি ঘটেছিল হলি আর্টিজানে

হলি আর্টিজান রেস্তরাঁর রন্ধনশিল্পী (কুক)  হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ করলেন ওয়াশরুমে। হামলাকারীদের আগ্রাসন থেকে রক্ষা পেতে তিনি এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। ততক্ষণে তিনি হত্যাকাণ্ডের কারণ অনুধাবন করতে পেরেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন রেস্তরাঁর  ভেতরের মানুষগুলোকে বাছাই করা হয়ে গেছে বা হচ্ছে।
একজন অস্ত্রধারী চিৎকার করে বললো, বাঙালিরা বেরিয়ে আসুন। এ কথা শুনে কুক সুমীর বাড়ৈ ও অন্য আট জন যখন কম্পিত হয়ে বাথরুমের দরজা খুললেন তারা  দেখতে পেলেন দুজন যুবক। তারা ক্লিন সেভ করা। পরনে জিন্স ও টি-শার্ট।
তাদের একজন বললো, আপনাদের অতো দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আমরা বাঙালিদের হত্যা করবো না। আমরা শুধু বিদেশিদের হত্যা করবো। এ সময় সুমীর বাড়ৈয়ের দৃষ্টি গিয়ে পড়ে রেস্তরাঁর মেঝেতে। তিনি দেখতে পান ৬ থেকে ৭টি মৃতদেহ পড়ে আছে। হয়তো তাদেরকে প্রথমে গুলি করা হয়েছে। তারপর চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহতরা সবাই বিদেশি বলে মনে হয় তার।
সুমীর বাড়ৈ বলেছেন, অস্ত্রধারীরা তাদের কর্মকাণ্ড সামাজিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ুক, ভীষণভাবে এমনটা চাইছিল বলে মনে হয় তার। রেস্তরাঁর অতিথিদের হত্যার পর তারা সেখানকার স্টাফদের নির্দেশ দেয় ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক। এরপর তারা কাস্টমারদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে নিহতদের মৃতদেহের ছবি পোস্ট করে ইন্টারনেটে।
শুক্রবার রাতে ঢাকার কূটনৈতিক এলাকায় হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলা হয়। হামলাকারীরা কমপক্ষে ২০ জিম্মি ও দুজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইসলামপন্থি উগ্রপন্থিদের সক্ষমতার চিহ্ন রেখে গেছে। এ যাবৎ তারা হত্যাকাণ্ডে সফল হয়েছে। তারা বেশির ভাগই ইসলামের সমালোচক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হত্যা করেছে।
পুলিশ বলেছে, শুক্রবারের হামলায় নিহতদের মধ্যে ৯ জন ইতালির নাগরিক, ৭ জন জাপানি,  ২ জন বাংলাদেশি, একজন মার্কিনি ও একজন ভারতীয়।
এ হামলা আরো বলে দেয় যে, বাংলাদেশের উগ্রপন্থিরা তাদের নেটওয়ার্ক আন্তর্জাতিকীকরণ ঘটাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইসলামিক স্টেটের বিস্তার কমানোর চেষ্টা করছে। সেক্ষেত্রে এ ঘটনা একটি মূল উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের বেশির ভাগই সুন্নি মুসলিম। এর মধ্যে রয়েছে ২৫ বছর বয়সী উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুবক। এটাই ইসলামিক স্টেটের সদস্য সংগ্রহের একটি মূল্যবান ক্ষেত্র। উল্লেখ্য, ইসলামিক স্টেট এখন ইরাক ও সিরিয়ায় তাদের মূল উৎপত্তিস্থলে তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। এ গ্রুপটি বিশ্বের যেকোন স্থানে তাদের মিশন চালাতে পারে বলে তাদের ওপর নজর রাখছেন পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। ইসলামিক স্টেট এখন হামলা চালাচ্ছে বেসামরিক টার্গেটে। তারা এর আগে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। তা থেকে তাদের কর্মকাণ্ড পরিবর্তিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের রিসার্চ ফেলো শাফকাত মুনীর বলেছেন, সার্বিক হুমকিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে আমাদেরকে। এ বিষয়ে সতর্কবার্তা ছিল, লক্ষণ ছিল, সবকিছুই ছিল। কিন্তু এত ব্যাপক আকারে এই নৃশংসতা ঘটবে এমনটা আমরা আন্দাজ করতে পারি নি।
হামলার আগে রেস্তরাঁর ভেতরে তখন অলস সময় ছিল। ১৮ জনকে ভেতরে চেয়ারে বসানো হলো। ব্রেড ও পেস্তা পরিবেশন করা হলো। একটি টেবিলে একসঙ্গে বসলেন ইতালির ৭ জন বন্ধু। দ্বিতীয় আরেকটিতে বসলেন তিন বা চারজন। তারা আর্জেন্টিনার শেফ ডিয়েগো রোসিনিকে ডাকলেন। কেউ একজন ইতালিয়ান পেস্তা ডিশের নির্দেশ দিলেন। রোসিনি কিচেনে ঢুকলেন। তিনি এতগুলো মানুষের জন্য খাবার তৈরি করা শুরু করলেন। হতে পারে তখন রাত প্রায় ৯টা ৩০ মিনিট।
কিন্তু রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে অর্ধ ডজন যুবক  ভেতরে প্রবেশ করে। তাদের ব্যাগে ভারী অস্ত্র। এর মধ্যে ছিল গ্রেনেড ও লম্বা সব রাইফেল। তা দেখে রোসিনি পালিয়ে গিয়ে ছাদে আশ্রয় নিলেন। তিনি আর্তনাদ ও  ‘আল্লাহু আকবর’ চিৎকার শুনতে পেলেন।
রোসিনি আর্জেন্টিনার ক্যাবল নিউজ স্টেশন চ্যানেল ৫ নোটিসিয়াসকে বলেছেন, ভেতরে অনেক বিদেশি ছিলেন। হামলাকারীরা মূলত তাদেরকেই খুঁজছিল। তারা বিদেশিদের হত্যা করলেও রেস্তরাঁর কর্মকর্তা- কর্মচারী ও বাংলাদেশি অন্যদের প্রতি ভদ্রতা ও বিনয় প্রদর্শন করেছে। এ কথা বলেছেন বাড়ৈ।
রেস্তরাঁর স্টাফদের তারা আস্থায় নিয়েছিল। তবে বিদেশিদের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ ছিল যে, তারা স্বল্প পোশাক পরে ও মদ পান করে। এটা ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ। একজন জঙ্গি বলেছিল, বিদেশিদের লাইফস্টাইল একই কাজ করতে স্থানীয় মানুষদের উৎসাহিত করছে।
এক পর্যায়ে হামলাকারীরা রেস্তরাঁর স্টাফদের কফি ও চা বানাতে বলে। বাকি জিম্মিদের তা পরিবেশন করতে বলে। রাত ৩টা ৩০ মিনিটের সময় মুসলিমরা যখন সেহরি খান তখন হামলাকারীরা কিচেনের স্টাফদের নির্দেশ দেয় বিভিন্ন রকম মাছ ও চিংড়ির ডিশ তৈরি করে তা পরিবেশন করতে। হামলাকারীরা ভালো বাংলা ও কিছু ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলতে থাকে বিদেশিদের সঙ্গে।
সুমীর বাড়ৈ বলেছেন, হামলাকারীরা সবাই ছিল স্মার্ট ও হ্যান্ডসাম। যদি আপনি তাদের দিকে তাকান তাহলে কেউই বিশ্বাস করতে পারবে না যে, তারা এ কাজ করতে পারে। ভোরের আগে আগে হামলাকারীরা ধর্মীয় বক্তব্য দিতে থাকে জিম্মিদের উদ্দেশে। কিচেনের স্টাফদের এ সময় তারা নিয়মিত নামাজ ও পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের নির্দেশনা দেয়।
একেবারে ভোরে অস্ত্রধারীরা হিজাব পরা একদল নারীকে মুক্তি দেয়। ফারাজ হোসেন নামে এক বাংলাদেশি যুবককেও চলে যাওয়ার অনুমতি দেয়। এ কথা বলেছেন, ফারাজ হোসেনের ভাতিজা হিশাম হোসেন। ফারাজ হোসেন এমোরি ইউনিভার্সিটির ছাত্র। তার সঙ্গে ছিলেন পশ্চিমা পোশাক পরা দুজন নারী। এক পর্যায়ে অস্ত্রধারীরা ওই দু’নারীকে জিজ্ঞেস করে তারা কোথা থেকে এসেছেন। জবাবে তারা জানান, একজন ভারত ও একজন যুক্তরাষ্ট্রের। ফারাজ হোসেনের আত্মীয়রা বলেছেন, অস্ত্রধারীরা যখন ওই দু’নারীকে মুক্তি দিতে অস্বীকৃতি জানায় তখন ফারাজ হোসেনও তাদেরকে ভেতরে রেখে বেরিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানান। শনিবার সকালে যাদের মৃতদেহ পাওয়া যায় তার মধ্যে ছিল ফারাজের দেহ।
অস্ত্রধারীরা দৃশ্যপটে আসার কয়েক ঘণ্টা পরে কয়েক শ’ পুলিশ কর্মকর্তা ওই রেস্তরাঁর দেয়ালের বাইরে ব্যাপকহারে জমায়েত হন। তারা ঘেরাও করার চেষ্টা করলে গ্রেনেড ছুড়ে তা প্রতিহত করা হয়। এতে দু’জন নিহত হন। আহত হন কমপক্ষে ২০ জন। ওদিকে রেস্তরাঁর ছাদে ছিলেন আর্জেন্টিনার শেফ রোসিনি। তিনি সেখান থেকে সামাজিক মিডিয়ায় তার অবস্থান জানাতে টেক্সট ম্যাসেজ পাঠাতে থাকেন। এতে তার অবস্থান জানান। পরে তিনি বলেছেন, ওই সময় রেস্তরাঁর ভেতরে পুলিশের প্রবেশ ছিল একেবারেই অসম্ভব। রেস্তরাঁটি একটি ছোট দুর্গে পরিণত হয়েছিল। পুলিশ তখন থাকে সেনাবাহিনীর সহায়তার অপেক্ষায়।
সিনিয়র এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, জিম্মিকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় পুলিশ। জিম্মিকারীরা কোনো দাবিই উত্থাপন করেনি।
ওদিকে ওয়াশরুম বা বাথরুমে বেদনা দীর্ঘায়িত হতে থাকে। সেখানে সুমীর বাড়ৈ ও অন্য আটজনকে তখনও তালাবদ্ধ করে রেখেছে অস্ত্রধারীরা। রাত ১টা ৪৪ মিনিটে সুমীর বাড়ৈ তার এক কাজিনকে একটি ম্যাসেজ পাঠান। এ সময় পুলিশ বেষ্টনীর বাইরে তার কাছ থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরে অবস্থান করছিলেন তার ওই কাজিন।
অভিযানে র‌্যাব যুক্ত হয়েছে। এ কথা জানিয়ে সুমীর বাড়ৈয়ের কাছে তার কাজিন ম্যাসেজ পাঠান ভেতরের পরিস্থিতি জানতে চেয়ে: রেস্তরাঁয় (বাথরুমের) বাইরের খবর কি এখন? তারা (নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা) এখনও কিছু করছে না। ফলে তোমরা শিকারে পরিণত হবে না।
সুমীর বাড়ৈ তার এক সহকর্মীর নাম জানান, যে কর্তৃপক্ষকে ওয়াশরুম দেখিয়ে দিতে পারবেন। এ নিয়ে যে ম্যাসেজ তিনি পাঠান তাতে লেখেন, আমরা এখানে। যদি সম্ভব হয় তাহলে টয়লেটের দেয়াল ভেঙে আমাদেরকে উদ্ধার করো।
ভোর যতই প্রস্ফুটিত হতে থাকে সুমীর বাড়ৈ ততই শঙ্কিত হয়ে ওঠেন ঘনকের মতো ৪ ফুট বাই চার ফুট পরিমাপের ওই টয়লেটের মানুষগুলোর পরিণতি নিয়ে। তিনি মনে করেন তারা দম বন্ধ হয়ে মারা যাবেন। এ সময় তিনি ম্যাসেজ পাঠান: দয়া করে যত তাড়াতাড়ি পারো টয়লেটে আসো। টয়লেটের  ভেতরকার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়।
এরপরই সুমীর বাড়ৈয়ের ওই কাজিন তার মোবাইল ফোনে কল দেন। কিন্তু আর কোনো উত্তর আসে না ভেতর থেকে। এ অবস্থায় রেস্তরাঁর বাইরের দেয়াল ঘেঁষে বসে পড়েন তিনি। কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ওদিকে খুব সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাসভবন থেকে সেনা অভিযানের অনুমতি দেন। তবে এ জন্য একটি কমান্ডো টিম আনার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তাদেরকে রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ১৫০ মাইল দূরের সিলেট থেকে সি-১৩০ এর মাধ্যমে নিয়ে আসার প্রয়োজন দেখা দেয়।
সূর্যোদয়ের অল্প পরেই ওই রেস্তরাঁর বাইরের বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নেন নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের সশস্ত্র সদস্যরা।
এ সময় সুমীর বাড়ৈ বলেছিলেন, জিম্মি দশার অবসান হচ্ছে এমন একটি ধারণা ছড়িয়ে পড়ে জিম্মিদের মধ্যে। দীর্ঘ সময় রেস্তরাঁর ভেতর থাকা অবস্থায় হামলাকারীরা এটা স্পষ্ট করেছে যে, তারা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চায়। সুমীর বাড়ৈই বলেছিলেন, হামলাকারীদের একজন ঠাণ্ডা মাথায় ছিল। সে চারদিকে পড়ে থাকা মৃতদেহ দেখিয়ে বলেছিল, তোমরা দেখতে পাচ্ছো আমরা কি করেছি। এখন একই ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছি আমরা।
সুমীর বাড়ৈ বলেছিলেন, সকাল ৭টা ৩০ মিনিটের দিকে হামলাকারীরা তাদের বলেছিল, আমরা চলে যাচ্ছি। দেখা হবে বেহেস্তে।
তারা দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তখনই কমান্ডোরা রেস্তরাঁয় অভিযান চালান।
জুলফিকার আলী মানিক, গীতা আনন্দ, ইলেন বেরি, নিউ ইয়র্ক টাইমস।

মুসলিম রাষ্ট্রে আইএসের সহিংসতার ধরন বদলেছে

প্রথম খুন হন এক জগার। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ঢাকার এক ছায়াঢাকা কূটনৈতিক মহল্লায় দৌড়াতে বেরিয়েছিলেন। তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। জানা যায়, তিনি ৫০ বছর বয়সী এক ইতালিয়ান সাহায্যকর্মী। পুলিশ জানায়, সাদা চামড়ার যেকোনো বিদেশিকে খুন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল হত্যাকারীদের। অক্টোবরে খুন হন একজন জাপানি। নভেম্বরে একজন ক্যাথলিক যাজককে আহত করা হয় মোটরসাইকেল থেকে গুলি ছুড়ে। সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) ইউরোপে তাদের সহযোগীদের পরামর্শ দেয় সেখানে ‘যে কেউ ও সকলকে’ হত্যা করতে। তবে বাংলাদেশে তাদের কৌশল অনেক নিয়ন্ত্রিত। গত নয় মাসে এখানে আইএস ১৯টি হামলার দাবি করেছে। এসব হামলার প্রায় সবাই ছিলেন হয় ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নয়তো বিদেশি। ধারালো অস্ত্রে কুপিয়ে হত্যার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন একজন হিন্দু ব্যক্তি, শিয়া ধর্মপ্রচারক, ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান হয়েছেন এমন ব্যক্তি। এর মধ্যে শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী হামলার ঘটনাও ঘটেছে। বেশ কয়েক বছর ধরে সিরিয়া ও ইরাকে আইএসআইএল গণহারে নরহত্যা চালিয়েছে। আর এসব হামলায় সংগঠনটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পশ্চিমা দেশগুলোকেও অনুপ্রাণিত করেছে—এর মধ্যে প্যারিস ও ব্রাসেলসে পরস্পরের মধ্যে সমন্বয় করে হামলা হয়েছে, ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে নাইট ক্লাবে গণহারে হয়েছে গুলি—সবগুলোতেই খুনিরা বাছবিচারহীন মানুষ খুন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে যে হামলার দাবি আইএস করেছে,
সেটার দিকে ভালো করে তাকালে দেখা যায়, এই জঙ্গিগোষ্ঠীটি অঞ্চলভেদে কৌশল বদল করছে। ভিন্ন এক গোষ্ঠীর মনোযোগ এখানে তাদের কাম্য। এটাও দেখা দরকার যে গোষ্ঠীটি গত সপ্তাহে তুরস্কের বিমানবন্দরসহ অন্যান্য বিস্ফোরণের দাবি করেনি। সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের পরিচালক রিটা কাটজ সম্প্রতি অনলাইনে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, ‘অনুগামী ব্যক্তিদের মধ্যে সমর্থন বজায় রাখার জন্য আইএসকে মুসলিম ও অমুসলিম দেশগুলোতে হামলার পরিকল্পনায় ভিন্ন ভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো পশ্চিমা দেশে আইএস গণহারে খুনকে উৎসাহিত করে। কিন্তু তুরস্কের মতো দেশে আইএসকে নিশ্চিত হতে হয় যেন কোনো মুসলিমকে হত্যা না করা হয়। অথবা তাদের অন্তত দেখাতে হয় যে তারা মুসলিমদের খুন করে না।’ কয়েক বছর আগে আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কে আল-কায়েদা থেকে আইএস যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন তাদের বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল সুন্নি মুসলমানদের হত্যা করা হবে কি হবে না—এই ইস্যু। গত সপ্তাহে বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। গত সপ্তাহে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে আত্মঘাতী বোমা হামলার পর ওই হামলার জন্য যখন আইএসকে দায়ী করা হচ্ছে, তখন আবু সুলায়মান আল-মুহাজির নামে সিরিয়ায় আল-কায়েদা শাখার একজন অস্ট্রেলিয়ান সদস্য টুইটারে একটি পোস্ট দেন। এতে বলা হয়, তুরস্কের মানুষ মুসলমান, তাদের রক্ত পবিত্র। সত্যিকারের মুজাহিদ তাদের জন্য জীবন দেবে, জীবন নেবে না। যেকোনো বোমা হামলা হলে যেখানে আইএস দ্রুত দায় স্বীকার করে, সেখানে ইস্তাম্বুল হামলা নিয়ে আইএসের আশ্চর্যজনক নীরবতা প্রমাণ করে,
মুসলিমপ্রধান দেশে সহিংস হামলার ক্ষেত্রে তাদের ভারসাম্য রাখতে হয়। রিটা কাটজ বলেন, মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে হামলার ক্ষেত্রে আইএস সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের চেয়ে সরকারি স্থাপনা ও ভিন্নধর্মাবলম্বীদের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ঠিক করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত মাসে জর্ডানের প্রথম বোমা হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল একটি মার্কিন-জর্ডানি সামরিক ঘাঁটি। মে মাসে সুন্নি–অধ্যুষিত সৌদি আরবের একটি শিয়া মসজিদে তারা বোমা হামলা চালায়। জানুয়ারিতে জাকার্তায় তারা স্থানীয় ব্যক্তিদের বদলে শুধু পর্যটকদের ওপর হামলা করে। বাস্তবে আল-কায়েদা ও আইএস উভয়েই তাদের হামলাগুলোতে বিপুলসংখ্যক মুসলমানকে হত্যা করেছে। কিন্তু তারা এ নিয়ে বিতর্ক বন্ধ করেনি। গুলশানের কূটনৈতিক এলাকার হলি আর্টিজান বেকারি রেস্তোরাঁয় আইএসের সর্বশেষ হামলার ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হামলাকারীদের লক্ষ্য অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট ছিল, যেটা আইএসের ক্ষেত্রে আগে বেশি দেখা যেত না। বাংলাদেশে বসবাসকারী প্রবাসীরা রেস্তোরাঁটি খুব পছন্দ করতেন, কারণ সেখানে আমেরিকান খাবার খাওয়া ও আরামে সময় কাটানো যেত। শনিবার আইএস হামলাকারীদের ছবি প্রকাশ করে। তাদের পরিচয় দেওয়া হয় ‘বাংলাদেশে বিভিন্ন শত্রুরাষ্ট্রের (ক্রুসেডার নেশন) মানুষদের আক্রমণকারী’ হিসেবে। এই অবস্থায় আইএসের এমন বক্তব্য স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে, তারা এই হত্যাকাণ্ডকে বিশেষভাবে ‘অমুসলিমদের’ হত্যা হিসেবে দেখাতে চাচ্ছে।
অনুবাদ: কুন্তল রায়।
রুকমিনি কালিমাচি: সাংবাদিক, নিউইয়র্ক টাইমস।

শুদ্ধাচার রমজানের ফলাফল

রমজান হচ্ছে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। তাই রমজান তওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে ক্ষমা পাওয়া ও নাজাত লাভের শ্রেষ্ঠ সময়। হাদিস শরিফে আছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: ‘যে ব্যক্তি ইমানের সহিত সওয়াবের নিয়তে রমজান মাসে রোজা রাখবে, তার অতীতের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি শরিফ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩১, হাদিস: ৩৭)। রমজান মাসের সওগাত লাভের জন্য তারাবির নামাজ। মহানবী রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: ‘যে ব্যক্তি ইমানের সহিত সওয়াবের উদ্দেশ্যে রমজান মাসে রাতে ইবাদত করবে ও তারাবির নামাজ পড়বে, তার অতীতের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি শরিফ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩০, হাদিস: ৩৬)। রমজান মাসে রয়েছে প্রভুর করুণার পরম পূর্ণতার রাত্রি লাইলাতুল কদর বা শবে কদর। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদতে রাত্র জাগরণ করবে, তার অতীতের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি শরিফ, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩০, হাদিস: ৩৪)।
রমজান মাসে আমরা কী পেলাম আর কী পেলাম না, এর মূল্যায়ন হবে রমজান মাস শেষে আমাদের আমল, আখলাক ও আচার-আচরণ দ্বারা। রমজানের যেসব অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য রয়েছে তার সবগুলোর সারকথা হলো শুদ্ধাচার। হাদিস শরিফে রয়েছে: ‘সব জিনিসের জাকাত আছে, শরীরের জাকাত রোজা।’ (বুখারি)। অর্থাৎ জাকাত প্রদানের মাধ্যমে যেমন সম্পদ পবিত্র হয়, তেমনি রোজা পালনের দ্বারা শরীর ও মন পবিত্র হয়। এই পবিত্রতা প্রমাণ হবে শুদ্ধাচারের মাধ্যমে। শুদ্ধাচার ইসলামের মূল শিক্ষা। ইমানের কালিমার নাম হলো ‘কালিমা তাইয়্যেবা’, যার অর্থ হলো পবিত্র বাণী ও পবিত্রকারী বাক্য। যে কালিমা বিশ্বাস করলে মানুষ কুফর ও শিরক থেকে পবিত্র হয়ে যায় এবং তার দেহ ও মন শুদ্ধাচারে ব্রতী হয়।
ঈদের রাতের ইবাদত ও চাঁদরাতের করণীয় আমল
পবিত্র রমজান মাসের শেষে সূর্যাস্তের পর পশ্চিমাকাশে নতুন চাঁদ দেখা গেলে একে আমরা ‘চাঁদরাত’ বলি। এর মাধ্যমে মূলত ঈদের সূচনা হয়। আরবি হিসাবে রাত আগে আসে বিধায় এটি ঈদের রাত। ঈদের রাতের ফজিলত অতুলনীয়। রমজানে আল্লাহ তাআলা প্রতিদিন আগের সব দিনের সমান লোককে ক্ষমা করেন। আর ঈদের রাতে পুরো রমজানব্যাপী যতসংখ্যক লোককে ক্ষমা করা হয়েছে, তার সমানসংখ্যক লোককে ক্ষমা করেন। তাই ঈদের রাতকে বেহুদা অযথা কাজে ব্যয় না করে, ইবাদত-বন্দেগিতে কাজে লাগানো দরকার। অনেকে দেখা যায়, পয়লা রমজান থেকে তারাবির নামাজসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঠিকমতো আদায় করেন; কিন্তু ঈদের চাঁদ দেখা গেলে সেদিন মাগরিব থেকেই নামাজ ছেড়ে দেন। মনে হয় যেন ইবাদতের ছুটি হয়ে গেছে; ঈদের চাঁদ বুঝি ইবাদতের ছুটির ঘণ্টা? অনেকেই রমজানে ধূমপান করা থেকে বিরত থাকেন; কিন্তু চাঁদরাত থেকে আবার তা শুরু করেন; মনে হয় নতুন চাঁদ যেন পাপের অনুমতি দেয়। অনেকে রমজান মাসের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত পালন করেন; কিন্তু চাঁদরাতেই সব ভুলে গিয়ে ফিরে যান পুরোনো চরিত্রে,
সাবেক চেহারায়; এটি আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছুই নয়। রমজানের প্রতিটি দিন তার আগের দিনের অপেক্ষা বেশি ফজিলতপূর্ণ। অর্থাৎ প্রথম থেকে শেষের দিকে ফজিলত ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে দেখা যায় এর বিপরীত। শুরু থেকে শেষের দিকে মুসল্লি দিন দিন কমতে থাকে। ২৭ রমজানে খতমে তারাবি শেষ হলে পরের তারাবিগুলোতে তেমন মুসল্লি দেখা যায় না। এটি আমাদের অজ্ঞানতার পরিচায়ক; কারণ পরের রাতগুলো ইবাদতের জন্য আগের রাতগুলোর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে ২৭ রমজানের পর তারাবির নামাজ ছেড়ে দেন, এটা মোটেও উচিত নয়। কেউ কেউ ঈদের প্রস্তুতিতে এতই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে রোজা রাখতে পারলেও ঠিকমতো জামাতে নামাজ আদায় করতে পারেন না। রমজানের শেষ দিকে এসে ঠিকমতো ইবাদত করতে পারেন না। কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যে, কেউ কেনাকাটায়, কেউ রান্নাবান্নায় মত্ত থাকেন; এটা মোটেই ঈদের প্রস্তুতি নয়। ঈদের প্রস্তুতি হলো: রমজানের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতসমূহ পালনপূর্বক ঈদের রাতের ও দিনের আমল ও ইবাদতের জন্য নিজেকে তৈরি করা।
মাসআলা
ঈদের দিনে সামর্থ্য থাকলে নতুন পোশাক পরা সুন্নত; অথবা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সাধ্যমতো সুন্দর কাপড় পরা সুন্নত। ঈদের রাতে সুরমা ব্যবহার করা সুন্নত। ঈদের রাতে ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকা সুন্নত। ঈদের দিনে সবার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করা ও সবার খোঁজখবর নেওয়া সুন্নত। কারও সঙ্গে দেখা হলে সালাম বিনিময়ের পর মুসাফাহা বা করমর্দন করা সুন্নত (পুরুষে পুরুষে ও নারীতে নারীতে)। দীর্ঘ সময় পর প্রিয় বা ঘনিষ্ঠ কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে মুআনাকা তথা কোলাকুলি করা সুন্নত (পুরুষে পুরুষে ও নারীতে নারীতে)। ঈদের দিনে ভিক্ষা করা হারাম; মসজিদে ভিক্ষা করা নাজায়েজ। (ইমদাদুল আকাম, মাজমুআ ফাতওয়া)।
মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি, সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।
smusmangonee@gmail.com

সিরিয়া যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সমন্বয় নয়

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, সিরিয়া ও অন্যান্য আঞ্চলিক যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর দেশ কখনোই সমন্বয় করবে না। গতকাল রোববার নিজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি বক্তব্যে খামেনি এ কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া নিজের বক্তব্যের একটি কপি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেন খামেনি। এতে তিনি বলেন, ‘আমরা এ ধরনের সমন্বয় চাই না।’ কারণ হলো তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য এই অঞ্চলে ইরানের উপস্থিতি বন্ধ করা।
ইসলামিক স্টেটসহ (আইএস) সশস্ত্র বিদ্রোহী ও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের যুদ্ধকে সমর্থন করে ইরান ও রাশিয়া। সিরিয়া ও ইরাকের জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বোমা হামলাসহ মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযানের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সমন্বয় তেহরান প্রত্যাখ্যান করে। এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি পুনরায় ব্যক্ত করেন খামেনি। তিনি বলেন, ইরানকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা
বন্ধে শক্তিধর পশ্চিমা রাষ্ট্রের সঙ্গে গত বছরের পরমাণু চুক্তি সত্ত্বেও ওয়াশিংটন আগ্রাসীভাবে কাজ করেই যাচ্ছে। আমেরিকানরা এখনো ইরানের বিরুদ্ধে বৈরিতায় জড়িত। জানুয়ারিতে পরমাণু চুক্তি কার্যকরের পর থেকে ইরান অভিযোগ করে আসছে যে তারা এর থেকে লাভবান হচ্ছে না। সেই সঙ্গে বিদ্যমান মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো এখনো তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করতে সংশয়ে আছে।

পাকিস্তানে আকস্মিক বন্যায় নিহত ৪৩

ভারী বর্ষণের ফলে পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় অন্তত ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির কর্মকর্তারা গতকাল রোববার জানান, দুর্গত এলাকায় হেলিকপ্টারযোগে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হচ্ছে। খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে রোববার গভীর রাতে বৃষ্টি শুরু হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় সীমান্তের চিত্রল জেলায়। এক রাতের টানা বৃষ্টিতে সেখানকার প্রত্যন্ত গ্রাম উরসুনে একটি মসজিদ, বহু বাড়িঘর এবং একটি সেনাশিবির তলিয়ে গেছে। স্থানীয় মেয়র মাগফিরাত শাহ বলেন, ওই গ্রামের ৪১ জন প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে অন্তত আটজন সেনাসদস্য বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রাদেশিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র লতিফুর রহমান বলেন, মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে আটজন নামাজ আদায় করছিলেন।
তখনই বানের তোড়ে ঘরটি ভেসে যায়। সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়েছে। দুর্গত মানুষের মধ্যে খাবার ও ওষুধ বিতরণ করা হচ্ছে। সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়, বন্যার পানিতে ৮২টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা ওসামা ওয়ারাইচ বলেন, আটজনের মরদেহ সীমান্তের ওপারে আফগান ভূখণ্ড থেকে উদ্ধার করা হয়। প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের কার্যালয় একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। বন্যায় মৃত ব্যক্তিদের পরিবার-পরিজনের উদ্দেশে তিনি শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন। এদিকে পৃথক ঘটনায় দুই চীনা প্রকৌশলী নিহত ও পাঁচ পাকিস্তানি শ্রমিক আহত হয়েছেন। তারবেলা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করার সময় ভারী বর্ষণের প্রভাবে তাঁদের ওপর একটি ছাদ ধসে পড়েছিল।